মন্ত্ৰার্থঃ– ১। হে দেব! অভীষ্টপূরণের জন্য আপনাকে আহ্বান করছি। (১) হে দেব! শক্তি এবং প্রাণ পাবার নিমিত্ত আপনাকে আহ্বান করছি। (২) হে দেবগণ! আপনারা আমাদের সম্বন্ধে বায়ুর মতো গতিশীল হোন। (প্রার্থনার ভাব এই যে, হে দেবগণ! ত্বরায় আমাদের পরিত্রাণ করুন)। (৩) হে আমার চিত্রবৃত্তিনিবহ! সকর্মে প্রবর্তক জ্ঞানদেবতা, তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ভগবৎ-আরাধনাদিরূপ সৎকর্মের জন্য প্রকৃষ্টরূপে পরিচালিত করুন। (ভাব এই যে, আমরা যেন নিয়ত সৎকর্মে নিরত থাকি) (৪) লোকপালিকা অজরা অক্ষরা বিনাশরহিতা হে দেবীগণ (অবিনশ্বর সত্ত্বের প্রবর্ধয়িত্রী সৎ-বৃত্তিসমূহ)! দেবতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত আমাদের পূজাকে অর্থাৎ ভগবৎ-উদ্দেশ্যে বিহিত আমাদের কর্মকে আপনারা সকলরকমে পরিবর্ধিত করুন। (ভাব এই যে, সৎ-বৃত্তির বা সত্ত্বভাবের দ্বারা আমরা যেন ভগবানের অনুসারী হই)। (৫) হে সৎ-বৃত্তিনিবহ! তোমাদের নিশ্চেষ্টতার দ্বারা পাপের প্রাধান্যখ্যাপক ইন্দ্রিয় ইত্যাদি চোর আমাদের যেন, হিংসা করতে সমর্থ না হয়। (ভাব এই যে, সৎ বৃত্তির প্রাধান্যের দ্বারা রিপুগণ নাশপ্রাপ্ত হোক)। (৬) হে দেবগণ। সত্যস্বরূপ আমাদের বুদ্ধিসমূহ (সবৃত্তিসমূহ বা সৎকর্মসকল) জ্ঞানাধারভূত এই হৃদয়ে আপনাদের বহনকারী হোক। (ভাব এই যে–আমাদের মধ্যে এইরকম ধী সঞ্জাত হোক, যার দ্বারা আমাদের হৃদয় দেশে নিয়ত দেবত্বের অধিষ্ঠান হয়)। (৭) হে দেব! প্রার্থনাকারী–আমার পাশববৃত্তিগুলিকে নাশ করুন, এবং আমাকে রক্ষা করুন। (প্রার্থনার ভাব এই যে,পশুবৃত্তির বা পাপের কবল হতে আমাকে সর্বথা পরিত্রাণ করুন)। (৮)। [এই কণ্ডিকার প্রথম চারটি মন্ত্র একটি মন্ত্রের মধ্যে পরিগণিত হয়।(কোন কোন গ্রন্থে আটটিই একটি মন্ত্র মধ্যে গণ্য হয়েছে)। ব্রাহ্মণদের পক্ষে ত্রিসন্ধ্যার পর চার বেদের প্রথম চারটি মন্ত্র উচ্চারণ করার বিধি আছে। সেই অনুসারে এই কণ্ডিকার প্রথম চারটি মন্ত্র ব্রাহ্মণগণ ত্রি-সন্ধ্যার সঙ্গে আবৃত্তি করেন। কিন্তু বড়ই আশ্চর্যের বিষয় এই যে, মন্ত্রের এক বিষম বিসদৃশ ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। ভাষ্যের অনুসরণে সে ব্যাখার বঙ্গানুবাদ এমন দাঁড়ায়;–(১) হে শাখে! বৃষ্টির জন্য তোমাকে ছেদন করছি। (২) হে শাখে! বলপ্রাণ পাবার জন্য তোমাকে সংনমন করছি। (৩) হে গোবৎসসমূহ! তোমরা গাভীসকলের কাছ হতে অন্যত্র গমন করো, অথবা তৃণভক্ষণের জন্য দিবসে সেই সেই অরণ্যে চরে সায়ংকালে বায়ুবেগে যজমানের গৃহে গমন করো।(৪) হে গাভী-সকল! শ্রেষ্ঠতম কর্মের জন্য তোমরা প্রভূত-তৃণোপেত বনে গমন করো। যে মন্ত্র ব্রাহ্মণগণ প্রতিদিন সন্ধ্যা বন্দনার সাথে জপ করেন, এই তার প্রচলিত অর্থ! বাছুরগুলো মাঠে চরে আসুক, গরুগুলো ঘাস খাক, এই হলো আমাদের জপের মন্ত্র! যাই হোক, আমরা এই মন্ত্রের যে অর্থ অধ্যাহার করলাম, এবং ভাষ্যের আলোচনায় যে অর্থ সিদ্ধি হয়, –দুই অর্থে অশেষ পার্থক্য লক্ষিত হবে। ধীর-স্থির ভাবে সুধীবর্গ তা অনুধাবন করিবেন, এটাই অভিপ্রেত]।
২। হে দেব! আপনি ভগবানের নিবাসের হেতুভূত যজ্ঞ ইত্যাদি কর্মের পবিত্রতা সাধক হন। (প্রার্থনা–আমাদের কর্ম পবিত্র করুন। (১) হে দেব! আপনি দ্যুলোক হন, আপনি ভূলোক হন (ভাব এই যে,–হে দেব! আপনি চরাচর বিশ্বাত্মক সর্বব্যাপী। (২) হে দেব! আপনি বায়ুর দীপক (প্রকাশক) হন; (ভাব এই যে, বায়ুরূপে আপনি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত); প্রকৃষ্ট তেজের দ্বারা আপনি। বিশ্বের ধারক(সকলের রক্ষক) হন। (৩) আপনি আমাদের বর্ধিত করুন; অর্থাৎ আমাদের শ্রেয়ঃসাধক হোন। কুটিল হবেন না; (ভাব এই যে, আমাদের ত্রুটিবিচ্যুতি দেখে, আমাদের প্রতি বিরূপ হবেন না)। আপনার সম্বন্ধীয় উপাসক, কখনও কুটিল হয় না–সদা সরল শুদ্ধ ভাবান্বিত হয়। (প্রার্থনা, আমিও যেন আপনার অনুকম্পার প্রভাবে সরল সৎ-ভাবসম্পন্ন হই। [এই কণ্ডিকার প্রথম মন্ত্রে কুশ-দ্বয়কে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় মন্ত্রে স্থালীকে আহ্বান করা হয়েছে–এমন নির্দেশ দেখি। কিন্তু আমরা মনে করি, এখানেও সেই সর্বকারণ-কারণ পরমেশ্বরকে লক্ষ্য করেই প্রার্থনা জানানো হয়েছে। যজ্ঞের ক্রিয়া ইত্যাদিতে মন্ত্র যে ভাবেই প্রযুক্ত হোক, মন্ত্রের লক্ষ্য কিন্তু সেই একমাত্র পরাৎপর পরমেশ্বর। যজ্ঞের প্রতি অঙ্গে, অনুষ্ঠানের প্রতি স্তরে, ভগবানকেই যে স্মরণ করা হয়, তাঁর কাছে যে প্রার্থনা জানানো হয়, যজ্ঞাঙ্গে এ সকল মন্ত্রের প্রয়োগ সেই ভাবই দ্যোতনা করছে]।
৩। হে দেব! আপনি ভগবানের নিবাস হেতুভূত যজ্ঞ ইত্যাদি সৎ-কর্মের শত রকমের পবিত্রতা সাধক হন; এবং আপনি সৎকর্মের সহস্র রকমের পবিত্রতা সাধক হন। (ভাব এই যে,আপনার অনুকম্পায় আমাদের কর্মনিবহ সর্বতোভাবে সৎ-সহযুত পবিত্ৰীকৃত হোক)। [৩য় কণ্ডিকার প্রথম মন্ত্রটি দেবতার আহ্বানমূলক। শেষের দুটি মন্ত্র আত্মসম্বোধনসূচক। ভাষ্যে এই কণ্ডিকার মন্ত্র তিনটিতে ক্রমান্বয়ে শাখাদেবতাকে পয়োদেবতাকে এবং দোহনকর্তাকে সম্বোধন করা হয়েছে। সেই অনুসারে কুশবেষ্টিত শাখার দ্বারা শতধারে সহস্রধারে হবিঃ ইত্যাদি দেব-উদ্দেশ্যে প্রক্ষিপ্ত হয়, এখানে তা-ই লক্ষ্য আছে। পয়োদেবতাকে আহ্বান করে, হবিঃ ইত্যাদিকে তিনি পবিত্র করুন, এই ভাবের প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। পরিশেষে দোহনকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তুমি কোন্ গরুটির দুগ্ধ দোহন করেছ? ভাষ্যকারদের মর্মার্থ এমনই অবগত হওয়া যায়। কিন্তু আমরা মনে করি, মন্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য অন্যরকম। আমাদের বঙ্গানুবাদে সেই তাৎপর্য প্রকাশিত করেছি। মন্ত্র যে কার্যেই ব্যবহৃত হোক না কেন, মন্ত্রের যা লক্ষ্য, তাতে কেন ভাবান্তর ঘটাব? সকল মন্ত্রই, আমরা লক্ষ্য করে দেখেছি, এক সুরে বাঁধা। সকলেরই লক্ষ্য–পরব্রহ্মের সান্নিধ্যলাভ। জলে তিনি, স্থল তিনি, অনলে তিনি, অনিলে তিনি–তিনি কোথায় নেই? ঋষিগণ যে স্থালীর মধ্যে, পলাশশাখার অভ্যন্তরে, গোবৎস প্রভৃতিতে, ভগবানের সন্নিধি অবলোকন করেছেন, তা তাদের সর্বত্র ব্রহ্মদর্শনের ফল মাত্র]।(১) হে আমার মন! যাগ ইত্যাদি সৎকর্মের অশেষ রকমে পবিত্রকারক পুণ্যপ্রদ অনুষ্ঠানের দ্বারা জ্ঞান-প্রেরক সবিতা-দেব তোমাকে পবিত্র করুন। (ভাবার্থ, ভগবানের কৃপায় আমরা 1 যেন সৎকর্মপরায়ণ হই; তা-ই আমাদের একমাত্র পরিত্রাণের হেতু)। (২) হে আমার মন! তুমি কোন্ দেবতাকে সৎকর্মকে দোহন (আকর্ষণ বা সঞ্চয়) করেছ? (ভাবার্থ-সকর্মে চিত্ত সংন্যস্ত হলে, সকর্মমূলাধার ভগবানকে আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়)। (৩)।
৪। সেই দেবতা বিশ্বায়ুঃ–নিখিল বিশ্বের জীবন স্বরূপ। (১) সেই দেবতা বিশ্বকর্মা, অর্থাৎ সকল কর্মের মূলীভূত। (২) সেই দেবতা বিশ্বধায়াঃ অর্থাৎ সকলের ধারক ও পোষণকর্তা। (৩) হে আমার হবণীয় সামগ্রী দেবতার যজ্ঞভাগ-রূপ তোমাকে শুদ্ধসত্ত্বভাবে অর্থাৎ বিশুদ্ধা ভক্তির দ্বারা হৃদয়ে দৃঢ়ীকৃত করিতেছি। (ভাব এই যে,–আমার কৃত পূজা ভক্তি সহযুতা হয়ে হৃদয়ে দেবতাকে প্রতিষ্ঠিত করুক)। (৪) হে বিশ্বব্যাপক ভগবান্ বিষ্ণুদেব! হবনীয় আমাদের সত্ত্বভাবকে চিরকালের জন্য প্রতিষ্ঠিত রাখুন। (৫)। [ সোম শব্দের অর্থ–ভাষ্যমতে সোমবল্লীর রস, একরকম মাদক দ্রব্য। কিন্তু আমরা মনে করি–সোম শব্দের অর্থ–সোমনামক লতা নয়; অথবা সেই সোমলতার রসের বিষয়ও এখানকার অভিপ্রেত নয়। সোম শব্দে বিশুদ্ধ সত্ত্বভাব (ভক্তিভাব) বোঝায়]।
৫। অনুষ্ঠেয় সৎকর্মসমূহের সাধক হে জ্ঞানদেব! আমি সৎকর্মের অনুষ্ঠান করব; সেই কর্ম আপনার অনুগ্রহে যেন সম্পন্ন করতে সমর্থ হই; আমার সেই কর্ম নির্বিঘ্নে সিদ্ধ হোক। (১) প্রার্থনাকারী আমি এই মিথ্যাস্বরূপ মনুষ্য-জন্ম থেকে এই সৎকর্মসমূহের দ্বারা প্রত্যক্ষীকৃত সত্যস্বরূপ দেবতাকে লাভ করি–প্রাপ্তির ইচ্ছা করি। (ভাব এই যে, সৎকর্মের প্রভাবে আমি দেবত্ব-লাভে আকাঙ্ক্ষা করছি)। (২)। [এখানে অগ্নি-সম্বোধনে ভাষ্যেও যে জ্ঞানাগ্নির সম্বোধন আছে, তা পরিষ্কার বোঝা যায়]।
৬। [স্বগতঃ প্রশ্ন] কোন্ পুরুষ তোমাকে দেহের ও মনের সাথে যুক্ত করেছেন? (দেহের স্বার্থে মনের সংযোগপূর্বক কে তোমাকে সৃষ্টি করেছেন? [স্বগতঃ উত্তর] সেই পরমেশ্বরই তোমাকে দেহধারী মনুষ্য করেছেন। [স্বগতঃ প্রশ্ন] কোন্ মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ভগবান্ তোমাকে নিযুক্ত করেছেন? [স্বগতঃ উত্তর] ভগবানেরই কার্যসাধনের জন্য ভগবান্ তোমাকে প্রেরণ করেছেন।(১)। হে আমার দেহমন! তোমাদের সৎকর্ম সাধনের জন্য এবং সৎ-ভাব ব্যাপ্তির উদ্দেশ্যে ভগবান্ সৃষ্টি করেছেন। (ভাব এই যে, ভগবৎ-কর্ম সাধনের জন্য দেহ-মনের সংযোগের দ্বারা মনুষ্য উৎপন্ন হয়েছে)। [এই মন্ত্রটি, আপন দেহকে ও মনকে সম্বোধন করে প্রযুক্ত হয়েছে](২)। [৬ষ্ঠী কণ্ডিকার প্রথম মন্ত্রটি স্বগতঃ প্রশ্নোত্তরমূলক। প্রশ্ন উত্থাপিত ও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর প্রদত্ত হয়েছে। ভাষ্যকারও প্রথম মন্ত্রে প্রশ্নোত্তরের ভাবই গ্রহণ করেছেন। তার মত এই যে, জলাধার কলসকে উদ্দেশ্য করে ঐ মন্ত্র বিহিত হয়েছে। দ্বিতীয় মন্ত্রে ভাষ্যকার বলেন, অগ্নিহোত্রহবনীকে এবং শূর্পকে সম্বোধন করা হয়েছে। এতে কেউ কেউ, শস্য ইত্যাদিকে ঝেড়ে ডাবার জলের মধ্যে রক্ষার ভাব গ্রহণ করেন। সেই অনুসারে ডাবাকে অগ্নিহোত্র হবনী বলা হয়। শূর্প বলতে, শস্য ইত্যাদিকে নিস্তুষকারক কুলা বুঝিয়ে থাকে। এ সকল কার্য যে পরমেশ্বরের দ্বারা সাধিত হয়, তা অনুমান করা সম্ভবপর নয়। অথচ ভাষ্যকার ডাবার ও কুলার কার্যকে পরমেশ্বরের কার্য বলে খ্যাপন করেছেন, এবং তাদের সম্বোধনেই মন্ত্র প্রযুক্ত বলেছেন]।
৭। হে দেব! সপ্রতিবন্ধক শত্রু (আমাদের দুর্বুদ্ধিসমূহ) প্রত্যেকে সর্বতোভাবে ভস্মীভূত হোক; আমাদের সকল রিপুশত্রুগণ, প্রত্যেকে বিশিষ্টরূপে দগ্ধ হোক। (ভাব এই যে, আমাদের দুর্বুদ্ধিসমূহ এবং রিপুশত্রুসমূহ সমূলে বিনাশ প্রাপ্ত হোক)।(১)। হে দেব! আমাদের দুর্বুদ্ধিস্বরূপ শত্রু, প্রত্যেকে সন্তপ্ত হোক; এবং আমাদের রিপুশত্রুগণ, প্রত্যেকে বিশেষভাবে তাপযুক্ত হোক। (ভাবার্থ-পূর্ব মন্ত্রেরই ন্যায়)।(২)। হে দেব! আমি যেন বিস্তৃত অন্তরিক্ষকে (কালকে) অনুসরণ করে চলতে পারি। (প্রার্থনার ভাব এই যে–হে দেব! আমি যেন সর্বদা শত্ৰুসকল নাশে সমর্থ হতে পারি, অনুকম্পা প্রদর্শনে তা-ই করুন) (৩)। [মন্ত্রের রক্ষঃ পদে ভাষ্যকার রাক্ষস-জাতিকে নির্দেশ করেন। তাতে ভাব আসে, রাক্ষসগণ, যজ্ঞের বিঘ্ন উৎপাদন করতো। আর তাদের দগ্ধ করবার জন্যই অগ্নির কাছে প্রার্থনা করা হতো। তারা নিষ্ট (সম্যভাবে পরিতপ্ত, শোকপ্রাপ্ত) হোক, অর্থাৎ তাদের বংশনাশ হোক। আমরা কিন্তু মন্ত্র দুটিতে রাক্ষসজাতি কিংবা যজ্ঞকারী লোকবিশেষের প্রতি লক্ষ্য দেখি না। এতে কালাকালেরও কোন সম্বন্ধ নেই। অতীত, অনাগত ও বর্তমান–তিন কাল ধরে যে শত্ৰু মানুষকে অহর্নিশ উত্যক্ত করছে, যে শত্রুর প্রবল প্রতাপে সকর্মনিবহ অনুষ্ঠিত হতে পারছে না–সেই অন্তঃশত্ৰু-কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ মাৎসর্য–এই মন্ত্রের লক্ষ্যস্থল। তৃতীয় মন্ত্রের লক্ষ্য;–আমার যেন চিরদিন সেই শত্রুদেরই শত্রু বলে জ্ঞান থাকে]।
৮। হে জ্ঞানস্বরূপ দেবতা! আপনি কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপুশত্রুগণের সংহারকর্তা; আমাদের অমঙ্গলসাধক শত্রুগণকে আপনি বিনাশ করুন; প্রার্থনাকারী আমাদের সর্বদাই হিংসা করবার জন্য যে শত্রু উদযুক্ত রয়েছে, আপনি তাদের উচ্ছেদ-সাধন করুন; আমরা যে শত্রুকে বিনাশ করতে উদযুক্ত হবো অর্থাৎ যাদের বিনাশ করা প্রয়োজন হবে, আপনি তাদের বিনষ্ট করুন।(১)। হে আমার অন্তর্নিহিত জ্ঞানস্বরূপ দেব! আপনি দেবগণের (দেবভাব-নিবহের) শ্রেষ্ঠ বহনকর্তা, আপনি সেই ভাবসমূহের বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণকারী, আপনি সেই ভাবসমূহের সম্যকরূপে পূর্ণতাসাধক, আপনি তাদের (সেই দেবভাব-সমূহের) অতিশয় প্রিয় এবং সেই দেবভাবনিবহের শ্রেষ্ঠ আহ্বানকর্তা। (ভাবার্থ এই যে জ্ঞানের দ্বারা দেবগণ আহূত হয়ে প্রার্থনাকারীর হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত থাকেন)।(২)।[ ভাষ্য ইত্যাদিতে প্রকাশ, এই মন্ত্রদুটির সাথে গো-শকটের সম্বন্ধ বিদ্যমান। ধুর শব্দের আলোচনায় তারা বলেন,–ধুর (যুগের বলীবর্দবহনপ্রদেশ অর্থাৎ যে কাষ্ঠখণ্ডে বৃষের স্কন্ধদেশ সংযুক্ত থাকে) সংস্থিত হিংসক অগ্নিকে লক্ষ্য করে মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছে। দ্বিতীয় মন্ত্রটি, ভাষ্যকারগণের মতে শকটকে লক্ষ্য করে উচ্চারিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, ভাষ্যকারগণ যে ভাবে অর্থ করেছেন, তাতে পূর্বাপর সামঞ্জস্য রক্ষা করা যায় না।]
মন্ত্ৰার্থঃ– ১। হে মন! তুমি কলঙ্ক কুলুষিত হয়ে আছ, সৎকর্ম-সহযুত হও। অগ্নিদেবের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে সুসংস্কৃত করছি। [কৃষ্ণ-কলঙ্ককুলুষিতঃ; আখরেষ্ঠঃসৎকর্মসহযুতঃ; অগ্নয়ে–অগ্নিদেবায়; জুষ্টং–প্রীত্যর্থং]। অথবা,-হে মন! তুমি অঙ্গারের মতো কলঙ্ক কলুষিত হয়ে আছ। ভগবানের প্রতি সাধনের জন্য অগ্নি-সযোগে (জ্ঞানাগ্নিতে দগ্ধ করে) তোমাকে পবিত্র ও সুসংস্কৃত করছি। [আখরেষ্ঠঃ– অঙ্গারসদৃশঃ কৃষ্ণঃ কলঙ্ককলুষিতঃ: জুষ্টং–ভগবৎপ্রীত্যর্থং; অগ্নয়ে–অগ্নিসংযোগায়, জ্ঞানাগ্নিনা] (১)। হে ধী। তুমি দেবীস্বরূপা, সৎকর্মাশ্রয়ভূতা হও। সকর্ম সাধনের জন্য (বৰ্হির মতো)। তোমাকে দেবপ্রিয় ও সুসংস্কৃত করছি। [বহিষে–সৎকর্মসাধনাঃ] (২)। হে মন! তুমি দৰ্ভরূপ যজ্ঞ ইত্যাদি সঙ্কর্মের সাধক হও। সৎকর্ম-সাধনের জন্য তোমাকে দেবপ্রিয় ও সুসংস্কৃত করছি। (তুমি। ভাগবৎ-কর্মে নিয়োজিত হও)। [বর্হিঃ–দৰ্ভরূপং, যজ্ঞাদিসৎকর্মসাধনং; সুগভ্যঃ– হবনীয়দানপাত্রেভ্যঃ, সৎকৰ্ম্মসাধনেভ্যঃ] (৩)।
২। হে মন! সেই অনন্ত-স্বরূপ ভগবানে কার্যসম্পাদনের জন্য ভক্তিরসার্স হও। [অদিতৈ-অনন্তস্বরূপায়, ভগবৎকর্মসাধনায়; বুন্দনং-ভক্তিরসাং ]।(১)। হে মন! তুমি বিশ্বব্যাপক পরমেশ্বরের ধারক হও; অথবা,তুমি যজ্ঞ ইত্যাদি সৎকর্মের অনুষ্ঠানের চূড়াস্বরূপ হও। [–বিষ্ণোঃব্যাপকস্য পরমেশ্বরস্য, যাগাদিসঙ্কর্মানুষ্ঠানস্য; স্তুপঃ-ধারক, শিখেব, চূড়া ইব] (২)। হে মন! তুমি স্নিগ্ধ সত্ত্বভাবযুত হও; সর্বদেবভাবের আবাসস্থান করবার উদ্দেশ্যে তোমাকে আসন-রূপে বিস্তৃত করছি।(৩)। হে মন! তোমাকে স্বাহামন্ত্রে পূত করে ভবপতির উদ্দেশ্যে সম্প্রদান করছি। [ভুবপতয়ে–অন্তরিক্ষস্বামিনে] (৪)। হে মন তোমাকে স্বাহা-মন্ত্রে পূত করে ভুবনপতির উদ্দেশ্যে সম্প্রদান করছি। [ভুবনপতয়ে–চতুর্দশভুবনস্বামিনে]।(৫)। হে মন! তোমাকে স্বাহা-মনে পূত করে সেই ভূতপতির–সেই বিশ্বস্রষ্টার উদ্দেশ্যে সম্প্রদান করছি। [ভূতানাং পতয়ে–সর্বসৃষ্টিস্বামিনে]।(৬)। [ভাষ্যানুসারে এই কণ্ডিকার মন্ত্র কটি এক কৌতুকপ্রদ উপাখ্যানের সাথে সম্বন্ধ-বিশিষ্ট। ব্যাখ্যাও কখনো প্রোক্ষণীকে, কখনো কুশসঙঘকে, কখনো যজ্ঞবেদীকে, কখনো বা উপাখ্যানকল্পিত তিন দেবতাকে সম্বোধন করে নির্বাহিত হয়ে থাকে। উপাখ্যানের কাহিনীটি এই দেব-উদ্দেশ্যে হবিঃ প্রক্ষেপকালে মৃত্তিকাতে হবিঃ অংশ পতিত হয়।অগ্নিদেবের তিনটি ভাই ছিল; তারা যজ্ঞভাগ পাবার জন্য বিবাদ উপস্থিত করেন। শেষে বষট্কারের ভয়ে মনের ক্ষোভে তারা ভূগর্ভে জলের মধ্যে লুকিয়ে থাকেন। কিছুকাল পরে অগ্নিদেবের হৃদয়ে ভ্রাতৃশোক উথলে ওঠে। তিনি তখন ভ্রাতৃগণের অনুসরণে জলের মধ্যে প্রবেশ করেন। তখন চার ভ্রাতার মধ্যে সম্ভব স্থাপিত হয় এবং ভ্রাতৃ তিনজনের ভয় দূরে যায়। তখন যজ্ঞের আর কোন ভাগ অবশিষ্ট না থাকায় অগ্নিদেব তাদের জন্য ভূপতিত হবিঃর অংশ (ঘৃত) প্রাপ্য বলে নির্দেশ করেন। কথিত হয়, সেই তিন ভাই ভুবপতি, ভুবনপতি ও ভূপতি নামে প্রখ্যাত হয়েছিলেন। কণ্ডিকার শেষ তিনটি মন্ত্র তাদেরই সম্বোধনে প্রযুক্ত]।
৩। হে মন! সর্বব্যাপী সৰ্বর্গ সেই ভগবান, সকল রকমের হিংসকগণের হিংসা হতে তোমাকে রক্ষা করেন। স্তবনীয় অগ্নির মতো (অর্থাৎ জ্ঞানাগ্নির সংশ্রবযুত হয়ে) তুমি বিশ্বের সকল রকম শত্রু হতে অর্চকের সংরক্ষক হও। [বিশ্বাবসুঃ–সর্বব্যাপী; অগ্নিঃ ইড–অগ্নিবুজ জ্ঞানাগ্নিসংশ্রবযুতং ভুত্ব] (১)। হে মন! তুমি ভগবানের দক্ষিণ বাহুস্বরূপ (শ্রেষ্ঠ অঙ্গ) হও। স্তবনীয় অগ্নির মতো (অর্থাৎ জ্ঞানাগ্নির সংশ্রবযুত হয়ে) তুমি বিশ্বের সকল রকম শত্রু হতে অর্চকের সংরক্ষক হও। [ইন্দ্রস্য–ভগবতঃ, ঈডিতঃ– স্তবনীয়] (২)। হে মন! তোমার সত্যধর্মপালন-ফলে, জ্ঞান-ভক্তিরূপ সেই মিত্রাবরুণ দেবতা দুজন তোমাকে সর্বতোভাবে শ্রেষ্ঠলোকে স্থাপন করুন। স্তবনীয় অগ্নির মতো (অর্থাৎ জ্ঞানাগ্নির সংশ্রবযুত হয়ে) তুমি বিশ্বের সর্বরকম শত্রু হতে অর্চকের সংরক্ষক হও। [ধ্রুবেণ ধৰ্ম্মণা–তব সত্যধর্মপালন ফলেন; মিত্রাবরুণৌ–জ্ঞানভক্তিরূপৌ দেবৌ, ভগবৎ-বিভূতিদ্বয়ৌ, উত্তরতঃ–শ্রেষ্ঠলোকে]।(৩)। [এই কণ্ডিকার মন্ত্রগুলি মনঃ সম্বোধন-মূলক]।
৪। হে ত্রিকালজ্ঞ জ্ঞানস্বরূপ অগ্নিদেব! মহান্ এবং দীপ্তিমান্ আপনাকে আমার ইষ্টলাভের জন্য, এবং হিংসারহিত যজ্ঞে (আমার সকর্মনিবহে–আমার হৃৎপ্রদেশে) প্রতিষ্ঠিত করছে। [ঋগ্বেদ ৫ মণ্ডল।২৬ সূক্ত।৩ঋক; প্রচলিত অর্থ,–হে অগ্নি! তুমি জ্ঞানসম্পন্ন, হব্যভোজী, দীপ্তিমান ও মহৎ; আমরা যজ্ঞস্থলে তোমাকে প্রজ্বলিত করি। কিন্তু এখানে। কবে ত্রিকালজ্ঞ, অগ্নে–জ্ঞানস্বরূপ হে অগ্নিদেব; বীতিহোত্রং–অভিলাষপরিপূরণার্থং। ভাবার্থ হে জ্ঞানস্বরূপ দেব! আপনি আমার হৃদয়ে প্রদীপ্ত হোন]।
৫। হে মন! তুমি সমিধ অর্থাৎ জ্ঞানাগ্নির দীপক হও(১)। হে মন! দেববিভূতির সম্যকরূপে অৰ্চনার জন্য (প্রতিষ্ঠার জন্য) সেই পূর্ণজ্যোতিঃস্বরূপ (জ্ঞানময়) সূর্যদেব, সর্বতোভাবে তোমাকে পালন করুন।(২)। হে মনঃসম্বন্ধী কর্মযোগ ও ভক্তিযোগ! তোমরা সেই সৎ-জ্ঞান-প্রেরক সবিতৃ-দেবতার দুই হস্তস্বরূপ হও (৩)। হে মন! তুমি স্নিগ্ধসত্ত্বভাবযুত হও। সকল দেবভাবের আবাসস্থান করবার জন্য, তোমাকে আস্তীর্ণ করছি।(৪)। হে মন! আশ্রয়স্থানভূত দেবগণ, শাসকস্থানীয় ঘোররূপ দেবগণ এবং জ্যোতিঃস্বরূপ (জ্ঞানস্বরূপ) দেবগণ তোমাকের প্রসারিত করুন।(৫)। [আধ্যাত্মিক পক্ষে মন্ত্রার্থের স্বরূপ দেওয়া হলো। সেই বিচারে মন্ত্রগুলির মধ্যে তৃতীয়টির সম্বোধ্য মনঃসম্বন্ধযুত কর্মযোগ ও ভক্তিযোগ। অবশিষ্টগুলি সাধারণভাবে মনঃ-সম্বোধন সূচক। তবে, ভাষ্যানুসারে এই কণ্ডিকার মন্ত্রগুলির যে প্রচলিত অর্থ হয়, জিজ্ঞাসু পাঠকের জন্য, তা নিবেদিত হলো। –যজ্ঞাগ্নিতে প্রজ্বলিত প্রথম সমিধ অর্পণ করবার পর, আর বেদী স্পর্শ না করে সেই সমিধূকে লক্ষ্য করে প্রথম মন্ত্র উচ্চারিত হয়–হে ইষ্মকাষ্ঠ! তুমি সমিধ হও, অগ্নিকে দীপ্তিমান্ করো। তারপর আহবনীয়ের প্রতি লক্ষ্য করে দ্বিতীয় মন্ত্র উচ্চারিত হয়–হে আহবনীয়! পুরোভাগের সকল রকম বিঘ্ন হতে সূর্যদেব তোমাকে রক্ষা করুন। তৃতীয় মন্ত্রের জন্য দুটি কুশ তির্যক ভাবে রাখতে হয়; তার উপর প্রস্তর স্থাপন উদ্দেশ্য থাকবে। সেই অনুসারে মন্ত্রে অর্থ হয়–হে তৃণদ্বয়! তোমরা সবিতৃদেবের বাহু হও। অর্থাৎ, প্রস্তরধারণের জন্য তোমরাই সূর্যের বাহুস্বরূপ। চতুর্থ মন্ত্রে সেই কুশদ্বয়ের উপর প্রস্তর মননে দর্ভমুষ্টি স্থাপন করে বলা হয়–হে প্রস্তর! দেবগণের উপবেশনের জন্য তোমাকে বিস্তৃত করলাম। তুমি উপাসনের মতো কোমল কোমল হও। পরিশেষে সেই আস্তরণে করস্পর্শ করে পঞ্চম মন্ত্র উচ্চারিত হয়–বসুগণ, রুদ্রগণ, আদিত্যগণ (সবনত্রয়াভিমানী দেবতা তিনজন) তোমাতে এসে উপবেশন করুন।কর্মকাণ্ড শিক্ষার জন্য এই প্রচলিত মন্ত্ৰার্থই উপযোগী। আধ্যাত্মিক পক্ষে নয়। আধ্যাত্মিক পক্ষে বসবঃ-(বসুগণ নয়) নিবাসভূতা দেবাঃ; রুদ্রাঃ-(রুদ্রগণ নয়) শাসক, ঘোররূপাঃ দেবতাঃ আদিত্যা–(আদিত্যগণ নয়) জ্যোতিস্বরূপাঃ জ্ঞানাধারাঃ দেবাশ্চ]
৬। হে ধি! তুমি সত্ত্বভাবান্বিতা হয়ে থাক; নামে তুমি জুহু (হবনপাত্র স্বরূপ, সুক) হও (অর্থাৎ তোমার নাম জুহু হোক); এমন হয়ে তুমি, প্রিয়বস্তুর আধার সত্ত্বভাবের সাথে আমার হৃদয়রূপ আসনে অধিষ্ঠিত হও।(১)। হে ধি! তুমি সত্ত্বভাবান্বিতা হয়ে থাক; নামে তুমি উপভৃৎ (দেবসমীপে আজ্য-ধারণকত্রী, সম্ভবপোষিকা সতী) হয়ে, আমার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হও।(২)। হে ধি! তুমি সত্ত্ববাবান্বিতা হয়ে থাক; নামে তুমি ধ্রুবা (স্থিরতাবিশিষ্টা, স্থৈর্যশালিনী, নিত্যস্বরূপা সতী) হয়ে আমার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হও (৩)। হে-ধি! তুমি এইভাবে প্রিয়বস্তুর আধারস্বরূপ সত্ত্বভাব ইত্যাদির সাথে আমার হৃদয়াসনে অধিষ্ঠিত হও।(৪)। হে বিশ্বব্যাপক দেবতা (বিষ্ণু)! সত্যের উৎপত্তিস্থান আমার হৃদয়ে নিত্যস্বরূপ যে সত্ত্বভাব ইত্যাদি বিদ্যামান আছে, সেই সকলকে আপনি রক্ষা করুন; আমার যজ্ঞকে (সত্ত্ব ইত্যাদি কার্যকে) রক্ষা করুন; আমার যজ্ঞ পালক সভাবকে রক্ষা করুন।(৫)। হে দেব! অর্চনাকারী আমাকে (এই সংসার-পারাবার থেকে) পরিত্রাণ করুন।(৬)। [এই কণ্ডিকার প্রথম চারটি মন্ত্র ধীকে সম্বোধন করে প্রযুক্ত এবং শেষোক্ত মন্ত্র দুটিতে বিশ্বব্যাপক দেবতাকে (বিষ্ণুকে) সম্বোধন করা হয়েছে]।
৭। সত্ত্বভাববিশিষ্ট (বাজজিৎ) হে। জ্ঞানস্বরূপ দেব (অগ্নে)! সত্ত্বভাব-সম্পাদনের উপযুক্ত সত্ত্বভাবের প্রতিবন্ধকতানাশক (বাজজিতং) আপনাকে আমি আমার হৃদয়-দেশে সম্যক্ প্রদীপ্ত করছি।(১)। দেবভবসমূহকে নমস্কার করছি (তারা আমাকে প্রাপ্ত হোক)।(২)।পিতৃগুণ সমূহকে উদ্দেশ্য করে স্বধা উচ্চারণ করছি। তদ্গুণাবলীকে আহ্বান করছি (সেই গুণসমূহ আমাতে সঞ্জাত হোক) (৩)। হে দেবভাব ও পিতৃগুণ, তোমরা উভয়ে আমার জন্য সুন্দররূপে সংযত হও।(৪)
৮। অদ্য (ইদানীং) আমি দেববিভূতিসমূহ লাভ করবার জন্য, হবিঃস্বরূপ শুদ্ধ-সত্ত্বভাবকে সম্যকরূপে ধারণ বা পোষণ করছি। [আজং-হবিঃস্বরূপং শুদ্ধসত্ত্বভাবং]।(১)। বিশ্বব্যাপক হে দেব! আমি আপনার শরণাগত হচ্ছি; আপনি, চরণাশ্রয়-দানে আমাকে রক্ষা করুন। অথবা, বিশ্বব্যাপক হে দেব! আমি পদের দ্বারা আপনাকে আক্রমণ করছি না (অর্থাৎ, আপনি বিশ্বব্যাপক বলে আমার পাদস্পর্শজনিত দোষ হবে না)। [প্রথম অন্বয় অবক্ৰমিষং অবক্ৰমণং করোমি, তব শরণাগতো ভবামি; অঙিঘণা–চরণাশ্রয়দানেন; মা-মাং। দ্বিতীয় অন্বয় অঙিঘ্ৰণা–পাদেন; মা অবক্ৰমিষং–অবক্ৰমণং মা করোমি] (২)। জ্ঞানস্বরূপ হে দেব! আপনি বিষ্ণুর (বিশ্বব্যাপক দেবতার) আধারস্বরূপ হয়ে থাকেন; আপনার ধনযুক্ত আশ্রয়রূপ ছায়াকে আমি আশ্রয় করছি।(৩)। হে পরমেশ্বর! আপনি, আমার এই হৃদয়ে শত্রুনাশক সামর্থ্য বিস্তার করুন; তাহলে, শক্রকৃত হিংসারহিত হয়ে আমার যজ্ঞ ঊর্ধ্বগতি লাভ করবে (অর্থাৎ, রিপুশ কর্তৃক প্রতিহত না হয়ে আপনার সান্নিধ্যলাভে সমর্থ হবে) (৪)
৯। হে জ্ঞানস্বরূপ দেব (অগ্নে)! আপনি হোতৃকর্ম ও হবনীয়বস্তু জানেন এবং দূতকর্মও জ্ঞাত আছেন।(১)। হে জ্ঞানাগ্নি! আপনাকে আকাশ ও পৃথিবীস্থ দেবগণ (আমার হৃদয়ে) পালন করুন।(২)। হে জ্ঞানাগ্নি! আপনি স্বর্গের ও মর্তের দেবভাবকে (আমার হৃদয়ে) পালন করুন; পরমেশ্বর, আমাদের দত্ত হবনীয় শুদ্ধসত্ত্বভাবে প্রীতি লাভ করে আমাদের দেবভাবপ্রাপ্তির পক্ষে অতিশয় হিতকারী হোন; আমাদের হুত বস্তু সুন্দরভাবে হুত হোক।(৩) জ্ঞানাগ্নির প্রভাবে আমরা পরম জ্যোতিঃকে (পরব্রহ্মকে) সম্যভাবে প্রাপ্ত হই।(৪)
১০৷ সেই ভগবান্ ইন্দ্রদেব আমার অন্তর্ভূত এই ইন্দ্রিয় ইত্যাদির কর্মকে (সমস্ত বীর্যকে) আমার অভ্যন্তরে স্থাপন করুন; অর্থাৎ, ভগবানের অনুগ্রহে আমার ইন্দ্রিয়ের স্থৈর্য সংসাধিত হোক; পরমসুখসাধক ধনসমূহ (মোক্ষ ইত্যাদি) আমার প্রতি বর্ষিত হোক; অর্থাৎ, ভগবানের অনুগ্রহে আমি যেন পরমসুখলাভে সমর্থ হই। প্রার্থনাকারী আমাদের অভীষ্ট পূর্ণ হোক; আমাদের মঙ্গল অবিচলিত হোক; অর্থাৎ, ভগবানের অনুকম্পায় আমাদের মঙ্গল অবিচ্ছিন্ন থাকুক।(১)। সকলের উপাস্যা দৃশ্যমানা পঞ্চভূতাত্মিকা এই পৃথিবী (সকল হবনীয় সামগ্রীর) জননীস্থানীয়া; অর্থাৎ, স্কুল-সূক্ষ্ম সকল আবহনীয় তাতেই উৎপন্ন। মাতা পৃথিবী (সকল ভাবের উৎপাদয়িত্রী দেবী) এই প্রার্থনাকারী আমাকে (সকলরকম) হবনীয়-সামগ্রী প্রদান করেন। কর্মাগ্নিপোষণকারী আমার হৃদয়োৎপন্ন জ্ঞান যথাপ্রযুক্ত হোক; অর্থাৎ, আমার কর্মের দ্বারা সজ্ঞিত জ্ঞান, যথাপ্রযুক্ত হয়ে ভগবানকে প্রাপ্ত হোক।(২)।
মন্ত্ৰার্থঃ– ১। হে চিত্তবৃত্তিনিবহ! তোমরা ভক্তিভাবের দ্বারা জ্ঞানস্বরূপ দেবতার সেবা করো। অতিথিস্বরূপ (অর্থাৎ অধুনা আগত) সেই জ্ঞানাগ্নিকে সত্ত্ববাদির দ্বারা প্রবর্ধিত করো। এমন প্রবর্ধিত জ্ঞানাগ্নিতে হবনীয় সমূহ দেব উদ্দেশে প্রদান করো (১)।
২। হে আমার চিত্তবৃত্তিনিবহ! তোমরা, সুন্দররূপে দীপ্ত অর্থাৎ প্রবর্ধিত, দীপ্তিমান, সর্বজ্ঞ (সেই) জ্ঞানস্বরূপ দেবতাকে অতিশয়রূপে শুদ্ধসত্ত্ব প্রদান করো; (অর্থাৎ, শুদ্ধসত্ত্বভাবের দ্বারা তার পূজা করো)। [সুসমিদ্ধায়–সুষ্ঠু সম্যক্ দীপ্তায়, প্রবর্ধিতায়; শোচিষে-দীপ্তিবিশিষ্টায়; জাতবেদসে-জাতপ্রজ্ঞায়, সর্বজ্ঞায়]।(১)।
৩। সর্বত্রগতিশীল হে জ্ঞানাগ্নি! সেই প্রখ্যাত আপনাকে ভক্তিভাব ইত্যাদির দ্বারা এবং শুদ্ধসত্ত্বভাবের দ্বারা আমরা (সাধকগণ) বর্ধিত করছি। প্রবর্ধিত হে জ্ঞানাগ্নি! আপনি বৃহৎ কিরণের দ্বারা আমাদের হৃদয়ে প্রদীপ্ত হোন। [অঙ্গিরঃ–হে সর্বত্রগ জ্ঞানাগ্নে! সমিদ্ভিঃ–ভক্তিভাবাদিভিঃ; ঘৃতেন–শুদ্ধসত্ত্বভাবেন চ; যবিষ্ঠ্য-যুবতম, সম্পূর্ণাবয়ব, প্রবর্ধিত হে জ্ঞানাগ্নে!; শোগ–শোচিষা, কিরণেন]।(১)।
৪। অভীষ্টপূরক হে জ্ঞানাগ্নি! হবনীয়বিশিষ্ট ও শুদ্ধসত্ত্বভাবযুক্ত সমিক্সপ আমার চিত্তবৃত্তিনিবহকে আপনি অনুগ্রহ করুন (তারা সৎপথাবলম্বী হোক)। [হত–অভীষ্টপূরক; হবিষ্মতীঃ–হবনীয়বিশিষ্টা; ঘৃতাচীঃ–শুদ্ধসত্ত্বভাবান্বিতাঃ সমিধ রূপা মে চিত্তবৃত্তয়ঃ] (১)।
৫। ভূলোকস্থ দেবভাবসমূহ, ভুবনলোকস্থ দেবভাবসমূহ, এবং স্বর্গস্থিত দেবভাবসমূহ আমার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন। [ভূঃ–ভূলোকস্থিতদেবভাবাঃ; ভূবঃভূবলোকস্থিতদেবভাবাঃ; স্বঃস্বলোকস্থিতদেবভাবাঃ] (১)। দেবার্চনার স্থানভূত, পৃথিবীর তুল্য হে আমার চিত্তবৃত্তিঃ! তুমি আকাশের ন্যায় অনন্ত ও পৃথিবীর ন্যায় শ্রেষ্ঠ। এবষ্কৃত তোমাতে, শুদ্ধসত্ত্বভাব এবং ভক্তিরস ইত্যাদি লাভ করবার নিমিত্ত, শুদ্ধসত্ত্বভাবপোষক জ্ঞানস্বরূপ দেবতাকে সম্যক্রূপে স্থাপন করছি। [দেবযজনি–দেবযজনস্থানভূতে; পৃথিবি–পৃথ্বীস্বরূপে হে মম চিত্তবৃত্তে! পৃথিবীর– পৃথিবীব–অন্তরীক্ষপ্রদেশে যথানন্ততয়া বহুঃ পৃথিবী যথা সর্বেষাং আধারভূতয়া শ্রেষ্ঠা; অন্নাদ্যায় শুদ্ধসত্ত্বভক্তিরসাদীন লন্ধুং]।(২)
৬। প্রসিদ্ধ সর্বত্রগ বিচিত্রকর্মোপেত জ্ঞানসূর্য সর্বতোভাবে (সকল স্থানে) পরিক্রমণ করেন; আমাদের মাতৃস্থানীয়া এই পৃথিবীকে তিনি প্রথমেই প্রাপ্ত হন, এবং স্বর্গে সঞ্চরণ করে আমাদের পরম আশ্রয়স্থান পিতৃলোকও তিনি প্রাপ্ত হন। [গৌঃ–সর্বত্রগঃ, জ্ঞানকিরণঃ, পৃশ্নিঃ– বিচিত্র কর্মোপেতঃ, জ্ঞানজ্যোতিঃ; স্বঃ–সূর্যদেবঃ; জ্ঞানসূর্য; মাতরং–অস্মাকং উৎপত্তিভূতাং মাতৃস্থানীয়াং পৃথিবীং; পিতরং–পিতৃলোকং, অস্মাকং পরমাশ্রয়-স্থানরূপং] (১)।
৭। এই জ্ঞানস্বরূপ অগ্নিদেবের দীপ্তি, প্রাণাপান-বায়ুর প্রযোজক হয়ে, দ্যাবাবৃথিবীর মধ্যে (শরীরের মধ্যে), বিচরণ করছে। (প্রাণব্যাপার সম্পাদন করছে); কর্মফলদাতা সেই অগ্নি, দুলাককে (স্বর্গের স্বরূপতত্ত্ব) প্রকাশ করেন। ৬ [মহিষঃ কর্মফলদাতা স জ্ঞানাগ্নি; অস্য–জ্ঞানস্বরূপস্য অগ্নেঃ] (১)
৮। সাধকগণ কর্তৃক শব্দরূপে ও গতি-রূপে (অথবা–সর্বত্রগতিশীল শব্দের মতো) ধ্যেয়, সেই ভগবান্ সকল কালে সকল স্থানে বিদ্যমান আছেন; তার জ্যোতিঃ দ্বারা প্রতি গৃহ প্রতি দিন উদ্ভাসিত হয়ে থাকে। [স ভগবান্ বাক্পতঙ্গায়–শব্দরূপায় গতিরূপায় চ, যদ্বা–সর্বত্রগায় শব্দরূপায়, ধীয়তে–মন্যতে সাধকৈরিতি শেষঃ; ত্রিশৎ–ত্রিংশৎসু মুহূর্তাখ্যেযু, সর্বেষু কালেষু ইতি যাবৎ; তস্য দুঃভিঃ–জ্যোতির্ভি]।(১)।
৯। যিনিই অগ্নিদেব, তিনিই দৃশ্যমান্ জ্যোতীরূপ; আবার যিনিই দৃশ্যমান্ জ্যোতিঃ, তিনিই অগ্নিদেব; স্বাহা মন্ত্রে তাকে হবিঃ প্রদান করছি; অনুষ্ঠান সুহুত (শুভ) হোক। (যঃ অগ্নিঃ–অগ্নিদেব; স এব জ্যোতিঃদৃশ্যমান্ জ্যোতিঃ-স্বরূপ; যঃ চ জ্যোতিঃ–দৃশ্যমান জ্যোতিরূপঃ; তস্মৈ স্বাহা স্বাহামন্ত্রেণ হরিদামি, সুহুতমস্তু ইতি প্রার্থনা] (১)। যিনিই সূর্যদেব, তিনিই দৃশ্যমান্ জ্যোতীরূপ; আবার যিনিই দৃশ্যমান্ জ্যোতিঃ, তিনিই সূর্যদেব; স্বাহা-মন্ত্রে তাঁকে হবিঃ প্রদান করছি। অনুষ্ঠান সুহুত (শুভ) হোক। [যঃ সূর্য–সূর্যদেব]।(২) যিনিই অগ্নিদেব, তিনিই তেজঃ; আবার যিনিই দৃশ্যমান্ জ্যোতীরূপ, তিনিই তেজঃ; স্বাহা-মন্ত্রে তাকে হবিঃ প্রদান করছি–অনুষ্ঠান সুহুত (শুভ) হোক। [বৰ্চঃ-তেজঃ] (৩)। যিনিই সূর্যদেব, তিনিই তেজঃ; আবার যিনিই দৃশ্যমান্ জ্যোতিরূপ, তিনিই তেজঃ; স্বাহা-মন্ত্রে তাকে হবিঃ প্রদান করছি–অনুষ্ঠান সুহুত (শুভ) হোক(৪)। যিনিই দৃশ্যমান্ জ্যোতীরূপ, তিনিই সূর্যদেব; আবার যিনিই সূর্যদেব, তিনিই দৃশ্যমান্ জ্যোতীরূপ; স্বাহা-মন্ত্রে তাঁকে হবিঃ প্রদান করছি-অনুষ্ঠান সুহুত (শুভ) হোক (৫)।
১০। জ্ঞানপ্রদাতা সবিতা দেবতার সাথে অগ্নিদেব প্রীত হোন; ঐশ্বর্যশালিনী রাত্রিদেবতার সাথে অগ্নিদেব প্রীত হোন; আমাদের প্রতি প্রীতিযুক্ত অগ্নিদেব আমাদের কর্মকে প্রাপ্ত হোন; স্বাহা-মন্ত্রের উচ্চারণে তাকে হবিঃ অর্পণ করছি–সুহুত (শুভ) হোক। [সবিত্রা দেবেন–জ্ঞানপ্রেরকেণ দেবেন সহ; সজুঃ–প্রীতঃ ভবতু ইতি, শেষঃ]।(১)। জ্ঞানপ্রদাতা সবিতা দেবতার সাথে সূর্যদেব প্রীত হোন; ঐশ্বর্যশালিনী উষা-দেবতার সাথে সূর্যদেব প্রীত হোন; আমাদের প্রতি প্রীতিযুক্ত অগ্নিদেব আমাদের কর্মকে প্রাপ্ত হোন; স্বাহা-মন্ত্র উচ্চারণে তাকে হবিঃ অর্পণ (পূজা) করছি–(কর্মানুষ্ঠান) সুহুত (শুভ) হোক। [উষসেন্দ্রবত্যা–ঐশ্বর্যশালিন্যা উযোদেবতয়ো সহ] (২)
১১। হিংসা-প্রত্যবায় ইত্যাদি রহিত কর্ম সম্যক্ অনুষ্ঠান করে, আমরা যখন জ্ঞানলাভের জন্য পরিত্রাণকারক মন্ত্র রূপ শব্দব্রহ্ম উচ্চারণ করি, দূরে বা নিকটে যেখানেই থাকুন, জ্ঞানস্বরূপ দেবতা তা শ্রবণ করেন। (ভাব এই যে, কর্মফল ও মন্ত্রফল অবশ্যম্ভাবী)। [অধ্বরং–হিংসাপ্রত্যবায়াদিরহিতং কর্ম; অগ্নয়ে–অগ্ন্যর্থং, জ্ঞানলাভায়; মন্ত্রং– পরিত্রাণকারকং শব্দব্রহ্ম; বোচেম–উচ্যাম]।(১)
১২। দ্যুলোকের মস্তক-স্থানীয়, ভূলোকের শ্রেষ্ঠপালক, সর্বব্যাপী সেই জ্ঞানস্বরূপ অগ্নিদেব, আপনার করুণা-ধারা বর্ষণের কারণ পরম্পরা বৃদ্ধি করেছেন।(বহু কারণে বহু রকমে তিনি করুণা বিতরণ করে থাকেন–এটাই ভাবার্থ)। [দিবঃ মূর্ধা দ্যুলোকস্য শিরঃসমানঃ; ককুৎপতি–শ্রেষ্ঠ পালকঃ] (১)
১৪। হে জ্ঞানস্বরূপ দেব! এই হৃদয় রূপ গৃহই (কর্ম প্রভাবে) দীপ্তিযুক্ত হয়ে, আপনার উৎপত্তি স্থান হয়। সেখানে হতে উৎপন্ন হয়েই, আপনি দীপ্তিমান্ হন। সেই স্থানের স্বরূপ জেনে, আপনি আমাদের এই হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন; এবং আমাদের পরমার্থ প্রাপ্তি রূপ ধনকে পরিবর্ধিত করুন। [অগ্নে–হে জ্ঞানস্বরূপ দেব!; ঋত্বিয়ঃকর্মপ্রভাবেন দীপ্তিযুক্তঃ সন্; যোনিঃ উৎপত্তিস্থানং; আরোহ–তগৃহং প্রাপয়, হৃদয়সিংহাসনে অধিরোহণং কুরু](১)
১৫। এই জ্ঞানস্বরূপ দেবতা, আমাদের সকল কর্মে মুখ্যস্থানীয় হোন (অর্থাৎ, আমাদের সকল কর্মেই জ্ঞানের প্রাধান্য থাকুক); আমাদের মধ্যে দেবভাবের আহ্বতা, আমাদের দ্বারা শ্রেষ্ঠকর্মের সম্পাদক, আমাদের হিংসাপ্রত্যয় ইত্যাদি রহিত সকল কর্মে সম্পূজিত, সেই দেবতা, জ্ঞানিগণ কর্তৃক চিত্তে ধৃত আছেন (অর্থাৎ, জ্ঞানিগণ জ্ঞানদেবতাকে চিরকাল হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছেন)। বিচিত্রকর্মোপেত, অশেষশক্তিযুত, সেই জ্ঞানদেবতাকে, আত্ম-উৎকর্ষসম্পন্ন সাধকগণ (অথবা, অপ্নবান ঋষি ও ভৃগুবংশীয় ঋষিগণ), জনহিতসাধনের জন্য, হৃদয়-রূপ গৃহে দীপ্তিমান্ রেখেছেন (জ্ঞানসঞ্চয়ে জনহিত-সাধনই সাধকবর্গের একমাত্র লক্ষ্য)। [অয়ংজ্ঞানস্বরূপে দেবঃ; হোতা–আত্মাসু দেবভাবানাং আহ্বতা; অধ্বরেষু হিংসাপ্রত্যবায়শূন্যে কর্মেষু; অপ্নবানঃ-এতৎ-নামীয় ঋষি, আত্মোৎকর্ষসম্পন্নাঃ; ভৃগবঃ– ভৃগুবংশীয় ঋষয়ঃ, সাধবঃ; বিশেবিশে–জনহিতসাধনায়; বিরুরুচুঃ দীপয়ন্তি স্ম] (১)।
মন্ত্ৰার্থঃ– ১। যে হৃৎ-প্রদেশে (অথবা যে যজ্ঞভূমিতে) নিখিল সঙ্ঘভাব (দেববিভূতি) অধিষ্ঠান করেন, হে ভগবন্। এমন হৃদয়প্রদেশ (যজ্ঞভূমি) এই মর্ত্যলোকে (সংসারে) থেকেই আমরা যেন প্রাপ্ত হই। (ভাব এই যে, –এই সংসারে অবস্থিত থেকেই আমরা যেন সত্ত্বভাব সমন্বিত হতে পারি)। [যত্র যস্মিন্ হৃদ্দেশে যজ্ঞভূমৌ বা; যজনং–হৃদ্দেশং, যজ্ঞভূমিং বা; আ পৃথিব্যাঃ–অস্মিন্ মর্ত্যলোকে এব, সংসারে এবং ইতি ভাবঃ] (১)। অজ্ঞানতা-সমুদ্র সমুত্তীর্ণ হতে ইচ্ছুক আমরা (যেন) ঋক সাম ও যজুমন্ত্র রূপ স্তরের দ্বারা এবং পরমধন তত্ত্বজ্ঞানের পোষক সত্ত্বভাবের দ্বারা সম্যক্ প্রকারের হৃষ্ট হই। (ভাব এই যে, ভগবানের উপাসনায় অজ্ঞানতার বিনাশে আমরা যেন প্রজ্ঞান লাভ করি। [সংতরন্তঃ–অজ্ঞানতাসমুদ্রং সমুদ্ধরন্তঃ] (২)। প্রসিদ্ধ (সাধকগণের অনুভূত) এই জলাধিষ্ঠাত্রী দেববিভূতিগণ (সত্ত্বভাব) আমার সুখদায়িনী হোন। (ভাব এই যে,ভগবান্ সর্বভূতে বিরাজমান; তার এই জলাধিষ্ঠাত্রী স্নেহকারুণ্য রূপী–বিভূতিসমূহ আমার কুশল বিধান করুন)। [ইমাঃ–প্রসিদ্ধাঃ, সাধকৈরনুভূতাঃ; আপঃ অপানধিষ্ঠাত্রঃ, সত্ত্বভাবানাং প্রদায়িঃ ] (৩)। হে কর্মফলপ্রদানকারিন্! আমাকে অজ্ঞানতা হতে উদ্ধার করুন। (ভাব এই যে, হে দেব! শীঘ্র আমার কর্মফল ধ্বংস করুন)। [ওষধে কর্মফলদায়ক দেব; ত্রায়স্ব–অজ্ঞানাদুদ্ধারয়] (৪)। হে ভববন্ধনছেদনকারী দেব! এই জনের (আমার) প্রতি প্রতিকূল হবেন না। (ভাব এই যে,আমাকে ভববন্ধন হতে মুক্ত করুন)। [স্বধিতে–ভববন্ধনচ্ছেদক দেব!;এনং জনং–মামিতি যাবৎ] (৫)।
২। জগতের নির্মাণকৰ্জী (অথবা মাতার ন্যায় পালনকর্তী) সত্ত্বভাবের দ্বারা পবিত্ৰকারিণী এবং দ্যুতিশালিনী জলের অধিষ্ঠাত্রী দেববিভূতিগণ, আমাদের পাপসমূহকে অপনীত করুন; সত্ত্বভাবের দ্বারা আমাদের পবিত্র করুন; এবং এই জন্মজরামৃত্যুরূপ সংসার হতে (অথবা অজ্ঞানী আমাদের) উদ্ধার করুন।(ভাব এই যে,–দেববিভূতিগণ আমাদের পাপসমূহকে বিনষ্ট করে সত্ত্বভাবের দ্বারা আমাদের এই সংসার হতে উদ্ধার করুন। এই প্রার্থনা)। [মাতরঃ–জগন্নির্মাঃ, মাতৃবৎ পালয়িত্রো বা; ঘৃতপৃঃসত্ত্বভাবেন পবিত্ৰকারিণ্যঃ; ঘৃতেন–ঘৃতবৎ আর্দকারিণা, সত্ত্বভাবেনেতি ভাবঃ; অস্মাৎ–জন্মজরামৃত্যুরূপাৎ সংসারা]।(১)। আমরা জলের অধিষ্ঠাত্রী দেববিভূতি হতে স্নানের দ্বারা (বহিঃশুদ্ধ) ও আচমনের দ্বারা (অন্তঃশুদ্ধ) শুদ্ধসত্ত্বভাবাপন্ন হয়ে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হই। (ভাব এই যে, দেববিভূতির প্রসাদে বাহির ও অন্তর শুদ্ধ হয়ে আমরা যেন ব্রহ্মলোক অর্থাৎ মুক্তি প্রাপ্ত হই– এই প্রার্থনা)। [আভ্যঃ–অদ্ভঃ, অপামধিষ্ঠাতৃ-দেববিভূতিভ্যঃ; শুচিঃ–স্নানেন শুদ্ধঃ, বহিঃশুদ্ধিযুক্ত ইতি ভাবঃ, পূতঃ–আচমনাদিভিরন্তঃশুদ্ধঃ, সত্ত্বভাবাপন্ন ইতি ভাবঃ] (২)। হে দেববিভূতি! তুমি দীক্ষণীয় ও উপসদ ইষ্টির (অর্থাৎ সকর্ম-সমূহের) তনু অর্থাৎ শরীরের মতো প্রধান হয়ে থাকো। ৬ কল্যাণপ্রদা সুখস্বরূপা সেই তোমাকে শুভঙ্কর সত্ত্বভাব পাবার জন্য আশ্রয় করছি। (ভাব এই যে, সত্ত্বভাব পাবার জন্য সৎকর্মের ফলদানকারী দেবকে আশ্রয় করছি)। [দীক্ষাতপসোঃ– দীক্ষণীয়োপসদিষ্টিকর্মণণাঃ, সৎকর্মসমূহস্য ইতি ভাব; তঃ–শরীরবদ অঙ্গী, প্রধানা ইতি ভাবঃ; শিবাং-কল্যাণপ্রদাং; শগ্নাং–সুখস্বরূপাং; ভদ্রং–মঙ্গলময়ং]।(৩)
৩। হে দেব! আপনি এই ভূমির অর্থাৎ এই মর্ত্যলোকের জলরূপ (জ্ঞানভক্তিস্বরূপ) হন। (ভাব এই যে, জল যেমন ভূমির আর্দ্রভাব জন্মায়, তেমন আপনি মর্ত্যলোকের রসাদ্রভাব অর্থাৎ ভক্তি ও জ্ঞান জন্মিয়ে থাকেন); এবং আপনি জ্ঞানতেজঃ প্রদ হন; অতএব আমাকে (জ্ঞানতেজোহীনকে) জ্ঞানরূপ তেজঃ বিতরণ করুন। [মহীনাং– ভূমীনাং, মত্যলোকানামিতি ভাবঃ; পয়ঃ– জলরূপ; জ্ঞানভক্তিরূপঃ ইতি ভাবঃ; বৰ্চঃ জ্ঞানতেজঃ] (১)। হে দেব! আপনি, অজ্ঞানরূপ অথবা বাহ্য ও অন্তর শত্রুরূপ অসুরের নাশে শক্তিস্বরূপ হন; (ভাব এই যে,–যেমন কণীনিকা দৃষ্টিশক্তির মূল কারণ, তেমনই আপনি অজ্ঞান নাশের অথবা বাহ্য ও অন্তর শত্রু নাশের মূল কারণ) হে দেব! আপনি অজ্ঞানতানাশক অথবা শত্রুনাশক বলে জ্ঞানদৃষ্টিপ্রদ হন। অতএব, আমায় জ্ঞানচক্ষু প্রদান করুন। (ভাব এই যে,–হে দেব আপনি অজ্ঞানতানাশক ও বহিরন্তঃশত্রুনাশক; অতএব আপনি আমাদের অজ্ঞানতা ও বহিরন্তঃশত্রু বিনাশ করে আমাদের জ্ঞানচক্ষুঃ প্রদান করুন)। [বৃত্রস্য–অসুরস্য–অজ্ঞানরূপস্য, বহিরন্তঃরূপস্য; কনীনকঃ তস্য নাশশক্তিরূপঃ; চক্ষুঃজ্ঞানচক্ষুঃ]](২)
৪। জ্ঞানাধিপতে, আমাকে পবিত্র করুন। [চিৎপতি–জ্ঞানাধিপতিঃ; পুনাতু–পবিত্রীকরতু]।(১)। বাত্ময়াধিদেব, আমাকে পবিত্র করুন। [বাপতিঃ– বাত্ময়াধিদেবঃ]](২)। জগৎপ্রসবকর্তা (অর্থাৎ জগতের আদি-কারণ) লীলাময় ভগবান, অবিচ্ছিন্ন শুদ্ধিকারক (অজ্ঞানতা-নাশক) সেই জ্ঞানরশ্মির দ্বারা আমাকে জ্ঞানেনাদীপ্ত করুন। হে জ্ঞানাধিপতে। আপনি জ্ঞানপূত (জ্ঞানময়) ও প্রসিদ্ধ (সাধকগণ কর্তৃক অনুভূত)। আপনার যে স্বরূপ (জ্ঞানময়ত্ব-জ্ঞান) আমি কামনা করছি, সেই স্বরূপ যেন পেতে পারি এবং তার দ্বারা পূত হতে সমর্থ হই। (ভাব এই যে, –হে ভগবন্! আমি তত্ত্বজ্ঞানাভিলাষী। যাতে সেই বস্তু প্রাপ্ত হয়ে পূত হতে পারি, আপনি তার বিধান করুন)। [সবিতাজগৎপ্রসবকর্তা, জগতামাদিকারণঃ; সূর্যস্য-জ্ঞানালোকস্য; পবিত্ৰপতে জ্ঞানাধিপতে]।(৩)। [এই কণ্ডিকার তিনটি মন্ত্রই প্রার্থনামূলক]।
৫। হে দেবভাব অর্থাৎ দেববিভূতিগণ! আমাদের অনুষ্ঠিত এই আন্তরযজ্ঞে (অথবা আত্মার উদ্বোধন যজ্ঞে) আমরা আপনাদের আনুকূল্য প্রার্থনা করছি। আর, হে দেববিভূতিগণ! এই যজ্ঞসম্বন্ধিনী আর্শীবাণী (অর্থাৎ এই যজ্ঞের শুভফল) পাবার জন্য আপনাদের আহ্বান করছি। (ভাব এই যে, হে দেবগণ! আমাদের এই মানস-যজ্ঞে অথবা আমাদের উদ্বোধনরূপ যজ্ঞে আপনাদের অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। আপনারা এই যজ্ঞ সম্পূর্ণ করে দিন এবং সকর্মের শুভফল–মোক্ষফল প্রদান করুন)। [দেবাসঃ–হে দেবভাবঃ; বামং বননীয়ত্বং, আনুকূল্যং ইতি। ভাবঃ] (১)। [কণ্ডিকার এই মন্ত্রটি প্রার্থনার ভাব প্রকাশ করছে।
৬। চিত্তের উদ্বোধনরূপ যজ্ঞকে যেন স্বাহার (স্বাহা নামক অগ্নির স্ত্রীর) মতো প্রাপ্ত হই। অথবা, চিত্তের দ্বারা দর্শপৌর্ণমাস ইত্যাদিরূপ সৎকর্ম যেন পাই। (ভাব এই যে, আমার মানস-যজ্ঞ যেন সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়)। [মনসঃ–চিত্তস্য; যজ্ঞং–আত্ম-উদ্বোধনরূপং যজ্ঞং; অথবা, মনসঃ–মনসা–চিত্তেন; যজ্ঞং-দর্শপৌর্ণমাসাদিরূপং সৎকর্ম; স্বাহা–প্রাপ্লেমি, সম্যক্ সাধয়ামিতি ভাবঃ)।(১)। সেই উদ্বোধনরূপ যজ্ঞ (মানস-যজ্ঞ) অথবা সৎকর্ম মহৎ অন্তরিক্ষলোক (বিশ্ব) ব্যাপিয়া প্রকাশ পায়। (ভাব এই যে, সঙ্কর্মের দ্বারা সত্ত্বভাব উপজিত হলে বিরাট বিশ্বময়ের স্বরূপ অবগত হওয়া যায়)। [স্বাহা–স উদ্বোধন যজ্ঞঃ, সকর্ম। বা]।(২)। সেই উদ্বোধন-রূপ যজ্ঞ অথবা সৎকর্ম ভূলোক ও স্বর্গলোক ব্যেপে প্রকাশ পায়। (ভাব এই যে,–সৎকর্মের প্রভাবে দেববিভূতি অধিগত হয়) (৩)। সেই উদ্বোধন-যজ্ঞ অথবা সকর্মকে যেন আমি সত্ত্বভাব হতে আরম্ভ করি অর্থাৎ সত্ত্বভাব সহযুত হয়ে আমি যেন সেই কার্যে প্রবৃত হতে পারি। সেই কার্য (আমার মানস-যজ্ঞ) সিদ্ধ হোক। (ভাব এই যে, যে জ্ঞানময় দেব উদ্বোধনরূপে বিরাজ করেন, যিনি স্বর্গ অন্তরীক্ষ মর্ত–এই ত্রিলোক ব্যেপে আছেন, তাকে যেন সত্ত্বভাবের দ্বারা অধিগত করতে সক্ষম হই)। [স্বাহা–তৎ উদ্বোধনযজ্ঞং, সৎকর্ম বা; স্বাহা–তৎসিদ্ধমস্তু ইত্যর্থঃ] (৪)। [এই কণ্ডিকার মন্ত্র চারটিতে আত্মার উদ্বোধনের ভাব প্রকাশ পেয়েছে]।
৭। আত্মার উদ্বোধন করব এমন সঙ্কল্প-সিদ্ধির জন্য (আমার অনুষ্ঠিত মানস-যজ্ঞ পরিপূরণার্থ) সঙ্কল্প-সিদ্ধির প্রযোজক (অথবা সিদ্ধিদাতা) সেই জ্ঞানদেবের উদ্দেশ্যে আমার এই সত্ত্বভাব সমর্পিত হোক। [আকুত্যৈ–আত্মেঘদ্বাধনং করিষ্যামীত্যেৰং বিধায় সঙ্কল্পায় তৎসিদ্ধর্থমিতি ভাবঃ, অনুষ্ঠীয়মানমানস যজ্ঞপূর্ণার্থমিতি যাবৎ; অগ্নয়ে-জ্ঞানদেবায়]।(১)। ভগবৎ বিষয়ে ধারণাশক্তি-লাভের জন্য, মনের অধিষ্ঠাতা সেই জ্ঞানদেবের উদ্দেশ্যে (আমার) এই সত্ত্বভাব সমর্পিত হোক। [মেধায়ৈ–ভগবদ্ধারণাশক্তয়ে, তল্লাভার্থমিতি.ভাবঃ]। ব্রত-নিয়ম অর্থাৎ সর্মসমূহ সিদ্ধির জন্য তপঃস্বরূপ সেই জ্ঞানদেবের উদ্দেশ্যে (আমার) এই সত্ত্বভাব সমর্পিত হোক। [দীক্ষয়ৈ–ব্রতনিয়মায়, সৎকর্মানিবহায়তৎসিদ্ধ্যর্থমিতি ভাবঃ] (৩)। বাসিদ্ধির জন্য, বাগিন্দ্রিয়পোষক সেই জ্ঞানদেবের উদ্দেশ্যে (আমার) এই সত্ত্বভাব সমর্পিত হোক। [সরস্বত্যৈ-বাচে, বাসিদ্ধয়ে ইতি ভাবঃ; পূষ্ণে-বাগিন্দ্রিয়পোষকায়]।(৪)। হে জলের অধিষ্ঠাত্রী! হে স্বর্গমর্তের অধিষ্ঠাত্রী! হে অন্তরীক্ষের অধিষ্ঠাত্রী! হে মহান্! হে বিশ্বব্যাপক! হে সকল সুখের জননী! হে দেববিভূতিসমূহ! তোমাদের ও দেবাধিদেবকে আমরা এই আমাদের হৃদয়গত সত্ত্বভাব দান করছি। এটি (সেই সত্ত্বভাব) তোমাদের প্রীতিপ্রদ হোক। [বিশ্বসম্ভুবঃ–সকলসুখজনয়িঃ; বৃহস্পতয়ে–দেবাধিদেবায়](৫)। [এই কণ্ডিকার পাঁচটি মন্ত্রই প্রার্থনা-মূলক]।
৮। সকল মনুষ্য, ফলদাতা সেই ভগবানের সাহায্য (আনুকূল্য) প্রার্থনা করেন। সকল জনই ধনের জন্য অর্থাৎ জ্ঞানধনের জন্য (পরমধন লাভের জন্য) ভগবানকে প্রার্থনা করেন। পুষ্টির জন্য (সত্ত্বভাব লাভের জন্য) দীপ্তিশালী যশঃ, অন্ন অথবা সত্ত্বভাব প্রার্থনা করেন। স্বাহা অর্থাৎ আমাদের প্রার্থনা সিদ্ধ হোক (অথবা আমাদের অনুষ্ঠিত কর্ম সুসম্পন্ন হোক) [এই কণ্ডিকার মন্ত্রটির ভাগবানের মহিমা প্রকাশ করছে]।(১)
৯। হে দেববিভূতিদ্বয় (অন্তৰ্বাধিবহিব্যাধিনাশক অশ্বিনীদ্বয়) আপনারা ঋক্ ও সাম বেদের (অথবা নিখিল শুদ্ধসত্ত্বভাবের) শিল্পী অর্থাৎ অভিব্যঞ্জক হন; সেই প্রসিদ্ধ (সাধকগণের অনুভূত) আপনাদের দুই জনকে আরাধনা করি; আপনারা আমাদের এই আরব্ধ আত্ম-উদ্বোধন যজ্ঞের সমাপ্তিকাল পর্যন্ত আমাকে রক্ষা করুন।(ভাব এই যে,–দেবতা আর দেববিভূতি অভিন্ন; সুতরাং আপনারা দুই জনও বেদের অভিব্যঞ্জক; অর্থাৎ নিখিল শুদ্ধসত্ত্বপ্রদাতা আপনারা আমাদের কর্তৃক আরাধিত হয়ে আমাকে রক্ষা করুন)। [ঋক্সাময়ো–তন্নামকবেদয়ো, যদ্বা নিখিলশুদ্ধসত্ত্বানামিতি ভাবঃ; যজ্ঞস্য–আত্মদ্বধনরূপস্য কর্মণঃ] (১)। হে দেব! আপনি মঙ্গলময় ও পরমসুখপ্রদাতা; আপনি আমাকে সুখ অর্থাৎ মঙ্গল প্রদান করুন। আপনাকে নমস্কার করি। আমাকে হিংসা করবেন না অর্থাৎ আমার প্রতি বিরূপ হবেন না। আমাকে পরিত্রাণ করুন।(২)। [আমরা মনে করি–এই মন্ত্র দুটি প্রার্থনার ভাব ব্যক্ত করছে। স্থঃ এই দ্বিবচনান্ত ক্রিয়াপদে দ্বিবচনান্ত কর্তৃপদ দ্যোতনা করছে। সেই অনুসারে দেববিভূতি অশ্বিদ্বয়কে (আধিব্যাধি-নাশক দেবতা দুজনকে) আমরা সম্বোধ্য মনে করেছি। তাদের নিকট প্রার্থনা জানান হচ্ছে, মা পাতমাস্য যজ্ঞস্যোদৃঢ়ঃ; অর্থাৎ, আমার এই আরব্ধ উদ্বোধনযজ্ঞের সমাপ্তি পর্যন্ত আমাকে পালন করুন; অর্থাৎ হে বহিরন্তৰ্বাধিনাশক দেবদ্বয়! যাতে এই ব্যাধি দুটি উদ্বোধন কার্যে ব্যাঘাত জন্মাতে না পারে, আপনারা তা-ই করুন। আমার শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি (পীড়া) বিনাশ করুন। সেই দেববিভূতি অশ্বিনী কুমারদ্বয় কেমন? ঋকসাময়য়াঃ শিল্পে অর্থাৎ ঋক্ ও সামবেদের শিল্পী অর্থাৎ অভিব্যঞ্জক। দেবতা ও দেববিভূতি–তত্ত্বতঃ একই পদার্থ। বিভূতিসমষ্টিই দেব বা ভগবান্। ব্যষ্টি তার বিভূতি। সুতরাং ভগবৎ-বিভূতি অশ্বিকুমার দুজনকে ঋক্ বা সামবেদের অতিব্যঞ্জক বলা যেতে পারে। তাদের বামারভে বলে আরাধনা করি–এই ভাব প্রকাশ করা যেতে পারে। যজ্ঞ শব্দের সাধারণ সোমবাগ ইত্যাদি অর্থ না ধরে বিশেষ উদ্বোধন-যজ্ঞ অর্থ আমরা গ্রহণ করি]।
১০। হে ভগবৎ-বিভূতে! আপনি অঙ্গিরস ঋষিদের অর্থাৎ সমস্ত মানবের অন্নরসস্বরূপ অর্থাৎ সত্ত্বভাবরূপ এবং উর্ণাতন্তর মতো মৃদুস্বভাব হন। সুতরাং আমার মতো দীনজনে অন্নরস অর্থাৎ সত্ত্বভাব স্থাপিত করুন। [আঙ্গিরস অঙ্গিরসাং ঋষীণাং সর্বজনানামিতি ভাবঃ সম্বধিনী]।(১)। হে ভগবৎ-বিভূতৈ! আপনি সত্ত্বভাবের গ্রন্থি অর্থাৎ সংযোজক হন। (প্রার্থনা,–আমাতে সত্ত্বভাব সংযোজিত করুন)। [সসামস্য–সত্ত্বভাবস্য]।(২)। হে ভগবৎ-বিভূতে! আপনি, ব্যাপক সৎকর্মসমূহের অর্থাৎ সেই নিমিত্তক সুখ-প্রাপ্তির হেতুভূত হন; অতএব যজমানকে (সকর্মকারী আমাকে) সুখ (পরমসুখ) প্রদান করুন। [বিষ্ণোঃব্যাপস্য, সৎকর্মনিবহস্য ইতি ভাবঃ; যজমানস্য–সকর্মকতুঃ]. (৩)। হে ভগবৎ-বিভূতে! আপনি, পরমেশ্বর্যশালী ভগবানের প্রাপ্তির কারণ হন। (প্রার্থনা–আমাকে ভগবৎপ্রাপ্তি-সামর্থ্য প্রদান করুন) [ইস্য–পরমৈশ্বর্যশালিনে ভগবতঃ; যোনি–প্রাপ্তিকারণং]।(৪)। হে ভগবৎ-বিভূতে! আপনি, কৃষ্টভূমিকে (অথবা চিত্তরূপ উৎকৃষ্ট ভূমিকে) ব্রীহিযব ইত্যাদি যুক্ত (অথবা সত্ত্বভাবাদিযুক্ত করুন। (প্রার্থনা, যাতে আমার হৃদয়ে সত্ত্বভাব উপচিত হয়, আপনি তার বিধান করুন)। [সুসস্যাঃ ব্রীহিযবাদিযুক্তাঃ, সত্ত্বভাবাদিশস্যযুক্তা বা]।(৫) হে সংসার-কাননের অধিপতি! আপনি সংসারীবর্গের আশ্রয়স্বরূপ হন। আপনি (আমাদের প্রতি) অনুকূল হয়ে (আমাদের) এই আরব্ধ সঙ্কর্মের উত্তরা (শেষ) ঋক্ পর্যন্ত অর্থাৎ সমাপ্তি পর্যন্ত আমাকে পাপ হতে রক্ষা করুন। (প্রার্থনা, সমস্ত পাপ থেকে বিমুক্ত করে আমাকে সৎকর্মের শুভফল প্রদান করুন)। [বনস্পতে–হে সংসারারণ্যানাং পতেঃ; যজ্ঞস্য সৎকর্মণঃ; আ উদৃচঃ–উত্তরায়া, ঋচঃ পর্যন্তং, সমাপ্তিং যাবৎ ইতি ভাবঃ] (৬)
মন্ত্ৰার্থঃ– ১। হে আমার হৃদয়াধিষ্ঠিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি প্রজানরূপী ভগবানের শরীররূপ (অঙ্গীভূত অথবা তার বিভূতিরূপ বা ধারক) হও; অতএব, বিশ্বব্যাপক ভগবানের প্রীতির জন্য তোমাকে নিয়োজিত করছি। (ভাব এই যে, শুদ্ধসত্ত্ব ভগবানের স্বরূপ; শুদ্ধসত্ত্বের সাহায্যেই ভগবানকে পাওয়া যায়)। [অগ্নেঃ– প্রজ্ঞানরূপস্য ভগবতঃ, বিষ্ণবে–বিশ্বব্যাপকায়, ভগবৎপ্রীতয়ে।(১)। হে আমার হৃদয়াধিষ্ঠিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবানের শরীররূপ বা অঙ্গীভূত (অথবা তার বিভূতিরূপ বা প্রকাশক) হও। অতএব, বিশ্বব্যাপী ভগবানের প্রীতির জন্য অথবা তাকে লাভ করবার জন্য তোমাকে উৎসর্গ করছি। (সত্যের দ্বারা সৎস্বরূপ ভগবানকে পাওয়া যায়। অতএব শুদ্ধসত্ত্বের এবং সভাব ইত্যাদির দ্বারা যাতে ভগবানের সন্নিকর্ষ লাভ করতে পারা যায়, তা করব)। [সোমস্য–সস্বরূপস্য ভগবতঃ]।(২)। হে আমার হৃদয়াধিষ্ঠিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি অতিথিরূপে জগৎপ্রীতিকর (অথবা অতিথিরূপে সকলের পূজ্য) ভগবানের প্রীণনসাধনভূত উপকরণ বা তুষ্টিসম্পাদক হও। অতএব, বিশ্বব্যাপনশীল ভগবানের প্রীতির জন্য তোমাকে উদ্বুদ্ধ বা নিয়োজিত করছি। (ভাব এই যে,ভগবান্ অতিথিরূপে জগতের আরাধনীয়। তার আরাধনার প্রধান উপকরণ সম্ভব ও শুদ্ধসত্ত্ব। তাই সঙ্কল্প–ভগবানের প্রীতির জন্য হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্বভাবকে নিয়োজিত করি)। [অতিথে–অতিথিরূপেন জগৎপ্রীতিকরস্য ভগবতঃ, যদ্বা– সর্বেষাং পূজাৰ্হস্য ভগবতঃ; আতিথ্যং-প্রীণনসাধনমূপকরণং তুষ্টি সম্পাদকং বা] (৩)। হে আমার হৃদয়াধিষ্ঠিত শুদ্ধসত্ত্ব! সোম-আনয়নকর্তা অথবা হৃদয়ে সৎ-ভাবজনয়িতা, ভক্তিমান্ অৰ্চনাকারিদের প্রতি শ্যেনের মতো ক্ষিপ্রগমনকারী, ভগবানের প্রীতির জন্য অথবা সৎকর্ম সাধনের জন্য, তোমাকে আহরণ করছি; এবং বিশ্বব্যাপক ভগবানের উদ্দেশ্যে অথবা তাকে লাভ করবার জন্য তোমাকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠাপিত করছি। (সৎকর্মের এবং সম্ভবের দ্বারা পরিতুষ্ট হয়ে ভগবান্ ত্বরায় ভক্তের উদ্ধারসাধন করেন। অতএব সঙ্কল্প–সত্তাবের উন্মেষে সকর্মের সাধনে হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্ব আহরণ করে মোক্ষলাভের জন্য তাকে নিয়োজিত করব)। [সোমভৃতে–সোমানয়নকত্রে, হৃদি সদ্ভাবজনয়িত্রে]।(৪) হে আমার হৃদয়-নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! পরমার্থরূপ ধনসমূহের পুষ্টিদানকারী জ্ঞান জ্যোতিঃ লাভের জন্য তোমাকে উদ্বুদ্ধ করছি। অপিচ, বিশ্বব্যাপী ভগবানের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রীতির জন্য তোমাকে সমর্পণ করি।(ভাব এই যে, জ্ঞানই পরমার্থপ্রদ। শুদ্ধসত্ত্বের সাহায্যে জ্ঞানকিরণ আহরণ করে ভগবৎপ্রাপ্তির জন্য তাকে নিয়োজিত করি)। [রায়ষ্পেষদে–পরমার্থরূপধনানাং পুষ্টিদায়িনে; অগ্নয়ে–জ্ঞানজ্যোতিঃ লাভায়]।(৫)।
২। হে আমার হৃদয়-নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি জ্ঞানময় ভগবানের প্রজননের হেতুভুত বা প্রাপ্তির কারণ হও। (ভাব এই যে, শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা জ্ঞানের উৎপত্তি ঘটে এবং জ্ঞানের সাহায্যে ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া ১ যায়)। [অগ্নেঃ–প্রজ্ঞানময়স্য ভগবতঃ] (১)। হে শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূত জ্ঞানকর্ম! তোমরা অভীষ্টবর্ষক সর্বাভীষ্টপূরক অথবা মোক্ষপ্রদায়ক হও। (ভাব এই যে, সৎ-জ্ঞান ও সৎকর্মের দ্বারা মানুষ অভীষ্ট লাভে সমর্থ হয়)। [বৃষণৌ–সেক্তারৌ, অভীষ্টবর্ষকৌ সর্বাভীষ্টপূরকৌ বা, মোক্ষপ্রদায়কৌ ইত্যর্থঃ] (২)। হে শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূতে ভক্তিরূপিণী দেবি। তুমি মহতের বশকারী অথবা মহাদীপ্তিবিশিষ্টা ষড়ৈশ্বর্যশালিনী হও। (ভাব এই যে, বিশুদ্ধা (অনন্যা) ভক্তির দ্বারা মহান্ ঐশ্বর্যশালী ভগবানও বশীভূত হন, অপিচ, ভক্তির দ্বারাই তিনি ভক্তের সাথে সম্মিলিত হয়ে তার উদ্ধার-সাধন করেন)। [উর্বশী–মহান্তং বশয়িত্রী, মহাদীপ্তিবিশিষ্টা, যদ্বাষড়ৈশ্বর্যশালিনী] (৩)। হে আমার হৃদয়াধিপতি শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি আয়ুঃ-দাতা অথবা অকালমৃত্যুর নিবারক হও। (ভাব এই যে, সৎ-ভাবের প্রভাবে মানুষ পূর্ণ-আয়ুষ্কাল পর্যন্ত জীবিত থাকে। প্রার্থনা, আমাকে পূর্ণ-আয়ুষ্কাল বা চিরজীবন প্রদান করুন)। [আয়ু–আয়ুষো দাতা, অকালমৃত্যুনিবারয়িতা] (৪)। হে শুদ্ধসত্ত্বরূপী দেব! তুমি বহুপ্রদাতা বা বহুফলদাতৃত্বহেতু অভীষ্ট-পূর্বক হও। (প্রার্থনা, আমাকে অভীষ্ট মোক্ষফল প্রদান করো)। [পুরূরবা বহুপ্ৰদাতা, বহুবিধফলপ্রদাতৃত্বাৎ অভীষ্টপূরকঃ ইত্যর্থঃ]।(৫)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! গায়ত্রীছন্দোবদ্ধ ব্ৰহ্মমন্ত্রের বা স্তুতির দ্বারা তোমাকে হৃদয়ে উদ্দীপিত করি। [মন্থমি-জনয়ামি, হৃদি সন্দীপয়ামীতি ভাবঃ] (৬)। ত্রিষ্ঠুভছন্দোবদ্ধ ব্ৰহ্মমন্ত্রের তা স্তুতির দ্বারা তোমাকে হৃদয়ে উৎপন্ন। করি।(৭)। জগতীচ্ছন্দোবিশিষ্ট ব্রহ্মমন্ত্রের উচ্চারণ বা স্তুতির দ্বারা তোমাকে উৎপন্ন করি। (ভাব এই যে, নিখিল সৎ-ভাবমূলক সৎকর্মগুলির দ্বারা অজ্ঞানতা দূর করে প্রজ্ঞানতা লাভ করব, অপিচ শুদ্ধসত্ত্ব দেবভাব সঞ্চয় করব)। [এই কণ্ডিকার প্রথম, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম মন্ত্র শুদ্ধসত্ত্বের সম্বোধনে, দ্বিতীয় মন্ত্র শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূত জ্ঞান-কর্মের এবং তৃতীয় মন্ত্র শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূতা ভক্তির বা ভক্তিরূপিণী দেবীর সম্বোধনের বিনিযুক্ত।–এই কণ্ডিকার মন্ত্রগুলির ভাষ্যপাঠে অনেকে এগুলিকে অশ্লীলতাপূর্ণ বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু একটু অভিনিবেশ-সহকারে দেখলে, মনে আপনা-আপনিই প্রশ্ন ওঠে,–নিত্য-সত্য বেদ-মন্ত্র সত্যই কি অশ্লীলতাময়? উত্তর আপনিই আসে–তা কখনই হতে পারে না।–ভাষ্যকারের মতে, প্রথম মন্ত্রটি শকল নামক দেবতার সম্বোধনে বিনিযুক্ত। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্রে অরণির সম্বোধন আছে। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম–এই তিনটি মন্ত্র অরণিদ্বয়-ঘর্ষণে প্রযুক্ত হয়েছে। আমরা তা মনে করি না, এবং আমাদের মত উপরে বর্ণিত হয়েছে। মন্ত্রের অন্তর্গত বৃষণৌ, উর্বশ্রী, পুরূরবা ও আয়ু প্রভৃতি পদ চারটির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণেই যত কিছু গণ্ডগোলের এবং অশ্লীলতার সৃষ্টি হয়েছে। — বৃষণ অর্থে সাধারণতঃ সেচক বোঝায়। তাতে ভাষ্যমতে, মন্ত্রের অর্থ হয়,সন্তান উৎপাদনে মুম্বুদ্বয় যেমন বীর্যসেচক হয়, তেমনি হে দৰ্ভৰ্দয়, অরণিদ্বয়-মন্থনে অগ্নি উৎপাদনে তোমরাও মুম্বুবৎ হও।– কিন্তু আমরা মনে করি, বর্ষাণার্থক বৃষ ধাতু থেকে বৃষণ পদের উৎপত্তি। আর তা থেকেই বৃষণ পদের অর্থ করি,–অভীষ্টবষ্টকৌ, সর্বাভীষ্টপূরকৌ বা মোক্ষপ্রদায়কৌ। এখানে আমাদের সম্বোধ্য জ্ঞান ও কর্ম। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্রে প্রকারান্তরে উর্বশী-পুরূরবার পৌরাণিক উপাখ্যানের সম্বন্ধ টেনে আনা হয়েছে। কিন্তু একটু অভিনিবেশ সহকারে বিচার করে দেখলে, মন্ত্রের সাথে কোনই পৌরাণিক উপাখ্যানের সম্বন্ধ সূচিত হয় না। যে শব্দ তিনটিকে অবলম্বন করে ঐ উপাখ্যানের বিষয় প্রখ্যাপিত হয়ে থাকে, সে দৃষ্টিতে সে অর্থও সম্পূর্ণ উল্টিয়ে যায়, আর তাতে মন্ত্রে এক অভিনব ভাবের সূচনা হয়। যেমন,–উর্বশী শব্দ–উরু+বশ+অ(অ) এইরকম নিষ্পন্ন হয়। উরু শব্দে মহৎ, এবং বশ অর্থে বশীভূত করাঅর্থ বুঝিয়ে থাকে। তাতে উর্বশী পদের অর্থ হয়,–মহৎকে যিনি বশীভূত করতে সমর্থ। উরু–মহৎ শব্দে ভগবানকে বোঝায়।–পুরূরবাঃপদে, আমাদের মতে, নৃপবিশেষকে বোঝায় না। আমাদের মতে, ঐ পদের অর্থ–বহুপ্রদাতা, যদ্বা বহুবিধফলপ্ৰদাতৃত্বাৎ অভীষ্টপূরক। আমরা মনে করি, পুরূরাবা বা পূরূরাবন্শব্দ থেকে পুরুররা পদ নিষ্পন্ন। তা থেকেই বহুফলপ্রদাতা এবং তা থেকেই অভীষ্টপূরক অর্থ অধ্যাহৃত হয়ে থাকে। শুদ্ধসত্ত্ব যে অভীষ্টপূরক-ভগবৎ-প্রাপ্তির মূলীভূত, সে বিষয় আর বেশী আলোচনার অপেক্ষা রাখে কি?–তৃতীয় মন্ত্রের আয়ুঃ পদের লক্ষ্যও পুরূরবার ঔরসে স্বর্বেশ্যা উর্বশীর গর্ভজাত পুত্র আয়ুকে নয়। তাতে পূর্ণায়ুষ্কাল বিধাতা–মৃত্যুভয়নিবারণকারী হৃদয়াধিষ্ঠিত শুদ্ধসত্ত্বকেই বোঝাচ্ছে। জীবের সংহারে অবস্থিতির বা জীবিত কালের একটা সময় নির্দিষ্ট আছে; কিন্তু মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট নেই। বিষয়টি একটু প্রহেলিকাময়। নির্দিষ্ট কাল পূর্ণ না হলে যদি জীব দেহত্যাগ না করে, তাহলে মৃত্যুরও নির্দিষ্ট সময় না থাকবে কেন? তার কারণ এই যে, জীব যদিও নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল নিয়ে সংসারে উপস্থিত হয়, কিন্তু কৃতকর্মের দ্বারা-পাপে বা পুণ্যানুষ্ঠানে স্বল্পায়ুঃ বা দীর্ঘায়ু হয়ে থাকে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিজের অভীষ্টসিদ্ধির জন্য জীব যখন ইতস্ততঃ ধাবমান হয়, তখন মায়া বা অবিদ্যার সহচর পাপ এসে তার মোহ উৎপাদনে প্রয়াস পায়। যদি পূর্বসুকৃতি বলে বা সভাবের প্রভাবে হৃদয়স্থিত দেবভাব শুদ্ধসত্ত্বের অনুকম্পায় সে, সেই প্রলোভনে বশীভূত না হয়, তবেই তার কল্যাণ সাধিত হয়; নচেৎ সে পাপের অতল তলে ডুবে মরে। সৎকর্মে সৎ-ভাবে মানুষ দীর্ঘজীবন লাভ করে বা নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল তো বটেই, এমন কি তা-ও অতিক্রম করে জীবিত থাকতে পারে।পাপ কার্যে আয়ুক্ষয় হয়–অকাল মৃত্যু ঘটে। সৎকর্মের দ্বারা সৎ-ভাব-সঞ্চয়ে সংসারে প্রধাবিত হলে, পাপ মানুষকে স্পর্শ করতে পারে না; জ্ঞানবহ্নিতে বিদগ্ধ হয়ে পাপ নির্মূল হয় হৃদয় জ্ঞানের অরুণ আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। জীবের কর্ম-ফলভোগ অবশ্যম্ভাবী; সুতরাং সৎকর্মে সুফল-লাভ এবং কুকর্মে দণ্ডভোগ–অনিবার্য। কুকর্মকারীর জীবন-মৃত্যু দুটিই সমান। মন্ত্রের তাই ভাব এই যে, শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে সঙ্কর্মের অনুষ্ঠানে যেন অকালমৃত্যু নিবারণ করে পূর্ণায়ুষ্কাল ভোগ করতে পারি, আমরা যেন চিরজীবন বা ভগবৎসামীপ্য লাভ করতে সমর্থ হই]।
৩। সকর্মসঞ্জাত হে জ্ঞানভক্তিরূপী দেবদ্বয়! (আমার হৃদয়-নিহিত এবং আমার হৃদয়গৃহস্বামী অথবা হৃদয়রূপ গৃহের পালকরূপে বিদ্যমান শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূত হে জ্ঞানাধিদেব!) আপনারা উভয়ে আমাদের সাথে সমান-মননযুক্ত অথবা আমাদের প্রতি অতিশয় প্রীতিযুক্ত, পরস্পর সমান-চিত্তযুক্ত অথবা আমাদের প্রতি অনুগ্রহের জন্য পরস্পর সখিত্বসম্পন্ন, এবং পাপরহিত অর্থাৎ অজ্ঞান ইত্যাদির দ্বারা অনভিভূত অথবা আমাদের অনুষ্ঠানেও আমাদের প্রতি অনুগ্রহ পরায়ণ হোন। অপিচ, সৎকর্মকারী আমাকে এবং আমার অনুষ্ঠিত কর্মকে বিনাশ করবেন না (অর্থাৎ আমাকে এবং আমার কর্মকে পরিত্যাগ করবেন না); পরন্তু অদ্য অর্থাৎ সর্বকালে আমাদের উপকারের জন্য আপনারা কল্যাণকারী ও মঙ্গলপ্রদ হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। ভাবার্থ– আমাতে জ্ঞান ও ভক্তি অবিচলিত হোক। আর, আমাদের কর্ম জ্ঞানের অনুসারী ও সৎ-ভাবমণ্ডিত হাক)। [হে জাতবেদসৌ–সৎকর্মণ্য সঞ্জাতৌ জ্ঞানভক্তিরূপৌ দেবৌ, মম হৃন্নিহিতৌ তথা মম হৃদয়গৃহস্বামিনৌ, যদ্বা–হৃদয়রূপগৃহস্য পালকরূপেণ বিদ্যমানৌ শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূতৌ হে জ্ঞানধিদেব! যজ্ঞপতিং–সৎকর্মানুষ্ঠাতারং–মামিতি ভাবঃ; শিবৌ কল্যাণকারিণৌ, মঙ্গলপ্রদৌ বা]।
৪। আত্ম উৎকর্ষ-সম্পন্ন জনের অথবা অতীন্দ্রিয়-দ্রগণের পুত্রস্থানীয় অর্থাৎ তাদের সৎকর্ম ইত্যাদি হতে সঞ্জাত, অভিসম্পাত অর্থাৎ পাপ হতে পরিত্রাণকারী, প্রজ্ঞান-স্বরূপ ভগবান, হৃদয় বিহিত শুদ্ধসত্ত্বে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বকে প্রাপ্ত হয়ে পরিচর্যা করেন অর্থাৎ সেই শুদ্ধসত্ত্বনিহিত হবিঃ বা ভক্তিকে গ্রহণ করেন। (ভাব এই যে, সম্ভব–শুদ্ধসত্ত্ব ভগবানের প্রীতির সামগ্রী। তা ভগবানের তৃপ্তিসাধক এবং তার দ্বারাই ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। [ঋষিণাং পুত্রঃ–আত্মোৎকর্ষসম্পন্নানাং অতীন্দ্রিয়দ্রষ্টুণাং বা পুত্রস্থানীয়ঃ, যদ্বা–তেষাং সৎকর্মাদিভিঃ সঞ্জাতঃ; অগ্নৌঃ হৃন্নিহিতৌ শুদ্ধসত্ত্বেী] (১)। তথাবিধ প্রজ্ঞানরূপী সেই আপনি, হে ভগবন্! আমাদের অভীষ্টসিদ্ধির জন্য অথবা পরমার্থ-প্রদানের জন্য, সুখদায়ক অথবা কল্যাণপ্রদ অর্থাৎ পরমানন্দদায়ক হয়ে, অপিচ সর্বকালে আমাদের প্রমাদপরিশূন্য করে অথবা (আমাদের প্রতি) অনোন্যচিত্ত হয়ে, শোভনযাগ অর্থাৎ পরমসুখসাধক সকর্ম ও সম্ভাবগুলির দ্বারা, সর্বদা সকল স্থানে বা আমাদের অনুষ্ঠিত সকল কর্মে, দেবগণের উদ্দেশ্যে অর্থাৎ প্রীতির জন্য অথবা আমাদের মধ্যে নিখিল দেবভাবের প্রজননের জন্য, আমাদের প্রদত্ত হবিঃ দেবগণকে প্রাপ্ত করুন, অর্থাৎ তাদের শুদ্ধসত্ত্ব অথবা হৃদয়ের ভক্তিভাব প্রদান করুন। এই হবিঃ স্বাহামন্ত্রে আপনাকে অর্পণ করছি অনুষ্ঠান সুহৃত হোক। (ভাব এই যে, সৎকর্মে এবং সৎ-ভাবে দেবভাব সঞ্চাত হয়। তার দ্বারাই সুদ্ধসত্ত্বের আধার ভগবান্ পরিতুষ্ট হন। অতএব প্রার্থনা,-হে ভগবন্! যাতে আমরা দেবভাবের অধিকারীও সৎকর্মপরায়ণ হই, আপনি তা-ই করুন)। [সঃ–তথাবিধঃ প্রজ্ঞানস্বরূপো ত্বং;স্যেনঃ– সুখদায়ক, কল্যাণপ্রদঃ, পরমানন্দদায়কো বাসন্নিতি যাবৎ] (২)।
মনস্ত আ প্যায়তাং বাক্ত আ প্যায়তাং প্রাণস্ত আ প্যায়তাং চক্ষুস্ত আ প্যায়তাং শ্রোত্ৰং ত আ প্যায়। যত্তে ক্রুতং যদাস্থিতং তত্ত আ প্যায়তাং নিষ্ঠ্যায়তাং তত্তে শুধ্যত্ শমহোভ্যঃ। ওষধে ত্ৰায়স্ব স্বধিতে মৈনং হিংসীঃ১৫৷৷ . মন্ত্ৰার্থঃ– ১। (যজ্ঞের স্তম্ভ প্রোথিত করার জন্যে গহ্বর খননের জন্যে অভ্ৰীটিতে উত্তোলিত করে) হে অভ্রে! সবিতাদেবের অনুজ্ঞায় বিদ্যমান (আমি) তোমায় অশ্বিনীর বাহু এবং পূষার হস্ত থেকে গ্রহণ করি। তুমি স্ত্রীরূপা। গহুর খননের নিমিত্ত তোমায় ভূমিতে পুনঃ পুনঃ আঘাত করে আমি রাক্ষসগণের মুণ্ড অবধি ছেদন করি। (যবগুলিকে জলে নিক্ষেপ করে) হে যবঃ! তুমি যববিশেষ (পৃথক করার শীলযুক্ত)। তুমি আমাদের থেকে দ্বেষ দূরীভূত করো এবং আমাদের থেকে অদাতাগণকে পৃথক্ করো।(যুপটিকে প্রোক্ষণ করে) হে যুপের অগ্রভাগ! দ্যুলোকের নিমিত্তরূপী হয়ে আমি তোমায় শুদ্ধ করি। হে যুপের মধ্যভাগ! অন্তরিক্ষের নিমিত্ত আমি তোমায় প্রেক্ষিত করি। হে যুপের মূলভাগ! পৃথিবীর নিমিত্ত আমি তোমায় পবিত্র করি। (প্রেক্ষিত জলটিকে গহ্বরে নিক্ষেপ করে) পিতৃগণের প্রতিষ্ঠাস্থল ও সমাধি প্রভৃতি শুদ্ধ হোক। (গহ্বরের অভ্যন্তরে পূর্ব-উত্তরদিকে অগ্রভাগগুলিকে সাজিয়ে দৰ্ভগুলি পেতে দিয়ে) হে দর্ভযুক্ত গহ্বর! তুমি পিতৃজনের স্থিত হওয়ার স্থান।
২। স্তম্ভ (স্তম্ভটিকে গহ্বরে প্রবিষ্ট করিয়ে) হে যুপ! তুমি উর্দ্ধে বা স্বর্গে) উখিতকারী শক্তিগুলির মধ্যে সর্বাগ্রে অবস্থিত (যজ্ঞকর্মে তুমিই স্বর্গপ্রদানকারী)। হে যুপ! তুমি সুখে এই গহ্বরে প্রবেশকারী। আমাদের দ্বারা যূপকে গহ্বরে স্থাপনের পর গহ্বর এটি জ্ঞাত হবে যে ঘূপটি গহ্বরের ওপর স্থিত হবে। হে নূপ! তোমায় সবিতাদেব মধুর ঘৃতে (বর্ষাজলে) উপলিপ্ত করুন। সুফল যুক্ত ঔষধিগণের নিমিত্ত, হে নূপ! আমি তোমায় গহ্বরে ধারণ করি। হে ঘূপ! তুমি আপন অগ্রভাগের দ্বারা দ্যুলোককে স্পর্শ করো। আপন মধ্যভাগের দ্বারা তুমি অন্তরিক্ষ পূর্ণ করে দিয়েছ। হে যুপ! তুমি তোমার শেষ মূলভাগটির দ্বারা পৃথিবীকে দৃঢ় করেছো।
৩। হে যুপ! তোমার দ্বারা প্রাপ্য সেই উত্তম লোকে গমনের কামনা আমরা করে থাকি। যেথায় অগণিত শৃঙ্গসম্পন্ন ও সঙ্গতিপন্ন গাভীগণ বিদ্যমান (গাভী = রশ্মিবাজি)। এখানেই সেই মহাগতি বিষ্ণুর পরমপদ পূর্ণরূপে প্রকাশিত। (যুপটিকে গহ্বরে প্রোথিত করে) হে ব্রাহ্মণদের সপ্রাপ্ত, ক্ষত্রিয়দের সপ্রাপ্ত, ধন অন্নাদির প্রদাতা, আমি তোমায় গহুরে ধারণ করি। হে যজ্ঞ্যুপ! তুমি ব্রাহ্মণকে দৃঢ় করো, ক্ষত্রিয়েকে দৃঢ় করো, আয়ুকে দৃঢ় করো এবং আমার প্রজাগণকে (= সন্তানগণকে) দৃঢ় করো।
৪। হে ঋত্বিজগণ (বিদ্বানগণ)। বিষ্ণু (= যজ্ঞের) বীর কর্মরাশিকে অবলোকন করো, যে বিষ্ণুর থেকেই এই সমস্ত ব্রত উদ্যাপিত হয়েছে। এই বিষ্ণুই ইন্দ্রের পরম অনুকূল মিত্র।
৫। সেই বিষ্ণুর পরম পদ বিদ্বানগণ সর্বদাই দর্শন করে থাকেন, ঠিক সেই প্রকারে যেরূপে দ্যুলোকে পরিব্যাপ্ত নক্ষত্রমণ্ডলীকে নেত্রের দ্বারা দর্শন করি।
৬। (কুশের রঞ্জু বা দড়িকে নাভিমূলের উচ্চতায় যজ্ঞস্তম্ভে তিনবার আবেষ্টন করে) হে ঘূপ! তুমি রঞ্জু দ্বারা পরিবেষ্টিত। দেবগণের প্রজা মরুৎগণ বা পশু তোমায় পরিবেষ্ঠিত করুক। মনুষ্যগণের গো-অশ্বদিগণ এই যজমানকে পরিবেষ্টিত করুক। হে স্বরগণ! তোমরা দুলোকের পুত্র। হে যুপ! পৃথিবীতে এটি তোমার আশ্রয় স্থান। অরণ্যে উৎপন্ন পশুরাজি তোমার ভাগ।
৭। হে তৃণবিশেষ! তুমি সমীবর্তী হয়ে রক্ষাকারী মিত্রস্বরূপ। (একটি তৃণের দ্বারা পশুকে স্পর্শ করাব)। দেবগণের প্রজা পশু, স্বর্গ প্রাপক অগ্নি সোম প্রভৃতি হবির্ভাগ যেন দেবগণের সপ্রাপ্ত হয়। হে ধৃষ্টাদেব! তুমি যজমানের ধনস্বরূপ। হে পশো! তোমার হবির্ভূত মাংসাদি দেবগণ আস্বাদন করুন।
৯। হে পশো! সবিতাদেবের অনুজ্ঞায় বর্তমান আমি, অশ্বিনীগণকে বাহুর দ্বারা এবং পূষার হস্তদ্বারা অগ্নি এবং সোমের প্রীতিকর যে তুমি, সেই তোমাকে যুগে সংযোজিত করছি। (মন্ত্র পাঠ করে পশুটিকে স্তম্ভের সঙ্গে বাঁধতে হবে)। হে পশো! আমি তোমায় জল এবং দর্ভ প্রভৃতি ঔষধির দ্বারা প্রোক্ষণ করি। (দর্ভের দ্বার পশুদের ওপর জল ছিটিয়ে দেবে)। হে পশো! দেবগণের হবিঃ হবার নিমিত্ত তোমার মাতা তোমায় অনুমোদিত করুন; তোমার পিতাও তোমায় অনুমোদিত করুন। তোমার ভ্রাতার তোমায় অনুমোদিত করুন। একই যুথে উৎপন্ন তোমার মিত্রও তোমার অনুমোদন করুন। হে পশো! তোমায় আমি অগ্নি ও সোমের প্রীতিকারক জেনে প্রেক্ষিত করছি।
১০। হে পশো, তুমি জলপান করে থাকো। (পশুর নিম্ন উদরাদি ভাগকে প্রেক্ষণ করবে) হে পশো তোমায় আপো দেবী আস্বাদ্য (= পবিত্র) করে তুলুন–কারণ পবিত্ৰীকৃত হয়ে সুস্বাদু পশু-মাংশ দেবতার হবিঃ রূপে পরিণত হয়। (মন্ত্রপাঠ করে পশুর সর্বাঙ্গে জল ছেটাবে) হে পশো! তোমার প্রাণ যেন বাহ্য প্রাণের সাথে সংযুক্ত হয়, সঙ্গত হয়ে অবস্থান করে। তোমার বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেন যথাবিধানে সেই সেই যজনীয় দেবতার সাথে সঙ্গত হয় এবং এই যজমান যজ্ঞস্বামী যেন অভীষ্ট স্বর্গাদির আশীষে আরো সঙ্গতিসম্পন্ন হয়ে ওঠেন।
১১। (পশুবধের জন্যে নিযুক্ত শমিতা, ব্যক্তির হাত থেকে অসি এবং স্বরু হাতে নিয়ে এবং সে দুটিকে ঘিয়ে আলিপ্ত করে) হে অসে–স্বরুগণ! ঘৃত দ্বারা আপ্লুত তোমরা দুজন এই বধ্য পশুটিকে রক্ষা করো। হে ধনকামনাযুক্ত স্তুতিপূর্ণ বাণী! তুমি যজমানের প্রিয় ধনাদিকে ধারণ করো। তুমি এই যজমানে প্রবেশ করো। হে স্তুতি! বায়ুদেবের সাথে সম্প্রীতি প্রাপ্ত হয়ে তুমি এই আসন্ন বধ্য পশুটিকে বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষে বিদ্যমান রাক্ষসাদির থেকে রক্ষা করো। তুমি স্বয়ং এই পশুহবির দ্বারা দেবতাদের যাজন করো এবং এই বধ্য পশুটির সাথে একাত্ম হও। হে বর্ষা হতে উৎপন্ন তৃণ! তুমি এই যজ্ঞের স্বামী যজমানকে ফলযুক্ত যজ্ঞে নিহিত করো। (মন্ত্রপাঠ করে পশুর নীচে, ভূমিতে তৃণদল রাখবে।) দেবতার জন্যে এই পশুহবি–দেবতার জন্যে এই পশুহবি।
১২। (পশুর মেদ চর্বি পৃথক করার জন্যে ব্যবহৃত দুটি কাঠের দ্বারা পশুটিকে বাঁধবার রঞ্জুটিকে মাটিতে ফেলে দিয়ে) হে রঞ্জু! তুমি সর্পের আকার বা অজগরের আকার কোনটাই ধারণ কোর না। হাত-মুখ প্রক্ষালনের নিমিত্ত জলের ঘড়াটিকে হাতে নিয়ে চলা যজমান-পত্নীকে পশুর নিকট নিয়ে গিয়ে প্রতিস্থাতা এই মন্ত্রটি পাঠ করাবেন। যজমান-পত্নী বললেন- হে বিস্তার প্রাপ্ত যজ্ঞ! তোমায় নমস্কার করি। তুমি শত্রুরহিত হয়ে সমাপ্ত হও। যজ্ঞমার্গে প্রাপ্ত আহুত ঘৃতের ধারাকে উদ্দেশ্য করে তুমি প্রবর্তমান হও।
১৩। হে হস্ত-পদ প্রক্ষালনের ঘটে সুষ্ঠুভাবে অবস্থিত জলসমূহ! শুদ্ধরূপী তোমরা, এই পশুটির শুদ্ধিকরণের দ্বারা দেবতাদের প্রাপ্ত করাতে সহায়ক ও সমর্থ হও। দেবতাদের মধ্যে অবস্থিত থেকে আমরাও যেন দেবগণের দ্বারা সর্বত্র পরিবেষ্টিত থাকি।
১৪। (মৃত পশুর কাছে উপবিষ্ট হয়ে যজমান-পত্নী) হে পশো! আমি তোমার জিহ্বাকে শুদ্ধ করি (জল দ্বারা মুখাঁটিকে স্পর্শ করাবে)। হে পশো! আমি তোমার চক্ষু শুদ্ধ করি (চক্ষুদ্বয় স্পর্শ করবে)। হে পশো! আমি তোমার কর্ণদ্বয় পবিত্র করে দিচ্ছি (কর্ণদ্বয় স্পর্শ করবে)। হে পশো! আমি তোমার নাভি শুদ্ধ করি (নাভিতে স্পর্শ করবে)। হে পশো! আমি তোমার শিশ্নকে সুদ্ধ করি (লিঙ্গকে স্পর্শ করবে)। হে পশো! পায়ুকে শুদ্ধ করি (পায়ুতে স্পর্শ করবে)। হে পশো! আমি তোমার চরণদ্বয়কে শুদ্ধ করি (মন্ত্রপাঠ করে জলদ্বারা পশুর চারটি চরণই স্পর্শ করবে)।
১৫। (যজমান-পত্নীর পরে, হস্ত-পদ প্রক্ষালনের জল দ্বারা যজমান এবং অধ্বর্যু পশুটিকে শুদ্ধ করবেন। ঘটস্থিত অবশিষ্ট জলটি পশুর সর্বাঙ্গে যজমান ছিটিয়ে দিয়ে বললেন) হে পশো! তোমার মন আপ্যায়িত হোক। তোমার জিহ্বা প্রসন্ন হোক। তোমার প্রাণ প্রসন্ন হোক, প্রফুল্ল হোক। তোমার চক্ষুরিন্দ্রিয় আপ্যায়িত হোক। তোমার শ্রবণশক্তি পরিবর্ধিত হোক। হে পশো! তোমার প্রতি বন্ধনাদির দ্বারা বা বধকার্য্যের দ্বারা যে ক্রুরতা আচরিত হয়েছে এবং যে কৃত্য বিহিত হয়েছে, সে সব তোমায় বিগতখেদ করে তুলুক। তোমার বিশৃঙ্খলিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদি সংহত হোক। তোমার এই হোমীয় সর্বাঙ্গ হে পশো। শুদ্ধ হোক। দিন হোক বা রাত, সর্বকালের জন্যে হে পশো! তোমার নিমিত্ত কল্যাণ হোক। (বাকী জলটা পশুর ওপর ছড়িয়ে দেবেন)। (তিনটি দর্ডকে পশুটির বুকের ওপর রাখবেন। বলবেন–) হে ঔষধে! এই পশুটির রক্ষা করুন। (হাতে বারি নিয়ে) অহো! তুমি এই পশুর আত্মাকে দুঃখিত কোর না,। (মন্ত্রপাঠান্তে পশুটির বক্ষের ত্বক উপড়ে ফেলবে)।
মন্ত্ৰার্থঃ— ১।হে সোম! অঙ্গুলির থেকে অভিযুত তুমি আপন রসস্রাবের অংশুসমূহের দ্বারা বাণীর স্বামীর নিমিত অভিযুত হয়ে, পবিত্র অবস্থায় পরিত হও। (মন্ত্র পাঠ করে প্রথমে উপাংশু গ্রহকে গ্রহণ করবে)। হে সোম! তুমি দেবতা হয়ে দেবতাগণের নিমিত্ত পরিশ্রুত হও। (মন্ত্র পাঠ করে দ্বিতীয় উপাংশু গ্রহকে গ্রহণ করবে) ॥
২। হে সোম! তুমি আমাদের বর্ষাকে (= অন্নকে) মধুর করে তোল, (তৃতীয় গৃহ গ্রহণ করে) হে সোম! তোমার তো অদম্য এবং সদা জাগরুক নাম সোম বলে কথিত। হে সোম! সেই গণবাচক তোমাকেই এই আহুতি অর্পণ করছি। (দ্বিতীয় স্বাহা-কে বলে বাইরে বেরিয়ে আসবে)। এই আমি বিস্তৃত অন্তরিক্ষকে প্রাপ্ত হচ্ছি।
৩। হে উপাংশুগ্ৰহ! সমস্ত ইন্দ্রিয়গণ, দিব্য এবং পার্থিব দেবতাদের নিমিত্ত তুমি স্বয়ং উৎপন্ন হয়েছে। তোমায় মন (= প্রজাপতি) ব্যাপ্ত করুক। এটি আহুতিস্বরূপ (মন্ত্রপাঠ করে উপাংশুগ্ৰহতে পরিপূর্ণ সোমের দ্বারা আহুতি দেবে)। হে সুষ্ঠুরূপে উৎপন্ন উপাংশুগ্রহে স্থিত সোম! আমি তোমায় সূর্যের (= প্রাণ) জন্যে আহুত করছি। মরীচিগণের পালক দেবতাদের জন্যে হে লেপ! তোমায় লেপন করি (এই যজু পাঠ করে হাতে লেগে থাকা সোমটিকে পশ্চিমদিকে যজ্ঞের পরিধিতে (লেপন, করুন)। হে দ্যুতিমান সোমের অংশবিশেষ! যে শত্রুকে মারার জন্যে আমি তোমায় প্রশংসিত করছি সেই আমার শত্ৰুটি এই ঊর্ধ্বগামী সোমাভিচারের দ্বারা নিহত হয়েছে। এই ফট (= অভিচারের আহুতি) হে উপাংশুগ্ৰহ! এই আমি তোমায় যথাপূর্ব স্থাপিত করছি। (যজুঃ পাঠ করে উপাংশুগ্রহের হাত দিয়ে পরিষ্কার করে পুনরায় পূর্বের স্থানে রেখে দেবে)। হে গ্রহ! তোমায় প্রাণের জন্যে আর ন্যায়ের জন্যে এখানে স্থাপিত করছি।
৪। হে উপমগ্রহ! তোমায় গ্রহণ করা হয়েছে। এবার তুমি নিজের ভেতরে সোমরসকে ধারণ করো। হে ধনবান্ ইন্দ্র! তুমি সোমরস পান করো (বা রক্ষ করো)।
৫। হে ইন্দ্র! তুমি আমাদের পশুধনের রক্ষা করো। বর্ষার সাথে আমাদের সঙ্গতি করাও। হে অন্তর্যামগ্রহ! আমি তোমার অভ্যন্তরে দ্যাবাপৃথিবীকে বিধৃত করছি। আমি তোমার অভ্যন্তরে বিস্তৃত অন্তরিক্ষকে ধারণ করছি। হে ধনবান ইন্দ্র। সামান্য এবং উৎকৃষ্ট দেবতাগণের সাথে সমান প্রীতিকারক তুমি অন্তর্যামগ্রহে বিদ্যমান সোমরসের দ্বারা পরিতৃপ্ত হও।
৬। হে ইন্দ্ৰবায়ুগ্রহ (= সোমরস পানের পাত্র)! সমস্ত ইন্দ্রিয় এবং দিব্য তথা পার্থিব দেবগণের নিমিত্ত তুমি উৎপন্ন হয়েছে। তুমি মন (= প্রজাপতি) প্রাপ্ত হও। হে সুষ্ঠু উৎপন্নগ্রহ! তোমায় সূর্যের জন্যে গ্রহণ করি। হে পাত্র! মরীচিপায়ী দেবগণের জন্যে তোমায় শোধন করি (যজুঃ পড়ে সম্মুখে রাখা ঐন্দ্র বায়বগ্রহের হাত দিয়ে পরিষ্কার করবে)। হে গ্রহ! শরীরে উদান বায়ুর পরিপুষ্টির জন্যে আমি তোমায় গ্রহণ করি ৷
৭৷ হে বায়ো! হে পবিত্র সোমপায়িন্! তুমি এখানে আমাদের নিকটে এসে প্রতিষ্ঠিত হও। হে সর্ববরণীয় বায়ো! সহস্রশঃ তোমার বাহক মৃগ বিদ্যমান রয়েছে। (তুমি তাদের থেকে এখানে যজ্ঞে শীঘ্ৰ আগমন করো)। হে বায়ো! আমি তোমার জন্যে এই মত্তকরী সোমরস উপস্থিত করি। যে সোমরস প্রথম পান করার তরে তুমি নিজেকে বিবৃত করো। হে সোমরস! আমি তোমায় বায়ুপান করার জন্যে গ্রহণ করি।।
৮। হে ইন্দ্র বায়ো! এই সোমরস তোমাদের দুজনের জন্যেই অভিযুত করা হয়েছে। তোমরা দুজনে তীব্রগামী অশ্বের দ্বারা শীঘ্র যজ্ঞে আগমন করো। কেননা এই আহ্লাদক সোমরস তোমাদের দুজনের সম্প্রপ্তির কামনা করেছে। হে উপমগ্রহ! তুমি বায়ুদেবকে সোমরস পান করানোর নিমিত্ত এখন গৃহীত হয়েছে। আমি তোমায় ইন্দ্র বায়ুর সোমরস পানের জন্যে গ্রহণ করছি। হে পাত্র? এই স্থল বিশেষটি তোমার স্থিত হওয়ার স্থান। (পাত্রটিকে বেদীর ওপর যথাস্থানে ধরবে)। তারপর বলবে হে উপমগ্রহ! পরস্পর সমানপ্রীতি এবং ইন্দ্র ও বায়ুর নিমিত্ত তোমায় এখানে ধারণ করি বা সোমরসে পূর্ণ করি।
৯। (মিত্র-বরুণের সোমরস পান করার পাত্রটি গ্রহণ করে) হে মিত্র-বরুণ! যজ্ঞ বা সত্যের বৃদ্ধিকারক এই সোমরসটিকে অভিযুত করা হয়েছে। হে মিত্র বরুণ! তোমরা দুজনে আমাদের এই সোমপানের আহ্বানকে শ্রবণ করো। হে উপমগ্রহ! তুমি এবার গৃহীত হয়েছ। হে গ্রহ! আমি তোমায় মিত্রবরুণের নিমিত্ত গ্রহণ করি।
১০। (মিত্র-বরুণ সম্পর্কিত উপযাম-গ্রহে দুটি কুশ ধরে, সেই পাত্র ভরা সোমরসে দুধ মেলাবে)। দেবতাগণকে সোমহবিঃ প্রদানকারী আমরা ঋত্বিগ-যজমান গো অশ্বাদি ধনে যেন প্রসন্ন হই। দেবতা সোমহবিঃ-র দ্বারা প্রসন্ন হোন, গো-অশ্বাদি ঘাসের দ্বারা আনন্দিত হোক। হে মিত্র বরুণ! তোমরা দুজনে সদাসর্বদা আমাদের সেই অবিচালিনী (= ঋজুভাবে স্বদ্ধ মোক্ষণকারিণী) গাভী প্রদান করো। হে পাত্র! এই তোমার স্থিত হওয়ার স্থান। আমি তোমায় এখানে মিত্র এবং বরুণ দেবতার নিমিত্ত ধারণ করছি।
১১৷ (অশ্বিনীদেবগণের সোমপাত্র গ্রহণ করে–হে অশ্বিনৌ! তোমার যে বাণী (বা পিচকারী) মধু ও সত্যের দ্বারা যুক্ত–সেটির দ্বারা তুমি আমাদের যজ্ঞকে আসিঞ্চিত করো। হে উপম গ্রহ! তোমাকে এবার গ্রহণ করা হল। আমি তোমায় অশ্বিনীদের জন্যে গ্রহণ করছি। এই তোমার স্থান। মধুবিদ্যাযুক্ত অশ্বিনীগণের জন্যে আমি তোমায় এখানে বেদির উপর ধারণ করছি।
১২। হে সোম! চিরন্তন পূর্বকাল–সর্বকালবর্তমান কালের অন্যান্য ঋষিগণের সমান তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ, যজ্ঞে আহুত হয়ে দুর্ভাসনে আসীন, স্বর্গদাতা, শত্রুর প্রতি গমনকারী, বলশালী, শত্রুকে পর্যদস্তকারী; ক্ষিপ্রকারী। শত্রুর ধনাদি বিজয়ী ইন্দ্রকে সেই যজমানের নিমিত্ত সব কিছু প্রার্থিত করে, থাকো, যে যজমানের যজ্ঞক্রিয়ায় মিশ্রণাদির দ্বারা তুমি অভিবর্ধিত হও। হে শুক্রগ্রহ! তোমায় উপযামের দ্বারা গ্রহণ করা হয়েছে। হে গ্রহ! আমি তোমায় শন্ড বের করবার নিমিত্ত গ্রহণ করছি। এই তোমার স্থান। হে গ্রহ! তুমি যজমানের নিমিত্ত বীরের ন্যায় আচরণ করো। (দুটি ঘূপখণ্ড নিয়ে অধ্বর্যু এবং প্রতিস্থাতা সেগুলিকে প্রেক্ষণ করবেন এবং তার দ্বারা অধ্বর্যু শুক্রগ্রহণে ও প্রতিস্থাতা মনিগ্রহকে শোধন করে ঢেকে দেবেন। শুক্রের পুত্র এবং অসুরগণের পুরোহিত শণ্ডকে (কচ!) যজ্ঞ থেকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। (অধ্বর্যু এবং প্রতিস্থাতা হবিধান মণ্ডপের থেকে বাইরে যাবেন)। হে শুক্রগ্রহ! শুভ্র সোমরসকে তোমার দ্বারা পানকারী দেবগণ তোমায় যজ্ঞস্থানে নিয়ে যাবেন। (বেদির দক্ষিণ ভাগে অধ্বর্যু শুক্রগ্রহকে এবং উত্তরভাগে প্রতিস্থাতা মনিগ্রহকে ধরবেন)।, হে উত্তরবেদিশ্রোতগণ! তুমি সর্বথা অহিংসিত হও।
১৩৷ (দক্ষিণ ভাগে স্থিত যুপের কাছে গিয়ে অধ্বর্যু বলবেন–) হে শুক্রগ্রহ! সুষ্ঠু বীর তুমি; বীরপুত্রগণের উৎপন্নকর্তা হয়ে গো-অশ্বের সমৃদ্ধি যজমানকে দিয়ে তুমি পরিতঃ প্রাপ্ত হও। আপন শুভ্র দীপ্তির দ্বারা শুক্রগ্রহ, দ্যাবাপৃথিবীর সাথে সঙ্গত হয়, তোমাদের সবাইকে ধারণ করে। শণ্ড যজ্ঞ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। (মন্ত্রপাঠ করে অধ্বর্যুর দ্বারা প্রেক্ষিত যুপখণ্ডটি বাইরে করে দিন)। হে যুপশকল! তুমি শুক্রগ্রহ ধারণের স্থান। (মন্ত্রপাঠ করে অধ্বর্যুর দ্বারা প্রেক্ষিত ঘূপশকলকে আহবনীয়তে ফেলে দেবেন)৷
১৪৷ হে সোমদেব! আমরা যজমানগণ তোমার অজস্রধারায় যুক্ত বলশালী রসের (দেবতাদের) প্রদাতা হতে পারি এবং সেই দেবগণের থেকে ধন-অন্ন প্রাপক হতে পারি। (যুপের দুদিকে দণ্ডায়মান হয়ে অধ্বর্যু এবং প্রতিপ্রস্থাতা ক্রমশঃ আহুতি দেবেন। অধ্বর্যু শুক্রগ্রহের সোমরসের দ্বারা প্রথম আহুতি দেবেন। তারপর প্রতিস্থাতা মনিগ্রহ দ্বারা আহুতি দেবেন)। সবার দ্বারা বরণীয় সেই প্রথম সোমক্রয়ের শুদ্ধ ক্রিয়া ছিল এবং সেই প্রথম বরুণ মিত্র এবং অগ্নি সোমের রক্ষক বা পানকারক।
১৫। সেই বৃহস্পতি এই সোমের সর্বপ্রথম জ্ঞাতা। সেই ইন্দ্রের জন্য, হে অধ্বর্যুগণ, অভিযুত সোমের আহুতি দুটি ইন্দ্রের জন্য এই সোমের রসের আহুতি। সেই ছন্দের অভিমানী দেবতাগণ তৃপ্ত হোন। যে ছন্দদেবতাগণ সোমরসের হোমে অপেক্ষিত এবং যাঁরা তাঁদের এই সোমযাগের প্রয়োগ দ্বারা সর্বথা। প্রীণিত–কেননা তাদের দ্বারা এটি সুষ্ঠুভাবে আহুত হয়ে দেবগণের সম্প্রপ্ত হচ্ছে। (অধ্বর্যু হোতার নিকট পশ্চিমমুখী হয়ে দণ্ডায়মান হবেন) অগ্নি সোমরসের দ্বারা পরিচরিত হল (এইরূপ তিনি হোতাকে বলবেন)।
১৬৷ (মনিগ্রহ কে গ্রহণ করবে)। বিদ্যুতের জ্যোতি থেকে গর্ভঝিল্লীর ন্যায় পরিবেষ্টিত এই কমনীয় চন্দ্ররূপী সোম আদিত্য দ্যুলোকের গর্ভে বিদ্যমান জলসমূহের নির্মাণে তাঁদের সম্প্রেরিত করে থাকে (= বর্ষিত হয়ে থাকে)। এই নোম মেধাবী, অধ্বর্যু এবং প্রতিপ্রস্থাতা সূর্যের জলসমূহের সাথে সঙ্গতিসম্পন্ন হলে পরে, বালকের ন্যায় স্তুতির দ্বারা অর্চনা করে থাকে। হে সোমরস! তুমি উপম গ্রহর দ্বারা গৃহীত হয়েছে। আমি তোমায় অসুর পুরোহিত মর্বকে যজ্ঞ থেকে বিতাড়িত করার জন্যে গ্রহণ করি।
১৭৷ মন্থিগ্রহতে পরিপূর্ণ যে সোমরস তার সাথে যবের ছাতু মেশাবে। যজ্ঞাদি কাৰ্য্যে ত্বরাবান্ অধ্বর্যু এবং প্রতিস্থাতা সোম্যগগুলিতে আপন স্বকর্মের দ্বারা মনের ন্যায় উৎসাহযুক্ত শুক্র, মন্থি গ্রহগুলিকে সম্প্রপ্ত করে থাকে। প্রভূতদক্ষিণ ধন যা অধ্বর্যু আপন হাতে গৃহীত পাত্রে আঙুলের দ্বারা সোমরস ও ছাতু রূপে সর্বদিকচক্রবালে মিলে দেয়, সেটিই প্রধান ঋত্বি। হে মহ্নিগ্রহ! এটাই তোমার স্থান। তুমি এখানে স্থিত হয়ে যজমানের প্রজাগণকে পালন করো। (প্রতিপ্রস্থাতা পোক্ষিত যূপসকলের দ্বারা মনিগ্রহকে ঢাকবেন এবং অপোক্ষিত যূপসকলের দ্বারা সেটি স্বচ্ছ করবেন)। এই অসুর পুরোহিত মর্বকে যজ্ঞ থেকে পরিষ্কার করে দেওয়া হল। (প্রতিস্থাতা হবিধান মণ্ডপ থেকে বাইরে যাবেন)। হে মন্থিগ্রহ! তোমায় মন্থিগ্রহ থেকে সোমরস পানকারী দেবগণ যজ্ঞস্থান প্রাপ্ত করাবেন। হে উত্তরবেদি শ্রোণে! তুমি সর্বথা অহিংসিত।
১৮। (প্রতিপ্রস্থতা উত্তর যূপস্থানে যাবেন)। হে মন্থিগ্রহ! সুন্দুর প্রজাগণের সাথে যুক্ত তুমি উত্তম প্রজাগণের উৎপন্নকর্তা হয়ে ধন-অন্নের যজমানকে সম্প্রাপ্ত হও। (প্রতিপ্রস্থাতা অরঙ্গি-কে যুক্ত করবেন) এই মন্থিগ্রহ দ্যাবাপৃথিবীর দ্বারা সঙ্গত হয়ে মন্থি জ্যোতি দ্বারা যুপকে ধারণ করে থাকে। (প্রতিপ্রস্থতা অপ্রেক্ষিত ঘূপসকলকে বাইরে করে দেবেন)। এই অসুর পুরোহিত মর্ব যজ্ঞ থেকে বহিষ্কৃত হল। (প্রতিপ্রস্থাতা প্রেক্ষিত ঘূপশকল-কে আহবনীয়তে রেখে দেবেন)। হে যুপশকল! তুমি মন্থিগ্রহের আধার।
১৯৷ যে এগারোজন দ্যুলোকবাসী দেবতা রয়েছেন; পৃথিবীর পরে যে এগারোজন দেবতা রয়েছেন তাদের এবং জল ও অন্তরীক্ষে স্বমহিমায় বিরাজিত যে দেবগণ রয়েছেন, তাদের সংখ্যাও এগাররা। সেই তোমরা সব দেবতাগণ আমাদের এই যজ্ঞকে প্রীতিপূর্বক সেবন করো।
২০। (আগ্রয়ণগ্রহকে গ্রহণ করবে) হে আগ্ৰয়ণগ্রহ! তুমি উপযামগ্রহের দ্বারা গৃহীত হয়েছে। তুমি আগে নিয়ে যাওয়ার আগ্ৰয়ণগ্রহ স্বরূপ। তুমি আপন শ্রেষ্ঠত্বের বসে আমাদের রক্ষা করো। যজ্ঞকে রক্ষা করো, যজ্ঞের স্বামী যজমানকেও রক্ষা করো। যজ্ঞাভিমানী দেবতা বিষ্ণু তোমায় আপন বলে রক্ষা করুন। তুমি বিষ্ণুকে রক্ষা করো। হে আগ্রয়ণগ্রহ! তুমি আমাদের তিনটি সবনকেই রক্ষা করো।
মন্ত্ৰার্থঃ– (এই অষ্টম অধ্যায়ে তৃতীয় সবনে উপযোগী আদিত্যগ্রহ প্রভৃতি গ্রহগণকে গ্রহণ করার মন্ত্র বলা হচ্ছে। দুজন দুজন দেবগণের সহহোমের নিমিত্ত প্রতিপ্রস্থতা নামক ঋত্বিজ দ্রোণ কলশের দ্বারা আদিত্যগ্রহতে। সোমরস ভরবেন। প্রতিপ্রস্থাতা)
১। হে সোমরস! তোমায় উপযাম পাত্র দ্বারা গ্রহণ করা হয়েছে (এরপর সে দ্বিদেবত্য আহুতিগুলিকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করে)। তারপর সে এই মন্ত্রাংশের দ্বারা হুতশেষ সোমরসকে একটি পাত্রে ঢেলে দেয় এবং সেটিকে আদিত্যস্থালী দ্বারা ঢোক রেখে দেয়। হে সোমরস! অদিতির পুত্র দ্বাদশ আদিত্যের জন্যে আমি তোমায় এই স্থালী-তে আসিঞ্চিত করি। হে উরুক্ৰম বিষ্ণো! এই তোমার সোমরস। তুমি একে রাক্ষসাদির থেকে রক্ষা করো। হে সোমরস! এবার তোমায় রাক্ষসাদি হিংসিত করতে পারবে না৷
২। হে ইন্দ্র! (= আদিত্য) তুমি কখনও হিংসক হওনা। তুমি হবিদাতা যজমানের হবিরন্নের সাথে সদাই সঙ্গত থাকো। হে ধনবান ইন্দ্র! তোমার অধিকাধিক দান আমরা প্রাপ্ত হয়েই থাকি। হে সোমরস! আমি তোমায় আদিত্যগণের জন্যেই গ্রহণ করছি।
৩। এই নিম্ন যজুঃ কে পাঠ করে পূতভৃদ ঘটের দ্বারা সোমরসকে আদিত্য গ্রহে পুনরায় ভরবেন)। হে আদিত্য! তুমি কখনও প্রমাদ করো না। তুমি দেব-মানবের রক্ষা করে থাকো। হে আদিত্য! এই তৃতীয় সবণগত বলকারী সোমরস তোমারই নিমিত্ত বেদিতে স্থিত করা হয়েছে। তোমার অমৃত স্বরূপ দুলোকে অবস্থিত। হে সোমরস! আমি তোমায় আদিত্যগণের জন্যে গ্রহণ করছি।
৪। আদিত্যগ্রহতে পরিপূর্ণ যে সোমরস, (সেটিকে দৈ-এর সাথে মেশান) দেবগণের সুখের নিমিত্ত যজ্ঞ প্রবর্তিত হয়ে থাকে। হে আদিত্যগণ! তোমরা আমাদের সুখ প্রদান করতে থাকো আর অবস্থান করো। হে দেবগণ! তোমাদের অনুগ্রহাত্মিকা বুদ্ধি আমাদের দিকে অভিমুখী হোক। তোমাদের যে অনুগ্রহপরা বুদ্ধি বর্তমান, সেটি যেন পাপীকে অত্যন্ত ধনবান না করে। হে সোমরস! আমি আদিত্যগণের জন্যেই তোমায় দৈ বা দধি দ্বারা মিশ্রিত করছি।
৫। (পাথর দিয়ে প্রতিস্থাতা দৈ আর সোমরসকে মিশ্রিত করবেন)। হে অন্ধকারনাশক আদিত্য! এই তোমার পান করবার দধিমিশ্রিত সোমরস। তুমি এতে পূর্ণরূপে তৃপ্ত হও (আনন্দে দধি-পান করো)। (এরপর যজমানের স্ত্রী পূতভৃদ ঘটটি অবলোকন করবেন এবং ঋত্বিজগণকে বলবেন–) হে আশীর্বাদদানে সমর্থ ব্ৰহ্মাদি ঋত্বিজগণ! তোমরা সবাই এবার আমার আশীর্বাণীতে শ্রদ্ধা ধারণ করো (= এই দৃঢ় বিশ্বাসী হও যে এই যজমান পত্নী যা কিছু চাইবে আমরা আশীঃ রূপে সেটাই তাকে প্রদান করবো)। এই যজমান পতি-পত্নী যেন বরণীয় ধনভোগ করতে পারে। পুরুষত্বোপেত পুত্র যেন এদের থেকে উৎপন্ন হয়। সেই পুত্র যেন বিপুল ধন প্রাপ্ত করে। ধনপ্রাপ্তির পর সে সদাই আপন গৃহে বাস করে পুত্রধনাদির দ্বারা অভিবৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।
৬। (সায়ংসবনের পুরোডাশ-ইডা ভক্ষণ করে এবং সব সম্পর্কিত শেষ কর্ম সমাপ্ত করে পুনরায় উপাংশু বা অন্তর্যামগ্ৰহ এদের মধ্যে কোন একটি দ্বারা সবিতাদেবের সোমাংশ গ্রহণ করবে)। হে, সবিতাদেব! আমরা যেন আজ বরুণীয় ধনপ্রাপ্ত হই। সেই স্পৃহনীয় ধন যেন আমরা কালও প্রাপ্ত হই এবং হে সবিতাদেব! তুমি আমাদের দিনে দিনে স্পৃহণীয় ধন,বরণীয় ধন প্রসূত করাও। হে সবিতাদেব! আর অধিক কি? আমরা (যেন) অত্যধিক ধনে পরিপূর্ণ গৃহের স্বামী হতে পারি। হে দেব! আমরা যেন আমাদের এই স্তুতির দ্বারা ধনভাক্ হতে পারি।
৭। হে সোমরস! তোমায় উপযাম পাত্রের দ্বারা গ্রহণ করা হয়েছে। তুমি সবিতাদেবের পেয়াংশ এবং অন্নদাতা। হে অন্নদাতা! তুমি আমাদের অন্ন প্রদান করো। হে সোমরস! তুমি এই যজ্ঞকে দেবগণের কৃপাপ্রাপ্তির যোগ্য করে তোল এবং যজ্ঞস্বামী যজমানকে প্রসন্ন করো। হে সোমরস! আমি তোমায় ঐশ্বর্যবান্ সবিতাদেবের জন্যে গ্রহণ করছি।
৮। (পান না করা সাবিত্রগ্রহ থেকে অধ্বর্যু পূতভৃদ ঘটের দ্বারা মহাবৈশ্বদেব গ্রহে সোমরসকে গ্রহণ করবে)। হে বৈশ্বদেবগ্রহে অবস্থিত সোমরস! তোমায় উপমপাত্রের দ্বারা গ্রহণ করা হয়েছে। তুমি সুষ্ঠু সুখদাতা এবং সুন্দররূপে স্থিত। অথবা সুশর্মা-সুপ্রতিষ্ঠান প্রাণরূপ (তৈ. সং ৪/৪/১/১৪) রূপে অভিহিত। বৃহৎ সেক্তা (= প্রজাপতি) কে নমস্কার। হে সোমরস! আমি তোমায় বিশ্বদেবগণের জন্যে গ্রহণ করছি। এই তোমার স্থান। বিশ্বদেবগণের নিমিত্ত আমি তোমায় এই বেদীতে প্রতিষ্ঠিত করছি।
৯। (উপাংশু বা অন্তর্যামগ্রহের দ্বারা প্রতিস্থাতা পত্নীবগ্রহকে গ্রহণ করবেন)। হে সোমরস! তোমায় উপযামপাত্রের দ্বারা গৃহীত বা গ্রহণ করা হয়েছে। হে আহ্লাদক সোমরস! যজ্ঞস্বামী যজমানের দ্বারা অভিষুত বীর্যশালী তথা পত্নীবৎ গ্রহগণকে আমি সমৃদ্ধি প্রদান করি–ভরে দেই। (এরপর প্রতিস্থাতা প্রচরণীবার দ্বারা অবশিষ্ট ঘৃত দিয়ে পত্নীবৎগ্রহে স্থিত সোমরসটি মিশ্রিত করবেন)। (মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি) পর = ঊর্ধ্বলোক আমিই প্রাপ্ত করেছি এবং অধোলোকগত পৃথিবী আদি আমারই স্বরূপ। এই যে অন্তরিক্ষ (= দ্যুলোক) রয়েছে, সেই আমার পিতা হয়েছিল। আমি সূর্যকে দুই দিক থেকেই দেখেছি। দেবগণের অবস্থিতি যে পরমগুহায় (= ইন্দ্রিয়স্থান ব্রহ্মগুহায়)–আমি সেটিও দেখেছি।
১০। (মন্ত্রটি পাঠ করে পত্নীবগ্রহের দ্বারা অগ্নির উত্তরভাগে হোম করবে)। হে পত্নী দ্বারা যুক্ত অগ্নে! তুমি ত্বষ্টাদেবের সাথে প্রীতিভাব প্রাপ্ত হয়ে এই সোমরস পার করো। এটি তোমার জন্যে সোমরসের আহুতি। (এরপর নেষ্টা নামক ঋত্বিজ যজমানের স্ত্রীকে পশ্চিমদ্বারে এনে উদ্গাতা ঋত্বিজের উত্তর দিকে উপবেশন করিয়ে দেবেন। তাকে বলবেন উদ্গাতাকে অবলোকন করতে। পত্নী উদ্গাতাকে অবলোকন করতে করতে এই যজু কে বলবেন–) হে উদ্গাতর! সন্তানদের স্বামী তুমি বীর্যধারণকর্তা হে বীর্যধারক ঋত্বিজ! তুমি আমার মধ্যে বীর্যকে ধারিত করো। আমি, তুমি, প্রজাপতি, সেক্তা এবং বীর্যধারকের বীর্যের দ্বারা যেন আমি বীর্যধারী পুত্র প্রাপ্ত হই৷৷
১১। (আগ্রয়ণঘটের দ্বারা হারিযোজন গ্রহকে ভরুন)। হে সোমরস! তোমায় উপযাম পাত্রের দ্বারা গ্রহণ করা হয়েছে। তুমি হরিতবর্ণের। তুমি হরি অশ্বগণকে স্বস্থতে সংযোজনকারী ইন্দ্রের ভাগ। হে সোম! আমি তোমায় ঋক্ সাম মন্ত্রাদির জন্যে গ্রহণ করছি। হে দগ্ধ যবগণ! তুমি ইন্দ্রের হরি অশ্বের খাদ্যাংশ স্বরূপ। তুমি সোমরসের সাথে হরি অশ্বগণের নিমিত্ত (ভোগরূপ) হও। অথবা সোমের সাথে ইন্দ্রের খাদ্য হও।
১২। (সকল ঋত্বিজগণ দগ্ধ যবগুলি নিয়ে এবং সেগুলির আঘ্রান গ্রহণ করে উত্তরবেদিতে অর্পণ করবেন) হে সযব (যবসংযুক্ত) সোমরস! তোমাদের এই সবগুলি দেবগণের দ্বারা ভক্ষণ হবে, অশ্ব এবং গাভীদের দেওয়া হবে। যজুগণের দ্বারা প্রীয়মান, উদ্গাতাগণের দ্বারা স্তুত্য, হোতা ঋত্বিজগণের দ্বারা প্রশস্যমান এবং অনুজ্ঞাত দ্বারা অনুজ্ঞায়মান আমি, তোমার সেই ভক্ষ্যবস্তুটিকে ভক্ষণ করি।
১৩। সকল ঋত্বিকগণ ছয়টি ছয়টি করে স্তম্ভ খণ্ডকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করবেন। হে ঘূপখণ্ড! দেবগণের মধ্যে যজ্ঞাদি না করে যে পাপ করা হয়েছে–তুমি সেই পাপের বিনাশকর্তা। মনুষ্যগণের মধ্যে নিন্দা আদি পাপের তুমি বিনাশক। পিতৃপুরুষগণকে পিণ্ডদানাদি না প্রদান করা হেতু পাপের তুমি বিনাশক। স্বয়ং আপন নিন্দা-শ্লাঘা জনিত পাপের তুমি বিনাশক। অন্য যাবতীয় প্রকার পাপেরও তুমি নাশক। আমার জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে কৃত সকল প্রকার পাপের তুমি বিনাশক।
১৪। (চাতালে রাখা জলপূর্ণ ঘটগুলিকে সেগুলির চমসের দ্বারা স্পর্শ করে)। আমার ব্রহ্মবৰ্চস, পুষ্টি শারীরিক অবয়ব এবং শুভ মনের দ্বারা যেন সঙ্গতিপ্রাপ্ত হই। সুদাতা ত্বষ্টাদেব আমাদের ধনের বিধান করো এবং সেটি আমাদের শরীরে যে পাপ বা শিথিলতা-বিকতা বিদ্যমান রয়েছে, সেগুলি যেন দূর করে৷
১৫। এই যজুগুলির দ্বারা সমষ্টযজু সংজ্ঞক নব আহুতিগুলির হোম করে বলবেন– ইন্দ্র! মঘবন্! তুমি আমাদের শুভ, মনোকামনা, গাভীগণ, বিদ্বানগণের সর্বপ্রকার স্বপ্তি (= কল্যা (গো) মন্ত্র, দেবগণের নিমিত্ত যজ্ঞ (যজ্ঞফল) এবং যজনীয় দেবগণকে সবুদ্ধি দ্বারা সংযোজিত করে থাকো। এই তোমার জন্যে আহুতি। (প্রথম আহুতি প্রদান করবে)।
১৬। আমরা ব্রহ্মবৰ্চস, জল, শরীর, পুষ্টি এবং শুভ মনের দ্বারা সঙ্গত হই। সুদাতা ত্বষ্টাদেব যেন আমাদের জন্যে ধনের বিধান দেন এবং শরীরের যা কিছু পাপ বা শৈথিল্য আছে–সেটিকে দূরীভূত করে। (এরপর দ্বিতীয় আহুতি প্রদান করবে) ॥
১৭। দানশীল ধাতা, সবিতা, ধনের পালক প্রজাপতি এবং দ্যুতিমান অগ্নি এই যজ্ঞ যেন সেবন করেন। ত্বষ্টাদেব এবং প্রজার অত্যন্ত দানে সমৃদ্ধ বিষ্ণু যজমানের জন্যে ধন বিহিত করবেন (= দেবেন)। এটিই আহুতি। (এরপর তৃতীয় আহুতি দেবে)।
১৮। আমাদের এই সবন (= যজ্ঞ)-কে প্রীয়মান করে তুমি যে এখানে আগমন করেছে–তাই আমি তোমাদের সবার জন্যে সুগমতার দ্বারা প্রাপ্য উপবেশনের স্থানগুলি নির্মাণ করছি। হে উপবেশনকারী দেবতাগণ! হবিগণকে বহনকারী এবং হবিগণকে স্বমুখাদিতে ভরে গমনকারী তোমরা সবাই আমাদের জন্যে ধনসমূহকে ধারণ করো। এই তোমার জন্যে হবি। (এই মন্ত্রের দ্বারা চতুর্থবার আহুতি দেওয়া উচিত)
১৯। হে দ্যুতিমান অগ্নি! হরিগণের কামনাকারী যে দেবতাগণকে হবি গ্রহণ করার জন্যে তুমি এখানে আমাদের মনে নিয়ে এসেছিলে–সেই সবাইকে এবার তুমি তাদের আপন-আপন ঘরে যাওয়ার জন্যে প্রেরিত করো। চরু এবং পুরোডাশ আদি হবিকে ভক্ষণ করেছে এবং সোমরস প্রকৃতি হবি পান করে সেই সব দেবতাগণ যেন বায়ু, আদিত্য তথা দ্যুলোকে যথাযোগ্য প্রস্থান করেন। তাদের সবার জন্যে এই আহুতি (এই মন্ত্র দ্বারা পঞ্চম আহুতি প্রদান করা উচিত)।
২০। হে অগ্নে! আমরা তোমায় এখানে এই যজ্ঞে হোতা (= দেবগণের আহ্বায়ক বা হোমনিস্পাদক) রূপে বরণ করেছিলাম। হে অগ্নে! তুমি যজ্ঞে সমৃদ্ধির অনুকূলে দেবতাদের যাজন করেছে এবং তার সাথে যজ্ঞের প্রকরণে ঘটিত ত্রুটি-বিচ্যুতিও তুমি যথাবৎ প্রশমিত করেছে। এবার আমাদের এই যজ্ঞ সম্পূর্ণ জেনে তুমি এবার স্বগৃহে পদার্পণ করো। এই তোমর জন্যে আহুতি। (এই মন্ত্র পড়ে যষ্ঠ আহুতি প্রদান করবে) ৷৷
২১। যজ্ঞকে সমাপ্ত বলে জ্ঞাত হওয়া হে দেবগণ! তোমরা যজ্ঞ সমাপ্ত জেনে এবার স্ব-স্ব স্থানে প্রস্থান করো। হে আমাদের মনে বিদ্যমান যজ্ঞের সংকল্প চরিতার্থকারী প্রজাপতি! আমি এই যজ্ঞ তোমার হস্তে সমর্পণ করছি। তুমি একে বায়ুতে ধারণ করে। এটি তোমার জন্যে আহুতি। (এই মন্ত্র পড়ে সপ্তমবার আহুতি প্রদান করবে)।
২২। হে যজ্ঞ! তুমি আপন প্রতিষ্ঠা (= স্থিতি) র জন্যে যজ্ঞের দেবতা বিষ্ণুকে সপ্রাপ্ত হও। আপন উৎপত্তির নিমিত্তভূত এবং ক্রিয়াশক্তির মূল বায়ুকে তুমি সপ্রাপ্ত হও। এটি তোমার আহুতি (এই যজুঃ পাঠ করে অষ্টম আহুতি দেওয়া উচিত)। স্তোত্ৰস্তব সহিত এবং চরু-পুরোডাশ, সোমরস এবং বধ্যপশু রূপী বীরগণের দ্বারা। যুক্ত। এই যজ্ঞ–এবং হে যজ্ঞের স্বামী যজমান! এটি তোমারই। তুমি এটিকে প্রীতির সাথে সেবন করো। এটি আহুতি স্বরূপ। (এই যজুষ দ্বারা নবম আহুতি প্রদান করা উচিত)
মন্ত্ৰার্থঃ– [এই অধ্যায়ের কণ্ডিকা ৩৪ পর্যন্ত বাজপেয় ভাগের মন্ত্র কথিত হয়েছে। এর অঙ্গভূত যজ্ঞে ঘৃতের আহুতি দেওয়া হয়]
১। হে দ্যোতমান সবিতাদেব! তুমি দয়া করে বাজপেয় যজ্ঞকে অনুমোদিত করো। এবং যজ্ঞের পালক যজমানকে ভগ অর্থাৎ বাজপেয়যাগরূপী ঐশ্বর্যের নিমিত্ত প্রেরিত করো। দ্যুলোকস্থ, রশ্মিসমূহের ধারক এবং অন্নকে পবিত্র করণশালী সূর্যদেব আমাদের হবিষণ্ণকে পবিত্র করুক। বাণীর (বাকের) স্বামী প্রজাপতি আমাদের হবিরান্নকে আস্বাদিত করুক।
২। (প্রাতঃ সবনে আগ্রায়ণ গ্রহকে গ্রহণ করার পর তিনটি অতিগ্রহকে গ্রহণ করণীয়। পুনরায় ষোড়শীগ্রহ গ্রহণ পূর্বক পঞ্চ ইন্দ্রদেবতাক গ্রহকে গ্রহণ করণীয়)–হে সোম! তুমি উপযাম পাত্রে গৃহীত হয়েছ। আমি ইন্দ্রের নিমিত্ত প্রিয় তোমাকে গ্রহণ করছি। আমি ধ্রুব পৃঙ্খীলোকে স্থিতিশালী; মনুষ্যলোকে স্থিতিশালী, ও মনে স্থিতিশালী তোমা হেন সোমকে গ্রহণ করছি। হে সোম! এই তোমার স্থিত হওয়ার স্থান। ইন্দ্রের অত্যন্ত প্রিয়, হে সোম! আমি তোমাকে সেই ইন্দ্রের নিমিত্ত গ্রহণ করছি। জলে স্থিতিশালী (উদকসদ), ঘৃতে স্থিতিশালী (ঘৃতসদ) এবং অন্তরীক্ষে স্থিতিশালী (ব্যোমসদ) তুমি হেন সোমকে ইন্দ্রের নিমিত্ত গ্রহণ করছি। তুমি উপযাম পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। ইন্দ্রের প্রতিকারী তুমি হেন সোমকে আমি গ্রহণ করছি। হে সোম! এই তোমার স্থান। ইন্দ্রের অত্যন্ত প্রীতিকারী তুমি হেন সোমকে আমি গ্রহণ করছি। পৃঙ্খীলোকে স্থিতিশীল (পৃথ্বীসদ), অন্তরিক্ষে স্থিতিশীল (অন্তরিক্ষসদ), দ্যুলোকে স্থিতিশীল (দিবিসদ), দেবগণে স্থিতিশীল (দেবসদ), এবং স্বর্গে স্থিতিশীল (স্বর্গসদ), তুমি হেন সোমকে আমি গ্রহণ করছি। হে সোম! তুমি উপম পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। ইন্দ্রের প্রীতিকরী তুমি হেন সোমকে আমি গ্রহণ করছি। হে সোম! এই তোমার স্থান! ইন্দ্রের অত্যন্ত প্রীতিকর তুমি হেন সোমকে আমি গ্রহণ করছি।
৩। (এই তিন যজুর্মন্ত্রে ইন্দ্রদেবতাক তিনগ্রহ গ্রহণীয়)–জলের সারভূত এবং অন্নকে পর্ধনশীল বায়ু সূর্যে সমাহিত। জলের সাররূপ বায়ুরও যে সার– সেই সাররূপ অতিশ্রেষ্ঠ প্রজাপতিকে আমি, হে দেবগণ! তোমাদের নিমিত্ত গ্রহণ করছি; (অর্থাৎ সোমরূপে বায়ু এবং তার অভিমানী দেবতা প্রজাপতিকে গ্রহণ করছি)। হে সোম! তুমি উপযাম পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। ইন্দ্রের প্রীতিকরী তুমি হেন সোমকে আমি গ্রহণ করছি। হে সোম! এই তোমার স্থান। ইন্দ্রের নিমিত্ত অত্যন্ত প্রীতিকর তোমাকে আমি গ্রহণ করছি৷
৪। (এই মন্ত্রে চারিটি ইন্দ্রগ্রহকে গ্রহণ করা উচিত।…) অন্ন বা বলের আহ্বান করণশীল মেধাবী যজমান বা ইন্দ্রকে বিশিষ্ট বুদ্ধি প্রদানশীল সেই তোমরা হেন অধরেষ্ঠের প্রিয় গ্রহ সমূহে অন্ন এবং রসকে আমি গ্রহণ করছি। হে সোম! তুমি উপযাম পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। ইন্দ্রের নিমিত্ত প্রীতিকর তুমি হেন সোমকে আমি গ্রহণ করছি। (অধ্বর্যু কর্তৃক সোমগ্রহকে অক্ষের উপর এবং নেষ্ঠা নামক ঋত্বিক কর্তৃক সুরাহকে অক্ষের নীচে ধারণ করণীয়…)—হে সোম ও সুরাহ! তোমরা দুজন একসাথে যুক্ত হয়ে যাও। এবং তোমরা দুজন আমাকে কল্যাণের সাথে সংযোজিত করো।…. হে সোম ও সুরাগ্রহ! এক্ষণে তোমরা পৃথক-পৃথক হয়ে গিয়েছ, অর্থাৎ বিযুক্ত হয়েছ। তোমরা দুজন আমাকে পাপ হতে পৃথক্ (বা বিযুক্ত) করো।
৫। (মহা মরুতৃতীয়ের অন্তে মহেন্দ্রগ্রহকে গ্রহণের পূর্বেই রথবাহনাচ্ছাদক শকট থেকে রথকে নামানো কর্তব্য)-হে রথ তুমি ইন্দ্রের বজ্রস্বরূপ। তুমি জন্ম প্রদানশালী। তোমার এই যজমান অন্নকে প্রাপ্ত করুক। অন্নের প্রাপ্তি বা অনুজ্ঞার নিমিত্ত আমি এই মহতী মাতা অদিতিকে বেদ বাক্যের দ্বারা অনুকূলা করছি। যে এই অদিতিতে: (দ্যাবাপৃথিবীতে) এই সমগ্র লোক সমাধা হয়েছে, সেই ভূমিতে সবিতাদেব আমাকে (যজমানকে) অবস্থান প্রদান করুক।
৬। জলের অন্দরে অমৃত আছে এবং জলের অন্দরে ভৈষজ্যও নিহিত আছে। হে অশ্বগণ! তোমরা সেই জলের প্রশস্তিসমূহে (উন্নত গুণাবলীতে) সঙ্গত হয়ে অন্ন বা বেগশালী হও। হে দ্যোতমানা জলরাশি! অত্যন্ত বেগশালিনী তোমাদের যে লহর (কল্লোল) আছে, তোমরা যে উচ্চ উচ্চ জলনিচয়ের সাথে যুক্ত এবং যে তোমরা অন্নকে প্রাপ্ত করণশালিনী আছে– তাদের দ্বারা এই যজমান অন্নকে সম্প্রপ্ত করুক৷
৭। (দক্ষিণে স্থিত অশ্বকে রথে সংযোজিতব্য)-বায়ু, মন এবং সপ্তবিংশ নক্ষত্র গন্ধর্ব আছে। তারা ভূমিকে ধারণশালী। তারাই পূর্বে অশ্বকে রথের মুখে সংযোজিত করেছিল। তারাই অশ্বে বেগ ধারণ (বা স্থাপন করেছিল।
৮। হে অশ্ব! রথে সংযোজন-কৃত হয়ে তুমি বায়ুর বেগের ন্যায় বেগশালী হও। (রথের) দক্ষিণ ভাগে স্থিত তুমি ইন্দ্রের সমান শোভায় সমৃদ্ধ হও। হে অশ্ব! সর্বধন মরুৎবর্গ তোমাকে রথে সংযোজিত করুক। ত্বষ্টাদেব তোমার পাদসমূহে বেগকে স্থাপন করুক।
৯। (এই যজুর্মন্ত্রে তৃতীয় দক্ষিণাপ্রষ্টি অশ্বকে রথে সংযোজিত করণীয়) হে অশ্ব! তোমার যে বেগ তোমার হৃদয়ে স্থাপিত, তোমার যে বেগ শ্যেন পক্ষীতে সঙ্গত হয়ে গতি সম্পন্ন করায়, এবং তোমার যে বেগ বায়ুতে প্রদত্ত হয়ে প্রবর্তিত হয়ে থাকে; হে অশ্ব! সেই ত্রিবিধ বেগের দ্বারা বলবান্ হয়ে তুমি আমাদের অন্নকে বিজয় করণশালী হও; এবং যুদ্ধে আমাদের উত্তীর্ণকারী হও। (বৃহস্পতির চরু অশ্বকে আঘ্রাণ করিয়ে)–হে অশ্বগণ! অন্নকে তোমরা মন্ত্রের দ্বারা প্রাপ্ত করে বৃহস্পতির এই চারুভাগকে আঘ্রাণ করো।
১০। সত্য আদেশ (অর্থাৎ যার অনুশাসন বা আদেশকে কেউই চলাতে পারে না) সবিতা দেবতার অনুজ্ঞায় (বা অনুশাসনে) বর্তমান আমি বৃহস্পতির উত্তম স্বর্গে আরোহণ করব। সত্যাদেশ সবিতাদেবের অনুজ্ঞায় বর্তমান আমি ইন্দ্রের উত্তম স্বর্গে আরোহণ করব৷
১১। হে বৃহস্পতি! তুমি অন্নকে বিজয় করো। (বেদির নিকটস্থ স্থানে গঠিত বল্লীতে লগ্নীকৃত ১৬টি দন্দুভীর মধ্যে একটিকে যজুঃ মন্ত্রে বাদ্য করণীয়)–হে দুন্দুভীসকল! তোমরা বৃহস্পতির নিমিত্ত ধ্বনিত হও। তোমরা বৃহস্পতির দ্বারা অন্ন বিজয় করাও। হে ইন্দ্র! তুমি অন্নকে বিজয় করো। হে দুন্দুভীসকল! তোমরা ইন্দ্রের নিমিত্ত ধ্বনি উৎসারিত করো ৷
১২। মন্ত্রের দ্বারা বাদিত হওয়া দুন্দুভীকে এই যজুর্মন্ত্রে বল্লী হতে অবতারিত করছি। হে দুন্দুভীসকল! এই তোমাদের যথার্থ সিদ্ধ হওয়া যে, যার দ্বারা তোমরা বৃহস্পতিকে অন্ন জয় করিয়েছ। হে দুন্দুভীসকল! এক্ষত্রে তোমরা উন্মুক্ত হও। –হে দুন্দুভীসকল! তোমাদের বাদিত বাণী সত্যসিদ্ধ হয়েছে যে, যার দ্বারা তোমরা ইন্দ্রকে অন্নবিজয় করিয়েছিলে। হে কাষ্ঠের দ্বারা নির্মিত দুন্দুভীসমূহ! তোমরা ইন্দ্রকে অন্ন বিজয় করিয়েছিলে। এক্ষণে তোমরা বিমুক্ত।
১৩। সত্য প্রশাসন সবিতা দেবের অনুজ্ঞায় বর্তমান আমি হেন যজমান অন্নকে জয় করেছি-ও বৃহস্পতির অন্নকে জয় করব। অন্নকে জয়শালী হে বেগবান্ অশ্বসমূহ! অন্ন জয় করে, বিক্ষুব্ধ করে এবং অনেক যোজন পরিমিত মার্গের শেষ সীমা পর্যন্ত গমন করো বা পৌঁছাও ৷৷
১৪। গ্রীবা (ঘাড়), কক্ষা (বগল), এবং মুখে বন্ধনপ্রাপ্ত এই অশ্ব কশার (অর্থাৎ চাবুকের) আঘাতরূপ সংকেতে তেজের সাথে দ্রুত গমনশালী হয়। পাদের উপর ভর করে চলনশীল এই অশ্ব আরোহীর অভিপ্রায় অনুসারে পদক্ষেপ করে মার্গের লক্ষণগুলি বা চিহ্নগুলির লক্ষ্য রেখে গমন করে থাকে। স্বাহা মন্ত্রে এই ঘৃতের আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে।
১৫। মার্গে তেজের সাথে ধাবমান হয়ে অত্যন্ত ত্বরাযুক্ত সীমাকে অতিক্রমণে ইচ্ছাশীল এবং অশ্বের বস্ত্র-চামর প্রভৃতি পক্ষীর পংখের (পান্নার) ন্যায় স্পষ্টই পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাজপক্ষীর ন্যায় বেগে উড্ডীয়মান এবং বলের সাথে মার্গকে অতিক্রম করণশালী এই অশ্বের চামর ইত্যাদি চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে৷
১৬। যজ্ঞের অন্দর আহ্বানসমূহে পরিমিতগামী, সুন্দরবর্ণ, সর্প-বৃক-রাক্ষসদের কবল হতে আমাদের রক্ষা করে এবং শীঘ্রই আমাদের সর্বরোগ-ব্যাধিগুলিকে দূর করে এই অশ্ব আমাদের নিমিত্ত কল্যাণকারী হোক৷
১৭। আহ্বান শ্রবণশালী, পরিমিতাগামী, সহস্র রূপ দানশালী, যজ্ঞে ধন ইত্যাদির দাতা এবং যুদ্ধের যে বহুমূল্য রত্ন ইত্যাদিকে আহরণ করণশালী সকল অশ্ব আমাদের আহ্বান শ্রবণ করো।
১৮। অন্ন-অন্নের প্রাপ্তি এবং ধনসমূহেরও লাভের নিমিত্ত মেধাবী, অমরধর্মা এবং সত্য বা যজ্ঞকে জ্ঞাতশালী হে অশ্বসমূহ! তোমরা আমাদের রক্ষা করো। তোমরা সকলে এই নবারের (উড়িধান্যের) চরুকে পান (গ্রহণ) করো এবং আনন্দিত হও। তৃপ্ত হয়ে দেবান পথে গন্তব্যকে প্রাপ্ত হও।
১৯। অন্নের প্রভূত উৎপত্তি আমাতে প্রাপ্ত হোক এবং বিবিধ রূপশালিনী এই দ্যাবাপৃথিবী আমায় প্রাপ্ত হোক। আমার মাতা-পিতা আমাতে অনুকূলতার সাথে প্রাপ্ত হোক। অমৃত হয়ে সোম আমাকে প্রাপ্ত হোক। অন্নকে জয়শীল, পবিত্র হওনশীল এবং সপ্রাপ্তিযোগ্য হে অশ্বগণ! তোমরা বৃহস্পতির ভাগ নীবার চরুকে আঘ্রাণ করো। (এই যজুর দ্বারা নীবার চরুকে অশ্বগণের দ্বারা আঘ্রাত করণী)।
২০। (সম্বত্রাভিমাণী প্রজাপতি দেবতার উদ্দেশ্যে স্তুতি) সকলকে প্রাপ্ত করণশালী প্রজাপতি দেবতার নিমিত্ত স্বাহামন্ত্রে এই ঘৃতাহুতি প্রদান করছি। শুভতার সাথে সকলকে প্রাপ্ত করণশালী প্রজাপতি দেবের নিমিত্ত … পুনঃ পুনঃ উৎপন্ন হওনশালী প্রজাপতি দেবের নিমিত্ত….। যজ্ঞস্বরূপ বা সঙ্কল্পরূপ প্রজাপতি দেবের নিমিত্ত…। নিবাসের হেতুস্বরূপ, দিবসের স্বামী স্বরূপ, দিবসস্বরূপ, মুগ্ধশীল সত্তাস্বরূপ, বিনাশশীল পদার্থ সমূহে বিদ্যমান স্বরূপ, অন্ত্যস্থানে উৎপন্নস্বরূপ, অন্ত্যস্বরূপ, ভুবনে উদ্ভূত ভুবনের স্বামী স্বরূপ এবং সকলের অধিপতি প্রজাপতি দেবের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই ঘৃতাহুতি প্রদান করছি৷৷
মন্ত্রার্থঃ– [এই দশম অধ্যায়ে রাজসূয়ের শেষ কর্ম এবং চরক সৌত্রামণি যজ্ঞের বর্ণনা আছে। অভিষেকের নিমিত্ত উদুম্বর কাষ্ঠনির্মিত পাত্রে সরস্বতী প্রভৃতি নদীর জল গ্রহণ করা হয়। পূর্ব থেকে গাভীর উল্ক (গর্ভবেষ্টন চর্ম) ইত্যাদি অন্য অপেক্ষিত বস্তুসমূহ সংগ্রহ করে রাখতে হয় এবং যথাকালে সেগুলি নিয়ে যুপের উত্তর ভাগে ধারণ করতে হয়]।
১। দেবতাগণ যে মধুর, উর্জযুক্ত, রাজগণের উৎপন্নকারী ও চেতনাপ্রদ জল গ্রহণ করেছিলেন, আমি সেই জল গ্রহণ করছি। দেবতাগণ সেই জল গ্রহণ করেছিলেন, যে জলের দ্বারা তাঁরা মিত্র-বরুণকে অভিসিঞ্চিত করেছিলেন এবং অভিসিঞ্চনের দ্বারা দেবতা ইন্দ্রকে শত্রুদের অতিক্রম করিয়েছিলেন (অর্থাৎ ইন্দ্রকে শত্রুদের দ্বারা অজেয় করে দিয়েছিলেন)।
২। [এই দ্বিতীয় মন্ত্রটির মধ্যে এক-এক যজুর দুবার পাঠ আছে। স্বাহান্ত পাঠে আহুতি দেওয়া হয় এবং দ্বিতীয় পাঠে ভিন্ন ভিন্ন জল গ্রহণ করা হয়। কোন মনুষ্য বা পশু নদীজলে প্রবেশ করলে যে ক্ষুদ্র ঢেউ (লহরী) ওঠে–সেই ঢেউ বা লহরীকে উদ্দেশ্য করতে হয়]। হে লহর! তুমি সেচন-সমর্থ জনের লহরী সদৃশ, তুমি রাষ্ট্রদানকারী, আমাকেও রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে লহর (দ্বিতীয়)! তুমি সেচন-সমর্থ জনের লহরী সদৃশ। [এইবার গ্রহণ করণীয়]। তুমি রাষ্ট্র দানকারী। তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে লহর! তুমি সেচক জলরাশি সদৃশ; তুমি রাষ্ট্রদানকারী, আমাকে রাষ্ট্র প্রদান, করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে লহর! তুমি সেচক জলরাশি সদৃশ। তুমি রাষ্ট্র দানকারী, তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো-।
৩। হে জল! অভিষেকের প্রয়োজনার্থে তুমি (বা তোমরা) যজ্ঞস্থলকে প্রাপ্ত হয়ে থাকো; তুমি রাষ্ট্রদানকারী; আমাদের তুমি রাষ্ট্র প্রদান করো। এই আহুতি প্রদান করছি। হে জল! অভিষেকের প্রয়োজনের নিমিত্ত তুমি যজ্ঞ-স্থল প্রাপ্ত হয়ে থাকো; তুমি অভিষেচনের দ্বারা রাষ্ট্র-প্রদানকারী হয়ে থাকো। তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। হে জল! তুমি ওজসের (বলের) সাথে যুক্ত, রাষ্ট্রের প্রদানকারী। হে জল! তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। হে জল! তুমি সর্বত্র গমনশীল, তুমি রাষ্ট্রের প্রদানকারী; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো।.হে জল! তুমি সর্বত্রগমনশীল, তুমি রাষ্ট্রের প্রদানকারী; তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। হে সমুদ্র জল! তুমি নদী ইত্যাদি জলের স্বামী, তুমি রাষ্ট্র-প্রদানকারী; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে সমুদ্রজল! তুমি নদী ইত্যাদি জলের স্বামী; তুমি অভিষেকের দ্বারা রাষ্ট্রপ্রদানকারী। তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে অভিষেচনের দ্বারা রাষ্ট্র প্রদান করো। জলাবর্ত! তুমি জলের গর্ভ-সদৃশ, তুমি রাষ্ট্রদায়ক; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে জলাবর্ত! তুমি জলের গর্ভ, তুমি রাষ্ট্রদায়ক; তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো ৷
৪। হে স্থির ও সদা রৌদ্রযুক্ত জল! তুমি সূর্যের কান্তির সাথে সদা যুক্ত হয়ে থাকো, তুমি রাষ্ট্র-দায়ক; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে স্থির সঘর্ম-জল (অর্থাৎ সূর্যতাপিত জল)! তুমি সূর্যতেজঃ সম্পন্ন, তুমি রাষ্ট্রদানকারী; তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। হে তাপে বর্ষণকারী জল! তুমি সূর্যের বর্ভস বা তেজঃসম্পন্ন, তুমি রাষ্ট্রদাতা; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে ঘর্মধর্ষিত (বা তাপ-পরাহত) জল! তুমি সূর্যের তেজঃদ্বারা যুক্ত; তুমি রাষ্ট্র দানকারী, তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। হে পুষ্করিণী ইত্যাদিতে স্থিত আনন্দদায়ী জল! তুমি পশু-পক্ষী ইত্যাদির আনন্দদায়ক, তুমি রাষ্ট্রদানকারী; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে পুষ্করিণীর আনন্দপ্রদ জল! তুমি পশু ইত্যাদির আনন্দদায়ক, তুমি রাষ্ট্রদায়ক; তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে আনন্দ প্রদান করো, হে কূপজল! তুমি কূপে বাসকারী এবং রাষ্ট্রদাতা; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে কূপজল! তুমি কূপে স্থিত ও রাষ্ট্রদাতা; তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। হে শিশির জল! অন্নের উৎপত্তির নিমিত্ত সকলের কামনা স্বরূপ তুমি, তুমি রাষ্ট্র দানকারী; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবির আহুতি প্রদান করছি। হে অবশ্যায় (শিশির) জল! তুমি সকলের কাম্য, তুমি রাষ্ট্রদানকারী; তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। হে মধুরূপ জল! তুমি বল ও রাষ্ট্রদানকারী; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হেমধুজল!তুমি বলপ্রদ ও রাষ্ট্রদ। তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রধান করো! হে গর্ভ চর্মধৃত জল! তুমি গাভী হতে লভ্য, তুমি রাষ্ট্রদানকারী; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে চর্মজল! তুমি গাভী-সম্বন্ধী ও রাষ্ট্রদা; তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। হে দুগ্ধজল! তুমি লোককে পান ইত্যাদির দ্বারা ধারণ করে থাকো, তুমি রাষ্ট্রপ্রদ; তুমি আমাকে রাষ্ট্র প্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে দুগ্ধরূপ জল! তুমি লোককে ধারণকারী ও রাষ্ট্রপ্রদ; তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। হে ধৃতরূপ জল! তুমি বিশ্বের ধারক, তুমি রাষ্ট্রপ্রদ; তুমি আমাকে রাষ্ট্রপ্রদান করো। এই হবিঃ আহুত হচ্ছে। হে ধৃতরূপ জল!তুমি বিশ্বের ধারণকারী, তুমি রাষ্ট্রদায়ক। তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতিকে রাষ্ট্র প্রদান করো। [এই ভাবে যোড়শ প্রকার জলে হোম কর্তব্য]। মিরীচি ও সরস্বতী নদীর জলে প্রত্যক্ষ হোম হয় না। সূর্যকিরণে তাপিত জলকে মরীচি বলে। এই মরীচি-জলকে অঞ্জলিতে গ্রহণ পূর্বক শেষ অর্থাৎ শীতল জলের সাথে মিশ্রিত করে নিয়ে হোম কর্তব্য]। হে মরীচি জল! তুমি স্বয়ং শোভিত হয়ে থাকো, তুমি রাষ্ট্র-প্রদ, তুমি এই দেবদত্ত প্রভৃতি যজমানকে রাষ্ট্র প্রদান করো। [আবার, সরস্বতী নদী প্রভৃতি থেকে গৃহীত জলকে উদুম্বর কাষ্ঠ নির্মিত পাত্রের জল মিশ্রিত করে হোম কর্তব্য]। হে মধুর-জলের সাথে বিমিশ্রিত মধুর জল! এই মহৎ-রাজ্য এই ক্ষত্রিয় রাজার জন্য বরণ কর। [উদুম্বর পাত্রে সংমিশ্রিত জলকে মিত্র বরুণ-সম্বন্ধী চিন্তা পূর্বক ধারণীয়]। হে জল! রাক্ষসগণের দ্বারা অপরাভূত ওজবল-যুক্ত হয়ে ও এই ক্ষত্রিয় যজমানের নিমিত্ত মহৎ রাজ্যকে ধারণ করা জন্য তুমি স্থিত হও।
৫। [পলাশ ইত্যাদি পাত্রের পূর্বে ব্যাঘ্রচর্ম বিন্যস্ত করণীয়]। হে ব্যাঘ্রচর্ম! তুমি সোমের দীপ্তি স্বরূপ, তোমার ন্যায় আমি যেন কান্তিযুক্ত হই। আমি অগ্নিদেবের উদ্দেশ্যে, সোমদেবের উদ্দেশ্যে, সবিতা দেবতার উদ্দেশ্যে, সরস্বতী দেবতার উদ্দেশ্যে, পূষা দেবতার উদ্দেশ্যে, বৃহস্পতি দেবের উদ্দেশ্যে,ইন্দ্রদেবের উদ্দেশ্যে, ঘোষের উদ্দেশ্যে, শ্লোসের উদ্দেশ্যে, অংশের উদ্দেশ্যে, ভগের উদ্দেশ্যে ও অর্যমার উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি।
৬। [যজ্ঞে আজ্যসংস্কারের নিমিত্ত কুশের দ্বারা নির্মিত দুটি কুশ নির্মাণ পূর্বক সেই সুখদ্বয়কে পবিত্র স্থ মন্ত্রে পবিত্ৰীকৃত করণীয়। এই কুশ পবিত্র নামে অভিহিত]। হে পবিত্র! তোমরা দুজনে বিষ্ণু-সম্বন্ধি পবিত্র। হও। সর্বপ্রেরক সবিতা দেবের অনুজ্ঞায় বর্তমান আমি ছিদ্ররহিত পবিত্র তথা সূর্যের রশ্মির দ্বারা এই অভিষেক জলকে পবিত্র করছি। রাক্ষসদের দ্বার অতিক্ষুব্ধ হে জল! তুমি বাণীর বা বাকের বন্ধু তপ (অর্থাৎ অগ্নি হতে উৎপন্ন এবং সোমের দাতা। এই আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে। তুমি অভিষেকের দ্বারা রাজার উৎপাদক হও।
৭। অভিষেকের জন্য পবিত্ৰীকৃত জলকে পলাশ-উদুম্বর-অশ্বত্থ বট ইত্যাদি কাষ্ঠে নির্মিত পাত্রে অভিষেকের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা কর্তব্য]। এক পাত্রে হর্ষিত, যশ বা অন্নপ্রাপ্ত, রাক্ষসগণের দ্বারা অনভিভূত কর্মসমর্থ ও পাত্রের অত্যন্ত পাবন-সমর্থ এবং গৃহরূপ জলে জলের পুত্রকে আচ্ছাদনকারী এবং যে জল, এর মধ্যে বরুণদেব আপন সহস্থান নির্মাণ করে থাকেন (অর্থাৎ বরুণ বাস করেন)।
৮। [মন্ত্র পাঠ পূর্বক বস্ত্র ইত্যাদি ধারণ কর্তব্য]। হে রেশম বা বল্কল বা ঘৃতাক্ত বস্ত্র! তুমি যজমানে ধারণীয় গর্ভবেষ্টনী। হে রক্তকম্বল! তুমি এই গর্ভস্থ যজমানকে আবরণকারী চর্ম। হে কঞ্চকরূপ অধিবাস! তুমি এই যজমানকে গর্ভে ধারণকারী যযানি। হে শিরোবেষ্টন! তুমি ক্ষত্রিয় যজমানের গর্ভবন্ধন স্থান। [ধনুকে উদ্দেশ পূর্বক] হে ধনুঃ! তুমি বৃত্রহননকারী ধনুঃ। হে (ধনুর) দক্ষিণ কোটি (দক্ষিণদিকের ছিলা)! তুমি মিত্র সম্বন্ধিনী। হে উত্তর কোটি! তুমি বরুণ সম্বন্ধিনী। [অধ্বর্যু কর্তৃক যজমানকে ধনুঃ প্রদান করণীয়]। হে ধনুঃ! তোমার দ্বারা এই যজমান আপন শত্রুকে বধ করতে সমর্থ হবে। [এক এক মন্ত্রে অধ্বর্যু তিনটি বাণ গ্রহণ করবেন এবং এক এক মন্ত্রে যজমানকে এক এক বাণ প্রদান করবেন]। হে বাণ! তুমি শত্রুকে। বিদীর্ণকারী। হে দ্বিতীয়বাণ! তুমি শত্রুকে ভেদকারী। হে তৃতীয় বাণ! তুমি শত্রুকে কম্পিতকারী। হে বাণ! তুমি এই যজমানকে পূর্বদিক হতে রক্ষা করো। হে বাণ! তুমি এই যজমানকে পশ্চিম দিক হতে রক্ষা করো। হে বাণ! তুমি এই যজমানকে যত্র-তত্র রক্ষা করো। হে বাণ! তুমি এই যজমানকে সর্বদিক হতে রক্ষা করো।
৯। হে মনুষ্য-ঋত্বিকগণ! এই যজমান সকলকে সম্মুখে আনয়ন করেছে। গৃহস্বামী অগ্নিকে এই যজমান সম্মুখে প্রকট করেছে। প্রবৃদ্ধ বা চিরন্তন কীর্তিশালী ইন্দ্রকে এই যজমান সম্মুখে প্রকট করেছে। দেবানুশাসনের ধারকদ্বয় মিত্র বরুণকে এই যজমান সমক্ষে প্রকট করেছে। বিশ্বধন-প্রাপ্তকারক পূষাকে এই যজমান সম্মুখে প্রকট করেছে। সমগ্র সংসারের কল্যাণকারণ দ্যাবাপৃথিবীকে এই যজমান সম্মুখে প্রকট করেছে। বিস্তৃত সুখসম্পন্না অদিতিকে এই যজমান সম্মুখে প্রকট করেছে৷৷
১০। [এই যজুতে মৃত্যু নাশ হয়]। যজ্ঞের বিনষ্টকারী সর্পসদৃশ, অর্থাৎ অত্যন্ত দংশনশীল রাক্ষসগণ বিনষ্ট হোক। [সোমরস অভিষব করতে করতে যজমান কর্তৃক পাঁচটি যজুঃ পঠনীয়]। হে যজমান! এখন আমি পূর্ব দিকে বিহরণ করো। গায়ত্রী তোমাকে রক্ষা করুক; অভিত্বা শূরনোনুম ঋকের আশ্রিত রথন্তর সাম তোমাকে রক্ষা করুক; ত্রিবৎ স্তোম তোমাকে রক্ষা করুক; বসন্ত ঋতু তোমাকে রক্ষা করুক; ব্রাহ্মণের ধন। বা ধনরূপ ব্রাহ্মণ তোমাকে রক্ষা করুক।
১১। হে যজমান! তুমি দক্ষিণ দিকে বিহরণ করো। ত্রিষ্টুপ ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুক; ত্বামিদ্ধি হবামহে ঋকের আশ্রিত বৃহৎ সাম তোমাকে রক্ষা করুক; পঞ্চদশ স্তোম তোমাকে রক্ষা করুক; গ্রীষ্ম ঋতু তোমাকে রক্ষা করুক। ধনরূপা ক্ষত্রিয় জাতি, তোমাকে রক্ষা করুক।
১২। এখন তুমি পশ্চিম দিকে বিহরণ করো। জগতী ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুক; বৈরূপ সাম তোমাকে রক্ষা করুক; সপ্তদশ স্তোম তোমাকে রক্ষা করুক; বর্ষা ঋতু তোমাকে রক্ষা করুক; ধনরূপা বৈশ্যজাতি তোমাকে রক্ষা করুক।
১৩। হে যজমান! এখন তুমি উত্তর দিকে বিহরণ করো। অনুষ্টুপ ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুক; পিবা সোমমিন্দ্র মন্দতু ত্ব ঋকের আশ্রিত ধৈরাজ সাম তোমাকে রক্ষা করুক; একবিংশ স্তোম তোমাকে রক্ষা করুক;শরৎ ঋতু তোমাকে রক্ষা করুক; যজ্ঞের ফলরূপ ধন তোমাকে রক্ষা করুক।
মন্ত্ৰার্থঃ– [এই একাদশ থেকে অষ্টাদশ অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত মন্ত্রগুলিতে যজ্ঞের বেদি নির্মাণ সম্পর্কিত মন্ত্রসমূহ কথিত হয়েছে। পৃথ্বীভূমিতে অর্থাৎ মাটিতে গর্ত খনন করে বেদি নির্মাণ করা হয়। আহুতির পরিমাণ এবং যজ্ঞকর্মের উদ্দেশ্যভেদে বেদির নির্মাণের ক্ষেত্রেও অনেক ভেদপ্রভেদ আছে। বেদীর মধ্যস্থ দেওয়াল নির্মাণে ইষ্টকের (ইটের) প্রয়োজন হয়। এই ইষ্টকের দ্বারা বেদিকে যথাযথ লম্বা চওড়া করার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বনীয়। ইষ্টকের এই চিহ্নকে চিতি বলে। সাধারণ বেদিতে পাঁচটি চিতি হয়ে থাকে]।
১। সর্বপ্রথম সর্বপ্রেরক বা উৎপাদক সবিতাদেব-আপন মনে বেদিচয়নের নিশ্চয়তা এবং তার প্রকার প্রভৃতি পর্যালোচনা করেছিলেন। তখন তিনি আপন বুদ্ধিতে নিশ্চিতরূপে জানলেন যে, সকল কর্মের সাধকত্ব হলো অগ্নির তেজঃ; সুতরাং তিনি অগ্নিকে পৃথিবীতে স্থাপন করার উদ্দেশ্যে ইষ্টক ইত্যাদি আহরণ করেছিলেন৷৷
২। সেই প্রথম সর্বপ্রেরক সবিতাদেবের প্রেরণায় বিদ্যমান আমরা যজমানগণ বর্তমানে যজ্ঞকর্তা ব্রহ্মগণও আপন মনে যজ্ঞকর্ম পিরণ পূর্বক স্বশক্তিভর, স্বর্গ-গমনের কামনায় বেদিকে চয়ন করছি৷৷
৩। অগ্নিকর্ম সংযোজিত করে সর্বপ্রেরক সবিতাদেব স্বর্গে গমনোদ্যত, আপন বুদ্ধিতে দ্যুলোককে চিন্তাকারী ও সর্বফল সাধক অগ্নির মহতী ও জ্যোতির্ময় যজ্ঞরূপের প্রচলনকারী দেবগণকে বেদি চয়নের নিমিত্ত সম্প্রেরিত করেছেন৷
৪। মহান্ ও বিদ্বান্ যজমানের মেধাবী বেদিচয়নকর্তা ঋত্বিকগণ আপন মনকে অন্য বিষয় হতে নিরস্ত করে বেদিচয়নের কর্মে নিয়োজিত করেছেন এবং তারা আপন বুদ্ধি অনুসারে বেদির পরিমাণ এবং ইষ্টক প্রভৃতির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ইত্যাদি বিষয় নির্ধারিত করেন। যজ্ঞকর্মের সকল বিষয় সম্পর্কে বিজ্ঞাত সবিতাদেবই এই যজমান ও হোমকর্তা ঋত্বিকগণকে ধারণ করেছেন। তিনি একাকীইএই যজমান ও ঋত্বিকগণকে তাদের স্বামী ও সেবকরূপে নিয়মিত করছেন। সেই সবিতাদেবের এই এক পরম স্তুতি (বা মহিমা)।
৫। হে যজমান ও যমমান-পত্নী! তোমাদের দুজনের কল্যাণের নিমিত্ত অন্ন ইত্যাদি সহ শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণগণকে সংযোজিত ও সন্তুষ্ট করছি। দুই লোককে প্রাপ্তকারী এই আহুতির মতো তোমাদের যশও সেই দুই লোককে প্রাপ্ত হোক। মরণরহিত প্রজাপতির সেই দেবপুত্রগণ সকলে এই যজমানের কীর্তিকথা শ্রবণ করুন–যে দেবপুত্রগণ দিব্যস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
৬। যে সবিতাদেবের গমনকে অন্য সকল দেবতা অনুসরণ করে থাকেন এবং যে দেবতার মহতী মহিমাকে সকল দেবতা আপন ওজ-তেজে অনুগমিত করে থাকেন, যিনি এই সকল পার্থিব পদার্থকে সৃষ্টি করেছেন–সেই সর্বপ্রেরক পরমাত্মা স্বমহিমায় সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে আছেন৷
৭। হে সবিতাদেব! আপনি যজ্ঞকে প্রেরিত করুন এবং যজ্ঞকর্তা যজমানকেও পরম সৌভাগ্যের (অর্থাৎ স্বর্গ ইত্যাদি ফলের) নিমিত্ত প্রেরিত করুন। স্বর্গস্থ জ্ঞানকে পবিত্রকারী ও বেদবাণীকে ধারণকারী এই সবিতাপে আমার জ্ঞানকে পবিত্র করুন। বাণীর স্বামী এই প্রজাপতি আমাদের এই স্তুতিবাক্য গ্রহণ করুন।
৮। হে সবিতাদেব! দেবতাগণকে প্রীণিতকারী, স্বনিম্পাদক যজমান-মিত্রের জ্ঞাপক, সত্যব্রহ্মকে জয়কারী, ধন-জয়ী, স্বর্গ-বিজয়ী আমাদের এই প্রবর্তমান যজ্ঞকে আপনি নির্বিঘ্নতার সাথে সম্পন্ন করিয়ে দিন। হে সবিতাদেব! ঋকের দ্বারা আমাদের ত্রিবৃৎ ইত্যাদি স্তোত্রকে পূর্ণভাবে পল্লবিত করুন। গায়ত্রসামের দ্বারা রথস্তর ও বৃহৎসামকে বর্ধিত করুন যে বৃহৎসাম গায়ত্রসামের মার্গভূত।
৯। হে অভ্রি (কাষ্ঠনির্মিত কুঠার)! সবিতাদেবের অনুজ্ঞায় আমি তোমাকে অশ্বিনযুগলের বাহুদ্বয় এবং পূষাদেবতার দুই হস্তের দ্বারা, পূর্বজ অঙ্গিরা ঋষিগণের ন্যায়, গায়ত্রী ছন্দের উচ্চারণে গ্রহণ করছি। হে অদ্রি! এখন তুমি অঙ্গিরা ঋষিগণের অনুরূপ আমার নিমিত্তও পৃথিবীর (মৃত্তিকার) নিম্ন হতে জলীয় বা পশুহিতকরী অগ্নিকে আহুত করো–আঙ্গিরস ঋষিগণ যেমন ত্রিষ্টুপ ছন্দে করেছিলেন।
১০। হে অভ্রি তুমি বাঁশ বা কাষ্ঠের দ্বারা নির্মিত কুঠার। তুমি স্ত্রীলিঙ্গা (অর্থাৎ নারীরূপা)। হে অভি! আঙ্গিরসগণের ন্যায় আমরাও তোমার দ্বারা জগতীছন্দে পৃথিবীর উৎসঙ্গে (ক্রোড়ে) বিদ্যমান অগ্নিকে খনন পূর্বক বাহিরে আনয়নে সমর্থ হবো।
১১। প্রজাপতি স্বর্ণবর্ণের অদ্রি হস্তে ধারণ করে অঙ্গিরাগণের ন্যায় অনুষ্ঠুভ ছন্দে পৃথিবীর নিম্নভাগে অগ্নির জ্যোতির বিদ্যমানতাকে নিশ্চয় করে তাকে সেখান হতে আহরণ করে এনেছিলেন।
১২। [হস্তে অত্রি ধারণ করে অশ্বকে সম্বোধন করে পঠিতব্য মন্ত্র] হে অশ্ব! পাষাণ ইত্যাদির অভাবজনিত কারণে খননের পক্ষে সুখসাধ্য এই শ্রেষ্ঠ ভূমির উপরে তুমি শীঘ্রতার সাথে আগমন করো। হে অশ্ব! তোমার জন্ম দ্যুলোকে, তোমার নাভি (মধ্যভাগ) উৎকৃষ্ট অন্তরিক্ষলাকে এবং তোমার পদ (বা যোনি) এই পৃথিবীর উপর রয়েছে৷৷
১৩। হে ধনবৰ্ষক পত্নীয়যজমান (যজমান ও পত্নী বা অধ্বর্যু ও যজমান)! তোমরা দুজনে এই কর্মবিশেষে অগ্নিকে আহ্বানকারী ও আমাদের হিতকামনাকারী গর্দভকে বন্ধন করো ৷
১৪। গের্দভকে বন্ধন পূর্বক ছাগকে আহ্বান করণীয়]। যথাযথ কর্মে (বা যে যে কর্মে) সেই সেই দেবতার হবিরান্নের অপেক্ষায় অত্যন্ত উৎসাহবান এই মিত্র ছাগকে আমরা ঋত্বিক-যজমান হবির অভাবরূপ বিপত্তি হতে রক্ষার নিমিত্ত আহ্বান করছি৷৷
১৫। [স্পর্শ না করে অশ্ব ও গর্দভকে অগ্রে চালিত করণীয়–] হে অশ্ব! আমাদের শত্রুদের দ্বারা কৃত অপকীর্তিকে আপন পদে দলিত করে এবং শত্রুদের প্রতি হিংসান্বিত হয়ে তুমি অগ্রে আগত হও। হে অশ্ব! তুমি আমাদের সুখকে সম্ভাবিত করতে রুদ্রের গণপতিত্ব প্রাপ্তির অভিলাষে অগ্রে আগত হও। হে গর্দভ! কল্যাণ-মার্গশালী তুমি আমাদের নিমিত্ত ভয়কে দূর করো; সহযোগিনী পৃথিবীর সাথে বিস্তৃত আকাশকে সম্প্রপ্ত হও।
১৬। [ছাগকে উকরিমিত করার উদ্দেশ্যে পঠনীয় মন্ত্র–] হে অভ্রি! পৃথিবীর অভ্যন্তর হতে তুমি পশুহিতকারী বা জলীয় অগ্নিকে আহরণ করো; যেমন–অঙ্গিরা ঋষিগণের নিমিত্ত নিয়ে এসেছিলে। এখন আমরা এই পশুর (অর্থাৎ অশ্ব, রাসভ ও অজের) হিতকারী অগ্নির অভিমুখ্য হচ্ছি। আমরা অঙ্গিরা ঋষিগণের মতো এই পশুহিতকারী অগ্নিকে সম্পাদিত করব।
১৭। উৎপন্ন পদার্থমাত্রকেই জ্ঞাতশালী এই অগ্নি, বেদিতে সর্বপ্রথম সম্পাদিত হয়ে, সর্বদা উষার অগ্রভাগ (অর্থাৎ প্রথম প্রকাশ) দর্শন করছেন। ইনি সূর্যের প্রথম রশ্মিমালাকেও বিবিধ রূপে প্রসারিত হতে দর্শন করেছেন। অন্তেও স্বয়ং এই অগ্নি দ্যাবাপৃথিবীর অনুকূলতায় উভয় লোককে বিস্তারিত করছেন (অর্থাৎ সর্বত্র সকলের যজ্ঞ ইত্যাদি কর্মকে সিদ্ধ করছেন)।(আমরা সেই অগ্নিকে দর্শন করছি)৷
১৮। মৃত্তিকার স্কুপের নিকট স্থিত যজ্ঞীয় অশ্বকে সম্বোধন) এই অশ্ব মার্গ অবলম্বন পূর্বক আগমন করছে এবং এখানকার সকল হিংসককে অত্যন্ত কম্পিত করছে। অনন্তর মহাসংস্থান পৃথিবীতে বর্তমান অগ্নির কারণে মৃত্তিকা আপন চক্ষে দর্শন করছেন।
১৯৷ হে বেগবান অশ্ব! তুমি অগ্নির স্থান বেদীর যোগ্য কিনা তা নিশ্চয় করার নিমিত্ত পৃথিবীকে (পদের দ্বারা) আক্রমণ করো। হে অশ্ব! এইভাবে আপন পদের দ্বারা সেই ভূমিকে স্পর্শ করে তুমি সেই মৃত্তিকা আমাদের নিকট সূচিত করো, যাতে আমরা তা শুদ্ধ জেনে (উখার নিমিত্ত) খনন করতে পারি৷৷
২০৷ হে অশ্ব! দ্যুলোক তোমার পৃষ্ঠ, পৃথিবী তোমার সহস্থান, অন্তরিক্ষ তোমার আত্মা এবং এই সমুদ্র তোমার উৎপত্তি স্থলী। এইরকম স্কুয়মান হে অশ্ব! তুমি আপন চক্ষে উখার যোগ্য মৃত্তিকার পরিচয় জ্ঞাত হও, এবং সেই মৃত্তিকায় শত্রুভাবে নিহিত রাক্ষস ইত্যাদিকে আপন পদে দলিত করো ৷৷
২১৷ হে বেগবান অশ্ব! ধনদাতা তুমি মহান্ সৌভাগ্যের নিমিত্ত এই মৃত্তিকার স্তূপ (বা পিণ্ড) হতে অবতরণ করো। এই পৃথিবীর উপর হতে মৃত্তিকা খননের কর্মে আমরা অধ্বর্যু, যজমান ইত্যাদি সকলে এই পৃথিবীর অনুগ্রহ-বুদ্ধিতে অবস্থান করতে পারব ৷৷
২২। এই বেগবান ও ধনদাতা অশ্ব মৃত্তিকা খননের স্থান হতে পৃথক্ (অর্থাৎ অপসারিত) হয়েছে। পৃথক্ হয়ে সেই স্থান এই অশ্বের দ্বারা পুণ্যবান হয়েছে। (অর্থাৎ আপন উপস্থিতির দ্বারা ঐ স্থলকে অগ্নিচয়নের মৃত্তিকা খননের অহতা বা যোগ্যতা প্রদান করে দিয়েছে)। এখন আমরা ঐ স্থান হতে শুভ মুখসম্পন্ন অগ্নির বেদির উখার নিমিত্তি মৃত্তিকা খনন করছি, কারণ আমরা বৈকুণ্ঠের উত্তম সুখে আরোহণ করার অভিলাষী হয়ে আছি৷৷
২৩। হে অভ্রি! তোমার দ্বারা সকল ভূতে (প্রাণীতে) নিবাসকারী অগ্নিকে আমি শ্রদ্ধাযুক্ত মনে ঘৃতের দ্বারা আসিঞ্চিত করছি। হে অগ্নি! আপন তির্যক্-গামিনী জ্যোতির দ্বারা অত্যন্ত ব্যাপ্তশালী এবং ধূমে অত্যন্ত মহান্ অবকাশবান্ তথা বিবিধ ঘৃত ইত্যাদি হবিরান্নের আহুতির দ্বারা ঊর্ধ্বে অতি বেগবান্ তুমি সকলের প্রত্যক্ষদ্রষ্টা দেবতা। (আমি ঘৃতের দ্বারা সিঞ্চিত করছি)
২৪। প্রত্যগাত্মতয়া সর্বত্র প্রতীয়মান সেই অগ্নিকে আমি ঘৃতের দ্বারা সর্বথা আপ্লুত করছি। এই অগ্নি আমার এই ঘৃতধারাকে ক্রৌর্যরহিত মনে (প্রসন্নচিত্তে) সেবন করুক। মনুষ্যের দ্বারা আশ্রয়ণীয়, স্পৃহনীয় বর্ণশালী এবং আপন জ্বালাময় শরীরে ইতস্ততঃ সঞ্চরণকারী (বা বিস্তারলাভী) এই অগ্নি (দাহক হওয়ার কারণে) কোনও রকমে স্পর্শ করার যোগ্য নয়৷
২৫। অন্নের পালক এবং ক্রান্তদ্রষ্টা অগ্নি হবিদাতা যজমানকে বিবিধ রমণীয় ধন প্রদান পূর্বক বিবিধ হবিঃ ভক্ষণের উদ্দেশ্যে পরিসংক্রান্ত (সপ্রাপ্ত) হচ্ছে৷
২৬। বলকে মন্থন করে উৎপাদ্যমান হে অভ্রি! সর্বরক্ষক পুরী রূপে স্থিত, মেধাবী, ধর্ষক (অসহ্য) স্বরূপ এবং দিন-প্রতিদিন বিঘাতক রাক্ষস ইত্যাদিকে বিনাশকারী তুমি অগ্নিকে আমাদের সকলের নিমিত্ত সর্বথা আঋত (ধ্যান) করে থাকো।
২৭। হে অগ্নি! তুমি মন্থনের দ্বারা দিনে প্রতিদিনে, উৎপন্নশালী, জল হতে বিদ্যুৎরূপে উৎপন্নশালী প্রস্তরে স্তরে সঙ্র্ষণের দ্বারা উৎপাদ্যমান এবং তুমি অরণি হতে উৎপন্নশালী। মানুষের পালক তথা অতিশীঘ্র আপন দীপ্তিতে তমঃ প্রভৃতির নাশকারী তুমি ঔষধি হতেও উৎপন্ন হয়ে থাকো, অথবা তুমি পরম পবিত্রকারী৷
২৮। হে অভি! এখন আমরা অঙ্গিরাগণের মতো,সবিতাদেবতার অনুজ্ঞায় এবং অশ্বিনযুগলের বাহুদ্বয় ও পূষাদেবতার হস্তদ্বেয়ের দ্বারা পশুহিতকরী অগ্নির নিমিত্ত তোমার সাহায্যে পৃথিবীর সহস্থানে খনন করছি। জ্যোতি-জ্বালা যুক্ত, সুন্দর মুখশালী ও সতত তেজের সাথে প্রকাশমান, প্রজাগণের নিমিত্ত সদা কল্যাণকারী তথা অহিংসক পশব্য (অর্থাৎ পশু-সম্বন্ধীয়) অগ্নির নিমিত্ত আমরা অভ্রির দ্বারা (চিতিতে চয়নযোগ্য মৃত্তিকা) খনন করছি। (পুনঃ পাঠ শ্রদ্ধার নিমিত্ত)।
২৯। [বিস্তৃত কৃষ্ণাজিনের উপরে কমলিনীদল ছড়িয়ে–] হে কমলিনীদল! তুমি জলের পৃষ্ঠ অগ্নির নিমিত্ত এই মৃত্তিকার স্কুপ খননের তুমি কারণভূত। সকলের অপেক্ষা বর্ধমান সমুদ্রকেও তুমি বর্ধিতকারী; তুমি মহান্। হে পুষ্করপর্ণ! তুমি দ্যুলোকের মাত্রা অনুসারে নিজেকে স্বমহিমায় বিস্তারিত করো (অর্থাৎ অতি দীর্ঘ প্রাপ্ত হত)।
মন্ত্ৰার্থঃ— ১। [এই দ্বাদশ অধ্যায়ে উখার উপর ধারণীয় মন্ত্রের সংগ্রহ আছে। যজমান একটি স্বর্ণহার গলে ধারণ করেন, তার নাম রূক্স। বাস্তবিক এই রূক্স সূর্যের প্রতীক। এখানে সূর্যের স্তুতিই করা হয়েছে]। আপন মহতী জ্যোতিতে প্রকাশিত এই দৃশ্যমান সূর্য পূর্ব দিকে উদয় প্রাপ্ত হয়েছেন। সমগ্র দিনব্যাপী এঁর জীবন (অধিষ্ঠান) সৰ্বৰ্থা দুর্ধর্ষ (অর্থাৎ অপরাজেয়)। ইনি শোভাপ্রাপ্ত হওয়ার নিমিত্ত দীপ্তিকে ধারণ করে থাকেন। সূবীর্যা দ্যুলোক যখন এই সূর্যকে প্রকট করেন, তখন হবিরান্নের দ্বারা অগ্নি অমৃতত্ব (অর্থাৎ দেবত্ব) প্রাপ্ত হয়েছিলেন (অর্থাৎ হবিরান্নে অগ্নিকে তৃপ্ত করা হয়েছিল বা হোম প্রারম্ভ করা হয়েছিল)
২। সমান চিত্ত তথা সমান প্রেমভাগে আপন আপন কালযাত্রাকারী, পরন্তু স্বরূপে শুক্লকৃষ্ণ হয়ে পরস্পর বিপরীত বর্ণশালী এই দিন-রাত্রি এই এক অগ্নিশিশুকে স্তন্যপান (অর্থাৎ হবিরাদি লাভ) করায় (বা সকাল-সন্ধ্যায় হোম সম্পন্ন করায়)। যেমনই এবং যখন পর্যন্ত (সায়ংকাল) এই প্রকাশমান রূক্স (সূর্য) দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যভাগে (অন্তরিক্ষে) চমকতা সৃষ্টি করে, সেইরকমই ধন (প্রাণ) দানকারী দেবগণ এই অগ্নিকে (বা অগ্নিহোত্রকে) ধারণ করেন, আমিও সেই অগ্নিকে ধারণ (বা তৃপ্ত) করছি৷
৩। ক্রান্তদ্রষ্টা এই সূর্য আপন কিরণকে বিবিধ রূপে ব্যক্ত করেন বা অন্ধকারাচ্ছন্ন পদার্থের বিবিধ কার্যকে প্রকাশিত করে। সেই সূর্য দ্বিপাদ মনুষ্য ইত্যাদি ও চতুষ্পদ গো ইত্যাদি পশুর নিমিত্ত কল্যাণ (স্ব স্ব ব্যাপারে নিরত) উৎপন্ন করে। এই বরণীয় সূর্য স্বর্গকে প্রকাশিত করে থাকেন। এই সূর্য উষার গমনের পর আকাশে শোভায়মান হয়ে থাকে।
৪। হে সবিতাদেব! তুমি গরূড়ের স্বরূপ। ত্রিবৃৎ সাম তোমার শির; গায়ত্ৰ সাম তোমার আঁখি; বৃহৎসাম ও রথন্তর সাম তোমার দুই পক্ষ। পঞ্চদশস্তোম তোমার অন্তঃকরণস্থানীয়; সাতটি ছন্দ তোমার অঙ্গ; সকল যজু তোমার নাম; বামদেব্য সাম তোমার শরীর; যজ্ঞাযজ্ঞিয় সাম তোমার পুচ্ছ, তথা হোত্র ইত্যাদি ধিষ্ণন্যসমূহে (অর্থাৎ যথাযথ স্থানে) স্থিত অগ্নিসমূহ তোমার হস্ত বা পদের পাঞ্জা বা খুর। হে সবিতৃদেব! তুমি শুভগতি গরুড়পক্ষী। তুমি দ্যুলোকে গমন করো এবং স্বর্গে উড্ডয়ন করো।
৫। [যজমান চারটি যজুমন্ত্র সহকারে পূর্বদিকে চার কদম অগ্রসর হন। তখন যজমান স্বয়ংই নিজেকে এই অগ্নির সাহচর্যে যজ্ঞের অভিমানী দেব বিষ্ণুরূপে মান্য করে থাকেন। হে আমার প্রথম পাদন্যাস! তুমি বিষ্ণুর (বা যজ্ঞদেবের পান্যাস স্বরূপ। তুমি শত্রুর বিনাশকারী; তুমি গায়ত্রী ছন্দের উপর আরূঢ় হও এবং এই পৃথিবীকে বিকসিত করে নাও (জয় করো)। হে আমার দ্বিতীয় পাদন্যাস!তুমি বিষ্ণুর প্রক্রম তুমি অভিমানী শত্রুকে হননকারী; তুমি ত্রিষ্টুপ ছন্দের উপর আরূঢ় হও এবং অন্তরিক্ষকে বিক্রমিত করে নাও (অর্থাৎ বিক্রমের দ্বারা অধিকার করো)। হে তৃতীয় পাদন্যাস! তুমি বিষ্ণুর প্রক্রম। তুমি অদাতৃত্ব আচরণকারী (অর্থাৎ দান করতে পরাম্বুখ) জনের বিনাশকারী; তুমি জগতী ছন্দের উপর আরূঢ় হও এবং দ্যুলোককে অনুক্রান্ত করে নাও। হে আমার চতুর্থ পাদন্যাস! তুমি বিষ্ণুর চতুর্থ পাদন্যাস।তুমি শত্ৰুত্ব আচরণকারীগণের বিনাশক; তুমি অনুষ্টুপ ছন্দের উপরে আরূঢ় হও এবং এই পূর্ব ইত্যাদি চারটি দিক-বিদিককে আপন পরাক্রমে অনুক্রমিত (বা বিজিত) করে নাও।
৬। মেঘের ন্যায় গর্জিত হয়ে অগ্নি নিনাদ করছে। মেঘের ন্যায়ই এ (এই অগ্নি) পৃথিবীকে সর্বথা লোহন করছে, তথা লতা ইত্যাদিতে ব্যাপ্ত করছে। অরনিমন্থন হতে তৎক্ষণাৎ উৎপন্ন হয়ে এই অগ্নি অত্যন্ত প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে। এই অগ্নি আপন প্রকাশের দ্বারা সকল বস্তু মাত্রকেই প্রকাশিত করে থাকে এবং দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যে, মেঘের মধ্যস্থ বিদ্যুতের মতো, আপন প্রকাশে বা দীপ্তিতে প্রদীপ্ত দান করে থাকে৷৷
৭। হে আমার সম্মুখে আগমনকারী অগ্নি!তুমি আয়ু, ব্রহ্মতেজঃ, সন্তান, ধন, অভীষ্টলাভ, ধারণাবতী বুদ্ধি, সুবর্ণালঙ্কারী তথা গো-অশ্ব ইত্যাদির পুষ্টির সাথে সাথে আমাদের সম্প্রপ্ত হও।
৮। হে অঙ্গে অঙ্গে রসভূত অথবা অঙ্গসৌষ্ঠবসম্পন্ন অগ্নি! আমাদের প্রতি অতিশয় প্রেমবশ তোমার শত শত আবৃত্তি (অর্থাৎ স্বয়ংই অসংখ্য বার আগমন) আমাদের যজ্ঞস্থানে সম্ভব হোক এবং তোমার দ্বারা প্রদীয়মান ধন-পশু ইত্যাদির উপবৃত্তিগুলি (অর্থাৎ সপ্রাপ্তিগুলি) সহস্র সহস্র হোক। হে অগ্নি! তোমার আবৃত্তি ও উপবৃত্তিগুলি দ্বিগুণিত-চতুগুৰ্ণিত হোক (অর্থাৎ অধিক অধিক ধন প্রদান করুক), সেগুলির দ্বারা তুমি আমাদের নষ্ট ধন-পশু ইত্যাদিগুলিকে পুনরায় সম্প্রপ্ত করাও। হে অগ্নি! আমাদের গো-অশ্ব-ধনকে পুনরায় সিদ্ধ (সপ্রাপ্ত) করাও।
৯। হে অগ্নি! তুমি পুনরায় আমাদের বলবীর্যে সম্পন্ন করো; পুনরায় আমাদের অন্ন ও আয়ুর সাথে সম্প্রাপ্ত হও। এখানে এই যজ্ঞে আগমন পূর্বক, হে অগ্নি! তুমি পুনঃ পুনঃ পাপ হতে আমাদের রক্ষা করো।
১০। হে অগ্নি! তুমি ধনের সাথে আমাদের সম্প্রপ্ত হও। হে অগ্নি! বৃষ্টিধারা যেমন সকলের উপর বর্ষণকারী, সেইভাবে সমগ্র বিশ্বের উপর ধন আসিঞ্চিত (অর্থাৎ বর্ষণ) করো।
১১। হে অগ্নি! আমি তোমাকে আহুত করেছি। তুমি এই উখার মধ্যে স্থিত হও। তুমি এর মধ্যে সম্পূর্ণ অচঞ্চল তথা স্থিরমান হয়ে উপবেশন করো, সকল প্রজা তোমাকে কামনা করুক এবং সমগ্র রাষ্ট্র (বা রাজ্য) তোমার পরিচর্যা (যজ্ঞ ইত্যাদি কর্ম) হতে যেন ভ্রষ্ট না হয়।
১২। হে বরণীয় পরমাত্মা (বরুণ)! আমাদের মস্তকস্থ বন্ধন (পাশ) দূর করো; নিম্নে পাদভাগস্থ বন্ধন দূর করো এবং দেহের মধ্যভাগে (অর্থাৎ বক্ষ ইত্যাদিতে) বিলগ্ন বন্ধনকে শিথিল করো। হে অদিতির পুত্র বরুণ! নিষ্পাপ আমরা এখন যেন তোমার যজনকর্মে যোগ্য হই এবং অদিতির প্রতিও আমরা যেন অনাগস (অর্থাৎ অপরাধহীন) হতে পারি৷
১৩। [এইখানে অগ্নিকে আদিত্যরূপে স্তুতি করা হচ্ছে]। উষার অগ্রেই মহান্ অগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে স্থিত হয়েছে। সেই অগ্নি রাত্রির অন্ধকারকে পার করেছে। জ্যোতির সাথে সে সূর্যরূপে সম্মুখে এসেছে। শোভন অঙ্গশালী অগ্নি অন্ধকার ইত্যাদি নাশকারী আপন জ্যোতির সাথে প্রকট হয়েছে এবং উৎপন্ন হওয়া মাত্রই সমস্ত লোক-লোকান্তরকে (আলোকে) ব্যাপ্ত করেছে৷৷
১৪। গমনশীল, পবিত্র স্থানে স্থিতিশীল, স্বয়ং ধনস্বরূপ বা সকলকে বসতি দানকারী, অন্তরিক্ষে স্থিতিশীল, দেবগণকে আহ্বানকারী, বেদিতে স্থিতিশীল অতিথিস্বরূপ বা সর্বপূজ্য, যজ্ঞগৃহে স্থিতিশীল, মনুষ্যের মধ্যে জঠরাগ্নি বা প্রাণরূপে স্থিতিশীল, শ্রেষ্ঠস্থানে স্থিতিশীল, আকাশে বিদ্যুৎরূপে স্থিতিশীল, জলে উৎপন্ন, গো-ইত্যাদিতে ঘৃত ইত্যাদি রূপে উৎপন্ন, সত্যে (যজ্ঞে) অরণিমন্থনে উৎপন্ন স্বয়ং পরমসত্য ও অত্যন্ত মহান এই অগ্নি (তৎস্বরূপ পরমাত্মা)।
১৫। হে অগ্নি! সকল প্রজ্ঞানভাগে জ্ঞানশালী তুমি এই মঞ্চে বা উখারূপ মাতৃক্রোড়ে উপবেশন করো। আপন তাপে বা আপন জ্বালা-উত্মায় তুমি এই স্থানকে তাপিত করো না। তুমি এই উখার মধ্যে শুভ্রজ্যোতিতে সদা দেদীপ্যমান হও।
১৬। হে অগ্নি! আপন গৃহরূপ এই উখার মধ্যে তুমি আপন কান্তিতে পূর্ণভাবে প্রকাশিত হও। আপন তেজঃ প্রভাবে এই উখাকে তাপিত করেও, হে অগ্নি! তুমি এর প্রতি (এই উখার প্রতি) কল্যাণকারী হও
১৭। হে অগ্নি! আমার নিমিত্তও তুমি কল্যাণকারী হয়ে আপন শিবস্বরূপে (বা মঙ্গলময় রূপে) এই উখায় স্থিত হও। সকল দিককে কল্যাণকারিণীরূপে প্রস্তুত করে, হে অগ্নি! তুমি আপন যোনিভূতা এই উখায় স্থিত হও।
১৮। সর্বপ্রথম আদিত্যরূপে অগ্নি দুলোকে উৎপন্ন হয়েছিল। উৎপন্ন হয়ে লভ্য এই অগ্নি আমাদের অরণিমন্থন হতে দ্বিতীয় রূপে (প্রথম উৎপত্তির পরে) উৎপন্ন হয়েছিল। মনুষ্যের কল্যাণ কামনাকারী এই অগ্নি (যজ্ঞ ইত্যাদির অনন্তরে) মেঘে (অথবা সমুদ্রে) বিদ্যুতাগ্নি (ঝ বড়বাগ্নি অথবা উভয়) রূপে উৎপন্ন হয়েছিল। জলে নিহিত বিদ্যুতাগ্নি (বা বড়বাগ্নি অথবা উভয়াগ্নি), সেই জল হতে সামিধ্যমান হয়ে সতত সেই জলকে ক্ষপিত (অর্থাৎ বর্ষিত) করতে থাকে। (অজস্র-জন্মা এই অগ্নিকে যজমান প্রজ্বলিত করে আপন জরা পর্যন্ত পরিচর্যা করে থাকেন)।
১৯৷ হে অগ্নি! আদিত্য, পার্থিবাগ্নি ও বিদ্যুতাগ্নি রূপে তোমার তিন জন্ম সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত আছি। তারা (সেই রূপত্রয়) দ্যুলোক পৃথিবী ও অন্তরিক্ষে স্থিত (তা-ও আমরা জ্ঞাত আছি)। পরন্তু সেই সাথে কাষ্ঠ ইত্যাদি গত সর্বত্র তোমার সূক্ষ্ম ব্যাপকতাও আমরা জ্ঞাত আছি। তোমার যে প্রাণস্বরূপ অত্যন্ত নিভৃতস্বরূপ আছে, আমরা তা-ও জ্ঞাত আছি। আমরা সেই পরমাত্মস্রোতকেও জ্ঞাত আছি, যে স্থান হতে তুমি সকল স্বরূপে অবতরিত হয়েছ৷
মন্ত্ৰার্থঃ– ১।[এই ত্রয়োদশ অধ্যায়ে চিতিতে কমলপত্র ইত্যাদি ধারণের (উপধানের) বিশেষ মন্ত্র কথিত হয়েছে। সর্বপ্রথম উত্তরবেদির পশ্চাতে উপরিষ্ট হয়ে যজমান এই মন্ত্র জপ করেন] গো-অশ্ব-ধনের পুষ্টির নিমিত্ত, সু-সন্ততি প্রাপ্তির নিমিত্ত এবং শুভ বলবীর্য লাভ করার নিমিত্ত আমি যজমান স্বয়ং অগ্নিকে স্থাপন করছি (অর্থাৎ আহিতাগ্নি নির্মাণ করছি)। এক্ষণে সকল যজনীয় দেবতা আমার (অর্থাৎ যজমানের) নিবেদিত হবিঃ ইত্যাদি সেবন করুন এবং আমাতে যুক্ত হোন।
২। (কুশপুঞ্জের উপর অধ্বর্যু কমলপত্র ধারণ করে বলেন) হে কমলপত্র! তুমি জলের পৃষ্ঠ। তুমি অগ্নির নিমিত্তে গৃহীত মৃত্তিকা বা চিতির কারণভূত। হে কমলপত্র! সকলের অপেক্ষা আরও বৃদ্ধিশালী সমুদ্রকে তুমি আপন ব্যাপ্তিতে স্তম্ভিত করো। বর্ধন প্রাপ্ত হয়ে অত্যন্ত বিস্তার লাভ করো। তুমি জলে দ্যুলোকের বিস্তৃতি হতে বিস্তার প্রাপ্ত হও; (অর্থ মর্ত্যের অসীম সমুদ্র ও সীমাতীত ভদ্রলোকের মতো বিস্তৃত হও)।
৩। পূর্বদিকে সুন্দর কিরণশালী এবং কমনীয় মহৎ সূর্য সর্বপ্রথম প্রকট হচ্ছে। প্রকট হয়ে অন্তরিক্ষের পাশে পাশে বিদ্যমান পরন্তু অস্পষ্ট তথা তাতে সমাহিত সত্য (প্রত্যক্ষদ্রষ্ট) এবং অসৎ (অর্থাৎ অপ্রত্যক্ষ বায়ু-প্রভৃতি)-কেও আপন প্রকাশে অভিব্যক্ত করছে৷
৪। সৃষ্টির পূর্বে এবং প্রজাপতিই হৈমাণ্ডভাবে (হিরণ্যগর্ভ রূপে) সর্বত্র বিদ্যমান ছিলেন। উৎপন্ন সেই প্রজাপতিই এই উৎপন্ন ভূতমাত্রের একমাত্র অধিপতি ছিলেন। সেই পরমাত্মাই এই অন্তরিক্ষলোককে ধারণ করেছিলেন; উনিই এই দ্যুলোককে এবং উনিই আমাদের এই পৃথিবীকেও ধারণ করেছিলেন। আমরা সেই হন প্রজাপতিদেবের উদ্দেশ্যে হবিঃ ইত্যাদি নিবেদন পূর্বক হোম করছি৷
৫। সেই মহৎ প্রকাশবিন্দু সূর্য এই অন্তরিক্ষ, দ্যুলোক ও এই ভূমির উপর সর্বপ্রথম প্রকাশিত হন। এই প্রকারে সকলের নিমিত্ত সমান স্থানভূত এই ত্রিলোকে সঞ্চরণশীল সেই সূর্যকে আমি যজমান সপ্ত দিকে প্রতীকভূত সপ্ত ঋত্বিকের সাথে সভাস্থ হয়ে অনুক্রমে (ক্রমানুসারে) যজন করছি।
৬। (যজমান স্বর্ণনিমিত এক পুরুষকে দর্শন করে বলবেন) সেই সর্পগণকে নমস্কার, যারা এই পৃথিবীর উপরে যত্র-তত্র বিদ্যমান আছে। যে সর্পগণ অন্তরিক্ষে আছে এবং যারা দ্যুলোকে বিদ্যমান আছে, সেই সকল সর্প (লোকসমূহ)-কে নমস্কার করছি৷
৭। যে সর্প যাতুনগণের (অর্থাৎ রাক্ষগণের) বাণস্বরূপ, যারা বনস্পতির অন্দরে লুকিয়ে থাকে এবং যে সর্প গর্তের মধ্যে শয়ন করে থাকে, সেই সকল সৰ্পকে নমস্কার।
৮। যে সর্প এই প্ৰকাশযুক্ত দ্যুলোকে বিদ্যমান এবং যে সর্প সূর্যের রশ্মিসমূহে বিদ্যমান আছে; যে সর্পের স্থান জলে নির্মিত, সেই সকল সৰ্পকে নমস্কার।
৯। হে অগ্নি! তুমি আপন বল ব্যক্ত করো। দুষ্টকে সন্তাপিত করার নিমিত্ত তুমি এই পৃথিবীর উপর বিস্তারপ্রাপ্তব্য জালের ন্যায় জাল বিস্তার করো–যেমন, কোন রাজা আপন মন্ত্রীদের সাথে হস্তীতে ভ্রমণ করে। হে অগ্নি! ক্রোধে আগত রাক্ষস ইত্যাদির প্রতি তুমি তীব্র শরবর্ণকারী। হে অগ্নি! তুমি রাক্ষসগণকে আপন অত্যন্ত তপনশীল জ্বালাবাণের দ্বারা বিদ্ধ করে ফেলো।
১০। হে অগ্নি! ঘূর্ণনশীল তথা শীঘ্রসঞ্চারী তোমার যে বায়ুপ্রেরিত জ্বালা-সমূহ ইতস্ততঃ গমন করে, অত্যন্ত তীক্ষ্ণতা প্রাপ্ত হয়ে, হে অগ্নি! তুমি সেই ধর্ষক জ্বালা-সমূহের দ্বারা তাপদ রাক্ষসগণকে ভষ্ম করে ফেলো। আপন জ্বালায় তুমি পিশাচগণকে দগ্ধ করো। অখণ্ডিত হয়ে তুমি, হে অগ্নি! আপন উল্কাসমূহ (অর্থাৎ স্ফুলিঙ্গ সমূহ) চতুর্দিকে প্রকীর্ণ করে দাও।
১১। হে অগ্নি! আমাদের রক্ষার নিমিত্ত চতুর্দিকে আরও আপন অনুচরগণকে নিয়োগ করো। অত্যন্ত বেগবান্ ও অহিংস তুমি এই আমাদের প্রজাগণের পালক হও। যারা পাপলিপ্তকারী (বা নিন্দক) তারা আমাদের নিকট হতে দূর হোক, এবং যারা আমাদের নিকটে স্থিত আছে, তাদের কেউই যেন তোমাকে ব্যথা দিতে সমর্থ না হয়; (অর্থাৎ তুমি সকলকে দমন করতে সমর্থ হও)
১২। হে অগ্নি! তুমি আপন জ্বালা-সমূহ হতে উদ্গত হও; আপন সেই জ্বালাসমূহকে বিস্তারিত করো এবং আমাদের শত্রুগণকে সম্পূর্ণরূপে দগ্ধ করে ফেলো। হে তীক্ষ্ণ আয়ুধশালী (বা জ্বালাসম্পন্ন) অগ্নি! যারা কাউকে আমাদের নিমিত্ত অদাতা করে দিয়েছে (অর্থাৎ কাউকে আমাদের কিছু দান করতে নিষেধ করে বা আমাদের কিছু দান করতে দেয় না)–তাদের তুমি অত্যন্ত ভস্মসাৎ করে ফেলো; যেমন–তুমি সুখে তৃণপুঞ্জকে জ্বালিয়ে দাও।
১৩। হে অগ্নি! তুমি আপন জ্বালাসমূহকে ঊধ্বস্থ করো। আমাদের উপর যে শত্রু দাঁত লাগায়, তাদের তুমি আপন জ্বালাসমূহে বিদ্ধ করো এবং এক্ষণে তুমি আপন দিব্য গুণ-কর্মকে অভিব্যক্ত করো। হে অগ্নি! তুমি রাক্ষসগণের সামান্য বা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ধনুগুলি (বা ধনুগুলির ছিলা) শিথিল করে দাও। একাকী বা সঙঘবদ্ধ আমাদের শত্রুগণকে তুমি সর্বথা মোচড় দান করো। (এক কাষ্ঠ বিশিষ্ট ঘৃতপূর্ণ জুহু স্থাপিত করণীয়)। হে জুহু! আমি তোমাকে অগ্নির তেজের সাথে এই স্থানে স্থাপিত করছি৷
১৪। এই অগ্নি দিবাকালে আদিত্য রূপে বিদ্যমান হয়ে দ্যুলোকের মূর্ধা (মস্তক) হয়, আকাশের উন্নত স্কন্ধ হয় এবং এই পৃথিবীর পালক হয়। এই অগ্নি জলের বল বৃদ্ধি করে। (উদুম্বরের কাষ্ঠনির্মিত সুবায় দধিপূর্ণ করে ধারণীয়)। হে ঔদুম্বরী সুবা! আমি তোমাকে ইন্দ্রের ওজঃ (অর্থাৎ তেজের) সাথে এই স্থানে স্থাপিত করছি৷
১৫। হে অগ্নি! যখন তুমি আপন জ্বালাজিহ্বাকে হবির বাহিকা করো, এবং যখন তুমি কল্যানা বায়ুর অশ্বে (অশ্বের উপর আরোহিত বায়ুতে) সঙ্গত হয়ে থাকো, তখন তুমি যজ্ঞ ও বর্ষাজলের নেতা হয়ে থাকো। সেই সময়ে তুমি স্বর্গপ্রদা জ্বালামূর্ধাকে দ্যুলোকে বিধৃত করে থাকে।
১৬। হে পাষাণ (ইষ্টকা)! পৃথিবীকে ধারণকারিণী তুমি অত্যন্ত স্থিরা। তুমি বিশ্বকর্মার (প্রজাপতির) দ্বারা এই স্থানে ধৃতা হয়েছ। তুমি এই সমুদ্র যেন না বিনাশ করে, এবং এই সুপর্ণও (হিরণ্য পুরুষও (যেন না বিনাশ করে)। তুমি ব্যথাপ্রাপ্ত না হয়ে চিতিকে দৃঢ় করো।
১৭। জলের পৃষ্ঠভাগ ও সমুদ্রের মার্গে, হে স্বয়মাতৃগ্না! তুমি অবকাশ এবং বিস্তারযুক্তা, প্রজাপতি তোমাকে স্থাপিত করুন। তুমি বিস্তারকে প্রাপ্ত, যেহেতু তুমি পার্থিব বিস্তীর্ণ শিলাভূমি।
১৮। হে স্বয়মাতৃগ্না! তুমি ভূমি (অর্থাৎ সুখের ভাবয়িত্রী); তুমি পৃথিবী; অদিতিস্বরূপা ও সমস্ত বিশ্বের ধারিকা তুমি বিশ্বের ধাত্রী। তুমি পৃথিবীকে সংযমিত করো। তুমি এই চিতিকে দৃঢ় করো। তুমি এই চিতিকে হিংসিত করো না।
১৯। হে স্বয়মাতৃগ্না! সকলের প্রাণ-অপান-ব্যান-উদান, কীর্তি, এবং শাস্ত্রীয় আচরণের সিদ্ধির নিমিত্ত আমি তোমাকে এইস্থানে স্থাপিত করছি। মহতী যোগক্ষেম এবং অত্যন্ত সুখকারী গৃহের দ্বারা অগ্নি তোমাকে আরও সকলের থেকে রক্ষা করুক। সেই অগ্নির দ্বারা সুরক্ষিত হয়ে তুমি অঙ্গীরা ঋষিগণের মধ্যে যেমন স্থিরা হয়ে ছিলে, সেই রকম আমাদের যজ্ঞে স্থির হয়ে প্রতিষ্ঠত থাকো।
২০। (স্বয়মাতৃগ্না ইষ্টকের উপরে কিছু দূর্বা ধারণীয়) –হে দূর্বা! এই প্রস্তরনির্মিত পাত্রের (পাথরের বাটির) প্রত্যেক ভাগে ও পর্বে পর্বে বা স্বয়ং প্রত্যেক কাণ্ডে ও পর্বে পর্বে অঙ্কুরিত হয়ে যে রকম তুমি স্বয়ং বিস্তারকে সম্প্রপ্ত হয়ে থাকে, সেই রকম আমাদেরও হে দূর্বা! শত-সহস্র পুত্র-পৌত্রে অভিবৃদ্ধ করো ৷৷
২১। হে দেবী দূর্বা (ইষ্টকা)! যে তুমি স্বয়ং নিজেকে শত-শত কাণ্ডে বিস্তার করো এবং তার পর আপন সহস্র-সহস্র অঙ্কুরের সাথে পৃথিবী ভেদ করে বাহির হও; সেই তুমি সদূর্বা ইষ্টকাকে এই স্থানের হবিঃতে আমরা পরিচরিত করছি৷
২২। হে অগ্নি! যে তুমি আপন জ্যোতিঃ সমূহ সূর্যতে সমাহিত হয়ে আপন রশ্মিসমূহের দ্বারা এই দ্যুলোককে প্রকাশিত করছ, আজ সেই আপন আভাসকলেরক দ্বারা, হে অগ্নি! আমাদের ও এই ব্যক্তির (যজমানের) নিমিত্ত নিজেকে প্রকাশিত করো। ২৩। হে দেবগণ! তোমাদের যে কান্তি সূর্য, গো এবং অশ্বে বর্তমান, হে ইন্দ্র-অগ্নি-বৃহস্পতি! আমাদের নিমিত্ত তোমরা নিজেদের সেই সকল কান্তিসমূহে কান্তিমান করো৷
২৪৷ বিশেষ রূপে শোভায়মান এই পৃঙ্খীলোক এই অগ্নি রূপ জ্যাতিকে ধারণ করছে। স্বয়ংই প্রকাশমান এই দ্যুলোক এই আদিত্য রূপ জ্যোতিকে ধারণ করছে। সকলের প্রাণ-আপান-ব্যানের নিমিত্ত পৃথিবীকে পৃষ্টমান এই বিশ্বজ্যোতিকে (বিশ্বজ্যোতি নামে অভিহিত ইষ্টকাকে) প্রজাপতি স্বয়ং ধারণ করেন। হে ইষ্টকা! তুমি আমাদের জ্যোতি প্রদান করো বা সমস্ত অগ্নিকে মর্যাদিত রাখো। হে ইষ্টকা! অগ্নিই তোমার স্বামী। অঙ্গিরা ঋষির যজ্ঞে স্থিরভাবে উপবেশনের মতোই তুমি সেই স্বদেবতা অগ্নির দ্বারা স্থাপিত হয়ে চিতিতে যথাস্থানে দৃঢ়তার সাথে স্থিত হও। [পূর্ব মন্ত্রে দ্বিযজুঃ এবং এই মন্ত্রে বিরাড় জ্যোতি, স্বরাড় জ্যোতি, রেতঃসি এবং বিশ্বজ্যোতি সংজ্ঞক ইষ্টককে ধারণের বিষয় বলা হয়েছে]।
২৫। (ঋতবী সংজ্ঞক ইষ্টককে ধারণীয়)–চৈত্র-বৈশাখ মাসদ্বয় মিলে বসন্ত ঋতু হয়। হে বসন্ত ঋতু! তোমরা চিতিভাবকে প্রাপ্ত করাতে জ্ঞানশালী অগ্নির মধ্যে বিজাড়িতশালী হয়েছ। দ্যাবা পৃথিবীকে অনুকূল করো। জল ও ওষধিসমূহকে অনুকূল করো। আমাকে অর্থাৎ যজমানের জ্যেষ্ঠতার নিমিত্ত তার সমান (বা উপযুক্ত) কার্যশালী বিবিধ ইষ্টকা রূপ অগ্নিসমূহকে আমার অনুকূল করো। অন্য লোকেরও দ্বারা এই দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যে সমান চিত্তে যে পৃথক্ বেদিসমূহ চয়ন করা হয়েছে। সেগুলিও এই বসন্ত ঋতুকে সম্পাদিত করতে আমাদের এই চয়ন কর্মে সমাহিত হয়ে যাক, যেমন, অন্য দেবসেবার নিমিত্ত ইন্দ্রকে সকলে আরও ঘিরে থাকে। হে ইষ্টকা! অগ্নি তোমার অধিপতি। সেই অগ্নিদেবের দ্বারা তুমি এই চিতিতে স্থাপিত হয়েছ; অঙ্গিরা ঋষির চয়নে যেভাবে স্থির হয়ে উপবেশন করেছিলে, আমাদেরও এই অগ্নিয়নে সেইভাবেই দৃঢ় হয়ে স্থিত হও।
২৬৷ (অষাঢ়া নামক ইষ্টকা ধারণীয়)–হে ইষ্টকা! তুমি অষাঢ়া (অহনশীলা) নাম-সম্পন্না। তুমি শত্রুকে অভিভূতকারিণী। হে ইষ্টকা! তুমি আমাদের অদাতা তথা যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক শত্রুদের অভিভূত করো। তুমি সহস্র শক্তিশালিনী; অতএব তুমি আমাকে প্রসন্ন করো।
২৭। ঋত (অর্থাৎ যজ্ঞ) কামনাকারী যজমানের নিমিত্ত বায়ু মধুর হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং তার জন্য মধুর জল বাহিত হচ্ছে। আমাদের নির্মিত্ত ওষধিসমূহ মধুর হোক।
২৮। আমাদের নিমিত্ত রাত্রি মধুর হোক, দিবা মধুর হোক, এই পার্থিব লোক আমাদের নির্মিত মাধুর্যযুক্ত থোক এবং আমাদের সকলের পালক দ্যুলোকও আমাদের নিমিত্ত মধুর হোক৷৷
মন্ত্ৰার্থঃ– [এই চতুর্দশ অধ্যায়ে দ্বিতীয় চিতির মন্ত্র সংগৃহীত হয়েছে। এই দ্বিতীয় চিতি ভূমির উপরভাগে এবং অন্তরিক্ষলোকের নিম্নভাগে মান্য করা হয়। এর দেবতা,অশ্বিদেবতাদ্বয়। সর্বপ্রথম পাঁচটি অশ্বিনীসংজ্ঞক ইষ্টক চিতিতে রাখা হয়]।
১। হে ইষ্টকা! অচল নিবাস, অচল কারণশালিনী এবং উখাস্থ অগ্নির প্রথম স্থানকে সেবনকারিণী তুমি অচলা, অতএব রেতঃসিথেলা সংজ্ঞক শুভ ও অচলস্থানে প্রতিষ্ঠিত হও। দেবতাগণের যজ্ঞে অধ্বর্যুভাব-প্রাপ্ত দুই অশ্বিনই তোমাকে এই স্থানে প্রতিষ্ঠিত করুক৷
২। হে অশ্বিনী ইষ্টকা! রেতঃ সিগ্নক্ষণ স্থানে স্থিতিশালিনী, হোম-সাধনীয় ঘৃতে সঙ্গত এবং অনেক ইষ্টককে ধারণকারিণী তুমি দ্বিতীয় চিতির সুখদ স্থানে স্থিত হও। রুদ্র ও বসুগণ প্রভৃতি দেবতা তোমার এই চিতিতে স্থিত হওয়ার পর সতত স্তুতি করুক। হে ইষ্টকা! তুমি আমাদের এই মন্ত্রকে সফল করে অভিবর্ধিত করো এবং যজমানের সৌভাগ্যের নিমিত্ত এখানে স্থিত থাকো। দেবগণের অধ্বর্যু অশ্বিদ্বয় তোমাকে এই দ্বিতীয় চিতিতে স্থাপিত করুক৷৷
৩। ! আপন সমগ্র সামর্থ্যের সাথে দেবগণের সুখ ও অত্যধিক সৌন্দর্যের নিমিত্ত তুমি এই দ্বিতীয় চিতিতে স্থান গ্রহণ করো। সুখে সেবনীয়া তুমি, পুত্রের প্রতি পিতার সুখদ হওয়ার ন্যায় এইস্থানে চিতিতে স্থিত হয়ে অভিবৃদ্ধ হও। আপন সুখপ্রবেশ্য শরীরে তুমি এই স্থানে দ্বিতীয় চিতিতে প্রবেশ করো। হে ইষ্টকা! দেবগণের অধ্বর্যু অশ্বিদ্বয়ই তোমাকে এখানে স্থাপিত করুক৷৷
৪। হে ইষ্টকা! তুমি দ্বিতীয় চিতির পূরিকা; তুমি জলের কারণভূতা রস। সেই তুমি অশ্বিনী ইষ্টকাকে সকল দেবতা প্রশংসিত করে থাকে। ত্রিবৃদ ইত্যাদি স্তোম ও রথন্তর ইত্যাদি পৃষ্ঠবতী এবং অমৃতময় ঘৃতে সঙ্গত তুমি, হে ইষ্টকা! এই দ্বিতীয় চিতিতে স্থান গ্রহণ করো। হে ইষ্টকা! তুমি আমাদের সন্তানের সাথে সাথে ধন প্রদান করো। দেবগণের অধ্বর্যু অশ্বিনীকুমারদ্বয়ই তোমাকে, হে ইষ্টকা! এই স্থানে দ্বিতীয় চিতিতে স্থাপিত করুক৷
৫। অন্তরিক্ষলোকের ধারণকারিণী, পূর্ব প্রভৃতি দিকসমূহকে স্তম্ভিতকারিণী, ভূতমাত্রের স্বামিনী তুমি, হে অশ্বিনী ইষ্টকার ইষ্টকা! আমি তোমাকে এই প্রথম চিতির উপর স্থাপিত করছি। হে ইষ্টকা! তুমি জলের লহর (তরঙ্গ) এবং তার সারভূত রস। বিশ্বকর্মা প্রজাপতি তোমার দ্রষ্টা (সৃষ্টিকর্তা)। দেবতাগণের অধ্বর্যু অশ্বদ্বয় তোমাকে এই দ্বিতীয় চিতিতে স্থাপিত করুক।
৬। (ঋতব্যা সংজ্ঞক দুটি ইটকে চিতিতে ধারণীয়)-জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে গ্রীষ্ম ঋতু। হে ঋতব্য ইষ্টকা! তুমি এই দ্বিতীয় চিতির অন্দরে সংশ্লিষ্টশালিনী। তুমি দুই দ্যাবাপৃথিবীকে আমাদের অনুকূল করো। জল ও ওষধিগুলিকে আমাদের অনুকূল করো। তোমরা সকলে এক কর্মশালিনী হয়ে, হে ইষ্টকাসমূহ! আমার শ্রেষ্ঠত্বের নিমিত্ত নিয়োজিত হও। এই যে একমনা সকল অগ্নি (ইষ্টক) দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যে স্থিত আছে– তারা এই দুই ঋতব্যা ইষ্টকাকে গ্রীষ্ম ঋতু কল্পনা করে (বুঝে) তাদের উভয়ে সঙ্গতা হোক; যেমন সকল দেবতা ইন্দ্রকে সম্প্রাপ্ত হয়ে থাকে। সেই দেবতার দ্বারা স্থাপিত হয়ে অঙ্গিরা ঋষির চয়নে ধ্রুবভাবে। যেমন স্থিত ছিলে, তেমনই আমাদের এই দ্বিতীয় চিতিতে, হে ঋতব্যা ইষ্টকা! তোমরা দুজনে অচল হয়ে স্থিত হও ৷
৭। (বৈশ্বদেবী সংজ্ঞক পাঁচটি হঁট চিতিতে ধারণীয়)–হে বৈশ্বদেবী ইষ্টকা! ঋতুগণের সাথে সমান প্রীতি, জলের সাথে সমান প্রীতি, দেবগণের সাথে সমান প্রীতি এবং বাল-যুবা-বৃদ্ধ ইত্যাদি অবস্থাকে সংযুক্তকারী প্রাণদেবতাগণের সাথে সমান প্রীতিযুক্ত তোমাদের–বৈশ্বদেবী ইষ্টকাগণের সকলের নেতা অগ্নির নিমিত্ত দেবগণের অধ্বর্যু অশ্বিদ্বয়ই এই দ্বিতীয় চিতিতে স্থাপন করুক। ঋতুসমূহের সাথে, জলের সাথে, বসুগণের সাথে এবং বাল্য ইত্যাদি অবস্থার সাথে বন্ধনকারী প্রাণদেবতার সাথে সমান প্রীতিযুক্তা তোমাকে–বৈশ্বদেবী ইষ্টকাকে বিশ্বের নেতা (বৈশ্বানর) অগ্নির নিমিত্ত দেবাধ্বর্য অশ্বিনদ্বয় এই দ্বিতীয় চিতিতে স্থাপিত করুক। হে ইষ্টকা! ঋতুসমূহ, জল, রুদ্রগণ এবং বাল্য ইত্যাদি অবস্থাগুলিকে বন্ধনকারী প্রাণদেবতার সাথে সমান প্রীতিযুক্তা তুমি বৈশ্বদেবী ইষ্টকাকে বিশ্বের নেতা অগ্নির নিমিত্ত দেবাধ্বর্য অশ্বিনীকুমারদ্বয়ই এই দ্বিতীয় চিতিতে স্থাপিত করুক। হে ইষ্টকা! ঋতুগণ, জল, আদিত্যবর্গ, এবং বাল্য ইত্যাদি অবস্থাগুলিকে সংযোগকারী প্রাণদেবতার সাথে সমান প্রীতিযুক্ত তোমাকে বৈশ্বাদেবী ইষ্টকাকে বিশ্বের নেতা অগ্নির নিমিত্ত দেবতাগণের অধ্বর্যু অশ্বিযুগলই এই দ্বিতীয় চিতিতে স্থাপিত করুক! ঋতুবর্গ, জলরাশি, বিশ্বদেবতাগণ ও বাল্য ইত্যাদি অবস্থা সমুদায়কে সংযুক্তকারী প্রাণদেবতাগণের সাথে সমান প্রীতিযুক্ত তুমি বৈশ্বদেবী ইষ্টকাকে বিশ্বের নেতা অগ্নির নিমিত্ত এই আমাদের দ্বিতীয় চিতিতে দেববর্গের অধ্বর্যু স্বয়ং অশ্বিনীকুমারদ্বয় স্থাপিত করুক৷৷
৮। (দ্বিতীয় চিতিতে প্রাণভৃৎ সংজ্ঞক পাঁচটি ইটকে ধারণীয়)–হে প্রাণভৃৎসংজ্ঞক ইষ্টকা! তুমি আমার প্রাণকে (অর্থাৎ প্রাণবায়ুকে) রক্ষা করো; তুমি আমার অপান বায়ুকে রক্ষা করো; তুমি আমার ব্যানবায়ুকে রক্ষা করো; আমার চক্ষুকে দূর পর্যন্ত দর্শনশালী করে দাও, আমার শ্রোত্রকে দূর পর্যন্ত শব্দ শ্রবণে সমর্থ করে দাও; জলকে বর্ধিত করো, ওষধিসমূহে প্রাণ বা বল ঢেলে দাও, দ্বিপদশালী মনুষ্য ইত্যাদিতে রক্ষা করো, চতুষ্পদশালী গো ইত্যাদি পশুগণকে রক্ষা করো, এবং দ্যুলোক হতে (সূর্য হতে) বৃষ্টি প্রবর্তন করো।
৯। (দক্ষিণ-উত্তর-পশ্চিম কোণে পাঁচটি-পাঁচটি করে এবং পূর্ব কোণে চারটি বয়স্যা সংজ্ঞক ইটকে ধারণীয়)-মূর্ধা প্রধান পশু-যেটি গায়ত্রী ছন্দের রূপ ধারণ করে তার নিকট হতে পালিয়ে গিয়েছিল, সেই পশুকে গায়ত্রী ছন্দ ও সেই পশুর বয়সের দ্বারা (বা তার বয়সী হয়ে) প্রজাপতি পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হে বয়স্যা ইষ্টকা! সেই তোমাকে–গায়ত্রী ছন্দে সেই সেই অবস্থাধারী পশুরূপ প্রজাপতিস্বরূপিণীকে–আমি এই দ্বিতীয় চিতিতে ধারণ করছি। ময়ন্দছন্দের রূপে বল-প্রধান প্রজাপতি সেই বয়সকে ধারণ করে ময়ন্দ (অনিরুক্ত) পশুকে পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সেই ময়ন্দপ্রজাপতিস্বরূপিণী তুমি বয়স্যা ইষ্টকাকে আমি এই দ্বিতীয় চিতিতে ধারণ করছি। অধিপতি ছন্দরূপ প্রজাপতি ধারক স্বভাব পশুকে তার অবস্থাসম্পন্ন হয়ে পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হে অধিপতি ছন্দ রূপ প্রজাপতিস্বরূপিণী বয়স্যা ইষ্টকা! আমি তোমাকে এই দ্বিতীয় চিতিতে ধারণ করছি। পরমেষ্ঠীছন্দরূপ প্রজাপতি সর্বকর্মক্ষম পশুর বয়সী হয়ে, তাকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হে তৎস্বরূপিণী বয়স্যা ইষ্টকা! আমি তোমাকে দ্বিতীয় চিতিতে ধারণ করছি। (এই রকমে চার বয়স ও চার অবস্থাকে নিয়ে আট প্রকার স্বরূপশালী প্রজাপতি পনেরোটি পশুকে ধরেছিলেন। প্রজাপতির এই স্বরূপ অষ্টাক্ষরা গায়ত্রীই সংকেতিত করে। অর্থাৎ অষ্টাক্ষরা গায়ত্রীর জপে পনেরো প্রকার পশু (বা তাদের বল) প্রাপ্ত হওয়া যায়। একপদা নামে ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে প্রজাপতি অজকে (ছাগকে) তার বয়সী হয়ে তাকে পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছিলেন।) হে বয়স্যা ইষ্টকা! একপদাছরূপ প্রজাপতির স্বরূপশালিনী তুমি বয়স্যা ইষ্টকাকে আমি এই দ্বিতীয় চিতিতে ধারণ করছি। প্রজাপতি বিশাল (অর্থাৎ দ্বিপদা গায়ত্রী) ছন্দ রূপে সঞ্চনসমর্থ মেষকে তার আয়ুশালী হয়ে পুনঃপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। হে দ্বিপদাগায়ত্রীস্বরূপ প্রজাপতির স্বরূপশালিনী বয়স্যা ইষ্টকা! আমি তোমাকে এই চিতিতে ধারণ করছি। এইভাবে প্রজাপতি তন্দ্র (অর্থাৎ পংক্তি) ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে তার আয়ুশালী হয়ে পুরুষকে, অনাধৃষ্ট (অর্থাৎ বিরাট) ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে তার আয়ুশালী হয়ে ব্যাঘ্ৰকে, ছদি (বা অতিছন্দের) স্বরূপ ধারণ করে তার বয়সী হয়ে সিংহকে, বৃহতি ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে পৃষ্ঠবাহ (পাঁচ বৎসরের কোনও) পশুকে পঞ্চবৎসর বয়সী হয়ে সেই পশুকে, ককুপ ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে সেচনসমর্থ আয়ুশালী (অর্থাৎ বয়স্ক) পশুকে বয়স্ক হয়ে, সর্ব বৃহতী ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে পূর্ণায়ু হয়ে পূর্ণ আয়ুশালী পশুকে বা বৃষভকে) পুনঃপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। অতএব আমিও, পংক্তিছন্দস্বরূপ প্রজাপতির স্বরূপশালিনী, বিরাটছন্দস্বরূপ প্রজাপতির স্বরূপশালিনী, অতিছন্দস্বরূপ প্রজাপতি স্বরূপশালিনী, বৃহতীছন্দস্বরূপ প্রজাপতির স্বরূপশালিনী, ককুপছন্দস্বরূপী প্রজাপতির স্বরূপরূপিণী, সর্ব বৃহতী ছন্দরূপী প্রজাপতির স্বরূপশালিনী, হে বয়স্যা ইষ্টকা! তোমাকে এই দ্বিতীয় চিতিতে ধারণ করছি৷৷
১০। পংক্তি ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে প্রজাপতি অনাহ (অর্থাৎ বলীবর্দ)-কে তারই আয়ুসম্পন্ন হয়ে পুনরায় প্রাপ্ত করেছিলেন। এইভাবে প্রজাপতি জগতীছন্দের স্বরূপ ধারণ করে ধেনু (অর্থাৎ সদ্য প্রসবকারিণী সবৎসা গাভী)-কে তারই আয়ুসম্পন্ন হয়ে পুনরায় প্রাপ্ত করেছিলেন। এইভাবে প্রজাপতি জগতীছন্দের স্বরূপ ধারণ করে ধেনু (অর্থাৎ সদ্য প্রসবকারিণী সবৎসা গাভী)-কে তারই আয়ুসম্পন্ন হয়ে পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছিলেন; ত্রিষ্টুপ ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে বি (দেড় বৎসর বয়স্ক) পশুকে (বা অবিকে) ত্রিবর্ষীয় হয়ে পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছিলেন; বিরাটু ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে বহনসমর্থ দ্বিবর্ষীয় পশুকে দ্বিবর্ষীয় পুনঃপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। গায়ত্রী ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে আড়াই বৎসরের পশুকে আড়াই বৎসর বয়সী হয়ে পুনঃপ্রাপ্ত হয়েছিলেন; উষ্ণীক ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে তিন বৎসর বয়স্ক পশুকে ত্রিবর্ষীয় আয়ুশালী হয়ে পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছিলেন; অনুষ্টুপ ছন্দের স্বরূপ ধারণ করে চার বৎসর বয়স্ক পশুকে চার বৎসরের আয়ুশালী হয়ে পুনঃপ্রাপ্তি হয়েছিলেন। অতএব পংক্তিছন্দস্বরূপী প্রজাপতির স্বরূপবতী, জগতীছন্দস্বরূপী প্রজাপতির স্বরূপধারিণী, ত্রিষ্টুপছন্দস্বরূপী প্রজাপতির স্বরূপশালিনী, বিরাটুছন্দস্বরূপী প্রজাপতির স্বরূপসম্পন্না, গায়ত্রীছন্দস্বরূপী প্রজাপতির স্বরূপভূতা, উষ্ণিকছন্দস্বরূপী প্রজাপতির স্বরূপবাহিতা, এবং অনুষ্টুপছন্দস্বরূপী প্রজাপতির স্বরূপবাহিকা, হে বয়স্যা ইষ্টকা! আমি তোমাকে এই দ্বিতীয় চিতিতে ধারণ করছি৷
১১। (এই স্থান হতে তৃতীয় চিতির চয়নমন্ত্র প্রারম্ভ হচ্ছে। সর্বপ্রথম স্বয়মাতৃগ্না ইষ্টকার নির্বাচন)–হে ইন্দ্র ও অগ্নি! তোমরা দুজন এই অচলা ইষ্টকাকে তৃতীয় চিতিতে দৃঢ় করো। হে স্বয়মাতৃগ্না ইষ্টকা! তোমার বেদির উপরস্থ চিতিতে চয়ন করে যাও এবং নিজের উপর অন্য ইষ্টকার ভার বহনশালিনীরূপে প্রস্তুত হয়ে দ্যাবাপৃথিবী তথা অন্তরিক্ষকে বহ্ন করো৷
১। হে অগ্নি! আমাদের উৎপন্ন শত্রুগণকে প্রকর্ষের সাথে বিনষ্ট করো। হে উৎপন্ন মাত্রকে জ্ঞাত (জাতবেদা) অগ্নি! আমাদের যে শত্রু উৎপন্ন হতে চলেছে-তাদেরও তুমি বিনষ্ট করে। বিনা ক্রোধে প্রসন্ন মনে তুমি সপক্ষপাত আপন কথন ব্যক্ত করো বা যজ্ঞবিদ্যা উপদেশ করো। হে অগ্নি! আমরা যেন তোমার পরিচর্যা করে সদঃ-হবিধান-আগ্নী নামে তিন বিভাগযুক্ত তোমার সুখ-সমৃদ্ধিকারী যজ্ঞগৃহে সদা বিদ্যমান থাকতে পারি।
২। হে অগ্নি! বল অর্থাৎ সেনাগণের সাথে উৎপন্ন আমাদের শত্রুগণকে নষ্ট করো এবং হে জাতবেদা অগ্নি! উৎপন্ন হবে এমন শত্রুদেরও সন্তপ্ত করো। প্রসন্নতা ধারণ করে আমাদের অধিক আপন করো বা বলো। আমরা যেন সদা প্রসন্ন থাকি। হে অগ্নি! আমাদের শত্রুদের বিনষ্ট করো
৩। পনেরো কলাযুক্ত এক পক্ষে বা আবৃত্তিযুক্ত যোড্রশস্তোম এবং বলরূপ ধনস্বরূপা তুমি। হে ইষ্টকা! আমি তোমাকে এই পঞ্চম চিতিতে নির্বাচন করছি। হে ইষ্টকা! তুমি চতুশ্চত্বারিংশস্তোম এবং ব্রহ্মচর্য রূপ ধন। আমি তোমাকে চয়ন করছি। হে ইষ্টকা! তুমি অভক্ষক অগ্নি এবং পঞ্চদশ কলাশালী চন্দ্রের পূরণকর্তী। সেই তুমি হেন ইষ্টকাকে বিশ্বদেবগণ সংস্তুত করেন। স্তোমসমূহ, পৃষ্ঠসমূহ এবং হোম করার ঘৃতের সাথে যুক্ত হয়ে, হে ইষ্টকা! তুমি এই স্থানে প্রতিষ্ঠিত হও। আমাদের পুত্রযুক্ত ধন প্রদান করো ৷
৪। (বিরাট সংজ্ঞক ইষ্টক ধারণীয়)–সকল প্রাণীর গমনাগমনের এই ভূলোকই এব-ছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি এব-ছন্দস্বরূপা। আমি তোমাকে চয়ন করছি। প্রভামণ্ডল হতে আব্রিয়মাণ এই অন্তরিক্ষই বরিব-ছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন তৎস্বরূপাকে আমি চয়ন করছি। সকলের সুখকারী এই দ্যুলোকই শম্ভু ছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন….। পরিতঃ বর্তমান এই দিকসমূহই পরিভূ-ছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন….। আপন রসে শরীরমাত্রকে আচ্ছাদিতকারী অন্নই আচ্ছাচ্ছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন তৎস্বরূপাকে….। প্রজাপতিই মনচ্ছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন তৎস্বরূপাকে….। সর্ব জগৎকে ব্যাপ্ত করণশীল এই সূর্যই ব্যচচ্ছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন….। নাড়িসমূহের দ্বারা শরীরে বেষ্টনশীল প্রাণই সিন্ধু ছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন….। মনই সমুদ্রছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন….। মুখকুহর হতে অভিসৃত (নির্গত)-শালী বাই সরিরছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন….। প্রাণকে ককু ছন্দ বলে। হে ইষ্টকা!….। পীত (পানকৃত) জলকে। তিন প্রকারে শরীরে ধারিত করণশীল উদান বায়ুই ত্রিককুছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন…। বেদত্রয়ই কাব্যছন্দ। হে ইষ্টকা!….। কুটিল গতিশীলা এই জলই অঙ্কুপছন্দ। হে ইষ্টকা!…। ক্ষরণরহিতা এই দুলোকই অক্ষরপংক্তিছন্দ। হে ইষ্টকা!…. এই ভূলোকই পদপংক্তিছন্দ। হে ইষ্টকা!….। বস্তুসমূহের বিস্তারের সাথে যুক্ত এই দিসমূহই বিষ্টারপংক্তিছন্দ! হে ইষ্টকা!….। স্বরূপে লঘু হলেও তীব্ৰলেখন সমর্থ এই সূর্যই ক্ষুরোভ্ৰজছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন তৎস্বরূপাকে আমি চয়ন করছি৷৷
৫৷ অন্নই আচ্ছচ্ছন্দ, অন্নই প্রচ্ছচ্ছন্দ, রাত্রিই সংমচ্ছচ্ছন্দ, দিবাই বিয়চ্ছন্দ, এই দ্যুলোকই বৃহচ্ছ, এই ভূমণ্ডলই রথন্তরছন্দ, সতত শব্দকারী বায়ুই নিকায়চ্ছন্দ, অন্তরিক্ষই বিবধচ্ছন্দ, অন্নই গিরচ্ছন্দ, অগ্নিই ভজচ্ছন্দ, বাই সংস্তূপ-অনুষ্টুপ ছন্দ, পৃথিবীই এবচ্ছন্দ, অন্তরিক্ষই বরিবচ্ছন্দ, অন্নই বয়চ্ছন্দ, আপন শক্তির ন্যূনাধিকতার দ্বারা বাল্য প্রভৃতি অবস্থাসমূহকে করণশীল এই জঠরাগ্নিই বয়স্কৃচ্ছন্দ, ঐ স্বৰ্গই বিস্পর্ধাচ্ছন্দ, এই ভূতলই বিশালছন্দ, এই অন্তরিক্ষই ছদিচ্ছন্দ, ঐ আদিত্যই দুরোহণছন্দ, পংক্তিই তন্দ্রছন্দ, এবং জলই অঙ্কাঙ্কছন্দ। হে ইষ্টকা! তুমি হেন সেই সেই স্বরূপাকে আমি চয়ন করছি৷৷
৬। হে ইষ্টকা! তেজোবৃদ্ধিকর অন্নের দ্বারা সত্যের নিমিত্ত বেদিতে চয়িতা হয়ে তুমি সত্যকে প্রীণিত (তর্পিত বা প্রীত) করো। অন্নের দ্বারা ধর্মের নিমিত্ত চয়িতা হয়ে তুমি ধর্মকে প্রীণিত করো। অন্নের দ্বারা, হে ইষ্টকা! দ্যুলোকের নিমিত্ত চয়িতা হয়ে তুমি দ্যুলোককে প্রীণিত করো। অন্নের দ্বারা অন্তরিক্ষের নিমিত্ত চয়িতা হয়ে তুমি অন্তরিক্ষকে প্রীণিত করো। হে ইষ্টকা! অন্নের দ্বারা পৃথিবীর নিমিত্ত চয়িতা হয়ে তুমি পৃথিবীকে প্রীণিত করো। প্রাণের ধারক অন্নের দ্বারা বৃষ্টির নিমিত্ত চয়নকৃতা হয়ে, হে ইষ্টকা! তুমি বৃষ্টিকে প্রেরিত করো। অন্নের দ্বারা দিনের নিমিত্ত চয়নকৃতা হয়ে তুমি দিনকে প্রীণিত করো। অনের দ্বারা রাত্রির নিমিত্ত চয়িতা হয়ে তুমি রাত্রিকে প্রীণিত করো। হে ইষ্টকা! বসুগণের নিমিত্ত চয়নকৃতা হয়ে তুমি বসুগণকে প্রীণিত করো। অন্নের দ্বারা আদিত্যগণের নিমিত্ত চয়নকৃতা হয়ে তুমি আদিত্যগণকে প্রীণিত করো।
৭। হে ইষ্টকা! অন্নের দ্বারা গো-অশ্বধনের নিমিত্ত আহৃতা হয়ে তুমি গো-অশ্বধনকে প্রীণিত করো। হে ইষ্টকা! অন্নের দ্বারা শাস্ত্রজ্ঞানকে অর্পিতা হয়ে তুমি শাস্ত্রকে প্রীণিত করো। হে ইষ্টকা! অন্নের দ্বারা ওষধিসমূহের নিমিত্ত আহৃত হয়ে তুমি ওষধিসমূহকে প্রীণিত করো! হে ইষ্টকা! অন্নের দ্বারা শরীরের নিমিত্ত উপহিতা তুমি শরীরকে প্রীণিত করো। হে ইষ্টকা! অন্নের দ্বারা অশ্বধনের নিমিত্ত আহৃতা হয়ে তুমি অশ্বধনকে প্রীণিত করো। হে ইষ্টকা! অন্নের দ্বারা তেজের নিমিত্ত আহৃত হয়ে তুমি তেজকে অভিবৃদ্ধ করো।
১০। হেইষ্টকা! তুমি পূর্বদিকে শোভামানা। বসুগণ তোমার পালক দেবতা। শত্রুগণের দ্বারা প্রযুক্ত অস্ত্রশস্ত্রসমূহের নিবারণকর্তা অগ্নি। ত্রিবৃৎ স্তোম তোমাকে পৃথিবীর উপর স্থাপিত করুক।প্র বো দেবায় অগ্নেয় প্রভৃতি আজ্য সংজ্ঞক উথ শস্ত্র অচলতার নিমিত্ত তোমাকে স্তম্ভিত করুক। অন্তরিক্ষলোকে প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত, হে ইষ্টকা! তোমাকে রথন্তর সাম স্তম্ভিত করুক। প্রথমোৎপন্ন সপ্তপ্রাণ দ্যুলোকের বিস্তারের অনুরূপই দেবগণে তোমাকে প্রথিত করুক। ধারক বাক্ এবং অধিপতি মনও তোমাকে প্রথিত করুক। হেইষ্টকা! এরা সকলে ঐকমত্য প্রাপ্ত হয়ে স্বর্গলোকে তোমাকে ও যজমানকে প্রতিষ্ঠিত করুক৷৷
১১। হে ইষ্টকা! বিশেষ রূপে রাজমানা (বা শোভমানা) তুমি দক্ষিণ দিক। রুদ্রগণ তোমার অধিপতি দেবতা। ইন্দ্ৰ শত্ৰুগণের আয়ুধসমূহকে প্রতিরোধকারী। পঞ্চদশস্তোম তোমাকে পৃথিবীতে স্থিত করুক। তোমার অচলতার নিমিত্ত বায়ুরগ্রেগা প্রউগৎ সংজ্ঞক উথ শস্ত্র তোমাকে দৃঢ় করুক। বৃহৎ সামও তোমাকে অন্তরিক্ষ লোকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নিমিত্ত স্তম্ভিত (দৃঢ়তার সাথে ধারণ করুক। প্রথমোৎপন্ন প্রাণ দ্যুলোকের বিস্তারের মতোই তোমাকে দেবতাগণের মধ্যে প্রথিত করুক (বিস্তার দান করুক)। এই বাক ও মনের অভিমানী দেবতাও তোমাকে প্রথিত করুক। ঐ সকল দেবগণ ঐকমত্য প্রাপ্ত হয়ে দ্যুলোকের উচ্চে স্বর্গস্থানে যজমান ও তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করুক৷
১২। হে ইষ্টকা! সম্যক রাজমানা তুমি পশ্চিম দিক। আদিত্যগণ তোমার অধিপতি দেবতা। বরুণ শত্রুবর্গের অস্ত্রসমূহের নিবারণকর্তা। সপ্তদশ স্তোম তোমাকে পৃথিবীতে উচ্ছিত (উন্নত) করুক। আ ত্বা রথং যথোতয়েইত্যাদি সংজ্ঞক উকথশাস্ত্র অচলতার নিমিত্ত তোমাকে দৃঢ়রূপে ধারণ করুক। বৈরূপ সাম তোমাকে অন্তরিক্ষে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির নিমিত্ত দৃঢ় করুক। প্রথমোৎপন্ন প্রাণ দ্যুলোকের উরুত্ব (অর্থাৎ বিশালত্ব) ও বিস্তারের ন্যায় তোমাকে দেবগণের মধ্যে প্রথিত করুক। এই বাক্ ও মনের অভিমানী দেবতাও তোমাকে সর্বথা প্রথিত করুক। ঐ সকল দেবতা ঐকমত্য প্রাপ্ত হয়ে দ্যুলোকের উত্তম স্থান স্বর্গে যজমান ও তোমাকে স্থাপিত করুক৷
১৩। হে ইষ্টকা! স্বয়ংই শোভমানা তুমি উত্তর দিক। মরুৎবর্গ তোমার অধিপতি দেবতা। শত্রুর প্রযুক্ত আয়ুধসমূহের নিবারণ কর্তা সোম। হে ইষ্টকা! একবিংশ স্তোম তোমাকে পৃথিবীতে উচ্ছিত করুক। অভি ত্বা শূর নোনুমঃ প্রভৃতি নিষ্কর্বল্য শস্ত্র তোমাকে অচলতার নিমিত্ত দৃঢ় করুক। অন্তরিক্ষে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নিমিত্ত বৈরাজসাম তোমাকে দৃঢ় করুক। প্রথমোৎপন্ন প্রাণ দুলোকের বিশালত্ব ও বিস্তারের ন্যায় তোমাকে দেবগণের মধ্যে প্রথিত করুক। এই বাক্ ও মনের দেবতাগণও তোমাকে প্রথিত করুক। ঐ সকল দেবতা ঐকমত্য প্রাপ্ত হয়ে দ্যুলোকের উত্তম স্বর্গস্থানে যজমান ও তোমাকে ধারণ করুক৷
১৪। হে ইষ্টকা! তুমি, সর্বপালনকী ঊর্ধ্ব দিক। বিশ্বদেবগণ তোমার অধিপতি দেবতা। শত্রুর আয়ুধসমূহের নিবারক বৃহস্পতি দেবতা। ত্রিণব-ত্রয়স্ত্রিংশ স্তোম তোমাকে পৃথিবীতে উন্নত করুক। তৎসবিতুৰ্বণীমহে এবং বৈশ্বানরায় পৃথুপাজসা ইত্যাদি অগ্নিমারতত শস্ত্র তোমাকে অচলত্বের নিমিত্ত দৃঢ়রূপে ধারণ করুক। অন্তরিক্ষে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নিমিত্ত শার ও রৈবত সাম তোমাকে দৃঢ় করুক। প্রথমোৎপন্ন প্রাণ তোমাকে দ্যুলোকের বিশালত্ব এবং বিস্তারের ন্যায়ই দেবগণে প্রথিত করুক। বাক্ ও মনের অভিমানী দেবতা তোমাকে প্রথিথ করুক। ঐ সকল দেবগণ ঐকমত্য প্রাপ্ত হয়ে দ্যুলোকের উত্তম স্থান স্বর্গে যজমান ও তোমাকে ধারণ করুক৷৷
১। হে রুদ্র! তোমার মোর (অর্থাৎ ক্রোধের) নিমিত্ত নমস্কার এবং তোমার উধৃত ইষুব (বাণের) নিমিত্তও নমস্কার। তোমার দুই বাহুর নিমিত্তও নমস্কার। (রুদ্র অর্থে জ্ঞানপ্রদ, দুঃখের দ্রাবয়িতা বা বিতাড়ক)
২। হে রুদ্র! তোমার যে শরীর মঙ্গলকারী, অভয়ঙ্কর এবং কখনও পাপফল নয়, সেই আপন অত্যন্ত শান্ত শরীরের দ্বারাই, হে গিরিবাসী রুদ্র! তুমি আমাদের দেখ।
৩। হে গিরিশ! শত্রুর প্রতি নিক্ষেপ করার নিমিত্ত তুমি আপন হস্তে যে বাণ ধারণ করছ, হে গিরিত্রাত (কৈলাস স্থিত প্রাণীগণের ত্রাতা)! তুমি সেই বাণগুলিকে শান্ত করো। তুমি আপন সেই বাণে কোন মনুষ্য বা চর-প্রাণীকে (জঙ্গমস্ত গো-ইত্যাদিকে) প্রহার (বা হত্যা) করো না৷
৪। হে গিরীশায়িন্! আমরা শান্তিকর স্তোত্রের দ্বারা অভিমুখ্য হয়ে তোমাকে স্তবন করছি। (এক্ষণে তুমি প্রসন্ন হয়ে কিছু এমন করো) যে প্রকারে আমাদের সমগ্র জগৎ রোগহীন ও প্রসন্ন হয়।
৫। সর্বপ্রধান ও দেবলোকের একমাত্র বৈদ্য ঐ প্রধান বক্তা শিব অধিক করে বলুন; হে রুদ্র! সকল সর্পকে স্থম্ভিত করে এবং সকল রাক্ষসকেও জড়ে পরিণত করে তাদের অধোমুখে পাতিত করুন।
৬। এই যে সূর্যরূপ তাম্র, রক্ত, ব (পিঙ্গল) এবং মঙ্গলরূপ রুদ্র আছেন, এবং তার অংশরূপ এই যে সহস্র রুদ্র আরও চার দিকে আধিশ্রিত আছে, সেই সকলের ক্রোধ আমরা প্রার্থনার দ্বারা দূর করব ৷
৭। নীল কণ্ঠশালী এবং বিশিষ্ট রূপে রক্তাভ এই যে রুদ্র ধীরে ধীরে সর্পণ (গমন) করছেন, এঁকে তো সাধারণ পশুচারণকারীগণ। (গোপালকগণ) দেখে থাকে এবং এঁকে জল আহরণকারিণী দাসীগণও (বা অঙ্গনাগণও) দেখে থাকে। আমাদের দ্বারাও ভয়পূর্বক দৃষ্ট ইনি আমাদের সুখী করুন।
৮।। নীলগ্রীবাশালী, সহস্রচক্ষু ও সেচন-সমর্থ সেই রুদ্রেদেবের উদ্দেশ্যে নমস্কার। এক্ষণে যাঁরা সেই রুদ্রের গণ (অর্থাৎ অনুচর), আমি তাদেরও নমস্কার করছি।
৯। হে রুদ্র! আপনি আপনার ধনুর দুই কোটি হতে প্রত্যঞ্চাকে পৃথক্ করুন (অর্থাৎ আপনি আপনার ধনুষের উভয় কোটিতে স্থিত জ্যাকে দূরীকৃত করুন)। এবং আপনার হস্তে যে বাণ আগত (বা ধৃত) হয়েছে, হে ভগবান্ রুদ্র! আপনি সেটিকে অন্য কোনও স্থানে নিক্ষেপ করুন।
১০। সেই কপর্দীর (জটাজুটধারীর) ধনুষ জ্যা-বিহীন হয়ে যাক; তিনি বিনা শল্যবাণধারী হোন। এক্ষণে তার সকল বাণ নিষ্ফল হয়ে যাক। এবং তার তূণীরও এক্ষণে শূন্য হয়ে যাক।
১১। হে অত্যন্ত সেচন-সমর্থ! তোমার হস্তে যে বাণায়ুধ আছে এবং যে ধনু আছে, সেই সেই রোগহীনের দ্বারাই (অর্থাৎ রোগ নিবারণকারীর) তুমি আমাদের সর্বতঃ স্পর্শ করো বা পালন করো।
১২। হে রুদ্র! ধনুষধারী তোমার বাণ আমাদের সকলকে আরও রক্ষা করুক। এক্ষণে যে তোমার পূর্ণকৃত তূণীর আছে, তাদের (অর্থাৎ তুণীরে রক্ষিত বাণগুলিকে) তুমি আমাদের থেকে দূরে রেখে দাও।
১৩। হে সহস্রাক্ষ! হে শততূনীরবান্ রুদ্র! আপন সেই ধনুষকে শিথিল করে ও বাণের অগ্রশল্যকে (ফলাকে) দূর করে (বা ধারহীন করে) তুমি আমাদের প্রতি কৃপালু হও।
১৫। হে রুদ্র! তুমি আমাদের কোনও মহান্ ব্যক্তিকে হত্যা করো না; কোনও শিশুকে হত্যা করো না; গর্ভাধান করণশীল যুবাকে হত্যা করো না এবং পরিসিক্ত গর্ভকে (গর্ভস্থ ভ্রণকে) হত্যা করো না। তুমি আমাদের পিতাকে হত্যা করো না এবং আমাদের মাতাকে হত্যা করো না। হে রুদ্র! তুমি আমাদের প্রিয় শরীরকে নষ্ট করো না।
১৬। হে রুদ্র! তুমি আমাদের পৌত্রে, পুত্রে, আমাদের আয়ু অথবা গো-অশ্বের বিষয়ে পুনঃ পুনঃ ক্রোধ করো না। হে রুদ্র! তুমি আমাদের ক্ৰোধী বীরগণকেও বধ করো না। আমরা সদা হবিযুক্ত হয়ে তোমাকে আহ্বান করছি।
১৭। সুবর্ণের বাহুশালী (হিরণ্যবাহু) সোনানী (সৈন্যাধ্যক্ষ) রুদ্রে উদ্দেশ্যে নমস্কার। দিকসমূহের অধিপতি রুদ্রকে নমস্কার। হরে-হরে পত্নীরূপী কেশসমূহে যুক্ত বৃক্ষের উদ্দেশ্যে (অর্থাৎ বৃক্ষরূপী রুদ্রকে) নমস্কার। পশুগণের পালকের (রুদ্রের) উদ্দেশ্যে নমস্কার। বালতৃণ অপেক্ষা পীতবন তেজস্বী রুদ্রের উদ্দেশে নমস্কার। মার্গের (পথের) রক্ষক রুদ্রের উদ্দেশ্যে নমস্কার। নীল কেশশালী, জরাহীন, যজ্ঞোপধাতধারী এবং গুণপূর্ণ মনুষ্যগণের পালক রুদ্রের উদ্দেশ্যে নমস্কার৷
১৯। লোহিতবর্ণ, স্থপতি (ছুতার বা সূত্রধর) এবং বৃক্ষের পালককে নমস্কার। ভূমণ্ডলের বিস্তারক ধনকর্তা এবং ওষধিসমূহের অধিপতি রুদ্রকে নমস্কার। মন্ত্রী, বাণিজ্য করণশীল তথা লতাগুল্ম ইত্যাদির পালক রুদ্রকে নমস্কার। তুমুল ধ্বনিকারী, আনন্দ (আহ্বান) করণশীল তথা পদাতিসেনার নায়ক রুদ্রের নিমিত্ত আমার এই নমস্কার।
২০। কর্ণ পর্যন্ত আকর্ষিত ধনুষ গ্রহণপূর্বক যুদ্ধে শীঘ্র গমনশীল রুদ্রের নিমিত্ত নমস্কার। সাত্ত্বিক ও শরণাপন্ন প্রাণিগণের পালক রুদ্রকে নমস্কার। শত্রুকে অভিভূত করণশীল, অত্যন্ত বেধনশীল তথা বিদারিণী সেনাগণের প্রভুর নিমিত্ত নমস্কার। নিষঙ্গধারী (অর্থাৎ তৃণধারী), মহান্ এবং চোরাগণের পালক রুদ্রের উদ্দেশ্যে নমস্কার। লুণ্ঠক ও ডাকাতগণের পালক এবং জঙ্গলের অধিপতি রুদ্রকে নমস্কার ৷৷
২১। বঞ্চক, পরিবঞ্চক এবং চোরগণের স্বামী রুদ্রকে নমস্কার। খঙ্গধারী, বাণবান্ এবং তস্করগণের প্রভু রুদ্রকে নমস্কার। আয়ুধধারী, হিংসেচ্ছুক ও চুরি করণশীল ডাকাতগণের পালক রুদ্রকে নমস্কার।। অসিধারী, রাত্রিতে ভ্রমণকারী ও শরীরচ্ছেদক লোকগণের পালক রুদ্রকে নমস্কার ৷৷
২২। উষ্ণিষ (পাগড়ী বা জটাজুট)-ধারী, পর্বতে-পর্বতে বিচারণশীল এবং ক্ষেত্র, গৃহ ইত্যাদির অপহর্তাগণের পালক রুদ্রকে নমস্কার। বাণধারী ও ধনুষধারী রুদ্রগণকে নমস্কার। ধনুষের দড়িতে (অর্থাৎ জ্যাতে) টান দিতে পরাগ তথা জ্যাতে বাণ যোজনা পূর্বক সন্ধানশীল রুদ্রগণকে নমস্কার। ধনুষকে আকর্ষণকারী এবং বাণসমূহকে ইতস্ততঃ নিক্ষেপকারী রুদ্রগণকে নমস্কার।
২৩। বাণ নিক্ষেপকারী এবং (বিদ্ধকারী) তোমাদের অর্থাৎ রুদ্রদের নমস্কার। নিদ্রাশীল এবং জাগরণশীল তোমাদের অর্থাৎ রুদ্রদের নমস্কার।শায়িত এবং উপবিষ্ট রুদ্রদের নমস্কার। স্থিত এবং ধাবনকারী রুদ্রদের নমস্কার।
২৪। (রুদ্রগণের) সভাকে নমস্কার, তাদের সভাপতিকে নমস্কার। (রুদ্রদের) অশ্বগুলিকে নমস্কার–তোমাদের অশ্বগুলির পালকগণকে নমস্কার। উৎকৃষ্টরূপে বিদ্ধশালী (রুদ্রদের) সেনাগণকে নমস্কার। বিবিধ রূপে বেধিত (ছেদন)-কারী (রুদ্রদের) সেনাগণকে নমস্কার। উৎকৃষ্ট সেবকগণের সাথে যুক্ত ব্রাহ্মী প্রভৃতি মাতৃকাগণকে নমস্কার এবং হিংসন সমর্থ দুর্গা প্রভৃতি মাতৃকাগণকে নমস্কার ৷৷
২৫। গণসমূহকে নমস্কার এবং তোমাদের অর্থাৎ গণপতিগণকেও নমস্কার। নানা জাতিসমূহের সঙ্ঘকে নমস্কার। এই সঙেঘর পালকগণকে নমস্কার। লম্পটগণকে নমস্কার। জটী-মুণ্ডী ইত্যাদি বিরূপগণকে নমস্কার। (নগ্নমুণ্ডজটিলাদয়স্তেভ্যো বো নমঃ)। এবং তুরঙ্গবদন তথা হয়গ্রীব প্রভৃতি বিশ্বরূপ গণসমূহকে নমস্কার।
চক্ষুষঃ পিতা মনসা হি ধীরো ঘৃতমেনে অজনম্নম্নমানে। যদেদন্তা অদহন্ত পূর্ব অদিদ দ্যাবাপৃথিবী প্রথেতা৷৷২৫৷৷
[কণ্ডিকা-৯৯ : মন্ত্র-১০৬]
মন্ত্ৰার্থঃ– [এই অধ্যায়ে চিতি-অপরিষেক ইত্যাদি মন্ত্র কথিত হয়েছে]
১। –হে মরুৎবর্গ! সেই মেঘ সমূহ বিন্ধ্য হিমালয় ইত্যাদি পর্বতে আশ্রয় গ্রহণকারী সারভূতা বৃষ্টি তথা ওষধি-বনস্পতিগুলি বিচরণশীল গাভীতে সঞ্চিত দুগ্ধ ইত্যাদি আমাদের প্রদান করো। হে মরুৎবর্গ! অত্যন্ত দাতা তোমরা আমাদের সেই বর্ষা তথা বলস্বরূপ ঘৃত ইত্যাদি প্রদান করো। হে সর্বগ্রাসী অগ্নি! আমাদের হবিঃ পান করে তোমাদের বিশাল ক্ষুধা উৎপন্ন হোক। হে অগ্নি! তোমার তেজ আমাদের হোক। আমরা যাদের দ্বেষ করি, তাদের তোমরা তাপ প্রদান করো।
২। হে অগ্নি! পাঁচটি চিতিতে যে হঁট চয়নকৃত হয়েছে, তারা তোমার প্রসাদে আমাদের অভিমত ফলকে দোহনকারক কামধেনু করে দাও। সেগুলির সংখ্যা ১-১০-১০০-১০০০-১০০০০ ১০০০০০-১০০০০০০-১০০০০০০০-১০০০০০০০০-১০০০০০০০০০-১০০০০০০০০০০ ১০০০০০০০০০০০-১০০০০০০০০০০০০-১০০০০০০০০০০০০০-১০০০০০০০০০০০০০০ ইত্যাদি ইত্যাদি রূপে (অর্থাৎ একের সাথে দশ-দশ গুণিতক পরার্ধরূপে) বর্তমান হোক। হে অগ্নি! এতগুলি হঁট তোমার কৃপায় আমার নিমিত্ত এই লোকে এবং পরলোকে কামধেনু হয়ে আগত (বা প্রাপ্ত) হোক ৷৷
৩। হে ইষ্টকাসমুহ! তোমরা বসন্ত ইত্যাদি ঋতুগণের স্বরূপশালিনী, যজ্ঞের সমৃদ্ধিকারিণী, এবং প্রত্যেক ঋতুকে যজ্ঞে স্থিরভাবে রক্ষাকারিণী। তোমরা ঘৃত ক্ষরণশালিনী, মধু ক্ষরিত করণশীলা, বিরাজসংজ্ঞকা (অর্থাৎ বিরাজ নামে খ্যাতা) এবং কখনও ক্ষীয়মান না হয় এমন ইষ্টকা, যা সাক্ষাৎ কামধেনুস্বরূপা।
৪। হে অগ্নি! আমরা জলকে শৈবালের সাথে তোমাকে পরিবেষ্টিত করছি। এক্ষণে তুমি আমাদের প্রতি শোধক ও শান্ত হও।
৫। হে অগ্নি! আমরা হিমের আবরক এই শৈবালের সাথে তোমাকে পরিবেষ্টিত করছি। এখানে তুমি আমাদের নিমিত্ত শান্ত ও শোধক হও।
৬। হে অগ্নি! তুমি পৃথিবীতে, বেতসের শাখায় এবং নদীর শীতল শৈবালে উত্তরিত হয়ে আগমন করো। হে অগ্নি! তুমি তো জলেরই তেজ। হে মক্কী! তুমি এই শৈবাল বেতের সাথে আমাদের সম্প্রপ্তা হও। সেই তুমি আমাদের এই যজ্ঞকে অগ্নির ন্যায় তেজস্বী ও শান্ত করো।
৭। এই অনুষ্ঠান জলের আপূরক এবং সমুদ্রের মহাস্থল। হে অগ্নি! এক্ষণে তুমি তোমার জ্বালাসমূহে আমাদের ভিন্ন অপর লোকগণকে তাপিত করো। তুমি আমাদের নিমিত্ত সর্বৰ্থা শান্ত থাকো।
৮। হে শোধক অগ্নি! তুমি আপন মন্দ জ্বালাজিহ্বার সাথে আমাদের প্রাপ্ত প্রাপ্ত হও। দেবগণকে এইস্থানে এই যজ্ঞে নিয়ে এস এবং এইস্থানে তাদের পূজা করো।
৯। হে শোধক! হে দেদীপ্যমান অগ্নি! তুমি দেবগণএক এইস্থানে আহ্বান করে আনয়ন করো আমাদের হবিঃ তাদের প্রাপ্ত করাও৷
১০। হে অগ্নি! তুমি আপন শোধক ও চেতনাকারিণী দীপ্তির দ্বারা এই পৃথিবীর উপর প্রকাশিত হয়ে থাক, যেমন উষাকাল আপন দীপ্তিতে শোভিত হয়ে থাকে। যুদ্ধে অশ্বকে শত্রুর প্রতি হিংসিতকারী যে অগ্নি অত্যন্ত তৃষিত ও সদা অজর হয়ে অবস্থান করে, সেই অগ্নিকে আমরা মক্কী, শৈবাল ও বেতস শাখার দ্বারা প্রশমিত করছি৷৷
১১। হে অগ্নি! তোমার রস-হরণশীল তেজকে নমস্কার। তোমার শিখাসমূহকে নমস্কার। তোমার জ্বালার হেতুসমূহ হতে আমাদের ভিন্ন অন্য লোকগণকে তাপিত করো। হে পাবক। তুমি আমাদের নিমিত্ত কল্যাণকারী হও।
১২। জঠরাগ্নিভাবে মনুষ্যে স্থিতিকারী অগ্নির নিমিত্ত এই পরোক্ষ আহুতি প্রদান করছি। জলে.ঔর্বাগ্নিরূপে স্থিত অগ্নির নিমিত্ত এই পরোক্ষাহুতি প্রদান করছি। আহবনীয় ইত্যাদি ভাবে কুশসমূহে স্থিত অগ্নির নিমিত্ত এই পরোক্ষাহুতি প্রদান করছি। বৃক্ষে দাবাগ্নিভাবে স্থিত অগ্নির নিমিত্ত এই পরোক্ষাহুতি প্রদান করছি। স্বর্গে আদিত্যভাবে বর্তমান অগ্নির নিমিত্ত এই পরোক্ষভূতি প্রদান করছি৷
১৩। দেবগণের মধ্যে যে দেবতা যজনের যোগ্য–যে যজনীয় দেবগণের মধ্যেও যারা বার্ষিকভাবে পরিপক্ক অন্ন ইত্যাদি প্রাপ্ত করে–সেই (ইন্দ্র ইত্যাদি হবির্ভুক্ত দেবতাগণ ব্যতীত) প্রাণ ইত্যাদি দেবতা আমাদের এই যজ্ঞে প্রতক্ষ ঘৃত ইত্যাদি ভক্ষণ করুক।
১৪। যে প্রাণ ইত্যাদি দেবতাগণ ইন্দ্র ইত্যাদি দেববর্গের শরীরে স্থিত হয়ে দেবত্ব প্রাপ্ত হয়েছে, যারা এই জীবের সাথে অগ্রগামী হয়ে থাকে এবং যারা ব্যতীত কেউই শরীরে গতি লাভ করতে পারে না, সেই প্রাণদেবতাগণ দ্যুলোকেও থাকে না, এবং পৃথিবীতেও থাকে না; তবে তারা নাসিকা, চক্ষু ইত্যাদি আয়তনেই (স্থানেই) বাস করে থাকে ৷৷
১৫। হে অগ্নি! তোমার প্রাণদাত্রী, অপানদাত্রী, ব্যানদাত্রী, ব্রহ্মবৰ্চস্ (বা ব্রহ্ম বল)-দাত্রী এবং ধনদাত্রী জ্বালাসমূহ আমাদের নিমিত্ত শান্ত হোক। তারা অন্যকে (অর্থাৎ শত্রুকে) তাপান্বিত করুক। হে শোধক অগ্নি! তুমি আমাদের নিমিত্ত শান্ত হও।
১৬। সকল ভক্ষক রাক্ষসগণকেই অগ্নি আপন তীক্ষ্ণ তেজের দ্বারা বিতাড়িত করুক। অগ্নি আমাদের ধন প্রদান করুক।
১৭। যে বিশ্বকর্মা, আদ্য ঋষি, সৃষ্টিযজ্ঞের হোতা এবং আমাদের পিতা (অর্থাৎ প্রাণীগণের পালক), এই সকল ভূতসমূহকে প্রলয়কালে সংহার করেন, তিনি আপন এই একোহহং বহুস্যাম্… (অর্থাৎ এক আমি বহু হবো)–ইচ্ছা পূর্বক বিশ্বসৃষ্টিরূপ ধন কামনা করেন এবং ঐ সৃষ্টিরূপে এই ব্রহ্মাণ্ডকে সর্বপ্রথম আচ্ছাদনকারী হন (অর্থাৎ ঐ সৃষ্টিভাবে বা সৃষ্টিগুণে পরিণত হন)। সেই পরমাত্মা পুনরায় সেই সৃষ্টিতে বিদ্যমান অন্য ভূতমাত্রে প্রবিষ্ট হয়ে যান।
১৮। ব্রহ্মাণ্ডকে সৃষ্টির সময়ে সেই বিশ্বকর্মার অধিষ্ঠানের স্থান কোথায় ছিল? ক্রিয়া কি ছিল? এবং কেমন ছিল বস্ত্র-চক্র ইত্যাদি উপকরণ সম্ভার, যখন ভূমিকে উৎপন্ন করে সর্বদ্রষ্টা বিশ্বকর্মা আপন মহিমায় এই দ্যুলোককে আচ্ছাদিত করেছিলেন?।
১৯। সেই বিশ্বকর্মা ঋষি তাহলে সর্বত্রচক্ষু, সর্বত্রমুখ, সর্বত্রবাহু এবং সর্বত্রপদশালীও। একাকীই সেই পরমাত্মাদের এই দ্যাবাপৃথিবীকে উৎপন্ন করে তাদের মাত্র নিজেরই ভুজদণ্ডে এবং চরণে অধিষ্ঠান বিস্তার করে তস্বরূপ নির্মাণ করে দেন (অর্থাৎ তাতে কোন বাহ্য উপকরণ ইত্যাদির অপেক্ষা থাকে না)।
২০। কোন রকম বন ছিল? কোন রকম সেই বৃক্ষ ছিল, যা থেকে সেই বিশ্বকর্মা এই দ্যাবাপৃথিবীকে গড়েছিলেন? বিদ্বানগণ! আপন মন হতে পর্যালোচনা পূর্বক এই প্রশ্ন উত্থাপিত করো যে আধারে সেই পরমাত্মদেব এই ভুবনকে ধারণ করে আশ্রয়ণ করেছিলেন, তা কি? (তার কোন আধার ছিল না। তিনিই সকলের আধার ও স্রষ্টা ছিলেন)৷
২১। হে বিশ্বকর্মা! তোমার যে উত্তম, মধ্যম এবং অবর লোক বা তেজ আছে, সেগুলি তুমি নিজের ভিন্ন ভিন্ন যজমানগণকে প্রদান করে দাও; কেননা তুমি সেই যজমানবর্গের দ্বারা হবিতেই অন্নবান্ হয়ে থাক। হে বিশ্বকর্মা। আপন বিশ্বরূপ স্বরূপকে যজ্ঞের দ্বারা অভিবর্ধিত করে তুমি স্বয়ংই আপন যজন করো (অর্থাৎ কোন অন্য মানব তোমার যজন করতে সমর্থ হয় না)।
২২। হে বিশ্বকর্মা! হবির দ্বারা অতিবৃদ্ধ হয়ে তুমি দ্যুলোকে স্থিত এবং পৃথিবীতে স্থিত ভূতবর্গকে (প্রাণিগণকে) স্বয়ং যজন করো। তোমাকে এইভাবে স্বয়ংই যজন করতে দর্শন করে আমাদের শত্রুগণ বিমোহিত হয়ে যাক। আমাদের এই যজ্ঞে এক্ষণে ধনশালী ইন্দ্রই আত্মজ্ঞানের উপদেশক হোক৷
২৩। বেদবাণীর পালক, সমস্ত বিশ্বের বিধাতা এবং মনের বেগের ন্যায় বেগশালী সেই বিশ্বকর্মাকে আমরা আজ আপন রক্ষার নিমিত্ত এই যজ্ঞে আহ্বান করছি। রক্ষণে অত্যন্ত কুশল এবং সকলের কল্যাণকারী সেই পরামাত্মা আমাদের সকল সামগ্রীকে আস্বাদিত করুক।
২৪। হে বিশ্বকর্মা! হবির দ্বারা অভিবর্ধনে তুমি রক্ষক ইন্দ্রকে সর্বথা বধরহিত (অবধ্য) করেছ, যাতে সেই উদগ্র্ণ বল ইন্দ্র যুদ্ধে সকলের দ্বারা আহুত হওয়ার যোগ্য রয়ে গিয়েছেন৷
২৫। চক্ষু ইত্যাদির পালক এবং মনে ধীর সেই বিশ্বকর্মা এই চঞ্চল দ্যাবাপৃথিবীকে দৃঢ় করার নিমিত্ত জলকে উৎপন্ন করেছিলেন। যখন পূর্বজাত বশিষ্ঠ ইত্যাদি ঋষিগণ এই দ্যাবাপৃথিবীকে দৃঢ় করেছিলেন, তখন বিশ্বকর্মা সেগুলিকে ব্যাপ্ত করেছিলেন৷৷
অষ্টাদশ অধ্যায়
শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ১
মন্ত্রঃ– বাজশ্চ মে প্রসবশ্চ মে প্রতিশ্চ মে প্রসিতিশ্চ মে ধীতশ্চ মে ক্রতুশ্চ মে স্বরশ্চ মে, শ্লোক মে শ্ৰবশ্চ মে শ্রুতিশ্চ মে জ্যোতিশ্চ মে স্বশ্চ মে যজ্ঞেন কল্পস্তা৷৷1৷৷
প্রাণশ্চ মেহপানশ্চ মে ব্যান মেহসুশ্চ মে চিত্তং চ ম আধীতং চ মে বা চ মে মনশ্চমে চক্ষুশ্চ মে শ্রোত্রং চ মে দক্ষশ্চ মে বলং চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্।।২।
ওজশ্চ মে সহ ম আত্মা চ মে তনুশ্চ মে শৰ্ম চ মে বর্ম চ মেহজানি চ মেহস্থীনি চ মে পুরূংষি চ মে শরীরাণি চ মে আয়শ্চ মে জরা চ মে যজ্ঞেন কল্পতাম।৷৩৷
জ্যৈষ্ঠাং চ মে আধিপত্যং চ মে মশ্চ ভামশ্চ মেহমশ্চ মেহত্তশ্চ মে জেমা চ মে মহিমা চ মে বরিমা চ মে প্রথিমা চ মে বর্ষিমা চ মে দ্রাঘিমা চ মে বৃদ্ধং চ মে বৃদ্ধিশ্চ মে যজ্ঞেন ক্লস্তাম্ ৷৪৷
সত্যং চ মে শ্রদ্ধা চ মে জগচ্চ মে ধনং চ মে বিশ্বং চ মে মশ্চ মে ক্রীড়া চ মে মোশ্চ মে জাতং চ মে জানিষ্যমাণং চ মে সুক্তং চ মে সুকৃতং চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্৷৷5৷৷
ঋতং চ মেহনমিত্রং চ মে হযক্ষ্মং চ মে ইনাময়চ্চ মে জীবতুশ্চ মে দীর্ঘায়ুত্বং চ মেহনমিত্রংহভয়ং চ মে সুখং চ মে শয়নং চ মে সূষাশ্চ মে সুদিনং চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তা৷৷৬৷
৷ যন্তা চ মে ধর্তা চ মে ক্ষেমশ্চ মে ধৃতিশ্চ মে বিশ্বং চ মে মহ মে সংবিচ্চ মে জ্ঞাত্রং চ মে সূশ্চ মে প্রসূশ্চ মে সীরং চ মে লয়শ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্।।৭৷
শং চ মে ময়শ্চ মে প্রিয়ং চ মেইনুকামশ্চ মে কামশ্চ মে সৌমনস, মে ভগশ্চ মে দ্রবিণং চ মে ভদ্রং চ মে শ্রেয়শ্চ মে বসীয়শ্চ মে যশশ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্।।৮।
উক্ চ মে সূতা চ মে পয়শ্চ মে রসশ্চ মে ঘৃতং চ মে মধু চ মে সন্ধিশ্চ মে সপীতিশ্চ মে কৃষিশ্চ মে বৃষ্টিশ্চ মে জৈত্রং চ ম ঔদ্ভিদ্যং চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্৷৷৷৷ রয়িশ্চ মে রায়শ্চ মে পুষ্টং চ মে পুষ্টিশ্চ মে বিভু চ মে প্রভু চ মে পূর্ণং চ মে পূর্ণতরং চ মে কুবং চ মেহক্ষিতং চ মেহন্নং চ মেইক্ষুচ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তা৷১০।
বিত্তং চ মে বৈদ্যং চ মে ভৃতং চ মে ভবিষ্যচ্চ মে সুগং চ মে সুপথ্যং চ মে ঋদ্ধং চ ম ঋদ্ধশ্চ মে ক্লপ্তং চ মে ক্লপ্তিশ্চ মে মতিশ্চ মে সুমতিশ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্ ৷৷১১৷
ব্রীহয়শ্চমে যবাশ্চ মে মাষাশ্চ মে তিলাশ্চ মে মুদগাশ্চ মে খাশ্চ মে প্রিয়ঙ্গবশ্চ মেহপবশ্চ মে শ্যামাকাশ্চ মে নীবারাশ্চ মে গোধূমাশ্চ মে মসূরাশ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্।১২৷৷ অশ্মা চ মে মৃত্তিকা চ মে গিরয়শ্চ মে পর্বতাশ্চ মে সিকতাশ্চ মে বনস্পতয়শ্চ মে হিরণ্যং চ মেহযশ্চ মে শ্যামং চ মে লোহং চ মে সীসং চ মে অপু চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্৷১৩।
অগ্নিশ্চ ম আপশ্চ মে বীরুধশ্চ ম ওষধয়শ্চ মে কৃষ্টপচ্যাশ্চ মেকৃষ্টপচ্যাশ্চ মে গ্রাম্যাশ্চ মে পশব আরণ্যাশ্চ মে বিত্তং চ মে বিত্তিশ্চ মে ভূতং চ মে ভূতিশ্চ মে যজ্ঞেন কল্প৷৷১৪৷
বসু চ মে বসতিশ্চ মে। কর্ম চ মেশক্তিশ্চ মেহর্থশ্চম এমশ্চ মইত্যা চ মে গতিশ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম৷১৫৷৷
অগ্নিশ্চম ইন্দ্ৰশ্চ মে সোমশ্চম ইন্দ্ৰশ্চ মে সবিতা চম ইন্দ্ৰশ্চ মে সরস্বতী চমইন্দ্ৰশ্চ, মে পূষা চ ম ইন্দ্ৰশ্চ বৃহস্পতিশ্চ ম ইন্দ্ৰশ্চমে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্৷৷১৬৷
মিত্রশ্চ ম। ইন্দ্ৰশ্চ মে বরুণশ্চ মইন্দ্ৰশ্চ মে ধাতা চ মইন্দ্ৰশ্চ মে ত্বষ্টা চম ইন্দ্ৰশ্চ মে মরুতশ্চম ইন্দ্ৰশ্চ মে বিশ্বে চ মে দেবা ইন্দ্ৰশ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্৷৷১৭৷৷
পৃথিবী চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মেহন্তরিক্ষং চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে দ্যৌশ্চম ইন্দ্ৰশ্চমে সমাশ্চম ইন্দ্ৰশ্চ মে নক্ষত্রাণি চম ইন্দ্ৰশ্চ মে দিশশ্চম ইন্দ্ৰশ্চমে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্৷৷১৮
অংশুশ্চ মে রশ্মিশ্চ মে হদাভ্যশ্চ মে হধিপতিশ্চম উপাংশুশ্চ মেহন্তর্যামশ্চম ঐন্দ্ৰবায়বশ্চ মে মৈত্রাবরুণ ম আশ্বিনশ্চ মে প্রতিপ্রস্থানশ্চ মে শুক্রশ্চ মে মন্থী চ মে যজ্ঞেন কল্পস্তাম্।১৯
আগ্রয়ণশ্চ মে বৈশ্বদেবশ্চ মে ধ্রুবশ্চ মে বৈশ্বানরশ্চম ঐন্দ্রাগ্নশ্চ মে মহাবৈশ্বদেবশ্চ মে মরুত্বতীয়াশ্চ মে নিক্কেবল্যশ্চ মে সাবিত্রশ্চ মে সারস্বতশ্চ মে পাত্নীবতশ্চ মে হারিযোজনশ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্ ৷৷২০৷
সুচশ্চ মে চমসাশ্চ মে বায়ব্যানি চ মে। দ্রোণকলশশ্চ মে গ্রাবাণশ্চ মেহধিবণে চ মে পূতভৃচ্চ ম আধবনীয়শ্চ মে বেদিশ্য মে বহিস্ট মেহবyথশ্চ স্বগাকার মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্ ৷৷২১৷৷
অগ্নিশ্চ মে ঘশ্চ মেহর্কশ্চ মে সূর্যশ্চ মে প্রাণশ্চ মেহশ্চমেধশ্চ মে পৃথিবী চ মেহদিতিশ্চ মে দিতিশ্চ মে দৌশ্চ মেহজুলয়ঃশবয়ো দিশশ্চমে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্।২২।
ব্রতং চম ঋতবশ্য মে তপশ্চ মে সংবৎসরশ্চ মেহহোরাত্রে ঊষ্ঠীবে বৃহদ্রথন্তরে চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্।।২৩৷
একা চ মে তিশ্চ মে তিশ্চ মে পঞ্চ চ মে পঞ্চ চ সপ্ত চ মে সপ্ত চ মে নব চ মে নব চ ম এদাদশ চ মে ত্রয়োদশ চ মে ত্রয়োদশ চ মে পঞ্চদশ চ মে পঞ্চদশ চ মে সপ্তদশ চ মে সপ্তদশ চ মে নবদশ চ মে নবদশ চ ম একবিংশতিশ্চম একবিংশতিশ্চ মে এয়োবিংশতিশ্চ মে ত্রয়োবিংশতিশ্চ মে পঞ্চবিংশতিশ্চ মে পঞ্চবিংশতিশ্চ মে সপ্তবিংশতিশ্চ মে সপ্তবিংশতিশ্চ মে নববিংশতিশ্চ মে নববিংশতিশ্চ ম একত্রিংশচ্চ ম একত্রিংশচ্চ মে ত্রয়স্ত্রিংশচ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্।।২৪৷৷
চতশ্চ মেইষ্টেী চ মে দ্বাদশ চ মে দ্বাদশ চ মে মোড়শ চ মে মোড়শ চ মে বিংশতিশ্চ মে বিংশতিশ্চ মে চতুর্বিংশতিশ্চ মে চতুর্বিংশতিশ্চ মেহষ্টাবিংশতিশ্চ মেহষ্টাবিংশতিশ্চ মে দ্বাত্রিশংশচ্চ মে দ্বাত্রিংশ মে ষট্ত্রিংশচ্চ মে ষট্ত্রিংশচ্চ মে চত্বারিংশচ্চ মে চত্বারিংশ মে চতুশ্চত্বারিংশচ্চ মে চতুশ্চত্বারিংশষ্ট মেহষ্টাচত্বাবিংশচ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্৷৷২৫।
বিশ্চ চ মে এবী চ মে দিত্যবাট্ চ মে দিতৌহী চ মে পঞ্চাবিশ্চ মে পঞ্চাবী চ মে ত্রিবৎসশ্চ মে ত্রিবৎসা চ মে তুর্যবান্ চ মে তুযৌহী চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তা৷২৬
পষ্ঠবাট্ চ মে পষ্ঠৌহী চম উক্ষা চ মে বশা চ ম ঋষভশ্চ মে বেহচ্চ মেইনাশ্চ মে ধেনুশ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্।।২৭
[কাণ্ড-৭৭, মন্ত্র-৮৯]
মন্ত্রার্থঃ– (এই অধ্যায়ে বসোর্ধারা ইত্যাদি মন্ত্ৰসমূহ উক্ত হয়েছে)
১। –অন্ন, অন্নদানের অনুজ্ঞা, শুদ্ধি, অন্নবিষয়ক মন্ত্র ঔৎসুক্য, ধ্যান, সঙ্কল্প, সাধুশব্দ, শ্লোক, যজ্ঞ, শ্রুতি, জ্যোতি এবং স্বর্গ–এইগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার সপ্রাপ্ত হোক; (অর্থাৎ আমি যজ্ঞ সম্পাদনের দ্বারা এইগুলি লাভ করব) ৷
২। প্রাণ, অপান, ব্যান, প্রবৃত্তিমান্ বায়ু, চিত্ত, বাহ্যবিষয়ক জ্ঞান, বাক্, মন, চক্ষু, শ্রোত্র, জ্ঞানেন্দ্রিয়-কৌশল এবং কর্মেন্দ্রিয় কৌশল–যজ্ঞের দ্বারা এগুলি আমার সিদ্ধ হোক ৷৷
৩৷ ওজ, বল, আত্মশক্তি, পুষ্ট শরীর, সুখ, করচ, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, অস্থিসমূহ, পূর্ব (অঙ্গুলির গ্রন্থি), বিবিধ শরীর, আয়ু এবং বৃদ্ধাবস্থা–এইগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক ৷
৪। জ্যেষ্ঠত্ব, আধিপত্য, ক্রোধ, তেজ, বল, জল, জয়সামর্থ্য, মহিমা, প্রজা ইত্যাদির বিশালতা, গৃহ-ক্ষেত্র ইত্যাদির বিস্তার, দীর্ঘজীবন, অবিচ্ছিন্ন বংশত্ব (অর্থাৎ ছোঁহীন বংশধারা), প্রভূত অন্নধন ইত্যাদি এবং বিদ্যা ইত্যাদি গুণকর্মযজ্ঞের দ্বারা এইগুলি আমার সম্প্রপ্ত হোক; (অর্থাৎ আমি যজ্ঞ গঠন করব)
৫। সত্য, শ্রদ্ধা, জগৎ, ধন, বিশ্ব, তেজঃ, ক্রীড়া (অক্ষত ইত্যাদি), মোদ (আনন্দ), সন্তান, বংশপরম্পরা, সূক্ত (ঋক্মন্ত্ৰসমূহ), এবং পুণ্য (ঋক্ পাঠের নিমিত্ত সুকৃতি বা শুভদৃষ্ট)–আমার যজ্ঞের দ্বারা এইগুলি সিদ্ধ হোক৷৷
৬। ঋত (যজ্ঞ ইত্যাদি ক্রিয়া), অমৃত (যজ্ঞকর্মের ফলস্বরূপ স্বর্গ ইত্যাদি), অপরাগত্ব (ধাতুক্ষয় ইত্যাদি জনিত রোগের অভাব), অনাময়ত্ব (সামান্যমাত্র ব্যাধিরও রহিত্য), জীবন (ব্যাধিনাশক ঔষধ সেবন), দীর্ঘায়ুত্ব, অশত্ৰুত্ব, অভয় (ভীতিহীনতা), সুখ (সুখমানন্দ), শয়ন (সুখকর শয্যা), শুভ উপায়সমূহ (স্নান, সন্ধ্যাহ্নিক ইত্যাদি যুক্ত প্রাতঃকাল) এবং সুদিন (যজ্ঞসাধন, দান, অধ্যয়ন ইত্যাদি) এইগুলি আমার যজ্ঞের দ্বারা সিদ্ধ হোক ৷
৭। অশ্ব ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণকর্তা, পোষক পিতা প্রভৃতি, ক্ষেম (বিদ্যমান ধনের রক্ষণশক্তি), ধৃতি (ধৈর্য), বিশ্ব (সকলের আনুকূল্য), তেজঃ, মহ (পূজা), সম্বিৎ (বেদশাস্ত্র ইত্যাদিতে জ্ঞান), বিজ্ঞানসামর্থ্য, প্রেরণাসামর্থ্য, জননশক্তি, ধান্য ইত্যাদি ও কৃষির প্রতিবন্ধকসমূহের নিবৃত্তি–এইগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক।
৮৷ ঐহিক সুখ, পারলৌকিক সুখ, প্রিয়, প্রিয় পদার্থ, বিষয়সুখ, প্রেমভাব (মনঃস্বাস্থ্যকর বন্ধুবৰ্গ), সৌভাগ্য, ধন, ঐহিক কল্যাণ, পারলৌকিক কল্যাণ, নিবাসযোগ্য গৃহ ইত্যাদি এবং যশ–যজ্ঞসাধনের দ্বারা এইগুলি আমাকে প্রাপ্ত হোক।
৯৷ অন্ন, সত্যবাণী, দুগ্ধ, দধি, ঘৃত, মধু, সহজে (বন্ধুবর্গের সাথে একত্রে ভোজন), সহপান (একত্রে পান), কৃষি, বৃষ্টি, জয়সামর্থ্য এবং শত্রুগণের মধ্যে ভেদনীতির প্রয়োগ এইগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক৷
১২৷ ধান্য, যব, কলাই, তিল, মুগ, ছোলা, প্রিয়ঙ্গব, চীনক, শ্যামক, নীবার, গোধূম এবং মসুর–এগুলি আমার যজ্ঞের দ্বারা সম্প্রপ্ত হোক।
১৩। প্রস্তর, মৃত্তিকা, পর্বত, মহাপর্বত বালু, বনস্পতিসকল, সুবর্ণ, রৌপ্য, তা লৌহ, সীসা ও ত্রপু (রঙ্গ বা রাং)–এগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার প্রাপ্ত হোক৷
১৪। অগ্নি, জল, লতাসমূহ, ওষধিসকল, কৃষি হতে উৎপন্ন শস্য ইত্যাদি, বিনা কৃষিকর্মে জাত শস্য ইত্যাদি, গ্রামীণ পশু, আরণ্য পশু, বিত্ত, ভাবি লাভ (ভবিষ্যতে লব্ধব্য সামগ্রী), পূর্বলাভ তথা স্ব-অর্জিত ঐশ্বর্য–এগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার প্রাপ্ত হোক৷
১৫৷ গো-ইত্যাদি ধন, সুন্দর বসতি (বাসস্থান), অগ্নিহোত্র ইত্যাদি কর্মের শক্তি, অর্থ (কাম্য অর্থ), প্রাপ্তব্য অর্থ, ইষ্ট প্রাপ্তির উপায়, এবং ইষ্টপ্রাপ্তি–এসকলই আমার যজ্ঞের দ্বারা সিদ্ধ হোক৷
১৬। অগ্নি, ইন্দ্র, সোম, সবিতা, সরস্বতী, পূষা, বৃহস্পতি ও বৃহস্পতির সাথে যুগ্ম দেবগণ আমার যজ্ঞের দ্বারা সিদ্ধ হোক।
১৭। মিত্র, বরুণ, ধাতা, ত্বষ্টা, মরুৎ, বিশ্বদেবগণ এবং তাদের যুগ্ম ইন্দ্রদেব–এরা সকলেই যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ (প্রাপ্তি) হোক৷
১৮৷ পৃথিবী, অন্তরিক্ষ, দ্যৌ (লেক), বর্ষ, নক্ষত্রগণ এবং দিকসমূহের (অর্থাৎ এগুলির অধিষ্ঠাতৃ দেবগণের সাথে) যুগ্মরূপে ইন্দ্রদেব–এরা সকলেই যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ (সম্পন্ন) হোক৷৷
১৯। অংশগ্রহ, রশ্মি, অদাভ্য, অধিপতি, উপাংশু, অন্তর্যাম, ঐন্দ্র বায়ু, মৈত্রা-বরুণ, আশ্বিন, প্রতিপ্রস্থান শুক্র এবং মন্থীগ্রহ–এসকলই যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক।
২০। আগ্রায়ন, বৈশ্বদেব, ধ্রুব, বৈশ্বানর, ইন্দ্র ও অগ্নি, মহাবৈশৃদেব, মরুতৃতীয় (মহামরুৎবর্গ), নিবৈল্য, সাবিত্র, সারস্বত্য, পাত্নীবত ও হারিযোজনগ্রহ–এগুলির সবই যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধি হোক।
২১। সুবা, চমসা, বায়ব্য, দ্রোণকলস, গ্রাবাণ (সোম হেঁচার প্রস্তর), কাষ্ঠের দুটি পাতলা তক্তা (কাষ্টফলক), পূতভৃৎ, আহবনীয় সোমকলস, বেদি, কূশ, অবভৃথ ও শ্যুবাক (বা স্বগাকার)–এই যজ্ঞীয় পাত্র ইত্যাদি যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক৷৷
২২। অগ্নি, প্রবর্গ, যজ্ঞবিশেষ, সূর্য, প্রাণ, অশ্বমেধ, পৃথ্বী, অদিতি, দিতি, দ্যুলোক, অঙ্গুলিসকল, শক্তিসমূহ এবং দিসমূহ–এইগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক৷৷
২৩। ব্রত, ঋতুবৃন্দ, তপ, সম্বৎসর, অহোরাত্র, জঙ্দ্ব য়, জানুদ্বয় ও বৃহত্ৰথন্তর নামক সামদ্বয়–এই সমস্তই যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক।
২৪। এক, ত্রি, পঞ্চ, সপ্ত, নব, একাদশ, এয়োদশ, পঞ্চদশ, সপ্তদশ, ঊনবিংশ, একবিংশ ত্রয়োবিংশ, পঞ্চবিংশ, সপ্তবিংশ, ঊনত্রিংশ, একত্রিংশ এবং এয়োবিংশ এভৃতি অযুগ্ম স্তোমগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক৷
২৫৷ চতুঃ (চারি), অষ্ট, দ্বাদশ, যোড়শ, বিংশ, চতুর্বিংশ, অষ্টবিংশ, দ্বাত্রিংশ, ষট্ত্রিংশ চত্বারিংশ, চতুশ্চত্বারিংশ, অষ্টচত্বারিংশ প্রভৃতি স্বর্গপ্রাপক যুগ্ম স্তোমগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক৷৷
২৬। এ্যবি অর্থাৎ দেড় বৎসরের এঁড়ে বাছুর, দেড় বৎসরের বনা বাছুর, দুই বৎসরের এঁড়ে বাছুর, দুই বৎসরের বা বাছুর, আড়াই বৎসরের এঁড়ে ও বনা, তিন বৎসরের গাভী ও বলদ, এবং সাড়ে তিন বৎসরের গাভী ও বলদ হোমার্থে যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক।
২৭। চারি বৎসরের গাভী ও বলদ, পূর্ণ বলদ অর্থাৎ সেচনসমর্থ ষাঁড়, বন্ধ্যা গাভী, যুবা বলদ, গর্ভপাতিনী গাভী, শকট বহনে সমর্থ বলদ এবং নবপ্রসূতা গাভী যজ্ঞের দ্বারা আমার সিদ্ধ হোক।
মন্ত্ৰার্থঃ– (এই অধ্যায়ে সৌত্ৰামণি যাগের মন্ত্রসমূহের প্রারম্ভ হচ্ছে। এই মন্ত্র তিনটি অধ্যায় পর্যন্ত কথিত হবে)
১। হে সুরা! তুমি হেন সুস্বাদু সুরাকে আমি সুস্বাদু সোমের সাথে সংযোজিত করছি, তুমি হেন তীব্রা সুরাকে আমি তীব্র সোমরসের সাথে, তুমি হেন অমৃতময়ীকে আমি অমৃতময় সোমের সাথে এবং তুমি হেন মধুমতী সুরাকে আমি মধুময় সোমরসের সাথে সংযোজিত করছি। হে সোম-সংমিশ্রিতা সুরা! তুমি সোমময়ী। তুমি অশ্বিনীকুমার যুগলের নিমিত্ত পরিপক্ক (উৎকৃষ্টরূপে পাকনিষ্পন্ন) হও; সরস্বতীর নিমিত্ত পক্ক হও এবং সুষ্ঠুত্রাতা ইন্দ্রের নিমিত্ত পাক প্রাপ্ত হও।
২। হে ঋত্বিকগণ! অভিযুত সোমকে গাভীর দুগ্ধে আসিঞ্চিত করো, যে সোম সর্বোত্তম হবিঃ; যা যজমানকে ধারণ করে, যা মানুষের পক্ষে হিতকরী এবং জলের অন্দরে বর্তমান যাকে অধ্বর্যু প্রস্তরে চূর্ণ পূর্বক অভিযুত করে থাকে৷৷
৩। উদরের মধ্যে বর্তমান বায়ুকে দশা পবিত্রে পবিত্ৰীকৃত করে সোমরস বাহিত হয়ে অধোগত হয়ে থাকে। সে ইন্দ্রের অনুকূল মিত্র হয়। হৃদয়ের মধ্যে বর্তমান বায়ুর দ্বারা পবিত্ৰীকৃত সোমরস ঊর্ধ্বগত হয়ে মুখের প্রান্তে বাহিত হয়ে থাকে। সে ইন্দ্রের অনুকূল মিত্র হয় ৷
৫। হে সোম! অভিযুত হয়ে তুমি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং ইন্দ্রিয়সমূহের তেজকে উৎপন্ন করে থাক। সবার সাথে সংমিশ্রিত হয়ে তুমি মদকারীও হয়ে গিয়ে থাকে। হে সোমদেব! তুমি আপন শুদ্ধ বীর্যের দ্বারা অগ্নি প্রভৃতি দেবগণকে প্রসন্ন করো এবং তারপর ঘৃত ইত্যাদির সাথে যজমানের নিমিত্ত অন্ন ধারণ করো; (অর্থাৎ যজমানকে অন্নরস প্রদান করো)।
৬। হে মিত্র অগ্নি! যে প্রকারের শস্য বপনকারী কৃষক যব প্রভৃতি শস্যসমূহকে ঘাস হতে পৃথক করে যথাক্রমে ছেদন করে নেয়, সেই প্রকারে এই সংসারে যে যে যজমান কুশ গ্রহণ পূর্বক নমস্কার সহকারে তোমার যজন করেন-তুমি পৃথক পৃথক রূপে তাদের নিমিত্ত অন্ন-পান ইত্যাদির প্রবন্ধ (ব্যবস্থা) করো। হে গ্রহ! তুমি উপযামপাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছে। আমি তোমাকে অশ্বিদ্বয়ের নিমিত্ত, সরস্বতীর নিমিত্ত, এবং সুষ্ঠুত্ৰাতা (সুরক্ষক) ইন্দ্রের নিমিত্ত গ্রহণ করছি। এই তোমার স্থান; এইস্থানে আমি তোমাকে তেজঃ ও বলের নিমিত্ত স্থাপন করছি৷৷
৭। (সুরাগ্রহকে গ্রহণ করণীয়)–হে সুরা ও সোম! তোমাদের দুজনের নিমিত্ত পৃথক পৃথক্ স্থান নির্মাণ করা হয়েছে। সেই স্থান দেবগণের হিত সাধনশীল। উত্তম বেদীস্থানে তোমরা দুজন কখনও মিলিত হয়ে যেও না। হে সুরা! তুমি বলশালিনী সুরা এবং এই শুদ্ধ সোমরস স্বরূপা। তুমি আপন ভূমিতে স্থান গ্রহণ করে কখনও এই সোমকে হিংসিত করো না। (আহবনীয় অগ্নিতে সোমকে আহুতি প্রদান করা হয় এবং দক্ষিণাগ্নিতে সুরাকে আহুতি প্রদান করা হয়। এই প্রকারে এই দুজনের সম্পূর্ণ পৃথক্ পৃথক্ স্থান)।
৮। হে গ্রহ! তুমি উপযামগ্রহের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। তুমি অশ্বিযুগলের তেজঃ (অর্থাৎ সাক্ষাৎ অশ্বিযুগলের মতো), তুমি সরস্বতীর বীর্য (অর্থাৎ সামর্থ্যসম্পন্ন), এবং ইন্দ্রের বলসম্পন্ন। এই তোমার স্থান। প্রমোদের নিমিত্ত, আনন্দের নিমিত্ত এবং তেজঃ প্রাপ্তির নিমিত্ত আমি তোমাকে এইস্থানে স্থাপিত করছি৷
৯। (পয়োগ্রহকে গ্রহণীয়)-হে পয়োগ্রহ! তুমি তেজঃস্বরূপ, আমাতেও তেজঃ পূর্ণ করে দাও। তুমি বীর্যস্বরূপ, আমাতেও বীর্য পূর্ণ করে দাও। তুমি বুলস্বরূপ, আমাতেও বল পূর্ণ করে দাও। তুমি ওজঃস্বরূপ, আমাতেও ওজঃ পূর্ণ করে দাও। তুমি মনুস্বরূপ (অর্থাৎ ক্রোধের স্বরূপ), আমাতেও মন পূর্ণ করে দাও। তুমি সহঃ (অর্থাৎ শত্রুকে অভিভূতকারী বলস্বরূপ), আমাতেও সহঃ পূর্ণ করো ৷
১০। যে বিষুচিকা ব্যাধিবিশেষ ব্যাঘ্র ও বৃক (নেকড়ে), দুজনকে রক্ষা করে, সেই-ই উড্ডীয়মান বাজপক্ষী ও সিংহকে রক্ষা করে। সেই বিষুচিকা (অর্থাৎ বিষুচিৎকার অধিষ্ঠাত্ দেবতা) ব্যাধিহেতু পাপ হতে এই যজমানকে রক্ষা করুক৷
১১। প্রসন্নতার সাথে স্তন্যপান করতে করতে যে আমি (পুত্র) আপন পদে মাতাকে প্রপীড়িত (পদাঘাত) করেছি, হে অগ্নি! এই আমি সেই ঋণ বা অপরাধ) হতে উত্তীর্ণ হলাম–আমার দ্বারা মাতা পিতা হিংসিত হলেন না। (আমি সন্তান উৎপাদনের দ্বারা মাতা-পিতার ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছি)। (যজমান কর্তৃক সমগ্ৰহকে স্পর্শ করণীয়)–হে সোমগ্রহ! তুমি স্বয়ংই সংযোজক। তুমি আমাকে কল্যাণের সাথে সঙ্গত করো। (সুরাহকে স্পর্শ করণীয়)–হে সুরাগ্রহ! তুমি স্বয়ং পৃথক্ অবস্থানকারী। তুমি আমাকে পাপ হতে পৃথক্ করো৷৷
১২। দেবগণ (সৌত্রামণি নামক) যজ্ঞ বিস্তারিত করেন; অশ্বিনযুগল বৈদ্যরূপে এই যজ্ঞকে ভৈষজ্য করেছিলেন; বাণীর দ্বারা সরস্বতীও এই যজ্ঞের বৈদ্য ছিলেন; যখন তারা ইন্দ্রের নিমিত্ত ইন্দ্রিয়বলকে প্রাপ্ত করাচ্ছিলেন।
১৪। মাসর আতিথ্যেষ্টির স্বরূপ অবগত হওয়া উচিত।নগ্নঃ মহাবীর ঘটের স্বরূপ। তিন রাত্রি পর্যন্ত অভিয়ুত সুরাকে যদি তিন রাত্রি পর্যন্ত গর্তে নত করে রাখা হয় তবে তা উপসদ্ সংজ্ঞক যজ্ঞের স্বরূপ৷
১৫। এক-দুই-তিন গাভীর দুগ্ধে যদি অভিমুত সুরা পরিসিঞ্চিত করা হয়, তবে তা সোমক্রয়ের স্বরূপ। অশ্বিন্দ্বয়ের নিমিত্ত একটি গাভীর দুগ্ধে প্রথম দিবস, সরস্বতীর নিমিত্ত দুটি গাভীর দুগ্ধে দ্বিতীয় দিবস, ও ইন্দ্রের নিমিত্ত তিনটি গাভীর দুগ্ধে তৃতীয় দিবস আসিঞ্চিত করা হয়।
১৬। সোমকে রক্ষণের (বা স্থাপনের) আসন্দী (মঞ্চ বা চৌকি) রাজার আসন্দীর স্বরূপ। সুরা-ধারণের কুম্ভ সৌমিকী বেদীর স্বরূপ। দুটি বেদীর মধ্যের ভাগ উত্তর বেদির স্বরূপ। সুরাকে পবিত্র করণশীল চালনী (অর্থাৎ ছাঁকনি)-কে ইন্দ্র ও যজমানের বৈদ্যরূপে জ্ঞাত হওয়া উচিত৷৷
১৭। বর্তমান বেদির দ্বারা সৌমিকী (সোমের বেদি) প্রাপ্ত হয়ে থাকে, বৰ্হির দ্বারা বহি (অর্থাৎ কুশ)-রূপ বল প্রাপ্তি হওয়া যায়; যুপ হতে ঘূপ প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং অগ্নির দ্বারা অগ্নি প্রণীত হয়ে থাকে৷
১৮। এই সৌত্রামণি যাগে অশ্বিন্দ্বয়ের সৎ-ভাবের দ্বারা হবিধান; সরস্বতীর উপস্থিতির দ্বারা আগ্নীব্র এবং ইন্দ্রের নিমিত্ত যে হবিঃ প্রদত্ত হয়, তা হতে গার্হপত্য পত্নীশালার সম্ভাবনা করা উচিত৷
১৯। প্রৈষ যজ্ঞের দ্বারা প্রৈষকে প্রাপ্ত হওয়া যায়, আগ্রী যজ্ঞের দ্বারা আপ্রীযজ্ঞকে; প্রজের দ্বারা প্রযাজকে, অনুযাজের দ্বারা অনুযাজকে, বষট্কারের দ্বারা বষট্কারকে তথা আহুতির দ্বারা আহুতিসমূহকে লাভ করা হয়।
২০। পশুর দ্বারা পশুসমূহকে; পুরোডাশের দ্বারা পুরোডাশসমূহকে; অন্য হবির দ্বারা অন্য হবিসমূহকে; ছন্দের দ্বারা ছন্দসমূহকে; সামিধেন্য বেদমন্ত্রের দ্বারা সামিধেনী বেদমন্ত্ৰসমূহকে; যাজ্যার দ্বারা যাজ্যাসমূহকে এবং বষট্কারের দ্বারা বষট্কারসমূহকে লাভ করা হয়।
২১। ধানাঃ (অর্থাৎ ভাজা ধান বা খৈ), জলের মন্থ (বা মাখন) ছাতু, হবিঃ বা ঘৃতধারা, দুগ্ধ ও দধি–এইগুলি সোমের প্রতিনিধিরূপে জ্ঞাত হওয়া উচিত। আমিক্ষা (ছানা), বাজিন (ছানার জল) এবং মধু–এইগুলি অন্য হবির স্বরূপ৷
২২। বড় বদরি (কুল) ভৃষ্ট ধান্যের (বা অন্নের) প্রতীক; গোধূম (গম) হবিষ্পংক্তির বা ঘৃতধারার রূপ; কোমল বদরী সঙ্কু বা ছাতুর প্রতিনিধি, তথা যব জলমন্থ বা মাখনের প্রতীক।
২৩৷ যব দুগ্ধের রূপ; স্থূল কুল দধির রূপ; ছানার জল সোমের রূপ এবং ছানা সৌম্যচরুর রূপ ॥
বিংশ অধ্যায়
শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ১
মন্ত্রঃ– ক্ষত্রস্য যোনিরসি ক্ষত্রস্য নাভিরসি। মা ত্বা হিংসী হিংসীঃ।১৷
নাভির্মে চিত্তং বিজ্ঞানং পায়ুর্মেপচিতির্ভসৎ। আনন্দনন্দাবাণ্ডেী মে ভগঃ সৌভাগ্যং পসঃ। জঞ্জভ্যাং পদভ্যাং ধর্মোহস্মি বিশি রাজা প্রতিষ্ঠিতঃ ৯৷৷
প্রতি ক্ষত্রে প্রতি তিষ্ঠামি রাষ্ট্রে প্রত্যশ্বেযু প্রতি তিষ্ঠামি গোষু। প্রত্যঙ্গেযু প্রতি তিষ্ঠাম্যাত্মন্ প্রতি প্রাণেষু প্রতি তিষ্ঠামি পুষ্টে প্রতি দ্যাপৃথিব্যোঃ প্রতি তিষ্ঠামি যজ্ঞে৷৷১০৷
মন্ত্ৰার্থঃ– (উত্তরবেদি এবং দক্ষিণবেদির মধ্যভাগে একটি উচ্চ মঞ্চ স্থাপনীয়)–হে আসন্দি! তুমি ক্ষত্রিয়ের যোনি। (উৎপত্তি স্থান) এবং ক্ষত্রিয়ের নাভি (নহনং বা বন্ধন) স্থান। (আসন্দীর উপর কৃষ্ণাজিন বিস্তীর্ণ করে)
১। হে কৃষ্ণাজিন! তোমাকে আসন্দী যেন হিংসিত না করে এবং তুমিও আসন্দীকে হিংসিত করো না।
২। ব্রতধারী এবং সুকর্মা রাজা বরুণ সাম্রাজ্যের নিমিত্ত প্রজাগণে স্থিত হয়েছেন। (আসন্দীর উপর উপবিষ্ট যজমানের পদের নিম্নে রৌপ্যের রুক্স (অর্থাৎ মণ্ডলাকার ভূষণবিশেষ) এবং মস্তকের উপরে স্বর্ণের রুক্স স্থাপনীয়) হে রুক্স! তুমি আমাকে অকালমরণ হতে রক্ষা করো। হে স্বর্ণরুক্স! তুমি আমাকে বিদ্যুৎ-পতন (বিদ্যুৎপাত) হতে রক্ষা করো।
৩। হে যজমান! সবিতাদেবের অনুজ্ঞায় বর্তমান, আমি অশ্বিন্দ্বয়ের বাহুযুগল এবং পূষার হস্তদ্বয়ের দ্বারা তোমাকে অভিসিঞ্চিত করছি। আমি তোমাকে অশ্বিদ্বয়ের বৈদ্যকর্মের কারণ তেজ এবং ব্রহ্মবৰ্চস্ প্রাপ্তির নিমিত্ত আসিঞ্চিত করছি। সরস্বতীর ভৈষজ্যের (ভিষজ ক্রিয়ার) দ্বারা তোমাতে বীর্য তথা অন্ন অন্নভোগের সামর্থ্যের নিমিত্ত আসিঞ্চিত করছি। তোমাতে ইন্দ্রের ইন্দ্রিয়বলের দ্বারা বল লাভের নিমিত্ত, শ্ৰী বা সমৃদ্ধির নিমিত্ত, তথা যশ, প্রাপ্তির নিমিত্ত আসিঞ্চিত করছি৷৷
৪। (অধ্বর্যু কর্তৃক যজমানকে স্পর্শ করণীয়)–হে যজমান! তুমি প্রজাপতিস্বরূপ। তুমি প্রজাপতিতম। প্রজাপতির পদের নিমিত্ত এবং প্রজাপতি হওয়ার নিমিত্ত আমি তোমাকে স্পর্শ করছি। (যজমান এই লোকগুলির নাম উচ্চারণ পূর্বক আহ্বান করছেন)–হে সুশ্লোক (অর্থাৎ শোভনকীর্তিশালী)! হে সুমঙ্গল (অর্থাৎ সুকল্যাণকারী)! হে সত্যরাজ (অর্থাৎ অনশ্বর রাজা)! তোমরা এইস্থানে আমার নিকটে আগত হও।
৫। (যজমান কর্তৃক নিজেকে ইন্দ্রস্বরূপ জ্ঞান করে বা সম্মানিত করে আপন অঙ্গকে স্পর্শ করণীয়)–আমার মস্তক শ্রীযুক্ত (অর্থাৎ শোভাবর্ধনকারী), আমার মুখ যশোযুক্ত (অর্থাৎ যশ বর্ধনকারী) হোক। আমার কেশ ও শ্মশ্রু (দাড়ি) দীপ্তিযুক্ত; হোক আমার প্রাণ (মুখবায়ু) অমৃতময় হোক; আমার চক্ষু সম্রাট (অর্থাৎ সম্যক্ বিরাজিত) হোক, এবং আমার শ্রোত্র বিরাট (বিবিধরূপে রাজমান) হোক।
৬। আমার জিহ্বা কল্যাণী হোক, আমার বাণী মহতী হোক, মন মন্পূর্ণ (ক্রোধফলদায়ী) হোক। আমার ভাব স্বরাট (স্বরাজ্যক্ষম) হোক। আমার অঙ্গুলিগুলি. মোদ (আনন্দস্বরূপ) ও অঙ্গ প্রমোদ (হর্ষযুক্ত) হোক। শত্রুকে অভিভূত করার বল (শক্তি) আমার মিত্র হোক।৷
৭। আমার বাহুতে ইন্দ্রের বল হোক, আমার হস্তদ্বয় বীরকর্মকারী হোক! আমার আত্ম ও হৃদয় ক্ষত্রিয় কর্মের দ্বারা ব্যাপ্ত হোক৷৷
৮। আমার পৃষ্ঠদেশ একদেশের (অর্থাৎ এক রাষ্ট্রের) ন্যায় সকলের আধার (আশুয়ভূত) হোক। আমার উদর, আমার স্কন্ধ, আমার গ্রীবা (ঘাড়), আমার কণ্ঠদেশ, আমার কটিদেশ (কোমর), আমার উরুদেশ, আমার অস্থি (হাড়), আমার মুষ্টিপ্রদেশ এবং আমার জানুদ্বয় সহ সমগ্র অঙ্গ প্রজার ন্যায় (পোষ্য) হোক।
৯। আমার নাভি জ্ঞানস্বরূপ হোক, আমার পায়ু বিজ্ঞানস্বরূপ হোক, আমার পত্নীর জননেন্দ্রিয় (যোনি) সুভগ (অর্থাৎ সুসন্তানপ্রদ) হোক, আমার অণ্ডকোষ আনন্দ নন্দ এবং ভগ-শিশ্ন সৌভাগ্যযুক্ত হোক। আমি আপন জঙঘাদ্বয় ও পদদ্বয়ের দ্বারা প্রজাগণের মধ্যে রাজা হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি৷৷
১০। আমি ক্ষত্রিয় জাতিতে, রাষ্ট্রে, অশ্বসমূহে, গো-সমূহে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, আত্মায়, প্রাণসমূহে, সমৃদ্ধিতে, দাবা পৃথিবীতে ও যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছি।
১১৷ সুধন সম্পন্ন দেবতা তিন, একাদশ ও ত্রয়োস্ত্রিংশ সংখ্যক। বৃহস্পতির পৌরোহিত্যশালী সেই দেবতাগণ সবিতাদেবের অনুজ্ঞায় বর্তমান আছে। দ্যোতমান সেই দেবতাগণ আমাকে দুঃখ হতে রক্ষা করুক।
১২। প্রথম দেবতা দ্বিতীয় দেবতার সাথে, দ্বিতীয় দেবতা তৃতীয় দেবের সাথে, তৃতীয় দেবতা সত্যের সাথে, সত্য যজ্ঞের সাথে, যজ্ঞ যজুর্মন্ত্রের সাথে, যজুঃ সামমন্ত্রের সাথে, সাম ঋমন্ত্রের সাথে, ঋক্সমূহ পুরোনুবাকার সাথে, পুরোনুবাক্যা যাজ্যার সাথে, যাজ্যা বষট্কারের সাথে, বষট্কার আহুতি সমূহের সাথে সঙ্গত হয়ে আমার বৃদ্ধি সাধিত করুক। আহুতিগুলি আমার মনোরথকে সমৃদ্ধ করুক। আমি ভূঃ হুতমিদং স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি৷৷
১৩। আমার রোমসমূহে প্রযত্ন আছে (অর্থাৎ যজমানের অসংখ্য রোমাবলীর মতো, সকলের প্রতি তার যত্নপরতা আছে)। আমার ত্বক আনতি (অর্থাৎ প্রাণীবর্গকে অবনমিত করে) ও আগতি (প্রাণীগণকে আগমন করায়)। আমার মাংস উপনতি (প্রাণীবর্গকে শরণাগত করে); আমার অস্থি ধনস্বরূপ এবং আমার মজ্জা আনতি। (লোকে এইগুলি দর্শন করে আমার সম্মুখে আকৃষ্ট হয়ে থাকে)।
১৪। হে দেবগণ! আমার যা কিছু দেবাপরাধ (দেবগণের প্রতি জ্ঞানে ও অজ্ঞানে পাপ) করেছি, অগ্নি সেই সমগ্র পাপ হতে আমাদের মুক্ত করুক।
১৫৷ যদি দিবা বা রাত্রে পাপ করে থাকি, তবে সেই সমগ্র পাপ হতে বায়ু আমাদের রক্ষা করুক।
১৬৷ যদি জাগরণে বা নিদ্রাকালে (স্বপ্নের মধ্যে) আমরা কোন পাপ করে থাকি, তবে সূর্য সেই সমস্ত পাপ হতে আমাদের মুক্ত করুক।
১৭। গ্রামে, অরণ্যে, সভায়, ইন্দ্রিয় বিষয়ে, শূদ্র ও বৈশ্যের বিষয়ে আমরা যে পাপ করেছি এবং পত্নী ও যজমানের মধ্যে একের ধর্ম বিষয়ে বিদ্যমান থেকে (অর্থাৎ প্রত্যেকের ধর্ম সম্বন্ধে) যে পাপ আমরা করেছি, হে ঘট (অর্থাৎ যজ্ঞে স্থাপিত কুম্ভ)! তুমি সেই সেই পাপকে নাশকারী হও।
১৮৷ যে জল, তা অহিংসনীয়। হে বরুণ! যদি আমরা অহিংস্য হয়েও (অর্থাৎ হিংসিত না হয়েও) আপন পাপবশতঃ অভিশপ্ত হয়ে থাকি, তবে তুমি সেই পাপ হতে আমাদের মুক্ত করো। হে অবভৃথ (প্রধান যজ্ঞের অঙ্গীভূত যজ্ঞ)! হে নিচুম্পূণ (যে নিম্নমুখ পাত্র নিঃশব্দে জলে পূর্ণ হয়ে যায়)! যদিও তুমি নিতান্ত গমনশীল, তথাপি এই সময় নিতান্ত মন্দগতি হও, কেননা আমার আপন ইন্দ্রিয়-লাম্পট্যে দেবগণের প্রাপ্য হবির্ভাগ প্রদানের ত্রুটিজনিত পাপসমূহ এবং আপন মনুষ্যের দ্বারা অন্য মনুষ্যের প্রতি কৃত পাপসমূহ আমাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। হে যজ্ঞদেব! সেই সেই পাপের ক্রোধ হতে তুমি আমাকে রক্ষা করো। অত্যন্ত বিপরীত ফলদায়ী সংসার-লক্ষণ বন্ধ হতেও তুমি আমাদের মুক্তি প্রদান করো।
১৯। সমুদ্রের অন্দরস্থিত জলে তোমার হৃদয় আছে। তোমাতে ওষধিসমূহ ও জল প্রবিষ্ট হোক। আমাদের নিমিত্ত জল ও ওষধিসমূহ সুমিত্র সদৃশ হোক। যারা আমাদের দ্বেষ করে এবং আমরাও যাদের দ্বেষ করি, তাদের নিমিত্ত জল ও ওষধিসমূহ দুষ্ট মিত্ৰসমান হোক। (অবভৃথ স্থান থেকে যজমান কর্তৃক উত্তর দিকে দুপদক্ষেপে অগ্রসর হয়ে হাতে জল গ্রহণ করে যে দিকে তার শত্রু আছে, সেই দিকে সেই জল নিক্ষেপণীয়)৷
২০। যেমন চলতে চলতে কাষ্ঠনির্মিত পাদুকা (খড়ম) ত্যাগ করলে পাদুকাসম্বন্ধী দোষ (বা কষ্ট) হতে ছাড় পাওয়া যায়, এবং স্বেদযুক্ত হয়ে স্নান করে মল (ময়লা) হতে শুদ্ধ হওয়া যায় এবং যে প্রকারে (কম্বলময়) পূত পবিত্রে আজ্য (ঘৃত)। শুদ্ধীকৃত হয়, সেই প্রকারে জল আমাকে পাপ হতে শুদ্ধ করে দিক৷
২১৷ উত্তম সূর্যের প্রকাশকে দর্শন করে আমরা অন্ধকারের পরপারে উত্তীর্ণ হয়েছি। দেবলোকে সর্বোত্তম জ্যোতি সূর্যকে (পরব্রহ্মকে) প্রাপ্ত হয়েছি।
২২। হে আবহনীয় অগ্নি! আজ আমি জলকে আচরণ করেছি (অর্থাৎ জলে স্নান করেছি)। আমি জলে সিক্ত হয়ে আছি। হে অগ্নি! আমি জলসিক্ত হয়েই তোমার নিকট আগমন করেছি। তোমার নিকট আগত আমাকে তুমি ব্রহ্মবৰ্চস, সন্তান ও ধনে সংযোজিত করো।
২৩। হে সমিধ (অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত যজ্ঞকাষ্ঠ)!তুমি দীপ্ত হও। তুমি ইন্ধনস্বরূপ। আমি তোমার প্রভাবে অভিবৃদ্ধি প্রাপ্ত হবো। হে সমিধ!তুমি সমিধা (অর্থাৎ তেজঃ)-রূপ। তুমি আমাতেও তেজঃ সঞ্চারিত করো। (ঘৃতাহুতি প্রদান)–পৃথিবী সম্যক আবর্তন করছে; উষা ও সূর্যও (সম্যক্ আবর্তন করছে) এই সম্পূর্ণ জগতও সমাবর্তনশীল। আমি বৈশ্বানর-জ্যোতি হবো। (অর্থাৎব্রহ্মরূপ প্রাপ্ত হবো)। আমি প্রভূত কামনাসমূহের সম্পূর্ণতা প্রাপ্ত হবো। ভূঃ স্বাহা মন্ত্রে (অর্থাৎ ভুবনমাত্রেরই সম্বন্ধিত স্বাহাযুক্ত মন্ত্রে) আমি ব্ৰহ্মকে এই আহুতি প্রদান করছি৷
২৪। হে ব্রতপালক আহবনীয় অগ্নি! আমি তোমাতে সমিধসমূহ প্রদান করছি। আমি তোমার, কৃপায় ব্রত ও শ্রদ্ধাকে লাভ করব। আমি তোমাকে প্রদীপ্ত করছি। সমিধ-আধানের দ্বারা এক্ষণে আমি দীক্ষিত হয়ে গিয়েছি৷৷
২৫৷ যে ব্রহ্মলোকে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় এক সাথে বিচরণশীল হয়ে থাকে এবং যে। স্থানে অগ্নির সাথে অন্য দেবতাও বিদ্যমান, আমি সেই পুণ্যের দ্বারা লব্ধ ব্রহ্মলোককে জ্ঞাত হবো–প্রাপ্ত হবো৷৷
২৬। যেস্থানে ইন্দ্র ও বায়ু সহচর হয়ে সঞ্চারণ (বা বিচরণ) করে থাকে এবং যে স্থানে কোন ক্ষুধার্ত নেই (অর্থাৎ অন্নাভাব নেই), আমি সেই পুণ্যলোককেই জানবপ্রাপ্ত হবো।
২৭। হে সুরা! সোমের অংশু (বা ভাগের) সাথে তোমার অংশু (বা ভাগ) সম্পৃক্ত হোক, এবং তোমার পর্বের (বা পরুষের) সাথে সোমের পর্ব সংযুক্ত হোক; তোমার গন্ধ আমাদের নিমিত্ত সোমকে আলিঙ্গিত করুক এবং তোমার অনাশমান্ (অচ্যুত ও অনশ্বর) রস সোমরসের সাথে সঙ্গত হোক৷
২৮। সোমরসকে সুরায় সিঞ্চিত, পরিসিঞ্চিত এবং উৎসিঞ্চিত করে তাকে পবিত্র করা হয়। পীতবর্ণা সুরার মদে মত্ত হয়ে ইন্দ্ৰ শত্ৰুগণকে কে তুই? তুই কারা? ইত্যাদি এইরকম তিরস্কার-বাক্য বলে থাকে৷৷
২৯। আমাদের যে পুরোডাশে ধান্যজাত করম্ভ (দধিমিশ্রিত শত্রু বা ছাতু), যবজাত শত্রু, অপুপ (পিষ্ট) ও উথবচনবন্ত (অর্থাৎ উথ মন্ত্র বর্তমান), হে ইন্দ্র! তুমি তা প্রাতঃকালে সেবন করো।
৩০। হে ঋত্বিকগণ! পুনঃ পুনঃ বৃত্রকে হননকারী ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে তোমরা সেই সামগান করো। যে সামের দ্বারা যজ্ঞের বৃদ্ধি সাধনশালী দেবগণ ইন্দ্রের নিমিত্ত জাগরণশীল জ্যোতিকে উৎপন্ন করেছিলেন।
একবিংশ অধ্যায়
শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ১
মন্ত্রঃ– ইমং মে বরুণ শ্রুধী হবদ্যা চ মৃডয়৷ স্বামবস্যুরা চকে৷1৷৷
মন্ত্ৰার্থঃ—১। হে বরুণ! আজ তুমি আমার এই আহ্বান শ্রবণ করো। আমাদের প্রসন্ন করো। রক্ষা কামনায় আমি তোমাকেই আহ্বান করতে থাকছি৷
২। আমি তোমাকে বেদমন্ত্রের দ্বারা বন্দনা পূর্বক আহ্বান করতে থাকছি। সেই হেন তোমার আগমনকে যজমান স্বয়ংই হবিসমূহের দ্বারা কামনা করছেন। হে বরুণ! ক্রোধ না করে তুমি আমাদের এই যজ্ঞস্থানে জ্ঞাত হও। হে অত্যন্ত প্রশংসিত! আমাদের আয়ুকে নষ্ট করো না।
৩। হে অগ্নি! তুমি পরম বিদ্বান। তুমিই বরুণদেবের ক্রোধকে দূর করো। অত্যন্ত যজন-কুশল, হবির বাহকতম (শ্রেষ্ঠ বাহক) এবং অত্যন্ত প্রজ্বাল্যমান হে অগ্নি! তুমিই আমাদের সমস্ত দ্বেষ্য পাপসমূহকে মুক্ত করো (ছাড়াও) বা দূর করো৷
৪। হে অগ্নি! আজ এই উষার উদয়-মুহূর্ত (ব্যষ্টিকালে) আপন রক্ষার সাথে তুমিই আমাদের রক্ষক এবং নিকটস্থতম হও। হে অগ্নি! প্রভূত পরিমিত ঘৃতকে আহুত করে বরুণকে যাজিত (যজন) করো। সেই সুখয়িতা বরুণকে জঠর পূর্ণ করে খাদ্য প্রদান করো (ভক্ষণ করাও)। সুষ্ঠু আহ্বানীয় তুমি নিজেও সমিধ ইত্যাদির দ্বারা অভিবৃদ্ধি প্রাপ্ত হও।
৫। মহতী, শুভ কর্মসমূহের জনয়িত্রী, যজ্ঞের পালিকা, প্রভূত রক্ষণশালিনী, জরাহীন, প্রভূতগমনা, শুভ আশ্রয়স্বরূপা বা সুখশালিনী এবং শুভ-নীতিসম্পন্না বা সেবনীয়া অদিতিকে আজ আমি আপন রক্ষার নিমিত্ত আহ্বান করছি৷৷
৬। সুষ্ঠু ত্রাণশীলা, বিস্তারবতী, প্রভাযুক্তা, নিষ্পপা, সুষ্ঠু আশ্রয়বতী, অদিতিরূপা, শুভ নীতিশালিনী, শুভ অরিত্র অর্থাৎ হালস্বরূপা, পাপরহিতা, ছিদ্ররহিতা দেব সম্বন্ধিনী এই যজ্ঞরূপা তরণীতে আপন কল্যাণের নিমিত্ত আমরা আশ্রয়ণ করছি (আরোহণ করছি)৷
৭। অছিদ্রা, অপাপা এবং শত দাঁড় (অরিত্র) শালিনী এই যজ্ঞরূপা সুনৌকার উপরে আপন কল্যাণের নিমিত্ত আরূঢ় হচ্ছি।
৮। হে মিত্র ও বরুণ! তোমরা আমার পথকে ঘৃত ও দুগ্ধে সিক্ত করে দাও। হে শুভ কর্ম! আমার সকল ভুবন মধুতে সিক্ত করো।
৯। হে মিত্র ও বরুণ! আমাদের জীবনের নিমিত্ত আপন দীর্ঘ দীর্ঘ বাহুগুলি প্রসারিত করো এবং আমাদের ক্ষেত্র ইত্যাদিকে ঘৃতস্বরূপ বর্ষাজলে আসিঞ্চিত করো। হে মিত্র ও বরুণ! তোমরা দুজন আমার আহ্বান শ্রবণ করো।
১০। দেবরক্ষক যজ্ঞে অপরিমিতগমন, স্বর্গীয়, সর্প-বৃক-রাক্ষসগণকে চর্বণকারী তথা ব্যাধিসমূহকে সমূলে আমাদের নিকট হতে দূরীকৃতকারী অশ্বগণ আমাদের নিমিত্ত সুখকারী হোক।
১১। হে অশ্বগণ! অন্ন ও অন্নের প্রাপ্তির যুদ্ধে আমাদের রক্ষা করো। ধনের নিমিত্ত যুদ্ধেও আমাদের রক্ষা করো। তোমরা বুদ্ধিমান্, অজয়-অমর এবং সত্যকে জ্ঞাতশীল। তোমরা এই মধুর অংশকে পান করো, এবং পান করে মদমত্ত হও। শেষে পরিতৃপ্ত হয়ে দেব্যান পথে স্বর্গে গমন ৬ করো।
১২। অগ্নি প্রদীপ্ত হেয়েছে; বরণীয় সেই সমিধসমূহে পূর্ণভাবে প্রদীপ্ত হয়েছে। গায়ত্রী ছন্দ ও ত্র্যবি (অর্থাৎ দেড় বৎসরের) গাভী ইন্দ্ৰে বল ও আয়ু ধারিত (স্থাপিত) করেছে।
১৩। পবিত্রকর্ম তন্নপাৎ (জলের পৌত্র) অগ্নি, শরীরকে পবিত্ৰকারিণী সরস্বতী, উষ্ণি ছন্দ এবং দিব্য হবিঃকে বহনকারিণী গাভী–ইন্দ্ৰে বল ও আয়ু ধারিত (স্থাপিত) করেছে।
১৪। প্রযাজদেববৃন্দের সাথে স্তুত অগ্নি, অমরণধর্মা ও দ্যোতমান সোম, অনুষ্টুপ ছন্দ এবং আড়াই বৎসর (পঞ্চাবি অর্থাৎ সার্ধদ্বিবর্ষ) বয়স্কা গাভী ইন্দ্রে বল ও আয়ুধারিত (স্থাপিত) করেছে৷
১৫। পূষার সাথে শুভ দৰ্ভাসন প্রাপ্ত অগ্নি, মর্ত্যভিন্ন স্তীর্ণবহি (প্রজাজদেবতা), বৃহতী ছন্দ এবং ত্রিবৎস্য (ত্রিবর্ষিকা অর্থাৎ তিন বৎসর) বয়স্কা গাভী ইন্দ্রে বল ও আয়ু ধারিত (স্থাপিত) করেছে।
১৮। দিব্য হোতা, বৈদ্য, ইন্দ্রে সংযুক্ত ও পরস্পরেও সংযুক্ত অগ্নি ও বায়ু, জগতী ছন্দ এবং পূর্ণবয়স্ক (শকটবাহী) বলদ–ইন্দ্রে বল ও আয়ু ধারিত (স্থাপিত) করেছে৷৷
১৯। ইড়া, সরস্বতী ও ভারতী নাম্নী তিন দেবী, ইন্দ্রের প্রজাবর্গ মরুৎ-গণ, বিরাট ছন্দ এবং দুগ্ধবতী ধেনু-ইন্দ্রে বল ও আয়ু ধারিত (স্থাপিত) করেছে।
২০। ক্ষিপ্ৰব্যাপী ও অদ্ভুত ত্বষ্টা, পুষ্টিকে বর্ধনশীল ইন্দ্র ও অগ্নি, দ্বিপদা ছন্দ ও সেচনসমর্থ বৃষ (উক্ষা)–ইন্দ্রে বল ও আয়ু ধারিত (স্থাপিত) করেছে৷৷
২১। সুখ দানশীল বনস্পতি (প্রযাজদেবতা), ধন উৎপাদনশীল সবিতা, ককু ছন্দ, বন্ধ্যা গো ও গর্ভপাতিনী গাভী–ইন্দ্রে বল ও আয়ু ধারিত (স্থাপিত) করেছে।
২২। সুষ্ঠু রক্ষক বরুণ ইন্দ্রে নির্মিত যজ্ঞকর্মের যোগ্য ভেষজ প্রদান করেছে। স্বাহা আকৃতির প্রজদেবতা, অতিছন্দা ছন্দ ও বৃহৎ ঋষভ-ইন্দ্রে বল ও আয়ু ধারিত (স্থাপিত) করেছে।
২৩। বসন্ত বায়ু, ত্রিবৃৎ স্তোন ও রথম্ভরপৃষ্ঠ (সামের) দ্বারা সংস্তুত বসুদেবগণ তেজের সাথে ইন্দ্রের নিমিত্ত বপারূপ হবিঃ, শক্তি ও আয়ুকে ধারিত করেছে৷৷
২৪। গ্রীষ্ম ঋতুর সাথে পঞ্চদশস্তোম ও বৃহৎপৃষ্ঠ (সামের) দ্বারা সংস্তুত রুদ্রদেবগণ যজ্ঞের সাথে হবিঃ, বল ও আয়ু ইন্দ্রে ধারিত (স্থাপিত) করেছে।
২৫। বর্ষা ঋতু, সপ্তদশস্তোম এবং বৈরূপপৃষ্ঠ (সামের) দ্বারা সংস্তুত আদিত্যদেবগণ ওজের সাথে হবিঃ বল ও আয়ু ইন্দ্রে ধারিত (স্থাপিত) করেছে৷৷
২৬। শরৎ-ঋতু, একবিংশস্তোম, শ্রী ও বৈরাজপৃষ্ঠ (সামের) দ্বারা সংস্তুত ঋভুদেবগণ শ্ৰীয়ের সাথে হবিঃ শক্তি এবং আয়ু ইন্দ্রে ধারিত (স্থাপিত) করেছে৷৷
২৭। হেমন্ত-ঋতু, ত্রিণ (অর্থাৎ সপ্তবিংশ) স্তোম এবং শাক্করপৃষ্ঠ (সামের) দ্বারা সংস্তুত হয়ে মরুৎবর্গ ইন্দ্রে বলের সাথে হবিঃ, ইন্দ্রিয়সামর্থ্য এবং আয়ুকে ধারিত (স্থাপিত) করেছে৷৷
২৮। শিশির ঋতু ত্রয়স্ত্রিংশস্তোম তথা রৈবতপৃষ্ঠ (সামের) দ্বারা সংস্তুত অমরাধর্মা দেবগণ ইন্দ্রে সত্যের সাথে ক্ষত্র, হবিঃ, শক্তি ও আয়ু স্থাপিত করেছে।
২৯। গাভীর পদে বা পদচিহ্নে আহবনীয়াগ্নিতে দৈবী হোতা অগ্নি; অশ্বিনদ্বয়, সরস্বতী ও ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে সমিধসমূহের দ্বারা যজন করুক। সেই যজ্ঞে অজ, ধূম্র (অর্থাৎ কৃষ্ণলোহিত বর্ণযুক্ত) মেষ, মধু, গোধূম (গম) কুল ও যবাঙ্কুর–এই সকল ভেষজ প্রস্তুত হয়। তেজঃ, বল, দুগ্ধ, সোমরস, সুরা ও মধু ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণের প্রাপ্ত হোক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো।
৩০। দৈবী হোতা তন্নপাৎ (প্রজাজদেব) অগ্নি; অশ্বিনদ্বয়, সরস্বতী ও ইন্দ্রের যজন করুক। সেই মধুময় যজ্ঞপথে ভেড়ী, মেষ, কুল, যব ও যবাঙ্কুর, ইত্যাদির দ্বারা প্রস্তুত হয়। দুগ্ধ, সোম, সুরা, ঘৃত ও মধু ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণে ব্যাপ্ত হোক। হে মানব হোতা! তুমি ঘৃতের দ্বারা যজন করো।
বিশ্বে দেবস্য নেতুৰ্মৰ্তো বুরীত সখ্য। বিশ্বে রায় ইষুধ্যতি দ্যুম্নংবৃণতি পুষ্যসে স্বাহা।।২১৷
[কাণ্ড-৩৪, মন্ত্র-২৬৭]
মন্ত্ৰাৰ্থঃ– (এই অধ্যায় থেকে পঞ্চবিংশ অধ্যায় পর্যন্ত অশ্বমেধ যজ্ঞের বর্ণনা বিধৃত হয়েছে। এই যজ্ঞ শুক্ল অষ্টমীর প্রারম্ভক। সর্বপ্রথম অধ্বর্যু একটি চার সুবর্ণ (মোহর) নির্মিত নিষ্ক (অর্থাৎ কণ্ঠভূষণ-বিশেষ) যজমানের গলে পরিয়ে দেন)
১। হে নিষ্ক! তুমি তেজঃস্বরূপ। তুমি শুদ্ধ স্বরূপ, তুমি অমৃতস্বরূপ এবং তুমি আয়ুকে রক্ষাকারী। তুমি আমার আয়ুকে রক্ষা করো। (অশ্বকে বন্ধনের নিমিত্ত হস্তে রঞ্জু গ্রহণীয়)-হে রঞ্জু! সবিতাদেবের অনুজ্ঞায় বর্তমান আমি অশ্বিনযুগলের বাহুসমূহ এবং পুষা দেবতার হস্তদ্বয়ের দ্বারা তোমাকে গ্রহণ করছি৷৷
২। যজ্ঞের আয়ুতে, যজ্ঞসমূহে পূর্বকালেও এই রঞ্জুকে বিদ্বানগণ গ্রহণ করেছিল। যজ্ঞের প্রারম্ভে সোমকে অভিযুত করার পর, যজ্ঞের বিস্তার হোক–এই কথা যে বলেছিল, সেই রঞ্জু আজ আমাদের দ্বারাও গৃহীত হয়েছে।
৩। (ওকে বন্ধন করো এই রকমে ব্রহ্মার দ্বারা আদিষ্ট হয়ে অধ্বর্যু সেই রজ্জুতে অশ্বকে বন্ধন করে থাকে)–হে অশ্ব! তুমি স্তুতিযোগ্য নামশালী; তুমি সকলের আশ্রয়; তুমি সকলের নিয়ন্ত্রণকর্তা এবং ধারণকর্তা। এই হেন তুমি স্বাহাকৃত হয়ে সকলের হিতকরী ও বিস্তার প্রাপ্তশীল অগ্নিকে প্রাপ্ত হও।
৪। হে অশ্ব! তুমি দেবগণ তথা প্রজাপতির নিমিত্ত স্বয়ং প্রাপ্তশালী হয়ে থাকো। (অধ্বর্যু বলবে–) হে ব্রহ্মা! আমি দেবতাগণ ও প্রজাপতির নিমিত্ত অশ্বকে বন্ধন করব; আমি সেই দেবগণকে আপন অনুকূল করে তুলব। (ব্রহ্মা বলবে–) হে অধ্বর্যু! তুমি তাকে (অর্থাৎ সেই অশ্বকে) দেবগণ ও প্রজাপতির নিমিত্ত বন্ধন করো। তাতে তুমি ওকে সিদ্ধিলাভ করাবে (অথবা, এর দ্বারা তুমি সিদ্ধিপ্রাপ্ত হবে)।
৫। (তড়াগ ইত্যাদির জলে অশ্বকে পোষণ করণীয়)–হে অশ্ব! প্রজাপতির নিমিত্ত প্রিয় তোমাকে আমি প্রেক্ষিত করছি। জলে উৎসক্তি করে তোমাকে পবিত্র করছি। বায়ুর নিমিত্ত প্রিয় তোমাকে প্রেক্ষিত করছি। ইন্দ্র ও অগ্নির নিমিত্ত প্রিয় তোমাকে প্রেক্ষিত করছি। বিশ্বদেবগণের নিমিত্ত প্রিয় তোমাকে প্রেক্ষিত করছি। সকল দেবতার নিমিত্ত প্রিয় তোমাকে পোক্ষিত করছি। (শূদ্র হতে বৈশ্যায় উৎপন্ন পুরুষের দ্বারা খদির কাষ্ঠের মূষলে চারি চক্ষু বিশিষ্ট কুকুরকে হত্যা করে অধ্বর্যু এই যজুঃ–যো অবন্তং জিঘাংসতি তমভ্যমীতি বরুণঃ–যজমানকে বলাবে)।যে এই অশ্বকে হত্যা করতে ইচ্ছা করে, তাকে বরুণই হিংসা করুক।(সেই মৃত কুকুরকে বেত্রে বা বাঁশের চটাইয়ের উপরে ধরে অশ্বের নিম্নে জলে নিক্ষেপনীয়)। অশ্বকে হত্যায় ইচ্ছাশীল মনুষ্য দূর হয়েছে কুকুর দূর হয়েছে।
৬। (স্তোকীয় সংজ্ঞকা আহুতি)–অগ্নির নিমিত্ত এই আহুতি; সোমের নিমিত্ত স্বাহা; জলের বক্ষের নিমিত্ত এই আহুতি; সবিতার নিমিত্ত স্বাহা; বায়ুর নিমিত্ত স্বাহা; বিষ্ণুর নিমিত্ত স্বাহা; ইন্দ্রের নিমিত্ত স্বাহা; বৃহস্পতির নিমিত্ত স্বাহা; মিত্রের নিমিত্ত স্বাহা; বরুণের নিমিত্ত স্বাহা এই স্বাহা মন্ত্রে সকলের উদ্দেশ্যে এই অশ্ব অর্পণ করছি।
৭। (প্রক্রম সংজ্ঞকা আহুতি)–অশ্বের হিংকার, হিংকৃত, ক্রন্দন, অবক্ৰন্দন, প্রোথ, প্রপোথ, গন্ধ, ঘ্রাত, নিবিষ্ট, উপবিষ্ট, সন্দিত, বঙ্গন, আসীন, শয়ান, সুপ্ত জাগ্রত, কূজনরত, প্রবুদ্ধ, বিম্ভনতা অর্থাৎ হাই গ্রহণশীলতা, উদ্দীপ্ত, সংহৃত শরীর, উপস্থিত, চলিত ও প্রচলিত এই সকলের নিমিত্ত এই আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে৷
৮৷ গতি প্রাপ্ত, ধাবিত, বেগবান শীঘ্রগতি, শূ করণশীল, শুকৃত, উপবেশন, উত্থিত, বেগ, বল, বিবর্তমান, বিবৃত্ত, শরীর দোলন, কম্পিতগাত্র, সেবিত, শ্রবণশীলতা, দর্শনশীলতা, বিশেষ ভাবে দেখে যাওয়া, পলকপতনশীলতা, যা কিছু সে পান করে, যতটুকু সে প্রস্রাব করে, সেগুলির নিমিত্ত, কর্মকারী ও কৃতকর্ম অশ্বের নিমিত্ত এই আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে৷
৯। বরণীয় সবিতাদেবের সেই পাপাবিনাশকারী তেজকে ধারণ (ধ্যান) করি, যে আমাদের বুদ্ধিকে সৎকর্মে প্রেরিত করে।
১০৷ রক্ষার নিমিত্ত আমি হিরন্ময় সবিতাকে আহ্বান করছি। সেই বিজ্ঞানী দেবতাই স্বর্গ ইত্যাদি উত্তম পদকে জ্ঞাতশীল৷
১১৷ সব কিছু জ্ঞাতশীল সবিতাদেবের মহতী ও সত্যসাধিনী সুমতিকে আমরা যাচনা করি৷৷
১২৷ সুমতিকে বর্ধনশীল এবং সকলের মতিকে জ্ঞাতশীল সবিতাদেবের সংস্তুতি করে আমরা তার দানকে যাচনা করি।
১৩। দেবগণের তর্পণের নিমিত্ত শ্রেষ্ঠের পালক ও শুভ কর্মসমূহে প্রেরণা দানশীল সবিতা দেবের দানকে আমরা যাচনা করছি।
১৪। সকল দেবতার তর্পণের নিমিত্ত প্রেরক সবিতাদেবকে ঐশ্বর্যের নিমিত্ত যাচনা আমরা স্ববুদ্ধির (অর্থাৎ স্তুতির) দ্বারা করছি৷৷
১৫। হে অধ্বর্যু! সমিদ্ধ করে তুমি অমর অগ্নিকে প্রবোধিত করো। প্রবুদ্ধ হয়ে অগ্নি আমাদের হবিঃসমূহকে দেবগণের মধ্যে বহন করে নিয়ে গিয়ে ধারণ করুক (অর্পণ করুক)।
১৬৷ হবিঃ বহনকারী, মরণরহিত, কাম্য বা কামিতা, দূত এবং হবিরান্নকে গ্রহণের নিমিত্ত স্থাপিত এই অগ্নি স্তুতির দ্বারা দেবতাগণের সাথে সম্মত হচ্ছে৷৷
১৭। হৃত অগ্নিকে আপন সম্মুখে স্থাপিত করছি এবং সেই হবিবাহককে আমি বলছি যে, সে এইস্থানে যজ্ঞে দেবতাগণকে নিয়ে এসে স্থাপন করুক৷
১৮৷ হে পবিত্রকারী সোম! তুমি আপন শক্তিতে সূর্যকে প্রকট করেছ। তুমি ধারার বেগে গতিসম্পন্ন হয়ে গাভী প্রভৃতি পশুদের জীবনের নিমিত্ত বর্ষার জলকে ধারণ করছ–বর্ষণ করছ।
১৯। হে অশ্ব!তুমি মাতা পৃথিবীর সম্পর্কে এত সমর্থ হয়েছ এবং পিতা দ্যুলোকের সাথে সম্পর্কের দ্বারাই এত প্রভূতাবান্ হয়েছ। তুমি অশ্ব-হয়-অত্য-ময়-অর্বা সপ্তি-বাজী-বৃষা-নৃমনা এইরকম নামে শংসনীয় হয়েছে; তুমি যজমানে বিলগ্ন মনঃসম্পন্ন এবং যযু, শিশু নামশালী হয়েছ। তুমি দেবমার্গকে প্রাপ্ত হও। হে আশাপাল দেবগণ (রক্ষক ক্ষত্রিয় কুমারগণ)! দেবগণের নিমিত্ত জলের দ্বারা পবিত্ৰীকৃত এই অশ্বকে সর্বথা রক্ষা করো। হে অশ্ব! এই স্থান তোমার রমণস্থলী। তুমি এইস্থানে রমণ করো। এইস্থানে তোমার স্থিতিস্থলী। তুমি এইস্থানে অবস্থান করো। এই স্থলে তুমি সন্তোষ প্রাপ্ত হও৷
২০। প্রজাপতির নিমিত্ত এই আহুতি। প্রজাপতি প্রজাপতিতমের নিমিত্ত স্বাহা। আধানকৃতের নিমিত্ত স্বাহা। মনে বর্তমান প্রজাপতির নিমিত্ত স্বাহা। চিত্তকে জ্ঞাতশীল আদিত্যের নিমিত্ত স্বাহা। মহতী-সুখদা অদিতির নিমিত্ত স্বাহা। মহতী ও পবিত্র কত্রী সরস্বতীর নিমিত্ত স্বাহা। পথে প্রাপ্ত এবং আপন উদয়ের দ্বারা মনুষ্যগণকে শব্দিত (আহূত) করণশীল পূষার নিমিত্ত স্বাহা। তীব্রগতি ও বহুরূপধারী ত্বদেবের নিমিত্ত স্বাহা। মৎস্য ইত্যাদি অবতারধারী হয়ে রক্ষাকরণশালী এবং অন্তর্যামিরূপে প্রাণীগণের মধ্যে প্রবিষ্ট সর্বব্যাপক দেবতা (বিষ্ণুর) নিমিত্ত এই আহুতি সমর্পিত করছি। (এটি ঔগ্রভণ মন্ত্র)।
২১। সকল মনুষ্য নেতা সবিতা দেবের মিত্রতা বরণ করে। সকলেই ধন প্রার্থনা করে। সন্তান ইত্যাদির পোষণের নিমিত্ত সকলে দ্যোতমান অন্ন ইত্যাদি যাচনা করে। সেই সবিতাদেবের উদ্দেশ্যে এই আহুতি সমর্পণ করছি।
মন্ত্রার্থঃ– (দ্বাবিংশ অধ্যায়ে হোমমন্ত্র কথিত হয়েছিল। এই ত্রয়োবিংশ অধ্যায়ে শিষ্ট কর্মসমূহ কথিত হচ্ছে)
১। সৃষ্টির আদিকালে একমাত্র হিরণ্যগর্ভ পুরুষই বিদ্যমান ছিলেন। তিনি একলাই সকল উৎপন্নমাত্র প্রাণীজাতের অধিপতি বা পালক ছিলেন। তিনিই এই পৃথিবী এবং দ্যুলোককেও ধারণ করেছিলেন। সেই প্রজাপতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাভক্তি সহ পরিচারিত করে।
২। (মহিম নামক গ্রহ গ্রহণীয়)–হে গ্রহ তুমি উপযাম পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। প্রজাপতির নিমিত্ত প্রিয় তোমাকে গ্রহণ করেছি। (গ্রহটিকে বেদিতে স্থাপনীয়)–এই তোমার স্থান। হে গ্রহ! এই সূর্য তোমার মহিমা। তোমার যে মহিমা দিনে ও সম্বৎসরে উৎপন্ন হয়েছে; তোমার যে মহিমা বায়ুতে ও অন্তরিক্ষে উৎপন্ন হয়েছে এবং তোমার যে মহিমা দুলোকে ও সূর্যে উৎপন্ন হয়েছে তোমার সেই মহিমার নিমিত্ত, প্রজাপতি এবং অন্য দেবতাগণের নিমিত্ত এই আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে।
৩। যে প্রজাপতি আপন মহিমার কারণে জগতের প্রাণন-নিমেষোষে করণশালীর পালক হয়েছেন এবং যিনি এই সমস্ত দ্বিপাদ-চতুষ্পদরূপী ঐশ্বর্যের পালক, সেই প্রজাপতি দেবের নিমিত্ত আমরা ধন-ধান্য ইত্যাদির দ্বারা সদা যজ্ঞ ইত্যাদি করে থাকি।
৪। হে পাত্র! তুমি উপযাম পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। প্রজাপতির নিমিত্ত প্রিয় তোমাকে আমি গ্রহণ করছি। হে গ্রহ! এই (বেদি) তোমার স্থান। এই চন্দ্রমা তোমার মহিমা। তোমার যে মহিমা রাত্রি ও সম্বৎসরে উৎপন্ন হয়েছে, তোমার যে মহিমা পৃথিবী ও অগ্নিতে উৎপন্ন এবং তোমার যে মহিমানক্ষত্র ও চন্দ্রমায় উৎপন্ন হয়েছে, সেই তোমার দ্বারা মহিমাবান্ প্রজাপতি এবং অন্য দেবগণের উদ্দেশ্যে এই আহুতি প্রদান করছি৷৷
৫। এই স্থির জগতের উপর রক্তাভ, আপন ক্রোড়ের উপর নিদ্রাশীল এবং আকাশচারী সূর্যকে ঋত্বিকগণ আপন স্তুতিসমূহে স্বকার্যরত করছে। তার জ্যোতিতে দ্যুলোকে এই রোচমান গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি প্রকাশিত হচ্ছে।
৬। ঋত্বিবৃন্দ আপন স্তুতিসমূহের দ্বারা এই সূর্যের কমনীয় রথের দুটি প্রান্ত সংযুক্তকারী; শ্বেত বর্ণ, শত্রুধর্ষক এবং নেতা সূর্যকে বহন করতে সমর্থ অশ্বকে রথে সংযোজিত করছে।
৭। (যজমান বলছেন)–হে অধ্বযুর্গগণ! এই যে আমার বায়ুবেগশীলা অশ্ব জলে ইন্দ্রের প্রিয় শরীরে দূর পর্যন্ত চলে এসেছে, আমার এই অশ্বকে পুনরায় সেই পথে নিবর্তিত করা।
৮। হে অশ্ব! বসুগণ তোমাকে গায়ত্রী ছন্দে শিরোভাগে ধৃতরঞ্জিত করুক। হে অশ্ব! রুদ্রগণ তোমাকে ত্রিষ্টুপ ছন্দে মধ্যভাগে ধৃতরঞ্জিত করুক, এবং হে অশ্ব! আদিত্যগণ জগতী ছন্দে তোমাকে পিছনভাগে ঘৃতের দ্বারা রঞ্জিত করুক। ভূ-ভুবঃ স্বঃ। খই, সতুসমূহ, যব এবং এই দধি প্রভৃতি হে অশ্ব! ভক্ষণ করো। হে প্রজাপতি! হে দেবগণ! এই ভুক্তশেষ অন্নকে ভক্ষণ করো।
৯। (ঋত্বিকদ্বয় ব্রহ্মা ও হোতর পরস্পর ব্রহ্মবার্তা আলোচনা) ব্রহ্মা–হে হোতা! কে একাকী ভ্রমণ করে? কে বিনষ্ট হয়েও পুনরায় উৎপন্ন হয়? হিম অর্থাৎ শীতের নিবর্তক কি? মহৎ আবপন কি?
১০। হেতা–হে ব্ৰহ্ম! সূর্য একলাই আকাশে সঞ্চারণ করে। চন্দ্রমা পুনঃ উৎপন্ন হয়। শীতের ভোজন (নিবর্তন) হলো অগ্নি এবং এই ভূমিই মহৎ আবপন (অর্থাৎ এই ভূমিতেই বীজ পুনঃ পুনঃ বপিত হয়)।
১১। হে হোতা! পূর্বচিত্তি (বা পূর্বচিন্তা) কি ছিল? বৃহৎ পক্ষী কে ছিল? পিলিগ্নিলা (চিক্কণা) কি ছিল? পিশঙ্গিলা (রূপকে গলাধঃকারিণী) কে ছিল? কে ছিল?
১২৷ হে ব্ৰহ্মণ! এই দৌ (অর্থাৎ বৃষ্টি)-ই পূর্বচিত্তি ছিল। অশ্বই ছিল বৃহৎ পক্ষী। এই পৃথিবীই পিলিপ্পিলা ছিল। রাত্রিতে সকল বর্ণ বা রূপ অন্তর্হিত হওয়ার কারণে রাত্রিই পিলিগ্নিলা।
১৩। হে অশ্ব! বায়ু তোমাকে পাক (বা রন্ধন)-এর দ্বারা রক্ষা করুক। ধূমের দ্বারা কৃষ্ণবর্ণ গ্রীবাশালী অগ্নি তোমাকে ছাগের দ্বারা (অর্থাৎ ছাগদানের দ্বারা) রক্ষা করুক। বটবৃক্ষ সোমপাত্রের দ্বারা এবং শাল্মলি বৃক্ষ বৃদ্ধির দ্বারা তোমাকে রক্ষা করুক। এই রথে যোজনযোগ্য সেচক তুমি (অর্থাৎ অশ্ব) চার পদে ভর করে গমন করছ। অকৃষ্ণব্রহ্মা (অর্থাৎ চন্দ্রমা) আমাদের রক্ষা করুক। অগ্নির উদ্দেশ্যে নমস্কার করছি৷৷
১৪। রথ লাগামে (অর্থাৎ আকর্ষক রজ্জতে) শোভিত হয়। লাগামে অশ্ব শাভিত হয়। জলে উৎপন্ন অশ্ব জলেই শোভিত হয়। ব্ৰহ্ম অর্থাৎ পরিবৃঢ় অশ্বমেধ সোমকে পুরোভাগে নিয়ে স্বর্গে গমনশীল হয়েছে।
১৫। হে অশ্বমেধিয় অশ্ব! তুমি স্বয়ংই স্বেচ্ছামতো শরীরকে কল্পনা করো (অর্থাৎ যে কোনও রকম শরীরকে ধারণ করতে পার)। স্বেচ্ছায় তুমি স্বয়ংই দেবগণের যজন করো এবং অভীষ্ট পদার্থসমূহকে সেবন করো। অন্য কিছুর দ্বারাই তোমার মহিমা লাভ করতে পারা যায় না।
১৬। হে অশ্ব! এই যে তুমি আমাদের দ্বারা কর্তিত হতে যাচ্ছ, সেই তোমার মরণ হবে না এবং নষ্ট হবে না। এক্ষণে তো তুমি সুগম দেবযান পথে দেবগণের প্রাপ্ত হবে। যে স্থানে পুণ্যবাঙ্গণ নিবাস করেন এবং যে স্থানে তারা (পুণ্যবাগণ) গমন করেন, সেই স্থানে তোমাকে সবিতাদেব ধারণ (স্থাপন) করুক।
১৭। পূর্বকালে স্বয়ং অগ্নিই পশু ছিল। দেবগণ সেই পশুরূপ অগ্নির দ্বারা যজ্ঞ করতেন। সেই পশুরূপ অগ্নি এই পৃঙ্খীলোক জয় করেছিল, যে লোকে স্বয়ং অগ্নি অধিপতি দেবতা। হে অশ্ব! যজ্ঞে নিহত হবার পর এই পৃঙ্খীলোক তোমার লোক হবে। তুমি সেই পৃঙ্খীলোককেই বিজয়। করবে। তুমি এই লোক্ষণী জল পান করো। (অশ্বের মুখে পোক্ষণী জল নিক্ষেপনীয়)। বায়ু পশু ছিল। দেবতাগণ তার দ্বারাই যজন করেছিল। সেই পশুরূপ বায়ু অন্তরিক্ষলোককে বিজয় করেছিল। যার অধিপতি দেবতা বায়ুই। হে অশ্ব! যজ্ঞে মরণপ্রাপ্তির পর এই অন্তরিক্ষলোকই তোমার লোক হবে। তুমি তাকেই বিজয় করবে। এই প্রোক্ষণী জল পান করো… সূর্য পশু ছিল। দেবতাগণ তার দ্বারাই যজন করেছিল। সেই পশুরূপ সূর্য দ্যুলোককে জয় করেছিল, যার অধিপতি দেবতা সূর্যই। হে অশ্ব!তুমি যজ্ঞে হত হবার পর সেই দ্যুলোকই তোমার লোক হবে। তুমি সেই লোককে বিজয় করবে। তুমি এই প্রোক্ষণী জল পান করো।….॥
১৮৷ প্রাণ, অপান ও ব্যানের উদ্দেশ্যে এই অ্যাতি প্রদান করছি। (মহিষী, বেশ্যা ও রাজরক্ষিতা কর্তৃক অশ্বের নিকট গমনীয়)–হে অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকা (সবই মাতৃরূপে সম্বোধন)! কোনও পুরুষ আমাকে অশ্বের নিকট শীঘ্র উপস্থাপিত করতে পারেনা। (আমার শীঘ্র না পৌঁছাবার কারণ এই যে,) এই দুষ্ট অশ্ব সেই কাম্পীলবাসিনী সুভদ্রিকাকে নিয়ে শায়িত রয়েছে। (কাম্পীল নামক নগরে সুভগা, সুরূপা, বিদগ্ধা ও বিনীতা নারীগণের বাস ছিল। তাদের মধ্যে সুভদ্রিকা নাম্নী একজনকে অশ্বমেধিয় অশ্বের পার্শ্বে শায়িতা করা হয়েছিল–এটাই তাৎপর্য)।
১৯। গণগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ গণপতি তোমাকে আমরা যাচিত করছি। প্রিয়গণের মধ্যে প্রিয়পতি তোমাকে আমরা যাচিত করছি। সুখনিধিসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুখের নিধিপতি তোমাকে আমরা যাচিত করছি। হে বসুরূপ অশ্ব! তুমিই আমাদের পতি হও। (মহিষী অশ্বের পার্শ্বে শায়তা হন)–হে অশ্ব! গর্ভধারক তোমার তেজ আমি? আকর্ষণ করে আপন যোনিতে ধারণ করছি। তুমি সেই গর্ভধারক আপন তেজকে আকর্ষণ পূর্বক আমার যোনিতে নিষেক করো৷
২০। হে অশ্ব! আগত হও। আমি ও তুমি উভয়ে আপন চারটি পদ বিস্তৃত করব। (অধ্বর্যু5) হে অশ্ব ও মহিষী! তোমরা দুজনে এই স্বর্গীয় যজ্ঞভূমিতে নিজেদের আচ্ছাদিত করে নাও। (মহিষী কর্তৃক অশ্বের লিঙ্গটি ধরে আপন যোনিতে প্রবিষ্ট করণীয়) বীর্যবান্ অশ্ব, বীর্যকে ধারণশীল, আমাতে আপন বীর্য স্থাপন করুক৷
২১। (যজমান কর্তৃক অশ্বকে কহনীয়)–হে সেচক অশ্ব! উত্থিত হয়ে জঙশালিনী এই মহিষীর যোনিতে আপন লিঙ্গ রক্ষা করো–তাকে (লিঙ্গকে) অগ্র পশ্চাৎ চালিত করো। এই লিঙ্গই স্ত্রীগণের জীবন ও ভোজন স্বরূপ৷৷
২২। (কুমারী কন্যার দ্বারা অধ্বর্যু যোনির প্রান্ত অঙ্গুলী দেখিয়ে–এই (যোনি) কেমন করে ছোট পক্ষীর ন্যায় আহলগ (হলে হলে) শব্দ করে যাচ্ছে?যখন ভগে শিশ্নকে ভরিত করা হচ্ছে, তখন যযানি যেন লিঙ্গকে গিলিত করে নিচ্ছে৷৷
২৩। (কুমারী শিশ্নের প্রান্ত অঙ্গুলী দেখিয়ে)–হে অধ্বর্যুগণ! এটি কিরকম পক্ষী যে তোমাদের অগ্রে আহলগ শব্দ করে থাকে? এ তো তোমাদের মুখ হতেই নির্গত শব্দ বলে মনে হয়। অধ্বর্যুগণ! আর কিছু বলো।
২৪। (ব্রহ্মা মহিষীকে বলছেন)–হেমহিষী! তোমার মাতা ও তোমার পিতা যখন খট্রার (খাটের) উপর আরোহরণ করেছিল–তখন আমি স্নেহিত করছি এমন কথা বলে তোমার পিতা মুষ্টিতে শিশ্নটিকে ধরে ভগে প্রবিষ্ট করেয়েছিল। (তাতেই জন্ম হয়)।
২৫। (মহিষী) হে ব্রহ্মন্! তোমারও মাতা-পিতা যখন খট্টায় রতিক্রীড়া করতেন….. তোমার মুখ যেন আরও কিছু বলতে ইচ্ছা করছে; হে ব্ৰহ্মণ! তুমি অধিক কিছু বলল না ৷
মন্ত্ৰার্থঃ— ১। (অশ্বমেধ যজ্ঞে একুশটি যুপ হয়। মধ্যম যুপকে অগ্নিষ্ট বলা হয়। এতে সতেরোটি পশু বন্ধন করা হয়। ক্রমশঃ এই সবগুলির বর্ণন ও নিয়োজন এই প্রকার) অশ্ব, শৃঙ্গহীন ছাগ, এবং গবয় (গলকম্বলশূন্য গোতুল্য পশু); এগুলি প্রজাপতির সাথে সম্বন্ধিত পশু। প্রজাপতির উদ্দেশ্যে প্রিয় এই পশুগুলিকে আমি মধ্যযূপে বন্ধন করছিবলে এগুলিকে মধ্যযুপে বন্ধন করণীয়। (এই প্রকারে অন্য পশুগুলিকেও গ্রহণ পূর্বক সেই সেই দেবগণের প্রিয় বলে উচ্চারণ করে তার তার যুপে বন্ধন করণীয়।) শ্যামবর্ণের গলদেশ সম্পন্ন অজ অগ্নির পশু; সেটিকে অশ্বের ললাটে বন্ধনীয়। সরস্বতীর নিমিত্ত মেষী সম্মুখে বন্ধনীয়। দুই হনুর নীচে কৃষ্ণ-শ্বেত দুই বর্ণশালী দুটি অজ; সোম ও পূষা দেবতার শ্বেতকৃষ্ণ রোমের ছাপ অশ্বের নাভিতে বন্ধনীয়। সূর্য ও যমের শ্বেত কৃষ্ণ পশু অশ্বের দক্ষিণ ও বাম পার্শ্বে ক্রমশঃ বন্ধনীয়। ত্বষ্টার দুটি পশু অশ্বের পশ্চাৎ পদদ্বয়ে একটি একটি করে বন্ধনীয়। বায়ুসম্বন্ধী শ্বেতবর্ণ পশু অশ্বের পুচ্ছে বন্ধনীয়। সুকর্মা ইন্দ্রের নিমিত্ত গর্ভঘাতিনী গাভী এবং বিষ্ণুর নিমিত্ত এক খর্বাকৃতি পশু অশ্বের পুচ্ছেই বন্ধনীয়৷
২। লোহিত, ধূম্রলোহিত এবং কুলের ন্যায় রক্তবর্ণ পশু সোমদেবতার; এগুলি মধ্যযূপে বন্ধনীয়; কপিলবর্ণ (বা ফ্যাকাসে) শুকপক্ষীর ন্যায় হলুদবর্ণ ও রক্তাভ কপিল (ফ্যাকাসে লাল) এগুলি বরুণ সম্বন্ধী পশু; এগুলিও মধ্যযুপে বন্ধনীয়। কৃষ্ণবর্ণীয় ছিদ্রযুক্ত পশুকে এক পার্শ্বে বন্ধনীয়; শিতির (এক দিকে কৃষ্ণছিদ্রযুক্ত) ও সর্বাঙ্গে কৃষ্ণছিদ্রযুক্ত পশু, এগুলি সবিতাদেবের পশু। কৃষ্ণবর্ণের পদযুক্ত পশুকে দ্বিতীয় পার্শ্বে বন্ধনীয়। শ্বেত বর্ণের বাহুবিশিষ্ট (অর্থাৎ সম্মুখস্থ পদদ্বয় শ্বেতবর্ণযুক্ত) এবং সর্বশিতিবাহু পশু; এগুলি বৃহস্পতি দেবতার পশু। বিচিত্র বর্ণবিন্দুযুক্তা, লঘু (অর্থাৎ সূক্ষ্ম বিচিত্ৰবিন্দুযুক্তা)–এই সকল স্ত্রীপশু মিত্র ও বরুণ দেবতার; এগুলি দ্বিতীয় যুপে বন্ধনীয়।
৩। শুদ্ধ অর্থাৎ শুভ্র কেশযুক্ত, সর্বশুভ্র কেশযুক্ত এবং মণিরত্নের ন্যায় শুভ্র কেশযুক্ত পশু; এগুলি অশ্বিন্দ্বয়ের পশু। শ্বেত, শ্বেতবর্ণের চক্ষু ও লোহিত পশু; এগুলি পশুপতি রুদ্রের পশু। চন্দ্রের ন্যায় শ্বেত কর্ণবিশিষ্ট পশু যমদেবতার। গর্বযুক্ত পশু রুদ্র সম্বন্ধী এবং তমোরূপ পশু পর্জন্য সম্বন্ধী হয়ে থাকে। এগুলি তৃতীয় যুপে নিযোজ্য৷
৪। চিবিত্র বর্ণ, বক্র বিচিত্র বিন্দু এবং উর্দ্ধে বিচিত্র বিন্দুধারী পশু; এগুলি মরুৎদেবগণের পশু। অপপুষ্ট শরীর, রক্তিম রোমযুক্ত ও শ্বেতবর্ণের স্ত্রী-পশু (মেষী); এগুলি সরস্বতী সম্বন্ধিনী পশু। প্লীহারোগযুক্ত কর্ণশালী, হ্রস্বকর্ণ এবং রক্তবর্ণের কর্ণশালী পশু; এগুলি ত্বষ্টার পশু। গ্রীবায় কৃষ্ণবর্ণের রোমযুক্ত, বগলে শ্বেতরোমশালী ও তিলকযুক্ত জঙ্শালী পশু; এগুলি ইন্দ্র ও অগ্নির পশু। কৃষ্ণপু, অল্প ও বহু রোমযুক্ত পশু; এগুলি উষা দেবতার সম্বন্ধী পশু। এইসব পশুগুলি ঐ সকল দেবতাগণের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করছি।
৫। বিচিত্র বর্ণালিনী তিনটি স্ত্রী-পশু বিশ্বদেবগণের। দেড় বৎসর বয়স্ক তিনটি রক্তবর্ণ ছাগ বা দেবতার বলে জানা যায়। বিশেষ চিহ্নহীন তিনটি পশু অদিতি দেবতার নিমিত্ত বন্ধনীয়। সমান বর্ণীয় তিনটি পশু ধাতার (ধাতৃদেবতার) নিমিত্ত উৎসর্গ করণীয়। পঞ্চমে তিনটি ছোট ছাগ (ছাগশিশু) দেবতাগণের পত্নীবৃন্দের নিমিত্ত বন্ধন করা উচিত।
৬। কৃষ্ণবর্ণের গ্রীবা ও কৃষ্ণকণ্ঠা তিনটি পশু অগ্নিদেবতা সম্বন্ধী হয়ে থাকে। শ্বভ্র (অর্থাৎ শ্বেত ভ্র সম্পন্ন) তিনটি পশু বসুদেবগণের; রক্ত বর্ণশালী তিনটি পশু রুদ্র দেবতার; শ্বেতবর্ণ ও অধোভাগে ছিদ্রশালী তিনটি পশু আদিত্যবর্গের; আকাশরূপ বর্ণবিশিষ্ট তিনটি পশু পর্জন্য দেবতার। এই পশুগুলি আমি ঐ ঐ দেবগণের উদ্দেশ্যে যুক্ত করছি৷৷
৭। পূর্ণ আয়ুঃশালী হয়েও বামনাকৃতিসম্পন্ন তিনটি পশু ইন্দ্র ও বিষ্ণু দেবতা সম্বন্ধী হয়ে থাকে। পূর্ণ শ্বেতবাহু ও শ্বেতপৃষ্ঠ পশু ইন্দ্র ও বিষ্ণু দেবতা সম্বন্ধী হয়ে থাকে। তোতাবর্ণের (টিয়াপাখীর ন্যায় বর্ণশালী) তিনটি পশু অশ্ব সম্বন্ধী হয়ে থাকে। ধূসর বর্ণের তিনটি পশু অগ্নি ও মরুবৃন্দের সম্বন্ধী হয়ে থাকে। শ্যামবর্ণের তিনটি পশু পূষাদেব সম্বন্ধী হয়ে থাকে। এই পশুসমূহ ঐ ঐ দেবতার উদ্দেশ্যে যুক্ত করছি৷৷
৮। ধূসর বর্ণের তিনটি পশু ইন্দ্র ও অগ্নি দেবতা সম্বন্ধী; দুই বর্ণবিশিষ্ট তিনটি পশু অগ্নি ও সোমদেবতা সম্বন্ধী; তিনটি বামনাকৃতি সম্পন্ন বলদ অগ্নি ও বিষ্ণু দেবতা সম্বন্ধী; তিনটি বন্ধ্যা ছাগী মিত্র ও বরুণ দেবতা সম্বন্ধী; ধূসর বর্ণের তিনটি ছাগী মিত্র দেবতা সম্বন্ধী। আমি এই পশুগুলি সেই সেই দেবতার উদ্দেশ্যে যূপে বন্ধন করছি।
৯। কৃষ্ণগ্রীবাশালী তিন পশু অগ্নিদেবতা সম্বন্ধী; পিঙ্গলবর্ণের তিন পশু সোম সম্বন্ধী; শ্বেত বর্ণের তিন পশু বায়ুদেবতাক হয়ে থাকে। চিহ্নহিত তিন পশু অদিতি দেবীর নিমিত্ত বন্ধনীয়। সমানবর্ণ তিন পশু ধাতৃদেবতার নিমিত্ত বন্ধনীয়। তিনটি ছোট ছাগ দেবপত্নীগণের নিমিত্ত বন্ধন করা উচিত। আমি ঐ সকল পশুগুলি ঐ ঐ দেবতার উদ্দেশ্যে যুপে যুক্ত করছি।
১০। কৃষ্ণবর্ণের তিনটি পশু ভূমিদেবতাকে, ধূম্র বর্ণের তিনটি পশু অন্তরিক্ষদেবতাক, বড় তিনটি পশু দ্যুদেবতাক, বিবিধবর্ণশালী তিনটি পশু বিদ্যুৎদেবতাক, সিল্মরোগী (অর্থাৎ কুষ্ঠ বা ছুলিরোগাক্রান্ত) তিনটি পশু নক্ষত্রদেবতাক হয়ে থাকে। আমি ঐ পশুগুলিকে ঐ ঐ দেবতার উদ্দেশ্যে যুপে যুক্ত করছে।
১১। ধূম্নবর্ণের তিনটি ছাগ বসন্ত দেবতার নিমিত্ত আলম্ভন (হনন) করছি। শ্বেতবর্ণের তিনটি ছাগ গ্রীষ্মের অভিমানী দেবতার নিমিত্ত, কৃষ্ণবর্ণের তিনটি ছাপ বর্ষার অভিমানী দেবতার নিমিত্ত, রক্তবর্ণের তিনটি ছাগ শরৎ ঋতুর অভিমানী দেবতার নিমিত্ত, বিন্দুযুক্ত তিনটি ছাগ হেমন্ত ঋতুর অভিমানী দেবতার নিমিত্ত এবং ফ্যাকাসে রক্তিম তিনটি ছাগ শিশির- ঋতুর অভিমানী দেবতার নিমিত্ত আলম্ভন করছি।
১২। দেড় বৎসর বয়স্ক তিনটি পশু গায়ত্রী ছন্দের নিমিত্ত, আড়াই বৎসর বয়স্ক তিনটি পশু ত্রিষ্টুপ ছন্দের নিমিত্ত, দুই বৎসর বয়স্ক তিনটি পশু ছন্দের নিমিত্ত, তিন বৎসর বয়স্ক তিনটি পশু অনুষ্টুপ ছন্দের নিমিত্ত এবং সাড়ে তিন বৎসর বয়স্ক তিনটি পশু উষ্ণিক ছন্দের নিমিত্ত আলম্ভন করা উচিত। আমি তা-ই করছি৷৷
১৩। চারি বৎসর বয়স্ক তিনটি পশু বিরাটু ছন্দের নিমিত্ত, তিনটি যুবা অজ বৃহতী ছন্দের নিমিত্ত, তিনটি উপযুক্ত বয়স্ক অজ ককুপ ছন্দের নিমিত্ত, তিনটি শকট-বহন-সমর্থ অজ পংক্তি ছন্দের নিমিত্ত এবং তিনটি নবপ্রসূতা অজ অতি ছন্দের নিমিত্ত আলম্ভন করণীয়। আমি তা-ই করছি৷৷
১৪। কৃষ্ণ গ্রীবাসম্পন্ন তিনটি পশু অগ্নিদেবতাক হয়ে থাকে। বজ্রবর্ণের তিনটি পশু সোমদেবতাক, ধ্বস্তবর্ণের (বিনষ্টবর্ণশালী) তিনটি পশু সবিতৃ দেবতাক, তিনটি বৎসতরী (ছাগশিশু) সরস্বতী দেবতাক, তিনটি কৃষ্ণবর্ণীয় পশু পূষাদেবতাক, শ্বেত ও কৃষ্ণ বর্ণমিশ্রিত তিনটি কৃশকায় পশু, মরুৎদেবতাক, বহু বিচিত্র বর্ণের তিনটি পশু বিশ্বদেবতাক এবং তিনটি বন্ধ্যা পশু দ্যাবাপৃথিবীতাক। এই পশুগণকে যথাযথ দেবতার উদ্দেশ্যে শূপে যুক্ত করছি৷
১৫। [বরুণপ্রধাস পর্বের (পূর্বকাণ্ডে কথিত) পনেরোটি পশু পূর্বে উক্ত হয়েছে।কবুর বর্ণের তিনটি পশু ইন্দ্র ও অগ্নিদেবতাক। কৃষ্ণবর্ণের তিনটি পশু বরুণদেবতাক। দাগযুক্ত কায়াধারী তিনটি পশু মরুৎদেবতাক এবং শৃঙ্গরহিত তিনটি পশু প্রজাপতিদেবতাক।
১৬। (শাকমেধ পশুসমূহ কথন)–প্রথম গর্ভেৎপন্ন তিনটি পশুকে সেনাবান্ অগ্নির নিমিত্ত আলম্ভন করছি। তিনটি বাত্যা পশুকে সান্তপণ মরুতের নিমিত্ত, গৃহমেধী মরুবৃন্দের নিমিত্ত তিনটি সদ্য-প্রসূত পশু, ক্রীড়ী মরুবৃন্দের উদ্দেশ্যে তিনটি সঙ্কল্পিত পশু তথা স্বতবান্ মরুবৃন্দের উদ্দেশে অনুক্রমে জাত তিনটি পশু আলম্ভন করছি৷৷
১৭। [অষ্টাদশ শূপের নিমিত্ত মহাহবিঃ সংজ্ঞক পঞ্চদশটি পশুর কথা প্রথমে বলা হয়েছে–ঊনবিংশটি যুপের নিমিত্ত তিনটি কবুরবর্ণ পশু ইন্দ্র ও অগ্নিদেবতাক তথা বৃহৎ বৃহৎ শৃঙ্গশালী তিনটি পশু মহেন্দ্রদেবতাক তথা অনেক বর্ণসম্পন্ন তিনটি পশু বিশ্বকর্মাদেবতা সম্বন্ধী হয়ে থাকে। এই পশুসমূহ যুপে বন্ধন করছি৷৷
১৮। (পিতৃ ইষ্টদেবতা পশুবর্গের কথন)–ধূম্রবর্ণ (অর্থাৎ কৃষ্ণলোহিত বর্ণ) মিশ্রিত কপিল বর্ণ সদৃশ তিনটি পশু সোমপায়ী পিতৃগণের উদ্দেশ্যে; কপিলবর্ণ মিশ্রিত ধূম্র বর্ণ সদৃশ তিনিটি পশু বহিষদ পিতৃগণের উদ্দেশ্যে; কৃষ্ণবর্ণ মিশ্রিত পিঙ্গল বর্ণের তিনটি পশু অগ্নিাত্ত পিতৃগণের উদ্দেশ্যে এবং কৃষ্ণবর্ণের দাগসমন্বিত তিনটি পশু এ্যম্বক দেবতার উদ্দেশ্যে বিংশতিতম যুপে বন্ধন করা উচিত৷৷
১৯। (শুনাসীরীয় পশুসমূহ কথন)–আগ্নেয় প্রভৃতি পঞ্চদশ পশুর কথা পূর্বে কথিত হয়েছে। এক্ষণে]–কবুরবর্ণের তিনটি পশু শুনাসীরীয় (শুনাসীর দেবতাক) হয়। শ্বেত বর্ণের তিনটি পশু বায়ুদেবতাক এবং শ্বেত তিনটি পশুও সূর্যদেবতাক হয়ে থাকে। এই পশুসমূহ যথাযথ: দেবতার উদ্দেশ্যে ঘূপযুক্ত করছি।
২০। (সকল ঘূপ মিলিয়ে এই তিনশত সাতাশটি গ্রাম্য পশু হয়ে থাকে) বসন্তের (অর্থাৎ বসন্ত ঋতুর অভিমানী দেবতার) উদ্দেশ্যে তিনটি কপিঞ্জল (বা চাতক) পক্ষী আলম্ভন করছি। তিনটি কলবিঙ্ক (বা চটক) পক্ষী গ্রীষ্মের (অর্থাৎ ঋতুর অভিমানী দেবতার) উদ্দেশ্যে আলম্ভন করছি। বর্ষা ঋতুর অভিমানী দেবতার উদ্দেশ্যে তিনটি তিত্তির পক্ষীকে, শরৎ ঋতুর অভিমানী দেবতার উদ্দেশ্যে তিনটি বর্তিক (বা ভারই) পক্ষীকে, হেমন্ত ঋতুর অভিমানী দেবতার উদ্দেশ্যে তিনটি ককর পক্ষীকে, হেমন্ত ঋতুর অভিমানী দেবতার উদ্দেশ্যে তিনটি ককর পক্ষীকে এবং শিশির ঋতুর অভিমানী দেবতার উদ্দেশ্যে তিনটি বিককর পক্ষীকে যুপে যুক্ত (বা হনন) করছি৷৷
মন্ত্ৰার্থঃ— ১। অশ্বের দন্তের দ্বারা শাদ নামক দেবতাকে প্রীণিত (প্রীত) করছি। দণ্ডের মূলের দ্বারা ভবকা নামক, দেবতাকে প্রীণিত করছি। দণ্ডের পৃষ্ঠভাগের দ্বারা মদ নামক দেবতাকে প্রীণিত করছি। স্রংষ্ট্রাসমূহের দ্বারা বেগা নামক দেবতাকে এবং জিহ্বাগ্রের দ্বারা সরস্বতীকে প্রীণিত করছি। জিহ্বার দ্বারা উৎসাহ নামক দেবতাকে, তালুর দ্বারা অবক্ৰন্দ দেবতাকে, হনুর দ্বারা বাজ নামক দেবতাকে, মুখের দ্বারা আপঃ দেবতাকে প্রীণিত করছি। অশ্বের অশুকোষের দ্বারা বরুণদেবকে, চিবুকের রোমের দ্বারা আদিত্যদেবগণকে, হৃদ্বয়ের দ্বারা মার্গদেবকে, চক্ষের পক্ষ্মদ্বয়ের রোমের দ্বারা দ্যাবাপৃথিবীকে, কণীনিকা অর্থাৎ চক্ষুগোলকদ্বয়ের দ্বারা বিদ্যুৎদেবতাকে প্রীণিত করছি। শুক্লের (শুক্ল দেবতার) নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি; কৃষ্ণের (কৃষ্ণ দেবতার) নিমিত্তও স্বাহা। নেত্ররোম পারদেবতাক। ইক্ষবো অর্থাৎ নেত্রের নিম্নভাগস্থ রোম অবার নামক দেবতাক। এ থেকে ভিন্ন অবারদেবতাক। চক্ষের পলক পারদেবতাক। এই সকল দেবতাকে আমি প্রাণিত করছি।
২। অশ্বের প্রাণের (বা প্রাণবায়ুর) দ্বারা বায়ু। দেবতাকে প্রীণিত করছি। অপান বায়ুর দ্বারা নাসিকার অধিষ্ঠাতা দেবদ্বয়কে, অধরের (অর্থাৎ নিম্ন ওষ্ঠের) দ্বারা উপম দেবতাকে এবং ওষ্ঠের (অর্থাৎ উধ্ব ওষ্ঠের) দ্বারা সৎ নামক দেবতাকে প্রীণিত করছি। উপরের কান্তির দ্বারা অন্তর দেবতাকে, নীচের দেহকান্তির দ্বারা বাহ্যদেবতাকে, মূর্ধার দ্বারা নিবেষ্য দেবতাকে প্রীণিত করছি। অশ্বের শিরঃমধ্যস্থ মজ্জাভাগের দ্বারা স্তনয়িতু দেবতাকে, মস্তিষ্কের দ্বারা অশনিদেবকে, কনীনিকাদ্বয়ের দ্বারা বিদ্যুৎদেবতাকে, কর্ণদ্বয়ের দ্বারা শ্রোত্রদেবকে, স্রোত্র অর্থাৎ কর্ণস্থ ছিদ্রদ্বয়ের দ্বারা কর্ণের অধিষ্ঠাতা দেবকে, নিম্নকণ্ঠের দ্বারা তেদনী দেবতাকে, শুষ্ককণ্ঠের দ্বারা আপঃ দেবতাকে, এবং গ্রীবার পশ্চাদ্ভাগের নাড়ীসমূহের দ্বারা চিত্ত দেবতাকে প্রণিত করছি। অশ্বের শিরের দ্বারা দিতি দেবতাকে, নির্জল্পন মস্তকের দ্বারা অদিতি দেবীকে, জর্জর শিরোভাগের দ্বারা নিঋতি দেবীকে, চলনকালে ধ্বনিকারী অশ্বাঙ্গসমূহের প্রাণদেবতাগণকে এবং উদ্ভুত শিখাভাগের দ্বারা রেশ্ম দেবকে প্রীণিত করছি।
৩। অশ্বের স্কন্ধস্থরোমসমূহের দ্বারা মশক নামক দেবকে, সুকর্মা (অর্থাৎ শোভন কর্মশালী) স্কন্ধের দ্বারা ইন্দ্রকে, লম্ফ প্রদান পূর্বক ভূমিতে গমনশীল পক্ষীর ন্যায় পশুর দ্বারা বৃহস্পতি দেবতাকে, খুরশালী পশুর দ্বারা কূর্ম দেবতাকে, স্কুল গুলের দ্বারা আক্রমণ নামক দেবতাকে প্রীণিত করছি। গুলের নিম্নস্থিত নাড়ীসমূহের দ্বারা কপিল দেবকে, পশুর জঙ্ঘার দ্বারা জব নামক দেবতাকে অগ্রভাস্থ পাদদ্বয়ের অর্থাৎ বাহুযুগলের দ্বারা অধ্বীন দেবতাকে, জাম্বীর অর্থাৎ লেবুর ন্যায় আকারসম্পন্ন জানুর মধ্যভাগস্থ অস্থিসন্ধির (অর্থাৎ হাঁটুর) দ্বারা অরণ্যদেবকে, উরুদ্বয়ের দ্বারা অগ্নিদেবতাকে, পশুর ভুজদ্বয়ের দ্বারা পুষা দেবতাকে, স্কন্ধের দ্বারা অশ্বিনদ্বয়কে এবং স্কন্ধগ্রন্থিসমূহের দ্বারা রুদ্র দেবতাকে প্রীণিত করছি৷৷
৪। (অশ্বের বগলের অস্থিসমূহকে বঙ্কি বলে। এগুলি সংখ্যায় ছাব্বিশটি–তেরটি এক দিকে এবং তেরটি অপর দিকে। এই বঙ্কিগুলির দেবতা-বিভাগ এই রকম) দক্ষিণ বগলের প্রথম বঙ্কি দ্বারা অগ্নি দেবের, নিম্নস্থ দ্বিতীয় বক্তি দ্বারা বায়ুদেবকে, তৃতীয়টির দ্বারা ইন্দ্রের, চতুর্থটির দ্বারা সোমদেবকে, অদিতির নিমিত্ত পঞ্চমটি, ইন্দ্রানীর নিমিত্ত ষষ্ঠটি, সপ্তমটি মরুৎদেবতারগণকে, অষ্টমটির দ্বারা বৃহস্পতি দেবতাকে, অর্যমার উদ্দেশ্যে নবমটি, ধাতার নিমিত্ত দশমটি, ইন্দ্রের নিমিত্ত একাদশতমটি, বরুণ দেবতাকে দ্বাদশতমটি এবং ত্রয়োদশতম বঙ্কির দ্বারা যমকে প্রণিত করছি।
৫। বাম বগলের প্রথম বঙ্কি ইন্দ্র ও অগ্নি দেবতার। এর নিম্নস্থ দ্বিতীয়টি সরস্বতীর, মিত্রের তৃতীয়টি, চতুর্থ বঙ্কিটি অপাং অর্থাৎ জলের অধিষ্ঠাত্ দেবতার, নিঋতির নিমিত্ত পঞ্চমটি, ষষ্ঠটি অগ্নি ও সোমের নিমিত্ত, সপ্তমটি সর্পদেবতার, অষ্টমটি বিষ্ণু দেবতার, নবমটি পূষা দেবতার, দশমটি ত্বষ্টাদেবতার, একাদশটি ইন্দ্রদেবের, দ্বাদশতমটি বরুণ দেবতার, ত্রয়োদশতম বঙ্কির দ্বারা যমদেবতাকে প্রীণিত করছি। এইভাবে দক্ষিণ পার্শ্বস্থ সকল বঙ্কিটি দ্বারা দ্যাবাপৃথিবীর অভিমানী দেবতার এবং বাম পার্শ্বস্থ সকল বঙ্কির দ্বারা বিশ্বদেবগণের (অর্থাৎ সকল দেবগণের) প্রীতি সাধন করছি।
৬। (অশ্বের অন্য অঙ্গসমূহের দেবতা)–মরুবৃন্দের নিমিত্ত অশ্বের স্কন্ধপ্রদেশের দ্বারা, বিশ্বদেবগণের নিমিত্ত অপুচ্ছের উপরস্থ প্রথম অস্থিপংক্তির দ্বারা রুদ্রদেবতার নিমিত্ত দ্বিতীয় অস্থিপংক্তির দ্বারা, আদিত্যগণের নিমিত্ত তৃতীয় অস্থিপংক্তির দ্বারা, বায়ুদেবের নিমিত্ত পুচ্ছের দ্বারা, অগ্নি ও সোমের নিমিত্ত নিতম্বের দ্বারা, কুঞ্চ নামক দেবদ্বয়ের নিমিত্ত দক্ষিণ ও বাম কটিভাগের দ্বারা, ইন্দ্র ও বৃহস্পতির নিমিত্ত উরুদ্বয়ের দ্বারা, মিত্র ও বরুণ দেবতার নিমিত্ত উভয় উরুর সন্ধিভাগের দ্বারা, আক্রমণ নাম দেবতার নিমিত্ত নিতম্বের স্থূলভাগদ্বয়ের দ্বারা, এবং বলদেবতার নিমিত্ত নিতম্বের আবর্তন ভাগের দ্বারা প্রীতি সাধন করছি৷৷
৭। পূষা দেবতাকে অশ্বের বৃহৎ অন্ত্রের দ্বারা প্রীণিত করছি। অন্ধাহি (অর্থাৎ অন্ধসর্প) দেবতাকে স্থূল, পায়ুস্থানের দ্বারা প্রীণিত করছি। পায়ুভাগের মাংসের দ্বারা বিত নামক দেবতাকে প্রীণিত করছি। বস্তির (বা মূত্রস্থলীর) দ্বারা আপঃ দেবতাকে প্রীণিত করছি। অণ্ডকোষের দ্বারা বৃষণ দেবতাকে প্রীণিত করছি। অশ্বলিঙ্গের দ্বারা অশ্বদেবতাকে প্রণীতি করছি। প্রজা দেবতাকে অশ্ববীর্যের দ্বারা প্রীণিত করছি। চাষ নামক দেবতাকে পিত্তের দ্বারা প্রীণিত করছি। পায়ুস্থানের তৃতীয় ভাগের দ্বারা প্রদর দেবতাকে প্রীণিত করছি এবং বিষ্ঠাপিণ্ডের দ্বারা কুম্মান নামক দেবতাকে প্রীণিত করছি।
৮। ইন্দ্র দেবতাকে অশ্বের ক্রোড়দেশের দ্বারা, অদিতিকে অশ্বের পাজস্যের (অর্থাৎ বলকারক অঙ্গের) দ্বারা, দিকসমূহকে অশ্বের স্কন্ধ ও কুক্ষির সন্ধিস্থানের দ্বারা, অদিতির নিমিত্ত অশ্বের ভস (অর্থাৎ লিঙ্গাগ্র)-এর দ্বারা, জীমূত দেবতাকে অশ্বের হৃদয়স্থ মাংসের দ্বারা, হৃদয়কে আচ্ছাদিত করণশালী অন্ত্রের দ্বারা অন্তরিক্ষের অভিমানী দেবতার, নভ নামক দেবতাকে অশ্বের উদরস্থ মাংসের দ্বারা, চক্রবাক দেবদ্বয়কে অশ্বগ্রীবার অপোভাগস্থ হৃদয়ের উভয় পার্শ্বের অস্থির দ্বারা, দিব নামক দেবতাকে বৃক্ক অর্থাৎ কুক্ষিস্থিত মাংসের দ্বারা, শিশ্নের মূলাগ্রভাগে স্থিত প্লাশী নামক নাড়ীসমূহের দ্বারা গিরি নামক দেবতাকে, অশ্বের প্লীহার দ্বারা উপল নামক দেবতাকে, অশ্বের ক্লোম অর্থাৎ যকৃতের দ্বারা বল্মীক দেবগণকে, হৃদয়ের নাড়ীসমূহের দ্বারা গুল্ম দেবগণকে, শিরাসমূহের দ্বারা স্রবন্তী দেবতাকে, কুক্ষির দ্বারা হ্রদ দেবতাগণকে, জঠরের দ্বারা সমুদ্র দেবকে এবং অশ্বের অঙ্গস্থ ভস্মের দ্বারা বৈশ্বানর দেবকে প্রীণিত করছি।
৯। অশ্বের নাভির দ্বারা বিধৃতি দেবতাকে, অশ্বের রস অর্থাৎ বীর্যের দ্বারা ঘৃত দেবতাকে, পান্নরসের দ্বারা আপঃ দেবতাকে, শরীরগত উষ্ম বা তাপের দ্বারা নীহার দেবতাকে, বসা দ্বারা শীন দেবতাকে, অশ্রুর দ্বারা প্রম্বা দেবতাকে, চক্ষের মল বা পিচুটির দ্বারা হ্রাদুনী দেবতাকে, রুধিরের দ্বারা রাক্ষসকে, অনুক্ত অঙ্গের দ্বারা চিত্রদেবগণকে, রূপের দ্বারা নক্ষত্রসমূহের অধিষ্ঠাত্ দেবতাগণকে, এবং চর্মের দ্বারা পৃথিবী দেবতাকে প্রীণিত করছি। জুমুক (বেদোক্ত গায়ত্রীর অধিষ্ঠাতা) বরুণের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি৷
১০। প্রাপঞ্চের (সৃষ্টির পূর্বে কেবল হিরণ্যগর্ভ দেবতাই বিদ্যমান ছিলেন। উৎপন্ন ভূতমাত্রের তিনিই একমাত্র স্বামী (বা পালক) ছিলেন। তিনি এই ভূলোককে ধারণ করেছিলেন। তিনি এই দুলোককেও ধারণ করেছিলেন। সেই হিরণ্যগর্ভ প্রজাপতি দেবের উদ্দেশ্যে আমরা সদা ভক্তি সহকারে হবিঃ প্রদান করছি।
১১৷ যে পরমাত্মা আপন মহিমায় এই জগতের সকল প্রাণ, অপান, নিমেষ ও উন্মেষকারী জীবসমূহের একমাত্র অধিপতি হয়েছেন, এবং যিনি এই জগতের সকল দ্বিপাদ ও চতুষ্পদ প্রাণীসমূহকে আপন ঐশ্বর্যের অন্তর্ভুক্ত করেন, সেই প্রজাপতি দেবের নিমিত্ত আমরা ধন-ধান্যে সদা পরিচর্যারত আছি৷
১২। যাঁর মহিমার প্রতীক স্বরূপ এই হিমালয় পর্বত দণ্ডায়মান এবং নদীসমূহের সাথে সমুদ্রকেও যাঁর মহিমা বলা হয় এবং এই প্রকৃষ্ট দিসমূহ যাঁর ভুজস্বরূপ, সেই প্রজাপতি কে বর নিমিত্ত আমরা সদা ভক্তি ও যোগের দ্বারা ধ্যানশীল হই।
১৩। যিনি আত্মা ও বলের দানকর্তা, বিশ্ব যাঁর অনুশাসনকে মান্য করে, দেবতাগণও যাঁর অনুজ্ঞায় বর্তমান থাকেন, যাঁর কৃপাসমূহ অমৃতস্বরূপ এবং যাঁর ক্রোধ সাক্ষাৎ মৃত্যুস্বরূপ, সেই প্রজাপতি দেবতাকে আমি হবিঃ দ্বারা পরিচর্যা করছি৷
১৪। চারি দিক হতে আমরা অহিংসিত, অনাক্রান্ত, শক্রভেদক যজ্ঞ প্রাপ্ত হই। যে প্রকারে দেবগণ সদা আমাদের অভিবৃদ্ধিতে লীন হয়ে থাকেন এবং দিনে দিনে তারা অপ্রমাদভাবে আমাদের রক্ষক হয়ে থাকুন।
১৫। দেবগণের কল্যাণী সুমতি আমাদের প্রতি আরও ঋজু (সরল বা সহজ) হোক। দেবগণের দান আমাদের সদাই প্রাপ্ত হোক। আমরা দেবগণের সাখ্যভাবকে সদাই প্রাপ্ত হওয়ার নিমিত্ত এবং.দেবগণ আমাদের দীর্ঘ জীবনের নিমিত্ত আমাদের আয়ুকে আরও আরও বর্ধিত করুক।
১৬। পূর্বকালীন স্ততির দ্বারা আমরা সেই ভগ, মিত্র, অদিতি ও অহিংসক দক্ষকে আহ্বান করছি। সেই সাথে অর্যমা, বরুণ, সোম এবং অশ্বিনদ্বয়কেও আহ্বান করছি। সুভগা সরস্বতী আমাদের কল্যাণ সাধন করুক।
১৭। বায়ু আমাদের সেই সুখকর, ভেষজ বহন করে আনয়ন করুক, সেই মাতা পৃথিবী ও সেই পিতা দুলোকও আমাদের মঙ্গল সাধন করুক। সোমের অভিষবকারী ও সুখের ভূমির উপরে স্থিত প্রস্তরগুলিও আমাদের সুখ ও কল্যাণ প্রদান করুক। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা দুজনও স্ববুদ্ধির দ্বারা সেই সুখ ও শান্তি প্রতিশ্রুত করো।
১৮। চরাচরের পালক, বুদ্ধির প্রেরক এবং সবৈশ্বর্যবান্ সেই রুদ্ররূপী পরমাত্মাকেই আমরা আহ্বান করছি। যেরূপে পৃষা দেবতা আমাদের ধনের বৃদ্ধির কারক হয়ে থাকে, সেইরূপেই সেই রক্ষক, পালক এবং অনুপহিংসিত পূষা দেবতা আমাদের কল্যাণের নিমিত্তভাগী হোক।
ষড়বিংশ অধ্যায়
শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ১
মন্ত্রঃ– অগ্নিশ্চ পৃথিবী চ সন্নতে তে মে সং নমতামদো। বায়ুশ্চান্তরিক্ষং চ সন্নতে তে মে সং নমতামদ। আদিতাশ্চ দৌশ্চ সন্নতে তে মে সংনমতামদ। আপশ্চ বরুণশ্চ সন্নতে তে মে সং নমতামদঃ। সপ্ত সংসদো অষ্টমী ভূতসাধনী। সকাম অনঙ্কুরু সংজ্ঞানমস্তু মেহমুনা ॥১॥
মন্ত্ৰার্থঃ– (এই অধ্যায়ে দর্শপৌর্ণমাস-পিতৃযজ্ঞ-অগ্নিহোত্র-উপস্থান ইত্যাদি অশ্বমেধসম্বন্ধী মন্ত্ৰসমূহ ব্যাখ্যাত)
১। অগ্নি ও পৃথ্বী পরস্পর সম্ভোগের নিমিত্ত সঙ্গত; তারা আমাকে… (অভীষ্ট দেবতার নাম উল্লেখনীয়)-এর সাথে সঙ্গত করুক। এই বায়ু ও অন্তরিক্ষ পরস্পর; তারা আমাকে…. সাথে সঙ্গত করুক। আদিত্য ও দুলোক পরস্পর সঙ্গত; তারা আমাকে…. সাথে সঙ্গীত করুক। আপঃ (জলদেবতা) ও বরুণ পরস্পর সঙ্গত; তারা আমাকে…. সাথে সঙ্গত করুক। হে পরমাত্মন! তোমার অগ্নি, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য, দ্যুলোক, জা ও বরুণ এই সপ্ত অধিষ্ঠান আছে। অষ্টম অধিষ্ঠান পৃথিবী ভূতমাত্রের অর্থাৎ প্রাণীজাতের সাধিকা (উৎপাদিকা)। হে দেব! তুমি আমাদের পথকে আমাদের অভীষ্টের সাথে পূর্ণ (অর্থাৎ সংযোজিত) করো। হে পরমাত্মন্! সেই… (অভীষ্ট দেবতার নাম উল্লেখনীয়)-এর সাথে আমার সঙ্গম (সংজ্ঞান বা সংযোগ) হোক।
২। যে ভাবে আমি এই কল্যাণী বাণীর উচ্চারণ করি-ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, শূদ্র, বৈশ্য এবং আপন ভক্তজনের নিমিত্ত–তাতে, দক্ষিণা দানশীল আমি দেবগণের প্রিয় হবো। আমার মনোরথ অভিবৃদ্ধ হোক। এই….(অভীষ্টের নাম) আমার প্রতি নমন (আত্মসমর্পণ করুক)।
৩। হে বৃহস্পতি! যে রমণীয় রত্ন ইত্যাদির নিমিত্ত বৈশ্য বা পালক অত্যন্ত স্পৃহা করে; যা যজনের হেতু; যা জনসাধারণে অত্যন্ত আভামা এবং যা বলকে দীপিত করে, হে সত্যোৎপন্ন! সেই বিচিত্র ধন তুমি আমাদের মধ্যে ধারিত (স্থাপিত করো)। হে সোম! তুমি উপযামের (গ্রহের বা পাত্রের) দ্বারা গৃহীত হয়েছ। আমি তোমাকে বৃহস্পতির নিমিত্ত গ্রহণ করছি। এই তোমার স্থান। বৃহস্পতি দেবতার নিমিত্ত আমি তোমাকে ধারণ করছি।
৪। গাভীশালী (গোমন) হে ইন্দ্র! এই স্থলে যজ্ঞে আগত হও। হে। শতক্রতু! খণ্ডকারী প্রস্তরে অভিষবকৃত এই সোমরস পান করো। হে সোম! তুমি উপযামে (গ্রহে)। গৃহীত হয়েছ। গোমান্ ইন্দ্রের নিমিত্ত আমি তোমাকে এই স্থানে ধারণ করছি৷৷
৫। হে বৃহন্তা ইন্দ্র! এই। স্থানে যজ্ঞে আগমন করো। হে শতপ্রজ্ঞ! তুমি সোমরসকে পান করো। এই সোমরস গো-দুগ্ধ প্রভৃতির সাথে প্রস্তরের দ্বারা অভিযুত হয়েছে। হে সোম!তুমি উপযাম পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। আমি তোমাকে গোমা ইন্দ্রের নিমিত্ত গ্রহণ করছি। এই তোমার স্থান। গোমা ইন্দ্রের নিমিত্ত আমি তোমাকে এই স্থানে ধারণ করছি৷৷
৬। যজ্ঞবান, সত্য জ্যোতির পালক, অনুপক্ষীণ এবং প্রদীপ্ত বৈশ্বানরকে যাচিত করছি। হে সোম! তুমি উপযামের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। আমি তোমাকে বৈশ্বানরের নিমিত্ত গ্রহণ করছি। এই তোমার স্থান। আমি তোমাকে বৈশ্বানরের নিমিত্ত ধারণ করছি।
৭। আমি বৈশ্বানর দেবের সৎ-ভাবনায় স্থিত হবো। এই রাজা বৈশ্বানর সর্বলোকের সুখ-শোভার স্বরূপ। এই পৃথিবীতে উৎপন্ন সেই বৈশ্বানর এই বিশ্বকে দর্শন করে থাকে। বৈশ্বানর অগ্নি সূর্যের সাথে সঙ্গত হয়ে থাকে। হে সোম! তুমি উপম পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। আমি তোমাকে বৈশ্বানরের নিমিত্ত গ্রহণ করছি। এই তোমার স্থান। আমি তোমাকে বৈশ্বানরের নিমিত্ত ধারণ (অর্থাৎ স্থাপন করছি)।
৮। আমাদের রক্ষার নিমিত্ত বহনক্ষম উথ মন্ত্রের দ্বারা। বৈশ্বানর অগ্নি সুদূর দেশ হতে আগত হোন। হে সোম! তুমি উপযাম পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। আমি তোমাকে বৈশ্বানরে নিমিত্ত গ্রহণ করছি। হে সোম! এই তোমার স্থান। আমি তোমাকে বৈশ্বানর দেবের নিমিত্ত এই স্থানে স্থাপন (ব। ধারণ) করছি।
৯। অগ্নি দ্রষ্টা, পবিত্রকারী, চারিজন ঋত্বিক ও যজমান সম্পন্ন এবং পুরস্কৃত সর্বকলকারী। এই মহাগতিকে আমি যাচিত করছি। হে সোম! তুমি উপযাম পাত্রের দ্বারা গৃহিত হয়েছ। তেজস্বী অগ্নির নিমিত্ত আমি তোমাকে গ্রহণ করছি। হে সোম! এই তোমার স্থান আমি তেজ ৰী অগ্নির নিমিত্ত তোমাকে এইস্থানে ধারণ করছি।
১০। মহান, বজ্রহস্তএবং ষোড়শী (পঞ্চ প্রাণ, মন পঞ্চ বুদ্ধীন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতা বা আত্মস্বরূপ) ইন্দ্রদেব আমাদের সুখ প্রদান করুক। ইন্দ্রদেব সেই পাপীকে হনন করুক, যে আমাদের দ্বেষ করে। হে সোম! তুমি উপযাম পাত্রে গৃহীত হয়েছ। আমি তোমাকে মহেন্দ্রের নিমিত্ত গ্রহণ করছি। হে সোম! এই তোমার স্থান। আমি তোমাকে মহেন্দ্রের নিমিত্ত এই স্থানে স্থাপিত করছি।
১১। হে যজমানবৃন্দ! দর্শনীয়, আক্রান্ত (বা আক্রমণকারী) শত্রুকে অভিভূত করণশালী এবং সোমান্নে মদমত্ত ইন্দ্রকে আমি তোমাদের নিমিত্ত সংস্তুত করছি- যেমন দিবাভাগে নবপ্রসূতা গাভী আপন বৎসকে শব্দ করে আহ্বান করে ৷৷
১২। হে উদ্গাতা! বিভীন অগ্নির উ;শ্যে সেই বৃহৎসামের গান করো। যা অত্যন্ত প্রাপণ সমর্থ (অর্থাৎ যে বৃহসাম অগ্নি প্রভৃতি দেবগণকে যজ্ঞে প্রাপ্ত করাতে অত্যন্ত সক্ষম)। হে অগ্নি! মহিষী (পরিণীতা পত্নী) যেমন পতির প্রতি গমন করে, সেই রকমই তোমার ধন এবং তোমার অন্ন উদ্গমিত হচ্ছে৷
১৩। হে অগ্নি! শীঘ্র যজ্ঞে আগত হও।!মরা এই স্তুতিসমূহে গান করছি এবং আরও এইরকমই স্তুতিসমূহে গান করব। তুমি উপস্থিত এই মেরসকে পান করে মদমত্ত হতে পারবে। (অতএব শীঘ্ৰ আগমন করো) ॥
১৪। হে যজমান (বা জমানরূপী অগ্নি)! ঋতুসমূহ তোমার যক্ষকে বিস্তারিত করুক। তোমার হবিঃ-কে মাসগুলি রক্ষা করুক সম্বৎসর তোমার যজ্ঞাকে ধারণ করুক। সে-ই (অর্থাৎ সম্বৎসরই) আমাদের সন্ততিগণকে পালন করুক।
১৫। পর্বতের নিকটে এবং নদীসমূহের সঙ্গমস্থলে যজ্ঞের উপযোগী বুদ্ধির দ্বারা সোম উৎপন্ন হয়ে থাকে৷
১৬। হে সোম! তোমার রসের যে অংশ ঊর্ধ্বে উত্থিত হয়ে আহুতির দ্বারা দ্যুলোকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বর্ষণরূপে তোমার সেই উগ্র, সুখস্বরূপ, মহৎ ও কীর্তিময় রস এই পৃথিবী গ্রহণ করছে৷৷
১৭। হে সোম! সেই ধনপ্রাপক তুমি যজনীয় ইন্দ্র, বরুণ এবং মরুবৃন্দের নির্মিত আমাদের যজ্ঞে অভিযুত হও।
১৮। মনুষ্যগণের এই সম্পূর্ণ ধনের পালক সোম আমাদের নিকট তা (অর্থাৎ সম্পূর্ণ ধন) আনয়ন করুক। সেই ধনকে আমরা বিতরিত করে নিজেরাও ভোগ করব।
১৯। পুত্রগণ, গাভীবর্গ, অশ্বসমূহ এবং অন্য পদার্থ সমুদায়ের দ্বারা আমরা সমৃদ্ধ হচ্ছে। দ্বিপাদ ও চতুষ্পদ সকলের দ্বারা আমরা পুষ্ট হচ্ছি। দেবতা আমাদের যজ্ঞকে যথাঋতু স্বীকার করুক৷
২০। হে অগ্নি! সকামা দেবপত্নীগণকে এবং ত্বষ্টাকেও সোম পানের নিমিত্ত এই স্থানে (যজ্ঞে) আনয়ন করো।
২১। হে ঋতু-দেবগণ (অর্থাৎ ঋতু যাগে আহূত দেবগণ)! আমাদের এই যজ্ঞের স্তুতি করো। অনেক পত্নী-সম্পন্ন হে অগ্নিদেব! তথা হে নেষ্টা (সোমযাগের প্রধান ঋত্বিকগণের মধ্যে এক)! তোমরা সোমপান করো; কারণ তোমরা রত্নদানশীল (বা রমণীয় ধনের দাতা) এবং তা ধারণকারী৷৷
২২। হে ঋত্বিকবর্গ! ধনদাতা অগ্নি সোমকে পানের নিমিত্ত অত্যন্ত ইচ্ছা করে। সেই নিমিত্ত সোমকে আহুতি প্রদান করো এবং তৎসম্পন্ধী কর্মে সংলগ্ন হও। যথাকালে নেষ্টার ধিষ্ণা (অর্থাৎ স্থান) হতে দেবতাগণের সাথে যথেচ্ছ সোমরস পান করো।
২৩। হে ইন্দ্র! এই সোমরস তোমারই। তুমি অগ্রে আগত হও। প্রসন্ন হয়ে তুমি এই চিরন্তন আপন অংশ যথেচ্ছ পান করো। এই যজ্ঞে দর্ভাসনে উপবেশন পূর্বক, হে ইন্দ্র! এই আহ্লাদক সোমরসকে আপন উদরে ধারিত করো ৷৷
২৪। হে দেবপত্নীগণ! আহ্বান করলে অত্যন্ত সরলা তোমরা আপন ঘর-সদৃশ এই যজ্ঞগৃহে আগমন করো এবং দুর্ভাসনের উপর বিরাজিতা হয়ে পরস্পর আলাপন করো। হে ত্বষ্টা! দেব-স্ত্রীগণের সাথে সুষ্ঠু গণবান তুমি এক্ষণে সোমান্নকে যথেচ্ছ সেবন পূর্বক মদমত্ত হও।
২৫। হে সোম! অত্যন্ত সুস্বাদু এবং মদকারিণী ধারার সাথে তুমি পবিত্র (অর্থাৎ দশাপবিত্রে পরিত) হও। তুমি ইন্দ্রের পানের নিমিত্ত অভিযুত হয়েছ।
২৬। রাক্ষসগণের হস্তারক তথা বিশ্বের শুভাশুভ দর্শনশালী সোমরস কাষ্ঠ-খোদাই যন্ত্র ইত্যাদির দ্বারা উৎকীর্ণ এবং সহস্থানভৃত স্বাধিষ্ঠানে দ্রোণকলশে শান্তির সাথে বিরাজমান হোক।
১। হে অগ্নি! বর্ষ, ঋতুসমূহ, সম্বৎসর, ঋষিজন এবং সত্য-পদার্থ তোমাকে বর্ধিত করুক। হে অগ্নি! তুমি আপন দিব্য প্রকাশের দ্বারা দেদীপ্যমান হও এবং সম্পূর্ণ চারি দিকসমূহকে প্রকাশিত করো।
২। হে অগ্নি! সমিন্ধিত (প্রজ্বলিত) হও। এই যজমানকে প্রবাধিত করো। মহৎ সৌভাগ্যের নিমিত্ত তুমি উন্নত (স্থিত) হও। হে অগ্নি! তোমার নিকট উপবিষ্ট যজমান যেন কখনও হিংসিত না হয়। তোমার ঋত্বিক ও যজমানগণ যশ-সম্পন্ন হোক; অন্য কোন প্রাকৃত জন নয়।
৩। হে অগ্নি! এই ঋত্বিকগণ তোমাকে বরণ করছে। এদের সংবরণে, হে অগ্নি! তুমি আমাদের কল্যাণকারী হও। শত্রুকে হননশীল এবং আমাদের শত্রুকে জয়কারী, হে অগ্নি! তুমি প্রমাদ রহিত হয়ে আপন যজ্ঞগৃহে সতত প্রজ্বলিত থাক।
৪। হে অগ্নি! তুমি এই স্থানে ধন ধারিত করো। পূর্বের অগ্নি চয়নকারীগণ যেন তোমাকে তিরষ্কার করতে না পারে। হে অগ্নি! ক্ষত্রিয়জাতি তোমার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোক এবং তোমার উপাসক যজমান অহিংসিত হয়ে বৃদ্ধিলাভ করুক৷
৫। হে দীর্ঘায়ু অগ্নি! ক্ষত্রিয়ের দ্বারা তুমি উদ্দীপ্ত হও। মিত্র (অর্থাৎ সূর্য)-এর সাথে তুমি আপন মিত্র যজমানের হিতে সংলগ্ন হও। হে অগ্নি! তুমি আমাদের সজাতিগণের মধ্যস্থিত হও। হে অগ্নি! রাজবর্গের দ্বারা যজ্ঞসমূহে বিবিধ রূপে আহ্বায়মান হয়ে তুমি দেদীপ্যমান হও।
৬৷ নিহন্তাগণ, হিংসকগণ, অন্যমনস্কতা ও অদাতাগণকে লঙ্ঘন করে, হে অগ্নি!তুমি সমস্ত পাপকে অভিভূত করো। তারপর আমাদের বীর পুত্রের সাথে যুক্ত ধন প্রদান করো৷
৭। হে জাতবেদা অগ্নি! অনুপহিংসিত, অক্ষীণ এবং বিশেষরূপের দ্বারা শোভমান তুমি জগতে ক্ষত্রিয়গণের দ্বারা আধানকৃত (স্থাপিত) হয়ে দেদীপ্যমান হও। সকল দিকে মৃত্যু ইত্যাদি মানবভয়কে আমাদের নিকট হতে দূর করে আপন কল্যাণী জ্বালাসমূহের দ্বারা বৃদ্ধির নিমিত্ত আমাদের পালন করো।
৮। হে বৃহস্পতি! হে সবিতা! এই যজমানকে প্রবোধিত করো। সুবুদ্ধকে. (অর্থাৎ জ্ঞানপ্রাপ্তকে) আরও সুবুদ্ধ করো। এঁকে মহৎ সৌভাগ্যের নিমিত্ত বর্ধিত করো। এঁর দ্বারা কৃত যজ্ঞের দ্বারা বিশ্বদেব তৃপ্ত হোক।
৯। পরলোকের সাথে সম্বন্ধিত যমের নরক-পাত ইত্যাদি পাপ হতে, হে বৃহস্পতি! তুমি আমাদের রক্ষা করো। দেবভিষক অশ্বিদ্বয় আপন যুক্তির দ্বারা আমাদের মৃত্যুকে দূর (নিবারণ) করুক৷
১০। হে অগ্নি। শ্রেষ্ঠ পরমাত্মা-জ্যোতি দর্শন করে আমরা অন্ধকার হতে উত্তীর্ণ হয়ে একই দেবতা এবং উত্তমজ্যোতি সূর্যকে প্রাপ্ত হয়েছি; (অর্থাৎব্রহ্মস্বরূপ জ্ঞাত হয়েছি)।
১১। এই অগ্নির সমিধসমূহ উচ্চ হোক এবং শুভ্র রশ্মি জ্বালাসমূহও উচ্চ (অর্থাৎ ঊর্ধ্বগতি প্রাপ্ত) হোক। যজমান পুত্রের সম্মুখে এই অগ্নির দীপ্তা রশ্মিগুলি ঊর্ধ্বগামী হোক৷
১২। জলের পৌত্র, প্রাণবান্ (অসুরঃ) সর্বধনবান্ এবং দেবগণের মধ্যে একভাবেই দ্যোতমান অগ্নি মধু ও ঘৃতের দ্বারা যজ্ঞপথ আরঞ্জিত করে৷৷
১৩। ঋত্বিকবৃন্দের দ্বারা স্থূয়মান হে অগ্নি! তুমি মধুর ঘৃতের হেতু যজ্ঞে ব্যাপ্ত হয়ে থাক, এবং পুণ্যবান্ এবং বিশ্বের দ্বারা বরণীয় সবিতাদেবকে তৃপ্ত করে থাক ৷
১৪। যজ্ঞ প্রারম্ভ হবার পর জ্ঞানের দ্বারা স্তুতি করে যজ্ঞনির্ধারক অধ্বর্যু স্তোত্র বা অন্ন এবং সুবা প্রভৃতির সাথে যজ্ঞের নিকট আগমন করে।
১৫। সেই, অধ্বর্যু এই মহিমাবান্ অগ্নিকে যজন করছে। উধ্বর্য সেই অগ্নিকে মদকারী হবিঃ-সমূহ প্রদান করে, যে অগ্নি সু-হবিযুক্ত, বাসয়িতা, অত্যন্ত চেতনাপ্রদ এবং ধনদাতা।
১৬। বিশাল অন্তরশালী এবং আপন স্থান গ্রহণের দ্বারা যজ্ঞকে ঐশ্বর্য-সম্পন্নকারিণী দ্বারদেবীগণ এই অগ্নির কর্মসমূহকে ধারণ করছে, (অর্থাৎ রাক্ষস ইত্যাদির উপদ্রব হতে সুরক্ষিত রাখছে)। বিশ্বদেবতাও এর কর্মসমূহকে রক্ষা করছে৷
১৭। সেই দিব্য নারীদ্বয়–উষা ও রাত্রি–এই অগ্নির ভার্যারূপে গাহপত্যাগ্নিতে স্থিত আমাদের এই শাস্ত্রোক্ত যজ্ঞকে রক্ষা করুক।
১৮। দৈবী হোতা অগ্নি ও বায়ু আমাদের এই যজ্ঞকে ঊধ্বস্থ করুক। সেই দুজনে অগ্নির জ্বালাসমূহের স্তুতি করুক। আমাদের যজ্ঞকে সিদ্ধ করুক।
১৯৷ জুয়মানা তিন মহতী দেবী– ইড়া, সরস্বতী ও ভারতী, এই দুর্ভাসনে বিরাজিতা হোন।
২০। শীঘ্রলব্ধ, অদ্ভুত, বহু স্থানে স্থিত তথা বীর্যশালী (সামর্থশালী) ধনের সমৃদ্ধিকে তৃষ্টাদেব আমাদের নাভিস্থানে (অর্থাৎ ক্রোড়দেশে) নিক্ষেপ করুক (অর্থাৎ ঢেলে দিক)।
২১। শান্তিকর অগ্নি হবিকে সংস্কৃত করছে, অতএব হে বনস্পতি!তুমি সেই হব্যসমূহকে সুকের দ্বারা দেবগণকে সমর্পণ করে তাদের হবির্ভুক্ত করো।
২২। হে জাতবেদা অগ্নি! ইন্দ্রের নিমিত্ত হবিঃ স্বীকার করে। এই হবিঃ বিশ্বদেবতাগণ আস্বাদিত করুক।
২৩। অন্নের দ্বারা স্ফীতকায় এবং ধনবর্ধক নিযুত সংজ্ঞক অশ্বসমূহকে সুপ্রজ্ঞ ও শ্বেত বায়ু অধিষ্ঠিত করছে। সেই নিযুত অশ্ব সেই বায়ুর নিমিত্ত প্রস্তুত হচ্ছে। তখন সকল যজমান ইত্যাদিগণ সুপুত্র ইত্যাদি প্রাপক কর্ম অর্থাৎ যজ্ঞ ইত্যাদি সাধন করছে৷
২৪। ধনের নিমিত্ত যে বায়ুকে এই দ্যাবাপৃথিবী উৎপন্ন করেছিল এবং যে দ্যোতমান বায়ুকে বাক্-দেবী স্বয়ং ধারণ করছে; জনাকীর্ণ পথে সেই শ্বেত ও ধনধারক বায়ুকে তার আপন নিযুত অশ্বগণ প্রাপ্ত হচ্ছে।
২৫। মহতী আপঃ (জলরূপা দেবী) যখন এই বিশ্ব প্রপঞ্চকে গর্ভরূপে ধারণ করেছিল, এবং গর্ভকে ধারণ করে তাদের দ্বারা আপন অন্দরে উত্মাকে উৎপন্ন করেছিল, তখন দেবতাগণের একমাত্র প্রাণ সেই হিরণ্যগর্ভ বিদ্যমান হয়েছিল। সেই হিরণ্যগর্ভ প্রজাপতির উদ্দেশ্যে আমরা হবিঃ ইত্যাদির দ্বারা যজন করি৷
২৬। হে বায়ু! তুমি আপন যে সমস্ত নিযুত অশ্বসমূহের দ্বারা হবিদাতা যজমানের যজ্ঞগৃহের দিকে যজ্ঞের উদ্দেশ্যে গমন করছ, সেই স্থান হতে আগমন করে আমাদেরও ভোজন, পর্যাপ্ত ধন, পুত্র এবং গো-অশ্বধনও প্রদান করো।
২৭ নম্বর মন্ত্রার্থ মিসিং
২৮। হে বায়ু! তুমি আপন শত সহস্র অশ্বের দ্বারা আমাদের এই অহিংসক যজ্ঞে আগমন করো। হে বায়ু! তুমি এই তৃতীয় সনে তৃপ্ত হও। হে দেবগণ! তুমি সদা কল্যাণসমূহের সাথে আমাদের সুরক্ষিত রাখো৷
২৯। হে বায়ু! নিযুত অশ্বের সাথে যুক্ত হয়ে তুমি আগমন করো। এই শুক্র গ্রহ তোমার নিমিত্ত প্রস্তুত আছে। তুমি সদাই শুক্র ইত্যাদি গ্রহপাত্রসমন্বিত যজমানের গৃহে গমন করে থাক৷৷
৩০। দেবযজ্ঞে মধুর সোমে পূর্ণ এই শুক্র গ্রহ; হে বায়ু! তোমার নিমিত্ত প্রস্তুত করা হয়েছে। হে স্পৃহনীয় বায়ুদেব! নিযুত অশ্বের সাথে যুক্ত হয়ে তুমি সোমপানের নিমিত্ত যজ্ঞে আগত হও।
৩১। অগ্রগন্তা, যজ্ঞের দ্বারা তুষ্টিশীল তথা কল্যাণকারী বায়ু আপন কল্যাণী নিযুত অশ্বগণের দ্বারা সাদরে (আদরের বা সম্মানের সাথে) যজ্ঞে আগমন করুক।
৩২। হে বায়ু! তোমার যে সেই সহস্ৰসংখ্যক রথ আছে, সেই রথে যুক্ত নিযুত অশ্বগণ সহ (অর্থাৎ নিযুতবান হয়ে) সোমরস পানের নিমিত্ত আগমন করো ৷
৩৩। হে জগৎস্বরূপ সমৃদ্ধিশালী বায়ু! আপন এক-দুই দশ-বিশ-ত্রিশ প্রভৃতি অশ্বগণের দ্বারা যে ধন বা পাত্রসমূহকে যজ্ঞের নিমিত্ত বহন করে আগত হয়েছ, সেইগুলি এই স্থানেই বিমোচিত (বিমুঞ্চিত) করো।
মন্ত্ৰার্থঃ— ১।পৃথিবীর স্থানে বেদির উপরে দৈব হোতা ইন্দ্রকে অগ্নিভাবে সমিধের দ্বারা যজন করুক। অন্তরিক্ষের নাভিস্থানে বিদ্যুৎরূপে এবং দ্যুলোকের উত্তম স্থানেও সূর্যরূপে ইন্দ্র যজনকৃত হয়ে থাকে। প্রজা বা মনুষ্যগণকে অভিভূত করণশালী সেই অত্যন্ত ওজস্বী ইন্দ্র ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোত! তুমিও যজন করো।
২। জেতা, অপরাজিতা এবং স্বৰ্গবেত্তা ইন্দ্রের ও তনূনপাৎ অগ্নির যজন দৈব হোতা অত্যন্ত মধুর হবিঃর দ্বারা করে থাকে। তেজস্বী নরাশংস অগ্নির সাথে ইন্দ্র ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো ৷
৩। দৈব হোতা প্রযাজ দেবতা ইড়া প্রভৃতির সাথে সংস্তুত, আহ্বায়মান তথা অমর ইন্দ্রকে যজন করুক। দেবগণের সমান বীর্যশালী, বজ্রহস্ত এবং অসুরপুরীকে বিদারণকারী ইন্দ্রদেব ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্যহোত! তুমিও যজন করো।
৪। বেদির উপর উপবেশনকারীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, অভীষ্টবৰ্ষক এবং যজমানের হিতকর কার্য করণশালী ইন্দ্রকে দৈব হোতা দর্ভাসনের উপর যজন করছে। সেই ইন্দ্র বসু, রুদ্র এবং আদিত্যগণের সাথে সংযুক্ত বা সম্মিলিত হয়ে দুর্ভাসনের উপর উপবেশন করুক। তারা ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোত! তুমিও যজন করো।
৫। ইন্দ্রের মধ্যে ওজ (অর্থাৎ ইন্দ্রিয়বল), বীর্য (অর্থাৎ শরীরবল) ও সহঃ (অর্থাৎ মনোবল) বৃদ্ধিকারিণী দ্বারদেবীগণকে দৈব হোতা যজিত করুক। সেচক ইন্দ্রের নিমিত্ত এই যজ্ঞে সুগমনা ও যজ্ঞবর্ধিনী দ্বারদেবীগণ পূর্ণভাবে প্রকাশ্যে স্থিতা হোক। দ্বারদেবীগণ ঘৃত পান করুক। হেমনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো।
৬। ইন্দ্রের সুদুঘা গাভীসমূহ তথা মহতী মাতৃদ্বয় (মাতৃবৃৎ পালিকা) উষা ও রাত্রিকে দৈব হোতা যজিত করুক। সেই দুজনা, সমানবসা গাভীর ন্যায়, ইন্দ্ররূপী বৎসকে তেজের দ্বারা বর্ধন করছে। সেই দুজনা ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তোমরাও যজন করো।
৭। দেববৈদ্য এবং পরস্পর মিত্র দৈবী হোতৃদ্বয় অগ্নি ও বায়ুর যজন দৈব হোতা করুক। তারা হবিঃর দ্বারা ইন্দ্রকে নিরোগ করে থাকে। ক্রান্তদ্রষ্টা এবং বিদ্বান্ সেই দুজন ইন্দ্রকে শক্তি প্রদান করতে থাকে। তারা ঘৃত পান করুক। হে হোতা! তুমিও যজন করো
৮। ভেষজরূপ, কর্মবান্ এবং অগ্নি-বায়ু-আদিত্যরূপ তিন ধারণকর্তাকে, তিনি লোকের এবং ইড়া-সরস্বতী ও ভারতী এই তিন দেবীর যজন দৈব হোতা করুক। ইন্দ্রের পালয়িত্ৰী তথা হবিযুক্তা সেই তিন দেবী ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোত! তুমিও যজন করো।
৯। ঐশ্বর্যবান্, দ্যোতমান, বৈদ্য, সুষজনীয় ঘৃতের দ্বারা শোভাপ্রাপ্তিশীল, অনেক রূপধারী, সুবীর্যবান্ এবং ধনবান্ ত্বষ্টাদেবকে দৈব হোতা যজন করুক। তৃষ্টাদেব ইন্দ্রকে ইন্দ্রিয়শক্তি প্রদান করেন। সেই ত্বষ্টাদেব ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা!তুমিও যজন করো।
১০। হবিঃসংস্কর্তা, বুদ্ধিকে কর্মে প্রয়োগশালী তথা শক্তিবান্ বনস্পতি-পকে দৈব হোতা যজন করুক। সুগম পথে আহুতির দ্বারা মধুর ঘৃতে যজ্ঞকে যুক্ত করে সেই ঘৃত দেবগণকে আস্বাদিত করিয়ে থাকে। সে ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো।
১১। দৈব হোতা ইন্দ্রদেবতার যজন ৬ করুক। মৃতের (আজ্যের) দেবতার উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। মেদবিন্দু সমূহের নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। স্বাহাকৃতিশালী দেবগণের নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। হব্যের সূক্তি সমূহশালী দেবগণের নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। প্রসন্ন হয়ে ঘৃতপায়ী দেবতা ঘৃত পান করুক। ইন্দ্রও ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো৷
১২। ঋত্বিক ইত্যাদির দ্বারা সনাথ (নাথ বা বীরযুক্ত), ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণের দ্বারা সুষ্ঠু যুক্ত এবং বেদির উপর বিস্তৃত দ্যোতমান দৰ্ভ ইন্দ্রদেবের বৃদ্ধি সাধন করছে। দিবায় ছিন্নিকৃত, রাত্রে সতর্ক হয়ে ধারণ কৃত এবং দৰ্ভত্বধনের দ্বারা অন্য সামগ্রীগুলিকে উল্লঙঘনশালী বৰ্হিদেব ধনদান ও যজমান ধন ধারণের নিমিত্ত ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো।
১৩। দ্বারদেবীগণ দ্যোতমান দ্বার, অর্গলবদ্ধ দেহলী ইত্যাদি সংঘাত সম্পন্ন হওয়ার পর দৃঢ় যজ্ঞকর্মে ইন্দ্রের বৃদ্ধি সাধন করে থাকেন। কার্যক্ষম যুবা এবং হিংসাপ্রিয় বালকগণের দ্বারা অনুগম্যমান এবং ধূলিতে উন্মুক্ত হওয়া কূপ ইত্যাদি পথ হতে দ্বারদেবীগণ দূর করুক। ধনদান এবং যজমানের গৃহে ধন-ধারণের নিমিত্ত দ্বারদেবীগণ ঘৃত পান করুক।
১৪। দ্যোতমানা উষা ও রাত্রির অভিমানী দেবীদ্বয় যজ্ঞে ইন্দ্রকে আহ্বান করুক। তারা দৈবী প্রজা বসু রুদ্র-আদিত্যগণকে প্রাপ্ত হোক। সুপ্রসন্না ও সুহিতকারিণী সেই দুইজনা ধনদান এবং যজমানের গৃহে ধন-ধারণের নিমিত্ত ঘৃত পান করুক। হে দৈব হোতা! তুমিও যজন করো ৷
১৫। দ্যোতমানা, সপ্রীতি তথা ধন ধারিত করণশালিনী দ্যাবাপৃথিবী ইন্দ্রের বৃদ্ধি সাধন করে। তাদের মধ্যে একজনা পাপ ও দ্বেষ (বা দুর্ভাগ্য) দূর করে, অন্য জনা ধন এবং বরণীয় বস্তুসমূহকে ঘরে আনয়ন করে অর্থাৎ দান করে। সেই দুজনা জ্ঞানবতী। ধনদান তথা যজমানের নিমিত্ত ধন স্থাপিত করণশালিনী সেই দুজানা ঘাত পান করুক। হে মনুষ্য হোত! তুমিও যজন করো।
১৬। সুষ্ঠু দোগ্ধী এবং দ্যোতমানা পূর্বা ও প্রৈষা (বা ঊর্জ ও আহুতি) নাম্না দুই দেবী দুগ্ধের দ্বারা ইন্দ্রের বৃদ্ধি সাধন করে। তাদের মধ্যে একজনা যজমানের নিমিত্ত অন্ন ও বল আনয়ন করে এবং অন্যজনা পুত্র ইত্যাদি সম্পর্কিত সহজে ও সহপান আনয়ন করে। দয়া পূর্বক সেই ঊর্জ ও আহুতি দেবীদ্বয় পুরাতন অন্নের দ্বারা নূতন অন্নকে আবৃত (ধারণ) করে থাকে। বল ব্যক্ত করে ঊর্জ ও আহুতি দেবীদ্বয় যজমানের নিমিত্ত ধন ও বরণীয় পদার্থ আনয়ন করে। শিক্ষিতা ঐ দুজানা ধনদান তথা যজমানের গৃহে ধন স্থাপনের কারণে ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো।
১৭৷ দৈবী হোত অগ্নি-বায়ু দুই জন, ইন্দ্রদেবের বৃদ্ধি সাধন করে। নিন্দককে মারণশীল ঐ দুই জন, যজমানের নিমিত্ত ধন তথা অন্য বরণীয় পদার্থ আনয়ন করে। শিক্ষিত ঐ দুই দৈবী হোতা ধনদান তথা যজমানের গৃহে ধন পূর্ণ করার নিমিত্ত ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা। তুমিও যজন করো।
১৮। তিন দেবী পালক ইন্দ্রের বর্ধন করে। ভারতী দেবী দ্যুলোককে স্পর্শ করে; সরস্বতী দেবী রুদ্রগণের সাথে যজ্ঞকে স্পর্শ করে; এবং ধনবতী ইড়া দেবী গৃহ অর্থাৎ পৃথিবীকে স্পর্শ করে। ধন দান তথা যজমানের গৃহকে ধনের দ্বারা পূর্ণ করার নিমিত্ত ঐ দেবীত্রয় ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোত! তুমিও যজন করো।
১৯। ঋত্বিবৃন্দের দ্বারা প্রশংস্যমান, দ্যোতমান, ঐশ্বর্যশালী, তিনটি গৃহ-সম্পন্ন এবং ঋক্-যজুঃ-সামের তিন বন্ধনযুক্ত এই নরাসংস যজ্ঞ ইন্দ্রদেবের বৃদ্ধি সাধন করছে। কৃষ্ণপৃষ্ঠশালিনী শত গাভীর দ্বারা অধ্যাসিত সেই যজ্ঞ গো সহস্রের দ্বারা প্রবর্তিত হয়ে থাকে। মিত্র ও বরুণ এর হোতৃকর্মের যোগ্য। বৃহস্পতি-এর উদগাতৃকর্মের এবং অশ্বিনদ্বয় এর অধ্বর্যুকর্মের যোগ্য। ধনদান ও ধন-ধারণের নিমিত্ত সেই যজ্ঞ (বা নরাশংসক দেবতা) ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা!তুমিও যজন করো।
২০৷ দেববর্গের দ্বারা হিরণ্যবর্ণ, মধুর শাখাসম্পন্ন এবং অশ্বিদ্বয় ও সরস্বতীর দ্বারা সুফলবান্ ঘূপদেব বনস্পতি ইন্দ্রদেবের বৃদ্ধি সাধন করে। সেই ঘূপ আপন অগ্রভাগে দ্যুলোককে স্পর্শ করে; অন্তরিক্ষকে মধ্যভাগের দ্বারা স্পর্শ করে এবং শেষভাগের দ্বারা পৃথিবীকে দৃঢ়রূপে নির্মাণ করে। সেই ঘূপ ধনদান এবং যজমানের গৃহে ধন ধারণের নিমিত্ত ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো৷
২১। ওষধি সমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বৰ্হি ইন্দ্রদেবের বৃদ্ধি সাধন করে। আপন স্থানের উপর সুখে স্থিত এবং ইন্দ্রের দ্বারা অধ্যাসিত বহি অপর বৰ্হি সমূহকে অভিভূত করে দিয়েছে। ধনদান তথা যজমানের গৃহে ধনকে ধারণের নিমিত্ত ঐ বৰ্হি ঘৃতপান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো।
২২। সুষ্ঠু যুজনকারী অগ্নিদেব ইন্দ্রদেবতার বৃদ্ধি সাধন করে। স্বিষ্টকৃৎ (অর্থাৎ শোভন ইষ্ট বা যজ্ঞকারী) সেই অগ্নি সুষ্ঠু যজন করে আমাদের অভষ্ট পূর্ণ করুক। ধনদান ও ধন ধারণের নিমিত্ত অগ্নি ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোত! তুমিও যজন করো ৷
২৩। আজ তবে এই যজমান অগ্নিকে হোতরূপে বরণ করেছেন। রন্ধন যোগ্য সামগ্রী সমূহকে রন্ধন করে, পুরোডাশ প্রস্তুত। করে এবং ইন্দ্রের নিমিত্ত ছাগকে বন্ধন করেছেন। এই বনস্পতি যুপদেবও ইন্দ্রের নিমিত্ত ছাগকে বন্ধন পূর্বক যজ্ঞস্থলে সুষ্ঠু উপস্থিত হয়েছে। ধারণ করেছে। অশ্বিনদ্বয় প্রভৃতি দেবগণ যজমানের দ্বারা প্রদত্ত পশু সমূহের মেদ হতে প্রারম্ভ পূর্বক সর্বাঙ্গ পর্যন্ত ভক্ষণ করেছে। পককৃত শেষ অবয়বগুলিকেও ভক্ষণ করেছে। সেই পুরোশের দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছে। হে অগ্নি! আজ আর্ষেয় (ঋষি সম্পর্কিত) রীতিতে হোতা তোমাকেই বরণ করেছে।
২৪। মহাযজ্ঞে সুসমিদ্ধ, সমিদ্ধ্যমান তথা বরণীয় অগ্নি ও অন্নদাতা ইন্দ্রকে দেবী হোতা যজন করুক। গায়ত্রী ছন্দ, দেড় বৎসর বয়স্ক গাভী এবং আয়ু দান করে প্রযাজদেবতার সাথে ইন্দ্র ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো।
২৫। দৈবী হোতা তনুনপাৎ অগ্নি এবং যজ্ঞফলের উদভেত্তা (অর্থাৎ প্রকটনকারী) সেই ইন্দ্রের যজন করুক, যে পবিত্র ও অনুধাতা (অর্থাৎ অন্নের বা আয়ুর ধারক) ইন্দ্রকে অদিতি দেবী গর্ভে ধারণ করেছিলেন। উষ্ণিক ছন্দ, শক্তি, দুই বর্ষ বয়স্ক গাভী এবং অন্নকে ইন্দ্রে ধারণ করে প্রজদেবতা ও ইন্দ্র ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোতা! তুমিও যজন করো।
২৬। দৈবী হোতা ইড়া প্রভৃতি দেবগণের স্তুতিযোগ্য, ঋষিসঙ্রে দ্বারা স্তুত, শিলার দ্বারা বৃত্রঘাতী, বলের দ্বারা সোমের সমান আহ্লাদক এবং অন্নধাতা ইন্দ্রের যজন করুক। ইন্দ্রে অনুষ্ঠুভ ছন্দ, শক্তি, আড়াই বৎসর বয়স্কা গাভী এবং আয়ু ধারণ পূর্বক প্রযাজ দেবতা ও ইন্দ্র ঘৃত পান করুক। হে মনুষ্য হোত! তুমিও যজন করো।
মন্ত্ৰার্থঃ— ১। হে জাতপ্রজ্ঞা অগ্নি! সমিদ্ধ বুদ্ধিসমূহের গর্ভ (রহস্য)-কে প্রকট করে, স্বাদিষ্ট ঘৃতকে দেবগণের মধ্যে পূর্ণ করে, বেগবান্ এবং দেবতাগণকে হবিঃ প্রাপনশীল তুমি দেবতাগণের প্রিয় যজ্ঞে দেবতাগণকে আনয়ন করো ৷
২। দেবযান পথকে জ্ঞাত হয়ে এবং ঘৃতের দ্বারা স্বকীয় অঙ্গকে আলিপ্ত করে অশ্ব, দেবগণকে প্রাপ্ত হোক। হে সূর্পণশীল অশ্ব! তোমাকে সকল কি সমূহের প্রাণীগণ সেবিত করুক। এই যজমানের নিমিত্ত তুমি অন্ন ধারিত করো।
৪। আমরা বিস্তৃত দৰ্ভাসনকে ঠিকমতো বিস্তৃত করছি। পৃথিবীর (অর্থাৎ বেদির) উপর বিস্তারের সাথে বিস্তৃত হয়ে থাকা, দেবগণের দ্বারা অধিষ্ঠিত দৰ্ভাসনকে সেবমানা ও সপ্রীতা অদিতি সুখময় করে। স্বর্গে ধারিত (স্থাপিত) করুক।
৫৷ সৌভাগ্যশালিনী, অনেক রূপ-সম্পন্ন, ঊর্ধ্বগমনশালী কপাট পক্ষের দ্বারা বিস্তাৰ্যমাণা, গমনশীলা, সমীচীনা, শব্দকারিণী এবং শোভায়মানা এই দ্বারদেবীগণ সুগমনা হোক।
৬। দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যে সঞ্চারণকারিণী, যজ্ঞের মুখ অগ্নিহোত্রের কাল জ্ঞাপনশালিনী, স্বর্ণালঙ্কৃতা এবং একে অপরের বিলোম (প্রতিরূপ) স্বরূপ হে উষা ও রাত্রি বা পত্নী ও যজমান! আমি তোমাদের এই স্থানে যজ্ঞের বেদির উপর স্থাপন করছি।
৭। প্রথমভাবী, সমান রথশালী, শুভ্র বর্ণশালী, সর্ব ভুবনকে দর্শনশালী, (হে যজমান ও যজমানপত্নী!) তোমাদের দুজনের কর্মের নির্মাণকারী, উপদেশের দ্বারা আহবনীয় জ্যোতিকে উপদিষ্ট করণশালী তথা দৈবী হোতা অগ্নি ও বায়ুকে আমি প্রীণিত করছি৷
৮। আদিত্যবর্গের সাথে ভারতী দেবী আমাদের যজ্ঞকে কামনা করুক। রুদ্রবর্গের সাথে সরস্বতী দেবী আমাদের রক্ষা করুক এবং বসুগণের সাথে আহ্বান প্রাপ্তা ইড়াদেবী প্রীতির সাথে আমাদের রক্ষা করুক। ঐ তিন দেবী আমাদের যজ্ঞকে অমর দেবগণের মধ্যে স্থাপিত করুক।
৯। ত্বষ্টা দেরগণের কামনানুসারে যোগ্য বীর পুত্র ইন্দ্রকে উৎপন্ন করেছিলেন। ব্যাপনশীল ও মরণবান্ অশ্ব ত্বষ্টার দ্বারাই উৎপন্ন হয়ে থাকে। ত্বষ্টা এই সম্পূর্ণ ভূবনকে উৎপন্ন করেছেন। হে হোতা! এই রকম বহু কিছুর উৎপাদক ত্বদেবতাকে তুমি এই যজ্ঞে যজন করো।
১০। অশ্ব নিজেকে নিজেই ঘৃতে আলিপ্ত করুক। সে যথাকালে হবিঃ হয়ে দেবগণের প্রাপ্ত হোক। দেবলোকে দেবগণের জ্ঞাতা বনস্পতি-নূপ অগ্নির দ্বারা অস্বাদিত (ভস্মীকৃত বা পৰ্কিত হয়ে যাওয়া) হবিঃ সমূহকে দেবলোকে বহন (বা উপস্থাপিত) করুক।
১১। প্রজাপতির তপস্যায় অভিবৃদ্ধি প্রাপ্ত, এবং সেইকালেই অরণি হতে উৎপন্ন হয়ে, হে অগ্নি! তুমি যজ্ঞকে ধারিত করে আছ। স্বাহাকার কৃত হবিঃর সাথে, হে পুরোগামী অগ্নি! তুমি দেবলোকে গমন করো। ও সাধ্যদেবতা হবিঃ ভক্ষণ করুক৷
১২। হে অশ্ব! সমুদ্র (অন্তরিক্ষ বা সাগর) হতে প্রকট হয়ে অথবা লৌকিক অশ্ব হতে উৎপন্ন হয়ে তুমি যে ক্রন্দন করেছিলে, তখন তোমার মহিমা স্তুতিযোগ্য হয়েছিল। হে অর্বন! তখন তুমি শ্যেনের পক্ষদ্বয় (অর্থাৎ শ্যেনপক্ষীর ন্যায় শীঘ্রতা) এবং হরিণের পদ ইত্যাদি (অর্থাৎ হরিণের ন্যায় শীঘ্রগামিতা) জয় (অর্জন) করেছিলে।
১৩। যমের দ্বারা প্রদত্ত এই অশ্বকে সর্বপ্রথম ত্রিত (তিন লোকে স্থিত বায়ু) যুক্ত করেছিল। ইন্দ্র সর্বপ্রথম এতে অধিষ্ঠিত হয়েছিল (অর্থাৎ আরোহণ করেছিল); বিশ্বাবসু গন্ধর্ব সর্বপ্রথম এর রশনা (অর্থাৎ লাগাম) ধারণ করেছিল। বসুগণ সূর্য হতে এই অশ্বকে গঠন করেছিল৷
১৪। হে অশ্ব! তুমি যম (বা যমস্বরূপ), তুমি আদিত্য (বা আদিত্যস্বরূপ)। হে অর্ব! তুমি আপন গুহ্য (অর্থাৎ গোপন) কর্মের দ্বারা ত্ৰিত অর্থাৎ (তিন স্থানে স্থিত ইন্দ্র)-স্বরূপ। হে অশ্ব! তুমি প্রতিজ্ঞার দ্বারা সোমের সাথে একীভূত হয়েছ। জ্ঞানী ব্যক্তিগণ বলে থাকেন–দেবলোকে ঋক্-যজুঃ ও সামরূপ তোমার তিনটি বন্ধন আছে৷
১৫। হে অশ্ব! বিজ্ঞজন বলে থাকনে–দ্যুলোকে তোমার তিনটি বন্ধন আছে; জলে কৃষি বৃষ্টি বীজ এই তিন বন্ধন; এবং অন্তরিক্ষের অন্দরে মেঘ-বিদ্যুৎ-অশনি এই তিন বন্ধন। হে অশ্ব! আরও, বরুণ নাকি তোমাকে প্রশংসিত করে থাকে। তারা তোমার পরম জন্মকথা বলে থাকেন।
১৬। হে অশ্ব! এই তোমার শোধক বেতের চড়াই (চাবুক) প্রভৃতি রয়েছে। এবং এই তোমার খুরের দ্বারা খননীয় স্থান। এই স্থানে আমি তোমার সেই মধ্যভাগের বন্ধন রঞ্জুকে দর্শন করতে পারছি, যা এই যজ্ঞে কল্যাণরূপ তোমার রক্ষাকারক।
১৭। হে অশ্ব! অন্তরিক্ষ পথের দ্বারা নীচ হতে সূর্যকে প্রাপ্ত হওয়া তোমার আত্মাকে আমি মনে মনে বহু দূর হতে দর্শন করছি। সুগমন এবং অধূলি পথে গমনশীল তুমি, তোমার শিরকে আমি গমন করতে দর্শন করছি।
১৮। হে অশ্ব! এই সূর্যমণ্ডলে অন্ন বা বর্ষাকে জয়েছু তোমাকে আমি উত্তম দেবস্বরূপ দর্শন করছি। যখন মনুষ্য তোমাকে খাদ্য ও পানীয় সমর্পণ করে, তখন ভ্রমণশীল তুমি ঘাস ইত্যাদি ওষধিগুলিকে ভক্ষণ করে থাকো।
১৯। হে অশ্ব! রথ, সেবক মনুষ্য ইত্যাদি, গাভী এবং কন্যাগণের সৌভাগ্য সূব তোমারই পশ্চাতে অনুবর্তন করে; (অর্থাৎ তোমার হওয়ার পরই সম্ভব হয়)। মনুষ্যগণের সঙঘ তোমারই মিত্রতা আকাঙ্ক্ষা করে। দেবতাগণও তোমার বীর্য ও বলের অনুমান করে; (অর্থাৎ প্রশংসা করে)।
২০। যে ইন্দ্র সুবর্ণময় কিরণসম্পন্ন এবং যে এই অশ্বের উপর সর্বপ্রথম আরোহণ করেছিল, সেই ইন্দ্রও মহিমার ক্ষেত্রে এই অশ্বের পশ্চাতে ছিল। এর পদসমূহ মনের ন্যায় বেগশীলা হয়ে থাকে। দেবতাগণ এই অশ্বের ভক্ষণীয় হবিঃ লাভের নিমিত্ত আকাঙিক্ষত হয়ে আগমন করে।
২১। সূর্যরথে প্রেরক অশ্বারোহীর সাথে। যুক্ত, সংকুচিত মধ্যভাগ, তীক্ষ্ণ বীরভাবশীলা, দিব্য এবং গমনশীল সপ্ত অশ্ব, হংসের ন্যায় পংক্তিবদ্ধ হয়ে যুদ্ধেরত হয়ে থাকে–যখন এই অশ্ব সুন্দর সংগ্রামকে প্রাপ্ত করে।
২২। হে অশ্ব! তোমার শরীর স্বভাবতঃই গমনশীল এবং তোমার মন বায়ুর সমান গতিশীল। অনেক স্থানে অধিষ্ঠিত (অর্থাৎ বিদ্যুতে, চন্দ্রে, সূর্যে, অগ্নিতে ব্যাপ্ত) তোমার জ্যোতিঃসমূহ অরণ্যে বিকশিত হয়ে (দাবাগ্নিরূপে) সঞ্চরণ করছে৷
২৩৷ দেবগামী মনের দ্বারা ধ্যানকারী বেগবান্ অশ্ব বিশসন স্থানের উপর আগত হয়েছে। একটি ছাগ এর অগ্রভাবে ও একটি ছাগ এর পশ্চাতে পশ্চাতে বাধ্যভূমিতে আনীত হচ্ছে। তার পর এগুলির পশ্চাতে স্তুতিকর্তা ঋত্বিকগণ গমন করছে৷
২৪। আপন মাতা-পিতার অভিমুখে যে পরম স্থান স্বর্গ আছে–সেখানে অশ্ব উপস্থিত হয়েছে। অত্যন্ত রুচিকর হবিঃস্বরূপ অশ্ব আজ দেবতাগণের সন্নিকটে গমন করেছে। এক্ষণে সে হবিদাতা যজমানের নিমিত্ত বরণীয় ধন ইত্যাদির কামনা করছে৷
২৫। হে উৎপন্নজ্ঞান (জাবেদা) অগ্নি! যজমানের যজ্ঞগৃহে সমিদ্ধ আজ দেবগণের যজন করছ। হে মিত্রকে মান দানকারী অগ্নি! তুমি কবি (ক্রান্তদর্শী) ও প্রকৃষ্ট চিত্তশালী (উদার আশয়)। তুমি দেবগণকে যজ্ঞে আনীত করো ৷
২৬। হে জলের পৌত্র (অগ্নি)! হে শুভ জিহ্বাশালী অগ্নি! যজ্ঞের দেবযানরূপ গমনপথকে হবিঃর ঘৃতের দ্বারা আলিপ্ত করে, আপন প্রজাগণ বা কর্মসমূহের দ্বারা স্তোত্রগুলি তথা যজ্ঞকে সমৃদ্ধ করে তুমি আমাদের এই যজ্ঞকে দেবপ্রাপ্ত করো।
২৭। এই দেবগণের মধ্যে এই ঋত্বিকবৃন্দের দ্বারা প্রশংসনীয় তথা যজ্ঞের দ্বারা যজনীয় অগ্নির মহিমাকে আমরা সংস্তুত করছি। শুভ কর্ম, পবিত্র ও যজ্ঞকে ধারণকর্তা যে দেব সোম ও অগ্নি আছে–তারা দুজন হবিঃ সেবন করছে৷
২৮। স্ততিযোগ্য ও বন্দনীয় হে অগ্নি! হোমকৃত হয়ে তুমি বসুগণের সাথে সমান প্রীতির সাথে যজ্ঞে আগমন করো। মহান্ তুমি, তুমি দেবগণের আহ্বতা। অত্যন্ত যজনীয় বা যজনকারী তুমি প্রেরিত হয়ে এই দেবগণের যজন করো।
২৯। হে অগ্নি! দিবসের অগ্রভাগে শ্রুতি বাক্যানুসারে বেদিকে আচ্ছাদিত করার নিমিত্ত পূর্বগামী বৰ্হি (কুশ) বিস্তৃত করা হয়। পবিত্র হতে পবিত্র এবং সুখকরী বৰ্হি (কুশ) দেববর্গ অদিতির নিমিত্ত বিস্তৃত করে বিছিয়ে দেওয়া হয়।
৩০। সাবকাশা, বৃহৎ-দেহিনী এবং সুশোভিতা দ্বারদেবীগণ পূর্ণরূপে বিস্তৃত হয়ে প্রকাশিত হোক–যেমন জায়াসমূহ আপন পতিগণের নিমিত্ত নিজ নিজ জঙ্ঘা প্রকাশিত (বা উন্মুক্ত) করে। মহতী তথা সর্বগম বা দ্বারদেবীগণ দেবগণের নিমিত্ত আজ সুপ্রবেশা (শুভভাবে ভিতরে প্রবিষ্টা) হোক।
২। সবিতাদেবের বরণীয় সেই তেজকে আমরা ধারণ করছি, যে সবিতাদেব আমাদের বুদ্ধি ও কর্মসকলকে প্রেরিত করে।
৩। হে সবিতাদেব! তুমি আমাদের সমস্ত দুগুণ (দোষ বা পাপ) দূর করে দাও। যা শুভ গুণ, তা আমাদের প্রাপ্ত করাও ৷
৪৷ বিবিধ ধন। দানশালী এবং মনুষ্যকে যথার্থ রূপে দর্শনশালী সবিতা দেবতাকে আমরা আহবান করছি।
৫। [এবার। পুরুষমেধ যজ্ঞ সম্পর্কে বলা হচ্ছে–ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে প্রিয় ব্রাহ্মণ পুরুষকে, ক্ষত্রিয়ের নিমিত্ত ক্ষত্রিয়কে, মরুবৃন্দের নিমিত্ত বৈশ্যকে, তপঃ দেবতার নিমিত্ত শূদ্রকে, অন্ধকারের অধিষ্ঠাত্ দেবতার উদ্দেশ্যে তস্করকে, নরকের অভিমানী দেবতার উদ্দেশ্যে নষ্টাগ্নিকে (অর্থাৎ শূরকে), পাপের অধিষ্ঠাতা দেবতার নিমিত্ত নপুংসককে, আক্রয় নাম দেবতার উদ্দেশ্যে লৌহমধ্যে গমনকারী পুরুষকে, কামদেবতার উদ্দেশ্যে ব্যাভচারিণী নারীকে, অতিকৃষ্ট নামক দেবতার উদ্দেশ্যে মগধদেশজ ক্ষত্রিয় অথবা বৈশ্যপুরুষকে যুপে বন্ধন করছি।
৬৷ নৃত্যের নিমিত্ত সূতকে (সূতজাতীয় পুরুষকে), গীতের উদ্দেশ্যে শৈলুষ অর্থাৎ নটকে, ধর্মের নিমিত্ত সভাচারী পুরুষকে, নরিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ভয়ঙ্কর পুরুষকে, নর্মদেবতার উদ্দেশ্যে শব্দকারী বাঁচালকে, হাস্যে সেবক বা ভৃত্যকে, আনন্দের নিমিত্ত স্ত্রীলোকর মিত্র বা সখাকে, প্রমদের নিমিত্ত কানীন বা কুমারীপুত্রকে, মেধার উদ্দেশ্যে মাহিষ্য-কুলজাত রথকারকে, ধৈর্য্যের নিমিত্ত তক্ষা অর্থাৎ সূত্রধরকে শূপে বন্ধন করছি।
৭। তপের নিমিত্ত কুলাল অর্থাৎ কুম্ভকারের অপত্যকে, মায়ার উদ্দেশ্যে লৌহকার বা কামারকে, রূপের নিমিত্ত মণিকারকে, শুভের উদ্দেশে বীজবপনকারীকে, শরব্যার নিমিত্ত ইষুকার বা বাণ নির্মাতাকে, হেতির উদ্দেশ্যে ধনুয-নির্মাতাকে, কর্মের নিমিত্ত জ্যা-নির্মাতাকে, দিষ্টের উদ্দেশে রঞ্জুকারকে, মৃত্যুর নিমিত্ত ব্যাধকে এবং যমের (অর্থাৎ অন্তকের) উদ্দেশ্যে কুকুরের দ্বারা শিকার ধারণকারীকে শূপে বন্ধন করছি।
৮। নদীর উদ্দেশ্যে পুল্কসের অপত্যকে, ঋক্ষিকার (বা ভল্লুকের) নিমিত্ত নিষাদপুত্রকে, পুরুষ ব্যাঘ্রের উদ্দেশ্যে দুর্ধর্ষ উন্মুত্তকে, গন্ধর্ব-অপ্সরাদের নিমিত্ত ব্রাত্যকে (অর্থাৎ সাবিত্রীপতিতকে), প্রযুগগণের উদ্দেশ্যে উন্মত্ত জনকে, সর্পদেবজনের নিমিত্ত পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ পুরুষকে, অয়ের উদ্দেশে কিতবকে (অর্থাৎ জুয়ারীকে), ঈর্যতার নিমিত্ত অকিতব জনকে, পিশাচগণের উদ্দেশে বিদলকারী বা বংশবিদারিণীকে, এবং যাতুনের নিমিত্ত কণ্টকীকারী বা কণ্টকীকর্মকারী জনকে যূপবদ্ধ করছি।
৯। সন্ধির নিমিত্ত জার বা কোন নারীর উপপতিকে, গেহের উদ্দেশ্যে ব্যভিচারী জনকে, আর্তির নিমিত্ত পরিবিত্তিকে (অর্থাৎ বিবাহিত কনিষ্ঠের অবিবাহিত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে), নিঋতির নিমিত্ত জ্যেষ্ঠের বিবাহ না হওয়া সত্ত্বেও বিবাহিত কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে, অপরাধ্যার (বা আরাধ্যদেবদ্বয়ের) উদ্দেশ অবিবাহিতা জ্যেষ্ঠা কন্যাকে ত্যাগ করে তার কনিষ্ঠা ভগ্নীকে বিবাহকারী পতিকে, নিষ্কৃতির নিমিত্ত রূপকরী অর্থাৎ রূপকর্মকারী জনকে, সংজ্ঞানের উদ্দেশ্যে স্মরকারী অর্থাৎ কামদীপ্তিকরী জনকে, প্রকামোদ্যত দেবের নিমিত্ত উপসদকে বন্ধন করছি। (এইসব পুরুষকে অগ্নিষ্ট শূপে বন্ধনীয়। অপর দ্বিতীয় যুপে) বর্ণের নিমিত্ত অনুরুধ্য পুরুষকে এবং বলের উদ্দেশ্যে উপদা (উৎকোচ গ্রহণকারী) পুরুষকে ঘূপবদ্ধ করছি।
১০। উৎসাদসমূহের নিমিত্ত কুজ বা বক্রাঙ্গশালী পুরুষকে, প্রমুদের উদ্দেশ্যে বামনাকৃতি সম্পন্ন পুরুষকে, দ্বারের নিমিত্ত সর্বদা জলক্লিন্ননেত্রশালী পুরুষকে, স্বপ্নের নিমিত্ত অন্ধপুরুষকে, অধর্মের নিমিত্ত বধির অর্থাৎ কর্ণেন্দ্রিয়হীন পুরুষকে, পবিত্রের উদ্দেশে বৈদ্যকে, প্রজ্ঞানের নিমিত্ত জ্যোতিষীকে, অশিক্ষার উদ্দেশে শকুন ইত্যাদি অর্থাৎ জ্যোতিষ সম্পর্কিত প্রশ্নকারীকে, উপশিক্ষার নিমিত্ত অভিপ্রশ্নকর্তাকে (অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রশ্নকারীকে) শূপে বদ্ধ করছি।
১১। অর্মের (বা নেত্রের) নিমিত্ত হস্তীপালককে, জবের (বা রোগের) উদ্দেশে অশ্বপালককে, পুষ্টির নিমিত্ত গোপালনকারীকে, বীর্যের উদ্দেশ্যে মেষপালককে, তেজের নিমিত্ত ছাগপালককে, ইরার উদ্দেশ্যে কর্ষণকারীকে (কৃষককে), কালীলের নিমিত্ত সুরাকার অর্থাৎ মদ্যপ্রস্তুতকারীকে, ভদ্রের নিমিত্ত গৃহপালককে, শ্রেয়ের নিমিত্ত মহাজনকে এবং আধ্যক্ষের উদ্দেশে অনুক্ষন্তা অর্থাৎ সারথির অনুসারী জনকে শূপে বন্ধন করছি।
১২। ভারের উদ্দেশে কাষ্ঠহর্তাকে অর্থাৎ কুঠারিয়াকে, প্রভার নিমিত্ত অগ্নিবর্ধককে, সূর্যলোকের উদ্দেশে অভিষেক্তাকে, শ্রেষ্ঠ স্বর্গের নিমিত্ত পরিবেষণকর্তাকে, দেবলোকের নিমিত্ত পেশিতাকে অর্থাৎ প্রতিমা ইত্যাদি নির্মাণকারীকে, মনুষ্যলোকের উদ্দেশে প্রকরিতাকে (অর্থাৎ বিক্ষেপকারীকে), সকল লোকের নিমিত্ত উপসেক্তাকে, অবঋতিবধের উদ্দেশে উপমন্থনকারীকে, মেধার নিমিত্ত রজককে এবং প্রকামের উদ্দেশ্যে বস্ত্র রঞ্জনকারিণীকে যুপে বন্ধন করছি।
১৩। ঋতির উদ্দেশ্যে স্তেনহৃদয় অর্থাৎ চৌর্যসম্পন্ন চিত্তশালী জনকে, বৈরহত্যার নিমিত্ত পিশুনকে, বিবিক্তির নিমিত্ত প্রতীহারকে, ঔপদ্রষ্ট্যার উদ্দেশ্যে প্রতীহারের সেবককে, বলের উদ্দেশ্যে অনুচরকে, ভূমার নিমিত্ত পরিষ্কন্দকে, প্রিয়ের নিমিত্ত প্রিয়বাদীকে, অরিষ্টির উদ্দেশে অশ্বারোহীকে, স্বর্গলোকের উদ্দেশ্যে ভাগদুধকে অর্থাৎ বিভাগকারীকে, এবং বর্ষিষ্ঠায়নকের উদ্দেশে পরিবেষ্ঠাকে শূপে বন্ধন করছি।
১৫। যমের উদ্দেশে যুগ্মপ্রসবিত্রী অর্থাৎ যমজ সন্তানের প্রসবকারিণীকে, অথর্বের নিমিত্ত অবতোকা বা নিরপত্যা অর্থাৎ নষ্ট-সন্তানশালিনী নারীকে, সম্বৎসরের নিমিত্ত পৰ্যায়িণীকে অর্থাৎ অনুক্রমে, প্রজ্ঞাশালিনীকে, পরিবৎসরের উদ্দেশে অবিজাতাকে অর্থাৎ অপ্রসূতাকে, ইদাবৎসরের নিমিত্ত কুলটা নারীকে, ইদবৎসরের উদ্দেশে প্রদররোগিণীকে, বৎসরের নিমিত্ত শিথিল অঙ্গশালিনীকে, সম্বৎসরের উদ্দেশে শ্বেতকেশা রমণীকে, ঋতুসমূহের নিমিত্ত চর্ম-সন্ধানকারী জনকে এবং সাধ্যগণের উদ্দেশে চর্মকারকে (অর্থাৎ মুচিকে) শূপে বদ্ধ করছি।
১৬। সরোবরের নিমিত্ত ধীবরকে, উপস্থাবরগণের নিমিত্ত দাতাকে, বৈশন্তগণের উদ্দেশে নিষাদের পুত্রকে, নলের নিমিত্ত মৎস্যজীবীকে, পারের উদ্দেশে মার্গার অর্থাৎ মৃগশিশুকে, অবারের নিমিত্ত কৈবর্ত জনকে, তীর্থের উদ্দেশে আন্দ অর্থাৎ বন্ধকর্তাকে, বিষমের নিমিত্ত মৈনাল অর্থাৎ মীন বা মৎস্যজীবীর পুত্রকে, স্বনের উদ্দেশে পর্ণক অর্থাৎ ভিল্লকে, গুহার নিমিত্ত কিরাতকে, সানুসমূহের উদ্দেশে জম্ভক অর্থাৎ হিংসককে এবং পর্বত সমূহের নিমিত্ত কিম্পুরুষকে (বা কুৎসিত জনকে) যূপবদ্ধ করছি।
১৭। বীভৎসের নিমিত্ত পৌল্কস বা পুল্কসের পুত্রকে, বর্ণের উদ্দেশে হিরণ্যকারকে, তুলার নিমিত্ত বণিপুত্রকে পশ্চাদোষার উদ্দেশ্যে গ্লাবিন অর্থাৎ অহৃষ্ট বা অসন্তুষ্ট জনকে, সকল প্রাণীর নিমিত্ত সিল অর্থাৎ ছুলিরোগাক্রান্তকে, ভূতির নিমিত্ত জাগ্রত জনকে, অভূতির উদ্দেশে স্বপ্নালু (অর্থাৎ নিদ্রামগ্ন) জনকে, আর্তির উদ্দেশে জনবাদী জনকে, ব্যর্ধির নিমিত্ত অপগম্ভকে এবং সংশরের উদ্দেশে প্রচ্ছেদনকর্তাকে যুপে বন্ধন করছি৷
১৮। অক্ষরাজের নিমিত্ত কিতব অর্থাৎ ধূর্ত জনকে, কৃতের নিমিত্ত দোষদর্শনকারী জনকে, ত্রেতার উদ্দেশ্যে কল্পককে, দ্বাপরের নিমিত্ত অধিক কল্পনাকর্তাকে, আস্কন্দের উদ্দেশে সভাস্থানু অর্থাৎ সভায় স্থিরভাবে অবস্থানকারী জনকে, মৃত্যুর নিমিত্ত গোব্যচ্ছ অর্থাৎ গরুর প্রতি গমনশীলকে, অন্তকের উদ্দেশে গো-ঘাতককে, ক্ষুধার নিমিত্ত গোমাংসযাচককে বা গোমাংসের দ্বারা জীবিকানির্বাহকারীর নিকট ভিক্ষাগ্রহণকারীকে, দুষ্কৃতের নিমিত্ত চরকাঁচার্য অর্থাৎ চরকগণের গুরুকে এবং পাপের নিমিত্ত সৈলগ অর্থাৎ দুষ্টের পুত্রকে শূপে বন্ধন করছি।
১৯। প্রতিশ্রুৎকার নিমিত্ত অর্তন অর্থাৎ দুঃখীজনকে, ঘোষের উদ্দেশ্যে ভষ অর্থাৎ জল্পক বা বাঁচালকে, অন্তের নিমিত্ত বহুবাদী জনকে, অনন্তের নিমিত্ত মূককে, শব্দের উদ্দেশে কোলাহলকারীকে, মহের নিমিত্ত বীণাবাদনকারীকে, ক্রোশের উদ্দেশ্যে তুণব বাদ্যবিশেষ বা বংশী বাদনকারীকে, অবরস্পরের নিমিত্ত শঙ্খবাদককে, বনে উদ্দেশে বনপালককে এবং অরণ্যশেষের উদ্দেশে দাবপালকে অর্থাৎ বনবহ্নির পালককে শূপে বন্ধন করছি৷
২০। নর্মের নিমিত্ত পুংশ্চলীকে অর্থাৎ ব্যভিচারিণী বা দুষ্টা রমণীকে; হাস্যের উদ্দেশে করণশীল বা চারককে; যাদসের নিমিত্ত শাবলীকে অর্থাৎ কবুরবর্ণের অপত্যভূতা স্ত্রীলোককে; মহাসের উদ্দেশে গ্রামের নেতা, জ্যোতির্বিদ ও নিন্দককে; নৃত্যের নিমিত্ত তান্ অর্থাৎ বীণাবাদক, পাণিগ্ন অর্থাৎ হস্তের দ্বারা তালবাদক, তৃণবঋ নামক বাদ্যের বাদককে এবং আনন্দের উদ্দেশে মুখের দ্বারা বাদ্যবাদককে শূপে বন্ধন করছি।
মন্ত্ৰার্থঃ– ১।পরমাত্মা সহস্র শির, সহস্র চক্ষু ও সহস্র পাদশালী (অর্থাৎ শির, চক্ষু ও পাদ–সবই তার সংখ্যাতীত)। তিনি সকল দিকের ভূমি (অর্থাৎ জগৎপ্রপঞ্চ)-কে স্পর্শ করেও (বা প্রাপ্ত করেও) জগৎ-বিকারের দ্বারা দশ অঙ্গুলী পরিমিত হৃদয়স্থানে অন্তর্যামী পুরুষরূপে স্থিত হয়ে আছেন।
২। এই সবই সেই পুরুষ; যা হয়ে গিয়েছে (ভূত) এবং যা হবে, তা সবই তিনি। তিনি সেই অমৃতত্বেরও স্বামী (অর্থাৎ অমর দেবগণেরও স্বামী) তিনি সেই অন্নেরও স্বামী যে অন্নের দ্বারা বৃদ্ধিকে প্রাপ্ত করা হয়; (তিনি সেই জীবেরও স্বামী এবং জীবের শরীরেরও অধিপতি)।
৩। অতীত-অনাগত-বর্তমান সকল কালের ও সকল জগতের মধ্যে এই পুরুষের মহিমা এতই এবং সেই পুরুষ এর অপেক্ষাও অধিক। এই সমস্ত ভূতজাত (প্রাণী) এঁর চতুর্থ অংশ মাত্র। এঁর অবশিষ্ট তিন চতুর্থাংশই অমৃতস্বরূপ এবং তা দ্যুলোকে (অর্থাৎ দ্যোতনাত্মক) স্বপ্রকাশে অবস্থিত।
৪। তিন-চতুর্থ পুরুষ (বা ত্রিপাদ পুরুষ) উর্ধ্বে গত হয়েছেন (অর্থাৎ অধিকারী অবস্থা প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছেন) এবং পুনরায় এঁর চতুর্থংশ মাত্র এই ব্রহ্মাণ্ডে পঞ্চরূপে পরিণত হয়েছেন; আপন সেই পূর্ণাবস্থায় সেই পরমাত্মা আপন চতুর্থাংশের দ্বারা সর্বত্র জীব-ভোক্তাভাবে পরিব্যপ্ত, হয়েছেন।
৫। সেই পরমাত্মা পুরুষ হতে বিরাট উৎপন্ন হয়েছেন। বিরাজ হতে পুরুষ। সেই উৎপন্ন পুরুষ শিথিল-রিক্ত হয়ে গিয়েছেন (অর্থাৎ দেবতা, মনুষ্য, তির্যক ইত্যাদি হয়েছেন। তারপর তিনি ভূমি ও লোকসমূহ সৃষ্টি করেছেন।
৬। সেই সর্বহোম স্বরূপ যজ্ঞপুরুষ হতে এই খাদ্য-পেয় (আজ) পূর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি সেই বায়ু (অর্থাৎ গতি) প্রধান গ্রাম্য অথবা আরণ্য পশুগণকেও উৎপন্ন করেছেন৷
৭। সেই সর্বহুত যজ্ঞপুরুষ হতে ঋক্গুলি ও সমাগান উৎপন্ন হয়েছে। গায়ত্রী প্রভৃতি ছন্দরাশি তা হতেই উৎপন্ন হয়েছে এবং যজুর্বেদও তা হতে উৎপন্ন হয়েছে।
৮। সেই যজ্ঞ হতে অশ্ব উৎপন্ন হয়েছে, সেই সাথেই যা কিছু উভদন্ত (উপর ও নীচের পাটিতে দন্তশালী) গদর্ভ ইত্যাদি উৎপন্ন হয়েছে। গেসমূহ তা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। তা হতেই ছাগ ও মেষ উৎপন্ন হয়েছে।
৯। সৃষ্টির পূর্বে প্রথম উৎপন্ন সেই পুরুষকে যজ্ঞের নিমিত্ত দর্ভের দ্বারা প্রেক্ষিত করা হয়েছিল। যজ্ঞের সাধনরূপ সেই পুরুষের দ্বারা সাধ্য দেবগণ, প্রজাপতি প্রভৃতি এবং মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিগণ যজন করেছিলেন।
১০। ঋষিগণ যে পুরুষকে কল্পনা করেছিলেন, কি রকম কিংবা কত প্রকার সেই পুরুষ? তার মুখ কি ছিল? বাহুদ্বয় কেমন ছিল? কেমন তার জঙ্ঘাদ্বয় ছিল? এবং কেমনই বা ছিল তার পাদদ্বয়?
১১। ব্রাহ্মণগণ ছিল তার মুখমণ্ডল (বা তার মুখমণ্ডল হতে ব্রাহ্মণগণ উৎপন্ন হয়েছিল)। ক্ষত্রিয় ছিল তাঁর দুই বাহু (অর্থাৎ তার বাহুদ্বয় হতে রাজন্যগণ উৎপন্ন হয়েছিল)। তার দুটি জঙ্ ছিল বৈশ্ববৰ্গ (অর্থাৎ তার জঙ্ঘাদ্বয় হতে বৈশ্বগণ উৎপন্ন হয়েছিল)। তার পাদদ্বয় ছিল শূদ্রসমূহ (অর্থাৎ তার পাদদ্বয় হতে শূদ্রগণ উৎপন্ন হয়েছিল)। [আধুনিক কোন কোন সমালোচক এই ব্যাপারটি থেকে এইরকম সিদ্ধান্ত করেন যে, পরমব্রহ্মের মুখমণ্ডল থেকে ব্রাহ্মণের সৃষ্টি ইত্যাদি বর্ণনার ছলে বর্ণাশ্রমের এই ব্যাখ্যা থেকেই নাকি প্রমাণিত হয় যে, শরীরের নিকৃষ্ট (অধস্থ) অঙ্গ থেকে উৎপন্ন শূদ্রগণ তথাকথিত ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্যগণ অপেক্ষা নিকৃষ্ট। কিন্তু একটু ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এই মন্ত্রের দ্বারাই শূদ্রগণের মহত্ব প্রমাণিত হয়। এই সংসার যেন সেই পরম পুরুষের বিরাট অবয়ব। এই সংসাররূপ দেহের সকল ভারকে বহন, সেই দেহকে চালনা প্রভৃতি কর্ম একমাত্র পাদদ্বয়েই সাধিত হয়। সুতরাংশূদ্রগণ পাদদ্বয়ে সৃষ্ট হওয়ায় তাদের নিকৃষ্টতা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতাই প্রমাণিত হয়]
১২। চন্দ্রমা সেই পুরুষের মন হতে উৎপন্ন হয়েছিল। তার চক্ষু হতে সূর্যের সৃষ্টি। সেই পরম পুরুষের শ্রোত্র হতে বায়ু ও প্রাণ উৎপন্ন হয়েছিল। তার মুখবিবর হতে উৎপন্ন হয়েছিল অগ্নি৷
১৩। সেই বিরাট পুরুষের নাভি হতে অন্তরিক্ষ উৎপন্ন হয়েছিল। তার শির হতে দ্যুলোক (অর্থাৎ স্বর্গ) উৎপন্ন হয়েছিল। সেই প্রজাপতির পাদদ্বয় হতে ভূমি ও শ্রোত্র হতে দিসমূহ সৃষ্টি হয়েছিল। এইরকমেই লোকসকল কল্পিত করা হয়েছিল।
১৪৷ যখন পুরুষরূপী হবিঃ হতে দেবগণ যজ্ঞকে (বা সৃষ্টিকে) বিস্তারিত করেছিলেন, তখন বসন্ত এই যজ্ঞের ঘৃত ছিল; গ্রীষ্ম ইন্ধন এবং শরৎ ঋতু হবিঃ ছিল।
১৫৷ এই যজ্ঞের সাতটি (গায়ত্রী ছন্দ ইত্যাদি) পরিধি এবং ত্রি-সপ্ত অর্থাৎ একুশটি (অতিজগতী ইত্যাদি) সমিধ ছিল; যখন দেবগণ যজ্ঞের বিস্তার করে প্রজাপতি পুরুষকেই আলস্ত্য পশুরূপে বন্ধন করেছিল।
১৬। দেবগণ মানস যজ্ঞের দ্বারাই যজ্ঞপুরুষের যজন করেছিল। পরন্তু পূর্বকালে জগৎস্বরূপ বিকারের ধারক ধর্মগুলি প্রধানভূত হয়ে উঠেছিল। সেই মহিমাবান্ ঋষিসঙঘ যজনের দ্বারা স্বর্গ লাভ করেছিলেন, যেস্থানে পূর্ব-সাধ্য এবং দেবতাগণ বাস করে থাকেন।
১৭। জল হতে সংগৃহীত, পৃথিবীর দ্বারা পুষ্ট ও বিশ্বকর্মা যে রস হতে হিরণ্যগর্ভ পুরুষকে সর্বপ্রথম উৎপন্ন করে, ত্বষ্টা তার রূপকে নির্ধারিত করেছিল। সেই পূর্বকালে মরণধর্মাকে আজানদেবত্ব (অর্থাৎ জন্মতঃ বা মুখ্য দেবত্ব) করেছে; (অর্থাৎ সেই রসের দ্বারা ধারিত রূপসম্পন্ন হয়ে সেই হিরণ্যগর্ভ পুরুষই প্রতিদিন উদয় লাভ করে–এটাই মনুষ্যের মুখ্য দেবত্ব)
১৮। অন্ধকারের পরপারে স্থিত সেই মহান পরম পুরুষকে ও আদিত্যস্বরূপ জ্যোতির্ময়কে আমি জ্ঞাত আছি। তাঁকে জ্ঞাত হয়েই যে কেউও মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারে; এর দ্বিতীয় কোন পন্থা নেই।
১৯। প্রজাপতিই গর্ভের অন্দরে উৎপন্ন হয়ে গতিময় বা বিচরণশীল হয়ে থাকেন। তার উৎপত্তি বা মূল সত্তাকে তো ব্রহ্মবিদ বুদ্ধিমান্ জনই পরিতঃ (সর্বতোভাবে) দর্শন করে থাকে৷
২০। যিনি দেবগণের নিমিত্ত প্রকাশমান, যিনি দেবগণের পুরোহিত, দেবতাগণের পূর্বে যিনি উৎপন্ন হয়েছিলেন, সেই ব্রহ্মতেজের (বা আদিত্য দেবের) উদ্দেশে সর্বদা নমস্কার করি ৷
২১। আদিত্যরূপী ব্রহ্মতেজকে উৎপন্ন করে পূর্বকালে দেবগণ তাকে বলেছিলেন যে ব্রাহ্মণ পরমাত্মাকে এই প্রকার ব্রহ্মতেজের রূপে জ্ঞাত হবে, দেবগণ তার (অর্থাৎ সেই জ্ঞানী ব্রাহ্মণের) বশীভূত হবে৷
২২। হে পরমপুরুষ (আদিত্য)! শ্ৰী এবং লক্ষ্মী (সর্বজনশ্রয়ণী সম্পদ ও সর্বজনলক্ষ্যিতা সৌন্দর্য) তোমার দুই পত্নী। অহোরাত্র তোমার দুই কক্ষ বা পার্শ্বস্থানীয়। নক্ষত্রসমূহ তোমার রূপ। অশ্বিদ্বয় তোমার বিস্তৃত মুখ। হে ভগবান্! ইচ্ছাপূৰ্ব্বক তুমি আমাকে আপনরূপে ইচ্ছা করো; (অর্থাৎ আপন করে লও)। এই পরলোককে আমার নিমিত্ত ইচ্ছা করো এবং সর্বলোককে আমার নিমিত্ত ইচ্ছা করো; (অর্থাৎ পরলোক যেন আমার ইষ্টপ্রদ হয় এবং আমি যেন সর্বালোকাত্মক হতে পারি)।
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ১
মন্ত্রঃ– তদেবাগ্নিস্তাদাদিত্যস্তদ্ধায়ুস্তদু চন্দ্রামাঃ। তবে শুক্রং তদ্ৰহ্ম তা আপঃ স প্রজা পতিঃ ১।
মন্ত্ৰার্থঃ– ১। [সর্বমেধের মন্ত্রগুলির বিধান এখান থেকেই প্রারম্ভ হচ্ছে] এই পরমাত্মা পুরুষই অগ্নি; তিনিই আদিত); তিনিই বায়ু; তিনিই চন্দ্রমা; তিনি বীর্য; তিনিই ব্রহ্ম বা শব্দব্রহ্ম (ত্রয়ী লক্ষণ); তিনিই আপঃ (জল); এবং তিনিই প্রজাপতি।
২। সেই বিদ্যোতমান পুরুষ হতেই সকল কাল-অবয়ব-নিমেষ-বর্ষা ইত্যাদি উৎপন্ন হয়েছে। এই পরম পুরুষকে আজ পর্যন্ত কেউই উদ্ধে, মধ্যে বা চতুর্দিকে অনুসন্ধান করেও ধরতে পারেনি (তিনি সর্বথা অপার অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ইত্যাদির বিষয়ীভূত নন)।
৩। সেই পরমাত্মার সূর্য ইত্যাদি অন্য কোনই উপমানও নেই (অর্থাৎ তার সাথে তুলনা করার মতো কিছুই নেই–যে পরমাত্মার নাম মহাযশ। সেই হিরণ্যগর্ভইত্যাদি, এই চারি মন্ত্র। তিনি যেন আমাদের না হনন করেন–ইত্যাদি অপর একটি মন্ত্র। যাঁর অপেক্ষা বৃহৎ কেউ উৎপন্ন হয়নি–ইত্যাদি এবং তিনি সম্রাট–ইত্যাদি এই দুটি মন্ত্রও এই ব্রহ্মেরই প্রতিপাদক। এগুলির পাঠ জপ ব্রহ্মযজ্ঞে করা উচিত)৷
৪। এই পরমাত্মাদেব সম্পূর্ণ দিসমূহকে ব্যাপ্ত করে স্থিত আছেন। তিনিই সর্বপ্রথম উৎপন্ন হয়েছিলেন, এবং তিনিই উৎপন্নশীল সর্ব-প্রপঞ্চ। হে মনুষ্যগণ! এই পরমাত্মা সকলের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে স্থিত হয়ে থাকেন। ইনি সর্বত্রই মুখ ইত্যাদি অবয়বশালী৷
৫। তার পূর্বে কিছুই উৎপন্ন হয়নি–তিনি স্বয়ং সর্বভূতময় হয়ে আছেন। সেই প্রজাপতি পরমাত্মা আপন জীবপ্রজার সাথে সম্যক রমমাণ হয়ে অগ্নি, বায়ু ও আদিত্য এই তিন জ্যোতিকে নির্মাণ করে থাকেন এবং তাদের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে থাকেন। সেই পরমাত্মাই ষোড়শ অবয়বশালী ষোড়শী।
৬। যে পরমাত্মার দ্বারা এই উগ্রস্বভাব দ্যুলোক (আদিত্য প্রভৃতি) ধারিত হয়েছে, এবং এই পৃথিবী যার দ্বারা দৃঢ়ীকৃত হয়ে স্থির হয়ে রয়েছে, সে পরমাত্মার দ্বারা স্বর্গলোক স্তব্ধ হয়ে আছে, এবং যাঁর দ্বারা বৈকুণ্ঠলোকও আধারিত হয়ে আছে, যিনি অন্তরিক্ষে জল বা রজোকণার দ্বারা নক্ষত্র ইত্যাদিকে নির্মাণ করেন এবং তাদের ধারণকারী হয়ে থাকেন, সেই সর্বশক্তিমানের উদ্দেশ্যে হবিঃ সমর্পণ পূর্বক পরিচরণ করছি৷
৭। এই ক্রন্দনশীলা দ্যাবাপৃথিবী বৃষ্টি-অন্ন ইত্যাদির দ্বারা জগৎকে স্তম্ভিত করণশালিনী হয়েও মনে মনে কম্পিত হয়, আপন রক্ষার নিমিত্তে যে পরমাত্মা পুরুষের মুখপানে প্রতীক্ষিত হয়ে থাকে, যাঁতেই উদয় হয়ে এই সূর্য প্রকাশমান হয়, সেই প্রজাপতি দেবের উদ্দেশ্যে আমরা হবিঃ সমর্পণ পূর্বক পরিচরণ করছি। (এরপর–মহতী আপঃ যখন বিশ্বকে গর্ভে ধারণ করেছিল এবং যিনি আপঃ অর্থাৎ জলকে ইত্যাদি মন্ত্র ও পাঠ করা উচিত)।
৮। বিদ্বান্ পুরুষ সেই পরমাত্মাকে আপন বুদ্ধিতেই প্রতিষ্ঠিত দর্শন করে থাকে। সেই পরমাত্মায় এই সর্ব সত্যপ্রপঞ্চ সংকুচিত হয়ে সমানা হয়ে যায়। সেই পরমাত্ম পুরুষে এই চরাচর জগৎ গতিশীল হয়ে থাকে। ইনিই সকলের মধ্যে ওতপ্রোত হয়ে থাকেন। প্রজাগণের মধ্যে তিনি ব্যাপ্ত হয়ে আছেন।
৯। ওরে! কোন বেদবিৎ বিদ্বান্ যদি সেই অমৃতস্বরূপ পরমাত্মাকে তত্ত্বতঃ (বা শাশ্বত) বলে থাকে তো তা-ই সত্য; যে তেজোধাম পরমাত্মা বুদ্ধির অগোচর। এই পরমাত্মার তিনি ভাগ বা পদ তো গুহাতে লুপ্ত হয়েই স্থিত আছে; (একভাগ মাত্র হলো–এই প্রপঞ্চজাত)। তার সেই তিন গুপ্ত ভাগ বা পদকে (সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় কিংবা ঋক্-যজুঃ-সাম কিংবা ভূত ভবিষ্য-বর্তমানকে) যে জ্ঞাত হয়, সে আপন অজ্ঞানী পিতারও পিতা হবে। (অর্থাৎ তাঁর সেই অজ্ঞাত স্থানত্রয় সম্পর্কে জ্ঞাত জন ব্রহ্মারও পিতা পরমাত্মা)।
১০। সে আমাদের বন্ধু। সে-ই আমাদের উৎপাদন করণশালী। সে আমাদের নির্মাণশীল। সে সমস্ত তেজঃ ও লোককে জ্ঞাতশালী। যে পরমাত্মপুরুষের মধ্যেই দেবতাগণ অমৃতকে ভোগ করে তৃতীয় স্বর্গে স্বেচ্ছায় বিহার করে।
১১। সেই পরমাত্মা ব্রহ্মরূপ সকল প্রাণীকে লঙঘন করে, ব্রহ্মরূপ সর্বলোককে লঙ্ঘন করে এবং সম্পূর্ণ, ব্রহ্মরূপ দিক্-বিদিককে লঙ্ঘন করে বিদ্যমান। ঋত অর্থাৎ সত্য বা যজ্ঞের পূর্বে উৎপন্না বাক্ বা প্রকৃতিকেই অধিষ্ঠিত করে সেই পরমাত্মা স্বয়ং স্বয়ংয়েই (নিজে নিজেতেই) সম্যক প্রবিষ্ট হয়ে রয়েছেন।
১২। সেই দেব অতিশীঘ্রতায় এই দ্যাবাপৃথিবীকে লঙঘন করে। এই সকল লোককে লঙ্ঘন করে, সকল দিককে লঙ্ঘন করে এবং স্বর্গকেও অতিক্রম করে স্থিত আছে। ঋতকে (অর্থাৎ ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতিকে) বিস্তৃত করে সূত্রকে, উচ্ছেদিত করে তাতে সেই প্রপঞ্চ ব্রহ্মকে দর্শন করেছিল (বা অনুধ্যান করেছিল)। সে স্বয়ংই সেই (প্রপঞ্চ) হয়ে গিয়েছে। সে-ই ছিল হিরণ্যগর্ভ৷
১৩। যজ্ঞগৃহের পতি (অধিস্বামী), অদ্ভুত, ইন্দ্রের প্রিয় এবং সেবকগণের দ্বারা কামনা করার যোগ্য অগ্নির নিকট হতে অন্ন ও ধনের দান এবং মেধা যাচিত করছি। তার নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি৷
১৪। যে পরম পবিত্র মেধাকে দেবগণ ও পিতৃপুরুষগণ উপাসনা (বা প্রার্থনা) করে থাকে, হে অগ্নি! আজ তুমি সেই মেধার দ্বারা আমাকেও মেধাবী করো। তোমার উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি৷
১৫। বরুণ আমাকে মেধা প্রদান করুক। অগ্নি আমাকে মেধা প্রদান করুক এবং প্রজাপতিও আমাকে মেধা প্রদান করুক। ইন্দ্র ও বায়ু আমাকে মেধা প্রদান করুক। ধাতাও আমাকে মেধাই প্রদান করুক। সকলের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি।
১৬। আমার এই মেধারূপী শ্রীকে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় দুজনেই আস্বাদিত (ভোগ) করুক। দেবগণ এই সর্বোত্তমা শ্রী ও মেধাকেই আমাতে স্থাপিত করুক। হে মেধা! সেই দেবস্বরূপিণী ঐশ্বর্যাধিষ্ঠাত্রী তোমার উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে এই পূর্ণহুতি প্রদান করছি। (প্রসন্না হও)।
মন্ত্ৰার্থঃ– ১।ক্ষীণতারহিত, যজ্ঞগৃহের রক্ষক, উথিত ধূমের দ্বারা পরিলক্ষিত, শোধক, শ্বেতভস্মের স্কুপ নির্মাণকারী, ভক্ষক রাক্ষস ইত্যাদি হতে রক্ষা করণশালী, ভরণকারিণী ইন্ধনে স্থিতি করণশালী, বায়ুর সমান দীপনকরী এবং সোমরসের ন্যায় এই যজমানের অগ্নিসমূহ যজমানের ইষ্টপ্ৰদা হোক।
২। রসহরণশীলা, ধূমের দ্বারা পরিলক্ষিত হওনশালিনী অগ্নিসমূহের রশ্মিগুলি বায়ুর দ্বারা প্রেরিত হয়ে পৃথক পৃথক প্রকারে স্বর্গে গমনের প্রযত্ন করছে।
৩। হে অগ্নি! আমাদের নিমিত্ত তুমি মিত্র ও বরুণের যজন করো; দেবতাগণের। যজন করো; মহান্ যজ্ঞের যজন করো। তুমি আপন যজগৃহেরও যজন করো ৷
৪। হে অগ্নি! দেবগণকে আহ্বান করণে অত্যন্ত কুশল আপন অশ্বগুলিকে এক কুশল রথবানের ন্যায় সংযোজিত করো। হোতারূপে তুমি পূর্ব দিকে উপবেশন করো।
৫। দুই বিপরীত রূপ এবং শুভ মনোরথশালিনী উষা (অর্থাৎ দিবা) ও রাত্রি সঞ্চরণ করছে। ক্রমশঃ তারা পৃথক পৃথক্ পুত্রকে দুগ্ধ পান করাচ্ছে। রসহারী শুক্লবর্ণশালী সূর্য অপরা উষাতে (দিবায়) অন্নবান্ হচ্ছে (অর্থাৎ হবিঃ প্রাপ্ত হচ্ছে)। এবং অপরা রাত্রিতে হরিৎবর্ণশালী শুভ অগ্নি দীপ্তিশীল দেখা যাচ্ছে। (অর্থাৎ রাত্রির বৎস যেন অগ্নি, রাত্রিতে হবিঃপ্রাপ্তিরূপ দুগ্ধ পান করছে; এবং দিবার বৎস যেন সূর্য, দিবাভাগে হবিঃপ্রাপ্তিরূপ দুগ্ধ পান করছে)।
৬। বিধাতা ঋত্বিকগণের দ্বারা হোতা, অত্যন্ত যাজক এবং যজ্ঞে স্তুতিযোগ্য সেই অগ্নিকেই সর্বপ্রথম যজ্ঞগৃহে স্থাপিত করেছিলেন; ভৃগু ও শিষ্যগণ কাষ্ঠসমূহে এবং প্রজা-প্রজাতে ব্যাপ্ত যে বিচিত্র অগ্নিকে প্রাপ্ত হয়ে প্রজ্বলিত করেছিল৷
৭। তেত্রিশ ক্রোড়, তেত্রিশ লক্ষ, তেত্রিশ সহস্র এবং তিনশত তেত্রিশ বসু প্রভৃতি দেবতা এই অগ্নির পূজন করছে। ধৃতের আহুতিতে একে সিঞ্চিত করছে; এর নিমিত্ত দর্ভাসন বিস্তারিত হয়েছে এবং তৎকালেই এই দেবগণের আকর্তাকে বেদিতে অধিষ্ঠিত করানো হচ্ছে।
৮। দ্যুলোকের মূর্ধাভূত (অর্থাৎ মস্তকসদৃশ), পৃথিবীকে ব্যাপ্ত করণশালী এবং যজ্ঞে উৎপন্ন বৈশ্বানর অগ্নিকে; কবি, সম্রাট, যজমানের অতিথি এবং জ্বালারূপ মুখে সুবাপাত্রকে ধারণকারী এই অগ্নিকে ঋত্বিকগণ উৎপন্ন করে থাকেন।
৯। ধনদাতা অগ্নি স্তুতির দ্বারা প্রসন্ন হয়ে বৃত্রকে (বা পাপকে) হনন করে।–যে সমিদ্ধ (অর্থাৎ দীপ্ত), শুক্র (অর্থাৎ শুভ্র) এবং আহুত (অর্থাৎ অভিহুত বা প্রদত্তাহুতি)।
১০। হে অগ্নি! বিশ্বদেবগণ, ইন্দ্র, বায়ু এবং মিত্রের তেজের সাথে এই সোমময় মধুকে পান করো।
১১। বৃষ্টির নিমিত্ত মনুষ্যগণের পালক অগ্নি যখন তেজঃ অভিবর্ধক হবিঃ প্রাপ্ত হয়ে থাকে, তখন সেই অগ্নির দ্বারা দ্যুলোকের নিকট পবিত্র জল আসিঞ্চিত করা হয়ে যায় (অর্থাৎ মেঘ উৎপন্ন হয়ে যায়)। অগ্নি অনিন্দনীয় (বা অনবদ্য), মিশ্রণকারী এবং ধ্যাতব্য বলে (বীর্য বা তেজঃ রূপ) মেঘজলকে উৎপন্ন করে এবং বর্ষণ করে থাকে।
১২। হে অগ্নি! তুমি মহৎসৌভাগ্যের (অর্থাৎ জলের) বিক্রম প্রদর্শিত করো। তোমার উত্তম ধন (বা যশ) হোক। এই পত্নী সহ এই যজমানকে সুনিয়ন্ত্রণশালী করো। শত্ৰুত্ব আচরণশালী তেজস্বীগণকেও অভিভূত করো।
১৩। হে অগ্নি! অর্চনীয় স্তোত্রের দ্বারা আমরা অত্যন্ত গম্ভীর তোমাকেই বরণ করছি। হে মহান্ অগ্নি! তুমি আমাদের আহ্বান শ্রবণ করে থাকো। বলে ইন্দ্র এবং বায়ুর সমতুল্য তুমি হেন মনুষ্যগণের পালকতম দেবতা অগ্নিকে ঋত্বিকগণ হবিরান্ন সমর্পণ পূর্বক প্রীণিত করছে বা পূর্ণ করছে৷৷
১৪। হে সম্যক্ আহুত অগ্নি! বুদ্ধিমান সেই যজমান তোমার প্রিয় হোক; যে ধনশালী এবং লোকগণের মধ্যে গাভীর দলকে রক্ষণ করে থাকে; (অর্থাৎ যার নিকট যজ্ঞসাধন বহু গাভী আছে)।
১৫৷ হে যাচকগণের যাচনা শ্রবণশালী কর্ণের দ্বারা যুক্ত অগ্নি! হবিবাহক এবং এক সঙ্গে আগমনকারী দেবগণের সাথে আমাদের প্রার্থনা শ্রবণ করো। মিত্র অর্যমা এবং অন্য প্রাতঃসবনে হবির্ভাব প্রাপক দেবতাগণ যজ্ঞে দর্ভাসনের উপরে উপবেশন করুক।
১৬। সকল যজনীয় দেবগণের মধ্যে অকৃপণ (অখণ্ড), সকল, মনুষ্যের পূজনীয়, এবং হবিঃ স্বীকারকারী জাতবেদা অগ্নি দেবগণের সুখয়িতা হোক৷
১৭। সবিতাদেবের প্রেরণায় চলনশীলা হয়ে এবং মিত্র ও বরুণের প্রতি নিরপরাধ হয়ে আমরা মহান্ এবং সমিধ্যমান অগ্নির অবিনাশিনী শরণে অবস্থান করি। আমরা আজ দেবগণের সেই রক্ষণের যাচনা করছি৷
১৮। সুখী গাভীর ন্যায় সোম অভিবৃদ্ধ হচ্ছে এবং হে ইন্দ্র! তোমার স্তোতা (বা ঋত্বিকগণ) যজ্ঞ নিষ্পন্ন করেছে। নিযুত অশ্বকে যুক্তকারী বায়ুর ন্যায়, হে ইন্দ্র! আমাদের যজ্ঞের দিকে আগত হও। তুমিই স্তুতিসমূহে সংস্তুত হয়ে বিবিধ অন্ন-ধন ইত্যাদি দিয়ে থাকো ৷
১৯। হে গাভীগণ (বা স্তুতিসমূহ)। তোমরা আমাদের রক্ষা করো। মহতী এবং যজ্ঞের রূপ-দানশালিনী হে দ্যাবাপৃথিবী! তোমাদের দুই দুই কর্ণ স্বর্ণমণ্ডিত, (যারা স্বর্ণদাত্রী, তোমরা আমাদের রক্ষা করো।
২০। অদ্য সূর্যোদয় হওয়ার পর পবিত্র মিত্র, অর্যমা, সবিতা এবং ভগদেবতা যে প্রেরণা দেবেন, তা-ই করণীয় হোক৷
২১। হে ঋত্বিগণ শ্রী, দ্যাবাপৃথিবীর অভিশ্রী (অর্থাৎ শোভা) এবং অভীষ্ট সোমরসের অভিযুত হওয়ার পর চামসে পূর্ণ করো। সেই সোমরসই নদীগুলিকে ধারণ করে। পূর্বকালের রীতি (৭–১২) এই করণীয় (৭–১২) মন্ত্র বলা হয়েছে৷
২২৷ দৰ্ভাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত ইন্দ্র আপন শোভায় সকল দেবতার কান্তি আচ্ছন্ন করে অবস্থিত; সকল স্তোতা সেই ইন্দ্রকে আভূষিত করেছে। সর্বরূপ সেই ইন্দ্র অমৃতস্বরূপ বর্ষাজলকে অধ্যাসিত করছে৷৷
২৩। হে ঋত্বিকগণ! মহান, সোমান্নে মদমত্ত, সকলের অগ্রণী এবং সমস্ত কিছু দানশীল সেই ইন্দ্রের পূজা করো, যে ইন্দ্রের সুযশ, সুবল, মহত্যশ, এবং ধনকে এই দ্যাবাপৃথিবীও (অর্থাৎ দেবতা ও মনুষ্যগণও) পূজা করে থাকে।
২৪। যুবা ইন্দ্র যে যজমানগণের মিত্র (বা সহায়), তাদের শাস্ত্রসম্মত যজ্ঞসাধনের ইন্ধন ইত্যাদি মহৎ হয়; তাদের স্তুতিসমূহ অনেক হয়ে যায় এবং তাদের যুপ (বা খড়ঙ্গ বিস্তীর্ণ বা বৃহৎ হয়ে থাকে।
২৫। হে ইন্দ্র! আগত হও।তুমি সকল যাগের যোগ্য। আগত হয়ে আপন যজ্ঞভাগের সাথে সোমান্ন ভক্ষণ করো। সেই ইন্দ্র মহান্ এবং আপন বলবীর্যে অভিপূজ্য হয়ে থাকেন।
২৬। বলনীতিশীল (অর্থাৎ চতুরঙ্গ বলে নীতিজ্ঞ) ইন্দ্র বৃত্রকে বেষ্টন (বা আচ্ছন্ন করেছে। বিবিধ রূপ ধারণ করে যুদ্ধনীতিশালী সেই মায়াবী বৃত্তকে ইন্দ্র হত্যা করেছে। তাকে স্কন্ধহীন করে ইন্দ্র হত্যা করেছে এবং জলে নিক্ষিপ্ত করেছে। তাতে যজমানগণের স্তুতিসমূহ প্রকট হয়েছে।
২৭। হে শ্রেষ্ঠ পালক ইন্দ্র! তুমি মহান্ হয়েও একাকী কোথায় গমন করছ? এই রকমে একাকী গমনের হেতু কী? একাকী সঞ্চারণ করে শুভ বচনে জিজ্ঞাসা করো–কোন্ পথ? হে হরী নামক অশ্বসমূহশালী ইন্দ্র! তোমার যা অভিপ্রায়, তা আমাদের বলো। মহান ইন্দ্রো য ওজসা (৭৪০); (অর্থাৎ ইন্দ্র তেজে মহা); কদাচন স্তরীরসি (৮২); (অর্থাৎ কখনও হিংসক নয়); এবং কদাচন প্রযুচ্ছসি(৮৩); (অর্থাৎ কখনও আপন কর্মে আলস্য নেই); –ঋক্সমূহে বলা হয়ে গিয়েছে৷
২৮। হে ইন্দ্র! মনুষ্য তোমার সেই কর্মের প্রশংসা করে থাকে, যে কর্মের দ্বারা তুমি গাভীর পিপাসা রক্ষা করো–যে কর্ম একবারই সর্বস্ব দানশালিনী, অনেকপুত্রা, সহস্রধারা এবং মহতী পৃথিবীকে দোহন করতে চায় (অর্থাৎ পৃথিবীর আধিপত্য চায়)। হে ইন্দ্র! সোমাভিষবকারী ব্রাহ্মণগণ এবং পৃথিবী পালনকারী ক্ষত্রিয়বর্গ তোমার স্তুতি করছে।
২৯। মহান্ তোমার নিমিত্ত এই মহতী স্তুতির গান করছি, কেননা এই যজমানের বুদ্ধি তোমার স্তোত্রে আসঞ্চিত হয়ে গিয়েছে; (অর্থাৎ আমার এই যজমান আকাঙ্ক্ষা করছে যে, ইন্দ্রের স্তুতি করা হোক, এই নিমিত্ত, হে ইন্দ্র। আমি মহান্ তোমাকে মহতী স্তুতি করছি)। শত্রুকে অভিভূত করণশালী সেই ইন্দ্রকে দেবগণ পানগোষ্ঠী এবং প্রেরণে আপন বলের দ্বারা প্রসন্ন করে।
৩০। বিশেষরূপে শোভমান এবং মহান সূর্য যজ্ঞপতি যজমানে অচঞ্চল বায়ুকে ধারিত (স্থাপিত) করে সোমময় মধুকে পান করে। বায়ুর দ্বারা প্রেরিত যে সূর্য স্বয়ংই প্রজাগণকে রক্ষা করে থাকে এবং সে-ই অনেকরকমে পোষণ করে থাকে। সেই বিশেষ রূপের দ্বারা (সূর্য) দ্যুলোকে শোভিত হচ্ছে।
৩১। সেই জাতপ্রজ্ঞান সূর্যদেবের বিশ্বকে দর্শনের নিমিত্ত রশ্মিসমূহের উপর দ্যুলোককে আনীত করা হয়।
৩২। হে পবিত্রকারী বরুণ (বা সূর্য)! আপন যে প্রকাশের মাধ্যমে তুমি হবিঃ ইত্যাদির দ্বারা দেবতাগণকে পূর্ণকারী যজমানকে দর্শন করে থাক (সেই প্রকাশের দ্বারা আমাদের অর্থাৎ স্তোতাগণকে দর্শন করো)।
৩৩। হে দৈবী অধ্বর্যু অশ্বিনদ্বয়! আপন সূর্যপ্রভা-সম্পন্ন রথে যজ্ঞে আগত হও। মধুর হবিঃ দ্বারা যজ্ঞকে সঙ্গত বা কৃতার্থ করো। দেবগণের মধ্যে তোমাদের বিচিত্র পুরাতন এই মেধাবীজন লাভ করুক। তং প্রত্নথা (৭।১২); অয়ং বেন (৭১৬) এবং চিত্রংদেবানমু (৭৪২) মন্ত্রে কথিত হয়ে গিয়েছে।
৩৪। সুশংসনীয় এবং সকলের নেতা সূর্যদেব আমাদের স্তুতিসমূহে সংস্তুত হয়ে যজ্ঞে আগমন করুক। হে অমর দেবগণ! যজ্ঞের অভ্যন্তরে গোষ্ঠীপানে তোমরা যে রকম মত্ত হয়ে থাক, সেই রকমে আপন কৃপায় আমাদের সব গতিশীল পুত্র, পশু ইত্যাদিকেও তর্পিত (তৃপ্ত) করো।
৩৫। হে ধ্বান্তনাশন (অন্ধকাররূপী বৃত্ৰবিনাশক) সূর্য! আজ যখন তুমি উদয় প্রাপ্ত হচ্ছে, তখন, হে ঐশ্বর্যবন্! আমাদের এই হবিঃ ইত্যাদি সবই তোমার বশীভূত হোক।
মন্ত্ৰার্থঃ— ১।দিব্য শক্তিসমূহের সাথে যুক্ত যে মন জাগ্রত মনুষ্যের নিকট হতে গমন করে দূরে ব্যক্ত হয়, সুষুপ্ত মনুষ্যেরও সেই মন সেই দূরে গমন করে। দূরে গমনকারী এবং শ্রোত্রা ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের স্বরূপ জ্যোতিসমূহে একই জ্যোতি প্রকাশক যে আমার মন, তা শুভ সঙ্কল্প-সম্পন্ন হোক৷
২। কর্মা, মনীষী এবং ধীর ব্যক্তি যজ্ঞের এবং অন্য ধনলাভের ক্ষেত্রে যে মনের দ্বারাই কর্ম করে থাকে, যে মন প্রজাগণের অভ্যন্তরে অপূর্ব এবং প্রকাশমান্ জ্যোতি, আমার সেই মন শুভ সঙ্কল্পশালী হোক।
৩। যা প্রজ্ঞান, যা চিত্র (বা চেতনা), এবং যা ধৃতি; যা প্রজাগণের মধ্যে আন্তর ঋত (সত্য) সংজ্ঞক, যা ব্যতীত কেউই কর্ম করতে পারে না, আমার সেই মন সদা শুভ সঙ্কল্পশালীই তোক৷
৪। যে অমর মনের দ্বারা এই ভূত-ভবিষ্যৎ বর্তমান সর্ব জগৎ ধারিত হয়েছে, এবং যার দ্বারা সপ্ত হোতা-সংযুক্ত যজ্ঞ বিস্তৃত হয়, আমার সেই মন, হে পরমাত্মা! সদা শুভ সঙ্কল্প-সম্পন্ন হোক।
৫। যার মধ্যে ঋক্সমূহ, সামগান এবং যজুঃ–রথের নাভিতে যুক্ত অরের (কাষ্ঠখণ্ডবিশেষের) ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, এবং যাতে প্রাণীগণের সকল মন্দ ও শুভ ভাব ওতপ্রোত হয়ে থাকে, আমার সেই মন, হে পরমাত্মা! সদা শুভ সঙ্কল্পশালীই হোক।
৬। কুশল সারথি কর্তৃক অশ্বকে অভীষ্ট স্থলে চালিত করার ন্যায় এবং লাগামের দ্বারা অশ্বকে নিয়ন্ত্রিত করার ন্যায়, যে মনুষ্যকে যত্রতত্র নিয়ে যায়; হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত যে অজর এবং অত্যন্ত বেগবা, আমার সেই মন, হে ভগবন্! সদা শুভ সঙ্কল্পশালী হোক৷
৭। আমি তেজ এবং শক্তির ধারক সেই অন্নের সংস্তুতি করছি, যে অন্নের বলে ইন্দ্রদেব বৃত্রকে খণ্ড খণ্ড করে কর্তন করেছিল।
৮। হে অনুমতি! তুমি আমাদের মনোরথের অনুমোদন করো এবং আমাদের কল্যাণ করো। কর্ম ও বলের নিমিত্ত তুমি আমাদের প্রেরিত করো এবং আয়ুকে বৃদ্ধি করো।
৯। আজ আমাদের যজ্ঞকে অনুমতি দেবী দেবগণের দ্বারা অনুমোদিত করুক। অনুমতি ও হব্যবাহক অগ্নি হবিদাতা যজমানের নিমিত্ত সুখস্বরূপ হোক৷
১০। হে মহাস্তুতা সিনীবালী (দেবপুত্রী)! যে তুমি দেবগণের ভগিনী, সেই তুমি, আহুত হবিঃ সেবন করো। হে দেবী! আমাদের সন্তান প্রদান করো।
১১। আপন সহায়িকা নদীসমূহের সাথে দৃষদ্বতীশতদ্র চন্দ্রভাগা-বিপাশা-রেবতী– এই পঞ্চ নদী সরস্বতী নদীতে সঙ্গমিতা হয়েছে। পাঁচটি ধারায় প্রবাহমানা সেই সরস্বতী আপন প্রবাহ প্রদেশে একই সরিৎ হয়ে গিয়েছে। (অর্থাৎ পাঁচটি নদী আপন নাম ত্যাগ করে সরস্বতীর নাম ধারণ করে নিয়েছে)।
১২। হে অগ্নি! তুমিই প্রথম অঙ্গিরা ঋষি। দ্যোতমান তুমি দেবগণের কল্যাণকারী ও মিত্র হয়েছ। ক্রান্তদ্রষ্টা, বিদিতকর্মা এবং দীপ্তিমান হয়ে ঋষি (বা বর্শা) সমন্বিত মরুৎ, হে অগ্নি! তোমার সেবায় রত হয়ে আছে।
১৩। হে দ্যোতমান-বন্দনীয় অগ্নি! তুমি আপন রক্ষাসমূহের দ্বারা এই ধনী যজমান এবং তার পুত্রদের রক্ষা করো। পুত্র-পৌত্র ও গাভীগণকে অনিমেষে রক্ষা করণশালী তুমিই রক্ষক। হে অগ্নি! আমরা তোমার কর্মে (অর্থাৎ যজ্ঞে) বিদ্যমান আছি৷
১৪। হে অধ্বর্যু! প্রজ্ঞানবান্ তুমি উত্তানিত হয়ে (চিৎ হয়ে) পড়ে থাকা কাষ্ঠে অগ্নিকে নিয়ে রাখো। কামনা করা মাত্র সেই অরণি তৎক্ষণাৎই অভিষেক্তা অগ্নিকে উৎপন্ন করে দিয়েছে। রক্তজ্বালাসঙ্ঘাত এবং পৃথিবীর পুত্র অগ্নি জ্ঞানের সাথে মন্থন করার পর উৎপন্ন হয়েছে। এর তেজ উজ্জ্বল।
১৫। হে জাতবেদা অগ্নি! যজ্ঞভূমির স্থান এবং পৃথিবীর নাভি উত্তর বেদিতে আমরা তোমাকে হবিঃ বহনের নিমিত্ত নিহিত (বা স্থাপিত) করছি।
১৬। বলের কামনা করণশালী, স্তুতির দ্বারা লভ্য, সৎ-স্তুতিসমূহের দ্বারা স্তুতিযোগ্য, ঋকসমূহের দ্বারা প্রতিপাদ্য, নররূপ লব্ধখ্যাতি ইন্দ্রদেবের নিমিত্ত আমরা, অঙ্গিরা ঋষির ন্যায় ত্রিবৃৎ ইত্যাদি বলপ্রাপক স্তোম স্মরণ করছি এবং মন্ত্র উচ্চারিত করছি।
১৭। হেঋত্বিকগণ! বলের কামনা করণশালী এবং মহান দেবতা ইন্দ্রের নিমিত্ত মহৎ সোমান্ন এবং স্তোমোপযোগী সাম আহৃত করো; যে সামের দ্বারা আমাদের পদজ্ঞ (পদমাত্মের স্বরূপ জ্ঞাতা) পূর্বজ অঙ্গিরাগণ (বা পূর্বপুরুষগণ) ইন্দ্রের অর্চনা করে গাভীসমূহ (বা সূর্যকিরণসমূহ) প্রাপ্তশালী হয়েছিলেন৷
১৮। হে ইন্দ্র! সোম সম্পাদন করণশালী মিত্র যজমান তোমাকে আকাঙ্ক্ষা করছেন। তারা সোমের অভিষব করছেন; হবিরান্নকে বেদির উপর স্থাপন করে এবং লোকের নিন্দা সহ্য করে–কেন? এইজন্য যে, তোমার নিকট হতে প্রজ্ঞান-বিশেষ অবশ্যই প্রাপ্ত হওয়া যায়।
১৯। সুদূরেও স্থিত লোক তোমা হতে দূরে নয়। অতএব হে হরী নামক অশ্বশালী ইন্দ্র! স্থির বলসেচক ইন্দ্রের উদ্দেশে এই প্রাতঃসবন ইত্যাদি করা হয়েছে। এবং অগ্নির সমিদ্ধ হওয়ার পর অভিষব প্রস্তর যুক্ত করা হয়েছে (অর্থাৎ সোমরস অভিযব করা হয়েছে)।
২০। যুদ্ধে অসহনীয়, সেনাগণে সর্বত্র ব্যাপ্তশীল, জলের বর্ষক, বলের রক্ষক; যুদ্ধে জয়ী, শুভ নিবাসভূত, সুকীর্তিবান্ এবং জয়শালী তুমি হেন সোমরসকে, হে সোম! আমরা আনন্দিত করছি।
২১। যে যজমান সোমের উদ্দেশ্যে হবিঃ প্রদান করেন, সোম তাঁকে নবপ্রসূতা গাভী প্রদান করে, ব্যাপনশীল অশ্ব প্রদান করে এবং কর্মঠ পুত্রও প্রদান করে। গৃহে সজ্জনতা, যজ্ঞে সৎ-সংযোগ, সভায় সৎ-সমাবেশে এবং পিতার অনুশাসনে বিদ্যমান (বিনীত) সন্তানদাতা এই সোমের নিমিত্ত আহুতি প্রদান করা হচ্ছে।
২২। হে সোম! তুমি এই সকল ওযধিসমূহকে জলকে এবং গাভীকে উৎপন্ন করেছ। তুমি বিস্তৃত অন্তরিক্ষকে বিস্তীর্ণ করেছ এবং তুমিই জ্যোতির দ্বারা অন্ধকারকে বিনষ্ট করেছ।
২৩। হে সোমদেব! আপন দিব্য মনের দ্বারা, হে বলবন্! তুমি তোমার আপন বনের এক ক্ষুদ্র অংশ আমাদের প্রদান করো। কেউই তোমাকে প্রতিবদ্ধ করে না। তুমি বলবীর্যের অধিষ্ঠাতা। যজ্ঞে তুমি আমাদের দুই লোকের যোগ্য নিরোগ করে দাও; (অর্থাৎ তোমার নিকট হতে দিব্য মন ও দিব্য ধন লাভ করে যজ্ঞ সুসম্পাদন পূর্বক আমরা যেন এই লোকে নিরোগ থাকতে পারি, এবং মরণের পরে স্বর্গলোকে গমন করতে পারি)।
২৪। হিরন্ময় কিরণশালী সূর্য পৃথিবীর সাথে সম্বন্ধিত অষ্ট দিককে, তিন অন্তরিক্ষকে (লোককে), যোজন দূর প্রদেশকে এবং সপ্ত বিশাল সাগরকে প্রকাশিত করছে। হবিদাতা যজমানের নিমিত্ত বরণীয় রত্ন ইত্যাদি প্রদান করে সবিতাদেব উদিত হচ্ছে৷
২৫। হিরন্ময় কিরণশালী এবং বিশিষ্ট রূপে প্রজাগণকে দর্শনশালী সবিতাদেব দ্যাবা ও পৃথিবী উভয়ের মধ্যেই গমন করে থাকে। উদয় হয়ে সে অন্ধকাররূপ ব্যাধিকে অপবাধিত (দূর) করে থাকে। যখন সূর্য অস্তমিত হয়, তখন আপন কৃষ্ণ প্রকাশের (অর্থাৎ অন্ধকারের) দ্বারা দ্যুলোককে রিক্ত সদৃশ করে দিয়ে থাকে৷
২৬। হিরন্ময় কিরণরূপ হস্তশালী, প্রাণবান্ কল্যাণস্তুতি, মিত্রগণের সুখয়িতা এবং তেজবা সূর্য আমাদের অভিমুখ হোক। যাতুধানদেব (অর্থাৎ রাক্ষসদের) অপসিদ্ধ (বা চূরীভূত করে প্রতিদিন স্কৃয়মান সূর্যদেব উধ্বস্থ হয়ে থাকে।
২৭। হে সবিতা! তোমার যে পূর্বকালীন, ধূলিরহিত এবং সাধু সম্পাদিত মার্গ বিধাতার দ্বারা অন্তরিক্ষে নির্মিত হয়েছে, সেই সুগম্য মার্গের দ্বারা, হে দেব! আজ তুমি যজ্ঞে আগমন করো এবং আমাদের রক্ষা করো। হে দেব! তুমি আমাদের স্থাপিত করো বা আপন করে লও।
২৮। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা দুজন সোমরস পান করো এবং আমাদের সুখ-শান্তি প্রদান করো। হে অশ্বিনদ্বয়! তোমরা দুজন আপন অখণ্ডিতা রক্ষাসমূহের দ্বারা আমাদের সুরক্ষিত করো।
২৯। হে যুবা অশ্বিনদ্বয়! আমাদের মধ্যে কর্মবতী বুদ্ধি পূর্ণ করো। হে দর্শনীয়গণ! হে সেচকগণ! আমাদের কামনাকেও যজ্ঞময়ী করে দাও। হে অশ্বিদ্বয়! দ্যুতক্রীড়া রহিত অর্থাৎ সৎপথে অর্জিত অন্নের নিমিত্ত, এই অন্নলাভক যজ্ঞে তোমরা দুজন আমাদের সহায়ক হও।
৩০। হে অশ্বিদ্বয়! অহিংসিত এবং সুগম যুক্তিসমূহ বা রক্ষাসমূহের দ্বারা তোমরা দুজন আমাদের দিবারাত্র রক্ষা করো। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী এবং দ্যুলোক আমাদের সেই রক্ষা প্রতিশ্রুত করুক৷
৩১। রাত্রিকালে লোকে লোকে ভ্রমণকারী, দেব ও মনুষ্যকে তাদের আপন আপন স্থানে ও কর্মসমূহের অধিষ্ঠিত করে এবং লোকসমূহকে দর্শন করতে করতে সবিতাদেব আপন হিরন্ময় রথে গমন করছে।
৩২। হে রাত্রি! পালক বা উৎপাদক অন্তরিক্ষের স্থানসমূহের সাথে তুমি পার্থিব লোককে সর্বৰ্থা আপূরিত করে দিয়েছে, অথবা পোষক সূর্যের কৃষ্ণ তেজের দ্বরা হে রাত্রি! তুমি পৃথীলোককে পূর্ণ করে দিয়েছ। হে মহতি! তুমি দুলোকেরও স্থানসমূহকে অভিব্যাপ্ত করে রয়েছ। অন্ধকার আপন পূর্ণ প্রদীপ্তির সাথে সর্বত্র বর্তমান হয়ে রয়েছে৷
৩৩। হে অন্নদায়িনী উষা! তুমি আমাদের জন্য সেই বিচিত্র ধন আহৃত করো যে, যার দ্বারা আমরা নিজেদের, পুত্র এবং পৌত্রকে জীবিত রাখতে পারি।
৩৪। প্রাতঃকালে আমরা অগ্নিকে আহ্বান করছি। ইন্দ্রকেও আহ্বান করছি। প্রাতঃ মিত্র ও বরুণের। প্রাতঃকাল অশ্বিন্দ্বয়ের। প্রাতঃকাল মনের, পূষার এবং মন্ত্ৰাধিদেবতা ব্ৰহ্মণস্পতির। তাদের সকলকে আমরা আহ্বান করছি। প্রাতঃকালে আমরা সোম ও রুদ্রেকেও আহ্বান করছি।
৩৫। প্রাতঃকালে আমরা অদিতির পুত্র, জেতা, উগ্রস্বভাব এবং বিশেষ রূপ ধারণশীল ভগদেবকে আহ্বান করছি। বুভুক্ষিতও যাকে সম্মান প্রদান করে উদিত হও–এমন বলে থাকে, রোগীও এবং রাজাও যাকে উদয় হও এমন বলে থাকে।
মন্ত্ৰার্থঃ– ১। [এই স্থান হতে পিতৃবেধ = অন্ত্যেষ্টি সংস্কারের মন্ত্র প্রারম্ভ হচ্ছে] অসুখকরী এবং দেবহিংসক পণি (নামক অনুসরগণ) এই স্থান হতে অপসারিত হয়ে যাক। এইটি সোম অভিষবকারীর স্থান। ঋতুসমূহ, দিবস সমুদায় এবং রশ্মিগুলির দ্বারা প্রকট (বা ঋতুসমূহ ও দিনে-রাত্রে সুখকর) এই স্থান যম মৃতজনকে প্রদান করুক।
২। হে মৃত! তোমার অঙ্গের নিমিত্ত সবিতা এক্ষণে পৃথিবীর অভ্যন্তরে স্থান যাচ্ঞা করছে। তার নিমিত্ত বৃষগুলিকে সংযোজিত করো।
৩। হে পৃথিবী! বায়ু তোমার সেই স্থানকে পবিত্র করুক। সবিতা সে স্থানকে পবিত্র করুক। অগ্নির তেজ এবং সূর্যের দ্যুতিতে সেই স্থান পবিত্র হোক। (সেই ক্ষেত্রে চারিটি বলদকে যুক্ত করে চারিবার হাল চালনা করণীয়)। তারপর বলদগুলিকে হাল হতে মুক্ত করে দেওয়া হোক।
৪। (সেই স্থানে খনন করে মৃতের অস্থিসমূহকে স্থাপনীয়)-হে ওষধিসমূহ! পীপুলে তোমার উপবেশন এবং পলাশ পর্ণে তোমার বসতি। এক্ষণে তুমি পৃথিবীকে প্রাপ্ত হও, যে তুমি পুরুষকে (যজমানকে) সেবিত করে থাকো।
৫। হে মৃত! সবিতা তোমার শরীরকে মাতা পৃথিবীর ক্রোড়ে স্থাপন করুক। হে পৃথিবী! তুমি সেই মৃতের (যজমানের) নিমিত্ত শান্তিদায়িনী হও।
৬। হে অমুক মৃত! জলের নিকটবর্তী স্থানে আমি তোমাকে প্রজাপতি দেবতায় স্থাপন করছি। সেই প্রজাপতি আমাদের পাপকে অত্যন্ত দগ্ধ করুক।
৭। হে মৃত্যু! অন্য কোন দূর মার্গ হতেই তুমি চলে যাও; কারণ তোমার যে মার্গ, সেই দেবান হতে তা অন্য। চক্ষু কর্ণশালিনী তোমাকে আমি বলেছি যে, তুমি আমার সন্তানকে হনন করো না এবং আমাদের বীর পুত্রদের হিংসা করো না।
৮। হে মৃত! বায়ু তোমার নিমিত্ত সুখকর হোক। সূর্য সুখকর হোক এবং এই ইষ্টকা (এবং সকল দিক্) তোমার নিমিত্ত সুখকর হোক। (সমাধিক্ষেত্রে ইষ্টক স্থাপনীয়)। হে মৃত! এই পার্থিব অগ্নিসকল তোমার নিমিত্ত সুখকর হোক। তারা তোমাকে যেন প্রদগ্ধ না করে।
১০। হে বন্ধুগণ! এই প্রস্তরময়ী নদী প্রবাহিত হচ্ছে। এক্ষণে সামলাও। প্রস্তুত হয়ে দণ্ডায়মান হও এবং একে উত্তরণ করো (বা পার হও)। এই নদীতে আমরা তাদের ত্যাগ করছি, যারা অশুভ (দুষ্ট রাক্ষস ইত্যাদি) ছিল। তারপর আমরা শুভ ও পথ্যভূত অন্নসমূহ (পিণ্ড বা প্রারব্ধ সংস্কার)-কে পার করছি৷
১১। হে অপামার্গ! অঘ (পাপ), কীর্তিভেদক চিন্তা, অভিচার ক্রিয়া এবং দুষ্ট স্বপ্নত্বকে তুমি আমাদের হতে দূর করো।
১২। জল এবং ওষধিসমূহ আমাদের নিমিত্ত সত্যনিষ্ঠ মিত্রবৎ স্বভাবশালিনী হোক। যারা আমাদের দ্বেষ করে এবং যাদের আমরা দ্বেষ করি, তাদের নিমিত্ত জল ও ওষধিসমূহ শক্তস্বরূপ হোক।
১৩। আমরা বৃষের লাঙ্গলকে ধরে তাকে আলম্ভন করছি। এই বৃষ সুরভীর পুত্র। এ আমাদের কল্যাণ করুক। দেবতাগণের নিমিত্ত ইন্দ্রের ন্যায়, এ আমাদের রক্ষক হোক। হে অগ্নিকের! তুমি হবিঃকে দেবতাগণের নিকট উপস্থাপিত করো (অর্থাৎ পৌঁছিয়ে দাও)।
১৪। অন্ধকারের পারে বিদ্যমান স্বর্গীয় জ্যোতিকে দর্শন করে, দেবগণের মধ্যে একমাত্র দেবতা সূর্য এবং তার উত্তম জ্যোতিকে (ব্রহ্মস্বরূপকে) প্রাপ্ত হয়েছি৷
১৫। (সমাধিক্ষেত্রে ও শ্মশানের মধ্যে একটি প্রস্তর ধারণীয়)–এতে আমি জীবিত মনুষ্যের নিমিত্ত সীমা বা পরিধি স্থাপন করছি। অন্য কোন জীবিত মনুষ্য যেন মৃত্যুভাবকে না প্রাপ্ত হয় (অর্থাৎ মৃত্যুগ্রস্ত না হয়)। তারা সকলে বহুকর্মে ব্যাপৃত শত বর্ষের জীবন লাভ করুক। এই জীবিত জনেরা মৃত্যুকে পর্বতে গোপন করে রাখুক। (অথবা, লোষ্ট্রের দ্বারা আঘাত পূর্বক মৃত্যুকে বিতাড়িত করে, দিক)।
১৬। হে অগ্নি! তুমি আয়ুকে পবিত্র করছ। তুমি আমাদের নিমিত্ত অন্ন ও বর্ষাকে প্রেরিত করো। দুষ্ট কক্করসদৃশ তুচ্ছ দুর্জনগণকে দূরে বাধাপ্রাপ্ত করাও বা দূর করে দাও।
১৭। হবিঃর দ্বারা বৃদ্ধিশীল, ঘৃতে পূর্ণ মুখ-সম্পন্ন এবং ঘৃতে উৎপন্ন, হে অগ্নি! তুমি চিরজীবী হও। পিতা যেমন আপন পুত্রকে রক্ষা করে, সেইভাবে মধুর ও স্বাদিষ্ট গো-ঘৃত পান করে তুমি আমাদের এই পুত্র ইত্যাদিকে রক্ষা করো। এই তোমার নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি৷
১৮। এরা (অর্থাৎ এই জনেরা) গাভীকে আনীত করেছে (অর্থাৎ গোদন করেছে); এরা অগ্নিকে আহুত করেছে (অর্থাৎ হোম করেছে) এবং এরা দেবগণকে হবিঃ সমর্পণ করেছে। এতসব কর্মকারী এই সব (মৃত) জনেরা, যারা শ্মশানে শায়িত হয়ে আছে, কে তাদের চেপে রাখতে বা পরাভব করতে পারে?
১৯। কাঁচা (অপৰ্ক) ভক্ষণশালী (পিতৃমেধী) অগ্নিকে আমি দূর করে দিচ্ছি। পাপবাহী সে শ্মশানভূমিকে প্রাপ্ত হোক। এই যজ্ঞগৃহে এই.তভিন্ন (অর্থাৎ সে ছারা অপর) উৎপন্নলব্ধ অগ্নিদেব আপন অদিকার জ্ঞাত হয়ে দেবগণের নিমিত্ত হবিঃ বহন করুক৷
২০। হে জাতবেদা অগ্নি! পিতৃগণের নিমিত্ত তুমি বপা (মেদ) বহন করো–দূরে যেখানে তুমি এঁদের নিহিত হওয়া জ্ঞাত আছ। সেই পিতৃগণের নিমিত্ত মেদের লঘু নদীসমূহ বাহিত হোক এবং আমরা তাঁদের আশীর্বাদ লাভ করি। হে অগ্নি! এই তোমার উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে।
২১। হে পৃথিবী (সমাধিক্ষেত্র)! তুমি আমাদের নিমিত্ত সুখদা (সুখস্বরূপা) এবং কণ্টকরাহিতা (দুঃখরহিতা) হও। তুমি প্রভূত সুখ প্রদান করো। এই জল আমার পাপকে ধৌত করে ক্ষার করে দিক।
২২। হে অগ্নি! তুমি এই যজমানের নিমিত্তে (বা যজমানের দ্বারা) উৎপন্ন হয়েছ। এক্ষণে পুনরায় এই যজমান তোমা হতে উৎপন্ন হোন। এই অমুক (যজমান) স্বর্গলোক-প্রাপ্তির যোগ্য হোন। এই তোমার উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্র সহকারে আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে।
মন্ত্ৰার্থঃ– ১।ঋচা বা ঋক্ (বেদ) রূপ বাণীকে প্রাপ্ত হচ্ছি। মন রূপ যজুর্বেদকে প্রাপ্ত হচ্ছি। সাম রূপ প্রাণকে প্রাপ্ত হচ্ছি। চক্ষু ও শ্রোত্রকে প্রাপ্ত হচ্ছি। বাক্, ওজ, শত্ৰুংসহ বল, বীর্য, প্রাণ এবং অপান আমাতে প্রাপ্ত হোক।
২। চক্ষু বা হৃদয়ের যে ছিদ্র আমাতে বিদ্যমান আছে অথবা মনের যে অতিহিংসন (ব্যাকুলতা) হয়ে গিয়েছে, আমার সেইগুলি বৃহস্পতি সম্পূর্ণ করুক (অর্থাৎ নিরোগ করুক)। যে স্বামী (অধিপতি বা পালক), সে আমাদের প্রতি সুখস্বরূপ হোক।
৩। ভূঃ ভুবঃ স্বঃ। বরণীয় সবিতাদেবের সেই বরণীয় তেজকে আমরা ধারণ করছি। সে আমাদের বুদ্ধিসমূহকে সৎপথে প্রেরিত করুক।
৪। বিচিত্র ও সদাবর্ধক সেই ইন্দ্র আমাদের কোন্ স্তুতির দ্বারা আপন রক্ষাশক্তির সাথে আমাদের মিত্র হয়ে থাকে? কোন্ অত্যন্ত সুগঠিত স্তুতির দ্বারা বরণকৃত হয়ে (সে আমাদের রক্ষক হবে)?
৫। হে ইন্দ্র! সকল মদকারী পদার্থের মধ্যে কোন্ রকম অত্যন্ত মদকরী সোমরস তোমাকে মদমত্ত করে, যে মদে তুমি অত্যন্ত দৃঢ় হয়েও শত্রুধন বিভেদিত (বা ছিন্ন) করে নিয়ে থাকো?
৬। হে ইন্দ্র! আমাদের মিত্র স্তোতাগণকে কবে তুমি আপন অসংখ্য রক্ষাসমূহের সাথে রক্ষক হয়ে থাকো? (যজ্ঞে কখন তুমি আগমন করছ?)।
৭। হে অভীষ্ট বর্ষক ইন্দ্র! কোন্ রক্ষার দ্বারা তুমি আমাদের আনন্দিত করছ? কোন্ স্তুতির দ্বারা প্রসন্ন হয়ে তুমি স্তোতৃগণের নিমিত্ত সম্পূর্ণ ধন আহরণ করে থাক?
৮। ইন্দ্রই সকল জগতের (বিশ্বের) রাজা। সে আমাদের দ্বিপাদ মনুষ্য ইত্যাদির নিমিত্ত সুখদ হোক; চতুষ্পদ গো ইত্যাদির নিমিত্তও (সুখদায়ক হোক)।
৯। মিত্রদেবতা আমাদের নিমিত্ত সুখদ হোক। বরুণদেব সুখদ থোক এবং অর্যমা দেবতাও আমাদের নিমিত্ত সুখকরী হোক। ইন্দ্র ও বৃহস্পতি দেবতাদ্বয় আমাদের নিমিত্ত সুখস্বরূপ তোক। উরুক্রম (অর্থাৎ বিস্তৃত পদক্ষেপ সম্পন্ন) বিষ্ণুঃ আমাদের সুখকারী হোক৷
১০। বায়ু আমাদের নিমিত্ত সুখকারী হয়ে প্রবাহিত হোক। সূর্য আমাদের নিমিত্ত সুখকর তাপ প্রদান করুক। গর্জনকারী পর্জন্য দেব আমাদের নিমিত্ত সুখদায়ক বর্ষণ করুক।
১১। দিবসগুলি আমাদের নিমিত্ত সুখকর হোক। রাত্রিসমূহ সুখ প্রদান করুক। ইন্দ্র ও অগ্নিদেব আপনাপন রক্ষার দ্বারা আমাদের সুখকর হোক। প্রদত্ত হবিঃ ইন্দ্র ও বরুণদেবতা আমাদের নিমিত্ত সুখদ হোক। অন্নপ্রাপক যুদ্ধ বা যজ্ঞে ইন্দ্র ও পূষা দেবতাদ্বয় সুখদ হোক। আমাদের নিমিত্ত সুখদ জীবন, সুখপ্রাপ্তি ও রোগ ইত্যাদি নিবারণে ইন্দ্র ও সোম দেবতাদ্বয় সুখদ হোক।
১২। অভীষ্ট সিদ্ধি ও পানের নিমিত্ত দ্যোতমানা জল আমাদের নিমিত্ত সুখদা হোক। আমাদের সুখপ্রাপ্তি এবং রোগ নিবারণের অনুকূলা হয়ে তারা সুবিত হোক।
১৩। হে পৃথিভী! তুমি আমাদের নিমিত্ত সুখস্বরূপা, অকণ্টকা (দুঃখরহিতা) এবং বাসয়িতা (বাসের যোগ্য) হও। তুমি আমাদের সবিস্তার সুখ প্রদান করো।
১৪। জলের অধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ সুখকারিণী হোক। তারা আমাদের মহারমণীয় প্রকাশের নিমিত্ত বলে (সামর্থ্যে) স্থাপিত করুক।
১৫। হে আপঃ (জলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী)! তোমার যে অত্যন্ত সুখকর সার (বা রস) আছে, সেইগুলিকে তুমি এই স্থানে আমাদের ভাজুন (যোগ্য ভোগকারী) করে দাও, যেমন কাময়মানা মাতৃগণ আপন পুত্রগণকে স্তন্যপান করিয়ে থাকেন।
১৬। হে আপঃ! আমরা তোমাদের সেই রস প্রভূত মাত্রায় প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে তার নিকট গমন করি, যার যজ্ঞগৃহের নিমিত্ত তোমরা অনুকূল হয়ে থাক। হে জলসমূহ। তোমরা আমাদের পবিত্র করো।
১৭। দ্যুলোক, অন্তরিক্ষলোক, পৃঙ্খীলোক, জল, ওষধিসমূহ, বনস্পতি সকল, দেবগণ, শব্দব্রহ্ম তথা সব কিছু আমাদের নিমিত্ত শান্তিময় হোক। স্বয়ং শান্তিই শান্তিময়ীরূপে আমাদের প্রাপ্ত হোক। সে-ই আমাদের সর্বশান্তি বৃদ্ধি করুক।
১৮। হে মহাবীর ঘট! তুমি আমাকে জরাজর্জরিত হলেও দৃঢ় করো। সকল প্রাণী যেন আমাকে মিত্রের দৃষ্টিতে দর্শন করে। আমিও যেন সকল প্রাণীকে মিত্রের দৃষ্টিতে দর্শন করি। আমরা সকলে যেন পরস্পর মিত্রের দৃষ্টিতে দর্শন করি।
১৯। হে মহাবীর ঘট! তুমি আমাকে দৃঢ় করো। আমরা তোমার কৃপাদৃষ্টিতেই জীবরিত আছি, আমরা তোমার দয়াদৃষ্টিতে গঠিত আছি।
২০। হে পবিত্রকারী অগ্নি! আমাদের নিমিত্ত তুমি কল্যাণকরী হও। রসহরণশীল জ্যোতির নিমিত্ত তোমাকে নমস্কার করছি। জ্বালাসমূহের নিমিত্ত তুমি নমস্কার প্রাপ্ত হও। অন্য শত্রুগণকেই তোমার জ্বালাসমূহ তাপদগ্ধা করুক৷
২১। হে ভগবন্! সেই সবই আমাদের নমস্কার প্রাপ্ত হোক, যাদের দ্বারা তুমি আমাদের সুখ সম্পাদিত করতে আকাঙ্ক্ষা করো। বিদ্যুতের নিমিত্ত (বা বিদ্যুঞ্জপী) তোমাকে নমস্কার করছি। গর্জনের নিমিত্ত (বা গর্জনরূপী) তোমাকে নমস্কার করছি।
২২। হে মহাবীর ঘট! হে ভগবন্! যে যে দুশ্চরিত হতে তুমি উচিত মনে করো, তাদের হতে আমাদের নির্ভয় করো। আমাদের সন্তানগণকে তুমি সুখ দান করো এবং আমাদের পশুগণকে অভয়ত্ব প্রদান করো।
২৩। আপঃ (জল) ওষধিসমুদায় আমাদের নিমিত্ত মিত্ররূপা হোক। তারা (অর্থাৎ সেই জলরাশি ও ওষধি সমুদায়) তাদের পক্ষে বা নিমিত্ত শত্রুরূপা হোক, যারা আমাদের প্রতি দ্বেষ করে এবং আমরা যাদের প্রতি দ্বেষ করি।
২৪। দেবতাগণের হিতের নিমিত্ত স্থাপিত সেই সর্বচক্ষু সূর্যের পূর্ব দিকে উদয় হচ্ছে। আমরা তার প্রসাদে শত বর্ষ পর্যন্ত দর্শন করব, শত বর্ষ পর্যন্ত জীবিত থাকব। আমরা তার প্রসাদে শত বর্ষ পর্যন্ত শ্রবণ করব; (অর্থাৎ স্পষ্ট শ্রবণেন্দ্রিয়সম্পন্ন হয়ে থাকব)। আমরা তার প্রসাদে শত বর্ষ পর্যন্ত বাক-সম্পন্ন হবো; (অর্থাৎ অখলিত বাগিন্দ্রিয়শালী থাকব) আমরা তার প্রসাদে শত বর্ষ পর্যন্ত অদীন হয়ে থাকব; (অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে দৈন্যরহিত হয়ে জীবন বাহিত করব)। শত শত বৎসরের পরেও বহুকালব্যাপী আমরা এমনই থাকব।
মন্ত্ৰার্থঃ— ১। (মৃত্তিকা খননের নিমিত্ত অদ্রি অর্থাৎ কাষ্ঠনির্মিত কুড়াল গ্রহণ করণীয়)। হে অভি! সবিতাদেবের প্রেরণায় বিদ্যমান আমি অশ্বিন্দ্বয়ের বাহুসমূহ এবং পূদেবতার হস্তযুগলের দ্বারা তোমায় গ্রহণ করছি। তুমি নারীরূপা (স্ত্রীনাম্নী) হও।
২। বিদ্বান্ এবং ব্রাহ্মণ যজমানের মহান ঋত্বিকগণ আপন মনকে একাগ্র করছে এবং আপন বুদ্ধিবৃত্তিকেও একাগ্র করছে। প্রজ্ঞানবি কোন হোতা যজ্ঞের বিধান করছে। সেগুলি এই সবিতাদেবেরই মহতী পরিস্তুতি।
৩। হে দ্যোতমানা দ্যাবাপৃথিবী! পৃথিবীর দেবযজন স্থান এই যজ্ঞে আজ আমি তোমাদের দুজনের দ্বারা (দ্যুলোকের জল এবং পৃথিবীর মৃত্তিকায়) যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীর-ঘটকে নির্মাণ করছি। (খনন পূর্বক মৃত্তিকা গ্রহণ করণীয়)। আমি যজ্ঞের নিমিত্ত এবং যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটের নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করছি৷
৪। হে বল্মীকরূপা দেবীগণ! সর্বপ্রথম উৎপন্না পৃথিবীর সম্বন্ধে তোমরাও ভূতজাত প্রাণীগণের উৎপত্তির মধ্যে প্রথম উৎপন্নশীলা। পৃথিবীর দেব্যজন স্থান যজ্ঞে আমরা আজ তোমাদের মৃত্তিকার দ্বারা যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীর ঘটকে নিষ্পন্ন করব। (বল্মীক-মৃত্তিকাকে গ্রহণ করণীয়) হে বল্মীকমৃত্তিকা! যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটের নিমিত্ত তোমাকে (বা তোমাদের) আমি গ্রহণ করছি।
৫। এই পৃথিবী আদিকালে অনেকটাই ক্ষুদ্র-মতো ছিল। হে পৃথিবী! তোমার দ্বারা আজ আমি পৃথিবীর দেবযজন স্থান এই যজ্ঞে যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটকে নিষ্পন্ন করব। (শূকরের দ্বারা খোদিত মৃত্তিকা গ্রহণ করণীয়)। হে মৃত্তিকা! যজ্ঞের নিমিত্ত আমি তোমাকে গ্রহণ করছি। যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটের নিমিত্ত আমি তোমাকে গ্রহণ করছি।
৬। হে পূতীকা (তৃণবিশেষ)! তোমরা ইন্দ্রের ওজঃ হতে সৃষ্ট হয়েছে। পৃথিবীর দেব্যজন স্থান এই যজ্ঞে তোমাদের দ্বারা আজ আমি যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটকে নিষ্পন্ন করব। (পূতিকা গ্রহণ করণীয়)। যজ্ঞের নিমিত্ত আমি তোমাকে গ্রহণ করছি। যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটের নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করছি। (ছাগদুগ্ধ গ্রহণ করণীয়)। যজ্ঞের নিমিত্ত এবং যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটের নিমিত্ত আমি তোমাকে গ্রহণ করছি। (কৃষ্ণাজিনের উপর স্থাপিত এইসব যজ্ঞসম্ভারকে স্পর্শ করণীয়)। হে সম্ভারসমূহ! যজ্ঞ তথা যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটের নিমিত্ত আমি তোমাদের স্পর্শ করছি।
৭। (কৃষ্ণজিনটিকে নিয়ে পরিবৃত্তের দিকে চলনীয়)–ব্রহ্মণস্পতি দেবতা আগত হোন। সত্য এবং দ্যোতমানা দ্যাবাপৃথিবীও আগমন করুক। বীর, মার্নবহিতকরীও পংক্তিসাধক আমাদের যজ্ঞকে উত্তারণ করুক। (যজ্ঞীয় সম্ভারগুলি একটি চতুষ্কোণ বিশিষ্ট স্থানে পরিবৃত্তে রক্ষণীয়)। হে সম্ভারসমূহ! যজ্ঞ ও যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটের নিমিত্ত ও তোমাদের এই স্থানে পরিবৃত্তে ধারণ (বা স্থাপন) করছি। (বল্মীকমৃত্তিকা, শূকরমৃত্তিকা এবং পূতিকাগুলি ছাগদুগ্ধের সাথে চটকিয়ে মেখে ভূমিতে রক্ষণীয়) হে মহাবীরঘট নির্মাণকারী সম্ভাররাশি! যজ্ঞ ও যজ্ঞের শিরোভূত মহাবীরঘটকে নির্মাণের নিমিত্ত আমি তোমাদের মিশ্রিত করছি। (ক্রমশঃ তিনটি মহাবীরঘটকে বিধিমতো নির্মাণ করণীয়)। হে মহাবীরঘট! যজ্ঞ ও যজ্ঞের শিরোভূত যজ্ঞদেবতার নিমিত্ত আমি তোমাকে নির্মিত করছি।
৮। হে প্রথম মহাবীরঘট! তুমি যজ্ঞের শিরস্বরূপ। (স্পর্শ করণীয়) যজ্ঞের নিমিত্ত এবং যজ্ঞের শিরোভূত যজ্ঞদেবতার নিমিত্ত আমি তোমাকে স্পর্শ করছি। হে দ্বিতীয় মহাবীরঘট! তুমি যজ্ঞের শিরস্বরূপ। (স্পর্শ করণীয়)। যজ্ঞ এবং যজ্ঞের শিরোভূত যজ্ঞদেবতা বিষ্ণুর নিমিত্ত আমি তোমাকে স্পর্শ করছি। হে তৃতীয় মহাবীরঘট! তুমি যজ্ঞের শিরস্বরূপ। (স্পর্শ করণীয়)। যজ্ঞ এবং যজ্ঞদেবতার নিমিত্ত আমি তোমাকে স্পর্শ করছি। (তিনটি মহাবীরঘটকে তৃণধান্যে ঘর্ষণ করে চিক্কণ করণীয়)। হে মহাবীরঘটসমূহ! যজ্ঞ এবং যজ্ঞের শিরোভূত যজ্ঞদেবতার নিমিত্ত আমি তোমাদের চিক্কণ (চক্চকে) করছি।
৯। হে মহাবীরঘট! পৃথিবীর দেবযজন স্থান যজ্ঞে সেচক অশ্বের বিষ্ঠায় আমি তোমাকে ধূপিত করছি। হে মহাবীরঘট! যজ্ঞ এবং যজ্ঞের শিরোভূত যজ্ঞদেবতার নিমিত্ত আমি তোমাকে ধূপিত করছি। সেচক অশ্বের বিষ্ঠায় আমি তোমাকে পৃথিবীর দেবযজন স্থান যজ্ঞে ধূপিত করছি। (দ্বিতীয় মহাবীরঘটটিকে ধূপিত করণীয়)। যজ্ঞ তথা যজ্ঞের শিরোভূত অধিদেবতার নিমিত্ত আমি তোমাকে ধূপিত করছি। (এইভাবে তৃতীয় মহাবীরঘটকে ধূপিত করণীয়)।
১০। হে প্রথম মহাবীরঘট! ঋজু দ্যুলোকের (অর্থাৎ আদিত্যের) নিমিত্ত আমি তোমাকে অগ্নির উপর স্থাপিত করছি (উঠাচ্ছি)। হে দ্বিতীয় মহাবীরঘট! বৃষ্টির দ্বারা সকল কামনাকে সাধনশালী অন্তরিক্ষের (অর্থাৎ বায়ুর) নিমিত্ত আমি তোমাকে অগ্নির উপর স্থাপন করছি। হে তৃতীয় মহাবীরঘট! আমাদের নিবাসকে সাধারভূতা ভূমির নিমিত্ত আমি তোমাকে অগ্নির উপর স্থাপন করছি। হে প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় মহাবীরঘট সমুদায়! যজ্ঞ এবং যজ্ঞদেবতার নিমিত্ত আমি তোমাদের ছাগদুগ্ধের সাথে আসিঞ্চিত করছি।
১১। (ব্রহ্মা নামক ঋত্বিক কর্তৃক আজ্ঞাকৃত হয়ে অধ্বর্যু প্রত্যেক মহাবীর বা ঘর্ম বা প্রবর্গকে তিনবার প্রেক্ষণ অর্থাৎ জলসিঞ্চন করে থাকে)।–হে ঘর্ম! যম, যজ্ঞ এবং সূর্যে তাপের নিমিত্ত আমি তোমাকে জলের দ্বারা পবিত্র করছি। (ঘর্মকে ঘৃতে আলিপ্ত করণীয়)–হে ঘর্ম! সবিতাদেব তোমাকে মধুর ঘৃতে আলিপ্ত করুক। (তৃণাস্তীর্ণ বা খড় বিছানো বালুর নীচে শতমান (বা শত রত্তি) পরিমিত রৌপ্য রক্ষণীয়)–হে রজত! তুমি অগ্নি হতে পৃথিবীর সংস্পর্শকে রক্ষা করো। (হে রৌপ্য! তুমি পৃথিবীর রাক্ষসগণের সংস্পর্শ হতে মহাবীরঘটকে রক্ষা করো)। হে ঘর্ম (মহাবীর)! তুমি চন্দ্রের রশ্মি সদৃশ; তুমি অগ্নির তেজঃস্বরূপ; তুমি সূর্যের তাপের সমান।
১২। (এক-এক ঘর্মের উপর অঙ্গুলী রক্ষণশালী যজমানকে অধ্বর্যু কর্তৃক এই মন্ত্র উচ্চারণীয়) হে পৃথিবী! তুমি পূর্ব দিকে অগ্নির আধিপত্যে অবস্থিত হয়ে রাক্ষস ইত্যাদির দ্বারা সর্বথা অনাধৃষ্টা হয়ে আছ। সেই তুমি আমাকে আয়ু প্রদান করো। দক্ষিণ দিকে ইন্দ্রের আধিপত্যে বিদ্যমানা তুমি, হে পৃথিবী! পুত্রবতী হয়ে আছ। তুমি আমাকে সন্তান প্রদান করো। পশ্চিম দিকে সবিতার আধিপত্যে বিদ্যমান তুমি সুখের সাথে আশ্রয়ণীয়া হয়ে আছ। তুমি আমাকে দর্শনশক্তি প্রধান করো। উত্তর দিকে ধাতার আধিপত্যে বিদ্যমানা তুমি ঋত্বিগণের আশ্রয়ণের যজণীয় প্রদেশ হয়ে আছ। তুমি আমাকে ধনের সমৃদ্ধি প্রদান করো। ঊধ্বস্থ প্রদেশে বৃহস্পতি দেবের আধিপত্যে বিদ্যমানা তুমি বিশেষ রূপে সকলকে ধারণকারিণী বিধৃতি সংজ্ঞিকা হয়ে আছ। তুমি আমাকে ওজঃ প্রদান করো। (মহাবীর হতে দক্ষিণ ভূমির উপর যজমান কর্তৃক আপন হস্ত উলটা করে ধরণীয়)–হে মহাবীরঘট হতে দক্ষিণ দিকে স্থিতা ভূমি! তুমি আমাকে সকল নাশক রাক্ষক ইত্যাদি হতে রক্ষা করো। (উত্তর দিকে হস্ত স্থাপন করে) হে ঘর্মের উত্তর ভূমি! তুমি মনুর অশ্বরূপ।
১৩। হে ঘর্ম! তুমি স্বাহার আকারশালী হওয়ার কারণে সূর্যস্বরূপ; তুমি মরুত্বর্গের দ্বারা অধিষ্ঠিত হও। (প্রত্যেক ধর্মে শত শত রত্তি সুবর্ণ রক্ষণীয়)–হে স্বর্ণ শতমান! তুমি আমাকে ভদ্রলোকের সংস্পর্শক রাক্ষস ইত্যাদি হতে রক্ষা করো। (কৃষাজিনের ব্যজনে বা পাখায় প্রবর্গকে বাতাস করণীয়)–প্রাণ, উদান, ব্যানকে ক্রমশঃ মধু-মধু-মধু বলে এক-এক প্রবর্গে (মহাবীরে) স্থাপন করছি।
১৪। দেববর্গের গর্ভ, স্তুতিসমূহের পিতা, এবং প্রজা সকলের অধিপতি প্রবর্গ (মহাবীর) সবিতাদেবের সাথে সঙ্গত হয়েছে। সে (ঘর্ম) এক্ষণে সূর্যের সাথেই শোভিত হচ্ছে।
১৫। যে ঘর্ম অগ্নির সাথে একীভাব প্রাপ্ত হয়েছে, সবিতাদেবের সাথে সঙ্গত হয়েছে এবং সূর্যের সাথে শোভিত হয়েছে; স্বাহাকৃত সেই অগ্নিরূপ ঘর্ম সূর্যের তেজের সাথে সবিতাদেবের সাথে এবং সূর্যের সাথে সঙ্গত হয়ে আরোচমান হচ্ছে।
১৬। যে এই দ্যুলোককে এবং কিরণরাশিকে ধারণ করণশালী এবং স্বয়ং মনুষ্যধর্ম রহিত (অর্থাৎ অজর ও অমর) দেবতা, সূর্য হতে উৎপন্ন সেই ঘর্মদেব আমাদের বাক্শক্তি প্রদান করুক।
১৭। রক্ষক ঘর্মশালী (বা ঘর্মরূপী) আদিত্যকে আমরা কখনও আকাশচ্যুত হতে দর্শন করিনি; (অর্থাৎ আশ্চর্য এই যে, আদিত্য কেন পতিত হয় না?), সেই সার্থেই আমরা তাকে বিভিন্ন মার্গে আগমন ও গমন করতেও দর্শন করেছি। সে সহগমনা এবং বিস্তৃর্গ (এইধারে ঐধারে)–গমনা রশ্মিসমূহকে ধারণ করে এই ভূবনের অন্দরে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করছে।
১৮। হে সর্বভূ (অর্থাৎ সকল ভুবনের) স্বামী! হে সকলের মনসম্পতি (মনের অধিপতি)! হে সকলের বাণীপতি (বাক্যের পালক)! হে ঘর্ম! দেবশ্রুৎ (অর্থাৎ দেবগণের মধ্যে প্রসিদ্ধ) তুমি দেবতা হয়ে দেবগণকে রক্ষা করো। হে অশ্বিদ্বয়! এইস্থানে যজ্ঞে দেবগণের তর্পণকালে মধুবিদ্যার জ্ঞানের নিমিত্ত মধু নামক ব্রাহ্মণকে প্রাপণশালী এবং মধুবিদ্যাকে পূজনশালী যে অর্থবাগণ তোমাদের দুজনকে জ্ঞান দান করেছিল, তারা তোমাদের দুজনকেও রক্ষা করুক৷
১৯। হে ঘর্মদেব! হৃদয় ও মনের পরিশুদ্ধি এবং দ্যুলোক ও সূর্যলোকের প্রাপ্তির নিমিত্ত আমি তোমার স্তব করছি। ঊর্ধ্বমুখ হয়ে, হে ঘর্মদেব! তুমি আমাদের যজ্ঞকে দেবগণের মধ্যে স্থাপিত করো।
২০। হে ঘর্ম (বা মহাবীর)! তুমি আমাদের পিতা বা পালক। তুমি নিজেকে আমাদের পিতারূপে জ্ঞাত হও। তুমি আমাদের নমস্কার প্রাপ্ত হও। তুমি আমাদের কখনও হিংসিত করো না। (মুখাবরণ অর্থাৎ ঘোমটা অপসারিত করে দর্শনশালিনী যজমানের পত্নীদের অধ্বর্যু এই যজুঃ বলাবে) –হে মহাবীর! বীর্যের অধিদেতা তৃষ্টার সাথে যুক্ত আমরা স্ত্রীগণ তোমাকে মৈথুনের নিমিত্ত স্পর্শ করছি। পুত্রগণ ও গাভী ইত্যাদি পশুসমূহকে (বা পশুসম্বন্ধিনী বৃদ্ধিকে) তুমি আমাদের মধ্যে স্থাপিত করো। প্রজাগণকে আমাদের মধ্যে ধারিত করো। এই পতির সাথে অবস্থিত হয়ে আমরা যেন সদা অহিংসিতা থাকতে পারি।
২১। আপন শুভ জ্যোতির সাথে সুজ্যোতিষ্মন্ দিবস সূর্যের সাথে হবিঃ সেবন করুক। স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি! আপন জ্যোতির সাথে শুভ তেজঃশালিনী রাত্রি প্রজ্ঞাপাক অগ্নির সাথে এই হবিঃ সেবন করুক। তাদের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (এই যজুমন্ত্রগুলি পাঠ করে রৌহিণ হোমে দুই ঘৃতাহুতি প্রদান করণীয়)।
মন্ত্ৰার্থঃ— ১। (গাভীকে রজ্জবদ্ধ করণীয়)–হে রঞ্জু! সবিতাদেবের অনুজ্ঞায় বর্তমান আমি অশ্বিন্দ্বয়ের বাহুসমূহ এবং পুষাদেবের হস্তদ্বয়ের দ্বারা তোমাকে গ্রহণ করছি। তুমি অদিতির মেঘলাস্বরূপ।
২। হে ইড়া (বা মানবী)! আগতা হও। হে অদিতি! আগতা হও। হে সরস্বতী! আগতা হও। হে ধবলী (গাভীর নামের পরিবর্ত)! আগমন করে। (তিনবার নাম সহ আহ্বান করণীয়)।
৩। হে রঞ্জু! তুমি অদিতির মেঘলা। তুমি ইন্দ্রাণীর (ইন্দ্ৰপত্নীর) শিরোবেষ্টনী। (গাভীর পশ্চাৎ পাদদ্বয়ে রঙ্কু বন্ধন করণীয়)–হে গোবৎস! তুমি পূষাদেবতা।(বৎসটিকে ছেড়ে দিয়ে)–হে গোবৎস! তুমি কিছু পরিমিত দুগ্ধ ঘর্মদেবতার নিমিত্ত শেষে পরিত্যাগ করো (অর্থাৎ ছেড়ে দাও)।
৪। হে গাভী! তুমি অশ্বীযুগলের নিমিত্ত আপ্যায়িত হও (অর্থাৎ প্লাবিত হও)। সরস্বতীর নিমিত্ত প্লাবিত হও! ইন্দ্রের নিমিত্ত প্লাবিত হও। (গাভীকে দোহন করণীয়) (দোহনকালে ছিটকে পড়া দুগ্ধকে উদ্দেশ্য করে) এই পতিত পয়ঃকণাগুলি ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে।
৫। হে সরস্বতী! তোমার স্তন সুপ্তসদৃশ হয়ে আছে, যা সুখভাবক, যা রত্ন দানশালী, যা ধনলাভ করানোর সামর্থযুক্ত, যা সুদাতা, যাতে তুমি সকল বরণীয় ধন্য ইত্যাদি পোষিত করে থাকো; হে সরস্বতী তোমার সেই আপন স্তনকে আমাদের পানের নিমিত্ত এই দিকে (অর্থাৎ আমার দিকে) প্রদান করো। আমি বিশাল অন্তরিক্ষকে প্রাপ্ত হতে গমন করছি। (অধ্বর্যুর গার্হপত্যাগ্নির দিকে গমন করণীয়)।
৬। (দুটি পরিশাসকে গ্রহণ করণীয়)–হে প্রথম পরিশাস! তুমি গায়ত্রী ছন্দস্বরূপ। হে দ্বিতীয় পরিশাস! তুমি ত্রিষ্টুপ ছন্দ স্বরূপ। (পরিশাসদ্বয়ে মহাবীরকে ধারণীয়)। হে ঘর্ম! আমি তোমাকে দ্যাবাপৃথিবীর উদ্দেশ্যে গ্রহণ করছি। হে ঘর্ম। আমি তোমাকে অন্তরিক্ষের উদরে ধারণ (স্থাপন) করছি। হে ইন্দ্র! হে অশ্বিনদ্বয়! মধুমুক্ষিকার দ্বারা একত্রীকৃত এই মধু (পয়)-কে তুমি পান করো। হে বসুগণ! বষারের দ্বারা স্বাহাকৃত এই দুগ্ধকে তোমরা সূর্যের বৃষ্টিকারিণী বৃষ্টিবনীরশ্মিসমূহকে প্রদান করো।
৮। বসু ও রুদ্রের সাথে যুক্ত ইন্দ্রের নিমিত্ত, হে ঘর্ম! তোমার উদ্দেশে এই আহুতি প্রদান করছি। শত্রুকে হননশালী ইন্দ্রের নিমিত্ত, হে ঘর্ম! তুমি স্বাহা হও। রিভু-বিভু-বাজবা যুক্ত সবিতার নিমিত্ত, হে ঘর্ম! তুমি স্বাহা হও। বিশ্বদেবগণের সাথে যুক্ত বৃহস্পতির নিমিত্ত, হে ঘর্ম! তোমাকে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি।
৯। অঙ্গিরা এবং পিতৃগণের সাথে যুক্ত যমের নিমিত্ত, হে ঘর্ম! তোমাকে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। ঘর্মের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। ঘর্ম পিতৃপুরুষগণের নিমিত্ত আহূত হোক।
১০। সকল দিক্ দক্ষিণ দিকে স্থিতিশীল হয়, কারণ অধ্বর্যু দক্ষিণ দিকেই উপবিষ্ট হয়ে সকল দেবকে যজন করেছে। হে অশ্বিনদ্বয়! ঘর্মস্থ মধুর স্বাহাকৃত অংশকে পান করো।
১১। হে মহাবীর! তুমি এই যজ্ঞকে দ্যুলোকে স্থাপিত করো; এই যজ্ঞকে দ্যুলোকে স্থাপিত করো। যজনীয় অগ্নির উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে। যজুঃসমূহের সাথে সম্পর্কের দ্বারা আমাদের সুখ লব্ধ হোক।
১৩। হে অশ্বিদ্বয়! ঘর্মস্থ মধুর পয় (রস) পান করো। দ্যাবাপৃথিবী দেবীদ্বয় আমাদের কর্মকে অনুমোদন করুক। ইন্দ্র ইত্যাদির দান আমাদেরই যজ্ঞে প্রাপ্ত হোক।
১৪। হে অতিতপ্ত ঘর্ম! বর্ষার নিমিত্ত তুমি পুষ্ট হও। অন্নের নিমিত্ত তুমি পুষ্ট হও। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় এবং দ্যাবাপৃথিবীর নিমিত্ত তুমি পুষ্ট হও। হে ঘর্ম! তুমি জগৎকে ধারণশালী ঘর্ম। তুমি সুঘর্ম। হে ঘর্ম! হিংসিত না করে (অর্থাৎ আমাদের প্রতি ক্ষুব্ধ না হয়ে) তুমি আমাদের মধ্যে ধন ইত্যাদি স্থাপিত করো। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, প্রজাগণকে আমাদের মধ্যে স্থাপিত করো; (অর্থাৎ তাদের আমাদের বশীভূত করে দাও)।
১৫। স্নেহ-উৎপাদক পূষার (বা বায়ুর) নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। গ্রহণকারী প্রাণসমূহের নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। প্রতিরকারী প্রাণসমূহের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। বৰ্হির অগ্রবর্তী ভাগের পাত্র (সোমপায়ী) পিতৃগণের নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। ঘর্মপায়ী পিতৃপুরুষবর্গের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। প্রাণ ও উদানের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। সকল প্রাণের নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি।
১৬। ঋত্বিকগণের দ্বারা স্তুত রুদ্রের নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। ঘর্মস্থ ঘৃতজ্যোতি উপমনী সুবাস্থ ধৃতজ্যোতির সাথে সঙ্গত হোক। আপন জ্যোতির দ্বারা শুভ জ্যোতিশালী দিবস প্রজ্ঞাপক সূর্যের সাথে সেচন করুক বা প্রীত হোক। স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। আপন জ্যোতিতে জ্যোতিষ্মতী রাত্রি প্রজ্ঞাপক অগ্নির সাথে সপ্রীতা হোক। স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। অত্যন্ত বীর্যমান্ অগ্নিতে মধুর দ্বারা হোম সাধিত হয়েছে। হে ঘর্মদেব! তোমাতে স্থিত ঘৃতকে আমরা ভক্ষণ করছি। (উপমনীতে অবশিষ্ট ঘৃত সকল ঋত্বিক ও যজমান ভক্ষণ করছে)। হে ঘর্ম! তোমাকে নমস্কার করি। তুমি আমার হিংসিত করো না ৷
১৭। হে ঘর্ম! তোমার মেধা ও বিস্তারবতী মহিমা এই দ্যুলোককেও অভিভূত করে দিয়েছে। তুমি আপন যশের দ্বারা পৃথিবীকে অধিষ্ঠিত (বা ব্যাপ্ত) করছ। হে যজনীয়প্রশস্ত অগ্নি! তুমি মহান্। তুমি আপন রক্তাভ ধূমকে বর্ধন করো। দেবগণের অত্যন্ত প্রিয় তুমি প্রকাশমান হও।
১৮। হে ঘর্ম! তোমার যে প্রভা দ্যুলোকে আছে; যা গায়ত্রী ছন্দে আছে এবং যা হবিধান গৃহে আছে, সেই তোমার প্রভা বর্ধিত হোক এবং দৃঢ় হোক। হে ঘর্ম! তোমার সেই প্রভাব উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। হে ঘর্ম! তোমার জ্যোতি অন্তরিক্ষে আছে; যা ত্রিষ্টুপ ছন্দে আছে এবং যা আগ্নীপ্রগৃহে আছে, সেই তোমার জ্যোতি প্রবৃদ্ধ ও সংহত হোক। তোমার সেই জ্যাতির নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। হে ঘর্ম! তোমার যে জ্যোতি পৃথিবীতে রয়েছে, যা জগতী ছন্দে রয়েছে এবং যা সভাগৃহে (বা যজ্ঞগৃহে) প্রবিষ্ট হয়ে রয়েছে, সেই তোমার জ্যোতি বৃদ্ধিলাভ করুক এবং এবং দৃঢ় হোক। তোমার সেই জ্যোতির উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (আগ্নী ঋত্বিকের দ্বারা ধার্যমান তিনটি শলাকার উপর অধ্বর্যু কর্তৃক ধৃতের আহুতি প্রদান করণীয়)।
১৯। হে মহাবীর! ক্ষত্রিয়কে পরম পালনের নিমিত্ত আমরা তোমার অনুগমন করছি। তুমি ব্রাহ্মণের শরীরকে পালন করো। যজ্ঞকে ধর্মপূর্বক ধারণের হেতু আমরা তোমাকে অনুগমিত করছি এবং নবীন কল্যাণের নিমিত্ত আমরা তোমার অনুগমন করছি।
২০। যে মহাবীর চতুর্দিক রূপী কোণ-সম্পন্ন যজ্ঞের নাভি এবং বিস্তারযুক্ত, সে আমাদের সম্পূর্ণ আয়ু প্রদান করুক; সমগ্র জগৎকে আয়ু প্রদান করুক। আমাদের কৌটিল্যকে দূর করুক। আমরা জগদনুগ্রহরূপ ব্রতধারী পরমাত্মার সাথে সঙ্গত হবো।
২১। হে ঘর্ম! এই দুগ্ধ তোমার পূরণকর্তা (অর্থাৎ তোমাকে পূর্ণকারী) তাতে তুমি পূর্ণ হও; পরিবর্ধিত হও। (দুগ্ধের দ্বারা তিনটি মহীবীরঘটকে পূর্ণ করণীয়)। হে মহাবীর! কৃপাপূর্বক আমাদেরও বর্ধন করো এবং আমরা ধনধান্যে সমৃদ্ধ হবো।
২২। অভীষ্টবর্ষক, রসহারী, মহান্ তথা মিত্রের ন্যায় প্রিয় মহাবীর পুনঃ পুনঃ শব্দ করছে। জলাধার এবং ধননিধি মহাবীর সূর্যের সাথে সঙ্গত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে।
২৩। আপঃ (জল) ও ওষধিসমূহ আমাদের নিমিত্ত সুমিত্র-সদৃশ হোক; এবং তাদের নিমিত্ত দুর্মিত্র (বা শত্রু)-সদৃশ হোক, যারা আমাদের দ্বেষ করে এবং আমরা যাদের দ্বেষ করি।
২৪। অন্ধকারের অবসানে শ্রেষ্ঠ পরমাত্মজ্যোতিকে দর্শন করে আমরা পরমোত্তম সূর্য (অর্থাৎ পরমাত্ম)-জ্যোতিকে সম্প্রাপ্ত হয়ে থাকি।
২৫। (যজমান কর্তৃক একটি সমিধা (সমিৎ) আহবনীয়। অগ্নিতে ক্ষেপণীয়)- হে কাষ্ঠ! তুমি সমিৎ হয়ে দীপ্ত হও।(অগ্নিতে ক্ষেপণ)। হে আবহনীয়াগ্নিস্থ সমিধা! তোমার কৃপায় আমরা বর্ধন প্রাপ্ত হবো। তুমি সমিধা;তুমি তেজের কারণস্বরূপ, তুমি আমাতে তেজঃ ধারিত (স্থাপিত) করো।
২৬। (দধিতে পূর্ণ করে ঘর্মকে গ্রহণ করণীয়)–হে ইন্দ্র! এই দ্যাবাপৃথিবী যে পরিমাণ বিস্তারশালিনী এবং এই স্থানে যে পরিমাণ বিস্তারশালী সপ্ত সাগর আছে, সে ই পরিমাণশালী তোমার গ্রহকে (যজ্ঞপাত্রকে) আমি অন্নের সাথে গ্রহণ করছি। হে ইন্দ্র! আমি নিজেতেই সেই গ্রহকে অনুপক্ষীণ গ্রহণ করছি। আমি সেই অক্ষয় পাত্রকে (অনুপক্ষীণ গ্রহকে) গ্রহণ করছি।
২৭। সেই প্রসিদ্ধ মহৎইন্দ্রিয়বল আমাতে প্রতিষ্ঠিত হোক। সঙ্কল্প-সম্পত্তি আমাতে বিরাজমান হোক। সঙ্কল্প আমাতে আশ্রয়ান্বিত হোক। তিন জ্যোতিসম্পন্ন ঘর্ম আমাতে শোভিত হচ্ছে। আদিত্য জ্যোতি, বেদ বা জ্ঞানজ্যোতি, এবং ব্রহ্মজ্যোতির সাথে ঘর্ম আমাতে শোভিত হোক।(ঋত্বি ও যজমান কর্তৃক ঘর্মস্থ দধি ভক্ষণ করণীয়)৷
মন্ত্ৰার্থঃ— ১।(প্রবর্গ বা ঘর্ম ভেদিত বা ভগ্ন হওয়ার পর প্রায়শ্চিত্তি সম্পর্কিত আহুতিসমূহ বিধৃত হচ্ছে)–হিরণ্যগর্ভের সাথে বর্তমান প্রাণসমূহের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে পূর্ণাহুতি প্রদান করছি। পৃথিবী, অগ্নি, অন্তরিক্ষ, বায়ু, দুলোক ও সূর্যের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে পূর্ণাহুতি প্রদান করছি।
২। দিকসমূহ, চন্দ্রমা, নক্ষত্র সমুদায়, আপঃ (জলরাশি) বরুণ, নাভিনামক দেবদ্বয় ও পূতায় (অর্থাৎ শোধক দেবতার) উদ্দেশ্য স্বাহা মন্ত্রে পূর্ণাহুতি প্রদান করছি।
৩। বাক্, প্রাণদ্বয়, চক্ষুদ্বয় ও শ্রোত্রদ্বয়ের অধিষ্টাতৃ দেবতাগণের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে পূর্ণাহুতি প্রদান করছি।
৪। মনের কামনার পূর্তি সঙ্কল্পের সিদ্ধি এবং বাক্যের সত্যতাকে আমি যেন প্রাপ্ত হই। পশুসমূহের রূপ, অন্নের রস, যশ ও লক্ষ্মী (বা ঐশ্বর্য) আমাতে আশ্রয়ণ করুক। সেই উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি।
৫। (নিষ্ঠিত অভিস্পর্শ হতে গ্রহণ পূর্বক ছাগদুগ্ধের দ্বারা সিঞ্চন পর্যন্ত কালে মহাবীরের সংজ্ঞা সম্রিয়মাণ হয়ে থাকে। এই অবস্থায় এর অধিপতি প্রজাপতি হয়ে থাকে। এই সময় ভগ্নের পর প্রজাপতির উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদান করণীয়)–সস্রিয়মাণ ঘর্ম প্রজাপতিদেবতাক। প্রজাপতির উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (এরপর কুশসমূহের উপর ধারণ পর্যন্ত কালে, ভগ্ন হলে ঘর্মকে সস্তৃত বলা হয়। তাতে সম্রাট প্রায়শ্চিত্ত দেবতা হয়ে থাকে)–আমি সস্তৃত ও সম্রাট দেবদ্বয়ের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। তারপর কুশের শূন্যস্থানের উপর ধারণ পর্যন্ত তাকে সংসন্ন বলা হয়। সেই সময় বৈশ্বদেব প্রায়শ্চিত্তীয় দেবতা হয়ে থাকে। অতএব–আমি সংসন্ন ও বৈশ্বদেবগণের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। (পরিশাসসমূহের দ্বারা গ্রহণ পর্যন্ত তা প্রবৃক্ত: সংজ্ঞক হয়ে থাকে। সেই কালে ভগ্ন হলে কেবল ঘর্মের নিমিত্ত স্বাহা বলা উচিত। অর্থাৎ)–আমি প্রবৃক্ত ঘর্মদেবের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (উদ্যতপন হতে গ্রহণ পূর্বক ছাগ দুগ্ধে সিঞ্চন পর্যন্ত তাকে উদ্যত বলা হয়। তখন ভগ্ন হলে তেজের নিমিত্ত স্বাহা বলা উচিত)–আমি উদ্যত তেজের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (দুগ্ধ লওয়ার দিকে ছাগকে দুগ্ধের দ্বারা সিঞ্চন পর্যন্ত ঘর্ম আশ্বিদেবতাক হয়ে থাকে। তখন ভগ্ন হওয়ার পর অশ্বিনদ্বয়কে স্বাহা বলা উচিত)–আমি অশ্বিনদ্বয়ের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি।(ঘৃতের বাহিরে সুবিত হওয়ার সময় ভগ্ন হবার পর ঘর্ম পূষাদেবতাক হয়ে যায়। তখন বলতে হয়)–আমি পূষা দেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (ঘর্মের অন্দরে ঘৃত অবর্তনকালে ঘর্ম মরুৎদেবতাক হয়ে যায়। তখন ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি মরুৎদেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (মথনের সময় ঘৃতের বিন্দুকে বা গাঢ়তাকে পরীক্ষার সময় ঘর্ম মিত্রদেবতাক হয়। তখন ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি মিত্র দেবতার– উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (আহবনীয়ে হ্রিয়মান ঘর্ম বায়ুদেবতাক হয়ে থাকে। তখন ভগ্ন হলে, বলতে হয়)–আমি বায়ুর উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (আহ্বায়মাণ ঘর্ম, অগ্নিদেবতাক হয়ে থাকে। তখন ঘর্ম যদি ভগ্ন হয়, বলতে হয়) আমি অগ্নি দেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি।
৬। (প্রথম দিনটি সবিতা দেবতার হয়ে থাকে। অতএব প্রথম দিনে ঘর্ম ভগ্ন হওয়ার পরে বলতে হয়)–আমি সবিতা দেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (দ্বিতীয় দিনটি অগ্নি দেবতার হয়ে থাকে। অতএব দ্বিতীয় দিনে ঘর্ম ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি অগ্নি দেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (তৃতীয় দিন ঘর্মদেব বায়ু দেবতার হয়ে থাকে। অতএব তৃতীয় দিনে ঘর্ম ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি বায়ুর উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (চতুর্থ দিনটি আদিত্য দেবতার হয়ে থাকে। অতএব চতুর্থ দিনে ঘর্ম ভগ্ন হলে বলতে হয়) আমি আদিত্যের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (পঞ্চম দিনটিতে ঘর্ম চন্দ্রদেবতার হয়ে থাকে। তখন ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি চন্দ্রমার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (ষষ্ঠ : দিনে ঘর্ম ভগ্ন হলে বলতে হয়) –আমি ঋতুসমূহের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (সপ্তম দিনের মরুৎ দেবতা। তখন ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি মরুত্ত্বর্গের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (অষ্টম দিনটি বৃহস্পতি দেবতার হয়ে থাকে। তখন ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি বৃহস্পতি দেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (নবম দিনের দেবতা মিত্র। অতএব তখন ঘর্ম ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি মিত্র দেবের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (দশম দিনটিতে ঘুমের দেবতার বরুণ। তখন ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি বরুণ দেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (একাদশতম দিনটি ইন্দ্র দেবতার। তখন ঘর্ম ভগ্ন হলে পর বলতে হয়) আমি ইন্দ্রের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (দ্বাদশতম দিনটিতে ঘর্মের দেবতা হয়। বিশ্বদেবগণ। অতএব ঐ দিবসে ঘর্ম ভগ্ন হলে বলতে হয়)–আমি বিশ্বদেবগণের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। (এইভাবে বলে প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত)৷
৭। উগ্র (উৎকৃষ্ট), ভীম (বিভেদকারী), ধ্বস্ত (ধ্বনি উৎসারণকারী), ধুনি (শত্রুগণকে কম্পিতকারী), সাসন (শত্রুগণের যুদ্ধাহ্বান সহনশালী। বা গ্রহণকারী), অভিযুথা (সম্মুখে যোগপ্রাপ্তশীল) এবং বিক্ষিপঃ (শগণকে বিক্ষিপ্তকারী)–এই নামে অভিহিত সপ্ত মরুতের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি।
৮। (এই অধায়ের অবশিষ্ট মন্ত্রগুলি অশ্বমেধের আহুতি)–আমি অশ্বের হৃৎপিণ্ডের দ্বারা অগ্নিদেবতাকে প্রীণিত করছি, হৃৎপিণ্ডের অগ্রভাগেরদ্বারা অশনিদেবতাকে প্রীণিত করছি। সমস্ত হৃদয় খণ্ডের দ্বারা পশুপতিদেবকে প্রীণিত করছি। অশ্বের যকৃতের দ্বারা আমি ভবদেবকে, মতব (হৃদয়াস্থিবিশেষের) দ্বারা শর্ব দেবতাকে, অশ্বের ক্রোধের দ্বারা ঈশান দেবতাকে, পার্শ্বের অস্থিসংলগ্ন মাংসের দ্বারা মহাদেব দেবকে, বৃহদন্ত্রের (অর্থাৎ ভুল অন্ত্রের) দ্বারা উগ্রদেবকে এবং বসিষ্ঠের হনুঃ বা কপোলের নিম্নভাগ ও হৃদয়কোশস্থ মাংসপিণ্ডের দ্বারা শিঙ্গীনি নাম্নী দেবতার প্রীতিসাধন করছি।
৯। আমি অষের রক্তের দ্বারা উগ্রকে, অশ্বের শুভ। কার্যসমূহের দ্বারা মিত্রদেবকে, অশ্বের দুষ্ট কর্মসমূহের দ্বারা রুদ্রকে, অশ্বের প্রক্রীড়ন অর্থাৎ প্রকৃষ্ট ক্রীড়ার দ্বারা ইন্দ্রকে, বলের দ্বারা মরুৎবর্গকে এবং প্রকৃষ্টরূপ হর্ষের দ্বারা সাধ্য দেবতাগণকে প্রীণিত করছি। অশ্বের কণ্ঠস্থিত মাংসের দ্বারা ভগদেবকে, পার্শ্বের অন্তর্মধ্যে অর্থাৎ মাংসবন্ত পার্শ্বদেশের দ্বারা রুদ্রদেবতাকে, যকৃতের দ্বারা মহাদেবকে, বৃহদন্ত্রের দ্বারা শর্বদেবকে এবং অশ্বের হৃদয়াচ্ছাদক নাড়ীর দ্বারা পশুদেবতাকে প্রীণিত করছি।
১১। আমি আয়াস নামক দেববিশেষের উদ্দেশে, প্রয়াস নামক দেবের নিমিত্ত, সংয়াস নামক দেবতার উদ্দেশে, বিয়াস নামক দেবতার নিমিত্ত, উদ্যাস নামক দেবের উদ্দেশে, শু (অর্থাৎ মনস্তাপের অধিষ্ঠাতা) দেবের উদ্দেশে, শোককে প্রাপ্ত করণশালী দেবের উদ্দেশে, শোচমান দেবতার নিমিত্ত এবং শোকের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে। আহুতি প্রদান করছি।
১২। আমি তপের উদ্দেশে, তপ করণশালীর উদ্দেশে, তপ্যমানের উদ্দেশে, তপ্তের উদ্দেশে, ঘর্মের উদ্দেশে, নিষ্কৃতির উদ্দেশে, প্রায়শ্চিত্তের উদ্দেশে, প্রায়শ্চিত্তের উদ্দেশে এবং ভেষজের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি।
১৩। আমি যমের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। আমি অন্তকের উদ্দেশে, মৃত্যুর উদ্দেশে, ব্রহ্মের উদ্দেশে, ব্রহ্মহত্যার উদ্দেশে, বিশ্বদেবগণের উদ্দেশে এবং দ্যাবাপৃথিবীর উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি।
অন্যদেবাহুঃ সম্ভবাদন্যদাহুরসম্ভবাৎ। ইতি শুশ্রুম ধীরাণাং যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে৷১০৷৷
[কাণ্ড-১৭ : মন্ত্র : ১৭]।
মন্ত্রার্থঃ— ১। [উবট বলছেন–সমাপ্তং কর্মকাণ্ডমিদানীং জ্ঞানকাণ্ডং প্রয়তে। মহীধরও বলেছেন–একোণচত্বা রিংশতাধ্যায়ৈঃ কর্মকাণ্ডং নিরূপিত। ইদানীং কর্মাচরণশুদ্ধান্তঃকরণং প্রতি জ্ঞানকাণ্ডমেকেনাধ্যায়েন। নিরূপতে। অর্থাৎ–এ পর্যন্ত.৩৯টি অধ্যায়ব্যাপী শুক্লযজুর্বেদোক্ত সংহিতা অংশে কর্মকাণ্ডের বিষয় বা মন্ত্ৰসমূহ বিধৃত। সুতরাং ঐ পর্যন্ত বেদানুসারী কর্ম আচরণ পূর্বক অন্তঃকরণ শুদ্ধ হওয়ার পর এই শেষ ৪০তম অধ্যায়টিতে জ্ঞানকাণ্ড বিধৃত হয়েছে। এই সকলই ঈশ্বরের দ্বারা অভিব্যাপ্ত হয়েছে। যা কিছুই এই জগতে চরাচর প্রপঞ্চ বিদ্যমান আছে, সেই ঈশ্বরের দ্বারা প্রদত্ত পদার্থসমূহকে নিষ্কাম ভাবের দ্বারা সেবন করো। কোনও ধনের প্রতি লালসা করো না। (বক্তব্যসর্বাণি দ্রব্যাণ্যণ্যোমুপগচ্ছন্তি দৃশ্যন্তে অতো মমেদমিতি বুদ্ধিরবিদ্যা তাং ত্যজতে যোগেহাধিকার ইত্যর্থঃ।)–আমার এই বুদ্ধি, বা অবিদ্যাকে পরিত্যাগ করলে তবেই আমি যোগে, অধিকার লাভ করব।
২। কর্ম করেই মনুষ্য শত বৎসর পর্যন্ত জীবিত থাকতে ইচ্ছা করে। সেই রকমে, হে জীব! তোমার মুক্তি হতে পারে। এ ব্যতীত ভিন্ন মার্গের দ্বারা তোমার মুক্তি নাই। এই রকম কর্মরত জীবন অতিবাহিত করার পরও মনুষ্যের মধ্যে কর্ম সংসক্ত (আসক্ত) হয় না; (অর্থাৎ তাকে কর্মফল ভোগ করতে হয় না)। (বক্তব্য–দ্বাবিমাবথ পন্থনৌ যত্র বেদাঃ প্রতিষ্ঠিতাঃ। প্রবৃত্তিলক্ষণো ধর্মো নিবৃত্তৌ চ। বিভাষিতঃ। এক কথায় নিবৃত্তিঃ, অর্থাৎ নিষ্কাম কর্মে প্রবৃত্তির দ্বারাই মনুষ্য মুক্তি লাভ করতে পারে)।
৩। ঘোর তমসায় বা অজ্ঞানতার অন্ধকারে আবৃত সেই লোক (যোনিসকল) অসুর্য (অর্থাৎ অসুরগণের বশীভূত) নামশালী হয়ে থাকে। সেই লোকসমূহ মরণের পর স্থাবর জঙ্গম ইত্যাদিরূপে পুনর্জাত হয়. যারা আপন কর্মকে বা নিজেকে হনন করে থাকে। অনুচিত কর্ম করার সময় যে আপন অন্তরাত্মার আওয়াজ শ্রবণ করেও তাকে অবহেলনা করে এবং সেই অনুচিত কর্ম করে, তারাই প্রাণপোষণপর অসুর)। (মহীধর-ভাষ্য অনুসারে, শুধু মনুষ্যই অসুরত্ব প্রাপ্ত হয় না, দেবগণও অসুর।–অসুর্যাঃ অসুরাণামিমে অসুৰ্যা অসুষু প্রাণেষু রমন্তেহসুরাঃ, প্রাণপোষণপরা)।
৪। সেই পরমাত্মা অচল অর্থাৎ কম্পন বা গতি করণশালী নন। তিনি এক। অথচ তিনি মনেরও অধিক বেগশালী। সেই বেগে দেবতাও পাদক্ষেপে সক্ষম হয় না; (অর্থাৎ পা ফেলে চলতে পারে না। তিনি প্রথম হতেই সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে আছেন; অথচ তিনি সকল চক্ষু-শ্রোত্র ইত্যাদি ইন্দ্রিয়েরও অগোচর। ধাবমান হয়ে তিনি তাতেই ব্যাপ্ত অন্যান্য লোকসমূহকেও উল্লঙ্ঘন করে যান।সেই পরব্রহ্মেই স্থিত হয়ে অন্তরিক্ষগামী (মাতরিশ্বা) পবন আপ (জল)-কে ধারণ করে থাকে; (জল অর্থে–তানি কর্মাণি যজ্ঞহোমাদীনি যস্মিন্ দধাতি স্থাপয়তি স্বাহা বাতে ধাঃ (৮২১) ইতি সমিষ্টয়জুষি বায়ুস্থত্বোক্তেঃ কর্মাণি তাবদ্বায়ৌ স্থাপ্যন্তে সমষ্টিরূপোহসৌ বায়ুরপি যস্মিন কর্মাণি স্থাপয়তি। যাগহোমদানাদিকর্মণাৎ পরমং নিধান)।
৫। জীবরূপ সেই পরমাত্মা গমন করে থাকেন এবং স্থাবররূপ তিনি কখনও গতিশীল নন। (তিনি চরাচর অর্থাৎ স্থাবর-জঙ্গমাত্মক নিখিল ব্রহ্মাণ্ড)। অজ্ঞানীর নিমিত্ত তিনি দূরস্থ, অর্থাৎ বোধের অগম্য; পরন্তু জ্ঞানীর নিমিত্ত তিনিই অত্যন্ত নিকটস্থ, অর্থাৎ হৃদয়ের অন্দরে স্থিত। তিনি সকলের অন্তরে বিরাজিত; আবার তিনিই এই প্রপঞ্চের বাহিরেও স্থিত হয়ে থাকেন; অর্থাৎ তার বিকার সমূহের উর্ধ্বে থাকেন।-(চেতনাচেতনরূপমনস্তং ব্রহ্ম)।
৬। যে বিদ্বান্ সকলভূতকে অর্থাৎ প্রাণীজাতমাত্রকে সেই পরমাত্মাতেই স্থিত দর্শন করেন এবং সকল ভূতে অর্থাৎ প্রাণীজাতমাত্রে অবস্থিত সেই পরমাত্মাকে দর্শন করেন (বা জ্ঞাত হন), তখন কোন বিষয়ে কখনও কোন সন্দেহ আরোপ করেন না। (তার সকল কার্য নিভ্রান্ত অর্থাৎ ভ্রান্তিহীন এবং উচিতই হয়ে থাকে)।(আত্মজ্ঞ মুমুক্ষুর বিচারনিবৃত্তি হয়ে যায়)।
৭। যে অবস্থায় উপনীত হয়ে যোগী সকল প্রাণীকে ঈশ্বরের স্বরূপ বলেই জ্ঞান করেন, তখন সেই অবস্থায় সেই একত্বকে দর্শনশালীর মোহই, বা কি এবং শোকই বা কি? অর্থাৎ তার কোনও শোক মোহ অবশিষ্ট থাকে না।–(অবিদ্যাকার্যয়োঃ শোকমোহোরসম্ভবাৎ সকারণস্য সংসারস্যাত্যন্তমুচ্ছেদ)।
৮। সেই পরমাত্মা সর্বত্র ব্যাপক হয়ে আছেন; তিনি বীর্যরূপ, অর্থাৎ শুদ্ধ (শুক্র) স্বরূপ; তিনি অকায়, অর্থাৎ প্রাকৃত শরীরহীন বা নিরাকার; তিনি অব্রণ, অর্থাৎ শিরারহিত; স্নায়ুসমূহের বন্ধনের উর্ধ্বে স্থিত; তিনি শুদ্ধ, অর্থাৎ নির্মল; তিনি অপাপবিদ্ধ, অর্থাৎ অধর্ম ইত্যাদি বর্জিত; তিনি কবি, অর্থাৎ ক্রান্তদর্শী, তিনি মনীষী, অর্থাৎ সর্বজ্ঞ, তিনি পরিভূঃ, অর্থাৎ পরিতঃ ব্যাপ্ত (সকলের উপর্যুপরি বর্তমান); এবং স্বয়ম্ভু, অর্থাৎ স্বয়ং জায়মান (অর্থাৎ নিজেকে নিজেই সৃষ্টি করণশালী)। সেই পরমাত্মা সদা-সর্বদার নিমিত্ত পূর্বকল্পের অনুকূলেই পঞ্চভূত ইত্যাদিকে সৃষ্টি করেন। এই রকম পরব্রহ্মকে জ্ঞাতশালী জন্যই তাকে (অর্থাৎ ব্রহ্মকে) প্রাপ্ত হন।(য এবমাত্মানং পশ্যতি স ঈদৃশং ব্রহ্ম পর্যগাৎ পরিগচ্ছতি প্রাণোতী)।
৯। সেই ব্যক্তি প্রগাঢ় অন্ধকারময় যোনিকে (অর্থাৎ জন্ম) প্রাপ্ত হয়ে থাকে, যে অসম্ভুতিকে (অর্থাৎ ত্রিগুণাত্মিকা মূল প্রকৃতিকে) উপাসনা করে থাকে। যে ব্যক্তি সম্ভুতিকে (অর্থাৎ স্থল প্রপঞ্চকে বা স্থল জগৎকেই পরমার্থ জ্ঞানে) উপাসনা করে, তাকে তারও অধিক অন্ধকারকে প্রাপ্ত হতে হয়। (ত্রিগুণাত্মিকা মূল প্রকৃতির উপাসক অবিদ্যা সম্ভুত কর্মে লিপ্ত হওয়ার কারণে মরণের পরে পুনরায় অন্ধকারময় সংসারে জীবরূপে জন্ম প্রাপ্ত হয়)।
১০। সম্ভব বা স্থূল জগতের উপাসনায় ভিন্নই ফল হয় এবং অসম্ভূতা মূল প্রকৃতির উপাসনাময় ভিন্ন ফলেরই কথা বলা হয়ে থাকে–ধীমান জনগণের মুখে এই রকম কথন আমরা শ্রবণ করি; যে ধীমান তত্ত্ববিদগণ আমাদের নিমিত্ত সেই ব্রহ্মতত্ত্ব বিবেচনা করে দিয়েছেন।(স্থূল জগতের উপাসনা অর্থে কার্যরূপ ব্রহ্মের উপাসনা; এতে অনিমাদি ঐশ্বর্যলক্ষণ ফল লাভ হয়–কার্য ব্রহ্মোপাসনাৎ অন্যদেব পৃথগেবানিমাদ্যৈশ্বর্যলক্ষণং ফলমাহুঃ…। আর অসংভূতেরব্যাকৃতাদব্যাকৃতেপাসনাদন্যদেব বলমুক্তম্। অর্থাৎ অসংভূতের উপাসনা অর্থে অব্যাকৃতের উপসানা; এতে যোগী-উপাসক প্রকৃতির মধ্যে লয় প্রাপ্ত হন)।
মন্ত্রার্থঃ— ১১। (জগতের) উৎপত্তি এবং বিনাশ এই দুটিকে যে বিদ্বান্ সাথে সাথে জ্ঞাত হন, তিনি বিনাশের দ্বারা মৃত্যুকে উত্তীর্ণ করে সন্তুতির দ্বারা অমৃতকে প্রাপ্ত হন, অর্থাৎ মুক্তি বা মোক্ষ প্রাপ্ত হয়ে যান। (সম্ভুতি অর্থে সর্ব জগতের উৎপত্তির একমাত্র কারণ রূপ ব্ৰহ্ম এবং বিনাশ অর্থে বিনাশধর্মী শরীর–এই দুটি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের দ্বারাই যোগী মোক্ষ লাভ করেন)।
১২। সে প্রগাঢ় অন্ধকারকে প্রাপ্ত হয়ে থাকে, যে অবিদ্যার উপাসনা করে। তারও অধিক অন্ধকারে সে গমন করে, যে বিদ্যার উপাসনা করে। (নবম মন্ত্রে সম্ভুতি ও অসম্ভুতি এই দুটির উপাসনাহানিপ্রদ বলা হয়েছে। দশম মন্ত্রেও এই কথা সমর্থিত হয়; পরন্তু একাদশতম মন্ত্রে অসম্ভুতির স্থানের উপর বিনাশ আসে এবং এই দুটির অর্থ হিতকরী, এমন বলা হয়। বিনাশেনএবং স্যুত্যাপদ করণকারক তৃতীয়া বিভক্তিতে হয়েছে। অতএব এই মন্ত্র অসম্ভুতি (বিনাশ?) এবং সম্ভুতির প্রয়োগ (করণত্ব)-কে বোঝাচ্ছে, না কি তাদের উপাসনাকে বোঝাচ্ছে। অর্থাৎ সঙ্কুতি অসম্ভুতির উপযোগ করে তো মৃত্যু হতে সন্তরণ (বা উত্তরণ) এবং অমৃতত্ব লাভ করা যায়; পরন্তু ঐ দুটিরই বা ঐ দুটির মধ্যে কোনও একটির উপাসনা হানিপ্রদ। সম্ভুতি পদ তিনটি মন্ত্রে এক এবং তাদের অর্থও সর্বত্র একই প্রতীত হয়ে থাকে; পরন্তু একাদশতম মন্ত্রে বিনাশ পদ অসম্ভুতির পর্যায়ই মানা উচিত। তবে প্রশ্ন এই ওঠে যে, অমৃতলাভের নিমিত্ত ত্রিগুণাত্মিকা মূলপ্রকৃতির উপযোগ কি প্রকারে করা যায়? মৃত্যু হতে পার হওয়াই তো অমৃতত্ব প্রাপ্তি। তবে দুটির উপযোগের অবকাশও কোথায় থাকে? এইরকম অবস্থায় স্যুতি, বিনাশ এবং মৃত্যু কোন ভিন্ন অর্থশালী বলে প্রতীত হয়। এই একাদশতম মন্ত্রে সম্ভুতির অর্থ পরব্রহ্ম প্রতীত হয়। উবট ও মহীধরও সেই অর্থ করেছেন। বিনাশ পদের দ্বারা বিনাশী ঘট-পট ইত্যাদি পদার্থ প্রতীত হচ্ছে। এগুলির সদুপযোগের দ্বারা ঠিকই মৃত্যু হতে উত্তীর্ণ হওয়া যায়।মৃত্যু পদ এখানে জন্ম-মরণের বাচক প্রতীত না হয়ে সাধারণ দুঃখের পর্যায়-সদৃশ মনে হয়। লৌকিক পদার্থসমূহের কুপ্রয়োগের দ্বারা আমরা সদাই দুঃখ প্রাপ্ত হয়ে থাকি। সাংসারিক দুঃখগুলি হতে পার হওয়া অমৃতলাভ হওয়ার প্রশ্ন। প্রথম লক্ষ্য–সাংসারিক শরীর ইত্যাদি পদার্থসমূহকে উচিত প্রয়োগের দ্বারা সিদ্ধ হয়ে যায় এবং দ্বিতীয় ফল প্রাপ্তির নিমিত্ত পরব্রহ্মের উপাসনাই একমাত্র সধন)।
১৩। বিদ্যার উপাসনার ফল অন্যই বলা হয়; এবং অবিদ্যার উপাসনার ফলকে অন্যই বলা হয়; (অর্থাৎ একের উপসনার ফলের সাথে অপরের উপাসনার ফলের ভিন্নতা আছে)। এইরকমে আমরা সেই ধীমন্ত আচার্যগণের সকাশে শ্রবণ করেছি, যাঁরা আমাদের প্রতি সেই বিদ্যা ও অবিদ্যার উপাসনার ফলকে ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন।–(বিদ্যা কিংবা অবিদ্যার উপাসনার ফল কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, তা যোগীদের কথিত বাণী হতেই জ্ঞাত হলে আমাদেরও উপাসনাপদ্ধতি যথার্থ হতে পারে। এই ফল সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি আপনা হতে জ্ঞাত হয় না)।
১৪। বিদ্যা ও অবিদ্যা এই দুটিকে যিনি সাথে সাথে জ্ঞাত হন, তিনি অবিদ্যার দ্বারা মৃত্যু হতে অতিক্রান্ত হয়ে বিদ্যার দ্বারা অমৃতকে উপভোগ করে থাকেন। (বিদ্যা অর্থে আত্মজ্ঞান, অবিদ্যা কর্ম-সম্পর্কিত। সুতরাং কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জ্ঞানকাণ্ডে উপনীত হওয়াই যোগীর মোক্ষ লাভ। এতদ্ধি অমৃতমুচ্যতে যদ্দেবতাত্মগমনং ইতি তেঃ)।
১৫। বায়ু (সপ্তদশ পদার্থে গঠিত লিঙ্গ শরীর) প্রাণত্বে মিলিত হয়ে যায় এবং (জীবাত্মা) সেই অমৃতময় পরমাত্মায়। এক্ষণে এই লিঙ্গ শরীর? ভস্ম পর্যবসায় হয় শরীর। (লিঙ্গ শরীর, জীবাত্মা এবং স্থূল শরীর, মুক্ত হয়ে যাওয়ার পর আপন আপন গতিকে প্রাপ্ত হয়)। হে জীব! সংসারের কর্তা পরমাত্মাকে ওঁ বলে (অর্থাৎ ওঙ্কারের দ্বারা) স্মরণ করো। এই পরমাত্মাকে তুমি মৃত্যুশয্যার উপরে ক্লীবতার নিমিত্ত স্মরণ করো। সেই সাথেই আপন কৃতকর্মকেও সদা বিচার করতে থাক (–কি বলেছি, কোন অনুচিত কর্ম হয়ে যায় নি তো? ইত্যাদি)। (এই বিদ্যা-অবিদ্যার উপাসনার নিষেধ রয়েছে। দুটিরই স্বয়ং আপনাতে কোন লক্ষ্য নেই। সেই দুটিই সাধন হয়ে থাকে। এক অবিদ্যার (লৌকিক জ্ঞানের) দ্বারা লৌকিক দুঃখ হতে উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া যায় এবং দ্বিতীয় বিদ্যার (ব্রহ্মবিদ্যার) দ্বারা অমৃতলাভ করা যায়)।
১৬। হে অগ্নি (বা পরমাত্মা)! সৎপথে আমাদের ধন প্রাপ্ত করণের দিকে নিয়ে গমন করো, কারণ তুমি সকল পথ জ্ঞাত আছ। কুটিল পাপকর্ম হতে আমাদের অত্যন্ত দূরে স্থাপিত করো (বা পৃথক্ করে দাও), যাতে আমরা তোমার উদ্দেশে নমঃ বাণী উচ্চারণ করতে পারি (অর্থাৎ পূর্ণ শ্রদ্ধাভক্তির সাথে আমরা তোমাকে নমস্কার করতে পারি)। (কুটিল পথে উপার্জিত ধনে পরমাত্মা বা পরব্রহ্মের পরিচর্যা করা যায় না। সম্পূর্ণ নির্মল চিত্তশালী হলেই ঈশ্বরের.অর্চনা করা সম্ভব হয়)।
১৭। সুবর্ণমণ্ডিত পাত্রের (আকর্ষক ঘট-পট ইত্যাদির) দ্বারা সত্যের (অর্থাৎ পরমাত্মার) মুখ (অর্থাৎ প্রবেশ দ্বার) আবৃত হয়ে রয়েছে। ঐ যে আদিত্যমণ্ডলে পরম পুরুষ প্রত্যক্ষীভূত হয়ে রয়েছেন, তা কার্যকারণের সংঘাতে এই আমিই। আমি আকাশের ন্যায় বৃহৎ ব্যাপক পরমাত্মা বা ব্রহ্মকে তার ওঁ নামের দ্বারা ধ্যান করছি; (অর্থাৎ আমি ব্রহ্মরূপী আমাকেই ধ্যান করছি)। (যদ্যপি ব্ৰহ্ম চেতনমাকাশচেতনস্তথাপ্যেকদেশে সাদৃশ্যং–অর্থাৎ যদিও ব্রহ্ম চেতনাত্মক এবং আকাশ অচেতনাত্মক, তথাপি এক দিক দিয়ে উভয়ের সাদৃশ্য রয়েছে।–এই কণ্ডিকায় যোগী সাধক যোগসাধনার মাধ্যমে অর্থাৎ জ্ঞানকাণ্ড অবলম্বন করে ব্রহ্মসাযুজ্য লাভ করছেন)।
মর্মার্থ –হে ভগবন! অভীষ্ট প্রদানের নিমিত্ত আপনাকে আহ্বান করছি। অপিচ, হে ভগবন্! শক্তি এবং প্রাণ পাবার কামনায় আপনাকে আহ্বান করছি। হে দেববৃন্দ! আপনারা বায়ুর মতো গতিবিশিষ্ট হন; তাই প্রার্থনা করি, বায়ুর ন্যায় গতিতে শীঘ্ৰ আগত হয়ে আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হোন এবং আমাদের পরিত্রাণ করুন। সৎকর্মের প্রবর্তক জ্ঞানপ্রদ দেবতা, আমাদের সম্বন্ধী ভগবৎ-আরাধনা ইত্যাদি রূপ সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্কর্মে আমাদের সর্বতোভাবে পরিচালিত করুন। (আমরা যেন নিয়ত সৎকর্মে নিরত থাকি); লোকরক্ষয়িত্রী বলপ্রাণ-রূপিণী জ্ঞানপ্রদায়িকা অজরা অক্ষরা বিনাশরহিতা হে দেবিগণ! ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত আমার পূজা (ভক্তি-ভাব) আপনারা সবরকমে পরিবর্ধিত করুন; পাপের আশ্রয়স্থানীয় ইন্দ্রিয় ইত্যাদি রূপ চৌর, আপনাদের অনুগ্রহে যেন আমাদের হিংসা করতে সমর্থ না হয়। অপিচ, হে দেবগণ! রপ্ৰকৃতিসম্পন্ন হিংসক রিপুদলের আয়ুধ আপনাদের যেন পরিহার (পরিত্যাগ করে অর্থাৎ স্পর্শ করতে না পারে। সত্যস্বরূপ বুদ্ধিসমূহ যেন আমাদের হৃদয়কে জ্ঞানের আধারে পরিণত করে আপনাদের সেখানে বহন করে আনয়নে সমর্থ হয়। অথবা, হে দেবিগণ! আপনারা জ্ঞানের আধারভূত আমাদের হৃদয়ে অবিচলিত ভাবে অবস্থান করুন এবং বহুরূপে হৃদয়ে অবিচলিত ভাবে অবস্থান করুন এবং বহুরূপে সেখানে আর্বিভূত হোন। (ভাবার্থ–আমার হৃদয়ে এমন ধী সঞ্জাত হোক, যাতে আপনারা সর্বদা সেখানে অধিষ্ঠিত থাকেন)। হে ভগব! প্রার্থনাকারী, আমার পাশবৃত্তিগুলিকে সংহার করে, পাপের কবল হতে আমাকে পরিত্রাণ করুন। (ভাবার্থ এই যে, আমার পাপপ্রবৃত্তি-সমূহকে নাশ করে আমাকে মোক্ষপথে স্থাপন করুন। ১।
[দশযাগে বিনিযুক্ত এই অনুবাকের মন্ত্র পলাশ-শাখার সম্বোধনে প্রযুক্ত বলে ভাষ্যকার সিদ্ধান্ত করেছেন। তার সিদ্ধান্তের অনুকূল প্রমাণ-পরম্পরা তিনি বৌধায়ন আপস্তম্ব প্রভৃতি সূত্র-গ্রন্থ থেকে উদ্ধার করে আপন মত প্রতিষ্ঠিত করবার প্রয়াস পেয়েছেন। শুক্লযজুর্বেদের ব্যাখ্যায় মহীধরও এই পন্থারই অনুসরণ করেছেন। মন্ত্রের সম্বোধ্য, ভাষ্যমতে, পলাশ-শাখা। পলাশ-বৃক্ষে দেবত্বের অধিষ্ঠান ব্রাহ্মণ-গ্রন্থে কথিত হয়েছে। সেখানে পলাশের উৎপত্তি সম্বন্ধে এইরকম প্রস্তাবনা দেখা যায়। যথা,-স্বর্গের তৃতীয় লোকে সোম অবস্থিত ছিল। গায়ত্রী-মন্ত্রে উক্ত সোম আহরণকালে অভিঘাত-জনিত তার একটি পর্ণ ছিন্ন হয়ে ভূতলে পতিত হয়। কেউ কেউ বলেন,-পক্ষীরূপা গায়ত্রীর একটি পক্ষ ভূতলে পতিত হয়েছিল। যাই হোক, সোমের সেই বিচ্ছিন্ন পর্ণ থেকে পলাশ-বৃক্ষের উৎপত্তি। সেই সোম-পৰ্ণই ভূতলে পলাশরূপে আর্বিভূত হয়েছিল। পণ্ডিতবর্গ প্রশ্ন তুলে বলেন,–পর্ণের বৃক্ষত্ব কিভাবে নিষ্পন্ন হয়? উত্তর–বিধাতার অচিন্ত্য-শক্তিত্ব। তার পক্ষে অসম্ভব কিছুই নেই। তারই বিচিত্র বিধানে সেই সোমপর্ণ থেকে পলাশের সৃষ্টি। জগৎ-নিম্পাদক ব্ৰহ্ম যেমন স্বতঃসিদ্ধ, যাগ-নিম্পাদক পলাশের ব্রহ্মত্বও সেইভাবে অবিসংবাদিত। এইভাবে পলাশের ব্রহ্মত্ব প্রতিপাদন করে ভাষ্যকার মন্ত্রের সম্বোধনরূপে ব্ৰহ্মত্বপ্রপাদিত পলাশকেই নির্ধারণ করে নিয়েছেন। তারপর এই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় ভাষ্যকার যে সব পদ অধ্যাহার করেছেন, ভাষ্যের সূচনায় তার যুক্তি-পরম্পরা নির্দিষ্ট হয়েছে। ব্যাখ্যা-প্রসঙ্গে ভাষ্যকারের সেই যুক্তিগুলির সারমর্ম প্রদত্ত হলো; যথা, পলাশবৃক্ষের বহু শাখা আহরণ করবার বিধি ব্রাহ্মণে উক্ত হয়েছে। পলাশবৃক্ষের পূর্বদিকের শাখা দেবলোক সম্বন্ধী, আর পশ্চিমদিকের শাখা মনুষ্যলোকসম্বন্ধী। যজমানের জন্য অধ্বর্য উক্ত উভয়প্রকার শাখাই কামনা করবেন। ইষে ত্ব প্রভৃতি মন্ত্রে সেই পলাশশাখা ছেদনের বিধি। সুতরাং বিনিয়োগ অনুসারে ছিদ্মি ক্রিয়াপদ অধ্যাহার করতে হবে।
ইট পদে অন্ন বোঝায়। অন্ন সকল প্রাণীর আকাক্ষনীয়। আবার রসরূপে বলসঞ্চার করে বলে উবল হেতু রসঃ বাক্যে উর্জ পদে বলপ্রাণয়ো অর্থ পরিগৃহীত হয়। মন্ত্রাংশের অর্থ হয়–হে পলাশশাখে! দেবগণের ভাগরূপ অধ্বর্যর জন্য তোমাকে ছেদন করছি। আবার সেই দেবতার বলপ্রদরসের নিমিত্তও তোমাকে ছেদন করি। এই মন্ত্রের দ্বারা অধ্বর্য যজমানের ভোজনের জন্য অন্ন এবং বলের জন্য রস সম্পাদন করবেন।-মন্ত্রের আমরা যে অর্থ অধ্যাহার করলাম এবং ভাষ্যের আলোচনায় যে অর্থ সিদ্ধ হয়, দুই অর্থে অশেষ পার্থক্য লক্ষিত হবে।
ভাষ্যকার প্রথম ও দ্বিতীয় মন্ত্রে ছিনদ্মি (ছেদন করছি) ক্রিয়াপদ অধ্যাহার করেছেন; আমরা আহ্বায়ামি (আহ্বান করছি) ক্রিয়ার অধ্যাহারই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেছি। ভাষ্যকারের মতে, শাখা-দেবতাকে সম্বোধন করে ঐ মন্ত্র প্রযুক্ত হয়েছে। আমরা বলি, শাখাদেবতা কেন, আপন আপন ইষ্ট দেবতা-মাত্ৰকেই সম্বোধন করে ঐ মন্ত্র প্রযুক্ত হতে পারে; সকলে সকল অবস্থায় সকল দেবতার উদ্দেশ্যেই ঐ মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারেন। ভাষ্যকার বলেন, মন্ত্রদ্বয় দশপূর্ণমাসযাগে পলাশশাখাছেদনে প্রযোজ্য। সে বিষয়ে আমরা অন্যমত খ্যাপন করছি না। তবে মন্ত্রের প্রার্থনা যে কেবল বৃষ্টির জন্য নয়, প্রার্থনা যে অভীষ্ট-পূরণের জন্য এবং প্রাণ ও শক্তি লাভের উদ্দেশ্যে, আমরা তা-ই বলছি। হিন্দুর সকল কর্মই যে ধর্মসহযুত, হিন্দুর প্রতি কমেই যে ভগবানের সম্বন্ধ সূচনা করা হয়, যজ্ঞে বৃক্ষ-শাখা-ছেদনে এই মন্ত্রের প্রয়োগ তা-ই শিক্ষা দিচ্ছে। শাখাদেবতার (শাখাধিষ্ঠাত্রী দেবতার) অনুধ্যানে বৃক্ষশাখার অভ্যন্তরে যে ভগবৎ-অধিষ্ঠান আছে, জগদীশ্বর যে সর্বব্যাপী, সেই ভাব প্রকাশ করে। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান, বৃক্ষ ইত্যাদির সংজ্ঞা আছে প্রমাণ করে আজ গর্বোন্নত-শীর্ষ। কিন্তু শাখা দেবতার অর্চনায় এই মন্ত্র দুটির (প্রথম ও দ্বিতীয়) বিনিয়োগ, কত কাল পূর্বে হিন্দুদের যে সে জ্ঞান ছিল, তা সপ্রমাণ করছে।…যাই হোক, শাখা-দেবতার উদ্দেশ্যেই প্রযুক্ত হোক, আর নিজের ইষ্টদেবতার উদ্দেশ্যেই মন্ত্র দুটি উচ্চারিত হোক, মন্ত্রের উচ্চারণকারী সর্বতঃ আপন শ্রেয়ঃ কামনা করছেন,-মন্ত্রের এটাই তাৎপর্য। ভাষ্যকারের মতে,–তৃতীয় ও চতুর্থ মন্ত্রের লক্ষ্য–গোবস; তাদের বায়ুদেবতাক বলে কল্পনা করা হয়েছে। বায়ুদেবতাক বলে বায়ুর সাথে বৎসগণের অভেদ কল্পনা করা হয়; বৎসগণের বায়ুস্বরূপত্ব হেতু, তাদের রক্ষার জন্য অধ্বর্যগণ বৎসদের বায়ুকে সমর্পণ করছেন। এ পক্ষে ভাষ্যকার সায়ণের যুক্তি, মনুষ্যগণ গৃহ ইত্যাদি নির্মাণ করে তাতে বাস করে। গোবৎসগণ তা পারে না, অন্তরীক্ষই তাদের বাসগৃহ। অন্তরীক্ষের অধিপতি–বায়ু; বায়ু পশুদের রক্ষা করেন; সুতরাং পশুদের বায়ুরূপত্ব কল্পিত হয়। এ বিষয়ে শুক্লযজুর্বেদে ভাষ্যকার মহীধর এমন যুক্তি প্রদর্শন করেছেন; যথা,-বায়ু যেমন পাদপ্রক্ষালন ও নিষ্ঠিবন ইত্যাদি দ্বারা উপহত অপবিত্ৰকৃত ভূমিকে শুষ্ক করে পবিত্র করেন, গোবৎসও সেইরকম গোময় ইত্যাদি দান করে ভূমিকে পবিত্ৰীকৃত করে। এই কারণে বায়ুর সাথে বৎসের সাদৃশ্য সূচনা করা যায়। (দেখা যায়, মহীধরের এবং সায়ণের ভাষ্যের ভাব প্রায় একই রকম;–কেবল বাক্যবিন্যাসের পার্থক্য-মাত্র)!–পঞ্চম ও ষষ্ঠ মন্ত্রের বিষয়েও আমাদের বক্তব্য ঐরকমই। ভাষ্যে প্রকাশ,–এই মন্ত্রে গাভীদের সম্বোধন করা হয়েছে।
গাভীগণই যেন যজমানকে শাতিকী গতি দান করেন। গোজাতিতে দেবতার অধিষ্ঠান আছে, অস্বীকার করি না; কিন্তু, গোজাতিকে লক্ষ্য করে, তাদের মধ্যে দেবতার কল্পনায়, এই মন্ত্র প্রযুক্ত হয়েছে বলা হোক, তাতেও আপত্তি নেই; কিন্তু বিশেষণগুলির ঐরকম ব্যাখ্যায়, অবিশ্বাসী জনের হৃদয়ে অবিশ্বাসের যে বিষবীজ উপ্ত আছে–তাতে জলসেক করা হয় মাত্র। সুতরাং এ ক্ষেত্রে সাধারণভাবে অজরা অমরা অক্ষরা দেবীগণকে (দেববিভূতি-সমূহকে) অর্চনা করা হয়েছে বললেই সব-বিষয়ে সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়। নবম মন্ত্র–শাখা-দেবতা বিষয়ক। এখানকার প্রার্থনা (ভাষ্যকারের মতে),-হে পলাশশাখে! আপনি উন্নত প্রদেশে অবস্থিত থেকে, দেখবেন-যজমানের পশুগুলি যেন নিঃশঙ্কে অরণ্যে সঞ্চরণ করতে পারে; তাদের রক্ষা করবেন; দেখবেন,-যেন চৌর-ব্যাঘ্র ইত্যাদি তাদের অপহরণ বা হনন না করে। তারা যেন নিরুপদ্রবে সন্ধ্যাকালে পুনরায় গৃহে ফিরতে পারে। ভাষ্যকার এ সম্বন্ধে উপসংহারে বলেছেন,-শাখা যদিও অচেতন, তথাপি তদভিমানিনী দেবতার উদ্দেশে ঐ মন্ত্র প্রযুক্ত হয়েছে বলা যায়। শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তিগণ শাস্ত্রদৃষ্টিবশতঃ যেমন অচেতন শালগ্রামে বিষ্ণুর সান্নিধ্য জ্ঞান করে বিষ্ণুসম্বোধনে যোড়শোপচারে তার পূজা করেন, শাখা-দেবতার সম্বোধনের বিষয়েও সেইরকম মনে করতে হবে। কোন্ দেবতার পূজার কি নিগুঢ় লক্ষ্য, সে তত্ত্ব প্রকাশ করার স্থান এখানে নয়। তবে স্থূলভাবে এই পর্যন্ত বলে রাখা যায়-স্মরণে মননে অর্চনে পূজনে, যাঁর স্মরণ, যার অর্চন, যাঁর বন্দন, যাঁর পূজন, তাতে প্রীতি আসে,তার গুণে গুণম্বিত হতে হতে তার স্বারূপ্য, তার সাযুজ্য ইত্যাদি লাভ ঘটে,-দেবতার পূজা-বন্দনা ইত্যদির এটাই মূল লক্ষ্য। শাখা-দেবতা যখন এখন বধিরতা-প্রাপ্ত হয়েছেন, অথবা আমাদের স্বর যখন তাদের কর্ণে এখন আর পৌঁছাতে সমর্থ হচ্ছে না, তখন কেন আর, কুট-কল্পনায় অর্থকে প্রচ্ছন্ন করি? অতএব আমরা সাধারণভাবেই মন্ত্রের মর্মার্থ প্রকাশ করলাম। যিনি যে দেবতার উদ্দেশ্যেই মন্ত্র প্রয়োগ করতে চান, তাতেই তিনি এ মন্ত্র প্রয়োগ করতে পারবেন। মন্ত্র বিশ্বজনীন ভাবপূর্ণ। কষ্ট-কল্পনায়, কেন তাকে একমাত্র শাখা-দেবতাতে আবদ্ধ রাখব? আমরা তাই মন্ত্রের শেষাংশের, অর্থ করতে চাই,-হে দেব! এই আমার পশুবৃত্তিগুলিকে বিনাশ করে আমায় রক্ষা (পরিত্রাণ) করুণ।
ফলতঃ, মন্ত্রটি দেবতার উদ্দেশে বিনিযুক্ত বলে বোঝাই সঙ্গত। বিতর্কে প্রয়োজন নাই। আপনার অন্তরকে জিজ্ঞাসা করুন আমাদের অর্থ সঙ্গত কি না? অন্তরই সে প্রশ্নের উত্তর প্রদান করবে ] । ১।
মর্মার্থ- হে ভগব আপনি সকর্ম-সমূহের নির্বাহক বা পূরক হন। (ভাবার্থ,ভগবানই সৎকর্মস্বরূপ সর্বজ্ঞেশ্বর)। অথবা হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি সৎকর্মের সাধনভূত উপাদান-স্বরূপ হও। (ভাব এই যে,-হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্বই সকল কর্মের প্রেরক বা সম্পাদক)। হে ভগব! অথবা হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনার অনুগ্রহে সপ্রতিবন্ধক শত্রু (আমাদের দুর্বুদ্ধি) সর্বতোভাবে ভস্মীভূত হোক; আমাদের রিপুশত্রুগণ প্রত্যেকে বিশিষ্টরূপে দগ্ধীভূত হোক। (ভাব এই যে, হে দেব! আপনার অনুগ্রহে অথবা আপনার প্রভাবে আমাদের দুষ্টবুদ্ধি এবং রিপুশত্রুসমূহ যেন সমূলে নাশপ্রাপ্ত হয়)।
শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ হে ভগব! আপনি সর্বাত্মক; কৃপা করে আমাদের এই সৎকর্মে প্রকৃষ্টরূপে আগমন করুন এবং আগমন করে, সকর্মের দ্বারা উত্তপ্রাপ্ত আমাদের এই হৃদয়রূপ যজ্ঞাগারকে প্রাপ্ত হোন; আত্ম-উৎকর্ষসম্পন্ন সাধকের কৃতকর্মের দ্বারা সঞ্জাত এবং সংসারবন্ধননাশক শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা আপনি সম্পূজিত হন; অপিচ, সৎ-ভাবসম্পন্ন জন সঙ্কর্ম সামর্থ্যের দ্বারা আপনাকে হৃদয়ে প্রতিস্থাপিত করেন; এতএব হে ভগবন্! দেবগণের প্রীতির নিমিত্ত আপনি আমাদের আরব্ধ এই সঙ্কর্মে বা আমাদের হৃদয়ে আগমন করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,–হে ভগবন্! আমাদের সকর্মে আগমন করুন এবং আমাদের আত্ম-উৎকর্ষ-সাধনের দ্বারা আমাদের মোক্ষপথে প্রতিষ্ঠাপিত করুন। হে আমার মন! তুমি দেবভাবসমূহের উৎপাদক সংবাহক, অতএব তুমি সদাবর্ধনশীল ও অভীষ্টবর্ষণের হেতুভূত হও। (মনই সর্বমূলাধার। মনের স্থৈর্যসাধনের দ্বারাই মানুষ পরম পদ প্রাপ্ত হতে পারে। এখানে আত্মসম্বোধনে মনের স্থৈর্যসাধনের জন্য সাধক আত্মাকে (আপনাকে) উদ্বোধিত করছেন)। হে মন! দুলোক-সম্ভুত নিখিল দেবভাবসমূহ যেন তোমাকে পরিত্যাগ না করে; ভুবিসম্ভব দেবভাবসমূহ যেন তোমার প্রতি বিরূপ না হয় এবং অন্তরীক্ষ-লোক-সম্ভব যে দেবভাব-সমুহ তারাও যেন তোমাকে পরিত্যাগ না করে। অপিচ, তোমার সম্বন্ধি চিত্তবৃত্তি-সমূহ যাতে শত্রুবর্গের দ্বারা হিংসিত বা বিপথগামী না হয়, সেইরকমভাবে তাদের সংযুম সাধন যেন করতে পারি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। এখানে চিত্তজয়ের জন্য উদ্বোধনা বর্তমান। চিত্তের স্থৈর্য-সাধন ভিন্ন ভগবৎপ্রাপ্তি কখনও সম্ভবপর হয় না। অতএব প্রার্থনা,নিখিল দেবভাব-সমূহ আমাদের মধ্যে উপজিত হোক। তার দ্বারা যেন আমরা ভগবানকে পেতে সমর্থ হই। হে আমার মন! তোমার সম্বন্ধি সঙ্কর্ম-বিঘাতক ভগবৎসম্বন্ধ বিচ্ছিন্নকারী কামক্রোধ ইত্যাদি রিপুশত্রু যেন তোমাকে হিংসা করতে সমর্থ না হয়। [কামক্রোধ] ইত্যাদি রিপুগণ যাতে ভগবৎসম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করতে সমর্থ না হয়, যেন সেরকম অবিচলিত হতে পারি)।
হে দ্যোতমান স্বপ্রকাশ শুদ্ধসত্ত্ব! আপনি বহুরূপ হয়ে, বিশেষভাবে আমাদের মধ্যে অধিষ্ঠিত হোন। তাতে প্রার্থনাকারী আমরা বহুসামর্থোপেত সৎ-ভাব ইত্যাদি সমন্বিত হয়ে বিশেষভাবে প্রবৃদ্ধ হতে পারব। (মন্ত্র দুটি প্রার্থনামূলক। ভাব এই যে,-ভগবান্ আমাদের মধ্যে অধিষ্ঠিত হয়ে আমাদের সৎ-ভাব-সমন্বিত করুন এবং পরমধন দান করুন। হে ভগবন্! পৃথিবীতে সম্ভাব্য পাপ-সম্পর্ক হতে (অর্থাৎ ইহজগতে অনুষ্ঠিত ভববন্ধনমূলক কর্মের সম্বন্ধ থেকে) আমাকে পরিত্রাণ করুন। (এই মন্ত্রে ভববন্ধন-ছেদনের জন্য প্রার্থনা আছে। ভাব এই যে,–যে কর্ম ভব-বন্ধন-মূলক, সেই কর্মের অনুষ্ঠানে আমাকে প্রতিনিবৃত্ত করুন)। হে চিত্তবৃত্তি! সর্বতোভাবে পিপক্লেদ-পরিশূন্য তোমাকে ভগবানের প্রীতির জন্য নিয়োজিত করি। সেই জন্য তুমি অনন্তস্বরূপ ভগবানের (প্রীতির জন্য) আমাদের ভক্তিসুধার আস্বাদ-প্রদানে সমর্থ হয়ে তাঁর রসনার মতো বিদ্যমান আছে। হে চিত্তবৃত্তি! তুমি ভক্তিরূপিণী দেবীর অর্থাৎ ভগবানের প্রীতি-হেতুভূত সম্যকরকমে বন্ধনমূল হও। (তাৎপর্য এই যে,মহান ঐশ্বর্যশালী ভগবান্ ভক্তির দ্বারাই বশীভূত হন। অপিচ, ভক্তিতেই ভগবান ভক্তের সাথে সম্মিলিত হয়ে থাকেন)। হে মন! সর্বপুষ্টির বিধায়ক ভগবান্ তোমার ভক্তির বন্ধন দৃঢ় করুন। হে আত্মা (আত্মসম্বোধন)! এই রকমে তোমার ভববন্ধন যেন চিরকাল না থাকে অর্থাৎ তুমি ভববন্ধন হতে মুক্ত হও। হে হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! সকল শক্তির আধার ভগবানের বাহুযুগলের দ্বারা অর্থাৎ সকল রকম শক্তি লাভের জন্য তোমাকে নিয়োজিত করি। (ভাবার্থসিদ্ধি লাভের জন্য ভগবানের উদ্দেশ্যে শুদ্ধসত্ত্ব উৎসর্গ করি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবানের সম্বন্ধি অশেষ প্রজ্ঞার দ্বারা অর্থাৎ প্রজ্ঞান লাভের জন্য তোমাকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠাপিত করি। হে দেব! কলুষক্লেদ-পরিশূন্য শত্রুর উপদ্রবরহিত নির্মল হৃদয়কে লক্ষ্য করে আপনি আগমন করুন। (তাৎপর্যার্থ–নির্মল বিশুদ্ধ হৃদয়ই ভগবানের নিবাস-স্থান)। হে আমার মন! তুমি ভগবানের প্রতি গমনকারী হও। অথবা, হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবানের অঙ্গীভূত অর্থাৎ ভগবানের স্বরূপ হও। (মর্মার্থ,–এই ভাবে পরিস্তুত হয়ে অনন্যা-ভক্তির দ্বারা যেন ভগবানে আত্মস্থাপনে সমর্থ হই) ॥ ২॥
[ এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত হয়েছে। সে বিভাগগুলি যে প্রচলিত ভাষ্যেরই অনুসারী, ভাষ্যগুলি দেখলেই তা উপলব্ধ হয়। ভাষ্যকার মন্ত্রগুলির যে ব্যাখ্যা করেছেন, সে ব্যাখ্যা কর্মকাণ্ডের অনুসারী; আর আমাদের ব্যাখ্যা আধ্যাত্মিকতামূলক। ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা আধিভৌতিক সম্বন্ধ বিজ্ঞাপক। ব্যাখ্যাপদ্ধতি বিভিন্ন হলেও–ভাষ্যকারের যে লক্ষ্য, আমাদের লক্ষ্য তা থেকে ভিন্ন নয়। ভাষ্যের মতে প্রথম মন্ত্রের সম্বোধ্যঅশ্বপর্শ। আমাদের পরিগৃহীত পন্থার অনুসরণে আমরা মন্ত্রটিকে ভগবৎসম্বোধনমূলক বলেই মনে করি। আবার শুদ্ধসত্ত্ব-সম্বোধনেও এ মন্ত্র বিনিযুক্ত হতে পারে। দুটি সম্বোধনেই মন্ত্রে উচ্চভাব ব্যক্ত হয়। কিন্তু ভাষ্যকারের মত অনুযায়ী এই মন্ত্রের অর্থ হয়–হে অশ্বপ! তুমি যজ্ঞের সাধনভূত সামগ্রী হও।–দ্বিতীয় মন্ত্রের রক্ষ শব্দে ভাষ্যকার রাক্ষস-জাতিকে নির্দেশ করেন। তাতে ভাব আসে,-রাক্ষসগণ যজ্ঞে বিঘু উৎপাদন করতো, আর তাদের দগ্ধ করবার জন্যই প্রার্থনা করা হতো। আমরা কিন্তু এখানে রাক্ষস জাতির প্রতি অথবা যজ্ঞকারী লোকবিশেষের প্রতি আদৌ লক্ষ্য দেখতে পাই না। তাতে কালাকালেরও কোনও সম্বন্ধ নেই। অতীত অনাগত বর্তমান তিন কাল ধরে যে শত্রু মানুষকে অহর্নিশ উত্যক্ত করছে, যে শত্রুর প্রবল প্রতাপে সকল সৎকর্ম অনুষ্ঠিত হতে পারছে না; আমরা মনে করি, সেই শত্রুই মন্ত্রের লক্ষ্যস্থল। বহিঃশত্রুবর্গ আমাদের কতটুকু অনিষ্ট করতে পারে? ভগবানের আরাধনার পথে বিঘ্নদানের শক্তি তাদের নেই বললেও অত্যুক্তি হয় না। কিন্তু যে শত্রু সৎকর্মের বিঘাতক, সে শত্রু আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই বিচরণ করছে। সেই আমাদের নিত্যসহচর-কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপুবর্গ, আমাদের বিভ্রান্ত পথে পরিচালিত করবার প্রধান পরামর্শদাতা। তাদের চেয়ে রাক্ষস শত্রু আর দ্বিতীয় কল্পনা করা যায় কি? আমরা তাই মনে করি, এখানে এই মন্ত্রে বলা হয়েছে–আমাদের অন্তরস্থ সেই পরম শত্রুগণ নিশ্চিহ্ন ভাবে বিদগ্ধ ও লুপ্ত হোক।
তৃতীয় মন্ত্র প্রার্থনামূলক ও নিত্যসত্যপ্রকাশক। ভাষ্যমতে এই মন্ত্র বহিরাহরণে প্রযুক্ত হয়।–ভাষ্যমতে চতুর্থ মন্ত্র দর্ভ-সম্বোধনে প্রযুক্ত। আমাদের মতে মন্ত্রটি মনঃ সম্বন্ধমূলক। মনই সকল সৎ-ভাবের জনক, মনই ভগবানকে সংবাহিত করে আনে। মনই সকল মঙ্গলের হেতু ভূত-পঞ্চম ও ষষ্ঠ মন্ত্র প্রায় একই ভাব দ্যোতনা করে। ভাষ্যকারে মতে এই মন্ত্র দুটি দেববহিঃ অর্থাৎ দেবসম্বন্ধযুক্ত বহিঃ সম্বোধনে প্রযুক্ত হয়েছে।–ভাষ্যকারের মতে দশম মন্ত্রে দর্ভময় শৃন্বকে নামুষ্টি প্রক্ষেপে ভূমিতে স্থাপন করবার বিধি। তার মন্ত্ৰার্থ-হে রজ্জ্ব! ভূমিক কাঞ্চীগুণস্থানীয় রসনা হও। হে দর্ভমুষ্টি-সমুদায়, তোমাদের সুষ্ঠুভাবে সংগ্রহের নিমিত্ত যোগ রশনার দ্বারা সংগ্রহ করছি। একাদশ মন্ত্রের অর্থ পূর্বমন্ত্রানুসারী। ইন্দ্রাণী পদে ভাষ্যকার এক আখ্যায়িকার অবতারণা করেছেন। পূর্বজন্মে ইন্দ্রপত্নী ইন্দ্রাণী শতসংখ্যক যজ্ঞের অনুষ্ঠাতা যজমান কর্তৃক সেই সেই ক্রতুতে যুক্ত হয়েছিলেন। যজমান ইন্দ্রাণীকে বন্ধন করতে সমর্থ হয়েছিলেন বলে, ইন্দ্রাণীত্ব-রূপ সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সেই অবধি সমৃদ্ধিলাভের নিমিত্ত অর্ধযুগণ দর্ভের দ্বারা গ্রন্থি-বন্ধন করে থাকেন। আমাদের মতে দশম ও একাদশ মন্ত্র চিত্তবৃত্তির সম্বোধনে বিনিযুক্ত।-দ্বাদশ মন্ত্রে ভক্তিবন্ধন দৃঢ় করবার প্রয়াস, এয়োদশে ভববন্ধন-ছেদনের সঙ্কল্প, চতুর্দশে ভগবৎ কার্যে নিয়োজন। পঞ্চদশ মন্ত্রে শুদ্ধসত্ত্ব আহরণ, যোড়শ মন্ত্রে ভগবানকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা, সপ্তদশ মন্ত্রে সকল কর্মফল তাতে সমর্পণ করে তার সেবায় আত্মাকে নিয়োজিত করা ইত্যাদি–যেন কি এক অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ বন্ধনে মন্ত্র কয়েকটি সংগ্রথিত রয়েছে। ভাষ্যমতে এই সব মন্ত্রের সম্বোধ্য যথাক্রমে-রক্ষ্ম, দর্ভ, বহিঃ প্রভৃতি ] । ২।
মর্মার্থ- হে আমার সৎ-অসৎ-বৃত্তিনিচয়! তোমরা দেবসম্বন্ধি যাগ ইত্যাদি সৎ-ক্রিয়ার দ্বারা দেবসম্বন্ধি সৎ-জ্ঞান-বর্ধনরূপ কর্মে বিশুদ্ধতা প্রাপ্ত হও। (এই মন্ত্রের দ্বারা প্রার্থনাকারী নিজেকে উদ্বোধিত করছেন। চিত্তবিক্ষোভজনিত চাঞ্চল্যে মনের স্থৈর্য-সাধনের নিমিত্ত চিত্তবৃত্তির উদ্বোধনার জন্য সাধক নিজেদের প্রবুদ্ধ করছেন বলে মনে করা যায়)। হে ভগবন্! আপনি বায়ুর দীপক (প্রকাশক); অর্থাৎ বায়ুরূপে আপনি সর্বত্র পরিব্যক্ত। অপিচ, হে ভগবন্! আপনিই দ্যুলোক আবার আপনিই ভূলোক অর্থাৎ আপনি বিশ্বচরাচরাত্মক (বিশ্বাত্মক) সৰ্বরূপী সর্বব্যাপী। আপনার প্রকৃষ্ট তেজের দ্বারা আপনি বিশ্বকে ধারণ করে আছেন। আপনি আমাদের বর্ধিত করুন; অর্থাৎ আমাদের শ্রেয়ঃ সাধন করুন।
আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখে, আমাদের প্রতি কুটিল (বিরূপ) হবেন না। (অতএব প্রার্থনা–আপনার অনুগ্রহে যেন সরল সৎ-ভাবসম্পন্ন সৎ হতে সমর্থ হই। হে দেব! আপনি ভগবানের নিবাসহেতুভূত সকর্মগুলিকে শত রকমে। (আপনার শতকরুণাধারা বর্ষণের দ্বারা পবিত্রতা-সাধন করেন। অপিচ, আপনার দ্বারা সহস্ররকমে সঙ্কমগুলি পুণ্যপ্রদ হয়। (প্রার্থনা–আপনার অনুগ্রহে আমাদের কর্মনিবহ যেন সর্বতোভাবে সৎসহযুত ও পবিত্ৰীকৃত হয়)। মহত্ত্ব ইত্যাদি গুণসম্পন্ন (সবগুণাধার গুণাতীত) বিশ্বকর্মী প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত আমাদের অনুষ্ঠিত সকর্মের সুফলসমূহ প্রদত্ত হচ্ছে; অপিচ, আমাদের সৎকর্মের দ্বারা সঞ্জাত সৎ-ভাবসমুহ (ভগবানের প্রীতির জন্য) উৎসর্গ করি। সেই উদ্বোধনরূপ যজ্ঞ অথবা আমার অনুষ্ঠিত সৎকর্ম ভূলোক ও স্বর্গলোক ব্যেপে প্রকাশ পাক। অথবা, দ্যাবাপৃথিবী-অভিমানিনী দেবতাকে অর্থাৎ নিখিল দেবভাবগুলিকে স্বাহা মন্ত্রে উদ্বোধিত করি। আমার যজ্ঞ (কর্ম) সুহুত সুসিদ্ধ হোক। (ভাব এই যে,-জ্ঞানময় দেবতা উদ্বোধনরূপে বিরাজ করেন; তিনি স্বর্গ মর্ত্য অন্তরীক্ষ ত্রিলোক ব্যেপে আছেন; তাকে যেন আমরা সত্ত্বভাবের দ্বারা অধিগত করতে সমর্থ হই)। সেই দেবতা বিশ্বায়ুঃ অর্থাৎ নিখিল বিশ্বের জীবন স্বরূপ; সেই দেবতা বিশ্বব্যচাঃ অর্থাৎ নিখিল বিশ্ব ব্যেপে রয়েছেন; এবং সেই দেবতা বিশ্বকর্মা অর্থাৎ সকল কর্মের মূলীভূত! সকল সঙ্কর্মের অধিষ্ঠাত্রী অথবা প্রেরয়িত্রী হে দেবি! আনন্দস্বরূপিণী পরমানন্দদায়িণী আপনারা পরমধন দানের জন্য অথবা ভগবানে কর্মফল-সমর্পণের সামর্থ্য-প্রদানের নিমিত্ত অত্যন্ত মাধুর্যসম্পন্ন পরমানন্দদায়িণী রূপে আমাদের সাথে (আমাদের অন্তরে) সঙ্গতা হোন। হে হবনীয় সামগ্রী। দেবতার যজ্ঞভাগরূপ তোমাকে শুদ্ধসত্বভাবে বিশুদ্ধ ভক্তির দ্বারা দৃঢ়িকৃত করছি; অর্থাৎ আমার কৃত পূজা ভক্তিসহযুত হয়ে দৃঢ়তা প্রাপ্ত হোক। হে বিশ্বব্যাপক ভগব! হবনীয় আমার শুদ্ধসত্ত্বভাবকে চিরকালের জন্য প্রতিষ্ঠিত রাখুন। ৩।
[ভাষ্যকার প্রথম মন্ত্রে পাত্ৰাদি, দ্বিতীয় কুন্ত তৃতীয় মন্ত্রে কুম্ভের উপর স্থাপিত-শাখা পবিত্র, ষষ্ঠ মন্ত্রে অপ, সপ্তম মন্ত্রে ক্ষীর প্রভৃতি সম্বোধন পদ অধ্যাহার করেছেন। আমাদের মতে প্রথম মন্ত্রের লক্ষ্য হৃদয়ে সৎ-অসৎ-বৃত্তিসমূহ। ভাষ্যকারের মতে, মন্ত্রে যজ্ঞপাত্রসমূহের সম্বোধন আছে। কর্মপদ্ধতির অনুসরণেই ভাষ্যকার এই অর্থ নিষ্কাশন করেছেন বলে মনে করা যায়। দ্বিতীয় মন্ত্রে ভাষ্যকার কুন্তকে আহ্বান করা হয়েছে বলে নির্দেশ করেছেন। সেই মতে মন্ত্রের অর্থ হয়,–হে কুম্ভ! তোমার অভ্যন্তরে বায়ুর সঞ্চার-স্থান আছে। সেইজন্য তুমি দীপক হও। অতএব অন্তরীক্ষলোক যেমন, তুমিও তেমন। আমরা মনে করি, আধ্যাত্মিক বিচারণায়, এখানে সেই সর্বকারণকারণ পরমেশ্বরকে লক্ষ্য করেই প্রার্থনা জানান হয়েছে। যজ্ঞের আনুষঙ্গিক ক্রিয়াদিতে মন্ত্র যে ভবেই প্রযুক্ত হোক, মন্ত্রের লক্ষ্য কিন্তু সেই একমাত্র পরাৎপর পরমেশ্বর।–তৃতীয় মন্ত্রের সম্বোধন–শাখাপবিত্র। কুম্ভের উপরিভাগে যে শাখা ও পবিত্র বা কুশ: স্থাপিত হয় ভাষ্যমতে সেইগুলিই এই মন্ত্রের সম্বোধ্য। সেই অনুসারে ভাষ্যকারের অর্থ,হে শাখাপবিত্র। কুম্ভমুখে স্থাপিত তুমি প্রাণনিবাসহেতুভূত বসুসমূহের শোধক হও। কর্মকাণ্ডের বিচারে এইরকম অর্থ সম্বন্ধে ভাষ্যকারের যুক্তি আছে অবশ্যই। কিন্তু আমরা মনে করি, মন্ত্র যে কার্যেই ব্যবহৃত হোক, মন্ত্রের যা লক্ষ্য, তাতে ভাবান্তর ঘটাই কেন? আমরা দেখেছি সব মন্ত্রেরই লক্ষ্য-পরব্রহ্মের সান্নিধ্যলাভ। জলে, স্থলে, অনলে, অনিলে–সর্বত্রই তিনি। ঋষিগণ যে স্থালীর অভ্যন্তরে, কুম্ভের অন্তরে, পলাশ-শাখার অভ্যন্তরে, গোবস প্রভৃতিতে, ভগবৎ-সান্নিধ্য অবলোকন করতেন, তা তাদের সর্বত্র ব্রহ্মদর্শনের ফল মাত্র।–চতুর্থ মন্ত্র আরও একটু জটিলতাসম্পন্ন। দ্রঃ ও স্তোকঃ পদদুটির অর্থেই যত কিছু বিতণ্ডার সৃষ্টি। কুম্ভের উপরিভাগে স্থাপিত শাখা-পবিত্রে সেচনকালে ক্ষীরবিন্দু কুম্ভের চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তাতে দুরকম ক্ষীরবিন্দুর উৎপত্তি হয়।
ভাষ্যকারের মতে ক্ষুদ্র বিন্দু স্তোক, আর বৃহত্তর বা প্রৌঢ় বিন্দু দ্র নামে আখ্যাত হয়। মন্ত্রের অর্থ হয়,অল্প বিন্দু ও প্রৌঢ় বিন্দু উভয়কেই নাকনামক স্বর্গবাসী প্রৌঢ় অগ্নির এবং দ্যাবাপৃথিবীর উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদান করি। কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে যা-ই হোক, আধ্যাত্মিক বিচারে আমরা ভাষ্যকারের এই অর্থের কোনও সার্থকতা উপলব্ধি করতে পারি না। আমাদের মতে, এই মন্ত্রে আত্মাকে উদ্বোধিত করা হয়েছে। মন্ত্র বলছেন–ভগবান্ স্বয়ং সৎকর্মের প্রেরণা নিয়ে সর্বভূতে অধিষ্ঠিত আছেন। এরপর পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম মন্ত্রের তাৎপর্য অনুধাবনীয়। পূর্বমন্ত্রের ভাষ্যে প্রশ্ন করা হয়েছিল,-হে দোহনকর্তা, তুমি কোন্ গাভীটিকে দোহন করেছ। আমাদের মনে হয়, পঞ্চম মন্ত্রে ভাষ্যকার সেই গাভীর গুণবর্ণন করেছেন। সে গাভী বিশ্বায়ুঃ, বিশ্বব্যচা, বিশ্বকর্মা। কল্প গ্রন্থ থেকে ভাষ্যকার গো-দহনের ক্রম উদ্ধৃত করে মন্ত্রের ব্যাখ্যায় প্রবৃত্ত হয়েছেন। যাই হোক, ঐ তিনটি বিশেষণে গাভীর যে গুণব্যাখ্যান হয়েছে, তাতে এ গাভীকে, সাধারণ লৌকিক গাভী বলে মনে করা যায় না। আমরা মনে করি, এখানে সেই বিশ্বপিতার প্রতিই লক্ষ্য আছে।–সপ্তম মন্ত্রে ভাষ্যকার ক্ষীরকে লক্ষ্য করেছেন। বলা হয়েছে–হে ক্ষীর। তোমাকে দধিরূপ সোমের দ্বারা প্রক্ষিপ্ত করছি। তুমি সোমবল্লীর রসের সাথে কঠিনতা প্রাপ্ত হও অর্থাৎ দধিরূপ ধারণ করো। এখানে দুগ্ধে দম্বল দিয়ে দধিপ্রস্তুতের বিষয়ই কথিত হয়েছে। যাই হোক, দুগ্ধ বা ক্ষীর সোমলতার রসমিশ্রণে কঠিন হয়ে ইষ্ট দেবতার যজ্ঞাংশের মধ্যে গণ্য হোক,–এরকম উক্তি, কোনই শুভ উদ্দেশ্য প্রকাশ করে না। আমরা মনে করি এখানে যাজ্ঞিকের (প্রার্থনাকারীর নিজের) হবনীয় দ্রব্যসামগ্রীর প্রতিই লক্ষ্য পড়েছে। তিনি হবনীয় দ্রব্যকে লক্ষ্য করে স্বাগত বলেছেন-হে আমার। হবনীয় দ্রব্য! দেবতার উদ্দেশে উৎসৃষ্ট হবার জন্য তোমরা শুদ্ধসত্ত্বভাবান্বিত হও; আর, তোমাদের সে ভাব যেন দৃঢ়রূপে চিরপ্রতিষ্ঠিত থাকে। সোম শব্দে সত্ত্বভাব (ভক্তিভাব) বোঝায়। হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্বেই সোম (সোম নামক মাদক-লতা নয়)। ভাষ্যকার বলেছেন, যদিও এখানে তঞ্চন (কঠিনী করণ) হেতু দধিনিষ্পন্নের ভাব আসছে, তথাপি ভাবনাশক্তির দ্বারা তার সোমত্ব সম্পাদিত হচ্ছে। ভাবনাতেই শত্রু মিত্র সংসূচিত হয়। বন্ধুভাবে ভাবিত হলে বন্ধুত্ব এবং শত্রুভাবে ভাবিত হলে শত্ৰুত্ব সঞ্জাত হয়ে থাকে। সোম যে ভাবনার সামগ্রী, হৃদয়ের বস্তু, তা-ই বুঝতে পারা যায়। সুতরাং বুঝতে পারি, এ মন্ত্র আত্ম-উদ্ভোধনমূলক; মন্ত্রে যাজ্ঞিক নিজের অন্তরকে ভগবানের আরাধনার জন্য দৃঢ় করছেন।–অষ্টম বা শেষ মন্ত্র-সেই দৃঢ়তারই পরিপোষক। এখানে প্রার্থনাকারী ভগবানকে সম্বোধন করে, প্রার্থনা জানাচ্ছেন,-হে ভগবান্ বিষ্ণুদেব! আপনি আমার হবনীয়কে রক্ষা করুন। অর্থাৎ আমি যেন আপনার পূজায় শুদ্ধসত্ত্বভাবে চিরনিরত থাকতে পারি।-ষষ্ঠ মন্ত্র, ভাষ্যমতে অপঃ-সম্বোধনে প্রযুক্ত। এই মন্ত্র পাঠে জলকে অভিমন্ত্রিত করে দোহনপাত্রে ঢালবার নিয়ম। যাই হোক, মন্ত্র যে ভগবানের সম্বন্ধে প্রযুক্ত, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। লক্ষ্য–ভগবান। উদ্দেশ্য–সর্বকর্মফল সমর্পণে তাতে আত্মলীন হওয়া। মন্ত্রে তাই প্রার্থনা হচ্ছে,–হে ভগবন্! আপনি আমার সাথে সঙ্গত হোন। আমার মধ্যে দেবভাবের প্রতিষ্ঠা করে আমাকে পরামুক্তি প্রদান করুন। এইভাবেই মন্ত্রটির দর্শন সার্থক ও সমীচীন ]। ৩
মর্মার্থ- হে আমার হৃদয়নিহিত জ্ঞানভক্তি! অথবা হে আমার সৎ-অসৎ চিত্তবৃত্তি! ভগবানের প্রীতি-হেতুভূত সৎকর্মসাধনে তোমাদের নিয়োজিত করতে যেন সমর্থ হই। (মন্ত্রটি আত্ম উদ্বোধনমূলক। অনুষ্ঠানকারী আত্মসামর্থ্যে নির্ভর পরায়ণ হতে না পেরে, আত্মাকে উদ্বোধিত করছেন, ভগবানের কর্মসম্পাদনে চিত্ত বৃত্তিসমূহ যেন সখ্যসম্পন্ন হয়)। হে আমার মন! সৎ-ভাব-ব্যাপ্তির নিমিত্ত ভগবান তোমাকে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ জীবদেহে সংযুক্ত করেছেন; অথবা সৎ-ভাব-জননের জন্য তোমাকে নিয়োজিত করছি। (মর্মার্থ এই যে–ভগবান্ কৃপাপূর্বক মানুষের মধ্যে মন সংন্যস্ত করেছেন। তার অভিপ্রায়-মানুষ ভগবৎ-পরায়ণ হোক)।
হে ভগবন্! সম্প্রতিবন্ধক শত্রু (আমাদের দুবুদ্ধি) সর্বতোভাবে ভস্মীভূত হোক; আমাদের রিপুশত্রুগণ, প্রত্যেকে বিশিষ্টরূপে দগ্ধ হোক। (ভাব এই যে, আপনি আমাদের দুর্বুদ্ধিকে এবং রিপুশত্রুদের সমূলে বিনষ্ট করুন। হে প্রজ্ঞানস্বরূপ দেবতা! আপনি কাম-ক্রোধী ইত্যাদি রিপুশত্রুদের সংহারকর্তা; আমাদের অমঙ্গলসাধক শত্রুদের আপনি বিনাশ করুন। প্রার্থনাকারী আমাদের সর্বদাই হিংসা করবার জন্য যে শত্রু উদযুক্ত রয়েছে, আপনি তাদের উচ্ছেদ-সাধন করুন; আমরা যে শত্রুকে বিনাশ করতে উদযুক্ত হবে অর্থাৎ যাদের বিনাশ করা প্রয়োজন হবে, আপনি তাদের বিনষ্ট করুন। (এখানে সর্বশত্রুনাশের প্রার্থনা রয়েছে)। হে আমার অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞানস্বরূপ দেবতা! আপনি দেবগণের (দেবভাব-সমূহের) শ্রেষ্ঠ বহনকর্তা। আপনি দেবভাবসমূহের বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণকারী; আপনি সৎ-ভাব-সমুহের সম্যরূপে পূর্ণতাসাধক; আপনি তাদের (দেবভাব-সমূহের) অতিশয় প্রিয়, এবং সেই দেবভাব-নিবহের শ্রেষ্ঠ আহ্বানকর্তা। অপিচ, আপনি সেই দেবভাবসমূহের ধারক ও পোষক। আপনি আমাদের আহবনীয় শুদ্ধসত্ত্বের আধার, আমাদের হৃদয়ের দৃঢ়তা সম্পাদন করুন অর্থাৎ ঐকান্তিকতা বিধান করুন। পরন্ত আপনি আমাদের প্রতি কুটিল হবেন না অর্থাৎ আমাদের কর্মবৈগুণ্যহেতু অথবা আমাদের ত্রুটিবিচ্যুতি দেখে আপনি বিরূপ হবেন না। (প্রার্থনার ভাব এই যে, ভগবানের অনুগ্রহে যেন আমরা সরল সৎ-ভাব-সম্পন্ন হতে পারি)। হে চিত্তবৃত্তি! মিত্রভূত ব্যক্তির অর্থাৎ হিতাকাঙ্ক্ষীজনের দৃষ্টিতে যেন তোমাদের দর্শন করতে সমর্থ হই! (ভাব এই যে-যেন তোমাদের উৎকর্ষ সাধন করতে পারি, যেন বিপথগামী না হই); তোমরা ভীত হয়ো না। (ভাবার্থ- অবিচলিতভাবে যেন ভগবানকে আরাধনা করি); অন্তরস্থিত শক্রসমূহ যেন তোমাদের হিংসা করতে না পারে অর্থাৎ বিপথে পরিচালিত না করে। হে দেব (অথবা হে আমার অন্তর)!
আপনি (তুমি) সর্বগ বায়ুর ন্যায় বিস্তৃত হোন (হও)। (দেবপক্ষে অর্থ এই যে–হে দেব! আপনি বায়ুর মতো আমাদের দেহে সর্বব্যাপী হয়ে আমাদের পাপসমূহকে বিদূরিত করুন। মনঃপক্ষে অর্থ এই যে–হে আমার অন্তর! দেবসামীপ্য লাভের জন্য সঙ্কীর্ণভাব পরিত্যাগ করো; সকলের প্রতি অভিন্নভাব প্রতিষ্ঠিত হোক)। আমার অন্তরের শুদ্ধসত্ত্বভাবরূপ হে হবিঃ। সকলের প্রসবিতা জ্ঞানপ্রদ দীপ্তিমান ষড়ৈশ্বর্যশালী ভগবানের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে, আত্মবাহুকে দেবগণের অধ্বযুস্থানীয় ভবব্যাধিনিবারক অশ্বিদ্বয়ের বাহুযুগলবৎ মনে করে, এবং আপন করযুগলকে দেবগণের হবির্ভাগপুরক পুষাদেবতার করস্বরূপ মনে করে, সেই বাহুযুগলের ও করদ্বয়ের দ্বারা তোমাকে অর্থাৎ ভগবৎ-উদ্দেশ্যে উৎসৃষ্ট হবিঃরূপ ভক্তিসুধা শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহকে প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত নিবেদন অর্থাৎ উপসর্গ করছি। (ভাব এই যে,ভগবৎ কর্মে নিজেকে বিনিযুক্ত করতে হলে, নিজের বাহুযুগলকে এবং করদুটিকে দেবতার বাহু ও হস্ত বলে মনে করা কর্তব্য। সর্বাত্মক ভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হবিঃ মানুষ কিভাবে গ্রহণ করতে পারবে? দেবতার স্মরণ না করলে মানুষের অনৃতত্বরূপহেতু, তার অনুষ্ঠিত কর্ম নিষ্ফল হয় এবং তাতে অনিষ্ট-উৎপাদন ঘটে। সেইজন্য সকল কার্যেই দেবতার স্মরণ কর্তব্য। দেবগণ সত্যস্বরূপ। দেবগণের অনুস্মরণপূর্বক কর্মের অনুষ্ঠান করলে, তা ফল-উপধায়ক হয় এবং সত্যস্বরূপ হয়। মন্ত্রের এটাই তাৎপর্য। দেবভাবে ভাবম্বিত হয়ে কর্ম-অনুষ্ঠানের সার্থকতাই মন্ত্রে প্রখ্যাপিত)। হে আমার মন! জ্ঞান ও ভক্তি রূপ দেবতাদ্বয়ের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে উৎসর্গ করছি। (তাৎপর্যার্থ– জ্ঞান ও ভক্তির দ্বারা যেন সৎকর্মের সাধনে এবং অন্তরকে পরিসুত করতে সমর্থ হই)। মনঃসম্বন্ধযুত জ্ঞান, দেবসম্বন্ধি অর্থাৎ দেবভাব হতে সমুৎপন্ন; (ভাব এই যে–সৎ-ভাবই সৎ জ্ঞানস্বরূপ; তার দ্বারাই মানুষ পরাজ্ঞান লাভ করে); অথবা আমাদের অনুষ্ঠিত সৎকর্ম দেবগণের উদ্দেশ্যে অর্থাৎ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত যেন অনুষ্ঠিত হয়।
(ভাব এই যে-সৎকর্মের প্রভাবেই সৎ-ভাব সমুদ্ভূত হয়); অতএব সেই জ্ঞান আমাদের সাথে সঙ্গত হোক; (অর্থাৎ সৎ-ভাব ও সৎকর্মের দ্বারা আমাদের মধ্যে পরাজ্ঞানের উদ্ভব হোক)। হে আমার অন্তর্নিহিত শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবি! অভিবৃদ্ধির নিমিত্ত অর্থাৎ বিশ্বসেবায় তোমাকে উৎসর্গ করছি; আত্মসুখকামনায় আমি অনুপ্রাণিত নই। (ভাব এই যে–আত্মসুখ-কামনা না করে বিশ্বহিতসঙ্কল্পে যেন ভগবানের আরাধনা করি এবং শুদ্ধসত্ত্ব নিবেদন করতে সমর্থ হই। ভগবানে শুদ্ধসত্ত্ব নিবেদনের এটাই সার্থকতা)। হে ভগবন্! সকল সৎকর্মেই যেন বিশ্বের হিতসাধক বিশ্বপ্রকাশক জ্যোতিঃস্বরূপ আপনাকে দর্শন করি। (ভাব এই যে,–আমাদের অনুষ্ঠিত সকল রকম কর্মেই ভগবানের অধিষ্ঠান হোক)। হে হবিঃ। (অথবা, হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব)! তোমার প্রভাবে ইহলোক-পরলোক-সম্বন্ধি (অথবা, জনন মরণধর্মশীল) নবদ্বারবিশিষ্ট এই দেহরূপ গৃহের (যেন) দৃঢ়তা সম্পাদিত হয়, অর্থাৎ ভগবানের কর্মসম্পাদনে সামর্থ্যযুত হয়। মনুষ্যজন্ম সহস্র প্রলোভনে পরিপূর্ণ। অতএব আমার হৃদয় যেন দৃঢ়তা প্রাপ্ত হয়।
হে দেব! আপনি আমার কলুষক্লেদ-পরিশূন্য শত্রুর উপদ্রবরহিত সুনির্মল হৃদয়রূপ আধার ক্ষেত্রকে লক্ষ্য করে আগমন করুন। (তাৎপর্যার্থ–বিশুদ্ধ নির্মল হৃদয়ই ভগবানের নিবাস-স্থান। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমি যেন সর্বদা আপনাকে হৃদয়ে রাখতে সমর্থ হই। অনুকম্পা-প্রদর্শনে আপনি তার বিহিত করুন)। হে হবি! সুপ্ত শিশু যেমন মাতৃক্রোড়ে সংন্যস্ত হয়, তেমনই তোমাকে অনন্তস্বরূপ ভগবানের অঙ্কে স্থাপন করছি। হে জ্যোতির্ময় প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবন্! আপনি আমার সেই হবিঃ অর্থাৎ হৃদয়স্থিত শুদ্ধসত্ত্বরূপ আহবনীয়কে সংরক্ষণ করুন (অর্থাৎ ইহলোক-পরলোক-সম্বন্ধি শত্রুদের অপসারিত করে চিরতরে সুপ্রতিষ্ঠিত করুন)। (মন্ত্রের তাৎপর্য এই যে,-হে ভগবন! আপনি বিশ্বরূপ জেনে আমার সমস্ত অনুরাগ ও সৎ-ভাব আপনাতে সংন্যস্ত করছি। আমার সেই অনুরাগ সারা বিশ্বে পরিব্যাপ্ত হোক। আপনি আমার সৎ-ভাব সংরক্ষণ করুন) ॥৪॥
[ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা ক্রিয়াকাণ্ডের অনুসারী। তাই যাগ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে, উপকরণ সামগ্রী কোন্ যজ্ঞে কি ভাবে প্রযুক্ত হবে, এবং কোন্ প্রকারে কি রকম পদ্ধতি-ক্রমে যজ্ঞে আহুতি প্রদান করলে কি ফললাভ হওয়ার সম্ভাবনা, ভাষ্যকার তা-ই প্রদর্শনের প্রয়াস পেয়েছেন। আলোচ্য মন্ত্রেও তিনি তা-ই করেছেন। বিনিয়োগ-সংগ্রহ এবং সূত্রগ্রন্থ ইত্যাদি থেকে প্রমাণ পরম্পরা উদ্ধৃত করে ভাষ্যকার এই মন্ত্র-সমূহের যে বিনিয়োগ নির্দেশ করেছেন, তারই জন্য তিনি প্রথম মন্ত্রে হস্তদ্বয়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় মন্ত্রে শূর্প, চতুর্থ মন্ত্রে বহ্নি, পঞ্চম মন্ত্রে শকট, ষষ্ঠ মন্ত্রে বীহি-সমূহ, সপ্তম মন্ত্রে দ্বার, অষ্টম ও নবম মন্ত্রে পবিত্র, দশম একাদশ ও দ্বাদশ মন্ত্রে এবং তীর পরবর্তী মন্ত্রগুলিতে হবিঃ প্রভৃতি সম্বোধন অধ্যাহার করেছেন। যেমন,-ভাষ্যকার প্রথম মন্ত্রে হস্তদ্বয়কে সম্বোধ্য বলেছেন। লৌকিক কার্যে হস্তদ্বয় পরিশুদ্ধ না করলেও চলতে পারে; কিন্তু দেবতার কর্মে হস্তদ্বয়কে প্ৰক্ষালিত করে পরিস্তুত ও বিশুদ্ধ করে নিতে হয়। নচেৎ, দেবকার্য সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় না। এই জন্যই হস্তদ্বয়কে বিশুদ্ধ করবার প্রয়োজনে মন্ত্রের অর্থ হয়েছে–দেবকার্যে নিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রক্ষালিত তোমাদের যেন দেবকার্যে নিযুক্ত করতে সমর্থ হই। এক হিসেবে আমরাও ভাষ্যকারের এই অর্থেরই অনুসরণ করেছি বটে; কিন্তু (আধ্যাত্মিক ভাবনায়) আমাদের সম্বোধ্য হয়েছে–জ্ঞানভক্তি বা সৎ-অসৎ-চিত্তবৃত্তি। তাই মন্ত্রের ভাব হয়েছে–হে জ্ঞানভক্তি অথবা হে আমার সৎ-অসৎ-চিত্তবৃত্তি! ভগবানের প্রীতিহেতুভূত সৎকর্মের সাধনে (ভগবানের কার্যে যেন তোমাদের নিয়োজিত করতে সমর্থ হই।–আমরা কর্মকাণ্ডের বিরোধী নই। কর্মকাণ্ড-অনুসারী ব্যাখ্যা প্রচুর আছে। আমরা আধ্যাত্মিক ভাবধারায় বিচার করেছি ] ॥ ৪৷৷
মর্মার্থ- হে আমার সৎ ও অসৎ কর্ম! দ্যোতমান স্বপ্ৰকাশ জ্ঞানপ্রেরক দেবতা অথবা প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবান, বিশুদ্ধ পবিত্রকারক বায়ুরূপে এবং জগৎ-নিবাস-হেতুভূত প্রজ্ঞানস্বরূপ বিশ্বপ্রকাশক ভগবানের বিশ্বপ্রাপক জ্যোতিঃ-নিবহের দ্বারা তোমাদের উৎকর্ষসাধনে পবিত্রতা সম্পাদন করুন। (অথবা, তোমরা জ্ঞানপ্রদ সবিতৃদেবের প্রেরণায় (অনুকম্পায়) ত্রুটি-পরিশূন্য বায়ুর ন্যায় পবিত্রকারক ও সূর্যরশ্মির মতো জ্ঞানপ্রদ হয়ে আমাদের উৎকর্ষ-সাধনে পবিত্র করো। (বায়ু ও সূর্যরশ্মি শুদ্ধিসম্পাদক। তাঁদের প্রভাবে আমাদের সৎ-অসৎ উভয় কর্ম পবিত্র হোক,–এটাই প্রার্থনা)। অগ্রগমনশীল অর্থাৎ মোক্ষপথে নয়নসমর্থ, অপহতিনিবারণে শোধনশীল অর্থাৎ মুক্তিদানসামর্থ-হেতু উৎকর্ষসম্পাদনে পবিত্রতা-বিধায়ক হে জলদেবতা অর্থাৎ দেবভাবসমূহ! আপনারা প্রবর্তমান যুগ ইত্যাদি সত্যকে সত্বর নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করুন অর্থাৎ সিদ্ধিযুক্ত করুন; অপিচ, যাজ্ঞিক কর্মের অনুষ্ঠাতাকে ভগবানের সন্নিকর্ষ-লাভে সমর্থ করুন; আমাদের কর্মসমূহে সর্বসিদ্ধিদাতা ভগবানকে আনয়ন করুন। অপিচ অন্তঃশত্রুনাশের নিমিত্ত পরমৈশ্বর্যশালী ভগবান পরাশক্তি-দানে তোমাদের ভগবৎকার্যে নিযুক্ত করুন। এবং তোমরাও অন্তঃশত্রুনাশের নিমিত্ত ভগবানকে সম্ভজনা করো; আর হে আমার হৃদয়স্থিত সৎ-ভাবসমূহ! তোমরা শত্রুনাশের নিমিত্ত অসৎসম্বন্ধরহিত এবং সর্বথা ভগবকর্মে নিয়োজিত হও। অথবা–হে আমার সৎ-বৃত্তিনিবহ! শত্ৰু-সংহারের নিমিত্ত-রিপুশনাশের জন্য, সেই ভগবান্ ইন্দ্রদেব তোমাদের প্রেরণ করেছেন, আত্মশত্রু-নিপাতের জন্য তোমরা সেই ভগবান্ ইন্দ্রদেবকে তোমাদের পরিচালক পদে বরণ করো! অর্থাৎ,–আত্মশত্ৰু-সংহারের জন্য সম্বন্ধযুত কর্মে অনুরক্ত হও। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক এবং আত্ম-উদ্বোধক। প্রার্থনার ভাব এই যে,হে দেব! আমাদের সৎ-চরিত্র দেবভাব সম্পন্ন করে ভগবানের সান্নিধ্য প্রদান করুন)। হে আমার সৎ-অসৎ চিত্তবৃত্তি-সমূহ! তোমাদের উৎকর্ষসাধনের নিমিত্ত, প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবানের এবং জ্ঞানভক্তিরূপী দেবতার উদ্দেশ্য, আমার হৃদয়-নিহিত শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবিকে উৎসর্গ করছি অর্থাৎ ভগবানের কার্যে নিয়োজিত করছি। হে আমার সৎ-অসৎ বৃত্তিনিবহ! তোমরা দেবসম্বন্ধি যাগ ইত্যাদি সৎক্রিয়ার দ্বারা দেবসম্বন্ধি সৎ-জ্ঞান-বর্ধনরূপ কর্মে বিশুদ্ধতা প্রাপ্ত হও। (এই মন্ত্রের দ্বারা প্রার্থনাকারী নিজেকে উদ্বোধিত করছেন। চিত্তবিক্ষোভজনিত চাঞ্চল্যে মনের স্থৈর্য সাধনের জন্য চিত্তবৃত্তির উদ্বোধনের উদ্দেশ্যে সাধক নিজেকে প্রবুদ্ধ করছেন বলে মনে করাই সঙ্গত)। তা হলে, আমার দুর্বুদ্ধিরূপ শত্ৰু বিকম্পিত হবে; এবং রিপুশত্রুগণ বিতাড়িত (নিপাতিত) হবে। হে আমার মন! তুমি অনন্তস্বরূপ ভগবানের অংশভূত হও; অতএব আমার হৃদয়রূপ আধারক্ষেত্ৰ তোমার সম্বন্ধি জ্ঞান প্রাপ্ত হোক। অথবা হে আমার মন! (চঞ্চলতা প্রভৃতি হেতু) তুমি অনন্তের সাথে মিলনের প্রতিবন্ধক হও; সেই অনন্ত তোমার প্রতি অনুগ্রহ করুন। হে মন! তুমি মহাবৃক্ষস্বরূপ অধিষবণের আধারভূত অর্থাৎ শনিবারণক্ষম দৃঢ় হও। অতএব অনন্ত ভগবানের করুণাধারা তোমাকে প্রাপ্ত হোক। (ভাব এই যে, বৃক্ষ যেমন ফল ছায়া ইত্যাদি দানে সকলকে পরিতুষ্ট করে, তুমিও তেমনই সকলের প্রীতির আস্পদ হও! তাহলে ভগবান তোমার প্রতি প্রসন্ন হবেন)। হে মন! তুমিই অগ্নিদেবতার অর্থাৎ আহবনীয় জ্ঞানের (বা আহবনীয়ের দেহস্বরূপ; তুমিই বাক্যের বা মন্ত্রের উৎপাদক উচ্চারণকারী; দেবতার প্রীতির নিমিত্ত আমি তোমাকে নিযুক্ত করছি। (ভাব এই যে,-মনই আহবনীয়; মনই মন্ত্র; মনের দ্বারাই ভগবানের অনুকম্পা লাভ করতে পারা যায়)। হে মন! তুমি মহাবৃক্ষস্বরূপ, তুমি মহত্ত্ব ইত্যাদি গুলোপেত, তুমি পাষাণের মতো দৃঢ়; অর্থাৎ তুমিই সর্বকর্ম-সম্পাদনে সমর্থ। সেই যে তুমি, আমাদের প্রদত্ত চিত্তবৃত্তিরূপ হবিঃ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত যাতে শান্ত ও শত্রুর উপদ্রব-পরিশূন্য হয়, সেইভাবে সংযমিত করো। অথবা–হে মন! সেই যে তুমি–দেবগণের প্রীতির জন্য সবরকম আহবনীয়রূপে সুষ্ঠুভাবে দেবসেবায় নিযুক্ত হও। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধক। চিত্তবৃত্তি যাতে ভগবানের অনুসারী হয়, সেই জন্য সাধক এখানে নিজেকে উদ্বোধিত করছেন)। হে ভগবন্! আপনি আমাদের অভীষ্ট প্রকৃষ্টরূপে পূর্ণ করুন; অপিচ, আমাদের মধ্যে বিশিষ্ট রূপে বলপ্রাণ সঞ্চার করুন। অপিচ, হে আমার হৃদয়নিহিত সৎ-বৃত্তিসমূহ! তোমরা জ্ঞানজ্যোতিতে উদ্ভাসিত হও। তা হলে প্রার্থনাকারী আমরা, শত্রুসঙ্ত অর্থাৎ অন্তঃশত্রুর উপদ্রব নিবারণ করতে সমর্থ হবো। অথবা, ইষে ত্ব উর্জে ত্ব প্রভৃতি মন্ত্র দুটি উচ্চারণে প্রার্থনা করো (অর্থাৎ অন্নরসপ্রাণ যাতে প্রাপ্ত হতে পারে, তার উপযোগী মন্ত্র ইত্যাদি উচ্চারণ করো)। তোমার সাহায্যে শ্রেয়োকামী আমরা অসৎ-বৃত্তিসমূহকে প্রতিরূদ্ধ করে জয়যুক্ত হই। (আত্মশক্তি উন্মেষণের জন্য মন্ত্রে প্রার্থনা রয়েছে। শত্রুনাশে অনিষ্টপরিহার এবং প্রজ্ঞানলাভে ইষ্টপ্রাপ্তি মন্ত্রে প্রখ্যাপিত। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন! আমাদের সকল অভীষ্ট পূরণ করুন। আমাদের এই অনুষ্ঠান মনঃ-প্রাণের অধিষ্ঠাত্ দেবতাসমূহের সাথে ঐক্যসম্বন্ধযুক্ত হোক)। হে মন! তুমি অভীষ্টবর্ষণের হেতুভূত হও। অতএব হে মন! তোমাকে অভীষ্টপূরণের হেতুভূত বলে ভগবান (যেন) জানতে পারেন। (অর্থাৎ, তোমার কর্মের দ্বারা ভগবান তোমার প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হোন। তা হলে, দুর্বুদ্ধিরূপ শত্রু দূরীকৃত হবে, আর রিপুশত্রুগণ বিতাড়িত বিমর্দিত হবে। হে আমার অন্তরস্থিত অসৎ-বৃত্তিসমূহ! তোমরা দেবভাব বিরোধী অন্তঃশত্রুদের অংশস্বরূপ হও। হে অন্তরস্থ অসৎ-বৃত্তিসমূহ! সেই বিচ্ছিন্নকারক বায়ুদেব (প্রবলবেগে প্রবাহিত হয়ে) আমাদের অন্তর থেকে তোমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিন। হে অসৎ-বৃত্তিসমূহ! সেই মঙ্গলরূপ সুবর্ণহস্তবিশিষ্ট জ্ঞানপ্রদাতা দ্যোতমান্ পরমেশ্বর তাঁর কলঙ্করহিত হস্তের দ্বারা তোমাদের প্রতিগ্রহণ করুন; অর্থাৎ আমাদের অন্তর থেকে তোমাদের অপসারিত করুন। ৫।
[এই মন্ত্রগুলি ব্রীহ্যবঘাত-বিষয়ক। ধান ভেনে তণ্ডুল প্রস্তুত করবার সময়, তণ্ডুলের গাত্রে রক্তাভ যে তুষ ও ভোলা পরিদৃষ্ট হয়, শাস্ত্রমতে ভাষ্যানুক্রমণিকায় সেই তুষ রক্ষোভাগ বলে অভিহিত হয়। সেই তুষ ছাড়াবার সময়, বক্ষ্যমাণ এই মন্ত্ৰসমূহ উচ্চারণ করবার বিধি সূত্র গ্রন্থ ইত্যাদিতে উক্ত হয়েছে। প্রথমেই যে উৎপবন অর্থাৎ পবিত্রীকরণ মন্ত্র ব্যবস্থিত হয়েছে, তার কারণ-স্বরূপ একটি আখ্যায়িকার অবতারণা করা হয়। সেই আখ্যায়িকাটি এই, ইন্দ্র বৃত্রকে বধ করেছিলেন। নিহত হবার পর বৃত্র উদকের অভিমুখে পতিত হয়। তাতে জল থেকে সার নির্গত হয়েছিল। দৈব ও মানুষ ভেদে সেই সার দুরকম। মলপ্রক্ষালন ইত্যাদির জন্য যে সার, তা মানুষ। আর শোধনের জন্য যে সার, তা-ই দৈব। দৈব আবার দুরকম,-পাপশোধক ও দ্রব্য-শোধক। স্নান ইত্যাদি বিষয়ক সার পাপ-শোধক; আর পোণ ইত্যাদি বিষয়ক সার দ্রব্য-শোধক। সেই জন্যই পূজার উপকরণ ইত্যাদিতে জল প্রক্ষেপ এবং পাপ-শোধনের নিমিত্ত অবগাহন ইত্যাদি প্রয়োজন। এখানে (কর্মকাণ্ডের বিচারে) সেই দুরকম সারই মেধ্য ও যজ্ঞীয় শব্দ দুটিতে বিক্ষিত হচ্ছে। সেই সার নির্গত হয়ে ভূমিতে পতিত হওয়ায় তা থেকে দুর্ভের উৎপত্তি হয়েছিল। সেই জন্যই দর্ভের পবিত্রতা প্রখ্যাপিত। বিনিয়োগ অনুসারে মন্ত্রের যে সম্বোধন-পদগুলি ভাষ্যকার অধ্যাহার করেছেন, তা এই,–প্রথম মন্ত্রের সম্বোধ্য আপ; দ্বিতীয়ের সম্বোধ্য জল-দেবতা; তৃতীয় মন্ত্রের হবিঃ; চতুর্থ মন্ত্রের যাগ-পাত্র-সমূহ; পঞ্চম ও ষষ্ঠ মন্ত্রের কৃষ্ণাজিন; সপ্তম মন্ত্রের উদুখল; অষ্টম মন্ত্রের পুরোডাশীয় ব্রীহি-সমূহ; নবম মন্ত্রের মুসল পদার্থ; দশম মন্ত্রের দৃষৎ বা পাষাণ; একাদশ মন্ত্রের শূর্প; দ্বাদশ মন্ত্রের ব্রীহি-সমূহ ও ত্রয়োদৃশ মন্ত্রের তুষ; পঞ্চদশ ও ষোড়শ মন্ত্রের তণ্ডুল প্রভৃতি সম্বোধন পদ অধ্যাহৃত হয়েছে। সেই অনুসারে মন্ত্রের যে অর্থ ভাষ্যকার নিষ্পন্ন করেছেন, তা কর্মকাণ্ডের পক্ষে যথাযথ। কিন্তু, বলা বাহুল্য, আমাদের অর্থ (আধ্যাত্মিক বিচারণায় ও বিশ্লেষণে) সম্পূর্ণ বিপরীত পন্থা অবলম্বন করেছে। ক্রিয়াকাণ্ডের অনুসরণে, ভাষ্যকার যেমন প্রক্রিয়া ইত্যাদি সহকারে মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাশন করেছেন, তা থেকেই অনেক স্থলে আমাদের মর্মার্থের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম হয় ] ॥ ৫॥
প্রথম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬
অনুবাক -৬
মন্ত্র- অবধূতং রক্ষোহবধূতা অরাতয়োহ দিত্যাগসি প্রতি জ্বা পৃথিবী বেত্ত্ব। দিবঃ স্তম্ভনিরসি প্রতি ব্ৰাহদিত্যান্বেন্তু। ধিষণাহসি পর্বত্যা প্রতি ত্বা দিবঃ স্কন্তনিৰ্বেত্ত্ব। ধিষণাহসি পার্বতেয়ী প্রতি ত্বা পর্বতিৰ্বেত্ত্ব। দেবস্য ত্বা সবিতুঃ প্রসবেংশ্বিনোৰ্ব্বাহুভ্যাং পুষ্ণো হস্তাভ্যামধি বপামি ধানমসি ধিনুহি দেবান। প্রাণায় বৃহপানায় ত্বা ব্যানায় ।। দীর্ঘামনু প্রসিতিমায়ুষে ধাম। দেবো বঃ সবিতা হিরণ্যপাণিঃ প্রতি গৃহ্নাতু ॥ ৬।
মর্মার্থ- হে আমার মন! (যখন তুমি সৎ-সহযুত হও তখন) দুবুদ্ধিরূপ শত্রু বিকশিত হয়, এবং রিপুশত্রুগণ বিতাড়িত (নিপাতিত) হয়। হে মন! (চঞ্চলতা প্রভৃতি হেতু) তুমি, অনন্ত-সহ মিলনে প্রতিবন্ধক-স্থানীয় হয়ে থাকো; অতএব সকল সৎ-বৃত্তির মূল সৎ-জ্ঞান ও সৎকর্ম তোমাকে অনুগ্রহ করুন। (চাঞ্চল্য-নিবন্ধন মন ভগবৎ-সম্মিলনের অন্তরায় হয়। সেই জন্য, ভগবানের অনুগ্রহ লাভের নিমিত্ত এই মন্ত্রে প্রার্থনা জানানো হয়েছে)। হে অসৎ-বৃত্তিনিবহ! তোমরা স্বর্গবাসিগণের অর্থাৎ হৃদয়রূপ স্বর্গপ্রদেশে অবস্থিত সৎ-বৃত্তিসমূহের স্তম্ভনকারী অর্থাৎ প্রতিবন্ধক হও। অথবা হে মন! (সৎকর্মের দ্বারা) তুমি দ্যুলোকবাসীরও স্তম্ভনকারী হও; (সৎ-কর্মের প্রভাবে মানুষ দেবগণকেও স্তম্ভিত করতে সমর্থ হন); অতএব অনন্তের অংশভূত শুদ্ধসত্ত্ব তোমাকে অনুগ্রহ করুন। (চাঞ্চল্য-নিবন্ধন চিত্তবৃত্তি-সমূহ অনন্তের সাথে মিলনের বাধক হয়। সেইজন্য অন্তরাত্মা আত্মাকে উদ্বোধিত করেন। প্রার্থনা এই যে, হৃদয়ে সৎ-ভাব সঞ্জাত হলে অসৎ ভাবও সৎ-ভাবে পরিণত হয়)। হে মনোবৃত্তি! তুমি সৎ-বুদ্ধি প্ৰদাত্রী এবং পর্বতের মতো দৃঢ় বলে অবিচলিত হও; অতএব হৃদয়স্থিত সবৃত্তির স্তম্ভনকারী প্রতিবন্ধকসমূহ তোমাকে পরিত্যাগ করুক। হে আমার মনোবৃত্তি! তুমি সৎ-বুদ্ধিদাত্রী হও; অনন্ত শক্তিশালিনী পরা প্রকৃতি তোমাকে পর্বতের মতো দৃঢ় (অচষ্ণল ও সৎ-ভাবসম্পন্ন) বলে জানুন অর্থাৎ অনুগ্রহ করুন। আমার অন্তরের শুদ্ধসত্ত্বভাবরূপ হবি! সকলের প্রসবিতা জ্ঞানপ্রদ দীপ্তিমান ষড়ৈশ্বর্যশালী ভগবানের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে, আত্মবাহুকে দেবগণের অধ্বর্যস্থানীয় ভবব্যাধিনিবারক অশ্বিদ্বয়ের বাহুযুগলের মতো মনে করে, এবং নিজের করযুগলকে দেবগণের হবির্ভাগপূরক পূষাদেবতার করস্বরূপ মনে করে, সেই বাহুযুগলের ও করদ্বয়ের দ্বারা তোমাকে (অর্থাৎ ভগবানের উদ্দেশ্যে উৎসৃষ্ট হবিঃরূপ শুদ্ধসত্ত্ব ভক্তিসুধাকে) ভগবানের কার্যে সম্যরকমে নিয়োজিত করছি। হে মন! তুমি সকলের প্রীতিকারক হও; অতএব, (আমাদের অন্তরে) সমস্ত দেবভাবকে প্রীণন অর্থাৎ প্রেরণ করো। হে মন! তোমাকে আমার প্রাণবায়ু-সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘজীবন কামনায় সংযত করছি। হে মন! তোমাকে আমার অপান বায়ু সংরক্ষণের জন্য (অর্থাৎ কুপ্রবৃত্তি পরিহারের জন্য) সংযত করছি; হে মন! তোমাকে আমার ব্যানবায়ু সংরক্ষণের (শারীরবলরক্ষার্থ) নিমিত্ত সংযত করছি। হে মন! ইহ-সংসারে ভগবানের প্রীতিহেতুভূত সম্পাদনযোগ্য অশেষ সত্যৰ্ম আছে জেনে আয়ুঃ-বৃদ্ধির (অথবা ভগবানের পরিতৃপ্তির) নিমিত্ত তোমাকে সংযত করছি। বহু রকম সকর্ম সাধনার জন্যই মনুষ্য জীবন লাভ। সুদীর্ঘ আয়ুঃ ব্যতীত সে সকল সৎকর্ম সাধিত হতে পারে না। যোগসাধনাই আয়ুবৃদ্ধির একমাত্র উপায়। অসৎ-বৃত্তিসমূহ আয়ুঃ-হানিকর। অতএব, মন্ত্রের শেষাংশে (অষ্টম মন্ত্রাংশে) তাদের সম্বোধন করা হয়েছে)। অথবা, হে মন! অবিচ্ছিন্নভাবে ভগবানের প্রীতিহেতু ভূতকর্ম সম্পাদন করে এবং সদাকাল তার সন্তোষ-বিধান করে আয়ুবৃদ্ধির অথবা সুখবধর্নের নিমিত্ত তোমাকে সংযতভাবে নিয়োজিত করছি। (মন্ত্রটি উদ্বোধনমূলক। ভাব এই যে,হে মন! ভগবানের সন্তোষ বিধান করে আমাদের সন্তোষ-বর্ধন করো। তোমার দ্বারা সেবিত হলে ভগবৎ-প্রীতিতে আমরা প্রীতি লাভ করবো)। হে অসৎ-বৃত্তিসমূহ! সেই মঙ্গলরূপ সুবর্ণহস্তবিশিষ্ট জ্ঞানপ্রদাতা দ্যোতমান সবিতৃদেব, তোমাদের প্রতিগ্রহণ করুন; অর্থাৎ, আমাদের অন্তর থেকে তোমাদের অপসারিত করুন ৷৷ ৬ ৷৷
[পঞ্চম অনুবাকের মন্ত্রগুলি ব্রীহির অবঘাত-মূলক। এই ষষ্ঠ অনুবাকের মন্ত্রগুলি তলপেষণাত্মক। ব্রীহি অবগাত বলতে খড় থেকে ব্রীহি বা ধান ছাড়ানো, আর তলপেষণ বলতে সেই ধান ভেনে চাল প্রস্তুত করণ বুঝি। অবঘাতমূলক মন্ত্রগুলির মতো, পেষণসংক্রান্ত মন্ত্রগুলিতেও বিভিন্ন সামগ্রী উপলক্ষিত হয়েছে। আর উপলক্ষিত সেই সেই দ্রব্যে মন্ত্র প্রযুক্ত হওয়ায়, সেই সকল সামগ্রীই অনেক স্থলে মন্ত্রের সম্বোধ্য মধ্যে পরিগণিত হয়েছে। বিনিযোগ অনুসারে, মন্ত্রে উপলক্ষিত সামগ্রী সম্পর্কে, মন্ত্র যে ভাবে প্রযুক্ত হয়েছে, এখানে তার সম্পূর্ণ বিবরণ অনাবশ্যক। কারণ ক্রিয়াকাণ্ডের বিচারে, ভাষ্যমতে প্রথম মন্ত্রের সম্বোধ্য-শম্যা, দ্বিতীয় মন্ত্রের–পেষণসাধনভূত দৃষৎ। তৃতীয় মন্ত্রের হবিঃপুরোভাশ, চতুর্থ মন্ত্রের হবিবৃত্তিয় সম্বোধন পদ রূপে অধ্যাহৃত হয়েছে। পঞ্চম মন্ত্রে তুণ্ডল এবং ষষ্ঠ মন্ত্রে তণ্ডুল-পেষণকারিণী দাসী উপলক্ষিত হয়েছে। ফলে যেমন প্রথম মন্ত্রের অর্থ দাঁড়িয়েছে–হে শম্যে! তুমি দুলোকের ধারয়িত্রী হও। সুতরাং ভূমির ত্বকরূপ এই কৃষ্ণাজিন তোমাকে স্বভূত বলে মনে করুক। অর্থাৎ, কৃষ্ণাজিন পৃথিবীর ত্বকস্বরূপ; তুমি পৃথিবীর অস্থিস্বরূপ। তোমাদের পরস্পর মিলন হোক। তেমনই দ্বিতীয় মন্ত্রের অর্থ-হে দৃষৎ! তুমি পেষণে অভিজ্ঞ, সুতরাং অতিশয় দৃঢ়। পর্বত থেকে তোমার উৎপত্তি; সুতরাং তোমাকে পর্বতের ন্যায় দৃঢ় বলে মনে করি। তুমি দ্যুলোকধারিকা এই শম্যাকে জান অর্থাৎ তোমার সাথে তার মিলন হোক। (গদার মতো আকৃতিবিশিষ্ট ব্যাসার্ধ পরিমিত কাষ্ঠবিশেষ–শম্যা। সেই শম্যা দৃষতের পশ্চাৎ-ভাগ ধারণ করে। দৃষৎ বলতে যাঁতার ভাব মনে আসে। দুখণ্ড গোলাকৃতি প্রস্তরে যাঁতা প্রস্তুত হয়। নিম্নভাগস্থ প্রস্তরের কেন্দ্রস্থানে বিদ্ধ যে কাষ্ঠফলক উপরিভাগস্থ পাষাণখণ্ডকে ধারণ করে, তা-ই শম্যা পদবাচ্য বলে মনে করি)। আমরা কর্মকাণ্ডের বিরোধী নই। তবে কর্মকাণ্ডের দিক ছাড়াও আধ্যাত্মিকতার বিচারে যে এই মন্ত্রগুলি পঠিতব্য, সেটাই আমরা দেখবার চেষ্টা করেছি। আমরা তো মনে করি, এই অনুবাকের পঞ্চম থেকে অষ্টম পর্যন্ত মন্ত্র-সমূহে যোগসাধনার এক মহান্ উপদেশও বিদ্যমান। যেমন, পঞ্চম মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে মনকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে মন! তুমি ভগবৎপ্রীতিসাধনে বিনিযুক্ত হও। সকল দেবভাব তোমাকে প্রতিষ্ঠিত থাকুক। সেই দেবভাব কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে? কি রকমে ভগবানের প্রীতিসাধনে প্রযুক্ত হতে সমর্থ হয়? পরবর্তী তিনটি মন্ত্রে তারই ব্যঞ্জনা আছে] ॥ ৬
মর্মার্থ- হে মন! তুমি শক্রসমূহের ধর্ষণে সমর্থ হও। অতএব তুমি পরব্রহ্ম (সত্ত্বভাব) প্রদান করো। অথবা হে মন! তুমি স্বতঃই প্রগম্ভ অর্থাৎ চঞ্চল আছ; অতএব তুমি ভগবানের কৃপালাভের নিমিত্ত তার প্রীতি-হেতুভূত কর্ম-সম্পাদনে প্রবুদ্ধ হও অর্থাৎ চাঞ্চল্য পরিহার করে স্থির হও। অথবা, হে মন! তুমি সকলের ধারক পরব্রহ্মস্বরূপ হও; অতএব তুমি সত্ত্বভাবরূপ পরমধন অর্থাৎ মোক্ষ প্রদান করো। হে প্রজ্ঞানস্বরূপ অগ্নিদেব! আপনি অপক জ্ঞান (বিভ্রম) বিদূরিত করুন। দুষ্টজ্ঞান অর্থাৎ পাপবুদ্ধিরূপ দহনজ্বালাপ্রদ শত্রুকে নিঃশেষ করুন। তার পর দেবভাবসাধক জ্ঞানাগ্নিকে আনয়ন করে আমাদের অন্তরে সর্বতোভাবে প্ৰদ্দীপিত করুন; অথবা, হে মন! দেবভাবসাধক জ্ঞানাগ্নিকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করো; অথবা হে অগ্নিদেব! দেবভাবসাধক জ্ঞানাগ্নিরূপে সর্বতোভাবে আপনি আমাদের অন্তরদেশে বিস্তৃত হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। ভাব এই যে, দাহক বা অজ্ঞানরূপ যে অগ্নি-প্রত্যক্ষীভূত হয়, তার অনুসরণে বিরত হও; জ্ঞানাগ্নিই সর্বসিদ্ধিকারক; তারই অনুসরণ করো)। হে দেব! আপনার প্রভাবে দুর্বুদ্ধিরূপ অন্তঃশত্রু নিঃশেষে বিদগ্ধ (বিনাশপ্রাপ্ত) হোক; অপিচ, কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপুশত্রু নিঃশেষে দগ্ধ (ভস্মীভূত) হোক। (ভাবার্থ এই যে, আমাদের সকল শত্ৰু নিঃশেষে বিনাশপ্রাপ্ত হোক)। হে মন! তুমি স্থির একাগ্র হও। সৎ-বৃত্তিমূল আধারক্ষেত্রকে দৃঢ় করো, সৎকর্মসাধন-সামর্থ্যকে অথবা সকর্মশীল পূর্ণজীবনকে রক্ষা করো, এবং লোকানুরাগ বা বিশ্বপ্রীতি দৃঢ় (রক্ষা) করো। তার পর হে মন! অথবা হে দেব! সকর্মে প্রবৃত্ত প্রার্থনাকারীর কল্যাণসাধনের জন্য তার জন্মসহজাত সম্প্রতিবন্ধক অর্থাৎ বন্ধনমূলক অসৎ-বৃত্তিসমূহকে অভিভূত বা অপসারিত করো। হে মন! তুমি সত্ত্বভাব-রক্ষক হও। অতএব অন্তরিক্ষের ন্যায় অনন্ত অর্থাৎ সত্ত্বভাব সমূহের সর্বব্যাপিত্ব দৃঢ় করো; আর সৎকর্ম-সাধনশীল প্রাণশক্তিকে এবং পরমাত্মার অংশভূত চৈতন্যকে তোমাতে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করো। তার পর হে আমার মন! অথবা হে ভগবন্! তুমি সৎকর্ম-প্রবৃত্ত সাধনরত প্রার্থনাকারীর কল্যাণ কামনায় তার জন্মসহজাত সৎপ্রতিবন্ধক অর্থাৎ বন্ধনমূলক অসৎ-বৃত্তি-সমূহকে (সৎ-ভাব ইত্যাদির দ্বারা) সর্বতোভাবে আবরণ অর্থাৎ বিনাশ করো। হে মন! তুমি সৎ-বৃত্তিসমূহের ধারক ও পালক হও। অতএব তুমি শুদ্ধসত্ত্ব-দেবভাব দৃঢ় করো অর্থাৎ তোমাতে দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত করো; সৎ বস্তুদর্শনসামর্থ্য দৃঢ় করো, সৎ-বাক্য-শ্রবণসামর্থ্য দৃঢ় করো। তারপর হে মন! সৎকর্মে প্রবৃত্ত সাধনরত প্রার্থনাকারীর কল্যাণ-কামনায় তার জন্মসহজাত সৎপ্রতিবন্ধক বন্ধন-হেতুভূত অন্তঃশত্রুদের (সৎ-ভাবের দ্বারা) আচ্ছাদিত করো অর্থাৎ অপসারিত করো। হে মন! তুমি প্রকাশশীল হও। অতএব তুমি সর্বদিকে পরিব্যাপ্ত সৎ-ভাবকে অর্থাৎ বিশ্বব্যাপক শুদ্ধসত্ত্বকে বা বিশ্বহিতসাধনের সামর্থ্যকে দৃঢ় করো অর্থাৎ তোমাতে দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত করো; এবং সৎ-বৃত্তির মূল বা আধারকে দৃঢ় করো এবং লোকানুরাগ বা বিশ্বপ্রীতি দৃঢ় করো। তার পর হে আমার মন! সৎকর্মে প্রবৃত্ত সাধনরত প্রার্থনাকারীর (আমার) জন্মসহজাত বন্ধনমূলক সম্প্রতিবন্ধক অন্তঃশত্রুদের (সৎ-ভাবের দ্বারা) আচ্ছাদিত অর্থাৎ বিদূরিত করো। হে আমার চিত্তবৃত্তিনিবহ! তোমরা ভগবৎ-অনুসারী হও। তার পর মোকামীকে (আমাকে) সৎ-ভাব-মূলক বিশ্বপ্রীতি প্রদান করো। অপিচ, মোক্ষকামীকে (আমাকে) পরমধন প্রদান করো; এবং সৎকর্মে প্রবৃত্ত সাধনরত প্রার্থনাকারীর (আমার) কল্যাণের জন্য জন্মসহজাত সৎপ্রতিবন্ধক বন্ধন মূলক অন্তঃশত্রুদের সৎ-ভাবের দ্বারা পরিবৃত করো। হে চিত্তবৃত্তিনিবহ! তোমরা অতি উচ্চ জ্ঞান-লাভের নিমিত্ত একাগ্রতার সাথে ভগবানের আরাধনায় নিরত হও। সৎকর্ম-সহজাত বিশিষ্ট জ্ঞান-লাভই ভগবৎ-প্রাপ্তির করাণ হয়ে থাকে। মেধাবী অর্থাল আত্মদর্শিগণ প্রকাশশীল অর্থাৎ প্রবর্ধমান জ্ঞানাগ্নিতে যে প্রসিদ্ধ জ্ঞানাবরণ-সমূহকে প্রক্ষিপ্ত করেন; জ্ঞান-শক্তি-প্ৰজনক হে ইন্দ্র-বায়ু দেবদ্বয়! আপনারা উভয়ে সৎ-ভাবপোষক (অনুষ্ঠাতার) যাগ ইত্যাদি সৎকর্মে (আবির্ভূত হয়ে) সেই সৎ-ভাবের অবরোধ আবরণ-সমূহকে বিমুক্ত অর্থাৎ অপসারিত করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক) । ৭।
[পঞ্চম অনুবাকে ব্রীহ্যবঘাত, ষষ্ঠে তলপেষণ এবং এই সপ্তম অনুবাকে কপালোপধান। কর্মকাণ্ডের অনুসরণে একে একে কেমন পর পর তণ্ডুল-প্রস্তুত-করণের প্রণালী মন্ত্ৰসমুহে বিধৃত রয়েছে। এই মন্ত্রে সর্বসমেত অষ্টবিধ কপাল স্থাপন করবার বিধি। যে কারণে এই অষ্টবিধ কপাল স্থাপন করতে হয়, তা এই,–গর্ভে অবস্থানকালে প্রথমে মানুষের শিরোরূপ একটি অখণ্ড কপাল উদ্ভূত হয়। তার পর সেই কপাল রেখা ইত্যাদি ক্রমে আটটি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে থাকে। পঞ্চম মন্ত্র আটটি কপালের সম্বোধনেই প্রযুক্ত হয়ে থাকে। চারদিকে অঙ্গার-আচ্ছাদন পূর্বক বলা হয়,-হে অষ্টকপাল! অঙ্গিরসের বংশীয় ভৃগুঋষির তপস্যার দ্বারা উদ্ভাবিত অগ্নির তাপ তোমরা প্রাপ্ত হও। কারও কারও মতে–ভৃগু ঋষির পূর্বে কেউ অগ্নির ব্যবহার অবগত ছিলেন না। তিনিই প্রথমে অগ্নির দাহিকা শক্তির বিষয় সংসারে প্রকাশ করেন। তাই মন্ত্রে তার নাম সন্নিবিষ্ট আছে। ষষ্ঠ বা শেষ মন্ত্র যজ্ঞের শেষে পঠিত হবার বিধি। মন্ত্রে অর্থ,–অধ্বর্যরূপে মেধাবিগণ যে সব কপালসমূহ ধ্রুবমসি প্রভৃতি মন্ত্রে প্রদীপ্ত অগ্নিতে স্থাপন করেন, সেই কপাল-সমূহ। বিমুক্ত করতে সমর্থ ইন্দ্ৰবায়ু পোষক যজমানের যাগরূপ ব্রত সমাপ্ত হলে বিমুক্ত করুন। ফলতঃ, চরুপ্রস্তুতের জন্য অগ্নিতে কপাল বা মালসা স্থাপনই যেন মন্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য।–কর্মকাণ্ডের বিচার যাই থাক, আমরা লক্ষ্য করে দেখেছি,–একই মন্ত্র ভিন্ন ভিন্ন কার্যে প্রযুক্ত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রের একটি সর্বজনীন অর্থ আছে নিশ্চয়ই স্বীকার্য। আমরা জানি,–তদ্বিষ্ণো পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীর চক্ষুরাততং-ঋগ্বেদের এই মন্ত্রটি শাক্তের, শৈবের, বৈষ্ণবের–সকল সম্প্রদায়ের সকল রকম ইষ্ট-ক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়। অথচ, বেদমন্ত্র বলে, ঐ মন্ত্রে কেউ কোনও সাম্প্রদায়িক ভাব আগমন করেন না। বেদের সকল মন্ত্রেই আমরা সেই সাম্প্রদায়িকতা-বিহীন ভাব প্রত্যক্ষ করি। তাতে একই মন্ত্র বিভিন্ন কার্যে প্রযুক্ত হওয়ার সার্থকতা প্রতিপন্ন হয়। সে দৃষ্টিতে দেখলে, সপ্তম অনুবাকের এই মন্ত্রগুলির যেমন অর্থ সঙ্গত হয়, আমাদের মর্মার্থে আমরা তা বিবৃত করেছি।–যেমন, আমাদের বিশ্লেষণের একটি উদাহরণ–পঞ্চম মন্ত্রে ভৃগুণাং এবং অঙ্গিরসাং শব্দ দুটিতে আমরা যে অর্থ গ্রহণ করেছি,আপাতঃদৃষ্টিতে তা সাধারণের পক্ষে বিসদৃশ বলে বোধ হবে। কিন্তু মন্ত্রার্থের পূর্বাপর সামঞ্জস্য রক্ষা করতে হলে, ঐ পদ দুটিতে কখনই ঋষি বিশেষের প্রতি লক্ষ্য আছে বলে মনে হয় না। ধাতুর অর্থ ও শব্দের অর্থ অনুসরণে ভৃগু শব্দে অতি-উচ্চ এবং অঙ্গিরস শব্দে জ্ঞান অর্থ পরিগৃহীত হতে পারে। সেই অর্থই এখানে সুসঙ্গত। তপ্যধ্বং (ভগবন্তং আরাধয়ত) ক্রিয়াপদের সার্থকতা তাতেই প্রতিপন্ন হয়। অপিচ, ভৃগু ও অঙ্গিরা ঋষিদ্বয় ক্রান্তদর্শী হলেও তারা মানুষ। মনুষ্য-সম্বন্ধ প্রখ্যাপিত হলে বেদমন্ত্রের অপৌরুষেয়ত্বেও বিঘ্ন ঘটে; নিত্যত্বও সিদ্ধ হয় না। আমরা যে অর্থ নিষ্পন্ন করলাম, তাতে বেদমন্ত্রে নিত্যত্ব ও অপৌরুষেয়ত্ব অক্ষুণ্ণ রয়েছে ] । ৭।
মর্মার্থ- হে আমার শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবিঃ! তোমাকে সম্যরূপে ভগবকার্যে নিয়োজিত করছি। (মন্ত্রটি উদ্বোধনমূলক। এখানে আত্মাকে পরমাত্মায় সংন্যস্ত করবার সঙ্কল্প বর্তমান)। আমাদের আপস্বরূপ শুদ্ধসত্ত্বভাব, সত্ত্বসমুদ্রের সাথে সম্যকমে সম্মিলিত হোক। অপিচ, আপস্বরূপ আমাদের সেই স্নেহসত্ত্বভাব, আমাদের এই ওষধীস্বরূপ কর্মফলের অবসানে ক্ষয়সূচক ওষধীর মতো জীবনসমূহকেও স্নেহরসময় ভগবানের সাথে অচ্ছেদ্যভাবে সম্মিলিত করুক। আমাদের শুদ্ধসত্ত্ববভাবসমূহ বিশ্ববাসী সকলের সাথে সম্মিলিত হোক; এবং আমাদের মাধুর্যভাবসমূহ মাধুর্যময় ভগবৎ-বিভূতির সাথে সম্মিলিত হোক। হে আমার শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহ! তোমরা সম্যক্রমে সত্ত্বসমুদ্র হতে উদ্ভূত হয়েছ। অতএব তোমরা সেই সত্ত্বসমুদ্র ভগবানে সম্যরকমে সম্মিলিত অর্থাৎ বিলীন হও। হে মন্! সৎ-ভাব সংজননের জন্য তোমাকে ভগবানের সাথে সম্মিলিত করি অথবা ভগবানের কর্মে বিনিযুক্ত করি। হে মন! প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত অপিচ, জ্ঞানভক্তিরূপী দেবতাদ্বয়ের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে সুসংস্কৃত ও সৎপথের অনুবর্তী করছি। হে মন! তুমি সৎকর্মের শ্রেষ্ঠ সম্পাদক হও। (ভাব এই যে,-মনই মূল। মন ভিন্ন কোনও কার্যই সুসম্পাদিত হয় না। হে ভগবন্! আপনি প্রকাশরূপ বিশ্বপ্রাণ হন। (ভাব এই যে-ভগবানই বিশ্বের সকলকেই প্রকাশ করেন এবং তাদের প্রাণস্বরূপ হন)। হে ভগবন্! আপনি বহু রকমে প্রখ্যাত আছেন। আবার বহু ভাবে প্রখ্যাত হোন। (পাপিগণের পরিত্রাণের জন্যই ভগবান সবচেয়ে বেশী প্রখ্যাত। আমাদের মতো পাপীর পরিত্রাণ-সাধনে তার মাহাত্ম্য বহুবিস্তীর্ণ হোক)। হে ভগবন্! আপনার অর্চনাকারী বহুরকম সৎকর্মের দ্বারা বিশেষভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করুক। হে ভগবন্! আমার অজ্ঞানরূপ আবরণ–অহংকার অথবা আমার বহিরাবরণ-স্বরূপ এই পাষ্ণভৌতিক দেহকে গ্রহণ করুন। (ভাব এই যে,-হে ভগবন! আমার অন্তরস্থ জ্ঞানের আবরণকারী অজ্ঞানকে জ্ঞানের আলোক প্রদান করে সর্বতোভাবে বিদূরিত করুন)।
তাতে আমাদের দুর্বুদ্ধিরূপ শত্রু বিনষ্ট হোক; সৎ-ভাবের প্রতিবন্ধক রিপুশত্রুগণ বিদুরিত অর্থাৎ বিনষ্ট হোক। হে ভগবন্! আমার অন্তরস্থ দ্যোতমান্ জ্ঞানসূর্য (কর্মের দ্বারা সমুন্নত) আমার হৃদয়রূপ স্বর্গে আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করুক। অপিচ, হে আমার হৃদয়স্থিত জ্ঞানাগ্নি! আপনার সম্বন্ধি আবরণকে অতিক্রম করে যেন আপনি গমন না করেন। (ভাবার্থ-ভগবৎসম্বন্ধি জ্ঞান যেন বিনাশপ্রাপ্ত না হয়)। অথবা, সংসার-সন্তাপরূপ অগ্নি যেন তোমাকে নিঃশেষে দগ্ধীভূত না করে (অঙ্গারে পরিণত না করে)। অথবা,হে মন! নির্মল জ্ঞানস্বরূপ সেই ভগবান তোমাকে চিরস্থায়ী চিরশান্তিময় স্থানে (স্থাপন করে) সৰ্বৰ্থা তোমার উন্নতিসাধন করুন। অপিচ, সংসার-সন্তাপরূপ অগ্নি যেন তোমাকে নিঃশেষে দগ্ধ করে অঙ্গারে পরিণত না করে। হে জ্যোতির্ময় প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবন্! আপনি আমার সেই হবিঃ অর্থাৎ হৃদয়স্থিত শুদ্ধসত্ত্বরূপ আহবনীয়কে সংরক্ষণ করুন (অর্থাৎ ইহলোক-পরলোক সম্বন্ধি শত্রুদের অপসারিত করে চিরতরে সুপ্রতিষ্ঠিত করুন)। (মন্ত্রের তাৎপর্য এই যে,-হে ভগবন্! আপনি বিশ্বরূপ জেনে আমার সমস্ত অনুরাগ ও সৎ-ভাব আপনাতে সংন্যস্ত করছি। আমার সেই অনুরাগ সারা বিশ্বে পরিব্যাপ্ত হোক, আপনি আমার সৎ-ভাব সংরক্ষণ করুন। হে শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবিঃ! তুমি ভগবানের সাথে সম্মিলিত হও। (আত্মা পরমাত্মায় প্রবেশ করুক–এখানে এই ভাব পরিব্যক্ত)। অথবা, হে জ্ঞানভক্তিরূপ হবিঃ! তোমরা আমার অনুষ্ঠিত কর্মের সাথে মিলিত হও। (আমার কর্ম জ্ঞানভক্তি সমন্বিত হোক)। হে মন! তোমাকে অদ্বিতীয় ব্রহ্মের উদ্দেশ্যে স্বাহা-মন্ত্রে নিয়োজিত করছি! আমার আত্মদানরূপ যজ্ঞ সুহুত বা সুসিদ্ধ হোক। (ভাবার্থ-মন যেন অদ্বিতীয় ব্রহ্মের জ্ঞানলাভে সমর্থ হয়)। হে মন! তোমাকে সেই প্রকৃতিপুরুষরূপে অথবা জ্ঞানক্রিয়ারূপে প্রকাশমান দেবতার উদ্দেশ্যে স্বাহামন্ত্রের উচ্চারণে প্রেরণ করছি। আমার আত্ম-উৎসর্গরূপ শুভ অনুষ্ঠান সুসিদ্ধ হোক! (যিনি পুরুষ ও প্রকৃতি–এই দুভাগে নিজেকে বিভক্ত করে জগতে আত্মপ্রকাশ করে আছেন, হে মন! তুমি সেই পরমাত্মার সন্ধানে নিযুক্ত হও)। হে মন! সত্ত্বরজস্তমোগুণাত্মক ত্রিদেবরূপে প্রকাশমান সেই ভগবানের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে তোমাকে নিবেদন করছি। আমার উদ্বোধনযজ্ঞ সুহুত বা সুসিদ্ধ হোক ॥ ৮
[এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি পুরোডাশ-নিম্পাদক। সপ্তমে প্রজ্বলিত অঙ্গারের উপরে কপাল-স্থাপনের বিষয় কথিত হয়েছে; এখানে সেই উত্তপ্ত কপালে পুরোডাশ পণের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি নিবদ্ধ আছে। ক্রিয়া-কর্মে পূর্বের মতো প্রয়োগ অনুসারে ভাষ্যকার প্রথম মন্ত্রের অর্থ করেছেন–হে পিষ্ট! তোমাকে এই পাত্রে নিক্ষেপ করছি। দ্বিতীয় মন্ত্রে পিষ্ট-সমূহে (চালের গুঁড়াতে) প্রণীত উপসর্জনী (শিল বা যাঁতা ধোয়া জল) নিক্ষেপ করার বিধি। সেই অনুসারে মন্ত্রের অর্থ হয়,–এই প্রণীত জল-ভাগ পিষ্টের (পিঠার) জলীয় ভাগের সাথে মিলিত হোক; ওষধিভাগ পিষ্টের ওষধিভাগের সাথে মিলিত হোক, বেরতীভাগ, পিষ্টের জগতী-ভাগের সাথে মিলে যাক; মাধুর্যভাগ পিষ্টের মাধুর্য-ভাগের সাথে মিলিত হোক। ভাব এই যে, চালের গুড়া ও জল এক হয়ে যাক।–এইভাবে কর্মকাণ্ডের অনুসারে সমগ্র সপ্তম অনুবাকের মন্ত্রগুলি যথাযথ বিশ্লেষিত। আমাদের মতে প্রথম মন্ত্রে হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্বভাবকে হবিঃস্বরূপে গ্রহণ করে ভগবানের উদ্দেশ্যে অর্পণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় মন্ত্রের সাথে এই মন্ত্রের বেশ একটু সম্বন্ধ আছে বলে মনে বুঝতে পারি। ফলতঃ, এই মন্ত্রে এক বিরাট সম্মিলনের ভাব বিদ্যমান রয়েছে। শুদ্ধসত্ত্ব ভগবানেরই বিভূতি তৃতীয় মন্ত্রে তা-ও প্রখ্যাপিত হয়েছে। চতুর্থ থেকে একাদশ পর্যন্ত মন্ত্রগুলি যে সব ক্রিয়া-কর্মে প্রযুক্ত হয়ে থাকে, তার আভাষ অনুমেয়। আমাদের মতে মন্ত্রের কোথাও পিষ্টের বা পুরোডাশের সম্বন্ধ নেই। মন্ত্রগুলির লক্ষ্য অন্যরকম। আধ্যাত্মিক বিচারে আমরা তা দেখিয়েছি। দ্বাদশ মন্ত্রের ব্যাখ্যা চতুর্থ অনুবাকের মর্মাথে পাওয়া যাবে। ত্রয়োদশ মন্ত্রেও এক বিরাট সম্মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এই মন্ত্রে দুরকম অম্বয়ে সেই একই ভাব প্রকাশ পেয়েছে। চতুর্দশ মন্ত্রে একতায়, দ্বিতায় ও ত্রিতায় পদ তিনটিতে উচ্চ উচ্চ স্তরে অগ্রসর হওয়ার অবস্থাই প্রকাশ করছে। অতি উচ্চস্তরে সাধক বুঝলেন,-একতায় ত্বা। সে অবস্থায় সবই এক হয়ে,এল। তখন সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্মের প্রতি সাধকের দৃষ্টি পড়ল। সাধক বললেন,–মন! কেন দ্বিধা ভাব পোষণ করো?একতায়–সেই অদ্বিতীয় পরমেশ্বরের প্রতি বিনিযুক্ত হও। ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করলে, আর কোনও দ্বিধা ভাবই তোমার মধ্যে থাকতে পারবে না। তখন একমেবাদ্বিতীয়ং এই বাক্য সিদ্ধিলাভ করলো। সাধক তখন সর্বং খশ্বিদং ব্রহ্ম ভাবে বিভোর হয়ে পড়লেন। কিন্তু একটু নিম্নস্তরের সাধক যিনি, ভগবানের অদ্বিতীয়ত্ব ধারণা করতে যিনি সমর্থ হলেন না, দ্বিত অর্থাল প্রকৃতি পুরুষরূপে অথবা ক্রিয়া জ্ঞানরূপে তিনি বিদ্যমান বলে তার লক্ষ্য পড়ল। তখন তিনি বললেন, প্রকৃতি ও পুরুষ দুই ভাবে বর্তমান সেই অদ্বিতীয় পরমেশ্বরের দুই ভাবের প্রতি মন তুমি বিনিবিষ্ট হও। আরও নিম্নস্তরের সাধক যিনি, যিনি ভগবানকে এক বা দুই ভাবে বুঝতে তার কাছে তিনি ত্রিত-রূপে প্রতিভাত হলেন। তিনি বুঝলেন, ভগবান সত্ত্বরজস্তমোময়। তিনি ত্রিমূর্তিতে ত্রিলোক ব্যেপে বর্তমান। সেই অবস্থায় মনকে সম্বোধন করে বলাই স্বাভাবিক,–মন! তোমায় সেই ত্রিতায় অর্থাৎ তিন স্বরূপ নিযুক্ত করছি। একেই তিন আবার তিনেই এক। জলের মধ্যে অগ্নির লুক্কায়িত হওয়ার পৌরাণিক আখ্যানে (যা ভাষ্যকার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন), অজ্ঞানে জ্ঞান আবৃত হওয়ার এবং জ্ঞানের উন্মেষে ত্রিত, দ্বিত ও একত ভাবের বিকাশ, রূপকে বিবৃত হয়েছে বলে মনে করি। এই মন্ত্রের একতায় পদে অদ্বৈতবাদ, দ্বিতায় পদে দ্বৈতবাদ এবং ত্রিতায় পদে বহুবাদ প্রসঙ্গও মনে আসতে পারে। ত্রিতায় অর্থাৎ ত্রিগুণাতমক ঈশ্বর প্রসঙ্গে বলা যায়–রজোরূপে তিনি ব্রহ্মা, সত্ত্বরূপে তিনি বিষ্ণু, তমারূপে তিনি মহেশ্বর]। ৮
প্রথম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৯
অনুবাক -৯
মন্ত্র- আ দদ।। ইন্দ্রস্য বাহুরসি দক্ষিণঃ সহস্রভৃষ্টিঃ শততেজা বায়ুরসি তিম্মতেজাঃ। পৃথিবী দেবযজনন্যাদ্যান্তে মূলং মা হিংসিষম্। অপহতোহররুঃ পৃথিব্যৈ। ব্ৰজং গচ্ছ গোস্থান। বৰ্ষতু তে দৌঃ। বধান দেব সবিতঃ পরমস্যাং পরাবতি শতেন। পাশৈর্যোহম্মান্দেষ্টি যং চ বয়ং দ্বিম্মস্তমতো মা মৌ। অপহতোহররুঃ পৃথিব্যৈ দেব্যজন্যৈ ব্ৰজং গচ্ছ গোস্থানং বৰ্ষতু তে দ্যোৰ্বধান দেব সবিতঃ পরমস্যাং পরাবতি শতেন পাশৈযৰ্যাহম্মান্দেষ্টি যং চ বয়ং দ্বিম্মশুমতো মা মৌগপহতোহররুঃ পৃথিব্যা অদেবযজনো ব্ৰজং গচ্ছ গোস্থানং বৰ্ষতু তে দৌধান দেব সবিতঃ পরমস্যাং পরাবতি শতেন পাশৈর্মোহম্মাদৃষ্টি যং চ বয়ম্ দ্বিম্মস্তমতো মা মৌ। অররুস্তে দিবং মা স্কা। বসবস্তাবা পরি গন্তু গায়ত্রণ ছন্দসা রুদ্রাত্ত্বা পরি গৃহ্নন্তু ত্ৰৈভেন ছন্দসাহদিত্যাস্তা পরি গৃহ্নন্তু জাগতেন ছন্দ। দেবস্য সবিতুঃ সবে কৰ্ম্ম কৃম্বস্তি বেধসঃ। ঋতমস্তসদন-মস্যশ্রীরসি।। ধা অসি স্বধা অৰ্ব্বী চাসি স্বী চাসি। পুরা নূরস্য বিসৃপো বিপশিমুদাদায় পৃথিবীং জীরদানুর্যামৈ রয়ঞ্চমসি স্বধাভিস্তাং ধীরাসো অনুদৃশ্য যজন্তে ॥ ৯৷৷ মর্মার্থ- হে আমার কর্মফল! তোমাকে সম্যকরকমে ভগবানে সমর্পণ করছি অর্থাৎ ভগবানে ন্যস্ত করছি। হে দেবচরণে সমর্পিত কর্মফল! তুমি অনন্ত বলশালী ভগবানের দক্ষিণ-বাহু হও অর্থাৎ ভগবানকে পরমানন্দ দান করে থাকো; তুমি অশেষ পাপ-নাশক, অমিততেজঃসম্পন্ন, দেব-সমীপে ক্ষিপ্রগমনকারী, পাপ-সমূহের দাহক এবং রিপুশত্রুগণের হননকারী হয়ে থাকো। (ভাবার্থ এই যে, -কর্মফল দেবতার উদ্দেশ্যে সমর্পিত হলে অনন্ত-ফলোপধায়ক এবং অশেষ পাপ-নাশক হয়ে থাকে)। অথবা,-হে কর্মফল! তুমি অনন্ত শক্তিশালী ভগবানের শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ বহু-সামর্থ্য-সম্পন্ন বাহু-স্বরূপ পরমানন্দদায়ক হও; অপিচ, তুমি অশেষ পাপনাশক অমিততেজ-সম্পন্ন, বায়ুর ন্যায় ক্ষিপ্রগমনকারী অর্থাৎ ভগবৎ-প্রাপ্তির হেতুভূত হও; অতএব তুমি তীব্রজ্বালাবিশিষ্ট অশেষ সন্তাপজনক রিপু-শত্রুদের হন্তারক হও অর্থাৎ তাদের বিনাশ করো। দেব-সম্বন্ধি কর্মের আধার-স্থানীয় হে আমার স্কুলদেহ! কর্মফলের অবসানে তোমার ক্ষয়ের কারণকে নষ্ট করো না। অর্থাৎ, এই স্থূল-শরীরের যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে–তা-ই করো। দেহের মঙ্গল সাধনের জন্য, দেব-সম্বন্ধি কর্মের আধারভূত হৃদয় হতে শত্রুগণ বিনষ্ট হোক। হে মন! তুমি তোমার কল্যাণাম্পদ প্রব্রজ্যা অবলম্বন করো; অর্থাৎ, সাংসারিক প্রলোভনে বৈরাগ্যযুক্ত হও। হে মন! দুলোকের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা তোমার অভীষ্ট পূরণ করুন অর্থাৎ তুমি দেবতার অনুগ্রহ লাভের উপযুক্ত হও। হে দ্যোতমান্ সবিতৃদেব! যে আমাদের হিংসা করে, অথবা আমরা যার হিংসা কামনা করি, সে সকল শত্রুকে এই পৃথিবীর সীমান্তস্থানে শত-পাপ বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখুন,কখনও তাদের ছেড়ে দেবেন না। (ভাবার্থ এই যে,-কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপুবর্গ–আমাদের অন্তরস্থিত অসৎ বৃত্তিগুলি–আমাদের পরম শত্রু; আমাদের নিকট হতে তাদের দুরে রাখুন)। দেবগণের প্রীতিসাধক যাগ ইত্যাদি সৎক্রিয়ার সাধন-সমর্থ আমার হৃদয়-রূপ যজ্ঞ-প্রদেশ হতে আমার অন্তঃশত্রু বিনষ্ট হোক। হে মন! তুমি তোমার কল্যাণাস্পদ প্রব্রজ্যা অবলম্বন করো; অর্থাৎ সাংসারিক প্রলোভন ইত্যাদিতে বৈরাগ্যযুক্ত হও। হে মন! দ্যুলোকের অধিষ্ঠাত্ দেবতা তোমার কল্যাণ-সাধনের জন্য তোমার অভীষ্ট বর্ষণ করুন। হে দ্যোতমান্ সবিতৃদেব! যে আমাদের হিংসা করে, অথবা আমরা যার হিংসা কামনা করি, সে সকল শত্রুকে এই পৃথিবীর সীমান্তস্থানে শতপাশবন্ধনে আবদ্ধ করে রাখুন,–কখনও তাদের ছেড়ে দেবেন না। (ভাবার্থ এই যে,-কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপু-বর্গ আমাদের অসৎ-বৃত্তিগুলি–আমাদের পরম শত্রু; আমাদের নিকট হতে তাদের দূরে রাখুন)। হৃদয়-রূপ যজ্ঞ-প্রদেশ হতে দেবভাবের প্রতিবন্ধক শত্রু বিনষ্ট হোক। তাহলে হে মন! তুমি তোমার কল্যাণাস্পদ প্রবজ্যা অবলম্বন করবে; অর্থাৎ সাংসারিক প্রলোভন ইত্যাদিতে বৈরাগ্যযুক্ত হবে। হে মন! দ্যুলোকের অধিষ্ঠাত্ দেবতা তোমার কল্যাণ সাধনের জন্য তোমার অভীষ্ট বর্ষণ করুন। হে দ্যোতমান্ সবিতৃদেব! যে আমাদের হিংসা করে, অথবা আমরা যার হিংসা কামনা করি, সে সকল শত্রুকে এই পৃথিবীর সীমান্তস্থানে শতপাশ-বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখুন, কখনও তাদের ছেড়ে দেবেন না। (ভাবার্থ এই যে,-কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপুবর্গ–আমাদের অসৎ-বৃত্তিগুলি আমাদের পরম শত্রু; আমাদের নিকট হতে তাদের দূরে রাখুন)। হে মন!–অন্তঃশত্রু যেন তোমার হৃদয়-রূপ দেব-স্থানে গমন করতে না পারে অর্থাৎ হৃদয় অধিকার না করে। (ভাব এই যে,-হৃদয় হতে অসৎ-ভাব অপসৃত হয়ে সৎ-ভাব সমুদ্ভুত হোক)। হে আমার চিত্তবৃত্তি! বসুদেবগণ অর্থাৎ জীবগণকে পরমপদে প্রতিষ্ঠাপক দেব-ভাব সমূহ তোমাকে গায়ত্রী-ছন্দোবিশিষ্ট মন্ত্রের দ্বারা অর্থাৎ পরিত্রাণ-সাধক অভীষ্টপূরক প্রভাবের দ্বারা সর্বতোভাবে ভগবৎ-সম্বন্ধে নিয়োজিত করুন। হে মনোবৃত্তি! রুদ্র-দেবগণ অর্থাৎ শত্ৰু-সংহারে রুদ্রভাব-সম্পন্ন দেবগণ তোমাকে ত্রিষ্টুভ ছন্দোবিশিষ্ট মন্ত্রের দ্বারা অর্থাৎ শত্রুবিনাশক অভীষ্টপূরক গামর্থ্যের দ্বারা সর্বতোভাবে ভগবৎ-কর্মে নিয়োজিত করুন। হে মনোবৃত্তি! আদিত্যগণ অর্থাৎ পাপ-নাশক প্রজ্ঞানদায়ক দেবভাব-সমূহ তোমাকে জাগতী-ছন্দোবিশিষ্ট মন্ত্রের দ্বারা অর্থাৎ অজ্ঞান-অন্ধকার- নাশক অভীষ্টপূরক প্রভাবের দ্বারা তোমাকে সর্বতোভাবে ভগবৎ-কর্মে নিয়োজিত করুন। দ্যোতমান্ প্রকাশনারূপ জ্ঞান-প্রেরক ভগবানের প্রেরণায় আত্ম-উৎকর্ষ-সম্পন্ন জন ভগবানের প্রীতিকর যাগ ইত্যাদি সৎকর্ম (আপন আপন অভীষ্টপূরণের জন্য) সম্পাদন করেন। হে আমার অন্তর! তুমি সৎকর্মময় অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্ব স্বরূপ কর্মফল হও। অথবা, হে অন্তর! তুমি সৎকর্মের আধারভূত অর্থাৎ কর্মফল-সাধক হও। হে আমার অন্তর! তুমি সঙ্কর্মের আধার-স্বরূপ অর্থাৎ সঙ্কৰ্ম সাধনের নিমিত্ত সত্যের আশ্রয়ভূত হও। হে আমার অন্তর! তুমি শুদ্ধসত্ত্বরূপ কর্মফলের মাধুর্য সম্পাদন করে থাকো। (মন্ত্রের এই তিনটি অংশই প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,হৃদয়-নিহিত সৎ-বৃত্তিগুলির সাথে ভগবানের অবিচলিতভাবে অবস্থিতি হোক)। হে মনোবৃত্তি! তুমি দেবভাব-সমূহের ধারক হও। অথবা হে ভগবান্! তুমি বিশ্বের সকলের ধারক হও। হে মনোবৃত্তি! তুমি অহং-জ্ঞান-নাশক ভব-বন্ধন ছেদক হও। অথবা, হে ভগবন্! আপনি অহং-জ্ঞানের নাশক ভব-বন্ধনের ছেদক পূর্ণজ্ঞানের স্বরূপ হন। হে মনোবৃত্তি! তুমি বহুধারক হও। অথবা, হে ভগবন্! আপনি বিরাট বিশ্ব-রূপ হন। হে মনোবৃত্তি! তুমি বহু ধনবতী পরমধনদাত্রী হও। অথবা হে ভগবন্! আপনি সকলের নিবাস-হেতু ভূত-জগতের ধারণকর্তা হন। হে ভগবন! হিংসক সপ্রতিবন্ধক ইতস্ততঃ বিসর্পণ-শীল মহাপরাক্রান্ত শত্রুর উপদ্রব হতে আপনি যে পৃথিবীকে অর্থাৎ হৃদয়-রূপ আধারক্ষেত্রকে নিত্যকাল রক্ষা করে স্নিগ্ধসত্ত্ব-ভাব-সমম্বিত জ্ঞান-কিরণের দ্বারা উদ্ভাসিত করেন, আত্ম-উৎকর্ষ সাধনশীল জন সেই হৃদয়রূপ বেদিকে মনের দ্বারা অনুকম্পিত করে সৎ-জ্ঞান-সমম্বিত শুদ্ধসত্ত্ব সহকারে আপনার উদ্দেশ্যে (আপনার প্রীতিকর কর্মে নিয়োজিত করে থাকেন। অথবা, শব্দব্রহ্মরূপ হে পরমেশ্বর! আপনি (এই) হিংস্র রিপুশত্রুর সংগ্রামে জীবের প্রাণ-স্বরূপ শুদ্ধসত্ত্বকে পার্থিব পদার্থ-সম্বন্ধ হতে (পাপের সংগ্রহ থেকে) উর্ধ্বে গ্রহণ-পূর্বক মূধ্বনদেশে জ্ঞানের আধারে রক্ষা করে আমাদের নিত্যকাল অনুগৃহীত করুন। দেবগণ (দেবভাব-সমূহ) বেদজ্ঞানসহ যে শুদ্ধসত্ত্ব ভাবকে চন্দ্রলোকে (স্নিগ্ধ আলোকময় মূৰ্ধিন-প্রদেশে) সংরক্ষিত করেন; সারভূত সেই সামগ্রীকে পাবার কামনায় মেধাবিগণ সর্বদা আপনার আরাধনা করে থাকেন। (আমরাও যেন সেই সঙ্কল্পে আপনার আরাধনায় সমর্থ হই) ॥ ৯৷৷
[কর্মকাণ্ড অনুসারে নবম অনুবাকের মন্ত্রগুলি যজ্ঞের জন্য বেদী নির্মাণে প্রযুক্ত হয়। বিনিয়োগ ও ভাষ্য অনুসারে, বোঝা যায়, মৃত্তিকা খননের জন্য স্ফা নামক মৃত্তিকা খননের উপযোগী যন্ত্র-বিশেষকে সম্বোধন করে প্রথম দুটি মন্ত্র প্রযুক্ত হয়েছে। তাতে মন্ত্রের অর্থ দাঁড়ায়-হে স্যা! অশ্বিদ্বয়ের বাহুদ্বয়ের এবং পূদেবতার হস্তদ্বয়ের সাহায্যে দেবপূজার জন্য তোমাকে যজ্ঞে নিযুক্ত করছি। এই মন্ত্রের পর ঐ স্ফাকে–বাম হস্ত থেকে দক্ষিণ হস্তে গ্রহণ করে দ্বিতীয় মন্ত্রে বলা হয়–হে স্ফা! তুমি ইন্দ্রদেবের দক্ষিণ বাহু, তুমি বহুদীপ্তিশালী, বহু জীবের নাশক, উগ্রতেজের জন্য তুমি বহুদীপ্তিশালী, বহু জীবের নাশক, উগ্রতেজের জন্য তুমি বায়ুর সাথে তুলনীয়। এই যজ্ঞের বেদিপ্রস্তুতরূপ কার্য তোমার দ্বারা সম্পন্ন হোক। এরপর তৃতীয় থেকে সপ্তম পর্যন্ত মন্ত্রে বিভিন্ন সামগ্রীর সম্বোধন বর্তমান রয়েছে। যেমন তৃতীয় মন্ত্রে পৃথিবী; পঞ্চম মন্ত্রের সম্বোধ্য–তৃণসমূহ (মাটি কেটে যেগুলিকে পরিষ্কার করা হয়); ষষ্ঠ মন্ত্রে–বেদি; সপ্তম মন্ত্রের সম্বোধন সবিতা দেবতা)। অষ্টম মন্ত্রের বিভিন্ন অংশে মৃত্তিকাখননের এবং বেদি প্রস্তুত করবার প্রক্রিয়াপদ্ধতি পরিবর্ণিত। নবম মন্ত্র পাংসুসমূহরূপ উৎকরকে (খামারকে) সম্বোধন করে বিনিযুক্ত হয়েছে। দশম মন্ত্রের বিভিন্ন অংশ উচ্চারণ করে আহবনীয় এবং গার্যপত্যের মধ্যস্থলে ম্যায়ের দ্বারা এই মন্ত্র উচ্চারণ করে তিন দিকে তিনটি রেখা অঙ্কিত করতে হয়। এই রেখাগুলি বেদির পরিগ্রাহ। সেই রেখাঙ্কিত দিকগুলিতে অধ্বর্য মনে মনে যথাক্রমে বসু, রুদ্র এবং আদিত্য দেবতাসমূহের অনুধ্যান করতে করতে মন্ত্র উচ্চারণ করবেন; ইত্যাদি। একাদশ মন্ত্রে বেদি খনন। দ্বাদশ মন্ত্র বেদি-সম্বোধন-মূলক। মন্ত্রের সাথে একটি পৌরাণিক উপাখ্যানেরও সংশ্রব-সুচনা দেখা যায়। সেটি এই–পূর্বে দেবাসুর-সংগ্রামের কালে দেবগণ ভীত হয়ে পৃথিবীর সারবস্তুকে এবং বেদকে চন্দ্রলোকে লুকিয়ে রাখনে। যুদ্ধে পরাজয় হলে ঐ অমূল্য সামগ্রী অসুরেরা অধিকার করে নেবে,এটাই তাঁদের আশঙ্কা ছিল; তখন ঐ দুই সুরক্ষিত সামগ্রীর সাহায্যে দেবতারা পুনরায় বলশালী হতে পারবেন,এটাই উদ্দেশ্য ছিল। তাই বেদি মার্জনা করবার সময় এই মন্ত্র উচ্চারিত হওয়ায়, কর্মকাণ্ডানুসারে মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের অর্থ দাঁড়িয়েছে,-ক্রুর অসুরদের যুদ্ধের সময় পূর্বকালে পৃথিবীর যে সারভাগ পরিগ্রহণ করে বেদের সাথে উধ্বদেশে চন্দ্রলোকে রক্ষিত হয়েছিল, হে যজ্ঞবেদি! তুমিই সেই সামগ্রী। সেই অনুসারে তোমাকেই লক্ষ্য করে মেধাবিগণ যজনা করছেন। এই দ্বাদশ মন্ত্রের মতো এই অনুবাকের আরও কয়েকটি মন্ত্র সম্বন্ধে উপাখ্যানের অবতারণা দেখতে পাওয়া যায়। সেইসব উপাখ্যানে ক্রিয়া-কর্মে মন্ত্রগুলি কিরকম পল্লবিত হয়েছে, তা বোধগম্য হয়।-আমরা কর্ম-পদ্ধতি বিষয়ে বিতর্কের কোনই প্রয়োজন দেখি না। আমাদের অভিপ্রায় এবং মন্ত্রের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আমাদের মর্মার্থেই পাওয়া যাবে। আমরা কোন কোন মন্ত্রের দ্বিতীয় অন্বয় অনুসারেও যে মর্মার্থ লিপিবদ্ধ করেছি, তা-ও লক্ষণীয় ] ॥ ৯।
মর্মার্থ- হে ভগব। সৎপ্রতিবন্ধক শত্রু (আমাদের দুর্বুদ্ধি) সর্বতোভাবে ভস্মীভূত হোক, আমাদের রিপুশত্রুগণ প্রত্যেকে বিশিষ্টরূপে দগ্ধ হোক। (অর্থাৎ,-হে দেব! আপনি আমাদের দুবুদ্ধিকে এবং রিপুশত্ৰু-সমূহকে সমূলে বিনষ্ট করুন)। জ্ঞানের দ্বারা উদ্ভাসিত হে আমার চিত্তবৃত্তিসমূহ! তোমাদের অতি-উগ্ৰ অভীষ্টপূরক (ভগবৎ-প্রাপক) জ্ঞানজ্যোতিঃ অর্থাৎ কর্মশক্তির দ্বারা পুনরায় উদ্দীপিত করছি। হে মন! আমার সত্ত্বভাব যাতে বিনষ্ট না হয়, সেই ভাবে সঙ্কর্মের সাধনে সমর্থ তোমাকে সম্যকমে উদ্বোধিত করছি। হে আমার চিত্তবৃত্তি! আমার সত্যানুরাগ, সকর্মশীল জীবন, সৎ-বস্তুদর্শনের সামর্থ্য (জ্ঞানদৃষ্টি, দূরদৃষ্টি), ভগবৎ-মহিমা শ্রবণের সামর্থ্য, লোকানুরাগ (বিশ্বপ্রীতি), সৎ-বৃত্তিমূল (শুদ্ধসত্ত্ব) যাতে নিঃশেষে বিনষ্ট হয়, সেই ভাবে সৎকর্ম-সাধন-সমর্থের শত্রুনাশকারী তোমাকে উদ্বোধিত (উদ্দীপিত) করি। (ভাব এই যে, আমি যেন ভগবৎ-পরায়ণ হই। হে আমার চিত্তবৃত্তি! তুমি ভগবৎ প্রীতি, লোকানুরাগ এবং মোক্ষরূপ পরমেশ্বর্য ও কর্মফলার মানে কর্মক্ষয় কামনা করছ। এতএব জ্ঞানজ্যোতির অনুবর্তিনী হয়ে (অর্থাৎ পরাজ্ঞান লাভ করে) যাতে তুমি পরমানন্দ লাভ করতে পারো, সেইরকম ভাবে তোমাকে ভাব্যপ্রীতিহেতুভূত কর্মে সম্যভাবে নিয়োজিত করছি। অথবা, আমার যে চিত্তবৃত্তি জ্ঞানানুসারিণী হয়ে, ভগবৎপ্রীতি, লোকানুরাগ, মোক্ষরূপ পরমৈশ্বর্য, সৎকর্মশীল জীবন অথবা কর্মফলের অবসান কামনা করে; আমার সেই চিত্তবৃত্তি ভগবপ্রীতিহেতুভূত কর্মে যাতে নিত্যানন্দ প্রাপ্ত হয়, সেইভাবে তাকে সম্যভাবে বিনিযুক্ত করি। প্রজ্ঞানস্বরূপ হে ভগবন্! লোকানুরাগসম্পন্ন অর্থাৎ বিশ্বমঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ, সৎ-বুদ্ধি সমন্বিত, শত্রুর উপদ্রবরহিত, সৎকর্মশীল ব্যক্তি (আমরা) সর্বশত্রুবিনাশক অপরাজেয় আপনাকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। মন্ত্রের মধ্যে সৎ-বুদ্ধি লাভের এবং লোকানুরাগ বর্ধনের নিমিত্ত সঙ্কল্প রয়েছে)। আমাদের কর্মের দ্বারা সঞ্জাত অর্থাৎ কামনা ইত্যাদি জনিত যে সংসার-বন্ধন আমরা দৃঢ় করেছি; শোভনপ্রজ্ঞ (প্রজ্ঞানাধার) জ্ঞানদাতা ভগবানের অনুগ্রহে সেই সংসার-বন্ধন যেন বিমুক্ত করতে সমর্থ হই। তাতে, সঙ্কর্মের ফলভূত পরমপদে অধিষ্ঠিত হয়ে, হৃদয়রূপ ভগবৎ অধিষ্ঠানে সৎ-ভাব ইত্যাদির দ্বারা পরিবৃত হয়ে, যেন পরমসুখ–পরমানন্দ লাভ করতে পারি। (এই মন্ত্রের প্রথমপাদে সঙ্কল্প এবং দ্বিতীয় পদে আত্ম-উদ্বোধনা বিদ্যমান রয়েছে। পরাজ্ঞানই বন্ধন-ছেদন। হৃদয় যদি জ্ঞানের দ্বারা উদ্ভাসিত হয়! বন্ধন-হেতুভূত কর্মমূল স্বতঃই বিনষ্ট হয়, আর তখনই ভগবানের অনুগ্রহ-লাভ সুগম হয়ে আসে। অতএব সঙ্কল্প–আমি যেন ভগবানের অনুসারী হই। প্রজ্ঞানস্বরূপ হে ভগবন্! আপনার অনুগ্রহে আমি যেন সকর্মান্বিত জীবন প্রাপ্ত হই। (অর্থাৎ আপনার অর্চনার দ্বারা যেন সকর্মশীল জীবন লাভ করি। ভাবার্থ-আমি যেন সদা সৎকর্মে রত থাকি)। প্রজ্ঞানস্বরূপ হে ভগবন্! আপনার অনুগ্রহে যেন আমার জনহিতসাধনে লোকানুরাগ জন্মে। (অর্থাৎ ভগবৎ-আরাধনায় যেন জনহিতসাধন-সামর্থ্য লাভ করি অর্থাৎ পরোপকারই যেন জীবনের ব্রত হয়)। জ্ঞানদাতা হে ভগবন্! আপনার অনুগ্রহে আমি যেন জ্ঞানঃ-জ্যোতিসমন্বিত হয়ে, আপনাকে সম্যকমে আরাধনা করতে সমর্থ হই।
(ভাব এই যে, আমি যেন ভগবৎপূজন-সামর্থ্য প্রাপ্ত হই)। প্রার্থনাকারী আমি, পত্নীর ন্যায় অনুগত হয়ে জগৎপতি ভগবানের সাথে যাতে অবস্থিতি করতে পারি, তা-ই যেন করতে সমর্থ হই। অপিচ, কখনও যেন বিয়োগ-সাধন না হয়। (পতিব্রতা রমণী যেমন ছায়ার মতো স্বামীর অনুগামিনী হয়, আমিও যেন তেমনই ভগবানের একান্ত অনুরাগী হই–মন্ত্রের এটাই ভাবার্থ)। আমার জীবাত্মা পরমাত্মায় গমন করুক। (এখানে আত্মায় আত্মসম্মিলনের সঙ্কল্প বর্তমান)। হে মন! তুমি বিশ্বের লোকসমূহের অমৃতস্বরূপ পরিরক্ষক অর্থাৎ জীবন-কারণ হও। হে মন! তুমি কর্মক্ষয়ের সুচক জীবনের অমৃতস্বরূপ (বা পরিরক্ষক) হও! হে মন! তথাবিধ ক্ষয়রহিত অর্থাৎ অক্ষয় অব্যয় তোমাকে ভগবৎ-কর্মে বিনিযুক্ত করছি। হে মন! তুমি বিশ্বের লোকসমূহের অমৃতস্বরূপ হও। (ভাব মা এই যে, আমাদের মন সবরকম সৎকর্মের সাধক হোক। সঙ্কল্পের এটাই তাৎপর্য)। অপিচ, হে মন বা কর্ম! তুমি কর্মক্ষয়ের দ্বারা ক্ষয়সূচক জীবনের অমৃত-স্বরূপ পরিরক্ষক হও। অতএব হে মন বা কর্ম! শুদ্ধসত্ত্ব-সংরক্ষণের নিমিত্ত অর্থাৎ জনহিত-সাধনের জন্য অতিশয় প্রীতিযুক্ত দৃষ্টিতে যেন তোমাকে সন্দর্শন করি। অথবা,-হে ভগব! আমার বিভ্রমরহিত (অথবা অদব্ধ অর্থাৎ অতিশয় প্রীতিযুক্ত) নেত্রের দ্বারা আমি যেন আপনাকে দর্শন করতে সমর্থ হই। হে আমার ভগবৎসম্বন্ধযুত কর্ম! তুমি জ্ঞানজ্যোতির দ্বারা দীপ্তিমন্ত হও। অতএব জ্ঞান-উদ্ভাসিত তুমি তেজোময় ভগবানের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হও অর্থাৎ ভগবানের সাথে সম্মিলিত হও। প্রজ্ঞানের আধার ভগবান্ যেন তোমার জ্ঞানকে অপনীত না করেন। (এই মন্ত্রে ভগবানে কর্মফল-সমর্পণের অপিচ আত্মসম্মিলনের আকাঙ্ক্ষা বর্তমান। কর্ম জ্ঞানসমম্বিত হলে ভগবপ্রাপ্তি মূলক হয়ে থাকে)। হে মন! তুমি প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবানের রসনাস্বরূপ অর্থাৎ আহ্বানকারী হও; অথবা জ্বালারূপ জিহ্বা দ্বারা অর্থাৎ তেজঃরূপ কিরণের দ্বারা তুমি অগ্নির উৎপাদকরূপে বিদ্যমান আছ। অতএব তুমি দেবগণের অর্থাৎ দেবভাবসমূহের সুখহেতুভূত হও। অথবা,-হে ভগবন্! আপনার অগ্নিরূপ রসনা বিদ্যমান রয়েছে। অতএব আপনি দেবভাবসমুহের সম্যক গ্রহীতা হন। অপিচ, হে মন! অথবা, হে ভগবন্! আমার সবরকম অবস্থিতির স্থানে, যাগ ইত্যাদি সকল সৎকর্মের অনুষ্ঠানে, সর্বদেবের অধিষ্ঠানের জন্য (আমাতে সর্ব দেবভাব বিকাশের জন্য) তুমি অথবা আপনি সুষ্ঠু আহ্বানকারী হও বা হোন। হে মন! অথবা, হে ভগবৎসম্বন্ধযুক্ত কর্ম!
তুমি দীপ্তিমন্ত বিশুদ্ধ সত্ত্বস্বরূপ। তুমি জ্যোতিস্বরূপ প্রজ্ঞানাধার হও; অপিচ তুমি তেজোময় শক্তিমন্ত হও। (ভাব এই যে, মনই সকলের মূলীভূত)। হে আমার সৎ ও অসৎ কর্ম! দ্যোতমান স্বপ্ৰকাশ জ্ঞানপ্রেরক দেবতা অর্থাৎ প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবান, বিশুদ্ধ পবিত্রকারক বায়ুরূপে এবং জগৎ-নিবাস-হেতুভূত প্রজ্ঞানস্বরূপ, বিশ্বপ্রাপক জ্যোতিঃ নিবহের দ্বারা তোমাদের উৎকর্ষ-সাধনে পবিত্রতা সম্পাদন করুন। অথবা, তোমরা জ্ঞানপ্রদ সবিতৃদেবের প্রেরণায়–অনুকম্পায়-ত্রুটি-পরিশূন্য বায়ুর মতো পবিত্রকারক ও সূর্যরশ্মির মতো জ্ঞানপ্রদ হয়ে আমাদের উৎকর্ষ-সাধনে আমাদের পবিত্র করো। (বায়ু ও সূর্যরশ্মি শুদ্ধিসম্পাদক। তাদের প্রভাবে আমাদের সৎ-অসৎ উভয় কর্ম পবিত্র হোক,–এই-ই প্রার্থনা)। হে চিত্তবৃত্তি! জ্ঞানজ্যোতির দ্বারা বিশুদ্ধতা-প্রাপ্ত তোমাকে আমাদের সকল অবস্থায় সর্ব-অবস্থানে এবং সকল রকম সৎ-অনুষ্ঠানে দেবতাদের প্রীতির নিমিত্ত অর্থাৎ সৎ-ভাব-জননের জন্য (আমাতে সবরকম দেবভাব বিকাশের জন্য) তোমাকে বিনিযুক্ত করি। অপিচ হে চিত্তবৃত্তি! ভগবান জ্যোতিঃস্বরূপ এবং তেজ (শক্তি) স্বরূপ হন। অতএব তোমাকে, আমাদের সকল রকম অবস্থিতির স্থানে এবং আমাদের সকল রকম সৎ-অনুষ্ঠানে সকল দেবতার প্রীতিসাধনের জন্য (আমাদের মধ্যে সবরকমের দেবভাব বিকাশের জন্য) জ্যোতিঃস্বরূপ এবং তেজঃ (শক্তি) স্বরূপ ভগবানে প্রতিষ্ঠিত করছি। (এখানে পরমাত্মায় আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান রয়েছে। মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। মন্ত্রে প্রার্থনার ভাবও প্রকটিত রয়েছে) । ১০।
[দশম অনুবাকের এই মন্ত্রগুলি বেদীতে প্রতিষ্ঠাপনের জন্য আজ্য ইত্যাদি হবিঃ-গ্রহণ-মূলক। ভাষ্যানুক্রমণিকায় প্রকাশ,-নবম অনুবাকের মন্ত্রগুলির দ্বারা বেদি নির্মিত হলে, যজ্ঞের জন্য আজ্য ইত্যাদি হবিঃ দশম অনুবাকের মন্ত্রের দ্বারা গ্রহণ করতে হয়। সেই অনুসারে প্রথম মন্ত্র সুকের সম্বোধনে বিনিযুক্ত। যজ্ঞের নিমিত্ত যজ্ঞাগ্নিতে ঘৃত প্রক্ষেপণের জন্য খদির ইত্যাদি কাষ্ঠনির্মিত পাত্রবিশেষ–সুক নামে অভিহিত ১ হয়। সাধারণতঃ সুক বলতে কাষ্ঠনির্মিত হাতা বোঝা যেতে পারে। দ্বিতীয় মন্ত্রের এক একটি অংশে সুক সমূহকে এক এক বার মার্জন করতে হয়। তৃতীয় মন্ত্রে যজমান নিজের পত্নীকে গার্হপত্য অগ্নির দক্ষিণ দিকে উপবেশন করিয়ে তার দুই হস্তে মুঞ্জের যোক্রু (ফাস বা অঙ্গুরীয়ক) পরিয়ে দিতে দিতে এই মন্ত্র পাঠ করবেন। চতুর্থ মন্ত্র যোক্র-বিমোচনে প্রযুক্ত হয়। সুতরাং এই মন্ত্রের অর্থ হয়,শোভনপ্রজ্ঞ সবিতা দেবতা এই যোক্ত-রূপ যে বরুণ-পাশ বন্ধন করেছিলেন, তার দ্বারা সেই পাশ মোচন করছি। তাতে ব্রহ্মযোনিতে অনুষ্ঠিত কর্মের ফলভূত লোকে পতির সাথে পত্নী সুখে বাস করতে পারবে।–পঞ্চম মন্ত্রে অগ্নিকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে-আমি যেন আয়ু লাভ করি, পতিব্রতালক্ষণরূপ শক্তি লাভ করি। আর তার দ্বারা পুনঃ পুনঃ এই পতির পত্নীর হয়ে যেন সুখে বাস করতে পারি। কখনও যেন আমাদের বিয়োগ সাধন হয়। আমার দেহে জীবাত্মা যেন চিরপ্রতিষ্ঠিত থাকে। ষষ্ঠ মন্ত্রে আজ্যের সম্বোধন-পূর্বক যজমান-পত্নী সেই আজ্য দর্শন করেন।–অষ্টম মন্ত্রে সমিধ-ধারণ।-নবম মন্ত্রও আজ্যকে সম্বোধন করে প্রযুক্ত। পঞ্চম অনুবাকের প্রথম মন্ত্র এবং দশম অনুবাকের দশম মন্ত্র অভিন্ন।ইত্যাদি। আমরা কিন্তু কর্মকাণ্ড অনুসরণে ভাষ্যকারকে অনুকরণ করিনি। ভাষ্যকার যেখানে গো অর্থে গরু অর্থ করেছেন, আমরা সেখানে এবং অন্যত্র বা সর্বত্র জ্ঞানকিরণ অর্থ পরিগ্রহ করেছি নিরুক্ত গ্রন্থে জ্ঞান-পর্যায়ে গো শব্দ পরিদৃষ্ট হয়। প্রজা ও যযানি পদে জনহিতসাধনে এবং সৎ-ভাবসঞ্চয়ে চিরপ্রতিষ্ঠিত থাকবার ভাব প্রকটিত করেছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্রকে আমরা চিত্তবৃত্তির সম্বন্ধসূচক বলে মনে করেছি। তৃতীয় মন্ত্রটির দুরকম অন্বয় সেইজন্যই দেওয়া হয়েছে। এইভাবে ষষ্ঠ মন্ত্রের বিভিন্ন অংশে যথাক্রমে সৎকর্মশীল পূর্ণজীবন লাভের, লোকানুরাগ বর্ধনের, ভগবৎ-পূজনসামর্থ্য অর্জনের ও ভগবানে একান্ত ভক্তিসম্পন্ন হওয়ার পরিশেষে আত্মায় ও পরমাত্নায় সম্মিলনের সঙ্কল্প প্রকাশ করেছি। মানুষ নিজের কর্মফলের অধিকারী। সে কর্ম ভগবানের সাথে সম্বন্ধযুক্ত হলেই শ্রেয়ঃ সাধক হয়। যজুর্বেদ কর্মকাণ্ডমূলক। তার প্রতি মন্ত্রই ভগবানের সংশ্রবযুত কর্মের সাথে সম্বন্ধবিশিষ্ট। ভগবৎসম্বন্ধযুত কর্ম সূর্যরশ্মির মতো জ্ঞানপ্রদ। মন্ত্র তাই বলছেন মানুষ, তুমি কর্ম করো; ভগবৎসম্বন্ধযুত কর্মে প্রবৃত্ত হও; তোমার অভীষ্ট-সিদ্ধি অবশ্যই হবে। আমরা মনে করি,এই ভাবেই দশম অনুবাকের মন্ত্রগুলির সার্থকতা।] ১০
মর্মার্থ- হে মন! তুমি কলঙ্ক-কলুষিত হয়ে আছ; সকর্ম-সহযুত হও। অগ্নিদেবের অর্থাৎ প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে স্বাহা-মন্ত্রের দ্বারা নিয়োজিত করছি অথবা পরিশুদ্ধ করছি। অথবা,হে মন! তুমি অঙ্গারের মতো কলঙ্ক-কলুষিত হয়ে আছ। কলঙ্ক বিমোচনে তোমার উৎকর্ষ-সাধনের জন্য অগ্নিসংযোগে (অর্থাৎ জ্ঞানরূপ অগ্নিতে দগ্ধ করে) তোমাকে পরিশুদ্ধ অর্থাৎ সুসংস্কৃত করছি। হে ধী! তুমি দেবীস্বরূপা, সঙ্কর্মের আশ্রয়ভূতা হও। সকর্ম-সাধনের নিমিত্ত (বহির মতো) তোমাকে স্বাহা মন্ত্রে নিয়োজিত (সুসংস্কৃতি) করছি। (আমার অনুষ্ঠান সুসিদ্ধ হোক)। হে মন! দৰ্ভরূপ তুমি যজ্ঞ ইত্যাদি সৎকর্মের সাধক হও। সৎকর্ম সাধানের নিমিত্ত তোমাকে স্বাহা মন্ত্রের দ্বারা সুসংস্কৃত করছি। আমার অনুষ্ঠান সুসিদ্ধ হোক। হে আমার ভগবৎ-সম্বন্ধি কর্ম! তোমাকে দুলোকে অবস্থিত অর্থাৎ দ্যুলোক-সম্বন্ধি দেবভাব-লাভের জন্য নিযুক্ত (প্রেরণ) করছি। হে আমার ভগবৎসম্বন্ধি কর্ম! তোমাকে অন্তরিক্ষলোকে অবস্থিত (অন্তরিক্ষ লোসম্বন্ধি) দেবভাবসমূহ লাভের জন্য নিয়োজিত (প্রেরণ) করছি। হে আমার ভগবৎসম্বন্ধি কর্ম। তোমাকে পৃথিবীতে অর্থাৎ ইহজগতে অবস্থিত (ইহলোকসম্বন্ধি) দেবভাব লাভের জন্য নিয়োজিত (প্রেরণ) করছি। পিতৃগুণ-সমুহকে উদ্দেশ করে স্বাধা উচ্চারণ করছি। সেই গুণাবলিকে আহ্বান করছি (সেই গুণসমূহ আমাতে সজ্ঞাত হোক। অথবা,হে আমার চিত্তবৃত্তিসমূহ! আমার পিতৃগুণসমূহ উৎপাদনের জন্য (সৎ-ভাবের প্রাপ্তি-কামনায়) স্বধা-মন্ত্রে তোমাদের বিনিযুক্ত করছি। তোমরা আমার হৃদয়রূপ বহিসমূহে সঞ্জাত পিতৃগুণগুলির রসস্বরূপ পোষক অর্থাৎ পরমানন্দদায়ক হয়ে সঞ্চারিত হও? অপিচ, হে শুদ্ধসত্ত্বরূপ পিতৃগুণসমুহ! তোমাদের সম্বন্ধি বলপ্রাণরূপ সত্ত্বের প্রবাহ আমার হৃদয়রূপ সৎ-বৃত্তির মূলকে প্রাপ্ত হোক। মন্ত্রটি প্রার্থনা মূলক। পিতৃগুণ অর্থাৎ সত্ত্বভাব-সংজননের জন্য মন্ত্রে সঙ্কল্প বিদ্যমান)। হে-মন! তুমি সেই অনন্তস্বরূপ, ভগবানের ধারক হও।
অথবা তুমি যজ্ঞ ইত্যাদি সৎকর্ম-অনুষ্ঠানের চূড়াস্বরূপ হও। হে মন! তুমি স্নিগ্ধ সত্ত্বভাবযুত হও; সর্বদেবভাবের অবস্থান করবার উদ্দেশ্যে তোমাকে আসনরূপে বিস্তৃত করছি। (ভাব এই যে,-হে মন! তোমাকে যেন শুদ্ধসত্ত্ব-সমম্বিত দেববাসের যোগ্য করে তুলতে পারি)। হে ভগবন্! আপনি সর্বগ সর্বব্যাপী হন। অতএব স্তবনীয় আপনি বিশ্বের সকল রকম শত্রু হতে অর্চকের সংরক্ষক হোন। হে মন অথবা শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবানের দক্ষিণ-বাহুস্বরূপ (শ্রেষ্ঠ অঙ্গ) হও। অতএব, সম্ভজনীয় তুমি (প্রজ্ঞান-সমন্বিত হয়ে) বিশ্বের সকল রকমের শত্রু হতে অর্চকের সংরক্ষক হও। হে মন! তোমার সত্যধর্ম পালনের ফলে, জ্ঞানভক্তিরূপ সেই মিত্রাবরণ দেবদ্বয় তোমাকে সর্বতোভাবে শ্রেষ্ঠ-লোকে স্থাপন করুন। তুমিও স্তবনীয় জ্ঞান-সহযুত হয়ে শত্রুর আক্রমণ হতে সবরকমে অর্চকের পরিরক্ষক হও (অর্থাৎ রক্ষা করো)। হে মন! সকল দেব-বিভূতির সম্যরূপে অর্চনার জন্য (প্রতিষ্ঠার জন্য) সেই পূর্ণজ্যোতি-স্বরূপ সূর্যদেব (স্বপ্রকাশ জ্ঞানময় ভগবান) সর্বতোভাবে তোমাকে পালন করুন। হে ত্রিকালজ্ঞ জ্ঞান-স্বরূপ অগ্নিদেব! মহান এবং দীপ্তিমান্ আপনাকে আমার ইষ্ট-লাভের জন্য, এই হিংসারহিত যজ্ঞে (আমার সৎকর্ম নিবহে–আমার হৃদয়-প্রদেশে) প্রতিষ্ঠিত করছি। হে মম ভগবৎসম্বন্ধযুত জ্ঞান ও কর্ম! তোমরা বিশ্বব্যাপক শুদ্ধসত্ত্বের নিয়ামক অর্থাৎ উৎপত্তি-হেতুভূত হও। হে মন! তুমি বিশ্বের সকলের নিবাসভূত (আশ্রয়ভূত) দেবগণের (অর্থাৎ দেবভাবসমুহের), শত্রু-বিমর্দক ঘোররূপ দেবগণের (দেবভাব-সমূহের), এবং জ্যোতিঃস্বরূপ (জ্ঞানদায়ক) দেবগণের (অর্থাৎ দেবভাবসমূহের) অধিষ্ঠানে প্রসারিত হও। (ভাব এই যে,হে মন! নিবাস-হেতুভূত শত্রু-বিমর্দক জ্যোতিঃস্বরূপ দেবভাবসমূহ পর্যায়ক্রমে তোমাতে শুদ্ধসত্ত্বের সঞ্চরের দ্বারা ভগবানকে প্রাপ্ত করান)। হে ধী! তুমি হবনপাত্র-স্বরূপা, দেবগণ-সমীপে হবির্ধারণকত্রী অর্থাৎ সৎ-ভাব-পোষিকা নিত্যস্বরূপা (সৎ-ভাবরূপা) হও। নামে তুমি জুহু অর্থাৎ হবিঃপূর্ণ–সত্ত্বসমন্বিত হয়ে প্রিয়বস্তুর আধার সত্ত্ব-ভাবের সাথে আমার হৃদয়রূপ অধিষ্ঠানে (আসনে অধিষ্ঠিত হও। (ভাব এই যে,-হে ধী! তুমি সৎ-ভাব-সমন্বিত হয়ে আমার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হও)। হে বিশ্বব্যাপক ভগব! সত্য-স্বরূপ সৎকর্মের উৎপত্তি-স্থান আমার হৃদয়ে নিত্যসত্যস্বরূপা যে শুদ্ধসত্ত্বসমূহ বিরাজিত আছে, সেই সবগুলিকে আপনি রক্ষা করুন; আমার যজ্ঞকে (সত্ত্ব ইত্যাদির কার্যকে) রক্ষা করুন; আমার যজ্ঞপালক সৎ-ভাবকে রক্ষা করুন; যজ্ঞকারী আমাকে রক্ষ করুন ॥ ১১।
[এই একাদশ অনুবাকে ই অর্থাৎ হোমের কাষ্ঠ এবং বৰ্হি অর্থাৎ সঙ্গবদ্ধ (আঁটিবাঁধা) কুশের সাথে বেদীতে হবিঃ স্থাপনের উল্লেখ আছে। সুতরাং প্রথম মন্ত্রে যজ্ঞকাষ্ঠ, দ্বিতীয় মন্ত্র বেদি-সম্বোধনে এবং তৃতীয় মন্ত্রে কুশগুলিকে সম্বোধন করা হয়েছে। চতুর্থ মন্ত্রের দ্বারা হস্ত প্রক্ষালন করতে হয়। পঞ্চম মন্ত্র উদক-সম্বোধনে বিনিযুক্ত। ভাষ্যমতে ষষ্ঠ মন্ত্রে প্রস্তরকে এবং সপ্তম মন্ত্রে বহিকে সম্বোধন। অথচ ষষ্ঠ মন্ত্রে মনকে বিষ্ণোঃ স্কুপোহসি অর্থাৎ বিষ্ণুর সুপ বলা হয়েছে। সপ্তম মন্ত্রে উর্ণাদসং পদের অর্থ– ভাষ্যকারের ব্যাখ্যাতেই প্রকাশ-কোমলতা-সম্পাদক। আমরা তাই সেখানে শুদ্ধসত্ত্ব ভাব গ্রহণ করেছি। কারণ তারই সঞ্চারে মন স্নিগ্ধ কোমলতাসম্পন্ন হয়। ভাষ্যমতে অষ্টম মন্ত্র পরিধি সম্বোধনে বিনিযুক্ত। বেদীর পশ্চিম দক্ষিণ ও উত্তর তিন দিকের পরিধি নির্দেশ করে, সেই তিন পরিধিকে সম্বোধন-পূর্বক এই মন্ত্রের তিনটি বিভাগ বিহিত হয়েছে। নবম মন্ত্র আহবনীয়ের প্রতি লক্ষ্য করে উচ্চারিতব্য। সেই অনুসারে মন্ত্রের অর্থ,-হে আহবনীয়! পুরোভাগের সকল রকম বিঘ্ন হতে সূর্যদেব তোমাকে রক্ষা করুন। আমাদের মতে মন্ত্রটি মনঃ-সম্বোধক। মনই হৃদয়ে জ্ঞানাগ্নি প্রজ্বলিত করে। দশম মন্ত্রে অগ্নির আবাহন। একাদশ মন্ত্রে (ভাষ্যকারের মতে) দর্ভ-নির্মিত বিধৃতিদ্বয়ের সম্বোধন রয়েছে। আমাদের মতে, মন্ত্রে জ্ঞান ও কর্মের সম্বন্ধ সূচিত হয়েছে। দ্বাদশ মন্ত্রে (কর্মকাণ্ড অনুসারে) প্রস্তর গ্রহণ। আমাদের মতে, এই মন্ত্রে ধী-কে লক্ষ্য করা হয়েছে। ভাষ্যকারের মতে, ত্রয়োদশ মন্ত্র সুকের (জুহুর) সম্বোধনে এবং শেষ মন্ত্র হবিঃ-সম্বোধনে বিনিযুক্ত। আমরা এয়োদশ মন্ত্রেও ধী-কে সম্বোধ্য বলে মনে করেছি। মন্ত্রে ধী-র নামবিশেষণেরও পরিচয় পাওয়া যায়। শেষ মন্ত্রের অর্থ পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, সাধক ঐ ত্রিভাবান্বিত ধী-কে লাভ করবার জন্য ব্যাকুল হয়েছে। (আধ্যাত্মিক বিচারে) মন্ত্রে যেন পূর্ববর্তী মন্ত্রসমূহের উপসংহার হয়েছে] । ১১।
মর্মার্থ- প্রজ্ঞানস্বরূপ হে ভগবন! আপনি নিখিল বিশ্বের ভূত-সমষ্টির উৎপাদক অর্থাৎ নিখিল সৎ-ভাবের জনক হন। অতএব আপনি বিশেষভাবে বিস্তৃত অর্থাৎ আমার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হয়ে আমার সৎ-ভাব ও লোকানুরাগ বর্ধন করুন। আমার অনুষ্ঠিত ভগবৎ-উদ্দেশ্যে নিয়োজিত কর্ম আপনাকে প্রাপ্ত হোক। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। আমার কর্মের দ্বারা আমাতে সৎ-ভাবের সঞ্চার হোক এবং সেই কর্ম ভগবানকে প্রাপ্ত হোক)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি হৃদয়ে সঞ্চারিত হও। দেবযাগ সম্পাদানের জন্য (ভগবৎকর্ম সাধনের জন্য) প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবান তোমাকে উদ্দীপিত করুন। সৎ-ভাব-পোষণকারিণী, দেবসমীপে হবিধারণকত্রী হে মনোবৃত্তি! তুমি হৃদয়ে প্রসারিত হও। দেবকার্য সম্পাদনে জন্য অর্থাৎ সকর্ম সাধনের জন্য জ্ঞানপ্রসরিতা স্বপ্রকাশ ভগবান তোমাকে সম্যক্ উদ্দীপিত করুন অর্থাৎ ভগবৎ-কর্মে নিয়োজিত করুন। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক। সৎ-ভাব সৎ-জ্ঞানই সৎকর্মের মূলীভূত। আর সেই সৎ-ভাবের ও সৎ-জ্ঞানের প্রভাবেই ভগবানের প্রীতি-কামনায় এখানে সঙ্কল্প বর্তমান রয়েছে)। হে আমার জ্ঞান ও কর্ম! তোমাদের উভয়কে যেন আমি পরিত্যাগ না করি। তোমরাও যেন তোমাদের সম্বন্ধ হতে আমাকে বিযুক্ত করো না; অপিচ, অর্চনাকারী আমার সন্তাপ উৎপাদন করো না। পরন্ত সকলকে পরম পদে প্রতিষ্ঠাপক তোমরা আমার জন্য পরমস্থান বিধান করো। (ভাব এই যে,-জ্ঞান ও কর্মই সকল মঙ্গলের হেতুভূত। সৎ-জ্ঞান-সহকারে যদি সৎকর্মের অনুষ্ঠান হয়, তাহলে সেই জ্ঞান-সমন্বিত কর্মের প্রভাবেই মানুষ পরমপদ প্রাপ্ত হতে পারে। অতএব সৎ-জ্ঞান সহকারে কর্মের অনুষ্ঠানই যে কর্তব্য, মন্ত্রে সেই উদ্বোধনাই বর্তমান রয়েছে)। হে আমার অন্তর! তুমি বিশ্বব্যাপক ভগবানের শুদ্ধসত্ত্বের আধার-স্বরূপ হও। হে পরমেশ্বর! আপনি আমার এই হৃদয়ে শনাশের সামর্থ্য বিস্তার করুন; তাহলে, শক্রকৃত হিংসারহিত হয়ে আমার যজ্ঞ ঊর্ধ্বগতি লাভ করবে (অর্থাৎ, রিপুশ কর্তৃক প্রতিহত না হয়ে আপনার সান্নিধ্যলাভে সমর্থ হবে)। সৎকর্মের পালক ও অনুষ্ঠাতা আমার কর্ম, শত্রুর উপদ্রব-পরিশূন্য হয়ে বিশ্বব্যাপক কৌটিল্য-পরিশূন্য এবং ভগবৎ-প্রাপক হোক। আমার সেই কর্মকে আমি স্বাহা মন্ত্রে ভগবানে সমর্পণ করছি। আমার অনুষ্ঠান সুসিদ্ধ হোক অর্থাৎ ভগবানকে প্রাপ্ত হোক। হে মন! আমার জ্ঞানরশ্মিসমূহ যাতে ভগবৎ-প্রাপক হয়, তা-ই বিহিত করো। প্রজ্ঞানাধার হে ভগবন্! আমাকে পাপ হতে পরিত্রাণ করুন। পাপ নষ্ট করে আমাকে প্রকৃষ্টভাবে সৎপথে প্রতিষ্ঠাপিত করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। সৎপথ-অবলম্বনের জন্য এখানে প্রার্থনা বর্তমান)। হে মন! তুমি সঙ্কর্মের শ্রেষ্ঠ অঙ্গস্বরূপ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ সম্পাদক হও। তুমি আমাতে পরমজ্যোতিঃ উৎপাদন করে সেই পরম জ্যোতির্মানের সাথে আমাকে সংযোজিত করো। ১২।
[কর্মকাণ্ড অনুসারে এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি আধার-গ্রহণমূলক। আধার বলতে আজ্যহবিঃ-পূর্ণ সুক বোঝায়। তা থেকে পুরোডাশসাংনায্য প্রভৃতি বেদীতে স্থাপনের বিষয় উপলক্ষিত হয়। ভাষ্যানুক্রমণিকা থেকে প্রতিপন্ন হয়,-দ্বাদশ অনুবাকে যজ্ঞকাষ্ঠের উপরিভাগে হোম-নিম্পাদনের জন্য আধার-স্থাপনের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি পরিবর্ণিত হয়েছে। একাদশ অনুবাকে যজ্ঞকাষ্ঠ, কুশ এবং কাষ্ঠনির্মিত হাতা প্রভৃতিকে প্রোক্ষণাদির দ্বারা বিশুদ্ধীকরণের প্রক্রিয়া কথিত হয়েছে। এখন, এই অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে, যজ্ঞকাষ্ঠের উপরিভাগে কিভাবে হোমের জন্য আধার স্থাপন করতে হয়, তা-ই পরিবর্ণিত হয়েছে। বিনিয়োগ-সংগ্রহ মতে এই অনুবাকের প্রথম মন্ত্রের (ভুবনমসি প্রভৃতি) মন্ত্রের দ্বারা অঞ্জলিবদ্ধ করে দ্বিতীয় মন্ত্রের (জুহুহ্যগ্নিস্বা ইত্যাদি) দুটি অংশে জুহূপভৃৎ গ্রহণীয়। তার পর অগ্নাবিষ্ণু প্রভৃতি মন্ত্রে দক্ষিণ দিকে গমন করে বিষ্ণোঃ স্থানমসি মন্ত্রে ভূমি নির্দেশ পূর্বক ইত ইন্দ্রো প্রভৃতি মন্ত্রে সেই জুহু স্থাপনীয়। তার পর বৃহদ্ভাঃ প্রভৃতি মন্ত্রে সুক গ্রহণ করে পাহি প্রভৃতি মন্ত্রে সেই সুককে প্রতিনিবর্তন করে অর্থাৎ স্থাপন করে, মখস্য প্রভৃতি মন্ত্রে ধ্রুবাকে সেই সুকের সাথে সংযোজিত করণীয়। বেদির উপরিভাগে আজ্যহবিঃ- পূর্ণ সুক স্থাপন এরই দ্বারা প্রতীত হয়। বিনিয়োগ-সংগ্রহের অনুসরণেই ভাষ্যকার এই মন্ত্রগুলির যথাযথ ব্যাখ্যা করেছেন। এইজন্যই তাঁর মতে প্রথম মন্ত্রের সম্বোধন–আহবনীয় অর্থাৎ যাগনিম্পাদক অগ্নি। আমাদের মতে মন্ত্রের সম্বোধ্য–প্রজ্ঞান-স্বরূপ ভগবান। ভাষ্যমতে দ্বিতীয় মন্ত্রের প্রথম অংশ জুহু সম্বোধনে এবং দ্বিতীয় অংশ উপভৃৎ সম্বোধনে বিনিযুক্ত। জুহু অর্থাৎ সুককে অগ্নিদেবের উদ্দেশ্যে এবং উপভৃৎ অর্থাৎ সুক-ব্যতিরিক্ত আজ্যধারণক্ষম অন্য পাত্রকে সূর্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়েছে বোঝা যায়। আমাদের মতে মন্ত্রের প্রথমাংশে শুদ্ধসত্ত্বকে এবং দ্বিতীয় অংশে মনোবৃত্তিকে সম্বোধন করা হয়েছে। তৃতীয় মন্ত্রে অগ্নির এবং বিষ্ণুর–যুগ্ম দেবতার সম্বোধন।
ভাষ্যমতে মধ্যম পরিধির পুরোভাগে আহবনীয় অগ্নি এবং তার পশ্চাতে সুকের অগ্রভাগে শাস্ত্রদৃষ্ট যজ্ঞাভিমানী বিষ্ণু অবস্থিত। অগ্নি ও বিষ্ণু বলতে আমরা এখানে জ্ঞান ও কর্মকে বুঝেছি। ভাষ্যমতে, পঞ্চম মন্ত্রের সম্বোধন-ভূ-প্রদেশ; আর ষষ্ঠ মন্ত্র ইন্দ্রদেবতা সম্বন্ধি। আমাদের মতে চতুর্থ মন্ত্রে নিজের অন্তরাত্মাকে সম্বুদ্ধ করা হয়েছে। অন্তরই যে বিশ্বব্যাপক দেবতার আধার-মন্ত্রে সেটাই ঘোষিত হয়েছে। অন্তরে জ্ঞানাগ্নি প্রজ্বলিত হলে, তার মতো ভগবানের শ্রেষ্ঠ আধার আর অন্য কিছু হতে পারে কি? পঞ্চম মন্ত্রটি পরমৈশ্বর্যশালী ভগবানকে লক্ষ্য করছে। ষষ্ঠ মন্ত্রে অগ্নির দীপ্তি যাতে অধিক হয়, অথচ জুহু দগ্ধীভূত না হয়,-ভাষ্যে এই ভাব পরিব্যক্ত। আমাদের মতে আত্ম-উদ্বোধনমূলক এই মন্ত্রে জ্ঞান যাতে ভগবৎপ্রাপক হয় অর্থাৎ দিব্যজ্ঞানলাভে যাতে মোক্ষপদ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তার জন্য সাধক আত্মাকে উদ্বোধিত করছেন। সপ্তম মন্ত্রে, ভাষ্যমতে, জুহু ও উপভৃৎকে পরস্পর বিচ্ছিন্নভাবে স্থাপন করতে হয়। আমরা মনে করি, এই মন্ত্রে প্রার্থনাকারী পরিত্রাণ-লাভের প্রার্থনা জ্ঞাপন করছেন। ভাষ্যমতে অষ্টম বা শেষ মন্ত্রের সম্বোধন–আধারশেষ। ভাষ্যমতে মন্ত্রটির অর্থ হয়,-হে আধারশেষ! তুমি যজ্ঞের শিরের মতো উত্তম অঙ্গ হও। অতএব সেইভাবে জ্যোতির দ্বারা ষ্ট্ৰেীবাজ্যরূপ জ্যোতির সাথে সম্মিলিত হও। আমাদের মতে মন্ত্রটি আত্মসম্বোধনে বিনিযুক্ত ও উদ্বোধনমূলক। এখানে আত্মায় আত্মসম্মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এই আকাঙ্ক্ষা–হৃদয়ে জ্ঞানজ্যোতিঃ উৎপাদন করে জ্যোতিরাধারা সেই ভগবানের সাথে সম্মিলিত হবার আকাঙ্ক্ষা।–কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনে ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা ক্রুটিহীন। আমরা কেবল আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে মন্ত্রের যে অন্যরকম অর্থও করা যায়, তা-ই দেখবার প্রয়াস পেয়েছি] । ১২।
মর্মার্থ- হে ভগবন! আপনার অনুগ্রহে কর্ম-শক্তি প্রাপ্তির জন্য, সৎকর্মশীল জীবন-লাভের নিমিত্ত এবং বিশ্ব-হিতসাধনের উদ্দেশে, দেব-বিভূতি-সমূহ আমাদের অভিষিঞ্চত করুক। (মন্ত্রটি প্রার্থনামুলক। প্রার্থনার ভাব এই যে, সৎ-ভাবের প্রভাবে আমরা যেন অক্ষয়-জীবন লাভ করতে পারি)। হে কর্মফলপ্ৰদনকারি! আমাকে অজ্ঞানতা হতে উদ্ধার করুন। (ভাব এই যে, হে দেব! শীঘ্র আমরা কর্মফল ধ্বংস করুন)। হে ভব-বন্ধনছেদনকারী দেব! এই জনের (আমার) প্রতি প্রতিকুল হবেন না। (ভাব এই যে, আমার সংসার-বন্ধন মোচন করুন)। অথবা,-হে দেব! পাপ-শত্রু যেন আমাদের কর্মের বিঘাতক না হয়। অপিচ, হে ভগবান! আপনার অনুগ্রহে দেবভাব-পোষণকারী শরণাগত আমি যেন কর্মফলসমূহ আপনাতে সমর্পণ করতে সমর্থ হই। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে, আমার কর্মফল যেন ভগবান প্রাপ্ত হন)। পরমার্থসাধক আমার কর্মসমূহ সিদ্ধিপ্রাপ্ত হোক অর্থাৎ সম্পূর্ণ হোক। (ভাব এই যে, আমাদের কর্ম-সমূহ আমাদের ভগবানের সাথে সম্মিলিত করুক)। মাতৃ-স্থানীয় (মায়ের মতো করুণাপরায়ণ) দেববিভূতি-সমূহ আমাদের বিশুদ্ধতা সাধন করুন। ঘৃতের মতো পবিত্রতাসম্পন্ন অর্থাৎ বিশুদ্ধতাসাধক সেই দেব-বিভূতিসমূহ সৎ-ভাব ইত্যাদির দ্বারা আমাদের অভিষিঞ্চিত করুন। অপিচ, সেই দেব-ভাবসমূহ আমাদের সকল রকম পাপ অপনীত করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। পাপ-নাশে সৎ-ভাবের উদয়ে পরমানন্দলাভের প্রার্থনা এখানে বর্তমান রয়েছে। প্রার্থনার ভাব এই যে, আমাদের মধ্যে সৎ-ভাবের সৃষ্টি করে আমাদের পরমপদে প্রতিষ্ঠাপিত করুন)। অথবা, জগতের নির্মাণকত্রী (অথবা মায়ের মতো পালনকর্তী), সত্ত্বভাবের দ্বারা পবিত্ৰকারিণী এবং দ্যুতিশালিনী জলের অধিষ্ঠাত্রী দেব-বিভূতিগণ, আমাদের পাপ-সমূহকে অপনীত করুন; সত্ত্বভাবের দ্বারা আমাদের পবিত্র করুন; এবং এই জন্মজরামৃত্যুরূপ সংসার হতে (অথবা অজ্ঞান আমাদের) উদ্ধার করুন। (ভাব এই যে,-দেব-বিভূতিগণ আমাদের পাপসমূহকে বিনষ্ট করে সত্ত্বভাবের দ্বারা আমাদের এই সংসার হতে উদ্ধার করুন,–এই প্রার্থনা)। দেব-বিভূতিসমূহের স্নেহ-ধারা-সমূহে অভিষিঞ্চিত হয়ে সর্বতোভাবে বাহিরের ও অন্তরের বিশুদ্ধতা-সম্পাদনে যেন সমর্থ হই। অথবা, –আমরা জলের অধিষ্ঠাত্রী দেব-বিভূতি হতে স্নানের দ্বারা (বহিঃশুদ্ধ) এবং আচমনের দ্বারা (অন্তঃশুদ্ধ) শুদ্ধসত্ত্বভাবাপন্ন হয়ে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হই। (ভাব এই যে,–দেববিভূতির প্রসাদে বাহির ও অন্তর শুদ্ধ হয়ে আমরা যেন ব্রহ্মলোক অর্থাৎ মুক্তিপ্রাপ্ত হই,–এই প্রার্থনা)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি সৎস্বরূপ ভগবানের শরীর, অর্থাৎ প্রকাশরূপ বা ধারক হও। অতএব সৎ-ভাব-অবরোধ শত্রুর উপদ্রব হতে আমাকে রক্ষা করো। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে, আমার হৃদয়ের সৎ-ভাবকে যেন আমি নষ্ট না করি)। হে মন! তুমিই বিশ্ববাসীর অমৃতস্বরূপ হও। অর্থাৎ আমাদের মন সকল সঙ্কর্মের সাধক হোক–সঙ্কল্পের এটাই তাৎপর্য। হে জ্ঞানস্বরূপ দেব! আপনি তেজের (শক্তির) ধারক হন; অতএব আমাকে তেজঃ (কর্মশক্তি) প্রদান করুন। অথবা,–হে দেব! আপনি এই ভূমির অর্থাৎ এই মর্ত্য লোকের জল-রূপ (জ্ঞান-ভক্তি রূপ) হন; (ভাব এই যে,জল যেমন ভূমির আদ্রর্ভব জন্মায়, তেমনই আপনি মর্ত্যলোকের রসাদ্রভাব অর্থাৎ ভক্তি ও জ্ঞান জন্মিয়ে থাকেন); এবং আপনি জ্ঞানতেজঃপ্রদ হন। অতএব আমাকে (জ্ঞানতেজোহীনকে) জ্ঞানরূপ তেজঃ বিতরণ করুন। হে দেব! আপনি অজ্ঞানরূপ অথবা বাহ্য ও আন্তর শত্রু-রূপ অসুরের নাশে শক্তি-স্বরূপ হন; (ভাব এই যে,–যেমন কনীনিকা অর্থাৎ চোখে তারা দৃষ্টিশক্তির মূল কারণ, সেইরকম আপনি অজ্ঞান-নাশের অথবা বাহ্য ও আন্তর সকল শত্রুনাশের মূল কারণ। হে দেব! আপনি সকলের দর্শনেন্দ্রিয়ের পালক অর্থাৎ দূরদৃষ্টি ও অন্তঃদৃষ্টি বিধায়ক অথবা অজ্ঞানতারূপ শত্রুনাশক বলে জ্ঞান-দৃষ্টিপ্রদ হন। অতএব আপনি আমার জ্ঞান-চক্ষু অর্থাৎ আত্ম-উৎকর্ষসাধন-সমর্থ দূর-দৃষ্টি বা অন্তদৃষ্টি সংরক্ষণ অর্থাৎ প্রদান করুন। (ভাব এই যে, –হে দেব! আপনি অজ্ঞানতানাশক ও বহিঃশত্ৰু-নাশক। অতএব আপনি আমাদের অজ্ঞানতা প্রভৃতি বিনাশ করে আমাদের জ্ঞান-চক্ষু প্রদান করুন)। হৃদয়-স্বামী সেই ভগবান তোমার পরিত্রাণ সাধন করুন; জীবন-স্বামী সেই ভগবান তোমাকে পরিত্রাণ করুন। হে আমার ভগবৎ-সম্বন্ধযুত কর্মসমূহ! জগৎপ্রসবিতা জগতের আদিকারণ স্বপ্ৰকাশ ভগবান বিশুদ্ধ পবিত্রকারক বায়ুরূপে জ্ঞানজ্যোতির দ্বারা এবং সকলের নিবাসহেতুভূত প্রজ্ঞানময় বিশ্বপ্রকাশক ভগবানের বিশ্বপ্রকাশক জ্যোতিঃনিবহের দ্বারা তোমাদের উৎকর্ষসাধনে পবিত্রতা সম্পাদন করুন। অথবা তোমরা জ্ঞানপ্রদ সবিতা দেবতার প্রেরণায়-অনুকম্পায়-ত্রুটি-পরিশূন্য বায়ুর মতো পবিত্রকারক ও সূর্যরশ্মির মতো জ্ঞানপ্রদ হয়ে আমাদের উৎকর্ষসাধনে আমাদের পবিত্র করো। (বায়ু ও সূর্যরশ্মি শুদ্ধিসম্পাদক। তাদের প্রভাবে আমাদের সৎ ও অসৎ কর্মসমূহ পবিত্রতা প্রাপ্ত হোক,–এটাই প্রার্থনা)। হে জ্ঞানাধিপতে! আপনি জ্ঞানপূত (জ্ঞানময়) ও প্রসিদ্ধ; (সাধকগণ কর্তৃক অনুভূত) আপনার যে স্বরূপ (জ্ঞানময়–জ্ঞান) আমি কামনা করছি, সেই স্বরূপ-জ্ঞান যেন পেতে পারি; এবং তার দ্বারা পূত হতে সমর্থ হই। (ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমি তত্ত্বজ্ঞানের অভিলাষী। যাতে সেই বস্তু প্রাপ্ত হয়ে পূত পবিত্র হতে পারি, আপনি তার বিধান করুন)। হে দেব-বিভূতিসমূহ! আমাদের অনুষ্ঠিত সত্যের ও ধর্মের বিজ্ঞাপক এই অন্তর্যজ্ঞে (ভগবৎ-কার্যে) আমরা আপনাদের অনুকূল্য প্রার্থনা করি। আর হে দেব-বিভূতিগণ! এই যজ্ঞসম্বন্ধী আশীবাণী (অর্থাৎ এই যজ্ঞের শুভফল) পাবার জন্য আপনাদের আহ্বান করছি। (ভাব এই যে,–হে দেবগণ! আমাদের এই মানসযজ্ঞে অথবা আমাদের এই উদ্বোধন যজ্ঞে আপনাদের অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। আপনারা এই যজ্ঞ সম্পূর্ণ করে দিন এবং সৎকর্মের শুভফল প্রদান করুন)। আমার সেই উদ্বোধনযজ্ঞ জ্ঞানশক্তি প্রদান করুক; ইহকাল-পরকালের মঙ্গলবিধান করুক এবং সৎ-ভাবের সঞ্চার করে আমাদের কর্মফল সাধন করুক। হে শুদ্ধসত্ত্বরূপিন্ ভগবন্! আপনি সৎকর্মের স্বামী হন। এই সঙ্কর্মে প্রবৃত্ত আমাকে রক্ষা করুন অর্থাৎ কর্ম পূর্ণ করে কর্মফল প্রদান করুন। ১।।
[ভাষ্যানুক্রমণিকা অনুসারে প্রথম প্রপাঠকে দশপূর্ণমাস ইষ্টির বিষয় কথিত হয়েছে। আর দ্বিতীয় প্রভৃতি তিনটি প্রপাঠকে সোম-যাগের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি এবং সেই সংক্রান্ত মন্ত্র ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। যাই হোক, ভাষ্যকার দ্বিতীয় প্রপাঠকের অন্তর্গত অনুবাকগুলির প্রয়োগবিধি বিনিয়োগ সংগ্রহ থেকে প্রদর্শন করে, প্রথম অনুবাকের মন্ত্র-ব্যাখ্যানে প্রবৃত্ত হয়েছেন। সেই অনুসারে মন্ত্রগুলির প্রয়োগ এইরকম প্রদর্শিত হয়েছে; যথা–প্রথম অনুবাকের মন্ত্র ইত্যাদি পাঠে, ক্ষৌর ইত্যাদির দ্বারা সংস্কৃত যজমান প্রাচীন-বংশ নামক যজ্ঞশালায় প্রবেশ করবেন। সেই অনুসারে আপ উদন্তু প্রভৃতি ক্ষৌর-মন্ত্র বলে অভিহিত। ক্ষৌর কার্যের পূর্বে শালানির্মাণের বিধি। বংশ-নির্মিত (বাঁশের তৈরী) সেই যজ্ঞ-শালার মন্মুখভাগ উন্নত এবং পশ্চাদ্ভাগ নিম্ন অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত অনুন্নত হয়–এইরকম ভাবে যজ্ঞশালা নির্মাণ করতে হয়। পূর্বভাগে আয়ত সেই গৃহ প্রাচীন-বংশ নামে অভিহিত। সেই শালায় সোম-যাগের বিধি সূত্র-গ্রন্থ ইত্যাদিতে নিবদ্ধ আছে। যজ্ঞ নিরুপদ্রবে সম্পন্ন হলে স্বর্গসুখ লাভ হয়, এটাই শাস্ত্রের অভিমত। মস্তক-মুণ্ডনে প্রথমতঃ জলের দ্বারা মস্তক ইত্যাদি আর্দ্র করবার সময় প্রথম মন্ত্র আপ উদন্তু ইত্যাদি পাঠ করতে হয়। দ্বিতীয় মন্ত্রের সম্বোধ্য–ক্ষুর। যজ্ঞ-যোগ্য হয়ে অর্থাৎ কেশ, শ্মশ্রু, নখ প্রভৃতি কর্তনের পর তৃতীয় মন্ত্রে বলা হয়ে-নির্বিঘ্নে যেন উত্তর কর্মগুলি প্রাপ্ত হই। মুণ্ডিত মস্তক হয়ে অবগাহন স্নানের পর যজমান চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্র পাঠ করবেন। সেখানে জলদেবতার নিকট ক্ষৌর-কর্মের জন্য অপকার নিবারণ এবং স্নান ও আচমনের দ্বারা বহিরন্তঃশুদ্ধির প্রার্থনা রয়েছে। ষষ্ঠ মন্ত্রে ক্ষৌরবস্ত্রের সম্বোধন আছে। সপ্তম মন্ত্রে নবনীত বা ঘৃতকে লক্ষ্য করা হয়েছে। এই মন্ত্রের সাথে পরবর্তী অষ্টম মন্ত্রের সম্বন্ধ সূচনা করা হয়। অর্থাৎ এই মন্ত্রে চক্ষু দুটিতে অঞ্জন (কাজল) গ্রহণ করার বিধি আছে। নবম ও দশম মন্ত্র যে কোন কার্যে বিনিযুক্ত ভাষ্যে তার স্পষ্টতঃ উল্লেখ নেই। তবে কল্প অনুসারে বোঝা যায়, একুশটি দর্ভপুঞ্জলি (কুশের আঁটি) এই মন্ত্র দুটির দ্বারা পবিত্ৰীকৃত করা হয়। একাদশ মন্ত্রটি অধ্বর্য (ঋত্বি-বিশেষ) যজমান পড়াবেন। ভাষ্যমতে দ্বাদশ মন্ত্র ইন্দ্রাগ্নী সম্বোধনে এবং এয়োদশ বা শেষ মন্ত্র আহবনীয় সম্বোধনে প্রযুক্ত হয়েছে বলে বোঝা যায়। বিনিয়োগ সংগ্রহ অনুসারে দ্বাদশ মন্ত্র-হে ইন্দ্রাগ্নি দেবদ্বয় আপনারা একে (যজমানকে) অবগত হোন। এই মন্ত্র পাঠ করতে করতে দক্ষিণ দিকে গমন করে শেষ মন্ত্র পাঠ করতে হয়; যথা,–হে আহবনীয়! তুমি দীক্ষারূপ নিয়মসমূহের পালক হও। অতএব তোমার সমীপে স্থিত আমাকে পালন করো।–যাই হোক, আমাদের অর্থে (আধ্যাত্মিকতার বিচারে) যে স্বতন্ত্র পন্থা অবলম্বন করেছে, তা আমাদের মর্মার্থেই বিধৃত] ॥১॥
প্রথম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ১৪
অনুবাক -১৪
মন্ত্র- আক্ত্যৈ প্ৰযুজেহগেয়ে স্বাহা। মেধায়ৈ মনসেহগ্নয়ে স্বাহা। দীক্ষায়ৈ তপসেহগ্নেয় স্বাহা। সবস্বত্যৈ পূষ্ণেগ্নয়ে স্বাহা। অপো দেবীবৃহতীৰ্বিশ্বশংভূবো দ্যাবাপৃথিবী উবন্তরিক্ষং বৃহম্পতিনো হবিষা বৃধাতু স্বাহা। বিশ্বে দেবস্য নেতুর্মর্তো বৃণীত সখ্যং বিশ্বে রায় ইযুধ্যসি দ্যুম্মং বৃণীত পুষ্যসে স্বাহা। ঋময়োঃ শিল্পে স্থস্তে বামারভে তে মা পাতমাহস্য যজ্ঞস্যোদৃত। ইমাং ধিয়ং শিক্ষমাণস্য দেব তুং দক্ষং বরুণ সং শিশাধি যযাহতি বিশ্বা দুরিতা তরেম সুতর্মাণমধি নাবং রুহেম। উর্গস্যাঙ্গিরসূর্ণদা ঊর্জং মে যচ্ছ। পাহি মা মা মা হিংসীঃ।। বিষ্ণোঃ শৰ্মাসি শৰ্ম যজমানস্যশৰ্ম মে যচ্ছ। নক্ষত্রাণাং মাহতীকাশাৎ পাহি। ইন্দ্রস্য যোনিরসি মা মা হিংসীঃ। কৃষ্যে ত্বা সুসস্যায়ৈ।। সুপিপ্ললাভ্যৗেষধীভ্যঃ।। সুপস্থা দেবী বনস্পতি রূৰ্দ্ধো মা পায্যোদৃচঃ। স্বাহা যজ্ঞং মনসা স্বাহা দ্যাবাপৃথিবীভ্যাম্। স্বাহোরোরন্তরিক্ষাৎ স্বাহা যজ্ঞং বাতাদা ব্ৰভে ॥২৷৷
মর্মার্থ- আত্মার উদ্বোধন-যজ্ঞ করব–এমন সঙ্কল্প-সিদ্ধির জন্য (আমার অনুষ্ঠিত মানস যজ্ঞ পরিপূরণের জন্য) সঙ্কল্প-সিদ্ধির প্রযোজক (অথবা সিদ্ধিদাতা) সেই জ্ঞান-দেবের উদ্দেশে আমার এই সত্ত্ব-ভাব সমর্পিত হোক। (আমার সেই উদ্বোধন-যজ্ঞ সুসিদ্ধ ও সুহুত হোক)। ভগবৎ-বিষয়ে ধারণা-শক্তি-লাভের জন্য, মনের অধিষ্ঠাতা সেই জ্ঞান-দেবের উদ্দেশে (আমার) এই সত্ত্বভাব সমর্পিত হোক। (আমার সেই উদ্বোধন-যজ্ঞ সুহুত ও সুসিদ্ধ হোক)। ব্রত-নিয়ম অর্থাৎ সকর্ম-সমূহ সিদ্ধির জন্য তপঃ-স্বরূপ সেই জ্ঞানদেবতার উদ্দেশে (আমার) এই সত্ত্বভাব সমর্পিত হোক। (আমার সেই উদ্বোধন-যজ্ঞ সুহুত ও সুসিদ্ধ হোক)। বাক্-সিদ্ধির জন্য, বাক্-ইন্দ্রিয়ের পোষক সেই জ্ঞান-দেবতার উদ্দেশে (আমার) এই সত্ত্বভাব সমর্পিত হোক। (আমার সেই উদ্বোধন-যজ্ঞ সুহুত ও সুসিদ্ধ হোক)। হে জলের অধিষ্ঠাত্রী! হে স্বর্গ-মর্তের অধিষ্ঠাত্রী! হে অন্তরিক্ষের অধিষ্ঠাত্রী! হে মহা! হে বিশ্বব্যাপক! হে সকল সুখের জনয়িতা দেব-বিভূতিসমূহ! আপনারা আমার হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্ব-ভাবকে প্রবর্ধিত (উদ্বোধিত) অথবা গ্রহণ করুণ। দেবাধিদেব ভগবান আমাদের (আমাদের সৎ-ভাব ও ভক্তি-সুধা) প্রবর্ধিত করুন–গ্রহণ করুন। সেই শুদ্ধসত্ত্ব-সৎ-ভাবসমূহ ভগবানের প্রীতি উৎপাদন করুক। স্বাহা-মন্ত্রের দ্বারা সেগুলির সবই ভগবানে সমর্পণ করছি। (আমার উদ্বোধন-যজ্ঞ সুহুত হোক)। [উপরোক্ত পাঁচটি মন্ত্রই প্রার্থনামূলক] সকল মনুষ্য ফলদাতা সেই ভগবানের সাহায্য (আনুকূল্য) প্রার্থনা করেন। সকলেই ধনের জন্য অর্থাৎ জ্ঞান-ধনের জন্য (পরমধন-লাভের জন্য) দীপ্তিশালী যশঃ অন্ন অথবা সত্ত্বভাব প্রার্থনা করেন। পুষ্টির জন্য (সত্ত্বভাব লাভের নিমিত্ত) দীপ্তিশালী যশঃ অন্ন অথবা সত্ত্বভাব প্রার্থনা করেন। স্বাহা অর্থাৎ আমাদের প্রার্থনা সিদ্ধ হোক (অথবা আমাদের অনুষ্ঠিত কর্ম সুসম্পন্ন হোক)। হে অন্তব্যাধি-বহির্বাধি-নাশক দেববিভূতিদ্বয় (অশ্বিনীদ্বয়)! আপনারা ঋক্ ও সাম বেদের (অথবা নিখিল শুদ্ধসত্ত্ব-ভাবের শিল্পী অর্থাৎ অভিব্যঞ্জক হন; সেই প্রসিদ্ধ (সাধকগণের অনুভূত) আপনাদের দুজনকে আরাধনা করি। আপনারা আমাদের এই আরব্ধ আত্ম-উদ্বোধন যজ্ঞের পরিসমাপ্তি কাল পর্যন্ত আমাকে রক্ষা করুন। (ভাব এই যে,-দেবতা আর দেববিভূতি অভিন্ন! সুতরাং আপনারা দুজনও বেদের অভিব্যঞ্জক; অর্থাৎ নিখিল শুদ্ধসত্ত্ব-প্রদাতা আপনারা আমাদের দ্বারা আরাধিত হয়ে আমাদের রক্ষা করুন)। দ্যোতমান জ্ঞানদায়ক স্নেহ-কারুণ্যময় হে ভগবন্ বরুণদেব! সকর্ম সাধনে ইচ্ছুক অৰ্চনাকারীর (আমার) সৎকর্ম-বিষয়ক বুদ্ধি উৎপাদকের জন্য সকর্মবেত্তা আপনি (আমার) সেই কর্মকে সম্যক্-রকমে সাধন করুন অর্থাৎ আমাকে কর্ম-বিষয়ক জ্ঞান প্রদান করে সেই কর্মের পূর্ণতা সাধনে সুফল প্রদান করুন। অপিচ, হে দেব! যে কর্মের দ্বারা সবরকম পাপ (দূরিত) হতে প্রকৃষ্টভাবে উত্তীর্ণ হতে পারি, সুখে-ত্রাণকারী (অথবা সুখ-সাধক পরিত্রাণ-বিধায়ক) সেই কর্মরূপ তরণী যেন প্রাপ্ত হই। (মন্ত্রটি সঙ্কল্প-মূলক। আত্যন্তিক দুঃখ-নিবৃত্তিতে পরমসুখ সাধনের আকাঙ্ক্ষাই এই মন্ত্রের অন্তর্গত সঙ্কল্পের লক্ষ্য)। হে ভগবৎ-বিভূতে! আপনি অঙ্গিরস ঋষিদের অর্থাৎ সমস্ত মানবের অন্নরসরূপ অর্থাৎ সত্ত্বভাবরূপ এবং উর্ণাতন্তুর (মাকড়সার জালের) মতো মৃদুস্বভাবা হন। সুতরাং আমার মতো অকিঞ্চন দীনজনে অন্নরস অর্থাৎ সত্ত্বভাব প্রদান করুন। হে ভগবৎ-বিভূতে! আপনি আমাকে রক্ষা (পরিত্রাণ) করুন। আমাকে হিংসা করবেন না অর্থাৎ আমার প্রতি কুটিল বা বিরূপ হয়ে আমাকে পরিত্যাগ করবেন না। হে ভগবৎ-বিভূতে! আপনি বিশ্বব্যাপক সৰ্কৰ্ম-সমূহের অর্থাৎ সেই নিমিত্তক সুখের প্রাপ্তিহেতুভূত হন; অপিচ, আপনি সকর্মকারীর পরম আশ্রয় হন। অতএব আমাকে আশ্রয়-পরমসুখ প্রদান করুন। তার পর অক্ষীয়মান সৎ-ভাবসমূহের ক্ষয় হতে আমাকে রক্ষা করুন অর্থাৎ আমার সৎ-ভাবসমূহ যেন বিনষ্ট বা ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়। হে ভগবৎ-বিভূতে! আপনি পরম-ঐশ্বর্যশালী ভগবানের প্রাপ্তির কারণ হন। অতএব আপনি আমার প্রতি বিরূপ হবেন অর্থাৎ আপনি আমাকে পরিত্যাগ করবেন না। হে আমার চিত্তবৃত্তি! সুকর্ষণের অর্থাৎ উৎকর্ষসাধনের নিমিত্ত এবং সুশস্য-লাভের অর্থাৎ সৎ-ভাব-রূপ সুবাস্য-প্রাপ্তির জন্য তোমাকে ১(এই কর্মে) নিযুক্ত করছি। হে আমার চিত্তবৃত্তি! সুফলসমন্বিত কর্মক্ষয়ের নিমিত্ত তোমাকে (এই কর্মে নিযুক্ত করছি। সৎকর্মের সুষ্ঠুসম্পাদক সংসার-অরণ্যের অধিপতি স্বপ্রকাশ ভগবান (আমাদের প্রতি) অনুকূল হয়ে (আমাদের) আরব্ধ কর্মের উত্তরা (শেষ) ঋক্ পর্যন্ত অর্থাৎ পরিসমাপ্তি পর্যন্ত আমাকে (পাপ হতে) রক্ষা করুন। (ভাব এই যে, সমস্ত পাপ হতে বিমুক্ত করে আমাকে সকর্মের শুভফল প্রদান করুন)। চিত্তের উদ্বোধনযজ্ঞকে যেন স্বাহার (স্বাহা নামক অগ্নির) মতো প্রাপ্ত হই। অর্থাৎ, সে যজ্ঞ যেন সুহুত ও সুসিদ্ধ হয়। অথবা চিত্তের দ্বারা দশপৌর্ণমাস ইত্যাদি রূপ সৎকর্ম যেন প্রাপ্ত হই। (ভাব এই যে, আমার মানস-যজ্ঞ যেন সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়)। সেই উদ্বোধনরূপ যজ্ঞ বা সৎকর্ম যেন ভূলোক ও স্বর্গলোক ব্যেপে প্রকাশ পায় (পেয়ে থাকুক)। (ভাব এই যে,–সকর্মের প্রভাবে দেব-বিভূতিসমূহ অধিগত হয়)। সেই উদ্বোধনরূপ যজ্ঞ (মানস-যজ্ঞ) অথবা সৎকর্ম যেন মহৎ-অন্তরিক্ষলোক (বিশ্ব) ব্যেপে প্রকাশ পায় (পেয়ে থাকুক)। (ভাব এই যে-সকর্মের দ্বারা হৃদয়ে সত্ত্বভাব উপজিত হলে সেই বিরাট বিশ্বময়ের স্বরূপ অবগত হওয়া যায়)। সেই উদ্বোধন-যজ্ঞকে অথবা সৎকর্মকে যেন আমি সত্ত্বভাব হতে আরম্ভ করি অর্থাৎ সত্ত্বভাব সহযুত হয়ে আমি যেন সেই কার্যে প্রবৃত্ত হতে পারি। (অথবা সত্ত্বভাবের প্রভাবে আমার সেই উদ্বোধন-যজ্ঞ যেন সুসিদ্ধ হয়। সেই কার্য (আমার মানস-যজ্ঞ) সিদ্ধ হোক। স্বাহা মন্ত্রে তাকে উদ্বোধিত করছি। (ভাব এই যে,-যে জ্ঞানময় দেব উদ্বোধনরূপে বিরাজ করেন, যিনি স্বর্গ অন্তরিক্ষ মর্ত–এই ত্রিলোক ব্যেপে আছেন, তাঁকে যেন সত্ত্বভাবের দ্বারা অধিগত করতে সমর্থ হই)। ২।
[এই দ্বিতীয় অনুবাকে দীক্ষা-বিধি কথিত হচ্ছে। দীক্ষা-নিয়মরূপ তপের দ্বারা পূর্বোক্ত অনুবাকের অনুসারে প্রাচীনবংশ-শালায় প্রবিষ্ট দীক্ষাভিলাষী ব্যক্তির শরীর-শুদ্ধি সংসাধিত হলে, দেবজনে তার অধিকার জন্মায়। তারপর তার দীক্ষা-বিধি। সুতরাং কর্মকাণ্ড অনুসারে দীক্ষণীয়-ইষ্টিতে মন্ত্রগুলির অতিদেশ প্রযুক্ত দীক্ষাহুতি বিষয়ক মন্ত্রগুলি এই দ্বিতীয় অনুবাকে উক্ত হয়েছে। ভাষ্যকার এইরকম অনুক্রমণ করে অনুবাকের মন্ত্রগুলির অর্থ-নিষ্কাশনে প্রবৃত্ত হয়েছেন। বিনিয়োগ-সংগ্রহে যে মন্ত্রে যে প্রক্রিয়া উপলক্ষিত, ভাষ্যে সেই মন্ত্রে তারই সাধন-উপযোগী সেই সামগ্রীই লক্ষিত হয়েছে এবং সেই ভাবেই ভাষ্যকার মন্ত্রের সম্বোধন ইত্যাদি অধ্যাহার করে নিয়েছেন। প্রথম দৃষ্টিতে এই অনুবাকের প্রথম পাঁচটি মন্ত্র সহজবোধ্য বলে প্রতীত হলেও ভাব-উদ্ধারে বড়ই প্রয়াস পেতে হয়। এই পাঁচটি মন্ত্র শুক্লযজুর্বেদে মহীধরকৃত ভাষ্যে কিরকম অর্থ পেয়েছে তা উপলব্ধ করা যায়–যথা,–(১) যজ্ঞ করব-এইরকম মানস-সিদ্ধির জন্য সেই সঙ্কল্প সিদ্ধির প্রয়োজক অগ্নিদেবের উদ্দেশে এটি সুহুত হোক। (২) মন্ত্রে ও ধারণাশক্তি-সিদ্ধির জন্য মনঃ অভিমানী অগ্নিদেবের উদ্দেশে (এটি) সুহুত হোক। (৩) ব্রত-নিয়ম-সিদ্ধির জন্য আমার শারীর-তপঃ অভিমানী অগ্নিদেবের উদ্দেশে (এটি) সুহুত হোক। (৪) মন্ত্র উচ্চারণের শক্তি-সিদ্ধির জন্য বাক্-ইন্দ্রিয় পোষক অগ্নিদেবের উদ্দেশে (এটি) সুহুত হোক। (৫) হে জলরাশি! হে দ্যাবাপৃথিবি! হে বিস্তীর্ণ অন্তরিক্ষ! তোমাকে এবং বৃহস্পতিকে হবিঃ দান করছি। তা সুহুত হোক। কিরকম জলরাশি? দ্যোতমানা, প্রভূত। এবং জগতের সুখজনিকা। বলা বাহুল্য সায়ণের ভাষ্যও কম-বেশী একই ধারায় বাহিত। ষষ্ঠ মন্ত্রে ভাষ্যকার বলছেন–বিশ্বাত্মক জগৎ-নির্বাহক দেবতার সখ্য মরণবান যজমান সহসা কামনা করেন। এইরকম স্তোত্রের দ্বারা সেই সখিত্ব প্রাপ্ত হওয়া যায়। বিশ্বাত্মক ধন ও যশ তার নিকট প্রাপ্ত হয়। আর যজ্ঞপোষণের নিমিত্ত তাঁর নিকট ধন প্রার্থনা করে। এই হবিঃ সুহুত হোক। এই মন্ত্রই শুক্লযজুর্বেদের চতুর্থ অধ্যায়ে মহীধরকৃত ভাষ্যে যে ভাব উপলব্ধ করে, তা এই,-সকল মনুষ্য ফলপ্রাপক ও দান ইত্যাদি গুণযুক্ত সবিতার সখিভাব (সখ্য) প্রার্থনা করেন; এবং সকল ব্যক্তিই ধনের জন্য সবিতাকে প্রার্থনা করেন ও যশ বা অন্ন তার নিকট কামনা করেন। কি জন্য? প্রজাপলিনের জন্য। যিনি এমনই সবিতা, তার উদ্দেশে এটি সুহুত হোক। কর্মকাণ্ডের অনুসরণে সপ্তম মন্ত্রের ভাষ্যে বোঝা যায়, এই মন্ত্র উচ্চারণে কৃষ্ণাজিনদ্বয়ের সন্ধিস্থান স্পর্শ করতে হয়। তাই মনে হয়–মন্ত্রটি কৃষ্ণাজিন সম্বন্ধে পঠিত হয় বলেই ভাষ্যকার সম্বোধনরূপে কৃষ্ণাজিন পদ অধ্যাহৃত করেছেন। অষ্টম মন্ত্রটির ভাষ্যানুসারী অর্থ-হে বরুণদেব! অগ্নিষ্টোম বিষয়ক ধী-শক্তি লাভেচ্ছু যজমানের সম্বন্ধী সমৃদ্ধ অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের বিষয়ে সম্যক উপদেশ প্রদান করে তাকে যজ্ঞের পারে নিয়ে যাও অর্থাৎ যজ্ঞ সম্পাদন করে। যে নৌকার দ্বারা বিঘ্নরূপ দূরিত হতে উত্তীর্ণ হতে পারি, সুখে তারণসমর্থ এই কৃষ্ণজিনরূপ নৌকায় আমরা পারে গমনের জন্য অধিরোহণ করছি। আমরা তো এই মন্ত্রে সংসার-সমুদ্র উত্তরণের আকাঙ্ক্ষাই দেখেছি এবং মর্মার্থে তা-ই প্রকাশ করেছি। নবম থেকে ত্রয়োদশ পর্যন্ত পাঁচটি মন্ত্র কর্মকাণ্ডানুসারে বিনিয়োগগ্রন্থের মতে এবং তার অনুসরণে ভাষ্যমতে যা অর্থ হয়েছে তা এই (৯)-হে মেখলে! তুমি অঙ্গিরস নামক ঋষিদের সম্বন্ধে অন্নরসরূপে প্রকটিত হয়ে থাক এবং কম্বলের মতো মৃদু হয়ে থাক। এইরকম তুমি আমাকে অন্নরস প্রদান করো। (১০)-হে মেখলে! তুমি আমাকে রক্ষা করো। হিংসা ও বন্ধনের দ্বারা বেদনা উৎপাদন করো না। (১১)–হে বস্ত্র! তুমি বিষ্ণুর সুখপ্রদ হও। তুমি যজমানকে সুখ প্রদান করো। অতএব তুমি আমারও সুখের বিধান করো। হে বস্ত্র! নক্ষত্রপ্রকাশ থেকে আমাকে রক্ষা করো। (১২)–হে কৃষ্ণবিষাণ! তুমি যেমন ইন্দ্রের যোনি (উৎপত্তিকারণ) হও, সেইরকম এই যজমানেরও (উৎপত্তির কারণ) হও। (১৩)–হে লোষ্ট! শোভনশস্য সম্পাদনের উপযোগী কর্ষণের জন্য তোমাকে ধারণ করছি অর্থাৎ নিয়োজিত করছি।–ভাষ্যে দ্বাদশ মন্ত্রের সাথে একটি উপাখ্যানের সমাবেশ দেখা যায়। সেই উপাখ্যানটি এই,–যজ্ঞদেবের সাথে দক্ষিণাদেবীর মিলন হলে ইন্দ্র জানতে পারেন, দক্ষিণাদেবীর গর্ভস্থ সন্তান ত্রিভূবনের ঐশ্বর্যপতি হবেন। সুতরাং ইন্দ্র স্বয়ং দক্ষিণাদেবীর যোনিপথে তার উদরে প্রবিষ্ট হন। এই ভাবে দক্ষিণাদেবীর গর্ভে ইন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন এবং ভবিষ্যতে আর কেউ যাতে দক্ষিণাদেবীর গর্ভে না জন্মাতে পারে, সেই হিংসার বশবর্তী হয়ে তিনি মাতা দক্ষিণাদেবীর যোনি-দেশ ছিন্ন করেন। বিযযানিত্বের জন্য দক্ষিণাদেবী বন্ধ্যা হলেন; কিন্তু সেই যোনি ইন্দ্রের হস্ত বেষ্টন করে রইলো। তখন ইন্দ্র বলিসমূহযুক্ত সেই যোনি কৃষ্ণমৃগে স্থাপন করলেন। সেইজনই কৃষ্ণবিষাণ যজ্ঞের ভোগ্যা দক্ষিণার অবয়বভূত এবং ইন্দ্রের কারণভূত যোনিস্বরূপ বলে কথিত হয়। যাই হোক, ভাষ্যকার এই অলৌকিক বেদমন্ত্রের সাথে যে লৌকিক মেখলা, বস্ত্র, কৃষ্ণবিষাণ প্রভৃতির যে সম্বন্ধ টেনে এনেছেন, তার বিশেষ কোনও সৎ-যুক্তি পাওয়া যায় না। উক্ত মেখলা প্রভৃতি সম্বন্ধে মন্ত্রের প্রয়োগ দেখে ভাষ্যকার ঐরকম কল্পনা করেছেন বলেই মনে হয়। ভাষ্যানুসারে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ মন্ত্র মস্তক-কণ্ডুয়ণ এবং দণ্ড-পরিগ্রহ কার্যে বিনিযুক্ত বলে নির্দেশিত হয়েছে। সেই অনুসারে মন্ত্রের লক্ষ্য–শির বা মস্তক; এবং পঞ্চদশ মন্ত্রের সম্বোধন-বৃক্ষাবয়ব দণ্ড। এই অনুবাকের শেষ মন্ত্রের প্রথম অংশ পাঠ করে দুই হস্তের দুই কনিষ্ঠা অঙ্গুরীকে সঙ্কুচিত করতে হবে এবং অন্য তিন অংশ উচ্চারণে অন্য অঙ্গুলি সঙ্কুচিত করতে হবে। শেষে পুনরায় শেষ অংশ পাঠে মুষ্টিদ্বয় বদ্ধ করতে হয়। কর্মকাণ্ডের স্বার্থে প্রচলিত ভাষ্যের অনুসরণে যে অর্থ প্রতীত হয়, তা এই,–(ক) চিত্তের দ্বারা আমি যজ্ঞে অভিগত হচ্ছি; (খ) বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষে যজ্ঞ আশ্রিত; (গ) স্বর্গ ও পৃথিবীতে যজ্ঞ আশ্রিত অর্থাৎ যজ্ঞ ত্রিলোকব্যাপী; (ঘ) বায়ুর (বায়ু সর্বকর্ম-প্রবর্তক বলে) প্রসাদে যজ্ঞে প্রবৃত্ত হয়েছি। সেই যজ্ঞ এইভাবে সিদ্ধ হয়।–এই মন্ত্রগুলির আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে কি রকম সঙ্গতিপূর্ণ অর্থ হয়, তা আমরা আমাদের মর্মার্থেই প্রকাশ করেছি] । ২।।
মর্মার্থ- হে ভগবন্! দেবকার্যে স্বতঃপ্রবৃত্তা পরম-সুখদায়িকা, তেজের ধারয়িত্রী (তেজোময়ী), সকর্মর্সাধয়িত্রী, বুদ্ধি (প্রজ্ঞা) আমরা প্রার্থনা করছি; সুখলভ্যা হয়ে, সেই বুদ্ধি (প্রজ্ঞা) আমাদের বশতাপন্ন হোক। (ভাব এই যে, আমরা যেন সর্বসিদ্ধিপ্রদা সুবুদ্ধির অধিকারী হই; হে ভগব, আপনি তা-ই বিধান করুন)। হৃদয়ে উৎপন্ন, হৃদয়ের সাথে সম্বন্ধবিশিষ্ট, সৎকর্মসাধক, সৎ-ভাব-উৎপাদক সকলেরই অনুভূত যে দেবভাবসমূহ, তারা সকলে আমাদের (পাপ হতে) পরিত্রাণ করুন এবং রক্ষা করুন। সেই পরিত্রাণকারী দেবতাগণকে নমস্কর্মের দ্বারা পূজা করি এবং স্বাহা-মন্ত্র-সহযোগে হবিঃ ইত্যাদি অর্পণ করছি; আমার কর্ম সুহুত হোক–আমার অভীষ্ট সিদ্ধ হোক। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। ভাব এই যে,-শুদ্ধসত্ত্বভাবের দ্বারা আমাদের হৃদয় পরিপূর্ণ হোক; সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সকল কর্ম তন্ময়ত্ব প্রাপ্ত হোক, অর্থাৎ তার ভাবে বিভাবিত হোক)। হে জ্ঞানময় দেব! আপনি আমাদের হৃদয়ে চিরজাগরুক থাকুন; আপনার প্রার্থনাকারী শরণাগত আমরা মোহঘঘারে সংজ্ঞারহিত হয়ে আছি। (ভাব এই যে,অজ্ঞানতার কারণে অথবা মোহের বশে আমরা যদি বিপথগামী হই, হে জ্ঞানময়, বিবেকরূপে হৃদয়ে উদিত হয়ে আমাদের সৎপথ প্রদর্শন করুন)। হে ভগবন্! আপনি আমাদের পরিত্রাণ করুন। আর সৎ-বুদ্ধি দানে রক্ষার নিমিত্ত এবং অবিনাশী সৎকর্মশীল জীবনের জন্য, পুনশ্চ জাগরণের অর্থাৎ সৎকর্মসমন্বিত ও সৎ-ভাবসহযুত করে উদ্বোধিত করবার নিমিত্ত, আমাদের ধারণ করুন অর্থাৎ আমাদের প্রমাদ-পরিহারে সৎ-কর্মান্বিত করে আমাদের হৃদয়ে আবির্ভূত হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে-হে ভগবন্! আপনার কৃপায় সৎ-উপদেশ লাভ করে আমরা যাতে সৎপথ-অবলম্বী হতে পারি, তা-ই বিহিত করুন)। হে জ্ঞানময় দেব! দ্যোতমান স্বপ্রকাশ আপনি, মনুষ্য পর্যন্ত সকল প্রাণীর সৎকর্মের পালক হন; আর সকল যজ্ঞেসকল সৎকর্মের অনুষ্ঠানে আপনি সর্বতোভাবে (সম্পূজিত) পূজনীয় হন। (ভাব এই যে,-সকল কর্মেই জ্ঞানদেবের প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে)। দেববিভূতিসমূহ সকলে শরণাগত আমাকে সর্বভাবে আবৃত করে অবস্থান করুন অর্থাৎ আমাকে রক্ষা করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। ভাব এই যে,-দেবভাবসমূহ হৃদয়ে সম্যভাবে উপজিত হোক)। সৎ-ভাব-পোষক সেই ভগবান, পরমধনের সাথে (আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন। পরমপদপ্রদায়ক শুদ্ধসত্ত্ব, শ্রেষ্ঠধনের সাথে আগমন করুন এবং হৃদয়ে অধিষ্ঠান করুন। দ্যোতমান স্বপ্ৰকাশ পরমাশ্রয় সৎকর্মের প্রেরক অথবা সৎকর্মের নিয়োজক সৎপথ-প্রদর্শক ভগবান অভীষ্টপূরক পরমধনদায়ক হয়ে আগমন করুন–হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনি এই কর্মে শ্রেষ্ঠ ধন অর্থাৎ কর্মের অপেক্ষিত ফল প্রদান করুন অর্থাৎ সৎকর্মের সুফল প্রদান করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। এখানে সঙ্কর্মের সুফল-লাভের প্রার্থনা বিদ্যমান। প্রার্থনার ভাব এই যে, সৎ-ভাবের প্রভাবে আমরা যেন কর্মফল ভগবানে সমর্পণ করতে প্রবুদ্ধ হই)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনি আমার সকর্মকে পূর্ণফলের দ্বারা পূর্ণ করে অথবা ফলসমন্বিত করে, পুনরায় আমাকে সেই কর্মের সুফল প্রদান করুন অর্থাৎ ধনদানে আকাঙ্ক্ষা পূরণ করুন। তা হলে হে শুদ্ধসত্ত্বরূপ ভগবন্! আমি যেন সকর্মসাধক জীবনের দ্বারা বিযুক্ত না হই, আপনি তা-ই সাধন করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। ভাব এই যে, আমাকে যেন পাপ স্পর্শ না করে এবং তার জন্য আমি যেন সৎপথ-ভ্রষ্ট না হই)। শুদ্ধসত্ত্বরূপিন্ হে ভগবন্! আপনি আহ্লাদক অর্থাৎ পরমানন্দ-প্রদায়ক হন। অতএব আপনি এই শরণাগত প্রার্থনাকারী আমার পরমসুখ-হেতুভূত হন; এইভাবে আমাকে অনুগৃহীত করুন অথবা হৃদয়ে প্রদীপ্ত হোন। শুদ্ধসত্ত্বরূপিন্ হে ভগবন্! আপনি সৎ-ভাব-রূপে শরণাগতের ব্যাপক হন। অতএব এই শরণাগত প্রার্থনাকারী আমার সৌভাগ্যের অর্থাৎ পরমসুখের নিমিত্ত আপনি সেইভাবে আমার অন্তর ব্যাপ্ত করুন। শুদ্ধসত্ত্বরূপিন্ হে ভগবন্! আপনি জ্ঞানজ্যোতিঃ-সমুহের উৎসারক হন। (অথবা, পয়স্বিনী গাভী যেমন পয়ঃনিঃসারণের দ্বারা লোকসমূহকে রক্ষা করে, সেইভাবে জ্ঞানধনদানে আপনি পাপনিঃসারক ও লোকসমূহের রক্ষক হন)। অতএব আপনি এই শরণাগত প্রার্থনাকারী আমার সৌভাগ্যের নিমিত্ত (অর্থাৎ সৎ-ভাবের দ্বারা পরমসুখ-সাধনের জন্য) জ্ঞানজ্যোতির দ্বারা হৃদয়কে পরিব্যাপ্ত করুন। শুদ্ধসত্ত্বরূপিন্ হে ভগবন্! আপনি অভীষ্টপ্রাপক হন। অতএব আপনি এই শরণাগত প্রার্থনাকারীর (আমার) অভীষ্টপ্রাপ্তির হেতু হোন অর্থাৎ সেইভাবে জাগরুক থাকুন। শুদ্ধসত্ত্বরূপিন্ হে ভগবন্! আপনি ভববন্ধনের ছেদক হন। অতএব আপনি এই শরণাগত প্রার্থনাকারী আমার সৌভাগ্যের অর্থাৎ ভববন্ধনছেদনরূপ পরমসুখের নিমিত্ত হোন অর্থাৎ অনুগ্রহ করুন। শুদ্ধসত্ত্বরূপিন্ হে ভগবন! আপনি সৎ-বৃত্তি-সমূহের উন্মেষক হন। অতএব আপনি এই শরণাগত প্রার্থনাকারী আমার পরমসুখের নিমিত্ত অনুগ্রহ করুন অর্থাৎ সৎ-বৃত্তির উন্মেষণে, সহায় হোন। হে আমার মন! বায়ুরূপে বর্তমান বিশ্বের জীবনস্বরূপ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিয়োজিত করছি। হে আমার মন! বরুণরূপে বর্তমান স্নেহকারুণ্যময় ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিয়োজিত করছি। হে আমার মন! দিপালরূপে বর্তমান জগতের পালক ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিয়োজিত করছি। হে আমার মন! শাসকরূপে বর্তমান সর্বসংহারক ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিয়োজিত করছি। দীপ্তিদান ইত্যাদি গুণযুক্ত দেবীস্বরূপ হে শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহ! তমোভাবের শোষক তোমাদের যে প্রসিদ্ধ সত্ত্বপ্রবাহ বিদ্যমান, ভগবানে স্থাপনযোগ্য, শক্তিদায়ক এবং পরমানন্দপ্রদ সেই সত্ত্বপ্রবাহকে যেন আমি অতিক্রম করে যাই (অর্থাৎ তাকে যেন বিনষ্ট করি)। অপিচ, সেই সত্ত্বপ্রবাহ লাভ করে ইহলোকসম্বন্ধি দুচ্ছেদ্য বন্ধন বিমুক্ত করতে যেন সমর্থ হই। হে মন! সঙ্কর্মে সমুদ্ভূত কল্যাণ কামনা করো অর্থাৎ সকর্মের সুফলোভের জন্য প্রবুদ্ধ হও। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধক)। অপিচ, হে মন! প্রজ্ঞানের আধার ভগবান্ তোমার অগ্রে গমন করুন। (ভাব এই যে,–প্রজ্ঞানের আধার ভগবান তোমার পথপদর্শক হোন)। অনন্তর (সৎপথ অবগত হয়ে) হে মন! ইহজগতে শ্রেষ্ঠ পদে গমন করো। অর্থাৎ সৎপথে গমন করে শ্রেষ্ঠ পরমস্থান প্রাপ্ত হও। সর্বশক্তির আধার হে ভগবন্! আপনি বাহিরের ও অন্তরের শত্রুদের (হৃদয়রূপ যজ্ঞ-স্থান থেকে দূরে স্থাপন করুন। যে হৃদয়-প্রদেশে (অথবা যে যজ্ঞভূমিতে) নিখিল সত্ত্বভাব (দেববিভূতি) নিত্যকাল অবস্থান করেন, হে ভগবন্! এইরকম হৃদয়-প্রদেশ (যজ্ঞভূমি) এই মর্ত্যলোকে (সংসারে) থেকেই আমরা যেন প্রাপ্ত হই। (ভাব এই যে,–এই সংসারে অবস্থিত থেকেই আমরা যেন সত্ত্বভাব-সমন্বিত হতে পারি)। অজ্ঞানতার সমুদ্র উত্তীর্ণ হতে ইচ্ছুক আমরা (যেন) ঋক্ সাম ও যজুমন্ত্র-রূপ স্তবের দ্বারা এবং পরমধন তত্ত্বজ্ঞানের পোষক সত্ত্বভাবের দ্বারা সম্যকমে হৃষ্ট হই। (ভাব এই যে, ভগবানের উপাসনায় অজ্ঞানতার বিনাশে আমরা যেন প্রজ্ঞান লাভ করি) ॥ ৩৷৷
[কর্মকাণ্ডানুযায়ী তৃতীয় অনুবাকে দীক্ষিত কর্তৃক দেবযজন বা দেবপূজার অধিকারের বিষয় পরিবর্ণিত। কিন্তু সেই সম্পর্কেও এক বিশেষ বিধি আছে। দেবযজনে অধিকার লাভের পূর্বে দীক্ষিত ব্যক্তিকে ব্রতপালন দ্রব্য সম্পাদন করতে হয়। এ ছাড়া, দীক্ষিত হলেও, তার দেব্যজনে অধিকার জন্মায় না। তাই এই অনুবাকের প্রথম কয়েকটি মন্ত্রে, সোমযাগ সম্পাদনে সোম-ক্রয়ণ ইত্যাদির পূর্বেই ব্রতপান ইত্যাদির বিষয় অভিহিত হয়েছে। এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির বিনিয়োগ পরিদৃষ্ট হয়;-দৈবীং ধিয়ং প্রভৃতি মন্ত্রে হস্ত ইত্যাদি প্রক্ষালন; তারপর আচমন ইত্যাদি ক্রিয়া সম্পাদনের পর যে দেবা প্রভৃতি মন্ত্রে ব্রতপয়ঃ পান করণীয়। অগ্নে ত্বং প্রভৃতি মন্ত্রে অগ্নি প্রজ্বালিত করে, ত্বমগ্নে প্রভৃতি মন্ত্রে সেই অগ্নির উদ্দেশে জপ করবার বিধি। বিশ্বে দেবা পুষা সন্যা প্রভৃতি মন্ত্রে সনিহারানুশাসন, দেবঃ সবিতা, বসো চন্দ্রমসি প্রভৃতি ছয়টি মন্ত্রে পরিগ্রহ। তারপর বায়বে ত্বাং প্রভৃতি চারটি মন্ত্রে গরুকে স্পর্শ করতে হয়। দেবীরাপঃ প্রভৃতি মন্ত্রে জলের মধ্যে লোষ্ট নিক্ষেপ করে, সেই লোষ্টকে জলের দ্বারা বিমর্দন এবং পরিশেষে ভদ্রাদভি প্রভৃতি মন্ত্রে রথে গমন করে এদং প্রভৃতি মন্ত্রে যাগভূমিতে অবস্থিতি। বলা বাহুল্য, বিনিয়োগ সংগ্রহের উল্লিখিত বিনিয়োগ অনুসারে ভাষ্যকার মন্ত্রের ব্যাখ্যা ইত্যাদি নিষ্কাশন করেছেন। আর সেই বিনিয়োগ অনুসারেই ভাষ্যে মন্ত্রের ভাব প্রকটিত হয়েছে।–ক্রিয়াকর্মে মন্ত্রগুলি যে ভাবেই প্রযুক্ত হোক, সে বিষয়ে আমাদের কিছু বক্তব্য নেই। আমরা কেবল আধ্যাত্মিক বিচারে মন্ত্রের নিগুঢ় ভাব লক্ষ্য করে তা মর্মার্থে প্রকাশ করেছি। তাই আমাদের অর্থ অনেক স্থলে ভাষ্য থেকে স্বতন্ত্র বলে উপলদ্ধ হবে। কয়েকটি স্থলে অবশ্য ভাষ্যকারের সাথে আমাদের মন্ত্রার্থে বিশেষ মতদ্বৈষ হয়নি । ৩।
মর্মার্থ- হে শুক্ল, হে জ্যোতির্ময় জ্ঞানদেব! আমার এই দেহলক্ষণে বিদ্যামানতাই (শরীরই) আপনার আশ্রয়স্থান; সকলের অনুভূয়মা শুদ্ধসত্ত্বই আপনার তেজঃ অর্থাৎ প্রকাশ-রূপ; আমার এই দেহের সাথে একীভূত হোন, (অথবা-একীভূত হয়ে) আপনি শুদ্ধসত্ত্বকে প্রাপ্ত হোন। (প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আপনি জ্ঞানরূপে হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হয়ে, আমার হৃদয়স্থিত শুদ্ধসত্ত্বের সাথে মিলিত হোন)। হে শুদ্ধসত্ত্বের অঙ্গীভূত ভক্তি! আপনি আমার হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত থেকে বিশ্বব্যাপী সেই ভগবানের প্রতি প্রীতিযুক্ত হয়ে, আমার শক্তিবর্ধক হোন। (ভাব এই যে, ভগবৎ-প্রীতিসাধিকা ভক্তি আমার হৃদয়ে আবির্ভূত হয়ে আমার প্রাণশক্তি বর্ধন করুন–এই আকাঙ্ক্ষা)। পূর্বোক্ত গুণে অন্বিতা সত্যসহজাতা ভক্তির অনুবর্তী হলে, আমি আমার এই জীবনের দৃঢ়তা প্রাপ্ত হতে পারি। সেই সঙ্কল্পে স্বাহামন্ত্রে হবিঃ-অর্পণ করছি। আমার উদ্বোধন-যজ্ঞ সুসিদ্ধ হোক। (ভাব এই যে, আমার হৃদয় ভগবৎ-ভক্তিতে পূর্ণ হোক)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি তেজঃস্বরূপ হও, পরম আনন্দদায়ক হও, মরণরহিত নিত্য হও, সর্ব-দেবভাবের প্রাপক হও। (ভাব এই যে, সেই শুদ্ধসত্ত্ব আমাতে জাগরিত হোক)। হে আমার মন! জ্ঞানাধারের দৃষ্টিকে প্রাপ্ত হও, এবং জ্ঞানদেবের নেত্রের তারকাকে প্রাপ্ত হও; (ভাব এই যে,জ্ঞানের দৃষ্টি তোমার প্রতি পতিত হোক অর্থাৎ তুমি একান্তে জ্ঞানের অনুসারী হও)। যে অবস্থায় গমনের জন্য তুমি জ্ঞানীর সাথে দীপ্যমান অর্থাৎ সম্মিলিত হও, ত্বরিৎ-সৎকর্মর্তার দ্বারা সেই অবস্থায় অগ্রসর বা উপনীত হও। (ভাব এই যে, –জ্ঞানীকে অনুসরণ করে সৎকর্মের অনুষ্ঠানে তুমি জ্ঞানবান্ হও)। হে শুদ্ধসত্ত্বের অঙ্গীভূতে ভক্তিরূপিনি দেবি! আপনি চিৎস্বরূপা চৈতন্যরূপা চিন্ময়ী অথবা অচেতনে চেতনা-সম্পাদয়িত্রী হন; আপনি মনঃস্বরূপা সর্বজ্ঞা অথবা সঙ্কল্প-বিকল্প-বিরহিতা নির্বিকল্পরূপা হন; আপনি নিশ্চয়রূপাত্মিকা প্রজ্ঞানস্বরূপা হন। আপনি সঙ্কৰ্ম-সমূহের পূর্ণর্তাসাধনকী অথবা অভীষ্টপূরণ কত্রী হন; আপনি অমিতেজা অজেয় হন; আপনি যজ্ঞস্বরূপা অথবা সকলের বন্দনীয়া ও নিখিল প্রাণিগণের হৃদয়ে ধারণযোগ্যা হন; আপনি আদি-অন্ত-রহিতা অনন্তরূপা হন; (অতএব আপনি আদি-অন্ত সর্বত্র সর্বতোভাবে শ্রেষ্ঠা অথবা সকলের বরণীয় হন। (এই মন্ত্রাংশে দেবী ভগবতীর স্বরূপ ব্যক্ত হয়েছে। ভাব এই যে,-হে দেবি! আপনি সর্বাত্মিকা সৎ-চিৎ-আনন্দরূপা ষড়েশ্বর্যশালিনী। অতএব, আপনি সকলেরই বরণীয়া পূজা। বিশ্বের সকল লোকই আপনাকে কামনা করে। আমরাও আপনার করুণা প্রার্থনা করছি। কৃপা করে, আপনি আমাদের নিকট আপনার মহিমা ব্যক্ত করুন এবং আমাদের আপনার সাথে সংযুক্ত করুন। মন্ত্রে এইরকম প্রার্থনার ভাব প্রকাশ পেয়েছে)। হে দেবি! পূর্বোক্ত-গুণোপে আপনি, আমাদের পরিত্রাণের জন্য সুষ্ঠুভাবে আমাদের অভিমুখী অর্থাৎ আমাদের সহজপ্রাপ্ত হোন; অথবা, প্রথমতঃ আমাদের সত্ত্বসমন্বিত করুন, পরে আমাদের সম্যকরকমে আপনার অভিমুখী করুন; অথবা, আমাদের শুদ্ধসত্ত্ব নিয়ে আমাদের হৃদয়ে আপনি অধিষ্ঠিত হোন। প্রজ্ঞানরূপী সেই মিত্রদেব, আপনাকে শ্রেষ্ঠপ্রদেশে বন্ধন করুন অর্থাৎ আমাদের হৃদয়ে দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত করুন। সর্বদশী সঙ্কর্ম স্বামী ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত সৎ-ভাব-পোষক সর্বসংরক্ষক পূষা দেবতা (আমাদের ) অসৎ-মার্গ হতে রক্ষা করুন। (মন্ত্রের এই অংশের প্রার্থনার ভাব এই যে,–হে দেব! আপনি আমাদের সত্ত্ব-সমন্বিত করুন, আর সেই সত্ত্বভাব-সহযুত হয়ে আপনি আমাদের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হোন। যেন অকিঞ্চন আমরা ভগবৎ-প্রীতির সাধনে সমর্থ হই এবং মোক্ষ লাভ করি)। ভক্তিরূপিণি হে দেবি! সন্তানের হিত-অভিলাষিণী সকল জননীই আপনাকে অনুস্মরণ করুন; (অর্থাৎ, ইহজগতে সকল জননীই ভগবানে ভক্তিপরায়ণা হোন); সেইরকম, সন্তানহিতকামী সকল জনকই আপনাকে অনুস্মরণ করুন; (অর্থাৎ-সংসারের সকল পিতাই ভগবানে ভক্তিপরায়ণ হোন); এইভাবে, সমানগর্ভস্যুত অর্থাৎ মনুষ্যপর্যায়ভুক্ত সকল ভ্রাতাই আপনাকে অনুস্মরণ করুন (অর্থাৎ ভগবৎ-ভক্তি-সমন্বিত হোন); এইরকম স্বদলভুক্ত সকল মিত্রজন আপনাকে অনুস্মরণ করুন;(অর্থাৎ, সকল মনুষ্যই ভগবানে ভক্তিপরায়ণ হোন)। হে দ্যোতমান-আত্মনে! অশেষ-হিতসাধিকা সেই আপনি, আমাদের দেবভাব প্রদান করুন। আর, ভগবান্ ইন্দ্রদেবের নিমিত্ত আমাদের শুদ্ধ সত্ত্বকে বহন করে নিন; রুদ্রভাবাপন্ন দেব (অর্থাৎ দেবতার কঠোর ভাব) আপনাতে অবস্থিত হোন, অর্থাৎ আপনাকে পেয়ে আমাদের প্রতি রোষ প্রকাশে প্রতিনিবৃত্ত হোন; আর, শুদ্ধসত্ত্বভাব-সহযুতা হয়ে, আপনি আমাদের হৃদয়ে চিরবিদ্যমানা থাকুন। (মন্ত্রের তাৎপর্য এই যে,সংসারের সকলেই ভগবৎ-ভক্তি-পরায়ণ হোক; ভগবৎ-ভক্তিই মানুষকে পরমপদ প্রদান করে)। ৪।
[ভাষ্যের মত এই যে,–এই অনুবাকের প্রথম মন্ত্রটি অগ্নিকে অথবা হিরণ্যকে সম্বোধন করে প্রযুক্ত হয়েছে এবং দ্বিতীয় মন্ত্রটি সোময়নি-রূপা বাক-সম্বোধনে প্রযুক্ত। কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে মন্ত্রের প্রয়োগ অনুসারে প্রথমটির অর্থ-হে শুক্ল অর্থাৎ দীপ্যমান হিরণ্য! এই দৃশ্যমান আজ তোমার শরীর, আর এই আজ্যে প্রক্ষিপ্যমাণ হিরণ্য তোমার বর্চঃ অর্থাৎ তেজঃ। হে অগ্নি! তোমার এই আজ্যরূপ তনুতে তুমি একীভূত হও এবং তার পর ভ্ৰাজকে অর্থাৎ স্বর্ণের দীপ্তিকে তুমি প্রাপ্ত হও। আর একরকম অর্থে ভ্ৰাজং পদে সোমং অর্থ গ্রহণ করায় ভাব এসেছে-তুমি সোমকে প্রাপ্ত হও। এইভাবে ভাষ্য-অনুসারে, দ্বিতীয়, মন্ত্রের অর্থ হয়েছে-হে বাক্! তুমি বেগযুক্ত আছ। তুমি কেমন? না–মনের দ্বারা নিয়মিতা আর যজ্ঞার্থে প্রীতিযুক্তা। শুক্লযজুর্বেদে উবটের ব্যাখ্যায় বিষ্ণবে পদের প্রতিবাক্যে বিষ্ণো সোমস্য অর্থ গৃহীত হয়েছে। সেই অনুসারে ভ্ৰাজং পদেও সোম বোঝায়, বিষ্ণু পদেও সোম বোঝায়। হায় সোম!-বেদের অঙ্গে যে তুমি কত মূর্তিতেই বিচরণ করছি, কে তার ইয়ত্তা করবে! সোম যে হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্ব-ভাব সেটা বুঝতে কষ্ট কোথায় তা আমরা বুঝি না। তৃতীয় মন্ত্রটি–কেন হিরণ্যের সম্বোধনে প্রযুক্ত হবে? আমাদের মতে বিষ্ণবে জুষ্টা ভক্তির সাহায্যে যে শুদ্ধসত্ত্বভাব সঞ্জাত হয়, এখানকার সেটিই লক্ষ্যস্থল। চতুর্থ মন্ত্রের, ভাষ্যমতে, সম্বোধন হিরণ্য, সূর্য এবং অগ্নি। আমরা কিন্তু মন্ত্রটি হিরণ্য, সূর্য, অগ্নি অথবা কৃষ্ণাজিন সম্বন্ধে প্রযুক্ত না হয়ে মনঃ-সম্বন্ধে প্রযুক্ত বলে মনে করি। ভাষ্যকার বলেন, পঞ্চম ও ষষ্ঠ মন্ত্র দুটিতে বাক্ দেবতারূপ সোমক্রয়ণীকে সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু ভাষ্যকারের অধ্যাহৃত সম্বোধন পদ মন্ত্রের মধ্যে দেখা যায় না। মন্ত্রে সোমক্রয়ণি বা গবাদি কিছুরই উল্লেখ নেই। আমরা মনে করি, পূর্ব পূর্ব মন্ত্রের সাথে এই উচ্চভাবে ভাবান্বিত মন্ত্র দুটির সম্বন্ধ সূচিত হয়েছে। পঞ্চম মন্ত্রে দেবতার স্বরূপ-তত্ত্ব এবং ষষ্ঠ মন্ত্রে দেবতার নিকট প্রার্থনার বিষয় পরিব্যক্ত হয়েছে। সপ্তম ও অষ্টম মন্ত্রেও, আমরা এক উচ্চ ভাব প্রকটিত দেখি। অথচ ভাষ্যে মন্ত্র দুটির যে অর্থ প্রকাশ করা হয়েছে, তার মর্ম এই যে,-হে সোমক্রয়ণি গো! সোম-আহরণে প্রবৃত্ত তোমাকে তোমার মাতা অনুমতি দান করুন, তোমার পিতা অনুজ্ঞা করুন, তোমার সহোদর ভ্রাতা এবং তোমার সমান গৃহে জাত তোমার সখা তোমায় অনুমতি দিন। হে সোময়নি দেবি! তুমি ইন্দ্রদেবের জন্য সোম (অবশ্যই মাদক-দ্রব্য) আনয়ন করতে যাও। সোমগ্রহণ পূর্বক অবস্থিত তোমাকে রুদ্রদেব আমাদের প্রতি নিবর্তন করুন, অথবা প্রবর্তন করুন। সোমদেব যার সখা, সেরকম সোমসখা অর্থাৎ সোমের সাথে তুমি সুমঙ্গলের সাথে পুনরায় আমাদের নিকট আগমন করো। রুদ্রের পথে যেও না; মিত্রের পথে যেও। তাহলেই তুমি স্বস্তি পাবে।–কর্মকাণ্ডের দিক থেকে এমনই অর্থ সমীচীন। কিন্তু এই মন্ত্রগুলির আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে কি রূপ পেতে পারে, আমাদের মর্মার্থেই তা প্রকাশিত] । ৪
মর্মার্থ- হে ভক্তিরূপিণি দেবি! আপনি বসুরূপা অর্থাৎ পৃথ্বীরূপা হন, আপনি অনন্তরূপা অর্থাৎ অশেষরূপধারিণী হন, আপনি অনন্তের অংশীভূতা অর্থাৎ দেবস্বরূপা হন, আপনি রুদ্রারূপা অর্থাৎ কঠোরতাময়ী হন, আপনি চন্দ্ররূপা হন, অর্থাৎ হ্লাদিনী কোমলতাময়ী হন। (এই মন্ত্রাংশ, ভক্তিরূপে অবস্থিত দেবীর স্বরূপ পরিকীর্তন করছে। সেই দেবী পৃথ্বীরূপে বিরাজিতা, সেই দেবীই সমষ্টিভূতা, সেই দেবীই অংশরূপা, সেই দেবীই সংহারমূর্তিধারিণী, সেই দেবীই আনন্দরূপিণী। কোমল-কঠোর সকল ভাব এবং ক্ষুদ্র বৃহৎ সকল রূপ সেই দেবীতেই যুগপং বিদ্যমান আছে। জ্ঞানী (জ্ঞানদেব) সংসারের সুখের নিমিত্ত আপনাকে সংযমন অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত করুন; (ভাব এই যে, জ্ঞানিগণের সহায়তায় আপনার প্রসাদে ইহলোক পরমানন্দ লাভ করুক)। কঠোরভাব (রুদ্রদেব) সর্বংসহা ধরিত্রীর সাথে আপনাকে রক্ষা করবার কামনা করুন; অর্থাৎ আপনার প্রভাবে সৃষ্টি সংহারমূর্তি রুদ্রের রোষ হতে রক্ষা-প্রাপ্ত হোক। (মন্ত্রের তাৎপর্যার্থ এই যে,-ভগবৎ-ভক্তিই সকল সুখের মূলীভূতা। তার কৃপাতেই মানুষ রক্ষাপ্রাপ্ত হয়)। হে ভক্তিরূপিণি দেবী! পৃথিবীর (অর্থাৎ বিশ্বের শীর্ষস্থানে দেব-যজন-প্রদেশে অবস্থিতা আপনাকে, অনুক্রমে আমি আমার প্রতি ক্ষরণ প্রবহণ বা আকর্ষণ করছি। (মন্ত্রাংশ সঙ্কল্পমূলক আত্ম-উদ্বোধক)। হে ভক্তিরূপিণি দেবি! তুমি ভগবৎ-সম্বন্ধযুত কর্মের অবলম্বন হও। অথবা হে আমার কর্ম! তুমি ভক্তিযুতা স্তুতির আশ্রয় হও; (ভাব এই যে, আমার কর্ম ভগবানে ভক্তিযুত হোক)। ভক্তিসহযুতা করে, হে আমার কর্ম, স্বাহা মন্ত্রে তোমাকে আমি ভগবানে সমর্পণ করছি। (আমাদের) দুবুদ্ধিরূপ শত্রু বিনাশপ্রাপ্ত হোক; সৎ-ভাবের প্রতিবন্ধক রিপুশত্রুগণ বিতাড়িত ও বিনাশিত হোক। (ভাব এই যে,-ভক্তির প্রভাবে আমাদের সকল শত্রু বিনষ্ট হোক। এই সৎকর্মের প্রভাবে আমি যেন দুবুদ্ধিরূপ শত্রুর মূলোচ্ছেদ করতে সমর্থ হই। যে সকল বহিঃ ও অন্তঃশত্রু প্রার্থনাকারী অনুষ্ঠানপরায়ণ আমাদের হিংসা করে, সেই উভয়রকম আধিভৌতিক শত্রু আমাদের এই কর্মরূপ আয়ুধের দ্বারা সমূলে বিনষ্ট হোক। (ভাব এই যে, আমাদের কর্মের দ্বারা আমরা যেন সকল শত্রুকে নাশ করতে সমর্থ হই)।
হে ভক্তিরূপিণি দেবি! পরমার্থ ধন আমাদের দান করুন–এই প্রার্থনা। হে ভক্তিরূপিণি দেবি! আপনাতে পরমার্থরূপ ধনসমূহ আছে। সেই ধন আপনি সকল লোকে স্থাপন করুন। (ভাব এই যে, –আমরা পরমধন প্রার্থনা করি। কেবল আমাদের নয়; পরন্তু বিশ্বের সকলকেই পরমধন প্রদান করুন। সকলের জন্য মঙ্গল-কামনা এখানে স্পষ্টরূপে স্বীকৃত)। হে ভক্তিরূপিণি দেবি! আপনি পরম শক্তিসম্পন্ন সকলের বশীভূতকারী শক্তির দ্বারা আমার প্রতি সম্যক্ করুণাপরায়ণ হোন। হে ভক্তিরূপিণি দেবী! আপনার অনুগ্রহে শোভন-কর্মশক্তি-সম্পন্না আপনাকে যেন প্রাপ্ত হই। (ভাব এই যে,ভগবৎ-ভক্তি আমার সাথে চিরসম্বন্ধযুত হোক)। অপিচ, শোভনশক্তিসম্পন্ন, শক্তির আধারভূতা হে ভক্তিরূপিণি দেবি! আপনার সন্দর্শন লাভ করে যেন সৎকর্মের সাধন-সামর্থ্য লাভ করতে পারি। (ভাব এই যে, আপনার প্রসাদে ও সহচারিত্বে সঙ্কৰ্ম-সাধনে সামর্থ্য পাবার কামনা করছি)। হে ভক্তিরূপিণি দেবি! অর্চনাকারী আমরা সেই ধনসঞ্চয়ে অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্ব-সঞ্চয়ে যেন বিমুখ না হই; (অর্থাৎ আমাদের পরমার্থরূপ ধন-সঞ্চয়ে যেন কোনও বিঘ্ন না ঘটে, তা-ই করুন)। ৫
[পঞ্চম অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে, সোমক্রয়ণি সংগ্রহে যাওয়ার সময়ে যে যে প্রক্রিয়া-পদ্ধতির অনুসরণ করতে হয়, তা-ই উক্ত হয়েছে। সে হিসেবে, কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে, সোময়ণিই অনুবাকের মন্ত্রগুলির লক্ষ্য। প্রথম মন্ত্রে শুক্র শব্দে দীপ্তিমান্ সোম বিবক্ষিত। চন্দ্র শব্দে আহ্লাদকারী সুবর্ণ উপলক্ষিত। মন্ত্রের অর্থ-হে সোমক্রয়নি! তুমি বসু প্রভৃতি দেবতার অপেক্ষিত সোম-যাগসাধক বলে ঐ সকল দেবতার স্বরূপ হও। শুক্লযজুর্বেদ-সংহিতা-য়ও এই মন্ত্র দৃষ্ট হয়। সেখানে উবটের ও মহীধরের ভাষ্যে একটু অর্থান্তর পরিদৃষ্ট হয়। সে অর্থ এই–হে গো! তুমি বসুরূপা হও, তুমি দ্বাদশ আদিত্যরূপা হও। তুমি একাদশ রুদ্ররূপা হও, তুমি চন্দ্ররূপা হও। বৃহস্পতি সুখে তোমায় রমণ করুন অথবা সংযমন করুন। রুদ্র, বসুগণ প্রভৃতি অষ্ট দেবতার সাথে তোমাকে রক্ষা করবার কামনা করুন। এই গৌঃ সম্বোধনে গাভীকে কি অন্য কোনও অপার্থিব বস্তুকে সম্বোধন করা হয়েছে, তা বোঝবার উপায় নেই। কর্মকাণ্ডে গৌঃ অর্থে গাভী থাকুক, তাকে বৃহস্পতি সুখে রমণ করুন, তাতে আমাদের কিছু বলবার নেই। তবে আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে আমরা ঐ সম্বোধনে জ্ঞানকে বা জ্ঞানস্বরূপিণী দেবীকে আহ্বান করা হয়েছে বলে মনে করেছি। গো অর্থে জ্ঞানরশ্মি–আমরা সঙ্গত ভাবেই সর্বত্রই তা উল্লেখ করেছি। দ্বিতীয় মন্ত্রটিও সোমক্রয়ণি সম্বোধনে বিনিযুক্ত। আমাদের মতে, মন্ত্রের সম্বোধ্য–সেই ভক্তিরূপিণী দেবী। মন্ত্রের বৃহস্পতি পদে আমরা জ্ঞানীকে বা জ্ঞান দেবতাকে লক্ষ্য করেছি। তৃতীয় ও সপ্তম, অষ্টম ও নবম মন্ত্রে হোম সম্পাদন করতে হয়। ভাষ্য অনুসারে মন্ত্রের সম্বোধ্য আজ্য! আমরা পূর্বাপর সঙ্গতির প্রতি লক্ষ্য রেখে, যে অর্থ পরিগ্রহণ করেছি তার যৌক্তিকতা যথেষ্ট আছে। সপ্তম থেকে নবম পর্যন্ত মন্ত্রের আধ্যাত্মিক ভাব মর্মার্থে প্রকাশিত। চতুর্থ, পঞ্চম এবং ষষ্ঠ মন্ত্র তিনটিতে আমরা অন্তঃশত্রু-নাশের আকাঙ্ক্ষা ও সঙ্কল্প পরিব্যক্ত বলে মনে করি। ভাষ্যমতে দশম মন্ত্রের সম্বোধ্য সোমক্রয়নি। আমাদের মতে পূর্ব পুর্ব মন্ত্রের মতো এই মন্ত্রেরও সম্বোধ্য ভক্তিরূপিণী দেবী। উর্বশী পদে ভাষ্যকার উর্বশী দেবী অর্থ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমাদের অভিপ্রায়-উর্বশী পদে সকলের বশকারী শক্তিকে বোঝাচ্ছে। একাদশ মন্ত্রে ভাষ্যকার প্রথমে যজমানকে এবং পরে সৌময়ণিকে সম্বোধন করেছেন। সেই অনুসারে মন্ত্রের অর্থ হয়েছে-হে যজমান! তোমার সাথে যেন গমন করি। অথবা হে সোময়নি! তোমার অনুগ্রহে আমি যেন পতির সাথে গমন করতে পারি। ত্বষ্টা–স্ত্রীপুরুষ মিথুন ক্রমে পশু ও মনুষ্যগণের শরীর নির্মাতা। সেই ত্বষ্টার অনুগ্রহে, হে সোময়নি! তোমার মতো বীর পুত্র যেন লাভ করতে সমর্ত হই। আমাদের মতে, পূর্ব পূর্ব মন্ত্রের মতো এ মন্ত্রেরও সম্বোধন-ভক্তিরূপিণী দেবী। লৌকিক যাগযজ্ঞের প্রয়োগ বশতঃ ভাষ্যকারের বক্তব্য বা বিশ্লেষণ অসম্ভব নয়। কিন্তু আধ্যাত্মিক যজ্ঞে কোন্ উক্তির কি সার্থকতা তা আমাদের মর্মার্থেই প্রকাশিত] ॥ ৫৷
মর্মার্থ- হে দেব! আমার সূক্ষ্ম-অবয়ব আপনার সূক্ষ্ম-অবয়বের সাথে মিলিত হয়ে বিলীন হয়ে যাক। অপিচ, আমার স্কুল-অবয়ব আপনার স্কুল-অবয়বের বা অংশের সাথে সম্মিলিত হোক। আপনার করুণা আমাদের অভীষ্ট পুরণ করুন। (অর্থাৎ আপনি কৃপা করে আমাদের অভিষ্ট পুরণ করুন)। আপনার স্নেহ-অনুরাগ অথবা আপনার অংশভূত শুদ্ধসত্ত্ব আমাদের পরমানন্দ-দানের নিমিত্ত বিনাশরহিত ও ক্ষয়রহিত হোক। হে দেব! আপনি সকলের সখিভূত হন অর্থাৎ বিশ্বের জড় অজড় সকল পদার্থে নিত্যবিদ্যমান রয়েছেন। আপনার সম্বন্ধি প্রকৃষ্ট জ্ঞান একমাত্র শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারাই অধিগত হয়। জ্ঞানই সকলের মূল। জ্ঞান ভিন্ন ভগবানের স্বরূপ জানতে পারা যায় না। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক এবং ভগবানের স্বরূপ বিজ্ঞাপক। মন্ত্রে আত্মার আত্মসম্মিলনের আকাঙ্ক্ষা বর্তমান। প্রার্থনার ভাব এই যে,-ভগবানের সাথে সম্বন্ধ আমাদের অবিচ্ছিন্ন হোক; অপিচ, তার সাথে সম্মিলন-সাধনে আমাদের পুনরাবৃত্তি অসম্ভব হোক)। দ্যাবাপৃথিবীর অভ্যন্তরে সর্বত্র বর্তমান অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী, মেধাবী অর্থাৎ সৎকর্মের ক্রমবেত্তা অথবা অশেষ-প্রজ্ঞানসম্পন্ন, সত্যস্বরূপ অথবা অর্চনাকারিদের সৎপথে নয়নকর্তা, সঙ্কর্মের ফলস্বরূপ রত্নধারণকারী অথবা মোক্ষফল-রূপ শ্ৰেষ্ঠরত্নের ধারক বা পোষক, সকলের প্রীতির সামগ্রী অথবা সকলের প্রতি প্রীতিসম্পন্ন-নিখিল বিশ্বের প্রতিস্থানীয়, মননযোগ্য অথবা অর্চনাকারিদের সুমতি বিধায়ক, ক্রান্তদর্শী (সর্বদশী) সেই প্রসিদ্ধ সবিতৃদেবকে (জ্ঞানপ্রেরক দেবতাকে) প্রকৃষ্টভাবে (কায়মন ও বাক্যের দ্বারা) অর্চনা করি অর্থাৎ হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করি। (এই মন্ত্রাংশ সঙ্কল্পমূলক এবং আত্ম-উদ্বোধনসূচক)। যে সবিতৃদেবের ১(জ্ঞানদেবতার) অপরিমেয় অর্থাৎ সর্বপ্রকাশশীল দীপ্তি জ্ঞানকিরণ, নিখিল সৎ-ভাব বিধানের জন্য (নিখিল সৎ-ভাব-জনন বা সৎকর্ম সম্পাদনের নিমিত্ত) গগনমুখী অর্থাৎ সাধকদের উচ্চ হৃদয়-অভিমুখী হয়ে, সকল বস্তুকে দীপ্তিশালী করে অর্থাৎ ইহজগতে সত্ত্বভাব ইত্যাদি উৎপন্ন (প্রেরণ) করে; জ্ঞানপ্রদ অর্থাৎ হিরণ্যের মতো জ্ঞানধন-প্রদানে মুক্তহস্ত, শোভনক্রতুসম্পন্ন অথবা সৎকর্মের আধার, সেই সবিতৃদেব, লোকসমূহের হিতসাধনে অসীম শক্তিসম্পন্ন হন, অর্থাৎ কল্পনাতেও তার শক্তির শেষ জানা যায় না। (এই মন্ত্রাংশে ভগবানের গুণ এবং তার স্বরূপ পরিব্যক্ত হয়েছে)। হে দেব! নিখিল জনগণের শ্রেয়ঃ সাধনের জন্য অথবা সৎকর্মশীল জীবনের জন্য অর্থাৎ হিতের নিমিত্ত আপনাকে অর্চনা অর্থাৎ পূজা করছি। হে দেব! প্রাণবায়ু-সংরক্ষণের অর্থাৎ সকর্মশীল জীবন লাভের নিমিত্ত আপনাকে অৰ্চনা (আরাধনা) করছি। হে দেব! ব্যানবায়ু সংরক্ষণের নিমিত্ত অর্থাৎ শরীরবল-রক্ষায় কর্মশক্তি-লাভের জন্য আপনাকে অর্চনা (আরাধনা) করছি। হে দেব! বিশ্ববাসী সকলকে আপনি অনুপ্রাণিত করুন অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বদানে জীবনদান করুন। (এই মন্ত্রাংশও প্রার্থনামূলক। প্রাণিগণের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হয়ে ভগবান্ জ্ঞানকিরণের দ্বারা তাদের শুদ্ধসত্ত্ব সমন্বিত সৎ-মার্গগামী করুন, অপিছু তাদের মৃত্যুতুল্য অজ্ঞান-আবরণ অপসারিত করুন– এটাই প্রার্থনা। হে দেব! সকল প্রজা (অর্থাৎ বিশ্ববাসী সকলে) আপনাকে জীবিত অর্থাৎ হৃদয়ে উদ্দীপিত করুক। (ভাব এই যে, বিশ্বের সকলে যাতে আপনাকে হৃদয়ে ধারণে উদ্বুদ্ধ হয়, আপনি তা করুন) ॥ ৬৷৷
[এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি সোম-ক্রয় বিষয়ক। সোম পরিমাণ কালে যেমন প্রক্রিয়া ইত্যাদি অবলম্বিত হয়, মন্ত্রে তা-ই উল্লিখিত হয়েছে। বিনিয়োগ সংগ্রহে যেমন ক্রমে মন্ত্রগুলি নির্দেশিত সেইরকম ক্রমেই ভাষ্যকার মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাশন করেছেন। প্রথম মন্ত্রটি সোম সম্বোধনে বিনিযুক্ত। সেই অনুযায়ী ভাষ্য অনুসারে মন্ত্রের অর্থ হয়েছে-তোমার এক অংশের সাথে অপর অংশের সংযোগ-সাধন করো। তোমার কোনও অংশই যেন বায়ু প্রভৃতির অভিঘাতে বিযুক্ত না হয়। তোমার এক পর্বের সাথে অন্য পর্ব সংযুক্ত হোক। তোমার গন্ধ যজমানের কামকে পালন করুক, দেবগণের হর্ষের জন্য তোমার রস বিনাশরহিত হোক। হে সোম! তুমি অমাত্য তুমি যজমান এবং দেবগণের সাথে সর্বদা বর্তমান আছ। তোমার স্বীকার হিরণ্যসাধ্য অর্থাৎ হিরণ্য বা স্বর্ণের দ্বারাই সোম ক্রয় করতে পারা যায়। বলা বাহুল্য, ভাষ্যকারের এই অর্থ কর্মকাণ্ডের অনুসারী। ভাষ্যকার এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ পর্যন্ত মন্ত্র পাঁচটির ভাষ্যও রচনা করেছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মন্ত্রের ভাষ্যে তিনি সবিতৃদেবের (সূর্য বা কোন্ দেবতা ঠিক বোঝা যায় না) গুণমহিমার বিষয় উল্লেখে ব্যাখ্যা করেছেন। চতুর্থ পঞ্চম ও ষষ্ঠ-মন্ত্রের ব্যাখ্যা-ব্যপদেশে ভাষ্যকার যে ভাব ব্যক্ত করেছেন, তাতেও সোম-সম্বোধন প্রযুক্ত। চতুর্থ মন্ত্রে সোমকে উষ্ণীষের দ্বারা বন্ধন করতে হয়। তাতে মন্ত্রের অর্থ হয়,-হে সোম! প্রজাগণের উপকারের জন্য তোমাকে বন্ধন করি। অঙ্গুলির মধ্যে বিবর করে পঞ্চম ও ষষ্ঠ মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়। চতুর্থ মন্ত্রে উষ্ণীষের মধ্যে যে সোমদেবতাকে বন্ধন করা হয়েছে, তার শ্বাসরোধ না হয়, এই জন্য পূর্বোক্ত বিবর করবার প্রয়োজন–সূত্রে এমনই উক্ত হয়েছে। তাতে পঞ্চম ও ষষ্ঠ মন্ত্রের যে অর্থ হয়, যথাক্রমে তা এই,-হে সোম! প্রাণার্থ তোমাকে গ্রহণ করি, প্রাণার্থ তোমাকে ক্ষরিত করি। হে সোম! প্রজাগণ তোমার শ্বাস করুক, অর্থাৎ তোমাকে অনুসরণ করে প্রজাগণ শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলে তোমাকে জীবিত রাখুক এবং তুমি শ্বাসকারী প্রজাকে অনুসরণ করে শ্বাস-প্রশ্বাস নির্গত করো। তোমার এবং প্রজাদের কখনও শ্বাসরোধ না হয়,–এইরকম ভাবে পরস্পর পরস্পরকে অনুসরণ করে জীবিত থাকো। আমাদের আধ্যাত্মিক-ব্যাখ্যার সাথে এই ব্যাখ্যার আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আমাদের মত ভগবান যেমন প্রজ্ঞানস্বরূপ, সাধকও যেন সেইরকমই প্রজ্ঞানসম্পন্ন হোন; তিনি যেমন সকর্ম-মণ্ডিত, সাধকও তেমনই সৎকর্মপন্ন হোন। হোন-জ্ঞানবান, হোন-সৎকর্মসাধক; সঞ্চয় করুন–জ্ঞান-কিরণ, সম্পন্ন করুন–সকর্ম। তাহলে প্রজ্ঞানরূপী সৎকর্ম-মণ্ডিত ভগবানের করুণা-কণা-লাভে সমর্থ হবেন;–ততে সাধকের গতিমুক্তির পথ সুগম হয়ে আসবে] ॥ ৬।
মর্মার্থ- হে আমার মন (আত্মসম্বোধন)! তোমার মঙ্গলের জন্য বলপ্রাণপ্রদ, জ্ঞানদায়ক অর্থাৎ অমৃতপ্রদ, কর্মশক্তিদায়ক এবং পাপরূপ অন্তঃশত্রুর হন্তারক শুদ্ধসত্ত্বকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করি। হে আমার মন! তোমার কল্যাণের নিমিত্ত তেজঃস্বরূপ জ্যোতির্ময় অথবা সৎস্বরূপ শুদ্ধসত্ত্বকে তেজের বা জ্ঞানের সাহায্যে অথবা শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করি; পরমানন্দদায়ক বা কমনীয় শুদ্ধসত্ত্বকে কমনীয় শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা অর্থাৎ পরমানন্দদায়ক ভক্তি-প্রবাহের দ্বারা হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করি; অপিচ, অক্ষর, ক্ষয়রহিত শুদ্ধসত্ত্বকে ক্ষয়রহিত সৎকর্মের প্রভাবে বা ভক্তির প্রভাবে ক্রয় করি অর্থাৎ হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক এবং আত্ম-উদ্বোধনসূচক। ভাব এই যে, অক্ষর অব্যয় সেই ভগবাকে জ্ঞানভক্তিবিমিশ্র শুদ্ধসত্ত্বের বা সৎকর্মের দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া যায়। অতএব সেই শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ ভগবানের অনুগ্রহ লাভ করতে হলে শুদ্ধসত্ত্ব-সঞ্চয় এবং সৎকর্ম অনুষ্ঠান একান্ত কর্তব্য)। হে শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ দেব! আপনার সম্বন্ধি যে জ্ঞান সেই জ্ঞান আমাতে অবস্থিত হোক। (ভাব এই যে, হে দেব! আপনি প্রজ্ঞানের আধার। কৃপা করে আপনার অনন্ত প্রজ্ঞানের কণামাত্রও আমাদের প্রদান করুন)। শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ হে দেব! (আপনার সম্বন্ধি), পরমানন্দদায়ক সৎ-ভাবগুলি আমাদের মধ্যে অবস্থিত হোক। (ভাব এই যে,হে দেব! আপনি সৎ-ভাবের আধার। আপনাতে যে সকল সৎ-ভাব বিদ্যমান আছে, তাদের কিঞ্চিৎ আমাদের প্রদান করুন)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনি সঙ্কর্মের অথবা সৎকর্মপরায়ণ জনের আধারস্বরূপ অথবা শরীরের মতো অঙ্গী অর্থাৎ প্রধানস্থানীয় হন। (ভাব এই যে,-তপের প্রভাবে সঙ্কর্মের দ্বারা শুদ্ধসত্ত্ব উপজিত হয়)। অপিচ, হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনি ভগবানের আধারস্বরূপ অথবা শরীরের মতো অঙ্গীভূত হয়। (ভাব এই যে,-ভগবান শুদ্ধসত্ত্বে চিরঅবস্থিত)। তথাবিধ আপনার প্রসাদে সংসারের লোকসকলের পালন কার্যের দ্বারা পরিতুষ্ট হয়ে অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ লোকপালক হয়ে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের দ্বারা যেন আপনাকে অধিগত করতে পারি। (ভাব এই যে,শ্রেষ্ঠ-জ্ঞানের দ্বারাই শুদ্ধসত্ত্ব অধিগত হয়। তার দ্বারা যাতে বিশ্ববাসিগণের পরিপুষ্টি সাধিত হয়, আমি তা-ই করব; অর্থাৎ জনহিতসাধন যেন আমার জীবনের একমাত্র ব্রতের মধ্যে গণ্য হয়)। [বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের এমন দৃষ্টান্তই হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্য]।
অথবা,–হে শুদ্ধসত্ব! আপনি বহু আয়াসে অধিগত হন; আপনার সাহায্যে আমি সংসারের লোকসকলের পালনকার্যে যেন পরিপুষ্ট অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ লোকপালক হতে পারি। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনার মিত্রস্বরূপ সেই ভগবান আমাদের মধ্যে ক্রীড়াপর হোন; অর্থাৎ, আপনার সাথে আমাদের মধ্যে এসে বিরাজমান থাকুন। তাহলে, হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনার সম্বন্ধি অর্থাৎ আপনাতে যে পরমার্থরূপ ধন আছে, তা আমাকে প্রদান করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে আমরা যেন মোক্ষধন প্রাপ্ত হই)। হে শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ ভগব! আপনি আমাদের মধ্যে জ্ঞানজ্যোতিঃ বিচ্ছুরণ করুন। অপিচ, সৎ-ভাব-প্রতিবন্ধক শত্রুদের মধ্যে অজ্ঞান-অন্ধকার বিস্তার করুন; অর্থাৎ অন্ধকারে আবৃত করে তাদের বিনাশ করুন। হে শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ ভগবান্! আপনি সুমিত্র অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ সুহৃৎ হন। মিত্রভূত সহায়ক-রূপে আপনি আগমন করুন; অথবা জ্ঞানজ্যোতিঃরূপে আপনি আগমন করুন; অথবা জ্ঞানজ্যোতিরূপে আমাদের প্রতি অর্থাৎ আমাদের হৃদয়ে আগমন করুন, অর্থাৎ জ্ঞানজ্যোতিঃ দ্বারা আমাদের হৃদয় আলোকিত করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনা আমাতে শুদ্ধসত্ত্ব অবিচলিত হোক)। হে হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! ভগবানের কামনাপরায়ণ অথবা ভগবানের প্রীতিপ্রদ সুখহেতুভূত অর্থাৎ পরমসুখনিদান তুমি, ভগবানের অঙ্গীভূত সুখস্বরূপ পরমানন্দপ্রদ বিশ্বের আধারস্বরূপ অনন্ত সত্ত্ব-সমুদ্রে প্রবেশ করো, অর্থাৎ অনন্ত সত্ত্ব-সমুদ্রে মিশে যাও। (মন্ত্রে প্রার্থনাকারীর আত্ম-সম্মিলনের কামনা সুচিত হচ্ছে। ভাব এই যে, আমাতে শুদ্ধসত্ত্বের সাথে ভগবানের সম্মিলন ঘটুক)। হে নাদরূপ! হে দীপ্তিমান স্বপ্রকাশ! হে পাপহারক! হে বিশ্বপালক! হে সদানন্দরূপ! হে সকলের পোষক! হে সকলের জীবন অথবা আত্ম উক্তসম্পন্ন জনের প্রাণস্বরূপ! হে আপনারা সপ্তদেবগণ! আপনারা সম্মুখে বর্তমান অর্থাৎ আমাদের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত, সোমক্রয়ের জন্য আনীত অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্ব-ধারণে উদ্বোধিত, সমসামর্থক বা সৎ-ভাব ইত্যাদিকে পোষণ করুন (রক্ষা করুন); অপিচ, আপনারা আমাদের হিংসা করবেন না অর্থাৎ আমাদের সৎসম্বন্ধচ্যুত করবেন না, অথবা আমাদের পরিত্যাগ করে যাবেন না। অথবা শত্রুগণ যেন আপনাদের হিংসা না করে; অর্থাৎ হে দেবগণ! আপনারা এমন করুন, আমাদের হৃদয়ের অন্তঃশত্রুগণ যেন আমাদের হৃদয় হতে আপনাদের অপসারিত করতে সমর্থ না হয়। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনা এই যে,-হে দেবগণ! আপনারা এমন করুন, যেন আমাতে সকর্মের সামর্থ্যগুলি এবং সৎ-ভাব-সমূহ অবিচলিত থাকে; তাতেই আমি শুদ্ধসত্ত্বরূপ ভগবানকে প্রাপ্ত হবো) । ৭৷
[ষষ্ঠ অনুবাকে ক্রয়ের জন্য সোমের ওজন-পরিমাণ নির্ধারিত হয়েছে; এখন এই সপ্তম অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে হিরণ্য-বিনিময়ে সোম-ক্রয় কার্যের পরিসমাপ্তির বিষয় উল্লিখিত হচ্ছে। সায়ণাচার্যের মতে প্রথম মন্ত্রে সোমূ-বিক্রেতাকে সম্বোধন করে মন্ত্রের বিভিন্ন অংশে বলা হচ্ছে,-হে সোম-বিক্রেতা! আমি তোমার সোম ক্রয় করব। সে সোম কেমন? উর্জন্তং অর্থাৎ শারীরবলপ্রদ, পয়স্বন্তং অর্থাৎ প্রভূতরসোপেত এবং অভিমাতিষাহং অর্থাৎ পাপরূপ বৈরিগণের হন্তা। শুক্র এবং চন্দ্র পদ দুটিতে অমৃত পদের সহযোগে অবিনাশী তেজ এবং সুখের কামনা করা হয়েছে; আর তার দ্বারা সোম-বিক্রেতাকে জানান হচ্ছে, তোমার সোম এবং আমার হিরণ্য উভয়ই তুল্য-মূল্য। অতএব, আমার এই হিরণ্য তোমার সোমকে কিনতে সমর্থ। আমি তোমাকে কেবলমাত্র হিরণ্য প্রদান করছি না; অধিকন্তু তোমাকে সমীচীন একটি গাভী পূর্বেই প্রদান করেছি। অতএব, এখন তোমাকে যে হিরণ্য প্রদান করছি, তা তোমার অধিক লাভ বলে মনে করবে। শুক্লযজুর্বেদ-সংসিতায় প্রথম মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশ সম্বন্ধে ভাষ্যকার মহীধরের মন্তব্যের মর্ম এই, হে সোম! দীপ্যমান্ তোমাকে দীপ্যমান্ হিরণ্যের দ্বারা ক্রয় করি। তুমি (সোম) কেমন? ফলহেতু-প্রযুক্ত আহ্লাদকর, স্বাদুত্বে অমৃতের সমান।–ইত্যাদি। দ্বিতীয় মন্ত্রের কর্মকাণ্ডানুসারী অর্থ–হে সোম-বিক্রেতা। তোমাকে যে হিরণ্য প্রদান করা হলো, সেই সকল হিরণ্য প্রত্যাবৃত্ত হয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠিত হোক; অর্থাৎ, সোমের মূল্যস্বরূপ তোমার গাভী তোমার থাকুক; আমাদের হিরণ্য আমাদের প্রত্যর্পণ করো। তৃতীয় মন্ত্র পাঠ করবার পূর্বে একটি অজা বা ছাগকে পূর্বমুখে স্থাপন করে বলতে হয়–হে অজা! তুমি পুণ্যের দেহ হও। অপিচ,-হে অজ! তুমি প্রজাপতির দেহ হও। প্রজাপতি যেমন সকল দেবতার প্রিয়, অজাও সেইরকম সর্বদেবপ্রিয়। এরপর সোম-সম্বোধন। বলা হয়–হে সোম! উত্তম অজা-লক্ষণ-বিশিষ্ট এই পশু সম্বন্ধি অন্যান্য সহস্র পশুর দ্বারা তোমাকে ক্রয় করছি। অর্থাৎ অন্যান্য পশুর দ্বারা তুমি ক্রীত হয়েছ, কিন্তু তোমার নিজের দ্বারা নয়। অতএব তোমার বন্ধুত্ব প্রাপ্ত সোমের কর্মে প্রবৃত্তি বলে তোমার প্রসাদে তোমার অপত্যরূপ ধনসমূহের দ্বারা এবং পুত্র-পশু ইত্যাদি সহস্বরূপ পুষ্টির দ্বারা পুষ্ট হবো। হে অজা! প্রজাপতি তপস্বরূপ; তুমি তা থেকে উৎপন্ন হয়েছ, অতএব তুমি তাঁর সেই রূপ। অপিচ, তুমি প্রজাপতির স্বরূপ। এইভাবে কর্মকাণ্ডের পরিপুষ্টি-কল্পে অপরাপর সব মন্ত্রেরই ভাষ্য-প্রণোদিত অর্থের সমীচীনতা স্বীকৃত হলেও, আধ্যাত্মিক পক্ষে ভাষ্যের ভাব বড়ই বিসদৃশ বলে মনে হয়। কর্মকাণ্ডে প্রয়োগ-বিধি-সম্বন্ধে অবশ্য আমরা ভিন্নমত পরিপোষণ করি না; কিন্তু কতকগুলি ব্যাপারে আমাদের সংশয় রয়েছে। যেমন, মন্ত্রের মধ্যে সোমবিক্রেতার বা অজার সম্বোধন-মূলক পদ খুঁজে পাওয়া যায় না। মন্ত্রে পশুনা পদ আছে। সম্ভবতঃ তাই দেখেই ভাষ্যকার অজা সম্বোধন-পদ অধ্যাহার করেছেন।-ইত্যাদি। আমরা মনে করি, মন্ত্র কটি শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ ভগবানের এবং শুদ্ধসত্ত্বের সম্বোধনে প্রযুক্ত। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মন্ত্রে ভগবানের নিকট প্রার্থনা জানান হয়েছে। সেখানেও সম্বোধন শুদ্ধসত্ত্বই। ষষ্ঠ এবং সপ্তম মন্ত্র কিছুটা দুর্বোধ্য। সূত্রাকারে গ্রথিত মন্ত্রদুটিতে কার প্রতিলক্ষ্য আছে, বোঝা কঠিন। ভাষ্যমতে মন্ত্রদুটির অর্থ হয়,–অবিরোম নির্মিত তন্তু উর্ণাস্তুক। সেই উর্ণাস্তুক শুকু–জ্যোতিঃ-স্বরূপ। সেই জ্যোতিঃ আমাদের মধ্যে অবস্থিত হোক। আর সোম-বিক্রেতা অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন হোক। আমরা এই মন্ত্রদুটিতে ভগবৎ-সম্বোধন লক্ষ্য করি। ভগবৎ অনুগ্রহে অজ্ঞান-অন্ধকার দূরীভূত হয়ে হৃদয়ে দিব্য জ্ঞান-জ্যোতিঃ বিচ্ছুরিত হোক–মন্ত্র দুটিতে এই ভাবই প্রকাশিত। অষ্টম মন্ত্রের কর্মকাণ্ডানুসারী অর্থ-হে সোম! তুমি আমাদের প্রতি আগমন করো। তুমি কেমন? অর্থাৎ সখা বা প্রীতিযুক্ত অথবা রবিরূপ এবং শোভন মিত্রের পালক।–ইত্যাদি। নবম মন্ত্রে ভাষ্যমতে সোমের রক্ষাকারী সাতটি দেবতার সম্বোধন আছে। মন্ত্রের অর্থ-হে শব্দকারী, হে শোভমান, হে পাপারি, হে বিশ্বপোষক, হে সদাহৃষ্টরূপ, হে শোভনহস্ত, হে দুর্বলরক্ষক, হে দেবতাসপ্তক। আপনাদের আশ্রিত এই সোমক্রয়কারীর হিরণ্য ইত্যাদি পদার্থ রক্ষা করুন। বৈরিগণ যেন আপনাদের হিংসা না করে।–আমরা মনে করি, মন্ত্রে যে সোমরক্ষক সপ্তদেবতার বিষয় উল্লেখ আছে, সেই সপ্ত দেবতা সপ্তলোক-পালক। ভুঃ ভুবঃ স্বঃ মহঃ জনঃ তপঃ ও সত্য–এই সপ্ত লোক। এই সপ্তলোকের যাঁরা অধিপতি, তাঁরাই সপ্তলোকপাল, তারাই পূর্বোক্ত সপ্তোকে সোম বা শুদ্ধসত্ত্ব রক্ষা করেন। এঁরা নামে স্বতন্ত্র হলেও একই ভগবানের সপ্ত-বিভূতি মাত্র। অগ্নি, বায়ু, সূর্য, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও বরুণ–এঁরাই সেই সপ্তলোক-পালক]। ৭।
মর্মার্থ- সৎকর্ম-সাধন-সমর্থ অক্ষয় জীবন-লাভের জন্য যেন আমি উদ্বুদ্ধ হই। (আত্মজ্ঞান-লাভে সৎকর্মশীল জীবন-প্রাপ্তির উদ্বোধনা মন্ত্রে বিদ্যমান)। অথবা, অক্ষয় জীবন লাভের জন্য যেন উদ্বুদ্ধ হই। অপিচ, সৎকর্ম-সাধন ইত্যাদির দ্বারা শোভন-জীবন-ধারণের জন্য যেন আমি উদ্বুদ্ধ হই। কর্মফল-ক্ষয়কারক কর্মের সারভূত শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা যেন আমি উদ্বোধিত হই। সৎ-ভাবের বর্ধক স্নেহকারুণ্য-স্বরূপ ভগবানের স্নেহ-করুণার দ্বারা অথবা তেজের দ্বারা ও জ্ঞান-দীপ্তিতে যেন আমি উদ্বুদ্ধ হই। তার পর শুদ্ধসত্ত্বের অনুসরণে (অর্থাৎ, তাদের হৃদয়ে ধারণের নিমিত্ত) আমি যেন প্রবুদ্ধ হই। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক ও সঙ্কল্পসূচক। ভাব এই যে, হে দেব! আত্ম-উৎকর্ষ-সাধনে ভগবানকে প্রাপ্তির জন্য যাতে প্রবুদ্ধ হই, সেই ভাবে আপনি আমাদের অনুগ্রহ করুন। হে দেব! আপনি আমার কলুষ-ক্লেদ-পরিশূন্য শত্রুর উপদ্রবরহিত সুনির্মল হৃদয়রূপ আরাধ্য-ক্ষেত্রকে লক্ষ্য করে আগমন করুন। (তাৎপর্যার্থ-বিশুদ্ধ নির্মল হৃদয়ই ভগবানের নিবাস-স্থান। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমি যেন সর্বদা আপনাকে হৃদয়ে রাখতে সমর্থ হই। অনুকম্পা-প্রদর্শনে আপনি তার বিহিত করুন)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি অনন্ত-স্বরূপ ভগবানের অধিষ্ঠান অর্থাৎ ধারক ও স্বরূপ হও। (ভাব এই যে,-শুদ্ধসত্ত্বই ভগবানের স্বরূপ। শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারাই ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। অতএব হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবৎ-সম্বন্ধি স্থানকে অথবা নির্মল হৃদয়কে সর্বতোভাবে প্রাপ্ত হও অর্থাৎ সেই হৃদয়ে উপবেশন করো। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,-শুদ্ধসত্ত্ব অধিগত করে আমরা যেন ভগবানকে হৃদয়ে ধারণ ও প্রতিষ্ঠিত করতে পারি)। অভীষ্টবর্ষণকারী অথবা সকলের বরণীয় সেই ভগবান্ দ্যুলোককে এবং অন্তরিক্ষ-লোককে (ব্যোমকে অর্থাৎ সর্বলোককে) স্তম্ভিত করেন অথবা ব্যেপে আছেন। অপিচ, এই পৃথিবীতে সেই ভগবানের শ্রেষ্ঠত্ব বা মহিমা অপরিমেয়। (ভাব এই যে,-ভগবান আপন প্রভাবের দ্বারা সর্বলোক ধারণ করে আছেন। কিন্তু তার মহিমার সীমা কেউই অবগত নন। প্রার্থনা–সেই ভগবান্ আমার হৃদয় অধিকার করুন)। সম্যক্ রাজমান অথবা সকলের স্বামী সেই ভগবান্ নিখিল বিশ্বভূবন ব্যেপে আছেন। বিশ্বের সকলেই সর্বশক্তিমান অথবা করুণাপরায়ণ সেই ভগবানের কার্য অর্থাৎ মহিমা ঘোষণা করে। (প্রার্থনার ভাব এই যে, বিশ্বব্যাপকতাই ভগবানের কর্ম বা ধর্ম। সেই ভগবান আমার হৃদয় ব্যেপে অবিচলিত ভাবে অবস্থিতি করুন)। যে ভগবান বনানীর অগ্রভাগে অন্তরিক্ষকে পুরুষগণের মধ্যে বীর্যকে এবং গাভীগণের মধ্যে দুগ্ধকে বিস্তারিত করে রেখেছেন; সেই করুণার আধারই অন্তরের মধ্যে সকর্ম-সাধনের সঙ্কল্পকে, লোকসমূহের মধ্যে জ্ঞানাগ্নিকে, স্বর্গলোকপ্রাপ্ত সাধুগণের হৃদয়ে জ্ঞানসূর্যকে বা পূর্ণজ্ঞানকে এবং পাষাণের মতো কঠোর আমাদের এই হৃদয়ের মধ্যে শুদ্ধসত্ত্বকে স্থাপন করেছেন। (ভাব এই যে,–সকল বস্তরই শ্রেষ্ঠ বা সার অংশ ভগবানের করুণা-সাপেক্ষ। সেই ভগবানই বিশ্বের অধিপতি)। অথবা,–যে করুণাধার ভগবান্ অরণ্য-সদৃশ্য হৃদয়ের মধ্যে অন্তরিক্ষের মতো অনন্ত-প্রসারিত স্নেহ-কারুণ্যকে বিস্তৃত করে রেখেছেন এবং আত্ম-উৎকর্ষ-সম্পন্ন জনগণের মধ্যে সৎকর্মের সাধন-সামর্থ্যকে বিস্তৃত করে রেখেছেন এবং জ্ঞানের অভ্যন্তরে ভক্তিকে বিস্তৃত করে রেখেছেন এবং ভগবানকে প্রাপ্তির অভিলাষী অন্তরের মধ্যে সৎকর্ম-সাধনের সঙ্কল্পকে বিস্তৃত করে রেখেছেন এবং লোকসমূহের মধ্যে জ্ঞানাগ্নিকে বিস্তৃত করে রেখেছেন; সেই ভগবানই স্বর্গে জ্ঞান-সূর্যকে (পূর্ণজ্ঞানকে) এবং পাষাণের মতো কঠোর আমাদের হৃদয়-মধ্যে শুদ্ধসত্ত্বকে স্থাপন করেছেন। (ভাব এই যে,ভগবানের কৃপাতেই আমাদের মধ্যে সত্ত্বভাবের উন্মেষ হয়)। জ্ঞানরশ্মিসমূহ সমস্ত দেবভাবের দর্শনের নিমিত্ত, সেই প্রসিদ্ধ সর্বজ্ঞ অথবা ধনপতি দ্যোতমান্ জ্যোতিঃস্বরূপ পরব্রহ্মকে সাধকের সহস্রার পদ্মে প্রকাশিত করে থাকে। বৃষের ন্যায় বলবীর্যসম্পন্ন জ্ঞানভক্তিরূপ অথবা সকাম-নিষ্কাম-রূপ হে বাহকদ্বয়! শকটধুর অথবা ভারবহনসমর্থ অথবা দেবতা বা সংবহন উপযোগী দেব-ভাব (অর্থাৎ বৃষদ্বয় যেমন শকটের ধূর বা ভার বহন করতে পারে, সেইভাবে জ্ঞান ও ভক্তি রূপ বাহকদ্বয় দেবভাবসমূহকে নরহৃদয়ে বহন করে আনে; অপিচ, অকিঞ্চন জনকে ভগবৎসমীপে নিয়ে যায়), ক্লান্তিরহিত অর্থাৎ সদানন্দরূপ, দুর্বলের অহিংসাকারী অথবা অজ্ঞানজনকে সৎপথে নয়নকারী, অৰ্চনাকারীদের সঙ্কৰ্ম-সাধনের অথবা ভগবানের প্রতি প্রেরণকারী,–এইরকম তোমরা (আমাদের হৃদয়ে) আগমন করো, আমাদের মনোরথে স্বয়ং যুক্ত হও এবং মঙ্গলপ্রদ হয়ে সৎকর্ম-সাধনে প্রবৃত্ত জনের অর্থাৎ আমাদের হৃদয়রূপ যজ্ঞাগার প্রাপ্ত হও অর্থাৎ সেখানে প্রবেশ করো। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক এবং আত্ম-উদ্বোধনসূচক। দেবগণের আনয়ন-উপযোগী সংবাহন করে জ্ঞান এবং ভক্তিকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করি-মন্ত্রে এই ভাব প্রকাশ পেয়েছে)। হে মম হৃদয়নিহিত সৎ-বৃত্তি! তুমি স্নেহকরুণার আধার ভগবানকে উন্নত প্রদেশে অর্থাৎ আমাদের কর্মরূপ যানে প্রতিষ্ঠা করে থাক। (প্রার্থনার ভাব এই যে-কর্মের প্রভাবে যেন আমরা শুদ্ধসত্ত্ব এবং ভগবাকে প্রাপ্ত হই। আমাদের কর্মসমূহ ভগবৎসম্বন্ধযুত হোক। হে আমার সৎ-অসৎ-বৃত্তি অথবা জ্ঞানভক্তি! তোমরা আমাদের হৃদয়ে অথবা কর্মরূপ যানে স্নেহকরুণার আধার ভগবানকে অচঞ্চলভাবে স্থাপনকর্তা হও। (প্রার্থনার ভাব এই যে, আমাদের কর্মের সাথে ভগবৎসম্বন্ধ অবিচ্ছিন্ন হোক)। হে ভগবন্! আমাদের হৃদয়ে যে অজ্ঞানতার আবরণরূপ মোহপাশ বিস্তৃত হয়েছে, তা অপসারিত করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,হে ভগবন্! কৃপাপূর্বক আমাদের সংসার-বন্ধন ছেদন করে আপনি আমাদের আপনাতে বিলীন করে নিন) । ৮।
[কর্মকাণ্ড অনুসারে ভাষ্যানুক্রমণিকায় প্রকাশ,-ক্রীত নোম প্রাচীনবংশ-শালায় সংবাহনের সময়ে কি ভাবে কিরকম প্রক্রিয়া-পদ্ধতির অনুসরণে সেই সোম শকটের উপরে স্থাপন করতে হবে, এই অষ্টম অনুবাকে, তা-ই উল্লিখিত। বিনিযোগ-সংগ্রহ গ্রন্থে সেই প্রক্রিয়া-পদ্ধতি যে ভাবে পরিবর্ণিত আছে, ভাষ্যকার তারই অনুসরণ করেছেন। প্রথম মন্ত্রের অর্থসম্বন্ধে ভাষ্যের মত এই যে,-অমৃত-স্বরূপ দেবতাকে লক্ষ্য করে আয়ুঃ ইত্যাদি বিশেষে বিশিষ্ট সোমের সাথে আমি উখিত হই।–ইত্যাদি। দ্বিতীয় মন্ত্র, ভাষ্যকারের মতে–উত্থান থেকে আরম্ভ করে পুনরায় ভূমিতে সোমস্থাপন পর্যন্ত সোমের আধার অন্তরিক্ষ। সেই হেতু সোম অন্তরিক্ষ-দেবতা বলে কথিত হয়।–ইত্যাদি। ভাষ্যের বিভাগ অনুসারে তৃতীয় চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্র তিনটি একমন্ত্ররূপে পরিগৃহীত হয়েছে। ভাষ্যমতে তৃতীয় মন্ত্রটির প্রথম অংশটির সম্বোধ্য কৃষ্ণাজিন; দ্বিতীয় অংশটির সম্বোধ্য-সোম। চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্রে ক্রীত সোমের বরুণ-দেবতাত্ব-নিবন্ধন বরুণকে ব্রহ্মরূপ জ্ঞানে তাঁর স্তুতি করা হয়েছে। ষষ্ঠ মন্ত্র করুণাময় ভগবানের মাহাত্ম্য প্রখ্যাপক। ভাষ্যেও সেই ভাবই প্রকাশিত। তবে তার মধ্যে যে একটু নিগূঢ় তত্ত্বের সন্নিবেশ আছে, আমরা তা মর্মার্থে লিপিবদ্ধ করেছি। আমাদের দুরকম অন্বয়ে একই ভাব প্রকাশ পেয়েছে। সপ্তম মন্ত্র, ভাষ্যমতে, শকটের উপরে বিস্তৃত কৃষ্ণসার মৃগের কর্মের দ্বারা বস্ত্রে আবদ্ধ সোমকে বন্ধন করতে হয়। মন্ত্রটি সুর্য-মন্ত্র। ভাষ্যের অর্থ-সকল জগতের বেত্তা সূর্যকে রশ্মিসমূহ ঊধ্বদেশ প্রাপ্ত করায়। কি জন্য?–সকল জগতের দর্শনের জন্য। মন্ত্রটি সামবেদ-সংহিতার আগ্নেয় পর্বে পরিদৃষ্ট হয়। সামবেদের আগ্নেয় পর্বে এই সূর্য-মন্ত্র কিভাবে সুসঙ্গত হয়, এ বিষয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন করে থাকনে। সায়ন তার উত্তরে ন্যায় অনুসারে সূর্যাত্মক মন্ত্রকেও আগ্নেয় বলে প্রতিপন্ন করেছেন। অষ্টম মন্ত্রের, ক্ষেত্রে ভাষ্যকার বক্ষ্যমান মন্ত্রে বৃষের সম্বন্ধ খ্যাপন করে, পূর্ব পূর্ব মন্ত্রের সাথে অর্থসঙ্গতি রক্ষা করেছেন। নবম মন্ত্রের ভাষ্য-আভাষে বোঝা যায়, শকটের উপরে সংস্থাপিত সোমকে এবং শকট-সংবদ্ধ প্রায় প্রত্যেক বস্তুকে লক্ষ্য করেই যেন এই মন্ত্র প্রযুক্ত হয়ে থাকে। সেই অনুসারে শকট-সংলগ্ন নানা সামগ্রী মন্ত্রগুলির সম্বোধ্য। শেষ মন্ত্রে, ভাষ্যমতে শকটের উপরিভাগে যে দীর্ঘক্ষ্ম প্রসারিত থাকে তাকে পাশ বলে। মন্ত্রের অর্থ–সেই পাশ বা রঞ্জু শকটের উপরে প্রসারিত হোক। আমরা তো এই পাশ পদে মোহপাশ অর্থ গ্রহণ করেছি।আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি কিরকম হওয়া উচিত তা আমরা আমাদের মর্মার্থেই প্রকাশিত করেছি] ॥ ৮।
মর্মার্থ- হে ভূতসমূহের অধিপতি বা পালক! আপনি নিখিল সৎকর্মের আগারকে অথবা ভগবৎ-নিবাসযোগ্য সকল হৃদয়কে লক্ষ্য করে প্রকৃষ্টভাবে গমন করুন এবং সেখানে অধিষ্ঠিত হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। আমাদের মঙ্গলের জন্য মোক্ষবিধায়ক সেই ভগবান্ আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন, এই মন্ত্রে এই ভাব পরিব্যক্ত হয়েছে)। হে ভগব! সর্বতঃসঞ্চারী সৎ-ভাব-নাশক বহিঃশত্রু যেন আপনাকে জানতে অর্থাৎ হিংসা করতে না পারে; অপিচ, সৎকর্মের প্রতিষেধক কাম ইতাদি অন্তঃশত্রুও যেন আপনাকে জানতে অর্থাৎ হিংসা করতে সমর্ত না হয়; বিকর্তনশীল অর্থাৎ সৎসম্বন্ধ-ছেদনকারী পাপশত্রুরাও যেন আপনাকে জানতে না পারে এবং সৎমার্গে গমন প্রতিরোধক হিংসক বহিঃ ও অন্তঃ শত্রুও যেন হিংসা করতে না পারে! (এ মন্ত্রটিও প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,হে দেব, আপনি এমন ভাবে আগমন করুন, যেন কিবা অন্তঃশত্ৰু কিবা বহিঃশত্ৰু কেউই আপনার আগমন-বার্তা জানতে সমর্থ না হয় এবং আমাদের সাথে আপনার সম্বন্ধ ছিন্ন করতে না পারে। অর্থাৎ আপনার প্রভাবে আমাদের সকল শত্রু বিনষ্ট হোক)। অপিচ, হে ভগবন্! আপনি শত্রুনাশের দ্বারা বিশ্বের যাবতীয় শ্রেষ্ঠধন আমাদের প্রদান করুন। অপিচ, আপনি শ্যেনপক্ষীর মতো ক্ষিপ্রগামী হয়ে আগমন করুন। তার পর, সৎকর্ম-সাধনে প্রবৃত্ত জনের (আমাদের) গৃহে অর্থাৎ হৃদয়রূপ যজ্ঞের আগারে গমন (প্রবেশ) করুন। আপনার এবং সৎকর্মসাধনরত আমার অর্থাৎ আপনার গ্রহণযোগ্য এবং আমার মঙ্গলপ্রদ সেই গৃহ (সেই হৃদয়) সুসংস্কৃত অর্থাৎ ক্লেদ-কলঙ্ক-পরিশূন্য নির্মল হয়ে আছে। (এ মন্ত্রে ভগবানের সন্নিকর্ষ লাভের জন্য প্রার্থনাকারীর প্রবল আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। ভাব এই যে, হে ভগবন! আমাদের ত্বরায় পরিত্রাণ, করুন)। হে ভগবন্! আপনি সাধনরত আমার কর্মফল প্রাপক হোন। অর্থাৎ আমার কর্মফল আপনি গ্রহণ করুন। যে প্রসিদ্ধ পথে গমন করলে নিখিল শত্রুদের অর্থাৎ কাম-ক্রোধ ইত্যাদি পাপসম্বন্ধ সমূহকে সর্বতোভাবে বর্জন করা যায়, হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনার প্রসাদে সেই সুখে গমন-যোগ্য অর্থাৎ সৎসম্বন্ধমণ্ডিত ও পাপসম্বন্ধরহিত (অথবা যে পথে গমন করলে, গমনকারীকে কোনও অপরাধ স্পর্শ করতে পারে না) সেই পথকে আমরা প্রাপ্ত হবো। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক এবং আত্ম উদ্বোধনসূচক। ভাব এই যে,–শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে সৎকর্ম ইত্যাদির দ্বারা ভগবানকে পাওয়া যায়; অতএব, সৎকর্মের দ্বারা সৎপথ আশ্রয় করে আমরা ভগবৎ-অভিমুখী হবো)। হে আমার চিত্তবৃত্তিনিবহ! জ্যোতীরূপ পরব্রহ্মকে নমস্কার (স্তুতি) করো। সকলের মিত্রভূত অপিচ স্নেইকারণ্যরূপ অথবা জগতের হিতকারী, সকল জগতের (নিখিল বিশ্বের) দ্রষ্টা অথবা সকল দ্যাবাপৃথিবীনিবাসী লোকের দ্রষ্টা, তেজো রূপে দ্যোতমান, অতীত-অনাগত-বর্তমান-ত্রিকালভূত প্রাণিদের দ্রষ্টা, (সর্বদ্রষ্টা বা ত্রিকাল-অভিজ্ঞ), দেবগণের অনুগ্রহের জন্য জাত অথবা দেবগণের জন্মকারণ, প্রজ্ঞানস্বরূপ অথবা বিজ্ঞান-ধন-আনন্দস্বভাব, দ্যুলোকের পুত্রের মতো প্রিয় অথবা বিশ্বের উৎপত্তি-হেতুভূত, জ্যোতীরূপ পরব্রহ্মকে–তিনিই সত্য জেনে, পূজা করো, অপিচ তাঁকে স্তুতি করো। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক। বিশ্বহেতুভূত সর্বদ্রষ্টা জ্যোতীস্বরূপ পরব্রহ্মকে যেন আমরা অর্চনা করি–এইরকম সঙ্কল্প মন্ত্রের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে)। হে মম হৃদয়নিহিত সবৃত্তি! তুমি স্নেহকরুণার আধার ভগবানের উন্নতপ্রদেশে অর্থাৎ আমাদের কর্মরূপ যানে অথবা হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করে থাকো। (প্রার্থনার ভাব এই যে,-কর্মের প্রভাবে যেন আমরা শুদ্ধসত্ত্ব এবং ভগবান্কে প্রাপ্ত হই। আমাদের কর্মসমূহ ভগবানের সম্বন্ধযুত হোক)। হে আমার সৎ-অসৎ-বৃত্তি অথবা জ্ঞানভক্তি! তোমরা আমাদের হৃদয়ে অথবা কর্মরূপ যানে স্নেহকরুণার আধার ভগবান্কে অচঞ্চলভাবে স্থাপন করো। (প্রার্থনা–আমাদের কর্মের সাথে ভগবৎ-সম্বন্ধ অবিচ্ছিন্ন হোক)। হে ভগবন্! আপনার অনুগ্রহে আমাদের (অজ্ঞানতার আবরণরূপ) মোহপাশ অপসারিত হোক। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! কৃপাপূর্বক আমাদের সংসারবন্ধন ছেদন করে আমাদের আপনাতে বিলীন করে নিন) ॥ ৯।
[অষ্টম অনুবাকে শকটে সোম-আরোপণের পর এই নবম অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে শকট-চালনার বিষয় উক্ত হয়েছে। ভাষ্যমতে, প্রথম মন্ত্র সোম সম্বন্ধে প্রযুক্ত। শকটে কৃষ্ণাজিন বিস্তৃত রয়েছে। তার উপরে সোম, স্থাপিত হয়েছে। শকটের বাহক বৃষ দুটি শকষ্টধূরে সংযোজিত হয়েছে। এখন শকট সংবাহিত হয়ে সোমক্রয়কারী যজমানের গৃহে গমন করবে। এই রকম অনুক্রমণে সোমকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, হে ভূপতি (অর্থাৎ ভূমিতে স্থিত ভূতসমুহের অর্থাৎ যজমান অধ্বর্য প্রভৃতির পালক)! হে সোম! তুমি প্রাচীনবংশ হবিধান প্রভৃতি স্থানসমূহ লক্ষ্য করে প্রকৃষ্টভাবে গমন করো। দ্বিতীয় মন্ত্রে বলা হয়েছে, তোমার গমনকালে, সর্বত্রবিচরনশীল বাধক তস্কর-প্রভু যেন তোমার গমন-বার্তা জানতে না পারে, তার যাগ-প্রতিষেধক ভৃত্যগণও যেন তোমার গমন-বার্তা জানতে না পারে; বৃক অর্থাৎ অরণ্যচারী শ্বাপদ প্রভৃতি যেন তোমাকে না জানে। পাপরূপ বধ-কর্তাও যেন তোমাকে জানতে না পারে। অপিচ, স্বর্গমার্গে সোমের অপহর্তা বিশ্বাবসু নামক গন্ধবও যেন তোমার প্রতি দৃষ্টি সঞ্চালন না করে। তৃতীয় মন্ত্রে বলা হচ্ছে-হে সোম! তুমি যাবতীয় শত্রুকে নাশ করে শ্রেষ্ঠ ধন প্রদান করো এবং শ্যেনপক্ষীর মতো শীঘ্রগামী হয়ে যজমান-গৃহে উপস্থিত হও। সেখানে তোমার ও আমার জন্য সর্ব-উপকরণ-সংযুক্ত স্থান আছে। সেখানে দেবসদৃশ অধ্বর্য প্রভৃতি তোমার উপবেশনের জন্য আসন্দী-রূপ স্থান সংস্কৃত করে রেখেছেন। চতুর্থ মন্ত্রে, আমরা মনে করি, ভগবানে কর্মফল-প্রদানের বিষয় প্রখ্যাপিত। কর্মকাণ্ড অনুসারে ভাষ্যকার অর্থ করেছেন–স্বস্তি অর্থাৎ শ্রেয়ঃরূপ যজ্ঞের অয়নঃ অর্থাৎ প্রাপ্তি যার আছে; অর্থাৎ তুমি যজমানের যজ্ঞপ্রাপক হও। এ মন্ত্রটির সোম-সম্বোধনে প্রযুক্ত। ভাষ্যমতে পঞ্চম মন্ত্র পথিদেবতার সম্বোধনে প্রযুক্ত। ক্রীত সোম মস্তকের উপরে গ্রহণ করে, হস্তের দ্বারা সোম-পাত্র ধারণ করে, শকটের প্রতি লক্ষ্য করতে করতে, এই মন্ত্র উচ্চারিতব্য। ষষ্ঠ মন্ত্রের প্রয়োগ বিষয়ে ভাষ্যকারের মত এই যে,–এই মন্ত্রে সোমকে সূর্য স্বরূপ কল্পনা করে স্তুতি করা হয়েছে। এই অনুবাকে সপ্তম বা শেষ মন্ত্র এবং অষ্টম অনুবাকের শেষ দুটি মন্ত্র প্রায়ই অভিন্ন। প্রভেদ মাত্র ক্রিয়াপদ নিয়ে। অষ্টম অনুবাকের প্রত্যস্ত পদের পরিবর্তে নবম অনুবাকে উন্মুক্ত পদ রয়েছে। তাছাড়া অন্য কোনও পার্থক্য নেই] ॥ ৯৷
মর্মার্থ- হে আমার হৃদয়-নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি অতিথির মতো:সকলের আকাঙ্ক্ষাণীয় এবং প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবানের তুষ্টি সম্পাদনকারী অর্থাৎ প্রকাশক হও। অতএব, বিশ্বব্যাপক ভগবানের প্রীতির জন্য তোমাকে নিয়োজিত (উৎসর্গ) করছি। (ভাব এই যে,–শুদ্ধসত্ত্ব ভগবানের স্বরূপ; শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারাই ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। হে আমার হৃদয়-নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি সৎস্বরূপ ভগবানের প্রীতিহেতুভূত হও। অতএব তোমাকে বিশ্বব্যাপী ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত উৎসর্গ করছি। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধক ও সঙ্কল্পমূলক। একমাত্র সত্যের এবং শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারাই সৎস্বরূপ ভগবাকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। অতএব শুদ্ধসত্ত্বের এবং সৎ-ভাব ইত্যাদির দ্বারা যাতে ভগবানের সন্নিকর্ষ লাভ করতে পারা যায়, সে বিষয়ে চেষ্টান্বিত হবে)। হে আমার শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূত কর্ম! তুমি অতিথিরূপে জগৎপ্রীতিকর (অথবা অতিথিরূপে সকলের নমস্য পূজ্য) ভগবানের প্রীতিহেতুভূত এবং তুষ্টিসম্পাদক হও। অতএব, বিশ্বব্যাপক ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে উৎসর্গ করছি। (ভাব এই যে,-ভগবান্ অতিথিরূপে জগতের আরাধনীয়। তাঁর আরাধনার প্রধান উপকরণ সৎ-ভাব ও শুদ্ধস্তত্ত্ব। মন্ত্রে তাই সঙ্কল্প–ভগবানের প্রীতির জন্য হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্ব-ভাবকে নিয়োজিত করছি)। অপিচ, হে আমার শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূত কর্ম! প্রজ্ঞানরূপ ভগবানের অর্থাৎ পরব্রহ্মের উদ্দেশে তোমাকে নিয়োজিত করছি। হে আমার শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূত কর্ম! তোমাকে ধনপুষ্টিদায়ক অর্থাৎ পরমধন প্রদায়ক সৎ-ভাব-জননকারী সর্বব্যাপী ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত নিয়োজিত (উৎসর্গ) করছি। অথবা,-[উপরোক্ত চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্র] হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! পরমার্থ-ধনসমুহের পুষ্টিদানকারী জ্ঞানজ্যোতিঃ-লাভের জন্য তোমাকে উদ্বুদ্ধি করছি। অপিচ, বিশ্বব্যাপী ভগবানের উদ্দেশ্যে, তার প্রীতির জন্য, তোমাকে সমর্পন করি। (ভাব এই যে,–জ্ঞানই পরমার্থপ্রদ। শুদ্ধসত্ত্বের সাহায্যে জ্ঞানকিরণ আহরণ করে ভগবৎ-প্রাপ্তির নিমিত্ত তাকে নিয়োজিত করি)। হে আমার হৃদয়াধিষ্ঠিত শুদ্ধসত্ত্ব! সোম-আনয়নকর্তা অথবা হৃদয়ে সৎ-ভাবের সংজনয়িতা, ভক্তিমান অর্চনাকারিদের প্রতি শ্যেনের মতো ক্ষিপ্রগমনকারী ভগবানের প্রীতির জন্য অথবা সকর্ম-সাধনের নিমিত্ত, তোমাকে আহরণ করছি; এবং বিশ্বব্যাপক ভগবানের উদ্দেশে অথবা তাঁকে লাভ করবার জন্য তোমাকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠাপিত করছি। (সঙ্কর্মের এবং সৎ-ভাবের দ্বারা পরিতুষ্ট হয়ে ভগবান্ ত্বরায় ভক্তের উদ্ধার-সাধন করেন। অতএব সঙ্কল্প-সৎ-ভাবের উন্মেষে সৎকর্মের সাধনে হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্ব আহরণ করে মোক্ষলাভের নিমিত্ত তাকে নিয়োজিত করি)। হে ভগবান্! আপনার সম্বন্ধি যে সকল স্থান বা নাম অবলম্বন করে জ্ঞান ও ভক্তির দ্বারা মানুষ যজ্ঞ করে অথবা আপনার অর্চনা করে, আপনার সম্বন্ধি সেই যজ্ঞ বা অর্চন আপনার যাবতীয় স্থানে বা নামে আপনি সর্বতোভাবে প্রাপ্ত হোন। (ভাব এই যে,-হে ভগব! যে জন যেখান হতে যে নামেই আপনাকে জ্ঞান ও ভক্তি সহকারে অর্চনা করে, আপনি সেই স্থান হতে সেই নামেই পরিতুষ্ট হয়ে তাকে উদ্ধার করেন)। হে ভগব! আপনি গৃহ-অভিবর্ধক অর্থাৎ শ্রেয়ঃসাধক, প্রকৃষ্ট ভাবে বিপদ-উদ্ধারকারী অথবা সংসার-পারে, নয়নকর্তা, শোভনবীর্যসম্পন্ন এবং বীরবর্গের পরিপালক অর্থাৎ অজ্ঞান অকিঞ্চন জনের আশ্রয়দাতা। আপনি আমাদের হৃদয়রূপ যজ্ঞের আগারে অধিষ্ঠিত হোন। (প্রার্থনার ভাব এই যে,আপনি অকিষ্ণন আমাদের আশ্রয় দান করুন এবং সংসার-সমুদ্র হতে পরিত্রাণ করুন)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি অনন্ত-স্বরূপ ভগবানের অধিষ্ঠান অর্থাৎ ধারক হও। (ভাব এই যে, শুদ্ধসত্ত্বই ভগবানের স্বরূপ। শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। অতএব হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবৎ-সম্বন্ধি স্থানকে অথবা নির্মল হৃদয়কে সর্বতোভাবে প্রাপ্ত হও, অর্থাৎ সে হৃদয়ে উপবেশন করো। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,-শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা আমরা যেন ভগবানকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি যজ্ঞের ধারক অর্থাৎ সৎকর্মে সকলের প্রেরক এবং স্নেহকরুণার আধার ভগবানের স্বরূপ হও। অপিচ, তুমি ভগবানের সাথে দেবভাবসমূহের সুষ্ঠু-মিশ্ৰয়িতা এবং ভগবানের প্রীতিসাধক স্নেহকরুণা-রূপ হও। অতএব যাতে আমি দেবভাবসমূহের সখিত্ব এবং কর্মসামর্থ্য হতে বিচ্ছিন্ন না হই, তার বিধান করো। (ভাব এই যে, আমার কর্মবিচ্ছেদ এবং সৎ-ভাবচ্যুতি যেন না ঘটে)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! সতত সর্বত্র গমনশীল অথবা জগতের প্রাণস্বরূপ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমায় উৎসর্গ অথবা নিয়োজিত করছি। সেইরকম, হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! সর্বব্যাপী অথবা বিশ্বের সকলের মনন-অধিষ্ঠাতা ভগবানের উদ্দেশ্যে তোমাকে উৎসর্গ অথবা নিয়োজিত করছি। অপিচ, হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! বিশুদ্ধ সত্ত্বভাবের সংরক্ষক অথবা জন্মকারণবিনাশকারী ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত–তাকে লাভ করবার জন্য, তোমাকে তার উদ্দেশ্যে নিবেদন করি বা উৎসর্গ করি। (ভগবান মঙ্গল বিধান করুন)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! প্রভূতশক্তিসম্পন্ন সকল শক্তির আধারভূত সেই ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিয়োজিত করছি। (আমি যেন কায়মনোবাক্যে ভগবানের সেবা করি)। অপিচ, বিশ্বকর্মী, জগতের যাবতীয় প্রাণীর শক্তিবিধায়ক অথবা সৎকর্মের সাধনে শক্তিপ্রদানকারী হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তোমাকে প্রভূত তেজোবীর্যসম্পন্ন অথবা অনাধৃষ্টবল ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত উৎসর্গ অথবা নিয়োজিত করছি। সমগ্র মন্ত্রটি আত্ম উদ্বোধনমূলক এবং সঙ্কল্পসূচক। মন্ত্রে ভগবানের কাছে নিখিল সৎ-ভাব প্রদানের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমার হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্ব গ্রহণে পরিতুষ্ট হয়ে আমাতে সৎ-ভাব সংরক্ষণ করুন এবং আমার জন্মকারণ নিবারণ করুন। হে আমার হৃদয় অধিষ্ঠিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি সদা অতিরস্কৃত অর্থাৎ প্রমাদ পরিশূন্য অহিংসিত ও হিংসা ইত্যাদি রহিত, অপিচ সর্বসাফল্য প্রদ। (অতএব আমাতে অথবা আমাদের সম্বন্ধে তুমি তেমনই অহিংসিত ও অতিরস্কৃত হিংসাপ্রবৃত্তি দূর করে অন্তরের বিশুদ্ধতা সম্পাদন করো)।
সেই রকমেই, হে আমার হৃদয়স্থিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি নিখিল সৎ-ভাবসমুহের অথবা সৎ ভাবসম্পন্ন জনের বল-শক্তি-স্বরূপ অর্থাৎ সারভূত এবং পাপ হতে পরিত্রাণকারক এবং আনন্দিত পরমলোকে নয়নক্ষম অর্থাৎ ভগবৎ-প্রাপক হও। দীক্ষারূপ সৎকর্মের পালক ভগবান্ আমার দীক্ষারূপ শোভন অনুষ্ঠান বা সৎকর্ম স্বীকার অর্থাৎ গ্রহণ করুন। আমার শারীর বাঁচিক মানস অথবা সাত্ত্বিক রাজস তামস তিনরকম তপঃকর্মের পালক (রক্ষক) ভগবান, আমার উক্তরূপ তিনরকম তপঃকর্ম স্বীকার করুন অর্থাৎ গ্রহণ করুন। সেই ভগবানের অনুগ্রহে নির্মলচিত্তে জ্ঞানদৃষ্টি লাভ করে সৎ-মার্গ-গমনে সত্যমূর্তি ভগবানের স্বরূপ আমি যাতে দর্শন করতে সমর্থ হই অর্থাৎ ভগবানকে প্রাপ্ত হতে পারি, সেইভাবে শোভনমার্গে বা সৎপথে আমাকে প্রতিষ্ঠিত করুন। সমগ্র মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থী বিশুদ্ধচিত্তে সৎকর্ম-সাধনে সৎপথে গমন করে ভগবৎ-প্রাপ্তির কামনা করছেন। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমার অনুষ্ঠিত কর্ম সৎ-ভাব সম্পন্ন করুন। অপিচ আমাতে অনুগ্রহপরায়ণ হয়ে আমার পূজা গ্রহণ করুন ] । ১০।
[সমীপে আনীত অতিথিরূপ সোমের সকারের জন্য এই অনুবাকে আতিথ্যেষ্টির বিষয় কথিত হয়েছে। সোম ক্রয় করা হলো, যাজ্ঞিক যজ্ঞশালায় প্রবেশ করলেন এবং সোম যজ্ঞশালায় সংবাহিত হলো। এখন সেই সোম পরিশোধিত হয়ে যজ্ঞে প্রযুক্ত হবে। তাই এই মন্ত্রের অবতারণা। এই দশম অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে এক নবভাবের বিকাশ হয়েছে; মন্ত্রগুলি যাজ্ঞিককে এক অভিনব পন্থা প্রদর্শন করছে। কল্প অনুসারে প্রথম ছটি মন্ত্রের এক একটি উচ্চারণ করে এক একটি পদবিক্ষেপের বিধি। এই রকম পদবিক্ষেপ-ক্রমে সোম নিয়ে যজ্ঞশালায় প্রবেশ করতে হয়। এই ছটি মন্ত্রই বিষ্ণুদেবতাত্মক; মন্ত্রের সম্বোধ্য হবিঃ। অগ্নি ইত্যাদি বিষ্ণুর অনুচর। যিনি সর্বদা গমন করেন, তিনিই অতিথি। সেই অতিথির সত্ত্বাররূপ যে কর্ম সম্পন্ন হয়, তা-ই আতিথ্য। লৌকিক-ব্যবহারে প্রভুকে কোনও সামগ্রী প্রদান করা হলে, প্রভুর অনুচরেরাও সেই উপঢৌকনে পরিতোষ লাভ করে। সেই অনুসারে এখানে বিষ্ণুর উদ্দেশে প্রদত্ত হবিঃ অগ্নির তুষ্টির হেতুভূত হওয়ায়, তা-ই অগ্নির অতিথ্যের মধ্যে পরিগণিত হয়ে থাকে। মন্ত্রার্থের অবতরণিকা এমনই। মন্ত্রগুলিতে অগ্নি ছাড়াও সোম, শ্যেন প্রভৃতি যে সব পদ পরিদৃষ্ট হয়, ভাষ্যমতে তারা সোমরাজার বিভিন্ন-নামধেয় ভৃত্যকে বোঝাচ্ছে। (আমাদের মতে মন্ত্রগুলির সম্বোধ্য, সোমরাজা-হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্ব। অগ্নি–প্রজ্ঞানরূপ ভগবান্ বা ভগবানের বিভূতি; বিষ্ণু–বিশ্বব্যাপক ভগবান্ বা ভগবানের বিভূতি; শ্যেন–শ্যেনায়–শ্যেনের মতো ক্ষিপ্রগামী; ইত্যাদি)। কৃষ্ণযজুর্বেদের এই ছটি মন্ত্রের কতক-অংশ শুক্লযজুর্বেদে পরিদৃষ্ট হয়। সেখানে মন্ত্রগুলির একটু রূপান্তরও দেখতে পাওয়া যায়। ভাষ্যমতে সপ্তম মন্ত্রের দুটি অংশই সোম-সম্বোধনে বিনিযুক্ত। (আমরা এই দুটি অংশই ভগবৎ-সম্বন্ধে বিনিযুক্ত বলে মনে করি। এই অনুবাকের অষ্টম মন্ত্র এবং অষ্টম অনুবাকের প্রথম মন্ত্রের প্রথমাংশ অভিন্ন। ভাষ্যমতে নবম-মন্ত্রটি সোম-সম্বোধনে প্রযুক্ত। এই মন্ত্রে বস্ত্রের দ্বারা সোমকে আচ্ছাদন করতে হয়। সেই অনুসারে মন্ত্রের অর্থ–হে সোম! তুমি বরুণ-পাশ নিবারক হও। যজ্ঞরূপ ব্রতকে যিনি ধারণ করেন, তিনিই ধৃতব্রত। হে সোম! উপসদস্বরূপ বলে তুমি বরুণ-সম্বন্ধি হও। সেইরকম বলে তোমার সুখমিশ্রণহেতু বরুণ-ইত্যাদি দেবগণের সখ্যদ্বয় যেন আমি ছিন্ন করি। অর্থাৎ আমাদের কর্মবিচ্ছেদ যেন সংঘটিত না হয়। (আমাদের মতে, মন্ত্রটি শুদ্ধসত্ত্ব ভগবানের প্রজ্ঞাপক; অপিচ শুদ্ধসত্ত্বের উদয়েই তো সৎকর্মে প্রবৃত্তি জন্মে। বারুণ্যং পদে আমরা বরুণদেবতার পরিবর্তে ভগবানের প্রীতিসাধক স্নেহকারুণ্যরূপ অর্থই সঙ্গত মনে করেছি)। ভাষ্যমতে দশম ও একাদশ মন্ত্র আজ্য-সম্বোধনে বিনিযুক্ত। দশম মন্ত্রের সঙ্গে একটি উপাখ্যানের সম্বন্ধ দেখা যায়। সেটি এই দেবাসুরের সংগ্রাম-কালে দেবগণ আপন আপন শ্রেষ্ঠত্ব বা প্রাধান্য-খ্যাপনের জন্য পরস্পর পরস্পরের বিরোধী হন। তারা সেইমতো পরস্পর বিরোধী পাঁচটি দলে বিভক্ত হয়ে পাঁচটি স্বতন্ত্র ব্যুহ রচনা করেন। অগ্নি ইত্যাদি পঞ্চদেবতা সেনানী এবং বসুদেবগণ সৈন্যসামন্তরূপে সেই পাঁচটি বহে প্রতিষ্ঠিত হন। পরে তারা বিচার করে দেখেন, যদি তারা পরস্পর এইভাবে আত্মকলহে নিযুক্ত থাকেন, তাহলে তারাই অসুরবর্গের জয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবেন। তখন পরস্পর বিরোধ পরিহারের জন্য, তারা পুত্র-ভার্যা ইত্যাদি সহ পরস্পর সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়ে প্রতিজ্ঞা করেন যে, আমাদের মধ্যে যিনিই বিরুদ্ধাচরণ করবেন, তিনিই স্বর্গভ্রষ্ট হবেন, পুত্র-কলত্র ইত্যাদি পরিত্যাগ করে স্থানান্তরে বিনষ্ট হবেন। মন্ত্রের অঙ্গীভূত এই উপাখ্যানের অবতারণা করে সূত্রকার বলেছেন,-দেবগণের অনুসরণে মন্ত্রে মনুষ্যগণের সেইরকম শপথের বিষয় উপলব্ধি হয়। মনুষ্যগণের মধ্যে যে প্রথমে বিদ্রোহী হবে, সেই বিনাশপ্রাপ্ত হবে, এটাই তাৎপর্য। (আমরা মন্ত্রের মধ্যে এমন কোনও উপাখ্যানের অবতারণা করবার হেতু দেখিনি)। দ্বাদশ মন্ত্রের প্রথমাংশে কোনও সম্বোধন পদের উল্লেখ নেই; তবে শেষে তনুনস্ত্রে আজ্য সম্বোধন ভাষ্যপাঠে উপলব্ধ হয়। দ্বাদশ মন্ত্রটির ভাষ্যানুসারী অর্থ–দীক্ষণীয়েষ্টির অধিপতি যে দেবতা, সেই দেবতা দীক্ষাপতি। দীক্ষাপতি আমার এই দীক্ষা জ্ঞাত হোন। তপ অর্থাৎ উপসদের অধিপতি দেবতা আমার তপ অবগত হোন। আমি আর্জবের দ্বারা তনুন-স্পর্শনরূপ শপথ প্রাপ্ত হই। হে তনুনস্ট্রে! আমাকে শোভনমার্গে-যজ্ঞকর্মে স্থাপন করো।–তনু বা শরীরকে যিনি বিনাশ করেন না, তিনিই তনুনগ্রা বা জঠরাগ্নি। সেই জঠরাগ্নি-দেবতার প্রীতির জন্য তোমাকে গ্রহণ করছি–এই অর্থ। এছাড়াও তনুন✉ পদটির আরও নানা অর্থ ভাষ্যে দেখা যায়। আমরা মনে করি, যিনি প্রাণবায়ুরূপে জগতের সর্বত্র সর্বজীবে বিরাজমান, তনুনত্ত্ব পদে সেই বিশ্বব্যাপী ভগবানকেই লক্ষ্য করা হয়েছে। তার কাছে কর্ম নবকলেবর প্রাপ্ত হয় বলেই তিনি তনপাৎ তউন+প+অ–এই চারটি পদাংশ্যের সমাবেশে তনপাৎ পদ সিদ্ধ হয়। তারই চতুর্থীর একবচনে তনুনে পদ পাওয়া যায়। অর্থ হয়–উন (অসম্পূর্ণ, ক্ষীণ), তনু (দেহের), প (পালক, পূর্ণতাসাধক) যে সামগ্রী, তা যিনি অৎ (ভক্ষণ) করেন, তাঁকেই তনুনপাৎ বলে। কর্মকে বিশুদ্ধ ভাব দান করে, তার স্থূলভাব ক্লেদরাশি ভস্মসাৎ করেন বলেই শুদ্ধসত্ত্বরূপী ভগবান্ তনুনপাৎ বলে পরিকীর্তিত। আমাদের মর্মাথে আমরা এইভাবেই আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেছি] ১০।
মর্মার্থ- হে দ্যোতমান দীপ্তিদান ইত্যাদি গুণযুক্ত আমার জন্মসহজাত অন্তর্নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তোমার সকল অবয়ব অর্থাৎ উৎকর্ষপ্রাপ্ত ও হীনতেজঙ্ক সকল অংশ, একধনবিৎ অর্থাৎ মোক্ষধন-প্রদায়ক পরমৈশ্বর্যশালী ভগবানের প্রীতির বা সেবার নিমিত্ত নিবেদিত অর্থাৎ উৎসর্গীকৃত হোক। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক ও সঙ্কল্পসূচক। ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত হৃদয়গত সৎ ভাবসমূহকে নিয়োজিত করবার সঙ্কল্প মন্ত্রে বিদ্যমান। প্রার্থনার ভাব এই যে, আমার হৃদয়ে বর্তমান সকল রকম সৎ-ভাবসমূহ ভগবানের সন্নিকর্ষ প্রাপ্ত হোক অর্থাৎ আত্ম-উন্নতি হোক)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! তোমাকে গ্রহণের জন্য (তোমার বিশুদ্ধতা সম্পাদনের উদ্দেশ্যে) পরমেশ্বর্যশালী ভগবান অভিবৃদ্ধ হোন অথবা তোমাকে অভিবৃদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ হোন! অপিচ, তুমিও ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত অথবা তার জন্য অভিবৃদ্ধ অথবা উৎকর্ষসম্পন্ন বা পবিত্রতা-প্রাপ্ত হও। (মন্ত্রটি আত্ম উদ্বোধনমূলক। এখানে ভগবানকে পাবার জন্য সাধক আপন চিত্তের উৎকর্ষ প্রার্থনা করছেন)। হে দ্যোতমান দেব! সখির মতো প্রীতির সামগ্রী অথবা তোমার প্রতি প্রীতি-আতিশয্যযুক্ত, সাধনসম্পন্ন বা ভক্তিযুক্ত সাধকদের (অর্চনাকারী আমাদের) পরমধনদানে এবং আপনাকে হৃদয়ে ধারণযোগ্য শক্তির দ্বারা প্রবর্ধিত করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। এখানে হৃদয়ে ভগবাকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য এবং মোক্ষলাভের জন্য ভক্ত সাধক প্রার্থনা জানাচ্ছেন। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন। আমাকে মোক্ষের অধিকারী ও মেধাবী করুন)। হে দ্যোতমান শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ ভগবন্! তোমার সম্বন্ধি মঙ্গল আমাদের মধ্যে অবিনাশী হোক। তোমার অনুগ্রহে আমরা যেন বিনাশরহিত হয়ে ভগবৎ-প্রাপ্তি রূপ কর্মফল প্রাপ্ত হই; অথবা তোমার কার্য (সৎকর্ম) সম্পাদনে ব্যাপৃত থাকি। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। আমাতে সৎ-ভাব ও শুদ্ধসত্ত্ব অবিচলিত ভাবে অবস্থিতি করুক; এবং তার দ্বারা সস্বরূপ ভগবানকে প্রাপ্ত হই)। হে ভগবন! আমাদের অভিলক্ষিত পরমেশ্বর্য (মোক্ষরূপ ঐশ্বর্য) লাভের নিমিত্ত, আমাদের সকল কর্মফল (নিখিল শুদ্ধসত্ত্ব সৎ-ভাব ইত্যাদি) আপনাকে সর্বতোভাবে আমাদের দ্বারা প্রদত্ত হচ্ছে; প্রার্থনা–আপনার প্রসাদে আমাদের অভিলক্ষিত মোক্ষধন অধিগত হোক। সৎকর্মকারী আমাদের কর্মফল অর্থাৎ মোক্ষফল প্রদান করুন। (ভাবার্থ-আপনার অনুগ্রহে আমাদের কর্ম সুফলমণ্ডিত এবং মোক্ষফল-সমন্বিত হোক)। দ্যুলোকের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাকে নমস্কার করছি; ভুলোকের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাকে নমস্কার করছি। তাদের অনুগ্রহে আমাদের সঙ্কল্প সিদ্ধ হোক। অথবা আমার নমস্কাররূপ সৎকর্ম দুলোক ব্যেপে প্রকাশ পাক; এবং আমার নমস্কার রূপ কর্ম ভূলোক ব্যেপে প্রকাশ পাক। (ভাবার্থ–আমার সঙ্কর্ম সর্বলোকে ব্যাপ্ত হোক)। সকর্মপালক অথবা সৎকর্মকারিগণের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ প্রজ্ঞানময় হে ভগবন! আপনি সৎকর্মকারিদের প্রতি প্রীতি-আতিশয্য-যুক্ত অর্থাৎ তাদের মধ্যে সৎ-ভাবের সংরক্ষক হন। অতএব আমি আপনার শরণ গ্রহণ করছি। (প্রার্থনা-আপনি অনুগ্রহ-পরায়ণ হয়ে আমাকে সৎ-ভাবের অধিকারী করুন)। অতএব হে দেব! কলুষ-কলঙ্ক-পরিম্লান আমার পাপপঙ্কিল যে দেহ, তা আপনার শরীরে বর্তমান হোক অর্থাৎ লয়প্রাপ্ত হোক (লীন হোক); এবং সঙ্কর্মের পালক আপনার যে পুণ্যময় শরীর আছে, আপনার সেই পবিত্রকারক পুণ্যময় শরীর আমাতে বর্তমান হোক অর্থাৎ লীন হোক। (মন্ত্রাংশটি প্রার্থনামূলক। এখানে প্রার্থনাকারী পরমাত্মায় আত্মসম্মিলনের আকাঙ্ক্ষা জানাচ্ছেন)। প্রার্থনার ভাব এই যে,-কলুষ-কলঙ্কে পরিলিপ্ত পাপময় আমার এই ভৌতিক দেহ নাশ করে আমাতে আপনার পুণ্যপূত দেবদেহ স্থাপন করুন। (মর্মার্থ এই যে,আমাকে পাপ থেকে পরিত্রাণ করে পবিত্র সত্ত্বসমন্বিত করুন অর্থাৎ আপনার অনুগ্রহে পাপ থেকে মুক্ত হয়ে আমি যেন পবিত্র শুদ্ধসত্ত্বসমন্বিত এবং সৎ-ভাবযুক্ত হই)। হে সৎকর্মের পালক প্রজ্ঞানের আধার দেব! (আপনার ও আমার শরীর এইভাবে বিনিময় হলে) আমার অনুষ্ঠিত সকর্ম-সমুহ, আপনার ও আমার উভয়ের সাথে প্রবর্তিত থোক অর্থাৎ আমার কার্যে আমার ন্যায় আপনারও আদর বা প্রীতি হোক। প্রজ্ঞানস্বরূপ হে ভগবন্! রুদ্রভাবসম্পন্ন অর্থাৎ শত্রুনাশক আপনার যে পবিত্রকারক প্রসিদ্ধ শরীর আছে, পবিত্রকারক শত্রুনাশক সেই শরীরের প্রভাবে আপনি আমাদের পরিত্রাণ করুন। স্বাহা মন্ত্রের দ্বারা আপনার সেই শরীর প্রার্থনা করছি। (ভাব এই যে, আপনার অনুগ্রহে আমি যেন শত্রুনাশ-সামর্থ্য এবং নির্মল সত্ত্বভাব লাভ করি)। প্রজ্ঞানময় হে ভগব! শ্রেষ্ঠতম অথবা ভক্তগণের অভীষ্ঠ-বৰ্ষণশীল, হৃদয়ের অতি নিগুঢ় প্রদেশে অবস্থিত, লৌহময় অথবা বজ্রের মতো অতি কঠোর অর্থাৎ তমোরূপ আপনার যে শরীর আছে, এবং হিরন্ময় অর্থাৎ সত্ত্বভাবাপন্ন আপনার যে প্রসিদ্ধ শরীর আছে বা অঙ্গ আছে, সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ–এই তিনরকম ভাবময় আপনার সেই শরীর বা অঙ্গ শত্রুদের তীব্র বাক্যকে অর্থাৎ হিংসা-প্রলোভন ইত্যাদির পাপ-সঙ্কল্পব্যঞ্জক কর্মকে সমূলে নাশ করে। অপিচ, শত্রুদের পৌরুষব্যঞ্জক বাক্যকে অর্থাৎ কাম-ক্রোধ ইত্যাদি অন্তরের শত্রুদের হৃদয়-অভিভবকারী শক্তিকে নাশ করে। অতএব স্বাহা মন্ত্রে তোমাকে পূজা করি, আমার উদ্বোধন-যজ্ঞ সুহুত অর্থাৎ সুসিদ্ধ হোক। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক এবং আত্ম-উদ্বোধক। সত্ত্বরজস্তমঃ এই ত্রি-মূর্তিতে (বা ভাবে) ভগবান্ সকল শত্রুকে নাশ করেন। অতএব ত্রি-মূর্তির দ্বারা বা ত্রিভাবের সহায়তায় ভগবান্ আমাদের সকলরকম শত্রুকে নিরাকৃত করে আমাদের আরব্ধ কর্ম সুসিদ্ধ করুন এবং আমাদের ভগবৎ-সমীপে নিয়ে যান) ॥ ১১।
[সোম স্থাপিত হয়েছে। সেই সোমের দ্বারা যে যজ্ঞ সম্পন্ন হবে, সেই যজ্ঞের বিঘ্নকারী অসুরদের প্রথমে বিতাড়িত করতে হবে। সেই অসুরদের বিজয়ের জন্য উপসদ-যজ্ঞের অনুষ্ঠান বিধেয়। একাদশ অনুবাকে সেই উপসদ নামা যজ্ঞের বিষয় পরিবর্ণিত হয়েছে। উপসদ-ইষ্টির প্রারম্ভেই অতিথি সোমের বন্ধন-উপদ্রব পরিহারকল্পে আপ্যায়ন ইত্যাদি উপচার কর্তব্য। সুতরাং কর্মকাণ্ড অনুসারে ভাষ্যকার কর্তৃক এই কণ্ডিকার। প্রথম মন্ত্রের সম্বোধ্য-সোম। প্রথম মন্ত্রের পর ঋত্বিকগণ সোমের পরিচর্যা করতে করতে দ্বিতীয় মন্ত্র উচ্চারণ করেন। সেই অনুসারে ভাষ্যমতে মন্ত্রের যে অর্থ হয়, তা এই-এ শব্দে ইচ্ছাবন্ত দ্যাবাপৃথিবী অভিমানী দেবতাকে বোঝায়। দয়ালু বলে সেই দেবতা ভক্তের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ। হে তাদৃশ দেবতা। তুমি যজ্ঞবাদী আমাদের অমৃতের মতো যজ্ঞ প্রকৃষ্টভাবে প্রদান করো। কি জন্য? ধনের জন্য। আর অন্নের জন্য। এবং ভগায় অর্থাৎ ঐশ্বর্য ইত্যাদি ষড়গুণের জন্য। দ্যুলোক অভিমানী দেবতা নমস্কার প্রাপ্ত হোন। শুক্লযজুর্বেদে এই মন্ত্র দুটির কম-বেশী একই ধরনে মহীধর অর্থ নিষ্কাশন করেছেন। সায়ণাচার্য মন্ত্রের সম্বোধ্য যে সোমকে নির্দেশ করেছেন, আমাদের মতে পূর্বাপর সে সোম-পার্থিব সোমলতা নয়; তাতে এক অনুপম স্বর্গীয় সামগ্রীর সূচনা রয়েছে। বেদ-মন্ত্রের ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে যেখানে সোম শব্দের প্রয়োগ দেখেছি, আমরা সেই সোম শব্দে সর্বত্রই সেই অমৃতময় স্বর্গীয় সামগ্রীরই পরিকল্পনা করেছি; আর তাতে (সেই আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে) মন্ত্রগুলিতে এক অভিনব ভাবের বিকাশ হয়েছে। সোম–হৃদয়ের অন্তর্নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব-হৃদয়ের সেই অনন্যা ভক্তিরসামৃত। তৃতীয় মন্ত্রের বিভিন্ন অংশে চরম প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। নিষ্কাম কর্মের চরম পরিণতি এখানেই আমরা দেখতে পেয়েছি এবং মর্মার্থে তা প্রকাশ করেছি। ভাষ্যমতে এই মন্ত্রের দ্বারা আহবনীয় উপস্থাপন করতে হয়। মন্ত্রের অর্থ,-হে ব্রতপতি অগ্নি! তুমি ব্রতের অধিপতি হও। একই মাত্র ব্রতের অধিপতি তুমি নও; পরন্ত অগ্নি বিশ্বের যাবতীয় ব্রতের পালক…।–ইত্যদি। শুক্লযজুর্বেদে, মহীধর ও উবটের ভাষ্যে, আরও একটু স্পষ্ট ভাবেই মন্ত্রের অর্থ অধ্যাহৃত হয়েছে। মহীধবের অর্থ-হে সকল ব্রতের পালক অগ্নি! তুমি আমাদের বর্তমান ব্রতের পালক হও।…..ইত্যাদি। ফলতঃ, ভাষ্যকারের মতে যজমান এই মন্ত্রের দ্বারা অগ্নির শরীরের সাথে নিজের শরীর বিনিময় এবং আহবনীয় অগ্নিতে সমিধ অর্পণ করছেন। আমরা চতুর্থ মন্ত্রটির সাথে তৃতীয় মন্ত্রের সম্বন্ধ রয়েছে মনে করি। তৃতীয় মন্ত্রে আমাদের মতে, আত্মায় আত্মসম্মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে, এই চতুর্থ মন্ত্রে সেই আত্মসম্মিলনের অন্তরায়মূলক শনাশের প্রার্থনা বিজ্ঞাপিত হয়েছে। এই অনুবাকের শেষ মন্ত্রের সাথে, কর্মকাণ্ড অনুসারে, একটি উপাখ্যান বিজড়িত দেখি। সে উপাখ্যান,-দেবগণ কর্তৃক পরাজিত হওয়ার পর অসুরবর্গ তপস্যা আরম্ভ করে; ফলে ত্রৈলোক্যে তাদের তিনটি পুর নির্মিত হয়–পৃথিবীতে লৌহময়, অন্তরিক্ষে রজতময় এবং স্বর্গলোকে হেমময়। তখন, সেই পুর দগ্ধ করবার জন্য, দেবগণ উপসদ অগ্নির আরাধনা আরম্ভ করেন। উপসদ দেবতারূপ অগ্নি যখন সেই তিন পুরে প্রবেশ করে দগ্ধ করেন, তখন তার তিনরকম–লৌহময়, রজতময় ও হিরন্ময়–দেহ উৎপন্ন হয়। মন্ত্রে অগ্নিদেবের সেই তিন রকম শরীরের বিষয় উল্লিখিত। ভাষ্যকার প্রথমেই সে বিষয় বিবৃত করেছেন। বলা বাহুল্য, আমরা ভাষ্যকারের সাথে একমত হতে পারিনি; কারণ আমরা আধ্যাত্মিকভাবে এই মন্ত্রের অন্য ভাব বুঝতে পেরেছি এবং আমাদের মর্মার্থে তা প্রকাশ করেছি] ॥ ১১।
মর্মার্থ- হে আমার অন্তরের শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবিঃ! দীপ্তিমান্ জ্ঞানপ্রদ ষড়ৈশ্বর্যশালী সকলের প্রসবিতা সবিতৃদেবের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে, আত্মবাহুকে দেবগণের অধ্বর্যস্থানীয় ভবব্যাধিনিবারক অশ্বিদ্বয়ের বাহুযুগলের মতো মনে করে, এবং আপন করযুগলকে দেবগণের পূজাংশভাগী হবির্ভাগপূরক পূষাদেবতার করস্তরূপ মনে, করে, সেই বাহুযুগলের ও করদ্বয়ের দ্বারা তোমাকে ভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। (এর ভাব-সঙ্কর্ম সাধনের সময়ে আমি ভগবানের অংশ, এটি স্মরণ করা কর্তব্য। মনে মনে এইরকম বিচার করে যিনি কর্মে প্রবৃত্ত হন, তিনি কর্মে সফলকাম হয়ে থাকেন। ভগবানের শক্তি ভিন্ন সৎকর্মের সাধন সুদূরপরাহত। সেই হেতু, সৎকর্ম সম্পাদনের সময়ে শুদ্ধসত্ত্বভাবের প্রভাবে হৃদয়ে ভগবানের শক্তির বিকাশ অবশ্য কর্তব্য)। হে আমার মন! তুমি স্থির অবিচলিত হও। অতএব তুমি ভগবানের আরাধনার জন্য অথবা সৎকর্ম সাধনের নিমিত্ত শান্তভাব ধারণ করো। (ভাব এই যে,-সৎকর্মের সম্পাদনে আমার মন অবিচলিত এবং শান্ত হোক। মনই মূল। মনের স্থৈর্য-সম্পাদনে ভিন্ন সাফল্যলাভ সুদূরপরাহত। মন্ত্রে সেই মনস্থৈর্য-সম্পাদনের জন্য উদ্বোধনা রয়েছে)। হে ভগবন্! আপনার অনুগ্রহে আমার দুর্বুদ্ধিরূপ শত্রু নাশপ্রাপ্ত হোক; এবং আমার সৎ-ভাব-অবরোধক রিপুশত্রু বিনাশিত হোক। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। বহিরন্তঃ–সকল শত্রুনাশের প্রার্থনা মন্ত্রে বিদ্যমান)। এইরকম সৎকর্মের প্রভাবে আমি দুবুদ্ধিরূপ শত্রুর মূল পর্যন্ত ছেদন করছি। যে বাহিরের ও অন্তরের শত্রু সৎকর্মে প্রবৃত্ত আমাদের হিংসা করে এবং যে শত্রুর আমরা হিংসাকারী, এই উভয়বিধ শত্রুর মূল পর্যন্ত কর্মরূপ অস্ত্রের দ্বারা ছেদন করছি। (কর্মশক্তির প্রভাবে আমরা যেন সকল শত্রুকে নাশ করতে সক্ষম হই– এটাই ভাবার্থ)। হে আমার ভগবৎসম্বন্ধি সৎকর্ম! তোমাকে দুলোকে অবস্থিত দেবভাব-লাভের নিমিত্ত নিযুক্ত করছি। হে আমার ভগবৎসম্বন্ধি কর্ম! তোমাকে অন্তরিক্ষলোকে অবস্থিত দেবভাব-লাভের নিমিত্ত নিযুক্ত করছি।
হে আমার সকর্ম! তোমাকে পৃথিবীলোকে অবস্থিত দেবভাব-লাভের জন্য নিযুক্ত করছি। হে ভগবন্! শুদ্ধসত্ত্ব-অবস্থায় উপনীত পিতৃদেবতাদের গৃহরূপ আমার হৃদয় বিশুদ্ধীকৃত হোক। অথবা–হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবিঃ! তোমার প্রভাবে পিতৃগুণসমূহের আশ্রয়ভূত সকল লোক অর্থাৎ পিতৃগুণসমূহের আশ্রয়ভূত হৃদয় বিশুদ্ধতা প্রাপ্ত হোক অথবা পরিত্রাণ লাভ করুক। (এর ভাব,–যেমন আমার পৃতিপুরুষেরা শুদ্ধসত্ত্ব-ভাবে উপনীত হয়েছিলেন, সেইভাবে আমিও সৎকর্মের দ্বারা হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বভাবের বিকাশ করছি)। হে ভগবন্! আপনি দ্রুতগামী হন। আপনি সৎকর্মকারক আমাদের নিকট হতে হিংসাদ্বেষ-কুপ্রবৃত্তিগুলিকে বিতাড়িত করুন; এবং আপনি অন্তঃশত্রু এবং বহিঃশত্রুদের নিবারণ করুন। (ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমার হৃদয়ে নিহিত কুপ্রবৃত্তিগুলিকে নাশ করুন)। অথবা,আমার অন্তরের শুদ্ধসত্ত্বরূপ হে হবিঃ! তুমি ভগবানের সাথে মিলন-সাধক অর্থাৎ পরমাত্মার সাথে আত্মার মিশ্রণকারী হও। অতএব তুমি আমাদের থেকে আমাদের শত্রুদের পৃথক করো অর্থাৎ দুরে অপসারণ ও বিনাশ করো; অপিচ, দানের প্রতিবন্ধক অর্থাৎ সৎ-বৃত্তির নাশক শত্রুদের বিনাশ করো। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমাদের অন্তর-বাহ্য সকল শত্রুকে বিনাশ করে আমাদের পরমাত্মার সাথে সম্মিলিত করুন)। হে আমার মন! তুমি পিতৃপুরুষদের গুণের আধার স্বরূপ হও। (ভাব এই যে,-পিতৃগুণের দ্বারা অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বভাবের দ্বারা আমার মন পরিপূর্ণ হোক)। হে ভগবন্! আমি হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্বভাবের ভববন্ধনছেদক গুণগুলির উদ্ধোধন করছি। হে ভগবন্! তুমি আমার হৃদয়কে ভক্তির দ্বারা পূর্ণ করো। সৎ-বৃত্তির মূল জ্ঞান ও কর্মকে দৃঢ় করো। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনা–হে ভগবন্! আমাকে রক্ষা করুন)। অথবা,হে আমার মন! তুমি দুলোককে অর্থাৎ দুলোক-সমন্ধি দেবভাবকে উৎকৃষ্টভাবে স্তম্ভিত করো অর্থাৎ যাতে তা পরিক্ষীণ না হয়, সেইরকম ভাবে রক্ষা করো; এবং পৃথিবীতলে অবস্থিত অথবা ভূলোক-সম্বন্ধি সৎ-ভাবকে দৃঢ় করো। (ভাব এই যে,-সকল দেবভাব আমার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোক)। অথবা, হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি আমার হৃদয়রূপ দেবস্থানকে অর্থাৎ পরমসুখমূলকে উন্নতভাবে বা প্রকৃষ্টরূপে স্তম্ভিত করো অর্থাৎ পতন হতে রক্ষা করো; অন্তরিক্ষের মতো অনন্তপ্রসারিত আমার সৎকর্মের মূলকে অথবা সৎ-ভাবসমূহের সর্বব্যাপকত্বকে পরিপূর্ণ অর্থাৎ পরিবধিত করো; এবং সৎ ভাবসমুহের আধারক্ষেত্রকে অর্থাৎ আমার সৎ-বৃত্তির মূলকে দৃঢ় করো।
(সৎ-ভাবের প্রভাবে ও শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে আমাতে সৎকর্ম সাধনের সামর্থ্য অবিচলিতভাবে অবস্থিতি করুক। তাতে পূর্ণজ্ঞান লাভ হবে এবং ভগবানকে প্রাপ্ত হতে পারব। হে আমার মন! দীপ্যমান পরমজ্ঞানময় মরুৎ-দেবতা বা বিবেক-অনুমত জ্ঞান অথবা প্রাণবায়ুরূপে সদা অধিষ্ঠিত ভগবান তোমাকে জ্ঞানভক্তিরূপে দেবতার সত্যধর্মপালনরূপ-বলের দ্বারা রক্ষা করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক) অথবা-হে আমার মন! দীপ্যমান পরমজ্ঞানময় মরুৎ-দেবতা বা বিবেকানুমত জ্ঞান অথবা প্রাণবায়ুরূপে অধিষ্ঠিত ভগবান্ তোমাকে অবিচলিত বা অবিচ্ছিন্ন রক্ষার দ্বারা রক্ষা বা পোষণ করুন; অপিচ, মিত্র-বরুণ দেবতা অর্থাৎ সকলের প্রতিসাধক ও অভীষ্টপূরক দেবতা অর্থাৎ মিত্রের ন্যায় হিতসাধক এবং বরুন বা অভীষ্টবষকরূপ শ্রেয়ঃ বিধায়ক দেবদ্বয় অবিচলিত অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন রক্ষার দ্বারা তোমাকে রক্ষণ ও পোষণ করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। দেবভাবের প্রভাবে মন চাঞ্চল্যরহিত ও ভগবৎপরায়ণ হোক,–মন্ত্রের এটাই প্রার্থনা)। হে মন! ব্রাহ্মণভাবাপন্ন অর্থাৎ সত্ত্বগুণোপেত ব্রহ্মস্বরূপ, ক্ষত্ৰভাবোপেত অর্থাৎ রজোভাবাপন্ন, পরমার্থরূপ ধনের পোষক তোমাকে প্রকৃষ্টরূপে স্থাপন করছি, অথবা পরমাত্মায় নিয়োজিত করছি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। মনই সকল সৎ-বৃত্তির মূল এবং সৎ-ভাবের পোষক। মন যাতে সর্বদা ভগবৎ-পরায়ণ হয়, তার পক্ষে চেষ্টান্বিত হওয়া কর্তব্য–এটাই ভাবার্থ)। হে আমার মন! তুমি ব্রাহ্মণ-ভাবকে অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্ব ভাবকে দৃঢ় অর্থাৎ পোষণ করো। হে মন! তুমি ক্ষত্র-ভাবকে বা রজোগুণকে অর্থাৎ কমর্সমর্থকে দৃঢ় অর্থাৎ পোষণ করো। হে মন! তুমি সৎ-ভাবকে দৃঢ় অর্থাৎ পোষণ করো। হে মন! তুমি পরমার্থ-ধনকে দৃঢ় অর্থাৎ পোষণ করো। [ এই চারটি মন্ত্র প্রার্থনামূলক। সকল সৎ-ভাব আমাকে প্রাপ্ত হোক; অপিচ, পরমার্থ-প্রাপ্তির পক্ষে তারা আমার সহায় হোক, এইরকম প্রার্থনার ভাব মন্ত্রে প্রকটিত]। হে মম মনোবৃত্তি! তোমার প্রভাবে শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবির দ্বারা দ্যুলোক ভূলোক অর্থাৎ সর্বলোক পরিপূর্ণ হোক। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,–আমার অন্তরস্থিত সৎ ভাবরাজি সকল লোকে অবস্থিত হোক অর্থাৎ সকল লোকের প্রীতি-বর্ধন করুক)। হে মনোবৃত্তি! তুমি পরমেশ্বর্যশালী ভগবানের আশ্রয়-স্বরূপ অর্থাৎ আধারস্থানীয় হও। হে মনোবৃত্তি! তুমি নিখিল-ভূত-সমূহের অথবা নিখিল সৎ-ভাবের আশ্রয় বা ধারক হও। স্তুতিমন্ত্রসেবনীয় হে ভগব! সবরকমে সকল কর্মে প্রযুজ্যমান্ আমাদের এই স্তুতিবাক্যসমূহ সর্বতোভাবে আপনাকে প্রাপ্ত হোক। (তার দ্বারা) নিত্যসত্যস্বরূপ আপনার সন্তোষ সাধনেই আমাদের সন্তোষ হোক। (ভাব এই যে, হে ভগবন্! আমাদের বাক্যসমূহ আপনাকেই প্রাপ্ত হোক; আপনার সেবায় নিযুক্ত হয়েই আমার প্রীতি হোক)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি পরমৈশ্বর্যশালী ভগবানের সীবনহেতুভূত অথবা গ্রন্থিস্বরূপ অর্থাৎ বন্ধন-হেতুভূত হও। (মন্ত্রটি নিত্যসত্যপ্রকাশক। ভক্তির ও শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারাই ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। ভক্তি-সামর্থ্যের দ্বারা এবং সৎ-ভাবের দ্বারা আমি আমাকে ভগবানে লীন করি-মন্ত্রে এই ভাব পরিত্যক্ত)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি পরমৈশ্বর্যশালী ভগবানের নিত্যসত্যস্বরূপ হও। (ভাব এই যে,-সত্যের দ্বারা এবং সৎ-ভাবের দ্বারাই সৎস্বরূপ ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। মোক্ষ-ইচ্ছু ব্যক্তি নিজের হৃদয়গত ভক্তিসুধারূপ শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা ভগবাকে পূজা করেন। অতএব হে আত্ম! শুদ্ধসত্ত্ব-সঞ্চয়ে প্রবুদ্ধ হও)। হে, আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবৎ-সম্বন্ধি অর্থাৎ ভগবানের স্বরূপ হও। (মন্ত্রটি নিত্যসত্য-প্রকাশক। শুদ্ধসত্ত্ব ভগবানের স্বরূপ। শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারাই ভগবাকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। ভক্তি-সামর্থ্যের দ্বারা এবং সৎ-ভাবের দ্বারা আমি আমাকে ভগবানে লীন করি-মন্ত্রে এই ভাব পরিত্যক্ত)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি পরমেশ্বর্যশালী ভগবানের নিত্যসত্যস্বরূপ হও। (ভাব এই যে,–সত্যের দ্বারা এবং সৎ-ভাবের দ্বারাই সৎস্বরূপ ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। মোক্ষ-ইচ্ছু ব্যক্তি নিজের হৃদয়গত ভক্তিসুধারূপ শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা ভগবানকে পূজা করেন। অতএব হে আত্ম! শুদ্ধসত্ত্ব-সঞ্চয়ে প্রবুদ্ধ হও)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবৎ-সম্বন্ধি অর্থাৎ ভগবানের স্বরূপ হও। (মন্ত্রটি নিত্যসত্য-প্রকাশক। শুদ্ধসত্ত্ব ভগবানের স্বরূপ। শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারাই ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! পরমেশ্বর্যশালী ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিয়োগ করছি। (ভাব এই যে, আমি যেন শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা পরম ঐশ্বর্যশালী ভগবানের প্রতি উৎপাদনে সমর্থ হই) ॥১॥
[প্রথম প্রপাঠকে সাধারণভাবে দর্শযাগের বিষয় উল্লিখিত। দ্বিতীয় প্রপাঠকে তার অন্তর্ভুত সোমযাগে সোমক্রয়ের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি প্রদর্শিত হয়েছে। সোমক্রয়ই দ্বিতীয় প্রপাঠকের প্রধান প্রতিপাদ্য। সোমক্রয় থেকে আরম্ভ করে হবির্ধানমণ্ডপ নির্মাণ পর্যন্ত কর্মর্জাত দ্বিতীয় প্রপাঠকে প্রতিপাদিত হয়েছে। এই তৃতীয় প্রপাঠকের প্রধান প্রতিপাদ্য-অগ্নিযোমীয় পশু। প্রথম অনুবাক থেকে আরম্ভ করে শেষ অনুবাক পর্যন্ত, সদ নাম মণ্ডপ-নির্মাণ ইত্যাদি প্রতিপাদিত হয়েছে।–কাষ্ঠনির্মিত খনন-সাধনোপযোগী তীক্ষাগ্র অস্ত্রবিশেষ অত্রি নামে অভিহিত হয়। বিনিয়োগ সংগ্রহের মতে দেবস্ব ত্ব প্রভৃতি মন্ত্রে সেই অভ্রি গ্রহণ করে অরিসি মন্ত্রে তাকে মন্ত্রপূত করে নিতে হবে; তারপর পরিলিখিত প্রভৃতি মন্ত্রে গর্ত খনন করে দিবে ত্ব প্রভৃতি মন্ত্রে ঔদুম্বরীর অগ্র মধ্যে ও মূল প্রেক্ষণ করে শুন্ধতাং প্রভৃতি মন্ত্রে সর্বশেষে সেই ঔদুম্বরীকে গর্তের মধ্যে অবনমিত করবার বিধি। তারপর যথাক্রমে যবোহসি প্রভৃতি মন্ত্রে যব নিক্ষেপ, পিতৃণাং প্রভৃতি মন্ত্রে দর্ভ আস্তীর্ণীকরণ, উদ্দিবং প্রভৃতি মন্ত্রে ঔদুম্বরী গ্রহণে দ্যুতানস্তাব প্রভৃতি মন্ত্রে তাকে অবটে অর্থাৎ সেই গর্তে প্রোথিত করবে। তারপর ব্রহ্মবনি প্রভৃতি মন্ত্রে গর্তকে দৃঢ় করতে হবে। তারপর ঘৃতেন প্রভৃতি মন্ত্রে ঔদুম্বরী হোম, ইন্দ্রস্য সদোহসি প্রভৃতি মন্ত্রে দিক অভিমন্ত্রণান্তর ছদিতে কর্তব্য সমাপন করে পয়িত্ব প্রভৃতি মন্ত্রে পরিশ্রঘণের বিধি সূত্র ইত্যাদিতে উক্ত হয়। তারপর ইন্দ্রস্য সরসি প্রভৃতি মন্ত্রসমূহে যজমান যথাক্রমে রঞ্জুগ্রহণ, গ্রন্থিবন্ধন এবং মণ্ডপনির্মাণ কার্য সম্পন্ন করবেন। প্রথম অনুবাকের কুড়িটি মন্ত্রে এইভাবে মণ্ডপ-নির্মাণের পদ্ধতি উক্ত হয়েছে এবং পূর্বোক্ত বিনিয়োগ অনুসারে ভাষ্যকার মন্ত্রের ব্যাখ্যানে প্রবৃত্ত হয়েছেন। এই অনুবাকের প্রথম মন্ত্রের অর্থ (ভাষ্যানুসারে)–সবিতৃদেবের প্রেরণায় অশ্বিদ্বয়ের বাহুযুগল এবং পূষাদেবতার হস্তের দ্বারা, হে অভি, তোমাকে গ্রহণ করছি।
এই প্রথম মন্ত্রটি প্রথম প্রপাঠকে ষষ্ঠ অনুবাকে একটু রূপান্তরে দেখা যায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মন্ত্রের ভাষ্যানুসারী অর্থ-হে অত্রি! যদিও তুমি খনন-সাধন কর্মের উপযোগী, তথাপি তুমি আমাদের অশত্রু হও। এই অদ্রির দ্বারা আমি যজ্ঞের বিঘ্ন-উৎপাদনকারীদের কণ্ঠদেশ ছিন্ন করি। যারা আমাদের দ্বেষ্য এবং যারা আমাদের হিংসা করে, সেই সকল শত্রুর গ্রীবা ছিন্ন করি। (বাহু বলতে অংশ অর্থাৎ স্কন্ধদেশ থেকে মণিবন্ধ পর্যন্ত অংশকে বাহু এবং মণিবন্ধ থেকে পঞ্চাঙ্গুলি সমেত অগ্র-অংশকে হস্ত বলে। চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্যন্ত মন্ত্র চারটি, ভাষ্যমতে ঔদুম্বরী শাখা অর্থাৎ যঞ্জ-দুম্বরের শাখা প্রোথিত করবার মন্ত্র। অষ্টম থেকে একাদশ পর্যন্ত চারটি মন্ত্রেও, ভাষ্যকারের মতে, ঔদুম্বরীর সম্বোধন আছে। যেমন অষ্টম মন্ত্রের অর্থ-হে ঔদুরি! তুমি দুলোককে স্তম্ভিত করো অর্থাৎ ঊর্ধ্ব হতে পতিত না হয়, তা-ই করো। অন্তরিক্ষকে পূরণ করো; এবং পৃথিবীকে দৃঢ় করো। আবার ঔদুম্বরী শাখার চারদিকে মৃত্তিকা দৃঢ় করতে করতে অর্থাৎ পিটতে পিটতে একাদশ মন্ত্র পাঠ করবার বিধি। সে হিসাবে মন্ত্রের অর্থ-হে ঔদুম্বরী! ব্রাহ্মণজাতি, ক্ষত্রিয়জাতি, জীবন এবং পুত্র ইত্যাদিকে দৃঢ় করো। (আমাদের মতে মন্ত্র-কয়টি মন বা চিত্তবৃত্তির সম্বোধন-মূলক। মন বা চিত্তবৃত্তি পাপ-পুণ্য সৎ অসৎ–সকল ভাবেরই আধার। মন স্থির না হলে, পাপ বা অসৎ মন হতে বিদুরিত না হলে, পরিত্রাণের আশা অতি বিরল)। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ মন্ত্র দুটি আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে খুবই সরল। কিন্তু ভাষ্যের ভাব জটিল। ভাষ্যে মন্ত্রের সম্বোধ্য–ঔদুম্বরী, তৃণময় কট প্রভৃতি। ঔদুম্বরী শাখার যেখান থেকে দুটি ডাল বাহির হয়েছে, সেই স্থানে সূব বা ঘৃত ঢেলে দিতে হয়। সেই অনুসারে মন্ত্রের অর্থ–হুয়মান এই ঘৃতের দ্বারা, হে দাবাপৃতিবীরূপ ঔদুরি! তোমরা পরিপূর্ণ হও। ইত্যাদি। চতুর্দশ মন্ত্রের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। ভাষ্যমতে মন্ত্রের অর্থ–হে গির্বণ ইন্দ্র! স্তোত্রশস্ত্ররূপা বা (বাক্য) তোমাকে সর্বদিকে বা সর্বভাবে কটরূপে পরিগ্রহণ করুন-ইত্যাদি। ভাষ্যমতে পঞ্চদশ মন্ত্রের তিনটি সম্বোধন পদ, যথা, রঞ্জু, গ্রন্থি ও সদ। কিন্তু এই তিনটি অধ্যাহৃত সম্বোধন পদের কোন চিহ্নই মন্ত্রের মধ্যে পাওয়া যায় না৷] ॥ ১।
মর্মার্থ- হে আমার হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহ! ভগবানের অংশসস্তৃত, সৎকর্মের বিঘাতকদের নাশয়িতা অর্থাৎ অজ্ঞানান্ধকারের নাশক, মোহজনক, অন্তর ও বাহ্য প্রবৃত্তির নাশকারী অর্থাৎ মায়ানমোহের নাশক তোমাদের হৃদয়ে স্থাপন করি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। হৃদয়গত সৎ-ভাবরাজি ভগবানের প্রীতিসাধক। ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত সেই সৎ-ভাবসমুহকে বিনিযুক্ত করি,–এটাই সঙ্কল্প)। বর্তমান এই মন্ত্ররূপ বাকের দ্বারা অথবা আমাদের অনুষ্ঠিত সকর্মসমূহের দ্বারা অর্থাৎ হৃদয়সঞ্জাত শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে সেই সকল মোহজনক অন্তর-বাহ্য-প্রকৃতিকে বিশেষভাবে বিনষ্ট করি। আমাদের সহাধিষ্ঠিত অন্তরস্থিত রিপুশত্রু, মোহজনক যে কুপ্রবৃত্তিসমূহকে উৎপন্ন করে অপিচ প্রলোভন ইত্যাদিরূপ বহিরাগত যে শক্র মোহজনক অন্তর্বাহ্য-প্রকৃতিকে উৎপাদিত করে, আমাদের বর্তমান সৎকর্মের প্রভাবে অর্থাৎ হৃদয়ে সঞ্জাত শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা সেই সকল মোহজনক আন্তরবাহ শত্রুকে আমি বিনাশ করি। আমাদের সহাধিষ্ঠিত যে শত্রু (মোহজনক কুপ্রবৃত্তি) এবং আমাদের বহিরাগত কুপ্রবৃত্তিরূপ যে শত্রু আমাদের হিংসা করে, সেই আন্তর্বাহ্যশত্রু গায়ত্রীছন্দোবদ্ধ ব্ৰহ্মমন্ত্রের দ্বারা নিবারিত (বিনাশিত) হোক। (ভাব এই যে, কর্মের প্রভাবে আমাদের কুপ্রবৃত্তিসমূহ দূরীভূত হোক)। হে ভগব! আপনার অনুগ্রহ (আমাদের) এই কর্ম-অনুষ্ঠানে আমাদের সাথে যাতে আপনি নিত্যবর্তমান হন, আপনি আমাদের সেইরকম কল্যাণ (কর্মফল) বিধান করুন। হে ভগবন! আপনি সর্বব্যাপী হন। অতএব আমাদের অন্তরস্থিত সহাধিষ্ঠিত অর্থাৎ জন্মসহজাত শত্রুগণের বিনাশকারী হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমাদের অন্তরের শত্রুকে বিনাশ করুন)। হে ভগবন্! আপনি সকলের অধিপতি স্বামী হন। অতএব আপনি আমাদের পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি সম্পর্কিত স্নেহ-বন্ধনের অর্থাৎ সংসারবন্ধনের নাশকারী হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। ভগবানের অনুগ্রহে আমাদের ভববন্ধন নাশপ্রাপ্ত তোক)।
হে ভগবন্! আপনি স্বয়ংই আপনাতে বিদ্যমান, দীপ্যমান ও প্রকাশমান হন। অতএব আপনি আমাদের অননুকূল মোহের উৎপাদক আন্তরবাহ্য শত্রুদের বিনাশকারী হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,হে ভগবন্! আপনি আমাদের শত্রুনাশ করবার সামর্থ্য প্রদান করুন)। হে ভগবন্! আপনি বিশ্বচরাচরে সকলের অন্তরে নিত্যবিরাজমান ও দীপ্তিসম্পন্ন হয়ে আছেন অথবা আপনি বিশ্বের সকলের প্রকাশক হন। অতএব আপনি বিশ্বের সর্বজনের রিপুশত্রুসমূহের নাশক হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! কৃপাপরবশ হয়ে আমাদের কুপ্রবৃত্তিগুলিকে নাশ করুন। হে আমার হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহ! ভগবৎ-অংশভূত, সৎকর্মের বিঘাতকবৃন্দের নাশয়িতা অর্থাৎ অজ্ঞান-অন্ধকারনাশক, মোহজনক আন্তর্বাহ্য প্রকৃতিনাশকারী অথবা মায়ামোহ ইত্যাদির নাশক তোমাদের ভগবানে নিয়োজিত করি অথবা প্রকৃষ্টভাবে সুসংকৃত করি অর্থাৎ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত প্রকৃষ্টভাবে উৎকর্ষ সাধন করি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। হৃদয়গত সৎ-ভাবরাজি ভগবানের প্রীতিসাধক! ভগবানের প্রীতির জন্য সেই সৎ-ভাবসমূহকে বিনিযুক্ত করি,-সাধকের এটাই সঙ্কল্প)। হে আমার হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্বভাব সমূহ! তোমরা যেন ভগবানের অংশভূত সৎকর্মের বিঘাতকদের বিনাশকারী অর্থাৎ অজ্ঞানান্ধকারের নাশক, মোহজনক আন্তর্বাহ্য-প্রবৃত্তিনাশক অথবা মায়ানমাহের বিনাশকারী হও, সেইভাবে তোমাদের অবনত অর্থাৎ ভগবানের প্রীতিসাধনের উপযোগীরূপে সুসংস্কৃত করছি। (এ মন্ত্রটিও সঙ্কল্পমূলক। আমার হৃদয়স্থিত সৎ-ভাবরাজি যাতে ভগবৎ-প্রীতি-সাধনসমর্থ হয়, তেমনভাবে উৎকর্ষসম্পন্ন করি)। হে আমার অন্তরের শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবিঃ! তুমি ভগবানের সাথে মিলনসাধক অর্থাৎ পরমাত্মার সাথে আত্মার সংসোজক (মিশ্রণকারী) হও। অতএব আমাদের থেকে আমাদের শত্রুদের পৃথক অর্থাৎ দূরে অপসারণ ও বিনাশ করো; অপিচ দান-প্রতিবন্ধক অর্থাৎ সৎ-বৃত্তির নাশক শত্রুদের বিনাশ করো। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। ভাব এই যে, আমাদের আন্তর্বাহ্য সকল শত্রুকে বিনাশ করে আমাদের পরমাত্মার সাথে সম্মিলিত করো)। হে আমার হৃদয়স্থিত শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহ! ভগবৎ অংশভূত, সকর্ম-বিঘাতকদের বিনাশকারী অর্থাৎ অজ্ঞানান্ধকার-নাশক, মোহজনক আন্তর্বাহ্যপ্রবৃত্তিনাশক অথবা মায়ানমোহ-বিনাশকারী তোমাদের ভগবানে নিয়োজিত করি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। সর্বকর্মফল ভগবানে সমর্পণের জন্য মন্ত্রে সঙ্কল্প বিদ্যমান। মন্ত্রটি নিষ্কাম-কর্মের মূলসূত্র প্রদর্শন করছে। ভাব এই যে, আমার সকল কর্মফল ভগবানে সমর্পিত হোক)।
হে আমার হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহ! ভগবানের অঙ্গীভূত সকর্ম-বিঘাতকদের বিনাশকারী অর্থাৎ অজ্ঞানরূপ অন্ধকার-নাশক, মোহজনক আন্তর্বাহ্য প্রবৃত্তিনাশক অথবা মায়ামোহ-বিনাশকারী তোমাদের পূজা করি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,–আমি ভগবানের অঙ্গিভূত শুদ্ধসত্ত্বভাবগুলিকে পূজা করি)। হে আমার জ্ঞানকর্ম! ভগবৎ-অঙ্গীভূত, সঙ্কৰ্ম-বিঘাতকদের বিনাশক অর্থাৎ অজ্ঞানান্ধকারনাশক, মোহজনক, আন্তর্বাহ্যবৃত্তিনাশকারী অথবা মায়া-মোহ ইত্যাদির বিনাশক তোমাদের প্রকৃষ্টভাবে স্থাপিত করি, অর্থাৎ শত্রুনাশের জন্য এবং ভগবানের প্রীতিসাধনের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে, আমার জ্ঞান ও কর্ম ভগবানের প্রীতিসাধনের যোগ্য হোক)। হে আমার জ্ঞানকর্ম! ভগবৎ-অঙ্গীভূত সৎকর্মবিঘাতকদের বিনাশক অর্থাৎ অজ্ঞানান্ধকারনাশক, মোহজনক আন্তর্বাহ্যবৃত্তিনাশকারী অথবা মায়ামোহ ইত্যাদির বিনাশক তোমাদের প্রকৃষ্টরূপে আচ্ছাদন করি অর্থাৎ ঔকষ্ঠসাধনের দ্বারা ভগবানকে প্রাপ্ত করি অর্থাৎ ভগবানের সাথে বিলীন করছি। (এই মন্ত্রটিও সঙ্কল্পমূলক। আমার জ্ঞান ও কর্ম এইরকমই হোক, যাতে আমার ভগবৎ প্রাপ্তি সুগম হয়)। হে আমার জ্ঞানকর্ম! ভগবানের অঙ্গীভূত সৎকর্ম-বিঘাতকদের বিনাশক অর্থাৎ অজ্ঞানরূপ অন্ধকার-নাশক, মোহজনক আন্তর্বাহ্যবৃত্তির নাশকারী অথবা মায়া-মোহ ইত্যাদি বিনাশক তোমাদের সংপাতিত করছি অর্থাৎ যাতে তোমরা ভগবানের প্রীতিসাধক হও, সেই রকমভাবে তোমাদের আস্তীর্ণ অর্থাৎ ঔৎকর্ষ সম্পন্ন করি। হে আমার জ্ঞানকর্ম! ভগবানের অঙ্গীভূত সৎকর্মের বিঘাতকদের নাশকারী, মোহজনক আন্তর্বাহ্যবৃত্তির নাশক (মায়া-মোহ ইত্যাদির নাশক) তোমরা আমার সম্বন্ধে ভগবৎ-প্রাপক হও অর্থাৎ ভগবানকে প্রাপ্ত করাও। হে শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবিঃ তুমি মহান অনন্তস্বরূপ এবং মহৎ-ধ্বনিযুক্ত অর্থাৎ মহামহিমোপেত শব্দব্রহ্মরূপ হও। পরমেশ্বযুক্ত ভগবানের প্রীতির জন্য তুমি স্তোত্রলক্ষণযুক্ত বাক্য অর্থাৎ স্তোত্রমন্ত্র উচ্চারণ করো। (মন্ত্রটি আত্ম উদ্বোধক)। ২।
[ভাষ্যানুক্রমণিকায় প্রকাশ, এই দ্বিতীয় অনুবাকের মন্ত্রগুলির দ্বারা উপরবাখ্য গর্ত খনন, করতে হয়। প্রথম অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে মহাবেদি নির্মাণকল্পে উত্তরবেদি হবিধান এবং সদস্ প্রভৃতি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু সেই মহাবেদীর উত্তর-দক্ষিণভাগস্থ আগ্নীপ্রীয় মার্জালীয় মন্ত্রগুলি উক্ত হয়নি। নির্মিত স্থানের অভ্যন্তরে অন্য যেসব প্রক্রিয়ার দ্বারা মন্ত্রের উচ্চারণে অন্যরকম সামগ্রী প্রস্তুত করতে হয়, সেই মন্ত্রগুলি এই অনুবাকে কথিত হচ্ছে। নির্মীতব্য সেইসব সামগ্রীর মধ্যে উত্তরবেদি সকলের আধারভূত বলে অভিহিত হয়; সেই হেতু তার অঙ্গীভূত হবির্ধানের অন্তর্গত উপরখ্য গর্তগুলি এই অনুবাকের প্রতিপাদ্য। পূর্বোক্ত বিধান অনুসারে (কর্মকাণ্ড অনুযায়ী) বিনিয়োগ-সংগ্রহে মন্ত্রগুলির যে প্রয়োগবিধি উক্ত হয়েছে, ভাষ্যকার সেইভাবেই মন্ত্রগুলির অর্থ নিষ্কাশন করেছেন। এমনিতেই এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি একটু জটিল ভাবাপন্ন। ভাষ্যকার মন্ত্রের যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, তা থেকে মন্ত্রের প্রকৃত ভাব পরিগ্রহণও সহজসাধ্য নয়। আমরা এই অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে যে আধ্যাত্মিক ভাব প্রাপ্ত হই, তা আমাদের মর্মার্থেই প্রকাশিত)] । ২।
মর্মার্থ- হে ভগবন! আপনি নানারকম ভাবে প্রকাশশীল স্বপ্রকাশ অথবা সর্বব্যাপী অর্থাৎ বহুরূপ এবং প্রকৃষ্টভাবে বহনকর্তা অর্থাৎ মানুষ্যগণকে ভব-সমুদ্রের পারে নয়নকর্তা হন। (অতএব আমাকে উদ্ধার করুন এবং আমার ভব-বন্ধন ছেদন করে দিন)। অথবা,-হে ভগবন! আপনি স্বপ্রকাশ অথবা সকলের উদ্ধারকর্তা হন; অতএব আপনি আমাদের ভব-সমুদ্রের পারে আনয়নকর্তা অর্থাৎ সংসার-বন্ধনের নাশক হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক)। হে ভগবন্! আপনি সকর্মপূরক সৎকর্মময় বা যজ্ঞেশ্বর এবং আত্মি-উৎকর্ষ সম্পন্ন জনের হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বরূপ সৎ-ভাবের সংরক্ষক হন। (অতএব আমাতে শুদ্ধসত্ত্বরূপ সৎ-ভাব সংস্থাপিত করুন)। অথবা,–হে ভগবন্! আপনি সঙ্কর্মের পূরক অর্থাৎ কর্মফলদাতা হন; অতএব আপনি আমাদের পক্ষে কর্মফলরূপ হবিঃসমূহের গ্রাহক অথবা শুদ্ধ সত্ত্বরূপ হবির উৎপাদক হোন। হে ভগবন্! আপনি জগতের মিত্ৰভূত হিতসাধক ও অভীষ্টবর্ষক শ্রেয়ঃবিধায়ক এবং প্রজ্ঞানস্বরূপ অর্থাৎ প্রকৃষ্টজ্ঞানসম্পন্ন হন। (অতএব আমাকে প্রজ্ঞানসম্পন্ন করুন এবং আমার অভীষ্ট পূরণ করুন)। অথবা,- হে ভগবন! আপনি অভীষ্টপূরক ও. শ্রেয়ঃসাধক হন। অথএব আপনি আমাদের সম্বন্ধে প্রকৃষ্ট চৈতন্যসম্পাদক দিব্যজ্ঞানদায়ক হোন। হে ভগবন্! আপনি পাপীদের সন্তাপক পূর্ণব্রহ্মস্বরূপ। সর্বধনোপেত এবং সর্বতত্ত্বজ্ঞ হন। (অতএব আমার অভীষ্ট পূরণ করুন এবং আমার পরমা-গতি বিধান করুন)। অথবা,–হে ভগবন্! আপনি পাপীদের উদ্ধারকারী অর্থাৎ পাপহারক হন। অতএব আপনি আমাদের সম্বন্ধে বিশ্বের সর্বভূতের প্রজ্ঞাপক অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানদাতা ও পরাগতি-বিধায়ক হোন। হে ভগবন্! আপনি সকলেরই কামনীয় এবং ক্রান্তদর্শন অর্থাৎ প্রজ্ঞানের আধার হন। (ভাব এই যে,-ভগবানের অনুগ্রহেই মানুষ প্রজ্ঞানসম্পন্ন হয়। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমাদের প্রজ্ঞানসম্পন্ন করুন)। হে ভগবন্! সর্বপাপনাশক আপনি সকলের পালক বা ধারক হন। (ভাবার্থ-হে ভগব! সর্বপাপনাশক আপনি আমাদের সকল পাপ হতে রক্ষা করুন এবং পালন করুন)। হে ভগব! শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবির গ্রাহক অথবা সকলের রক্ষক আপনি শুদ্ধসত্ত্বের আধার হন। (ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমাদের শুদ্ধসত্ত্ব-সম্পন্ন করুন)। হে ভগবন্! বিশুদ্ধতাপ্রাপক নিত্যশুদ্ধ আপনি সকলের পরম পবিত্রতা-বিধায়ক হন। (ভাবার্থ-ভগবানের অনুগ্রহে আমাদের সকলরকম কলুষ দুরীভূত হোক এবং আমাদের হৃদয় নির্মল হোক)। হে ভগবন্! সকলের অধিপতি–স্বামী আপনি, সকলের জীবনস্বরূপ হন অর্থাৎ ক্ষীণপাপ বা তপক্ষীণ ধর্মবুদ্ধি সম্পন্নদের রক্ষক হন। (ভাবার্থ-ভগবানই সকলের প্রাণ বা আয়ুঃ। তার অনুগ্রহেই সকলে জীবিত থাকে; অথবা আত্মজ্ঞানসম্পন্ন জনের হৃদয়ে ভগবান স্বতঃ-প্রকাশিত হন। হে ভগবন্! আপনি ভক্তের ভক্তির সাথে বর্তমান আছেন; অতএব আপনি পতিতের উদ্ধারক ও পুণ্যের বিধায়ক হন। (ভাবার্থ-ভগবান্ ভক্তির স্বরূপ। একমাত্র ভক্তির দ্বারাই তাঁকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক)। অথবা,- হে ভগবন্! আপনি ভক্তির দ্বারাই ভক্তের প্রাপ্তব্য হন। অতএব আপনি আমাদের পবিত্রতা সাধন করুন অর্থাৎ পাপমোহ হতে উদ্ধারকারী এবং ভক্তির উন্মেষকারী হোন।
হে ভগবন্! আপনি সকলের পরমাশ্রয় এবং আকাশরূপ বা বিরাটরূপ হন। (ভাব এই যে, একমাত্র ভগবানই পরমাশ্রয়। সেই ভগবান আমাদের পরমাশ্রয় দান করুন)। হে ভগবন্! পবিত্রকারক আপনি সৎ-ভাবের জনক হন। (ভাব এই যে,-ভগবানের অনুগ্রহে আমাদের আন্তর বাহ্য পবিত্র হোক এবং আমাদের মধ্যে শুদ্ধসত্ত্বের বিকাশ হোক)। হে ভগব! সৎকর্মের কারণভূত আপনি বিশ্বের প্রকাশক ও সৎকর্মের প্রবর্তক হন। (ভাবার্থ, জ্যোতির আধার ভগবান্ জ্ঞানজ্যোতিঃ বিচ্ছুরণ করে আমাদের প্রদীপ্ত করুন)। হে ভগবন্! আপনি শুদ্ধসত্ত্বভাবের প্রকাশ এবং সুন্দরভাবে আমার হৃদয়রূপ গৃহের অধিষ্ঠাতা হন। (ভাব এই যে,হে শুদ্ধসত্ত্ব-ভাবের প্রকাশক ভগবন! আপনি আমার হৃদয়ে আগমন করুন)। হে ভগবন! জন্মজরারহিত অথবা সকল ভূতে বর্তমান আপনিই একমাত্র ত্রাণকর্তা, অথবা সর্বভূতের পরমাশ্রয় বিশ্বমূলাধার হন। (ভাবার্থ,ভগবান্ বিশ্বমূলাধার পরমাশ্রয়। প্রার্থনা–তিনি আমাদের পরমাশ্রয় বিধান করুন)। হে ভগবন্! আপনি বিকাররহিত নির্বিকার অতএব জগৎ-কারণ হন; অথবা, হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি উৎকর্ষ-সাধক এবং কারণস্বরূপ ভগবান্ হতে সমুদ্ভূত হও। (নিত্যসত্যমূলক এই মন্ত্র ভগবানের মাহাত্ম-প্রকাশক। ভাব এই যে, আমাদের হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব ভগবৎ-সম্বন্ধযুত হোক)। হে ভগবন! আপনি আমাকে শত্রুনাশক উগ্রবলের দ্বারা পালন করুন। (ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আপনি আমাদের শত্রুসম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করুন এবং ভগবৎসম্বন্ধযুত পরমসুখে বিধান করুন)। হে প্রজ্ঞানরূপ দেব! আপনি পরমধনদানের দ্বারা আমার অভীষ্ট পূর্ণ করুন। আমাকে পরিত্যাগ করবেন না অথবা আপনার কৃপা হতে বঞ্চিত করবেন না। (ভাব এই যে,-হে ভগবন্! পরমধনদানের দ্বারা আমার অভীষ্ট পূর্ণ করুন এবং আমাকে আপনার কৃপা থেকে বঞ্চিত করবেন না) ৷ ৩৷৷
[দ্বিতীয় অনুবাকে হবিধান-মণ্ডপ-নির্মাণ-কল্পে উপর বাখ্য গর্ত খননের প্রক্রিয়া-প্রণালী উক্ত হয়েছে। বক্ষ্যমাণ অনুবাকে আগ্নীখ্রীয়সদ প্রভৃতি স্থানে ধিষ্ণ প্রভৃতির নির্মাণ-প্রথা পরিব্যক্ত। ভাষ্যকার এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির বিভিন্ন সম্বোধ্য পদ অধ্যাহার করেছেন। আর সেই সম্বোধ্য-পদের উপযোগী মন্ত্রের অর্থ নিষ্পন্ন করে গেছেন। ভাষ্যকার মন্ত্রগুলির যে অর্থ পরিগ্রহ করেছেন, তা যথাক্রমে এই–(১) হে আগ্নীখ্রীয়! তুমি বিবিধরূপ হও। (২) হে হোত্ৰীয়! তুমি বহ্নি-হব্যবাহনের স্বরূপ হও। হবির প্রবাহক বলে হোত্রীয় প্রবাহন নামে পরিকল্পিত হয়। (৩) হে মৈত্রাবরুণীয় শত্র! তুমি মিত্র প্রচেতা ও বরুণের রূপ হও। (৪) হে ব্রাহ্মণাচ্ছংসিসম্বন্ধী ধিষ্ণ্য! দেবগণের দক্ষিণা-বিভাগকারী বিশ্বাভিজ্ঞ যে তুথ দেবতা, তুমি তার স্বরূপ হও। (৫) হে পোত্ৰীয়! তুমি কমনীয় কবি অর্থাৎ বিদ্বান্ হও। (৬) হে নেধিষ্ণ্য! তুমি সোমরক্ষক অঙ্ঘারি ও বম্ভারি দেবদ্বয়ের স্বরূপ হও। (৭) হে অচ্ছাবাকসম্বন্ধী ধিষ্ণ! তুমি দুবস্বত নামক বায়ু-বিশেষের স্বরূপ হও। (৮) হে মার্জালীয়! তুমি শোধক অর্থাৎ পাত্রপ্রক্ষালনের হেতু লেপমার্জনস্থানভূত হও। (৯) হে আহবনীয়! তুমি সম্যক্ রাজমান কৃশানু হও। (১০) হে আস্তাব স্তোত্রস্থান (বহিষ্পবমানদেশ)! তুমি সদনযোগ্য পূত হও। (১১) হে চাত্বাল! তুমি কৃষ্ণবিষাণত্যাগার্থ প্রকৃষ্টগমনবিষয়ীভূত এবং অন্তরবকাশবান্ হও। (১২) হে পশুশ্ৰপণদেশ! তুমি রাক্ষসের দ্বারা অসংমৃষ্ট এবং হৃদয়াদি হব্যপাঁচক হও। (১৩) হে ঔদুম্বরি! তুমি সাম-গানের অবশ্যম্ভাবী উপবেশন-স্থান-স্বরূপ অর্থাৎ তদনুরূপ উন্নতত্ব-হেতু স্বর্গ-প্রকাশিকা হও। (১৪) হে ব্ৰহ্মসদন! তুমি ব্ৰহ্ম নামক ঋত্বিকের সোক্ষণাদি-কার্যের অনুজ্ঞান জ্যোতিঃস্থান এবং স্বর্গসদৃশ স্থানের স্বরূপ হও। (১৫) হে নূতন গার্হপত্য! তুমি অজ একপাদ দেবতার স্বরূপ হও। (১৬) হে ত্যজ্যগাহপত্য! যে দেবতা ১ ভোষ্টপদা নক্ষত্র-সম্বন্ধী অহিবুর্ধ দেবতার স্বরূপ, তুমি তারই অংশভূত হও। (১৭) হে অগ্নি! আপনার রৌদ্রভাবাপন্ন সৈন্যগণের সাহায্যে রাক্ষসদের আক্রমণ হতে আমাকে পরিত্রাণ করুণ; এবং কর্মফল প্রদানে আমাকে পূর্ণমনোরথ করুন; অপিচ আপনি যেন আমার বিনাশরূপ হিংসা না করেন। যাই হোক, আমরা কিন্তু মন্ত্রগুলির এইরকম সম্বোধন পদ স্বীকার করি না। তবে, কর্মকাণ্ডের অনুসারী ভাষ্যানুগত সম্বোধন পদ ইত্যাদির বিরুদ্ধেও আমরা কিছু বলতে চাই না। আমাদের মতে, আধ্যাত্মিক বিচারে, অনুবাকের মন্ত্রগুলি ভগবৎ সম্বোধনে বিনিযুক্ত। আমরা সেইকরম সম্বোধন স্বীকার করেই মন্ত্রগুলির অর্থ নিষপন্ন করেছি। যেমন প্রথম মন্ত্রে,-বিভুঃ পদে আমরা প্রথম অন্বয়ে বিবিধরূপেণ প্রকাশণীলঃ স্বপ্রকাশঃ বা, যদ্ধা–সর্বব্যাপী বহুরূপঃ বা ইতি ভাবঃ, দ্বিতীয় অন্বয়ে স্বপ্রকাশঃ, যদ্বা–সর্বেষাং উদ্ধারকঃ ইতি ভাবঃ বলেছি। তেমনই প্রবাহণঃ পদটিতে যথাক্রমে প্রকৃষ্টরূপেণ বহনকর্তা, যদ্বা নরাণাং ভবান্ধিপিরনয়নকর্তা ইতি ভাবঃ এবং ভবাদ্ধিপারনায়কঃ ইত্যর্থঃ বলেছি। দ্বিতীয় মন্ত্রে আমরা বহ্নি পদে সৎকর্মপূরক, সৎকর্মময়ঃ, যজ্ঞেশ্বরঃ বা এবং সকর্মপূরকঃ-কর্মফলপ্রদাতা ইত্যর্থঃ; কিংবা হব্যবাহনঃ পদে আত্মোৎকর্ষ-সম্পন্নেষু জনেষু শুদ্ধসত্ত্ব-সদ্ভাব-সংরক্ষকঃ, যদ্বা সম্ভাবজনকঃ ইত্যর্থ এবং হবিষাং প্রবাহক, যদ্বা–শুদ্ধসত্ত্বরূপস্য হবিষঃ জনকঃ ইতি ভাবঃ বলেছি। আমরা শ্বত্র পদে জগতের মিত্রভূত, বা অভীষ্টপূরক, শ্রেয়ঃসাধক ভাব গ্রহণ করেছি। তুথঃ পদে পাপিদের সন্তাপক, বা পাপিদের উদ্ধারক ভাব গ্রহণ করেছি। আমাদের আরও কতকগুলি অর্থ, যথা–অঙরি–সর্বপাপনাশক; বম্ভারি–সকলের পালক বা ধারক; অবস্যুঃ শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ হবিগ্রাহক বা সকলের রক্ষক; শুন্ধু।–পবিত্রতাসাধক নিত্যপূত নিত্যশুদ্ধ; মার্জালীয় পবিত্রতাসাধক, পাপনাশক; সম্রাট-সম্যাজমান, সকলের অধিপতি স্বামী; ঋতবীমা-সৎকর্মের কারণভূত; সুবজ্যোতিঃ–বিশ্বের প্রকাশক বা সৎকর্মের প্রকাশক; ব্রহ্মজ্যোতি;–শুদ্ধসত্ত্বভাবের প্রকাশক। শেষ মন্ত্রে, ভাষ্যকারও যে ভাব এনেছেন, সেই অনুযায়ীই আমরা (প্রজ্জ্বলন অগ্নির কাছে নয়) স্বয়ং সেই ভগবানের নিকটেই (অর্থাৎ অগ্নিরূপে যিনি প্রজ্ঞানরূপ দেবতা, তার কাছেই) প্রার্থনা জানিয়েছি মা মা হিংসীঃ অর্থাৎ আমাকে হিংসী করবেন না। এখানে প্রশ্ন হয়-দেবতা আমার হিংসা করেন কিভাবে? সে সমস্যার সমাধানে বলা যায়-যখন দেবগণ মানুষকে পরিত্যাগ করে যান, তখনই তাদের হিংসা প্রকাশ পায়। যখন অন্তর থেকে সৎ-ভাব সত্ত্বভাব অন্তর্হিত হয়, তখনই মানুষ দেবতাদের দ্বারা হিংসিত হয়! ফলতঃ, মন্ত্রগুলি যে ভগবানের বিভূতি-লাভের জন্য মানুষকে উদ্বোধিত করছে, প্রার্থনার ভাবে সেটাই বোঝ যায়] ॥ ৩॥
মর্মার্থ- হে আমার হৃদয়নিহিত দেবভাব! ইহজন্মকৃত কর্মের দ্বারা সঞ্জাত, জন্ম সহ আগত অথবা পূর্বজন্মকৃত কর্মের সাথে জাত এবং অপরের কৃত অর্থাৎ বহিরন্তঃশত্রুর কৃত দুরিতসমূহের আপনি প্রভূতরকমে নিয়ন্তা অর্থাৎ বিনাশক হন। শত্রুগণ যাতে আমাদের কর্মের অনুষ্ঠানে আমাদের বাধা দিতে না পারে, সেইভাবে আপনি আমাদের সুরক্ষিত ভাবে প্রতিষ্ঠাপিত করুন; সেই ভাবেই আপনি তোকসমূহের অশেষ কল্যাণকারী হন। স্বাহা মন্ত্রে আপনাকে উদ্বোধিত করছি; আমাদের কর্ম সুসিদ্ধ হোক। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক। ভাবার্থ এই যে, আমাদের হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে আমাদের পরমমঙ্গল সাধিত হোক)। আমাদের সৎ-ভাব গ্রহণ করে (অথবা কর্মের দ্বারা) প্রিয়মাণ সর্বতোব্যাপ্ত ভগবান আমাদের হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব গ্রহণ করুন। সেই ভগবানকে স্বাহামন্ত্রে পূজা করি; আমাদের অনুষ্ঠান সুসিদ্ধ হোক। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,–ভগবান আমাদের কর্মের দ্বারা প্রীত হয়ে আমাদের শুদ্ধসত্ত্ব গ্রহণ করুন; অপিচ আমাদের পরমমঙ্গল বিধান করুন)। আমাদের প্রার্থিত প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবান্ আমাদের পরমধন প্রদান করুন। আরও, সেই জ্ঞানদেব শত্রুগণকে বিদূরিত করে আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন। তারপর সেই ভগবান আমাদের পরমধনদানের জন্য শত্রুদের অথবা শত্রুসম্বন্ধী ধনসমুহকে জয় করুন এবং সেই ভগবান্ আমাদের হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্বগ্রহণে প্রীত হয়ে আমাদের সকর্মবিরোধী অন্তঃশত্রুকে বিনাশ করুন। স্বাহামন্ত্রে সেই ভগবানকে পূজা করি; আমার কর্মানুষ্ঠান সুহুত অর্থাৎ সুসিদ্ধ হোক। (ভাব এই যে,ভগবান্ অশেষ প্রজ্ঞানের আধার। তার অনুগ্রহে আমাদের মধ্যে প্রজ্ঞান উপজিত হোক। সৎ-জ্ঞানদানে সেই ভগবান আমাদের শত্রুগণকে বিনাশ করুন এবং আমাদের পরম পদে প্রতিষ্ঠাপিত করুন। মন্ত্রে এইরকম প্রার্থনা প্রকটিত)। বিশ্বব্যাপিন হে ভগবন্! আপনি অনন্ত সত্ত্বসমুদ্রের দ্বারা আমাদের ব্যাপ্ত করুন এবং অনন্তনিবাস বা শ্রেষ্ঠনিবাস লাভের জন্য আমাদের সামর্থ্যসম্পন্ন করুন। আরও, হে শুদ্ধসত্ত্বের আধার ভগবন্! আমাদের হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব বা ভক্তিসুধা গ্রহণ করুন এবং সৎকর্মের অনুষ্ঠাতা আমাদের প্রকৃষ্ট ভাবে প্রতি করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,–শুদ্ধসত্ত্বের সাথে আপনি আমাদের মধ্যে আগমন করুন; আমরা যাতে শ্রেষ্ঠ নিবাসভূত আপনাকে প্রাপ্ত হই, সেইভাবে আমাদের সামথ্যসম্পন্ন করুন; অপিচ, আপনার প্রদত্ত শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা আমাদের উদ্ধার করুন এবং আপনাতে প্রতিষ্ঠাপিত করুন)। হে ভগবন্! দেবসম্বন্ধযুক্ত সঙ্কর্মের উৎপত্তিস্থান নানারকম গুণের অলঙ্কৃত আমার হৃদয়-গৃহে শুদ্ধসত্ত্ব আগমন করুক। (ভাব এই যে, আমার হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বের বিকাশ হোক। যেন আমার হৃদয় আমাকে ভাগবানের প্রীতির নিমিত্ত সৎকর্মে আমাকে নিয়োগ করতে পারে)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি অনন্তস্বরূপ ভগবানের অধিষ্ঠান অর্থাৎ ধারক ও স্বরূপ হও। (ভাব এই যে, Aশুদ্ধসত্ত্বই ভগবানের স্বরূপ। শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। অতএব হে শুদ্ধসত্ত্বও তুমি ভগবৎ-সম্বন্ধি স্থানকে অথবা নির্মল হৃদয়কে সর্বতোভাবে প্রাপ্ত হও অর্থাৎ সে হৃদয়ে উপবেশন করো। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। ভাব এই যে,-শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা আমরা যেন ভগবানকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি)।
স্বতঃপ্রকাশমান জ্ঞানপ্রেরক হে ভগবন্! আমাদের হৃদয়সঞ্জাত এই শুদ্ধসত্ত্ব আপনাকে সমর্পণ করছি। আমাদের সোম আপনারা গ্রহণ করুন। আমাদের প্রদত্ত শুদ্ধসত্ত্বকে হিংসা করবেন না অর্থাৎ পরিপোষণ করুন। (এই মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। এস্থলে সাধক ভগবাকে শুদ্ধসত্ত্ব উৎসর্গ করছেন এবং প্রার্থনা করছেন–ভগবান্ যেন সদাই শুদ্ধসত্ত্বকে পালন করেন)। দীপ্যমান শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ হে ভগবন! আপনি নিত্যকাল আপনা-আপনিই প্রকাশমান হয়ে দেবভাব সম্পন্নদের প্রাপ্ত হন অর্থাৎ দেবভাবসমুহের সাথে কিংবা দেবভাবসম্পন্নদের হৃদয়ে আগমন করেন। মরণধর্মাবলম্বী প্রার্থনাকারী আমি সৎ-ভাব ও শুদ্ধসত্ত্বরূপ পরমধনের সাথে মনুষ্যেচিত পৌরুষ কামনা করছি। (প্রার্থনামূলক এই মন্ত্রটি নিত্যসত্যপ্রকাশক। ভগবান সৎ-ভাবসম্পন্নদের মধ্যে স্বয়ং প্রকাশমান হন। এখানে সাধক মানুষের উপযুক্ত পৌরুষ প্রার্থনা করছেন। প্রার্থনার ভাব-পরমধনদানে ভগবান আমাকে উদ্ধার করুন)। হে আমার চিত্তবৃত্তিসমূহ। দেবতাদের প্রীতিসাধনের নিমিত্ত তোমাদের নমঃমন্ত্রের (নমস্কর্মের দ্বারা নিয়োজিত করছি। এবং পিতৃপুরুষদের প্রীতিসাধনের নিমিত্ত তোমাদের স্বধা-মন্ত্রের দ্বারা নিয়োজিত করছি। আমি যেন নিত্যকাল কামনাবাসনা ইত্যাদি রূপ পাপসম্বন্ধের বন্ধন হতে অর্থাৎ ভববন্ধন হতে মুক্তি লাভ করতে সমর্থ হই। হে ভগবন্! সকল সৎকর্মেই যেন বিশ্বের হিতসাধক বিশ্বপ্রকাশক জ্যোতিঃস্বরূপ আপনাকে দর্শন করি। (ভাব এই যে, আমাদের অনুষ্ঠিত সবরকম কর্মেই ভগবানের অধিষ্ঠান হোক)। সৎকর্মের পালক অথবা সঙ্কৰ্মকারিগণের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ প্রজ্ঞানময় হে ভগবন! আপনি সত্যকারিদের প্রতি প্রীতি-আতিশয্য-মুক্ত অর্থাৎ তাদের মধ্যে সৎ-ভাবের সংরক্ষক হন। অতএব আমি আপনার শরণ গ্রহণ করছি। (প্রার্থনা–আপনি অনুগ্রহপরায়ণ হয়ে আমাকে সৎ-ভাবের অধিকারী করুন)। অতএব হে দেব! কলুষকলঙ্কপরিম্নান আমার পাপপঙ্কিল শরীর আপনার আত্মাতে অবস্থিত হোক; আপনার পবিত্রকারক শরীর আমাতে অবস্থিত হোক। এইরকমই, সৎকর্মের পালক আপনার পবিত্রতাসাধক পুণ্যময় যে শরীর আমাতে সংন্যস্ত বা বর্তমান ছিল, আপনার সেই পবিত্রকারক শরীর আপনাতেই বর্তমান থাকুক। আপনার ও আমার অভিন্ন শরীর হোক। (মন্ত্রের এই অংশটি প্রার্থনামূলক। এখানে প্রার্থনাকারী পরমাত্মায় আত্মসম্মিলনের আকাঙ্ক্ষা জানাচ্ছেন। প্রার্থনার ভাব এই যে,কলুষ-কলঙ্কে পরিলিপ্ত আমার এই ভৌতিক শরীর নাশ করে আমাতে আপনার পুণ্যপূত দেবদেহ স্থাপন করুন। মর্মার্থ এই যে, আমাকে পাপ হতে পরিত্রাণ করুন; আমাকে পবিত্র সত্ত্বসমন্বিত করুন। আপনাতে আত্মসম্মিলন করে আমি যেন পরাগতি লাভ করতে পারি, হে দেব, তা-ই বিহিত করুন)। এইরকম হলে, হে সৎকর্মপালক প্রজ্ঞানাধার ভগবন্! সঙ্কর্মের অনুষ্ঠাতা আমাদের অনুষ্ঠিত সকমণ্ডলি, আপনার ও আমার উভয়ের সাথে যথাক্রমে প্রবর্তিত হোক অর্থাৎ আমার কার্যে আমার মতো আপনারও আদর ও প্রীতি হোক ॥ ৪।
[এই অনুবাকের প্রথম অংশ সম-সম্বোধনে বিনিযুক্ত। আমরাও সে ভাব গ্রহণ করি। কিন্তু আমাদের সোম অন্যরকম। আমাদের সোম-পূর্বাপর সর্বক্ষেত্রেই-হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্ব, দেবভাব-সৎ-ভাবরাজি। ভাষ্যকারের অর্থেও সেই ভাবেরই আভাস পাই। বেদের বিভিন্ন স্থানে সোম শব্দের প্রয়োগ আছে। সে সকল স্থলে সোম শব্দে প্রায়ই সোম-রসরূপ মাদক দ্রব্য অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। কিবা ঋগ্বেদে, কিবা সামবেদে, কিবা এই যজুর্বেদে–সর্বত্রই এ ভাবের বিকাশ দেকতে পাওয়া যায়। কিন্তু এখানকার ভাব অন্যরকম বলেই মনে হয়। এখানে সোমকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে-হে সোম! তং তনুকৃদ্ভ্যো দ্বিযোভ্য অন্যকৃতেভ্য। যা অসি। ভাবার্থ–তাদৃশাঃ অম্মান মা বাধন্তে তথাস্মান সুরক্ষিত-প্রদেশে সংস্থাপ্য পালয়সীত্যর্থঃ।-শত্রুগণ আমাদের বাধা প্রদান করতে না পারে, সেইরকমভাবে আমাদের সুরক্ষিত-প্রদেশে স্থাপন করে পালন করুন। এখন, এ সোমকে কি বলব? শত্ৰু-সংহার করে সুরক্ষিত-প্রদেশে স্থাপন করে যে সোম, সে কোন্ সামগ্রী? তাকে কি মাদকদ্রব্য বলব? মাদকদ্রব্যের এমন কি সামর্থ্য আছে যে, সে শত্রু নাশ করে সুরক্ষিত প্রদেশে স্থাপন কবে? শত্রুনাশ করা দূরে থাকুক, মাদক দ্রব্য শত্রুকে বৃদ্ধি করেই থাকে। তাছাড়া তার সেবকদের তো সে সর্বনাশই সাধন করে। সুতরাং বক্ষ্যমাণ মন্ত্রে উল্লিখিত এ সোম যে মাদকতার সাধনকারী সোম নয়–এ সোম যে তার অতিরিক্ত কোনও শ্রেষ্ঠ সামগ্রী, তা সহজেই উপলব্ধ হয়। আমরা সোম শব্দে হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্ব, ভক্তি-সুধা প্রভৃতি অর্ত পূর্বাপর পরিগ্রহণ করেছি। এখানেও আমরা সেই অর্থই সমীচীন বলে মনে করি। আমাদের মতে, ভাষ্যকারও এ ছাড়া অন্য কোনও অর্থই এখানে সোম শব্দের প্রয়োগে লক্ষ্য করেছেন। নচেৎ, মাদকতাবিশিষ্ট সোম হলে, ভাষ্যে তিনি তার আভাস প্রদানে বিরত থাকতেন না। অন্যত্র সোম-কে তিনি মাদক দ্রব্য রূপেই পরিচিহ্নিত করেছেন। সুতরাং এ সোম শুদ্ধসত্ত্বরূপী ভগবান্ ভিন্ন অন্য কিছু নয়–এটা সহজেই বোঝা যায়। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির ভাষ্যকারকৃত অর্থের সাথে আমাদের মতান্তর ঘটেছে। যেমন পঞ্চম মন্ত্রের ভাষ্যকারের অর্থ–সোমদেব যেমন অন্যান্য দেবতার নিকট গমন করেন, মানুষ আমি, আমিও তেমনি মানুষের নিকট গমন করি। (আমাদের মর্মার্থ দ্রষ্টব্য)। আবার, সপ্তম মন্ত্রে ভাষ্যের সাথে সামান্য ইতর-বিশেষ লক্ষিত হলেও মূলতঃ কোনও পার্থক পরিদৃষ্ট হবে না। তবে ভাবপক্ষে আমরা যে তাৎপর্য গ্রহণ করি, ভাষ্যে তার অভাব দেখা যায়। ভাষ্যমতে মন্ত্রের অর্থ–হে অগ্নে! তুমি স্বভাবতঃ সকল ব্রতের পালক হও। সেই কারণে ইদানীং তুমি আমার ব্রতের পালক হও। হে অগ্নি, ব্রতের প্রার্থনাকালে তোমার সম্বন্ধী যে তনু আমাতে অবস্থিত ছিল, তোমার সেই তনু তোমাতেই হোক। হে ব্রতপতে অগ্নি! আমাদের অনুষ্ঠিতব্য কর্মসমূহ যেন স্ব-সম্বন্ধ অতিক্রম না করে..ইত্যাদি।–(আমাদের মর্মার্থ দেখুন)]। ৪।
মর্মার্থ- হে ভগবন! এক এবং অদ্বিতীয় আপনি বিশ্বের সকলকে অতিক্রম করে রয়েছেন; অথবা আপনি বিশ্বের সকল জ্ঞানবিজ্ঞানের অতীত হন। (ভাব এই যে, ভগবানই সর্বমূলাধার)। এটি জেনে, হে ভগবন্! আমি আপনার শরণ গ্রহণ করছি। আপনি আমাকে উদ্ধার করুন। আপনি ভিন্ন কারও শরণ গ্রহণ করছি না; কারণ আপনি ভিন্ন অন্য কেউই ত্রাণ করতে সমর্থ নন। [ মন্ত্র দুটিই ভগবানের মাহাত্ম্য-বিজ্ঞাপক। বিশ্বের সকলের অতীত অপিচ অবাঙ্-নসোগোচর সেই ভগবান্ আমাকে উদ্ধার করুন; আমি সেই ভগবানের শরণ গ্রহণ করছি। হে ভগবন্! আপনি ভিন্ন কেউই ভবসিন্ধুর পার করতে অর্থাৎ ত্রাণ করতে সমর্থ নয়। হে ভগবন্! আপনিই একমাত্র উদ্ধারকর্তা]। হে ভগবন্! আপনার নিকট আগমন করলাম। নিকটে, দূরে অথবা নিকট ও দূরের বাহিরে যে কোনও স্থানে আপনি থাকুন না কেন, সেই স্থানেই আমি আপনাকে প্রাপ্ত হই। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! এইভাবে ভগবানের অঙ্গীভূত আপনাকে হৃদয়ে সৎ-ভাব-জননের অর্থাৎ দেবভাব উন্মেষণের জন্য সেবা করি অর্থাৎ প্রীত করি। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধক। হে ভগবন্! পরমপদপ্রাপ্তির কামনায়, সৎ-ভাব লাভের জন্য এবং শুদ্ধসত্ত্ব-প্রজননের জন্য আমি যাতে আপনার সেবা করতে পারি, আপনি কৃপা করে তার বিধান করুন)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! জ্ঞান-প্রদায়ক ভগবান্ তোমাকে মাধুর্য রসের দ্বারা রঞ্জিত (সিঞ্চিত) করুন–পালক করুন। কর্মফলনাশকারি হে দেব! আমাকে অজ্ঞান-মোহ হতে উদ্ধার করুন। (ভাবার্থ-হে দেব! আমার কর্মফল ধ্বংস করুন)। হে ভববন্ধনছেদনকারী দেবতা! এই জনের (আমার) প্রতি প্রতিকূল বা বিরূপ হবেন না। (ভাব এই যে,আমাকে ভববন্ধন হতে মুক্ত করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক)। [ভগবান আমাদের কর্মফল ও ভববন্ধন নাশ করে, আমাদের পরমপদে প্রতিষ্ঠিত করুন-মন্ত্রের তিনটি অংশেই এই রকম প্রার্থনা বিদ্যমান রয়েছে ]। হে ভগবন্! আমার হৃদয়রূপ দেবস্থানকে যেন একেবারে পরিত্যাগ করবেন না। অন্তরিক্ষের মতো অনন্ত-প্রসারিত সক্কর্মের মূলকে কৃপা-বিরামের দ্বারা পরিত্যাগ করবেন না অর্থাৎ আমার প্রতি বিরূপ হবেন না। পরন্ত সৎ-বৃত্তির মূল হৃদয়রূপ আধারক্ষেত্রের সাথে সকলে এসে সঙ্গত হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক)। দ্যোতমান স্বপ্রকাশ হৃদয়রূপ অরণ্যের অধিস্বামি হে ভগবন্! আপনি বহুরূপ হয়ে বিশেষভাবে আমাদের মধ্যে অধিষ্ঠিত হোন। তাতে, উপাসক আমরা, বহুসামর্থোপেত সৎ-ভাব ইত্যাদি সমন্বিত হয়ে, বিশেষ ভাবে প্রবৃদ্ধ হতে পারব। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। ভাব এই যে,-ভগবান্ আমাদের মধ্যে অধিষ্ঠিত হয়ে আমাদের সৎ-ভাব-সমন্বিত করুন এবং পরমধন প্রদান করুন)। সংসারবন্ধননাশক সেই ভগবানই একমাত্র ভবসিন্দুর পারে নয়ন-সমর্থ। অতএব হে ভগবন্! ঐশ্বর্যসমন্বিত সৌভাগ্যলাভের জন্য অথবা শোভন সকর্ম-সাধনের নিমিত্ত তোমাকে ভজনা করি। (মন্ত্র প্রার্থনামূলক। ভাব এই যে,–সেই ভগবানই একমাত্র ভবসমুদ্রপারের নায়ক। সংসার-বন্ধন মোচনের জন্য আমি সেই ভগবানকে পূজা করি। হে ভগব! আমার সংসার-বন্ধন ছেদন করুন)। হে ভগবন্! আপনার পরমার্থরূপ ধন অশেষ এবং মোক্ষপ্রদানকারক হোক ॥ ৫॥
[কর্মকাণ্ড অনুসারে এই অনুবাকের জটিল মন্ত্রগুলি যুপতক্ষণে প্রযুক্ত হয়। ভাষ্যে মন্ত্রগুলির যে প্রয়োগবিধির উল্লেখ আছে, তা-ই প্রথমে বিবৃত করছি। আজশেষ গ্রহণের পর তক্ষের অভিমুখে গমন করে অত্যন্যা মন্ত্রে যুপকে অভিমৰ্শন এবং পূর্বাভিমুখ হয়ে অভিমন্ত্রিত করা কর্তব্য। তারপর যূপাহুতি-শেষ আজ্য গ্রহণের পর যুপক্ষণের জন্য বনে গমন করে আবার ঘূপকে অভিমৰ্শন বা আমন্ত্রিত করবার বিধি সুত্রে উক্ত আছে। অনুবাকের মন্ত্রগুলি বনস্পতি দেবতা বিষয়ে বিনিযুক্ত। কোন্ বৃক্ষ যুপের উপযুক্ত এবং কোন্ বৃক্ষ যুপের উপযুক্ত নয়,ভাষ্যে তারও আভাস দেওয়া হয়েছে। সে সম্বন্ধে ভাষ্যকারের উক্তি; যথা–যাপ্যা ও অপ্যা ভেদে বৃক্ষ দুরকম। পলাশ, খদির ও বিশ্ব প্রভৃতি বৃক্ষ–যুপ্যা; আর নিম্ব-জম্বীর ইত্যাদি বৃক্ষ–অযুপ্যা।
এইরকম সূচনার অবতারণা করে ভাষ্যকার মন্ত্রগুলির যে অর্থ প্রকাশ করেছেন; তা এই-হে পুরোবর্তী ঘূপবৃক্ষ! তুমি ভিন্ন, সমপ্রদেশে জন্ম ইত্যাদি লক্ষণ-বিরহিত অপর সকল ঘূপকেই আমি অতিক্রম করেছি। অন্যান্য যূপ-সমূহকেও আমি পরিত্যাগ করেছি। পর, অপর এবং দূরবর্তী বৃক্ষসমূহের নিকটস্থ তোমাকে আমি প্রাপ্ত হয়েছি। নিকট হতে পূর্ববর্তী তোমাকেই জেনেছি। হে বৃক্ষ, দেবযাগের নিমিত্ত এই হেন তোমাকে আমরা সেবা করি। (মার্থ-হে যুপবৃক্ষ যজ্ঞের নিমিত্ত তোমাকে স্পর্শ করি)। দেবযাগের নিমিত্ত দেবগণও তোমাকে সেবা করুন। ওষধে ত্ৰায়স্ব মন্ত্রে কুশতরুকে তিরস্কার করতে হয়। ঘূপবৃক্ষের কুশকে অপসারিত করবার সময় এই মন্ত্র পাঠ করার বিধি। (মার্ত-হে ওষধে! স্বাধিতি ভয় হতে আমাকে রক্ষা করো।স্বাধিতি প্রভৃতি মন্ত্রে পরশূনা-প্রহরণের বিধি। (মন্ত্রের অর্থ-হে স্বধিতি পরশু! এই ঘূপকে বধ করো না)।-যুপবৃক্ষের কাছে এমন অর্থহীন প্রার্থনায় ঐহিক বা পারাত্রিক কি সুফল লাভের সম্ভাবনা, বোঝা যায় না। কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনে এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা নেনে নিলেও, আমরা আধ্যাত্মিক বিচারে কোনক্রমেই ভাষ্যকারের সাথে একমত হতে পারিনি। সুতরাং আমাদের ব্যাখ্যা ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত পন্থাই অনুসরণ করেছে। যেমন–অত্যন্যান মন্ত্রাংশের ভাষ্যানুমোদিত অর্থ–হে ঘূপবৃক্ষ!–ইত্যাদি। কিন্তু বৃক্ষবাচক কোনও পদ বা অন্যান্য বৃক্ষকে অতিক্রম করে আসার ভাব মন্ত্রের কোথাও পরিদৃষ্ট হয় না; এমন কি, তার আভাস মাত্রও মন্ত্রের মধ্যে নেই। মন্ত্রে আছে মাত্র-অতি ও অন্যান দুটি পদ। এতে অঅমরা কেন বৃক্ষের সম্বন্ধ টেনে আনব? সকল ধর্মের উৎসস্থানীয় বেদে ভগবানের মাহাত্ম্যই পরিকীর্তিত। এটাই আমাদের বিশ্বাস। ভগবানের গুণগান, ভগবানের মহিমা কীর্তন, ভগবানের অনুস্মরণ–এটাই হলো বেদের মূল সুত্র। অপার্থিব সামগ্রীতে পার্থিব সামগ্রীর পার্থিব সম্বন্ধ খ্যাপন, নিত্যসামগ্রীর সাথে অনিত্য পৌরুষেয় সামগ্রীর সম্বন্ধ সূচনায়, বেদের নিত্যত্বে ও অপৌরুষেয়ত্বে বিঘ্ন ঘটে। আমরা তাই মনে করি, মন্ত্র ভগবানের উদ্দেশ্যেই প্রযুক্ত। ভগবানের মাহাত্ম্যই মন্ত্রে পরিব্যক্ত। অতি ও অন্যান পদ দুটি সেই উদ্দেশ্যেই প্রযুক্ত। তাই আমরা অতি পদের অর্থ করেছি–অতিক্রম্য বর্তসি; আর অন্যান্ পদের অর্থ করেছি-বিশ্বান্ সর্বান্। অর্থাৎ,-হে ভগবন্! আপনি বিশ্বের সকলকে অতিক্রম করে বিদ্যমান রয়েছেন অর্থাৎ আপনি সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের অতীত। তার পরই, ভগবানের মহিমা অবগত হয়ে প্রার্থনাকারী প্রার্থনা করেছেন;–অগাং অর্থাৎ আপনার নিকট আগমন করলাম আপনার শরণ নিলাম। কেন শরণ নিলাম?–ভবসমুদ্র উত্তরণের আশায়। আরও, আমি জানি আমার বোধগম্য হয়েছে,ন অন্যান অর্থাৎ আপনি ভিন্ন সংসারসমুদ্রপারের কাণ্ডারী অন্য কেউই নেই। তা জেনেই আপনার শরণ নিচ্ছি। আপনিই একমাত্র ত্রাণকর্তা। আশা করি, পাঠক-পাঠিকাগণ আমাদের এইরকম বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনুধাবন করতে পারবেন । ৫।
মর্মার্থ- হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! পৃথিবী-সংস্থিত ভূতসঙ্ঘের নিমিত্ত অথবা পৃথিবীর হিতকামনায় (অথবা হৃদয়ে পৃথিবী সম্বন্ধী দেবভাব সংজননের জন্য) তোমাকে সুসংস্কৃত অর্থাৎ নিয়োজিত করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! অন্তরিক্ষলোকস্থিত ভূতসঙ্ঘের উপকারের নিমিত্ত অথবা অন্তরিক্ষলোকের হিতসাধনের জন্য (অথবা হৃদয়ে অন্তরিক্ষলোকসম্বন্ধী দেবভাব সংজননের জন্য) তোমাকে সুসংস্কৃত অর্থাৎ নিয়োজিত করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! দুলোকস্থিত ভূতসঙ্ঘের প্রীতির জন্য অথবা স্বর্গলোকের হিতসাধনের জন্য (অথবা হৃদয়ে স্বর্গলোক-সম্বন্ধি দেবভাব-সংজননের জন্য) তোমাকে সুসংস্কৃত অর্থাৎ নিয়োজিত করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তোমার প্রভাবে পিতৃগুণসমূহের আশ্রয়ভূত লোকসকল অর্থাৎ পিতৃগুণসমূহের আশ্রয়ভূত হৃদয়, বিশুদ্ধতা প্রাপ্ত হোক অথবা পরিত্রাণ লাভ করুক। হে আমার হৃদয়-নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবানের সাথে মিলনসাধক অর্থাৎ পরমাত্মার সাথে আত্মার মিশ্রণকারী হও। অতএব তুমি আমাদের থেকে আমাদের শত্রুদের পৃথক অর্থাৎ দূরে অপসারণ ও বিনাশ করো; অপিচ, দান-প্রতিবন্ধক অর্থাৎ সৎ-বৃত্তি-নাশক শত্রুদের বিনাশ করো; অপিচ, দান-প্রতিবন্ধক অর্থাৎ সৎ-বৃত্তি-নাশক শত্রুদের বিনাশ করো। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,–হে ভগবন্! আমাদের আন্তর্বাহ্য সকল শত্রুকে বিনাশ করে আমাদের পরমাত্মার সাথে সম্মিলিত করো)। হে আমার হৃদয়! তুমি পিতৃগুণসমূহের আশ্রয়ভূত হও।
অতএব তুমি বিশুদ্ধতা লাভ করো। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি সুন্দরভাবে ব্যাপ্ত হও এবং সকর্মের পরিচালক সৎ-বৃত্তিগণের অগ্রগামী হও। তারপর সংসাররূপ অরণ্যের অধিকারী ভগবান, তোমাকে আমার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত অর্থাৎ সঞ্চারিত করুন, যেন আমি ভগবানের পরমধন অর্থাৎ মোক্ষলাভে বঞ্চিত না হই। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। ভগবান্ আমার হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্ব সঞ্চার করুন–এটাই প্রার্থনা)। হে মন হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব!
জ্ঞান-প্রদায়ক ভগবান্ তোমাকে মাধুর্যরসের দ্বারা রঞ্জিত করুন অর্থাৎ পালন করুন। হে মন চিত্তবৃত্তি! সুফল-সমন্বিত কর্মক্ষমের নিমিত্ত তোমাকে নিযুক্ত করছি। হে আমার মন! ১ তুমি দ্যুলোককে অর্থাৎ দ্যুলোক-সমন্ধি দেবভাবকে উৎকৃষ্টভাবে স্তম্ভিত করো অর্থাৎ যাতে তা পরিক্ষীণ না হয়,সেইরকম ভাবে রক্ষা করো; অন্তরিক্ষলোকস্থিত দেবভাবকে সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ করো; এবং পৃথিবীতলে অবস্থিত অথবা ভূলোক-সম্বন্ধি সৎ-ভাবকে দৃঢ় করো। (ভাব এই যে, সকল দেবভাব আমার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোক)। অথবা,-হে ভগবন্! তুমি আমার হৃদয়রূপ দেবস্থানকে অর্থাৎ পরমসুখমূলকে উন্নতভাবে বা প্রকৃষ্টভাবে স্তম্ভিত করো অর্থাৎ পতন হতে রক্ষা করো; অন্তরিক্ষের মতো অনন্ত-প্রসারিত আমার সৎকর্মের মূলকে অথবা, সৎ-ভাব-সমূহের সর্বব্যাপকত্বকে পরিপূর্ণ অর্থাৎ পরিবর্ধিত করো; এবং সৎ-ভাব-সমূহের আধারক্ষেত্রকে অর্থাৎ আমার সৎ-বৃত্তিমূলকে দৃঢ় করো। (সৎ-ভাবের প্রভাবে ও শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাব আমাতে সৎকর্ম সাধনের সামর্থ্য অবিচলিতভাবে অবস্থিতি করুক। তাতে পূর্ণজ্ঞান লাভ হবে এবং ভগবানকে প্রাপ্ত হতে পারব)। হে ভগবন্! আপনার অধিষ্ঠিত স্থানে গমন করবার কামনা করি; অতএব আমাদের বিবেকবাণীরূপ জ্ঞানকিরণসমূহ বহু-দীপ্তিপূর্ণ এবং অবিনশ্বর হোক। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি এমন হও, যেন আমাদের হৃদয়ে নিত্যকাল সত্ত্বভাব-প্রদায়ক মহত্ত্বসম্পন্ন ভগবানের শ্রেষ্ঠ স্বরূপ প্রকাশিত হয়। (মন্ত্রটি সঙ্কল্প-মূলক)। হে আমার চিত্তবৃত্তি-সমূহ! তোমরা বিশ্বব্যাপক ভগবানের সৃষ্টি-স্থিতি-সংহারচরিত কর্মসমূহকে অথবা তাঁর অলৌকিক শক্তিকে অবলোকন করো; সে শক্তিসমূহের দ্বারা ভগবান্ যে সৎকর্মসমূহ আমাদের সম্পাদনের নিমিত্ত সৃষ্টি করেছেন, সেই সৎকর্মসমূহ সম্পন্ন করো। তাহলে ষড়ৈশ্বর্যশালী ভগবানের উপযুক্ত বন্ধু বা প্রীতি উৎপাদক হতে পারবে। (মন্ত্রটি নিত্যসত্যমূলক। ভগবানের নির্দিষ্ট কর্মের অনুষ্ঠানের দ্বারা লোক তার প্রীতি উৎপাদন করতে সমর্থ হয়–এটাই ভাব)। অথবা,–হে আমার চিত্তবৃত্তিসমূহ! বিশ্বব্যাপী ভগবান বিষ্ণুর যে পালন ইত্যাদি কর্ম সকল তোমরা প্রত্যক্ষ করো–অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হও। সেই বিষ্ণু ইন্দ্রদেবের অভিন্ন সখা অর্থাৎ তার সাথে একাত্মক। (ভাব এই যে,ভগবান্ বিষ্ণুর অনুগ্রহে, হে মনুষ্যগণ, তোমরা সৎকর্মপরায়ণ হও; দেবগণ যে অভিন্ন, তা স্মরণ রেখে)। আকাশে নিবারণে সূর্যের আলোক-লাভে চক্ষু যেমন অবাধে সমস্ত দৃষ্টি করে, সেইরকম জ্ঞানিগণ পরমেশ্বর্যসম্পন্ন সর্বব্যাপক ভগবান বিষ্ণুর পরমপদ (শ্রেষ্ঠ-স্বরূপ) সদাকাল প্রত্যক্ষ করে থাকেন। (ভাব এই যে-সূর্যের আলোকের সাহায্যে বাধা-বিরহিত আকাশে চক্ষু যেমন প্রকৃতিপুঞ্জুকে পর্যবেক্ষণ করে, জ্ঞানিগণ তেমনই জ্ঞানের প্রভাবে সকল কালেই ভগবানের তত্ত্ব অবগত হয়ে থাকেন)। হে মন! ব্রাহ্মণভাবাপন্ন অর্থাৎ সত্ত্বগুণেপেত ব্রহ্ম-স্বরূপ, ক্ষত্র-ভাববাপেত অর্থাৎ রজোভাবাপন্ন, সৎ-ভাব-সম্পন্ন, পরমার্থরূপ ধনের পোষক তোমাকে প্রকৃষ্টভাবে স্থাপন করছি অথবা পরমাত্মায় নিয়োজিত করছি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। মনই সকল সৎ-বৃত্তির মূল এবং সকল সৎ-ভাবের পোষক। মন যাতে সর্বদা ভগবৎপরায়ণ হয়, সেইরকমভাবেই বিহিত করো,–এটাই ভাবার্থ)।
হে মন! তুমি সত্ত্বভাবকে দৃঢ় করো। তুমি ক্ষত্ৰভাবকে অর্থাৎ রজোভাবকে দৃঢ় করো, অর্থাৎ পোষণ করো; তুমি সৎ-ভাবকে দৃঢ় করো অর্থাৎ পোষণ করো; তুমি পরমার্থরূপ ধনকে দৃঢ় করো অর্থাৎ পোষণ করো। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি চতুর্দিকে সৎ-গুণের দ্বারা বেষ্টিত হও; দেব-সম্বন্ধি সৎ ভাবসমূহ তোমাকে বেষ্টন করুক; এবং পরমার্থরূপ ধন ইত্যাদি এবং মনুষ্যোচিত ধর্ম-কর্মসমূহ এইরকম সকর্মকারক আমাকে পরিবেষ্টন করুক। হে আমার শুদ্ধসত্ত্ব! তোমাকে অন্তরিক্ষলোকে স্থিত দেবভাবের পার্শ্বে স্থাপন করি। (আমি শুদ্ধসত্ত্বকে দেবভাবের সাথে সম্মিলিত করি এটাই পূর্বের অনুবাকে যুপচ্ছেদ উক্ত হয়েছে; আর এই অনুবাকে ছিন্নকূপ স্থাপন করবার মন্ত্র কথিত হচ্ছে। কর্মকাণ্ডের পরিপোষক সেই ভাব গ্রহণ করে ভাষ্যকার অনুবাকের মন্ত্রগুলির অর্থ নিষ্পন্ন করেছেন। — আমাদের মতে প্রথম চারটি মন্ত্রের সম্বোধ্য সেই শুদ্ধসত্ত্বভাব। এ হিসেবে প্রথম মন্ত্রটির প্রথম অংশের অর্থ হয়–হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! পৃথিবী-নিবাসী ভূতসঙ্ঘের উপকারের নিমিত্ত অথবা পৃথিবীর হিতকামনায় অথবা পৃথিবী-সম্বন্ধী দেবভাব সমূহকে হৃদয়ে উন্মেষের জন্য তোমাকে সুসংস্কৃত অর্থাৎ নিয়োজিত করছি। এরকম প্রায় প্রত্যেক মন্ত্রেই আধ্যাত্মিক অর্থ দৃষ্ট হয়। এই মন্ত্রের কয়েকটি অংশে এবং দ্বিতীয় মন্ত্রের প্রথম অংশের লক্ষ্য-স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বিশ্বচরাচরের হিতসাধন। মন্ত্র কয়টিতে এক বিশ্বজনীন ভাবের বিকাশ হয়েছে। দ্বিতীয় মন্ত্রের প্রথম অংশটি যেন বলে দিচ্ছে-চিত্রের বিক্ষোভ দূর করো; হৃদয় নির্মল করো; সৎ-ভাব আপনিই এসে তাতে আশ্রয় গ্রহণ করবে। ঐ মন্ত্রের পরবর্তী অংশের ভাবটি নিগূঢ় আখাত্মিক তথ্যে পরিপূর্ণ। তৃতীয় ও চতুর্থ মন্ত্রেও শুদ্ধসত্ত্বকে সম্বোধন করা হয়েছে। হৃদয়-নিহিত সমস্ত সৎ-গুণের শ্রেষ্ঠ যে শুদ্ধসত্ত্ব–এটা আমরা এই মন্ত্রে দেখতে পাই। পঞ্চম মন্ত্রটিতে ভক্তের কর্মক্ষমের নিমিত্ত প্রচেষ্টার ভাব দৃষ্ট হয়। ষষ্ঠ মন্ত্রে নিখিল দেবভাব আহরণ করে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করবার কামনা প্রকাশ পেয়েছে। এ মন্ত্রে দুরকম অর্থ সংসূচিত হতে পারে বলে দুটি অন্বয় অনুযায়ী অর্থ প্রকাশিত হয়েছে। সপ্তম মন্ত্রে ভক্ত ভগবানের সাযুজ্য সামীপ্য লাভ করতে ইচ্ছুক হয়ে বহুদীপ্তিসম্পন্ন ও অবিনশ্বর জ্ঞান প্রার্থনা করছেন। অষ্টম মন্ত্রের দুটি ভাবের মধ্যে প্রথমটিতে বোঝান হচ্ছে–ভগবানের নির্দিষ্ট কর্মের অনুষ্ঠানের দ্বারা লোক তার প্রীতি উৎপাদন করতে পারে। দ্বিতীয় ভাবটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক। সেখানে ভক্ত আপন মনোবৃত্তিনিচয়কে সম্বোধন করে পুণ্যের অনুষ্ঠানে উদ্বুদ্ধ করছেন। নবম মন্ত্রে ভক্তের দিব্য-দৃষ্টি লাভের প্রার্থনা,-মূঢ় অজ্ঞ আমি, আমার আননেত্র উন্মীলিত করে দিন। আমার সম্মুখের বাধা অপসারিত হোক;–আকাশের মতো নির্মল পথে আমি যেন আপনাকে সদাকাল সর্বত্র দেখতে পাই। দশম মন্ত্রের প্রথম অংশটি সঙ্কল্পমূলক। ভাষ্যকার মন্ত্রের অন্তর্গত ব্রহ্মবনিঃ ও ক্ষত্রবনিঃ পদ দুটির অর্থ করেছেন ব্রাহ্মণজাতির ও ক্ষত্রিয়জাতির প্রীণনকারী। কিন্তু এখানে বেদমন্ত্রে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জাতির সম্বন্ধ কিভাবে প্রখ্যাপিত হয়, তা আমরা অনুধাবন করতে পারলাম না। যাই হোক, আমরা এই মন্ত্রের অন্তর্গত ব্রহ্মবনিঃ ও ক্ষত্রবনিঃ পদ দুটিতে কোনও জাতির সম্বন্ধ স্বীকার করি না। এই দুই পদে সত্ত্ব-রজগুণ দুটির ব্যাখ্যান হয়েছে বলেই আমরা মনে করি। সেইজন্য ব্রহ্মবনিঃ পদের ব্রহ্মস্বরূপং এবং ক্ষত্ৰবনি পদের ক্ষত্ৰভাবোপেতং রজোগুণসম্পন্নং অর্থ অধ্যাহার করেছি। এই মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে ভক্তের প্রার্থনা–হে মন! তুমি আমার হৃদয়ে সত্ত্ব, রজঃ এবং পরমার্থরূপ ধনকে পোষণ করো। (ভাব এই যে,–সত্ত্ব, রজঃ প্রভৃতি উচ্চ ভাব আমার হৃদয়কে অলঙ্কৃত করুক)। একাদশ মন্ত্রে ভক্ত তার হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্ব-বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সৎ-গুণের বিকাশও প্রার্থনা করছেন। শুদ্ধসত্ত্বের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যেন দেবভাবে হৃদয় পরিপূর্ণ হয় এবং তিনি (ভক্ত) যেন মনুষ্যোচিত সকর্মে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারেন। দ্বাদশ মন্ত্রটিতে শুদ্ধসত্ত্ব যে দেবভাবেরই অংশ তা-ই বোধগম্য হয়] ॥ ৬।
মর্মার্থ- হে ভগবন! অভীষ্ট লাভের নিমিত্ত অর্থাৎ পরামুক্তিলাভরূপ অভীষ্ট-পূরণের জন্য আপনাকে আহ্বান করি-হৃদয়ে ধারণ করি। হে আমার মন! তুমি ভগবৎ-সমীপে গমনে অভিলাষী হও। (সাধনার প্রভাবে) তুমি ভগবানের সামীপ্য লাভের জন্য উদ্বুদ্ধ হও। তাহলে, দেবভাব সমূহ-শুদ্ধসত্ত্ব ইত্যাদি এবং দেবভাব-সমন্বিত চিত্তবৃত্তি-সমূহ সঞ্জাত হবে। অপিচ, তাতে তুমি সৎ-ভাব-সঞ্চারক জ্ঞানরশ্মি-সমূহ এবং কর্মক্ষয়কারী প্রবৃত্তি-সমূহ লাভ করতে পারবে। অশেষ প্রজ্ঞানাধার হে ভগবন্! আপনি ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষরূপ নানা রত্নসমূহকে প্রদান করুন। অপিচ, আপনার সম্বন্ধী হবিঃসমূহ অর্থাৎ আমার জ্ঞান-কর্ম-ভক্তি আপনার গ্রহণযোগ্য হোক। পবিত্ৰাতা সাধক দ্যুতিমান হে ভগবন্! আপনি রমণীয় পরমধন প্রদান করুন। পরমার্থযুত হে দেবতা। আপনারা আনন্দরূপে আমাদের হৃদয়ে বিরাজিত হোন। (ভাব এই যে,পরম ধনের অধিকারী দেবগণ আনন্দরূপে আমাদের মধ্যে সদা-সর্বদা বিরাজমান থাকুন)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি জ্ঞানময় ভগবানের প্রীণন-হেতুভূত অথবা প্রজনক অর্থাৎ প্রাপ্তির কারণ হও। (ভাব এই যে,-শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা জ্ঞানের উৎপত্তি ঘটে এবং জ্ঞানের সাহায্যে ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। হে শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূত জ্ঞানকর্ম! তোমরা অভীষ্টবর্ধক সার্বাভীষ্টপূরক অথবা মোক্ষদায়ক হও। (ভাব এই যে, সৎ-জ্ঞান ও সৎ-কর্মের দ্বারা মানুষ অভীষ্ট লাভ করতে সমর্থ হয়)। হে শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূতে ভক্তিরূপিণি দেবি! তুমি মহাদীপ্তি-বিশিষ্টা ষড়ৈশ্বর্যশালিনী–মহতের বশকারিণী হও। (তাৎপর্য এই যে, বিশুদ্ধা (অনন্যা) ভক্তির দ্বারা মহান-ঐস্বর্যসম্পন্ন ভগবান ও বশীভূত হন। অপিচ, ভক্তিতে তিনি ভক্তের সাথে মিলিত হয়ে তা উদ্ধার-সাধন করেন)। হে আমার হৃদয়াধিপতি শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি আয়ুদাতা, অকাল-মৃত্যু-নিবারক অর্থাৎ সৎকর্মশীল জীবন-বিধাতা হও। (ভাব এই যে,–সম্ভবের প্রভাবে মানুষ পূর্ণ-আয়ুষ্কাল পর্যন্ত জীবিত থাকে, এবং সকর্ম-সাধনের সামর্থ্য প্রাপ্ত হয়। অতএব প্রার্থনা–আমাকে পূর্ণায়ুষ্কাল বা চিরজীবন অর্থাৎ সৎকর্মশীল জীবন প্রদান করুন)। হে শুদ্ধসত্ত্বরূপ ভগবন্! আপনি বহুপ্রদাতা অর্থাৎ বহুরকম-ফলদান-হেতু অভীষ্ট-পূরক হন। অথবা সর্ব অভীষ্ট-দায়ক, সর্ব ফল-পুরক হন। অতএব প্রার্থনা–আপনি অভীষ্টফল মোফল প্রদান করুন। হে শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূত জ্ঞান-কর্ম! তোমরা ভক্তিরূপ ঘৃতের দ্বারা অভিষিক্ত হয়ে অভীষ্ট-পূরণে অভিবৃদ্ধ হও। হে শুদ্ধসত্ত্ব! গায়ত্রীছন্দোবদ্ধ ব্ৰহ্মমন্ত্র বা স্তুতি লক্ষ্য করে তুমি প্রদীপ্ত হও; অপিচ জগতীছন্দোবদ্ধ ব্ৰহ্ম-মন্ত্র বা স্তুতি লক্ষ্য করে উদ্দীপিত হও। (ভাব এই যে,নিখিল সৎ-ভাবমূলক সৎকর্মের দ্বারা অজ্ঞানতা দুর করে প্রজ্ঞানতা যেন লাভ করি; অপিচ শুদ্ধসত্ত্ব দেবভাব যেন সঞ্চয় করতে সমর্ত হই। সৎ-কর্ম-সঞ্জাত হে জ্ঞানভক্তিরূপী দেবদ্বয়! আমার হৃদয়-নিহিত এবং আমার হৃদয়-গৃহ-স্বামী অথবা হৃদয়রূপ গৃহের পালকরূপে বিদ্যমান। শুদ্ধসত্ত্বাঙ্গীভূত হে জ্ঞানদেব! আপনারা উভয়ে আমাদের সাথে সমান-মননযুক্ত অথবা আমাদের প্রতি অতিশয় প্রীতিযুক্ত, পরস্পর সমান-মনোযুক্ত অথবা আমাদের প্রতি অতিশয় প্রীতিযুক্ত পরস্পর সমান-চিত্তযুক্ত অথবা আমাদের প্রতি অনুগ্রহের জন্য পরস্পর সখিত্ব-সম্পন্ন এবং পাপরহিত অনুষ্ঠানেও আমাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হোন। অপিচ, সৎকর্মকারী আমাকে এবং আমার অনুষ্ঠিত কর্মকে বিনাশ করবেন না। (অর্থাৎ আমাকে এবং আমার কর্মকে পরিত্যাগ করবেন না); পরন্তু অদ্য অর্থাৎ সর্বকালে আমাদের উপকারের জন্য আপনারা কল্যাণকারী ও মঙ্গলপ্রদ হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। ভাবার্থ-আমাতে জ্ঞান ও ভক্তি অবিচলিত হোক; আর আমাদের কর্ম জ্ঞানানুসারী ও সৎ-ভাবমণ্ডিত হোক)। আত্ম-উল্কর্য-সম্পন্ন জনের অথবা অতীন্দ্রিয়দ্রগণের পুত্রস্থানীয় অর্থাৎ তাদের সৎকর্ম ইত্যাদি হতে সঞ্জাত, সর্বভূতে বিরাজমান অথবা সর্বভূতের অধিপতি প্রজ্ঞানস্বরূপ অথবা প্রজ্ঞানাধার ভগবান, হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্বে তানুঃপ্রবিষ্ট হয়ে অর্থাৎ শুদ্ধসত্বকে প্রাপ্ত হয়ে পরিচর্যা করেন অর্থাৎ সেই শুদ্ধসত্ত্বনিহিত হবিঃ বা ভক্তিকে গ্রহণ করেন। (ভাব এই যে, সৎ-ভাব শুদ্ধসত্ত্ব ভগবানের প্রীতির সামগ্রী। তা ভগবানের তৃপ্তিসাধক এবং তার দ্বারাই ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। প্রজ্ঞানাধার হে ভগব। স্বাহা-শব্দসহযুত স্তুতিরূপ মন্ত্রের দ্বারা আপনাকে অর্চনা করছি। দেবভাব সমূহের (শুদ্ধসত্ত্ব ইত্যাদির) অংশভূত বা আধারস্বরূপ আপনাকে যেন কর্মবেগুণ্যে মিথ্যাভূত না করি । ৭।
[বিনিয়োগ-সংগ্রহের অনুসরণে এই অনুবাকের সকল মন্ত্রের বিনিয়োগ; যথা,-ইষে ত্বা প্রভৃতি মন্ত্রে বহি এবং উপ প্রভৃতি মন্ত্রে প্লক্ষশাখা গ্রহণের পর পুনরায় উপ প্রভৃতি মন্ত্রে পণ্ড হনন করে অগ্নে প্রভৃতি মন্ত্রে সেই পশুর অংশ বিশেষ দ্বারা হোম করতে হয়। বৃষণৌ স্থ প্রভৃতি মন্ত্রে দুটি দর্ভ স্থাপন, উর্বশী প্রভৃতি মন্ত্রে তার একটিকে অরণি-মধ্যে নিক্ষেপন এবং পুরূরবা প্রভৃতি মন্ত্রে দ্বিতীয় দর্ভকে তার উপরে স্থাপন করবার বিধি। ঘৃতেনাক্তে প্রভৃতি মন্ত্রে তারপর সেই দর্ভ দুটিকে এবং হত পশুর মেদকে অরণির দ্বারা মন্থন করে ভবতং নঃ সমানসৌ প্রভৃতি মন্ত্রে তার দ্বারা অগ্নিতে হোম করবার বিধি। ভাষ্যের প্রারম্ভে ভাষ্যকার বলছেন,-ষষ্ঠ অনুবাকে ঘূপস্থাপনের মন্ত্রগুলি উক্ত হয়েছে। সপ্তম অনুবাকে সেই যুপে পশু-বন্ধন এবং পশু-হনন প্রভৃতির এবং হোমের বিষয় উক্ত হচ্ছে। পূর্বোক্ত বিনিয়োগ অনুসারে। মন্ত্রগুলির অর্থ; যেমন, প্রথম মন্ত্রে–হে বহ্নি! পশুলক্ষণযুক্ত দেবগণের আগমনের আকাঙ্ক্ষায় তোমাকে ধারণ করছি। উপকরণ বা হননের জন্য গমন করে যে, তা-ই উপবী। হে প্লক্ষশাখে! তুমি উপবী হও। তোমাকে সমীপে প্রাপ্ত হয়েছে। কে প্রাপ্ত হয়েছে?–অর্থাৎ উপক্রিয়ামাণ পশু-সমন্ধী হৃদয় ইত্যাদি অবয়বসমূহ। কাদের প্রাপ্ত হয়েছে? না-দেবান্ অর্থাৎ অগ্নীষোম ইত্যাদি দেবসম্বন্ধিনী প্রজাদের। হে বৃহস্পতে! বসুনি অর্থাৎ হৃদয় ইত্যাদি দ্রব্যসমূহকে পোষণ করো। হে পশু! তোমার সম্বন্ধী হব্য-সমূহ স্বাদু হোক। হে স্বনামক দেবতা! তুমি পশুকে রমণীয় করো। হে রেবতী! ক্ষীরাদি-ধনবন্ত পশুসমুহ যজমানের গৃহে ক্রীড়া করুক। আমরা পুনঃ পুনঃ বলেছি,- ক্রিয়াকাণ্ডের অনুসরণে মন্ত্রে যে ভাব–যে অর্থই সূচিত হোক না কেন, আমরা তার বিরোধী নই। তবে আমরা যে পথের অনুসন্ধানে যে লক্ষ্যপথে ছুটেছি, তাতে ভাষ্যকারের পূর্বোক্ত অর্থের সাথে একমত হতে পারি না। আমাদের মতে মন্ত্রের সম্বোধন স্বতন্ত্র-মন্ত্রের ভাব স্বতন্ত্র। বহি বা প্লক্ষশাখা অথবা পশু আধ্যাত্মিক উন্নতি-বিধায়ক ৰা পারলৌকিক মঙ্গল-সাধক হতে পারে কিনা, সে বিষয়ে আমাদের বিলক্ষণ সন্দেহ আছে। আমরা মন্ত্রটিকে ছয় ভাগে বিভক্ত করেছি। সেই ছয়টি বিভিন্ন বিভাগে ছয়টি বিভিন্ন সম্বোধন পদ পরিকল্পতি হয়েছে। দ্বিতীয় মন্ত্রের বিভিন্ন অংশ অরণি সম্বোধনে বিনিযুক্ত। আমাদের মতে, প্রথম অংশ হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্বের অংশ জ্ঞানকর্মের, তৃতীয় অংশ ভক্তির, চতুর্থ অংশ শুদ্ধসত্ত্বের, পঞ্চম অংশ ভগবানের, ষষ্ঠ অংশ জ্ঞানকর্মের এবং শেষ অংশ ভগবানের সম্বোধনে প্রযুক্ত। মন্ত্রের অন্তর্গত বৃষণেী, উর্বশী, পুরূরবা ও আয়ু পদ চারটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেও গণ্ডগোল দেখা যায়।
অনেকে এখানে পৌরাণিক উপাখ্যান অনুসারে স্বর্গোপ্সরা উর্বশী ও নৃপতি পুরূরবার সহযোগে আয়ু নামক নরপতির উৎপত্তিকে টেনে আনেন। কিন্তু তাতে ভাষ্যমতে মন্ত্রের অর্থ হয়–সন্তান-উৎপাদনে মুম্বুদ্বয় যেমন বীর্যসেচক হয়, তেমনি হে দৰ্ভয়, অরণিদ্বয় মন্থনে অগ্নি-উৎপাদনে তোমরাও মুষ্কের মতো হও। আমরা কিন্তু বৰ্ষণাত্মক বৃষ ধাতু থেকে বৃষণ পদের উৎপত্তি বলে মনে করি। আর তা থেকেই বৃষণ পদের অর্থ করি–অভীষ্টবর্ধকৌ, সর্বাভীষ্টপূরকৌ বা মোক্ষপ্রদায়কৌ।
এখানে আমাদের সম্বোধ্য–জ্ঞান ও কর্ম। উর্বশী শব্দ–উরু + বশ + অ (অ)। উরু শব্দে মহৎ এবং বশ অর্থে বশীভূত করা অর্থ বুঝিয়ে থাকে। তাতে উর্বশী পদের অর্থ হয়,-মহৎকে যিনি বশীভূত করতে সমর্থ। উরু–মহৎ শব্দে ভগবানকে বোঝায়। তাহলে, মহান, যে ভগবান, তিনি কিসে বশীভূত হন?-কে তাঁকে বশীভূত করতে সমর্থ হয়? একমাত্র ভক্ত ভিন্ন আর কে তাকে বশীভূত করতে পারে? আমরা এই ভাব উপলব্ধ করেই মন্ত্রের সম্বোধ্য-ভক্তিরূপিণী দেবীকে লক্ষ্য করেছি। পঞ্চম অংশের ঐ পুরূরবাঃ পদে, আমাদের মতে, পৌরাণিক নৃপবিশেষকে বোঝায় না। আমাদের মতে ঐ পদের অর্থ–বহুপ্ৰদাতা, যদ্বা– বহুবিধ ফলপ্রদাতৃত্বৎ অভীষ্টপূরকঃ। ভাষ্যমতে, মন্ত্রের সম্বোধ্য–উত্তরায়ণি। আমাদের মতে-শুদ্ধসত্ত্ব। আমরা মনে করি,-পুরূরাবা বা পুরূরাব শব্দ থেকে পুরূরবা পদ নিষ্পন্ন। তা থেকেই বহুফলপ্ৰদাতা এবং তা থেকেই অভীষ্টপূরক অর্থ অধ্যাহৃত হয়ে থাকে। চতুর্থ অংশের আয়ুপদের লক্ষ্য–পুরূরবার ঔরসে উর্বশীর গর্ভজাত পুত্র আয়ুকে নয়। তাতে পূর্ণ-আয়ুষ্কাল-বিধাতা মৃত্যুভয়নিবারণকারী হৃদয়াধিষ্ঠিত শুদ্ধসত্ত্বকেই বোঝাছে। জীবের সংসারে অবস্থিতির বা জীবিতকালের একটা সময় নির্দিষ্ট আছে; কিন্তু মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট নেই। বিষয়টি একটু প্রহেলিকাময়। নির্দিষ্ট কাল পূর্ণ না হলে যদি জীব দেহত্যাগ না করে, তাহলে মৃত্যুরও নির্দিষ্ট সময় থাকবে না কেন? তার কারণ এই যে,জীব যদিও নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল নিয়ে সংসারে উপস্থিত হয়, কিন্তু কৃতকর্মের দ্বারা–পাপের বা পুণ্যের অনুষ্ঠানে-স্বল্পায়ুঃ বা দীর্ঘজীবী হয়ে থাকে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিজের অভীষ্টসিদ্ধির জন্য জীব যখন ইতস্ততঃ ধাবমান হয়, তখন মায়া বা অবিদ্যার সহচর পাপ এসে তার মোহ-উৎপাদনে প্রয়াস পায়। যদি পূর্বসুকৃতির বলে বা সৎ-ভাবের প্রভাবে হৃদয়স্থিত দেবভাব শুদ্ধসত্বের অনুকম্পায় সে, সেই প্রলোভনে বশীভূত না হয়, তবেই তার কল্যাণ সাধিত হয়; নচেৎ সে পাপের অতল তলে ডুবে মরে। সকর্মে সৎ-ভাবে মানুষ দীর্ঘায়ুঃ লাভ করে বা নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল পর্যন্ত জীবিত থাকে। পাপকার্যে আয়ুক্ষয় হয়–অকালমৃত্যু ঘটে। এটাই শাস্ত্রমত-মহাজনের উক্তি। মন্ত্রের শেষাংশে ভক্তিসুধা- গ্রহণে অভীষ্টপূরণের নিমিত্ত ভগবানের নিকট প্রার্থনা জানান হয়েছে। এ পক্ষে কর্মই মূলীভূত। তৃতীয় মন্ত্রে গায়ত্রী ও জগতীছন্দোবিশিষ্ট স্তুতিমন্ত্র উচ্চারণে অন্তরে শুদ্ধসত্ত্বকে সন্দীপিত করবার অর্থাৎ নিখিল-সৎ-ভাব-সঞ্চয়ে এবং সঙ্কর্মের অনুষ্ঠানে ভগবানকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করবার সঙ্কল্প মন্ত্রের মধ্যে নিহিত রয়েছে। চতুর্থ মন্ত্রের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে জাতবেদসৌ পদে ভাষ্যকার নির্মন্থনে উৎপন্ন অগ্নিকে এবং আহবনীয় নামক অগ্নিকে–এই দুরকম অগ্নিকে লক্ষ্য করেছেন। ক্রিয়াকাণ্ডানুসারে তা হতে পারে; কিন্তু বেদমন্ত্রের ব্যাখ্যায় গাহপত্যাগ্নি অর্থে আমরা হৃদয়রূপ গৃহের পালক জ্ঞানাগ্নি অর্থ অধ্যাহার করেছি। পঞ্চম মন্ত্রে অগ্নিকে ঋষিণাং পুত্র বলা হয়েছে। এর তাৎপর্য কি? ভাষ্যাভাষে বোঝা যায়–ঋত্বিক বেদপারগ ঋষিগণের উৎপাদিত বলে অগ্নি ঋষিপুত্র বলে পরিকল্পিত। আমাদের মতে, যাঁরা পরম ত্যাগশীল, যাঁরা জিতেন্দ্রিয়, যাঁরা অতীন্দ্রিয়দ্রষ্টা–যাঁরা সদা-সৎকর্মপরা আত্ম উৎকর্ষ সম্পন্ন, তারাই ঋষি-পদবাচ্য। এঁদের সকর্মের প্রভাবে, এঁদের চিত্তের উৎকর্ষতা হেতু, জ্ঞানবহ্নি আপনা-আপনিই সন্দীপিত হয়ে থাকে। এঁরাই জ্ঞানের জনক বলে, হৃদয়ের অন্তর্নিহিত জ্ঞানবহ্নিকে ঋষিণাং পুত্র বলা হয়েছে ॥ ৭৷৷
মর্মার্থ- হে আমার কর্মফল! তোমাকে সম্যকরকমে ভগবানের উদ্দেশে সমর্পণ (উৎসর্গ) করছি। দেবগণের প্রীতি-সাধক হে আমার হৃদয়নিহিত ভক্তি! ভগবানের প্রীতিসাধক কর্মে সিদ্ধিলাভের জন্য (অর্থাৎ কর্ম সম্পূরণের জন্য) তোমাকে দৃঢ় বন্ধনে হৃদয়মূলে বন্ধন করি। হে ভক্তি! আপনি মনুষ্য-স্বভাবসুলভ উপদ্রব-সমূহকে অর্থাৎ কাম-প্রলোভন ইত্যাদির সৎ-ভাবের সংহারক প্রভাব-সমূহকে অভিভূত করুন। (সমগ্র মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক এবং আত্ম-উদ্বোধক। ভক্তি-সহযুত সৎকর্মানুষ্ঠানের দ্বারা ভগবানের অনুগ্রহ লাভ করা যায়। বিশুদ্ধা ভক্তির দ্বারা শক্রসমূহও বিদুরিত হয়। অতএব অনন্যা ভক্তির সহযোগে ভগবৎ-কর্মসাধনার উদ্বোধনা এই মন্ত্রে বর্তমান)। হে আমার ভগবৎ-অনুসারী কর্ম! ভক্তি রসের দ্বারা এবং কর্ম ফলক্ষয়কারক দেবভাব সমূহের দ্বারা তোমাকে অভিষিঞ্চিত করছি। হে আমার কর্ম! তুমিই দেবভাব-সমূহের পালক বা পোষক হও। (অতএব আমাতে দেবভাব–সভাব পোষণ করো)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমিই নিশ্চয় (একমাত্র) ভগবানের গ্রহণযোগ্য হও। অতএব দেবগণের (ভগবানের) প্রীতি-সাধনের নিমিত্ত, হে জ্ঞানভক্তিরূপিণি দেবিদ্বয়! ভগবানের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত আমার, কর্মকে স্বাদুভূত করুন অর্থাৎ ভক্তির প্রভাবে আমার অনুষ্ঠিত কৰ্ম ভগবানের প্রীতিসাধক হোক। [এই মন্ত্রের মধ্যে সঙ্কল্প এবং আত্ম-উদ্বোধন বর্তমান। সকর্মই সকল সৎ-ভাবের পোষক। পক্ষান্তরে শুদ্ধসত্ত্ব ব্যতিরেকে সৎকর্মের অনুষ্ঠান সম্ভবপর হয় না। কর্ম ভক্তি-সহযুত এবং শুদ্ধসত্ত্বসমন্বিত হোকমন্ত্রে এমনই উদ্বোধনা বর্তমান ]। হে মন (আত্মসম্বোধন)! তোমার প্রাণবায়ু বায়ুরূপী ভগবানের সাথে সংযুক্ত থোক। হে মন! তোমার বৃত্তিরূপ যাবতীয় অবয়ব বিভূতিসমুহের সাথে সম্মিলিত হোক। তাহলে, ভগবানের কর্মানুষ্ঠাতা আমি ভগবানের আশীর্বাদের সাথে গমন করতে পারব অর্থাৎ ভগবানের অনুগ্রহ লাভ করতে পারব। (সমগ্র মন্ত্রটিতে পরমাত্মার সাথে আত্ম-সম্মিলনের সঙ্কল্প বর্তমান।
আমার কর্ম এইরকমই হোক, যার দ্বারা আমি ভগবানের অনুগ্রহ লাভ করতে পারব অর্থাৎ তাতে আত্মলীন করতে সমর্থ হবো)। হে আমার জ্ঞান-কর্ম! তোমরা অনন্যা-ভক্তিরসে অভিষিঞ্চিত হয়ে (অর্থাৎ আমার হৃদয়নিহিত ভক্তি-সুধাকে ভগবানে সমর্পন করে) আমার অন্তরস্থিত পশু-প্রবৃত্তি-সমূহকে বিনাশ করো। (ভাব এই যে, আমার জ্ঞান ও কর্ম ভগবানের প্রীতিসাধক এবং ভক্তিজনক হোক। হে পরমার্থযুক্ত দেবতা! আপনারা কর্মানুষ্ঠাতা আমার প্রতি প্রিয়সামগ্রীদাতা প্রীতি-অতিশয়-যুক্ত হোন; এবং আমাদের অনুষ্ঠিত কমে আগমন করুন। অন্তরিক্ষের মতো অনন্তপ্রসারিত হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনি ভগবানের কর্মে নিয়োজিত আমাকে প্রাণবায়ুরূপে বর্তমান পরমাত্মা ভগবানের সাথে সংযোজিত করুন; অপিচ, সেই উদ্দেশ্যে হবিঃরূপ অন্ন অর্থাৎ ভক্তি-সুধা আমার হৃদয়ে সঞ্চার করে দিন। অপিচ, হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনি সম্যকমে সকর্মের অনুষ্ঠাতা আমার পাশব-বৃত্তিনাশক ও দেবভাবজনক হোন। আরও, অন্তরিক্ষের মতো অনন্তপ্রসারিত হে শুদ্ধসত্ত্ব! আমাদের অনুষ্ঠিত ভগবৎ-প্রীতি-সাধক এই যজ্ঞ-কর্মে সৎকর্মের অনুষ্ঠাতা আমাকে প্রকৃষ্টভাবে স্থাপন করুন। হে ভগবন! পৃথিবীতে সম্ভাব্য পাপ-সম্পর্ক হতে (অর্থাৎ ইহজগতে অনুষ্ঠিত ভববন্ধনমূলক কর্ম-সম্বন্ধ হতে) আমাকে পরিত্রাণ করুন। (এই মন্ত্রে সংসার-বন্ধন ছেদনের প্রার্থনা রয়েছে। ভাব এই যে,–যে কর্ম সংসার-বন্ধন-মূলক, সেই কর্মের অনুষ্ঠানে আমাকে প্রতিনিবৃত্ত করুন)। যে ভগবান সর্বতোভাবে সর্বব্যাপী সর্বপ্রকাশক, সেই ভগবানকে নমস্কর্মের দ্বারা অর্চনা করি। হে আমার চিত্ত বৃত্তি! তুমি শত্রুরহিত হয়ে ভক্তি-রসের প্রবাহকে লক্ষ্য করে গমন করো। (ভাব এই যে,–তুমি ভক্তি-রসে আপ্লুত হও)। তাহলে, ধন-পুষ্টির সাথে এবং পরমধন ও সৎ-ভাব-পোষণের সাথে গমন করবে। (ভাব এই যে, ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে তুমি পরমধন এবং সৎ-ভাব লাভ করো)। হে ভক্তিরূপিণি দেবিগণ! স্বতঃ পবিত্রতাযুত আপনারা আমাকে দেবভাব-সমূহ প্রাপ্ত করুন। সৎকর্মের অনুষ্ঠাতা আমরা আপনাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ও শুদ্ধ হয়ে যেন আপনাদের সংরক্ষক হই ॥ ৮।
[সপ্তম অনুবাকে যজ্ঞীয় পশুর উপকরণ মন্ত্র কথিত হয়েছে। এই অষ্টম অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে উপকৃত সেই যাবতীয় পশুর বিশসনাভিধান উক্ত হচ্ছে। বিশসন শব্দে হত্যা, মারণ, বিনাশ প্রভৃতি বোঝায়। সুতরাং পশুহননের প্রাক্কালে, পশুকে বধ-যোগ্য করবার জন্য যে সমস্ত প্রক্রিয়া অবলম্বিত হয়, এই অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে তা-ই কথিত হয়েছে। বিনিয়োগ-সংগ্রহে এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির যেমন বিনিয়োগ পরিদৃষ্ট হয়; যথা,-আদদে মন্ত্রে রক্ষ্ম গ্রহণ করে, ঋতস্য মন্ত্রে যুপে পশুকে বন্ধন করবে। অদ্ভ্যঃ প্রভৃতি মন্ত্রে সেই পশুর গাত্রে জলে-পোক্ষণের পর অপাং পেরুঃ প্রভৃতি মন্ত্রে পশুকে জল পান করাবে।-ইত্যাদি। কর্মকাণ্ডের অনুসৃত এই বিনিয়োগ-পদ্ধতির অনুসরণে ভাষ্যকার মন্ত্রগুলির সেইরকমভাবেই সম্বোধন পদ আমনন করে মন্ত্র-ব্যাখ্যানে নিযুক্ত হয়েছেন। আমরা কোনও স্থলেই ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা অনুমোদন করিনি। ভাষ্যকার প্রথম মন্ত্রের তিনটি অংশের অর্থ করেছেন–হে রশনে! তোমাকে গ্রহণ করি। হে দেবহবি পশু! যসিদ্ধির জন্য তোমাকে রঞ্জুর দ্বারা বন্ধন করি। হে বিনিযুজ্যমান পশু! দেবত্ব প্রাপ্ত হয়ে, মনুষ্য কর্তৃক তাড়ন ইত্যাদি উপদ্রবকে অভিভূত করো। দ্বিতীয় মন্ত্রের বিভিন্ন অংশ ভাষ্যমতে যজ্ঞীয় পশুর গাত্রে জলপোক্ষণে বিনিযুক্ত। তাতে ভাষ্যমতে মন্ত্রের অর্থ হয়,-হে পশু। তোমাকে জলের দ্বারা এবং ওষধি-সমূহের দ্বারা পোক্ষণ করছি। যজ্ঞের নিমিত্ত আলভ্যমান পশু ইতিপূর্বে জলপান করেনি বলে, তাকে জল পান করবার বিধি। মন্ত্রের অর্থ–হে জল, তুমি নিশ্চিত স্বাদুভূত। দেবতার প্রীতির নিমিত্ত হোমযোগ্য এই পশুকে স্বাদু করো। তৃতীয় মন্ত্রে ভাষ্যের লক্ষ্য-যজ্ঞ; সুতরাং সেই যজ্ঞ-সাধনের উপযোগী রূপইে মন্ত্রের ব্যাখ্যান হয়েছে। ভাষ্যমতে মন্ত্রের অর্থ,-হে পশু! তোমার প্রাণ, বায়ুর সাথে মিলিত হোক। তোমার হৃদয় ইত্যাদি অঙ্গসমূহ যজত্র নামক যাগবিশেষের সাথে মিশে যাক। আর তাতে যজ্ঞপতি যজমান আশীষের সাথে সংযুক্ত থোক।
আমরা চতুর্থ মন্ত্রে জ্ঞান ও কর্মের এবং পঞ্চম মন্ত্রে শুদ্ধসত্ত্বের সম্বোধন পরিকল্পনা করি। ষষ্ঠ মন্ত্রে ভাষ্যকারের লক্ষ্য-যজ্ঞসাধন। তাই তিনি উরো অন্তরিক্ষ পদ দুটির অর্থ করেছেন,–হে বিস্তীর্ণ ইন্দ্রিয়সমুদায়। বর্ষীয়া পদেরও তিনি ঐ একই অর্থ পরিগ্রহণ করেছেন। আমরা অন্তরিক্ষ পদে শুদ্ধসত্ত্বের অনন্তত্বের প্রতি লক্ষ্য রয়েছে বলে মনে করি। সেইভাবেই আমরা উরো অন্তরিক্ষ পদের অর্থ করেছি–অন্তরিক্ষবৎ অনন্তপ্রসারিত শুদ্ধসত্ত্ব। সপ্তম মন্ত্রে ভাষ্যে বৰ্হি সম্বোধন দেখা যায়। মন্ত্রের অর্থ-হে বহি! ভূসম্পর্ক হতে পরিত্রাণ করো। অষ্টম মন্ত্রে, ভাষ্যমতে, যজমান-পত্নী সূর্যের উপাসনা করবেন। সে মতে মন্ত্রের অর্থ–সমন্তাৎ ব্যাপ্তি যাঁর, সেই সূর্যরশ্মিকে নমস্কার করি। নবম বা শেষ মন্ত্রে যজমানপত্নী যজ্ঞশালায় গমন করে জল স্পর্শ করবেন। মন্ত্রের অর্থ-হে পত্নী! তুমি শত্রুরহিত হয়ে ঘৃত প্রবাহ লক্ষ্য করে ধনপুষ্টির এবং প্রজার সাথে গমন করো। (ঘৃতস্য কুল্যাং বাক্যে সর্ববস্তু সম্পূর্ণত্বের ভাব বুঝিয়ে থাকে)। হে আপদেবি! আপনারা যজ্ঞপ্রদেশ প্রাপ্ত করুন। আপনারা স্বতঃই শুদ্ধ। আমরাও যেন আপনাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে শুদ্ধ এবং আপনাদের পরিবেষ্টা হই। আমাদের মতে মন্ত্রে চিত্তবৃত্তির সম্বোধন আছে ]। ৮
মর্মার্থ- হে মানব (আত্মসম্বোধন)! ভগবানের গুণানুকীর্তন-শ্রবণে বিমুখ তোমার বাগিন্দ্রিয় ভগবানের কথামৃত পানের জন্য প্রবর্ধিত হোক; সংসারতাপে তপ্ত তোমার প্রাণবায়ু, বায়ুরূপে বর্তমান ভগবানের সাথে সঙ্গত হোক; অন্তদৃষ্টিহীন অর্থাৎ সৎ-বস্তু-দর্শনে বিমুখ তোমার দর্শনেন্দ্রিয় সর্বদ্রষ্টা ভগবানের স্বরূপদর্শনে প্রবর্ধিত হোক; অপিচ, ভগবানের কথামৃত শ্রবণে বিমুখ তোমার শ্রবণেন্দ্রিয় ভগবানের গুণানুকীর্তনের শ্রবণে প্রবর্ধিত হোক। হে মানব! তোমার প্রাণশক্তি সংসারতাপে যে বিদগ্ধতা প্রাপ্ত হয়েছে, অপিচ তোমার দর্শনেন্দ্রিয় অপ্রিয়বস্তুর দর্শনে যে শোক প্রাপ্ত হয়েছে এবং ভগবানের মাহাত্ম-শ্রবণে বিমুখ তোমার শ্রবণেন্দ্রিয় অনৃতশ্রবণে যে কলুষতা প্রাপ্ত হয়েছে, আরও তুমি প্রাণচক্ষুশ্রোত্র ইত্যাদির দ্বারা সংসারে বন্ধনমূলক যে দুঃখের কারণসমূহের সৃষ্টি করেছ এবং দুঃখমূলক যে অমৃতসমূহের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হয়েছ, সে সবই (তোমার কর্মের প্রভাবে) সাম্য প্রাপ্ত হোক। আর, শুদ্ধসত্ত্বরূপ ভক্তিবারিনিষেকে সে সকলই বিশুদ্ধতাপ্রাপ্ত হোক অর্থাৎ ভগবানের গ্রহণযোগ্য হোক। হে মানব (আত্মসম্বোধন)! তোমার বন্ধন মূলক জন্মকারণ, ভক্তিবারিনিষেকে প্রবর্ধিত হোক অর্থাৎ বিনষ্ট হোক। অপিচ, তোমার পাপকারণ–অমৃতমূল শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে প্রবর্ধিত হোক। (ভাব এই যে,-তোমার কর্ম জন্মকারণ- নিরোধক হোক)। পরন্ত তোমার চরিত্র (আচরণ বা কর্মসমূহ) শুদ্ধসত্ত্বসমন্বিত ও বিশুদ্ধ হোক।
হে মানব! তোমার সম্বন্ধে শুদ্ধসত্ত্ব দেবভাবসমূহ সুখবিধায়ক হোক; কর্মফলের ক্ষয়কারক সৎ-ভাবসমূহ সুখদায়ক হোক, ইহলোকে সম্বন্ধযুক্ত দেবভাবসমূহ তোমার সুখমূলক অর্থাৎ জন্মগতিনিরোধক হোক; অপিচ, তোমার জ্ঞান ও কর্ম তোমার পরমসুখের সাধক হোক। কর্মক্ষয়কারক কর্মফলদায়ক হে দেবতা! সৎকর্মের অনুষ্ঠানকারী আমাকে অজ্ঞানমোহ হতে উদ্ধার করুন। (ভাবার্থ-হে দেব! সত্বর আমার কর্মক্ষয় করে দিন)। ভববন্ধনছেদনকারী হে দেব! এই জনের (আমার) প্রতি বিরূপ হবেন না; পরন্তু আমার ভববন্ধন মোচন করে দিন। অথবা হে দেব! পাপশত্রু যেন আমাদের কর্মের বিঘাতক হয়। হে আমার অন্তরিস্থত অসৎ-বৃত্তিনিবহ! তোমরা দেবভাবের বিরোধী অন্তঃশত্রুসমূহের অংশস্বরূপ হও। এই কর্মপ্রভাবে অনুষ্ঠানকারী আমি যেন দুবুদ্ধিরূপ শত্রুকে নীচ তমোময় প্রদেশে প্রাপ্ত করি অর্থাৎ নিঃশেষে অপনীত করতে সমর্থ হই। যে সকল বহিরন্তঃশত্রু অনুষ্ঠানপরায়ণ আমাদের হিংসা করে, এবং অর্চনাকারী আমরা যে সকল শত্রুকে হিংসা করি, আমাদের এই কর্মের প্রভাবে সেই উভয়রকম শত্রুকেই যেন নিঃশেষে অপনীত করতে সমর্থ হই। হে ভগবন্! অভীষ্টপূরণের নিমিত্ত–সর্বার্থিসিদ্ধির জন্য আপনাকে আহ্বান করছি– অর্চনা করছি। হে ভগবন! ইহলোক-পরলোকের অর্থাৎ ইহকালপরকালসম্বন্ধি বাধক শত্রুদের শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা আচ্ছাদিত করুন। অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে শত্রুগণও শুদ্ধসত্ত্বসমন্বিত হোক। হে ভগবন! আমাদের সম্বন্ধে আপনার পরমার্থরূপ ধন অশেষ (অবিচ্ছিন্ন–শাশ্বত) এবং শোভনশক্তিসম্পন্ন অর্থাৎ মোক্ষপ্রদায়ক হোক। হে দেব! আপনি আমার কলুষক্লেদপরিশূন্য অর্থাৎ বিশুদ্ধ, অন্তরিক্ষের মতো অনন্তপ্রসারিত, শত্রুর উপদ্রবপরিশূন্য নির্মল হৃদয়কে লক্ষ্য করে আগমন করুন। (তাৎপর্যার্থ-বিশুদ্ধ হৃদয়ই ভগবানের নিবাস-স্থান। প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! আমি যেন সর্বদা আপনাকে হৃদয়ে রাখতে সমর্থ হই। অনুকম্পাপ্রদর্শনে আপনি তার বিহিত করুন)। হে প্রাণবায়ুরূপে নিত্যবিরাজমান সর্বগামী ভগব! হৃদয়ে সঞ্জাত শুদ্ধসত্ত্বরূপ অপত্যক বিশিষ্টভাবে গ্রহণ করুন। হে আমার মন (আত্মসম্বোধন)! উন্নত দেশে স্থিত অর্থাৎ হৃদয়রূপ নভোমণ্ডলে অবস্থিত প্রাণবায়ুরূপে সর্বশুদ্ধিবিধায়ক ভগবানকে প্রাপ্ত হও। স্বাহা-মন্ত্রে তোমাকে উদ্বোধিত করছি, আমার অনুষ্ঠান সুহুত অর্থাৎ সুসিদ্ধ হোক ॥ ৯
[এই অনুবাকের মন্ত্রগুলিতে পশুর বপোৎখেদন উক্ত হয়েছে। ক্রিয়াকাণ্ড অনুসারে পশুকে অভিমন্ত্রিত করে রঞ্জুর দ্বারা যুপকাষ্ঠে আবদ্ধ করা হয়েছে। তার পরবর্তী ক্রিয়াগুলি এই নবম অনুবাকের প্রতিপাদ্য। পশুর বাগিন্দ্রিয়, প্রাণেন্দ্রিয়, শ্রবণেন্দ্রিয় প্রভৃতি গোলোক থেকে এসেছে, গোলোক পরিত্যাগের জন্য তারা শোক-সন্তপ্ত, এখন বলিদানের পর দেবত্ব-প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রিয়-সমূহের শোক অপনীত হোক, প্রথম মন্ত্রের প্রথম অংশের মধ্যে এই ভাবই পরিস্ফুট। এই ব্যাখ্যার সাথে প্রথমেই আমাদের মত-বিরোধ উপস্থিত হয়েছে–সম্বোধন পদ নিয়ে। আমরা এখানে পশুর পরিবর্তে আত্ম-সম্বোধনে মানুষকে লক্ষ্য করি। যুপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত পশুর যন্ত্রণার সমান সংসার-সুখ-প্রমত্ত অবিবেকী জনের জীবন-যন্ত্রণা। আমরা মনে করি, তাদেরই (সেই মানুষদেরই) বিবেক উন্মেষণের জন্য এ মন্ত্রের অবতারণা। দ্বিতীয় মন্ত্রের সম্বোধ্য ওষধি এবং স্বধিতি অর্থাৎ কুশ এবং পশুছেদনের যোগ্য অস্ত্র। আমাদের মতে ওষধে এবং স্বধিতে পদ দুটিতে এক ভগবাকেই বোঝাচ্ছে। ভাষ্যমতে, আস্তৃত শোণিতসিক্ত কুশের অগ্রভাগ ধারণ করে মধ্যভাগ আচ্ছাদনে তৃতীয় মন্ত্রটি পাঠ করতে হয়। আমাদের মতে মন্ত্রটি অসৎ-বৃত্তির সম্বোধনে বিনিযুক্ত। কিন্তু লক্ষ্য ভগবান। চতুর্থ মন্ত্রের অন্তর্গত ইষে ত্ব অংশটির ব্যাখ্যা প্রথম প্রপাঠকের প্রথম অনুবাক দেখলেই বোঝা যায়। পঞ্চম মন্ত্র এবং ষষ্ঠ মন্ত্রের ব্যাখ্যা যথাক্রমে পঞ্চম অনুবাকে এবং প্রথম প্রপাঠকের দ্বিতীয় অনুবাক দেখলেই বোঝা যায়। সপ্তম মন্ত্রের ক্ষেত্রে ভাষ্যকারের পরিগৃহীত অর্থ অন্যরকম। তার মতে,–দ্বিশুল শাখায় ধৃত পশুমেদের উপরিভাগে পোক্ষিত আজ্যের যে বিন্দুগুলি ইতস্ততঃ নিপতিত, সেই আজ্জ্যবিন্দু স্তোক নামে অভিহিত হয়ে থাকে। বায়ুকে সম্বোধন করে মন্ত্রে বলা হয়েছে-হে বায়ু! সেই বিন্দুসমূহকে তুমি বিভক্ত করো অর্থাৎ পান করো। আমরা মনে করি,ভক্ত যিনি, তিনি তাঁর অন্তরের ভক্তি-সুধা তার প্রাণের দেবতাকে প্রদান করে পরিতৃপ্ত হন। এখানে সেই ভক্তিসুধা প্রদানেরই আকাঙ্ক্ষা প্রকটিত। অষ্টম বা শেষ মন্ত্র ভাষ্যমতে, বপা ও শ্ৰপনি সম্বোধনে বিনিযুক্ত। মন্ত্রের অর্থ-হে বপা এবং পণি! তোমরা ঊর্ধ্বনভঃসংজ্ঞক মরুৎপুত্রে গমন করো। আমাদের মতে, মারুত পদে এখানে প্রাণবায়ুরূপে বর্তমান ভগবানকে বোঝাচ্ছে। উর্ধ্বং নভসং পদ দুটিতে হৃদয়রূপ নভঃ-প্রদেশের প্রতি লক্ষ্য আছে। নভোমণ্ডল যেমন উন্নত দেশে অবস্থিত, সৎ-ভাব-সমন্বিত অন্তরও তেমনি নভোমণ্ডলের মতো সমুন্নত। সৎ-ভাবমণ্ডিত হৃদয়ে ভগবানের আসন বিস্তৃত। সেই হৃদয়েই তার অধিষ্ঠান ॥ ৯৷
মর্মার্থ- হে মানব (আত্মসম্বোধন)! তোমার মননেন্দ্রিয় মনোরূপে বিরাজিত মনোময় ভগবানের সাথে সঙ্গত হোক। হে মানব (আত্মসম্বোধন)! তোমার শরীরান্তঃসঞ্চারী প্রাণবায়ু (জীবন) বিশ্বপ্রাণরূপে বিরাজিত অর্থাৎ জগতের প্রাণ-স্বরূপ ভগবানের সাথে সঙ্গত হোক। অপিচ, তোমার শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবনীয় ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত যাতে প্রীতিপ্রদ এবং ভক্তিজনক ও দেবভাবের উন্মেষক হয়, সেই রকমভাবে সুহুত অর্থাৎ ভগবানে সমর্পিত হোক। (সমগ্র মন্ত্রটি আত্ম-উদ্ভোধক ও সঙ্কল্পমূলক। প্রার্থনাকারী এখানে নিজেকে উদ্ভোধিত করছেন। আত্ম-সম্মিলনের আকাঙ্ক্ষাও এখানে বর্তমান। ভাব এই যে,হে মানব! যদি কল্যাণ কামনা করো, ভগবানে আত্মসমর্পন করো। সৎ-ভাবে এবং ভক্তির প্রভাবে ভগবাকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। সুতরাং শুদ্ধসত্ত্ব-লাভে ভক্তিরস-সঞ্চারে প্রবুদ্ধ হও। তাতেই তুমি আত্ম-সম্মিলনে পরাগতি লাভ করতে পারবে)। সর্ব-ঐশ্বর্যশালী ভগবান্ আমার প্রাণ-বায়ু বা জীবনকে তার আপন কায়ায় অর্থাৎ সেই সেই অঙ্গে বিশিষ্টরূপে স্থাপন করুন; এবং আমার প্রাণ-সংরক্ষক অপান-বায়ুকে তার আপন কায়ায় অর্থাৎ সেই সেই অঙ্গে বিশিষ্টভারে সঙ্গত করুন। দ্যোতমান্ সকল শক্তির আধার বিশ্বনির্মাতা হে ভগবন্! আপনার অনুগ্রহে বিচ্ছিন্ন অর্থাৎ পরস্পর-বিরোধী আমার প্রাণমন ইত্যাদি আপনাতে সঙ্গত (সমবেত) হোক। অপিচ, আমার যে হৃদয় ইত্যাদি অবয়ব-সমূহ বিভিন্ন বিরুদ্ধ-প্রকৃতি সম্পন্নরূপে বর্তমান, আপনার অনুগ্রহে সেই সমস্ত সমান লক্ষণযুক্ত অর্থাৎ আপনাতে সন্নিবিষ্ট হয়ে সমানধর্মবিশিষ্ট এবং আমার গতিমুক্তিদায়ক হোক। হে মানব (আত্মসম্বোধন)! ভগবানে আত্ম সম্মিলনে উদ্বুদ্ধ তোমাকে পাপসংক্রমণ হতে রক্ষার জন্য, তোমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব তোমার সহায়ক অর্থাৎ সখার মতো প্রীতির আস্পদ এবং সৎ-ভাব-জনক ও ভক্তিরসের উৎপাদক অর্থাৎ পিতামাতার মতো রক্ষক ও পালক হোক। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি পরম-ঐশ্বর্যদায়ক হও। অতএব পরমৈশ্বর্য-সম্পন্ন ভগবান তোমাকে গ্রহণ করুন। স্নেহকারণ্যময় ভক্তাধীন ভগবান তোমাকে সম্যকরূপে প্রাপ্ত হোন। অপিচ হে শুদ্ধসত্ত্ব! তোমাকে ভগবানের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি। এইভাবে, প্রজ্ঞানময় ভগবানের উদ্দেশ্যে অর্থাৎ পরাজ্ঞান-লাভের নিমিত্ত তোমাকে ভগবানে নিয়োজিত করছি। অপিচ, সৎ-ভাব-সঞ্চয়ের নিমিত্ত এবং কর্মক্ষয়ের জন্য তোমাকে ভগবানে সংন্যস্ত করছি। শুদ্ধসত্ত্বগ্রাহী হে আমার হৃদয়নিহিত দেবভাব-সমূহ! আমার হৃদয়গত ভক্তি-সুধা গ্রহণ করুন; হে আমার হৃদয়গত ভক্তি-রসপানকারী, দেবগণ! আপনারা আমার হৃদয়-সঞ্জাত ভক্তি-রূপ সারসামগ্রী গ্রহণ করুন। হে আমার হৃদয়-নিহিত ভক্তি! তুমি অন্তরিক্ষের মতো সমুন্নত হৃদয়ে সভাবের সংরক্ষয়িত্রী হও। অতএব তোমাকে স্বাহা মন্ত্রের দ্বারা ভগবানে সমর্পণ করছি। আমার এই দানকর্ম সুসিদ্ধ সুহুত হোক। হে আমার হৃদয়-নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! পূর্ব ইত্যাদি হতে আরম্ভ করে ঊর্ধ্ব-অধঃ পর্যন্ত সর্বদিক-রূপে বিরাজিত ভগবানের উদ্দেশ্যে তোমাকে স্বাহা মন্ত্রের দ্বারা নিয়োজিত করছি। সর্বদিক-স্বরূপ ভগবানকে নমস্কর্মের দ্বারা পরিচর্যা করি ॥১০।
[ ভাষ্যানুক্রমনিকায় প্রকাশ,নবম অনুবাকে বপাপ্রয়োগ উক্ত হয়েছে, দশম অনুবাকে বসাহোম কথিত হচ্ছে। এই রকম অনুক্রমণে এবং বিনিয়োগ সংগ্রহের অনুসরণে ভাষ্যকার মন্ত্রের অর্থ-নিষ্কাশনে অগ্রসর হয়েছেন। সেই অনুসারে প্রথম মন্ত্রে অর্থ হয়েছে,-হে হৃদয়। তোমার মনঃস্থানীয় পৃষদাজ্যের দ্বারা দেবগণের মন সঙ্গত হোক। সেইরকম তোমার প্রাণও সঙ্গত হোক। হে হব্য! তুমি যাতে দেবগণের প্রিয় এবং ঘৃতের মতো হও, সেইভাবে তোমাকে স্বাহা-মন্ত্রে উৎসর্গ করছি। দ্বিতীয় অর্থাৎ ইন্দ্রদেবতা-সম্বন্ধী মন্ত্রের ভাষ্যমতে অর্থ হয়, ইন্দ্রদেবতা এই পশুর প্রাণকে আপন সেই সেই অঙ্গে স্থাপন করুন। পশুর অপান ইত্যাদিও সেইরকমভাবে স্থাপিত হোক। হে দেব তৃষ্টা! আপনার অনুগ্রহে ছেদন দ্বারা বিশ্লিষ্ট সমুদায় অঙ্গ সমবেত হোক। হে হৃদয় ইত্যাদি অবয়বসমূহ! তোমরা বিলক্ষণরূপ হলেও হবিষ্ট্রের দ্বারা সমান লক্ষণযুক্ত হও। হে পশু! দেবগণে গমনকারী তোমার সখীভূত অন্যান্য পশু এবং তোমার মাতা-পিতা সকলেই হৃষ্ট হোক। কি জন্য? তোমার মুখে স্বর্গপ্রাপ্ত হয়ে স্বকুল সকলকে সেবা করবার জন্য। আমরা এ মন্ত্রের প্রথম অংশে ইন্দ্রদেবতার সম্বোধনে পরমৈশ্বর্যশালী ভগবানের সম্বোধন স্বীকার করি; আর পশুর পরিবর্তে আত্মসম্বোধন অধ্যাহার করি। তাতেই মন্ত্রের অর্থ সুস্পষ্ট হয়, এবং তাই-ই আমাদের পন্থার অনুসারী। শুদ্ধসত্ত্ব সৎ-ভাব ইত্যাদি যে পরম পথের সহায় হয়, তৃতীয় মন্ত্রে সেই ভাব পরিব্যক্ত। চতুর্থ মন্ত্রে অন্তরস্থিত দেবভাবসমূহকে ভক্তিরসে অভিসিঞ্চিত করে ভগবানে সমর্পণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু ভাষ্যমতে মন্ত্রের সম্বোধ্যবসা। বসা বলতে মজ্জা, মেধ ও চর্বি প্রভৃতি বোঝায়। অর্থাৎ শরীরের যা সারসামগ্রী, তা-ই বসা। ভাষ্যকার মন্ত্রের অর্থ করেছেন-হে বসা! তুমি আয়নীয়া হও। অতএব আহবনীয় অগ্নি তোমাকে স্বীকার করুন। অপ তোমাকে সমভাবে প্রাপ্ত হোক অর্থাৎ যেন তোমার শোষ হয় অথবা তুমি যেন শুষ্ক না হও। হে বসা, তোমাকেও প্রদান করি। কি জন্য? বায়ুর গতির নিমিত্ত, আদিত্যের গমনের জন্য, এবং অপ সম্বন্ধী ওষধিসমূহের প্ররোহণের জন্য। তোমার পিধানের দ্বারা সুরক্ষিত হয়ে এবং তোমার হোমসুকৃতির জন্য বায়ুগমন ইত্যাদি সুস্থিত হোক। মন্ত্রের শেষাংশে এক বিশ্বজনীন ভাব পরিব্যক্ত] ॥১০৷৷
মর্মার্থ- হে মম হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি সত্ত্ব-সমুদ্রকে–ভগবানকে প্রাপ্ত হও অথবা অনন্তসত্ত্বসমুদ্র ভগবানে মিলিত হও। স্বাহামন্ত্রে তোমাকে উৎসর্গীকৃত করছি। আমার সঙ্কল্প সিদ্ধ হোক। হে আমার হৃদয়নিহিত ভক্তি! তুমি অন্তরিক্ষের মতো অনন্ত-প্রসারিত বিশ্ব-ব্যাপক ভগবানকে প্রাপ্ত হও। অর্থাৎ তার সাথে সঙ্গত হও। স্বাহামন্ত্রে তোমাকে ভগবানে নিয়োজিত করছি;–আমার উদ্বোধন-যজ্ঞ সুসিদ্ধ হোক। হে আমার হৃদয়-সঞ্জাতি সৎ-জ্ঞান! তুমি দ্যোতমান স্বপ্ৰকাশ, জগৎ-প্রসবিতা (জগৎ-প্রকাশক) প্রজ্ঞানময় ভগবাকে প্রাপ্ত হও অর্থাৎ তাঁর সাথে সঙ্গত হও। স্বাহা-মন্ত্রে তোমাকে প্রেরণ করছি;–আমার সঙ্কল্প সুসিদ্ধ হোক। হে আমার সৎ-ভাব সমন্বিত সকর্ম! তুমি অহোরাত্রি-অভিমানী দেবতাকে অর্থাৎ অহোরাত্রিরূপে নিত্য-প্রত্যক্ষীভূত ভগবাকে প্রাপ্ত হও অর্থাৎ তার সাথে সঙ্গত হও। স্বাহা-মন্ত্রে তোমাকে ভগবানে নিয়োজিত করছি;–আমার অনুষ্ঠান সুসিদ্ধ হোক। (অথবা যে অহোরাত্রে আমার ভগবৎপ্রীণন-সাধক কর্ম অনুষ্ঠিত হয়, সে সকল কালেই আমার অনুষ্ঠিত সেই কর্ম ভগবানের প্রীতিপ্রদ হোক; অপিচ, সেই কাল শুভদায়ক হোক)। হে আত্মা! তুমি মিত্রভূত এবং স্নেহকারুণ্যময় ভগবাকে প্রাপ্ত হও অর্থাৎ পরমাত্মার সাথে সঙ্গত হও। স্বাহা-মন্ত্রের দ্বারা তোমাকে ভগবানে প্রেরণ করছি; আমার অনুষ্ঠান সুসিদ্ধ হোক। হে আমার মন! তুমি অন্তরে শুদ্ধসত্ত্ব উৎপাদন করে। অথবা হে আমার মন! তুমি সৎ-স্বরূপ ভগবাকে হৃদয়ে ধারণ করো। হে আমার মন! ভগবানের প্রীতি-হিতুভূত সঙ্কর্মের অনুষ্ঠানের দ্বারা প্রবর্ধিত হও। অথবা হে আমার কর্ম! তুমি সৎকর্ম-স্বরূপ যজ্ঞেশ্বর ভগবানকে প্রাপ্ত হও। স্বাহা-মন্ত্রে তোমাকে ভগবানে নিয়োজিত করছি;–আমার সঙ্কল্প সুসিদ্ধ হোক। হে আমার কর্ম! তুমি গায়ত্রী-ইত্যাদি ছন্দে প্রকাশমান ভগবাকে সম্যকরূপে বরণ করো অর্থাৎ প্রকাশ ও পূজা করো। অথবা, হে আমার কর্মসমূহ! গায়ত্রী-ইত্যাদি ছন্দোবদ্ধ বেদমন্ত্রের দ্বারা সুষ্ঠুরূপে অনুষ্ঠিত হয়ে তোমরা ভগবানে নিয়োজিত হও।
স্বাহা মন্ত্রের দ্বারা তোমাদের প্রবর্তিত করছি; আমার সেই কর্মসমূহ সুসিদ্ধ অর্থাৎ সম্পূর্ণ হোক। হে আমার কর্মসমূহ! তোমরা ইহকাল-পরকালের মঙ্গল-সমূহ অর্থাৎ ঐহিক-আমুষ্মিক পরমার্থ সম্পাদন করে। স্বাহা-মন্ত্রের দ্বারা তোমাদের নিয়োজিত করছি। আমার সঙ্কল্প সুসিদ্ধ হোক। হে ভগবন্! আপনি দীপ্যমান অর্থাৎ জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত হৃদয়রূপ নভঃস্থলে বর্তমান শুদ্ধসত্ত্বকে গ্রহণ করুন। আমার অনুষ্ঠান সুসিদ্ধ হোক অর্থাৎ স্বাহা-মন্ত্রে আমার হৃদয়নিহিত সেই শুদ্ধসত্ত্বকে আপনার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত করছি। হে মন! তুমি বিশ্ব-নেতা অর্থাৎ বিশ্বের হিতসাধক প্রজ্ঞানময় ভগবানকে প্রাপ্ত হও। স্বাহা-মন্ত্রে তোমাকে উদ্বোধিত করছি; আমার অনুষ্ঠান অর্থাৎ সাধনা সুসিদ্ধ হোক। হে আমার চিত্তবৃত্তি! সুফল-সমন্বিত কর্মক্ষয়ের নিমিত্ত তুমি প্রবৃদ্ধ অর্থাৎ উদ্বোধিত হও। স্বাহা-মন্ত্রের দ্বারা তোমাকে উদ্বোধিত করছি;–আমার উদ্বোধন-যজ্ঞ সম্পূর্ণ হোক। হে ভগব। আপনি আমার হৃদয়ে আবির্ভূত হোন;–অপিচ, আমাতে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ স্থাপন করুন। আমি যেন তাতে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ রূপ চতুর্বর্গ-ধন প্রাপ্ত হতে পারি। হে শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি শত্রুদের সন্তাপক হও। অতএব যে বহিরন্তঃ শত্রু, ভগবানের পূজাপরায়ণ আমাদের হিংসা করে, অপিচ যে শত্রুকে প্রার্থনাকারী আমরা হিংসা করি, সেই শত্রুকে তুমি সস্তাপিত করো। স্নেহ-করুণাময় হে ভগবন! আমাদের শত্রুগণ আমাদের মধ্যে বর্তমান থেকে যে সকল স্থান হতে আমাদের হিংসা করে, সেই সকল স্থান হতে আমাদের শত্রুর উপদ্রব হতে মুক্ত করুন। স্নেহকরুণাময়, সৎ-ভাব-পোষক শুদ্ধসত্ত্বের সঞ্চারক পাপ-নাশক হে ভগবন্! এইভাবে শোকসন্তপ্ত আমরা অনিষ্ট-নিবারণে ইষ্ট-প্রাপ্তির নিমিত্ত যেন প্রবুদ্ধ হই। স্নেহ-কারুণ্যময় হে ভগবন্! আমাদের সংসার-পাশ মোহ-পাশ হতে পরিত্রাণ করুন । ১১।
[ এখানে এই মন্ত্রের দ্বারা উপষদ-হোম সম্পন্ন করতে হয়। উপষদের পূর্ববর্তী বসাহোমের বিষয় পূর্বের অনুবাকে উক্ত হয়েছে। ভাষ্য অনুসারে প্রথম মন্ত্রের সম্বোধ্য-হবিঃ, লেপ এবং সমুদ্র ইত্যাদি দেবতা; দ্বিতীয় মন্ত্রের সম্বোধ্য হৃদয়শূল ও বরুণ প্রভৃতি। ভাষ্যকারের মতে প্রথম মন্ত্রের অর্থ–হে হবিঃ! তুমি সমুদ্র ইত্যাদি নামক দেবতা-সমূহে গমন করো। স্বাহা মন্ত্রের দ্বারা তোমাকে নিক্ষেপ করছি।–ইত্যাদি। ভগবানের অর্চনাকারী ভগবৎ-পূজায় নিজেকে উদ্বুদ্ধ করে জ্ঞান ভক্তি ও কর্ম–সবই ভগবানের চরণে সমর্পণ করছেন। ভাষ্যকার বিভিন্ন প্রয়োজন সমুদ্র প্রভৃতি পদের প্রয়োগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু আমরা তার স্বীকার করি না। আমাদের মতে, ঐ সকল পদের লক্ষ্য–ভগবান্। ভগবান তেমনই শুদ্ধসত্ত্বের আধার, যেমন সমুদ্র জলের আধার। প্রার্থনাকারী সেই সত্ত্বসমুদ্র ভগবানে আত্ম-সম্মিলন করে পরমানন্দলাভের জন্য উদ্বোধিত হচ্ছেন। ক্রিয়াকাণ্ড অনুসারে ভাষ্যের মত হোক, আমরা দেখেছি–প্রথম মন্ত্রের শেষে বলা হলো–ভগবান্ হৃদয়ে আবির্ভূত হোন। কিন্তু হৃদয় নির্মল না হলে তো সে হৃদয়ে ভগবানের অধিষ্ঠান হয় না। তাই দ্বিতীয় মন্ত্রে শত্রুনাশের (অর্থাৎ যে শত্রুর দ্বারা মনে মালিন্যের সৃষ্টি হয়-কাম-প্রলোভন ইত্যাদি সেই অন্তর ও বাহিরের শত্রদের ধ্বংসের কামনা প্রকাশ পেয়েছে। মন্ত্রের শেষে প্রার্থনা জানান হয়েছে,-হে ভগব! হৃদয়ে আবির্ভূত হয়ে, আপনি আমার অন্তরিস্থত পাপ শত্রুগণকে বিনাশ করুন; আমার সংসার-বন্ধন টুটে যাক। আপনার অনুগ্রহে আমি যেন পরাগতি লাভে সমর্থ হই ] । ১১।
মর্মার্থ- আমার জন্মসহজাত সৎ-বৃত্তিনিবহ পরমজ্ঞানদায়ক ও পরমার্থপ্রকাশক হোক। দ্যোতমান স্বপ্ৰকাশ ভগবান্ (আমাদের কর্মের প্রভাবে) শুদ্ধসত্ত্বের গ্রাহক ও পরমার্থের প্রদায়ক হোক। আমাদের হিংসাবিরহিত কর্ম সুফলসমন্বিত, সৎ-ভাবজনক এবং ভগবৎপ্রকাশক হোক। অথবা, আমাদের অনুষ্ঠিত কর্ম যাতে সুফলসমন্বিত এবং ভগবানের প্রীতিপ্রদ হয়, সেইভাবে প্রবর্তিত হোক। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পজ্ঞাপক)। জ্ঞান-সূর্য আমাদের হৃদয়ে অবির্ভূত হয়ে শুদ্ধসত্ত্বমণ্ডিত হোন। অথবা, স্বপ্রকাশ প্রজ্ঞানময় ভগবান্ আমাদের হৃদয়ে আবির্ভূত হয়ে আমাদের শুদ্ধসত্ত্বসমন্বিত করুন। সমগ্র মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক আত্ম-উদ্বোধক। আমাদের জ্ঞান কর্ম ও ভক্তি আমাদের পরমমঙ্গলদায়ক হোকমন্ত্রে এই ভাব প্রকটিত)। প্রজ্ঞানময় হে ভগবন্! আপনাকে আমাদের সৎ-ভাব-মণ্ডিত হৃদয়রূপ অবিনশ্বর-গৃহের আধারে স্থাপন (প্রতিষ্ঠা) করি। (মন্ত্রটি উদ্বোধনমূলক ও সঙ্কল্পজ্ঞাপক। ভাব এই যে, সৎ-ভাব-সমন্বিত হৃদয়েই ভগবানের অধিষ্ঠান হয়। অতএব হৃদয়ে সৎ-ভাবের জননের দ্বারা আমি যেন সে হৃদয়ে ভগবানকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হই)। হে শুদ্ধসত্ত্ব ইত্যাদি! তোমরা জগতের হিতসাধনের নিমিত্ত (সকলের মঙ্গলের জন্য) সর্বপ্রাণীর সুখের হেতু হও। এবং তোমরা ভগবৎকামী আমাকে পরমসুখে স্থাপন করো। হে শুদ্ধসত্ত্ব ইত্যাদি। তোমরা ইন্দ্রাগ্নীদেবতাদ্বয়ের অংশভূত হও; এবং তোমরা মিত্রাবরুণ দেবতার অংশভূত হও। আরও, তোমরা বিশ্বের সকল দেবভাবের অংশস্বরূপ হও। অতএব তোমরা আমার অনুষ্ঠিত সকল কর্মে সদা-জাগরুক থাকো, অথবা সকর্মে আমাকে সদা উদ্বোধিত করো। (সমগ্র মন্ত্রটি উদ্বোধনমূলক। ভাব এই যে,–শুদ্ধসত্ত্ব সম্ভাবসমূহ আমার সকল কর্মে সদা বর্তমান থাকুক এবং তারাই আমার পরমার্থদায়ক হোক] । ১২।
[একাদশ অনুবাক পর্যন্ত তৃতীয় প্রপাঠকের মন্ত্রগুলি অগ্নিবোমিয় পশু সম্বন্ধে প্রযুক্ত। তার পরই সোম অভিষব। সোম-অভিষবের প্রথম এবং প্রধান উপাদান–বসতীবরী। দ্বাদশ অনুবাকে সেই বসতীবরী-সংজ্ঞক উপাদানের বিষয় কথিত হচ্ছে। বসতীবরী সম্বন্ধে একটি উপাখ্যান সূত্রগ্রন্থে পরিদৃষ্ট হয়। সেটি এই, পুরাকালে কোনও সময়ে দেবগণ, আগ্নী-মণ্ডলে অবস্থিত হয়ে, যজ্ঞশালার এটি আমার ইত্যাদি ভাবে বিভিন্ন অংশ বিভাগ করে নেন। এইভাবে দেবগণের নিজ নিজ বিভাগ-অনুসারে কতক অংশ অবশিষ্ট থাকে। তখন তারা সকলে স্থির করেন,–অবশিষ্ট অংশ আপাততঃ সাধারণ-সম্পত্তির মধ্যে পরিগণিত থাকুক। পরে প্রত্যুষে পুনরায় ঐ অবশিষ্ট অবিভক্ত অংশের বিভাগ করে নেওয়া যাবে। সেই অবশিষ্ট অংশ বসতু বলে দেবগণ কর্তৃক সেই সময়ে পরিত্যক্ত হওয়ায়, সেই অংশের নাম–বসতীবরী হয়। আর সেই শেষভূত অংশ-সম্পন্ন আপ বসতীবর্যাপঃ নামে অভিহিত। তারপর প্রাতঃকালে দেবগণ পুনরায় আগমন করে সেই অভিভক্ত অংশের বিভাগে প্রবৃত্ত হলেন। কিন্তু কিছুতেই তার বিভাগ-মীমাংসায় সমর্থ হলেন না। অবশিষ্ট অংশের অল্পতৃ-হেতু বহুর মধ্যে তার বিভাগ সম্ভবপর হলো না। সাধারণের সেই অংশের পরস্পর বিভাগে অসামৰ্থ-হেতু সেই অংশ জলে পরিত্যক্ত হলো। তা থেকে জলের নাম হলো– বসতীবঃ। যজ্ঞের অংশভূত বলে বসতীবরী গ্রহণীয়। বসতীবরী-গ্রহণে তার কাছে যজ্ঞ দৃঢ় স্থাপিত হয়–সূত্রকারবর্গের এটাই অভিপ্রায়। ভাষ্যকার তাই প্রথম মন্ত্রের অর্থ করেছেন,-এই গৃহ্যমাণ বসতীবরী সংজ্ঞক জল স্বসংস্কারে সোমের দ্বারা হবিঃসাংযুক্ত থোক। দেব ইন্দ্ৰ হবিঃসম্পন্ন হোন। যাগও হবিযুক্ত হয়ে প্রবর্তিত হোক। আর বসীতবরীসমূহের প্রকাশের দ্বারা সূর্যও হবিষ্মন্ হোন।-যজ্ঞকর্মের অনুকুল ক্রিয়াকাণ্ডের বিধি-পদ্ধতির অনুসরণে ভাষ্যকার মন্ত্রের যে অর্থ নিষ্কাশনে প্রবৃত্ত হয়েছেন, সে সম্বন্ধে আমাদের কোনই বক্তব্য নেই। তবে পুনরায় বলি, ক্রিয়াকাণ্ডের অনুসরণে মন্ত্রের প্রয়োগে যা-ই থাকুক, বেদমন্ত্রের ব্যাখ্যানে আমরা তার সাথে অল্পই সংসৃষ্ট। আমরা মন্ত্রের সাথে বসতীবরীর সম্বন্ধ উপলব্ধি করি না। আবার, এখানে অধ্বরঃ পদটি লক্ষ্য করার বিষয়। ঐ পদের আমরা অর্থ করেছিঅস্মাকং হিংসবিরাহিতং কর্ম। হিংসা বিরহিত কর্ম বলবার তাৎপর্য এই যে,-এ যজ্ঞে নরবলি নেই;–এ যজ্ঞ নরমেদ বা পশুমেদ যজ্ঞ নয়। স্থূলতঃ, এ যজ্ঞে কোনও প্রাণহানির সম্ভাবনা আদৌ নেই।–দ্বিতীয় মন্ত্রে ইন্দ্রাগ্নী মিত্রাবরুণ প্রভৃতি ভগবানের বিভিন্ন বিভূতিসমূহ মঙ্গলদায়ক হোন, তাদের অনুগ্রহে সৎ-ভাব-মণ্ডিত হয়ে বিশ্বজনকে সৎ-ভাবে অনুপ্রাণিত করি–এইরকম সঙ্কল্পের এবং উদ্বোধনার ভাব বর্তমান ] । ১২।
মর্মার্থ– উৎকর্ষসাধক পবিত্রকারক হে ভগবন্ বা শুদ্ধসত্ত্ব! আপনি সৎকর্মের সম্পাদক হন। অতএব আত্মার উৎকর্ষসাধনের জন্য আপনাকে হৃদয়ে ধারণ (প্রতিষ্ঠিত) করছি। (মন্ত্রটি নিত্যসত্যমূলক আত্ম-উদ্বোধক)। দেবগণের প্রীতিসাধনের জন্য অর্থাৎ অন্তরে দেবভাবের উদ্দীপনার নিমিত্ত আপনি আমাদের অনুষ্ঠিত সৎকর্ম হিংসাপ্রত্যবায় ইত্যাদি পরিশূন্য করুন। শ্রেষ্ঠ পবিত্রকারক আপনার প্রীতির জন্য (আপনার অনুগ্রহে) আমার অন্তরস্থিত শুদ্ধসত্ত্ব যেন পবিত্রতাসম্পন্ন, অনন্তমাধুর্যযুক্ত অর্থাৎ ভক্তিরসের উদ্দীপক জ্ঞানদায়ক–অমৃতপ্রদ এবং অভীষ্টসাধক করতে সমর্থ হই। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! সর্বশক্তির আধার ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে উৎসর্গ করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তোমাকে অজ্ঞানরূপ আবরণের নাশক প্রজ্ঞানস্বরূপ ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত উৎসর্গ করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! রিপুশত্রুর নাশক পরম-ঐশ্বর্যশালী ভগবানের (ভগবান্ ইন্দ্রদেবতার) প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিয়োজিত করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! পাপতাপবিনাশক সর্বশক্তির আধার ভগবান ইন্দ্রদেবতার প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিবেদন করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! প্রজ্ঞানদায়ক স্বপ্রকাশ ভগবান ইন্দ্রদেবতার প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিয়োজিত করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! সর্বদেবময় একমেবাদ্বিতীয় ভগবানের পূজার নিমিত্ত তোমাকে উৎসর্গকৃত করছি। হে আমার জন্মসহজাত সৎ-ভাবসমূহ! তোমরা ভগবানের প্রীতিসাধক হও। অপিচ, তোমরা অন্তঃশত্রুনাশক পরমধনের গোপয়িতা অর্থাৎ প্রকাশক, অমৃতস্বরূপ সোম-আধার ভগবানের পালয়িতা অর্থাৎ হৃদয়ে প্রতিষ্ঠাপয়িতা হও। তথাবিধ তোমরা অর্থাৎ তোমরা তেমনই হয়ে, পরমজ্যোতিঃপ্রদ দেবভাবসমূহে অর্থাৎ পরমজ্যোতিঃপ্রদ দেবভাব সংজননের দ্বারা আমাদের অনুষ্ঠিত সৎকর্ম সম্পূরণ করো। হে দেবতাগণ! আপনারা আমাদের আহুতির দ্বারা হৃদয়ে উদ্দীপিত হয়ে আমাদের প্রদত্ত সৎ-ভাবকে গ্রহণ করুন। অপিচ, আপনাদের অনুগ্রহে আমাদের হৃদয়ে উদ্দীপিত শুদ্ধসত্ত্বকে আমাদের হৃদয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত করুন। হে শুদ্ধসত্ত্বাধার ভগবন্! দুলোক ভূলোক এবং বিস্তীর্ণ অন্তরিক্ষলোক অর্থাৎ সর্বলোকে আপনার যে প্রসিদ্ধ দিব্যজ্যোতিঃ বিদ্যমান আছে, সেই জ্যোতির দ্বারা প্রার্থনাকারী শরণাগত আমাকে পরমধনের দ্বারা সমৃদ্ধ করুন। অপিচ, কর্মফল প্রদানকারী আপনার সম্বর্ধনার নিমিত্ত এই যজমানকে অর্থাৎ আমাকে সৎপথ প্রদর্শন করুন। শুদ্ধসত্ত্বের ধারক হে আমার জ্ঞানভক্তি! তোমরা অচঞ্চল হয়ে আমাকে অচঞ্চল করো অর্থাৎ আমার মনের চাঞ্চল্য দূর করো; এবং বলপ্রাণ প্রদান করো। আমি তোমাদের হিংসা করব না,–তোমরাও আমাকে হিংসা অর্থাৎ পরিতাগ করো না। হে আমার অন্তর! পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ–সর্বদিকে অবস্থিত অর্থাৎ সর্বদিরূপে বর্তমান সেই ভগবান্ তোমাকে সম্যভাবে প্রাপ্ত হোন অথবা ব্যাপ্ত করুন। হে আমার অন্তরস্থিত শুদ্ধসত্ত্ব! তোমরা ভগবানের প্রীতির উপযোগী হয়ে অবির্ভূত হও। হে শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ ভগবন্! আপনার যে নামের দ্বারা আপনি শত্রু কর্তৃক অনভিভূত অর্থাৎ যে নামে শত্রুসমূহ অভিভূত হয়, চৈতন্যস্বরূপ (চৈতন্যদায়ক) শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ হে ভগবন্! আপনার সেই সোম-নামের দ্বারা (নাম উচ্চারণে) স্বাহা (অর্থাৎ স্বাহা মন্ত্রে এই হবিঃ প্রদান করছি; আমার অনুষ্ঠান সুহুত হোক) ॥ ১।
[এই প্রপাঠকের এই অনুবাকে সোমাভিষব পরিবর্ণিত। পাত্রগুলিতে রসগ্রহণের জন্য তৃতীয় প্রপাঠের মন্ত্রের দ্বারা সোম আহরিত হয়েছে। আর এই চতুর্থ অনুবাকের মন্ত্রের দ্বারা সেই সোম থেকে রস নিঃসারিত হচ্ছে। রসনিঃসারণে গ্রাব অর্থাৎ প্রস্তর ইত্যাদি প্রয়োজন বলে প্রথম মন্ত্রে গ্রাব অর্থাৎ সোমকুণ্ডয়নের প্রস্তর-বিশেষের উল্লেখ দেখতে পাই। ভাষের প্রারম্ভে অনুক্রমণিকায় ভাষ্যকারের মন্তব্যও তা-ই। এই স্থলে মন্ত্রগুলিতে সোম শব্দ যে ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতে সোম বলতে সোমলতা ভিন্ন অন্য কিছুই উপলব্ধ হয় না। কিন্তু মাদকতাপূর্ণ সোমরস পাত্রে নিঃসারিত করে দেব-উদ্দেশ্যে যজ্ঞকার্যে প্রদত্ত হলে কি যে পারমার্থিক মঙ্গল সংসাধিত হয়, তা সহজে বোধগম্য হয় না। সেই জন্য আমরা বেদমন্ত্রের ব্যাখ্যায় সাধারণ প্রচলিত (এবং কল্পিত) সোমের অর্থ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি। আমরা সোম বলতে হৃদয়ে বিশুদ্ধ শুদ্ধসত্ত্ব অংশকেই বুঝেছি এবং সেই অনুসারে পূর্বাপর মন্ত্র-ব্যাখ্যানে প্রয়াসী হয়েছি। আমরা মনে করি, জ্ঞানরূপ অগ্নিমুখে সুসংস্কৃত হয়ে হৃদয়ের অভ্যন্তরে সাধনারূপ যজ্ঞহবির যে সূক্ষ্মতম শুদ্ধসত্ত্ব অংশে দেবতার সমীপে গমন করে, তাদের প্রীতি উৎপাদন করে, তা-ই সোম। অর্থাৎ অন্তর্নিহিতা যে বিশুদ্ধ ভক্তি, তা-ই সোম। ক্লেদকলঙ্কপরিশূন্য আবিল্যরহিত যে জ্ঞান, তা-ই সোম। এই সোমকে আশ্রয় করে ভগবানের সমীপে উপনীত হতে হয়। দেবতার উদ্দেশ্যে হুত সোম যে বাস্তব কোনও পদার্থ নয় (মাদকদ্রব্য তো নয়ই), সেটি যে প্রাণের সামগ্রী, পুরাণ প্রমাণেও তা সপ্রমাণ হয়। পুরাণে ত্রিত ঋশির উপাখ্যান আছে। দৈবচক্রে এক সময় তিনি কূপের মধ্যে নিপতিত হন। তিনি সেই অবস্থাতেই কুপের মধ্যে বৈদিক নিত্যকর্ম যজ্ঞের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। সেখানে সোম ছিল না, সরস্বতী নদী ছিল না, অগ্নি বা আহবনীয় দ্রব্য কিছুই ছিল না, অথচ তিনি সেই কূপের মধ্যেই সোমযাগ সম্পন্ন করেছিলেন। ফলে দেবতাগণ তার প্রতি প্রসন্ন হন এবং ঋষি কূপ থেকে উদ্বার লাভ করেন। সোম যে কি বস্তু, এ থেকেই তা আপনা-আপনি উপলব্ধ হয়। সোম–প্রাণের সামগ্রী; সোম–জ্ঞানস্বরূপ। ঋষি অন্ধকারে নিপতিত হয়েছিলেন; হৃদয়ে অনুষ্ঠিত সোমযজ্ঞের প্রভাবে জ্ঞান-স্ফুর্তিতে তিনি মুক্তিলাভ করেন। যাই হোক, প্রথম মন্ত্রের অন্তর্গত গ্রাব পদে ভাষ্যকার স্বাভাবিক ভাবেই অভিযবসাধনকারী পাষাণকে লক্ষ করেছেন। প্রস্তরমধ্যে নিক্ষেপ করে নিষ্পেষণের দ্বারা সোমলতা থেকে রস-নিঃসারণ করতে হয়,–এই লক্ষ্যেই ভাষ্যকারের অর্থের অবতারণা। কিন্তু আমরা ঐ পদে ভগবানের প্রতি লক্ষ্য আছে বলে মনে করি। পাপীর পরিত্রাণের জন্য তিনি পাষাণের মতো দৃঢ়। দ্বিতীয় মন্ত্রের অন্তর্গত ইন্দ্রায় বৃত্ৰতুর ইন্দ্রায়, অভিমাতিঘ্ন ইন্দ্রায়, আদিত্যবত ইন্দ্রায় এবং বিশ্বদেবতাবতে ইন্দ্রায় পদগুলিতে সাধনার বিভিন্ন স্তরের বিষয় সূচিত হয়েছে বলেই আমরা মনে করি। তৃতীয় মন্ত্রে অন্তরস্থিত সৎ-ভাব ইত্যাদির সম্বোধন কল্পনা করি। অর্থাৎ স্নিগ্ধ চন্দ্রকিরণের মতো হৃদয়ের নির্মলতা সাধিত হোক, এটাই কামনা। এইভাবে হৃদয় নির্মল হলে জ্যোতির্মানের দিব্যজ্যোতিঃ-লাভে হৃদয় উদ্ভাসিত হবে; আর তখনই সৎ-পথের প্রতি লক্ষ্য আসবে; তখনই সকর্মের ফলস্বরূপ পরমধন মোক্ষধন অধিগত হবে। আমরা মনে করি, চতুর্থ মন্ত্রে এই ভাবেই পরিব্যক্ত। পঞ্চম মন্ত্রে জ্ঞান-ভক্তির প্রতি লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু ধিষণা পদে ভাষ্যমতে সোমের চর্ম বা সোম-লতার গায়ের বল্কল বোঝাচ্ছে। ষষ্ঠ মন্ত্রের ভাষ্যানুসারী অর্থ–হে সোম! দিমূহ তোমার অভিমুখে প্রধাবিত হোক। হে অশ্ব! মাতৃস্থানীয় সোম রসাত্মক হয়ে নিঃসারিত হোক। অভিষব-আধার পাষাণের উপরি ভাগে সোম স্থাপন করে এই নিগ্রাভ মন্ত্র পাঠ করতে হয়। আমরা কর্মকাণ্ডের বিরোধী না হলেও মনে করি, এই মন্ত্রে সর্বদিকরূপে সর্বদিকে নিত্য-বিদ্যমান ভগবানের প্রতি লক্ষ্য আছে। শেষ মন্ত্রে আমরা যে অভিনব প্রার্থনার ভাব দেখতে পাই, তা-ই মর্মার্থে প্রকাশ করেছি। পরিশেষে মন্ত্রের অন্তর্গত স্বাহা পদটি লক্ষ্য করতে অনুরোধ করি। যজুর্বেদের অনেক স্থলে স্বাহা পদের প্রয়োগ দেখা যায়। অগ্নির সহধর্মিণী স্বাহা। স্বাহা নাম উচ্চারণ করে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করলে সে অনুষ্ঠান সুসিদ্ধ হয়, অগ্নিদেব সে আহুতি গ্রহণ করেন এবং পরিতুষ্ট হন। পুরাণের উপাখ্যানে এই ভাব দেখতে পাওয়া যায়। যা কিছু দেব-উদ্দেশ্যে সর্বথা প্রদত্ত হয়, আমরা মনে করি, তা-ই স্বাহা পদের দ্যোতক। সেই অনুসারে ঐ পদে ভগবানে কর্ম বা কর্মফল সমর্পণের ভাব আসে। আমরা তাই সর্বত্রই ঐ পদে সুহুত-মস্তু মম অনুষ্ঠানং ইত্যাদি অর্থ পরিগ্রহণ করেছি। সায়ণাচার্যের মতে ঐ পদে স্বাহা নামক অগ্নির প্রতি লক্ষ্য হয়। স্বাহা শব্দে মন্ত্র বোঝায়। সুতরাং মন্ত্ররূপ ব্ৰহ্মও ঐ পদের লক্ষ্য বলে মনে করতে পারি। স্বাহা শব্দে দেবতাদের আহ্বান করাও বোঝায়। মাতৃকাবিশেষও অভিধায়ে সম্পূজিতা হন। স্বাহা মন্ত্র উচ্চারণে যজ্ঞে পূর্ণাহুতি দেওয়া হয়। স্বাহা পদে সেই পূর্ণাহুতির ভাবই বিদ্যমান। পূর্ণাহুতি বলতে কায়মনোবাক্যে ভগবানে আত্মসমর্পণ] । ১।
মর্মার্থ- পরমার্থধনদাত হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! জ্ঞানের অধিপতি ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত আমার হৃদয়ে বিশুদ্ধীকৃত হও। অভীষ্টবর্ধণশীল ভক্তিধারার সাথে ক্ষরিত হও। তুমি দেবভাবসমূহের উন্মেষক এবং সৎ-ভাবসমূহের পবিত্রতা-সাধক হও। অতএব তুমি দেবভাবসমূহের অংশসস্তৃত হয়ে থাকো। সেই দেবভাব-সমূহের রক্ষণের নিমিত্ত তোমাকে নিয়োজিত করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবানের পথে সংযোজক হও। তুমি আমাদের নিমিত্ত অমৃতপ্রদ অভীষ্টফলসমূহ সম্পাদন করো। ইহজন্মে অথবা পরজন্মে অর্থাৎ ইহকাল-পরকালে সর্বভূতের হিতের নিমিত্ত তোমাকে হৃদয়ে ধারণ করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তোমাকে আমার মন ব্যপ্ত করুক অর্থাৎ আমার মনে সৎ-ভাব সঞ্জাত হোক। অপিচ, তুমি আমার নির্মল অন্তরিক্ষের মতো হৃদয়রূপ আধারক্ষেত্রকে লক্ষ্য করে আগমন করে। ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত স্বাহা-মন্ত্রে তোমাকে নিয়োজিত করছি। হে আমার অন্তর-নিহিত সৎ-ভাব! স্বপ্রকাশ পরমদেবতার এবং পালকদেবতার অর্থাৎ ভগবানের প্রীতির জন্য তোমাকে উৎসর্গ করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! আমার নির্মল হৃদয়ই তোমার আধারক্ষেত্র। অতএব প্রাণদেবতার সন্তোষ-সাধনের জন্য তোমাকে নিয়োজিত করছি। ২৷৷
[কর্মকাণ্ডানুসারে উপাংশু-গ্রহণের জন্য প্রথম অনুবাকে তার পূর্ববিহিত সোমাভিষবসংনাহ অভিহিত হয়েছে। দ্বিতীয় অনুবাকে উপাংশু-গ্রহণের মন্ত্রগুলি পরিবর্ণিত হচ্ছে। অনুবাকের প্রথম মন্ত্রে প্রথমেই বাগাধিষ্ঠাতা জ্ঞানদেবতার প্রীতি-সাধনের জন্য সৎ-ভাব-সংজননের সঙ্কল্প বর্তমান রয়েছে। তারপর সৎ ভাবে অন্তর পরিপ্লুত হলে যে বিশ্বজনীন প্রেম অন্তরে উদিত হয়, তারই জন্য শত্রু-মিত্র প্রভেদ থাকে না। দ্বিতীয় মন্ত্রের বক্তব্য তা-ই। তৃতীয় মন্ত্রে ভগবৎ-কার্যে আত্মনিয়োগের ভাব উপলব্ধ হয়। জপ, তপ, পূজা, আরাধনা-যা কিছুই করো না কেন, সকলের মধ্যেই দেবভাবের সমাবেশ থাকা আবশ্যক৷ মন্ত্রের অন্তর্গত স্বাহা শব্দে সে সব কর্মফল ভগবানে সমর্পিত হচ্ছে। এই তো নিষ্কাম কর্ম! তার কর্ম সাধনে সে কর্মের ফল তাতেই তো সমর্পিত! মন্ত্রের উপসংহারে সেই নিষ্কাম কর্মের ভাবই পরিস্ফুট] ॥ ২॥
মর্মার্থ- হে আমার হৃদয়নিহিত ভক্তিরসামৃত! তুমি সৎ-কর্মের দ্বারা সমুদ্ভুত হও। অতএব তুমি আমার হৃদয়রূপ আধারে প্রবেশ করে অর্থাৎ হৃদয়ে সমুৎপন্ন হও। পরম-ধনদাত হে ভগবন্! আপনি আমার অন্তরে ভক্তিরসামৃতকে রক্ষা করুন। অপিচ, শুদ্ধসত্ব এবং চতুর্বর্গরূপ ধন-সমূহকে শত্রুগণ হতে রক্ষা করুন অর্থাৎ শত্রুদের দ্বারা যাতে অন্তর্ধান না হয়, সেইভাবে নিয়মিত করুন। তার পর সমীচীন অন্ন-সমূহ অর্থাৎ সৎ-কর্মের সুফল প্রদান করুন। আপনার অনুগ্রহে আমি যেন ইহকাল-পরকালের সমস্ত কল্যাণসাধন করতে পারি এবং বিস্তীর্ণ হৃদয়রূপ আধারে যেন আপনাকে ধারণ করতে সমর্থ হই। পরমধনদাত হে ভগবন্! আপনি সকল দেবগণের সাথে আমার ভক্তি রসাপ্লুত হৃদয়রূপ গৃহে আগমন করুন; এবং আপনি আনন্দ লাভ করে দেবতাসমূহকে আনন্দিত করুন। (অর্থাৎ আপনি অধিষ্ঠিত হয়ে দেবভাবগুলিকে উৎপাদন কুরুন)। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি ভগবানের সাথে সংযোজক হও। তুমি আমাদের নিমিত্ত অমৃতপ্রদ অভীষ্টফলসমূহ সম্পাদন করো। ইহজন্মে ও পরজন্মে অর্থাৎ ইহকাল-পরকালে সর্ব ভূতের হিতের নিমিত্ত তোমাকে হৃদয়ে ধারণ করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! তোমাকে আমার মন ব্যাপ্ত করুক অর্থাৎ আমার মনে সৎ-ভাব সঞ্জাত হোক। অপিচ, তুমি আমার নির্মল অন্তরিক্ষের মতো হৃদয়রূপ আধার-ক্ষেত্রকে লক্ষ্য করে, আগমন করো। ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে তোমাকে নিয়োজিত করেছি; আমার অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হোক। হে আমার অন্তর্নিহিত সৎ-ভাব! স্বপ্রকাশ পরমদেবতার এবং পালক দেবতার নিমিত্ত অর্থাৎ ভগবানের প্রীতির জন্য তোমাকে উৎসর্গ করছি। হে আমার হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব! আমার নির্মল হৃদয়ই তোমার আধারক্ষেত্র। অতএব প্রাণ-দেবতার সন্তোষ-সাধনের জন্য তোমাকে নিয়োজিত করছি ॥ ৩॥
[ দ্বিতীয় অনুবাকে, কর্মকাণ্ড অনুসারে, উপাংশু-গ্রহের বিষয় অভিহিত। তারপর চতুর্থ থেকে ষট্ত্রিংশৎ পর্যন্ত অনুবাকগুলিতে যোড়শ্যন্ত গ্রহ-সমূহ বিবৃত হয়েছে। পৌর্বাপৌর্য অনুসারে এই তৃতীয় অনুবাকে অন্তর্যাম-গ্রহ উক্ত হচ্ছে। এই মন্ত্রের অন্তর্গত উপযাম এবং অন্তর্যাম পদ দুটি লক্ষ্যস্থানীয়। ভাষ্যমতে উপম পদে পৃথিবী অর্থ পরিগৃহীত। পৃথিবীতে সোমলতা উৎপন্ন হয়; সেই ভাবেই এই অর্থ অধ্যাহৃত হয়েছে। আর অন্তর্যাম বলতে দারুময় অন্তর্যাম সংজ্ঞাক পাত্র-বিশেষকে বোঝায়। সোমলতার রস নিঃসারণ করে দারুময় পাত্রে সংরক্ষিত হয়–তা-ই ভাষ্যকার এমন অর্থ অধ্যাহার করেছেন। ক্রিয়া-কাণ্ডের অনুসারী এমন অর্থ সম্বন্ধে আমরা বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করি না। তবে, আধ্যাত্মিক ভাবের অনুসারী হয়ে আমরা ভিন্নমতে কি অর্থ উপলব্ধি করে তা আমাদের মর্মার্থেই প্রকাশিত। সোম যেমন পৃথিবীতে উৎপন্ন, অন্তরের সোম তেমনি সৎ-কর্ম থেকে সঞ্জাত হয়-এই-ই আমাদের বক্তব্য। মন্ত্রটিতে সঙ্কল্প বিদ্যমান। সঙ্কর্মের প্রভাবে জ্ঞান-ভক্তির সমাবেশে অন্তর বিশুদ্ধীকৃত করে ভগবানকে প্রতিষ্ঠিত করবার সঙ্কল্প মন্ত্রের প্রধান লক্ষ্য-স্থানীয়]। ৩৷৷
মর্মার্থ- প্ৰাণবায়ুরূপে সর্বভূতে অধিষ্ঠিত হে ভগবন! অথবা, বায়ুরূপে সর্বত্রগামি হে ভগবন! আপনি আগমন করুন অর্থাৎ হৃদয়ে সমুদিত হোন। (হৃদয়ে আগমন করে) আমাকে অলঙ্কৃত অর্থাৎ পবিত্রতাসম্পন্ন করুন। শুদ্ধসত্ত্বগ্রাহক হে ভগবন! আপনি আমাদের প্রাপ্ত হোন। বিশ্বব্যাপক হে ভগবন্! আপনার করুণার অন্ত নেই অর্থাৎ আপনি অনন্তমহিমান্বিত। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক)। হে ভগবন্!শুদ্ধসত্ত্বরূপ ভক্তিরসামৃতের প্রবাহই যদি আপনার একমাত্র গ্রহীতব্য বলে মনে হয়, আপনার প্রীতিকর পরমানন্দদায়ক সেই ভক্তিরসামৃত বা শুদ্ধসত্ত্ব যেন প্রাপ্ত হই (অথবা আমাদের প্রদান করুন)। হে শুদ্ধসত্ত্ব (অথবা ভক্তিরসামৃত)! তুমি সৎ-কর্মের দ্বারা সঞ্জাত হও। অতএব সৎকর্মসাধনের উদ্দেশ্যে বায়ুরূপে সর্বত্রগমনকারী ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে উৎসর্গীকৃত করি। পরমেশ্বর্যশালিন্ হে ইন্দ্রদেবতা! সর্বান্তর্যামি হে বায়ুদেবতা! আমাদের অন্তরস্থিত সোম-সুধা অর্থাৎ ভক্তিরসামৃত সুসংস্কৃত হয়ে বিদ্যমান আছে। আপনারা বিশুদ্ধ ভক্তিসুধা কামনা করেন বলে, আপনারা উভয়ে, (সেই ভক্তিসুধা গ্রহণের জন্য) গুণসাম্য সাধনে আমাদের নিকটে আগমন করুন। (মন্ত্রে ভগবানের সামীপ্য লাভের জন্য সাধকের প্রবল আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। সাধক সত্ত্ব–সাম্য-ভাবও কামনা করছেন)। হে শুদ্ধসত্ত্ব (অথবা ভক্তিরসামৃত)! তুমি সৎকর্মের দ্বারা সঞ্জাত (হৃদয় থেকে উৎপন্ন) হও; অতএব ইন্দ্ৰবায়ু-দেবতার প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে নিয়োজিত করছি। আমার নির্মল হৃদয় তোমার আধারস্থানীয়। দেবভাব-সংজননের জন্য তোমাকে ধারণ বা স্থাপন করছি । ৪।
[ভাষ্যমতে (কর্মকাণ্ডানুসারে) এই মন্ত্রের অর্থ–হে বায়ু! তুমি আগমন করে গ্রহসমূহকে অলঙ্কৃত করো। হে শুদ্ধ সোমপানকারী! আমাদের প্রাপ্ত হও। হে বিশ্বব্যাপক! তোমার বাহনভূত অযুত অশ্ব আছে। সোমরসরূপ অন্ন তোমার হর্ষকর; অতএব তোমাকে যেন সমীপে প্রাপ্ত হই। হে দেব! সোম-সম্বন্ধি যে। রসদ্রব্য তুমি প্রথম পানযোগ্য বলে মনে ধারণ করে, সেইরকম সোমের সাথে তোমার সামীপ্য যেন প্রাপ্ত হই। হে সোমরস! তুমি পৃথিবীরূপ দারুপাত্রে গৃহীত হয়েছ। তোমাকে বায়ুর নিমিত্ত গ্রহণ করি। হে, ইন্দ্ৰবায়ু! এই সোম অভিযুত হয়েছে। অতএব তোমরা সোমরসরূপ অন্ন গ্রহণের জন্য সমীপে আগমন করো। কেননা, সোমরস তোমাদেরই কামনা করে। হে সোম! দারু-পাত্রে গৃহীত হয়েছে। ইন্দ্র-বায়ুর নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করি। হে পাত্র! খরের একদেশে তোমার স্থান। অতএব এই স্থানে সমান-প্রীতিযুক্ত ইন্দ্ৰবায়ুর নিমিত্ত তোমাকে স্থাপন করছি।–ইত্যাদি। আমাদের ব্যাখ্যার অনেক স্থলে আমরা ভাষ্যের ভাব প্রকারান্তরে গ্রহণ করেছি বটে; কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই তাৎপর্যের অর্থ ভিন্ন পন্থা পরিগ্রহ করেছে। মন্ত্রের অন্তর্গত সহস্রং নিযুতঃ পদে ভাষ্যকার বায়ুর বাহনভূত অশ্ব-সমূহের বিষয় উল্লেখ করেছেন। তার দ্বারা সহস্ৰ নিযুত অর্থাৎ অসংখ্য অশ্বের বেগে বায়ু প্রবাহিত হয়, এই ভাব উপলব্ধ হয়। সাধারণ বায়ুর পক্ষে সে ভাব অসঙ্গত হতে পারে। কিন্তু এখানে বায়ো সম্বোধনে সর্বভূতে প্রাণবায়ুরূপে বিরাজিত ভগবানকে লক্ষ্য করা হয়েছে বলে মনে করি। তার অনন্ত রূপ, অনন্ত নাম; তার অনন্ত বিভূতি, অনন্ত আকৃতি। মানুষ তার অনন্তত্বের ধারণা করতে পারে না বলেই তাকে ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ করে! বলে–তিনি বায়ু, বলে তিনি অগ্নি; বলে–তিনি ইন্দ্র; বলে–তিনি মরুৎ; বলে–তিনি ব্যোম; বলে–তিনি যম। কিন্তু যখন সে বুঝতে পারে–তিনি সবই, সবের মধ্যেই তিনি বিরাজমান; তখনই তার স্বরূপ উপলব্ধ হয়–তখনই সকল সংশয় টুটে যায়। যিনি অগ্নিরূপে তাঁকে দেখেছেন, কিংবা বায়ুরূপে তাঁকে দেখেছেন, তিনি যে ভূল দেখেছেন তা নয়। যিনি ইন্দ্র, মিত্র, মরুৎ, বরুণ প্রভৃতি রূপে তাকে দেখেছেন, তিনিও যে বিভ্ৰমগ্রস্থ, তাও নয়। অগ্নি, বায়ু, ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ প্রভৃতি–সবই তার বিভূতির বিকাশ মাত্র। যে জন যত নিকটে যেতে পারে, সে ততই তাতে লীন হতে সমর্থ হয়। বায়ো সম্বোধনে তাই সেই প্রাণবায়ুরূপে বিরাজমান ভগবানের প্রতি লক্ষ্য আছে বলেই মনে করি। সে হিসেবে সহস্রং নিযুতঃ পদ দুটিতে তার অনন্ত মহিমার–তাঁর অনন্ত করুণার বিষয়ই প্রখ্যাপিত। তাই ঐ পদের অর্থ করা হয়েছে–করুণায়াঃ পারং নাস্তি–ত্বং হি অনন্তমহিমোপেতঃ। মন্ত্রের অন্তর্গত মদ্যং পদে আমরা মাদকতা-সাধক সোমরস মনে করি না। কি মনে করি, তা পূর্বেই বলেছি। মন্ত্রের অন্তর্গত ইন্দ্ৰবায়ু থেকে বামুশন্তি হি অংশে চাররকম ভাব মনে আসতে পারে। শরীরধারী ইন্দ্র ও বায়ুদেবতা যেন মানুষের অন্নদাতা; সোমরসের দ্বারা তাদের তুষ্ট করে যজমান যেন অন্ন ইত্যাদি প্রার্থনা করছেন, প্রথম দৃষ্টিতে সাধারণতঃ এমন অর্থই উপলব্ধ হয়। আবার রূপক ভেদ করে যে দ্বিতীয় অর্থ-নিষ্কাশন করা যায়, সেই অনুসারে ইন্দ্র বলতে তেজকে বোঝায়, সোম শব্দে রস বোঝায়। পৃথিবীর রস তাপে শুষ্ক হয়ে বায়ুমণ্ডলে আকৃষ্ট ও সঞ্চিত হয়। তা থেকে মেঘসঞ্চার ও বারিবর্ষণ ঘটে। সেই বর্ষণই অন্ন ইত্যাদির উৎপাদক। অন্য অর্থ দেহাত্মভাব-মূলক। যেমন জীবদেহে বায়ু-পিত্ত-কফের দ্বন্দ্ব চলেছে, ঐ তিনের একের আধিক্য হলে যেমন অপরকে এনে পরস্পরের সাম্য-বিধানের চেষ্টা হয়; ইহসংসারে সত্তরজস্তমোরূপ গুণতিনটির সাম্যভাব-স্থাপনের জন্যও সেইরকম বিষম দ্বন্দ্ব চলছে। মন্ত্রে, দেহপক্ষে, বায়ু-পিত্ত-কফ–এই তিনের সাম্য-বিধানের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে; অথবা অন্তরের পক্ষে, সত্ত্বরজস্তমঃ গুণতিনটির সাম্যসাধনের প্রয়াস দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। উগ্রমূর্তির অহঙ্কারের প্রশমনই ইন্দ্রদেবতার ও বায়ুদেবতার সোমপান–প্রশান্ত ভাব ধারণ। সোম (শান্তভাব), রুদ্রভাবকে প্রশান্ত করবার জন্য আপনা-আপনিই প্রযত্নপর। অর্থাৎ সৎ-ভাবের সাথে মিশ্রিত হতে পারলেই,-সত্ত্বের সংশ্রবে রুদ্রভাবে শান্তি এলেই, ইন্দ্রদেবতার ও বায়ুদেবতার সোমপান হয়। সোম– সত্ত্বভাব নিয়তই আকাঙ্ক্ষা করছে,রজোভাব ও তমোভাব আমাকে এসে পান করুক অর্থাৎ আমার সাথে মিশে স্নিগ্ধতা প্রাপ্ত হোক। মন্ত্রে ইমে সূতা পদ দুটিতে সোম সংস্কারের বিষয় উপলব্ধ হয়। আমাদের মতে, সোম অর্থে ভক্তিসুধা-যখন অনন্যভাবে শ্রীভগবানের চরণ সরোজে ন্যস্ত হয়, তখনই তা (ভক্তিসুধা) সুসংস্কৃত হয়। মন্ত্রের অন্তর্গত ইন্দর পদের সোমরসরূপ মাদকদ্রব্য অর্থ পরিকল্পিত হয়। আমাদের মতে-ইন্দবঃ পদেরও ভক্তি-সুধা অর্থই সুসঙ্গত] ॥ ৪
মর্মার্থ- ঋতের বা জলের বৃদ্ধিকারী (অর্থাৎ শস্যের উপাদনে সহায়ক) অথবা সত্যের বা যজ্ঞের পালক, অথবা সঙ্কর্মের ক্রমপ্রদর্শক বা সকমে নিয়োজক, হে মিত্রাবরুণ দেবদ্বয় অর্থাৎ মিত্রস্থানীয় করুণাময় ভগবন! আমার অন্তরস্থিত ভক্তিসুধা অভিযুত অর্থাৎ বিশুদ্ধীকৃত হয়েছে। সেই ভক্তিসুধা গ্রহণ করে আমার প্রার্থনা শ্রবণ (পূরণ) করুন। হে আমার অন্তরস্থিত ভক্তিসুধা! তুমি সৎকর্মে সঞ্জাত হও। সৎ-ভাবের সংজনয়িতা ভক্তি-রস-প্রদাতা মিত্রাবরুণ দেবদ্বয়ের প্রতির নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ (নিয়োজিত) করছি। হে আমার অন্তরস্থিত ভক্তি-সুধা! আমার নির্মল হৃদয় তোমার আধারস্থানীয়। অতএব তুমি আমার হৃয়ে দৃঢ় হও । ৫।
[চতুর্থ প্রপাঠকের এই পঞ্চম অনুবাকটি, কর্মকাণ্ডের অনুসারে, মিত্রাবরুণগ্রহ-অভিধায়ে বিনিযুক্ত। ভাষ্যমতে মন্ত্রের অর্থ–সত্যের বর্ধক হে মিত্রাবরুণ দেবদ্বয়! তোমাদের জন্য সোম অভিযুত হয়েছে। যেহেতু সোম অভিযুত, সেই হেতু এই কর্মে তোমরা আমার আহ্বান শ্রবণ করো। সত্য-ইচ্ছাকারী মিত্রাবরুণ দেবদ্বয়ের নিমিত্ত (সেই বিশুদ্ধীকৃত সোম বিনিযুক্ত হোক)–ইত্যাদি। এখানে মিত্রদেবতার ও বরুণ দেবতার বিশেষণ পদ ঋতাবৃধৌ প্রধান লক্ষ্য-স্থানীয়। ঋত শব্দ বহুভাবদ্যোতক। সাধারণ ভাবে ঐ শব্দে জল অর্থ উপলব্ধ হয়। ঋত শব্দের আর এক অর্থ–সত্য। ঋত শব্দে আর বোঝায়–সত্যধর্ম। মরুদেশে বা জলহীন স্থানে মানুষ বারিবিন্দুর প্রার্থনায় জলাধিপতির শরণে, তাঁকে জলাধিপতি বা ঋতাবৃধ বুঝে তার কাছে বারিবর্ষণের কামনা করে–এটা স্বাভাবিক। কিন্তু একই উচ্চস্তরের মানুষ যাঁরা, তারা দেখেন তিনি কেবল এই সাধারণ জলের অধিপতি নন; তিনি যেন শান্তি-বারি প্রদানকারী–স্নিগ্ধতার বিধানকর্তা। সংসারের জ্বালামালায় অন্তর যখন জ্বলে ক্ষার হবার উপক্রম হয়, এই স্তরের মানুষ, তাকে স্নিগ্ধতা গুণের আধার জেনে, তার শরণাপন্ন হয়। সুতরাং ঋতাবৃধৌ পদ সংসার-তাপ-তপ্ত এবং শুধুই তাপ-দগ্ধ–ঐ দুরকম মানুষের পক্ষে যথাক্রমে স্নিগ্ধকারী ও জলাধিপতি অর্থ সুচিত করে। আরও একটু উচ্চস্তরের সাধক–সংসারের দৃঢ় গণ্ডী অতিক্রম করে যিনি কিছুটা উধ্বক্ষেত্রে অগ্রসহ হয়েছেন–তিনি বুঝে থাকেন, এ মিত্র ও বরুণদেব তাঁরই নাম মাত্র; যার নাম নেই, তারই নাম; যাঁর রূপ নেই, যিনি অরূপ, তাতে রূপের কল্পনা মাত্র। সেই সাধকের চক্ষেই প্রতিভাত হয়–ঋতাবৃধৌ সত্যস্বরূপৌ অর্থাৎ তিনিই সৎ, তিনিই সত্যস্বরূপ।–বৈজ্ঞানিক দেখবেন কিভাবে মিত্রের (সূর্যের) খরকরতাপে জল থেকে বাষ্প উখিত হয়ে আকাশে মেঘরূপে সঞ্চারিত হচ্ছে; আর কিভাবে সেই মেঘ থেকে বারিবর্ষণ হয়ে পৃথিবীর উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি করছে। ফলতঃ মন্ত্রের আধ্যাত্মিক অর্থ–জ্ঞান ও ভক্তিমূলক। মন্ত্রে প্রার্থনা হচ্ছে-হে মিত্রদের! হে বরুণদেব! আপনার সেই সামর্থ্য প্রদান করুন, যেন আমাদের শক্তি যথার্থরূপে ভগবৎ-কর্মসাধনে নিয়োজিত হয়।–ইত্যাদি। এবার সুতঃ সোম পদ দুটির তাৎপর্য উপলব্ধি করা যাক। ঐ দুটি পদে সাধারণতঃ সুসংস্কৃত সোমরস অর্থ নিষ্পন্ন হয়। কিন্তু ঐ দুই পদের অন্য অর্থও নিষ্কাশন করা যেতে পারে। সুতঃ শব্দে সম্বন্ধ এবং সোম শব্দে অমৃত অর্থ নিষ্পন্ন হয়। যিনি অমৃতের সাথে সম্বন্ধযুক্ত, তাঁকেই সুতঃ সোম বলা যেতে পারে। যিনি অমৃতের সন্ধান পেয়েছেন, যিনি অমৃতের রস আস্বাদনে সমর্থ হয়েছেন, আমাদের মতে, তিনিই সুতসোম। দ্বিতীয় মন্ত্রটির অর্থ পূর্ব পূর্ব মন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রকাশিত। মিত্রাবরুণ দেবতাকে এই মন্ত্রে ঋতায়ুভ্যাং বলা হয়েছে। তারা ঋত অর্থাৎ সত্যের বর্ধক; সুতরাং তারা সৎস্বরূপ। সৎ ভিন্ন, সত্যের প্রতিষ্ঠায় আর কে সমর্থ হতে পারে? সৎস্বরূপ যাঁরা, সৎ-বস্তুই তাঁদের গ্রহণীয়। মন্ত্রে তাই অন্তরের ভক্তি-সুধা প্রদান করে তাদের পরিতৃপ্ত করবার কামনা প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করি। আকাঙ্ক্ষা–আমায় আত্মসম্মিলন; ভক্তিই সে পক্ষে একমাত্র অবলম্বন] ৷ ৫৷৷
মর্মার্থ- ভবব্যাধিনিবারক ত্রিগুণসাম্যসাধক হে দেবদ্বয়। আপনারা সেই অমৃতনিঃস্যন্দিনী প্রিয়সত্যবাস্বরূপিণী বিবেকরূপা তাড়নী সহ উপস্থিত হয়ে আমাদের যাগ ইত্যাদি কর্ম সম্পন্ন করুন। (প্রার্থনার ভাব এই যে,হে দেবদ্বয়! আমরা ভ্রান্তি-পরায়ণ। সেই হেতু সতর্ক করবার জন্য বিবেকরূপে সর্বদা আমাদের হৃদয়দেশে বিরাজ করুন। হে আমার হৃদয়নিহিত ভক্তিরসামৃত! তুমি সকর্মের দ্বারা হৃদয়ে সমুদ্ভূত হও; অতএব তোমাকে অমৃত-বিধায়ক ভবব্যাধিনাশক দেবতার প্রীতির নিমিত্ত গ্রহণ বা নিয়োজিত করছি। আমার নির্মল হৃদয় বা সঙ্কর্ম তোমার আধার; অতএব তোমাকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করছি। তুমি দৃঢ়তা অবলম্বন করো ॥ ৬।
মর্মার্থ- প্রাতঃসবনসম্বন্ধযুক্ত অর্থাৎ প্রাতঃস্মরণীয়, অন্তর্ব্যাধি-বহির্ব্যাধি-ভবব্যাধি-নাশক (অথবা জ্ঞানের উন্মেষকালে সাধকের সাথে যুক্ত) হে দেবদ্বয়! আপনারা উভয়ে আমাদের সর্বতোভাবে পাপসম্বন্ধ হতে বিমুক্ত করুন। অপিচ, এই সুসংস্কৃত অর্থাৎ একৈকশরণ্যভাবে উৎসর্গীকৃত ভক্তি রসামৃত পানের জন্য আমাদের কর্মে বা অন্তরে আগমন করুন–চিরপ্রতিষ্ঠিত হোন। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধক। আসূর্যোদয় সর্বকাল মন ভগবানের সম্পর্কে চিন্তাপরায়ণ হোক– এটাই কামনা)। হে আমার হৃদয়নিহিত ভক্তিরসামৃত! তুমি সৎকর্মের দ্বারা সমুদ্ভূত অর্থাৎ হৃদয় হতে উৎপন্ন হও। অতএব ভবব্যাধি-নাশক আধিব্যাধির বিনাশক দেবতার প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ অর্থাৎ বিনিযুক্ত করি। আমার নির্মল হৃদয় বা সৎকর্মই তোমার আধার-স্বরূপ; অতএব তোমাকে হৃদয়ে ধারণ বা স্থাপন করছি ॥৭॥
[ষষ্ঠ ও সপ্তম অনুবাক, ক্রিয়াকাণ্ডনুসারে, আশ্বিন-গ্রহ-বিধানে বিনিযুক্ত। ভাষ্যকারের মতে, ষষ্ঠ অনুবাকের মন্ত্রের অর্থ-হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের যে কশা বা বাক্য, তার দ্বারা যজ্ঞকে সম্পন্ন করো। সমান জিহ্বার দ্বারা উৎপন্ন বাক্য এখানে কশা নামে অভিহিত। কিরকম কশা? মধুমতী অর্থাৎ পরুষশব্দরহিত; সুনৃতাবতী অর্থাৎ প্রিয়বচনোপেত। মধুর দ্বারা পূর্ণ বলে মাধ্বী। সেই অশ্বিমূর্তিদ্বয়ের নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করি।–এই মন্ত্রের সাথে একটি উপাখ্যানের সমাবেশ দেখা যায়।–একসময়ে যজ্ঞপুরুষ দেবগণের সামগ্রী গ্রহণ করে, দেবগণের সাথে যুদ্ধে প্রস্তুত হন। সেই সময়ে তিনি ধনু বাম হস্তে গ্রহণ করে এক কোটী ভূমিতে এবং অপর কোটী গলদেশে স্থাপন করে অবস্থান করেছিলেন। এই অবস্থায় ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত জ্যা-ভাগ কীট কর্তৃক ভক্ষিত হওয়ায়, গলদেশে স্থাপিত ধনুর ঊর্ধ্বকোটী আপনা-আপনি দুরিত হয় এবং যজ্ঞের শিরচ্ছেদ করে যজ্ঞপুরুষের সাথে উর্ধ্বে সঙ্কলিত হয়। প্রবর্গ-ব্রাহ্মণে এই বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে। যাই হোক, এই অনুবাকের প্রথম মন্ত্রের বড়ই এক হাস্যাস্পদ অর্থ প্রচারিত আছে। ঘোড়া তাড়াবার চাবুক যা ঘোড়ার গায়ের ঘামে ভিজেছে, আর যা অশ্বকে দ্রুত লাতে পারে-সেইরকম চাবুক সঙ্গে করে তোমরা আমাদের যজ্ঞক্ষেত্রে আগমন করো;–এই যেন মন্ত্রের প্রার্থনা] ॥ ৬।
[ সপ্তম অনুবাকের মন্ত্রের যে অর্থ করা হয়, তাতে হোত যেন ঋত্বিকদের সম্বোধন করে উপদেশ দিচ্ছেন। সে মতে প্রাতুর্যজৌ শব্দের অর্থ হয়–প্রাতঃকালে যাঁরা রথে অশ্বযোজনা করেন। সে ব্যাখ্যায় মন্ত্রের ভাব দাঁড়ায়–প্রাতঃকালে রথে অশ্বযোজনা যাঁদের কার্য (শকটচালক কোচম্যান আর কি) সেই অশ্বিনীদ্বয় সোমরসরূপ মাদকদ্রব্য পানের জন্য এই যজ্ঞে আগমন করুন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ মন্ত্রের ভাব সম্পূর্ণ অন্যরকম। এখানে সাধক নিজের অন্তরকে ভগবৎ-আরাধনায় উদ্বুদ্ধ করছেন। মন্ত্রের প্রথমে ঐ যে প্রাতুষুজৌ বিমুচ্যেথাং বাক্য, ওটি আর কিছুই নয়,–ওটি আত্ম-উদ্বোধনের মন্ত্র। ঘোটকের সম্বন্ধ ওখানে কোথাও নেই। এখানে আর এক গভীর তত্ত্বকথা ব্যক্ত হয়েছে মনে করা যায়। একদিকে অজ্ঞানতারূপ নৈশ-অন্ধকার, অন্যদিকে জ্ঞান-স্বরূপ দিবার আলোক। দুয়ের সন্ধি-স্থল–প্রাতঃকাল। জ্ঞান অজ্ঞান, আঁধার-আলোক–এখানে একে একীভূত হয়ে গেছে। প্রাতুর্যজৌ শব্দে সেই মিলনের-সঙ্গমের ভাব প্রকাশ পেয়েছে বলেও মনে করা যেতে পারে। অশ্বিনৌ অর্থাৎ অশ্বিদ্বয়কে সম্বোধন-এরও কোনও নিগুঢ় লক্ষ্য আছে বলে মনে করা যেতে পারে। ব্যাপ্তার্থক অশ ধাতু-অশ্বিন শব্দের মূল। নিশায় ও দিবায়, আঁধারে ও আলোকে, অজ্ঞানে ও জ্ঞানে তারা ব্যাপ্ত হয়ে আছেন, এইজন্যই অশ্বিদ্বয়রূপে তারা সম্পূজিত হন। জ্ঞানের ও অজ্ঞানের মিলনে তাদের সহায়তা প্রথম প্রয়োজন। জ্ঞানের ও অজ্ঞানের স্বরূপ জ্ঞাপনের জন্য তারা ব্যাপ্ত হয়ে আছেন। এখানে তাদের সেই মূর্তিই কল্পিত হয়েছে। মনে হয়, এই জন্যই–অজ্ঞান, জ্ঞানে বিলীন করবার ভাব বিকাশের জন্যই-যুগ্মদেবতার-অশ্বিদ্বয়ের আহ্বানে মন্ত্রের সূচনা করা হয়েছে। তারপর অশ্বিদ্বয়কে দেববৈদ্য বলা হয় এবং পুরাণে তাদের যুগ্মমূর্তির (অশ্বিনীকুমারযুগলের) পরিকল্পনা দেখি। তা থেকেই তাদের অন্তর্ব্যাধি ও বহিব্যাধির নাশক দেবযুগল বলে বিশ্লেষণ দেখি। ব্যাধি দুরকম–অন্তরের (কাম-ক্রোধ ইত্যাদি) ও বাহিরের (রোগ, শোক ইত্যাদি)। দেবতা তাই যুগ্ম] ॥ ৭
মর্মার্থ- জ্ঞানরশ্মিসম্ভব দিব্যকান্তি ভক্তি, হৃদয়ে সৎ-ভাব অথবা সস্বরূপকে প্রেরণ বা প্রকটিত করে। উদরে গর্ভ যেমন জরায়ুর দ্বারা বেষ্টিত হয়ে অবস্থিত থাকে, আত্মদর্শিগণের হৃদয়ে দিব্য-জ্যোতির দ্বারা পরিবেষ্টিত সেই ভক্তি মরুসদৃশ (মরুভূমির মতো) শুষ্ক অজ্ঞান অন্ধকারে আবৃত হৃদয়ে সৎ-ভাব ও জ্ঞানের জ্যোতিঃ প্রেরণ করে। জ্ঞান-জ্যোতির সাথে সৎ-বৃত্তিসমূহের সম্মিলন-সাধনের নিমিত্ত ক্রান্তদর্শিগণ, মাতাপিতা বান্ধবগণ যেমন শিশুপুত্রকে আদর ইত্যাদির দ্বারা সম্বর্ধিত ও লালিত করে, সেইরকমভাবে জ্ঞানদেবকে প্রীতিদায়ক স্তোত্র-কর্মের দ্বারা সম্বর্ধিত অর্থাৎ পূজা করেন। অথবা,-অশেষকান্তির আধার সেই ভগবান দিব্যজ্যোতির আধার অর্থাৎ নিখিল জ্যোতিঃসমূহকে প্রেরণ করেন। তিনি জরায়ুর ন্যায় জ্যোতিঃসমূহের ধারক অর্থাৎ জরায়ু যেমন উদরে গর্ভকে বেষ্টন করে অবস্থিতি করে, সেইরকম সাধকগণের হৃদয়ে জ্ঞান-জ্যোতিঃ-বেষ্টনের দ্বারা অধিষ্ঠান করেন। সেই ভগবান্ আত্ম-জ্ঞানসম্পন্নদের হৃদয়ে সেইভাবে অধিষ্ঠিত হয়ে, ধূলিসমূহ যেমন জলে সিক্ত ও মৃত্তিকায় পরিণত হয়, সেই ভাবে শুষ্ক মরুর মতো কঠিন হৃদয়কে প্রেরণ বা নির্মাণ করেন অর্থাৎ দিব্য-জ্যোতিঃ এবং করুণাধারা বর্ষণ করেন। সৎ-ভাবসমূহের সাথে জ্ঞান-সূর্যের সঙ্গম-সাধনের নিমিত্ত আত্মদর্শিগণ, মাতাপিতা যেমন আদরের দ্বারা শিশুপুত্রকে তুষ্ট করেন, সেইভাবে প্রীতিকর স্তোত্রের দ্বারা ভগবানকে পূজা করে থাকেন। অথবা-উদরে গর্ভ যেমন জরায়ুর দ্বারা বেষ্টিত হয়ে অবস্থিত হয়, সেই মতোই মেঘের মধ্যে গর্ভের ন্যায় প্রসিদ্ধ দিব্যকান্তিবিশিষ্ট সেই বেনদেবতা, উদকের নির্মাতা অন্তরিক্ষে স্থিত হয়ে, আদিত্যের গর্ভভূত অর্থাৎ সপ্ত-উজ্জ্বলবর্ণ সূর্যরশ্মিসমূহের দ্বারা সঞ্জাত অন্তরিক্ষস্থিত অপকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। উদক, অন্তরিক্ষ ও সূর্যের পরস্পর সঙ্গমের নিমিত্ত অন্তরিক্ষে স্থিত এই বেনদেবতাকে, মেধাবি স্তোতাগণ, শিশুপুত্রকে পিতামাতা যেমন মিষ্ট-বাক্যে লালিত করেন, সেইরকম ভাবে স্তুতির দ্বারা অর্চনা বা পূজা করে থাকেন।
হে আমার হৃদয়নিহিত ভক্তিরসামৃত! তুমি সৎকর্মের দ্বারা সঞ্জাত অথবা হৃদয় হতে উৎপন্ন হও। অতএব তোমাকে শুর ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত গ্রহণ বা নিয়োজিত করি। আমার নির্মল হৃদয়েই তোমার স্থান। তুমি আমাদের কর্ম-শূরত্ব অর্থাৎ কর্ম-সামর্থ্য রক্ষা করো॥ ৮৷৷
মর্মার্থ- হে অন্তরাত্মা! পুরাতন, আমাদের পূর্ববর্তী, ইদানীং বর্তমান বিশ্বের সকল প্রাণী ভগবাকে আরাধনা করে অভীষ্টফল প্রাপ্ত হয়েছেন। অতএব তুমিও সর্বশ্রেষ্ঠ পুরাণপুরুষ, হৃদয়রূপ বৰ্হিতে অধিষ্ঠিত অথবা সঙ্কর্মের সুফলদাতা চৈতন্যস্বরূপ, শরণাগতদের পরিত্রাণের জন্য ত্বরান্বিত, সকলের অভিভবিতা, সকলের আরাধনীয় সেই ভগবানকে স্তোত্র-কর্মের দ্বার পূজার্চনা করো। সেই ভগবান্ আমাদের প্রতিকূল সবরকম কামনা আমাদের নিকট হতে বিচ্ছিন্ন করেন। অতএব হে অন্তরাত্মা! কাম-সঙ্কল্প-বর্জনের নিমিত্ত সেই ভগবানের আরাধনা করো। যে স্তুতি-কর্মের দ্বারা সেই ভগবানের প্রবৃদ্ধি হয় (অর্থাৎ ভগবান্ প্রবৃদ্ধ হন), সেই স্তোত্রের দ্বারা তাকে স্তুতি করো। অথবা-পুরাতন, পূর্বে বর্তমান, ইদানীং বর্তমান সকল প্রাণিগণ ভগবাকে আরাধনা করেছিলেন ও করেন। অনাগত অর্থাৎ ভবিষ্যৎ সকল প্রাণীও সেই ভগবানকে আরাধনা করবেন। অতএব হে অন্তরাত্ম! তুমিও পুরাতন, কর্ম-সমুহে সদা বিরাজিত, সৎ-কর্মের সুফলপ্ৰদাতা, সর্বজ্ঞ আমাদের অনুকুল, বলবান–সকল শক্তির আধার, ভক্তগণের রক্ষার জন্য শীঘ্রগমনকারী, সকলের অভিভবিতা সেই ভগবানকে সাধনার প্রভাবে (স্তুতির দ্বারা) পূজা করো। (অর্থাৎ সকল-কাম-সম্বন্ধ হতে বিমুক্ত হবার জন্য আরাধনা করো)। অপিচ, যে সকল কর্মে ভগবানের মহিমা বৃদ্ধি হয় অর্থাৎ ভগবান্ তৃপ্ত হন, সেই সকল কর্মের দ্বারা ভগবানের স্তুতি করো। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক ও নিত্যসত্যপ্রকাশক)। হে আমার হৃদয়নিহিত ভক্তিরসামৃত! তুমি সৎকর্মের দ্বারা হৃদয় হতে সঞ্জাত হও। অতএব তোমাকে জ্ঞান-জ্যোতির আধার ভগবানের প্রীতির নিমিত্ত নিয়োজিত করছি। আমার নির্মল হৃদয় তোমার উৎপত্তিস্থান। অতএব তুমি আমার অন্তরস্থিত সৎ-বৃত্তিসমূহকে রক্ষা করো । ৯।
[ কর্মকাণ্ড অনুসারে অষ্টম ও নবম অনুবাকের মন্ত্রের দ্বারা শুক্র-মনি গ্রহদ্বয়ের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি বিবৃত হয়েছে। মন্ত্র দুটি একত্র-সন্নিবিষ্ট এবং ভাষ্যকার কর্তৃক একযোগে ব্যাখ্যাত। ভাষ্য অনুসারে অষ্টম অনুবাকের প্রথম মন্ত্রে ইন্দ্রকে নির্দেশ করে। প্রথম মন্ত্রের ভাষ্যানুসারী যে একটি বঙ্গানুবাদ প্রচলিত আছে, তা এইবেন নামে যে দেবতা, তিনি জ্যোতির দ্বারা পরিবেষ্টিত, তিনি জল-নির্মাণকারী আকাশের মধ্যে সূর্যকিরণের সন্তানস্বরূপ জল-গণকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। যখন সূর্যের সাথে জলের মিলন হয়, তখন বুদ্ধিমান স্তবকারীগণ সেই বেনদেবতাকে বালকের মতো নানা মিষ্টবচনে সন্তুষ্ট করেন। ভাষ্যের এবং ব্যাখ্যার ভাবে বোঝা যায়, মন্ত্রে যেন বৃষ্টির বারিধারার জন্য আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। বেন (ইন্দ্র) মেঘাধিপতি। তার প্রভাবে মেঘরাশি বারিরূপে নিপতিত হয়ে ধরিত্রীতে শান্তিশীতলতা আনয়ন করে, শস্য-উৎপাদন করে। এখানে সূর্যই যে বৃষ্টির বা জলের জনক, সেই ভাব উপলব্ধ হয়। বলা বাহুল্য, এই ভাবটির মধ্যে সূর্যকিরণে জলরাশি শুষ্ক ও বাষ্পরূপে ঊর্ধ্বে উখিত হয়ে মেঘে পরিণত হয়–এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটির সন্ধান পাওয়া যায়। যাই হোক, এই মন্ত্রটি আরও একটু সূক্ষ্মভাবে দেখলে, এর দ্বারা মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ পায়। বোঝা যায়,অবিমিশ্র ভক্তিসুধা মুমুক্ষুর মোক্ষের ইচ্ছা বহন করে তার প্রীতির জন্য গমন করে। স্থল-দেহ তার কাছে পৌঁছাতে পারে না; তাই এস্থানে অপাং সূর্যস্য সঙ্গমে অংশে সূক্ষ্মদেহের দৃষ্টান্ত পরিস্ফুট। ফলতঃ মন্ত্রটি যেন নিরাশায় আশার সঞ্চার করছে। সেই মতোই আমরা মন্ত্রটির বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হয়েছি। অষ্টম অনুবাকের প্রথম অংশটি ঋগ্বেদসংহিতার দশম মণ্ডলে পাওয়া যায়। এখানে যে শব্দের একাধিক অর্থ উপলব্ধ হয়, সেখানে একাধিক অম্বয় অনুসারী মর্মার্থ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ভাষ্যমতে অষ্টম অনুবাকের দ্বিতীয় মন্ত্রের অর্থ-হে শুক্রগ্রহ! তুমি দারুপাত্রের দ্বারা গৃহীত হও। শুক্ৰপুত্র শণ্ডের (ষণ্ডের) নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করি। এই খরের একদেশে তোমার স্থান। সেই মতোই তুমি যজমানের কর্মরত্ব পালন করো। আমরা উপযামগৃহীতঃ অর্থে সৎকর্মণা সমুদ্ভুতং, হৃদয়াৎ উৎপন্নং বা অর্থ ধরেছি। শণ্ডায় পদে শুরায় ভগবতে, যদ্বা–তস্য ভগবতঃ প্রীত্যর্থং ইত্যাদিরূপ অর্থ ধরেছি] ॥ ৮।
[নবম অনুবাকের মন্ত্রে ভাষ্যে যে ভাব প্রকটিত তা এই–সেই ইন্দ্রকে আমরা স্তুতি করি। পুরাতন ভৃগু ইত্যাদি যেভাবে ইন্দ্রকে স্তুতি করেছিলেন, সেইভাবে স্তুতি করি। পিতৃ ইত্যাদির মতে, অতীত যজমানগণের মতে, বর্তমান যজমানদের মতে, স্তুতি করি। কিরকম ইন্দ্র? জেষ্ঠতাতি, যাগসন্নিহিত, স্বর্গের বেত্তা ইত্যাদি। হে ইন্দ্র! আপনি আমাদের প্রতিকূল বর্জনীয় আলস্য-অশ্রদ্ধা ইত্যাদি বিনাশ করেন; এইরকম আপনার স্তুতি করি। যে সকল কার্যে আপনি ক্ষিপ্রতার সাথে সোমপানের দ্বারা যজমানকে সম্বর্ধিত করেন, সেই সকল কার্যে আপনাকে স্তুতি করি। হে মন্থিগ্রহ! তুমি উপযামগৃহীত হও। মর্কনামক শুক্রপুত্রের নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করি। এই খর প্রদেশে তোমার স্থান। তুমি যজমানের প্রজাসমূহকে পালন করা। আমাদের পরিগৃহিত অর্থ, একাধিক অন্বয়ানুসারে, মর্মার্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে] ॥ ৯।
প্রথম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৪৫
অনুবাক-৪৫
মন্ত্র- যে দেবা দিব্যেকাদশ ও পৃথিব্যামধ্যেকাদশ স্থাদো মহিনৈকাদশ তে দেবা যজ্ঞমিমং জুষধ্বমুপমগৃহীতোহস্যাগ্রয়ণোহসি স্বাগ্রায়ণে জিম্ব যজ্ঞং জিম্ব যজ্ঞপতিমভি সবনা পাহি বিষ্ণুস্থাং পাতু বিশং ত্বং পাহীন্দ্রিয়েনৈষ তে যোনিৰ্বিশ্বেভ্যস্তা দেবেভ্যঃ ॥ ১০
মর্মার্থ- দ্যুলোকে যে দেবগণ অভিন্নভাবাপন্ন হন, ভূলোকেও যাঁরা অভিন্নভাবাপন্ন হন, অপিচ, শুদ্ধসত্ত্বের গ্রাহক অন্তরিক্ষের যে দেবগণ আপন মহিমায় অভিন্নভাবাপন্ন হন, এই রকম হে দেবগণ, আপনারা (অর্থাৎ সকল দেবতা) আমাদের সকর্ম গ্রহণ করুন, অর্থাৎ আমাদের সকর্মে প্রীত হয়ে আমাদের প্রাপ্ত হোন। হে দেবভাব! আপনি সাধকের হৃদয়ে আবির্ভূত হন; আপনি শ্রেষ্ঠ কাম্য হন। হে দেবভাব! শ্রেষ্ঠতম কাম্য হয়ে আমাদের সৎকর্ম যেভাবে সুসম্পন্ন হয়, তা করুন। আপনি সকর্মের সাধনকারীকে প্রীত করুন অর্থাৎ সকল সৎকর্ম যে রকমে সুসম্পন্ন হয়, তা করুন। আপনিই সকল জগৎকে কর্ম-সামর্থ্য প্রদান করে রক্ষা করুন। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনাকে বিশ্বব্যাপক বিশ্বপালক দেবতা রিপু কবল হতে রক্ষা করুন। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আমাদের হৃদয়-দেশ আপনার আশ্রয়-স্থান হোক, সকল দেবভাবের অর্থাৎ সকল দেবভাব প্রাপ্তির জন্য আপনাকে যেন আমরা হৃদয়ে উৎপাদন করতে পারি। ১০
মর্মার্থ- ত্রিগুণত্রিধাতুসাম্যসাধক একত্রে অবস্থিত দেবগণ দ্যুলোকে অবস্থিতি করেন; রিপুনাশক দেবতা পৃথিবীস্থিত অর্থাৎ পার্থিব বিষয়-ভোগ বিনাশ করেন; অভিন্নভাবাপন্ন সকল শুদ্ধসত্ত্বগ্রহকে অন্তরিক্ষবাসী দেবগণ আমাদের আরাধনা সফল করবার নিমিত্ত আমাদের হৃদয়নিহিত ভগবৎ-পূজোপচাররূপ শুদ্ধসত্ত্ব যেন গ্রহণ করেন। হে দেবভাব! আপনি সাধকের হৃদয়ে আবির্ভূত হন; আপনি শ্রেষ্ঠ কাম্য হন। হে দেবভাব! শ্রেষ্ঠতম কাম্য হয়ে আমাদের সকর্ম যেভাবে সুসম্পন্ন হয়, তা করুন। আপনি সৎকার্মের সাধনকারীকে প্রীত করেন; সুতরাং আমাদের অনুষ্ঠিত সকল সৎ-কর্ম যেভাবে সুসম্পন্ন হয়, তা করুন। আপনিই সকল জগৎকে কর্মসামর্থ্য প্রদান করে রক্ষা করুন। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনাকে সর্বব্যাপক সর্বপালক দেবতা রিপুর কবল হতে রক্ষা করুন। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আমাদের হৃদয়দেশ আপনার আশ্রয়স্থান হোক; সকল দেবভাবের অর্থাৎ সকল দেবভাবপ্রাপ্তির জন্য আপনাকে যেন আমরা হৃদয়ে উৎপাদিত করতে সমর্থ হই ॥ ১১৷৷
[দশম অনুবাকে সাতটি মন্ত্র আছে। প্রথম মন্ত্রের একাদশঃ পদটিই বিশেষভাবে সমস্যামূলক। এই পদটি মন্ত্রে তিনবার ব্যবহৃত হয়েছে। প্রচলিত ব্যাখ্যা ইত্যাদিতে মন্ত্রটির যে অর্থ গ্রহণ করা হয়ে থাকে, তার সারমর্ম এই যে, পৃথিবীতে এগারো জন, অন্তরিক্ষে এগারো জন এবং দ্যুলোকে এগারো জন, এই সর্বমোট তেত্রিশজন দেবতা আছেন। পাশ্চাত্য মতাবলম্বীদের মতে এই মূল তেত্রিশজন দেবতা থেকেই তেত্রিশ কোটি দেবতার উদ্ভব হয়েছে। আবার অন্য কারও মতে কোটি শব্দ সংখ্যাবাচক কোটী বা কোটি শব্দ থেকে পৃথক ছিল। তেত্রিশ কোটি বলতে তেত্রিশজন দেবতাকে বোঝাত। কিন্তু পরবর্তীকালে কোটি শব্দ সংখ্যাবাচক অর্থ গ্রহণ করায় মূল শব্দটিই সংখ্যাবাচক হয়ে যায় এবং তারই ফলে তেত্রিশজন দেবতার স্থানে তেত্রিশ কোটি দেবতা হয়ে গেলেন। এছাড়া আরও অনেক মতবাদ আছে। বিভিন্ন মতানুসারে এই তেত্রিশজন দেবতার বিভিন্ন বর্ণনাও পাওয়া যায়। আমরা মনে করি, এখানে একাদশঃ পদ সংখ্যাবাচক নয়। একা দশা যস্য সঃ এই অর্থে একাদশঃ পদ নিষ্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ এক ভগবানেরই বিভিন্ন বিভূতি বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়; এবং তা-ই বিভিন্ন নামে জগতে প্রকাশ পায়। সেই সমস্তকেই বিভিন্ন দেবতা বলে কল্পনা করা হয়। ভূলোকে যে দেবতার প্রকাশ দ্যুলোকেও তারই প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। বস্তুতঃ অদ্বিতীয় একং-ই বিশ্ব ব্যেপে বিরাজিত আছেন। সেই দেবগণ অথবা সেই এক পরমদেবতা আমাদের প্রতি কৃপাপরবশ হয়ে আমাদের প্রাপ্ত হোন, অর্থাৎ সকর্মসাধনের দ্বারা যেন আমরা তাঁর চরণতলে পৌঁছাতে পারি। সুতরাং দেবতার প্রকাশ বা দেবভাবকেই এখানে একাদশঃ প্রভৃতি পদে লক্ষ্য করা হয়েছে। দ্বিতীয় মন্ত্রে সেই দেবভাবকেই সম্বোধন করা হয়েছে। সেই দেবভাব আগ্রয়ণঃ অর্থাৎ মানবের শ্রেষ্ঠ কাম্য বস্তু। তৃতীয় মন্ত্রে তার কারণ বিবৃত হয়েছে। স্বায়ণঃ যজ্ঞং জিম্ব অর্থাৎ সেই দেবভাবই আমাদের সকর্মের সাধনে যেন সহায় হন। চতুর্থ মন্ত্রের সম্বোধ্যও দেবভাব। পঞ্চম মন্ত্রের মধ্যে প্রকটিত নিত্যসত্যটি এই যে-দেবভাবের দ্বারাই সমগ্র বিশ্ব রক্ষিত হচ্ছে। ষষ্ঠ মন্ত্রের সম্বোধ্য বস্তু ভিন্ন। এখানে শুদ্ধসত্ত্বকে সম্বোধন করা হয়েছে। শেষ মন্ত্রটিও শুদ্ধসত্ত্বসম্বন্ধে উচ্চারিত] । ১০।
[একাদশ অনুবাকের প্রথম মন্ত্রে ত্রিংশত্রয়শ্চ গণিনঃ পদ দুটি থাকতে ভাষ্যকারগণ বলছেন, পূর্ব মন্ত্রের আমরা যে অর্থ করেছিলাম, পরবর্তী মন্ত্রে তাই সমর্থিত হচ্ছে। ত্রিংশত্রিয়ঃ পদে তেত্রিশ সংখ্যাই বোঝায়। সুতরাং এই মন্ত্র দুটি দেবতার সংখ্যাসম্বন্ধেই প্রযুক্ত হয়েছে। আমরা পূর্ব অনুবাকের মন্ত্রের মতো এখানেও সেই অর্থের অনুসরণে ত্রিংশত্রয়ঃ পদের অর্থ নির্ধারণ করেছি–ত্রিগুণ-ত্রিধাতু-সাম্য-সাধকাঃ, একত্রাবস্থিতাঃ দেবাঃ। মন্ত্রের অন্তর্গত রুদ্রাঃ পদের ভাষ্যার্থ,–যিনি শত্রুপক্ষীয়গণের নারীদিগকে রোদন করান। নারীগণ রোদন করেন কখন? স্বামী হত হলে নারীর রোদনের কারণ উপস্থিত হয়। এছাড়াও অন্য বহু কারণ আছে এবং থাকতে পারে, কিন্তু এখানে শত্রু শব্দের উল্লেখ আছে বলেই এখানে পরাজয় বা মৃত্যুর বিষয় আনয়ন করা যায়। আমরা তাই রুদ্রাঃ পদে সাধারণ ভাবে রিপুনাশক অর্থই গ্রহণ করেছি। পরবর্তী পদগুলির দ্বারাও এ অর্থের সমর্থন পাওয়া যায়। রুদ্রাঃ কি করেন?-পার্থিব ভোগপ্রবৃত্তি প্রভৃতি বিনাশ করেন। মন্ত্রের শেষভাগে একটি প্রার্থনা উচ্চারিত হয়েছে। দ্বিতীয় মন্ত্রে দেবভাবকে আহ্বান করা হয়েছে এবং তৃতীয় মন্ত্রে তার কারণ বিবৃত হয়েছে।স্বায়ণঃ যজ্ঞং জিম্ব অর্থাৎ সেই দেবভাবই আমাদের শ্রেষ্ঠতম কাম্য বস্তু হয়ে আমাদের সকর্মসাধনে যেন সহায় হন। চতুর্থ মন্ত্রটিরও সম্বোধ্য দেবভাব। পঞ্চম মন্ত্রে যে নিত্যসত্যটি প্রকটিত তার মর্ম এই যে, দেবভাবের দ্বারাই সমগ্র বিশ্ব রক্ষিত হচ্ছে। ষষ্ঠ মন্ত্রের সম্বোধ্য বস্তু ভিন্ন। এখানে শুদ্ধসত্ত্বকে সম্বোধন করা হয়েছে। এই শুদ্ধসত্ত্ব আমাদের অন্তর্নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব বিশ্বশক্তি শুদ্ধসত্ত্ব নয়। এই উভয় বস্তু এক হলেও আধার ও ক্রিয়াভেদে বিভিন্ন গুণ প্রকাশ করছে। অনুবাকের শেষ মন্ত্রটিও শুদ্ধসত্ত্বসম্বন্ধে উচ্চারিত হয়েছে। এই মন্ত্রের প্রথম অংশ–এষঃ তে যোনিঃ অর্থাৎ আমাদের হৃদয়ই আপনার (অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বের) প্রকৃত বিশ্রামস্থান অথবা আশ্রয়স্থান হোক। অর্থাৎ আমাদের মধ্যে যেন শুদ্ধসত্ত্ব উপজিত হয়। তার প্রয়োজনীয়তা কি? এর উত্তরে মন্ত্র বলছে-বিশ্বেভ্যঃ দেবেভ্যঃ ত্বঃ-সর্বদেবভাব প্রাপ্তির জন্যই শুদ্ধসত্ত্বের প্রয়োজন। যেখানে পবিত্র হৃদয়, আন্তরিক অনুরাগ আছে, যেখানে শুদ্ধসত্ত্ব বিরাজিত সেখানে দেবভাব আগমন করবেই। দেবভাবের প্রয়োজনীয়তা দেবতাকে প্রাপ্তি–তাতেই মানবজীবনের চরম সার্থকতা। সেই সার্থকতা লাভের জন্যই মন্ত্রে প্রার্থনা করা হয়েছে। (দশম অনুবাকের প্রথম মন্ত্রটি সামান্য পাঠভেদের সাথে ঋগ্বেদ-সংহিতার প্রথম মণ্ডলের ঊনচত্বারিংশাধিকশততম সূক্তের একাদশী ঋকে পাওয়া যায়)] । ১১।
মর্মার্থ- হে শুদ্ধসত্ত্ব! আপনি সাধকের হৃদয়ে উৎপাদিত হন; পূজনীয় পরম শক্তিশালী বেদ-মন্দ্রের দ্বারা আরাধনীয় ভগবান্ ইন্দ্রদেবের জন্য আপনাকে যেন আমরা লাভ করি। বলধিপতে হে দেব! আপনার প্রসিদ্ধ যে পরম বল আছে, তা লাভ করবার জন্য আপনাকে আরাধনা করছি। (প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে ভগবন্! কৃপাপূর্বক আমাদের আপনার পরাশক্তি প্রদান করুন। হে শুদ্ধসত্ত্ব! সর্বব্যাপক দেবতার জন্য, অর্থাৎ তাকে লাভ করবার জন্য আমরা যেন আপনাকে হৃদয়ে সমুৎপাদিত করতে পারি। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আমাদের হৃদয়দেশ আপানার আশ্রয়স্থল হোক; বেদ-মন্ত্রের দ্বারা আরাধনীয় ভগবান্ ইন্দ্রদেবের জন্য আপনাকে যেন আমাদের হৃদয়ে সমুৎপাদিত করতে পারি, অর্থাৎ আমরা যেন শুদ্ধসত্ত্ব লাভ করি । ১২।
[এই অনুবাকের চারটি মন্ত্রের মধ্যে প্রথমটিতে শুদ্ধসত্ত্বকে সম্বোধন করা হয়েছে। এই মন্ত্রের দুটি অংশ। প্রথম অংশে একটি নিত্যসত্য প্রখ্যাপিত হয়েছে, তার মর্ম এই যে, সাধকগণই সকর্মসাধনের দ্বারা হৃদয়ে শুদ্ধসত্য লাভের অধিকারী হন। দ্বিতীয় অংশের প্রার্থনা–সেই পরম দেবতাকে লাভ করবার জন্য আমরা যেন হৃদয়ে বিশুদ্ধ সত্ত্বভাব উৎপাদন করতে পারি। দ্বিতীয় মন্ত্রে ভগবাকে সম্বোধন করে প্রার্থনার বিষয় ভগবৎশক্তি। তৃতীয় মন্ত্র প্রথম মন্ত্রেরই অনুরূপ। বিষ্ণবে পদে ভগবানকেই বোঝাচ্ছে। চতুর্থ মন্ত্রে শুদ্ধসত্ত্ব প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। সেই প্রার্থনার চরম উদ্দেশ্য–ভগবৎপ্রাপ্তি]। ১২।
মর্মার্থ- দ্যুলোকের মস্তকস্থানীয়, মত্যলোকের গতিকারক, বিশ্ববাপী নরগণের সৎকর্ম হতে সর্বতোভাবে উৎপন্ন, সর্বদর্শী, সর্বপ্রকাশশীল, হবিবাহক, সত্ত্বভাব গ্রহণকারী পরিত্রাতা, সেই জ্ঞান-স্বরূপ অগ্নিদেবকে দেবভবসমূহ উৎপন্ন করেছেন। ভাব এই যে,-সত্ত্বভাবসহযুত সৎকর্মের দ্বারা জ্ঞানাগ্নি উৎপাদিত হয়। হে শুদ্ধসত্ত্ব! বিশ্বের পরিচালক পরাজ্ঞানের জন্য আপনাকে আমরা যেন প্রাপ্ত হই; আপনি সাধকের হৃদয়ে সমুৎপাদিত হন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে, আমরা যেন শুদ্ধসত্ত্বসমন্বিত পরাজ্ঞান লাভ করি)। হে ভগবান্! আপনি অপরিণামী হন লোকবর্গের পরমাশ্রয় হন; অচঞ্চলের মধ্যেও স্থিরতম, অক্ষয় অব্যয় হন; সকর্মসাধনসম্পন্নদের পরমাশ্রয় হন। (মন্ত্রটি নিত্যসত্যমূলক। ভাব এই যে,ভগবানই লোকগণের পরমাশ্রয় হন)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আমাদের হৃদয়-প্রদেশে আপনার নিবাসস্থান; বিশ্বধারক, পরাজ্ঞানের জন্য আপনাকে আমাদের হৃদয়ে আহ্বান করছি। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে, আমরা যেন শুদ্ধসত্ত্ব লাভ করি) ॥ ১৩৷৷
[এই অনুবাকটি চারটি মন্ত্রে বিভক্ত। প্রথম মন্ত্র অগ্নি সম্বন্ধে প্রযুক্ত হয়েছে। দেবভাব হতে শুদ্ধসত্ত্বভাবের প্রভাবে-জ্ঞানাগ্নি উৎপন্ন হন। এই মন্ত্রের এটাই মুখ্য বক্তব্য। দ্বিতীয় বক্তব্য–সেই জ্ঞানাগ্নি কি রকম? এখানে যে পরিদৃশ্যমান জ্বলন্ত অগ্নিকে মাত্র লক্ষ্য নেই, অগ্নিদেবের বিশেষণ কয়েকটিতে তা প্রতিপন্ন হয়। এখানে দুটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করবার আছে। প্রথম–বৈশ্বানরমৃত আ জাতিমগ্নিং। দ্বিতীয়-জনয়ন্ত দেবাঃ। এর প্রথম অংশের অর্থ-সকল লোকের ঋত হতে উৎপন্ন অগ্নিকে। দ্বিতীয় অংশের অর্থ-দেবগণ উৎপন্ন করেন। ভাষ্যকার ঋত পদে যজ্ঞ অর্থ গ্রহণ করেছেন;এবং তা থেকে, যজ্ঞে যে অগ্নি প্রজ্বলিত হয়–এই ভাব এসেছে।দেবাঃপদে তিনি ঋত্বিক-গণ অর্থ গ্রহণ করেছেন; এবং জনয়ন্ত পদে, অরণি-কাষ্ঠ হতে ঋত্বিগণ যে অগ্নিকে উৎপাদিত করেন–এই ভাব প্রকাশ করে গেছেন। সেই অনুসারে ঐরকম ব্যাখ্যাই অধুনা প্রচলিত। অরণি কাঠের দ্বারা ঋত্বিকেরা যজ্ঞক্ষেত্রে যে অগ্নি প্রজ্বলিত করেন, তারই বিষয় ঐ মন্ত্রে প্রখ্যাপিত হয়েছে, তারই মাহাত্ম্য কথা মন্ত্রে পরিকীর্তিত আছে, এটাই এখানকার ভাষ্য-ব্যাখ্যার অভিমত। আমাদের অর্থ আমাদের মর্মার্থেই প্রকাশিত। দ্বিতীয় মন্ত্রটির লক্ষ্য শুদ্ধসত্ত্ব। বৈশ্বানর শব্দের অর্থ–বিশ্বের নেতা, পরিচালক, সমগ্র বিশ্বকে যিনি বা যে শক্তি পরিচালিত করতে পারেন–তাঁকেই বৈশ্বনার বলা হয়। অগ্নির পক্ষে এটি সার্থক বিশেষণ। বিশ্বকে যদি কেউ পরিচালিত করতে পারে, তবে তা জ্ঞান। জ্ঞানের বলেই জগৎ বিধৃত আছে। বিশ্ব পরিচালনা, বিশ্বকে ধারণ করা জ্ঞানের কার্য। বিশ্বকে ধারণ করেন বলে জ্ঞানকে বিশ্বধারক বলা যায়। বৈশ্বানর শব্দে এই দুইরকমই অর্থ সাধিত হয় বলেই আমরা দুটি ব্যাখ্যাই গ্রহণ করেছি। মন্ত্রের তৃতীয় অংশে ভগবানের মহিমা প্রখ্যাপিত হয়েছে। তিনি ধ্রুব, অর্থাৎ চিরস্থির, অপরিণামী। ভগবানের প্রতি যখন এই ধ্রুব শব্দ প্রযুক্ত হয়, তখন এর অর্থ হয় অপরিণামী, যার পরিণাম অর্থাৎ পরিবর্তন নেই। তিনি কেবলমাত্র ধ্রুব নন, তিনি অচ্যুতও বটেন, অর্থাৎ তাঁর কখনও পতন নেই। কিন্তু এই পরম ও চরম সত্য প্রখ্যাপনের পরেই শুদ্ধসত্ত্বলাভের জন্য প্রার্থনা আছে। সাধক বলছেন–শুদ্ধসত্ত্ব সাধকদের হৃদয়েই উপজিত হয়; আমরা যেন ভগবানের কৃপায় সেই পরমবস্তু লাভ করে ধন্য হতে পারি। দ্বিতীয় মন্ত্রের সাথে চতুর্থ মন্ত্রের ভাবগত যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হবে। এই অনুবাকের প্রথম মন্ত্রটি ঋগ্বেদের ষষ্ঠ মণ্ডলের সপ্তম সূক্তের প্রথমা ঋক রূপেও পাওয়া যায়] । ১৩।
মর্মার্থ- হে ভগবন! আপনি অমৃতস্বরূপ এবং সর্বসিদ্ধিদায়ক হন; জ্যোতময় এবং পবিত্র হন; দুলোক এবং দ্যুলোকবিহারী হন; বল এবং বলদাতা হন; সাধনা এবং সাধ্য হন। (ভাব এই যে, ভগবানই বিশ্বরূপে সর্বভাবে প্রকাশিত হন)। হে ভগবন্! সর্বত্র ব্যাপ্ত আপনি সকলের হৃদয়ে বর্তমান আছেন। হে শুদ্ধসত্ত্ব! পাপনাশক দেবতার জন্য অর্থাৎ তার অনুগ্রহ লাভের জন্য আমরা যেন আপনাকে প্রাপ্ত হই। (ভাব এই যে,–শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়া যায়)। ১৪।
[তিন অংশে বিভক্ত এই অনুবাকটির প্রথম মন্ত্রে ভগবানের বিশ্বরূপ প্রকটিত হয়েছে। তিনি অমৃত, তিনি জ্যোতি; তিনিই স্বর্গ, আবার স্বর্গপ্রাপক, স্বর্গবিহারীও তিনি। তপঃ চ তপস্য চ মন্ত্রাংশে একটি বিশেষভাব প্রকাশিত হয়েছে। তিনিই তপস্যা, আবার আরাধ্যও তিনি, অন্যপক্ষে আরাধকের মধ্যেও তিনি বর্তমান আছেন। দ্বিতীয় মন্ত্রটি প্রথম মন্ত্রেরই ভাব অনুসরণ করেছে। প্রথম মন্ত্র কতকটা বহির্জগতের বিষয় বলেছেন দ্বিতীয় মন্ত্রে পাই অন্তর্জগতের বিষয়। তৃতীয় মন্ত্রের সম্বোধ্য বিষয়–শুদ্ধসত্ত্ব। শুদ্ধসত্ত্বের উদ্বোধনের কারণ বর্ণিত হয়েছে-অংহস্পত্যায়–পাপনাশক দেবতাকে লাভ করবার উপায়স্বরূপ শুদ্ধসত্ত্বের উদ্বোধন হয়েছে। ভাষ্য মন্ত্রের ভিন্ন অর্থ করা হয়েছে। ভাষ্যকারের মতে মধুঃ প্রভৃতি পদে চৈত্র ইত্যাদি দ্বাদশ মাসকে লক্ষ্য করেছে। আমরা এই মত গ্রহণ করতে পারিনি।] । ১৪।
মর্মার্থ- হে বলাধিপতিদেব এবং জ্ঞানদেব! আপনারা সাধকের প্রার্থনার দ্বারা প্রীত হয়ে দুলোক হতে আগমন করেন এবং আত্ম-শক্তির দ্বারা এর বরণীয় সত্ত্বভাব রক্ষা করেন (অথবা গ্রহণ করেন)। (মন্ত্রটি নিত্যসত্যমূলক। ভাব এই যে,-ভগবান্ সাধককে সর্বতোভাবে রক্ষা করেন)। হে শুদ্ধসত্ব! আপনাকে আমরা যেন প্রাপ্ত হই; বলাধিপতি দেবতা এবং জ্ঞানদেবের দ্বারা আপনি আমাদের হৃদয়ে উৎপাদিত হোন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে,আমরা যেন ভগবক্তৃপায় শুদ্ধসত্ত্ব লাভ করতে পারি)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আমাদের হৃদয়প্রদেশ আপনার নিবাসস্থান হোক। হে শুদ্ধসত্ত্ব! বলধিপতি দেব এবং জ্ঞানদেবের দ্বারা অর্থাৎ এই দুই দেবতার কৃপায় আপনাকে আমরা যেন লাভ করি। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে, ভ্যাবান আমাদের শুদ্ধসত্ত্ব প্রদান করুন) ১৫
[এই অনুবাকটির দেবতা–ইন্দ্রাগ্নি; অর্থাৎ ইন্দ্র ও অগ্নিরূপে পরিচিত ভগবৎ-বিভূতিদ্বয়কে লক্ষ্য করেই মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছে। ইন্দ্র বলতে শক্তির এবং অগ্নি বলতে জ্ঞানকে লক্ষ্য করে। জ্ঞানই শক্তি অথবা জ্ঞানই পরমৈশ্বর্য অর্থাৎ এই উভয়ের একত্ব প্রতিপাদনের জন্যই ইন্দ্রাগ্নি-রূপে ভগবানের উপাসনা বিহিত হয়েছে। বস্তুতঃ তিনি এক, বহু তারই বিকাশ মাত্র। কিন্তু ইন্দ্রাগ্নি মিত্রবরুণ বিশ্বদেব প্রভৃতি দেবতার উল্লেখ দেখে পাশ্চাত্যপণ্ডিতগণ এক অপূর্ব গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণার সার কথা এই যে,–আদিম আর্যগণ বহুদেববাদী ছিলেন। জগতের প্রাকৃতিক কার্যের মধ্যে তারা এক একজন দেবতা কল্পনা করতেন। তা থেকেই বহু দেবতার সৃষ্টি হয়…।–ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের মত ভিন্ন। আমরা মনে করি–বেদ সর্বজনীন ধর্মগ্রন্থ, তার মধ্যে সর্ববিষয়ই পাওয়া যায়। সুতরাং বেদে বিভিন্ন স্তরের চিন্তাধারার পরিচয় পাওয়াই স্বাভাবিক। অপরপক্ষে আমরা বেদের মধ্যে যে একত্ব দ্বিত্ব বহুত্ব প্রভৃতির পরিচয় পাই, তা বিভিন্নশ্রেণীর অধিকারীদের জন্য নির্দিষ্ট হয়েছে। সকল লোক এক সঙ্গে সাধনার উচ্চতরলোকে আরোহণ করতে পারে না, তাই সকল শ্রেণীর সাধকের জন্যই যথোপযুক্ত ব্যবস্থা বিহিত হয়েছে। নতুবা বেদের মধ্যে অজ্ঞানতা অথবা অসম্পূর্ণ জ্ঞানের আরোপ করাই বাতুলতা মাত্রা। পুর্বেই উল্লেখিত হয়েছে, প্রথম মন্ত্র ইন্দ্রাগ্নির প্রতিই প্রযুক্ত। অথচ সূতং পদটি দেখেই প্রচলিত ব্যাখ্যা ইত্যাদিতে সোমরসের সম্বন্ধ কল্পনা হয়েছে। একটি প্রচলিত বঙ্গানুবদ হে ইন্দ্রাগ্নি! তোমরা স্তুতিদ্বারা আহুত হয়ে স্বর্গলোক হতে অভিযুত ও বরণীয় (এই সোমের উদ্দেশে) আগমন করো। আমাদের ভক্তিহেতু আগমন করে (এই সোম) পান করো। মূলে কিন্তু সোমরসের উল্লেখ নেই। আমরা সুতং পদে বিশুদ্ধং–সত্ত্বভাবং মনে করি। দ্বিতীয় মন্ত্রের বিষয় সাক্ষাভাবে শুদ্ধসত্ত্ব হলেও পরোক্ষভাবে ইন্দ্র ও অগ্নির মহিমাও পরিকীর্তিত হয়েছে। মন্ত্রটিতে প্রার্থনা করা হয়েছে, আমরা যেন শুদ্ধসত্ত্ব লাভ করতে পারি। কিভাবে তা লাভ করা যায়? তার উত্তর–ইন্দ্রাগ্নিভ্যাং অর্থাৎ ইন্দ্র ও অগ্নির দ্বারা, তাদের কৃপাতেই শুদ্ধসত্ত্ব লাভ করতে সমর্থ হবে। তৃতীয় মন্ত্রের ভাবও দ্বিতীয় মন্ত্রের অনুরূপ। তবে দ্বিতীয় মন্ত্রে পরোক্ষভাবে ভগবানের নিকট প্রার্থনা করা হয়েছে, আর তৃতীয় মন্ত্রে সাক্ষাভাব ভগবৎ-শক্তি শুদ্ধসত্ত্বের নিকটেই প্রার্থনা করা হয়েছে। চতুর্থ মন্ত্রের ভাব দ্বিতীয় মন্ত্রেরই অনুরূপ) ॥ ১৫।
মর্মার্থ- রক্ষক, প্রতিপালক, কর্মফলদাতা হে বিশ্বদেবগণ! অর্চনাকারী পূজা বা শুদ্ধসত্ত্বভাব গ্রহণের জন্য আপনারা আগমন করুন। (ভাব এই যে,-দেবগণ বা দেবভাবসমূহই আমাদের রক্ষক ও প্রতিপালক, সকল দেবভাব বা সকল দেবতা আমাদের মধ্যে অধিষ্ঠিত হোন–এই প্রার্থনা)। হে শুদ্ধসত্ব! আপনি সাধকের হৃদয়ে উৎপাদিত হন; সর্বদেবভাব লাভের জন্য আমরা যেন আপনাকে প্রাপ্ত হই। হে শুদ্ধসত্ত্ব! আমাদের হৃদয়প্রদেশ আপনার নিবাসস্থান হোক। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার ভাব এই যে, আমরা যেন শুদ্ধসত্ত্ব লাভ করি)। হে শুদ্ধসত্ত্ব! সর্বদেবভাব লাভের জন্য আপনাকে আমরা প্রার্থনা করছি । ১৬।
ষোড়শ অনুবাকের প্রথম মন্ত্রে বিশ্বদেব অভিধায়ে সকল দেবতাকে আহ্বান করা হয়েছে। একে একে আহ্বান করতে করতে যখন অন্তরের ব্যাকুলতা বৃদ্ধি পেল, বিভিন্ন দেবতার বিভিন্ন শক্তির অভিব্যক্তির ভাব যখন অন্তরে জাগরূক হলো, অভাবের তীব্র জ্বালা যখন চারদিকে প্রকট হয়ে পড়ল; তখন আর এক বিশেষ দেবতাকে ডেকে তৃপ্তি হলো না, তখন সর্বদেবকে এক সঙ্গে এক স্বরে ডেকে জ্বালা-নিবারণের জন্য প্রার্থনা জানান হলো। এই মন্ত্রের আর এক নিগূঢ় তাৎপর্য এই যে, এখানে এই প্রার্থনায় প্রার্থনাকারী আপন হৃদয়ে সব রকম দেবভাব সঞ্চয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এখানে যেন তার জ্ঞানসঞ্চার হয়েছে–সকল রকম দেবভাব-সত্ত্বভাবসমূহই–শ্রেয়ঃসাধক,দেবভাবের দ্বারাই সত্ত্বভাবের প্রভাবেই মানুষ রক্ষা প্রাপ্ত হয়। তাই সকল দেবতাকে সকল দেব-ভাবকে তিনি আহ্বান করছেন। আবার বিশ্বদেবকে এক সঙ্গে আহ্বান করার আরও একটি নিগূঢ় অর্থ এই যে,–এই বিশ্বের সবই যে সেই একেরই প্রতিরূপ তা প্রতিপাদন করা। দ্বিতীয় মন্ত্রের প্রার্থিত বস্তু দেবভাব। তা লাভ করার উপায়-হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বের উপজন। তৃতীয় মন্ত্রের প্রার্থনার ভাবও দ্বিতীয় মন্ত্রেরই মতো।–পঞ্চদশ ও ষোড়শ, উভয় অনুবাকেই শুদ্ধসত্ত্বলাভের জন্য প্রার্থনা পরিদৃষ্ট হয়। বস্তুতঃ এই প্রার্থনাই উভয় অনুবাকের মধ্যে যোগসূত্র। পঞ্চদশ অনুবাকের প্রথম মন্ত্রটি ঋগ্বেদ-সংহিতায় এবং সামবেদ-সংহিতায় পাওয়া যায়। যোড়শ অনুবাকের প্রথম মন্ত্রটি ঋগ্বেদ-সংহিতার প্রথম মণ্ডলের তৃতীয় সূক্তের সপ্তমী ঋক্-রূপে পাওয়া যায়] ॥ ১৬৷৷
মর্মার্থ- (পুরাকালে) দেবতা ও অসুরবর্গের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হয়। (জয়-পরাজয় অনিশ্চিত জেনে) দেবগণ তাদের মণিরত্ন প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ ধনরাশি সুরক্ষিত রাখবার উদ্দেশ্যে অগ্নিতে নিক্ষেপ করেন (অর্থাৎ অগ্নির কাছে গচ্ছিত রাখেন); কারণ, যদি কোনও রকমে অসুরগণ বিজয়ী হয়, তবে এই ধন তাদের (অর্থাৎ দেবতাদের) বিপদে প্রয়োজনে লাগবে। অগ্নি সেই ধনরাশি নিজে আত্মসাৎ করবার মানসে সেগুলি নিয়ে পলায়ন করলেন। (এ দিকে) পুণ্যবশে দেববর্গ অসুরগণকে পরাজিত করে অগ্নির নিকট হতে বলপূর্বক সেই ধন প্রাপ্ত হতে ইচ্ছা করলেন। সেই কালে (ভীত) অগ্নি রোদন করেছিলেন। এই রোদন করার জন্যই রুদ্রের রুদ্রত্ব হয় অর্থাৎ তখন থেকেই অগ্নির নাম হয় রুদ্র। তার চক্ষু হতে যে অশ্রুরাশি মৃত্তিকায় পতিত হয়েছিল, তা রজতরূপ ধনরূপে পরিগণিত হয়। অশ্রু হতে উৎপন্ন হওয়ায় দক্ষিণায় রজত-প্রদান অকর্তব্য; করলে সম্বৎসরের মধ্যে সেই যজমান-গৃহে রোদনের (শোকের) কোন না কোন কারণ উপস্থিত হয়। অতএব যজ্ঞে রজত প্রদান অনুচিত। ক্ৰন্দনাতুর অগ্নি (দেবতাগণকে) বলেছিলেন–আমাকে তোমাদের ভাগ প্রদান করা উচিত। এই কথা শ্রবণ করে দেবগণ বলেছিলেন–বেশ, এরপর যা তোমাতে রক্ষিত হবে, তার সবটুকুই তোমার হবে। এই শুনে অগ্নিদেব হৃষ্ট হয়ে বলেছিলেন–আমাতে যিনি হবিঃ প্রদান করবেন, তিনি সমৃদ্ধি লাভ করবেন। পূষা, ত্বষ্টা, মনু ও সংবৎসরাভিমানী ধাতাবর্গ অগ্নিতে হবিঃ প্রদানপূর্বক পশু, প্রজা প্রভৃতিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। এইরকম ভাবে যিনি অগ্নিতে আহুতি প্রদান করবেন, তিনিই সমৃদ্ধি লাভ করবেন। অগ্নির সাথে যিনি বন্ধুত্ব করবেন, তিনি পূষা ইত্যাদির বন্ধুত্ব প্রাপ্ত হবেন। প্রথম আধানে আহিত অগ্নি আপনার অধিক ভাগ প্রাপ্ত হতে ইচ্ছমান হওয়ায় যজমানের প্রজা ও পশু-সম্পদের অধিক উপদ্রব করেন; সেইজন্য, পুনরায় যজ্ঞপাত্র ইত্যাদির সংস্কার সাধিত করে অগ্নির আধান করলে আপন ভাগ প্রাপ্ত হয়ে পরিতুষ্ট অগ্নিদেব যজমানের সমৃদ্ধি সাধন করেন এবং তার দ্বারা শান্তি লব্ধ হয়। পুনরায় তাতে ধন স্থাপন করার জন্য পুনর্বসু নামধেয় নক্ষত্রাত্মিকা দেবতা ব্রহ্মচর্য প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ব্রাহ্মণের এটিই ঋদ্ধি। পুনরুক্তির অকরণের জন্য দর্ভের দ্বারা আধান করণীয়। জল ও ওষধির জন্য দর্ভের দ্বারা অগ্নিতে আধান কর্তব্য। এই পুনরাহিত অগ্নিতে অগ্নিদেবতা, পঞ্চকপাল পুরোডাশ পঞ্চ ঋতুতে আহিত হয়ে থাকে। [বাস্তবিক পক্ষে ঋতু সংখ্যা ছটি হলেও হেমন্ত ও শিশিরকে একত্রে একটি ঋতু ধরে ঋতুসংখ্যা পাঁচটি বলা হয়েছে।বহুব্রাহ্মণে দ্বাদশ মাসঃ পঞ্চৰ্তবে হেমন্তশিশিরয়োঃ সমাসেনেত্যানাদৃতুনাং পঞ্চমসংখ্যা] ॥১।
আচার্য সায়ন এই স্থানে বলেছেন–বিজয়ং প্রাপ্নবন্তো দেবাস্তদা তেভ্যোহসুরে ভ্যোহপহৃতং মণিমুক্তাদিকং শ্রেষ্ঠং বসু রক্ষণায়াগ্নেী নিক্ষিপ্তবন্তঃ।–এ থেকে বোঝা যায়, দেবাসুরের যুদ্ধ হওয়ার প্রাথমিক মুহূর্তে দেবগণ জয়লাভ করে অসুরগণের মণিমুক্ত ইত্যাদি শ্রেষ্ঠ ধন অপহরণ করে তা রক্ষার জন্য অগ্নিতে নিক্ষেপ করেছিলেন। কিন্তু এই কাহিনীই অন্যত্র যেভাবে আছে, তাতে বলা হয়েছে ঐ ধনরাশি দেবগণেরই, অর্থাৎ অসুরদের জয় করার পূর্বেই তাঁদের কাছে রক্ষিত ছিল। আমরা সেইভাবেই উল্লেখ করেছি।
মর্মার্থ- অগ্নিকে যিনি ত্যাগ করেন, তিনি যজ্ঞরূপ পশুর বিনাশ করে থাকেন। পঞ্চ কপাল পুরোশ হয়ে থাকে। ধান্য ইত্যাদিরূপ হবির দ্বারা সাধিত যজ্ঞকে পাঙক্ত বলে। পংক্তি ছন্দ পশুহেতু ভূত হওয়ায় পশুবৰ্গও পাঙক্ত নামে কথিত; পাঙুক্ত পশুবৰ্গ যজ্ঞরূপ পশুকে প্রাপ্ত হয়। যিনি অগ্নিকে ত্যাগ করেন, তিনি দেববর্গের মধ্যবর্তী বীর অগ্নির বিনাশক হন। এইজন্যই সত্যকামী (ঋতায়বঃ) ব্রাহ্মণবর্গ এই অগ্নি-বধকারী যজমানের প্রদত্ত অন্ন পূর্বে ভক্ষণ করেননি। পংক্তি ছন্দের দ্বারা যজ্যা ও অনুবাক হয়ে থাকে, যজ্ঞ পাংক্ত বলে কথিত। পুরুষের দুটি হস্ত, দুটি পদ ও একটি মস্তক–এই পঞ্চ-প্রত্যঙ্গও পাংক্ত নামে অভিহিত। দেবগণের বীর অগ্নিকে পরিত্যাগ রূপ বধের শঙ্কা হতে আকর্ষণ সংঘটনপূর্বক পুনরপি স্থাপন করণীয়। অণ্ডাভিমাণী ব্ৰহ্মার আপন প্রমাণ (স্বপ্রমাণ) অনুসারে পুরুষের শত সংবৎসরকাল আয়ু হয়ে থাকে। ধর্ম আচরণের ফলে এই আয়ুষ্কালের বৃদ্ধি ও অধর্ম আচরণের ফলে এর হ্রাস হয়ে থাকে। শতসংখ্যক নাড়ীতে সঞ্চারের কারণে ইন্দ্রিয়বর্গেরও শত সংখ্যা বলে কথিত। শতসংখ্যক বর্ষ ও শতসংখ্যক বীর্য আয়ু ও ইন্দ্রিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। যখন অগ্নি অধিকভাবে আপন ভাগ ইচ্ছা করেন, তখন সমৃদ্ধি সাধিত হয় না; যখন সবকিছু অগ্নির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত হয়, তখনই সমৃদ্ধি সাধিত হয়। যজমানে সমৃদ্ধির অভাব ঘটলে অগ্নিরও সমৃদ্ধির অভাব অনুমিত হয়ে থাকে; অতএব সবকিছুই অগ্নিতে সমর্পণ করা বিধেয়। অগ্নিকে যে যজমান পরিত্যাগ করেন, সেই যজমানের বাক্য তাঁর গৃহবস্থিত স্ত্রী শূদ্র ইত্যাদির বাক্যের সমতুল্যতা প্রাপ্ত হয়; অপর হতে পার্থক্যহীনতার কারণে উল্কর্ষের অভাবে যজমানের পরাভব হয়ে থাকে; অপিচ, অগ্নি আহিত হলে, তাঁর বাক্য উৎকর্ষতা প্রাপ্ত হয় এবং সেই যজমান পরাভব হতে নিস্তার লাভ করেন। অগ্নি আহিত হলে ব্রহ্ম দৃঢ়তা প্রাপ্ত হন। যেমন প্রচুর ধনলাভী তার ধন গোপনে রক্ষা করেন, সেইরকম সকল যাগ নীচধ্বনি দ্বারা অর্থাৎ নিম্নস্বরে (উপাংশুভাবে) করা কর্তব্য। প্রচুর পরিমিত ধন লব্ধ হলে লোকে যেমন খ্যাতি লাভের জন্য আকাঙ্ক্ষা করে, সেই রকম স্বিষ্টকৃৎ অগ্নির প্রতি নিঃশেষধ্বনির দ্বারা অর্থাৎ উচ্চৈস্বরে যাগ করা কর্তব্য। সেই উক্তির সাথে প্রযাজ মন্ত্রে বষট্কার সহযোগে হবিঃ প্রদান করা কর্তব্য। তা হলে পূর্বকথিত পরাভব রহিত হয়ে আপন গৃহে প্রতিষ্ঠিত হয়। পুনরপি বলের সাথে সংযুক্ত হও ইত্যাদি মন্ত্রের পূর্বে ও পরে পুরোশ হোম করতে হয়। সর্পরাজ্ঞী ইত্যাদি আধান মন্ত্রের দ্বারা বিবক্ষিত যজুঃ উচ্চারণের কারণে সিকতা (বালুকা) প্রভৃতি সপ্ত-মৃত্তিকা ও অশ্বত্থ প্রভৃতি সংভাব সম্পাদিত হওয়ায় পুনরায় উভয়কে গ্রহণ অনুচিত বলে কোন কোন আচার্য (বাজসনেয়ী মতে) ভাষ দিয়ে থাকেন। সূত্রকারের মতে, সম্ভার কৃত হোক বা না হোক যজুর্যজ্ঞের সমৃদ্ধি সাধনের জন্য যজুমন্ত্র উচ্চারণ করা কর্তব্য। ভগ্ন রথের সংদৃঢ়ীকরণ অর্থাৎ সংস্কার সাধন করতে হয়, ছিন্ন বাস (বস্ত্র) সীবন (সেলাই) করতে হয়, দুর্বলতা হেতু ভার বহনে অসমর্থ বলদকে খাদ্য ইত্যাদির দ্বারা কথঞ্চিৎ শক্তি বিধান করে পুনরায় কর্মে নিযুক্ত হয়, সেইরকম ভাবে দক্ষিণা হয়ে থাকে। হে অগ্নি, আপনার সপ্ত সমিধ, সপ্ত জিহ্বা ইত্যাদি অগ্নিহোত্র মন্ত্রের দ্বারা অগ্নিহোত্র যাগ সম্পন্ন করতে হয়। পুনরায় আধেয় দেবতা অগ্নির যে যে অঙ্গ যে যে প্রদেশে ন্যক্ত নিমগ্ন বা বিস্মৃত হয়েছে, সেই সেই প্রদেশ থেকে এই অগ্নির সেই অঙ্গ সম্পাদন করতে হয়। যিনি অগ্নিকে ত্যাগ করেন, তিনি দেবগণের মধ্যবর্তী বীর অগ্নির বিনাশক হয়ে থাকেন, ঋণকারী ব্যক্তি যেমন পীড়ানুভ করে, বরুণদেব তাঁকে সেইরকম ভাবেই পীড়ন করেন। একাদশ সংখ্যক কপালের সহযোগে অগ্নিদেব ও বরুণদেবের যাগ করা হলে তারা তুষ্ট হন, এবং যজ্ঞকর্তা (যজমান) কোন পীড়া অনুভব করেন না ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন–তৃতীয়ে ত্বাধানমন্ত্ৰা আন্নয়ন্তে। এই তৃতীয় অনুবাকে আধানমন্ত্ৰ কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে ভূমিরূপিনী দেবি অদিতি! আপনি বাহুল্যে ভূমিস্বরূপা, শ্রেষ্ঠত্বে দুলোকস্বরূপা ও মহিমায় অন্তরিক্ষরূপা। এই কারণে আপনার ক্রোড়ে হবি–ভক্ষণকারী অগ্নিকে যজমানের ভক্ষণযোগ্য অন্ন সিদ্ধির উদ্দেশ্যে স্থাপন করছি। এই গার্হপত্য অগ্নি আদিত্যরূপে গমনশীল ও শ্বেতবর্ণ ধারণ করে জগৎ আক্রমণ করেন। অতঃপর মাতৃসমা পৃথিবীতে আগমনপূর্বক শান্ত রূপ ধারণ করেন এবং পিতৃসম দুলোকে গমনপূর্বক অবস্থান করেন। আদিত্যরূপ গার্যপত্যের দিবায় পঞ্চদশ ও রাত্রে পঞ্চদশ মোট ত্রিশসংখ্যক মুহূর্তরূপ তেজঃ বিশেষরূপে প্রকাশমান হচ্ছে। পক্ষীবৎ আকাশে বিচারণশীল আদিত্যকে এই বেদাশ্রয়ী (বৈদিক) স্তুতি আশ্রয় করে। হে অগ্নি! আপনার প্রতি যে প্রতিকুল আচরণ করেছি, তা আপনি স্মরণে রাখবেন না, আপনার জ্বালার সহযোগে আমাদের নিবেদিত হবিঃ দেবগণের সন্নিকটে বাহিত করুন। এই আদিত্যের বোচনা বা দীপ্তি শ্বাস-প্রশ্বাস-রূপ উদয় ও অস্তের দ্বারা দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যে বিচরণ করে থাকে। মহতি মণ্ডলে অবস্থিত আদিত্য যজমানদের জন্য স্বর্গলোক প্রকাশ করে থাকেন। এইভাবে আদিত্যরূপে স্তুত অগ্নিকে গ্রহণ করি। হে অগ্নি! কোপের অধীনস্থ আমি ক্রোধের বশবর্তী হয়ে অথবা দারিদ্র্যে কারণে আপনার প্রতি যে বিরুদ্ধাচরণ করেছি, আপনার প্রসাদে তা সুকৃত হোক, পুনরায় আপনার উদ্দীপন সাধন করব। হে আহবনীয় অগ্নি! আমার ক্রোধে বিনাশপ্রাপ্ত আপনার যে তেজঃ পৃথিবীলোকে প্রবিষ্ট হয়েছে, আদিত্যবর্গ, বিশ্বদেববর্গ ও বসুদেববর্গ তা আহরণ করে নিন। মাননীয় অগ্নির জ্যোতি হবিঃ সেবন করুন, বিচ্ছিন্নতাপ্রাপ্ত এই যজ্ঞের সংযোজন সাধিত করুন, বৃহস্পতি দেবতা আমাদের অনুষ্ঠিত এই যজ্ঞকে বিস্তার দান করুন, সকল দেবগণ এই যজ্ঞে তৃপ্তি লাভ করুন। হে অগ্নি! আপনার প্রিয় সপ্তলোকে (ভূ-ভুবঃ-স্বঃ-মহঃ-জন-তপঃ-সত্য) আপনার সপ্ত সমিধ (অশ্বখখাদুম্বরপলাশশমীবিকঙ্কশনিহতবৃক্ষপুষ্করপৰ্ণরূপাঃ), জ্বালারূপ সপ্ত জিহ্বা (কালী-করালী-মনোজবা-সুলোহিতা-সুধুম্রবর্ণা-স্ফুলিঙ্গীনী-বিশ্বরুচি), সপ্ত ঋষিবর্গ (মরীচি-অত্রি অঙ্গিরাঃ-পুলস্ত্য-পুলহ-ক্রতু-বশিষ্ঠ), সপ্ত হোতাগণ (হোত্রা হোতৃপ্রমুখ বষট্কর্তারো হোতা প্রশান্তা ব্রাহ্মণাচ্ছংসী পোতা নেষ্টাহগ্নীদ্রোহচ্ছাবাকশ্চেতি সপ্তসপ্তসংখ্যকা) আপনার উদ্দেশ্যে সপ্ত রকমে (অগ্নিষ্টোমোহত্যগ্নিষ্টোম উথ্যঃ যোড়শ্যতিরাত্ৰোহবপ্তাৰ্যামো বাজপেয়শ্চেতি সপ্ত প্রকারাঃ) যাগ করে থাকেন। সেই আপনি সপ্ত লোক জলের দ্বারা পূর্ণ করুন। হে অগ্নি! আমরা প্রতিকূল আচরণ করলেও আমাদের নিবেদিত ক্ষীর ইত্যাদি রসের সহযোগে পুনরায় আপনি এই স্থানে আগমন করুন। অন্ন ও আয়ুর সঙ্গী হয়ে পুনরায় আপনি আগমন করুন, আমাদের সকল অপরাধ হতে রক্ষা করুন (অর্থাৎ আমাদের সকল অপরাধ মার্জনা করুন)। হে অগ্নি! আপনি ধনসঙ্গী হয়ে এই স্থানে আগমন করুন। সকলের পানীয় বৃষ্টিধারা তৃণ লতা গুল্মদির উপর সেচন বা বর্ষণ করুন। লেক, সেলেক, সুলেক, কেত, সকেত, সুকেত, বিবস্বান, আদিতি ও দেবজুতি–এই নবসংখ্যক আদিত্য নিবেদিত এই আজ্য প্রীতচিত্তে পান করুন ॥৩৷৷
মর্মার্থ- বাহুল্যে ভূমি, শ্রেষ্ঠত্বে দুলোক-ইত্যাদি চারিসংখ্যক ঋমন্ত্রের দ্বারা অন্নলাভের ইচ্ছায় অগ্নিকে স্থাপন করা বিধি। জরাপ্রাপ্ত হয়ে সর্পগণ তার প্রতিকারের বিষয়ে মনে মনে বিচার করেছিল। সেই কালে কণীর নামধারী এক কাদ্রবেয় (অর্থাৎ কপুত্র) ভূমি ইত্যাদি মন্ত্রসঙ্ দর্শন করেছিল। সেই মন্ত্রের সামর্থ্য-বশে সর্পগণ শরীরের জীর্ণ ত্বক পরিত্যাগপূর্বক কোমল ত্বক প্রাপ্ত হয়েছিল। সর্পগণ রাজ্ঞিবর্গ ভূমি ইত্যাদি ঋক্সমুদয়ের দ্বারা আহতি হয়ে বহ্নিজরা (বহ্নিবৎ জরা) পরিত্যাগপূর্বক নব (নুতন) ও পূত (পবিত্র) দেহ লাভ করেন। পৃথিবীর ক্রোড়ে অন্নভক্ষণকারী অগ্নিকে এই মন্ত্রের দ্বারা তারা দর্শন করেছিল এবং সর্পরাজ্ঞিগণ এই বৈদিক মন্ত্রে অগ্নিকে স্থাপিত করেছিলেন। অতঃপর হে দেবি! আপনার ক্রোড়ে ইত্যাদি মন্ত্রের সহযোগে ভূমিতে অগ্নিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। হে অগ্নি! আমরা ক্রোধান্বিত হয়ে আপনার যে বিরুদ্ধাচরণ করেছি, তার ফলে আপনি ক্রোধান্বিত হবেন না ইত্যাদি মন্ত্রে, দুষ্কৃতও আপনার প্রসাদে সুকৃত হয় ইত্যাদি মন্ত্রে এবং পুনরায় আপনাকে উদ্দীপিত করি ইত্যাদি মন্ত্রে অগ্নিকে প্রজ্বলিত করা হয়ে থাকে। হে অগ্নি! আপনার প্রতি যে প্রতিকূল আচরণ করেছি, আদিত্য ইত্যাদি দেববর্গ তার পূর্ণতা সাধন করুন ইত্যাদি মন্ত্রে অগ্নির উপস্থান কর্তব্য। যিনি অগ্নির বিনাশ সাধন করেন, তিনি যজ্ঞ ছিন্ন করে থাকেন। বৃহস্পতি শব্দযুক্ত ঋ-মন্ত্রের দ্বারা ব্রহ্মের অর্চনা কর্তব্য। ব্রহ্ম দেবগণের বৃহস্পতি, সুতরাং ব্রহ্মের দ্বারা যজ্ঞ সুসম্পন্ন করণীয়। বিচ্ছিন্নতাপ্রাপ্ত যজ্ঞ দেবগণ যুক্ত করুন ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞের বিস্তার করণীয়। সকল দেববর্গ এই যজ্ঞে তৃপ্তি লাভ করুন ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞের বিস্তার সাধিতপূর্বক দেবগণকে যজ্ঞের বিষয় প্রজ্ঞাপিত করতে হয়। হে অগ্নি! আপনার সপ্ত সমিধ, সপ্ত জিহ্বা ইত্যাদি মন্ত্রে সপ্তপ্রকার পদার্থ, অগ্নির প্রিয় তনুর মতো প্রধানস্বরূপ কল্পনীয়। অগ্নি সে সকল পদার্থ লাভ করেন। হে অগ্নি! ধনসঙ্গী হয়ে, অন্নসঙ্গী হয়ে এই স্থানে আগমন করুন ইত্যাদি মন্ত্র দুটির পূর্বে ও পরে পুরোডাশ আহুতি প্রদান করা কর্তব্য। আদিত্যবর্গ ভূলোক হতে দুলোকে গমনপূর্বক সমৃদ্ধিকামনায় অতৃপ্তিজনিত কারণে পুনরায় এই লোকে আগমনপূর্বক অগ্নিকে অবলম্বন করে লেক ইত্যাদি নব আদিত্য মন্ত্রে আহিত হয়ে পর্যাপ্ত সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যিনি এইরকম সমৃদ্ধি লাভ পূর্বক স্বর্গলোক-প্রাপ্তির কামনা করেন, তাঁর পক্ষে পুনরায় অগ্নির স্থাপনা সাধিত করে লেক ইত্যাদি নব আদিত্য ইত্যাদি মন্ত্রে হোম কর্তব্য ॥৪
মর্মার্থ- যজ্ঞের সন্নিকটে গমনপূর্বক আমরা সেই অগ্নির সন্তোষ সাধনের উদ্দেশ্যে উপস্থান মন্ত্র উচ্চারণ করব, যে অগ্নি দূর হতেও আমাদের বাক্য শ্রবণ করে থাকেন। এই অগ্নির পুরাতনী গোস্থানীয়া অনুকুল দীপ্তি হতে ঋত্বিকবর্গ লজ্জাশূন্য হয়ে দুগ্ধ-স্থানীয় শুভ্র জ্যোতির দোহন করেছিলেন। সেই দুগ্ধ, সহসাং অর্থাৎ বহুধনপ্রদ কর্ম প্রবর্তক। অতএব আমরাও এই উপস্থানের সহায়তায় তার দোহন সমাধা করব। এই অগ্নি আদিত্যরূপে দুলোকের মস্তকের মতো, দাহপাক ইত্যাদির দ্বারা পৃথিবীর পালক এবং বৃষ্টির দ্বারা স্থাবর-জঙ্গমের প্রীতিসাধন করে থাকেন। কর্মের মুখ্যস্বরূপ এই সেই অগ্নিকে আমরা ধারণ করছি। যে অগ্নি দেববর্গের আহ্বাতা মনুষ্য অপেক্ষা অতিশয় যজনকর্তা, যাগে স্তুত্য এবং অপ্নবান ও ভৃগু নামধারী মুনিগণ আপন আপন আশ্রমে আপন আপন প্রজার অভ্যুদয়ার্থে বিচিত্ররূপে ব্যাপ্ত যাঁকে অর্থাৎ যে অগ্নিকে বিশেভাবে দীপিত করেছিলেন। এইরকম যে মহান অগ্নি, তিনি আমাদের সুখ প্রদান করুন। হে ইন্দ্রাগ্নী (অর্থাৎ ইন্দ্র ও অগ্নি)! আপনাদের উভয়ের উদ্দেশ্যে আমরা যাগ করতে ইচ্ছা করি, আপনাদের উভয়কে অন্নের দ্বারা তৃপ্ত করতে বাসনা করি; যেহেতু আপনারা উভয়েই অন্ন ও ধনের প্রদাতা, অতএব অন্ন লাভের অভিলাষে আপনাদের উভয়কে আহ্বান করছি। হে অগ্নি! এই আহবনীয় প্রদেশ আপনার স্থান। সম্বৎসরের সকল ঋতুব্যাপী এই স্থানে আপনি উদ্ভূত হয়ে দীপ্যমান হন। আপনার স্থানরূপ এই প্রদেশকে জ্ঞাত হয়ে এখানে আগমন করুন এবং অনন্তর আমাদের ধন বর্ধন করুন। হে অগ্নি! আপনি আমাদের আয়ুর শোধন অর্থাৎ নির্দোষ করুন, রসযুক্ত অন্ন আনয়ন করুন ও বৈরিসেনাবর্গকে দূরে অপসৃত করুন। হে অগ্নি! শোভনকর্মকারী আপনি আমাদের ব্রহ্মতেজ ও সমীচীন সামর্থ্য শোধন অর্থাৎ দোষহীন করুন, পুষ্টি ও ধন আমাদের জন্য ধারণ করুন (অর্থাৎ স্থাপন করুন)। হে পাবক অগ্নিদেব! রোমান ও মাদয়িা (মত্ততাপ্রদ) আপনার জিহ্বার দ্বারা দেবগণকে আহ্বান করুন এবং যাগ অনুষ্ঠিত করুন। হে পাবক অগ্নি! দীপ্যমান (দীদিবো) আপনি দেবগণকে এই স্থানে আনয়ন করুন এবং আমাদের যজ্ঞ ও হবি গ্রহণ করুন। এই অগ্নি অতি শুদ্ধ ব্ৰতযুক্ত, বিপ্রত্বের কারণে শুচি, কবিত্বের বা মেধাবিত্বের কারণে (বিদ্বদভিমানিত্বাদপি) শুচি; ইনিই আমাদের দ্বারা সর্বত্র আহুত হয়ে শুদ্ধরূপে ভ্ৰাজিত অর্থাৎ দীপ্তিময় হয়ে ঊর্ধ্বে উম্মত হচ্ছে অর্থাৎ গমন করছে! অর্চনাকারিগণ আপনার জ্যোতিসমূহ লাভ করে থাকেন। হে অগ্নি! আপনি আয়ুৰ্দাতা, (অর্থাৎ আয়ু দান করেন) আমাকে আয়ু দান করুন। আপনি তেজঃপ্রদ, আমাকে তেজঃ প্রদান করুন; আপনি দেহ-রক্ষাকারী, আমার দেহের যে অংশ সামর্থ্যে নন, তার পূর্ণতা (অর্থাৎ পুষ্টি) বিধান করুন। হে রাত্রি! আপনার পরিসমাপ্তি যেন আমি স্বস্তির সাথে (অর্থাৎ মঙ্গলের সাথে) প্রাপ্ত হই। হে অগ্নি! আপনাকে সমিধসহযোগে প্রজ্বলিত করে হেমন্ত উপলক্ষিত শতসংখ্যক সংবৎসরকাল দীপ্তিশালী হয়ে এই লোকে সম্যকভাবে প্রখ্যাত,হবো। আপনি অন্নের কর্তা, যশস্কৃত (অর্থাৎ কীর্তিপ্রদ, অন্যের দ্বারা অ-তিরস্কৃত; স্বর্গবিষয়ে অতিপ্রৌঢ় আপনি দন্তকারী বিরোধীবর্গের বিনাশকারী; আমরা আপনাকে দীপিত করে অন্নবস্তু, কীর্তিমন্ত ও শোভন পুত্র ইত্যাদি যুক্ত হবো। হে অগ্নি! আপনি সূর্যের তেজের সাথে সংগত, ঋষিবর্গের (কঠোৎসাবিত) স্তোত্রের সাথে সংগত, প্রিয় আহবনীয় দেশে বা স্থানে সংগত আছেন। হে সংবৎসরকাল আয়ু, তেজ ও পুত্রপৌত্র ইত্যাদির সাথে সংগত করে দিন ॥৫॥
মর্মার্থ- আমি মনুষ্যপালিত পশুগণকে সম্যভাবে দেখব। আমাদের গৃহে ধেনু (গো) ইত্যাদি সকল পালিত পশু ও পুত্রপৌত্র-মিত্র ইত্যাদি মনুষ্যরূপী সকল পালিতজন অবস্থান করুক। হে পশুবর্গ! তোমরা খাদ্যের কারণভূত হও। তোমাদের ক্ষীর, ঘৃত ইত্যাদি খাদ্য আমরা ভক্ষণ করব। তোমরা যাগ ইত্যাদির দ্বারা পূজ্য হও, তোমাদের বলকারক ও স্বাদুতম ক্ষীর ইত্যাদি আমরা ভক্ষণ করব। হে পশুবৰ্গ! তোমরা এই পৃথিবীতে, গোষ্ঠে (ব্রজবিশেষে), গৃহবিশেষে এবং যে-কোন স্থানবিশেষে ক্রীড়াপর হও। সর্বদা এইস্থানেই তোমরা অবস্থান করো ও এই স্থান হতে অন্যত্র কোথাও গমন করো না, আমাদের নিমিত্ত অপত্যপরম্পরায় বহুসংখ্যক হও। হে বৎস! তুমি মাতার সাথে সংযুক্ত হয়ে অবস্থান করো; আদরে স্তন্যপান কালে বাম ও দক্ষিণভাগে পুনঃ পুনঃ গমনাগমনের ফলে তোমাদের বহুরূপীর মতো দেখায়। সেইভাবে তোমরা ক্ষীর ইত্যাদি রসের নিমিত্ত আমার নিকটে আগমন করো, বহুসংখ্যক পশুর স্বামিত্বের কারণে আমার নিকটে আগমন করো, ধনপুষ্টির নিমিত্ত আমার নিকটে আগমন করো। সহস্ৰসংখ্যক পুষ্টি যেস্থানে আছে, সেস্থানে আমি তোমাদের পোষণ করব, তোমাদের ক্ষীর ইত্যদি ধন আমাতে আশ্রয়প্রাপ্ত হোক। হে অগ্নি! প্রতিদিন আমরা আপনার নিকট গমন করে থাকি। আপনি যজ্ঞের রাজা, গো-গণের পানকর্তা, সত্যের দ্যোতমা (প্রকাশক) ও স্বকীয় অগ্নিহোত্র-গৃহে হবির দ্বারা বর্ধমান। হে অগ্নি! পুত্রের নিকট পিতা যেমন সহজপ্রাপ্য, সেইরকম আমাদের নিকটে আপনি সহজলভ্য হোন (অর্থাৎ আপনার দ্বারা আমরা মঙ্গল লাভ করি)। হে অগ্নি! আপনি আমাদের অস্তিকতম (নিকটতম) হোন। পরিত্রাতা ও মঙ্গলময় রূপে আপনি আমাদের গৃহে সন্নিহিত হোন। হে বহ্নি! শুদ্ধতম, দীপ্যমান আপনি সখারূপে আমাদের সুখের নিমিত্ত প্রাপ্ত হোন। বসু, বসুমান, বসুরগ্নি, বসুরুদ্র ইত্যাদির দ্বারা বসুশ্রবা (বা শ্রুতকীর্তি) নামে অভিহিত হে অগ্নি! আপনি আমাদের দর্শনলভ্য হোন (অর্থাৎ সম্মুখে আগমন করুন)। অতিশয় দীপ্যমান আপনি আমাদের ধন দান করুন। আমাদের গৃহে আগত (বা পালিত) হে পশুগণ! ক্ষীর ইত্যাদি রসের নিমিত্ত এবং ধনপুষ্টির কারণে তোমাদের আমরা দেখছি, তোমরাও আমাদের সেইভাবে দেখ। হে গাভিগণ! তোমরা মধুর ঘৃতকারিণী হও। তোমরা সুখকর অন্নরাশিযুক্ত ও আমোদর, আমার নিকট আগমন করো। সহস্ৰসংখ্যক পুষ্টি যেস্থানে বর্তমান, আমি তোমাদের সেই স্থানে পোষণ করব। তোমাদের ক্ষীর ইত্যাদি ধন আমাতে আশ্রয়প্রাপ্ত হোক। বিশ্বলোকে ব্যাপ্ত যে সবিতাদেব আমাদের বুদ্ধিকে কর্মে প্রেরণ করেন, আমরা তাঁর সেই বরণীয়, তেজের ধ্যান করি। হে ব্ৰহ্মণস্পতি (অগ্নিদেব)! আপনি যেমনভাবে ঔশিজকে অর্থাৎ উশিজ নামক ঋষির পুত্র কক্ষীবানকে কর্মে প্রবৃত্ত করেছিলেন, তেমন ভাবে আমাকে সোমযাগের উপদেষ্টা করুন। হে পরম ঐশ্বর্যযুক্ত অগ্নি! কদাচিতও হিংসক হবেন না। হবিঃ-দানকারী যজমানের অত্যন্ত সমীপবর্তী আপনি মিলিত হোন। হে মঘবান-সদৃশ (ইন্দ্রসম) অগ্নি! পুনরপি আপনার দান ফলদানার্থে আমাদের সাথে সংযুক্ত হোক, কখনও যেন তো বিযুক্ত না হয়। হে সহস্র বলবান্ অগ্নি! আমরা প্রতিদিন আপনার সেই রূপকে ধারণ করে থাকি, যে রূপে আপনি আমাদের অভিমত-পূরক, ব্রাহ্মণাভিমানী, বৈরিদের পরাভব করার উপযুক্ত বর্ণ ও আকারবিশিষ্ট এবং ধ্যান ইত্যাদি ভগ্নকারী রাক্ষগণের বিদারক হন। হে গৃহপালক অগ্নি! গৃহপতি আপনার অনুগৃহীত হয়ে আমি শোভন গৃহপতি হবো। হে অগ্নি! গৃহপতি আমার দ্বারা সম্পূজিত হয়ে হেমন্তসহ শত সংবৎসরকাল আপনি গৃহপতি থাকুন। আপনার সকাশে আমরা উৎপন্নমান অর্থাৎ ভাবি পুত্রসন্তানদের নিমিত্ত ব্ৰহ্মতেজ-যুক্ত আয়ু, আরোগ্য, ঐশ্বর্য ইত্যাদির অভিবৃদ্ধি রূপ আশীর্বাদ কামনা করি ॥৬৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমেইনুবাকে পঞ্চমানুবাকোক্ত মন্ত্ৰা ব্যাখ্যায়ন্তে। অর্থাৎ এই অনুবাকে পঞ্চম অনুবাকের মন্ত্রগুলি ব্যাখ্যাত]
মর্মার্থ- যা সামরহিত (অর্থাৎ সামবেদোক্ত গীত ব্যতিরেকে যে যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়) তা যজ্ঞ হয় না। ঋক্-ভেদে ও আবৃত্তিভেদে নিষ্পন্ন সামসঙ্ স্তোম নামে অভিহিত। সেই স্তোম এই অগ্নিহোত্রে সম্পাদিত হয়ে থাকে। উপপ্রয়ন্ত ইত্যাদি দ্বাদশসংখ্যক ঋকে স্তোম-স্থানীয় বলে ধরা হয় এবং এই যজ্ঞে তা পাঠ করা কর্তব্য। প্রজাগণও পশুবর্গ এই ভূলোকে আগত হয়; সেই কারণে যজমানও ভুলোকে গমন করেন। অগ্নির অনুকুল দীপ্তি ইত্যাদি মন্ত্রে প্রত্ন-শব্দ সুচিত হওয়ায় এবং স্বর্গস্থানীয় দীপ্তিকে দোহনের দ্বারা স্বর্গারোহণ সূচিত হচ্ছে। অগ্নি দুলোকের মস্তকস্থানীয় ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা সমানজাতীয় মনুষ্যগণের মধ্যে যজমানের শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপন করা হয়ে থাকে। তারপর দেবলোক হতে আগত হয়ে এই মনুষ্যলোকে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অগ্নি এই কার্যে মুখ্যভূত, আমাদের কর্তৃক তাকে ধারণ করা হচ্ছে ইত্যাদি মন্ত্রে পার্থিব অগ্নির প্রথমত্ব সূচিত হওয়ায় অগ্নির প্রধানত্ব সূচিত হয়। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! আমি তোমাদের দুজনেরই উদ্দেশ্যে যজ্ঞানুষ্ঠানে ইচ্ছা করি ইত্যাদি মন্ত্রে ইন্দ্রদেবের বলাভিমানিত্ব এবং অগ্নিদেবের তেজোভিমানিত্ব–শব্দ দুটি উল্লেখিত হওয়ায় উভয় প্রাপ্তি সূচিত হচ্ছে। এই অগ্নি, এই আহবনীয় প্রদেশ ঋতু-সম্বন্ধীয় ইত্যাদি মন্ত্রে রয়ি শব্দটিতে পশুরূপ ধন অর্থ গৃহীত হয়েছে। উপপ্রয়ন্ত অধ্বরং ইত্যাদি থেকে অয়ং হে যোনিঋত্বিয়ো ইত্যাদি পর্যন্ত পূর্বোক্ত ছটি মন্ত্র এবং অগ্ন আয়ুংষি ইত্যাদি থেকে উদগ্নে শুচয়স্তব ইত্যাদি পর্যন্ত পরবর্তী ছটি মন্ত্রের দ্বারা যাগ করণীয়। এখানে পূর্ববর্তী দুটি মন্ত্রের দ্বারা প্রতিদিনের উপস্থান এবং সেই রকমে পরবর্তী ছটি মন্ত্রের দ্বারা কালবিশেষের নির্দেশ করা হয়। যেমন পুরুষ (মনুষ্য), অশ্ব, গো প্রভূতি আহার লাভ করলেও জীর্ণতা প্রাপ্ত হয়, তেমনই আহিত অগ্নিও জীর্ণ হয়ে থাকে। এটি নিবারণকল্পে অগ্ন আয়ুংষি ইত্যাদি মন্ত্রে অগ্নি কর্তৃক সংবৎসরব্যাপী প্রাপ্ত জরাকে নিবারণপূর্বক নূতন শরীর শোধন করবার নিমিত্ত সংবৎসরকালের ঊর্ধ্বে উপস্থাপন করবার বিধান দেওয়া হয়েছে। অগ্নিদেবতা সম্বন্ধীয় ও পবমানদেবতা সম্বন্ধীয় ঋ-মন্ত্র অগ্নি (বা আগ্নেয়) ও পাবমানী নামে অভিহিত হয়। পাবমানী মন্ত্রে অগ্নি স্থাপন (বা শোধন) করলে অগ্নি অজর (জীর্ণতাহীন) ও পবিত্র (শুদ্ধ) হন। উপতিষ্ঠত ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা অগ্নির যোগ অর্থাৎ যজমানসহ অনুগ্রাহ্য অনুগ্রাহকরূপ সম্বন্ধ, তথা দম দাহ ইত্যাদি লক্ষণযুক্ত উপদ্রবের নিবারণ এবং ধন ইত্যাদি যাচ্ঞার কথা ব্যক্ত হয়েছে। যেমন এই লোকজগতে কোনও দরিদ্র ব্যক্তি কোনও ধনীর নিকট কোনও উপায়ে সংগৃহীত উপঢৌকন প্রদান করে তাকে নমস্কার করে, সেইরকম এই উপস্থাপন। হে অগ্নি, তুমি আয়ুর দাতা, আমাকে আয়ু দান করো। তুমি তেজের প্রদাতা, আমাকে তেজঃ প্রদান করো। তুমি শরীরের পালনকর্তা, আমার তনু রক্ষা করো (অর্থাৎআয়ুদা অগ্নেহস্যায়ুর্মে দেহি ইত্যাদি) মন্ত্রে তনু শব্দে প্রজা, পশু ইত্যাদিরও শরীর অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। যথা–হে অগ্নি! আমার শরীরের যে অংশ অপটু আছে, তা পূর্ণ করো অর্থাৎ পটুতা দান করো; আমার প্রজা ও পশুদের পটুত্বে যা কম আছে, তা পূর্ণ করে অর্থাৎ পটুতার ন্যূনতা দূর করো। চিত্রাবসো স্বস্তি তে পারমশীয়–হে রাত্রি! আপনার পরিসমাপ্তি যেন আমি স্বস্তির সাথে প্রাপ্ত হই।–ইত্যাদি মন্ত্রে চিত্রাবসু শব্দে রাত্রিকেই অভিব্যক্ত করা হয়েছে। নক্ষত্র ইত্যাদি রূপ চিত্র অভিব্যক্ত বলেই চিত্রাবসু শব্দের দ্বারা রাত্রি লক্ষিত হয়েছে। অন্যষ্টি শব্দে প্রভাকাল বোঝানো হয়েছে। হেমন্তঋতুতে রাত্রি দীর্ঘত্ব প্রাপ্ত হওয়ায় প্রভাত হবে না চিন্তা করে কদাচিৎ ব্রাহ্মণবর্গ আশঙ্কিত হয়ে এই প্রার্থনার দ্বারা প্রভাত লাভ করেন। ইন্ধানাস্তা শতং হিমা অর্থাৎ হে অগ্নি! আপনাকে সমিধসহযোগে প্রজ্বলিত করে (হেমন্ত উপলক্ষিত) শতসংখ্যক সংবৎসরকাল দীপ্তিশালী ও বীর্যবান্ হয়ে এই লোকে সম্যভাবে প্রখ্যাত হবো–ইত্যাদি মন্ত্রে হিম শব্দটিতে সংবৎসর অর্থ ধরা হয়েছে। এই মন্ত্রের সহায়তা অগ্নির স্থাপন করলে পুরুষ শতসংবৎসরকাল যাবৎ আয়ু ও শতসংখ্যক (প্রচুর) সামর্থ্য লাভ করে থাকে। এষা বৈ সূক্ষ্মী কর্ণকাবত্যেতয়া ইত্যাদি মন্ত্রে যে সূক্ষ্মী শব্দটি আছে তার অর্থ বা লক্ষ্য জ্বলন্তী লোহময়ী স্মৃণা। এটির মধ্যভাগে একটি ছিদ্র থাকায় (কর্ণকাবতী) অন্তরভাগও প্রজ্বলিত হয়ে থাকে। এর দ্বারা একটি প্রহারে (আঘাতে) দেবগণ শতসংখ্যক অসুর-বীরের বিনাশ সাধন করতে পারেন। এই মন্ত্রের দ্বারা সমিধ আধান করে শতক্ষ্মী (শতঘাতী) বজ্র লাভ করে বৈরিগণকে প্রহার করতে হয়। অচ্ছম্বার শব্দের–নিজের যাতে বিনাশ না হয়–এমনই অর্থ। হে অগ্নি! আপনি সূর্যসদৃশ তেজঃ-যুক্ত হোন–ইত্যাদি মন্ত্রে অগ্নির গুণকথা ব্যক্ত হয়েছে এবং নিজের জন্যও সূর্যসদৃস তেজঃ-লাভের প্রার্থনা প্রজ্ঞাপিত হয়েছে। এই আশিস প্রার্থনা করা হয়েছে–হে অগ্নি! আপনি যেমন সূর্যসদৃশ তেজঃ-সম্পন্ন, আমাকেও তেমনই তেজঃ, আয়ু ও প্রজার সাথে যুক্ত করুন ॥৭॥
মর্মার্থ- সং পশ্যামি প্রজা অহমিড়প্রজসো মানবীঃ অর্থাৎ আমি মনুষ্যপালিত পশুগণকে সম্যভাবে দেখব ইত্যাদি মন্ত্রে ইড়প্রজা শব্দটিতে গো, অশ্ব ইত্যাদি গ্রাম্য-পালিত পশুসমূহকে লক্ষ্য করা হয়েছে। অম্ভ স্থাম্ভো যে ভক্ষীয় অর্থাৎ হে পশুবর্গ! তোমাদের ক্ষীর, ঘৃত ইত্যাদি খাদ্য, আমরা ভক্ষণ করব ইত্যাদি মন্ত্রে অম্ভ, মহ, সহ, উর্জ প্রভৃতি শব্দগুলি গাভীগণ সম্পর্কে উপলক্ষিত এবং কথিত। অন্ত শব্দের দ্বারা ভক্ষণীয় সামগ্রীকে, যথা–গো-দুগ্ধ, ঘৃত প্রভৃতি বোঝায়। ঊর্জ শব্দে ক্ষীর ইত্যাদি রসকে লক্ষ্য করা হয়েছে। রেবতী রমধ্বম্ অর্থাৎ রেবতী তৃপ্তিলাভ করো ইত্যাদি মন্ত্রে উল্লিখিত রেবতী শব্দে গো-ইত্যাদি পশুগণ লক্ষিত হয়েছে। আত্মন শব্দে আপন গৃহ বোধিত হয়েছে। এই স্থান হতে অন্যত্র কোথাও গমন করো না ইত্যাদি মন্ত্রে ধ্রুব শব্দে নিত্যজীবন এবং অনপগা শব্দে বিয়োগাভাব প্রার্থিত হয়েছে। ইষ্টকচিত্বা অন্যোহগ্নিঃ ইত্যাদি মন্ত্রে ইষ্টক ব্যবধান রচিত করে কখনও যেমন অগ্নি প্রজ্বলিত হয়, তেমনই পশুকে ব্যবধান করে যদি কখনও অগ্নিকে প্রজ্বলিত করা হয় এমন উৎপ্রেক্ষা করা হয়েছে (ইব্যুৎপ্রেক্ষতে)। সেইরকমই বসকে স্পর্শ করে অগ্নিকে চয়ন করার বিধান কথিত হয়েছে। প্র বা এযোস্মাল্লোকাচ্চবতে অর্থাৎ যিনি এই লোক হতে বিচ্যুত হন ইত্যাদি মন্ত্রে গার্হপত্য অগ্নির উপস্থান বিহিত (সমাধা) হয়েছে। হে অগ্নি! আমরা নিত্য আপনার সকাশে গমন করব ইত্যাদি মন্ত্রে প্রজাপতির মুখ হতে অগ্নির সহোৎপন্ন হওয়ায় গায়ত্রীর তেজের স্বরূপত্ব বিহিত হয়েছে। গার্হপত্যং বা অনু দ্বিপাদো অর্থাৎ হে অগ্নি! আপনি আমাদের সমীপবর্তী হোন ইত্যাদি ঋক্ তিনটিতে দ্বিপদা শব্দে বিরাট ও গায়ত্রী লক্ষিত হয়েছে। উজ্জা বঃ পশ্যামুজ্জা অর্থাৎ আমাদের গৃহে আগত (বা পালিত) হে পশুবর্গ! ক্ষীর ইত্যাদি রসের নিমিত্ত এবং ধনপুষ্টির কারণে তোমাদের আমরা দেখছি, তোমরাও আমাদের সেইভাবে দেখ ইত্যাদি মন্ত্রে পশ্যত পদে লোট বিভক্তি প্রযোজ্য হওয়ায় প্রার্থনা প্রজ্ঞাপিত হয়েছে। তৎসবিতুৰ্ব্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি অর্থাৎ আমরা সবিতাদেবের সেই বরণীয় তেজের ধ্যান করি ইত্যাদি মন্ত্রে এবং সোমযাগের উপদেশকারী, সোমপানকারী, ব্ৰহ্মণস্পতি ইত্যাদি বিশেষণে ব্রহ্মতেজকে লক্ষ্য করা হয়েছে। (তৎসবিতুর্বরেণ্যমিত্যাহ প্রসূত্যৈ সোমানং স্বরণমিত্যাহ সোমপীথমেবাব রুন্ধে কৃণুহি ব্ৰহ্মণস্পত ইত্যাহ ব্ৰহ্মবৰ্চসমেবাব রুন্ধে। ইতি।।) কদাচন স্তরীরসীত্যাহ অর্থাৎ হে রাত্রি! আমাদের হিংসক হয়ো না ইত্যাদি মন্ত্রে অন্ধকারযুক্ত রাত্রিতে চোর, বৃশ্চিক ইত্যাদির উপদ্রজনিত কারণে হিংসক কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে। অগ্নির বিদ্বান উপস্থাতা (যিনি উপস্থান করেন) সেইরকম রাত্রিতে বাস করেন না (ন অধিবসতি), কিন্তু সুখকরী রাত্রিতে বাস করেন–এই অর্থ প্রজ্ঞাপিত হয়েছে। পরি ত্বাহগ্নে পুরং বয়ং অর্থাৎ হে সহস্র বলবান অগ্নি! আমরা প্রতিদিন আপনার সেই রূপকে ধারণ করি ইত্যাদি মন্ত্রে পরিধাত্মক, অর্থাৎ সর্বরকমে যা ধারণ করে,তা অগ্নির অস্কন্দনার্থ। পরি ত্বাহয়ে পুরং বয়মিত্যাহ পরিধিমেবৈতং পরি দত্যস্কন্দায় ইতি।)। হে গৃহপালক অগ্নি! গৃহপতি আপনার অনুগৃহীত হয়ে আমি শোভন গৃহপতি হবো ইত্যাদি মন্ত্রে গার্হপত্য অগ্নির উপস্থান সূচিত। (যথাযজুরেবৈতৎ)। শতং হিমাঃ অর্থাৎ হে অগ্নি! গৃহপতি আমার দ্বারা সম্পূজিত হয়ে হেমন্তসহ শতসংখ্যক সংবৎসরকাল আপনি গৃহপতি থাকুন ইত্যাদি মন্ত্রে হিম শব্দের দ্বারা হেমন্তসহ সংবৎসরকে বোঝাচ্ছে। পুত্রস্য নাম অমুস্মৈ ইত্যাদি মন্ত্রশব্দে অমুক অর্থে পুত্রের নামোল্লেখ বিহিত। তামাশিষমা শাসেহমুম্মৈ ইত্যাদি স্থলে অর্থাৎ আমি পুত্রের নাম গ্রহণ করছি, আপনি এই পুত্রসন্তানকে ব্রহ্মতেজঃ-যুক্ত করুন ইত্যাদি স্থলে অনুৎপন্ন (অর্থাৎ ভাবী) পুত্রের নিমিত্ত তন্তু শব্দ এবং উৎপন্ন (অর্থাৎ জাত) পুত্রের নিমিত্ত অদ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ॥৮
[সায়ণাচার্য বলেন-পুর্বোক্তোপস্থানস্যাগ্নিহোত্রাঙ্গতা প্রদর্শতে। এই অনুবাকে পূর্বোক্ত অগ্নিহোত্রের অঙ্গ প্রদর্শিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- বাক্যান্তর বিহিতের নিমিত্ত দুগ্ধ, দধি, যবাগু ইত্যাদি দ্রব্য সহযোগে অগ্নিহোত্র নামক হোম করণীয়। যজনমানের দ্বারা দুগ্ধ প্রভৃতি যা কিছু দ্রব্য অগ্নিতে আহুতি দেওয়া হয়, তার কিছুই বিনষ্ট হয় না, বরং তা যজমানেরই থাকে। প্রজোৎপাদকে অর্থাৎ প্রজননের ক্ষেত্রে যেমন সিক্ত রেতঃ অবস্থান করে থাকে, তেমনই প্রজননরূপ এই অগ্নিতে আহুত দ্রব্য অবস্থিতি করে। যেমন ঘর্মকালে অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে দাবাগ্নি কর্তৃক নিকটবর্তী ওষধিগুলি দগ্ধীভূত হলেও সেই দগ্ধীভূত ওষধিগুলি পুনরায় বৃষ্টিকালে উৎপন্ন হয়। সায়ংকালীন হোমের দ্বারা সেচন হয়ে থাকে, এবং প্রাতঃকালীন হোমের দ্বারা উৎপাদন হয়ে থাকে। লোকে (পৃথিবীতে) যোনিতে সিক্ত (সেচিত) রেতঃ বিশ্বকর্মা কর্তৃক যদি না বিকারলাভ (যদি ন বিক্রিয়েত) করে তাহলে উৎপত্তি হতে পারে না। সেই ত্বষ্টা (অর্থাৎ বিশ্বকর্মা) যেমন রূপ উদ্দেশ্য করে বিকার সাধিত করেন, তেমনই উৎপাদন হয়ে থাকে। এই স্থানেও দেবতা কর্তৃক অনুগৃহীত ত্বষ্টারূপ যজমান বিবিধ রূপ সাধিত করবার নিমিত্ত বহুভাবে যাগ সম্পাদন করে থাকেন। উপস্থাতা প্রজা উৎপাদন পূর্বক প্রতিদিন উত্তরোত্তর ধন ইত্যাদি বর্ধিত করেন। দিবা (অহঃ) দেবগণের এবং রাত্রি অসুরগণের অধিকারভুক্ত। অসুরবর্গ দেবগণের পশুরূপ ধনসমূহ অপহরণ করে রাত্রির অন্ধকারে কোনও স্থানে চলে গিয়েছিল। তারপর ভিন্ন মনে আমরা পশুহীন এমন চিন্তা করে দেবতাগণ একটি উপায় দেখলেন। রাত্রিকালে অগ্নির প্রকাশের আধিক্য থাকায় রাত্রি আগ্নেয়ী নামে কথিত এবং অগ্নি পশুগণের অধিপতি হওয়ায় পশুগণ আগ্নেয় নামে কথিত হয়। দেববর্গ স্থির করেছিলেন-তারা এই অগ্নির স্তব করবেন, তা হলে সেই অগ্নি তাদের দ্বারা স্তুত হয়ে পুনরায় পশুবৰ্গকে দান করবেন। এইরকম চিন্তা করেই তারা অগ্নির স্তব করলেন, এবং দেবগণের সেই স্তবের দ্বারা তুষ্ঠ হয়ে অগ্নি সেই গোপনে-রক্ষিত পশুগণকে বার করে দিলেন। সেই দেববর্গ পশুগুলি পুনপ্রাপ্ত হয়ে কামনানুরূপ ভোগ করেছিলেন। যিনি এইরকম জ্ঞাত হয়ে অগ্নির উপাসনা করেন, তিনি পশু লাভ করে থাকেন। আদিত্য এই (পৃথিবী) লোক হতে ঐ (সুর) লোকে গমন করেছিলেন। পুনরায় ঐ লোক হতে এই লোকে প্রত্যাগত হয়ে মৃত্যুর জন ভীতিপ্রাপ্ত হলেন। তিনি মানস করলেন–যদি আমি অগ্নির স্তব করি, তাহলে আমার স্তুতিতে, তুষ্ট হয়ে অগ্নি আমাকে এই মৃত্যুসংযুত লোক হতে স্বর্গলোকে নিয়ে যাবেন। এই কথা চিন্তা করে তিনি অগ্নির স্তব করেছিলেন, এবং সেই অগ্নি আদিত্যের দ্বারা স্তুত হয়ে তাঁকে স্বর্গলোকে নিয়ে গিয়েছিলেন। যিনি এইরকম জ্ঞাত হয়ে বিদ্বান অগ্নির উপাসনা করেন, তিনি স্বর্গলোকে গমন করেন এবং পূর্ণ আয়ু লাভ করেন। (….বিদ্বানগ্নিমুপতিতে সুবৰ্গমেব লোকমেতি সর্বমায়ুরেতি)। আহবনীয় ও গার্হপত্য নামে অভিহিত এই উভয় অগ্নির যিনি উপাসনা করেন, তার (ঐ উভয় অগ্নি) তাঁর বশীভূত হয়ে থাকেন। এই (পৃথিবী) লোকে পূর্বের কোনও অধম ব্যক্তি যেমন কামনা করেন যে, তিনি বিদ্যা ইত্যাদির দ্বারা ভবিষ্যতে উত্তম পদ লাভ করবেন, তেমনই এই যজমান অগ্নির উপস্থানের দ্বারা শ্রেষ্ঠ পদ লাভ করেন। কখন অগ্নির উপস্থান প্রশস্ত, সেই বিষয়ে উল্লেখ করা হচ্ছে। কেউ কেউ বলেন–প্রাতঃকালে অগ্নির উপস্থান বিহিত নয় (কচিপ্রাতরপ্পির্নোপস্থেয়)। অন্যেরা বলেন–কোন সময়েই অগ্নির উপস্থান উচিত নয় (ন কদাচিদপুপস্থেয়)। সিদ্ধান্তবাদীগণের মতে–সকল সময়েই অগ্নির উপস্থান চলতে পারে (সর্বদাইপস্থেয়)। সেখানে প্রথম পূর্বপক্ষ দেখাচ্ছেন–রাত্রিকালে অগ্নির উপস্থান করণীয়, প্রাতঃকালে নয়। রাত্রিকালে অনুষ্ঠিত কমগুলির শুভ বা অশুভ পার্থক্য বোঝা যায় না। যথাশাস্ত্রানুসারে অনুষ্ঠিত ব্রতবিশেষ মঙ্গলপ্রদ, তবে বিপরীত হলে পাপীয়ান। রাত্রিকালে অগ্নির উপস্থান হলে, তাহলে অগ্নির জ্যোতিতে রাত্রিপ্রযুক্ত তমোদোষ অর্থাৎ অন্ধকার দূরীভূত হয়ে যায় (তমোদোষ তরতি); সেই কারণে রাত্রিযোগেই অগ্নির উপস্থান কর্তব্য। দিবাভাগে অন্ধকারের অভাবের জন্য আলোকের প্রয়োজন হয় না; সুতরাং এইকালে (অর্থাৎ দিবায়) অগ্নির উপস্থান করা অনুচিত–এটাই প্রথম পূর্বপক্ষের অভিমত। দ্বিতীয় পূর্বপক্ষের মতানুসারে-অগ্নি কখনই উপস্থানযোগ্য নন। এই লোকে (পৃথিবীতে) দেখা যায়–কোনও দরিদ্র ব্যক্তি যৎকিঞ্চিৎ জম্বীর ফল ইত্যাদি সংগৃহীত করে তা নিয়ে রাজার নিকটে গমন করে যদি প্রতিদিন ক্ষেত্র (জমি) ধন ইত্যাদি যাচ্ঞা করে, তবে সেই যাচক রাজাকে পীড়াই দিয়ে থাকে। তাহলে কি ভাবে মহাপ্রভাবশালী প্রতিদিন প্রার্থনা চলতে পারে? যাচ্ঞারূপ এই উপস্থান, যথা–হে অগ্নি, আমাকে আয়ু দান করুন ইত্যাদি মন্ত্রে তা প্রতীত হয়। সেই কারণেই কদাচিৎও অগ্নির উপস্থান করণীয় নয়।–এটি দ্বিতীয় পূর্বপক্ষের অভিমত। সিদ্ধান্তবাদীর পক্ষ বলছেন–অভিজ্ঞ লোক বলে থাকেন, সকল আশা পূর্তির জন্য যজমান প্রজাপতিসদৃশ সর্বদেবাত্মক অগ্নির যজন করবেন। এই জগতেও দেখা যায় যে, রাজার চিত্তবৃত্তি বিষয়ে বিজ্ঞাত না হয়ে সদা যদি দেহি দেহি বলা যায়, তাতে রাজা অপরাধ গ্রহণ করেন; কিন্তু যথাযথ সময় বিজ্ঞাত হয়ে প্রশংসা ইত্যাদি বিনোদনের দ্বারা রাজার পরিতোষ উৎপন্ন করলে রাজা উৎসাহভরে যাচিতের যাচ্ঞার অধিক দান করেন। সেইরকম আহিতাগ্নির উপস্থানই প্রার্থনা। তা হলো বহুবিধ প্রশংসাপূর্বক, এবং সেইজন্য তা অগ্নির অত্যন্ত পরিতোষের কারণ। সেইজন্য সায়ংকালে ও প্রাতঃকালে বহ্নির উপস্থান কর্তব্য। (সা চ বহুবিধপ্রশংসাপুর্বকত্বান্নোপরোধায় ভবতি কিং ত্বত্যন্তপরিতোষয়ৈব)। প্রজাপতি পশুদের সৃজন করেছিলেন। অহ (দিবা) ও রাত্রির দেবতা দুজন সেই পশুগণকে লুক্কায়িত করে রেখেছিলেন, কেবল ছন্দোযুক্ত মন্ত্রের দ্বারাই অন্বেষণ করে সেগুলি প্রাপ্ত হয়েছিল। সেইজন্য ছন্দের দ্বারা অগ্নির উপস্থান বিনষ্ট বস্তু লাভের জন্য হয়ে থাকে। যিনি অগ্নির উপস্থান-কর্তা, তার তার অভিলাষানুয়ী প্রার্থনা থাকবে এবং তার মধ্যে স্তুতিও থাকে। সুতরাং উপস্থান সম্পর্কে কারও কোন আলস্য করা উচিত নয়। প্রাতিমুখ্যে অগ্নির উপস্থান করলে সেই অগ্নি যজমানের প্রতিকুলে দগ্ধ করে থাকেন। যে যজমান পরাঘুখ হয়ে অগ্নির উপস্থান করেন, সেই যজমান প্রজা ও পশু হতে বিযুক্ত হন। সুতরাং কিছুটা তির্যক ভাবে অগ্নির উপস্থান করণীয়। (কবাতিভিবেষত্তিরীন ইব) ॥৯॥
[সায়ণাচার্য বলেন–দশমানুবাকস্য পূর্বভাগে প্রবৎস্যতো যজমানস্যাগ্নপস্থানমন্ত্ৰা উত্তরভাগে কেচিদ্দর্শ পূর্ণমাসাঙ্গমাশ্চাভিধীয়ন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাকের প্রথমভাগে যজমানের অগ্নির উপস্থাপন মন্ত্র এবং পরবর্তী ভাগে দর্শপূর্ণমাসের অঙ্গমন্ত্রগুলি কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে জাতবেদা অগ্নি! আমার জন্মকালে মাতা-পিতা আমায় যে দেবদত্ত নাম প্রদান করেছিলেন, আমার বিদেশ হতে পুনরাগমন পর্যন্ত আপনি আমার সেই নাম গ্রহণ করুন এবং আমি আপনার নাম ধারণ করব। হে জাবেদা অগ্নি! আমার দেবদত্ত ইত্যাদি নাম গ্রহণ-পূর্বক এই স্থানে আমার কর্ম সাধন করলে কোনরকম বিপর্যয় ঘটবে না; আমিও আপনার বহ্নি ইত্যাদি নাম ধারণ করে বিদেশে গমন করলে আমার কোনও কর্ম অকরনীয় থাকবে না। পুনরায় প্রত্যাগত হয়ে আমি আমার (দেবদত্ত প্রভৃতি) পূর্ব নাম গ্রহণ করব এবং আপনি আপনার (বহ্নি প্রভৃতি) পূর্ব নাম গ্রহণ করবেন। এইভাবে পরিবর্তন পূর্বক বসন পরিধান করার মতো আমরা দুজনে দুজনের নাম পরিবর্তন করে পুনরায় আপন আপন নাম পরিগ্রহ করব। এর ফলে আয়ু বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, ধন ইত্যাদি সম্পত্তির বর্ধন ঘটে এবং প্রশস্ত জীবন-লাভ ঘটে। কেউ যাঁকে তাড়না করতে সক্ষম নয়, কেউ যাঁকে তিরস্কার করতে অপারগ, শত্রুগণের যিনি অশক্য বা অসহনীয়, যার প্রভূত অন্ন আছে, যিনি বিশ্বজিৎ অর্থাৎ সকলকে জয় করেন, যিনি স্বয়ং সহিষ্ণু, যিনি গন্ধর্ববৎ সঙ্গীত ইত্যাদি কলাবিদ্যায় অতি কুশল, আমি সেই অগ্নিকে বারংবার নমস্কার করি। হে অগ্নি! আপনিই দেবগণের পিতা ও পালক, যেমন দেবগণ আপনার পিতা; আপনার দ্বারা দেবগণ আহুতি প্রাপ্ত হন; আপনিই দেবগণের গুণ প্রখ্যাপন করে থাকেন। হে অগ্নি! আমাকে আপনি দীর্ঘ আয়ু সংযোজিত করে দিন; আপনি আমাকে গো-বর্গের স্বামিত্বের (অর্থাৎ অধিপত্যের) সাথে সংযোজিত করে দিন; আপনি আমাকে সুহিতের অর্থাৎ সুমঙ্গলের সাথে সংযেজিত করে দিন। এই অগ্নি প্রশস্যের (অর্থাৎ মেযুক্তের বা স্তুতের বা শ্ৰেষ্ঠর) মধ্যে শ্রেষ্ঠতম; ভগবৎ-গুণশালীবর্গের মধ্যে অতি ভগবত্তম; ইনিই সহস্ৰসংখ্যক ধনের অতিশয় দাতা। সেই হেন অগ্নির প্রসাদে আমার যজমান শোভন সামর্থ্য হোক। মাননীয় অগ্নির জ্যোতিঃ হবিঃর দ্বারা সেবিত হোন, বিচ্ছিন্ন যজ্ঞ সংযুক্ত করুন। প্রাতঃকালে ও সন্ধ্যাকালে অন্য কর্তৃক প্রদত্ত আহুতিসকল (উষসঃ প্রাতঃকালোপলক্ষিতা আহুতয়ঃ, যাশ্চা নিষুচোহস্তময়কালোপলক্ষিতা আহুতয় ইষ্টা) এই ঘৃত ও চরুর দ্বারা অবিচ্ছিন্ন করছি। হে ইন্দ্র! ওষধিসমূহের যা সারবত্তা (শ্রেষ্ঠাংশ), লতাসকলের যা সারবত্তা, জল ও গবাদির দুগ্ধের যা সারবত্তা, সেগুলির সাথে আমাকে সংযোজিত কর। হে ব্রতপতি অগ্নি! আমি ব্ৰতাচরণ করব, তার জন্য যেন আমি সমর্থ হই; আমার সেই ব্রত সমৃদ্ধ হোক। আমি দেবগণের আহ্বানকর্তা অগ্নিকে এই যজ্ঞে আহ্বান জানাচ্ছি। আমি যে দেবতাগণের উদ্দেশ্যে যাগানুষ্ঠান করব, তাদের আহ্বান জানাচ্ছি। আহ্বানপ্রাপ্ত হয়ে সেই দেববর্গ সুমনস্যমানা হয়ে অর্থাৎ শোভন মন সহ আগমন করুন ও আমাদের প্রদত্ত এই হবিঃ ভক্ষণ করুন। হে যজ্ঞ! প্রজাপতি সর্বত্র আপনাকে যোগ্য করে থাকেন, সেই রকমেই আমার এই যজ্ঞকর্মেও তিনিই আপনাকে যোগ্যতা দান করুন। ব্রহ্মসম পোষক ঋত্বিকবর্গ যে সমস্ত কপাল বহ্নিতে স্থাপন করেছেন। সেই সমস্তকেই ইন্দ্র ও বায়ু ব্ৰত সমাপ্তে যুক্ত করে দিন। (বেধসসা ব্ৰহ্মসমাঃ পূষ্ণঃ পোযকা ঋত্বিজো যানি কপালানি বাবুপস্থাপয়ন্তি তানি সর্বাণ্যপি ব্রতে সমাপ্তে সতীন্দ্ৰবায়ু বিমুষ্ণতা)। ঘর্মে দীপ্ত অর্থাৎ সন্তপ্ত এই কপালবিশেষ স্বয়ং ভিন্ন ভাবে প্রতীত হলেও তা মন্ত্রের সামর্থ্যে অভিন্ন আকারশালী হয়। মৃত্তিকা হতে উৎপন্ন এই কপাল পুনরায় মৃত্তিকাতে বিমিশ্রিত হয়ে গেছে, অর্থাৎ তার কার্যরূপত্ব আর নেই, কারণরূপে মিলিত হয়ে গেছে। সেইরকম ইন্ধন কাষ্ঠ, বেদি ও পরিধি সবই যজ্ঞের আয়ুরূপ, সেগুলি যজ্ঞের পশ্চাতে বিচরণ করছে। (ইপ্লে বেদিঃ পরিধয়শ্চ সর্বে যজ্ঞস্যাইয়ুরনুসঞ্চরতি)। যেমন তন্তুর দ্বারা পট নিম্পাদিত হয়, সেইরকমই তন্তুস্থানীয় যজ্ঞতনু নামক ত্রয়স্তিংশৎ (তেত্রিশটি) মন্ত্র যজ্ঞের বিস্তার করেছে। (তন্মপ্রতিপাদ্যা যজ্ঞতনবো ইহ তন্তুস্তানীয়াঃ) যে সকল ঋত্বিক হবিঃর দ্বারা এই যজ্ঞের বিস্তার সাধিত করছেন, তাদের যে সমস্ত বিচ্ছিন্নতা ঘটেছে, তা আমি এই হবিঃর দ্বারা পূর্ণ করে দিচ্ছি। এই আহুতি সুষ্ঠুভাবে প্রদান করা হোক। ঘমো দীপ্ত যজ্ঞাঙ্গ বিশেষ দেবগণকে প্রাপ্ত হোক। (অতঃ স্বাহা সুষ্ঠু প্রতিসংহিতো ঘৰ্মো দীপ্তো যজ্ঞাঙ্গাবিশেষো দেবানপ্যেতু প্রাদোতু) ॥১০।
[সায়ণাচার্য বলেন–অথান্তিম একাদশানুবাকে কাম্যা যাজ্যা (পুরোনুবাক্যা) উচন্তে। অর্থাৎ–এই শেষ একাদশ) অনুবাকে কাম্যা যাজ্যা (পুরোনুবাক্যসমূহ) কথিত হয়েছে ]
মর্মার্থ- আহিতাগ্নির পাকযজ্ঞের উদ্দেশে (আহিতাশ্নেঃ পাকযজ্ঞমনু) গো ইত্যাদি পশুবর্গ অবস্থিত থাকে। এই স্থানে ইড়াভক্ষণ পাকযজ্ঞ, অর্থাৎ ইড়াভক্ষণের দ্বারা পশুবৰ্গ লব্ধ হয় (অতোহনেপীড়াভক্ষণেন পশবো লভ্যন্তে)। ইহলোক যজমানের ফলসাধনে প্রযাজ ও অনুজের মধ্যে ইড়ার অনুষ্ঠান করতে হয় (অনুষ্ঠেয়ত্বৎ)। সেই ইড়া হোর সমীপে নীত হলে তুমি সুরূপ বর্ষবর্ণ, আগত হও–ইত্যাদি মন্ত্র উচ্চারিত হয়। ইড়াদেবতার পশুসাধনত্বের (গোরূপত্বের) উদ্দেশনায় মন্ত্রমধ্যে আগত হও পদে পশুকেই আহ্বান করা হয়। দেবগণ প্রথমে যজ্ঞের সারফল স্বীকার পূর্বক যজ্ঞের দোহন করেছিলেন (যজ্ঞমদুন্নদুহ), সেই যজ্ঞ অসুরবর্গকে দোহন করেছিল, তারপর তারা পরাভূত হয়েছিল। যে যজমান দেবগণ কর্তৃক যজ্ঞের রিক্তীকরণ বা যজ্ঞ কর্তৃক অসুরদের রিক্তীকরণ বা দোহন জ্ঞাত আছেন, তিনি অপর যজমানের রিক্তীকরণ বা দোহন করেন। (দোহনং রিক্তীকরণং)। এতে যজমানের কোনও ক্ষতি হয় না, কারণ এই যজ্ঞের ফল আমার প্রাপ্ত হোক–ইত্যাদি বাক্যে মন্ত্রের প্রশংসার দ্বারা তিনি যজ্ঞের আশিস লাভ করেন। এইটি যজ্ঞের দোহন, এইটির দ্বারা অন্য যজমানের দোহন করা হয়। গো-দোহনকালে প্রসুতস্তনী গাভী যখন বৎসের গাত্র লেহন করে, তখন যেমন দুগ্ধ ক্ষরিত হয়, সেইরকম ইড়া বৎসের গাত্র লেহন করতে থাকলে, যজমানের ফল দোহন হয়। সেই ইড়ার স্তন হলো ইডোপহুতে ইত্যাদি মন্ত্রভাগ, বৎস হলো বায়ু (বায়ুবৎস)। যখন হোতা ইড়াকে আহ্বান করেন, তখন যজমান হোতাকে ঈক্ষণ করে মনে মনে বায়ুকে ধ্যান করা মাত্রই দোহনের নিমিত্ত বায়ু মায়ের নিকটে বৎসকে প্রেরণ করেন। মনুর সাথে সর্ব দেবতা দর্শপূর্ণমাস যাগের দ্বারা স্বর্গলোক প্রাপ্তির উদ্যোগ করেছিলেন (স্বর্গলোকং প্রাপ্তমুদ্যতাঃ)। মনু পাকযজ্ঞের দ্বারা শ্রান্ত হন; ইড়া হলো পাক্যজ্ঞ–এমন উক্ত হয় (ইড়া খলু বৈ পাকযজ্ঞ ইত্যুক্ত। সেই ইড়াদেবতা মনুর নিকট উপগতা হয়। তা দর্শন করে দেবতা ও অসুরগণ পরস্পর বৈপরীত্যানুসারে তাকে আহ্বান করতে থাকেন। দেবগণ সম্মুখ দিক হতে (প্রতীচীং) আহ্বান করেছিলেন, সুতরাং ইড়া তাদের নিকট গমন করেছিল; অসুরগণ পশ্চাৎ দিক হতে আহ্বান করার জন্য ইড়া তাদের প্রতি বিমুখ (পরাচীন) হন, অর্থাৎ তাদের পরিত্যাগ করেছিলেন। পশ্চাৎ দিক হতে যারা আহ্বান করেছিল, তারা পশুলাভ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, আর যারা সম্মুখ দিক হতে আহ্বান করেছিলেন, তারা পশু-প্রাপ্ত হয়েছিলেন (প্রাপ্তবঃ)। বেদার্থবিচারকবর্গ বলে থাকেন। যাঁরা বুদ্ধিমান তারা ইড়াকে সম্মুখ দিক হতে আহ্বান করে তাতে (অর্থাৎ ইড়াতে) আত্মা যোজনা করেন (তস্যামিড়ায়ামাত্মা মুপহুয়তে যোজয়তি); তারা যথাশাস্ত্র ইড়াকে আহ্বান করেন (যথাশাস্ত্রমুপহুয়েতিতি)। সেই ইড়া আমাদের প্রিয় ইত্যাদি বচনের দ্বারা ইড়াতে আপন আত্মা যোজিত করণীয়। ইড়ার ভাগরূপ পুরোডাশের অবশিষ্টাংশ (লেশ) ঋত্বিকগণ ভক্ষণ করেছিলেন, তার সামান্য জল শিরে সিঞ্চন করেছিলেন। এই কর্ম পূর্বে কৃত হওয়ার কারণে যাগ বিচ্ছিন্ন হয়; তার ফলে অসুরগণ অনুযাজ ইত্যাদি বিস্মৃত হয়ে যায়। দেবগণ সতর্কভাবে তা লক্ষ্য করেন। দেবগুরু বৃহস্পতি আমাদের এই যজ্ঞের বিস্তার সাধন করুন ইত্যাদি মন্ত্রে প্রার্থনা করা হয়ে থাকে। ব্রহ্ম দেবগণের বৃহস্পতি, ব্রহ্মের দ্বারাই যজ্ঞ সম্পাদিত হয়। বিচ্ছিন্ন এই যজ্ঞ ব্রহ্ম সংযুক্ত করুন ইত্যাদি মন্ত্রে যজ্ঞের অবিচ্ছেদত্ব কামনা করা হয়েছে। সকল দেবতা এই যজ্ঞে তৃপ্তিলাভ করুন– ইত্যাদি মন্ত্র যজ্ঞের বিস্তৃতির জন্য উক্ত হয়েছে। যজমানের দ্বারা ঋত্বিকবর্গ গো ইত্যাদি দক্ষিণা দান করলে, সেই পশুগুলিও তাদের অনুগমন করে (তদীয়াঃ পশবঃ সর্বেইপ্যনুগচ্ছত্তি); তখন যজ্ঞের অনুষ্ঠাতা পশুরহিত হয়ে থাকেন (তদা যজ্ঞানুষ্ঠাতা চ পশুরহিতো ভবতি)। অতএব দেবতাকে উদ্দেশ করে ঋত্বিগণকে এমন দক্ষিণাদ্রব্য দান করতে হবে, যাতে পশুগুলি নিজেদেরই থাকে (যথা স্বস্মিন্নেব রমন্তে); যজমানের এমন কর্তব্যই বুদ্ধিমন্ত বলা হয় হে ব্ৰধু, তুমি প্রীত হও ইত্যাদি মন্ত্রে ব্ৰধু অর্থে যজ্ঞকে বোঝায় এবং সেই যজ্ঞের পূজার প্রোৎসাহের দ্বারা দেবতার উদ্দেশে দান করো এবং পশুগুলি নিজেদের তৃপ্ত করুক এই যথোক্ত প্রয়োজন দুটি সম্পাদিত হয়েছে। যজ্ঞে দান করলে, সেই দানের ক্ষয় হয় না–ইতাদি মন্ত্রে দানপ্রযুক্ত দ্রব্যক্ষয় নিবারণের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে (দানপ্রযুক্ত দ্রব্যক্ষয়ো মা ক্ষারীতি প্রার্থনেন ভবতি)। দানকারী আমার যেন ক্ষয় না হয়–এই মন্ত্রের উপক্ষয় নিবারণের জন্য অর্থাৎ অভিবৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। বাহুল্য হিসাবে এতে প্রার্থনাকারী ভূমাকে প্রাপ্ত হয় (বাহুলমেব প্রার্থতে ভূমানমেবোপৈতীতি) ॥১।
[সায়ণাচার্য বলেন–ইড়াদ্যমন্ত্রণমন্ত্রাঃ প্রথমে ব্যাখ্যাতাঃ। তামিড়াং দ্বিতীয়ে দ্বয়োর্মনোর প্রশ্নোত্তরাভ্যাং প্রশংসতি। অর্থাৎ–প্রথম অনুবাকে ইড়ার অনুমন্ত্রণের মন্ত্রগুলি ব্যাখ্যাত হয়েছিল। এই দ্বিতীয় অনুবাকে দুই মুনির প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সেগুলির প্রশংসা উক্ত হয়েছে।] ।
প্রথম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬৩
অনুবাক -৬৩
মন্ত্র- সংশ্রবা হ সৌবচ্চনসস্তুমিঞ্জমৌপোদিতিমুবাচ। যৎসত্ৰিণাং হোতাহভূঃ কামিড়ামুপাখা ইতি। তামুপাহু ইতি হোবাচ যা প্রাণেন দেবান্দার ব্যানেন মনুষ্যানপানেন পিতৃনিতি। ছিনত্তি সা ন ছিনত্তীতি। ছিনত্তীতি হোবাচ শরীরং বা অস্যৈ তদুপাহুথা ইতি হোবা গৌর্বৈ অস্যৈ শরীরং গাং বাব তৌ তৎপৰ্য্যবদতাং যা যজ্ঞে দীয়তে সা প্রাণেন দেবালাধার যয়া মনুষ্যা জীবন্তি সা ব্যানেন মনুষ্যান্যাং পিতৃভ্যো ঘন্তি সাহপানেন পিতৃন্ য এবং বেদ পশুমান্ ভবত্যথ বৈ তামুপাহু ইতি হোবাচ যা প্রজাঃ প্রভবন্তীঃ প্রত্যাভবতীত্যন্নং বা অস্যৈ তদুপাহুথা ইতি হোবাচৌষধয়ো বা অস্যা অন্নমোষধয়ো বৈ প্রজাঃ প্ৰভবন্তীঃ প্ৰত্যা ভবন্তি। য এবং বেদান্নদোভব্যথ বৈ তামুপান্তু ইতি হোবাচ যা প্রজাঃ পরাভবন্তীরনুগৃতি প্রত্যাভবন্তীহাতীতি প্রতিষ্ঠাং বা অস্যৈ তদুপাহুথা ইতি হোচেয়ং বা অস্যৈ প্রতিষ্ঠা ইয়ং বৈ প্রজাঃ পরাভবন্তীরনুগৃতি প্রত্যাভবন্তীৰ্গতি য এবং বেদ প্রত্যেক তিষ্ঠ্যথ বৈ তামুপাহু ইতি হোবাচ যস্যৈ নিক্রমণে ঘৃতং প্রজাঃ সঞ্জীবন্তীঃ পিবন্তীতি ছিনত্তি সা ন ছিনত্তী ইতি ন ছিনত্তীতি হোবাচ প্র তু জনয়তীত্যেষ বা ইড়ামুপাহুথা ইতি হোবাচ বৃষ্টিৰ্ব্বা ইড়া বৃষ্ট্যে বৈ নিক্রমণে ঘৃতং প্রজাঃ সং–জীবন্তীঃ পিবন্তি য এবং বেদ প্রৈব জায়তেহন্নাদো ভবতি ॥ ২॥
মর্মার্থ- সুবৰ্চনা ঋষির পুত্র সংশ্রবা নামধারী মুনি, উপদিত ঋষির পুত্র তুমিঞ্জ নামধারী মুনিকে প্রশ্ন করলেন, যজ্ঞকর্মে যখন আপনি হোতা হন, তখন কোন্ ইড়াকে (কোন গুণের কারণে) আহ্বান করেন? তুমিঞ্জের উত্তর, যে প্রাণবায়ুর দ্বারা দেবগণকে ব্যাণবায়ুর দ্বারা মনুষ্যবর্গকে এবং অপানবায়ুর দ্বারা পিতৃগণকে ধারণ করে, এমন গুণসম্পন্না ইড়াকে আহ্বান করি। (সংশ্রবার) পুনঃ প্রশ্ন,সে বিনাশ করে কি? অর্থাৎ আপনা কর্তৃক আহুতা এই গোরূপা ইড়া দক্ষিণাকালে প্রতিগ্রহীতাকে প্রতিগ্রহ দোষের জন্য বিনাশ করে কি না, এটাই প্রশ্নের বিচারার্থ। (তুমিঞ্জের) উত্তর, বিনাশ করে। প্রশ্নবাদী তখন এই ইড়ার দোষ বর্ণনা করে বললেন, তাহলে এই ইড়া মুখ্য ইড়া নয়। আপনি এই ইড়াদেবতার শরীরকেই আহ্বান করেছেন, সেই দেবতাকে নয় (ন তু সা দেবতা)। গাভী এই ইড়ার শরীর। ইড়ার শরীরভূত গাভীরূপকে জ্ঞাত হওয়ার জন্যই তার নিন্দা করা হচ্ছে। যজ্ঞে দক্ষিণারূপে যা দান করা হয়, তা প্রাণের দ্বারা দেবতাগণকে ধারণ করে। যজ্ঞে দক্ষিণারূপে দত্ত গাভী দেবগণকে তুষ্ট করে, তারা তার দোহন করেন না বা বিনাশ করেন না (ন তু তাং দুহস্তি নাপি ঘন্তি)। মনুষ্যগণ গাভী দোহনপূর্বক দুগ্ধ ইত্যাদির দ্বারা জীবন ধারণ করে। এই প্রাণ ও অপানের মধ্যবর্তী বৃত্তি ব্যানের দ্বারা মনুষ্যগণকে ধারণ করে। অপানের দ্বারা সেই গাভী অধমবৃত্তি অপানের দ্বারা (মারণরূপী হয়ে) পিতৃগণকে ধারণ করে। যিনি এইরূপ জ্ঞাত হন, তিনি পশুযুক্ত (পশুমা) হন। অনন্তর তুমিঞ্জ আপন আহূত ইড়ার অন্য গুণ প্রদর্শন করছেন–আমি সেই ইড়াকে আহ্বান করি যে প্রজাগণের (মনুষ্যগণের) প্রত্যাভিমুখে (সম্মুখে) অবস্থান করে। সংশ্রবা এই ইড়ারও মুখ্যত্ব নিবারণ করে দেখালেন–এই ইড়ার অন্নকে আপনি আহ্বান করেছেন। ওষধিসমূহ এই ইড়ার অন্ন; ওষধিসমূহ প্রভূতভাবে মনুষ্যগণের সম্মুখে থাকে। ওষধিসমূহ গাভীগণের খাদ্যরূপে প্রসিদ্ধ। প্রভূতরূপে মনুষ্যগণের গৃহে বহুজনের ভোজনের জন্য ব্রীহি ইত্যাদি ওষধি প্রাপ্ত হয়ে থাকে। যিনি এইরূপ জ্ঞাত হন তিন অন্নের ভক্ষক হন। পুনরপি তুমিঞ্জ গুণান্তর উক্তির দ্বারা ইড়ার মুখ্যত্ব সম্পাদনের উদাহরণ দিলেন–আমি সেই ইড়ার আহ্বান করি, যে ইড়া পরাভূয়মান (পীড়িত) মনুষ্যগণকে পুষ্টি দানপূর্বক অনুগ্রহ করে, পীড়িত মনুষ্যগণ যাকে অপেক্ষিত স্থান প্রদান করে (অর্থাৎ অবলম্বন করে)। এইবার ইড়ার পীড়াহীনতারূপ মুখ্যত্ব নিরাকরণার্থে সংশ্রবা উক্তি করলেন–আপনি এই ইড়ার গোরূপের প্রতিষ্ঠাকেই আহ্বান করে থাকেন; গাভীরূপা ইড়ার প্রতিষ্ঠা যে ভূমি, আপনি সেই ভূমিকেই আহ্বান করে থাকেন, মুখ্য ইডাকে নয়। এই ভূমি হলো গাভীরূপা ইড়ার প্রতিষ্ঠার স্থান, যা পীড়িত মনুষ্যগণকে পুষ্টি প্রদান করে এবং মনুষ্যগণ যাকে আশ্রয় করে। যিনি এইরকম জ্ঞাত আছেন, তিনি প্রতিষ্ঠিত হন (প্রত্যেব তিষ্ঠতি)। অতঃপর মুখ্যত্ব সম্পাদনের নিমিত্ত (তুমিঞ্জের) উক্তি–আমি সেই ইড়ার আহ্বান করি যার নিষ্ক্রমণে মনুষ্যগণ ঘৃত পান করে সঞ্জীবিত হয়ে থাকে। বৃষ্টিরূপ ইড়ার নিক্রমণে ক্ষরিত জল গ্রহণ পূর্বক মনুষ্যগণ জীবিত থাকে; আমি সেইরকম ইড়াকে আহ্বান করে থাকি (তাদৃশীমিড়ামুপহুতবানস্মি)। পূর্বের মত ইড়ার দোষভাবে ভাবিত হয়ে পুনরায় সংশ্রবা প্রশ্ন করলেন–সেই ইড়া বিনাশ করে কিনা। গাভী, অন্ন, ভূমি–এইগুলির প্রতিগ্রহ দোষ আছে, কিন্তু বৃষ্টিরূপ ইড়ার গ্রহণে সেই দোষ আছে কিনা এইটিই জিজ্ঞাস্য। প্রতিগ্রহদোষাভাব প্রদর্শনের নিমিত্ত ইড়ার গুণান্তরে তুমিঞ্জু উক্তি করলেন, না বিনাশ করে না; এই ইড়া কোনও পুরুষকে বিনাশ করে না; কোনরকম দোষদান করে না, কিন্তু প্রকর্ষের সাথে শস্য ইত্যাদি উৎপন্ন করে। সংশ্রবা ইড়ার মুখ্যত্ব স্বীকারপূর্বক বললেন,–আপনি এই ইড়ার আহ্বান করুন; এই বৃষ্টিরূপা ইড়া বৃষ্টিপাতে জলদান করে। বৃষ্টির ফলে শস্য ইত্যাদির বৃদ্ধি ঘটে; তার ফলে সকলে জীবন ধারণ করে। যিনি এইরকম জানেন, তিনি অন্নের ভক্ষক হন।-এই অনুবাকে সর্বপ্রাণীর উপকারী গাভী, অন্ন, ভূমি ও বৃষ্টিরূপা ইড়ার প্রশস্তি করা হয়েছে (তদেবমস্মিন্ননুবাকে সর্বপ্রাণুপকারিভিগবান্নভূমিবৃষ্টিরূপৈরিয়মিড়া প্রশস্তা) ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন–তৃতীয়েহহার্য উচ্যতে। এই তৃতীয় অনুবাকে অন্যহার্য সম্পর্কে বলা হয়েছে। অনুকূলে আনয়ন করাকে অন্যহার্য বলা হয়।]
মর্মার্থ- দেবতাগণের উদ্দেশে পরোক্ষ যাগ এবং ঋত্বিৰ্গণের উদ্দেশ্যে প্রত্যক্ষ যাগ করা হয়। অগ্নি, ইন্দ্র ইত্যাদির অদৃশ্যমানত্বের কারণে তাদের যাগ পরোক্ষ যাগ। ঋত্বিগণের দৃশ্যমানতার কারণে তাদের যাগ পরোক্ষ যাগ। ঋত্বিগণকে অন্যহার্য অর্থাৎ ওদন বা সিদ্ধান্ন বা বাত প্রদান করতে হয. (দদ্যাৎ)। কারণ ব্রাহ্মণগণ প্রত্যক্ষ দেবতা, তাদের অনুদানের দ্বারা প্রীত করতে হয়। দক্ষিণারূপে অন্নদানের ফলে যজ্ঞের ছিদ্র পূর্ণ হয় (যজ্ঞস্যৈব ছিদ্রমপি দধাতি)। যজ্ঞের যা অতিরিক্ত এবং যা নন, এই উভয়ই অহার্য দামের দ্বারা সমাধা করা হয় (সমাদধাতি)। অনুকুলে আনয়ন করাকে অন্বহার্য বলা হয়। ঋত্বিগণের প্রীতিহেতুত্বের জন্য পুনরায় অন্যাহার্যের প্রশস্তি করা হয়েছে। ঋত্বিৰ্গণ হলেন দেবদূত তুল্য, তাদের অন্নদান করলে দেবদুতের তুষ্টি সাধিত করা হয়। প্রজাপতি অগ্নি ইত্যাদি দেবগণকে যাগ বিভাগ করে দিয়ে দেখলেন যে, তাঁর নিজের কোন ভাগ (পুরোডাশ) অবশিষ্ট নেই, তখন তিনি এই অন্যহার্যকে অবিভাজ্য দেখে তা নিজেতে স্থাপন করলেন (তমাতুনি স্থাপিতবা); সেই হতে অন্যহার্যকে প্রাজাপত্য বলা হয়ে থাকে। যাঁরা এই কথা জ্ঞাত হয়ে অন্নদান করেন, তাঁরা প্রজাপতির প্রীতি সাধিত করে থাকেন। সর্ব দেবগণের স্বামিত্বের জন্য, অর্থাৎ ব্যাপ্তি বা বাহুল্যের কারণে প্রজাপতির অপরিমিতত্ব। এই অহাৰ্য প্রজাপতির তৃপ্তি, আপন বিজয়েহেতুত্বের ও বৈরি-পরাজয়হেতুত্বের কারণ। দেবতাগণ যজ্ঞে যা করেছিলেন, অসুরগণও তা-ই করেছিল। দেবগণ প্রাজাপত্যনামে অভিহিত এই অহাৰ্য আহৃত করে জয় লাভ করলেন, অসুরগণ (তা না করে) পরাজিত হলেন। এইরকম জ্ঞাত হয়ে যিনি অহাৰ্য আহরণ করেন, তিনি বিজয় লাভ করেন এবং তার শত্রুবৰ্গ বিনাশ প্রাপ্ত হয়। যজ্ঞেন বা ইষ্টী অর্থাৎ যজ্ঞের দ্বারা ইষ্টী, ও পকেন পূর্তী অর্থাৎ পকের বা পক্ক অন্নের দ্বারা পূর্তী (ইচ্ছাপূরণ)–এইরকম জ্ঞাত হয়ে যিনি অহাৰ্য আহরণ করে থাকেন, তার ইষ্টাপূর্তী হয় (অর্থাৎ যজ্ঞ সম্পূর্ণ হয়)। আগ্নেয় (যাগানুষ্ঠান) ইত্যাদি শ্রৌতকর্ম ইষ্ট, পুষ্করিণী কুপ (প্রতিষ্ঠা) ইত্যাদি স্মার্তকর্ম পূর্ত। আগ্নেয় ইত্যাদি যাগানুষ্ঠানের দ্বারা ইষ্টসম্পত্তি (তত্রাইগ্নেয়াদিযাগেনেষ্টসম্পত্তিঃ) এবং পক অন্ন ইত্যাদির অর্থাৎ অদাহার্যের দ্বারা (দানের দ্বারা) পূর্তসম্পত্তি (পকেনাহার্যেণ পূর্তসম্পত্তিঃ) লব্ধ হয়। আপনি প্রজাপতির ভাগ হোন–ইত্যাদি মন্ত্রে অন্বহার্য দানে প্রজাপতির ভাগধেয়ের সম্যক্ বর্ধন করা হয়। অন্নবান, রসবান্ ইত্যাদি মন্ত্রে অন্যহার্যের বলবত্তার কথা বলা হয়েছে। প্রাণাপানৌ মে পাহি. অর্থাৎ আমার প্রাণ অপান সমান ব্যান রক্ষা করুন–ইত্যাদি মন্ত্রে ঋত্বিকগণকে অন্যহার্য দানপূর্বক আপন প্রাণ ইত্যাদি বায়ুর পালনরূপ আশীর্বাদ (স্বকীয়প্রাণাদিপালনমাশীৰ্বাদ) প্রার্থিত হয়েছে। হে অন্যহার্য! আপনি অক্ষয়, পরলোকে আমার ভোগের নিমিত্ত যেন ক্ষয় হবেন না–ইত্যাদি মন্ত্রে অন্বহার্য দানের দ্বারা অক্ষয় ফলপ্রাপ্তির বিষয় কথিত হয়েছে। স্বর্গের কর্মভূমিত্বের অভাবের নিমিত্ত সেখানে অন্নের উৎপত্তি হয় না অর্থাৎ অন্ন দানের সাধন সম্পাদিত হয় না। কিন্তু স্বর্গপ্রাপ্ত মনুষ্যগণ, সেই স্থানে (স্বর্গলোকে) ইহলোকে অনুষ্ঠিত কর্মের ফল ভোগ করছেন (উপজীবন্তি)। অতএব অক্ষিতোহসীতি মন্ত্রের দ্বারা এই লোকে অন্নদান করলে স্বর্গে অক্ষয় ফল প্রাপ্ত হওয়া যায় ॥৩॥
মর্মার্থ- বহিঁযোহহং দেব্যজ্যয়া প্রজাবা-ভূয়াসং.. অর্থাৎ বৰ্হি নামক দেবতার যাগের দ্বারা আমি প্রজাবান্ (বহু অপত্যশালী) হবো–ইত্যাদি মন্ত্রে বলা হয়েছে, বহি নামক অগ্নির দেবযাগের অনুমন্ত্রণের দ্বারা প্রজাপতি প্রজাগণকে সৃষ্টি করেছিলেন এবং তার দ্বারাই প্রজা সৃষ্টি করে থাকেন। নরাশংসস্যাহং…. অর্থাৎ নরাশংস নামক অগ্নির দেবযাগের দ্বারা আমি পশুযুক্ত হবো–ইত্যাদি মন্ত্রে নরাশংস অগ্নির দেবযাগের অনুমন্ত্রণের দ্বারা প্রজাপতি পশুগণকে সৃষ্টি করেছিলেন এবং তার দ্বারাই তিনি পশু সৃষ্টি করে থাকেন। স্বিষ্টকৃতোহহং… অর্থাৎ স্বিষ্টকৃৎ অগ্নির দেবযাগের অনুমন্ত্রণের দ্বারা প্রজাপতি আয়ুষ্মন হয়েছিলেন ও যজ্ঞের ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন, অর্থাৎ এই মন্ত্রে আয়ু ও যজ্ঞের ফল লাভের কথা ব্যক্ত হয়েছে। দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞের দ্বারা দেবগণ বিজয়প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং তার দ্বারা অসুরবর্গকে পরাভব করেছিলেন। হে অগ্নি! আমিও উৎকর্ষ লাভ করব–ইত্যাদি মন্ত্রে দর্শপূর্ণমাস যাগের দ্বারা জয়লাভ হয় এবং তার দ্বারা শত্রুদের বিনাশ সাধন সূচিত হচ্ছে। এই মন্ত্রে উজ্জিতি অর্থে উৎকর্ষ বা সম্পূর্ণতা বোঝায়। বাজস্য মা… অর্থাৎ ইন্দ্র অন্নের প্রসূতি-নিমিত্তে সুত বা সুচার উধ্বগ্রহণের দ্বারা আমাকে উৎকর্ষ প্রদান করেছেন ইত্যাদি মন্ত্রে বাজ শব্দের দ্বারা অন্নকে বোঝানো হচ্ছে। প্রকর্ষের দ্বারা স্থিতি অর্থের জন্য মন্ত্রের দ্বিত্ব হয়েছে (পদদ্বয়েনেব প্রকর্ষেণ স্থিত্যর্থং মন্ত্রদ্বিত্বমিত্যাহ)। যজ্ঞের দুটি দোহন জ্ঞাত হয়ে যাগ বিধেয়। উভয় ক্ষেত্রে পূর্বে ও পরে পৃথকভাবে যাগ করণীয়, একটি যজ্ঞের দোহন, অন্যটি ইড়ার দোহন। যখন হোতা যজমানের নাম গ্রহণ করবেন, তখন বলবেন, এই আশীর্বাদগুলি আমার প্রতি আগত হোক-ইত্যাদি এবং এই মন্ত্রে দর্শপূর্ণমাসের সকল দেবতার দোহন করবেন, এর পূর্বে ও পরে যজ্ঞের দোহন কর্তব্য।রোহিতেন ত্বাইগ্নিদেবতাং গময়তু হরিভ্যানং…. অর্থাৎ রোহিত নামক অশ্বের দ্বারা অগ্নি আমাদের দেবতাবৃন্দের নিকট গমন করান–ইত্যাদি মন্ত্রে যজমানবৎ যাগের সাধনত্ব বা প্রকরণ নির্দেশ পূর্বক যজমানের আরোপ করা হয়েছে। দেবগণের অশ্ববর্গের দ্বারা যজমানকে সুবর্গলোকে অর্থাৎ স্বর্গলোকে গমন করানো হচ্ছে। বি তে মুঞ্চামি রশনা বি রশ্মীন্থি যোত্ৰা… অর্থাৎ অশ্বের রঞ্জু প্রভৃতির মোচনের মতো, হে অগ্নি! আপনার বন্ধন মোচিত করছি–ইত্যাদি মন্ত্রে অগ্নির উদ্দেশে বলা হওয়ায় এটি অগ্নির বিমোক। বিষ্ণোঃ শংযোরহং দেব্যজ্যায়া.. অর্থাৎ বহুঁকার্যে ব্যস্ত বৃহস্পতির পুত্র শংযুর দেব্যাগের দ্বারা আমি যজ্ঞে প্রতিষ্ঠা লাভ করব–ইত্যাদি মন্ত্রে যজ্ঞই বিষ্ণু, তা সমাপ্তিকালে ফল প্রদান করে থাকে (অন্ততঃ সমাপ্তিকালে)। এই স্থলে ফলের ব্যাপ্তির কারণে যজ্ঞের বিষ্ণুত্ব কথিত হয়েছে (যজ্ঞস্য ফলব্যাপ্ত বিষ্ণুত্বম)। সোমোস্যাহং দেব্যজ্যয়া সুরে রেতো. অর্থাৎ সোমদেবতার উদ্দেশে দেব্যাগের দ্বারা আমরা অমোঘ বীর্য ধারণ করব–ইত্যাদি মন্ত্রে সোম রেতের ধারক। তার দ্বারা রেত ধারণ করব বলায় সোমকে রেতোধা বলা হচ্ছে। গর্ভাশয়ে রেত-ধারণ সোমের অনুগ্রহেই হয় (গর্ভশয়ে রেতোধারণং সোমস্যানুগ্রহাদ্ভবতি)। তৃষ্ঠুরহঃ দেব্যজ্যয়া… অর্থাৎ ত্বষ্টার (তথা বিশ্বকর্মার) দেবযাগের দ্বারা আমরা পশুগণকে (পশুগণের রূপ) পোষণ করব–ইত্যাদি মন্ত্রে দৃষ্টাকে পশুমিথুনের রূপস্রষ্টা (রূপকৃৎ) বলা হয়েছে, অর্থাৎ তিনি নিষিক্ত রেতকে পশু ইত্যাদির বিকার ঘটিয়ে থাকেন, ইত্যাদি উক্ত হয়েছে। (যাবচ্ছো বৈ রেতসঃ সিক্তস্য ত্বষ্টা রূপানি বিকরোতি)। দেবানাং পত্নীরগ্নিগৃহপসিযজ্ঞস্য… অর্থাৎ দেবগণের পত্নীবর্গ ও গৃহপতি অগ্নি মিলিত হয়ে যজ্ঞসম্বন্ধি মিথুনসদৃশ, তাদের উদ্দেশে দেবযাগের দ্বারা আমরা প্রকৃষ্টভাবে পুত্ৰপুত্রী লাভ করব ইত্যাদি মন্ত্রে বলা হচ্ছে যে, প্রজাপতি মিথুন হতে প্রজা লাভ করেছিলেন, সেইরকমে যজমানও মিথুন হতে প্রাপ্ত হন। বেদোহসি বিক্তিরসি বিদেয় কর্মাসি করুণমসি ক্রিয়াসং.. অর্থাৎ হে দর্ভময়! আপনি বেদ-নামক হন, আপনি দ্রব্য লাভের সাধন, আপনার প্রসাদে আমরা ধন লাভ করব–ইত্যাদি মন্ত্রে বোঝানো হয়েছে যে, দেবগণ অসুরবর্গের পূর্ব ও পরলব্ধ ধন যেস্থানে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তা অবগত হয়েছিলেন। যার দ্বারা ধন জ্ঞাপিত হওয়া যায়, এই অর্থে বেদ শব্দের (বেদত্ব) নিষ্পন্ন হয়েছে। শত্রুগণের গৃহ ইত্যাদি সকল বস্তু আমি লাভ করব–ইত্যাদি মন্ত্রে যজমান সেই বস্তুগুলির নাম মন্ত্রের মধ্যে গ্রহণ করে সেই মন্ত্র পাঠ করবেন (মন্ত্ৰমধ্যে গৃহীত্বা বিদেয়েত্যেতৎপদং পঠেৎ)। এইজন্য মন্ত্রের শেষভাগে সহস্ৰ সংখ্যক পদের উচ্চারণ প্রশস্ত। ঘৃতবন্তং কুলায়িনং রায়স্পোষং সহনিং বেদো দদাতু বাজিন–অর্থাৎ হে বেদ! আপনি আমাকে ধনপুষ্টি দান করুন, আপনি আমাকে ঘৃত ইত্যাদি ভোজ্য-সাধনে সমৃদ্ধ করুন, নিবাসের হেতুভূত বহু গৃহ দান করুন, সহস্র লক্ষ ইত্যাদি সংখ্যোপেত ভোজ্য অন্নে সমৃদ্ধ করুন–ইত্যাদি মন্ত্রে সহস্র পশু প্রাপ্ত হওয়া যায়। যিনি এইটি জ্ঞাত আছেন তিনি সর্বতঃ পুত্র ও অন্নে সমৃদ্ধ হন (প্রজায়াং সন্ততৌ সর্বতঃ পুত্ৰোহন্নসমৃদ্ধো জায়তে) ॥৪॥
[সায়ণাচার্য বলেন–পঞ্চমে ত্বপ্যায়নাদিমন্ত্ৰা ব্যাখ্যায়ন্তে। অর্থাৎ–এই পঞ্চম অনুবাকে পূর্বোক্ত ষষ্ঠ প্রপাঠকের পঞ্চম অনুবাকের আপ্যায়ন ইত্যাদি মন্ত্রসমূহের ব্যাখ্যা প্রদত্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- যজ্ঞের অসম্পূর্ণতার কারণে যজমানের পক্ষে যজ্ঞফল প্রাপ্তির অভাব ঘটে বলে তাঁর প্রজা (সন্তানসন্তুতি), অন্ন ইত্যাদির অভাব দেখা যায়; এবং যজ্ঞের পূর্ণতায় তার প্রজা ও অন্ন ইত্যাদির বৃদ্ধি ঘটে। প্রজাপতেৰ্বিভান্নাম… অর্থাৎ প্রজাপতি-সম্বন্ধিনি বিভান নামক এই ভূলোকে বা কর্মভূমিতে যজমানরূপী আমার সাথে তোমাকে (ধ্রুবাকে, পূর্ণপাত্রকে) স্থাপন করছি–ইত্যাদি মন্ত্রে বিভান শব্দের দ্বারা এই ভূলোককে বোঝানো হয়েছে, এই ভূলোক কর্মভূমি বলে প্রজাপতির বিভাগ নামক লোকে স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। এই বেদিতে হবিঃ ধারণের জন্য এটি যজমানের স্থান (যজমানস্থানত্ব), এই উচ্চ স্থানে বিস্তীর্ণ তৃণ ও জল বিদ্যমান। এই বেদির ও মধস্থেলে যে পূর্ণপাত্র স্থাপিত হয়, তা তৃণ ও জলের দ্বারা সমৃদ্ধ করতে হবে (তৃণসমৃদ্ধিং সোদকমুদকসমৃদ্ধিং চ কুরুতে)। সদসি সমে… অর্থাৎ হে পূর্ণপাত্র! তুমি শোভনস্বরূপ হও। অতঃপর আমাকে যজ্ঞফল প্রদানের দ্বারা আমার পক্ষেও সংযমন ইত্যাদি কার্যকারী হও–ইত্যাদি মন্ত্রে যজ্ঞ নিষ্পন্ন হওয়ার জন্য জলের যজ্ঞসাধনত্ব এবং জীবনদানের হেতুভূত হওয়ায় অমৃতত্ব অভিলক্ষিত হয়েছে। সেই যজ্ঞরূপ অমৃত আমি যেন ধারণ করতে পারি (স্বস্মিন্ধারয়তি)। সর্বানি বৈ ভূতানি ব্রতমুপয়ন্তমপন্তি… অর্থাৎ সকল প্রাণী যজ্ঞ দর্শন করতে আসে, পূর্বদিকে দেবতাভিমানী ঋত্বির্গ আমার যজ্ঞের শোধন করুন–ইত্যাদি মন্ত্রে দেবগণ পিতৃগণ ইত্যাদির মার্জন প্রতিপদনের দ্বারা সকলের সাথে অবyথ প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। পূর্বকালে দেবগণ বিষ্ণুকে মুখ্য করে গায়ত্রী-ত্রিষ্টু-জগতী ইত্যাদি ছন্দ-অভিমানী দেবগণের সহযোগে অন্যের অজেয় লোকসমূহ জয় করেছিলেন, এই নিমিত্ত যজমান বিষ্ণুর ক্রম গ্রহণ করেন, তাতে তিনি বিষ্ণুর মতো সকল লোক জয় করেন। বিষ্ণোঃ ক্রমোহস্যভিমাতিহা… অর্থাৎ আপনি বিষ্ণুর ক্রম–ইত্যাদি মন্ত্রের অভিপ্রায় এই যে, গায়ত্রী ইত্যাদি ছন্দ-অভিমানী দেববর্গ পৃথিবী ইত্যাদি লোকের স্বামিত্বের জন্য তাদের সহযোগে সকল লোক জয় করতে সমর্থ ॥৫॥..
[সায়ণাচার্য বলেন–উপস্থানাদিমন্ত্ৰা ষষ্ঠে ব্যাখ্যায়ন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাকে পূর্বোক্ত ষষ্ঠ প্রপাঠকের ষষ্ঠ অনুবাকের উপস্থান ইত্যাদি মন্ত্রের ব্যাখ্যা উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- অগন্ম সুবঃ সুবরগন্ম অর্থাৎ হে আহুনীয়! আপনার প্রসাদে প্রথমে কর্মফল ভোগের স্থান স্বর্গলোকে গমন করব–ইত্যাদি মন্ত্রে আদরের আধিক্যের কারণে দ্বিরুক্তি করা হয়েছে। এতে স্বর্গলোক অবশ্যই প্রাপ্ত হবো–এই কথাই প্রজ্ঞাপিত হয়েছে (দ্বিরুক্ত্যাহদরস্য প্রতীতেঃ সৰ্বৰ্থা প্রাপ্লেত্যেব)। সদৃশস্তে মা ছিৎসি যত্তে তপস্তস্মৈ তে মাহবৃক্ষি অর্থাৎ আপনার দর্শন হতে যেন বিচ্ছিন্ন না হই; আপনার নিমিত্ত যে তপস্যা আমরা সম্পাদিত করেছি, তার ফলস্বরূপ আপনার অনুগ্রহ হতে যেন বিচ্ছিন্ন না হই–ইত্যাদি মন্ত্রে তপঃ শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায়–এই যজুমন্ত্র হতেও যেন বিচ্ছিন্ন না হই–এমন প্রার্থনা করা হয়েছে! সুভূরসি শ্রেষ্ঠো রশ্মীনামায়ুৰ্ঘা অস্যায়ুৰ্ম্মে ধেহী অর্থাৎ হে আদিত্য! আপনি সুষ্ঠুভাবে উদিত হয়ে থাকেন, রশ্মিযুক্ত চন্দ্র ইত্যাদির মধ্যে আপনিই শ্রেষ্ঠ। আপনি আয়ুর স্থাপনকর্তা, আমাতে আয়ু স্থাপন করুন–ইত্যাদি মন্ত্রে আমাতে আয়ু স্থাপন করুন ইত্যাদি আর্শীবাদ প্রতীয়মান হয়েছে। যো বিষ্ণুক্রমা ক্ৰমতে… অর্থাৎ যিনি বিষ্ণু-ক্রমে পাদবিক্ষেপ করেন, তিনি এই লোক হতে স্বর্গলোকে গমন করেন ইত্যাদি মন্ত্রে বলা হচ্ছে– স্বর্গলোকের নিমিত্ত বিষ্ণুক্রম অনুসরণ করলে এই লোক হতে প্রচ্যুতি ঘটে। এই প্রচ্যুতি পরিহারের উপায়স্বরূপ ব্ৰহ্মবাদিগণ পরস্পর বলে থাকেন–যে যজমান এই লোকের বৈরিগণকে জয় করে বিষ্ণুক্রমের দ্বারা স্বর্গারোহণ করলে পুনরায় এই মনুষ্যলোকে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন, সেই যজমান বিষ্ণুক্রম বিষয়ে চতুর। ইদমহমমুং ভ্রাতৃব্যমাডভ্যা… অর্থাৎ যে শত্রু পৃথিবী ইত্যাদি লোকয়ে পূর্ব ইত্যাদি দিকে আমার বিরোধ আচরণ করে, আমার অন্ন জোরপূর্বক অপহরণ করে, আমি তাকে এই পৃথিবী ইত্যাদি লোক হতে অপসারিত করব–ইত্যাদি মন্ত্রে এই ভূলোকে প্রত্যাবর্তনের (বা অবতরণের) কথা ব্যক্ত হয়েছে। সং জ্যোতিষাহভুবম অর্থাৎ আমি আদিত্যের জ্যোতিঃর সাথে মিলিত হবো–ইত্যাদি মন্ত্রে এই লোকে জ্যোতির সাথে সংগত হয়ে আমি প্রতিষ্ঠিত হবে–এটাই প্রতীয়মান হয়েছে। ঐন্দ্রিমাবৃতমন্ববৰ্ত্তে অর্থাৎ ইন্দ্রবৎ পরম ঐশ্বর্যযুক্ত আদিত্যের আবর্তনের আমি অনুবর্তন করছি–ইত্যাদি মন্ত্রে আদিত্য হচ্ছেন ইন্দ্র, তার আবর্তন আমি অনুসরণ করব। পরম ঐশ্বর্য ইত্যাদি যুক্ত হওয়ায় আদিত্যকে ইন্দ্র বলা হয়েছে (পরমেশ্বৰ্যযোগাদাদিত্যস্যেন্দ্ৰত্বম)। দক্ষিণ দিক হতে বামদিকে প্রদক্ষিণ করাই বিধান। পুরুষের দক্ষিণভাগে অতিশয় সামর্থ্য থাকার জন্য সেই দিক হতেই অনুবর্তন করা হয়। যেহেতু পুরুষের দক্ষিণভাগে অতিরিক্ত বীর্য বা শক্তি থাকে, সেইজন্য লোকেও সকল ব্যাপারে দক্ষিণ হস্তের বীর্যাতিশয় উপলভ্য (জ্ঞাপিত হয়। সমহং প্রজয়া সং ময়া প্রজা… অর্থাৎ আমি সন্ততিজনের সাথে সংগত (মিলিত) হবো; সেই সন্ততিজনেরাও আমার সাথে সংগত হোক–ইত্যাদি মন্ত্রে মন্ত্রোচ্চারক ও তার সন্ততি, উভয়ের মিলনের প্রার্থনা করা হয়েছে। সমিদ্বো অগ্নে… অর্থাৎ হে অগ্নি! আপনি এই সমিধের দ্বারা আমার নিমিত্ত দীপ্য হোন। আপনার দীপ্তকারী আমিও আপনার প্রসাদে দীপ্ত হবো–ইত্যাদি মন্ত্রে অগ্নিতে সমিধ প্রদান পূর্বক আপনিই দীপ্ত হবার প্রার্থনা করা হয়েছে। বসুমান্যজ্ঞো বসীয়াভূয়াস অর্থাৎ হে অগ্নি! এই যজ্ঞ আপনার প্রসাদে ধনযুক্ত হয়েছে; আমিও আপনার প্রসাদে তার অপেক্ষা অধিক ধনযুক্ত হবো।–ইত্যাদি মন্ত্রে অতিশয় ধনবান হবার প্রার্থনা জ্ঞাপিত হয়েছে। গৃহে বহুবিধ জন্তুর (পিপীলিকা ইত্যাদি বহু ক্ষুদ্র প্রাণীর) বিনাশজনিত পাতকের সম্ভাবনা থাকে। সেইজন্য যজমান হে অগ্নি! আমাকে দীর্ঘ আয়ু প্রদান করুন–ইত্যাদি মন্ত্রে গার্হপত্য অগ্নির সমীপে পাপক্ষয়ের নিমিত্ত হোম ইত্যাদি কর্ম অনুষ্ঠান করে অগ্নি ও পবমান দেবতার নিকট শুদ্ধ প্রার্থনা করে থাকেন। অগ্নে গৃহপতে সুগৃহপতিরহং… অর্থাৎ হে গৃহপতি অগ্নি! আপনার দ্বারা অনুগৃহীত হয়ে আমি সুগৃহপতি হবো। আপনি আমারূপী গৃহপতির দ্বারা পুজিত হয়ে সুষ্ঠু গৃহপতি হোন। শতসংবৎসরব্যাপী অগ্নিযাগ সম্পাদিত করে অনুৎপন্ন বহু পুত্র ইত্যাদির নিমিত্ত আপনার সেই উৎপত্তি প্রকাশের সামর্থ্যরূপ আশিষ আকাঙ্ক্ষা করছি–ইত্যাদি মন্ত্রে শতবৎসরব্যাপী পুত্র ইত্যাদির অন্ন লাভের ও অনুৎপন্ন (ভাবীকালে জন্মাবে, এমন) ব্রহ্মতেজঃসম্পন্ন পুত্র লাভের প্রার্থনা জ্ঞাপিত হয়েছে। যে পুত্র এখনও জন্মায়নি, তার নাম না থাকার জন্য সন্তান শব্দ এবং জাত পুত্রের সম্পর্কে তার নাম উল্লেখ কর্তব্য। (অজাতস্য পুত্রস্য বিশেষনামাভাবাত্তম্ভব ইত্যেদেব সামান্যনাম গৃহীয়াৎ..)। যিনি যজ্ঞ অনুষ্ঠিত করে তা বিসর্জন দেন না, তিনি সেই যজ্ঞের ফল প্রাপ্ত হন না। যিনি আপনাকে যুক্ত করেছেন, তিনি আপনাকে মুক্ত করবেন। প্রজাপতি যজ্ঞ যুক্ত করেছেন, সেই প্রজাপতি প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত আপনাকে মুক্ত করবেন ইত্যাদি যজ্ঞবিমোচক মন্ত্রে যজ্ঞ বিসর্জনের কথা উক্ত হয়েছে। ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট যে ব্ৰত গৃহীত হয়, তা বিসর্জন না করা হলে, তা যজমানকে প্রদগ্ধ করতে সমর্থ হয়; এইজন্য অগ্নে ব্রতপতে ইত্যাদি মন্ত্রপাঠের দ্বারা এই ব্রত বিসর্জন করতে হয়। তাহলে তা শীতল (বা শান্ত) হয় এবং দগ্ধ করে না। যজ্ঞ বিমুখ হলে আর নিবৰ্ত্তিত (প্রত্যাবর্তিত) হন না, কিন্তু পুনরালম্ভমন্ত্রবাদী যজমানের (অর্থাৎ পুনরালম্ভ মন্ত্র যিনি জ্ঞাত আছেন, এমন যজমানের) নিকট পুনরায় প্রত্যাবর্তিত হয়। যজ্ঞো বভুব …অর্থাৎ যজ্ঞ হয়েছিল-ইত্যাদি পুনরালম্ভ মন্ত্র পাঠ করলে যজ্ঞ পুনরায় লব্ধ হয় (পুনরালম্ভস্তেনৈবৈনং পুনরা লভতে)। যে যজমান অগ্নিকে আহিত করে তার সাথে সভারহিত হন (আহিতাগ্নিরপি স সভারহিতো ভবেৎ), তিনি অবরুদ্ধ হয়ে অস্বাধীন (স্বাধীনতাহীন) হন। এই স্থলে সভা অর্থে রাজার ন্যায় অমাত্য যোদ্ধা ইত্যাদি যুক্ত (রাজ) সভা নয়, সেইটি ব্রাহ্মণোচিত সভা, কারণ সেইটি যজ্ঞনিম্পাদক দ্বিপাদ ও চতুষ্পদ পশুসমূহ লাভের সভা। যজ্ঞ সম্পন্ন করে বলতে হয় (ক্ৰয়াৎ)–হে অগ্নি! আমি বহু গো, অবি, অশ্ব ইত্যাদি (সমৃদ্ধ) সভা লাভ করব। এর ফলে যজমান পশুবান ও অনুশালী পুত্রপৌত্র ইত্যাদি লাভ করে থাকেন ॥৬॥
মর্মার্থ- হে সবিতা দেব! আপনি অন্তর্যামি হয়ে আমাদের বাজপেয় যজ্ঞের প্রবর্তন করুন; যজ্ঞপতিকে (যজমানকে) সৌভাগ্যানুষ্ঠানরূপ ঐশ্বর্যের জন্য প্রবৃত্ত করান। আপনি দিব্য, বৃষ্টির দ্বারা যজ্ঞের প্রবর্তক। আপনার অনুগ্রহে যে বায়ুদেব প্রাণিগণের জ্ঞানসমূহকে শোধন করেন, তিনি আমাদের জ্ঞানকে, পুনরায় শোধন করুন। আপনার অনুজ্ঞায় বাচস্পতি (বৃহস্পতি) এই কর্মে আমাদের বাজপেয় মন্ত্র দান করে সুমতি প্রদান করুন। হে রথ! তুমি ইন্দ্রের বৈরিঘাতী বজ্রতুল্য, তুমি বৃত্রের হননকারী; ইন্দ্র যে রথে আরোহণ করে বৃত্রাসুরকে বধ করেছিলেন, সেই রথ তুমি (স এব ত্বমসি)। তোমার সহকারিগণের সাথে এই যজমান (আমি) যজ্ঞের শত্রুগণকে বধ করব। অন্নের উৎপত্তির নিমিত্ত অন্নের নির্মাণকত্রী বেদিরূপা অদিতির (অর্থাৎ পৃথিবীর) আমরা স্তুতি করছি। যে পৃথিবীতে সকল ভূতজাত (প্রাণিগণ) প্রবিষ্ট হয়ে অবস্থান করছে, তাতে আমাদের ধারণকর্তা সবিতাদেব অনুমোদন করুন। জলে শরীর প্রক্ষালিত হয়। জলের মধ্যে অপমৃত্যুনিবারক ও লোগনিবারক সারপদার্থ আছে। হে অন্নবস্ত অশ্বগণ! জল-সম্বন্ধিনী প্রশংসা, যথা–অমৃতত্ব ভেষজত্ব সদৃশী অন্যান্য গুণবত্বও, তোমাদের হোক। তোমরাও তার মতো স্বভাব প্রাপ্ত হও। হে রথ! বায়ু মনু ও পঞ্চবিংশতিসংখ্যক গন্ধর্ব মিলিত হয়ে পূর্বে তোমাতে অশ্ব যোজিত করেছিলেন, আমিও তোমাকে যুক্ত করব। তারা (সেই অশ্বগণ) তোমাকে বেগযুক্ত করুক। হে অশ্ব! তুমি জলের পৌর এবং শীঘ্র গমনশীল। প্রধান ঊর্মি বা তরঙ্গ তোমার প্রতি গমন করছে। তুমি অন্নের দাতা, যজমানকে অন্ন দান করো। হে রথ! তুমি বিষ্ণুর ক্রমতুল্য (বিষ্ণুমামতে), বিষ্ণুর বিক্রমের ন্যায় জয়শীল তুমি, তুমি বিষ্ণুর বিজয়সদৃশ বিজয়ের কারণ স্বরূপ। রথের দুটি চক্র নিরন্তর ঘূর্ণিত হচ্ছে, সে দুটি শব্দযুক্ত ও বায়ুর পুরোদেশে সঞ্চরণ করছে (অর্থাৎ বায়ু অপেক্ষাও শীঘ্ৰতর গমনশীল হচ্ছে)। দুরে হেতি, ইন্দ্রিয়বান্ ও পতত্রী নামক অগ্নিক্রয় আমাদের কর্মযোগ্য করে তুলুন ॥৭॥
মর্মার্থ- সকলের প্রেরণকর্তা সবিতা দেবের অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে অন্নের জয়কারী বৃহস্পতির। অনুগ্রহে অন্ন জয় করব। সবিতা দেবের অনুজ্ঞায় অন্নের জয়কারী বৃহস্পতির আনুকূল্যে বৃহৎ স্বর্গতুল রথে (বা রথচক্রে) আরোহণ করব। হে দুন্দুভি! ইন্দ্র যাতে জয়লাভ করেন, তুমি তেমন শব্দ করো। অশ্বের প্রেরণকর্তা, অন্নের সাধনকারী হে কশা (চাবুক)! তুমি অশ্বগণকে সমরে প্রেরণ করো (ত্বমশ্বান্ সমৎসু বাজয় গময়)। তুমি ধাবনকুশল, সংগ্রামের প্রাপক ও অন্নযুক্ত হও। হে অশ্বগণ! অন্নসম্পাদনের নিমিত্ত তোমরা ত্বরায় ধাবন করো; মরুৎ-গণের অনুজ্ঞায় অন্নকে জয় করো। শীঘ্র ধাবনের দ্বারা বিশেষ ভাবে বহু যোজন দীর্ঘ (পথ) পরিমিত বা অল্প করো! শীঘ্রগতির দ্বারা পথগুলিকে স্কয়ত অর্থাৎ শব্দরুদ্ধ করো, এবং পীড়িত করো। হে অশ্বগণ! প্রতি অন্নের জন্য, ধনের জন্য আমাদের রক্ষা করো। ব্রাহ্মণের ন্যায় স্নানের দ্বারা শুদ্ধ ও অমৃত বা সত্যের গন্তব্যদেশ সম্পর্কে জ্ঞাতা হে অশ্বদেবগণ! তোমরা ধাবনের পূর্বে মধুসম চরুরস (ঘৃত) পান করো এবং তুষ্ট হও। তৃপ্ত হয়ে দেবযান পথের প্রতি গমন করো। হে গতিকুশল, সর্বত্র আহ্বান-শ্রবণকারী অশ্বগণ! তোমরা সকলে আমাদের আহ্বান (যজ্ঞের আহ্বান) শ্রবণ করো। প্রভূত অনুরাশির দাতা, যজ্ঞের প্ৰদাতা, আমাদের ধন দান করতে ইচ্ছাবান অশ্ববর্গ সংগ্রামে শত্রুর প্রচুর ধন হরণপূর্বক আমাদের সুখকর হোক। দেবতাগণের অর্থনকারী অর্থাৎ পূজাকারী, শীঘ্র-ধাবনকারী সেই অশ্বগণ সপবৎ, বৃকবৎ যজ্ঞধ্বংসকারী রাক্ষসগণকে ভগ্ন করে ক্ষিপ্রতার সাথে আমাদের নিকট হতে পৃথক করুক; আমাদের রোগ বিযযাজিত করুক। গ্রীবা, কক্ষ ও আস্যে যথাযথ (তত্ত) রজ্জ্ববিশেষের দ্বারা বদ্ধ এই অশ্ব কশার দ্বারা তাড়নাপ্রাপ্ত হয়ে আরোহীর অভিপ্রায় অনুসারে পথের অবরোধক পাষাণ ইত্যাদি অতিক্রম পূর্বক উচ্চনীচ বক্র পথে (মার্গাণামঙ্কাংসি লক্ষণানি কুটিলানি নিম্নেন্নতানি চ) শীঘ্র ধাবন করছে। গন্তব্য পথ অতিক্রম করতে ইচ্ছাকামী শীঘ্র ধাবনকারী এই অশ্বের দেহলগ্ন অলঙ্কাররূপ বস্ত্র চামর ইত্যাদি সজ্জাগুলি উড্ডীয়মান পক্ষীর পক্ষের ন্যায় বিস্পষ্ট পরিদৃষ্ট হচ্ছে এবং শ্যেনবৎ দ্রুত ধাববান পর্বত ইত্যাদি অতিক্রমকারী এই অশ্ব অত্যন্ত বলের সাথে (অত্যন্তবলেন) ত্বরিতে ধাবিত হচ্ছে। অন্নের উৎপতি আমার নিকট প্রত্যাগত হোক (প্রত্যাজগম্যাদাগচ্ছতু)। দাবাপৃথিবী জগতের সুখভাব সহ আমার নিকট আগত হোক। আমার পিতা মাতা চিরজীবনের জন্য আমার নিকট সমাগত হোন (চিরজীবিত্বায় সমাগচ্ছতা), এবং সোম অমৃতত্বের নিমিত্ত আমার দেবত্ব প্রাপ্তির জন্য আগমন করুন। অন্ন জয়ের উদ্দেশ্যে ধাবমান অশ্বগণ, যুদ্ধে গমনপূর্বক অন্ন জয় করে তোমরা বৃহস্পতির ভাগ চরুর ঘ্রাণ গ্রহণ করো। (মুয়ং বৃহস্পর্ভোগমিমং চমবজিত)। হে অশ্বগণ! অন্নের নিমিত্ত যুদ্ধে ধাবনকারী, অন্ন জয়কারী তোমরা বৃহস্পতির এই ভাগের দ্বারা শুদ্ধি লাভ করো। হে রথ। ইন্দ্রের অনুগ্রহে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলে, সেই যুদ্ধগমনের প্রতিজ্ঞা সত্য হয়েছে। হে বনস্পতির বিকার দুন্দুভিগণ! তোমরা যাগস্বামী ইন্দ্রকে অগ্নের জিতবা (বিজয়ী) করেছ, এক্ষণে মুক্ত হয়ে তোমরা বিশ্রাম গ্রহণ করো ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন-অষ্টমে রথধাবনমুক্তং নবমে যুপারোহণ-মুচ্যন্তে। অর্থাৎ–অষ্টম, অনুবাকে রথধাবন উক্ত হয়েছে, এবং এই নবমে যুপে আরোহণের কথা বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে বস্তু! তুমি রাজস্থানীয় যজমানের আবরণ হও। হে দর্ভময় পট (বস্ত্র)! রাজমহিষী স্থানীয় পত্নী-শরীরের শীতনিবারণের কারণ হও। হে জায়া! তুমি এখানে আগমন করো, আমরা স্বর্গপ্রাপ্তির কারণস্বরূপ সোপানে আরোহণ করবো-যজমান যজ্ঞারম্ভে এইরকম আহ্বান করলে পত্নীও সেইভাবে বলেছিলেন। বাজপ্রসবীয়ের জন্য দ্বাদশসংখ্যক হোম করণীয়। সেগুলির নাম, যথা–বাজ (অন্ন), প্রসব (অন্নের উৎপত্তি), অপিজ (পুনরুৎপতি), ক্রতু (ভোগ ইত্যাদি বিষয়ে যাগ), সুব, মূর্ধা, ব্যশিয়, অত্যায়ন, আত্য, ভৌবন, ভুবন ও অধিপতি। বাজ ইত্যাদি শব্দে সম্বৎসরের চৈত্র ইত্যাদি নামবিশেষ বলে কারো কারো অভিমত, সেই সেই কালে সকলে বা অনুক্ত কাল ইত্যাদি দেবতা তুষ্ট হোন–এইরকমই অর্থ। এই যজ্ঞের দ্বারা আয়ু, প্রাণ, আপান, ব্যান, চক্ষু, শ্রোত্র, মন, বাক, আত্ম ও যজ্ঞ আপন আপন প্রয়োজন সামর্থ্য লাভ করুক (আয়ুরাদায়ঃ স্ব স্ব প্রয়োজন সমর্থ ভবতু)। এই ঊর্ধ্বারোহণের দ্বারা আমরা স্বর্গপ্রাপ্ত হবো, আমরা স্বৰ্গাবস্থিত দেবতাগণকে প্রাপ্ত হবো। আমরা অমর হবো। আমরা প্রজাপতির প্রজা (সন্তান) হবো। অতঃপর প্রজাপতির প্রীতিবিষয়ক সন্তান আমরা এই ভূলোকে যজ্ঞানুষ্ঠানপরায়ণ হবো। আমি পুত্র ইত্যাদির সাথে মিলিত হবো, পুত্র ইত্যাদিও আমার সাথে সংগত হোক। আমি ধনপুষ্টির সাথে সংগত হবো, ধনপুষ্টিও (অর্থাৎ ধন ও তার পোষণ সামর্থ্য) আমার সাথে যুক্ত হোক। অন্নভোজনের সামর্থ্যের নিমিত্ত, সংগ্রামের সামর্থ্যের নিমিত্ত এবং সংগ্রামে জয়প্রাপ্তির সামর্থ্যের জন্য তোমাকে তাড়না করছি। তুমি অমৃতের কারণভূত হও, তুমি পুষ্টির হেতুভূত হও, তুমি সন্তান-সন্ততির উৎপত্তির মূলীভূত হও॥৯॥
[সায়ণাচার্য বলেন–দশমোহন্নহোমা উচ্যন্তে। অর্থাৎ-দশম অনুবাকে অন্নহোম সম্পর্কে বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- ভূতিকামী ব্যক্তি (অর্থাৎ যিনি অণিমা ইত্যাদি অষ্ট ঐশ্বর্য কামনা করেন, তিনি) বায়ুদেবতার নিমিত্ত বায়ব্য অর্থাৎ শ্বেতবর্ণ পশু সংগ্রহ করবেন। বায়ু অতি ক্ষিপ্রগামী (ক্ষেপিষ্ট) দেবতা। শ্বেত পশু তার অতি প্রিয় বলে তা তার আপন ভাগ (স্বকীয়ে ভাগঃ)। যে যজমান বায়ুর ভাগের দ্বারা তার সেবা করেন, তাতে বায়ু তুষ্ট হয়ে তাকে ঐশ্বর্য প্রদান করেন, (যজমানমৈশ্বর্যং গময়তি…)। তাঁর অনুগ্রহে তিনি ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হন (তদনুগ্রহাদয়ং ভবত্যেবৈশ্বং প্রাগোত্যেব)। এই বিষয়ে অভিজ্ঞ জন বায়ুর পূর্বোক্ত বিশেষণ অর্থাৎ বায়ুর অত্যন্ত ক্ষিপ্রকারিত্ব গুণের কথা বলে থাকেন। সেই উগ্র দেবতা যজমানকে প্রদগ্ধ করতেও সমর্থ। (এই) লোকে দেখা যায়, বায়ু ক্ষিপ্রভাবে বাহিত হলে জাজ্বল্যমান অগ্নি গৃহ ইত্যাদি দগ্ধ করেন, এই জন্যই অগ্নির দ্বারা বায়ুর দাহকত্ব কথিত হয় (অতোহগ্নিদ্বারা বায়োদাহকত্ব)। তা পরিহারের জন্য (অর্থাৎ বায়ু দ্বারা দগ্ধ হওয়া হতে রক্ষা পাওয়ার নিমিত্ত) নিযুৎ বিশেষণ যুক্ত অশ্ব দ্বারা বায়ুর সেবা করণীয়। অতএব রথে নিযুক্ত নিযুৎ নামক অশ্বসমূহ বায়ুর ধারক হওয়ায়, তারা ধীর গতিতে চলমান হয়ে বায়ুকে সংযত করতে পারে। এইভাবে নিযুৎ-সহ বায়ুকে হরিনের দ্বারা যজমানও ধৃতি অর্থাৎ ধৈর্য ধারণ পূর্বক অবিনাশী (এবাবিনষ্ট) হয়ে ঐশ্বর্য প্ৰা সেই ঐশ্বর্য তাঁকে প্রদাহিত করতে পারে (অপ্রদাহায় ভবত্যেব)। নিযুৎ-যুক্ত বায়ুর অনুগ্রহে-ধেযুক্ত জমান স্বকীয় পুরুষগণকে নিয়ন্ত্রিত করতে এবং স্বকীয় দ্রব্য ইত্যাদি অবিনাশভাবে পালন করতে সমর্থ হন এবং সেই কারণে তাঁর মনে কখনও সন্তাপরূপ প্রহাদ হয় না (সন্তাপরূপঃ প্রদাহঃ সর্বথা না ভবত্যেব)। গ্রামকামী (অর্থাৎ গ্রাম লাভের কামনা পূর্বক) নিযুৎ-মুক্ত বায়ুর সেবা করবেন। বায়ু প্রজাগণকে অর্থাৎ গ্রামবাসীদের নাসিকায় রঞ্জু বন্ধন করে ঘূর্ণন করিয়ে থাকেন (যেমন লোকে বলীবদের নাসিকাছিদ্রে রজ্জ্ব বন্ধন করে সুখে নিয়ে যাওয়া হয়)। যাঁরা নিযুৎ-যুক্ত বায়ুকে তার ভাগের (অর্থাৎ তার প্রিয় শ্বেতবর্ণ পশুর) দ্বারা সেবা করেন, বায়ু তুষ্ট হয়ে সেই প্রজাগণকে অর্থাৎ গ্রামবাসীগণকে যজমানের অধীন করে দিয়ে থাকেন (যজমানাধীনা করোতি)। এর ফলে যজমান গ্রামস্বামী (গ্রামের অধিপতি) হন। নিযুৎ-বৎ গুণযুক্ত পশু সহযোগে বায়ুকে তার ভাগ প্রদান করলে গ্রামস্থিত সকল প্রজা বা গ্রামবাসী এই যজমানের অনুরক্ত হয়ে থাকে, কখনও কেউ (তার প্রতি) অনুরাগশূন্য হয় না (ন তু তাঃ কদাচিদপৗপরক্তা ভবতি)। প্রজা বা অপত্য কামনায় নিযুৎ-যুক্ত বায়ুর সেবা কর্তব্য। প্রাণ বায়ু হৃদয়ে ও আপন বায়ু গুহ্যে অবস্থান করে। নিযুবায়ু প্রজার নিকট হতে প্রাণ ও আপন বায়ুকে অপসৃত করে নেন, সেই কারণে অনুকূল পত্নীযুক্ত হওয়া সত্বেও সেই ব্যক্তি অপত্য লাভ করতে পারেন না। নিযুৎ-যুক্ত বায়ুর ভাগ প্রদান করে যে যজমান তাকে তুষ্ট করেন, তিনি (অর্থাৎ সেই বায়ু) যজমানের রেতে (তদীয়রেতসি) প্রাণ ও অপান যুক্ত করে অপত্য প্রজনন করেন। তখন যজমান পুত্রলাভ করেন (ততো যজমানঃ পুত্রং লভতে)। দীর্ঘরোগযুক্ত পুরুষ নিযুৎ-যুক্ত বায়ুর সেবা করবেন।
যে পুরুষ দীর্ঘরোগযুক্ত হন, তার হতে প্রাণ ও অপান বায়ু নিষ্ক্রান্ত হতে উদ্যত হয়। সেইরকম ব্যক্তি নিযুৎ-যুক্ত বায়ুর ভাগ প্রদান পূর্বক তাঁর নিকট গমন করেন, বায়ু তাতে প্রাণ ও অপান বায়ু চিরকালের জন্য স্থাপন করেন (চিরং স্থাপয়তি); যদি মুহূর্তমাত্র তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন, তথাপিও বায়ুর অনুগ্রহে তিনি জীবিত হন। সৃষ্টির পূর্বে প্রজাপতি একাই ছিলেন; তিনি প্রজা ও পশুর সৃষ্টি কামনায় আপন শরীর হতে পটসদৃশীব (মেদ, চর্বি) উদ্ধৃত করে সেই বপা অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত করলেন। তখন সেই দগ্ধ বলা হত শৃঙ্গরহিত অজ সমুৎপন্ন হলো। সেই অজকে তার অনুরূপ (স্বাত্মরূপাং) দেবতার উদ্দেশ্যে অর্পণ করেন। সেই কর্মের সামর্থ্যে তিনি প্রজা ও পশু লাভ করেন। যিনি প্রজা ও প কামনা করবেন, তিনি প্রজাপতির উদ্দেশে শৃঙ্গরহিত অজু অর্পণ করলো প্রজাপতিকে তার ভাগ প্রদান পূর্বক সেবা করলে তিনি প্রজা ও পশু উৎপন্ন করে থাকেন। যাদের শ্মশ্রু থাকে, তারা পুরুষের রূপ; যারা শৃঙ্গহীন, তারা অশ্ব ইত্যাদির রূপ; যারা নিম্ন দন্তপাটিযুক্ত, তারা গো ইত্যাদির রূপ; যারা মেষের খুরের ন্যায় খুরবিশিষ্ট, তারা অজ জাতির রূপ–এইগুলি গ্রাম্য পশু; এইভাবে প্রজাপতি সকল প্রজা ও পশু লাভ করেন। যিনি ত্ৰৈতমা অর্থাৎ তিনটি পশু একত্রে লাভ করতে কামনা করেন, তিনি সোমদেব ও পূষাদেবতার উদ্দেশে এইরকম তিনটি পশু প্রদান করবেন। অজার দুটি স্তন প্রসিদ্ধ, সেইজন্য তার দুটি বস জাত হয় এবং তারা দুটি স্তন পান করে; তৃতীয় বৎস জাত হলে লক্ষ করতে হবে যে তার (সেই অজার) শরীরে উর্জ অর্থাৎ বলের ও পুষ্টির অধিক্য আছে। সোমদেব রেতের ধারক, পুষা পশুগণের পোষক বা প্রজনয়িতা; সোম রেতঃ দান করে ও পূষা পশুগণের প্রজনন করেন। ফলের মধ্যে উদুম্বর যেমন বহুফলযুক্ত, তা ক্ষীররূপ; ক্ষীরের দরা পশুলাভ ও সেইরকম (ক্ষীরদ্বারণে পশুরপি তথাবিধঃ)। অতএব যজমানের নিমিত্ত উদুম্বররূপ (উদুম্বররূপয়া) ক্ষীরের দ্বারা পশুলাভ সম্পাদন করতে হয় (সম্পাদয়তি) ॥১।
[সায়ণাচার্য বলেন-তানেতান পশুন প্রথমানুবাকে বিধায় দ্বিতীয়ে বরুণগৃহীতাদীনাং পশব উচ্যন্তে। অনুবাক-২৪ যাগযোগ্য পশুর কথা উক্ত হয়েছে; দ্বিতীয়ে বরুণ ইত্যাদি কর্তৃক গৃহীত পশুর কথা বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- প্রজাপতি প্রজাগণকে সৃষ্টি করলেন। তারা পরায়ুখ হয়ে তার নিকট গমন না করে বরুণের নিকট গমন করল। সেই প্রজাপতি বিরুণের নিকট যাচ্ঞা করলেন, যে প্রজাগণ তোমার অনুগ্রামী হয়েছে তাদের পুনরায় আমাকে প্রদান করো। কিন্তু তিনি তা দিলেন না (বরুণস্তু ন দদৌ)। অতঃপর প্রজাপতি বরুণকে বললেন, এই প্রজাগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ একটি গ্রহণ করে, অবশিষ্টগুলি আমাকে দাও (দেহীতি)। তখন বরুণ প্রজাদের মধ্যে হতে কোনও একটি শ্রেষ্ঠ পশুকে নিজের নিমিত্ত হস্তের দ্বারা স্পর্শ করলেন। পরীক্ষা করে দেখা গেল (পরীক্ষ্যমাণঃ) সেটি কৃষ্ণবর্ণ এবং তার একটি পদ শ্বেতবর্ণ যুক্ত। যে ব্যক্তি ভীষণ (মহা) উদরব্যাধি দ্বারা গৃহীত (বা আক্রান্ত), সে বরুণের উদ্দেশে এইরকম পশু (অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণ-সর্বাঙ্গ এবং একটি পদমাত্র শ্বেতবর্ণ, এমন পশু) দান করবে। বরুণদেবকে তাঁর আগধেয় প্রদান করার নিমিত্ত সে বরুণ-পাশ হতে মুক্ত হয়। এই রকম বরুণ-দেবতাক পশু (কৃষ্ণবর্ণ এবং এক পদ শ্বেত পশু) বরুণের উদ্দেশে দান করলে যজমানের আরোগ্য ও সমৃদ্ধি (যজমানস্যাহবোগ্যসমৃদ্ব্যৈ) সম্পাদিত হয়। স্বর্গলোক হতে আগত প্রভাকে ম্লানকারী সুবর্ণভানু নামধারী কোনও তমঃপুঞ্জরূপ অসুর আপন তমসায় সূর্যকে আচ্ছাদিত করে জগৎকে অন্ধকার করে দিয়েছিল (জগদান্ধ্যং কৃতবা)। সেই সূর্যের প্রভাকে আচ্ছাদনকারী তমসার পরিহারের নিমিত্ত দেববর্গ নানারকম প্রকাশরূপ মণি ইত্যাদি দ্রব্যের দ্বারা চারটি পর্যায়ে তা অপসারিত করেছিলেন। প্রথম পর্যায়ে অপসৃত তমসা কোনও কৃষ্ণবর্ণা অবি বা মেষ বা ছাগ (কাচিদবিরভৃৎ) হলো; দ্বিতীয় পর্যায়ে কোন লোহিতবর্ণা অবি হলো; তৃতীয় পর্যায়ে কোনও শ্বেতবর্ণ অবি হলো; চতুর্থ পর্যায়ে কোনও মৃতদেহের দীপ্যমান অস্থি দ্বারা তমসা অপাকৃত করা হলে, তা হতে কোন এক বন্ধ্যা অবি হলো। তখন দেবগণ পরস্পর বিচারপূর্বক বললেন, দৈব অস্থি হতে জাত হওয়ায় এটি উত্তম দেব-পশু (জাতত্বাদয়মুত্তমো); এর দ্বারা কোন উত্তম প্রয়োজনীয় কর্ম অধিগত করব। এইরকম বিচার করে তারা পৃথিবীর অল্পত্ব ও ওষদির অনুৎপন্নত্ব, এই দোষদুটি নিরীক্ষণ করে সেই দুটিকে পরিহার করার কামনায় তা (অর্থাৎ সেই অবি) আদিত্যকে অর্পণ করে পৃথিবীর বিস্তার ও ওষধির উৎপত্তি সম্পাদিত করেছিলেন। যিনি পশু ও পুত্রপৌত্র ইত্যাদি কামনা করবেন, তিনি এইরকম বন্ধ্যা অবি আদিত্যকে অর্পণ করবেন; আদিত্য তার পশু ও পুত্রপৌত্র ইত্যাদির বর্ধন করবেন। কখনও প্রকাশের মান্দ্য বশত আদিত্য দীপ্তবান্ হননি (প্রকাশমান্দ্যাদ্বিশেষেণ ন দীপ্তবান); তখন দেবগণ তার প্রতিকারের নিমিত্ত গল-লম্বিত শুনান্বিতা তিনটি অজা অর্পণ করেন। অগ্নির উদ্দেশে কৃষ্ণগ্রীবী অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণ গ্রীবাযুক্তা অজা অর্পণ। করেছিলেন, ইন্দ্রের উদ্দেশে লোহিত-শুক্ল-কৃষ্ণবর্ণযুক্ত অজা অর্পণ করেছিলেন এবং বৃহস্পতির উদ্দেশে শ্বেতবর্ণা অজা অর্পণ করেছিলেন। এর ফলে সূর্য পুনরায় তার দীপ্তি লাভ করেন। যিনি ব্রহ্মবর্চ অর্থাৎ ব্রহ্মতেজ কামনা করেন, তিনি এই রকম গল-লম্বিত স্তন সম্পন্না অজা অর্পণ করবেন। অগ্নির নিমিত্ত কৃষ্ণগ্ৰীবী, ইন্দ্রের নিমিত্ত লোহিত- শুক্ল-কৃষ্ণবর্ণ সম্পন্ন ও বৃহস্পতির উদ্দেশে শ্বেতবর্ণ সম্পন্না অজা অর্পণ করা কর্তব্য। উক্ত পশু তিনটি লাভ করে অর্থাৎ তিন দেবতা তাদের নিজ নিজ ভাগ প্রাপ্ত হয়ে শাস্ত্র-অধ্যয়ন সম্পতিরূপ (শ্ৰধ্যয়নসম্পত্তিরূপং) ব্রহ্মতেজ সম তেজ প্রদান করে থাকেন। সেই ব্যক্তি ব্ৰহ্মতেজসম্পন্ন হন। উক্ত পশু তিনটির প্রয়োগের নিমিত্ত কালবিশেষ নির্ণীত হচ্ছে–বসন্তকালের প্রাতে অগ্নির উদ্দেশে কৃষ্ণগ্রীবী, গ্রীষ্মকালের মধ্যাহ্নে (মধ্যন্দিনে) ইন্দ্রের উদ্দেশে লোহিত-শুকু-কৃষ্ণবর্ণা এবং শরৎকালের অপরাহ্নে বৃহস্পতির উদ্দেশে শ্বেতবর্ণ–এই তিন প্রকারের অজা অর্পণীয়। বসন্ত ঋতুর প্রাতঃকালে বর্ষার ন্যায় তীব্র মেঘের আবরণের অভাবের কারণে এবং হেমন্ত ও শীতকালের ন্যায় নীহারের আবরণের অভাবের কারণে আদিত্যের তেজঃ স্পষ্ট প্রকাশিত হয়ে থাকে। গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নে সেই (তেজঃ) প্রকাশের অধিক্য অতি স্পষ্টভাবে অনুভূত হয় (প্রকাশাধিক্যমতিস্পষ্ট)। শরৎঋতুর অপরাহ্নে সূর্যতেজ সেব্য হয়ে থাকে; (কিন্তু) প্রাতেঃ ও মধ্যাহ্নের তীব্র তেজঃ জ্বর ইত্যাদির কারণ হওয়ায় তা অসেবনীয় (অসেবত্ব)। এই নিমিত্ত আদিত্যের যথোক্ত তিনটি তেজঃ প্রশংসনীয় বা উৎকৃষ্ট (প্রশস্তানি); অতএব সেই কালে (ব্রত) অনুষ্ঠানের দ্বারা উৎকৃষ্ট তেজঃ-সম্পত্তি লাভ করা যায়।
ব্রত আরম্ভ হতে সম্বৎসর পর্যন্ত ব্রহ্মচর্য ইত্যাদি নিয়মবিধি কথিত হচ্ছে–উপনয়ন-সম্পন্ন (উপনীত) ব্ৰহ্মণ-কুমারের (মাণবকস্য) সম্ববৎসর ব্যেপে সন্ধ্যাবন্দনা ইত্যাদি আচার-শিক্ষা সম্যকভাবে সম্পাদন করতে হয়, এই কারণে সংবৎসরের ব্ৰহ্মতেজ-প্রদাতৃত্ব স্বীকার্য। যিনি বিদ্বৎসভায় অর্থাৎ পণ্ডিতবর্গের সভায় জয় কামনা করেন (বিদ্বৎসভায়ার্থিত্বকামিনঃ), তাঁর পক্ষে সরস্বতী উদ্দেশে গর্ভযুক্তা মেষী অর্পণ কর্তব্য। বেদ ও শাস্ত্র ইত্যাদি পাঠাভ্যাসে নৈপুণ্য থাকলেও যিনি সভায় কথা বলতে সমর্থ হন না, সেই ব্যক্তি সরস্বতীর উদ্দেশে এই পশুই দান করবেন। সরস্বতীই বাক্য, তাকে তাঁর ভাগ অর্পণ করে উপাসনা করলে, তিনি সেই ব্যক্তিকে বাক্য দান করেন, এবং তিনি (অর্থাৎ সেই ব্যক্তি) বাক্য বলতে পারেন (বাচং বদন্তি)। লোকে অর্থাৎ এই জগতে সদন্ত পুরুষ বর্ণলোপ বিনা (অন্তরেণ) সম্পূর্ণ বাক্য বলতে পারে। যাঁরা তীব্ররোগে আক্রান্ত, তাদের নিমিত্ত দুটি পশুসম্পন্ন কর্মের বিষয় কথিত হচ্ছে। তাঁরা অগ্নির উদ্দেশে কৃষ্ণবর্ণ গ্রীবাযুক্ত (কৃষ্ণগ্রীবমা) ও সোমের নিমিত্ত পিঙ্গল (ব) বর্ণের অজা দান করবেন। শরীরে প্রাণের বন্ধক, যে সূক্ষ্ম অন্নরস তা সোমদেব প্রাপ্ত হন। ব্যাধিতে অভিভূত জনের ভুক্ত অন্নরস (ভুক্তান্নরসঃ) শরীরে প্রবেশ করে না; কিন্তু সোমাধিষ্ঠিত ঔষধির, কার্য এই অন্নে অবস্থান করে (সোমাধিষ্টিতৌষধিকাৰ্য এবান্নেহবতিষ্ঠতে)। এই জন্য সেই রস সোম প্রাপ্ত হন। অগ্নি মাংস ইত্যাদিকে শোষণ করেন, এইজন্য অগ্নি শরীর প্রাপ্ত হন। দীর্ঘকালব্যাপী রোগগ্রস্ত জন সোম ও অগ্নিদেবের উদ্দেশে উক্ত বিধান অনুসারে সেবা করলে তারা তাকে জীবন দান করেন। যিনি প্রজা কামনা করবেন, তিনি অগ্নিদেবের উদ্দেশে কৃষ্ণগ্রীবা বিশিষ্ট অজা অর্পণ করবেন এবং সোমদেবের উদ্দেশে পিঙ্গলবর্ণ বিশিষ্ট অজা অর্পণ করবেন। সোম রেতের ধারক এবং অগ্নি প্রজাগণের প্রজননকারী; সোম এই ব্যক্তিকে রেতঃ এবং অগ্নি প্রজা প্রজনিত করেন; তখনসেই ব্যক্তি পুত্র লাভ করেন। (বিদ্বৎসভায় মূকীভূত ব্যক্তির কর্ম পূর্বে উক্ত হয়েছে), এখন বিদ্বান ব্যক্তির জন-অনুরাগের বিষয়ে দুইটি পশু সম্পর্কিত কর্ম বলা হচ্ছে। যে ব্রাহ্মণ বিদ্যা লাভ করেও সাধারণের অনুরাগভাজন হতে পারেন না, তিনি অগ্নিদেবের উদ্দেশে কৃষ্ণগ্রীবা বিশিষ্ট অজা অর্পণ করবেন এবং সোমদেবের উদ্দেশে পিঙ্গল বর্ণ বিশিষ্ট অজা অর্পণ করবেন। তাহলে অগ্নির প্রতিবাদী অর্থাৎ যারা বিদ্বান ব্যক্তিতে অননুরাগী থাকেন, তাঁদের পক্ষে অসহনীয় তেজঃ যজমানে স্থাপিত হয় এবং সোমদেবতা সম্পর্কিত ব্ৰহ্মতেজে বেদশাস্ত্রবচনের স্ফুর্তি হয় (বেদশাস্ত্রবচনস্ফুর্তি-রূপমস্মিন্দধাতি)। অগ্নির উদ্দেশে কৃষ্ণগ্রীবা দানের নিমিত্ত বুদ্ধিমান্দ্যরূপ অন্ধকার (অর্থাৎ বুদ্ধির অল্পতারূপ অজ্ঞানতা) অপহত অর্থাৎ বিনষ্ট হয়। গ্রীবা ব্যতীত অন্য স্থানে (গ্রীবাতিরিক্তপ্রদেশে) শ্বেতবর্ণের প্রভার ন্যায় সভার পক্ষে উচিত অনুরঞ্জনরূপ প্রভা এই যজমানে স্থাপিত হয় (সভোচিতানুরঞ্জনরূপাং প্রভামেবাস্মিন্ধধাতি)। সোমের উদ্দেশে পিঙ্গলবর্ণ অজা প্রদানের ফলস্বরূপ ব্রহ্মতেজ প্রাপ্ত যজমানের জনানুরাগ অধিক হয়ে থাকে। এবার পৌরোহিত্যের স্পর্ধা বিষয়ে পশু সম্পর্কিত কর্ম কথিত হচ্ছে। যিনি পৌরোহিত্যের স্পর্ধা করেন, তিনি অগ্নিদেবের উদ্দেশে কৃষ্ণগ্রীবা অজা এবং সোমদেবতার উদ্দেশে পিঙ্গলবর্ণের অজা প্রদান করবেন। ব্রাহ্মণ অগ্নিরূপ ও সোমদেব রাজন্যরূপ। সোমদেবের রাজত্বের ব্যবহারের নিমিত্ত রাজন্য সৌম্য (সোমস্য রাজত্বের ব্যবহারাদ্ৰাজন্যঃ সৌম্যং)। সোমদেবের সম্মুখে ও পশ্চাতে আগ্নেয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলে রাষ্ট্র উভয় দিক হতেই ব্রহ্মতেজ লাভ করে (রাষ্ট্রমুভয়তে ব্ৰহ্মণা তেজসৈব পরিগৃহূতি)। সেই বেদশাস্ত্রপ্রযুক্ত পৌরোহিত্যলক্ষণসম্পন্ন ব্রাহ্মণোচিত তেজের দ্বারা রাষ্ট্র সর্বতোভাবে বশীকৃত হয়। অতঃপর রাজা অমাত্য ইত্যাদি সকলে এই ব্রাহ্মণকে পৌরোহিত্য পদে স্থাপন করেন ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন–তৃতীয়ানুবাকে জয়াদিহেতুন পশূনম্বিধিৎসন্নাদৌ লোকয়জয়হেতুং পশুং বিধাতুং প্রস্তেীতি–। অর্থাৎ–এই অনুবাকে তিন লোক জয়ের নিমিত্ত পশুর বিধান প্রদত্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- দেবতা ও অসুরগণের মধ্যে বিষয়কে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব হয় (লোকেষু বিষয়ভূতেষু)। সেই বিষ্ণু বামন অর্থাৎ হ্রস্ব বা খর্বাকৃতি পশু দর্শন করেছিল। তা (অর্থাৎ খর্বাকৃতি পশু) বিষ্ণুরূপী দেবতার উদ্দেশে অর্পণ করা হয়। অতঃপর সেই বিষ্ণু তিনটি লোক জয় করেন। গৃহ ক্ষেত্র ইত্যাদি বিষয়ে বিবাদবান যে লোক বিষ্ণুর উদ্দেশে তার প্রয়ি খর্বাকৃতি পশু (বা অবি) প্রদান করবে, সে বিষ্ণুত্ব প্রাপ্ত হয়ে এই লোকসমূহ জয় করবে। পৃথিবী ইত্যাদি লোকের মধ্যে উত্তরোত্তর বিস্তৃতি ও ভোগ ইত্যাদি সম্পর্কে বৈষম্য আছে; এই বিষম দেশ সমৃদ্ধির জন্য কল্পিত হয়ে থাকে। এখন সংগ্রামার্থীর নিমিত্ত পশুর বিধান করা হচ্ছে। সংগ্রাম উপস্থিত হলে (সংগ্রামে) ক্রোধযুক্ত ধৈর্যবান্ ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে শ্বেতপুণ্ডকেশাঙ্কিত ললাটপ্রাপ্ত এমন (শ্বেতপুণ্ডবালাঙ্কিতললাটোপেতং) ও মুখের দিকে সন্নিহিত শৃঙ্গবান এমন (মুখং প্রত্যাসন্নশৃঙ্গঃ) বলীবর্দ (পুঙ্গবঃ) অর্পণ কর্তব্য। তাহলে ইন্দ্রিয় অর্থাৎ শারীরিক বল, শত্ৰুবিষয়ে কোপ ও ধৈর্যের দ্বারা সংগ্রামে জয় প্রাপ্ত হবে। ধৈর্যশালী ক্রোধযুক্ত ইন্দ্রের নিকটে যিনি তার ভাগধেয় নিয়ে যান, ইন্দ্র তাকে শরীরে বল এবং মনে কোপ ও ধৈর্য প্রদান করেন এবং তিনি (অর্থাৎ সেই বাহক) সংগ্রামে জয়যুক্ত হয়ে থাকেন। যিনি গ্রাম কামনা করেন, তিনি মরুৎ-যুক্ত ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে শ্বেত-উরুযুক্ত (বৃশ্নিসকথ) বলীবর্দ প্রদান করবেন। মরুত্বর্গের সাথে ইন্দ্রের ভাগ নিয়ে যিনি তাঁর নিকট গমন করেন, সেই ইন্দ্র তাকে সহোৎপন্ন ভ্রাতা ইত্যাদি ও সহবাসী ভৃত্য ইত্যাদি প্রদান করেন এবং সেই ব্যক্তি গ্রাম প্রাপ্ত হন। এর মধ্যে ইন্দ্রের বৃষ কৃ-যজুর্বেদ। এবং মরুত্বর্গের শ্বেতবর্ণের (পৃশ্নিবর্ণস্য) পশু, এই উভয়ই সমৃদ্ধির কারণ (সমৃদ্ধ্যৈ ভবতি)। পশ্চাতের উরু শ্বেতবর্ণ হবে (এমন পশু দানের ফলে) গ্রামস্বামী যজমান প্রথম যে কার্য করবেন, সেই গ্রামনিবাসী প্রজাগণ তার (সেই যজমানের) পশ্চাতে অনুসরণ করবে এবং কেউই তাঁর প্রতিকূল (বিরুদ্ধ) চিন্তা করবে না। যিনি অন্ন কামনা করবেন তিনি সোমদেবের উদ্দেশে পিঙ্গলবর্ণের অজা অর্পণ করবেন। সোম ওষধির রাজা, এই নিমিত্ত অন্নকে সৌম্য বলা হয়ে তাকে। যিনি সোমের ভাগ নিয়ে তাঁর নিকট গমন করেন, সোম তাকে সেই অন্ন প্রদান করেন, যা তাঁকে (সেই বহনকারীকে) ব্যাধিরহিত করে অগ্নিবৎ দীপ্ত করে। পিঙ্গল বর্ণ হলো অন্নের রূপ, তা সমৃদ্ধির কারণ। বিদলিত ছোলা প্রিয়ংগু ইত্যাদি অন্ত্রের রূপ পিঙ্গল বর্ণ। যিনি রাজ্যপ্রাপ্তির কামনা করবেন, তিনি সোমদেবের উদ্দেশে পিঙ্গল বর্ণের পশু অর্পণ করবেন। রাজার জ্যেষ্ঠপুত্র যদি শৌর্য ইত্যাদি গুণসম্পন্ন হয়েও রাজ্য লাভ করতে না পারেন, সেই জন্য এই পশু অৰ্পণ বিহিত হয়েছে। রাজ্য সোমন্ধীয়। সুতরাং যিনি রাজ্য কামনা করেন, তিনি সোমদেবে ভাগ সহ তার নিকট গমন করলে সোমদেব তাকে রাজ্য দান করে থাকেন। চন্দ্রমণ্ডলের সুবর্ণ-বর্ণেত্বের কারণে পিঙ্গল বর্ণ হলো সোমের রূপ, এবং তা সমৃদ্ধির কারণ (চন্দ্রমণ্ডলস্য সুবর্ণবর্ণাদ্বত্বং সোমস্য রূপ। শত্রুগণের দ্বারা ভ্রষ্টশী (অর্থাৎ রাজ্যহারা) হয়ে পুনরায় তার প্রতিষ্ঠাকামী (অর্থাৎ রাজ্য লাভ করতে ইচ্ছুক রাজ) বৈরিহিংসক ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে লোম (লালটের ভূষণস্বরূপ) প্রাশৃঙ্গ (তীক্ষশৃঙ্গশালী) বৃষ অর্পণ করবেন, তা হলে তিনি পাপরূপ বৈরিকে পরাজয় পূর্বক প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হবেন (অর্থাৎ রাজ্য পুনঃ প্রাপ্ত হবেন)। যিনি গোবধ ইত্যাদি উপপাতকে লিপ্ত, তিনি পাপক্ষালনের নিমিত্ত ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে লোম ও শৃঙ্গ বৃষ অর্পণ করবেন। ইন্দ্র বৈরিবিনাশক, তার ভাগধেয় সহ তাঁর নিকট গমন করলে, ইন্দ্র তার (অর্থাৎ সেই ভাগপ্রদানকারীর) শত্রুবর্গকে বিনাশ করে থাকেন। যিনি রাজ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও রাজ্য লাভে সমর্থ হন না, তিনি রাজ্যের কামনায় বজ্রধারী ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে লোম ও শৃঙ্গ বৃষ অর্পণ করবেন। যিনি বজ্রধারী ইন্দ্রের নিকট তার ভাগধেয় সহ গমন করেন, ইন্দ্র তাঁকে বজ্রসদৃশ অস্ত্র প্রদান করে থাকেন। সেই বজ্রবৎ প্রহরণসমত আয়ুধ যজমানকে বৈরিসন্তাপের নিমিত্ত প্রদীপ্ত করে (বৈরিসন্তাপায় প্রদীপ্তং করোতি)। সেই কুটিল শৃঙ্গের অগ্রভাগ তীক্ষ্ণধারযুক্ত বজ্রের রূপ; তা সমৃদ্ধির কারণভূত (নতস্য শৃঙ্গস্য তীক্ষাগ্ৰত্বাত্তীক্ষ্ণধারাযুক্ত বজ্ররূপত্ব ॥৩॥
[সায়ণাচার্য বলেন–চতুর্থে ব্ৰহ্মবসকামাদীনাং পশূন্নিধিৎসুরাদৌ ব্রহ্মবচসকামায় বিধাতুং প্রস্তৌতি–। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২৪ ব্রহ্মতেজঃকামীগণের পক্ষে পশুদানের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- পূর্বকালে কোনও এক সময়ে আদিত্যের দীপ্তির অভাব ঘটায় দেবতাগণ তার প্রতিকারের উদ্দেশে দশটি বৃষ প্রদান করেন। এর ফলে আদিত্য পুনরায় তাঁর দীপ্তি লাভ করেন। সুতরাং যিনি ব্রহ্মতেজঃ কামনা করবেন, তিনি আদিত্যের উদ্দেশে দশটি বৃষ অর্পণ করবেন। আদিত্যের ভাগ বহন করে যিনি তাঁর সমীপে গমন করেন, আদিত্য তাঁকে ব্রহ্মতেজঃ প্রদান করেন; তিনি ব্রহ্মবৰ্চসী (অর্থাৎ বেদাধ্যয়নজনিত ব্রাহ্মণের তেজঃ) সম্পন্ন হন। বসন্তের প্রাতঃকালে তিনটি লোম বৃষ, গ্রীষ্মকালের মধ্যাহ্নে তিনটি সেত-পৃষ্ঠ যুক্ত বৃষ এবং শরঙ্কালে অপরাহ্নে তিনটি শ্বেত-পুচ্ছ যুক্ত বৃষ আদিত্যের উদ্দেশে প্রদান কর্তব্য। উক্ত তিন কালবিশেষে আদিত্যের তেজঃ প্রশংসনীয়, যথা–বসন্তকালের প্রাতঃ, গ্রীষ্মের মধ্যন্দিন ও শরৎকালের অপরাহ্ন। এই তিন কালে যেমন আদিত্যের তেজঃ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, তেমনই উত্তরোত্তর কালেও এই যজমানের তেজঃ বৃদ্ধিলাভ। করে, কখনও কমে না (ন হীয়ত)। সম্বৎসর ব্যাপী আদিত্যের সেবা কর্তব্য, (কারণ) সম্বৎসর ব্ৰহ্মবসের প্রদাতা, উপনয়ন-সম্পন্ন ব্রাহ্মণ-কুমার (যদি) সম্বৎসরব্যাপী সন্ধ্যা বন্দনা ইত্যাদি আচরণ করে, তাহলে সম্বৎসর তাকে ব্ৰহ্মতেজঃ প্রদান করেন, সে ব্রহ্মচঁসী হয়।–দশটি বৃষের দেবতা, কাল ও বর্ণবিশেষ কথিত হচ্ছে। সম্বৎসরের পরে প্রজাপতির উদ্দেশে কদ্রু অর্থাৎ পিঙ্গল বর্ণের বৃষ প্রদান কর্তব্য; প্রজাপতি সকল দেবতার স্বরূপ হওয়ায় সকল দেবতার মধ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠিত (প্রতিষ্ঠিতি)। ভবিষ্যকালীন কুষ্ঠরোগ অনুমান করে ভীতিগ্রস্ত হলে সোমদেব ও পূষাদেবের উদ্দেশে শ্যামবর্ণশালী বৃষ দান কর্তব্য। পুরুষ সোমদেবতাক ও পশু পূষাদেক (পুরুষস্য সোমদেবতাকত্বং পশূণাং পৌষ্ণত্বং চ)। এই দুই দেবতা (এমন কি) পশুরও ত্বক নির্মল করেন; (সুতরাং) যজমানের কুষ্ঠ ইত্যাদি চর্মরোগ নিবারণ করেন। (একদা) এই লোকে দেবগণ ও যম পরস্পর স্পর্ধান্বিত হয়েছিলেন; যম দেবগণের বীর্যসামর্থ্য পৃথক করে দিয়েছিলেন, এটিতে যমেরই প্রভুত্ব। বীর্য অপগত হওয়ায় দেবগণ পরস্পর বলাবলি করলেন–আমরা পূর্বে, (বীর্যসামর্থ্যে) ভূলোকের যে অধিপত্য প্রাপ্ত হয়েছিলাম, এখন তা যমই প্রাপ্ত হবে। (সুতরাং) তারা প্রজাপতির নিকট গমন করেছিলেন। সেই প্রজাপতি এক বৎস উৎপাদনক্ষম বৃষ এবং এক বন্ধ্যা অজা সৃষ্টি করলেন। তখন দেবগণ বিষ্ণুদেবতার উদ্দেশে বন্ধ্যা অজা ও ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে বৃষ উৎসর্গ করলেন, অতএব দেবগণ যমকে বরুণের পাশাস্ত্রে গ্রহণপূর্বক যজ্ঞরূপ বিষ্ণুদেবের দ্বারা নিষ্কাষিত করলেন (নিষ্কাসিতবন্তঃ) এবং ইন্দ্রের কৃপায় (প্রসাদেনাস্য) যমের বীর্য বা সামর্থ্য নাশ করেছিলেন। (অতএব যিনি অর্থাৎ যে যজমান শত্রুগণকে বিনাশ করতে কামনা করবেন, তিনি বিষ্ণুদেবের উদ্দেশে বন্ধ্যা অজা ও ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে বৎসউৎপাদনক্ষম বৃষ দান করবেন। অতঃপর বরুণের পাশের দ্বারা শত্রুকে গ্রহণ পূর্বক যজ্ঞরূপ বিষ্ণুর দ্বারা তাকে দূরীভূত করে দেবেন এবং ইন্দ্রের দ্বারা শত্রুর ইন্দ্রয়-সামর্থ্য বিনষ্ট করবেন; এতে যজমান বিজয়ী হবেন।–পাপবিমুক্তর কামনায় দ্বিপশু দান বিষয়ক বিধির কথা বলা হচ্ছে। (একদা) ইন্দ্রদেব বৃত্রকে আঘাত করেছিলেন। বৃত্র আহত হয়ে তার দেহ হতে উৎপন্ন ক্রোধাবিষ্ট সর্পাকার যোড়শ সংখ্যক শরীরের দ্বারা রঞ্জু-বন্ধনের ন্যায় ইন্দ্রকে বদ্ধ করেছিল (রজ্জ্বভিরির ববন্ধ)। সেই বৃত্রের মস্তক হতে কতিপয় বিশিষ্ট দেহধারিণী গাভী উৎপন্না হয়েছিল; সেই গাভীগণের পশ্চাতে (জঘনে পৃষ্ঠভাগে) একটি বৃষ অনুগমন করেছিল (অনুগমোদগচ্ছৎ)। ইন্দ্রদেব সেই বৃষের উদ্দেশে পূজা করেছিলেন। অহো আমার কার্য সম্পন্ন হয়েছে, ইন্দ্র মনে মনে বলেছিলেন। যে কেউ দেবতার উদ্দেশে এইরকম বৃষ অর্পণ করবে, সে এইরকম বন্ধন ইত্যাদি রূপ পাপ হতে মুক্ত হবে (ঈশাদ্বন্ধনাদিরূপাৎ পাশ্মনো মুচ্যেতেতি)। এই বিচারপূর্বক ইন্দ্রদেব অগ্নির উদ্দেশে কৃষ্ণগ্রীবা পশু ও ইন্দ্র-সম্বন্ধি বৃষ অর্পণ করেছিলেন। ইন্দ্র-সম্বন্ধি আপন ভাগ প্রাপ্ত হয়ে তুষ্ঠ অগ্নিদেব বৃত্রে সর্পাকার যোড়শ সংখ্যক শরীর দগ্ধ করেছিলেন। তাতে ইন্দ্র যাগ-সামর্থ্য লাভ করেছিলেন। যিনি বা যে যজমান পাপলিপ্ত হয়ে অগ্নিদেবের উদ্দেশে কৃষ্ণগ্রীবা পশু ও ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে ইন্দ্র-সম্বন্ধি বৃর্য দান করেন, তাতে অগ্নিদেব আপন ভাগধেয় লাভ করে তার পাপ দগ্ধ করেন এবং ইন্দ্রদেব তাঁকে সামর্থ্য প্রদান করেন। এতে যজমান পাপ হতে মুক্ত হয়। যিনি দীর্ঘকালব্যাপী (চিরং) রাজ্যভ্রষ্ট হয়েছেন, তিনি দ্যাবাপৃথিবীর উদ্দেশে ধেনু দান করবেন। যিনি প্রজাপিলনের অভাবে এই লোকে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হননি এবং বৈদিক কর্মানুষ্ঠানের অভাবে স্বর্গেও প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হননি তিনিই হলেন জ্যোগপরুদ্ধ অর্থাৎ রাজ্যভ্রষ্ট। তার পক্ষে দ্যাবাপৃথিবীর পরিতোষের দ্বারা উভয় লোকে (ভুবনে ও স্বর্গে) প্রতিষ্ঠা লব্ধ হয়। যে গর্ভিনী গাভী প্রসবকাল অতিক্রম করে (প্রসবকালং পরিত্যজ্য) দীর্ঘকাল গর্ভ ধারণ করে থাকে, তাকে বলা হয় প্যারিণী। যিনি রাজ্যভ্রষ্ট, তিনি এই প্যারিণীর ন্যায় দীর্ঘকাল (কষ্টভোগের) পরে (চিরমতীত্য) পুনরায় ভোগকাল প্রাপ্ত হয়ে সমৃদ্ধ হন। রাজ্যভ্রষ্ট ব্যক্তির পক্ষে বায়ুদেবতার উদ্দেশে গো-বৎস দান কর্তব্য। বায়ু দ্যাবাপৃথিবীর বৎসস্বরূপ। (যেমন বৎস ধেনুর নিকটে সঞ্চরণ করে, বায়ুও তেমনই দ্যাবাপৃথিবীতে সঞ্চরণ করে)। যখন রাজ্যের মুখ্যপুরুষগণ ও সাধারণ জনবর্গ বিরাগভাজন হন, তখনই রাজা রাজ্যভ্রষ্ট হন। বৎসের দ্বারা তুষ্ট হয়ে বায়ু মুখ্য ও সাধারণ প্রজাবর্গকে তাঁর অনুরক্ত করেন। তাতে সকলে তাকে প্রচুর মণিমুক্তা ইত্যাদি ধন প্রদান করে এবং তিনি পুনরায় প্রজাগণকে পালন করেন (প্ৰজা চৈনং ভুঞ্জতী পালয়ন্তী সেবতে)। ৪
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ পঞ্চমে পশুকামাদীনাং পশবো বক্তব্যাঃ। অর্থাৎ এই অনুবাক-২৪ পশুকামীগণের পক্ষে পশুদানের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- বল নামক কোন এক তস্কর অসুর যেখান-সেখান হতে (যতস্ততত) বহু পশু অপহরণ করে কোনও একটি পর্বতগুহায় স্থাপন করে রাখত। ইন্দ্রদেব এই বৃত্তান্ত অবগত হয়ে সেই গুহাদ্বার আবৃতকারী পাষাণটি অপণীত করেন। অতঃপর সেই পশুগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ (যূথপতি) পশুটিকে পশ্চাৎ ধরে উপরে উৎক্ষিপ্ত করেন। সেই যুথপতির সাথে সাথে সহস্র পশুও উপরে নীত হয় (উচ্চতবন্তঃ)। সেই মুখ্য পশুটি উত্তম হওয়ার কারণে পূর্ব হতেই যুথপতি ছিল, পরে ইন্দ্র কর্তৃক উৎক্ষিপ্ত হওয়ায় আরও উন্নত হলো (অত্যন্তমুন্নতোহভবৎ)। যিনি পশু কামনা করেন, তিনি ইন্দ্রের উদ্দেশে উত্তম পশু প্রদান করবেন। যিনি ইন্দ্রের নিকট তার ভাগধেয় নিয়ে গমন করেন, ইন্দ্র তাঁকে বহু পশু প্রদান করেন; এইভাবে তিনি পশুমান্ হন। উত্তম পশু লাভ হলো সহস্র পশুলাভের নিমিত্তভূতা বা সম্পদরূপা। এর দ্বারা সেই ব্যক্তি পশুসমৃদ্ধিরূপ লক্ষ্মীযুক্ত হয়ে পশু লাভ করেন (লক্ষ্মা যুক্তস্থান পশুনবরুন্ধে)। যখন পশুকামী জন সহস্র পশু প্রাপ্ত হন, তখন বিষ্ণুর উদ্দেশে একটি খর্বকায় পশু প্রদান কর্তব্য। এর ফলে তিনি সহস্র পশুর নিমিত্ত তৃণ জল ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিবাসস্থান প্রাপ্ত হবেন (নিবাসস্থানং কৃতবান্ ভবতি)। সহস্র পশুপ্রাপ্তি প্রায় দুর্লভ; কারণ চোর, ব্যাঘ্র ইত্যাদি বহু বিঘ্ন আছে (বিঘ্ননাং…বহুত্বাৎ)। অতএব সহস্র পশু লব্ধ হলে তার সহস্র দিন পরে বিষ্ণুর উদ্দেশে বামনাকৃতি পশু প্রদান কর্তব্য। এর ফলে সেই ব্যক্তি পশুসম্পদের দ্বারা প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। প্রজাকামী জন ওষধির উদ্দেশে গর্ভবিনাশিনী গাভী দান করবেন (বেহুতং গর্ভবিনাশিনী)। যিনি সন্তান উৎপাদনে সমর্থ হয়েও সন্তান লাভ করতে পারেন না, ওষধিদেবতা তার প্রতিবন্ধক। ওষধিগণ গর্ভবিনাশিনী গাভীরও গর্ভ বিনাশ করেন। যিনি ওষধিগণের নিকট তাদের ভাগ সহ গমন করেন, ওষধিগণ তাদের সন্তান দান করেন। যারা এটি অবগত নয়, তারা ভাবে অসৎপুরুষ হতে সৎপুরুষ উৎপাদিত হচ্ছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যজমান ওষধিগণের কৃপাতেই আপন বীর্যেই সন্ততি লাভ করেন, ক্ষেত্রজ পুত্র-কন্যা ইত্যাদি নয় (ন তু ক্ষেত্ৰজপুত্রিকাসুদিক)। উন্নতিকামী বা ঐশ্বর্যকামী (ভূতিকামী) জন, ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে সূতবশা গাভী (অর্থাৎ একবার বৎস উৎপাদন বা প্রসব করার পর বন্ধ্যা হয়েছে, এমন গাভী) প্রদান করবেন। যিনি উৎকর্ষ বা ঐশ্বর্যলাভের যোগ্য হয়েও তা প্রাপ্ত হননি, তিনি ইন্দ্ৰে ভাগধেয় (ঐ সূতবশা গাভী) সহ তার নিকট গমন করলে ইন্দ্র তাকে উৎকর্ষ বা ঐশ্বর্য প্রাপ্ত করান। সূতবশা প্রদানের পূর্বে ইন্দ্রের উদ্দেশে একটি বৎসও প্রধান কর্তব্য। এই সূতবশা গাভী প্রথমে ইন্দ্রের সমান বৎস উৎপাদন করে বন্ধ্যা হয়, এই কারণে এর লাভে (অর্থাৎ বৎস ও সূতবশা গাভী প্রাপ্ত হয়ে) ইন্দ্র তার ইন্দ্রিয়-সামর্থ্য প্রত্যর্পণ করেন। যে ব্রাহ্মণ (পিতামহ, পিতা ও স্বয়ং ক্রমে) তিন পুরুষ সোম না পান করার নিমিত্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছেন, তিনি ইন্দ্র ও অগ্নিদেবের উদ্দেশে ত্যক্ত (উৎসৃষ্ট) জীর্ণ বলদ অর্পণ করবেন। ইন্দ্র ও অগ্নিদেবের উদ্দেশে তাদের ভাগধেয় বহন করে যিনি তাঁদের নিকট গমন করেন, তাঁরা তাঁকে পুনরায় সোমপায়ী করেন। সোমপানে ইন্দ্রিয়বৃদ্ধি হওয়ার কারণে তিনি ইন্দ্রিয়সামর্থ্য লাভ করেন (সোমপানস্যেন্দ্রিয়বৃদ্ধিহেতুত্বাদিন্দ্রিয়রূপত্ব)। এবং অগ্নিদেবের সেবা করার নিমিত্ত সেই ব্রাহ্মণ আপন দেবতার সাথে মিলিত হন। ত্যক্ত (উৎসৃষ্ট) পশু দানের ন্যায় ত্যক্ত সোমপায়ী (পিতামহ, পিতা ও স্বয়ং) পুনরায় সমৃদ্ধি লাভ করেন (প্রথমং পিতামহেন সোমপীথ উৎসৃষ্টঃ, পুনঃ পিতা, পুনরপি স্বেন তত উক্তপশুসাদৃশ্যাত্তদালম্ভঃ সমৃদ্ধ্যৈ সম্পদ্যতে)। শত্রুবিনাশের নিমিত্ত অভিচার কর্মের উদ্দেশে ব্ৰহ্মণস্পতিদেবকে শৃঙ্গরহিত বলদ অর্পণ কর্তব্য। যিনি ব্ৰহ্মণস্পতি দেবতার নিকট তাঁর ভাগধেয় সহ গমন করেন, ব্ৰহ্মণস্পতি দেবতা তাঁর শত্রুকে ছিন্ন করে থাকেন এবং সেই শত্রু মরণ প্রাপ্ত হয় (তাদানীমেব বৈরী মরণং প্রাপ্লেতি)। শৃঙ্গরহিত বলদ ক্ষুরের তীক্ষ্ণধারের ন্যায় বজ্রসদৃশ (ভীষণ), বৈরিকে মারণে তা সম্পাদনযোগ্য। স্ক্যা নামক যজ্ঞীয় অস্ত্রবিশেষ যুপের (যজ্ঞীয় পশুবন্ধনের স্তম্ভের) আকৃতিবিশিষ্ট, তা বজ্রসদৃশ। তার দ্বারা শত্রু প্রহৃত হয়। শরময় কুশতৃণের (বহির) দ্বারা শত্রুকে হিংসা করা হয়ে থাকে। সেই কুশতৃণের শীর্ষভাগ বজ্রের অবয়ব হতে উৎপন্ন হওয়ার নিমিত্ত তা হিংসাত্মক (তেষাং চ তৃণানাং শীষ্ণৌৰ্বৰ্জাবয়বৈরুৎপন্নত্বাদ্ধিংসকত্বম)। অক্ষ নামক বৃক্ষবিশেষ হতে উৎপন্ন বৈভীদক কাষ্ঠের দ্বারা বিশেষভাবে শত্রুকে বিদারণ করা হয় (স চ বিশেষেণ ভেং শক্ত ইতি কৃত্বা বৈরিণং ভিনত্ত্যেব) ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন–ষষ্ঠে গ্রামকামাদীনাং পশ্বম্ভরানি বক্তব্যানি। অর্থাৎ এই অনুবাক-২৪ে গ্রামকামীগণের পক্ষে স্বতন্ত্র পশুদানের বিষয় কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- গ্রামস্বামীগণের মধ্যে আমি শ্রেষ্ঠ হবো–যিনি এরকম কামনা করেন, তিনি বৃহস্পতি দেবের উদ্দেশে শ্বেতপৃষ্ঠ (পশ্চাদ্ভাগ শ্বেত এমন) বৃষ প্রদান করবেন। বৃহস্পতি দেবতার নিকটে তার ভাগধেয় সহ যিনি গমন করেন, বৃহস্পতি দেবতা তাঁকে সমাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন, তিনি শ্রেষ্ঠ গ্রামস্বামী হন। শ্বেতপৃষ্ঠ বৃষ বৃহস্পতি-সম্বন্ধি দেবরূপ (বাম্পত্যো হেষ দেবতয়া), এবং তা সমৃদ্ধির কারণভূত। অন্নকামী জন পূষাদেবতার উদ্দেশে শ্যামবর্ণ পশু অর্পণ করবেন। যিনি পূষাদেবের নিকট তার ভাগধেয় সহ গমন করেন, পুষাদেব তাকে অন্ন প্রদান করেন; তিনি অন্নের ভোগকারী হয়ে থাকেন। (তিনি) অন্নের দ্বারা পোষণ করেন বলে তাকে পূষা বলা হয় (অন্নস্য পোশকত্বাৎ পুষত্বম)। পত্র, শাক ইত্যাদি অন্নের রূপ শ্যামবর্ণ, এবং তা সমৃদ্ধির কারণভূত। অন্নকামী ব্যক্তির মরুৎগণের উদ্দেশে শ্বেতবর্ণ পশু প্রদান কর্তব্য। যিনি মরুৎগণের উদ্দেশে তাঁর ভাগধেয় সহ গমন করেন, মরুৎদেবগণ তাঁকে অন্ন প্রদান করেন; তিনি অন্নের ভক্ষণকারী হয়ে থাকেন। শ্বেত বর্ণ হল শালি-অন্নের রূপ, এবং তা সমৃদ্ধির কারণভূত। ইন্দ্রিয়ের সামর্থকামী জন ইন্দ্রিয়-সামর্থ্য লাভের নিমিত্ত ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে অরুণ বর্ণের পশু প্রদান করবেন। ইন্দ্রের নিকট যিনি তাঁর ভাগধেয় সহ গমন করেন, ইন্দ্র তাঁকে ইন্দ্রিয়ের সামর্থ্য প্রদান করে থাকেন। অরুণবর্ণের পশু মহতী-সম্পন্ন হয়, এটি সহস্রাক্ষ ইন্দ্রের বাহুল্যের স্বরূপ, এবং তা সমৃদ্ধির কারণভূত। পরকর্তৃক দানকামী জন সবিতাদেবের উদ্দেশে মিশ্রবণশালী পশু অর্পণ করবেন। সবিতা হলেন প্রেরণাদানকারী দেবতা। যিনি সবিতাদেবের নিকট তার ভাগ সহ উপস্থিত হন, সবিতাদেব তাঁর নিকট দানী জনকে প্রেরণ করেন, তিনি (অর্থাৎ পরের নিকট হতে দান আকাঙ্ক্ষী জন) দাতাকে প্রাপ্ত হন। সঙ্কীর্ণবর্ণ (উপধ্বস্তঃ) অর্থাৎ মিশ্রবণশালী পশু হলো সবিতাদেবের সম্বন্ধি, এবং তা সমৃদ্ধির হেতুভূত। অন্নকামী জন বৈশ্বদেবতার উদ্দেশে বহুরূপ পশু অর্পণ করবেন। সকল (বিশ্বনেব) দেবতার নিকট তাদের ভাগধেয় সহ গমন করলে বৈশ্বদেব তাঁকে অন্ন প্রদান করে থাকেন; সেই জন অন্নের ভক্ষণকারী হয়ে থাকেন। বহুরূপ হলো ভোজ্য (ভক্ষণ করার যোগ্য), লেহ্য (আস্বাদ করার যোগ্য) ও চোষ্য (চোষণের যোগ্য) ভেদে অন্নের বহুরূপত্ব, এবং তা সমৃদ্ধির কারণভূত। যিনি গ্রামকামী, তিনি বৈশ্যদেবের উদ্দেশে বহুরূপ (বহুবর্ণশালী) পশু প্রদান করবেন। ভ্রাতা ভৃত্য ইত্যাদির (সজাতা) সাথে সকল দেবতার নিকট তাঁদের ভাগধেয় সহ উপস্থিত হলে তারা তাঁকে ভ্রাতা ভৃত্য ইত্যাদি প্রদান করে থাকেন; সেই জন গ্রামাধিপত্য লাভ করেন। সকল দেবতা বহুবর্ণশালী পশুর অধিপতি (স্বামিত্বাৎ পশোহুদেবত্যত্ব), তাতে (অর্থাৎ বহুবর্ণত্বের নিমিত্ত) সমৃদ্ধি লাভ হয়। যাঁর রোগবিশেষের লক্ষণ দেখা যায় না, (অথচ) বলক্ষয় ও ক্ষীণ (কৃশ) দেখা যাচ্ছে, সেই অজ্ঞাত রোগে আগ্রস্ত ব্যক্তি প্রজাপতির উদ্দেশে শৃঙ্গরহিত বৃষ অর্পণ করবেন। সকল পুরুষ প্রজাপতি হতে উৎপন্ন হওয়ার নিমিত্ত সেই রোগবিশেষ চিকিৎসকের অজ্ঞাত হলেও প্রজাপতির জ্ঞাত (প্রজাপতিনা জ্ঞায়তে)। এইরকম ব্যাধিগ্রস্থ জন প্রজাপতির নিকট তার ভাগধেয় সহ গমন করলে, প্রজাপতি তাকে দীর্ঘকালব্যাপী সেই অজ্ঞাত রোগ হতে মুক্ত করেন (অর্থাৎ নিরাময় করেন)। শৃঙ্গহীন পশুর অধিপতি বা দেবতা প্রজাপতি, এই নিমিত্ত এতে সমৃদ্ধি লব্ধ হয় ॥৬
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ, সপ্তমে ব্রহ্মবচসকামাদীনাং যথাযোগং পশ্বম্ভরানি বিধাতুং প্রস্তেীতি। অর্থাৎ–এই অনুবাকে ব্রহ্মতেজঃকামী ইত্যাদির পক্ষে স্বতন্ত্র পশুদানের বিষয় কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- বৌষড় নামক মন্ত্রের অভিমানী দেব বষট্কার, গায়ত্রীর সাথে তার বিরোধ ছিল। সেই বষকার দেব (একদা) গায়ত্রীর মুণ্ডচ্ছেদ করলে গায়ত্রীর সেই ছিন্ন মুণ্ড হতে জল ও রক্ত নির্গত হয়; সেই জল ও রক্ত হতে অনেক রকম বন্ধ্যা গাভী উৎপন্ন হয় (অনেকাবধা বশা উৎপন্নাঃ)। প্রথমে বৃহস্পতিদেবতা যা গ্রহণ করেন, তা তাঁর প্রিয় শ্বেতপৃষ্ঠা গাভী হয়; দ্বিতীয় বারে মিত্র ও বরুণদেবতাদ্বয় যা গ্রহণ করেন, তা দ্বিরূপা অর্থাৎ দুই বর্ণশালিনী বন্ধ্যা গাভী হয়; তৃতীয় বারে বিশ্বদেব যা গ্রহণ করেন, তা বহুরূপা অর্থাৎ বহুবর্ণযুক্তা বন্ধ্যা গাভী হয়। চতুর্থ পর্যায়ে ভূমিতে পতিত রস বৃহস্পতিদেব তাঁর ভোগের নিমিত্ত গ্রহণ করেন, এবং তা বিনষ্টবীর্ষ বৃষ হয়। যে রক্ত পতিত হয়েছিল, তা রুদ্রদেব গ্রহণ করেন; তা হতে রোহিণী অর্থাৎ রক্তবর্ণশালিনী বন্ধ্যা গাভী হয়। যিনি ব্রহ্মবৰ্চ অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞানজনিত তেজঃ কামনা করেন, তিনি বৃহস্পতি দেবতার নিকট তাঁর ভাগধেয় সহ গমন করলে বৃহস্পতিদেব তাকে ব্রহ্মতেজঃ প্রদান করেন এবং তিনি ব্রহ্মবচসী হয়ে থাকেন। গায়ত্রীছন্দের রসরূপ হলো বন্ধ্যা গাভী। সোম আহরণের পক্ষে অন্য ছন্দ অপেক্ষা গায়ত্রী প্রশস্তা। এই নিমিত্ত বশা অর্থাৎ বন্ধ্যা গাড়ী সকল ছন্দের সারস্বরূপ (তস্মাদ্বশা সবেষাং ছন্দসাং সারঃ)। বন্ধ্যা গাভীরূপ ছন্দরসের দ্বারা ইহলোক ও পরলোকসম্বন্ধীয় পূজাহেতু রসরূপ ব্ৰহ্মতেজঃ লব্ধ হয়। বৃষ্টির কামনা পূর্বক মিত্র ও বরুণদেবতার উদ্দেশে দুই বর্ণশালিনী বন্ধ্যা গাভী অর্পণ কর্তব্য। মিত্রদেবের সূর্যত্ব অর্থাৎ আলোকত্ব হেতু তিনি দিবাভাগে এবং বরুণদেবের অন্ধকাররূপ আবরণত্ব হেতু তিনি রাত্রে–এইরকম ভাবে দিবারাত্র মেঘ বৃষ্টি দান করে। মিত্র ও বরুণদেবের নিকট তাঁদের ভাগধেয় সহ উপস্থিত হলে তারা অহোরাত্ৰব্যাপী মেঘ হতে বৃষ্টি দান করেন। বন্ধ্যা গাভীরূপ ছন্দরসের দ্বারা বৃষ্টির উৎপত্তি। সেই কারণে ছন্দের রসে বৃষ্টি লব্ধ হয়ে থাকে। এইরকম প্রজাকামনায় মিত্রদেব ও বরুণদেবের উদ্দেশে দুই বর্ণযুক্ত বন্ধ্যা গাভী প্রদান করলে মিত্রদেব ও বরুণদেব পুত্র প্রদান করেন। মিত্র ও বরুণদেবতার নিকট তাঁদের ভাগধেয় সহ উপস্থিত হলে তারা অপত্যের উৎপত্তি সাধিত বা সম্পাদিত করে থাকেন। অন্নকামী জন বৈশ্বদেবীর উদ্দেশে বহুবর্ণযুক্তা বন্ধ্যা গাভী অর্পণ কর্তব্য। সর্ব দেবতার ভোজ্যত্বের কারণে অন্নের বৈশ্বদেবত্ব এবং জীবনহেতুত্বের কারণে অন্নের সারত্ব বা রসসাম্য (সারত্বসসাম্য। সর্বেদেবের নিকট তাদের ভাগধেয় সহ যিনি গমন করেন, তাকে সেই দেবগণ অন্ন প্রদান করে থাকেন; সেই ব্যক্তি অন্নের ভোক্তা হন। ছন্দের রসের দ্বারা অন্ন লব্ধ হয়ে থাকে। এইরকম গ্রামকামী জন বৈশ্বদেবীর উদ্দেশে বহুবর্ণযুক্তা বন্ধ্যা গাভী প্রদান করলে, সকল দেবতা তাঁকে ভ্রাতা ভৃত্য ইত্যাদি প্রদান করেন; সেই ব্যক্তি গ্রাম লাভ করেন। যিনি বৈশ্বদেবীর নিকট তার ভাগধেয় সহ গমন করেন, বৈশ্বদেবী তাকে ভ্রাতা ভৃত্য ইত্যাদি ও গ্রাম প্রদান করে থাকেন; সেই গ্রামকামী জন গ্রাম লাভ করে থাকেন। ব্রহ্মতেজঃ কামনা পূর্বক বৃহস্পতি দেবতার ভাগধেয়রূপ ব্যর্থবীর্য (বশত্বসম্পন্ন) বৃষ অর্পণ কর্তব্য। যিনি বৃহস্পতিদেবের ভাগধেয় সহ তার নিকট গমন করেন, বৃহস্পতি দেব তাঁকে ব্ৰহ্মতেজঃ প্রদান করে থাকেন, তিনি ব্রহ্মজ্ঞানজনিত তেজঃসম্পন্ন হন। এইরকম বৃষ যেমন ধেনুর সাথে বনে চরতে যায় এবং পুনরায় তাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গৃহে প্রত্যাবর্তন করে তাদের অধীন হয়, সেইরকম ব্রহ্মতেজঃ প্রাপ্ত জনও নিয়মের অধীন হয়, অধীন হয়ে চলেন। শত্রুর বিনাশের নিমিত্ত অভিচার ক্রিয়া সাধনের ইচ্ছায় রুদ্রদেবের উদ্দেশে রুদ্রদেবতাকে রক্তবর্ণ পশু প্রদান করলে রুদ্রদেব তাঁর (অর্থাৎ সেই প্রদাতার) শত্রুগণকে বিনাশ করেন। স্ক্যা নামক যজ্ঞীয় অস্ত্রবিশেষ যুপের (যজ্ঞীয় পশুবন্ধন-স্তম্ভের) আকৃতিবিশিষ্ট, তা বজ্রসদৃশ। তার দ্বারা শত্রুকে প্রহার করা হয়। শরময় কুশতৃণের (বহির) দ্বারা শত্রুকে হিংসা করা হয়ে থাকে। শরময় কুশতৃণের শীর্ষভাগ বজ্রের অবয়ব হতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে তা হিংসাত্মক। অক্ষ নামক বৃক্ষবিশেষ হতে উৎপন্ন বৈভীদক কাষ্ঠের দ্বারা শত্রুকে বিশেষভাবে বিদারণ করা হয় ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অষ্টমে পুনব্রহ্মবৰ্চসকামাদীনাং পশ্বম্ভরানি বিধাস্যন্নাদৌ কস্যচিৎ পশোবিধানায় প্রস্তৌতি–। এই অনুবাকে পুনরায় ব্রহ্মতেজঃকামী ইত্যাদি গণের পক্ষে স্বতন্ত্র পশুদানের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- কোনও এক সময়ে আদিত্যদেব দীপ্তিরহিত হয়ে পড়েন। দেবগণ এর প্রতিকারের ইচ্ছা করে সূর্যদেবের উদ্দেশে শ্বেতবর্ণযুক্তা বন্ধ্যা গাভী অর্পণ করলে আদিত্যদেব পুনরায় দীপ্তি প্রাপ্ত হন। যিনি ব্রহ্মতেজঃকামী, তিনি সূর্যের উদ্দেশে শ্বেতবর্ণযুক্তা বন্ধ্যা গাভী অর্পণ করবেন। যিনি আদিত্যের নিকটে তার ভাগধেয় সহ গমন করেন, তিনি তাকে ব্রহ্মতেজঃ দান করেন; সেই ব্যক্তি ব্রহ্মবৰ্চসী (অর্থাৎ ব্রহ্মতেজঃসম্পন্ন) হন (ব্রহ্মবéস্যের ভবতি)। বিশ্ব কাষ্ঠ দ্বারা ঘূপ হবে; সূর্য ও বিশ্ব সহোদর হওয়ায় সমযোনিজ (সূৰ্য্যবিয়োঃ সহোদরাত্বাৎ সযযানিত্ব)। এইরকম ব্ৰহ্মতেজঃও সমযোনিতে সম্পন্ন হয়ে থাকে। আপন পিতা ইত্যাদির যে বেদশাখায় অধ্যয়ন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে প্রবৃত্তি, নিজেরও তাতে প্রবৃত্তি জন্মে; এই কারণেই ব্ৰহ্মতেজঃ সমান যোনিতে নিজেরও তাতে প্রবৃত্তি জন্মে; এই কারণেই ব্রহ্মতেজঃ সমান যোনিতে লব্ধ বলে কথিত হয়েছে। যিনি অভিচার কর্ম সম্পাদনে ইচ্ছুক, তিনি ব্রহ্মণস্পতি দেবের উদ্দেশে পিঙ্গলবর্ণযুক্তা (বকর্ণী) গাভী প্রদান করবেন। বরুণদেবের উদ্দেশে দশ কপাল নির্বপণ পূর্বক তার দ্বারা প্রথমে শত্রুর (ভ্রাতৃবস্য) রোগ উৎপাদিত করে পরে ব্রহ্মণস্পতি দেবতার দ্বারা শত্রুর হনন সাধিত করতে হবে। পিঙ্গলবর্ণযুক্তা গাভী ব্রহ্মার রূপ, এবং তা সমৃদ্ধির হেতুভূত হয়। স্ক্যা নামক যজ্ঞীয় অস্ত্রবিশেষের আকৃতি যুপের (অর্থাৎ যজ্ঞীয় পশু বন্ধনের স্তম্ভের) ন্যায় বজ্রতুল্য। এর দ্বারা শত্রুকে প্রহার করা হয়। শরময় কুশতৃণের দ্বারা শত্রুকে হিংসা করা হয়। সেই কুশতৃণের শীর্ষভাগ বজ্রের অবয়ব হতে উৎপন্ন হওয়ার নিমিত্ত তা হিংসাত্মক। অক্ষ নামক বৃক্ষবিশেষ হতে উৎপন্ন বৈভীক কাষ্ঠের দ্বারা বিশেষভাবে শত্রুকে বিদারণ করা হয়। অগ্নিষ্টোম ইত্যাদি মহাযজ্ঞ যিনি অনুষ্ঠিত করতে ইচ্ছুক, তিনি বিষ্ণুদেবতার উদ্দেশে হ্রস্বকায় পশু অর্পণ করবেন। যজ্ঞ যাঁর নিকট আগত হন না, যজ্ঞরূপ বিষ্ণুর নিকট তাঁর ভাগধেয় সহ গমন করলে বিষ্ণু তাকে যজ্ঞ প্রদান করেন, যজ্ঞ তার নিকট আগমন করেন। হ্রস্বকায় পশুর দেবতা বিষ্ণু, এর দ্বারা সমৃদ্ধি লব্ধ হয়ে থাকে। যিনি পশু কামনা করেন, তিনি ত্বষ্টার উদ্দেশে বড়বা নামক অশ্ব প্রদান করবে। ত্বষ্টুদেব পশুমিথুনের প্রজনয়িতা; যিনি তাঁর ভাগধেয় সহ তার নিকটে গমন করেন, ত্বদেব তার নিমিত্ত মিথুন পশু উৎপন্ন করে থাকেন। সেই জন শীঘ্র পশু ও প্রজা লাভ করেন। পরের অর্থাৎ বিপক্ষের সেনাকে যিনি জয় করতে প্রতিজ্ঞা করবেন কিংবা শত্রুর সাথে যিনি সন্ধিস্থাপনে ইচ্ছুক হন, তিনি সংগ্রামের সূচনায় মিত্রদেবতার উদ্দেশে শ্বেত পশু অর্পণ করবেন। সন্ধি করণের ইচ্ছা পূর্বক মিত্রদেবতার ভাগধেয় সহ তার নিকট গমন করলে, মিত্রদেবতা তাকে (অর্থাৎ সেই ভাগধেয় প্রদানকারীকে) কার্যসাধনের উপযুক্ত সহকারীর সাথে যুক্ত করেন অথবা শত্রুকে মিত্রভাবাপন্ন করে তার সাথে যোজিত বা মিলিত করে (যদ্ধা বৈরিণো মিত্রত্বমাপাদ্য তেন মিত্রেণ যোজয়তি)। এই প্রতিজ্ঞাকারী জনের ধৈর্য উৎপাদন করে আপন কার্য-সাধনের নিশ্চয়তা আনয়ন করেন। বৃষ্টির কামনায় প্রজাপতিদেবের উদ্দেশে কৃষ্ণবর্ণযুক্ত পশু অর্পণ কর্তব্য। প্রজাপতি বৃষ্টির নিয়ামক; যিনি প্রজাপতির নিকটে তার ভাগধেয় সহ উপস্থিত হন, প্রজাপতি তার জন্য মেঘ হতে বারি বর্ষণ করে থাকেন। কৃষ্ণবর্ণ, হলো বৃষ্টির রূপ, তার দ্বারা বৃষ্টি লব্ধ হয়। সর্বশরীরে কৃষ্ণবর্ণ, শুধু উদর হতে স্তনপ্রদেশ পর্যন্ত যে পশুর শ্বেতবর্ণ-মিশ্রিত (বুদুরাদ্যধস্তনপ্রদেশবিশেষেষু শৈত্যমিশ্রণং), সেই রকম পশু অর্পণ করলে বিদ্যুৎসহ বৃষ্টির উৎপত্তি হয়। সেই পশুর শৃঙ্গ নিম্নের দিকে হলে (অধোমুখত্বেন) নিম্নভিমুখী বৃষ্টির ধারা দেখা যায় ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ নবমেহন্নাদ্যকামাদীনাং পশূন্বিধিৎসুরাদৌ ক্কচিৎ পশুং বিধাতুং।–এই অনুবাক-২৪ অন্ন, রোগারাগ্য, পুষ্টি ইত্যাদি কামীগণের পক্ষে পশুদানের বিষয় কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- সোমের অভিষবকারী ও অন্নের প্রদানকারী বরুণদেবতাকে যিনি লাভ করতে পারেননি, তিনি (একদা) বরুণ-সম্বন্ধি কৃষ্ণবর্ণযুক্তা বন্ধ্যা গাভী দর্শন করেছিলেন; সেই গাভীটিকে তার দেবতার উদ্দেশে অর্পণপূর্বক তিনি (সেই দানকারী) অন্নের ভক্ষণকারক হয়েছিলেন। শালি অন্ন পায়স ইত্যাদি ভোজনে সমর্থ হয়েও মনুষ্যজনের অভাব ইত্যাদির কারণে যিনি তা প্রাপ্ত হন না, তিনি বরুণ দেবতার উদ্দেশে কৃষ্ণবর্ণা বন্ধ্যা গাভী প্রদান করবেন। বরুণ দেবতার সমীপে তার ভাগধেয় সহ গমন করলে তিনি তাকে অল্পের ভক্ষণকারী করেন। বরুণদেবতা মেঘের দ্বারা আবরণ সৃষ্টি পূর্বক কৃষ্ণবর্ণ (অন্ধকার) সম্পন্ন করে থাকেন। এই কারণে বরুণ কৃষ্ণবর্ণযুক্ত পশুর দেবতা; এর দ্বারা সমৃদ্ধি লব্ধ হয়ে থাকে। অন্নকামী জন বর্ষা ও শরঙ্কালের সন্ধিক্ষণে নদী ও ক্ষেত্রের মধ্যে (ঋতত্বাৰ্ম্মধ্যে নদীক্ষেত্ৰয়োৰ্ম্মধ্য ইতি) মিত্ৰদেবের উদ্দেশে শ্বেতবর্ণযুক্ত পশু ও বরুণদেবের উদ্দেশে কৃষ্ণবর্ণযুক্ত পশু অৰ্পণ কর্তব্য। মিত্রদেব ওষধির দেবতা এবং বরুণদেব জলের দেবতা; ওষধি ও জলের দ্বারা জীব নিশ্চিতভাবে জীবন ধারণ করে। মিত্রদেব ও বরুণদেবের উদ্দেশে তাদের ভাগধেয় সহ গমন করলে তারা সেই জনকে অন্ন প্রদান করেন এবং তিনি অর্থাৎ (সেই গমনকারী) অন্নের ভোজনাধিকারী হন। জল ও ওষধির সন্ধিকালের প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে উভয়ের রসে জীবন ধারণের প্রশস্তির নিমিত্ত (সন্ধৌ প্রয়োগ উভয়রসোপজীবনেন প্রশস্তঃ)। বিবিধ শাখাযুক্ত বৃক্ষ বিশাখা (বিবিধে শাখে যস্যাসৌ বিশাখঃ)। এই রকম বিশাখায় যুপ হয়। এই দুই দেবতা (মিত্র ও বরুণ) সমৃদ্ধির কারণ। দীর্ঘকালের রোগীর পক্ষে দ্বি-পশু সম্পৰ্কীয় কর্মের কথা বলা হচ্ছে। তিনি (অর্থাৎ দীর্ঘকালব্যাপী রোগভোগী জন) মিত্রদেবের উদ্দেশে শ্বেতবর্ণযুক্ত এবং বরুণদেবের উদ্দেশে কৃষ্ণবর্ণশালী পশু অর্পণ করবেন। মিত্রদেবতা ক্রুর বরুণদেবকে শান্ত করেন, তিনি (অর্থাৎ মিত্রদেব) তাকে (অর্থাৎ সেই পশুদাতা রোগভোগী জনকে) বরুণপাশ হতে মুক্ত করেন (বরুণপাশাম্মোচয়তি); সেই জন বিগতপ্রাগ হলেও জীবিত হন। দেবগণ প্রজা ও পশুর সমৃদ্ধিরূপ পুষ্টি (প্রজাপশুসমৃদ্ধিং পুষ্টিঃ) দর্শন করতে পারেননি, তা মনুষ্যমিথুনে সম্ভবের উপায় দর্শন করেছিলেন, কিন্তু তা সাধন করতে অপারাগ হয়েছিলেন। তখন তারা অশ্বিদেবদ্বয়কে বলেছিলেন, এই পুষ্টির সাধন বিনা তোমরা আমাদের সম্ভাষণ করো না (পুষ্টাবাবাভ্যাং বিনা মা বদধ্বং)।তখন সেই পুষ্টি অশ্বিযুগলের অধীন হয়েছিল। যিনি পুষ্টি কামনা করেন, তিনি অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের উদ্দেশে যমীং বশামা পশু অর্পণ করবেন। যিনি পুষ্টিকামী হয়ে অশ্বিদ্বয়ের নিকট তাদের ভাগধেয় সহ উপস্থিত হন, অশ্বিযুগল তাকে পুষ্টি প্রদান করেন; সেই পুষ্টিকামী জন প্রজা ও পশুর পুষ্টি লাভ করে থাকেন। (এখানে অশ্বিদ্বয়ের ভাগধেয় পশু হলো যমীং বশামা। একই গর্ভে সহজাত যমজের মধ্যে যেটি স্ত্রী, সে যমী এবং যে যমী বন্ধ্যা, সে বশামা) ॥৯॥
মর্মার্থ- তিনপুরুষ ক্রমে যার বেদ (বেদাধ্যয়ন) ও বেদী (এখানে যজ্ঞসাধন অর্থে) বিচ্ছিন্নতাপ্রাপ্ত হয়েছে, তিনি শুদ্রতুল্য দুব্রাহ্মণ; সেই ব্যক্তি যদি শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে সোম পানের আকাঙ্ক্ষা করেন, তবে অশ্বিদেবদ্বয়ের উদ্দেশে ললাটে শ্বেতচিহ্ন লাঞ্ছিত ও শরীরের অবশিষ্টে ধূ (অর্থাৎ ধূসর বা মলিনশ্বেত) বর্ণশালী পশু অর্পণ করবেন। দেববর্গের মধ্যে চিকিৎসক (ভিষজ) হওয়ায় অশ্বিযুগল পূর্বে সোমপায়ী ছিলেন না (সোমপাতৃত্বং নাস্তি), পরে যজ্ঞের ছিন্ন শির যুক্ত করার নিমিত্ত দেববর্গ তাঁদের সোমগ্রহণ লব্ধ করান (দেবেভ্যঃ সোমগ্রহং লবন্তেী)। কোনও দুব্রাহ্মণ শ্রদ্ধালু হয়ে সোম পানের ইচ্ছায় অশ্বিদ্বয়ের নিকট তাদের ভাগধেয় সহ গমন করেন, তাহলে তারা তাকে সোমপায়ী করে দেন; এবং তার কলঙ্ক দূরীভূত পূর্বক ব্রহ্মতেজঃ প্রদান করেন। ব্রহ্মহত্যাকারী বলে মিথ্যাপবাদগ্রস্ত জন তাঁর সেই অপবাদ ক্ষালনের নিমিত্ত বায়ুর উদ্দেশে তার ভাগধেয় গোমৃগ সহ গমন করলে বায়ু তাকে পবিত্র করেন। দেবগণের মধ্যে বায়ু হলেন পবিত্রকারী। সেই জন অভিজ্ঞ শিষ্টজনের দ্বারা আদৃত হলেও সাধারণ্যের নিকট তাঁর অপবাদ রয়ে যায়। তা দূরীভূত করার নিমিত্ত সূর্যদেবতার উদ্দেশে বহুরূপমা অর্থাৎ বহুবর্ণশালী পশু প্রদান, কর্তব্য। সোমযাগের মধ্যে অগ্নি হোতা, গৃহপতি, রাজা ইত্যাদি আশ্বিন-শস্ত্র (শস্ত্র অর্থে প্রণীত মন্ত্র) উচ্চারণ করার সময়ে যদি সূর্য মেঘ ইত্যাদির দ্বারা আবৃত থাকেন (মেঘাদ্যাবরণমন্তরেণ…) তাহলে সেই দোষ ক্ষালনের নিমিত্ত সূর্যের উদ্দেশে বহুবর্ণযুক্ত পশু প্রদান করলে সূর্য অন্ধকার দূর করেন (অর্থাৎ যজমান রাত্রির ন্যায় অন্ধকারের অবসানে প্রভাত প্রাপ্ত হন)। সেইরকম মিথ্যাপবাদ দূর করার নিমিত্ত যে জন সূর্যের নিকটে তাঁর ভাগধেয় সহ গমন করেন, আদিত্য তার পাপ-কালিমা অপননাদিত করেন ॥১০
মর্মার্থ- সকল জগতের উপরিভাগে সুষ্ঠুরূপে অবস্থানকারী ইন্দ্রদেবকে পুত্র ইত্যাদি (অপত্য) লাভের নিমিত্ত আমরা আহ্বান করছি। হে মরুত্বর্গ! যেহেতু আমরা সুখলাভের কামনায় আপনাদের আহ্বান করছি, সেই হেতু আপনারা দ্যুলোক হতে আগমন করে আমাদের সুখ প্রদান করুন। সপ্ত দেবতার উদ্দেশে হবিঃ প্রদানের নিমিত্ত ও যজমানের মঙ্গলের নিমিত্ত (দেবেভ্যো হবিদানায়, স্বস্তয়ে যজমানস্য শ্রেয়সে চ) ইন্দ্র, অগ্নি, মিত্র, বরুণ, ভাগ, দ্যাবাপৃথিবী, ও মরুৎগণের যজ্ঞ আরম্ভের কালে আমরা আহ্বান করছি (আহ্বায়ামঃ)। ইন্দ্র হলেন সুখে আহ্বান-সাধ্য (শক), পাপ- উন্মোচনকারী, হিতকরী, দিবি (দৈব্যং) ও জনের নিমিত্ত বৃষ্টিধারণপূর্বক শস্য ইত্যাদির উৎপাদনকারী। অগ্নি সর্বৰ্ভক্ষণকারী, সূর্য দিবা-কারক, বায়ুবর্গ ও পর্জন্যদেবতা বর্ষণকারী–তাঁরা আমাদের আনন্দ দান করুন। হে ইন্দ্র ও পর্বত! আপনারা আমাদের শরীরের পাপ ক্ষয় করুন। সকল দেবগণ পরিচর্যাসময়ে আমাদের কৃপাপূর্বক অবলোকন করুন। হে মরুৎ-বর্গ! হবিঃ-স্বীকারের নিমিত্ত ত্বরান্বিত-গতিমান আপনাদের প্রিয় নামসমূহে আহ্বান করছি। যে মরুত্বর্গ প্রাণীগণকে সুখ প্রদানের নিমিত্ত সূর্যরশ্মির সাথে বৃষ্টির দ্বারা ভূমি সিক্ত করার ইচ্ছা করেন, সেই মরুৎগণ ঋক্-মন্ত্রের দ্বারা স্তুত হয়ে হবিঃ ভক্ষণ করছেন। অতঃপর তারা উৎসাহজনিত বহুরকম শব্দ করতে করতে আপন গৃহের প্রতি অসুর হতে ভয়-রহিত হয়ে তাদের প্রিয় স্থান লাভ করছেন (লব্ধবন্তঃ)। যখন দেবতা ও অসুরগণ যুদ্ধের নিমিত্ত উদ্যত হয়েছিল, তখন পরস্পর প্রীতিরহিত হয়ে সকল সেনা চতুধা বিভক্ত হয়েছিল। সেইমতো বসুগণের সাথে প্রথম সঙ্ঘের অধিপতি অগ্নিদেব আমাদের রক্ষা করুন; রুদ্রবর্গের সাথে দ্বিতীয় সঙ্রে অধিপতি স্বয়ং প্রীতি পূর্বক আমাদের রক্ষা করুন; মরুত্বর্গের সাথে তৃতীয় সঙ্ঘের অধিপতি ইন্দ্রদেব ঋতু অনুযায়ী ভোগ দান করে আমাদের রক্ষা করুন (ঋতুচিতভোগধারিণোস্মন্ করোতু); আদিত্যগণের সাথে চতুর্থ সঙ্ঘের অধিপতি বরুণ আমাদের সম্যকভাবে ব্রতপরায়ণ করুন। পুর্বোক্ত সঙ্ঘ চারটির মধ্যবর্তী দেবগণ, যথা–অগ্নি সমীপবর্তী বসুগণ, সোম সমীপবর্তী রুদ্রগণ, ইন্দ্রের সমীপবর্তী মরুৎগণ, বরুণের সমীপবর্তী আদিত্যগণ আমাদের সমীপবর্তী হয়ে আমাদের এই অনুষ্ঠান অনুমোদন করুন। আদিত্যগণ যেমন বসুগণের সমীপবর্তী হয়ে এবং বসুগণ যেমন অগ্নির সমীপবর্তী হয়ে প্রীতিযুক্ত হয়েছিলেন, যেমন মরুঙ্গণ ইন্দ্রের সমীপবর্তী হয়ে এবং রুদ্রগণ যেমন সোমের সমীপবতী হয়ে সম্যভাবে জ্যেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছিলেন, হে ত্রিনামযুক্ত অগ্নি (অর্থাৎ হে আহবনীয় অগ্নি, হে গার্হপত্য অগ্নি ও হে দক্ষিণাগ্নিরূপ হব্যকব্য বহনকারী অগ্নি)! সকল দেববর্গ সেইরকম পরস্পর সমানমনস্ক হয়ে আমাদের প্রতি প্রীতিযুক্ত হোন।
যাঁর সাথে সঙ্গত বা মিলিত হয়ে মনুষ্যগণ আপন গৃহে (মনুষ্যস্থানে, অর্থাৎ গ্রাম গৃহ ইত্যাদি স্থানে) সানন্দে অবস্থান করে, চিন্মন্ত্রে যাঁর পূজা করবার মানসে বহ্নি প্রজ্বলিত করে যজমানগণ সমীচীন ফল লাভ করেন, সেই স্বিষ্টকৃৎ দেব প্রসন্ন হোন। যার কারণে আমরা অন্ন, যজমানগণের (প্রয়োজনীয়) হোমযোগ্য দ্রব্যসকল প্রাপ্ত হই, এবং ধনের বলের ও যজ্ঞের রশ্মির ন্যায় উৎকর্ষ স্বীকার করি (রশিবপ্রকাশমুৎকর্ষমাদদে স্বী কুৰ্ম্মঃ), সেই স্বিষ্টকৃৎ দেবের ভজনা করছি (ভজাম)। এই যজ্ঞ দেবগণের সুখ প্রবর্তন করুন। হে আদিত্যগণ! আপনারা আমাদের সুখপ্রদ (সুখয়ন্তো) হোন। অর্বাচীন আমাদের প্রতি আপনাদের অনুগ্রহ-বুদ্ধি প্রবৃত্ত হোক (অনুগ্রহবুদ্ধিরর্বাচীনেশ্বাসু প্রবৃত্তা সতী), চা আমাদের পাপ বিনাশ করুক এবং আমাদের পরিচর্যা সম্পর্কে অভিজ্ঞ হোক (পরিচৰ্য্যাভিজ্ঞা ভবতু)। অন্নযুক্ত, অন্যের এমন কি শত্রু কর্তৃকও অতিরস্কৃত, চিরজীবী (বৃদ্ধবয়াশ্চিরজীবীত্যর্থঃ), সুবীর অর্থাৎ পুত্র-ভৃত্য ইত্যাদি যুক্ত, এমন যজমান পবিত্র হয়ে কর্মাভিমুখে গমন করছেন। আদিত্যের প্রতি কর্মকারী (আদিত্যানাং প্রণয়নে কর্মানি ভবতি) এই যজমানকে শত্রুগণ নিকট হতে (অর্থাৎ অস্ত্রের দ্বারা) বা দূর হতে (অর্থাৎ অভিচার ক্রিয়ার সাহায্যে) বিনাশ করতে পারে না। জগতের ধারক (জগদ্ধারয়ন্ত), ভুবনের পালক (ভুবনস্য পালয়িতারঃ) স্থিরবুদ্ধি, যজমানের রক্ষক, তাদের (যজমানদের) স্বরাষ্ট্র বা সত্যে স্থাপনকারী এবং শত্রুগণের (বহু ঋণগ্রস্ততার দ্বারা) দারিদ্র্যসম্পাদনকারী আদিত্যগণ আমাদের অভিমত কার্য করুন (অস্মৃদভিমতং কুবন্তিবতি)। হে অর্যমা, বরুন, মিত্র ইত্যাদি (দ্বাদশ) আদিত্যবর্গ! আপনাদের রমণীয় মাহাত্ম্য অধিক। আপনারা স্বর্গ, মত ও পাতালরূপ তিন ভূমি (লোক) ধারণ করে আছেন; সূর্য, ছন্দ ও বহ্নিকে প্রকাশ করেছেন (প্রকাশান্ধারিতবঃ); এবং যজমানদের যজ্ঞে মন-বাক্য-কায় দ্বারা নিম্পাদ্য নিম্পাদ্য তিনটি ব্রত সত্যবচনের দ্বারা ধারণ করেছেন (সত্যবচনেন ধারিতবন্তঃ)। ক্ষত্রিয়ের ন্যায় প্রবল, সুখদায়ক সেই আদিত্যগণকে আমাদের কর্তব্যসিদ্ধির নিমিত্ত প্রার্থনা করছি (কর্তব্যেষ্টিসিদ্ধ্যর্থমাদিত্যান….প্রার্থয়ামহে)। হে আদিত্যগণ! বৈরিগণ কর্তৃক উৎপীড়িত হয়ে বিমূঢ়চিত্ত আমি অপরিপক্ক কাতর (অস্থির) বালকের ন্যায় দক্ষিণ (ডান) সব্য (বাম) সম্মুখ পশ্চাৎ কিছুই অনুভব করতে পারছি না। আমি যেন আনাদের প্রিয়জনরূপে শত্রুভয়রিতে বিবেকজ্ঞানরূপ জ্যোতি প্রাপ্ত হই। আমরা যজমানগণ আদিত্য সম্বন্ধী নূতন রক্ষণের দ্বারা যুক্ত হয়ে সর্ব উপদ্রবরহিত শান্তিতে ও সুখে থাকব। হে আদিত্যগণ! নিরপরাধী আমাদের স্তুতি শ্রবণের নিমিত্ত আপনারা এই যজ্ঞ শীঘ্র ধারণ করুন (ত্বরমাণা ইমং যজ্ঞং ধারয়ন্তু)। হে বরুণ! আমাদের এই যজ্ঞাহ্বান শ্রবণ করে আমাদের সুখী করুন। আমরা মন্ত্রের দ্বারা বন্দনা করে আপনাকে প্রাপ্ত হবো। হে ক্রোধরহিত বরুণ! এই কর্মে আমাদের নিবেদন জ্ঞাত হোন (অস্মদ্বিজ্ঞাপনাং বুধ্যস্ব)। হে উরুশংস! প্রভূত স্তুতিকারক আমাদের আয়ুর বিনাশ করবেন না ॥১১৷৷
দ্বিতীয় অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ১২
অনুবাক-১২
মন্ত্র- প্রজাপিতঃ প্রজা অসৃজত তাঃ সৃষ্টা ইন্দ্রাগ্নী অপাগৃহতাং সোহচায়ৎ প্রজাপতিরিন্দ্রাগ্নী বৈ মে প্রজা অপাধুক্ষতমিতি স এতমৈন্দ্রাঘুমেকাদশ কপালমপশ্যত্তং নিরপত্তাবস্মে প্রজাঃ প্রাসাধয়তামিন্দ্রাগ্নী বা এতস্য প্রজামপ গৃহতো যোহলং প্রজায়ৈ সন্ প্রজাং ন বিন্দত ঐন্দ্রাগ্নমেকাদশকপালং নিৰ্ব্বপেৎ প্রজাকাম ইন্দ্রাগ্নী এব স্বেন ভাগধেয়েনোপ ধাবতি তাবেবাম্মৈ প্রজাং প্র সাধয়তো বিন্দতে প্রজামৈন্দ্রাগ্নমেকাদশকপালং নিৰ্ব্বপেৎ স্পর্ধমানঃ ক্ষেত্রে বা সজাতে। বোগ্নী এব স্বেন ভাগধেয়েনোপ ধাবতি ভ্যামে বেন্দ্ৰিয়ং বীৰ্য্যং ভ্রাতৃব্যস্য বৃক্তে বি পাশ্মনা ভ্রাতৃব্যেণ জয়তেহপ বা এতস্মাদিন্দ্ৰিয়ং বীৰ্য্যং ক্ৰামতি যঃ সগ্রামমুপপ্রত্যেন্দ্রাগ্নমেকাদশকপালং নিঃ বপেৎ সংগ্রামমুপপ্রয়াস্যন্নিদ্রাগ্নী এব স্বেন ভাগধেয়েনোপ ধাবতি তাবে স্মিন্নিন্দ্রিয়ং বীৰ্যং ধঃ সহেন্দ্রিয়েণ বীর্য্যেপোপ প্র যাতি জয়তি তং সংগ্রামং বি বা এষ ইন্দ্রিয়েণ বীর্য্যেণৰ্দ্ধতে যঃ সগ্রামং জয়ত্যৈন্দ্রাগ্নমেকাদশকপালং নিৰ্বপেৎ সংগ্রামং জিত্বেভ্রাগ্নী এব স্পেন ভাগধেয়েনোপ ধাবতি তাবে স্মিন্নিন্দ্রিয়ং বীৰ্য্যম ধত্তো নেন্দ্রিয়েণ বীর্যেণ বৃধ্যতেহপবা এতম্মাদিন্দ্ৰিয়ং বীৰ্যং ক্ৰামতি য এতি জনতামৈন্দ্রাগ্নমেকাদশকপালং নিৰ্ব্বপেজ্জনতামে য্যন্নিাগ্নী এব স্বেন ভাগধেয়েনোপ ধাবতি তাবেবাস্মিন্নিন্দ্রিয়ং বীৰ্য্যং ধঃ সহেন্দ্রিয়েণ বীর্যেণ জনতামেতি পৌষ্ণং চরুমনু নিৰ্ব্বপেৎ পূষা বা ইন্দ্রিয়স্য বীৰ্য্যস্যানুপ্রদাতা পূষণমেব স্বেন চরুমনু নিৰ্বপেৎ পূষা বা ইন্দ্রিয়স্য বীৰ্য্যস্যানুপ্রদাতা পূষণমেব স্বেন ভাগধেয়েনোপ ধাবতি স এবাম্মা ইন্দ্রিয়ং বীৰ্য্যমনু প্র যচ্ছতি ক্ষৈত্ৰপত্যং চরুং নিৰ্বপেজ্জনমাগত্যেয়ং বৈ ক্ষেত্রস্য পতিরস্যামের প্রতি তিষ্ঠত্যৈন্দ্রাঘুমেকাদশকপালমুপরিষ্টান্নিৰ্ব্বপেদস্যামে প্রতিষ্ঠায়েন্দ্রিয় বীৰ্য্যমুপরিষ্টাদাত্মন্ধত্তে ॥১॥ [এই প্রপাঠকের মন্ত্রগুলি পূর্ব পূর্ব অনুবাকের বিভিন্ন মন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা অবলম্বনে যথাযথ মর্মার্থ দেওয়া হয়েছে। এই মন্ত্রগুলির অর্থাৎ এই প্রপাঠকের দ্বাদশটি অনুবাকের ব্যাখ্যা যেহেতু ভাষ্যকার স্বতন্ত্রভাবে প্রদান করেননি, সুতরাং আমরাও তারই অনুসরণে মন্ত্রগুলির বিষয়বস্তুর উল্লেখ করলাম ]।
মর্মার্থ- এখানে কাম্য পশুর কথা প্রসঙ্গে চরু নির্বপণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রজা কামনা না করে, কিংবা বৈরির প্রতি স্পধান্বিত হয়ে, কিংবা জনসভায় জয়লাভের নিমিত্ত অগ্নিদেবের উদ্দেশে একাদশ কপাল, ইন্দ্রদেব ও অগ্নিদেবের উদ্দেশে পঞ্চসংখ্যক এবং পূষাদেবতার উদ্দেশে একটি চরু নির্বপণ কর্তব্য। ক্ষেত্রপতির উদ্দেশে গরু প্রদান করতে হয়। এই অনুবাকে ইন্দ্রদেব ও অগ্নিদেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে ॥১॥
দ্বিতীয় অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ১৩
অনুবাক-১৩
মন্ত্র- অগ্নয়ে পথিকৃতে পুরোডাশমষ্টাকাঁপালং নিৰ্ব্বপেদ্যো দর্শপূর্ণমাসযাজী সন্নমাবস্যাং বা পৌৰ্ণমাসীং বাহতিপাদয়েৎ পথো বা এযোহধ্যপতেনৈতি যো দর্শপূর্ণমাসযাজী সন্নমাবস্যাং বা পৌর্ণমাসীং বাহতিপাদয়ত্যগ্নিমেব পথিকৃতং স্বেন ভাগধেয়েনোপ ধাবতি স এবৈনমপথাৎ পন্থামপি নয়ত্যনন্দক্ষিণা বহি হ্যে সমৃদ্ধ্যা অগ্নয়ে ব্রতপতয়ে পুরোডাশমষ্টাকপালং নিৰ্ব্বপেদ্য আহিতাগ্নিঃ সন্নব্ৰত্যমিব চরেদগ্নিমেব ব্রতপতিং স্বেন ভাগধেয়েনোপ ধাবতি স এবৈনং ব্ৰতমা লয়তি ব্রতত্যা ভবত্যগুয়ে রক্ষোঘ্নে পুরোড়াশমষ্টাকপালং নিৰ্বপেদ্যং রক্ষাংসি সচেরন্নগ্নিমেব রক্ষোহণং ষেন ভাগধেয়েনোপ ধাবতি স এবাম্মাদ্ৰক্ষাংস্যপহন্তি নিশিতায়াং নিৰ্বপেৎ নিশিতায়াং হি রক্ষাংসি প্রেরতে সম্প্রের্ণান্যেবৈনি হন্তি পরিশিতে যাজয়েদ্রক্ষ সামনবচারায় রক্ষোপ্পী যাজ্যানুবাক্যে ভবতো রক্ষসাং ত্যা অগ্নয়ে রুদ্রবতে পুরোডাশমষ্টাকপালং নিৰ্ব্বপেদভিচরন্নেষা বা অস্য ঘোরা তনূর্যদ্রম্মা এবৈনমা বৃশ্চতি তাজগার্তিমাচ্ছত্যগয়ে সুরভিমতে পুরোডাশমষ্টাকপালং নিৰ্ব্বপেদ্যস্য গাবো বা পুরুষাঃ বা প্রমীয়েরন্যো বা বিভীয়দেষা বা অস্য ভেষজ্যা তনুর্যৎ সুরভিমতী তয়ৈবাস্মৈ ভেবজং কয়রাতি সুরভিমতে ভবতি পূতীগন্ধস্যাপহত্যা অগ্নয়ে ক্ষামবতে পুরোডাশমষ্টাকপালং নিৰ্বপেৎ সংগ্রামে সংযত্তে ভাগধেয়ে নৈবেনং শময়িত্ব-পরানভি নিৰ্দিশতি যমবরেষাম বিধ্যন্তি জীবতি স যং পরেং প্র স মীয়তে জয়তি তম সংগ্রামং অভি বা এষ এতানুচ্যতি যেষাং পূৰ্ধাপরা অঞ্চঃ প্ৰমীয়ন্তে পুরুষাহুতিহস্য প্রিয়তমাহগ্ননেয় ক্ষামবতে পুরোডাশমষ্টাকপালং নিৰ্ব্বপেত্তাগধেয়েনেবৈনম শময়তি নৈষাং পুরাইয়ুমোহপরঃ প্র মীয়তেহভি বা এষ এতস্য গৃহানুচ্যতি যস্য গৃহা-হত্যগ্নয়ে ক্ষামবতে পুরোডাশমষ্টাকপাল নিৰ্ব্বপেস্তাগধেয়েনৈবেনং শময়তি নাস্যাপরং গৃহাহতি ॥২॥ মর্মার্থ এখানে দর্শপূর্ণমাস যাগের পরে পথিকৃৎ অগ্নিদেবের উদ্দেশে অষ্টকপাল পুরোডাশ (যজ্ঞীয় ঘৃত) এবং ব্রতের কোনরকম হানি (অতিপাদ) ঘটলে ব্রতপতি অগ্নির উদ্দেশে অষ্টকপাল পুরোডাশ নির্বপণের নির্দেশ প্রদত্ত হয়েছে৷ উভা বামিন্দ্রাগ্নী ইত্যাদি মন্ত্রে এগুলি ব্যাখ্যাত হয়েছে। পিশাচ ইত্যাদির উপদ্রব হতে নিষ্কৃতি লাভের নিমিত্ত অগ্নিদেবতার উদ্দেশে কৃণুম্ব ইত্যাদি মন্ত্রে ব্যাখ্যাত হয়েছে। বৈরির প্রতি অভিচার কর্ম সাধনের নিমিত্ত রুদ্রদেবতার উদ্দেশে পুরোডাশ নির্বপণ, কর্তব্য। মনুষ্য (পুরুষাঃ), গো ইত্যাদির মৃতুভীতি হতে রক্ষার নিমিত্ত সুরভিমৎ (সুরভীমতী) যাগের অনুষ্ঠান কর্তব্য। যুদ্ধাকাঙ্ক্ষী বা অপমৃত্যু ও গৃহদাহ ইতাদিতে ভীতিগ্রস্থ জন শান্ত অগ্নির উদ্দেশে তিনটি অষ্টকাঁপাল পুরোডাশ নির্বপন করবেন ॥২॥
মর্মার্থ- এখানে অগ্নির উদ্দেশে অন্নবৎ যাগ হতে জ্যোতিষ্মৎ যাগ পর্যন্ত বিষয় বলা হয়েছে। অন্নকামী জন অন্নবান্ অগ্নির উদ্দেশে অষ্টকপাল পুরোডাশ নির্বপণ করবেন। যিনি শক্তি কামনা করবেন, তিনি অন্নদানকারী অগ্নির উদ্দেশে পুরোডাশ অর্পণ করবেন। প্রভূত পরিমাণ অন্নের আধিপত্য লাভের কামনা করলে অন্নপতি অগ্নির উদ্দেশে পুরোডাশ নির্বপণ কর্তব্য। দীর্ঘ রোগ হতে মুক্ত হওয়ার নিমিত্ত পবমান অগ্নির উদ্দেশে একটি, পাবকাগ্নির উদ্দেশে একটি ও শুচি অগ্নির উদ্দেশে যথাক্রমে একটি করে হবির্যাগ নিষ্পন্ন করতে হবে। ক্ষীর ইত্যাদি কামনা করলে রসবান অগ্নির উদ্দেশে অজক্ষীরে প্রস্তুত চরু অর্পণ কর্তব্য। ধনকামনায় বসুমান অগ্নির উদ্দেশে অষ্টকপাল পুরোশ নির্বপণ কর্তব্য। সংগ্রামে জয়লাভ পূর্বক অনুপ্রাপ্তির কামনায় রাজসৃৎ অগ্নিদেবের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। উধৃত অগ্নিকে বিনাশ করণের নিমিত্ত জ্যোতির্মান অগ্নির উদ্দেশে যাগ নিম্পাদন করতে হবে ॥৪॥
মর্মার্থ- পুত্রেষ্টি যাগ হতে মন্ত্রগুলির অর্থ যত্ত্বা হৃদা ইত্যাদি মন্ত্রে ব্যাখ্যাত হয়েছে। অপবাদ মোচনের নিমিত্ত বৈশ্বানর অগ্নিদেবতার উদ্দেশে পুরোশ নির্বপণ করতে হয় এবং বরুণদেবের উদ্দেশে একটি ও দধিকাৰ্ণদেবের উদ্দেশ্যে একটি চরু প্রদান কর্তব্য। পুত্রের জন্মের পর তার মঙ্গলার্থে বৈশ্বানর অগ্নিদেবের উদ্দেশে একটি যুগানুষ্ঠান কর্তব্য। গ্রামকামী জন বৈশ্বানর অগ্নির উদ্দেশে একটি ও মরুৎ-দেবগণের উদ্দেশে একটি যুগানুষ্ঠান করবেন ॥৫৷৷
দ্বিতীয় অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ১৭
অনুবাক-১৭
মন্ত্র- আদিত্যং চরুং নিৰ্ব্বপেৎ সংগ্রামমুপপ্রয়াসন্নিয়ং বা অদিতিরস্যামের পূর্বে তিতিষ্ঠন্তি বৈশ্বানরং দ্বাদশকপালং নিৰ্বপেদায়তনং গত্বা সম্বৎসরো বা অগ্নিব্বৈশ্বানরঃ সম্বৎসরঃ খলু বৈ দেবানামায়তনমেতস্মাদ্বা আয়তনাদে অসুরানজয়ন্যদ্বৈশ্বানরং দ্বাদশকপালং নিৰ্বপতি দেবানামেবাহয়তনে যততে জয়তি তং সঙগ্রামমেতস্মিম্বা এতৌ মৃজাতে যো বিদ্বিষাণয়োরন্নমত্তি বৈশ্বানরং দ্বাদশ কপালং নিৰ্ব্বপেদ্বিদ্বিষাণয়োরন্নং জাব্বা সম্বৎসরো বা অগ্নির্বৈশ্বানরঃ সম্বৎসর- স্বদিতমেবাত্তি নাস্মিম্মুজাতে সম্বৎসরায় বা এতৌ সমমাতে যৌ সমমাতে তয়োর্যঃ পূৰ্বোহভিহতি তং বরুণণা গৃতি বৈশ্বানরং দ্বাদশকপালং নিৰ্বপেৎ সমমানয়োঃ পূর্বেহভিক্ৰহ্য সম্বৎসরো বা অগ্নিব্বৈশ্বানরঃ সম্বৎসরমোহশ্বা নিৰ্বরুণং পরস্তাদভি দ্রুহ্যতি নৈনং বরুণণা গৃহ্বাত্যাব্যং বা এষ প্রতি গৃতি যোহবিং প্রতিগৃতি বৈশ্বানরং দ্বাদশকপালং নিৰ্বপেদবিং প্রতিগৃহ্য সম্বৎসররা বা অগ্নিব্বৈানরঃ সম্বৎসরঘদিতামের প্রতি গৃতি নাইব্যৎ প্রতি গৃহ্বাত্যাত্মনো বা এষ মাত্রামাগোতি য উভয়াদৎ প্রতিগৃহ্বত্যং বা পুরুষং বা বৈশ্বানরং দ্বাদশকপালং নিৰ্ব্বপেদুভয়াদৎ প্রতিগৃহ্য সম্বৎসরো বা অগ্নির্বৈশ্বানরঃ সম্বৎসরস্বদিতমেব প্রতিগৃতি নাহত্মনো মাত্রামাগোতি বৈশ্বানরং দ্বাদশকপালং নিৰ্বপেৎ সনিমেষ্যসম্বৎসররা বা অগ্নিব্বৈশ্বানররা যদা খলু বৈ সম্বৎসরং জনতায়াং চরত্যথ স ধনাৰ্ঘো ভবতি যদ্বৈশ্বানরং দ্বাদশকপালং নিৰ্বপতি সম্বৎসরসাতামের সনিমভি চ্যবতে দানকামা অস্মৈ প্রজা ভবন্তি যো বৈ সম্বৎসরং প্রযুজ্য ন বিমুঞ্চত্যপ্রতিষ্ঠনো বৈ স ভবত্যেমেব বৈশ্বানরং পুনরাগত্য নিৰ্বপেদ্যমে প্রযুক্তে তং ভাগধেয়েন বিমুঞ্চতি প্রতিষ্ঠিত্যৈ যয়া রজ্জোত্তমাং গামাজেত্তাং । ভ্রাতৃব্যায় প্রহিনুয়ান্নি ঋতিমেবাস্মৈ প্ৰহিপোতি ॥৬৷৷
মর্মার্থ- সংগ্রামে জয়লাভেচ্ছু হলে আদিত্য দেবতার উদ্দেশে চরু নির্বপণ করতে হবে। সংগ্রামে গমন করে বৈশ্বানর অগ্নির উদ্দেশে দ্বাদশ কপাল পুরোডাশ নির্বপণ কর্তব্য। বিপক্ষকে মারণের বা আঘাতের নিমিত্ত উদ্যত হয়ে অন্ন পাক পূর্বক বৈশ্বানরের উদ্দেশে পুরোভাশ নির্বপণ করতে হয়। পূর্বে শপথ করেও যিনি তা পালন করেননি, তাঁরাও বৈশ্বানর অগ্নিদেবের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। এই অনুবাকে আদিত্য-চরু ইত্যাদি বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে ৷৬৷
মর্মার্থ- পশু-কামনাকারী যজমান ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে চরু নির্বপণ করবেন। ব্রহ্মবৰ্চস কামনাকারী জন ঘর্মবৎ আদিত্যের উদ্দেশে একাদশকপাল পুরোডাশ নির্বপণ করবেন। অন্নের প্রার্থনাকারী ও ঐশ্বর্যের কামনাকারী জন অর্কদেব ও ইন্দ্র দেবতার উদ্দেশে তিনবার একাদশকপাল পুরোডাশ নির্বপণ করবেন। পাপ (অংহ) হতে মুক্তি প্রাপ্তি ও অপরের দ্বারা পীড়িত বা বদ্ধ হয়ে তা হতে মুক্তি লাভের নিমিত্ত ইন্দ্র দেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠানকামী জন আশ্বমেধিক ইত্যাদি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করবেন। এখানে ইন্দ্রদেবতা ইত্যাদির উদ্দেশে চরু নির্বপণের বিষয় উক্ত হয়েছে ॥৭।
মর্মার্থ- যিনি গ্রাম কামনা করেন, তিনি ঋজুদেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করবেন। যিনি সেনালাভের কামনা করেন, তিনি ইন্দ্রাণীর উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করবেন। যিনি সংগ্রাম কামনা পূর্বক ধৈর্যচ্যুত হয়েছেন, তিনি ক্রোধবান্ (মমন্ত) ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করবেন। অপর জনের সমান সম্পদ কামনাকারী সম্পদবান ইন্দ্রের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করবেন। এখানে ঋজু ইত্যাদি দেবগণের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠানের বিষয় উক্ত হয়েছে ॥৮॥
মর্মার্থ- অগ্নিদেব, বিষ্ণুদেবতা ও দেবী সরস্বতীর উদ্দেশে একাদশ কপাল পুরোডাশ নির্বপণ কর্তব্য। অভিচার কর্মে ইচ্ছুক জন বৃহস্পতির উদ্দেশে তিনবার চরু নির্বপণ করবেন; যিনি প্রত্যাভিচার কর্মে (যাঁর বিরুদ্ধে প্রথম অভিচার কর্ম অনুষ্ঠিত হয়েছিল) ইচ্ছুক জনও ঐ রকম ভাবে (বৃহস্পতি দেবতার উদ্দেশে তিনবার) চরু নির্বপণ করবেন। অর্থাৎ অন্যের অভিচার কর্মে পীড়িত হলে, তার শাস্তির নিমিত্ত ঐ রকম যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। যিনি যুগানুষ্ঠান ইত্যাদি হতে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, অথচ পুনরায় যজ্ঞলাভের ইচ্ছা করেন, তিনি অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেবতার উদ্দেশে যজ্ঞানুষ্ঠান করবেন। দৃষ্টিশক্তি লাভের নিমিত্ত যজমান অধ্বরে হবির্দান করবেন। অন্যের অনুবন্ধ্যকালে (অনুবৈন্ধ্যা) মিত্র ও বরুণদেবতার উদ্দেশে যাগ কর্তব্য। এখানে আভিচারিক কর্ম সম্বন্ধে বলা হয়েছে। ৯।
মর্মার্থ- যিনি ব্রহ্মবর্চ কামনা করবেন, তিনি সোমদেব ও রুদ্রদেবের উদ্দেশে চরু নির্বপণ করবেন। দুশ্চমা অর্থাৎ চর্মব্যাধিতে আগ্রস্ত ভীত জনের ভেষজ প্রাপ্তির নিমিত্ত সোমদেব ও পুষাদেবের উদ্দেশ্যে যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। যিনি প্রজাকামনা করেন, কিংবা যিনি অভিচারিক কর্ম সাধনে ইচ্ছা করেন, কিংবা যিনি দীর্ঘকালব্যাপী শারীরিক ব্যাধিগ্রস্থ, কিংবা যিনি অপরের প্রতি শত্রুতা আচরণ করেন (ভ্রাতৃব্যং জনয়েয়মিতি), তিনি সোমদেব ও রুদ্রদেবের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করবেন। এই অনুবাকে সোম, পূষা ও রুদ্রের যাগ বিষয় কথিত হয়েছে ১০
মর্মার্থ- গ্রামকামী জন ইন্দ্রদেব ওমরুৎ-দেবগণের উদ্দেশে যথাক্রমে একটি করে (মোট দুটি) যাগানুষ্ঠানের মাধ্যমে সপ্তকপাল পুরোডাশ নির্বপণ করবেন। কলহে লিপ্ত হতে অথবা কলহের সমাধানে ইচ্ছুক হলে, ইন্দ্রদেব ও মরুৎ-বর্গের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। গ্রামকামী জন গ্রামের আধিপত্য লাভের ইচ্ছায় ইন্দ্রদেব ও বৈশ্যদেবের উদ্দেশে চরু নির্বপণ করবেন। সমান সমান জনের মধ্যে (সমানৈৰ্মিৰ্থো) প্রীতির অভাব (বিপ্রিয়) ঘটলে অগ্নির উদ্দেশে সংজ্ঞানী যজ্ঞ (সংজ্ঞন্যা যজয়েদষ্ময়ে) কর্তব্য। এখানে ইন্দ্র মরুৎ বৈশ্বদেব ইত্যাদির উদ্দেশে অনুষ্ঠিতব্য যাগের বিষয় কথিত হয়েছে ।১১।
মর্মার্থ- কাম্যযাগ সম্পর্কে কথিত এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির কিছু ব্যাখ্যা ৪র্থ কাণ্ডের ১ম প্রপাঠক, ১ম কাণ্ডের ৮ম প্রপাঠক, ১ম কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠক ১ম কাণ্ডের ৭ম প্রপাঠক ইত্যাদি স্থানে পাওয়া যাবে। এছাড়া অপর সব মন্ত্রগুলিরই ব্যাখ্যা পূর্ব পূর্ব অনুবাকে পাওয়া যাবে।
মর্মার্থ- যিনি ঐশ্বর্য কামনা করেন, তিনি আদিত্যদেবতার উদ্দেশে চরু নির্বপণ করবেন। বন্ধনদশাগ্রস্ত ব্যক্তি, বন্ধনমুক্তির নিমিত্ত বরুণদেবতার উদ্দেশে চরু নির্বপণ করবেন। আদিত্যের নিমিত্ত শুক্ল (শ্বেতবর্ণের) ধান্যের দ্বারা গৃহীত চরু নির্বপণ করতে হয়। বরুণ দেবতার নিমিত্ত কৃষ্ণবর্ণের ধান্যের দ্বারা গৃহীত চরু নির্বপণ করতে হয়। বন্ধনোন্মুখ জনের পক্ষে (বদ্ধবীরা বিশমব গময়ন্তি যদি) ময়ূখ স্তোত্র পঠনীয় এবং বন্ধনপ্রাপ্ত হলে আদিত্যের উদ্দেশে চরু নির্বপণ কর্তব্য। এই অনুবাকে এই সম্পর্কেই বিশেষভাবে উক্ত হয়েছে ॥১॥
মর্মার্থ- [উপরোক্ত অনুবাকে বিষয় বক্তব্য দ্রষ্টব্য]। মৃত্যুভীত জনের পক্ষে শত বৎসরব্যাপী আয়ুলাভের নিমিত্ত শতকৃষ্ণলা যাগানুষ্ঠান কর্তব্য (যো মৃত্যুর্বিভীয়াত্তস্ম এতাৎ..শতকৃষ্ণলাং নিবপেৎ..)। যিনি ব্রহ্মবর্চ বা ব্রহ্মতেজঃ কামনা করেন, তিনি সূর্যের উদ্দেশে চরু নির্বপণ করবেন। যিনি হিরণ্য কামনা করেন, তিনি অগ্নিদেবের উদ্দেশে তিনবার হবিঃ নির্বপণ করবেন। সোমপান কামনাকারী জন সোমদেব ও ইন্দ্রদেবরে উদ্দেশে শ্যামাক ধান্যের চরু নির্বপণ করবেন। পশুকামী জন পশু-প্রদাতা অগ্নিদেবের উদ্দেশে তিনবার হবিঃ নির্বপণ করবেন। হিরণ্যগর্ভ আপো হ যৎ ইত্যাদি মন্ত্রে এগুলির ব্যাখ্যা প্রদত্ত হয়েছে। ২৷৷
[সায়
ণাচার্য বলেন–তৃতীয়েইনুবাকে যজ্ঞবিভ্রষ্টাদীনামিষ্টয়া বিধাতব্যাঃ। অর্থাৎ–এই অনুবাকে যজ্ঞবিভ্রষ্ট জনগণের পক্ষে যজ্ঞবিভ্রষ্ট-ইষ্টির বিধান প্রদত্ত হয়েছে ]
মর্মার্থ- (একদা) দেবগণ যশপ্রাপ্তির নিমিত্ত সহস্ৰ সংখ্যক যজ্ঞ অনুষ্ঠিত করেছিলেন (সহস্রং সত্ৰাণি…তদন্বতিষ্ঠ)। তার ফলস্বরূপ দেবগণের মধ্যে সোমদেব যশ প্রাপ্ত হয়। অন্যে যশ প্রাপ্ত না হোক–এমন মনস্থ করে সোমদেব কোনও দুর্গম (কঞ্চিদুর্গং) পর্বতে আরোহণ করেন। অগ্নিদেবও সহসা তাঁর পশ্চাতে পশ্চাতে সেখানে আরোহণ করেন। তখন অগ্নিদেব ও সোম পরস্পর একমত (ঐকমত্যাং) হন। অতঃপর ফলরহিত ইন্দ্রদেব অনেক পরে সেখানে গমন করে যজ্ঞপলের অংশ প্রদান করতে বলেন (অবোচৎ)। তারা ইন্দ্রের নিমিত্ত তিনটি হবিষ্কাম যাগ নির্বপণ করেন। সেই তিনটি যাগের দ্বারা, অর্থাৎ অগ্নিদেবের উদ্দেশে অষ্ট কপাল ও ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে একাদশ কপাল পুরোডাশ এবং সোমদেবের উদ্দেশে চরুনির্বপণ পূর্বক তিনি পরাক্রম (তেজঃ), ইন্দ্রিয়শক্তি ও ব্রহ্মতেজ লাভ করেন। যে যজমান যজ্ঞবিভ্রষ্ট তিনি এইভাবে অগ্নির উদ্দেশে অষ্ট কপাল ও ইন্দ্রের উদ্দেশে একাদশ কপাল পুরোডাশ এবং সোমের উদ্দেশে চরু নির্বপণ করলে অগ্নি তাকে তার তেজ, ইন্দ্র তাঁকে তাঁর ইন্দ্রিয়শক্তি এবং সোম তাঁকে তাঁর ব্রহ্মতেজ দান করে থাকেন। অগ্নিদেবতার, সোমদেবতার ও ইন্দ্রদেবতার তেজের একীভবনে (সমাশ্লেষে) যজমানের মধ্যে তেজ (আজ্ঞা করার পক্ষে উপযুক্ত পরাক্রম), শক্তি (ইন্দ্রিয়ের সামর্থ্য) ও শ্রুতি-অধ্যয়ন (অর্থাৎ ব্রহ্মবৰ্চস বা বেদাদ্যয়নজনিত ব্রাহ্মণের তেজঃ)-রূপ সম্পত্তি সম্পূর্ণভাবে স্থাপিত হয়। কামনা পূর্তির নিমিত্ত অগ্নিদেব ও সোমদেবের উদ্দেশে একাদশ কপাল পুরোডাশ নির্বপণ কর্তব্য। অগ্নিদেব মুখ হতে সহজাত হওয়ার কারণে (অগ্নিনা সহ মুখে জাতত্বাৎ) ও (মুখের দ্বারা) সোমপান করার কারণে–এই উভয়ই ব্রাহ্মণের দেবতা (তদুভয়ং ব্রাহ্মণস্য দেবতা)। যিনি তাঁদের ভাগধেয় সহ তাদের নিকটে গমন করেন, তারা তার কামনা পূর্ণ করে থাকেন। ব্রহ্মবৰ্চসকামী জন অগ্নিদেব ও সোমদেবের উদ্দেশে অষ্ট কপাল পুরোডাশ নির্বপণ করবেন।
অগ্নিদেব ও সোমদেবের ভাগধেয় সহ তাদের নিকট গমন করলে তাঁরা তাঁকে ব্রহ্মবর্চ প্রদান করেন; তিনি ব্রহ্মবৰ্চসী হন। কপালগত এই অষ্টসংখ্যক হবি অগ্নিদেবের এবং শ্যামাক ধান্যের পুরোডাশ সোমের নিমিত্ত নির্বপণ করলে তা সমৃদ্ধির কারণ হয়। ক্লীবত্ব (প্রজননে অসামর্থ্য) পরিহারের নিমিত্ত সোমদেবতার উদ্দেশে শ্যামাক ধান্যের চরু নির্বপণ কর্তব্য। যে জন ক্লীবত্ব হতে ভীত হয়ে প্রজনন-সমর্থ অন্নরসরূপ ভাগধেয় সহ সোমদেবের নিকট গমন করেন, তিনি সেই জনকে রেত-রূপ অন্নরস প্রদান করেন; সেই ব্যক্তি আর ক্লীব হন না। গ্রামকামী জন ব্ৰহ্মণস্পতি দেবতার উদ্দেশে একাদশ কপাল পুরোডাশ নির্বপণ করবেন। যিনি ব্ৰহ্মণস্পতি দেবতার উদ্দেশে তার ভাগধেয় সহ গমন করেন, তিনি তাকে সজাতবর্গ অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজন প্রদান করেন; সেই জন গ্রামের অধিপতি হন। গন-গণের তুমি অধিপতি ইত্যাদি দুই ঋক-মন্ত্রের (ঋচোরস্তি) দ্বারা যাগানুষ্ঠান করলে তিনি তাঁকে (যাগকারীকে) গণবন্ত (গণের অধিপতি) করেন। কোন বৈশ্যজাতি যদি ধনের গর্বে কোনও ব্রাহ্মণকে অতিক্রম করে, তাহলে হে মরুৎ-গণ! আপনারা দুলোক হতে আমাদের আহ্বান শ্রবণ করুন ইত্যাদি (মরুতো যদ্ধবো দিবো যা বঃ শম্মেত্যেতে) দুই ঋক্-মন্ত্রে যাগানুষ্ঠান করলে ঐ বৈশ্যজাতিকে তার (অর্থাৎ ঐ ব্রাহ্মণের) অধীন করা যায় ॥৩॥
[সায়ণাচার্য বলেন–চতুর্থে স্বৰ্গকামাদীনামিষ্টয়ো বিধাতব্যাঃ। অর্থাৎ–অনুবাক-২৪ স্বৰ্গকামী ইত্যাদি জনের পক্ষে অনুষ্ঠেয় যজ্ঞ বর্ণিত হয়েছে]
মর্মার্থ- স্বর্গপ্রাপ্তির কামনাপূর্বক অর্যমা আদিত্যের উদ্দেশে চরু নির্বপণ কর্তব্য। যিনি অর্যমা আদিত্যদেবের নিকটে তার ভাগধেয় সহ গমন করেন, তিনি তাকে স্বর্গে প্রেরণ করেন। আমার প্রজা (সন্ততিবর্গ) দানকামী হোক–এমন ইচ্ছা পূর্বক অর্মদেবের উদ্দেশে চরু নির্বপণ করলে তিনি সেই চরু-অর্পণকারীর সন্ততিবর্গকে দানকামী করে থাকেন। এই (পার্থিব) লোকে কেউ যদি কিছু দান করেন, তবে তিনি সূর্যবৎ কীর্তিশালী (অর্থাৎ দীপ্তিমান হন। এই নিমিত্ত অর্যমা আদিত্যের নিকট তার ভাগধেয় সহ গমন করলে তিনি (অর্থাৎ আদিত্যদেব) সেই গমনকারীর সন্ততিগণকে দান-গ্রহণের উপযুক্ত করে দেন। যিনি নির্বিঘ্নে (স্বস্তির সাথে) জনসমূহকে জয় করতে (সমান সমান জনগণের মধ্যে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করতে) কামনা করেন, তিনি আমার নিকট তাঁর ভাগধেয় সহ গমন করলে, তিনি তাকে জনজয়ী করে দেন। (একদা) দেববর্গের মধ্যে ইন্দ্রদেব অত্যন্ত নিকৃষ্ট ছিলেন; তিনি প্রজাপতির উদ্দেশে একাদশ কপাল দ্বিফলরূপ ব্রীহির (দ্বিতীয়ফলরূপা ব্রীহয়োহনুযুকাঃ) হবি বুধ শব্দযুক্ত (বুধশব্দোহস্তি) ও অগ্র শব্দযুক্ত (অগ্রশব্দোহস্তি) দুই ঋক্ মন্ত্রে নির্বপণ করেছিলেন। এর ফলে প্রজাপতি তাঁকে (ইন্দ্রদেবকে) দেববর্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেন। যে রাজন্য অত্যন্ত নিকৃষ্ট হন, তিনি ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে ঐরকম যাগানুষ্ঠান করলে, ইন্দ্রদেব তাঁতে শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপন করেন। যে ব্রাহ্মণ অত্যন্ত নিকৃষ্ট হন, তিনি বৃহস্পতি দেবতার উদ্দেশে ঐরকম ভাবে যাগানুষ্ঠানের মাধ্যমে চরু নির্বপণ করে তার ভাগধেয় সহ গমন করলে, ইন্দ্রদেব তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেন ॥৪॥
[পঞ্চম রাজ্যক্ষ্মগৃহীতস্যেষ্টিং বিধাতুং প্রস্তেীতি–অর্থাৎ–এই অনুবাক-২৪ রাজ্যক্ষ্মাগ্রস্থ জনের পক্ষে অনুষ্ঠেয় ইষ্টির বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- প্রজাপতির ত্রয়স্ত্রিংশৎ (তেত্রিশটি) দুহিতা ছিলেন। (অম্বা দুলা ইত্যাদি সপ্ত কৃত্তিকা। এবং অশ্বিনী, রোহিণী ইত্যাদি ষড়বিংশতি তারকা)। প্রজাপতি রাজা সোমের হস্তে তাদের সমর্পণ করেছিলেন। এই কন্যাগণের মধ্যে সোমদেব রোহিণীর প্রতিই অধিক অনুরাগ পোষণ করার কারণে অপর কন্যাগণ (অর্থাৎ রোহিণী ব্যতিরিক্তা অপর সোমপত্নীগণ) ঈর্ষাপরান্বিতা হয়ে পিতার নিকট আগমন করেন। সোম তাঁদের অনুগমন পূর্বক প্রজাপতির নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের যাচ্ঞা করলেন। প্রজাপতি তাকে সকলের প্রতি সমান ব্যবহার করার জন্য শপথ করতে বলেন। সোম সেই শপথ স্বীকার করলে প্রজাপতি সেই কন্যাগণকে পুনর্দান করেন। কিন্তু সোম পূর্ববৎ তাদের প্রতি অবহেলা পূর্বক রোহিণীর প্রতি অধিক অনুরক্তি প্রকাশ করায়, কন্যাগণ পুনরায় পিতার নিকট গমন করেন। অতঃপর প্রজাপতির কোপে সোম যক্ষ্মাব্যাধিতে আক্রান্ত হন। প্রথম রাজা সোমকে আক্রমণ করার কারণে যক্ষ্মার নাম হয় রাজযক্ষ্মা; সোমরূপ পাপীকে আক্রমণ করার কারণে তার নাম হয় পাপযক্ষ্মা এবং জায়ার নিমিত্ত এই ব্যাধির উৎপত্তির কারণে জায়েন্য নামে–মোট তিন রকম নাম হয় (ত এতে এয়ো যক্ষ্মব্যাধেরবান্তরবিশেষাঃ)। যাঁরা যক্ষ্মারোগের এই জন্মকথা বিদিত হন, যক্ষ্মা তাদের নিকট হতে বিদূরিত হয়। সোম কর্তৃক উপভুক্ত (সেবিত) এই ব্যাধি পরিহারের নিমিত্ত সোমের উদ্দেশে যিনি চরু নির্বপণ করবেন, তিনি এই প্রবল রোগ হতে মুক্ত হবেন। যিনি পাপযক্ষ্মার দ্বারা গৃহীত (আক্রান্ত) হয়েছেন, তিনি আদিত্য দেবতার উদ্দেশে চরু নির্বপণ করবেন। যিনি আদিত্য দেবতার নিকটে তাঁর ভাগধেয় সহ গমন করেন, আদিত্য দেবতা তাঁকে এই প্রবল ব্যাধি হতে মুক্ত করেন। এই যাগ অমাবস্যায় অনুষ্ঠিতব্য। কারণ অমাবস্যার পর শুক্লা প্রতিপদ হতে চন্দ্রের কলা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই ব্যাধির বৃদ্ধি ঘটে। জন্মানোমাত্রই নব নব হয়–ইত্যাদি ঋক্-মন্ত্রের শেষে (ঋচ্যন্তে) দীর্ঘ আয়ু প্রার্থনা করা হয়েছে, তা পাঠ করলে আয়ু-প্রাপ্তি হয় ॥৫৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–ষষ্ঠে তন্নাদনশক্তিকামস্যেষ্টিং বিধাতুং প্রস্তেীতি। অর্থাৎ–এই অনুবাকে অন্নভক্ষণকামীর পক্ষে অনুষ্ঠেয় যজ্ঞের কথা উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- (একদা) প্রজাপতি দেবগণের মধ্যে অন্ন বিভাগ করে দিয়ে বললেন–এই তিন লোকে বিভাজন পূর্বক যা অতিরিক্ত হবে, তা তাঁর ভাগধেয়। তিন লোকে বিভাজন করার পর অতিরিক্ত ছিল। এই তিন লোক বলা হয়েছে–ইন্দ্ররাজ ইত্যাদি শব্দে অভিধেয় লোক, অর্থাৎ ইন্দ্ররাজ, ইন্দ্রাধিরাজ ও ইন্দ্র স্বরাট, শব্দ সমন্বিত যে লোক, অর্থাৎ পৃথিবী অন্তরীক্ষ ও দুলোক। এই কথা বলে প্রজাপতি ইন্দ্ররাজ ইত্যাদি তিন লোক হতে দোহন করে তিন রকম সার গ্রহণ করলেন (ত্রিবিধং সারং গৃহীতবা)। এই সার প্রজাপতি আপন ভাগ বলে স্বীকার করলেন (স্বপ্রিয়ত্বেন….)। যে যাগে তিন লোক হতে তিন ভাগ সার গ্রহণ করা হয়েছে, তা ত্রিধাতু যাগ নামে অভিহিত। অধ্বর্য যে যজমানের উদ্দেশে কামনা করেন–এই যজমান অন্ন ভক্ষণকারী হোন, তার নিমিত্ত এই ত্ৰিধাতু যাগের অনুষ্ঠান করবেন (যং যজমানমুদ্দিশ্যধ্বর্যঃ কাময়েতায়ং যজমানোহন্নাদঃ স্যাদিতি তস্মৈ যজমানায়েয়মিষ্টিঃ)। রাজা ইন্দ্র এই ভূলোকের অধিপতি, অধিরাজ ইন্দ্র এই অন্তরিক্ষ লোকের অধিপতি এবং স্বরাট ইন্দ্র স্বর্গলোকের অধিপতি বলে অভিহিত। এই তিন লোকাধিপতির উদ্দেশে যে যজমান তাঁদের ভাগধেয়স্বরূপ একাদশ কপাল পুরোড়াশ সহ গমন করেন, তাঁরা সেই যজমানেকে অন্ন প্রদান করেন; তার ফলে সেই যজমান অন্নের ভক্ষক হন। এই জগতে যেমন বৎস কর্তৃক (গো-স্তন) চোষণের পর লোকে (জনো) গাভী দোহন করে, তেমনই দেবগণ কর্তৃক বর্ধনপ্রাপ্ত এই তিন লোকে আপন অভীষ্ট অন্ন লাভ করা যায় (স্বাভীষ্টমন্নাদ্যং লভতে)। উত্তানিত (অর্থাৎ চিৎ করে রক্ষিত) কপালে পুরোডাশ অর্পণ করতে হয়। তিন লোক প্রাপ্তির উদ্দেশে তিনটি পুরোডাশ হবে। এইগুলির উত্তরোত্তর শ্রেষ্ঠত্ব (জ্যায়া), যথা–ভূলোক অপেক্ষা অন্তরিক্ষ লোকের শ্রেষ্ঠত্ব, অন্তরিক্ষ লোক অপেক্ষা স্বর্গলোকের শ্রেষ্ঠত্ব; এই লোকসকল সমৃদ্ধির হেতু ভূত। একটিও পুরোডাশের যেন বৈয়র্থ (নিষ্ফলতা বা ব্যর্থতা না হয় (একস্যাপি পুরোডাশস্য বৈয়ং ন ভবতি) ॥৬॥
[সায়ণাচার্য বলেন–ইন্দ্রিয়সামর্থং শরীরসামর্থং চ কাময়ামানস্যেষ্টিং বিধাতু প্রস্তেীতি–। অর্থাৎ এই অনুবাকে ইন্দ্রিয়সামর্থ্য শারীরিক বলকামী জনের পক্ষে অনুষ্ঠিতব্য যজ্ঞের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- (একদা) দেবতা ও অসুরগণের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাতে অসুরগণ দেবতাগণকে পরাজিত করে। পরাজয়প্রাপ্ত দেবগণ অসুরবর্গের অধীনস্থ হয়ে তাঁদের সেবকের ন্যায় কর্ম সম্পাদন করতে থাকেন। এর ফলে দেবতাগণের ইন্দ্রিয়সামথ্য এবং শরীরের সামর্থ্য উভয়ই অপগত হয়ে যায়। ইন্দ্রদেব তা বিদিত হয়ে সেই সামর্থ্য দুটি পুনপ্রাপ্তির নিমিত্ত চেষ্টা করেও তা পারলেন না। অবশেষে তিনি সামর্থ্যদ্বয়ের অর্ধাংশ প্রাপ্ত হলেন এবং অপর অর্ধাংশ প্রাপ্তির উদ্দেশে প্রজাপতির নিকট গমন পূর্বক সর্বপৃষ্ঠ যুগানুষ্ঠান করেন। এতে তিনি সামর্থদ্বয়ের সম্পূর্ণাংশ প্রাপ্ত হন। (সর্বপৃষ্ঠ যাগের পরিচয়, যথা–রথান্তর, বৃহৎ, বৈরূপ, বৈরাজ, শাকর ও রৈবত নামক সর্ব পৃষ্ঠস্তোত্র; এই সর্ব পৃষ্ঠস্তোত্রযুক্ত ইন্দ্র এখানকার দেবতা (ত্যৈক্ত ইন্দ্ৰহত্র দেবতা)। এই কারণে এই যাগ সর্বপৃষ্ঠা নামে অভিহিত। এতে স্তোত্রপাঠ প্রযুক্ত হয় না (না স্তোত্রপাঠঃ প্রয়োক্তব্যঃ), কিন্তু দেবতার বিশেষণরূপে স্তোত্রাভিজ্ঞত্বং কথাটির উল্লেখ রয়েছে। যিনি ইন্দ্রিয়সামর্থ্য ও বীর্যসামর্থ্য কামনা করেন, তিনি এই সর্বপৃষ্ঠের দ্বারা যাগ করবেন। এই দেবগণের নিকট তাদের ভাগধেয় সহ গমন করলে তারা তাঁকে এইরকম ইন্দ্রিয় ও বীর্য প্রদান করেন। রাথন্তরায় অর্থাৎ রথান্তর সামে অভিজ্ঞ ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করলে, অগ্নির যেমন তেজঃ সেইরকম তেজঃ লাভ করা যায় (যাদেবাগ্নেস্তেজস্তদেবাব রুন্ধে)। বার্তায় অর্থাৎ বৃহৎসামে অভিজ্ঞ ইন্দ্রদেবের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করলে দেবেন্দ্রের যেমন তেজঃ সেইরকম তেজঃ লাভ করা যায়। বৈরূপায় অর্থাৎ বৈরূপ সামে অভিজ্ঞ ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করলে সবিতাদেবের যেমন তেজঃ সেইরকম তেজঃ লাভ করা যায়। বৈরাজায় অর্থাৎ বৈরাজ সামে অভিজ্ঞ ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করলে ধাতার (অর্থাৎ আদিত্যবিশেষের) যেমন তেজঃ সেইরকম তেজঃ লাভ করা যায়, শারায় অর্থাৎ শাকর সামে অভিজ্ঞ ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করলে মরুৎ-দেবগণের যেমন তেজঃ সেইরকম তেজঃ লাভ করা যায়। রৈবতায় অর্থাৎ রৈবত সামে অভিজ্ঞ ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করলে বৃহস্পতিদেবতার যেমন তেজঃ সেইরকম তেজঃ লাভ করা যায়। সর্বপৃষ্ঠ যাগকারী এই সবগুলির তেজই লাভ করেন। উত্তানিত (অর্থাৎ চিৎ করে বা উপর দিকে মুখ করে স্থাপিত) কপালে পুরোভাশ অর্পণ করতে হয়। বৈশ্বাদেবের উদ্দেশে দ্বাদশ কপাল পুরোডাশ নির্বপণ কর্তব্য। সর্বদিক হতে ইন্দ্রিয় ও বীর্য (সামর্থ্য) যজমানে ধৃত (ধারণকৃত) হয়। অশ্ব, বৃষ, অবি (পুরুষ মেষ) অজ (পুরুষ ছাগ) দক্ষিণা প্রদান করতে হয়। রাথন্তর ইত্যাদি সম্বন্ধি ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণ যে যে পুরোডাশরূপ অন্ন গ্রহণ করেন, মনুষ্যগণও সেইরকম ভক্ষণ করে থাকেন। মিথ্যাপবাদযুক্ত হওয়ায় ব্যবহার সম্পর্কে সন্দেহ হলে যেমন শিষ্টাচারসম্পন্ন জনের নির্ণয় কথিত হয়, সেইরকমে দেবগণের আচরণও শিক্ষার যোগ্য বা নিয়ামক হয় ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অষ্টমে চক্ষুষ্কামস্য ত্রিহবিষ্কামিষ্টিং বিধাতুং প্রস্তেীতি–। অর্থাৎ–চক্ষুরোগ নিরাময়কামী ব্যক্তির পক্ষে অনুষ্ঠেয় ত্রিহবিষ্ক যাগের কথা উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- রজন নামক কোন পুরুষ তুজিৎ নামক এক পুরুষের নিকট গমন করেছিল। রজন ছিলেন কুণির পুত্র (কুণেরপত্যং) এবং ক্রতুজিৎ ছিলেন জনকের পুত্র (ক্রতুজিজ্জনকস্যাপত্যং)। তুজিৎ চক্ষুরোগ নিরাময় করতে পারত। এই নিমিত্ত রজন চক্ষুর দৃষ্টিশক্তির আরোগ্য কামনায় (দৃষ্টিপাটবায়) তুজিতের নিকটে গমনপূর্বক ত্রিহবিষ্ক যাগানুষ্ঠানের দ্বারা দৃষ্টিশক্তির দক্ষতা প্রাপ্ত হয়েছিল (তৎপাটবং প্রাপ্তবা)। যে জন চক্ষুর আরোগ্য কামনা করেন, তিনি এই যুগানুষ্ঠান করবেন। দীপ্তিশালী (ভ্রাজস্বতে) অগ্নিদেবের উদ্দেশে দুটি করে অষ্টাদশ কপাল পুরোডাশ এবং সূর্যের উদ্দেশে চরু নির্বপণ কর্তব্য। মনুষ্যগণ অগ্নির চক্ষে দর্শন করে, এবং দেবগণ দর্শন করেন সূর্যের চক্ষে। উন্মেষ ও নিমেষযুক্ত মনুষ্যের দৃষ্টি অনিত্য (উন্মেষনিমেষসম্ভাবান্মনুষ্যদৃষ্টিবনিত্যা), এবং অগ্নি কখনও জ্বলেন কখনও উপশমপ্রাপ্ত হন (উপশাভ্যতি, নিভে যান), এই কারণে মনুষ্যের দৃষ্টির সাথে অগ্নির সম্বন্ধ। দেবগণের চক্ষু অনিমেষ হওয়ায় তা সূর্যপ্রকাশের ন্যায় নিত্য, এই কারণে দেবগণের দৃষ্টির সাথে সূর্যের সম্বন্ধ। অগ্নিদেব ও সূর্যদেবের নিকট যিনি তাঁর ভাগধেয় সহ গমন করেন, তারা উভয়ে তাতে চক্ষু স্থাপন করেন এবং তিনি চক্ষুম্মান হয় (চক্ষুম্মানের ভবতি)। অগ্নির প্রতিষ্ঠা যজমানের দুটি চক্ষে, সূর্যের প্রতিষ্ঠা নাসিকায়। নাসিকার দ্বারা চক্ষুদ্বয় বিধৃত; দুই চক্ষের মধ্যবর্তী নাসিকা, যাতে, চক্ষুদ্বয়ের পরস্পরের মিশ্রণ না হয়। সমান চক্ষু সমৃদ্ধির হেতুভূত। এই স্থলে উদুত্যং জাতবেদসং-ইত্যদি তিন মন্ত্র পঠিতব্য। প্রথম কাণ্ডের চতুর্থ প্রপাঠকে এগুলি ব্যাখ্যাত হয়েছে। (প্রথম কাণ্ডস্য চতুর্থ প্রপাঠকে ব্যাখ্যাত)। এর ফলে যজমানের রোগ-উৎপত্তির পূর্বে যেমন চক্ষুর দক্ষতা, ছিল, পিণ্ডদানের দ্বারা তেমনই হয় ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন–নবমে সাংগ্ৰহণীষ্টিং…। অর্থাৎ এই অনুবাকে সাংগ্ৰহণী ইষ্টির বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে মধ্যম পরিধি (পারিধে)! তুমি স্থির (হও) (স্তিয়োহসি), তোমার স্থাপনে আমিও জ্ঞাতিগণের মধ্যে স্থির হবো। তুমি ধীর, অভিজ্ঞ ও ধনবান; আমিও ধীর, অভিজ্ঞ ও ধনবান হবে। তুমি উগ্র, ধীর, অভিজ্ঞ ও ধনবান; আমিও উগ্র, ধীর, অভিজ্ঞ ও ধনবান হবো। জ্ঞাতিবর্গের মধ্যে প্রতিবাদী ও আজ্ঞালঙ্ঘনকারীগণকে আমি উগ্রত্বের দ্বারা তিরস্কৃত করব। হে হুয়মান আজ্য! তুমি তেমনই হও। হে দেবগণ! জ্ঞাতিগণের মধ্যে যারা আমার অনুকুল, সেই স্ত্রী ও পুরুষগণেকে আমি কামনা করি, তারাও আমাকে কামনা করুক, তাদের মন আমার প্রতি অনুকূল (কামনান্বিত) করে দিন; স্বাহা মন্ত্রে এই আজ্যে আহুতি প্রদান করছি (ইদমাজ্যং স্বাহুত। কুমার-মন্ত্ৰস্ত্রীমন্ত্রো ব্যাখ্যায়ৌ-পরস্পর ঐকমত্যের দ্বারা মনে মনে সম্যক স্বীকারকে সংগ্রহ বলে; এই সংগ্রহ যে ইষ্টিতে (যজ্ঞে) আছে, সেই ইষ্টিকে সাংগ্ৰহণী বলা হয় (তদ্যস্যামিষ্টাবস্তি সা সাংগ্ৰহণী)। গ্রামের অধিপতি হবার কামনায় বৈশ্যদেবের উদ্দেশে সাংগ্ৰহণী যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। বৈশ্যদেব হলেন সজাতা অর্থাৎ সর্বদেবতার সজাতীয়; সকল দেবতার নিকট তাদের ভাগধেয় সহ গমন করলে, তারা যজমানকে সজাতীয় মনঃসম্পন্ন জনগণকে প্রদান করেন; ফলে সেই যজমান গ্রামের আধিপত্য লাভ করেন। জ্ঞাতিগণের মনকে আপন অধীনতায় গ্রহণ করাকে সংগ্রহণ বলা হয়; যে যাগের দ্বারা এই সংগ্রহণ কর্ম সাধিত হয়, তা সাংগ্ৰহণী। তুমি স্থির, জ্ঞাতিদের মধ্যে আমিও স্থির হবো ইত্যাদি মন্ত্রের মধ্যে আশা জ্ঞাপন করা হয়েছে। এইটি বিদিত হয়ে তিনটি মন্ত্রে প্রার্থনা জ্ঞাপন করলে সর্বাধিক ফল হয় (সর্বমধিকং সম্পদ্যতে)। আপন বংশে (স্বকুলে), আপন. জ্ঞাতিগণের মধ্যে (স্বজাতি মধ্যে) ও আপন গ্রামে (স্বগ্রামে) যাঁরা মহান (মহান্তঃ) পুরুষ, যাঁরা প্রৌঢ়, যারা ক্ষুদ্র বালিকা (ক্ষুল্লকা বালা), যাঁরা পত্নী ভগ্নী ও মাতৃস্থানীয়া, তাঁরা সজাতি। এই ইষ্টির দ্বারা তাদের আপন অধীন করা হয়। তারা অধীন হয়ে (যজমানকে) সেবা করে থাকেন ॥৯॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ….আয়ুষ্কামেষ্টিং..। বক্তব্য এই যে, পরবর্তী অনুবাকে যে আয়ুষ্কাম যজ্ঞের কথা বলা হয়েছে, এই অনুবাকে তার মন্ত্রগুলি উক্ত হচ্ছে।]
মর্মার্থ- যা দধি হতে নব নব রূপ প্রাপ্ত হয়ে সারপিণ্ড হয়, তার নাম নবণীত; যে নবণীত অগ্নির সংস্পর্শে বিগলিত হয়ে, তার নাম সর্পি; এবং যে সর্পি শীতল পাত্রে রক্ষা করলে পুনরায় ঘণীভূত হয়ে যায়, তার নাম ঘৃত। হে যজমান! তুমি অশ্বিযুগলের প্রাণবৎ প্রিয় (হও), এই নিমিত্ত তারা তাদের প্রিয় তোমাকে প্রাণ দান করেছেন (প্রাণং দত্তা), সেই অশ্বিনীদ্বয়ের উদ্দেশে এই আজ্যাতি প্রদান করা হোক। তুমি ইন্দ্রদেবের প্রাণবৎ প্রিয়, এই কারণে ইন্দ্রদেব তার প্রিয় তোমাকে আয়ু প্রদান করছেন, তার উদ্দেশে এই আজ্যাহতি প্রদান করা হচ্ছে। তুমি মিত্রদেব ও বরুণদেবের প্রাণবৎ প্রিয়, সেই নিমিত্ত তারা উভয়ে তাদের প্রিয় তোমাকে প্রাণ প্রদান করেছেন; তাদের উদ্দেশে এই আজাহুতি প্রদান করা হয়েছে। সর্ব দেবতার তুমি প্রাণবৎ প্রিয়, এই নিমিত্ত তারা সকলে তাদের প্রিয় তোমাকে আয়ু প্রদান করুন; তাদের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রের দ্বারা এই আজাহুতি প্রদান করা হচ্ছে। ঘৃতের ধারা অবেক্ষণ (দর্শন) করো। কিরকম ধারা? যা অমৃতের পথ–অর্থাৎ কর্মফলের সাধনরূপ মার্গভূত ইন্দ্রের দ্বারা বৃষ্টি তৃণোৎপত্তি ইত্যাদি পরম্পরাগতভাবে সম্পাদিত এবং মরুত্বর্গরূপ বৈশাধিপগণের দ্বারা সযত্নে ধৃত। হে ধৃত! সেইরকম তোমাকে বিষ্ণুসদৃশ যজমান পরিদর্শন করছেন (পরিপশ্যতি)। পশু-অভিমানিনী দেবতা ইড়া সেইরকম তোমাকে গো-গণে স্থাপন করেছেন। হে যজমান! পবমান ত্রিবৃৎ ইত্যাদি স্তোত্রসমূহের দ্বারা, গায়ত্রী ছন্দ্রের যে পথ (গায়ত্ৰচ্ছন্দসসা যো মার্গস্তন), (সেই পথে) সোম আহরণরূপ যজ্ঞাঙ্গ সম্পাদন করে এবং উপাংশু-গ্রহ-হোমসাধ্য সামর্থ্যের দ্বারা (বীর্যের্ণ) সবিতা দেব আপনাকে দীর্ঘরোগ হতে মুক্ত করে দীর্ঘ জীবন দান করুন। বৃহৎ রথান্তর স্তোমের দ্বারা, ত্রিষ্টুপছন্দের পথে যজ্ঞ সম্পাদন করে এবং শুক্রের সামর্থ্যের দ্বারা তোমাকে দীর্ঘরোগ হতে মুক্ত করে সবিতা দেব আপনাকে দীর্ঘজীবন দান করুন। অগ্নিদেবতার গীতির দ্বারা, জগতীছন্দের পথে যজ্ঞ সম্পাদিত করে এবং অগ্রয়ণের সামর্থ্যের দ্বারা সবিতা দেব আপনাকে দীর্ঘরোগ হতে মুক্ত করে দীর্ঘজীবন দান করুন। হে অগ্নিদেব! এই যজমানকে দীর্ঘ আয়ু ও সামর্থ্য দান করুন (দীর্ঘায়ুষে বলায় চ কৃষি সমর্থং কুরু)। হে বরুণদেব! হে রাজন্য সোমদেব! এই যজমানের পুত্র-উৎপাদন সম্পাদন করুন। হে পৃথিবী (অদিতে)! আপনি মাতৃবৎ এঁকে (অর্থাৎ এই যজমানকে) সুখ প্রদান করুন। হে বিশ্বদেবগণ (অর্থ সকল দেবতা)! এই যজমান যাতে জরাগ্রস্ত কাল পর্যন্ত আয়ু লাভ করতে পারেন, তেমন করুন। কাষ্ঠের (ইন্ধনের) প্রক্ষেপণে যেমন অগ্নি আয়ুস্মান হয়, সেইরকম বর্ধমান অগ্নির আয়ুর দ্বারা আপনাকে আয়ুষ্মন্ত করছি। এইরকম ওষধির দ্বারা যেমন সোমরস বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, দক্ষিণার দ্বারা বশীকৃত ঋত্বিকগণের দ্বারা যেমন যজ্ঞ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, ব্রাহ্মণ অধ্যাপকের দ্বারা বেদ অবিচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় (বেদশ্চ ব্রাহ্মণেষধ্যাপকে অবিচ্ছেদেন বর্ধতে); হবিঃ-রূপ অমৃতের দ্বারা যেমন দেবগণ জীবন লাভ করেন এবং স্বাধাকার পূর্বক পিণ্ড ইত্যাদির দ্বারা যেমন পিতৃগণ জীবন লাভ করেন (জীবন্তি), তেমনই তাদের আয়ুর দ্বারা আপনাকে আয়ুষ্মন্ত করছি৷৷ ১০৷
[এই অনুবাকে আয়ুঃকামী জনের পক্ষে অনুষ্ঠেয় আয়ুষ্কাম-যজের বিধান কথিত হচ্ছে। মন্ত্রগুলি পূর্ববর্তী অনুবাকে উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- যে জন দীর্ঘ ব্যাধিতে পীড়িত, অগ্নিদেব এমন ব্যক্তির শরীরে প্রবিষ্ট হয়ে মাংস ভক্ষণের দ্বারা তাকে কৃশ করেন, সোম তার শরীরের রস গ্রহণ (স্বীকার) করে, তার বক্ষয় করেন। বরুণদেব সেই জনকে পাশে গ্রহণ (বদ্ধ) করে তার উদর ইত্যাদিতে ব্যথা সৃষ্টি করেন। দেবী সরস্বতী তার বাক (ভাষা) গ্রহণ করায় সে কথা বলতে অসক্ষম হয়। অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব তার জীবাত্মা গ্রহণ (প্রাপ্ত)করার নিমিত্ত সে মুমূর্ষ হয়ে যায়। যে জন দীর্ঘ রোগ পরিহার করতে কামনা করে এবং যে অপমৃত্যু পরিহার করে জীবিত থাকতে কামনা করে, সে এই পঞ্চ দেবতার উদ্দেশে এই (পঞ্চহবিষ্ক) যাগ নির্বপণ করবে। (অর্থাৎ) অগ্নিদেবের উদ্দেশে একাদশ কপাল হবিঃ, সোমদেবের উদ্দেশে চরু, বরুণদেবতার উদ্দেশে দশ কপাল হবিঃ, সরস্বতীর উদ্দেশে চরু এবং অগ্নি-বিষ্ণুর উদ্দেশে একাদশ কপাল হবিঃ নির্বপণ করলে অগ্নিদেব তার শরীর হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে যান, সোম আর রসগ্রহণ করেন না, বরুণ তাকে পাশ হতে মুক্তি প্রদান করেন, সরস্বতী তাকে তার বাকশক্তি পুনঃপ্রদান করেন, অগ্নিদেব ও যজ্ঞরূপ বিষ্ণুদেব সর্ব দেবতার সাথে এই যজ্ঞের মাধ্যমে চিকিৎসা করেন, সেই জন (যজ্ঞকারী যজমান) মরণাপন্ন হলেও জীবিত হয় (যজ্ঞেন চ ভিষজ্যত্যুত যদীতাসুর্ভবতি জীবত্যেব)। এই যুগে পঠিত মন্ত্রের মধ্যে (মন্ত্রোক্ত) নবনীত, সর্পি ও ঘৃত শব্দের নির্বচনের দ্বারা ঘৃতের (আজ্যের) মহিমা খ্যাপন করা হয়েছে। অশ্বিযুগলের প্রাণবৎ প্রিয় তুমি, তাঁরা দেবগণের চিকিৎসক (ভিষজৌ), তারা তোমার চিকিৎসা (ভেষজং) করছেন। ইন্দ্রের প্রাণবৎপ্রিয় তুমি, সেই ইন্দ্র তোমাকে সামথ্য প্রাদন করছেন। মিত্র ও বরুণদেবের প্রাণবৎ প্রিয় তুমি, সেই দেবদ্বয় যজমানরূপী তোমাতে প্রাণ ও আপন বায়ু স্থাপন করছেন। সর্ব দেবতার প্রাণবৎ প্রিয় তুমি, সেই দেবগণ এই মন্ত্রের দ্বারা যজমানরূপীতোমাতে বীর্য প্রদান করছেন। ঘৃতস্য ধারামমৃতস্য পন্থা (ঘৃতের ধারা অমৃতের পথ) ইত্যাদি মন্ত্রে যজমান আজ অবেক্ষণ (দর্শন) করবে। ঋতিগণ পাবমানেন ত্বা স্তোমেনেত্যাহ. (পবমান বৃহৎ স্তোত্রের দ্বারা) ইত্যাদি মন্ত্রে যজমানে প্রাণ স্থাপন করবেন; বৃহৎ রথান্তর স্তোত্রের দ্বারা তোমাকে ইত্যাদি মন্ত্রে যজমানে বল স্থাপন কর্তব্য; অগ্নির মাত্রা দ্বারা ইত্যাদি মন্ত্রে যজমানে আত্মা স্থাপন কর্তব্য। এইভাবে সর্ব ঋত্বিকগণ একমত হয়ে (একধৈব) যজমানের শত বৎসর পূর্ণ হতে যত সম্বৎসর পরিমাণ আয়ু প্রয়োজন, তা স্থাপন করে থাকেন। হে অগ্নিদেব! এই যজমানে আয়ু ও বল প্রদান করুন; হে বিশ্বদেববর্গ! আপনারা এই যজমানে তার জরা ব্যাপ্তি অবধি অর্থাৎ আয়ুর চরম ভাগ পর্যন্ত আয়ু প্রদান করুন (আয়ুষশ্চরমভাগস্থয়া জরায়া অষ্টিৰ্য্যাপ্তিস্য)। অগ্নিরায়ুম্মান (অগ্নি আয়ুস্মান) ইত্যাদি মন্ত্রে অধ্বর্য যজমানের দক্ষিণ হস্ত ধারণ পূর্বক দেবা আয়ুষ্মন্তস্ত … (দেবগণ আয়ুষ্মন্ত, তারা এই যজমানে আয়ু প্রদান করুন) ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা যজমানের আয়ুলাভ সম্পাদন করেন ॥১১৷
[সায়ণাচার্য বলেন-অনুবাক-২৪ দীর্ঘরোগ নিরাময়ের দ্বারা আয়ু লাভের নিমিত্ত ইষ্টির বিষয় কথিত হয়েছে। অথ দ্বাদশেহানবত ইষ্টিং বিধাস্য প্রস্তেীতি–। অর্থাৎ এই অনুবাক-২৪
ে নশ্ব দানকারীর পক্ষে অনুষ্ঠেয় যজ্ঞের বিধান কথিত হচ্ছে।]
মর্মার্থ- (পূর্বকালে একদা) দেবতা ও অসুরগণ পরস্পর যুদ্ধকামী হয়ে উভয় পক্ষেই সৈন্যের দ্বারা বহ রচনা করেছিল (সন্নদ্ধমাসী)। দেবতাগণের পক্ষে মনুষ্যগণ ও পিতৃগণ এবং অসুরগণের পক্ষে রাক্ষস ও পিশাচগণ যোগদান করেছিল। অসুরবর্গ ছিল রাক্ষসগণের অন্তঃপাতী (অবাস্তর অর্থাৎ মধ্যগত) জাতি। (অর্থাৎ অসুর ও রাক্ষস একই জাতির মধ্যগত)। সেই যুদ্ধে স্বল্প প্রহারেই দেবগণের শরীরে যে রক্ত ক্ষরিত হত, প্রতিদিন রাত্রে আগমন পূর্বক রাক্ষসগণ সেই রক্ততাযুক্ত স্থানে কোনও বিষ ইত্যাদি প্রয়োগ করে ক্ষুভিত (ব্যাকুলিত) করত। সেইজন্য সেই ক্ষোভে দেবতাগণ মৃতপ্রায় হয়ে পড়তেন।
অতঃপর রাত্রি প্রভাত হলে দেবগণ সেই অবস্থা লক্ষ্য করে এই কর্ম যে রাক্ষসগণের দ্বারা কৃত তা অবগত হলেন। তখন তারা (দেবগণ) রাক্ষসগণকে আমন্ত্রণ করে তাঁদের উৎকোচ প্রদানের প্রতিশ্রুতির দ্বারা নিজেদের অধীন করেন। তাতে রাক্ষসগণ বিজয়ফলের ভাগ প্রার্থী হয়ে আপন সৈন্যগণ সহ অসুর পক্ষ হতে নির্গত হয়ে দেবসৈন্যে (দেবপক্ষে) প্রবিষ্ট হলো। তাতে দেবগণ অসুরগণকে পরাজিত করার পরে রাক্ষসগণকেও দুরীকৃত করলেন (অপনোদিতবস্তঃ)। তখন রাক্ষসগণ নিশ্চিত হলো যে, দেবগণ মিথ্যা কর্ম করেছেন; সুতরাং তারা তাদের পরিবেষ্টিত করে ফেলল। তখন দেবগণ আপন কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত অগ্নির শরণপ্রার্থী হলেন। এই প্রার্থনা পূর্তির জন্যই তারা ত্রিহবিষ্কা যাগ নির্বপণ করলেন। সেই বিষয়ে (অর্থাৎ এই ত্রিবিষ্কা যাগে) প্রথম হবির দেবতা হলেন প্রবান অগ্নি (প্রয়মগ্নির্ভরতস্যেত্যাদিকয়োর শ্রুতঃ প্ৰশব্দো যস্যাগেরস্তি সোহয়ং প্রবান), দ্বিতীয় হবির দেবতা হলেন বিবাধবান (পৃথুনেত্যস্মিন্মন্ত্রে শায়মাণে বিবাধশব্দো যস্যাগেরস্তি সোহয়ং বিবাধবান) অগ্নি, এবং তৃতীয় হবির দেবতা হলেন প্রতীকবান অগ্নি (ত্বমগ্নে প্রতাঁকেনেতি মন্ত্রে প্রতীকশব্দো যস্যাগেরস্তি সোইয়ং প্রতীকবা)। প্রবান্ অগ্নিকে অষ্টকপাল পুরোডাশ নির্বপণ পূর্বক যাগ করার ফলে সেই অগ্নি পূর্বদিক হতে রাক্ষসগণকে প্রতিহত করলেন। বিবাধবান্ অগ্নির উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করলে, তার ফলে দক্ষিণ ও উত্তর পার্শ্বস্ত রাক্ষসগণ বিতাড়িত হলো (বিবাধিতবন্তঃ)। প্রতীকবান্ অগ্নির উদ্দেশে যাগানুষ্ঠানের ফলে পশ্চিম দিক হতে রাক্ষসগণ অপসারিত হলো (অপনোদিতবন্তঃ)। অতঃপর দেবতাগণ বিজয়ী হলেন এবং অসুরগণ পরাজিত হলো। যাঁরা শত্রুগণের প্রতি স্পর্ধমান পূর্বক এই যাগানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হন, তাঁরা প্রবান অগ্নির উদ্দেশে অষ্টকপাল পুরোডাশ নির্বপণ করবেন এবং বিবাধবা ও প্রতীকবান অগ্নির উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করলে, তাদের শত্রুগণ বিতাড়িত হবে। তিনরকম শত্রু আছে–প্রবল, সমানবল ও হীনবল। ত্রিহবিষ্ক যাগে অর্থাৎ তিন প্রকার (প্রবান, বিধবা ও প্রতীকবা) অগ্নির যাগের ফলে ঐ তিনরকম শত্রু যথাক্রমে পরাভূত হয়; অর্থাৎ প্রবল শত্রুগণ প্রবান অগ্নির কৃপায় বিতাড়িত হয় (প্রণুদতে), সমবলসমম্বিত শত্রুগণ বিবাধবান্ অগ্নির কৃপায় আক্রান্ত হয় (অতিক্রামতি) এবং হীনবল শত্রুগণ প্রতীকবান্ অগ্নির কৃপায় যুগানুষ্ঠাকারীর নিকটস্থ হতে পারে না (ন প্রাপ্লেত্যেব) ১।
[সায়ণাচার্য বলেন–অর্থ দ্বিতীয়ে তসৈব বিজিতিসংজ্ঞামিষ্টিং বিধাতুং প্রস্তৌতি। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২৪ বিজিত নামে অভিহিত যাগের বিষয় কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- (পূর্বকালে একদা) দেবতা ও অসুরগণের মধ্যে যুদ্ধ আসন্ন হয়ে উঠেছিল। সেই যুদ্ধে উদ্যোগী দেবতাগণ মিলিত হয়ে পরস্পর কথোপকথন প্রসঙ্গে বললেন–আমাদের মধ্যে যিনি অতিশয়রূপে বীর্যবন্ত (শক্তিমান), আমরা তাকেই অনুসরণ করে সম্যভাবে যুদ্ধ শুরু করব (উপক্ৰমং কুর্ব)। সেই নিমিত্ত তারা (দেবরাজ) ইন্দ্রকে অতিশয় বীর্যবন্তরূপে নিশ্চিত হয়ে তাকে বললেন–আপনি আমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিমান, সুতরাং আমরা আপনাকেই অনুসরণ করব। ইন্দ্র বললেন-আমার যে তিনটি তনু আছে, সেইগুলির উদ্দেশে আপনারা যাগানুষ্ঠান করুন। তখন তারা তাঁর উক্তিমতো তিনটি তনুর তর্পণ (তৃপ্তি) সাধনে ব্রতী হলেন। তারা হবির দ্বারা ক্রমে পাপ-বিমোচক (পাপবিমোকং) বৈরীবিনাশক (বৈর্যপঘাতং) এবং সামর্থ্য-ধারক (সামর্থ্যধারণং), এই তিনটি ইন্দ্ৰতনুর প্রতিটির উদ্দেশে একাদশ কপাল করে পুরোডাশ নির্বপণ পূর্বক সর্বসমেত (মিলিত্বা) তেত্রিশ কপাল হবিঃ সম্পন্ন করলেন। এবং সেই জন্য ইন্দ্ৰ তেত্রিশসংখ্যক দেবতাকে আপন অধীনস্থ করলেন, অর্থাৎ তাদের ঐশ্বর্যসম্পন্ন করলেন। তার ফলে দেবতাগণ অসুরগণের সাথে যুদ্ধে শত্রুবধের উপযুক্ত ইন্দ্রিয়ধারণ করে বিজয় প্রাপ্ত হলেন। যে যজমান শত্রুগণকে পরাজিত করতে ইচ্ছা করেন, তিনি ঐরূপ তিনটি তনুর উদ্দেশে তিনটি যুগানুষ্ঠান করলে, তার ফলে, উত্তম বিজয় লাভ করবেন। এই হলো বিজিতি নামক যাগ; এই কথা বিদিত হয়ে যিনি শত্রুগণের সাথে যুদ্ধ করেন, তিনি পূর্বোক্ত পাপমোক্ষ বা পাপবিনোক ইত্যাদি রূপ উত্তম বিজয় লাভ করেন (উত্তমাং বিজিতিং প্রাপ্লেতি) ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন– অনুবাক-২৪ শত্রুজয়ের নিমিত্ত বিজিতি নামক যজ্ঞের বিষয় কথিত হয়েছে। অথ তৃতীয়ে ভ্রাতৃব্যবতঃ স্পর্ধমানস্য সংবর্গেষ্টিং বিধিৎসুরাদৌ তদঙ্গভূতং মন্ত্রং পঠিতুং প্রস্তেীতি। অর্থাৎ এই অনুবাকে শত্রুবর্গের প্রতি স্পর্ধাপূর্বক সংবর্গ নামে অভিহিত যাগের বিষয় কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- (পুরাকালে একদা) দেবতা ও অসুরগণের মধ্যে যুদ্ধ আসন্ন হলে গায়ত্রী তাদের উভয় পক্ষের ওজঃ (তেজ বা ওজো নামা অষ্টমীদশা), বল (শরীরের শক্তি), ইন্দ্রিয় (দৃষ্টি ইত্যাদির দক্ষতা), বীর্য (উৎসাহ), প্রজা, (পুত্র ইত্যাদি) ও পশু (গো ইত্যাদি)–এই ছয়টি পদার্থ সংগ্রহ করে নিয়ে উভয়ের নিকট হতে দূরে স্থিতবতী হয়েছিলেন, অর্থাৎ দূরে গমন করেছিলেন। তা দর্শন করে দেবতা ও অসুরগণ মনে মনে বুঝতে পারলেন–আমাদের উভয় বর্গের (দলের) মধ্যে যে বর্গ গায়ত্রীকে প্রাপ্ত হবে, সেই বৰ্গই ঐ ঐশ্বর্যসমূহ প্রাপ্ত হবে। তখন তারা উভয় পক্ষই গায়ত্রীকে বিশেষণযুক্ত শব্দের দ্বারা (বিলক্ষণেন শব্দেন) আহ্বান করতে লাগলেন। দেবতাগণ গায়ত্রীকে হে বিশ্বকর্মনি! এবং অসুরগণ তাঁকে হে দাভী (বিরোধিগণের দমনকারিণী)! বলে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু গায়ত্রী উভয়পক্ষের কোনও পুরুষের পক্ষে প্রাপ্তা হলেন না; অর্থাৎ দেবতা ও অসুর কোন পক্ষই গায়ত্রীকে প্রাপ্ত হতে সমর্থ হলেন না। তখন দেবগণ তাঁকে প্রাপ্তির উপায়স্বরূপ এই যজুমন্ত্রটি দর্শন করেছিলেন–ওজোহসি সোহসি বলমসি ইত্যাদি, অর্থাৎ আপনি ওজঃ (তেজ), আপনি ধৈর্য (সহিষ্ণু), আপনি বল, আপনি দীপ্তি, আপনি স্বর্গ (অর্থাৎ দেবগণের ধাম), আপনি দেবগণের নাম (অর্থাৎ ইন্দ্র ইত্যাদি নাম নামে অভিহিতা), আপনি বিশ্বমসি (অর্থাৎ অচেতন কৃৎস্য (সর্ব) জগৎ), আপনি বিশ্বায়ু (অর্থাৎ সর্ব (কৃৎস্ন) অন্নযুক্ত), আপনি সর্বমসি (অর্থাৎ চেতনরূপ কৃৎক্স (সর্ব) জগৎ), এবং আপনি সর্বায়ুরভিভূঃ (অর্থাৎ জগতের সকলকে চেতনারূপ আয়ুৰ্দাত্রী এবং শত্রুগণের পরাভবকারিণী)।এই স্তুতিরূপ সর্বাত্মক মন্ত্রের দ্বারা দেবতাগণ গায়ত্রীর প্রসাদে অসুরগণের ছয়টি দ্রব্য বিনাশ করলেন এবং নিজেদের ছয়টি দ্রব্য পুনরায় লাভ করলেন। এই যাগের দুটি নাম–গায়ত্রী ও সংবর্গ। যেহেতু গায়ত্রী সর্ব দ্রব্য সহ অপসৃত হয়েছিলেন এবং পুনরায় মন্ত্রের দ্বারা স্তুত হয়ে সেই সর্ব দ্রব্যই আনয়ন করেছিলেন, এই নিমিত্ত এই মন্ত্রের দ্বারা ক্রিয়মাণ যাগেকে গায়ত্রী বলা হয় (ক্রিয়মাণেষ্টির্গায়ত্রীত্যুচ্যতে)। গায়ত্রী হলেন সম্বৎসররূপা; কারণ সম্বৎসরে দ্বাদশ মাসের অর্ধ অর্ধ হিসাবে যে চতুর্বিংশতি সংখ্যা হয়, (অর্থাৎ এক সম্বৎসরে পক্ষ হিসাবে যে চতুবিংশতি সংখ্যা হয়)–তা গায়ত্রীর অক্ষরের সমান–সেই নিমিত্ত সম্বৎসরই হলেন গায়ত্রী। আবার যেহেতু এই যাগের দ্বারা দেবগণ অসুরবর্গের ওজঃ ইত্যাদি ছয়টি দ্রব্য সম্যরূপে বিনাশ করেছিলেন, সেই কারণে এই যাগকে সংবর্গ যাগও বলা হয়। যিনি শত্রুগণকে জয় করতে ইচ্ছা করেন, তিনি এই সংবর্গ যাগের দ্বারা অগ্নির উদ্দেশে অষ্টকপাল পুরোশ নির্বপণ করবেন। (সংবর্গ শব্দ শ্রবণমাত্রই শত্রুসম্বন্ধীয় ওজঃ ইত্যাদি বর্জন হেতু এই অগ্নিও সংবর্গ অগ্নি নামে অভিহিত)।(পূর্বপঠিত ওজোহসি ইত্যাদি মন্ত্রের বিনিয়োগ কথিত হচ্ছে)-পুরোডাশ পাক পূর্বক বেদিতে সংস্থাপিত করে (বেদ্যামাসাদিতম) এই যজুমন্ত্রটি পাঠ করলে শত্রুর ওজঃ, বল, ইন্দ্রিয়, বীর্য, প্রজা ও পশু বিনাশ প্রাপ্ত হয় এবং নিজে (আত্মানা) শত্রুগণকে পরাভূত করতে সমর্থ হয়। ৩
মর্মার্থ- (পুরাকালে) প্রজাপতি প্রজা সৃষ্টি করেন; তারপর তারা তার প্রতি পরাম্বুখ (বিমুখ) হয়ে তাঁর নিকট হতে প্রস্থান পূর্বক যে দেশে নিবাস করছিল, সেই দেশে গমুত নামক অরণ্যে বিনা কারণে (অকৃষ্টপচ্য) উরূপ ধান্য উৎপন্ন হতো। বৃহস্পতি ও প্রকৃত প্রজাপতি সেই প্রজাগণকে অনুসরণ করে তথায় উপনীত হয়েছিলেন। তখন বৃহস্পতি প্রজাপতিকে বললেন–আপনাকে এই গামুতরূপ (অর্থাৎ গমুর্তারণ্যে জাত অথবা গমুত নামক তৃণবিশেষে উৎপন্ন) ধান্যের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করছি; তার ফলে ধান্যবন্ত আপনার নিকট ধান্যের প্রার্থনায় প্রজাগণ আপনার নিকট উপস্থিত হবে। এই কথা বলে বৃহস্পতি প্রজাপতিকে ধন্যবন্ত করে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তারপর ধন্যবন্ত প্রজাপতির নিকট ধান্যার্থী হয়ে প্রজাগণ উপস্থিত হয়েছিল। যিনি প্রজা কামনা করেন, তিনি প্রজাপতির উদ্দেশে গামুত-চরু নির্বপণ করবেন। প্রজাপতির নিকট ভাগধেয় সহ গমন করলে তিনি এইরূপ প্রজার প্রজনন করেন। অতঃপর পশুকামীর দ্বারা সোম ও পূষার উদ্দেশে গামুত-চরু, নির্বপণের বিধি কথিত হচ্ছে)–(পুরাকালে) প্রজাপতি পশু সৃষ্টি করেন, তারপর তারা তার প্রতি বিমুখ হয়ে যে স্থানে অবস্থান করছিল, সেখানেও ভক্ষিততৃণের উচ্ছিষ্ট গোময় ইত্যাদির পতনের ফলে উৎপন্ন গামুত ধান্য ছিল (গমুদুদতিত্বা)। পূষা ও প্রজাপতি সেই পশুগণকে অনুসরণ করে তথায় উপনীত হলেন। তখন পুষা প্রজাপতিকে বললেন–আপনি এই ধান্যের দ্বারা সমৃদ্ধি লাভ করুন, তা হলে পশুগণ আপনার নিকট আগত হবে। সোমদেব বললেন-আমাকেও বিনাকারণে উৎপন্ন এই ধান্যে প্রতিষ্ঠিত করুন। তখন প্রজাপতি সেই গামুত ধান্যের দ্বারা পূষা ও সোমের প্রতিষ্ঠা পূর্বক পশুসমূহ প্রাপ্ত হয়েছিলেন (প্রতিষ্ঠাপ্য পশুনাপ্তবা)। যিনি পশু কামনা করেন, তিনি সোম ও পূষার উদ্দেশে গামুত-চরু নির্বপা করবেন। যিনি সোম ও পূষার নিকট তাদের ভাগধেয় সহ যথাশীঘ্র গমন করেন, তিনি তাঁদের দ্বারা পশু লাভ করেন। (অর্থাৎ পূষা ও সোম তাঁকে পশু প্রদান করেন)। সোমদেব হলেন রেতোধা, অর্থাৎ শুক্ৰধাতুর ধারক; এবং পূষা হলেন পশুনাং প্রজনয়িতা, অর্থাৎ পশুসমূহের জন্মদাতা। সোম রেতঃ প্রদান করেন এবং পূষা পশুসমূহকে গর্ভগ্রহণ করিয়ে থাকেন (পশূ প্র জনয়তি) ॥৪৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–অর্থ ব্যবহিতেন ষষ্ঠেন চিত্রাগং বিধিৎসুরাদৌ পঞ্চমেনানুবাকেনো হোমমন্ত্রান পঠতি। অর্থাৎ অনুবাক-২৪ যে চিত্রাযাগের কথা উক্ত হয়েছে, এই অনুবাক-২৪
মর্মার্থ- হে অগ্নি! গো-বর্গের সাথে আপনি আমাদের প্রতি আগমন করুন। হে ইন্দু! পশুসমূহের পুষ্টি সাধনের দ্বারা আপনি আমাদের লক্ষ করুন। ইন্দ্র আমাদের গৃহের পশুসমূহের ধারণকর্তা হোন। সহস্রিয়, অর্থাৎ সহস্র পশুদ্বারা সমৃদ্ধ, যে সবিতা, তিনি আমাদের গৃহে আনন্দজনক হয়ে অবস্থান করুন। পশুর পোষক দেবতা পূষা আগমন করুন (আগচ্ছতি) এবং ধনসমূহও আগত হোক। সকলের বিধাতা (সর্বস্য বিধাতা) জগতের পালক ঈশ্বর আমাদের ধন দান করুন। সেই ঈশ্বর আমাদের পূর্ণরূপে ধনের দ্বারা রক্ষা করুন। সেই ত্বষ্টা, যিনি শ্রেষ্ঠ কামনাসমূহের বর্ষক, তিনি আমাদের গৃহে সহস্র ও অযুত পশুর সাথে আনন্দজনক হয়ে অবস্থান করুন। হে ধনপোষক! যে আপনি দেবতাগণের কীর্তিহেতুভূত অনুরূপ অমৃত স্থাপিত করেছেন, সেই আপনি আমাদের জীবনযাপনের নিমিত্ত গো-সঙ্ আহরণ পূর্বক যুক্ত করুন (মিশ্রয়)। অগ্নি আমাদের গৃহের অধিপতি; সোম বিশ্ববনি, অর্থাৎ সর্বজনের সেবা করেন (ভজত); সবিতা সুমেধা, অর্থাৎ শোভনা মেধাযুক্ত। এঁদের সকলের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করা হচ্ছে (স্বাহুতমস্তু)। হে গৃহপতি অগ্নি! আপনার ঘৃতযোগ্য যে ভাগ আছে, সেই ভাগের দ্বারা অনুষ্ঠানকারী যজমানের শরীরে অষ্টমধাতুরূপ ওজঃ (তেজঃ) স্থাপন করুন। যজমান আমি যেন শ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠানরূপ পথ হতে বিযুক্ত না হই; আমি যেন যজমানগণের মধ্যে শিরোবৎ উত্তম হই। (দেহের মধ্যে উত্তম অঙ্গ হলো মস্তক, আমি যেন সকল যজমানরূপ অঙ্গের মধ্যে সেই মস্তকের ন্যায় উত্তমতা প্রাপ্ত হই)। আমি আপনার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন-অনুবাক-২৪
ে চিত্রাযাগের হোমমন্ত্রগুলি উক্ত হয়েছে। অথ তং যাগং বিধত্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২৪ সেই চিত্রাযাগ সম্পর্কে বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- পশুকামী জন এই চিত্রা নামধেয় যাগের অনুষ্ঠান করবেন। সেই চিত্রা হলেন ভূমিস্বরূপা। যে কারণে (যেহেতু) এই ভূমিতে প্রাণীজাত অধিকরূপে উৎপন্ন হয়, সেই হেতু সেই বিচিত্র অর্থাৎ আশ্চর্যজনক প্রাণিসমূহের উৎপাদনের নিমিত্ত এই ভূমিকে চিত্রা বলা হয়। সেই রকমে, বিচিত্র প্রজা পশুর হেতুস্বরূপ যে যাগ হয়, সেই যাগকেও চিত্রাযাগ বলা হয়। এই কথা বিদিত হয়ে যে পশুকামী ব্যক্তি চিত্রার দ্বারা যাগানুষ্ঠান করেন, (বা চিত্ৰাযাগের অনুষ্ঠান করেন), তিনি প্রজা ও পশু লাভ করে থাকেন।–চিত্রার স্বরূপভূত সাতটি যাগবিশেষের বিধান ক্রমে তুলে ধরা হচ্ছে (উন্নয়তি)।–এই স্থানে অগ্নির উদ্দেশে হবির প্রবাপনে প্রকৃষ্টরূপে পশু-উৎপত্তির বীজ প্রক্ষিপ্ত হয়। ব্রীহি ইত্যাদি বীজের (অঙ্কুরোদ্দামের) নিমিত্ত গোময় ইত্যাদির প্রয়োগের মতো সোমের উদ্দেশে হবিঃ নির্বপণের দ্বারা প্রজা ইত্যাদির বীজস্বরূপ (অর্থাৎ প্রজননের হেতুস্বরূপ) পোষক রেতঃ ধারণ করা হয়। এবং তৃতীয় হবির দেবতা ত্বষ্টা সেই রেতঃকে নানারূপ আকারসম্পন্ন করেন। সরস্বতী দেবতা হলেন দেবগণের স্ত্রী-পুরুষরূপত্ব-দেবতাসম্বন্ধী মিথুনস্বরূপা; তার উদ্দেশে নির্বাপিত হবির মধ্যে অর্থাৎ যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দ্বারা যজমানের নিমিত্ত গৃহের মধ্যে দৈব-মিথুন সম্পাদিত হয়ে থাকে। তা উৎপাদিত প্রজা ও পশুগণের পুষ্টি সম্পাদিত করে এবং প্রজা ও পশুগণের প্রজনেন বা উৎপত্তি সম্পাদিত করে। তারপর সিনীবালীর উদ্দেশে চরু নির্বপণ কর্তব্য। (সিনীবালী বাকের দেবতা। সভামধ্যে বাকের পুষ্টিহেতু যজমান পণ্ডিতরূপে অবলোকিত হয়ে থাকেন)। সিনীবালীর উদ্দেশে চরু নির্বপণ করলে বাক্য (অর্থাৎ পাণ্ডিত্যপূর্ণ বাকশক্তি) লাভ করা যায়। চরমে অর্থাৎ শেষে ইন্দ্রের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। কারণ ইন্দ্রের দ্বারা পুরুষত্ব ও সিনীবালীর দ্বারা স্ত্রীত্ব–এই উভয়ের মিলনে মিথুন হয়।-(পাঠপ্রাপ্ত হবিঃসংখ্যার প্রশংসা করা হয়েছে)–এই চিত্রাযাগে মোট সাতটি হবি (অর্থাৎ অগ্নি, সোম, ত্বষ্টা, সরস্বতী, সিনীবালী, ইন্দ্র ও ইন্দ্রাগ্নী) যথাক্রমে (পর পর) নির্বপণ করতে হয়; তার ফলে সাতটি গ্রাম্য পশু (গো, পুরুষ, অশ্ব, অজা, অবি, গর্দভ ও উষ্ট্র), ও সাতটি আরণ্য পশু (দ্বিখুর, শ্বাপদ, পক্ষী, সরীসৃপ, হস্তি, মর্কট ও জলচর তথা নদীসত) এবং সাতটি ছন্দ (গায়ত্রী, উষ্ণিক, অনুষ্টুপ, বৃহতী, পঙক্তি, ত্রিষ্টুপ ও জগতী) লব্ধ হয়। (অর্থাৎ এতে পশুসঙ্ ও ছন্দসঙ্ উভয়ই লাভ করা যায়)। –হে অগ্নি! আপনি গো-গণের সাথে আগমন করুন ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা অগ্নি ও ইন্দ্রের উদ্দেশে সম্মিলিত হোম অর্থাৎ আহুতি প্রদান করণীয়। তার ফলে পুষ্টির পোষণকারী দেবতাগণ প্রজা ও পশুর সাথে পুষ্টি বা পোষণ দান করেন; এই আহুতি সমূহ প্রতিষ্ঠার কারণ হয় ॥৬॥
[সায়ণাচার্য বলেন-অনুবাক-২৪
ে পশুকামীর পক্ষে অনুষ্ঠেয় চিত্রা নামে আখ্যাত যাগের বিষয় কথিত হয়েছে। অতঃপর সপ্তম হতে অনুবাক-২৪ পর্যন্ত কারীরী যাগের বিষয় প্রতিপাদিত হয়েছে। অনুবাক-২৪
মর্মার্থ- হে কৃষ্ণবাস (কৃষ্ণবর্ণ পরিধেয় বস্ত্র)! তুমি মরুতের সাথে সম্বন্ধবিশিষ্ট। (অর্থাৎ বস্ত্রে প্রক্ষিপ্ত কৃষ্ণদ্রব্য মিশ্রিত জল মরুৎ-গণ শোষণ করেন; সেই বস্ত্রের উদ্দেশে আহ্বান করা হচ্ছে)। অতএব তুমি মরুৎ-গণের বলস্বরূপ, জলের ধারার উদ্দেশে প্রতিবন্ধরূপ মেঘকে ভিন্ন করো (মেঘং ভিন্ধি)। হে মরুৎ-গণ! আপনারা শ্যেনের ন্যায় প্রবলগতিসম্পন্ন পুরোবাতের (সম্মুখ দিকের অর্থাৎ বিপরীত দিক হতে বাহিত বায়ুর সাথে ক্রীড়া করে থাকেন। (কীরকম পুরোবাত? না) মনের ন্যায় বেগশালী, বীর্যান্বিত জলের বর্ষণকারী, পশ্চাতের বায়ুর সুষ্ঠু বর্জনকারী এবং যার দ্বারা মেঘ হতে মোচিত জল তীব্র ধারারূপ হয়ে শীর্ণতা প্রাপ্ত হচ্ছে–সেই পুরোবাত।–হে অশ্বিযুগল (দেবতাগণের বৈদ্যদ্বয়)! সেই জল যাতে মঙ্গলকর (ক্ষেমকরং) হয়, সেইভাবে আপনারা তা ধারণ করুন। যে পুরোবাত বৃষ্টির প্রবর্তন করে প্রজাগণের তুষ্টি সাধনপূর্বক আবর্তন করে, সেই পুরোবাতের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করা হচ্ছে। ঝঞ্জাবায়ুর সাথে যুক্ত হয়ে (প্রবাতেন যুক্ত) তীব্র ধারাযুক্ত যা ভীষণ গর্জন পূর্বক ভয়ঙ্কর, প্রাণঘাতক বজ্রপতনের মতো শব্দকারী, বিদ্যুৎ প্রকাশের সাথে যুক্ত, বর্ষধারায় শস্যক্ষেত্র ইত্যাদির উদ্দীপক, দিবারাত্র পৃথিবীর পূরয়িতা, প্রভূত বর্ষণকারী বলে জনগণের মধ্যে খ্যাত, রৌদ্রের অবস্থানেও বিশেষরূপে রাজমান–সেই গর্জনকারী ও বিদ্যুযুক্ত অর্থাৎ যথৌক্তগুণযুক্ত সর্বধারণক্ষম বায়ুর উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। হে মান্দা-বাশা (মান্দা অর্থাৎ হর্ষহেতুকরী ও বাশা অর্থাৎ শব্দের দ্বারা বর্ষণযুক্তা), শুক্কু (শুদ্ধি হেতুকরী), অজিরা (প্রবাহরূপে গমনশীলা), জ্যোতিষ্মতী (শুকুরূপযুক্তা), তমস্বরী (সূর্যকে আচ্ছাদিত করে যেভাবে তমঃ অর্থাৎ অন্ধকার ঘটানো হয়, সেইভাবে আপন ইচ্ছায় অন্ধকার সৃষ্টিকারিণী, উতী (ভূমির ক্লেদনাশিনী), সুফেনা (জলপ্রবাহের বাহুল্যের দ্বার বহুফেনযুক্তা), মিত্রভূত (জগতের মিত্রভূতা ওষধিসমূহের ধারণকত্রী), ক্ষত্ৰভৃত (সুবৃষ্টির দ্বারা দেশাধিপতি রাজবর্গের সন্তোষ পোষণকারিণী), সুরাষ্ট্রা (শোভন শস্যের দ্বারা পূর্ণ রাষ্ট্রসৃষ্টিকারিণী)-হে জলবর্গ! তোমরা আমাকে এই যজ্ঞকর্মে ফলপ্রদানের দ্বারা রক্ষা করো। –হে রঞ্জু! কৃষ্ণসার মৃগের চর্মদ্বারা নির্মিত তুমি সেচনসমর্থ অশ্বের (বৃষ্ণোহশ্বস্য) মুখের দৃঢ় বন্ধনসাধন হও; অতএব বৃষ্টিসৃষ্টির নিমিত্ত এই রজ্জ্বরূপ হে কৃষ্ণাজিন! তোমাকেও বন্ধন করছি । ৭।
মর্মার্থ- হে প্ৰজাগণের বাসয়িতা (আশ্রয়দাতা) অগ্নি, সোম ও সূর্য দেবত্রয়! হে সুখপ্রদায়ক মিত্র, বরুণ ও অৰ্মা দেবত্রয়! হে জলের অবিনাশকারী (অপাং নাপাদুকানামবিনাশয়িত) শীঘ্রগতিসম্পন্ন সোমপানকারী দেবগণ! আপনারা দ্যুলোক, অন্তরীক্ষ ও পৃথিবী–এই তিন লোকের নিমিত্ত মেঘ বিদারণ পূর্বক বৃষ্টির (জলের) দ্বারা আমাদের রক্ষা করুন। যখন দেবগণ বিশেষভাবে ক্লেদযুক্ত পৃথিবীকে জলের দ্বারা ধৌত করেন, তখন দিবাভাগও অন্ধকারে আবৃত করে দেন, রাত্রের আর কি কথা? (অর্থাৎ রাত্রি তো এমনই অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে)। মনুষ্যরূপা ঋত্বিৰ্গণ সুষ্ঠুভাবে হবিঃ দানকারী যজমানের নিমিত্ত দুলোক হতে জলের বাহক মেঘকে প্রসারিত করে থাকেন। পূর্ববর্তী সেই এক মেঘও বহু মেঘ হয়ে দ্যাবাপৃথিবীকে লক্ষ্য করে বিবিধ বৃষ্টির সৃষ্টি করে; কিন্তু মরুভূমিকে জলরহিত রাখে। হে মরুৎগণ! আপনারা সমুদ্রসমান মেঘ হতে বৃষ্টি উৎপাদিত করুন; তারপর পাংসুযুক্ত (ধূলিময়) ভূপ্রদেশসমূহ প্লাবিত করুন (বষয়থাপ্লাবয়থ)। হে ভূমিশোষণ-নিবারণকারী মরুৎ-গণ! আপনাদের ধেনুসদৃশ মেঘসমূহ কখনও উপেক্ষার যোগ্য নয়। (কারণ) তার দ্বারা আপনারা জগতের প্রতি অনুগ্রহরূপ মঙ্গলকার্য সাধিত করে থাকেন। আপনাদের রথের অনুবর্তনকারী (পশ্চাতে গমনকারী) অন্য দেবগণও বৃষ্টি দামের নিমিত্ত রথে আরোহিত হয়ে আমাদের এই যজ্ঞকর্মে সমাগত হোন। হে মরুৎ সঙ্! দ্যুলোকের নিকট হতে বৃষ্টি সৃষ্টি করুন, বহ্নিদাহসদৃশ রৌদ্রতাপে শুষ্ক এই সমুদ্রসদৃশ কুম্ভ পূর্ণ করুন। হে মেঘ! তুমি জল হতে উৎপন্ন (অজা) প্রথমজাত, সমুদ্রসম্বন্ধি বলের দ্বারা বৃষ্টির উৎপাদনে সামর্থযুক্ত। (অর্থাৎ জল যেন তোমার মাতা-পিতা, তাদের দ্বারাই তুমি উৎপন্ন)। হে পুনর্নবা (পুনরায় নবরূপে জাত) অর্থাৎ বর্ষা! তুমি প্রকৃষ্টরূপে ক্লেদযুক্ত পৃথিবীকে সিঞ্চিত করো; তার নিমিত্ত আকাশের ন্যায় ব্যাপ্ত মেঘমণ্ডলকে বিদীর্ণ করো; এবং বিদারণ পূর্বক আকাশে উৎপন্ন জল আমাদের প্রদান করো। (অর্থাৎ আমাদের প্রতি বর্ষণ করো)। পুনর্নর্বা-সমূহের (পুনর্নর্বায়া) অর্থাৎ পুনরায় নবরূপে জাত ওষধিসমূহের উৎপাদক হে দেব! আপনি বর্ষণের নিমিত্ত জলপূর্ণ ভিস্তীর সমান মেঘ প্রেরিত করুন (বিসৃষ্টদ্বারং কুরু)। যে দেবতাগণ দুলোকের, অন্তরীক্ষলোকের ও পৃথিবীলোকের আধার, তারা সেই তিন লোক হতে এই যজ্ঞে আগমন পূর্বক প্রথমে শস্যনিষ্পদক ক্ষেত্রে সামান্যরূপে প্রবেশ করুন এবং তারপর প্রতি ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রবেশ করুন। ৮।
মর্মার্থ- (যজমানের বস্ত্র পবিধান বিধি)-মারুত অসি মরুতাম্ ওজঃ অর্থাৎ তুমি মরুৎ-গণের বলস্বরূপ–এই মন্ত্রে কৃষ্ণবস্ত্র পরিধানের কথা ব্যক্ত হয়েছে। জলপূরিত মেঘের দ্বারা আদিত্য প্রকাশিত হলে অর্থাৎ সর্বত আবৃত থাকায় বৃষ্টির স্বরূপ কৃষ্ণবর্ণ হয় (কৃষ্ণভাতি)। সেই রকম যজমানও কৃষ্ণবস্ত্র পরিহিত থাকায় বৃষ্টির সমান রূপ প্রাপ্ত হয়ে মেঘ বর্ষণে সমর্থ হন (প্রভুর্ভবতি)। রময়ত মরুতঃ শ্যেনমায়িনমিতি ইত্যাদি, অর্থাৎ হে মরুৎ-গণ! আপনাক শ্যেনের ন্যায় প্রবলগতিসম্পন্ন হয়ে পুরোবাতের (সন্মুখ দিকের অর্থাৎ বিপরীত দিক হতে বাহিত বায়ুর) সাথে ক্রীড়া করে থাকেন-এই মন্ত্রে পশ্চাতের বাতাস রুদ্ধ পূর্বক সন্মুখস্থ বাতাস বর্ষণের নিমিত্ত উৎপাদিত হয়ে থাকে। বাতনামানি জুহোতি ইত্যাদি, অর্থাৎ পুরোবাতের উদ্দেশে স্বাহামন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি–এই মন্ত্রের বায়ুর নাম করে আহুতি প্রদান করা হচ্ছে। বায়ু হলেন বৃষ্টির ঈশ্বর (স্বামী বা প্রভু), সুতরাং বায়ুর নিকটু তার ভাগধেয় সহ গমন করলে (অর্থাৎ বায়ুর উদ্দেশে হোম করলে) বায়ু তাকে (অর্থাৎ সেই হেমকারীকে) বৃষ্টি দান করেন। মান্দা বাশাঃ শুন্ধরজিরাঃ ইত্যাদি, অর্থাৎ হে মান্দা-বাশা, শুন্ধু, জ্যোতিষ্মতি ইত্যাদি মন্ত্রে তার আধারের কথা ব্যক্ত হয়েছে। কৃষ্ণাজিনের উপর হবিঃ-স্বরূপ ব্রীহি (তণ্ডুল) পেষণ করা হয়ে থাকে (ব্রীহিনহন্তি তণ্ডুলান্ পিনষ্টি চ)। সেই হেতু এই স্থানেও অর্থাৎ বেদির মধ্যে হবির মিশ্রণ কর্তব্য। পারমহংসরূপে চতুর্থাশ্রমে প্রাপ্ত (অর্থাৎ সন্ন্যাসাশ্রম প্রাপ্ত পরমহংস নামে কথিত) যে যতিদের (তপস্বীগণের) মুখে ব্রহ্মত্ম প্রতিপাদক বেদান্ত শব্দ নেই ইন্দ্র তাদের আরণ্য হিংস্ৰজন্তসমূহের মধ্যে নিক্ষেপ করেন (শ্বভ্য প্রাযচ্চৎ)। (নিত্যকর্ম পরিত্যাগ করে, বেদান্ত শ্রবণ না করে, যে সন্নাসী অবস্থান করেন, তিনি পতিত হয়ে থাকেন, তাতে কোন সংশয় নেই)। নেকড়ে বাঘ শৃগাল ইত্যাদির দ্বারা ভক্ষিত যতিগণে মস্তক বা কপালের যে অস্থিসমূহ ভূমিতে পতিত হয়, সেগুলি হতে খর্জুরবৃক্ষ উৎপন্ন হয়। তাল নামে অভিহিত সেই সহাখজুর ফলগুলি (অর্থাৎ তালবৃক্ষের তাল নামক ফলগুলি) মস্তকের মতো দৃষ্ট হয়। (অর্থাৎ মনুষ্যমুণ্ডের আকারসম্পন্ন হয়ে থাকে)। সেই ফলগুলির রস ঊর্ধ্ব হতে নিম্নের ভূমিতে পতিত হয়ে সোমলতার ন্যায় (অর্থাৎ সোমলতার তুল্য) অঙ্কুররূপে উন্নত হয়। সেইগুলিকে করীর শব্দে অভিহিত করা হয়। এই নিমিত্ত এই করীরসমূহ সোমাঙ্কুরের ন্যায় সৌম্য (সুন্দর বা সোমতুল্য)। এবং সেই সৌম্যসমূহের আহুতি প্রদান করলে আকাশ হতে বৃষ্টি পতিত হয় (প্ৰচ্যাবয়তি)। মক্ষিকা (মধুমক্ষিকা) নানারকম পুষ্প হতে মধু রস সংগ্রহ পূর্বক মধু সঞ্চয় করে (মধু কুৰ্বান্তি); এবং সেই রসসমূহ হতে (অর্থাৎ মধু হতে) ওষধি উৎপন্ন হয় এবং সেই ওষধি বৃষ্টি আনয়ন করে। ওষধির উৎপাদন ও দ্রবজের কারণে তাতে উভয়ের সারত্ব থাকে (রসানামোষধি জন্যত্বাäবচ্চোভয়সারত্ব। মান্দা বাশা ইত্যাদি জলের নামের দ্বারা তাদের আহ্বান করা হয়েছে। (কৃষ্ণাজিনবন্ধনের মন্ত্র ব্যক্ত হচ্ছে)–হে রজ্জো তৃং বৃষ্ণোহশ্বস্য ইত্যাদি,অর্থাৎ হে রক্ষ্ম! কৃষ্ণসার মৃগের চর্মদ্বারা নির্মিত তুমি সেচনসমর্থ অশ্বের মুখের দৃঢ় বন্ধনসাধন হও ইত্যাদি মন্ত্রে যেমন অশ্ব সেচনসমর্থ এইরকমে পন্য বা মেঘও সেচনসমর্থ জলে পূর্ণ হয়ে (উদকপূর্ণেন) কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে, এবং তার পর বর্ষণ সম্পাদন করে। এতএব কৃষ্ণবর্ণ রঞ্জুরূপের দ্বারা মেঘ সমৃদ্ধ হয় এবং তার ফলে বর্ষণ সম্পন্ন হয়ে থাকে ॥৯॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথোত্তরভাগস্থমন্ত্র দশমে ব্যাখ্যায়ন্তে। অর্থাৎ এই অনুবাকে কারীরী যাগের উত্তরবাগস্থ অর্থাৎ অনুবাক-২৪ ে উক্ত মন্ত্রগুলি ব্যাখ্যাত হয়েছে]
মর্মার্থ– দেবাঃ বসবা দেবাঃ শৰ্মণ্যা দেবাঃ সপীতয় ইত্যাদি, অর্থাৎ হে প্রজাগণের বাসয়িতা অগ্নি, সোম ও সূর্য দেবত্রয়! হে সুখপ্রদায়ক মিত্র, বরুণ ও অর্যমা দেবত্রয়! হে সোমপানকারী দেবতাবর্গ! ইত্যাদি মন্ত্রে সেই সেই দেবতার অনুগ্রহে তিন দিনের প্রতিদিনই বৃষ্টির ইচ্ছা করা হয়েছে। যদি প্রথম দিনে বৃষ্টি হয়, তবে পিণ্ডয় হোমের দ্বারা যজ্ঞকর্মের সমাপ্তি করা বিধি (পিণ্ডত্ৰয়হোমেনৈব কর্মর্সমাপ্তিঃ)। সেইরকম দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও করণীয়। এই তিন দিনে যদি বৃষ্টির অভাব ঘটে, তবে চতুর্থ দিনে পুরোডাশ নির্বপণ করতে হয়। সূর্যের প্রকাশযুক্ততার কারণে দিনের দেবতা মিত্র (সূর্য), এবং অন্ধকারের দ্বারা লীনত্বহেতু রাত্রের দেবতা বরুণ (জলাধিপতি দেবতা, যিনি পশ্চিম দিকের অর্থাৎ সূর্যাস্তের অভিমুখী দেবতাও বটেন)। দিবা বা রাত্র ব্যতীত মেঘ বৃষ্টির বর্ষণে অক্ষম (ন ক্ষমঃ), কারণ দিবা ও রাত্র ব্যতীত আর কোন কালই নেই (কালান্তরস্যাভাবাৎ)। রাত্রি বা দিবসে অথবা দিবারাত্র (সর্বদা) কখন যে বর্ষণ হবে, তা পূর্বে জ্ঞাত হওয়া যায় না বলেই নিরন্তর বন্ধন করনীয় (অর্থাৎ রাত্রি ও দিনকে যেন যজ্ঞের দ্বারা বন্ধন করা হচ্ছে, এমনভাবে অবিচ্ছদে যজ্ঞ সাধনীয়)। তাতে মিত্র ও বরুণ তুষ্ট হয়ে বর্ষণ দান করেন (বষয়তঃ)। (অর্থাৎ মিত্র ও বরুণের নিকট তাঁদের ভাগধেয় সহ গমন করলে, তার ফলস্বরূপ আহোরাত্রব্যাপী মেঘ বর্ষণ দান করে)। ধাম বা স্থানের আচ্ছাদক অগ্নিদেবতার উদ্দেশে অষ্টকপাল পুরোডাশ, মরুৎ-দেবতার উদ্দেশে সপ্তকপাল পুরোডাশ, এবং সূর্যদেবতার উদ্দেশে এক কপাল পুরোডাশ নির্বপণ করণীয়। (স্মৃতিশাস্ত্র অনুসারে) অগ্নিদেব সূর্য বা আদিত্যদেবের দ্বারা বৃষ্টির উৎপাদন করেন, সেই উৎপাদিত বৃষ্টিকে মরুৎ-গণ যেস্থানে সেস্থানে (যত্র তত্র) বাহিত করেন (নয়ন্তি)। যে সময়ে আদিত্যদেব তীব্র রশ্মির দ্বারা অতিশয় সন্তাপ দান করেন, তখন মেঘের দ্বারা তিনি বর্ষণ করিয়ে থাকেন। গৃহ ইত্যাদি আচ্ছাদিত করেই যেন বহুল মেঘযুক্ত হয়েই বর্ষণ করেন। সেই নিমিত্ত অগ্নি, মরুৎ ও আদিত্য এই তিন দেবতাকে বৃষ্টির নিয়মনে সমর্থ দেবতারূপে অভিহিত করা হয়। এঁদের নিকট এঁদের ভাগধেয় নিয়ে গমন করলে (অর্থাৎ হবিঃ নির্বপণ করলে) তাতে তুষ্ট হয়ে তারা যজমানের নিমিত্ত বর্ষণ করেন। সৃজা বৃষ্টিং দিব আহদ্ভিঃ সমুদ্রং পৃণ অর্থাৎ হে মরুৎসঙ্! দুলোকের নিকট হতে বৃষ্টি সৃষ্টি করে বহ্নিদাহসদৃশ রৌদ্রতাপে শুষ্ক এই সমুদ্রসদৃশ কুম্ভ পূর্ণ করুন–এই মন্ত্রে জলের দ্বারা পূর্ণ করার অর্থে এই ভূলোকস্থিত জলের বৃদ্ধি সূচিত মা হচ্ছে; এবং সৃজা বৃষ্টিং এই মন্ত্রাংশের দ্বারা ভূলোকস্থিত এই জল স্বর্গস্থিত জল প্রাপ্তির নিমিত্ত গমন করছে–এই অর্থ সূচিত হচ্ছে। অজাঅসি প্রথমজা বলমসি সমুদ্রিয় অর্থাৎ হে মেঘ! তুমি জল হতে উৎপন্ন প্ৰথমজাত, সমুদ্রসম্বন্ধি বলের দ্বারা বৃষ্টির উৎপাদনে সামর্থযুক্ত এই মন্ত্রের যথাত যজুই তার অর্থ সূচিত করছে (যথাযজুরেবৈতৎ)। উন্নম্ভয় পৃথিবীং ভিন্ধীদং দিব্যং নভঃ ইত্যাদি মন্ত্রে জলপূর্ণ ভিস্তীর সমান মেঘ প্রেরণ করুন ইত্যাদি বচনের দ্বারা বর্ষার উদ্দেশে হোম অনুষ্ঠানের কথা ব্যক্ত হয়েছে। বর্ষাকালে ওষধিসমূহের মধ্যে পুনর্ণবা (বর্ষা) বহুলতর বৃষ্টির সমুদ্ভব করে। যে দেবা দিবিভাগা ইত্যাদি মন্ত্রে দ্যুলোক, অন্তরীক্ষলোক ও পৃথিবীলোকের আধারভূত দেবতাগণের তুষ্টি কামনা করে তাদের যজ্ঞক্ষেত্রে আগমন পূর্বক যজমানের অভীষ্টপ্রদ হওয়ার (যজমানায়াভীষ্টপ্রদা ভবন্তি) কথা ব্যক্ত হয়েছে ১০
[সায়ণাচার্য বলেন–অনুবাকে তু দশমে কারীরীষ্টিঃ সমাপিতা। অথৈকাদশে ত্রৈধাতবীয়েষ্টিবিধীয়তে। অর্থাৎ- অনুবাক-২৪ পর্যন্ত কারীরী যাগের বিষয় সমাপ্ত হয়েছে। অতঃপর এই অনুবাক-২৪
মর্মার্থ- অভিজ্ঞ জনবৃন্দ বলে থাকেন যে, এই ত্ৰৈধাতবীয় যজ্ঞে অগ্নি-সন্দীপন-মন্ত্রের দ্বারা (সামিধেনীরূপেণ) সকল ছন্দগুলির অনুবচন (সদৃশবাক্য) প্রয়োগ করা কর্তব্য। সকল ছন্দের অনুবচর কি করে সম্ভব, সেই প্রসঙ্গে উক্ত হয়েছে–ককু ছন্দ ত্রিষ্টুভের সার, উষ্ণি ছন্দ জগতীর সার। অতএব ঐ উভয়ের অনুবচনের দ্বারা সকল ছন্দের অনুবচন সম্পন্ন হয়। কিন্তু এর দ্বারা (অর্থাৎ ককুদ ও উষ্ণিক এই উভয় ছন্দের বচনের বা কথনের দ্বারা) ত্রিষ্টুপ ও জগতী ছন্দের লাভ হলেও গায়ত্রী ছন্দের অলাভের শঙ্কা নিবারণ প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে– উষ্ণিক ছন্দ অষ্টাবিংশতি অক্ষর সমন্বিতা, সুতরাং সেখানে (অর্থাৎ তার মধ্যে) চতুর্বিংশতি অক্ষরযুক্ত গায়ত্রী অন্তর্ভুত আছেন। গায়ত্রীর চতুর্বিংশতি ব্যতীত উষ্ণিকের আরও যে চারটি অক্ষর অধিক রয়েছে, তা চতুষ্পদ পশুস্বরূপা সদৃশ। পূর্ববর্তী প্রপাঠকে (২কাণ্ডের ২য় প্রাপঠকের ৬ষ্ঠ অনুবাক ইত্যাদি দ্রষ্টব্য) যেমন একটি পুরোডাশের উপরিভাগে অপর পুবোডাশ স্থাপনের বিধি দেখান হয়েছে, সেইরকম উষ্ণিক ছন্দযুক্ত ঋকে (উষ্ণিকছস্কায়ামৃচি) গায়ত্রী ছন্দের অক্ষরসংখ্যার অধিক চারটি অক্ষর স্থাপিত বলে অবগত হতে হবে (যত্তদবগন্তব্য। বিকল্পে ত্রিষ্টুভের আবরণে (দ্বারা) সামিধেনী সমাপন কর্তব্য। ত্রিষ্ঠুভ (বা ত্রিষ্টুপ) ইন্দ্রিয়-সামর্থ্যে প্রতিষ্ঠাপিত, সেইজন্য তাতে যজ্ঞের বিনাশ হয় না (ন নাশয়তি)। এই ঋকে যেমন ত্রি শব্দ আছে (তৃতীয় কাণ্ডের দ্বিতীয় প্রপাঠকে ব্যাখ্যাত), ত্রৈধাতবীয় কর্মেও তেমন ত্রি শব্দ থাকায় উভয়ের (অর্থাৎ ত্রিষ্টু ছন্দ ও ত্রৈধাতবীয় যজ্ঞের) সারূপ্য (সমরূপতা) আছে। সকল যজ্ঞে যে ছন্দসমূহ প্রয়োগ করা হয়, সেইগুলি সবই এই উষ্ণিক ও ককুদের দ্বারা উক্ত (বা রচিত)। যেমন জ্যোতিষ্ঠোম ইত্যাদি যজ্ঞ সমুহ সকল কামনার নিমিত্ত প্রযুক্ত হয়; সেইরকম সকল যজ্ঞের স্বরূপও সকল কামনার সাথে যুক্ত।
বিশেষতঃ আভিচারিক ক্রিয়ায় এই ত্রৈধাতবীয় যজ্ঞের বিধি আছে। আবার অভিচার পরিহারের নিমিত্তও এই ত্ৰৈধাতবীয় যজ্ঞের বিধি আছে। যিনি সহস্র দক্ষিণার দ্বারা যাগানুষ্ঠানে সমর্থ, তিনি এই অভিলাষ নিয়ে যাগানুষ্ঠান করলে পরে বহুরক ভাবে সহস্র দান করতে সমর্থ হন (শক্তো ভবত্যেব)। (অর্থাৎ) তার পর সেইরকম কর্মানুষ্ঠান সিদ্ধ হয় (তাদৃশকর্মানুষ্ঠানং সিধ্যতি)। (অনন্তর সহস্রদক্ষিণা দানের দ্বারা যায়ানুষ্ঠানে বহুবিধ যজ্ঞসাধন দ্রব্যের বিধি কথিত হচ্ছে)–যে পুরুষ (বা মনুষ্য) গো-সহস্র দান পূর্বক যাগে অভিলাষী হন, তার এই পশুসমূহ শেষ হয়ে যায়; সুতরাং তার পর তিনি আর যজ্ঞানুষ্ঠানে অসমর্থ হন। প্রজাপতি হলেন পশুগণের স্রষ্টা, সেই কারণে প্রথমে পশুকামনায় প্রজাপতির উদ্দেশে যাগানুষ্ঠানের দ্বারা পশু লাভ পূর্বক যজমান পরবর্তী গো-সহস্র যাগে সমর্থ হন। দেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠানের সঙ্কল্প করেও যিনি তা সাধন করেন না, সেই সঙ্কল্প-ভ্রষ্ট ব্যক্তি এই ত্রৈধাতবীয় যজ্ঞানুষ্ঠান করলে সেই দোষ নষ্ট হয় এবং দেবতার দ্রোহ হয় না, অর্থাৎ দেবতা হতে বিচ্ছেদ ঘটে না। (এই যজ্ঞকর্মের দ্রব্যবিধি)–এই যজ্ঞে চার কপালে করে তিন বারে মোট দ্বাদশ কপাল পুরোডাশ প্রদান করতে হয় এবং তার ফলে সমৃদ্ধি লাভ করা যায়। তিনবারে পুরোডাশ অর্পণের দ্বারা যজমান উত্তরোত্তর তিনটি লোক, অর্থাৎ ভূলোক, অন্তরীক্ষলোক ও স্বর্গলোকের অধিকার প্রাপ্ত হন। ভূলোকবর্তী মনুষ্যগণ স্বর্গলোকবর্তী সূর্য চন্দ্র ইত্যাদিকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি (বা দর্শন) করতে পারে, কিন্তু অন্তরীক্ষবর্তী যক্ষ গন্ধর্ব ইত্যাদি দেবযোনিগণ তা দর্শন করতে পারেন না। যব (শস্যবিশেষ) হলে অন্তরীক্ষলোকের স্বরূপ (অন্তরিক্ষরূপত্বম), সুতরাং যবের দ্বারা যাগানুষ্ঠান করলে তাতে সমৃদ্ধি সম্পাদিত হয়। ত্রৈধাতবীয় যজ্ঞে পুরোডাশ নির্বপণের শেষে যে দক্ষিণা দানের বিধি আছে, তা তিন প্রকার, যথা–হিরণ্য, ঘৃতাক্ত বস্ত্র (ঘৃতের দ্বারা লেপিত বস্ত্র) ও ধেনু। এর মধ্যে হিরণ্য দানের দ্বারা তেজঃপ্রাপ্ত হওয়া যায়, ঘৃতাক্তবস্ত্র দানের দ্বারা পশুপ্রাপ্তি ঘটে; এবং ধেনু দানের দ্বারা কামধেনুর নিকট হতে প্রাপ্ত সর্বকামনার সিদ্ধিস্বরূপ আশিস প্রাপ্তি হয় (অর্থাৎ সর্বকামনার পূর্তি হয়)। (সুতরাং) উক্ত দ্রব্য তিনটি দক্ষিণস্বরূপ দানের দ্বারা উপরের বর্ণনানুসারে ফলপ্রাপ্তি হয় (উক্তদ্রব্যত্রয়-দানেনোক্তাম্বর্ণ প্রাপ্নোতি) ॥১১।
[সায়ণাচার্য বলেন-অর্থ দ্বাদশে তস্য দ্রব্যস্যেন্দ্রাবিষুদেবতাকত্বং সহস্রদক্ষিণাং চ বিধাস্যন্নাদৌ কৰ্মনামি ত্রিধাতুত্বসম্পাদনা-য়োপাখ্যানং দর্শয়তি। অর্থাৎ-পূর্ববর্তী অনুবাকে যে ত্রৈধাতবীয় যজ্ঞের কথা উক্ত হয়েছে, এই অনুবাক-২৪ ে সেই যাগ সম্পর্কিত দেবতার উপাখ্যান, সহস্র দক্ষিণা-বিধি ইত্যাদি কথিত হয়েছে।]
[সায়ণাচার্য বলেন–তত্র দ্বিতীয়ানুবাকে পৌর্ণমাসীগতমগ্নীযোমীয়পুরোশং বিধিৎসুস্তদুপোদ্যাতত্বেন প্রথমানুবাকে কাঞ্চিদাখ্যায়িকামাহ। অর্থাৎ-পরবর্তী অনুবাকে পৌর্ণমাসীগত অগ্নি ও সোমের উদ্দেশে পুরোডাশ নির্বপণের বিষয় বর্ণিত হয়েছে, এই অনুবাকে সেই সম্পর্কে ইন্দ্র কর্তৃক বিশ্বরূপ বধের এক উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে]
মর্মার্থ- বিশ্বরূপ ছিলেন ত্বষ্টার পুত্র। তিনি দেবগণের পুরোহিত ছিলেন এবং সম্পর্কে ছিলেন অসুরদের ভাগিনেয়। তিনটি মস্তকধারী সেই বিশ্বরূপ সত্ত্বিক মুখের দ্বারা সোমপান করতেন, তামসিক মুখে দ্বারা সুরাপান করতেন এবং রাজসিক মুখটির দ্বারা অন্ন গ্রহণ করতেন। তিনি দেবতাগণের উদ্দেশে প্রত্যক্ষভাবে হবির ভাগ প্রদান করতে বলতেন এবং অসুরগণকে পরোক্ষভাবে হবির ভাগ প্রদানের নির্দেশ দিতেন। ভুবনলোকে প্রত্যক্ষ অপেক্ষা পরোক্ষবাদে অর্থাৎ রহস্যময়তার কারণে লোকে অধিক আকৃষ্ট বা বিশ্বাসী হয়ে থাকে। ইন্দ্রদেব এই বৃত্তান্ত শ্রবণ পূর্বক ভীত হয়েছিলেন, কারণ এর ফলে রাষ্ট্রে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা। এই নিমিত্ত ইন্দ্রদেব তার বজ্রের দ্বারা বিশ্বরূপের মস্তক ছেদন করলেন। এই ছিন্ন মস্তক তিনটি হতে তিনটি পক্ষীর উদ্ভব হলো; যথা– সোমপানকারী মুখ হতে কপিঞ্জল (চাতক) পক্ষী, সুরাপানকারী মুখ হতে কলবিঙ্ক (চড়ুই) এবং অনুগ্রহণকারী মুখ হতে তিত্তির পক্ষী। এই অসুরবধজনিত ব্ৰহ্মহত্যা ইন্দ্র তাঁর অঞ্জলির দ্বারা গ্রহণ করলেন, কিন্তু আত্মতত্ত্ব-জ্ঞানের জন্য পাপ তাকে স্পর্শ করল না; কিন্তু লোকে তাকে ব্রহ্মহত্যাকারী বলে অপবাদ প্রদান করতে লাগল। অতঃপর এই জনাপবাদ পরিহারের নিমিত্ত ইন্দ্র তার পাপকে তিন ভাগে বিভক্ত করে পৃথিবীর নিকট গমন পূর্বক বললেন, আমার ব্রহ্মহত্যাজনিত পাপের তৃতীয় ভাগ গ্রহণ করো। পৃথিবী বললেন, আমার ভূমি খননজনিত খাত যাতে পূর্ণ হয়, তেমন করুন, তাহলে আমি আপনার পাপের তৃতীয় ভাগ গ্রহণ করতে পারি। ইন্দ্র বললেন, সম্বৎসরের মধ্যে তোমার খাত পূর্ণ হবে। এই বর প্রাপ্ত হয়ে পৃথিবী সেই ব্রহ্মহত্যাজনিত পাপের তৃতীয় অংশ গ্রহণ করলেন। স্বতঃসিদ্ধ উষরক্ষেত্র হলো সেই ব্রহ্মহত্যা পাপের স্বরূপ, যেস্থানে শ্রাদ্ধদেব অগ্নি কখনও অবস্থান করেন না (কদাচিদপি ন তিষ্ঠেৎ)। অর্থাৎ সেই স্থানে দেবতাগণের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান হয় না। অতঃপর ইন্দ্র তার পাপের অপর তৃতীয় ভাগের নিমিত্ত বনস্পতিকে (বৃক্ষকে) বললেন, তুমি আমার পাপের একতৃতীয়াংশ গ্রহণ করো। বৃক্ষ বলল, আমার ত্বক ইত্যাদি ছিন্ন হলে যে খাত সৃষ্টি হয়, আপনি তা পূরণ করলে আমি আপনার পাপভাগ গ্রহণ করতে পারি। ইন্দ্র তাকে তার মনোমতো বর প্রদান করলে সে ব্রহ্মহত্যা পাপের তৃতীয় অংশ গ্রহণ করল। বৃক্ষের ত্বক ইত্যাদি ছিন্ন হলে সেখানে যে লোহিত বর্ণ দেখা যায়, সেই স্থান হতে নিঃসৃত নির্যাসই (রস বা আঠাই) ব্রহ্মহত্যা পাপের স্বরূপ; তা ভোজ্য (ভক্ষণীয়) নয় (ন ভোজ্যং ভবতি)। এরপর ইন্দ্র তার পাপের অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশের নিমিত্ত স্ত্রীলোকগণকে বললে তারা তাকে বললেন, গর্ভের উপদ্রব ব্যতিরেকে যদি আমরা পুরুষসঙ্গ লাভ করতে পারি, তাহলে আমরা আপনার পাপ গ্রহণে সম্মত আছি। ইন্দ্র সেইমতো বর প্রদান করলে তাঁরা সেই অবশিষ্ট পাপ গ্রহণ করলেন। রজঃস্বলা অবস্থায় স্ত্রীলোকবর্গের শরীরে কধুকবৎ (খোলসের ন্যায়) সেই ব্রহ্মহত্যা পাপ লিপ্ত হয়ে থাকে, সেই কালে তাদের সাথে সম্ভাষণ অকর্তব্য। সেই কালে তাঁদের সাথে গৃহবাসও অকর্তব্য।
সেই কালে স্ত্রীগণ আপন অঙ্গে তৈল ইত্যাদি লেপন করেন না, কিংবা শরীরে শৃঙ্গারের উপযোগী কোন অভঞ্জন হতে বিরত থাকেন। সেই কালে তাদের সৃষ্ট অন্ন ইত্যাদিও কেউ ভোজন করেন। প্রসঙ্গক্রমে রজঃস্বলা নারীর ব্রত কথিত হচ্ছে–যে মলবৎ বাসযুক্ত (রজঃ-আপ্লত বসনযুক্ত) নারীর সাথে সম্ভাষণ করবে, সে মিথ্যা অপবাদের দ্বারা অভিশপ্ত হয়, সভাস্থলে লজ্জিত বা পরাঙ্মুখী হয়, মরণশীল হয় (অর্থাৎ অল্পায়ু হয়), কুষ্ঠরোগাক্রান্ত হয়। সেই অবস্থায় (অর্থাৎ রজঃস্বলা-কালে) যে নারী ভিত্তি (দেওয়ালে) ইত্যাদি স্থানে চিত্র ইত্যাদি অঙ্কন করে, সে কেশশূন্যা, দুর্মরণযুক্তা, কুণ্ঠিতাক্ষী (কাণা) ও মলিন দন্তশালিনী হয়। এইকালে যে নারী তৃণ ইত্যাদি ছেদন করে, সে কুনখযুক্তা হয়, যে রঙ্কু প্রস্তুত করে সে উদ্বন্ধনে (গলায় দড়ি দ্বারা) মৃত্যুপ্রাপ্ত হয়, যে পর্ণে (পাতার ঠোঙায়) পান করে সে উন্মাদ হয় ও যে বহ্নিপ (আগুনে পোড়া) শরাব (সরা, মাটির পাত্র) ইত্যাদিতে পান করে সে খর্ব (বামন) হয়। ঐসব উক্ত দোষাবলি পরিহারের নিমিত্ত সম্ভবপর ইত্যাদি বর্জনরূপ নিয়মসমূহ আচরণ করা কর্তব্য (সম্ভবাদিবর্জনরূপং নিয়মমাচরেৎ)। তিন রাত্রি এই ব্রত আচরণের দ্বারা সন্তানের রক্ষা হয় (প্রজায়া রক্ষাণার্থং ভবতি) ॥১॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অর্থ দ্বিতীয়ানুবাকেহগ্নিযোমীয় পুরোডাশং বিধিৎসুবাদৌ তস্যোপোদঘাতস্য বিধুপযোগং দর্শয়তি। অর্থাৎ অনুবাক-২৪ ে পূর্ণিমা তিথিতে যে অগ্নি-সোমীয় পুরোডাশের প্রস্তাবনায় বৃত্রবধের উপাখ্যান বর্ণনা করা হয়েছে, এই অনুবাকে সেই যাগের কথা বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ—পুত্র হত হওয়ায় ত্বষ্টা ইন্দ্রহীন সোম্যগ অনুষ্ঠিত করতে আরম্ভ করলেন। ইন্দ্র এই যজ্ঞে উপস্থিত হয়ে সোমাহুতি প্রার্থনা করলে ত্বষ্টা পুত্রহত্যার কারণে তাকে আহুতি প্রদান করেন নি। ইন্দ্র বলপ্রয়োগ পূর্বক সোম পান করলেন। ত্বষ্টা তখন অবশিষ্ট সোম গ্রহণ করে স্বাহেন্দ্রোশত্ৰুবর্ধস্ব (ইন্দ্রের শত্রু বর্ধিত হোক)–এই মন্ত্রে অগ্নির উদ্দেশে আহুতি প্রদান করলেন। কিন্তু ষষ্ঠীসমাসের স্থলে বহুব্রীহিস্বর উচ্চারিত হওয়ায় (অর্থাৎ উচ্চারণের পার্থক্যে) ইন্দ্র যার ঘাতক এমন অর্থ প্রকটিত হওয়ায় তা হতে এক পুরুষের উদ্ভব হলো। সে জাতমাত্রই অগ্নিদেব ও সোমদেবকে আপন দন্তপংক্তিতে গ্রহণ পূর্বক প্রতিদিন ইষুপাতন স্থান পর্যন্ত বর্ধিত হতে লাগল। এইভাবে তার অবয়বে সকল দিক অন্ধকারবৎ আচ্ছান্ন হলে সে যথার্থ বৃত্র নামে অভিহিত হলো। (বৃত্র শব্দের অর্থ অন্ধকার)। এর ফলে ইন্দ্রদেব ভীতিগ্রস্ত হয়ে প্রজাপতির নিকট গমন করে তাকে বললেন,মম কিশ্চৎ শত্ৰুৰ্জাত (আমার কোনও শত্রু জন্মগ্রহণ করেছে)। প্রজাপতি তখন ইন্দ্রদেবের বজ্রটিকে অভিমন্ত্রিত করে (কুতাভিমন্ত্রিতজলেন…) বৃত্ৰবধের নিমিত্ত গমন করতে বলেন। ইন্দ্র বৃত্রবধে উদ্যত হলে অগ্নিদেব ও সোমদেব বলে উঠলেন,হে ইন্দ্র! আপনি বৃত্রকে প্রহার করবেন না, আমরা উভয়ে এর মুখে অবস্থিত আছি। সেই কথা জ্ঞাত হয়ে সেই ইন্দ্রদেব বললেন, যুবাং মম স্থা বৈ খল্বিতি তস্মাম্মামভ্যেতং মামভিলক্ষ্যাগচ্ছতম্ (আপনারা তো আমার ছিলেন, অতএব আমার অভিলক্ষ্যে আগত হোন)। তারা ইন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সকাশে গমন করলে আমাদের কি ভাগ প্রদান করবেন? (কিং ভাগধেয়মিতি পপ্রচ্ছতুঃ)। ইন্দ্র পূর্ণমাসীতে নির্বপণীয় পুরোডাশ তাদের ভাগধেয়স্বরূপ প্রদান করেন। এই কারণে পূর্ণিমা তিথিতে অগ্নি ও সোমের উদ্দেশে একাদশ কপাল পুরোডাশ নির্বপণ করতে হয়। তারপর অগ্নি ও সোমদেব বললেন, আমরা বৃত্রের মুখে দন্তপংক্তির দ্বারা সম্যকরকমে বদ্ধ হয়ে থাকার নিমিত্ত নিষ্ক্রান্ত হতে পারছি না। এর প্রতিকারের নিমিত্ত ইন্দ্রদেব শীতজ্বর ও সন্তাপ সৃষ্টি করলেন। (যাঁরা শীতজ্বর ও সন্তাপের এই জন্মকথা জ্ঞাত হন, তাঁরা শীতে ও তাপে মারা যান না)। অতঃপর ইন্দ্রদেব অস্ত্রসদৃশ শীতজ্বর ও সন্তাপকে বৃত্রের অভিলক্ষ্যে নিক্ষেপ করলেন। এর ফলে বৃত্র মুখ বিদারণ করলে অগ্নিদেব ও সোমদেব বিনির্গত হলেন। অগ্নিদেব ও সোমদেবের নিষ্ক্রমণ হলে প্রাণ ও অপান বৃত্রকে ত্যাগ করল। তখন হতে প্রাণ ও অপান যথাক্রমে দক্ষ ও ক্রতু এই দুই নামে অভিহিত হলো। এই কারণে যজ্ঞ সম্পাদন কালে যজমান মুখ বিদারণ করলে আমাতে দক্ষত্ৰুতু ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করেন (ময়ি দক্ষত ইতি মন্ত্রং ক্ৰয়াৎ); সেই মন্ত্রপাঠে প্রাণ ও অপান তার আত্মায় স্থির হয়ে থাকে (স্থিরৌ ধারিতবান্ ভবতি); এবং অপমৃত্যু পরিহার পূর্বক দীর্ঘ আয়ু (সর্বমায়ুঃ) প্রাপ্ত হন। ইন্দ্রদেব অগ্নি সোম প্রমুখ সর্ব দেবতাকে বৃত্রের মুখ হতে নিঃসারিত করে বৃত্ৰহননের হেতু ভূত পূর্ণমাসীতে আজ্যভাগদ্ৰব্যরূপ হবিঃ নির্বপণ করলেন। এই লোকেও বৃত্রের আবরণাত্মক অন্ধকারের অবস্থিত শত্রুকে পূর্ণিমাদিনে জ্যোৎস্নায় বিনাশ করে থাকে। অমাবস্যায় জ্যোৎস্নার অভাবে অন্ধকার সর্বতো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এই নিমিত্ত বৃত্রহনন শব্দযুক্ত (শব্দলাঞ্ছিতে) ঋক মন্ত্রের সাথে (পুরোনুবাক্যে), আজ্যভাগ পূর্ণিমায় নির্বপণ করতে হয় এবং বৃধিধাতুযুক্ত (অর্থাৎ বৃধ শব্দযুক্ত) ঋকের সাথে অমাবস্যায় পুরোনুবাক্যে হবিঃ নির্বপণ করতে হয়। এর পরে বৃত্রহনন হেতুভূত আজ্যভাগরূপ হবিঃ নির্বপণ সম্পূর্ণ করে ইন্দ্রদেব পুনরায় বজ্র গ্রহণ পূর্বক বৃত্রের অভিমুখে আগত হলেন। তখন দ্যাবাপৃথিবী ইন্দ্রদেবকে বললেন, এই বৃত্র ভূমি হতে আরম্ভ করে দ্যুলোক পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়ে আছে, অতএব একে প্রহার করবেন না। (কারণ তাহলে সব কিছুই বিনষ্ট হয়ে যাবে)। ইন্দ্রদেব এই অনুরোধ স্বীকার না করে প্রহারে উদ্যত হলে ভূমি (পৃথিবী) ও দুলোক (স্বর্গ) তার নিকট বর প্রার্থনা করলেন। সেই অনুসারে দ্যুলোক বর প্রাপ্ত হলেন–আকাশে নক্ষত্ররূপে বিহিত অলঙ্কারে মণ্ডিত হয়ে থাকবেন এবং পৃথিবী বর প্রাপ্ত হলেন–মনুষ্য, পশু, বৃক্ষ, পর্বত (নগ), নদী, সমুদ্র ইত্যাদি বিচিত্র (বিহিত) অলঙ্কারে মণ্ডিত হয়ে থাকবেন। ইন্দ্র কর্তৃক প্রদত্ত বরের প্রভাবে তারা তেমনই হলেন। এই বর সম্পর্কে যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁরাও আপন আপন বর লাভ করে থাকেন। অতঃপর দ্যাবাপৃথিবীর অনুজ্ঞাক্রমে ইন্দ্রদেব বৃত্রকে নিহত করলেন।
বৃত্রবধের পরে ইন্দ্র সহ পার্শ্ববর্তী সর্ব দেবতা অগ্নিদেব ও সোমদেবকে উদ্দেশ করে বললেন, আপনারা আমাদের নিমিত্ত হব্য বহন করুন (হব্যমস্মদর্থে বহতম)। তারা বললেন,বৃত্র দীর্ঘকাল (চিরং) দন্তে ধারণ করায় (দংশনের কারণে) আমাদের তেজঃ অপগত হয়ে গেছে, সেই সামর্থ্য এখন বৃত্রে স্থিত হয়েছে। সুতরাং বৃত্রের নিকট হতে সেই তেজঃ কে আনয়নে সমর্থ,পরস্পর সেই চিন্তা পূর্বক তারা (অর্থাৎ দেবগণ) স্থির করলেন, বুদ্ধিমন্ত গাভী (গোঃ) সকলের মিত্র, অতএব সেই গাভীই গমন করুক এবং বৃত্রের নিকট হতে তেজঃ আনয়ন করুক। গাভী উৎকোচস্বরূপ বর প্রার্থনা করল, আমাতে যদি সেই তেজঃকে প্রদান করো, (অর্থাৎ সেই তেজঃ যদি আমাতেই স্থিত হবার বর প্রদান করো), তাহলে আমি সেই তেজঃ আনয়ন করব এবং তোমরা তা ভক্ষণ করতে পারবে। গাভী এই বর যথাযথ প্রাপ্ত হয়ে সেই তেজঃ আনয়ন করেছিল (এবং তা গাভীতেই নিরন্তর স্থিত হয়েছিল)। সেই নিমিত্ত এই লোকে গাভীর তেজঃরূপ ঘৃত ও দুগ্ধে সকলের ভোজন নিষ্পন্ন হয়। ঘৃত হলো অগ্নির তেজঃ ও দুগ্ধ হলো সোমের তেজঃ। যাঁরা এই তথ্য অবগত হন, তারা তেজস্বী হয়ে থাকেন (তেজস্বী ভবতি)। ব্রহ্মবাদী ব্যক্তিগণ বলে থাকেন–পৌর্ণমাসী যজ্ঞের দেবতা হলেন প্রজাপতি; তিনি তার আপন জ্যেষ্ঠ পুত্র ইন্দ্রকে পৌর্ণমাস যজ্ঞের কর্মের দ্বারা নিঃশেষে বিত্ত দান পূর্বক স্থিত করেছেন। যেমন প্রজাপতি যজ্ঞ সৃষ্টি করেছেন (যথা প্রজাপতির্যজ্ঞান সসৰ্জ) তেমনই ইন্দ্রদেবও বৃত্র হতে (অগ্নি ও সোমদেবকে) নিঃসৃত করে তাদের পুরোডাশ দান করেছেন, এইটাই প্রজাপতি ও ইন্দ্রদেবের সম্বন্ধ (প্রজাপতেরিরেন্দদরস্যাপি সম্বন্ধঃ)। যেভাবে প্রজাপতি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইন্দ্রকে ধন প্রদান করেছিলেন, এই লোকেও মনুষ্যগণ সেইভাবেই তার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে নিঃশেষে ধন প্রদান করে যান (ধনেন যুক্তো যথা প্রাপ্নোতি তথা কুন্তী) ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন-তৃতীয়েহমাবা্যায়াং সান্নায্যযাগো বক্তব্যঃ। অর্থাৎ এই অনুবাক-২৪ ে অমাবস্যা তিথিতে অনুষ্ঠেয় সান্নায্য যাগের বিষয় কথিত হয়েছে। ]
মর্মার্থ- পূর্ণিমা তিথিতে বৈধ যাগ সম্বন্ধে বলা হচ্ছে। ইন্দ্রদেব বৃত্রকে বধ করলে বৃত্রের পক্ষপাতী শত্রুবর্গ সমাগত হয়ে প্রকর্ষের সাথে ইন্দ্রকে ভীত ও কম্পিত করে তুলেছিল (ভয়মুৎপাদ্যাকম্পয়ন্ত)। যিনি শত্রুকে বিনাশ করেন তিনি বিমৃৎ নামে অভিহিত হন; তাঁর যিনি দেবতা তিনি বৈমৃধ; এই বৈমৃধ যাগে (অর্থাৎ বিমৃৎ-এর দেবতার উদ্দেশে) একাদশ কপাল পুরোড়াশ পূর্ণমাস যাগের প্রধান কর্মানুষ্ঠানের পরে নির্বপণ করতে হয় (পশ্চান্নির্বাপযোগ্য মপশ্যৎ)। যে যজমান এইরকম করেন, তিনি কখনও বিনাশপ্রাপ্ত হন না। ইন্দ্রদেব বৃত্রবধের নিমিত্ত ভীত হয়ে দূরে পলায়ন করার ফলে তার আপন সামর্থ্যরূপ দেববর্গের নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন (বিযুক্তোহভূৎ)। তখন অগ্নিদেবের উদ্দেশে অমাবস্যায় অষ্টকপাল পুরোডাশ নির্বপণ করে ও ইন্দ্রের উদ্দেশে দধি অর্পণ করে পুনরায় দেববর্গের সাথে তিনি (ইন্দ্রদেব) সংযুক্ত হন। এইভাবে অগ্নিদেবতার উদ্দেশে অষ্টকপাল হবিঃ ও ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে দধি নির্বপণ করে সান্নায্য যাগ নিষ্পন্ন করলে যজমান তার অপহৃত সামর্থ্য পুনরায় লাভ করেন। বৃঘাতী ইন্দ্রদেব পৃথিবীর নিকট হতে দুই রকমে বীর্য বা সামর্থ্য লাভ করেন। তাঁর ইন্দ্রিয়সামর্থ্য ওষধি ও লতাগুল্মে অবস্থিত–এই কথা ইন্দ্র প্রজাপতিকে বলেছিলেন (প্রজাপতেরগ্রে কথিতবা)। প্রজাপতি ইন্দ্রের এই ইন্দ্রিয়সামর্থ্য আনয়নের নিমিত্ত পশুদের আদেশ করলেন। পশুগণ ইন্দ্রে নিমিত্ত সেই সামর্থ্য ওষধি ও লতাগুল্মের নিকট হতে আনয়ন করে আপন শরীরে সম্যক স্থাপন করল এবং তারপর দুগ্ধ ইত্যাদি রূপে তা ইন্দ্রকে প্রদান করল। পশুগণ কর্তৃক আনীত ও সম্পাদিত হওয়ার নিমিত্ত এর নাম হয় সান্নার্য (সান্নায্যনাম ভবতি); ইন্দ্রের প্রতি (অর্থাৎ উদ্দেশ্যে) প্রতিদিন (প্রতিধুষঃ) দোহন করার (দুহ্যমানস্য) নিমিত্ত তার নাম হয় প্রতিষ্ঠুক। অতঃপর ইন্দ্রদেব প্রজাপতিকে জ্ঞাত করলেন, আপনার আদেশে পশুগণ কর্তৃক আনীত ক্ষীররূপ সামর্থ্য পাকাভাবের কারণে অর্থাৎ হজমশক্তির অভাবে আমার উদরে জীর্ণ হচ্ছে না। অতঃপর প্রজাপতি পশুগণের প্রতি তা পাক করে দিতে বললেন। সেই মতো করা হলে ইন্দ্রিয় সামর্থ্য দুগ্ধ ইত্যাদি পক্ক বা পরিণত (অর্থাৎ হজমের উপযোগী) অবস্থায় ইন্দ্রদেবের উদরে সম্যভাবে আশ্রিত হলো। পাক করা হয়েছে বলে এর নাম হয় শৃত (শৃতমিতি নাম নিষ্পন্ন)। ঐ ক্ষীররূপ সামর্থ্য আনয়নকৃত হলেও, দুগ্ধরূপে দোহনকৃত হলেও, অগ্নিস্পর্শে জ্বলিত (জ্বাল দেওয়া) হলেও তা ইন্দ্রের প্রীতিসম্পাদক হলো না। তখন প্রজাপতি সেই ক্ষীরকে দধি করতে বললেন। সেই দধি ইন্দ্রের প্রীতিকারক হলো। এই ভাবে দধি নাম সম্পন্ন হলো এবং ইন্দ্রদেবকে দধি প্রদানের বিধি নির্ধারিত হয়েছে। ব্রহ্মবাদী ব্যক্তিগণ বলে থাকেন–যেহেতু পূর্বিদিনের রাত্রে দধি প্রস্তুত (পাততে) করতে হয়, সেই হেতু পুর্বে দধি প্রদান কর্তব্য। কিন্তু এর উত্তরস্বরূপ বলা হয়েছে, অগ্রে দধি দান উচিত হয় না, দুগ্ধই দান করা উচিত এমন করলে, যজমান ক্ষীররূপ ইন্দ্রিয়সামর্থ্য লাভ করেন এবং তারপরে দধি দ্বারা প্রীত হন। অগ্রে ক্ষীর (দুগ্ধ) ও পরে দধি প্রদান কর্তব্য–এটাই বিধি (ক্ষীরং পূর্বভাবি দধি পশ্চাদ্ভাবী…)। সোমবল্লীর লতাখণ্ড পূতিকা ও পলাশ বৃক্ষের অংশ পর্ণবল্কা–এই দুটির সাথে যুক্তকৃত দধি সোমদেবের প্রিয় হয়ে থাকে (সোমাদীনাং প্রিয়)। এইভাবে সুপরিণত বদর বা কুলের সাথে যুক্তকৃত (মিশ্রিত) দধি রাক্ষসগণের প্রিয় হয়, তণ্ডুলের সাথে যুক্তকৃত (মিশ্রিত) দধি বিশ্বদেববর্গের প্রিয় হয়, দধ্য বা দম্বলের সাথে বিমিশ্রিত দধি (অর্থাৎ ঘোল) মনুষ্যগণের প্রিয় হয় এবং (শুদ্ধ অর্থাৎ কোনকিছুর সাথে অযুক্ত) দধি ইন্দ্রদেবের প্রিয় হয়। সেই কারণে ইন্দ্রদেবের প্রীতির নিমিত্ত দধি প্রদান করতে হয় (ইন্দ্রপ্রীত্যৈ দর্ধাহতঞ্চ্যাৎ)। দ্যাগের অগ্নিহোত্রের সাথে যাতে বিচ্ছেদ না ঘটে, সেই নিমিত্ত দধি প্রদান কর্তব্য। ইন্দ্রদেব বৃত্রকে বধ করায় অসুরগণের নিকট অপরাধ করেছেন, এমন ধারণা করে দূরে পলায়ন করেছিলেন। দেবগণ ইন্দ্রের প্রতি আহ্বান করতে ইচ্ছা করেছিলেন। প্রজাপতি উক্তি করেছিলেন যে, দেববর্গের মধ্যে যিনি প্রথমে ইন্দ্রকে প্রাপ্ত হবেন তাঁকে যজ্ঞীয় হবির প্রথম ভাগ প্রদান করা হবে। দেখা গেল, ইন্দ্রের প্রথম সন্ধান পেলেন পিতৃগণ; এই নিমিত্ত দর্শর্যাগের পূর্বদিনে পিতৃগণের উদ্দেশে পিণ্ডপিতৃযজ্ঞের অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে। দর্শর্যাগ দেবগণের অমাবস্যায় আরম্ভ এবং প্রতিপদে তার যাগ। কিন্তু পিতৃগণের উদ্দেশে পিণ্ডদান অমাবস্যায় করতে হয়। পিতৃগণ পলায়িত ইন্দ্রদেবকে অন্বেষণ করে অমাবস্যায় তাকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং ইন্দ্রদেব সেই অমাবস্যাঁতেই প্রত্যাগত হয়েছিলেন। এর ফলে ইন্দ্রদেবকে সম্প্রপ্ত দেবগণ বলেছিলেন, অদ্য নোস্মাকং বসুং শ্রেষ্ঠং ধননমা বসতি সহ তিষ্ঠতি,.. অর্থাৎ অদ্য আমরা শ্রেষ্ঠ ধনের সাথে বসতি করছি।-ইন্দ্ৰ হলেন সব দেবগণের শ্রেষ্ঠ ধন। তিনি বর্তমান থাকলে দেবগণ প্রভুকে লাভ করেন (স্বামিলাভা)। সাথে বসতি করার ব্যুৎপত্তিগত অর্থে অমাবস্যা নামটি সম্পন্ন হয়েছে। অতঃপর পিতৃগণ কর্তৃক আনীয়মান ইন্দ্রের সম্মুখে সর্ব দেবতা সমাগত হলেন। ব্রহ্মবাদিগণ জানতে চাইলেন, কোন দেবতা সান্নায্য যাগের দেবতারূপে বৃত হবেন? এর উত্তরে কোন কোন জন বিশ্বদেবের পক্ষ গ্রহণ করলেন, অর্থাৎ বিশ্বদেবকেই সান্নায্য যাগের দেবতারূপে চিহ্নিত করলেন। পক্ষান্তের অপর জনেরা বললেন যে, ভীত হয়ে দূরদেশে গত ইন্দ্রদেবের ভয় নিবারণ করে দেবগণ এই স্থানে তাকে আনয়ন পূর্বক মিলিত হয়েছে, অতএব এই ইন্দ্রদেবই সান্নায্য যাগের দেবতা। এইজন্যই বুদ্ধিমানগণ সান্নায্য আগের দেবতারূপে ইন্দ্রকেই নির্দেশ করেন (তস্মাৎ সান্নায্যমৈন্দ্ৰমিত্যেব বুদ্ধিমান্ ক্ৰয়াৎ) ॥৩॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ চতুর্থে আগ্নাবৈষ্ণবাদয়ো বক্তব্যাঃ। অর্থাৎ–এই অনুবাকে অগ্নি ও বিষ্ণুর উদ্দেশে অনুষ্ঠেয় যাগের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- ব্রহ্মবাদী ব্যক্তিগণ বলে থাকেন, যিনি ইন্দ্রদেবের সাথে (অমাবস্যায়) দর্শযাগ ও (পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠেয়) পূর্ণমাস যাগ করেন, তিনিই দর্শপূর্ণমাসযাজী হয়ে থাকেন, অন্য কেউ নয় (ন বন্যঃ)। সেই দুটি যাগ ইন্দ্রসহ (অর্তাৎ ইন্দ্রকে যাগ-দেবতারূপে বরণ করে) বৈমৃধ ও সান্নায্য যাগের দ্বারা সম্পাদন করতে হয়। যাঁরা এই সম্পর্কে জ্ঞাত থাকেন, ইন্দ্রদেবের সাথে যাগানুষ্ঠানের ফলস্বরূপ তাদের উত্তরোত্তর ধনাধিক্য ঘটে থাকে। দেবতাগণের যজ্ঞানুষ্ঠান দর্শন করে তাদের অনুচর অসুরগণ সেইভাবেই যজ্ঞানুষ্ঠান করত। এর ফলে তারা দেবতাগণের সমান বিজয় লাভ করত। এইটি লক্ষ্য করে দেবগণ বঞ্চনা করবার নিমিত্ত একটি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। সেখানে অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেবের উদ্দেশে একাদশ কপাল পুরোডাশ ও সরস্বতীর উদ্দেশে চরু নির্বপণ করা হয়। সরস্বতীর চরু পৌৰ্ণমাসীতে সংস্থাপন করে দেবতাগণ বিজয়লাভ করলেন এবং অসুরগণ পরাভূত হলেন (অসুরাশ্চা পরাভূতাঃ)। যিনি শত্রুগণকে জয় করতে আকাঙ্ক্ষা করেন, তিনি পৌর্ণমাসীতে এই যজ্ঞানুষ্ঠান করবেন। পৌর্ণমাসীর এই প্রধান যজ্ঞে বজ্রপ্রহার হয়। অগ্নি সর্ব দেবতার স্বরূপ এবং বিষ্ণু যজ্ঞের স্বরূপ (অগ্নি সর্বা দেবতা বিষ্ণুৰ্যজ্ঞ), এই নিমিত্ত তাঁদের উদ্দেশে অনুষ্ঠিত যাগের ফলে শত্রুগণের দেবতা ও যজ্ঞ বিনাশপ্রাপ্ত হয়; এর দ্বারা (এতাবতা) শত্রুগণের যা কিছু তাকে তার সবই নাশপ্রাপ্ত হয়। শত্রুঘাতী এই যুগ পূর্ণিমা তিথিযগেই করণীয়; অমাবস্যা তিথিতে পিতৃযজ্ঞ পরিত্যক্ত হওয়ার নিমিত্ত, তাতে শত্রুর বিনাশ সাধিত হয় না। অতঃপর দর্শপূর্ণমাসের গুণবিকৃতিরূপ যাগের বিষয় কথিত হচ্ছে। পশুকামনায় সাম্প্রস্থায়ী যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। ব্রাহ্মণ কর্তৃক আহৃত দধিক্ষীরপূর্ণ চারটি কুম্ভ সহ অধ্বর্য হোমের স্থানে প্রস্থান করে থাকে যে যাগে, সেই যাগকে সাম্প্রখ্রীয় যুগ বলা হয় (সোহয়ং সাকন্দ্রস্থায়ীয়ো যাগস্তেন….)। সেই যাগে প্রভূত ক্ষীরদ্রব্যের দ্বারা পূর্ণ হবিঃ প্রদান করতে হয় (মহতা ক্ষীরদ্রব্যেণ পূর্ণং হবিহোতব্যম)।
এই লোকে যেমন রাজাকে অল্প কর প্রদান করলে রাজা তুষ্ট হন না, কিংবা সেই অল্প পরিমিত ধন আহরণ করে অপরকে স্বয়ং দান করতে পারেন না; আবার যেমন প্রভূত পরিমাণে ধন আহরণ করলে রাজা স্বয়ং তৃপ্ত হন, তেমনই অপরকে তা দানও করতে পারেন; সেই রকমই যজ্ঞে প্রভূত পরিমিত পূর্ণ দ্রব্যের দ্বারা হোম করলে ইন্দ্ৰং স্বয়ং তৃপ্তি লাভ করেন এবং হোমকারী যজমানকে পশুদান পূর্বক তৃপ্তিসম্পাদন করেন (তপয়তি)। এই যজ্ঞের আহুতিদ্রব্য দারুপাত্রে (কাষ্ঠনির্মিত আধারে) ধারণীয়, মৃন্ময় অর্থাৎ মাটির পাত্রে নয়। (প্রথম প্রপাঠকে ঔদুম্বরো যুপো ভবতি ইত্যাদি মন্ত্রে এই সম্পর্কে ব্যাখ্যাত হয়েছে)। এইবার অধিকারী ভেদে সান্নায্য যজ্ঞের দেবতাব্যবস্থা সম্পর্কে কথিত হচ্ছে (দেবতাব্যবস্থাং বিধত্তে)। ঋকু সাম ও যজুর্বেদে অভিজ্ঞ ব্যক্তি গ্রামাধ্যক্ষ ও রাজার পুত্র (রাজন্য) এই তিন জন শ্ৰী বা ঐশ্বর্যপ্রাপ্ত বলে প্রসিদ্ধ; এঁদের অনুষ্ঠিতব্য সান্নায্য যাগের দেবতা মহেন্দ্র (তেষামেব এয়াণাং মহেন্দ্রো দেবতা)। এঁরা ব্যতীত অপর যে পুরুষ আপন দেবতাকে অতিক্রম করে অপর দেবতার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করেন, এমন কি মহেন্দ্রের উদ্দেশেও যাগ করেন, তাহলে তাঁর স্বকীয় দেবতা হতে প্রচ্যুত হন এবং পরকীয় দেবতাকেও প্রাপ্ত হন না, অধিকন্তু সেই দেবতার অভিশাপে পাপী ও দরিদ্র হয়ে থাকেন (তদ্দেবতাশাপেন পাপীয়ারিশ্চ ভবতি)। যাঁরা গতশ্রী অর্থাৎ ঐশ্বর্যলাভে ব্যর্থ হয়েছেন, তারা সম্বৎসরব্যাপী ব্ৰতানুষ্ঠানের মাধ্যমে ইন্দ্রের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করবেন। তাতে তিনি ধনবান হতে পারবেন। সম্বৎসর অতিক্রান্ত হলে ব্রতপালনকারী যজমান অগ্নিদেবের উদ্দেশে অষ্টকপাল পুরোডাশ নির্বাপণ করবেন। এর ফলে ব্রতপতি অগ্নিদেব সেই যজমানকে মহেন্দ্রের উদ্দেশে অনুষ্ঠিত সান্নায্য যাগের ফল প্রদান করে থাকেন। তারপর যজমান তাঁর ইচ্ছামতো মহেন্দ্র বা ইন্দ্রের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠানে রত হতে পারবেন। গতশ্রী ব্যক্তির পক্ষে ইন্দ্র বা মহেন্দ্রের উদ্দেশে যাগ বিষয়ে এই বিধিই কথিত হলো (ইন্দ্রমহেন্দ্ৰয়োরৈচ্ছিকত্বং বিধত্তে) ॥৪॥
মর্মার্থ- সান্নায্য যাগের অধিকারী বিষয়ে কথিত হচ্ছে।–প্রথমে সোমযাগের অনুষ্ঠান কর্তব্য, তার পরে দর্শযাগী সান্নায্য যাগের অনুষ্ঠান করবেন; অর্থাৎ সোমযাগের পূর্বে দর্শর্যাগী সান্নায্য যাগের অনুষ্ঠান করবেন না (সোম যাগাৎ পুরা দর্শযাগী সান্নায্যং নানুতিষ্ঠেৎ)। যদি সোমগানুষ্ঠান না করে সান্নায্য যাগের অনুষ্ঠান করা হয়, তাহলে সেই অনুষ্ঠানকারী তস্কর (চোর) হয় ও মিথ্যাচারী বা অন্যায্যকৰ্মকারী হয়; এবং অগ্নিতে সিচ্যমান সেই সান্নায্য যাগ অন্যায্য বলে বিনাশ প্রাপ্ত হয়। অতএব সোম্যজীই (অর্থাৎ প্রথমে সোম যাগানুষ্ঠানকারী যজমানই) পরে সান্নায্য যাগ করবেন (তস্মাৎ সোম্যজ্যেব সন্নয়েৎ)। সোম ঔষধিসত্বের নিমিত্ত পয়োরূপ, সান্নায্য ও তথাবিধ; এই নিমিত্ত সোমযাগকারী যজমান সোমরূপ রসের দ্বারা সান্নায্যরূপ রস আপনাতে ধারণ করেন (আত্মনি ধারয়তি)। এ যজমানের যজ্ঞীয় হবিঃ রাত্রিকালে ফলীকৃত তণ্ডুল পর্যন্ত সম্পাদিত হয়, এবং তার পরে প্রতীক্ষমাণ চন্দ্রমা পূর্বদিকে অভদিত হয়, তবে চন্দ্রদেব এই যজমানের প্রজা (সন্তানসন্ততি) ও পশুগণের বর্ধন করেন। অতএব অভ্যুদয়ের নিমিত্ত তণ্ডুলকে সুষ্ঠুভাবে তিনভাগে বিভাজিত করতে হবে (ষ্ঠানিষ্ঠরূপৈস্ত্রিধা…বিভজেৎ)। বিভাজনের পরে মধ্যম ভাগ দাতা (দাত্রে) অগ্নিদেবের উদ্দেশে অষ্টাদশ কপাল পুরোডাশ নির্বপণ কর্তব্য, স্থলভাগ (স্থবিষ্ঠ) প্রদাতা ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে দধির চরু প্রদান কর্তব্য এবং কনিষ্ঠভাগ শিপিবিষ্ট বিষ্ণুর উদ্দেশে রন্ধিত (শৃতু) চরু নির্বপণ কর্তব্য। অর্থাৎ দাত্রাদিগুণযুক্ত অগ্নি ইত্যাদি দেবতাগণের উদ্দেশে হবিঃ প্রদান করবে (হবিঃ কুর্যাৎ)। যজ্ঞ হলো বিষ্ণুস্বরূপ এবং পশুগণের দ্বারা যজ্ঞ প্রতিষ্ঠিত হয়। দুটি পৌর্ণমাসী ও দুটি অমাবস্যা সম্বন্ধী যাগ কর্তব্য, এই রকম উক্তি যাঁরা করেন, তাদের উত্তরস্বরূপ বলা হয়–না, দুটি করে যাগের অনুষ্ঠান বিধিসম্মত নয়; কারণ পূর্বে অনুষ্ঠিতব্য পৌৰ্ণমাসীর যাগ যদি বর্তমানে (সম্প্রতি) করা হয়, তবে সম্যকভাবে অনুষ্ঠিত পরেরটি ব্যর্থ হয়; আর যদি পরে অনুষ্ঠিতব্য যাগটি বর্তমানে (সম্পতি) করা হয়, তবে সম্যক্ অনুষ্ঠিত পূর্বেরটির বৈয়র্থ ঘটে। দুইবার অনুষ্ঠিত হলে ইষ্টি হতে পারে না, কারণ ইষ্টিতে অধিক আবৃত্তি বিহিত নয় (ইষ্টাবধিকাবৃত্তেরবিহিতত্বাৎ); কিংবা অগ্নিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞও সম্ভব নয় কারণ অধিক প্রয়োগের কারণে তাতে প্রাতঃসবন ইত্যাদি হয় না। (প্রাতঃসবনাদীনামভাবাৎ)। অতএব উভয়ভ্রষ্ট (দুইটি যাগই বিনষ্ট) হওয়ার নিমিত্ত যজমান সভার মধ্যে লজ্জিত (খ্রীতমুখী) হন। তিনি সদুত্তর দিতে পারে না, প্রগলভ অর্থাৎ অসংকোচে কথাও বলতে পারেন না। অতএব সমৃদ্ধি কামনায় আবৃত্তি পরিত্যাগ পূর্বক একটি পৌর্ণমাসী ও একটি অমাবস্যা যাগ কর্তব্য। তাহলে সেই যজমানের পুত্রও সভার মধ্যে অসংকোচে কথা বলতে সক্ষম হন (প্রগলভো জায়তে), যজমান আর কি কথা (অর্থাৎ যজমান তো প্রগম্ভ হবেই)। পূর্বপক্ষ (অর্থাৎ দুটি দুটি যাগের নির্দেশকারী পক্ষীয়গণ) এই পক্ষের (অর্থাৎ একটি করে যাগের নির্দেশকারী পক্ষীয়গণের) বাক্যকে তাচ্ছল্য (অনাদর) করে বলছেন, না, দুটি দুটি যাগই সম্পন্ন করা কর্তব্য।
কারণ পূর্বের ইষ্টি সম্যক অনুষ্ঠিত হলে যজ্ঞের উপক্রম (যজ্ঞসুখরূপ) লব্ধ হয়, দেবতাগণের অবরোধ হয় ও দেবলোক জয়রূপ তিনটি প্রয়োজন সম্পাদিত হয় (প্রয়োজনত্রয়ং সম্পাদ্যতে)। পরের যাগটি অনুষ্ঠিত হলে প্রকৃত যজ্ঞের সম্পূর্তি, ইন্দ্রিয়াবরোধ (ইন্দ্রিয় সংযমের দ্বারা সামর্থ্য লাভ) ও মনুষ্যলোক জয় এই তিন প্রয়োজন সম্পাদিত হয়। তাহলে কোন একটিরও বৈরর্থ্য হয় না (নৈকস্য অপি বৈয়র্থম)। এই ক্ষেত্রে ইষ্টি ও যজ্ঞের অভাব ঘটে না, প্রত্যেকটি ইষ্টিই সমুহিতভাবে (একত্রিত হয়ে) প্রৌঢ়যজ্ঞ হয়ে ওঠে। এই অনুষ্ঠানের দ্বারা অনেক সত্ররূপ যজ্ঞ ও ক্রতু লব্ধ হয়। কিন্তু দ্বিতীয়াতে ইষ্টমন্ত (যাগানুষ্ঠাতা) যজমানের অভিলক্ষ্যে চন্দ্রমা পরে অভূদিত হয়; তাঁর এই ইষ্টিকে সুমনা নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে (তস্যেয়মিষ্টিনাম্না সুমনা ইত্যুচ্যতে)। বর্ধিষ্ণু চন্দ্রোদয় সৌমনস্যের (প্রসন্নতার) হেতুভূত। সেই নিমিত্ত এই লোকে তাঁর (অর্থাৎ যজমানের) সমৃদ্ধি বর্ধিত হয়। স্বর্গলোক প্রাপ্তির কামনায় দাক্ষায়ণ যজ্ঞের দ্বারা যাগ কর্তব্য। এই যজ্ঞের স্বরূপ সূত্রকার কর্তৃক স্পষ্টীকৃত হয়েছে। পূর্ববৎ দুটি পৌর্ণমাসী ও দুটি অমাবস্যা যাগের সাথে ইন্দ্রের উদ্দেশে দধি সমর্পণ কর্তব্য। এর দ্বারা পৌর্ণমাসীতে দেবগণের নিমিত্ত সোম অভিযুত হয়। সেই দেববর্গের পৌর্ণমাসী হতে আরম্ভ করে অমাবস্যা পর্যন্ত অর্ধমাস নিরন্তর সোম প্রকর্ষতা প্রাপ্ত হয়। এইবার অমাবস্যার পর বিহিত আমিক্ষার প্রশংসা প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত যাগে মিত্র ও বরুণদেবের উদ্দেশে যে আমিক্ষা (দুগ্ধবিকার বা ছানা) প্রদত্ত হয়, তা দেবগণের বশানুবন্ধ্যা সম্পাদিত করে। পূর্বদিন শুক্লপ্রতিপদে যাগ করার বিধি অনুসারে বেদি নির্মাণ করা হয়ে থাকে। যে দিনে বৎসগণকে মুক্ত করার যে বিধি, সেই অনুসারে দুটি মণ্ডপ নির্মাণ করা হয়ে থাকে (সদোহর্বিধানে ঘৌ মণ্ডপৌ সম্পাদিতবান্ ভবতি)। দ্বিতীয়া তিথির প্রাতঃকালে অগ্নির উদ্দেশে অষ্টকপাল পুরোডাশ নির্বাপণের দ্বারা যেমন যাগ সম্পাদিত হয়, সেইভাবে যজমান শুক্লপক্ষের অর্ধমাসব্যাপী দেববর্গের সাথে সহর্ষে সোমপান করে থাকেন। অতঃপর অমাবস্যার দ্বিতীয়ায় মিত্রদেব ও বরুণদেবের উদ্দেশে আমিক্ষা নির্বপণের দ্বারা যাগানুষ্ঠান কর্তব্য; এই নিমিত্ত এই আমিক্ষা যজমানের বশার (বন্ধ্যাগাভীর) কার্য করে (অর্থাৎ যজমান বন্ধ্যাগাভী দানের ফল প্রাপ্ত হন)। সোমযাগের অবসানে দেবগণের নিমিত্ত যে বশার কথা বলা হয়েছে, তা হলো এই আমিক্ষা (সৈবেয়মামিক্ষেত্যর্থঃ)। যে যজমান এই বিধিবাক্যে উক্ত অগ্নি ইত্যাদি দেবগণের নিমিত্ত সম্যভাবে যজ্ঞানুষ্ঠান করেন তিনি সাক্ষাৎ সেই অগ্নি ইত্যাদি দেবগণকে প্রাপ্ত হন (অর্থাৎ বহুকাল ব্যবধানেও দেবসদৃশ ভোগ প্রাপ্ত হয়ে থাকেন)। এই লোকে যেমন কোন ব্যক্তি রাজা অমাত্য ইত্যাদি শ্রেষ্ঠ পদে আরূঢ় হয়ে স্বকীয় ভৃত্যগণের দ্বারা আনীত তার ভোগসাধনের উপযোগী দ্রব্য পুনঃ পুনঃ কামনা করে, সেইরকম আবৃত্তজী (পুনঃ পুনঃ যাগকারী) যজমান পুনঃ পুনঃ ফলসম্পাদন করে থাকেন। যজ্ঞে যদি অন্য কোন রকম সামান্য বৈকল্য (অঙ্গহানি) ঘটে বা করা হয়ে যায়, তাহলে সেই যজমান পাপীয়া হয় এবং অপর যজমান অপেক্ষা অতি নিকৃষ্ট হন। যদি বৈকল্য না ঘটে, তবে তাদের (অন্য যজমানের) সমান হন, কিন্তু তাঁদের অপেক্ষা অধিক হন না (ন তু তেভ্য আধিক্যলক্ষণা সিধ্যতি)। অতএব তার নিবৃত্তির নিমিত্ত (অর্থাৎ নিকৃষ্ট বা সমান না হয়ে উৎকর্ষসম্পন্ন হওয়ার নিমিত্ত) কামনাকারী হলে এই দাক্ষায়ণ যজ্ঞের দ্বারা যাগ কর্তব্য। যেহেতু এই (যস্মদেষ) ক্ষুরের ন্যায় কিংবা বজ্রের মতো অতি তীক্ষ্ণ, সেই হেতু এর সম্যক অনুষ্ঠান-জনিত (তদনুষ্ঠায়ী তাজ) পুণ্য অর্জনের দ্বারা যজমান উত্তম স্থানাধিকারী হন, এবং বৈকল্যজনিত অপুণ্য হতে মুক্ত হন (বৈকল্যং প্ৰমীয়তে বা)। বৈকল্য পরিহারের নিমিত্ত পালনীয় ব্রতবিশেষের বিধি কথিত হচ্ছে।বস্ত্রশুদ্ধি সাধনের দ্বারা যজমান আপন পরিধেয়কে শুদ্ধ করে নেবেন, ক্ষার ব্যবহার করবেন না; যেহেতু পূজ্য দেববর্গ কোন মিথ্যা কথা বলেন না, সেই হেতু যজমানও মিথ্যা কথা বলবেন না; মাংস ভক্ষণ করবেন না; স্ত্রী-সংসর্গ পরিহার করবেন ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন–ষষ্ঠে দর্শপূর্ণমাসয়োঃ সোমযাগেন সহ পৌর্বাপর্যং বিধত্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২৪ে দর্শপূর্ণমাস যাগের সাথে সোম যাগের পৌর্বাপর্য বিধান করা হয়েছে।]
মর্মার্থ- দর্শপূর্ণমাস হলো দেবগণের রথসদৃশ (দেবানাং রথসদৃশঃ)। এই নিমিত্ত প্রথমতঃ দর্শপূর্ণমাস যাগ সম্পন্ন করে সোমযাগের অনুষ্ঠানে মহৎ সৌকর্য অর্থাৎ সুবিধা হয়ে থাকে। যেমন লোকে রথ সঞ্চরণের দ্বারা মহামার্গের (প্রশস্ত পথের) কণ্টক পাষাণ ইত্যাদি চূর্ণ হওয়ায় গ্রামের পথে বিচরণ সুখসাধ্য হয়, অর্থাৎ কন্টক ইত্যাদি না থাকায় মনুষ্যগণ অনায়াসে গমনাগমন করতে পারে, তেমনই দেবগণ-সম্বন্ধি দর্শপূর্ণমাসরূপ রথের দ্বারা সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ (বাধাহীন) পথে যজমান সুখে (বা সহজে) সোমের দ্বারা যাগ সম্পন্ন করতে পারেন। দর্শপূর্ণমাস হলো সম্বৎসরের অঙ্গস্বরূপ। মনুষ্যের যেমন হস্ত, পদ ইত্যাদি অঙ্গ (বা প্রত্যঙ্গ) ও মণিবন্ধ, কনুইয়ের জোড়, কক্ষ (বগল, ঝাঁকাল) ইত্যাদি দেহসন্ধিস্থলরূপ পর্বসমুহ থাকে, সেইরকম সম্বৎসরের দ্বাদশটি অঙ্গ অর্থাৎ দ্বাদশটি পৌর্ণমাসী (পূর্ণিমা) হলো পর্বসদৃশ। এই কথা বিদিত হয়ে দর্শপূর্ণমাসের যাগানুষ্ঠান করলে তার উভয়তঃ যাগের সম অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে (তদুভয়ং সম্যগনুষ্ঠাপয়তি)। দর্শ ও পূর্ণমাস হলো সম্বৎসরের দুটি চক্ষুস্বরূপ, এই কথা জ্ঞাত হয়ে যিনি যুগানুষ্ঠান করেন, তিনি স্বর্গলোক দর্শন করে থাকেন (সুবর্গং লোকমনু পশ্যতি)। এই হলো দেবগণের বিক্রমস্বরূপ, এই কথা বিদিত হয়ে যিনি দর্শপূর্ণমাসের যাগানুষ্ঠান করেন তিনি দেবগণসদৃশ পরাক্রম প্রাপ্ত হন। এই হলো স্বৰ্গমার্গ অর্থাৎ দেবানের পথ, এই পথ বিজ্ঞাত হয়ে যিনি দর্শপূর্ণমাস যাগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি দেবযান-পথে অর্থাৎ দেবতাগণের গমনাগমনের পথে সম্যক রূপে আরূঢ় হতে পারেন। এই হলো দেবতাগণের অশ্বস্বরূপ, এই কথা জ্ঞাত হয়ে যে যজমান দর্শপূর্ণমাসের যাগানুষ্ঠান করেন, তিনি অগ্নি ইত্যাদি দেবগণের উদ্দেশে যজ্ঞের পুরোডাশ বহন করে থাকেন। এই হলো দেবগণের (আহার গ্রহণের) মুখস্বরূপ, এই কথা জ্ঞাত হয়ে যিনি দর্শপূর্ণমাস যাগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণগণের হস্ত দ্বারা প্রদত্ত হবিঃ দেবগণের মুখ প্রদান করে থাকেন। যে যজ্ঞমণ্ডপে সোমগ্রহরূপ হবিঃ রক্ষিত হয়, তার নাম হবিধান, তা যাঁর আছে তিনি হলেন হবির্ধানী বা সোমযাজী (তদস্যাস্তীতি হবির্ধানী সোমযাজী)। দর্শপূর্ণমাসের যাগগারী যজমান সোমযাজীর স্বরূপ বলা হয়ে থাকে;-কারণ এই যুগে আধানের পর প্রতিদিন সন্ধ্যায় ও প্রাতে অগ্নিহোত্র যুগানুষ্ঠান হয়ে থাকে এবং পর্বে পর্বে অর্থাৎ অমাবস্যায় ও পূর্ণিমাতে দর্শ ও পূর্ণমাস যাগ দুটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই উভয় যাগেই সোমদেবের নিমিত্ত প্রতিদিন সোম অভিযুত হয় (সোমদেবানাং প্রতিদিনং সোমোহভিযুতো ভবতি)। সোমের অভিষবণে (সোমপানে) দেবগণের যে প্রীতি, তা এস্থলে (অত্র) সম্পাদিত হয়। এইরকম যে যজমান দেবগণের ভবিষ্যৎ সোমযাগ বিষয়ে প্রীতির কথা জ্ঞাত হয়ে আমি সোমযাজী হবো এই বুদ্ধিতে (বুদ্ধা) দর্শপূর্ণমাস যাগের অনুষ্ঠান করেন, তাঁর সোমযাগে বহিতে দাঁতব্য যা যা করণীয় থাকে, তার সবই প্রদত্ত হয়ে যায় (দত্তং ভবতি)। দৰ্শ ও পূর্ণমাস যাগ তিথির দ্বারা বিচার্য, কর্মের দ্বারা নয়। দেবগণের দ্বারা দৰ্শ (অমাবস্যা) ও পূর্ণমাস (পূর্ণিমা) তিথি দুটির শুদ্ধিকরণ হয়েছে, এই কথা বিচার করে যে যজমান এই দুটির অনুষ্ঠান করেন, যাগানুষ্ঠানের যোগ্য, তিথি বিশেষের দ্বারা তিনি শোধিত হয়ে চরিতার্থতা লাভ করেন। প্রসঙ্গক্রমে পুরুষার্থ লাভের বিষয়ে কিছু বিধি উক্ত হচ্ছে।–অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় স্ত্রী-সহবাস অকর্তব্য, অন্যথায় (অর্থাৎ স্ত্রী-সহবাস করলে) ইন্দ্রিয়সামর্থ্য বিনষ্ট হবে। এর প্রমাণস্বরূপ পৌরাণিক আখ্যায়িকায় দেখান হয়েছে–রাজা সোম অতিরিক্ত স্ত্রী-সঙ্গমের নিমিত্ত যেমন পাপযক্ষ্মা-রোগে আগ্রস্ত হয়েছিলেন, তেমনই অমাবস্যা বা পূর্ণিমায় স্ত্রী-সঙ্গমকারী ব্যক্তির পরিণতি হয়। (২য় কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকে অনুবাক-২৪
ে প্রজাপতয়েস্ত্রয়স্ত্রিংশদুহিতর ইত্যাদি মন্ত্রে এই আখ্যায়িকার মর্মার্থ দ্রষ্টব্য)। অমাবস্যা ও পূর্ণিমা–দুটি তিথিই দেবগণের ভাগ, সুতরাং এই দুই তিথিতেই দেবগণের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। এই কথা যে মনুষ্য জ্ঞাত হন, তিনি সকল ভাগই (যজ্ঞফল) প্রাপ্ত হন (মনুষ্যা সর্বেহবি ভাগং ধারায়ত্ব প্রথচ্ছন্তি)। মনুষ্য ইত্যাদি প্রাণিবর্গ প্রতি দিবসে ক্ষুধার নিবৃত্তি সাধিত করেন, দেবগণ ক্ষুধার নিবৃত্তি সাধিত করেন অর্ধ মাসে, পিতৃগণ ক্ষুধার নিবৃত্তি সাধিত করেন এক মাসে এবং বনস্পতিগণ ক্ষুধার নিবৃত্তি সাধিত করে একটি সম্বৎসরে। বনস্পতিগণের ক্ষুধা-নিবৃত্তি হলো তাদের ফলধারণ (বনস্পতয়ঃ ফলং গৃহুতি)। যিনি এই কথা বিদিত হন, তিনি অন্নের দ্বারা সমৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে ক্ষুধারূপ শত্রুকে বিনাশ করে থাকেন (য এবং বেদ হন্তি ক্ষুধং ভ্রাতৃব্যম) ॥৬৷৷
মর্মার্থ- দেবতাগণ পূর্বকালে ঋক্-মন্ত্রে কিংবা যজুর্মন্ত্রের দ্বারা তুষ্ট হতে পারেননি; কিন্তু সামমন্ত্রে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন (কিংতু সামনেব সন্তুষ্টাঃ)। অতঃপর হিং-শব্দ উচ্চরিত হলে সামের দ্বারা তাঁরা কৃতকৃত্য হন (কৃতং ভবতি)। হিং-শব্দে সামমন্ত্র বিদ্যমান থাকে। সামের দ্বারা দেবগণ তুষ্ট হন অর্থাৎ আশ্রিত হন বলে হোতা হিং-শব্দ উচ্চারণ পূর্বক তাদের সন্তোষ সাধিত করে। এই হিং-শব্দ প্রথম উচ্চারণের দ্বারা সাম চরিতার্থতা লাভ করে, দ্বিতীয়বার উচ্চারণের দ্বারা সামের আশ্রয়ভূত ঋরূপ বাক্যের সম্বন্ধ সম্পাদিত হয়, তৃতীয়বার উচ্চারণের দ্বারা যজমান প্রজা (সন্তান-সন্ততি) সৃষ্টি করে থাকেন। লোকে ধান্য ইত্যাদি বন্ধনের নিমিত্ত যেমন কম্বল বা বস্ত্রের দুটি অংশ (দুই প্রান্ত) বন্ধন করে নেয়, সেইরকম ভাবেই প্রথম উত্তম হিং-শব্দের তিনবার অভ্যাসের (উচ্চারণের দ্বারা) যজ্ঞের অন্তভাগের বন্ধন করা হয় অর্থাৎ যজ্ঞকে বিচ্যুতি-রহিত করা হয় (স্বংসনরাহিত্যায় ভবতি)। এইরকম নিরন্তর ভাবে উচ্চারণের ফলস্বরূপ যজমানের প্রাণ ও ভোজ্যসামগ্রীর নিরন্তর যোগান সম্পাদিত হয়ে থাকে, এমন কি রাক্ষসগণ শাসনিরোধ হয়ে অপহত (মৃত্যুপ্রাপ্ত) হয়ে যায়। প্রথমে রাথন্তর সাম-গান করা হয়ে থাকে; এর ফলে লোকে এই লোক (ভুবন) জয় করতে পারেন। কোনও সামশাখাবিশেষে প্র বো বাজাঃ এই ঋমন্ত্র গীত হলে তাকে রাথন্তরী বলে। তৃতীয় সামধেনীর প্রথম পাদ উচ্চারণ একবার সকৃৎ (যার অর্থে এক শব্দের পরে স প্রত্যয় করে নিপাতনে সিদ্ধ) বিগ্রহ প্রদান করতে হয়; অর্ধ ঋক্ উচ্চারণ করে দ্বিতীয় বিগ্রহ প্রদান করতে হয় এবং তারপর উত্তরার্ধে উপরিতন মন্ত্রের পূর্বার্ধ সংযোজিত পূর্বক তৃতীয় বিগ্রহ প্রদানকার্য সম্পন্ন করতে হয়। এর দ্বারা অর্থাৎ এই তিন বিগ্রহের দ্বারা স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল জয় করা যায় (এতেন বিগ্রহত্রয়েণ লোকত্রয়োজয়ো ভবতি)।
যে ঋকে বৃহৎ যবিষ্ট–এইরকম শব্দ শায়মাণ হয়, তাকে বাহঁতী বলে; তৃতীয়ে কৃত এই মন্ত্র প্রথম ও মধ্যম অপেক্ষা উত্তম; এই মন্ত্রের দ্বারা স্বর্গলোক জয় করা যায় এবং এই মন্ত্রের দ্বারা সাধিত হয় বলে স্বর্গলোকের বাহতত্ব অর্থাৎ স্বর্গলোক বাহঁত নামে অভিহিত (স্বর্গলোকস্য বাহঁতত্ব)। কোনও দেববিশেষের বিশেষ নাম যেস্থানে উক্ত হয়নি, সেই ঋকে অনিরুক্তা বলা হয় (সেয়মনিরুক্তা)। সৃষ্টির প্রাক্কালে রূপবিশেষের অভাবজনিত কারণে প্রজাপতিও অনিরুক্ত নামে অবিহিত ছিলেন (প্রাগরূপবিশেষা ভাবাদানিরুক্তঃ)। অতএব এইটি (এই ঋক) প্রাজাপত্য। প্রজাপতির দ্বারা সৃষ্টত্বের কারণে যজ্ঞকে প্রজাপতির স্বরূপ বলা হয়। সেই নিমিত্ত প্রথমে প্রজাপতি-সম্পর্কিত মন্ত্র পাঠের দ্বারা যজ্ঞরূপ-সদৃশ প্রজাপতির (প্রাজাপত্য-যজ্ঞের) আরম্ভ করা হয়। প্র বো বাজা মন্ত্রের প্র শব্দ উচ্চারণের দ্বারা তথাবিধ প্রাচীন রেতঃ গর্ভাশয়ে স্থাপিত হয়; বাজ শব্দ উচ্চারণের দ্বারা অনুপ্রাপ্তি ঘটে। অগ্ন আ যাহি বীতয় অর্থাৎ হে অগ্নিদেব! আপনি এই স্থানে আগমন করুন ইত্যাদি মন্ত্রের উচ্চারণের দ্বারা পশ্চিমামুখ সদৃশ (অর্থাৎ সূর্যাস্তকালে সন্ধ্যাবন্ধনাপরায়ণ) প্রজা (সন্তান-সন্ততি) লাভ করা যায়। এই মন্ত্রে যায় (গচ্ছন্তি) ক্ৰমের দ্বারা প্রবর্তন হয়, বাজ শব্দে চৈত্র ইত্যাদি মাসকে বোঝানো হয়। এই ব্রাহ্মণবাক্যের (বা মন্ত্রের) দ্বারা যজমান সুখকামী হয়ে থাকেন। হে অগ্নে! ত্বমিদং…. অর্থাৎ হে অগ্নিদেব! আপনি মাস-স্বরূপ (মাসানাং স্বরূপমসি), আপনি অধর্মাস-স্বরূপ, আপনি দেব-স্বরূপ- এই মন্ত্রের তাৎপর্যের দ্বারা যজ্ঞের প্রিয় ধাম অর্থাৎ আহুতি-স্থানে প্রজ্বলন্ত অগ্নির স্বরূপ সম্পাদিত হয়। যে যজমানকে উদ্দেশ্যে করে হোতা কামনা করেন যে, এই যজমান মৃত্যরহিত হয়ে সর্ব-আয়ু প্রাপ্ত হোন, সেই যজমানের আয়ুপ্রাপ্তির নিমিত্ত প্রথমে সামিধেনী মন্ত্র অবিচ্ছেদে উচ্চারণ কর্তব্য; অতঃপর উত্তর-মন্ত্রের প্রথম অর্ধ ঋক উচ্চারণ করতে হয় (প্রথমমধুচমুপক্ৰমেত)। এতে সেই যজমানের বাহিরে নির্গমন-প্রয়াসী প্ৰাণবায়ুর সাথে অপানবায়ুকে পুনরায় গমন-প্রয়াস হতে ধারণ বা নিবৃত্ত করা হয়। সেই ধারণের দ্বারা যজমান সকল আয়ু প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। উভয় সামধেনীর মধ্যে কনুই হতে কনিষ্ঠ অঙ্গুলি পর্যন্ত প্রসারিত অরত্নি নামক হস্তভাগের ন্যায় অবিচ্ছেদ ভাব থাকে। যে হোতা এই অবিচ্ছিন্নতার কথা জ্ঞাত হয়ে অনুষ্ঠান করেন, তিনি শত্রুকে যজমানের ঐ অরঙ্গির মধ্যে স্থাপন করতে পারেন। যে ঋষি চক্ষু কর্ণ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের অগোচর সামগ্রীকে দর্শন করতে সক্ষম, তিনি ঈশ্বরের অনুগ্রহে একটি সামিধেনী মন্ত্র দর্শন করে তার সম্প্রদায় পরম্পরায় রচিত করে দেন (নির্মিতবা)। এই ভাবে ভিন্ন ভিন্ন ঋষিগণের দ্বারা প্রবাৰ্তিত সামিধেনী মন্ত্র অসংযুক্তা হওয়ার কারণে যজমানের প্রজা (সন্তান-সন্ততি) ও পশু এর দ্বারা যুক্ত হয় না, অর্থাৎ প্রজা ও পশুর সমৃদ্ধি ঘটে না। এর পরিহার কল্পে পূর্বের সামিধেনীর সাথে উত্তর-অর্ধের এবং উত্তর সামিধেনীর সাথে পূর্ববর্তী সামিধেনীর অর্ধের যোগ স্থাপন করতে হয়। এইরকম ভাবে সংযুক্ত সামিধৈনীর মন্ত্রসমূহ যজমানের সকল শুভ-কামনার পূর্তি সম্পাদিত করে থাকে ॥৭॥
[এই অনুবাকে সামিধেনীর অবশিষ্ট মন্ত্রগুলির ব্যাখ্যা করা হয়েছে]
মর্মার্থ– সামিধেনী মন্ত্রের প্রথমটি পূর্বের অনুবাকে ব্যাখ্যাত হয়েছে। এইবার, এই অনুবাকে, অবশিষ্ট সামিধেনী মন্ত্রগুলি ব্যাখ্যাত হচ্ছে। সামিধেনী মন্ত্রের দ্বিতীয়টি হলো–হে অগ্নে হব্যদাতয়ে….অর্থাৎ হে অগ্নিদেব! যজমানের হবিঃ দানের নিমিত্ত, দেববর্গের দ্বারা হবিঃ ভক্ষণের নিমিত্ত–যজমান দেবগণকে হবিঃ দান করবেন, আপনারা তা ভক্ষণ করুন–এই রকম কথা ঘোষণা করতে করতে আপনি আগমন করুন এবং আগমনের পর আপনি হোতা বা আহ্বাতা হয়ে এই যজ্ঞে দীপ্যমান হয়ে উপবেশন করুন। তৃতীয় সামধেনী মন্ত্রটিতে বলা হচ্ছে–হেহঙ্গিবোহগ্নে তং… অর্থাৎ হে সমিধের দ্বারা প্রজ্বলিতাঙ্গধারী অগ্নিদেব! আমরা সেইভাবেই দেবগণের আহ্বতা আপনাকে সমিধ ও ঘৃতের দ্বারা বর্ধিত করছি। হে যুবতম অগ্নি! জ্বালামালায় যেমন দীপ্তির আধিক্য দেখা যায়, আপনি তেমনই দীপ্যমান হোন। চতুর্থ সামিধেনী মন্ত্র হলো–হে অগ্নে দেব স ত্বং…. অর্থাৎ হে দেব অগ্নি! আপনি আমাদের নিমিত্ত দেবগণের উদ্দেশে বিস্তীর্ণ শ্রবণযোগ্য কর্ম-ইচ্ছার অভিমুখে বৃহৎ (জ্বলাধিক্য) ও সুবীর্য (হয়মান হবিঃকে সম্যকভাবে দহন-সমর্থ) হয়ে বিভাত হোন অর্থাৎ প্রকাশিত হোন। পঞ্চম সামিধেনী মন্ত্রের পাঠ–এই অগ্নি সম্যভাবে দীপ্ত হচ্ছেন; তিনি স্তুতির যোগ্য, তিনি নমস্কারের যোগ্য, তিনি অন্ধকারকে তিরস্কৃত বা বিদূরিত করে সকল পদার্থকে দর্শনকার ও সকল কামনার বর্ষণকারী হয়ে থাকেন। ষষ্ঠ সামিধেনী মন্ত্রের পাঠে আছে-অয়মগ্নিঃ সম্যগিধ্যতে.. অর্থাৎ এই অগ্নি সম্যভাবে দীপ্যমান হচ্ছেন। কীরকম অগ্নি? যে অগ্নি কামনাসমূহের বর্ষক, দেবগণের বাহনস্বরূপ অশ্বের ন্যায় দেবগণের উদ্দেশে নিবেদিত হবিঃর বাহক। এমনই এই অগ্নিকে হবিষ্মন্ত (হবিঃ প্রদানকারী) যজমানগণ স্তুতি করে থাকেন। সপ্তম সামিধেনী মন্ত্রের বক্তব্য–হে বৃষন্ কামানাং বর্ষকাগ্নে… অর্থাৎ হে কামবৰ্ষক অগ্নি! আমাদের সকল আকাঙ্ক্ষার বর্ষণকারী বা পূরণকারী আপনাকে আমরা আহুতিরূপ বৃষ্টির দ্বারা সাম্যভাবে প্রকাশ করব। কীরকম ভাবে আপনার সেই প্রকাশ ঘটবে? না, প্রভূত জ্বালাবিশিষ্ট হয়ে (প্রজ্বলন্ত সামগ্রীর আলোক-দানের ন্যায়) দীপ্যামান হোন। সামিধেনীর অষ্টম মন্ত্রের পাঠ–অগ্নিং দুতং বৃণীমহে… অর্থাৎ এই অগ্নিকে আমরা প্রার্থনা করছি। কীরকম অগ্নি? যিনি দেবগণের দূত, দেবগণের আহ্বানকারী, সর্ব দেববর্গের বিজ্ঞাতা, এবং এই যজ্ঞ-সম্বন্ধি শোভনকর্মা (সুক্ৰতুং)। নবম সামধেনী মন্ত্রের পাঠসামিধ্যমানো অধ্বরে… অর্থাৎ যে অগ্নি এই কর্মে (যজ্ঞে) সমিদ্ধমান অর্থাৎ দীপ্তিমান শুদ্ধিহেতু পাবক (অর্থাৎ পবিত্র), স্তবের যোগ্য, সেই দীপ্ত বা প্রজ্বলিত শিখাধারী অর্থাৎ শোচিষ্কেশ (শিখাযুক্ত কেশস্থানীয়) অগ্নিদেবতার (কৃপাপ্রাপ্তির নিমিত্ত) আমরা প্রার্থনা করছি। দশম সামিধেনী মন্ত্র হলো–সমিদ্ধো অগ্ন আহুত… অর্থাৎ হে আহুতির দ্বারা আহুত বা আরধিত অগ্নিদেব! আপনি দীপ্তিমান হয়ে দেববর্গের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করুন। হে সুষ্ঠু যাগ-নিপাদনকারী, আপনি হব্যবাহক হয়ে যাগ করুন (যজেত্যন্বয়ঃ)। একাদশ সামিধেনীর পাঠ–হে যজমানা… অর্থাৎ হে যজমানগণ! আপনারা আহুতির দ্বারা এই অগ্নিদেবতাকে প্রীত করুন, প্রযত্নের সাথে এঁর পরিচর্যা করুন। এই অধ্বরে (যাগে) বর্তমান হব্যবাহক অগ্নির (কৃপা) প্রার্থনা করুন। এই মন্ত্র সামধেনীর পরিসমাপ্যমানত্বের নিমিত্ত পরিধানীয়া নামে অভিহিত। এ ছাড়া পুরুষভেদেও অন্য পরিধানীয়া বিকল্পিত হয়ে থাকে। এর বিকল্প মন্ত্র হলো–হে অগ্নিদেব! আপনি অনিষ্টের নিবারণ কারক (নিবারক) হওয়ার নিমিত্ত বরুণ নামে এবং ইষ্টের প্রাপণ-কারক (প্রাপক) হওয়ার নিমিত্ত মিত্র নামে অভিহিত। আমরা বশিষ্ঠগোত্রীয়গণ আপনাকে স্তুতির দ্বারা বর্ধন করছি (বর্ধয়ন্তি স্বাম)। আপনাতে ধন ও সুষ্ঠুভাবে দাঁতব্য হবিঃ অবস্থিতি করুক। আপনারা আমাদের মঙ্গলের সাথে সর্বদা রক্ষা করুন।–দর্শপূর্ণমাসে সাম না থাকার নিমিত্ত এটি মুখ্যষজ্ঞরহিত অর্থাৎ প্রধান যোগ্যরূপে গণ্য হয় না। তথাপি (অতোহয়ং) সাম-তিনটির স্বরূপ এই স্তুতি পাঠের দ্বারা দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞ সামবন্ত হয়। পুরাকালে স্বর্গলোকে অগ্নিদেব এবং ভূলোকে আদিত্যদেব অবস্থিত ছিলেন। তখন ঐ দুই লোক অশান্ত ও ক্ষুদ্ধ ছিল। স্বর্গে দেবগণের পাকের কোন প্রয়োজন ছিল না, তাদের প্রয়োজন ছিল কেবল প্রকাশের (প্রকাশায়)। কিন্তু ভূলোকবাসীগণের মুখ্য প্রয়োজন ছিল পাকের। এই নিমিত্তই ছিল উভয় লোকবাসীদের ক্ষোভ। এই ক্ষোভ দর্শন করে দেবতাগণ পরস্পর এমন বললেন,অগ্নি ও আদিত্যঘটিত এই বিপর্যয়ের পরিবর্তন সাধিত করব।
এই নিমিত্তই অগ্ন আয়াহী… অর্থাৎ হে অগ্নিদেব! আপনি আগমন করুন, এই বৰ্হিতে (যজ্ঞে) উপবেশন করুন– ইত্যাদি ঋমন্ত্রে প্রথম লোকে অর্থাৎ আদিত্যের প্রকাশক উপরিলোকে স্থাপন-কর্ম সম্পাদিত করা হলো। এইভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঋমন্ত্রের উচ্চারণও আদিত্যমণ্ডলস্থায়ী দেবতার শ্ৰয়মান হলে (অর্থাৎ এই বিপর্যয়ের দ্বারা) উভয় লোক (অর্থাৎ স্বর্গ ও ভূলোক) আপন আপন কার্যসিদ্ধিযুক্ত হয়ে শান্তি (প্ৰদায়ক) হয়েছে। অতএব এই ঋক-মন্ত্রের ক্রমপাঠ নোক দুটির শান্তির কারক হলো। যাঁরা এই কথা বিদিত হন, তারা উভয় লোকেই শান্তি লাভ করেন (তদ্বেদিতৃশ্চ তদুভয়শান্তিৰ্ভবতি)। সামিধেনী মন্ত্র পদশ; কিন্তু এর মধ্যে একাদশ মন্ত্র বলে অভিহিত একটি বিকল্প মন্ত্র থাকায় মোট দ্বাদশটি বলা হয়। অধিকন্তু প্রথম ও উত্তম মন্ত্র তিনবার আবৃত্তির দ্বারা সামিধেনীর পঞ্চদশত্ব সম্পূর্ণ করা হয়। এক একটি করে অধর্মাস ধরে রাত্রিসমূহের চতুবিংশতিবার আবৃত্তির মাধ্যমে সম্বৎসর-প্রাপ্তি হয়। পঞ্চদশ সংখ্যাবিশিষ্ট গায়ত্রী ছন্দের এক একটি হিসাবে চতুবিংশতি অক্ষর হয়। সেইরকম এর অক্ষরসংখ্যা মিলিত হয়ে সম্বৎসরের রাতির সংখ্যার সমান হয়। কোনও সময়ে নৃমেধ ও পরুচ্ছেপ নামে দুজন ব্রহ্মবাদী ঋত্বিক আপন আপন মন্ত্রের সামর্থ্য-বিষয়ে পরস্পর বাদানুবাদে লিপ্ত হন। তারা প্রতিজ্ঞা করলেন যে, তাদের মধ্যে যিনি ব্রহ্মীয়ান (ব্রহ্মবাদী) এবং সামিধেনীমন্ত্রে অধিক কুশল তিনি তা নিশ্চিত রূপে প্রতিপন্ন করতে আর্দু কাষ্ঠে ঘর্ষণের (মথনের) দ্বারা অগ্নির সৃষ্টি করবেন। তখন প্রথমে নৃমেধ ঋষি আদ্রকাষ্ঠের অভিক্ষ্যে মন্ত্র পাঠ করলেন (মন্ত্রমবৎ)। কিন্তু তার সেই মন্ত্ৰসামর্থ্যে কেবল ধূমই উৎপাদিত হলো। অতঃপর পরচ্ছেপ ঋষি মন্ত্র পাঠ পূর্বক অগ্নির সৃষ্টি করলেন। তখন নৃমেধ ঋষি পরুচ্ছেপ ঋষিকে অতীন্দ্রিয়দ্রষ্টা বলে সম্বোধিত করে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা দুজনেই সামিধেনী মন্ত্রের বিষয়ে সমান পারদর্শী, তথাপি আপনি কি রকমে অগ্নি উৎপাদনে সক্ষম হলেন? এর উত্তরে পরুচ্ছেপ বললেন, যদিও সামিধেনী মন্ত্রের পাঠ ও তার অর্থজ্ঞানে আমরা সমান, তথাপি আমি সেই সামিধেনীসমূহের বর্ণরহস্য ও সেই বর্ণসমূহের তেজঃ সম্পর্কে জ্ঞাত আছি, কিন্তু আপনি তা বিদিত নন। সেই বর্ণরহস্য ও তেজঃ কি?–তা হলো ঘৃতশব্দোপেত (অর্থাৎ ঘৃত-শব্দের দ্বারা সংযুক্ত) অনুচ্যমান (অনুচ্চারিত) পাদ, যা সামিধেনীর বর্ণ ও সারভূত তেজঃ। তং ত্বা সমিত্তিরঙ্গিরঃ অর্থাৎ হে সমিধের দ্বারা প্রজ্বলিতাঙ্গী অগ্নি! ইত্যাদি ঋক-মন্ত্র পাঠের মধ্যে ঘাতেন বর্ধয়ামসি ইত্যাদি পাদও বর্তমান। সুতরাং সেই পাঠের দ্বারা জ্যোতিঃ উৎপাদিত হয়। সেই একক মন্ত্র আপনিও পাঠ করেছেন, কিন্তু তার মহিমা অবগত নন; কিন্তু তা আমি অবগত আছি বলেই সৃষ্ট জ্যোতির দ্বারা আদ্ৰ কাষ্ঠেও অগ্নি উপাদানে সমর্থ হয়েছি। ঋক্, গায়ত্রী ও সামিধেনী শব্দ স্ত্রীলিঙ্গবাচক হওয়ার কারণে পুংলিঙ্গবাচক বৃষ-শব্দযুক্ত ঋক্-মন্ত্র উচ্চারণ করতে হবে (বৃষঞশব্দবতীচং ক্ৰয়াৎ)। তা পাঠের মাধ্যমে পুরুষবৎ ইন্দ্রিয়যুক্ত স্ত্রীপুরুষ মিথুনরূপ সম্পাদিত হয়। দেববর্গ আপনি কার্যসাধনের নিমিত্ত অগ্নিদেবকে দৌত্যে (দূতের কর্তব্য কার্যে প্রেরণ করেছিলেন; এবং অসুরগণ প্রেরণ করেছিলেন কবিপুত্ৰ উশনাকে (অসুরগুরু শুক্রাচার্যকে)। তারা উভয়ে প্রজাপতির নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি তাদের মধ্যে সন্ধি-বিগ্রহ ইত্যাদি কর্মে কার দৌত্য উচিত (অর্থাৎ যাথাযযাগ্য) বলে মনে করেন। তখন প্রজাপতি যোগ্য দূতরূপে অগ্নিদেবকেই বরণ করলেন। এর ফলস্বরূপ দেবগণের বিজয় ও অসুরগণের পরাজয় সংঘটিত হলো। এই কথা যিনি জ্ঞাত থাকেন, সেই যজমান এই মন্ত্রের দ্বারা আপনার বিজয় ও শত্রুর পরাজয় সংঘটনে সমর্থ হন। সমিঘে অগ্ন আহুত…অর্থাৎ হে সমিমান অগ্নিদেব! আপনি এই যজ্ঞে আগত হোনইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা শত্রুবিনাশের জন্য বিশেষত প্রার্থনা করা হয়েছে। শোচিম্বেশস্তমামহ…ইত্যাদি মন্ত্রের মধ্যপাদে পাবক শব্দের দ্বারা পবিত্রের কথা এবং শোচি-শব্দে শুচির হেতুভূত রশ্মিসমূহের উক্তির অভিপ্রেতও পবিত্র বাক্যটির অভিধা সূচিত হয়েছে (পবিত্ৰমেতদ্বাক্যামিত্যতিধীয়তে)। এর দ্বারা অর্থাৎ এই ঋমন্ত্রের দ্বারা যজমানের শোধন সম্পন্ন হয়ে থাকে। সমিদ্ধ অগ্ন আহুত… ইত্যাদি মন্ত্র পরিসমাপ্তি সূচক পরিধিস্বরূপ স্থাপিত হয়েছে। (পরিসমাপ্তিতে প্রক্ষিপ্যমান কাষ্ঠবিশেষকে পরিধি বলে)। এই মন্ত্র পাঠের উদ্দেশ আর কিছুই নয়, যাতে আজ্য পুরোডাশ ইত্যাদি হবিঃ পরিধি বাইরে পাতিত হয়ে বিনাশ না পায় তারই জন্য এই সম্পাদন। আজুহোত ইত্যাদি মন্ত্রের তিনবার আবৃত্তির দ্বারা তিনবার (তিনটি) সমিধ প্রক্ষেপণ (প্রাপ্ত) করতে হয়। অতঃপর চতুর্থ সমিধের দ্বারা দেবগণের হব্যবাহন, পিতৃগণের কব্যবাহন, অসুরবর্গের সহরক্ষক অগ্নি আমাকে বরণ করুক এমন প্রার্থনা ব্যক্ত হয়। হে দেবগণ, ঐ রকম গুণসম্পন্ন হব্যবাহন অগ্নির প্রার্থনা করুন। ঋষি-সম্পর্কিত অগ্নির বরণের দ্বারা অপত্য আত্মীয় ইত্যদির বৃদ্ধি সাধিত হয়ে থাকে। যেমন হোতা যা পূর্বভাবী পিতৃপুরুষগণ অর্থাৎ ভৃগু, চ্যবন, জমদগ্নি (ভৃগুর পুত্র চ্যবন, ভৃগুপুত্র ঋচীকের তনয় জমদগ্নি) ইত্যাদি ক্রমে বর্তমান পুত্র ইত্যাদির বরণ করেন, সেইভাবে এই লোকে পূর্বপূর্বভাবী পিতৃপুরুষগণ হতে উত্তরোত্তর পুত্র ইত্যাদি অনুক্রমে পালন করা হয় (পুত্রাননুক্রমেণ পালয়ন্তি)। (পরবর্তী অনুবাকে ভৃগু প্রভৃতি ঋষিগণের নামোল্লেখের মাধ্যমে এই অনুক্রোম স্পষ্ট পরিব্যক্ত হয়েছে) ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন-নবমে প্রবরমন্ত্রস্য নিগদস্য সুগাদাপননিগদস্য চ ব্যাখ্যানং প্রবর্ততে। অর্থাৎ–এই অনুবাকে প্রবর মন্ত্রের ও সুগাদান রূপ নিগদের ব্যাখ্যা করা হয়েছে]
মর্মার্থ- অগ্নে মহা অসি… অর্থাৎ হে অগ্নিদেব! আপনি মহান্ হন, আপনি ব্রাহ্মণ হন, আপনি ভারত হন; আপনি দেবগণের উদ্দেশে নিবেদিত হব্য বহন করে থাকেন-ইত্যাদি প্রবরমন্ত্রে সকল আহুতির আধারত্বের নিমিত্ত অগ্নিদেবকে মহান বলা হয়েছে (মহানসীত্যুচ্যতে)। ব্রাহ্মণ বর্ণাভিমানী হওয়ার কারণে অগ্নিদেবকে ব্রাহ্মণ বলে সম্বোধন করা হয়েছে (ব্রাহ্মণেতিসম্বোধ্যতে)। দেবগণের নিমিত্ত হব্য ধারণ করেন (ভরতি অর্থাৎ ভরণ করেন) বলে তাঁকে ভরত বলে সম্বোধন করা হয়েছে (তস্মাভারতেতি সম্বোধ্যতে)। মন্ত্রের মধ্যে ভৃগু চ্যবন ইত্যাদি ঋষিগণের নাম উল্লিখিত হয়েছে। অর্থাৎ পূর্বানুবাকের ক্ষেত্রেও যেমন, এখানেও তেমনই উদাহরণের দ্বারা ঋষিগণের নাম নির্দেশ অভিপ্রেত। যেহেতু দেবতাগণ আপন আপন যাগে এই অগ্নিকে ইন্ধনিত (প্রজ্বলিত) করেন, সেই হেতু তাকে দেবেদ্ধ বলা হয়েছে। শ্রুতি-অধ্যয়ন-সম্পন্ন বিদ্বান বিপ্র বা ব্রাহ্মণগণ তাদের সৃষ্ট স্তবের দ্বারা এই অগ্নির স্তুতি করেন; ব্রহ্মমন্ত্রের দ্বারা সম্পূর্ণ তীক্ষ্ণ করেন (সংশিতস্তীক্ষ্ণীকৃতঃ), এবং ধৃতরূপ হবনের দ্বারা আহুতি প্রদান করে থাকেন। যজ্ঞসমূহের নেতৃত্বের নিমিত্ত অগ্নি প্রসিদ্ধ। দেবতাগণের উদ্দেশে নিবেদিত হবিঃ-বহন সম্বন্ধী কর্মের নিমিত্ত এই অগ্নি যজ্ঞের রথস্বরূপ। যেহেতু এই অগ্নি যজ্ঞসমূহের আহ্বতা, সেই কারণে কোনও দেবতা এই অগ্নিকে অতিক্রম করতে পারেন না (ন তরতি), সেই নিমিত্ত এঁকে অনতিক্রম্য হোতা বলা হয়ে থাকে (তস্মাদয়মতুর্তো হোতেত্যুচ্যতে)। এই অগ্নি দেবগণের লৌহপাবৎ দৃঢ় জুহু-সদৃশ (যজ্ঞীয় কাষ্ঠপাত্রবিশেষ)। এই অগ্নি মনুষ্যগণের সোমপানের নিমিত্ত চমসের (হাতার) ন্যায় দেবগণের পানসাধনের নিমিত্ত চমচ-স্থানীয়। হে অগ্নিদেব! আপনি শকটচক্রস্থিত নেমির ন্যায় দেবতাগণের পক্ষে ব্যাপ্তবান (অর্থাৎ চক্রের বেড় যেমন ঘূর্ণনের ফলে যত পথ অতিক্রম করে, তত পথ পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়, তেমনই অগ্নিও দীর্ঘস্থানব্যাপী পরিব্যাপ্ত।–আপনি এই যজমানের নিমিত্ত দেবতাগণের আহ্বান করুন… ইত্যাদি মন্ত্রে যজমানের বৃদ্ধিপ্রাপ্তি সাধিত হয় (বৃদ্ধিং প্রাপয়তি)। হে আহুতির আধারভূত অগ্নিদেব! প্রথম আজ্যভাগটি দেবতা অগ্নির উদ্দেশে বহন করুন। দ্বিতীয় আজ্যভাগটি দেবতা সোমের উদ্দেশে বহন করুন। পৌর্ণমাসী ও অমাবস্যায় নির্বপিত প্রথম পুরোডাশটি দেবতা অগ্নির উদ্দেশে বহন করুন। পৌর্ণমাসীতে উপাংশুযাগের দেবতা প্রজাপতির উদ্দেশে (পুরোডাশ) বহন করুন। পৌর্ণমাসীতে দ্বিতীয় পুরোডাশটি দেবতা অগ্নি ও সোমের নিমিত্ত বহন করুন। অমাবস্যায় নির্বপিত পুরোডাশটি সান্নায্য যাগের দেবতা ইন্দ্রের নিমিত্ত বহন করুন। ….ইত্যাদি। হে অগ্নিদেব! আপনি সর্বদেবতার মহিমা বিষয়ে অভিজ্ঞ। আপনি দেবতাগণকে এই স্থানে বহন করে আনয়ন করুন এবং শোড়ন যজ্ঞের দ্বারা যজন (পূজা) করুন। কেবল বহনই নয়, হবিঃ-প্রাপণ-লক্ষণযুক্ত যাগও অগ্নির কর্তব্য। (অর্থাৎ সেই অগ্নি তীক্ষ্ণীকৃত বা অপ্রমত্ত হয়ে যজমানের নির্বপিত হব্য দেবতাগণের নিকট ক্রমে যজমানের নির্বপিত হব্য দেবতাগণের নিকট ক্রমে বহন করেন। এই অগ্নি হোতা অর্থাৎ হোমের কর্তা; অতএব তিনি হোমক্রম জ্ঞাত হোন (হোমক্রমং জানাতু)। যাতে ফলদানরূপ আমাদের রক্ষণ আছে, সেইরকম হোমের অনুষ্ঠান জ্ঞাত হোন। মনুষ্য হোতা আমরাও হোমক্রমে জ্ঞানবন্ত হবো।-হে যজমান! আপনার হবিঃ-স্বীকারকারী দেবতা উত্তম ফল প্রদান করুন।-হে অধ্বর্য! ঘৃতপূর্ণ সুছ (যজ্ঞপাত্রবিশেষ) গ্রহণ করুন। কীরকম সু? যা দেবতাগণের যুক্তকারী সুশ (দেবায়ুস্তাদৃশী); সকল রাক্ষসকৃত বিঘ্নের নিবারণকারী। স্ততিপ্রিয় মনুষ্যগণকে আমরা স্তুতি কছি; নমস্কারপ্রিয় পিতৃগণকে আমরা নমস্কার করছি। যজ্ঞপ্রিয় দেবতাগণের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করছি (যজ্ঞিয়ান্যজ্ঞপ্রিয়ান্দেবানজাম)। দেবতার হোতা অগ্নিদেবের সাহায্যের নিমিত্ত মনুষ্যের নিজের সৎ-ভাব। হে যজমান! যেহেতু আপনি হোতা অগ্নিকে হেতৃত্বে বরণ করেছেন, সেই হেতু অগ্নিদেব আপনাকে উত্তম ফল প্রদান করুন। এই স্থলে যজমানকে শাখার-পাঠের দোষ প্রদর্শনপূর্বক তা পরিহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (তমিমং শাখান্তরপাঠং দূষয়তি)। যদিও জুহু (যজ্ঞীয় কাষ্ঠপাত্রবিশেষ ও উপভৃৎ (বট-কাষ্ঠে নির্মিত গোলাকার যজ্ঞপাত্রবিশেষ)–এই দুটিই যজ্ঞকর্মে গৃহীত হয়ে থাকে, তথাপি জুহুর প্রাধান্য প্রতিপন্ন করার উদ্দেশে সুচম্ এই একবচনান্ত পাঠের কারণ দেখানো হয়েছে। যদি জুহু ও উপভূতের সম-প্রাধান্য বলা হয়, তবে যজমানের সমান তাঁর শত্রুগণেরও বর্ধন করা হবে। সেই নিমিত্তই উপভৃৎ-কে উপেক্ষিত করে জুহুর প্রাধান্যবাচক শব্দের দ্বারা যজমানের বর্ধন করা হয়ে থাকে (যজমানং বর্ধিতবান্ ভবতি)। জুহুর ন্যায় কখনও কোথাও উপভৃৎ-এর সাক্ষাৎ হোমসাধনত্ব নেই। সেইজন্যই উপসর্জনে (সমাসঘটিত পদে প্রথমান্ত নির্দিষ্ট পদে অর্থাৎ এক বিভক্তি অন্ত পদে) এটি (উপভৃৎ) যুক্ত। দেব-মিশ্রণের দ্বারা দেবতার রক্ষণ এবং বিঘ্ন-নিবারণের দ্বারা সর্ব-রক্ষণের অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছে। মনুষ্যগণের স্তুতি, পিতৃগণের নমস্কার ও দেববর্গের যজ্ঞের লক্ষণ বিষয় কথিত হওয়ায় যাঁর যা ভাগ তার দ্বারা তার অনুষ্ঠান করা কর্তব্য–এটাই বোধিত হয়েছে (ভাগমনতিক্রম্যানুষ্ঠিতবান্ ভবতি) ॥৯॥
মর্মার্থ- অগ্ন আয়াহী ইত্যাদি তিনটি ঋকের আবৃত্তির দ্বারা রাজন্য ব্যতিরিক্ত ব্রাহ্মণ, বৈশ্য ও শূদ্র এই তিন বর্ণ রাজন্যের আনুকূল্য করবেন (আনুকূলান্ করোতি)। প্রজাপতির ঊরু ও বাহু দ্বারা উৎপন্ন পঞ্চদশ স্তোম; এবং রাজন্যের উৎপন্নের নিমিত্ত সেই স্তোম রাজন্যের নিজস্ব (স্বকীয়ঃ)। ত্রিষ্ঠুভ ছন্দ ইন্দ্রের সহোৎপন্ন অর্থাৎ ইন্দ্রের সাথে সৃষ্ট হওয়ায় তার সম্বন্ধ ইন্দ্রিয়রূপ। সমরাভিলাষী রাজন্য ইন্দ্রিয়সামর্থ্যের নিমিত্ত ত্রিষ্টুভের দ্বারা যজন করবেন। যদি ব্রহ্মতেজঃ-সমন্বিত হবার কামনা থাকে, তবে তৎসবিতুঃ ইত্যাদি গায়ত্রী মন্ত্রে গ্রহণ কর্তব্য এবং গায়ত্রীর উপদেশের দ্বারা ব্ৰহ্মতেজঃ নিষ্পন্ন হওয়ার নিমিত্ত গায়ত্রীর রূপত্ব কথিত হয়েছে। প্রজাপতির মধ্যদেশ দ্বারা উৎপন্ন সপ্তদশ স্তোম; এবং বৈশ্যের উৎপন্নের নিমিত্ত সেই স্তোম বৈশ্যের নিজস্ব। ক্ষীর দধি ইত্যাদি বিক্রয়ের নিমিত্ত বৈশ্যগণের পশুকামনা প্রসিদ্ধ। পশুকামনার উদ্দেশে বৈশ্যগণের জগতী ছন্দের দ্বারা অনুষ্ঠান কর্তব্য। যে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা কামনা করবেন, তার পক্ষে একবিংশতি স্তোম উচ্চারণ কর্তব্য; কারণ একবিংশতি স্তোমে সকল স্তোমের প্রতিষ্ঠা (ত্রিবৃৎপঞ্চদশসপ্তদশানাং সংখ্যা চতুর্থ একবিংশস্তোমেহন্তৰ্ভূতেতি স স্তোম ইতরেষাং স্তোমানাং প্রতিষ্ঠা)। পুনরায় ফলান্তরায় কথিত হচ্ছে।–ব্রহ্মতেজঃকামী ব্যক্তির পক্ষে যে গায়ত্রীর উপদেশ ইত্যাদির কথা উল্লিখিত হয়েছে সেই প্রসঙ্গে বলা যাচ্ছে–তিনি (অর্থাৎ ব্রহ্মকেজঃ-সম্পন্ন হতে কামনাকারী জন) চতুর্বিংশতি অর্থাৎ চব্বিশ অক্ষরযুক্ত গায়ত্রীর উচ্চারণ করবেন। (তৎসবিতু ইত্যাদি চব্বিশ অক্ষরযুক্ত গায়ত্রী মন্ত্র)। গায়ত্রীর দ্বারা ব্রহ্মবর্চ লব্দ হয়ে থাকে (ব্রহ্মবৰ্চসমব রুন্ধে)। যিনি অন্ন কামনা করেন, তিনি ত্রিশ অক্ষরসমন্বিত বিরাট ছন্দের দ্বারা অনুষ্ঠান করবেন। (দশাক্ষরের তিনবার পাঠে ত্রিশ অক্ষরযুক্ত এই ছন্দানুষ্ঠানে অন্নত্ব লব্ধ হয়ে থাকে)। প্রতিষ্ঠাকামী ব্যক্তি বত্রিশ অক্ষরযুক্ত অনুষ্ঠুভ ছন্দের অনুষ্ঠান করলে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হবেন (অনুষ্ঠুবিতরচ্ছন্দসাং প্রতিষ্ঠা)। যিনি পশু কামনা করেন, তিনি ষট্ত্রিংশৎ অর্থাৎ ছত্রিশ অক্ষরসমন্বিত বৃহতী ছন্দের অনুষ্ঠান করবেন। বৃহতী ছন্দের অনুষ্ঠানে পশু লব্দ হয়ে থাকে (লভ্যত্বাদ্বাহতত্বম)। ইন্দ্রিয়শক্তির কামনাকারী ব্যক্তির পক্ষে চতুশ্চত্বারিংশৎ অর্থাৎ চুয়াল্লিশ অক্ষরসমন্বিত ত্রিষ্ঠুভ ছন্দের অনুষ্ঠান করবেন। ত্রিষ্ঠুভ ছন্দের দ্বারা ইন্দ্রিয়-সামর্থ্য লব্ধ হয়ে থাকে। পশুকামী ব্যক্তি (বৃহতী ছন্দ ব্যতীতও) অষ্টচত্বারিংশৎ অর্থাৎ আটচল্লিশ অক্ষরসমন্বিত জগতী ছন্দের দ্বারা অনুষ্ঠান করবেন। জগতী ছন্দের দ্বারাও পশু লাভ করা যায় (জগত্যৈবাস্মৈ পশুনব রুন্ধে)। যিনি বহু যাগের অনুষ্ঠান করতে আকাঙ্ক্ষা করেন, তাঁর পক্ষে সকল ছন্দের অনুষ্ঠান কর্তব্য। এই বহুজির অনুষ্ঠেয় তিনটি যজ্ঞে (সবনত্রয়ে) গায়ত্রী, উষ্ণিক, অনুষ্ঠুভ ও জগতীরূপ সকল ছন্দই অবরুদ্ধ হয়ে থাকে (সর্বাণিচ্ছন্দাংস্যবরুদ্ধানি ভবন্তি)। (অগ্নি, সোম, ইন্দ্র, বায়ু ইত্যাদি সকলের উদ্দেশে যাগকারী ব্যক্তি বহুযাজী নামে অভিহিত)। অপরিমিতের অধিক ফল লাভের আকাঙ্ক্ষাকারীর অপরিমিত ছন্দের অনুষ্ঠান কর্তব্য; এতে সংখ্যাবিশেষের যেমন নির্দেশ নেই, বাচনেরও কোন নিয়ম নেই ॥১০৷৷
[অথৈকাদশে সামিধেনীষু হোতুর্নিয়মবিশেষোহধ্বর্যোরাঘারবিশেষশ্চাভিধীয়তে। অর্থাৎ এই অনুবাকে সামিধেনীর হোতা, অধ্বর্য, হোম ইত্যাদির নিয়মবিশেষ কথিত হয়েছে]
ে প্রজ মন্ত্রগুলি কথিত হয়েছে। এই মন্ত্রগুলি মন্ত্ৰকাণ্ডের অনুবাক-২৪
ে এইরকমেই কথিত হয়েছে ]
মর্মার্থ- এই অনুবাকে সমিধ ইত্যাদি শব্দসমূহের দ্বারা যজ্ঞবিশেষের নাম উল্লেখিত হয়েছে। ঋতুগুলি হলো প্রযাজ (যজ্ঞের উপসর্গ বা আরম্ভ); ঋতু অনুসারে যজ্ঞগুলিকে স্তুতি করণের উদ্দেশে ক্রমের দ্বারা বসন্ত ইত্যাদি ঋতুর প্রাপ্তি বিষয়ে কথিত হয়েছে। সমিধ যাগের দ্বারা বসন্ত নামক ঋতু,তনপাতের দ্বারা গ্রীষ্ম নামক ঋতু, ইড়া যাগের দ্বারা বর্ষা নামক ঋতু, বহি যাগের দ্বারা শরৎ নামক ঋতু এবং স্বাহাকারযোগের দ্বারা হেমন্ত ঋতুকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। হেমন্ত ঋতুতে দ্বিপাদ ও চতুষ্পদ সকল জীব পীড়িত হয়। তেমনই দৃষ্টান্ত স্বাহাকৃতের। স্বাহাকারের দ্বারা অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত সমিধ যেমন দাহের দ্বারা পীড়িত হয়, তেমনই হেমন্তকালে হিমের প্রভাবে সকলে পীড়া অনুভব করে। সেইরকমই, উগ্র হেমন্ত ঋতুও এই যাগের অধীন বলে যাগের স্তুতি করা হয়েছে (তাদৃশঃ উগ্রোহপি হেমন্তোৎস্যাধীনো ভবতীতি যাগস্তুতিঃ) পুনরপি অন্য বিধানের দ্বারা (বিধানন্তরেণ) যাগের প্রশাংসা করা হয়েছে। যেমন, সমিধ যাগের দ্বারা ঊষাকালে দেবগণকে অবরোধ করা যায় অর্থাৎ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তনুনপাতের দ্বারা যজ্ঞকে অবরোধ বা লাভ করা যায়, ইড়া যাগে পশুসমূহকে লাভ করা যায় এবং বহি যাগের দ্বারা প্রজাসমূহ লাভ হয়। সমিধ শব্দের দ্বারা সমিৎ-এর স্তুতি সূচনা করার কারণে ঊষার কথা কথিত হয়েছে, তনুনপাৎ শব্দের দ্বারা বিনাশ সূচনা করার কারণে সকল যজ্ঞের কথা কথিত হয়েছে, ইট শব্দের দ্বারা ক্ষীর ইত্যাদির সূচনা করার কারণে পশুলাভের বিষয় কথিত হয়েছে (ইটশব্দেনেষ্যমাণক্ষীরাদিসুচনাৎ পশ্ববরোধঃ), বহি শব্দের দ্বারা বহির্যাগের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে এবং এই যাগের দ্বারা প্রজা লাভের কথা কথিত হয়েছে। উপভৃৎ (বটকাষ্ঠনির্মিত যজ্ঞপাত্র) হতে আজ্য (ঘৃত) গ্রহণ কর্তব্য। বহির্যাগের প্রজারূপত্বের কারণে আজ্যের তেজঃ প্রজাতে স্থাপিত হয়। স্বাহাকার যাগের দ্বারা (অর্থাৎ এই যাগে স্বাহা শব্দে অগ্নি ইত্যাদি বহু নাম উচ্চারণের দ্বারা) বাক্ বা বাগিন্দ্রিয়ের লাভ হয়। বসন্ত ইত্যাদি পঞ্চ ঋতুর প্রাপ্তি ও ঊষাকাল ইত্যাদি পঞ্চের প্রাপ্তি এই দশসংখ্যা দ্বারা যাগের প্রশংসা করা হয়েছে। দশ অক্ষর হলো বিরাট; এটি অনুরূপ, এই নিমিত্ত বিরাট যাগের অনুষ্ঠানে অন্ন লাভ করা হয়। সমি-যাগের দ্বারা প্রথমলোকে অর্থাৎ এই ভুবনে প্রতিষ্ঠা লব্ধ হয়; তনুনপাৎ-যাগের দ্বারা ভবন ও দেবলোকের অন্তর্বর্তী দ্বিতীয় লোকে অর্থাৎ অন্তরিক্ষে লোকে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তি ঘটে; ইড়াযাগের দ্বারা পশু লাভ করা হয়। (ইড্যাগস্য পশুসম্বন্ধঃ), বহি শব্দের দ্বারা দেবযানমাৰ্গ রূপ সাধন সূচিত হয়, সুতরাং বহি যাগের দ্বারা দেবলোকে যাত্রার পথ লব্ধ হয়; স্বাহাকার যাগের দ্বারা যথাপূর্ব স্বর্গলোকে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তি ঘটে। ভূলোক হতে আরম্ভ করে স্বর্গলোক পর্যন্ত (স্বর্গান্তা) যা উক্ত হয়েছে, তা দেবগণেরে ক্ষেত্রে, (দেবানাং পূজ্যানামপেক্ষিতা লোকাস্তেষু…) এই সকল ক্ষেত্রে যথাক্রমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নিমিত্ত পূর্বোক্ত যাগসমূহের যথাযথ অনুষ্ঠান কর্তব্য। দেবতা ও অসুরগণ এই সকল ক্ষেত্রকে নিজেদের অধিকারভুক্ত করার মানসে পরস্পর স্পর্ধা করত। দেবগণ প্রযাজ যাগের অনুষ্ঠান করে স্বর্গ ইত্যাদি সকল স্থান হতে অসুরগণকে বিতাড়িত করেন। যে যাগানুষ্ঠানের দ্বারা বিরোধীগণকে দুরীভূত করা যায়, সেই যাগের নাম প্রজ। যাঁরা এই সম্পর্কে বিদিত হয়ে প্রযাজ যাগের অনুষ্ঠান ১ করেন, তাঁরা এই লোক হতে শত্রুগণকে বিতাড়িত করতে পারেন। দুরে স্থিত হয়ে প্রথম আহুতি প্রদান করতে হয়, তারপর সন্মুখ ভাগে পাদ স্থাপন করে দ্বিতীয় আহুতি প্রদান করতে হয়। যিনি প্রযাজ যাগের মিথুন জ্ঞাত আছেন, তিনি মিথুন (অর্থাৎ পুরুষ ও স্ত্রীবর্গ সমন্বিত) প্রজা ও পশু লাভ করেন। সমিৎ-যাগের দ্বারা বহু যাগ করণীয়, তনুনপাৎ-এর দ্বারা একটি মিথুন, ই-যাগের দ্বারা অনেক মিথুন, বহির্যাগের দ্বারা একটি মিথুন যাগ কর্তব্য। (এক পুরুষের বহু স্ত্রী থাকলেও সেই পুরুষ ও একাধিক স্ত্রী নিয়ে একটি মিথুন ধরা হয়)। এইরকম যিনি জ্ঞাত আছেন, তিনি মিথুন (পুরুষ ও স্ত্রী সমন্বিত) প্রজা ও পশু লাভ করে থাকেন।–পুরাকালে একদা দেবাগণ যখন যজ্ঞ আরম্ভ করেছিলেন, তখন আজ্যভাগ ইত্যাদির অধিকারী দেবগণ অনিষ্ট (অনভিষিত) ছিলেন। সেই অবসরে সেই স্থানে অসুরগণ সমাগত হয়ে যজ্ঞের হানি সাধনে তৎপর হলো। এই প্রতিবন্ধের প্রতিকারের নিমিত্ত দেবতাগণ অষ্টাক্ষরে গায়ত্রীপাদের দ্বারা দুটি ব্যুহ রচনা করলেন।
তার মধ্যে পঞ্চ অক্ষরযুক্ত ব্যুহ পূর্ব দিকের ও তিন অক্ষরযুক্ত ব্যুহ পশ্চিম দিকের রক্ষক। সেই দুটি ব্যুহ যেমন যজ্ঞের, তেমনই যজমানের কবরূপ আচ্ছাদনতুল্য। এই নিমিত্ত পঞ্চ অক্ষররূপ পঞ্চ (অর্থাৎ পাঁচটি) প্রযাজ প্রথমে করতে হয় এবং তিন অক্ষররূপ তিনটি প্রযাজ পরে করতে হয়। এই উভয় কবচ যজ্ঞ ও যজমানকে উভয় দিক হতে রক্ষা করে। এই রক্ষণের দ্বারা শত্রুগণের অভিভূতি (পরাভব বা বিনাশ) ঘটে। এই স্থানে যেমন পূর্বদিকের ব্যুহে অধিকতর (বহু) অক্ষর ও পশ্চিমদিকের বা পশ্চাতের ব্যুহে অল্পতর অক্ষর থাকে, সেইরকম যুদ্ধার্থে গমনকালে পরকীয় (বিপক্ষীয়) সৈন্যগণের মনে ভয় উৎপাদনের নিমিত্ত পুরোভাগে (সম্মুখে) বহুসংখক সৈন্য (জনসঙ্ঃ) এবং পৃষ্ঠভাগে (পশ্চাতে) অল্প সৈন্য রাখতে হয়। কোনও এক কালে দেবতাগণ যাগানুষ্ঠান আরম্ভ করে প্রথমেই যজ্ঞ-উপঘাতক (যজ্ঞ-বিনাশকারী) রাক্ষসগণের আর্বিভাবের পূর্বে স্বাহাকার নামধেয় পঞ্চমযাজের দ্বারা যজ্ঞ সমাপনীয় বিচার করে সেই মতো যজ্ঞানুষ্ঠান করেন। তাতে যজ্ঞ-বিচ্ছেদ হওয়ার নিমিত্ত, তা যুক্তিযুক্ত নয়। এই নিমিত্ত প্রযাজের পরে অবশিষ্ট হবির দ্বারা যাগানুষ্ঠান করা হলে যজ্ঞের বিস্তরা হয়ে থাকে (সন্ততো ভবতি)। অতঃপর পুরোডাশ ইত্যাদি দ্রব্যের দ্বারা হোম করণীয়। এইভাবে যথাপূর্ব ও যথারে প্রজের নির্বিঘ্ন অনুষ্ঠান করলে যজ্ঞও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। প্রযাজ হলো পিতৃস্থানীয় এবং অনুযাজ হলো তার পুত্রস্থানীয়। অনুযাজের নিমিত্ত হবিঃ উপভৃতে (যজ্ঞপাত্রে) গৃহীত বা রক্ষিত থাকে। পুরোডাশ ইত্যাদি হৰিঃ-র অভিক্ষরণ কালে প্রজের শেষে উপভৃতে রক্ষিত অভিঘার অর্থাৎ হবিঃও প্রদান করতে হয়। তাহলে পিতৃস্থানীয় প্রযাজের যা অবশিষ্ট আজ্যদ্রব্য, তা পুত্রস্থানীয় অনুজেরও সাধারণ দ্রব্য হয় (সাধারণং কৃতং ভবতি)। এই বিষয়টি একটি লৌকিক উদাহরণের দ্বারা স্পষ্টীকৃত হয়। যেমন,–এই জগতে বাল্য বয়সে পুত্র যা উপার্জন করে থাকে, সেই সেই দ্রব্য পরবর্তীকালে পুত্রের নিমিত্ত সাধারণভাবে সংগৃহীত করে রেখে দেওয়া হয়, তা পিতা কিংবা ভ্রাতৃগণকেও দেওয়া হয় না। কিন্তু পিতা যা উপার্জন করে, তা পিতার বালক পুত্র ও সেই স্থানীয় সকলেরই সমান ভোগ্যরূপে পরিগণিত হয়। সেইরকমই (পিতৃস্থানীয়) প্রযাজ হলো সাধারণ, তার শেষ ভাগের দ্বারা সেইজন্যই অন্য হোম করা হয়। অনুযাজ (পুত্রস্থানীয়) হলো অসাধারণ, তার শেষ ভাগের দ্বারা আর বিনিয়োগ করা যায় না। যাগানুষ্ঠানের পূর্বে যাগের জন্য সংগৃহীত দ্রব্যের অন্যত্র পতন হলে তা বিনষ্ট হয়। এই কারণেই প্রযাজ যাগের পরে অন্যত্র হবির শেষ প্রক্ষিপ্ত করতে হয়। তাতে বিনষ্ট দোষের পরিহার হয় (তস্মাদেতদস্কন্নমবিনষ্টমেব)।পুনরায় প্রকারান্তরে প্রশংসিত হচ্ছে যে,-একদিকে গায়ত্রীর পঞ্চাক্ষাররূপা প্রজ, অন্য দিকে গায়ত্রীর তিন অক্ষর রূপা অনুযাজ। মধ্যে যে অভিঘারণ (হোম) করা হয়, তার দ্বারা গায়ত্রী আপন উদরে গর্ভ ধারণ করেন (গর্ভং ধৃতবতী ভবতী)। এরই ফলে সেই গায়ত্রী যজমানের নিমিত্ত (যজমানার্থং) প্রজা ও পশুসমূহ উৎপাদিত করে থাকেন ॥১॥ [সায়ণাচার্য বলেন–অনুবাকে দ্বিতীয়েহস্মিন বক্তব্যাবাজঃভাগকৌ। অর্থাৎ–এই অনুবাকে দুটি আজ্যভাগের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- (যজ্ঞাগ্নিকে উদ্দেশ করে কথিত হচ্ছে)–এই অগ্নিদেব আমাদের অনুগ্রহ করে থাকেন। তিনি আমাদের কর্মানুষ্ঠান-নিবারক সমূহকে (বৃত্ৰাণি) অর্থাৎ পাপসমুদয়কে অতিশয়রূপে বিনষ্ট করে থাকেন। তিনি আমাদের স্তুতির দ্বারা (তুষ্ট হয়ে) আমাদের নিমিত্ত ধনেচ্ছু (অর্থাৎ আমাদের ধন প্রদানের নিমিত্ত ইচ্ছুক হয়ে) সম্যভাবে জ্বালিত হোন। আমাদের দ্বাৰা আহুত হয়ে এই অগ্নি প্রীত হোন এবং আমাদের প্রদত্ত এই আজ্য ভক্ষণ করুন (অস্মাদ্দত্তমিদমাজমশ্নাতু)। হে সোমদেব! আপনি সৎ-ভাবান্বিত জনের অনুষ্ঠিত কর্মসমূহের পালক (পতিয়সি)। আপনি দীপ্তিমান রাজা। অধিকন্তু আপন পাপঘাতী। আপনি মঙ্গলকর ফলপ্রদানের দ্বারা সকলের পক্ষেই মঙ্গলস্বরূপ, আপনি যজ্ঞের নিম্পাদনকর্তা। এমনই যে আপনি (সোম) এই আজ্য ভক্ষণ করুন। এই অগ্নিদেব পুরাতন জন্মের দ্বারা আপন দেহ শোধন করে থাকেন। এই অগ্নিদেব কবি অর্থাৎ পণ্ডিত; ইনি অপরের অভিপ্রায় জ্ঞাত হয়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। এমনই অগ্নিদেব আমাদের স্তুতির দ্বারা তুষ্ট হয়ে আমাদের দত্ত এই হবিঃ ভক্ষণ করুন। হে সোমদেব! বাক্যের তাৎপর্য বিষয়ে অভিজ্ঞ আমরা স্তুতিরূপা বাক্যের দ্বারা আপনাকে বর্ধিত করছি। আপনি সম্যকরূপে সুখ সম্পন্ন হয়ে আমাদের নিকট আগত হোন। এমনই সোমদেব আমাদের দত্ত এই হবিঃ ভক্ষণ করুন। যজমান ব্রাহ্মণের দ্বারা উচ্চারিত বা নিবেদিত অগ্নিদেব ও সোমদেবের প্রতি উদ্দিষ্ট এই দুটি মন্ত্র বা আজ্যভাগ যজ্ঞের চক্ষুস্বরূপ। যাঁরা এই আজ্যভাগের (তথা মন্ত্রের) দ্বারা যাগ নিষ্পন্ন করেন, তারা জ্ঞের চক্ষুদান করে থাকেন। লোকের যেমন মস্তকের সম্মুখ ভাগে (পূর্বর্ভাগে) চক্ষু থাকে, পশ্চাতে (পৃষ্ঠভাগে) নয়, তেমনই পূর্বার্ধে এই চক্ষুস্বরূপ যাগ করা বিধি। লোকের দুটি বাহু যেমন সমান হয়, সেইরকমই পরিমাণ-বৈষম্য নিবারণ করে উভয় আহুতির পংক্তিরূপত্বে সাম্য (সমতা বিধান করণীয়। দেবলোক উত্তর দিকে অবস্থিত (উত্তরদেশস্থঃ) এবং পিতৃলোক দক্ষিণ দিকে অবস্থিত (দক্ষিণদেশস্থঃ)। সেইভাবেই যজমান দেবলোক ও পিতৃলোককে দর্শন করে থাকেন। (অগ্নি ও সোম) এই দুই দেবতা দেবগণের রাজার ন্যায় পরিগণিত; সুতরাং দেবগণের মধ্যে যে দুজনকে প্রধান বলা হচ্ছে তাদের উদ্দেশে যাগ করণীয়। তাহলে রাজা কর্তৃক সেবক-ভৃত্য ইত্যাদির পরিপোষণের ন্যায় এই অগ্নি ও সোমও সকল দেবতার পোষক হন। এইভাবে দুইটি আজ্যভাগের নিরূপণ করে (ইস্থমাজ্যভাগে নিরূপ্য) সেগুলির যাজ্যানুবাক্যে উপরিতন অগ্নির প্রধান হবিঃ-র যাজ্যা ও অনুবাক্যের বিষয় ক্রমে কথিত হচ্ছে। কোন কোন ব্ৰহ্মবাদী ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করে থাকেন–যজমান কৃত সেই যজ্ঞাঙ্গ কিরকম বা তার নাম কি যার দ্বারা অধোভাগে (নিম্নদিকে) দন্তবিশিষ্ট গো ইত্যাদি পশু লাভ করা যায় এবং সেই যজ্ঞাঙ্গই বা কিরকম (অর্থাৎ তারই বা নাম কি) যার দ্বারা ঊর্ধ্ব ও অধঃ অর্থাৎ উভয় ভাগেই দন্তবিশিষ্ট অশ্ব ইত্যাদি পশু লাভ করা যায়? এর উত্তরে বিজ্ঞজনগণ বলে থাকেন–আজ্যভাগের হোমের সময়ে পুরোনুবাক্যরূপ কোনও ঋক্ পাঠপূর্বক যাজ্যারূপে জুষাণ ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা যাগ করতে হয়। তা হলে অধোভাস্থ সম্পূর্ণ ঋক্ পাঠের কারণে অধোভাগস্থ দন্তযুক্ত পশুসমূহ প্রাপ্ত হওয়া যায়।
আবার প্রধান অগ্নির হোমে পুরোনুবাক্যা ঋক্ পাঠ করে যাজ্যা ঋকের দ্বারাও যাগ করতে হয়। তাতে উধ্ব নিম্ন উভয় ঋক সম্পূর্ণ হওয়ার কারণে উভয়ভাগে (উপরে ও নিম্নে) দন্তযুক্ত অশ্ব ইত্যাদি পশু প্রাপ্ত হওয়া যায়। উভয় ঋমন্ত্র পূর্বেই ব্যাখ্যাত হয়েছে (তত্রাজ্যভাগবিষয়া পুরোনুবাক্যা যজুশ্চেত্যুভয়ং পূর্বমেবোক্তং ব্যাখ্যাতং চ)। আগ্নেয় যাগের যাজ্যানুবাক্যা সামান্য বিধায় বিশেষ আকারে বলা হচ্ছে–মূর্ধ-শব্দ সমন্বিত ঋকের দ্বারা (অর্থাৎ যে ঋকে মূর্ধ শব্দ আছে সেই মূর্ধন্বতী নামে অভিহিত ঋকের উচ্চারণে) যজমান সমশ্রেণীয়গণের মধ্যে উৎকৃষ্ট হয়ে থাকেন; আর নিযুত্বতী অর্থাৎ নিযুৎ-শব্দ সমন্বিত ঋকের দ্বারা শত্রুগণের পশুবগকে বিযযাজিত (বিযুক্ত) করা হয়ে থাকে। এই যাজ্যানুবাক্যা যুগলের অনেক রকমে প্রশংসা উপলক্ষে বলা হয়েছে–পুরাকালে দর্ভ নামক ঋষির একটি পুত্র ছিলেন, তার নাম কেশী; আবার সত্যকাম নামক ঋষির পুত্রের নামও ছিল কেশী। একদা সত্যকাম-পুত্র কেশী তার সহযোগী দৰ্ভ-পুত্র কেশীকে বলেছিলেন–হে দার্ভ! আগামী দিনে তোমার যজ্ঞে সপ্ত-পদরূপ শঙ্করী-ছন্দের প্রয়োগ করো। সেই ঋক অত্যন্ত বীর্যবতী অর্থাৎ ক্ষমতাশালী। (অগ্নিমূর্ধা ইত্যাদি ত্রিপাদ এবং ভুবো যজ্ঞশ্চ ইত্যাদি চতুঃপাদ; উভয়ে মিলিত হয়ে সপ্তপদা শঙ্করী হয়)। সেই শরীর সামর্থ্যের দ্বারা পূর্বে উৎপন্ন শত্রুসমূহ নিরাকৃত হয়, এবং জন্মের সম্ভাবনা যুক্ত অর্থাৎ যে শত্রু এখনও উৎপন্ন হয়নি (জনিষ্যমান), তার আর উৎপত্তি হয় না। এমন কি সেই (শরী) ছন্দের ক্ষমতাবলে পুরুষ ভূলোক ও স্বর্গলোকের (জ্যোতিঃ) উৎকর্ষ ধারণ করে। সেই শরীর ক্ষমতাবলে লাঙ্গল ও শকটবাহী বলীবদগণ তাকে প্রভুর ন্যায় সেবা (পালন করে। ক্ষীরপ্রদানকারী গাভীগণ যেভাবে প্রভুকে সেবিত (পালন) করে, শঙ্করীও সেইরকম (সেই যাজ্ঞিকের অধীন হয়)।–যাজ্যা ও অনুবাক্যার লক্ষণ প্রদর্শন করছেন–যে ঋকে মন্ত্রের প্রতিপাদ্য দেবতার নামধেয় পূর্বার্ধে চিহ্নরূপে (লক্ষ্ম) থাকে, তা পুরোনুবাক্যা; আর দেবতার নাম পরার্ধে (উত্তরার্ধে) থাকলে, তা যাজ্যা। যথা–অগ্নিমূর্ধা ইত্যাদি মন্ত্রে পুর্বার্ধে গ্নি-শব্দ থাকায় তা পুরোনুবাক্যা। অবার, জিহ্বামগ্নে চকৃষে হব্যবাহন ইত্যাদি মন্ত্রে উত্তরার্ধে অগ্নি-শব্দ (অর্থাৎ দেবতার নাম) উল্লেখিত থাকায় তা যাজ্যা। পূর্বাধগত দেবতার নাম-চিহ্নে (লক্ষ্ম) পূর্ব উৎপাদিত শত্রুগণের বিনাশ (নিরাকরণ) ও উত্তরার্ধগত নামের (লক্ষ্মণের) দ্বারা জনিষ্যমান শত্রুর জন্মে প্রতিবন্ধ ঘটে। পুরোনুবাক্যার দ্বারা এই লোকের উপরিভাগে অবস্থিত স্বর্গলোকের জ্যোতিঃ এবং যাজ্যার দ্বারা এই লোকস্থিত জ্যোতিঃ ধারণ করা যায়। এই উভয় বিষয় সম্পর্কে যাঁরা বিদিত হন, তারা উভয় লোক লাভ করে থাকেন এবং পূর্বে পরিব্যক্ত শকটবাহী বলীবদরে দ্বারা বহিত (পালিত) ও ক্ষীরপ্রদানকারী ধেনুর দ্বারা পালিত হওন-রূপ উপকার লভ করেন। আজ্য, আজ্যভাগ ও বষট্কার–এই তিনটিকে বজ্র নামে অভিহিত করা হয়। এই তিনটি আজ্যভাগ নামে আখ্যায়িত কর্মসূহে মিলিত হয়ে ত্রিগুণাত্মক বজ্র সম্পাদিত হয়। তার দ্বারা শত্রুর প্রহার করা হলে বষট্কারে বৈয় হয়, তার অর্থাৎ শত্রুর প্রহার হয় না। সেই নিমিত্তই বলা হচ্ছে–উচ্চধ্বনি করার নিমিত্তই বার। সেই ধ্বনিই শত্রুর প্রতি হিংসা কর্ম সম্পাদিত করে থাকে। গায়ত্রী (ছন্দ) পুরোনুবাক্যা; অগ্নিমূর্ধা-ই গায়ত্রী, এইটি ব্রাহ্মণের সাথে উৎপন্ন হওয়ার কারণে ব্রহ্মস্বরূপা। ত্রিষ্টুপ (ছন্দ) যাজ্য। ভুবো যজ্ঞস্য-ই ত্রিষ্টুপ। তা ক্ষত্রিয়ের সাথে উৎপন্ন হওয়ায় ক্ষত্রস্বরূপা। গায়ত্রী ও ত্রিষ্টুভের পৌবাপর্যানুসারে, অর্থাৎ ব্রাহ্মণের পরে ক্ষত্রিয়ের প্রবর্তন হওয়ার কারণে ব্রাহ্মণ মুখ্য হয়ে থাকেন (যস্মাব্রাহ্মণঃপূর্বং প্রবৃত্তস্তস্মান্মুখখ্যা ভবতি)। যিনি এইরকম জানেন, তিনিও মুখ্য হন।
পুরোনুবাক্যা পাঠের দ্বারা হবিঃ-র দাতা দেবতার সম্মুখে প্রকর্ষের সাথে কথিত হন। যাজ্যের দ্বারা তাঁকে পথের দ্বারা নিয়ে যাওয়া হয়। বষট্রারের দ্বারা দেবতাকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই তিনিটি মন্ত্র ক্রমে যজমানকে গ্রহণপূর্বক দেবতার নিকট প্রদান করে সেখানে (দেবতার সম্মুখে) উপবেশন করিয়ে দিয়ে থাকে। ত্রিপদা পুরোনুবাক্যা হয়; এই তিন পদের দ্বারা যজমান তিন লোকে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হন। চতুষ্পদা যাজ্যা হয়; এই চারি পদের দ্বারা যজমান চতুষ্পদ পশু লাভ করেন। দুই অক্ষরা বক্কার হয়। এই দুই অক্ষরের দ্বারা যজমান আপন দুইটি পদে স্থিরভাবে অবস্থান করেন এবং (মনুষ্য-প্রজারূপ দ্বিপদযুক্ত) পশু লাভ করেন। পূর্বে উক্ত সপ্তপদা শরীর সপ্তপাদের উদাহরণের গুণকীর্তন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে–গায়ত্রী পুরোনুবাক্যা, ত্রিষ্টুপ যাজ্যা এবং এই দুইয়ের যোগে সপ্তপদী হলো শঙ্করী। (যিনি এই বিষয়টি বিদিত হন, তিনি) এই শরীর দ্বারা আপন ইচ্ছানুযায়ী কার্যে সিদ্ধিপ্রাপ্ত হন ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন–তৃতীয়ানুবাকে প্রধানভৃত আগ্নেয় পুরোশোহভি ধাতব্য। অর্থাৎ–যাগে দুই দিনে নির্বপণীয় প্রধানভূত আগ্নেয় পুরোডাশের বিষয় কথিত হয়েছে]।
মর্মার্থ- (একদা) দেবতাগণের মধ্যে যজ্ঞসাধনের দ্রব্যসমূহ বিভাগ করে দিয়ে প্রজাপতি তার নিজের নিমিত্ত আজ্যদ্রব্য সংরক্ষিত করে রেখে দিয়েছিলেন (স্থাপিতবা)। তখন দেবতাগণ প্রজাপতিকে বললেন–আজ্যই হলো যজ্ঞ (অর্থাৎ যজ্ঞের নিমিত্তই আজ্যের নাম যজ্ঞ); যজ্ঞকর্মের যোগ্য সকল দ্রব্যের মধ্যে ঘৃত (আজ) সারবস্তু (ঘৃতস্যৈব সারাৎ)। সেই কারণে আমাদেরও এই আজ্যের কিছুটা ভাগ প্রদান করুন। তখন প্রজাপতি দেবতাগণকে বললেন-হে দেবগণ! আপনাদের উদ্দেশ্যে যাজ্ঞিকগণ আজ্যভাগদ্বয়ের দ্বারা যাগ করুন এবং প্রধান হবিঃ-প্রদানের পর অভিঘারণ (সিঞ্চিত) করুন। আজ্যভাগের যাগ আজ্যের দ্বারা করতে হয় (আজ্যভাগাবাজ্যেন যজেয়ুঃ)। পুরোডাশ, চরু ইত্যাদি হবিঃ দুই বা তিন দিনেই গতসার (বিনষ্ট) হয়ে যায়; কিন্তু আজ্য সোর (অবিনষ্ট) থাকে, তার স্বাদও নষ্ট হয় না (ন তু স্বাদিমানং পরিত্যজতি)। এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসু হয়ে ব্রহ্মবাদীবর্গ পরস্পর প্রশ্ন করতে থাকলে কোন একজন বুদ্ধিমান ব্ৰহ্মবাদী বললেন যে, এই আজ্য প্রজাপতিরই। এই কারণেই এই বস্তু যতাযথ (সারবা) থাকে। ইন্দ্র, অগ্নি ইত্যাদি দেবতাগণ কল্পে কল্পে বিনশ্বরতা প্রাপ্ত হন, কিন্তু প্রজাপতি তাঁর জগদীশ্বরত্বের প্রভাবে তাদের পুনঃ পুনঃ বিনাশ ও সৃষ্টি পূর্বক নিজে যথাপূর্ব বিরাজমান থাকেন (অর্থাৎ তিনি অবনিশ্বর), এই কারণে তাঁর আজ্যও সর্বদা সারবান্ অর্থাৎ অসারত্বহীন হয়ে থাকে। পুরোনুবাক্যা ইত্যাদি মন্ত্রের মধ্যগত গায়ত্রী ইত্যাদি ছন্দ সমূহ হবির্ভাগী দেবগণের নিকট হতে বিমুখ হয়ে আমরা ভাগরহিত হওয়ার কারণে আপনাদের হব্যসমূহ বহন করব না–এই বলে নির্গত হয়ে যাচ্ছিলেন। এই ছন্দ-শব্দের দ্বারা তাদের অভিমানী দেবতা বোঝাচ্ছে। অতঃপর হবির্ভাগী দেববর্গ সেই ছন্দ-অভিমানী দেবতাগণকে ভাগ প্রদান করেন। এই স্থলে পুরোনুবাক্যো ইত্যাদি শব্দে অভিধেয় হয়েছেন ছন্দের অভিমানী দেবতাগণ, এবং আহুতির আধারভূত অগ্নি ইত্যাদি দেবতাগণ। সেই জন্যই যেমন আহুতির আধারভূত দেবতাগণকে, তেমনই ছন্দের অভিমানী দেবতাগণকেও তাদের প্রীতির নিমিত্ত যাগ কর্তব্য। তাতে প্রীত হয়ে ছন্দের অভিমানী দেবগণ হবির্ভাগী দেবতাগণের উদ্দেশে নিবেদিত হবিঃ বহন করবেন। (একদা) অঙ্গিরা নামক ঋষিগণ ভূলোক হতে নির্গত হয়ে স্বর্গলোকে গমন করেন। সেখানে সেই ঋষিগণ স্বর্গের যজ্ঞভূমিতে সমাগত হয়ে দেখলেন যে, পুরোডাশ অভিমানী দেবতা আপন শরীরকে অন্তর্হিত করে কূর্মশরীর ধারণ করে প্রকৃষ্টরূপে পলায়ন করছেন (কুর্মশরীরী ভূত্বা প্রকর্ষেণ পলায়ত)। তাকে দর্শন করে ঋষিগণ বললেন-ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতার উদ্দেশে তোমাকে প্রদান করব। এই কথাতেও পুরোডাশ-অভিমানী দেবতার পলায়ননিবৃত্তি হলো না।–অগ্নির উদ্দেশে তোমাকে প্রদান করব–এই কথা বলার ফলে সেই পুরোডাশ-অভিমানী দেবতা স্থিতবা হলেন, অর্থাৎ পলায়ন স্থগিত করলেন। এই নিমিত্ত দিনদ্বয়ে অর্থাৎ দুই দিনে অগ্নির উদ্দেশে অষ্ট কপাল পুরোডাশ নির্বপণ করতে হয়। তাতে স্বর্গ জয় হয়ে থাকে (স্বর্গাভিজয়ে ভবতীতি)। ঋষিগণ অতঃপর পুরোশকে জিজ্ঞাসা করলেন –কোন্ হেতুতে তুমি এই যজ্ঞভূমি পরিত্যাগ করছ? তবে পুরোডাশ বলল-আমি অঞ্জনের দ্বারা অলঙ্করণরহিত হয়ে আছি, সেই নিমিত্তই ত্যাগ করে গমন করছি (তস্মাত্তাবনস্মি)। লোকে যেমন শকটের চক্র (তৈল ইত্যাদি) মিশ্রণরহিত করে রাখলে তা বিনষ্ট হয়ে যায়, সেইরকমই আমিও অঞ্জন-রহিত হওয়ার কারণে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছি। এই নিমিত্ত পুরোশের উপরে ও নীচে ঘৃতসিক্ত করণীয় (আজ্যেনালং কুর্যাৎ)। তার দ্বারা স্বর্গের সম্যক ব্যাপ্তি হয়ে থাকে। যতগুলি কপাল স্থাপিত হবে, তার সবগুলিই প্রসারের কারণ হয়; অর্থাৎ স্থাপিত কপালের সংখ্যানুসারে পুরোডাশ নির্বাপণের দ্বারা স্বৰ্গমুখ প্রসারিত করা হয়। বিকৃতভাবে (অর্থাৎ আংশিক) দগ্ধ বা পক্ক দ্রব্য রাক্ষসগণের প্রিয়; অপক্ক (অর্থাৎ পাক না করা) দ্রব্য রুদ্রের প্রিয়, এবং সুষ্ঠুভাবে (অর্থাৎ সম্পূর্ণতঃ) পাক করা দ্রব্য দেবতাগণের প্রিয়। সেই নিমিত্ত সম্যভাবে পক পুরোডাশ দেবগণের প্রীতির নিমিত্ত প্রদান করা কর্তব্য। পাক করা কঠিন পুরোডাশের উপরে ভস্মের দ্বারা আচ্ছাদন করা হলে তা মাংসচ্ছাদনের মতো হয়। আচ্ছাদনকালে বেদগত দৰ্ভনাড়ীর সংস্পর্শের দ্বারা কেশচ্ছন্ন মস্তকের মতো হয় (কেশচ্ছন্নং শির ইব ভবতি)। মন্ত্রের দ্বারা হবিঃ পাক করা হলে এই লোক হতে প্রচ্যুতি ঘটে; অভিঘারণের অভাবে শাস্ত্রায়ত্ব অর্থাৎ সম্পূর্ণ না হওয়ার কারণে স্বর্গপ্রাপ্তি হয় না।
সেই নিমিত্ত শাস্ত্রীয় মতে আজ্যের দ্বারা অভিঘারণ করে পরে উদ্বাসন (বিসর্জন) করণীয়; তা হলে তা দেবতাগণের প্রাপিত (ভোগ্য) হয়। কপালসমূহের উদ্বাসন কালে, গণনা করা উচিত; কারণ একটি বা দুটি কপাল নষ্ট হলে সম্বৎসরের মধ্যে যজমানের মৃত্যু হয়; সুতরাং যজমানের রক্ষার নিমিত্ত কপাল-গণনা কর্তব্য। প্রমাদ ইত্যাদির কারণে যদি কপাল বিনষ্ট হয়ে থাকে, তবে তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত কর্তব্য। তখন অশ্বিদ্বয়ের উদ্দেশে দুটি কপাল ও দ্বিকপাল দ্যাবাপৃথিবীর নিমিত্ত এক কপাল হবিঃ নির্বপণ করতে হবে। অশ্বিদ্বয় হলেন দেবগণের ভিষজ অর্থাৎ চিকিৎসক, তাঁরা দেবগণকে ভেষজ দান করেন অর্থাৎ তাদের চিকিৎসা করে থাকেন। এইভাবে (এই প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা) কপাল-বিনষ্টি-জনিত দোষের ক্ষালন হয় এবং যজমান প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকেন৷৩৷৷
মর্মার্থ- দেবস্য ত্বা সবিতুঃ অর্থাৎ সবিতা দেবতার প্রেরণায় ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা স্ক্য (খঙ্গের ন্যায় আকৃতি বিশিষ্ট খাদির কাষ্ঠনির্মিত মৃত্তিকা খননের নিমিত্ত যজ্ঞীয় অস্ত্রবিশেষ) গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর অশ্বিনোর্বাহুভ্যাম্ অর্থাৎ অশ্বিযুগলের বাহুদ্বয়ের দ্বারা ইত্যাদি এবং পুষ্ণো হস্তাভ্যাম অর্থাৎ পুষাদেবতার হস্তদ্বয়ের দ্বারা ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করতে হবে। অশ্বিযুগল হলেন দেবতাবর্গের অধ্বর্য। অতঃপর নিম্নোক্ত মন্ত্র পঠনীয়–হে স্ক্য! তুমি শতসংখ্যক শত্রুর সন্তাপরূপ পাকবিশেষ (স্ক্য নামক অস্ত্রের দ্বারা যেন শত্রুগণকে জলসেক ব্যতীত অগ্নিতে পাক করা হয়ে থাকে), বনস্পতির বিকার, বিদ্বেষকারী শত্রুগণের বধের হেতুভূত (বধহেতুরসি)। এই মন্ত্রের দ্বারা শত্রুর প্রতি প্রহারের নিমিত্ত বজ্রকে সম্যভাবে তীক্ষ্ণ (শাণিত) করতে হয়। তারপর স্তম্বযজুঃ ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা বেদিস্থানে স্থাপিত দর্ভ ছেদন করে পাংশুর সাথে নিক্ষেপ করতে হবে। এর দ্বারা (অর্থাৎ স্তম্বযজুরণের দ্বারা) শত্রুগণকেও নিঃসারিত (অর্থাৎ নিক্ষিপ্ত) করা হয়ে থাকে। এই মন্ত্র তিনবার আবৃত্তির দ্বারা তিন লোক হতে শত্রুগণকে দূর করা হয়, চতুর্থ বার আবৃত্তির দ্বারা লোকত্রয় বহির্ভূত অপর সকল স্থান হতেই তাদের নিঃসারণ করা যায়। তারপর বেদিস্থানে স্থিত উপরের দিকের মৃত্তিকা অপসারিত করতে হবে; কারণ ঐ মৃত্তিকা উচ্ছিষ্ট ইত্যাদির সংস্পর্শের সম্ভাবনায় অমেধ্যও (অযজ্ঞিয় বা অপবিত্র) হতে পারে। এর ফলে ওষধি সহ উদ্দত (অবাঞ্ছিত) তৃণ ইত্যাদিও ত্যক্ত বা বিনষ্ট হয়। অতঃপর ওষধির যে মূলগুলি পুনরায় প্ররোহিত (অঙ্কুরিত) করার নিমিত্ত ভূমিতে রক্ষিত থাকে, সেগুলির ছেদন বিহিত। সেই মূলসমূহের ছেদনে শত্রুগণের মূলোচ্ছেদ (সমূলে বিনাশ) সাধিত হয়ে থাকে। তার পর যজমানের চিবুক (থুতনি) হতে মুখ পর্যন্ত যতটুকু পরিমাণ, সেই পরিমিত খনন বিধি। যতটুকু খননের ফলে ভূমি দৃঢ় হয়, ততটুকু পর্যন্ত খননের দ্বারা যজমানের প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তি হয় (যজমানঃ প্রতিষ্ঠাং প্রাপিত ভবতি)। দক্ষিণভাগ উন্নত করলে দেব-যজনের রূপ হয়; দক্ষিণভাগের নিম্নত্বে পিতৃ-যজনের রূপ হয়। যে ভূমিতে প্রজা ও পশুর সঞ্চার বাহুল্য আছে, তা পুরীষতুল্য (অর্থাৎ প্রজা ও পশুর বিষ্ঠায় আকীর্ণ) হয়। বেদি নির্মাণের পূর্বে বসবত্ত্ব ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা বেদির সীমা নির্দেশ পরিগ্রহ কর্তব্য। নির্মাণের পরে অমৃতমসী ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা উত্তর পরিগ্রহ কর্তব্য। পূর্ব পরিগ্রহের দ্বারা বেদি-মর্যাদা সিদ্ধ করতে হয়। খননের ফলে নিম্ন বা উন্নত হয়ে গেলে বেদি ক্রুর (ক্ষতিকারক) হয়, সমীকরণে (সমান হলে) তার দ্বারা শান্তি লাভ হয়। (সমীকরণেন তচ্ছান্তিৰ্ভবতি)। অতঃপর হে বেদে ধা অসি… ইত্যাদি অর্থাৎ হে বেদি! তুমি ধারক (অর্থাৎ তোমার স্বরূপ বৰ্হি বা যজ্ঞ ইত্যাদির ধারক), তোমার উপরে কুশ ইত্যাদি রক্ষিত করা হবে। এই মন্ত্রের পরে জল ইত্যাদির দ্বারা বেদির প্রোক্ষণ (সেচন) কর্তব্য; তার ফলে রাক্ষসগণ অপহত (বিনাশপ্রাপ্ত) হয় এবং যজ্ঞের বিস্তৃতি হবে ॥৪॥
[সায়ণাচার্য বলেন–পঞ্চমে তস্যাং বেদাং বহির্বিষয় প্রয়োগহভিধীয়তে। অর্থাৎ-পূর্ব অনুবাকে যে বেদি-নির্মাণের বিষয় বিস্তৃত কথিত হয়েছে, এই অনুবাকে সেই বেদির উপরিস্থিত দ্রব্যাদি সম্পর্কে উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ–জিজ্ঞাসু ব্ৰহ্মবাদীগণ অধ্বর্যকে উদ্দেশ করে বললেন, হে অধ্বর্য! আপনি জলের দ্বারা হবিঃ প্রেক্ষণ করে থাকেন, কিন্তু অন্য কিসের দ্বারা জলকে শোধিত করেন? এর উত্তরে ব্রাহ্মণ অধ্বর্য বললেন, মন্ত্রের দ্বারা। (হবিঃ ও জল এই উভয়ের যেমন যেমন পোণ, তেমনই করণীয়; অর্থাৎ মন্ত্রের দ্বারা জলকে শুদ্ধ করে নিয়ে সেই জলের দ্বারা হরির শুদ্ধি কর্তব্য)। এইভাবে কাষ্ঠ, কুশ ইত্যাদি ইন্ধন সামগ্রীর পোক্ষণের পরে বেদির পোক্ষণ কর্তব্য। দিবে ত্বাহন্তরিক্ষায় ত্বা পৃথিব্যৈ ত্বা.. অর্থ্যাৎ দ্যুলোক, অন্তরিক্ষলোক ও ভুলোকের নিমিত্ত আমি তোমাকে প্রেক্ষিত করছি ইত্যাদি (মকাণ্ডে ব্যাখ্যাত) মন্ত্রের দ্বারা কুশ গ্রহণ করে বেদির প্রোক্ষণ করণীয়। লোমরহিত পুরুষ পোণ-কর্মের উপযুক্ত নন, কারণ এমন পুরুষ যাগযোগ্য হন না। বেদির পূর্বভাগে ব্রহ্মা (ঋত্বিবিশেষ) কিংবা যজমান প্রস্তর ধারণ করবেন। কুশতৃণ বিস্তৃত করে বেদির আস্তরণ করণীয়। প্রজা হলো বৰ্হি সদৃশ,পৃথিবী হলো বেদি সদৃশ। এর দ্বারা প্রজাগণ পৃথিবীতে প্রতিস্থাপিত হয়ে থাকে। অনতিদৃশ্ন অর্থাৎ অতিরিক্তভাবে যাতে ভূমি দৃশ্যমান না হয়, সেইভাবে বেদির আস্তরণ করণীয়; তাতে চতুর্দিক হতে প্রজা ও পশুগণের দ্বারা বেষ্টিত যজমানকে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে না। আস্তীর্ণ কুশের উপরে প্রস্তর স্থাপন করতে হবে। প্রজা হলো বৰ্হি-সদৃশ এবং যজমান হলেন প্রস্তর-সদৃশ। আস্তীর্ণ কুশ অধঃস্থিত হওয়ার কারণে তার প্রজাত্ব (অর্থাৎ প্রজাতুল্য) এবং প্রস্তর প্রধানভূত হওয়ার কারণে তার যজমানত্ব (অর্থাৎ যজমানতুল্য)। বেদিতে আস্তীর্ণ বহির (অর্থাৎ কুশের) উপরে স্থাপিত প্রস্তরের মধ্যভাগে দুটি কুশ তির্যকভাবে স্থাপনা করে ব্যবধান রক্ষা করা বিধি। তারপর প্রস্তরকে ঘৃতের দ্বারা অঞ্জনিত (সিক্ত করে স্বর্গপ্রাপ্তির যোগ্য করা হয়। ত্রিলোকের স্মরণে প্রস্তরকে তিনবার ঘৃত-সিঞ্চিত করনীয়।
ঊর্ধ্ব দিক হতে অগ্নির উপরে প্রস্তরের আঘাত করা কর্তব্য; তার ফলে যজমানের স্বর্গলোকের উপরে স্থান হয়। প্রস্তরযুক্ত হস্তের, অধোমুখত্ব বিধি (অর্থাৎ যে হস্তে প্রস্তর ধারণ করা হবে, সেটি নিম্নের দিকে রক্ষণীয়)। তাতে যজমানের নিমিত্ত বৃষ্টি ন্যভূত অর্থাৎ নিম্নভিমুখী হবে। প্রস্তরের দ্বারা অতিরিক্তভাবে আঘাত বা প্রহার করা উচিত নয়, কারণ যত অধিক আঘাত করা হবে, তত অধিক বৃষ্টিপাতের ফলে শস্যহানি এবং অধ্বর্যর বিনাশের সম্ভাবনা থাকে। (অতিবৃষ্টির ফলে শস্যহানিজনিত কারণে অধ্বর্যর সর্বনাশ, অথবা ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অধ্বর্যর বিনাশ–এই কথাই এখানে ব্যক্ত হয়েছে)। এই জন্যই প্রস্তরাগ্রের আহবনীয় অতিক্রম নিষিদ্ধ (প্রস্তরাগ্রস্যাহহবনীয়াতিক্রমং নিষেধতি)। পশ্চিম দিকে মুখ করে প্রস্তরের আঘাত করা নিষিদ্ধ; কারণ তার ফলে যজমান স্বর্গলোক হতে প্রত্যাবৃত্ত হবে (প্রতিনুদেৎ)। সেই নিমিত্ত পূর্বাভিমুখী হয়ে প্রহার কর্তব্য, যাতে যজমানের স্বর্গলোকে গমন সুনিশ্চিত হয়। প্রস্তরগত দর্ভের অগ্রভাগ সর্বতো অর্থাৎ নানাদিকে বিশ্লেষ অর্থাৎ পৃথক বা বিযুক্তকরণ অকর্তব্য; কারণ তার ফলে যজমানের স্বপত্য অর্থাৎ কন্যাসন্তান জন্মে। দর্ভের অগ্রভাগগুলি সমূহরূপে অর্থাৎ একত্রে গুচ্ছ করে রাখতে হবে; তার ফলে যজমানের পুত্রসন্তান জন্মে (পুমানবে জায়তে)। দৰ্ভগুলি হস্তের দ্বারা একীকৃত অর্থাৎ গুচ্ছ করলে তা যজমানের পক্ষে রক্ষার কারণ হবে; কিন্তু স্ক্যা-দ্বারা গুচ্ছবদ্ধ করলে তা যজমানের হিংসার কারণ হবে। যজমান যজ্ঞের কোন স্থানীয় ব্রহ্মবাদীগণ কর্তৃক এইরকম জিজ্ঞাসিত হলে বুদ্ধিমান ব্যক্তির উত্তর হবে–প্রস্তরস্থানীয়। আহবনীয়ে প্রস্তরের প্রহার করা হয়, সেই নিমিত্ত যজমান স্বর্গলোকে গমন করেন; এতএব যজমান যজ্ঞের প্রস্তরস্থানীয় ॥৫
[সায়ণাচার্য বলেন–ষষ্ঠেহনুবাক উপাংশুজস্বিষ্টকৃতৌ বক্তব্যৌ। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২৪ ে উপাংশু ও স্বিষ্টকৃৎ–এই দুটি যাগের বিষয় কথিত হয়েছে ]
মর্মার্থ- অগ্নিদেবতার তিনজন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন। তারা দেবতাবর্গের নিমিত্ত হবিঃ বহন করতে করতে মারা গিয়েছিলেন। অগ্নি ভাবলেন, যে হবিঃ বহন করবে সে-ই মরণপ্রাপ্ত হবে– এমন ভেবে অগ্নি ভীত হয়ে জলের মধ্যে প্রবেশ করে লুকিয়ে পড়লেন। দেবগণ প্রকৃষ্টভাবে অগ্নির সন্ধান করতে থাকলে মৎস্য জলের মধ্যে অবস্থানকারী অগ্নির কথা দেবগণের নিকট প্রকাশ করে দিয়েছিল। সেই কারণে অগ্নি সেই মৎস্যকে এইরকম অভিশাপ দিলেন, হে মৎস্য! তুমি যেমন হিংসাভাবান্বিত হয়ে দেবগণের সম্মুখে আমার সংগুপ্তির কথা জ্ঞাপন করেছ, সেই ভাবে জালধারী কৈবর্তগণ বুদ্ধিকৌশলে অম্বেষণ করে জাল ইত্যাদির দ্বারা তোমার বন্ধনপ্রাপ্তি ঘটাবে এবং তোমাকে হত্যা করবে। অতঃপর মৎস্যের মুখ-হতে অগ্নির অবস্থান সম্পর্কে বিজ্ঞাত হয়ে দেবগণ অগ্নির নিকটে গমনপূর্বক তাকে বললেন, হে অগ্নি! আপনি আমাদের সমীপে সমাগত হোন এবং আমাদের হবিঃ বহন করুন। তখন অগ্নিদেব তাঁদের নিকট বর প্রার্থনা করলেন, তাহলে হবিঃ-সম্বন্ধি যে দ্রব্য (আজ্যা) হোমের পূর্বে সুক্ (ঘৃত প্রক্ষেপণের পাত্র) হতে পরিধির বহির্ভাগে পতিত হবে, তা আমার (মৃত) ভ্রাতৃগণের প্রাপ্তিযোগ্য হোক। দেবগণ তাঁকে সেই বর প্রদান করলেন। এর ফলে হোমে প্রক্ষেপণ কালে যে হবিঃ পরিধির বহির্ভাগে পতিত হয় (অর্থাৎ ক্ষরিত হয়ে পড়ে), তার দ্বারা যজমান অগ্নির ভ্রাতৃগণকে প্রীত করে থাকেন (তেন স্কনেন তানগ্নি ভ্রাতৃন) যজমানঃ প্রীণয়তি)। পরিধির বহির্দেশে অগ্নির ভ্রাতৃগণের উপযুক্ত স্থান নির্ধারিত হওয়ার নিমিত্ত তা রাক্ষসগণের অপঘাতের (অপকৃষ্ট মরণের) কারণ হয়। পশ্চিম দিকে স্থাপিত মধ্যম পরিধিকে দক্ষিণ ও উত্তর পরিধির দ্বারা সংস্পৰ্শন বিধি। তার ফলে রাক্ষসগণ যজ্ঞকেন্দ্রে অর্থাৎ হোমক্ষেত্রে প্রবেশের কোন ছিদ্র প্রাপ্ত হয় না; সুতরাং অগ্নির সমীপে সঞ্চরণ করতে পারে না। (ছিদ্রাভাবাদগ্নিসমীপে সংচারো ন ভবতি)।
উত্তর দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক ব্যতীত পূবদিকে পরিধির প্রয়োজন হয় না; কারণ সেই দিকে আদিত্য উদয়ের দ্বারাই রাক্ষসগণকে বিতাড়িত করে থাকেন; অর্থাৎ রাক্ষসগণের অপঘাতের জন্যই পরিধির যে প্রয়োজন, পূর্বদিকে সেই কর্মটি আদিত্যের দ্বারাই সিদ্ধ হয়। দক্ষিণোত্তর পরিধির অগ্রদেশে (উপরের দিকে) দুটি সমিধ স্থাপন করা কর্তব্য; তার ফলে চারটি দিক থেকে রক্ষার মতো উধ্ব দিক হতেও রাক্ষসগণের অপঘাত হয়। দক্ষিণে সমিধ স্থাপন কালে মন্ত্রকাণ্ডে কথিত বীতিহোত্রং ত্বা কব ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করণীয়। হবির ক্ষরণে যজ্ঞের বিনাশ হয়, তার দ্বারা যজমান বিনাশাভিমুখী (বিনাশপ্রাপ্তির সম্ভাবনাযুক্ত) হন; তা পরিহারের দ্বারা যজমান কি ভাবে অনেক ধনবান (বসুমত্তর) হবেন-এর উত্তরস্বরূপ বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলেন–যজ্ঞের আহরণকর্তা ভূপতয়ে স্বাহা ভুবনপতয়ে স্বাহা ভূতানাং পতয়ে স্বাহা এই তিনটি মন্ত্র পাঠ করবেন। ভূপতি ইত্যাদি অগ্নির ভ্রাতারূপী দেবতাবিশেষ তাদের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রের দ্বারা হবিদত্ত হওয়ার নিমিত্ত যজ্ঞেরও আর্তি (বিপত্তি) বিনাশ করেন; ফলে যজমান ধনপ্রাপ্ত হন। আগ্নেয় যজ্ঞে অগ্নিও সোমের উদ্দেশে পুরাডাশ নির্বপণের ক্ষেত্রে অবনুক্রমগত কারণে যজ্ঞের জাম্যালস্য (জামি অর্থাৎ পুত্রবধু, ভগিনী, দুহিতা ইত্যাদি সম্পর্কিত অনুভাব) ঘটতে পারে; অতএব তথাকোথিত অলিস্য পরিহারের নিমিত্ত সেই পুরোশের মধ্যে উপাংশু যাগ কর্তব্য। পুরোডাশ দ্রব্যের একটি যাগ, এবং আজ্য দ্রব্যের অপর যাগ, এই উভয়ের মিথুনত্ব হয়ে থাকে। (অর্থাৎ পুত্র-পুত্রবধু, ভগিনী-ভগ্নীপতি, দুহিতা-জামাতা ইত্যাদি প্রাপ্তি সম্ভবিত হয়ে থাকে)। অতঃপর স্বিষ্টকৃতের বিষয় সম্পর্কে বলা হচ্ছে–(স্বিষ্টকৃতং বিধত্তে)–পুরাকালে কোনও সময়ে অগ্নি স্বর্গে ছিলেন, যম ছিলেন ভূলোকে। এর ফলে (অর্থাৎ ভুলোকে অগ্নির অনুপস্থিতির কারণে) মনুষ্যগণ পাক (রন্ধন) ইত্যাদি কার্য সম্পন্ন করতে পারত না। (সুতরাং হোমের অভাবে) পিতৃগণের পক্ষে রাজা হওয়া সম্ভব হতো না। এর পরিবর্তন সাধনে ইচ্ছুক দেবগণ অগ্নি ও যমকে পরস্পর আহ্বান করে উৎকোচ দানের দ্বারা প্রলোভিত করলেন। তারা অন্ন ইত্যাদি প্রাপ্তিরূপ উৎকোচের দ্বারা অগ্নিকে পৃথিবীতে গমনের এবং পিতৃগণের রাজ্য প্রাপ্তিরূপ উৎকোচের দ্বারা যমকে স্বর্গে গমনের জন্য প্রলুব্ধ করলেন। ফলে ভুলোকে আগত অগ্নি সকল দেবগণের মধ্যে বহু অন্নের ভক্ষক হলেন, এবং যম পিতৃগণের রাজা হলেন। এই উভয় বিষয় যিনি জ্ঞাত হন, তিনি প্রকৃষ্ট রাজ্য ও অন্ন ইত্যাদি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। অতঃপর দেবগণ অগ্নিকে যজ্ঞভাগ দান করলেন। কোন্ ভাগ? না, যজমান স্বিষ্টকৃৎ অগ্নির উদ্দেশে যে হবিঃ প্রদান করেন সেই হলো অগ্নির ভাগ। সেই হতে অগ্নি স্পিষ্টকৃৎ হবিঃ প্রদত্ত হয়ে থাকেন। এই ভাগপ্রদানের দ্বারা রুদ্রভাবাপন্ন ক্রুর অগ্নিকে সমৃদ্ধ করা হয়ে থাকে। ঈশান দিক (উত্তর-পূর্ব কোণের দিক) হলো রুদ্রের দিক। সেই নিমিত্ত উত্তরার্ধ (অর্থাৎ না পূর্ণ উত্তর, না পূর্ণ পূর্ব) হতে হবিঃ প্রদান করলে রুদ্রের তুষ্টি বিধান করা হয়। পূর্বে পুরোডাশ ইত্যাদি আহুতিসমূহ ছিল পশুস্বরূপ অর্থাৎ পশুবৎ অভীষ্টদায়ক (পশুবদিষ্টার্থপ্রাপকত্বাৎ)। এই অগ্নি কূরত্বের কারণে রুদ্রস্বরূপ, সুতরাং যদি পূর্বে তাদের উদ্দেশে আহুতি প্রদান করা হতো, তাহলে তা সকল পশুর ঘাতক রুদ্রের অধিকার ভুক্ত হতো। তাতে যজমান পশুহীন হয়ে পড়তেন। এই নিমিত্ত পুর্বের আহুতি পরিত্যাগ করে দুরে (অর্থাৎ নিকটকালে নয়, পরে) হোম কর্তব্য; এমন হোম পশুগণের সংরক্ষণ করে থাকে ॥৬৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–অস্মিন্ সপ্তমানুবাক ইড়োপানবিধিস্তন্মত্রব্যাখ্যানং চ প্রস্তুয়তে। অর্থাৎ এই অনুবাক-২৪ ে ইড়ার উপানবিধি ও মন্ত্রসমূহের ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।]
মর্মার্থ- পুরাকালে কোনও সময়ে ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু পৃথিবীতে যজ্ঞের নিমিত্ত কি কি দ্রব্যের অস্তিত্ব আছে, তার অন্বেষণে সর্বত্র ঘুরতে ঘুরতে সেখানে গো-পাদাঙ্কিত ভূপ্রদেশে নিষিক্ত (সিক্ত বা ক্ষরিত) ঘৃত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। (অর্থাৎ গরুর পায়ের চাপে মাটিতে গঠিত গর্তে দুগ্ধ ঘৃত দেখতে পেয়েছিলেন)। তা প্রাপ্ত হয়ে তিনি দেবতাগণের উদ্দেশে এইরকম বললেন, এই গো-পাদে স্থিত ঘৃতের স্বরূপ উপযুক্ত লৌকিক পাত্র কে (প্রস্তুত) করতে সমর্থ? এই কথা শ্রবণ পূর্বক সেখানে উপস্থিত বরুণদ্বয় (অর্থাৎ মিত্র ও বরুণ দেবতাদ্বয়) বললেন, গাভীর কার্যভূত ঘৃতের কি প্রয়োজন? তার কারণভূত গাভীকেই যজ্ঞের অঙ্গরূপে উপযুক্ত করে দিতে আমরা সমর্থ। এই কথা বলে তারা দুজন ঊর্ধ্ব হতে ইরূপা গাভীকে সমভূমিতে আনয়ন করলেন। সেই গাভী ভূমিতে যেখানে যেখানে পাদ-প্রক্ষেপ করতো সেখানে সেখানে সেই গো-পাদাঙ্কিত ভূ-প্রদেশে ঘৃত নিপীড়িত (নিড়ন) হতো। যে স্থানে তার পাদ হতে ঘৃত নির্গত হতো, সেই স্থান বা সেই ভূমি ঘৃতপদী নামে প্রসিদ্ধি হয়। এইরকমে যজ্ঞভূমিতে ইড়ার জন্ম সম্পন্ন হয়। এবার মন্ত্র বলা হচ্ছে রথন্তরং সাম তৎপৃথিব্যা সহ ময়োপহৃতং সমীপে যথা তিষ্ঠতি তথাইহ্বানং কৃতম্ (পৃথিবীর সাথে রথন্তর সামকে আমার হোমের নিকট অবস্থান করতে আহ্বান করি)–এই মন্ত্রের মধ্যগত রথন্তর শব্দের দ্বারা ভূমি উপলক্ষিত হচ্ছে; পৃথিবী শব্দের দ্বারা তার কার্য অন্ন ইত্যাদিকে উপলক্ষ্য করা হয়েছে। অতএব অন্ন ইত্যাদির সাথে ভূমিকে আহ্বান করছি মন্ত্রবাক্যের এই অর্থই বোধিতব্য। উপহুতং বামদেব্যং… অর্থাৎ অন্তরিক্ষের সাথে বামদেব্যকে আহ্বান করছি-ইত্যাদি মন্ত্রে সামবিশেষবাচী বামদেব্য শব্দের দ্বারা সেই সামসাধ্য পশুকে উপলক্ষ্য করা হয়েছে (পশব উপলক্ষ্যন্তে)। ইরা শব্দের দ্বারা যে মন্ত্রে বৃষ্টিকে উপলক্ষ্য করা হয়েছে, সেই মন্ত্র যথা–উপহতং দিবেত্যাহৈরং. অর্থাৎ দিবলোকের সাথে বৃহৎ ইরাকে আহ্বান করছি ইত্যাদি। বৃহসাম হতে বৃষ্টি হয়, সেই নিমিত্ত তার সম্বন্ধি বৃহৎসামকে ইরা শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। উপহৃতাঃ সপ্ত হোত্রা…ইত্যাদি মন্ত্রের সাতজন হোতা হলেন–হোতা, প্রশাস্তা, ব্রাহ্মণচ্ছংসী, পোতা, নেষ্টা, অগ্নী ও অচ্ছাবাক। উপহৃতা ধেনু… অর্থাৎ ঋষভের সাথে ধেনুকে আহ্বান করছি। ইত্যাদি মন্ত্রে– মিথুনের আহ্বান সুচিত হয়েছে। উপহুতো ভক্ষঃ সখা ইত্যাদি মন্ত্রে সখা শব্দে স্ব-উপকারক। সোমপানকে উপলক্ষ্য করা হয়েছে। উপহৃতাং হো ইত্যাদি মন্ত্রে হো শব্দপ্রযুক্ত স্বরূপবাচী অর্থাৎ আপনাকে আহ্বান করা হয়েছে (স্বরূপবাচীত্যেতদ্দর্শয়তি)। আত্মায়ূপহূতানাং বসিষ্ঠ-এর অর্থে আত্মার আহ্বানের প্রয়োজন দেখানো হয়েছে। ইড়ামুপহুয়তে পশবো…অর্থাৎ ইড়ার আহ্বান করছি ইত্যাদি মন্ত্রে ইড়া শব্দের দ্বারা গো-শরীরধারিণী দেবতাকে বলা হয়েছে। তার উপাহ্বান ইড়া উপহুতা ইত্যাদি বাক্যের দ্বারা করণীয়। ইড়ার পশুরূপত্বের নিমিত্ত তার আহ্বানের দ্বারা পশু-প্রাপ্তি হয়ে থাকে। পশুগণের চতুষ্পদত্বের নিমিত্ত মন্ত্রের আরোহ অবরোহ ইত্যাদি ক্রমে আবৃত্তির দ্বারা চারবার আহ্বান সম্পন্ন করতে হবে। মানবীত্যাহ মনুৰ্হেতামগ্রে.. অর্থাৎ মনু পৃথিবী হতে যজ্ঞিয় দ্রব্য অন্বেষণ করেছিলেন–ইত্যাদি উপাখ্যানে মিত্র ও বরুণ ইড়াকে আনয়ন করেছিলেন, তা কথিত হয়েছে। পুরাকালে দেবতাগণের দ্বারা নিম্পাদিত ইড়ার আহ্বানরূপ যে কর্ম-সামর্থ্যে ব্রহ্মের আহ্বান করা হয়েছে, তা ব্ৰহ্ম দেবকৃতমপহৃঙ্গামিত্যাহ ব্ৰহ্মৈবোপ হুয়তে-র দ্বারা ব্যক্ত। দৈব অর্থাৎ দেবতাগণের অধ্বর্য হলেন অশ্বিনীকুমারদ্বয়; তাদের আহ্বানের দ্বারা এই জগতের দৃশ্যমান) মনুষ্যরূপ অধ্বর্যকেও আহ্বান করা হয়েছে। পূর্বোক্ত দৈব অধ্বযুদ্বয় এবং মনুষ্য অধ্বর্যগণ সকলে এই যজ্ঞ রক্ষা করুন ও যজ্ঞপতির বর্ধন করুন-এই বক্তব্যের দ্বারা নিমিত্ত আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়েছে। উপতে দ্যাবাপৃথিবী ইত্যাদি রখন্তর (সামবিশেষ) মন্ত্রে দ্যুলোক ও ভূলোকের আহ্বান করা হয়েছে। পূর্বজে ঋতাবরী… মন্ত্রে বলা হয়েছে যে, দেবতা, পশু-পক্ষী, মনুষ্য ইত্যাদির উৎপত্তির পূর্বে দ্যাবাপৃথিবী (দ্যুলোক ও ভুলোক) উৎপন্ন হয়েছে; ঋত শব্দের দ্বারা যজ্ঞকে বর্তায়, সেই যজ্ঞ এই দুটি লোকে (দেবলোকে ও মনুষ্যলোকে) অনুষ্ঠিত হওয়ার নিমিত্ত তাদের ঋতাবরী (ঋতবযৌ) বলা হয়েছে। কেবল ঋত্বিক ইত্যাদিরূপে নয়, দেবতাগণ যে এই দুটি লোকেরই পুত্র, সেই অর্থই দেবপুত্রে বিশেষণটির দ্বারা বোধিত হয়েছে। উপহুতোহয়ং যজমান… মন্ত্রে অর্থান্তরে প্রস্তর ইত্যাদিকে লক্ষ্য করা হয়নি, এখানে যজমানকেই উদ্দেশ করে আহ্বান জ্ঞাপিত হয়েছে। সোমযাগ ইত্যাদি রূপ উত্তর দেব্যজ্যাগুলির প্রজাহেতুত্বের নিমিত্ত প্রজাত্ব এবং এই যজ্ঞ বহু হবিঃ-দ্বারা সম্পাদিত হওয়ার কারণে পশুহেতুত্বের নিমিত্ত পশুত্ব সুচিত হয়েছে উত্তরস্যাং দেবযজ্যায়াম ইত্যাদি মন্ত্রের মধ্যে। ইদমসীদমসীত্যেব… অর্থাৎ দেবগণ আমার প্রদত্ত এই হবিঃ ভক্ষণ করুন-ইত্যাদি মন্ত্রে সোমযাগরূপ কর্মে চিকীর্ষ (ইচ্ছুক) হয়ে সর্বকর্মানুষ্ঠান বিবক্ষিত যজ্ঞের প্রিয় স্থানের প্রতি যজমান আহ্বান জানাচ্ছেন। বিশ্বমস্য প্রিয়ম্ ইত্যাদি মন্ত্রে যজমানের যা প্রিয় তার সকল সামগ্রীকেই তিনি আহ্বান করছেন, যাতে যজ্ঞের প্রচ্ছাদনের দ্বারা অনুষ্ঠানে কোনরকম বৈয়াৰ্থ না ঘটে, অর্থাৎ যজ্ঞের সম্পূর্ণতা সম্পাদিত হয় ॥৭ ৷৷
[ইড়ভোশিত্ৰভক্ষৌ দ্বাবুচ্যেতে অষ্টমে পুনঃপুনরায় ইড়া ও প্রাশি ভক্ষণের বিষয় কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- গোরূপা ইড়ার পশুত্বের কারণে হোতা যখন ইড়ার আকাঙ্ক্ষা করেন, তখন তার (হোতার) পশুসমূহেরই অভিলাষের জন্য স্বীকৃত হয়ে থাকে। হোতা ব্যতীত অন্য কেউই ইড়ারূপা পশু-কামনা পূর্ণ করতে সমর্থ হন না (দাতুং সমর্থঃ)। ইড়ার আহ্বানরূপা যে বচন, তার পতি হলেন জীবাত্মা; তার উদ্দেশে আহুত (হুতং) হে পুরোডাশ! তোমাকে ভক্ষণ করছি–এই মন্ত্রের উচ্চারণের দ্বারা ভাগ প্রদান পূর্বক বচনের দেবতাকে প্রীত করা হয়। যজ্ঞসভার (সদসো) পতি যে হোতা, তার জীবাত্মার উদ্দেশে আহুত (হোমের) পুরোডাশ আমি আপন উদরকৃত করছি। এই ভাবেই বাচস্পতয়ে ত্বা হুতং ইত্যাদি মন্ত্রে পুরোডাশের ভক্ষণ (ইড়াভাগপ্রাশন) সম্বন্ধে বলা হয়েছে। হোতার হস্তে ক্রিয়মান অবদানের সংখ্যা সম্বন্ধে চতুরবত্তং ভবতি ইত্যাদি মন্ত্রের বক্তব্য এই যে, পশুর পাদসংখ্যা চার, সুতরাং এই মন্ত্রটিরও চারবার আবৃত্তি করণীয়। দেবতারূপা ইড়ার ভক্ষণের দ্বারা হোতা মরণপ্রাপ্ত হয়। ভক্ষণ পরিত্যাগপূর্বক অগ্নিকে (তদ্ভাগ) হোমে সেই ইড়ারূপ গো ইত্যাদি পশুসমূহ অগ্নিরূপ ক্রুর রুদ্রকে সমর্পিত করা হলে যজমান পশুরহিত হন। এই মনিমিত্তই প্রথমে বাচস্পতয়ে ত্বা হুতং ইত্যাদি মন্ত্রের উচ্চারণের পর পুরোডাশ ভক্ষণ করলে সাক্ষাৎ অগ্নিতে হোম (হুতং) হয় না, রুদ্রকেও পশুসমর্পণ করা হয় না; এই স্থলে বাচস্পতির ব্যবধানের দ্বারা পরোক্ষভাবে আহুতি হয়ে যায়। তার ফলে এর দ্বারা এটিও সাক্ষাৎ ইড়ার ভক্ষণ না হওয়ার কারণে (ন প্রশ্নাতি) যজমানের মরণদোষ হয় না। মরণদোষরূপ দুঃখ উত্তীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে ঋত্বিকগণেরও ভক্ষণের ফলে দক্ষিণাও প্রদান করা হয়ে যায়। জল হলো সর্ব দেবতার। স্বরূপ (সর্বদেবতারূপত্ব), এই নিমিত্ত জলের দ্বারাই যজ্ঞের বিস্তার করণীয়। পুরাকালে দেবতাগণ প্রথমে যজ্ঞ করতে আরম্ভ করে (যজ্ঞং প্রথমমকুৰ্বস্তদা) স্বিষ্টকৃৎ অগ্নিরূপ রুদ্রকে অন্তরিত (অপসারিত) করে রেখেছিলেন; সেই অপসারিত হওয়ার কারণে রুদ্র কুপিত হয়ে তাদের যজ্ঞকে নিষ্ফল করে দেন। অতঃপর দেবতাগণ সেই রুদ্রের অভিমুখে গমন করে তাদের যজ্ঞানুষ্ঠান সম্পূর্ণ করে দেবার নিমিত্ত প্রার্থনা জ্ঞাপন করলেন। তখন বুদ্ধিমত্ত দেবতাগণের কোন কোন জন একে অপরকে বলতে লাগলেন, যদি আমরা হবিঃ প্রদানের দ্বারা রুদ্র দেবতার আরাধনা করি, তাহলে আমাদের কর্ম সিদ্ধ হবে (স্পিষ্টং ভবিষ্যতীতি)। এই ভাবে হবিঃ-র দ্বারা আরাধনার মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সিদ্ধ করার নিমিত্ত অগ্নিদেব স্বিষ্টকৃৎ নাম-সম্পন্ন হয়েছিলেন। অতঃপর দেবতাগণ তাঁর আরাধনা করে যবমাত্র পরিমিত পুরোভাশের অংশ ছিন্ন করে তাকে প্রদান করেন। এই নিমিত্ত যবমাত্র ভক্ষণভাগ (প্রাশিভাগ) অর্পণ করা কর্তব্য। এর অধিক দান করলে (অধিকাবদানে) যজ্ঞের প্রয়োগে ভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। যদি অবদানের পূর্বে উপস্তরণ ও পরে অভিঘারণ করা হয়, তাহলে পুরোশের উভয় পার্শ্বে সংশ্বায়ি ব্যাধি হয়। সম্যকভাবে বিনষ্টিপ্রাপ্তিরূপ রোগবিশেষের নাম সংশ্বায়ি (উচ্ছন্নত্বরূপ রোগবিশেষো….)। এই নিমিত্ত একবার (সকৃত) অবদান ও অভিঘারণ করলে যজমানের প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে। পুরাকালে কোনও এক সময়ে দেবতাগণ সেই প্রাশি পূষাদেবকে সমর্পন করেছিলেন। এবং পূদেবতা মন্ত্র ব্যতীতই সেই প্রাশি। দন্তবলে (দন্তের দ্বারাই) চর্বণ করেছিলেন, ফলে তাঁর সকল দন্তই পতিত হয়ে যায় (স্বকীয়ান্তান পাতিতবান)। এই কারণেই তার পর হতে সর্বত্র পূষাদেবকে চরুর পিষ্টভাগ (মর্দিত পূর্বক) প্রদান করা হয়। তখন দেবতাগণ দন্তহীন পূষার দ্বারা প্রাশি ভক্ষণের অসামর্থ্য দেখে, তা বৃহস্পতিদেবকে অর্পণ করলেন। বৃহস্পতিদেবতা মনে মন ভাবলেন (মনস্টেবমবিভেৎ), পূষা যখন প্রাশি ভক্ষণ করতে গিয়ে আর্ত (অর্থাৎ পীড়িত) হয়েছেন, তখন অন্যেরাও এই প্রাশি ভক্ষণে পীড়িত হবে। তখন বৃহস্পতিদেব সূর্যস্য ত্বা চক্ষুষা ইত্যাদি মন্ত্র দর্শন করলেন। তিনি দর্শন করলেন–মনুষ্যগণের চক্ষু চক্ষু রোগের দ্বারা হিংসিত (বা আক্রান্ত) হয়, কিন্তু আরোগ্যপ্রদ সূর্যের চক্ষু কখনও (রোগের দ্বারা) হিংসিত হয় না। তখন দেব বৃহস্পতি অভীত হয়ে সবিতুঃ প্রসবেংশ্বিনোবাহুভ্যাং… অর্থাৎ সবিতা দেবতার প্রেরণায় অশ্বিযুগলের বাহুর দ্বারা ও পূদেবতার হস্ত দুটির দ্বারা আমি তোমাকে (অর্থাৎ প্রাশিভাগকে) গ্রহণ করছি ইত্যাদি মন্ত্রে তা প্রতিগ্রহ করলেন। এই ব্রহ্ম মন্ত্রের দ্বারা অশ্বিন ইত্যাদি দেবতাগণ তাদৃশ প্রতিগ্রহ করলে, চাঁদের কোন হানি হলো না। সেইজন্যই এই মন্ত্রের দ্বারা (প্রাশিত্র) প্রতিগ্রহ কর্তব্য। এই জন্যই প্রবৃদ্ধ অরণ্য দাবাগ্নির দ্বারা ভক্ষিত হলেও শুষ্ক কাষ্ঠ কিংবা কণ্টক ইত্যাদি তাঁর মুখবিবরের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে না (কেনাপি ন হিংস্যতে)। শ্রাদ্ধ ইত্যাদিতে ব্রাহ্মণ পরান্ন (পরপিণ্ড বা অপরের পক অন্ন) ভোজন করলেও তার উদর কোন অনিষ্টের দ্বারা আক্রান্ত হয় না (প্রত্যবায়েন ন হিংসিতং ভবতি)। যেহেতু বৃহস্পতিদেব ব্রহ্মিষ্ট অর্থাৎ মন্ত্রাবিগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, সুতরাং বৃহস্পতে ব্রাহ্মণ ইত্যাদি মন্ত্রভাগ পাঠ করা কর্তব্য। অতঃপর অপ বা এতস্মাহ প্ৰাণাঃ ক্রামান্তি যঃ প্রাশি….. অর্থাৎ যে প্রাশি ভক্ষণ করবে, জল তার প্রাণকে রক্ষা করবে ইত্যাদি মন্ত্রে জলসেচন পূর্বক শিরোমার্জন করে প্রাণ রক্ষা কর্তব্য। অমৃত হলো প্রাণ, অমৃত হলো জল; তা প্রাণকে যথাস্থানে আহ্বান করে থাকে ॥৮॥
[অনুযাজাঃ সুক্তবাকা নবমে দ্বয়মীর্যতে- অনুবাক-২৪ ে অনুযাজ ও সূক্তবাক, এই দুইয়ের কথা উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- আগ্নীপ্রভাগ প্রথমেই প্রদান করা কর্তব্য; কারণ পৌরডাশিক কাণ্ডে আগ্নিপ্ৰভাগপ্রদান প্রথমের সাথে যুক্ত। আগ্নীপ্র (হোমকুণ্ড) হলো ইধ্যমান অগ্নির মুখস্বরূপ (মুখত্ব)। সমিধযুক্ত অগ্নিতে যাগ (সমিদযুক্ত এবাপ্পাবনূযাজাঞ্জুঘোতি)। সেই সময়ে পরিধির সংমাষ্টি (সম্মার্জন) করণীয়। যখন আহুনীয়ের দক্ষিণদিকে ব্রহ্ম (ঋত্বিকবিশেষ) স্থিত থাকেন (বর্ততে), তখন যজ্ঞ তাকে আশ্রয় করে হোতব্য হয়ে থাকেন (তৎসমীপে স্থিত্বা হোতব্যত্বাৎ)। এই জন্যই ব্রহ্মার অনুজ্ঞার দ্বারা যজ্ঞ যে দিকে আশ্রিত সেই দিক হতে যজ্ঞের উপক্রম (উদ্যেগ) করণীয়। ব্ৰহ্মর অনুজ্ঞাপ্রদানের প্রকার প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা রয়েছে–ব্রহ্মা হস্তাগ্র সঞ্চালন করে অনুজ্ঞা দেবেন, কিম্বা শিরশ্চালন করে, অথবা মৌনী হয়ে (তুষ্ণীমেবাহস্ত) কিম্বা তার বিকল্পে বাক্যের দ্বারা–এর মধ্যে কোন্ ভাবে এই অনুজ্ঞা-প্রদান সমুচিত? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে,–যদি হস্তচালনার দ্বারা অনুজ্ঞা প্রদত্ত হয়, তবে শরীরে বায়ু ইত্যদির নিমিত্ত কোন কম্পরোগ উৎপাদিত হবে; শির-চালিত করে অনুজ্ঞা প্রদান করলে শিরোরোগে আক্রান্ত হবে (শিরোরোগবান্ ভবেৎ); মৌনভাবে অবস্থিত হয়ে অনুজ্ঞা প্রদান করলে যজ্ঞ অসম্প্রত্ত অর্থাৎ সম্যভাবে প্রবৃত্ত হবে না; সেই নিমিত্ত অবশিষ্ট প্রকারে অর্থাৎ বচনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ইত্যাদি মন্ত্রের উচ্চারণের দ্বারা–অনুজ্ঞা প্রদান করবেন। মন্ত্ররূপ বাক্যে যজ্ঞের আশ্ৰয়ত্ব থাকার কারণে অর্থাৎ যজ্ঞ মন্ত্ররূপ বাক্যে আশ্রিত থাকেন বলে এই মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারাই যজ্ঞ প্রতিষ্ঠ হন (প্রযচ্ছতি)।হে সবিতাদেব! ইত্যাদি মন্ত্রে যেমন অনুজ্ঞা প্রার্থনা করা হবে, তেমনই তার পরে অধ্বর্য আপনি যাগ করুন ইত্যাদি বলতে হবে। বৃহস্পতি এখানে ব্রহ্মা। হে বৃহস্পতি! আপনি এই যজ্ঞকে রক্ষা করুন; যজ্ঞপতি (যজমান) ও মনুষ্য-ব্রহ্মারূপী আমাকেও রক্ষা করন।হে অধ্বর্য! আপনি যা বলেছেন, তাই তোক (তথাহস্তু) অর্থাৎ যাগ করতে প্রস্থান করুন। অন্যের শ্রুতিযোগ্যভাবে বলতে হয় দেবান যজেতি অর্থাৎ দেবতাগণের যাগ করুন। ব্রহ্মবাদীগণ জিজ্ঞাসা করেন–অগ্নি প্রজাপতি ইত্যাদি যে সকল দেবতা পুরোডাশ ইত্যাদির দ্বারা যাগ-প্রদত্ত হয়ে থাকেন, অর্থাৎ যাঁদের উদ্দেশে যাগ অনুষ্ঠিত করতে হয়, তাঁরা কত জন? এর উত্তরে পূর্ব পক্ষীয় কোন কোন জন বলে থাকেন–অধ্বর্য যে দেবতাগণের যাগানুষ্ঠানের আরম্ভ করেছেন, তারা ব্যতীত আর কোন দেবতা অবশিষ্ট নেই। অপর পক্ষীয় কোন কোন জন বলেন-ছন্দগুলি অবশিষ্ট আছে; অর্থাৎ গায়ত্রী, ত্রিষ্ঠুভ ও জগতীর যাগও কর্তব্য। এই উক্তির বিশেষত্ব হলো– ছন্দগুলি ব্রাহ্মণের দ্বারা পঠিত হওয়ার জন্য ব্রাহ্মণ হলেন ছন্দের রূপ (ছন্দোরূপা)। অতএব ব্রাহ্মণজাত্যাভিমানী যে অগ্নি, তাঁরও যাগনুষ্ঠান কর্তব্য; সেই অগ্নি হলেন এই অনুযাজেয় দেবতা (এবানুযাজদেবতা)। পুরাকালে কোনও সময়ে দেবতাগণ যে যাগানুষ্ঠানে কৃতবন্ত হয়েছিলেন, সেই যাগে তাদের ইষ্ট ছিলেন অগ্নি, প্রজাপতি ইত্যাদি দেবতা। তখন সেই যাগের ঊর্ধ্বে আহুতির আধারভূত অগ্নি প্রজ্বলিত হলেন না। তারপর দেবতাগণ অনুযাজের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে সেখানে নিলীন অগ্নিকে অন্বেষণ পূর্বক আহুতির দ্বারা লাভ করেছিলেন। অতএব অনুযাজের দ্বারা যাগ করলে তবেই অগ্নি প্রজ্বলিতবান হয়ে থাকেন। [দেবং বৰ্হি অর্থাৎ দ্যোতনশীল বৰ্হিনামক যে অগ্নিস্বরূপ ইত্যাদি অনুযাজের মন্ত্রগুলি মন্ত্রকাণ্ডে কথিত (আত) হয়েছে]। পুরাকালে এতদু নামে কোন এক অসুর ছিল। সে কোন এক যজ্ঞে এইরকম সুক্তবচন পাঠকালে সমাগত হয়ে যজমান-সম্বন্ধিনী আয়ু, সুপ্ৰজা ইত্যাদি প্রার্থনা করে। (অর্থাৎ নিজেকে যজমান-রূপে চিন্তা করে প্রকৃত যজমানের বিনাশ এবং নিজের সম্বন্ধিনী আশীর্বাদ প্রার্থনা করে)। তখন যদি হোতা এতদু (এতদিদং–এই) দ্যাবাপৃথিবী ইত্যাদি শাখাত্তরোক্ত এই সূক্তবাক্য পাঠ করতেন, তবে তার আশীর্বাদ অসুর প্রাপ্ত হতো; এই নিমিত্ত অন্য শাখায় উক্ত দ্যাবাপৃথিবী ভদ্রম (এতদুর এই প্রথমবাক্য ব্যতিরেকে) সূক্তবাক্য পাঠ কর্তব্য। তাহলে যজ্ঞের ফল ( আয়ু, সুপ্রজা ইত্যাদি) যজমানের প্রাপ্ত হয়। সুক্তবাক ও নমোবাক এই শব্দ দুটির ক্রিয়াবিশেষণত্ব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, এই দুটি যেমন হবে (যথা ভবতি), তেমন সমৃদ্ধি প্রাপ্তি পূর্বক মন্ত্রবাক্য বলতে হবে। যজ্ঞ অগ্নিরূপে পৃথিবীতে আশ্রয় করে থাকেন এবং দিব্যলোকে (অর্থাৎ স্বর্গলোকে) ফলরূপে অবস্থান করেন। শাখান্তরে পঠিত অবসান শব্দের দোষ সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, যখন কোন জনের মৃত্যু হয়, তখন তার পর্যঙ্ক (অর্থাৎ খট্রা বা খাট) ইত্যাদিতে শয়ন পরিত্যাগ করিয়ে (অর্থাৎ সেখানে হতে অবতরণ করিয়ে) ভুমিতে উপেত (প্রাপ্ত বা শায়িত) করা হলে, তখন তার অবসান হয়। সেই জন্য এই সাদৃশ্যের কারণে সুপাবসান শব্দে মরণশীল অর্থ সূচিত হয়। সুতরাং সুপাবাসান শব্দের পরিবর্তে সু-অধিচরণ (স্বাধিচরণ) শব্দ প্রয়োগ কর্তব্য। ভূমিবিষয়ক স্বধিচরণ শব্দের দ্বারা প্রভূত-পরিমিত শ্রেষ্ঠ (বরীয়সীমতিবহুলাং) গোচারণ-ভূমির কামনা থাকে।–সূক্তবাকের দ্বিতীয় ভাগের পাঠে বলা হয়েছে–আজ্যভাগী দেবতা অগ্নি কর্তৃক প্রদত্ত এই হবিঃ সেবন পূর্বক যজমানের বর্ধন করে থাকেন (যজমানুং বর্ধিতবা)। তার দ্বারা যজমানের অধিক তেজঃ সম্পাদিত হয়ে থাকে। মন্ত্ৰকাণ্ডে কথিত সূক্তবাকের মধ্যভাগের তাৎপর্যে বলা হয়েছে যে, এখানে ইষ্টবন্ত (অভীষ্ট) দেবতার অভিবৃদ্ধি কামনার মধ্য দিয়ে স্বকীয় বৃদ্ধিও কামনা করা হয়েছে। হোম ইত্যাদি ক্রিয়ায় মন্ত্রের মধ্যগত অসৌ পদের দ্বারা যজমানের নাম উচ্চারণ (নির্দেশ) করা কর্তব্য। যদি এখানে যজমানের নাম নির্দেশ করা না হয়, তবে যজ্ঞ-সম্বন্ধিনী আয়ু ইত্যাদি আশী (আশিস-এর স্ত্রীলিঙ্গ) যজ্ঞশালায় প্রবিষ্ট পার্শ্বস্থ যে কোনও ব্যক্তি প্রাপ্ত হতে পারে। এই নিমিত্ত যজমানের নাম নির্দেশ করা (অবশ্য) কর্তব্য। তার ফলে যজমান যজ্ঞের আশী তত লাভ করবেনই, পরন্ত তার স্বর্গের প্রাপ্তিও সম্ভব হবে। দেবতার নিকট হতে ও মনুষ্যের নিকট হতে (দেবসকাশান্মনুষ্যসকাশ্বাচ্চ) যজ্ঞের ফল হোত অগ্নির নিকট সম্যক অবস্থিত থাকে। (অর্থাৎ দেবতা ও মনুষ্যগণ যজ্ঞক্রিয়া সুসম্পাদনের কারণে যে সুফল অর্জন করে থাকেন, তা হোতা অগ্নির নিকট গচ্ছিত থাকে)। দেবতা অগ্নি অর্থাৎ দৈবযজ্ঞের হোত দেবগণের নিকট এবং মনুষ্য অগ্নি অর্থাৎ মনুষ্য-যজ্ঞের হোতা মনুষ্যগণকে যজ্ঞফলের ভোগ প্রদান করে থাকেন। এই যজ্ঞকর্মে হবিঃ-র দ্বারা যে দেবগণকে সকৃত করা না হয়ে থাকলে, তাদের নমস্কারের দ্বারাও সৎকার করা যায়। এই উভয়বিধ সকারই দেবতাগণের প্রসন্নতা-সাধক ॥৯॥
[দশমে শংযুবাকমব্যাথ্যা পত্নীসংযাজাশ্চ বক্ষ্যন্তে।–অর্থাৎ এই অনুবাক-২৪ ে শংযুবাক নামক মন্ত্রের ব্যাখ্যা ও পত্নীসংযাজ নামক যাগের বিষয় উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- যে দেবতার নিমিত্ত যে হবিঃ প্রদান বিহিত (যস্মৈ দেবায় যদ্ধবির্ধিহিতং), সেই হবিঃ অপর দেবতার হবিঃ-র সাথে মিশ্রিত না করে (সাংকমন্তরেণ) যাতে সেই দেবতার স্বাগত অর্থাৎ নিজস্ব বা আত্মগত করা হয়, তার নিমিত্ত দেবতাগণ শংযু নামধারী বৃহস্পতি-পুত্রের নিকট (প্রতি) বলেছিলেন। তাতে শংযু চিন্তা করলেন (চিন্তিতবান)–এইসব যজ্ঞগুলির মধ্যে কেউ যদি আপন ইচ্ছায় কোনটির অনুষ্ঠান করে, কিংবা শারহিত হয়ে (অর্থাৎ অনিচ্ছাক্রমে) কোনটির অনুষ্ঠান করে, সেই উভয় যজ্ঞের ফলই আমার হোক (মোস্কৃতি বরঃ)। সেই হতে অনুষ্ঠিত ঐ যজ্ঞফলদ্বয় শংযুর প্রাপ্তি হলো। পুনরায় শংযু এইরকম বললেন-তাহলে ঐ দুই ফলে আমার প্রাপ্তি সম্পন্ন হলো, কিন্তু আমার পুত্র-পৌত্র ইত্যাদিরূপ প্রজাগণকে কি প্রদান করছেন? তখন দেবতাগণ তার পুত্রদের অধীনে অপগোরণ ইত্যাদি কর্মের যাতনাপ্রাপ্তির বর প্রদান করলেন। তাড়ন অর্থাৎ আঘাত বা প্রহারের উদ্যোগ অর্থাৎ চেষ্টাকে অপগোরণ বলে। ব্রাহ্মণদের উপরে সেই তাড়নার উদ্যোগ যে করে, সে শতনিষ্ক (শত কাহন পরিমাণ অর্থ) দণ্ডের ক্লেশ প্রাপ্ত হয়; যে ব্রাহ্মণকে বধ করার উদ্দেশে তাড়না বা আঘাত করে, সে সহস্ৰ নিষ্ক দণ্ডের ক্লেশ প্রাপ্ত হয়; যে ব্রাহ্মণের শরীরে তাড়নার দ্বারা রুধির (লোহিতং) গ্রহণ করে অর্থাৎ রক্তপাত ঘটায়, সেই রুধির ভূমির উপরে পতিত হয়ে যত পরমাণু পরিমিত স্থান ব্যাপ্ত হবে, আঘাতকারী তত বৎসরব্যাপী পিতৃলোক প্রাপ্ত হবে না, অধিকন্তু যমযাতনা অনুভব করবে। এই সমস্তই তাঁর (অর্থাৎ শংযুর) পুত্রপৌত্র ইত্যাদি প্রজাগণের নিমিত্ত দেবগণের দ্বারা প্রদত্ত বর হলো (তৎসর্বং ত্বপ্রজাধীনমিতি বরঃ)। যেমন বলা হলো তেমনভাবে ব্রাহ্মণের প্রতি অধিক্ষেপ অর্থাৎ তিরস্কার ইত্যাদি কর্ম হতে বিরত থাকা কর্তব্য। এর প্রত্যবায় হলে (অর্থাৎ বিপরীত আচরণ করলে) পূর্বোক্ত পাপের দ্বারা যুক্ত (লিপ্ত) হতে হয়। এই রকম প্রশস্ত ফল বৃহস্পতি-পুত্র শংযুর নিকট আমরা প্রার্থনা করি। কি রকম ফল? না, যজ্ঞের ফল দেবতাগণের প্রতি গমন করুক; যজ্ঞপতি (যজমান) দেবতাগণের নিকট গমন করুন; আমাদের মাঙ্গল্যে দেবগণের নিমিত্ত ও মনুষ্যগণের দ্বারা কৃত বিঘ্নের বা প্রতিবন্ধের উপশম হোক। সর্বপাপের এই ঔষধ (ভেষজ) নির্বিঘ্নে সমাপ্তি প্রাপ্ত হোক (অবিঘ্নেন সমাপ্তিং প্রাণোতু), আমাদের অর্থাৎ দ্বিপদধারী মনুষ্যগণের ও চতুষ্পদ পশুগণের মঙ্গল ঘটুক (সুখমস্তু)। –শংযুর নিকট প্রার্থনা করছি (তচ্ছংযোরা বৃণীমহ) ইত্যাদি মন্ত্রের পাঠের দ্বারা যজ্ঞের ফল সেই সেই দেবতাগণ স্বগতভাবে (নিজ নিজ নামে) প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। এই মন্ত্রবাক্য পাঠের দ্বারা বাম্পত্য শংযুও তার অভীষ্ট ভাগ লাভ করে তুষ্ট হন।গাতুং যজ্ঞায় গাতুং যজ্ঞপতয় ইত্যাদি মন্ত্রে আশিস প্রাথনা করা হয়েছে। তারপর সোমং যজতি রেত ইত্যাদি চারটি মন্ত্রে পত্নী-সংযাজের বিষয় কথিত হয়েছে। যথা,সোমদেবের যাগ করলে তিনি রেতঃ (বীর্য) প্রদান করে থাকেন; তা ধারণ পূর্বক ত্বষ্টার (বিশ্বকর্মার) উদ্দেশে যাগ করলে তিনি সেই রেতঃকে বিকৃত করে নানা রূপ প্রদান করে থাকেন; দেবপত্নীগণের উদ্দেশে যাগকর্মের দ্বারা মিথুনত্ব লাভ হয়; গৃহপতি অগ্নির নিমিত্ত যুগানুষ্ঠান করলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। প্রজ ও পত্নী-সংযাজের মধ্যে দ্রব্য-সম্পর্কিত (তাবন্দ্ৰব্যকৃতং) কোন বৈষম্য নেই; তবে যদি মন্ত্রগত বৈষম্য থাকে তবে তা পরিহারেরও উপায় আছে। সে ক্ষেত্রে যজুঃ-মন্ত্রের যাজ্যানুবাক্যে প্রযাজ যাগ এবং ঋক্-মন্ত্রের যাজ্যানুবাক্যে পত্নী-সংযাজ যাগের অনুষ্ঠান করতে হয়। (এই যাজ্যা ও অনুবাক্যের মধ্যগত প্রথম পুরোনুবাক্যা ও যাজ্যা এবং দ্বিতীয় পুরোনুবাক্যা ও যাজ্যা–উভয়ই যথাক্রমে চতুর্থ কাণ্ডের দ্বিতীয় প্রপাঠকে এবং তৃতীয়কাণ্ডের প্রথম প্রপাঠকে ব্যাখ্যাত হয়েছে)।–অনন্তর অর্থবাদের দ্বারা সমিষ্ট-যজুর বিধি কথিত হচ্ছে।–পঞ্চাক্ষরা পংক্তি, সেই কারণে পংক্তি শব্দের দ্বারা পঞ্চসংখ্যা বোঝায় (লক্ষ্যতে)। এই পংক্তি যার প্রারম্ভে (প্রায়ণে) থাকে, তাকে পংক্তি-প্ৰায়ণ যাগ বলে। পংক্তির সমাপ্তি (উদয়ন) যাতে থাকে, তাকে পংক্তি-উদয়ন (পঙক্তৃদয়নঃ) যাগ বলে। দর্শপূর্ণমাস যাগের প্রারম্ভে পঞ্চ প্রযাজ যাগ কর্তব্য (ইজ্যন্তে) এবং সমাপ্তিতে চারটি পত্নী-সংযাজের সাথে একটি (পঞ্চম) সমিষ্ট-যাগ করণীয়। সেই রকমভাবে পংক্তির দ্বারা প্রারম্ভ ও পংক্তির দ্বারা অন্ত (শেষ) সম্পন্ন করতে হয়। তাহলে সমিষ্ট-যজুর দ্বারা যাগ হবে–এটাই তাৎপর্যার্থ। দেবা গাতুবিদঃ ইত্যাদি মন্ত্র যজ্ঞের সম্পূর্ণতা সূচিত করে বলে (ইষ্টিসংপূর্তিকারিত্বাৎ) তা সমিষ্ট-যজুঃ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। [সেই মন্ত্র আধ্বর্যবকাণ্ডে পুনরায় কথিত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে। ১০।
[সায়ণাচার্য বলেন–দশমে শংযুবাকশ্চ পত্নীসংযাজকাঃ স্থিতা। যা দর্শপূর্ণমাসাখ্যা সেষ্টিরত্র সমাপিতা। অথৈকাদশে সম্বর্গেষ্টিহৌত্রমন্ত্ৰা অভিধীয়ন্তে। অর্থাৎ– অনুবাক-২৪ পর্যন্ত দর্শপূর্ণমাস নামে অভিহিত ইষ্টি সমাপ্ত হয়েছে। এই অনুবাক-২৪
মর্মার্থ- হে অগ্নিদেব! রথস্বামী যেমন রথে অশ্ব যোজনা করে, সেইভাবে আপনি আমাদের এই প্রসিদ্ধ যজ্ঞকর্মে আহ্বানযোগ্য দেবতাগণকে যুক্ত করুন। এবং আপনি হোম-উৎপাদক (হোতা) হয়ে এই যাগস্থানে (যজ্ঞসভায়) আসীন বা স্থিত হোন (নিষীদ)। আরও, হে দেবাগ্নি! আপনি আমাদের অভিপ্রায় অতিশয়রূপে বিদিত হয়ে দেবগণের নিকট গমন পূর্বক তাদের বলুন যে, এই যজমান হবিঃ প্রদান করবেন। আমাদের সকল বরণীয় অভিপ্রায় যাতে বিশ্বাসযোগ্য হয়, তেমন করুন। হে যুবতম! হে বলের পুত্র (শত্রুকে বিনাশকারী শক্তির উৎপাদক)! হে দেবগণের আহ্বাতা! যেহেতু আপনি সত্যের স্বরূপ, সেই হেতু আপনি যজ্ঞ-সাধন হন। এই ইধ্যমান (দীপ্তিশালী) অগ্নিদেব শতসহস্র-সংখ্যক অন্নের পালনকর্তা, মস্তকের ন্যায় উন্নত (শিরোবদুন্নতঃ), বিদ্বান এবং ধনসমূহের দাতা হোন। হে অঙ্গসৌষ্ঠবযুক্ত অগ্নি! দেবগণের আহ্বানে সম-সামর্থ্যবান যে সকল ঋত্বিক আছেন, তাদের দ্বারা আহুত হয়ে এই যজ্ঞে আমাদের সমীপে দেবগণকে তেমনভাবে আনয়ন করুন, যেমন ভাবে দেবতক্ষণগণ (সূত্ৰধারগণ) রথচক্রের নেমিগুলিকে (পরিধিকে) আপন আয়ত্তে আনয়ন করে পরিভ্রমণের যোগ্য করে (পরিভ্রাম্যমাণাং কুন্তি)। হে বিবিধরূপযুক্ত অগ্নিদেব! সর্বতোভাবে দ্যোতমান, কাম্যবস্তুসমূহের বর্ষণকারী, যজনীয় (যষ্টব্যায়) দেবগণের উদ্দেশে বৈদিকমন্ত্ররূপ বাক্যের দ্বারা ক্রিয়মান আমাদের শোভন স্তুতি সর্বথা তাদের নিকট প্রেরণ করুন (অর্থাৎ তাদের নিকট বলুন)। সর্ব বিষয়ে জ্ঞানধারী এই অগ্নির পরিচারক-জনের সাথে গো-ইত্যাদি দ্রব্য বিষয়ে কোন কিছুর ব্যবহার গোপন করতে পারব না। (কেবলমাত্র) তার (অগ্নির) অনুগ্রহের দ্বারাই সর্ব দ্রব্যের ব্যবহার করতে পারব। দেবগণ সম্পর্কীয় বাণিজ্যকারী প্রজাগণ (অর্থাৎ যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণ ইত্যাদি) যেন আমাদের পরিত্যাগ না করেন, যেমন ক্ষীরপুর্ণস্তনযুক্তা গাভী তার শিশুকে (বৎসকে) পরিত্যাগ করতে পারে না।
যেমন নদীতে গমনকারী নৌকাকে ঊর্মিমালা (তরঙ্গসমূহ) বিনাশ করে না, তেমনই শত্রুগণ কৃত কোন অনিষ্টাচরণ (দ্রোহ) যেন আমাদের বিনাশ করতে না পারে। হে দেবাগ্নি! মনুষ্যগণ আপনার তেজঃ বা বলের নিমিত্ত নমস্কার বাচক শব্দ প্রয়োগ করে থাকে; (অর্থাৎ আপনাকে নমস্কার করে)। আপনি আমাদের অপকারী অমিত্র অর্থাৎ শত্রুদের রোগ ইত্যাদির দ্বারা বিনাশ করুন। হে অগ্নি! আপনি আমাদের ধনবাহুল্যের সম্যক ব্যাপ্তি করুন। গাভীযুক্ত যজ্ঞের নিমিত্ত আমাদের কর্মফল প্রভূত করুন। আমাদের প্রতি প্রদত্ত আপনার মহাধন যেন কোন কারণে বর্জন বা বিনাশ করবেন না। এই লোকে যেমন ভারবাহী বলীবর্দ ইত্যাদি দ্রব্যের বিনাশ ঘটতে দেওয়া হয় না, তেমনই আপনার দেয় ধনরাশিতে পুনঃ পুনঃ প্রভূত ধন সমানীত করে (অর্থাৎ সরবরাহের দ্বারা) তার সম্যক্ বৃদ্ধি করুন (সম্যক প্রাপয়)। হে অগ্নিদেব! আমাদের যারা বৈরিগণের দারিদ্ররূপ অনেকরকম পীড়ার সংবৃদ্ধি করুন, যাতে সেই বৈরিগণ ভীত হয়ে পলায়ন করে তথা পীড়া প্রাপ্ত হয়। শত্রুগণের রোগ বৃদ্ধির মতো আমাদের বল বৃদ্ধি করুন। (অনন্তর পুরোনুবাক্যা)–অগ্নিদেব সম্যক যুগানুষ্ঠানকারী যজমানের সুখরূপ আহুতির সেবা করেন (সুখকরীমাহুতিমজুষদগ্নিবসেবত) এবং সম্যক যজ্ঞানুষ্ঠানকারী ও সম্যভাবে তাঁকে নমস্কারকারী এই উভয় যজমানকে ধন ইত্যাদি বর্ধনের দ্বারা রক্ষা করে থাকেন। (বিকল্পিত পুরোনুবাক্যা) সম্যভাবে ভজনীয় এই ক্রিয়ায় (সম্যানুতে ভজতে যস্যাং সা ক্রিয়া সংবৎ) আমরা নিকৃষ্ট হলেও আমাদের অভিমুখে আগমন পূর্বক আমার দুঃখসমূহ বিনাশ করুন; যাঁরা আমাদের বন্ধু, তাঁদেরও রক্ষা করুন (বন্ধুনপ্যব রক্ষ)। হে অগ্নি! লোকে যেমন পিতার পালন-কর্ম জেনে থাকে, সেইরকম আমরা আপনার রক্ষণ-কর্ম জ্ঞাত আছি। সেই কারণে আপনার সম্পাদিত (অর্থাৎ আপনার দ্বারা প্রদত্ত) সুখ আমরা প্রাপ্ত হবে। (অনন্তর তিনটি মন্ত্রের উপহোমের অর্থ বর্ণিত হচ্ছে। তার মধ্যে প্রথমটি)–হে অগ্নি! আপনি উগ্র অর্থাৎ ক্রুর রাজার ন্যায় শত্রুগণের ভৎসনকারী (তর্জিতবানসি), তীক্ষ্ণ শৃঙ্গধারী মৃগের ন্যায় বনশ্রেণীতে গমনকারী এবং দাবাগ্নিরূপ ধারণ করে বনে অবস্থান করে থাকেন। সেই আপনি সেইরূপেই শত্রুবর্গের পুর (অর্থাৎ নগরগুলিকে) ধ্বংস করুন। (অতঃপর দ্বিতীয়টি)–হে পরস্পর সখ্যযুক্ত ঋত্বিক ও যজমান! আপনারা সমীচীন অভীষ্ট সম্পাদন করুন; পৃথিবীতে নিবাসহেতুগণের মধ্যে বৃদ্ধতম (সর্বাপেক্ষা প্রাচীন) বলের নগ্ধা (পৌত্র বা দৌহিত্র), স্বয়ং অতিশয় বলশালী,–সেই হেন অগ্নির উদ্দেশে স্তোত্র (স্তুতিমন্ত্রের পাঠ) সম্পাদন করুন। (অতঃপর তৃতীয়টি)–হে বৃষ (কামবর্ষণকারী অর্থাৎ সকলের সর্বকামনার পূরণকর্তা) অগ্নি! আপনি ঈশ্বর, যজ্ঞের সকল ফল সম্পাদিত করে যজমানের সাথে যুক্ত করুন (অর্থাৎ যজমান যেন যজ্ঞের সকল ফল লাভ করেন), আপনি পৃথিবীরূপা বেদীস্থানে সম্যক জ্বলিত হোন এবং মহানুভবতার সাথে আমাদের নিমিত্ত ধনসমূহ সম্যরূপে আহরণ পূর্বক প্রদান করুন (সম্যগাহৃত্য প্রযচ্ছ)। [প্রজাপতে স বেদ সোমাপূষণেমৌ দেবৌ- মন্ত্রটির পুরোনুবাক্য ও যাজ্যাগুলির মধ্যে এর মর্মার্থ ব্যাখ্যাত হয়েছে। ১ম কাণ্ডের ৮ম প্রপাঠকের ১৪শ অনুবাকে, ২য় কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ১২শ অনুবাক, ১ম কাণ্ডের ৮ম প্রপাঠকের ১২শ অনুবাক দ্রষ্টব্য] ॥১১।
[সায়ণাচার্য বলেন–দ্বাদশে পিতৃযজ্ঞস্য হৰিষং হৌমুচ্যতে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২৪ ে পিতৃযজ্ঞে হবিঃ নির্বপণ সম্পর্কে বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে অগ্নিদেব! আমরা পিতৃগণের উদ্দেশ্যে কামনা করে (কাময়মান হয়ে) আপনাকে আহ্বান করছি এবং সমিধ ইত্যাদি দ্বারা প্রজ্বলিত করছি। আপনিও হবিঃ-ভক্ষণের নিমিত্ত কাময়মান হয়ে যজমানের পিতৃগণের আহ্বান করুন। হে সোমদেব! আপনি আপন বুদ্ধির (মনীষার) উৎকর্ষের দ্বারা সব কিছু জ্ঞাত হয়ে থাকেন। এরই সহায়তায় আপনি প্রতিদায়ক অন্নজল লাভের অকথিত পথ প্রাপ্ত করিয়ে দিন। হে ইন্দু (সোমদেব)। আপনার পরিচর্যায় (পরিচরণেন) আমাদের পিতৃবর্গ দেবতাগণের মধ্যে স্থিত হয়ে ধীর হয়ে রমনীয় (রত্নং) হবিঃ-র সেবা করেছেন (ভজন্ত)। হে পবমান (শোধক) সোম! আপনার অনুগৃহীত হয়ে আমাদের পিতৃগণ তাদের পূর্বকৃত কর্মসমূহ এবং জন্মাবলি স্মরণ পূর্বক ধীর হয়ে অবস্থান করছেন (ধীরাস্থিন্তি)। আপনি বায়ুর নিমিত্ত অনপেক্ষ্য হয়ে অর্থাৎ অপেক্ষা না করে আমাদের প্রজ্বলিত হবিঃ ভক্ষণ পূর্বক আপনার যুদ্ধ কুশলতার দ্বারা যজ্ঞীয় পরিধির ন্যায় সর্বতো অবস্থিত প্রতিবন্ধকসমূহ নিরাকৃত করুন। আপনি আমাদের (প্রদানের) নিমিত্ত ধনবান্ হোন। হে সোমদেব! আপনি আমাদের পিতৃগণের দ্বারা জ্ঞাত হয়ে (সংবিদং প্রাপ্তোহনুক্রমে) দ্যাবাপৃথিবীতে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন। হে ইন্দু (সোমদেব)! সেই রকমে (অর্থাৎ সেই কারণে) আমরা আপনাকে হবিঃ দ্বারা পরিচর্যা করছি। আপনার প্রসাদে (প্রসন্নতায়) আমরা ধনের পতি হবো। হে অগ্নিম্বাত্তা (পিতৃলোকবাসী পিতৃগণ! আমাদের কৃত পরিচর্যা লাভ পূর্বক আপনারা এই যজ্ঞকর্মে আগমন করুন এবং আপন আপন স্থান প্রাপ্ত হোন। এই যজ্ঞে প্রকৃষ্ট যত্নের সাথে সম্পাদিত হবিঃ ভক্ষণ করুন। অনন্তর বৈদিক কর্মে কুশল পুত্রকে ধনদান সম্পাদিত করুন। হে বহিষদ (পিতৃলোকবাসী) পিতৃগণ! অর্বাচীন (অধম) আমাদের রক্ষা করা আপনাদের কর্তব্য। আপনাদের উদ্দেশে প্রদত্ত (যুম্মদর্থমিমা) এই হবিঃ সেবন করুন। (অর্থাৎ হবিঃ সেবন পূর্বক আমাদের রক্ষণের দ্বারা সুখ প্রদানের নিমিত্ত আগমন করুন)। অতঃপর আমাদের প্রথমাবধি সুখ প্রদান (অর্থাৎ দুঃখবিযুক্ত) করুন এবং আমাদের পাপ-রহিত করুন। আমি যজমান, আমার ভক্তির দ্বারা সুষ্ঠুভাবে জ্ঞাত হয়ে আমার পিতৃগণকে আমি লাভ করেছি এবং সর্বব্যাপী যজ্ঞের অবিনাশী (বিনাশাভাবং) প্রবৃত্তিকে বিশেষভাবে লাড় করেছি। যে বহিষদ পিতৃগণ এই যজ্ঞে আগমন করেছেন, তারা আদরপূর্বক প্রদত্ত সোমসম হবিঃ-র স্বাদ গ্রহণ করে প্রীতি লাভ করুন। আমাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ সোম্য (সোমপ্রিয়) পিতৃগণ যাগযোগ্য তৃপ্তিকর নিধির ন্যায় এই হবিঃ-র নিমিত্ত আমাদের দ্বারা আহুত হয়ে এই যজ্ঞকর্মে আগত হোন; এবং আগত হয়ে এই যজ্ঞে প্রযুক্ত আমাদের স্তুতি শ্রবণ করুন; এবং তা শ্রবণ করে এই যজমান সাধু ইত্যাদি আদরের সাথে বলুন; এবং বলে আমাদের পালন বা রক্ষা করুন (অব)। উত্তম, মধ্যম ও অধম-পিতৃপুরুষগণ এই তিন রকম (ত্রিবিধাঃ)। যারা যথানিয়মে শ্ৰেীত-কর্মের (বেসিদ্ধ কর্মের অর্থাৎ শ্রুতিসম্মত কর্মের অনুষ্ঠান পূর্বক পিতৃলোক প্রাপ্ত হয়েছেন, তারা উত্তম; যাঁরা স্মার্ত-কর্মের (অর্থাৎ মনু, অত্রি ইত্যাদি প্রণীত স্মৃতিশাস্ত্র বা ধর্মসংহিতা-অনুসারী কর্মের) সাধন পূর্বক পিতৃলোকে গমন করেছেন, তারা মধ্যম। এবং যাঁরা কোনরকম সংস্কার-রহিত, তারা অধম।
তারা সকলেই (উৎকৃষ্ট-নিকৃষ্ট নির্বিশেষে) আমাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হোন। যে পিতৃগণ বৃকের ন্যায় (অরণ্যচর শ্বাপদের মতো) আমাদের হিংসা করেন না, যারা আমাদের অনুষ্ঠিত যজ্ঞ সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে আমাদের প্রাণকে রক্ষা করতে (রক্ষিতুং প্রাপ্তস্তে) আগমন করেছেন, তারা আমাদের আহ্বান মতো আমাদের রক্ষা করুন। যাঁরা যজমানের পূর্বে জাত হয়েছেন (যেমন, জ্যেষ্ঠভ্রাতা পিতা পিতামহ ইত্যাদি) এবং পিতৃলোক প্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে যাঁরা এই পার্থিব রজোগুণাত্মক কর্মে আনীত হবিঃ স্বীকার করতে (অর্থাৎ গ্রহণ করতে) আগমন পূর্বক এই স্থলে উপবিষ্ট হয়েছেন, এবং অপর যে সকল বন্ধুবৰ্গরূপ পিতৃলোকপ্রাপ্ত জন তাদের ধনসমৃদ্ধ শ্রাদ্ধ ইত্যাদি কর্মপরায়ণ সন্ততিগণের এই যজ্ঞকর্মে আগমনপূর্বক উপবিষ্ট হয়েছেন, তাঁদের সকলের উদ্দেশে অদ্য এই আহুতি প্রদান পূর্বক নমস্কার করছি। হে অগ্নিদেব! অতীতকালে আমাদের পিতৃগণ যজ্ঞানুষ্ঠান পূর্বক যেরকম শুদ্ধ লোক প্রাপ্ত হয়েছেন, আমরাও সেই রকমভাবে দীপ্যমান পিতৃরূপ দেবতার উদ্দেশে উথ-শস্ত্র (সাম মন্ত্রবিশেষ) পাঠ করে সেইরকমই উচ্চস্থান প্রাপ্ত হবে। সেই পিতৃগণ কিরূপ? না,তারা আমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্ট পিতা পিতামহ এবং তাদের অপেক্ষাও পুরাতন বা পূর্বভাবী। সেই পূর্বতম পিতৃপুরুষগণ এই হবিঃ-র দ্বারা ক্ষুধার উপদ্রব নিবৃত্ত করে দেবত্ব লাভ পূর্বক আমাদের ফল-প্রতিবন্ধক পাপ অপাকৃত (অপসারিত) করুন। হে কব্যবাহন (মৃত পিতৃলোককে দেয় অন্ন ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য বহনকারী) অগ্নিদেব! যে কারণে আপনি যজ্ঞবর্ধক পিতৃগণের যাগ করেন, সেই কারণে দেবগণের উদ্দেশে (হব্য) এবং পিতৃগণের উদ্দেশে (কব্য)-এই শ্রেষ্ঠ হবিঃ পুনঃ পুনঃ বহন করুন। হে জাতবেদা (প্রাণিমাত্রেরই জঠরে অবস্থানকারী অথবা সর্ব জগৎকে বিদিত) অগ্নিদেব! আপনি যজমানের দ্বারা স্তুত হয়ে তাদের প্রদত্ত হবি-সমূহকে সুগন্ধযুক্ত করে বহন করুন এবং তা পিতৃগণকে প্রদান করুন। সেই পিতৃগণ স্বধাকারের (অর্থাৎ পিতৃলোকের উদ্দেশে জলপিণ্ড ইত্যাদি প্রদানের মন্ত্রের) দ্বারা প্রদত্ত হব্য ভক্ষণ করুন। হে দেব (অগ্নি)! আপনিও প্রযত্নে সম্পাদিত হবিঃ ভক্ষণ করুন। মাতলীর (অর্থাৎ ইন্দ্রের রথের সারথির) সাথে ইন্দ্রও কব্যভাগী পিতৃগণের সাথে বর্ধমান হন। যমও অঙ্গিরস পিতৃবিশেষের সাথে বর্ধমান হন, এবং বৃহস্পতি ঋক্-প্রতিপাদ্য (অর্থাৎ ঋক্-মন্ত্রের দ্বারা বোধ্য) পিতৃবিশেষের সাথে বর্ধমান হন। যে কব্যভাগী পিতৃগণ ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণের বর্ধন করেন, তাঁদের মধ্যে ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ স্বাহাকারের (অর্থাৎ দেবতার উদ্দেশে হবিঃ-দানের মন্ত্রের) দ্বারা তৃপ্ত হন; অন্য পিতৃগণ স্বাধাকারের দ্বারা তৃপ্ত হন। হে যম! অঙ্গিরস নামক পিতৃগণের সাথে ঐক্যমত প্রাপ্ত হয়ে এই প্রস্তীর্ণ যজ্ঞবিশেষে আগমন পূর্বক উপবেশন করুন। যখন উপবেশন করবেন তখন বিদ্বান ঋত্বিকগণের প্রযুক্ত মন্ত্রসমূহ আপনাদের আহ্বান করুক। হে রাজন! এই হবির দ্বারা তুষ্ট হয়ে যজমানের হর্ষ সাধিত করুন (হয়স্ব)। হে যম! বিবিধ রূপযুক্ত যজ্ঞের যোগ অঙ্গিরসগণের সাথে আগত হয়ে যজমানের হর্ষ সাধিত করুন। এই যজ্ঞে আপনার পিতা বিবস্বানকে (সূর্যকে) আহ্বান করছি। তিনিও এই যজ্ঞে আগমনপূর্বক উপবেশন করে যজমানের হর্ষ সাধিত করুন। অঙ্গিরা নামক, অথর্ব নামধারী এবং ভৃগু নামে অভিহিত আমাদের পিতৃপুরুষগণ অভিনব অর্থাৎ নূতনের মতো আমাদের প্রীতিজন হোন। তারা সোম্যা অর্থাৎ সোম প্রাপ্তির যোগ্য। তারা যজ্ঞিয়, অর্থাৎ যজ্ঞকর্মের যোগ্য; আমরা তাদের সুমতির দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবো; আমরা তাদের প্রসন্নতায় (সৌমনস্যকারণে) যজ্ঞের কল্যাণপ্রদ ফলে সর্বদা স্থিত হয়ে থাকব ॥১২।
মর্মার্থ- পুরাকালে প্রজাপতি প্রজাসৃষ্টির নিমিত্ত কাময়মান হয়ে নিয়মবিশেষরূপ তপস্যা করেছিলেন। তিনি দীক্ষিতবান না হওয়ায় অর্থাৎ তার বিকলতার কারণে প্রথমে তিনি নীচশ্রেণীর সর্প এবং পক্ষি সৃষ্টি করলেন। তিনি মনুষ্য ইত্যাদি সৃষ্টি করতে না পেরে দীক্ষিত দর্শন করলেন। অতঃপর তিনি অগ্নিষ্টোমের দ্বারা তপস্যা করেন। অগ্নিষ্টোম হলো প্রজাপতির তপস্যা। তার ফলে অর্থাৎ দীক্ষিতবাদের বৈকল্যের অভাবে তিনি মনুষ্য ইত্যাদি উত্তম সৃষ্টিসাধন সম্পন্ন করেন। যিনি নিয়মবিশেষযুক্ত হয়ে দীক্ষিতবাদ বলেন, সেই যজমান প্রজাসৃষ্টি করে থাকেন। তপস্যা শব্দের দ্বারা এখানে স্নান ইত্যাদি অভিহিত হয়েছে। স্নান ইত্যাদি শব্দের দ্বারা দান, অনশন ও বৈদিক মন্ত্রপাঠ এই তিন বিবক্ষিত অর্থাৎ বলবার ইচ্ছার বিষয়ীভূত। দীক্ষিতের দ্বারা পঠিতব্য মন্ত্রই হলো দীক্ষিতবাদ। যিনি দীক্ষিত হয়ে অমেধ্য অর্থাৎ অপবিত্র বস্তু দর্শন করেন, তিনি দীক্ষার ফল লাভ করতে পারেন না (ফলরাহিতত্য); তিনি পাপে লিপ্ত হন; তাঁর তেজঃ তিরোহিত হয়ে যায় ও তার শরীর বিকৃতি প্রাপ্ত হয়। তখন সেই প্রমাদকারী মনে মনে ধ্যান করেন–আমার মন অসংযত এবং চক্ষুও কৃপণ। দর্শনের হেতু ভূত জ্যোতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ হে সূর্য! আপনি আমার চক্ষুর দোষের নিষ্পত্তি করবেন। অতএব হে দীক্ষা! আমি প্রমাদকারী, আমাকে আপনি পরিত্যাগ করবেন না।
এই মন্ত্র পাঠ করলে দীক্ষাও তাকে পরিত্যাগ করেন না (দীক্ষাইপ্যস্মান্নাপামতি), তিনি পাপে লিপ্ত হন না কিংবা তার শরীরস্থ তেজঃ অপগত হয় না। যে দিব্যোদক (বৃষ্টির জল) অন্তরীক্ষে বর্তমান, তা ভূমিস্পর্শরহিত হওয়ার নিমিত্ত দুরদৃষ্টের হেতু; সুতরাং এর দ্বারা অর্থাৎ বৃষ্টির জলে ওজঃ (তেজ), বল, দীক্ষা, তপস্যা বিনষ্ট হয়ে থাকে। অতএব এর নিমিত্ত উতী ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ কর্তব্য (উন্নতীরিত্যাদিকো মন্ত্রঃ)–হে আপো (জল) তোমরা আমার শরীরে বল স্থাপন করো, তার নিমিত্তই আমাতে তেজও স্থাপন করো; পুনর্বার আমার ইন্দ্রিয়গত বলও স্থাপন করো। আমার দীক্ষা এবং তপস্যাও বিনাশ করো না। এই মন্ত্র পাঠ করলে ওজঃ, বল, দীক্ষা ও তপস্যা বৃষ্টিতে বিনষ্ট হয় না। অগ্নি হলেন দীক্ষিত ব্যক্তির দেবতা (অগ্নির্বৈ দীক্ষিতস্য দেবতা)। দীক্ষিত ব্যক্তি যখন গৃহ হতে প্রস্থান করে, তখন সে তার পালক বা রক্ষক বহ্নিদেবতার কোপে পতিত হয়, অর্থাৎ বহ্নি অন্তর্হিত হন। সেই জন্য রক্ষকহীন (স্বামিরহিতং) সেই দীক্ষিত ব্যক্তিকে পথের মধ্যে রাক্ষসগণ হনন করতে সমর্থ হতে পারে। সেই আশঙ্কা বা সম্ভাবনা পরিহারের নিমিত্ত ভদ্রাদভি ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করা কর্তব্য (ভদ্রাদভীত্যাদিমন্ত্রং পঠেৎ)-হে রথ! আমার গৃহ হতে অত্যন্ত প্রশস্ত স্থানের অভিমুখে গমন করো। তোমার অগ্রভাগে বৃহস্পতি গমন করছেন। দেবগণের মধ্যে বৃহস্পতির ব্রাহ্মণত্ব থাকায় তিনি রাক্ষসগণকে অভিশাপ প্রদানে সমর্থ। এমন যে বৃহস্পতি, তিনি যজমানের অনুগমন করছেন; সুতরাং তিনি যজমানকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবেন। অতঃপর যিনি যাগ করবেন তিনি এতদসগন্ম দেবাজনং ইত্যদি মন্ত্রটি পাঠ করবেন, তার প্রথম ভাগের অর্থ–আমি পৃথিবী সম্বন্ধী যে দেবযজন স্থান আছে, সেখানে আগমন করেছি। দ্বিতীয় ভাগের অর্থ–সকল দেবতা পূর্বে যেমন তুষ্ট হয়েছিলেন, তেমনই তুষ্ট হয়েছেন। তৃতীয় ভগের অর্থ–আমি ঋক, সাম ও যজুঃ মন্ত্রের দ্বারা সন্তরণপূর্বক (অর্থাৎ এই মন্ত্র পাঠের দ্বারা) সম্যক্রপে যাগের তীর (পারং) প্রাপ্ত হবো। (অর্থাৎ যাগরূপ সমুদ্র উত্তীর্ণ হবো)। চতুর্থ ভাগের অর্থআমি ধনপুষ্টি লাভে হৃষ্ট হবার আশীর্বাদ লাভ করব। (অর্থাৎ ধন ও অন্ন ইত্যাদির দ্বারা সংবর্ধিত হবো) ॥১॥
মন্ত্র- এষ তে গায়ত্রো ভাগ ইতি মে সোমায় তাদেষ তে ত্ৰৈষ্ঠুভো জাগতো ভাগ ইতি মে সোমায় ব্রুচ্চন্দোমানাং সাম্রাজ্যং গচ্ছতি মে সোমায় তাদো বৈ সোম রাজানং সাম্রাজ্যং লোকং গময়িত্ব ক্রীণাতি গচ্ছতি স্বানাং সাম্রাজ্যং ছন্দাংসি খলুবৈ সোমস্য রাজ্ঞঃ সাম্রাজ্যে লোকঃ পূরস্তাৎ সোমস্য ক্রয়াদেবমভি মন্ত্ৰয়েত সাম্রাজ্যমেব এনং লোকং গময়িত্ব ক্রীণাতি গচ্ছতি স্বানাং সাম্রাজ্যং যো বৈ তানুনস্য প্রতিষ্ঠাং বেদ প্রত্যেব তিষ্ঠতি ব্ৰহ্মবাদিননা বদন্তি ন প্রান্তি ন জুহুত্যথ কৃতানুনত্ৰম প্রতি তিষ্ঠতীতি প্রজাপতৌ মনসীতি ক্ৰয়ালিরব জিঘ্ৰেৎ প্রজাপতৌ ত্বা মনসি জুহোমীত্যেষা বৈ তান্নস্য প্রতিষ্ঠা য এবং বেদ প্রত্যেব তিষ্ঠতি যঃ বা অধ্বৰ্যোঃ প্রতিষ্ঠাৎ বেদ প্রত্যেব তিষ্ঠতি যতো মনন্যতানভিক্রম্য হোষ্যামীটি তত্তিন্না শ্রাবয়েদেষা বা অধ্বৰ্যোঃ প্রতিষ্ঠা য এবং বেদ প্রত্যেক তিষ্ঠতি যদভিক্রম্য জুহুয়াৎ প্রতিষ্ঠায়া ইয়াত্তস্মাৎ সমান। তিষ্ঠতা হোতব্যং প্রতিষ্ঠিত্যৈ যো বা অধ্বৰ্যোঃ স্বং বেদ স্ববানেব ভবতি সুথা অস্য স্বম্ বায়ব্যমস্য স্বং চমসোহস্য স্বং যদ্বায়ব্যং বা চমসং বাহনদারভ্যাহশ্রাবয়েৎ স্বাদিয়াম্মাদারভ্যাহশ্রাব্যং স্বাদের নৈতি যো বৈ সোমমপ্রতিষ্ঠাপ্য স্তোত্রমুপাকরোত্যপ্রতিষ্ঠিতঃ সোমো ভবত্যপ্রতিষ্ঠিত স্তোমোহপ্রতিষ্ঠিতানথান্যপ্রতিষ্ঠিত যজমানোহপ্রতিষ্ঠিতোহধ্বর্য্যৰ্বায়ব্যং বৈ সোমস্য প্রতিষ্ঠা চমসোহস্য প্রতিষ্ঠা সোমঃ স্তোমস স্তোম উথানাং গ্রহং বা গৃহীত্ব চমসং বোন্নীয় স্তোত্রমুপাকুৰ্য্যাৎ প্রত্যেব সোমং স্থাপয়তি প্রতি স্তোমং প্রত্যুত্থানি প্রতি যজমানস্তিষ্ঠতি প্রত্যধ্বর্য্যঃ ॥২॥
মর্মার্থ- যজমানরূপী আমার গায়ত্রী দেবতা সোমদেবকে এই বক্তব্য বলুন (জ্ঞাপন করুন) হে দেবতাত্মক রাজা সোম! সম্মুখে দৃশ্যমান ক্রেতব্য (ক্রয়ের যোগ্য) বল্লীরূপ (লতারূপ) আপনার ভাগ (সোম) প্রাতঃসবনে (প্রাতঃকালীন সোমযাগে) গায়ত্রীছন্দের দ্বারা কৃতসংস্কার (সংস্কাৰ্য) হয়েছে। এইরকমে এই বক্তব্য বলুন যে, তাঁর এই ভাগ (সোম) মাধ্যন্দিন সবনে (মধ্যাহ্নকালীন সোমযাগে) ত্রিষ্টুপ ছন্দের দ্বারা এবং তৃতীয় সনে (সন্ধ্যার পূর্বকালীন সোমযাগে) জগতী ছন্দের দ্বারা কৃতসংস্কার হয়েছে। যে যজমান সোমরাজের সাম্রাজ্যরূপ স্থান দিয়ে গমন পূর্বক পরে বল্লীরূপ সোম ক্রয় করেন, তিনি নিজেদের মধ্যে সাম্রাজ্য প্রাপ্ত হন। গায়ত্রী, ত্রিষ্টুপ ও জগতীরূপ ছন্দসমূহে উপলক্ষিত লোকই হলো সোমরাজের সাম্রাজ্য-সম্পর্কিত তোক (সাম্রাজ্যযুক্তা লোক)। সোমের অভিমন্ত্রণে পূর্বে কথিত মন্ত্র পাঠ কর্তব্য। অতঃপর, হে তন! তোমাকে গ্রহণ করছি ইত্যাদি মন্ত্রে চমসে (চামচসদৃশ যজ্ঞপাত্র বিশেষে) যে আজ্য গ্রহণ করা হয়, তাতে তার প্রতিষ্ঠা হয় না। সোমরস বহ্নিতে আহুত হলে, ঋত্বিকগণ পান করলে তবেই তার প্রতিষ্ঠা হয়। তানূনপত্রের প্রতিষ্ঠা কোথায়, এই প্রশ্ন ব্রহ্মবাদীগণ কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হলে, বুদ্ধিমান জন উত্তরে বলবেন–মনের দ্বারা প্রজাপতিতে স্থাপনা করলে তবেই তার প্রতিষ্ঠা হয়। প্রজাপতৌ ত্ব ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা অবঘ্রাণ করা বিধি। হে নূনপত্র! ত্বং প্রজাপতৈ… অর্থাৎ হে তান! তোমাকে প্রজাপতির উদ্দেশে অর্পণ করছি ইত্যাদি মন্ত্র মনে মনে চিন্তা করছি (স্মরামি)। [এই মন্ত্রের মর্মার্থ ১ম কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ১০ম অনুবাকের শেষে দ্রষ্টব্য]। আশ্রাবণ হতে আরম্ভ করে (আশ্রাবণমারভ্য) হোম পর্যন্ত একত্রে অবস্থান হলো অধ্বর্যর প্রতিষ্ঠা। আহবনীয়ের সমীপস্থ হোম স্থান হতে অন্য কোথাও গমন না করে আমি হোম সাধন করব (হোষ্যাম)–এইরকম মনে করে সেই স্থানে অবস্থান করাই হলো আশ্রাবণ। যে অধ্বর্য নিজে এই কথা বিদিত থাকেন তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন; হোমের স্থান মহতে অন্য কোথাও গমন করলে হোমের নিন্দা হয়। আশ্রাবণকালে হোমসাধন দ্রব্যসমূহ অধ্বর্য আপন হস্তে ধারণ করে অবস্থিত থাকবেন, এটাই বিধি। সুক, জুব্বা ইত্যাদি পাত্রগুলি ইন্দ্র বায়ু ইত্যাদি দেবগণের সোমরস গ্রহণের আধারভূত হওয়ায় এগুলি বায়ব্য অর্থাৎ বায়ু কর্তৃক বৃত হয়ে থাকে। এইবার প্রতিঃসবন ইত্যাদি স্তোত্রসমূহের কালবিশিষ্ট উপকরণ কথিত হচ্ছে।–যিনি সোম প্রতিষ্ঠা ব্যতিরেকে স্তোত্র পাঠ করেন, তার সোম, স্তোম (স্তুতিবিশেষ), উথ (সামবেদের গেয় অংশবিশেষ), যজমান, অধ্বর্য সকলেই প্রতিষ্ঠাহীন হয়ে থাকে। বায়ব্য চমসে সোমের প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে; এই নিমিত্ত বায়ব্য পাত্রগুলি গ্রহণ করে চমসে সোমরস পূর্ণ করে সূত্রানুসারে স্তোত্র পাঠ কর্তব্য। এতে যজমান, অধ্বর্য সকলেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেন ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন–এই অনুবাকে সোমক্রয়ণীর পদাঞ্জন ইত্যাদির বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- যজ্ঞ সোমক্রয়ণীর পদ পূরণ করে (সং ভরন্তি)। যখন গাৰ্হপত্য অগ্নির সমীপে দুটি (উভে) শক পূর্বমুখী করে (প্রাঙমুখে) প্রবর্তিত করে রক্ষিত হয়, তখন সেই শকট দুটির অগ্রভাগ (ধুর) ঘৃতের দ্বারা লিপ্ত কর্তব্য। তাতে হবির্ধানত্মক (হবির্ধনাত্মন্যেব) যজ্ঞমুখে পদপাংসুরূপে (পাদস্পৃষ্ট ধূলিরূপে) অর্থাৎ বিস্তীর্ণ ধূলিকণার ন্যায় যজ্ঞ বিস্তীর্ণকৃত হয়ে থাকে (সন্ততং কৃতবান্ ভবতি)।-অনন্তর প্রাচীনবংশের পশ্চিম-দেশস্থিত পুরাতন গার্হপত্য হতে (গার্হপত্যাৎ) অগ্নিকে সোমীয় পশু শ্ৰপণের (পাক করবার নিমিত্ত) আনয়ন কর্তব্য। (শ্ৰপণদেশং প্রতি) আনয়নের বিধি-পশ্চিম দিকে অবস্থিত পত্নীশালা হতে পত্নীকেও পুরাতন আহবনীয় স্থানে (অগ্নিশালামুখী করে) আনয়ন করা কর্তব্য (প্রত্যুদানয়ন্তি)। পূর্বেকার পশ্চিম গার্হপত্য-সমীপে অবস্থিত শকট দুটিকেও পূর্বদিকে অনুক্রমানুসারে প্রবর্তিত (আনীত) করতে হয়। যখন এইসকল কর্ম সম্পন্ন হবে তখন পুরাতন গার্যপত্যের স্থানবিশেষ (ধিষ্ণিয়ঃ) শূন্য হয়ে যাওয়ায় অগ্নি পুনরায় মনে মনে চিন্তিত হয়ে উঠবেন। এই চিন্তার ফলস্বরূপ তিনি ক্রুর হয়ে যজমানের প্রজা ও পশুসমূহের বিনাশক হয়ে উঠতে পারেন। তার প্রতিকারের নিমিত্ত অস্ত্রীসংজ্ঞক প্রযাজ যাজ্যার দ্বারা তোষিত পশুকে উত্তর দিকে আনয়ন কালে পশুপণকারী পশ্চিমস্থ গার্হপত্য অগ্নিকে ভাগপ্রদান করলে তিনি আর প্রজা ইত্যাদির বিনাশ করেন না (ততঃ প্রজাদ্যবিনাশ)। আহবনীয় অগ্নির বিকৃষ্টের (বিশেষরূপে আকৃষ্টের অর্থাৎ হরণের ফলে) যজমানের বিকর্ষ (অপকর্ষ অর্থাৎ নিম্নে আকর্ষণ) হয়। এই নিমিত্ত অন্য কোন জাগতিক অগ্নিকে শ্ৰপণার্থে উৎপাদিত করলে যজমান বিকর্ষরহিত অর্থাৎ সম্পূর্ণতা, (স্বরূপতা) লাভ করেন। অনন্তর পশু প্রসঙ্গে কিছু প্রায়শ্চিত্তের বিধি উক্ত হচ্ছে। প্রত্যেকটি গণনা পূর্বক যতগুলি পশু অবদানের দ্বারা নষ্ট হয়েছে দেখা যায়, ততটা আজ্য প্রদান (অবদান) করা কর্তব্য (তাবকৃত আজ্যমবদ্যেৎ)। সেই অবদান ক্রিয়ার দ্বারা দোষ-বিমোচনের ফলেই প্রায়শ্চিত সম্পন্ন হয়ে থাকে। যদি শত্রুগণ আমাদের পশু বলে দাবী পূর্বক কলহ সংঘটিত পূর্বক পশু হরণ করে, তাহলে যজমান সেই বিপত্তি নিবারণকল্পে কুবিদঙ্গ ইত্যাদি ঋকমন্ত্র পাঠ পূর্বক হোম করবেন (কুবিদঙ্গেচাহগ্নীধিফিয়স্থবঙ্কৌ জুহুয়াৎ) ॥৩॥
মর্মার্থ- যে সকল প্রজা ইদানীং জাত হচ্ছে এবং পূর্বে যারা জন্মগ্রহণ করেছে, তারা সকলেই প্রজাপতির দ্বারা সৃষ্ট। এই নিমিত্ত প্রত্যেক পশুর নিকট গমন পূর্বক বলতে হবে (প্রবেদয়)–হে পশু! তোমার বৃত্তান্ত বলো; প্রজাপতি তোমার স্বর্গপ্রাপ্তি অনুমোদন করুন। হে পশুপতি অগ্নিদেব! অদ্য এই দিনে সুকৃতি সহ সম্যক অনুষ্ঠিত জ্যোতিষ্টোম কর্মের অন্তর্বতী এই পশুকে বন্ধন করছি, আপনি তা অনুমোদন করুন। আমরা শোভন যাগের অনুষ্ঠান করব (শোভনেন যজাম)। এই হব্য দেবতাগণের প্রতিদায়ক হোক (প্রিয়মস্তু)। হে পশু! পূর্বে দেবগণ তোমার বৃত্তান্ত জেনে তোমার প্রাণ প্রতিগ্রহ করেছেন; এক্ষণে তুমি আমাদের অধীন–এটা তারা স্বীকার করে নিয়েছেন। এইবার দেবগণ যে পথে গমন করে থাকেন, তুমি সেই পথ ধরে স্বর্গে গমন করো। প্রাণরূপে স্বর্গে গমন পূর্বক অবশিষ্ট অবয়বের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হও, অর্থাৎ পুরোডাশ ইত্যাদির মতো হবিঃ-রূপ হও (পুরোশাদিবন্ধবির্ভবেত্যর্থঃ)। পশুস্বামী রুদ্রদেব দ্বিপদ ও চতুষ্পদ যে পশুসমূহের স্বামিত্বে বা প্রভুত্বে বর্তমান, সেই পশুর মধ্যে আমাদের দ্বারা ক্রীত এই পশু যাগযোগ্য হোক; যজমানের ধনপুষ্টি হোক। এই পশুর পিতা-মাতা-ভ্রাতা ও সগর্ভ-সম্পর্কিত যে পশুগণ একে অর্থাৎ এই বধ্যমান পশুকে মন ও চক্ষুর দ্বারা লক্ষ্য করছে, অগ্নি তাদের অগ্রেই প্রকর্ষের সাথে মুক্ত করুন। তারপর প্রজাপতি দেবতা আপন প্রজাগণের সাথে ঐকমত্য হয়ে সেই পশুগণকে মুক্ত করুন (পশু ন মোচয়তু)। আরণ্য পশুগণ সকলে জাতিভেদে, বর্ণভেদে, উচ্চ-নীচত্ব ভেদে বিবিধরূপসম্পন্ন হলেও পশুত্বের দিক থেকে একই রকম (পশুত্বেনৈকরূপাঃ)। বায়ুদেবতা অগ্রে তাদের মুক্ত করুন, দেব প্রজাপতিও তাঁর স্বকীয় প্রজাগণের সাথে ঐকমত্য হয়ে তাদের মুক্ত করুন। হে দেবগণ! যাগের দ্বারা উৎপন্নের হেতুভূত এই পশুকে প্রকর্ষের সাথে মুক্ত করে যজমানের স্বর্গলোকপ্রাপ্তি সংঘটিত করুন (স্বর্গলোকপ্রাপ্তিং ধত্ত)। উপকরণ (সংস্কারপূর্বক পশুবধ) ক্রিয়ার দ্বারা সংস্কৃত এই পশুর অঙ্গজাত হবিঃ হবিঃ-ভোজী দেবগণের জীবিকা হোক (জীবনার্থমুপাকরোতু); যজমানেরও স্বর্গলাভ ঘটুক। যজমানের প্রাণ পশুর প্রাণের সাথে পৃথক্ হোক। এই অনুষ্ঠীয়মান যজ্ঞ দেবনশীল পশু-প্রাণের সাথে হবিঃ-ভোজী দেবগণের প্রতি গমন করুক। পশুরূপ অন্ন দেবতাগণের জীবনহেতুত্ব প্রাপ্ত হোক। তাতে যজমানের কামনা সত্য হোক। এই পশু মরণকালে যে দুঃখজনক (দুঃখহেতুকং) শব্দ করেছে অথবা হস্ত-পদ তাড়না করেছে, তার পাপ হতে অগ্নিদেব আমাকে মুক্ত করুন; কিংবা এর বন্ধন ইত্যাদি উপদ্রবের দ্বারা যা কিছু পাপ উৎপন্ন হয়েছে তার সব হতে আমাকে আমাকে মুক্ত করুন। (সর্বস্মদংহসো মাং মোচয়তু)। হে খঙ্গধারীগণ (বিশসনের অর্থাৎ খঙ্গের দ্বারা ছেদনের বা মারণের কর্তাগণ)! দেবগণের দ্বারা ব্যাপ্ত যজ্ঞ প্রবর্তন (আরম্ভ) করো। এই পশুকে রজ্জ্বরূপ পাশবন্ধন হতে মুক্ত করো এবং এই বন্ধনজনিত দোষ হতে যজ্ঞপতিকে মুক্ত করো। এই মন্ত্রের দ্বারা অধ্বর্য ও যজমান বাপাপণের (মেদঃ পাকের) কারণে কাষ্ঠনির্মিত এক শূলযুক্ত হয়ে শামিত্রদেশে (সূনায় অর্থাৎ পশুবধের স্থানে) সমাগত হবেন। অদিতি (পৃথিবী) এই পশুর পাশ মুক্ত করুন (প্রমুঞ্চতু)। এবং আমি পশু ও পশুপতির উদ্দেশে আমার অপরাধ নিবৃত্তির নিমিত্ত নমস্কার করছি। যে পুরুষ (অর্থাৎ ব্যক্তি) আমাদের অরাতিত্ব অর্থাৎ শত্রুতা করতে ইচ্ছা করে তাদের আমরা সাবধান (অধ্বরং) করে দিচ্ছি। যারা ইদানীন্তন কালে শত্রুতার ইচ্ছা করছে না, তথাপি কালান্তরে (ভবিষ্যতে) যাদের দ্বারা সেই শত্রুতার সম্ভাবনা আছে তাদের আমরা দ্বেষ করি। সেই পুরুষে এই পাশ বদ্ধ হোক, এই রঞ্জুর দ্বারা (রশনয়া) তাকে বদ্ধ করছি। হে অগ্নিদেব! দেবগণ আপনার কার্যকরত্বের নিমিত্ত নিশ্চিত বোধ করেন। আপনি হব্যবাহ অর্থাৎ দেবতাগণের প্রতি প্রদত্ত হবির বহনকর্তা, আর্দ্র হবির পাককর্তা; অধিকন্তু আপনি যজ্ঞ-সম্পাদনের যোগ্য। হে জাতবেদা! আপনি দৃঢ় শরীরধারী ও দক্ষতাসম্পন্ন; অতএব উৎসাহের সাথে আমাদের হবিঃ বহন করতে প্রীতিযুক্ত হোন। হে জাতবেদা অগ্নি! বপা সহ (অর্থাৎ বপা বহন করে) দেবতাগণের নিকট গমন করুন। যেহেতু আপনি প্রথম হোতা (অর্থাৎ মনুষ্য-হোতার পূর্বভাবী), অতএব আপনি ঘৃতের দ্বারা দেবগণের তনু বর্ধন করুন। সেই দেবগণ স্বাহাকারের (দেবোদ্দেশে হবিদানের মন্ত্রের) দ্বারা সমর্পিত এই হবিঃ ভক্ষণ করুন। যে দেবতাগণ পূর্বে স্বাহাকারের দ্বারা আহুত হয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশে এই আজ বপাহোমের পূর্বে স্বাহাকৃত হোক। এবং সেই হোমের বপাহোমাঙ্গত্ব সাধিত হোক। যে দেবতাগণ পরে (উপরিষ্টাৎ) স্বাহাকারের দ্বারা আহুত হবেন, তাদের উদ্দেশে বপাহোমের পরে এই আজ্য আহুত হোক। পাহামের পূর্বে ও পরে স্বাহাকারের প্রয়োগ হয়ে থাকে ॥৪॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ পঞ্চমে তেষাং মন্ত্রাণাং ব্রাহ্মণভিধীয়তে। এই অনুবাক-৫ ে পূর্ববর্তী মন্ত্ৰসমূহের ব্রাহ্মণগুলির অভিধা বা শব্দগুলির অর্থবোধক শক্তির কথা বলা হয়েছে]।
মর্মার্থ- প্রজাপতি পশুগণের জনক অর্থাৎ স্রষ্টা, এবং রুদ্র শব্দের দ্বারা অভিধেয় অগ্নি হলেন তাদের স্বামী অর্থাৎ অধিপতি। প্রজাপতের্জায়মানা ইমং পশুম… অর্থাৎ প্রজাপতির দ্বারা জায়মান এই পশুকে… ইত্যাদি মন্ত্রে সেই পশুকে যজ্ঞের নিমিত্ত বধ করলে তা দেবগণের লব্ধ হয়। সুতরাং এই মন্ত্রের কথনে যজমানের অপরাধ হয় না। অতঃপর সংস্কারপূর্বক পশুবধ বা বলিদানের পর প্রজানন্তঃ ইত্যাদি পাঁচটি মন্ত্রে হোম কর্তব্য। পুচ্ছের সাথে চারিটি পদ, এই পঞ্চসংখ্যার যোগের নিমিত্ত পশুকে পাক্ত বলা হয় (পশূনাং পঙিক্তত্ব)। সংজ্ঞপন অর্থাৎ বলিপ্রদানের জন্য যখন পশুকে আনয়ন করা হয়, তখন অধ্বর্য তার পৃষ্ঠে হস্তের দ্বারা স্পর্শ করে নানা মন্ত্র পাঠ করে থাকেন। (এই হস্তস্পর্শ হতেই হনন আরম্ভ হয়)। ব্যাবৃত্তিবাচক নানা শব্দের প্রয়োগের ফলে যজমানের প্রাণ ম্রিয়ম্রাণ পশু হতে ব্যাবৃত্ত হয়। পাপ হতে মুক্ত করুন ইত্যাদি মন্ত্রগত প্রার্থনার দ্বারা পাপের শান্তি হয় (অর্থাৎ পাপজনিত মানসিক জ্বালা দুর হয়)।হে খঙ্গের দ্বারা ছেদনের বা মারণের কর্তাগণ! তোমরা যজ্ঞ প্রবর্তন করো ইত্যাদি মন্ত্রে অধ্বর্য ও যজমান বপাশপণীর ব্যবধানে পশু লাভ করে থাকেন। হোমের নিমিত্ত যখন পা আনীত হয়, তখন অগ্নির নিকট হতে যজ্ঞ উপক্রমিত হয় অর্থাৎ চলে যায় (অগ্নেঃ সকাশাদ্যজ্ঞোহপক্ৰামতি)। এই নিমিত্ত বপার উপর হোমের বিধান করা হয়েছে। সেই হোমের দ্বারা যজ্ঞের উপক্রমণ নিবারিত হয়ে থাকে। অগ্নিং যজ্ঞস্য ধারকং কৃতবন্ত ইত্যাদি মন্ত্রে বপা-পাক সম্পন্নের নিমিত্ত হোম করা হয় (বপায়াঃ পায় সম্পদ্যতে)। বপা হোম সাধনের কালে স্বাহা দেবেভ্য ইত্যাদি মন্ত্রে যাঁরা বোর সামীপ্য বাঞ্ছা করেন এবং যাঁরা স্বাহাকারের ব্যবধান হতে ভয় প্রাপ্ত হন–এই উভয় রকম দেবতাগণের প্রীতির নিমিত্ত মন্ত্রের পূর্বে ও শেষে স্বাহা শব্দের প্রয়োগ হয়েছে (স্বাহাশব্দস্য মন্ত্ৰয়োৰ্যত্যাসেন প্রয়োগ ইত্যর্থঃ) ॥৫॥
মর্মার্থ- আগ্নী (অগ্নির আধান অর্থাৎ স্থাপন) হবির্ধান (হোমদ্রব্যের আধার) ইত্যাদির মধ্যে যার যে দেবতা সেই দেবতাকে অভিক্ৰম (আক্রমণ অর্থাৎ উল্লঙ্ঘন করে) তার উপচারে যাগ করলে যজমান দেবতা হতে বিচ্ছিন্ন হন এবং সেই যজমান দরিদ্র হয়ে থাকেন। এই নিমিত্ত সেই সেই দেবতার প্রতিপাদক মন্ত্রের দ্বারাই তাদের অভিমৰ্শন (অভক্ষণ) করতে হবে; তাহলে উক্ত দোষ হবে না (নোক্তদোষো ভবতি)। তাদের মন্ত্রবিশেষ উদাহৃত হচ্ছে।–অগ্নে নয় ইত্যাদি মন্ত্রে আগ্নী, বিষ্ণুর্বিচক্রম ইত্যাদি মন্ত্রে হবিধান, অগ্ন আযুংসি পবস ইতি সুচ আ বায়ো ভূষ শুচিপা ইত্যাদি মন্ত্রে বায়ুদেবতার এবং ঐন্দ্রিয়া সদঃ (অন্যাঘা যে অগ্নিমিন্থত ইতি সদঃ) ইত্যাদি মন্ত্রে যথাযোগ্য দেবগণের যাগ কর্তব্য। [ তেষু চত্বারো মন্ত্রা…অর্থাৎ এই চারটি মন্ত্রের মর্মার্থ প্রথম কাণ্ডে উল্লেখিত হয়েছে]। হে দ্রোণকলস (মময় অর্থাৎ কাষ্ঠনির্মিত কলস-সদৃশ যজ্ঞপাত্রবিশেষ)! তোমার স্বরূপভূতা পৃথিবীকে জ্যোতির্ময় অগ্নির সাথে যুক্ত করে এই স্থানে স্থাপন করছি। হে আধবনীয় (যজ্ঞপাত্রবিশেষ)! তোমার স্বরূপভূত বায়ুকে তার আধার অন্তরীক্ষ সহ এই স্থানে যুক্ত করছি (যুনজ্ঞি)। হে পূতভৃৎ (যজ্ঞীয় সামগ্রীকে পূতকারী পাত্রবিশেষ)! তোমার স্বরূপভুত বাক্যকে (নানাপ্রকার মন্ত্রকে) দ্যুলোকস্থিত সূর্যের সাথে এই স্থানে যুক্ত করছি। জুহু, উপভৃৎ ও ধ্রুব নামক তিনটি সুক (যজ্ঞে ঘৃত প্রক্ষেপণের নিমিত্ত পাত্রবিশেষ) যাতে পরস্পর সম্পর্করহিত হয় (অর্থাৎ মিশে না যায়, সেই নিমিত্ত সূর্যের প্রকাশের দ্বারা তা পরীক্ষা করে যুক্ত করছি। (অর্থাৎ–হে সুত্রয়! তোমরা যাতে পরস্পর সম্পর্করহিত থাকো, সেই জন্য সূর্যের প্রকাশের দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা পূর্বক যুক্ত করছি)। অতঃপর অগ্নিদেবতা গায়ত্রী ছন্দ উপাংশো পাত্ৰমসি ইত্যাদি দশটি মন্ত্রে যাগ করণীয়। হে ঊধ্বপাত্র (যজ্ঞীয় পাত্রবিশেষ)! অগ্নি দেবতা তোমাকে রক্ষা করুন, গায়ত্রী ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুন, তুমি হলে উপাংশু নামক সোমরস গ্রহণের পাত্র। এই প্রকারে পরে নয়টি মন্ত্র যোজনা কর্তব্য। যথা–সোম দেবতা ও ত্রিষ্টুপ ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুন, তুমি হলে অন্তর্যামের (অর্থাৎ অন্তর্যাম নামক) পাত্র; ইন্দ্র দেবতা ও জগতী ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুন, তুমি ইন্দ্র ও বায়ুদেবতার (সোমরস গ্রহণের) পাত্র; বৃহস্পতি দেবতা ও অনুষ্টুপ ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুন, তুমি হলে মিত্র ও বরুণদেবতার (সোমরস গ্রহণের) পাত্র; অশ্বিদ্বয় দেবতা ও পংক্তি ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুন, তুমি হলে অশ্বিনীকুমার যুগলের (সোমরস গ্রহণের) পাত্র; সূর্য দেবতা ও বৃহতী ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুন, তুমি হলে শুক্রের (সোমরস গ্রহণের) পাত্র। চন্দ্র দেবতা ও সতোবৃহতী ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুন, তুমি হলে মস্থিনের (সোমরস মন্থনের) পাত্র (মহিনঃ পাত্ৰমসি); বিশ্বদেবগণ তোমাকে রক্ষা করুন, উষণিহ ছন্দ (সপ্তাক্ষর ছন্দোবিশেষ) তোমাকে রক্ষা করুন, তুমি হলে আগ্রয়ণের (স্থালীরূপ) পাত্র; ইন্দ্র দেবতা ও ককু ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুন; তুমি হলে উথের (অর্থাৎ যজ্ঞবিশেষ-সম্বন্ধী সোমরস গ্রহণের) পাত্র; পৃথিবী দেবতা ও বিরাট ছন্দ তোমাকে রক্ষা করুন, তুমি হলে ধ্রুবের পাত্র ॥ ৬৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন-সপ্তমে পরস্পরমাৎসর্যেন প্রবৃত্তয়োর্যজমানয়োঃ কশ্চিন্নৈমিত্তিকঃ প্রয়োগো বক্তব্যঃ। অর্থাৎ– অনুবাক-৭ ে পরস্পর মাৎসর্যযুক্ত দুই যজমানের কোন নৈমিত্তিক প্রয়োগ সম্পর্কে বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- ইষ্টপূর্তির নিমিত্ত যাগানুষ্ঠানের বিধানে প্রমাদ আলস্য ইত্যাদির দ্বারা যজ্ঞ বিনষ্টি লাভ করে, সুতরাং যজ্ঞকর্তা যজমানের আর্তির পূর্বে অধ্বর্য নিজের বিনাশ পরিহারের নিমিত্ত হোতা-সম্বন্ধী প্রাতরনুবাক পাঠ করার পূর্বে আসন্যাদ ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা যাগ করবেন (প্রাতরনুবাকপাঠাৎ পুরাইজ্যমধ্বমুরাগীঘ্ৰে জুহুয়াৎ)। তার ফলে হোমের দ্বারা অধ্বর্য প্রথমে আত্মসুখ লাভ করবেন এবং তার পরে যজমানের আর্তি সম্পন্ন হবে। মন্ত্রের অর্থ হলো– আসন্যাদ্বৈরিনামাস্যে.. অর্থাৎ হে দেব! শত্রুর মুখে উচ্চারিত অভিচার-রূপ মন্ত্রের অমঙ্গল হতে আমাকে রক্ষা করুন। সকল অপবাদ-রূপ মন্ত্রের অমঙ্গল হতে আমাকে রক্ষা করুন। সকল অপবাদ-রূপ অভিশাপ হতে আমাকে রক্ষা করুন। মাৎসর্যে অন্বিত হয়ে সোম যাগানুষ্ঠানকারী দুই যজমানের নিমিত্ত অন্য পাঁচটি মন্ত্রে যাগ কর্তব্য। হে অগ্নিদেব! আমার শয়ন (সম্বেশঃ) ও আসন (উপবেশ) এই উভয় প্রকার সিদ্ধির কামনায় এবং গায়ত্রী কর্তৃক বৈরির অভিভবের (পরাভবের) নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রের অনুষঙ্গে আপনার উদ্দেশে আহুতি প্রদান করছি। এই রকমেই ত্রিষ্ঠুভ ও জগতী কর্তৃক বৈরির পরাভবের নিমিত্ত আপনাকে শয়ন ইত্যাদির পূর্বানুষঙ্গে আপনার উদ্দেশে আহুতি প্রদান করছি।–এই হলো তিনটি মন্ত্র। চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্র–হে প্রাণ ও অপান! মৃত্যুর সকাশে আমাকে পাতিত করো না-তোমরা কখনও আমাকে পরিত্যাগ করো না।–এই উভয় ক্ষেত্রেই স্বাহা মন্ত্রের সাথে আহুতি প্রদান কর্তব্য। যে যজমানবর্গ মাৎসর্যে অন্বিত হয়ে সোমযাগ অনুষ্ঠানের প্রবর্তন করেন, তাদের দেবতা-বিষয়ে ও প্রাণ-অপান-বিষয়ে বিপ্রতিপত্তি (বিরোধ বা সংশয়) ঘটে। একজন মনে করেন এই দেবতা ইত্যাদি আমার থাকুন, অন্যের নিকট যেন না গমন করেন; অপরজনেও সেইরকমই সংশয়ান্বিত হন। এই বিরোধ বা সংশয়ের মীমাংসার নিমিত্ত সম্বেশায় তত্বাপবেশায়… ইত্যাদি (পূর্বে উল্লেখিত) পাঁচটি মন্ত্রের দ্বারা প্রাতরনুবাক পাঠের পূর্বে অগ্নীর্ধে যাগ কর্তব্য (অগ্নীঘ্ৰে জুহুয়াৎ)। তাতে দেবগণ এবং প্রাণ ও অপান তার অধীনে থাকবে এবং তিনি স্বয়ং নিরুপদ্রবে ও সুখের দ্বারা শয়ন ও আসনের প্রভু হয়ে থাকেন (অর্থাৎ সিদ্ধি প্রাপ্ত হন)। অতঃপর উদ্গাতার কর্তব্যবিশেষ উক্ত হয়েছে।–যে সকল আজ্য-স্তোত্রের প্রকৃষ্টা গতি আছে, উদ্গতার সেইরকম আজ্য-স্তোত্রের অনুষ্ঠান কর্তব্য; এবং তার দ্বারা অভিজয় সম্পাদিত হয়। নিত্যপ্রয়োগে অগ্ন আয়াহি বীতয় ইত্যাদি মন্ত্র পঠনীয়, কিন্তু মাৎসর্যপ্রবৃত্ত-রূপে অস্মিন্ সংসবে প্র বো বাজা ইত্যাদি আজ্যাস্তাত্ৰসমূহ পাঠ করা কর্তব্য। এই কর্মে অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োগে (পৃষ্ঠস্তোত্রে) বৃহৎসাম ও রথন্তরসাম এই উভয় সামের প্রয়োগ কর্তব্য। এই উভয় মন্ত্রের প্রয়োগে পাঠকারীর ভুলোক ইত্যাদি প্রাপ্তি হেতু এই লোকসমূহ হতে তার প্রতিস্পর্ধী (বিদ্বেষী) জনের বিচ্যুতি ঘটে। বিশ্বামিত্র যেমন প্রজ্বলিত অগ্নির ন্যায় (জমদগ্নি) বশিষ্ঠের সামর্থ্য হরণ করেছিলেন, সেইভাবে বিদ্বেষী জনের স্পর্ধা (ইন্দ্রিয়সামর্থ্য) বিনাশ করতে হলে মোগ্নে বর্চো বিহবে ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করা কর্তব্য। দুই স্পর্ধমান যজমানের মধ্যে যাঁর যজ্ঞ (দেবতার উদ্দেশে যজন) ও ক্রতু (স্তুতি ইত্যাদি) অঙ্গ ও উপাঙ্গের সাথে অধিক হবে (ভূয়ান ভবতি) তিনি অপর প্রতিস্পর্ধীর দেবতাকে (দেবার্চনাকে) বিনাশ পূর্বক নিজে অধিক ধনশালী হবেন (স্বয়ং বসুমত্তমো ভবতি) ॥৭॥
মন্ত্র- নিগ্রাভ্যাঃ স্থ দেবশ্রুত আয়ুৰ্ম্মে তপয়ত প্রাণং মে তর্পায়তাপিনং মে তৰ্পয়ত ব্যানং মে তৰ্পয়ত চক্ষুৰ্ম্মে তৰ্পয়ত শ্ৰোত্ৰং মে তৰ্পয়ত মনো মে তৰ্পয়ত বাচং মে তৰ্পয়তাহত্মানং মে তৰ্পয়তাঙ্গানি মে তৰ্পয়ত প্রজাং মে তৰ্পয়ত পশু মে তপয়ত গৃহান্মে তৰ্পয়ত গণান্নে তৰ্পয়ত সৰ্ব্বগণং মা তৰ্পয়ত মা গণা মে মা বি তৃষরোষধয়ো বৈ সোমস্য বিশশা বিশঃ খলু বৈ রাজ্ঞঃ প্ৰদাতোরীশ্বরা ঐন্দ্রঃ সোমোহবীবৃধং বো মনসা সুজাতা ঋতপ্রজাতা ভগ ইদ্বঃ স্যাম।। ইন্দ্ৰেণ দেবীৰ্ব্বীরুধঃ সম্বিদানা অনু মন্যাং সবনায় সোমমিত্যাহৌষধীভ্য এবৈনং স্বায়ৈ বিশঃ স্বায়ৈ দেবতায়ৈ নিৰ্য্যচ্যাভি যুণোতি যো বৈ সোমস্যা ভিমূয়মাণস্য প্রথমোহংশু স্কতি স ঈস্বর ইন্দ্রিয়ং বীর্যে প্রজাং পশূন্য জমানস্য নিহঁন্তোস্তমভি মন্ত্রয়েতাহমাহস্কাৎ সহ প্রজয়া সহ রায়ম্পোষেণে য়িং মে বীর্যং মা নিৰ্ব্বধীরিত্যাশিষমেদৈতামা শান্ত ইন্দ্রিয়স্য বীৰ্য্যস্য প্রজায়ৈ পশূনামনির্ঘাতায় দ্রশ্চস্কন্দ পৃথিবীমনু দামিমং চ যোনিমনু যশ্চ পূৰ্ব্বঃ। তৃতীয়ং যোনিমনু সঞ্চরন্তুং দ্রং জুহোম্যনু সপ্ত ছোত্রাঃ ॥৮॥
মর্মার্থ- হবিষ্মতীরিমা আপ ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা কুম্ভে অবশ্যই যে জল গ্রহীতব্য হয়, তা নিগ্রাভ্য নামে অভিহিত। হে আপো (জলরাশি)! তোমরা দেবশ্রুত অর্থাৎ দেবগণের দ্বারা শ্রুত হও (দেবৈঃ শায়ন্ত)। তোমরা আমাদের আয়ুর রক্ষণ (অথবা তৃপ্তি বিধান) করো (তপয়ত)। এই প্রকারে আমার প্রাণের, অপানের, ব্যানের, চক্ষুর, শ্রোত্রের (কর্ণের), মনের, বাক্যের (বাচং), আত্মার (আত্মাং জীবম), অঙ্গসমূহের (হস্তপদ ইত্যাদি অবয়বসমূহের), প্রজার (সন্ততির), পশুর, গণের (ভৃত্যসমূহের) ও সকলের (অর্থাৎ আমার পুত্র-ভৃত্য-আত্মীয়-স্বজন সকলের রক্ষণ (অথবা তৃপ্তি সাধন) করো। তোমাদের তর্পণের দ্বারা (তৃপ্তির দ্বারা) আমাদের সর্বজনের তৃষ্ণা ইত্যাদি রহিত হোক। ওষধিসমূহ সোমরাজের প্রজাস্থানীয় (বিশঃ খলু), তারা আমাদের নিমিত্ত সোমরাজকে দানে সমর্থ। সোম হলেন চন্দ্রদেবতা-সম্বন্ধীয় (সোমশ্চেন্দ্রদেবত্যঃ)। সেই নিমিত্ত ওষধীন্দ্র বিষয়েনাবীবৃধম ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা সোমের অভিমন্ত্রণ করা উচিত। মন্ত্রের অর্থ হলো–হে সুজাতা (সর্বজনের উপকারকারী)! শোভনজন্মা ও বিশেষভাবে ঋতপ্রজাতা অর্থাৎ যজ্ঞের নিমিত্ত উৎকর্ষের সাথে উৎপন্ন, হে ওষধিসকল! আমরা মনে মনে তোমাদের বর্ধন করছি (অর্থাৎ তোমাদের বৃদ্ধি কামনা করছি)। আমরা সর্বদা তোমাদের ভজন অর্থাৎ সেবা বা পূজা করব। সোমবল্লীরূপা দৈব বীরুধগুলি (শাখাপত্ৰচয়বিশিষ্টা লতাসমূহ) ইন্দ্রের সাথে ঐকমত্য হয়ে প্রাতঃসবন কর্মে সোমের অনুমোদন করুক। ওষধি হলো সোমের স্বকীয় প্রজা, এবং ইন্দ্র হলেন সোমের স্বকীয় দেবতা; এই মন্ত্র পাঠের দ্বারা ওষধিরূপা সোমের প্রজা ও ইন্দ্ররূপা সোমের দেবতার নিকট হতে সোমকে বিশেষভাবে যাচ্ঞা করে নিয়ে অভিষব করণীয়। সোমের অভিষবণ কালে (ক্ষরিত হওয়ার সময়ে) প্রস্তর হতে সোমের লেশমাত্র অংশ ভূমিতে পতিত হলে, সেই লেশ যজমানের ইন্দ্রিয় ইত্যাদির নিঃশেষে বিনাশে সমর্থ হয়। এই বিনাশ পরিহারের নিমিত্ত আ মাহস্ক ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা সেই লেশকে অভিমন্ত্রিত করতে হয়। সেই মন্ত্রের অর্থ-হে ভূমিতে পতিত অংশ! তুমি প্রজাবর্গ ও ধনসমৃদ্ধির সাথে আমার প্রতি আস্কান্ অর্থাৎ পুনরায় আগত হয়েছ। অতএব আমার ইন্দ্রিয়সামর্থ্য (বীর্য) বিনাশ করো না। এই অভিমন্ত্রণের দ্বারা প্রজা ইত্যাদির বিনাশ হবে না, এমনই প্রার্থনা করা হয়েছে। দুষ্প অর্থাৎ সোমরস-বিন্দু পৃথিবীতে স্কন্দিত অর্থাৎ ক্ষরিত বা পতিত হলে, সেই বিন্দু আহুত হয়ে দ্যুলোক, অন্তরিক্ষলোক ও ভূলোক–এই তিনটি স্থানে সঞ্চারিত হয়ে যায়। যে দিকে ঐ দুষ্প পতিত হয়, সেই দিক ব্যতিরিক্ত হোমযোগ্য সপ্তদিকে অনুক্রমে তার যাগ কর্তব্য (করছি), যাতে এই দ্রঙ্গ আদিত্য ইত্যাদি তিন স্থানে সঞ্চারিত হয়ে উপকার করে ॥৮৷৷
মর্মার্থ- যিনি অর্থাৎ যে যজমান দেবতাগণকে যশ বা কীর্তি অর্পণ করেন, তিনি দেবলোকে অর্থাৎ স্বর্গে দেবগণের মধ্যে যশস্বী হন এবং ভূলোকে মনুষ্যগণের মধ্যে মনুষ্য-যশবান্ হন (অর্থাৎ দেবলোকে দেব্যশস্বী ও মনুষ্যলোকে মনুষ্য-যশস্বী হয়ে থাকেন)। এই দুটির সিদ্ধির উপায় কথিত হচ্ছে।–আগ্রয়ণ গ্রহের (সাগ্নিকের কর্তব্য যজ্ঞ বিশেষের) পূর্বে অন্তর্যামী, ইন্দ্র, বায়ু ইত্যাদির উদ্দেশে যে উপাংশু (অপরের শ্রবণের অযোগ্য জপ সমন্বিত) যাগ করা হয় (গ্রহানংশু পাংশ্বন্তর্যামৈন্দ্ৰবায়বাদী গৃহূতি), তাতে দেবলোকে অর্থাৎ দেবতাগণের মধ্যে কীর্তিপ্রাপ্তি ঘটে এবং ঈষৎ উচ্চ মন্ত্র-ধ্বনির দ্বারা যাগ করলে মনুষ্যগণের মধ্যে কীর্তিপ্রাপ্তি হয়। এর ফলে যজমান দুটি লোকেই কীর্তি প্রাপ্ত হন (লোকদ্বয়ে কীর্তির্ভবতি)। আমাদের অনুষ্ঠিত প্রাতঃসবনে এই অগ্নি আমাদের রক্ষা করুন। স্বকীয় মহিমার দ্বারা বিশ্বের বা সকলের সুখপ্রাপক বৈশ্বানর (বিশ্বের সকল মানুষের পালক) অগ্নিদেব আমাদের ধন প্রদান করুন (ধনং দদ্যাৎ); সেই পাবক অগ্নি আমাদের শোধন অর্থাৎ পাপক্ষয় করুন, আমরা সহভক্ষগণের (অর্থাৎ সকলের) সাথে অবস্থান করব।–এই হলো প্রাতঃ-সবন সমাপ্তির (প্রাতঃসবনসমাপ্তেী) হোমমন্ত্র। মরুত্বর্গ, ইন্দ্র ও সকল দেবতা (সর্বে দেবা) এই দ্বিতীয় মাধ্যন্দিন সবনে আমাদের যেন পরিত্যাগ না করেন (মা পরিত্যজেয়ুঃ)। আমরা সুদীর্ঘ আয়ু প্রাপ্ত হয়ে যে দেবগণের উদ্দেশে স্তোত্র ইত্যাদি বলব, তাদের অনুগ্রহবুদ্ধিতে যেন অবস্থান করতে পারি।–এই হলো মাধ্যন্দিন সবন সমাপ্তির (মধ্যন্দিনসবনসমাপ্তেী) হোমমন্ত্র। বিদ্বান ঋত্বিকগণের সাথে সম্বন্ধযুক্ত (অর্থাৎ তাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত) আমাদের এই তৃতীয় সবনে অর্থাৎ শোভন যাগে আমাদের ধনযুক্ত করে সেই দেবগণ আগত হোন, যে দেবগণ চমসগণের প্রেরণকারী (অর্থাৎ বিশেষ যজ্ঞপাত্রসমূহের প্রেরক), ইন্দ্র-সম্বন্ধী যে দেবগণ ঋভু-নামে অভিহিত হয়ে স্বর্গপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই হলো তৃতীয় সবন সমাপ্তির (তৃতীয়সবনসমাপ্তেী) হোমমন্ত্র। অতঃপর আঘারমন্ত্র পাঠ করা কর্তব্য।–আঘার মন্ত্রের অর্থ-হে দেবগণ! আমাদের এই অধ্বর অর্থাৎ যজ্ঞ হিংসকরহিত হোক। হে সোম! আপনি এই যজ্ঞকে হিংসারহিত ও ঘৃতবৎ সিঞ্চিত করুন; কারণ আমাদের এই যজ্ঞ ওষধি, পশু ও সর্বজন সহ সকল প্রাণীর (মঙ্গলের) নিমিত্ত অনুষ্ঠিত। এতে সৌম্য ঐন্দ্র ও বায়ু ইত্যাদি গ্রহের বিস্তৃতি হবে। যিনি এমন বিষয় জ্ঞাত হন, তিনিও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। আরও, দ্যাবা পৃথিবী ঘৃতের দ্বারা সিক্ত হলে, তা সকল প্রাণীর উপজীব্য হবে। যিনি এমন বিষয় জ্ঞাত হন, তিনিও উপজীব্য (আশ্রয়) লাভ করেন। হে রুদ্র! ক্রুর দেবগণের নিকট হতে যাচিত এই সংস্রাব আপনার ভাগ, আপনি তা সেবন (ভোগ) করুন। গাভীসমূহের পালন, ধনের সাধন, শোভন পুত্র ও সম্বৎসরব্যাপীনিম্পাদ্য ওষধিসমূহের রক্ষা (অবিনাশং) আপনি জানেন। সেই হেতু এগুলি সবই আমাদের নিমিত্ত সম্পন্ন করুন।–সংস্রাব হোমের বিধান বিষয়ে একটি আখ্যায়িকা সম্যক রচিত হয়েছে (পীঠিকামারচয়তি)।–মনুর বহু পুত্রের মধ্যে নাভানেদিষ্ঠ নামক কনিষ্ঠ বালক পুত্রটি ব্রহ্মচর্য-পালনের দ্বারা বেদাধ্যয়ন করতে অন্যত্র গমন করেছিলেন। ইতিমধ্যে (তদানীং) মনু তার জ্যেষ্ঠ পুত্রগণের মধ্যে স্বকীয় সকল ধন বিভাগ করে দিয়েছিলেন, অর্থাৎ অধ্যয়নরত বালক পুত্রটিকে ভাগরহিত করে দিয়েছিলেন। পরে (অধ্যয়নশেষে) সেই বালক পুত্র (নাভানেদিষ্ঠ) গৃহে প্রত্যাগত হয়ে পিতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন্ হেতুতে আমাকে ভাগ হতে বঞ্চিত করলেন? তখন মনু তাকে জানালেন যে, তিনি তাকে ভাগরহিত করেননি এবং সেই ভাগপ্রাপ্তির উপায়ের নিমিত্ত পুত্রকে উপদেশ দান করলেন। তিনি বললেন, এই যে অঙ্গিরা নামক মহর্ষিগণ স্বর্গপ্রাপ্তি-সাধনের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করছেন, এঁরা নাভানেদিষ্ঠ-নামক শস্ত্র (প্ৰগীত মন্ত্রবিশেষ) ইত্যাদি অপরিজ্ঞাত আছেন; এবং সেই জন্য এঁরা স্বর্গে গমন করতে সমর্ত হবেন না। তুমি তাদের যজ্ঞে গমন পূর্বক শস্ত্র ইত্যাদি প্রতিপাদক (নিম্পাদক) ব্রাহ্মণ (বেদের অংশবিশেষ) পাঠ করো। তাহলে যজ্ঞের পরিসমাপ্তিতে তারা স্বর্গে গমনকালে যাগের উপযুক্ত আপন আপন অবশিষ্ট সকল পশু তোমাকে প্রদান করবেন। এই হলো ভাগপ্রাপ্তির উপায়। সেইমতো করে (অর্থাৎ পিতার কথামতো যজ্ঞে গমন পূর্বক ব্রাহ্মণ-মন্ত্র পাঠ করে যজ্ঞবশিষ্ট পশুসমূহ লাভের পর) নাভানেদিষ্ঠ যখন পশুগুলিকে সঞ্চারিত করে গৃহে প্রত্যাগমন করছিলেন, সেই সময়ে রুদ্র আগত হয়ে বললেন, যজ্ঞশেষে অবশিষ্ট দ্রব্যসমূহে আর যজ্ঞকারীর স্বামিত্ব থাকে না, সুতরাং যজ্ঞকারীর দানের অধিকার নেই। যজ্ঞশেষের এই অবশিষ্ট সব কিছুই আমার। তুমি আমার বিনা অনুমতিতে এগুলি নিয়ে গমন করছ কেন? তাতে নাভানেদিষ্ঠ বললেন, এই পশুগুলি অঙ্গিরা ঋষিগণ আমাকে দান করে গেছেন। রুদ্র বললেন, এই যজ্ঞাবশিষ্ট পশুসমূহে তাদেরই যখন অধিকার নেই, তারা তা তোমাকে কেমন করে দান করতে পারেন? এগুলিতে তোমার কোন অধিকার নেই; কারণ যজ্ঞ সমাপ্তির পরে যজ্ঞভূমিতে যা কিছু অবশিষ্ট থাকে, তার সবই আমার অধিকারভুক্ত। সেইজন্য আমার অনুজ্ঞা ব্যতিরেকে কেউই যজ্ঞভূমিতে প্রবেশে সমর্থ হয় না। অবশ্য যদি তোমার পশুর প্রয়োজন থাকে, তবে আমাকেও যজ্ঞ-ভাগ অর্পণ করে। এর ফলে আমি এই পশুগুলির বিনাশ সাধন করব না। অতঃপর নাভানেদিষ্ঠ সেই রুদ্রের উদ্দেশে মন্থি সংস্রাব যাগের অনুষ্ঠান করলেন (মন্থিনঃ সংস্ৰাবমজুহোৎ)। তাতে তুষ্ট হয়ে রুদ্র নাভানেদিষ্ঠের পশুগুলির প্রতি হিংসা পরিত্যাগ করে তাকে সমস্ত পশু দান করলেন।-এই কথা জ্ঞাত হয়ে যিনি মন্থি সংস্রব যাগ করেন, রুদ্র তার পশু হনন করেন না (তত্র রুদ্রঃ পশুনভি মন্যতে)।–এটাই এই আখ্যানের পরিসমাপ্তির বিধান ॥৯॥
মর্মার্থ– আমি বাগদেবতার (বাগবাদিনী দেবী সরস্বতীর) প্রিয় হবো (প্রিয় ভূয়াসং); সেইরকমে অর্থাৎ সেই কারণে যিনি বাক্যের পালক, সেই দেবতার প্রিয় হবো। হে বাকের অধীশ্বরী দেবি! শব্দরূপ বাক্যের সম্বন্ধযুক্ত যে মধুর তা আমাতে স্থাপন করুন। আমি সেই সরস্বতীর উদ্দেশে আহুতি প্রদান করছি (তুভ্যমেতদ্রুতমস্তু)। হে বাগদেবি! আপনি ঋকের যোনিভূত (সৃষ্টি) স্তোত্রের (সামাবৃত্তির) সমৃদ্ধি সাধন করুন; সেই ভাবে গায়ত্রীর সাথে রথস্তর সামের বর্ধন করুন এবং গায়ত্রীর বর্তনীর বা মার্গের দ্বারা বৃহৎসামের বর্ধন করুন [তাৎপর্য এই যে, এই কর্মানুষ্ঠানে (যজ্ঞে) বৃত ঋত্বিকগণের ঋক-সাম ইত্যাদি সম্পর্কিত (ঋক্সামাদিগতং) যে বৈকল্য, তা পরিহার করে এই যজ্ঞের সমৃদ্ধি সাধন করুন]। হে সোম! আপনার সম্বন্ধী যে দুষ্প (সরবিন্দু) অভিষবণের প্রস্তর-ফলক হতে ভূমিতে পতিত হয়েছে, অথবা অধ্বর্যর বাহুচ্যুত হয়ে ক্ষরিত হয়েছে, অথবা পবিত্র (আজ্যসংস্কারক কুশদ্বয় অথবা অনামিকাস্থ কুশাঙ্গুরীয়) হতে ভূমিতে নিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে, সেই বিন্দু গ্রহণ করে আমি স্বাহাকারের দ্বারা ইন্দ্রের উদ্দেশে সমর্পিত করে যাগ করছি। হে ইন্দ্র। যে রসবিন্দু সবনীয় পুরোডাশ-দ্রব্যসমূহ, লাজসমূহ (আর্দ্র তণ্ডুল বা ভৃষ্টধান্য), সোম (সোমলতা ) ও মন্থী (শুক্রশ্চ গ্রহৌ) হতে ভূমিতে পতিত হয়েছে, সেই রসবিন্দু আপনার উদ্দেশে স্বাহাকারের দ্বারা সমর্পিত করে যাগ করছি। হে সোম! আপনার যে রসবিন্দু মধুময় ও ইন্দ্রিয়ের সামর্থ্য বৃদ্ধিকারী, যা আমার দ্বারা স্বাহামন্ত্ৰকৃত হয়ে দিব্যলোকে, বা পৃথিবীলোক, বা অন্তরীক্ষলোকে পতিত হয়ে পুনরায় দেবতাগণের প্রাপ্ত হচ্ছে, সেই বিন্দু আমি স্বাহাকারের দ্বারা ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে সমর্পিত করে যাগ করছি। বহিষ্পবমানের নিমিত্ত গমনকারী ঋত্বিকবৃন্দের মধ্যে অধ্বর্য প্রথমে গমন করেন, সেই অধ্বর্য স্তোমযুক্ত করবেন (স্তোমো যোক্তব্য)। বহিষ্পবমান-স্তোত্র প্রস্তোতা ইত্যাদিতে যুক্ত হয়ে থাকে–অভিজ্ঞ জনেরা এই কথা বলে থাকেন (ইত্যভিজ্ঞা আহুঃ)। তা যোজনা করার নিমিত্ত বাগগ্রেগা ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করা কর্তব্য। অগ্রে গমনে সমর্থ যিনি, তিনি অগ্রেগা।–সেই রকম, বাগদেবতা ঋত্বিকগণের অগ্রে গমন করুন; সেই কথংভূতা বা দেবগণের প্রাপ্তির নিমিত্ত ঋজু-মার্গে (সহজ বা সোজা পথে) গমন করে থাকেন; তিনি আমারূপী অধ্বর্যকে যশ দান করে থাকেন; তিনি গো-ইত্যাদি পশুর প্রাণকে সুস্থিরতা দান করেন, এবং তিনি আমার ও যজমানের পুত্র ইত্যাদি রূপ প্রজাগণকে দান করে থাকেন। এই মন্ত্র পাঠ পূর্বক অধ্বর্য যজ্ঞমুখে বহিষ্পবমানের আরম্ভে বাক্যকে যযাজিত করেন। বহিষ্পবমানের গতির কাল নির্দেশ করা হচ্ছে। ইন্দ্র, বায়ু ইত্যাদির পূর্বভাবী সকল গ্রহগুলিকে (অর্থাৎ পূর্বেই প্রস্তুত যজ্ঞীয় পাত্রগুলিকে) গ্রহণ পূর্বক ঋত্বির্গ বহিষ্পবমানে গমন করেন। এর দ্বারা যজ্ঞের বাস্তু অর্থাৎ গৃহরূপ স্থান করা হলো। সেই হেতু সেই গ্রহের উর্ধ্বে ঋত্বিকগণ গমন করবেন। পুনরাবৃত্তিরহিত ঋত্বিকগণ বহিষ্পবমানে গমন করেন, এবং সামগানকারীগণ ঋমন্ত্রে স্তব করে যাতে যজ্ঞবিঘ্ন না হয়, সেই নিমিত্ত পুনরায় সোমের সমীপে আগমন পূর্বক যজমানের নিকট অবস্থান করে থাকেন। বিষ্ণু ব্যাপ্তত্বের নিমিত্ত যজ্ঞস্বরূপ, এই কারণে বৈষ্ণব মন্ত্রে পুনরায় প্রবর্তন (অর্থাৎ আরম্ভ বা প্রচলিত করা) হয়। এইস্থলে মন্ত্র পাঠের তাৎপর্য কথিত হচ্ছে।–হে বিষ্ণু! আপনি আমার অস্তিকতম (নিকটবর্তীতম) হোন। হে আমাদের অপরাধসমূহ সহকারি (সহত্যাস্মদপরাধং সহিষ্ণো)! আপনি আমাদের সুখ প্রদান করুন। আপনার সম্বন্ধী সোমরসের ধারা মধুর রস ক্ষরণ পূর্বক ক্ষয়রহিত হয়ে প্রকর্ষের সাথে প্রবাহিত হোক। এই মন্ত্র পাঠের দ্বারা পাত্রের মধ্যে পুর্বে গৃহীত সোম চির-অবস্থানেও স্বরূপেই বিদ্যমান থাকে, কখনও শুষ্ক হয় না, বরং সর্বতোভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত বা প্রীতিকর সদৃশ হয় (তৎসমাপ্যায়িতমেব ভবতি) ॥১০।
মর্মার্থ- বহিষ্পবমান, মাধ্যন্দিন পবমান ও আর্ভব পবমান–এই তিনটি (পবমানত্রয়গতা) স্তোত্রবিশেষ, যা সামবেদে পরম্পরাক্রমে কথিত হয়েছে, তা যে যজমান মন্ত্ররূপে পাঠ (বা জপ) করেন, সেই যজমান কখনও পবমান হতে বিচ্ছিন্ন হন না। যথা,-হে বহিষ্পবমান! আপনি শ্যেনপক্ষীর ন্যায় শীঘ্রগতিসম্পন্ন ও গায়ত্রীছন্দযুক্ত হয়ে থাকেন। আপনাকে আমি অনুক্রমে গ্রহণ করছি (বা জপ করছি), আপনি আমাকে নির্বিঘ্নে সম্যকভাবে পার করুন।–হে মাধ্যন্দিন পবমান! আপনি সুপর্ণের (স্বর্ণচুড়াপক্ষীর) ন্যায় উৎপতনশীল (উধ্বগামী) ও ত্রিষ্ঠুভ ছন্দযুক্ত হয়ে থাকেন। আপনাকে আমি মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা অনুক্রমে গ্রহণ করছি (বা জপ করছি), আপনি আমাকে নির্বিঘ্নে সম্যভাবে পার করুন।–হে আর্ভব পবমান! আপনি ভাস-নামক পক্ষীর ন্যায় নিম্নে পতিত (অর্থাৎ নিম্নগামী) হতে সমর্থ ও জগতীছন্দযুক্ত হয়ে থাকেন। আপনাকে আমি অনুক্রমে গ্রহণ করছি (বা জপ করছি), আপনি আমাকে নির্বিঘ্নে সম্যভাবে পার করুন। যে যজমান বহিষ্পবমান ইত্যাদি শব্দ-অভিধেয়মান তিনটি পবমান স্তোত্রবিশেষ অবিচ্ছিন্নভাবে (অবিচ্ছেদে) বিদিত হন, তিনি সম্পূর্ণ আয়ু প্রাপ্ত হন (অর্থাৎ জন্মকালে কর্ম ও দেবতাগণের দ্বারা পরিকল্পিত সম্পূর্ণ আয়ু ভোগে সমর্থ হন), তাঁর অপমৃত্যু (বা অকালমৃত্যু) ঘটে না, এবং তিনি (অর্থাৎ সেই মযজমান) প্রজা ও পশুসমৃদ্ধ হয়ে থাকেন। দ্রোণকলশ (কাষ্ঠনির্মিত সোমরসাধার কলশ) ইত্যাদির তিনটি গ্রহ (যজ্ঞীয় পাত্ৰসমূহ) ঐন্দ্র বায়ব ইত্যাদি গ্রহের ন্যায় (অর্থাৎ ইন্দ্রসম্বন্ধী কিংবা বায়ুসম্বন্ধী যজ্ঞ পাত্রের মতো) মন্ত্রের দ্বারা গ্রহণ কর্তব্য। সেই সমস্ত পবমান সম্বন্ধী গ্রহসমূহ সন্ততি-প্রাপ্তির নিমিত্ত গৃহীতব্য এবং এর ফলে অধ্বর্যর প্রাণবিচ্ছেদ হয় না, অর্থাৎ তিনি পূর্ণ আয়ু লাভ করেন। মন্ত্রের অর্থ–হে সোমরস! তুমি পার্থিব পাত্রের দ্বারা (কলশের দ্বারা) গৃহীত হয়েছে। তোমাকে প্রজাপতির নিমিত্ত গ্রহণ করেছি (অর্থাৎ প্রজাপতিকে নিবেদন করা হচ্ছে)। এই মন্ত্র পাঠপূর্বক দ্রোণকলশটি স্পর্শ করতে হবে। এইভাবে, হে সোমরস! তোমাকে উপখামের দ্বারা (অর্থাৎ মৃত্তিকানির্মিত যজ্ঞীয় ভাণ্ডে বা পাত্রে) ইন্দ্র ও সকল দেবগণের নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করছি–এই মন্ত্র পাঠ পূর্বক তিনটি পাত্র স্পর্শ কর্তব্য, তাতে পবমান স্তোত্র অবিচ্ছিন্ন হবে এবং যজমান ও পূর্ণ আয়ু ইত্যাদি প্রাপ্ত হবেন (যজমানোহপি আয়ুরাদিকং প্রাপ্নোতি) ।১।
মর্মার্থ- প্রাতঃসবন, মাধ্যন্দিন সবন এবং তৃতীয় সবন–এই তিন সবন সর্বৰ্থা বর্তমান (ভবন্তি)। এই তিন সবনের মধ্যে প্রথম দুটিতে অর্থাৎ প্রাতঃসবনে ও মাধ্যন্দিন সবনে সোম অভিযুত (অর্থাৎ সোমরসের নিপীড়ন) হয়; কিন্তু তৃতীয়টিতে অর্থাৎ তৃতীয় সবনে সোম অভিযুত হয় না, তার ভর্জনপাত্র-বিশেষ সেখানে অভিযুত হয়। এর ফলে সোমের সূক্ষ্ম অংশ (সোমাংশু)-রহিত তৃতীয় সবনের অনুষ্ঠান করে যজমান সেই সবনের বিনাশ করে থাকেন; কারণ সবন শব্দের অর্থ হলো সোমের অভিষবন (অর্থাৎ যেখানে সোম অভিযুত হয়), অথচ তৃতীয় সবনে তার সম্ভাবনাই থাকে না; সুতরাং কোন যুক্তিতে তাকে সব বলা যায়? এই নিমিত্তই কথিত হয়েছে–সেই উপাংশু গ্রহে (পাত্রে) কিছুটা অনভিযুত সোমাংশু নিক্ষিপ্ত (প্রক্ষিপ্ত) করে তৃতীয়সবন পর্যন্ত তার অভিষবন কর্তব্য (অভিযুণুয়াৎ)। সেই অভিষবে সেই অংশুকে বসতীবরী জলের দ্বারা পূর্ণ করা কর্তব্য। এইভাবে জলের দ্বারা আপ্যায়িত হলে সেই তৃতীয় সবনও অন্যান্য সবনের ন্যায় সোমাংশুযুক্ত হয়ে থাকে। তার ফলে তৃতীয় সবনের সাথে সব সবনগুলি সোমাংশুযুক্ত হওয়ার কারণে সমশক্তিসম্পন্নকৃত হয়ে থাকে (তুল বীর্যানি কৃতানি ভবন্তি)। অতঃপর আপস্তম্বের দুটি মন্ত্রের বিনিয়োগ (পাঠ) করণীয়। প্রথম মন্ত্রের দ্বৌ সমুদ্রৌ ইত্যাদির দ্বারা দুটি সমুদ্রের ও দুটি অহোরাত্রের (অহঃ ও রাত্রির) আরোপ পূর্বক পূতভৃৎ ও আধবনীয়ের স্তুতি করা হয়েছে। দুইট যেন বিস্তীর্ণ সমুদ্র, যা কখনও শুষ্ক হয়ে যায় না। সেই রকম এই দুটি (পূতভৃৎ ও আধবনীয়) পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয় (অর্থাৎ এই দুটির প্রয়োগ কখনও স্তব্ধ হয় না)। সমুদ্রের মধ্যে যেমন প্রথম একটি তরঙ্গের পিছনে অপর একটি তরঙ্গ পর পর (পর্যায়ক্রমে) আগত হয়, সেই রকম পূতভৃৎ ও আধবনীয় পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে (উপযুজ্যতে)–(অর্থাৎ পূতভৃতের পরে আধবনীয়, আবার আধবনীয়ের পরে পূতভৃৎ, এইরকম)। ঠিক এইরকমেই দিবা ও রাত্রির সাথে পূতভৃৎ ও আধবনীয়ের তুলনা করা হয়েছে। দিবার পর রাত্রি ও রাত্রির পর দিবা এই তো পর্যায়ক্রম। দিবাভাগে মানুষজন সবকিছু দর্শন করতে পারে, সেই কারণে সহজেই উত্তীর্ণ হয়, কিন্তু রাত্রে সেতুসদৃশ নৌকার দ্বারা উত্তীর্ণ হয়, এটাও তুলনার একটি দিক। তারপর দ্রোণকলশকে আদিত্যরূপে স্তুতি করা হয়েছে। এক আদিত্য যেন দিবা ও রাত্রিরূপ দুটি বস্ত্রে আপনাকে আচ্ছাদিত করেছেন। সেই দুটি অবিচ্ছেদে অবস্থিত থাকে (অবিচ্ছেদেন-বর্তেতে), সেখানে দিবা ও রাত্রির মধ্যে কোন বিচ্ছেদ থাকে না। এক আদিত্য কেশসমান রশ্মিযুক্ত হয়ে আপন সেই রশ্মির দ্বারা সর্ব লোককে প্রকাশ করছেন (প্রকাশয়মানঃ)। ঐ দুটি (উভয়) বস্ত্রের মধ্যে রাত্রিরূপ বস্ত্র মলিন এবং দিবারূপ বস্ত্র শুভ্র। যখন আদিত্য রাত্রিরূপ কৃষ্ণ বস্ত্র পরিধান করেন, তখন তিনি আপন রূপকে তিরোহিত (আচ্ছাদিত) করে থাকেন। তারপর রাত্রির অবসানে (পরে) সেই কৃষ্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে দিবারূপ শুক্লবস্ত্র পরিধান করেন। আদিত্য যেমন কখনও তিরোহিত হন, কখনও আবির্ভূত হন, দ্রোণকলশও সেইরকম হবিধানের শেষে তিরোভূত হয়ে থাকেন। দেবগণ পুরাকালে অসুরবিজয়ের নিমিত্ত যজ্ঞানুষ্ঠান আরম্ভ করলে, অসুরগণও তা জ্ঞাত হয়ে সেইরকম যজ্ঞানুষ্ঠান করতো (তথৈবাকুর্বত)। অতঃপর দেবগণ জয়ের অভাবে পুনরায় বিচার-বিবেচনা করে জয়ের উপায় স্বরূপ সোমাগরূপ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে কৃতনিশ্চয় হলেন, এবং অসুরগণ যাতে সেই মহাযজ্ঞের কথা জানতে না পারে, সেই নিমিত্ত গুপ্তভাবে তার অনুষ্ঠানে রত হলেন (প্রচ্ছন্নমনুষ্ঠিতবন্তঃ)। বাহিরে (অর্থাৎ প্রকাশ্যভাবে) প্রসিদ্ধ অগ্নিহোত্র যাগের অনুষ্ঠান প্রদর্শন পূর্বক তারা গোপনে দীক্ষাব্রতের অনুষ্ঠান করতেন (দীক্ষাব্রতমকুর্বত)। সায়ংকালে ও প্রাতঃকালে যেমন দুবার অগ্নিহোত্র যাগ করতে হয়, তেমন করে তারই মধ্যে ক্ষীরপানরূপ ব্রত ও সায়ং ও প্রাতঃকালে অনুষ্ঠিত করতেন। প্রকাশ্যে পৌৰ্ণমাস যজ্ঞের প্রসার (প্রদর্শন) করে তারই মধ্যে অগ্নীযোমীয় যাগের অনুষ্ঠান করতেন (পশুমকুর্বত)। সেইরকমেই প্রকাশ্যে দর্শপূর্ণ মাসের প্রসার করে তারই তারই মধ্যে আগ্নেয় সবনের যাগ অনুষ্ঠান করতেন। এইভাবে প্রকাশ্যে চাতুর্মাস্যরূপ বৈশ্যদেবের যাগ অনুষ্ঠানের মধ্যেই প্রাতঃসবন করতেন। প্রকাশ্যভাবে বরুণপ্রঘাসের অনুষ্ঠান করে তারই অন্তরালে মাধ্যন্দিন সবনের অনুষ্ঠান করে নিতেন। সেইভাবে প্রকাশ্যে সাকমেধের দ্বারা পিতৃযজ্ঞ ও ত্র্যম্বকের যজ্ঞ প্রসারিত করে তারই মধ্যে তৃতীয় সবনের অনুষ্ঠান করতেন। তখন (তদানী) অসুরগণ দেবতাদের ক্রিয়ামান যজ্ঞের ক্রম অবগত হতে ইচ্ছা করে বাহিরে (অর্থাৎ দেবতাগণের দ্বারা প্রকাশ্যে) অনুষ্ঠিত অগ্নিহোত্র ইত্যাদি দর্শন পূর্বক বিভ্রান্ত হয়ে গুপ্তভাবে অনুষ্ঠিত সোমযাগের অনুক্রম অবগত হতে ব্যর্থ হলো। সেই নিমিত্ত তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো–আমরা এই দেবগণকে হিংসা করতে সমর্থ নই, কারণ এঁরা আমাদের হিংসার বাহিরে (ইমে দেবা অধ্বর্তবা অম্মাভিধ্বারতুং হিংসিতুমশকা অভুবন্নিতি)। সেই কারণে যে যাগে হিংসা করা হয় না এই অর্থে অধ্বর শব্দটি সম্পন্ন হয়েছে। সেই অধ্বর (সোমযাগের) অনুষ্ঠানের দ্বারা দেবগণ বিজয়ী হলো ও অসুরগণ পরাজিত হলো। এই তথ্য বিদিত হয়ে যিনি সোমের দ্বারা যাগানুষ্ঠান করেন, তিনি শত্রুগণকে পরাভূত করতে সক্ষম হয়ে থাকেন (পরাহস্য ভ্রাতৃব্যো ভবতি) ॥২॥
মর্মার্থ- হে সোম! আপনি যেভাবে অগ্নিকে ব্যাপ্ত করে অবস্থিত, সেইভাবে ইন্দ্র ও সকল দেবতাকেও ব্যাপ্ত করে আছেন। আমাকে ব্ৰহ্মতেজের দ্বারা ব্যাপ্ত করে অবস্থিত আছেন। আপনি আমাদের পবিত্রতা সম্পাদন করুন (পবস্ব, শোধয়ঃ)। হে রাজন (সোম)! আপনি আমাদের গাভী, জন, অশ্ব ও ওষধি (প্রাপ্তি বা বৃদ্ধিজনিত) সুখ প্রদান করুন। হে ধনপতি! আপনার প্রসাদে আমরা শোভনপুত্রপ্রাপ্ত হয়ে ধনের দাতা হবো। আপনার দানপ্রার্থী আমাকে ধন প্রদান করুন। আপনার রস ভক্ষীয় কালে (অর্থাৎ পানযোগ্য সময়ে) প্রাপ্ত হচ্ছি (পান করছি)। এই পানের ফলে আপনার প্রসাদে উত্তর্ষের সাথে অতি উজ্জ্বল হবো৷ এই মন্ত্রের দ্বারা সকল রাজারই সামান্যরকম অবেক্ষণ (সমাদর বা সম্মান জ্ঞাপন) করা হয়; বিশেষভাবে এই মন্ত্রের দ্বারা পাত্রগত সোমকে অবেক্ষণ করা কর্তব্য। হে উপাংশুপাত্র! তুমি বলপ্রদ হয়ে থাক, অতএব তুমি আমার প্রাণ ও বলের শোধন করো (শোধয়)। সেইভাবে তুমি আমার অপান (নিঃশ্বাসোহবধাবৃত্তি), ব্যান (বিধবৃত্তি), বা (বচনসামর্থ), প্রাণাপান (প্রাণ অর্থাৎ দক্ষ এবং অপান অর্থাৎ ক্রতু; দক্ষতু), চক্ষু (দৃষ্টিশক্তি), শ্ৰোত্ৰ (শ্রবণশক্তি), আত্মা (জীবঃ), অঙ্গসমূহ (হস্তপদ ইত্যাদি), আয়ু (জীবৎকাল) ও বীর্যের (সামর্থ্যের) শোধন করো। হে দ্রোণকলস তুমি বিষ্ণুর জঠর হও (অর্থাৎ বিষ্ণুর জঠরের ন্যায় পবিত্রকারক), তুমি তেজঃপ্রদ, তেজের নিমিত্ত (আমি যাতে তেজঃপ্রাপ্ত হই, সেই নিমিত্ত) আমাকে শোধিত করো। হে আহবনীয় (বেদীর পূর্বদিকে স্থাপিত অগ্নি)! আপনি প্রজাপতিরূপ হন; আপনাকে প্রজাপতির সুখের নিমিত্ত অবেক্ষণ করছি। হে আহবনীয়! আপনাকে সোমের দ্বারা তৃপ্ত করছি, সোমের দ্বারাই আপনাকে আমোদিত করছি (হর্ষিতবানস্মি)। আপনার প্রসাদে শোভন শোভন ভৃত্যযুক্ত হবো, বীর পুত্রপৌত্র ইত্যাদির দ্বারা শোভন পুত্রপৌত্র ইত্যাদি সমন্বিত হবো, বলের (বা তেজের) প্রভাবে শোভন বলযুক্ত হবো, ধন ইত্যাদির পোষণের দ্বারা শোভন পুষ্টিযুক্ত হবো। হে সর্বসমষ্টিরূপ সোম! পূর্বে উক্ত প্রাণাপান ইত্যাদি সর্বফলসিদ্ধির কারণে বাদাতা আপনি বলের নিমিত্ত (বলপ্রাপ্তির উপযোগিতা সম্পাদনের নিমিত্ত) আমাকে শোধন করুন। অতঃপর বুভুষণ ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা আভিচারিক ক্রিয়ার নিমিত্ত সোমের অবেক্ষণের ক্ৰম কথিত হয়েছে (অভিচারার্থিনাং সোমাবেক্ষণং ক্রমেণ বিধত্তে)।-ঐশ্বর্যকামনা পূর্বক অবেক্ষণ কর্তব্য (বুভুষণ ভবিতুমিচ্ছনৈশ্বর্যকামঃ)। পাত্রে অবস্থিত এই নোম প্রজাপতির স্বরূপ (প্রজাপতিস্বরূপঃ)। এই হেতু এর দ্বারা (অর্থাৎ পাত্রস্থ সোমের অবেক্ষণের দ্বারা) সেই প্রজাপতির তর্পণ করা হয়ে থাকে (তপয়তি)। সেই প্রজাপতি তৃপ্ত হয়ে যজমানকে ঐশ্বর্যের নিমিত্ত (ঐশ্বর্যপ্রাপ্তির উপযুক্ত করার নিমিত্ত) শোধন করেন। চতুর্থ পর্যায়ে, সেই অভিচার বিষয়ে যজ্ঞাত্মা প্রজাপতি শত্রুগণের প্রাণ হতে বিযুক্ত করেন, অর্থাৎ বৈরিগণের প্রাণ ইত্যাদি হনন করেন (প্রাণাদিতভ্যাহন্তরেতি) ॥৩॥
মর্মার্থ- স্ক্য (খননহেতুঃ), বিঘন (ভূমিঘট্টনহেতুঃ), পশু (তৃণাদিচ্ছেদনহেতুঃ), পরশু (বৃক্ষাদিচ্ছেদনহেতুঃ) ইত্যাদি যজ্ঞীয় অস্ত্রসমুহ আমাদের অবিনাশের (অর্থাৎ আমরা যাতে বিনাশপ্রাপ্ত না হই তার) কারণভূত হোক। সেইভাবে এই অস্ত্রগুলির সাহায্যে আমরা যে বেদি নিষ্পন্ন করছি, তা আমাদের মঙ্গলদায়ক হোক (স্বস্তিরস্তু)। হে স্ক্য ইত্যাদি অস্ত্রগণ! তোমরা যাগের যোগ্য, অতএব এখানে আমাদের যজ্ঞ-সম্পাদক (যজ্ঞ সম্পাদনের সহায়ক) হও। তোমরা এই যজ্ঞে আমাকে অনুজ্ঞা প্রদান করো (অনুজানীত)। এই দেবাপৃথিবী লোকদ্বয় আমাকে অনুজ্ঞা প্রদান করুক। এই বহিঃষ্পবমান দেশ আমাকে অনুজ্ঞা প্রদান করুক। এইভাবে দ্রোণকলশ, সোম, অগ্নি, দেবগণ, যজ্ঞ, প্রশাস্তা-ব্রাহ্মণচ্ছংসী ইত্যদি হোতৃগণ, সকলেই আমার আহ্বান অনুমোদন করুন (অর্থাৎ যজ্ঞ-সাধনের সহায়ক হোন)। যে অগ্নিদেব যজ্ঞের বিনাশক (মখহা), তার উদ্দেশে আমি মখস্নেহগ্নয়ে নমোহস্ত বলে নমস্কার করছি। এই মন্ত্রে মখ শব্দের দ্বারা যজ্ঞকে বোঝানো হয়েছে নমস্কার করা না হলে অগ্নিদেব যজ্ঞ বিনাশ করে থাকেন (যজ্ঞমেব সোহগ্নিস্তদা হন্তি যদা নমস্কারো ন ক্রিয়তে); অতএব সেই অগ্নিকে নমস্কার করলে যজমানের শরীরে কোন পীড়া হয় না (অর্তিন ভবতি)। আগ্নীঘ্ৰীয়ে অবস্থিত অগ্নিদেব যজ্ঞবিনাশক রুদ্ররূপ, আমি সেই রুদ্রের উদ্দেশে নমস্কার করছি। হে রুদ্রদেব! আমাকে রক্ষা করুন।–এই মন্ত্রের দ্বারা অগ্নীব্রম্ অগ্নির সেবা করলে যজমানের শরীরে কোন পীড়া হয় না। পরম ঐশ্বর্যযোগে হোত্ৰীয় অগ্নিদেব যজ্ঞঘাতী ইন্দ্ররূপ, সেই যজ্ঞঘাতীর উদ্দেশে নমস্কার করছি। হে ইন্দ্র! আমার ইন্দ্রিয়সামর্থ্য ও বীর্য আপনি বিনাশ করবেন না (মা বিনাশয়)।–এই মন্ত্রে দ্বারা হোত্ৰীয়ের উপস্থানে অগ্নিকে স্থাপন পূর্বক আশিস প্রার্থনা করা হয়। তার দ্বারা ইন্দ্রিয়সামর্থ ও বীর্যের অবিনাশ (বিনাশরাহিত্য) সম্পাদিত হয়। অগ্নি-রুদ্র ইন্দ্ররূপী যে দেবগণের দ্বারা যজ্ঞস্থানে অবস্থিত যজমান ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গ আর্তি (পীড়া) প্রাপ্ত হন, তা বিদিত হয়ে যে যজমান সেই দেবগণকে নমস্কারের দ্বারা উপাসনা করেন, তারা যজ্ঞক্ষেত্রে প্রবিষ্ট হয়ে আর কোন পীড়া প্রাপ্ত হন না। এই নিমিত্ত পূর্বোক্তরূপে হে অগ্নি!, হে রুদ্র! হে ইন্দ্র! ইত্যাদি মন্ত্ৰসমূহ পাঠ করা কর্তব্য (পূর্বোক্তান্মান পঠেৎ)। হে দ্যাবাপৃথিবী! উপাসনাহীন জনের (উপস্থানরহিতের) প্রতি শিথিল (অর্থাৎ মন্দ বা বিরূপ) হলেও তোমরা উপাসকের (উপস্থাতার) অনুকূলে (অর্থাৎ মাঙ্গলে) দৃঢ় হয়ে থাক (দুঢ়ে স্থঃ)। অতএব উপাসক আমাকে প্রতিবন্ধকরূপ পাপ হতে রক্ষা করো। দ্যুলোক সংক্রান্ত (দ্যুলোক বিষয়ে) আমার কৃত পাপ হতে সূর্যদেব আমাকে রক্ষা করুন। অন্তরীক্ষলোক সংক্রান্ত আমার কৃত পাপ হতে বায়ুদেবতা আমাকে রক্ষা করুন, পৃথিবীলোক সংক্রান্ত পাপ হতে অগ্নিদেবতা, পিতৃলোক-বিষয়ক পাপ হতে যমদেব এবং মনুষ্যলোক-বিষয়ক আমার কৃত পাপ হতে সরস্বতী দেবী আমাকে রক্ষা করুন। হে দ্বাররূপা দেবীদ্বয়! উপাসক আমাকে আপনারা সন্তাপযুক্ত করবেন না। আমি সদঃ (অর্থাৎ যজ্ঞস্থান), সদস্পতি (অর্থাৎ যজ্ঞস্থানের অধিপতি ব্রহ্মা), প্রধান ঋত্বিক, দুলোক (দিবে) ও পৃথিবীলোকের (পৃথিব্যা) উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করছি, এবং আপন আপন ব্যাপারে (কর্মে) অগ্রগামী চক্ষুস্থানীয় (অর্থাৎ আপন আপন কর্মে) অভিজ্ঞজনকে নমস্কার করছি। যজমানের আয়তনে (যজ্ঞবেদীতে) সমুৎপন্ন হে তৃণ! তুমি এই স্থান হতে উখিত হও এবং আমাদের অপকারী পুরুষগণের স্থানে (সদনে) অবস্থান করো (তিষ্ঠ)। যে পুরুষ আমার তুলনায় অধম বা উন্নত, আমি তাদেরও উল্লঙ্ঘন করে যাব (তানপ্যহমুঙ্গেষমুল্লঙঘোপরি গম্যাসম)। অদ্যকার এই দিনে অগ্নিষ্টোম অনুষ্ঠানের উৎসবে, হে দাবাপৃথিবী (লোকদ্বয়)! যাতে কোনরকম বৈকল্য না ঘটে, তার নিমিত্ত আমাকে রক্ষা করো। যজ্ঞসভার সর্বস্থানে যজমানের পিতৃগণও ব্যাপ্ত হয়ে থাকেন, যজমান তাঁদের নমস্কার না করলে তারা (অর্থাৎ সেই পিতৃগণ) হিংসা, প্রকাশ করতে পারেন (হিংসিতুং প্রভবন্তি)। এই নিমিত্ত যজ্ঞসভার দক্ষিণভাগের প্রতি লক্ষ্য রেখে (অবেক্ষমান হয়ে) আগন্ত ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করণীয়। হে পিতৃগণ! আপনারা এই যজ্ঞসভায় আগত হয়েছেন (বা হোন)। এর দ্বারা আমি পিতৃমান হয়েছি (বা হবো), আপনারাও আমার দ্বারা শোভন অপত্যযুক্ত (পুত্ৰবা) হয়েছেন বা হবেন।–এই মন্ত্রের দ্বারা পিতৃগণকে নমস্কার করলে যজমানের কোন পীড়া হয় না ॥৪৷৷
মর্মার্থ- হে ভক্ষযোগ্য (পানযোগ্য)! সোমরস! তুমি আমাদের দীর্ঘায়ুত্ব সাধনের নিমিত্ত আমার নিকটে আগমন করো। তুমি আমার দেহে সুখকারিত্বের হেতু আগত হও। তুমি আমার ধনপুষ্টি ও তেজঃপ্রাপ্তির নিমিত্ত আগমন করো। তুমি আমার সুসন্তান ইত্যাদির নিমিত্ত আমার নিকট আগমন করো। নিবাসের হেতুভূত হে বসু! তুমি আমার বাসের নিমিত্ত আগমন করো। হে পুরোবসু! তুমি আমার চিত্তের প্রিয় (প্রিয়হসি)। হে ভক্ষ! দেবগণের চিকিৎসক যুগল অশ্বিনীকুমারের ন্যায় আমার এই বাহুদুটির দ্বারা আমি তোমাকে গ্রহণ করছি। হে সোমদেব! মনুষ্যের দর্শনীয় তোমাকে যেন আমি সুষ্ঠুভাবে দর্শন করতে পারি। আমার মুখস্থিতা বান্দেবতা যেন সোম পান করে (সেবমানা হয়ে) তৃপ্ত হোন। সেই বাক্ মা (অর্থাৎ হর্ষের হেতুভূতা), বিঘ্নের নাশয়িত্রী (বিঘানামভিভাবত্রী), যজ্ঞসমূহের কারণভূতা, অখণ্ডনীয়া এবং অনাহতশীঞ্চী (অর্থাৎ যাঁর আরম্ভ অপ্রতিবদ্ধা)-সেই হেন বাক্-দেবতা যেন সোমের দ্বারা সেবিতা হয়ে তৃপ্তি লাভ করেন। হে সোম! তুমি আমার নিকট আগমন করো। তুমি (সোম) শান্তিকারক (শস্তৃঃ) ও সুখদায়ক (ময়য়াভূঃ)–এই হেন তুমি আমার সন্নিহিত হও। হে হরিদ্বর্ণ (শ্যামল-বর্ণশালী)! আমরা যাতে বিনাশ প্রাপ্ত না হই, সেইভাবে আমাদের মধ্য প্রবেশ করো। আমাদের যজ্ঞ ইত্যাদির সিদ্ধির নিমিত্ত, উৎসাহ প্রদানের নিমিত্ত, ধনপুষ্টির নিমিত্ত এবং শোভনবীর্য পুত্র দানের নিমিত্ত তুমি আগত হও। হে রাজন! আমাকে উপদ্রবের দ্বারা বিশেষভাবে ভয় প্রদর্শন করো না, আমার হৃদয়পুণ্ডরীকে অবস্থিত (মনের) দীপ্তির দ্বারা আমাকে হিংসা করো না (মা বধীহিংসাং মাং কুরু)। আমাদের ইন্দ্রিয় (বৃষেন্দ্রিয়), বল (শুত্মো), দীর্ঘ আয়ু ও কান্তি (বৰ্চঃ) প্রদান করো। হে সোমদেব! অষ্টসংখ্যক বসু বা বসুমানবৎ গণযুক্ত, শ্রদ্ধাশীল যজমানের মতির বেত্তা তুমি, তোমার অনুজ্ঞাক্রমে গায়ত্রীছন্দযুক্ত বহিষ্পবমান ইত্যাদি মন্ত্রে, ইন্দ্র ও নরাশংস পিতৃগণের দ্বারা পীত প্রাতঃসবনে আহুত হয়ে আমি পান করব। সেই ভাবে একাদশসংখ্যক রুদ্রবৎ গণযুক্ত শ্রদ্ধাবান্ যজমানের মতির বেত্তা তোমার অনুজ্ঞাক্রমে ত্রিষ্টুপছন্দময় মন্ত্রে ইন্দ্র ও নরাশংস পিতৃগণের দ্বারা পীত মাধ্যন্দিন সবনে আহুত হয়ে আমি পান করব। হে সোমদেব! ঐরকম ভাবেই দ্বাদশ আদিত্যবৎ গণযুক্ত, শ্রদ্ধাপরায়ণ যজমানের মতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ তোমার অনুজ্ঞাক্রমে জগতীছন্দসমন্বিত মন্ত্রে, ইন্দ্র ও নরাশংস পিতৃগণের দ্বারা পীত তৃতীয় সবনে আহুত হয়ে আমি পান করব। হে সোম! তুমি সর্বতোভাবে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হও। তোমার শক্তি (বীর্য) সর্বতো ব্যাপ্ত হোক (সঙ্গচ্ছতাম), তুমিও অন্ন-সংভোগের নিমিত্তভূত হও। হে হরিতবর্ণ (হরিবো) সোম! আমার অঙ্গসমূহকে (প্রত্যঙ্গগুলিকে) তৃপ্ত করো; আমার সম্বন্ধযুক্ত গণকে (অর্থাৎ পুত্র-ভৃত্য ইত্যাদিকে) সোমপানে তৃষ্ণারহিত করো না (অর্থাৎ তারা যেন সর্বদা সোমপানের নিমিত্ত আগ্রহান্বিত থাকে)। তুমি মঙ্গলময় হয়ে আমার মস্তক ইত্যাদি সপ্তস্থানে স্থিত প্রাণের (প্রাণবায়ুর) তৃপ্তি সাধন করো, যেন অবধাদ্বার দিয়ে নির্গত হয়ে না যায় (অধধাদ্বারেণ মা নির্গচ্ছেতি)। আমরা সকলে সোমপান করব, সেই কারণে মরণহীন দেবত্ব লাভ করব। আদিত্যস্বরূপ জ্যোতি দর্শন করে ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণকে লাভ করব। এই রকম করলে পাপরূপ শত্রু আমাদের কি করতে পারবে (কি করিষ্যতি)? মর্তের মনুষ্যশরীরধারীগণের হিংসা অমরত্বপ্রাপ্ত আমাদের কি করতে পারবে? (অথবা অমৃতধারী আমাদের প্রতি উৎসারিত হিংসা নিজেই বিনাশপ্রাপ্ত হবে)। ঋত্বিকগণ কর্তৃক আমার যজ্ঞের যে অঙ্গবৈকল্য হবে, জাবেদা (অর্থাৎ উৎপত্তি-মাত্রই যজ্ঞের দোষ সম্পর্কে জ্ঞাত) বিচক্ষণ (বিশেষ দ্রষ্টা) অগ্নি সেই অঙ্গ পূর্ণ করে দিন। যজ্ঞের (বিকল) অঙ্গ সমাধানের নিমিত্ত এই অগ্নি আমাকে (অর্থাৎ যজমানকে) পুনরায় চক্ষু দান করবেন। সেই রকম ইন্দ্র ও বৃহস্পতি যজ্ঞাঙ্গ সমাধানে আমাকে পুনরায় চক্ষু দান করুন। হে অশ্বিযুগল! আপনারা আমাকে চক্ষুর দর্শনসামর্থ্য দান করুন (চক্ষুর্দর্শনসামর্থমাধত্ত)। হে সোমদেব! আপনার অনুজ্ঞা জ্ঞাত হয়ে (অর্থাৎ আপনার অনুমতি গ্রহণ করে তবেই ) আমি আপনার সংযোগবিশিষ্ট রসসুধা পান করব। আপনি ইষ্টসাধক যাগসাধনের নিমিত্ত যজু-যুক্ত (মন্ত্রবিশেষে সাথে সম্পর্কিত), সামাবৃত্তিলক্ষণযুক্ত স্তোত্রের দ্বারা স্তুত, উথ-শস্ত্রের দ্বারা কথিত (শংসিত), হরিতবর্ণশালী (হরিহরিতবর্ণ), ইন্দ্র কর্তৃক পীত, মাধুর্যমণ্ডিত ও অন্যের দ্বারা অনুজ্ঞাত (অন্যৈরনুজ্ঞাত)। হে সোমভাগের অবশিষ্ট ধানসমূহ, তোমরা সর্বতোভাবে পূর্ণ হয়ে থাকো এবং আমাকে প্রজা ও ধনের দ্বারা সর্বতোভাবে পূর্ণ করে রাখো (পূরয়ত)। হে পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ (অর্থাৎ সকল পিতৃপুরুষ)! আপনারা সকলে আমার কৃত এই কর্মযজ্ঞে আপন আপন ভাগানুসারে (অর্থাৎ যার যেমন প্রাপ্য, তা প্রাপ্ত হয়ে) হৃষ্ট হোন। হে পিতৃগণ! আপনাদের যে রস (অর্থাৎ বীর্য বা সার) তার উদ্দেশে আমি নমস্কার করছি (নমো বঃ পিতরো…)। সেই রকম পরপর (এবমুত্তরত্র)–আপনাদের বলের উদ্দেশে, আপনাদের জীবাত্মার উদ্দেশে আপনাদের স্বধার (অর্থাৎ হবিঃদাতৃত্বের উদ্দেশে), আপনাদের ক্রোধের উদ্দেশে, আপনাদের শিক্ষারূপ উগ্রকার্যের উদ্দেশে আমি নমস্কার করছি। হে পিতৃগণ আমি আপনাদের উদ্দেশেও নমস্কার করছি। পিতৃলোকে অন্য যাঁরা আপনাদের সাথে অবস্থান করছেন, তারা আপনাদের অনুবর্তন (অনুসরণ বা পালন) করুন। আপনারা যারা এই লোকে অবস্থিত আছেন, তারা আমাদের অনুবর্তন করুন। পিতৃলোকে, যে অন্য অনেকের সাথে আপনারা অবস্থান করছেন, আপনারা তাদের আচ্ছাদন-সাধক (বাসয়িতৃতমা) হোন। এবং যে মনুষ্যগণ এই লোকে আমার সাথে অবস্থান করছেন, আমি যেন তাদের আচ্ছাদন-সাধক হতে পারি। হে প্রজাপতি। আপনি ব্যতীত অন্য কোন পুরুষই এই সৃষ্ট বিশ্বসমূহের পরিভব (সংহার) করতে সমর্থ হন না। অতএব যে উদ্দেশে আমরা আপনার যাগানুষ্ঠান করছি, তার ফল যেন আমরা লাভ করতে সমর্থ হই, অর্থাৎ আমরা যেন ধনের পালক হই (বয়ং ধনানাং পতয়ঃ স্যাম)। আপনি দেবতার প্রতি কৃত পাপ হতে আমাদের মুক্ত করুন, মনুষ্যের প্রতি কৃত পাপ হতে আমাদের মুক্ত করুন এবং পিতৃগণের প্রতি আমাদের কৃত পাপ হতে আমাদের রক্ষা করুন। (আত্মকৃত এই মন্ত্র তিনটি শাখাত্তরে পাপবিনাশনের উদ্দেশে পঠিত হয়ে থাকে)। হে সোমদেব! মজলে প্রক্ষালন, মনুষ্যের দ্বারা অভিযুত, যজুঃ-সাম-উথ মন্ত্রের দ্বারা আপনার যে অশ্বপ্রদায়ক, গাভীপ্রদায়ক, পিতৃগণের দ্বারা স্বীকৃত, অপরের দ্বারা অনুমোদিত পানযোগ্য ভাগ আছে, আমি তা আঘ্রাণের দ্বারা পান করছি (আম্রাণেন ভক্ষয়ামি) ॥৫॥
মর্মার্থ- হে পৃষদাজ্য (দধিসিক্ত ঘৃত)! তুমি পৃথিবীস্থ গাভীগণের দুগ্ধস্বরূপ হও (গবাং পয়োহসি)। তুমি সকল দেবতার শরীরস্থিতির হেতু (অর্থাৎ সর্বদেবতার শরীরস্থানীয়) হও। মরুৎগণের পৃষতী-নামক অশ্বসমূহের তুমি গ্রহস্থানীয়। অদ্য আমি তোমার বৃদ্ধি-সাধন করছি। তুমি বিষ্ণুরূপী যজ্ঞের (বিষ্ণোযজ্ঞস্য) হৃদয়স্বরূপ (অর্থাৎ প্রিয়) হও (প্রিয়মসি)। হে সর্বদেবতার কাম্য। যজ্ঞের মুখ্য হিসাবে তুমি বিশেষভাবে গৃহীত (স্বীকৃত) হয়েছে। এই স্থানের ঘৃত ও দধির সাথে তোমার মাহাত্ম বর্ধিত হোক। দেবগণের উদ্দেশে মন্ত্রের দ্বারা অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত ও দেবগণের দ্বারা ভক্ষিত সেই আজ্যের (আজ্য দানের) ফল যেন আমি লাভ করতে পারি। সকল মনুষ্যের হিতকারী জ্যোতি বা দীপ্তিমা, তুমি শ্বেতবর্ণা গো-সমূহের ক্ষীরস্বরূপ। হে ইন্দ্র! দ্যাবাপৃথিবীর নিজস্ব মহিমা যতকাল যৎপরিমাণে বিদ্যমান থাকবে, এবং লবণ-ইক্ষু সুরা-সর্পিঃ-দধি-দুগ্ধ-জল এই সপ্তসিন্ধু যাবৎকাল পর্যন্ত স্থিত থাকবে, যতদিন সর্বদেশে ও সর্বকালে আপনার বল বা তেজঃ বিস্তারিত হয়ে থাকবে, তত দিন আমি অবিনাশিত ভাবে আপনাকে গ্রহণ করে থাকব। দধিবিন্দুর সাথে মিশ্রিত যে আজ্য, তা-ই পৃষদাজৎ; এই পৃষদাজ্যের সাথে পক্ষী ও কুকুরের স্পর্শ ঘটলে, কিংবা তা ভূমিতে পতনের দ্বারা বিনাশপ্রাপ্ত হলে, পুনরায় তা গ্রহণের নিমিত্ত প্রায়শ্চিত্ত করলে পশুগণের বিনাশ হয় না। এইভাবে প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা পশুবিনাশের দোষ পরিহার পূর্বক প্রাণবিনাশের দোষ পরিহারও প্রশংসনীয়। তার নিমিত্ত প্রাণো বৈ পৃষদাজ্য… অর্থাৎ প্রাণ হলো পৃষদাজ্য ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করা কর্তব্য। হিরণ্যনির্মিত গ্রহণপাত্রে তা যদি গ্রহণ করা হয়, তবে তা অমৃতসদৃশ হয়; হিরণ্যপাত্রে গৃহীত সেই প্রাণস্বরূপ পৃষদাজ্যের দ্বারা পুরুষ শতায়ু ও শতেন্দ্রিয় হয়ে থাকে। গৃহীত এই পৃষদাজ্য অশ্বের মুখে স্পর্শ করা কর্তব্য। কারণ প্রজাপতির অক্ষি হতে অশ্বের উৎপত্তি হওয়া জন্য (অশ্বস্য প্রজাপত্যজিন্যত্বাৎ) স্বকীয় যোনিরূপ অশ্ব হতে প্রাণের নির্মাণ (উৎপত্তি) সিদ্ধ হয় (সিধ্যতি)। পুনরায় পৃষদাজ্যের গ্রহণে বিষ্ণো ত্বং নো অন্তমঃ…. অর্থাৎ হে বিষ্ণু! আপনি আমাদের নিকটতম হোন ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করা কর্তব্য। [এই মন্ত্রটির ব্যাখ্যা এই কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ১০ম অনুবাকে ও অন্যত্র দ্রষ্টব্য] ॥৬৷
মর্মার্থ- হে সবিতাদেব! এই উদ্গাতা (যজ্ঞের যোড়শ ঋত্বিকের একজন, যিনি সামবেদজ্ঞ ও সামগানে পারদর্শী) আপনাকে স্তুতি করবেন বলে যে কথা বলেছেন, তা আপনি প্রকর্ষের সাথে অনুমোদন করুন এবং এই যজ্ঞ সম্পাদন করুন (অর্থাৎ প্রকৃষ্টভাবে এই যজ্ঞ নিম্পাদনে সহায়ক হোন)। হে উদ্গাতাগণ! আমি বৃহস্পতিই ব্রহ্মা, কেবল মনুষ্যমাত্র নই (ন তু মনুষ্যমাত্রঃ)। সেই হেন আমি আপনাকে বলছি–আপনি আয়ুষ্মতী ঋকের (আয়ুঃস্থানীয়োর নির্বাহোস্যামৃচ্যস্তীতি আয়ুষ্মতী) উচ্চারণে সাবধান হোন, তনূনপাৎ সামের প্রকটনে (গান করার কালে) অপ্রমত্ত থাকুন (অর্থাৎ প্রমাদযুক্ত হবেন না)। আপনাদের দ্বারা গীয়মান স্তোত্রে আপনাদের সাথে সম্বন্ধযুক্ত যজমান-বিষয়ক আশিস (যজমানের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা) সত্য (ফলপ্রদ) হোক, আপনাদের সঙ্কল্পরূপ অভিলাষ সত্য (সার্থক) হোক। আপনারা যথার্থ চিন্তা করুন (স্মরত) এবং সত্য বলুন। সবিতাদেবের অনুজ্ঞায় সত্যকার স্তোত্র পাঠ করুন। উদ্গাতাগণের দ্বারা গীয়মান হে স্তোত্র! তুমি স্তোত্রেরও স্তোত্র (অর্থাৎ স্তোত্র হতেই তোমার উৎপত্তি)। সেই রকম, স্তোত্ররূপ তোমা হতে আমার নিমিত্ত সার (বল) গ্রহণ করছি (সারং দুহে)। সেই নিমিত্ত উত্তম স্তোত্র আমার প্রতি আগত হোক (অর্থাৎ আমি যেন শ্রেষ্ঠ স্তোত্রসমূহ প্রাপ্ত হই)। হোতাগণের দ্বারা শস্যমান (স্তবনীয় বা প্রশসনীয়) হে শস্ত্র (প্ৰগীত মন্ত্রবিশেষ)! তুমি শস্ত্রেরও শস্ত্র, সেই রকম, শস্ত্ররূপ তোমা হতে আমি সার গ্রহণ করছি। সেই নিমিত্ত উত্তম শস্ত্র আমার প্রতি আগত হোক। তোমাদের. (অর্থাৎ স্তোত্র ও শস্ত্রের) প্রসাদে আমি আমার অভিলাষাঅনুরূপ (স্বাপেক্ষিত) ফল লাভ করব; এবং পুত্র ইত্যাদিরূপ প্রজা ও অন্নসম্পন্ন হবে। আমি দেবতাগণের বিষয়ভূত যজ্ঞের অনুষ্ঠান করব বলে যে আশা করেছি, তা সত্য হোক। যজ্ঞানুষ্ঠানরূপ ব্ৰহ্মতেজ (অর্থাৎ যজ্ঞানুষ্ঠানের দ্বারা লব্ধ ব্ৰহ্মতেজ) আমার প্রতি আগত হোক, (অর্থাৎ উত্তরোত্তরত্তর অভিবর্ধিত হোক, এটাই অর্থ)। এই অনুষ্ঠীয়মান যজ্ঞ সম্পূর্ণ হোক। এই যজ্ঞ পুনঃ পুনঃ আবৃত্ত (সংঘটিত) হোক। সেই যজ্ঞ (বা যজ্ঞপুরুষ) আমাদের দ্বারা পূজিত দেবগণের অতিমাত্র পালনকারী হোক বা হোন; সেই যজ্ঞ (বা যজ্ঞপুরুষ) আমাদেরও যেন যজ্ঞানুষ্ঠানের পক্ষে অতিমাত্র পালনকারী করুক বা করেন (অর্থাৎ আমরাও যেন সেই যজ্ঞানুষ্ঠানের পক্ষে অতিমাত্র সামর্থ্য লাভ করি); আমরাও যেন তার (অর্থাৎ সেই যজ্ঞপুরুষের) প্রসাদে যজ্ঞসাধনের নিমিত্ত ধনসমূহের অধিকার লাভ করি (ধনানাং পতয়ো ভূয়াস্ম)। বৈদিক পরিভাষায় এই অনুমণকে স্তুতি ও শস্ত্রের দোহন বলে (তদিদমনমন্ত্রণং স্তুতশস্ত্রয়োদোহ ইতি বৈদিকৈঃ পরিভাষ্যতে), তার বিধান–যজ্ঞ যজ্ঞপতির দোহন করে, যজ্ঞপতি যজ্ঞের দোহন করেন। (দোহন অর্থে রিক্তীকরণ বা শূন্যকরণ, অর্থাৎ অন্তঃস্থিতদ্রব্য-নিঃসারণ ব্যাপার; যেমন গাভীকে দোহন করে তার স্তন্যস্থিত দুগ্ধ নিঃসারণ, সেইরকম)। যে যজমান স্তুতি ও শস্ত্রের দোহন (রিক্তীকরণ) সম্পর্কে বিদিত না হয়ে অর্থাৎ দোহনামক অভিমন্ত্রণ অজ্ঞাত হয়ে, যাগানুষ্ঠান করেন, সেই পুরুষকে যজ্ঞ দোহন করে; সেই যজমান পাপী হয় (পাপীয়ান্ ভবতি)। আর যে যজমান দোহনামক অভিমন্ত্রণ বিদিত হয়ে যজ্ঞের দোহন করেন, তিনি ইষ্ট লাভ করেন (অর্থাৎ তার অভিলাষ পূর্ণ হয়)। মোট কথা, অভিমন্ত্রণ জ্ঞজ্ঞাত না হয়ে যজ্ঞ করলে যজ্ঞ সেই যাজ্ঞিককে রিক্ত করে, তিনি দরিদ্র হন এবং যিনি অভিমন্ত্রণ জ্ঞাত হয়ে যজ্ঞ করেন, তিনি উন্নত (বসীয়া) হয়ে থাকেন ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথষ্টমে তৃতীয়সবনগতা মাধ্যন্দিনসবনগতা হোমবিশেষমন্ত্ৰা উচ্যন্তে। অর্থাৎ এই অনুবাক-৮ ে তৃতীয়সবনগত ও মাধ্যন্দিনসবনগত হোমমন্ত্র বিশেষ কথিত হয়েছে]।
মর্মার্থ- শ্যেনরূপ পতনশীল ইন্দ্র ঋভুভিঃ ইত্যাদি যাজ্যার প্রতিপাদ্য দেবের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে অবশ্যই আহুতি প্রদান করছি (হুতমিদমস্তু)। (বটু শব্দে অবশ্য বোঝাছে)। স্বয়ংই সোমের পার্শ্বে গমনোদ্য স্বয়ং অভিগুর্তের উদ্দেশে অবশ্যই নমস্কার করছি (নমোহস্তু)। শত্রুর বিনাশকারী (বিনাশয়িত্রে) আমাদের ধারক ও পোষক যাজ্যা প্রতিপাদ্য ইন্দ্র ও বরুণ দেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আমি আহুতি প্রদান করছি (স্বাহুত)। সোমপান ইত্যাদি যাজ্যার প্রতিপাদ্য জনগণের ধারক ইন্দ্রের উদ্দেশে আমি স্বাহমন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। এইভাবে হোমকর্তার অন্নপ্রদায়ক, ক্ষীরপ্রদায়ক ইত্যাদি যাজ্যার প্রতিপাদ্য দেবতার উদ্দেশে আমি স্বাহামন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। ইন্দ্রাবিষ্ণ পিবত ইত্যাদি যাজ্যার প্রতিপাদ্য প্রজাপতি (প্রজাগুণের পালঙ্ক) মনুর উদ্দেশে আমি স্বাহামন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। হে ঋতপা (সত্যপালক), হে সুবর্বাট (স্বর্গপ্রাপক)! আমাদের যজ্ঞ যথাযথ পালন করুন; স্তোমমহত ইত্যাদি যাজ্যা প্রতিপাদ আপনাকে আমি স্বাহামন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। হোতা কর্তৃক মধুর ঘৃতের দ্বারা হুয়মান (আহুত) দেবগণ তৃপ্ত হোন (তুপ্যন্তু)। অনুরহিত হয়ে যখন প্রজাগণ অনুতপ্ত হয় (অর্থাৎ পীড়ানুভব করে) তখন সংযুক্ত ঋষিবর্গ বলে থাকেন যে, যজ্ঞপতির অপরাধেই এমন হয়েছে; কারণ যজ্ঞপতির অপরাধের কারণেই বৃষ্টি ইত্যাদির অভাব ঘটে এবং তার ফলেই প্রজাগণের পীড়া (কষ্ট) জন্মে। যজ্ঞপতির অপরাধ কি, সে সম্পর্কে বলা হয়েছে-চৈত্র ও বৈশাখ এই দুমাসের অনুষ্ঠানযোগ্য জ্যোতিষ্টোম যাগের অনুষ্ঠান প্রত্যহ না করা। এই অকরণজনিত অপরাধে যজ্ঞপতি (যজমান) পাপী হয়। অতএব যজ্ঞপতি এই যজমান যাতে উপরোক্ত দুই মাসব্যাপী জ্যোতিষ্টোম অনুষ্ঠিত করেন সেইভাবে বিশ্বকর্মা এঁদের প্রেরণা দান করুন। পূর্বোক্ত যে উগ্র ঋষিবর্গ আমাদের অপরাধ অন্বেষণ পূর্বক (অপরাধমন্বিষ্য) পাপী বলে জনসমক্ষে আমাদের নিন্দা করেন, সেই ঋষিবৃন্দকে নমস্কারের দ্বারা শান্ত করছি, যেন তারা আমাদের নিন্দা না করেন। এই ঋষিগণ যাতে আমাদের প্রতি সমান অনুগ্রহে দৃষ্টি দান করেন, সেই নিমিত্ত আমরা বৃহস্পতির অনুগ্রহ প্রার্থনায় তাঁকে নমস্কার জ্ঞাপন করছি। আমরা বিশ্বকর্মা অর্থাৎ বিশ্ববিষয়ক সৃষ্টি ইত্যাদি কর্মকারী প্রজাপতির উদ্দেশে আত্যন্তিক ভক্তি সহকারে নমস্কার জ্ঞাপন করছি। হে বিশ্বকর্মা! আপনি ব্যতিরেকে আমাদের অন্য গতি নেই (গত্যন্তরহিতানস্মা), এই কথা জ্ঞাত হয়ে আমাদের সেইভাবেই সোমপানের যোগ্যতা দান করুন, যেভাবে এই লোকে যুদ্ধক্ষেত্র হতে প্রাণভয়ে ভীত জনগণের প্রতি ধীর পুরুষ করুণা করে থাকেন। এই যজমান প্রমাদ আলস্য ইত্যাকার তমোগুণে আবৃত হয়ে ঋষিগণের প্রতি অপরাধ করেছেন, সেই অপরাধীকে তার মঙ্গলের নিমিত্ত (স্বস্তয়ে) প্রকর্ষের সাথে মুক্ত করুন, যেন তিনি বিনাশরহিত হন (বিনাশরাহিত্যায়)। যারা যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার কামনায় ভিক্ষার দ্বারা ধন অর্জন করে, কিন্তু যজ্ঞানুষ্ঠান না করে সেই ধন আপন ভোগের উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করে রেখেছে, অগ্নি (ধিষ্ণ) যাদের নিমিত্ত খেদ করেন (খেদং কৃতবন্ত), তাদের যাগাভাবজনিত (অর্থাৎ যজ্ঞানুষ্ঠান অকরণজনিত) অপরাধ বিনাশ করার নিমিত্ত বিশ্বকর্মা এই যাগকে (অর্থাৎ আমাদের অনুষ্ঠিত এই যজ্ঞকে) শোভন যজনসম্পন্ন করুন (স্বিষ্টিং করোতু)। যজ্ঞসভাস্থলে দর্শক হিসাবে সমবেত ব্রাহ্মণমণ্ডলীর সকলেই দক্ষিণার যোগ্য (দক্ষিণাহ), সুতরাং তাদের অদানের দ্বারা (অর্থাৎ প্রাপ্য দক্ষিণা দান না করার কারণে) যে পাপ হয়, তা নিবারণের নিমিত্ত যথোক্ত বিধানে বৈশ্বকর্মের (বিশ্বদেব-সম্বন্ধী) যাগ সম্পাদন কর্তব্য। এর ফলে যজমান পাপ হতে মুক্তিলাভ করেন এবং ঋত্বিকগণ দক্ষিণা লাভের পর প্রীত হন। হে দেবগণ! আমাদের বপু অর্থাৎ শরীর যাতে পাপরহিত থাকে, তেমন করুন। আতপতণ্ডুল ইত্যাদি প্রক্ষেপের দ্বারা দোহনপাত্রস্থ ঘনীভূত দধি পান করে যজমান-দম্পতি পুত্র ও ধন লাভ করে থাকেন; এঁদের সম্বন্ধে আপনি সবই জ্ঞাত আছেন; এঁদের গৃহ (অর্থাৎ গৃহের সমৃদ্ধি) বর্ধন করুন। একগৃহবাসী এমন দম্পতি কল্যাণ প্রাপ্ত হোন। পত্নীযুক্ত হিংসরহিত যজমান ধনসমূহ করুন। যে যজমান প্রীতিযুক্ত হয়ে কুম্ভে যথোক্তদধিভাবাপন্ন ক্ষীর পূর্ণ করে তা সিক্ত করেন, সেই যজমানের দুর্বুদ্ধি রোগ ইত্যাদি দূর হোক। এই যজমানের পত্নী স্নিগ্ধকণ্ঠা (অর্থাৎ কোমলধ্বনিযুক্তা) ও সর্ব অবয়বে পুষ্টিযুক্তা হোন। এই যজমানের পুত্রগণও সর্বাঙ্গে পুষ্ট হোক (অর্থাৎ কখনও যেন শীর্ণতা প্রাপ্ত না হয়)। যে যজমান শোভন যজ্ঞ কামনা পূর্বক (সুমখস্যমানঃ) ইন্দ্রের উদ্দেশে পূর্ণ কুম্ভ প্রদান করেন সেই যজমানের পত্নী ইত্যাদি পুবিক্তরূপ হোক (অর্থাৎ পত্নী স্নিগ্ধকণ্ঠা ইত্যাদি রূপা ও পুত্র সর্বাঙ্গে পুষ্ট ইত্যাদি হোক)। সেই যজমানে পত্নীর সাথে একত্রে অবস্থানকারী হোন (অর্থাৎ আশিসদানকালে যজমানের পত্নীও সহাবস্থিত থাকুন)। হে ইন্দ্রদেব! আপনি আমাদের আশীর্বাদ প্রদান করুন, এটাই প্রথানা। আপনি আমাদের শোভন অপত্য, অন্ন ও সদীপ্ত (বৰ্চসহিতং) ধন দান করুন। আমি আপনার প্রসাদে বলের দ্বারা শত্রুগণেকে সহসা (শীঘ্র) পরাভূত করে তাদের যেন আমাদের আজ্ঞাধারী করতে সক্ষম হই। হে ধ্রুব (যজ্ঞপাত্রভেদ)! তুমি নিত্যসিদ্ধ-স্বরূপ; সুতরাং নিত্যসিদ্ধ পরমাত্মায় আমাকে স্থাপন করো। তুমি সকল গ্রহের (গ্রহণসাধন যজ্ঞপাত্রবিশেষের) মধ্যে মুখ্য, তোমার প্রসাদে আমিও সকলের মধ্যে মুখ্য হবো। হে ধ্রুব! দ্যাবাপৃথিবীসদৃশ অঞ্জলিপুটের দ্বারা তোমাকে স্বীকার (অর্থাৎ গ্রহণ) করছি। হে ধ্রুব! বিশ্বমানবের হিতকারী সকল দেবতা তোমাকে স্বস্থান হতে চালিত করুন (স্বস্থানাচ্চালয়ন্তু); এবং তুমি স্বর্গলোকে দেবগণকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করো, অন্তরীক্ষে পক্ষিগণকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করো এবং পৃথিবীতে পর্বত ইত্যাদিকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করো (দৃঢিকুরু); কিন্তু তোমার চলনের দ্বারা যেন সর্ব জগৎ চালিত (বিচলিত) না হয়। আমরা ধ্রুবস্থালীগত (স্থালীর ন্যায় ধ্রুবনামক যজ্ঞপাত্রে রক্ষিত) সোমরসের দ্বারা পূর্বে হোতার চমসে (যজ্ঞপাত্রে) স্থিত সোমের উপর তোমাকে সিঞ্চিত করছি। যে কোনও রকমে আমাদের গো-ইত্যাদি জঙ্গম (গমনশীল) পশুসমূহ রোগরহিত ও সুমনা (অর্থাৎ শোভনমনস্ক) হোক, আমাদের সকল প্রজা কেবল বোগরহিত ও সুমনাই নয়, তারা আমাদের অনুকূল মনোভাবাপন্নও হোক, এবং ইন্দ্র যেন এমনই করেন। শুধু আমাদের সকল দিবর্তী প্রজা যেন আমাদের অধীন হয়, তা-ই নয়, কিন্তু আমরা যাতে অসাধারণভাবে বিদ্যমান থাকতে পারি, সেই সকল অভিলাষ সিদ্ধ হোক ॥৮
মর্মার্থ- মন্ত্রোক্তির মাধ্যমে হোতা যখন অধ্বর্যকে আহ্বান করেন, তখন হোতার সেই আহ্বান অধ্বর্যর নিকট বজ্রপ্রহারের ন্যায় প্রতীয়মান হয়। উক্ত মন্ত্রটি এই–হে অধ্বর্য! আমার শস্ত্রপাঠের সময়ে তুমি সাবধান হও। হোতা কর্তৃক বজ্রপ্রহারতুল্য সাবধানবাণীর সমাধানের নিমিত্ত প্রাতঃসবনের প্রতিগরের পর উথশাস্ত্রীয় মন্ত্রের দ্বারা হোতার সম্যক্ স্তুতি করণীয়। স্তুতিমন্ত্র-হে হোতা! তুমি সর্বৰ্থা আনন্দিত থাকো (সর্বথৈব মোদ)! এটাই তোমার উদ্দেশে আমাদের প্রতিগরের মন্ত্রের অর্থ। ঋক্ সমাপ্ত হওয়ার পর প্রতিগর প্রণব ইত্যাদি পাঠ কর্তব্য। অস্তি–এই হলো প্রণবের অর্থ (অর্থাৎ সর্বশস্ত্রসমাপ্তিরূপ অঙ্গীকারবাচক প্রণবই হলো প্রতিগর)। প্রত্যুত্তরকথন প্রতিগর শব্দের দ্বারা উচ্চারিত হয়। প্রাতঃসবনে যতগুলি শস্ত্র বিদ্যমান, তার সবগুলিই প্রতিকার বলে উক্ত হওয়ায় ক্ষরমুকথশা ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করা কর্তব্য। এই ক্ষেত্রে অক্ষরগত ত্রিত্বের নিমিত্ত ত্রিপদা গায়ত্রীর স্মরণ করা কর্তব্য, এবং সেই গায়ত্রীর উক্তিতেই প্রাতঃসবন স্মৃত হয়। প্রাতঃসবনে ত্রিপদা গায়ত্রীর স্মরণ হোতা কর্তৃক প্রযুক্ত বজ্ৰমানতাকে অন্তর্হিত করে দেয়। এইভাবে মাধ্যন্দিন সবনে চতুষ্পদা ত্রিষ্টুপের স্মরণ হোতা কর্তৃক প্রযুক্ত বজ্ৰমানতাকে অন্তর্হিত করে। আবার তৃতীয় সবনে সপ্তাক্ষরা শরীর স্মরণের দ্বারা হোতা কর্তৃক প্রযুক্ত বজ্ৰমানতাকে অন্তর্হিত করে। বিহিত এই মন্ত্র য়ের প্রশংসা বিষয়ে ব্রহ্মবাদিগণ পরস্পর বলেন, যে পুরুষ সবনের অনুরূপ ছন্দের প্রয়োগ মত ওছেন, তিনি প্রাতঃসবনে ত্রি-অক্ষরা গায়ত্রীছন্দের, মাধ্যন্দিন সবনে একাদশাক্ষরা ত্রিঃ ছরে এবং তৃতীয় সবনে দ্বাদশাক্ষরা জগতীছন্দের প্রয়োগ করেন। এইরকম সম্পাদনে যিনি সম, তিনি মুখ্য অধ্বর্য (স এব মুখ্যোহধ্বযুঃ স্যাৎ)। কোন ব্রহ্মবাদী বলেন, প্রাতঃসবনের সমাপ্তির পরে আত্মায় যিনি তেজঃ ধারণ করেন, মাধ্যন্দিন সবনের পরে যিনি ইন্দ্রিয় (সামর্থ্য) ধারণ করেন এবং তৃতীয় সবনের পর যিনি পশু ধারণ করেন, তিনিই হলেন মুখ্য অধ্বর্য। প্রথম মন্ত্রের দ্বারা সবচেত ছন্দঃসম্পত্তি এবং তেজোধারণ বিষয়ে কথিত হচ্ছে–প্রাতঃসবনগত স্তোত্রশস্ত্রগুলি গায়ত্রী ছন্দের। গায়ত্রী-উপদেশের দ্বারা সম্পূর্তি হয়, কারণ গায়ত্রী তেজোরূপা (গায়াস্তেজোরূপত্ব)। প্রাতঃসবন বহিষ্পবমানগত। দ্বিতীয় মন্ত্রের দ্বারা সবনোচিত ছন্দঃসম্পত্তি এবং ইন্দ্রিয়ধারণ বিষয়ে কথিত হচ্ছে–মাধ্যন্দিন সবন ত্রিষ্টুপ ছন্দগত, প্রজাপতির ঊরু ও বাহু হতে ইন্দ্রের সাথে উৎপন্ন হওয়ায় ইন্দ্রসৃষ্ট ইন্দ্রিয়ের ত্রিষ্টুপত্ব (ইন্দ্ৰেন সহোৎপন্নত্বাদিন্দ্র সৃষ্টস্যেন্দ্রিয়স্য ত্রিষ্ঠুত্বম)। তৃতীয় সবনোচিত ছন্দঃসম্পত্তি ও পশুপ্রাপ্তি বিষয়ে কথিত হচ্ছে–এই সবনে শরী ছন্দ ও জগতী ছন্দ পশুপ্রাপ্তির কারণভূত হওয়ায় সবনগত স্তোত্রশস্ত্রসমূহ জগতী ছন্দের হয়। অতএব শরীর দ্বারা সবনোচিত ছন্দঃসম্পত্তি তৃতীয় সবনে পশুপ্রাপ্তির হেতুভূত হয়। অধুনা অযুর অপ্রমত্ত বিধান কথিত হচ্ছে–যখন হোতা অধ্বর্যকে সম্বোধন পূর্বক সাবধান হতে আহ্বান করেন, তখন অধ্বর্যর চিত্তক্লেশরূপ রোগবিশেষ স্থাপিত হয়, এর প্রতিকারের নিমিত্ত হোতাকে উদ্দেশ করে তাকে সর্বৰ্থা আনন্দিত থাকার মন্ত্র উচ্চারণ করে থাকেন। (এইটি পূর্বেই বলা হয়েছে)। এটি কেমন? না–এই লোকে রাজার অমাত্য ইত্যাদি প্রতিসেবক ভৃত্যগণ রাজার বাক্যের উত্তর প্রদানের নিমিত্ত যেমন নিয়ত সাবধান থাকে, সেইরকম অধ্বর্যর পক্ষে হোতার সাবধান-বাণীরূপ বাক্যের প্রত্যুত্তরের নিমিত্ত সাবধান থাকা কর্তব্য। ঋত্বিক, উদ্গাতা, হোতা ও অধ্বর্য–এঁরা সকলে সমান হলেও উদ্গাতাই উষ্মীথ (অর্থাৎ উৎকৃষ্ট সামগান) করে থাকেন; কিন্তু অপরে (অর্থাৎ ঋত্বিক-হোতা-অধ্বর্য প্রণবপুরঃসর ভক্তি-উদ্দীথ করে থাকেন ॥৯॥
মর্মার্থ- হে প্রতিনিগ্রাহ্য (গ্রহ অর্থাৎ এই নামে অভিহিত যজ্ঞপাত্র)! তুমি পার্থিব পাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়েছে। সেখানে বাগিন্দ্রিয় অবস্থিত আছে (বাগিন্দ্ৰিয়ং তত্রাবস্থিতোহসি)। প্রতিনিগ্রাহ্য-নামক যে গ্রহগুলি ইন্দ্র, বায়ু, মিত্র, বরুণ ও অশ্বিদেবদ্বয়ের সম্বন্ধীয় কর্মের সাথে যুক্ত, সেগুলি তাদের নিমিত্ত গৃহীত হচ্ছে। ইন্দ্র ও বায়ুর মিমিত্ত প্রতিনিগ্রাহ্য গ্রহণের মন্ত্র–বাথা এষা যদৈন্দ্র-বায়বঃ এই শ্রুতিবাক্যানুসারে আমি তোমাদের বাক্য ও যজ্ঞের পালক, অবিনাশী যজ্ঞের অধ্যক্ষ ইন্দ্রদেব ও বায়ুদেবের নিমিত্ত গ্রহণ করছি। মিত্র ও বরুণদেবতার নিমিত্ত প্রতিনিগ্রাহ্য গ্রহণের মন্ত্র–উপযাম গৃহীতোহস্তসদসি চক্ষুষ্পভ্যাং ইত্যাদি, অর্থাৎ চক্ষুর পালক, ক্রতুর পালক, যজ্ঞের অধ্যক্ষ মিত্র ও বরুণের নিমিত্ত আমি তোমাদের গ্রহণ করছি। অশ্বিনপ্রতিনিগ্রাহ্যমন্ত্র–উপমগৃহীতোহসি তসসি শ্রোত্রপাভ্যাং ইত্যাদি, অর্থাৎ শ্রোত্রের পালক ক্রতুর পালক, যজ্ঞের অধ্যক্ষ অশ্বিদেবদ্বয়ের নিমিত্ত আমি তোমাদের গ্রহণ করছি। হে উরুম (মহৎ পাদবিক্ষেপকারী) বিষ্ণু! রক্ষণের নিমিত্ত এই সোম আপনার অধীন; অতএব আপনি তা রক্ষা করুন। পাপদৃষ্টিসম্পন্ন পুরুষ যেন আপনার এই সোমকে দর্শন করতে না পারে (মা দ্রাক্ষৎ)। বসুবর্ধনরূপ (অর্থাৎ ধনবৃদ্ধি রূপ) সোম, যা প্রাণ ইত্যাদির পোশক, তা আমার নিকট অবস্থিত আছে। আপনি বাক্যের পালনকর্তা, সেই হেতু আমার বাক্যের যাতে পালন হয়, তেমন করুন। এই মন্ত্রের দ্বারা ইন্দ্র ও বায়ুদেবতার গ্রহ (পাত্র) হোতাকে প্রদান করা হলো; এইভাবে অনন্তরবর্তী মন্ত্র দ্বারা মিত্র, বরুণ ও অশ্বিদ্বয়ের পাত্র প্রদত্ত হয়েছে। হে হস্তস্থিত সোম! তুমি সখের ভাবয়িতা (অর্থাৎ উৎপাদক); অতএব সুখপ্রকাশক বস্তুসমূহের মধ্যে তুমি শ্রেষ্ঠ। তুমি প্রাণের ফলস্বরূপ, আমার প্রাণ রক্ষা করো। হে মিত্র ও বরুণের গ্রহ! তুমি দুঃখের প্রতি হিংসাকারী (অর্থাৎ বিনাশকারী), অতএব আমার অপান রক্ষা করো। হে ইন্দ্র ও বায়ুদেবতা! যে শত্রু আমাদের হীন মনে করে, আমাদের উল্লঙ্ঘন করে সোম পান করে (বা করতে আকাঙ্ক্ষা করে), হে শুভস্পতী (শুভকর্মের পালকদ্বয়)! সেই শত্রুকে আমি পাদে নিক্ষেপ করছি (অর্থাৎ আমার পদে পাতিত করছি)। হে ইন্দ্র। আমি যাতে শত্রুগণ অপেক্ষা উত্তম হয়ে ইহলোক ও পরলোক সম্বন্ধে জ্ঞানবান হতে পারি, আপনি তেমনই অনুগ্রহ করুন ॥১০।
মর্মার্থ- হে তেজস্বী অগ্নি! আপনি দেবগণের মধ্যে কান্তি ও বলযুক্ত। দীক্ষা ও তপস্যার তেজঃ লাভের নিমিত্ত হে আগ্নেয় অতিগ্রাহ্য! তোমার যাগ করছি (ত্বং জুহোমি)। এই হোমের দ্বারা আমার দীক্ষানিয়ম ও তপস্যা নির্বিঘ্নে সিদ্ধ হোক এটাই আমার অভিপ্রায়। হে অগ্নি! আপনি তেজোভিজ্ঞ অর্থাৎ তেজঃ-সম্পর্কিত বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। আপনার প্রসাদে তেজঃ যেন আমাকে কখনও ত্যাগ করে না। আমিও যেন কখনও তেজকে পরিত্যাগ না করি, সেই হেতু তেজঃও যেন আমাকে পরিত্যাগ না করে (মাং মা পরিত্যজুত)। হে ওজস্বী (তেজস্বী) অগ্নি! আপনি দেবগণের মধ্যে বলের হেতুভূত এবং ওজঃযুক্ত (ওজস্বয়ং) আমাদের আয়ুর্বানকারক। হে ঐন্দ্র (ইন্দ্র-সম্পর্কিত) অতিগ্রাহ্য! তুমি মনুষ্যগণের মধ্যে ব্রাহ্মণজাতির ও ক্ষত্রিয়জাতির বলকারক বা বলের হেতুভূত, সেই নিমিত্ত তোমার হোম সম্পাদন করছি। হে ইন্দ্র! আপনি ওজঃ-বিদ (অর্থাৎ ওজঃ বা বলের সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন), বলহেতুভূত অষ্টম ধাতু ওজঃ যেন আমাকে পরিত্যাগ না করে (অর্থাৎ অষ্টবিধ তৈজস ধাতুর মধ্যে ওজঃ নামক অষ্টম ধাতু যা মানবের বলি, পলিত, লালিত্য, কৃশতা, দুর্বলাত, জরা প্রভৃতি নিবারণ পূর্বক দেহকে ধারণ করে রাখে, সেই ধাতুপ্রাপ্তি হতে আমি যেন বঞ্চিত না হই)। আমি কখনও ওজাকে পরিত্যাগ করব না, ওজঃও যেন আমাকে কখনও পরিত্যাগ না করে। হে শরীরকান্তি হতে বহির্ভূত রশ্মিরূপ দীপ্তির দ্বারা দীপ্যমান সূর্য! আপনি দেবগণের মধ্যে অতিরিক্ত কান্তিশালী। হে সৌর্য (সূর্য-সম্পর্কিত) অতিগ্রাহ্য! বায়ু ও জলের যে দীপ্তি (বায়োরপাং চ যম্রাজঃ), তার নিমিত্ত তোমার হোম সম্পাদন করছি। হে সূর্য! আপনি সুববিদ (অর্থাৎ স্বর্গমার্গ সম্পর্কে অভিজ্ঞ)। সেই স্বর্গমার্গ যেন আমাকে পরিত্যাগ না করে, এবং আমি যেন সেই স্বর্গ মার্গ পরিত্যাগ না করি। হে অগ্নি! আমাতে মেধা (মন্ত্র ও তার অর্থ ধারণের সামর্থ্য), প্রজা (সন্ততি, জন), ও আপনার তেজঃ দান করুন। হে ইন্দ্র! আমাতে মেধা, প্রজা ও আপনার ইন্দ্রিয় (সামর্থ্য) দান করুন। হে সূর্য! আমাতে মেধা, প্রজা ও আপনার দীপ্তি দান করুন ॥১।
মর্মার্থ- সামপানের পঞ্চ ভাগ (সাঃ পঞ্চ ভাগা); যথা–হিংকার, প্রস্তাব, উষ্মীথ, প্রতিহার ও নিধন। সেই বিষয়ে হিংকার ও নিধনরূপ আদি ও অন্ত ভাগ সকলের পঠনীয়। দ্বিতীয় প্রস্তাব ভাগ প্ৰস্তোতা কর্তৃক গীত হয়। তৃতীয় উষ্মীথ ভাগটি উদ্গাতা কর্তৃক গীত হয়। চতুর্থ প্রতিহার ভাগটি প্রতিহর্তা কর্তৃক গীত হয়। এঁদের দ্বারা এইরূপে সামভাগগুলি গীত হলে অধ্বর্য ব্যতীত সকল ঋত্বিক ওম উচ্চারণপূর্বক গান করে থাকেন। যজমান হো শব্দ উচ্চারণপূর্বক গান করেন। এই সকলে বায়ু ইত্যাদি দেবতারূপে মন্ত্রের দ্বারা প্রতিপাদিত হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে সর্ব দেবতার জনকত্বের কারণে প্রজাপতিকে সমষ্টিরূপে সম্পূর্ণ সামরূপ বলা হয়েছে। বায়ু ইত্যাদি দেবতাকে প্রজাপতির একদেশত্বের দ্বারা হিংকার ইত্যাদির কর্তৃত্বে স্থাপিত করা হয়েছে। যথা–হিংকারের কর্তা বায়ু, অগ্নি প্রস্তোতা, প্রজাপতি সাম, বৃহস্পতি উদ্গতা, বিশ্বদেবগণ উপগাতা, মরুৎগণ প্রতিহর্তা এবং ইন্দ্র নিধন। এই বায়ু হতে ইন্দ্র পর্যন্ত দেবগণ প্রাণের পোষক, তাঁরা আমাতে প্রাণ স্থাপন করুন (প্রাণং ময়ি স্থাপয়)। যখন অধ্বর্য উদ্গাতাগণকে স্তোত্রপাঠের অনুজ্ঞা প্রদান করেন তখন বায়ু ইত্যাদিরূপ হিংকর্তাগণ সকলেই সেই অনুজ্ঞা প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। এই মন্ত্রে তে এতে দেবা… ইত্যাদি অর্থাৎ সেই বায়ু ইত্যাদিরূপ বিংকর্তা ইত্যাদি দেবগণ সকলেই আমাতে প্রাণ স্থাপন করুনএই ভাগটি অধ্বর্য বলবেন (অধ্বর্যক্ৰয়াৎ)। ইড়া, যিনি দেবগণের গাভীরূপা, তিনি এই স্থানে দেবগণের আহুয়িত্রী। যিনি মনু, এইস্থলে তিনি যজ্ঞের প্রবর্তক। যিনি বৃহস্পতি, এই স্থলে তিনি উথশস্ত্র সম্বন্ধী মন্ত্রবাক্যের দ্বারা হর্ষপ্রদানকারী (হর্ষো যেষু মন্ত্রবাক্যেষু তানি বাক্যান্থামদানি)।
এই স্থলে যাঁরা বিশ্বদেব, তাঁরা সূক্তসমূহের বক্তা। হে মাতৃরূপা পৃথিবি! যথাক্তনামা ইড়া ইত্যাদি দেবতার অনুগ্রহে অপরাধরহিত আমাকে হিংসা করবেন না। আপনার অনুগ্রহে আমি মধুর ন্যায় প্রিয় কার্যাবলী মনে মনে চিন্তা করব, সেইরকমই মধুর ন্যায় প্রিয় কর্মফল উৎপাদিত করব; সেইরকমে মধুর ন্যায় প্রিয় হবিঃ দেবগণের প্রতি বহন করে গমন করব; সেই রকমেই আমি মধুর ন্যায় প্রিয় বাক্য উচ্চারণ করব (মধুবৎ প্রিয়ং প্রতিগরূপং বাক্যমুচ্চারয়িষ্যামি)। সেইভাবেই দেবগণের নিকট মধুবৎ প্রিয় ও মনুষ্য হোতা ইত্যাদির শ্রবণযোগ্য মধুবৎ প্রিয় বাক্য উচ্চারণ করছি। আমার সেইরকম বাক্যে যাতে কোন ত্রুটি না ঘটে অর্থাৎ যাতে আমার কোন বাঁচিকপ্রমাদ না ঘটে, সেই নিমিত্ত পূর্বোক্ত ইড়া ইত্যাদি দেবগণ সকলেই আমাকে রক্ষা করুন (সর্বেহপি পালয়ন্তু) এবং পিতৃগণ সেই সমীচীন বাক্যসমূহ অনুমোদন করুন (সমীচীনেয়ং বাগিত্যুপলালয়) ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ তৃতীয়ানুবাকে ঘাবদাভ্যাংশুগ্রহৌ প্রত্যপেক্ষিতা মন্ত্র উচ্যন্তে। অর্থাৎ এই অনুবাকে দুই অংশুগ্রহের প্রতি অপেক্ষিত মন্ত্রাবলী উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- হে সোমাংশু (সোমদেবতা সম্বন্ধি গ্রহ)! বসুনামক দেবগণ বস্ত্রের দ্বারা বদ্ধ ১সোমলতাসমূহ হতে তোমাকে প্রকর্ষের সাথে পৃথক করুক (প্রকর্ষেণ পৃথকুবন্তু)। কি সাধনের দ্বারা? না–গায়ত্রী ছন্দের দ্বারা; তুমি অগ্নির প্রিয় অনুভাব (পাথ) হও। সেইভাবে রুদ্রগণ ত্রিষ্টুভ ছন্দের দ্বারা তোমাকে পৃথক করুক; তুমি ইন্দ্রের প্রিয় অন্নভাব হও। আদিত্যগণ জগতী ছন্দের দ্বারা তোমাকে পৃথক করুক; তুমি বিশ্বদেবগণের প্রিয় অনুভাব হও। এই স্থানে হোতার চমসে (যজ্ঞপাত্রে) বসতীবরী নামিকা জলের কিছু পরিমাণ গ্রহণ পূর্বক পূর্বোক্ত তিনটি মন্ত্রে সোমাংশু দ্বারা মান্দাসু ইত্যাদি মন্ত্রে সেই চমসস্থ জলের প্রকম্পণ করণীয়। মান্দাসু ইত্যাদি সপ্তমী-অন্তক দ্বাদশটি পদ জলের গোপন নাম (গোপ্যানি নামানি)।
সেগুলি হলো–মান্দাসু (মান্দা, অর্থাৎ মন্দগতিশালিনী), ভন্দনাসু (ভন্দনা বা ভদ্রা, অর্থাৎ কল্যাণকারিণী), কোতনাসু (কোতনা, অর্থাৎ জ্ঞানকারিণী), নূতনাসু (নূতনা, অর্থাৎ অভিনবা), রেশী (রেশী, অর্থাৎ শীঘ্র গমনকারিণী), মেষীষু (মেষী, অর্থাৎ স্পর্ধমানা), বাশীষু (বাশী, অর্থাৎ শব্দবতী), বিশ্বভৃৎসু (বিশ্বভৃৎ, অর্থাৎ বিশ্বের ধারিকা), মাধ্বীযু (মাধ্বী, অর্থাৎ মধুররসবতী), ককুহাসু (ককুহা, অর্থাৎ ককুৎসদৃশী, প্রধানভূতা), শরীযু (শরী, অর্থাৎ শক্তিমতী) ও শুক্রাসু (শুক্রা, অর্থাৎ দীপ্যমানা)। মন্ত্রের পূর্ণ রূপ হলো– হে দীপ্যমান সোম, তোমার দীপ্যমান সারাংশ আমি মান্দা ইত্যাদি জলে প্রকম্পিত কৃরছি। হে দধিদ্রব্য! তোমার দীপ্যমান সারাংশ সোম ইত্যাদি রূপ সারের সাথে গ্রহণ করছি। কিসের সাধনের দ্বারা?-না, সূর্যের রশ্মিতে দীপ্যমান দিবসের রসের দ্বারা। এই পাত্রে সোমরসের উগ্রা ধারা পতিতা হয়ে সঙ্গতা (অর্থাৎ মিলিতা) হচ্ছে (পতিতাস্তা ধারা অসশ্চত পাত্রে সঙ্গতাঃ)। বর্ষণকারী ইন্দ্রের বৃষ্টিলক্ষণরূপ প্রধানভূত স্বরূপ শোভা পাচ্ছে। এই বল্লীরূপ সোম রাজরূপী সোমদেবের প্রথমগামী দীপ্যামান রস দীপ্যমান ইন্দ্রের সম্মুখে গমন করছে (অর্থাৎ নিবেদিত হচ্ছে।) হে সোম! তোমার যে সদা জাগরণশীল নাম রয়েছে; হে সোম! তোমার সেই অ-তিরস্করণীয় সোম-নামের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি (স্বাহা হুতমিদস্তু)। হে সোমদেব! আপনার যে কমনীয় তথাবিধ অংশরূপ অগ্নির প্রিয় অন্নভাবের নিমিত্ত সোমসমূহ হতে গায়ত্রী ছন্দের দ্বারা পৃথকৃত হয়েছিল, তা পুনরপি সোমসমূহে গমন করুক। এই রকম, এইভাবে আপনার যে কমনীয় তথাবিধ অংশরূপ অগ্নির প্রিয় অন্নভাবের নিমিত্ত সোমসমূহ হতে ত্রিষ্টু ছন্দের দ্বারা পৃথকৃত হয়েছিল, তা পুনরায় সোমসমূহে গমন করুক। সেই একই ভাবে, আপনার যে কমনীয় তথাবিধ অংশরূপ বিশ্বদেবগণের প্রিয় অনুভাবের নিমিত্ত সোমসমূহ হতে জগতী ছন্দের দ্বারা পৃথকৃত হয়েছিল, তা পুনর্বার সোমসমূহে গমন করুক। দূরদেশ হতে (পরাবত) প্রাণ আমাদের প্রতি আগত হোক; এই ভাবেই অন্তরিক্ষলোক হতে প্রাণ আমাদের প্রতি আগত হোক। স্বর্গলোকের উপরেস্থিত যে প্রাণ, তা-ও সেখান হতে আমাদের প্রতি আগমন করুক। হে হিরণ্য! পৃথিবীর অধ্যুপরি তুমি আয়ু ও অমৃতত্বের হেতু হও (আয়ুৰ্হেতুরমৃতত্বহেতুশ্চাসি);সেইরকমেই তোমাকে প্রাণস্থিতির নিমিত্ত ক্ষেপণ করছি। যেভাবে ইন্দ্র ও অগ্নি আমায় বল সম্পাদন করেন, সেইভাবে সোম ও বৃহস্পতি এবং বিশ্বদেবগণ আমায় তেজঃ প্রদান করুন; হে অশ্বিযুগল! আপনারা আমাতে তেজঃ সম্পাদিত করুন। যজ্ঞসম্বন্ধিনী, দীক্ষা ইত্যাদি অঙ্গসমূহের অনুবচনক্রমে বেদে অভিব্যক্ত কোনও মন্ত্র আমি বিস্মৃত হইনি (অর্থাৎ বেদে যজ্ঞ, দীক্ষা ইত্যাদি সম্পর্কিত যা যা মন্ত্র আছে, তার কোনটিই আমি বিস্মৃত হইনি); কাব্যের ন্যায় বিস্পষ্টরূপে অভিহিত সর্ব অঙ্গ আমি নিরীক্ষণ করতে পারছি (অর্থাৎ কবিতা বা রসাত্মক বাক্য যেমন স্মৃতিতে বিশেষ স্পষ্টভাবে বিধৃত থাকে, বেদোক্ত মন্ত্রসমূহের সকল অঙ্গই মা আমার স্মৃতিপটে অঙ্কিত হয়ে আছে)। যেমন রথের চক্র তার নেমির (পরিধির) সর্বত্র ব্যপ্ত হয়ে থাকে, সেইভাবে এই যজ্ঞ ব্যাপ্তবান হোক। সেই নিমিত্ত (অর্থাৎ সেই কামনাতেই) আমি প্রজাপতির উদ্দেশে যাগ করছি ॥৩৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন-অথ চতুর্থে তেষাং ব্রাহ্মণমুচ্যতে। অর্থাৎ-পুর্বোক্ত অনুবাকে যে অংশুগ্রহের মন্ত্রগুলি কথিত হয়েছে, এই অনুবাক-৪ ে সেগুলির ব্রাহ্মণসমূহের দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।]
মর্মার্থ- মান্দাসু ইত্যাদি এই প্রকার মন্ত্রে মান্দা ইত্যাদি পদ জলের নির্দেশক নাম; এই নামগুলি জনোকে অপ্রসিদ্ধ (প্রসিদ্ধ্যভাবাৎ); কেবল বৈদিক মন্ত্রে প্রতীয়মান হওয়ার কারণে এগুলির গোপ্যত্ব রয়েছে (অর্থাৎ এই নামগুলি জলের গোপন-নাম বলে কথিত হয়েছে)। অধাবা শব্দের অর্থ সর্বতে যা কম্পিত করা হয়, সুতরাং মান্দা ইত্যাদি মন্ত্রগুলি অধাবা অর্থাৎ এইগুলির দ্বারা জলকে কম্পিত করা হয়ে থাকে। জলের অভিমানী দেবতাগণের প্রীতির নিমিত্ত মান্দা ইত্যাদি মন্ত্র পঠনীয়। তারপর সেই গুহ্য নামের দ্বারা (নামধেয়েন) পরিতোষ প্রাপ্ত হয়ে দেবগণ দুলোক হতে বৃষ্টি সম্পাদিত করেন। গ্রহণমন্ত্রে সূর্যরশ্মির দ্বারা দিবসের রূপ-প্রকাশের কথা ব্যক্ত হয়েছে। রাত্রি ও সূর্যের রশ্মি হলো বৃষ্টির স্বামিভূতা (প্রভুস্বরূপ)। রাত্রিরূপ ও সূর্যরশ্মিযুক্ত কাল ব্যতীত বৃষ্টির অন্য কোন কাল নেই (বৃষ্টেরন্যঃ কালোহস্তি)। সেই নিমিত্ত এই মন্ত্রভাগ পাঠপূর্বক দিন ও রাত্রিলক্ষণের দ্বারা কাল নিরূপণ করে দুলোক হতে ভূমিতে বৃষ্টিপাত করানো হয়ে থাকে। হরণমন্ত্রে প্রধানরূপ বাঁচি ককুহ ও রূপ এই দুটি পদের দ্বারা বৃষ্টিকে বিবক্ষিত করা হয়েছে। হোমমন্ত্রে সোমায় এই পদে দেবতার উদ্দেশে দধিদ্রব্য হবনের (হবিঃস্বরূপ প্রদানের) কথা উক্ত হয়েছে। যে যজমান অদাভ্য নামক দধিগ্রহ (দধিপ্রদানের নিমিত্ত পাত্র বিশেষ) গ্রহণ সোমদেবের যাগ করেন, সেই যজমান হবিঃ-স্বরূপ দেবতার উদ্দেশে যজ্ঞ করেন। যো যজমানোহংশুনামকং সোমরসং পাত্রে গৃহ্নাতি অর্থাৎ যে যজমান অংশুনামক সোমরস পাত্রে গ্রহণ করেন ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা আয়ুপ্রদ প্রাণের আত্মাতে স্থাপন করার কথা ব্যক্ত হয়েছে। অমৃতমসি প্রাণায় ত্ব ইত্যাদি মন্ত্রে শাসবায়ুর বাহিরে পরিত্যাগকে প্রাণ, অন্তরাকর্ষণকে অপান এবং মধ্যে ধারণকে ব্যান বলে উক্ত হয়েছে। হিরণস্যোপরি…অর্থাৎ হিরণ্যের উপরে ধারণ এই কথার দ্বারা হিরণ্যের উপরে ব্যানের দ্বারা আত্মাতে বায়ুর ধারণ করা হয়েছে (ব্যানলেন স্বাত্মন্যায়ুধারয়ন্তি)। ইন্দ্রাগ্নী- এই মন্ত্রে যে জলস্পর্শের কথা উক্ত হয়েছে, সেই জলের ভেষজত্ব আরোপিত হয়েছে (অর্থাৎ সেই জলকে ঔষধস্বরূপ বলা হয়েছে)। (অপ উপ স্মৃতি ভেষজুং বা আপো ভেষজমেব কুরুতে) ॥৪॥
[সায়ণাচার্য বলেন-পঞ্চমেহগ্নিষ্টোমশেষং পরিত্যজ্য বিকৃতিরূপস্য দ্বাদশাহস্য শেষাঃ পৃশ্নিগ্রাহা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৫ ে দ্বাদশাহের শেষে পৃশ্নিগ্রহ-সাধন সম্পর্কে বলা হয়েছে ]
তৃতীয় অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ২৫
অনুবাক-২৫
মন্ত্র- বায়ুরসি প্রাণো নাম সবিতুরাধিপত্যেহপিনং মে দাশ্চক্ষুরসি শ্রোত্রং নাম ধাতুরাধিপত্য আয়ুৰ্ম্মে দা রূপমসি বর্ণো নাম বৃহম্পতেরাধিপত্যে প্রজাং মে দা ঋতমসি সত্যং নামেন্দ্রস্যাহধিপত্যে ক্ষত্রং মে দা ভূতমসি ভব্যং নাম পিতৃণমাধিপত্যেহপামোষধীনাং গর্ভং ধা ঋতস্য ত্বা ব্যোমন ঋতস্য ত্বা বিভূমন ঋতস্য ত্বা বিধৰ্ম্মণ ঋতস্য ত্বা সত্যায়াত্তস্য ত্বা জ্যোতিষে প্রজাপতিব্বিরাজম পশ্যত্তয়া ভূতং চ ভবাং চাসৃজত তামৃষভ্যস্তিয়োহদধাত্তাং জমদগ্নিস্ত পসাহপশ্যত্তরা বৈ স পৃশ্লী কামানসৃজত তৎ পৃশ্লীনাং পৃম্নিত্বং যৎ পৃশ্লয়ো গৃহ্যন্তে পৃশ্নীনেব তৈঃ কামান্যজমানোহব রুন্ধে। বায়ুরসি প্রাণঃ নামেত্যাহ প্রাণাপানাবেবাব রুন্ধে চক্ষুরসি শ্রোং নামেত্যাহাইয়ুরেবাব রুন্ধে। রূপমসি বর্ণো নামেত্যাহ প্রজামেবাব রুগ্ধ ঋতমসি সত্যং নামেত্যাহ ক্ষত্রমেবাব রুন্ধে ভূতমসি ভবা নামেত্যাহ পশবো বা অপামোষধীনাং গর্ভঃ পশূনেব অব রুন্ধে এতাবদ্বৈ পুরুষং পরিতস্তদেবাব রুগ্ধ ঋতস্য বা ব্যোমন ইত্যাহয়ং বা ঋতস্য ব্যোমেমামেবাভি জয়তৃতস্য ত্বা বিভূমন ইত্যাহান্তরিক্ষং বা ঋতস্য বিভূমান্তরিক্ষমেবাভি জয়তৃতস্য ত্বা বিধৰ্ম্মণ ইত্যাহ দ্যৌব্বা ঋতস্য বিধৰ্ম্ম দিবমেবাভি জয়তৃতস্য ত্বা সত্যায়েত্যাহ দিশো বা ঋতস্য সত্যং দিশ এবাভি জয়তৃতস্য বা জ্যোতিষ ইত্যাহ সুবর্গো বৈ লোক ঋতস্য জ্যোতিঃ সুবৰ্গমেব লোকমভি জয়ত্যেতাবন্তো বৈ দেবলোকাস্তানেবাভি জয়তি দশ সং পদ্যন্তে দশাক্ষরা বিরাডম্নং বিরাডুবিরাজ্যেবান্নাদ্যে প্রতি তিষ্ঠতি ॥৫৷৷
মর্মার্থ- হে সোম! তুমি যজমানের দ্বারা পীত (পান-কৃত) হয়ে শরীরের মধ্যে ধারণ ইত্যাদির দ্বারা সামান্য অকারে বায়ুর্ভূত (অর্থাৎ বায়ুরূপী) হও, আবার বিশেষ আকারে প্রাণ নামে অভিহিত হয়ে থাকো। বাহিরে নির্গমনশীল হয়ে তুমি উচ্ছ্বাসরূপ হয়ে থাকো (অর্থাৎ সোমপানের ফলে যজমানের মধ্যে উচ্ছ্বাসের প্রকাশ দেখা যায় (বহির্নির্গমশীলমুজ্জ্বাসরূপোহসি)। সেইরূপ তুমি সবিতার প্রেরক পরমেশ্বরের আধিপত্যে স্থিত হয়ে আমাকে আমার অন্তরে প্রবিষ্টমান অপান বায়ু (বায়ুবিশেষ) দান করো। তুমি চক্ষু ও শ্রোত্রের আপ্যায়নকারিত্বের নিমিত্ত উভয়রূপ (অর্থাৎ চক্ষু ও শ্রোত্ররূপ) হও। তুমি ধাতুর অর্থাৎ দেহ ও ইন্দ্রিয়ের স্রষ্টা বিধাতার আধিপত্যে স্থিত আয়ু আমাকে দান করো। তুমি শরীর বা অবয়বের সৌষ্ঠবলক্ষণরূপ কান্তি ও বর্ণের হেতু ভূত হও। এই হেতু তুমি এই উভয়কারী (অর্থাৎ কান্তি ও বর্ণদানকারী) বৃহস্পতির আধিপত্যে স্থিত হয়ে আমাকে পুত্রপৌত্র ইত্যাদি প্রজা দান করো। তুমি মনের (অর্থাৎ চিন্ত্যমানের) সত্যস্বরূপ ও তুমি বাকের (অর্থাৎ বাক্য উচ্চারণের) সত্যস্বরূপ, এই উভয়ের (চিন্তাশক্তির ও বাকশক্তির) হেতুভূত রূপ তুমি; অতএব এই উভয়ের পালক ইন্দ্রের আধিপত্যে স্থিত হয়ে আমাকে বল দান করো। সেই রকম শরীরের মধ্যে পূর্ব হতে সিদ্ধ ধাতুবৈষম্য এবং পরে অর্থাৎ ভবিষ্যতে যা হবে (অর্থাৎ যে ধাতুবৈষম্য হবে), সেই উভয়ের সমাধান হেতুত্বের নিমিত্ত তুমি উভয়রূপ; অতএব এই উভয় সমাধান-দাতা পিতৃগণের আধিপত্যে স্থিত হয়ে এবং ওষধীর সম্বন্ধী যে পশুরূপ গর্ভ তা সম্পাদন করো (অর্থাৎ অতীত ও ভবিষ্যতের যাবতীয় ধাতুবৈষম্যের সমাধানদাতৃ হলেন পিতৃগণ; সুতরাং তাদের আধিপত্যে স্থিত হয়ে ধাতু বৈষম্যের যথাযথ সমাধান পূর্বক এবং ওষধীগুণের সহায়তায় পশুগণের উৎকৃষ্ট গর্ভেৎপাদন সম্পন্ন করো)। হে সোম! সত্যের রক্ষণের নিমিত্ত, সত্যের বাহুল্যের নিমিত্ত, সত্যের ধারণের নিমিত্ত, সত্যের সত্যত্বের অর্থাৎ প্রমাদরূপ মিথ্যার রহিত্যের নিমিত্ত এবং সেই সত্যের প্রকাশের নিমিত্ত আমি তোমাকে গ্রহণ করছি (ত্বাং মিমে)। এই দশটি মন্ত্র সোমের উন্মানরূপা পৃশ্নিগ্রহ-সাধনের নিমিত্ত কথিত হচ্ছে। প্রজাপতি পূর্বে বিচারপূর্বক সৃষ্টির সাধনভূত বিরাটকে দর্শন করেছিলেন (বিরাজমপশ্যৎ)। বায়ুরসি ইত্যাদি মন্ত্রসমষ্টি দশসংখ্যা পেতত্বের কারণে দশ অক্ষরযুক্ত ছন্দসাম্যের দ্বারা বিরাট নামে উক্ত হয়েছে (বিরাডিত্যুচ্যতে)। তার দ্বারা বিরাজা (আদিপুরুষ প্রজাপতি) ভূত ও ভবিষ্যৎ জগৎ সৃষ্টি করে থাকেন। সম্পূর্ণ জগৎ সৃষ্টি করে কিছুটা ভূত কিছুটা ভবিষ্যৎ, এইভাবে বিভাগ করেছিলেন। এই বিরাটু তিনি ঋষিগণের নিকট প্রকাশ করেননি (ন প্রকাশিতবা)। তখন জমদগ্নি তপস্যা পূর্বক প্রজাপতির অনুগ্রহের দ্বারা সেই বিরাটকে দর্শন করতে সক্ষম হন। সেই বিরাটের দ্বারা জমদগ্নি পৃশ্নি অর্থাৎ ধেনুস্বরূপ ভোগ সৃজন করেন (ভোগানসৃজাত)। যেভাবে বায়ুরসি ইত্যাদি দশসংখ্যক মন্ত্রে পৃশিশব্দ-অভিধেয় ধেনুরূপ ভোগ সৃজিত হয়, সেই কারণে ঐ মন্ত্রগুলিরও পৃশিনাম সম্পন্ন হয়েছে। পৃশ্নি হলো কামধেনু। পৃশিশব্দ-অভিধেয় বায়ুরসি ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা গ্রহীতব্য সোমভাগ পৃশ্নিরূপেই ধারণ কর্তব্য। এই উন্মান-লক্ষণ সমন্বিত গ্রহ ধারণের দ্বারা যজমান কামধেনুসদৃশ ভোগ লাভ করেন। প্রথম মন্ত্রের দ্বারা প্রাণ ও অপানের পোষণলক্ষণ সমন্বিত কাম লাভের প্রার্থনা উক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় মন্ত্রের দ্বারা চক্ষু-শ্রোত্রের স্থৈর্যের হেতুভূত আয়ু প্রাপ্তির প্রার্থনা উক্ত হয়েছে। তৃতীয় মন্ত্রের দ্বারা অঙ্গসৌষ্ঠব ও কান্তিযুক্ত প্রজাসম্পত্তি প্রাপ্তির প্রার্থনা উক্ত হয়েছে। চতুর্থ মন্ত্রের দ্বারা মানসিক ও বাঁচিক সত্যসাধনের সম্পত্তি প্রাপ্তির প্রার্থনা উক্ত হয়েছে। পঞ্চম মন্ত্রের দ্বারা ভূত, ভবিষ্যৎ, অস্বাস্থ্য (অর্থাৎ ধাতুবৈষম্যজনিত ক্ষতি) পরিহার পূর্বক পশুপ্রাপ্তির প্রার্থনা উক্ত হয়েছে। পূর্ববর্তী এই মন্ত্রপঞ্চকে এইভাবে অন্যান্য সকল ফল প্রাপ্তির বিষয় উক্ত হয়েছে। পরবর্তী মন্ত্রপঞ্চকে তিন লোক, সকল দিক ও দেবলোক বিজয়ের ফলের কথা ব্যক্ত হয়েছে। এই স্থানে ঋত-শব্দ সত্যের বাচক (ঋতশব্দঃ সত্যবাচী)। এই দশাক্ষরা বিরাটু মন্ত্রের দ্বারা সর্বলোক জয় করা যায় ॥৫॥
[অথ ষষ্ঠে গবাময়নগতা পরঃসংজ্ঞকা অতিগ্রাহ্যবিশেষা উচ্যন্তে। অর্থাৎ এই অনুবাকে গবাময়ন নামক সত্রে অতিগ্রাহ্য বিশেষের কথা উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ– গবাময়ন নামে সম্বৎসর সাধনীয় একটি সত্ৰ আছে (অস্তি গবাময়নং নাম সম্বৎসরস); তার পূর্ব অর্থাৎ প্রথম ছয় মাস ও পরবর্তী ছয় মাস, এই রকম দুটি ভাগ আছে। এই দুই ভাগের মধ্যবর্তী একটি দিন আছে, তার নাম বিষুব। বিষুবের পূর্ববর্তী তিনটি দিন পরঃসাম নামে অভিহিত; এইগুলি পূর্ববর্তী ছয় মাসের শেষ তিন দিন। সেই রকম বিষুব দিবসের পরবর্তী তিন দিনকে অবাক সাম বলা হয়; এইগুলি পরবর্তী ছয়মাসের প্রথম তিন দিন। তত্রাপি পরঃসাম নামক তিন দিবসে পর্যায় ক্রমে উক্ত তিনটি মন্ত্রের দ্বারা তিনটি অতিগ্রাহ্য নামে আখ্যাত সোমরস গ্রহণ কর্তব্য (অতিগ্রাহ্যাখ্যাঃ সোমরসা গ্রহীতব্যাঃ)। আবার অর্বাক-সাম নামক তিন দিবসে সেই মন্ত্রগুলির বিপরীতক্রমের দ্বারা তিনটি অতিগ্রাহ্য গ্রহণ কর্তব্য। বিষুব নামক মুখ্যদিনে সমাতিক্রমে (অর্থাৎ পরম্পরাক্রমে) ও বিপরীতক্রমে মোট ছয়টি অতিগ্রাহ্য গ্রহীতব্য। পুরাকালে দেবগণ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন, কিন্তু বিধিমতো অতিগ্রাহ্যরহিত্যের কারণে যজ্ঞের কোন ফল তাঁরা প্রাপ্ত হননি; পরে পরাশ্য গ্রহের দ্বারা সেই ফল প্রাপ্ত হন। যাতে অভীষ্টের সমাপ্তি হয় (অর্থাৎ অভীষ্টপ্রাপ্তি ঘটে), তা-ই পরা নামে অভিহিত। প্রথম গ্রহের দ্বারা এই ভূ-লোক, দ্বিতীয় গ্রহের দ্বারা অন্তরীক্ষলোক এবং তৃতীয় গ্রহের দ্বারা দু-লোক–এই ভাবে গ্রহের দ্বারা লোকসমূহ অভিজয় করা যায়। বিষুব দিবসের পরবর্তী দিনগুলিতে বিপরীত ক্রমে গ্রহণ কর্তব্য। (বিষুবের পূর্ববর্তী দিনগুলিতে যেমন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রহের দ্বারা যথাক্রমে ভূলোক, অন্তরীক্ষলোক ও দুলোক জয় করা হয়, তেমনই তারই বিপরীতে) বিষুবের পরবর্তী প্রথম দিবসে তৃতীয় গ্রহ, দ্বিতীয় দিবসে দ্বিতীয় গ্রহ ও তৃতীয় দিবসে প্রথম গ্রহের দ্বারা যথাক্রমে দ্যুলোক, অন্তরীক্ষলোক ও ভূলোক জয়ে প্রত্যাবর্তিত হতে হয়। বিষুব দিবসের পূর্ববর্তী দিনসমূহে প্রথম অতিগ্রাহ্য হতে আরম্ভ করে ক্রমে পরাঞ্চ গ্রহণ কর্তব্য। প্রথম গ্রহণ করে তার পর দ্বিতীয় অতিগ্রাহ্য, দ্বিতীয় গ্রহণের পর তৃতীয় অতিগ্রাহ্য; এগুলি পরাঞ্চ (এতে পরাঞ্চ)। এই নিমিত্ত ভূলোক, অন্তরীক্ষলোক ও দ্যুলোক–এই তিনটি লোক উত্তরোত্তরগত পরাঞ্চ হয়। বিষুর দিবসের উত্তরবর্তী তিনটি দিন হতে তৃতীয় গ্রহ হতে আরম্ভ করে অবাঞ্চ (অধস্তন) গ্রহ গ্রহণীয়। প্রথম দিনে তৃতীয় গ্রহ, দ্বিতীয় দিনে দ্বিতীয় গ্রহ এবং তৃতীয় দিনে প্রথম গ্রহ গ্রহণ কর্তব্য। এগুলি অর্বাঞ্চ (ত এহতের্বাঞ্চঃ)। দ্যুলোক হতে অধস্তন অন্তরীক্ষলোক, অন্তরীক্ষলোক হতে অধস্তন ভূলোক, এগুলি অর্বাঞ্চ লোক। এর দ্বারা মনুষ্যগণ নূতন স্থান প্রাপ্ত হয়। ব্রহ্মবাদীগণ বলেন-জল হতে ওষধীর উদ্ভব হয়; ওষধী হলো মনুষ্যগণের অন্নের স্বরূপ; প্রজাপতি মনু হতে প্রজাগণের উৎপত্তি হয়। এগুলির কারণ কি? এই কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তার উত্তরে কোন বুদ্ধিমান্ ব্রহ্মবাদী বলেন–পর হলো এর কারণ। অতিগ্রাহ্য গ্রহণ মন্ত্রের উৎকৃষ্টত্বের কারণে তা পর শব্দে অভিহিত হয়েছে (উদ্ধৃষ্টত্বাৎ পরশব্দাভিধেয়াঃ)।–সেই রকম, প্রথম মন্ত্রে বলা হচ্ছে–হে প্রথম অতিগ্রাহ্য! তোমাকে ওষধির উৎপত্তির নিমিত্ত (ওষধৎপত্ত্যর্থ) গ্রহণ করছি। এই মন্ত্রের দ্বারা প্রথম অতিগ্রাহ্যটি গ্রহণ করলে জল হতে ওষধির সম্যক উৎপত্তি হয়। দ্বিতীয় মন্ত্রে বলা হচ্ছে–হে দ্বিতীয় অতিগ্রাহ্য! প্রজাবর্গের জীবনের নিমিত্ত (প্রজাজীবনার্থ) ওষধি হতে তোমাকে গ্রহণ করছি। এই মন্ত্রের দ্বারা দ্বিতীয় অতিগ্রাহ্যটি গ্রহণ করলে সেই ওষধিসমূহ মনুষ্যগণের অন্ন হয়। অতঃপর তৃতীয় মন্ত্রে বলা হচ্ছে–হে তৃতীয় অতিগ্রাহ্য! তোমাকে প্রজা ও প্রজাপতির নিমিত্ত গ্রহণ করছি (প্রজার্থং প্রজাপত্যর্থং গৃহ্নামি)। প্রজা অর্থাৎ সকল প্রজাও, যারা প্রজাপতির আশ্রিত বা প্রজাপতি হতে উৎপন্ন, তাদের সকলকেই প্রাপ্তির অভিপ্রায়ে তোমাকে (অর্থাৎ তৃতীয় অতিগ্রাহ্যকে গ্রহণ করছি ॥৬॥
মর্মার্থ- পুরাকালে কোনও সময়ে প্রজাপতি দেবতা ও অসুরগণকে সৃষ্টি করেন, তার পর যজ্ঞও সৃষ্টি করেন; এবং যজ্ঞের অনুষঙ্গে তিনি ছন্দও সৃষ্টি করেন। তদানীন্তন কালে দেবতাগণের মধ্যে পরস্পর ঐকমত্যের অভাবে তারা নানা পথে বিবিধ দেশে গমন করলেন। অতঃপর সেই যজ্ঞ অসুরবর্গকে অনুসরণ করায় দেবগণের নিকট হতে দূরে গমন করল। তখন দেবগণ পরস্পর ঐকমত্য প্রাপ্ত হয়ে বিচার করলেন–আমরা যে ঐশ্বর্য লাভ করেছিলাম তা সবই এখন অসুরগণের নিকট অবস্থান করছে (অর্থাৎ অসুরগণ লাভ করছে)। দেবগণ এই কথা বিচারপূর্বক এই পরাভবে অসহ্যমান হয়ে প্রজাপতির নিকট গমন করলেন (প্রজাপতিমুপাধাব)। অতঃপরে দেবগণ কর্তৃক উপসেবিত হয়ে প্রজাপতি বললেন, ছন্দরূপ বৈদিক মন্ত্রসমূহের মধ্যে বীর্য (অর্থাৎ তেজসের প্রভাব বা সার) যুক্ত করে তা আমি তোমাদের প্রদান করছি। এই কথা বলে তিনি সেই মতো করলে সকল ছন্দসমূহ অসুরদের নিকট হতে পশ্চাদপসারিত হয়ে দেবগণের প্রাপ্ত হলো। ছন্দকে অনুসরণ করে যজ্ঞও অসুরদের নিকট হতে পলায়ন করে দেবগণের প্রাপ্ত হলো। তার ফলে (ততো) দেবগণ বিজয়ী হয়ে অসুরগণকে পরাভূত করলেন। যিনি ছন্দের এই সার বা তেজঃপ্রভাবের কথা (বীর্য) জ্ঞাত হন, তিনি স্বয়ং বিজয়ী হয়ে থাকেন, অর্থাৎ তার শত্রুগণ পরাভূত হয়। সেই কারণে তেজঃপ্রভাব (অর্থাৎ বী) জ্ঞাত হয়ে ছন্দের প্রয়োগ কর্তব্য। আশ্রাবয় ইত্যাদি মন্ত্রপঞ্চক হলো ছন্দের সেই বীর্য (তেজঃপ্রভাব)। [আশ্রাবণ ইত্যাদি মন্ত্রসমূহের অর্থ ১ম কাণ্ডের ৬ষ্ঠ প্রপাঠকের ১১শ অনুবাকে বিস্তারিতভাবে রয়েছে। এতেষাং মন্ত্রানামৰ্থা যো বৈ সপ্তদশমিত্যস্মিন্ননুবাকে (সং, কা-১, প্র-৬, অ-১১) প্রপঞ্চিতাঃ] কিন্তু কিসের কামনায় রা কোন্ প্রয়োজনে অধ্বর্য এই আশ্রাবণ মন্ত্র পাঠ করেন? ব্ৰহ্মাদিগণের দ্বারা এইরকম জিজ্ঞাসিত হয়ে যিনি বুদ্ধিমান, তিনি উত্তরে বলেন–প্রজাপতি কর্তৃক ছন্দের যে বীর্য (অর্থাৎ সার বা তেজঃ প্রভাব) উদ্ধৃত হয়েছিল, তা পুনরায় লাভ করার নিমিত্ত অধ্বর্য এই মন্ত্র শ্রবণ করান। এই যজ্ঞে বা লৌকিক ব্যবহারে বীর্যদেবী যে কোন (যৎকিঞ্চিৎ) দেবতা ইত্যাদির পূজা করে থাকে, সেই সবই সবীর্য (অর্থাৎ তেজঃপ্রভাব যুক্ত) ছন্দের দ্বারাই পূজিত হয়ে থাকে (সবীযৈরেব ছন্দোভিঃ পূজিতবান্ ভবতি)। ইন্দ্র বৃত্রকে নিহত করেছিলেন, সেই বধরূপ কর্ম অমেধ্য বা অযজ্ঞিয় হয়েছিল (অর্থাৎ যজ্ঞের দ্বারা সেই পাপ ক্ষালনের যোগ্য ছিল না)। আবার ইন্দ্র যে যতিগণের সাল-বৃক ইত্যাদির মুখে দিয়েছিলেন তা-ও (যত্তদপি) পাপরূপত্ব হেতু অযজ্ঞিয়। তাহলে কোন কারণে এই যজ্ঞ সমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত ইন্দ্রের নিমিত্ত সম্পন্ন হয়ে থাকে? (অর্থাৎ কি জন্য এই পবিত্র যজ্ঞ আরম্ভ হতে শেষ পর্যন্ত অজ্ঞিয় কর্মকারী ইন্দ্রের নিমিত্ত সম্পন্ন করা হয়?)–ব্রহ্মবাদিগণ এই প্রশ্ন করলে তখন বুদ্ধিমান যিনি, তিনি উত্তরে বলেন–ইন্দ্রের অযজ্ঞিয় এবং যজ্ঞিয় (দুটি তনু বা সত্তা) আছে। রাজ্য পালন বা বিস্তার কল্পে দেবরাজ ইন্দ্র যে ক্ষত্রিয় ইত্যাদিকে হিংসা করেন, তা তার অযজ্ঞিয় তনু; এটি রাজসিক (অর্থাৎ রাজার স্বাভাবিক কর্মের পর্যায়ভুক্ত হলেও হিংসাকর্মের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় অযজ্ঞিয়)। আবার যজ্ঞের নিমিত্ত ইন্দ্রের যে তনু আছে, তা যাগযোগ্য, অর্থাৎ যজ্ঞিয় তনু বা সত্তা (যজ্ঞাহা তনুঃ) এবং তা সাত্ত্বিকী (অর্থাৎ সত্ত্ব গুণাশ্রয়ী)। (যজ্ঞে যজ্ঞাঙ্গের দেবতারূপে হবির দ্বারা পূজনীয় ইন্দ্র সাত্ত্বিক বিগ্রহ, এটাই বক্তব্য)। সেই কারণেই যজমান এই যজ্ঞে ইন্দ্রের সেই যাগযোগ্য সাত্ত্বিকী তনুবই যাগ করে থাকেন। যিনি এই কথা বিদিত হন, তার নিকট যজ্ঞ নত হয় (নমতি)-(অর্থাৎ প্রাপ্তিযোগ্য হয়) ॥৭॥
[অথষ্টমেহব থাঙ্গহোমাদয়ো বক্তব্যাঃ। অর্থাৎ– অনুবাক-৮ ে অবyথ-অঙ্গের হোম ইত্যাদি উক্ত হয়েছে ]
মর্মার্থ- হে অগ্নি! আপনি আয়ুদা (অর্থাৎ আয়ু দান করেন); এই যজমানের আয়ুষ্পদ হন (অর্থাৎ এই যজমানকে আয়ু প্রদান করুন। আপনি হবির দ্বারা সেবমান হয়ে ঘৃতপ্রতীক বা ঘূতোপক্রম হয়েছেন, অর্থাৎ যজ্ঞে ঘৃতের দ্বারা হৃয়মান হয়েছেন। আপনি ঘৃতযোনি, অর্থাৎ ঘৃতই আপনার জ্বালার (অগ্নিশিখার) উৎপত্তির কারণ। সেই রকম স্বাদুতম শোধিত (অর্থাৎ নির্মল) গব্য ঘৃত পান করে পিতা কর্তৃক পুত্রের মতো যজমানকে রক্ষা করুন (অর্থাৎ পিতা যেমন পুত্রকে পালন করে, সেই ভাবে আপনি পুত্রবৎ যজমানকে রক্ষা করুন)। আহবনীয় ও গার্হপত্য অগ্নির নিমিত্ত ঘৃত (হবিঃ) পাক করে বরুণের পুরোডাশরূপ অবyথ হোম না করে (হোমমকৃত্বা) অন্যত্র অবভৃথ কর্মের (যজ্ঞের) নিমিত্ত জলের সমীপে (অবভূথ স্নানের উদ্দেশে) গমন করলে যজমানের অপরাধ হয়, তার ফলস্বরূপ আহবনীয় ও গার্হপত্য উভয় অগ্নি হতে যজমান বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেন (বিচ্ছিন্নো ভবতি)। অতএব অবyথ স্নানের উদ্দেশে গমনের ইচ্ছা থাকলে আয়ুদা অগ্ন ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা আজ্যহোম করা কর্তব্য (আজ্যমাহবনীয়ে জুহুয়াৎ)। এই আহুতির দ্বারা আহবনীয় ও গার্হপত্য অগ্নিকে শান্ত করা হয়। এইভাবে শান্তকরণের ফলে সেই যজমান কোন আর্তি (ক্লেশ বা দুঃখ-কষ্ট) প্রাপ্ত হন না। হে অগ্নি! আমি যদি কারও ঋণ পরিশোধ না করে থাকি, আপনার নিকট এই আহুতি প্রদানের দ্বারা যমরূপ উত্তমর্ণের (অর্থাৎ সেই ঋণদাতার) নিকটে আমি অঋণী হলাম (অহমনৃণো ভবামি)। এই যজ্ঞের অনুষ্ঠানে যজমানের যদি কোন সঙ্কীর্ণতা হয়ে থাকে, তবে সেই সাঙ্কর্যের পরিহারের নিমিত্ত বেদিদাহক অগ্নিতে অঞ্জলি দ্বারা নিম্নোক্ত সত্ত্ব মন্ত্রে আহুতি প্রদান কর্তব্য। মন্ত্র-বিশ্বকোপ বিশ্বদাবস্য… অর্থাৎ হে বিশ্বলোপ (অর্থাৎ সকল পাপলোপকারী বা পাপবিনাশকর্তা)! হে স-অঞ্জলি! সকল পাপের দহনে প্রবৃত্ত দাবাগ্নির মুখে (আস্যে) তোমাকে আহুতি প্রদান করছি। এই হোমের দ্বারা আহিতাগ্নি, গার্হপত্যাগ্নি ও দাবাগ্নি এই তিন অগ্নি তুষ্ট হয়ে আমাদের ভেষজ প্রদান করুন (যা আমাদের রোগকে জয় করবে), আমাদের ক্ষুধা পরিহারে সমর্থ করুন, আমাদের নিবাসস্থান দান করুন, আমাদের বল সঞ্চারিত করুন, এবং বরণীয় ধন ইত্যাদি প্রদানের দ্বারা শ্রেষ্ঠ করুন (শ্রেষ্ঠং কুর্ব) এই অগ্নি, যা আমাদের পুরোভাগে (সম্মুখে) বর্তমান, তিনি তেজের দ্বারা বর্ধমান হয়ে আমাদের রক্ষা করুন। সেই অগ্নির রক্ষণের দ্বারা আমরা যেন বহু গৃহ লাভ করি। হে নভস্পতি (অর্থাৎ আকাশের পালক) বায়ু! আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহরূপী হয়ে অন্ন ইত্যাদি রস প্রদান করুন; আমাদের নষ্ট অন্ন পুনরায় আনয়ন করে প্রদান করুন; আমাদের নিমিত্ত অপেক্ষিত (আকাঙ্ক্ষিত) ধন আনয়ন করে প্রদান করুন। হে সংস্ফান (অর্থাৎ সম্যক বৃদ্ধিযুক্ত) আদিত্যদেব! আপনি সহস্ৰসংখ্যক ধন পশু ইত্যাদির প্রভু। আমাদের দারিদ্রাভাব (দারিদ্র্যহীনতা দান) করুন, ধনের দ্বারা পুষ্টিশালী করুন, শোভন অপত্যবান্ করুন, এবং সম্বৎসরব্যাপী স্বস্তি (অর্থাৎ অনিষ্টনাশরূপ সম্পদ) দান করুন। যমস্য বলিনা চরামি ইত্যাদি মন্ত্রে অভিধীয়মান (অস্মিন্মহেভিধীয়মানো) যম হলেন অগ্নিদেব; হোমের আধারে নিয়ত অবস্থানের কারণে তিনি অগ্নি এবং বেদীরূপা এই ভূমি যমী (ইয়ং বেদিরূপা ভূমির্যমী)।
যজমান বেদিদাহ না করে (বেদিমদধ্বা) ভূমি হতে প্রয়াণ করে গেলে, যমের ভৃত্যসমূহ গলায় রঞ্জুবন্ধন পূর্বক যজমানকে স্বর্গলোকে নীত করে। যিনি এই জন্মেই যজ্ঞপ্রদেশে অবস্থিত থেকেই দাহের দ্বারা দাহের নিঃশেষে অঋণী হন, তিনি স্বর্গলোক প্রাপ্ত হন। যে সঙ্কীর্ণ অঙ্গজাত মিশ্রিত করে যজমান অনুষ্ঠান করেন, সেই সাস্কর্য (অর্থাৎ সঙ্কীর্ণ দোষ) পরিহারের নিমিত্ত বেদিদাহক দাবাগ্নিতে অঞ্জলির দ্বারা সত্ত্ব প্রদান কর্তব্য। এই অগ্নি বৈশ্বানর অর্থাৎ সকল পুরুষের সম্বন্ধযুক্ত (অর্থাৎ সর্বপুরুষের আকাঙ্ক্ষিত ব্যবহারে পর্যাপ্তবৎ)। এই অগ্নি সঞ্জু হোমের দ্বারা তুষ্ট হয়ে মিশ্রচারী যজমানকে স্বাদু করে থাকে (অর্থাৎ তাকে মিশ্রণদোষরহিত করে থাকে)। অতঃপর বেদিদাহ প্রসঙ্গের দ্বারা বুদ্ধিপূর্বক দাহরূপ কর্মান্তর উক্ত হচ্ছে।-মাঘমাসের কৃষ্ণষ্টমীকে একাষ্টকা বলে (একাষ্টকা নাম মাঘকৃষ্ণাষ্টমী)। এবং সেই দিনটি হলো প্রতিপদ ইত্যাদি তিথিগুলির প্রবর্তয়িত্রী এবং সম্বত্রস নামক পুরুষের পত্নী (পত্নীত্বাৎ)। তথাবিধ চারটি শরাব পরিমিত দ্রব্যে নির্মিত অপূপ (পিষ্টক) পাক করে সেই অতি উষ্ণ অপুপের দ্বারা পরিদবসের প্রাতঃকালে অরণ্যে কক্ষ (শুষ্ক তৃণ) দগ্ধ করণীয়। সেই অপূপের উপরে জীর্ণ তৃণ প্রক্ষিপ্ত করণীয়। এই সমস্তই কক্ষের মধ্যে (তৃণের মধ্যে) করা কর্তব্য। এমন করলে যদি এই অপূপের অগ্নিতে সামগ্র কক্ষটি দগ্ধ হয় (দহতি), তাহলেও যে কার্যের উদ্দেশে এই দহন কৃত হলো তা অর্থাৎ সেই কার্য পুণ্যসম হয়। (অর্থাৎ সম্যক পারোত্তীর্ণ হয়, এটাই অর্থ)। কিন্তু অদাহে অর্থাৎ দহন না করলে তা পাপসম হয়ে সেই উদ্দিষ্ট কার্যের বিনাশক হয়। এই কক্ষদাহরূপ কর্মটি নির্বিঘ্নে সম্পূর্তির জ্ঞানে পূর্বকালের মহর্ষিগণ সম্বৎসরব্যাপী সত্ৰ ইত্যাদি প্রৌঢ় (প্রকৃষ্টরূপে অঙ্গীকৃত) কর্ম আরম্ভ করতেন। অগ্নি উপদ্রষ্টা (অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক), বায়ু উপশ্রোতা (অর্থাৎ প্রতিশ্রুত), আদিত্য অনুখ্যাতা (অনুকূল কর্মের নিমিত্ত খ্যাত)–এই কথা বিদিত হয়ে যিনি যাগানুষ্ঠান করেন, তিনি ইষ্ট (অর্থাৎ শ্রৌত বা শ্রুতি শাস্ত্রসম্মত) ও পূর্ত (অর্থাৎ স্মার্ত বা স্মৃতিশাস্ত্রসম্মত) কর্মের ফলস্বরূপ স্বর্গলোক প্রাপ্ত হন (স্বর্গলোকে সঙ্গচ্ছতে)। পুরোভাগে দৃশ্যমান জ্বালাযুক্ত (শিখাসমন্বিত) এই অগ্নি আমার কর্মফল রক্ষা করুন, এই প্রার্থনা অর্থাৎ এইরূপ প্রার্থিত হোন (গোপায়েতি প্রার্থিতবান্ ভবতি)। আকাশে সঞ্চারমান নভস্পতি (অর্থাৎ আকাশের পালক) বায়ু এবং সংস্ফান অর্থাৎ রশ্মির দ্বারা সর্বত্র অভিবর্ধমান (উৎকর্ষের সাথে ক্রমে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত) আদিত্য দেব আমার কর্মফল রক্ষা করুন ॥৮৷৷
[অথ নবমে বৃষলম্ভাখ্যং কিঞ্চিৎ কর্মাভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৯ ে বৃষালম্ভ নামে আক্যাত কিছু কর্মের বিষয় উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে গাভীগণ! তোমাদের নিমিত্ত এই যুবা বৃষকে পরিদান (প্ৰদান) করছি; তোমরা প্রীতির সাথে এর সাথে ক্রীড়া করো এবং বিচরণ করো (ক্রীয়ন্তীশ্চরত)। আমাদের শাপ প্রদান করো না (নোহস্মাম্মা শাপ্ত)। তোমরা জন্ম হতেই সুভগা (অর্থাৎ সুষ্ঠুভাবে ভাগ্যবতী; সেই কারণে আমাদের শাপ প্রদান করা তোমাদের উচিত কর্ম নয়; অধিকন্তু এই তরুণকে (অর্থাৎ যুবা বৃষকে) দান করার নিমিত্ত আমাদের অনুগ্রহ করাই তোমাদের উচিত কর্ম। তোমাদের প্রসন্নতায় ধনপুষ্টি ও অন্নের দ্বারা আমাদের হৃষ্ট হওয়াই সম্ভব। হে দেবগণের জনক প্রজাপতি! আপনার সৃষ্টি ইত্যাদিরূপ মহিমাকে নমস্কার করছি, আপনার দৃষ্টিরূপ সর্বগোচর জ্ঞানকে নমস্কার করছি। আমাদের বিবক্ষিত (অর্থাৎ আমরা যা বলতে ইচ্ছুক) বিষয় আপনি অনুমোদন করুন (অনুমন্যস্ব)। আমরা বৃষভের দ্বারা শোভন যজ্ঞ সাধন করব।.এই বৃষভরূপ হব্য দেবতাগণের প্রিয় ছিল এবং সেই কারণে তা দেবগণের দ্বারা আবদ্ধ ছিল। (অর্থাৎ এই বলীবৰ্দে দেবতাগণ অতিরিক্ত প্রীতিসক্ত ছিলেন, এটাই বক্তব্য)। এবং সেই বৃষ আহুত হয়ে মেঘের জলসম্বন্ধী গর্ভ হতে মুক্ত হয়ে বৃষ্টিরূপে পুনরায় অধোমুখে ওষধিতে পতিত হয়েছে।–সেই জলরূপ গর্ভ কি প্রকারে সম্পন্ন, তা বলা হচ্ছে।–পূষা সোমের রস বরণ করেছিলেন (বৃণীত), আদিত্য সলিলাত্মক চন্দ্রের রস রশ্মির দ্বারা গ্রহণ করেছিলেন (গৃহীতবা)। এবং সেই রসরূপ জল হতে রশ্মিসমূহ সম্বন্ধী বৃহৎ পবর্তসদৃশ মেঘের সৃষ্টি হয়েছিল (মেঘোহভবৎ)। এই বৃষভ কেবল গাভীগণের পতিই নয়, সে গো-বৎসগণের পিতাও বটে, এবং গম্ভীর ধ্বনিযুক্ত (অর্থাৎ কলসীতে জলভরণকালে যেমন গর্গর শব্দ হয় তেমনই ধ্বনিযুক্ত) ও শারীরিক বৃদ্ধ (শরীর বৃদ্ধ্যা) বহু বৃষভেরও পিতা। গাভীর উদরে বা গর্ভে বৎসের অধিকরণ অর্থাৎ অধিকার পূর্বক স্থিতি, দুগ্ধের দোহনপাত্রস্থ হওয়া, ক্ষীরের অমৃতসমান হওয়া, রন্ধনের দ্বারা আমিক্ষা বা ছানার এবং নবনীতের (অর্থাৎ মাখনের) পক ঘৃতে নিষ্পন্ন হওয়া, এই সমস্তই এই বৃষভের রেতঃ অর্থাৎ সারভূত রসের পরিণামস্বরূপ (এতদীয় সারভূতরসপরিণামরূপ) এইরকম মহাভাগ বৃষ দেবগণের প্রীতির কারণ, এইটি প্রতিপন্ন করাই অভিপ্রায় (দেবাংশুপত্বিত্যভিপ্রায়ঃ)।–সৌবিষ্টকৃত মন্ত্রের পাঠ–হে বৃষভ! গাভীগণ তোমাকে সকলের রাজারূপে বরণ করে নিয়েছিল (বৃতবত্যঃ)। সুষ্ঠুভাবে অর্চনীয় দেবতাগণ তোমাকে হবিঃস্বরূপে আহ্বান করে থাকেন। ক্ষত্রিয়জাতির প্রধানভূত শরীরে আশ্রিত বলরূপে অবস্থান করে থাকো। (সর্বনিয়ামক রাজবিগ্রহের মত সকল পশুর মধ্যে বৃষভের বলাধিক্য থাকার কারণে বৃষভকে রাজাবিগ্রহের সাথে তুলনা করা হয়েছে)। সেই নিমিত্ত রাজার মতো উগ্র হয়ে তুমি আমাদের নিমিত্ত শত্রুগণের ধনসমূহ (বসূনি) ভাগ করে (বণ্টন-করে) দান করো।-যে যজমানের নিমিত্ত এই যজ্ঞাঙ্গগুলি করা হচ্ছে, সেই যজমান সর্বাঙ্গ-সমৃদ্ধ পশুর দ্বারা যাগ করছেন (এষ যজমানঃ সর্বাঙ্গসমৃদ্ধেন পশুনা যাগং করোতি) ৯।
মর্মার্থ- বশার (বন্ধ্যা বা গাভীর) একটি শরীর হবিঃ রূপে সঙ্কল্পিত হয়েছে, তাতে পশু গর্ভস্থ হলে (তত্র গর্ভে) হবির অতিরেকজনিত কারণে বপার (মেদ বা চর্বির আধিক্য হবে। এই রকম হবির আধিক্যের ফলে যজমান কৃত যজ্ঞের বৈগুণ্য হয় (বিগুণ এব ভবতি)। তখন সূর্যো দেবো দিবিষ্য এই মন্ত্রের দ্বারা হোম করলে সূর্য দেবতা ঐ মন্ত্রোক্ত বৃহস্পতি ও প্রজাপতি দেবতার দ্বারা যজ্ঞের বৈগুণ্যের (দোষের) সমাধান করেন। এক দেবতার উদ্দেশে একটি পশু আলব্ধ হয়, তার ফলে সেই নিরাকৃত পশু গর্ভ ধারণ করলে তা ভূয়ান্ (অর্থাৎ বহুতর বা প্রচুর) হবে; এই আধিক্যজনিত বৈকল্যে রাক্ষসগণ তা গ্রহণ করবে। এই বৈকল্যজনিত দোষ পরিহারের নিমিত্ত যস্যাস্তে হরিতো গর্ভ এই মন্ত্রের দ্বারা কৃত সেই দেবতার উদ্দেশে বশা অর্পণ করলে (অর্থাৎ দেবতা সেই বশা প্রাপ্ত হলে) রাক্ষসগণ হত হয়। লৌকিক গর্ভের পর্যাবর্তনের নিষেধ করে বলা হয়েছে–ব্রহ্মনৈবৈনমা বর্তয়তি অর্থাৎ ব্রহ্ম এর আবর্তন করবেন। উচ্ছেদন (জরায়ুছেদন) সম্পর্কিত মন্ত্রের স্পষ্টার্থতা সম্পর্কে বলা হয়েছে-বি তে ভিনদ্মি তকরীমিত্যাহ যথাযজুরেবৈতৎ। রসধারণের নিমিত্ত পাত্রের উপোহন মন্ত্রণাত ইন্দু শব্দের তাৎপর্য দেখান হয়েছে (দর্শয়তি) উরুদ্রন্সে বিশ্বরূপ ইন্দুরিত্যাহ প্ৰজা বৈ পশব ইত্যাদি মন্ত্রে। ইদি (অর্থাৎ পরমৈশ্বর্য) এই ধাতু হতে ইন্দু-শব্দ উৎপন্ন হয়েছে। প্রজা ও পশুর ঐশ্বর্যরূপত্ব ইত্যাদিই ইন্দুত্ব। অতএব ই-শব্দ প্রয়োগের দ্বারা প্রজা ইত্যাদির দ্বারা এই রস সমৃদ্ধ করা হয়েছে–এটাই দেখান হয়েছে। তারপর অভিসমূহন মন্ত্রে দ্যু-শব্দের এবং পৃথিবী শব্দের তাৎপর্য দেখান হচ্ছে-দিবং বৈ যজ্ঞস্য বৃদ্ধং গচ্ছতি….দৌঃ পৃথিবী চ ইত্যাদি মন্ত্রে। যজ্ঞের সম্বন্ধি যে অঙ্গ বৃদ্ধ অর্থাৎ ন হয়, তা স্বর্গে গমন করে; যা অতিরিক্ত হয়, তা পৃথিবীতে গমন করে। এমন হলে যদি এই উভয়ের দমন না করা হয় (মা শময়েত্তদা), তাহলে যজমান আর্তি (ক্লেশ বা বিপত্তি) প্রাপ্ত হয়। অতএব এই মন্ত্রে দ্যৌ পৃথিবী এই শব্দ প্রয়োগের দ্বারা ঐ উভয়ের দমনের কথা বলা হয়েছে, যাতে যজমান আর্তি না প্রাপ্ত হন। কিভাবে দ্যাবা পৃথিবীর দ্বারা গর্ভের আত্মসাৎ-কর্ম সংঘটিত হয়, তার বিচার পূর্বক নির্দেশ করা হয়েছে-ভস্মের দ্বারা গর্ভের আচ্ছাদন করণীয়। এই গর্ভ দ্যাবাপৃথিবী হতে (অর্থাৎ উভয় লোক হতে) সমুৎপন্ন। অতএব ভস্মনাহভি সমূহতি স্বাগাকৃত্যা ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা গর্ভের ভস্মাচ্ছাদন করা হলে দ্যাবাপৃথিবীতে গর্ভ স্থাপন করা হয় (গর্ভং স্থাপয়তীতি)। যদি গর্ভের মধ্যস্থ পশুর হৃদয় ইত্যাদি কোন অঙ্গ ছেদিত হয়, তবে পশুর হৃদয় ইত্যাদি অপেক্ষা হবির আধিক্য হবে (হবিরতিরিক্তং ভবেৎ)। যদি সেই দোষ পরিহারেরর নিমিত্ত ছেদন না করা হয়, তবে পশুর অবদান (সম্পাদিত কর্ম) না করা হয়। (গর্ভস্থ পশুর কোন অঙ্গের ছেদন এবং অ-ছেদন) এই উভয় দোষ পরিহারের নিমিত্ত নাভির পুরোভাগের কোন অঙ্গ এবং তার উপরের কিছু অংশ ছেদন করণীয়, তাতে যতগুলি পশু তার সবগুলিরই ছেদন হয়ে যায়, সেটি কি করে সম্ভব হয়, সেই সম্পর্কে কথিত হয়েছে–তির্যক জাতির (তিরাং, পশু-পক্ষী ইত্যাদির) নাভির সম্মুখস্থ প্রাণবায়ু মুখে সঞ্চারিত হয়ে থাকে এবং অপান বায়ু নাভির উপরিভাগে অর্থাৎ পুচ্ছদেশে সঞ্চারিত হয়ে থাকে। সুতরাং এই উভয় ছেদনের দ্বারা (উভয় কর্মসম্পাদন বা অবদানের দ্বারা) সকল অবদান (অর্থাৎ সম্পাদিতব্য কর্ম) সিদ্ধ অর্থাৎ সাধিত হয়ে যায়।–বিষ্ণবে শিপিবিষ্টায় জুহোতি ইত্যাদি মন্ত্রের বিধি কথিত হচ্ছে।-যজ্ঞই বিষ্ণু এবং পশুগণ শিপি (অর্থাৎ তেজঃ বা রশ্মি), এই শ্রুতি হতে জ্ঞাত হওয়া যায় যে, পশুস্বামী যজ্ঞদেব কোন শিপিবিষ্ট নামধেয় বিষ্ণুর উদ্দেশে যাগ কর্তব্য। যজ্ঞের সম্বন্ধি যে অঙ্গ অতিরিক্ত হয়, যা পশুর বহুত্ব এবং হবির আধিক্যের ও পশু-দেহে পুষ্টির আধিক্যের হেতু, সেই সবই শিপিবিষ্ট বিষ্ণুর অধীন। এতএব বিষ্ণুর উদ্দেশে অনুষ্ঠিত হোমে সেই সমস্ত অতিরিক্ত স্থাপন (বা অর্পণ) করা হয়। এবং তার ফলে সমস্ত অতিরেকজনিত দোষের শান্তি ঘটে।–অতঃপর দেয় দক্ষিণার বিধি কথিত হচ্ছে। অষ্টা অর্থাৎ অষ্ট বিন্দুর দ্বারা লাঞ্ছিত (চিহ্নিত) হলে সেইরকম হিরণ্য (কড়ি) প্রদান কর্তব্য। যদি এই বশা সগর্ভা হয়, তাহলে অষ্টপদ হিরণ্য অধিক ৫লন কর্তব্য। আত্মা পশুর দেহ অপেক্ষা যেহেতু অতিরিক্ত অর্থাৎ নবম, সেই কারণে অষ্টবিন্দুর দ্বারা যুক্ত হিরণ্য ও অষ্টপাদের সাথে যুক্ত পশু সমান হয়। সেই রকম হলে পশুপ্রাপ্তি সম্পন্ন হয় (সদৃশং ভবতীতি পশুপ্রাপ্তৈ সম্পাদ্যতে)। বাহ্য কোশ (বাহিরের আবরণ) হতে আরম্ভ করে আভ্যন্তরস্থ তৃতীয় কোশে হিরণ্য উষ্ণীষের দ্বারা সর্বতোভাবে বেষ্টন করণীয়। যে ভাবে সেই। হিরণ্য চারবার বেষ্টিত হয়, সেইভাবে গর্চরূপ পশুও চারবার বেষ্টিত হয় (তথৈব গর্ভরূপঃ পশুরপি চতুর্ভিবেষ্টিতো ভবতি)। সেটি কি করে সম্ভব, তার কারণ উক্ত হচ্ছে–উ (গর্ভবেষ্টন চর্ম) হলো বহিরের বেষ্টন (বহির্বেষ্টনং), তার অভ্যন্তরে চর্ম, তার অভ্যন্তরে মাংস, তারপর তার অভ্যন্তরে অস্থি, এবং তার অভ্যন্তরে পশুর জীবন বা প্রাণ। (অর্থাৎ গর্ভাশয়টি বাহিরের দিক থেকে আবৃত থাকে। তার মধ্যে যে পশু-প্রাণ থাকে, প্রথমে তার চর্ম, দ্বিতীয়ে তার মাংস, তৃতীয়ে তার অস্থি এবং চতুর্থে তার প্রাণ সৃষ্টি হয়)। এইভাবে হিরণ্যের পশুসাদৃশ্য ঘটলে, তা দানের দ্বারা সম্পূর্ণ পশুপ্রাপ্তি হয়। যে যজমানের যজ্ঞে বোগর্ভ সম্পর্কিত অপরাধের নিমিত্ত যথাক্ত হোমরূপ প্রায়শ্চিত্তের বিধি কথিত হলো, সেইরকম বিধি অনুসারে প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা প্রকৃতভাবে যজ্ঞানুষ্ঠান করলে সেই যজমান উত্তম ধনশালী হন (বসুমত্তরো ভবতি) ॥১॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ দ্বিতীয়ানুবাকে ভূত্যাদিকামস্য বশালম্ভাৰ্থং মন্ত্রা বক্তব্যাঃ। অর্থাৎ– অনুবাক-২ ে ভূতি বা ঐশ্বর্য ইত্যাদি কামনাকারীর বশালম্ভের মন্ত্রগুলি উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- হে বায়ুদেব! আপনি আগমন পূর্বক পশুকে ভূষিত (অর্থাৎ অলঙ্কৃত) করুন। হে শুচিপা (অর্থাৎ শুদ্ধ হবির পালনকর্তা)! আপনি আমাদের নিকট আগমন করুন। হে বিশ্ববার (অর্থাৎ বিশ্বব্যাপক)! আপনার সহস্ৰ সংখ্যক নিযুত (অর্থাৎ নিযুত নামক বায়ুবাহনভূত অশ্বসমূহ) আছে। পশুরূপ অন্ন আপনার হর্ষকর, এই নিমিত্ত আপনার সমীপে আগত হয়েছি। অতএব হে দেব! আপনি যে পশু সম্বন্ধি হবিঃ সোমসদৃশ মনে করছেন, আমি সেইরকম হবিঃ বহন করে আপনার নিকট আগত হয়েছি। হে পশু! আমার সঙ্কল্পসিদ্ধির নিমিত্ত (মদীয় সঙ্কল্পসিদ্ধার্থং), তথা অভীষ্ট পালনের নিমিত্ত, তথা সমৃদ্ধি সিদ্ধির নিমিত্ত কিক্কিটাকার পূর্বক (কিক্কিটের অনুকরণে শব্দ পূর্বক) তোমার মনঃ-প্রীতিকর এই আজদ্রব্য প্রজাপতি দেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। (পশুগণকে অভিমুখী করার নিমিত্ত মুখের মধ্যে আপন জিহ্বার অগ্রভাগ ঊর্ধ্বে কুঞ্চিত করে মনুষ্যগণ যে ধ্বনিবিশেষ সৃষ্টি করে, সেই অনুকৃত ধ্বনি কিক্কিট শব্দের দ্বারা ব্যঞ্জিত)। এইরূপে কিক্কিটাকার পূর্বক তোমার প্রাপ্য প্রাণ বায়ুদেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে তোমার প্রিয় আজ্যদ্ররূপে আহুতি প্রদান করছি; ঐ একই ভাবে সূর্যদেবতার উদ্দেশে তোমার প্রাপ্য চক্ষু, দ্যাবাপৃথিবীর উদ্দেশে তোমার প্রাপ্য শ্রোত্র এবং সরস্বতী দেবতার উদ্দেশে তোমার প্রাপ্য বা কিকিটাকার পূর্বক প্রিয় আজ্যদ্রব্যরূপে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। হে বশা! তুমি তুরীয়া অৰ্থা চতুর্থী (চতুর্থা) বশিনী। (বশ অর্থে ইন্দ্রিয়নিয়ম অর্থাৎ ইন্দ্রিয় যথা আয়ত্তাধীন। যে বৃষভের অর্থাৎ প্রজনন সমর্থের সাথে সঙ্গম করেনি, সে বশিনী। এর দ্বারাই বশিনীর বশাত্ব প্রতিপাদিত হয়েছে)। তুমি বন্ধ্যা। পুরুষের প্রতি অভিলাষযুক্ত মনে প্রথম বার গর্ভে তোমার উদরে শয়ন করেছিল। দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বার তুমি পুরুষের সাথে সংযোগের ইচ্ছারহিত হয়েছিল। এক ব্যতীত তোমার অন্য কোন অপত্য নেই, অতএব তুমি চতুর্থ বশিনী (অর্থাৎ বশা)। তুমি রকম যে তুমি, হবিঃরূপে দেবতাগণের নিকট গমন করো; এবং সেই গমনের দ্বারা যজমানের কামনা সিদ্ধ হোক। হে পশু! তুমি জাতিতে ছাগী, হবিঃরূপত্ব হেতু তুমি দেবগণের ধনভূত হয়েছ। সেইরকম তুমি আদৌ (অর্থাৎ প্রথমে বা অগ্রে) পৃথিবীতে উপবেশন করো, তারপর উর্দ্ধে উন্নীত হয়ে অন্তরিক্ষে গমন করো। তোমার বৃহত তেজঃ দ্যুলোকে গমন করছে। এই ভাবে তুমি তিন লোকে (অর্থাৎ পৃথিবী, অন্তরিক্ষ এবং দ্যু) অবস্থান করো। হে পশু! রজাত্মক (অর্থাৎ রজোগুণাশ্রয়ী) হবির বিস্তার পূর্বক তুমি আদিত্যলোকে গমন করো এবং প্রজ্ঞার দ্বারা সম্পাদিত প্ৰকাশমান আমাদের স্বর্গপথ রক্ষা করো (প্রজ্ঞয়া সম্পাদিতাজ্যোতিষ্মতঃ প্রকাশরতঃ অস্মীয়স্বর্গমার্গারক্ষ)। পশুর হৃদয় ইত্যাদি হে অঙ্গসমূহ! আমাদের কর্মগুলি নির্বিঘ্নে সমাপ্তির নিমিত্ত অনতিরিক্ত করে দাও। (অর্থাৎ কর্মের আধিক্য থাকলে তা সুষ্ঠুভাবে বা নির্বিঘ্নে সম্পাদিত হয় না; সুতরাং সেই কর্মসমূহ যাতে অতিরিক্ত হয়ে কম হয়, তেমন করো)। হে পশু। তুমি মনুর ন্যায় উৎপাদক হও। (অর্থাৎ প্রজাপতি মনু যেমন সবকিছুর উৎপাদনকর্তা, তেমনই বহুসৃষ্টিকারী হও)। এই যজমান জন্মান্তরে যাতে দেবজন (অর্থাৎ দেবতুল্য লোক বা রাজা) হন, সেইরকম করো। হে পশু! তুমি মনঃ-রূপ দেবতার হবিঃ এবং প্রজাপতির বর্ণস্বরূপ উৎপাদিত হও। তোমার অঙ্গসমূহের ভোজনের দ্বারা আমরা পুষ্টাঙ্গ (গাত্রভাজঃ) হবো॥ ২॥
[সায়ণাচার্য বলেন–মাঃ কাম্যপশোরত্র দ্বিতীয়ে সমুদরিতাঃ। অথ তৃতীয়ে তদ্বিধিরুচ্যতে। অর্থাৎ অনুবাক-২ ে যে কাম্য পশুর বিষয় উক্ত হয়েছে, এই অনুবাকে তার বিধি কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- পশু-আলম্ভের পূর্বে (অর্থাৎ পশুর উৎসর্গীকৃত হওয়ার পূর্বে) কর্তব্য অষ্টাদশ কপাল পুরোডাশ সম্পৰ্কীয় বিধি কথিত হচ্ছে।–এই দ্যাবাপৃথিবী (অর্থাৎ দ্যুলোক ও ভূলোক) পুরাকালে অবিভক্ত ছিল। সেই সহাবস্থিত লোককে বায়ুদেবতা বিভক্ত করেছেন। তাঁরা পুনরায় বায়ুর সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে বশারূপ গর্ভ ধারণ করেছিলেন; এবং সোমদেব উৎকর্ষের নিমিত্ত সেই গর্ভের জনন করেছিলেন। সেই উৎপাদিত গর্ভকে অগ্নিদেব গ্রাস করলেন। তারপর অগ্নিকে উৎকোচরূপে পুরোডাশ নিপণ করে সেই অগ্নি হতে এই বশাকে নিষ্ক্রান্ত করেন। যেহেতু প্রজাপতির দ্বারা অগ্নির নিকট হতে বশা নিষ্ক্রান্ত হয়েছিল, সেই নিমিত্ত অন্য দেবতার উদ্দেশে সেই বশাকে আলভন (অর্থাৎ উৎসর্গ করতে হলেও অগ্নিকে পুরোভাশ প্রদান কর্তব্য। এইভাবে সেই পুরোশের দ্বারা অগ্নির নিকট হতে বশাকে ক্রয় করে (নিষ্ক্রীয়) তা অন্যের আলভানে প্রবৃত্ত হতে হয়। বায়ু, দ্যাব-পৃথিবী, অগ্নি, সোম, সরস্বতী ও প্রজাপতি এই সকল দেবতারই সেই বন্ধ্যা অজার উপরে আধিপত্য রয়েছে। (দ্যাবাপৃথিবীর বিযুক্ত হওয়ার কালে তাদের মুখে ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল; সেই কারণে বায়ু ইত্যাদি সকল সংশ্লিষ্ট দেবতার সাথে ধ্বনি বা বাকের দেবতা সরস্বতীরও আধিপত্যের কথা উল্লেখিত হয়েছে)। তথাপি আকাঙ্ক্ষাবিশেষের যোগ্য দেবতাবিশেষের বিষয় কথিত হচ্ছে) ঐশ্বর্যসিদ্ধির কামনায় বায়ুদেবতাকে এই পশু অর্পণ করা কর্তব্য; কারণ বায়ু হলেন ক্ষেপনকারী (ক্ষেপিষ্ঠা) দেবতা, সুতরাং যিনি বায়ুদেবতার উদ্দেশে তার ভাগধেয় সহ গমন করেন, তিনি ঐশ্বর্যসিদ্ধি লাভ করেন। কৃষিবলের অর্থাৎ শস্যসমৃদ্ধির দ্বারা প্রতিষ্ঠাকামী যজমান দ্যাবাপৃথিবীর উদ্দেশে এই বশাকে অর্পণ করবেন; এর ফলে মেঘ বৃষ্টিপাত ঘটায় এবং তাতে ওষধিসমূহ উৎপাদিত হওয়ায় যজমান শস্যশালী হয়ে থাকেন। অন্নসমৃদ্ধি ও তার ভোগের সামর্থপ্রাপ্তির কামনায় সোমের উদ্দেশে এই অজাকে অর্পণ করা কর্তব্য; তার ফলে যজমান অন্ন ইত্যাদি ও অনুভক্ষণের সামর্থ্য (অন্নাদ্যমন্নভক্ষণসামর্থ্য) লাভ করবেন। বেদশাস্ত্রে পারগত (অর্থাৎ সমর্থ) হওয়া সত্ত্বেও যিনি সভা ইত্যাদিতে (অর্থাৎ জনগণের সম্মুখে) যিনি কথা বলতে ভয়ে কম্পিত হন, তিনি দেবী সরস্বতীর উদ্দেশে এই পশু অর্পণ করলে অর্থাৎ ভাগধেয় সহ গমন করলে সরস্বতী তাঁর ভাগধেয় প্রাপ্ত হয়ে তাকে বাক্ (বা বাকশক্তি) দান করে থাকেন। যে ফল (সাফল্য) উপায়ান্তরে (অর্থাৎ অন্য কোন পদ্ধতিতে) সম্পাদিত হয় না, তা সম্পাদনের কামনায় প্রজাপতির উদ্দেশে এই পশু অর্পণ করা কর্তব্য; তার ফলে প্রজাপতি সকল দেবতার দ্বারা যজমানকে সেই ফলের দ্বারা জয়যুক্ত করে দেন (অর্থাৎ সাফল্য দান করেন)। আকুত্যা এই মন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক জিহ্বাগ্রের দ্বারা ধ্বনিবিশেষ (কিক্কিটাকার) সৃষ্টি করে পশু অর্পণ করা কর্তব্য। কিকিটাকার এই ধ্বনিদ্বারা গো-মহিষ ইত্যাদি গ্রাম্য পশুগণ ক্রীড়া করে, আরণ্যক পশুগণ প্রকৃষ্টভাবে পলায়ন করে। এই কারণে এই ধ্বনি গ্রাম্য পশুগণের নিমিত্তই করতে হয়। উম্মুকের (অর্থাৎ জ্বলন্ত অঙ্গারের) দ্বারা পশুর প্রদক্ষিণাবৃত্তিকে (প্রদক্ষিণ প্রত্যাগমন ইত্যাদিকে) পর্যগ্নিকরণ বলা হয়, এই পর্যগ্নিকরণের সময়ে এই পশুর যাগ করণীয়; তার ফলে সেই পশুর জীবনযুক্ত অবস্থায় স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে।
মন্ত্রের মধ্যে মন ইত্যাদির সাথে প্রজাপতি ইত্যাদি দেবতার উদ্দেশে আহুতি সমর্পণের কথা অভিহিত হয়েছে। নীয়মান পশুর অনুমন্ত্রণের মন্ত্রে দেবতাগণের নিকট গমন করো (দেবান্ গচ্ছেতাস্য) এমন অভিপ্রায় ব্যক্ত (কথিত) হয়েছে।–যজমান যাতে বিঘুরহিত ভাবে এই যজ্ঞের কর্মসমূহ সমাপ্ত করতে পারেন (অর্থাৎ তার মুখ্য কামনাগুলি যাতে বাধাহীন ভাবে যজ্ঞসমাপ্তির দ্বারা ফলপ্রাপ্ত হতে পারে) তার নিমিত্ত অধ্বর্য কামাঃ সত্যাঃ সন্তু অর্থাৎ কামনাসমূহ সত্য হোক এই মন্ত্র পাঠ করে থাকেন। হন্যমানের (অর্থাৎ যাকে বধ করা হচ্ছে) অনুমন্ত্রণের মন্ত্রে পৃথিব্যা সিদেতি অর্থাৎ পৃথিবীতে অবস্থান করো ইত্যাদি মন্ত্রের তাৎপর্য দেখানোনা হয়েছে।–অজা হয়ে তুমি সেই সেই লোকে প্রতিষ্ঠিত হও-এই মন্ত্রভাগের চরম তাৎপর্য এই যে, দেবতাগণের প্রিয়ত্ব হেতু অজা ইত্যাদির সেই সেই লোকে (অর্থাৎ স্বর্গ ইত্যাদি লোকে) প্রতিষ্ঠা এবং যজমানের নিমিত্ত স্বর্গের প্রকাশ উৎপাদিত হোক। বপা হোমের (অর্থাং হত পশুর মেদঃ বা চর্বির দ্বারা কৃত হোমের) মন্ত্রে এই পথ শব্দে লোকসমূহ বিবক্ষিত দেখানো হয়েছে–এখানে লোক অর্থে ভানুমান অর্থাৎ সূর্য ইত্যাদি লোকের কথা উক্ত হয়েছে। মন্ত্রের শেষভাগে এই যজমানের নিমিত্ত স্বর্গলোক প্রকাশ করো (লোকাঞ্জ্যোতিষ্মতঃ করোতি) ইত্যাদি কথিত হয়েছে। হবির হোম মন্ত্রের তাৎপর্য দেখানো হয়েছে।–এখানে অণুম্বণ শব্দ উচ্চারণের দ্বারা বিধি অতিক্রম পূর্বক অনুষ্ঠিত অঙ্গের (অর্থাৎ উণের) শান্তির কথা ব্যক্ত হচ্ছে। এই মন্ত্রের উত্তরভাগে (শেষে) মনু শব্দটির প্রয়োগের তাৎপর্য প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- স্বায়ম্ভুব মনুর প্রজাপতিত্বরূপ, সুতরাং প্রজাপতি মনুর সৃষ্ট দৈবজন সকল প্রজাই মানব (মানব্যো) নামে অভিহিত হয়ে থাকে। অতএব এই মন্ত্রভাগের দ্বারা তাদের সকলকেই আদিভূত বলা হয়েছে। হবিঃশেষপ্রাশন (অর্থাৎ হবির শেষ ভক্ষণের) মন্ত্রে হবির শেষভাগের উদরগত হওয়ার নিমিত্ত মনঃ শব্দের প্রয়োগে বলা হচ্ছে-তুমি মনঃরূপ দেবতার হবিঃ (মনসো হবিরসি) ইত্যাদি। সেই মন্ত্রের উত্তরভাগে অভিলাষ ব্যক্ত হয়েছে–তোমার অঙ্গ ভক্ষণ করে (তে গাত্রভাজো) আমরা (অর্থাৎ যজমানগণ) পুষ্ট হবো। আমাদের (অর্থাৎ যজমানগণের অভিলাষ আশীর্বাদযোগ্য হোক (অর্থাৎ পূর্ণ হোক)। এর পর বশার আলম্ভের (বধের) পক্ষে বর্জনীয় দিন দেখানো হচ্ছে। এই বশার আলম্ভের দিন যদি আকাশ মেঘের আবরণের দ্বারা দুর্দিন (অর্থাৎ অশুভ) হয়, তবে সেই দিন এই বশার দ্বারা দেবযাগ যোগ্য হয় না। সেই নিমিত্ত যদি নিশ্চিতভাবে মনে হয় যে, এদিন মেঘ হবে না (অর্থাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হবে না), সেদিনই এই বশার আলম্ভ করণীয়। প্রমাদ বশে বশার আলম্ভ আরম্ভের পর যদি আকাশে মেঘদর্শন হয়, তবে যজমান সেদিন যজ্ঞবিঘাতের দরুন সবরকম ভোজ্যরহিত হয়ে শুধুমাত্র জলপান করে থাকবেন। এই বশার মুখ্য অধিকারী প্রতিপাদিত হচ্ছে।–তিনটি কর্মকারীর যে কোন একজন এই বশার অধিকারী (অর্থাৎ এই বশার আলম্ভনের কর্তৃত্ব প্রাপক)। কোন তিনজন, সেই প্রসঙ্গে উক্ত হয়েছে–প্রথমতঃ যিনি গবাময়ন ইত্যাদি রূপ সম্বৎসরব্যাপী সাধ্য সত্রের অনুষ্ঠানকারী, তিনি বশা-আলম্ভের অধিকারী। দ্বিতীয়তঃ, যিনি সহযাজী, অর্থাৎ সহস্ৰসংখ্যক দক্ষিণা যুক্তের দ্বারা যিনি যজ্ঞ করেন, তিনি এই বশা-আলম্ভের অধিকারী। তৃতীয়তঃ, যিনি গৃহমেধী, অর্থাৎ যিনি সম্বৎসরসাধ্য যজ্ঞে অর্বাচীন (অপ্রবীণ) হয়েও গৃহপতিত্বের দ্বারা দীক্ষিত হন, তিনি এই বশার আলম্ভনের অধিকারী। মোট কথা, এই তিন কর্মকারীই বশার দ্বারা যজ্ঞ অনুষ্ঠানের যোগ্য অধিকারী ॥৩৷৷
মর্মার্থ- অগ্রে (আদৌ) জয়-সংজ্ঞক এয়োদশ মন্ত্র পঠিত হচ্ছে–চিত্তং চ তিত্তিশ্চাহকুতং চাকুতিশ্চ ইত্যাদি (অর্থাৎ চিত্ত, চিত্তি, আকুত, আকৃতি, বিজ্ঞাত, বিজ্ঞান, মন, শর্করী, দর্শ, পূর্ণমাস, বৃহৎ, রথন্তর ও প্রজাপতি)। সামান্যভাবে নির্বিকল্পক জ্ঞানের দ্বারা প্রতীত বস্তু চিত্ত (সামান্যাকারেণ নির্বিকল্পকনেন প্রতীতং বস্তু চিত্তং)। এই চিত্ত আমার হোক (অর্থাৎ আমি যেন চিত্তকে জয় করি)–এটাই বাক্যের অর্থাৎ চিত্ত শব্দের অর্থ। এইভাবে সব মন্ত্র-শব্দের পরে যোজিতব্য। যেমন–চিত্তি হলো নির্বিকল্পক জ্ঞান, এই নির্বিকল্পক জ্ঞান আমার হোক (অর্থাৎ আমি যেন নির্বিকল্প জ্ঞানকে জয় করি)। আকৃষ্ট হলো সঙ্কল্পিত বস্তু; এই সঙ্কল্পিত বস্তু আমার হোক (অর্থাৎ আমি যেন সঙ্কল্পিত বস্তুকে জয় করতে পারি)। আকুতি হলো সঙ্কল্প; এই সঙ্কল্প আমার হোক (অর্থাৎ আমি যেন সঙ্কল্পকে জয় করি)। বিজ্ঞাত হলো বিশেষ আকারে বা রকমের দ্বারা নিশ্চিত বস্তু। এই বস্তু আমার হোক (অর্থাৎ আমি যেন বিশেষকারে নিশ্চিত বস্তু লাভ করি। বিজ্ঞান হলো সেই বিষয়ে নিশ্চয় (তন্নিশচয়ং); সেই বিজ্ঞান আমার হোক (অর্থাৎ আমি যেন বিজ্ঞানকে জয় করি)। মন হলো জ্ঞানসাধন অন্তঃকরণ (জ্ঞানসাধনমন্তঃকরণ), সেই মন আমার হোক (অর্থাৎ আমি যেন মনকে জয় করতে পারি)। শঙ্করী হলো চক্ষু ইত্যাদি বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলির শক্তি; এই শরী আমার হোক (অর্থাৎ আমি যেন আমার বাহ্যিক ইন্দ্রিয়সমূদয়ের শক্তিকে জয় করতে পারি)। দর্শ ও পূর্ণমাস দুটি যাগবিশেষের নাম, এই দর্শপূর্ণমাস যাগদ্বয় আমার হোক (অর্থাৎ আমি যেন এই যাগদুটিকে জয় করতে পারি বা এই যাগদুটি যেন সার্থকভাবে আমার দ্বারা নিষ্পন্ন হতে পারে)। বৃহৎ ও সাম দুটি সামের নাম (বৃহদ্রথরে সামনী); আমি যেন এই সামদ্বয়কে জয় করতে পারি (বা এই দুই গান দুটি যেন আমার দ্বারা সুষ্ঠুভাবে গীত হতে পারে)। প্রজাপতি সংগ্রামের অভিমুখে গমনেচ্ছু বর্ষণকারী উগ্র ইন্দ্রদেবকে জয়ের হেতুস্বরূপ এই মন্ত্রগুলি প্রদান করেছিলেন। সেই হতে সকল প্রজা (দেবতা মানব ইত্যাদি সকলে) সঙ্গত ভাবে ইন্দ্রের অধীন হয়েছিল (অর্থাৎ ইন্দ্র কর্তৃক সকলে বিজিত হয়েছিলেন) এবং ইন্দ্র সকল প্রজার উগ্র শিক্ষক (অর্থাৎ প্রচণ্ড শাসনকর্তা) হয়েছিলেন। যেহেতু সেই ইন্দ্রদেব হোমযোগ্য, সেই নিমিত্ত সেই ইন্দ্রের প্রতি প্রজাপতির এই অনুগ্রহ উপযুক্ত। অতঃপর এই মন্ত্রগুলির দ্বারা হোম নিষ্পন্ন করার বিষয় কথিত হয়েছে। বলা হয়েছে–একদা দেবতা ও অসুরগণ যুদ্ধ করবার উদ্দেশ্যে মিলিত হয়েছিলেন। ইন্দ্র প্রজাপতির উদ্দেশে ধাবিত হয়ে তার নিকট উপস্থিত হলেন। তখন প্রজাপতি এই জয়সুচক (বা জয় নামক) মন্ত্ৰসমূহ ইন্দ্রকে দান করলেন। অতঃপর এই মন্ত্রসমূহের দ্বারা দেবতাগণ অসুরবৃন্দকে জয় করেছিলেন। যে মন্ত্রসমূহের দ্বারা জয় করা হয়, অর্থাৎ যে মন্ত্রগুলি জয়ত্ব হেতু প্রযোজ্য হয়, সেগুলি জয়াখ্যা বা জয়নামক মন্ত্র। স্পর্ধমান (অর্থাৎ স্পর্ধিত) শত্রুর সৈন্যকে (পৃতনাম) জয় করার নিমিত্ত জয়দায়ক মন্ত্রে হোম কর্তব্য। (পৃতনা অর্থে নির্দিষ্ট সখ্যাবিশিষ্ট রথ-হস্তি প্রভৃতি সৈন্যবিশেষ) ॥৪॥
মর্মার্থ- এই অগ্নি প্রাণিবর্গের অধিপতি তথা স্বামী। এইরকম অগ্নি আমাকে রক্ষা করুন (স তাদৃশো মামবতু)। এইরকম জ্যেষ্ঠ বা বৃদ্ধতম লোকপালগণের অধিপতি ইন্দ্রদেব আমাকে রক্ষা করুন (অধিপতিঃ মাহবত)। পৃথিবীর অধিপতি যম (যম শব্দের দ্বারা অগ্নিবিশেষকে বোঝাচ্ছে) আমাকে রক্ষা করুন। অন্তরীক্ষের (অর্থাৎ আকাশের) অধিপতিরূপে প্রসিদ্ধ বায়ু আমাকে রক্ষা করুন। দ্যুলোকের (অর্থাৎ স্বর্গের) অধিপতিরূপে প্রসিদ্ধ সূর্যদেব আমাকে রক্ষা করুন। নক্ষত্রসমূহের অধিপতিরূপে প্রসিদ্ধ চন্দ্র দেবতা আমাকে রক্ষা করুন। ব্রাহ্মণজাতিবর্গের অধিপতিরূপে প্রসিদ্ধ বৃহস্পতি দেবতা আমাকে রক্ষা করুন। সত্যবচনের অধিপতি মিত্রদেব আমাকে রক্ষা করুন। কূপ ইত্যাদিতে স্থিত স্থির জলের অধিপতি বরুণ দেবতা আমাকে রক্ষা করুন। স্রোতযুক্ত নদীপ্রবাহে স্থিত জলের অধিপতি সমুদ্র দেবতা আমাকে রক্ষা করুন। সাম্রাজ্যের অর্থাৎ সার্বভৌম রাজভোগ্য দ্রব্যসমূহের অধিকারী (স্বামী) অন্ন দেবতা আমাকে রক্ষা করুন। ওষধিসমূহের অধিপতিরূপে প্রসিদ্ধ সোমদেব আমাকে রক্ষা করুন। প্রসব অর্থাৎ অনুজ্ঞা বা উৎপত্তির অধিপতিরূপে প্রসিদ্ধ সবিতাদেব আমাকে রক্ষা করুন। পশুগণের অধিপতিরূপে প্রসিদ্ধ রুদ্রদেবতা আমাকে রক্ষা করুন। রূপের অধিপতিরূপে প্রসিদ্ধ ত্বষ্টাদেব আমাকে রক্ষা করুন। গোবর্ধন ইত্যাদি পর্বতসমুহের অধিপতি বিষ্ণুদেব আমাকে রক্ষা করুন। মরুৎ-বর্গ, যাঁরা আদিত্য বসু ইত্যাদি গণদেবতাগণের অধিস্বামী, তাঁরা আমাকে রক্ষা করুন। এইভাবে পিতৃগণ, পিতামহগণ এবং সপিণ্ড অর্থাৎ সপ্তপুরুষান্তবতী পিতৃপুরুষগণ আমাদের রক্ষা করুন। হে পিতৃগণ (পিত্রাদয়ো)! আপনারা সেই সেই বিষয়ে আমাদের রক্ষা করুন। (কোন্ কোন্ বিষয়ে? না,) ব্রাহ্মণজাতির দ্বারা শুদ্ধিকৃত ও ক্ষত্রিয়ের দ্বারা শাসনীয় বা পালনীয় এই প্রজা ও পশুরূপ ফলে (অর্থাৎ প্রাপ্ত ফলের বিষয়ে) পুরস্করণরূপ এ প্রধান কর্মের বা যজ্ঞের সাধন বিষয়ে, এবং দেবতাগণের প্রতি আমাদের আহ্বানের বিষয়ে আপনারা আমাদের রক্ষা করুন। (এতেষু সর্বেষু বিষয়েষু মাং রক্ষত) ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ ষষ্ঠে তদ্ধোমবিধিরাভিধীয়তে। অর্থাৎ- অনুবাক-৬ ে অভ্যাতান মন্ত্রের দ্বারা কৃত হোমের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- অভ্যাতান নামে আখ্যাত মন্ত্ৰসমূহ যজ্ঞকর্মে সমৃদ্ধি লাভের হেতুস্বরূপ, এইটি দর্শন করে (অর্থাৎ বিজ্ঞাত হয়ে) দেবগণ সেই মন্ত্রগুলির দ্বারা হোমানুষ্ঠান করেছিলেন; বলা বাহুল্য, তার ফলে দেবগণের কর্ম সমৃদ্ধ হয়েছিল; আর সেই হোমের অভাবে (অর্থাৎ অভ্যাতনমন্ত্রে হোম না করার ফলে) অসুরগণের কর্ম সমৃদ্ধ হলো না। যিনি কর্মের সমৃদ্ধি ইচ্ছা করবেন, তাঁর পক্ষে এই মন্ত্রের দ্বারা যাগ করা কর্তব্য; তার ফলে সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হওয়া যায়। যেহেতু সকল দেবগণও পূর্বোক্ত প্রকারের দ্বারা অভ্যাতান মন্ত্ৰসমূহ সম্পাদিত করেছিলেন, সেই হেতু এগুলিকে বৈশ্বদেব (অর্থাৎ সকল দেবতার দ্বারা উদ্দিষ্ট) বলা হয়। যেমন ইন্দ্রদেবকে প্রজাপতি জয় নামক মন্ত্র প্রদান করেছিলেন, সেই নিমিত্ত দেবতাগণকে প্রাজাপত্য বলা হয়ে থাকে। যেমন উপরিতন (অর্থাৎ পূর্বের) অনুবাকে কথিত রাষ্ট্রভৃৎ সংজ্ঞাক মন্ত্রের দ্বারা দেবগণ অসুর-সম্বন্ধি রাষ্ট্র (অর্থাৎ অসুরগণের রাজ্য) জয় করেছিলেন বলে তারা (দেবগণ) রাষ্ট্রভৃৎ নামে অভিহিত হয়ে থাকেন। দেবতাগণ প্রথমে অভ্যাতন মন্ত্রের দ্বারা অসুরগণকে বশীভূত করেন (বশীকৃত্য), তারপর জয় মন্ত্রের দ্বারা তাদের (অসুরগণের) ঐশ্বর্য বিনষ্ট করেন (বিনষ্টেশ্বর্যা কৃত্ব), তারপর রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্রের দ্বারা তাদের (অসুরগণের) নিবাসস্থান (রাজ্য) অপহরণ করেন। অভ্যাতান এই শব্দের অর্থ যার অভ্যাতনত্ব আছে, অর্থাৎ যার দ্বারা বিস্তার লাভ করা যায়। (অভি উৎকর্ষ, আতত বিস্তৃত)। যার দ্বারা জয় করা তা জয় (জয়ান্ত্যোভিরিতি জয়ত্ব)। যার দ্বারা রাষ্ট্রকে আপন অধিকারভূক্ত করা হয়, তার নাম রাষ্ট্রভৃৎ (এভিরিতি রাষ্ট্রভৃত্ব)। একত্রভাবে অভ্যাতন জয় ও রাষ্ট্রভৃৎ এই তিনটি মন্ত্রের দ্বারা হোম অনুষ্ঠিত করে দেবগণ বিজয়ী হয়েছিলেন এবং অসুরগণ পরাভূত হয়েছিল। যিনি শত্ৰুবর্গকে বশীভূত করতে অভিলাষ করেন, তাঁর পক্ষে অভ্যাতন নামক যাগ কর্তব্য; যিনি অপরের বা শত্রুর ঐশ্বর্য বিনাশ করতে আকাঙ্ক্ষা করেন, তাঁর পক্ষে জয় নামক যাগ করণীয়। যিনি অপরের বা শত্রুর রাষ্ট্র আপন অধিকারভুক্ত করতে কামনা করেন, তাঁর পক্ষে রাষ্ট্রভৃৎ যাগ বিধেয়। যিনি এই তিন প্রকার ফল একত্রে সিদ্ধ করতে ইচ্ছা করেন তিনি মিলিতভাবে এই তিনটি যাগের সমুচিত অনুষ্ঠান করলে নিজে বিজয়লাভ করবেন এবং শত্রুগণ পরাজিত হবে। (তত্রিবিধফলসিদ্ধ্যর্থং ত্রিবিধান সমুচ্চিত্য জুয়া) ॥৬॥
মর্মার্থ- সত্যের দ্বারা সকল মিথ্যাকে পরাভব করেন যিনি, অথবা ঋতের অর্থাৎ সত্যের দ্বারা আবৃত আছে যাঁর ধাম বা স্থান (ঋতশব্দবাচ্যং ধামাং স্থানং যস্যাসাবৃতধামা), তিনি ঋতধাম; এই রকম ঋতধাম অগ্নি নামে অভিহিত কোন গন্ধর্বের ওষধিদেবতারূপিনী অপ্সরাবর্গ প্রিয় ভার্যা আছেন এবং তারা (অর্থাৎ ঐ ভার্যাগণ) উৰ্দ্ধ (অর্থাৎ বলবন্ত বা প্রাণবন্ত) নামধারিণী। সেই গন্ধর্ব এই বৃহৎক্ষত্র অর্থাৎ বৃহৎ ফলদানে সমর্থ কর্ম বা হবিঃ রক্ষা করুন (অর্থাৎ ফল পর্যবসিত করুন) সেই অপ্সরাগণও এই ব্রহ্মকর্ম (অর্থাৎ বেদবিহিত যজ্ঞকর্ম রক্ষা করুন। সেই গন্ধর্ব ও অপ্সরাগণের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। বিশ্বের সামান্য কিছুরও অনুসন্ধান যাঁর আয়ত্তে আছে, তিনি বিশ্বসামা। এইরকম বিশ্বসামা সূর্য নামে কোনও গন্ধর্বের আয়ুব (অর্থাৎ শীঘ্র গমনকারিণী) নামে অভিহিতা কিরণ বা প্রভার দেবতারূপিণী প্রিয় ভার্যা আছেন। সেই ভার্যাগণ সহ গন্ধর্বকে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। তারা আমাদের এই কর্ম রক্ষা করুন। সুষুম্ন অর্থাৎ সুখস্বরূপ ও সূর্যরশ্মিতুল্য জ্যোতিষ্মন্ চন্দ্রমা নামক কোনও গন্ধর্বের নক্ষত্ৰতুল্য শরীরধারিণী (চিত্তের বিকার ঘটাতে পটুতার নিমিত্ত) বেকুরি নামিকা ভার্যাগণকে ও গন্ধর্বকে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। তারা আমাদের এই কর্ম রক্ষা করুন। ভুজু অর্থাৎ যিনি বিশ্বের পালক। এইরকম পক্ষীর ন্যায় আকাশগামী বিশ্বপালক যজ্ঞ নামক কোনও গন্ধর্বের দক্ষিণাদেবতারূপা স্তবা নামধারিণী ভার্যাবর্গ আছেন। তাঁদের (অর্থাৎ সেই গন্ধর্ব ও তার ভার্যাগণকে) স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। তারা আমাদের এই কর্ম রক্ষা করুন। প্রজাপতি অর্থাৎ যিনি প্রজাগণের পালক; বিশ্বকর্মা অর্থাৎ বিশ্বের সকল কর্ম যিনি দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেন। এইরকম প্রজাপালক ও বিশ্বকর্মী মনো নামক কোনও গন্ধর্ব আছেন; ঋক-সামদেবতারূপিণী তাঁর ভার্যাগণ প্রভূত সৌন্দর্যের নিমিত্ত বহ্ন নামে অভিহিতা।
সেই গন্ধর্বকে ও তার ভার্যাগণকে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি; তারা আমাদের এই কর্ম রক্ষা করুন। যা ইষ্যমাণ (অর্থাৎ অভিলষিত) বস্তুর সম্পাদনকারী, তা ইষিররা; যিনি সর্বত্র গমনশীল, তিনি বিশ্বব্যচ, এইরকম ইষ্যমাণ বস্তুর সম্পাদক ও সর্বত্র গমনকারী বাত নামক কোন এক গন্ধর্ব আছেন, যাঁর মুদা (হর্ষযুক্তত্বার নিমিত্ত এই) নামধারিণী ভার্যাবর্গ আছেন। সেই গন্ধর্বকে ও তাঁর ভার্যাগণকে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি; তার আমাদের এই কর্ম রক্ষা করুন। হে ভুবনের (অর্থাৎ সর্বলোকের) পতি! অন্তরীক্ষ, দ্যুলোক ও পৃথিবীতে আপনার গৃহ আছে (গৃহাঃ সন্তি)। আপনি আমাদের নিমিত্ত বয়স (দীর্ঘ আয়ু), ধনপুষ্টি, সুবীর্য অর্থাৎ শোভন পুত্র, ও সম্বৎসরজীবন পরিমিত (সমগ্র জীবনব্যাপী) সমৃদ্ধি প্রদান করুন। পরমে অর্থাৎ সর্বোত্তম স্থানে অবস্থানকারী যিনি, তিনি পরমেষ্ঠি; যিনি অধিকরূপ ফলের পতি, তিনি অধিপতি। এইরকম পরমেষ্ঠি ও অধিপতি মৃত্যু নামধারী কোন গন্ধর্ব ও বিশ্বাভিমানিনী দেবতারূপিণী তার ভার্যাগণ সর্বদা বর্তমানত্বের কারণে ভুব নামে অভিহিত হয়ে আছেন। সেই গন্ধর্ব ও তার ভার্যাগণকে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি; তারা আমাদের এই কর্ম রক্ষা করুন। শোভন ভূমিস্থানে (অর্থাৎ সমীচীন নিবাসস্থানে) যিনি বাস করেন, তিনি সুক্ষিতি; শোভনা ভূতি বা ঐশ্বর্য যাঁর, তিনি সুভূতি; যজমানের ভদ্র অর্থাৎ কল্যাণ করেন করেন যিনি, তিনি ভদ্রকৃৎ; সুবঃ অর্থাৎ স্বাধীনভাবে স্বর্গলোকে যিনি থাকেন, তিনি সুবর্বান্। এইরকম সুক্ষিতি, সুভূতি, ভদ্রকৃৎ ও সুবর্বাপী পর্জন্য নামক কোন গন্ধর্ব আছেন; বিদ্যুৎদেবতারূপিণী তার ভার্যাগণের নাম রুচ। এই হেন পর্জন্য নামক গন্ধর্ব ও তার ভার্যাগণের উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি; তারা আমার এই কর্ম রক্ষা করুন। দূরে অবস্থিত থেকেও যিনি প্রহার সাধনের নিমিত্ত হেতি (অর্থাৎ অস্ত্র ধারণ করেন, তিনি দূরেহেতি; নামশ্রবণমাত্রেই যিনি সুখের নিবর্তন করেন, তিনি মৃড়য়। এইরকম দূরেহেতি ও মৃড়য় কোন এক গন্ধর্ব আছেন, তার নাম মৃত্যু, এই গন্ধর্বের ভার্যাগণ প্রজাভিমানিনী দেবতারূপিণী ভীরু (মৃত্যুর কারণে ভীতা) নামে অভিহিতা। সেই গন্ধর্ব ও তার ভার্যাগণকে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি; তারা আমার এই কর্ম রক্ষা করুন। রমণীয় চরণোপেতত্বের নিমিত্ত যাঁর রমণীয় শরীর, তিনি চারু; ইন্দ্রিয়ের নিমিত্ত যাঁর কাম প্রকাশমান, তিনি কৃপণকাশী। এইরকম চারু ও কৃপণকাশী কোন এক গন্ধের্বের নাম কাম, এবং বিষয়াভিলাষের নিমিত্ত চিত্তক্লেশের অভিমানিনী দেবতা শোচয়ন্তী নাম্নী তার ভার্যাগণের উদ্দেশে আমি স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি; তারা আমার এই কর্ম রক্ষা করুন। হে ভুবনের অর্থাৎ সর্বলোকের পতি বা পালক! উপরিতল লোকত্বয়ে (অর্থাৎ অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোকে) এবং পৃথিবীলোকে আপনার গৃহ আছে, আপনি আমাদের বিপুল সুখ প্রদান করুন (বিপুলং শর্ম যচ্ছ); ব্রাহ্মণজাতি ও সমর্থ ক্ষত্রিগণকে অধিক (মহৎ) সুখ প্রদান করুন ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথষ্টমে তেষাং কাম্যাঃ প্রয়োগা উচ্যন্তে। অর্থাৎ- অনুবাক- ে যে রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্রগুলি উক্ত হয়েছে, এই অনুবাক-৮ ে সেগুলির কাম্য প্রয়োগ উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- পূর্ববর্তী অনুবাকে উক্ত রাষ্ট্রভৃৎ-সংজ্ঞক মন্ত্রের দ্বারা রাষ্টপ্রাপ্তির হেতুভূত যাগের কথা বলা হয়েছে। এই হেতু সেই মন্ত্রের হোম-লক্ষণের দ্বারা অধ্বর্য কর্তৃক যজমানের নিমিত্ত ভূমি, বিশেষরূপে রাষ্ট্র, প্রাপ্তি সম্পন্নের কথা বলা হচ্ছে এবং সেই যজমান রাষ্ট্র লাভ করবেনও। মন্ত্রগুলির পূর্ববৎ সাধনে রাষ্ট্র প্রাপ্তি অর্থে প্রজা, পশু ও নিজের উৎকর্ষ বোঝায়, অর্থাৎ প্রজা ইত্যাদিও রাষ্ট্রত্ব। এই ভাবে (রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্রের দ্বারা হোম করলে) যজমান গ্রামস্বামিত্ব ও অপরাপর দেশের আধিপত্য লাভ করেন (অর্থাৎ এই মন্ত্র তাকে সকলের অধিপতি করে থাকে)। যজমানের ওজঃ অর্থাৎ বলের কামনায় রথের চাকার অগ্রভাগ (রহস্য যদীগ্রং) অগ্নির উপরে ধারণ করে রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্রের দ্বারা যাগ করণীয়। তাতে (অর্থাৎ রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্র ও যাগের, এই উভয়ের দ্বারা) বলকে যজমানের অধীন করা হয়; অর্থাৎ যজমান বল লাভ করেন। ভ্ৰষ্টরাষ্ট্র বা রাজ্যভ্রষ্ট হলে তা পুনঃপ্রাপ্তির নিমিত্ত যতগুলি রথ তার সবগুলিকে ততসংখ্যক ব্যক্তির দ্বারা একত্রিত করে প্রৈষ (প্রেরণীয় বা নিযযাজ্য) হোম কর্তব্য (প্রৈষং ক্ৰয়াৎ)। এই হোমের দ্বারা ভ্ৰষ্টরাজ্য পুনঃপ্রাপ্তি সম্পন্ন হয়। যদি রাজ্যলাভ করেও ইষ্টসাধন-সমর্থ না হওয়া যায় (অর্থাৎ রাজ্যভোগ-ক্ষম হতে না পারা যায়), তার নিমিত্ত প্রয়োগ-বিশেষের কথা বলা হয়েছে। রাজ্যভোগের নিমিত্ত পূর্বে যাগাহুতি দেওয়া সত্ত্বেও স্বকার্যক্ষম না হলে আপন রথের দক্ষিণ অগ্নির উপর ধারণ করে সেই চক্রের রন্ধ্রাভিমুখে অর্থাৎ ছিদ্রের প্রতি লক্ষ্য রেখে হোম কর্তব্য। সেই আহুতির দ্বারা স্বকার্যক্ষম হওয়া যায়; এই স্বকার্য সাধনের ক্ষমতাই রাজ্যভোগের সামর্থ্য প্রদান করে। রাষ্ট্রের নিমিত্তভূত কলহের কারণে যুদ্ধ উপস্থিত হলে, যিনি প্রথমে এই রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্রের দ্বারা হোমে প্রবৃত্ত হবেন, তিনিই এতে সামর্থ্য লাভ করবেন, অন্যে (অর্থাৎ তার পরে যাঁরা হোম করবেন, তারা) নয়। সেই সামর্থ্য লাভের অর্থ সংগ্রামে জয়লাভ করা। মধুবৃক্ষ সম্বন্ধী কাষ্ঠ বিশেষের নাম মান্ধুক। সেই কাষ্ঠের দ্বারা শ্ৰেীতাগ্নি (বেদসম্মত অগ্নি; যথা–গার্হপত্য, আহবনীয় ও দক্ষিণাগ্নি) প্রজ্বালন করণীয়। প্রজ্বলিত এই মধুককাষ্ঠজনিত অঙ্গার সেই যজমানের বিরোধীপক্ষীয় পুরুষদের অর্থাৎ সেনাগণের প্রত্যেককে বেষ্টন করে থাকে। ফলে পরকীয় (অপর পক্ষের) কটকে (অর্থাৎ সেনানিবেশে) অগ্নিপীড়া উপস্থিত হয়। (অর্থাৎ বিপক্ষীয় পুরুষ বা সৈন্যগণের দেহে জ্বর ইত্যাদি সন্তাপ জাত হয়)। অতঃপর উন্মাদগ্রস্ততা পরিহারের নিমিত্ত হোম-বিধি কথিত হচ্ছে।–যে পুরুষ উন্মত্ত হয়ে পড়ে, অর্থাৎ উন্মাদ রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়, তার প্রতিকারের নিমিত্ত এই রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্রের দ্বারা হোম করা উচিত। যেহেতু গন্ধর্ব-অপ্সরাগণ লোককে উন্মত্ত করে, সেই হেতু গন্ধর্ব-অপ্সরাগণের উদ্দেশে সেইভাবে রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্রের দ্বারা স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করতে হয়। এই উভয়বিধ (অর্থাৎ গন্ধর্ব ও অপ্সরাগণের উদ্দেশে স্বতন্ত্র) হোমের দ্বারা উন্মাদরোগের শান্তি করা হয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রেও পূর্ববৎ অগ্নি প্রজ্বলনের নিমিত্ত কাষ্ঠবিশেষের কথা বলা হচ্ছে।–লোকপ্রসিদ্ধ ন্যগ্রোধ (বট), উদুস্বর (যজ্ঞডুমুর), অশ্বথ, প্লক্ষ (পাকুড়) এই সমস্ত বৃক্ষের কাষ্ঠ দ্বারা (ইন্ধনের দ্বারা) অগ্নি প্রজ্বালন করণীয়। আভিচারিক ক্রিয়ায় প্রতিলোম ক্রমে অর্থাৎ অন্ত্য হতে আদি ক্রমে (প্রতিলোম মন্ত্যাদিক্রমে) এই রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্রের দ্বারা হোম কর্তব্য। তাতে প্রতিকূল বা প্রতিপক্ষীয়গণ অনায়াসে বিনষ্ট হয়। আভিচারিক দেবতার আপন স্থানে ঊর্ষর বা সুষীররূপা (অর্থাৎ অনুর্বর বা বিবর বা গর্তময়) ভূমিতে নিঋতি (অলক্ষ্মী) দেবতার সাথে বষট্কারের দ্বারা (অর্থাৎ অগ্নিতে আহুতি প্রদানের মন্ত্রের দ্বারা) হোমানুষ্ঠান করলে প্রকর্ষের সাথে প্রতিপক্ষ ক্লেশ প্রাপ্ত হয়। শত্রুর অন্ন ইত্যাদি ভক্ষণের শক্তি হরণকামী হলে (অর্থাৎ বিনষ্ট করবার ইচ্ছা হলে) তার সভা হতে তৃণসমূহ সংগ্রহ করে প্রজাপতিৰ্বে ভুবনস্য পতি ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ কর্তব্য। মন্ত্রসংখ্যা সম্বন্ধে বলা হচ্ছে–প্রজাপতি ছয় ঋতুতে অন্ন দান করেন বলে এই মন্ত্র ছয়বার পঠনীয়। পরকৃত (অর্থাৎ অপরের দ্বারা সৃষ্ট) ভয় পরিহারের নিমিত্ত কমান্তর-বিধি কথিত হচ্ছে।–উচ্চ স্থানে উপবেশন করে চারটি শরাবে অন্ন পাক করে রাষ্ট্রভৃৎ মন্ত্রের দ্বারা হোম করণীয়। শরাব সংখ্যা সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, যেহেতু দিকসংখ্যা চার, সুতরাং শরাব সংখ্যা হবে চারটি। পাকসাধন দ্রব্য সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, ক্ষীরের দ্বারা স্বাদুত্বম্ অন্ন বা চরু হলো পাকসাধন দ্রব্য। পাক সুপক্ক হলো কিনা তা দেখার বিধি সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, একটি দীর (অর্থাৎ হাতার) সাহায্যে সেই পমান অন্ন উত্তোলিত করে সুপক্ক হলো কিনা দেখতে হয়। পান্নের ঘৃতাপ্লুতত্ব সম্পর্কীয় বিধি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে–সর্পিৰ্ধা ভবতি মেধ্যত্বায় অর্থাৎ ঘৃতের দ্বারা আপ্লুত করে সেই পান্নকে শুদ্ধ করতে হয়। ঋষিসমান ব্যক্তির দ্বারা সেই হুতশেষের অন্ন ভক্ষণ সম্বন্ধে বলা হয়েছে–চতুর্দি সম্বন্ধি বহ্নিস্থানীয় চারজন ব্রাহ্মণ অতঃপর সেই হুতশেষ অন্ন ভক্ষণ করবেন (অতস্তৈঃ প্রাশিতমগ্নাবেব হুতং ভবতি) ॥৮॥
মর্মার্থ- অপেক্ষিত (অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষানুযায়ী) ফলবিশেষ প্রকাশ করার নিমিত্ত ধাত্রা ইত্যাদি পঞ্চ ইষ্টিকে (যজ্ঞকে) দেবিকা বলা হয় (পঞ্চেষ্টয়ো দেবিকাঃ)। অনুমতি ইত্যাদি স্ত্রীরূপিণী দেবতা এই যজ্ঞের অধিষ্ঠাত্রী হওয়ার নিমিত্ত এই পঞ্চ যজ্ঞের নাম হয়েছে দেবিকা। গায়ত্রী এই ক্ষেত্রে অনুমতি ইত্যাদি ছন্দোরূপা হওয়ার কারণে দেবিকাও ছন্দোরূপা। যেমন ছন্দসমূহ ফলপ্রদান হেতু সুখকর, এইরকম প্রজাগণও সুখহেতুত্ব (অর্থাৎ সুখপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে) ছন্দের সমান। অতএব দেবিকারূপা ছন্দের দ্বারা যজমানের নিমিত্ত প্রজা উৎপাদন কর্তব্য। পঞ্চযজ্ঞেয় দ্বারা প্রজা-উৎপত্তির দৃশ্যগুণযোগ বিচারপূর্বক স্তুত হয়েছে–পঞ্চ দেবতার মধ্যে প্রথমে ধাতার যাগ কর্তব্য, কারণ ধাতা যজমানের আপন পত্নীর সাথে মিলন ঘটিয়ে দেন (অর্থাৎ যজমান ও তাঁর পত্নীকে যুগ্ম করে দেন)। অনুমতি দেবতা যজমানের সেই মিথুনীকরণে অনুমতি প্রদান করেন। রাকা দেবতা প্রজা প্রদান করেন। সিনীবালী দেবতা গর্ভস্থিত প্রজা বা সন্তান উৎপাদিত করেন। কুহু দেবতা উৎপাদিত প্রজাগণকে (সন্তান সন্ততিগণকে) সম্ভাষণ করার অভ্যাস শিক্ষা দেন। পশু কামনা পূর্বক এই দেবিকা ছন্দে হোম করণীয়। তাতে ধাতা গো-ইত্যাদি পশুর বীজবপন সম্পাদিত করেন। কুহু দেবতা উৎপন্ন পশুগণকে তৃণজল প্রদান পূর্বক পোষণ করেন। অনুমতি দেবী এই সবেতেই অনুমতি প্রদান করেন, রাকা দেবী পুনঃ প্রজা প্রদান করেন, সিনীবালী দেবী পুনঃ গর্ভস্থ সন্তান উৎপাদিত করেন, ইত্যাদি। ১ যজমানের যদি গ্রামের মধ্যে আধিপত্য স্থাপনের অভিলাষ থাকে, তবে প্রথমে অনুমতি ও রাকাকে ঊর্ধ্বে এবং সিনীবালী ও কুহূকে নিম্নে স্থাপন করে, সেই উৰ্ব্ব ও নিম্নের মধ্যবর্তী স্থানে ধাতাকে স্থাপন করবেন; ফলে তিনি (অর্থাৎ সেই যজমান গ্রামের আধিপত্যে স্থাপিত হবেন। যে পুরুষের ব্যাধি-পীড়া ঘটে, সেই পুরুষের প্রতি ছন্দসমূহ ক্রুদ্ধ হয়েছে, জানতে হবে। সুতরাং তার সেই ব্যাধি-পীড়া দেবিকা ছন্দের সাহায্যে নিরাময় হয়। এখানেও পূর্ববৎ উধ্বস্থ অনুমতি ও রাকা এবং অধীঃস্থ সিনীবালী ও কুহুর মধ্যস্থানে ধাতাকে স্থাপন পূর্বক দেবিকাছন্দে যাগানুষ্ঠান কর্তব্য। যাঁর উদরমধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি কিছুমাত্র উপশম হয় না, ধাতাকে ঐভাবে মধ্যভাগে স্থাপনের ফলে সেই উদরস্থ ব্যাধি নিরাময় হবে।অতঃপর জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞের প্রাপ্তি বিষয়ে বলা হয়েছে। যে পুরুষ কোনও বিঘ্নের দ্বারা যজ্ঞ প্রাপ্ত না হয়ে থাকেন, তখন প্রথমেই ছন্দের দ্বারা যজ্ঞসাধনে কোন প্রাপ্তি ঘটে না। সেই বিষয়ে প্রথমে তাকে স্থাপন করলে ছন্দগুলি সেই যজমানের অনুকূল হয় এবং সেই আনুকূল্যে প্রথমত এই ছন্দগুলি যজ্ঞীয় ঘৃত হয়ে যায়, অর্থাৎ সেই যজমান ছন্দগুলির আপন আনুকূল্যে যজ্ঞকে প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। যে পুরুষ পূর্বে ইষ্টবান্ ছিলেন অর্থাৎ পুর্বে যজ্ঞানুষ্ঠান করেছিলেন, সেই ক্ষেত্রে পূর্বজ্ঞে ব্যাপৃত হওয়ার নিমিত্ত ছন্দের সার অপগত হয়ে গিয়েছিল। এই নিমিত্ত চরমস্থানে ধাতার স্থাপন করলে পরবর্তী করিষ্যমাণ (যা করা হবে সেই) যজ্ঞে সারযুক্ত– ছন্দের পুনঃপ্রাপ্তি সম্পন্ন হয়ে থাকে। (অর্থাৎ, পরে অনুষ্ঠিত সেই যজ্ঞে যজমানের পুনঃ প্রতিষ্ঠা লাভ হয়)। মেধা অর্থাৎ গ্রন্থধারণের শক্তি লাভের নিমিত্ত এই দেবিকা ছন্দগুলির দ্বারা যাগ কর্তব্য। কান্তি প্রাপ্তির নিমিত্ত ক্ষীর সহযোগে চারটি চরু পাক করে ধাতাকে (পূর্ববৎ) মধ্যস্থানে স্থাপন করে ছন্দসাম্যে যাগানুষ্ঠান করলে যজমান কান্তিযুক্ত হন। গায়ত্রী ইত্যাদি ছন্দগুলি যেমন অভীষ্ট সাধন করে, সেই রকম অনুমতি ইত্যাদি দেবতাগণও অভীষ্টসাধন করেন। যেমন, অনুমতি হলেন গায়ত্রীছন্দের রূপ, রাকা হলেন ত্রিষ্টুপছন্দের রূপ, সিনীবালী হলেন জগতীছন্দের রূপ, কুহু হলেন অনুষ্টুপ ছন্দের রূপ এবং ধাতা হলেন বষট্কার (হোম-কর্ম)। রাকা পূর্ণচন্দ্রমণ্ডলোপেতা (অর্থাৎ চন্দ্রমণ্ডলের পূর্ণরূপা), এবং সেই কারণে তিনি শুক্লাপক্ষস্বরূপা। কুহু নষ্টেন্দুকলা (অর্থাৎ চন্দ্রকলার লেশমাত্রও হীনা), এবং সেই কারণে তিনি কৃষ্ণপক্ষস্বরূপা। সিনীবালী হলেন চতুর্দশী-মিশ্রিতা কৃষ্ণাপঞ্চদশী অর্থাৎ আমাবস্যাস্বরূপা। অনুমতি হলেন চতুর্দশী-মিশ্রিতা শুক্লপক্ষের পঞ্চদশী, অর্থাৎ তিনি পৌর্ণমাসী বা পূর্ণিমা তিথিরূপে কথিতা। উভয়পক্ষীয় (কৃষ্ণপক্ষ ও শুক্লপক্ষের) দ্বারা নিষ্পন্ন এই তিথিগুলির চন্দ্রমা ধাতারূপে কথিত। এই রকম (ইথং) পূর্বপক্ষ ইত্যাদি রূপের দ্বারা পুনরায় বসু ইত্যাদি রূপেও এঁদের প্রশংসা করা হয়েছে। বসু অষ্ট জন, গায়ত্রীও অষ্টাক্ষরা; রুদ্র একাদশ জন, ত্রিষ্টুপও একদশাক্ষরা; আদিত্য দ্বাদশ জন, জগতীও দ্বাদশাক্ষরা। কুহু অনুষ্ট্রপত্বে (অনুষ্টুপ ছন্দে) নিরূপিতা, তিনি এইস্থানে প্রজাপতিরূপা। বষট্কার মুখ্য, সেই কারণে ধাতা বষট্কারস্বরূপ। অনুমতি প্রভৃতি দেবতার সাথে গায়ত্রী প্রভৃতি ছন্দের রূপত্বের কারণে দেবিকাগণের সর্ব ছন্দের রূপত্ব (অর্থাৎ সর্ব দেবিকারূপত্ব) ও বষট্কারের রূপত্ব নিশ্চয় হয়েছে। এই (অনুমতি, রাকা, সিনীবালী, কুহু ও ধাতা) পঞ্চ-দেবিকার মধ্যে অর্থাৎ পঞ্চ যজ্ঞের মধ্যে তিনটির নির্বপণ উপলক্ষে কথিত হয়েছে যে, একত্রে পঞ্চ দেবিকার নির্বপণ করলে যজমান দগ্ধ হয়ে যেতে পারেন (যজমানং প্রদন্ধুমীশ্বরা)। এই নিমিত্ত অনুমতি ও রাকার দুটি চরু নির্বপণ করে, তারপর তৃতীয়ের দ্বারা ধাতার পুরোডাশ নির্বপণ করণীয়। তারপর ঊর্ধ্বে (অর্থাৎ ধাতার পুরোডাশকে মধ্যে রেখে, তার উপরে) সিনীবালী ও কুহুর দুটি চরু নির্বপণ কর্তব্য। তাহলে দেবিকা যজমানকে দহন করেন না (যজমানং দেবিকা ন প্রদহন্তি)। অনন্তর যে কামনার নিমিত্ত এই যাগ নির্বপণ করা হয়, সেই কামনা এই দেবতাগণের দ্বারা লাভ করা যায় (তং কামোভিদেবতাভিঃ প্রাপ্পোত্যেব) ॥৯৷
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ দশমে প্রায়ণং করিষ্যতোহগ্নিহোত্রিণ্যেহগ্নিসমাপণমভিধীয়তে। এই অনুবাক-১০ ে অগ্নিহোত্রীর অগ্নিসমাপন কথিত হয়েছে, অর্থাৎ বস্তোতিযুক্ত হোম সম্পর্কে উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- যিনি অগ্নিহোত্রী (সাগ্নিক, অর্থাৎ যে গৃহস্থ ব্রাহ্মণ অগ্নিপূজক), তাঁর গৃহস্থানীয় হলেন গার্হপত্য অগ্নি। প্রবাসে যাত্রার কালে তিনি পত্নীর সাথে যে মন্ত্রের দ্বারা হোম করবেন, সেই পুরোনুবাক্যের মন্ত্ৰাৰ্থ হলো–অগ্নিহোত্রের নিবাসস্থানীয় হে গৃহপতি (বা গৃহপালক) গার্হপত্য! আমরা গ্রামান্তরে গমন করছি, আপনি তা জ্ঞাত আছেন। সেখানে আপনি আমাদের সুখে অবস্থানকর্তা (বাসয়িতা) হোন, এবং আমাদের রোগনিবারক হোন। (অর্থাৎ আমরা যাতে সেখানে সুখে ও নিরোগে থাকতে পারি, তা করুন)। যে কার্যের উদ্দেশ্যে আমরা গমন করছি, তা যেন আমরা প্রীতিপূর্বক প্রাপ্ত হই (অর্থাৎ তা যেন সফল হয়), এই নিমিত্ত আপনার নিকট প্রার্থনা করছি। আপনি দ্বিপদযুক্ত মনুষ্যগণের (অর্থাৎ আমাদের) এবং চতুষ্পদ পশুগণের পক্ষে সুখের হেতুভূত হোন। হে বাস্তোতে (গৃহপতি বা গাহপত্য)! আমরা যেন আপনার সর্বার্থসাধনের সমর্থ, রমণীয়কারক, সর্বজ্ঞেয়ত্বদায়ক সংসদে (সভায়) মিলিত হতে পারি। আপনি বরদান করুন, আমরা যেন যোগের (লাভের) নিমিত্ত সম্যকরূপে যোগ্য হতে পারি। অপিচ, আপনি আমাদের ক্ষেমের (রক্ষণের) নিমিত্ত সম্যকরূপে যোগ্য করুন। [এই যোগ ও ক্ষেম অর্থাৎ যোগক্ষেমের অর্থ–অলব্ধ বস্তুর লাভ (যোগ) ও লব্ধ বস্তুর রক্ষণ (মে) ]। আপনি নানারকম স্বস্তির (অর্থাৎ শ্রেয়ঃ বা মঙ্গলের) দ্বারা আমাদের রক্ষা করুন। যিনি অগ্নিহোত্রী, তিনি সায়ং ও প্রাতঃ অর্থাৎ সন্ধ্যায় ও সকালে, এই দুটি সময়ে অগ্নিহোত্র যাগের অনুষ্ঠান করেন, যাতে সকল আহুতিরূপা ইষ্টকা (ইট) এই যজমান ধারণ করেন। যদি বা মৃন্ময়নির্মিত ইষ্টক না-ও থাকে, তথাপি যে পুরুষ আহিতাগ্নি (অর্থাৎ সাগ্নিক তথা অগ্নিহোত্রী) হন, তার নিমিত্ত অহোরাত্র ইষ্টকরূপে সম্পন্ন হয়। (অর্থাৎ যাগের ক্ষেত্রের জন্য যে ইষ্টকের প্রয়োজন হয়, তার অভাবে সেই যজমানের প্রাতঃকালের ও রাত্রকালের যাগে ঐ কালদ্বয়ই যথাক্রমে ইষ্টকের কার্য সম্পাদন করে)। অতএব যদি অগ্নিহোত্রী সায়ংকালে ও প্রাতঃকালে নিয়মিতভাবে (নিয়মেন) যাগ করেন, তাহলে সেই কালদ্বয় প্রাপ্তকালরূপা ইষ্টকরূপে উপধান (বালিশ) হয়। যদি একাদিক্রমে (সমানত্ৰৈকত্র) দশ দিন ব্যাপী অগ্নিহোত্র হোম অনুষ্ঠিত করা হয়, তাহলে দশ সংখ্যার সমান বিরাট ছন্দ সম্পাদিত হয়; ফলে অগ্নিহোত্রী যজমান বিরাট প্রাপ্ত হন। তখন সেই বিরাটু ছন্দকে ইষ্টকরূপে গ্রহণ করে উপধান কর্তব্য। বিরাট লব্ধ হলে অগ্নিষ্টোম যজ্ঞবিশেষ লব্ধ হয়। এই দশ দিন ও রাত্রিব্যাপী হোমের দ্বারা বিবিধরূপ অগ্নি-সম্পত্তি লব্ধ হয়। যখন এইভাবে একত্রে দশ অহোরাত্রে অনুষ্ঠিত হোমের দ্বারা বিরাটুম্পত্তি লব্ধ হয়, তখন সেই কারণে দশদিন বাস করার পর অগ্নিহোত্রী প্রয়াণ (প্রস্থান) করবেন। তার ফলে, সেই দেশ যজ্ঞভূমিতে পরিণত হয়। (অর্থাৎ অগ্নিহোত্রীর অল্পকাল বাসহেতু সেই স্থান যজ্ঞভূমির স্বরূপতা লাভ করে)। হোমের নিমিত্ত দশ দিন একাদিক্রমে বাস করণীয়। সেই হোমের দেবতা হলেন রুদ্র-শব্দে অভিধেয় গার্হপত্য অগ্নি। যদি বাস্তোম্পতীয় হোম (গার্হপত্য অগ্নির উদ্দেশে হোম) অকৃত রেখে প্রয়াণ করা হয়, তাহলে গার্হপত্য অগ্নি ক্রুদ্ধ হয়ে যজমানের হনন করে থাকেন। অতএব সেই হনন পরিহারের নিমিত্ত অগ্নিহোত্রীর প্রয়াণকালে অবশ্যই বাস্তোস্পতীয় হোম কর্তব্য। সেই হোমভাগ প্রদানের ফলে অগ্নিদেবকে শান্ত করা হয় এবং যজমান ম্রিয়মান (মৃতপ্রায়) হন না। প্রস্থানের নিমিত্ত শকটের দক্ষিণে একটি বলীবর্দ যুক্ত করা হলে বামের বলীবর্দটি যুক্ত করার পূর্বেই বাস্তোতির উদ্দেশে হোম কর্তব্য। বাতোম্পতে প্রতিজানীহি অর্থাৎ হে গার্হপত্য অগ্নি! আপনি জ্ঞাত আছেন এই পুরোনুবাক্য এবং বাস্তোতে শগুয়েতি অর্থাৎ হে গার্হপত্য অগ্নি! আপনি আমাদের মঙ্গল সাধন করুন এই যাজ্যায় (দুটি মন্ত্রেই) যাগ কর্তব্য। এই মন্ত্রযুক্ত যাগ দেবগণের অত্যন্ত প্রিয়ত্বের কারণে অগ্নিহোত্রী যজমান দেবত্ব লাভ করেন। অতঃপর ক্রমে শকটে ভাণ্ডস্থাপন পূর্বক অরণি অগ্নি সমারোহণ এবং অরণিসমারোহণে পাক্ষিকদোষ নিরাকরণ ইত্যাদি বিধি কথিত হয়েছে। (এগুলি যথাক্রমে অধ্বর–ইত্যাদি অনুবাকে এবং ব্রাহ্মণগ্রন্থে দ্বিতীয় কাণ্ডে পঞ্চম প্রপাঠকে ব্যাখ্যাত), ॥১০৷৷
মর্মার্থ– পূর্ণা অর্থাৎ পৌৰ্ণমাসী বা পূর্ণিমার অভিমানী দেবতা (যিনি পূর্ণিমারূপে খ্যাতা) যজ্ঞভূমির পশ্চিম দিকে জয়লাভ করেছিলেন। অপিচ, তিনি পূর্ব দিকে এবং মধ্যম স্থানেও জয়লাভ করেছিলেন। সেই পূর্ণিমায় অধিষ্ঠিত এই যজ্ঞে আহুত সকল দেবতা ভোগবহুল স্বর্গে আমাদের হর্ষ বিধান করুন। হে অমাবস্যা! যেহেতু (যদ্যস্মাৎ কারণাত্তে) দেবতাগণ আপনার মহিমায় নির্বাসিত হয়ে হবির্ভাগ (ভাগধেয়রূপ হবিঃ) প্রাপ্ত হয়েছেন, সেই কারণে, সকল অনিষ্টনিবারক (হে অমাবস্যা-অভিমানী দেবতা!) আপনি আমাদের ধন ও শোভন পুত্ৰসম্পন্ন করুন। সেই হেন সৌভাগ্যযুক্তা দেবতা আমাদের প্রতি আগমন করুন। (ধনসমূহের প্রাপয়িত্রী বা প্রদানকারিনী দেবতা আগমন করে কি করবেন? না,) তিনি আমাদের গৃহে নিয়ত বহুপ্রকার মণিমুক্তা ইত্যাদি প্রবেশ করাবেন, সহস্ৰলক্ষ ইত্যাদি (অর্থাৎ অসীম) ধনপুষ্টি প্রদান করবেন। হে অগ্নি ও সোম! আপনারা দেবতাগণের মধ্যে মুখ্য, আপনারা আপনাদের সামর্থ্যের দ্বারা এই যজ্ঞকর্মে বসু রুদ্র ও আদিত্য দেবতাগণকে প্রীত করুন। মধ্যে পশ্চাতে ও সম্মুখে পৌর্ণমাসী-সম্বন্ধী দেবতার দ্বারা রক্ষিত হবিঃ ভক্ষণ করুন। আপনারা স্তুতিরূপ মন্ত্রের দ্বারা সন্তুষ্ট হয়ে আমাদের সম্যক অনুষ্ঠিত কর্মের ফল প্রদান করুন এবং হবিঃসেবনের পর পুত্র ও তার সাথে ধন প্রদান করুন। আদিত্য দেবতাগণ ও অঙ্গিরস ঋষিগণ এই দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞ আরম্ভ করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের উভয় দলের মধ্যে অঙ্গিরস ঋষিগণ সারস্বত হোম অজ্ঞাত থাকার কারণে প্রথমে অরম্ভণীয় ইষ্টির নিমিত্ত হবিঃ নির্বপণ করেন; অতঃপর সেই আদিত্য দেবতাগণ এই অধ্যারম্ভণীয় যজ্ঞের অঙ্গভূত সারস্বত হোম নিশ্চিত কর্তব্য বলে জ্ঞাত থাকার নিমিত্ত প্রথমে তার (অর্থাৎ সারস্বত হোমের) অনুষ্ঠান করেন। এর ফলে তারা (আদিত্যগণ) সেই অঙ্গিরস ঋষিগণের পূর্বেই দর্শপূর্ণমাস আরম্ভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন (উপক্রান্তবন্ত)। দর্শপূর্ণমাস আরম্ভ করতে ইচ্ছুক, এমন পুরুষ সেই আরম্ভণীয় যজ্ঞের উপক্রমে অর্থাৎ শুরুতে পূর্ণা পশ্চাৎ এই মন্ত্র দুটির দ্বারা যাগ করবেন। সেই জন্য তিনি অবিলম্বে দর্শপূর্ণমাস আরম্ভ করবার যোগ্য হবেন। ব্রহ্মবাদগণ বলে থাকেন–পূর্ণিমা ও অমাবস্যার মধ্যে কোটি অনুলোম (অর্থাৎ প্রকৃত প্রণালীমে) ও প্রতিলোম (বিপরীত ক্রমে) ভাবে আরম্ভ হবে, তা নির্ধারণীয়। (পূর্ণিমা থেকেই প্রথম আরম্ভ করতে হবে, না অমাবস্যা থেকে–এইটাই বক্তব্য)। অন্যেরা বলেন–যে যজমান এই দর্শপূর্ণমাসমন্ধী কাল সম্পর্কে (অর্থাৎ অনুলোম ও প্রতিলোম) জ্ঞাত আছেন, তিনিই এই যজ্ঞের মুখ্য অধিকারী। সেই বিষয়ে কোন কোন বুদ্ধিমান অনুলোম ও প্রতিলোম ভাব সম্বন্ধে এইরকম বলে থাকেন–অমাবস্যার পর (উর্ধ্বং) শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথি হতে অনুলোম ক্রমে অর্থাৎ দিনে দিনে চন্দ্রের বৃদ্ধি ঘটে (বর্ধমানত্বাৎ) এবং পূর্ণিমা অন্তর্হিত হওয়ার পর কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ তিথি হতে দিনে দিনে প্রতিবোম ক্রমে চন্দ্রের ক্ষয় হয় (অপক্ষীয়মাণত্বাৎ)। এইরকমে যদি পূর্ণিমাকে পূর্বভাবিনী করে (অর্থাৎ পূর্ণিমা থেকে) প্রতিলোম ক্রমে দর্শপূর্ণমাস আরম্ভ করা যায়, তাহলে সেই পূর্ণিমা হতে আরম্ভিত যাগের সমানে সমানে (একটু একটু করে) চন্দ্রের ক্ষয় আরম্ভ হবে। এবং তার ফলে যজমানও ক্ষয়প্রাপ্ত হবেন। এই প্রাতিলোম্য দোষ পরিহার করার নিমিত্ত দেবতাবিশেষের বিধান কথিত হয়েছে–আরম্ভণীয় ইষ্টির পূর্বে দুটি সারস্বত হোম করণীয়। (সরস্বতী ও সরস্বান, এই দুজন যে হোমের দেবতা, সেই হোমকে সারস্বত হোম বলা হয়)। এই দুই দেবতার হোম অনুষ্ঠানের দ্বারা প্রাতিলোম্য (অর্থাৎ প্রতিলোমজনিত) দোষের পরিহার পূর্বক অনুলোমক্রমে দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞ আরম্ভ করা কর্তব্য (আরব্ধবান্ ভবতি)। সেই হেতু ক্রমবর্ধমান চন্দ্রকলার সমানে সমানে যজমানেরও বর্ধন হবে। অগ্নি ও বিষ্ণুর উদ্দেশে একাদশ কপাল এবং সরস্বতী ও সরস্বানের উদ্দেশে দ্বাদশ কপাল হবিঃ নির্বপণ কর্তব্য। অগ্নি ব্যতীত যজ্ঞের নিষ্পত্তি হয় না; অগ্নিই যজ্ঞের মুখ (মুখ), অতএব আগ্নেয় হোমের দ্বারা যজ্ঞমুখের উদ্দেশে হবিঃ নির্বপণ পূর্বক প্রথমতঃ যজ্ঞের সমৃদ্ধি সম্পাদন করা হয়। যজ্ঞের সর্বাঙ্গব্যাপিত্ব হেতু যজ্ঞ বিষ্ণুস্বরূপ, অতএব বৈষ্ণব হোমের দ্বারা যজ্ঞ আরম্ভ করে (বিষ্ণুর উদ্দেশে হবিঃ নির্বপণ করলে) যজ্ঞ প্রকর্যের সাথে বিস্তৃত হয় (বিস্তৃতবান ভবতি)। (স্ত্রীলিঙ্গ নির্দেশের দ্বারা অমাবস্যায় সরস্বতীত্ব এবং পুংলিঙ্গশব্দ নির্দেশের দ্বারা পূর্ণমাসকে সরস্বান্ বোঝান হয়েছে)। সেই হেতু এই দেবতাদ্বয়ের দ্বারা যজ্ঞ আরম্ভিত হলে তদাত্মক (তাদের স্বরূপ) দর্শপূর্ণমাস যাগ ব্যবধানরহিতভাবে আরম্ভ হয়ে থাকে (ব্যবধানমন্তরেতোপক্রান্তবা)। এবং এই দুই দেবতার দ্বারা (অর্থাৎ দেবদ্বয়ের আনুকূল্যে) যজমান সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। দ্বিতীয় হোমে স্ত্রীদেবতাত্ব ও তৃতীয় হোমে পুংদেবতাত্ব নির্দেশিত হওয়ার কারণে যজমানের মিথুনত্ব সম্পন্ন হয়েছে, এবং তার দ্বারা পুত্র (প্রজা) উৎপত্তি সূচিত হয়। এই যজ্ঞের সমৃদ্ধিযুক্ত দক্ষিণা হবে মিথুন গাভী (মিথুনৌ গাবৌ দক্ষিণা সমৃদ্বৌ) ॥১॥
মর্মার্থ– কোনও এক সময়ে বশিষ্ট প্রমুখ সকল ঋষিগণ মন্ত্রবিশেষ অবগত হবার নিমিত্ত ইন্দ্রের নিকট উপস্থিত হয়েছিলেন; কিন্তু অনধিকারী জনকে মন্ত্র বলা ঠিক নয় (মন্ত্র না বক্তব্যা)–এই অভিপ্রায় ইন্দ্র তখন অন্তর্হিত হয়েছিলেন। অন্যান্য ঋষিগণ অন্তর্ধানপ্রাপ্ত ইন্দ্রকে সাধারণ চক্ষে দর্শন করতে সক্ষম হলেন না, কিন্তু যোগসামথ্যযুক্ত ঋষি বশিষ্ঠ তাঁর দিব্যচক্ষুর দ্বারা সেই ইন্দ্রকে দর্শন করলেন। অগত্যা ইন্দ্রদেব বশিষ্ঠকে বললেন–সৌমিক ব্রহ্মত্বের উপযোগী মন্ত্রগুলি যাতে প্রতিপাদিত (বোধিত) আছে, সেইরকম ব্রাহ্মণ (বেদের অংশবিশেষ) আমি আপনাকে বলব। আপনি পুরোহিতরূপে অর্থাৎ মন্ত্রোপদেষ্টা হয়ে যাদের নিকট বলবেন, তারাই এই বক্ষ্যমাণ ব্রাহ্মণ জ্ঞাত হতে সামর্থ্য লাভ করবে, তবে আপনি এই মন্ত্র অনধিকারী ঋষিগণের নিকট বলবেন না (মা প্রবোচ)। এই কথা বলে ইন্দ্রদেব বশিষ্ঠকে রশ্মিরসি ইত্যাদি স্তোমভাগ নামক (স্তবের ভাগরূপে কথিত) মন্ত্রগুলি বললেন (মন্ত্রানব্রবীৎ)। স্তোমা অর্থাৎ বহিষ্পবমান ইত্যাদি মন্ত্ৰসমূহ যারা ভজনা করে (অর্থাৎ এই মন্ত্রের যারা ভাগ প্রাপ্ত হয়। তারা স্তোমভাগ। এই মন্ত্রসমূহ উচ্চারণ করে ব্রহ্মা স্তোত্রসমূহের দ্বারা অনুজ্ঞাত হয়েছিলেন, সেই নিমিত্ত একে স্তোমভাগ বলা হয়। এইভাবে ইন্দ্রের প্রসাদে সকল প্রজা (জন) বশিষ্ঠকে পুরোহিতরূপে উদ্ভূত করেছিল, অর্থাৎ তাকে গুরুরূপে বরণ করে নিয়েছিল। যেহেতু ইন্দ্রদেব বশিষ্ঠের নিকট ব্ৰহ্মত্বের উপযুক্ত সব তথ্যই ব্যক্ত করেছিলেন, সেই হেতু যিনি সোমযাগ করতে ইচ্ছুক হন, তিনি বশিষ্ঠগোত্রে উৎপন্ন বা তার বিদ্যাসম্প্রদায়ের দ্বারা স্তোমভাগে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোন জনকে যজ্ঞের ব্রহ্মারূপে (অর্থাৎ ব্রহ্মা নামে অভিহিত ঋত্বিকবিশেষের কার্য সাধনের নিমিত্ত) বরণ করে থাকেন। (প্রথম স্তোমভাগের অবক্তব্য অংশের অর্থ)-রশ্মিরসি ক্ষয়ায়….প্ৰাহহঃ অর্থাৎ হে আদিত্য! আপনি রশ্মিযুক্ত হন। দেবগণ যে সঙ্ নিবাসিত, সেই দেবসষ্মের প্রীতির নিমিত্ত, হে আদিত্য! আপনাকে স্মরণ করছি। অতএব আপনি দেবসঙ্ঘকে প্রীত করুন (অর্থাৎ দেবগণ এই যজ্ঞের হোতরূপে কথিত হোন)। (দ্বিতীয় স্তোমভাগের অর্থ)–প্রেতরসি ধর্মায়…যজ্ঞং প্রাইহঃ অর্থাৎ (হে) ধর্মাভিমানী (ধর্মরূপে প্রতীত বা খ্যাত) দেব! আপনি প্রেতরসি (অর্থাৎ প্রাণিগণের উপকারের নিমিত্ত প্রকৃষ্টরূপে গতিমান) হন; অতএব ধর্মানুষ্ঠাতা পুরুষগণের নিমিত্ত আপনাকে স্মরণ করছি; আপনি ধর্মানুষ্ঠানকারী পুরুষের প্রতি সম্পাদন করুন। (তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্তোমভাগের তাৎপর্য)–অন্বিতিরসি দিবে…লোকেভ্যো যজ্ঞং প্ৰাহহ অর্থাৎ হে দুলোকাভিমানী (অর্থাৎ দেবগণের অনুকূলে গতিমান) দেব! সেইরূপে দ্যুলোকের নিমিত্ত আপনাকে স্মরণ করছি। আপনি দুলোকের প্রীতি সম্পাদন করুন। হে অন্তরীক্ষের ও ভূলোকের অভিমানী দেবতা!…আপনি অন্তরীক্ষের ও ভূলোকের প্রতিবিধান করুন।–(ষষ্ঠ স্তোমভাগে বৃষ্টিপ্রাপ্তিহেতুত্বের প্রশংসা করা হয়েছে, যথা)–বিষ্টম্ভোহসি বৃষ্ট্যৈ…রুন্ধে অর্থাৎ হে বৃষ্টি-অভিমানী দেব! আপনি বিশেষভাবে জলের ধারক হন। বৃষ্টিপ্রাপ্তিহেতু আপনাকে স্মরণ করছি; আপনি বৃষ্টিদান পূর্বক আমাদের প্রীত করুন। (সপ্তম ও অষ্টম স্তোমভাগে দিবা ও রাত্রির প্রতীকদ্বয়ের দ্বারা মিথুনত্ব সূচিত হয়েছে, যথা-)–হে অহরভিমানী (অর্থাৎ দিবসের অভিমানী) দেবতা! আপনি প্রবা (অর্থাৎ প্রকর্ষের সাথে জগতকে আলোকের দ্বারা প্রবর্তনকারী) হন।–হে রাত্রি অভিমানী দেবতা! আপনি অনুবা (অর্থাৎ নিদ্রা ইত্যাদি ব্যবহারের অনুকূল রূপে বর্তমান) হন। (এই দিবা-রাত্রির প্রতাঁকে উভয়ের মিথুনত্ব সাধিত হচ্ছে)।–(নবম, দশম ও একাদশ স্তোমভাগের তাৎপর্য সাধিত হচ্ছে)।-(নবম, দশম ও একাদশ স্তোমভাগের তাৎপর্য)-হে বসুগুণপালক! আপনি আমাদের কামনীয় (কাময়মানঃ)। অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য–এই সকল দেবতাগণকে এই যজ্ঞে সংগ্রহ করে আনয়ন করুন।–(দ্বাদশ স্তোমভাগের বক্তব্য)–হে পিতৃপালক দেব! আপনি ওজঃ (অর্থাৎ বলরূপ) হন। পিতৃপুরুষগণের নিমিত্ত আপনাকে স্মরণ করছি; আপনি নিরন্তর তাদের তুষ্ট করুন।–(ত্রয়োদশ স্তোমভাগ)-হে প্রজাভিমানী দেবতা! আপনি তন্তুরসি (অর্থাৎ পুত্রপৌত্র ইত্যাদি বিস্তারের হেতুভূত হন)। প্রজাগণের নিমিত্ত আপনাকে স্মরণ করছি; আপনি প্রজাগণকে নিরন্তর প্রীত রাখুন।–(চতুদশ স্তোমভাগে পশুগণের প্রীতিসাধনের কথা বলা হয়েছে, যেমন)–হে পশুপালক দেব! আপনি পৃতনাষান্টু (অর্থাৎ যে পরকীয় সেনা আমাদের পশুসমূহকে অপহরণ করে, সেই শত্ৰুদলের বিনাশক) হন। পশুগণের নিমিত্ত আপনাকে স্মরণ করছি; আপনি সেই পশুগণকে তুষ্ট রাখুন।-(পঞ্চদশ স্তোমভাগে পশুগণের নিমিত্ত ওষধি প্ৰতিষ্ঠাপন করা হয়েছে)–হে ওষধিপালক দেবতা! আপনি ধনবান হন (রেবদসি)। ওষধিপ্রাপ্তির নিমিত্ত আপনাকে স্মরণ করছি; আপনি ওষধিসমূহের বৃদ্ধি সাধন করুন, যাতে আমাদের পশুগণ প্রতিষ্ঠাপন হবে।–(যোড়শ স্তোমভাগ)- হে বজ্র! তুমি পাষাণের (অর্থাৎ প্রস্তরের) ন্যায় দৃঢ়ত্বযুক্ত ও অভিজিৎ (অর্থাৎ শত্রুজয়ী) হও। ইন্দ্রদেবের (আয়ুধরূপে) তোমাকে স্মরণ করছি; তুমি জয়দায়করূপে ইন্দ্রের প্রীতি সম্পাদন করো।–(সপ্তদশ স্তোমভাগের দ্বারা প্রাণের স্থাপন দেখান হয়েছে)–হে প্রাণের অভিমানী দেব! আপনি প্রাণের অধিপতি, অর্থাৎ সকল প্রাণের পালক হন। প্রাণের নিমিত্ত আপনাকে স্মরণ করছি; আপনি প্রাণসমূহের তুষ্টি সম্পাদতি করুন, আমাদের পুত্র ইত্যাদি প্রজগণের প্রাণসমূহকে তুষ্ট করুন (অর্থাৎ রক্ষা করুন)।–(অষ্টাদশ, উনবিংশ ও বিংশ স্তোমভাগে যথাক্রমে অপান, চক্ষু ও শ্রোত্র প্রতিপাদিত হয়েছে। এইগুলি সপ্তদশ স্তোমভাগে যেভাবে প্রাণের স্থাপন দেখান হয়েছে, সেইভবেই স্থাপনীয় বা বোধিতব্য)।–(একবিংশ, দ্বাবিংশ, এয়োবিংশ ও চতুর্বিংশ এই চারটি স্তোমভাগে মিথুনত্বের সম্পাদকত্ব দেখান হয়েছে)–হে মিথুনীভাব! তুমি ত্রিগুণশালী ও প্রবর্তক হও। (অর্থাৎ নারী পুরুষের সংযোগসাধনকারী, সংযোগের পর মন্থনব্যাপারে প্রবৃত্তি ও মন্থনের সমাপ্তি সাধন, এইভাবে ত্রিগুণসম্পন্ন হয়ে মন্থনের প্রবর্তনকারী হয়ে থাকে)। (পঞ্চবিংশ, ষড়বিংশ, সপ্তবিংশ, অষ্টাবিংশা এই চারটি স্তোমভাগের দ্বারা প্রজা-উৎপাদনপরত্ব দেখান হয়েছে। যথা-)-হে প্রজনন-ব্যাপার! তুমি সংরোহ (অর্থাৎ পুরুষের শুক্র ও নারীর শোণিতের সংশ্লেষে গর্ভের অভিব্যক্তি) ও নীরোহ অর্থাৎ নিঃশেষে অবয়বসমুহের অভিব্যক্তি) হও। (উনত্রিংশ, ত্রিংশ ও একত্রিংশ এই তিন স্তোমভাগে উৎপন্ন প্রজাগণের প্রতিষ্ঠা দর্শিত হয়েছে)–হে উৎপন্ন প্রজার অভিমানী দেবতা! আপনি শ্রীস্বরূপ নিবাসযোগ্য স্থানের প্রদাতা হন। এই তিন স্তোমভাগের দ্বারা প্রজাগণের প্রতিষ্ঠা সম্পাদিত হয়ে থাকে (প্রতিষ্ঠা সম্পদ্যতে) ॥২॥
মর্মার্থ- (দেবতা, ছন্দ, স্তোম, সাম ও বজ্রের দ্বারা পরকীয় সৈন্যগণের বা শত্রুগণের পরাভব সাধিত হয়ে থাকে। শত্রু ত্রিবিধ,–পূর্বজ, সহজ ও অপরজ। পূর্ব শত্রু অর্থে পিতৃপিতামহ ইত্যাদির কাল হতে অনুবর্তমান শত্ৰু, সহজ শত্রু অর্থে বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ইত্যাদি, অপরজ শত্রু অর্থে ইদানীং যার বা যাদের দ্বারা আপন কার্য ব্যাহত হয়। এই তিন প্রকার শত্রুর মধ্যে পূর্ব শত্রুগণ সর্বাপেক্ষা নীচ)। (সুতরাং) দেবতারূপী অগ্নি, ছন্দরূপা গায়ত্রী, স্তোমরূপ ত্রিবৃৎ, সামরূপ রথস্তর ও বজ্ররূপ বষটকারের দ্বারা আমি আমাদের পূর্বজ শত্রুগণকে পাদপ্রহার করছি। আমাদের নিবাসগৃহে যারা শৃঙ্খল ইত্যাদির দ্বারা আমাদের বন্ধন করে অথবা বাহিরের ভূমিলোকে যারা আমাদের দ্বেষ করে এবং আমরা যাদের দ্বেষ করি, এইরকম সকল বিদ্বেষী জনকে আমার (অর্থাৎ, বিষ্ণুরূপ যজমানের) বিক্রমের দ্বারা পাদবিন্যাস পূর্বক লঙ্ঘন করছি। (অর্থাৎ সকল পূর্ব শত্রুদের আমি ইন্দ্র, গায়ত্রী, ত্রিবৃৎ ইত্যাদির দ্বারা পদদলিত করব)। এইভাবে দেবতারূপী ইন্দ্র, ছন্দরূপ ত্রিষ্টুপ, পঞ্চমদশবিধ স্তোম, সাম্নরূপ বৃহৎ, বজ্ররূপ বষট্কারের দ্বারা সহজ শত্রুগণকে জয় করব। এই ভাবে দেবতারূপী বিশ্বদেবগণ, ছন্দরূপা জগতী, সপ্তদশবিধ স্তোম, সামরূপ বামদেব্য এবং বরূপ বষট্কারের দ্বারা অপরজ শত্রুগণকে বিনাশ করব। ইন্দ্রের সাথে যুক্ত হয়ে (ইন্দ্ৰেন সযুজঃ–অর্থাৎ পরমৈশ্বর্যযুক্ত আহবনীয় ইন্দ্রের সহযোগে) শত্রুসেনাগণকে আমরা বিনাশ করব এবং প্রতিকূলতা না থাকলেও শত্ৰু মাত্রকেই বধ করব। হে অগ্নিদেব! আপনার তেজে আমি কান্তি হবে, আপনার বর্চঃ অর্থাৎ বল ও হরঃ অর্থাৎ রশ্মিরূপ তেজঃ আমি প্রাপ্ত হবো৷৷ ৩৷৷
মর্মার্থ- দেবতাগণের মধ্যে নীচশ্রেণীয় (ম্লেচ্ছজাতয়ঃ) কোন কোন জন আছেন, যাঁরা যজ্ঞভাগাৰ্হ হয়েও (অর্থাৎ যজ্ঞভাগ প্রাপ্ত হয়েও) তা দর্শন করে অসহমান হয়ে কোন কোন যজ্ঞ বিনাশ করেন, অপর কোন কোন জন যজ্ঞসাধন দ্রব্য অপহরণ পূর্বক অন্যত্র গমন করেন। সেই বিষয়ে যজ্ঞবিঘাতী যে দেবগণ পৃথিবীর মধ্যগত যে কোনও স্থানে (দেশে) লুক্কায়িত (অবতিষ্ঠিত) আছেন, সেই যজ্ঞবিঘাতকগণ হতে অগ্নি আমাদের রক্ষা করুন। (অর্থাৎ তারা যেন আর আমাদের যজ্ঞ ব্যাহত করতে না পারেন, তেমন করুন। আমরা যেন সুষ্ঠুভাবে যজ্ঞ নিষ্পদিত করে যজ্ঞফল প্রাপ্ত হতে পারি। সেইরকম যে দেবতাগণ যজ্ঞসাধন দ্রব্যসমূহ অপহরণ করে পৃথিবীর কোন স্থানে লুক্কায়িত আছেন, সেই অপহরণকারী দেবতাগণ হতে অগ্নি আমাদের রক্ষা করুন, আমরা যেন সুষ্ঠুভাবে যজ্ঞ সম্পন্ন করে যজ্ঞের ফল লাভ করতে পারি। (অর্থাৎ তাঁরা যেন আর আমাদের যজ্ঞসাধন দ্রব্য অপহরণ করতে না পারেন, তেমন করুন)।–হে বরেণ্য (শ্রেষ্ঠ) মিত্র ও বরুণ দেবদ্বয়! আপনাদের যজ্ঞসম্বন্ধিনী রাত্রির মধ্যে বশা বা অনুবন্ধ্যারূপা যে ভাগ আছে, তার দ্বারা আমরা সর্বতঃ স্বর্গসুখ প্রাপ্ত হবে। তা পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ অপেক্ষা আরও ঊর্ধ্বে যজ্ঞসম্বন্ধিনী তৃতীয়লোকে, অর্থাৎ অধিক ভাসমান (দীপ্তিমান) স্বর্গের উপরে অবস্থান করছে। যে দেবগণ যজ্ঞের হননকারী ও যজ্ঞসাধন দ্রব্যের অপহরণকারী হয়ে অন্তরীক্ষলোকে অধ্যাসিত আছেন, বায়ু তাদের নিকট হতে আমাদের রক্ষা করুন; আমরা সুকৃত লোকে (পুণ্যলোকে) গমন করব।–হে সবিতাদেব! দ্যাব-পৃথিবীর মধ্যে যজ্ঞের অনুষ্ঠানযোগ্য আপনার সম্বন্ধিনী যে রাত্রিসমূহ আছে দৈবিক কর্মের উপযুক্ত সেই রাত্রিসমূহে কর্ম (অর্থাৎ যজ্ঞকর্ম) অনুষ্ঠিত করে আমাদের গৃহবর্তী ভৃত্য ও পুত্র ইত্যাদির সাথে আমরা যজমানগণ স্বর্গের প্রীতিজনক (রঞ্জনীয়) সুখসমূহ প্রাপ্ত হবো। যজ্ঞবিঘাতক ও যজ্ঞসাধন দ্রব্যসমূহের অপহর্তা যে সকল দেবতা দুলোকে অধ্যাসিত আছেন, তাদের হতে সূর্য আমাদের রক্ষা করুন; আমরা সুকৃত লোকে গমন করব।
–হে জাতবেদা! যে উত্তম হবিঃস্বরূপ সোমরস ক্ষীররসের ন্যায় স্বাদযুক্ত করে ইন্দ্রের নিমিত্ত সস্তৃত (সঞ্চিত বা প্রস্তুত) হয়েছে, সেই হবির দ্বারা (অর্থাৎ সেই হবিঃ সেবন করে), হে ইন্দ্র! আপনি এই যজমানের বৃদ্ধি সাধন করুন, অধিকন্তু সজাতির মধ্যে এই যজমানকে শ্রেষ্ঠ করুন। কপটরূপধারী কোন কোন দেবতা যজ্ঞভাগরহিত হয়ে (অর্থাৎ যজ্ঞভাগ না প্রাপ্ত হয়ে) যজ্ঞশালা ভস্মীকরণ ইত্যাদি উপদ্রবের দ্বারা যজ্ঞঘাতী হন; এবং অপর কেউ কেউ গ্রহ, চমস ইত্যাদি যজ্ঞদ্রব্য অপহরণ করেন কিংবা ভগ্ন করেন, সোমরস অপহরণ করেন, যজ্ঞকারী যজমানের দেয় গো-ইত্যাদি দক্ষিণাদ্রব্য অপহরণ করেন। এই উভয়বিধ (অর্থাৎ যজ্ঞশালা দগ্ধকারী ও যজ্ঞদ্রব্য ভগ্নকারী বা অপহরণকারী) দেবতাগণ এই তিন লোকে অবতিষ্ঠিত আছেন। যে যজ্ঞহননকারী দেবগণ এই পৃথিবীতে, অন্তরীক্ষে ও দুলোকে অবস্থান করছেন, পৃথক মন্ত্রের দ্বারা (মন্ত্রগুলি পূর্বে উরুং হি রাজা–এই অনুবাকে, ১/৪/৪৫, দ্রষ্টব্য) তাঁদের উপদ্রবসহিত অতিক্রম করে সগৃহ (অর্থাৎ স্ত্রী, পুত্র ইত্যাদি সহ), সপশু (অর্থাৎ গো, অশ্ব ইত্যাদি সহ) যজমান স্বর্গলোক প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। সোম-অভিলাষী (সোমেনেষ্টবানভবৎ) যজমানের যজ্ঞ হতে দেবগণ অপসৃত হয়ে যেতে উদ্যত হন; এই নিমিত্ত অগ্নিদেবতার উদ্দেশে পঞ্চকপাল পুরোডাশের দ্বারা সাধ্য উদবসানীয় নামে আখ্যাত কর্ম কর্তব্য; অগ্নি ও গায়ত্রী প্রজাপতির মুখ হতে উৎপন্ন, সেই কারণে গায়ত্রী অগ্নিরূপ। পঞ্চকপাল পুরোডাশ নির্বপণ করলে অগ্নি আপন ছন্দ হতে বিযুক্ত হয়ে পড়েন, সেই নিমিত্ত অষ্টকপাল পুরোডাশ নির্বপণ পূর্বক অষ্টাক্ষরা গায়ত্রীর সমৃদ্ধি করণীয়। অতঃপর পাঙ্ক্তমন্ত্র পাঠের দ্বারা ধানা অর্থাৎ সৃষ্ট যব, করম্ভ অর্থাৎ দধিমিশ্রিত ছাতু ইত্যাদি সহযোগে পাক্ত যজ্ঞের অনুষ্ঠান করলে যজমানের অপগমন (অর্থাৎ বিনাশ) হয় না (নাপগচ্ছতি)।৪।।
মর্মার্থ- এই আদিত্যগ্রহ সূর্য, বায়ু ও অগ্নির স্বরূপ। সূর্যরূপধারী এই দেব যজ্ঞবিঘাতী দেবগণ হতে আমাকে রক্ষা করুন। সেই রকম বায়ুরূপে তিনি বিঘ্নকারী দেবযুক্ত (দেবনিবাসিত) অন্তরীক্ষ লোক হতে আমাকে রক্ষা করুন। অগ্নিরূপে তিনি যাগকারী যজমানদের প্রতি বিরোধী দেবতাগণের দৃষ্টি (অর্থাৎ রোষচক্ষু) হতে আমাদের রক্ষা করুন। হে সোম! আপনার যে সক্ষ (পাত্রসঙ্গ), শূষ (লবন্), সবিতা (প্রেরক) ও বিশ্বচর্ষণ (সকল মনুষ্যের অনুগ্রাহক), এই চারটি সম্বোধনরূপ নাম আছে, সেই নামের দ্বারা সূর্য-বায়ু-অগ্নির সাথে আপনার পরিচর্যা করব। আমি যজমান এই আদিত্য গ্রহের জ্যোতিতে বিশেষভাবে অন্ধকার (মো) বিদূরিত করছি। উপরিভাগ (ঊর্ধ্বলোক বা স্বর্গ) ও অধোভাগ (নিম্নলোক বা পৃথিবী) এই উভয়ের মধ্যবর্তী যে অন্তরীক্ষলোক, তিনিও পিতৃবৎ হয়ে (অর্থাৎ পিতার ন্যায়) আমাকে পালন করেছিলেন (পালকমভূৎ)। ঊর্ধ্ব ও অধোভাগ বা দক্ষিণ ও উত্তরভাগ হতে সূর্য বা আদিত্য গ্রহকে দর্শন করেছি; অতএব আমি সমপর্যায়ভুক্ত যজমানগণের মধ্যে উত্তম (শ্রেষ্ঠ) হবো। প্রজাপতি দর্ভের দ্বারা চতুর্দিকে সমুদ্র সমান (অর্থাৎ উধভাগ, অধোভাগ, অন্তরীক্ষ ও সমুদ্র অবধি) এই অদিত্য গ্রহের বিস্তার করুন। ইন্দ্র গাভীর উধের (অর্থাৎ স্তনের) ন্যায় এই গ্রহের ক্ষরণ (দোহন) করুন। মরুত্বর্গ মেঘের ন্যায় (মেঘা ইব) এই গ্রহ হতে নিরন্তর (সন্তত) ধারা বর্ষণ করুন। হে আদিত্য! আপনি আকাশ হতে পৃথিবীকে উদ্ধৃষ্টভাবে ক্লিন্ন (আ) করুন; দ্যুলোকস্থ বা আকাশবর্তী মেঘের ন্যায় গ্রহকে ভিন্ন (বিদারিত) করুন। দিব্যস্থ অর্থাৎ আকাশস্থ উদক-সমৃদ্ধি (অর্থাৎ গগনমণ্ডলে জল সম্পর্কিত শেয়তা) আমাদের প্রদান করুন। আপনি সমর্থ (বা আধিপত্যশালী); জলবিধারক দৃতি (অর্থাৎ ভিস্তি) সমান মেঘসমূহকে আপনি মুক্ত করুন (বিমুঞ্চ)। আদিত্যগ্রহ পশু প্রাপ্তির হেতুভূত। অগ্নিস্বরূপ ক্রুর দেবতাগণের সেই ক্রুরতা পরিহার করার নিমিত্ত অগ্নিতে ওষধি প্রক্ষিপ্ত করে তারপর আদিত্যগ্রহের যাগ করণীয়। তার ফলে (তথা) রুদ্ররূপ অগ্নির সকাশে আদিত্যগ্রহরূপ পশুসমূহ অন্তর্হিত হয় না; অধিকন্তু ওষধির মধ্যে আদিত্যগ্রহরূপ পশুসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। যজ্ঞের বিদ্বান এই আদিত্যগ্রহ স্বর্গের পথ বিস্তৃত করেন। হে অগ্নি! প্রকৃষ্ট রূপে আমাদের কর্মানুষ্ঠান জ্ঞাত হয়ে দেবতাগণের দূতরূপে হবিঃ বহন করে আপনি যে পথ ধরে গমন করেন, সেই পথ বিস্তৃত করুন। আপনি স্বর্গলোকের অতিশয় ফলদাতা। হে অগ্নি! ভূলোকে, যজ্ঞদেশে (বহিষি) ও সূর্যে আপনার যে দীপ্যমান জ্বালা আছে, সেই জ্বালাসমূহ এই ঘৃতের আহুতি প্রাপ্ত হোক। দেবায়ুতে (দেবতাকে প্রাপ্তির নিমিত্ত অভিলাষ পরায়ণ) যজমানকে সুখ প্রদান করুন। (আদিতগ্রহ-বিষয়ক এই মন্ত্রগুলি কদা চন স্তরীরসি এই অনুবাকের ঊর্ধ্বে, ১/৪/২২, দ্রষ্টব্য)। হে যুপ (যজ্ঞীয় পশুবন্ধনের নিমিত্ত কাষ্ঠবিশেষ)! তুমি যজমানরূপী আমার নিমিত্ত সুবীর্যশালী অশ্বরূপ (অর্থাৎ অশ্ববৎ) ভোগসামর্থযুক্ত (সামর্থ্যেনোপেতং) শোভন ধনের পুষ্টি আকাঙ্ক্ষা করো। তুমি বৃহস্পতি দেবতার দ্বারা প্রভূত ধনের নিমিত্ত সৃষ্ট হয়ে যজমানের মনোগত রূপে অবস্থান করো। (সোহয়ং মন্ত্রঃ পশুপ্রকরণগতাৎ সমুদ্রং গচ্ছ ইতি অনুবাকাদূর্ধ্বং দ্রষ্টব্য, ১ম কাণ্ড/৩য় প্রপাঠক/১১শ অনুবাক), ॥৫॥
মর্মার্থ- হে পত্নী! তোমাকে দুগ্ধ ও ঘৃতের নিমিত্তভূত (অর্থাৎ এই উভয়ের পকের নিমিত্ত)। সম্যকরূপে বন্ধন করছি। সেই রকম, ওষধির সাথে জলের উদ্দেশ্যে (অর্থাৎ উভয়ের পকের নিমিত্ত) তোমাকে সম্যক বন্ধন করছি। অধ্বর্যরূপী আমি প্রজার নিমিত্তভূতা (অর্থাৎ পুত্র ইত্যাদি প্রাপ্তির নিমিত্ত) তোমাকে বন্ধন করছি। আমাদের অন্ন দানের নিমিত্ত সেই পত্নী দীক্ষিত হোন। ব্রাহ্মণ যজমানের পত্নী পত্নীসালা হতে নির্গত হয়ে প্রকর্ষের সাথে যজ্ঞশালায় গমন করুন। (অনন্তর) আমি (অর্থাৎ যজমানের পত্নী) যজমানের (অর্থাৎ স্বামীর) আনুকূল্য কামনা করে (কাময়মানা হয়ে) আপন স্থানে উপবেশন করছি। হে অগ্নি! শোভন অপত্যশালিনী ধর্মপত্নী আমরা কারো দ্বারা তিরস্কৃতা হই না, আমরা সপত্নদম্ভনং অর্থাৎ বৈরিবিনাশকারিণী; আমরা আপনার সমীপে উপবেশন করছি। শোভন জ্ঞানযুক্ত প্রেরক বরুণের যে মরণরূপ পাশ পূর্বে বন্ধন করেছিল, তা আমি বিমোচিত করছি (বিমুঞ্চামি)। তার পর সুকৃতির ফলভূত উত্তম লোকে পরমেশ্বরের স্থানে (গমন করে) পতির সাথে সুখ প্রাপ্ত হবো (সুখং করোমি)।–হে পত্নী! যজ্ঞশালার পাকস্থলী হতে নির্গত হয়ে জল আনয়নের নিমিত্ত বিলম্ব না করে গমন করো। যজ্ঞের প্রেরক এই অগ্নিদেব তোমার গমনে অনুমন্যমান হয়ে (অর্থাৎ অনুমোদন করে) তোমাকে সম্মুখে প্রেরণ করুন। অদিতি (পৃথিবী) ও ভূমি উভয়পার্শ্বের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত পথ প্রদান করুন (অর্থাৎ যজ্ঞস্থলীর মধ্যস্থান দিয়ে নির্গমনের ও প্রবেশের পথ প্রদান করুন)। তুমি ক্রুর উপদ্ৰবকারী দেবগণ হতে বিমুক্ত। অতএব তোমাকে আমার প্রতি হিংসা করো না (অর্থাৎ রুষ্টা হয়ো না)।–হে জল! বসুগণ, রুদ্রবর্গ, আদিত্যবৃন্দ ও সকল দেবতার প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করছি; এবং যজ্ঞের নিমিত্তও তোমাকে গ্রহণ করছি।-হে অগ্নিদেব! বিশ্বাত্মক আপনার কটাক্ষবীক্ষণে (অপাঙ্গ দৃষ্টির দর্শনে) এই অনুষ্ঠানের প্রবর্তক আমি বহুপুত্রের কামনায় (বহুপুত্ৰকারণানি) পত্নীতে সকল বীর্য স্থাপন করব। এই যজ্ঞ দেবগণের নিকট প্রাপ্ত হয়েছে। দ্যোতমানা জলদেবী আমাদের এই যজ্ঞের বিষয় নিরন্তর স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করেছেন–এই যজমান সোম অভিষব করলে স্বাহাকারের দ্বারা সম্পাদিত স্বর্গে অবস্থিত সমুদ্রতুল্য আশিসরূপ ফলবিশেষসমূহ সবই, গন্ধর্বপত্নীর নিকট গন্ধর্বের মতো, আমার প্রিয় যজমানের প্রাপ্ত হোক। যজ্ঞপ্রবর্তক বায়ু কর্তৃক প্রেরিত হয়ে ঋত্বিকগণের দ্বারা (অন্যত্র, অধ্বর্যর দ্বারা) প্রযুক্ত ফল সাধনভূত স্তোত্র বিশেষ যজমান প্রাপ্ত হোন ॥৬॥
মর্মার্থ- বষট্কার-অভিমানী (অর্থাৎ যজ্ঞের অধিষ্ঠাতৃ) দেবতা এক কোনও এক বিরোধের কারণে (কেনাপি বিরোধেন) গায়ত্রীর শিরচ্ছেদন করে ফেলেছিলেন। তখন গায়ত্রীর সেই ছিন্ন স্থান হতে জল নির্গত হয়ে ভূমিতে পতিত হয়ে খদির (অর্থাৎ খয়ের) বৃক্ষে পরিণত হলো। এই নিমিত্ত সুব (হোমের নিমিত্ত কাষ্ঠনির্মিত পাত্রবিশেষ) খদির বৃক্ষের দ্বারা প্রস্তুত করণীয়। সেই খাদির কাষ্ঠনির্মিত সুক বা সুচার (পাত্রের) দ্বারা যা যা প্রদান করা হয়, সেই সব সামগ্রীই ছন্দরসে যুক্ত হয়ে থাকে। তার ফলে এই যজমানের (অর্থাৎ যে যজমান সুকের দ্বারা আহুতি প্রদান করেন, তাঁর) আহুতিগুলি সরস হয়ে থাকে। এই ভূলোক হতে গণনা করে যে তৃতীয়লোক আছে, সেই তৃতীয় দ্যুলোকে পূর্বে সোম বর্তমান ছিল। গায়ত্রী তাকে সংগৃহীত করেন। (২য় কাণ্ড/ ১ম প্রপাঠক/৭ম অনুবাকও দ্রষ্টব্য) আহরণ কালে সোমের একটি পর্ণ (বা পাতা) ভূমিতে পতিত হয়ে পলাশবৃক্ষে পরিণত হলো। পর্ণ হতে জন্ম হওয়ার কারণে এই বৃক্ষ পর্ণ নামে অভিহিত হয়; সেইজন্য পর্ণ বৃক্ষের দ্বারা জুহু (যজ্ঞপাত্রবিশেষ) নিষ্পন্ন, (প্রস্তুত) করণীয়। এই রকম জুহুর দ্বারা হুয়মান যে আহুতিসমূহ প্রদান করা হয়, তার সবগুলিই সোমসম্বন্ধী (অর্থাৎ সোমের সম্পর্কযুক্ত) হয়ে যায়; এবং দেবগণ সেই আহুতিসমূহ প্রীতিপূর্বক (প্রীতিপুরঃসরা) সেবা করেন। (অর্থাৎ সোমপত্ৰ হতে উৎপন্ন পর্ণবৃক্ষের কাষ্ঠে নির্মিত জুহু নামক যজ্ঞপাত্রবিশেষের দ্বারা যা কিছু আহুতি প্রদান করা হয়, তা সবই সোম সহযোগে আহুতির সমযোগ্য হয়; সুতরাং সোমসেবী দেবগণ সানন্দে সেই আহুতিগুলি গ্রহণ করেন)।–(প্রকারান্তরে পর্ণবৃক্ষের প্রশংসা করা হয়েছে)-কোন এক সময়ে দেবগণ সমবেতভাবে এক পর্ণবৃক্ষের ছায়ায় উপবিষ্ট হয়ে যখন ব্রহ্মতত্ত্ব বিষয়ে পরস্পর আলাপনে রত ছিলেন, তখন পর্ণবৃক্ষ-অভিমানী দেবতা তাদের (অর্থাৎ দেবতাগণের) বাক্য শ্রবণ করেছিলেন। এই শ্রবণজনিত কারণে তার (অর্থাৎ পর্ণবৃক্ষের) সুশ্রবা নাম সম্পাদিত হয়। যেহেতু এই বৃক্ষ সুবা, সেই হেতু এর কাষ্ঠ দ্বারা জুহু নির্মাণ করলে (অর্থাৎ সুশ্রবা নামে অভিহিত পর্ণবৃক্ষের কাষ্ঠে নির্মিত জুহু দ্বারা আহুতি প্রদান করলে) সেই যজমান সর্বদা শোভন স্তুতিরূপ বাক্য শ্রবণ করেন; কখনও নিন্দাবচন (পাপং শ্লোকং) শ্রবণ করেন না। দেববর্গের দ্বারা উচ্চারিত ব্রহ্মতত্ত্ব শ্রবণ করে পর্ণবৃক্ষও ব্রহ্মত্ব বা ব্রাহ্মণ অভিমানী হয়; বৈশ্যজাতির অভিমানের দ্বারা মরুৎ-গণ সৃষ্টি হওয়ার কারণে মরুৎ-গণ বৈশ্য (বি)-রূপ। কৃষি ইত্যাদি কর্মপরায়ণ বৈশ্য জাতির দ্বারা অন্ন উৎপন্ন (সম্পাদিত) হওয়ার কারণে অন্নও মরুৎ-রূপ। মরুতাং বা এতদোজো যদশ্বঃ অর্থাৎমরুৎ-গণের তেজঃ হলো অশ্বত্থা–এই শ্রুতিবাক্য হতে অশ্বথ বৃক্ষের মারুত্ত্ব সম্পাদিত হয়েছে। এইরকমভাবে (অর্থাৎ শ্রুতিবাক্য অনুসারে) স্থিত হয়ে যে যজমান পর্ণময় (পর্ণের দ্বারা) জুহু নির্মাণ করেন, তার পক্ষে অশ্বথের দ্বারা উপভৃৎ (অশ্বত্থ কাষ্ঠে নির্মিত গোলাকার যজ্ঞপাত্রবিশেষ) নির্মাণ কর্তব্য। এই উভয়ের দ্বারা যজমান জুহুরূপ ব্রাহ্মণ ও অশ্বত্থাস্বামী বৈশ্যাভিমানী মরুত্বর্গের দ্বারা অন্নকে প্রাপ্ত হবেন; অধিকন্তু, ব্রাহ্মণজাতি এই বৈশ্যজাতি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠরূপে স্থাপিত হন (অধিকত্বেন স্থাপয়তি)।
পর্ণবৃক্ষ তার স্বামী (প্রভু) ব্রাহ্মণগণের নিবাসস্থানত্ব প্রাপ্ত হওয়ায় রাষ্ট্রত্বও পর্ণরূপ। মরুৎ-দেবতাগণের দ্বারা অশ্বথের বৈশ্বরূপত্ব (বি-রূপত্ব) সূচিত হয়েছে। অতএব পূর্বোক্ত রীতিতে পর্ণবৃক্ষের কাষ্ঠে জুহু এবং অশ্বথ বৃক্ষের কাষ্ঠে উপভৃৎ নির্মিত হলে (নিম্পাদিত হলে) ব্রাহ্মণরূপ রাষ্ট্র অশ্বত্থরূপ বৈশ্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বে স্থাপিত হয়ে থাকে। প্রজাপতি পূর্বে যে স্থান হতে আহুতি প্রদান করেছিলেন, সেই দেশ (স্থান) হতে বিকঙ্কত (বৈঁচি) নামে বৃক্ষ উৎপন্ন হয়েছিল। সেই যজ্ঞসাধনভূত বিকঙ্কত হতে প্রজাগণের সৃজন হয়েছিল। এই নিমিত্ত বৈকঙ্কত (অর্থাৎ বিকঙ্কত বৃক্ষের দ্বারা) ধ্রুবা (যজ্ঞপাত্রবিশেষ) নির্মাণ করণীয়। এই ধ্রুবার দ্বারা কৃত আহুতিগুলি যজমানে প্রতিষ্ঠিত হয়, অধিকন্তু যজমান প্রজা উৎপাদন করেন।–(উপসংহারে সুগবৃক্ষবিধি কথিত হচ্ছে)–খদির বৃক্ষের কাষ্ঠে সুচ, পর্ণবৃক্ষের কাষ্ঠে জুহু, অশ্বত্থবৃক্ষের কাষ্ঠে উপভৃৎ এবং বিকঙ্কত বৃক্ষের কাষ্ঠে ধ্রুবা+এইগুলি মুখ্য স্বরূপ। যে যজমানের সুবগুলি (হোমের নিমিত্ত পাত্রগুলি) এইরকমভাবে নির্মিত হয়, সেই যজমান গো, অশ্ব ইত্যাদি সবই প্রাপ্ত হয়ে থাকেন; অধিকন্তু সেই যজমানের কোনও অপত্য (সন্তান) বিরুদ্ধস্বরূপ (বিরুদ্ধ স্বভাবশালী) হয় না, বরং সকল অপত্যই সুস্বরূপ (উত্তম স্বভাবশালী) হয়ে থাকে। ৭।
মর্মার্থ- হে দধিগ্রহ (যজ্ঞনিমিত্ত পাত্রে গৃহীত দধি)! তুমি পার্থিবপাত্রের দ্বারা গৃহীত হয়ে থাক; জ্যোতির্মান প্রজাপতির উদ্দেশ্যে জ্যোতিষ্মন্ত তোমাকে গ্রহণ করছি (জ্যোতিষ্মন্তং ত্বা গৃহূমি)। বর্ধনপ্রাপ্ত কর্মকুশলতাসম্পন্ন তুমি পূর্বে প্রজাপতি কর্তৃক দেবতাগণের নিকট প্রদত্ত হয়েছিলে। সেই দেবতাগণ অগ্নিজিহ্ (অর্থাৎ অগ্নির ন্যায় প্রজ্বলন্ত জিহ্বসম্পন্ন), সত্য সন্ধানেচ্ছু; ইন্দ্র যাঁদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ, বরুণ যাঁদের রাজা, বায়ুপান যাঁদের আহার, পর্জন্য যাদের আত্মা (অর্থাৎ তারা বৃষ্টি ইত্যাদি সহিষ্ণু)–এইরকম যে দেবগণের নিকট তুমি প্রদত্ত হয়েছিলে, তাঁদের নিকট হতে তোমাকে আমি পূর্বে গ্রহণ করছি। সেইভাবে দ্যুলোককে প্রাপ্তির নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করছি, অন্তরীক্ষলোককে প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে তোমাকে গ্রহণ করছি, পৃথিবীলোককে প্রাপ্তির কামনায় তোমাকে গ্রহণ করছি। তিন রকমের শত্রু আছে; যথা–দ্বিষৎ, জিজ্যাসৎ ও অরাতি। এর মধ্যে যে শত্রু যজমানের জন্য রক্ষিত (যজমানস্য বিদ্যমানং) দ্রব্য ইত্যাদি বিনাশ করে, সে দ্বিষৎ; যে শত্রু যজমানের দ্রব্য অপহরণ করে ও যজমানের মরণ ইচ্ছা করে, সে জিজ্যাসৎ; যে শত্রু পূর্বে প্রদত্ত বস্তু প্রত্যর্পণ করতে ইচ্ছা করে না, সে অরাতি। হে ইন্দ্রদেব! আপনি এইরকম দ্বিষৎও জিজ্যাসৎ নামধেয় শত্রুগণের মন জয় করুন এবং সেইরকম আমাদের অরাতিগণকেও জয় করুন।–হে দধিগ্রহ! প্রাণের (প্রাণবায়ু তথা উৰ্দ্ধবৃত্তির) প্রীতির নিমিত্ত তোমার উদ্দেশে হোম করছি; এইরকমে অপানের (অর্থাৎ বাক্-বৃত্তির) প্রীতির নিমিত্ত তোমার উদ্দেশে যাগ করছি, ব্যানের (অর্থাৎ মধ্যবৃত্তির) প্রীতির নিমিত্ত তোমার উদ্দেশে হোম করছি, শাস্ত্রীয় পথাবলম্বী অর্থাৎ সৎ ও তার বিপরীতগামী অর্থাৎ অসৎ জনের প্রীতির নিমিত্ত তোমার উদ্দেশে হোম করছি, জল ও ওষধিসমূহের প্রীতির নিমিত্ত তোমার উদ্দেশে হোম করছি, এবং সর্বপ্রাণীর (বিশ্বানি ভূতানি) প্রীতির নিমিত্ত তোমার উদ্দেশে হোম করছি। আরও, প্রজাপতি সকাশে যে সকল প্রজা খেদরহিত হয়ে উৎপন্ন হয়েছে, তিনি তাদের প্রভূত ঐশ্বর্য দান করেছেন; সেই সর্বপ্রকাশাত্মক প্রজাপতির উদ্দেশে জ্যোতিষ্মন্ত তোমাকে আহুতি প্রদান করছি ॥৮॥
মর্মার্থ– সোমযাগে বহু দেবতার সমাবেশ হয় (অর্থাৎ দেবগণের বাহুল্য থাকে)। সেই কারণে অধ্বর্য ও যজমানের প্রমাদে কোন দেবতার অন্তরায় (বিঘ্ন) করা হলে (কুর্বাতে), (অর্থাৎ যদি ভুলবশতঃ কোন দেবতা সম্পর্কে কিছুমাত্র ত্রুটি ঘটলে), তা হতে এই দুজন (অর্থাৎ অধ্বর্য ও যজমান বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই দেবতার নিকট অপরাধী হন। এই হেতু সেই অপরাধ পরিহারের নিমিত্ত প্রজাপতি দেবতার উদ্দেশে দধিগ্রহ গ্রহণ কর্তব্য। প্রজাপতির দ্বারা সৃষ্টি হওয়ার কারণে প্রজাপতি সকল দেবতারই স্বরূপ। অতএব তাকে (অর্থাৎ প্রজাপতি দেবকে গ্রহ দান করলে সকল দেবতাই অনুবন্ত হয়ে থাকেন (অর্থাৎ যজ্ঞান্ন প্রাপ্ত হন) এবং শাঠ্য পরিত্যাগ করেন। ফলে যজমান ও অধ্বর্য সকল দেবতারই দ্বেষ হতে মুক্ত হন। গ্রহগুলির (অর্থাৎ যজ্ঞপাত্রবিশেষগুলির) মধ্যে যেটি জ্যেষ্ঠ বা প্রথমভাবী, সেটিই প্রথমে গ্রহণ করা কর্তব্য। যে যজমানের এই গ্রহ প্রথম গৃহীত হয়, তিনি সকল যজমানের মধ্যে মুখ্যত্ব প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। প্রজাপতি সর্বদেবতাত্মক (অর্থাৎ সর্বদেবতার স্বরূপ), সেই কারণে তার উদ্দেশে যে যজমান গ্রন্থ গ্রহণ করেন, তিনি গো অশ্ব ইত্যাদিরূপ সকল পশু লাভ করে থাকেন। প্রজাপতয়ে….গৃহূমি অর্থাৎ প্রজাপতির উদ্দেশে জ্যোতিষ্মন তোমাকে গ্রহণ করছি–এই মন্ত্রে আহুতি প্রদান করলে সেই যজমান সমযোগ্য যজমানগণের মধ্যে তেজোযুক্ত হয়ে থাকেন। ইন্দ্র দ্বিষতঃ মনঃ অর্থাৎ ইন্দ্ৰ শত্ৰুগণের ভ্রাতৃব্যগণের অর্থাৎ শত্রুবর্গের মন জয় করুন–এই মন্ত্রে আহুতি প্রদান করলে শত্রুগণের বিনাশ ঘটে। প্রাণায় অপানায় ইত্যাদি অর্থাৎ প্রাণ অপান ইত্যাদির প্রীতির নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করছি ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা হোম করলে যজমানে প্রাণ ইত্যাদির প্রতিষ্ঠ হয়ে থাকে। ত্ব প্রজাপতয়ে বিভূদারে জ্যোতিন্মতে..ইত্যাদি অর্থাৎ প্রভূত দানকারী জ্যোতির্মান প্রজাপতির উদ্দেশে জ্যোতিষ্মন্ত তোমাকে গ্রহণ করছি–এই মন্ত্রে দধিগ্রহ গ্রহণ করা কর্তব্য। তেজের কামনায় আজ্যগ্ৰহ গ্রহণ করলে তেজ লাভ হয়, ব্রহ্মতেজের কামনায় সোমগ্রহ গ্রহণ করলে ব্ৰহ্মতেজ, এবং পশুকামনায় দধিগ্রহ গ্রহণ করলে পশুসমূহ লাভ করা যায় ॥৯৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–অনুবাকে তু নবমে দধিগ্রহবিধিঃ শ্রুতঃ। অথ দশমেইনুবাকে গবাময়নেহতিগ্রাহ্যাঃ প্রাণগ্রহাশ্চোচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-১০ ে গবাময়নে অতিগ্রাহ্য ও প্রাণ নামক গ্রহ সম্পর্কে উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- [অতিগ্রাহ্যস্থানে (যজ্ঞক্ষেত্রে অতিগ্রাহ্য স্থাপনের স্থানে) চারটি অতিগ্রাহ্য চারটি দিকে স্থাপন করে মধ্যে পঞ্চমটি স্থাপনীয়। তারপর পঞ্চ অতিগ্রাহ্য পাত্রের প্রতিটির যথাযথ মন্ত্রে গ্রহণ স্থাপন পূর্বক সোমরসসাধ্য যজ্ঞ করণীয়]।-হে অতিগ্রাহ্য! সকল ঋত্বিক তোমাতে যজ্ঞ সমাপন করেন (সমাপয়ন্তি)। অন্য চারটি পাত্র হতে (গ্রহান্তরেডভ্যা) এই রস তোমাতে, অর্থাৎ এই পঞ্চম পাত্রে রক্ষা করা হয়েছে, সেই কারণে তোমাতে সোমরসসাধ্য যজ্ঞের (ক্রতুর) সমাপন যুক্তিযুক্ত (যুক্ত)। অতএব (হে সোমরস) তুমিও স্বাদু হতে স্বাদুতমের সংসর্গে অতিশয় স্বাদু হয়ে মধুর ভাগের সাথে যুক্ত হও। এই মধুরস পার্থিবপাত্রে গৃহীত, প্রজাপতির প্রিয় তোমাকে (মধুর সোমরসকে) অন্য পাত্র হতে আনয়ন পূর্বক মধ্যম পাত্রে স্থাপন করছি। (এইটিই গ্রহণ মন্ত্র)। এই খরপ্রদেশ (উষ্ণপ্রদেশ) তোমার স্থান (যোনিস্তব স্থান), এই হেতু প্রজাপতির নিমিত্ত তোমাকে এই স্থানে স্থাপন করছি (তামত্র সাদয়ামি)।–এই মন্ত্রের দ্বারা গবাময়েনর সম্বৎসরসাধ্য সত্রের (৩কা, ৩.অ. দ্রষ্টব্য) শেষ দিনে (উপান্তেহহ্নি) মহাব্রত নামে আখ্যাত এই অতিগ্রাহ্য গ্রহণ করণীয়। অনন্তর চতুর্থ কাণ্ডে কথিত পৃশ্নিগ্রহের মতো বায়ুরসি প্রাণো অর্থাৎ তুমি প্রাণনামক বায়ু ইত্যাদি অভিমন্ত্রের দ্বারা সোমোত্মানবিশেষ এই গ্রহগুলি গ্রহণ করা কর্তব্য। (প্রকারান্তরে প্রাণগ্রহের প্রশংসা)-জ্যেষ্ঠা বা এতান্ ব্রাহ্মণাঃ ইত্যাদি অর্থাৎজ্যেষ্ঠ ব্রাহ্মণগণের ন্যায় সকল দিকের অভিজিৎ (জয়কারী) হবো ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা এই গ্রহগুলি গ্রহণ করলে জ্যেষ্ঠত্ব প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং নানাদিকে অবস্থিত পুরুষগণ অধীনস্থ হয় (পুরুষস্তস্য ভবতি)। (প্রাণগ্রহপর্যায়ের সংখ্যাবিধি কথিত হচ্ছে)–অয়ং পুরো ভুব ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা প্রথম পর্যায়, অয়ং দক্ষিণা বিশ্বকর্মা ইত্যাদির দ্বারা দ্বিতীয়, অয়ং পশ্চাদ্বিশ্বব্যচা ইত্যাদির দ্বারা তৃতীয়, ইদমুত্তরাৎ সুবরিতি ইত্যাদির দ্বারা চতুর্থ, এবং ইয়মুপরি মতিরিতি ইত্যাদির দ্বারা পঞ্চম–এই পঞ্চবিধ গ্রহণের দ্বারা সর্বদিকে (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম ও উধ্বে) সমৃদ্ধি লাভ করা যায়। মস্তক ইত্যাদিতে অবস্থিত সপ্তসংখ্যক ছিদ্রে (অর্থাৎ দুটি কর্ণ, দুটি চক্ষু, দুটি নাসারন্ধ্র, ও মুখগহ্বর) এবং নিম্নভাগে অবস্থিত দ্বিসংখ্যক ছিদ্রে (অর্থাৎ পায়ু ও উপস্থ)-দেহের এই নবস্থানে (নয়টি দ্বারা) সঞ্চারিত প্রাণ নবসংখ্যক। এই নিমিত্ত নয়টি উপাংশু (সোমের নিমিত্ত গ্রহপাত্রবিশেষ) গ্রহণের দ্বারা যজমানে সেগুলি (প্রাণগুলি) স্থাপন করা হয়। সম্বৎসর সত্রের প্রথম দিনটিকে প্রায়ণীয় এবং চরম বা শেষের দিনটিকে উদয়নীয় বলা হয়ে থাকে। ঐ প্রায়ণীয় ও উদয়নীয় নামে কথিত উভয় দিনে গ্রহগুলি গ্রহণ করণীয়। তার ফলে সেই গ্রহগুলি প্রাণরূপত্ব প্রাপ্ত হওয়ায় প্রাণের দ্বারা সম্বৎসর আরম্ভ করে এবং প্রাণের দ্বারাই তা সমাপিত করে। (কালান্তর সম্পর্কে কথিত হচ্ছে)–সম্বৎসর সত্রের দ্বাদশদিনের (বিকৃতির কারণে এই সত্রের দশম দিনে প্রাণগ্রহসমূহ গ্রহণ করা কর্তব্য। বামদেব্যাখ্যা (বামদেব্য নামে কথিত) সামের কয়া নিশ্চত্ৰ আ ভুব ইত্যাদি মন্ত্র এর সৃষ্টিস্থান (যোনিঃ)। দশম দিনে সেই স্থান (অর্থাৎ ঐ মন্ত্র) পরিত্যাগ করে অন্য ঋকের দ্বারা (অর্থাৎ অগ্নিং নর ইত্যাদি) সামগান করণীয়। এর ফলে বামদেব্য আপন স্থান হতে চ্যুত হওয়ার কারণে, অর্থাৎ এই চ্যুতিজনিত অপরাধে, প্রজার প্রাণবিনাশের সম্ভাবনা থাকে। এই নিমিত্ত, প্রাণগ্রহের প্রাণরূপত্ব হেতু, দশম দিনে প্রাণগ্রহকে গ্রহণ করলে প্রজাগণের প্রাণ বিনাশপ্রাপ্ত হয় না (প্রজাঃ প্রাণঃ নাপগচ্ছত্তি) ॥১০।
[সায়ণাচার্য বলেন–অথৈকাদশে পাশুকহৌত্রোপযোগিমা উচ্যতে। অর্থাৎ ব্রাহ্মণগ্রন্থে তৃতীয় কাণ্ডে ষষ্ঠ প্রপাঠকে যে পাশুক-হোত্রের মন্ত্রগুলি উক্ত হয়েছে, এই একাদশ অনুবাকে সেই পাশুক-হোত্র উপযোগী অবশিষ্ট মন্ত্রগুলি উক্ত হচ্ছে।]
মর্মার্থ- হে ঋত্বিক-যজমানগণ! জাবেদা (অর্থাৎ উৎপন্ন হওয়া মাত্রই জগতের সবকিছু যিনি বিদিত) দেবতার প্রকাশরূপকে বিবেকের সাথে যুক্ত হয়ে পোষণ করুন। (জাবেদা নামে অবিহিত সেই দেবতার জ্ঞানময় স্বরূপকে আপন তত্ত্বজ্ঞানের দ্বারা ধারণ করুন)। সেই জাতবেদা আদরযুক্ত হয়ে আমাদের প্রদত্ত হবিঃ বহন করুন। সেই (জাতবেদা) অগ্নি যজ্ঞের নিমিত্ত উত্তরবেদির প্রতি প্রকর্ষের সাথে অনীত হচ্ছেন। (কীরকম অগ্নি? না, তিনি দেবনাত্মন অর্থাৎ দেবতাগণের অভিলাষী, তিনি হোতা অর্থাৎ হোমের নিম্পাদক; রথ যেমন তাতে (অর্থাৎ রথে) আরোহিত পুরুষকে ভূমি হতে পৃথক করে গ্রামে নয়ন করে (বা নিয়ে যায়), সেইরকম এই হবি আপনার উদ্দেশে আহুত হবিঃ অপর হবিঃ হতে পৃথক করে দেবগণের উদ্দেশে নয়ন করেন। (যজ্ঞে অগ্নির উদ্দেশে এবং অপরাপর দেবতাগণের উদ্দেশে হবিঃ নির্বপণ করা হয়। অগ্নিদেব তার আপন হবিঃ ও দেবগণের উদ্দেশে প্রদত্ত হবিঃ পৃথক করেন। তিনি তার উদ্দেশে প্রদত্ত হবিঃ স্বয়ং গ্রহণ করেন, এবং দেবগণের উদ্দেশে প্রদত্ত হবিঃ দেবগণের নিকট বহন করে নিয়ে যান। এই থেকেই তার হব্যবাহ নামের সার্থকতা প্রতিপন্ন হয়েছে)। যজমানের দ্বারা স্বীকৃত, ঘৃণীবা অর্থাৎ রশ্মিযুক্ত, এই হেন অগ্নি নিজেই যজমানের ভক্তি জ্ঞাত আছেন। অমৃত পান করে (দেবগণ) যেমন মরণ রহিত হয়ে প্রবর্তন করেন (চালিত থাকেন), সেইরকম এই অগ্নি জন্ম মাত্রই প্রবুদ্ধ (জ্ঞানী) হতে ইচ্ছা করেন। এই দেব জীবনৌষধির নিমিত্ত (জীবন রক্ষার নিমিত্ত ঔষধি প্রাপ্ত হয়ে বলবা অপেক্ষাও অতিপ্রবল হয়েছেন (বলবতোহপি অতিপ্রবলঃ কৃতঃ) এই প্রবল অগ্নি তখন স্বয়ং বিনাশরহিত হয়ে জীবিত থাকেন এবং যজ্ঞনিম্পাদনের নিমিত্ত যজমানকেও জীবিত রাখেন। হে জাতবেদা অগ্নিদেব! হবিঃ বহনের নিমিত্ত আমরা নিরন্তর আপনাকে স্থাপন করছি। (কোথায় স্থাপন করছি? না, পৃথিবীর উপরে নাভিসদৃশ (প্রধানভূত) আহবনীয় আয়তনে অর্থাৎ স্থানে, যেস্থান গোষ্পদ-তুল্য ঘৃতযুক্ত তথা ঘৃতাহুতিযুক্ত, সেই স্থানে, স্থাপন করছি)।
হে অগ্নি! আপনার সেনারূপ দেবতাগণের মধ্যে আপনি মুখ্য, আপনি আপনার উৎপত্তিস্থল (যোনিং) লাভ করুন। (কীরকম স্থল? না,) ঊর্ণাবন্তং অর্থাৎ যে স্থান কম্বলের আস্তরণের মত মৃদু, যে স্থান কুলায়িনং অর্থাৎ পক্ষীগণের দ্বারা সম্যভাবে নির্মিত নীড়ের মতো এবং ঘৃতবন্তং অর্থাৎ ঘৃতাহুতির আধারভূত, এমন স্থল আপনি লাভ করুন। এইরকম আহবনীয়খ্য, কুলায়োপেত ও ঘৃতাহুতির আধার সদৃশ হলে স্থাপিত হয়ে যজ্ঞের অনুষ্ঠাতা যজমানের যজ্ঞ সম্যভাবে সমাপন করুন (সমাপ্তিং গময়)। হে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হোমনিস্পাদক! উত্তরবেদিরূপ আপনার আপন স্থানে (স্বকীয়স্থানে) উপবিষ্ট হয়ে পুণ্যকর্মসাধনের এই যোগ্যস্থানে যজ্ঞকে স্থাপক করুন (স্থাপয়)। আপনি দেবগণের প্রিয় (দেবান্বেতি কামায়ত ইতি দেবাবীদেবপ্রিয়ং); সেই কারণে আপনিও এই হবিঃ দ্বারা দেবতাগণের পূজা করুন। হে অগ্নি! আপনি যজমানে দীর্ঘ আয়ু স্থাপন করুন। (অর্থাৎ যজমানকে দীর্ঘজীবী করুন)।হোতৃসদনে অর্থাৎ হোম-নিম্পাদনের পক্ষে যোগ্য স্থান উত্তরবেদিতে এই অগ্নি উত্তমরূপে উপবিষ্ট আছেন। (কি রকম অগ্নি? না,) তিনি হোতা, অর্থাৎ দেবগণের আহ্বায়ক; তিনি বিদানঃ, অর্থাৎ স্থান সম্পর্কে অভিজ্ঞ; তিনি ত্বেষো, অর্থাৎ দীপ্তিমান; তিনি দীদিবান, অর্থাৎ দেবতাগণের উদ্দেশে হবির দাতা; তিনি সুদক্ষ, অর্থাৎ অত্যন্ত কুশল; তিনি। বশিষ্ঠ, অর্থাৎ অতিশয় বাসপ্রদ; তিনি সহস্রম্ভর, অর্থাৎ সহস্ৰসংখ্যক তথা অগণিত হবির পোষণকারী; তিনি শুচিজিন্তু, অর্থাৎ হোমযোগ্যা শুদ্ধা জিহ্বা তথা জ্বালা বা শিখা সমন্বিত। হে অগ্নি! আপনি দেবগণের দূত হন, আপনি আমাদের সাতিশয়রূপে পালনকর্তা (পালক), আপনি আমাদের এই যজ্ঞকর্মে নিবাসযোগ্য (অর্থাৎ আমাদের এই যজ্ঞে যোগ্যতম অধিষ্ঠাতা)। হে বৃষভ (অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ বা দেবশ্রেষ্ঠ)! আপনি আগত হয়ে আমাদের যাগের প্রবর্তক, আপনি আমাদের অপত্যগণের শরীররক্ষায় অপ্রমাদযুক্ত হোন (অর্থাৎ অপত্যগণের শরীরের বর্ধন রক্ষার ক্ষেত্রে যেন আপনার সকল প্রমাদ নিবারিত হয়); অথবা আপনি দেবতাগণের নিকট হবিঃ উপহার পূর্বক অপ্রমত্তভাবে সকলের পালক হোন। হে সকলের প্রেরক, সকলের রক্ষক, ভজনীয় অগ্নিরূপী পরমেশ্বর! সকল বিঘ্নবিনাশে সমর্থ আপনার প্রসাদ (প্রসন্নতা) যেন সর্বদা প্রাপ্ত হই। মহতী দুলোক ও পৃথিবী, উভয়ে আমাদের এই যজ্ঞ আজ্য ইত্যাদি হোমসাধন দ্রব্যের দ্বারা সিক্ত করুন; ভরণের দ্বারা আমাদের পূরিত করুন। হে অগ্নি! অথবা নামে আখ্যা ঋষি পুষ্করপৰ্ণে অর্থাৎ পদ্মপাতার উপরে আপনাকে নিঃশেষে মথিত করেছেন। (কিরকম পুষ্করপূর্ণ? না,) মুধু অর্থাৎ উত্তমাঙ্গ বা মস্তকের ন্যায় প্রশস্ত (অতিশ্রেষ্ঠ) এবং সর্ব জগতের বাহকের ন্যায় অর্থাৎ এই হেন পুষ্কারপৰ্ণে অগ্নি-মন্থন পূর্বক যজ্ঞনিম্পাদন ইত্যাদির দ্বারা সর্ব জগৎকে বহন করেছেন (সর্বং জগন্নিবহতি)। হে অগ্নি! অথর্বণের পুত্র দধ্য নামক ঋষি আপনাকে প্রজ্বালিত করেছেন (প্রজ্বালিতবা)।(সেই আপনি কীরকম? না) আপনি বৈরিবিনাশক পুরন্দর অর্থাৎ রুদ্ররূপে অসুরসম্বন্ধী তিনটি পুর বা নগরের বিদারক। হে অগ্নি! পাথ্য নামক কোন ঋষি আপনাকে সমিধের দ্বারা (হোম প্রজ্বালনের কাষ্ঠের দ্বারা) সম্যকভাবে প্রজ্বালিত করেছেন। (কিরকম পাথ্য? না,) তিনি শ্রেষ্ঠ। (আপনি কিরকম? না, আপনি দহন্তমং, অর্থাৎ তস্করগণের সাতিশয় হন্তা (বধকারক; আপনি রণে রণে ধনঞ্জয়ং, অর্থাৎ প্রতিটি সংগ্রামে ধনের জেতা (জয়কর্তা)। (অতঃপর অগ্নির জন্ম সম্পর্কিত দুটি ঋক হোতা কৃর্তৃক পঠিতব্য। তারমধ্যে প্রথমটি)–উত ব্রুবন্তু জন্তব.. ইত্যাদি অর্থাৎ সকল প্রাণিগণও পরস্পর, বলাবলি করে থাকে–অগ্নি উৎপন্ন (বা প্রজ্বলিত) হয়েছেন। (কিরকম অগ্নি? না, তিনি বৃত্ৰহা, অর্থাৎ শত্রুঘাতী, এবং তিনি রণে রণে ধনঞ্জয়ঃ, অর্থাৎ যুদ্ধের পর যুদ্ধে ধনজয়কারী।
(অতঃপর দ্বিতীয়টি)–আ যং হস্তে ন খাদিনং ইত্যাদি, অর্থাৎ ঋত্বিক কর্তৃক ধৃত হস্তের ন্যায় পানপাত্রে সদ্য সমুৎপন্ন শিশুর ন্যায় যে অগ্নি হবিঃ ভক্ষণ করে থাকেন, সেই অগ্নিকে আমরা সম্মুখে দর্শন করব। (তিনি কিরকম অগ্নি? না,) তিনি প্রজাগণের প্রতি সম্যকরূপে অহিংসক। (এই অগ্নির সাথে পুর্বগ্নির মেলনে হোতা কর্তৃক ছয়টি মন্ত্র পঠিতব্য। তার প্রথমটি)–প্র দেবং দেববীতয়ে ইত্যাদি, অর্থাৎ হে ঋত্বিকগণ! দেবতাগণের হবিঃ ভক্ষণের নিমিত্ত (হবিঃস্বাদনায়) হবিঃ-লক্ষণরূপ ধনে অভিজ্ঞ (হবিলক্ষণ ধনাভিজ্ঞম) দীপ্তিমন্ত অগ্নিদেবকে আপনারা প্রকর্ষের সাথে পোষণ করুন; এবং সেই দেব আগত হয়ে পূর্বাগ্নিরূপে আপন স্থানে প্রবিষ্ট হোন। (দ্বিতীয়)–আ জাতং জাতবেদসি ইত্যাদি, অর্থাৎ হে ঋত্বিকবর্গ! ইদানীং (সম্প্রতি) জাত এই প্রিয় অতিথিরূপী অগ্নিকে পূর্ব হতে স্থিত গৃহপতি (অর্থাৎ সর্বতোভাবে গৃহের পালক) জাবেদা অগ্নির নিকট সুখরূপে শয়ন করিয়ে দিন (অর্থাৎ উভয়কে মিলিত করিয়ে দিন)। (তৃতীয়)–অগ্নিনাইগ্নিঃ সমিধ্যতে ইত্যাদি, অর্থাৎ পূর্বসিদ্ধ (অর্থাৎ পূর্ব হতেই নিত্যরূপে স্থিত) অগ্নির সাথে ইদানীং আনীত অগ্নি সম্যকরূপে প্রজ্বালিত হোন। (কিরূপ এই অগ্নি? না,) এই অগ্নি সম্যকরূপে প্রজ্বলিত হোন। (কিরূপ এই অগ্নি? না,) এই অগ্নি কবি, অর্থাৎ বিদ্বান; গৃহপতি, অর্থাৎ গৃহের পালয়িতা; ইনি যুবা, অর্থাৎ নিত্যতরুণ; ইনি হব্যবাট, অর্থাৎ হব্য বহনকারী, ইনি জুব্বাস্য, অর্থাৎ জুহুর (জুহু নামক যজ্ঞপাত্রবিশেষের) ন্যায় মুখযুক্ত। (চতুর্থ)–ত্বং হ্যগ্নে অগ্নিনা ইত্যাদি, অর্থাৎ হে নূতন অগ্নি! আপনি পূর্বের অগ্নির সাথে প্রজ্বালিত হন। (আপনি কিরূপ? না, আপনি ব্রাহ্মণজাত্যভিমানী হয়ে তাদের সকল বিনাশ রহিত করে সর্বদা তাঁদের সখার ন্যায় প্রীতিযুক্ত হয়ে থাকেন; এবং আপনি বিপ্রগণের দ্বারাও সমপ্রাণযুক্ত (বিপ্ৰেণ সতা সখ্যা)। (পঞ্চম)–তং মজ্জয়ন্ত সুক্ৰতুং ইত্যাদি, অর্থাৎ হে ঋত্বিকমণ্ডলী! আপনারা এই মথিত অগ্নিকে শোধন করুন (শোধয়ত)। (কিরকম এই অগ্নি? না,) ইনি সুতুং, অর্থাৎ সুষ্ঠুভাবে সোমরসসাধ্য যজ্ঞের নিম্পাদক; ইনি পুরো যাবানমজি্যু, অর্থাৎ সংগ্রামে পুরোভাগে গমনকারী; ইনি স্বেষু ক্ষয়েষু বাজিম, অর্থাৎ যজমানের আপন গৃহে অন্নসম্পাদনকারী। (ষষ্ঠ) যজ্ঞেন যজ্ঞমযজন্ত দেবাস্তানি ইত্যাদি, অর্থাৎ দেবত্ব প্রাপ্তির কামনা পূর্বক যজমানবৃন্দ যজ্ঞ সাধনের দ্বারা নূতন অগ্নির সাথে যজ্ঞসাধন পুরাতন অগ্নির পূজা করছেন (পূজিতবন্তঃ)। তাঁদের মিলিত অর্থাৎ অগ্নিদ্বয় সাধ্য সুকৃতসমূহ অর্থাৎ পুণ্যকর্মসমূহ মুখ্যত্ব লাভ করেছিল (প্রথমান্যা সন্মুখ্যান্যভব। মহান্ত যজমানগণ সেই স্বর্গলোকের সেবা করছেন (সমবয়ন্তি), যে স্বর্গলোকে পূর্বে যজমানগণ ও সাধ্যফলযুক্ত (সাধ্যফলোপেতা) দেবতাবর্গ দেবত্ব লাভ পূর্বক (দেবা ভূত্বা) স্থিত আছেন ॥১১।
তৃতীয় অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৫২
অনুবাক-৫২
মর্মার্থ- হে অগ্নি! যে। যজমানকে আপনি সখাবৎ স্নেহে পালন করেন, সেই যজমান প্রকৃষ্ঠভাবে সংসারক্লেশ অক্রিম করে থাকেন। কিভাবে? না–আপনার পালনের দ্বারা তিনি শোভন পুত্র ইত্যাদি যুক্ত হতে পারেন, যজ্ঞকর্মানুষ্ঠানকারী হতে পারেন, অন্নের নিমিত্ত কর্মানুদ্যোগী হতে পারেন; তারই ফলে তিনি সংসারক্লেশ অতিবর্তন করতে সক্ষম হন। হে ঋত্বিকগণ! আপনারা পূর্ববর্তী ঋষিবর্গের দ্বারা (বৃহৎপ্রৌঢ়ং) অগ্নির উদ্দেশে সেই স্তুতিরূপ বাক্য বলুন, যা আমাদের পালনের নিমিত্তই রচিত, আমাদের হিতের নিমিত্তই উচ্চারিত এবং আমাদের দ্বারাই হোমনিস্পাদক। হে অগ্নি! আপনার অনুরূপ তিনটি পুরোডাশ বর্তমান; পরস্পরযুক্ত লোকত্রয় রূপ আহবনীয়, গার্হপত্য ও দক্ষিণাগ্নি তিনটি বাসস্থান বর্তমান। হে ঋতজাত (সত্যরূপ জ্ঞান হতে জাত) অগ্নি! আপনার পূর্বাসিদ্ধা (পূর্বীঃ) তিনটি জিহ্বা–সাত্ত্বিক, রাজস ও তামসরূপা–ইষ্টপ্রাপ্তি, অনিষ্ট পরিহার ও আভিচারিক কর্মের হেতুভূত। (অগ্নির সাত্ত্বিক শক্তিসম্পন্ন রসনারূপ প্রজ্বলনে যজমানের ইষ্টপ্রাপ্তি ঘটে, রাজসিক-শক্তিসম্পন্ন রসনারূপ প্রজ্বলনে যজমানের অনিষ্ট দূরীভূত হয়, তামসিক-শক্তিসম্পন্ন রসনারূপ প্রজ্বলনে যজমানের আভিচারিক-ক্রিয়া অর্থাৎ অপরের মারণ, বশীকরণ ইত্যাদি সংঘটিত হয়। এগুলি সবই পূর্ব হতেই নিম্পাদিতব্য বা নির্ধারিত)। আরও, দেবগণ কর্তৃক পূর্বলব্ধ অগ্নি, বিদ্যুৎ ও আদিত্যরূপ যে তিনটি তনু আছে, সেই তনুর দ্বারা আমাদের রক্ষা করুন (অস্মান পাহি)। হে ইন্দ্র ও বিষ্ণু! আমরা এই কর্মের দ্বারা আপনাদের সম্যকভাবে প্রীত করছি, এবং এই হবিলক্ষণ অন্নের দ্বারা আপনারা প্রীতি প্রাপ্ত হোন। (কি নিমিত্ত? না)–আপনারা আমাদের এই যজ্ঞের সেবা করবেন, আমাদের ধন বা বাঞ্ছিত সামগ্রী দান করবেন এবং বিনাশরহিত এই অনুষ্ঠানের পথে আমাদের কর্মের পার প্রাপ্ত করুন (অর্থাৎ কর্মরূপ সমুদ্রের পরপারে উত্তীর্ণ করে দিন)। হে বিষ্ণু ও ইন্দ্র!
আপনাদের উভয়ের মধ্যে কেউ কখনও পরাজয় প্রাপ্ত হন নি; আপনারা উভয়ে যখন পরস্পর স্পর্ধা করেছিলেন, তখন দক্ষিণস্বরূপে দাঁতব্য সহস্র গো ত্রিধাবিভক্ত করে নিয়েছিলেন। (অয়ং চ বিভাগঃ সপ্তমকাণ্ডে স্পষ্টমান্নাতঃ–অর্থাৎ এই বিভাগের কথা সপ্তম কাণ্ডের স্পষ্টরূপে কথিত হয়েছে)। হে জাতবেদা! আপনার আয়ুবৃদ্ধিকারণের নিমিত্ত সোম, সান্নায্য (মন্ত্র ইত্যাদির দ্বারা সংস্কার্য ঘৃত প্রভৃতি), ও পুরোডাশরূপ তিনটি হবি আছে। হে অগ্নি! ঊষাকালসদৃশ (দিবসের প্রথমেই) আবির্ভারূপ আহবনীয় ইত্যাদি তিনটি স্থানে (অর্থাৎ আহবনীয়, গার্হপত্য ও দক্ষিণাগ্নিতে) ত্রিবিধ জ্বালার দ্বারা না অর্থাৎ দেবগণের রক্ষাকারক হবির দ্বারা যাগ করুন (হবিৰ্বিৰ্ধান্যক্ষি যজ)। অনন্তর যজমানের পক্ষে সুখপ্রদ ও দুঃখবিয়োজক (দুঃখবিহীনকারী, হোন। কবি অর্থাৎ বিদ্বান এই অগ্নি এই যজ্ঞে তিন রকম হবিঃ সর্বতোভাবে প্রাপ্ত হন। সেই অগ্নি এই কর্মে একাদশ দেবতার সাথে তিন গণের তর্পন করুন (তপয়ত্বিতি)। [একাদশ দেবতা, তিন গণ ইত্যাদির ব্যাখ্যা ১ম কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকে ১০ম, ১১শ ইত্যাদি অনুবাকে দ্রষ্টব্য]। দেবতাগণের দূতরূপ ব্রাহ্মণজাত্যাভিমানী এই অগ্নি আমাদের প্রীতি সম্পাদিত করুন। কিরকম অগ্নি?-না, পরিষ্কৃত দূচিহ্নসমূহে অলঙ্কৃত। তিনি আমাদের সর্ব কুৎসিত শত্রুগণকে বিনাশ করুন। [ অন শব্দের দ্বারা শত্রু, ক-প্রত্যয় কুৎসিত অর্থে ও সম শব্দের দ্বারা সর্ব বোঝায় ]। হে ইন্দ্র ও বিষ্ণু (ইন্দ্রাবিষ্ণু)! শম্বর নামক অসুরের সম্বন্ধি নগরী আপনারা বিনাশ করেছেন। কিরকম নগরী?-না, নব নবতিং চ অর্থাৎ নিরানব্বই সংখ্যক এবং দৃংহতা অর্থাৎ সুদৃঢ়া। সেই অসুরকে তার দীপ্তমত শত সহস্র বীরগণকে পরহিত করে (অর্থাৎ তার পক্ষীয় প্রধানভূত অমাত্য ইত্যাদি সহ) বিনাশ করেছেন। ইন্দ্র দেবের মাতা মহান্ত ইন্দ্রদেবকে জ্ঞাপন করেছিলেন–হে পুত্র ইন্দ্র! শত্রুদের বিনাশপূর্বক তুমি তুষ্ণিক থাকলে (অর্থাৎ নীরব হলে) দেবগণ তোমাকে পরিত্যাগ করে। (অর্থাৎ দেবগণ বুঝতেই পারেন না যে, তুমিই শত্রুদের নিধন পূর্বক তাঁদের রক্ষা করেছ)। অতঃপর মাতার দ্বারা বোধিত হয়ে ইন্দ্র বৃত্রকে বধের নিমিত্ত উদ্যত হয়ে বিষ্ণু প্রতি এইরকম বলেছিলেন, হে সখা বিষ্ণু! তোমার বিশিষ্টতর বিক্রমের দ্বারা শীঘ্র বৃত্রকে বধ করো। তথাবিধ হে ইন্দ্র ও বিষ্ণু! আপনারা আমাদের অভীষ্ট সম্পাদন করুন ॥১১।
মর্মার্থ– প্রেরণকর্তা (পরমেশ্বর) প্রথমে অগ্নিচয়ন বিষয়ে মনোনিবেশ পুর্বক সকল কর্মের সফল প্রকাশ সাধনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে অগ্নিকে পৃথিবীতে আনয়ন করেন। অনন্তর সেই অগ্নিমুখে উখারূপে (পাকপাত্র অর্থাৎ হাঁড়ীরূপে) এই পৃথিবীকে স্থাপিত করে এই হোমানুষ্ঠান করছি। সবিতাদেব (অর্থাৎ সেই পরমেশ্বর) চপল বা চঞ্চল ইন্দ্রিয়বিশেষগুলিকে প্রকর্ষের সাথে সংযত করে স্বর্গপ্রাপ্তির কামনায় বর্ধমান অগ্নিকে ইষ্টক ইত্যাদি বিষয়ক প্রজ্ঞার দ্বারা প্রকাশের নিমিত্ত দ্যোতমান্ করে প্রেরণ করেছেন। সেই সবিতাদেবের প্রেরণায় বিষয়সমূহ হতে মনকে নিয়মিত (সংযত করে স্বর্গলোকে গীয়মান্ (প্রশংসিত) এই অগ্নির সম্পাদনের নিমিত্ত আমরা সমর্থ হবো (গীয়মানস্যাগ্নেঃ সম্পাদনায় শক্ত্যা ভুয়াম্ম)। যজমান্ সম্বন্ধী ব্রাহ্মণ ঋত্বিকগণের অনুগ্রহে প্রথমে আপন মন বিষয়সমূহ হতে নিবর্তিত হয়; এবং ইষ্টক ইত্যাদি বিষয়ক জ্ঞানসমূহ সম্পাদিত হয়। (কিরকম বিপ্রগণের? না,) প্রভূত অগ্নিচয়নে উদ্যোগী, অর্থাৎ অগ্নির প্রয়োগে অভিজ্ঞ। সেই বিপ্রগণ হোমানুষ্ঠানের কর্মে আলস্যরহিত। তারা জানেন যে, ঋত্বিক যজমানগণের আভপ্রায় সম্পর্কে অভিজ্ঞ (বয়ুনাবিৎ) সেই এক ও অদ্বিতীয় সবিতাদেব হতেই সবকিছু নির্মিত হয়েছে। সর্ব বেদে শায়মাণা মহতী স্তুতিসমূহ সেই পরমেশ্বর সবিতাদেবের উদ্দেশেই ধ্বনিত (বা সম্পাদিত)।–হে যজমানদম্পতি! আপনাদের রথে (চলার পথে) পূর্ববর্তী মহর্ষিগণের দ্বারা অনুষ্ঠিত ব্রাহ্মণ পরিবৃত অগ্নিচয়ন নামে আখ্যাত কর্ম নমস্কারপূর্বক সম্পাদিত করছি (সম্পাদয়ামি)। সেই সম্পাদনের ফলে আপনাদের কীর্তি ভূলোকে নানাভাবে প্রসারিত হবে; (তার দৃষ্টান্ত)–যেমন অন্তরীক্ষ হতে প্রসারিত পথ ধরে সূর্যরশ্মি (সুরাঃ) প্রসারিত হয়ে আসে, সেইভাবে। অধিকন্তু, অমৃতের প্রজাপতিরূপ পুত্রগণ, অর্থাৎ দেবতাগণ, যাঁরা দিব্যলোকেও স্থিত হয়ে আছেন, তাঁরাও সকলে যজমানের সেই কীর্তিকথা শ্রবণ করতে পারবেন। যে প্রেরক পরমেশ্বর (সবিতাদেব) পৃথিবীগত অনুপরমাণু-বিশেষকে গণনা করে নিশ্চিত হয়েছেন, (অর্থাৎ নির্ভুলভাবে গণনা করেছেন), যে সবিতাদেবের মহত্ত্ব সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে আছে, সেই সবিতাদেবের মহিমার অর্চনা পূর্বক অন্য সকল দেবতা তার অনুগমনে প্রবৃত্ত হয়ে থাকেন।–হে সবিতাদেব! আপনি সৌভাগ্যের নিমিত্ত (ভগায়) প্রকৃষ্টরূপে যজ্ঞের প্রবর্তন (বা প্রেরণ) করুন এবং যজ্ঞপতি অর্থাৎ যজমানকে প্রেরণ করুন। স্বর্গস্থিত কোন গন্ধর্ব পরকীয় চিত্তে বর্তমান জ্ঞানের বিভ্রান্তি পরিহার পূর্বক যেমন শোধন করেন, সেইভাবে তিনি আমাদেরও চিত্তস্থায়িনী জ্ঞানের ভ্রান্তি পরিহার পূর্বক (দূরীভূত করে) শোধিত করুন। বাচস্পতি অদ্য এই কর্মসমূহে (যজ্ঞে) আমাদের বাক্য (মন্ত্র) আস্বাদন করুন (স্বদয়তু)। হে সবিতাদেব! আমাদের এই যজ্ঞ প্রবর্তন (বা প্রেরণ) করুন। (কীরকম যজ্ঞ? না,) যে যজ্ঞ দেবতাগণের সাথে যুক্ত বা মিলিত হবে, যে যজ্ঞ স্বনিম্পাদক যজমানের বেত্তা বা সখ্যবৎ, যে যজ্ঞ দ্বাদশাহ সত্ৰসমূহের দ্বারা ব্যাপ্ত, যে যজ্ঞ তার সাধনের ফলস্বরূপ ধনজয় (অর্থাৎ ধনপ্রাপ্তি) ও স্বর্গজয় (অর্থাৎ স্বর্গলাভ) সম্পাদন করে।–হে অগ্নি! সামাধারভূত স্তোত্ৰসমূহকে ঋক-আবৃত্তিরূপে সমৃদ্ধ করুন। গায়ত্রী সামের সাথে রথন্তর সামের সমৃদ্ধি করুন (সমৰ্দ্ধয়)। যে বৃহৎসামের পথ হলো গায়ত্রীসাম (বৃহৎসামস্তগায়ত্রবর্তনি), সেই গায়ত্রীসামের সাথে বৃহৎসামকে সমৃদ্ধ করুন।–হে অত্রি (মৃত্তিকা খননের নিমিত্ত কাষ্ঠনির্মিত কুদ্দাল বা কোদাল)! সবিতাদেবের প্রেরণায় অশ্বিযুগলের (অশ্বিনীকুমার নামে অভিহিত দুই দেববৈদ্য দেবতার) বাহুযুগলের (কক্ষ বা বগল থেকে মণিবন্ধ পর্যন্ত দুই বাহুর) দ্বারা, পূষাদেবতার হস্তদ্বয়ের (মণিবন্ধ থেকে অঙ্গুলী পর্যন্ত দুই হস্তের) দ্বারা, অঙ্গিরা ঋষিগণ প্রথম যেরূপ প্রথম গায়ত্রীছন্দে (বা মন্ত্রে) তোমাকে গ্রহণ করেছিলেন, সেই রূপে গায়ত্রীছন্দে তোমাকে গ্রহণ করছি। তোমার কোন শত্রু নেই (ন বিদ্যতে অরির্যস্যাস্তব…)। হে শত্রুরহিত অভ্রি! পৃথিবীর ক্রোড় (উৎসঙ্গ) হতে পাংসু (অর্থাৎ শুষ্ক মৃত্তিকারূপ অগ্নি স্থাপন করো। (অর্থাৎ শুষ্ক মৃত্তিকা খনন করে তার দ্বারা উখা অর্থাৎ উনান নির্মাণ করে সেখানে অগ্নি প্রজ্বলন করা বা করব)। (এখানে অগ্নিচয়ন প্রকরণে সর্বত্র মৃত্তিকা ও অগ্নিকে অভিন্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছে–অয়ং চোপচারোইগ্নিচয়নপ্রকরণে সর্বত্রানুবর্তিষ্যতে)। হে অত্রি! তুমি মৃৎসম্পাদন- কুশল, তোমার কোন শত্রু নেই। তোমার সহায়তায় আমরা পৃথিবীর উৎসঙ্গ খননে সমর্থ হবো। অঙ্গিরা ঋষিগণ যেরূপে প্রথম জগতী ছন্দে (বা মন্ত্রে), ত্রিষ্টুপছন্দে (বা মন্ত্রে) এবং অনুষ্টুপ ছন্দে (বা মন্ত্রে গ্রহণ করেছিলেন, সেইভাবে আমরাও তোমাকে জগতী, ত্রিষ্টুপ ও অনুষ্টুপ ছন্দে গ্রহণ করছি। অতঃপর এই তিন ছন্দের সহায়তায় তোমার সাথে যুক্ত হয়ে আমরা পৃথিবীর উৎসঙ্গ খনন করে (উখা নির্মাণপুর্বক) অগ্নির আহরণে (বা স্থাপনে) সমর্থ হবো। প্রেরক পরমেশ্বর (সবিতাদেব) পুরাকালে সুবর্ণনির্মিত অভ্রি আপন হস্তে ধারণ করেছিলেন। অতএব তুমি সেই হিরন্ময় অভ্রির সাথে যুক্ত হয়ে সর্বদা জ্যোতিঃ প্রকাশমান অগ্নিকে খনন করো, অর্থাৎ অগ্নিরূপ মৃত্তিকা খনন করে আমাদের নিমিত্ত আনয়ন করো (অম্মদৰ্থমাভরাহনয়)। [এই অনুবাকে ব্যাখ্যাত মন্ত্রাংশগুলি পরবর্তী কাণ্ডের প্রথম প্রপাঠকের অনুবাক-১
ের সাথে সংশ্লিষ্ট ॥১॥
[সায়ণাচার্য বলেন–দ্বিতীয়ে মৃদাক্রান্তিরুচ্যতে। অর্থাৎ, এই অনুবাক-২ মৃত্তিকার আক্রমণের বিষয় কথিত হয়েছে।]</string>
মর্মার্থ– পূর্বে মহর্ষিগণ অশ্বের আগমনের নিমিত্ত (অর্থাৎ অশ্বকে আনয়নের নিমিত্ত) এই রশনা (লাগাম) গ্রহণ করেছিলেন, যে রশনা জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞের পরিসমাপ্তি পর্যন্ত ঋত্বিক ও যজমানের প্রবৃত্তির (নিযুক্ত থাকার কথা জ্ঞাপিত করে (প্রবৃত্তিমারপন্তী কথয়ন্তী), সেই রশনার দ্বারা পুরাকালে দেবগণ সোমযাগ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সেই রকমেই (অর্থাৎ যাগপ্রাপ্তির উদ্দেশে) এই রশনা গৃহীত হয়। (রশনার দ্বারা বদ্ধ অশ্বকে মৃত্তিকা খননের স্থানে আনয়ন পূর্বক তার আক্রমণে অর্থাৎ পাদঘর্ষণের দ্বারা উৎখাত মৃত্তিকার দ্বারা নিষ্পন্ন উখাতে বা উনানে অগ্নি উৎপন্ন পূর্বক ইষ্টকোচিত দেশে, অর্থাৎ যেন ইষ্টকের দ্বারা নির্মিত এমন স্থানে, ঋত্বিকগণ জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে থাকেন (ঋত্বিগভিরনুষ্ঠেয়াঃ)। যজ্ঞের যে অঙ্গ মরহিত ব্যাপারের বা কর্মের দ্বারা সম্পন্ন হয়, যজ্ঞসম্বন্ধি সেই অঙ্গ সমৃদ্ধিহীন হয়। সেই কারণে এই মন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক রশনা গ্রহণ কর্তব্য–হে অশ্ব (বাজি)! পাষাণ ইত্যাদির অভাবের কারণে অতি প্রশস্ত বা বরিষ্ঠ ভূমি অতিক্রম করার নিমিত্ত তুমি আগত হও। দ্যুলোকে পরম উৎকৃষ্ট রোহিত ইত্যাদি দেবশ্বরূপে তোমার জন্ম সাধিত হয়েছে; অন্তরীক্ষলোকে নিযুৎ নামক বায়ুর অশ্বরূপে রথ বহন করে তুমি সঞ্চরণ করো, এই পৃথিবীর ভূমির উপর তোমার নিবাসস্থান, তা প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করা যায়। অতএব তুমি শীঘ্ৰ আগমন করো। এই শীঘ্র আগমনের স্বরূপভূত মন্ত্রের দ্বারা অশ্বের মহিমা প্রকাশিত হয়েছে। –হে যজমান-দম্পতি! আপনারা আমাদের মঙ্গলকারী অগ্নিরূপ মৃত্তিকা বহনরূপ নিয়মবিশেষের নিমিত্তভূত (অর্থাৎ বহনসমর্থ) এই গর্ভকে বশনার দ্বারা বদ্ধ করুন; আপনারা যাগ নিম্পাদনের দ্বারা ফল-অভিবর্ষণের নিমিত্তভূত ধনবর্ষণকারী। রথবহন যোদ্ধৃবহন বা এই অশ্বের যোগ্য অপরাপর প্রতিটি কর্মের দ্বারা ইন্দ্রিয় অবরোধ (বা রক্ষা) ও অন্ন প্রাপ্তির নিমিত্ত পরস্পর সখ্যতাবদ্ধ আমরা (অর্থাৎ এই ঋত্বিক ও যজমানগণ) বলশালী অশ্বের আহ্বান করছি। হে অশ্ব! পাপরূপ শত্রুবর্গের দ্বারা কৃত বিঘ্নসমূহ পরিহার পূর্বক, পশুস্বামী রুদ্রদেবের গাণপত্য হতে আমাদের সুখ সম্পাদিত করে, বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষ অভিলক্ষিত করে (অনুবীক্ষ্যেহি), গো-সমূহের স্বস্তি বিধান করে (অর্থাৎ ব্যাঘ্র ইত্যাদি হতে গাভীগণের আক্রমণের শঙ্কা পরিহার করে), তুমি আগমন করো। হে অশ্ব! পূদেবতার সাথে পৃথিবীর ক্রোড় হতে পুরীষায়তন অর্থাৎ শুষ্ক মৃত্তিকারূপ অগ্নি আহরণের নিমিত্ত আগত হও। (পোষাক-দেবতা পূষা উপদ্রব পরিহারের দ্বারা মার্গসমূহের সম্যক্ পরিচালক; সেই কারণে তাঁর সাহচর্যের কথা উক্ত হয়েছে)। প্রথমে অঙ্গিরা ঋষিগণ যেমন তোমাকে আহ্বান করেছিলেন, সেইভাবে আমরাও তোমাকে আহ্বান করছি। (এই ব্যাখ্যাত মন্ত্রাংশ পরবর্তী কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ২য় ও ৩য় অনুবাকের সাথে সংশ্নিষ্ট। অপরাংশ পূর্বে ব্যাখ্যাত) ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন-তৃতীয়ে খননমভিধীয়তে। অর্থাৎ এই অনুবাক-৩ ে মৃত্তিকার খননকার্য সম্পকীত বিষয় কথিত হয়েছে]।
মর্মার্থ- প্রেরক পরমেশ্বরের (সবিতার) প্রেরণায় অশ্বিদেবতাযুগলের বাহুদ্বয়ের দ্বারা ও পূদেবতার হস্তদ্বয়ের দ্বারা আমরা সেইভাবে পৃথিবীর ক্রোড় হতে অগ্নিস্বরূপ শুষ্ক মৃত্তিকা খনন করছি, যেভাবে প্রথম অঙ্গিরা ঋষিগণ করেছিলেন। হে অগ্নি! পৃথিবীর উপরিপ্রদেশে শুষ্ক মৃত্তিকাযোগ্য (পাংসুযোগ্যম) যে আপনাকে অঙ্গিরা ঋষিগণ প্রথম খনন করেন, (এবং বর্তমানে আমরা যে আপনাকে খনন করছি), সেই আপনি জ্যোতিৰ্ম্মন্ত (অর্থাৎ শিখাযুক্ত বা দীপ্তিবিশিষ্ট), সুপ্রতীক (অর্থাৎ সুমুখ বা সুন্দর অবয়বশালী), নিরন্তর অজস্র রশ্মির দ্বারা প্রকাশমান, প্রজাবর্গের উপকারার্থে শান্তমত (শিব, মঙ্গলময়) এবং হিংসাকর্ম রহিত।–হে পদ্মপত্র (পুষ্করপর্ণ)! তুমি জলের উপরিভাগে ভাসমান (বা সবিস্তারমত); অগ্নিসাধন মৃত্তিকা প্রভূত ভাবে (বহুলং) পূর্ণ করতে সমর্থ; জলের ন্যায়ই বিনাশহীন; দিনে দিনে বৃদ্ধিযুক্ত, নির্লেপত্বের কারণে (কোনকিছুর সাথে নিঃসম্পর্ক হেতু) পূজনীয়, অগ্নির নিম্পাদনের দ্বারা পুষ্টিকর–এইরকম যে তুমি, আকাশ অপেক্ষাও অধিক পরিমাণে বিস্তৃত হও।–হে কৃষ্ণজিন ও পুষ্করপর্ণ! তোমরা উভয়ে সুখকর হও এবং কবচের ন্যায় রক্ষকও হও (কবচবদ্রক্ষকে অপি ভবথঃ)। (কিরকম? না,) ছিদ্ররহিত বহুল বিস্তীর্ণ কৌটা ইতাদির মতো আচ্ছাদক হও (আচ্ছাদনপ্রকারবতী পুটিকাদিসদৃশ)। এইরকম তোমরা সম্যকরূপে মৃত্তিকাকে আচ্ছাদিত করে থাকো। অতএব (এই স্থলে) শুষ্ক মৃত্তিকারূপ অগ্নিকে ধারণ করো (বা আছাদিত করো)। হে কৃষ্ণাজিন ও পুষ্করপর্ণ! তোমরা স্বয়ং পরনিরপেক্ষ, বক্ষসদৃশ তোমাদের স্বরূপের বা দেহের দ্বারা সম্যকরূপে আচ্ছাদন করো। (তোমরা কীরকম? না,) তোমরা সুবর্বিদা, অর্থাৎ স্বর্গলাভ সাধনের উপায়ভূত, সমীচীনরূপ মৃত্তিকা বন্ধনের অনুকুল, অন্তরে বা আপন উদরে নিরন্তর জ্যোতিষ্মন্ত অগ্নিকে ধারণ করে আছ।–হে খনন-প্রদেশ (যজ্ঞভূমির খননযোগ্য স্থান)! তুমি বহুল পরিমিত পাংপুর (শুষ্ক মৃত্তিকার) যোগ্য, অতএব তুমি সকল উখামুখ পূরণ বা ভরণ করো।–হে অগ্নি! অথবা নামক ঋষি প্রথমে আপনাকে নিঃশেষে মথিত করেছিলেন। হে অগ্নি! অথবা নামক ঋষি যে পুষ্করপর্ণের (অর্থাৎ পদ্মপত্রের) উপরে আপনাকে নির্মন্থিত করেছিলেন, সেই পত্র মস্তকের ন্যায় (উত্তমাঙ্গবৎ) প্রশস্ত এবং সর্বজগতের বাহক (বাহকাৎ)। হে অগ্নি! অথর্বণ (বা অথবা) ঋষির পুত্র দধ্য নামক ঋষি আপনাকে প্রজ্বলিত করেছিলেন। (আপনি কিরকম? না,) আপনি বৃত্ৰহনং (অর্থাৎ বৈরিবিনাশক), পুরন্দরং (অর্থাৎ রুদ্ররূপে অসুরগণের তিনটি পুরীর বিদারক)। (রুদ্র অসুরগণের তিনটি পুরীকে একসঙ্গে ধ্বংস করে ত্রিপুরারী নামে অভিহিত হন; অগ্নিও যেন সেই রুদ্রতুল্য অসুরপুরীর ধ্বংসকারী)। হে অগ্নি! পাথ্য নামক কোনও শ্রেষ্ঠ ঋষি আপনাকে প্রজ্বলিত করেছিলেন। (সেই আপনি কিরকম? না,) আপনি দস্যুহমং (অর্থাৎ তস্করগণের অতিশয়ভাবে হত্যাকারী, রণে রণে ধনঞ্জয় (অর্থাৎ যে যে যুদ্ধে আপনি লিপ্ত হয়েছেন সেই সেই প্রতিটি যুদ্ধে আপনি ধনসমূহ জয় করেছেন)। হে হোতই (হোমনিষ্পদক)! আপনি অভিজ্ঞ; যজ্ঞস্থানে উত্তরবেদিরূপ আপনার নিজস্থানে উপবেশন করুন এবং আমাদের এই যজ্ঞ পুণ্যকর্মসম্পাদক যোগ্যস্থানে স্থাপন করুন। আপনি দেবতাগণের প্রিয়, সেই রকমে আপনি হবির দ্বারা দেবতাগণের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠানকারী। হে অগ্নি! আপনি যজমানে দীর্ঘ আয়ু স্থাপন করুন; (অর্থাৎ যজমানকে দীর্ঘ-আয়ু প্রদান করুন)। হোমনিষ্পদকের যোগ্য উত্তরবেদিরূপ স্থানে অগ্নি সম্যক উপবিষ্ট হয়েছেন। (কিরকম অগ্নি? না,) তিনি হোতা (অর্থাৎ দেবগণের আহ্বায়ক), বিদানঃ (অর্থাৎ স্থান সম্পর্কে অভিজ্ঞ), ত্বেষো (অর্থাৎ দীপ্তিমা) দীদিবান (অর্থাৎ দেবতাগণের হবির দাতা) ও সুদক্ষ (অর্থাৎ অত্যন্ত কুশল); তিনি বিনাশহীন যজ্ঞকর্মে প্রকৃষ্টরূপে মতিমান, তিনি বশিষ্ঠ (অর্থাৎ অতিশয় বাসয়িতা বা বাসস্থান বা স্থিতি দানকারী), সহস্রম্ভর (অর্থাৎ সহস্ৰসংখ্যক হবির পোয়ণকারী) ও শুচিজি (অর্থাৎ হোমযোগ্য শিখাবিশিষ্ট)। হে অগ্নি! আপনি এই পুষ্করপর্ণে সম্যক উপবেশন করুন। আপনি অনেক যজ্ঞসাধনের হেতুভূত হওয়ায় মহান; আপনি দেববীতমঃ (অর্থাৎ দেবতার নিকট গমনকারী; এইরকম যে আপনি, দীপ্ত হন। হে মেধাহ্ (অর্থাৎ প্রশস্ত বা উৎকৃষ্ট) অগ্নি! আপনি শান্ত (শমগুণযুক্ত) ধূম বিশেষভাবে সৃজন করুন। হে অগ্নি! আপনি প্রভাতকালে জয়শীলরূপে উৎপন্ন হয়ে থাকেন। (অর্থাৎ দিবার প্রথমেই যাজ্ঞিককে জয়শীল করার নিমিত্ত প্রজ্বলিত হয়ে থাকেন)। হবিঃ-ভক্ষণকারী দেববর্গ ও ঋত্বিক যজমানরূপী মনুষ্যগণ আপনার হিত (মঙ্গল) আচরণ করেন, এই কারণে আপনিও তাদের সকলের হিত সাধন করে থাকেন। নানাবিধ ফলবৃক্ষ সমন্বিত বনে আপনি কোপরহিত হয়ে অবস্থান করুন, অর্থাৎ দাবাগ্নিরপে সেই বন দগ্ধ করবেন না। এই অগ্নি যজমানগণের গৃহে গৃহে উপবিষ্ট। (তিনি কিরকম? না,) সেই অগ্নি সপ্তরত্ন ধারণ করেন। অতএব তিনি সপ্তজিহ্ নামে সর্বত্র প্রসিদ্ধ। (আথবণ অর্থাৎ অথর্ববেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ বলে থাকেন–কালী করালী চ মনোজবা চ সুলোহিতা যা চ সুধুম্রবর্ণা। স্ফুলিঙ্গিনী বিশ্বরূচী চ দেবী লেলায়মানা ইতি সপ্ত জিহ্বা ।–অর্থাৎ অগ্নির সপ্ত জিহ্বা হলেন কালী, করালী, মনোজবা, সুলোহিতা, সুধুম্রবর্ণা, স্ফুলিঙ্গিনী ও বিশ্বরুচী নামে লেলিহমান জিহ্বারূপিণী সপ্ত দেবী)। সেই অগ্নি দেবতাগণের আহ্বাতা (হোতা)। (এই অনুবাকে ব্যাখ্যাত মন্ত্ৰসমূহ পরবর্তী কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ৪র্থ অনুবাকের সাথে সংশ্লিষ্ট) ॥৩॥
[সায়ণাচার্য বলেন–চতুর্থে মৃদাহরণমুচ্যতে। অর্থাৎ, এই অনুবাক-৪ ে মৃত্তিকার আহরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে]
মর্মার্থ- হে পৃথিবী! উর্ধ্বাভিমুখে অবস্থিত (অর্থাৎ উপরিস্থিত) আপনার হৃদয়সদৃশ যে স্থান খনন করা হয়েছে, বিশেষভাবে স্বল্পপরিমিত (বিশেষেণাপ্পীকৃতং) সেই স্থান তৃণ ইত্যাদির সাথে জলপ্রক্ষেপণের দ্বারা বায়ু যথাপূর্ব সম্যক্ করুন (অর্থাৎ সম্যকভাবে পূর্ণ করে দিন)। (সেই বায়ু কিরকম? না,) তিনি মাতরিশ্বা, অর্থাৎ অন্তরিক্ষস্থায়ী হয়ে সর্বপ্রাণীর ইয়ত্তারূপে অবধারণকারী, তিনি দেববর্গের প্রাণরূপে বিচরণকারী।-হে দেবি পৃথিবি! আপনার ও বায়ুর উদ্দেশে বষট্ মন্ত্রে তৃণের মসাথে জল আহুতি প্রদান করছি। (ভূপ্রদেশ খননজনিত কারণে অর্থাৎ হস্ত ইত্যাদি ছেদনজনিত ব্যথা অনুভবের হেতু পৃথিবী ক্রুরা হন। সেই ব্যথা দূর করার উদ্দেশে মৃত্তিকা খননের স্থানে শীতল জল প্রদান কর্তব্য। এইরকম করলে খননের কারণে পৃথিবীর অনুভব্য শোক (বা ব্যথা) প্রশমিত হবে। বায়ু দেবতাগণের প্রাণস্বরূপ হওয়ার নিমিত্ত বায়ুর দ্বারা পৃথিবীর প্রাণসন্ধান সম্পাদিত হয়। বায়ু আকাশ হতে বৃষ্টি প্রচ্যুত করে আনয়ন করেন, (বা বৃষ্টির প্রবর্তন করেন), সেই নিমিত্ত এখানে বায়ুর কথা উল্লেখিত হয়েছে)।–হে অগ্নি! আপনি সুজাত অর্থাৎ সুষ্ঠুভাবে উৎপন্ন। আপনার জ্যোতির সাথে স্বর্গসদৃশ সুখসম্পন্ন কৃষ্ণাজিননির্মিত গৃহে অবস্থানপ্রাপ্ত হোন। হে বিভাবসু (অর্থাৎ দীপ্তিরূপ ধনের অধিপতি)! হে অগ্নি! আপনি বহুরকম কৃষ্ণাজিনরূপ বস্ত্র পরিধান করুন। হে স্বধ্বর (অর্থাৎ সুষ্ঠু যাগনির্বাহক অগ্নি)! আপনি উখিত হোন, এবং উখিত হয়ে কৃপা পূর্বক আমাদের দেবনস্বভাবের দ্বারা ক্রীড়াপর হয়ে পালন করুন। হে অগ্নি! আপনি আপনার বৃহৎ দীপ্তিতে দীপ্যমান হয়ে উঠুন এবং শোভন কীর্তির সাথে সর্ব প্রাণীর দ্বারা দৃশ্যমান হয়ে আগমন করুন। হে অগ্নি! আপনি দ্যাবাপৃথিবীর গর্ভ হতে জাত হয়েছেন (জাতোহসি)। (আপনি কিরকম? না,) আপনি চারু (অর্থাৎ পূজনীয়) ও ভুজামান ওষধিসমূহের জঠরাগ্নিরূপ পোষণকারী। (অর্থাৎ জঠরস্থায়ী অগ্নির দ্বারাই ওষধিসমূহ ভুক্ত হয়ে থাকে)। আপনি চিত্রো (অর্থাৎ নানাবর্ণের জ্বালা বা শিখার দ্বারা বিচিত্ররূপে) ও (সদ্য উৎপরুত্বের কারণে) শিশুরূপে জাত (ইদানীমুৎপন্নত্বাচ্ছিশুঃ), তথাপি আপনি অন্ধকার পরিহার করছেন। এই জগতে শিশু যেমন মায়ের উদ্দেশে ক্রন্দনরূপ আদরের দ্বারা আপন গৃহে গমন করে, সেইরকম আপনিও মাতৃবৎ ওষধির নিমিত্ত অধিক ক্রন্দনাতুর হয়ে প্রকর্ষের সাথে গমন করছেন। অগ্নির হেতুভূত পুরীষের বহনকারীর মতো হে গর্দভ! হে গমনকুশল (অব)! তুমি চলনরহিত (স্থরি), দৃঢ়কায়, শীঘ্র-বেগবান ও অনুপ্রাপ্তির হেতুভূত হয়ে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ পৃষ্ঠে অগ্নির সুখাসন হও (সুখাসনশ্চ ভব)।–হে অঙ্গিরার অগ্নি (অর্থাৎ অঙ্গিরা ঋষিগণের দ্বারা সম্পাদিত অঙ্গসৌষ্টব-সমন্বিত অগ্নি)! আপনি মনুষ্য প্রজাগণের নিমিত্ত শান্ত হোন। অধিকন্তু আপনি দ্যাবাপৃথিবী, অন্তরিক্ষ এবং বনস্পতিগণকে সন্তাপ দেবেন না (মা শুচঃ)। এই তুরগ (অশ্ব) হ্রেষাশব্দ করতে করতে প্রথম গমন করুক। অতঃপর রাসভ (গর্দভ) যথাক্রমে শব্দ করতে করতে গমন করছে, দাহক অগ্নিকে বহন করে যেন তার অপমৃত্যু না ঘটে। হে বৃষণ (সেচনসমর্থ) অশ্ব ও গর্দভ! তোমাদের দুজনের মধ্যে যে গর্দভ, সে অতিশয় উচ্চ (ভূশং) শব্দ করতে করতে রথসদৃশ মৃত্তিকার ভার বহনের নিমিত্ত সুষ্ঠুভাবে প্রযুক্ত হও এবং দুজনের মধ্যে সেই গর্দভ রাজপ্রেরিত দূতের ন্যায় শীঘ্রগামী হয়ে এই স্থান হতে পাংসু বা শুষ্ক মৃত্তিকারূপ অগ্নিকে (পুরীষ্যমগ্নিঃ) বহন করে এবং সেই ভাবে বহন করেও তোমার কোনও যেন ক্ষতি না হয়।–সেচনসমর্থ গর্দভ ফল-অভিবর্ষণে সমর্থ অগ্নিকে বহন পূর্বক গমন করুক। (কীরকম অগ্নি?) যিনি জলগর্ভ মেঘের মধ্যস্থায়ী জলে বিদ্যুঞ্জপে ও সমুদ্রে বড়বাগ্নিরূপে উৎপন্ন (উৎপন্ন)। সেই হেতু, হে অগ্নি! আপনি প্রজনন ইত্যাদি সম্পন্ন হয়ে ঋতের (অর্থাৎ পৃথিবীর) ও সত্যের (অর্থাৎ দ্যুলোকের) প্রতি আগমন করুন। (মন্ত্ৰব্ৰাহ্মণানুসারে, অবশ্যম্ভাবী কৃষি বা শস্য ইত্যাদি ফলের হেতুত্বের কারণে পৃথিবীকে ঋত এবং অবশ্যম্ভাবী কর্মফলের হেতত্বের কারণে দু বা স্বর্গকে সত্য বলা হয়েছে। পৃথিব্যা ঋতত্ব, স্বাস্য সত্যত্ব)।–হে ওষধিসমূহ! এই স্থানে (অত্রাস্মিন্ দেশে) তোমাদের অভিমুখে আগতবা শান্ত (শিব) এই অগ্নিকে প্রতিগ্রহণ করো (অর্থাৎ স্বীকার করে নাও)। এই অগ্নি তোমাদের মধ্যে নিহিত আমাদের প্রমাদ আলস্য ইত্যাদি যুক্ত দুর্মতি অপহত করুন। অপহত করে কি করবেন? না, আমাদের শত্রুসমান সকল রোগজনিত বাধা পরিহার করবেন। প্রশান্ত পুষ্পেপেতা (উৎকৃষ্ট পুষ্পশালিনী) ও শোভন ফলোপেতা (সুশোভন ফলদায়িনী) হে ওষধিসমূহ! এই অগ্নির প্রতি তোমরা হৃষ্টভাবাপন্ন হও (হৃষ্টাভবত)। এই অগ্নি তোমাদের ঋতুকালীন গভরূপ হয়ে (গর্ভ ভূত্ব) পুরাতন গর্ভযোগ্য স্থান প্রাপ্ত হয়েছেন। (এই অনুবাকে ব্যাখ্যাত মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ৫ম অনুবাকের সাথে সংশ্লিষ্ট) ॥৪॥
[সায়ণাচার্য বলেন–পঞ্চম উখানিৰ্মাণমুচ্যতে। অর্থাৎ, এই পঞ্চ অনুবাকে উখা-নির্মাণের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে অগ্নি! বিস্তৃতরূপে বলের দ্বারা দীপ্যমান হয়ে আপনি শত্রুরূপী রাক্ষসবর্গ ও রোগসমূহকে বিশেষভাবে রোধ করুন (বিশেষেণ বাধস্ব)। আমি শোভন সুখরূপ প্রবৃদ্ধ বা মহান আহ্বানযোগ্য অগ্নিদেবের পরিচর্যাপূর্বক সর্বদা সুখে অবস্থান করব (সর্বদাহবতিষ্ঠেয়)।-হে জলরাশি! তোমরা আমাদের স্নান-পান ইত্যাদির হেতুভূত সুখের উৎপাদক রূপে প্রসিদ্ধ। সেই রকমভাবে তোমরা তোমাদের রস আমাদের অনুভবে স্থাপন (দান) করো; অধিকন্তু আমাদের পরতত্ত্ব সাক্ষাৎকারের যোগ্য করো। (অর্থাৎ আমরা যাতে রমণীয় সেই পরমাত্মার দর্শনপ্রাপ্ত হই, সেইরকম ভাবে আমাদের যোগ্যতাসম্পন্ন করো)। প্রীতিযুক্তা মা যেমন বৎসদের আপন স্তন্যরস (দুগ্ধ) প্রদান করেন (প্রাপ্তয়ন্তি), সেইরকম তোমাদের যে শান্ততম সুখহেতুকর রস আছে, তা আমাদের এই কর্মে প্রদান করো। যে রসের ক্ষরণের বা নিবাসের নিমিত্ত তোমরা প্রীত হয়েছ, সেই রসপ্রাপ্তির উদ্দেশে আমরা যেন তোমাদের লাভ করি। অধিকন্তু, হে জলরাশি! তোমরা আমাদের প্রজার উৎপাদক করো। (অর্থাৎ আমরা যেন সুপ্রজা উৎপাদনে সমর্থ হই, তেমন করো)। সকলের হিতকরী মিত্র নামক দেবতা পৃথিবী, ভূমি (অর্থাৎ বিস্তৃত মৃত্তিকা), ও জলের দ্বারা কপাল ইত্যাদি সৃষ্টি পূর্বক অগ্নিরূপ উখা নির্মাণ করেছেন। (কিরকম অগ্নি? না,) তিনি জাতবেদারূপে সমুৎপন্ন ও সকল প্রাণী সম্পর্কে অভিজ্ঞ, তিনি বৈশ্বানর রূপে সকল পুরুষের উপকার হয়ে সকল যজমানের গৃহে ব্যাপ্ত (সর্বেষু যজমানগৃহেষু ব্যাপ্ত। হে অগ্নি! প্রজাগণের ক্ষয়রোগ ও নেত্ররোগের অভাব ঘটানোর উদ্দেশে (অর্থাৎ রোগ নিরাময়ে নিমিত্ত) আপনাকে সৃষ্টি পূর্বক সংযোজিত করছি। বৈশ্বানর, অর্থাৎ সকল পুরুষের উপকারক দেবতাসকল অনুষ্টুপ ছন্দে তোমাদের (অর্থাৎ জাবেদা, বৈশ্বানর ইত্যাদিরূপী অগ্নিদেব) যুক্ত করুন। (কি ভাবে? না) অঙ্গিরস্বৎ, অর্থাৎ পূর্বকালে অঙ্গিরা ঋষিগণ যেভাবে আপনাদের যুক্ত করেছিলেন, সেইভাবে। (মন্ত্রে দেবতান্তর পরিত্যাগ পূর্বক মিত্রকে স্বীকারের কারণ এই যে,) দেবতাগণের মধ্যে মিত্র সর্বাপেক্ষা শান্ত বা মঙ্গলপ্রদায়ক। অতএব, হে অগ্নি! আপনি শান্ত মিত্রকে স্বীকার করুন। রুদ্ৰনামক দেবগণ পৃথিবীতে উখা নিম্পাদক মৃত্তিকা গ্রহণ পূর্বক হস্ত দ্বারা সম্যকরূপে উখা নির্মাণ করেছেন (অর্থাৎ সমিধের দ্বারা প্রবীণ অগ্নিকে প্রদীপ্ত করেছেন)। রুদ্রগণের দ্বারা প্রদীপ্ত এই অগ্নি নিরন্তর দীপ্তিযুক্ত হয়ে দেবতাগণের মধ্যে শোভিত হচ্ছেন (রোচতে)। (পূর্বৰ্মন্ত্রে রুদ্র শব্দে বসুও উপলক্ষিত হয়েছে। সেই কারণে অতঃপর বলা হচ্ছে)বুদ্ধিমন্ত বসুগণ ও রুদ্রগণ উখা নির্মাণের নিমিত্ত মৃত্তিকা আহরণ করেছেন, সিনীবালী দেবী পুনরায় সেই মৃত্তিকাকে হস্ত দ্বারা মৃদু করে উখা নিম্পাদন করুণ। হে মহী (ভূমিদেবী)! সুকপর্দা অর্থাৎ শোভন জব্রা বা কেশশালিনী, সুকুরীরা অর্থাৎ শৃঙ্গারার্থে মস্তকে শোভন কবরী-ধারণকারিণী সিনীবালী দেবী) আপনার হস্তে উখাকে দান (স্থাপন) করুন। এই আদিতি (অর্থাৎ ভূমি) বুদ্ধিকৌশলের ও হস্তুকৌশলের দ্বারা এবং শারীরিক বলের সাহায্যে উখা নির্মাণ করুন। লোকে যেমন মাতা তার আপন পুত্রকে ক্রোড়ে রক্ষা করে রাখেন, তেমনই এই অদিতি তার উৎসঙ্গে (ক্রোড়ে) কর্মের সমাপ্তি পর্যন্ত এই উখাকে (তথা অগ্নিকে) ধারণ করুন (উক্ত মন্ত্র চারটির তাৎপর্য এই যে, রুদ্রগণ, বসুগণ, সিনীবালী ও আদিতি এই শব্দযুক্ত দেবতাগণ পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত)–হে মৃৎপিণ্ড! তুমি যজ্ঞের মস্তক-স্থানস্বরূপ হও।–হে কৃষ্ণাজিন ও পুষ্করপর্ণ! তোমার যজ্ঞের পাদরূপে স্থিত হও।-হে উখা! তুমি পৃথিবীরূপা হও; বসু-নামক দেবতাগণ পূর্বকালবর্তী আঙ্গিরস ঋষিগণের মতো গায়ত্রী ছন্দ সহকারে তোমাকে নিষ্পন্ন (বা নির্মাণ) করুণ। হে উখা! তুমি অন্তরীক্ষরূপা হও; রুদ্র-নামক দেবতাগণ পূর্বকালবর্তী অঙ্গিরা ঋষিগণের মতো ত্রিষ্টুপ ছন্দ সহকারে তোমাকে স্থাপন করুন। সেইভাবে, হে উখা! তুমি দুলোকস্বরূপা হও; আদিত্য নামক দেবতাগণ পূর্ববর্তী অঙ্গিরা ঋষিগণের মতো জগতী ছন্দ সহকারে তোমাকে উৎপন্ন করন। হে উখা! তুমি দিপা হও; বৈশ্বানর-নামক (অর্থাৎ সর্ব মনুষ্যের উপকারী রূপে প্রসিদ্ধ) সকল দেববর্গ পূর্বকালীন অঙ্গিরা ঋষিগণের মতো অনুষ্টুপ ছন্দ সহকারে তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করুন। হে উখা! তুমি ধ্রুবা (অর্থাৎ দৃঢ়া) হও; অধ্বর্যরূপী আমার এবং অপর উখা নির্মাতাগণের প্রজাবৃন্দের ধারক (স্থাপক) হও। যজমানের নিমিত্ত প্রজা, ধনপুষ্টি (রায়স্পোষং), গাণপত্য, শোভন বীর্য ও আত্মীয়স্বজন প্রদান করো। হে রেখা (রশনা বা রশ্মিসদৃশী ভাণ্ডের গলগতা চিহ্ন)! তুমি ভূমিরূপা উখার কাঞ্চীগুণস্থানীয়া (অর্থাৎ মেখলা বা কটিভূষণস্বরূপা) রশনা। হে উখা! অদিতি (অর্থাৎ ভূমি) তোমাকে পংক্তিছন্দ সহকারে পূর্বকালীন্ অঙ্গিরা ঋষিগণের ন্যায় ছিদ্রযুক্ত করুক। সেই অদিতি (বা ভূমি) অগ্নির কারণস্বরূপ মৃত্তিকার দ্বারা মহতী উখা নির্মাণ (নিম্পাদন) পূর্বক সেটি আপন পুত্ৰসদৃশ শ্ৰপণকারীগণকে (পাককারীগণকে) সম্যরূপে দান করে বলেছিলেন–পয়ন্তু ভবন্তু অর্থাৎ তোমরা পাক করো। (অদিতির পুত্রগণ দেবতারূপে প্রতিষ্ঠাপিত হন)। (এই অনুবাকে ব্যাখ্যাত মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ৬ষ্ঠ অনুবাকের সাথে সংশ্লিষ্ট) ॥৫॥
[সায়নাচার্য বলেন-ষষ্ঠে উখাসংস্কারোইভিধীয়তে। অর্থাৎ, অনুবাক-৫ ে যে উখানির্মাণের কথা বলা হয়েছে, এই অনুবাক-৬ ে সেই উখার সংস্কার কথিত]।
মর্মার্থ- হে উখা! পূর্বকালে (প্রথমে অঙ্গিরা ঋষিগণ যেমন করেছিলেন, সেইভাবে বসুগণ গায়ত্রীছন্দ সহকারে ধূমের দ্বারা তোমার সংস্কার করুন (সংস্কুবন্তু)। এই ভাবে, পূর্বকালে অঙ্গিরা ঋষিগণের মতো রুদ্রগণ ত্রিষ্টুপ ছন্দ সহকারে ধূমের দ্বারা তোমার সংস্কার করুন। এইভাবে, আদিত্যগণ জগতী ছন্দ সহকারে ও বৈশ্বানরগণ অনুষ্টুপ ছন্দ সহকারে পূর্বকালীন্ অঙ্গিরা ঋষিগণের অনুসরণে ধূমের দ্বারা তোমার সংস্কার করুন। সেই একই ভাবে, পূর্বকালীন অঙ্গিরা ঋষিগণের ন্যায় ইন্দ্র, বিষ্ণু ও বরুণ ধূমের দ্বারা তোমার সংস্কার করুন। (এই নিমিত্ত ৫ম কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ৭ম অনুবাকস্থ সপ্তভিধূপয়তি সপ্ত বৈ শীর্ষণ্যা ইত্যাদি মন্ত্র বিনিযুক্ত হয়। ধূপসাধনের বিধিও ঐ একই অনুবাকস্থ অশ্বশকেন ধূপয়তি ইত্যাদি মন্ত্রে প্রাপ্তব্য)। সকল দেবগণের যোগ্যা উপচারা (পরিচর্যাকারিণী) অদিতি দেবী পৃথিবীর (অর্থাৎ ভূমির) উপরে পূর্বকালীন অঙ্গিরা ঋষিগণের ন্যায় তোমার খনন করুন। (এই মন্ত্রে খনন কর্তৃত্ব অদিতির উপরে ন্যস্ত হওয়ার কারণ অদিতি ও ভূমি একার্থক। সুতরাং অদিতি কৰ্ত্তক ভূমিখননের ফলে ভূমির হিংসা উপজাত হতে পারে না, যেমন লোকে কখনও নিজে নিজেকে হিংসা করে না। ৫ম কাণ্ডের প্রথম প্রপাঠকের ৭ম অনুবাকে অদিতিস্কৃত্যাহেয়ং বা অদিতিরদিত্যৈবাদিত্যাং ইত্যাদি মন্ত্রে এই কথা বলা হয়েছে)। সকল দেবতার উপচার বা পরিচর্যার যোগ্য দেবপত্নীবর্গ পৃথিবীর উপরে তোমাকে স্থাপন করুন, যেমন ভাবে পূর্বকালে অঙ্গিরা ঋষিগণ করেছিলেন। হে উখা! ধিষণা অর্থাৎ বিদ্যাভিমানী দেবতাগণ তোমাকে চতুর্দিক হতে প্রজ্বলিত করুন। ছন্দোভিমানী দেবতাগণ পচ্যমানতা (পাক হয়ে যাওয়া অবস্থা) সম্পন্ন (বা পরীক্ষা) করুন। হে সকল প্রাণীর হিতকরী মিত্রদেব! আপনি এই উখায় পাক করুন (পাং কুরু); এবং এই উখা যেন ভগ্ন না হয়;এই উখার ভগ্নরাহিত্যের নিমিত্ত (অর্থাৎ ভগ্ন হওয়া থেকে রক্ষার নিমিত্ত) এটিকে তোমায় প্রদান করছি। মিত্রদেব এই উখাকে প্রাপ্ত হয়েছেন। (কিরকম মিত্রদেব? না,) প্রচুর কীর্তিশালী। (এই উখাই বা কিরকম? না, এই উখা দুলোক ও পৃথিবী সদৃশ। মনুষ্যগণের ধারয়িতা, শ্রবণযোগ্য যশোশালী (কীর্তিমান) মিত্রদেব এই ফলদানশীল (দ্যুম্নং বা দ্রবিণপ্রদং) কীর্তিমান (চিত্রশ্রবাঃ) উখায় পাক সম্পন্ন করুন। হে উখা! সবিতাদেব তোমাকে গহুর হতে উর্ধ্বে আনয়ন করুন (অবটাদুর্ধমানয়)। (কিরকম সবিতা? না,) তিনি সুপানি, অর্থাৎ শোভন পাণিযুক্ত; স্বচ্ছুরি, অর্থাৎ শোভন অঙ্গুলিযুক্ত; এবং সুবাহু, অর্থাৎ শোভন বান্থশালী। (মণিবন্ধ বা হাতের কব্জির উভয় দিকের অংশ পানি ও বাহু শব্দের দ্বারা উক্ত হয়েছে)। হে উখা! পৃথিবীতে বা ভূমিতে উত্তিষ্ঠিত হয়ে ভগ্নপ্রাপ্ত না হয়ে তুমি সর্বদিক পূরণ করো। গহ্বর হতে বহিরাগত হয়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হও, এবং ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ধ্ৰুবা বা স্থির হয়ে অবস্থান করো। হে উখা! বসু নামক দেবগণ পূর্বকালীন অঙ্গিরা ঋষিবর্গের মতো গায়ত্রী ছন্দে তোমার সিঞ্চন করন। হে উখা! রুদ্র নামক দেবগণ পূর্বকালীন অঙ্গিরা ঋষিগণের মতো ত্রিষ্টুপ ছন্দে তোমার সিঞ্চন করুন। হে উখা! আদিত্য নামক দেবগণ পূর্বকালীন অঙ্গিরা ঋষিগণের মত জগতী ছন্দে তোমার সিঞ্চন করুন। হে উখা! বৈশ্বানর অর্থাৎ সকলের হিতকারক দেবগণ পূর্বকালীন্ অঙ্গিরা ঋষিগণের মত তোমার সিঞ্চন করুন। (যজ্ঞসাধন পাত্র অগ্নিদগ্ধ হলে তাকে সিক্ত না করলে তা অসুরযোগ্য হয়। পাত্রকে সিক্ত বা সিঞ্চিত করলে তা দেবযোগ্য হয়। ছন্দরূপ মন্ত্রের দ্বারা সিঞ্চন কর্তব্য। এই অনুবাকে ব্যাখ্যাত মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ৭ম অনুবাকের মন্ত্রসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট) ॥৬॥
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমেহনুবাকে পঞ্চপশ্বঙ্গভূতা অগ্নিক্যঃ সামিধেন্য উচ্যন্তে। অর্থাৎ, এই অনুবাক-৭ ে অগ্নিচয়নের পঞ্চাঙ্গভূত পশুর সামিধেনী সংক্রান্ত মন্ত্রগুলি উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ– হে অগ্নি! সমা (অর্থাৎ সম্বৎসর), ঋতু, মাস, পক্ষ (অধমাস) ইত্যাদি কালবিশেষ এবং মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিবর্গ ও তাদের সত্যবচনসমূহ (মন্ত্ৰসমূহ) আপনাকে বর্ধিত করুক ও করুন। তাদের দ্বারা বর্ধিত হয়ে দুলোকের তেজে আপনি সম্যভাবে দীপ্যমান হোন; এবং আপন সেই তেজঃপ্রভাবে পৃথিবীর সর্ব দিক উদ্ভাসিত করুন। হে অগ্নি! আপনি সমিধের দ্বারা স্বয়ং দীপ্ত হোন, এই যজমানকে কর্মানুষ্ঠানে প্রবুদ্ধ করুন এবং এই যজমানের মহতী সৌভাগ্যের নিমিত্ত (অর্থাৎ যজমানকে অত্যন্ত সৌভাগ্য দানের নিমিত্ত) উদ্যোগী হোন। হে অগ্নি! আপনার পরিচারকদের প্রতি হিংসা করবেন না (মা হিংস্যতাম)। অধিকন্তু, আপনার ব্রাহ্মণগণ অর্থাৎ ঋত্বিক ও যজমানগণ যশস্বী হোন; এবং যারা আপনার পরিচর্যা-বিমুখ (অর্থাৎ যারা অগ্নি-পরিচর্যাহীন) তারা যেন যশস্বী না হতে পারে (মা ভূব)। হে অগ্নি! এই ঋত্বিক যজমানরূপী ব্রাহ্মণগণ আপনার আরাধনা করছেন। হে অগ্নি! আপনি আমাদের অপরাধ সম্বরণ (বা আচ্ছাদনের) নিমিত্তভূত হয়ে শান্ত হোন, অর্থাৎ অপরাধ প্রকটিত করবেন না। অধিকন্তু, আপনি আমাদের শত্রুগণের বিনাশকরূপে ও পাপজয়কারী হয়ে আপন গৃহে (অর্থাৎ অগ্নি-পরিচর্যাকারীর গৃহে) প্রমাদণুন্য হয়ে বিরাজমান থাকুন। হে অগ্নি! এই গৃহে ধনের আধিক্য সম্পাদিত করুন। আমাদেরও পূর্বে যাঁরা অগ্নিচয়ন করেছেন, তারা যেন আমাদের চীয়মান অগ্নিকে নিরাকরণ (খণ্ডন বা নিবারণ) না করেন। হে অগ্নি! আপনাতে ক্ষত্রিয়বল সুস্থিত থোক, আপনার উপসত্তা বা পরিচারকবৃন্দ কারও দ্বারা হিংসিত না হয়ে যেন নিয়ত বর্ধিত হন (কেনাপি নিরামহিংসিতঃ সন্ বর্ধম)। হে অগ্নি! আপনি আপনার ক্ষত্ৰ-বলের দ্বারা আমাদের শোভন আয়ুর সংরক্ষণে অপ্রমত্ত (প্রমাদশূন্য বা সতর্ক) হয়ে থাকুন। হে অগ্নি! আপনার মিত্র আমাদের ধারণে অনুগ্রহযুক্ত চিত্ত হয়ে (আমাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হয়ে) প্রকৃষ্টরূপে যত্ন করুন (প্রযত্নং কুরু)। প্রজাপতির মুখ-হতে আপনার (অর্থাৎ অগ্নির) সাথে ব্রাহ্মণগণও জাত হয়েছিলেন, সেই কারণে ব্রাহ্মণগণ আপনার সজাতি (সহজাত বা জ্ঞাতি); তাঁদের মধ্যে আপনি সকল সময়ে অবস্থিত থাকেন (বা ব্রাহ্মণগণের দ্বারা পূজিত হয়ে থাকেন)। হে অগ্নি! আপনি এই ভূমিভাগে রাজগণের দ্বারা অনুষ্ঠেয় বিবিধ যজ্ঞের প্রবর্তক হয়ে অতিশয়রূপে দীপ্যমান হোন। হে অগ্নি! কুকুর শূকর ইত্যাদি নিকৃষ্ট জন্মপ্রাপক যে পাপ, শরীরশোষণ ইত্যাদি হেতুকারক যে রোগ, কর্মানুষ্ঠান সম্পর্কিত যে অজ্ঞানতা, কর্মবিঘ্নকারী শত্রুগণের যে প্রয়াস, এবং আমাদের অনিষ্টকারক অন্য যা কিছু আছে, তা সবই আপনি বিনাশ করুন। অতঃপর শ্রেষ্ঠ পুত্র ইত্যাদির সাথে আমাদের ধন প্রদান করুন। হে অগ্নি! আপনি এই কর্মে দীপ্ত হোন। (কিরকম আপনি? না,) আপনি অনাধৃষ্য, অর্থাৎ কেউই আপনাকে ধর্ষন (অর্থাৎ অবজ্ঞা) করতে পারে না; জাতবেদা, অর্থাৎ জামাত্র সকল জগৎ সম্পর্কে অভিজ্ঞ; অনিত, অর্থাৎ ইতিপূর্বেও কারও দ্বারা হিংসিত না হয়ে রাজমান; ক্ষত্ৰভৃৎ, অর্থাৎ ক্ষত্রবলের ধারক। অধিকন্তু, যথোক্ত গুণবিশিষ্ট অনুগ্রহদৃষ্টিতে আমাদের সর্বতোভাবে পালন করে থাক। (কি জন্য পালন? না,) আমরা যেন সর্বরকম নিষিদ্ধ বিষয় সম্পর্কিত সকল তৃষ্ণা ব্যাধি ইত্যাদি হতে প্রকর্ষের সাথে নিবৃত্ত হতে পারি। বৃহস্পতি ও সবিতাদেব সদৃশ হে অগ্নি! আপনি। এই যজমানকে কর্মসাধন (যজ্ঞসাধন) বিষয়ে বুদ্ধি-মন্ত (বুদ্ধি প্রদান) করুন; পূর্বের ন্যায় তীক্ষ্ণীকৃত বুদ্ধি হলেও তাকে পুনরায় অতিশয়ভাবে (সম্যক) অনুশাসন করুন। এইভাবে এই যজমানের সৌভাগ্য বর্ধন করুন। সকল দেবগণও এই যজমানের প্রতি সমীচীনরূপে হৃষ্ট হোন। হে বৃহস্পতিতুল্য অগ্নি! স্বর্গে চিরকালব্যাপী অবস্থানের নিমিত্ত পাপসংক্রান্ত কারণে যমের হিংসা হতে আপনি আমাদের মুক্ত করেছেন, সেই কারণে পরলোক বিষয়ে আমাদের চিন্তা নেই। হে অগ্নি! দেববৈদ্য অশ্বিযুগল তাদের নিজস্ব শক্তিতে এই যজমানের মৃত্যু প্রতিহত করুন, অর্থাৎ ইহলোকে অপমৃত্যু নিরাকৃত করুন। আমরা উৎকৃষ্টভাবে অন্ধকার বিনাশক অগ্নিকে এবং দেবগণের মধ্যে সূর্যরূপে বর্তমান অগ্নি-সম্বন্ধিয় দেবোত্তমকে দর্শন পূর্বক জ্যোতির্গময়কে (অর্থাৎ পরব্রহ্মকে) প্রাপ্ত হবো (জ্যোতির্গন্ম প্রাপ্তস্ম) ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অষ্টমে প্রজযাজ্যা আপ্রীনামকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ, এই অনুবাক-৮ ে আপ্রীনামক প্রজ যাজ্যার বিষয় কৃথিত হয়েছে]
মর্মার্থ– সকল প্রজের দেবতা হলেন বিশেষ বিশেষ নামে অভিহিত অগ্নি। প্রথম প্রজের অগ্নিদেবতা সমিৎ (ব্যুৎপত্তিগত অর্থে যিনি সম্যকরূপে প্রকাশিত) নামে অভিহিত। অগ্নির স্বরূপবিশেষ সেই সমিৎ-নামক দেবতা আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত উদ্যোগী হোন; অর্থাৎ তার পবিত্র ও সমুজ্জ্বল শিখা বা জ্বালাসমূহ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আকাশকে অতিশয়ভাবে দীপ্ত করুক। (সেই অগ্নি কিরূপ? না,) তিনি সুপ্রতীক (অর্থাৎ শোভন মুখবিশিষ্ট) পুত্রের ন্যায় হিতকরী। (দ্বিতীয় প্রজ তনু বা দেহকে যিনি বিনষ্ট হতে দেন না, সেই তনপাৎ নামক শরীর-পালক অগ্নিবিশেষ মধুর বা সুমিষ্ট ঘূতের দ্বারা (অর্থাৎ হবিঃর দ্বারা) ঋর্গসাধনের (অর্থাৎ স্বর্গপ্রাপ্তির উপায়ভুত) পথসমূহ সিক্ত করুক। (সেই তনুনপাৎ কিরকম? না,) তিনি প্রাণপ্রদ (অতএব শরীরপালক), বিশ্ববেদা (অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বকে বিদিত), দেবদ্যোতনাত্মক (অর্থাৎ কেবল মনুষ্যগণেরই নয়, দেবতাগণেরও পূজনীয়)। (তৃতীয় প্রজের দেবতা হে অগ্নি! আপনি নরাশংস (নরের বা মনুষ্যের প্রশংসনীয়) রূপী হয়ে মধুর ঘৃতের (হবির) দ্বারা প্রীত বা তৃপ্ত হয়ে এই যজ্ঞ সম্পাদন করুন। (নরাশংস অগ্নি কিরকম?) তিনি সুষ্ঠু কর্মকারী বা সকল বৈকল্য-পরিহারকারী, দ্যোতনাত্মক বা সর্বপ্রকাশক, সবিতা বা সকল কর্মে আমাদের প্রেরক, বিশ্বাবার বা সকল পাপের নিবারক। (চতুর্থ প্রযাজের দেবতা) স্তুতিপ্রিয়ত্বের নিমিত্ত ঈড়ান নামধেয় অগ্নি বলের সাথে যুক্ত হয়ে এই যজ্ঞ প্রাপ্তির নিমিত্ত গমন করুন। যজ্ঞ প্রবর্তিত হলে সুচে (যজ্ঞীয় ঘৃত ধারণের পাত্র বিশেষে) রক্ষিত আজ্যের (ঘৃতের) ও নমস্কারের দ্বারা আমরা তার পরিচর্যা করব।(পঞ্চম প্রজের দেবতা) বহিনামক কোনও অগ্নিবিশেষ প্রাকৃতে বৰ্হিরগ্ন আজ্যস্য ইত্যাদি মন্ত্রে প্রসিদ্ধ। সেই বহি নামক অগ্নিবিশেষ এই সামান্যরূপ অগ্নির মহিমা বিস্তার করুন। সেই অগ্নি হর্ষজনক স্তুতিমন্ত্রে প্রয়াসবান্ (অর্থাৎ অধিক পরিচর্যাযুক্ত)। অধিকন্তু, এই বৰ্হি নামক অগ্নি প্রাণীবর্গের বাসয়িতা (নিবাসস্থান) ও প্রাণীবর্গ সম্পর্কে অতিশয়রূপে অভিজ্ঞ এবং যজমানের ধন ইত্যাদি দ্রব্যসমূহের ধারয়িংবরণকারী)। (ষষ্ঠ প্রজের দেবতা) দ্বারদেবী নামক কোনও অগ্নি প্রথমে তার ব্রত আচরণ করেছিলেন; তারপর সেই দ্বারদেবীর অনুসরণে সকল যজমান তার ব্রত-সম্পর্কিত কর্মগুলি গ্রহণ করে হবিঃ প্রদান করেন। (দ্বাঃ শব্দের দ্বারা স্ত্রীমূর্তিধর কোনও অগ্নিবিশেষকে লক্ষ্য করা হয়েছে। পূজার নিমিত্ত বহুবচন ব্যবহৃত)। (কিরকম দ্বারঃ? না,) তিনি উরুব্যচসো, অর্থাৎ বিস্তীর্ণ গতিসম্পন্না; তেজসা পত্যমানাঃ (অর্থাৎ প্রাপ্যমাণা তেজস্বিনী)। (সপ্তম প্রজের দেবতা) উষাসানক্তা (অর্থাৎ উষাসা বা উষাকাল ও নক্তা বা রাত্রিরূপা) নামক কোনও অগ্নি আমাদের এই যজ্ঞস্থানকে হিংসারহিত করুন অর্থাৎ এই যজ্ঞকে শত্রুর হিংসা হতে রক্ষা করুন। (কিরকম সেই উষা ও নক্তা? না,) ঘোষণে, অর্থাৎ পরস্পর মিশ্রিত হয়ে। (তার দৃষ্টান্ত কি? না,) দ্যুলোর্কস্থিত ভাসমান দুটি মূর্তি যেমন পরস্পর মিশ্রিত হয়ে একাকার হয়ে যায়, সেই মতো উষা ও নক্তা পরস্পর মিশ্রিত হয়ে একাকার সম্পন্ন অগ্নিরূপ হয়ে যায়। (অষ্টম প্রজের দেবতা)-হে দৈব্যা হোতৃদ্বয় নামক অগ্নি (হোতৃশব্দাভিধেয় দুই অগ্নিবিশেষ; কারণ হোতৃত্ব দুরকম, অগ্নি যথা,-দেব ও মনুষ্য)
! আপনার জিহ্বা বা জ্বালা লক্ষ্য করে আমাদের প্রবর্তিত এই যজ্ঞ বিস্তৃত করুন। অধিকন্তু, আমাদের নিমিত্ত এই যজ্ঞের বৈগুণ্য পরিহারপূর্বক শোভন করুন। (নবম প্রজের দেবতা) মহী অর্থাৎ মহতী, গৃণানা অর্থাৎ যজ্ঞের প্রখ্যাপিকা–এই বিশেষণযুক্তা ইড়া, সরস্বতী ও ভারতী নামান্বিতা তিন দেবীর মূর্তিধর অগ্নি এই যজ্ঞ লাভ করুন। (দশম প্রজের দেবতা) ত্বষ্টা নামক অগ্নিবিশেষ আমাদের তাঁর ঐশ্বর্যের দ্বারা পূর্ণ করুন। (কিরকম ঐশ্বর্য? না,) আমাদের পক্ষে যা তুরীপং, অর্থাৎ শীঘ্রপ্রাপক; অদ্ভুতং, অর্থাৎ গো-অশ্ব ইত্যাদির বাহুল্যে আশ্চর্যজনক (আশ্চর্যরূপং); পুরুক্ষু, অর্থাৎ বহু মনুষ্যের দ্বারা প্রশংসিত; সুবীরম, অর্থাৎ শোভন পুত্ৰযুক্ত; রায়ম্পোষং, অর্থাৎ ধনের পোষক পুষ্টিকারক; নাভিং, অর্থাৎ রথচক্রের নাভির বন্ধনের ন্যায় সকল বন্ধুজনের আশ্রয়ভূত (অর্থাৎ চক্রের নাভি যেমন চক্ৰপরিধিকে বন্ধন করে রাখে, সেইরকম ঐশ্বর্যও সকল বন্ধুজনের আশ্রয়স্বরূপ হয়ে থাকে)। (একাদশ প্রযাজের দেবতা) হে বনস্পতি (অর্থাৎ বনস্পতি নামধেয় অগ্নিবিশেষ)! আপনি দানশীলরূপে রম্যমান হয়ে যজ্ঞে প্রদত্ত আমাদের হবিঃ স্বয়ং দেবতাগণের নিকট স্থাপন করুন। আমাদের প্রার্থিত এই অগ্নি আমাদের দুরিত অর্থাৎ পাপ বা অনিষ্ট উপশমের কর্তারূপে আমাদের প্রদত্ত এই হবিঃ দেবগণকে আস্বাদন করান। হে স্বাহা (অর্থাৎ স্বাহাকার-অভিমানী কোনও অগ্নিবিশেষ)! হে জাতবেদা (অগ্নি)! ইন্দ্রের নিমিত্ত এই হবিঃ স্বাহাকৃত অর্থাৎ স্বাহামন্ত্রে সম্যকরূপে হুত বা প্রক্ষিপ্ত করুন (অর্থাৎ ইন্দ্রের উদ্দেশে আমরা এই যে হবিঃ স্বাহা মন্ত্রে আপনাতে প্রক্ষেপণ করছি, তা আপনি গ্রহণ করুন)। তাহলে সকল দেবগণও আমার দীয়মান এই হবিঃ আস্বাদন করবেন। (সায়ণাচার্য বলেছেন, যদিও এটি একাদশ প্রজ, তথাপি দ্বিতীয় ও তৃতীয় মন্ত্রের পুরুষভেদের দ্বারা ব্যবস্থিত হওয়ায় এটি দ্বাদশ সংখ্যার বিরোধী নয়। অর্থাৎ এটি দ্বাদশ প্রযাজের মরূপেও গণ্য)।–হিরণ্যে অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডরূপ গর্ভে অবস্থিত (হিরণ্যগর্ভ) প্রজাপতি সকল প্রাণিজাতের অগ্রে বা পূর্বে স্বয়ং শরীরধারী ছিলেন। তিনি উৎপন্নমাত্র পরবর্তীকালে উৎপস্যমান (অর্থাৎ যা উৎপন্ন হবে, সেই) সর্ব জগতের পতি ছিলেন। তিনি এই ভাবে পৃথিবী, দ্যুলোক ও বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষলোক ধারণ করে আছেন। অতি অর্থেও তিনি ভূমিকে ধারণ করে আছেন। এইরূপ যে প্রজাপতি দেবতা, আমরা তার উদ্দেশে হবিঃ নির্বপণ পূর্বক তার পরিচর্যা করছি। সেই প্রজাপতি দেবতা একাকীই (ইদেক এব) শ্বাসযুক্ত ও নিমেষযুক্ত হয়ে আপন মহিমার দ্বারা সর্ব জগতের রাজা হয়েছিলেন। অতএব এমন যে প্রজাপতি, তিনি মনুষ্য ইত্যাদি দ্বিপদ ও গো-ইত্যাদি চতুষ্পদ প্রাণী সমূহের নিয়মনে সমর্থ হন। আমরা সেই প্রজাপতি দেবতাকে হবির দ্বারা অর্চনা করছি (বিধেম)। যে প্রজাপতিদেবতা শরীরে জীবরূপে আত্মপ্রদ, বলপ্রদ ও সামর্থ্যপ্রদ, যে প্রজাপতির আজ্ঞা কেবল মনুষ্যই নয়, দেববর্গও বহন করে থাকেন, মোক্ষরূপ অমৃত বা অমরণত্ব যাঁর ছায়া বা যাঁর ছায়ার ন্যায় অধীন, মৃত্যুও অর্থাৎ প্রাণীগণের মরণও যাঁর ছায়ার ন্যায় অধীন, আমরা সেই প্রজাপতি দেবতাকে হবির দ্বারা অর্চনা করছি। হিমবন্ত বা হিমালয় প্রমুখ পর্বতসমূহ যাঁর মহিমা ধারণ করে আছে, ভূমির সাথে অবস্থিত (সহাবস্থিত) সমুদ্র যাঁর অধীন হয়ে আছে, এই দৃশ্যমান পূর্ব ইত্যাদি দিসমূহ যাঁর অধীনরূপে স্থিত, যে প্রজাপতির দুটি বাহুরূপে ধর্ম ও অধর্ম যুগপৎ বিদ্যমান, আমরা সেই হেন প্রজাপতি দেবতাকে আমরা হবির দ্বারা অর্চনা করছি। প্রজাপতির ক্রন্দন বা রোদন হতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে দ্যাবাপৃথিবী অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী যুগপৎ ক্রন্দসী (বা রোদসী) নামে খ্যাত; এই উভয় লোক মনে মনে যে প্রজাপতির দ্বারা রক্ষণের নিমিত্ত তার ঈক্ষণ (অর্থাৎ দর্শন) কামনা করে, আমরাও তার রক্ষণ বা শাসনের প্রার্থনা করি। (সেই দ্যাবাপৃথিবী কিরকম? না, সেই দ্যাবাপৃথিবী দেবতা ও মনুষ্যগণের অবস্থানের নিমিত্ত স্তম্ভিত ও দীপ্যমান। সূর্য যে প্রজাপতি দেবতাকে আশ্রয় পূর্বক উদিত হন, আমরা হবির দ্বারা সেই প্রজাপতি দেবতার অর্চনা করছি। পুণ্যরহিত প্রাণীবর্গের পক্ষে দুষ্প্রাপ্য দ্যুলোক ও পৃথিবীকে যে প্রজাপতি দৃঢ় করেছেন, (অর্থাৎ অবোলোকের পক্ষে উপযুক্ত পাপীগণ যাতে দুলোক ও পৃথিবীতে না অবস্থান করতে পারে, সেই মতো যিনি ব্যবস্থা করেছেন), পুণ্যকর্মকারী জনবর্গের নিমিত্ত যে প্রজাপতি স্বর্গসুখের বিধি নির্ধারণ করেছেন, যে প্রজাপতি জ্ঞানীবর্গের নিমিত্ত দুঃখরহিত মোক্ষ স্থির করেছেন, যে প্রজাপতি অন্তরীক্ষলোকে রজোগুণান্বিত যক্ষ, গন্ধর্ব ইত্যাদির নির্মাতা, সেই প্রজাপতি দেবকে আমরা হবির দ্বারা অর্চনা করছি। যে প্রজাপতি দেবতার অনুগ্রহে মহতী জলসমূহ বিশ্বের আকার প্রাপ্ত হয়েছে (বিশ্বাকারং প্রাপ্তাঃ), (কিরকম সেই জলসমূহ? না,) সেই জলসমূহ অগ্নিচয়নে দক্ষ বা কুশল যজমানকে উৎপন্ন করেছে, তথা চেতব্য (অর্থাৎ চয়ন করা হবে, এমন) অগ্নিকেও উৎপাদন করেছে; যে প্রজাপতি দেবতার দ্বারা সকল দেবতার সুজীবন হেতু প্রাণ নিষ্পন্ন হয়েছে, আমরা হবির দ্বারা সেই প্রজাপতি দেবতার অর্চনা করছি। (অন্য বিকল্পিত যাজ্যায় বলা হয়েছে)–যশ্চিদাপো মহিনা পৰ্য্যপশ্যদ্দক্ষং দধানা জনয়ন্তীরগ্নি। যো দেবেম্বধি দেব এক আসীৎ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম।- আপ এখানে দ্বিতীয়ার বহুবচন। যে প্রজাপতি পূর্বোক্তরীতিতে স্ব মহিমায় বিশ্বাকারে পরিণত হয়েছেন এবং অগ্নির জনয়িতা (উৎপাদক) জলসমূহকে সেইরকম সামর্থ্য প্রদানের নিমিত্ত কটাক্ষ বিক্ষেপ করেছেন, যিনি দেবগণের এক অধিদেব (সর্বেধিকো দেব), সেই প্রজাপতি দেবতার উদ্দেশে আমরা হবির দ্বারা অর্চনা করছি। [এই অনুবাকে ব্যাখ্যাত মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের প্রথম প্রপাঠকেরঅনুবাক-৮
ের কোন কোন মন্ত্র সংশ্লিষ্ট]।
[সায়ণাচার্য বলেন-নবমেহনুবাকেহগ্নৎপাদনমভিধত্তে। অর্থাৎ, এই অনুবাক-৯ ে অগ্নির উৎপাদনের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- আমাদের অনুষ্ঠান-বিষয়ক সঙ্কল্পের প্রেরক অগ্নিদেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। আমাদের অনুষ্ঠেয় কর্মের স্মরণসাধক মন ও স্মৃতির ধারণসামর্থ্যরূপা মেধা, এই উভয়ের প্রেরক অগ্নির উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। অজ্ঞাত অনুষ্ঠানকে জ্ঞাত হওয়ার নিমিত্ত এবং জ্ঞাত অনুষ্ঠানকে সাধনের নিমিত্ত,–এই উভয়ের প্রেরক অগ্নির উদ্দেশে স্বাহা মন্তে আহুতি প্রদান করছি। মন্ত্রপাঠরূপ বাকের প্রেরক অগ্নির উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। সেইরকম, যিনি মনুষ্যগণের জনক, সেই প্রজাপতির উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি; বিশ্বের মনুষ্য বা নরগণের যিনি অনুগ্রাহক, সেই বৈশ্বানর অগ্নির উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। জগতের নির্বাহক যে দেবতার সখ্য বা অনুগ্রহ যজমান সহসা যাঞ্চা করেন এবং স্তুতির দ্বারা যজ্ঞের পোষণের (পুষ্টির) নিমিত্ত যাঁর বিশ্বাত্মক ধন প্রার্থনা করেন, সেই অগ্নির উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে সপ্ত সংখ্যক আহুতি প্রদান করছি। (আকুতিম ইত্যাদি মন্ত্রে দীক্ষা সংক্রান্ত সংস্কার করণীয়)-হে উখা! তুমি ভিন্ন হয়ো না, অর্থাৎ অভিন্ন থেকে সুষ্ঠু কর্তব্য সাধন করো। সেই রকমে, তুমি স্ফুটিত হয়েও (অর্থাৎ বিস্তৃত হয়েও) হিংসা করো না। তুমি ভেদাভাবে দৃঢ়া হও এবং শুটনাভাবে আপন অঙ্গসমূহ দৃঢ়ীকৃত করো (দৃঢ়ী কুরু)। হে ধৃষ্ণু (সহিষ্ণু)! হে মাতৃ-সদৃশি উখা! তুমি বীরের মতো আচরণ করো। (মা যেমন পুত্রের প্রতি আচরণ করেন, সেইভাবে আমাদের প্রতি আচরণ করো)। অগ্নি ও তুমি মিলিত হয়ে আমাদের এই কর্ম সম্পাদিত করতে দাও।–হে পৃথিবী দেবীরূপা উখা! (মৃৎকার্যের নিমিত্তভূত হওয়ার কারণে উখা পৃথিবীদেবীরূপে সম্বোধিতা) তুমি যজমানের মঙ্গলের নিমিত্ত দৃঢ় হও। তুমি শম্বর ইত্যাদি অসুর কর্তৃক নির্মিত মায়ার ন্যায় কব্যপ্ৰদানবাচক স্বধা-শব্দের দ্বারা যাগ নিষ্পদিত করো। (স্বধা শব্দে অনুমাত্র উপলক্ষিত হয়েছে। আসুরী মায়া যেমন চিন্তার অতীত বিচিত্ররূপে প্রতিভাত, সেই ভাবে তুমি স্তনদ্বয় ইত্যাদি রচনাযুক্তা হয়ে নিষ্পন্না হও, এটাই বোঝান হয়েছে)। তোমা (উখা) হতে উংপস্যমান (পকমান) এই হবিঃ দেবতাগণের প্রীতিকর হোক (প্রিয়মস্তু)। তুমিও কারো দ্বারা হিংসিকা না হয়ে এই যজ্ঞে উগত হও। হে মিত্র! আপনি এই উখাকে তপ্ত করুন। এই উখা যাতে ভগ্ন না হয়, সেই উদ্দেশে একে আপনার হস্তে সমর্পণ করছি। (পরবর্তী কাণ্ডে উখা ভঙ্গজনিত অপরাধের প্রায়শ্চিত্তির মন্ত্র উল্লেখিত। উখাকে মিত্রের হস্তে পরিদানের দ্বারা মিত্রের পরব্রহ্মত্ব সূচিত হয়েছে)। দ্বন্নঃ সর্পিরাসুতিঃ ইত্যাদি অর্থাৎ–এই উৎপন্নমান অগ্নি পুরাতন (প্রত্ন), দেবগণের আহ্বানকারী (আহ্বাতা বা হোতা), বরণীয় (বরেণ্য), বলের পুত্র (অর্থাৎ মন্থন বা ঘর্ষণহেতু বলের দ্বারা উৎপদ্যমান), ও আশ্চর্যরকম। দ্রু অর্থাৎ বৃক্ষ বা বনস্পতি হলো এই অগ্নির খাদ্য এবং তাতে সর্পি (অর্থাৎ আজ্য বা ঘৃত) আহুতি দেওয়া হয়। (এখানে, কাষ্ঠে কাষ্ঠে ঘর্ষণের দ্বারা, অর্থাৎ অরণি-মন্থনের দ্বারা অগ্নি প্রজ্বলনের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। দাবাগ্নির দ্বারা বনের বৃক্ষ সমূহ দগ্ধ বা ভক্ষণের প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে)। হে যজমানগণের প্রিয় অগ্নি! আপনি যজ্ঞের উৎকৃষ্ট অধিষ্ঠাতা; আপনি এই যজ্ঞে দূরদেশ হতে আগমন পূর্বক নিকৃষ্টরূপ আমাদের দুঃখ হতে উদ্ধার করুন এবং আমাদের মিত্রদের রক্ষা করুন (অর্থাৎ শত্রুগণকে অতিক্রম করান)। আপনি লোহিতবর্ণশালী অশ্বযুক্ত ও উখার হেতুভূত পাংসুমৃত্তিকা লাভ করে থাকেন। হে অগ্নি! আপনি মাতৃসমানা এই উখার উৎসঙ্গে উপবেশন করুন। (আপনি কিরকম? না, আপনি সকল উপায় জ্ঞাত হয়ে আপনার জ্বলদর্চির তাপপ্রভাবে এই উখাকে সন্তপ্ত করেন না, এর অভ্যন্তরে নির্মল জ্যোতির প্রকাশে বিশেষভাবে দীপ্ত হয়ে থাকেন। হে অগ্নি! আপনি আমার নিমিত্ত শান্ত হোন এবং আমাদের সকলের প্রতি শান্তভাবাপন্ন হয়ে এই স্থানে উপবেশন করুন। তারপর সর্ব দিককে শান্ত করে এই উখায় অর্থাৎ আপনার নিজের স্থানে আগত হয়ে উপবেশন করুন। [এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ৯ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৯॥
[সায়ণাচার্য বলেন–দশমেহগ্নিধারণমুচ্যতে। অর্থাৎ এই অনুবাক-১০ ে অগ্নিধারণ সম্পর্কিত বিষয় কৃথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- হে অগ্নি! কুঠারের দ্বারা ছেদন না করে শুধুমাত্র অরণ্যে পতিত যত কাষ্ঠই আপনাকে অৰ্পণ করি না কেন, তা সবই আপনার নিমিত্ত ঘৃতের ন্যায় প্রিয় হোক। হে যুবতম (অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ যুবা বা চিরযুবা বা চিরনবীন) অগ্নি! সেই দারুণজাত সামগ্রী আপনি ভক্ষণ করুন। অরণ্য হতে আমাদের আনীত দারু বা কাষ্ঠের মধ্যে যেটি মহারণ্যে দাবাগ্নি কর্তৃক স্বল্পপরিমাণে দগ্ধ হয়েছে, পিপীলিকা-সদৃশ ক্ষুদ্রজীববৎ সেই কাষ্ঠকে আপনি ভক্ষণ করুন এবং অতিশয়রূপে যে কাষ্ঠ দগ্ধপ্রাপ্ত হয়েছে, তার সার ভক্ষণ করুন। সেগুলি সবই ঘৃতের ন্যায় আপনার প্রিয় হোক। হে অগ্নি! আপনার প্রতিবেশী (নিকটবর্তী) আমরা যেন আপনার হিংসা প্রাপ্ত না হই। আমাদের ধনপুষ্টি ও অন্নপুষ্টি সম্যকভাবে দান করুন। আমরা প্রতিটি রাত্রির অবসানে অর্থাৎ প্রতিদিন আপনাকে সমিধরূপ ঘাস প্রদান করে থাকি, যেমন অশ্বশালায় (আস্তাবলে) বদ্ধ প্রৌঢ় অশ্বকেও প্রতিদিন ঘাস প্রদান করা হয়ে থাকে। বৃহৎ ধনপোষক অগ্নির উদ্দেশে আমরা আহ্বান করছি। (কিরকম অগ্নি? না,) তিনি পৃথবীর নাভিরূপ উখার মধ্যে সম্যক্ দীপ্যমান, সমিধরূপ অন্নের দ্বারা আনন্দিত, বৃহৎ উথমন্ত্রে প্রশংসিত, যজত্রং অর্থাৎ যাগের কারণস্বরূপ, জেতার অর্থাৎ রাক্ষসবিষয়ে জয়শীল, পৃতনাসু অর্থাৎ সংগ্রামে অগ্রে গমনকারী এবং সাসহি অর্থাৎ আমাদের অপরাধের অতিশয়রূপে সোঢ়াব বা সহ্যকারী। যে কোনও শত্রুসেনা উৎকৃষ্ট (শক্তিশালী) সগণসহ পীড়া প্রদানের নিমিত্ত আমাদের অভিমুখে আগমনশীল, এবং যারা গুপ্তচোর ও যারা প্রকটচোর, তাদের সকলকে আপনার (অর্থাৎ অগ্নির) মুখে নিক্ষেপ করছি। গুপ্ত ও প্রকট ভেদে চোর দুরকম। প্রকট চোরও দুরকমের। যারা অরণ্যে, পথের মধ্যে অপহরণ করে প্রত্যক্ষরূপে পলায়মান হয়, তারা প্রকট-চোর। আবার, নির্ভয়ে গ্রামের মধ্যে গমন করে যারা চুরি করে, তারাও প্রকট-চোর। মল বা পাপের আধিক্য হেতু এদের মলিন (মলিব) বলে।–হে পূজনীয় অগ্নি! মলিন চোরগণকে দন্তপংক্তিতে, তস্করগণকে বহিদৃশ্যমান দন্তে বা জম্ভায় ও স্তেন নামক চোরদের হতে পীড়ন পূর্বক তুমি ভক্ষণ করো। মলিন, স্তেন ও তস্কর এই ত্রিবিধ চোর, পূর্ব যাদের নাম ব্যক্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা গ্রামে, পথে বা বনে জনগণের প্রতি হিংসা ইচ্ছা করে, তাদের সকলকে আপনার জম্ভায় নিক্ষেপ করছি। (পূর্বে চোরভেদ দর্শিত হয়েছে। ইদানীং শত্রুভেদ কথিত হচ্ছে)।–শত্রুও প্রধানতঃ তিন রকম। আরতি (যারা দাঁতব্যত্বের দ্বারা আমাদের প্রাপ্য ধন প্রদান করে না, অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও যারা আমাদের প্রাপ্য ধন প্রদান করে না), দ্বেষী (যারা আমাদের প্রতি বিদ্বেষ প্রযুক্ত হয়ে আমাদের কার্যে বিঘাত করে) এবং নিন্দক (বাক্-দৌজন্যমাত্ৰ সদাই আমাদের নিন্দা করে)। এতৎ ব্যতীত আমাদের বধ করতে কামনাকারী (হকাম) শত্রু আছে, যাদের চতুর্থ বলে ধরা হয়। হে অগ্নি! আপনি তাদের সকলকে চূর্ণ করুন। আমি আমার ব্রাহ্মণ্যকে (ব্রাহ্মণ্যতেজঃ বা শক্তিকে) সম্যক তীক্ষ্ণীকৃত করছি; যাতে যে রাজার আমি পুরোহিত, ব্ৰহ্মতেজের দ্বারা তার মঙ্গলসাধন করতে পারি। আমার বীর্য তথা ইন্দ্রিয়শক্তি ও বল তথা শরীরশক্তিকে সম্যকরূপে স্বকার্যক্ষম করছি। তাতে যে রাজার আমি পুরোহিত, তার প্রতি আমার প্রদেয় সেই ক্ষত্ৰতেজ জয়শীল হোক। আমার এই স্বকীয় ব্রাহ্মণত্ব রাজা ও ব্রাহ্মণ ইত্যাদির মধ্যে একে অপরের বাহু, কান্তি ও বলের দ্বারা বর্ধিত করছি।–এই মন্ত্রের সামর্থে আমি শত্রুগণকে ক্ষীণ করছি এবং আপন পুরুষজনকে উত্তপ্রাপ্ত করাচ্ছি। তিরস্কারহীন জীবন বা আয়ুলাভের আকাঙ্ক্ষা (বাঞ্ছা) করে দর্শনীয়রূপ রূক্স (সুবর্ণনির্মিত ফলকাকার আভরণবিশেষ) যেমন দীপ্ত হয়ে থাকে, সেইরকম (তথাবিধ) দ্যুলোকবাসী দেবগণের সৎ-জনের দ্বারা উৎপন্ন এই অগ্নি অন্নরূপ হবিঃ লাভ করে অমৃত অর্থাৎ অমর হয়েছেন। (অত্র রুক্সস্যাগ্নিধারণাঙ্গত্বাদগ্নিত্বমুপচরিত–এখানে অগ্নিধারণের অঙ্গ হিসাবে রুক্সেতে অগ্নিত্ব উপচরিত হয়েছে, অর্থাৎ লক্ষণার দ্বারা বোধিত হয়েছে)। কবি (পণ্ডিত বা বিদ্বান), বরেণ্য (শ্রেষ্ঠ) সবিতাদেব জগরূপ সমস্ত কিছুকে আলোকিত করেন (প্রকাশ করেন)। দ্বিপদ মনুষ্য ইত্যাদি ও চতুষ্পদ পশুবৰ্গকে আপন আপন কর্মে প্রেরণ পূর্বক এবং দুলোককে বিশেষভাবে প্রকাশিত করে উষার অন্তে উদয় লাভ করেছেন বা বিরাজিত হয়েছেন। দুজনা মাতা যেমন এক শিশুকে পালন করেন তেমনই দিবা ও রাত্র ভিন্নরূপা হয়েও (দিবা শুক্ল ও রাত্রি কৃষ্ণ হওয়া সত্ত্বেও) পরস্পর একমতি হয়ে, এক শিশুরূপ অগ্নিকে ধারণ করছে, অর্থাৎ যজমান কর্তৃক অগ্নিধারণ সম্পাদিত করছে। দ্যাবা বা দ্যুলোক, ক্ষামা বা ক্ষিতিলোক (তথা ভূলোক) ও এই উভয়লোকের মধ্যবর্তী অন্তরীক্ষলোকে রুক্মসদৃশ এই অগ্নি বিশেষভাবে প্রকাশ পাচ্ছেন। দেবগণ যাগের দ্বারা যেমন ধনরূপ ফল প্রদান করেন, সেইরকম যজমানের প্রাণ অগ্নিকে ধারণ করছে (অগ্নিমেতং ধারয়ন ধৃতবন্তঃ)। হে অগ্নিদেব! আপনি পক্ষী-আকারে চেষ্যমান বা চয়নীয় হওয়ার কারণে পক্ষীরাজ গরুড়ের ন্যায়, ত্রিবৃৎস্তোম আপনার শিরস্থানীয়, গায়ত্রী নামে আখ্যাত সাম আপনার চক্ষু, পঞ্চদশ ইত্যাদি স্তোম আপনার জীবাত্মা, বামদেব্য সাম আপনার শির ব্যতিরিক্ত তনুস্থানীয় অর্থাৎ শরীর, বৃহৎ ও রথম্ভর নামে আখ্যাত সামদ্বয় আপনার দুটি পক্ষস্থানীয় এবং যাজ্ঞিয় নামে আখ্যাত সাম আপনার পুচ্ছস্থানীয়। (উল্লিখিত গায়ত্রী ইত্যাদি ছন্দসমূহ হৃদয় ইত্যাদি অঙ্গস্থানীয়)। সৌমিক হোত্রিয় ইত্যাদির আসন আপনার শফ বা খুরস্থানীয় এবং যতগুলি যজু, তা আপনার নামস্থানীয়। [এই অনুবাকের ব্যাখ্যাত মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ১০ম অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥১০৷
মর্মার্থ- বিষ্ণু অর্থাৎ সর্বব্যাপ্ত দেবতা তাঁর ত্রিপাদিবিক্ষেপে তিন লোক অধিকার করেন। এখানে ত্রিপাদ বিক্ষেপে তিনটি লোক এবং চতুর্থ পাদবিক্ষেপে সর্ব দিকে অধিকার সম্পর্কিত মন্ত্র উধৃত হচ্ছে। ইত্যাদি)।–হে প্রথম পাদবিন্যাস! তুমি বিষ্ণুর পাপঘাতী (বা পাপরূপ শত্রুঘাতী) ক্রম হও; তুমি গায়ত্রী ছন্দ গ্রহণ পূর্বক এই পৃথিবীতে বা ভূদেবতারূপ প্রদেশে আগম করো; যাকে আমরা দ্বেষ করি, সে এই প্রদেশ হতে নিঃসারিত (বহিস্কৃত) হোক। সেইরকম, হে দ্বিতীয় পাদবিন্যাস! তুমি বিষ্ণুর মিথ্যাপবাদঘাতী ক্রম হও; তুমি ত্রিষ্ঠুভ ছন্দ গ্রহণ পূর্বক অন্তরীক্ষলোক প্রাপ্ত হও; যাকে আমরা দ্বেষ করি সে এই প্রদেশ হতে নিঃসারিত হোক। হে তৃতীয় পাদবিন্যাস! তুমি বিষ্ণুর অরাতিঘাতী ক্রম হও; তুমি জগতী ছন্দ গ্রহণ পূর্বক দ্যুলোক প্রাপ্ত হও; যাকে আমরা দ্বেষ করি, সে এই প্রদেশ হতে নিঃসারিত হোক। হে বিষ্ণুর চতুর্থ পাদবিন্যাস! তুমি বিষ্ণুর শহন্তারক ক্রমরূপে অনুষ্টুপ ছন্দ গ্রহণ পূর্বক সকল দিক প্রাপ্ত হও; যাকে আমরা দ্বেষ করি, সে এই প্রদেশসমূহ হতে (অর্থাৎ পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোক হতে) নিঃসারিত হোক। (এখানে গায়ত্রী ইত্যাদি ছন্দ-অভিমানী দেবতা প্রতিটি ক্রমের অনুগ্ৰাহিকারূপে চিহ্নি)।–যেমন দুলোকস্থায়ী মেঘ শস্যের শোষণভীতি দূর করার নিমিত্ত গর্জন করে, অর্থাৎ দাহ বা তাপের প্রভাব দুর করে বৃক্ষলতা ইত্যাদিকে সমৃদ্ধ করার অনুকূলে সম্যক গর্জন করে, সেইরকম এই অগ্নি আমাদের অনিষ্ট নিবারণের নিমিত্ত গর্জন করুন (গজ)। এই অগ্নি সদ্য উৎপদ্যমান হয়ে দ্যাবাপৃথিবীর অন্তরলোক আপন রশ্মিতে উদ্ভাসিত করে থাকেন। হে অগ্নি! আপনি আমাদের অপমৃত্যুরহিত আয়ু (অর্থাৎ পূর্ণ আয়ু), বর্চ (অর্থাৎ কান্তি বা বল), মেধা (অর্থাৎ শ্রুত বিষয়সমূহকে ধারণশক্তি), প্রজা (পুত্র ইত্যাদি) ও ধন (অর্থাৎ সুবর্ণ) দানের নিমিত্ত আমাদের নিকট আগমন করুন। হে অঙ্গসৌষ্ঠবযুক্ত অগ্নি! আপনার আবর্তনশক্তি শতসংখ্যক হোক, এবং আপনার উপবৃত্তি শক্তি সহস্ৰসংখ্যক হোক। আমাদের প্রতি স্নেহাতিশয় প্রযুক্ত আপনি পুনঃ পুনঃ (অগণিতবার) আগমন করুন এবং আপনার পুরুষ ইত্যাদি ও দ্রব্যসমূহ পুনঃ পুনঃ (অসংখ্যবার) আগত হোক। আপনার পোষণের দ্বারা আমাদের নষ্ট ধন অযুত-লক্ষ ইত্যাদি সংখ্যায় পুনঃ পুনঃ লব্ধ করান এবং পূর্বে অপ্রাপ্ত ধন আমাদের প্রাপ্ত করান। হে অগ্নি! আপনি বলপ্রদ ক্ষীর ইত্যাদি রসের সাথে পুনঃ পুনঃ এখানে আগমন করুন, আপনি আয়ু-বৃদ্ধিকারক অন্নের সাথে পুনঃ পুনঃ এখানে আগমন করুন, এবং আমাদের দ্বারা পুনঃ পুনঃ কৃত সকল অপরাধ হতে রক্ষা করুন। হে অগ্নি! ধনের সাথে আপনি নিবর্তিত (প্রত্যাবর্তিত) হোন। সকলের পেয় (বিশ্বস্ত্রী) বৃষ্টিধারা তৃণধান্য লতা ও পাদপ ইত্যাদির উপরে সিঞ্চন করুন। হে বরুণ! উত্তমাঙ্গে অর্থাৎ মস্তকে স্থাপিত আপনার পাশ আকর্ষণ পূর্বক নমিত করে উৎকৃষ্টভাবে বিনাশ করুন। অধমাঙ্গে অর্থাৎ পাদপ্রদেশে স্থাপিত আপনার পাশ আকর্ষণ পূর্বক বিনাশ করুন। মধ্যদেশে অর্থাৎ দেহের মধ্যভাগে স্থাপিত আপনার পাশ বিচ্ছিন্ন করুন। অনন্তর, অর্থাৎ পাশত্রয় বিনাশের পর, হে আদিত্যসদৃশ বরুণ, আমরা পাপরহিত হয়ে আপনার ব্রতে বা কর্মে অখণ্ডিতভাবে (ছেদহীনরূপে) যোগ্য হবে (যোগ্যা ভবেম)। হে অগ্নি! আপনি আহৃত হয়েছেন (অর্তাৎ আপনাকে আহরণ করা হয়েছে);উখার অভ্যন্তরে চলনরহিত হয়ে অর্থাৎ স্থির হয়ে অবস্থান করুন। সকল প্রজা, আপনাকে বাঞ্ছা করে; আপনি এই যজমানেক অধিপতিরূপে স্থাপন করুন। এই অগ্নি উষাকালে অগ্নি হোত্র ইত্যাদি বোধ্যমান হয়ে উখিত হয়েছেন এবং আপন তেজঃ প্রভাবে তমসা হতে (আলোকের মধ্যে) নির্গত হচ্ছেন। (সেই অগ্নি কিরকম? না,) তিনি তমসার হিংসক, রশ্মির দ্বারা সু-অঙ্গশালী (অর্থাৎ শোভন শরীরধারী), এবং উৎপন্ন হওয়া মাত্র আপন তেজঃপ্রভাবে সকল স্থান: পূর্ণ করেছেন। হে অগ্নি। আপনি মাতৃসমা এই উখার উৎসঙ্গে (ক্রোড়ে) উপবেশন করুন। (উপবেশন করে আপনার করণীয় বা অকরনীয় কি? না, আপনি সর্বজ্ঞানীরূপে সকল উপায় বিদিত আছেন, সুতরাং এই উখাকে অত্যন্ত তাপ দেবেন না। এই উখার অন্তরে আপনার শুক্লজ্যোতির (পবিত্র জ্যোতির) নির্মল প্রকাশে আপনি বিশেষভাবে দীপ্ত হোন।–হে অগ্নি! এই উখার অন্তরে, আপনার নিজস্ব স্থানকে দীপ্তিযুক্ত করুন। হে জাতবেদা! আপনি তেজের দ্বারা দীপ্ত হয়ে এই উখার সুখপ্রদ হোন (ভব)। হে অগ্নি! প্রথমে আমার নিমিত্ত শান্ত হয়ে, অনন্তর সকলের প্রতি শান্ত ভাবাপন্ন হয়ে উপবেশন করুন। সকল দিককে শান্ত করে আপনি আপনার আপন সৃষ্টিস্থান এই উখাতে আগমন পূর্বক উপকেশন করুন। স্বয়ং আহবনীয় ইত্যাদি সম্পন্ন দেশে (অর্থাৎ যে স্থানে যজন বা যজ্ঞসাধন ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়, সেই স্থানে) গমন করে যজমানকে স্থাপন পূর্বক এই শত্রুনাশক অগ্নি যজ্ঞক্রিয়া সম্পন্ন করুন। এই অগ্নি অন্তরীক্ষে ধুম্রজ্বালারূপে অবস্থান করেন; তিনি হোতা, অর্থাৎ দেবগণের আহ্বাতা; তিনি বেদিষৎ, অর্থাৎ যজ্ঞসম্বন্ধিনী বেদীতে আসীন; তিনি অতিথিদুরোণসৎ, অর্থাৎ অতিথিসমান হয়ে যজমানে গৃহে অবস্থিত; তিনি নৃষৎ, অর্থাৎ মনুষ্যের মধ্যে জঠরাগ্নিরূপে অবস্থিত; তিনি বরসৎ, অর্থাৎ শ্রেষ্ঠরূপে শ্রোত্রিয় বা বেদাধ্যায়ী ব্রাহ্মণের গৃহে অবস্থিত; তিনি ঋতসৎ, অর্থাৎ যজ্ঞে যজ্ঞনিম্পাদকরূপে অবস্থিত; তিনি ব্যোমসৎ, অর্থাৎ ব্যোমে বা আকাশে সূর্যরূপে অবস্থিত; তিনি ত্যা, অর্থাৎ বৃষ্টিধারায় বিদ্যুরূপে প্রাদুর্ভূত; তিনি গোজা, অর্থাৎ গো-কার্যে বা ঘৃতে জ্বালারূপে অবস্থিত, (অর্থাৎ অগ্নিতে ঘৃত আহুতি দেওয়ার ফলে শিখা বা জ্বালার উৎপত্তিকারক); তিনি অদ্রিজা, অর্থাৎ পর্বতে দাবনলরূপে জাত। এইরকম প্রৌঢ় অগ্নি চয়নোপেত হয়ে যজ্ঞ নিম্পাদন করুন। এই মন্ত্রগুলির সাথে ৫ম কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ১ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥১॥
মর্মার্থ- অগ্নি প্রথমে দিবস্পরি অর্থাৎ দুলোকের উপরে সূর্যরূপে উৎপন্ন হয়েছেন। তাঁর দ্বিতীয় জন্ম হলো আমাদের এই মনুষ্যলোকে প্রসিদ্ধ জাতবেদা বহ্নিরূপে। সমুদ্রে বড়বানলরূপে উৎপত্তি তার তৃতীয় জন্ম। এই অগ্নি যজমানের প্রতি অনুগ্রহবুদ্ধি সম্পন্ন। পুরোডাশ ইত্যাদির দ্বারা দীপয়ন (উদ্দীপ্ত) করে জরা পর্যন্ত এই হেন অগ্নির পরিচর্যা করা হয়ে থাকে।–হে অগ্নি! পূর্ববর্তী মন্ত্রে আদিত্য, অগ্নি ও বড়বানল নামে আপনার যে তিনটি রূপের কথা উক্ত হয়েছে, আমরা সেই তিনটি রূপ জ্ঞাত হতে ইচ্ছা করব। নানা স্থানে আপনার প্রতিপালিত গার্হপত্য, আহবনীয়, অন্বহার্য, পচন, আগ্নীখ্রীয়, শামিত্র ইত্যাদি নামে অবস্থান আছে, আমরা জ্ঞাত হতে ইচ্ছা করব। এবং আপনার যতগুলি পরম উৎকৃষ্ট মন্ত্রপ্রতিপাদ্য গোপন নাম আছে, আমরা তাও বিদিত হতে চাইব। অধিকন্তু বিদ্যুঞ্জপে আগত আপনার উৎসও বিদিত হতে চাইব।–হে অগ্নি! যজমান আমি আপনাকে দীপ্ত করছি। (কিরকম যজমান? না,) নৃমণা, অর্থাৎ কর্মানুষ্ঠানপর মনুষ্য ঋত্বিকগণের মনের অনুসন্ধানকারী; নৃচক্ষা, অর্থাৎ বেদপারগ মনুষ্যগণের মধ্যে মন্ত্র ইত্যাদির স্পষ্ট উচ্চারণকারী। (আপনি কিরকম? না,) আপনি সমুদ্রে বড়বানলরূপে স্থিত, বৃষ্টিধারার মধ্যে বিদ্যুঞ্জপে স্থিত, এবং দুলোকের ঊধ (অর্থাৎ স্তন) স্থানীয় রঞ্জনাত্মক তেজোমণ্ডলে সূর্যরূপে স্থিত। মহিমান্বিত যজমানবৃন্দ যজ্ঞ সম্বন্ধিনী বেদিস্থানে স্থিত আপনাকে (আহুতির দ্বারা) প্রীত করেন। দ্যুলোকস্থ মেঘ যেমন পৃথিবীস্থ শস্যের শেষে বা শুষ্ক হবার ভীতি নিবারণের নিমিত্ত গর্জন করে বৃক্ষ ও পুষ্পলতা ইত্যাদির উপর সম্যক বর্ষণ করে, সেইভাবে আমাদের অনিষ্ট অনিষ্ট নিবারণের নিমিত্ত এই অগ্নি গর্জিত হোন। এই অগ্নি সদ্য উৎপদ্যমান হয়ে দ্যাবাপৃথিবীর অন্তরদেশ আপন রশিপ্রভাবে উদ্ভাসিত করে সবকিছুই প্রকাশ করছেন। আমাদের প্রতি অনুগ্রহকারী, পাবক অর্থাৎ শোধনকারী, অরতি অর্থাৎ যাগরহিত জনের প্রতি প্রীতিরহিত, সুমেধা (শোভম মেধা) অর্থাৎ সেবকগণের অভিপ্রায় ধারণশক্তি সম্পন্ন, অমৃত অর্থাৎ মরণরহিত–এই হেন যে অগ্নি, তিনি এই মর্ত্যলোকে (মনুষ্যগণের মধ্যে) নিহিত রয়েছেন। এই অগ্নি চক্ষু ইত্যাদির উপর উপদ্রবরহিত হয়ে উর্ধ্বে অতিশয় ধূম বিস্তার পূর্বক নির্মল প্রভারূপে দ্যুলোকে ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছেন (ব্যাপ্নোতি)। বিশ্বের কেতু, অর্থাৎ জগতের জ্ঞাতা; ভুবনের গর্ভবৎ অর্থাৎ ভুবনের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী এই অগ্নি জামাত্র (অর্থাৎ জন্মলাভ মাত্রই) আপন তেজে দ্যাবাপৃথিবী পূর্ণ করছেন। যজমানের সাথে ঋত্বিকরূপী পঞ্চসংখ্যক জন যখন অগ্নির উদ্দেশে যাজ্ঞানুষ্ঠানে রত হন, তখন এই অগ্নি আহুতিরূপে অদিত্যের সমীপে গমনের নিমিত্ত পর্বতসমান মেঘ ভেদ করে থাকেন (বিদারিতবা)। শ্ৰীণাং অর্থাৎ গো অশ্ব ইত্যাদি সম্পদের উৎকর্ষ প্রাপয়িতা (অর্থাৎ যাঁর সহায়তায় ঐ সম্পদের উৎকর্ষতা প্রাপ্তি ঘটে), ধরুণণা রয়ীণাং অর্থাৎ যিনি ধনসমূহ ধারণ বা রক্ষণ করে থাকেন, মনীষাণং প্রাপণঃ অর্থাৎ মনীষীগণের পক্ষে স্বর্গ ইত্যদি ফলের প্রাপয়িতা (অর্থাৎ যার দ্বারা জ্ঞানী ব্যক্তিগণ তাঁদের সুকর্মজনিত শোভন ফল প্রাপ্ত হয়ে থাকেন), সোমগোপা অর্থাৎ যজমানের দ্বারা অনুষ্ঠিত সোমযাগের রক্ষক, বসো অর্থাৎ নিবাসের হেতুস্বরূপ, সৃণু সহসো অর্থাৎ মথনবেগরূপ বলের পুত্র, অসু রাজা অর্থাৎ বৃষ্টিরূপ জলে বিদ্যুত্রপে দীপ্যমান,–এই হেন অগ্নি উষার অগ্রে (প্রাতঃকালে) অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক দীপ্যমান হয়ে বিশেষভাবে রমণীয় হয়ে উঠছেন। হে কল্যাণময় দীপ্তিশালী অগ্নিদেব (ভদ্রশোছে)! যে যজমান অদ্য আপনার নিমিত্ত ঘৃতযুক্ত পিষ্টক অর্থাৎ পুরোডাশ প্রস্তুত করছেন, হে যুবতম! দেবতায় ভক্তিযুত সেই পুরোডাশকারী যজমানের প্রতি তার অভিমত ধন (দ্যুম্ন) প্রকর্ষের সাথে প্রেরণ করুন। (কিরকম দ্যুম্ন? না,) প্রকৃষ্টতর অর্থাৎ অতিশয়ভাবে নিবাসের কারণরূপ দ্যুম্ন। এই যজমান সূর্যের প্রিয় হোন, ইনি অগ্নিরও প্রিয় হোন; এবং জাত পুত্র ও জনিষ্যমান (অর্থাৎ জন্ম হবে, এমন) পৌত্র ইত্যদির দ্বারা এই যজমান বৃদ্ধি লাভ করুন (জনিষ্যমাণৈঃ পৌত্রাদিভিশ্চোনিদ)। হে অগ্নি! প্রতিদিন সকল যজমান আপনার অনুগমন পূর্বক সকল বরণীয় ধন ধারণ করতে সমর্থ হন। আপনার সাথে অবস্থানকারী যজমানগণ পুনরায় অধিক দ্রব্য কাঙ্ক্ষা পূর্বক বহু গাভীযুক্ত ব্ৰজ (গো-নিবাসস্থান গোষ্ঠ) বিশেষভাবে বরণ করেছেন। দৃশানো অর্থাৎ দর্শনীয়, রুক্স অর্থাৎ সুবর্ণসাদৃশ, উবা অর্থাৎ মহৎ দীপ্তিতে বিদ্যোতিত হয়ে অগ্নিদেব অবস্থান করছেন। (কি করবেন? না,) তিনি অন্যের অতিরস্কৃত আয়ু বা জীবন প্রদানের নিমিত্ত অবস্থান করছেন। তথাবিধ এই অগ্নি হবিরূপ অন্নের দ্বারা অমর হয়েছেন এবং স্বর্গবাসী দেবগণের অমরত্বের সাথে যুক্ত হয়েছেন। [এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ১ম অনুবাকের কতিপয় মন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন–তৃতীয়ে চয়নার্থস্য দেবযজনস্য পরিগ্রহোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৩ ে চয়নের নিমিত্ত বহ্নিকে দেব্যজনস্থানে আনয়ন সম্পর্কে বলা হয়েছে]
মর্মার্থ- হে অন্নপতি অগ্নিদেব! বোগরহিত, বলের হেতুকারক অন্নের প্রাপ্তি আমাদের প্রদান করুন। প্রকর্ষের সাথে হবিসমূহের দাতা যজমানকে প্রকৃষ্টরূপে পাপ হতে উত্তরণ করুন। আমাদের দ্বিপদী মনুষ্যগণকে ও চতুষ্পদী পশুগণকে বলসম্পন্ন করুন। হে অগ্নিদেব! সকল দেবগণ প্রাণস্বরূপ হয়ে কুশলতাযুক্ত বুদ্ধিবৃত্তির সহযোগে আপনাকে ঊর্ধ্বে স্থাপন করুন। আপনি আমাদের নিকট শান্ততম, সুপ্রতীক বা সুমুখ ও বিভাবসু বা প্রভার বাসয়িতা রূপী হোন। হে অগ্নিদেব। আপনার শান্ত জ্বালা বা শিখার সাথে প্রকাযুক্ত হয়ে অদ্য দেব্যজন (দেবতাগণের যজন বা যজ্ঞ) স্থানে গমন করুন। বৃহৎ বা উজ্জ্বল রশ্মিতে বিভাসিত বা প্রকাশিত হয়ে আপনার দাহক দেহের দ্বারা প্রজাগণের প্রতি হিংসান্বিত হবেন না (প্রজা মা হিংসী)। হে ঋত্বিক ও যজমানবৃন্দ! সমিধকে ঘৃতের দ্বারা সিক্ত করে এই অগ্নির পরিচর্যা করুন। (অর্থাৎ ঘৃতের দ্বারা যেমন অতিথিকে আপ্যায়িত করা হয়, সেইমতো ঘৃতসিক্ত সমিধ (ইন্ধন) অর্পণ করে এই অগ্নিকে উদ্দীপিত করুন)। তারপর এই অগ্নিতে হবিঃসমূহ সমর্পণ পূর্বক সমুদায় যাগ নিষ্পন্ন করুন। এই অগ্নি হবির পোষণকারী যজমানের আহ্বান অতি প্রকৃষ্টরূপে শ্রবণ করেন (শৃণোতু)। এই যে অগ্নি, তিনি সূর্যের ন্যায় অধিক দীপ্যমান (ভাসমান) হয়ে প্রকাশিত হচ্ছেন। যে অগ্নিদেব সংগ্রামে জয়পূর্তি পূর্বক অবস্থান করেন, সেই অগ্নিদেব অতিথিরূপে আমাদের নিকটে আগমন করুন। (সেই অগ্নি কিরকম? না,) সেই অগ্নি দেবতো হিতঃ, অর্থাৎ দেবতাবর্গের হিতকরী; তিনি শিবঃ, অর্থাৎ পরম-মঙ্গলরূপ। হে জলদেবীগণ (আপো দেবীদেব্যা)! আপনারা অগ্নির উপরে সঞ্চিত ভস্ম গ্রহণ করুন এবং ঐ গৃহীত ভস্ম কোন সুখকর সুগন্ধযুক্ত (সুরভাবু) স্থানে স্থাপন করুন। আপনারা সুপত্ন, অর্থাৎ শোভন বরুণের পত্নী এবং অগ্নির জননী। (উল্লেখ্য-বড়বাগ্নি ও বৈদ্যুতাগ্নির জন্ম জলে)। হে জলদেবীগণ! মাতা যেমন পুত্রকে পালন করেন, সেইমতো আপনারা সাবধানে (সুষ্ঠুভাবে) এই অগ্নিকে পালন করুন। হে অগ্নিদেব! আপনার বল ভস্মরূপ জলে বর্তমান আছে; আপনি ওষধীরূপে ব্রীহি যব ইত্যাদিতে বর্তমান, এবং তা জঠরাগ্নিরূপে স্বীকৃত। (অর্থাৎ ব্রীহি যব ইত্যাদিতে যে ওষধী আছে, তা খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের জঠরস্থ হয়ে জঠরাগ্নির সংস্পর্শ লাভ করে)। অরণ্যগর্ভে স্থিত আপনি পুনঃ পুনঃ সম্যভাবে জাত হবেন। ভেষজরূপ ওষধিবিশেষ হতে উৎপদ্যুমান হওয়ার কারণে আপনি ওষধির গর্ভস্বরূপ হন; আবার, অরণী হতে উৎপদ্যমান হওয়ার কারণে আপনি বনস্পতির গৰ্ভরূপ হন। হে অগ্নি! সর্ব প্রাণীজাতের জঠরে বর্তমান হওয়ার কারণে আপনি জঠরাগ্নিরূপে সকল প্রাণীর গর্ভরূপ আবার বড়বা ও বিদ্যুৎরূপেও জলের গৰ্ভরূপ হন। হে অগ্নি! ভস্মের সাথে আপনার কারণভূতা (যোনিভূতা) পৃথিবী ও পৃথিবীর কারণভূতা জলের সাথে মিলিত হয়ে অর্থাৎ একীভূত হয়ে আপনি জ্যোতিষ্মন জ্যোতি সম্পন্ন হোন এবং পরে আপন স্থান উখাতে আসীন হোন। হে অগ্নিদেব! পুনরায় আপনি আপনার নিজ স্থান জল ও পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে উখার মধ্যে সেইভাবে শান্ত হয়ে শয়ন করে আছেন, যেমন কোন শিশু তার মাতার ক্রোড়ে সুখে শায়িত থাকে। হে অগ্নিদেব! আপনি ক্ষীর ইত্যাদি রসের সাথে পুনরায় নিবর্তিত হয়ে এই স্থানে আগত হোন, পুনরায় আয়ুসমূহ সহ এই স্থানে আগত হোন এবং পুনরায় আমাদের কৃত অপরাধ হতে আমাদের রক্ষা করুন। হে অগ্নিদেব! আপনি ধনের সাথে নিবর্তন পূর্বক এই স্থানে আগমন করুন; আপনি সকলের পানযোগ্য বৃষ্টিধারা সকলের উপরে অর্থাৎ তৃণ-শস্য-লতা-বৃক্ষ ইত্যাদি সকলের উপরে সিঞ্চন করন। হে অগ্নি! আপনাকে আদিত্যগণ, রুদ্রসমূহ ও বসুবৃন্দ পুনরায় সন্দীপিত করুন (সন্দীপয়ন্তু)। হে বসুনীথ (অর্থাৎ ধনের প্রাপয়িতা)! ব্রাহ্মণ-ঋত্বিকবর্গ যজ্ঞের নিমিত্তভূত আপনাকে পুনরায় সন্দীপ্ত করুন। আপনি ঘৃতের দ্বারা তুষ্ট হয়ে আমাদের শরীরগুলিকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত করান; কারণ আপনি যদি তুষ্ট হন, তবে যজমানের কামনাসমূহ সত্য হবে (অর্থাৎ পূর্ণ হবে)। হে যুবতম (অগ্নি)! আপনি স্বধা (অর্থাৎ পিতৃলোকের উদ্দেশে জলপিণ্ড দানের মন্ত্র) উপলক্ষিত আমাদের অন্নরূপ স্তুতিবাক্যের তাৎপর্য উপলব্ধি করুন (বুধ্যস্ব)। (কিরকম বাক্য? না,) আপনার অভিবৃদ্ধিহেতু প্রকৃষ্ট আদরের দ্বারা সম্পাদিত বাক্য বা মন্ত্র। আপনার স্তুতিকারী যজমানগণের মধ্যে কেউ আপনার যথোচিত প্রশংসায় স্তুতি করেন, কেউ বা উচিত উক্তি উল্লঙ্ঘন করে নিন্দারূপে অতি প্রশংসা করেন; আপনি যজমারূপী আমাদের অভিপ্রায় উপলব্ধি করুন, এই-ই প্রার্থনা করছি।–হে অগ্নি! অভিবন্দনপর এই আমি, আপনার তনুর বন্দনা করছি। হে অগ্নিদেব! আপনি আমাদের অভিপ্রায় বোধিত হোন। (আপনি কিরকম? না,) আপনি সূরি, অর্থাৎ জ্ঞানী বা বিদ্বান; মঘবা, অর্থাৎ অন্নবান; বসুদাবা, অর্থাৎ ধনপ্রদায়ক ও বসুপতি, অর্থাৎ ধনপতি। এই হেন যে দেব আপনি, শত্রুর কৃত দ্বেষ বা হিংসা হতে পৃথক বা মুক্ত করুন। [পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ২য় অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৩৷৷
মর্মার্থ- (যম হলেন সর্বভূমির অধিপতি। সেই নিমিত্ত তার ভৃত্যগণ পৃথিবীর সর্বত্র বিদ্যমান)। হে যমভৃত্যগণ! এইস্থানে অর্থাৎ এই দেবযজনস্থানে পুরাতন ও নূতন তোমরা যারা বর্তমান আছ, তারা সকলেই এই স্থান হতে অপগত হও (অর্থাৎ আমাদের সান্নিধ্য পরিত্যাগ করো)। পৃথিবীর এই স্থানটুকু যম আমাদের প্রদান করেছেন। এবং পিতৃগণ যজমান-কর্মের (যজ্ঞের) নিমিত্ত এই স্থানটিকে ব্যতিক্রমীভাবে চয়নস্থান রূপে পরিচিহ্নিত করেছেন। হে সিকতাস্বরূপ (বালুকার স্বরূপ)! তুমি হও অগ্নির প্রকাশক (অর্থাৎ বালির আধার তাপের প্রভাবে অত্যধিক উত্তপ্ত হয়ে অগ্নির অস্তিত্ব প্রমাণ করে)। অগ্নির অবস্থানের কারণে তুমি পাংসুরূপ (অর্থাৎ শুষ্ক ধূলিসদৃশ) হয়েছে। হে ঊষস্বরূপ (অর্থাৎ ক্ষারময় মৃত্তিকাস্বরূপ) তুমি হও পশুসম্বন্ধি সম্যক জ্ঞান। (অর্থাৎ পশুগণ আঘ্রাণের দ্বারা জ্ঞাত হয়ে উষর-ভূমি লেহন করে থাকে। সেই রকমে তুমি যজ্ঞের মাধ্যমে কামনার ধারক হয়ে থাক; অতএব তোমার যা কর্মর্ধারণের সামর্থ্য তা আমাদের হোক। হে সিকতা ও উষর প্রদেশ! তোমাদের যে প্রিয় তনুদ্বয়, তা পরস্পর সংযুক্ত হোক; তোমাদের যে দুই প্রিয় হৃদয়, তাও পরস্পর সম্মিলিত হোক। তাহলে তোমাদের প্রিয় যে আত্মাযুগল, তাও সম্যকভাবে পরস্পরের প্রিয় হবে। অধিকন্ত আমারও তনু সম্যকভাবে প্রিয় হবো। হে জাতবেদা! আপনি সত্বর গমনকুশল অশ্বের ন্যায় বেগে সহস্ৰসংখ্যক ধনের দ্বারা যজমানকে তুষ্ট করতে আগত হোন। হে ইষ্টকারূপ অগ্নি! আপনি দিবঃ অর্থাৎ দ্যুলোক হতে জলের অভিমুখে দিকে গমন করছেন (অর্থাৎ যজ্ঞের পুষ্টি সম্পাদন করছেন); আসনাসীন দেবতাগণকে হবিঃ স্বীকার করতে বলুন। (অর্থাৎ আপনার দ্বারা আহুত হলে দেবতাগণ আপন স্থান পরিত্যাগ করে এই স্থানে আগমন পূর্বক হবিঃ স্বীকার করবেন)। যে জলদেবীগণ সুর্যের দীপ্তিরূপ মণ্ডলের ঊর্ধপ্রদেশে ও অধোভাগে অবস্থিত আছেন (উপতিষ্ঠন্তে), তারা সকলে এই স্থানে আগমন পূর্বক উপহিত (অর্থাৎ স্থাপিত) হবেন। হে যাগনিস্পাদক (যজত্র) অগ্নি! আপনার যে দীপ্তি দুলোকে সূর্যরূপে ও পৃথিবীতে বহ্নিশিখা বা বহ্নিরূপে বর্তমান, সেইরকমেই আপনার যে তেজঃ ওষধিতে তার ফল পরিপাকের আকরে ও জলে বড়বানলরূপে বর্তমান; এবং আপনার যে দীপ্তি বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষে বিদ্যুত্রপে সর্বতো প্রকাশবান হয়েছে, আপনার সেই সমুদ্ররূপ বিস্তীর্ণ তেজঃসমূহ নৃচক্ষা অর্থাৎ মনুষ্যগণের প্রখ্যাপক। সেইরকম তেজোরূপ ইষ্টকার দ্বারা (ইষ্টক সমূহের দ্বারা) আমি উপধান করছি। ইষ্টকারূপ অগ্নিগণ এই আহুত হব্য ভক্ষণ করুন। (প্রতিটি ইষ্টকই এক একটি অগ্নিরূপ। তাঁরা কিরকম না, তাঁরা পাংসুরূপ (শুষ্ক) মৃত্তিকাতে উৎপন্ন, পরস্পর সমান প্রীতিযুক্ত, অনমীবা অর্থাৎ বোগরহিত, ইযষা অর্থাৎ অভীষ্টপ্রাপ্তির হেতুভূত এবং প্রৌঢ়। আমি সেই হেন (তথাবিধ) অগ্নিরূপা ইষ্টকা সমূহের উপধান করছি। হে অগ্নি! যাগসাধনে প্রবৃত্ত যজমানকে গো ইত্যাদি পশুর দাতা করুন। (কি রকম গো ইত্যাদি পশু? না,) সকলের দ্বারা প্রশংসনীয় এবং অত্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে বর্তমান, অর্থাৎ যেন এই পশুর সরবরাহে কোন ছেদ না পড়ে। অধিকন্তু আপনার প্রসাদে আমরা বিবিধরকম পুত্রের পিতা হবো। (কিরকম পুত্র? না, তনয় বা দত্তক পুত্ৰ ইত্যাদি এবং ঔরস–এই রকম। হে অগ্নিদেব! আমাদের প্রতি আপনার সুমতি-রূপ অনুগ্রহবুদ্ধি সঞ্জাত হোক। হে অগ্নিদেব! এই ইষ্টকারূপ পদার্থ আপনার যোনিরূপ ঋত্বিয় অর্থাৎ উৎপত্তির হেতু ভূত ঋতুকালীন স্ত্রী-পুরুষ সঙ্গমতুল্য। এই ইষ্টকারূপ যোনি হতে উৎপন্ন হয়ে আপনি দীপ্তিমান হয়ে থাকেন–এইরকম বিজ্ঞাত হয়ে আপনি আগমন করুন এবং তারপর আমাদের ধন বর্ধন করুন। হে ইষ্টকা! তুমি হও চৈতন্যস্বরূপা (চিদসি), দেবতাগণের দ্বারা অনুগৃহীতা হয়ে তুমি স্থির হয়ে অবস্থান করো–যেমন অঙ্গিরা ঋষিগণের দ্বারা উপধান প্রাপ্ত হয়ে (অর্থাৎ উপহিত বা স্থাপিত হয়ে) তুমি স্থিরভাবে অবস্থান করেছিলে। তুমি সর্বতোভাবে ভোগ সম্পাদন করো–যেমন দেবতাগণের দ্বারা অনুগৃহীতা হয়ে কিংবা অঙ্গিরা ঋষিগণের দ্বারা উপহিত হয়ে তুমি স্থিরভাবে অবস্থান পূর্বক সর্বতোভাবে ভোগ সম্পাদন করেছিলে। হে ইষ্টকা! গার্হপত্য অগ্নির চয়নস্থানে দুটি ইষ্টকার মধ্যবর্তী ছিদ্র সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ করে তুমি শান্ত হয়ে অবস্থান করো। ইন্দ্র, অগ্নি ও বৃহস্পতি–এই তিন দেবতা এই স্থানে তোমাকে স্থাপন করেছিলেন। স্বর্গের প্রকাশক, যজমানের জন্মের নিমিত্তভূত দেবতাগণ-সম্বন্ধিনি প্রজারূপ গো-সদৃশা অন্নের দোহয়িত্রী এই ইষ্টকা সোম পাক করছে (শ্রীণন্তি)। (অর্থাৎ এই ইষ্টকা প্রাতঃসবন ইত্যাদি তিনটি সবনে নিরন্তর সোমপাকের হেতু)। [পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৩য় অনুবাকের মন্ত্রসমূহের সাথে এই মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৪॥
মর্মার্থ- পূর্ব অনুবাকে যে গার্হপত্য অগ্নির কথা বলা হয়েছে, সেই গার্হপত্য চিতিতে মুখ্য অগ্নির সন্নিবপনের বেলায় দুটি অগ্নির স্থাপন করা হয়–একটি পূর্বসিদ্ধ অগ্নি, অপরটি পরসিদ্ধ অগ্নি। এই উভপ্রকার অগ্নিকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে–হে অগ্নি (অর্থাৎ অগ্নিদ্বয়)! আপনারা উভয়ে সঙ্গত (অর্থাৎ মিলিত) হোন; এবং সঙ্গত হয়ে সম্যকরূপে যজ্ঞের কল্পনা নিষ্পদন করুন। (কি রকম অগ্নিদ্বয়? না, আপনারা সম্যক্ পরস্পর তুল্যরূপ (প্রতিযুক্তৌ); রোচিষ্ণু, অর্থাৎ দীপ্যমান; ও পরস্পর সমানমনস্ক (সুমনস্যমানৌ)। এই হেন আপনারা এই অন্নের বল ও রস সম্যক্ সম্পাদন করুন। আপনাদের মনঃ সঞ্জাত সঙ্কল্পগুলি আমি সর্বতঃ সঙ্গত করব; সেই রকম কর্মসমূহ এবং কর্মবিষয়ক জ্ঞানমূহ আমি সম্পন্ন করব (সমাকর)। মিলিতভাবে উভয় অগ্নিস্বরূপ হে পাংসুযুক্ত অগ্নি! আপনারা আমাদের পালয়িতা হোন এবং সেই রকমে যজমানের নিমিত্ত অন্ন ও রস সম্পাদন করুন। হে যুগলাত্মক (দ্ব্যাত্মক) অগ্নি! আপনারা শুষ্ক মৃত্তিকাযযাগ্য (পুরীষার্থে), ধনবান (রয়িমান), এবং পুষ্টিমানও। সকল দিক শান্ত করে চিতিদ্বয়রূপ আপনাদের এই নিজস্থানে উপবিষ্ট হোন। আপনাদের মধ্যে যে অগ্নি পুরাতন এবং যে অগ্নি যুবা, সেই আপনারা আমাদের প্রতি সমানমনস্ক, সমাননিবাসস্থানবাসী ও পাপচিত্তরহিত হয়ে এই যজ্ঞ ও যজ্ঞপতির প্রতি হিংসা করবেন না। হে জাতবেদা অগ্নিদ্বয়! অদ্য এই যজ্ঞকর্মে আমাদের প্রতি শান্ত হোন (শাস্তৌ ভবতম)। যেমন লোকজগতে মাতা তাঁর পুত্রকে পালন (বা ভরণ) করেন, সেইরকম পৃথিবীরূপা এই উখা আপন গর্ভস্থানে এই শুষ্কমৃত্তিকারূপ অগ্নিকে ধারণ করছেন (পুরীষ্যমেতমগ্নিমভাবিভর্তি)। প্রজাপতি সেই উখাকে শিক্যপাশ (দড়ির শিকা) হতে মুক্ত করুন। (কিরকম প্রজাপতি? না,) তিনি বিশ্বের সৃষ্টিরূপ কর্মকারী বিশ্বকর্মা, তিনি বিশ্বদেব ও ঋতুদের সাথে একমত হয়ে থাকেন।
ধূমের অবসানে অগ্নির যে নির্মল জ্যোতি স্ফুরিত হয়, সেই জ্যোতির প্রতি বিদ্বেষকারীগণকে অতিক্রম করে। আমাদের প্রীত করুন। হে বৈশ্বানর নামে আখ্যাত অগ্নিদেব! আপনার শিক্যকে স্বাহা মন্ত্রে সুষ্ঠুভাবে আহুতি প্রদান করছি। হে (দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের মধ্যবর্তী স্থানের অভিমানিনী দেবতা) নিঋতি! বহুরকম রূপযুক্তা আপনাকে নমস্কার করছি। আপনি লৌহনির্মিত শৃঙ্খলের মতো দৃঢ় বন্ধনরূপ এই স্বর্গপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধক পাপ সমূহকে বিনাশ করুন। আপনি যমরূপ অগ্নি ও যমীরূপা পৃথিবীর সাথে একমত হয়ে যজমানের সর্বসুখখাপেত স্বর্গে অধিরোহণ প্রাপ্তি সম্ভবিত করুন। (অর্থাৎ যাতে তিনি স্বর্গপ্রাপ্ত হতে পারেন তেমন করুন)। হে যজমান! আপনার গ্রীবাদেশে নিঋতিদেবী নিজের যে অবিনাশক দৃঢ় পাশ বন্ধন করেছেন, আপনার গ্রীবাস্থিত সেই পাশ আমি বিমুক্ত করছি। অনন্তর (অর্থাৎ পাশবিমোচনের পর) আপনি চিরজীবীরূপে সকল প্রতিবন্ধকরহিত হবেন এবং পিতৃগণ অন্ন ভক্ষণ করবেন। হে নিঋতি! আপনার ক্রুর বা উগ্ররূপ মুখমধ্যে আহুতির ন্যায় ইষ্টকার উপধান করছি। (কি নিমিত্ত? না,) এর দ্বারা যজমানের পরলোক প্রাপ্তির (অর্থাৎ স্বর্গপ্রাপ্তির) প্রতিবন্ধক পাপসমূহের বিনাশ হবে। আপনার ঊষরভূমিরূপ মুখে আমি এই যে ইষ্টকার উপদান (বা স্থাপন) করছি, তা জন্তুমাত্ররূপী বা শাস্ত্রসংস্কাররহিত জন ভূমি বলে জ্ঞাত; আমি কিন্তু শাস্ত্রাভিজ্ঞ, সুতরাং আপনাকে সর্বৰ্থা নিঋতিদেবী বলে উত্তমভাবে পরিজ্ঞাত আছি (সম্যজানামি)। হে নিঋতি! যে জন সোমযাগ করে না ও যে জন হবির দ্বারা যজ্ঞ করে না এবং সেইরকম অনুচিত কর্মকারী যজমানকে আপনি গ্রহণ করতে ইচ্ছা করুন। অধিকন্তু যারা প্রচ্ছন্নচোর (স্তেন) এবং যারা প্রকটচোর (তস্কর), আপনি তাদের অনুগমন করুন, (অর্থাৎ তাদের গ্রহণ করুন)। সর্বথা সোমযাগকারী ও হবিঃ-যজ্ঞকারী আমাদের ব্যতীত অন্যদের গ্রহণ করতে ইচ্ছা করুন। হে দেবী নিঋতি! আপনাকে নমস্কার করি। দেবী নিঋতিকে আমি স্তুতিরূপ বাক্যের দ্বারা আপন অধীন করছি; যেমন লোকজগতে পিতা তার দুঃশীল বালক পুত্রকে হে তাত, হে বৎস ইত্যাদি লালনমূলক বাক্যে নিজের অধীন করে থাকেন। যে বিদুষী নিঋতি দেবী এক এক করে সকল স্তেন ও তস্করদের মস্তক ধারণ পূর্বক বিশেষভাবে বলেন যে, তিনি তাদের অপরাধ জ্ঞাত আছেন–আমি সেই হেন নিঋতি দেবীকে স্তুতিরূপ ব্যক্যের দ্বারা আপন অধীন করে বন্দনা করছি।–এই অগ্নি যজমানবর্গের আপন আপন গৃহে নিবাসকারী ও প্রজা-পশু ইত্যাদিরূপ দ্রব্যসমূহের প্রাপক। এই অগ্নি আপন শক্তির দ্বারা সর্বরূপকে (সবকিছুকে) প্রকাশ করেন; যেমন সবিতা দেব, অর্থাৎ সূর্য। সর্ব রূপকে প্রকাশ করে থাকেন।
(কিরকম অগ্নি? না, তিনি সত্যধর্মা (অর্থাৎ সত্য বা অবশ্যম্ভাবীফলোপেত অগ্নিহোত্র ইত্যাদি লক্ষণযুক্ত ধর্মশালী); ইন্দ্র (অর্থাৎ পরম ঐশ্বর্যবান); এবং সমরে শত্রুগণের সমাগমে স্বয়ং পুরোগামী হলেও তাকে সমরে লিপ্ত হতে হয় না, কারণ শত্রুগণ তাঁর (অগ্নি) নাম শ্রবণ মাত্রই পলায়ন করে থাকে। হে কৃষকগণ (কর্ষকাঃ পুরুষা)! চর্মময়ী রঞ্জু সম্যভাবে স্থাপন করো এবং সেখানে বলীবর্দসমূহের জলপানের নিমিত্ত দ্রোণীবিশেষ (গামলা) নিষ্পদিত (নির্মাণ করো)। জল উদ্ধারণের নিমিত্ত নির্মিত কূপের ন্যায় বহুল জলে পূর্ণ, ভূতলগত পঙ্ক উদ্ধারণের দ্বারা প্রস্রবণেপেত, সকলের দ্বারা অহিংসিত, গ্রীষ্মকালেও শোষণাভাব লক্ষণযুক্ত অর্থাৎ অশোষক অবটের সেচন করো। কাষ্ঠ-পাষাণ নির্মিত দ্রোণীর অন্তস্থিত যে অবকাশ (স্থান) থাকে, সেটি হোল অবট; আমি সেই অবটে জল সিঞ্চন করছি (অর্থাৎ সেখানে জল প্রক্ষিপ্ত করছি)। (সেই অবট কিরূপ? না,) তা নিতাহাবং (অর্থাৎ পার্শ্ববতী সচ্ছিদ্র কূপ আছে, যা থেকে জল নিষ্কাষিত হয়) এবং সুবরত্রং (অর্থাৎ কুপ হতে জল উদ্বারণের নিমিত্ত দৃঢ় চর্মময় রজ্জ্বর সাথে যুক্ত), সুষেচন (অর্থাৎ সুষ্ঠুভাবে সেচনমোগ্য জল উদ্ধরণের উপযুক্ত পাত্রযুক্ত), উদ্রিণং (অর্থাৎ উদকবন্ত বা জলশালী), অক্ষিত (অর্থাৎ জলের অগলিত বা অ-ক্ষরিত হওয়ার বিষয়ে পক্ষপাতরহিত)। কবয়, অর্থাৎ কৃষিকর্মে অভিজ্ঞ জনেরা লাঙ্গল সজ্জিত করুক; তারপর এক এক করে তিন বা ছয় যুগ (জোয়াল) বিস্তার করুক (একৈকং বিস্তারয়ন্তু)। (কিরকম কবয়? না,) তারা ধীরা অর্থাৎ ধৈর্যযুক্ত বা আলস্যহীন ও দেবেষু সুন্নয়া অর্থাৎ দেবতাবিশেষের নিকট হতে সুখপ্রাপ্তি ইচ্ছা করে (সুখমিচ্ছন্তি)। হে কৃষকগণ (কর্যকাঃ)। লাঙ্গল যোজনা করো; যুগসমূহের বিস্তার করো, এবং কর্ষণ করা হলে সেইস্থানে বীজ বপন করো (বপত), অধিকন্তু, সেই বীজ আশীর্বাদরূপ মঙ্গলবাক্যের দ্বারা যুক্ত। মঙ্গলবাক্য-আমাদের শস্য ইত্যাদি সভরা (সফল বা সুফলা ) হোক, পক্ক ফল দা বা কাটারির দ্বারা লবনসাধিত অর্থাৎ ছেদিত হয়ে আমাদের সমীপে আগত হোক। এই লাঙ্গল ভূমি কর্ষণ করছে। (কিরকম লাঙ্গল? না,) এই লাঙ্গল বজ্রবৎ অতি তীক্ষ্ণ, কর্ষণে সুষ্ঠুভাবে কর্মক্ষম (অর্থাল অতি তীক্ষ্ণত্বের নিমিত্ত ভূমি কর্ষণে কোন প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না), এবং নিম্ন-উচ্চতাসম্পন্ন (অসমতল ভূমিতেও অবিচ্ছিন্নভাবে গমনকারী। এই কর্ষণের দ্বারা ফলাধিক্য হলে যজমান গো-ইত্যাদি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। লাঙ্গলের ফাল বা মুখাগুলি সুখে বিশেষভাবে কৰ্ষণ করুক। কৰ্ষক বা কৃষকগণ বলীবৰ্দের পশ্চাতে সুখে গমন করুক। মেঘ সুখে মধুর রসের দ্বারা ধারা যুক্ত হয়ে জল বৃষ্টি সৃষ্টি করুন (অর্থাৎ বর্ষণ করুন)। বায়ু ও আদিত্যদেবতা আমাদের সুখ প্রদান করুন (সুখমশ্বাসু ধৰ্ত্তম)। হে কামদুঘা (কামবর্ষণকারী) লাঙ্গলপদ্ধতি (লাঙ্গলের সীতা বা রেখা সমূহ)! তোমরা মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র, অগ্নি, পূষা, ওষধি ও প্রজাগণের কামনানুরূপ ভোগ সম্পাদন করো। এই সীতা বা লাঙ্গলরেখা মধুর স্মৃতের দ্বারা সম্যক আদ্রীকৃত (সিক্ত) হয়েছে; অতএব বিশ্বদেবগণ ও মরুৎ-দেবতাগণ তা সমীচীনরূপে অঙ্গীকার (স্বীকার করেছেন; সেগুলি আবার জলের দ্বারা আপ্যায়িত হয়েছে। হে সীতা (লাঙ্গলরেখা)! তুমি জলের দ্বারা আপ্যায়িত হয়ে আমাদের প্রতি আবর্তিতা হও। [এই মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৪র্থ ও ৫ম অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন-ষষ্ঠ ওষধিবালো বিধীয়তে। অর্থাৎ এই অনুবাক-৬ ে ওষধিসমূহের বপন সংক্রান্ত বিধি কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- (যুগে অর্থে কাল বা সময় বোঝান হয়েছে) ত্রিযুগ অর্থাৎ বর্ষা, শরৎ ও বসন্তকালের উদ্দেশে পুর্বে দেবতাগণের নিকট হতে (সকাশাৎ) যে ওষধিসমূহ উৎপন্ন হয়েছে, পরিপাকের দ্বারা পিঙ্গলবর্ণ সেই জাতিভেদানুসারে (অর্থাৎ গ্রাম্য এ আরণ্য ভেদে) শত সংখ্যক ও সাত প্রকার ধান্য সমূহকে দর্শন করে আমি হৃষ্ট হচ্ছি (হৃষ্যামি)। হে অম্ব (মাতৃস্থানীয়) ওষধিসমূহ! তোমাদের জাতিভেদে শত (অর্থাৎ অসংখ্য) ক্ষেত্র আছে, এবং তোমাদের প্ররোহ বা অঙ্কুরও সহস্ৰসংখ্যক (অর্থাৎ অসংখ্য)। সেইরকম তোমরা শত যজ্ঞ সাধনকারীত্বের বলে আমারপী এই যজমানকে অগদ অর্থাৎ ক্ষুৎপিপাসা ইত্যাদি রোগরহিত করো। এই ওষধিসমূহ নানাবিধ বিশেষণে প্রশংসিত হয়ে থাকে। কোনও ওষধি পুষ্পবতী (অর্থাৎ পুষ্পমাত্রে পর্যাবসি, ফল দান করে না), কোনটি প্রসূবতী (অর্থাৎ পুষ্পপূর্বক ফলোৎপত্তিস্থায়িনী); কোনও ওষধি বা ফলিনী (অর্থাৎ পুষ্প ব্যতিরেকে কেবলই ফলের দ্বারা যুক্তা), আবার কোন কোনটি বা অফলা (অর্থাৎ ফল-পুষ্প বিরহিতা)। ধীরুধ অর্থাৎ কোন কোন ওষধি লতারূপা; এগুলির কোনটি বহু সম্বৎসরব্যাপী স্থায়িনী, কোনটি যুদ্ধে জয়শীল শীঘ্রগামী অশ্বের ন্যায় উৎপন্নমাত্রই বিস্তৃতি লাভ করছে। হে মাতরো (মাতৃসমানা) দেবীগণ! (এই শব্দ এখানে হেতু অর্থে প্রযুক্ত)। তোমরা ওষধি বলে তোমাদের নিকট প্রার্থনা করছি। (অর্থাৎ ফল পক্ক হওয়া অবধি অবস্থান করে থাক বলে তোমাদের প্রতি প্রার্থনা উচিত হচ্ছে)। প্রার্থনা এই ফল পক্ক হওয়ার ক্ষেত্রে বিঘ্নরূপ পাপসমূহ বা পাপফলগুলি ও ফলপজনিত দুঃখসমূহ বিনাশপুর্বক তোমরা এই স্থানে প্রাপ্তা হও (অর্থাৎ আগতা হও)। হে ওষধি-দেবতাগণ! অশ্বথ বৃক্ষে তোমাদের অধিষ্ঠান (সেই হেতু লোকজগতে মনুষ্যগণ অশ্বখবৃক্ষকে প্রদক্ষিণ অর্থাৎ নমস্কার ইত্যাদির দ্বারা পূজা করে), ও পলাশ বৃক্ষে তোমাদের বাস (সেই হেতু পলাশবৃক্ষের কাষ্ঠে যজ্ঞের ইন্ধনরূপ কর্ম সাধিত হয়)।
এই রূপেও অর্থাৎ স্থাবররূপেও তোমাদের অধিষ্ঠান লোকজগতে প্রসিদ্ধ। সেই কারণে বলা হয়ে থাকে–মনুষ্যগণকে অন্ন ইত্যাদির দ্বারা পোষণের কারণে তোমরা স্থাবররূপে ভূমিভাগে অবস্থান করে থাক। যখন অন্ন প্রাপ্তির ইচ্ছায় আমি ওষধিসমূহ হস্তে ধারণ করি তখন ক্ষুধা ইত্যাদি রোগের আত্মা স্বরূপেই বিনষ্টপ্রায় (নষ্টসদৃশ) হয়; যেমন লোকে ব্যাধগণ শশকদের গ্রহণের পূর্বেই কর্ণ ও নেত্র রুদ্ধ করে ভূমিসংশ্লিষ্ট মৃতের ন্যায় অবস্থান করে থাকে। সকল ওষধি ফলপ্রদানের নিমিত্ত ক্ষেত্রসঙ্গতা (মিলিত) হয়েছে, যেমন যুদ্ধে প্রতিপক্ষ সেনাদের জয় করবার নিমিত্ত পরস্পর অনুকুল রাজাগণ একত্রে মিলিত হন, সেই মতো (তবৎ)। সেই নিমিত্ত সঙ্গত ওষধি সম্বন্ধে মেধাবী অর্থাৎ ওষধির রসবীর্য সম্পর্কে অভিজ্ঞ পুরুষকে ভিষজ বা ক্ষুধা ইত্যাদি রোগের চিকিৎসক বলা হয়ে থাকে। তাঁরা পক্ক ওষধির দ্বারা পুরোডাশকে রাক্ষসগণের দ্বারা বধের অযোগ্য করে নির্মাণ পূর্বক তাদের (অর্থাৎ রাক্ষসদের) উপদ্রবরূপ রোগ বিনাশ করেন। হে ওষধিসমূহ! তোমরা ক্ষুধা ইত্যাদি বিনাশের নিমিত্তই মাতৃবৎ উৎপন্না; অতএব তোমরা নিজকর্মে সম্যক্ সক্ষমা হও (ক্ষমা ভবত)। হে ওষধিসমূহ! তোমরা মিলিতভাবে পরস্পর রক্ষা করে থাক এবং তা উচিতও; সেইরকমে হে ওষধিসমূহ! পরস্পর একমত হয়ে আমার প্রার্থনা প্রকৃষ্ট ভাবে রক্ষা করো (প্রকর্ষেণ রক্ষতু)। ওষধিগুলি উপভোগের নিমিত্ত বিশেষ বলে উদ্দীপিত হচ্ছে, যেমন গাভীগণ, (তৃণ, লতা ইত্যাদি প্রাপ্তির নিমিত্ত) নিবাসস্থান বা গৃহ হতে অরণ্যদেশে গমনকালে হয়ে থাকে, সেইরকম। (ওষধিগুলির বিশেষ বলে উদ্দীপিত হওয়ার কারণ কি? না,) হে যজমান! ধনের মতো আপনাদের শরীর দানের নিমিত্ত, অর্থাৎ ধন বা বহুমূল্য সম্পদ দানের মতো (আপনাদরে শরীরাকারে পরিণত হয়ে) শরীর দানের নিমিত্ত বিশেষ বলে উদ্দীপিত হচ্ছে। ওষধিগুলি শরীর সম্বন্ধীয় জ্বর, শিরোব্যাধি, প্লীহা, উদরাময় ইত্যাদিরূপ যৎকিঞ্চিৎ পাপফলও (বা ব্যাধিও) বিনাশ করবার নিমিত্ত উদরের মধ্যে প্রবেশ করছে, যেমন রাত্রিকালে গুপ্ত চোরগুলি গরু চুরি করবার উদ্দেশে সাবধানে গোশালায় প্রবেশ করে সর্বতো ব্যাপ্ত হয়ে থাকে, সেই রকম। হে যজমান। ওষধিগুলি আপনার দেহে রসরূপে প্রবেশ করে আপনার রোগ (যক্ষ্ম) বিনাশ করুক, যেমন স্বকীয়-পরকীয় পক্ষপাতহীন কোন রাজা শাস্ত্রীয় মার্গনুসারে (ধর্মানুসারে) দুষ্টদের প্রতি উগ্রভাবাপন্ন হয়ে তাদের বিনাশ করেন, সেইরকম।
(শ্লেষ্ময় কণ্ঠ অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কি কি ধ্বনির অনুকরণে শব্দ ধ্বনিত হয় বলে কিকিদিবি, শ্লেষ্মর জন্য শ্যেনবৎ তীব্রতর পিত্তজনিত রোগ শ্যেনঃ)। হে রাজযক্ষ্মা রোগ! তুমি পিত্তজনিত ও শ্লেষ্মাজনিত রোগের সাথে (সাকং) বিনাশ প্রাপ্ত হও। সেই রকম, বাত রোগের ব্যাপ্তির সাথে বিনষ্ট হও। সেইরকম, যে রোগের পীড়ায় আমি হা কষ্ট হা কষ্ট বলে চিৎকার করছি, সেই রোগের সাথে তুমি বিনষ্ট হও। যে (অশ্বাবতী) ওষধি সমূহের দ্বারা অশ্ব লাভ করা যায়, যে (সোমবতী) ওষধি সমূহের দ্বারা ধান্য-সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে সোমযাগ করা যায়, যেগুলির দ্বারা প্রাণধারণের উপযোগী বল লাভ করা যায়, যেগুলি জাতিরুদোজা অর্থাৎ অন্নের দ্বারা পালিত উৎকৃষ্ট ধাতুরূপ ওজঃ লাভ করা যায়, সেই সকল ওষধিই আমি লাভ করেছি। (কি নিমিত্ত? না,) আমার অনিষ্টকে বিনাশ করবার নিমিত্ত (অর্থাৎ যজমানের প্রতি কারও হিংসাকে রহিত করবার নিমিত্ত)। যে ওষধিসমূহ ফলযুক্তা এবং যেগুলি ফলরহিতা, যেগুলি পুষ্পযুক্ত এবং যেগুলি পুষ্পরহিতা, সেই সবগুলিই বৃহস্পতি কর্তৃক ও প্রসূতা হয়ে আমাদের পাপমোচন করুক। সোমরাজার অনুরূপ যে ওষধিগুলি এই পৃথিবীতে অনুপ্রবেশ করছে, হে ওষধি! তুমি সেইগুলির মধ্যে উত্তম। (অর্থাৎ সেই ইদানীং উৎপদ্যমান ওষধির মধ্যে যেগুলি উত্তম জীবনসদৃশ, সেইগুলি লাভের নিমিত্ত আমাদের প্রকৃষ্টভাবে প্রেরণ করো)। স্বর্গের উপরিতন প্রদেশ হতে ভূমিতে বৃষ্টিবিন্দুর মতো পতিত ওষধিসমূহ ঘোষণা করেছিল। (কি ঘোষণা করেছিল? না,) যে পুরুষের মধ্যে আমরা ব্যাপ্ত হবো (ব্যাথুমঃ) সেই পুরুষ কখনও বিনষ্ট হবে না। যে ওষধিদেবতাগণ আমার প্রার্থনা পূর্ণরূপে শ্রবণ করেছেন, যাঁরা দূর হতে আংশিক শ্রবণ করেছেন, সেই ওষধিদেবতাগণ আমার এই কর্মে (যজ্ঞে) সঙ্গত (মিলিত) হয়ে যজমানের ক্ষুধা ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা সম্যক্ সাধিত করুন। হে ওষধিসমূহ! যারা চিকিৎসার উদ্দেশে ভূমি খনন পূর্বক তোমার মূল গ্রহণ করেছে, তারা যেন বিনষ্ট না হয়, এবং আমি যে রুগ্ন ব্যক্তির চিকিৎসার্থে খনন পূর্বক তোমার মূল গ্রহণ করছি, সেই ব্যক্তিও যেন বিনাশপ্রাপ্ত না হয়। অধিকন্তু, আমাদের সম্বন্ধি যে দ্বিপদ (মনুষ্য) চতুষ্পদ (পশু) প্রাণী আছে, যারা তোমাদের অবলম্বন করে জীবিত আছে (যুম্মদুপজীবতি), তারা সকলেই অনাতুর (অর্থাৎ রোগরহিত) হোক। ওষধিদেবীগণ তাদের স্বামী সোমরাজের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে বলেছিলেন–যস্মৈ রুণায় চিকিৎসামস্মদীয়মূলাদিনা ব্রাহ্মণঃ করোতি, হে রাজংস্তমাতুরং বয়ং পরায়ামসি ব্যাধেরুত্তাবয়ামঃ। (অর্থাৎ-হে রাজন! আমাদের মূলের দ্বারা ব্রাহ্মণ যে রোগার্তের চিকিৎসা করেন, আমরা সেই রোগতুরকে ব্যাধি হতে পার করি, অর্থাৎ তার ব্যাধি নিরাময় করি)। [এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৫ম অনুবাকের কিছু মন্ত্র সম্পৃক্ত]।
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমে লোষ্টক্ষেপাদিকমভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৭ ে লোষ্টক্ষেপণ ইত্যাদি বিষয় কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- যে প্রজাপতি পৃথিবীর ও দুলোকের জনয়িতা, (অর্থাৎ স্রষ্টা), যে প্রজাপতি সত্যধর্মা (অর্থাৎ সত্যকে ধারণশক্তিসম্পন্ন), পুনরায় যে প্রজাপতি আহ্লাদকারিণী বহুলা জল সৃষ্টি করেছেন, সেই প্রজাপতি যেন আমাদের হিংসা না করেন (মা হিংসীৎ)। সেই হেন প্রজাপতির উদ্দেশে আমরা হবির দ্বারা পরিচর্যা করব। হে পৃথিবী! যজ্ঞানুষ্ঠানের ফলভূত পয়সের সাথে (অর্থাৎ জল বা দুগ্ধ বা অন্নের সাথে) আমাদের অভিমুখে আগত হোন। ইষিত অর্থাৎ ইচ্ছাবান্ অগ্নিদেব আপনার বপাসদৃশ (ছিদ্রবৎ) স্থান প্রাপ্ত হোন। হে অগ্নিদেব! আপনার যে অঙ্গ দীপ্তিমান, যে অঙ্গ আহ্লাদকর, যে অঙ্গ শুদ্ধ এবং যে অঙ্গ যজ্ঞাহ অর্থাৎ যজ্ঞের যোগ্য, লোষ্টরূপ (মৃত্তিকাপিণ্ডরূপ) সেই সবগুলি দেবতাগণের নিমিত্ত সম্পাদন করছি। অমৃতের যোনিস্বরূপ অর্থাৎ কারণভূত এই যজ্ঞস্থান হতে অন্নরূপ তেজঃ ও রসরূপ লোষ্ট (মৃত্তিকাপিণ্ড) গ্রহণ করছি। হে অগ্নিদেব! প্রাণীগণের শ্রবণযোগ্য আপনার বহু নাম আছে। আপনি বিভাবসু, অর্থাৎ বিভা বা দীপ্তির ন্যায় বিস্তারিত বসু বা ধনশালী আপনি। হে বিভাবসু! আপনার শিখাসমূহ দীপ্যমান হচ্ছে (দীপ্যন্তে)। আপনি বৃহদ্ভানু, অর্থাৎ আপনার বৃহৎ (মহৎ) ভানু (কিরণ বা দীপ্তি) আছে। আপনি কবি, অর্থাৎ বিদ্বানরূপে যজমানের অভিপ্রায় সম্পর্কে সম্যক অভিজ্ঞ। এই হেন হে অগ্নিদেব! আপনি হবিঃ-দানকারী (হবিত্তবতে) যজমানকে উথ্য যজ্ঞের নিমিত্ত যাগযোগ্য অন্ন আপনার বলের দ্বারা দান করে থাকেন। হে অমর্ত্য (মরণহীন) অগ্নিদেব! পুরোডাশ ইত্যাদি হবিঃ-প্রদানকারী প্রাণীগণের দ্বারা দীপ্যমান হয়ে আপনি আমাদের ধনসমূহ বিস্তার করুন। আপনি চিত্য অর্থাৎ কৃতচয়ন অগ্নিরূপ দর্শনীয় শরীরের মধ্যে বিশেষভাবে দীপ্যমান হচ্ছেন; এবং আমাদের নিমিত্ত বহুরকম দানযোগ্য ধনসম্ভার পূর্ণ করুন। অন্নের অবিনাশয়িতা হে (ভো) জাবেদা! আপনি দীপ্তিযুক্ত হয়ে শোভন স্তুতির দ্বারা হৃষ্ট হোন (হৃষ্যস্ব)। যজমানগণ আপনার নিমিত্ত প্রভূত সারযুক্ত এই অনুরূপ আহুতিগুলি সম্পাদন করছেন। (কিরকম যজমানগণ? না,) আপনার দ্বারা রক্ষিত এবং সম্যক ভজনীয় (অর্থাৎ উক্তৃষ্ট) দেশে ও বংশে (কুলে) জাত। শোধকদীপ্তি, নির্মলদীপ্তি ও সম্পূর্ণদীপ্তিতে দীপ্যমান হয়ে আপনি উক্ত প্রাপ্ত হয়েছেন। আপনি দুলোক ও পৃথিবী এই উভয় লোকের সমীপে আগমন পূর্বক তাদের রক্ষা ও সম্পূর্ণতা বিধান করে পরিচর্যা করেন। (কেমন সেই পরিচর্যা? না,) লোকজগতে যেমন শাস্ত্রীয়মার্গানুসারী পুত্র তার পিতার পরিচর্যা করে, সেইরকম। মনুষ্যজাতিযুক্ত (অর্থাৎ মনুষ্যরূপী) ঋত্বিক ও যজমানগণ পূর্বকালে সুখপ্রাপ্তির উদ্দেশে স্তুতিরূপ বাক্যের দ্বারা এই স্থানে অগ্নিদেবকে স্থাপিত করেছিলেন। (কিরকম অগ্নিদেব? না,) তিনি ঋতাবানং, অর্থাৎ সত্যস্বরূপ; মহিষং, অর্থাৎ মহান; বিশ্বচষনিঃ, অর্থাৎ মনুষ্যগণের দ্বারা পরিচর্যাপ্রাপ্ত; কর্ণং, অর্থাৎ কর্ণে শ্রবণমাত্রই তা সম্পন্নকারী; এবং সপ্রথমস্তমং, অর্থাৎ অতিশয় প্রসিদ্ধির সাথে কীর্তিমান। ঋত্বিক ও যজমানগণ সেইরূপ অগ্নিকে দেববর্গের মঙ্গলসাধনের নিমিত্ত এই স্থানে ধারণ করেছিলেন। হে অগ্নিদেব! আপনি যজমানকে ধনের দ্বারা সম্পৃক্ত করুন (অর্থাৎ তাকে ধনপ্রাপ্ত করুন)। (কিরকম যজমান?) তিনি যজ্ঞের নিম্পাদক, তিনি প্রকৃষ্টচিত্তযুক্ত অর্থাৎ শ্রদ্ধালু, তিনি মহৎ বা প্রভূত হবিঃ-দানের নিমিত্ত এই স্থানে, নিবাসকারী, দাতা, তিনি ভৃগু ইত্যাদি তপস্বীগণের মধ্যে উশিজতুল্য (অর্থাৎ অত্যন্ত তপোযুক্ত), এবং তিনি বিদ্বানের ন্যায় সকল কর্তব্য, সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত হয়ে তা পালনকারী। হে শর্করা (অর্থাৎ চয়ন কালে ভূমিতে প্রক্ষিপ্ত হে কাকর)! তোমরা চয়নকালে (অর্থাৎ অগ্নিচয়নের নিমিত্ত কর্ষণের কালে) ভূমিতে, চতুর্দিকে ও ঊর্ধ্বে প্রক্ষিপ্ত হয়ে থাক। সেই অবস্থাতেই তোমরা এই চিতির সেবা পূর্বক এই স্থানে স্থির হয়ে থাক (অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যে শর্করাগুলির যে যে দেবতা, সেই দেবতাগণের সাথে এই চিতির অর্থাৎ অগ্নির সেবা পূর্বক এই স্থানে অবস্থান করো); যেমন, অঙ্গিরা ঋষিগণের চয়নে তোমরা স্থির হয়ে অবস্থান করেছিলে, সেই রকম। হে সোম! তুমি সর্বতোভাবে বর্ধিত হও। তুমি সকল আহার হতে রেতঃ সপ্রাপ্ত হও। অন্নের সাথে সঙ্গমের তুমি নিমিত্ত হও। হে সোম! তোমার পানীয়রূপ ক্ষীর ইত্যাদি রেতঃ সপ্রাপ্ত হোক; সেই রকমে তোমার অন্নসমূহও রেতের সাথে সংযুক্ত হোক, তোমার রেংসুও সংযুক্ত হোক। (কিরকম তোমার? না,) সহনের ক্ষেত্রে যে তুমি পাপের তিরস্কারকারী, ক্ষীর ইত্যাদির দ্বারা আপ্যায়িত হয়ে যে তুমি যজমানের অমৃতত্ব বা দেবত্বপ্রাপ্তির নিমিত্ত (দেবতাভাবায়) দুলোকে শ্রবণযোগ্য উত্তম অন্ন ধারণ করো (অর্থাৎ সম্পাদন করো)। [ এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৫ম ও ৬ষ্ঠ অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অষ্টমে রু পধানং বক্তব্য। তাহদৌ তাবশ্বাক্ৰমণমুচ্যতে। অর্থাৎ–এই অনুবাকের বক্তব্য রুক্স ইত্যাদির উপধান। সেই সঙ্গে অষের অভিক্রমণ বিষয় কথিত হয়েছে ]
মর্মার্থ– এই অশ্ব পৃতনা অর্থাৎ প্রতিপক্ষ সেনাগণকে পদের দ্বারা অভিক্রম পূর্বক অবস্থান করুক। আহা সেই অভিক্রমণ অগ্নিদেব অনুমোদন করুন; সোমদেব, বৃহস্পতি দেবতা ও সবিতাদেবও তা অনুমোদন করুন। পূষাদেব সুকৃতির লোকে অর্থাৎ সুকৃতির ফলভূত স্বর্গে আমাকে স্থাপন করুন। হে অশ্ব (অর্ব! যে স্থান হতে জাত হয়ে তুমি প্রথম ক্রন্দন করেছিলে (অর্থাৎ অগ্নি ইত্যাদির কারণ-কারকরূপে মহৎ শব্দ করে উঠেছিলে) তোমার সেই জন্ম সমীচীন বলে সকলে স্তুতি করেছিল। (শ্রুতিতে বলা হয়েছে–অসু যোনির্বা অশ্ব–অর্থাৎ সমুদ্র-উপলক্ষিত জল হতে অশ্বের উৎপত্তি। অতএব) সমুদ্র হতে অথবা পুরুষের শক্তিসম্পন্ন অশ্ব হতে তোমার উৎপত্তি। তোমার জন্ম উপস্তুত (উৎকৃষ্ট বলে প্রশংসিত) হয়েছে; যেমন শ্যেনপক্ষীর পক্ষ দুটি শীঘ্র উড্ডীয়মান হওয়ার কারণে কিম্বা মৃগের পদসমূহ শীঘ্র গমনের কারণে লোকে প্রশংসা করে থাকে। হে পুষ্পরপর্ণ (পদ্মপত্র)! তুমি জলের উপরিভাগে অবস্থিত, তুমি অগ্নির যোনি অর্থাৎ জন্মের কারণস্বরূপ; সেইরকমে তুমি সমুদ্রসমান তোগজলের (বৃহৎ পুষ্করিণীর জলের) প্রীতিকর, জলে উৎপন্ন হয়ে দিনে দিনে বুদ্ধিযুক্ত, নির্লিপ্ত থাকার নিমিত্ত পূজনীয়, অগ্নির সম্পাদনের কারণে বৃদ্ধিযুক্ত (পুষ্টিকর)। এই হেন তুমি আকাশ অপেক্ষাও অধিক পরিমাণে বিস্তৃত হও।–প্রথম উৎপন্ন এই রুক্মস্বরূপ ব্ৰহ্ম অতি মহৎ। (তস্য রুক্মস্য দৃষ্টান্তত্বেন সূর্য প্রপঞ্চতে–অর্থাৎ) এই স্থলে রুক্সের (স্বর্ণের) দৃষ্টান্তের দ্বারা সূর্যের প্রসঙ্গ বিস্তারিত হচ্ছে–পূর্বদিকে অবস্থিত এই কমনীয় সূর্য তার শোভন রশ্মিসমূহের দ্বারা বিস্তৃত হচ্ছেন। এই রুক্সের উপমানভূত তিনি পৃথিবীতে বিশেষভাবে অবস্থান করছেন এবং সেখানে অবস্থিত সবকিছুকে প্রকাশ করছেন, (অর্থাৎ সেখানকার ঘটপট ইত্যাদির কারণ মৃত্তিকা ও মনুষ্য সব কিছুকেই প্রকাশ করছেন। অর্থাৎ সেইরকমে সূর্যসদৃশ এই রুক্সও প্রকাশ পাচ্ছে)। হিরণ্যগর্ভ (অর্থাৎ হিরণ্যে তথা ব্রহ্মাণ্ডরূপ গর্ভে অবস্থিত) প্রজাপতি প্রাণিগণের উৎপত্তির পূর্বে স্বয়ং শরীরধারীরূপে বিরাজিত ছিলেন। তিনি উৎপন্নমাত্র সকল জগতের অধিপতি ছিলেন (পতিরাসীৎ)। অতএব তিনি মর্ত্যলোক, অন্তরিক্ষলোক এবং বিস্তীর্ণ স্বর্গলোক ধারণ করেছেন (ধৃতবা)। সেই হেন প্রজাপতিদেবতার উদ্দেশে হবিঃ সমর্পন পূর্বক পরিচর্যা করছি। দ্রব্যান্তরসঙ্টুনের অর্থাৎ মেলনের দ্বারা স্ফুটিত সেই হিরন্ময় পুরুষের অত্যন্ত স্বল্প অংশ (অবয়বলেশ) সর্পরূপে এই পৃথিবীতে পতিত হয়েছে; এবং সেই সর্পসমুহ আহুত হয়ে দুলোক, অন্তরিক্ষলোক ও ভূলোকে অনুসঞ্চারিত হয়েছে। পৃথিবীতে যে সর্পগণ আছে, সেই সর্পগণের উদ্দেশে নমস্কার (সর্পেভ্যো নমোহস্তু)। অন্তরিক্ষে অর্থাৎ যক্ষ, গন্ধর্ব ইত্যাদি লোকে যে সৰ্পৰ্জন বর্তমান, সেই সৰ্পৰ্গণের উদ্দেশে নমস্কার। এবং যে সর্পগণ দুলোকে বর্তমান, রাহু প্রভৃতি সেই সর্পগণের উদ্দেশে নমস্কার। যে সর্পগণের সূর্যমণ্ডলে বাস, যে সর্পগণ সূর্যরশ্মির ন্যায় দৃশ্যমান, যে সর্গণের নিবাসস্থান জল, সেই সকল সর্পের উদ্দেশে নমস্কার। যে সর্পজাতি রাক্ষসগণের বাণরূপে বর্তমান (রক্ষসামিষবো বাণরূপা বৰ্তন্তে), যে সর্পগণ বনস্পতি চন্দন ইত্যদি বৃক্ষ বেষ্টন করে অবস্থিত, যে সর্পগণ অবটে অর্থাল গহ্বরে শায়িত, সেই সর্পগণের উদ্দেশে নমস্কার। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৬ষ্ঠ ও ৭ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন-নবমে স্বয়মাতৃম্নাদীষ্টকোপধানমুচ্যতে। অর্থাৎ, এই অনুবাক-৯ ে স্বয়মাতৃঃ ইত্যাদি ইষ্টকের উপধান উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে স্বয়মাতুন্ন নামে অভিহিতা ইষ্টকা! তুমি স্থিরা। (কিরকম? না,) ধরুণা, অর্থাৎ ভূমিরূপে বিশ্বের ধারয়িত্রী; বাস্তৃতা, অর্থাৎ কারও দ্বারা না হিংসিতা; বিশ্বকর্মা সুকৃতা, অর্থাৎ জগকর্তা বিশ্বকর্মা কর্তৃক সুষ্ঠ ভাবে নির্মিত। সমুদ্র যেন তোমাকে আপন উদরের মধ্যে নিমজ্জিত করে না বধ করেন, পক্ষীরাজ সুপর্ণও (গরুড়ও) যেন সাপ-উত্তোলন কালে (অর্থাৎ সর্পকে উত্তোলিত করে ভক্ষণ করার সময়ে) তোমাকে পরিত্যাগ করেন অর্থাৎ বধ না করেন। এইভাবে তুমি ভয়রহিত হয়ে (অর্থাৎ অব্যথমানা হয়ে) এই পৃথিবীকে দৃঢ় করো। (উপধান মন্ত্র)–হে স্বয়মাতৃগ্না! প্রজাপতি তোমাকে এই প্রদেশে (অর্থাৎ পৃথিবীর উপরে) স্থাপন করুন। (কিরকম তুমি? না, তুমি বিস্তারযুক্তা, পৃথুলা (অর্থাৎ স্থলা); অধিকন্তু এই চিতির বিস্তাররূপা (বিস্তাররূপমসি)। তোমার দ্বারা চিতির বিস্তার হয়। পৃথিবী হতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে তুমি পৃথিবী, তুমি সুখের ভাবয়িত্রী (সুখদত্ৰী), তুমি ভূমিরূপা অর্থাৎ পৃথিবীর অভিমানী ভূমিদেবতা এবং তুমি অদিতি অর্থাৎ অখণ্ডনীয়া। তুমি বিশ্বধায়া, বিশ্বের পোষণকারিণী। সেইভাবে তুমি ভুবনের সর্ব লোকের ধারণকারিণী (ধত্রী)। তুমি এই পৃথিবীকে নিয়মিতা করো (অর্থাৎ সংযতা করো), তাকে দৃঢ়া করো এবং এই পৃথিবীর প্রতি হিংসা করো না। সকলের (অর্থাৎ সর্ব জীবের) প্রাণ-অপান-ব্যান-উদান নামে আখ্যায়িত বায়ুসমূহের বৃত্তি (অর্থাৎ স্বদেহে স্থিতি) লাভের নিমিত্ত ও শাস্ত্রীয় আচার লাভের নিমিত্ত অগ্নিদেব তোমাকে রক্ষা করুন। (কি ভাবে রক্ষা করবেন? না, তার মহতী যোগক্ষেম (অর্থাৎ অলব্ধ বস্তুর লাভ ও লব্ধ বস্তুর রক্ষণ)–রূপ সম্পত্তি ও অত্যন্ত সুখকর দীপ্তি বিশেষের দ্বারা রক্ষা করবেন। তোমার (অর্থাৎ স্বয়মাতৃণা ইষ্টকার) স্বামীভূত যে দেবতা, তাঁর দ্বারা অনুগৃহীতা হয়ে তুমি স্থির হয়ে এইস্থানে উপবেশন করো, যেমন অঙ্গিরা ঋষিগণ কর্তৃক অগ্নিচয়নের অনুষ্ঠানে ছিলে। হে দূর্বা, তুমি যেমন গুচ্ছে গুচ্ছে (গাছায় গোছায়) পর্বে পর্বে (গাঁটে গাঁটে) প্রকৃষ্টভাবে উৎপন্ন হয়ে থাক, সেইভাবে আমাদেরও শতশত ও সহস্ৰসহস্র সংখ্যায় তোমার মতোই প্রকর্ষের সাথে বিস্তৃত করো। হে দূর্বা! যে তুমি শত শত সংখ্যায় স্বরূপে অর্থাৎ দুর্বারূপে অত্যন্ত বিস্তৃতা হও, সেই তুমিই সহস্র সহস্র সংখ্যায় নানা আকারে উৎপাদিত হয়ে থাক। হে ইষ্টকা দেবী! আমরা হবির দ্বারা তোমার পরিচর্যা করছি। হে ইষ্টকা! তুমি অষাঢ়া (অর্থাৎ উখানির্মাণ কালে নির্মিতা অষাঢ়া নামক ইষ্টকা); তুমি কারও দ্বারা পরিভূত না হয়ে নিজে বিরোধীগণকে পরিভূত (তিরস্কৃত) করে থাক। যারা আমাদের দেয় (বা প্রাপ্য) বস্তু প্রদান করে না, সেই শত্রুগণকে পরিভূত করো; যারা পূর্বে শত্রুতা করেনি, কিন্তু পরে করবে, সেই শত্রুদেরও পরিভূত করো। হে ইষ্টকা! তুমি শত্রুসেনাকে পরিভব করো; যে শত্রুগণ সেনারহিত হয়েও বৈরিতা করেছে এবং পরে সেনা কামনা করছে, সেই শত্রুদেরও পরিভব করো। তুমি সহস্রবীর্য, অর্থাৎ সহস্ৰসংখ্যক সামর্থ্যের অধিকারিণী; সেইভাবেই তুমি আমাকে প্রীত করো। যজ্ঞসাধনে ইচ্ছুক যজমানের উদ্দেশে বায়ুবর্গ মধুর রস ক্ষরণ (স্রবণ) করছে, সমদ্রসমূহও মধুর রস ক্ষরণ করছে; ওষধীসমূহও আমাদের নিমিত্ত মধুর রসোপেত (রসযুক্ত) হোক।
রাত্রি ও দিবা (বা প্রভাত) আমাদের পক্ষে মধুময় হোক; পার্থিব রজঃ (অর্থাৎ পৃথিবীর সকল ধূলিকণাও) মধুর রসযুক্ত হোক; আমাদের পিতৃস্থানীয় দুলোক মধুর রসযুক্ত হোক। অশ্বত্থ ইত্যাদি বনস্পতিগণ আমাদের নিমিত্ত মাধুর্যরসোপেত হোক; সুর্যও সন্তাপরাহিত্য-লক্ষণ হয়ে মাধুর্যরসযুক্ত (অর্থাৎ মধুমান বা মধুর রস বর্ষণকারী) হোক, এবং গাভীগুলি আমাদের নিমিত্ত মধুর ক্ষীরযুক্তা হোক। এই দ্যাবাপৃথিবী উভয়ে আমাদের এই যজ্ঞ মধুর ফলবর্ষণের দ্বারা সিক্ত করতে ইচ্ছান্বিত হোক, ভরণ বা পালন শক্তির দ্বারা আমাদের পরিপূরিত করুক। বেদান্তপারগ বিদ্বানগণ বিষ্ণুর পরম পদ বা স্থান সদা দর্শন করে থাকেন। (কিরকম সেই দর্শন? না,) দিব্যাকাশে (নিরাবরণে) চক্ষুর ন্যায় ব্যাপ্ত। হে পৃথিবীর কার্যস্বরূপা উখা! তুমি স্থিরা; তুমি সংগ্রাম করতে ইচ্ছুক শত্রুগণ পরাজিত করো। তুমি দেবতাদের সাথে অমৃতসমান ঘৃতে পূর্ণা হয়ে আগমন করো। হে অগ্নিদেব! সূর্যমণ্ডলে উদিত হয়ে আপনার যে রশ্মিস্বরূপ দীপ্তির দ্বারা দ্যুলোককে সর্বতোভাবে ব্যাপ্ত করেছেন, সেই দীপ্তির দ্বারা আমার যজমানের প্রকাশ করুন। হে দেবতাগণ! সূর্যমণ্ডলে আপনাদের সম্বন্ধিনী যে দীপ্তি আছে, হে ইন্দ্র, অগ্নি ও বৃহস্পতি দেব! আপনারা তিনজন সেই সকল দীপ্তির দ্বারা আমাদের নিমিত্ত প্রকাশ সম্পাদিত করুন (নোহস্মর্থং রুচং প্রকাশং সম্পাদয়ত)। বিশেষভাবে রাজমান হওয়ার নিমিত্ত বিরাটু নামে আখ্যাত, সম্যক রাজমান হওয়ার কারণে সম্রাট নামে খ্যাত, স্বয়ং রাজমান হেতু স্বরা নামে অভিহিত, যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ইষ্টকা তিনটি আমাদের নিমিত্ত (প্রতি) অনুগ্রহবশতঃ জ্যোতি ধারণ করেছিল। হে অগ্নিদেব! আপনার সাথে সম্বন্ধবিশিষ্ট যে সকল দান্ত (শান্ত), শীঘ্রগামী ও সুষ্ঠুভাবে ভারবহণকারী অশ্ব আছে, সেই অশ্বগুলিকে যোজনা করুন (যোজয়)। হে অগ্নিদেব! দেবতাবর্গকে আহ্বানকারী অশ্বগুলিকে সেইভাবে যোজিত করুন, যেভাবে রথস্বামী (রথী) তার অশ্বগুলিকে (রথে) যোজনা করেন। অধিকন্তু,আপনি পুরাতন হোতরূপে (অর্থাৎ হোমের উৎপাদক হয়ে) এই যজ্ঞস্থলে উপবেশন করুন।-দ্রব্যান্তর সঙ্টুনের দ্বারা (দ্রব্যসমূহের মেলনে বা পরস্পর ঘর্ষণ জনিত কারণে) স্ফুটিত যে হিরণ্যখণ্ড পৃথিবীতে পতিত হয়েছিল, সেই প্রন্স বা খণ্ড আহুত হয়ে দ্যুলোক, অন্তরিক্ষলোক ও ভূলোক–এই তিন স্থানে অনুসঞ্চারিত হচ্ছে। সেই তিনস্থানে অনুসঞ্চরমান হিরণ্যখণ্ডের উদ্দেশে আমি মনে মনে আহুতি প্রদান করছি। (অর্থাৎ যে স্থানে খণ্ড পতিত হয়েছে, সেই স্থান ব্যতিরিক্ত হোমযোগ্য যে সাতটি দিক আছে, সেই দিক সমূহে আমি অনুক্রমে যুগানুষ্ঠান করছি, যাতে এই খণ্ড আহুত হয়ে আদিত্য ইত্যাদি তিন স্থানে সঞ্চারিত হয়, এমন ভাবছি)। এই হিরণ্য ভুবনের ভূতজাতের (অর্থাৎ প্রাণীসমূহের) অন্নস্বরূপ; এবং সেই হেতু এই হিরণ্য বিশ্বের সকল নরের হিতকরী বৈশ্বানর অগ্নিরও অনুভূত। এই অগ্নি হিরণ্যের প্রভায় (জ্যোতিতে) স্বয়ং জ্যোতিষ্মন হয়েছেন; সেইভাবে রোমান (কান্তিমান) অগ্নি হিরণ্যের কান্তিতে স্বয়ংও কান্তিমান হয়েছেন। (এইস্থলে বাহ্য প্রভা জ্যোতি ও শরীরগত কান্তি বর্চ বলে চিহ্নিত হয়েছে–অথ বাহ্যপ্রভা জ্যোতিঃ,শরীরগতকান্তির্বর্চ ইতি)। হে হিরণ্যশকল (খণ্ড)! এই যে স্তোত্ররূপা ঋক, তার নিমিত্ত তোমাকে দক্ষিণ অক্ষিগোলকে; এবং সেইভাবে, হে হিরণ্যখণ্ড! রুচি বা দীপ্তির নিমিত্ত তোমাকে বাম অক্ষিগোলকে প্রতিস্থাপিত করছি। পানযোগ্য দধির মধুর অংশসমূহ (অবয়বাঃ) সম্যক্ প্রবাহিত হচ্ছে। (কেমনভাবে? না, সরিতের মতো, যেমন নদী প্রবাহিত হয়, সেই রকম। শরীরের অভ্যন্তরে হৃদয়-পুণ্ডরীকবর্তী (অর্থাৎ মন বা হৃদয়রূপ পদ্মের মধ্যস্থায়ী) অন্তঃকরণের দ্বারা শোধিত হয়ে দধির মধুর অংশগুলি ঘৃতের ধারারূপে সম্পাদিত হচ্ছে (পরিণত হচ্ছে), সেই ধারাসমূহ আমার সম্মুখে (অভিতঃ) প্রকাশিত হচ্ছে (অর্থাৎ আমি অনুভব করছি)। এই ঘৃতধারার মধ্যে সুবর্ণময় (এমন) তেজোরূপ পুরুষের মস্তক প্রকাশমান হচ্ছে, যেমন জলপ্রবাহের মধ্যগত বেতসবৃক্ষ প্রকাশমান হয়ে থাকে। সেই বেতসস্থানীয় (অর্থাৎ বেতসের ন্যায় প্রকাশমান) পুরুষের মস্তকে কোনও মধুকর আছে। (কিরকম? না,) কুলায়ী, অর্থাৎ শোভন পক্ষবিশিষ্ট মধুকরের নিবাসস্থানের মতো। (কি করছে? না) সে দেবতাগণের নিমিত্ত মধু সম্পাদন করছে (অর্থাৎ সংগ্রহ করছে)। সেই পুরুষের মস্তকের সমীপে সপ্তছিদ্রবর্তী সপ্তসংখ্যক মধু আহরণশীল মধুকর বর্তমান। (কি করছে তারা? না,) তারা স্বকার-উপলক্ষিত ভোগ্যবস্তুরূপ অমৃতের বা মধুর ধারা ক্ষরণ করছে (মধুনো ধারাং দুহানাঃ স্রাবয়ন্তস্তে)। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৮ম ও ৯ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৯॥
[সায়ণাচার্য বলেন–দশমে পশুশীর্ষোপধানং বক্তব্য। অর্থাৎ এই অনুবাক-১০ ের বক্তব্য হলো পশুশীর্ষের উপধান।]
মর্মার্থ- হে অগ্নি! আপনি চীয়মান হয়ে অদিতি দেবতার কার্যরূপ গর্ভসদৃশ এই পুরুষশীর্ষকে সর্বতোভাবে বর্জন করুন; আপনার তেজঃ বা জ্বালারূপের দ্বারা একে স্পর্শ করবেন না। (অর্থাৎ আপনার জ্বালামালায় সবকিছু দগ্ধ হলেও এই পরুষশীর্ষকে যেন দগ্ধ করবেন না)। এই দাহাভাবের দ্বারা (অর্থাৎ দাহ না করার দ্বারা) আপিনি গর্ভ বা যজমানকে শতায়ু করুন। (কিরকম গর্ভ? না,) সহস্র পশুতুল্য।–হে সহস্রাক্ষ (অর্থাৎ সহস্ৰসংখ্যক জ্বালারূপ চক্ষুযুক্ত)! হে মেধ (অর্থাৎ যজ্ঞনিম্পাদক অগ্নিদেব)! আপনি চীয়মান হয়ে গ্রাম্য ও আরণ্য পশুগণের মধ্যে এই পুরুষমুণ্ডরূপ দ্বিপাদযুক্ত গ্রাম্যপশুকে দাহরূপ হিংসা করবেন না ( অর্থাৎ মনুষ্য যজমানকে দগ্ধ করবেন না)। যদি আপনার ক্ষুধার উদ্রেক হয়, তবে আপনার ভক্ষণের নিমিত্ত এই কৃষ্ণমৃগ প্রদান করছি; এই মৃগভক্ষণের দ্বারা আপনার জ্বলদর্চিরূপ তনুর পুষ্টি সাধন পূর্বক এই স্থানে উপবেশন করুন। হে অগ্নি! আপনার জ্বালারূপ হিংসায় এই অশ্বকে দগ্ধ করবেন না। বিবিধ রোগ হতেও একে রক্ষা করুন। (অর্থাৎ অশ্বের সহস্র রকমের রোগ থাকে, সেই সর্ব রোগ হতে একে রক্ষা করুন); এবং রক্ষিত এই অশ্বের যাতে পুনরায় কোন উপদ্রব না ঘটে। সেইভাবে একে পরম ব্যোমে স্থাপন করুন। (এই অশ্ব কিরকম? না,) এই অশ্ব বায়ুর ন্যায় শীঘ্রগতিসম্পন্ন; জলাধিপতি বরুণের নাভিস্থানীয়, (অর্থাৎ আপন উদরমধ্যবর্তী নাভিকে বস্ত্রাবৃত করে যেমন রক্ষা করা হয়, সেইরকম অত্যন্ত প্রিয়ত্বের কারণে বরুণ কর্তৃক পালনীয়); সমুদ্রজলের মধ্যে বড়বারূপে উৎপন্ন, (এই নিমিত্ত অশ্বকে অঙ্গুযযানি বলা হয়); নদীসমূহের শিশু, (অর্থাৎ নদীগণের পতি সমুদ্র এই অশ্বের পিতা, সুতরাং সমুদ্রের পত্নী নদীসমূহ এই অশ্বের মাতা); এবং তার উপরে আরোহণকারীকে বহনকারী। এই অশ্বের খুরের দ্বারা ক্ষুদ্র পাষাণ চূর্ণ হয়, সুতরাং পথের মধ্যে সেই পাষাণচূর্ণ দর্শনে বোধগম্য হয় (বোষ্ঠুং শক্যতে) যে, সেই পথে অশ্ব গমন করেছে। হে অগ্নিদেব! চতুষ্পদ পশুগণের মধ্যে এই অশ্ব এক খুরবিশিষ্ট, একে হিংসা করবেন না। (কিরকম অশ্ব? না,) হ্রেষা শব্দ (অশ্বধ্বনি)-রূপ অত্যন্ত ক্রন্দন উৎসারিত করতে করতে চলেছে; এই অশ্ব প্রাণীগণের মধ্যে অত্যন্ত শীঘ্রগতিযুক্ত। আপনার যদি ক্ষুধাদ্রেক হয়, তবে আপনাকে এই গৌর অর্থাৎ সিংহ প্রদান করছি, এই সিংহকে ভক্ষণের দ্বারা আপনার জ্বলদর্চিরূপ তনুর, পুষ্টি সাধন পূর্বক এই স্থানে উপবেশন করুন। পূর্বকালীন মহর্ষিগণ কর্তৃক চয়নকালে পূজিত হয়ে অবস্থানকারী, এই ধ্যেয় (ধ্যানের বিষয়ীভূত) অগ্নিকে আমি নমস্কারযুক্ত স্তুতি করছি। (কিরকম আগ্ন? না,) এই অগ্নি নিরন্তর পরম ঐশ্বর্যোপেত; মর্মসংঘাত না করে যজমানকে পালন করে থাকেন। (অর্থাৎ যজমানের মনে কোনরূপ বৈরিতা উদঘাটিত না করে, এমন)। সেই অগ্নি আদিত্য রূপে অবস্থিত হয়ে প্রতি ঋতুর প্রতি অমাবস্যা ইত্যাদি তিথিতে বা পর্বে কর্ম সম্পাদন করে থাকেন। সেই হেন, হে অগ্নিদেব! আপনি ঋষভশ্রেষ্ঠ এই গো-টিকে হিংসা করবেন না। (কিরকম গো? না,) অদিতি, অর্থাৎ অখণ্ডনীয়; বিরাজং, অর্থাৎ বিশেষরূপে রাজমান বা শোভমান। হে অগ্নিদেব! যজমানের নিমিত্ত এই ঋষভশ্রেষ্ঠ গো-টিকে হিংসা করবেন না; পরন্তু একে পরম ব্যোমে উত্তমভাবে বিবিধরকম রক্ষণের দ্বারা স্থাপন করুন। (কিরকম গো? না,) ইমং সমুদ্রং, অর্থাৎ এই গো সম্যক্ উন্নত; শতধারং, অর্থাৎ স্বজাতীয় ধেনুর দ্বারা শতসংখ্যক (অপরিমেয়) ক্ষীরধারাযুক্ত, (অর্থাৎ এর উৎস জলপ্রবাহের মতো; ভুবনের মধ্যে বাচ্যমান, বিদ্যমান বা সেব্যমান, স্বজাতীয় ধেনুর ক্ষীর ইত্যাদির দ্বারা ঘৃতদোহন বা ঘৃতপ্রাপ্তি যুক্ত); এবং অদিতিম, অর্থাৎ অখণ্ডনীয়। হে অগ্নি! আপনার যদি ক্ষুধাদ্রেক হয়, তবে আপনাকে এই গবয়টি (আরণ্য মৃগবিশেষ তথা বনগব বা গলকম্বলশূন্য গো-তুল্য আরণ্য পশুটিকে) প্রদান করছি, এটিকে ভক্ষণের দ্বারা আপনার জ্বলদর্চিরূপ তনুর পুষ্টি সাধন পূর্বক এই স্থানে উপবেশন করুন।–হে অগ্নি! আপনি এই জ্যোতির্ময় মস্তকধারী অবিকে (মেষটিকে) হিংসা করবেন না; পরন্তু একে পরম ব্যোমে উত্তমভাবে বিবিধরকম রক্ষণের দ্বারা স্থাপন করুন। (এই অবি কিরকম? না,) এই অবি সকল বরণীয় রূপের নির্মাতা যে ত্বষ্ট্রদেবতা (বিশ্বকর্মা) তাঁরই অনুগ্রহে বরণীয় রূপযুক্ত, অগ্নি হতে অনিষ্ট নিবারক বরুণের নাভিস্থানীয় (অর্থাৎ নাভিকে বস্ত্রাবৃত করে যেমন রক্ষা করা হয়, সেইরকমভাবে বরুণ কর্তৃক পালনীয়), প্রজাপতির বক্ষঃস্থল হতে উৎপন্ন (প্রজাপত্যুরস উৎপন্না), মহান, সহস্র অসুরের মায়ায় গঠিত সুবর্ভানু নামক অসুর সম্বন্ধীয় ঘটনাক্রমে নির্মিত (বা সৃষ্ট)। (সুবর্ভানু ইত্যদির বিষয় ২য় কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ২য় অনুবাকে প্রাপ্তব্য)।–হে অগ্নিদেব! এই জ্যোতির্মণ্ডিত মস্তক (বৃষ্ণিশিরো) উর্ণায়ু অর্থাৎ মেষকে আপনি হিংসা করবেন না। (কিরকম মেষ? না, এই মেষ অগ্নি সম্বন্ধীয় অনিষ্টের নিবারক বরুণের মায়ায় নির্মিত; মে দ্বিপদ মনুষ্য ও চতুষ্পদ গো-ইত্যাদি পশুর ত্বক-সদৃশ, (অর্থাৎ মনুষ্যগণ শীতনিবারণের নিমিত্ত মেষরোম-নির্মিত কম্বলের দ্বারা দেহ আচ্ছাদিত করে; কিংবা অশ্ব ও বলীবদের ভারবহনের মৃদুত্ব সম্পাদনের নিমিত্ত তাদের পৃষ্ঠে ঐ রকম কম্বলের আস্তরণ দেওয়া হয়। এই কম্বল যেন মনুষ্য ও ঐ পশুগণের ত্বকস্বরূপ);এই মেষ প্রজাপতির (ত্বদেবতার) সকাশে উৎপদ্যমান হওয়ার কারণে প্রজাগণের মধ্যে প্রথম ও প্রধান; এবং প্রাধান্যং, অর্থাৎ বীর্যবান। হে অগ্নি! আপনার যদি ক্ষুধাদ্রেক হয়, তবে আমি এই আরণ্য উষ্ট্র প্রদান করছি, আপনি এই উষ্ট্রকে ভক্ষণ পূর্বক আপনার জ্বলদর্চিরূপ তনুর পুষ্টি সাধন করুন এবং তারপর এই স্থানে উপবেশন করুন। হে অগ্নিদেব! আপনি প্রজাপতির সৃষ্টিসংকল্পরূপ তপস্যা হতে উৎপন্ন। (অর্থাৎ প্রজাপতি যখন সকল সৃষ্টির কামনায় তপস্যা করছিলেন, তখন তার সেই তপস্যা হতে অগ্নি জাত হয়েছিলেন)। আপনি পৃথিবী বা ভূমির উপরে শোভা পাচ্ছেন, এবং স্বর্গের উপরেও শোভা পাচ্ছেন। অধিকন্তু জগৎস্রষ্টা প্রজাপতি (বিশ্বকর্মা)। আপনার সৌজন্যেই বিবিধরকম প্রজা ও পশুর দ্বারা ব্যাপ্ত হয়েছেন। হে অগ্নি! প্রজাপতি আপনাকে তাপরূপ যে কোপ বা ক্রোধ প্রদান করেছেন, সেই কোপের বশে আপনি যেন এর বিনাশ করবেন না। হে অগ্নি! প্রজাপতি হতে সস্তৃতা এই অজাকে হিংসা করবেন না। এই অজা উৎপন্ন হবার পর আপন উৎপাদক প্রজাপতিকে দর্শন করেছিল; সেই কারণে এই অজা দেবতাগণের উদ্দেশে অনুষ্ঠিত যাগের পক্ষে উপযুক্ত হয়েছে, (অর্থাৎ যাগযোগ্য দৈব-অজা রূপে গৃহীত হয়েছে)। এই যাগযোগ্য অজা যজমানের স্বর্গপ্রাপ্তির কারণ। কারণ, পূর্ববর্তী জন্মে এই অজার দ্বারা যজ্ঞকর্ম অনুষ্ঠিত করে দেবগণ দেবত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। (২কা, ১, ২অ. দ্রষ্টব্য)। হে অগ্নিদেব! আপনি এই অজাকে হিংসা করবেন না; পরন্তু আপনি একে পরম ব্যোমে স্থাপনপূর্বক রক্ষা করুন। আপনার যদি ক্ষুধাদ্রেক হয়, তবে আপনাকে এই শরভ (অর্থাৎ সিংহঘাতী ক্রুর মৃগ) প্রদান করছি, একে ভক্ষণ পূর্বক আপনি আপনার জ্বলদর্চিতনুর পুষ্টি সাধন করুন, এবং তারপর এই স্থানে উপবেশন করুন। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৯ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ১০।
[সায়ণাচার্য বলেন–প্রথমচিতিগতা অপস্যাভিধানা ইষ্টকা উচ্যতে। অর্থাৎ, এই অনুবাক-১ ে প্রথম চিতিগতা অপস্যা নামে চিহ্নিত ইষ্টকার বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- (প্রথম মন্ত্র) হে ইষ্টকা (অর্থাৎ অপস্যা ইষ্টকা)! তোমাকে জলসম্বন্ধিনী প্রবাহ ইত্যাদিতে (গমন রীতিতে) স্থাপন করছি। হে ইষ্টকা! তোমাকে তরঙ্গ ইত্যাদি রূপ দীপ্তিতে, শুক্লরূপ নির্মল প্রকাশে স্থাপন করছি, তোমাকে নদী কূপ ইত্যাদি আধারে স্থাপন করছি। (দ্বিতীয় মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! তুমি প্রৌঢ় তটে, জলের সদনে অর্থাৎ সমুদ্রে, শুষ্ক তটে, জলপূর্ণ মেঘে এবং উপল বা শিলাবর্ষণকারী বৃষ্টিতে উপবেশন করো। (তৃতীয় মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! তোমাকে জলের সদনে অর্থাৎ নদী ইত্যাদিতে স্থাপন করছি, বিদ্যুৎপূর্ণ মেঘে স্থাপন করছি, নদী ইত্যাদির বালুকায় (পুরীষে) স্থাপন করছি, জলের যোনি বা কারণভূত অগ্নিতে স্থাপন করছি, এবং সমুদ্রে স্থাপন করছি। (চতুর্থ মন্ত্র)– হে ইষ্টকা! তুমি গায়ত্রী নামে আখ্যাত ছন্দোরূপা। এইভাবে তুমি ত্রিষ্টুপ, জগতী, অনুষ্টুপ ও পঙক্তি ছন্দোরূপা (ছন্দোরূপাহসি) ॥১॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ দ্বিতীয় প্রাণভৃত উচ্যতে। অর্থাৎ, এই অনুবাক-২ ে প্রাণভৃৎ নামে চিহ্নিতা ইষ্টকার বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- (পূর্বদিকে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–হে ইষ্টকা (অর্থাৎ প্রাণভৃৎ বা প্রাণের পোষক ইষ্টকা)! তোমাকে পূর্ব দিকে স্থাপন করছি, কারণ তুমি পূর্বদিকে বর্তমান প্রজাতির প্রাণস্বরূপ। তুমি প্রজাপতি-সম্বন্ধী প্রাণ, তাঁর পুত্র, বসন্ত ঋতু, গায়ত্রী, গায়ত্ৰ সাম, উপাংশু গ্রহ, ত্রিবৃৎস্তোম, রথন্তর সাম, ঋষি বসিষ্ঠ ইত্যাদি উপচারের দ্বারা সকল প্রজার প্রাণসিদ্ধির নিমিত্ত গৃহীত হয়েছ (অর্থাৎ উপদান প্রাপ্ত হয়েছে)। (এখানে ভুবঃ শব্দে প্রজাপতি-সম্বন্ধী প্রাণকে, ভৌবায়ন শব্দে তাঁর অপত্য বা পুত্রকে, সেই প্রাণের স্বাসবৃত্তিরূপে (প্রাণায়ন) অর্থাৎ অপত্যরূপে উপচরিত বা বোধিত বসন্তকে, বসন্ত-সম্বন্ধিনী বাসন্তী গায়ত্রীকে, ছন্দোরপা গায়ত্রী-সম্বন্ধী গায়ত্র-সামকে, গায়ত্র-সাম হতে উৎপন্ন উপাংশু গ্রহকে, উপাংশু গ্রহ হতে উৎপন্ন ত্রিবৃৎ-স্তোমকে, ত্রিবৃৎস্তোম হতে উৎপন্ন রথন্তর সামকে এবং রথম্ভর সাম হতে উৎপন্ন বসিষ্ঠ নামে আখ্যাত ঋষিকে উলপক্ষ করা হয়েছে)।–(দক্ষিণ দিকে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! জগতের সকল ব্যাপার বা কর্মের কর্তা যে প্রজাপতি বিশ্বকর্মা, তুমি দক্ষিণ দিকস্থায়ী সেই প্রজাপতির মনের স্বরূপ। সেই প্রজাপতির মন হতে (পূর্বে উল্লিখিত প্রাণ, বসন্ত ইত্যাদির মতো) গ্রীষ্ম, গ্রীষ্ম-সম্বন্ধিনী (গ্রৈষ্মী) ত্রিষ্টুপ ছন্দ, ত্রিষ্টুপ-সম্বন্ধীয় ঐড় নামক সামবিশেষ, ঐড়-সাম হতে অন্তর্যাম গ্রহ, অন্তর্যাম হতে পঞ্চদশ বৃহৎস্তোম ও বৃহৎভোম হতে ভরদ্বায় নামক ঋষি পরম্পরাক্রমে উৎপন্ন হয়েছেন। হে ইষ্টকা! তুমি তাদের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। তুমি দক্ষিণ দিকস্থায়ী প্রজাপতির মনস্বরূপ, সুতরাং প্রজাগণের মন লাভের নিমিত্ত তোমাকে দক্ষিণ দিকে স্থাপন করছি (অর্থাৎ উপধান করছি)।–(পশ্চিম দিকে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! সর্ব জগৎব্যাপ্ত যে প্রজাপতি পশ্চিম দিকে অবস্থিত আছেন, তুমি তার চক্ষুস্বরূপ। সেই প্রজাপতির চক্ষু হতে বর্ষাঋতু, বর্ষাঋতু হতে জগতী ছন্দ, জগতী হতে ঋক্ষ সাম, ঋক্ষ সাম হতে শুক্র গ্রহ, শুক্ৰ হতে সপ্তদশ বৈরূপ স্তোম ও বৈরূপ হতে বিশ্বামিত্র নামক ঋষি পরস্পরাক্রমে উৎপন্ন হয়েছেন। তুমি তাদের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। সুতরাং প্রজাগণের চক্ষু লাভের নিমিত্ত তোমাকে পশ্চিম দিকে স্থাপন করছি (অর্থাৎ উপধান করছি)।–(উত্তর দিকে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! সর্ব জগতের প্রেরয়িতা যে সুবঃ অর্থাৎ প্রজাপতি উত্তর দিকে অবস্থান করছেন, তুমি তার শ্রোত্র স্বরূপ। সেই প্রজাপতির শ্রোত্র হতে শরৎ ঋতু, শরৎ হতে অনুষ্টুপ ছন্দ, অনুষ্টুপ হতে স্বার-সাম, স্বার হতে মন্থী গ্রহ, মন্থী হতে একবিংশ বৈরাজ স্তোম ও বৈরাজ হতে জমদগ্নি নামক ঋষি পরম্পরাক্রমে উৎপন্ন হয়েছেন। তুমি তাদের দ্বারা গৃহীত হয়েছে।, সুতরাং প্রজাবর্গের শ্রোত্র লাভের নিমিত্ত তোমাকে উত্তর দিকে স্থাপন করছি (অর্থাৎ উপধান করছি)।–(মধ্যদেশে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–সকল জগতের জ্ঞানাতীত মতি নামক যে প্রজাপতি উধ্বদিকে বর্তমান, হে ইষ্টকা! তুমি তার তনু বা শরীর স্বরূপ। সেই মতি নামধেয় প্রজাপতির তনু হতে বাক, বা হতে বাচ্যায়ন (বাকের অপত্য), বাচ্যায়ন হতে পংক্তি ছন্দ, পংক্তি ছন্দ হতে হেমন্ত ঋতু, হেমন্ত ঋতু হতে নিধনবৎ সামবিশেষ, নিধনবৎ হতে আগ্রয়ণ গ্রহ, আগ্রয়ণ হতে ত্ৰিণবত্রয়ত্রিংশ, তা হতে শাক্কর বৈরত, শোকর রৈবত হতে ঋষি বিশ্বকর্মা পরম্পরাক্রমে উৎপন্ন হয়েছেন। হে ইষ্টকা! তুমি তাদের দ্বারা গৃহীত হয়েছ। সুতরাং প্রজাগণের বাক লাভের নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করছি (অর্থাৎ উপধান করছি)। (এই স্থলে এক একটি মন্ত্রে প্রজাপতি, ইন্দ্রিয় (বা), ঋতু (হেমন্ত), ছন্দ (পংক্তি), সামবিশেষ (নিধনবৎ), গ্রহ (যজ্ঞপাত্র, আগ্রয়ণ), স্তোম (ত্ৰিণবত্রয়ত্রিংশ), পৃষ্ঠস্তোত্র (শাকর বৈরত) ও ঋষি (বিশ্বকর্মা)–এই নয়টি লোকপ্রসিদ্ধ পদার্থের কথা বলা হয়েছে; যদিও এগুলির জন্ম নেই, তথাপি মন্ত্রের অর্থত্বের দ্বারা এগুলিকে এইভাবে ভাবলে কোন বিরোধ হয় না)। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ১০ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] । ২।
[সায়ণাচার্য বলেন–তৃতীয়েহপানভৃত উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৩ ে অপানভৃৎ (অপান ধারণকারী) নামে চিহ্নিতা ইষ্টকার বিষয় উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- (পূর্বদিকে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! দিকের মধ্যে যেদি পূর্বদিক, তুমি তাই-ই। ঋতুগুলির মধ্যে যেটি বসন্ত, তুমি সেই বসন্তরূপা; দেবতাগণের মধ্যে যিনি অগ্নি, তুমি সেই অগ্নিরূপা; নিজের দ্বারা অর্জিত ধনের মধ্যে যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ্যরূপ, তুমি তারই রূপা; স্তোমের মধ্যে যে ত্রিবৃৎস্তোম পঞ্চদশ স্তোমের প্রবর্তক, তুমি ত্রিবৃৎস্তোমের সেই প্রবর্তকশক্তি রূপা; বয়সের মধ্যে যা সাধসম্বৎসররূপ (বি অর্থাৎ দেড় বৎসর), তুমি তাই-ই। অয়ানাং অর্থাৎ যুগগুলির মধ্যে যেটি কৃতযুগ (অর্থাৎ সত্যযুগ), তুমি হেই সত্যযুগরূপা; বায়ুগুলির মধ্যে যা পুরোবাত (অগ্রবর্তী বায়ু) নামে আখ্যাত, তুমি সেই বায়ুরূপা; এবং ঋষিগণের মধ্যে যিনি সানগ নামে আখ্যায়িত, তুমি সেই ঋষিরূপা।–(দক্ষিণদিকে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! দিকের মধ্যে যেটি দক্ষিণদিক, তুমি তাই-ই। ঋতুগুলির মধ্যে যেটি গ্রীষ্ম, তুমি সেই গ্রীষ্মরূপা; দেবতা-গণের মধ্যে যিনি ইন্দ্র, তুমি সেই ইন্দ্ররূপা; ধনের মধ্যে যেটি ক্ষত্রিয়ত্বের দ্বারা অর্জিত, তুমি সেই ধনরূপা; স্তোমের মধ্যে যেটি সপ্তদশ স্তোমের প্রবর্তক, তুমি সেই স্তোমরূপা; বয়সের মধ্যে যা দ্বিসম্বৎসররূপ (দিত্যবাট অর্থাৎ দুই বৎসর), তুমি তাই-ই; বায়ুর মধ্যে যেটি দক্ষিণ বায়ু (দক্ষিণাঘাতঃ), তুমি সেই বায়ুরূপা; এবং ঋষিগণের মধ্যে যিনি সনাতন নামে আখ্যাত, তুমি সেই ঋষিরূপা।-(পশ্চিমদকে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! দিকের মধ্যে যেটি পশ্চিমদিক, তুমি সেই পশ্চিমদিকরূপা;ঋতুগুলির মধ্যে যেটি বর্ষা, তুমি সেই বর্ষারূপা;ধনের মধ্যে যা বৈশ্যত্বের দ্বারা অর্জিত, তুমি সেই দেবতারূপা; স্তোমের মধ্যে যেটি একবিংশ স্তোমের প্রবর্তক, তুমি সেই সপ্তদশ স্তোমরূপা; বয়সের মধ্যে যা ত্রিবৎস অর্থাৎ তিন বৎসর, তুমি সেই বয়সরূপা; যুগের মধ্যে যেটি দ্বাপরযুগ, তুমি সেই যুগরূপা; বায়ুর মধ্যে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত যে বায়ু, তুমি সেই পশ্চিমা বায়ুরূপা; এবং ঋষিগণের মধ্যে অহভূন নামে অভিহিত যে ঋষি, তুমি সেই ঋষিরূপা।–(উত্তরদিকে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! দিকের মধ্যে যেটি উত্তর দিক, তুমি সেই উত্তরদিকরূপা; ঋতুগুলির মধ্যে যেটি শরৎ, তুমি সেই শরৎ-রূপা; দেবতাগণের মধ্যে যাঁরা মিত্রাবরুণ (মিত্র ও বরুণ), তুমি সেই মিত্রাবরুণরূপা; ধনের মধ্যে পরিচর্যাপরয়াণ (অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্যের পোষকত্বে নিযুক্ত) শুদ্ৰত্বের দ্বারা অর্জিত যে ধন, তুমি সেই ধনরূপা; স্তোমের মধ্যে যা ত্রিণবের প্রবর্তক একবিংশ স্তোম, সেই একবিংশ স্তোমরূপা; বয়সের মধ্যে যেটি সার্ধত্রিসম্বৎসররূপ (তুবাই, চতুর্থ সম্বৎসরে উপনীত হতে চলেছে এমন, অর্থাৎ সাড়ে তিন বৎসর), তুমি সেই বৎসররূপা; যুগের মধ্যে যেটি সকল ধর্মের শোষণকারী কলিযুগ, তুমি সেই কলিযুগরূপা; বায়ুর মধ্যে যেটি উত্তরদিকে প্রবাহিত, তুমি সেই উত্তরবায়ুরূপা; এবং ঋষিগণের মধ্যে যিনি প্রত্ন নামধারী, তুমি সেই প্রত্ন-ঋষিরূপা।- (মধ্যদেশে উপধেয় ইষ্টকার মন্ত্র)–হে ইষ্টকা! দিকের মধ্যে যেটি উধ্বদিক, তুমি সেই ঊধ্বরূপা; ঋতুর মধ্যে যা হেমন্ত ও শিশির, তুমি সেই ঋতুদ্বয়রাপা; দেবতাগণের মধ্যে যা যিনি বৃহস্পতি, তুমি সেই দেবতারূপা; ধনের মধ্যে যে ধন চতুর্বরে বলে অর্জিত, তুমি সেই ধনরূপা; স্তোমের মধ্যে ত্রয়স্ট্রিংশ স্তোমের প্রবর্তক যে ত্রিণব স্তোম, তুমি সেই ত্ৰিণবরূপা; বয়সের মধ্যে যেটি চার বৎসর, তুমি সেই বর্ষচতুষ্টয়রূপা, (অর্থাৎ পষ্টবাট বা পৃষ্ঠে ভার বহনকারী বলীবর্দ চতুর্থ বৎসরে ভার বহনে সমর্থ হয়, এতএব তুমি সেই চার বৎসর রূপা); যুগসমূহের মধ্যে যেটি ধর্মের অভিভবকারী কলিযুগের অবসানকারী কাল, তুমি সেই কলিযুগাবসানরূপা; নানাদিকে সঞ্চরমান হওয়ার কারণে যে বায়ু বিম্বগাত নামে অভিহিত, তুমি সেই বায়ুরূপা; এবং ঋষিগণের মধ্যে যিনি সুপর্ণ ঋষি নামে খ্যাত, তুমি সেই সুপর্ণ ঋষিরূপা।–(উপরোক্ত পঞ্চ মন্ত্রের অনুসঞ্জনীয় শেষাংশ)–হে পিতা! হে পিতামহ! হে প্রপিতামহ ও পরলোকগত পিতৃপুরুষগণ! হে অবর (অর্থাৎ ভ্রাতা পুত্র ইত্যাদি অনুজাতগণ)! তোমরা যজ্ঞকর্মের অনুষ্ঠানের নিমিত্ত আমাদের পালন করো; অধিকন্তু আমাদের কর্মসিদ্ধির পালক হও। এই ব্রাহ্মণজাতিতে (ব্রহ্মন্নস্যাং), এই ক্ষত্রিয়জাতিতে (ক্ষত্রেহস্যাং), তাঁদের কামনাতে, এই রাজপুরোহিত বৃত্তিধারী পুরোধাগণে, এই অগ্নিচয়নরূপ কর্মে ও দেববর্গের আহ্বানরূপ ক্রিয়ার নিমিত্তভূত হয়ে, হে ইষ্টকা! তোমার উপধান (রক্ষণ) করছি। [ এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ১০ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৩৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন-তৃতীয়েনুহবাকে….। তাবতা প্রথমা চিতি সমাপ্তা। অথ চতুর্থানুবাকে দ্বিতীয়স্যাং চিতাবাশ্বিন্যাখ্যা ইষ্টকা অভিধীয়ন্তে। অর্থাৎ–অনুবাক-৩ অবধি প্রথমা চিতি সমাপ্ত হয়েছে। অতঃপর এই অনুবাক-৪ ে দ্বিতীয় চিতিতে আশ্বিন্য নামে আখ্যাত ইষ্টকার বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- যে ভূমিতে ইষ্টকাকে আশ্রয়ান্বিত করা হয় (অর্থাৎ স্থাপন করা হয়) সেই ভূমি ধ্রুব বা স্থির; (অর্থাৎ ভূমির চাঞ্চল্যের অভাবে স্থির দেখায়)। ধ্রুবা অর্থাৎ বিনাশরহিতা মৃত্তিকা যে ইষ্টকার উৎপত্তির হেতু, হে ইষ্টকা! তুমি স্বরপতঃও সেইরকমই ধ্রুবা। আমাদের দ্বারা স্থাপিত হয়ে (অর্থাৎ উপধান-প্রাপ্ত হয়ে), তুমি স্থির অগ্নিক্ষেত্ররূপ স্থানে আগত হয়ে উপবেশন করো। এই স্থান উখাতে স্থিত অগ্নির অস্তিত্বের জ্ঞাপক (কেতুং) এবং প্রথম ইষ্টকার উপধানের পূর্ব নিষ্পন্ন। অতএব, হে ইষ্টকা! এই অগ্নিক্ষেত্রের পূর্ব দিকে দেববর্গের অধ্বর্য উভয় অশ্বিন (অশ্বিনীকুমারদ্বয়) তোমাকে স্থাপন করুন (স্থাপয়তা)। হে ইষ্টকা! তুমি আপন স্থানে উপবেশন করো, যেমন দক্ষপিতেতি লুপ্তোপমা অর্থাৎ দক্ষ বা ব্যবহার-কুশল পুত্রের গৃহে পিতা উপবেশন করে থাকেন। হে ইষ্টকা! তুমি দেবতাগণের মধ্যে স্বকীয় শরীরে সম্যক অবস্থিত হও। (কিরকম? না,) পৃথিবী যেমন মৃৎকার্যের নিমিত্ত ভূমিস্বরূপা, প্রৌঢ়া (বৃহতী), নিরুপদ্রবত্বের কারণে রমণীয়া ও সুখকরা হয়ে এই স্থানে স্থিতা আছেন। হে ইষ্টকা! তুমি, সর্বতঃ সুখে সেবিত হও, যেমন সুনবে পিতব, অর্থাৎ পুত্রের নিমিত্ত পিতা সুখে সেবিত হয়ে থাকেন। দেববর্গের অধ্বর্য উভয় অশ্বিন (অশ্বিনীকুমারদ্বায়) তোমাকে এই স্থানে স্থাপন করুন।–হে ইষ্টকা! তুমি আপন নিবাস্থানে অবস্থান পূর্বক ধনবতীরূপে ধনপ্রদা হও; তুমি বয়োধা অর্থাৎ দীর্ঘ আয়ুর সম্পাদিকা হও। এইরকমে তুমি আমাদের নিমিত্ত প্রভূত ধন (বহুলং রয়িং) ও শোভন পুত্র (সুবীরং) সম্পাদন করো। অমতি অর্থাৎ বুদ্ধিহীনতা ও দুর্মতি অর্থাৎ পাপবুদ্ধি নিঃশেষে বিনষ্ট করে ধনপুষ্টির দ্বারা যজ্ঞপতিকে সর্বতো প্রাপ্ত হও এবং স্বর্গলোকে যজমানের নিমিত্ত পুষ্টি সম্পাদন করো। দেববর্গের অধ্বর্য উভয় অশ্বিন্ তোমাকে এই স্থানে স্থাপন করুন। হে ইষ্টকা! দেবগণকে প্রাপ্ত হয়ে তুমি চিত্য (চয়িত) অগ্নির পূরক হও। এইরূপে সকল দেবতা তোমার সর্বতো কীর্তন করুন। তুমি সকল স্তোমের (বা স্তুতির) সাথে এবং হোমের ঘৃতের সাথে যুক্ত হয়ে এই স্থানে স্থিত হও। সেই সঙ্গে আমাদের পুত্রপৌত্র ইত্যাদি যুক্ত ধন সর্বত প্রদান করো। দেববর্গের অধ্বর্য উভয় অশ্বিন তোমাকে এই স্থানে স্থাপন করুন।–হে ইষ্টকা! তুমি সবাত্মকা (সর্বাত্মকাহসি)। এই কারণেই বলা হয় যে, তুমি তুমি দুলোকের শিরঃস্থানীয় আদিত্য, পৃথিবী বা ভূমির নাভিস্থানীয় মেরু ইত্যাদি, পূর্ব ইত্যাদি দিক সমূহের প্রতিবন্ধকতা দুরীকরণের ব্যবস্থাপক, সকল ভুবনের অধিপত্নীগণ অপেক্ষাও অধিক পালয়িত্রী, জলের ঊর্মি ও রস–উভয় রূপা, এবং প্রজাপতি বিশ্বকর্মা তোমার দ্রষ্টা ঋষি (ঋষিদ্ৰষ্টা)। দেববর্গের অধ্বর্য উভয় অশ্বিন তোমাকে এই স্থানে স্থাপন করুন। এই অগ্নিচয়নরূপ বিপুল যজ্ঞে প্রমাদবশতঃ অগ্নির কোন অঙ্গ অনুষ্ঠিত বা অননুষ্ঠিত হতে পারে। তা জানা সব সময়ে সম্ভব নয়। সুতরাং যদি কোন অঙ্গ অপূর্ণ হয়, তবে সেই অন্তরায় পরিহারের নিমিত্ত এই অশ্বিন্দ্বয় ইষ্টকার উপধান করুন (অর্থাৎ অশ্বিদেবদ্বয়যুক্ত মন্ত্রের দ্বারা এই ইষ্টকার উপধান হওয়ার নিমিত্ত এটি আশ্বিন্য নামে অভিহিত হবে)। তার ফলে দেববৈদ্য অশ্বিদ্বয় এই যজ্ঞের চিকিৎসা করবেন (যজ্ঞায়োষধং করোতি)।-হে ইষ্টকা! তুমি বসন্ত ইত্যাদি ঋতুগুলির সাথে সমান প্রীতিযুক্ত, (অর্থাৎ বসন্ত ইত্যাদি ঋতুসমুহ যেমন প্রীতিযুক্ত, সেইরকম হয়ে থাক)। সেইভাবেই তুমি জগতের পোষক ব্রহ্মা ইত্যাদি বিধাতাগণের সাথে, বসুগণের সাথে, রুদ্রবরে সাথে, আদিত্যবৃন্দের সাথে ও বিশ্বদেব সমূহের সাথে সমান প্রীতিযুক্ত হও। এই সকল দেবতাই বয়োনাধা অর্থাৎ আয়ুঃ-প্রদাতা। সেই দেবতাগণের সাথে সমান প্রীতিসম্পন্ন তোমাকে বৈশ্বানর অর্থাৎ সর্বপুরুষের হিতকরী অগ্নির উদ্দেশে উপধান করছি। দেববর্গের অধ্বর্য অশ্বিদ্বয় তোমাকে এই ক্ষেত্রে স্থাপন করুন। হে ইষ্টকা! আমার প্রাণকে (পঞ্চবৃত্তিক দেহস্থ বায়ুকে) পালন করো (পালয়), আমার ব্যানকে (প্রাণধারণসাধন দেহস্থ বায়ুবিশেষকে) পালন করো, ও আমার চক্ষুকে পালন করো। তুমি বিশাল দৃষ্টিতে বিভাত (প্রকাশিত) হও, অর্থাৎ বিশেষভাবে দর্শন-সামর্থ্য দান করো এবং বহুরকমে বেদ ইত্যাদি শাস্ত্র বচন (তথা শব্দসংঘাত) শ্রবণে সমর্থ করো। হে ইষ্টকা! তুমি জলের ও ওষধির প্রীতি সম্পাদন করো, দ্বিপাদ অর্থাৎ মনুষ্য সমুহের শরীরকে পালন করো ও চতুষ্পদ পশুসমুহের শরীরকে রক্ষা করো (মনুষ্যশরীরং পালয়, পশুশরীরমবরক্ষ)। তুমি দ্যুলোক বা আকাশ হতে বৃষ্টির প্রবর্তন করো। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ১ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৪॥
[সায়াণাচার্য বলেন–পঞ্চমে বয়স্যাখ্যা ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ, এই অনুবাক-৫ ে বয়স্যা নামে আখ্যাত ইষ্টকার বিষয় উক্ত হয়েছে।] .
মর্মার্থ- হে ইষ্টকা! তুমি ত্রি-অবি অর্থাৎ সাধসম্বৎসর পরিমিত কালরূপা বা দেড় বৎসর বয়সরূপা ও চতুশ্চত্বারিংশ (চুয়াল্লিশ) অক্ষর সমন্বিত ত্রিষ্টুপ ছন্দোরূপা। এই রকমেই তুমি দ্বিবৎসর ( দিবা) পরিমিত বয়সরূপা ও বিরাট ছন্দোরূপা; তুমি পঞ্চাবি অর্থাৎ সার্ধদ্বিবৎসর (আড়াইবৎসর) পরিমিত বয়সরূপা ও গায়ত্রী ছন্দোরূপা; তুমি তিনবৎসর পরিমিত বয়সরূপা ও উষ্ণিক ছন্দোরূপা, তুমি তুর্যবা অর্থাৎ সার্ধসম্বৎসরত্রয় (সাড়ে তিন বৎসর) পরিমিত বয়সরূপা ও অনুষ্টুপ ছন্দোরপা; তুমি পষ্ঠবাৎ অর্থাৎ সম্বৎসরচতুষ্টয় (চার বৎসর) পরিমিত বয়সরূপা ও বৃহতী ছন্দোরূপা; তুমি উক্ষা অর্থাৎ সাধসম্বৎসরচতুষ্টয় (সাড়ে চার বৎসর) পরিমিত বয়সরূপা ও সতোবৃহতী ছন্দোরূপা।–এইভাবে ঋষভ ইত্যাদি শব্দের দ্বারা সেই সেই শব্দের সাথে সম্বন্ধবিশিষ্ট বয়স ও ছন্দ উল্লেখিত হচ্ছে; যেমন-ঋষভো বয়ঃ ককুচ্ছন্দো অর্থাৎ ঋষভের বয়স ককু ছন্দ, ধেনুর বয়স জগতী ছন্দ, অনড়বান অর্থাৎ বলদের বয়স পংক্তি ছন্দ, বস্ত অর্থাৎ ছাগলের বয়স বিবল ছন্দ, বৃষ্ণির বয়স বিশাল ছন্দ, পুরুষের বয়স তন্দ্র ছন্দ, ব্যাঘ্রের বয়স অনাধৃষ্ট ছন্দ, সিংহের বয়স ছদি ছন্দ, বিষ্টম্ভের বয়স অধিপতি ছন্দ, ক্ষত্রিয়ের বয়স ময়ন্দ ছন্দ, বিশ্বকর্মার বয়স পরমেষ্ঠী ছন্দ, মুধার অর্থাৎ মস্তকের ন্যায় উর্ধ্বে বিরাজিত দুলোকের বয়স প্রজাপতি ছন্দ (অর্থাৎ দুলোকের বয়স যত কাল, ততকালের বয়স প্রজাপতি ছন্দ)।–তাৎপর্য এই যে, নানাবিধ বয়সরূপা ও নানাবিধছন্দোরূপা তুমি। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ১ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন–পঞ্চমেহনুবাকে …। তাবতা দ্বিতীয়চিতঃ সমাপ্তা। অথ ষষ্ঠে তৃতীয়স্যাং চিতৌ স্বয়মাতৃম্নাদ্যা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–চতুর্থ ও অনুবাক-৫ অবধি দ্বিতীয়া চিতি সমাপ্তে হয়েছে। অতঃপর এই অনুবাক-৬ ে স্বয়মাতৃদ্মা ইত্যাদি ইষ্টকার বিষয় কথিত হয়েছে]।
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ২৬
অনুবাক-২৬
মন্ত্র- ইন্দ্রাগ্নী অব্যথমানামিষ্টকাং দৃংহতং যুবম। পৃষ্ঠেন দ্যাবাপৃথিবী অন্তরিক্ষং চ বি বাধতাম বিশ্বকর্মা ত্বা সাদয়ত্বন্তরিক্ষস্য পৃষ্ঠে ব্যচস্বতীং প্রথমস্বতীং ভাস্বতীং সূরিমতীমা যা দ্যাং ভাস্যা পৃথিবীমোর্বান্তরিক্ষমন্তরিক্ষং যচ্ছান্তরিক্ষং দৃংহান্তরিক্ষং মা হিংসীর্বিশ্বম্মৈ প্রাণায়াপনায় ব্যানায়োদানায় প্রতিষ্ঠায়ৈ চরিত্রায় বায়ুস্তাহভি পাতু মহ্যাঁ স্বস্ত্যা ছর্দিষা শম্ভমেন তয়া দেবতয়াহঙ্গিরস্বদৰা সীদ। রাসি প্রাচী দিঘিরাডসি দক্ষিণ দিকসম্রাডসি প্রতীচী দিস্বরাড়স্যুদীচী দিগধিপত্নসি বৃহতী দিগায়ুৰ্ম্মে পাহি প্রাণং মে পাহ্যপানং মে পাহি ব্যানং মে পাহি চক্ষুৰ্মে পাহি শ্ৰোত্ৰৎ মে পাহি মনো মে জিম্ব বাচং মে পিন্ধাহত্বানং মে পাহি জ্যোতিৰ্মে যচ্ছ ৷৬৷৷
মর্মার্থ- হে ইন্দ্রাগ্নী (অর্থাৎ ইন্দ্র ও অগ্নিদেব)! আপনারা অব্যথমানা অর্থাৎ ভঙ্গরহিতা স্বয়মাতৃদ্মা নামে আখ্যাতা ইষ্টককে দৃঢ় করুন, এবং এই ইষ্টকা আপন উপরিভাগে তিন লোক ব্যাপ্ত করুন (বাধমানেব)। হে স্বয়মাতৃগ্না! বিশ্বের সকল কর্মের সম্পাদক বিশ্বকর্মা প্রজাপতি তোমাকে অন্তরীক্ষের উপরে স্থাপন করুন। (কিরকম? না,) ব্যক্তিযুক্তা অর্থাৎ প্ৰকাশযুক্তা, প্রথস্বতী অর্থাৎ বিস্তারযুক্তা, ভাস্বতী অর্থাৎ দীপ্তিযুক্তা, সুরিমতী অর্থাৎ বিদ্বান ঋত্বিকগণের দ্বারা যুক্তা। এই হেন যে স্বয়মাতৃগ্না! তুমি সর্বতো প্রকাশ করেছ। সেইরকমেই তুমি পৃথিবীকে প্রকাশ করেছ ও বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষকে প্রকাশ করেছ। সেই রূপেই তুমি গন্ধর্ব অপ্সরাগণ ইত্যাদির ধারকরূপী অন্তরীক্ষলোককে সংযথ বা নিয়মিত করো; তাকে পরের দ্বারা কৃত উপদ্রবরহিতপূর্বক দৃঢ় করো এবং তুমি সেই অন্তরীক্ষকে হিংসা করো না। সকল প্রাণ, আপন, ব্যান ও উদান নামক বায়ুর বৃত্তি বা স্থিতি লাভের নিমিত্ত, আপন গৃহে প্রতিষ্ঠা লাভের নিমিত্ত, শাস্ত্রীয় আচারসম্পন্নতার নিমিত্ত প্রাণীগণের এই সকল বিষয়ের সিদ্ধির নিমিত্ত বায়ু তোমাকে রক্ষা করুন। (কিরকমে রক্ষা করবেন? না,) মহতী বোগমে সম্পত্তি (অর্থাৎ অলব্ধ বস্তুর লাভ ও লব্ধ বস্তুর রক্ষণরূপ সামর্থ্য) ও সুখকর দীপ্তিবিশেষের দ্বারা রক্ষা করবেন। তোমার স্বামীভূত যে দেবতা, তার দ্বারা অনুগৃহীতা হয়ে তুমি এই স্থানে স্থিরা হয়ে উপবেশন করো, যেমন অঙ্গিরা ঋষিগণ কর্তৃক চয়ন (অগ্নিচয়ন) অনুষ্ঠানে স্থিরা হয়ে অবস্থান করেছিলে। হে ইষ্টকা! তুমি রাজ্ঞীরূপে (রাজমানা) পূর্বদিকরূপা, বিরাটরূপে (বিবিধরূপে রাজামানা) দক্ষিণদিকরূপা, সম্রাটরূপে (অর্থাৎ সম্যক্ রাজমানা) পশ্চিমদিকরূপা, স্বরাষ্ট্রপে (স্বয়ং রাজামানা) উত্তরদিকরূপা ও অধিপত্নীরূপে উধ্বদিকরূপা। হে ইষ্টকা! আমার আয়ুকে রক্ষা করো (মদীয়মায়ুঃ পাহি); সেইরকমে আমার প্রাণকে রক্ষা করো, আমার অপানকে রক্ষা করো, আমার ব্যানকে রক্ষা করো, আমার চক্ষুদ্বয়কে রক্ষা করো, আমার শ্রোতদ্বয়কে রক্ষা করো। আমার মন ও বাক্যের প্রীতি বিধান করা; এবং আমার জীবনস্বরূপ আত্মাকে রক্ষা করো। আমাকে জ্যোতি দান করো। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ২য় অনুবাকের কতকগুলি মন্ত্র সংশ্লিষ্ট ] ॥৬॥
[সায়ণাচার্য বলেন-সপ্তমে বৃহত্যাখ্যা ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৭ ে বৃহতী নামে। আখ্যাত ইষ্টকার কথা বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ– এই মন্ত্রে ইষ্টকাকে স্তোমরূপে (স্তুতিমন্ত্ররূপে গ্রহণ করা হয়েছে। ত্রিবৃৎ, পঞ্চদশ, সপ্তদশ, অষ্টাদশ, নবদশ ইত্যাদি শব্দের দ্বারা স্তোমবিশেষকে লক্ষ্য করা হয়েছে। (স্তোমবিশেষবাচিনঃ)। সামগুলির আবৃত্তির প্রকার (ভেদ) অনুসারে ত্রিবৃৎ ইত্যাদি স্তোম নিষ্পন্ন হয়। এই অনুবাকে ত্রিবৃৎ হতে চতুষ্টোম পর্যন্ত অষ্টাদশ সংখ্যক স্তোমবিশেষ কথিত হয়েছে (স্তোমবিশেষা আন্নাত। আশু ভাস্ত ইত্যাদি স্তোমের বিশেষণ বাচক শব্দ)। এগুলির মধ্যে কোনটি গুণবাচক (গুণবাচীনি), কোনটি বা দ্রব্যবাচক (দ্রব্যবাচীনি)। এই স্থলে গুণসম্বন্ধী বা দ্রব্যাত্মক সম্পর্কিত ভাবে স্তোমগুলির উপচার করা হয়েছে, এবং সেই সেই স্তোমরূপত্ব সম্পন্ন ইষ্টকার প্রশাংসা করা হয়েছে (তত্তদিষ্টকায়াঃ প্রশংসাৰ্থমুপন্যসতে)। যেমন–হে ইষ্টকা! যে ত্রিবৃৎ স্তোম শীঘ্র-গুণোপেতা (অর্থাৎ শীঘ্র-গুণযুক্তা), তুমি সেই ত্রিবৃৎ স্তোমরূপা। হে ইষ্টকা! যে পঞ্চদশ স্তোম ভান্তো অর্থাৎ ভাসমান-গুণেপেতা, তুমি সেই পঞ্চদশ স্তোমরূপা। হে ইষ্টকা! যে সপ্তদশ স্তোম ব্যোম বা আকাশ (বৎ)-গুণোপেতা, তুমি সেই সপ্তদশ স্তোমরূপা। হে ইষ্টকা! যে অষ্টাদশ স্তোম প্রত্যুর্তি অর্থাৎ প্রকৃষ্ট শীঘ্র গমনকারিণী-গুণোপেতা, তুমি সেই অষ্টাদশ স্তোমরূপা। হে ইষ্টকা! যে নবদশ স্তোম তপস্যা-গুণোপেতা, তুমি সেই নবদশ স্তোমরূপা। হে ইষ্টকা! যে সবিংশ (অর্থাৎ বিংশতী সংখ্যার সাথে বিদ্যমান) স্তোম অভিবর্ত নামক সামবিশেষের গুণোপেতা, তুমি সেই সবিংশ স্তোমরূপা। হে ইষ্টকা! যে একবিংশ ডোম বর্চো অর্থাৎ বলহেতুকরী গুণোপেতা, তুমি সেই একবিংশ স্তোমরূপা।–এইভাবে ইষ্টকাকে দ্বাবিংশ (২২), এয়োবিংশ (২৩), চতুর্বিংশ (২৪), পঞ্চবিংশ (২৫), ব্রিণব বা উনত্রিংশ (২৯), একত্রিংশ (৩১), এয়ঃ-ত্রিংশ (৩৩), চতুঃ-ত্রিংশ (৩৪), ষট্ত্রিংশ (৩৬), ও অষ্টচত্বারিংশ (৪৮) পর্যন্ত অর্থাৎ চতুষ্টোম পর্যন্ত স্তোমবিশেষরূপা রূপে গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলি গুণ বা দ্রব্যাত্মকতা সম্পর্কে যথাক্রমে বলা হয়েছে–সম্ভরণ অর্থাৎ সম্যক পোষণগুণযুক্তা, যোনিঃ অর্থাৎ প্রজা-উৎপাদন গুণযুক্তা, গর্ভ-গুণযুক্তা, ওজঃ অর্থাৎ অষ্টমধাতু গুণযুক্তা, ঋতু অর্থাৎ জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি ক্রতুর গুণযুক্তা, প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ স্থিতিহেতুকরী গুণযুক্তা, ব্ৰধস্য বিষ্টপং অর্থাৎ অদিতির নিবাসস্থানরূপ গুণোপেতা, নাকঃ অর্থাৎ স্বৰ্গনামক ভোগভূমির গুণযুক্তা, বিবর্তঃ অর্থাৎ বিপরীতভাবে বর্তমান হওয়ার গুণযুক্তা এবং ধর্তো অর্থাৎ ধারক গুণযুক্তা। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ৩য় অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৮
[সায়ণাচার্য বলেন–নবমেহবশিষ্টান্তা উচ্যন্তে। অর্থাৎ অনুবাক-৮ ে কতকগুলি অক্ষয়াস্তোমীয় ইষ্টকার কথা বলা হয়েছে। অতঃপর এই নকম অনুবাকে অবশিষ্ট অশ্লয়াস্তোমীয় ইষ্টকার কথা বলা হচ্ছে]
মর্মার্থ- হে ইষ্টকা! এই যে হবিঃ-লক্ষণযুক্ত অগ্নির ভাগ, এই যে দীক্ষাদেবতার আধিপত্য বা স্বামিত্ব, এই যে দেবগণের প্রীতিকর মন্ত্রসমূহ বা ব্রাহ্মণজাতি (ব্রাহ্মণজাতির্বা) এবং এই যে ত্রিবৃৎ নামক স্তোমবিশেষ,–এ সবই তুমি। হে ইষ্টকা! ইন্দ্রের এই যে ভাগরূপ হবিঃবিশেষ, এই যে পরমেশ্বররূপে বিষ্ণুর আধিপত্য, এই যে প্রীতিহেতুভূত ক্ষত্রিয়ের বল বা ক্ষত্রিয় জাতি, এই যে পঞ্চদশ নামে আখ্যাত স্তোমবিশেষ, –এ সবই তুমি। এই রকমে, ঋত্বিকগণের গো-ইত্যাদি যে দক্ষিণারূপ ভাগ, প্রজাপতির যে আধিপত্য, ধৃতং অর্থাৎ প্রীতিকর জনিং অর্থাৎ জননশীল যে অন্ন,এবং সপ্তদশ নামে আখ্যাত যে স্তোম,-এ সবই তুমি। মিত্রের যে ভাগ, বরুণের যে আধিপত্য, প্রীতির কারণরূপ যে বায়ুবৃন্দ ও দুলোক হতে আগত বৃষ্টি, এবং একবিংশ নামে আখ্যাত যে স্তোম,–এ সবই তুমি। অদিতির যে ভাগ, পূষার যে আধিপত্য, অষ্টম ধাতু অর্থাৎ ওজের যে প্রীতিকারিতা এবং ব্রিণব অর্থাৎ ঊনত্রিংশ নামে আখ্যাত যে স্তেম,–এ সবই তুমি। বসুগণের যে ভাগ, রুদ্রগণের যে আধিপত্য, প্রীতিহেতু যে চতুষ্পদ গো-ইত্যাদি পশু এবং চতুর্কিশ নামে আখ্যাত যে স্তোম,–এ সবই তুমি। আদিত্যসমূহের যা ভাগ, মরুৎগণের যা আধিপত্য, মনুষ্য (দ্বিপদা) ও পশুগণের (চতুস্পদা) উদরগতা যে প্রীতি বা তৃপ্তি, এবং পঞ্চবিংশ নামে আখ্যাত যে স্তোম,–এ সবই তুমি। সবিতা দেবতার যে ভাগ, বৃহস্পতি দেবতার যে আধিপত্য, প্রাণীগণের অনুকূলরূপে (প্রীতিকারকরূপে) অবস্থিত যে দিকসমূহ এবং চতুষ্টোম নামে আখ্যাত যে স্তোম,–এ সবই তুমি। হে ইষ্টকা! শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষযুক্ত মাসসমূহের যে ভাগ, অর্ধমাসের (অতথাবিধাদনা) যে আধিপত্য, প্রীতিহেতুকারক যে প্রজাগণ, ও চতুশ্চত্বারিংশ নামে অভিহিত যে স্তোম,–এ সবই তুমি। ঋভু নামক দেববিশেষের যে ভাগ, বিশ্ব দেবগণ নামক গণবিশেষের যে আধিপত্য, প্রীতিহেতুকরী নিষ্পন্ন যে গৃহ, ও ত্রয়স্তিংশ নামে আখ্যাত যে স্তোম, এ সবই তুমি। (এই সকল মন্ত্রবিশেষ ও দেশবিশেষের সহযোগে অক্ষয়াস্তোমীয় ইষ্টকাগুলির উপধান বিধিমন্ত্রবিশেষে। দেশবিশেষেষু চ সহোপধানং বিধীয়তে)। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ৪র্থ অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৯।
[সায়ণাচার্য বলেন–দশমে সৃষ্টিশব্দাভিধেয়া ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-১০ ে সৃষ্টি শব্দে অভিহিতা ইষ্টকার বিষয় কথিত হচ্ছে।]
মর্মার্থ- পুরাকালে মহর্ষিগণ যাগানুষ্ঠানের সময়ে একটি স্তোত্রিয় ঋকের (অর্থাৎ স্তোমাত্মক মন্ত্রের) দ্বারা স্তুতি করেছিলেন, তার শক্তিতে (সামর্থ্যাৎ) প্রজাগণ উৎপন্ন হয়েছিল। তখন প্রজাপতি সেই প্রজাগণের অধিপতি হলেন। অতঃপর কোন সময়ে তারা (মহর্ষিগণ) তিনটি ঋকের দ্বারা (তিসৃভিঃ) স্তুতি করেছিলেন; তার শক্তিতে ব্রাহ্মণজাতির সৃষ্টি হয়েছিল; তখন ব্ৰহ্মণস্পতি তাদের অধিপতি হলেন। এই ভাবে মহর্ষিগণ পাঁচটি ঋকের দ্বারা স্তুতি করেছিলেন; তার শক্তিতে প্রাণীগণের সৃষ্টি হয়েছিল; তখন ভূতসমূহের পতি তাদের অধিপতি হলেন। (ভূতগণের পতি কোন দেবতা বিশেষ। অন্যত্র কথিত আছে-ভূতানাং পতয়ে স্বাহা। সেই অনুসারে ভূতজাত অর্থাৎ প্রাণীমাত্রের পতি বা অধিপতি হলেন এই দেবতা)। মহর্ষিগণ তারপর সাতটি ঋকের দ্বারা স্তুতি করেছিলেন; তার শক্তিতে সপ্তর্ষিগণ সৃষ্ট হয়েছিলেন; তখন ধাতা (জগৎস্রষ্টা) তাঁদের অধিপতি হলেন।–এইভাবে সর্বত্র যোজনীয়, যেমন–নয়টি ঋকের দ্বারা স্তুতিতে যে পিতৃগণ সৃষ্ট হয়েছিলেন, তাঁদের অধিপতি হলেন অদিতি বা ভূমি; একাদশ ঋকে ঋতুসমূহ এবং তাঁদের অধিপতি হলেন আর্তব অর্থাৎ ঋতুপালক কোন দেবতা; ত্রয়োদশ ঋকে মাসসমূহ, এবং তাদের অধিপতি সম্বৎসর; পঞ্চদশ ঋকে ক্ষত্র বা ক্ষত্রিয়জাতি, এবং তাঁদের অধিপতি ইন্দ্রদেব; সপ্তদশ ঋকে পশুগণের সৃষ্টি, এবং তাদের অধিপতি বৃহস্পতি দেবতা; ঊনবিংশ ঋকে শূদ্র ও বৈশ্য নামে জাতিদ্বয়, এবং তাদের অধিপতি অহদেবতা ও রাত্রিদেবতা; (এই জাতিদ্বয়ের অধিপত্নী বা স্বামীরূপে অহোরাত্রি দেবতা পরিগণিত); একবিংশ ঋকে একখুরবিশিষ্ট পশুসমূহ, এবং বরুণ তাদের অধিপতি; ত্ৰয়োবিংশ ঋকের দ্বারা স্তুতির শক্তিতে ক্ষুদ্র পশুসমূহ সৃষ্ট হয়, এবং পূষা তাদের অধিপতি হন; এইভাবে পঞ্চবিংশ ঋকে আরণ্য পশুসমূহের উৎপত্তি, এবং তাদের অধিপতি হলেন বায়ু; সপ্তবিংশ ঋকের দ্বারা স্তুতির সামর্থ্যে পূর্বে সংযুক্তভাবে অবস্থিতা দ্যাবাপৃথিবী দুলোক ও ভূলোক রূপে বিভক্ত হয়, এবং বসুগণ রুদ্রবর্গ ও আদিত্যসমূহ তাদের অধিপতি হন; ঊনত্রিংশ ঋকে বনস্পতিসমূহ সৃজিত হয়, এবং তাদের অধিপতি হন সোম; একত্রিংশ ঋকে যে প্রজাগণ সৃষ্টি হন, তাদের অধিপতি হলেন মাস ও অর্ধমাসের দেবতা, (যাবা অবা), অর্থাৎ এই উভয় দেবতা ঐ প্রজাগণের অধিপতি হয়েছিলেন। মহর্ষিগণ অতঃপর ত্রয়স্ত্রিংশ ঋকের দ্বারা স্তুতি করেছিলেন, তার সামর্থ্যে সৃষ্ট অশান্ত প্রাণীগণকে পরমে অর্থাৎ সত্যলোকে স্থিত (পরমেষ্ঠী) প্রজাপতি উপদ্রবরহিত করেন এবং তিনি তাদের অধিপতি হন। ১০৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–একাদশে ব্যষ্টিনামিকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ, এই একাদশ অনুবাকে বৃষ্টি নামে অভিহিতা ইষ্টকার বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে ইষ্টকা! তুমি আদিত্যের রশ্মিরূপা, তোমাকে নিবাস সিদ্ধির নিমিত্ত উপধান করছি, তুমি আমাদের নিবাস সম্পন্ন করো। তুমি প্ৰেতিঃ, অর্থাৎ প্রকৃষ্ট গতিযুক্তা, ধর্ম, অর্থাৎ বিহিত কর্ম অনুষ্ঠানের নিমিত্ত তোমার উপদান করছি, তুমি আমাদের কর্মানুষ্ঠান অর্থাৎ যজ্ঞকর্ম সম্পন্ন করো। তুমি সাহন্বিতিঃ, অর্থাৎ অনুকুলা গতিযুক্তা; দুলোকের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি আমাদের দ্যুলোক গমনের পথ প্রাপ্ত করিয়ে দাও। তুমি সন্ধি, অর্থাৎ দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যবর্তী দেশরূপা, সেই সন্ধিদেশে গমনের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি আমাদের সেই স্থানে গমনের পথ প্রাপ্ত করিয়ে দাও। তুমি গন্ধর্ব ইত্যাদি লোভাগী অন্তরীক্ষরূপা; সেই অন্তরীক্ষে গমনের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি সেই লোকে গমনের পথ প্রাপ্ত করিয়ে দাও। তুমি প্রতিধি, অর্থাৎ ভূলোকভাগ-স্বরূপা; সেই ভূলোকের স্থিতির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি ভূলোকে আমাদের স্থিতি সম্পন্ন করে দাও। তুমি বিষ্টম্ভ, অর্থাৎ বিশেষভাবে, জলের ধারক মেঘ-স্বরূপা; সুতরাং মেঘ হতে বর্ষণের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি আমাদের বৃষ্টিপ্রাপ্ত করিয়ে দাও। তুমি প্রবোষকাল অর্থাৎ প্রথম আলোক-উৎপাদিকা (সূর্যোদয়ের পূর্বেই আলোক-প্রবর্তিকা) উষা-স্বরূপা; দিবসের সিদ্ধির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি আমাদের দিবসকে সার্থক করো।-হে ইষ্টকা! তুমি সূর্যাস্তের পশ্চাতে বিচরণকারিণী সায়ংসন্ধ্যা-স্বরূপা; রাত্রির সিদ্ধির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি; তুমি আমাদের রাত্রিকে সিদ্ধির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি; তুমি আমাদের রাত্রিকে সার্থক করো। তুমি কাম্যমানা; অতএব বসু বা ধনসমূহের কামনায় তোমার উপধান করছি, তুমি আমাদের ধনের দ্বারা প্রীত করো। তুমি রুদ্রের প্রকৃষ্ট কেতু বা ধ্বজা-স্বরূপা; সেই রুদ্রগণের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি রুদ্রগণের প্রতি সম্পাদন করো। তুমি শোভনা দীপ্তি-স্বরূপা; আদিত্যবর্গের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি তাঁদের প্রীত করো। তুমি ওজঃ বা বলরূপা; পিতৃগণের বল বা অনুগ্রহ সমর্থের নিমিত্ত তোমাকে স্থাপিত করছি, তুমি তাদের প্রীত করো। তুমি বিস্তৃতি-স্বরূপা; পুত্রপৌত্রাদির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি তাদের প্রীত করো। তুমি পৃতনাষা অর্থাৎ গো-ইত্যাদি পশুসমূহের অপহর্তা শত্রুসেনার অভিভবকারী-স্বরূপা; সেই পশুসমূহের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি তাদের রক্ষার দ্বারা প্রীত করো।-ওষধিসাধ্য যে জীবন, তুমি তৎ-রূপা; সেই ওষধিসমূহের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি তা সম্পাদনের দ্বারা প্রীত করো। তুমি অভিজিৎ, অর্থাৎ শত্রুগণের অভিভবকারী, যুক্তগ্রাবা, অর্থাৎ পাষাণসদৃশ বজ্রগ্রাবাকে যুক্ত হস্তে স্বীকারকারী, বজ্রধারী ইন্দ্র-স্বরূপা; তোমাকে ইন্দ্রের নিমিত্ত উপধান করছি, তুমি চক্ষু ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতা ইন্দ্রদেবকে প্রীত করো। শ্বাসরূপ বায়ুর যে অধিপতি, তুমি তৎ-রূপা; সেই প্রাণরূপ বায়ুর নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি সেই বায়ুকে প্রীত করো। বাহিরে নির্গমন ও পুনরায় অন্তরভাগে প্রবেশের নিয়ামক যে বায়ু, তুমি তৎ-স্বরূপা; তোমাকে সেই অপান বায়ুর নিমিত্ত উপধান করছি, তুমি তাকে প্রীত করো। তুমি সম্যক প্রবর্তমান দৃষ্টিস্বরূপা; সেই সংসপো দৃষ্টির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি সেই সংসর্পো দৃষ্টির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি সেই দৃষ্টিকে প্রীত করো। পক্ষী যেমন যত্র তত্র গমন পূর্বক আপন কার্য সাধন পূর্বক শ্রোত্রেন্দ্রিয় শক্তির দ্বারা শব্দ প্রাপ্ত হয়ে থাকে, তুমি সেই শক্তিরূপা; শ্রোত্রের শক্তির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি, তুমি সেই শ্রবণশক্তিকে প্রীত করো। তুমি ত্রিবৃৎ অর্থাৎ নারী-পুরুষের ত্রি-অবয়ব বিশেষ মিথুনীভাব বা সঙ্গমরূপা (মিথুনীভাবরূপা ত্বমসি)। স্ত্রী-পুরুষের সংসর্গানন্তরভাবিনী যে প্রবৃত্তি, তুমি সেই প্রবৃত্তিরূপা। প্রবৃত্তির পর যে সম্যক ব্যাপার, তুমি সেই সংবৃত্তরূপা। সেই ব্যাপারের পর যে বিবৃত্তি, তুমি সেই বিবৃত্তরূপা। সম্ভোগের পর যে বীজের ক্ষেত্রে যে সমারোপ, তুমি সেই সংবোহরূপা। ক্ষেত্রে প্রক্ষিপ্ত বীজের নিঃশেষে গর্ভাশয় ব্যাপ্তি যে নীরোহ, তুমি সেই রূপা। গর্ভাশয়ে ব্যাপ্ত বীজের শরীরাকারে যে পরিণাম, তুমি সেই প্ররোহরূপা। এবং সেই পরিণত শরীরের অনুকূলে পুত্র ইত্যাদিরূপে যে প্রাদুর্ভাব, তুমি সেই অনুবোহরূপা।–তুমি বসুকো অর্থাৎ ধনসদৃশ পুত্ররূপা, ব্যাপ্ত ধনের বর্ধনকারিণী (অর্থাৎ প্রাপ্ত ধনের অভিবৃদ্ধিকারিণী) ও অভিবৃদ্ধিকৃত ধনের ভোজনরূপা। যে ধন অর্জন করে এবং যে তার বৃদ্ধির দ্বারা জীবনধারণ করে, তুমি তৎ-রূপা (অপা ত্বমসি)। [পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ৫ম ও ৬ষ্ঠ অনুবাকের মন্ত্রের সাথে এই মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥১॥
[সায়ণাচার্য বলেন–দ্বিতীয়ে নাকদাখ্যা ইষ্টক অভিধীয়ন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২ ে নাকসৎ নামে আখায়িতা ইষ্টকার কথা বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ– এই অগ্নি পূর্ব দিকে হিরণ্যকর্ণ কেশের ন্যায় (হরিকেশ) জ্বালাবিশিষ্ট সূর্যসমান; এঁর দুজন পরিচারক আছে–সেনানী ও গ্রামনী। সেনানীর নাম রথগৃৎস এবং গ্রামণীর নাম রথৌজ। (গৃৎস অর্থে গর্ধনবান, অর্থাৎ লোভী; সেই অর্থে রথে যার বৃহতী তৃষ্ণা বা আকাঙ্ক্ষা, সে রথগৃৎস)। সে রথে আরোহিত হয়ে শত্রুর সেনাদলকে পররাজ্যে বিতাড়িত করে। (ওজঃ অর্থে : বল, অর্থাৎ যার রথারোহণে অধিক বল, সে রথৌজা)। সে রথে আরোহিত হয়ে স্বরাজ্য বা গ্রাম রক্ষা করে। এই দুই পরিচারকের মতো অগ্নির দুটি অপ্সরা পরিচারিকা আছে–একজনা পুঞ্জিকস্থলা ও অপরজনা কৃতস্থলা। অবান্তর জাতিতে উৎপন্ন হেতি ও প্রহেতি হলো অগ্নির দুই অস্ত্রবিশেষ। (যাতুধান অর্থে তীক্ষ্ণ হেতি বা অস্ত্র, এবং রাক্ষস অর্থে অতি ক্রুর বা তীক্ষ্ণ প্রহেতি বা অস্ত্র)। এই হেন যে অগ্নি, হে ইষ্টকা! তুমি সেই অগ্নিস্বরূপা।–এই যে অগ্নি, ইনি অগ্নিহোত্র ইত্যাদি বিশ্বের সকল কর্মসাধনকারী বলে বিশ্বকর্মা নামে অভিহিত হয়ে দক্ষিণ দিকে স্থিত আছেন। তার দুই পরিচারক, রথস্বন ও রথেচিত্র। প্রথম জন সেনানী ও দ্বিতীয় জন গ্রামণী। রথস্বন রথে আরোহিত হয়ে শত্রুর সেনাদলকে পররাজ্যে বিতাড়িত করে। রথেচিত্র রথে আরোহিত হয়ে স্বরাজ্য বা গ্রাম রক্ষা করে। এই দুই পরিচারক হলো বিশ্বকর্মা-অগ্নির দুই অস্ত্রবিশেষ। এরা ব্যতীত এই অগ্নির দুই অপ্সরা পরিচারিকা আছে–মেনকা ও সহজন্যা। এই অগ্নির হেতিরূপ অস্ত্র হলো দংশনশীল ব্যাঘ্র ইত্যাদি ও প্রহেতিরূপ অস্ত্র হলো সংগ্রামে পুরুষগণের যে বধ। হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিশ্বকর্মা-অগ্নিরূপা।–বিশ্ববাচ্য নামক অগ্নি পশ্চিম দিকে অবস্থিত। (বিশ্বকে প্রাপ্ত অর্থে বিশ্ববাচ্য)। তার দুই পরিচারক,রথোেত ও সমরথ। প্রথম জন সেনানীরূপে রথে আরোহিত হয়ে শত্রুর সেনাদলকে পররাজ্যে প্রেরণ করে। দ্বিতীয় জন গ্রামণীরূপে রথে আরোহিত হয়ে স্বরাজ্য বা গ্রাম রক্ষা করে।
বিশ্ববাচ্য অগ্নির হেতিরূপ অস্ত্র হলো সর্পগণ ও প্রহেতিরূপ অস্ত্র হলো ব্যাঘ্রগণ। এই দুই পরিচারক ব্যতীত এই অগ্নির দুই অপ্সরা পরিচারিকা আছে–প্রম্নোচন্তী ও অনুম্নোচন্তী। হে ইষ্টকা! তুমি সেই হেন বিশ্ববাচ্য- অগ্নিরূপা। সংযদ্বসু নামক অগ্নি উত্তর দিকে অবস্থিত। (সংযপ্রাপ্ত বসু বা ধন যে অগ্নির, তিনি সংযদ্বসু)। তাঁর দুই পরিচারক,–সেনাজিৎ ও সুষেণ, যথাক্রমে সেনানী ও গ্রামণী। প্রথম জন শত্রুর সেনাদলকে পররাজ্যে প্রেরণ করে, দ্বিতীয় জন স্বরাজ্য বা গ্রাম রক্ষা করে। সংযদ্বসু নামক অগ্নির হেতিরূপ অস্ত্র হলো জল ও প্রহেতিরূপ অস্ত্র হলো বাত বা ঝড়। এই অগ্নির দুই অপ্সরা পরিচারিকা আছে বিশ্বাচী ও ঘৃতাচী। হে ইষ্টকা! তুমি সেই উত্তর দিক্রবর্তী অগ্নিরূপা।-উধ্বদিকে অবস্থিত এই অগ্নি অবাসু নামে খ্যাত। (মেঘমধ্যস্থ যে বিদ্যুৎ অবাক বা অধোমুখে পতিত হয়, সেই বিদ্রূপ অগ্নি অবাথসু)। সেই অগ্নির দুই পরিচারক–তাক্ষ ও অরিষ্টনেমি, যথাক্রমে সেনানী ও গ্রামণী। প্রথম জন শত্রুর সেনাদলকে পররাজ্যে প্রেরণ করে ও দ্বিতীয় জন স্বরাজ্য বা গ্রামকে রক্ষা করে। এই অগ্নির দুজনা অপ্সরা পরিচারিকা আছে–উর্বশী ও পূর্বাচিত্তি। অবাথুসুর হেতি ও প্রহেতিরূপ দুই অস্ত্র–ভয়ের হেতুকারক (প্রকাশমান) বিদ্যুৎ ও মারক বজ্ৰরব হলো স্ফুর্জ (মারকোহশনিরবস্ফুর্জ )। হে ইষ্টকা! তুমি সেই অগ্নিরূপা। এই যে অগ্নি, এই যে তার সেনানী ও গ্রামণীদ্বয়, এই যে তার অঙ্গরাদ্বয়, এই যে তার সেনানী ও গ্রামণীদ্বয়, এই যে তার অঙ্গরাদ্বয়, এই যে তার হেতি-প্রহেতিরূপ অস্ত্রদ্বয়–এই সকলের উদ্দেশে নমস্কার করছি (তেভ্য সর্বেভ্যো নমোহস্তু)। তারা সকলে আমাদের সুখী করুক। যে বৈরিগণ আমাদের দ্বেষ করে এবং আমরা যে বৈরিগণকে দ্বেষ করি, তাদের আমি তোমার বিদারিত আস্যে (মুখগহ্বরে) স্থাপন করছি।–সর্ব জগতের পালয়িতা আদিত্যের ছায়াতে (সন্তাপ পরিহারের নিমিত্ত) স্থানে, হে ইষ্টকা! তোমাকে স্থাপন করছি। সমুদ্রসদৃশ আদিত্যের উদ্দেশে নমস্কার করছি; সমুদ্রের প্রকাশককে (আদিত্যকে) নমস্কার করছি।–হে ইষ্টকা! পরম উৎকৃষ্ট সত্যলোকে অবস্থিত পরমেন্থী ব্রহ্মা তোমাকে দিবঃ পৃষ্ঠে অর্থাৎ স্বর্গের উপরে স্থাপন স্থাপন করুন। (তুমি কিরকম? না,) তুমি অভিব্যক্তিমতী অর্থাৎ প্রকাশময়ী, প্রথস্বতী অর্থাৎ বিস্তারবর্তী, বিভুমতী অর্থাৎ নানা নূতন উৎপাদনে শক্তিমতী, প্রভূমতী অর্থাৎ প্রভুত্বশক্তিমতী ও পরিভূমতী অর্থাৎ পরসৈন্যকে পরাভবে শক্তিমতী। তুমি নিয়ত যজমানকে স্বর্গভোগের অধীন করো (অর্থাৎ যজমান যেন সর্বাবস্থায় স্বর্গভোগ করতে পারেন, তেমন করো); দুলোকে তার (যজমানের) ভোগ দৃঢ় করো (অর্থাৎ দ্যুলোকে তার সুষ্ঠু ভোগ যেন বিনাশ করো না)। সকলের প্রাণবায়ু, অপানবায়ু, ব্যানবায়ু ও উদানবায়ুর বৃত্তিলাভের উদ্দেশে (অর্থাৎ স্থিতির জন্য), স্বগৃহে স্থিতিলাভের উদ্দেশে চরিত্রায়, অর্থাৎ শাস্ত্রীয় আচরণের উদ্দেশে, সূর্যদেব তোমাকে রক্ষা করুন। (কিভাবে? না,) মহতী যোগক্ষেম সম্পত্তির দ্বারা ও অত্যন্ত সুখকর দীপ্তি বিশেষের দ্বারা (তোমাকে রক্ষা করুন)। তুমি তোমার স্বামীরূপ দেবতার অনুগ্রহক্রমে এই স্থানে স্থির হয়ে উপবেশন করো, যেমন অঙ্গিরা ঋষিগণের চয়নানুষ্ঠানে (অর্থাৎ প্রথম অগ্নিচয়নের কালে) স্থিতা হয়েছিল।–এই জাজ্বল্যমান অগ্নি অশ্বের মতো শব্দ করছেন। (দৃষ্টান্তস্বরূপ, অশ্ব কখন শব্দ করে, তা বলা হচ্ছে)–যেমন বিরাট অশ্বশালারূপ সভৃত স্থান হতে নির্গত হয়ে অরণ্যে ঘাস ভক্ষণের নিমিত্ত গমনকালে অশ্ব শব্দ করে থাকে, সেইরকম।–অগ্নিজ্বালার শব্দের পরে অগ্নির দীপ্তি অনুসরণ করে বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। অগ্নিজ্বালার সঙ্গে সঙ্গে (অগ্নিজ্বালাসব্দসমনন্তরমেব) বায়ু প্রবাহিত হয় বলে লোকে অগ্নিকে বায়ুসখ নামে অভিহিত করে থাকে। হে অগ্নি! আপনার জ্বালার সাথে বায়ু সংযোগ হওয়ায় অরণ্যে গমন স্থান (ব্রজ) দাহের দ্বারা কৃষ্ণবর্ণ হয়ে যায় (কৃষ্ণবর্ণমেবাবভাসতে)। [পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ৭ম অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৩৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–চতুর্থেহনুবাকে ছন্দোবিধা ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৪ ে ছন্দ নামে অভিহিত ইষ্টকার বিষয় কথিত হছে]।
মর্মার্থ– এই অগ্নি আদিত্যরূপে গিরিশিখরের ন্যায় উচ্ছিত বা মস্তক-স্থানীয়, দাহ-পাক ইত্যাদি কার্যকারণে পৃথিবীর পালকও; অধিকন্তু স্থাবরজঙ্গমের শরীরে জঠরাগ্নিরূপে প্রীতি সম্পাদক।–হে অগ্নি! অথবা নামে আখ্যাত ঋষি পদ্মপত্রের উপরে আপনাকে নিঃশেষে মথিত করেছেন (পুষ্করপৰ্ণে হেনমুপশ্রিতমবিন্দ)। (কিরকম পদ্মপত্র? না,) মূর্ধ অর্থাৎ মস্তকের ন্যায় প্রশস্ত এবং বিশ্বস্য বাঘতঃ অর্থাৎ সকল জগতের বাহক। (এই পদ্মপত্রে অগ্নিমন্থনপূর্বক যজ্ঞনিম্পাদন ইত্যাদির দ্বারা জগৎ নির্বাহিত হয়)।–এই সমিধ্যমান (অর্থাৎ সমিধের দ্বারা প্রজ্বলন্ত) অগ্নি সহস্র সহস্র শত শত অন্নের পতি বা পালক, শিরোবৎ উত্তম; কবি বা বিদ্বান; সেইরকমে এই অগ্নি আমাদের ধনদাতা হোন। এই অগ্নি ভূলোকে অনুষ্ঠেয় যজ্ঞের প্রবর্তক ও রজোগুণের নির্বাহক। সেই রকমে, হে অগ্নি! যে দ্যুলোকে সূর্যরূপ হয়ে নিযুৎ নামক অশ্বযুক্ত রথে মিলিত হন, সেই দ্যুলোক শিরোবৎ উন্নত করে ধারণ করুন। (কিরকম শিরোবৎ? না,) স্বর্গে সর্বদা অবস্থানকারী, অর্থাৎ স্বর্গতুল্য উন্নত। হে অগ্নি! আপনি এই যজ্ঞে আপনার হব্যপ্রাপিকা জিহ্বা (জ্বালা) বিস্তার করছেন। ঋত্বিগণ এই অগ্নিকে সমিধ সহযোগে প্রজ্বলিত করছেন, যেমন উষাকালে দোহনের নিমিত্ত গাভীকে (ধেনুমুষঃকালে) দোহনের নিমিত্ত শয়ন হতে জাগ্রত করা হয়ে থাকে। প্রজ্বলিত এই অগ্নির শিখাসমূহ স্বৰ্গকে অভিপ্রাপ্ত হওয়ার উদ্দেশে উর্ধ্বাভিমুখে অতিশয় প্রসারিত হচ্ছে, যেমন পক্ষীগণের মধ্যে মহান্ত অর্থাৎ বিরাটকায় পক্ষীগুলি প্ৰকর্ষের সাথে উধ্বদিকে ডানা মেলে যায়।–এই অগ্নিসমূহ বিদ্বান (বাক্যের দ্বারা যিনি সব বোঝেন)। (কিরকম বিদ্বান্? না,) মেধ্যা অর্থাৎ যাগযোগ্য, বৃষভায় অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ, বৃষ্ণে অর্থাৎ কামসমূহের বর্ষয়িতা, ও গবিষ্ঠিরো অর্থাৎ ভূমিতে স্থির। (কিরকম বাক? না) নমস্কারযুক্ত স্তুতিরূপ বাক্য, যার দ্বারা আমরা তাদের (অগ্নিসমূহকে) বন্দনা করব। (তার দৃষ্টান্ত)– যেমন দুলোকে রোমান (দীপ্যমান) বিস্তীর্ণগতিযুক্ত আদিত্যকে সন্ধ্যাবন্দনা ইত্যাদিতে ব্রাহ্মণগণের প্রযুক্ত (উচ্চারিত) বাক্য আশ্রয় করে, সেইরকম আমাদের বাক্যও বহ্নিকে আশ্রয় করুক।–এই অগ্নি উৎপন্ন হয়েছেন। (কি নিমিত্ত? না,) সুষ্ঠুভাবে দীপ্ত (প্রকাশিত) স্তুতিযুক্ত এই (যজ্ঞ) কর্মের সিদ্ধির নিমিত্ত। (ইনি কিরকম? না,) এই অগ্নি প্রাণীগণের রক্ষক, অত্যন্ত কুশল, সদা জাগরণশীলরূপে কর্মের সাধনকারী, ঘৃতমুখ বা ঘৃতপ্রতীক (অর্থাৎ ঘৃত বা আজ্য মুখে যার)। এই হেন অগ্নি আকাশস্পর্শী জ্বালা বা শিখার দ্বারা শুদ্ধ হয়ে ভরণকুশল যজমান ইত্যাদির নিমিত্ত বিশেষরূপে শোভিত হচ্ছেন (বিশেষেণ ভাসতে)। হে অগ্নি! আপনাকে অঙ্গিরা ঋষিগণ অন্বেষণ পূর্বক লাভ করেছিলেন। (আপনি কিরকম? না,) আপনি অরণি প্রভৃতির মধ্যে গোপনে অবস্থিত ছিলেন, বনে বনে দাবাগ্নিরূপে আশ্রিত ছিলেন এবং আপনি মহৎ বলের দ্বারা বিমথ্যমান হয়ে জাত হয়েছেন। হে অঙ্গির অঙ্গসৌষ্ঠবযুক্ত অগ্নি (দেহীর ন্যায় অঙ্গধারী)! আপনাকে বলের পুত্র বলা হয়ে থাকে। (কারণ মহৎ বলের দ্বারা মন্থনে আপনি জাত)।–তিন রূপে স্থিত এই অগ্নিকে মনুষ্য ঋত্বিৰ্গণ সমিধের দ্বারা দীপ্ত করেন। (কিরকম অগ্নিকে? না,) যজ্ঞস্য কেতুং অর্থাৎ যজ্ঞের জ্ঞাতা (যজ্ঞ সম্পর্কে বিদিত বা যজ্ঞচিহ্নধারী), প্রথমে অর্থাৎ যাগের উপক্রমেই সম্পন্ন, পুরোহিতং অর্থাৎ পুরোদেশবর্তী (সম্মুখবর্তী)–এই তিনরূপে স্থিত অগ্নিকে। সুতু অর্থাৎ শোভন ক্রতু-নিম্পাদক সেই অগ্নি যাগসিদ্ধির নিমিত্ত হোতা অর্থাৎ আহ্বাতা হয়ে ইন্দ্রের ও দেবগণের সাথে রথযুক্ত হয়ে এই যজ্ঞে উপবিষ্ট হয়েছেন। হে চিত্রশ্রবন্ত (বিচিত্র কীর্তি যার, সে চিত্রশব; অতিশয় চিত্রশ্রব যে, সে চিত্রশ্রবস্তম)! হে যজমানগণের প্রিয়! হে অগ্নি! প্রজাগণের মধ্যে মনুষ্যগণ আপনাকে আহ্বান করছেন। (কি নিমিত্ত? না,) হব্যায় বোঢ়বে অর্থাৎ হবি বহনের নিমিত্ত। (কি রকম আপনি? না,) শোচিঙ্কেশ (অর্থাৎ যার জ্বালা বা শিখা কেশস্থানীয়)।–হে সখায় (অর্থাৎ পরস্পর সখ্যযুক্ত) ঋত্বিক ও যজমানগণ! আপনারা আপনাদের সমীচীন বা অভীষ্ট অন্ন সম্পাদন করুন; এবং আপনারা অগ্নির উদ্দেশে স্তোত্র সম্পাদন করুন। (কিরকম অগ্নি? না,) রক্ষকগণের মধ্যে বরিষ্ঠ (বৃদ্ধতম), স্বয়ং অতিশয় বলবান।-হে কামসমূহের বর্ষণকারী অগ্নি! সকল (যজ্ঞীয়) ফল সম্পাদিত করে আপনি যজমানে সংমিশ্রিত করুন, (অর্থাৎ যজমান যেন সকল যজ্ঞফল লাভ করেন, তেমন করুন)। আপনি ঈশ্বরস্বরূপ; এই পৃথিবীরূপা বেদি স্থানে সমিধের দ্বারা সম্যক্ প্রজ্বালিত হোন। সেই হেন আপনি মহানুভবতায় আমাদের নিমিত্ত ধনসমূহ সম্যকরূপে আহরণ পূর্বক প্রদান করুন।–হে ঋত্বিক ও যজমানগণ! আপনাদের সম্বন্ধি (অর্থাৎ আপনাদের সাথে সম্বন্ধযুক্ত) অগ্নিকে আমি নমস্কারের দ্বারা আহ্বান করছি। (কিরকম অগ্নি? না,) অন্নের অবিনাশক (নপাতম), যজমানের প্রীতির কারণস্বরূপ, অতিশয় জ্ঞাতা, সর্বদা উদ্যোগযুক্ত (অর্থাৎ সর্বদা শোভন বা সুষ্ঠু ক্রতু বা যজ্ঞের নিষ্পদনে উদ্যোগী), সর্ব জগতের দূতের ন্যায় কার্যকারী, (অর্থাৎ জগতের সকলের গৃহে দাহ, পাক ইত্যাদি কার্য সম্পাদনকারী), এবং অমৃতং বা মরণরহিত (কেবল মনুষ্য নয়, দেবতাগণেরও মৃত্যু রহিতকারী)।–সেই অগ্নি প্রস্তুত কর্ম যোজিত করেন। তিনি রোষরহিত (অর্থাৎ যজমানের প্রতি স্নিগ্ধ বা ক্রোধরহিত); তিনি বিশ্বভোজসা অর্থাৎ দাহের দ্বারা জগতের সকলের রাধো বা অন্নের সম্পাদক। (কিরকম রাবধা? না) প্রাণীগণের ব্যবহারের কারণস্বরূপ রাধো বা অন্ন। (কিরকম অগ্নি? না,) ঋত্বিকগণের দ্বারা সুষ্ঠু ও কর্মের নিমিত্ত আহুত বা ঋত্বিকরূপী ব্রহ্মা (নামক যাজ্ঞিক) কর্তৃক শোভন মন্ত্রে যজনীয়, এবং সুশমী অর্থাৎ সুষ্ঠুভাবে পাপের শময়িতা (প্রশমনকারী)।
–এই অগ্নির দীপ্তি (শিখা) ঊর্ধ্বে উখিত হচ্ছে। (কিরকম এই অগ্নি? না,) এই অগ্নি সর্বতোভাবে হোমনিস্পাদক, মীষ অর্থাৎ আহুতির দ্বারা বৃষ্টির সেচনে সমর্থ; এবং এই অগ্নি হতে উখিত ধূম আকাশস্পর্শী হলেও কারও চক্ষে উপদ্ৰবকারক হয় না। এই নিমিত্তই সকল মনুষ্য ঋত্বিক ও যজমান অগ্নিকে দীপ্ত বা প্রজ্বালিত করছেন।–হে বলের পুত্র জাবেদা (অর্থাৎ জগতের যা কিছুই উৎপন্নমাত্র সেই সম্পর্কে অভিজ্ঞ) অগ্নি! আপনি বহু গোযুক্ত অন্নের সম্পাদনকারী; আমাদের মহতী কীর্তি সম্পাদন করুন।–হে। পূর্বনীক (বহু সৈন্যসম্পন্ন) অগ্নি! আপনি আমাদের ধনযুক্ত গৃহ ক্ষেত্র ইত্যাদি প্রদান করুন। (কিরকম আপনি? না, আপনি দীপ্যমান, নিবাসের হেতুভূত, বিদ্বান, অগ্রণী, প্রথম যজ্ঞের প্রবর্তক এবং মন্ত্ররূপ বাক্যের স্তুতিযোগ্য (স্তুত্য)। হে অগ্নি! আপনি দিবাভাগে এবং উষাকালেও রাক্ষসগণকে বিনাশ করুন, (অর্থাৎ সকল কালেই আপনি রাক্ষসগণের বিনাশ করুন)। হে দীপ্যমান অগ্নি! কেবল আপনার স্বকীয় সেনামুখের দ্বারাই নয়, আপনি নিজেও রাক্ষসগণের বিনাশ করুন। (এখানে সেনামুখ অর্থে মুখ বিদারণ পূর্বক জ্বম্ভন বা হাই তুলে শব্দের দ্বারা জ্বালা বা শিখা উপলক্ষিত)। হে তীক্ষ্ণ জ্বম্ভনকারী অগ্নি! আপনি সেই রাক্ষসগণকে ভস্মীভূত করুন। (অগ্নিশিখার হিস্ হিস্ ধ্বনি যেন অগ্নির জ্বম্ভন বা হাই)। হে অগ্নিদেব! জরারহিত আপনাকে আমরা প্রজ্বলিত করে দীপ্তিমন্ত করছি। যে কারণে অতিশয় স্তুতিযুক্ত সমিধ প্রতিদিন আপনাকে প্রকাশিত (প্রজ্বলন্ত) করে, সেইভাবেই চেতনবান আমরা আপনাকে দীপ্ত করব–এতে আর কি বক্তব্য আছে? (ইতি কিমু বক্তব্য)। আপনি ঋত্বির্গের নিমিত্ত অন্ন সম্পাদন করুন (আভর)। শুদ্ধ জ্যোতির পালক (শুক্ৰস্য জ্যোতিষম্পতে), সুশ্চন্দ্র অর্থাৎ সুষ্ঠু আহাদকারী, পাপের বিনাশক, প্রজাগণের পালক ও হবির বহনকারী। সেই হেন হে অগ্নি! আপনার সম্বন্ধি মন্ত্রের দ্বারা আপনি হবির নিমিত্ত আহুত হচ্ছেন।–হে সুষ্ঠু আাদকারী (সুশ্চন্দ্র) অগ্নি! আপনি হনু অর্থাৎ চোয়াল পর্যন্ত পূরণ করে হবিঃ গ্রহণ করছেন; এবং আরও, হে বলের অধিপতি (শবসম্পত)! উথে (অর্থাৎ যজ্ঞে) আমাদের। উৎকর্ষের সাথে পূর্ণতা প্রাপ্ত করান; স্তুতিকারক যজমানের নিমিত্ত অন্ন সম্পাদন করুন।–হে অগ্নি! আপনি আমাদের হৃদয়ের প্রিয়; কল্যাণকর আপনাকে অদ্য এই কর্মসমূহে স্তুতির দ্বারা সমৃদ্ধ করব। (তার একটি দৃষ্টান্ত) যেমন অশ্বকে ঘাস ইত্যাদি প্রদান পূর্বক কর্মসমৰ্থ করা হয়, তেমন। (অপর দৃষ্টান্ত) যেমন সর্ব যাগানুষ্ঠানের দ্বারা জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদির সমৃদ্ধি সাধন করা হয়, তেমন। হে অগ্নি! আপনি আমাদের স্তোত্রের পর অনুষ্ঠীয়মান ক্রতু বা কর্মসমূহের নির্বাহক হয়েছিলেন, (অর্থাৎ আমাদের যাগকর্মরূপ রথের সারথি হয়েছিলেন); (কিরকম ক্রতু বা কর্ম? না) ভদ্রস্য অর্থাৎ কল্যাণরূপ, দস্য অর্থাৎ স্বফল প্রদানে সমর্থ, সাধো অর্থাৎ রশ্মির দ্বারা সাধ্য, ঋতস্য অর্থাৎ সত্যের ন্যায় বলশালী, ও বৃহতো অর্থাৎ প্রৌঢ় বা প্রবীণ।–হে অগ্নি! অদ্য এই কর্মে (অর্থাৎ যাগকর্মে) মন্ত্ররূপ স্তবে আমরা আপনাকে হবিঃ প্রদান করছি, আপনার প্রবল জ্বালাসমূহ প্রকর্ষের সাথে শব্দ করছে। (কিরকম শব্দ? না,) দুস্থা মেঘ ইব অর্থাৎ দ্যুলোকস্থ বা আকাশস্থ মেঘের মতো। –হে অগ্নি! আপনার সকল সৈন্যের সাথে সৌমনস্য প্রাপ্ত হয়ে (অর্থাৎ শুভ মনঃ-সম্পন্ন হয়ে), আমাদের দ্বারা অর্চনীয় হয়ে, আমাদের সমীপে আগত হোন। (কেমনভাবে? না,) স্বর্গলোকের প্রকাশরূপ আদিত্য যেভাবে সমীপবর্তী হন, সেইরকম ভাবে। –এই অগ্নিকে দেবগণের আহ্বতা বলে মনে করি। (কিরকম অগ্নি? না,) এই অগ্নি বসোদান্বন্তং অর্থাৎ ধনের দাতা, সহসঃ সুনুং অর্থাৎ বলের পুত্র, এবং জাতবেদসম্ অর্থাৎ জগতের উৎপন্নমাত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ। (এর দৃষ্টান্ত) কুলীন ব্রাহ্মণ যেমন উৎপন্ন পুত্র ইত্যাদি সম্পর্কে অভিজ্ঞ থাকে, সেইরকম। যে অগ্নিদেব তার অপেক্ষা উন্নত দেবতাগণের প্রতি গমনকারী জ্বালার দ্বারা সুষ্ঠু যাগনিম্পাদক হয়ে থাকেন, সেই অগ্নি ঘৃতের দ্বারা বিশেষভাবে দীপ্ত হচ্ছেন। (কিরকম ঘৃত? না,) শুদ্ধ দীপ্তিযুক্ত, সর্বতো হুয়মান ও সর্পণশীল। হে অগ্নি! আপনি আমাদের নিকটতম হোন (অন্তিকতমো ভব), আমাদের পরিত্রাণকারী হোন, আমাদের মঙ্গলকারী হোন, এবং আমাদের গৃহে নিত্য সন্নিহিত থাকুন-হে শুদ্ধতম দীপ্যমান (শোচিষ্ঠ দীদিবঃ)! আমাদের সুখের নিমিত্ত আপনার সখ্য-স্বরূপ পূর্বোক্ত গুণযুক্ত (নূনং) আপনাকে আমরা প্রাপ্ত হবো।এই অগ্নি বসুমান (অর্থাৎ ধনবান); ইনি সুশ্রবা (অর্থাৎ রুদ্র ইত্যাদি দেবতার দ্বারা আদরের সাথে শায়মান; এই কারণে ইনি বসুশ্রবা নামে অভিহিত)। এই হেন হে অগ্নি! আপনি আমাদের স্বাভিমুখী হোন এবং আমাদের শ্রেষ্ঠ ধন প্রদান করুন; (হে তাদৃশাগ্নেহচ্ছ স্বাভিমুখো নক্ষি প্রাপুহি)। [এই মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ৮ম অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥৪
[সায়ণাচার্য বলেন–পঞ্চমে সযুজাদয় ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৫ ে সযুজা ইত্যাদি ইষ্টকার বিষয় কৃথিত হচ্ছে]।
মর্মার্থ– হে ইষ্টকা! ইন্দ্র ও অগ্নির সাথে তোমার যে সম্বন্ধ, সেই সম্বন্ধের দ্বারা তোমাকে এই ক্ষেত্রে যুক্ত করছি। (সহ যযাজিত, সযুক, শেষে যুক শব্দের দ্বারা সম্বন্ধ বোঝায়)। এইভাবে আঘার অর্থাৎ আজাহুতি, তেজঃ অর্থাৎ কান্তি, বর্চো অর্থাৎ ধন, উথানি অর্থাৎ শস্ত্রসমূহ, স্তোমানি অর্থাৎ স্তোত্রসমূহ, ছন্দাংসি অর্থাৎ গায়ত্রী ইত্যাদি ছন্দসমূহের সাথে যোজক সম্বন্ধে তোমাকে যুক্ত করছি। ধনপুষ্টির নিমিত্ত জ্ঞাতিগণের মধ্যে মুখ্যত্বে অবস্থানের কারণে, হে ইষ্টকা! আমার সাথে তোমার যোজক সম্বন্ধের দ্বারা এই ক্ষেত্রে তোমাকে যুক্ত করছি। হে ইষ্টকা! কৃত্তিকাঁদেবীর যে অম্বা নাম, তুমি সেই নামরূপা; এই হেন তোমাকে প্রজাপতি দেবতার দ্বারা প্রেরিত হয়ে আমি সাবধানে বুদ্ধিবৈচিত্র্যের দ্বারা সম্যক উপধান করছি। (অম্বা, দুলা, নিতত্নি, অভ্রয়ন্তী, মেঘয়ন্তী, বর্ষয়ন্তী ও চুপুণীকা–এই সাতটি পদ কৃত্তিকাঁদেবীর সাতটি নাম। এই সাতটি নামবিশেষের প্রতিটির উল্লেখ পূর্বক পর পর সাতটি মন্ত্র ঐভাবে উচ্চারণীয়)। হে ইষ্টকা! অন্নের দ্বারা যুক্তা যে পৃথিবী, সেই পৃথিবী জলপূর্ণা (উদকসম্পূর্ণং)। মনুষ্যগণ তোমার রক্ষক (গোপ্তারো); অগ্নি এই পৃথিবীতে রক্ষণের নিমিত্ত বিশেষভাবে প্রযত্নবান্। সেই পৃথিবীরূপা তোমাকে আমি প্রাপ্ত হচ্ছি। সেই হেন ইষ্টকা আমার যজমানের গৃহস্থান হোক (অর্থাৎ আমার গৃহে অবস্থিত হোক) ও রক্ষার নিমিত্ত বর্ম বা কবচস্থানীয়ও হোক।-প্রৌঢ় জনের দ্বারা যুক্ত (ব্ৰহ্মণা বিষ্ট) দুলোকেরও নিম্নে যে অন্তরিক্ষ নামক লোক, হে ইষ্টকা! তা তোমার পুরী (গৃহ); মরুত্বর্গ তোমার রক্ষক (গোপ্তারো); সেই স্থান হতে (অর্থাৎ সেই অন্তরিক্ষলোক হতে) বায়ু তোমার রক্ষার নিমিত্ত যত্নবান। সেই অন্তরিক্ষরূপা তোমাকে আমি প্রাপ্ত হচ্ছি। সেই হেন ইষ্টকা আমার যজমানের গৃহস্থান হোক ও রক্ষার নিমিত্ত কবচস্থানীয় হোক। অমূতের দ্বারা যুক্ত (অর্থাৎ পীযুষের দ্বারা পূর্ণ), দ্যুলোক নামে আখ্যাতা যে তোক কারও দ্বারা পরাজিত হয় না, সেই লোক, হে ইষ্টকা! তোমার পুরী (গৃহ); দ্বাদশসংখ্যক আদিত্য তোমার রক্ষক; সেই দ্যুলোক হতে সূর্য তোমার রক্ষার নিমিত্ত যত্নবান। সেই দুলোকরূপা তোমাকে আমি প্রাপ্ত হচ্ছি। সেই হেন ইষ্টকা আমার যজমানের গৃহস্থান হোক ও রক্ষার নিমিত্ত কবচস্থানীয় হোক। [পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ৯ম অনুবাকের মন্ত্রের সাথে এই মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন–ষষ্ঠে বিশ্বজ্যোতিরাদ্যা ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৬ ে বিশ্বজ্যোতি ইত্যাদি ইষ্টকার বিষয় কথিত হচ্ছে।]
মর্মার্থ- হে ইষ্টকা! বৃহস্পতি তোমাকে পৃথিবীর পৃষ্ঠে (উপরে) স্থাপন করুন। (তুমি কিরকম?,) তুমি জ্যোতিষ্মতীং অর্থাৎ প্ৰকাশবতী। (কি নিমিত্ত স্থাপন? না,) সকল প্রাণীজাতের প্রাণ ও অপানবৃত্তি লাভের নিমিত্ত, (অর্থাৎ প্রাণ ও অপান বায়ুর স্থিতির নিমিত্ত)। তুমি সম্পূর্ণ (কৃৎস্ন) স্বর্গপ্রকাশক জ্যোতিঃ সংযমিত করো। অগ্নি তোমার অধিপতি বা পালক।–জ্যোতিষ্মতীরূপা তোমাকে সকল প্রাণীজাতের প্রাণ ও অপান বায়ুর স্থিতির নিমিত্ত বিশ্বকর্মা অন্তরিক্ষের উপরে স্থাপন করুন। তুমি সম্পূর্ণ স্বর্গপ্রকাশক জ্যোতিঃ সংযমিত করো। বায়ু তোমার পালক।-সকল প্রাণীজাতের প্রাণ ও অপানবৃত্তি লাভের নিমিত্ত জ্যোতিষ্মতীরূপা তোমাকে প্রজাপতি লোকের উপরে স্থাপন করুন। তুমি স্বর্গপ্রকাশক সকল জ্যোতি সংযমিত করো। পরমেষ্ঠী তোমার পালক (অধিপতি)।–হে ইষ্টকা! তুমি পুরোবাত অর্থাৎ ঝড়-ঝঞ্ঝা দানকারিণী ও সেই রূপধারিণী, তুমি বিদ্যুৎ দানকারিণী ও বিদ্রূপা, তুমি মেঘদাত্রী ও মেঘরূপা, তুমি বৃষ্টি দানকারিণী ও বৃষ্টিরূপা।
হে ইষ্টকা! তুমি যজমানের নিমিত্ত চীয়মান অগ্নির প্রাপিকা–তুমি দেবগণের নিমিত্ত বায়ুর প্রাপিকা।-তুমি দেবগণের নিমিত্ত অন্তরিক্ষের প্রাপিকা।–হে ইষ্টকা! তুমি অন্তরিক্ষরূপা। হে দ্বিতীয় ইষ্টকা! অন্তরিক্ষ লোকের প্রীতির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি।–হে ইষ্টকা! যে বহুল (গভীর) জলে কোন বস্তু পতিত হলে তা লীন হয়ে যায়, অর্থাৎ পাওয়া যায় না, এমন সলিলের সিদ্ধির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি। সেইরকম, প্রবাহরূপ (সরণশীল) জলের সিদ্ধির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি। সৎ-ভাবাপন্ন (স্থির) জলের সিদ্ধির নিমিত্ত তোমার উপধান করছি। এইভাবে কেতো অর্থাৎ জ্ঞানমাত্রের নিমিত্ত, প্রচেতঃ অর্থাৎ প্রকৃষ্ট জ্ঞানের নিমিত্ত,বিবস্বান অর্থাৎ বিশেষভাবে বাসের হেতুকারক সূর্যের প্রকাশের নিমিত্ত, দিবোজ্যোতি অর্থাৎ দ্যুলোকবর্তী নক্ষত্র ইত্যাদির প্রকাশের নিমিত্ত, এবং দ্বাদশ আদিত্যের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি। হে ইষ্টকা! পাদবদ্ধ মন্ত্রের দ্বারা সাধনায় স্তুতির নিমিত্ত (ঋচে ত্বা রুচে ত্ব) তোমার উপধান করছি। আদিত্যের জ্যোতির নিমিত্ত, চন্দ্রের দীপ্তির নিমিত্ত, অগ্নির জ্বালার নিমিত্ত ও নক্ষত্রের আলোকের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি।–হে ইষ্টকা! তুমি কীর্তি-প্ৰদাত্রী (যশোদা); কীর্তি বা যশ প্রাপ্তির নিমিত্ত যশোরূপা তোমার উপধান করছি। তুমি কান্তি-প্ৰদাত্রী (তেজোদা); কান্তি বা তেজঃ প্রাপ্তির নিমিত্ত তেজোরূপা তোমার উপধান করছি। তুমি ক্ষীর-প্ৰদাত্রী (পয়োদা); ক্ষীর বা দুগ্ধ প্রাপ্তির নিমিত্ত পয়োরূপা তোমার উপধান করছি। তুমি বল-প্ৰদাত্রী (বৰ্চোদা); বৰ্চ বা বল প্রাপ্তির নিমিত্ত বর্চোরূপা তোমার উপধান করছি। তুমি ধন-প্ৰদাত্রী (দ্রবিনোদা); ধনপ্রাপ্তির নিমিত্ত দ্রবিণরূপা তোমার উপধান করছি। পুরাকালে অঙ্গিরা ঋষিগণ যেভাবে তোমার উপধান করেছিলেন, সেই ভাবে যথাযথ অভিজ্ঞ ঋষি, ব্রহ্মপ্রতিপাদক যথাযথ মন্ত্রবাক্য এবং সেই সেই অভিমানী দেবতা–সেই সকলের সাথে তোমার উপধান করছি; তুমি স্থিরা হয়ে উপবিষ্টা হও। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ১০ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৬।
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমে ভূয়স্কৃদাদয় ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৭ ে ভূয়স্কৃৎ ইত্যাদি ইষ্টকার বিষয় কথিত, হচ্ছে।]
মর্মার্থ- হে ইষ্টকা! তুমি ভুয়ো অর্থাৎ বাহুল্যকারী হওয়ার কারণে ভূয়স্কৃৎ নামে অভিহিত; তুমি সেইরকমই (অর্থাৎ বাহুল্যকারী)। তুমি ভূমির পূজ্যত্বের (অর্থাৎ ভূমিকে পূজা করে বলে) বরিবস্কৃৎ নামে অভিহিত; তুমি সেইরকমই (অর্থাৎ ভূমির পূজাকারিণী)। তুমি পূর্ব, ঊর্ধ্ব, ও অন্তরিক্ষারূপা; তোমাকে অন্তরিক্ষে স্থাপন করছি। যে অগ্নি জলে স্থাপিত, হে ইষ্টকা! তুমি তৎ-স্বরূপা। শ্যেন (বাজপক্ষী), গৃ৮ (শকুনপক্ষী) ও সুপর্ণ (গরুড়) এই এই পক্ষীর আকারে স্থিত যে অগ্নি, তুমি সেই নাকসৎ অর্থাৎ স্বর্গে বা আকাশে বর্তমান অগ্নিরূপা; হে ইষ্টকা! সেই নাকসজ্রপা তোমাকে আকাশে স্থাপন করছি। পৃথিবী সম্বন্ধি যে ধন, তুমি সেই ধনরূপা; তোমাকে সেই ধনেই স্থাপিত করছি। তুমি ধনপ্রদা (দ্রবিণপ্রদা), সেই ধনের নিমিত্তই তোমাকে স্থাপন করছি। এইরকমে অন্তরিক্ষ, দ্যুলোক ও দিকসকলের যে ধন, সেই ধনের নিমিত্ত তোমাকে স্থাপন করছি। হে ইষ্টকা! তুমি আমার প্রাণবৃত্তিকে পালন করো। তুমি আমার অপানবৃত্তিকে পালন করো। তুমি আমার ব্যানবৃত্তিকে পালন করো। তুমি আমার স্বকীয় আয়ু ও আমার স্বসম্বন্ধি পুত্র ইত্যাদির আয়ু রক্ষা (বা পালন) করো। হে অগ্নি! তোমার যে পরম উৎকৃষ্ট (অনিষ্টনাশক) নাম আছে, সেই পাপহারক নামের সাথে তুমি আমার নিকটে আগত হও; আমরা উভয়ে (অর্থাৎ তুমি ও আমি) মিলিত হবো। হে অগ্নি! তুমি এই পাঞ্চজন্যেও অর্থাৎ এই পঞ্চচিতি সম্বন্ধি সকল স্থানে অবস্থিত হও। হে ইষ্টকা! তুমি যাবা (বসন্ত), অযাবা (গ্রীষ্ম) এব (বর্ষা), উমা (শরৎ), সব্দ (হেমন্ত), সগর (শিশির)–এই ঋতুরূপা এবং সুমেক বা সম্বৎসররূপা। তোমাকে সেই সেই ঋতুতে ও সম্বৎসরে স্থাপন করছি। [এই মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ১১শ অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অষ্টম ইন্দ্রতখ্যা ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৮ ে ইন্দ্ৰতনু নামে আখ্যাত ইষ্টকার বিষয় কথিত হচ্ছে।]
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৩৮
অনুবাক-৩৮
মন্ত্র- অগ্নিনা বিশ্বাষাই সুৰ্যেণ স্বরাষ্ট্র ক্ৰত্বা শচীপতিঋষভেণ ত্বষ্টা যজ্ঞেন মঘবান দক্ষিণয়া সুবর্গোমনুনা বৃত্ৰহা সৌহার্দেন তনুধা অন্নেন গয়ঃ পৃথিব্যাহ সনোদৃগভিরশ্নটো বষট্কারেণর্ধঃ সাম্ন তনূপা বিরাজা জ্যেতিয়া ব্ৰহ্মণা সোমপা গোভিজ্ঞং দাধার ক্ষত্রেণ মনুষ্যানখেন চ রথেন চ বজ্ৰতুভিঃ প্রভুঃ সম্বৎসরেণ পরিভূপসাহনাধৃষ্টঃ সূৰ্যঃ সন্তনুভিঃ ॥৮॥ মর্মার্থ-হে ইষ্টকা! অগ্নির সাথে বিশ্বের পালন প্রয়াসী (বিশ্বাষাট) ইন্দ্ররূপা তুমি। সূর্যের সাথে স্বততা রাজমান (স্বরাষ্ট্র) ইন্দ্ররূপা তুমি। এইভাবে ক্রতু অর্থাৎ জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি প্রৌঢ় কর্মসমূহের সাথে (শচীপতি) ইন্দ্ররূপা তুমি; ধর্মের সাথে (ত্বষ্টা বা রূপকৃৎ) ইন্দ্ররূপা তুমি; যজ্ঞের সাথে (মঘবান) ইন্দ্ররূপা তুমি; দক্ষিণার সাথে (স্বর্গলোকাত্মক) ইন্দ্ররূপা তুমি; মন অর্থাৎ ক্রোধের সাথে (শত্রুঘাতী) ইন্দ্ররূপা তুমি; সৌহার্দ্য অর্থাৎ স্নেহাতিশয়ের সাথে (শরীরধারী) ইন্দ্ররূপা তুমি; অন্নের সাথে (গৃহবিশেষরূপ) ইন্দ্ররূপা তুমি; পৃথিবীর সাথে দ্রব্যাদি দানরূপ (কৃতবান) ইন্দ্ররূপা তুমি; ঋকমন্ত্র বিশেষের সাথে হবিঃ-লক্ষণ বিশিষ্ট (ভভাক্তা) ইন্দ্ররূপা তুমি; বষট্কারের সাথে অর্থাৎ হবিঃ-প্রদানের হেতুর সাথে (ঋদ্ধ বা সমৃদ্ধ) ইন্দ্ররূপা তুমি; সাম-মন্ত্রের সাথে (তপা বা শরীরপালক) ইন্দ্ররূপা তুমি; বিরাট বা দশাক্ষর ছন্দের সাথে (প্রকাশবা) ইন্দ্ররূপা তুমি; ঋত্বিকগণের বা মন্ত্রের সাথে (সোমপানকারী) ইন্দ্ররূপা তুমি; যজ্ঞশেষে গাভী-দক্ষিণার সাথে (যজ্ঞকারক) ইরূপা তুমি; ক্ষত্রিয় রাজার সাথে (মনুষ্যধারক) ইন্দ্ররূপা তুমি; অশ্ব ও রথারোহী (বজ্রী বা বজ্রযুক্ত) ইন্দ্ররূপা তুমি; বসন্ত ইত্যাদি ঋতুর সাথে (প্রভু বা ফলদানসমর্থ) ইন্দ্ররূপা তুমি; সম্বৎসরকালরূপের সাথে (পরিভু বা ব্যাপ্তবান) ইন্দ্ররূপা তুমি; এবং তপস্যা অর্থাৎ ভোজনবর্জন, ধনদান ইত্যাদির সাথে (অপরের অতিরস্কৃত) ইন্দ্ররূপা তুমি; তুমি দ্বাদশ মূর্তি সহ সূর্যরূপে বর্তমান যে ইন্দ্ৰ হে ইষ্টকা! তুমি সেই রূপা (তদ্রপা ত্বমসি)। [এই মন্ত্রের সাধ্য উপধান বিধি পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকের ১ম অনুবাকে দেবাসুরাঃ সংযত্তা…ভ্রাতৃব্যো ভবতি মন্ত্রে প্রাপ্তব্য] ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন–নবমে যজ্ঞতদাখ্যা ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৯ ে যজ্ঞতনু নামে আখ্যাত ইষ্টকার বিষয় কথিত হচ্ছে।]
মর্মার্থ- (সঙ্কল্প হতে আরম্ভ করে সমাপ্তি পর্যন্ত যে সোমযাগ, সেইগুলি যজ্ঞপুরুষের তনুবিশেষ। সেইরকমে এই ইষ্টকা উক্ত হচ্ছে)। যে যজমান আমি যজ্ঞ করব এই উপলক্ষ্যে সঙ্কল্পিতবান হন, তিনি সঙ্কল্পদশাপন্ন প্রজাপতি নামক যজ্ঞের বিগ্রহ বা মূর্তি (সোহয়ং সঙ্কল্পদশামাপন্নে যজ্ঞস্য বিগ্রহঃ)। হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। সঙ্কল্পের পর দীক্ষাতে যজ্ঞসম্বন্ধী যে ধাতৃ বা ধাতাব ন্যায় বিগ্রহ আছে, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। দীক্ষার পর ভূতি অর্থাৎ যজ্ঞভিক্ষাতে সবিতার ন্যায় যে বিগ্রহ আছে, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। যজ্ঞভিক্ষার পর সোমক্রয়ে একহায়নী অর্থাৎ একবৎসর বয়স্কা গাভীকে পূষার সমান যে যজ্ঞবিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। সোমক্রয়ের পর বস্তুবদ্ধ সোমে (উপনদ্ধো) বরুণের সমান শরীর বিশিষ্ট যে যজ্ঞপুরুষের বিগ্রহ, হে ইষ্টকা তুমি সেই বিগ্রহরূপা। সোমক্রয়ের পর সেই ক্ৰীয়মান সোমে যে ইন্দ্ৰসমান বিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। অতঃপর সেই ক্রীত সোমে যজ্ঞের যে মিত্রসমান বিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। অতঃপর যজমানের প্রাপিত সোমে যে শিপিবিষ্ট অর্থাৎ বিষ্ণুসমান যজ্ঞ বিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। অতঃপর শকটের দ্বারা প্রাংশের প্রতি নীয়মান যে সোমে নরন্ধিষ অগ্নিসমান যজ্ঞবিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। অতঃপর প্রাগবংশের আসন্দী বা চৌকিতে সমাগত সোমে যে আহবনীয় অগ্নিসমান যজ্ঞবিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। অতঃপর আগ্নীদ্রের প্রতি নীয়মান যে সোমে প্রজাপতিসমান বিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। অতঃপর আগ্নীঞ্জে অবস্থিত যে সোমে সেই অগ্নিসমান বিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। অতঃপর হবিধানের প্রতি নীয়মান, যে সোমে বৃহস্পতিসমান বিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। অতঃপর হবির্ধানে প্রবিষ্ট যে সোমে ইন্দ্ৰসমান বিগ্রহ, হে ইষ্টকা! তুমি সেই বিগ্রহরূপা। (এইভাবে পরবর্তী মন্ত্রগুলি যোজিতব্য। যথা) আসন্দীতে স্থাপিত, সোমে অদিতিসমান বিগ্রহ, অধিষবণে বৃত সোমে বিষ্ণুসমান বিগ্রহ, বসতীবরীতে ক্লেদিত সোমে অথর্বঋষিসমান বিগ্রহ, অভিষবে চূর্ণিত সোমে যমসমান বিগ্রহ, ইত্যাদি। হে ইষ্টকা! তুমি সেই সেই বিগ্রহরূপা। [এই মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকের ১ম অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥৯॥
[সায়ণাচার্য বলেন–দশমে নক্ষত্রেষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-১০ ে নক্ষত্র নামে আখ্যাত ইষ্টকার বিষয় কথিত হচ্ছে]
[সায়ণাচার্যের মতে–এই পঞ্চম প্রপাঠকটি রুদ্ৰাধ্যায় নামে খ্যাত। এর এই অনুবাক-১ ে ভগবান রঞদেবতার স্তুতি উক্ত হয়েছে। এখানে পঞ্চদশ সংখ্যক ঋক্ উল্লেখিত]
মর্মার্থ- হে রুদ্র! আপনার যে কোপ বা ক্রোধ (মনু) সেই কোপকে নমস্কার করি; (আপনার ক্রোধ আমাদের শত্রুগণকে পরাভূত করুক); অধিকন্ত আপনার বাণ ও ধনুকে নমস্কার করি; বাণ ও ধনুর ধারক আপনার বাহু বা হস্তদ্বয়কে নমস্কার করি। এর সবগুলিই আমার শত্রুর প্রতি প্রবর্তিত হোক, আমার প্রতি নয়। হে রুদ্র! আপনার যে ইষু (বাণ) আছে, তা শান্ততমা হোক, আপনার যে ধনু আছে, তা শান্ত হোক। আপনার সেই শান্ত শর ও ধনুর দ্বারা আমাদের সুখী করুন (নোহস্মামৃড়য়)। হে রুদ্র! আপনার যে অনুগ্রহকারিণী তনু আছে, তা যেন আমাদের প্রতি অঘোরা বা প্রচণ্ড হিংসিকা না হয়। (গিরিশ, অর্থাৎ কৈলাসে স্থিত হয়ে নিত্য প্রাণীগণকে যিনি শং বা সুখ, দান করেন, সেই হেন) হে গিরিশ বা রুদ্র! আপনার অতিশয় সুখকারিণী তনু আমাদের অভিলক্ষ্যে প্রকাশ করুন। (গিরিত্র অর্থাৎ কৈলাস নামে আখ্যাত গিরিকে যিনি ত্রাণ বা পালন করেন, সেই হেন) হে গিরিত্র বা রুদ্র! আপনার হস্তষ্কৃত যে বাণ, শত্রুর প্রতি নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত, তা আমাদের নিমিত্ত শান্ত করুন; আপনার সেই বাণ আমাদের (অর্থাৎ মনুষ্যগণের) ও মনুষ্যব্যতিরিক্ত জঙ্গম বা গো ইত্যাদি পশুগণের প্রতি যেন হিংসা করে। হে গিরিশ! আপনাকে প্রাপ্তির নিমিত্ত মঙ্গলকারক স্তুতিরূপ বাক্যের দ্বারা আমরা প্রার্থনা করছি–যে কোন প্রকারে যেন আমাদের সকল মনুষ্য ও জঙ্গমজাত পশু ইত্যাদি রোগরহিত ও সৌমনস্যোপেত (অর্থাৎ শোভন মন) লাভ করে, তাই করুন। হে রুদ্র! সকলের অগ্রে ও সকলের অধিক আমাকে বক্তব্য বলুন। (কি বক্তব্য? না, দেবতাগণের মধ্যে আপনিই প্রথম বা মুখ্য এবং স্বয়ং দেবগণকে পালনে সক্ষম। আপনি ধ্যানমাত্র সর্বরোগের উপশমকারী চিকিৎসক। (কেমন করে? না,) সৰ্প ব্যাঘ্র ইত্যাদি ও রাক্ষসজাতীয়গণকে বিনাশ করে। যে রুদ্র মণ্ডলস্থ আদিত্যরূপ, তিনি উদয়কালে অত্যন্ত অরুণবর্ণ, অধিকন্তু উদয়ের পরে পরে নানা বর্ণে রঞ্জিত হয়ে অন্ধকার ইত্যাদির নিবর্তকরূপে অত্যন্ত মঙ্গলরূপ ধারণ করেন। এবং সেই মঙ্গলরূপ রুদ্রের সহস্র সহস্র (অনেক) রশ্মি পূর্ব ইত্যাদি দিকে বিস্তৃত; এবং এই আদিত্যের রশ্মিরূপ সকল (একাদশ) রুদ্রের ক্রোধসদৃশ তীক্ষ্ণত্বকে আমরা ভক্তিপূর্ণ নমস্কার ইত্যাদির দ্বারা নিবারণ করব। যে রুদ্র নীলগ্রীব অর্থাৎ কালকূট বিষ ধারণের নিমিত্ত নীলবর্ণ গ্রীবাশালী হয়েছেন, সেই রুদ্র লোহিত বর্ণরূপে মণ্ডলবর্তী হয়ে উদয় ও অস্ত প্রবর্তন করছেন। (রুদ্রের সেই মণ্ডলবর্তী স্বরূপ ধারণের প্রয়োজন এই যে,) সেই রুদ্রকে বেদশাস্ত্রসংস্কাররহিত গোপগণ (গোপালকগণ), জল আহরণকারিণী রমণীগণ, এমন কি গো-মহিষ ইত্যাদি সকল প্রাণীগণও দর্শন করতে পারে। সকলের দর্শনের নিমিত্ত রুদ্রের এই আদিত্যমূর্তি ধারণ; কারণ তার কৈলাসবর্তী রুদ্ররূপ কেবল বেদশাস্ত্রে অভিজ্ঞ জনেরাই দর্শন করে থাকে। সেই হেন রুদ্র আমাদের দর্শন দানপূর্বক সুখী করুন। সেই নীলগ্রীব, সেই ইন্দ্রমূর্তিধারী সহস্রাক্ষ, সেই পর্জন্যমূর্তিধারী বৃষ্টিকর্তা রুদ্রকে নমস্কার; আরও, সেই রুদ্রের যারা ভৃত্যরূপ প্রাণী, তাদের সকলকে নমস্কার করছি। পূজাবৎ মহৎ আশ্চর্যসম্পন্ন হে ভগব রুদ্র! ধনুর্ধারী (বন্ধন) আপনার ধনুকের জ্যা (মৌবী) মুক্ত করে দিন ও আপনার হস্তধৃত বাণটি পরিত্যাগ করুন। (শতসংখ্যক ইষুধি অর্থাৎ বাণস্থাপনকোশ বা তুণ যাঁর, তিনি শতেষুধি এবং ইন্দ্ররূপে সহস্ৰসংখ্যক অক্ষি বা চক্ষু যাঁর, তিনি সহস্রাক্ষ। সেই মতো–) হে সহস্রাক্ষ ও শতেষুধি রুদ্র! আপনার ধনুর জ্যা উন্মুক্ত করে (অর্থাৎ বাণাকর্ষণের অযোগ্য করে) বাণের লৌহনির্মিত তীক্ষ্ণমুখ ফলাগুলি শীর্ণ করে তুণের মধ্যে রক্ষা পূর্বক আমাদের প্রতি অনুগ্রহান্বিত হয়ে শান্ত হোন। অথবা, আপনার যে খুঙ্গ আছে, সেটিও আকর্ষণের অসমর্থ করে আপনার খঙ্গকোশে রক্ষাপূর্বক আমাদের প্রতি অনুগ্রহান্বিত হয়ে শান্ত হোন। (পরবর্তী তিনটি মন্ত্র শুক্লযজুর্বেদের ১৬শ অধ্যায়ে ব্যাখ্যাত। যথা–যা তে হেতিমীচুষ্ট ইত্যাদি মন্ত্রটি ঐ অধ্যায়ের একাদশ শ্লোকে ব্যাখ্যাত। তার পরেরটি চর্তুদশ শ্লোকে ব্যাখ্যাত এবং তার পরেরটি অর্থাৎ পরি তে ধন্বনো ইত্যাদি মন্ত্রটি দ্বাদশ শ্লোক ব্যাখ্যাত) ॥১॥
মর্মার্থ– হিরণ্য নির্মিত আভরণ যাঁর, তিনি হিরণ্যবাহু; সংগ্রামে সৈন্যগণকে যিনি নেতৃত্ব দেন, তিনি সেনানী বা সেনানায়ক;–এই হেন মূর্তিধর রুদ্রগণকে নমস্কার। যাঁরা দিকসমূহের পালক, সেই রুদ্রদেবগণের উদ্দেশে নমস্কার। হরিৎ বা সবুজ বর্ণের পত্র বা কেশবিশিষ্ট যে বৃক্ষ, সেই হরিকেশ বৃক্ষাকার রুদ্রমূর্তি সমূহকে নমস্কার; যে রুদ্র পশুগণের পালক, সেই রুদ্রবর্গকে নমস্কার। সম্পিঞ্জর অর্থাৎ কচি তৃণের মতো পিঞ্জর (অর্থাৎ পীতরক্ত মিশ্রিত বর্ণশালী), স্বল্প ) উদরবিশিষ্ট (অর্থাৎ সাধু) ও দীপ্তিমান যে রুদ্রমূর্তি, তাঁদের নমস্কার। শাস্ত্রোক্ত দক্ষিণোত্তর তৃতীয় মার্গের পালক যে রুদ্র, তাঁদের নমস্কার। (অবশিষ্ট মন্ত্রগুলির জন্য শুক্ল যজুর্বেদের ১৬শ অধ্যায় দ্রষ্টব্য) ॥২॥
মর্মার্থ- অত্যন্ত বিরোধীরূপী ও তাদের বিদ্ধকারক যে রুদ্র, সেই রুদ্রকে নমস্কার। যিনি ককুভসদৃশ (ককুভ নামক ছন্দের ন্যায়) প্রধানভূত, যিনি খঙ্গহস্ত, সেই রুদ্রকে নমস্কার। যিনি স্তেনা বা গুপ্তচোরগণের পালক, সেই রুদ্রকে নমস্কার। যিনি লীলায় নটের (অর্থাৎ অভিনয়কর্তার) বেশ ধারণ করেন, সেই রুদ্রকে নমস্কার। যিনি নিষঙ্গ অর্থাৎ হস্তে বাণধারী ও ইষুধি অর্থাৎ পৃষ্ঠে বাণাধার বা তুণ বদ্ধকারী, এই উভয়যুক্ত রুদ্রকে নমস্কার। তঙ্কর অর্থাৎ প্রকট চোরগণের পালক রুদ্রকে নমস্কার। (অবশিষ্ট মন্ত্রগুলির জন্য শুক্ল যজুর্বেদের ১৬শ অধ্যায় দ্রষ্টব্য) ॥৩ ৷৷
[সায়ণাচার্যের মতে–এই অনুবাক-৪ ে স্ত্রী মূর্তিধারী রুদ্রশক্তির যজুঃসমূহ উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- সমস্ত দিকে ব্যাপ্ত ও বিশেষ ভাবে বিদ্ধ করতে সামর্থযুক্ত আব্যাধিনী ও বিবিধ্যস্তী স্ত্রীমূর্তিধারিণী যে শক্তিগণ আছেন, রুদ্রের সেই শক্তিগণের উদ্দেশে নমস্কার। উৎকৃষ্ট গণরূপা (উগণা) যে ব্রাহ্মী ইত্যাদি সপ্তমাতৃকা আছেন, হিংসায় সমৰ্থা দুর্গা ইত্যাদি যে উগ্র দেবতাগণ আছেন, রুদ্রের সেই স্ত্রীমূর্তিধারণী দেবতার উদ্দেশে নমস্কার।–গৃৎসা অর্থাৎ বিষয়-লম্পটা এবং তাদের পালক রুদ্রকে নমস্কার।–নানাজাতীয় সঙ্চারিণী ও তাদের পালক (ব্রাতস্পতি) রুদ্রকে নমস্কার।–দেবতার অনুচরী ভূতবিশেষা (গণা) ও তাদের পালক রুদ্রকে নমস্কার।-বিরূপা বা বিকৃতরূপা (নগ্নমুণ্ডা) ও বিশ্বরূপা অর্থাৎ নানাবিধ রূপপারিণী রুদ্রের ভৃত্যাদের নমস্কার।–অণিমা ইত্যাদি ঐশ্বর্যক্তা মহতী ও ঐশ্বর্যরহিতা ক্ষুদ্রা (ক্ষুল্লকা) রুদ্রগণকে নমস্কার। রথে আরূঢ়া ও অরথা অর্থাৎ রথরহিতা রুদ্রদের নমস্কার। (এর পর রথ ও রথপতিরূপী, সেনা ও সেনাপতিরূপী, রথাধিষ্ঠাতা ক্ষত্রিয় ও অশ্বসংগ্রহকারী সারথিরূপী, শিল্পী ও সূত্ৰধাররূপী, কুম্ভকার ও কর্মকাররূপীপক্ষীপুঞ্জের ঘাতক ও নিষাদরূপী, বাণধারী ও ধনুর্ধারীরূপী, ব্যাধরূপী ও কুকুরের গলে বদ্ধ রঞ্জুর ধারকরূপী, কুকুর ও কুকুরের পালকরূপী-রুদ্রগণের উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করা হয়েছে। এই সবই শুক্লযজুর্বেদের ১৬ শ অধ্যায়ে উল্লিখিত ॥৪॥
[সায়ণাচার্য বলেন-চতুর্থেহনুবাক উভয়তোনমস্কারাণি যজুংষি সমাপিতানি। অথ পঞ্চমমারভ্য নবমান্তেধনুবাকে নমস্কারোপক্রমাণ্যেব যজুংষ্যান্নয়ন্তে। অর্থাৎ অনুবাক-৪ পর্যন্ত উভয়তঃ নমস্কার সমূহ সমাপ্ত হয়েছে। অতঃপর এই পঞ্চম অবাক থেকে আরম্ভ করে অনুবাক-৯ পর্যন্ত রুদ্রদেবের বিভিন্ন মূর্তির উদ্দেশে নমস্কারের উপক্রমে যজুসমূহ কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- হরিণ অর্থাৎ অনুর্বর ক্ষেত্রে স্থিত বা উৎপন্ন (ভব) রুদ্রকে নমস্কার। এইভাবে, বহুজনের দ্বারা সেবিত মার্গে (অর্থাৎ পথে) উৎপন্ন, কুৎসিত ক্ষুদ্র শিলাকীর্ণ প্রদেশে উৎপন্ন, নিবাসযোগ্য স্থানে বা দেশে উত্ন যিনি জটাবদ্ধবান, যিনি ভক্তের সম্মুখে অবস্থিত, যিনি গোষ্ঠে স্থিত, যিনি গৃহে উৎপন্ন, যিনি শয্যায় উৎপন্ন, যিনি প্রাসাদে উৎপন্ন, যিনি কণ্টকলতা ইত্যাদিতে পূর্ণ দুর্গম অরণ্যে স্থিত, যিনি বিষম গিরিগুহা ইত্যাদিতে স্থিত, যিনি অগাধ জলে উৎপন্ন, যিনি নিবেম্পং অর্থাৎ নীহার জলে উৎপন্ন, যিনি পরমাণুতে অবস্থিত, যিনি ধুলির মধ্যে অবস্থিত, যিনি শুষ্ক কাষ্ঠে উৎপন্ন, যিনি আর্দ্র স্থানে উৎপন্ন, যিনি তৃণ ইত্যাদি শূন্য (লুপ্ত) কঠিন প্রদেশে জাত, যিনি তৃণ ইত্যাদিতে উৎপন্ন, যিনি পৃথিবীতে উৎপন্ন, যিনি নদীর শোভন তরঙ্গে উৎপন্ন, যিনি পর্ণে অর্থাৎ (সরস) পত্রে উৎপন্ন, যিনি শুল্ক পর্ণের সমষ্টিতে (সংঘাতঃ) উৎপন্ন, যিনি (শত্রুর উদ্দেশে) উদ্যত আয়ুধধারী, যিনি (শত্রুকে) প্রহারকারী, যিনি (শত্রুকে) খেদন বা বিতাড়নকারী, যিনি ভক্তদের ধন ইত্যাদি দান করে তাদের হৃদয়স্বরূপ হয়ে থাকেন, যিনি সকল দেবতার প্রিয়সদৃশ তাদের হৃদয়স্বরূপ, যিনি বিপরীতা বিক্ষণকাঃ অর্থাৎ কখনও ক্ষয়রহিত (যাঁর কখনও ক্ষয় নেই), যিনি বৃষ্টি প্রভৃতির দ্বারা জগতের কারক, যিনি নিঃশেষে পাপকে হত করে থাকেন, যিনি সকল স্থূলীভাব প্রাপ্তবান–সেই হেন রুদ্রগণকে নমস্কার। (পূর্ববর্তী অনুবাকের মতো পঠিতব্য এই যজুগুলিরও অধিকাংশ শুক্লযজুর্বেদের ১৬শ অধ্যায়ে প্রাপ্তব্য) ॥৯॥
মর্মার্থ– পাপীগণকে নরক-প্রদানরূপ কুৎসিত গতি দানকারী, ভক্তগণকে অন্নের দ্বারা পালনকারী, দরিদ্র (স্বয়ং নিস্পৃহ), হে নীললোহিত (কণ্ঠে নীল ও অন্যত্র লোহিতবর্ণশালী) রুদ্র। আমাদের পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি সহ আমাদের ও গো-মহিষ ইত্যাদি সমূহকে ভয় প্রদর্শন করবেন না, এদের মধ্যে কাউকেই কিছুমাত্র বিনাশ করবেন না, তারা যেন রুগ্ন না হয় (মা আমমন্মৈব রুগ্নমভূৎ)-হে রুদ্র! আপনার যে শিবময় (শান্ত বা মঙ্গলময়) তনু বিদ্যমান, সেই তনুর দ্বারা আমাদের জীবন সুখী করুন। (শিবত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, প্রতি দিন সকল রোগের আরোগ্যের নিমিত্ত ভেষজরূপী যিনি, তিনি শিব; দারিদ্র্য ইত্যাদির বিনাশের হেতুকারক যিনি, তিনি শিব; অধিকন্তু যিনি জ্ঞানপ্রদান পূর্বক জন্মমরণ ইত্যাদি দুঃখ নিবারণ করেন, তিনিও শিব)।–যে প্রকারেই হোক, দ্বিপদযুক্ত (অর্থাৎ মনুষ্যরূপী) আমাদের পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির এবং চতুষ্পদমুক্ত গো-মহিষ ইত্যাদি পশুগণের যাতে সুখ হয়, তেমন করুন। অধিকন্তু, এই গ্রামে সকল প্রাণী যাতে পুষ্ট ও উপদ্ররহিতরূপে সুখী হয়, সেই নিমিত্ত আমরা রুদ্রের উদ্দেশে পূজা ধ্যান ইত্যাদি বিষয়ে বুদ্ধি প্রকর্ষের সাথে পোষণ করছি (প্রকর্ষেণ পোষয়ামঃ)। (কিরকম রুদ্র? না, তিনি বলযুক্ত, জটাবন্ধযুক্ত তাপসের মতো ও ক্ষীয়মান প্রতিপক্ষ পুরুষ ভিন্ন অপরের পাপবিনাশের হেতু।–হে রুদ্র! আমাদের ইহলোকে, এবং পরলোকেও, সুখ বিধান করুন। আমাদের পাপবিনাশকারী আপনাকে আমরা মনে মনে নমস্কারের দ্বারা পরিচর্যা করছি। হে রুদ্র! আমাদের পিতা বা পালক প্রজাপতি আমাদের নিমিত্ত যে সুখ ও যে দুঃখভিন্ন অপর যা কিছু ভাব সম্পাদন করেছেন, তার সবটুকুই আমরা আপনার স্নেহাতিশয়ে প্রাপ্ত হবো।-হে রুদ্র! স্থবির (বৃদ্ধ) পুরুষগণকে হিংসা করবেন না। অধিকন্তু, আমাদের অর্ভক অর্থাৎ বালক বা শিশুদের, সেচনসমর্থ যুবা পুরুষদের, গর্ভস্থ পুরুষদের, পিতা-মাতা, ও আমাদের এই প্রিয় শরীরের প্রতি হিংসা করবেন না।-হে রুদ্র! আমাদের অপত্যমাত্রকে, বিশেষভাবে আমাদের পুত্রকে হিংসা করবেন না, আমাদের আয়ু, আমাদের গো, আমাদের অশ্ব–এইগুলির প্রতি হিংসা করবেন না। আপনি ক্রুদ্ধ হয়ে আমাদের ভৃত্যদের প্রতি হিংসা করবেন না। আমরা হবিষ্মন্ত অর্থাৎ হবিযুক্ত হয়ে আপনাকে নমস্কারের দ্বারা পরিচর্যা করছি। গোঘ্ন অর্থাৎ গোঘাতী, পুরুষঘু অর্থাৎ পুত্রপৌত্র ইত্যাদি পুরুষগণের ঘাতক ও ভৃত্য ইত্যাদির ঘাতক আপনার যে উগ্ররূপ, তা দুরে অবস্থান করুক (দুরে তিতু); বরং আপনার সুখকর রূপ আমাদের নিকটস্থ হোক। আপনার ঘোর (উগ্র) ও শিব (শান্ত)–দুই শরীর আছে, তার যেটি ঘোর শরীর, সেটি দূরে গমন করুক, (অর্থাৎ আপনার সেই শিবময় শরীরটিই এইস্থানে আগত হোক)। অধিকন্তু, আপনি আমাদের সর্বতঃ পালন করুন। হে দেব! সকল যজমান অপেক্ষা আমাদের অধিক উৎকর্ষের কথা আপনি দেবগণের নিকট বলুন (ঐহি)। পৃথিবী ও দুলোক এই দুই লোকের বর্ধয়িতা (দ্বয়োলোকয়োর্বর্ধয়িতা) আপনি; আপনি আমাদের সুখ-প্রদান করুন।হে আমার বাক্য! তুমি সেই প্রসিদ্ধ রুদ্রের স্তুতি করো। (কিরকম রুদ্র? না,) যে রুদ্র গর্ভসদৃশ হৃদয় পদ্মে সর্বদা অবস্থান করেন, যে রুদ্র যুবানং অর্থাৎ নিত্যতরুণ এবং যে রুদ্র প্রলয়কালে সর্ব জগৎকে সংহারের নিমিত্ত উগ্ররূপী হন। (উগ্রতার নিদর্শন কি? না,) যেমন হস্তীকে বিদারিত করবার জন্য সিংহ ভয়ঙ্কর উগ্র হয়ে ওঠে। সেই হেন হে রুদ্র! দিনে দিনে ক্ষীয়মাণ আমাদের শরীরে সুখ প্রদান করুন। আপনার সেনা আমাদের শত্রুগণের বিনাশ সাধন করুক।–রুদ্রের হেতি নামক অস্ত্র যেন কখনও আমাদের বিদ্ধ না করে (বা আমাদের যেন পরিত্যাগ করে); আপনার জ্বলিত ক্রোধরূপ প্রহারের ইচ্ছান্বিত দুর্মতি বা উগ্রবুদ্ধি যেন আমাদের ত্যাগ করে; এবং বিরোধীদের বিনাশের নিমিত্ত আপনার যে উগ্রবুদ্ধি (তথা দুর্বুদ্ধি) আছে, তা হবিঃ-লক্ষণাম্বিত অন্নের দ্বারা যুক্ত যজমানগণের নিকট হতে অপনীত করুন (অপনীতাং কুরু)। হে কামসমূহের অভিবষক! আপনি আমাদের পুত্র ও তাদের পুত্রগণকে সুখ-প্রদান করুন।–হে অতিশয়রূপে কামনাসমূহের অভিবৰ্ষক (মীদুষ্টম)! হে অতিশয়রূপে শান্তস্বরূপ (শিবতম)! আপনি আমাদের প্রতি শান্ত (মঙ্গলপ্রদ) ও সৌমনস্য বা স্নেহের দ্বারা যুক্ত হোন। আপনার ত্রিশূল ইত্যাদি অস্ত্র উচ্চ বট-অশ্ব ইত্যাদিতে স্থাপন পূর্বক কৃত্তিবাস হয়ে (অর্থাৎ ব্যাঘ্রচর্মমাত্র পরিহিত হয়ে) আমাদের অভিমুখে আগত হোন। বাণ ইত্যাদি পরিত্যাগ করে কেবল ভূষণের নিমিত্ত (ভূষণার্থ) পিনাক নামক ধনু ধারণ পূর্বক এই স্থানে আগত হোন।-ভক্তের প্রতি বহুধা ধন বিশেষভাবে ক্ষেপণকারী (অর্থাৎ প্রভূত ধন দানকারী), শ্বেতবর্ণধারী (বিলোহিততা বা লৌহিত্যরহিত), (আবার বিশেষভাবে লোহিত বোঝাতে ও বিলোহিতঃ শব্দ প্রযোজ্য হতে পারে), হে ভগব (অর্থাৎ সম্পূর্ণ ঐশ্বর্য, সম্পূর্ণ বীর্য বা ধর্ম, সম্পূর্ণ যশ, সম্পূর্ণ শ্ৰী, সম্পূর্ণ জ্ঞান ও সম্পূর্ণ বৈরাগ্য–এই ছয় ভাগের দ্বারা অম্বিত বা মহাত্ম্য সম্বলিত)! আপনাকে নমস্কার। হে রুদ্র! আপনি উৎপত্তি, বিনাশ ও ভূতসমুহের বেত্তা, এই হেন গুণত্রয়বিশিষ্ট আপনাকে নমস্কার। হে রুদ্র! আপনার দুটি বাহুতে ধনু-খঙ্গ-ত্রিশূল ইত্যাদি ভেদে সহস্র রকমের অস্ত্র আছে (বিদ্যন্তে)। হে ষড়গুণোপেত ভগবন্! সব আয়ুধেরই নিয়মনে সমর্থ আপনি; আপনি সেই হেতি নামক আয়ুধগুলির মুখ বা শল্যসমূহ (ধারাল দিকগুলি) আমাদের দিক হতে বিমুখ (পরঙুখ) করুন ॥১০৷
[সায়ণাচার্য বলেন–প্রথমানুবাকে পরিষেনবিকর্ষর্ণাদয়োহভিধীয়ন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-১ ে পরিষেচন বিকর্ষণ ইত্যাদি বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে মরুত্বর্গ! আপনারা সম্যক্ দানশীল, আপনারা আমাদের নিমিত্ত বলকারক অন্ন সম্পাদন করুন। (কিরকম অন্ন? না,) পর্বতে (অর্থাৎ মেরু-বিন্ধ্য-হিমালয় প্রভৃতি পর্বতে), প্রচণ্ড বায়ুতে, বর্ষণক্ষম বিস্তৃত মেঘে এবং বরুণ-সম্বন্ধিনী বলে সারভূত জলে উৎপন্ন ব্রীহি-যব ইত্যাদি ওষধী ও উদুম্বর ইত্যাদি বনস্পতি হতে জাত যে অন্ন আমাদেরও বলের হেতুকারক, এমন অন্ন। হে পাষাণসদৃশ দৃঢ় অগ্নি! আপনার যে ক্ষুৎপীড়া ও আপনার যে সন্তাপ, তা উভয়ই সেই বৈরিগণকে প্রাপ্ত হোক যে বৈরিগণকে আমরা দ্বেষ করি।-হে অগ্নি! সমুদ্র-সম্বন্ধী শৈবালের দ্বারা পরিব্যাপ্ত প্রদেশের উপরিভাগে আপনাকে বিকর্ষণ করছি। আপনি আমাদের শোধক (পাবক) ও শান্তস্বরূপ (শিবঃ) হোন।–হে অগ্নি! হিমের (শৈত্যের) জরায়ুবৎ শৈবালের দ্বারা পরিব্যাপ্ত প্রদেশের উপরিভাগে আপনাকে বিকর্ষণ করছি। আপনি আমাদের শোধক ও শান্তস্বরূপ হোন।
হে অগ্নি! আপনি পৃথিবীর উপরে উপগত হয়ে, বেতসবৃক্ষে (বঙুলক) উপগত হয়ে এবং নদীজলেও উপগত হয়ে তাদের রক্ষক রূপে বর্তমান আছেন। সেই হেতু আপনি জলের তেজঃরূপী।–হে মঞ্জুকি (মণ্ডুকজাতীয় বা মুনিবিশেষ)! আপনি ঋ-মন্ত্রের সাথে আগত হোন; আপনি-আমাদের এই অনুষ্ঠীয়মান যজ্ঞকে অগ্নির ন্যায় সমান তেজস্ব ও ফলপ্রদানের দ্বারা শান্ত (বা মঙ্গলময়) করুন।–হে মকি! পাবক অগ্নির বিষয়ভূতা হয়ে এই চিতিতে তার সামর্থ্যে যুক্ত হয়ে আপনি এখানে আগত হোন। আপনার আগমনে এই অগ্নি পৃথিবীতে দীপ্তবান হবেন। (তার দৃষ্টান্ত কি? না,) উষাকালের প্রকাশের দ্বারা যেমন পদার্থসমূহ দীপ্যমান হয়, তেমন। শীঘ্র গমনকুশল অশ্বের নিয়ামক যেমন যুদ্ধে কখনও শত্রুবলের দ্বারা নির্জিত না হয়ে থাকে, এই অগ্নি তেমনই প্রজ্বলিত হয়ে অবধি সর্বতো জরারহিত হয়ে দীপ্যমান থাকেন; (অর্থাৎ রণে প্রবৃত্ত অশ্বারোহী পুরুষ শীঘ্র গমনশীল অশ্বের লাগাম বাম হস্তে সংযমিত করে যেমন শত্রুসেনাগণকে অবিরত হিংসা করে থাকে, সেই রকমে এই অগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে কখনও জীর্ণ হন না বা তৃষ্ণাযুক্ত হন না, বরং তৃপ্ত হয়ে থাকেন।–হে শোধক দ্যোতনাত্মক অগ্নিদেব! আপনার দীপ্তিমন্ত জিহ্বায় দেবগণকে আহ্বান করুন এবং যাগ করুন।-হে শোধক দীপ্যমান অগ্নি! আমাদের নিমিত্ত দেবতাগণকে এই যজ্ঞকর্মে আহ্বান করুন এবং আমাদের এই যজ্ঞ ও হবিঃ দেবতাগণের সমীপে উপনীত করুন (দেবসমীপে প্রাপয়)।–এই চিত্যাগ্নি-স্থান জলের প্রাপ্য; অতএব এই জল বহুলত্বের কারণে সমুদ্রের গৃহস্থানীয়। সেই রকম, হে অগ্নি! আপনার হেতি বা অস্ত্রগুলি আমাদের ব্যতীত অন্য বিরোধী পুরুষকে ক্লেশ প্রদান করুক; আমাদের নিমিত্ত বা পক্ষে আপনি শুদ্ধ ও শান্ত হোন।–হে অগ্নি! আপনার শোষণকারক তেজঃকে নমস্কার করি। অধিকন্তু, আপনার যে তেজঃ পদার্থসমূহকে প্রকাশ করে, সেই তেজঃকে নমস্কার করি। আপনি আমাদের নিমিত্ত শুদ্ধ ও শান্ত হোন।–যে অগ্নি মনুষ্যের মধ্যে জঠরাগ্নিরূপে অবস্থান করছেন, সেই নৃষৎ অগ্নিকে হবিঃ প্রদান করা হচ্ছে; যে অগ্নি বড়বানলরূপে অবস্থান করছেন, সেই অঙ্গুষৎ অগ্নিকে হবিঃ প্রদান করা হচ্ছে; যে অগ্নি দাবাগ্নিরূপে বনে অবস্থান করছেন, সেই বনসৎ অগ্নিকে হবিঃ প্রদান করা হচ্ছে; যে অগ্নি আহবনীয় ইত্যাদিরূপে যজ্ঞে অবস্থান করছেন, সেই বহিষৎ অগ্নিকে হবিঃ প্রদান করা হচ্ছে; যে অগ্নি আদিত্যরূপে স্বর্গে অবস্থান করছেন, সেই সুবর্বিৎ অগ্নিকে হবিঃ প্রদান করা হচ্ছে।–দেবতা দুরকমের (দ্বিবিধা দেবা)–হবির্ভুজ অর্থাৎ হবিঃ-ভক্ষক ইন্দ্ৰ বরুণ ইত্যাদি ও শরীর-নির্বাহক (প্রাণাত্মক) প্রাণ অপান ইত্যাদি। এই উভয়ই যজ্ঞিয় (অর্থাৎ যজ্ঞকর্মের যোগ্য); যেমন–ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতা যজ্ঞের দ্বারা পূজিত হওয়ার কারণে যজ্ঞিয় এবং প্রাণ ইত্যাদি দেবতা যজ্ঞের পূজক হওয়ার কারণে যজ্ঞিয়। এই ভাবে ইন্দ্র ইত্যাদি যজ্ঞিয় দেবতাগণ সম্বৎসর-সাধ্য চিতিরূপ অগ্নিতে স্বাহাকারের দ্বারা সমর্পিত যজ্ঞের ভাগ ভক্ষণ (সেবন্তে) করে থাকেন; প্রাণ ইত্যাদি আহুত না হয়েও (অহুতাদঃ) তা ভক্ষণ করেন। এই হেন হে প্রাণসমূহ! এই যজ্ঞে আমাদের আহূত হবির মধুর ভাগ আপনারা স্বাহাকার মন্ত্রে সমর্পন বিনাই স্বয়ং স্বীকার (গ্রহণ) করুন। যে প্রাণসমূহ ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতার অধিষ্ঠতৃত্বের দ্বারা (অধিষ্ঠতৃত্বেন) দেবত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন, অধিকন্তু যে প্রাণসমূহ চীয়মান অগ্নির সম্মুখে যজ্ঞকর্মের নির্বাহক, যাঁরা ব্যাতিরেকে চীয়মান অগ্নি-স্থান শুদ্ধ হয়।, সেই প্রাণরূপ দেবগণ স্বর্গেও অবস্থান করেন না (দিব্যপি ন তিষ্ঠন্তি), পৃথিবীতেও অর্থাৎ ভূমিতেও অবস্থান করেন না (ভূমাবপি না তিষ্ঠন্তি); পরন্তু পর্বতের সানু-সদৃশ (অর্থাৎ উপরিস্থ সমতল ভূমির ন্যায়) শরীরগত চক্ষু ইত্যাদির গোলকে আশ্রয়ান্বিত হয়ে বর্তমান থাকে (বর্তন্তে)। হে অগ্নি! আপনি যজমানের প্রাণকে সুস্থির করুন, অপানকে সুস্থির করুন, ব্যাকে সুস্থির করুন, চক্ষুকে সুস্থির করুন, বর্চো বা বলকে সুস্থির করুন, ববিবো অর্থাৎ প্রজাগণকে বা পুত্র ইত্যাদি অপত্যদের সুস্থির করুন; আপনার হেতি বা অস্ত্রগুলি আমাদের ব্যতীত অন্য পুরুষকে ক্লেশ বা তাপ প্রদান করুক; আমাদের নিমিত্ত আপনি শুদ্ধ ও শান্ত থাকুন।–এই চীয়মান অগ্নি তার তীক্ষ্ম জ্বালামালায় রাক্ষস ইত্যাদি সকল বিরোধীগণকে বিনাশ করুন, এবং সেইভাবেই আমাদের অনিষ্টকারীগণকে বিনাশে ইচ্ছুক হোন।-হে অগ্নি! আপনি দীপ্যমান (দ্যুমদ্দীপ্যমান), অধিকন্তু বহুধনযুক্ত গৃহ ক্ষেত্র ইত্যাদি প্রকাশ করেন। (আপনি কিরকম? না,) আপনি সকল জ্বালামালার দ্বারা সুষ্ঠু জ্ঞাপিত (বেদিত), অর্থাৎ আপনার প্রজ্বলন্ত শিখা-সমূহের দ্বারা সম্যক সাক্ষাৎকৃত; আমাদের নিমিত্ত দেবগণের উদ্দেশে যাগের নিম্পাদক; আপনি বিঘুরহিত হয়ে অতিশয়ভাবে যাগসমাপ্তকারী; আপনি অদঃ অর্থাৎ কারও দ্বারা হিংসিত নন, অর্থাৎ কেউই আপনাকে হিংসা করতে পারে না; আপনি মন্ত্রের গোপ্তা বা রক্ষক; এবং আমাদের পরস্প অর্থাৎ অতিশয়রূপে পালয়িতা। [পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকের ৪র্থ ও ৫ম অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে এই মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥১॥ :
মর্মার্থ- হে অগ্নি! আমাদের পূর্বে উৎপন্ন (জাতান সপন্যে) শত্রুগণকে প্রকৃষ্টরূপে নাশ করুন। হে জাতবেদা! পূর্বে উৎপন্ন ছাড়াও যে শত্রুগণ এখনও অজাত, তাদের উৎপত্তির প্রতিবন্ধ (বাধা) সৃষ্টি করে নিরাকৃত করুন, অর্থাৎ তারা যেন আর জন্মলাভ করতে না পারে, তেমন করুন। অনুগ্রহযুক্ত চিত্তে আপনি অক্ৰোধি হয়ে ত্রি-বরুথ, প্রাক-বংশ, ও হবিধানরূপ এয়োপেত (তিন রকম) গৃহে অনুষ্ঠেয় কর্মের উৎপাদক হয়ে আমাদের প্রকাশ করুন। আপনার প্রসাদে আমরা যেন সুখবা হই। হে অগ্নি! বলের দ্বারা আমাদের পূর্বে উৎপন্ন শত্রুদের বিনাশ করুন, এবং অজাত শত্রুদের উৎপত্তির প্রতিবন্ধ সৃষ্টি করে নিরাকৃত করুন। আপনি শোভনচিত্তযুক্ত হয়ে আমাদের অধিক বলরূপা, আমরাও যেন আপনার অনুগ্রহে অধিক (বলশালী) হতে পারি। আপনি আমাদের শত্রুগণকে বিনাশ করুন। এই যে স্তোম চতুশ্চত্বারিংশ আবৃত্তির দ্বারা সম্পন্ন এবং যা বলরূপ ধন, হে ইষ্টকা! তুমি সেই উভয়রূপা। সেই ভাবে, এই যে যোড়শ স্তোম (অর্থাৎ ষোড়শ আবৃত্তির দ্বারা নিষ্পদ্য স্তোম এবং এই যে ওজঃ অর্থাৎ অষ্টম ধাতুরূপ ধন); সেই উভয়রূপা তুমি। হে ইষ্টকা! তুমি চিতিরূপা পৃথিবীর পূরক এবং তুমি অন্সো নামধারিণী। হে ইষ্টকা! তুমি ঐব, বরিব, শম্ভু, পরিভু, আচ্ছৎ, মন, ব্যচ, সিন্ধু, সমুদ্র, সলিল, সংযৎ, বিঘৎ, বৃহৎ, রথন্তর, নকায়, বিবধ, গির, প্রজ, সস্তূপ, অনুষ্টুপ, ককুৎ, ত্রিককুৎ, কাব্য, অঙ্কুপম, পদপঙক্তি, অক্ষরপঙক্তি, বিষ্টারপঙক্তি, ক্ষুর ভূজ্বান, প্রচ্ছৎ, পক্ষ, বয়, বয়স্কৃৎ, বিশাল, বিস্পর্ধা, ছদি, দুঃরোহণ, তন্দ্র ও অঙ্কাঙ্ক নামে অভিহিতা স্বর্গলোকবর্তী ছন্দোবিশেষসমূহের স্বরূপা। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ৫ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ১২
[সায়ণাচার্য বলেন–দ্বাদশে অনুবাকে…… অথ ত্রয়োদশস্যাভ্যানুবাকত্বত্তত্র যাজ্যানুবাক্যা উচ্যন্তে। অর্থাৎ-দ্বাদশ অনুবাকে অসপত্না ইত্যাদি ইষ্টকা কথিত হয়েছে। অতঃপর এই ত্রয়োদশ অনুবাকে তার যাজ্যা ও অনুবাক্যা কথিত হচ্ছে]
মর্মার্থ- ঘৃত দ্রব্যের দ্বারা সর্বতো আহুত (হুয়মান) হে অগ্নি! এই যজমানের উৎকৃষ্ট ঐশ্বর্য উত্তর্ষের সাথে শীঘ্র সম্পন্ন করুন। উৎকৃষ্ট ঐশ্বর্য অর্থে–এই যজমানকে ধনপুষ্টির দ্বারা বা ধনসমৃদ্ধির সাথে সংযযাজিত করুন, তথা পুত্রপৌত্র ইত্যাদি ও গো-অশ্ব ইত্যাদিরূপ ধনের সাথে সংযোজিত করুন।–হে ইন্দ্রসম পরম ঐশ্বর্যযুক্ত অগ্নি! আপনি এই যজমানকে অতিশয়রূপে শ্রেষ্ঠ (প্রকৃষ্ট) করুন। প্রকৃষ্ট অর্থে–এই যজমান তাঁর সহোৎপন্ন জ্ঞাতীবর্গের নিয়মনে (অর্থাৎ শাসনে) সমর্থ হোন, এঁকে বলের দ্বারা সংযোজিত (অর্থাৎ বলসম্পন্ন) করুন, ইনি যেন যজ্ঞে দেবতাগণকে তাঁদের ভাগপ্রদ (অর্থাৎ যজ্ঞসম্পন্ন) হোন।–আমরা ঋত্বিকগণ যে যজমানের গৃহে হবিঃ নিবৰ্পণ করব, হে অগ্নি! আপনি সেই যজমানকে বর্ধিত করুন (বৃদ্ধি ঘটান)। দেবগণ বলুন যে, এই যজমান সকলের অপেক্ষা অধিক (শ্রেষ্ঠ)। এই যজমান ব্ৰহ্মণস্পতি অর্থাৎ বৈদিক কর্মকাণ্ডের পালক হোন।–হে অগ্নি! সকল দেবতা প্রাণরূপ ইন্দ্রিয়বৃত্তির দ্বারা আপনাকে ধারণ করুন। আপনি আমাদের পক্ষে শিবতম বা শান্ততম এবং সুমুখ (হৃষ্টমুখশালী) ও প্রভাব বাসয়িতা (প্রভা-প্রকাশক) হোন। পূর্ব ইত্যাদি পঞ্চদিবর্তী দেব-সম্বন্ধি দেবীগণ আমাদের পাপবিষয়ক দুর্মতিসমূহ বিনাশ করে ধনসমৃদ্ধির দ্বারা যজমানের সেবাপুর্বক এই যজ্ঞ রক্ষা করুন।–এই যজ্ঞ অধিক ধনসমৃদ্ধিতে অবস্থিত হয়ে সর্বদা ধনপুষ্টি প্রদান করুক। (কিরকম যজ্ঞ? না,) সমিধের দ্বারা অগ্নি সম্যক্ প্রজ্বালিত হওয়া অবধি এই যজ্ঞ পুনঃ পুনঃ পূজ্যমান হয় এবং উথ শস্ত্র সমূহের বাহক রূপে ঋত্বিক ও যজমানগণের দ্বারা পরিগৃহীত হয়। তারা সেই অগ্নি পরিগ্রহ পূর্বক সর্বদা যাগ করেন।–ঋত্বিক ও যজমানগণ যে সময়ে অগ্নির উদ্দেশে হবিঃ-স্বরূপ অন্নের দ্বারা যজ্ঞের তুষ্টির হেতুকারক হন, সেই সময়ে অগ্নি এইরকম হন। (কিরকম অগ্নি? না, তিনি দেবতাগণের হিতের নিমিত্ত যজ্ঞের দ্বারা জগতের ধারয়িতা। (কিরকম হন? না, তিনি দেবশ্রী হন, অর্থাৎ দেবগণের উদ্দেশে প্রদত্ত হবির বহনকারী হন; তিনি শ্রীমণা হন, অর্থাৎ যজমানের প্রতি অনুগ্রহবুদ্ধিসম্পন্ন হন; তিনি শতপয়া হন, অর্থাৎ শতসংখ্যক পয়ঃ প্রভৃতি যুক্ত হবিঃস্বরূপ হন। এই হেন অগ্নিকে পরিগৃহীত করে ঋত্বিক ও যজমানবৃন্দ যজ্ঞমায় হন, অর্থাৎ যজ্ঞকে প্রাপ্ত হয়ে অবস্থান করে থাকেন। দারিদ্র্য-হরণকারী হিরণ্যবর্ণ কেশস্থানীয় শিখাবিশিষ্ট সূর্যরশ্মিরূপে প্রাণীগণের প্রেরক জ্যোতির্মগুলরূপ অগ্নি পূর্বদিকে প্রতিদিন উদিত হন; যাঁর উদয়ে পূষাদের জগতের প্রেরণা লাভ করে থাকেন। (কিরকম দেব? না) গোপা অর্থাৎ রক্ষক। (কিসের প্রেরণা? না,) সকল ভুবনকে অবলোকন করার।–পশুবন্ধরূপ যজ্ঞের চারটি বিভাগ; তার মধ্যে উপকরণ প্রথম, শামিত্রদেশে অর্থাৎ পশুবধস্থানে স্থিতি দ্বিতীয়, যাগের নিমিত্ত সংস্কার তৃতীয় এবং হবিঃ-প্রদান চতুর্থ। এই চারটি ভাগ ক্রমে প্রতিপাদিত হচ্ছে–দেবতাগণের দ্বারা হবিঃ-স্বীকারের উদ্দেশে ঋত্বিক ও যজমানগণ যে অভিলাষ করেন, তা-ই উপকরণ। যে স্থানে পশুবধ হবে, সেই স্থানে পশুরূপ হবিকে আনয়ন দ্বিতীয়।
তারপর যাগে নিমিত্ত পশুর সংস্কার হলো তৃতীয় এবং চতুর্থে যজ্ঞভাগ অর্থাৎ দেবতার উদ্দেশে সেই হবিঃরূপ পশুকে সমর্পণ ইত্যাদি। চারটি ভাগসমন্বিত যে যজ্ঞে দেবতা হবিঃ প্রাপ্ত হন, সেই ভাগচতুষ্টয়োপেত যজ্ঞ হতে পাবকগণ অর্থাৎ আহবনীয় ইত্যাদি অগ্নিগণ আমাদেমাশিষরূপ যজ্ঞফলবিশেষ সম্পাদন (প্ৰদান) করুন।–এই অশ্মা বা প্রস্তরসমূহ বিবিধ জগৎ নির্মাণের নিমিত্ত আগ্নীপ্রস্থানীয় আকাশের মধ্যে অবস্থিত। (কিরকম প্রস্তর? না,) দ্যাবাপৃথিবী ও অন্তরিক্ষ লোককে সর্বতো পূর্ণকারী প্রস্তর। (যদ্যপ্যেবশ্ম ন কিঞ্চিজ্জগনির্মিমীতে নাপি লোকয়মাপুৰ্য তিষ্ঠতি তথাপি পরমেশ্বরগুণৈরস্য স্বয়মানত্বান্ন কোহপি বিরোধঃ–অর্থাৎ এই স্থানে সায়ণাচার্য বলেছেন যে, জগৎ নির্মাণের ক্ষেত্রে যদিও প্রস্তরের কোন প্রয়োজন হয়নি, কিংবা প্রস্তরের দ্বারা তিনটি লোক পূর্ণ হয়নি, তথাপি পরমেশ্বরের গুণস্তুতি করণের কারণে এই বর্ণনায় কোন বিরোধ বা বৈপরীত্য হয়নি)। এই প্রস্তর স্তয়মান হয়ে বিশ্বাচী অর্থাৎ বিশ্বব্যাপিনী দিমূহকে প্রকাশ করছে, তথা ঘৃতাচী অর্থাৎ ঘৃত প্রাপ্তির হেতুভূত ধেনুগণকে প্রকাশ করছে, এবং অন্তরা ও পূর্বপরং অর্থাৎ উদয়-অস্তের দ্বারা ব্রহ্মাণ্ডলোকের পূর্বাপর দিকসমূহকে চিহ্নিত (কেতু) করবার নিমিত্ত সূর্যকে প্রকাশ করছে। এই প্রস্তর মেঘরূপ (উক্ষা), অর্থাৎ যাগের দ্বারা ফলের (যজ্ঞফলের) অভিবষক; সমুদ্ররূপ, অর্থাৎ সমুদ্রসদৃশ বহুফল প্রদানকারী; অরুণরূপ, অর্থাৎ পূর্ববর্তী মন্ত্রের উক্তি অনুযায়ী সূর্যসদৃশ সর্বপ্রকাশক; সুপর্ণ, অর্থাৎ স্বর্গের প্রতি গমণের হেতু বা কারণ হওয়ায় শোভন পক্ষশালী পক্ষীসদৃশ। এই হেন প্রস্তরসমূহ পালক পূর্বদিবর্তী আহবনীয়ের কারণভূত আগীর্ধে প্রবিষ্ট হচ্ছে। এই শ্বেতবর্ণ প্রস্তর দুলোকে স্থাপিত হয়ে পরমেশ্বর রূপে সংখ্যাতীত জগতের উৎপত্তিপ্রলয়রূপ কার্যসমূহ পালন করছে।–সকল সুতি ইন্দ্রবৎ পরম ঐশ্বর্যসমন্বিত অগ্নির বৃদ্ধিসাধন করছে। (কিরকম ইন্দ্ৰবৎ অগ্নি? না, সমুদ্রব্যচসং অর্থাৎ সমুদ্রের ন্যায় ব্যাপ্ত, রথীনাং রথীতমং অর্থাৎ রাজ-অমাত্যগণের মধ্যে অতিশয় রথী, বাজানাং পতিং অর্থাৎ অন্নের পালক ও সৎপতিং অর্থাৎ সৎ-পথাবলম্বী যজমানগণের পালক। প্রজা ও পশুগণের সুখ-সম্পাদক (সুখস্যাহহ্রাতা) যজ্ঞ ও অগ্নিদেব দেবগণকে আহ্বান করুন।পরম ঐশ্বর্যমুক্ত অগ্নি অন্নে নিমিত্ত আপন গ্রহণ-সামর্থ্যের দ্বারা আমাদের যজমানবৃন্দের উৎকর্ষ গ্রাহিত (অর্থাৎ প্রাপ্ত) করুন। অনন্তর ইন্দ্রবৎ পরমৈশ্বর্যযুক্ত অগ্নি আপন নিগ্রহ-সামর্থ্যের দ্বারা আমাদের আমাদের শত্রুগণকে নিগৃহীত করুন।-সকল দেবতা ব্রহ্ম-পরিবৃত সামথ্যের দ্বারা আমাদের উৎকর্ষ ও শত্রুগণের নিকর্ষ বা অবপর্ষ বর্ধন করেছেন। অনন্তর এই ইন্দ্র ও অগ্নি (ইন্দ্রাগ্নেী) সর্বতো পলায়মান আমাদের শত্রুগণকে বিনাশ করুন (মদীয়ান্বৈরিণো ব্যস্যতাং)। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকের ৬ষ্ঠ অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ৷৩৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন-অথাপ্রতিরথসূক্তমুচ্যতে। অর্থাৎ–অতঃপর এই অনুবাক-৪ ে অপ্রতিরথ-সূক্ত কথিত হয়েছে]।
মর্মার্থ– এই পরম ঐশ্বর্যযুক্ত ইন্দ্র একবারের চেষ্টায় (একপ্রযত্নেনা) শতসংখ্যক পরকীয় সেনাকে (শত্রুসৈন্যকে) জয় করেছেন। (কিরকম ইন্দ্র? না,) ইনি আশুঃ অর্থাৎ শীঘ্নকারী ও শিশানঃ অর্থাৎ অতি উগ্র। (তার দৃষ্টান্ত কি? না,) বৃষ যেমন অপর বৃষের সাথে যুদ্ধ করতে উৎসুক, সেইরকম। সেই হেন ইন্দ্র অতিশয় শত্রুগণের হিংসক বা ঘাতক, শত্রুসেনাগত মনুষ্যগণের ক্ষোভের কারক, বিপক্ষগণের ভয়ের হেতুকারক সমীচীন বা বিশেষ ধ্বনি উৎসারক, নিমেষমাত্র অসতর্ক হন না অর্থাৎ অত্যন্ত সাবধান, ও অপরের উপর নির্ভর না করে স্বয়ং একাকী যুদ্ধজয়ে সমর্থ–হে যুদ্ধার্থী মনুষ্যগণ। ইন্দ্রের দ্বারা অনুগৃহীত হয়ে তোমরা পরসৈন্যকে জয় করে বশীভূত করো, এবং বশীভূত করে তাদের বিনাশ করো। (কিরকম ইন্দ্র? না,) সংক্রন্দনেনিমিষেণ অর্থাৎ বিপক্ষগণের ভয়ের হেতুকারক সমীচীন বা বিশেষ ধ্বনি উৎসারক ও নিমেষমাত্ৰ অসতর্ক না হয়ে অত্যন্ত সাবধানী, জিষ্ণুনা অর্থাৎ জয়শীল, যুকারেণ অর্থাৎ যুদ্ধকারী, দুশ্চ্যবনেন অর্থাৎ অবিচলিত, ধৃষ্ণুনা অর্থাৎ ভীতিরহিত, ইযুহস্তেন অর্থাৎ হস্তে বাণ ইত্যাদি অস্ত্রধারী ও বৃষ্ণা অর্থাৎ কামসমূহের বর্ষণকারী।-ধনুঃ ও খঙ্গধারী আপন সৈন্যবর্গের সাথে সেই ইন্দ্ৰ ধনুঃ ও খঙ্গধারী শত্রুসৈন্যগণকে বশীভূত করে থাকেন। যোদ্ধা ইন্দ্র সহসা শত্রুসৈন্যগণের মধ্যে সম্যক মিশ্রিত বা মিলিত হয়ে তাদের জয় করে থাকেন। তিনি যজমানের যজ্ঞে সোমপান করেন। তার পর সেই বাহুবলসমম্বিত ইন্দ্র উদ্যতধনুঃ হয়ে বাণনিক্ষেপ পূর্ব শত্রুগণকে বিনাশ করে থাকেন।–হে বাক্যের পালক বা বাপতিস্বরূপ ইন্দ্র (বৃহস্পতিরিন্দ্র)! আপনি রথে আরোহিত হয়ে। সর্ব দিকে গমন করুন। (কিরকম ইন্দ্র? না, আপনি রাক্ষসগণের হন্তা, শত্রুসেনাকে অবরুদ্ধকারী, সেই শত্রুসেনাকে প্রকর্ষের সাথে ভগ্নকারী ও সর্বত্র বিজয়মান। আপনি আমাদের রথের রক্ষক হোন।-হে আমাদের জ্ঞাতিবর্গ! আপনারা এই ইন্দ্রের বীরত্ব অনুসরণ করুন; পুরত অর্থাৎ অগ্রে এই ইন্দ্ৰ বীর হোন (অর্থাৎ বীরত্ব প্রদর্শন করুন), তার পশ্চাৎ অর্থাৎ পরে আপনার বীর হবেন (অর্থাৎ বীরত্ব প্রদর্শন করুন), হে সখাগণ! ইন্দ্র অগ্রে যুদ্ধ সমারম্ভ করুন, তার পশ্চাৎ আপনারা যুদ্ধ আরম্ভ করবেন। (কিরকম ইন্দ্র? না,) এই ইন্দ্র পর্বতসমুহে পক্ষছেদনকারী (গোত্রভিং ), গাভীগণকে ভূমিতে আনয়নকারী (গোবিদং), বভ্রুবাহু (অর্থাৎ বজ্র যাঁর দুটি বাহু), শবর্গকে ভূমিরহিত করে বিজয় লাভ করেন (অজ প্রবৃণম), ও তিনি বলের দ্বারা শত্রুদের প্রকর্যের সাথে হিংসা করেন (ওজসা)।–হে ইন্দ্রদেব! আপনি জয়শীল রথে আরোহণ করুন। (আপনি কিরকম? না, আপনি বলবিজ্ঞায়, অর্থাৎ শত্রুপক্ষীয় সেনাগণের সামর্থ্য সম্পর্কে জ্ঞাত; আপনি স্থবিরঃ অর্থাৎ পুরাতন; আপনি প্রবীরঃ, অর্থাৎ বীর অপেক্ষাও বীর; আপনি সহস্বান, অর্থাৎ বলবান; আপনি বাজী, অর্থাৎ অন্নবান; আপনি সহমান, অর্থাৎ পরকে বা শত্রুকে পরাভবকারী; আপনি উগ্র, অর্থাৎ যুদ্ধে স্বভাবী; আপনি অভিতো বীরাঃ, অর্থাৎ আপনি বীরগণের দ্বারা বেষ্টিত; আপনি অভিতঃ সত্বানঃ, অর্থাৎ পরিচারক ও প্রাণীবৃন্দ সমন্বিত; আপনি সহোজা, অধিক বলশালী; আপনি রথে অধিষ্ঠিত; এবং আপনি গোবিৎ, অর্থাৎ গাভীগণকে ভূমিতে আনয়নকারী। –এই ইন্দ্র যুদ্ধে প্রকৃষ্টরূপে আমাদের সৈন্যগণকে রক্ষা করুন। (কিরকম ইন্দ্র? না,) ইনি শীঘ্র (সহসা) যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশকারী, অদায়ো অর্থাৎ দয়ারহিত বা বিপদহীন, বীর, বহুবিধ ক্রোধযুক্ত, অবিচলিত, পরকীয় সৈন্যগণের অভিভবিতা, ও কেউই তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সমর্থ হয় না (কেনাপি যুন্ধুমশকঃ)–যে সেনাগণ আমাদের অনুগ্রহের নিমিত্ত শত্রুগণের প্রতি গমন করছে, ইন্দ্র সেই সেনাগণের নেতা হোন। যে বৃহস্পতি ও দক্ষিণাদেবী, যে যজ্ঞ ও সোম, তারা একে একে এদের পুরোভাগে গমন করুন। এদের সম্বন্ধি দেবসেনাগণ শত্ৰুবলকে জয় করার নিমিত্ত মরুৎগণ সহ গমন করুক।-ইন্দ্রের রাজ্যকারক (ইন্দ্রস্য রাজ্যং কুর্বতে) কামাভিক বরুণের বল যুদ্ধে অতি তীব্র হয়ে উঠুক। যুদ্ধে স্থিরচিত্তশালী শত্ৰুবর্গকে ভূমিচ্যুত করতে সমর্থ, বিজয়শালী দেবতাবর্গের ধ্বনি সর্বতো উখিত হোক।-যুদ্ধার্থে শত্রুসেনা আগমন করলে ইন্দ্রদেব আমাদের রক্ষা করুন। সেইকালে (তদানী) আমাদের বাণগুলি মুক্ত হয়ে (অর্থাৎ নিক্ষিপ্ত হয়ে) শত্রুসেনাগণকে বিদ্ধ করুক। আমাদের যে বীরগণ আছে, তারা শত্রুসেনাগণ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট হোক। দেবগণ যুদ্ধে আমাদের রক্ষা করুন। [ইখং দশৰ্চমপ্রতিরথসূক্তং সমাপ্ত। অথ তত্রৈব বিকল্পিতাঃ পঞ্চর্চ উচ্যন্তে–অর্থাৎ এই পর্যন্ত এই দশটি ঋক্ অপ্রতিরথ সুক্ত সমাপ্ত হয়েছে। অতঃপর সেগুলির বিকল্পিত পাঁচটি ঋক্ কথিত হচ্ছে)–হে মঘবন্ ইন্দ্র! শত্রুসেনা অপেক্ষা আমাদের উৎকৃষ্ট করে আমাদের হর্ষান্বিত করুন। আমাদের প্রাণীগণকে উস্কৃষ্ট করে আমাদের হর্ষান্বিত করুন। হে বৃহ! আমাদের অশ্বগুলিকে শীঘ্রগমনের পক্ষে উৎকৃষ্টতা দান করে তাদের হর্ষান্বিত করুন; বিজয়প্রাপ্ত আমাদের রথগুলির মহাধ্বনি উদ্যত হোক (মহাধ্বনিরুগচ্ছতু)।–হে আমাদের পুরুষগণ! তোমরা শত্রুসৈন্যের প্রতি প্রকর্ষের সাথে গমন করো; তারপর বিজয়প্রাপ্ত হও;তোমাদের স্বকীয় প্রহরণগুলি (অস্ত্রগুলি) স্থির হোক। তোমরা যাতে কারও দ্বারা তিরস্কৃত না হও, সেইভাবে ইন্দ্র তোমাদের সুখ প্রদান করুন।–হে শরব্য (হিংসিকা হেতিঃ শরব্যা–অর্থাৎ হেতি নামক হিংসক অস্ত্র)! মন্ত্রের দ্বারা (ব্ৰহ্মণা সংশিতা) তীক্ষ্ণীকৃত হয়ে তুমি আমাদের দ্বারা মুক্ত (অর্থাৎ নিক্ষিপ্ত) হয়ে শত্রুসেনার মধ্যে পতিত হও; পতিত হয়ে শত্রুকে প্রাপ্ত হও; প্রাপ্ত হয়ে শত্রুর শরীরের মধ্যে প্রবেশ করো; এবং প্রবেশ করে এমনভাবে তাদের বিনাশ করো, যাতে তাদের কোন পুরুষ না অবশিষ্ট (বা জীবিত) থাকে।–হে যজমান! তোমার মর্মসমূহ কবচের দ্বারা আচ্ছাদিত করছি। সোম রাজা দেহের মধ্যে ১০৭টি মর্ম বা মর্মস্থান থাকে। মর্মের মধ্যে প্রাণ বিশেষভাবে অবস্থিতি করে। মাংসে ১১, অস্থিতে ৮, সন্ধিতে ২০, স্নায়ুতে ২৭, এবং শিরায় ৪১ টি মর্ম থাকে।মর্ম পাঁচ প্রকার; যথা-(১) সদ্যঃ প্রাণহর (এতে আঘাত লাগলে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে; এর সংখ্যা ১৯); (২) কালান্তর-প্রাণহর (এটা আহত হলে কিছুদিন পরে মৃত্যু ঘটে; এর সংখ্যা-৩৩); (৩) বৈকল্যকর (এতে আঘাত লাগলে অঙ্গ বিকল হয়ে যায়; এর সংখ্যা-৪৪); (৪) পীড়াকর (এটি আহত হলে পীড়া জন্মে; এর সংখ্যা-৮); (৫) বিশল্যপ্ন (এতে শল্য ইত্যাদি বিদ্ধ হলে তা উৎপাটনমাত্র মৃত্যু হয়; এর সংখ্যা-৩)। তোমাকে অমৃত বা মরণনিবারক কোনও কবচের দ্বারা আচ্ছাদিত করুন। তোমার ধনসমূহ অন্য সকল অপেক্ষা অধিক হোক। বিজয়প্রাপ্ত দেববর্গ অনুকুল হয়ে তোমাকে হর্ষান্বিত করুন। মুণ্ডিতমস্তক বা বিশীর্ণকেশ (শুষ্ককেশবিশিষ্ট) অত্যন্ত চঞ্চল বালকের মতো (বালাশ্চপলাঃ) ইতস্ততঃ ভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে বাণগুলি পতিত হচ্ছে, সেই যুদ্ধে শত্রুপক্ষের সকল প্রাণীর ঘাতক (পরকীয়সৰ্বপ্ৰাণিঘাতী) বিশেষতঃ বৈরিঘাতী হয়ে এই ইন্দ্রদেব শত্রু বিনাশপূর্বক আমাদের সুখ প্রদান করুন। (এই মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকের ৬ অনুবাকের কিছু মন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥৪৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন-পঞ্চমেহগ্নিস্থাপনমুচ্যতে। অর্থাৎ–এই পঞ্চম অনুৰাকে অগ্নিস্থাপনের বিষয় উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- হে অগ্নিদেব! প্রকৃষ্টভাবে পূর্বদিক সম্পর্কে বিদিত হয়ে আপনি অনুক্রমে (পরপর প্রতিটি দিকে) প্রবেশ করুন। ইষ্টকা-নিম্পাদিত চিতিরূপ বহ্নির মধ্যে আপনি মুখ্য; (যেহেতু আপনি পূর্ব দিকে স্থাপিত)। সকল দিকেও বিশেষভাবে প্রকাশিত করে আপনিও প্রকাশিত হোন। আমাদের দ্বিপদ মনুষ্য ও চতুষ্পদ প্রাণীগণকে অন্ন দান করুন।–হে ঋত্বিক ও যজমানগণ! স্বর্গসাধন (অর্থাৎ স্বর্গপ্রাপ্তির সাধনভূত) উখায় পূর্বে সম্পাদিত এই অগ্নি হস্তের দ্বারা ধারণ করে পদের দ্বারা বিক্ষিপ্ত করুন (পাদান বিক্ষিপত)। তারপর আকাশের উপরে বর্তমান স্বর্গলোক প্রাপ্ত হয়ে দেবতাগণের সাথে একীভূত হয়ে উপবেশন করুন। আমি, অর্থাৎ এই যজমান, পৃথিবী হতে উত হয়ে অন্তরিক্ষে আরূঢ় হচ্ছি, তারপর সেই অন্তরিক্ষলোক হতে উগত হচ্ছি। তারপর দুঃখরহিত যে প্রদেশ সেই দুলোক-সম্বন্ধি প্রদেশের উর্ধ্বে স্বর্গলোকে আদিত্যরূপ জ্যোতির্মণ্ডল আমি প্রাপ্ত হবো।যে যজমানগণ সুষ্ঠুভাবে কর্মের অনুষ্ঠান প্রকার জ্ঞাত হয়ে (জানস্তো) সর্ব জগতের ধারণের হেতুকর যে অগ্নির বিস্তার করে থাকেন, সেই যজমানগণ দ্যুলোকে আরোহণ করেন; তারপর দ্যাবাপৃথিবীর ঊর্ধ্বে স্বর্গনিবাস আদিত্যমণ্ডল প্রাপ্ত হন, তাদের আর কোনও স্থানের অপেক্ষা থাকে না, (অর্থাৎ শেষপর্যন্ত যখন তারা আদিত্যমণ্ডলে স্থাপিত হন, তখন আর কোন লোক প্রাপ্তির প্রয়োজন থাকে না)।–হে অগ্নি! আপনি দেবতাগণের কৃপাকাঙ্ক্ষী যজমানবৃন্দের উপকারের নিমিত্ত অগ্রভাগে গমন করুন। আপনি দেবতা ও মনুষ্যগণের চক্ষুস্থানীয়। ইহাজগতে (লোকে) গমনকারী পুরুষের দৃষ্টি পুরোভাগে গমন করে। যাগ করতে ইচ্ছুক (যমিচ্ছন্তো) যজমানগণ যজ্ঞানুষ্ঠানরত ভৃগুনামক মুনিগণের সমান প্রিয় হয়ে কর্মক্ষমরূপে (অর্থাৎ যজ্ঞকর্ম অনুষ্ঠান করে) স্বর্গে গমন করুন। রাত্রি ও দিবস (নক্তষাসা) যথাক্রমে কৃষ্ণবর্ণা ও শুক্লবর্ণ হয়ে (বিরুপে) পরস্পর ঐক্যমত্যযুক্ত হয়ে সমীচীনভাবে শিশুরূপ অগ্নিকে ধারণ করে যজমান কর্ক অগ্নিধারণকর্ম সম্পন্ন করছে। দ্যুলোক ও ভূলোকের মধ্যবর্তী অন্তরিক্ষলোক আলোকিত করে (রোমান) অগ্নি বিশেষভাবে প্রকাশ পাচ্ছেন। ক্রীড়াপরায়ণ দেবগণ ও প্রাণসমূহ যেমন যাগের দ্বারা ধনরূপ ফল প্রদান করেন, সেইরকমে যজমানের প্রাণ এই অগ্নিকে ধারণ করেছে (যজমানস্য প্রাণা অগ্নিমেতং ধৃতবন্ত)। হে অগ্নিদেব! আপনার সহস্র (অপরিমিত) চক্ষু, শত (অপরিমিত) মস্তক, অপরিমিত প্রাণ, অপান আছে। আপনি অপরিমিত ধনের প্রভু; সেইরকম আপনাকে অন্নসিদ্ধির নিমিত্ত পরিচর্যা করছি, স্বাহা মন্ত্রে আপনাকে হবিঃ সমর্পণ করছি।–হে অগ্নিদেব! আপনি পক্ষীর আকার সম্পন্ন গরুড়ের সমান, আপনি এই চিতিরূপা পৃথিবীতে বা পৃথিবীর উপরে উপবেশন করুন। আপনি আপনার আপন প্রকাশের (দীপ্তির) দ্বারা অন্তরিক্ষলোককে সর্বত পূর্ণ করুন, আপন সামর্থ্যে (জ্যোতিষা) দুলোককে স্তম্ভিত করুন, তারপর আপন তেজে বা সামর্থ্যে পূর্ব ইত্যাদি দিক সমূহকে উৎকর্ষের সাথে দৃঢ় করুন।–হে অগ্নিদেব! আপনি যজ্ঞে আহূত হয়ে সুমুখে বা শোভন মুখসম্পন্ন হয়ে পূর্ব দিকে আপনার স্বীকার স্থান প্রাপ্ত হয়ে উপবেশন করুন।–হে বিশ্বদেবগণ ও যজমানবৃন্দ! আপনারা এই পুরোবর্তী উৎকৃষ্ট স্থানে অগ্নির সাথে উপবেশন করুন।–হে অগ্নিদেব! পূর্বেরই মতো আপনি দীপ্ত হয়ে পুনরায় আমাদের সম্মুখে (পুরোদেশে) নিরন্তর সূর্মিসমান (অর্থাৎ জ্বলন্ত লৌহময়ী স্কুণা বা প্রতিমার ন্যায়) জ্বালার সাথে দীপ্ত হোক। হে যুবতম অগ্নিদেব! অন্নসমূহ আপনাকে নিকটে প্রাপ্ত হচ্ছে।–হে অগ্নিদেব! আপনার পরম উৎপত্তিস্থান সমূহকে (অর্থাৎ যে উৎকৃষ্ট ভূমি সমুহে আপনার উৎপত্তি, সেই ভূমিকে) আমরা জ্ঞানের দ্বারা পরিচর্যা করছি; আপনার যে নিকৃষ্ট ভূমিতে জন্ম, সেই ভূমিকে আমরা স্তোত্রের দ্বারা পরিচর্যা করছি; ইষ্টকায় বা চিতিরূপ যে স্থানে আপনার আবির্ভাব হয়, সেই স্থানকে আমরা পূজা করছি। সমিধের দ্বারা সম্যক প্রজ্বলিত আপনার উদ্দেশে ঋত্বিকগণ হবিঃ দ্বারা প্রকর্ষের সাথে যজ্ঞ করেন।–পুরাকালে কোন সময়ে কথ নামক মহর্ষি যেমন এই অগ্নির শোভন বুদ্ধির (কৃপার) সৌজন্যে অভীষ্ট ফল প্রাপ্ত হয়েছিলেন, সেইরকম শোভন বুদ্ধি আমি প্রার্থনা করছি। (কিরকম শোভন বুদ্ধি? না, স্বাপেক্ষিত বহুবিধ ফল প্ৰাদনে এবং জগতের উৎপাদনে সমর্থ সুমতি বা শোভন বুদ্ধি।–হে অগ্নিদেব! আপনার প্রিয় সমিধ সপ্ত প্রকার (যথা–অশ্বত্থ, উদুম্বর, পলাশ, শমী, বিকঙ্কত বা বৈঁচি, অশনিহত বা বজ্রাহত বৃক্ষ ও পুষ্করপর্ণ বা পদ্মপত্র); আপনার প্রিয় জ্বালামালারূপ সপ্ত জিহ্বা (যথা-কালী, করালী, মনোজবা, সুলোহিতা, সুধুম্রবর্ণা, ফুলিঙ্গিনী ও বিশ্বরুচী); আপনার প্রিয় সপ্ত মহর্ষি (যথা–বশিষ্ঠ, ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য, অঙ্গিরাঃ, অত্রি ও মরীচি); আপনার প্রিয় সপ্ত ধাম বা স্থান (যথা–আহবনীয়, গার্হপত্য, দক্ষিণাগ্নি, সভ্যা, অবসথ্য, জহিত ও আগ্নী)। সেই রকম আপনার প্রিয় সপ্ত হোতা বা হোমকর্তা (যথা–বষকর্তা, হোতা, প্রশাস্তা, ব্রাহ্মণাচ্ছংসী, পোতা, নেষ্টা ও অচ্ছাবাক) আপনার উদ্দেশে আপনার প্রিয় সপ্ত স্থানে যজ্ঞানুষ্ঠান করছেন; আপনি আপনার প্রিয় সপ্ত উৎপত্তিস্থানগুলি (অর্থাৎ আহবনীয় গার্হপত্য ইত্যাদি প্রিয় ধাম বা স্থানগুলিকে) ঘৃতের দ্বারা পূর্ণ করে দিন। [ঈঙচান্যাদৃঙচৈতাদৃঙ চ ইত্যাদি অবশিষ্ট মন্ত্রসমূহ মরুগণের পঞ্চগণের নামোল্লেখিত হয়েছে। এগুলি পূর্বে ব্যাখ্যাত ] [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ অনুবাকের ৭ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশিষ্ট] ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন-ষষ্ঠেহনুবাকেহশ্বমেধক রথসজ্জাকরণভাবিনী কবচস্বীকারাদীন্যঙ্গানুচ্যন্তে। অর্থাৎ এই অনুবাক-৬ ে অশ্বমেধ যজ্ঞকর্তার কবচ স্বীকার (গ্রহণ) ইত্যাদি অঙ্গগুলি উক্ত হয়েছে ]
মর্মার্থ– যখন (যদ্যদা) বর্মী অর্থাৎ কবচযুক্ত (অর্থাৎ বর্মধারী) রাজা যুদ্ধের উদ্দেশে শত্রুগণের সম্মুখে উপস্থিত হন, তখন মাসবশতঃ তাঁর মুখ মেঘের মতো (অন্ধকার) দেখায়। উভয়পক্ষের সৈন্যগণ যুদ্ধের নিমিত্ত মিলিত হলে বিপুল মেঘ যেমন অন্তরিক্ষলোককে ব্যাপ্ত করে, সেই রকম ভূমি ব্যাপ্ত হয়। সেই কালে, হে রাজন! শত্রুর প্রহার রহিত (পরকীয়প্রহাররহিতয়া) আপন শরীরের দ্বারা আপনি বিজয় প্রাপ্ত হোন, এই কবচের সেই মহিমা আপনি পালন করুন। আমরা ধনুর দ্বারা শত্রুর গো-ইত্যাদি আহরণ করব; আমরা ধনুর দ্বারা যুদ্ধ জয় করব; সেইভাবে আমরা ধনুর দ্বারা মদমত্ত (মদসহিতাঃ) শত্রুসেনাগণকে জয় করব। এই ধনু আমাদের বৈরিগণের কামনা (অর্থাৎ আমাদের বিনাশ করার আকাঙ্ক্ষা) শূন্য (বা ব্যর্থ করে দিক, এই ধনুর দ্বারা আমরা সর্বদিক্বর্তী শত্রুগণকে জয় করব। [পরবর্তী মন্ত্রগুলি শুক্লযজুর্বেদের ২৯শ অধ্যায় ব্যাখ্যাত। যেমন ব্যতীবেদা মন্ত্রটি ৪০শ মন্ত্রে, তে আচরন্তী মন্ত্রের ৪১শ মন্ত্রে এবং বীনাং পিতা থেকে আহমুরজ প্রত্যাবর্তয়েমাঃ মন্ত্রের ব্যাখ্যা যথাক্রমে ৪২শ থেকে ৫৭শ পর্যন্ত মন্ত্রসমূহে প্রাপ্তব্য॥৬৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমাদ্যনুবাকত্রয়ে হোমোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই সপ্তম ইত্যাদি (অষ্টম ও নবম) অনুবাকে হোমমন্ত্র উক্ত হয়েছে। এই হোমমন্ত্রগুলি অশ্বস্তোমীয় মন্ত্র নামে অভিহিত। এই অনুবাকে সেই অশ্বস্তোম প্রতিপাদক কতকগুলি মন্ত্র উক্ত হয়েছে ]
মর্মার্থ- হে অর্ব অর্থাৎ অশ্ব! যে স্থান হতে উৎপাদিত হয়ে তুমি প্রথম ক্রন্দনাকুল (ক্রন্দিতবা) হয়েছিলে, অর্থাৎ আমি অগ্নির সাধন বলে মহতী শব্দ করেছিলে, সেই কারণে তোমার জন্মস্থান মহৎ, সেই কারণে তুমি সকলের দ্বারা স্তোতব্য (স্ততির যোগ্য হয়েছিলে। (উৎপদ্যমানতা বিশদীকৃত হচ্ছে)–সমুদ্র হতে বা সমুদ্র-উপলক্ষিত জল হতে তোমার উৎপত্তি; (শ্রুতিতে বলা হয়েছে-অঙ্গুযযানিৰ্বা অশ্ব); অথবা লৌকিক দৃষ্টিতে পুরীষাৎ অর্থাৎ পুরুষশক্তিসম্পন্ন মহান্ অশ্ব হতে তুমি উৎপাদিত হয়েছে। (জন্মের উপস্তুতি)-শ্যেনস্য পক্ষা হরিণস্য বাহু অর্থাৎ শ্যেনপক্ষীর দুটি পক্ষ যেমন শীঘ্র উড্ডীয়মান হওয়ার কারণে সকলের স্তুতিযোগ্য, কিংবা হরিণের দুটি বাহু ও দুটি পদ (মোট চতুষ্পদ) যেমন শীঘ্র গমনের নিমিত্ত সকলের স্তুতিযোগ্য, সেই রকমই হে অশ্ব! তুমি সকলের দ্বারা স্তুতিযোগ্য হয়েছি। [পরবর্তী মন্ত্রগুলি; যথা–যমেন দত্তং ত্রিত থেকে উপ প্রাগাৎপরমং পর্যন্ত মোট বারোটি ঋকের ব্যাখ্যা শুক্লযজুর্বেদের ২৯শ অধ্যায়ের ১৩শ থেকে ২৪শ মন্ত্রে বিধৃত] ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমেইনুবাকেহশ্বস্তোমীয়মন্ত্ৰা কেচিদুক্তাঃ অগাষ্টমে ত এবান্যে কেচিদ্যুচ্যন্তে। অর্থাৎ-অনুবাক-৭ ে যেমন কতকগুলি অশ্বস্তোমীয় মন্ত্র উক্ত হয়েছিল, এই অনুবাক-৮ ে তেমনই আরও কতকগুলি উক্ত হয়েছে ]
মর্মার্থ– এই যজ্ঞে অন্নসাধনের উদ্দেশে আমরা অশ্বের সামর্থ্য প্রকর্ষের সাথে কীর্তন করছি, তার জন্য মিত্রদেব, বরুণদেব, অর্যমা বা সূর্যদেব, ইন্দ্রদেব, প্রজাপতিদেব, মরুৎদেব আমাদের যেন নিন্দা না করেন, কারণ সেই অশ্ব দেবতাগণের নিমিত্ত উৎপন্ন। [পরবর্তী দশটি মন্ত্র অর্থাৎ যনির্নির্জা রেসা থেকে যত্তে গাত্ৰাদগ্নিনা পর্যন্ত ঋক্ শুক্লযজুর্বেদের ২৫শ অধ্যায়ের ২৫শ থেকে ৩৪শ মন্ত্রে ব্যাখ্যাত ] ৮
মন্ত্র- যে বাজিনং পরিপশ্যন্তি পকৃং য ঈমাহুঃ সুরভিনিৰ্হরেতি। যে চার্বতো মাংসভিক্ষামুপাসত উতো তেমভিগুৰ্ত্তিন ইন্বতু। যীক্ষণং মাংস্পচন্যা উখায়া যা পাত্রাণি যুষ্ণ আসেচনানি। উষ্মণ্যাহপিধানা চরণামকাঃ সুনাঃ পরি ভূষ্যম। নিক্রমণং নিষদনং বিবর্তনং যচ্চ পীশমৰ্বতঃ। যচ্চ পপৌ যচ্চ ঘাসিম জঘাস সব্বা তা তে অপি দেবেম্ব। মা ত্বাইগ্নিপময়িধুমগন্ধিৰ্ম্মোখা ভ্রাজ্যভি বিক্ত জখ্রিঃ। ইষ্টং বীতমভিগুৰ্তং বষট্কৃতং তং দেবাসঃ প্রতি গৃভণষ্য। যদশায় বাস উপণ্যধীবাসং যা হিরণ্যান্যশ্মৈ। সন্দানমন্তং পড়বীশং প্রিয়া দেবে যাময়ন্তি। যত্তে সাদে মহসা শুকৃতস্য পার্ফিয়া বা কশয়া বা তুতোদ। সুচেব তা হবিষো অধ্বরেষু সৰ্বা তা তে ব্ৰহ্মণা সূদয়ামি। চতুস্ত্রিংশদ্বাজিনো দেববন্ধোবীরশ্বস্য স্বধিতিঃ সমেতি। অচ্ছিদ্রা গাত্ৰা বয়ুনা কৃপোত পুরস্পরুরনুঘুষ্যা বি শস্ত। একঞ্জুরশ্বস্যা বিশস্তা দ্বা যারা ভবতন্তখণ্ডুঃ। যা তে গাত্ৰাণামৃতুথা কৃগামি তাতা পিণ্ডানাং প্র জুহোম্যগ্নেী। মা ত্বা তপৎ প্রিয় আত্মাহপিয়ং মা স্বধিতিশুনুব আ তিষ্ঠিপত্তে। মা তে গৃধ্রুরবিশস্তাতিহায় ছিদ্রা গাত্ৰাণ্যসিন্য মিথু কষ্ট। ন বা উবেতম্বিয়সে। ন রিষ্যসি দেবাং ইদেমি পথিভিঃ সুগেভিঃ। হরী তে যুঞ্জা পৃষতী অভূতামুপাস্থাদ্বাজী ধুরি রাসভস্য। সুগব্যং নো বাজী স্বশ্বিয়ং পুংসঃ পুত্ৰান্ উত বিশ্বাপূষং রয়িম্।। অনাগাস্তাং নো অদিতিঃ কৃপোতু ক্ষং নো অশ্বে বনতাং হবিষ্মন্ ॥৯৷৷
মর্মার্থ— যিনি এই অশ্বের (অর্থাৎ অমাংসের) পাক (রন্ধন) সাদরে দর্শন করেছেন, যিনি এই পক্কমান অশ্বের (অর্থাৎ রন্ধিত অশ্বমাংসের) সৌরভ প্রাপ্ত হয়েছেন, অধিকন্তু অপর যাঁরা এই অশ্বমাংস প্রাপ্তির নিমিত্ত প্রার্থনা করেছেন, তাঁদের সকলের সংকল্প আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোক। [পরবর্তী দশটি মন্ত্র অর্থাৎ যন্নীক্ষণং মাংস্পচন্যা থেকে সুগব্যং নো বাজী পর্যন্ত ঋক্ শুক্লযজুর্বেদের ২৫শ অধ্যায়ের ৩৬শ থেকে ৪৫শ মন্ত্রে ব্যাখ্যাত] ॥৯॥
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬০
অনুবাক-৬০
মন্ত্র- অগ্নাবিষ্ণু সজোষসেমা বর্ধন্তু বাং গিরঃ। মৈৰ্ব্বাজেভিরা গতম্। বাজশ্চ মে প্রসব মে প্রতিশ্চ মে প্রসিতিশ্চ মে ধীতিশ্চ মে ক্রতুশ্চ মে স্বরস্ট মে শ্লোকশ্চ মে শ্রাবণ্ট মে শ্রুতিশ্চ মে জ্যোতিশ্চ মে সুবশ্চ মে প্রাণশ্চ মেহপানঃ চ মে ব্যানশ্চ মেহসুশ্চ মে চিত্তং চম আধীতং চ মে বাক চ মে মনশ্চ মে চক্ষুশ্চ মে শ্রোত্রং চ মে দক্ষশ্চ মে বলং চ ম ওজশ্চ মে সহশ্চম আয়ুশ মে জরা চ ম আত্মা চ মে তনুশ্চ মে শৰ্ম চ মে বৰ্ম্ম চ মেহঙ্গানি চ মেহস্থানি চ মে পরূংষি চ মে শরীরাণি চ মে ॥১॥
[এই প্রপাঠকের দ্বাদশ অনুবাকের সূচনায় আচার্য সায়ণ বলেন–এতৈরেকাদশভিরনুবাকৈর্বসো ধাররাহোমঃ উক্তঃ। সেই অনুসারে এই অনুবাক-১
থেকে একাদশ অনুবাক পর্যন্ত বসোর্ধারা হোমের বিষয় উক্ত হয়েছে, ধরা যায়।]
মর্মার্থ- হে অগ্নাবিষ্ণু (অর্থাৎ অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব)! আপনারা সমান প্রীতিসম্পন্ন হোন। আপনাদের উদ্দেশে নিবেদিত এই স্তুতিরূপ বাক্যসমূহ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হোক। আপনারা ধন ও অন্নের যুক্ত হয়ে এই স্থানে আগত হোন।-(অতঃপর একাদশ অনুবাক পর্যন্ত অনুবাকভেদে সংযুক্ত পৃথক মন্ত্র কথিত হচ্ছে। তারমধ্যে অনুবাক-১
ের মন্ত্র)–আপনারা আমার অন্ন সম্পাদন করুন (সম্পদ্যতা); আপনারা আমার অন্নের অনুজ্ঞান সম্পাদন করুন (প্রসবো অর্থাৎ অন্নের অনুজ্ঞান); আপনারা আমার শুদ্ধি (প্রতিঃ) সম্পাদন করুন; আপনারা আমার অন্নবিষয়ক ঔসুক্যবর্ধন (প্রসিতি) সম্পাদন করুন; আপনারা আমার অন্নধারণ (ধীতিঃ) সম্পাদন করুন; আপনারা আমার অন্নহেতু যজ্ঞ (ক্রঃ) সম্পাদন করুন; আপনারা আমার মন্ত্রগত উদাত্ত ইত্যাদি স্বর সম্পাদন করুন; আপনারা আমার স্তুতি (শ্লোকঃ) সম্পাদন করুন। এইভাবে আপনারা আমার শ্রবণ-করাবার সামর্থ্য (শ্রাবঃ); আমার শ্রবণ করার সামর্থ্য (শ্রুতিঃ); আমার প্রকাশ (জ্যোতিঃ); আমার স্বর্গ (সুবঃ), আমার প্রাণ-অপান-ব্যানরূপ বায়ুবৃত্তিবিশেষকে (মে প্রাণশ্চ মেহপানং চ মে ব্যানশ্চ মেহসুশ্চ); আমার মনোজন্য জ্ঞান (তিত্তং), সেই জ্ঞানের দ্বারা সর্বদা বিষয়ীকৃত দ্রব্য (আধীতং); আমার বাক্য-মর্ম-চক্ষু-শ্রোত্র, আমার জ্ঞানেন্দ্রিয়গত কৌশল (দঃ), আমার কর্মেন্দ্রিগত সামর্থ্য (বলং), আমার বলের হেতুকারক অষ্টম ধাতু (ওজঃ), বৈরিবিষয়ক অভিভব করার শক্তি (সহঃ), আমার আয়ু, আমার বলীপলিত ইত্যাদি পর্যন্ত আয়ু অর্থাৎ পূর্ণ আয়ু (জরা), আমার শাস্ত্রপ্রসিদ্ধ পরমাত্মা (আত্মা), আমার শোভনসন্নিবেশ বপু (তনুঃ), আমার সুখ (শর্ম), আমার? শরীররক্ষক কবচ ইত্যাদি (বর্ম), আমার সম্পূর্ণ অবয়ব (অঙ্গানি), আমার অস্থিসমূহ যথাস্থানে স্থিতি (অস্থানি), আমার অঙ্গুলি ইত্যাদির পর্ব বা সন্ধিসমূহ (পরূংষি) এবং পূর্বে অনুক্ত হস্ত, পদ, ইত্যাদি আমার শরীরের অবয়বগুলি আপনারা সম্পন্ন করুন ॥১॥
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬১
অনুবাক-৬১
মন্ত্র- মধুশ্চ মাধবশ্চ বাসন্তিকাবৃতু শুক্রশ্চ শুচিশ্চ গ্রৈবৃতু নভশ্চ নভস্য বার্ষিকাবৃতু ইষশ্চোর্জশ্চ শারদাবৃতু সহ সহস্যশ্চ হৈমন্তিকাবৃতু তপশ্চ তপস্যশ্চ শৈশিরাবৃতু অগ্নেরন্তশ্লেষোহসি কল্পেং দ্যাবাপৃথিবী কল্পশ্যামাপ ওষধীঃ কল্পন্তামগ্নয়ঃ পৃথম জ্যৈষ্ঠ্যার সব্রতাঃ। যেহগ্নয়ঃ সমনসোহরা দ্যাবাপৃথিবী শৈশিরাবৃতু অভিকল্পমানা ইন্দ্ৰমিব দেবা অভি সং বিশন্তু সংযচ্চ প্রচেতাশ্চাগ্নেঃ সোমস্য সূৰ্য্যশস্যাগ্রা চ ভীমা চ পিতৃণাং যমেস্যেন্দ্রস্য বা চা পৃথিবী চ দেবস্য সবিতুৰ্ম্মরুতা বরুণস্য ধর্তী চ ধরিত্রীচ মিত্রাবরুণয়োৰ্ম্মিস্য ধাতুঃ প্রাচী চ প্রতীচী চ বসুনাং রুদ্রণা আদিত্যানাং তে তেহধিপতয়স্তেভ্যা নমস্তে নো মৃড়য়ন্তু তে যং দ্বিগ্নে যশ্চ নো দ্বেষ্টি তং বো জঙে দধামি সহস্ৰস্য প্রমা অসি সহস্ৰস্য প্রতিমা অসি সহসা বিমা অসি সহস্রস্যোম্মা অসি সাহম্রোহসি সহায় মো মে অগ্ন ইষ্টক ধেনবঃ সকো চ শতং চ সহস্রং চাযুতং চ নিযুতং চ প্রযুতুম চাবুদং চ ন্যৰ্ব্বদং চ সমুদ্রশ্চ মধ্যং চান্তশ্চ পৰ্দ্ধশ্চেমা মে অগ্ন ইষ্টক ধেনবঃ সন্তু যষ্টিঃ সহমযুতমক্ষীয়মাণা ঋতস্থাঃ স্থৰ্ত্তাবৃধো ঘৃতশ্রুততা মধুচুত ঊজ্জতীঃ স্বধাবিনীতা মে অগ্ন ইষ্টকা ধেনবঃ সন্তু বিরাজো নাম কামদুঘা অমুত্ৰামুষ্মিল্লোকে ॥১১৷৷ মর্মার্থ–মধু ও মাধব অর্থাৎ চৈত্রমাস ও বৈশাখমাস–এই দুই মাস বসন্ত ঋতু (বসন্ত সম্বন্ধিনাবৃত্ববয়বৌ)। শুক্র ও শুচি অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠমাস ও আষাঢ়মাস–এই উভয় মাস গ্রীষ্ম ঋতু। নভঃ ও নভস্য অর্থাৎ শ্রাবণ ও ভাদ্র-এই উভয় মাস বর্ষা ঋতু। ইষ (আশ্বযুজঃ) ও উর্জঃ অর্থাৎ আশ্বিন মাস ও কার্তিকমাস–এই উভয় মাস শরৎ ঋতু। সহহ (মার্গশীর্ষ) ও সহস্যঃ (পৌষ) অর্থাৎ অগ্রহায়ণ ও পৌষ–এই উভয় মাস হেমন্ত ঋতু। তপো ও তপস্যঃ অর্থাৎ মাঘমাস ও ফাল্গুনমাস এই উভয়মাস শিশির বা শীত ঋতু।-(বসন্তে দুটি ইষ্টকায় প্রথম চিতি (অগ্নি)-র উপধান কর্তব্য, গ্রীষ্মে দুটি ইষ্টকায় দুটি চিতির উপধান করণীয়, বর্ষায় ও শরতে চারটি ইষ্টকাম মধ্যম চিতির উপধান কর্তব্য, হেমন্তে দুটি ইষ্টকায় চতুর্থ চিতির উপধান করণীয়, শীতে দুটি ইষ্টকায় পঞ্চম চিতির উপধান কর্তব্য)। সকল ঋতুরই অনুষঙ্গে এই মন্ত্রশেষ পাঠনীয়–হে ঋতুবিশেষ! তুমি চীয়মান অগ্নির অন্তঃশ্লেষ হও (অন্তঃশ্লেষোহসি)। যজমানের উৎকর্ষের নিমিত্ত দ্যাবাপৃথিবী আপন উচিত উপকার সম্পাদন করুন (স্বাচিতমুপকারং সম্পাদয়তা)। (শুক্ল যজুর্বেদের ১৩শ অধ্যায়ের ২৫শে মন্ত্র দ্রষ্টব্য)। [পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকের ২য় অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে এই মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥১১। [সায়ণাচার্য বলেন–একাদশানুবাক……উক্তাঃ। তাবতা চিতয়ঃ সমাপ্তাঃ। অথান্তিমে দাদশে যাজানুবাক্যা উচ্যন্তে। অর্থাৎ, একাদশ অনুবাকে ঋতু নামক ইষ্টকার বিষয় কথিত হয়েছে। সেই পর্যন্ত চিতি সম্পর্কিত বিষয় সমাপ্ত। অতঃপর শেষে এই দ্বাদশ অনুবাকে যাজ্যা ও অনুবাক্যার মন্ত্র কথিত হয়েছে]
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬২
অনুবাক-৬২
মন্ত্র- জ্যৈষ্ঠ্যং চ ম আধিপত্যং চ মে মোশ মে ভামর্শ মেহমশ্চ মেহন্তশ্চ মে জেমা চ মে মহিমা চ মে বরিমা চ মে প্রথিমা চ মে বৰ্মা চ মে দ্রাঘুয়া চ মে বৃদ্ধং চ মে বৃদ্ধিশ্চ মে সত্যং চ মে শ্রদ্ধা চ মে জগচ্চ মে ধনং চ মে বশশ্চ মে বৃষিশ্চ মে ক্রীড়া চ মে মোশ্চ মে জাতং চ মে জনিষ্যমাণং চ মে সূক্তং চ মে সুকৃতং চ মে বিত্তং চ মে বেদ্যং চ মে ভূতং চ মে ভবিষ্যচ্চ মে সুগং চ মে সপথং চ ম ঋদ্ধং চ ম ঋদ্ধিশ্চ মে কুপ্তং চ মে কুপ্তিশ্চ মে মতিশ্চ মে সুমতিশ্চ মে ॥২৷৷ [বসোর্ধারা হোমমন্ত্র।]
মর্মার্থ- (হে অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব! আপনারা সমান প্রীতিসম্পন্ন হোন। আপনাদের উদ্দেশে নিবেদিত এই স্তুতিরূপ বাক্যসমূহ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হোক)। আপনারা আমার প্রশস্ততমত্ব (জৈষ্ঠ্যঃ) সম্পাদন করুন। সেইভাবে আপনারা আমার স্বামিত্ব (আধিপত্যং); আমার বাহ্যিক ক্রোধ (মন্য); আমার অন্তরস্থ বিশেষ ক্রোধ বা ক্ষোভ (ভাম); আমার অপ্রমেয়ত্ব (অমঃ); আমার শৈত্য ও মাধুর্যোপেত জল (অম্ভঃ); আমার জয়সামর্থ্য (জেমা); আমার মহত্ব অর্থাৎ জয়ের দ্বারা লব্ধ ধন ইত্যাদি সম্পত্তি (মহিমা); আমার বরণীয়ত্ব বা পূজ্যত্ব; আমার গৃহ ক্ষেত্র ইত্যাদির বিস্তার (প্রথিমা); আমার পুত্র পৌত্র ইত্যাদি বিষয়ক অবিচ্ছিন্ন সন্ততি, অর্থাৎ দীর্ঘকালস্থায়ী বংশধরগণের উৎপত্তি (দ্রাঘুয়া); আমার প্রভূত অন্ন ও ধন (বৃদ্ধং); আমার বিদ্যা ইত্যাদি গুণসমূহের উৎকর্ষ (বৃদ্ধিঃ); আমার যথার্থ ভাষণ (সত্যং); আমার পরলোকের অস্তিত্ব সম্পর্কিত বুদ্ধি বা অস্তিকতা (শ্রদ্ধা); আমার জঙ্গম ও অজঙ্গম বা স্থাবরাত্মক জগৎ; আমার সুবর্ণ ইত্যাদি (ধনং); আমার সর্বরকমের স্বাধীনত্ব (বশঃ), আমার শরীরকান্তি (ত্বিমিঃ); আমার অক্ষ বা দুত ইত্যাদি ক্রীড়া; ঐ ক্রীড়া সম্পর্কিত আমার হর্ষ (মোদস্তজ্জনন্যা); আমার পূর্বসিদ্ধ পূর্বজাত. অপত্য (জাতং); আমার ভাবীকালের অর্থাৎ ভবিষ্যতে জন্মগ্রহণ করবে এমন অপত্য (জনিয্যমাণং); আমার ঋক্ বা মন্ত্ৰসমূহ (সূক্তং); আমার সেই ঋমুদায়ের অপূর্বত্ব (সুকৃতং); আমার পূর্বলব্ধ ধন (রিত্তং); আমার পরে লন্ধব্য দ্রব্যজাত (বেদ্যং); আমার পূর্বসিদ্ধ অর্থাৎ পুর্বে লব্ধ ক্ষেত্র ইত্যাদি (ভূতং); আমার ভবিষ্যতে লব্ধব্য সম্পদ (ভবিষ্যৎ); আমার সুষ্ঠু গন্তব্য বন্ধুজনযুক্ত গ্রামান্তর ইত্যাদি (সুগং), অর্থাৎ গ্রামান্তরে যে বন্ধুজন আছেন তাদের নিকট সুষ্ঠুভাবে গমনের উপযযাগিতা; চোর ইত্যাদি রহিত বা শূন্য মার্গ (সুপথং); আমার ধন ইত্যাদি বা অনুষ্ঠিত কর্মফলের বৃদ্ধি, (ঋদ্ধং); আমার অনুষ্ঠাস্যমান (অর্থাৎ পরে অনুষ্ঠিত হবে, এমন) যজ্ঞের ফল (ঋদ্ধি); আমার সমর্থ বা স্বকার্যক্ষম দ্রব্য, অর্থাৎ কোন দ্রব্যের সাহায্যে কর্মসাধনে সমর্থ হওয়া (ক্লপ্তং); আমার স্বকীয়? সামর্থ্য; আমার পদার্থমাত্র নিশ্চয় (মতিঃ), অর্থাৎ যে কোন পদার্থ নির্ণয়ের দক্ষতা; এবং আমার দুর্ঘটরাজকার্যাদিনিশ্চয় (সুমতি), অর্থাৎ রাজকার্য ইত্যাদি নির্ণয়রূপ দুঃসাধ্য বিষয় সম্পর্কে সুবুদ্ধি আপনারা সম্পাদিত করুন ॥২॥
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬৩
অনুবাক-৬৩
মন্ত্র- শং চ মে ময়শ্চ মে প্রিয়ং চ মেইনুকামশ্চ মে কামশ্চ মে সৌমনসর্শ মে ভদ্রং চ মে শ্ৰেয়শ্চ মে বস্যশ্চ মে যশ মে ভগশ্চ মে দ্রবিণং চ মে যা চ মে ধৰ্তা চ মে ক্ষেমশ্চ মে ধৃতিশ্চ মে বিশ্বং চ মে মহশ্চ মে সচ্চি মে জ্ঞাত্রং চ মে সুশ্চ মে প্রসূ মে সীরং চ মে লয়শ্চ ম ঋতং চ মেহমৃতং চ মেহং চ মেহনাময় মে জীবাতুশ্চ মে দীর্ঘায়ুত্বং চ মেহনমিত্রং চ মেহভয়ম্ চ মে সুগং চ মে শয়নং চ মে সুষা চ মে সুদিনং চ মে ॥৩॥ [বসোর্ধারা হোমমন্ত্র]
মর্মার্থ- (হে অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব!)–আপনারা আমার শং অর্থাৎ ঐহিক বা ইহলোকের সুখ ও ময়ঃ অর্থাৎ আমুষ্মিক বা পরলোকের সুখ সম্পাদন করুন। আপনারা আমার প্রীতিকারক বস্তু (প্রিয়ং); আমার অনুকুলের নিমিত্ত ঐহিক কাম্যমান পদার্থ (অনুকামঃ); আমার আমুষ্মিক স্বর্গ ইত্যাদি (কামঃ), আমার মনের পক্ষে স্বাস্থ্যকর অর্থাৎ মনের উপযুক্ত বন্ধুবর্গ (সৌমনসো); আমার এই লোকে যা কল্যাণরূপ রমণীয় (ভদ্রং); আমার পরলোকে যা হিতকর (শ্রেয়ঃ), আমার নিবাসহেতু গৃহ ইত্যাদি; আমার কীর্তি (যশঃ); আমার সৌভাগ্য (ভগঃ); আমার ধন (দ্রবিণং); আমার আচার্য ইত্যাদি নিয়ামক (যা); আমার পিতা ইত্যাদি পোষক (ধর্তা); আমার বিদ্যমান ধনের রক্ষণশক্তি (ক্ষেমঃ); আমার বিপদে-আপদে নিশ্চলতা বা ধৈর্য (ধৃতিঃ); আমার সর্বজনের আনুকুল্য (বিশ্বং); আমার পূজা (মহঃ); আমার বেদ-শাস্ত্র ইত্যাদি বিজ্ঞান (সম্বিৎ); আমার জ্ঞাপয়িতৃত্ব অর্থাৎ অপরকে জ্ঞাত করার সামর্থ্য (জ্ঞাত্ৰং); আমার পুত্র ইত্যাদি প্রেরণের সামর্থ্য (সু); আমার ভৃত্য ইত্যাদি প্রেরণের সামর্থ্য (প্রসুঃ); আমার লাঙ্গল ইত্যাদি কৃষিসাধন সম্পত্তি (সীরং); ঐ কৃষিকার্যের প্রতিবন্ধের নিবৃত্তি (লয়ঃ); আমার যজ্ঞ ইত্যাদি কর্ম (ঋতং); আমার সেই যজ্ঞ ইত্যাদির ফল (অমৃতং); আমার রাজযক্ষ্মা ইত্যাদি প্রবল ব্যাধির রাহিত্য (অযক্ষ্মং); আমার জ্বর ইত্যাদি অল্প ব্যাধির রাহিত্য (অনাময়ঃ); আমার জীবনরক্ষার প্রয়োজনে ব্যাধি পরিহারের নিমিত্ত ঔষধ (জীবাতুঃ); আমার অপমৃতুরাহিত্য (দীর্ঘায়ুত্বং); আমার বৈরিরাহিত্য (অনমিত্রং); আমার ভয়রাহিত্য (অভয়ং); আমার শোভনগমন তথা সকলের অঙ্গীকৃত আচরণ (সুগং); আমার শয্যা-উপধান ইত্যাদি সম্পত্তি (শয়নং); আমার স্নান-সন্ধ্যাবন্দনা ইত্যাদির দ্বারা যুক্ত শোভন প্রাতঃকাল (সুষা) এবং আমার যজ্ঞ-দান-অধ্যয়ন ইত্যাদি যুক্ত সম্পূর্ণ দিন (সুদিনং)–আপনারা সম্পাদিত করুন ॥৩॥
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬৪
অনুবাক-৬৪
মন্ত্র- উক্ মে সুনৃতা চ মে পয়শ্চ মে রসশ্চ মে ঘৃতং চ মে মধু চ মে সন্ধিশ্চ মে সপীতিশ্চ মে কৃষিশ্চ মে বৃষ্টিশ্চ মে জৈত্রং চ ম ঔদ্ভিদাং চ মে রয়িশ্চমে রায়শ মে পুষ্টং চ মে পূষ্টিশ্চ মে বিভু চ মে প্রভু চ মে বহু চ মে ভূয়শ্চমে পূর্ণং চ মে পূর্ণতরং চ মেহক্ষিতিশ্চ মে কুষবশ্য মেহন্নং চ মেইক্ষুচ্চ মে ব্ৰহয় মে যবাশ্চ মে মাষাশ্চ মে তিলাশ্চ মে মুদগাশ্চ মে খাশ মে গোধূমাশ্চ মে মসুরাশ্চ মে প্রিয়ঙ্গবশ মেহণবশ মে শ্যামাকাশ মে নীরাশ্চ মে ॥৪॥
[বসোর্ধারা হোমমন্ত্র]
মর্মার্থ- (হে অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব!) আপনারা আমার ঊর্ক অর্থাৎ অন্নসামান্য সম্পাদন করুন। এইভাবে আপনারা আমার প্রিয় উক্তি (সুনৃতা); আমার পয়ঃ প্রভৃতি অন্নবিশেষ, যথা–দুগ্ধ বা ক্ষীর (পয়ঃ); সেই দুগ্ধের সার (রসঃ); ঘৃত; আমার মধু; আমার বন্ধুগণের সাথে ভোজন। (সন্ধি); তথা আমার সেই বন্ধুগণের সাথে পান (সপীতি); আমার অন্নের হেতুত্বে কৃষিকর্ম (কৃষি); আমার কৃষির হেতুত্বে বৃষ্টিপাত (বৃষ্টি); আমার জয়শীল সুক্ষেত্র (জৈত্রং), অর্থাৎ যে ক্ষেত্রে প্রভূত শস্য লাভ করা যায় আমার এমন সুফলা কৃষিক্ষেত্র; আমার তরু-গুল্ম ইত্যাদির উৎপত্তি (ঔদ্ভিদ্যং); আমার সুবর্ণ (রয়িঃ); আমার মণিমুক্তা ইত্যাদি (রায়ঃ); পূর্বোক্ত সুবর্ণ ইত্যাদির সমৃদ্ধি (পুষ্টং); আমার শরীরে পোষণ বা পুষ্টি; আমার ধান্য বিষয়ে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি (বিভু); কেবল আমার ধান্যের প্রবৃদ্ধিই নয়, আমার ব্রীহি, যব, মাষকলাই, তিল, মুগ, গম (গোধুম), মসুর, প্রিয়ঙ্গব, সুশালী ধান্য (অণবঃ), শ্যামাক নামক গ্রাম ধান্য এবং আমার আরণ্য ধান্য (নীবারা) এগুলি সম্পাদন করুন ॥৪॥
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬৫
অনুবাক-৬৫
মন্ত্র- অশ্ম চ মে মৃত্তিকা চ মে গিয়শ্চ মে পৰ্বতাশ্চ মে সিকতা মে বনস্পতয়শ্চ মে হিরণ্যং চ মেয়শ্চ মে সীসং চ মে পুশ্চ মে শ্যামং চ মে লোহং চ মেহগ্নিশ্চম আপশ্চ মে বীরুধশ্চম ওষধয়শ্চ মে কৃষ্টপচ্যং চ মেহকৃষ্টপচ্যং চ মে গ্রাম্যাশ মে পশৰ আরণ্যাশ্চ যজ্ঞেন কল্পভাং বিত্তং চ মে বিত্তিশ্চ মে ভূতং চ মে ভূতিশ্চ মে বসু চ মে বসতিশ্চ মে কৰ্ম্ম চ মে শক্তিশ্চ মেহর্থস্ট ম এম ম ইতিশ্চ মে গতিশ্চ মে ॥৫৷৷ [বসোর্ধারা হোমমন্ত্র]
মর্মার্থ- (হে অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব!) আপনারা আমার অশ্ম অর্থাৎ প্রস্তরগুলি সম্পাদন করুন। এইভাবে আপনারা আমার মৃত্তিকা, আমার গিরি (গিরয়ঃ), আমার পর্বত, আমার বালুকায় (সিকতাঃ), আমার বনস্পতি, আমার হিরণ্য, আমার লৌহ নির্মিত দ্রব্য (অয়ঃ), আমার সীসা, আমার শোধিত সীসা, আমার রঙ্গ (পু), আমার কৃষ্ণলৌহ অর্থাৎ কাংস্য-তাষ ইত্যাদি (শ্যামং), আমার লৌহ, আমার অগ্নি, আমার জল, আমার লতা (ধীরুধঃ), আমার ওষধী, আমার কৃষিক্ষেত্রে পক্ক ধান ইত্যাদি (কৃষ্টপচ্য), আমার কৃষিক্ষেত্রে এপক ধান ইত্যাদি (অকৃষ্টপচ্য), আমার যজ্ঞের নিমিত্তভূত গ্রাম্য ও আরণ্য পশু (পশব) (অর্থাৎ যজ্ঞের নিমিত্ত কল্পিত হোক, এমন পশু), আমার পূর্বলব্ধ ধন (বিত্তং), আমার ভবিষতে লব্ধব্য ধন (বিত্তিঃ), আমার ঐশ্বর্যোপেত পুত্র ইত্যাদি (ভূতং), আমার স্বকীয় ঐশ্বর্য ইত্যাদি (ভূতঃ), আমার নিবাসসাধন গো-ইত্যাদি (বসু); আমার নিবাসাধার গৃহ ইত্যাদি (বসতিঃ), আমার অগ্নিহোত্র ইত্যাদি (কর্ম), আমার সেই কর্মানুষ্ঠানের সামর্থ্য (শক্তিঃ), আমার প্রয়োজন বিশেষ (অর্থঃ), আমার প্রাপ্তব্য সুখ (এমঃ), আমার ইষ্টপ্রাপ্তির উপায় (ইতিঃ) এবং আমার ইষ্টপ্রাপ্তি (গতিঃ)–এগুলি সম্পাদন করুন ॥৫॥
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬৬
অনুবাক-৬৬
মন্ত্র- অগ্নিশ্চম ইন্দ্ৰশ্চ মে সোমশ্চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে সবিতা চ মে ইন্দ্ৰশ্চ মে সরস্বতী চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে পূষা চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে বৃহস্পতিশ্চ মে মিত্ৰশ্চম ইন্দ্ৰশ্চমে বরুণশ্চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে ত্বষ্টা চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে ধাতা চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে বিষ্ণুশ্চম ইন্দ্ৰশ্চ মেহশ্বিনৌ চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে মরুতশ্চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে বিশ্বে চ মে দেবা ইন্দ্ৰশ্চ মে পৃথিবী চ ম ইন্দ্র মেহন্তরিক্ষং চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে দ্যেশ্চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে দিশৰ্শ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে মূর্ধা চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে প্রজাপতিশ্চ ম ইন্দ্ৰশ্চ মে ৬৷৷ [বসোর্ধারা হোমমন্ত্র]
মর্মার্থ- সমান ভাগোপেত (অর্থাৎ যজ্ঞীয় হবিঃতে সমান ভাগযুক্ত হয়ে অগ্নির সাথে ইন্দ্র, সোমের সাথে ইন্দ্র, সবিতার সাথে ইন্দ্র, সরস্বতীর সাথে ইন্দ্র, পুষার সাথে ইন্দ্র, বৃহস্পতির সাথে ইন্দ্র, মিত্রের সাথে ইন্দ্র, বরুণের সাথে ইন্দ্র, ত্বষ্টার সাথে ইন্দ্র, ধাতার সাথে ইন্দ্র, বিষ্ণুর সাথে ইন্দ্র, অশ্বিযুগলের সাথে ইন্দ্র, মরুত্বর্গের সাথে ইন্দ্র, বিশ্বদেবগণের সাথে ইন্দ্র, পৃথিবীর সাথে ইন্দ্র, পূর্ব ইত্যাদি চারিটি দিকের সাথে ইন্দ্র, ঊর্ধ্ব দিকের সাথে ইন্দ্র (মূর্ধ অর্থে ঊর্ধ্ব দিক; মুখত্ব নির্দেশের অভিপ্রায়ে পৃথরূপে উল্লেখিত), এবং প্রজাপতির সাথে ইন্দ্র আমাদের কর্মসমুহ সম্পাদন করুন। (অগ্নি ইত্যাদি প্রসিদ্ধ দেবতা। মন্ত্রে তাদের সকলের সাথে সমান ভাগপেতত্ব হয়ে ইন্দ্রকে এইভাবে একে একে উল্লেখ করা কর্তব্য) ॥৬৷৷
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬৭
অনুবাক-৬৭
মন্ত্র- অংশুশ্চ মে রশ্মিশ্চ মেহদাভ্যশ্চ মেহধিপতিশ্চ ম উপাং শুশ্চ মেহন্তর্যামশ্চ ম ঐন্দ্রয়ব মে মৈত্রাবরুণশ্চ ম আশ্বিনশ্চ মে প্রতিপ্রস্থানশ্চ মে শুক্রশ্চ মে মন্ত্রী ৮ ম আগ্রয়ণশ্চ মে বৈশ্বদেবশ্চ মে ধ্রুবশ মে বৈশ্বানর ম ঋতুগ্রহাশ্চ মেহতিগ্রাহ্যাশ্চ ম ঐন্দ্রাগ্নশ্চ মে বৈশ্বদেবশ্চ মে মরুতীয়াশ্চ মে মাহেন্দ্ৰশ্চম আদিত্যশ্চ মে সাবিত্র মে সারস্বতশ্চ মে পৌষ্ণশ্চ মে পাত্নীবতশ্চ মে হারিযোজনশ্চ মে ॥৭॥ [বসোর্ধারা হোমমন্ত্র]
মর্মার্থ- (হে অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব!) অংশু (সোমের অংশু সমূহ সোমগ্রহবিশেষ, সোমপ্রকরণে প্রসিদ্ধ), রশ্মি (গ্রহের গৃহ্যমাণত্বের কারণে পৃথক নির্দেশিত), ইত্যাদি যজ্ঞের দ্বারা আমার যজ্ঞ সম্পাদিত হোক। (অধিপতি শব্দের দ্বারা দধিগ্রহ বিবক্ষিত। প্রথমে উক্ত বৈশ্বদেব প্রাতঃসবনগত, পরে উক্ত বৈশ্বদেব তৃতীয়সবনগত। ইত্যাদি।) [এই মন্ত্রগুলির অর্থ শুক্লযজুর্বেদের ১৮শ অধ্যায়ের ১৯শ ও ২০শ মন্ত্রে প্রাপ্তব্য] ॥৭॥
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬৮
অনুবাক-৬৮
মন্ত্র- ইরাশ্চ মে বহির্শ মে বেদিশ্চ মে ধিফিয়াশ্চ মে সুশ্চ মে চমসাশ্চ মে গ্রাবাণশ্চ মে স্বরবঞ্চ মে উপবাশ্চ মেহধিষণে চ মে দ্ৰোণকলশ মে বায়ব্যানি চ মে পুতভূ ম আধবনীয় ম আগ্নীপ্রং চ মে হবির্ধানং চ মে গৃহাশ্চ মে সদশ্চ মে পূরোডাশাশ্চ মে পচতাশ্চ মেহৰভৃথশ্চ মে স্বগাকারণ্ট মে ॥৮॥ [বসোর্ধারা হোমমন্ত্র]
মর্মার্থ- (হে অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব!) আপনারা আমার ইয়াদীনি অর্থাৎ যজ্ঞাঙ্গ-দ্রব্যসমূহ সম্পাদন করুন। (যজ্ঞাঙ্গদ্রব্য-যজ্ঞপ্রকরণে প্রসিদ্ধ দ্রব্যসম্ভার; যথা–) আমার অগ্নি প্রজ্জ্বলনের কাষ্ঠ (ই), আমার যজ্ঞীয় কুশ (বহিঃ), আমার যজ্ঞীয় বেদি, আমার যজ্ঞীয় আসন (ধিষ্ণ), আমার সুক (যজ্ঞে ঘৃত প্রক্ষেপণের নিমিত্ত পাত্রবিশেষ), আমার চমস (যজ্ঞীয় চামচ বা চামচে), আমার গ্রাবাণ (যজ্ঞপাত্রবিশেষ), আমার স্বরব আমার উপরব, আমার অধিষবণ (যজ্ঞস্নান), আমার দ্রোণকলশ (ক্ৰমময় যজ্ঞপাত্রবিশেষ), আমার বায়ব্য (যজ্ঞীয় গোরজঃ স্নান), আমার পূতভৃৎ, আমার আধবনীয়, আমার আগ্নী (অগ্নিরক্ষণে নিযুক্ত ঋত্বি), আমার হবিধান (হবির ধারক ঋত্বিক), আমার গৃহা (যজ্ঞীয় পত্নীশালা ইত্যাদি), আমার সদঃ (যজ্ঞসভা), আমার পুরোডাশ, আমার পশুবন্ধন স্থান ইত্যাদি (পচতাঃ অর্থাৎ শামিত্র ইত্যাদি), আমার অবyথ (যজ্ঞান্তে স্নান বা প্রধান যজ্ঞের অঙ্গীভূত যজ্ঞ) এবং আমার কল্যাণযুক্ত বাক্য (স্বগাকারঃ বা শংযুবাকঃ) সম্পাদন করুন। এগুলির দ্বারা যথাযথ দেবতাগণের উদ্দেশে হবিঃপ্রদান করা হয় (তেন হি যথাস্বং দেবতানাং হবির্গমনং ক্রিয়তে) । ৮।
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৬৯
অনুবাক-৬৯
মন্ত্র- অগ্নিশ্চ মে ঘর্ম মেহর্কশ্চ মে সূৰ্য্যশ্চ মে প্রাণশ্চ মেহশ্বমেধশ্চ মে পৃথিবী। চ মেহদিতিশ্চ মে দিতিশ্চ মে দৌশ্চ মে শকৃরীরঙ্গুলয়ো দিশ মে যজ্ঞেন কল্পতামৃক মে সাম চ মে স্তোমর্শ মে যজু মে দীক্ষা চ মে তপশ্চম ঋতুশ্চ মে ব্রতং চ মেহতোরাত্ৰয়োৰ্বষ্টা বৃহদ্রথরে চ মে যজ্ঞেন কম্লেতাম্ ॥৯॥ [বসোর্ধারা হোমমন্ত্র]
মর্মার্থ- (হে অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব!) আপনারা চীয়মান বহ্নি (অগ্নি), প্রবর্গ (ঘর্ম), যাগ (অর্ক, অর্থাৎ ইন্দ্রকে অবৎ পুরোডাশ বিহিত যাগ), সুর্য (সূর্যের উদ্দেশে চরু বিহিত যাগ), প্রাণ (প্রাণের উদ্দেশে স্বাহা বিহিত যাগ), অশ্বমেধ যজ্ঞ, পৃথিবী দেবতার উদ্দেশে যাগ, অদিতি দেবতার উদ্দেশে যাগ, দিতির উদ্দেশে যাগ, দ্যুলোক দেবতার উদ্দেশে যাগ, আমার শক্কর্যের উদ্দেশে যাগ, অঙ্গুলিবৎ বিরাট পুরুষের অবয়ববিশেষের উদ্দেশে যাগ, পূর্ব ইত্যাদি দিকের উদ্দেশে যাগ–এই সবগুলি আমার দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়ে আপন আপন ক্রিয়ায় (ব্যাপারে) সমর্থ হোক। (এই অংশ শুক্লযজুর্বেদের ১৮শ অধ্যায়ের ২২শ মন্ত্রেও প্রাপ্তব্য)।আমার ঋক্-মন্ত্র, আমার সাম-মন্ত্র, আমার স্তোম অর্থাৎ সাম-আবৃত্তিরূপ স্তোত্র, আমার যজমান-সংস্কার (দীক্ষা), আমার পাপক্ষয়ের নিমিত্ত অনশন ইত্যাদি (তপঃ), আমার যজ্ঞের অঙ্গভূত কাল (ঋতু); আমার ব্রত (একস্তন ইত্যাদি), অহোরাত্র সম্বন্ধিনী যে বৃষ্টি ও সেই বৃষ্টির দ্বারা আমার অভীষ্ট শস্যপ্রাপ্তি, ইত্যাদি সম্পাদিত করুক। এইভাবে বৃহৎ ও রথযুর নামক সাম দুটি আমার যজ্ঞের দ্বারা আপন আপন ক্রিয়ায় সমর্থ হোক (স্বস্বব্যবহারসমর্থে ভবেত্যম্ ॥৯॥
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৭০
অনুবাক-৭০
মন্ত্র- গর্ভাশ্চ মে বসাশ্চ মে বিশ্চ মে বী চ মে দিত্যবাই চ মে দিতৌহী চ মে পঞ্চাবিশ্চ মে পঞ্চবী চ মে ত্রিবৎসর্শ মে ত্রিবৎসা চ মে তুৰ্য্যবা চ মে তুৰ্যেীহী চ মে পষ্ঠবাচ্চ মে পষ্ঠৌহী চম উক্ষা চ মে বসা চ ম ঋষভশ্চ মে বেহচ্চ মেহনড্রাঞ্চ মে ধেনুশ্চ ম আয়ুৰ্যজ্ঞেন কল্পতাং প্রাণো যজ্ঞেন কল্পতাম পানো যজ্ঞেন কল্পং ব্যানো যজ্ঞেন কল্পতাং চক্ষুর্যজ্ঞেন কল্পতাং শ্রোত্রং যজ্ঞেন কল্পতাং মনো যজ্ঞে কল্পতাং বাগ্যজ্ঞেন কল্পতামাত্মা যজ্ঞেন কল্পতাং যজ্ঞো যজ্ঞে কল্পতা৷৷ ১০৷৷ [বসোর্ধারা হোমমন্ত্র]
মর্মার্থ- (হে অগ্নিদেব ও বিষ্ণুদেব!) আপনারা আমার (গাভীর) গর্ভ, বৎসমূহ (বসা), দেড় বৎসর বয়স্ক পুরুষ-গোবৎস (এ্যবি), তথাবিধা অর্থাৎ দেড় বৎসর বয়স্কা স্ত্রী-গোবৎসা (ত্রবী), দুবৎসর বয়স্ক ঋষভ (দিত্যবাট), তথাবিধা অর্থাৎ দু বৎসর বয়স্কা গাভী (দিতৌহী), আড়াই বৎসর– বয়স্ক ঋষভ (পঞ্চাবি), তথাবিধা অর্থাৎ আড়াই বৎসর বয়স্কা গাভী (পঞ্চাবী), তিনবৎসরোপেত ঋষভ (ত্রিবৎস), তথাবিধা অর্থাৎ তিনবৎসর বয়স্কা গাভী (ত্রিবৎসা), সাড়ে তিন বৎসর বয়স্ক ঋষভ (তুর্যবাট), তথাবিধা অর্থাৎ সাড়ে তিন বৎসর বয়স্কা গাভী (তুর্যৌহী), চারবৎসর বয়স্ক ঋষভ (পাষ্ঠবাৎ), তথাবিধা গাভী (পষ্ঠোহী), সেচনসমর্থ ঋষভ (উক্ষা), বন্ধ্যা গাভী (বশা), সেচনসমুর্থ, অপেক্ষা অধিক বয়স্ক (ঋষভ), গভর্ঘাতিনী গাভী (বেহৎ), শকটের বাহক (অনড়া), নবপ্রসূতা গাভী (ধেনু), ইত্যাদি সম্পাদন করুন। এইভাবে আমার আয়ু, আমার প্রাণ, আমার অপান, আমার ব্যান, আমার চক্ষু, আমার শ্রোত্র, আমার মন, আমার বাক, আমার আত্মা (শরীর) এবং আমার যজ্ঞ–এই যজ্ঞের দ্বারা সম্পাদিত হোক। [আয়ুজ্ঞেন কল্পতাং থেকে যজ্ঞে যজ্ঞেন কল্পতাম পর্যন্ত অংশটুকু শুক্লযজুর্বেদের ১৮শ অধ্যায়ের ২৯শ মন্ত্রেও প্রাপ্তব্য] ১০।
চতুর্থ অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৭১
অনুবাক-৭১
মন্ত্র- একা চ মে তিশ্চ মে পঞ্চ চ মে সপ্ত চ মে নব চ ম একাদশ চ মে এয়োদশ চ মে পঞ্চদশ চ মে সপ্তদশ চ মে নবদশ চ ম একবিংশতিশ্চ মে ত্রয়োবিংশতিশ্চ মে পঞ্চবিংশতিশ্চ মে সপ্তবিংশতিশ্চ মে নববিংশতিশ্চ ম একত্রিংশচ্চ মে ত্রয়স্ত্রিংচ্চ মে চতশ্চ মেহষ্টো চ মে দ্বাদশ চ মে ষোড়শ চ মে বিংশতি মে চতুর্বিংশতিশ্চ মেহষ্টাবিংশতিশ্চ মে দ্বাত্রিংশচ্চ মে ষট্ত্রিংশচ্চ মে চত্বারিংশচ্চ মে চতুশ্চত্বারিশ মেহষ্টাচত্বরিংশ মে বাজশ্চ প্রসবশ্যাপিজশ্চ ক্রতুশ্চ সুব মূৰ্দ্ধা চ ব্যশ্লিয়শ্চাত্যায়নশ্চাত্য ভৌবনশ্চ ভুবনশ্চাধিপতি ॥১১৷ [বসোর্ধারা হোমমন্ত্রের অবশিষ্ট অংশ]
মর্মার্থ- [সায়ণাচার্য বলেন-একাদিশাঃ সংখ্যাপরাঃ। বাজাদয়ঃ সর্বে মম সত্ত্বিতি শেষ। বাজোহন্ন। ইত্যাদি। অর্থাৎ এই মন্ত্রে এক ইত্যাদি শব্দগুলি সংখ্যার বা সংখ্যাবাচক। বাজ ইত্যাদি শব্দগুলি অন্নপর অর্থাৎ অন্নবাচক। অর্থাৎ অন্ন ইত্যাদি সব আমার হোক–এমনই অর্থ এক, তিন, পাঁচ সাত, নয়, এগারো, তেরো, পনেরো, সতেরো, উনিশ, একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ, উনত্রিশ, একত্রিশ–এই অযুগ্ম স্তোমমন্ত্রগুলি এবং চার, আট, বারো, ষোলো, কুড়ি, চব্বিশ, আটাশ, বত্রিশ ছত্রিশ, চল্লিশ, চুয়াল্লিশ, আটচল্লিশ–এই যুগ্ম স্তোমমন্ত্রগুলি যজ্ঞের দ্বারা আমার অন্ন, অন্নের উৎপত্তি, অন্নের পুনঃ পুনঃ উৎপত্তি, আমার সঙ্কল্প ভোগ ইত্যাদি বিষয় বা যাগ (ক্রঃ) সম্পাদিত করুক। আদিত্য এই ভূমিতে আমাকে অবস্থান করান এবং ভুবনের অধিপতি করুন। [বসোর্ধারা হোমমন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকের ৮ম অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥১১।
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ দ্বাদশে বাজপ্রসবীয়হোম উচ্যতে। অর্থাৎ-অতঃপর এই দ্বাদশ অনুবাকে বাজপ্রসবীয় হোমের বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- (বাজপ্রসবীয় হোমে সাতটি গ্রাম্য ও সাতটি আরণ্য হোমের মন্ত্র আছে। গ্রাম্যা মন্ত্রগুলি ১ম কাণ্ডের ৭ম প্রপাঠকের ১০ম অনুবাকে প্রদত্ত। এই স্থলে আরণ্য হোম-মন্ত্ৰসমূহ কথিত হচ্ছে]।-(বেনুধান্যের দ্বারা কৃত হোমের প্রথমা ঋক)–পূর্ব ইত্যাদি চারটি দিক ও ঊর্ধ্ব-অপো-মধ্য এই তিন, মোট সাতটি প্রকৃষ্ট দিক্ আমাদের অন্নপ্রদা (বাজোহন্নস্বরূপা) হোক। তথা অত্যন্ত দুরবর্তী আগ্নেয় ইত্যাদি (অগ্নি-নৈঋত-বায়ু-ঈশান) চারটি দিক আমাদের অন্নপ্রদা হোক। সেই অন্নসমূহ এই ধনপ্রদেশে যজ্ঞে বিশ্বদেবগণ কর্তৃক প্রেরিত হয়ে আমাদের আমাদের রক্ষা করুক। (শ্যামাকধান্যের দ্বারা কৃত হোমের দ্বিতীয় ঋক)–অদ্য এই দিনে সকল মরুৎ ও সকল দেবতা আমাদের রক্ষণের নিমিত্ত প্রবর্তিত হোন। তথা সকল অগ্নিও সম্যক প্রজ্বলিত হোন। সেইভাবে সকল দেবতাও আমাদের রক্ষার নিমিত্তভূত হয়ে এই স্থানে আগত হোন। তথা সকল ধন আমাদের হোক।-(নীবার অর্থাৎ তৃণধান্য বা উড়িধানের দ্বারা কৃত হোমের তৃতীয় ঋক)-হে দেববর্গ। আমাদের অন্ন প্রেরণ বা সম্পাদনের নিমিত্ত অগ্নি,ইন্দ্র, ও বৃহস্পতি–এই তিন দেবতা ও মরুত্বর্গ, সোমপানের উদ্দেশে সুবর্ণনির্মিত রথের সাথে আমাদের এই যজ্ঞস্থান প্রাপ্ত হোন (যাগস্থান প্রাপ্লুত)।–(জর্তিলহোমের নিমিত্ত চতুর্থী ঋক)–হে অন্নসম্পাদক দেববর্গ! সেই সেই অন্নের নিমিত্ত ও ধনের নিমিত্ত আমাদের রক্ষা করুন। ব্রাহ্মণবৎ শুদ্ধ, মরণরহিত, সত্য-জ্ঞাত বা যজ্ঞ-জ্ঞাত, হে দেবগণ! আপনারা এই অন্ন ভক্ষণ পূর্বক হৃষ্ট হোন; তারপর তৃপ্ত হয়ে দেবযান পথ ধরে আপন আপন স্থানে গমন করুন (স্ব স্ব স্থানং প্রাপ্লুত)।–(গবীধুকের দ্বারা কৃত হোমের পঞ্চমী ঋক)–আমাদের পূর্ব-বয়সে (অর্থাৎ বাল্য ও কিশোর কালে) ও মধ্য-বয়সে (অর্থাৎ যৌবন ও প্রৌঢ় কালে) অন্ন হোক (অর্থাৎ আমরা যেন অন্নের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে থাকি)। অধিকন্তু এই অন্ন কালবিশেষে অর্থাৎ কালানুযায়ী দেবতাগণের যজ্ঞ সম্পাদিত করে; অর্থাৎ এই অন্ন যজ্ঞসাধনে সমর্থ। অন্নের প্রেরণ বা সমৃদ্ধি (প্রসবঃ) সকল দিককে অবনত করে (শয়েনাবনতাঃ করোতি), অর্থাৎ অন্নের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে সর্বদিতী প্রাণীগণ স্বাধীন হয় (অর্থাৎ অন্নের জন্য তাদের আর অপরের মুখাপেক্ষি হতে হয় না); সেই কারণে আমিও যেন অন্নপতি হই (বাজপতিৰ্ভবেয়)। (মর্কটকারব্য-ধান্যের হোমে ষষ্ঠী ঋক)–অন্নসমৃদ্ধির নিমিত্ত পৃথিবীতে জল স্থাপন করছি, সেইরকম ওষধীসমূহেও জল স্থাপন করছি, সেইরকম দ্যুলোকেও জল স্থাপন করছি, অন্তরিক্ষেও জল স্থাপন করছি। প্রকৃষ্টরূপে সকল দিক আমাদের নিমিত্ত জলময় হোক (জলবতত্যা ভবন্তু)।–(গামুর্তহোম বা কুলস্থ বা কলাইবিশেষের দ্বারা হোমের নিমিত্ত সপ্তমী ঋক)–হে অগ্নিদেব! আপনার প্রসাদে আমি দুগ্ধের দ্বারা (বা সাথে) যুক্ত হবো, ঘৃতের দ্বারা যুক্ত হবো, এবং জল ও ওষধীর দ্বারা যুক্ত হবো (সংসৃজামি)। এইভাবে দুগ্ধ ইত্যাদির দ্বারা যুক্ত হয়ে অদ্য আমি আপনার প্রদত্ত অন্ন লাভ করব।–(হোমান্তিক প্রার্থনা)–নক্তোষাসা সমনসা..ধারয়ন্দ্ৰবিনোদাঃ–এই মন্ত্রটি ৪র্থ কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ১০ম অনুবাকে, কিংবা বর্তমান প্রপাঠকের ৫ম অনুবাকে ব্যাখ্যাত। সমুদ্ৰোহসি…..মা বাহি স্বাহা মন্ত্র তিনটি শুক্লযজুর্বেদের ১৮শ অধ্যায়ের ৪৫শ মন্ত্রে ব্যাখ্যাত। [ এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকের ৯ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥১২।
[সায়ণাচার্য বলেন-য়োদশেহগ্নিযোগোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই এয়োদশ অনুবাকে অগ্নিযোগ সম্পর্কে বলা হয়েছে]।
মর্মার্থ- যেমন রথের সাথে অশ্বকে যোজিত করা হয়, সেইরকমে এই চিত (চয়িত) অগ্নিকে বলের দ্বারা ঘৃত ইত্যাদি দ্রব্যযুক্ত কর্মসকলের সাথে যুক্ত করছি। (কিরকম অগ্নি? না, সেই অগ্নি দিব্যং অর্থাৎ দ্যোতনাত্মক, সুপর্ণং অর্থাৎ পক্ষীর ন্যায় আকরসম্পন্ন, ও বৃহন্তং অর্থাৎ চিরকালস্থায়ী। সেই হেন অগ্নির সাথে আমরা যজমানগণ আদিত্যের তাপরহিত (বিষ্টপং) স্থান প্রাপ্ত হবো। (কিরকম আমরা? না,) আমরা অতি উৎকৃষ্ট (উত্তমে) স্বর্গলোকে সুখপ্রাপক স্থান প্রাপ্তির নিমিত্ত অধিরোহণে আকাঙ্ক্ষী।–পক্ষীর আকারবিশিষ্ট সেই অগ্নির পক্ষ দুটি কখনও জীর্ণ হয় না।–হে অগ্নি! যে পক্ষ দুটির দ্বারা রাক্ষসগণকে মারেন (মারয়সি), আমরা তার দ্বারা পুণ্যকর্মকারী (পুণ্যকৃতামেব) পুরুষগণের যোগ্য সেই লোক প্রাপ্ত হবে, যে লোকে সৃষ্টির আদিতে সৃষ্ট অনাদিসিদ্ধ মহর্ষিগণ বাস করে থাকেন।–হে অগ্নি! আপনি জগতের বা যজমানের চৈতন্য (চিৎ বা চেতনা বা জ্ঞান) সঞ্চারক; সমুদ্র যেমন সকল জলগ্রহণের (জলগ্রহাণং) স্থান, সেইরকম আপনিও সকল ক্রতুর (যজ্ঞের) স্থান। আপনি ই অর্থাৎ পরম ঐশ্বর্যযুক্ত, আপনি দক্ষ অর্থাৎ কর্মানিষ্পদনকুশল, আপনি শ্যেনঃ অর্থাৎ পক্ষীর আকারবিশিষ্ট, আপনি ঋতাবা অর্থাৎ সত্যবান, আপনি হিরণ্যপক্ষ অর্থাৎ সুবর্ণময় পক্ষদ্বয়যুক্ত, আপনি শকুনঃ অর্থাৎ কামনা ইত্যাদি ভেদে কঙ্ক (কক) ইত্যাদি পক্ষীর আকার, আপনি ভুরণু অর্থাৎ সকলের ভরণে (পোষণে) সক্ষম (ক্ষমঃ), আপনি মহাৎঅর্থাৎ বহু ইষ্টকায় চিত হওয়ায় (চিতত্বাৎ) প্রৌঢ়, আপনি সধস্থ অর্থাৎ আদিত্যের সাথে একত্রে স্থিতিযোগ্য মণ্ডলে স্থির হয়ে উপবিষ্ট।–হে অগ্নি! আপনাকে নমস্কার, আপনার যাগকর্মকারী আমাকে বিনাশ করবেন না। আপনি সকল জগতের শিরোবৎ উত্তম চিতিপ্রদেশে আশ্রিত হয়ে উত্তম হয়ে (অধিকো ভূত্ব) স্থিত আছেন। আপনার চিত্ত সমুদ্রে স্থিত; বৃষ্টির দ্বারা যে সমুদ্রসমান জল সম্পাদিত হয়, তা সর্বদা আপনারই অনুগ্রহ। সেইভাবে আপনার চিত্তের মধ্যে সকল প্রাণীর আয়ু অবস্থিত; অধিকন্তু সকল লোকের নিমিত্তভূত দারাপৃথিবী অর্থাৎ উপরে দুলোক (দৌঃ) এবং নিম্নে ভূমি (ভুলোক) দ্বারাই স্থাপিত হয়েছে; এরই মধ্যে সকল তোক অবস্থান করে থাকে, এমনই আপনার অনুগ্রহ।-হে অগ্নিগণ! (এখানে পূজার নিমিত্ত এক অগ্নিতে বহুত্ব আরোপিত)। আপনারা জলসমূহ প্রদান করুন। (উদক বা জলপ্রদানে বিভিন্ন উপায়ের কারণে অগ্নির বহুত্ব; যথা–) অন্তরিক্ষ হতে পৃথিবী ইত্যাদি তিন লোকের নিমিত্ত জলপূর্ণ মেঘের বিদারণ করুন এবং মেঘ বিদারণের পরে মেঘ-বিগলিত বৃষ্টির দ্বারা আমাদের রক্ষা করুন। (পুনরায় একত্বে সম্বোধন)–হে অগ্নি! আপনি দুলোকের মূর্ধ বা মস্তকস্থানীয় আদিত্যরূপ; আপনি পৃথিবীর নাভি অর্থাৎ নাভিবৎ মধ্যদেশে অবস্থিত। আপনি জলসমূহ ও ওষধিগণের রসরূপ, আপনার দ্বারা পাককর্ম সাধিত হলে সেখানে রস উৎপন্ন হয়ে থাকে। আপনি বিশ্বায়ুঃ অর্থাৎ সর্বজগতের আয়ুপ্রদ, আপনি শর্ম অর্থাৎ শরণভূত (রক্ষা বা আশ্রয়ভূত), আপনি সপ্রথা অর্থাৎ সবিস্তার বা বিস্তারসম্পন্ন, আপনি পথে অর্থাৎ পুণ্যলোকে গমনের পথস্বরূপ; আপনাকে নমস্কার করছি। (যেনর্যয়স্তপসা সত্ৰম থেকে নো বর্ধয়া রয়িম্ পর্যন্ত অবশিষ্ট আটটি মন্ত্র শুক্লযজুর্বেদের ১৫শ অধ্যায়ের ৪৯শ থেকে ৫৬শ মন্ত্রে ব্যাখ্যাত)। [এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ৪র্থ প্রপাঠকের ১০ম অনুবাকের মন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥১৩।
[সায়ণাচার্য বলেন-চতুর্দশে বিহব্যাখ্যা ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই চতুর্দশ অনুবাকে বিহব্য নামে আখ্যাত ইষ্টকার বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- আদি সৃষ্টিকালে প্রথম যে প্রভাতকাল, এই উপধীয়মানা ইষ্টকা তথাবিধ (অর্থাৎ ব্যষ্টি বা প্রভাতরূপা)। সেই সৃষ্টিকালীন প্রথমা ঝুষ্টি (বা প্রভাত) আদিত্যে অনুপ্রবিষ্টা হয়ে এই পৃথিবীর দৈনন্দিন প্রভাতরূপে বিচরণ করছে। (তার দৃষ্টান্ত)–নববিবাহবতী বধূ যেমন উত্তরোত্তর সন্তানের জননী হন, সেইরকমে এই বৃষ্টি (অর্থাৎ প্রভাত) উত্তরোত্তর প্রভাতসমূহের নিম্পাদিকা। অগ্নি, সূর্য ও চন্দ্র প্রমুখ ত্রয়স্ত্রিসংখ্যক (মহিমময় দেবতা) এই ঝুষ্টির সম্যক্ বিস্তার করেছেন; অর্থাৎ এই তিন দেবতার প্রকাশের অনুগ্রহে (প্রকাশকানুগ্রহাৎ) এর প্রভাতরূপত্ব নিষ্পন্ন হয়েছে। আমি এই রকম ঝুষ্টিরূপা ইষ্টকার উপধান করছি। সৃষ্টিকালীন প্রথম উষা (পূর্বোক্ত মন্ত্রগত উষা) ও প্রতিদিনের সঞ্চারিণী ঊষা (এটি পূর্বের মন্ত্রে উক্তা) এই উভয়ে মিলিত হয়ে নানাভাবে বিচরণ করছেন। রাত্রির মতো প্রলয়কালে জগৎ যেমন তিরোহিত হয়, আবার দিবসের (মহাপ্রভাতের) আর্বিভাবের মতো যেমন সৃষ্টির সূচনা হয়, সেইরকম এই দুই ঊষার একটির দ্বারা ব্যষ্টিতে (প্রভাতে) বিচরণ তথা সৃষ্টির সূচনা হয় অপরটির দ্বারা প্রলয়রূপা রাত্রির অন্ধকার দূরীকৃত হয়। (কিরকম সেই উষাদ্বয়? না, তাঁরা ছন্দোযুক্তা (অর্থাৎ মন্ত্রের দ্বারা স্মৃয়মানা), আত্যন্তিকরূপে প্রকাশমানা, কালসামান্যে (অর্থাৎ সমকালে) উভয়ে সৃষ্টমানা, উভয়ে সূর্যের পত্নী (সূর্যপত্নী), উভয়ে স্বয়ং দেবতারূপত্বের দ্বারা প্রজ্ঞানবতী, (অর্থাৎ তারা নিজেদের দেবত্ব সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্না), উভয়েই প্রকাশ প্রদানের দ্বারা প্রাণীগণের রূপজ্ঞানের জনিকা (অর্থাৎ রাত্রির অন্ধকার দূর করে প্রভাত ও দিবসের আলোক বিস্তার পূর্বক প্রাণীগণের মধ্যে সকল রূপ সন্দর্শনের দ্বারা জ্ঞানার্জনের সহায়িকা), কখনও জরারহিতা, ও প্রভূত রেতস্কা (অর্থাৎ বহু ব্যাপারের কারণভূতা)।–তিনটি উষা (তিস্র উষস) যজ্ঞরক্ষার্থে ব্যবস্থিতা; তারা দীপ্তিরূপ অগ্নি, চন্দ্র ও আদিত্যের প্রকাশ-প্রদানের দ্বারা যজ্ঞমার্গ (যজ্ঞের পথ) প্রাপ্ত হয়েছেন। তিন উষাদেবীর মধ্যে একজনা যজমানের প্রজা রক্ষা করে থাকেন, একজনা যজমানের বল রক্ষা করে থাকে, এবং একজন দেবতাকাঙ্ক্ষী (দেবানাত্মন ইচ্ছতাং) যজমানের ব্রত অর্থাৎ কর্মানুষ্ঠান রক্ষা করে থাকেন। যদিও উষা একই, তথাপি জগৎকে রক্ষার নিমিত্ত যোগ-ঐশ্বর্য ইত্যাদির দ্বারা অনেক শরীর স্বীকার করে (গ্রহণপূর্বক) বহু উষা হয়ে থাকেন। এই বহুর মধ্যে যে যিনি চতুথা উষা, তিনি স্তোমচতুষ্টয়যুক্ত অগ্নিস্টোমরূপা। (কিরকম? না,) যজ্ঞের দুটি পক্ষরূপে যজ্ঞের পূর্ব ও পশ্চিমরূপ দুটি অঙ্গ (অবয়ব) সৃষ্টি করেছেন, সেইভাবে যজ্ঞনিম্পাদক ঋত্বিকগণকে সৃষ্টি করেছেন, এবং প্রৌঢ় (বৃহৎ) অর্চনরূপ স্তোত্র সম্পাদন করেছেন। গায়ত্রী ইত্যাদি চারজন দেবতা স্বর্গ ও তার ফলভূত কর্ম সর্বতোভাবে পালন করেছেন। জগতের যা কিছু আছে, সেই সকলের স্রষ্টা (ধাতা) প্রজাপতি পঞ্চ উষাদেবীর সহযোগে এই জগৎকে নির্মাণ করেছেন। সেই পঞ্চ উশা পঞ্চ পঞ্চ সংখ্যায় ভগ্নী (স্বসারঃ) সৃষ্টি করেছেন। প্রথম পঞ্চ মুখ্য উষা এবং তাঁদের পঞ্চবিংশতি সংখ্যকা ভগ্নী–এঁরা এক মাসের (ত্রিংশতি দিবসের) প্রতিপদ ইত্যাদি তিথিরূপা, অর্থাৎ ত্রিংশতি উষারূপে প্রকাশ লাভ করেছেন।
সেই উষাগুলির সাথে মিশ্রিত হয়ে মুখ্য পঞ্চ উষা ক্রতু নিষ্পন্ন করে থাকেন এবং এইভাবে তারা ক্রতুর নানারকম রূপ লাভ করেছেন। তাদের মধ্যে একজনা দৈনন্দিন অগ্নিহোত্র যজ্ঞ নিষ্পন করছেন (দৈনন্দিনমগ্নিহোত্রং নিম্পাদয়তি); অন্য দুজনার মধ্যে একজন দর্শ ও একজন পূর্ণমাস যজ্ঞ নিষ্পন্ন করছেন (দর্শপূর্ণমাসৌ নিম্পাদয়তঃ); অন্য দুজনার মধ্যে একজন উপসথ্যদিনকৃত্য (ঔপসথ্যদিনকৃতং) ও একজন সুত্যা-দিনকৃত্য সম্পন্ন করছেন। মাসগত ত্রিংশতি তিথিরূপে ত্রিংশতি সংখ্যকা ভগ্নীরূপা উষাদেবী অজস্র অগ্নিহোত্র ইত্যাদি কর্ম প্রাপ্ত হচ্ছেন। (কিরকম? না,) তারা সমান প্রকাশরূপ চিহ্ন ধারণ করেছেন (কঞ্চকবদ্ধারিয়ন্ত্য), তারা বিদ্বান পুরুষের ন্যায় সেই সেই দিনে সম্পাদনীয় (কর্ম) জ্ঞাত হয়ে স্বয়ং পুনঃ পুনঃ আবর্তনের দ্বারা বসন্ত ইত্যাদি ঋতুসমূহ সম্পন্ন করছেন এবং সূর্যের পরিপার্শ্বে প্রকাশমানা হয়ে অবস্থান করছেন। এই উষা নক্ষত্রযুক্ত হওয়ার কারণে জ্যোতিষ্মতী (জ্যোতীরূপৈক্ষত্রৈযুক্তত্বাৎ); রাত্রির শেষ ও সূর্যোদয়ের পূর্বভাবিনী হওয়ার কারণে রাত্রিরূপাও দীপ্যামানা। এই উষা আকাশস্থ সূর্যের রশ্মিজালসমূহ কঞ্জুকের (কাঁচুলীর) ন্যায় স্বীকার (ধারণ) করছেন। এই উষা নানারূপ গো-মহিষ ইত্যাদি বিভিন্ন পশুগণকে জন্মলাভ সদৃশ নিদ্রা হতে জাগ্রত হয়ে মাতৃরূপা পৃথিবীর ক্রোড়ে অর্থাৎ অরণ্যে গমন ইত্যাদি নানা ব্যবহার অবলোকন করছে; (অর্থাৎ শিশু যেমন জন্মলাভ করে মাতৃক্রোড়ে স্থিত হয়, পশুগণও রাত্রির অবসানে নিদ্রা হতে জাগরণ পূর্বক পৃথিবীর ক্রোড়ে গমন করছে)। মাঘমাসের কৃষ্ণষ্টমী তিথি একাষ্টকা নামে কথিত। এই একাষ্টকা পুত্রের নিমিত্ত তপস্যা পূর্বক আপন গর্ভে মহিমময় ইন্দ্রকে উৎপাদন করেছেন। সেই ইন্দ্রের দ্বারা দেবগণ দস্যু-তস্কররূপ রাক্ষসগণকে বিশেষভাবে অভিভব (পরাভূত) করেছেন। সেই ইন্দ্ৰ আপন শক্তিতে অসুরগণের হন্তা হয়েছেন। হে একাষ্টকা দেবীগণ! আপনারা আমাকে (অর্থাৎ যজমানকে) অনুষ্ঠানে নিযুক্ত করুন (অর্থাৎ অনুষ্ঠানরহিত আমাকে অনুষ্ঠানযুক্ত করুন)। (কিরকমে? না,) তারা যেন আমাকে সত্য ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত করে দেন, (অর্থাৎ তাঁরা যেন আমাকে হে যজমান! এইটি সত্য ধর্ম। এই রকম বলে প্রজ্ঞাপিত করে দেন)। হে একাষ্টকা দেবীগণ! আপনাদের প্রসাদে সৎ-মার্গাবলম্বী হয়ে আকাঙ্ক্ষিত (অপেক্ষিত) প্রার্থনা করছি। (কি সেই আকাঙ্ক্ষিত প্রার্থনা? না,)-হে একাষ্টকা দেবীগণ! আপনারা যেমন ইন্দ্রের কল্যাণবুদ্ধিতে স্থিতা হয়ে থাকেন, সেইভাবেই আমিও যেন ইন্দ্রের সম্যক অনুগ্রহচিত্তে স্থিত হই। আপনাদের মধ্যে কেউ যেমন একে অপরকে লঙ্ঘন করে কোন কর্ম করেন না, বরং পরস্পরের অনুকুলে কর্ম করেন, সেইরকম আমিও যেন ঋত্বিকগণের অনুকূলে কর্মযুক্ত হই (ব্যবহারযুক্তো ভূয়াসম)। যজমানরূপী আমার ভক্তিযুক্ত বুদ্ধিতে সর্ব জগৎ সম্পর্কে অভিজ্ঞ এই উষা স্থিতবতী হয়েছিলেন এবং আমার প্রতি অনুগ্রহে ব্যাপ্তবতী হয়েছিলেন। অগ্নিহোত, দর্শ, পূর্ণমাস, অবসথ্য ও সুত্য নামে আখ্যাত কর্মানিস্পাদিকা যে পঞ্চ মুখ্য উষার কথা পূর্বে কথিত হয়েছে, সেই উষা-পঞ্চকা হতে এই পঞ্চাত্মকা সব কিছু উৎপন্ন হয়েছে। (কি কি উৎপন্ন হয়েছে? না,) পঞ্চ দোহা উৎপন্নাঃ অর্থাৎ অন্ধকার (তমিস্রা), জ্যোৎস্না, সায়ংসন্ধ্যা, প্রাতঃসন্ধ্যা, ও দিবস–এই পঞ্চসংখ্যক দোহ উৎপন্না হয়েছে। এই পঞ্চ ঝুষ্টি হলো ঋতু অনুসারে পৃথিবীর পঞ্চবিধ নাম। যথা,-বসন্তে পৃথিবী পুষ্পবতী নামে খ্যাতা, গ্রীষ্মে তাপবতী নামে খ্যাতা, বর্ষা ঋতুতে বৃষ্টিমতী নামে খ্যাতা, শরতে জলপ্রসাদবতী (অর্থাৎ জলের নির্মলতা সম্পাদনকারিণী) নামে খ্যাতা, এবং হেমন্ত-শীতে (যুগ্মভাবে এক ঋতুতে) শৈত্যবতী নামে আখ্যাতা। এই পঞ্চ নামান্বিতা পৃথিবী ব্যষ্টি উৎপন্ন করছেন।
সেইভাবেই ঝুষ্টি হতে পূর্ব ইত্যাদি পঞ্চসংখ্যক দিক (উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম-ঊর্ধ্ব) উৎপন্ন হয়েছে। সেইভাবেই পঞ্চদশ নামে আখ্যাত স্তোমের দ্বারা পঞ্চসংখ্যক স্তোত্রে ঝুষ্টির কথা ব্যক্ত হয়েছে। এই পঞ্চ ঝুষ্টি মুখ্য প্রকাশরূপ স্বভাব প্রাপ্ত হয়েছে, (মুখ্যস্বভাবশ্চ ঝুষ্টিং প্রকাশকত্ব)। এই রকমে ঝুষ্টিরূপা ইষ্টকার স্তুতি করা হয়েছে। পূর্ব কথিত পঞ্চসংখ্যকা মুখ্য উষার মধ্যে যিনি প্রথমা উষাকালরূপা, তিনি সত্যের গর্ভসদৃশী; তিনি আদিত্যের সাথে বর্তমান থাকেন। কোন এক উষা রশ্মির সহকারিণী হয়ে জলে মহিমা বিস্তার করছেন; তিনি গ্রীষ্মকালে রশ্মির দ্বারা জল। আনয়নপূর্বক মেঘের উদরে গর্ভরূপ মহত্ব পোষণ করছেন। অপর কোন এক উষা সূর্য-সম্বন্ধীয় সংস্কৃত (নির্মলীকৃত) প্রদেশে বিচরণ করে বর্তমান রয়েছেন। অপর কোন এক উষা দীপ্যমান অগ্নিকে প্রকাশ করছেন। আবার কোন এক উষাকে সবিতা তার দৈনন্দিন প্রকাশকারিত্বের দ্বারা নিয়মিত করছেন, অর্থাৎ সবিতা যেমনভাবে নিয়মিত উদয় ও অস্ত প্রাপ্ত হন, সেইভাবে উষাকেও নিয়মিত করে থাকেন। মুখ্য উষার মধ্যে যিনি প্রথমা, তিনি আলোক উৎপাদনের দ্বারা অন্ধকারকে বিদূরিত করছেন। সেই উষা যমের আধিপত্যে প্রতিষ্ঠিত এই ধেনুবৎ লোকে আলোক প্রদান করায় ধেনুর ন্যায় প্রীতিহেতুকরী। সেই হেন, হে উষা! ধেনু যেমন দুগ্ধ প্রদান করে, সেইভাবে আপনি আমাদের নিমিত্ত বৃষ্টিজলযুক্ত হয়ে সম্বৎসরব্যাপী নিরন্তর ঝুষ্টি ও আলোক প্রদান করুন (দোহনং কুরু)। যে উষা সকল প্রকাশ বা আলোকরূপে নক্ষত্রসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, সেই উষা আকাশবর্তী আলোকের সাথে যুক্ত হয়ে এই স্থানে আগত হয়েছেন। (সেই উষা কেমন? না) সেই উষা বিশ্বরূপা, অর্থাৎ সকল রূপ প্রকাশকারিণী; সেই উষা শবলী বা মিশ্ৰবৰ্ণা, অর্থাৎ সূর্যোদয়ের পূর্বে সামান্য আলোকের সাথে অন্ধকারের লেশমাত্রযুক্তা; সেই উষা অগ্নিকেতু, অর্থাৎ অগ্নিহোত্রীগণ কর্তৃক প্রজ্বলিত অগ্নির কেতু বা ধ্বজা বা পতাকাস্বরূপা; সেই উষা সমানার্থে স্বপস্যমানা, অর্থাৎ সূর্যের সাথে সমান প্রয়োজনে অন্ধকার নিবারণরূপ শোভন ইচ্ছাকারিণী।–হে অজর উষা! আপনি বলীপলিত (বার্ধক্যহেতু শিথিল মাংস ও পৰু চুল) ইত্যাদি জরারহিত হয়েও সৃষ্টি ইত্যাদির আরম্ভকাল হতে চিরকাল অবস্থানরূপ (লক্ষণাং) জরা প্রাপ্ত হয়েছেন। অর্থাৎ সেই হেন উষারূপা এই ইষ্টকা (আমি যার উপধান করছি)। এই প্রথমা উষা এই কর্মে (যজ্ঞে) আগত হয়েছেন। (কিরকম উষা? না,) বসন্ত ইত্যাদি ঋতুগণের পালয়িত্রী, অর্থাৎ সদা আবর্তনের দ্বারা ঋতুসমূহকে সম্পন্ন করছেন; তিনি অহাং নেত্রী, অর্থাৎ নয়নের হেতুকরী আলোক প্রদানের দ্বারা দিবসের নিম্পাদিকা; তিনি জনিত্ৰী প্ৰজানাম, অর্থাৎ প্রজাগণের উৎপাদয়িত্রী-হে উষা! আপনি স্বরূপে এক হয়েও (স্বরূপেনৈক সতী) বহুপ্রকারা হয়ে অন্ধকার দূর করেন এবং আপনি অজীর্ণা হয়েও (অর্থাৎ স্বয়ং বলীপলিত ইত্যাদি জরারহিত হয়েও) সকল মনুষ্যের শরীর ইত্যাদিকে জীর্ণ করে থাকেন। [এই মন্ত্রের সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ৩য় প্রপাঠকের ৪র্থ অনুবাকের না বা ইদং…তম এ বাপ হতে অংশটি সংশ্লিষ্ট] ১১।
[সায়ণাচার্য বলেন-একাদশেহনুবাকে ……. তাবতা চতুর্থচিতিঃ সমাপ্তা। অথ দ্বাদশে পঞ্চভ্যাং চিতাবসপত্নদ্যা ইষ্টকা উচ্যন্তে। অর্থাৎ, একাদশ অনুবাক অবধি চতুর্থ চিতি সমাপ্ত। অতঃপর এই দ্বাদশ অনুবাকে পঞ্চম চিতিতে অসপত্না ইত্যাদি ইষ্টকার বিষয় কথিত হচ্ছে ]
মর্মার্থ- প্রসঙ্গে বক্তব্য–এই পঞ্চম কাণ্ডোক্ত প্রথম থেকে চতুর্থ প্রপাঠক পর্যন্ত মন্ত্রগুলি পূর্ববতী অনুবাকসমূহে ব্যাখ্যাত হওয়ায় সায়ণাচার্য পুনরায় সেগুলি ব্যাখ্যা করেননি। লাহিড়ী মহাশয়ের গ্রন্থে এই চারটি প্রপাঠকের অনুবাকোক্ত মন্ত্রগুলির সায়ণাচার্যকৃত যে বিষয়সূচী পাওয়া যায়, আমরা যথাযথ তারই উল্লেখ করছি।
মর্মার্থ- প্রসঙ্গে বক্তব্য–এই প্রপাঠকের ১ থেকে ১১ অনুবাক পর্যন্ত কোন ভাষ্য সায়ণাচার্য রচনা করেননি। লাহিড়ী মহাশয় গ্রন্থে সায়ণাচার্য কৃত এই পঞ্চম কাণ্ডের তৃতীয় প্রপাঠকটির বিষয়সুচীর উল্লেখ পাওয়া যায়; যথা
মর্মার্থ- এই মন্ত্রে চিতি (অর্থাৎ যজ্ঞস্থলে অগিচয়নের নিমিত্ত ইষ্টক ইত্যাদি পরিমাণ) চিহ্নিত করণের উদ্দেশে যে নামগুলি প্রদত্ত হয়েছে সেগুলি হলো–আশ্বিন্য চিতি, ঋতব্য প্রাণভৃত চিতি; অপস্যা চিতি ও বয়স্যা চিতি। বলা বাহুল্য, চিতির এই নির্ধারিত রূপ অবশ্যই ঋত্বিকগণ ব্রাহ্মণ গ্রন্থ থেকে পরিজ্ঞাত হয়ে থাকেন। (অগ্নিকে কেন ও কিভাবে ইষ্টকার উপর চয়ন করা হয়, কেন অগ্নির নামও হয় চিতি-এই সকল বিষয় পরবর্তী প্রপাঠকগুলিতে পাওয়া যাবে) ॥১॥
মর্মার্থ প্রসঙ্গে বক্তব্য–এই প্রপাঠকের ১ থেকে ১১ অনুবাক পর্যন্ত কোন ভাষ্য সায়ণাচার্য রচনা করেননি। ১২ অনুবাকের যে ভাষ্য পাওয়া যায়, তা একান্তই যজ্ঞ-কেন্দ্রিক এবং তারও মর্মার্থ সাধারণের পক্ষে অপ্রয়োজনীয়। লাহিড়ী মহাশয়ের গ্রন্থে এই পঞ্চম কাণ্ডের চতুর্থ প্রপাঠকটির চিতিসংস্কার মূলক বিষয়সূচীর উল্লেখ পাওয়া যায়; যথা
মর্মার্থ- সায়ণাচার্য বলেন-দীক্ষণীয়েষ্টিরাদ্যানুবাকে ত্রিহবিরীরিতা–অর্থাৎ এই অনুবাকে দীক্ষণীয়েষ্টি ও ত্রিহবি দান সম্পর্কিত মন্ত্র কথিত হয়েছে। সায়ণাচার্য কৃত বিস্তৃত ভাষ্য সাধারণের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিধায় তার মর্মার্থ দেওয়া হলো না ॥১॥
[সায়ণাচার্য বলেন-চয়নস্য বিধিস্তস্য ফলমুখ্যস্য ধারণম্। অনুবাকে দ্বিতীয়ে হি তদেত্ৰয়মীরিতম৷৷ অর্থাৎ এই অনুবাকে অগিচয়নের বিধি এবং অগিচয়নের ফল সম্পর্কিত মন্ত্র কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- পুরাকালে কোনও সময়ে প্রজাপতি সকল প্রজাগণের মধ্যে প্রবিষ্ট হন। কিন্তু সেই প্রজাগণের নিকট হতে আপন কোনও রূপে পুনরায় উদ্ভবিত (প্রকাশিত) হতে সক্ষম হলেন না। সেই অবস্তায় স্থিত হয়ে প্রজাপতি বললনে–এই প্রজাগণের মধ্যে হতে যে আমাকে চয়ন করে পুনরায় সম্ভবিত করতে পারবে, সেই সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হবে। সেই কথা শ্রবণ পূর্বক দেবগণ প্রজাপতিরূপ অগ্নিকে ইষ্টকার দ্বারা চয়ন করে পুনরায় তাকে সম্ভবিত করলেন। ফলে, দেবগণ ঋদ্ধি (অর্থাৎ সমৃদ্ধি) লাভ করলেন। অগ্নিকে সম্যক্ চয়ন করা হয়েছিল বলে অগ্নির নাম হয় চিতি। ব্ৰহ্মবাদিগণের মধ্যে কোন কোন জন জিজ্ঞাসা করেন–কি কামনায় এই অগ্নিচয়ন করণীয়? তার উত্তরে কোন ব্রহ্মবাদী বলেন–আমি শাস্ত্রীয় অগ্নিযুক্ত হবে, এই কামনা পূর্বক অগ্নিচয়ন করণীয়। (ইতি কাময়িত্বাহমগ্নিশ্চীয়ত)। সেই নিমিত্ত অগ্নিচয়ন করলে পরবর্তী ক্রতুর যোগ্য শাস্ত্রীয় অগ্নি যুক্ত হয় (শাস্ত্রীয়াগ্নি এব ভবতি)।-স্বর্গস্থ সকল দেবতা যজমানরূপী আমাকে সম্যক এইরকম ভাবে যজ্ঞানুষ্ঠানে সামর্থ্য প্রদান করুন, আমি যেন শাস্ত্রীয় সর্বকর্মের অনুষ্ঠানে সমর্থ গৃহস্থ হতে পারি, আমি যেন পশুসমৃদ্ধি লাভ করতে পারি–ইত্যাদি কামনা করে অগ্নিচয়ন কর্তব্য।–আমি যেন পূর্ববর্তী তিনপুরুষ (অর্থাৎ পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ) এবং পরবর্তী তিন পুরুষ (অর্থাৎ পুত্র, পৌত্র ও প্রপৌত্র) এবং মধ্যবর্তী স্বয়ং (অর্থাৎ নিজে)–এই সপ্তপুরুষের রক্ষক হতে পারি এই কামনা পূর্বক অগ্নিচয়ন করলে স্বর্গে ও ইহলোকে এই রকম রক্ষক হওয়া যায়। পুরাকালে কোনও সময়ে প্রজাপতি পৃথিবীর উপরে অগ্নিচয়নে ইচ্ছা করেন। তখন চয়নার্থী প্রজাপতিকে পৃথিবী এই কথা বলেন-হে প্রজাপতি! আমার উপরে অগ্নিচয়ন করবেন না; যদি করেন, তাহলে আমি অত্যন্ত দহ্যমান হয়ে পুরলুণ্ঠিত হবে এবং আমার উপরে স্থিত আপনিও কম্পিত হবেন। এর ফলে আপনি পাপিষ্ঠ (তথা দরিদ্র) হবেন। এই কথা শ্রবণ করে প্রজাপতি বলেন-বেশ, আমার চীয়মান অগ্নি (অর্থাৎ চয়নকৃত অগ্নি) যাতে তোমাকে অধিক তাপ দিতে না পারেন, সেই রকম করছি। এই কথা বলে প্রজাপতি বক্ষ্যমান মন্ত্রে ভূমিকে স্পর্শ করলেন। মন্ত্র-হে ভূমে! ত্বমাদ্যকারণভূতামাদ্যপ্রজাপতিরূপয়া….. অর্থাৎ হে ভূমি! তুমি আদি কারণভূত প্রজাপতিরূপ দেবতার দ্বারা রক্ষিত হয়ে অঙ্গিরা ঋষিগণ কর্তৃক অগ্নিচয়ন কর্মকালে যেমন স্থির হয়ে স্থাপিত ছিলে, সেইরকম স্থির হয়ে উপবিষ্ট হও। এই মন্ত্রের সাথে স্পর্শ পূর্বক সর্ব ভূমিকে ইষ্টকারূপ করায় (ভূমিমিষ্টকামেব কৃত্ব) অগ্নি আর ভূমির শরীরাভ্যন্তরে প্রবেশ করেন না। অর্থাৎ অগ্নি স্বয়ং নিজেকে অতি-দগ্ধ করেন না (স্বাত্মানমতিদহতি)। এইভাবে ইষ্টকার উপরে অগ্নিচয়ন করলে ভূমিভাগ অতি তাপ প্রাপ্ত হয় না (অতিদাহো না ভবতি) ২।
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ তৃতীয়ানুবাক উখাহোমাদিকমভিধীয়তে–অর্থাৎ, এই অনুবাক-৩ উখাহোম ইত্যাদির কথা ব্যক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ– এই উখা (পাকস্থলী বা হাঁড়ি) বহু যজুঃ-মন্ত্রে সম্পাদ্যমান হয়েছে। এইভাবে বহুধা প্রযুক্ত হওয়ার কারণে সারহীন (গতসারা) হওয়ায় উখাকে পুনরায় সারযুক্ত করার নিমিত্ত (সসারত্বসম্পাদনায়) অগ্নে যুম্ফা হি ইত্যাদি, অর্থাৎ হে অগ্নি! আপনি যাগানুষ্ঠান করুন ইত্যাদি দুটি মন্ত্রে হোমানুষ্ঠান করতে হবে। এই হোমের দ্বারা উখাকে পুনরায় সারসম্পন্ন প্রয়োগযোগ্য করা হয়ে থাকে। যে যজমান যোগকাল সমাগত হলে প্রমত্ত না হয়ে অগ্নিকে যুক্ত করেন, সেই যজমান অগ্নিযোগানুষ্ঠাতা যজমানগণের মধ্যে নিজেও অগ্নিযোগানুষ্ঠাতা বলে পরিগণিত হন (অগ্নিযোগানুষ্ঠাতেতিব্যপদেশাহো ভবতি)।–হে অগ্নে! ত্বং যুক্তো ভবেতি, অর্থাৎ হে অগ্নি! আপনি যুক্ত হোন–এই মন্ত্রের উচ্চারণের দ্বারা অগ্নির যোগ সম্পন্ন হয়ে থাকে। (৫ম কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৮ম অনুবাকের পূণাং তস্যোপ দধ্যানুপদস্যদেবানুমত্তি এই বাক্যসমূহে এই হোমব্রাহ্মণ বিধৃত আছে)। চিত (চয়নকৃত) অগ্নি অধোমুখে স্থিত হলে, সেই অধোমুখত্বের কারণে সকল আহুতি তার পৃষ্ঠভাগে প্রদত্ত হয় এবং তা অগ্নিকে প্রাপ্ত হয়; অগ্নি ঊর্ধ্বমুখে স্থিত হলে পক্ষের দ্বারা আকাশে গমন করতে সমর্থ হয় না। এবং ঊর্ধ্বে গমনের অভাবে স্বর্গের কোন মঙ্গল হয় না। এই দোষ দুটি পরিহারের নিমিত্ত অগ্নিকে পুরুষের শীর্ষদেশের ন্যায় স্থাপন কর্তব্য। শিরস্থ (মাথার) কেশভাগ যেমন উপরে স্থিত হয়, গলদেশের নিম্নে যায় না, সেইরকম সেখানে আহুতি প্রদান করলে আহুতিগুলি মুখপ্রদেশে অগ্নিকে প্রাপ্ত হয়; কিন্তু পশ্চাৎ দিকে নয় (ন তু পৃষ্ঠতঃ)। –চিত্রং দেবানা ইত্যাদি সূর্যমন্ত্রের দ্বারা হোম করণীয়। সূর্য হলেন চক্ষুর অভিমানী দেবতা, সেই কারণে এই মন্ত্রের দ্বারা পুরুষষীর্ষে চক্ষুরিন্দ্রিয় সম্পাদিত হয়। [অতঃপর বামভৃৎ নামে আখ্যায়িত ইষ্টকার উপধান (ব্রতবিশেষ)কথিত হচ্ছে–পুরাকালে দেবতা ও অসুরগণ যুদ্ধে উদ্যত হলে উভয় পক্ষ তাদের নিজ নিজ ধনসমূহ গোপন পূর্বক কোন স্থানে সম্য রক্ষা করেছিলেন। তখন দেবগণ বামভৃৎ আখ্যায়িত ইষ্টকার দ্বারা অসুরগণের ধনসমূহ বিনাশ করেন। (বামের দ্বারা হরণ বা নাশ করার জন্য ব্যুৎপত্তিগতভাবে হ-কার স্থানে ভ-কার হওয়ায় বামভৃৎ নাম সম্পন্ন হয়েছিল)। অতএব যজমানও এই বামভূৎ উপধানের দ্বারা শত্রুগণের ধন বিনাশ করে থাকেন (ভ্রাতৃব্যস্য ধনং বিনাশয়তি) ॥৩॥
[সায়ণাচার্য বলেন–উখাহুতিঃ পুংশির বামভৃচ্চ তৃতীয়কে। অথ চতুর্থে রেতঃসিগাদ্যা উচ্যন্তে। অর্থাৎ অনুবাক-৩ উখা-আহুতি (বা উখাহোম), পুরুষশীর্ষ ও বামভৃৎ-এর কথা বলা হয়েছে। অতঃপর এই অনুবাক-৪ রেতঃসিক হোম সম্পর্কে কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ- বরুণপত্নী জলদেবীগণের কথা মনে মনে চিন্তা করে (একদা) অগ্নি কামুক হয়ে উঠেছিলেন। ফলে, উত্তেজনা বশে তার রেতঃ (বীর্য) স্খলিত হয়। প্রথম বারে সেই রেতঃ থেকে এই পৃথিবী গঠিত হয়। দ্বিতীয়বারে স্খলিত রেতঃ থেকে দুলোকের উৎপত্তি হয়। পৃথিবী বিবিধরকম প্রাণী ধারণ পূর্বক বিরাজমান হওয়ার কারণে বিরাট নামে অভিহিত হয়। দ্যুলোক স্বতন্ত্ররূপে বিরাজিত হওয়ার কারণে স্বরাষ্ট্র নামে পরিচিতি লাভ করে। বিরাট ও স্বরাট–এই শব্দোপেত মন্ত্র দুটির দ্বারা উপধান (অগ্নিস্থাপনরূপ ব্রতবিশেষ পালন) করলে দ্যুলোক ও ভূমিতে প্রতিষ্ঠা লাভ হয়। দ্যুলোক-দেবতা যখন বৃষ্টিরূপে রেতঃ সিঞ্চন করেন, তখন সেই রেতঃ ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নানা আকারে উৎপন্ন হয়। এই উৎপন্ন সামগ্রী হলো–ব্রীহি (ধান্যবিশেষ), যব ইত্যাদি ওষধিসমূহ এবং নাগবল্পী (তাম্বুলীলতা) ইত্যাদিরূপ সকল বীরুধ (বিস্তৃত লতা)। জঠরাগ্নির দ্বারা সেগুলি অক্ষিত হয়। যিনি এই রকম জানেন, তিনি অন্নদাতা হয়ে থাকেন। রেতস্বী (অর্থাৎ রেতঃশালী) যুবা চিত অগ্নিতে দ্যুলোক ও পৃথিবীলোকের উদ্দেশে,–উভয় হোমই অনুষ্ঠিত করবেন। অগ্নিচয়ন পূর্বক এক বৎসরের পূর্তি পর্যন্ত কোন সমাগত বয়োবৃদ্ধ ও বিদ্যাবৃদ্ধের প্রতি অভ্যুত্থান ইত্যাদি করবেন না। (অর্থাৎ বয়োবৃদ্ধ ও জ্ঞানবৃদ্ধ ব্যক্তিও সমাগত হলে তাকে সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্ত উত্থিত হয়ে দণ্ডায়মান হবেন না)। দ্যু ও ভূমি বিরাট বলে এর অনুষ্ঠানকারী যুবা তার অপেক্ষা কোন উৎকৃষ্ট পুরুষকে সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্ত প্রত্যুত্থান করবেন না। (অর্থাৎ প্রত্যুত্থান না করে হোম বা যাগানুষ্ঠানে সংযত বা আচারযুক্ত হয়ে থাকবেন–এটাই এই ব্রতের নিয়ম) ॥৪॥
মর্মার্থ— বিশ্বকর্মা সকল দিকের পালক, তিনি আমাদের এবং আমাদের পশুসমূহকে রক্ষা করুন। সেই বিশ্বকর্মার উদ্দেশে নমস্কার (জ্ঞাপন করি)। প্রজাপতি, রুদ্রদেব, বরুণদেব ও অগ্নিদেব–এই চারজন চারটি দিকের অধিপতি (পতিঃ), এঁরা আমাদের রক্ষা করুন। অশ্ব, বৃষ ইত্যাদি শুক্ৰল পুরুষভেদ (বৃষ্ণিবঃ) পশুসমূহের স্বামিভূত দেবতা হলেন বিশ্বকর্মা ইত্যাদি দেবতাগণ। পশুশীর্ষ উপধানের (অর্থাৎ ব্রতবিশেষের) পালনে এঁরা অনিষ্টকারী হয়ে থাকেন; এই কারণে (তাদের সেই অনিষ্টকরণের ইচ্ছার পরিহারের নিমিত্ত) হিরণ্য-ইষ্টকা (হিরণ্যখণ্ড-নির্মিত ইষ্টকা) স্থাপন পূর্বক তাদের নমস্কার কর্তব্য।–(প্রকারান্তরে হিরণ্যেষ্টকার প্রশংসা কথিত হচ্ছে) ব্রহ্মবাদিগণ যজমান-সম্বন্ধীয় সর্বকর্মের উপদ্রবজনিত বিষয়ে পরস্পর কথোপকথাচ্ছলে বলে থাকেন-জগতে (লোকে) দুরকম পশু আছে–গ্রাম্য পশু ও আরণ্য পশু। অশ্ব ইত্যাদি গ্রাম্য পশুর দ্বারা যজমান চীয়মান অগ্নিকে স্থাপিত করেন; ময়ুর ইত্যাদি আরণ্য পশুসমূহকে অগ্নির শোকের দ্বারা যোজিত করা হয়। এই উভয় পশু ভিন্ন আর কোন পশুর দ্বারা যাগ কর্তব্য, কি নাম সেই পশুর? অতএব দেখা যাচ্ছে, এই যজমান-সম্বন্ধীয় ব্যাপার সর্বকর্মের উপদ্রবস্বরূপ বা কষ্টকর। এর উত্তরে বলতে শোনা যায়–না, এটি কষ্টকর ব্যাপার নয়; কারণ হিরণ্য-ইষ্টিকার উপধান করলে (অর্থাৎ হিরণ্যনির্মিত ইষ্টকা স্থাপন পূর্বক ব্রতপালন করলে) গ্রাম্য ও আরণ্য পশুসমূহ হিংসা ইত্যাদি দোষ প্রাপ্ত হয় না। অতঃপর প্রথম-মধ্যম-উত্তম এই তিন বৃত্তিক্রমে প্রাণ, ব্যান ও অপানরূপ স্বয়মাতৃদ্মা ইত্যাদি চিতি বা ইষ্টকার দ্বারা উপধানের নিমিত্ত অগ্নি স্থাপন কর্তব্য। প্রথম স্বয়মাতৃগ্ন চিতি অগ্নির প্রাণের উচ্ছ্বাস ঘটায়, মধ্যম চিতি প্রাণ-অপান-ব্যানের স্তম্ভন করে, তৃতীয় বা উত্তম চিতিও অগ্নির শ্বাসক্রিয়া ঘটায়। এইভাবে এর দ্বারা অগ্নির প্রাণ ইত্যাদির সম্বর্ধন ঘটে। অতঃপর ক্রমানুসারে তিনটি ব্যাহৃতি (ভূর্ভুবস্বঃ ইত্যাদি লোক-সপ্তাত্মক মন্ত্র বিশেষের দ্বারা) হোম কর্তব্য। হে পূর্ব ইত্যাদি দিকস্থায়ী স্বয়মাতৃগ্না! আমাদের প্রাণ, ব্যান, অপান, বাক্য ও চক্ষুর বা দৃষ্টির সিদ্ধির নিমিত্ত তোমার উপধান (স্থাপন) করছি। যিনি তোমার স্বামিভূত (প্রভুস্বরূপ) দেবতা, তার অনুগ্রহে (পূর্ববর্তী) অঙ্গিরা ঋষিগণের অগ্নিচয়নকার্যের অনুসরণে এই স্থানে স্থির হয়ে উপবেশন করা (সীদোপবিশ)। পুরাকালে কোনও সময়ে দেবগণ চীয়মান অগ্নির সাধনে স্বর্গপ্রাপ্তির নিমিত্ত ইচ্ছান্বিত হয়েছিলেন (স্বর্গং প্রাপ্তমৈচ্ছন; কিন্তু তা সাধন করেও স্বর্গপ্রাপ্ত হতে সক্ষম হলেন না। সেই নিমিত্ত শক্তিসাধনত্বসম্পন্ন স্বয়মাতৃগ্নার উপধান করে তার সর্বদিক অবগতির দ্বারা চক্ষুলাভ করে স্বর্গপ্রাপ্ত হলেন। এই নিমিত্ত স্বয়মাতৃগ্নার মন্ত্রে চক্ষুষেত্ব ইত্যাদি, অর্থাৎচক্ষুর নিমিত্ত তোমাকে ইত্যাদি মন্ত্র যুক্ত করণীয়। এই হেতু এই চারটি স্বয়মাতৃগ্না ইষ্টকা চারটি দিকে উপধান করে সর্বদিক অবগতি-কারক চক্ষুর সাথে অগ্নির দ্বারা স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে (স্বর্গং স্নোতি) ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন-ষষ্ঠেহাং রূপিদয়ঃ কথ্যন্তে অর্থাৎ এই অনুবাকে দিবসের রূপ ইত্যাদি কথিত]
মর্মার্থ- অগ্ন আ যাহি বীতয় ইত্যাদি, অর্থাৎ অগ্নি! আপনি আগত হন-ইত্যাদি আনমূলক পাঁচটি মন্ত্র হলো দিবসের রূপ। প্রথম মন্ত্র আয়াহী–এই উক্তির দ্বারা অগ্নির আহ্বান জ্ঞাপিত হয়। দ্বিতীয় বৃণীমহ উক্তির দ্বারা অগ্নির বরণ (পশ্চাদ্বরণং) প্রতীত হয়। তৃতীয় সমিধ্যত উক্তির দ্বারা অগ্নির সমিন্ধন (সম্যক দীপ্তি) প্রতীয়মান হয়। চতুর্থ মন্ত্র বৃত্রাণি জঘনদিতি-র দ্বারা শত্রুবধের সামর্থ্য বোধিতব্য হয় এবং পঞ্চমে মনামহ উক্তির দ্বারা অগ্নির মননের কথা ব্যক্ত হয়েছে। (প্রথম চারটি মন্ত্র পূর্ববর্তী কাণ্ডগুলির ভিন্ন ভিন্ন প্রপাঠকে ব্যাখ্যাত হয়েছে। যেমন, প্রথম ও দ্বিতীয় মন্ত্র হোতৃকাণ্ডে প্র বো বাজা–এই অনুবাকে কিংবা ২য় কাণ্ডের ৫ম প্রপাঠকে সামিধেনীব্রাহ্মণে, তৃতীয় মন্ত্রটি যত্ত্বা হৃদা অনুবাকে (১কা, ৪. ৪৬অ.), চতুর্থটি চতুর্থ কাণ্ডের তৃতীয় প্রপাঠকের ত্রয়োদশ অনুবাকে ব্যাখ্যাত; ইত্যাদি। পঞ্চম মন্ত্রটি শাখাস্তরগত)। পাঁচটি দিনে যথাযথ চিতিতে উপধান অর্থাৎ ইষ্টকা স্থাপনরূপ এই পাঁচটি মন্ত্র দিবসের রূপ (এতৈর্মন্ত্রৈরুপধেয়ানামিষ্টকানামহ্নাং রূপাণীত্যেতন্নামধেয়)। সেই উপধানের বা ইষ্টকা স্থাপনের দ্বারা সর্বদা অর্থাৎ প্রতিদিন অগ্নির চয়ন করা হয় (অগ্নিং চিতবান্ ভবতি) এবং কালবিশেষ অর্থাৎ দিবসের স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। ব্ৰহ্মবাদীগণ বলে থাকেন–একবার চিতিতে মন্ত্রের দ্বারা অগ্নির উপধান করলে তার গতসারত্ব হয়; তাহলে বারবার কেন তার উপধান করা হয়? এর উত্তরে বলা হয়–ইন্দ্রগ্নী বা বৃহস্পতি-এই মন্ত্রপাঠের জন্য ইন্দ্রদেব, অগ্নিদেব ও বৃহস্পতিদেব অতিশয়রূপে তার সামর্থ্য প্রদান করেন বলে কখনও তা গতসারা হয় না (অর্থাৎ তার সার বা বল গত হয় না। একটি মন্ত্রের দ্বারা পুনঃ পুনঃ উপধানের ফলে আলস্য হতে পারে, সেই কারণে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্র পাঠ কর্তব্য; তাতে আলস্য হবে না (তদালস্যং ন ভবতি)। লোকং পৃণ এই রকম মন্ত্র পাঠ করা কর্তব্য; এই মন্ত্রে আত্মা শরীর, অনুচররূপ দ্বিতীয় অনুষ্টুপছন্দস্ক প্রাণরূপ। ফলে প্রাণবায়ু সর্ব শরীরে সঞ্চরবান্ হবে। যো বা ইষ্টকানাং প্রতিষ্ঠাং বেদ ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা উপধানে ইষ্টকার প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে ॥৬॥
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমে যুপৈকত্বদীচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৭ একযুপ ইত্যাদির বিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে।]
পঞ্চম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৪৭
অনুবাক-৪৭
মন্ত্র- সুবৰ্গায় বা এষ লোকায় চীয়তে যদগ্নিৰ্ব্বজ্র একাদশিনী যদয়াবেকাদশিনীং মিনুয়াদ্বজ্রেণৈনং সুবর্গালোকান্তধ্যাদ্যম মিনুয়াৎ স্বরুভি পশুষ্যৰ্দ্ধয়েদেকযুপং মিনোতি নৈনং বজ্রেণ সুবর্গাল্লোকাদধাতি ন স্বরুভিঃ পশুন ব্যkয়তি বি বা এষ ইন্দ্রিয়েণ বীৰ্য্যেৰ্দ্ধতে যোহল্পিং চিম্বধিক্ৰামত্যৈন্দ্রিয়া ঋচাইক্ৰমণং প্রতীষ্টকামুপদধ্যামেন্দ্রিয়েণ বীর্যেণ বধ্যতে রুদ্ৰো বা এষ যদগ্নিস্তস্য তিঃ শরব্যাঃ প্রতীচী তির্যনুচী তাভ্যো বা এষ আ বৃশ্চ্যতে যোহগিনং চিনুতেহগ্নিং চিত্বাতিধন্বমযাচিং ব্রাহ্মণায় দদ্যাক্তাভ্য এব নমস্করোত্যথোতাভ্য এবাত্মানং নিষ্ক্রীণীতে যত্তে রুদ্র পুরঃ ধনুস্তদ্বততা অনু বাতু তে তস্মৈ তে রুদ্র সম্বৎসরেণ নমস্করোমি যত্তে রুদ্র দক্ষিণা ধনুস্তঘাত্যে অনু বাতু তে তস্মৈ তে রুদ্র পরিবৎসরেণ নমস্কয়োমি যত্তে রুদ্র পশ্চাদ্ধদ্বাতো অনু বাতু তে তস্মৈ তে রুদ্রেদাবৎসরেণ নমস্কয়োমি যত্তে রুদ্রোত্তরাস্তৎ বাতো অনু বাতু তে তস্মৈ তে রুদ্রেদুবৎসরেণ নমস্কায়োমি যত্তে রুদ্রোপরি ধনুস্তদাতো অনু বাতু তে তস্মৈ তে রুদ্র বৎসরেণ নমস্কারোমি-রুদ্ৰো বা এষ যদগ্নিঃ স যথা ব্যাঘ্রঃ ক্রুদ্ধস্তিত্যেং বা এষ এতৰ্হি সঞ্চিতমেতৈরূপতিতে নমস্কারৈরেবৈনং শময়তি যেহগ্নয়ঃ পুরীষ্যাঃ প্রবিষ্টাঃ পৃথিবীমনু। তেষাং ত্বমত্তমঃ প্র নো জীবাতৰে সুৰ।। আপং ত্বাহগ্নে মনসাহপং দ্বাগ্নে তপাসাহপং ত্বাহগ্নে দীক্ষয়াহপং জাহগ্ন উপসদ্ভিপং ত্বাংগ্নে সুত্যয়াহপং ত্বাহগ্নে দক্ষিণাভিরাপং ত্বাহগ্নেহভৃথে নাহপং ত্বাহগ্নে বশয়াহপং ত্বাহয়ে স্বগাকারোণেত্যাহৈ বা অগ্নেরা প্তিস্তয়ৈবৈনমাগ্নেতি ॥৭॥ মর্মার্থ-যে অগ্নি এই স্বর্গলোকের নিমিত্ত চয়ন করা হয় (চীয়তে), তা একযুপদশিনী ও বজ্রসমানা করতে হবে। এই বিষয়ে সূত্রোক্ত উপধান বিধিতে বলা হয়েছে–যে উপধানকর্তা চয়নকালে অগ্নিকে অতিক্রম করেন, তাঁর ইন্দ্রিয় সামর্থ্য বিযুক্ত বা বিনষ্ট হয়। এই যে অগ্নি, তিনি রুদ্ররূপ ক্রুর দেবতা; এই নিমিত্ত তাকে ধনুর দ্বারা চয়ন কর্তব্য। (কারণ কুরের সাথে সখ্যতা শরের দ্বারা করণীয়)। হে রুদ্র! পূর্বদিকে আপনার যে ধনু আছে, তার অনুসরণপূর্বক বায়ু প্রবাহিত হোক (বাতু প্রসরতু)। (কি নিমিত্ত? না,) তার সহায়তা নিমিত্ত। হে রুদ্র! আপনার ধনুতে যখন বায়ুর আনুকুল্য ঘটে, তখন তখন নিক্ষিপ্ত বাণ শীঘ্র আপনার সাহায্যে গমন করে থাকে। হে রুদ্র! আপনার ধনুঃকে প্রথমতঃ এক সম্বৎসরব্যাপী নিরন্তর নমস্কার করছি। তারপর দ্বিতীয় পরিবৎসরব্যাপী, তৃতীয় ইন্দাবৎসরব্যাপী, চতুর্থ অনুবৎসরব্যাপী এবং পঞ্চম বৎসরব্যাপী যথানুক্রমে আপনাকে নিরন্তর নমস্কার করছি। (জগতে ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্র ভক্ষণোদ্যত হয়ে যেমন ভয়ঙ্কর গর্জন করে থাকে, সেইভাবে চিত-অগ্নি উপস্থানে (উপাসনায়) উগ্র হয়ে উঠলে সেই মন্ত্রগত নমস্কারের দ্বারা তাকে শান্ত করা হয়) ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অষ্টম উপস্থানাদিকমুচ্যতে। অর্থাৎ এই অনুবাক-৮ উপস্থান অর্থাৎ উপাসনা ইত্যাদি বিষয় কথিত হয়েছে।]
মর্মার্থ– গায়ত্রী ইত্যাদি সামবিশেষের নাম। তৎসবিতুর্বরেন্যম–অর্থাৎ সেই সবিতাদেবের বরণীয় তেজের ধ্যান করি–এই ঋক গায়ত্রী হতে উৎপন্ন; তার দ্বারা শিরোভাগের উপস্থান করলে এই অগ্নিতে প্রাণ স্থাপিত হয়। এইভাবে তামিদ্ধি হবামহ এই ঋক্ হতে বৃহৎ সাম, অভিত্বা শুর নোনুম এই ঋক্ হতে রথস্তর সাম উৎপন্ন। এগুলির দ্বারা পক্ষদ্বয়ের (অর্থাৎ শরীরের পার্শ্বভাগ দ্বয়ের) উপস্থান করলে এই অগ্নিতে বল সম্পাদিত হয়ে থাকে। এই ভাবে পুচ্ছ-উপস্থানের দ্বারা ঋতুর প্রতিষ্ঠা, পৃষ্ঠস্তোত্রগত সামের দ্বারা অগ্নির শরীরকান্তি প্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয় কথিত হয়েছে। অশ্বং ন ত্বা বারবস্ত এই ঋক্ বারবন্তীয় সাম হতে উৎপন্ন, অভি প্র বঃ সুরাধসম এই ঋক শ্যৈত সাম হতে উৎপন্ন। এই সাম দুটির দ্বারা শ্রোণিদ্বয়ের উপস্থানে অন্যত্র গমন নিবারিত হয় (বা স্বাধীন করা হয়)। (শাখান্তর অনুসারে শৈত্যস্থানে বামদেব্য উক্ত হয়। প্রজাপতেহৃদয় নামক স্তোভের (শব্দের) দ্বারা উপস্থানে অগ্নি প্রীতিপ্রাপ্ত হন। ইত্যাদি এবং অধুনা (শেষে) আত্মেষ্টকার উপস্থানের বিধি কথিত ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন-নবম আহুত্যাদিমভিধীয়তে। সূত্রকার বলেন–অগ্নে উদধে যা ত ইষুযুর্ব নামেতি পঞ্চাহজাহুতীহুত্বা। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৯ আহুতি ইত্যাদি বিষয় কথিত হয়েছে। সেই সম্পর্কিত ইযুবা নামক পঞ্চ-আজাহুতি, প্রোক্ষণ ইত্যাদির কথা উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- (উদধি কোনও অগ্নির নাম)। উদধিনামক হে অগ্নি! পরশরীরে সহসা মিশ্রিত বা বিদ্ধ হওয়ার নিমিত্ত ইষুযুর্ব নামক আপনার যে বাণ আছে, সেই যুবা-অভিধেয় বাণের দ্বারা আমাদের সুখী করুন (সুখয়)। আপনার সেই বাণের উদ্দেশে নমস্কার করছি। আপনার সেই বাণের প্রসাদে আমরা সমীচীনভাবে জীবনযুক্ত হবে। এখানে উল্লেখিত দুধ, গহ্য, কিংশিল, বন্য ইত্যাদি শব্দসমূহ ইষুযুর্বার মতো অগ্নির এক একটি নামবিশেষ। সেই নামাত্মক অগ্নিগণের বাণ আমাদের সুখী করুক–এটাই প্রতিপাদ্য।৯।
[সায়র্ণাচার্য বলেন–দশমে সর্পাহুত্যাদিকমুচ্যতে। অর্থাৎ এই অনুবাক-ে সর্প-আহুতির কথা ব্যক্ত হয়েছে। সূত্রকার বলেন–সমীচী নামক প্রাচী দিকবর্তী ছয় সর্পকে দধি দুগ্ধ মিশ্রণের দ্বারা আহুতি প্রদান পূর্বক পরিচর্যা এই অনুবাকের বিষয়বস্তু] ।
মর্মার্থ- (সমীচী নামের ব্যুৎপত্তি এই যে, প্রাচী বা পূর্বদিকে প্রাতঃকালে প্রবর্তিত অনুষ্ঠানে পূজিত হওয়ার কারণে পূর্বদিক সমীচী নামে অভিহিত)। হে প্রাচি (বা পূর্বদিক)! তুমি সমীচী অভিধায় ভূষিত, এই কারণে অগ্নিদেব তোমার স্বামী বা অধিপতি, কৃষ্ণসর্প তোমার রক্ষক। তোমার সেই অধিপতি ও রক্ষকের উদ্দেশে নমস্কার করছি; তারা উভয়ে আমাদের সুখী করুন (সুখয়তা)। সেই সুখী হওয়ার নিমিত্ত আমরা যে জনকে হিংসা করি এবং শত্রুরূপে আমাদের যারা দ্বেষ করে সে দুরকম শত্রুকে তোমার অধিপতি অগ্নির ও তোমার রক্ষক কৃষ্ণসর্পের বিদারিত (বিস্তারিত) আস্যে অর্থাৎ মুখবিবরে স্থাপন করছি। (এইভাবে পরপর যোজিতব্য। উল্লেখ্য-ওজস্বিনী বা বলবতী হলো দক্ষিণ দিকের নাম। পৃদাকুঃ হলো অজগর সর্প। প্রকর্ষের সাথে সায়ংসন্ধ্যায় পূজিত হওয়ার কারণে পশ্চিম (প্রতীচী) দিক প্রাচী নামেও অভিহিত। স্বজঃ অর্থে স্বাধীনবল সর্প। কটকবলয়াকার রেখাযুক্ত সর্প হলো তিরশ্চরাজিঃ। অধিপালয়তি অর্থে ঊর্ধ্ব দিকের নাম। প্রৌঢ়ত্বাদ বৃহতী। যে সর্পের শাসধারণের দ্বারা আপন শরীর উচ্ছনতা অর্থাৎ স্ফীত হয়ে থাকে তাকে শিত্র বলে। ভূমিরূপয়া অর্থে অবধাদিকের নাম। যে সর্পের গ্রীবা কৃষ্ণ, তা কল্মষগ্রীবঃ। ইত্যাদি)।১০৷
[সায়ণাচার্য বলেন-অগ্নিশেষমবস্থাপ্যাশ্বমেধশেষভূতা একাদশিনঃ পশবো বিধীয়ন্তে। একাদশানাং পশুনাং সমুহ একাদশিনী। স চৈকৈকস্মিন্ননুবাক একৈকা বিধীয়তে। অর্থাৎ–এই একাদশ অনুবাকে অশ্বমেধের শেষ একাদশ সংখ্যক পশুর আলভন (বলিপ্রদান) বিষয় কথিত হয়েছে।]
[সায়ণাচার্য বলেন যে, এই অনুবাকের ত্রয়োদশ সংখ্যক মন্ত্রে কুন্তেষ্টিকা আমন্ত্রণের কথা বিবৃত হয়েছে।]
মর্মার্থ– যাঁরা নির্মলত্বের কারণে হিরণ্যবর্ণা অর্থাৎ স্বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বলবর্ণশালিনী, যাঁরা স্নান ইত্যাদির দ্বারা স্বয়ং শুদ্ধা ও সদাচারিণী, যাঁদের হতে কশ্যপ, প্রজাপতি ও ইন্দ্রও উৎপন্ন হয়েছেন এবং যাঁরা অগ্নিকে গর্ভে ধারণ করেছেন, সেই হেন জলদেবীগণ (আপঃ) আমাদের সুখপ্রাপ্ত করুন।– বরুণ নামে আখ্যায়িত রাজা বা অধিপতি জলদেবীগণের মধ্যে গূঢ়ভাবে সঞ্চরণ করে থাকেন। (কি করেন তিনি? না,) তিনি জনগণের যথাশাস্ত্র স্নান-পান ইত্যাদি আচরণ সবই লক্ষ্য করেন। সেই জলদেবীগণ মধুর রস ক্ষরণ করে থাকেন। সেই হৈন শুদ্ধা ও সদাচারিণী জলদেবীগণ আমাদের সুখপ্রাপ্ত করুন। দুলোকে দেবগণ যে জল-সম্বন্ধি সার নিজেদের ভোজ্য পীযুষ বা অমৃত রূপে গ্রহণ করেছেন, যে জল অন্তরীক্ষলোকে বহুপ্রকার হয়ে থাকে, যে জল পৃথিবীকে নিজে আর্দ্র করে, সেই নির্মল জল আমাদের সুখপ্রাপ্ত করুক। হে জলদেবীগণ! আপনারা শান্ত দৃষ্টিতে আমাকে অবলোকন করুন; আপনাদের শান্ত শরীরের দ্বারা আমাকে স্পর্শ করুন। আমি জলের মধ্যে স্থিত সকল অগ্নিকে হোমের দ্বারা তৃপ্ত করছি (তপয়ামি)। আপনাদের কান্তি, বল ও ওজও আমাতে স্থাপন করুন (স্থাপয়ত)। হে জলদেবীগণ (হে আপো মূয়ম)! দুলোক হতে সম্যক্ প্রকর্ষের সাথে আপনারা গমন করে থাকেন। মেঘ নামে অভিহিত হয়ে আপনারা নাদ (শব্দ) করে থাকেন। (অর্থাৎ প্রবাহকালে পাষাণসদৃশ মেঘে জলাঘাতের দ্বারা শব্দ সৃষ্টি হয়)। এই নাদ (শব্দ) করার নিমিত্ত সকল স্থানে আপনারা নদী নামে পরিচিত হয়ে থাকেন (নদীতি নামধেয়ং প্রাপ্ত)। হে সিন্ধবঃ অর্থাৎ স্যন্দনশীলা (ক্ষরণশীলা) জলদেবীগণ! আপনাদের নির্বাচনসাধ্য সেইরকম কতকগুলি নাম বিদ্যমান। হে আপো (জগদেবীগণ)! যখন বরুণের দ্বারা প্রেরিত হয়ে আপনারা সম্যক আনন্দে নৃত্য করছিলেন, তখন উৎসুক ইন্দ্রদেব আপনাদের দর্শনপূর্বক আপ্যায়িত (প্রীত) হয়েছিলেন, সেই কারণেও আপনারা আপ নাম প্রাপ্ত হন। আপনারা সকলের অনুকুলা হোন। হে জলদেবীগণ (দেবীর্যে আপো)! স্বভাবত (অর্থাৎ প্রয়োজন না থাকলেও) প্রবহমান আপনাদের দর্শনে পরিতুষ্ট ইন্দ্র আপনাদের বরণ করেছেন। আপনাদের প্রবাহের নিমিত্ত অপর কোন শক্তির প্রয়োজন হয় না (অর্থাৎ আপনাদের প্রবাহ অপর কোন শক্তির অপেক্ষা করে না), আপনারা আপন শক্তিতেই প্রবাহিত হয়ে থাকেন। (জল আপন শক্তিতেই ক্ষরিত হয়, এটি সর্বলোক-প্ৰসিদ্ধ)। ইন্দ্রের দ্বারা বৃত (বরিত) হওয়ার কারণে আপনাদের বারি নাম নিম্পাদিত হয়েছে। স্বেচ্ছায় স্যন্দমানা (ক্ষরিত বা প্রবাহমানা) জলসমূহকে ইন্দ্রদেবও আপন অধীন করেছিলেন। ইন্দ্র কর্তৃক অধিষ্ঠিত হয়ে জলসমূহ প্রভূত রূপে উল্কর্ষতা লাভের জন্য চেষ্টিত হয় (উদানিযুরুকর্ষেণ চেষ্টিতবত্যা); সেই কারণে তারা উদক নামেও কীর্তিত হয়। এই কল্যাণরূপা জলরাশি গাভীর শরীর হতে (ঘৃতমাসুগোশরীর দ্বারা) ঘৃতরূপে পরিণত হয়েছে; সেই হেন জলরাশি এইভাবে অগ্নি ও সোমদেবকে ধারণ করেছে। সোমকে ধারণের কারণে এই জলের রস (অর্থাৎ সার) মাধুর্যযুক্ত হয়ে সর্বজনের পক্ষে পুষ্টিকর হয়েছে। সেই হেন রস প্রাণ ও বলের সাথে আমাতে আগত হোক। যাবৎকাল জলের রস অন্ন ইত্যাদিরূপে শরীরে অবস্থান করে, তাবৎকাল প্রাণ বিগত হয় না এবং বলও বিনষ্ট হয় না। জলের সার বা রস যাবৎকাল আমাতে (আমার শরীরে) স্থিত থাকে, তাবৎকাল আমার চক্ষু দর্শনে সমর্থ হয় এবং আমার কর্ণও শ্রবণে সমর্থ হয়। জলের নাদ (শব্দ) আগত হয়ে আমাদের শরীরে স্থিত হয়। সেই নাদই আমাদের বাক্ (অর্থাৎ কথা)। হে হিরণ্যবর্ণ তেজস্বী জলরাশি! যে সময়ে আমি তোমাদের সেবায় তৃপ্ত হই (অর্থাৎ জলপান করি) তখনই মনে করি যে আমি যেন অমৃত পান করছি। হে জলরাশি বা জলদেবীগণ! আপনারা আমাদের সুখদাত্রী হোন, (অর্থাৎ স্নান-পান ইত্যাদির হেতুভূত সুখে উৎপাদকত্বের নিমিত্ত জল প্রসিদ্ধ); আপনাদের সেই হেন রস আমাদের অনুভব করান; অধিকন্তু মহীত রমণীয়া দর্শনের নিমিত্ত আমাদের যোগ্য করুন। (আমরা যাতে পরতত্ত্ব সাক্ষাৎকারের অর্থাৎ পরম ব্রহ্মকে জ্ঞাত হওয়ার যোগ্য হতে পারি, তেমন করুন)। আপনাদের যে শান্ততম সুখৈকহেতুকর রস আছে তা আমাদের প্রাপ্ত করান, যেমন প্রীতিযুক্তা মাতা শিশুকে আপন স্তন্যরস পান করিয়ে থাকেন, সেইভাবে। হে জলদেবীগণ! আপনারা যে রসের নিবাসে প্রীত হয়ে থাকেন, আমরা যেন সেই রস অতিশয়যুক্ত প্রাপ্ত হই (ভূশং প্রামঃ)। অধিকন্তু, হে জলদেবীগণ! আপনারা আমাদের প্রজাগণের উৎপাদক করুন। (অর্থাৎ আমরা যাতে প্রজাগণের উৎপাদক হতে পারি, তেমন করুন)। হে নৈবারচর! তুমি দুলোকে আশ্রিত হও, অন্তরীক্ষেও প্রযত্নবান হও, পৃথিবীতে সংযুক্ত হও। তুমি ব্ৰহ্মতেজঃস্বরূপ হও (ব্রহ্মাবচসমসি); (অর্থাৎ তুমি ব্রহ্মসাধনত্বের রূপ)। অতএব আমি তোমাকে এই ব্রহ্মতেজে স্থাপন করছি (ব্রহ্মবৰ্চসায় ত্বমত্রোপদধামি) ॥১॥
[সায়ণাচার্য বলেন–দ্বিতীয়ে ইষ্টকোপধান বিধত্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২ ে ইষ্টকা-উপধান বা ইষ্টকার স্থাপন বিষয়ক ব্রতের কথা ব্যক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- যে পাত্রে জল গ্রহণ করা হয়, সেই পাত্রকে গ্রহ বলা হয়; অর্থাৎ গ্রহ হলো জলাধার পাত্র, যা কুম্ভ ও কুম্ভী। সেই পাত্রগুলি জলের দ্বারা পূর্ণ হওয়ার নিমিত্ত জলের গ্রহ, কুম্ভ ও কুম্ভীরূপ; সেগুলি গ্রহণ কর্তব্য। গ্রহণের দ্বারা উপধান লক্ষিত হচ্ছে। এই কুম্ভ কুম্ভীরূপ জলের পাত্রদ্বয় রাজসূয়স্বরূপ–অর্থাৎ ফলের দিক হতে তার মতো। চীয়মান (অর্থাৎ যে অগ্নিকে চয়ন করা হচ্ছে, এমন) অগ্নি হলেন সবঃ (যজ্ঞ), অর্থাৎ যেস্থানে অভিষেচন করা হয়। (অর্থাৎ যজমান এখানে অভিষেকযুক্ত হয়ে থাকেন বলে যজ্ঞ সবঃ নামে অভিহিত; এই অগ্নিও তারই মতত)। এবং যা রাজসূয় নামে আখ্যাত কর্ম, তা এই বরুণসবঃ। বরুণ দেবতাও কোনও কালে রাজসূয় যজ্ঞ অনুষ্ঠান করলে সেখানে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। যা চিত্য, তা এই অগ্নি; এই অগ্নিতেও অভিষেক বিদ্যমান। অতএব কুম্ভীষ্টকার উপধানের দ্বারা বরুণ ও অগ্নির সৌজন্যে যজমান অনুষ্ঠান পরায়ণ হন (অনুষ্ঠিতবান্ ভবতি)। আরও, রাজসূয়ের দ্বারা কিংবা অগ্নিচয়নের দ্বারা যে লোকপ্রাপ্তি ঘটে, ইষ্টকা উপধানের দ্বারাও সেই লোক জয় করা যায়। জলের দ্বারা অগ্নিকে শান্ত করা হয়, সেই কারণে জল ও অগ্নির মধ্যে শত্রুতা। অতএব চয়মান অগ্নির অবোস্থ ভূমিতে কুম্ভ কুম্ভিগত জলের উপধান করলে শত্রুগণ অভিভূত হবে এবং উপধাতা (অর্থাৎ যে যজমান উপধান করবেন, তিনি) স্বয়ং ঐশ্বর্যবান্ হবেন; শত্রুগণ পরাভূত হবে। অধিকন্তু, উদক হতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে জল অমৃতরূপ; যে কারণে অত্যন্ত গ্লানিমাপন্ন বা মূৰ্ছিত জনের মূৰ্ছা নিবারণের নিমিত্ত শীতল জলে তাকে সিঞ্চন করতে করা হয়ে থাকে। যিনি এই তথ্য বিদিত হয়ে ইষ্টকার উপধান করেন, তিনি কোনভাবে আর্ত হন না, বরং পূর্ণ আয়ু লাভ করেন। অন্ন উদক হতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে অন্ন হলো জলের স্বরূপ; জলের দ্বারা পুষ্টিপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে পশুগণ জলের স্বরূপ; দুগ্ধ ইত্যাদি অন্নের হেতুভূত হওয়ায় পশুগণও অনুরূপ (পশুনামপ্যন্নত্ব। যে উপধাতা এই তথ্য বিদিত হন (অর্থাৎ যিনি এই তথ্য বিদিত হয়ে ইষ্টকার উপধান করেন), তিনি অন্নবা ও পশুশালী হয়ে থাকেন।–(উপধানের নিমিত্ত জলাধারের বা জলপাত্রসমূহের বিধি)-জলপাত্ৰসমূহ কুম্ভ-কুম্ভীরূপ। কাংস্য (কাসার) ইত্যাদি নির্মিত পাত্রে লোকে (অর্থাৎ জনে) অন্ন পাক করে ও ভক্ষণ করে। অতএব পাত্র হলো অন্নের যোনি (অর্থাৎ উৎপত্তিস্থল); তার সহায়তাতেই অন্নপ্রাপ্তি ঘটে। সেই নিমিত্ত ইষ্টকার উপধাতা ও উপধান-বেত্তা (উপধান সম্বন্ধে যিনি সম্যক বিদিত) পাত্রের সংখ্যা অনুসারে পুত্র পৌত্র ইত্যাদি দ্বাদশ পুরুষ পর্যন্ত সমৃদ্ধ হয়ে থাকেন। আরও, পাত্র ইত্যাদি ও গৃহের উপকরণসমূহের মধ্যে সংঘাতের নিমিত্ত কখনও সেগুলি হতে বিচ্যুতি ঘটে না। কুম্ভ হলো পুরুষ-সদৃশ প্রবৃদ্ধ ঘট, কুম্ভী হলো নারী-সদৃশা ক্ষুদ্রা; অতএব এই মিথুন সম্পত্তির দ্বারা প্রজা উৎপাদিত হয়ে থাকে; উপধাতা ও উপধান-বেত্তা মিথুনরূপ প্ৰজা উৎপাদন করে থাকেন। এই অগ্নি সন্তাপের হেতু; অতএব সেই অগ্নি অধ্বর্য প্রভৃতিকে সন্তাপের দ্বারা যোজিত করে। জল উপধানের দ্বারা অগ্নির সন্তাপহেতুত্ব প্রশমিত হয়। যে কর্মে (অর্থাৎ যজ্ঞে) এই ইষ্টকার উপধান করা হয় (উপধীয়ন্তে), সেই স্থানে অধ্বর্য এবং যজমানেরও মৃত্যু হয় না; এবং প্রজাগণও সকল প্রতিবন্ধকতা হতে নিবৃত্তি লাভ করে। এই পাত্রগত যে জল, তা অন্য দেবতার হৃদয়স্থানীয়। এই ইষ্টকার উপধাতা দিব্য জলের দ্বারা সংযযাজিত হন (অর্থাৎ দিব্য জল প্রাপ্ত হয়ে থাকেন)। মেঘও বর্ষণশীল হয়। যিনি এই ইষ্টকাসমুহের আয়তন (অর্থাৎ স্থান) ও কুপ্তি (অর্থাৎ সামর্থ্য) উভয়ই জ্ঞাত আছেন, তিনি বিশাল গৃহ ইত্যাদি স্থান লাভ করেন এবং সর্ব ভোগ্যজাত সামগ্রীতে সমৃদ্ধবান্ হন। ইষ্টকা অন্নের হেতুত্বের নিমিত্ত অনুরূপ, চরু হলো সাক্ষাৎ অন্নসম্মত; এতএব চরু উপধানের দ্বারা মুখ্য অন্ন প্রাপ্ত হওয়া যায়। ইষ্টকার মধ্যে চরু স্থাপন করলে যজমানের মধ্যে (অর্থাৎ উদরে) অন্ন স্থাপিত হয়ে থাকে। তিনি মধ্যে বয়সে প্রভূত অন্নের ভক্ষণকারী হয়ে থাকেন (ভুয়িষ্টমন্নমদ্যতে)। ব্রহ্মবৰ্চসমসি ব্রহ্মবৰ্চসায় ইত্যাদি, অর্থাৎ তুমি ব্ৰহ্মবর্চ, ব্রহ্মবর্চ লাভের নিমিত্ত তোমার উপধান করছি,–এই মন্ত্রে ব্রহ্মবৰ্চস শব্দদ্বয়ের তাৎপর্য প্রসঙ্গে বলা হয়েছে–ব্রহ্মবৰ্চস বা ব্রহ্মতেজঃ শব্দের তেজঃ হলো কান্তি এবং ব্রহ্মবৰ্চস শব্দের বর্চ হলো অধ্যয়ন ইত্যাদি সম্পত্তি। (অর্থাৎ ব্রহ্মবৰ্চস শব্দের দুটি অর্থ-ব্রহ্মতেজ ও বেদাধ্যয়নজনিত সম্পদ) ॥২॥
মর্মার্থ- দেশ, কাল ও নিমিত্ত বিশেষে অপমৃত্যুর ব্যাপ্তি ঘটে। সর্প, ব্যাঘ্র ও চোর অধ্যুষিত দেশ বা স্থান মৃত্যুর কারণ (হেতবঃ)। সন্ধ্যা, মধ্যরাত্রি ইত্যাদি সময় যক্ষ রাক্ষস ইত্যাদি প্রযুক্ত (অর্থাৎ ঐ সময়ে যক্ষ-রাক্ষসদের প্রাদুর্ভাব হওয়ার কারণে, ঐ কাল) মৃত্যুকাল। দুষ্ট (দোষযুক্ত) খাদ্য আহার-ভোজন ইত্যাদি মৃত্যুর নিমিত্ত (কারণ)। ভূতেষ্টকা উপধানের দ্বারা সেই দেশ, কাল ও নিমিত্ত প্রযুক্ত (সম্পর্কিত) সরকম মৃত্যু হতে যজমান পরিত্রাণ প্রাপ্ত হন (অর্থাৎ মৃত্যু দুরীভূত হয়)। অতএব অগ্নিচয়নকারী নিজের পূর্ণ আয়ু প্রাপ্ত হন; তার ফলে সকল অপমৃত্যুও বিনাশিত হয়। অধিকন্তু এই অগ্নিচয়নকারী কোন আভিচারিক কর্মের বিষয়ীভূতও হন না। সেইরকম যে মূর্খ অতিচার কর্ম করে, এমন মূর্খ সেই অভিচারের দ্বারা পশ্চিমাভিমুখ (প্রত্যঙ্গুখো) হয়ে অর্থাৎ বিমুখতায় বিনাশ প্রাপ্ত হয়। যে যজমান অগ্নিচয়ন করেন, তিনি দেবগণ কর্তৃক প্রেরিত হন। অগ্নয়ে গৃহপতয়ে পুরোডাশম–অর্থাৎ গৃহপতি অগ্নির উদ্দেশে পুরোডাশ ইত্যাদি রাজসূয় যজ্ঞে কথিত মন্ত্রে অগ্নি প্রমুখ দেবতাগণ এই যজমানের প্রেরক। অভিষেকযুক্ত যাগের নাম সব–এই হেতু কথিত হয়, এবং তা দুরকম–বরুণ-সব ও ব্রহ্ম-সব। রাজা কর্তৃক অনুষ্ঠেয় রাজসূয় হলো বরুণ-সব; কারণ বরুণ হলেন রাজাভিমানী দেবতা। কিন্তু চিত্য (অর্থাৎ চয়িত বা চয়নকৃত) অগ্নি ব্রাহ্মণের দ্বারাও অনুষ্ঠিত হয়; সেই কারণে তা (অর্থাৎ অগ্নিচয়ন) ব্রহ্মসব; যেহেতু অগ্নি হলেন ব্রাহ্মণাভিমানী দেবতা। অতএব সব-দ্বয় (যাগদ্বয়) অভিষেকের যোগ্য। দেবস্য ত্বা সবিতুঃ প্রসব–অর্থাৎ সবিতাদেবের প্রেরণায় (বা উৎপত্তিতে)–এই ব্ৰহ্মমন্ত্রের দ্বারা সবিতা ইত্যাদি দেবতাগণের অভিষেকের বিষয় প্রতিপাদিত হয়েছে। এই অভিষেক চিত্য অগ্নির রাজসূয়ের স্বরূপ–এইরকম বিজ্ঞাত হয়ে যিনি অগ্নিচয়ন করেন, তিনি বরুণযাগ ও ব্রহ্মযাগ উভয় যাগের ফলস্বরূপ উভয় তোক জয় করে থাকেন (উভয়ফলং ভবতি) ॥৩॥
মর্মার্থ– অব্দ হলো সম্বৎসর। অবা হলো মাসসমূহ। এবং সম্বৎসরের সাথে মাসসমূহের সমান প্রীতি (সজু) লক্ষ্যণীয়। সজু অর্থে সমান প্রীতিযুক্ত। এখানে সকল মন্ত্রে ঘৃতেন স্বাহা অর্থাৎ ঘৃতের দ্বারা স্বাহা মন্ত্রে-এই কথা সংযুক্ত করণীয়। যেমন, মাসের সাথে সম্বৎসরের উদ্দেশে ঘৃত-দ্রব্যের দ্বারা স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি (মাসসহিতায় সম্বৎসরায় ঘৃতেন দ্রব্যেণ স্বাহা জুহোমি)। [মন্ত্রগুলির অর্থ শুক্ল যজুর্বেদের ১২শ অধ্যায়ের ৭৪তম মন্ত্রে প্রাপ্তব্য]।
মর্মার্থ– পূর্ববর্তী প্রপাঠকে সম্বৎসর অর্থাৎ দ্বাদশ মাস ব্যাপী, এ্যহ অর্থাৎ তিন দিবস ব্যাপী, ষড়হ অর্থাৎ ছয় দিন ব্যাপী ও দ্বাদশাহ অর্থাৎ দ্বাদশ দিন ব্যাপী সাধ্য চারটি যাগে অগ্নিধারণ বিষয় কথিত হয়েছে। এখানে উল্লেখিত কালব্যাপী সাধ্য সত্রের অঙ্গভূত চয়নে সেই সেই কালব্যাপী উখা ধারণ ও সংশ্লিষ্ট দেবতাগণের উদ্দেশে নির্ধারিতসংখ্যক কপালে হবিঃ নির্বপণের কথা বলা হয়েছে। বলা বাহুল্য এইগুলি সবই পূর্ব পূর্ব কাণ্ডের বিভিন্ন প্রপাঠকে উক্ত হয়েছে ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন–ষষ্ঠে পূর্বপ্রকরণণাক্তানেব বিধী কানিচিদনুদ্য প্রশংসতি। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৬ পূর্ববর্তী প্রকরণের বা প্রসঙ্গের কোন কোন বিধির প্রশংসা করা হয়েছে]।
মর্মার্থ- (পূর্বকালে) প্রজাপতি যখন অগ্নিচয়ন করেছিলেন, তখন সেই অগ্নি ক্ষুরপবি হয়ে (অর্থাৎ ক্ষুরধারাসমান উগ্র বজ্রের ন্যায়) অবস্থান করেছিলেন। সেই হেন অগ্নিকে দর্শন করে সকল দেবতা ভীতিগ্রস্ত হয়ে তার সমীপস্থ হতে পারলেন না। অতঃপর তার প্রতিকারের উপায় বিবেচনা করে তারা ছন্দোযুক্ত মন্ত্রের দ্বারা আপনাপন শরীর আচ্ছাদন করে অর্থাৎ মন্ত্রজপের দ্বারা। রক্ষাবিধান পূর্বক বহ্নির সমীপে আগমন করলেন। ছাদন অর্থাৎ আচ্ছাদন হতে ব্যুৎপত্ত্য হওয়ার কারণে ছন্দ নাম সম্পন্ন হয়েছে। এবং ছন্দ অন্তর্ভূত হওয়ার কারণে বেদ হলো ছন্দোরূপ (তদ্রূপ)। এবং কৃষ্ণাজিন অর্থাৎ কৃষ্ণসার মৃগের চর্ম হলো বেদের স্বরূপ। সেই কারণে কৃষ্ণসার মৃগের চর্মে নির্মিত পাদুকা (উপানহ) গ্রহণের নির্দেশ প্রদত্ত হয়েছে। সেই রকম, ছন্দের দ্বারা আপন শরীর আচ্ছাদন পূর্বক অগ্নির নিকটে গমন করলে তিনি অগ্নির দ্বারা হিংসিত হন না ৷৬৷৷
মর্মার্থ– চীয়মান অগ্নির দীক্ষার দ্বারা দেবগণ বিরাট লাভ করেছিলেন। এখানে মৌন ইত্যাদি নিয়ম স্বীকারকে দীক্ষা বলা হয়েছে। বিরাট শব্দে শ্রেষ্ঠ ছন্দোবিশেষ বোঝায়, এই কারণে এখানে বিশিষ্ট রাজ্য অর্থটি উপলক্ষিত হয়েছে; অর্থাৎ দেবগণ রাজ্য লাভ করেছিলেন এইরকম বোধিতব্য হয়েছে। বিরাট নামক ছন্দ দশাক্ষর তিনপাদের দ্বারা মিলিত। অতএব তিন সংখ্যার সহযোগে তার প্রাপ্তি,–অর্থাৎ তিন রাত্রি দীক্ষা বা নিয়ম স্বীকারের দ্বারা দেবগণ কর্তৃক বিরাট ছন্দ লব্ধ হয়েছিল। এইভাবে দীক্ষাকালের বিকল্পের দ্বারা সর্বত্র বিরাট প্রাপ্তি বোধিতব্য হয়। যেমন ষড়রাত্রি দীক্ষা বা নিয়ম স্বীকারের দ্বারা ষড়ঋতু সম্বন্ধী সম্বৎসরে বিরাট প্রাপ্তি, দশরাত্রি দীক্ষা বা ১ নিয়ম স্বীকারের দ্বারা দশাক্ষরা বিরাট প্রাপ্তি, দ্বাদশ রাত্রি দীক্ষা বা নিয়ম স্বীকারের দ্বারা দ্বাদশমাস ও সম্বন্ধী সম্বৎসরে বিরাট প্রাপ্তি, ত্রয়োদশ রাত্রি দীক্ষা বা নিয়ম স্বীকারের দ্বারা একাধিক দ্বাদশ মাস সম্বন্ধী সম্বৎসরে বিরাটু প্রাপ্তি, ইত্যাদি যোজনীয় ॥৭॥
মর্মার্থ- সুবর্গলোক বা স্বর্গলোক প্রাপ্তির নিমিত্ত অগ্নিচয়ন কর্তব্য। সেই চয়নের পরে অনু-আরোহণের অভাবে সুবর্গলোকে হতে যজমানকে পতিত হতে হয়। সেই নিমিত্ত পৃথিবী ইত্যাদি ক্ৰমে অনু-আরোহণের বিধি উল্লিখিত হয়েছে। এর মন্ত্র–যজমানোহহং পৃথিবীং পাদেনাইক্ৰমিষমতঃ প্রাণো মাং মা পরিত্যজতু, অর্থাৎ–আমি যজমান, পদের দ্বারা পৃথিবী আক্রমণ (অর্থাৎ আরোহণ বা অক্রিম) করতে ইচ্ছা করছি, প্রাণ আমাকে যেন পরিত্যাগ না করে। অন্তরিক্ষাক্রমণেন পুত্ৰাদিজা মা পরিত্যজতু, অর্থাৎ–অন্তরীক্ষ আক্রমণের দ্বারা (ফলে) পুত্র ইত্যাদি প্রজাগণ যেন আমাকে পরিত্যাগ না করে।–দিব আক্রমণেন স্বর্গং প্রাপ্নমঃ, অর্থাৎ দ্যুলোক আক্রমণের দ্বারা আমি স্বর্গলোক প্রাপ্ত হবে। এই মন্ত্রপাঠ হলো অগ্নির অনু-আরোহণের হেতুঃ, তার দ্বারা স্বর্গপ্রাপ্তি হয়ে থাকে। ইত্যাদি । ৮।
[সায়ণাচার্য বলেন–নবম আসন্দাদিকমভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৯ ে আসন্দীতে (আসনে) উখা স্থাপন সম্পর্কে বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- যে অগ্নি উখাতে ধারণীয় (বা স্থাপনীয়) হয়, সেই অগ্নি অন্যান্য অগ্নির মধ্যে অভিষিক্ত ঈশ্বরত্ব (শ্রেষ্ঠত্ব) প্রাপ্ত হন। যদি এই অগ্নিকে অধোভাগে অর্থাৎ ভূমিতে স্থাপন করা হয়, তা হলে প্রাণীগণের গর্ভ ভূমিতে পতিত হয়ে থাকে। অবধোভাগে অগ্নিস্থাপনের ফল হলো ঐশ্বর্য হতে ভ্রষ্ট হওয়া। অতএব অগ্নিকে মহতী আসন্দীতে বা আসন্দীরূপা উখাতে স্থাপন কর্তব্য; এবং তার ফলে অর্থাৎ সেই স্থাপনের ফলে প্রাণীগণের গর্ভধারণ হবে ও তা পতনরহিত হবে। (এতচ্চ সাদনবিধিসমীপ এব দ্রষ্টব্য–অর্থাৎ এই মন্ত্রগুলি সাদন-বিধির সমীপে দ্রষ্টব্য) ॥৯॥
মর্মার্থ- (বসন্ত ইত্যাদি ঋতুর দ্বারা প্রশংসা) ঋতুর দ্বারা যেমন সম্বৎসর নিম্পাদিত হয়, সেই রকমে প্রজাপতি ঋতুর দ্বারা অগ্নিচয়ন করেছিলেন (তথাইগ্নিমপ্যতুভিঃ প্রজাপতিরচিত)। ঋতুময়োইয়ং যজ্ঞ অর্থাৎ ঋতুময় এই যজ্ঞ–এই সঙ্কল্প হলো চয়ন। সেখানে বসন্তু ঋতু হলো এর শিরোভাগ, গ্রীষ্ম ঋতু হলো এর দক্ষিণ পক্ষ, বর্ষা হলো এর পুচ্ছ, শরৎ হলো উত্তর বা বাম পক্ষ ও হেমন্ত হলো মধ্যভাগ।–(ব্রাহ্মণ ইত্যাদি রূপ সঙ্কল্পের দ্বারা প্রশংসা)–ব্রাহ্মণ এর উধ্বভাগ চয়ন করেছিলেন; ক্ষত্রিয় এর দক্ষিণ পক্ষ, পশুগণ এর পুচ্ছ, বৈশ্বগণ এর বাম পক্ষ এবং আশা অর্থাৎ মানস তৃষ্ণা ইত্যাদি এবং মধ্যভাগ চয়ন করেছিল।–(জ্ঞানের দ্বারা প্রশংসা)–যে যজমান বসন্ত ইত্যাদির ও ব্রাহ্মণ ইত্যাদির দ্বারা চয়নের কথা বিদিত হয়ে সর্বদা অগ্নিচয়ন করেন, তিনি প্রজাপতির ন্যায় সেই বসন্ত ইত্যাদি ঋতু ও ব্রাহ্মণ ইত্যাদির দ্বারা যুক্ত হয়ে থাকেন।–(অতঃপর চিতি পঞ্চক ও পুরীষপঞ্চকের দ্বারা, আদ্য চিতিত্রয় ও উত্তরদ্বয়ের বিভাজনের দ্বারা, সমুহরূপের দ্বারা অগ্নিচয়নের প্রশংসা করা হয়েছে। এগুলি সবই মূল মন্ত্রের মধ্যে পাওয়া যাবে) ১০।
অতঃপর ১১শ অনুবাক থেকে ২৩শ অনুবাক পর্যন্ত মন্ত্রগুলিতে আমেধিক পশুর (পশবো আমেধিকা) কথা উক্ত হয়েছে। দেবতা ও বিভিন্ন বর্ণ বা চিহ্নশালী পশুর নাম এই এয়োদশ সংখ্যক অনুবাকের মধ্যে পাওয়া যাবে। এতৎ ব্যতীত শুক্ল যজুর্বেদের ২৪শ অধ্যায়েও এগুলির উল্লেখ আছে।
মর্মার্থ–যে চিতির (অর্থাৎ চয়নের) যে দেবতা তাকে অতিক্রম পূর্বক চয়ন করা হলে তাকে অযথাদেবত (অন্যায়রূপে দেবতা সম্বন্ধীয় চয়ন) বলা হয়, এবং অনতিক্রম পূর্বক (অর্থাৎ অতিক্রম করে) চয়ন করা হলে তাকে যথাদেবত (অনতিক্রমরূপে দেবতা সম্বন্ধীয়) চয়ন বলা হয়। অতএব যথাদেবতভাবে (অর্থাৎ যে চিতির যে দেবতা, সেইভাবে) তাদের গায়ত্রী ইত্যাদির সাথে চিতির অভিমৰ্শন (প্রাক্ষণ বা স্পর্শন) কর্তব্য। অন্যথায় চিতির দোষ হবে। অগ্নে দেবাং ইহাহবহ–এটি আগ্নেয়ী গায়ত্রী। অগন্ম মহা মনসা যবিষ্ঠ–এটি ত্রিষ্টুপ। মেধাকার–এটি জগতী। মনুষত্ত্ব নিধিমহি–এটি অনুষ্টুপ। অগ্নিহিঁ বাজিন–এটি পঙক্তি।–এইরকম অভিমর্শনে কোনও দোষ হয় না।–অতঃপর উপধানে অশ্বস্পর্শনের বিধি, দানবিধি, এবং দানের পূর্বকালীন অবেক্ষণ (দর্শন), অবেক্ষণের পরে পরেই ঘ্রাপণ (ঘ্রাণ গ্রহণ) ইত্যাদি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। ১।
[সায়ণাচার্য বলেন-দ্বিতীয় ঋষভেষ্টকাদিকমভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২ ঋষভ নামক ইষ্টকা ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে]
মর্মার্থ- হে অগ্নি! আপনি বৃষভ অর্থাৎ কামসমূহের বর্ষণকারী, চেকিতান অর্থাৎ সর্বজ্ঞ, যুবানং অর্থাৎ নিত্যতরুণ। এই হেন আপনাকে আমি প্রজাসমূহের উৎপাদকরূপে বহু বহুতর প্রাপ্ত হচ্ছি। আমাদের গার্হপত্য কর্মসমূহ অস্তুরি অর্থাৎ সাররহিত হোক। উজ্জ্বল ব্ৰহ্মতেজের দ্বারা (অর্থাৎ বেদাধ্যয়নজনিত তেজের মাধ্যমে) আমাদের সম্যক উপদিষ্ট করুন (অনুশিষ্টান্ কুরু)। এই যে ইষ্টকাগুলি তা সবই গোরূপা; অতএব যজ্ঞে তাদের মিথুন ভাবের নিমিত্ত ঋষভ নামক ইষ্টকার সাথে যুক্ত করুন (উপদধ্যাৎ)। হে একাষ্টকারূপা রাত্রি! তোমার প্রতিনিধিরূপা যে প্রতিমাকে সকল যজমান এষা বৈ সম্বৎসর পত্ন যদেকাষ্টকৈতস্যাং বা এষ এতাং রাত্রিং বসতি মন্ত্রে উপাসনা বা সেবা করে, সেই তোমার উপধান করে শোভন ভৃত্য পুত্র ইত্যাদিরূপ পূর্ণ আয়ুও বিশ্নেষভাবে প্রাপ্ত হবো। একষ্টকাগুলি সম্বৎসররূপ প্রজাপতির পত্নীত্বের কারণে সেগুলি প্রাজাপত্য (অর্থাৎ প্রজাপতি সেগুলির অধিপতি), সেই রূপেই এগুলির উপধান কর্তব্য। এই একাষ্টকা ভূমিস্বরূপা, সেই নিমিত্ত ভূমিরূপা একাষ্টকাতে যে অন্ন অন্ন সম্পাদিত হবে, তার সবই প্রাপ্ত হওয়া যাবে (তৎসং প্রাপ্নোতি)। অধিকন্তু এই একাষ্টকা সম্বৎসররূপে প্রজাপতির কামধেনু তুল্য। অতএব এর দ্বারা যজমান আমুষ্মিক লোকে (অর্থাৎ পরলোকে) অগ্নি হতে কামনানুরূপ বস্তুতে পুরিত হন (কামাহে দুগ্ধে)। দেবতাগণ সকলে যে অগ্নির দ্বারা উপরিতন লোকে উৎকর্ষ প্রাপ্ত হয়েছেন, সেইরকমে যে অগ্নির দ্বারা দ্বাদশ অদিত্য, অষ্ট বসু ও একাদশ রুদ্র উৎকর্ষ প্রাপ্ত হয়েছেন এবং সে অগ্নির দ্বারা অঙ্গিরা মহর্ষিগণ মহিমান্বিত হয়ে আপন সামর্থ্য প্রাপ্ত হয়েছেন, সেই অগ্নির দ্বারা এই যজমান স্বস্তি (অর্থাৎ ক্ষেম বা কল্যাণ) প্রাপ্ত হোন (প্রাদোতু)। স্বর্গের নিমিত্ত এই অগ্নির চীয়মানত্বের কালে (অর্থাৎ অগ্নিচয়নের কালে) স্বর্গস্থিত সকল দেবতা-প্রতিপাদক মন্ত্রে যে সমিধ অর্পণ করণীয়, সেই সকল সমিধ বানস্পত্য ইষ্টকায় উপধান কর্তব্য। তার দ্বারা স্বর্গপ্রাপ্তি সম্পাদিত হয়। (এই কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ১ম অনুবাকে দ্রষ্টব্য)। যে ইন্দ্রদেবতা আমাদের শতসংখ্যক শরৎ বা শত সম্বৎসরব্যাপী যে কোনও ব্যাধি, তস্কর ইত্যাদির দ্বারা পীড়িত না হতে দিতে সমর্থ (অর্থাৎ এগুলি হতে আমাদের রক্ষা করতে সমর্থ) সেই ইন্দ্রের উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করি। (তিনি কি করেন? না,) তিনি, আমাদের কৃত সকল পাপ বিনাশ করেন। (সেই ইন্দ্র কিরকম? না,) সেই ইন্দ্র শতসংখ্যক আয়ুধধারী, (অর্থাৎ বজ্ৰ ধনু ইত্যাদি শতপ্রকার অস্ত্রধারী), শতসংখ্যক বীর্যশালী, (অর্থাৎ শত শত যুদ্ধে বিজয়রূপ বীর্যবান), শতসংখ্যক রক্ষাকর্মশালী, (অর্থাৎ শত শত ভাবে আমাদের রক্ষাকারী), এবং যিনি সংখ্যাতীত পাপের বিনাশকারী। দাবা পৃথিবীর মধ্যে যে চারটি দেবযান পথ প্রবর্তিত আছে, অর্থাৎ দেবলোক, পিতৃলোক, ব্রহ্মলোক ও মনুষ্যলোক নামে যে চারটি পরিচিত পথে দেবগণ গমনাগমন করে থাকেন, সেই পথ চারটিকে ইন্দ্রদেব রাক্ষস প্রভৃতির উপদ্রবরহিত করেছেন। হে দেবতাবর্গ! এই যজ্ঞকর্মে আমাদের পরিদাতা যজমান যাতে সকল পথে রক্ষণীয় হন, সেই নিমিত্ত ইন্দ্রের নিকট আমাদের সমর্পন করুন (অস্মনিন্দ্রায় সমৰ্পয়ত)। গ্রীষ্ম, হেমন্ত, বসন্ত, শরৎ ও বর্ষা নামে আখ্যাত ঋতুগুলি আমাদের প্রতি শোভনগতি প্রাপ্ত হোক। (অর্থাৎ ঐ ঋতুগুলি আমাদের পক্ষে ভোগ্য স্বকালোচিত দ্রব্য প্রদান করুক)। সেই গ্রীষ্ম ইত্যাদি ঋতুসমূহের অনুগ্রহে (অনুগ্রহাৎ) আমরা যেন শত সম্বৎসরব্যাপী বাত (বায়ু বা ঝঞ্ঝা) ইত্যাদির উপদ্রবরহিত ও ভয়রহিত স্থানে সুখে অবস্থিত হই। হে ঋত্বিক ও যজমানবর্গ! প্ৰভব ইত্যাদি সম্বৎসর পঞ্চকে চতুর্থ ইদুবৎসর, দ্বিতীয় পরিবৎসর, প্রথম সম্বৎসর–এই সকল কালের উদ্দেশে ভক্তিপূর্বক নমস্কার করুন। যজ্ঞ নিম্পাদক সেই বিশেষ সম্বসরগুলির অনুগ্রহবুদ্ধির সৌজন্যে আমরা যেন কারও দ্বারা বশীকৃত না হই এবং অক্ষত থাকি (অহুতা স্যাম)। হে দেববর্গ! এই কল্যাণরূপ কর্মসাধন হতে শ্রেয়ঃ-অধিক (প্রশস্ত) ফল আমাদের সম্যক প্রাপ্ত করান। সেইরকম চিত্যাগ্নিদ্বয়ে হ্রয়মান হে সোম! তোমার রক্ষণের দ্বারা আমরা যেন সঙ্গতভাবে ব্যাপ্ত হই। হে পিতো (অন্নভূত সোম)! তুমি সুখের ভাবয়িতা (উৎপাদক) হয়ে আমাদের মধ্যে প্রবেশ করো, (অর্থাৎ আমরা সোমপানে যেন তৃপ্ত হই), আমাদের অপত্যগণকে সুখী করো এবং আমাদের শরীরে সুখপ্রদ হও (তবে স্যোনঃ)। এই মন্ত্রসমূহের প্রতিপাদ্য যে ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাগণ, তাঁরা সকলেই অপরাজেয়; যজমানও এই দেবতাগণকে প্রাপ্ত হওয়ার কারণে কখনও পরাভূত হন না। ব্রহ্মবাদীগণ পরস্পর এইরকম তত্ত্বনির্ণয় করেন–অধর্মস, ঋতু ও সম্বৎসররূপ দেবতাবর্গ ওষাধিসমূহের পরিপাক (উৎকৃষ্ট পাক) সম্পাদন করেন; তবে এই দেবতাগণকে উপেক্ষা পূর্বক ইন্দ্র অগ্নি ইত্যাদি দেবতাগণকে আগ্রয়ণ নামে আখ্যাত নবান্নশ্রাদ্ধে নূতন ধান্যরূপ হবিঃ কোন্ কারণে নির্বাপ (অর্থাৎ দান) করা হয়? তখন এর উত্তরে অভিজ্ঞবর্গ বলে থাকেন–যেহেতু ইন্দ্র অগ্নি ইত্যাদি দেবগণ অন্যতর দেবতাগণের সাথে সহমত হয়ে সেই ওষধিবিষয়ে উৎকর্ষের সাথে জয় প্রাপ্ত হন, সেই হেতু ইন্দ্র অগ্নি ইত্যাদি দেবগণের উদ্দেশে হবিঃ নির্বপণ যুক্তিযুক্ত। ২৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–তৃতীয়ে বজ্বিণীষ্টকেপধানং বিধাতুং মন্ত্রানুৎপাদয়তি। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৩ বজ্রসদৃশ ইষ্টকের উপধান বিধি সম্পর্কিত মন্ত্রের কথা বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- ইষ্টকাস্থানীয় হে অশ্ম (প্রস্তর)! তুমি ইন্দ্রের বজ্রসমান। (তুমি কিরকম? না,) তুমি বার্তঘ্ন (অর্থাৎ বৈরিঘাতী), তনূপা (অর্থাৎ আমাদের শরীরের পালক), প্রতিস্পশো (অর্থাৎ আমাদের রোগ ইত্যাদি অনিষ্টের বিনাশক)। অধিকন্তু, যে অঘ বা পাপরূপ শত্রু আমাদের উপর উপদ্রব করতে পূর্ব দিক থেকে আগত হচ্ছে, সে এই উপধীয়মান পাষাণ প্রাপ্ত হোক (অর্থাৎ সে এই পাষাণে বাধাপ্রাপ্ত হোক)। এইরূপে যে শত্রু আমাদের উপর উপদ্রব করতে দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে আগত হচ্ছে, তারা এই পাষাণ কর্তৃক বাধা প্রাপ্ত হোক। দেবতা ও অসুরগণ যুদ্ধের নিমিত্ত উদ্যত হলে, যখন অসুরগণ চতুর্দিক হতে দেবতাগণকে আক্রমণ করে, তখন দেবতাগণ এই বজ্রসদৃশ পাষাণের দ্বারাই তাদের বিতাড়িত করেন। সেই নিমিত্ত যজমান তার শত্রুগণকে অপনোদিত (দূরীকৃত) করার উদ্দেশে বজ্বিণী (অর্থাৎ বজ্রসদৃশ ইষ্টকা) স্থাপন (উপধান) করবেন। এই বজ্বিণী ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাগণের নগরী-স্থানীয় (পুরুস্থানীয়া), আমাদের দেহের পালয়িত্রী; এইরূপা বর্জিণীগুলিকে চতুর্দিকে স্থাপন করা কর্তব্য (স্থাপয়তি)। হে অগ্নি ও বিষ্ণুদেব! আমাদের এই স্তুতিরূপ বাক্য শ্রবণ পূর্বক সমান প্রীতিযুক্ত হয়ে আপনারা পরিতোষ প্রাপ্ত হোন। আপনারা ধন ও অগ্নের সাথে এই স্থানে আগত হোন। এই ক্ষেত্রে ব্রহ্মবাদিগণ তত্ত্বনির্ণয় প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করে থাকেন-বসুধারা (মাঙ্গলিক ঘৃতধারা) মন্ত্রে তো কোন দেবতা প্রতিপাদতি হয় না; বিধিবাক্যেও আজ্যধারারূপ দ্রব্যকেই প্রতীয়মান হয়, কোন দেবতা তো নয়। তা হলে তার দেবতা কে?-এর উত্তরে অভিজ্ঞবর্গ বলেন– বিধিবাক্যগত বসুধারা শব্দে দ্রব্য ও দেবতার সম্বন্ধ প্রতীয়মান হচ্ছে। বাসয়তি এই ব্যুৎপত্তি অনুসারে বসু শব্দের অর্থ অগ্নি, অর্থাৎ অগ্নিই এর দেবতা, সঙ্গে বিষ্ণুকেও যুক্ত করতে হবে (এবং বিষ্ণাবপি যযাজ্য)। বসুধারায় যথোচিত ভাগের দ্বারা অগ্নি ও বিষ্ণু এই উভয় দেবতারই তুষ্টি সাধন (তোষণ) করতে হবে। যে ফল কামনাপূর্বক এই বসুধারা যাগের অনুষ্ঠান করা হয়, তা লব্ধ হয়ে থাকে। শতরুদ্ৰীয় হোমের দ্বারা রুদ্র দেবতার উগ্র তনু শান্ত হলেও তাঁর শিবময় তনুর প্রীতির নিমিত্ত এই বসুধারা হোম করতে হয়। যে যজমান বসুধারার প্রতিষ্ঠা-প্রকার জানেন তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বসুধারার প্রতিষ্ঠা কি? না–হোমাবশিষ্ট আজ্যে ব্রহ্মেদিন অর্থাৎ ব্রহ্মের অন্ন পাক করে (পা) ব্রাহ্মণগণকে ভোজন করানোই হলো বসুধারার প্রতিষ্ঠা। সর্বপুরুষের প্রিয়ত্বের নিমিত্ত ব্রাহ্মণ বৈশ্বানর। আবার অগ্নিও বৈশ্বানর; সুতরাং ব্রাহ্মণ হলেন অগ্নির প্রিয় শরীরস্বরূপ; এই নিমিত্ত সেই প্রিয় শরীরে অগ্নির প্রতিষ্ঠা কর্তব্য (তমগ্নিং প্রতিষ্ঠাপয়তি)। (সূত্ৰকারের বক্তব্য–এই স্থলে ব্রহ্মেদিন অর্থাৎ ব্রহ্মের অন্ন পাক করে চারজন ব্রাহ্মণের ভোজন ও তারপর দক্ষিণাস্বরূপ চারটি ধেনু দান করা কর্তব্য।–সেই চারটি ধেনু দানের ফলে যজমান পরলোকে অগ্নির দোহন করে থাকেন)।৩।।
[সায়ণাচার্য বলেন–চতুর্থে হোমবিশেষ রাষ্ট্রভৃদারব্যা ইষ্টকাশ্চাভিধীয়ন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৪ হোমবিশেষ ও রাষ্ট্রভৃৎ ইত্যাদি ইষ্টকার স্থাপন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে]
মর্মার্থ– চিত্তিং…..এবাব রুন্ধে–এই মন্ত্রটি পুর্বে (৫কা, ৫৫, ৪অ)-এ উক্ত ও ব্যাখ্যাত। এটি হোমসাধনে পঠিতব্য।–চিতিং জুহোমি মনসা ঘৃতেন ইত্যাদি অর্থাৎ দেববর্গ যাতে এই যজ্ঞকর্মে আগমন করেন, সেই নিমিত্ত ভক্তিসহকারে ঘূতের দ্বারা তাদের চিত্তের প্রসন্নতা বিধান করছি–এই মন্ত্রে যে আহুতি প্রদান করা হয়, তা রাক্ষস ইত্যাদি কেউই বিনাশ করতে সমর্থ হয় না। সেই আহুতি বিশ্বকর্মাদেবতাক অর্থাৎ এই মন্ত্রে বিশ্বকর্মাকে আহুতি দেওয়া হয়। এই আহুতি প্রদান করলে যজমানকে কোন শত্রু হিংসা করতে পারে না; সেই করণে এই হোম কর্তব্য এবং যাগকর্তা পুরুষ এই হোমের দ্বারা দেবতাগণকে প্রাপ্ত হন।- অগ্নে….যজ্ঞমুখমা রভতে–এই মন্ত্রটি চতুর্থ কাণ্ডে অগ্নিমূর্ধা (৪.৪অ)-এ পঠিত ও ব্যাখ্যাত। অর্থ–হে অগ্নি! আপনাকে অদ্য পংক্তি ছন্দে আহুতি প্রদান করছি–এই মন্ত্রে পংক্তি ছন্দের দ্বারা আহুতি যজ্ঞের প্রারম্ভ সূচিত করছে। অপর মন্ত্রগুলি, যথা–সপ্ত অগ্নে …বসীয়া ভবতি–এই মন্ত্রের মর্মার্থ চতুর্থকাণ্ডে প্রাচীং (৬.৫অ.)-এ দ্রষ্টব্য। ইত্যাদি ॥৪॥
[সায়ণাচার্য বলেন–পুনঃপরীহ্মনাদয়ো বিধীয়ন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাকে পুনঃপরীন্ধন ইত্যাদির বিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে]
মর্মার্থ- (বিধি) যে যজমানের উখ্যাগ্নি শাম্য অর্থাৎ শমপ্রাপ্ত হয় বা নিভে যায়, তার অগ্নিনাশজনিত কারণে পুত্রের মরণতুল্য দুঃখ উৎপন্ন হয় (জায়তে)। আবার, নির্মন্থন পূর্বক অন্য অগ্নি উৎপাদন করলে পূর্ব-অগ্নি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; এবং সেই বিচ্ছিন্নতার কারণে যজমানের শত্রু উৎপন্ন করে (জনয়েৎ) তা (অর্থাৎ সেই বিচ্ছিন্নতারূপ বিপদ) পরিহারের নিমিত্ত গাহপত্যনিষ্ঠ সেই অগ্নিকে পুনরায় আনয়ন পূর্বক কাষ্ঠ প্রক্ষেপ পূর্বক প্রজ্বালিত করণীয়। আপন কারণ-স্থান হতে উৎপন্ন হওয়ার নিমিত্ত এই অগ্নি আর বৈরি উৎপন্ন করে না।-(প্রায়শ্চিত্তরূপ দক্ষিণার বিধান) যে যজমানের উখ্যাগ্নি বিনষ্ট হয়, তাঁর সবই অন্ধকার হয়ে যায়, তা মৃত্যুতুল্য। তা পরিহারের নিমিত্ত একটি কৃষ্ণবর্ণ বস্ত্র ও একটি কৃষ্ণবর্ণ ধেনু দক্ষিণাস্বরূপ দান করা কর্তব্য। সেই তমোরূপ দক্ষিণার ফলে যজমামের মৃত্যুরূপ অন্ধকার বিনষ্ট হয়।–(ভিন্ন দান-বিধি)–হিরণ্য অর্থাৎ সুবর্ণ দান কর্তব্য; হিরণ্যরূপ জ্যোতির দ্বারা মৃত্যুরূপ অন্ধকারের বিনাশ যুক্তিযুক্ত (হিরণ্যরূপেণ জ্যোতিষা মৃতুরূপস্য তমসো বিনাশনং যুক্ত) এবং হিরণ্যের তেজঃ আত্মাতে তেজঃ সম্পাদিত করে। এর মন্ত্র–সুবর্ন ঘর্মঃ স্বাহা সুবর্নার্কঃ স্বাহা সুবর্ন শুক্রঃ স্বাহা সুবর্ন জ্যোতিঃ স্বাহা সুবর্ন সূর্যঃ স্বাহা। সুবর্ন অর্থে স্বর্গের ন্যায়, অর্কঃ অর্থে অর্চনীয়, শুক্রঃ অর্থে অতি নির্মল, জ্যোতিঃ হলো প্রকাশরূপ, সূর্য শব্দে সূর্যবর্ণ আদিত্যরূপ বোঝায়।(হোমমন্ত্র বিধি)–অর্কো বা এষ….ক্রিয়তে এই ব্রাহ্মণ-মন্ত্র অগ্নির্দেবেভ্য (৫কা, ৪প্র. ৯অ) অনুবাকের শেষে দ্রষ্টব্য।–(চিতিপঞ্চকার প্রশংসা প্রসঙ্গে প্রথমা চিতি)–আপো বা ইদমপ্লে….তদিয়মভবৎ;-(দ্বিতীয়া চিতি)–তং বিশ্বকর্মাহ ব্ৰবীদুপ…তদন্তরিক্ষমভবৎ;(দিশ্যাখ্যা ইষ্টকার প্রশংসা)–স যজ্ঞঃ প্রজাপতিমব্রবীদুপ… দিশোহভব; (তৃতীয়া চিতির প্রশংসা)+স পরমেষ্ঠী…..তদসাবভবৎ; (লোকশৃণা ইষ্টকার প্রশংসা)–স আদিত্যঃ প্রজাপতিমব্রৰীদুপ…হ্যসাবাদত্যিঃ;-(চতুর্থ ও পঞ্চম চিতির প্রশংসা)– তানৃষোহব্রুবনুপ…সমপদ্যত; (অনুষ্ঠানের প্রশংসা)–য এবং বিদ্বানগ্নিং…সাযুজ্যং গচ্ছতি।
এই মন্ত্রগুলিও পূর্বে ব্যাখ্যাত ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন-যষ্ঠে ব্রতচারণাদিকমভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাকে ব্রতচরণ ইত্যাদি সম্পর্কে। বলা হয়েছে]।
মর্মার্থ– এই চীয়মান অগ্নি হলো পক্ষীরূপ, এতে পক্ষীগণকে ভক্ষণ করলে অগ্নির ভক্ষক হতে হয়। অতএব তা পরিহারের নিমিত্ত সম্বৎসরমাত্র পক্ষিভক্ষণ-বর্জনরূপ ব্রতচরণ কর্তব্য। এই এক সম্বৎসর-ব্রত পর্যাপ্ত। (এই ব্রাহ্মণ মন্ত্র পূর্বে চিতি প্রশংসারূপ ব্রাহ্মণের সর্ব শেষে দ্রষ্টব্য– চিতিপ্রশংসারূপং ব্রাহ্মণং সর্বান্তে দ্রষ্টব্য)।–পশুবা এষ…..আত্মনোহহিংসায়ৈ, পশ্চিম দিকে চিতি-আরোহণের বিধান সম্পর্কিত এই মন্ত্রটি অগ্নে তব শ্রবো বয় অনুবাকে (৫কা.২প্র.৫অ) দ্রষ্টব্য।তেজোহসি তেজো….দিবো মা পাহি অর্থাৎ হে হিরণ্যাষ্টক! তুমি তেজোরূপা হও, আমার নিমিত্ত তেজঃ দান করো ইত্যাদি মন্ত্র তৃতীয় পঞ্চম চিতি বিষয়ে যুক্ত করণীয়। ইত্যাহৈতভিৰ্বা….বিধৃত্যৈ মন্ত্র উপধানকালে পঠিতব্য। স্বয়মাতৃগ্না উপধায় প্রভান্তি মন্ত্রটি চিতিগত উকাল বিধি সম্পর্কে প্রযোজ্য; এটি স্বয়মাতৃগ্নাম (৫কা, ২৫. ৮অ) অনুবাকে প্রাপ্তব্য। (এর প্রথমা উপধান মন্ত্র)–যাস্তে অগ্নে ইত্যাদি। (দ্বিতীয়া)–যা বো দেবা ইত্যাদি। (তৃতীয়া) রুচং না ধেহি ইত্যাদি। (এই মন্ত্রসাধ্য হোমের বিধি)–দ্বেধা বা অগ্নিং ইত্যাদি, অগ্নির্দেবেভ্যো (৫কা. ৪. ৯অ.) অনুবাকে দ্রষ্টব্য। ঈশ্বরো বা এষ ইত্যাদি মন্ত্রের বিধির কারণ এই যে, যে যজমান অগ্নিচয়নকালে অগ্নিকে পদের দ্বারা অতিক্রম করার নিমিত্ত দোষলিপ্ত হওয়ার কারণে বিনাশ প্রাপ্ত হওয়ার অবস্থায় উপনীত হন, তাঁর সেই দোষ পরিহারের নিমিত্ত এই মন্ত্রে যাগ করা কর্তব্য। এটি ইন্দ্ৰ বো বিশ্বতস্পরীং নর ইত্যাদি (২কা, ১৫.১১অ) অনুবাকে ব্যাখ্যাত। হবিষ্কৃত বা এষ ইত্যাদি মন্ত্রও বিনাশ রাহিত্যের নিমিত্ত যাগে পঠন বিহিত। যো বা অগ্নিমৃতুস্থাং ইত্যাদি মন্ত্রে অগ্নির সম্বৎসররূপকল্পনার প্রশংসা করা হয়েছে। প্রজাপর্তিবা এতং জৈষ্ঠকামো ইত্যাদি মন্ত্রে ফলান্তরের প্রশংসা চিতি প্রশংসারূপ ব্রাহ্মণের সর্বশেষে দ্রষ্টব্য (সর্বৰ্মন্তে দ্রষ্টব্য) ॥৬॥
মন্ত্র- যদাতাং সমসুম্রোদো বা মনসা বা সস্তৃতং চক্ষুযোবা। তমনু প্রোহি সুকৃতস্য লোকং যত্ৰষয়ঃ প্রথমজা যে পুরাণাঃ। এতং সধস্থ পরি তে দামি যমাবহাচ্ছেবধিং জাতবেদঃ। অন্বগন্তা যজ্ঞপতিৰ্ব্বো অত্র তং স্ম জানীত পরমে ব্যোম। জানীতাদেনং পরমে ব্যোমন্দেবাঃ সধস্থাবিদ রূপমস্য। যদাগচ্ছাৎ পথিভিৰ্দের্যনৈরিষ্টাপূৰ্তে কৃণুতাদাবিরম্মৈ। সং প্র চ্যবধ্বমনু সং প্র যাতাগ্নে পথো দেবযানা কৃণুধ্বম্। অস্মিনৎসধস্থে অধত্তরম্মিন্বিশ্বে দেবা যজমানশ্চ সীদত।। প্রস্তরেণ পরিধানা মুচা বেদ্যা চ বহিষা। সচেমং যস্তং নো বহ সুবদ্দেবেষু গন্তবে। যদিষ্টং ষৎ নরাদানং যন্দুত্তং যা চ দক্ষিণা। তৎ অগ্নিব্বৈশ্বকৰ্ম্মণঃ সুবদ্দেবেষু নো দধৎ। যেনা সহস্রং বহসি যেনাগ্নে সৰ্ব্ববেদসম্। তেনেমং যজ্ঞং নো হব সুবদেবেষু গবে। যেনাগ্নে দক্ষিণা যুক্তা যজ্ঞং বহ্যত্বিজঃ। তেনেমং যজ্ঞং নো বহ সুবর্পেবেষু গন্তবে। যেনাগ্নে সুকৃতঃ পথা মধোৰ্দ্ধারা ব্যানশুঃ। তেনেমং যজ্ঞং নো রহ সুবৰ্দেষু গন্তবে। যত্র ধারা অনপেতা মশোধৃতস্য চ যাঃ। তদগ্নিবৈশ্বকৰ্ম্মণঃ সুবন্ধেবেষু নো দখৎ। ৭৷ মর্মার্থ–আকুত ইত্যাদির দ্বারা সম্পাদিত যে ফল পূর্ববর্তী যজমানসঘ সম্যক প্রাপ্ত হয়েছেন, হে যজমান! আপনি সুকৃতলোকরূপ (স্বর্গরূপ) সেই কর্মের ফল অনুক্রমে প্রাপ্ত হোন। আকূত হলো অক্ষয় সুখ প্রাপ্ত হবো–এইরকম সঙ্কল্প। চিত্ত (অর্থাৎ শ্রুতি-স্মৃতি ইত্যাদি সাধনের উপায় চিন্ত), মন (অর্থাৎ অন্তঃকরণের অনুকূল-প্রতিকূল প্রবৃত্তি-নিবৃতির স্বরূপ), চক্ষু (দশ-ইন্দ্রিয়) ইত্যাদির দ্বার কৃত সম্যক অনুষ্ঠানে আপনার অভিমত ফল সাধিত হোক। যে সুকৃত লোকে প্রথমজাত (প্রথমজাঃ) স্বয়ম্ভু প্রভৃতি সর্বজ্ঞ ঋষিগণ আছেন এবং যেখানে পূর্ববর্তী যজমানগণ আছেন, সেই লোকে, হে যজমান! আপনি প্রেরিত হোন।-ঋত্বিক ও যজমানরূপী আমাদের সাথে যজ্ঞভূমিতে অবস্থিত, হে অগ্নি! এই যজমানকে রক্ষার নিমিত্ত আপনার হস্তে দান করলাম। জাতমাত্র প্রাণীগণের যোগক্ষেমে অভিজ্ঞ, হে জাতবেদা অগ্নি! নিধিবৎ (বিত্ত বা ধনের মতো) রক্ষণীয় আমাদের এই যজমানকে আপনি স্বীকার করুন। হে দেবগণ! যজ্ঞপতি এই যজমান আপনাদের পশ্চাতে আগমন করবেন। আপনাদের এই পরম ব্যোমে অর্থাৎ বিশিষ্ট রক্ষণযোগ্য স্থানে এই যাজমানকে সর্বৰ্থ রক্ষণীয় বলে (রক্ষণীয়েহয়মিতি) স্মরণ করুন।-হে দেবগণ! আপনাদের পরম লোকে এই যজমানকে অবিস্মৃত হয়ে (বিস্মৃত না হয়ে) সর্বদা রক্ষার নিমিত্ত স্মরণ করুন। হে যজমান সহ সেই পুণ্যলোকে স্থিত দেবগণ! এই যজমানের অগ্নিচয়ন ইত্যাদি অনুষ্ঠানযুক্ত স্বরূপ বিদিত হয়ে পুনরায় সেই লোকে স্মরণ করুন। আপনাদের গমনযোগ্য পথে (দেবযানে) যখন এই। যজমান আগত হবেন, তখন এই যজমানের ইষ্টাপূর্ত অর্থাৎ শ্ৰেীত (বেদবিহিত) ও স্মার্ট (স্মৃতিশাস্ত্রবিহিত) কর্মফল প্রকটিত করুন।–হে অগ্নিদেব ও সকল দেবগণ! আপনারা ভূলোক হতে সম্যক্ চালিত হোন এবং যজমানকে সঙ্গে নিয়ে যান। এবং গমনকালে যজমানের নিমিত্ত নরকলোক বা মনুষ্যলোকের পথ পরিত্যাগপূর্বক দেবযান-পথ (স্বর্গগমনের পথ) অনুসরণ করুন (কৃণুধ্বং)। আপনারা এই ভূলোকের যজ্ঞস্থানে যেমন যজমানের সাথে অবস্থিত আছেন, তেমনই ফলভোগস্থানে ও স্বর্গলোকেও আপনারা যজমানের সাথে অবস্থান করুন।-হে অগ্নিদেব! প্রস্তর ইত্যাদি সর্বজ্ঞসাধনের সাথে আমাদের এই যজ্ঞ স্বর্গলোকে বহন করে নিয়ে যান। ( কি নিমিত্ত? না,) দেবগণকে প্রদর্শন করাবার নিমিত্ত।দর্শপূর্ণমাস ইত্যাদি রূপ যে ইষ্টকর্ম অনুষ্ঠিত, দীন অন্ধ ও কৃপণজনের যে স্বল্প (বা সামান্য) দান, বহির্বেদিতেও যে বহু দ্রব্য সমর্পিত এবং যজ্ঞের মধ্যে গো ইত্যাদি যে দক্ষিণা, আমাদের সেই সমস্ত কর্মের স্বামিভূত (অধিপতি) এই অগ্নিদেব স্বর্গলোকনিবাসী দেবগণের মধ্যে স্থাপন করুন।–হে অগ্নি! আপনি যে পথে (মার্গেন) সহস্রদক্ষিণাযুক্ত যজ্ঞ ও সর্বস্বদক্ষিণাযুক্ত যজ্ঞ বহন করেন, সেই পথে আমাদের এই যজ্ঞকে বহন করুন, এবং স্বর্গলোক নিবাসী দেবগণের মধ্যে স্থাপন করুন। হে অগ্নি! যে শাস্ত্রীয় মার্গানুরণে যুক্ত সকল যোগ্য ঋত্বিক এই যজ্ঞ নির্বাহ করছেন, আপনি সেই শাস্ত্রীয় মার্গে এই যজ্ঞকে বহন করুন, এবং স্বর্গলোকনিবাসী দেবগণের মধ্যে স্থাপন করুন।–হে অগ্নি! পূর্বে পুণ্যকৃত যজমানগণ যে পথে পীযূষের ধারায় ব্যাপ্ত হয়েছেন, সেই পথে আমাদের এই যজ্ঞকে বহন করুন, এবং স্বর্গলোকনিবাসী দেবগণের মধ্যে স্থাপন করুন।যেস্থানে বা যে লোকে মধু ও ঘৃতের ধারা অনপেতা অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন রয়েছে, বিশ্বকর্মা অগ্নি সেই স্বর্গলোকে দেবতাগণের নিকটে আমাদের এই যজ্ঞকে বহন করুন, এবং দেবগণের মধ্যে স্থাপন করুন। [সায়ণাচার্য বলেন–এতে চ দশ মন্ত্রাঃ পূর্বস্মিন্মকাণ্ডে মমগ্ন ইত্যনুবাকাদুধ্বং দ্রষ্টব্যঃ] । ৭।
[সায়ণাচার্য বলেন–অষ্টমে স্বয়ঞ্চিত্যাদিকমভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৮ স্বয়ঞ্চিতি ইত্যাদি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- হে জাতবেদা অগ্নিদেব! আপনার যে সমিধঃ অর্থাৎ সমিন্ধন ত্রিয়া অছে (সন্তি), আপনার যে গার্হপত্য ইত্যাদি স্থানসমূহ আছে, আপনার যে কালী করালী ইত্যাদি জিহ্বাগুলি আছে, আপনার যে অর্চিঃ অর্থাৎ প্রকাশনের সামর্থ্য আছে, এবং (হে অগ্নিদেব!) আপনার যে চন্দ্রসদৃশ বিশেষ স্ফুলিঙ্গ আছে, সেই সবগুলির দ্বারা চয়নপ্রকারে অভিজ্ঞ আপনি আপন স্বরূপ উন্মোচিত করুন।–চীয়মান অগ্নি থেকে উৎসন্ন যজ্ঞ বা বিনষ্ট যজ্ঞ জ্ঞাত হওয়া যায়। অতএব যজ্ঞের কোন অঙ্গ অনুষ্ঠিত হলো বা কোন্ অঙ্গ হলো না তা জ্ঞাত হওয়া যায় (জ্ঞাতুমশক), এবং অধ্বর্য যদি কোন অঙ্গ অন্তরিত করেন, তাহলে তা পরিহারের নিমিত্ত ক্ষেত্ৰ-অভিমৰ্শনকালে যাস্তে অগ্ন এই ঋক্ উচ্চারণ কর্তব্য (ক্ৰয়াৎ)। এই ঋক্ স্বয়ঞ্চিচি নামে অভিহিত। এই মন্ত্রে অগ্নি স্বয়ংই নিজেকে চয়ন করেন, তাই এই নাম। তাহলে অধ্বর্যর দ্বারা কোন অঙ্গ দুষ্ট হয় না। [এই অংশ অগ্নে তব এবো বয় অনুবাকেও (৫কা, ২প্র .৫অ) দ্রষ্টব্য। পরবর্তী মন্ত্রগুলি স্বয়মাতৃদ্মামুপদধাতীয়ং অনুবাকে (৫কা. ২প্র. ৮অ) দ্রষ্টব্য] ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন–নবমেহগ্নিগ্ৰহণাদিকমভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৯ অগ্নিগ্রহণ ইত্যাদি অভিহিত হয়েছে]।
মর্মার্থ- পরকীয় (পরসম্বন্ধী) অগ্নি চয়নের অগ্রে আপন পূর্বসিদ্ধ বহ্নিকে আমি নিজের মতো করে স্বীকার করছি। (কি নিমিত্ত? না,) সেই গৃহীত অগ্নির প্রসাদে আমি ধনপুষ্টি, শোভন অপত্য, শোভন ভৃত্য লাভ করব এবং শরীরের বল স্থাপন করব। শোভন পুত্র ভৃত্য ইত্যাদির দ্বারা যুক্ত হয়ে আমরা আমাদের শরীরের সাথে হিংসারহিত হবো (হিংসারহিতাঃ স্যাম)।–হে আমাদের শরীরগত ভূত-ইন্দ্রিয়বিশেষের পিতরঃ বা পালক! যে অগ্নিদেব আমাদের অন্তর হৃদয় ইত্যাদি অবয়বের মধ্যে সর্বতঃ প্রবিষ্ট, তাকে আমরা আমাদের শরীরে স্থিরভাবে ধারণ করব (ধারয়ামঃ)। সেই অগ্নি যেন আমাদের পরিত্যাগ করে অন্যত্র না গমন করেন।যদি অধ্বযু ময়ি গৃহ্বামী–এই মন্ত্রের দ্বারা আপন অগ্নিকে গ্রহণ না করে পরের নিমিত্ত অগ্নি চয়ন করেন, তাহলে তার পূর্বচিত অগ্নিও যজমানের চিত অগ্নির মতো হয়ে যায়, এবং তাঁর সকল পশুও অগ্নির সেবা করে (অনুসেবন্তে)। সেই নিমিত্ত তা পরিহারের উদ্দেশে ময়ি গৃহামী মন্ত্র দুটি পঠনীয়। তাতে আপন অগ্নি আপনারই মতো থাকে, পশুগণও পলায়িত (অপক্রান্ত) হয় না।–(অতঃপর প্রশ্নোত্তরে চয়নের প্রশংসা) ব্রহ্মবাদীগণের প্রশ্ন, মৃত্তিকা ও জল এই উভয়ের মধ্যে কোনটিই তো ভক্ষণ যযাগ্য নয়, তাহলে ভক্ষণযোগ্য আজ্য পুরোডাশ ইত্যাদি পরিত্যাগ করে কি নিমিত্ত মৃত্তিকা ও জলের দ্বারা ইষ্টকারূপ অগ্নির চয়ন করা হয়? সে বিষয়ে অভিজ্ঞজন উত্তরে বলেন, যদিও জল অগ্নির ভক্ষ্য নয়, তথাপি জলের দ্বারা মৃত্তিকার মিশ্রণে দেবগণের সাথে অগ্নিকে সংযোজিত করা হয়। জল হল সর্বদেবতাত্মক। বৃত্ৰবধ ইত্যাদিতে ইন্দ্রের সহকারিত্বের দ্বারা সর্বদেবতার উপকার সাধনের কারণে জলে সর্বদেবতাত্মকত্ব। অতএব সর্বদেবতার সংযোজনের কারণে জলের দ্বারা অগ্নির চয়ন যুক্তিযুক্ত (চয়নং যুক্ত)। সেই রকম, মৃত্তিকার দ্বারা চয়নও যুক্তিযুক্ত; কারণ ভূমি (বা মৃত্তিকা) হলো বৈশ্বানর অগ্নির রূপ।-ব্রহ্মবাদীগণের প্রশ্ন, এই অগ্নি নামে আখ্যাত চিতি মৃত্তিকা ও জলের দ্বারা নিম্পাদিত হয়েছে, অঙ্গার বা জ্বালার (অগ্নি শিখার) দ্বারা নয়; তবে কি কারণে অগ্নি নাম সম্পন্ন হলো? সে বিষয়ে অভিজ্ঞজনের উত্তর,কেবল মৃত্তিকা ও জলের দ্বারাই চয়ন করা হয়নি, ছন্দোযুক্ত মন্ত্রের দ্বারাও চয়ন করা হয়েছে; এবং ছন্দ হলো অগ্নির স্বরূপ, অভি ত্বা দেব সবিতঃ ইত্যাদি মন্ত্রগত ছন্দে মন্থনের হেতু অগ্নি উৎপাদিত। অতএব ছন্দের দ্বারা চিতি অগ্নি সিদ্ধ (চিতেরগ্নিত্বম)। আরও, ভূমির বৈশ্বানরত্ব পূর্বে উদাহৃত হয়েছে; অতএব মৃকার্যত্বের কারণে অগ্নিত্ব যুক্তিযুক্ত। [এগুলি ব্রাহ্মণের শেষে দ্রষ্টব্য। পরবর্তী মন্ত্রগুলি সম্বন্ধে সায়ণাচার্যের উক্তি–ইদং চ ব্রাহ্মণং নক্ষত্রেষ্টকাভ্য ঊর্ধ্বং দ্রষ্টব্য) ॥৯॥
[সায়ণাচার্য বলেন–দশমে পশুশীর্ষানচ্যন্তে। অর্থাৎ- অনুবাক-১০ ে পশুশীর্ষগুলি সম্পর্কে বলা হয়েছে]
পঞ্চম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৭০
অনুবাক-৭০
মন্ত্র- প্রজাপতিরগ্নিমসুজত সোহস্মাৎ সৃষ্টঃ প্রাপ্ৰাদ্রবত্তস্মা অশ্বং প্রত্যাস্যৎ স দক্ষিণাহবৰ্ত্তত তস্মৈ বৃষ্ণিং প্রত্যাস্যৎ স প্রত্যাহবৰ্ত্তত তম্মা ঋষভং প্রত্যাস্যৎ স ঊর্ধোহদ্রবত্তস্মৈ পুরুষং প্রত্যাস্যদ্যৎ পশুশীর্ষাণুপদধাতি সৰ্ব্বত এবৈম অবরুদ্ধ চিনুত এতা বৈ প্রাণভূতশ্চক্ষুষ্মতীরিষ্টকা যৎপশুশীর্ষানি যৎপশুশীর্ষাণুপদধাতি তাভিরেব যজমানোহম্মিল্লোঁকে প্রাণিত্যথোতাভিরৈম্মা ইমে লোকাঃ প্র ভাস্তি মৃদাহভিলিপপ্যাপ দধাতি মেধ্যায় পশুব্বা এষ যদগ্নিরন্নং পশব এষ খলু বা অগ্নিৎপশুশীৰ্যাণি যং কাময়েত কনীয়োহস্যান্ন স্যাদিতি সন্তরাং তস্য পশুশীর্ষাণুপ দধ্যাৎ কনীয় এবস্যান্নং ভবতি যং কাময়েত সমাবস্যান্নং স্যাদিতি মধ্যস্তস্যোপ দধ্যাৎ সমাবদেবস্যান্নং ভবতি যং কাময়েত ভূয়োহস্যানুং স্যাদিত্যন্তেষু তস্য ব্যুদূহ্যোপ দধ্যান্তত এবাশ্ম অনুমব রুন্ধে ভূয়োহস্যান্নং ভবতি ॥১০৷ মর্মার্থ–প্রজাপতি কর্তৃক সৃষ্ট অগ্নি যখন পূর্ব দিকে পলায়ন করে, তখন তা নিবারণে তার প্রতিকূলে অশ্বকে স্থাপিত করা হয়। এইভাবে দক্ষিণাবর্তে বৃষ্ণি, প্রত্যাহবর্তে (অর্থাৎ পশ্চিমবর্তে) ঋষভ, উদঙাইবর্তে (অর্থাৎ উত্তরবর্তে) বস্ত, এবং ঊধ্ব দিকে পুরুষকে (পশুশীষগুলিকে) উপধান (স্থাপন) কর্তব্য।–[অবশিষ্ট মন্ত্রগুলির দ্বারা প্রকারান্তরে পশুশীর্ষগুলির প্রশংসা, তার উপধানে কিছু বিশেষ বিধি, ইত্যাদি কথিত হয়েছে। এগুলি এষাং বা এতল্লোকানামিত্যনুবাকে (৫কা, ২প্র. ৯অ.) প্রাপ্তব্য] ॥১০।
[একাদশ থেকে পঞ্চবিংশ অনুবাক সম্পর্কে সায়ণাচার্যের বক্তব্য–অথাশ্বমেধাঙ্গমন্ত্রাঃ কেচিত্রোচ্যন্তে।… অথ দ্বিতীয়ান্তনির্দিষ্ট দেবতাঃ। তৃতীয়ান্তনির্দিষ্টাম্যশ্বস্যাঙ্গানি। ইমাং দেবতামনেনাঙ্গেন প্রীণয়ামীতি হোমকালে উভয়ং স্মর্তব্যমিতি মন্ত্রাভিপ্রায়ঃ। অর্থাৎ–এইগুলিতে অশ্বমেধের অঙ্গমন্ত্রগুলি কথিত হয়েছে। অনন্তর দ্বিতীয়া পদের দ্বারা নির্দিষ্ট দেবতা এবং তৃতীয়ান্ত পদের দ্বারা নির্দিষ্ট অশ্বের অঙ্গসমূহ কথিত হয়েছে। এই দেবতাকে এই অঙ্গের দ্বারা প্রীত করছি–হোমকালে এই উভয়ই স্মরণ করা কর্তব্য।–যেমন, স্তেগাঃ অর্থাৎ গোকর্ণতুল্য যার কর্ণ (অশ্বতর) বা চক্ষু যার কর্ণ (সর্প) এমন ক্ষুদ্র জন্তুবিশেষের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। দ্রংষ্ট্রে অর্থাৎ উন্নত দন্তশালী। মন্ত্রে বলা হচ্ছে–স্তেগাভিমানীনীং দেবতাং দ্রংষ্ট্রাভ্যাং যজামি। এই মন্ত্রগুলি সবই এইভাবে সহজে বোধিতব্য] ॥১১-২৫।
মর্মার্থ- দেবরাজ ইন্দ্রের উদ্দেশে সূকর অর্থাৎ বরাহ আলম্ভ (বধ বা স্পর্শ কর্তব্য। এই রকমে জলের রাজা বরুণের উদ্দেশে কৃষ্ণমৃগ; ধর্মের রাজা যমের উদ্দেশে ঋষ্য (মৃগবিশেষ); ঋষভের অর্থাৎ গোসমূহের রাজার উদ্দেশে গবয় (গলকম্বলহীন গরুর ন্যায় পশুবিশেষ); অরণ্যের রাজা শার্দুলের উদ্দেশে গৌরমৃগ; পুরুষগণের রাজা বা প্রধানের উদ্দেশে মর্কট বা বানর; ক্ষিপ্রগতি শকুনিরাজের উদ্দেশে বর্তিক (চটকসদৃশ) পক্ষীবিশেষ; সরীসৃপগণের রাজা নীলপ্রভ নামক সর্পবিশেষের উদ্দেশে গোময়পিণ্ডকারী ক্রিমি (বা কীট); ঔষধিরাজ সোমের (চন্দ্রের) উদ্দেশে কুলুঙ্গ (কুরতহরিণ), চিত্ৰক বা চিতাবাঘ কটুকস্বর; সমুদ্ররাজ সিন্ধুর উদ্দেশে শিশুমার নামক গ্রাহ (বা হাঙর), এবং পর্বতরাজ হিমবত বা হিমালয়ের উদ্দেশে হস্তী আলভন করণীয় ॥১১৷৷
[একাদশ অনুবাকে একাদশ সংখ্যক পশুর আলভন বিষয় কথিত হয়েছে। অতঃপর এই দ্বাদশ অনুবাকে এবং এর পরবর্তী দ্বাদশটি অনুবাকে আরও কিছু পশুর আলভন বিষয় কথিত হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ১৮শ অনুবাক পর্যন্ত মর্মার্থ দেওয়া হলো] ।
মর্মার্থ- বল নামে আখ্যায়িত দেবতার উদ্দেশে অজগর নামক মহাসর্প (মহেরগঃ); মিত্র দেবতার উদ্দেশে আখু (মুষিক বা শুকর), সৃজায়া (নীলমক্ষিকা, শুক্লসর্প, নীলমহিষ) ও শরৎক (অর্থাৎ কৃকলাস বা কাঁকলাস); মৃত্যু দেবতার উদ্দেশে কৃষ্ণ সর্প; মনদেবতার উদ্দেশে স্বজ (অর্থাৎ সর্পবিশেষ, যা গর্তের মধ্যে স্বয়ং জন্মায়); তষ্টা বা তৃষ্টা বা তন্টু দেবতার উদ্দেশে কুম্ভীনস (স্বাপশীল অর্থাৎ নিদ্রাতুর বৃহৎ সর্পবিশেষ), পুষ্করসাদ (পুর নামক নাগবিশেষ) বা ভ্রমরও শ্বেতলোহিত সর্প; এবং প্রতিশ্রুতি দেবতার উদ্দেশে বাহস বা কল্পপ্রমাণ সর্প আলভন কর্তব্য । ১৪।
মর্মার্থ- ভূমি দেবতার উদ্দেশে একটি মক্ষিকা আলভন কর্তব্য। এই ভাবে পিতৃদেবতাগণের উদ্দেশে একটি পাস্ত্র ও একটি কশ নামক পক্ষীবিশেষ ও একটি মান্থীলব (জলকুকুট); ঋতুরূপ দেবতাগণের উদ্দেশে একটি জহকা (বিলবাসী শৃগাল); সম্বৎসররূপী দেবতার উদ্দেশে একটি লোপা (শ্মশান-শকুনি); নৈঋত দেবতার উদ্দেশে একটি কপোত, একটি উলুক ও একটি শশক; এবং সাবিত্র বা সবিতা দেবতার উদ্দেশে একটি কৃকবাকু (অরণ্য-কুকুট) আলভন কর্তব্য ॥১৮৷৷
[অবশিষ্ট ছয়টি অনুবাক, অর্থাৎ, একোনবিংশ থেকে চতুর্বিংশ অনুবাক পর্যন্ত মন্ত্রগুলির অর্থ উপযুক্ত মর্মার্থ অনুসারে বোধিতব্য। অবশ্য এগুলিরও অধিকাংশ ব্যাখ্যা বা মর্মার্থ শুক্লযজুর্বেদের ২৪শ অধ্যায়ের বিভিন্ন মন্ত্রের মধ্যে প্রাপ্তব্য]
মর্মার্থ- প্রসঙ্গে বক্তব্য–এই ষষ্ঠ কাণ্ডোক্ত সকল প্রপাঠকের সকল অনুবাকের বিস্তৃত ব্যাখ্যাপ্রদান থেকে সায়ণাচার্য বিরত থেকেছেন। তাঁর বক্তব্য এই যে, এই মন্ত্রগুলি প্রথম কাণ্ডের দ্বিতীয় তৃতীয় ইত্যাদি প্রপাঠকে ব্যাখ্যাত; সুতরাং পুনরায় সেগুলির উল্লেখ অপ্রয়োজনীয়। তবে এই সমগ্র কাণ্ডের প্রতিটি প্রপাঠকের প্রতিটি অনুবাকের যে বিষয়বস্তু স্বয়ং সায়ণাচার্য নির্দেশ করেছেন, তাই উল্লেখিত হলো। যথা
মর্মার্থ- পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম এই তিন অনুবাকে উপাংশু গ্রহ, অন্তর্যাম গ্রহ, চান্দ্র গ্রহ, বায়ব গ্রহ, মৈত্রাবরুণ গ্রহ ও অশ্বিন্ গ্রহ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে৷৷(৫-৭)।
মর্মার্থ— মনুষ্যগণের মধ্যে প্রজা-উৎপাদন হলো জ্যোতি, (কারণ অপত্যরহিত মনুষ্যের ম্লানমুখ তমঃসদৃশ); দেবতাগণের মধ্যে অগ্নি হলেন জ্যোতি, (কারণ গৃহমধ্যে অন্য দেবতাগণ অপেক্ষা অগ্নিই অধিক জ্যোতির্ময়); ছন্দের মধ্যে বিরাট ছন্দ জ্যোতি। স্তোত্ৰীয়াখ্যা বাক্য সম্বন্ধিনী বিরাট উপলক্ষিতা দশ সংখ্যায় অগ্নি প্রতিপাদিত হয়েছে (সমাপ্যতে)। অতএব সোমযাগের অগ্নিরূপত্ব ও বিরাট্ররূপত্ব সিদ্ধ।–লোকজগতে প্রাণ ও অপান যেমন পুরুষের জীবন নির্বাহ করে, সেইরকম ত্রিবৃৎস্তোম (বহিঃষ্পবমানাখ্যং স্তোমং) ও পঞ্চদশস্তোম প্রাতঃসবন নির্বাহ করে। যেমন চক্ষু ও শ্রোত্র পুরুষের রূপদর্শন ও শব্দগ্রহণ ব্যবহার সম্পন্ন করে, তেমনই পঞ্চদশ স্তোম ও সপ্তদশ স্তোম মধ্যন্দিন সবন নির্বাহ করে। পুরুষের বাগিন্দ্রিয় ও পাদেন্দ্রিয় যেমন বচন ও গমন ব্যবহার সম্পন্ন করে, তেমনই সপ্তদশ ও একবিংশ স্তোম তৃতীয় সবন নির্বাহ করে। এইভাবে স্তোমের দ্বারা নিষ্পন্ন সোম্যগ পুরুষসদৃশ, কিন্তু কোনও অঙ্গে নন নয় (নতু স্থূরিঃ)। এই রকম স্তোমরূপত্বে সিদ্ধ হয়ে জ্যোতিরূপ স্তোমগুলি এখানে ব্যুৎপন্ন হওয়ায় এই জ্যোতিষ্টোম নাম। [১ম কাণ্ডের ৮ম প্রপাঠকের ১৩শ অনুবাকে রাজসূয় প্রকরণে সামব্রাহ্মণের উদাহরণে স্তোমের স্বরূপ কথিত হয়েছে]। সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পন্ন পুরুষ যেমন সকল কর্ম সাধনে সমর্থ হয়, সেইরকম এই সম্পূর্ণ জ্যোতিষ্টোমের দ্বারা সর্ব কামনার প্রাপ্তি ঘটে।–পুরাকালে সৃজনেচ্ছু প্রজাপতি অগ্নিষ্টোম যাগ সাধন পূর্বক প্রজা সৃষ্টি করেন তাঁদের আপন অধীন করেন। এই সম্পর্কে বিদিত হয়ে যিনি অগ্নিষ্টোম যাগের অনুষ্ঠান করেন, সেই অগ্নিষ্টোমযাজী প্রজা প্রাপ্ত হয়ে থাকেন।–ইত্যাদি ॥১।
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ তত্র স্তোমানাং মুখ্যত্বং দর্শয়িতুং দ্বিতীয়েইনুবাকে স্তোমানাং সম্ভয়কারিত্বং তাবদাদৌ দর্শয়তি।-পূর্ব অনুবাকে যে স্তোমের কথা বলা হয়েছিল, এই অনুবাক-২ সেই স্তোমের প্রশংসা প্রসঙ্গে সেগুলির যুক্তকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে]
[সূত্রকারের উক্তি–অগ্নিষ্টোমঃ প্রথমযজ্ঞোহতিরামেকে পূর্বং সমামন্তি–অতিরাত্র হলো অগ্নিষ্টোমের প্রথম যজ্ঞ। এখানে সেই অতিরাত্রের বিধি ও সংশ্লিষ্ট স্তোমসমূহের প্রশাংসা বিধৃত হয়েছে]
মর্মার্থ- যে পুরুষ অগ্নিষ্টোমের অনুষ্ঠান করেন, তিনি পুনরায় সেই সকল স্তোমের দ্বারা যাগ করলে মুখ্য যাগকারী হন (যষ্টেতি)–ব্রহ্মবাদীগণ বলেন। সেই নিমিত্ত সর্ব স্তোমের দ্বারা অনুষ্ঠান করা বিধি। অগ্নিষ্টোমে ত্রিবৃৎ ইত্যাদি চারটি এবং অতিরাত্রে ব্রিণব ও ত্রয়স্ত্রিংশ নামে দুটি স্তোম বিদ্যমান।–যে যজমানের যাগে ঋত্বিকগণ ত্রিবৃৎ স্তোমকে অন্তরিত (অর্থাৎ পরিহার) করেন, সেই যাগে প্রাণরূপ স্তোমের পরিহারে তাঁরা যজমানের প্রাণও অন্তরিত করেন। এরকম করতে নিষেধ করা হয়েছে। অয়ং যজমানো হি মে ইত্যাদি, অর্থাৎ এই যজমান প্রাণযুক্ত হোন এইরূপে যজ্ঞের অনুষ্ঠান অভিপ্রেত; সেই নিমিত্ত ত্রিবৃৎস্তোম অবশ্যম্ভাবী।–এইরকম পঞ্চদশস্তোমের অন্তরায়ে যজমানের বীর্যের অন্তরায় ঘটে। এরকম করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই যজমান বীর্যযুক্ত হোন এইভাবে যজ্ঞের অনুষ্ঠান অভিপ্রেত; সেই কারণে পঞ্চদশস্তোম অপরিহার্য।–এইভাবে সপ্তদশ স্তোমের অন্তরায়ে যাতে যজমানের প্রজাবর্গের অন্তরায় না ঘটে; কিংবা একবিংশস্তোমের অন্তরায়ে যাতে যজমানের প্রতিষ্ঠার অন্তরায় না ঘটে; কিংবা ব্রিণবস্তোমের অন্তরায়ে যাতে যজমানের ঋতুসমূহের অন্তরায় না ঘটে; কিংবা ব্রয়স্ত্রিংশস্তোমের অন্তরায়ে যাতে যজমানের দেবতাগণ অন্তর্হিত না হন; সেইভাবে যজ্ঞানুষ্ঠান কর্তব্য ॥৩॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অনুবাক-৩ একদিন সাধ্য অতিরাত্র যাগের কথা বলা হয়েছে। অনুবাক-৪ দ্বিরাত্র যাগের কথা বলা হয়েছে।চত্বারো হি দ্বিরাত্রভেদাঃ]
মর্মার্থ– অঙ্গিরস মহর্ষিগণ যখন সত্র (যজ্ঞ) অনুষ্ঠিত করে স্বর্গপ্রাপ্ত হন, তখন তাদের মধ্যে হবিষ্মন্ ও হবিস্তৃৎ নামে দুজন পুরুষ স্বর্গপ্রাপ্তির পক্ষে হীন ছিলেন, অর্থাৎ স্বর্গলাভের অনুপযুক্ত ছিলেন। তারা তখন স্বর্গপ্রাপ্তির কামনায় পুনরায় দ্বিরাত্র নামে আখ্যাত যাগ সাধন পূর্বক স্বর্গ প্রাপ্ত হন। অতএব অন্যেও স্বর্গপ্রাপ্তির নিমিত্ত দ্বিরাত্র যাগ করেন। (এরপর দিনবিশেষ, স্তোমবিশেষ, দিনভেদে সামবিশেষ ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৪॥
মর্মার্থ- (পৃথিবীর উৎপত্তি প্রসঙ্গে আখ্যায়িকা)–ইদানীং দৃশ্যমান এই গিরি-নদী-সমুদ্রযুক্ত পৃথিবী উৎপত্তির পূর্বে কেবল সলিল (জল) ছিল। সেই সলিলে কোন প্রাণীর অস্তিত্বমাত্র ছিল না। তখন প্রজাপতি মূর্ত (ভূতাত্মক) শরীরের অবস্থানযোগ্য স্থানের অভাবে বায়ুরূপ ধারণ পূর্বক সেই সলিলের সর্বত্র বিচরণ করতে থাকেন। এবং এইভাবে বিচরণ করতে করতে সেই সলিলে নিমগ্ন ভূমি দর্শন করে স্বয়ং বরাহরূপী হয়ে দন্তের অগ্রভাগের দ্বারা সেই ভূমিকে ধারণ করে সলিলের উপরে আহরণ করে আনেন। এবং আহরণের পর রাহরূপ পরিত্যাগ করে বিশ্বকর্মা রূপধারী হয়ে সেই ভূমিকে বিশেষভাবে পরিষ্কার (মার্জনং) পূর্বক তার দ্রবদ্রব্য (বা আর্দ্রতা) অপনীত করে তাকে বিস্তৃত করেন। তখন সর্বপ্রাণীর আধারভূতা এই পৃথিবী দৃশ্যমান হয়। সেই হতে এই পৃথিবী নামটি সম্পন্ন হয়।–(অতঃপর ক্রমে দেবসৃষ্টি ও গোসৃষ্টি দেখানো হচ্ছে)–তখন সেই ভূমিতে আপন মূর্তিতে অবস্থিত হয়ে সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক হয়ে তপস্যা করতে থাকেন। সেই তপস্যার সামর্থ্যে তিনি প্রথমে বসুগণ, রুদ্রগণ ও আদিত্যগণকে সৃষ্টি করেন। সেই বসু ইত্যাদি দেববর্গ প্রজাপতির প্রতি প্রজা উৎপাদনের উপায় জিজ্ঞাসা করলেন (পপ্রচ্ছ)। প্রজাপতি তাদের তপস্যার দ্বারা প্রজা উৎপাদনের উদ্দেশে তপস্যার আধারভূত অগ্নির উদ্দেশে হোম করতে বললেন। তারা সম্বৎসর ব্যাপী সেই হোম সাধন পূর্বক শেষে একটি গাভী সৃষ্টি করলেন (গামসৃজন্ত)। প্রজাপতি সেই গাভীটিকে রক্ষার নিমিত্ত বসুদেবতাগণকে দান করলেন। বসুগণের দ্বারা রক্ষিতা সেই গাভী বসুগণের নিমিত্ত তিনশত তেত্রিশ সংখ্যক গাভী উৎপাদন করে (গবাং শতত্রয়ং ত্রয়স্ত্রিংশতং চোৎপাদয়ামাস)। তখন প্রজাপতি (সেই পূর্বোক্ত) গাভীটি রক্ষার নিমিত্ত রুদ্রদেবতাগণকে দান করলেন। সেই গাভী রুদ্রগণের নিমিত্তও সেইরকম (অর্থাৎ তিনশ তেত্রিশটি) গাভী উৎপাদন করলো। তখন প্রজাপতি সেই গাভীটি রক্ষার নিমিত্ত আদিত্যদেবতাগণকে দান করলে সেই গাভী আদিত্যগণের নিমিত্তও সমসংখ্যক (অর্থাৎ তিনশ তেত্রিশটি) গাভী উৎপাদন করে। এই তিনটি পর্যায় গ্রহণ পূর্বক শ্রুতি একটি বাক্যে যুক্ত করে। তিন ভাবে বাক্যকে বিভাজিত করে যুক্ত করণীয় (তত্র ত্রেধা বাকং বিভজ্য যোজয়িতব্য এবং সত্যেকোনসহস্রং গাবং সম্পন্ন–এইভাবে এক-কম সহস্র অর্থাৎ নয়শত নিরানব্বই সংখ্যক গাভী সম্পন্ন হলো এবং সেই সঙ্গে পুর্বোক্ত গাভীটি সংযুক্ত করে সহস্র সংখ্যার পুরণ হয়েছে।–(সহস্র দক্ষিণাযুক্ত ত্রিরাত্ৰগের সাধন) বসু-রুদ্র-আদিত্যগণ সকলে মিলিত হয়ে অতঃপর প্রজাপতির নিকট গো-সহস্র দক্ষিণাযুক্ত যজ্ঞ সাধনের নিমিত্ত প্রার্থনা করেন। সেই প্রজাপতি সেই তিন-নামী দেবগণেকে তিন ভাগে বিভাজিত করে তিন দিনক্রমে অগ্নিষ্টোম, উথ্য ও অতিরাত্র যাগানুষ্ঠানের পরামর্শ দান করলেন। সেই মতো তাঁরা দ্বাদশস্তোত্র অগ্নিষ্টোম, পঞ্চদশস্তোত্র উকথ্য এবং একোনত্রিংশ-স্তোত্র অতিরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করলেন। এবং এর দ্বারা তারা তিন লোক জয় করেন (তৈর্লোকত্রয়মজয়) ও নিজ নিজ গোধন দক্ষিণারূপে ঋত্বিগণকে দান করেন। (এরপর ত্রিরাত্রযাগের হবিৰ্বিশেষ, সহস্র দক্ষিণাদানের বিকল্প নিয়ম, সহস্ৰদানোপেত কর্মের প্রশংসা ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৫॥
[সায়ণাচার্য বলেন-যষ্ঠেহনুবাকে সহস্রতমীং প্রশস্য তদঙ্গভূতং হোমাদিকমুক্ত। অর্থাৎ-অনুবাক-৬ সহস্র দক্ষিণাযুক্ত অতিরাত্রের প্রশংসা পূর্বক তার অঙ্গভূত হোম ইত্যাদি কথিত হয়েছে ]
মর্মার্থ- পুরাকালে কোনও সময়ে সোমদেব সহস্র গো লাভ করেছিলেন। তাঁর অনুগমন করে ইন্দ্রদেবও সেইরকম সহস্র গো লাভ করেছিলেন। যমও সেই সোম ও ইন্দ্রের নিকট হতে ঈঙ্গিত ভাগ আদায়ের নিমিত্ত তাদের প্রতি আগমন করলেন; এবং বললেন-আমাকেও কিছু ভাগ প্রদান করো। তাঁরা সাদরে তা অঙ্গীকার (বা স্বীকার করলে যম তাঁদের দ্বিসহস্র গো-র মধ্যে হতে পরীক্ষাপূর্বক একটি গো-কে সমর্থ বলে নির্ধারণ করলেন। তখন ইন্দ্রদেব ও সোমদেব বললেন–আমরা সকলে মিলিত হয়ে এই উত্তম গবির শক্তি (বীর্য) পরীক্ষা করে এর এক একটি অংশ স্বীকার (গ্রহণ) করব–এই রকম বিচারপূর্বক তারা সেইরকমই করতে উদ্যোগী হলেন। (সোমের প্রথম অংশ হরণের প্রকার)–তারা তিনজনে মিলিত হয়ে সেই উত্তমা গাভীটিকে জলে প্রবেশ করালেন এবং বললেন, সোমদেবের যেমন রূপ, সেইরকম যোগ্য রূপ গ্রহণ করে জল হতে উদ্গত হও। তখন সেই গাভী জল হতে উগমনের বেলায় তাদের প্রার্থিত রূপ গ্রহণ করে আগত হলো। (তার রূপ স্পষ্টীকৃত হলো) রোহিণী শরীরা অর্থাৎ লোহিতবর্ণা, পিঙ্গলাক্ষী ও এক সম্বৎসর-বয়স্কা এইরকম লাবণ্যযুক্তা ও রূপশালিনী হয়ে সে জল হতে উদ্গত হলো এবং সঙ্গে এইরকম আরও তিনশত তেত্রিশসংখ্যক গাভী আনয়ন করলো। যেহেতু সোমদেবের নিমিত্ত সে রোহিণী ইত্যাদি রূপ ধারণ করেছিল; সেই কারণে রোহিণীশরীরা (লোহিতবর্ণা), একবৎসর-বয়স্কা ও পিঙ্গলচক্ষুবিশিষ্টা গাভীর বিনিময়ে সোম ক্রয় করা হয়। তার দ্বারা সোম ক্রীত হওয়ার অর্থ তিনশত তেত্রিশটি গাভীর দ্বারা সোমের ক্রয়। সেই নিমিত্ত সুক্ৰীত সোমের দ্বারা যায় অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।–(অতঃপর ইন্দ্র কর্তৃক সেই গাভীর অংশহরণের প্রকার দেখানো হচ্ছে)–সেই রোহিণী লক্ষণা অর্থাৎ শৃঙ্গ-পুচ্ছ ইত্যাদি অঙ্গসৌষ্ঠবযুক্ত চতুর্বর্ষা (পষ্ঠৌহী), দর্শনমাত্রই মানসক্লেশ-অপহন্ত্রী ইন্দ্রের যোগ্য রূপা গাভী ইন্দ্রের গৃহীতব্যা হলো। সুতরাং এই রূপবিশিষ্টা গাভীই যজ্ঞের দক্ষিণারূপে প্রদেয়। (অতঃপর যমের অংশহরণের প্রকার)–জরতী অর্থাৎ বৃদ্ধা, মূখা অর্থাৎ রোষণশীলা, জঘন্যা অর্থাৎ অত্যন্ত কুরূপা, জরা ইত্যাদি গুণযুক্ত কার্যকারিণী–এমন গাভী যমের অংশভূতা হলো।–(প্রকারান্তরে সহস্র গাভীর প্রশংসা)–এই যে সহস্র গাভীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ গাভী তিনরকম রূপ ধারণ করে জলে হতে উগতা হয়েছিল তিনি বাগদেবতা। যেহেতু এটি বাগদেবতার রূপ, সেই হেতু সহস্র দক্ষিণাযুক্ত যাগে বাগদেবতার উদ্দেশে যজমানের এইরকম শ্রেষ্ঠ গাভীবিশেষ প্রদান কর্তব্য। এতে সহস্র গাভী দেওয়া হয়। (অতঃপর প্রকারান্তরে লক্ষণবিধি, সহস্র গাভীর পক্ষান্তরবিধি, গাভীর আম্রাপণে মন্ত্রের উৎপত্তি, আম্রাপণের ফল, হোমাঙ্গভূত মন্ত্র, সহস্র দক্ষিণার মন্ত্রভাগের তাৎপর্য, তার অঙ্গভূত জপবিধি, মন্ত্রাবলী এবং মন্ত্রের তাৎপর্য কথিত হয়েছে) ॥৬॥
[সায়ণাচার্য বলেন–ষষ্ঠেইনুবাকে সহস্রতমীং প্রশস্য তদঙ্গভূতং হোমাদিকমুক্ত। অথ সপ্তমে তদানং বিধীয়তে। অর্থাৎ–অনুবাক-৭ সহস্রতমী দিনের বিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে]।
সপ্তম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৭
অনুবাক-৭
মন্ত্র- সহস্রতম্যা বৈ যজমানঃ সুবৰ্গং লোকমেতি সৈনং সুবর্গং লোকং গময়তি সা মা সুবৰ্গং লোকং গময়েত্যাহ সুবৰ্গমেবৈনং লোকং গময়তি সা মা জ্যোতিষ্মন্তং লোকং গময়্যোহ জ্যোতিষম্মস্তমেবৈনং লোকং গময়তি সা মা সৰ্বান্ পুণ্যাল্লোঁকা গময়েত্যাহ সর্বানেবৈনং পুণ্যাল্লোঁকা গময়তি সা মা প্রতিষ্ঠাং গময় প্রজয়া পশুভিঃ সহ পুনৰ্মাহবিশতায়িরিতি প্রজয়েবৈনং পশুভী রয্যাং প্রতিষ্ঠাপয়তি প্রজাবান পশুমান রয়িমান ভবতি য এবং বেদ তামগ্নীধে বা ব্ৰহ্মণে বা হোত্রে বোপ্পাত্রে বাহৰ্যবে বা দদ্যাৎ সহস্রমস্য সা দত্তা ভবতি সহস্রমস্য প্রতিগৃহীতং ভবতি ষস্তামবিদ্বান প্রতিগৃতি তাং প্রতি গৃহীয়াদেকাহসি ন সহস্ৰমেকাং ত্বা ভূতাং প্রতি গৃমি ন সহস্ৰমেকা মা ভূতাহবিশ মা সহস্ৰমিত্যেকামেবৈনাং ভূতাং প্রতি গৃতি ন সহস্রং য এবং বেদ স্যোনাহসি সুষদা সুশে সোনা মাহবিশ সুষদা মাহবিশ সুশেবা মাহবিশ ইত্যাহ স্যোনৈবেনং সুষদা সুশেবা ভূতাহবিশতি নৈনং হিনস্তি ব্ৰহ্মবাদিনো বদন্তি সহস্রং সহস্রতম্যন্বেতী সহস্রতমীং সহস্রামিতি যৎ প্রাচীমুসৃজেৎ সহস্রং সহস্রতম্যম্বিয়াৎ সহস্রমপ্রজ্ঞাত্রং সুবর্গং লোকং ন প্র জানীয়াৎ প্রতীচীমুৎস্যজতি তাং সহমনু পৰ্য্যাবর্ততে সা প্রজাতী সুবর্গং লোকমেথি যজমানমভসৃজতি ক্ষিপ্রে সহস্রং প্র জায়ত উত্তমা নীয়তে প্রথমা দেবান গচ্ছতি ॥৭॥
মর্মার্থ- যজমান এই সহস্র গাভীর মধ্যে শ্রেষ্ঠাটির দ্বারা স্বর্গলোক প্রাপ্ত হন। এইটিই তাকে স্বর্গলোক প্রাপ্ত করায়। সেই নিমিত্ত সা মা সুবর্গং লোকং গময়েতি অর্থাৎ হে সহস্রতমি! তুমি আমাকে স্বর্গলোক প্রাপ্ত করাও মন্ত্র পঠনীয়। সেইরকম সা মা জ্যোতিষ্মন্তং লোকং….(অর্থাৎ আদিত্যলোক প্রাপ্ত করাও) এবং সা মা সর্বান্ পুণ্যাল্লোঁকান্ .. (অর্থাৎ ইন্দ্রলোক ইত্যাদি সকল লোক প্রাপ্ত করাও) মন্ত্র পঠনীয়। এইভাবে ঐ ঐ লোকে প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ স্থির অবস্থান এবং পশুগণ সহ ধন লাভের প্রার্থনা জানানো হয়েছে। (অতঃপর সহস্রতমি দানের বিধি, প্রতিগ্রহদোষ পরিহারের নিমিত্ত সেই প্রতিগ্রহ মন্ত্র ইত্যাদি উল্লেখিত হয়েছে) ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমে সহস্রতমীদানমুক্ত। তাবতা পঞ্চমমারভ্য ত্রিধনুবাকে্যু গর্গত্রিরাত্রঃ সমাপিতঃ। অথষ্টমনবময়োদ্বেী চতুরাত্ৰাবুচ্যতে। অর্থাৎ অনুবাক-৭ সহস্রতমী দানের কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অনুবাক-৭ পর্যন্ত গর্গ-ত্রিরাত্রের কথা সমাপ্ত হয়েছে। এবার অনুবাক-৮< এবং পরবর্তী অনুবাক-৯ মোট দুটি চতুরাত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই অনুবাক-৮ অত্রির চতুরাত্র নিরূপিত ]
মর্মার্থ- উর্বের পুত্র ছিলেন ঔর্ব। তিনি পুত্রকামী হয়ে অত্রির নিকট পুত্র যাচ্ঞা করলে অত্রি তাকে আপন প্রজা (পুত্র) দান করেছিলেন। তারপর সন্তানরহিত হয়ে রিক্ত মনে চিন্তা করতে লাগলেন–আমি প্রজা-উৎপাদনের সামর্থ্যরহিত (নির্বীর্য) ও কার্যে অক্ষম (শিথিল) হয়েছি। অতএব যাতযাম অর্থাৎ গতসার হয়েছি এমন বিচার করে তিনি প্রজা-উৎপাদনের সাধক, (নিম্পাদক) চতুরাত্র অনুষ্ঠানের নিমিত্ত নিশ্চয় (মনস্থির করলেন। এই উদ্দেশে তিনি চতুরাত্রের উপযোগী সামগ্রী আহরণ করে যাগ করবেন। এর ফলে তার সুহোত্র ইত্যাদি চারটি পুত্ৰ উৎপন্ন হয়েছিল। তার মধ্যে হৌত্র, ঔাত্র ও আধ্বর্য যজ্ঞের প্রয়োগে ও উপদেশে কুশল হয়েছিলেন। এইভাবে অন্যেও চতুরাত্র যাগের দ্বারা পুত্র লাভ করে থাকে। (অতঃপর বহিষ্পবমান, মাধ্যন্দিনপবমান, আর্ভবপবমান-এই তিনটির স্তোমবিশেষ; পবমান ব্যতিরিক্ত অপর স্তোত্রের স্তোমবৃদ্ধি; চতুরাত্রের বিকার ইত্যাদি কথিত হয়েছে)।৮৷৷
মর্মার্থ– চতুরাত্র যাগে লোকপ্রসিদ্ধ পুত্র(প্রজা), পশু, ধন ও পুষ্টি সম্পাদিত হয়। যখন জমদগ্নি পুষ্টিকামনায় এই যাগ প্রবর্তন করেন, তখন তিনিও এগুলি লাভ করেন; এবং তাঁর বংশে উৎপন্ন কেউই কখনও দরিদ্র হননি। (অতঃপর অগ্নি, অশ্বিন, বিষ্ণু, সূর্য, সবিতা, ধাতা, মরুৎ, বৃহস্পতি, মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণের উদ্দেশে পুরোডাশ নির্বপণের বিধি কথিত হয়েছে)।–যিনি এইসব বিদিত হয়ে চতুরা যাগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি অন্নভক্ষক (অন্নাদঃ) ও পশুমান্ হয়ে থাকেন৷৷৯৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–দশমে পঞ্চরাত্রোহভিধীয়তে–অর্থাৎ চতুরাত্রের পর এবার এই অনুবাকে পঞ্চরাত্র যাগের কথা বলা হয়েছে]
মর্মার্থ– এই বসন্ত ইত্যাদি ঋতুভেদযুক্ত কালস্বরূপ ঋতুর উৎপত্তির পূর্বে প্রজাপতি সম্বৎসররূপে এক ছিলেন; (অর্থাৎ ঋতুগুলির উৎপত্তি হওয়ার পূর্বে কেবলমাত্র একটি সম্বৎসরের অস্তিত্ব ছিল, কোন বিভাগ ছিল না)। তিনি ঋতুসৃষ্টির ইচ্ছায় অন্বিত হয়ে পঞ্চরাত্র যাগের অনুষ্ঠান সৃষ্টি করেন (অনুষ্ঠায় সৃষ্টিবা। এইরকমে অন্যজনেও পুত্রকামনায় (প্ৰজাকামাস্তেন) এই যাগের দ্বারা পুত্র উৎপাদন করে থাকেন।–প্রজাপতি কর্তৃক সৃষ্ট হয়ে বসন্ত ইত্যাদি ঋতুদেবতাগণ নিজ নিজ ঋতুচিহ্নের কোন বিশেষ পার্থক্য প্রাপ্ত না হয়ে পঞ্চরাত্রের অনুষ্ঠান পূর্বক সেই সেই পার্থক্য প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই রকমে অন্যজনেও এই যাগের অনুষ্ঠানের দ্বারা পাপ ও শত্রুগণ হতে বিয়োগ প্রাপ্ত হন। (অতঃপর এই পঞ্চরাত্র যাগের দ্বারা পশুপ্রাপ্তি, সভায় বক্তৃতাদানের কামনাকারীর কামনাপূর্তি, এমন বহুবিধ ফলসাধন ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে দিনগত পঞ্চসংখ্যার প্রশংসা ও পঞ্চরাত্রের অবয়বভূত পঞ্চ দিবসের কথা বলা হয়েছে) ॥১০।
[সায়ণাচার্য বলেন-..একাদশমারভ্য প্রপাঠক সমাপ্তিপর্যন্তমশ্বমেধমন্ত্র উচ্যন্তে। অর্থাৎ–অতঃপর একাদশ অনুবাক থেকে প্রপাঠকের সমাপ্তি পর্যন্ত (২০শ অনুবাক পর্যন্ত) অশ্বমেধ যজ্ঞের মন্ত্রাবলী উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ- (সাধ্য শব্দে দেবগণবিশেষকে বোঝায়। এখানে পশ্যন্ত অর্থাৎ দর্শন অর্থে শাস্ত্রীয় নিশ্চয় বোঝাচ্ছে। আহরণ অর্থে সামগ্ৰীসম্পাদন)। সাধ্য দেবগণ স্বর্গ কামনা করে এই ষড়রাত্র যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করেছিলেন। তারা যাগের সামগ্রী-সংগ্ৰহ (সম্পাদন) করে স্বর্গে গমন করেছিলেন। এই ষড়রাত্র যাগ সুবর্গলোকের প্রিয়; সুতরাং একে দেবত্র বলা হয়। সত্ররূপ দ্বাদশাহে যে পৃষ্ট্য ষড়হ, তার ছয় দিনে যে পৃষ্ঠস্তোত্র, তার দ্বারা রথস্তর, বৃহৎ, বৈরূপ, বৈরাজ, শাকর ও বৈরত নামক সাম নিস্পাদিত করতে হয়। এই ছয় দিনে ক্রমে প্রত্যক্ষ উপলব্ধ হয়, এই সত্ৰ দেবগণের কত প্রিয়। এইরকম দেবপ্রিয়ত্ব বিদিত হয়ে যাগের অনুষ্ঠান করলে স্বল্পকালের মধ্যেই দেবতার প্রাপ্তি হয়। (অতঃপর ছয় সংখ্যার প্রশংসা, পৃষ্ঠস্তোত্রের বিশেষ প্রশংসা, ধর্মবিধি, ধর্মান্তরবিধি ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥১॥
[সায়ণাচার্য বলেন–প্রথমেইনুবাকেষড্রাদ্ৰোহভিহিতঃ। অথ দ্বিতীয়ে সপ্তরাত্রোইভিধীয়তে। অর্থাৎ-পূর্ব অনুবাকে ষড়রাত্র যাগের পর এই অনুবাকে সপ্তরাত্র যাগ সম্পর্কে বলা হচ্ছে ]
মর্মার্থ- উদ্দালকের পুত্র কুসুরুবিন্দ নামধারী ঋষি পশুমান অর্থাৎ বহু পশুর দ্বারা সমৃদ্ধ হওয়ার অভিলাষে এই সপ্তরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করেন। তার ফলে তিনি গো, ছাগ, অশ্ব, মেষ, পুরুষ, গর্দভ ও উষ্ট্র–এই সপ্ত গ্রাম্য পশু লাভ করেন। যিনি এই কথা বিদিত হয়ে সপ্তরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি এই রকম সপ্ত গ্রাম্য পশু লাভ করেন।–(সপ্তদিনের সপ্তসংখ্যার প্রশংসা)-সপ্তরাত্র যাগের দ্বারা উপযুক্ত সপ্ত গ্রাম্য পশু, সপ্ত আরণ্য পশু (দ্বিখুরবিশিষ্ট মহিষ, রুরুমৃগ, পৃষৎ অর্থাৎ শ্বেতবিন্দুযুক্ত হরিণ ও সাধারণ মৃগ এবং বানর, ভল্লুক ও সরীসৃপ) এবং সপ্ত ছন্দ (গায়ত্রী, উষ্ণি, অনুষ্টুপ, বৃহতী, পংক্তি, ত্রিষ্টুপ ও জগতী) লাভ হয়।–(অতঃপর দিনবিশেষ এবং কিছু বিশেষ বিধি কথিত হয়েছে) ॥২॥
মর্মার্থ- বৃহস্পতি ব্রহ্মতেজঃ প্রাপ্তির কামনায় এই অষ্টরা। যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করেন। তিনি এই অষ্টরাত্র যাগের অনুষ্ঠান পূর্বক ব্রহ্মতেজঃসম্পন্ন হয়েছিলেন। যিনি এইটি বিদিত হয়ে অষ্টরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি ব্রহ্মতেজঃ প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। অষ্টরাত্র হলো অষ্টাক্ষরা গায়ত্রী; গায়ত্রী ব্রহ্মতেজঃরূপা; সুতরাং গায়ত্রীর দ্বারা ব্ৰহ্মতেজঃ লাভ করা যায়। গায়ত্রীর অক্ষর অষ্টসংখ্যক, দিক ও অবান্তর দিকসমূহের মিলিত সংখ্যা অষ্ট; এই নিমিত্ত উভয়ের দ্বারা অর্থাৎ অষ্টসংখ্যাত্বের দ্বারা ব্ৰহ্মতেজের প্রাপ্তি ঘটে (অষ্টসংখ্যোপেতত্বাৎ সংখ্যাদ্বারা তদুভয়মুখেন ব্রহ্মবৰ্চস প্রাপ্তিঃ)। (অতঃপর ত্রিবৃৎ, পঞ্চদশ, সপ্তদশ ইত্যাদি স্তোমের বিশেষত্ব সমূহ কথিত হয়েছে) ॥৩॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অর্থ চতুর্থে নবারাত্রোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৪ নবরাত্র যাগ সম্পর্কে বলা হয়েছে]
মর্মার্থ– প্রজাপতি প্রজা সৃষ্টির পর যখন প্রজাগণ অন্নাভাবে নিরন্তর ক্ষুধাপ্রাপ্ত হয়েছিল, সেই কালে তিনি নবরাত্র যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করেন। অতঃপর তিনি প্রজাগণের ক্ষুধা নিবারণের উদ্দেশে নবরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করেন। এর ফলে তিনি প্রজাগণের ক্ষুন্নিবৃত্তিতে সমর্থ হন। অতএব যে কালে প্রজাগণ নিরন্তর ক্ষুধাতুর হবে, সেই কালে এই নবরাত্র যাগের অনুষ্ঠান কর্তব্য। এর দ্বারা ভূমিতে প্রভূত শস্য উৎপন্ন হওয়ায় যজমান প্রজাগণের ক্ষুধা-নিবারণে সমর্থ হন; এবং লোকগণও যজমানের ইচ্ছানুসারে শস্য নিম্পাদন করবে। তারপর যজমান প্রজাগণকে অন্নের দ্বারা স্থাপন করেন (স্থাপয়তি)। (দৃষ্টান্তের দ্বারা তিনভাগে বিভক্ত নবরাত্রের প্রশংসা)–নবরাত্র যাগের মধ্যে প্রথম ত্রিরাত্র যাগ ভূলোকের ক্ষুধা নিবারণে সমর্থ করে, এইভাবে দ্বিতীয় ত্রিরাত্র যাগ অন্তরিক্ষের ক্ষুধা নিবারণে সমর্থ করে, এবং তৃতীয়বারের ত্রিরাত্র যাগ স্বর্গের ক্ষুধা নিবারণে সমর্থ করে। এইভাবে এই নবরাত্র যাগ সকল প্রজার ধারণে সমর্থ হয়। (অতঃপর ত্রিরাত্রের অবয়বভূত দিনসমূহের প্রশংসা, নবরাত্র ক্রতুর প্রশংসা ও নবরাত্রের দ্বারা দীর্ঘ রোগ নিবৃত্তির কথা উক্ত হয়ে) ॥৪॥
মর্মার্থ– প্রজা সৃষ্টির ইচ্ছা পূর্বক প্রজাপতি প্রথমে (আদৌ) তার সাধনভূত দশরাত্র-ক্রতু উৎপাদনের নিমিত্ত তারও সাধনভূত দশহোত্ৰাখ্য চিত্তিঃ গ্রু। চিত্তমাজ্যম ইত্যাদি আরণ্যকাণ্ডোক্ত মন্ত্রের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করেন। অতঃপর এই মন্ত্রের দ্বারা যাগ নিষ্পন্ন করে তিনি প্রজাগণের সৃষ্টি করেন। সেই মন্ত্রে চিত্তি সুক হতে আরম্ভ করে সামার্ধ্বযু পর্যন্ত হোমনিস্পাদক ব্যাক্যের দ্বারা সুগ ইত্যাদি দশটি সঙ্কল্পের কারণে এই মন্ত্র দশ হোতা নামে অভিহিত (দশানামভিধানাদয়ং মন্ত্রো দশহোতা)। অথবা সেই মন্ত্রের অভিমানী পুরুষ দশবার আহূত হয়ে প্রতিবচন বলেন (প্রত্যশৃণোৎ), এই নিমিত্ত এই যজ্ঞ দশ হোতা। এই মন্ত্রটির দ্বারা দশরাত্র দীক্ষার নিমিত্ত হোম করণীয়। সেই হোমের দ্বারা দশরাত্র ক্রতু সৃষ্ট হয়; সেই দশরাত্র ক্রতুর দ্বারা প্রজা উৎপন্ন হয়ে থাকে। (অতঃপর দশসংখ্যা-উপজীব্য ক্রমের প্রশংসা, প্রজাপতি-সৃষ্টি ক্রতুর প্রশংসা ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৫॥
মর্মার্থ- বসন্ত ইত্যাদি ঋতু-অভিমানী দেবগণ প্রজা ইচ্ছা করেও তা লাভ করতে পারেননি। তারা চতুর্বিধ অর্থাৎ চাররকমের কামনা করেছিলেন। তাদের প্রথম কামনা–প্রজা সৃষ্টি করতে সমর্থ হবো; দ্বিতীয় কামনা–তাদের অর্থাৎ সেই প্রজাদের নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হবো; তৃতীয় কামনা উৎপাদনের দ্বারা প্রজা লাভ করবো; এবং চতুর্থ কামনা–বহু ও প্রশস্ত (বহুভিঃ প্রশস্তাভিশ্চ) প্রজার সাথে যুক্ত হয়ে অবস্থান করবো (অবতিষ্ঠেম)। অবশেষে সেই ঋতু-দেবতাগণ একাদশরাত্র যাগের দ্বারা (একাদশরাত্রেণ) সেই সবগুলিই সিদ্ধ করেছিলেন, অর্থাৎ প্রজারূপ ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যেহেতু সকল প্রাণী ঋতুগণের পুত্র, সেই নিমিত্ত তাদের আর্তব বলা হয় (আর্তবা ইত্যুচ্যন্তে)। এই ঋতুদেবতাগণের ন্যায় অন্য যজমানগণও এই একাদশরাত্র যুগানুষ্ঠান করলে তাদের সকলই সিদ্ধ হবে। (অতঃপর ঋতুদেবগণের একাদশরাত্রের অনুষ্ঠানে একাদশ দিনের হবিৰ্বিধান ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৬৷৷
মর্মার্থ– পূর্বে পিতৃ-পিতামহগণ যেরকম আচারে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন, তাঁদের পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি ও প্রজাগণও সেইরকম (যথাপূর্ব) আচারে প্রবৃত্ত হয়ে থাকে। এইরকম কাময়মান হয়ে দ্বি-দেবতা সম্পর্কিত গ্রহের মধ্যে ইন্দ্র ও বায়ুদেবতার গ্রহ গ্রহণ করা কর্তব্য। যদিও নিত্য প্রয়োগেও এগুলির অগ্ৰত্ব আছে, তথাপি কাম্য-সংযোগের নিমিত্ত পুনরায় বিধান প্রদত্ত হলো। যেমন অগ্নিহোত্রে দধির দ্বারা যাগ করার নিত্যবিধি থাকলেও ইন্দ্রিয়কামী জনকে দধির দ্বারা যাগ করার বিধান পুনরায় প্রদত্ত হয়েছে–এইরকম (তদ্বৎ)। যজ্ঞের সম্যক প্রবৃত্তির দ্বারা তার ফলভূত প্রজাগণের প্রবৃত্তি সমীচীন হয়ে থাকে। যজ্ঞের বিপর্যয়ে প্রজাগণেরও বিপর্যয় হয়ে থাকে। জ্যেষ্ঠ পিতা বা পিতামহকে কনিষ্ঠ কেউই অতিক্রম করে না। (অতঃপর রোগ নিবৃত্তির নিমিত্ত, কিছু নৈমিত্তিক গ্রহের নিমিত্ত, অপকর্য পরিহারের নিমিত্ত, প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত, অভিচারের নিমিত্ত, আপন পিতৃ ইত্যাদির সমান উৎকর্ষ প্রাপ্তির নিমিত্ত, পরের অভিচার নিবৃত্তির নিমিত্ত, পুনরায় বৃষ্টির নিমিত্ত যাগ ইত্যাদির বিধান কথিত হয়েছে) ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমেহনুবাকে দ্বাদশাহগতাঃ কাম্যগ্রহপ্রকারা উক্তাঃ। স চ দ্বাদশাহো দ্বিবিধঃ সমূঢ়ো বুঢ়শ্চ।…তত্রাস্মিন্নষ্টমেহনুবাকে ব্যুঢ়প্রকারোইভিধীয়তে। অর্থাৎ-অনুবাক-৭ দ্বাদশাহগত কাম্যগ্রহের প্রকার উক্ত হয়েছে। এই অনুবাক-৮ সমূঢ় ও বুঢ়-ভেদে সেই দ্বাদশাহের বুঢ় প্রকার সম্পর্কে বলা হচ্ছে]।
মর্মার্থ- দ্বাদশাহের প্রথম ও শেষ অহ বা দিন পরিত্যাগ করে তার মধ্যবর্তী যে দশটি দিন, তার প্রথম দিনে, অর্থাৎ দ্বাদশাহের দ্বিতীয় দিনে, ঐন্দ্র ও বায়বগ্রহের বিধান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, গায়ত্রী, ত্রিষ্টুপ, জগতী ইত্যাদি রূপা যতগুলি মুখ্য ছন্দ আছে, তার মধ্যে গায়ত্রী প্রথমা। এবং অগ্রত্বের দ্বারা (অর্থাৎ অগ্ৰত্ব অনুসারে) ইন্দ্র, বায়ু, শুক্র ইত্যাদি গ্রহের গ্রহণ বিধি। এর মধ্যে ঐন্দ্র ও বায়ব গ্রহ প্রথম বলে আমাত (কথিত) হয়েছে। সেই নিমিত্ত প্রাথম্য সাম্যের কারণে ঐন্দ্র ও বায়ব গায়ত্রীর রূপ নিরূপণীয় দশটি দিনের মধ্যে যেটি প্রায়ণীয় অর্থাৎ প্রথম, সেটি প্রাথম্য সাম্যের কারণে গায়ত্রীরূপ; এইভাবে সেই প্রায়ণীয় দশটি দিনের প্রথম দিনটিতে ঐন্দ্র ও বায়ব গ্রহ প্রথমে (আদৌ) গ্রহীতব্য। ঐন্দ্র ও বায়ব গ্রহের সাথে গায়ত্রীর সাম্য বর্তমান। (অতঃপর ঐ দশটি দিনের দ্বিতীয়টিতে শুক্ৰাগত্ব, তৃতীয়টিতে অন্যায়ণাগ্রত্ব ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৮৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন-নবমে দ্বাদশাহস্যাহর্বিশেষা উচ্যন্তে। অর্থাৎ-অনুবাক-৯ দ্বাদশাহের দিনবিশেষ সম্পর্কে উক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ– প্রজাপতি কামনা করেছিলেন যে, তিনি প্রজা সৃষ্টি করবেন। তখন তিনি এই দ্বাদশরাত্র যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করেছিলেন। অতঃপর তিনি দ্বাদশরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করে প্রজা লাভ করেছিলেন। যিনি প্রজা কামনা করে দ্বাদশরাত্রের দ্বারা যাগ করেন, তিনি প্রজা লাভ করেন। (অতঃপর প্রশ্নোত্তরমুখে প্রথম দিনের বিধান, সেই বিধান প্রসঙ্গে দশ দিনের পক্ষীরূপে পরিকল্পনা, দ্বাদশরাত্রের দুটি প্রকার, সত্র বিদিত হওয়ার প্রশংসা ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৯॥
মর্মার্থ- বৈশ্বানর নামে আখ্যাত অগ্নির দ্বারা দৃষ্টত্বের কারণে অতিরাত্র হলো বৈশ্বানর। অন্যত একই ভাগে বৈশ্বানর-শব্দবাচ্য অতিরাত্র যেটি দ্বাদশাহের, সেটি একটি বৈশ্বানর।–ইত্যাদি। (এইভাবে এর পর দ্বাদশাহের প্রশংসা, সত্ররূপে দ্বাদশাহের প্রয়োগ, দীক্ষাবিশেষের বিধি, ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥১০।
মর্মার্থ- (একাদশ থেকে বিংশ অনুবাকের মন্ত্র)–এই মন্ত্রগুলি অশ্বমেধ যজ্ঞে পঠিতব্য মন্ত্রবিশেষ। এগুলির দ্বারা উত্তরোত্তর বা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সংখ্যায় স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করা হয়। যেমন,একাত্মকরূপী যে প্রজাপতি সকল পদার্থে বিদ্যমান, তার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করছি। এইভাবে–শত, সহস্র, অযুত, নিযুত ইত্যাদি পদার্থরূপী প্রজাপতির উদ্দেশে আহুতি প্রদান করার মন্ত্র ॥১১-২০।
মর্মার্থ- (প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ঋত্বিকগণের নিন্দার ছলে যজমানের প্রশংসা)-ব্রহ্মবাদীগণ প্রশ্ন করছেন–অহীন দ্বাদশাহের অনুষ্ঠাতা যজমান দ্বাদশাহের প্রথম দিবসে ঋত্বি-সম্বন্ধি যা কিছু শ্রেয়, তা কি স্বয়ং (যজমান) গ্রহণ করেন, না কি কোন বিশেষ দিনের কোন ফলবিশেষ গ্রহণ পূর্বক করে থাকেন? তখন এর উত্তরে কোন অভিজ্ঞ ব্রহ্মবাদী বলেন–তেজঃ ইত্যাদি ক্ৰমে গ্রহণ করে করেন। ব্রহ্মবাদীগণের বক্তব্য–দ্বাদশাহের প্রথম দিনে যজমান তেজঃ বা ইন্দ্রিয় সামর্থ্য, দ্বিতীয় দিনে অন্নরূপ প্রাণ (প্রাণানন্নাদ্যমিতি), তৃতীয় দিনে তিন লোক (ব্রীনিমাল্লোঁকনিতি), চতুর্থ দিনে চতুষ্পদ পশু (চতুষ্পদঃ পশুনিতি), পঞ্চমে পঞ্চাক্ষরা পঙক্তির সাধ্য ফল (পঞ্চাক্ষরপাদান্বিতং যৎপঙক্তিচ্ছন্দস্তেন সাধ্যং ফলং বৃঙক্তে), ষষ্ঠ দিনে ছয় ঋতু, সপ্তম দিনে সপ্তপদা শকরী ছন্দ, অষ্টম দিনে অষ্টাক্ষরা গায়ত্রী ছন্দ, নবম দিনে ত্রিবৃৎ স্তোম (ত্রিবৃত্ৰং স্তোমমিতি), দশম দিনে দশাক্ষরা বিরাজ স্তোম, একাদশ দিনে একাদশাক্ষরা ত্রিভূ ছন্দ এবং দ্বাদশ দিনে দ্বাদশাক্ষরা জগতী ছন্দ–এই দ্বাদশ বাক্যের দ্বারা যে শ্রেয় উক্ত হয়েছে (এতৈরুদ্বৈাদশভিবাক্যৈাবদেতচ্ছেয়), তা ঋত্বিকবর্গের জন্য বিদ্যমান। পরে এই সবগুলিই যজমান কর্তৃক গৃহীত হয়ে থাকে (আদত্তে) ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন-তৃতীয়ে এয়োদশরাত্রোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৩ ত্রয়োদশরাত্র যাগ সম্পর্কে বলা হয়েছে]
মর্মার্থ– স্বতন্ত্র রূপে উল্লিখিত (বিধাসমান) ত্রয়োদশরাত্র যাগ হলো সম্পূর্ণ দ্বাদশাহ। পূর্বের দ্বাদশাহের এক দিনের আধিক্যে ফলের আধিক্য ও দিনের আধিক্য থাকলেও কোন সাম্যের বিচারে দ্বাদশাহত্ব নিরূপিত হচ্ছে? এর উত্তরে বলা হয়েছে–দ্বাদশাহে প্রায়ণীয় ও উদয়নীয় উভয়ই যেমন, সেইরকম এই ক্ষেত্রেও দুরকম দিনের সমানত্বের কারণে দ্বাদশাহত্বের উপচার করা হয়েছে (সমানত্বাাদশাহেত্বাপচারঃ)। (অতঃপর বিশেষ বিধি)-দ্বাদশাহে প্রায়ণীয় ও উদয়নীয় এই দুটি অতিরাত্র। আবার এর মধ্যেও (অর্থাৎ মধ্যবর্তী দিনের মধ্যেও) কোনটি অতিরাত্র আছে, তার জন্যও লোকত্রয় প্রাপ্তি ঘটে (তেন লোকত্রয়প্রাপ্তি)। (অতঃপর ত্রয়োদশরাত্রের বিধি কথিত হচ্ছে)–প্রাণ প্রথম অতিরাত্র, ব্যান দ্বিতীয় অতিরাত্র এবং অপান তৃতীয় অতিরাত্র; প্রাণ, আপন ও উদান অন্ন লাভ করলে প্রতিষ্ঠিত সকল আয়ু লাভ করে থাকে; এই কথা বিদিত হয়ে ত্রয়োদশাত্র যাগ করণীয়। (অতঃপর মধ্যম অতিরাত্রের ছন্দোমানের উপরে স্থান প্রদান এবং প্রকারান্তরে সেই অনুষ্ঠানের প্রশংসা করা হয়েছে) ॥ ৩৷৷
মর্মার্থ- আদিত্যবর্গ উভয় লোকের (ইহলোক ও পরলোকের) ঋদ্ধি (সমৃদ্ধি) কামনা করে চতুর্দশ যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করেছিলেন। অতঃপর তারা এই চতুর্দশরাত্রের যাগানুষ্ঠান করে উভয় লোকের ঋদ্ধি লাভ করেন। যিনি এই কথা বিদিত হয়ে চতুদর্শরাত্র যাগ করেন, তিনি ইহলোক ও পরলোকে ঋদ্ধি প্রাপ্ত হন।–(দিনসংখ্যার প্রশংসা)–চতুদর্শরাত্র হলো (ভবতি) সপ্ত গ্রাম্য ওষধী ও সপ্ত আরণ্য ওষধি, যা এই যজ্ঞসাধনে লভ্য। (অতঃপর প্রায়ণীয় ও উদয়নীয়ের মধ্যবর্তী দ্বাদশসংখ্যক দিনের কথা বলা হয়েছে) ॥৪॥
[সায়ণাচার্য বলেন–পঞ্চমেহন্যশ্চতুদশরাত্রোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–অনুবাক- অন্য চতুদর্শরাত্র যাগের কথা বলা হয়েছে]
মর্মার্থ- যখন প্রজাপতি স্বর্গে গমন করলেন, তখন প্রজাপতিকে অনুসরণ পূর্বক সকল দেবতাও গমন করলেন এবং দেবতাগণের পশ্চাতে আদিত্যবর্গ ও আদিত্যবর্গের সাথে পশুসমূহ গমন করলো। আদিত্য ও পশুগণকে দর্শন করে দেবতাগণ পরস্পর এইরকম বলতে লাগলেন-যে পশুগণের সমীপগত হয়ে আমরা মনুষ্যগণের সাথে জীবন যাপন করেছিলাম, তারা সকলেই আমাদের পশ্চাতে সমাগত। এই আগতগণের মধ্যে আদিত্যগণ স্বর্গে আরোহণ করুন, আর পশুগণ ভূমিতে প্রত্যাবর্তিত হোক–এইরকম বিবেচনা করে তারা প্রত্যাবৃত্তিগুণযুক্ত এই চতুর্দশরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করলেন। (তত্রেয়মহঃকৃপ্তিঃ-আদাবেকোহতিরাত্রঃ)। প্রথমে একটি অতিরাত্র, তারপর জ্যোতি-গো-আয়ু-এইরকম আরোহরূপ ত্রিরাত্র (জ্যোতিগৌরায়ুরিত্যারোহরূপস্ত্রিরাত্রঃ); তারপর পৃষ্ট্য ষড়হ। তারপর আয়ু-গো-জ্যোতি–এই অবরোহরূপ ত্রিরাত্র (আয়ুর্গেীর্জোতিরিত্য বরোহরূপস্ত্রিরাত্রঃ), তারপর অতিরাত্র। এইরকমে অনুষ্ঠান করে পৃষ্ঠশব্দাভিধেয় ছয় দিনে আদিত্যগণ স্বর্গে গমন করলেন। আর, প্রত্যাবৃত্তিযুক্ত এ্যহ দুটির দ্বারা (হাভ্যাং) দেবগণ পশুবৰ্গকে এই লোকে (ভূমিতে) প্রতিনিবর্তিত (প্রেরণ করেন। তারপর পৃষ্ঠের দ্বারা আদিত্যগণ স্বর্গে সমৃদ্ধি লাভ করেন। পশুগণ ঐ দুই হ্রহের সৌজন্যে এই লোকে সমৃদ্ধি প্রাপ্তি হয়।–যিনি এই কথা বিদিত হয়ে চতুদর্শরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি ইহলোকে ও পরলোকে ঋদ্ধিমান হয়ে থাকেন। (অতঃপর আরোহরূপ হ্রহের বিধি, প্রত্যাবরোহরূপ হের বিধি, দিনগত সংখ্যার প্রশংসা, ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৫॥
মর্মার্থ– দেবতাগণের স্বামিত্ব অর্থাৎ প্রভুত্ব লাভের যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রথমে ইন্দ্র তাদের রাজা হতে পারেননি, (অর্থাৎ তিনি দেবতাগণের সমান হয়ে অবস্থান করছিলেন)। এই নিমিত্ত তিনি প্রজাপতির নিকট গমন করলে, প্রজাপতি তাঁকে এই পঞ্চদশরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করতে উপদেশ প্রদান করেন। সেই উপদেশ মতো পঞ্চদশরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করে ইন্দ্র দেবতাগণের নিকট হতে ভিন্ন বা পৃথক্ হন, (অর্থাৎ তিনি আর সাধারণ দেবতা রইলে না; তাদের অধিপতি হলেন)। সেইরকমে এই পঞ্চমদশরাত্র যুগানুষ্ঠান করে অন্যেও পাপ ও শত্রুকে নিবৃত্ত করতে পারেন, বা পাপ ও শত্রু হতে পৃথক্ হন। (অতঃপর ক্রতুগত সংখ্যার প্রশংসা ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৬॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ সপ্তমে দ্বিতীয় পঞ্চরাত্রোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৭দ্বিতীয় প্রকার পঞ্চরাত্র যাগের কথা ব্যক্ত হয়েছে।]
মর্মার্থ- কোন এক সময়ে শিথিল হয়ে পড়ে অর্থাৎ যুদ্ধে অসমর্থ হয়ে ইন্দ্র সেনারহিত অবস্থায় একাকী দরিদ্রের ন্যায় অসুরগণের উপদ্রবরহিত স্থানে (লুক্কায়িত হয়ে) অবস্থান করছিলেন। অসুরগণ হতে ভীত ইন্দ্র তারপর প্রজাপতির উপদেশক্রমে বজ্রসমান বক্ষ্যমাণ (পরে বলা হবে, এমন) পঞ্চদশরাত্র ক্রতুর অনুষ্ঠান পূর্বক অসুরগণকে পরাভূত করে স্বয়ং ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সেই ক্রতুতে (অর্থাৎ যজ্ঞে) অগ্নিষ্ঠুৎ নামে আখ্যাত দ্বিতীয় দিনে ইন্দ্র তার আপন শৈথিল্যহেতুকর পাপসমূহকে নিঃশেষে দগ্ধ করেন। অবশিষ্ট পঞ্চদশরাত্র ক্রতুভাগের দ্বারা বলহেতুকর ওজঃরূপ সপ্তমধাতু অর্থাৎ শারীরিক বল ও যুদ্ধে বিজয়লাভের উৎসাহসম্পন্ন হন।–যিনি অর্থাৎ যে যজমান এইরকম বিদিত হয়েপঞ্চদশরাত্রের যাগানুষ্ঠান করেন, তিনিও শত্রুগণকে পরাভূত করে শ্রী বা ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হন এবং অগ্নিষ্ঠুৎ-আখ্যাত দ্বিতীয় দিনে পাপসমূহকে নিঃশেষে দগ্ধ করে পঞ্চদশরাত্রের দ্বারা ইন্দ্রের ন্যায় ওজঃ, বল, ইন্দ্রিয়সামর্থ্য তথা বীর্য লাভ করেন। (অতঃপর পঞ্চদশরাত্রির প্রশংসা, ঋতুগত রাত্রিসংখ্যার প্রশংসা, প্রায়ণীয়-উদয়নীয় বিধি, ইত্যাদি উক্ত হয়েছে) ॥৭॥
সপ্তম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ২৮
অনুবাক-২৮
মন্ত্র- প্রজাপতিরকাময়তান্নাদঃ স্যামিতি স এতং সপ্তদশরামপশ্যক্তমাংহরত্তেনাযজত ততো বৈ সোহন্নদোহভবদ্য এবং বিদ্বাংসঃ সপ্তদশরাত্ৰমাসতেহদা এ ভবন্তি পঞ্চাহো ভবতি পঞ্চ বা ঋতবঃ সম্বৎসর ঋতুষেব সম্বৎসরে প্রতি তিষ্ঠ্যথথা পঞ্চাক্ষরা পঙক্তিঃ পাজো যজ্ঞে যজ্ঞমেবাব রুহৃতেহসত্রং বা এতৎ যছন্দোমং যচ্ছন্দোমা ভবত্তি তেন সত্রং দেবতা এব পৃতীৈরব রুন্ধতে পশূন্দোমৈরোজো বৈ বীৰ্য্যং পৃষ্ঠানি পশবচ্ছন্দোমা ওজস্যের বীর্যে পশুধু প্রতি তিষ্ঠন্তি সপ্তদশরাত্রো ভবতি সপ্তদশঃ প্রজাপতি প্রজাপতেরাপ্ত্যা অতিরাত্রাবভিতো ভবতোহন্নাদ্যস্য পরিগৃহীত্যৈ ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অষ্টমে সপ্তদশরাত্রোইভিধীয়তে। অর্থাৎ–অনুবাক-৮ সপ্তদশরাত্র যাগের কথা বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ- আমি অন্নভক্ষক হবো–প্রজাপতি এমন কামনা করে এই সপ্তদশরাত্র যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করেছিলেন; তারপর এই সপ্তদশরাত্রের অনুষ্ঠান করে অন্নভক্ষক হয়েছিলেন। এই কথা বিদিত হয়ে যিনি সপ্তদশরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি অন্নভক্ষক হন। (অতঃপর জ্যোতি-গৌ-আয়ু ইত্যাদি দিন পঞ্চকের বিধি, ঋতুগত রাত্রিসংখ্যার প্রশংসা, প্রায়ণীয়-উদয়নীয় বিধি, ইত্যাদি উক্ত হয়েছে) ॥৮॥
[সায়ণাচার্য বলেন–নবমে বিংশতিরাত্রোহভিধীয়তে। অর্থাৎ-অনুবাক-৯ বিংশতিরাত্র যাগের কথা বলা হয়েছে]
মর্মার্থ– দশরাত্ৰ-অভিমানিনী বিরাটু নাম্নী কোন দেবতা দুটি রূপে বিভক্ত হয়ে অবস্থান করতেন (রূপদ্বয়েন বিভাজ্যাতিষ্ঠৎ),-দেবতাগণের মধ্যে ব্রহ্মবৰ্চস (অর্থাৎ তপস্যা ও অধ্যয়নজনিত তেজঃ)-রূপা এবং অসুরগণের মধ্যে অনুরূপা। তখন দেবতাগণ অসুরগণের নিকট হতে অন্ন অপহরণ করে সেই দুটিই, অর্থাৎ ব্রহ্মবৰ্চস্ ও অন্ন উভয়ই, লাভ করতে কামনা করেছিলেন (লভেমহীত্যকাময়ন্ত)। তারপর তা সাধনের নিমিত্ত, (বক্ষ্যমানা, অর্থাৎ পরে বলা হবে, এমন) বিংশতিসংখ্যক্য রাত্রির নিশ্চয়তা অনুধাবন করে তার অনুষ্ঠানের দ্বারা অসুরগণের নিকট হতে অন্ন অপহরণ করে নিজেরাই ব্ৰহ্মবৰ্চ ও অন্নের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছিল। এইরকমে অন্যেরাও এই অনুষ্ঠানের দ্বারা এইরকমই ফল প্রাপ্ত হবে; অর্থাৎ এইরকম বিদিত হয়ে যাঁরা এই পঞ্চবিংশতিরাত্র যাগের অনুষ্ঠান করবেন, তাঁরাও ব্রহ্মবৰ্চ ও অন্ন প্রাপ্ত হবেন। (অতঃপর ক্রতুগত বিংশতি রাত্রিসংখ্যার প্রশংসা, প্রত্যবরোহরূপ এ্যহের বিধান, প্রায়ণীয়-উদয়নীয়ের বিধি, ইত্যাদি উক্ত হয়েছে) ।৯
[সায়ণাচার্য বলেন-দশম একবিংশতিরাত্রোইভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-১০একবিংশতিরাত্র যাগের সম্পর্কে বলা হয়েছে]
মর্মার্থ– স্বর্গে দৃশ্যমান এই আদিত্য পুরাকালে ভুলোকে অবস্থিত ছিলেন। সেই আদিত্যকে দেবতাগণ পৃষ্ঠাখ্য ছয় দিনের যুগানুষ্ঠানের দ্বারা স্বর্গে আনয়ন করেন (প্রাপিতবন্তঃ); এবং আদিত্য যাতে স্বর্গের নিম্নে গমন করতে না পারেন, সেই মতো বিভাগ করে দিয়েছিলেন (যথাহধস্তান্নাহগচ্ছতি তথা ব্যবধানং কৃতবম্ভঃ)। অন্যেও এইভাবে পৃষ্ঠাখ্য যাগের অনুষ্ঠান করে গমন করবে এবং দিনে কীর্তনীয় সামের দ্বারা আদিতের ন্যায় সেই স্বর্গে প্রতিষ্ঠাপিত হবে। (অতঃপর দিনসংখ্যার প্রশংসা, দিবা-কীর্তনীয় অনুষ্ঠানের প্রশংসা, অবরোহরূপ পৃষ্ঠ্যষড়হের বিধি, স্বর্গপ্রাপ্তির নিমিত্ত ক্রতুবিশেষ ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥১০৷৷
[সায়াণাচার্য বলেন-দ্বেী চতুবিংশতিরাত্রেী তয়োরাদ্যং প্রথমেহনুবাকং বিধত্তে। অর্থাৎ-দুটি চতুর্বিংশতিরাত্র যাগের মধ্যে প্রথমটি এই অনুবাক-১ বিধিত হয়েছে]।
মর্মার্থ- পুরাকালে কোন এক সময়ে ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাগণের নিকট অবিশ্বসনীয় (বিশ্বাসের বা নির্ভরতার পক্ষে অযোগ্য) হয়ে বৃহস্পতি মনে মনে এমন কামনা করেছিলেন–এই দেবতাগণ আমাকে শ্রদ্ধা করুন এবং আমি যে তাদের হিতকারী (বৃহস্পতিরস্মভ্যং হিত), তা বিশ্বাস করুন। তার ফলে আমি তাঁদের পুরোহিত বা আচার্যরূপে মুখ্যত্ব প্রাপ্ত হবে।এইরকম উপায় বিচার করে চতুর্বিংশতিরাত্র যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করে তার অনুষ্ঠান করেন এবং তার দ্বারা দেবগণের বিশ্বাস অর্জন পূর্বক তাদের পৌরোহিত্য (পুরোধা) প্রাপ্ত হন। এই রূপে এই যাগের দ্বারা অন্য যজমানগণও মনুষ্যের বিশ্বাসনীয় হয়ে তাদের পৌরোহিত্য প্রাপ্ত হন। (অতঃপর দিনবিধি, ক্রতুগত দিনসংখ্যার প্রশংসা ইত্যাদি বিবৃত হয়েছে) ॥১॥
[সায়াণাচার্য বলেন–অথ দ্বিতীয়েইন্যশ্চতুর্বিংশতিরাত্রোহভি ধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাকে দ্বিতীয় চতুর্বিশতিরাত্র কথিত হয়েছে]
মর্মার্থ- মনুষ্যগণ যেমন তাদের দারিদ্র্যের কারণভূত পাপযুক্ত, সেই রকম পুর্বে দেবতাগণও ছিলেন। তখন তারা (দেবতাগণ) একসময়ে এইরকম চিন্তা করলেন (কদাচিদেবমকাময়ন্ত) ধনসম্পদ হলো জীবনধারণের উপায়; এই ধনসম্পদের অভাব হলো জন্মান্তরকৃত পাপবিশেষ, যা দারিদ্র্যের হেতুকারক; ক্লেশহেতুত্বের কারণে এই দারিদ্র্য মৃত্যুস্বরূপ। তাহলে কেমন করে এই পাপরূপ মৃত্যুকে সুকৃত অনুষ্ঠানের দ্বারা অপহত করে দেবসম্বন্ধিনী সম্পদ প্রাপ্ত হওয়া যেতে পারে?–তিনি এইরকম বিচারণা করে তার উপায়স্বরূপ চতুর্বিশতিরাত্র যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করলেন, এবং তার অনুষ্ঠানের দ্বারা মনোমত ফল প্রাপ্ত হলেন (তৎফলং প্রাপ্তা)। এইরকম মনুষ্যগণও এই চতুর্বিশতিরাত্র যাগের অনুষ্ঠান পূর্বক দারিদ্র-হেতুকর পাপের নিবৃত্তির দ্বারা দেবসম্বন্ধিনী সংসদ (দেবসভা) লাভ করে। (দেবাঃ সম্যক্ সীদন্তি সুখেনাবতিষ্ঠন্তে যস্যাং শিয়াঃ সা শীরেব দৈবী সংসৎ–অর্থাৎ, দেবতাগণ যেখানে সম্যক্ সুখে অবস্থান করেন, সেই শ্রী বা ঐশ্বর্য হলো দেবসভা)। মনুষ্যগণ ঐশ্বর্যকেই দেবসভা মনে করে (মন্যন্তে)। (অতঃপর প্রথম অহর্বিধি, ষড় অহর্বিধি, ঋতুগত অহঃসখ্যার প্রশংসা ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥২॥
[সায়ণাচার্য বলেন–ত্রিংশদ্ৰাতত্রাহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাকে ত্রিংশৎ-রাত্র (ত্রিশরাত্র) যাগের কথা বলা হয়েছে ]
মর্মার্থ– ওষধি ও বনস্পতিসমূহ হলো পৃথিবীর লোমাবলী; কিন্তু পুরাকালে পৃথিবীর এইরকম লোম ছিল না; এই অভাবের কারণে পৃথিবী রূক্ষ (পরুষ) হয়ে ছিলেন। তখন ওষধি ও বনস্পতির উৎপাদনের নিমিত্ত কামনা করে পৃথিবী ত্রিংশৎ-রাত্র যাগের অনুষ্ঠান করে তাদের উৎপন্ন করেন। এইভাবে অন্যেও এই অনুষ্ঠানের দ্বারা প্রজা ও পশু উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়। কোনও এক সময়ে পৃথিবী অন্নাভাবের কারণে ক্ষুধিতা হয়েছিলেন। সেই ক্ষুধা পরিহারের উপায় বিচার করে পৃথিবী ত্রিংশত্রাত্রিরূপা বিরাজের বা বিরাট সামের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করলেন। (ত্রিশ অক্ষরযুক্ত সাম্যে বিরাটত্ব সূচিত হয়) তারপর আপন মনে সেই বিরাটকে স্থাপন পূর্বক তার অনুষ্ঠান করলেন এবং তাতে অন্ন প্রাপ্ত হলেন। এবং সেই অন্ন হলো জল, তৃণ ইত্যাদি রূপে বহুবিধ। তার দ্বারা ওষধি ইত্যাদি বর্ধিত হলো এবং বর্ধনের কারণে পৃথিবী সর্বত্র পুজ্যলক্ষণযুক্ত হলেন এবং পূজিতা হলেন। এইভাবে অন্যেও এই অনুষ্ঠানের দ্বারা ঐরকম ফল প্রাপ্ত হয়ে থাকে। (অতঃপর অন্নপ্রাপ্তির নিমিত্ত ক্রতুর বিধি, হবির বিধি, ঋতুগত অহসংখ্যার প্রশংসা ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৩৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–চতুর্থে দ্বাত্রিংশদ্ৰাত্রোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৪ দ্বাত্রিংশৎ-রাত্র (বত্রিশ রাত্র) যাগের কথা বলা হয়েছে ]
মর্মার্থ– যখন প্রজাপতি স্বর্গে গমন করেছিলেন, তখন প্রজাপতির সাথে আমরা গমন করে স্বর্গ প্রাপ্ত হবো–এইরকম মনে করে দেবগণ যে যে ছন্দের দ্বারা যুক্ত হয়ে যজ্ঞানুষ্ঠান করেছিলেন তাতে তাদের কেউই স্বর্গে গমন করতে পারেননি। তখন তারা এই দ্বাত্রিশৎ-রাত্র যাগ সাধনের নিমিত্ত উদ্যোগী হয়েছিলেন। বত্রিশটি সংখ্যা অনুষ্টুপ ছন্দে বিদ্যমান থাকার কারণে প্রজাপতি এই মন্ত্ররাজ অনুষ্টুপ ছন্দের সাহায্যে সবকিছু সৃষ্টি করেছিলেন; এই নিমিত্ত এই অনুষ্টুপ ছন্দের দ্বারা দেবগণ ভোগ প্রাপ্ত হন। এইরকম অন্য যজমানও এই যজ্ঞের অনুষ্ঠান পূর্বক প্রজাপতিকে প্রাপ্ত হন, এবং তাঁর অনুগ্রহে শ্ৰী বা ঐশ্বর্য লাভ করে থাকেন। (এখানে স্বর্গ অনুক্ত থাকলেও তা বিতর্কিত নয়, যেমন মনুষ্যের শ্রী হলো স্বর্গ)–এই যাগের (ক্রতুগত) রাত্রির সংখ্যা বত্রিশ। অনুষ্ঠুপের অক্ষর সংখ্যাও তা-ই এবং বাকের বিশেষরূপত্বের নিমিত্ত অনুষ্টুপ বাক্যরূপ। অতএব তার এই অনুষ্ঠানের দ্বারা বেদ ইত্যাদি সকল শাস্ত্ররূপ বাক্য প্রাপ্ত হওয়া যায়। সকল যজমানও সভার আনন্দের নিমিত্ত (সভারঞ্জনায়) বাক্য বলতে অর্থাৎ ভাষণ দান করতে সমর্থ হন। সেই বক্তৃতার দ্বারা তারা পূজ্যত্বলক্ষণযুক্ত শ্ৰীও প্রাপ্ত হন। (অতঃপর ঋতুগত অহঃসংখ্যার প্রশংসা, ক্রতুগত দিনসংখ্যার সমূহরূপে প্রশংসা ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৪॥
[সায়ণাচার্য বলেন–পঞ্চমে ত্রয়স্ত্রিংশদ্ৰাত্রোহভিধীয়তে। অর্থাৎ-অনুবাক-৫ ত্রয়স্তিশৎ-রাত্র ( (তেত্রিশ রাত্র) যাগের কথা বলা হয়েছে ]
মর্মার্থ- সত্রগুলির মধ্যে দ্বাদশাহ এবং ত্রয়স্ত্রিংশৎ-অহঃ–এই উভয় যাগই দেবতাগণের অতি প্রিয়।–এই প্রীতির কথা জ্ঞাত হয়ে যিনি এর অনুষ্ঠান করেন, তিনি অবিলম্বে দেবতাকে প্রাপ্ত হন; কেবল দেবতাকে লাভই নয়, উপরন্তু পাপ হতেও নিবৃত্তি লাভ করেন। (ব্যতিরেক দৃষ্টান্ত)–যেমন এই লোকজগতে রাজা অমাত্য ইত্যাদি শ্রেষ্ঠ পুরুষগণ রাজ্য প্রাপ্ত হয়ে ও পুনরায় অধিক রাজ্যলাভের অভিলাষী হয়ে সাম, ভেদ ইত্যাদি উপায়ের দ্বারা অন্য রাজ্যও অধিকার করেন, সেইরকম; অর্থাৎ এই উপায় জ্ঞাত না হলে তারা দরিদ্র হন এবং পূর্বের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করতে পারেন না। সেইরকম পূর্বে বিদ্যা, ঐশ্বর্য ইত্যাদি সম্পন্ন হয়েও যজমান এই ত্রয়স্ত্রিংশরাত্র যাগের মহিমা জ্ঞাত হয়ে এর অনুষ্ঠানের দ্বারা দেবত্বপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধক পাপরূপ শত্রু হতে বিযুক্ত হয়ে পূর্বসিদ্ধ মনুষ্যত্বের অধিক দেবত্ব বিশেষ লাভ করেন। (অতঃপর পুনরায় প্রকারান্তরে এই যাগের প্রশংসা, দ্বাদশ শব্দের প্রায়ণীয়-উদয়নীয় বর্জিত অবশিষ্ট দশরাত্রের কথন, দোরাত্রের পুনরায় প্রশংশা, ইত্যাদি বলা হয়েছে) ॥৫৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ ষষ্ঠে ষট্ত্রিংশদ্ৰাত্রাহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৬ ষট্ত্রিংশৎ-রাত্র (ছত্রিশরাত্র) যাগের কথা বলা হয়েছে]।
মর্মার্থ- পুরাকালে কোনও এক সময়ে আদিত্যগণ স্বর্গলোকে গমনের কামনা করেও পথ অজ্ঞাত থাকার কারণে স্বর্গলোক প্রাপ্ত হননি। তখন তার উপায় অন্বেষণ করে তারা ষট্ত্রিংশৎ-রাত্র যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন পূর্বক সেই যাগের অনুষ্ঠান করেন এবং গমনের পথ জ্ঞাত হয়ে স্বর্গ লাভ করেন। এইভাবে অন্য যজমান এই ষট্ত্রিংশৎ-রাত্র যাগের অনুষ্ঠান করে স্বর্গ লাভ করতে পারেন। (এরপর ক্রতুগত অহঃসংখ্যার প্রশংসা করা হয়েছে) ॥৬॥
মর্মার্থ– বিশ্বামিত্রের শাপের ফলে বসিষ্ঠের পুত্রগণ হত হলে বসিষ্ঠ প্রজা অর্থাৎ পুত্র লাভ ও শত্রুক্ষয়ের কামনা করে এই একোনপঞ্চাশৎ-রাত্র যাগের শাস্ত্রীয় নিশ্চয়তা অনুধাবন করে তার অনুষ্ঠান করেন। এর ফলে তিনি প্রজা লাভ করেন এবং সৌদাসগণকে পরাভূত করেন। সুদাসের পুত্রগণ সৌদাস নামে অভিহিত এবং তারা বসিষ্ঠের শত্রু ছিলেন; (অর্থাৎ সৌদাসগণের পরাভব অর্থে বসিষ্ঠের শত্রুগণের পরাভব)। বসিষ্ঠের ন্যায় অন্য যজমানগণও এই যাগের অনুষ্ঠান পূর্বক প্রজা লাভ ও শত্ৰু পরাভব করতে পারবেন। (অতঃপর অহসমূহের বিধি, একোনপঞ্চাশৎ-রূপ স্তুতি, ক্রতুগত অহঃ সংখ্যার প্রশংসা, ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথষ্টমাদিক্ষু চতুর্থবাকে্যু সম্বৎসরসমভিধীয়তে। অর্থাৎ–অনুবাক-৮ হতে একাদশ অনুবাক পর্যন্ত (চারটি অনুবাকে) সম্বৎসর-সত্ৰ কথিত হয়েছে। এই অষ্টমে সম্বৎসর-সত্রের দীক্ষাকাল উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ– যে যজমানগণ সম্বৎসর-সত্রের নিমিত্ত দীক্ষিত হতে চান, (অর্থাৎ এর অনুষ্ঠানে ব্রতী হতে ইচ্ছা করেন), সেই যজমানগণের একাষ্টকা অর্থাৎ মাঘমাসের কৃষ্ণা অষ্টমীতে দীক্ষা গ্রহণ করণীয়। যিনি এই একাষ্টকার অভিমানিনী দেবতা, তিনিই সম্বৎসর-অভিমানী দেবতার পত্নী। একাষ্টকা-অভিমানিনী দেবী গর্ভধারণের উদ্দেশে অবগমন করে থাকেন। এই সম্বৎসর অভিমানী দেবতা মাঘ-কৃষ্ণাষ্টমী তিথির সমস্ত রাত্রি একাষ্টকা দেবীর সাথে বাস করেন। অতএব যে যজমানগণ সম্বৎসর যাগের অনুষ্ঠান করতে কামনা করেন, তারা এই মুখ্য তিথিতে সম্বৎসর-সত্র আরম্ভ করে দীক্ষিত হন। (অতঃপর পক্ষদোষের কারণে পক্ষান্তর বিধি গুণবিশেষ অবলোকনে পক্ষান্তর বিধি ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৮॥৷
[সায়ণাচার্য বলেন–নবমে দীক্ষা উপসদশ্চোচ্যন্তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৯ সম্বৎসর-সত্রের দীক্ষা ও দক্ষিণা সম্পর্কে বলা হয়েছে]
মর্মার্থ- সম্বসর-সত্রের অনুষ্ঠানকারী যজমান স্বর্গে গমন করেন। অতএব তার যোগ্যতার নিমিত্ত দীক্ষার দ্বারা আপন আত্মা ও দেহ সর্বতো প্রজ্বলিত করণীয়। উপসদের নিমিত্ত আপন দেহ পাক করণীয় (শ্ৰপয়ন্তে)। এই স্থানে দীক্ষা ও দক্ষিণা দান অনুষ্ঠানের বিধি কথিত হয়েছে। (অতঃপর বিভজ্য প্রশংসা ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৯॥
মর্মার্থ–অতিরাত্র নামে যে ক্রতু বা যজ্ঞ আছে, তা এই ক্রতুগুলির মধ্যে পরম (উত্তম); এবং সোমযাগরূপ যে সকল ক্রতু আছে, তার মধ্যে চরম (শেষ)। অগ্নিষ্টোম, উথ্য, যোড়শী অতিরাত্র–এইগুলির মধ্যে ক্রমানুসারে অগ্নিষ্টোম প্রথম (প্রাথম্যম)। তা হলে অগ্নিষ্টোমকে পরিত্যাগ করে কি কারণে এই যজ্ঞের শেষভব অতিরাত্র হোম প্রথমে করা হয়ে থাকে? ব্রহ্মবাদীগণের এটাই প্রশ্ন। এই প্রসঙ্গে অভিজ্ঞজনেরা উত্তর প্রদান করেন–নাত্ৰাগ্নিষ্টোমঃ পরিত্যক্ত; অত্রাগ্নিষ্টোমোকথ্যষোড়শ্যতিরাত্ৰাণামুত্তরোত্তস্য পূর্বপুর্বগর্ভিতত্বাৎ। অর্থাৎ-এখানে অগ্নিষ্টোম পরিত্যক্ত নয়; এখানে অগ্নিষ্টোম, উথ্য, যোড়শী-অতিরাত্ৰ-সমূহ উত্তরোত্তর পূর্বে পূর্বে অন্তর্ভুতীকৃত হয়েছে। (অতঃপর প্রকারান্তরে গোষ্টোম ও আয়ুষ্টেীমের পূর্বাবা জ্যোতিষ্টোমের পুনঃ প্রশংসা, জ্যোতিষ্টোমে সামবিশেষের বিধি, ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥১০৷
[সায়ণাচার্য বলেন–তাদৌ তাবৎ সম্বৎসরসত্রং বিধত্তে। অর্থাৎ–এই প্রপাঠকে সব সম্বৎসরসত্রের বিধি কথিত হয়েছে। প্রথমোহনুবাকে গবাময়ননামকং সম্বৎসরসত্ৰং কৈশ্চিদ্বিশেষৈঃ সহ বিহিত। অর্থাৎ–এই অনুবাক-১ কিছু বিশেষত্ব সহ গবাময়ন নামক সম্বৎসরসত্রের কথা বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ– যদিও গো-বর্গ তির্যজাতি (পশু) হওয়ার নিমিত্ত তাদের কর্মের (অর্থাৎ যজ্ঞকর্মের) অধিকার নেই, তথাপিও তাদের অভিমানী দেবতাগণকে এখানে গো-শব্দে বিবক্ষিত (কথিত বা অভিহিত করা হয়েছে। গো-গণের শৃঙ্গের অভাব আপনাতে আরোপিত করে (স্বস্মিন্নারোপ্য) গো-গণ সহ অভিন্নভাবে কথিত হচ্ছে। পুরাকালে গো-বর্গ শৃঙ্গরহিত ছিল (সুতরাং গো-বর্গের অভিমানী দেবতাগণ শৃঙ্গরহিত ছিলেন)। সেই গো-অভিমানী দেবতাগণ শৃঙ্গের উৎপত্তি কামনা পূর্বক এই সম্বৎসরসত্রে দীক্ষিত হয়ে এর অনুষ্ঠান আরম্ভ করেন। এইভাবে শৃঙ্গকামনায় যজ্ঞানুষ্ঠান করতে করতে (প্রবৃত্তাং) তাঁদের দশ মাস অতিক্রান্ত (নির্গত) হয়ে যায়। তারপর দশ মাসের পরেই তাদের শৃঙ্গ উৎপন্ন হয়। তখন গো-বর্গ তথা গো-অভিমানী দেবতাগণ অপেক্ষিত যজ্ঞফলে সমৃদ্ধ হয়েছি মনে করে সেই যজ্ঞ হতে উত্থিত হলেন। সেই কালে যে গো-গণের (বা গো-অভিমানী দেবতাগণের) শৃঙ্গ উৎপন্ন হয়নি, তারা পুনরায় অবশিষ্ট দুটি মাস যজ্ঞানুষ্ঠান করে সম্বৎসর-সম্পূর্ণ করে শৃঙ্গ-প্রাপ্ত হলেন। তারা তখন আমরাও সমৃদ্ধ হয়েছি মনে করে যজ্ঞ হতে উত্থিত হলেন। যেহেতু গো-বর্গের দ্বারা এই যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই হেতু এই সম্বত্যাখ্য সত্ৰ গো-সত্র বা গবাময়ন কর্মবিশেষ নামে অভিহিত হয়। যে যজমান এইরকম জ্ঞাত হয়ে সম্বত্রখ্য কর্মবিশেষের (যজ্ঞবিশেষের) অনুষ্ঠান করেন, তিনি সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হবেন। (অতঃপর প্রকারান্তরে এই সত্রানুষ্ঠানের প্রশংসা, এই সত্রের প্রায়ণীয়-উদয়নীয় দিনবিশেষের বিধি,, এই সত্রের অতিরাত্রের বহুধা প্রশংসা ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥১॥
সপ্তম অধ্যায়
কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা · মন্ত্রাংশ ৪২
অনুবাক-৪২
মন্ত্র- গাবো বা এতৎ সমাসতাশৃঙ্গাঃ সতীঃ শৃঙ্গাণি সিষাসন্তীস্তাসাং দশ মাসা নিষগ্না আসন্নথ শৃঙ্গাণ্যজায়ন্ত তা অব্রুবন্নরাস্মোত্তিষ্ঠামাব তং কামমরুৎস্মহি যেন কামেন ন্যষদামেতি তাসামু ত্বা অব্রুবন্নর্ধা বা যাবতীৰ্বাহসাম এবেমৌ দ্বাদশৌ মাসৌ সম্বৎসরং সম্পাদ্যোক্তিঠামেতি তাসাম স্বাদশে মাসি শৃঙ্গাণি বৰ্ত্তন্ত শ্ৰদ্ধয়া বাহশ্রদ্ধয়া বা তা ইমা যাপরা উভয্যো বাব তা আধুর্বন্যাশ্চ শৃঙ্গাণ্যসম্বন্যাশ্চো জঁমবারুন্ধতম্নোতি দশসু মাসুত্তিষ্ঠমৃস্নোতি দ্বাদশসু য এবং বেদ পদেন খলু বা এতে যন্তি বিতি খলু বৈ পদেন যন্তদ্বা এতদৃদ্ধময়নং তম্মদেতসেনি ॥২॥ [সায়ণাচার্য বলেন–দ্বিতীয়ে দশমাসদ্বাদশমাসবিকল্লোহভিহিতঃ। অর্থাৎ–এই অনুবাক-২ দশ মাস ও দ্বাদশ মাসের বিকল্প ভেদে (অথবা দ্বাদশ মাসের বিকল্পে দশ মাসে সাধ্য সম্বৎসর) যজ্ঞের কথা হলা হয়েছে।
মর্মার্থ- পুরাকালে শৃঙ্গরহিত হওয়ার কারণে গো-বর্গ (গো-অভিমানী দেবতাগণ) শৃঙ্গ লাভের আকাঙ্খয় সম্বৎসরসাধ্য যজ্ঞানুষ্ঠান আরম্ভ করেন। এইভাবে দশ মাস অতিক্রান্ত হলে তাদের মধ্যে কারো কারো শৃঙ্গ উৎপন্ন হয়। তখন তারা অর্থাৎ সেই উৎপন্ন-শৃঙ্গ গো-গণ পরস্পর কথোপথন করতে লাগলেন–যে কারণে শৃঙ্গবিষয়ে কামনা করে আমরা সত্রানুষ্ঠানে একত্র সমবেত হয়েছি, আমাদের সেই কামনা সম্পাদিত হয়েছে। এই কথা বলে (এবমুক্তা) কিছুসংখ্যক গো কৃতার্থবুদ্ধিতে সত্ৰ হতে উত্থিত হলেন।-জাতশৃঙ্গ গো-বর্গ গমন করলে অবশিষ্ট শৃঙ্গরহিতগণ পরস্পর কথোপথন করতে লাগলেন। এঁরা দুভাগে বিভক্ত হলেন। কেউ শৃঙ্গকাম, অপর কেউ বা বললেন–আমাদের শৃঙ্গের প্রয়োজন নেই, তার চেয়ে আমরা উদরপূরণক্ষম বলকারক অন্ন সম্পন্ন হবো। এইভাবে শৃঙ্গকামী এবং অশৃঙ্গকামী সকলে মিলিত হয়ে স্থির করলেন–এই সম্বৎসরের মধ্যে যে দুমাস দ্বাদশসংখ্যার পূরণে অবশিষ্ট আছে, তা পূর্ণ করে আমরা যজ্ঞ হতে উত্তিষ্ঠ হবো (পশ্চাদুত্তিষ্ঠামেতি)। অতঃপর দ্বাদশমাস পূর্ণ করায় শৃঙ্গ সম্পর্কে যাঁদের শ্রদ্ধা ছিল, তাদের শৃঙ্গ উৎপন্ন হলো; যাঁদের শৃঙ্গ সম্পর্কে শ্রদ্ধা ছিল না, তারা উদরপূরণক্ষম বলকারক অন্ন প্রাপ্ত হলেন। এইভাবে উভয় দলই নিজ নিজ প্রয়োজন সিদ্ধ হওয়ায় সমৃদ্ধ হলেন। এখানে দেখা যাচ্ছে, দশমাস অনুষ্ঠানের দ্বারা শৃঙ্গমাত্র লব্ধ হলো, এবং দ্বাদশমাসের অনুষ্ঠানে রমণীয় শৃঙ্গত্ব ও যজ্ঞফলভূত অন্য কাম্য সামগ্রী লব্ধ হলো।–যজমান এই দুরকম উপায় বিদিত হয়ে আপন ইচ্ছানুসারে দশ মাস অথবা দ্বাদশ মাসব্যাপী যজ্ঞানুষ্ঠান করলে প্রকারান্তরে অন্যতর সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন।-দশমাস অনুষ্ঠানকারী যজমান অল্পকাল হলেও শাস্ত্রীয় মার্গের অনুসরণ করার নিমিত্ত ইচ্ছানুরূপ ফল প্রাপ্ত হবেনই; যেমন লোকজগতে রাজপথ অবলম্বন করে গমনকারী পুরুষ স্বল্প স্থলন হলেও শেষ পর্যন্ত গ্রাম প্রাপ্ত হয়, সেইরকম এখানেও ফলপ্রাপ্তি যুক্তিযুক্ত। (উপসংহারে কথিত হচ্ছে)–এই গবাময়ন যজ্ঞ দশ মাসেই সমাপ্ত হোক, কিংবা দ্বাদশ মাসব্যাপীই অনুষ্ঠিত হোক, সর্বৰ্থাই ফলপ্রদ হয়, যেহেতু এর অপার মহিমা। তির্যকজাতিরূপ গো-বর্গও অভিমত ফলোভের হেতুভূত যে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, সেই যজ্ঞের অনুষ্ঠান পূর্বক বিশিষ্ট ব্রাহ্মণগণ যে ফল লাভ করবেন তাতে আর বক্তব্য কি? (কিমু বক্তব্যং) ॥২॥
মর্মার্থ- সকল মাসে পৃষ্ঠ্য ষড়হ অনুষ্ঠেয় নয় (নানুষ্ঠেয়ঃ), কিন্তু প্রথম মধ্যম ও উত্তম, এই তিন মাসে অনুষ্ঠান কর্তব্য–এটি এক পক্ষের অভিমত। অপর পক্ষের অভিমত–না, এই তিনমাস অনুষ্ঠান উচিত নয়; যেমন, লোকজগতে দোগ্ধা পুরুষ গাভীকে এক দিনের মধ্যে তিনবার দোহন করলে সেই গাভী প্রথম পর্যায়ে প্রভূত ক্ষীর প্রদান করে, অপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে অল্প অল্প করে দুগ্ধ প্রদান করে। তাহলে সেই গাভীকে এক দিনে দ্বাদশবার দোহন করলে সে কি করে দুগ্ধ প্রদান করবে? দুগ্ধাভাবে দোহন উচিত নয়। সেইরকম, গো-সমান এই পৃষ্ঠ্য ষড়হেবও তিন মাস অনুষ্ঠান অনুচিত; তাহলে দ্বাদশ মাসে যে অনুচিত, তাতে আর বক্তব্য কি? এই পৃষ্ঠ্য ষড়হ বিষয়ে অভিজ্ঞ জনগণ বলে থাকেন–সেই কারণে সম্বৎসরব্যাপী অনুষ্ঠানের অন্তিম (শেষ) মাসে একবার মাত্র পৃষ্ঠ্য ষড়হ অনুষ্ঠান করণীয়। অন্যান্য মাসে পরিব্যাপ্ত (অভিপ্লব) ষড়হ যাগের দ্বারা মাসপূরণ কর্তব্য। তাহলে যজমান পৃষ্ঠ্য ষড়হের সারত্ব ইত্যাদি যা কিছু যজ্ঞফল, তা সম্পূর্ণ প্রাপ্ত হবেন। (অতঃপর বিশেষ আকারে এর বিধি বর্ণিত হয়েছে) ॥৩॥
[সায়ণাচার্য বলেন–চতুর্থ উত্তরে পক্ষসি প্রকারবিশেষোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৪ সম্বৎসর যাগের বিভাগ বা পক্ষ সম্পর্কে বিশেষভাবে বলা হয়েছে]।
মর্মার্থ- দ্বে হি সম্বৎসরসত্ৰস্য পক্ষসীসম্বৎসরসত্রের দুটি বিভাগ; প্রথম ছয়মাসাত্মক কাল একটি বিভাগ এবং দ্বিতীয় ছয়মাসাত্মক কাল অপর বিভাগ। উভয়ের মধ্যে প্রথম ছয়মাসাত্মক অর্থাৎ পূর্ববতী পক্ষটি সামের একতা ও ঋকের নানাত্ব পূর্বে অভিহিত হয়েছে। ইদানীং দ্বিতীয় ছয়মাসাত্মক অর্থাৎ উত্তরবর্তী পক্ষটির বিষয় পূর্ববর্তীর বিপরীতক্রমে অর্থাৎ ঋকের একতা ও সামের নানাত্ব। কথিত হয়েছে।-মনুষ্যলোক কর্মক্ষেত্র; অর্থাৎ মনুষ্যলোকে কর্ম সম্পাদন করে, তারপরে দেবলোক প্রাপ্ত হতে হয়। সেইরকম, আধারভূত ঋকের অভ্যাসের পর সামগান গীত হয়। সেই কারণে ঋক্ হলো মনুষলোক-স্বরূপ এবং সেগুলি একরূপ করা কর্তব্য; অর্থাৎ একদিন যে ঋকগুলি প্রযুক্ত হবে, পরের দিনও তা-ই করণীয়। এইরকম করলে খৃকাত্মক মনুষ্যলোক হতে কখনও বিচ্ছেদ হবে না, অপত্য ইত্যদি অর্থাৎ সন্তানগণ অবিচ্ছেদে থাকবে (অপত্যাদিসন্তানাবিচ্ছেদাৎ)। –পশ্চাদ্ভাবিত্বের কারণে সামে দেবলোকত্ব প্রতিষ্ঠিত। সেই রকম পূর্বদিনে যে সাম গীত হবে, পরের দিন সেটি ব্যতীত অন্য সাম গান করা কর্তব্য; লোকজগতেও দেবলোক হতে নির্গত পুরুষ মনুষ্যলোকের অন্যান্য প্রদেশে গমন করে থাকে। অর্থাৎ দেবলোক হতে প্রত্যাবর্তিত পুরুষ বা যজমান কর্মফলের তারতম্য অনুসারে (অর্থাৎ বিবিধত্ব অনুসারে) মনুষ্যলোক প্রাপ্ত হন, এটাই বক্তব্য। [অতঃপর বিশেষান্তর বিধি, অতিগ্রাহ্যদ্বয়ের বিধি, দ্বাদশাহীয় দশরাত্রের বিধি, ইত্যাদি কথিত হয়েছে] ॥৪৷৷
[সায়ণাচার্য বলেন–পঞ্চমে মাৎসর্যের্ণ প্রবৃত্তয়োৰ্ধয়োর্গবাময়নয়োর্বিশেষোভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই অনুবাক-৫ মাৎসর্যে প্রবৃত্ত দুই গবাময়ন যাগকারী যজমানের বিষয়ে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে।]
মর্মার্থ– যদি কখনও দুই যজমান সঙ্গের মধ্যে পরস্পর মাৎসর্য বশতঃ গবাময়ন যাগের নিমিত্ত সোম অভিযুত হয় (সদ্ভুয়াভিযুতৌ), তবে মহারাত্রে (অর্থাৎ অর্ধরাত্রের পর মুহূর্তদ্বয় রাত্রিকালে) উখিত হয়ে প্রাতরনুবাক নামক (অর্থাৎ প্রাতর্যাবভ্যো দেবেভ্য ইত্যাদি মন্ত্রে) শস্ত্রের দ্বারা উপকরণ করণীয়। যে যজমান-সঙ্ঘ পূর্বে প্রবৃত্ত হয়ে উপকরণ করেন, তারা অপর সঘের বাক্ ইত্যাদি আয়ত্ত করে থাকেন। [অতঃপর প্রাতরনুবাকের ঋবিশেষ, অভিভূতি-হোমমন্ত্র, মন্ত্রের তাৎপর্য, শস্ত্রবিশেষের বিধি, নৈমিত্তিক স্তোত্রবিশেষ, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সবনবিশেষ, ইত্যাদি বিধৃত হয়েছে] ॥৫॥
মর্মার্থ- সেবিত (অভিপ্লব) ষড়হের পাঁচ বার আবৃত্তি পূর্বক (পঞ্চকৃত্ব আবৃত্তৈঃ) এক মাস অনুষ্ঠানের পর (অনুষ্ঠায়ানন্তরে) পরবর্তী মাসের প্রথম দিনে জ্যোতি-নামে আখ্যাত দিন উৎসর্গ করণীয়। অথবা চারটি অভিপ্লব ও একটি পৃষ্ঠ্য যাগের দ্বারা মাস সমাপনের পর পরবর্তী দিনের প্রসারণ কর্তব্য, লোকে যেমন পাঁচটি ছদিন হিসাবে ত্রিশ দিন গণনা করে এটি সাবন মাস–এই সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে থাকে। (অতঃপর পক্ষান্তর, চান্দ্রমাসাভিপ্রায়ের পক্ষদ্বয়, প্রকারান্তরে পক্ষের প্রশংসা, পুনরায় কর্তব্যান্তর, ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৬॥
[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমে তত্রৈব বিশেষহভিধীয়তে। অর্থাৎ-পূর্বোক্ত অনুবাকে গবাময়ন যাগের গুণবিকাররূপ যে উৎসর্গের বিষয় কথিত হয়েছে, এই অনুবাক-৭ সেই বিষয়েই কিছু বিশেষ কথা কথিত হচ্ছে।]
মর্মার্থ–উৎসর্গপক্ষে যজ্ঞবিচ্ছেদ, অনুৎসর্গপক্ষে শ্বাসনিরোধ–এই দুটি দোষ মনে রেখে ব্রহ্মবাদীগণ গবাময়ন যাগের কর্তব্যাকর্তব্য বিচার করেছেন। এই ক্ষেত্রে ব্রহ্মবাদীগণের বিচারের বিষয় হলো প্রতি, অর্থাৎ একটিকে উল্লম্বন করে অপরটির সঙ্টন। এই সম্পর্কে অভিজ্ঞ জনগণ নিশ্চিতরূপে নির্দেশ করেন–প্রাজাপত্য (প্রজা বা অপত্য) পশু ইত্যাদির দ্বারা বিচ্ছেদের সমাধান সাধনযোগ্য হওয়ার নিমিত্ত শাসনিরোধ পরিহার পূর্বক উৎসর্জন পক্ষ গ্রহণীয়। (অতঃপর দিনবিশেষ, উৎসর্গের অনুষ্ঠান বিশেষের বিশদ বিবরণ, হবিঃ-প্রশংসা, ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৭॥
[সায়ণাচার্য বলেন-তাব বিকৃতিং সমাপ্যাথ প্রকৃতাবেব গবাময়নে যন্মহাব্ৰতমস্তি তস্মিন্ননেনা নুবাকত্রয়েণ বিশেষাঃ কেচিদুচ্যন্তে। অর্থাৎ–অষ্টম হতে অনুবাক-১০ পর্যন্ত তিনটি অনুবাকে গবাময়নে যে মহাব্রত আছে, সেগুলি কথিত হয়েছে। তারমধ্যে এই অনুবাক-৮ সামবিশেষ উক্ত হয়েছে]
মর্মার্থ– পুরাকালে কোন সময়ে সত্রের সমাপ্তি প্রাপ্ত হওয়ার পর দেবতাগণ তাদের ইন্দ্রিয় এবং ইন্দ্রিয়সামর্থ্য অপক্রান্ত (গত) হয়েছিল। তখন দেবতাগণ ক্রোশ নামে আখ্যাত সামের দ্বারা পুনরায় তা প্রাপ্ত হন। কুশ ধাতু আহ্বানার্থক; সুতরাং এই ধাতু হতে উৎপন্ন হওয়ায় ক্রোশ শব্দে আহ্বানসাধন বোঝানো হয়েছে। সেই নিমিত্ত অপগত বীর্যের আহ্বানসাধনত্ব সম্পন্ন সামকে ক্রোশ, নামে অভিহিত করা হয়। সেই ক্রোশ নামে আখ্যাত সামের দ্বারা হোমকুণ্ডের নিকট (চাত্বালসমীপে) স্তুতি করণীয়। তাতে যজ্ঞসমাপ্তি প্রাপ্তির পর ইন্দ্রিয়সামর্থ্যের প্রাপ্তি ঘটে। (অতঃপর সত্রের ঋদ্ধিনামক সামান্তর, ভদ্র নামে আখ্যাত সামগান, ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥৮॥
মর্মার্থ- পুরাকালে প্রজাপতি অর্ক নামধেয় কোনও সামের দ্বারা বহুবিধ সহস্রসঙ্রূপ প্রজা সৃষ্টি করেন। ইলা নামধেয় সামান্তরের দ্বারা আপন সৃষ্ট প্রজাগণের নিমিত্ত পূর্ব-বিচ্ছিন্ন অন্ন পুনরায় অবিচ্ছেদে সম্পাদন করেন। সেইরকমে যজমানগণও ঐ দুই সামের দ্বারা প্রজা সৃষ্টি পূর্বক তাদের নিমিত্ত অন্ন সম্পাদন করেন। যে সত্রে সামের দ্বারা অন্ন সম্পাদিত হয়, সেই সম্বৎসরব্যাপী নিরন্তর সমৃদ্ধ সত্রে ক্ষুধিত প্রজাগণ সকল দিক হতে সমাগত হয়ে থাকে। সত্রানুষ্ঠাতা এইসকল প্রজাগণকে নানারকম অন্ন ও রস প্রদান করে থাকেন। যে সম্বৎসর-সত্রে ক্ষুধিত প্রজাগণকে ব্রীহি ইত্যাদি অন্ন এবং ক্ষীর ইত্যাদি রস প্রদান করা হয় না, সেই সম্বৎসর সত্রে প্রজাগণের আগমন ঘটে না।–সত্ৰ সমাপ্ত হলে সকল যজমানের পক্ষে সন্তুষ্ট হয়ে উৎক্ৰোদ করণীয়। (হর্ষের নিমিত্ত অতি উচ্চধ্বনিকে উৎক্রোদ বলা হয়)। যেমন লোকজগতে দীর্ঘকাল (চিরং) শৃঙ্খলে আবদ্ধ পুরুষ পরে বিমুক্ত (অর্থাৎ মুক্তিপ্রাপ্ত) হয়ে আনন্দে উচ্চধ্বনি উৎসারিত করে, সেইরকম এই যজমানবৃন্দ দীর্ঘকালব্যাপী অনুষ্ঠেয় সত্ররূপ দেববন্ধন দৈবকর্মের সাধনে সঙ্কল্পবদ্ধ অবস্থা) হতে মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে (অর্থাৎ সত্রানুষ্ঠান সার্থকভাবে সম্পন্ন করে), সেই যজ্ঞের সামর্থ্যে স্বয়ং অন্ন ও রস লাভ পূর্বক আনন্দে উচ্চধ্বনি উৎসারিত করে থাকেন। তখন শততন্তু বীণা ইত্যাদি এবং দিকে দিকে স্থাপিত দুন্দুভিগুলি বাদিত হয়। শততন্তু বীণা শতায়ু (শতবৎসর আয়ুশালী) ও শতেন্দ্রিয় (শত ইন্দ্রিয়শালী) পুরুষের দ্যোতক এবং ঐ দুন্দুভিগুলির ধ্বনি সকল ধ্বনি অপেক্ষা উত্তম বা অতি উচ্চ; এগুলির বাদনের দ্বারা সভার (যজ্ঞসভায় সমবেত সকলের) মনোরঞ্জনযোগ্য পরম বাপটুতা প্রাপ্ত হওয়া যায়। (অতঃপর ভূমিদুন্দুভি, শঙ্খ ইত্যাদি নানা বাদ্যধ্বনি, ব্রাহ্মণ ও শুদ্রের মধ্যে চর্মের নিমিত্ত কলহ, আক্রোশ ও তার প্রশংসা, কিছু সামবিশেষের কথা, ব্রহ্মচারী-পুংশ্চলীর মিথুনীভাব ইত্যাদি বিবৃত হয়েছে) ॥৯॥
[সায়ণাচার্য বলেন–অথ দশমে দাসীনৃত্যমুচথে। অর্থাৎ–গবাময়নের মহাব্রত সম্পর্কিত এই অনুবাক-১০ দাসীনৃত্যের কথা বলা হয়েছে]
মর্মার্থ- চর্মবেধের (অর্থাৎ চর্ম বিদ্ধ করণের) দ্বারা যজমানগণের পাপসমূহের বিদারণ হয়। জলপূর্ণ কলসী মস্তকে ধারণ করে অগ্নির চারিদিকে দাসীগণ নৃত্য করে। (কিরকম দাসী? না,) নৃত্যকালে নৃত্যের তালে তালে দক্ষিণ পাদের দ্বারা ভূমিতে তাড়ন করে এবং মধুর সুরে গান করে। মধু হলো দেবতাগণের অত্যন্ত প্রিয় অন্নস্বরূপ; অতএব সেই গানের দ্বারা পরম অন্ন প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই পাদ-তাড়নায় যজমানগণের পূজা সম্পন্ন হয়। (চর্মবেধের পূর্বে বেধ-মন্ত্র উল্লিখিত আছে) ॥১০৷
মর্মার্থ- দ্বাদশাহের দশম দিনের অনুষ্ঠানে প্রমাদঘটিত কারণে কোন অঙ্গের বিস্মৃতি ঘটলে অপরে যাতে তা স্মরণ না করায়, এমন নিষেধ আরোপিত হয়েছে। এই দশম দিনে অনুষ্ঠেয় অঙ্গের (অর্থাৎ বিভিন্ন ক্রিয়ার) বাহুল্যের কারণে সকল কার্য প্রকৃষ্ট বেগে সমাপ্ত করণীয়। এর কারণ,–এই দিনে, অর্থাৎ এই দশম দিনের মধ্যেই, পাপক্ষয় করতে হয়; সুতরাং সেই প্রয়াস সহ্য করেও ত্বরান্বিত হয়ে এই অনুষ্ঠান করতে হয়। এই অনুষ্ঠাতার স্খলন সম্পর্কে লৌকিক দৃষ্টান্ত দেওয়া হচ্ছে–চোর ব্যাঘ্র ইত্যাদির ভয়ে আকুল হয়ে কোন মহারণ্যে প্রকৃষ্ট বেগে ধাবমান পুরুষের মধ্যে কোন মন্দবুদ্ধি (অর্থাৎ বুদ্ধিভ্রংশ) পুরুষ নিজেকে পণ্ডিত মনে করে সম্মুখবর্তী রাজপথ পরিত্যাগ পূর্বক যেমন অন্য কোনও পথে গমন করে, কিংবা অন্য কোন জন যেমন সহসা গমনে উদ্যত হয়ে পুরোবর্তী কোন বৃক্ষে চোট খায়, কিংবা অন্য কোন জন যেমন কণ্টক ইত্যাদির দ্বারা বা রোগের দ্বারা পীড়িত হয়ে নিরন্তর গমনভ্রংশ বা গতিচ্যুত হয়–এই তিন প্রকার পুরুষ রক্ষার নিমিত্ত গমন করতে গিয়ে যেমন জনসঙ্খহীন হয়ে পড়ে, তেমনই যে পুরুষ এই দিনের যাগের কোন অঙ্গ বিস্মৃত হন, তিনি ঋত্বিত্থের মধ্যে হীন বলে পরিগণিত হন। অন্য যাগে একজন কোন অঙ্গ বিস্মৃত হলে অপরে তাকে তা স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু এই দশম দিনের যুগে বিবাক্য বা বিকল বা বিস্মৃত বাক্য কেউই বলে দেবেন না–এই হলো এই অনুষ্ঠানের বিধান। (অতঃপর পক্ষান্তরের বিধানসমূহ, দিনগুলির মানসগ্রহকালে স্তোত্রবিশেষ ইত্যাদি কথিত হয়েছে) ॥১॥
মর্মার্থ- (এখানে প্রথম হতে সপ্তদিনগত আহুতিমন্ত্র এবং পূর্ণাহুতির মন্ত্র বলা হয়েছে। পূর্ণাহুতিতে সর্বপ্রকার পালকগণকে স্বাহা মন্ত্রে আহুতি প্রদান করি–এই রকম বলা হয়েছে) ॥১৫৷৷
মর্মার্থ–জ্যোতিষ্টোম, গোষ্টোম ও আয়ুষ্টোম–এই যাগগুলি একাহ-বিশেষ। এগুলির দ্বারা অনুলোম-প্রতিলোমগত, (অর্থাৎ অনুকূল-প্রতিকুল উভয়ভাবে), অভিপ্লব (অর্থাৎ পরিব্যাপ্ত) ষড়হ যাগ সম্পাদিত হয়ে থাকে। সেই ষড়হ পূর্বভাগবর্তী অনুলোমগতভাবে এগুলি অনুষ্ঠেয় (এতেহনুষ্ঠেয়াঃ)। এর ফলে ক্রমে ক্রমে এই তিন লোকে প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে। জ্যোতি ইত্যাদির মধ্যে ভূ-ইত্যাদিরূপত্বের কারণে ঐ তিনটির অনুষ্ঠানের দ্বারা ঐ তিন লোকে সুখসম্ভোগের প্রতিষ্ঠা ঘটে। অনুবাক-১০ সম্বৎসর-সত্রের প্রায়ণীয় নামে আখ্যাত অতিরাত্ররূপ জ্যোতিষ্টোমের বিষয় ব্যবস্থাপিত হয়েছে; এখানে তৃতীয় দিনে অনুষ্ঠেয় অগ্নিষ্টোমাত্মক (অর্থাৎ অগ্নিষ্টোমরূপ) জ্যোতিষ্টোমের কথা নির্ধারিত হয়েছে এই বিশেষ (ইতি বিশেষঃ)। (অতঃপর পূর্বোক্ত অতিরাত্রের ন্যায় এই অগ্নিষ্টোমরূপ জ্যোতিষ্টোমের প্রথম দিনটির প্রশংসা, ষড়হের পুনঃ প্রশংসা, ষড়হের দ্বিরাবৃত্তি ও তৃতীয়াবৃত্তির বিধি, আক্ষেপ সমাধানকল্পে সকল মাসের অনুষ্ঠান বিধি, চতুর্থীবৃত্তির বিধি ইত্যাদি কথিত হয়েছে) । ১১।
[সায়ণাচার্য বলেন–অথান্তিমেহনুবাকে সর্বজগদাত্মকত্বেনাশ্ব ভুয়তে। অথবা বিরাড়পেণাশ্বেপাসন প্রতিপাদকোহয়মনুবাকঃ প্রকরণাদুকৃষ্যোপনিষদাদৌ দ্রষ্টব্যঃ। অর্থাৎ–এই শেষ অনুবাকে সর্ব জগতের আত্মভূত (স্বরূপ) অশ্বের স্তুতি করা হয়েছে। পক্ষান্তরে বিরাট্ররূপে (বিশেষভাবে ব্রহ্মরূপে রাজমান) অশ্বের উপাসনা প্রতিপাদক এই অনুবাকটি বিশিষ্ট উপনিষদ ইত্যাদিতে দ্রষ্টব্য]
মর্মার্থ–যে মনুষ্য অশ্বমেধের যোগ্য এই অশ্বের শির প্রভৃতি অবয়বভূত ঊষাকাল ইত্যাদিরূপে উপাসনা করেন (উপাস্তে), তিনি শির প্রভৃতির ন্যায় বিরাট অবয়বযুক্ত পবিত্র (মেধ্য) যাগফলের যোগ্য হয়ে থাকেন; এবং যাগানুষ্ঠানের ও উপাসনার সমান ফল প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। (পঞ্চম কাণ্ডের তৃতীয় প্রপাঠকের দ্বাদশ অনুবাকে ব্রহ্মহত্যা ইত্যাদি সকল উপপাতক ও মহাপাতকের প্রায়শ্চিত্ত রূপে অশ্বমেধ যজ্ঞানুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে)। অতঃপর অশ্বের কোন অবয়বে ব্রহ্মরূপী বিরাটের কোন্ অবয়ব ধ্যান কর্তব্য (ধ্যাতব্য) তা সবই বলা হচ্ছে।–মেধ্য অশ্বের যে শির, তা উষাকালরূপ; সেই অশ্বের যে চক্ষু তা সূর্যরূপ; তার যা প্রাণ, তা হলো বাহ্য বায়ু; তার যা শ্রোত্র, তা হলো চন্দ্রমা; তার যা পাদ তা হলো পূর্ব দিক; তার পার্শ্বের যে অস্থিবিশেষ, সেগুলি আগ্নেয় ইত্যাদি (অর্থাৎ ঈশান, নৈঋত, অগ্নি, বায়ু) সামান্য দিমূহ। তার যা উন্মেষের সাথে নিমেষ (অর্থাৎ নেত্র-উন্মীলনের ও নেত্ৰ-মুদ্রণের কাল) এই উভয়ই দিন ও রাত্র; তার হস্ত পদ ইত্যাদিগত যে সকল পর্ব (অর্থাৎ দেহসন্ধি বা গাঁট) তা শুক্ল বা কৃষ্ণপক্ষ সমন্বিত অর্ধমাস (অর্থাৎ পুর্ণিমা বা অমাবস্যার কাল); এবং তার দেহসন্ধির যে স্থলগুলি তা চৈত্র ইত্যাদি মাস; তার যে খুর ইত্যাদি অঙ্গসমুহের উল্লেখ হয়নি (অনুক্ত), সেইগুলি বসন্ত ইত্যাদি ঋতু; তার যে মধ্যদেহ, তা সম্বৎসরকাল; তার যে কেশসমূহ, তা সূর্যরশ্মি। এই অশ্বের যে ভাস্বর রূপ, তা কৃত্তিকা ইত্যাদি নক্ষত্রসমূহ; তার অঙ্গের যে সকল স্থান অনুক্ত হয়েছে, বৃহস্পতি-শুক্র-ধ্রুব ইত্যাদি প্রৌঢ় তারকা; তার অঙ্গস্থ যে মাংসখণ্ডসমূহ, তা আকাশ; তার যে ক্ষুদ্র লোমসমূহ, তা ওষধী; তার পুচ্ছগত যে দীর্ঘকেশসমূহ, তা বনস্পতি; তার যে মুখ, তা লোকপ্রসিদ্ধ অগ্নি; তার মুখের যে বিদারণ, তা বৈশ্বানর নামক দেবতা বিশেষ; তার যে উদর, তা সমুদ্র;তার যে পায়ু, তা অন্তরিক্ষ; তার যে অণ্ড, তা দ্যাবাপৃথিবী, তার যে শিশ্ন (লিঙ্গ), তা পর্বত; তার যে রেত; তা সোমরস; তার যে গাত্রভঙ্গ, তা বিদ্যুৎ এবং তার যে সশব্দে শরীর-কম্পন্ন, তা সেই বিদ্যুতের গর্জন; তার যে মূত্র, তা বৃষ্টি; তার হ্রেষা বা শব্দরূপ যে বাক্, তা বেদরূপ বাক্য।-যজ্ঞে প্রযুজ্যমান অশ্বের সংজ্ঞপনের (অর্থাৎ বধের) পূর্বে মহিমা নামক যে রাজতগ্রহ, তা এই দিনরূপ (অহরেব) এবং সংজ্ঞপনের পরে যে মহিমা নামক সুবর্ণগ্রহ, তা রাত্রি। এই উভয় মহিমা-গ্রহ অশ্বের সংজ্ঞপনের পূর্বে ও পরে ব্যবস্থিত। হয়, অর্বা, বাজী, অশ্ব–এইরকম গৌণ জাতিবিশেষরূপে (অর্থাৎ নামযুক্ত হয়ে) এ দেবতা, অসুর, গন্ধর্ব, মনুষ্য ইত্যাদিকে বহন করে থাকে। এইরকম এই বিরাট্রপ অশ্বের সৃষ্টিস্থান হলো সমুদ্র। সম্যক্রপে যা হতে জগৎ উৎপন্ন, তা হলো সমুদ্র; এবং সেই সমুদ্রই পরমাত্মা। পরমাত্মা ব্যতীত অন্য কোথা হতে এই বিরাটের (অর্থাৎ অশ্বের) উৎপত্তি হতে পারে না (নাহ্যন্যস্মৃদয়ং বিরাডুৎপমহতি)। (এই অশ্ব এই জগতের স্থিতির কারণ–এটাই অর্থ)। এইভাবে যাঁরা উপাসনা করেন, পাপক্ষয়ের দ্বারা তারা বিরাটরূপকে প্রাপ্ত হন। এই নিমিত্তই শ্রুতিতে বলা হয়েছে–তং যথা যথোপিসতে তথৈব ভবতি। এবং এই বিরাটপ্রাপ্তি হলো ক্রমমুক্তির হেতু। তত্র (অর্থাৎ এই বিরাট পুরুষে) জ্ঞানের উৎপত্তি হলে জীব মুক্তি লাভ করে থাকে। ২৫৷৷