সামবেদ সংহিতা - সাম মানে গান। যে মন্ত্র গান করা যায়, তাকেই সাম বলে। যজ্ঞ করার সময় কোন কোন ঋগ আবৃত্তি না করে সুর করে গাওয়া হত। এই গেয় ঋগ্সমূহকে বলা হয় সামবেদ। আর সামর সংকলনই সামবেদ সংহিতা। সামবেদের অধিকাংশ মন্ত্র ঋকবেদ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এই বেদের নিজস্ব মন্ত্রের সংখ্যা ৭৫টি। বৈদিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত গানের সঙ্কলন হলো সামবেদ। এই কারণে সামবেদকে অনেক সময় সঙ্গীত গ্রন্থ বলা হয়। এই বেদকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। এই প্রথমভাগ আর্চিক এবং দ্বিতীয় ভাগ গান। আর্চিক আবার দুই ভাগে বিভক্ত। এই ভাগ দুটো হলো‒ পূর্বার্চিক ও উত্তরার্চিক।
সামবেদ - ১ম অধ্যায় আগ্নেয় কাণ্ডঃ অগ্নিস্তুতি
প্রথম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতা অগ্নি
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।২।৪।৭।৯ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য
৩ মেধাতিথি কান্ব; ৫ তশনা কাব্য; ৬ সুদীতি পুরুমীঢ় আঙ্গিরস; ৮ বৎস কান্ব; ১০ বামদেব॥
অর্থঃ- (১০) হে অগ্নি, তমোনাশক তুমি, আমাদের পালনের জন্য মহাধন আন আর আমাদের দর্শনের জন্য তুমিই দেবতা।
সামবেদ - ১ম অধ্যায় আগ্নেয় কাণ্ডঃ অগ্নিস্তুতি
দ্বিতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতা অগ্নি
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ আয়ুঙ্ ক্ষ্বাহি, বিরূপা আঙ্গিরস, ২ বামদেব গৌতম, ৩।৮।৯ প্রয়োগ ভার্গব, ৮ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৫।৭ শূ্নঃশেপ আজীগর্তি, ৬ মেধাতিথি কান্ব, ১০ বৎস কান্ব॥
অর্থঃ- (৩৫) যজ্ঞে যজ্ঞে মন্ত্রে মন্ত্রে তোমাদের জন্য আমরা অমৃতসমান, সর্বজ্ঞ, প্রিয়, মিত্র, প্রশংসনীয় অগ্নির উদ্দেশ্যে সেই পবিত্রবলের উদ্দেশ্যে স্তব করি।।
অর্থঃ- (৩৬) হে অগ্নি, আমাদের প্রথমের দ্বারা ( ‒ঋগ্বেদের দ্বারা পালন কর। আমাদের দ্বিতীয়ের দ্বারা ( ‒যজূর্বেদের দ্বারা) পালন কর; হে বলপতি, আমাদের তৃতীয় স্তবমালার দ্বারা ( ‒সামবেদের দ্বারা) পালন কর; হে ধনী, আমাদের চতুর্থের দ্বারা ( ‒অথর্ববেদের দ্বারা) পালন কর॥
অর্থঃ- (৩৭) হে অগ্নি, প্রবল দীপ্তিসহায়ে, হে দেব, শুভ্রজ্যোতি সহায়ে যেমন ভরদ্বাজের কাছে সন্দীপ্ত হও তেমনি হে চিরযুবা, ধনাধীশ, হে পাবক, আমার কাছে প্রকাশিত হও।।
অর্থঃ- (৪০) হে অগ্নি, তমোনাশক তুমি; নিয়ে এস তার জন্য ঊষা হতে বিচিত্র সর্বার্থধন যে তোমাকে চায়; হে অমর্ত্য, হে জাতপ্রজ্ঞান, আজ আন সেই দেবদের যাঁরা ঊষাকালে জাগরিত॥
অর্থঃ- (৪৪) যিনি বিশ্বধন, বসু, হোতা, জনগণের আনন্দদায়ক, সেই অগ্নির উদ্দেশ্যে সব স্তুতিমন্ত্র মধুপূর্ণ পাত্রের মত যাচ্ছে॥
সামবেদ - ১ম অধ্যায় আগ্নেয় কাণ্ডঃ অগ্নিস্তুতি
পঞ্চম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতা অগ্নি
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ বশিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি; ২ ভর্গ প্রাগাথ; ৩।৭ সৌভরি কাণ্ব; ৪ মনু বৈবস্বতি; ৫ সুদীতিপুরমীঢ় আঙ্গিরস; ৬ প্রস্কন্ব কাণ্ব; ৮ কাণ্ব মেধাতিথি ও মেধ্যাতিথি; ৯ গাথি বিশ্বামিত্র; ১০ ঘৌর কণ্ব ॥
অর্থঃ- (৪৭) সকল পথের সন্ধান যিনি জানেন, যাঁর মধ্যে সকল ব্রত ধৃত আছে সেই অগ্নি দেখা দিলেন। আর্যগণের জন্য জাত জ্ঞানবৃদ্ধিকর অগ্নি আমাদের সকল স্তুতি গ্রহণ করুন।
অর্থঃ- (৪৮) অগ্নি দ্যুলোকাগ্নির মধ্যে প্রধান, আকাশে মেঘের মধ্যে জলের সাথে বর্তমান। হে ব্রহ্মের পালক অগ্নি, প্রাণবায়ু মরুদগণের কাছে বর্ষমিরূপ বরণীয় পালন ঋক্ মন্ত্রের দ্বারা যাচ্ঞা করি।
অর্থঃ- (৫০) শোন হে অগ্নি, হে শ্রবণসমর্থ, আমার বচন; যে দেবেরা তোমার সঙ্গে হব্য বহন করেন তাঁদের নিয়ে এবং মিত্র অর্যমা ও প্রাতর্যাগে আগমনকারী অন্যদেবতাদের সঙ্গে নিয়ে এই অহিংসিত যজ্ঞে এসে যজ্ঞাসনে বোসো।
অর্থঃ- (৫৩) হে অগ্নি, যখন তোমার নিজের উৎপত্তিস্থান বনকাষ্ঠমধ্যে ও সকলজীবের স্রষ্টা জলরাশিকে কামনা করে তাদের মধ্যে প্রবেশ কর তখন তুমি চিরতরে হারিয়ে যাও না তুমি আমাদের থেকে দূরে গেলেও আবার ফিরে আস।
অর্থঃ- (৫৪) জ্যোতিস্বরূপ্ তোমাকে হে অগ্নি, মানুষের হিতের জন্য সূর্যদেব সদাই ধারণ করেন; মেধাবী সত্যজাত সদা বর্ধমান তুমি দীপ্তিলাভ কর, যে তোমাকে মানুষেরা নমস্কার জানায়।
সামবেদ - ১ম অধ্যায় আগ্নেয় কাণ্ডঃ অগ্নিস্তুতি
ষষ্ঠ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতা অগ্নি
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ বশিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি; ২ ভর্গ প্রাগাথ; ৩।৭ সৌভরি কাণ্ব; ৪ মনু বৈবস্বতি; ৫ সুদীতিপুরমীঢ় আঙ্গিরস; ৬ প্রস্কন্ব কাণ্ব; ৮ কাণ্ব মেধাতিথি ও মেধ্যাতিথি; ৯ গাথি বিশ্বামিত্র; ১০ ঘৌর কণ্ব ॥
অর্থঃ- (৪৭) সকল পথের সন্ধান যিনি জানেন, যাঁর মধ্যে সকল ব্রত ধৃত আছে সেই অগ্নি দেখা দিলেন। আর্যগণের জন্য জাত জ্ঞানবৃদ্ধিকর অগ্নি আমাদের সকল স্তুতি গ্রহণ করুন।
অর্থঃ- (৪৮) অগ্নি দ্যুলোকাগ্নির মধ্যে প্রধান, আকাশে মেঘের মধ্যে জলের সাথে বর্তমান। হে ব্রহ্মের পালক অগ্নি, প্রাণবায়ু মরুদগণের কাছে বর্ষমিরূপ বরণীয় পালন ঋক্ মন্ত্রের দ্বারা যাচ্ঞা করি।
অর্থঃ- (৫০) শোন হে অগ্নি, হে শ্রবণসমর্থ, আমার বচন; যে দেবেরা তোমার সঙ্গে হব্য বহন করেন তাঁদের নিয়ে এবং মিত্র অর্যমা ও প্রাতর্যাগে আগমনকারী অন্যদেবতাদের সঙ্গে নিয়ে এই অহিংসিত যজ্ঞে এসে যজ্ঞাসনে বোসো।
অর্থঃ- (৫৩) হে অগ্নি, যখন তোমার নিজের উৎপত্তিস্থান বনকাষ্ঠমধ্যে ও সকলজীবের স্রষ্টা জলরাশিকে কামনা করে তাদের মধ্যে প্রবেশ কর তখন তুমি চিরতরে হারিয়ে যাও না তুমি আমাদের থেকে দূরে গেলেও আবার ফিরে আস।
১ শ্যাবাশ্ব আত্রেয় বা বামদেব গৌতম; ২ উপস্তুত বার্ষ্টিহব্য; ৩ বৃহদুকথ্ বামদেব্য; ৪ কুৎস আঙ্গিরস; ৫।৬ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য; ৭ বামদেব গৌতম; ৮।১০ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি; ৯ ত্রিশিরা ত্বাষ্ট্র॥
অর্থ : (৬৩) তাঁর উদ্দেশে নিবেদন কর, হোতাকে প্রশংসিত কর, গৃহপতিকে অন্তরে ধারণ কর; সকল গৃহের উপাস্যকে স্তুতি দ্বারা, যজ্ঞভূমিতে সেই হব্যগ্রহণকারীকে পূজার দ্বারা প্রীত কর।
অর্থ (৬৪): এই শিশুর এই তরুণের কাজ বড়ই বিচিত্র। এ স্তন্যপানের জন্য মায়ের কাছে যায় না। এর মাতার (-অরণি কাষ্ঠ যা থেকে অগ্নি উৎপন্ন) স্তন নেই, তবু এ জন্মমাত্রই মহান দেবদৌত্যকার্যের ভার গ্রহণ করলো॥
অর্থ (৬৫): হে অগ্নি, এই পার্থিব অগ্নি তোমার একরূপ, অন্তরিক্ষে বিদ্যুৎ তোমার আর এক রূপ, আর দ্যুলোকে সুর্যরূপ জ্যোতির্ময় তোমার শরীর তৃতীয়রূপ – এ তিন রূপে তুমি সকল কিছুর মধ্যে প্রবেশ কর। তারপর তুমি কল্যাণরূপ ধারণ করে দেবশ্রেষ্ঠ পরমপিতা সূর্যদেবের প্রিয় হও॥
অর্থ (৬৬) : সুর্যসমান পূজনীয় সর্বজ্ঞান অগ্নির উদ্দেশে প্রজ্ঞার দ্বারা এই স্তুতি রচনা করি। অগ্নির উপাসনায় আমাদের বুদ্ধি হোক কল্যাণময়ী। হে অগ্নি, আমরা তোমার সখা হলে কেউ হিংসা করতে পারবে না॥
অর্থ (৭০) রাজা, ঈশ্বর স্তবের দ্বারা সম্যক্ দীপ্ত, যাঁর পূর্ণদর্শন ঘৃতের দ্বারা সংবর্ধিত, মানুষেরা আগ্রহের সঙ্গে হবির দ্বারা তাঁকে পূজা করে; অগ্নিদেব ঊষার আগে দীপ্তি লাভ করতে চলেছেন; কাছের আকাশ দূরের আকাশ তিনি ছেয়ে ফেললেন; জলের আধার আকাশে মহান বিদ্যুৎরূপে তিনি বর্ধিত হলেন॥
অর্থ (৭১) : বিশাল পতাকা উড়িয়ে অগ্নিদেব দ্যুলোক ভূলোক জুড়ে বৃষের মত শব্দ করতে করতে চলেছেন; কাছের আকাশ দূরের আকাশ তিনি ছেয়ে ফেললেন; জলের আধার আকাশে মহান বিদ্যুৎরূপে তিনি বর্ধিত হলেন ॥
অর্থ (৭২) যিনি প্রশস্ত, দূরে দৃশ্যমান, গৃহপতি, দেবগণের উদ্দেশ্যে গমনশীল, সেই অগ্নিকে মানুষেরা আঙ্গুলের সাহায্যে অরণিকাষ্ঠ থেকে উৎপন্ন করেন (-প্রজ্জ্বালিত করেন)॥
সামবেদ - ১ম অধ্যায় আগ্নেয় কাণ্ডঃ অগ্নিস্তুতি
অষ্টম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৮
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতা অগ্নি; ৩ পূষা
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ত্রিষ্টুপ
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ আগ্নেয় বুধ ও গবিষ্টির, ২।৫ ভালদ্দন বৎসপ্রি; ৩ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ৪।৭ গাথি বিশ্বামিত্র, ৬ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ৮ পায়ু ভারদ্বাজ॥
অর্থ (৭৩) ঊষাকালে দুগ্ধদাত্রী গাভীগণ যেমন মানুষের কাছে যায় অগ্নিও সেরূপ সমিধকাঠে প্রজ্জ্বালিত হন। তাঁর সেই মহান্ শিখাগুলি শাখাবিস্তারকারী বৃক্ষের মত দ্যুলোকের পানে ছুটে চলে।
অর্থ (৭৪) ভুবনজয়ী, প্রাণদ, মূঢের মত দৃষ্ট অথচ অবাধজ্ঞানসম্পন্ন, পুরনাশক, বেদবাণীর দ্বারা ভজনীয়, সর্বকর্মধারক শ্মশ্রুর মত উজ্জ্বল সুবর্ণশিখারূপ বর্মের দ্বারা আবৃত অগ্নিকে উত্তমরূপে স্তব কর।
অর্থ (৭৫) সে উদিতভানু পূষারূপী অগ্নি, তোমার এই যে লোহিতবর্ণ এ তোমার এক রূপ, আর যজ্ঞযোগ্য পূজনীয় তোমার যে রূপ তা অন্য; দিন ও রাত্রি সৃষ্টিরূপ কর্মের দ্বারা তুমি অন্তরিক্ষের মত বিশ্বব্যাপী। যে নিয়ন্তা, এই বিশ্বমায়ার তুমিই পালক; হে পূষা, তোমার এই দান কল্যাণময় হোক॥
অর্থ (৭৬) হে অগ্নি, তোমার উপাসকের জন্য বহুকর্মযুক্ত ধন ও শাশ্বতী বেদবাণী তুমি দিয়ে থাক। হে অগ্নি, আমাদের এমন পুত্র দাও যার থেকে বংশ বিস্তার হবে আর তোমার কল্যাণ আমাদের ওপর বর্ষিত হবে।
অর্থ (৭৭) অগ্নি মহান্ হয়ে হোতারূপে জাত হলেন, মানুষের মধ্যে নিবাস করলেন, জলের মধ্যে অবস্থান করলেন॥ ওই মহাশূন্যে জন্মলাভ করে সকল কিছুই তিনি জানলেন আর সকল জীব ও ধনসম্পদের নিয়ামক হলেন॥
অর্থ (৭৯) গর্ভিণীর গর্ভে সুরক্ষিত ভাবে অবস্থিত প্রাণের মত দুই অরুণি কাঠের মধ্যে নিহিত আছেন জাতবেদা অগ্নি। যাঁরা নিজকর্মে সচেতন সেই হবির দাতা নরকূলে অগ্নি প্রতিদিন পূজিত।।
অর্থ (৮০) হে অগ্নি, যাদের হাত দুই অরণি কাঠের মধ্য মধ্য নিহিত আছেন জাতবেদা অগ্নি। যাঁরা, যাদের হাত থেকে জীবন রক্ষিতব্য তাদের ধ্বংস কর; তারা যেন তোমার ওপর জয়লাভ না করে; অপক্বমাংসভোজীগণ যেন তোমার দিব্য অস্ত্রের আঘাত থেকে মুক্তিলাভ না করে॥
সামবেদ - ১ম অধ্যায় আগ্নেয় কাণ্ডঃ অগ্নিস্তুতি
নবম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতা অগ্নি
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ অনুষ্টুপ
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ গয় আত্রেয়, ২ বামদেব, ৬।৪ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ৫ দ্বিত মৃক্তবাহ্য আত্রেয়, ৩ অত্রিপুত্র বসুগণ, ৭।৯ গোপবন আত্রেয়, ৮ পুরু আত্রেয়, ১০ বামদেব কশ্যপ বা মারীচ অথবা বৈবস্বত মনু অথবা উভয়কৃত॥
অর্থ : (৯৪) যজ্ঞে উপাসক যে হব্য দান করেন, যে মন্ত্র উচ্চারণ করেন ব্রহ্মস্বরূপ অগ্নি তা সমস্তই জানেন॥নেমি যেমন চক্রকে ব্যাপ্ত করে বর্তমান থাকে অগ্নিও সেরূপ উপাসকের সমস্ত কর্মই ব্যাপ্ত করে আছেন॥
অর্থ : (৯৭) হে অগ্নি, আমি তোমার উদ্দেশ্যে অনেক হব্য দান ক’রে তোমার কাছে অনেক কামনা করি। হে অগ্নি, মহান্ প্রভুর গৃহে যেমন সেবক থাকে, আমিও তোমার তেমনি সেবক॥
অর্থ : (১০০) হে অগ্নি, তুমি যজ্ঞকারিগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যাজ্ঞিক, যারা দেবকাম তাদের জন্য তুমি দেবতাদের মিলিত কর; তুমি হোতা আনন্দময়, তুমি অবিশ্বাসীকে পরাভূত ক’রে বিরাজ কর।
অর্থ : (১০১) সোম যখন জন্মালেন তখন সপ্তমাতারূপিণী সপ্তছন্দ সৌন্দর্যের জন্য সোমকে ঘিরে স্তব করতে লাগলেন, কারণ তিনি সর্বজ্ঞ, আর তিনিই নিশ্চিত ধনের সন্ধান জানেন॥
অর্থ : (১০৯) হে স্তোতা, যিনি দ্যুলোকে হব্য নিয়ে যান সেই প্রসিদ্ধ অগ্নির স্তব কর; বিদ্বান্গণ তাঁরই কাছে গমন করেন এবং তাঁর মাধ্যমে দেবগণকে হব্য প্রদান করেন॥
অর্থ : (১১১) সম্যক্ পূজিত অগ্নি আমাদের জন্য কল্যাণকর হোন; হে শোভনধন অগ্নি, তোমার দান আমাদের কল্যাণ করুক; এই অহিংসিত যজ্ঞ কল্যাণময় হোক; আমাদের স্তুতি কল্যাণকর হোক।
অর্থ : (১১৪) জনগণের পালক তীক্ষ্ণ অগ্নি প্রীত হয়ে যখন গৃহে অবস্থান করেন তখন তিনি সকল বিঘ্ন সমূলে বিনাশ করেন॥
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
প্রথম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (৩য় ঋকের দেবতা অগ্নি বা হবীংষি)
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ শংযুর্বার্হস্পত্য, ২ শ্রুতকক্ষ সুকক্ষ অথবা আঙ্গিরস, ৩ হর্যত প্রাগাথ, ৪।৫ শ্রুতকক্ষ বা সুকক্ষ (৫ সুকক্ষ আঙ্গিরস), ৬ দেবজামি ইন্দ্রমাতা ঋষিকা, ৭।৮ গোষুক্তি-অশ্বসুক্তি কান্বায়ন, ৯।১০ মেধাতিথি কান্ব, আঙ্গিরস প্রিয়মেধ॥
অর্থ : (১১৫) হে স্তোতাগণ, গবাদি পশুর কাছে উদ্ভিদ্ যেমন সুখকর হয় সেরূপ সোমাভিষবে বহুলোকের বন্দনীয় সর্বশক্তিমান ইন্দ্রের সুখদায়ক স্তোত্র একত্র মিলিত হয়ে গান কর॥
অর্থ : (১২৭) যিনি সুষ্টু নীতির দ্বারা পরিচালিত হয়ে দূরদেশ থেকে তুর্বশ ও যদুকে এনেছিলেন সেই যুবা ইন্দ্র আমাদের সখা॥[তুর্বশ=ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষযুক্ত মানুষ॥যদু=আচার্যের উপদেশে বিপথ হতে বিরত মানুষ॥(নিঘন্টু ভাষ্য)]॥
অর্থ : (১৩৩) যাঁরা অগ্নিকে সন্দীপ্ত করেন, যাঁরা মিলিতভাবে প্রসারিত করেন, যুবা ইন্দ্র তাঁদের সখা॥
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
তৃতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (১ মরুদ্গণ, ৪ বিশ্বদেবগণ; ৫ ব্রহ্মণস্পতি; ৭ সবিতা)
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ কন্ব ঘৌর, ২ ত্রিশোক কানব, ৩।৯ বৎস কান্ব, ৪ কুসীদো কান্ব, ৫ মেধাতিথি কান্ব, ৬ শ্রুতকক্ষ বা সুকক্ষ আঙ্গিরস, ৭ শাবাশ্ব আত্রেয়, ৮ প্রগাথ কান্ব, ১০ ইরিম্বিঠি কান্ব॥
অর্থ: (১৪৪) মানুষের সম্রাট, নেতা, শত্রুপরাভবকারী, অতিদাতা ইন্দ্রকে নতুন মন্ত্রে স্তব কর॥
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
চতুর্থ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (৪ ইন্দ্র ও পূষা)
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ শ্রুতকক্ষ বা সুকক্ষ আঙ্গিরস, ২ মেধাতিথি কান্ব (ঋগ্বেদ শংযু বার্হস্পত্য), ৩ গোতম রাহুগণ, ৪ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ৫ বিন্দু বা পূতদক্ষ অঙ্গিরস, ৬।৭ শ্রুতকক্ষ বা সুকক্ষ আঙ্গিরস, ৮ বৎস কান্ব, ৯ শুনঃশেপ আজীগর্তি, ১০ শুনঃশেপ আজীগর্তি বা বামদেব।।
(১৪৫) জল বর্ষণের দ্বারা অন্নদাতা ইন্দ্র নিপুণ যজ্ঞকারীর যবমিশ্রিত সোমরস তৃপ্তির সঙ্গে পান করেন।।
(১৪৬) হে বহুজনের আশ্রয়দাতা ইন্দ্র, গোবৎসের প্রতি ধেনুগণ যেমন গমন করে সেরূপ আমাদের এই স্তুতিসকল তোমা অভিমুখে গমন ক’রে।।
(১৪৭) সুর্যমন্ডল হতে স্নিগ্ধরশ্মি যে চন্দ্রমন্ডলে প্রবিষ্ট হয় তা’ ইন্দ্র জানেন।।
(১৪৮) অতি বর্ষণকারী ইন্দ্র যখন ঋতকর্মের দ্বারা মহান বারিরাশিকে প্রেরণ করেন তখন পূষারূপী সূর্য তাঁর সহায়ক হন।।
(১৪৯) বহুধনের স্রষ্টা, যশ ও অন্নের নির্মাতা মাতৃরূপী ইন্দ্র (বর্ষণ ইচ্ছা ক’রে) মরুৎ বায়ুদের সোম পান করাচ্ছেন, তাঁর গমনপথে রশ্মিসমূহকে যুক্ত করছেন।।
(১৫০) হে আনন্দের দেবতা, তোমার রশ্মিরূপ অশ্বের সহায়তায় আমাদের এই সোমযাগে এস, আমাদের এই সোমযাগে এস।।
(১৫১) যজ্ঞের বগৃধি কামনা করে যজ্ঞকামী হোতাগনো ইন্দ্রের উদ্দেশে আহুতি উৎসর্গ করলেন; যজ্ঞান্তে অবগাহন স্নানের জন্য গমন করলেন।
(১৫২) আমিই যজ্ঞের দ্বারা সত্য ও অন্নের অনুগ্রহ লাভ করেছি।। আমি সূর্যের মত প্রকাশিত।।
(১৫৩) সোম মত্ত ইন্দ্রে হোও আমাদের জন্য প্রচুর অন্ন ও জল, যে অন্ন-জলে অন্নবান হয় আমরা হৃষ্ট হবো।।
(১৫৪) সোম ও পূষা বিশ্বের সকল পদার্থকে জানুন, যাঁরা দেবরশ্মিগণের সঙ্গে রথে যোজিত।।
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
পঞ্চম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৪ শ্রুতকক্ষ বা সুকক্ষ আঙ্গিরস, ২ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ৩ মেধাতিথি কান্ব, প্রিয়মেধ আঙ্গিরস, ৫ ইরিম্বিঠি কান্ব, ৬।১০ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৭ ত্রিশোক কান্ব, ৮ কুসীদী কান্ব, ৯ শুনঃশেপ আজীগর্তি।।
(১৫৭) হে ইন্দ্র, আমরা তোমার সখা, তোমাকেই কামনা করি। আমরা কন্বের সন্তান (অথবা বিপ্রগণ) তোমাকে মন্ত্রমালায় স্তুতি করি।।
(১৫৮) ইন্দ্রের উদ্দেশে যে মদকর সোম তাকে ঘিরে আমাদের গান হোক; গায়কেরা সোমকে অর্চনা করুন।।
(১৫৯) হে ইন্দ্র, কুশের উপরে যে পূত সোম রয়েছে তা তোমার জন্য; এখন এস, ওই সোম পান কর।।
(১৬০) পয়স্বিনী গাভীকে দোহনের জন্য দোহনকারী যেমন ডাকে আমরাও তেমনি সুকর্ম ইন্দ্রকে ডাকি আমাদের রক্ষার জন্য।।
(১৬১) হে অভীষ্টবর্ষী ইন্দ্র, সোম প্রস্তুত হলে তোমার পানের জন্য তা’ উৎসর্গ করি; সেই মদকর সোম পান করে’ তৃপ্ত হও।।
(১৬২) হে ইন্দ্র, তোমার জন্য সোম চমসে ও চমূ পাত্রে আছে। তুমি তা’ পান করে প্রভুত্ব কর।।
(১৬৩) আমরা ইন্দ্রের সখা, আমাদের রক্ষার জন্য অতি মহান ইন্দ্রকে প্রত্যেক কর্ম কৌশলে, প্রত্যেক জ্ঞানকর্মে আহ্বান করি।।
(১৬৪) হে সামগানকারী সখাগণ, এস, শীঘ্র এস, উপবেশন কর। ইন্দ্রের উদ্দেশে অন্তর দিয়ে গান কর।।
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
ষষ্ঠ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (৭ সদসস্পতি; ১০ মরুদ্গণ)
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ গাথি বিশ্বমিত্র, ২ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৩ কুসীদী কান্ব, ৪ প্রিয়মেধ আঙ্গিরস, ৫।৮ বামদেব গৌতমি, ৬।৯ শ্রৃবক্ষ বা সুবক্ষ আঙ্গিরস, ৭ মেধাতিথি কান্ব, ১০ বিন্দু বা পূতদক্ষ আঙ্গিরস।।
(১৬৬) বজ্রী ইন্দ্রের মহত্ব হোক, বল হোক বিপুল, দ্যুলোকের মত; ইন্দ্র যে শ্রেষ্ঠ ও মহান।।
(১৬৭) এস হে ইন্দ্র, মহাহস্তবিশিষ্ট; আমাদের গ্রহণযোগ্য বিবিধ অন্নধন দানের জন্য তোমার দক্ষিণহস্ত প্রসারিত কর।।
(১৬৮) সত্যের দ্যোতক, সৎকর্মের পালক, রশ্মিসমূহের অধিপতি ইন্দ্র যাতে জানতে পারেন সেইভাবে তাঁকে স্তব কর।।
(১৬৯) সদা বর্ধমান, বিচিত্রকর্মা, সখা ইন্দ্র কোন পূজাতে আমাদের কাছে আসবেন? কোন শ্রেষ্ঠ কর্মের দ্বারা বৃত হয়ে তিনি আমাদের কাছে আসবেন? (১৭০) সকল কিছু যিনি জয় করেন, সকল স্তোত্র যাঁকে প্রসারিত করে সেই ইন্দ্রকে তোমাদের মঙ্গলের জন্য মন্ত্র উচ্চারণ করে কাছে আন।
(১৭১) মহান ইন্দ্রের প্রিয়, সকলের কার্ম সর্বযজ্ঞাধিপতি অগ্নির কাছে ভক্তি ও প্রজ্ঞা যাচ্ঞা করি।।
(১৭২) যে পন্থা অবলম্বন করে তুমি দ্যুলোক থেকে অধোলোকে তোমার অশ্বরশ্মিকে প্রেরণ কর, আমাদের পৃথিবীর জন্যও তুমি সেই ভাবে তোমার কর্মে অপ্রমত্ত থাক।।
(১৭৩) হে ইন্দ্র, যখন তুমি আমাদের সুখী কর তখন হে শতকর্মা, আমাদের জন্য অন্ন বল সম্পাদন করে আমাদের সকল কিছুই ভদ্র কর।।
(১৭৪) এই সোম প্রস্তুত হয়েছে; প্রাণবায়ু মরুদ্গণ তা’ পান করুন; আর মহাভোজী অশ্বিদ্বয়ও (=দেশ ও কাল) পান করুন।।
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
সপ্তম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (৪ অশ্বিদ্ব্য, ১০ বায়ু)
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ ইন্দ্রমাতা দেবজামিগণ, ২ গোধা ঋষিকা, ৩ দধ্যঙ্ আথর্বণ, ৪ প্রস্কন্ব কান্ব, ৫ গোতম রাহুগণ, ৬ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৭ বামদেব গৌতম, ৮ বৎস কান্ব, ৯ শুনঃশেপ আজীগর্তি, ১০ উল বাতায়ন।।
অনুবাদঃ (১৭৫) কর্মকে পরিচালনা করতে ইচ্ছা করে অন্তরিক্ষে অবস্থিত পরিচালিকা শক্তিগণ সুবীর্য ইন্দ্রকে জন্মমাত্রই উপাসনা করলেন।। (১৭৬) হে দেবগণ, আমাদের কর্মে ত্রুটি করিনি কোন কাজে শৈথিল্য প্রকাশ করিনি; আমরা শ্রুত মন্ত্র অনুসারে আচরণ করি।। (১৭৭) স্বীয় কর্মে অবিচল, মহাগতিসম্পন্ন, দীপ্ত সূর্য অন্ধকার নাশ করে এসেছেন; সবিতাদেবকে স্তব কর।। (১৭৮) প্রিয় ঊষা যাঁকে এর আগে দেখা যায় নি, তিনি এখন আকাশ থেকে অন্ধকার দূর করছেন। হে অহোরাত্ররূপী অশ্বিদ্বয়, তোমাদের দু’জনকে প্রভূত স্তুতি করি।। (১৭৯) অপরাজিত ইন্দ্র লোকপালনের জন্য ধ্যানস্থ সূর্য (দধীচি) থেকে বজ্র (-অস্থি) আহরণ ক’রে অসংখ্যবার বৃত্রকে (মেঘকে) বধ করে থাকেন। (১৮০) হে ইন্দ্র এস; সকল সোমযাগে সোমপানে হৃষ্ট হয়ে বলের দ্বারা মহান হয়ে শত্রুপরাভবকারী হয়।। (১৮১) হে বৃত্রহন্তা ইন্দ্র, মহান তুমি; তোমার মহৎ পালনের জন্য আমাদের কাছে শীঘ্র এস। (১৮২) ইন্দ্রের বল বিশেষভাবে দীপ্তি লাভ করে, যখন দ্যু ও পৃথিবী উভয়ে মিলিতভাবে মেঘ সৃষ্টি করেন শরীরচর্মের মত ইন্দ্র দ্যু ও পৃথিবীকে আবৃত করে আছেন। (১৮৩) হে ইন্দ্র, এই সোম তোমার জন্য কপোত যেমন কপোতীর প্রতি বকম্ শব্দে ধাবমান হয়, তুমিও তেমনি গুরুগুরু গর্জনে সোমের প্রতি ধাবমান হও; আর সেই মেঘধ্বনিরূপ বাক্যের দ্বারা আমাদের প্রাপ্ত হও।।। (১৮৪) বায়ু আমাদের অভিমুখে প্রবাহিত হোন; তিনি ভেষজকে সকল কালেই আমাদের জন্য সুখপ্রদ করুন; তিনি আমাদের আয়ু বৃদ্ধি করুন।।
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
অষ্টম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৯
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ কান্ব, ২।৩ বৎস কান্ব (ঋগ্বেদে ২।৯ বশোহশ্ব্য), ৪ শ্রুতকক্ষ বা সুকক্ষ আঙ্গিরস, ৫ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৬ বামদেব গৌতম, ৭ ইরিম্বিঠি কান্ব, ৮ সত্যধৃতি বারুণি।।
(১৯৫) প্রকৃষ্টজ্ঞানযুক্ত বরুণ মিত্র ও অর্যমা যাঁকে রক্ষা করেন তাঁকে কোন মানুষই দ্বেষ করতে পারে না। (১৮৬) হে ইন্দ্র, গো অশ্ব ও রথলাভের ইচ্ছা হলে পূর্বে যেমন দান করতে তেমনি মহৎ দানে আমাদের ইচ্ছা পূরণ কর।। (১৮৭) হে ইন্দ্র, জাগতিক সুনিয়ন্ত্রিত ঋতকর্মে নিযুক্ত তোমার দেবরশ্মিগণ অমৃত বারিরাশি দোহন করে।। (১৮৮) হে বহুস্তুত বহুনামবিশিষ্ট ইন্দ্র, আমরা অমৃত বারিরাশির দ্বারা ধী‑বিশিষ্ট কর্মে নিযুক্ত হব যেহেতু তুমি প্রতি সোমকর্মে (=বারিসৃষ্টিকর্মে) উপস্থিত থাক।। (১৮৯) পবিত্রা অন্নবর্তী কর্মফলদাত্রী বাক্ জলের অধিষ্ঠাত্রী সরস্বতী দেবী আমাদের যজ্ঞকে কামনা করুন।। (১৯০) মানুষের মধ্যে কে ইন্দ্রকে সোমের দ্বারা প্রীত করতে পারে? তিনিই আমাদের সর্বসম্পদে পূর্ণ করেছেন।। (১৯১) হে ইন্দ্র, এস; তোমার জন্য এই চারু সোম, তুমি পান কর; এই যজ্ঞাসনে বস।। (১৯২) দ্যুলোকস্থ দুরাধর্ষ মিত্র অর্যমা ও বরুণ এই তিনি মহান্ দেবের পালন আমাদের রক্ষা করুক।। (১৯৩) হে বহুধন, উদক ও যজ্ঞের নেতা ইন্দ্র, তোমাসদৃশ দেবকেই আমরা কামনা করি, তুমি সকল দেবরশ্মিরূপ অশ্বের অধিষ্ঠাতা।।
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
নবম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ প্রগাথ কান্ব, ২ গাথি বিশ্বামিত্র, ৩।১০ বামদেব গৌতম, ৪।৬ শ্রুতকক্ষ আঙ্গিরস, ৫ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৭ গৃৎসমদ শৌনক, ৮।৯ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য।।
(১৯৪) হে বজ্রধারী ইন্দ্র, সোমসকল তোমাকে উত্তমরূপে হর্ষান্বিত করুক; আমাদের ধন প্রদান কর; আর ব্রহ্মদ্বেষীকে বিনাশ কর।। (১৯৫) হে স্তুতিপ্রিয় ইন্দ্র, মধুর সোমধারায় তোমার পূজা হয়ে থাকে; তুমি আমাদের সোম পান কর। হে ইন্দ্র, যশরূপ অন্ন তোমারই দান।। (১৯৬) ইন্দ্র সর্বদাই তোমাদের জন্য পুনঃ পুনঃ কর্ষণের ব্যবস্থা করেন; সেই যথার্থ অনুষ্ঠাতাকেই কামনা কর; কোন দেবতাই শূর ইন্দ্রের মত আচ্ছাদিত করতে পারেন না।। (১৯৭) নদীসকল যেমন সমুদ্রে মেশে তেমনি সকল সোমধারাই তোমাতে মিলিত হয়; হে ইন্দ্র, তোমাকে কেহ অতিক্রম করতে পারে না।। (১৯৮) সাম গায়কেরা (=সামগান গায়কেরা) বৃহৎ সামে, ঋগ্বেদীয় হোতাগণ ঋক্ মন্ত্রে, যজুর্বেদীগণ যজুর্মন্ত্রে ইন্দ্রকেই স্তব করেন।। (১৯৯) ইন্দ্র আমাদের অন্নদান ইচ্ছা করে অন্তরিক্ষে নিবাসী সূর্যরশ্মিসমূহ থেকে আহৃত বৈদ্যুতিক জ্যোতিরূপ ধন দান করেন; (বাজী=) অন্ন বল ও বাকের অধিকর্তা ইন্দ্র, (সেই বৈদ্যুতিক জ্যোতি থেকে সৃষ্ট) অন্ন বল ও বাক্ দান করুন।। (২০০) ইন্দ্র অবিলম্বে মহৎ ভয়ে ভীতগ্রস্ত অবস্থা থেকে মুক্ত করুন; তিনি স্থিরপ্রজ্ঞ ও বিশ্বদ্রষ্টা।। (২০১) হে স্তুতিপ্রিয় ইন্দ্র, প্রতি সোম অভিষবে আমাদের সকিল স্তুতি তোমা অভিমুখে ধাবিত হয়, গোবৎসের প্রতি গাভী যেমন যায়।। (২০২) ইন্দ্র ও পূষাকে আমরা সখ্যতার জন্য, মঙ্গলের জন্য ও বিপুল ধনের জন্য আহ্বান করি।। (২০৩) হে বৃত্রহন্তা ইন্দ্র, তোমার ওপরে কোন দেবতা নেই, তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন দেবতা নেই, আর তুমি যেমন, তেমন কোন দেবতাও নেই।।
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
দশম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৪ ত্রিশোক কান্ব, ২ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৩ বৎস কান্ব (ঋগ্বেদে অশ্বপুত্র বশ), ৫ সুকক্ষ আঙ্গিরস, ৬।৯ বামদেব গৌতম, ৭ গাথি বিশ্বামিত্র, ৮ গোষুক্তি ও অশ্বসুক্তি কান্ব, ১০ শ্রুতকক্ষ বা সুকক্ষ আঙ্গিরস।।
(২০৪) তোমাদের সকলের জন্য উদকযুক্ত অন্ন-বলের অবাধ উদ্ঘাটক, সমদৃষ্টিসম্পন্ন, দক্ষ, আদরণীয় ইন্দ্রকে স্তব করি। (২০৫) হে ইন্দ্র, আমি তোমার উদ্দেশে মন্ত্র উচ্চারণ করছি; তুমি বর্ষণশীল, রক্ষক; তোমাকে প্রাপ্ত হবে বলে এই স্তুতি ঊর্ধ্বলোকে গমন করছে; তুমি তা প্রীতির সঙ্গে গ্রহণ করেছ। (২০৬) হিংসাশূন্য, দ্বাষশূন্য প্রাণবায়ু মরুৎগণ যাঁকে রক্ষা করেন, শত্রুভূত অন্ধকারনাশক অর্যমা (=আদিত্য) যাঁকে রক্ষা করেন, মরণ থেকে ত্রাণকারী মিত্র (=আদিত্য) যাঁকে রক্ষা করেন, সেই মানুষই দেবতার স্তুতিকরণে সুসমর্থ হয়। (২০৭) হে ইন্দ্র, দৃঢ় দুর্গম স্থানে, স্থাবর, মেঘের মধ্যে যে ধন তুমি গুপ্ত রেখেছ সেই স্পৃহণীয় ধন আমাদের জন্য আন। (২০৮) শ্রুতকীর্তি, বৃত্রহন্তা, জনগণের যজ্ঞকর্মে উৎসাহী ইন্দ্রের কাছে তোমাদের জন্য সর্বসিদ্ধিকর মহাধন কামনা করি। (২০৯) হে শূর, হে ইন্দ্র, তোমার মত প্রচুর যশ ইচ্ছা করে তোমার কাছে এসেছি। হে দানসমর্থ দেব, এমন ভাবে দাও যেন উছলে পড়ে।। (২১০) হে ইন্দ্র, আমাদের এই প্রাতঃকালীন যজ্ঞে তোমার উদ্দেশে ভাজা যবের ছাতু, দধিমিশ্রিত সোম ও আস্কে পিঠে যা নিবেদন করলাম এবং যে স্তুতি করলাম তা’ তুমি গ্রহন কর। (২১১) হে ইন্দ্র, যখন বর্ষণবিমুখ মেঘের (=নমুচির) মস্তক আকাশে অবস্থিত জলরাশির ফেনার আঘাতে ছিন্ন করলে তখন তুমি সকল স্পর্ধমান মেঘকেই জয় করলে। (২১২) হে ইন্দ্র, এই যা কিছু সোম (=বারিরাশি) সৃষ্ট হয়েছে, তা’ তোমার জন্যই হয়েছে। হে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধনের ঈশ্বর, তুমি তাদের পেয়ে হর্ষান্বিত হও। (২১৩) হে বিভাবসু, তোমার জন্যই অভিষুত সোম অন্তরিক্ষ বিস্তৃত হয়েছে; হে ইন্দ্র, স্তুতিকারকদের জন্য সুখপ্রদ হও।
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
একাদশ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৯
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ শুনঃশেপ আজীগর্তি, ২ শ্রুতকক্ষ বা সুকক্ষ আঙ্গিরস, ৩ ত্রিশোক কান্ব, ৪।৯ মেধাতিথি কান্ব, ৫ গোতম রাহুগণ, ৬ ব্রাহ্মতিথি কান্ব, ৭ গাথি বিশামিত্র বা জমদগ্নি ভার্গব, প্রস্কন্ব কান্ব।
(২১৪) অন্নকামিগণ যেমন কূপকে সেচন করে তেমনি তোমাদের জন্য শতকর্মা শ্রেষ্ঠদাতা ইন্দ্রকে সোমরসে সিক্ত করি।।
(২১৫) হে ইন্দ্র, শতবল ও সহস্র অন্নের সঙ্গে দ্যুলোক হতে আমাদের কাছে এস।।
(২১৬) মেঘবিদারণকারী ইন্দ্র জন্মেই তীক্ষ্ণ বাণ ধারণ করলেন, আর জিজ্ঞাসা করলেন মাতাকে, কারা উগ্র বলে খ্যাত, কেই বা তাদের কথা শুনেছে?
(২১৭) উদকরূপ প্রসারিত বাহুর দ্বারা পালনের জন্য, রশ্মিদানরূপ সুকর্মের দ্বারা আশ্রয়দানের জন্য মহান স্তুতিযুক্ত ইন্দ্রকে ডাকি।।
(২১৮) বরুণ ও মিত্র আমাদের ভক্তিভাব জেনে আমাদের ঋজুপথে নিয়ে যায়; দেবগণসহ অর্যমাও প্রীতির সঙ্গে আমাদের ঋজুপথে নিয়ে চলুন।।
(২১৯) দূরে থেকেও উজ্জ্বলদীপ্তি ঊষা তাঁর শ্বেতরূপ বিশ্ব আকাশে ছড়িয়ে দেন।।
(২২০) হে শোভনকর্ম-বিশিষ্ট মিত্র ও বরুণ, আমাদের গোষ্ঠ ঘৃতপূর্ণ কর; পৃথিবী মধুময় হোক।।
(২২১) মরুদগণ সকল বাণী সৃষ্টি করেন; তাঁরা ধেনুর মত শব্দ করতে করতে বারিরাশির বিস্তারের দ্বারা কর্ম সাধন করেন।।
(২২২) বিষ্ণুর স্থান অন্তরিক্ষে দৃঢ়রূপে স্থাপিত; তিনি সেইখানে অবস্থিত থেকেই তিনি প্রকার পদ স্থাপনের দ্বারা (=উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ণ ও বিষুবসংক্রান্তি) এই চরাচর বিশ্ব পরিক্রমা করেন।। [বিষ্ণু=সূর্য]।।
সামবেদ - ২য় অধ্যায় ঐন্দ্র কাণ্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
দ্বাদশ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৭।৮ মেধাতিথি কান্ব, ২ বামদেব গৌতম, ৩।৫ মেধাতিথি কান্ব ও প্রিয়মেধ আঙ্গিরস, ৪ গাথি বিশ্বামিত্র, ৬ দুর্মিত্র বা সুমিত্র কৌৎস, ৯ গাথি বিশ্বামিত্র বা অভীপাদ্ উদল, ১০ শ্রুতকক্ষ আঙ্গিরস।।
অনুবাদঃ (২২৩) হে ইন্দ্র, তুমি সব সময়ে এস; আন্তরিকতার সঙ্গে প্রস্তুত আমাদের সোম গ্রহণের জন্য এস। আর এই সোম আমাদের ধনদান করবে বলে পান কর।। (২২৪) প্রকষ্টজ্ঞানী মহান দেবতার উদ্দেশে কেনই বা এই স্তুতি? কারণ তা’ স্তুতিকারীর ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করে।। (২২৫) স্তুতিকারীর স্তুতি আর গায়কের গায়ীছন্দের গান অসমর্থ ও বিদ্বেষীর বোধগম্য হয় না।। (২২৬) স্তুতি দ্বারাই ইন্দ্র অত্যন্ত হৃষ্ট হন; তিনিই সকল অন্ন বল ও বাকের অধিপতি; তিনিই রশ্মির অধিপতি; তিনিই সোমজ্ঞদের (=আনন্দবোধ-প্রাপ্তদের) সখা।। (২২৭) যুবতী পত্নীর প্রতি মহান স্বামীর মত আমাদের সঙ্গে ব্যবহার কর, ক্রুদ্ধ হয়ো না; হে ইন্দ্র, আমাদের অন্ন-বল দেবে বলে আমাদের এই অভিষুত সোমের কাছে এস।। (২২৮) নদী, খাল, বিল যেমন বারিরাশিকে বদ্ধ করে তেমনি কবে আমাদের স্তোত্র তোমাকে আমাদের বশে আনতে পারবে? হে ধনস্বামী, আমাদের এই সোমযাগ প্রচুর বারিবর্ষণ কামনা করে।। (২২৯) হে ইন্দ্র, তুমি ঋতুদের সোম পানের পর ব্রহ্মজ্ঞ স্তুতিকারীর ধনভূত সোমপাত্র থেকে সোম পান কর; হে ইন্দ্র, তোমার সখ্যতাই অবিচ্ছিন্ন।। (২৩০) হে স্তুতিপ্রিয় ইন্দ্র, আমরা তোমার স্তোতা বলেই হে সোমপায়ী, আমাদের প্রীত কর।। (২৩১) হে ইন্দ্র, কিরূপ সংগ্রামে তুমি আমাদের দেহে বল দেবে? হে সকল সোমযজ্ঞজয়ী, হে উগ্রবল, আমাদের বল দাও।। (২৩২) হে শূর, তুমি অবিচল, তুমি বীর্যকামী, তুমি এইরূপ; তোমার আরাধ্য মনও এইরূপ।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
প্রথম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৬।৯ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ২ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য (ঋগ্বেদে শংযু বার্হস্পত্য, ৩ প্রস্কণ্ব কাণ্ব (বালখিল্য সুক্তমন্ত্র), ৪ নোধা গৌতম, ৫ কলি প্রাগাথ, ৭ মেধাতিথি কাণ্ব, ৮ ভর্গ প্রাগাথ, ১০ প্রাগাথ ঘৌর কাণ্ব।।
অনুবাদঃ (২৩৩) দোহন করা হয় নি এমন পয়স্বিনীদের মত আমরা স্তুতিভারে অবনত হয়ে, হে শূর, তোমার কাছে এসেছি। হে ইন্দ্র, তুমি জঙ্গমের ঈশ্বর, তুমি স্থাবরের ঈশ্বর, তুমি সর্বদর্শী।। (২৩৪) আমরা স্তোতারা তোমাকেই ডাকি অন্নবল লাভের আশায়, হে ইন্দ্র, যে তুমি মেঘপুঞ্জে অবস্থিত জলরাশির মধ্যে অশ্বরশ্মিরূপে অবস্থান করে মেঘবিদারণের দ্বারা সৎকর্মসাধক হও, নরগণ সেই তোমাকেই ডাকে।। (২৩৫) আমি যেমন করি তোমরাও তোমাদের মঙ্গলের জন্য শোভন সর্বসিদ্ধিকর ধনবিশিষ্ট ইন্দ্রের কাছে সেইভাবে প্রার্থনা কর, তিনি মহানদাতা বহুধনযুক্ত এবং স্তোতাকে সহস্র প্রকারে দান করে থাকেন।। (২৩৬) তোমাদের জন্য সেই দর্শনীয় জগৎনিয়ামক, সোমে বাসকারী, অন্নের দ্বারা হৃষ্ট ইন্দ্রকে মন্ত্ররূপ শব্দের দ্বারা স্তুতি করি যেমন গোষ্ঠে ধেনুগণ বাছুরকে (সন্তানকে) ডাকে।। (২৩৭) তোমাদের সব কিছু রক্ষার জন্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ও আন্তরিকতার সঙ্গে, অহিংসিত সোমযজ্ঞে, বৃহৎ সামগানে, সেই ইন্দ্রকে আহ্বান করি যিনি প্রচুর লাভে হৃষ্ট ব্যক্তির ন্যায় ধনশালী।। (২৩৮) প্রজ্ঞার দ্বারা যুক্ত হয়ে ক্ষিপ্রকারী ব্যক্তিই ধনসেবা করে থাকেন। বহু ব্যক্তির দ্বারা আহুত ইন্দ্রকে স্তুতির দ্বারা নত হয়ে তোমাদের জন্য বেষ্টিত করি, যেমন সূর্য সুগমনের দ্বারা সংবৎসরকে বেষ্টন করেন।। (২৩৯) হে ইন্দ্র, আমাদের দেওয়া উদকযুক্ত এই রসাল সোম পান করে হৃষ্ট হও। তুমি আমাদের বন্ধু বলে মনে কর; সোমপানে হৃষ্ট হয়ে তোমার ধী বৃদ্ধি হোক আমাদের রক্ষার জন্য।। (২৪০) তুমি ভজনীয় একথা জেনে শ্রদ্ধা নিবেদনকারীর কাছে, ধনকামীর কাছে এস; হে উত্তমদাতা ইন্দ্র, ইচ্ছাপূরণের জন্য, মহাগতির জন্য ঊর্ধ্বে অবস্থান করে বারবার বর্ষণ কর।। (২৪১) বসিষ্ঠ তোমাদের কাউকেই অবহেলা করেন না। হে প্রাণরূপী মরুদ্গণ, সোম কামনা করে তোমরা সকলে মিলিত হয়ে আজ আমাদের সোমযাগে এস।। (২৪২) হে সখাগণ, তোমার অন্যের পূজা করো না। কাউকে হিংসাও করো না। বর্ষণকারী ইন্দ্রকেই একত্র মিলত হয়ে স্তোত্র ও গানের দ্বারা মুহুর্মুহু স্তব কর।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
দ্বিতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ পুরুহন্মা আঙ্গিরস, ২।৩ মেধাতিথি ও মেধ্যাতিথি কাণ্ব, ৪ গাথি বিশ্বামিত্র, ৫ গোতম রাহুগণ, ৬ নৃমেধ ও পুরুমেধ আঙ্গিরস, ৭।৮।৯। মেধাতিথি বা মেধ্যাতিথি কাণ্ব (ঋগ্বেদে মেধাতিথি), ১০ দেবাতিথি কাণ্ব।।
অনুবাদঃ (২৪৩) যিনি সদা বৃদ্ধিশীল, যিনি যজ্ঞেয় দ্বারা সর্বস্তুতিযোগ্য, মহান, অপরাজিত ও অতিনিপুণ, সেই ইন্দ্রকে কেহই বলের দ্বারা বা কর্মের দ্বারা জানতে পারে না।। (২৪৪) যিনি পূর্বেই, সংযোগকারী বস্তু ব্যতিরেকেই, বস্তু ব্যতিরেকেই, বিচ্ছিন্ন অস্থিকে জোড়া দেন, যিনি বিচ্ছিন্ন বস্তুকে বারবার সংস্কার করেন, সেই সংস্কারকর্তা, সংযোগকারীই বহুধন অতিদাতা ইন্দ্র।। (২৪৫) হে ইন্দ্র, উদকহরণের জন্য বেগবান, স্তুতিযুক্ত, শতসহশ্র কিরণরাশি তোমাকে সোমপানের জন্য বহন করুক।। (২৪৬) হে ইন্দ্র, ময়ূরপেখমের মত উজ্জ্বল, বিচিত্র রশ্মিযুক্ত হয়ে আনন্দে মত্ত হয়ে এস; ব্যাধ যেমন তার শিকারকে ঘিরে ফেলে সেভাবে তোমার আগমনে যেন কেউ বাধা না দেয়; মরুপ্রান্তর অতিক্রমকারীর মত সকল বাধা দূর করে এস।। (২৪৭) হে অতিবলইন্দ্র, তুমি দীপ্যমান, (তাই) স্তুতিরত মানুষকে অবিলম্বেই প্রশংসিত কর; হে মঘবা, তুমি ভিন্ন আর কেউ সুখদাতা নেই; আমি তোমারই স্তুতি করে থাকি।। (২৪৮) হে ইন্দ্র, তুমি বলপতি, সোমবান ও যশস্বী; তুমি একাই অপ্রতিহতগতিতে বৃত্রহনন কর; তুমিই জনগণপালক।। (২৪৯) একমাত্র ইন্দ্রকেই যজ্ঞের জন্য, ইন্দ্রকে যজ্ঞকালে দান উৎসর্গের জন্য, ইন্দ্রকে সকলে মিলিতভাবে ভজনার জন্য, ইন্দ্রকে ধনলাভের জন্য আমরা আহ্বান করি।। (২৫০) হে বহুধন, আমার এই যা কিছু স্তুতি তোমাকে বর্ধিত করুক, অগ্নির মত তেজোদীপ্ত ও শুচি বিদ্বান্গণ তোমাকেই স্তুতি করেন।। (২৫১) আর অতি মধুর বাক্যের মন্ত্রমালা যা শত্রুকে জয় করে, যা ধনদ, যা অক্ষয়রক্ষাকারী ও অথের মত বেগবান্ তা ঊর্ধ্বে যাচ্ছে (ইন্দ্রকে পাবে বলে)।। (২৫২) মৃগ তৃষ্ণার্ত হলে যেমন জলপুর্ণ স্থানের অভিমুখে যায়, তুমিও তেমনি, হে ইন্দ্র, তোমার সোমপানের সময় হলে আমাদের কাছে অবশ্যই এস। আমরা কণ্বগণ, আমাদের সঙ্গে একত্র সোমপন কর।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
তৃতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ ভর্গ প্রাগাথ, ২।৮। রেভ কাশ্যপ, ৩ জমদগ্নি ভার্গব, ৪।৯ মেধাতিথি কান্ব (ঋগ্বেদে মেধ্যাতিথি কান্ব), ৫।৬ নৃমেধ ও পুরুমেধ আঙ্গিরস, ৭ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ১০ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য (ঋগ্বেদে শংবু বার্হস্পত্য)।।
অনুবাদঃ (২৫৩) সকল বল ও কর্মের অধিপতি হে ইন্দ্র, তুমি সকল বলকর্মে অবস্থিত থেকে সমস্ত প্রকারে আমাদের রক্ষা কর। হে শূর, উদয়কালীন সূর্যের জ্যোতিকে যেমন লোকে ভজনা করে সেরূপ যশস্বী ও ধনপ্রাপক তোমাকে ভজনা করি।। (২৫৪) হে ইন্দ্র, অসুররূপী মেধ হতে (=মেঘ বিদীর্ণ করে’) যে প্রাণধন (=বারিরাশি) সকলের ভোগের জন্য আহরণ করেছ তার দ্বারা, হে ধনবান্, যারা তোমার স্তবকারী ও যজ্ঞকারী মিত্রদেবের উদ্দেশে, অন্ধকারনাশক দেব অর্যমার উদ্দেশে, আশ্রয়দাতা দেব বরুণের ছন্দে বাক্যে স্তোত্রে গান কর।। (২৫৬) হে ইন্দ্র, তুমিই প্রথমে সোমপান করবে বলে মানুষেরা তোমার উদ্দেশে বারবার গান করছে; আর একত্র মিলিতভাবে অবস্থিত বৈদ্যুতিক জ্যোতিসমূহ ও শব্দায়মান রুদ্রগণ প্রথমাবধি সমস্বরে তোমার আনুকূল্যের জন্য গম্ভীর গর্জন করে চলেছেন। (২৫৭) হে প্রাণবায়ু মরুদ্গণ, মহান ইন্দ্রের উদ্দেশে ব্রহ্মসঙ্গীতে উপাসনা কর; শতকর্মা বৃত্রনাশকারী ইন্দ্র শতপর্ববিশিষ্ট বজ্রের দ্বারা বৃত্রমেধকে বধ করেন।। (২৫৮) বৃত্রবিনাশকারী মহান সঙ্গীত শুরু কর, হে মরুদ্গণ; সদাদীপ্ত ইন্দ্রকে জাগরুক ভাখবার জন্য সকল দেবরশ্মিগণ যেন জ্যোতিঃ উৎপন্ন করতে পারেন।। (২৫৯) হে ইন্দ্র, পিতা যেমন পুত্রদের জ্ঞানদান করেন তেমনি তুমিও আমাদের জ্ঞান দাও; হে বহুস্তুত দেবতা, আমাদের চলার পথ এমন ভাবে অভ্যস্ত কর যেন আমরা জ্যোতিষ্মান সূর্যকে নিত্যই প্রাপ্ত হই।। (২৬০) হে ইন্দ্র, আমাদের পরিত্যাগ করো না, আমাদের সঙ্গে আনন্দহৃদয়ে মত্ত হও; তুমিই আমাদের রক্ষা, তুমিই বন্ধু; আমাদের ছেড়ে যেও না।। (২৬১) হে বৃত্রহন্তা (=মেঘবিদারণকারী ইন্দ্র), সম্প্রতি তুমি অন্তরিক্ষে বিস্তৃত যে বারিরাশি দান করলে, আমরা সোমবান স্তোতারা সেই পবিত্র প্রস্রবণকে ঘিরে বসেছি। আর আমাদের মনও তোমা অভিমুখে নিম্নগতি বারির মত যাচ্ছে।। (২৬২) হে ইন্দ্র, মনুষ্যসমাজে যে কিছু ধন ও বল আছে, আর যা কিছু অন্নধন আছে পঞ্চভূতে, তুমি তা সকলই অমিতবলে আমাদের জন্য নিয়ে এস।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
চতুর্থ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ মেধাতিথি কাণ্ব (ঋগ্বেদে মেধ্যাতিথি কাণ্ব), ২ রেভ কাশ্যপ, ৩ বৎস (ঋগ্বেদে অশ্বপুত্র বশ), ৪ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য (ঋগ্বেদে শংযু বার্হস্পত্য), ৫ বৃমেধ আঙ্গিরস, ৬ পুরুহন্মা আঙ্গিরস, ৭ বৃমেধ ও পুরুমেধ আঙ্গিরস, ৮ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ৯ মেধাতিথি ও মেধ্যাতিথি কাণ্ব, ১০ কলি প্রাগাথ।।
অনুবাদঃ (২৬৩) একথা সত্য যে, তুমি ইচ্ছাপূরণকারী এবং উদ্যোগী পুরুষের মত উৎসাহযুক্ত; তুমি আমাদের রক্ষক। হে উগ্রবল, তুমি ইচ্ছাপূরণকারী, এরূপ খ্যাতি তোমার আছে; দূরে এবং কাছে সর্বত্র তোমার খ্যাতি শোনা যায়।। (২৬৪) হে সামর্থ্যযুক্ত ইন্দ্র, তুমি দূরে থাক আর কাছে থাক, সেখান থেকে অশ্বরশ্মিযুক্ত তোমাকে স্তুতির দ্বারা ক্ষিপ্রতার সঙ্গে নিকটে আনছেন তাঁরা যাঁরা সোমবান।। (২৬৫) তোমরা সেই শক্তিমান ইন্দ্রের কাছে নত হয়ে, অন্নলাভে হৃষ্ট হয়ে বিশ্ববিশ্রুত অন্নদাতা ও আনন্দে আত্মহারা মহাচৈতন্য ইন্দ্রের উদ্দেশে, যেরূপ বাক্যে স্ফূর্তি হয় সেরূপ বাক্যে গান মহাসঙ্গীত কর।। (২৬৬) হে ইন্দ্র, আমাদের কল্যাণের জন্য অন্ন-জল-তেজরূপ তিনপ্রকার আশ্রয় থেকে উৎপন্ন তনূত্রাণকারী মন-প্রাণ-বাক্ দাও; প্রচুর ধনসম্পদ রক্ষার জন্য গৃহ দাও; আর আমার জন্য আমার তেজস্বী দীপ্তিমান কান্তির জন্য এই সকল একত্র সমবেত কর।। (২৬৭) রশ্মিগণ যেমন সূর্যের সেবা করেন তেমনি, যারা জন্মেছে এবং যারা জন্মাবে তাদের মধ্যে নিজ মাহাত্মবলে রশ্মিগণ ইন্দ্রের সমস্ত ধন ভাগ করে দেবেন বলে ইন্দ্রের সেবা করেন; আর আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ধনের মত সেই ধন গ্রহণ করি।। (২৬৮) হে চিরজীবী ইন্দ্র, মর্ত্যের মানুষ সেই কাম্যধনকে বিচ্ছিন্নভাবে (=স্বার্থপর ব্যক্তির মত একাকী) ভোগ করতে পারে না, কারণ ইন্দ্রই (জীবাত্মা-পরমাত্মা অথবা দেশ-কালরূপ) হরি নামক বিচিত্র দীপ্ত অশ্বরশ্মি দুটিকে সর্বদাই একত্র যুক্ত করে রেখেছেন।। (২৬৯) আমাদের মঙ্গলের জন্য সকল যজ্ঞে আহবানযোগ্য, বৃত্রনাশক (মেঘবিদারণকারী), স্তুতিদ্বারা সম্বোধনযোগ্য ইন্দ্রকে সকল ভক্ষণীয় বস্তু নিবেদনের দ্বারা অলঙ্কৃত কর।। (২৭০) হে ইন্দ্র, অধম ধন তোমারই; মধ্যপ ধনও তুমি পালন কর; বিশ্বের পরমধনে তুমিই বিরাজ কর। রশ্মিসমূহের দ্বারাই তুমি এ সমস্ত কর আর সে বিষয়ে তোমাকে কেঊ বাধা দিতে পারে না।। (২৭১) হে বহুজনের ত্রাতা ইন্দ্র, তুমি কোথায় গিয়েছ? এখন কোথায় আছো? তোমার মন নানাদিকে। হে সংক্ষুব্ধকারী ধর্মযোদ্ধা, হে দেহপুরবিদারক আত্মা, সামগানকারীরা তোমার উদ্দেশে গান করছেন; তুমি এস।। (২৭২) আমরা আজ এবং কাল বজ্রযুক্ত ইন্দ্রকে যজ্ঞে আপ্যায়িত করবো। আজ এই প্রখ্যাত যজ্ঞে তাঁরই উদ্দেশে অভিষুত সোম অবশ্যই আন, তাঁকে ভূষিত কর।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
পঞ্চম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (৩ মন্ত্রের দেবতা ইন্দ্র বা বাস্তোস্পতি; ৪ সূর্য, ৯ ইন্দ্রাগ্নী)।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৬ পুরুহন্মা আঙ্গিরস, ২ ভর্গ প্রাগাথ, ৩ ইরিম্বিঠি কাণ্ব, ৪ জমদগ্নি ভার্গব, ৫।৭ দেবাতিথি কাণ্ব, ৮ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ৯ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ১০ মেধ্য কাণ্ব।।
অনুবাদঃ (২৭৩) যিনি মানুষের রাজা, রশ্মিসহায়ে অপ্রতিহতগতিযুক্ত ও পুনঃ পুনঃ ভ্রমণকারী, যিনি সকল সংগ্রামে ত্রাণকর্তা সেই শ্রেষ্ঠ ও বৃত্রহননকারী ইন্দ্রকে স্তব করি। (২৭৪) হে ইন্দ্র, যা থেকে আমরা ভয় পাই তা থেকে আমাদের অভয় কর। হে মঘবা, তুমি ক্ষমতাশালী, আমাদের রক্ষার জন্য তোমার সামর্থ্যের দ্বারা হিংসাকারী শত্রুদের বিনাশ কর। (২৭৫) হে গৃহপালক দেবতা, সোমযজ্ঞকারীদের সোমযজ্ঞরূপ স্তম্ভকে দৃঢ় ও অবিচল কর। (পরমাত্মা) ইন্দ্র সকল দেহ ভেদ করে প্রবেশ করে প্রতি জীবদেহে বিন্দুবৎ (আত্মারূপে) অবস্থান করেন, তিনি মুনিগণের সখা।। (২৭৬) হে সূর্য, তুমি সত্যই মহান; হে আদিত্য, তুমি সত্যই মহান; তোমাকে লক্ষ্য করে যে মহাসঙ্গীত তা’ তোমারই মতই মহান; হে দেব, বৃষ্টি প্রভৃতি দানরূপ মহৎ কর্মের দ্বারা তুমি মহান হয়েছ।। (২৭৭) হে ইন্দ্র, যাঁরা তোমার সখা তাঁরা ব্যাপ্তিযুক্ত, পৌরুষযুক্ত রূপবান ও জ্ঞানবান; তারা সর্বদা পাখীর মত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গমন করেন এবং সভাস্থলে চন্দ্রের মতন স্নিগ্ধকান্তিযুক্ত হয়ে শোভিত হন।। (২৭৮) হে ইন্দ্র, দ্যুলোক এবং পৃথিবী যদি শতশতও হয় তবু তারা তোমার মহিমা প্রকাশ করতে পারে না। হে বজ্রধারী, সহস্র সূর্যও তোমাকে প্রকাশ করতে পারে না; যারা জন্মেছে তারা, এবং দ্যুলোক ও পৃথিবী কেহই তোমাকে ব্যাপ্ত করতে পারে না।। (২৭৯) হে ইন্দ্র, যখন তুমি পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ সকল দিকের সকল মানুষের দ্বারা আহূত হও তখন উদ্যোগী সেই সকল মানুষের যজ্ঞকর্মের কাছে তাদের প্রীতির জন্য তুমি উপস্থিত থাক।। (২৮০) হে ইন্দ্র, কোন্ মানুষ তোমার ধনকে অতিক্রম করতে পারে? হে মঘবা, যাঁরা তোমার প্রতি শ্রদ্ধাশীল তাঁরাই ঊর্ধ্বে দ্যুলোকস্থিত অন্ন-বল-বাক্রূপ ধনকে লাভ করতে পারেন।। (২৮১) হে ইন্দ্র ও অগ্নিদেব, এই সেই ঊষা যিনি পাদরহিত হয়েও পাদযুক্ত প্রাণিবর্গের নিদ্রা ত্যাগ করিয়ে মস্তক উত্তোলন করাচ্ছেন, তারা এখন কথা বলতে আরম্ভ করেছে; আর এইভাবেই ঊষাদেবী প্রতিদিন তিরিশ পা অতিক্রম করেন। (২৮২) হে ইন্দ্র, কাছে এস সকল প্রজ্ঞা ও কল্যাণের সঙ্গে। হে অতি সুখপ্রদ, সকল সুখ ও অভিলষিত বস্তুর সঙ্গে এবং নিদ্রাকালে আত্মার অতীন্দ্রিয় সুখানুভূতির সঙ্গে এস। [স্বাপ=নিদ্রা]। স্বাপেভিঃ স্বাপম্=নিদ্রাজনিত আত্মার নির্গুণ অতিন্দ্রিয় সুখ (শ্রীধর – ভাগবত ৬।১৬।৫৫)।
১ নৃমেঘ আঙ্গিরস, ২।৩ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ৪ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য (ঋগ্বেদে শংযু বার্হস্পত্য), ৫ পরুচ্ছেপ দৈবদাসি, ৬ বামদেব গৌতম, ৭ মেধ্যাতিথি কান্ব, ৮ ভর্গ প্রাগাধ, ৯।১০ মেধাতিথি ও মেধ্যাতিথি কাণ্ব।।
অনুবাদঃ (২৮৩) তোমাদের মঙ্গলের জন্য তোমরা জরারহিত (অবিনাশী), সংবৎসরচক্রের প্রবর্তক, অপ্রতিহত, ক্ষিপ্রগামী, জয়শীল, যজ্ঞ নির্বাহক, অহিংস, জলবর্ধক ইন্দ্রের পথে চল (=সত্যপথে চল)।। (২৮৪) হে ইন্দ্র, তুমি উদকের দ্বারা সমস্ত হবির প্রভু; আমাদের থেকে দূরে অবস্থিত উদকবহনকারী রশ্মিগণই যেন তোমার সঙ্গে বারবার আনন্দে মত্ত না থাকে। আমাদের সঙ্গে আনন্দে মত্ত হবে বলে, হে ইন্দ্র, তুমি কাছে এস; আমাদের প্রার্থনা শোন।। (২৮৫) যিনি জলরাশি পালনের দ্বারা সকল দ্রব্যকেই সিদ্ধবস্তুতে পরিণত করেন সেই বজ্রধারী সোমরক্ষক ইন্দের উদ্দেশে সোমরস প্রস্তুত কর ও নিবেদন কর; তিনিই প্রীত হয়ে সুখ দান করবেন।। (২৮৬) যিনি বিধ্ননাশক ও সর্বদর্শী সেই ইন্দ্রকে আমরা ডাকি। হে অশেষ ক্ষমতাশালী, অতুলবিত্ত, সৎকর্মা ইন্দ্র, তুমি আমাদের বৃদ্ধির জন্য আমাদের সকল প্রয়াসে থাক।। (২৮৭) হে জ্ঞান-কর্ম-বাক্যরূপ ধনের অধিপতি অশ্বিদ্বয় (=অহোরাত্র অথবা দেশ ও কাল), তোমরা দুজন জ্ঞান-কর্ম-বাক্যের দ্বারা দিবারাত্র আমাদের অনুগ্রহ কর। তোমাদের দুজনের দান যেন কখনও ক্ষয় না হয়, আমাদের দানও যেন কখনও নিঃশেষ না হয়।। (২৮৮) যখন যে সময়ে স্তুতিশীল মানুষ মুক্তহস্তে দানকারী দেবতার উদ্দেশে গান করতে চায় তখনই সে সকল ব্রতকর্মের ধারক বরুণদেবের (=সূর্যের) উদ্দেশে নিবিষ্টচিত্তে গান করুক।। (২৮৯) হে মেধাতিথি যিনি (বৃষ্টিদানের জন্য উদক ও বিদ্যুতের মিশ্রণকর্তা, যিনি হিরণ্যবর্ণ ব্রজধারী সেই হিরণ্যরূপ আনন্দে মত্ত ইন্দ্রের দান অন্ন-ধনকে রক্ষা কর।। (২৯০) ইন্দ্র আমাদের মুখের বাণী ও অন্তরের বাণি শ্রবণ করুন। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অতিদাতা অতিবল ইন্দ্র কর্ম ও প্রজ্ঞাসহায়ে সোমপানের জন্য আসুন।। (২৯১) হে মেঘবিদারণকারী ইন্দ্র, তোমার মহৎ দান শুল্কের (=মূল্যের) বিনিময়ে পাওয়া যায় না, হে বজ্রহস্ত, হে শতধন, শত-সহস্র-অযুত দানের বিনিময়েও নয়।। (২৯২) হে ইন্দ্র, তুমি আমার পিতা ও ভ্রাতা অপেক্ষা অনেক উদার ও ধনসম্পন্ন। হে বসু, তুমি মায়ের মত এবং সংবৎসররূপে আমাকে সর্বসিদ্ধিকর ধনে আচ্ছাদিত কর।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
সপ্তম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (৭ মন্ত্রের দেবতা বহু)।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ২।৬।৭। বামদেব গৌতম, ৩ মেধাতিথি ও মেধ্যাতিথি কাণ্ব অথবা বিশ্বামিত্র, ৪ নোধা গৌতম, ৫ মেধাতিথি কাণ্ব (ঋগ্বেদে মেধ্যাতিথি), ৮ শ্রুষ্টিণ্ড কাণ্ব (বালখিল্য); ৯ মেধ্যাতিথি বা মেধাতিথি কাণ্ব, ১০ নৃমেধ আঙ্গিরস।।
অনুবাদঃ (২৯৩) এই সবল দধিমিশ্রিত সোমরস ইন্দ্রের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। হে বজ্রহস্ত ইন্দ্র, তুমি সেই সোমপানের জন্য আনন্দে মত্ত হয়ে অশ্বরশ্মিগণের সঙ্গে স্বস্থান হতে (অথবা আমাদের গৃহে) এস।। (২৯৪) হে ইন্দ্র, অভিজ্ঞ স্তোতারা তোমার হর্ষের জন্য এই সোমরস প্রস্তুত করেছেন। হে স্তুতিপ্রিয় ইন্দ্র, মধু পান কর, আমাদের স্তোত্র শোন, স্তোতার স্তুতিতে আনন্দশব্দ কর।। (২৯৫) সোমরূপ দুগ্ধের নিষ্কাষণকারী, গায়ত্র-সঙ্গীতে হর্ষান্বিত, ধেনুর মত সুদোহনকারী, বহুধারায় বারিবর্ষণের দ্বারা শোভিত ইন্দ্র তোমাকে আজ আমরা আহ্বান জানাই।। (২৯৬) হে ইন্দ্র, বিশাল ও দৃঢ় পর্বতসকলও তোমাকে বাধা দিতে পারে না; যখন তুমি আমার মত স্তোতাকে ধন দাও তখন কেহ হিংসা করতে পারে না। (২৯৭) অভিষুত সোমপানকারীকে কে-ই বা জানে, কেবা অন্ন ধারণ করে? ইনি সেই (ইন্দ্র পরমাত্মা) যিনি বলসহায়ে দেহপুর ভেদ করে প্রবেশ করেন, যিনি উদকবান ও সোমাখ্য অন্নে পরিতৃপ্ত।। (২৯৮) হে ইন্দ্র তুমি শাসনকর্তা বলে’ অব্রতকে (=তোমা কর্তৃক প্রবর্তিত কর্মচক্র ব্রতকে যে মানে না) যজ্ঞকর্ম থেকে দূরে নিক্ষেপ করে থাক। হে মঘবা, (আমরা ব্রতধারী) আমাদের বহু কাম্য সোমকে অধিক ধনের জন্য বর্ধিত কর।। (২৯৯) ত্বষ্টা, পর্জন্য এবং ব্রহ্মণপতিদেব আমাদের দিব্যবাণীকে গ্রহণ করুন। আমাদের এই অজেয় রক্ষণীয় স্তোত্রবাক্যের দ্বারা অদীনা অক্ষয়া ঐশীশক্তি মাতা অদিতি আমাদের পুত্র-ভ্রাতাসহ রক্ষা করুন।। (৩০০) হে ইন্দ্র, তুমি ভক্তের প্রতি (=তোমাকে যে হব্যদান করে তার প্রতি) কখনও ক্রুদ্ধ হও না, তুমিও তার সঙ্গে মিলিত হও। হে ধনবান, দেবতা তুমি তোমার ভূরি ভূরি দান ভক্তের কাছে এসে মিলিত হয়।। (৩০১) হে বৃত্রহত্যাকারী ইন্দ্র, তোমার সব হরণকারী অশ্বদুটিকে (=দেশ ও কালকে) একসঙ্গে যুক্ত কর। হে উগ্রবল, হে মঘবা, দূরদেশ থেকে শোভন মরুদ্গণের সঙ্গে (=প্রাণবায়ুর সঙ্গে) সোমপানের জন্য আমাদের কাছে এস।। (৩০২) তোমাকে, হে বজ্রধারী ইন্দ্র, কর্মব্যস্ত যজ্ঞনেতারা (অথবা নৃত্যশালী রশ্মিগণ) কাল ও আজ সোমপান করিয়েছেন। সেই ইন্দ্র সামগানকারীদের গান শুনুন তাঁদের গৃহে আসুন।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
অষ্টম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১ ঊষা; অশ্বিদ্বয়; ৪-১০ ইন্দ্র (ঋগ্বেদে ৪ মন্ত্রের দেবতা অশ্বিদ্বয়)।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।২।৭।।৮ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ৩ বৈবস্বত অশ্বিদ্বয়, ৪ প্রস্কন্ব কাণ্ব, ৫ মেধাতিথি-মেধ্যাতিথি কাণ্ব, দেবাতিথি কাণ্ব, ৯ নৃমেধ আঙ্গিরস, ১০ নোধা গৌতম।।
অনুবাদঃ (৩০৩) অন্ধকার নাশ করতে করতে দ্যুলোকের দুহিতা আসছেন। তিনি সকলকে দেখা দিলেন। ঊষা জ্ঞানলোকের দ্বারা তমোনাশ করে জ্যোতি বিস্তার করেন; আর বিপুল জলরাশিকে বরণ করেন।। (৩০৪) হে অশ্বিদ্বয়, এই দ্যুলোকগামী রশ্মিগণ তোমাদের দুজনকেই আহ্বান করে। কর্ম, প্রজ্ঞা ও বাক্যরূপ সম্পদের অধিকারী, হে অশ্বিদ্বয় তোমরা প্রতি মানুষের গৃহেই গমন করে থাক; এরূপ যোগ্যতাসম্পন্ন তোমাদের দুজনকে আমি আমার রক্ষণের জন্য আহ্বান করি। [অশ্বিদ্বয়=দেশ ও কাল। কালই অশ্ব বা রশ্মি যা সব কিছু বহন করে (অথর্ববেদ)। রশ্মিগণ দেশ ও কালের সঙ্গে যুক্ত (-অশ্বিদ্বয়ের সঙ্গে যুক্ত)। এই দেশ ও কালের মধ্যেই কর্ম, প্রজ্ঞা ও বাক্য নিহিত থাকে; ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান দেশ ও কালের অধীন]।। (৩০৫) হে অশ্বিদ্বয়, হে দেবদ্বয়, পৃথিবীতে অবস্থিত কৃচ্ছ্রতাসাধনে রত কোন্ মানুষ তোমাদের মত তপস্যাকারী? কৃচ্ছ্রতাসাধক যেমন অভিমত অন্ন ভোজনের দ্বারা তৃপ্ত হন, তোমরাও সেইভাবে রশ্মিদ্বারা তাড়িত হয়ে রশ্মিদ্বারাই ব্যাপ্ত হও (=তৃপ্ত হও)।। (৩০৬) স্বর্গলোক কামনা করে তোমাদের উদ্দেশে এই যে উত্তম মধুময় সোম প্রস্তুত হয়েছে, হে অশ্বিদ্বয়, গতকালের প্রস্তুত (-অশ্বিদ্বয়ের যাগ ভোররাত্রে শেষ হয়, এইজন্য পূর্বদিনে প্রস্তুত সোম অশ্বিদ্বয়ের উদ্দেশে নিবেদিত হয় থাকে) সেই উত্তম সোমকে পান কর আর সোমদানকারীর (=যজমানের) জন্য রমণীয় ধন ধারণ কর।। জয় সম্পাদনকারী সোমরসের ধারা নিবেদন করে’ সর্বদাই আমি তোমাকে ডাকি। বন্যপশুর মত ভ্রমণশীল প্রচণ্ড সেই ঈশানের কাছে (=সূর্যের কাছে) তিনবেলা (সবনেষু=প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন ও সায়াহ্ন – তিনবেলার যজ্ঞকর্ম) কে না যাঙ্ঞা করে? (৩০৮) ইন্দ্র সোমপানের ইচ্ছা করছেন; হে অধ্বর্যু (=যিনি যজ্ঞকর্ম সম্পন্ন করান) শীঘ্র কর। বৃত্রহা (=মেঘবিদারণকারী ইন্দ্র) এসেছেন, আর নিজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন বর্ষণশীল দুই অশ্বকে (রসহরণকারী রশ্মিকে)।। (৩০৯) হে ইন্দ্র, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ রশ্মিসকলকে আন; সকলদিকে তাদের ব্যাপ্ত কর। হে বহুধন, তুমি চিরদিনই বহু ঐশ্বর্যশালী এবং প্রচুর হব্যেরও ঈশ্বর।। (৩১০) হে ইন্দ্র, তোমার যত ধনসম্পদ আছে যদি তা’ আমার থাকতো তবে আমি স্তোতাকে (=ঈশ্বরভক্তকে) দান করতাম; আপাত রমণীয় পাপকর্মের জন্য ধন ব্যয় করতাম না।। (৩১১) হে ইন্দ্র, তুমি প্রকৃষ্ট্ গতিকে বিশ্বের সকল স্পর্ধমানকে অভিভূত কর; তুমি কোপনস্বভাব ও অজ্ঞানরূপ অন্ধকার নাশ করে থাক; তুমি বিশ্বের উৎপাদয়িতা, ত্রাণকর্তা। [বৃত্র=মেঘের শরীর। তা’ বিদীর্ণ করলেই জীবের প্রাণধন জল পাওয়া যায় বলে’; বৃত্রের সঙ্গে অজ্ঞান অন্ধকারের তুলনা করা হয়ে থাকে]।। (৩১২) হে ইন্দ্র, যে তুমি দ্যুলোকে আকাশের সকল স্তরের ওপরে থেকে জ্যোতির দ্বারা ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছ সেই তোমাকে পার্থিব ধন ব্যাপ্ত করতে পারে না; তুমি বিশ্বকে অতিক্রম করে সকলভার বহন করে চলেছ।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
নবম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (ঋগ্বেদে ৫ মন্তের দেবতা ইন্দ্রবৈকুণ্ঠ; ৮ মন্ত্রের দেবতা বেন)।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ত্রিষ্টুপ্
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।২।৬। বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি, ৩ গাতু আত্রেয় অথবা গৃৎসমদ্ ৪ পৃথু বৈন্য, ৫ সপ্তগু আঙ্গিরস, গৌরিবীতি শাক্ত্য, ৮ বেন ভার্গব, ৯ বৃহস্পতি বা নকুল, ১০ সুহোত্র ভারদ্বাজ।।
অনুবাদঃ (৩১৩) দীপ্ত ঋজু রশ্মির সঙ্গে জল মিশ্রিত হলে তা’ হতে ইন্দ্র (=বজ্র) উৎপন্ন হন [রশ্মি জল আকর্ষণ করে। তা হতে মেঘের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। বিদ্যুৎ বা বজ্রই ইন্দ্র]। হে হর্যশ্ব (=রসহরণকারী রশ্মির অধিপতি), তোমাকে যজ্ঞের দ্বারা প্রবুদ্ধ করি; সোমরসে মত্ত হয়ে (=বারিরাশি প্রাপ্ত হয়ে) আমাদের স্তোত্র হৃদয়ঙ্গম কর।। (৪১৩) হে ইন্দ্র, তুমি জলের দ্বারা সম্পাদিত হয়ে জলমধ্যে অবস্থান কর; সেই তুমি বহুমানুষের দ্বারা প্রকৃষ্টরূপে আহূত, তুমি এস। যেহেতু তুমি আমাদের রক্ষক ও বর্ধক সুতরাং সোমের দ্বারা মত্ত হয়ে আমাদের ধন দান কর।। (৩১৫) হে ইন্দ্র, তুমি জলের উৎস মেঘকে বিদীর্ণ করেছ, জলের নির্গমন দ্বারসমূহ উদ্ঘাটিত করেছ, জলভারে পীড়িত মেঘকে উন্মুক্ত করেছ। তুমি অতীতেও বিপুলাকৃতি মেঘকে উদ্ঘাটিত করে জলধারা পাতিত করেছ, জলপ্রদাতা মেঘকে নিহত করেছ।। (৩১৬) প্রচুর অন্ন-বলের ঈশ্বর হে ইন্দ্র, ধনলাভেচ্ছু সোমপ্রস্তুতকারী আমরা তোমাকে বাক্-অন্ন বলের জন্য স্তব করি। আমাদের জন্য যে কর্ম তোমার নিজের অভিপ্রেত তা’ তুমি দাও; তোমার দ্বারা রক্ষিত হয়ে আমরা তা’ লাভ করে প্রীত হবো।। (৩১৭) বসুরূপ সম্পদের অধিপতি হে ইন্দ্র, বসুরূপ ধন কামনা করে উৎসাহযুক্ত হয়ে তোমার দক্ষিণহস্ত ধারণ করলাম। [দক্ষিণহস্ত=উৎসাহযুক্ত (নিরুক্ত)]। হে শূর, তুমি রশ্মিরূপ গোধনের স্বামী, তোমাকে আমরা জানি। কিরণরাশির সহায়ে বিচিত্র বর্ষণকারী ধনসমূহ তুমি আমাদের জন্য প্রদান কর। [বৃষ্টিধন সকল সম্পদের কারণ]।। (৩১৮) মানুষেরা যখন জীবনসংগ্রামে অন্নের জন্য মনোযোগ সহকারে এবং সাফল্যের সঙ্গে নিজেকে নিযুক্ত করে তখন তারা ইন্দ্রকেই ডাকে। (হে ইন্দ্র) তুমি বীর; মানুষের জন্য উজ্জ্বল ক্ষিপ্রগতিযুক্ত হয়ে বিদ্যুৎপূর্ণ মেঘে অবস্থিত ধনসম্পদকে (=বারিরাশিকে) আমাদের মধ্যে বিভাগ করে দাও।। (৩১৯) গমনশীল, যজ্ঞপ্রিয়, দর্শনকারী আদিত্য রশ্মিসমূহ যাচ্ঞাপরায়ণ হয়ে ইন্দ্রের নিকট (=সূর্যের নিকট) উপস্থিত হয়ে পার্থনা করলো – হে ইন্দ্র, অন্ধকার দূর কর, জ্ঞান প্রসারিত কর (অথবা চক্ষু আলোকপূর্ণ কর), পাশবদ্ধের মত অবস্থিত আমাদের মুক্ত কর।। (৩২০) হে বেন (=হে ইন্দ্র), যখন তুমি দ্যুলোকে উড়ন্ত পাখীর মত অনস্থান কর তখন তোমাকে সকলে এইরূপেই দর্শন করে হৃষ্ট হয়। তোমার ডানা সুবর্ণময় তুমি বরুণের দূত, দ্যুলোকের সংযোগকারী শক্তির আধার, অতি উচ্চে শকুনের মত অবস্থান করেও জগতের ভরণপোষণকারী।। (৩২১) ব্রহ্ম জাত হয়ে প্রথমে পূর্বদিকের সীমায় সুদীপ্তিশালী বেনকে (=সূর্যকে) ধারণ করলেন। সেই ব্রহ্মের উপমা অন্তরিক্ষ (=ব্রহ্ম আকাশের মতই অনন্ত), এঁর অবস্থান বিবিধপ্রকার, ইনি ব্যক্ত ও অব্যক্ত জগতের কারণস্বরূপ।। (৩২২) যাঁর তুল্য শক্তিমান পূর্বে দেখা যায় নি, যিনি সর্বাপেক্ষা শক্তিমান, সেই শীঘ্রগতিযুক্ত, স্তবার্হ, শব্দকারী, বজ্রযুক্ত, সুখদায়ক স্থিরপ্রজ্ঞ, মহান বীর ইন্দ্রের উদ্দেশে বাক্যের দ্বারা স্তবমালা রচনা করি।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
দশম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৯
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ১-৫, ৭-৯ ত্রিষ্টুপ্, ৬ বিরাট।।
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।২।৪ দ্যুতান মারুত (ঋগ্বেদে তিরশ্চী আঙ্গিরস), ৩ বৃহদুক্থ, বামদেব্য, ৫ নামদেব গৌতম, ৬।৮ বসিষ্ট মৈত্রাবরুণি, ৭ গাথি বিশ্বামিত্র, ৯ গৌরিবীতি শাক্য।।
অনুবাদঃ (৩২৩) সহস্র সহস্র গমনশীল কৃষ্ণ জলবিন্দু (=কালো মেঘ) অংশুমতী নদীকে ঘিরে (অথবা কিরণরাশিকে ঘিরে) ছিল। ইন্দ্র প্রজ্ঞাযুক্ত বলকর্মের দ্বারা সেই মেঘপুঞ্জ থেকে জলরাশি নির্গমনের ব্যবস্থা করে নিম্নাভিমুখে প্রবাহিত করলেন।। (৩২৪) হে ইন্দ্র, যে বিশ্বদেবগণ (=কিরণরাশি) তোমার সখা ছিলেন তাঁরা বৃত্রের (=মেঘের) নিশ্বাসে ভীত হয়ে তোমাকে ত্যাগ করে চলে গেলেন (অর্থাৎ মেঘের আকাশ ছেয়ে গেল বলে কিরণরাশি আর দেখা গেল না)। তখন মরুদ্গণের সঙ্গে (=বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে) তোমার সখ্যতা হোল। আর তাতেই তুমি সমস্ত শত্রু জয় করলে (অর্থাৎ বায়ুর দ্বারা তাড়িত হয় মেঘেরা পরাজিত হোল)।। (৩২৫) বহুর সঙ্গে মিলিতভাবে থেকেও একাকী ভ্রমণশীল আদিত্য সর্বগ্রাস করলেন (=অস্তগমনের দ্বারা অন্ধকার সৃষ্টি করলেন); দেবতার অতিক্রান্ত দর্শনের মাহাত্ম্য লক্ষ্য কর; এখন তিনি মৃত হলেন (=অস্তগমন করলেন), যে কাল অতিক্রান্ত হোল তখন তিনি সমস্ত অধিকার করে ছিলেন।। (৩২৬) হে ইন্দ্র, তুমি জন্মলাভ করে (=বিদ্যুৎরূপে জাত হয়ে) সপ্তলোকে অবস্থিত সকল শত্রুর (=মেঘের বা অন্ধকাররূপ শত্রুর) শত্রু (=শাতয়িতা) হলে; তুমি অন্ধকারাবৃত দ্যাব্যাপৃথিবীকে আলোকে নিয়ে এলে আর বিভুময় সকল ভুবনের জন্য আনন্দকে ধারণ করলে।। (৩২৭) হে ইন্দ্র, গর্জনকারী বজ্রধারী সদাকরণশীল প্রজ্ঞাবান বর্ষণকারী সদা অন্নদাতা দ্যুলোকবাসী বৃত্রহন্তা সকল ইন্দ্রিয়ের ঈশ্বর ত্রাণকর্তা শ্রদ্ধাবান তোমাকে স্তব করি।। (৩২৮) তোমাদের মঙ্গলের জন্য তোমরা মহান ইন্দ্রের উদ্দেশে স্তুতি উচ্চারণ কর, তাঁর বর্ধনের জন্য সোম সম্পাদন কর; প্রকৃষ্ট বুদ্ধিসম্পন্ন কল্যাণবুদ্ধিযুক্ত ইন্দ্রকে সুষ্ঠুরূপে স্তব কর। তিনি চিরকাল মানুষের প্রিয়, তাঁকেই চিন্তা কর।। (৩২৯) অন্নের নিমিত্ত সংগ্রামে আমাদের রক্ষার নিমিত্ত যিনি সকল দিক্ থেকে শুনতে পান, যিনি বৃত্রমেঘবধরূপ সংগ্রামে জলরূপ ধন আহরণে সদাজয়শীল, যিনি সদা ক্ষিপ্রগতি, স্বীয় কর্মে উগ্র, নৃশ্রেষ্ঠ ধনবান সেই ইন্দ্রকে আমরা আহ্বান করি।। (৩৩০) হে বসিষ্ঠ, এই যজ্ঞে উপস্থিত ব্যক্তিদের সামনে ইন্দ্রের প্রীতি কামনায় মহান স্তোত্রের দ্বারা ইন্দ্রকে স্তব কর। যিনি বিশ্বের ধনকে ব্যাপ্ত করেন তাঁর প্রতি গমনশীল আমার এই স্তুতিবাক্য তিনি শ্রবণ করুন। (৩৩১) অন্তরিক্ষে জলরাশির মধ্যে এঁর (ইন্দ্রের) যে চক্র নিহিত আছে সেই চক্রের দ্বারাই জলরূপ মধুভাণ্ডার ছেদন হয়, আর সেই জমাটবাঁধা জলরাশিকে ছেদন করে পৃথিবীতে গোদুগ্ধরূপে ওষধীরূপে তিনি ধারণ করেন।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
একাদশ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৯
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১ তার্ক্ষ্য, ২-৬।৮।১০ ইন্দ্র, ৭ পর্বত ও ইন্দ্র, ৯ যম বৈবস্বত।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ত্রিষ্টুপ
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ অরিষ্টেনেমি তার্ক্ষ্য, ২ ভরদ্বাজ (ঋগ্বেদে গর্গ ভারদ্বাজ), ৩ বিমদ ঐন্দ্র, বসুকৃৎ বা বাসুক (ঋগ্বেদে প্রাজাপত্য), ৪।৫।৯ বামদেব গৌতম (ঋগ্বেদে ৯ যম বৈবস্বত), ৭ গাথি বিশ্বামিত্র, ৮ রেণু বৈশ্বামিত্র, ১০ গোতম রাহুগণ।।
অনুবাদঃ (৩৩২) যিনি প্রভূত অন্নবলের অধিকারী, দেবগণের সঙ্গে প্রীতিসম্পন্ন, বলবান্, গতিশীল পদার্থসমূহের পরিচালক, অপ্রতিহতবজ্রযুক্ত, সংগ্রামে জয়শীল, শীঘ্রগতিসম্পন্ন সেই অন্তরিক্ষনিবাসী জলপ্রাদানকারী দেবতাকে (=তার্ক্ষ্য=সূর্য) আমাদের কল্যাণের জন্য এই যজ্ঞে আহ্বান করছি। (৩৩৩) যিনি ত্রাণকারী ও অভীষ্টপূরণকারী, যিনি সহজেই প্রতি যজ্ঞকর্মে আহ্বানযোগ্য সেই বীর ইন্দ্রকে আহ্বান করি। বহুজনের দ্বারা আহূত অতিধনদাতা ইন্দ্র দেবতা আমাদের উৎসর্গীকৃত এই হবি গ্রহন করুন। (৩৩৪) বিবিধপ্রকার কর্মের সহিত সম্বন্ধিত সকল বস্তুর হরণকারী রশ্মিসমূহকে যিনি নিজ গমন্রথের সহিত যুক্ত করেন, যাঁর রশ্মিসমূহ কম্পমান শ্মশ্রুর মত এবং যিনি সর্বসিদ্ধিকর ধনদানের জন্য নিজবলের দ্বারা বিপক্ষকে ভীতিগ্রস্ত করে ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন, সেই দক্ষিণহস্তে বজ্রধারণকারী ইন্দ্রকে ভজনা করি।। (৩৩৫) শত্রুনাশক, দূরাধর্ষ, মহাবল, সীমাহীন, বর্ষণকারী, সুবজ্র ইন্দ্রকে স্তব করি। এই সেই ইন্দ্র যিনি ধনসম্পদের জন্য বৃত্রকে হনন করেন এবং অন্নবল ও মহাধনের অতিদাতা।। (৩৩৬) যে মানুষ নিজকে বলবান ও ক্ষিপ্রগতিযুক্ত মনে করে, আমাদের হিংসা করবার জন্য আমাদের প্রতি ধাবিত হয়, তাকে হে বলবান, ইন্দ্র, তোমার দ্বারা রক্ষিত হয়ে মনুষ্যবলে যুক্ত হয়ে যেন অভিভূত করতে পারি।। (৩৩৭) শত্রুর দ্বারা বেষ্টিত হয়ে শত্রুকে পরাজিত করার ইচ্ছা করে সতর্ক ক্ষিপ্র মানুষেরা যাঁকে ভজনা করে, জ্ঞানবানেরা যাঁকে বলের জন্য, জলের জন্য এবং অন্নের জন্য ভজনা করেন তিনিই ইন্দ্র।। (৩৩৮) হে ইন্দ্র ও মেঘদেবতা (=পর্বত), তোমরা দুজন মহান্ রথে সুবীর অন্ন আন। হে দেবদ্বয়, সকল যজ্ঞে হবি ও স্তুতির দ্বারা পূজিত হয়ে হর্ষ ও আনন্দ লাভ করে বর্ধিত হও। (৩৩৯) ইন্দ্রের উদ্দেশে যে বিরামহীন স্তুতি করা হয়েছে তার ফলে অন্তরিক্ষে অবস্থিত বারিরাশি থেকে ইন্দ্র জল সমূহকে প্রেরণ করলেন। (ইনিই সেই ইন্দ্র যিনি) অক্ষ যেমন চক্রকে ধারন করে, তেমনি কর্মসমূহের দ্বারা পৃথিবী ও দ্যুলোকেরূপ চক্রকে স্তম্ভিত করে রেখেছেন। (৩৪০) সখাগণ তোমাকে সখ্যতা প্রাপ্ত হয়ে আকাশে বিচরণশীল বিস্তীর্ণ মেঘরাশিকেই প্রাপ্ত হলেন; (হে সখাগণ) জেনে রাখ অন্ন হতেই সন্তান (বা বীজ) জাত হয়; এবং এই পৃথিবীতে ভবিষ্যতে এইভাবেই চিন্তা করব। (৩৪১) সত্যের কর্মের ও ঔজ্জ্বল্যের প্রতীক ইন্দ্রের দূরাধর্ষ গোসমূহকে (=উজ্জ্বল) রশ্মিসমূহকে আজ কে জোয়ালে জুড়বে? জলরাশির পরিচালক জীবের সুখ ও পুষ্টিকারক রশ্মিগণের কর্মকে যিনি জানেন তিনি দীর্ঘজীবী হয়ে আত্মগতি লাভ করেন।।
সামবেদ - ৩য় অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
দ্বাদশ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ অনুষ্টুপ
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র, ২ জেতা মাধুচ্ছন্দস, ৩।৬। গৌতম রাহূগণ, ৪ অত্রি ভৌম, ৫।৮ তিরশ্চী আঙ্গিরস, ৭ নীপাতিথি কাণ্ব, ৯ বিশ্বামিত্র গাথিন, ১০ শংযু বার্হস্পত্য অথবা তিরশ্চী আঙ্গিরস।।
অনুবাদঃ (৩৪২) (লোকে যেমন সুকর্মের দ্বারা নিজ বংশকে উন্নত রাখেন সেইরূপ) হে শতক্রতু (=শতকর্মা) ইন্দ্র, সামগানকারীরা তোমার উদ্দেশে গান করেন, হোতারা তোমাকে অর্চনা করেন, ব্রহ্মা প্রভৃতি ঋত্বিক্গণ (বেদমন্ত্র পাঠের দ্বারা) বংশের ন্যায় তোমাকে উন্নত করেন।। (৩৪৩) যিনি আকাশের মত সর্বব্যাপী, যিনি রথীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রথী, যিনি অন্ন ও সকল জীবের রক্ষক সেই ইন্দ্রকে সকল স্তবস্তুতি উজ্জ্বলরূপে প্রকাশিত করে। (৩৪৪) হে ইন্দ্র, এই শ্রেষ্ঠ হর্ষজনক অমৃত সোম পান কর; জলের গৃহে (=অন্তরিক্ষে) উজ্জ্বল এই সোমধারা তোমার উদ্দেশেই প্রবাহিত হচ্ছে।। (৩৪৫) হে ইন্দ্র, যে কাম্য পূজনীয় ধন আছে (অথবা যে কাম্য ধন আমার গৃহে নেই) সেই ধন আমাদের দেওয়া তোমার কর্তব্য। হে বজ্রধারী, হে ধনাধিপতি, সেই ধন তোমার দুই হাতে আমাদের দান কর।। (৩৪৬) হে ইন্দ্র, তিরশ্চী ঋষির আহ্বান শোন যে তোমাকে পরিচর্যা করছে। জলযুক্ত বীর্যবান্ মহান তুমি আমাকে ধনাদানে পূর্ণ কর।। (৩৪৭) হে ইন্দ্র, এই জলরাশি তোমার কিরণরাশিতে সৃষ্ট হয়েছে। হে শ্রেষ্ঠকর্মা এস। সূর্য যেমন কিরণরাশির দ্বারা আকাশকে পূর্ণ করেন তোমাকেও তেমনি ইন্দ্রিয়সামর্থ্য পূর্ণ করুক। [ইন্দ্রিয়শক্তি আত্মার, এইজন্য এরূপ বলা হোল]।। (৩৪৮) হে ইন্দ্র, সর্ববস্তু হরণকারী তোমার অশ্বরশ্মিগণের সঙ্গে তুমি কন্ব ঋষির এই সুন্দর স্তুতি লক্ষ্য করে এস। এই দ্যুলোকে বাস করেই তুমি দ্যুলোক শাসন কর; হে দ্যুলোকবাসী, তুমি দ্যুলোকেই থাক। (৩৪৯) হে স্তুতিপ্রিয় ইন্দ্র, সকল অভিষুত সোমযোগে তোমার উদ্দেশে উচ্চারিত সকল স্তুতি তোমাকে রথীর মত ঘিরে থাকে। গাভী যেমন তার বৎসকে ডাকে তেমনি এই স্তুতি তোমাকে লক্ষ্য করেই সম্যক্রূপে উচ্চারিত।। (৩৫০) শীঘ্র এস, এখনই পবিত্র ইন্দ্রবে স্তব করবো পবিত্র সামগানে। পবিত্র উক্থের দ্বারা শুদ্ধ সোমরসের দ্বারা বর্ধিত ইন্দ্র আনন্দিত হোন।। (৩৫১) যিনি অতি ধনশালী, যিনি ধনের দ্বারা দীপ্ত সমুজ্জ্বল; যে ধন তোমাদের জন্য (ইন্দ্র দান করেন) সেই নিষ্কাশিত সোমরূপ ধনসম্পদ, হে ইন্দ্র, হে অন্নপতি, তোমার আনন্দকারক হয়।।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
প্রথম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৮
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১।৪।৬।৮ ইন্দ্র, ৫ মরুদ্গণ, ৭ দধিক্রাবা।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ অনুষ্টুপ
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ২ বামদেবগৌতম বা শাকপূত, ৩ প্রিয়মেধ আঙ্গিরস, ৪ প্রগাথ কাণ্ব, ৫ শ্যাবাশ্ব আত্রেয়, ৬ শংযু বার্হস্পত্য, ৭ বামদেব গৌতম, ৭ জেতা মাধুচ্ছন্দস।।
অনুবাদঃ (৩৫২) সর্ববেত্তা পিপাসিত ইন্দ্রের উদ্দেশে তোমরা সকল সোম অর্পণ কর। তিনি সর্বগামী, সকল যজ্ঞের নায়ক, অগ্রণী।। (৩৫৩) গর্ভে থাকাকালীন অবস্থাতেই আমাদের জন্য মহান্ অন্ন তুমি প্রস্তুত করে রাখ। তোমার এই মহান্ ব্রত চিরকাল ধরে প্রচলিত আছে। হে ইন্দ্র, উগ্র বচন দূর কর।। (৩৫৪) বহুকর্মা শত্রু পরাজয়কারী বলিষ্ঠ সৎপতি ইন্দ্রকে আমি আমার রক্ষা ও সুখের জন্য সূর্যের মত আবর্তিত করছি।। (৩৫৫) তিনিই পূজ্যগণের মধ্যে প্রথম, তিনিই সর্বলোককান্ত আলোকময় দেবতারূপে (=বেন) কর্মসকলের দ্বারা সকল কিছুই প্রাপ্ত হয়েছিলেন, যাঁকে অবলম্বন করে মনু (আদিত্য) পিতা দেবগণের মধ্যে (=রশ্মিগণের মধ্যে) জ্ঞানকর্ম প্রাপ্ত হয়েছেন।। ((৩৫৬) যখনই ক্ষিপ্রগামী দীপ্ত রশ্মিগণ তোমাকে রথে বহন করে তখনই তাঁরা মদির মধুপান করতে করতে (রশ্মিদ্বারা জলবাস্প আকর্ষণ করতে করতে) অন্নসম্পদ সৃষ্টি করেন। (৩৫৭) তোমাদের মঙ্গলের জন্য সেই উপকারক অন্নবলপতি ইন্দ্রকে স্তব কর, যিনি বিশ্বজয়ী শ্রেষ্ঠবলনায়ক বিশ্বজ্ঞানী।। (৩৫৮) চলনপটু শব্দকারী সর্বজয়ী [রশ্মিগণ জলসৃষ্টির দ্বারা অন্নসৃষ্টিকারী বলে সর্বজয়ী] অশ্বরশ্মির (=দধিক্রার) স্তুতি করি। হর্ষকারক বৃষ্টিরূপ অগ্রসেনাকে আমাদের জন্য প্রেরণ কর, আমাদের আয়ু বৃদ্ধি কর।। (৩৫৯) ইন্দ্র সকল জীবদেহের অন্তরাত্মা (=পুরাম্ ভিন্দুঃ); তিনি একই সময়ে অনেক কর্ম করেন (=যুবা) এবং গতির দ্বারা সেই কর্মকে অতিক্রম করেন (=কবি), তিনি অমিতবলরূপে জাত হয়ে বিশ্বের সকল কর্মের ধারক, বজ্রধারী ও বহুস্তুত।।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
দ্বিতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (ঋগ্বেদে ৬ মন্ত্রের দেবতা অগ্নি), ৮ ঊষা, ৯ বিশ্বদেবগণ, ১০ ঋক্ ও সাম।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ অনুষ্টুপ
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৩।৫ প্রিয়মেধ আঙ্গিরস, ২।১০ বামদেব গৌতম, ৮ মধুছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৬ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ৭ অত্রি ভৌম, ৮ প্রস্কণ্ব কাণ্ব, ৯ ত্রিত আপ্ত্য।।
অনুবাদঃ (৩৬০) তোমরা (অন্নপ্রস্তুতের) সামর্থ্যযুক্ত জল কামনা করে অন্নের জন্য ইন্দ্রের স্তুতি কর। ইন্দ্র যজ্ঞসাধনের জন্য কর্মের দ্বারা বহুপ্রজ্ঞার দ্বারা তোমাদের পরিচর্যা করেন। (৩৬১) সূর্যের গতিপথের সন্ধান জানেন ইন্দ্রের যে দুরি যুক্ত অশ্ব (=রশ্মি বা দেশ-কাল বা অহোরাত্র) তাঁরাই সকলই কর্ম ও যজ্ঞকে ধারণ করে আছেন, পণ্ডিতেরা এইরূপ বলে থাকেন। (৩৬২) প্রিয়মেধা ঋষির প্রিয়জনগণ, তোমরা ইন্দ্রের অর্চনা কর, অন্তর দিয়ে অর্চনা কর, তাঁকেই অর্চনা কর। তোমাদের সন্তানেরাও জীবের আত্মা ইন্দ্রকে অর্চনা করুক, অতি অনুরাগে অর্চনা কর।। (৩৬৩) বহু অপশক্তির নিবারক ইন্দ্রের উদ্দেশে আমাদের এই উৎকৃষ্ট সামগান; শক্তিমান ইন্দ্র যেন আমাদের যজ্ঞকর্মে ও সখ্যতায় অত্যন্ত অনুরক্ত হন।। (৩৬৪) বিশ্বের অধিনায়ক, দুর্দমনীয় বলের অধিপতি ইন্দ্রকে তোমাদের এবং জনগণের কাম্যবস্তু লাভের জন্য রশ্মিসমূহের গমন পথে (রথানাম্ উতী=কিরণরাশি যে পথে গমন করে সেই পথ) আহ্বান করি।। (৩৬৫) মর্তের যে মানুষ কর্ম ও প্রজ্ঞার দ্বারা তোমার পূজা করে সে দ্যুলোক প্রাপ্ত হয়। দ্যুলোকের মহান পথে গমন করে সে হিংসা দ্বেষকে অতিক্রম করে।। (৩৬৬) হে ইন্দ্র, হে শতযজ্ঞকর্মা, তোমার বিভূতি সর্বসিদ্ধিকরধন ও দানবহ। অতএব হে বিশ্বদ্রষ্টা, হে মঙ্গলদাতা, আমাদের প্রচুর ঐশ্বর্য প্রদান কর।। (৩৬৭) হে শুভ্র আলোকের দেবী ঊষা, তোমার আগমনকালে ঋতুদের অনুসরণ করে দ্বিপদ ও চতুস্পদ যুক্ত পক্ষীরূপা উদকবহনকারী রশ্মিগণ দ্যুলোকের অন্তঃস্থলে অবস্থান করে।। (৩৬৮) এই যে বিশ্বদেবগণ (=সকল রশ্মিগণ) যে তোমরা দ্যুলোকের আলোকময় মধ্যভাগে বাস কর তোমাদের ঋতকর্মই বা কি অনৃতকর্মই বা কি, কিই বা তোমাদের প্রাচীনতা, কিই বা তোমাদের আহুতি? (অর্থাৎ এদের বিষয়ে কিছুই জানা যায় না) (৩৬৯) এই ঋক্ সামের দ্বারা দেবগণের পূজা করি, যা থেকে কর্ম সম্পন্ন হয়। এই স্তোত্রমন্ত্রসকলই গৃহে (বা যজ্ঞসভায়) বিরাজ করে এবং যজ্ঞকে দেবগণের কাছে নিয়ে চলে।।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
তৃতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১১
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র, ২ দ্যাবাপৃথিবী।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ জগতী, ১ অতি জগতী, ১০ মহাপঙ্ক্তি।।
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ রেভ কাশ্যপ, ২ সুবেদা শৈরীষি বা শৈলুষি, ৩ বামদেব গৌতম, ৪।৭।৮ সব্য বা সত্য আঙ্গিরস, ৫ বিশ্বামিত্র গাথিন, ৬ কৃষ্ণ বা আঙ্গিরস, ৯ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ১০ মেধাতিথি কান্ব (ঋগ্বেদে মান্ধাতা যৌবনাশ্ব), ১১ কুৎস আঙ্গিরস।।
(৩৭০) বিশ্বের বরগণ প্রীত হয়ে সকল সংগ্রামে ইন্দ্রকেই শত্রুপরাজয়কারীরূপে নিরূপণ করেছেন এবং সং গ্রামে তিনিই অধিস্বামীরূপে বিরাজিত হন। সেই বলিষ্ঠ, উগ্র, অতি মহান প্রবৃদ্ধ ইন্দ্রকে সকল সঙ্কল্পে ও বরণীয় কর্মে তাঁরা কামনা করেন।।
(৩৭১) একথা সত্য যে তোমাকে প্রধান বলে মানি; কারণ তুমি জীবের প্রয়োজনে বৃত্রবধ করে বৃষ্টি, কর্ম, জ্ঞান প্রভৃতির সৃষ্টি করেছে; হে মেঘবিদারণকারী ইন্দ্র, দ্যুলোক ও পৃথিবী তোমার বলে ভীত হয়ে দুজনেই নিজ নিজ কর্ম করবার জন্য গতিযুতক হয়েছে।
(৩৭২) হে নরগণ, যিনি স্বীয় তেজে দ্যুলোকে এক ও অদ্বিতীয়রূপে বিরাজমান, যিনি সকল জনের কাছে অতিথির মত পূজ্য, সেই চিরপুরাতন অদ্বিতীয় ইন্দ্র বারবার আবর্তনের দ্বারা বিজয়ী ও নব রূপে দেখা দেন।। [ইন্দ্র=সূর্য]।।
(৩৭৩) হে ইন্দ্র, হে বহুস্তুত, হে বহুধন, এই যা কিছু সব এবং আমরা যারা কর্মের জন্য বিচরণ করি, এ সবই তোমার। হে স্তুতিপ্রিয়, তুমি ছাড়া আর কেউ নেই আমাদের স্তুতি গ্রহণ করতে, যেমন পৃথিবী ছাড়া আর কেউ নেই আমাদের ধারণ করতে। হে সকল ইচ্ছাপূরক, আমাদের স্তুতি গ্রহণ কর।।
(৩৭৪) মানুষের রক্ষক, ধনবান স্তুতিযুক্ত ইন্দ্রকে মহান সঙ্গীতের দ্বারা স্তব কর। তিনি সদা বর্ধমান, বহুর দ্বারা আহূত, দোষবর্জিত সুশোভন কর্মের দ্বারা মরণরহিত এবং প্রতিদিন আয়ুক্ষয়কারী (অথবা প্রতিদিন পূজিত)।।
(৩৭৫) তোমাদের বুদ্ধি ও জ্ঞানালোকের জন্য তোমরা সকলে মিলে একাগ্রচিত্তে সকল কামনা পূরণের জন্য ইন্দ্রকে স্তব কর। পত্নী যেমন স্বামীর সেবে করে মানুষেরাও তেমনি সকল রক্ষার জন্য ধনদাতা শুদ্ধজ্ঞান ইন্দ্রকে ঘিরে থাকে।।
(৩৭৬) ধনসমুদ্র, বহুর দ্বারা স্তুত, সর্ববস্তুর প্রতি সমদর্শী (=মেঘ), স্তুতির দ্বারা আহ্লাদিত, অর্চনীয় বিদ্যুৎরূপী অগ্নি ইন্দ্রকে স্তব কর। যাঁর কর্ম দ্যুলোকের আলোকরাশির মত মানুষের ভোগের জন্য বিচরণ করে সেই শ্রেষ্ঠ চৈতন্য ইন্দ্রকে অর্চনা কর।
(৩৭৭) যিনি সুন্দররূপে সমদর্শী, যিনি নিজ নিজ মাহাত্ম্যে স্বর্লোককে জানিয়ে দেন, যাঁর সুন্দর ভুবনের শতকর্ম একই সঙ্গে চলতে থাকে, বেগবান্ অশ্বের মত যিনি সকল যজ্ঞকর্মের প্রতি ধাবিত হন সেই ইন্দ্রকে আমাদের রক্ষার জন্য দোষবর্জিত শোভন কর্মের দ্বারা নিভৃতে আরাধনা করি।।
(৩৭৮) হে দ্যু ও পৃথিবী, তোমরা মজনে উদকবর্তী, ভুবনের সকলের আশ্রয়স্বরূপা, বিপুলা, মধুদুঘা, সুরূপা। তোমরা দুজনে বরুণদেবের (=সূর্যদেবের) ধারণকার্যের দ্বারা চিরকাল বিভক্তরূপে বর্তমান থেকে প্রচুর প্রজনন ক্ষমতা যুক্তা (ভূরিরেতসা)।।
(৩৭৯) যখন হে ইন্দ্র, তুমি ঊষার মত দ্যুলোক ও পৃথবীকে আলোকে পরিপূর্ণ করি, তখন তুমি মানুষের মধ্যে যে সম্রাট্ তার থেকেও মহান সম্রাট্রূপে বিরাজিত হও। কল্যাণময়ী অদীনা অক্ষয়া মাতা অদিতি দেবী তোমাকে জন্ম দিয়েছেন, তিনিই তোমাকে জন্ম দিয়েছেন।।
(৩৮০) স্তুতির যোগ্য ইন্দ্রের উদ্দেশে অন্নসহযোগে স্তুতি অর্পণ কর, যে ইন্দ্রের বাক্যমাত্রই তাঁর দুইর অশ্ব ঘনকালোমেঘের অন্তর্গত বারিরাশিকে আঘাতের দ্বারা নিঃশেষে নির্গত করলো সকলের রক্ষণেচ্ছায়। বর্ষণকারী, দক্ষিণহস্তে বজ্রধারী মরুদ্গণের সখা ইন্দ্রের সঙ্গে সখ্যতার জন্য আমরা ইন্দ্রকে আহ্বান করি।।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
চতুর্থ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ঊষ্ণিক্
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ নারদ কাণ্ব, ২৩ গোষুক্তি ও অশ্বসুক্তি কাণ্বায়ন, ৪ পর্বত কাণ্ব, ৫।৬।৭।১০ বিশ্বমনা বৈয়শ্ব ৮ নৃমেধ আঙ্গিরস, ৯ গোতম বাহূগণ।।
অনুবাদঃ (৩৮১) হে ইন্দ্র, অভিষুত সোমযোগে যজ্ঞকর্ম ও স্তুতিকে পবিত্র কর; দক্ষতা ও বৃদ্ধির জন্যই ইন্দ্র মহান।। (৩৮২) বহুজনের দ্বারা আহূত, বহুজনের দ্বারা স্তুত সেই ইন্দ্রের উদ্দেশে উত্তমরূপে গান কর। মহাবল ইন্দ্রকে সঙ্গীতে পরিতুষ্ট কর।। (৩৮৩) হে বজ্রধারী ইন্দ্র, তুমি রশ্মিআশ্রিত ও লোককল্যাণকারী অভীষ্ট বর্ষণকারী, শত্রুপরাভবকারী তোমার উল্লাসের প্রশংসা করি।। (৩৮৪) হে ইন্দ্র, যে সোম বিষ্ণুতে আছে, অথবা যে সোম তোমার সহচর সর্বব্যাপী রশ্মি ত্রিত আপ্তো আছে, অথবা যে সোম মরুৎ বায়ুগণের মধ্যে আছে, তুমি সেই সকল সোমের সঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দে মত্ত হয়।। [আপ্ত্যগণ সর্বব্যাপী মাধ্যমিক রশ্মি – এঁরা সংখ্যায় তিনজন – একত, দ্বিত ও ত্রিত। এঁরা ইন্দ্রের সহচরী হয়ে জলপ্রদানে সহায়তা করেন। এই মন্ত্রে সোম=জল]।। (৩৮৫) হে অধ্বর্যু (=যজ্ঞের এক ঋতি্ক), সোমরূপ মদকর অন্নের অতি মদির অংশ ইন্দ্রের জন্য সেচন কর। এইভাবেই সদাবৃদ্ধিশীল বীর ইন্দ্র স্তুত হন।। (৩৮৬) ইন্দ্রের উদ্দেশে সোম সিঞ্চন কর। তিনি সোমময় মধু পান করে থাকেন এবং সোমপানের দ্বারা মহান হয়ে সর্বসিদ্ধিকর ধনসম্পদ প্রেরণ করেন।। (৩৮৭) এস হে বন্ধুগণ শীঘ্র এস, এখনি স্তুতিযোগ্য নায়ক ইন্দ্রকে স্তব করবো, যিনি একাই বিশ্বের সকল মানুষের ঈশ্বর।। (৩৮৮) ইন্দ্রের উদ্দেশে সাম গান কর, মহান জ্ঞানীর উদ্দেশে বৃহৎ সাম গান কর। সেই ধনকারী চৈতন্যময় মহিমান্বিতের উদ্দেশে তোমরা গান কর।। (৩৮৯) যিনি একাই মর্তের মানুষের জন্য ও হব্যদাতার জন্য ধন বিভাগ করে দেন তিনিই অপ্রতিহত ক্ষিপ্র জগৎনিয়ামক ঈশ্বর ইন্দ্র।। (৩৯০) হে বন্ধুগণ, বজ্রধারী ধনাদীশ ইন্দ্রকে এখন সুখের জন্য স্তব করবো। তোমরাও উৎসাহী নায়কশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রের স্তুতি কর।।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
পঞ্চম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৮
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১।২।৩।৪।৮ ইন্দ্র, ৫।৭ আদিত্যগণ, ৬ অগ্নি।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ঊষ্ণিক্, ৮ বিরাট্ ঊষ্ণিক্।।
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ প্রগাথ ঘৌর কাণ্ব, ২ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ৩ নৃমেধ আঙ্গিরস, ৪ পর্বত কাণ্ব, ৫।৭ ইরিম্বিঠি কাণ্ব, ৬ বিশ্বমনা বৈয়শ্ব, ৮ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি।।
অনুবাদঃ (৩৯১) হে ইন্দ্র, তোমার বলই তোমার উপমা; সুকর্মলাভের জন্য সেই বলকে স্তব করি, যে বলের দ্বারা হে বলপতি, তুমি মেঘরূপ বৃত্র শত্রুকে হনন করেছ।। (৩৯২) হে ইন্দ্র, সোমপানে মত্ত হয়ে দিবোবাস ঋষির কামনা পূরণের জন্য শম্বর হত্যা করেছিলে; এই সেই সোম তোমার জন্য প্রস্তুত হয়েছে; তুমি তা’ পান কর।। (৩৯৩) হে ইন্দ্র, তুমি সকলের প্রিয়, সকল যজ্ঞজয়কারী, তুমি অগোপনীয় [ইন্দ্র=সূর্য বা বিদ্যুৎ যাকেকেউ গোপন করতে পারে না]; তুমি আমাদের জন্য সকলভাবকে মিশ্রিত কর। তুমি গিরিপর্বতের মত সর্বত্র বিপুল হয়ে বিস্তৃত রয়েছ; তুমি দ্যুলোকের পতি।। (৩৯৪) যে ইন্দ্র সোমের (=জলের) রক্ষক, হর্ষান্বিত, শ্রেষ্ঠবল তিনি সকল কিছু জানেন। তুমি যে শক্তিতে নিঃশেষে শত্রু ধ্বংস কর তোমার সেই বল আমরা যাচ্ঞা করি। (৩৯৫) হে সুমহান আদিত্যগণ (বিভিন্ন ঋতুতে সূর্য আদিত্যের বিভিন্নরূপ-আদিত্যগণ), আমাদের সন্তান-সন্তুতিদের প্রিয়ত্বে মিলিতভাবে রাখ, তাদের জীবন দীর্ঘ কর। (৩৯৬) অগ্নি (বা সূর্য=শুন্ধ্যুঃ) যেমন সর্বক্ষণ পাপকে জানেন ও শুদ্ধ করেন (=অগ্নির পবিত্রতা কারকের মত) সেইরূপ হে বজ্রহস্ত ইন্দ্র, তুমিও পাপসমূহের পরিবর্জনীয় অংশকে জান (=তোমার বজ্রের দ্বারা পরিশুদ্ধ কর)।। (৩৯৭) হে আদিত্যগণ, রোগ দূর কর, বিঘ্ন দূর কর, দূর্মতি দূর কর; আমাদের সকল পাপ নাশ কর।। (৩৯৮) হে ইন্দ্র, সোম পান কর; সেই সোম তোমাকে আনন্দিত করুক। অশ্বরশ্মির দ্বারা সকল বস্তুর অভিভবকারী হে, ইন্দ্র, সুন্দরভাবে প্রস্তুত এই সোমকে সংযতস্বভাবযুক্ত মানুষেরা তাঁদের দুই বাহুবলে পেষণের দ্বারা প্রস্তুত করেছেন।।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
ষষ্ঠ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ইন্দ্র (৩।৬ মরুদ্গণ)।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ককুপ
মন্ত্রের ঋষিঃ
(৩৯৯) অভ্রাতৃব্যো অন্য ত্বমনাপিরিন্দ্র জনুষা সনাদসি।
(৩৯৯) হে ইন্দ্র, বাস্তবিক তুমি শত্রুহীন, আর জন্মবধি তুমি বন্ধুহীন। তুমি কেবল যুদ্ধের দ্বারাই বন্ধুত্ব লাভ করতে ইচ্ছা কর।
(৪০০) যিনি এই সমস্ত ধন পুরাকাল থেকে আমাদের জন্য এনে দিয়েছেন, হে সখাগণ, সেই ইন্দ্রকে তোমাদের মঙ্গলকামনায় স্তব করি।।
(৪০১) হে মরুদ্গণ, তোমরা এস, আমাদের হিংসা কোরো না। তোমরা ক্ষিপ্রগামী, পরিমিত দীপ্তিশালী এবং সকলেই একই সময়ে উৎপন্ন; তোমরা দৃঢ় হলেও নমনীয়।।
(৪০২) হে অশ্বপতি, হে গোপতি, হে ঊর্বরাপতি, হে সোমপতি, তোমার জন্য প্রস্তুত সোমকে পান করার জন্য এস।।
(৪০৩) হে কামবর্ষিতা, তোমার দ্বারা তোমার সাথে মুক্ত হলে পরে আমরা বিদ্বান ব্যক্তির সমাবেশে প্রতিজনের কাছে তোমার কথাই বলি।।
(৪০৪) হে মরুৎগণ, রশ্মিগণও তোমার স্বজাতি বলে একই সময়ে উৎপন্ন এবং তোমরা সমানবন্ধু হয়ে আকাশে মিলিত হয়ে পরস্পর পরস্পরকে লেহন কর।।
(৪০৫) হে শতকর্মা বিশ্বদ্রষ্টা ইন্দ্র, আমাদের জন্য ধন ও বল আন। আর আন শত্রুজিৎ বীরদের।।
(৪০৬) হে ইন্দ্র, হে স্তুতিপ্রিয়, জল যেমন জলে গিয়ে মেশে তেমনি তোমার কাছে যে কাম্যবস্তু যাচ্ঞা করি তাই আবার তোমাকে উৎসর্গ করি।।
(৪০৭) তোমার কিরণরাশি যখন অতি বিস্তৃত দুগ্ধমিশ্রিত মদির সোম মধুপানে মত্ত থাকে (=জলরাশি সৃষ্টিতে ব্যাপৃত থাকে) আমরাও সেরূপ হে ইন্দ্র, বারবার তোমা অভিমুখে নত হয়ে আসি।।
(৪০৮) হে অপূর্ব্য (=যার পূর্বে কেউ জন্মে নি) ইন্দ্র, আমরা তোমাকে বিপুল মনে করে আমাদের রক্ষার জন্য তোমার কাছে নত হয়ে আসি নি। আমরা তোমাকে বজ্রধারী ও বিচিত্রলীলাকারীরূপে পূজা করি।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
সপ্তম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১-৮ ইন্দ্র, ৯ বিশ্বদেবগণ, ১০ অশ্বিদ্বয়।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ পঙ্ক্তি
মন্ত্রের ঋষিঃ
১-৮ গোতম (বা সম্মদ) রাহূগণ, ৯ ত্রিত আপ্ত্য অথবা কুৎস আঙ্গিরস, ১০ আত্রেয়।।
ন বো হিরণ্যনেময়ঃ পদং নিন্দন্তি বিদ্যুতো বিত্তং মে অস্য রোদসী।।৯।।
(৪১৮) প্রতি প্রিয়তমং রথং বৃষণং বসুবাহনম্।
স্তোতা বামশ্বিনাবৃষিঃ স্তোমেভির্ভূষতি প্রতি মাধ্বী মম শ্রুতং হবম্।।১০।।
অনুবাদঃ (৪০৯) হলুদবরণ কিরণরাশি এই বিষুববিন্দুতে মধুর জলের স্বাদ আস্বাদন করেন; সেই বর্ষণশীলা কিরণরাশি ইন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে বর্ষণকর্মে মত্ত হন আর ইন্দ্রের অনুগমন করে তাঁর রাজ্যকে শোভিত করেন। (৪১০) তোমার বৃদ্ধি কামনা করে স্তুতিকার এই সোম এই মদকর সোম প্রস্তুত করেছেন। হে বলিষ্ঠ, হে বজ্রী, তুমি বলের দ্বারা পৃথিবী থেকে মেঘকে নিঃশেষে বিদারিত করলে, তারপর স্বরাজ্যে দীপ্তি লাভ করে বিরাজিত হলে।। (৪১১) মেঘহননকারী ইন্দ্র নরগণের দ্বারা আনন্দের জন্য বৃদ্ধির জন্য ও বলের জন্য স্তুত হন। তাঁকেই আমরা ক্ষুদ্র মহৎ সকল সংগ্রামেই ডাকি, তিনিই সংগ্রামে আমাদের সুন্দরভাবে রক্ষা করেন। (৪১২) হে ইন্দ্র, হে মেঘবিদারণকারী, হে বজ্রী, তোমার জন্যই অভেদ্য বীর্য, যার দ্বারা সেই মৃগরূপী মেঘমায়াকে তুমি তোমার প্রজ্ঞারূপে মায়ার দ্বারা বধ করলে, আর তারপর নিজ রাজ্যে দীপ্তি লাভ করে বিরাজিত হলে।। (৪১৩) এস, এখানে এস, প্রগলভের মত, কারণ তোমার বজ্র বৃষ্টি প্রদান করে। হে ইন্দ্র, তোমার সেনাবলই (=রশ্মিগণই) এবং তোমার বল বৃত্রমেঘকে হনন করে বারিরাশিকে জয় করেছে, তারপর তুমি তোমার স্বরাজ্যকে দীপ্তি দিতে থাকলে।। (৪১৪) সাহসের সঙ্গে এগিয়ে গেলেই সংগ্রামে (=জীবনসংগ্রামে) ধনলাভ হয়। হে ইন্দ্র, সোমপানে মত্ত তোমার অশ্ব দুটির (=দেশ ও কাল) সহযোগিতায় কাউকে বধ কর, কাউকে ধন দান কর। হে ইন্দ্র, তুমি আমাদের ধনসম্পদে রাখ।। (৪১৫) ব্যাপ্তিকে লক্ষ্য করেই তোমার প্রিয় দুই অশ্বরশ্মিকে দীপ্তিকারক হন। হে ইন্দ্র, স্বীয় দীপ্তিতে উজ্জ্বল বিদ্বানগণ নবতম স্তোত্রে তোমার স্তুতি করেছেন; অতএব এখনই তুমি তোমার বুদ্ধিদীপ্ত দুই অশ্বকে যুক্ত কর (=বর্ষণ কর্মে নিযুক্ত কর)।। (৪১৬) হে মঘবা ইন্দ্র, নিকটে এস, আমার স্তুতি শোন, যেমন শুনেছিলে আগে সেইভাবে শোন। কবে আবার তুমি আমাদের অন্ন ও বাক্যযুক্ত করবে? তাই যাচ্ঞা করছি এখনই তোমার দুই অশ্বকে যুক্ত কর।। (৪১৭) স্নিগ্ধ উজ্জ্বল রশ্মিযুক্ত চন্দ্রমা মেঘের মধ্য দিয়ে আকাশে ধেয়ে চলেছেন। হে সুবর্ণ-বজ্রগণ, বিদ্যুৎ হতে উৎপন্ন তোমাদের স্থান মানুষেরা জানতে পারে না। হে দ্যু ও পৃথিবী, আমার স্তোত্র শোন।। (৪১৮) হে অশ্বিদ্বয়, বৃষ্টিকামী স্তোতা তোমাদের দুজনের ধনবাহন বর্ষণকারী প্রিয়তম রথকে (=সূর্যকে) স্তোমের দ্বারা (=সামগানে) ভূষিত করছে। হে মধুবিদ্যাবিশারদ অশ্বিদ্বয়, তোমরা আমার আহবান শোন।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
অষ্টম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৮
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১।২।৭ অগ্নি, ৩ ঊষা, ৪ সোম, ৫।৬ ইন্দ্র, ৮ বিশ্বদেবগণ।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ১-৭ পঙ্ক্তি, ৮ উপরিষ্টাদ্ বৃহতী।।
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৭ বসুশ্রুত আত্রেয়, ২।৪ বিমদ ঐন্দ্র, বা প্রাজাপত্য বা বাসুক বসুকৃৎ, ৩ সত্যশ্রবা আত্রেয়, ৫।৬ গোতম রাহ্গণ ৮ অঙ্ঘোমুক বামদেব্য বা কুল্মল শৈলুষি।।
অনুবাদঃ (৪১৯) হে দেব অগ্নি, তোমার দীপ্ত অজর রূপকে সন্দীপ্ত করি। তোমার সেই অর্চনীয় সম্যক্দীপ্তরূপ দ্যুলোকে অনুক্ষণ জ্বলে; তুমি স্তুতিকারীর জন্য অন্ন আন। (৪২) হে অগ্নি, অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল স্বরচিত স্তোত্রের দ্বারা দেবগণের আহবানকর্তা তোমাকে বরণ করি। বিস্তীর্ণ নক্ষত্রখচিত আকাশে জগতের মস্তক শুদ্ধপাবকরূপে তোমার যে রূপ প্রকাশিত তা আহ্লাদকর সকল যজ্ঞকর্মে প্রসারিত কর। (৪২১) হে দ্যুলোকবাসিনী ঊষা, হে সুজাতা, হে ঋজুগমনের দ্বারা সৎকর্মের ব্যাপ্তিকারিণী দেবী, যেমন তুমি নিত্যই সৎকর্মের দ্বারা অন্নসংগ্রহের জন্য ও বন্ধুত্বে বাস করার জন্য আমাদের জাগরিত কর, সেরূপ আজও প্রচুর ধনলাভের জন্য আমাদের জাগ্রত কর। (৪২২) হে সোমদেবতা, আমাদের মন বা ইন্দ্রিয়কে ভদ্র, দক্ষ ও কর্মের উপযুক্ত করে পরিচালিত কর। তুমি যখন তোমার রূপ প্রকাশিত কর তখন আমরা অন্নের জন্য তোমার সখ্যতা লাভ করে হৃষ্ট হই যেমন গবাদিপশু তৃণাদি ভক্ষণে আনন্দিত হয়। (৪২৩) ইন্দ্র যজ্ঞকর্মের দ্বারা নিজের ইচ্ছামত বিপুল আকার ধারণ করে ভয়ঙ্কর বলশক্তিকে বরণ করেন। উদকবান রশ্মিযুক্ত ইন্দ্র দুই হাতে লৌহবজ্রকে ধারণ করে সুন্দর মনোজ্ঞ জল আমাদের কাছে আনেন। (৪২৪) যে ইন্দ্র রশ্মিযুক্ত পাত্রকে পূর্ণ বলে জানেন (- রশ্মির দ্বারা আকৃষ্ট জলবাস্পে আকাশ পূর্ণ) তিনিই তাঁর গমনপথে জলবর্ষণকারী জল আকর্ষণকারী রশ্মিকে স্থাপনা করেন। হে ইন্দ্র, এখনই তোমার অশ্বরশ্মি দুইটিকে যুক্ত কর (=বর্ষণকার্যে নিযুক্ত কর)। (৪২৫) আমি সেই অগ্নিকে জানি যিনি রশ্মিধন (=যাতে সকলরশ্মি বাস করে), যাঁকে আশ্রয় (বা গৃহ) মনে করে বাক্সমূহ যাঁর প্রতি গমন করে। তিনি আকাশে বিচরণকারী ব্যাপ্ত রশ্মিদের আশ্রয়; তিনিই আশ্রয় চিরন্তন রশ্মিগণের। হে অগ্নি, স্তোতাদের জন্য অন্নধন আন (যা স্তোতাদের ইচ্ছা পূরণ কর)। (৪২৬) পরস্পর প্রীতিসম্পন্ন অন্ধকারনাশক (-অর্যমা), মৃত্যু থেকে ত্রাণকারী (-মিত্র) ও বর্ষনকারী (বরুণ)[সূর্য] যে মানুষকে হিংসা অতিক্রম করে নিয়ে যান সেই মানুষকে কোন পাপ কোন দুস্কর্ম স্পর্শ করতে পারে না; দেবগণ তাঁকে ব্যাপ্ত করেন।
অনুবাদঃ (৪২৭) হে সোম, তুমি মধুরসযুক্ত হয়ে ইন্দ্র মিত্র পূষা ও ভগ দেবতার উদ্দেশে গমন কর। [এই সকল দেবতা একই সূর্যের বিভিন্নরূপ]। (৪২৮) হে সোম, মেঘের দ্বারা পরিবৃত বারিরাশিকে অন্নধনের জন্য বিজয়ীর মত প্রাপ্ত হও। (অন্নের দ্বারা) আমাদের দ্বেষ ও ঋণ দূর করে আমাদের প্রাপ্ত হও। (৪২৯) হে সোম, তুমি মহান সমুদ্রের মত (বা অন্তরিক্ষের মত) ব্যাপ্ত, সকল দেবগণের পিতা, তুমি সকলস্থানে ক্ষরিত হও। (৪৩০) হে সোম, তুমি রশ্মির মত শুদ্ধ ও গতিশীল; মহান সঙ্কল্পসিদ্ধির জন্য ও ধনের জন্য ক্ষরিত হও। (৪৩১) ইন্দু (=সোম=জল) সর্বাপেক্ষা শুদ্ধিকারক, সুশ্রী, কবি; তিনি বারিরাশির উপস্থানে (=আকাশে অবস্থিত বারিরাশির মধ্যে) ভগদেবতার (=সূর্যের) আনন্দের জন্য বাস করেন। (৪৩২) হে সোম, ঈশ্বরের মহান রাজ্যে (বা লোকাকীর্ণ যজ্ঞস্থানে) সুতসোম তোমাকে অনুসরণ করে (=সোমরস প্রস্তুতকালে) আমরাও হর্ষান্বিত হই। হে পবমান সোম (=বিশুদ্ধরূপে ক্ষরিত সোম), অন্নবলের জন্য উত্তম গতিশীল হও। (৪৩৩) এই ব্যক্ত (=ইন্দ্রিয়বিষয়ীভূত) নেতা সমানস্থানবাসী, সুন্দরগতিবিশিষ্ট রুদ্রের পুত্রগণ (=মরুদ্গণ) এঁরা কে? (৪৩৪) হে অগ্নি, যে তুমি সামগানের দ্বারা স্তুত হলে অশ্বের ন্যায় বেগবান এবং যজ্ঞের মত কল্যাণকর ও হৃদয়গ্রাহী হও, সেই তোমাকে আজ উহগানে (=সামগানে) বর্ধিত করবো। (৪৩৫) গতিশীল স্বপ্রকাশিত দেবরশ্মিগণ অন্নসৃষ্টির কারণে সবিতাদেবের (=সূর্যদেবের) ক্ষরিত জল অভিমুখে গমন করলেন এবং আকাশে স্থিত জলকে রশ্মিগণ জয় করলেন। (৪৩৬) হে সোম, তোমার মহান অনুগ্রহের উজ্জ্বল ও সুন্দর ধারা পূর্বের মত পর্যায়ক্রমে ক্ষরিত কর।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
দশম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১-৫, ৮-১০ ইন্দ্র, ৬ বিশ্বদেবগণ, ৭ ঊষা।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ দ্বিপদা বিরাট্ (কোন কোন পুস্তকে ১।৬।৯ পঙ্ ক্তি বিরাট্ বা গায়ত্রী), ২ দ্বিপদা অনুষ্টুপ্, ৩।৪ ত্রিষ্টুপ্, ৫ বৃহতী ১০ জগতী বা গায়ত্রী।
মন্ত্রের ঋষিঃ
৩ ত্রসদস্যু, পৌরকুৎস্য, ৭ সম্পাত (সংবর্ত আঙ্গিরস), অন্য মন্তের ঋষি কোন পুস্তকে বসিষ্ঠ, কোন পুস্তকে বামদেব গৌতম।।
অনুবাদঃ (৪৩৭) হে সদাদানশীল ইন্দ্র, সকল ধন বল আমাদের জন্য আহরণ কর যে ধন বলিষ্ঠ তোমার কাছে যাচ্ঞা করি। (৪৩৮) ইনিই ব্রহ্মা (=শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ-কর্তা) যিনি প্রতি ঋতুতে যথাকালে কর্ম করেন, যিনি ইন্দ্র নামে বিখ্যাত; আমি তাঁকেই স্তব করি। (৪৩৯) মহান যাজ্ঞিকগণ মেঘনহনের জন্য ইন্দ্রকে ঋকের দ্বারা স্তুতি করে ইন্দ্রের বল বর্ধিত করেছেন। (৪৪০) হে ইন্দ্র, অশ্বরশ্মির দ্বারা ব্যাপ্তির জন্য ত্বষ্টা (=সূর্য) তোমার রথ (=গমনপথ) ও বজ্র প্রস্তুত করেছেন; মানুষেরা বহুস্তুত দীপ্তিমান ইন্দ্রকেই স্তব করে। (৪৪১) ধনকামীর জন্যই ধন ও সুখকর স্থান; কর্মহীন ব্যক্তির কামনা পূর্ণ হয় না, সে ধনকে স্পর্শও করতে পারে না। (৪৪২) রশ্মিগণ সর্বদাই শুচি ও সকলকিছুর পোষক, রশ্মিগণ সর্বদাই পাপশূন্য। (৪৪৩) এস হে ঊষা শুভ্রকান্তি রশ্মিগণের সঙ্গে যে রশ্মিগণ রাত্রির সহায়তায় ভ্রমণপথকে ভজনা করেছিলেন (=রাত্রির পথে তোমার আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন)। (৪৪৪) হে ইন্দ্র, তোমার মধুময় প্রবাহের নিকট নিবাস করে আমরা যেন পুষ্টি লাভ করি ও ধন ধারণ করতে পারি। (৪৪৫) সুদীপ্ত মরুদ্গণ সূর্যকে অর্চনা করেন এবং সূর্যকেই আর যিনি অর্চনা করেন তিনি প্রখ্যাত যুবা (=সর্বকর্ম-মিশ্রণকারী অনেককর্মা) ইন্দ্র। (৪৪৬) লোকে যাঁকে বারবার সেনা করে সেই মেঘবিদারক দীপ্তকান্তি ইন্দ্রের উদ্দেশে তোমরা সাম গান কর।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
একাদশ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১।২ অগ্নি, ৩।৪।৮।১০ ইন্দ্র, ৫ ঊষা, ৬।৭।৯ বিশ্বদেবগণ।।
১ পৃষধ্র কান্ব বা সম্পাত, ২।৩।৪ বন্ধু সুবন্ধু বিপ্রবন্ধু গোপায়ন, ৫ সংবর্ত আঙ্গিরস, ৬ ভৌবন আপ্ত্য, ৭ কবষ ঐলুষ, ৮ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ৯ আত্রেয়, ১০ বাসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণি।।
অনুবাদঃ (৪৪৭) গতিযুক্ত দীপ্ত হব্যবাহী অগ্নি আমাদের জন্য স্বয়ং রথযুক্ত। (৪৪৮) হে অগ্নি, তুমি আমাদের সর্বাপেক্ষা নিকটে বাসকারী এবং ত্রাতা; তুমি সুখদায়ক (বা মঙ্গলময়) ও ভূলোকে নিবাসকারী। (৪৪৯) সূর্যের ন্যায় বিচিত্রদীপ্ত ও পূজনীয় অগ্নি রমণীয় ধন ধারণ করেন। (৪৫০) হে ইন্দ্র, যদি তুমি পূর্বে সকলের পূজ্য থেকে থাক তবে এখনও তাই আছ। (৪৫১) সুন্দররূপে জাত ঊষাদেবী ভগিনী রাত্রির অন্ধকার দূর করে (আকাশরূপ) গমনমার্গকে সম্যক্রূপে বেষ্টন করলেন। (৪৫২) ইন্দ্র এবং বিশ্বের সকল দেবতা (=সর্বরশ্মিগণ) এই নিখিল ভূবনকে যেন আমাদের জন্য সুখকর করেন। (৪৫৩) হে ইন্দ্র, সকল পথ যেমন রাজপথে গিয়ে মেশে তেমনি সকল ধন তোমাতেই মেশে। (৪৫৪) হে ইন্দ্র, দেবদত্ত এই অন্নবল লাভ করে আমরা যেন সুবীর্যশালী হয়ে শত হেমন্ত আনন্দে ভোগ করতে পারি। (৪৫৫) মিত্র ও বরুণ জলবৃদ্ধিকারক; হে ইন্দ্র, তুমি আমাদের জন্য প্রচুর অন্ন উৎপন্ন কর। ইন্দ্র বিশ্বের রাজা।
সামবেদ - ৪র্থ অধ্যায় ঐন্দ্র কান্ডঃ ইন্দ্রস্তুতি
দ্বাদশ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১।৩।৪।১০ ইন্দ্র, ২ সূর্য ৫ বিশ্বদেবগণ, ৬ মরুদ্গণ ৭ পবমান সোম, ৮ সবিতা, ৯ অগ্নি।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ১।৩।৫।৭।৯ অত্যষ্টি (কোন কোন পুস্তকে ১ অষ্টি) ২।৪।৬ অতি জগতী, ৮।১০ অতিশক্করী (কোন কোন পুস্তকে ৮ অত্যষ্টি)।।
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।১০ গৃৎসমদ শৌনক, ২ গোউরাঙ্গিরস, ৩।৫।৯ পরুচ্ছেপ দৈবদাসি, ৪ রেভ কাশ্যপ, ৬ এবয়ামরুৎ আত্রেয়, ৭ অনানত পারুচ্ছেপি, ৯ নকুল।।
অনুবাদঃ (৪৫৭) অতিবল মহান ইন্দ্র ইচ্ছানুযায়ী তিন যজ্ঞেই (বা তিন লোকেই) বিষ্ণুর সঙ্গে (=সূর্যের সঙ্গে) অভিষুত সোমপান করে তৃপ্ত হয়েছিলেন। সেই সোমই এই অতিব্যাপ্ত ইন্দ্রকে মহৎ কর্তব্যকর্ম সাধনে হর্ষান্বিত করেছিলেন। দীপ্ত সত্য সোম সত্য ইন্দ্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। (৪৫৮) সহস্রমানবের দর্শনীয়, কবিগণের বুদ্ধি ও জ্যোতিকে বিশেষরূপে ধারণকারী এই সূর্য পাপশূন্যা দীপ্তিমতী ঊষার সঙ্গে দিনের বেলায় সূর্যের সঙ্গে যুক্ত রশ্মিকে প্রেরণ করলেন (=রাত্রি অবসানে দিন আরম্ভে ঊষার সঙ্গে রশ্মিদের আগমন)। (৪৫৯) রাজা যেমন সজ্জনের পালক সেইরূপ ইন্দ্র শত্রুনাশের দ্বারা (=মেঘহননের দ্বারা) সকলজীবের পালনকর্তা; হে ইন্দ্র, তুমি দূর হতে নিজ নিজ কর্মে নিযুক্ত আমাদের কাছে এস; অন্নবান আমরা সকল যজ্ঞকর্মে মহান দাতা তোমাকে ধনদানের জন্য প্রার্থনা করি যেমন পুত্রগণ ধনের জন্য পিতার কাছে যাচ্ঞা করে। (৪৬০) সেই ধনবান উগ্রবল যজ্ঞকর্মের ধারক অপ্রতিহতগতি ইন্দ্রকে প্রচুর অন্নধনের জন্য আহবান করি; বজ্রধারী যজ্ঞযোগ্য পূজ্যতম ইন্দ্র আমাদের স্তুতির দ্বারা আবর্তিত হয় ধনদানে আমাদের সকল পথ কল্যাণযুক্ত করুন। (৪৬১) জ্ঞানবৃদ্ধির দ্বারা অগ্নিকে পুরোভাগে ধারণ করেছি; তিনি আমাদের কথা শুনুন; সেই দিব্য শক্তিকে বরণ করি; ইন্দ্র ও বায়ুকে বরণ করি। যেহেতু জগতের নাভিস্বরূপ সূর্যের উদ্দেশে এই নতুন স্তুতি স্বত-প্রণোদিতভাবে উচ্চারিত হচ্ছে সুতরাং দেবগণ (=রশ্মিগণ) যেমন ধারণশক্তির দ্বারা অন্য কর্মকে বহন করেন, তেমনি এই স্তুতিও নিশ্চয়ই ধীশক্তিসম্পন্ন দেবগণের কাছে পৌঁছাবে। (৪৬২) হে মরুদ্গণ্, বলশালী পূজনীয় সুখদাতা শীঘ্রগামী মেঘসঞ্চালনকারী স্তুতিপ্রিয় তোমাদের উদ্দেশে, মরুদ্যুক্ত (=প্রাণবায়ু সমন্বিত) বিষ্ণুর উদ্দেশে এই উত্তম স্তোত্রগান গমন করুক। (৪৬৩) সূর্য যেমন কিরণরাশির সহযোগে অন্ধকার নাশ করেন, সেরূপ এই শুদ্ধা শোভনা হরিৎবর্ণা সোমধারাসকল মিলিত হয়ে সকল হিংসাকে দূর করেছেন। সেই সোমধারার ঊর্ধ্বে দীপ্তিমান পবিত্র সূর্য উজ্জ্বল শোভা ধারণ করেন; তাঁর সেই বিশ্বরূপ সপ্তছন্দের দ্বারা ছন্দায়িত হয়ে তাঁকে বেষ্টন করে ভ্রমণ করে। (৪৩৬) দ্যুলোক ও পৃথিবী উভয়ের মধ্যে বর্তমান সবিতাদেব (=সূর্য); সেই সর্বকর্মে ব্যাপ্ত, সৎকর্মের প্রেরক, রমণীয় রত্ন ধারণকারী, সর্বজন প্রিয়, মননযোগ্য সবিতাদেবকে আমি অর্চনা করি। যার স্বপ্রকাশময়ী দীপ্তি গমনাভিমুখী হয়ে উদ্ভাসিত, যার অনুশাসনে জগৎ প্রবর্তিত, তিনি হিরণ্যহস্ত (=স্বর্ণবর্ণ কিরণ-যুক্ত) সুকর্মা, জলনির্মাণকারী আদিত্য সূর্য। (৪৬৫) আমিই সেই অগ্নিকে জানি যিনি দানাদিগুণযুক্ত, সকলের নিবাসের কারণ, বলের পুত্র (=বলের দ্বারা উৎপন্ন), জ্ঞানপ্রজ্ঞান, কৃতবিদ্য বিপ্রের মত প্রজ্ঞাবিশিষ্ট। সেই উজ্জ্বলশিখাযুক্ত ঘৃতযুক্ত অগ্নি গৃতাহূতির দ্বারা বেষ্টিত হয়ে ঊর্ধ্বগতির দ্বারা দেবগণের প্রতি হব্যবহনে সমর্থ হন। (৪৬৬) হে ইন্দ্র, প্রথমেই আকাশে তুমি মানুষের হিতকর যে বীরোচিত কর্ম পূর্ব-কালে সম্পাদন করেছিলে তা’ অত্যন্ত প্রশংসনীয় কার্য। তুমি প্রাণের কারণে নিরুদ্ধ জলকে দেবশক্তির দ্বারা (=রশ্মির বলের দ্বারা) মুক্ত করেছিলে, বলের দ্বারা পৃথিবী হতে সকল আদেবমায়াকে (অদেব=মেঘ) দূর করে জলপ্রদান করলে; হে শতকর্মা ইন্দ্র, (সেই জলের দ্বারা) অন্নকে প্রাপ্ত হলে।।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
প্রথম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ পাবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৪ অহমীয়ু আঙ্গিরস, ২ মধুছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৩ ভূণ্ড বারুণি বা জমদগ্নি ভার্গব, ৫ ত্রিত আপ্ত্য, ৬ কাশ্যপ মারীচ, ৭ জমদগ্নি ভার্গব, ৮ দৃঢ়চ্যুত আগস্ত্য, ৯।১০ কাশ্যপ আদিত বা দেবল।।
অনুবাদঃ (৪৬৭) (হে পবমান সোম), ঊর্ধ্বলোকে অন্নরসরূপে উৎপন্ন জল ভূমিতে পতিত হয়ে প্রচুর অন্ন, বল ও সুখ দান করে।। (৪৬৮) হে সোম, তুমি ইন্দ্রের পানের জন্য অভিযুত হয়েছ; অতি সুস্বাদু ও আনন্দজনক ধারায় ক্ষরিত হও।। (৪৬৯) হে বর্ষণকারী, মরুদ্গণসমন্বিত ইন্দ্রের আনন্দের জন্য আনন্দধারা প্রবাহিত কর, যারা সকলকিছু বলের দ্বারা ধারণ করে আছেন।। (৪৭০) হে সোম, যে আনন্দ বরণীয়, যা দেবগণকে মত্ত করে এবং অন্ধকার নাশ করে সেই অন্নরূপ আনন্দরস ধারণ করে ক্ষরিত হও।। (৪৭১) তিনপ্রকার স্তুতিবাক্য (=ঋক, যজুঃ, সাম) ঊর্ধ্বলোকে যাচ্ছে, আকাশে অবস্থিত রশ্মিগণ ও বাকরূপী ধেনুগণ শব্দ করছে (=মেঘগর্জন); হরিৎবর্ণ সোম শব্দ করতে করতে যাচ্ছেন।। (৪৭২) হে সোম, তুমি মরুদ্গণের সঙ্গে যুক্ত ইন্দ্রের পাণের জন্য মধুরতম রসরূপে ক্ষরিত হও; ইন্দ্রের গৃহে তোমার বাস।। (৪৭৩) মেঘে অবস্থিত কর্মকুশল সোম আনন্দের জন্য অভিযুত হয়ে শ্যেন (=রশ্মি) যেমন দ্রুতবেগে ধায় সেই ভাবে আপনস্থানে (=আকাশে) গিয়ে বসলেন।। (৪৭৪) হে হরিৎবর্ণ সোম, তুমি আনন্দদায়ক, কুশলকর্ম নিষ্পাদক; তুমি দেবগণের (রশ্মিগণের) মরুদ্গণের (=প্রাণবায়ুগণের) ও বায়ুর (=ইন্দ্রের) পানের জন্য ক্ষতির হও।। (৪৭৫) সুন্দররূপে পরিচালিত হয়ে মেঘস্থিত সোম রশ্মিকে আশ্রয়ে করে ক্ষরিত হলেন। হে সোম, তুম আনন্দের মধ্যে সকল কিছু ধারণ কর।। (৪৭৬) সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত হয়ে সর্বকর্মা ক্রান্তদর্শী প্রিয় সোম দ্যুলোকে জলের মধ্যে নিহিত রশ্মিরূপ পাখীদের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য যাচ্ছেন।।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
দ্বিতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ পাবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ কবি মেধাবী, ২ শ্যাবাশ্ব আত্রেয়, ৩ ত্রিত আপ্তা, ৪।৮ অহমীয়ু আঙ্গিরস, ৫ ভূণ্ড বারুণি, ৬ কাশ্যপ মারীচ, ৭ নিধ্রুবি কাশ্যপ, ৯।১০ কাশ্যপ আদিত বা দেবল।। (এই খণ্ডের মন্ত্রগুলির দেবতা বিষয়ে উল্লেখ সকল পুস্তকে একরূপ নয়)।।
অনুবাদঃ (৪৭৭) মদ্রস্রাবী সোমসকল যজ্ঞে অভিষুত হয়ে আমাদের জন্য ধনসমূহের শ্রেষ্ঠ অন্নধনের জন্য (ঊর্ধ্বে) গমন করেছেন।। (৪৭৮) মহান মাধ্যমিক রশ্মিগণের মত অজ্ঞানতানাশক সোম জলতরঙ্গ সমূহকে ঊর্ধ্বে নিয়ে যাচ্ছেন।। (৪৭৯) হে বর্ষণকারী ইন্দ্র (=সোম) অভিষুত হয়ে ক্ষরিত হও, লোকমধ্যে আমাদের যশস্বী কর, সকল দ্বেষ নাশ কর।। (৪৮০) হে পবমান সোম, তুমিই বর্ষণকারী; সূর্যের দ্বারা সূর্যরশ্মির মত ঔজ্জ্বল্যযুক্ত তোমাকে আহবান করি।। (৪৮১) ইন্দু (=সোম) অতি পবিত্র, চেতনাসম্পন্ন, প্রিয়, কবিগণের বুদ্ধি; তিনি ইন্দ্রের মত (রথী=ইন্দ্র) জলমধ্যে বিদ্যুৎ (অশ্ব=রশ্মি, বিদ্যুৎ) সৃষ্টি করতে করতে ব্যাপ্ত হন।। (৪৮২) উজ্জ্বল বীরত্বব্যঞ্জক দুগ্ধমিশ্রিত সোমরস রশ্মিদ্বারা (বা বিদ্যুৎ সহযোগে) অন্নসমূহ সৃষ্টি করলেন।। (৪৮৩) হে সোম, তোমার হর্ষ, আয়ুহিতরক অন্ন-সৃষ্টিকারক ইন্দ্রের প্রতি গমন করুক; সত্যকর্মের দ্বারা বায়ুতে আরোহণ কর (=বৃষ্টিপ্রদানের জন্য বায়ুকে আশ্রয় কর); হে দেব, ক্ষরিত হও।। (৪৮৪) সোম, ক্ষরিত হতে হতে আকাশে বৈশ্বানরের মত (=সূর্যের মত) বৃহৎ জ্যোতি বিচিত্র বিদ্যুৎকে সৃষ্টি করলেন।। (৪৮৫) বহনকারী রশ্মির দ্বারা শব্দের দ্বারা সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত বারিরাশি আনন্দের জন্য (=প্রাণীকুলের আনন্দের জন্য) মধুর ধারায় গমন করছেন (=বর্ধিত হচ্ছেন)।। (৪৮৬) বহুলোকের আরাধ্য কর্মকে ধারণ করতে করতে (=বারিরাশিকে ধারণ করতে করতে) সমুদ্রতরঙ্গের উপর নিক্ষিপ্ত হয়ে কবি সোম স্থিত হলেন।।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
তৃতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ পবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৮।৯ অমহীয়ু, আঙ্গিরস, ২ বৃহন্মতি আঙ্গিরস, ৩ জমদগ্নির্ভাগবঃ ৪ প্রভুবসু আঙ্গিরস, ৫ মেধ্যাতিথি কান্ব ৬।৭ নিধ্রুবি ক্যাশপ, ১০ উচথ্য আঙ্গিরস।।
অনুবাদঃ (৪৮৭) শব্দের দ্বারা বিদলিত শুদ্ধীকৃত যথাসময়ে বর্ষণকারী ইন্দু সোমের প্রতি (=উপযুক্ত সময়ে ক্ষরিত বারিরাশির প্রতি) দেবগণ (=রশ্মিগণ) নিজ আধিপত্যের জন্য গমন করেছেন (=বর্ষণের পর রশ্মিগণ পুনরায় জল থেকে বাস্প সৃষ্টির জন্য জলের প্রতি যাচ্ছেন)।। (৪৮৮) শুদ্ধীকৃত সোম সকল যুদ্ধ অতিক্রম করে এলেন (=পৃথিবীতে বারিরাশি পতিত হলো); সকলে সেই সঞ্চারিত সোমকে (=বিপ্র) জ্ঞান ও কর্মের দ্বারা শোভিত করছেন (অর্থাৎ বর্ষণকে প্রয়োজনমত কর্মে নিযুক্ত করছেন)।। (৪৮৯) ইন্দ্রের জন্যই অভিষুত সোম ক্ষিপ্ত হলেন; (কর্মের জন্য) কলশে প্রবেশ করলেন, সকল সৌন্দর্যকে প্রাপ্ত হলেন।। (৪৯০) গতিশীলা দ্যু ও পৃথিবীর রশ্মিতে যথানিয়মে সোম সৃষ্ট হয়ে বেগবান অশ্বের মত চক্রাকারে পথ অতিক্রম করলেন (=অন্তরিক্ষের পথ অতিক্রম করে পৃথিবীতে এলেন)।। (৪৯১) যখন তিনি ভ্রমণশীল রশ্মির মত উদকের সঙ্গে বিচরণ করছিলেন, তখন কালো মেঘের আবরণ ভেদ করে উদককে প্রাপ্ত হলেন।। (৪৯২) হে সোম, তুমি কর্মপ্রেরক ও তৃপ্তিদায়ক। তুমি যুদ্ধে মেঘকে তাড়িত করে দেবভক্ত মানুষের প্রতি উদক প্রেরণ কর।। (৪৯৩) হে সোম, সেই ধারায় ক্ষরিত হও যে ধারায় ক্ষরিত হলে পর বারিরাশি মনুষ্যকুলকে তৃপ্ত করবে ও সূর্যকে প্রকাশিত করবে।। (৪৯৪) হে সোম, যখন বিপুল আকৃতি মেঘের মধ্যে বিশাল জলরাশি নিরুদ্ধ ছিল, তখন ইন্দ্র বৃত্রকে (=মেঘকে) হত্যা করতে উদ্যত করলে তুমি ইন্দ্রকে রক্ষা করেছিলে; সেই তুমি এখন ক্ষরিত হও।। (৪৯৫) যে ইন্দ্র মত্ত হয়ে অসংখ্য মেঘ ধ্বংস করলেন, হে সোম, সেই মেঘনিঃসৃত বারিধারাকে প্রবাহিত কর।। (৪৯৬) হে সোম, রশ্মিতে প্রস্তুত বারিরাশির দ্বারা সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত হয়ে আমাদের জন্য উজ্জ্বল, সকলভারবহনকারী বলকারক শাশ্বত ধন আন।।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
চতুর্থ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১৪
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ পবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ মেধাতিথি কান্ব, ২। ৭ ভৃণ্ড বারুণি বা জমদগ্নি ভার্গব, ৩ উচথ্য আঙ্গিরস, ৪ অবৎসার কাশ্যপ, ৫। ৬ নিধ্রুবি কাশ্যপ, ৮। ৯ কাশ্যপ মারীচ, ১০ আসিত কাশ্যপ বা দেবল, ১১ কবি ভার্গব, ১২ জমদগ্নি ভার্গব, ১৩ অয়াস্য আঙ্গিরস, ১৪ আমহীযু আঙ্গিরস।।
অনুবাদঃ (৪৯৭) বর্ষণকারী, হরিৎবর্ণ, মহান, মিত্রের মত শোভন সোম শব্দ করে চলেছেন এবং সূর্যের দ্বারা সম্যক্ রূপে দীপ্ত হয়েছেন।। (৪৯৮) হে সোম, তুমি দক্ষ, সুখপ্রদ, বহনশীল, পানযোগ্য এবং বহুলোকের আকাঙ্ক্ষিত; তোমাকে আজ বরণ করি।। (৪৯৯) হে অধ্বর্যা (=যজ্ঞকর্মা=সূর্য), মেঘপুঞ্জ হতে নিঃসারিত সোমকে রশ্মিতে বহন করে আন; ইন্দ্রের পানের জন্য শোধিত কর।। [এই মন্ত্রের যাজ্ঞিক অর্থ এইরূপঃ হে অধ্বর্যু (=একজন ঋত্বিক্), প্রস্তরের দ্বারা অভিষুত সোমকে ইন্দ্রের পানের জন্য ছাঁকনিতে ঢেলে দাও ও শোভিত কর। অধ্বর্যু=যিনি যজ্ঞকর্মের কামনা করেন এবং যজ্ঞকে সমাপ্তির পথে নিয়ে যান = সূর্য। লৌকিক আনুষ্ঠানিক বিচারে অধ্বর্যু একজন ঋত্বিক্। অদ্রি = মেঘ ও প্রস্তর। পবিত্র = রশ্মি এবং ছাঁকনি] (৫০০) সেই অভিষুত সোমের আনন্দধারা তড়িৎবেগে বয়ে যাচ্ছে। সেই আনন্দধারা তড়িৎবেগে বয়ে যাচ্ছে।। (৫০১) হে সোম, সুবীর্য সহস্র ধন (=বারিসম্পদ) ক্ষরণ কর; আমাদের জন্য অন্নসকল ধারণ কর।। (৫০২) প্রাচীন সামগানের অনুসরণে নতুন এই সামগান সূর্যমণ্ডলে দীপ্তি পাবার জন্য গমন করছে। [প্রত্নাসঃ = প্রাচীন; আয়বঃ = এক ধরনের সামগান]।। (৫০৩) হে সোম, তুমি অতি গম্ভীর শব্দ করতে করতে মেঘপুঞ্জের প্রতি ধাবমান হও; অন্তরিক্ষে অবস্থিত জলমধ্যে প্রবেশ কর।। (৫০৪) হে সোম, তুমি দীপ্তিমান, তুমি বর্ষণকারী; হে দেব, বর্ষণকর্মই তোমার ব্রত, বর্ষণের দ্বারাই তুমি সকল ধর্মকে ধারণ কর।। (৫০৫) হে ইন্দ্র, (=সোম), মনীষিদের দ্বারা শোভিত হয়ে অন্নলাভের জন্য ধারারূপে ক্ষরিত হও। দীপ্তশোভা ধারণ করে জলরাশির দিকে গমন কর। (৫০৬) হে সোম, দেবকামী বর্ষণকারী তুমি আনন্দ ধারায় ক্ষরিত হও; আমাদের হিতাকামী তুমি তোমার অনুগ্রহের দ্বারা সকল জলাশয়ে অবস্থিত থাক।। [যাজ্ঞিক অর্থ এইরূপ – মেঘলোমের ছাঁকনির দ্বারা শুদ্ধ হয়ে তুমি আমাদের হিতকামী]।। (৫০৭) হে সোম, তুমি এই সুকর্মের দ্বারা মহান হয়ে বৃদ্ধিলাভ কর। আনন্দভরে বর্ষণ কর। (৫০৮) এই মনুষ্যহিতকারী পবমান সোম জলের দ্বারা বৃদ্ধিকারক অন্নকে প্রচুর উৎপন্ন করে তাঁর কর্মকে জানিয়ে দিচ্ছেন।। (৫০৯) হে ইন্দু, মহান জলতরঙ্গের মত দেবনগোনকে ধারণ করে অয়াস্য ঋষির কাছে এস।। (৫১০) ইন্দ্রের সহায়তায় যুদ্ধে অনুদার মেঘকে হনন করে মেঘ থেকে নির্গত হয়ে সোম বয়ে চলেছেন।।
অনুবাদঃ (৫১১) হে সোম, তুমি পবিত্র, তুমি জলের বসন পরিধান করে (=পবিত্র জলে আচ্ছাদিত হয়ে) ধারারূপে বর্ষিত হও। তুমি দেব, হিরন্ময় সকল রমণীয় ধন ধারণ করে জলের উৎস অন্তরিক্ষে বাস কর। [যাজ্ঞিক অর্থ = যজ্ঞস্থানে এসে উপবেশন কর]।। (৫১২) এই সোমদেবকে সকল দিকে সেচন কর, যিনি উত্তম হবি (=অন্ন), যিনি মানুষের হিতকারী, যিনি মেঘপুঞ্জে অবস্থিত থেকে অভিষুত হয়ে সোমের (= শস্য উৎপাদন দ্বারা মানুষের হিতরক উদকের) ধারাকে প্রবাহিত করেন।। (৫১৩) হে সোম, তোমার অনুগ্রহে মেঘ নিঃসারিত বারিরাশি সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত হয়ে জলাশয় সমূহকে প্রাপ্ত হোল। দ্যু ও পৃথিবীর মধ্যে অবস্থিত উজ্জ্বল সোম আকাশ থেকে জলমধ্যে প্রবেশ করলেন, যেন কোন মানুষ নগরে প্রবেশ করছে।। (৫১৪) হে সোম, দেবতার আনন্দপানের জন্য যেমন জলের দ্বারা নদীকে পরিপূর্ণ কর, তেমনি জলের মধুর ক্ষরিত ধারার মত সোমের মদির ধারায় তোমার প্রতি জাগরুক যে তাকে পূর্ণ কর। (৫১৫) ঊর্ধ্বাকাশে হরিৎ অশ্বরশ্মির দ্বারা নিপীড়িত হয়ে সোম পরিচালিত হয়ে ধারারূপে বয়ে চলেছেন; আনন্দ সহকারে সোম ধারারূপে বয়ে চলেছেন।। (৫১৬) হে ইন্দু, প্রতিদিন আমি তোমার সখ্যতায় প্রীতিলাভ করি। বহু জলভরা মেঘ আকাশে বিচরণ করছে; আমাকে রক্ষা করবে বলে সেই নিরুদ্ধ জলকে আমার কাছে আন।। (৫১৭) হে ক্ষরণশীল সোম, তুমি সুকৌশলে পরিস্কৃত হয়ে আকাশে শব্দ করে বিচরণ কর, তুমি উজ্জ্বল বর্ণ, বহু লোকের আকাঙ্ক্ষিত প্রচুর জলসম্পদ এনে দিয়ে থাক।। (৫১৮) সূর্যের জন্য (=রশ্মির সহায়ে) ঊর্ধ্বাকাশে অবস্থিত মনের অভিলাষ পূর্ণকারী; আনন্দদায়ক, মধুক্ষরণকারী, আয়ুস্কারক সোম রাশি আনন্দধারা ক্ষরণ করছেন।। [বিষ্টপ্ = আদিত্য; যিনি রসগ্রহণের জন্য রশ্মির দ্বারা প্রবিষ্ট হন]।। (৫১৯) হে সোম, তুমি শুদ্ধ ও অপ্রমত্তরূপে অবস্থিত থেকে অনুগ্রহের দ্বারা জলাশয় পূর্ণ করে সকলের প্রিয় হলে। তুমি চেতনাসম্পন্ন ও অঙ্গিরশ্রেষ্ঠ; তুমি মধুপূর্ণ রসের দ্বারা আমাদের যজ্ঞকে (=কর্মকে; প্রার্থনাকে) অভিষিক্ত কর।। [অঙ্গিরা = Carbon: অঙ্গার হতে অঙ্গিরা উৎপন্ন। (৫২০) আনন্দদায়ক সোম ইন্দ্রের জন্য ক্ষরিত মরুদ্গণের জন্য অভিষুত হন। সহস্রধারায় বায়ুস্তর ভেদ করে তিনি আসেন; তাঁকেই মানুষেরা শুদ্ধ করে অলঙ্কৃত করেন।। (৫২১) হে শ্রেষ্ঠধন, সকল ধনকে লক্ষ্য করে ক্ষরিত হও। হে সোম, আনন্দদায়ক আকাশ তোমাকে প্রথমে দেবগণের জন্য (=রশ্মিগণের জন্য) ধারণ করেছেন।। (৫২২) অন্তরিক্ষে প্রবাহমান জলসমূহ প্রাণবায়ুসমন্বিত, আনন্দদায়ক, ধনসম্পন্ন, গতিযুক্ত ও ক্লান্তিহরণকারী; এই বারিরাশি মেধা ও শুদ্ধিকে লক্ষ্য করে অতি ধারার বর্ষিত হচ্ছেন। (অথবা এই বারিরাশি ধন উৎপন্নের জন্য জলকে অতিধারায় বর্ষণ করেন)।।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
ষষ্ঠ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১০
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ পবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ত্রিষ্টুপ্
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৯ উশনা কাব্য, ২ বৃষগণ বাসিষ্ঠ, ৩।৭ পরাশর শাক্ত্য, ৪।৬ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণ, ৫।১০ প্রতর্দন দৈবদাসি, ৮ প্রষ্কন্ব কান্ব।।
অব দ্রোণানি ঘৃতবন্তি রোহ মদিন্তমো বৎসর ইন্দ্রপানঃ।।১০।।
অনুবাদঃ (৫২৩) হে সোমদেব, তুমি দ্রুত গমত কর; মেধকে ঘিরে উপবেশন কর; অশ্বরশ্মিসমূহের দ্বারা পরিস্রুত হয়ে অন্নকে লক্ষ্য করে (=অন্ন সৃষ্টির উদ্দেশ্য) গমন কর। পরিশোধনকারী রশ্মিগণ অশ্বের মত বলবান তোমাকে মেঘের (বা বিদ্যুতের) দ্বারা ব্যাপ্ত করে জলবর্ষণের উদ্দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। (৫২৪) সোমদেব কবির মত উৎসাহিত হয়ে মেঘধ্বনি রূপ রসাত্মক বাক্য (বা ধ্বনি) সৃষ্টি করে দেবগণের অবস্থান (বা উৎপত্তিস্থান) জানিয়ে দিচ্ছেন। মহান ব্রতধারী, শুচি বন্ধু, পবিত্রতাকারক সোম শব্দ করতে করতে গমনসাধনের দ্বারা মেঘকে সর্বদা প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। (৫২৫) বহনকারী সোম ঋতদেবের (=সূর্যদেবের=) বৃষ্টিপ্রদান বিষয়ক বৃদ্ধি এবং অন্নদানরূপ প্রজ্ঞাকে ধারণ করে তিন প্রকার বাক্য প্রেরণ করেন (তিন প্রকার বাক্য = ঋক্, যজু, সাম)। গাভীগণ যেমন গোপতিকে লক্ষ্য করে শব্দ করতে করতে যায় তেমনি কামনাভিলাষী বুদ্ধিসকল অভিমুখে যাচ্ছে। (৫২৬) (ইন্দ্র হিরন্ময় বিদ্যুতের সহায়তায় মেঘ থেকে যে উদক সৃষ্টি করলেন) সেই উজ্জ্বলকান্তি উদকের দ্বারা প্রেরিত হয়ে ক্ষরণশীল সোমদেব দেবগণের (=রশ্মিগণের) সহায়তায় সেই উদককে মধুর রসযুক্ত করলেন। সেই অভিষুত সোম জলকে ঘিরে শব্দ করতে করতে সর্বধনযুক্ত হোতা অগ্নির গৃহে (=পৃথিবীতে) পরিচিত ব্যক্তির মত প্রবেশ করলেন। (৫২৭) সোম ক্ষরিত হচ্ছেন; তিনি বুদ্ধির জন্মদাতা, দ্যুলোকের জন্মদাতা; পৃথিবীর জন্মদাতা, অগ্নির জন্মদাতা, সূর্যের জন্মদাতা, ইন্দ্রের জন্মদাতা, এবং বিষ্ণুরও জন্মদাতা। (৫২৮) তিন লোকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, বর্ষণশীল, বলশালী, স্তুতিযুক্ত সোমকে লক্ষ্য করে কামনাযুক্ত বাক্য সকল যাচ্ছে। উদকের বসন পরা বরুণ যেমন নদীকে জল দান করেন, তেমনি রত্নধারক সোম বরণীয় ধন দান করেন। (৫২৯) আকাশের মত অনতিক্রমণীয় ভুবনের রক্ষক সোম প্রথমে জগৎধারণের উদ্দেশ্যে প্রজা সৃষ্টি করলেন। সেই বর্ষণশীল মহান সোম নিজ অনুগ্রহে পর্বতশিখরে রশ্মিকে আশ্রয় করে শব্দযুক্ত মেঘরূপে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হলেন। (৫৩০) সর্বদিকে সৃষ্ঠ ক্ষরণশীল শব্দকারী হরিৎবর্ণ সোম বনের জঠরে গিয়ে বসলেন (=বনমধ্যে বৃক্ষাদিতে প্রবেশ করলেন), যেখানে তিনি রশ্মিগণের দ্বারা পরিশুদ্ধ হলেন, (তারপর উদ্ভিদ হতে উৎপন্ন) অন্নসমূহের দ্বারা বাক্যুক্ত বৃদ্ধি উৎপন্ন হোল। (৫৩১) হে ইন্দ্র, এই তোমার বর্ষণশীল কাম্য মধুমান সোম যা আকাশে সর্বত্র ক্ষরিত হয়; ইনি সহস্রদাতা, শতদাতা, ভূরিদাতা, নিত্যশ্রেষ্ঠ ও অন্নকে আশ্রয় করে সদা বৃদ্ধিশীল। (৫৩২) হে মধুমান সোম, উপযুক্ত কালে জলের বসন পরে তুমি পর্বত শিখরে বসেছ; তুমি ক্ষরিত হও। ঘৃতরূপ মেঘরাশিকে থেকে অবতরণ কর। তুমি অতি সুখকর, আনন্দায়ক ইন্দ্রের পানীয়।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
সপ্তম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১২
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ পবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ত্রিষ্টুপ্
মন্ত্রের ঋষিঃ
১. প্রতর্দন দৈবদাসি, ২।১০; পরাশর শাক্ত্য ৩ ইন্দ্রপ্রমতি বাসিষ্ঠ, ৪ বসিষ্ঠ মৈত্রাবরুণ, ৫ কর্ণশ্রু মুড়ীক বা বাসিষ্ঠ, ৬ নোধা গৌতম, ৭ কণ্ব ঘৌর, ৮ মন্যু বাসিষ্ঠ, ৯ কুৎস আঙ্গিরস, ১১ কশ্যপ মারীচ, ১২ প্রঙ্কন্ব কাণ্ব।
অনুবাদঃ (৫৩৩) সেনাপতি বীর সোম (=সমানগতিসম্পন্ন শক্তির রক্ষক উদকের আত্মা) জলসমন্বিত মেঘকে পাবেন বলে সকল রথের (=গমনপথের) আগে যাচ্ছেন; এঁর সেনা আনন্দ প্রকাশ করছেন। সকলের কল্যাণ করবেন বলে ইন্দ্রকে আহবান করে সখাদের জন্য (=ইন্দ্রের সখা মরুৎবায়ুগণের জন্য) সোমদেব আচ্ছাদক তেজোরাশি আহরণ করছেন।। (৫৩৪) মেঘ ভেদ করে যে পবিত্র জল প্রাপ্ত হলে তা’ থেকে তোমার মধুময় রসের ধারা সৃষ্ট হোল। হে ক্ষরণশীল সোম, সূর্য রশ্মির দ্বারা সৃষ্ট হয়ে যে জলরাশি স্ফীত হোল সেই জলের আধার থেকে জল ক্ষরিত কর।। (৫৩৫) তোমরা সোমদেবের উদ্দেশ্যে গান কর; এস ঐ দেবগণকে অর্চনা করি; বিপুল ধন প্রাপ্তির জন্য সোমকে উন্নত কর। মেঘ থেকে স্বাদু জল বর্ষণ কর; হে দেব ইন্দু, কলশে প্রবেশ কর।। (৫৩৬) দ্যুলোক ও ভূলোকের রচয়িতা উত্তমরূপে বৃদ্ধিলাভ করে অন্নলাভের উদ্দেশে রথের মত বেগে গমন করলেন; ইন্দ্রের কাছে গিয়ে অস্ত্র শানাতে লাগলেন; তিনি সকল ধন দুই হাতে ধারণ করে আছেন।। (৫৩৭) যদি বাক্দেবী (=মাধ্যমিক মেঘগর্জন, যা থেকে অন্ন উৎপন্ন হয়) মনের ইচ্ছায় ইজ্জ্বল অন্নসমূহ সৃষ্টি করে বৃহতের ধর্মকে পালন করেন, তবে কাময়মান শব্দকারী এবং শ্রেষ্ঠ বস্তু প্রদানকারী রশ্মিগণ সমাগত হয়ে প্রীতিজনক ইন্দুকে (=সোমকে বা জলকে কলশে স্থাপিত করেন।। (৫৩৮) ধনুর মত আকৃতি ধারণ করে দশটি ভগিনী (=দশ দিকে অবস্থিত অগ্নিশিখা) ধীমান সোমকে শোধন করে (ঊর্ধ্বে) প্রেরণ করছে। হরিৎবর্ণ সোম বেগবান ধোড়ার মত সূর্য হতে জাত ইতস্তত ভ্রমণকারী মেঘপানে ধাবিত হলেন।। (৫৩৯) ঊষার আলোক যেমন অন্ধকারকে পরাভূত করে, সূর্যোদয়ে যেমন মানুষের কর্ম পরস্পরকে স্পর্ধা করে, বুদ্ধি যেমন পশুবর্ধনের জন্য গ্যেষ্ঠ সৃষ্টি করে (=পশুদের পরাভূত করে) জ্ঞানী সোমও সেইরূপ জলকে ঘিরে (=পরাভূত ক’রে) ক্ষরিত হচ্ছেন।। (৫৪০) ইন্দু অশ্বের মত ব্যাপ্ত। তিনি প্রচুর বারিরাশি ক্ষরণ করেন। সোম ইন্দ্রের সহযোগে মত্ত হয়েছেন। যাদের হাত থেকে জীবন রক্ষা করা কর্তব্য সেই শত্রুদের পরাভূত করছেন। তিনি বলশালী রাজার মত কাম্যবস্তু উৎপাদন করেন।। (৫৪১) হে অশ্বযুক্ত ইন্দু (=গতিযুক্ত সোম দেবতা) এই ভাবেই আকাশ হতে ক্ষরিত হয়ে জলাশয়ে ধন ক্ষরণ কর। বায়ুর মত যাঁর গতি সেই মহান বহুমেধা সোম গতির জন্যই যেন মানুষকে ধারণ করেন। (৫৪২) সেই মহান সোম বিপুল জলরাশি সৃষ্টি করলেন যার গর্ভ সমস্ত দেবরশ্মিদের আচ্ছাদিত করলো (=মেঘে ঢাকা সূর্যরশ্মি)। সোম ক্ষরিত হয়ে ইন্দ্র বলাধান করলেন। সূর্যে জ্যোতি সৃষ্টি করলেন।। (৫৪৩) যুদ্ধে যেমন রথের চাকায় প্রচুর ধুলো উৎপন্ন হয় তেমনি শব্দের প্রথম আবিস্কারক (বা সৃষ্টিকর্তা) সোমদেব মনন ও কর্মের দ্বারা জল বুদ্বুদ্ সৃষ্টি করলেন। দশটি ভগিনী (=দশদিকের অগ্নিশিখা) গিরিশিখরে জলরাশির মধ্যে অবস্থিত জলবহনকারী সোমকে অগ্নিশুদ্ধ করে শব্দ করেছেন। (৫৪৪) জলরাশিই তরঙ্গমালা যা মননের দ্বারা সৃষ্ট, তা সোমকে উদ্দেশ করে প্রবল বেগে যাচ্ছে, নত হয়ে যাচ্ছে, তাতে কাময়মানা ও কাময়মান এক হয়ে গেছে।।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
অষ্টম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৯
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ পবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ত্রিষ্টুপ্।। ৭ বৃহতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ অন্ধীণ্ডঃ শ্যাবাশ্বি, ২ নহুষ মানব, ৩ যযাতি নাহূষ, ৪ মনু সাংবরণ, ৫।৮ অন্বরীষ বার্ষাগির ও ঋজিশ্বা ভারদ্বাজ, ৬।৭ রেড ও সূনূ কাশ্যপ, ৮ বাক্ বা বিশ্বামিত্র পুত্র প্রজাপতি।।
অনুবাদঃ (৫৪৫) হে সখাগণ (মরুৎগণ = প্রাণবায়ু) তোমাদের আনন্দের জন্য মেঘ হতে প্রস্তুত আহ্লাদজনক সোমরস পূর্বেই সংগ্রহ করা হয়েছে; দীর্ঘ শব্দকারী প্রবল বাতাসকে দূর কর (শ্বান = ঝড় বাতাস)।। (৫৪৬) ইনিই পোষণকারী, ইনিই ভজনীয় সম্পদ, ইনি শোধিত হয়ে যাচ্ছেন; ইনি বিশ্বভুবনের পতি; ইনি দ্যুলোক ও পৃথিবীকে পরস্পর থেকে পৃথক করেছেন।। (৫৪৭) ইন্দ্রের হর্ষর জন্য এই উত্তম মধুময় সোম প্রস্তুত হয়েছে। যে রশ্মিযুক্ত সোমরস সকল, তোমাদের আনন্দ দেবগণকে (=রশ্মিগণকে) লক্ষ্য করে ক্ষরিত হতে হতে গমন করুক।। (৫৪৮) উত্তমরূপে পথের সকল বাধা অতিক্রমকারীর সুন্দরভাবে প্রস্তুত জলধারা আমাদের জন্য ক্ষরিত হচ্ছেন। এই সোমধারা বন্ধু, বাক্যুক্ত, পাপশূন্য, সুপ্রজ্ঞ এবং সূর্যকে জানেন।। (৫৪৯) হে ইন্দু, আমাদের জন্য সর্বজনকাম্য সহস্রপ্রকার বল ও ধনযুক্ত বহু অন্নসম্পদ আন।। (৫৫০) অন্তরিক্ষে জলের নির্মাত্রী রশ্মিগণ ইন্দ্রের প্রিয় কাম্য অনিষ্টরহিত সোমকে প্রাপ্ত হলেন (=সৃষ্টি করলেন), প্রথম জাত সন্তানকে মাতা যেরূপ আদর করেন সেইভাবে রশ্মিগণ নবজাত জলকে লেহন করছেন। (৫৫১) রশ্মিগণ সর্বত্র প্রগল্ভ গতিযুক্ত সোমের জন্য তীক্ষ্ণবল শস্ত্র বিস্তার করেছেন। (রশ্মির তীক্ষ্ণ অগ্রভাগের দ্বারা জল বৃদ্ধি করছেন)। উত্তম মিশ্রণকারী উজ্জ্বল রশ্মিগণ জলের অগ্রভাগে অবস্থিত থেকে প্রাণবান জলের জন্য মেঘরূপ বস্ত্রকে বিস্তার করছেন। (৫৫২) রশ্মিগণ সেই গমনশীল সর্বস্তুধারক হরিৎবর্ণ সোমকে জলযুক্ত করে সর্বত্র প্রেরণ করছেন, যে সোমদেব সকল দেবগণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সর্বত্র আনন্দসহকার যাচ্ছেন।। (৫৫৩) মানুষের কামনাসুলভ স্তুতি যেমন জলকে ঘিরে হয়, তেমনি সোমদেব মেঘ হতে জল নিস্কাশনের জন্য মেঘকে ঘিরে থাকেন। তিনি ক্রুর আদানকারী বায়ুকে বিনাশ করেন যেমন মাধ্যমিক ভৃণ্ড নামক রশ্মিগণ যজ্ঞকর্মকে শুস্ক করেন। [ভৃগবঃ = ভৃণ্ডগণ = মধ্যকাশে অবস্থিত রশ্মিগণ, যাঁরা জলরাশি প্রদান না করে মেঘকে শুস্ক করেন। মখ= যজ্ঞ। শ্বান = ঝড় বা প্রবল বায়ু যা বৃষ্টিকে তাড়িত করে নিয়ে যায়, বর্ষণ করে না]।।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
নবম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১২
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ পবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ জগতী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।২ ৩।৫ কবি ভার্গব, ৪।৬ সিকতা নিবাবরী, ৭ রেণু বৈস্বামিত্র, ৮ বেন ভার্গব, ৯ বসু ভারদ্বাজ, ১০ বৎসপ্রি ভালন্দন, ১১ অত্রি ভৌম, ১২ পবিত্র আঙ্গিরস।।
অনুবাদঃ (৫৫৪) যিনি অন্নের হিতকারী সেই বিচক্ষণ সোম মহান সূর্যের অতি ব্যাপ্ত রথের উপর আরোহণ করলেন, মহান হয়ে জলের মধ্যে বর্ধিত হলেন, সকলের প্রীতিকর জলরাশি ক্ষরিত করলেন (৫৫৫) বাণরুপ তীক্ষ্ণ আলোক ক্ষেপণকারী সর্বরস-হরণকারী, বর্ষণবিমুখ, অদানকারী মেঘসমূহকে বিদীর্ণ করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহকারক সোমদেব মহান দেবগণের মধ্যে অবস্থিত উত্তমরূপে পরিচালিত উজ্জ্বলবর্ণ জলরাশিকে অন্তরিক্ষ হতে প্রেরণ করুন। তিনি আমাদেরই, তিনি আমাদের ধর্ম ও প্রজ্ঞায় প্রবেশ করেন।। (৫৫৬) ইন্দ্রের উদ্যত বজ্র মেঘে অবস্থিত জলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জল মধুমান রসকে প্রস্তুত করল। সুন্দররূপে, দোহনযোগ্য, উদক্ষরণকারী বাক্ ও রশ্মিগণ সেই জলকে নিয়ে আসছেন।। (৫৫৭) ইন্দ্রের সখা ইন্দু উত্তমরূপে শোধিত হয়ে গমন করলেন; সখার মত রসহরণকারী মেঘকে হনন করলেন; মানুষেরা যেমন যুবতী সমভিব্যহারে গমন করে তেমনি সোম রশ্মিগণসহযোগে শতপথে কলশে (=পৃথিবীরূপ কলশে) প্রবেশ করলেন।। (৫৫৮) দ্যুলোকের ধারক, দেবগণের সৃষ্ট, দক্ষ, রসরূপ সোম রশ্মিসহায়ে মত্ত হয়ে দ্যুলোক হতে ক্ষরিত হচ্ছেন। অশ্বের মত বেগবান, বর্ষণশীল উজ্জ্বল সোম উদকের দ্বারা অনায়াসে নদীসমূহের বলবৃদ্ধি করলেন।। (৫৫৯) সোমদেব সকলকে অনুগ্রহ বুদ্ধিতে দর্শন করেন; তিনি বর্ষণক্রিয়ার দ্বারা বুদ্ধিসমূহের বর্ষণকারী; তিনি দ্যুলকের ঊষার আলোকে বিস্তৃত করে দিন করেন (=মেঘ হতে বারিবর্ষণের দ্বারা আলোকের বিস্তার সাধন করেন); তিনি নদীসমূহের প্রাণ জলরাশিকে সৃষ্ট করেন; ইন্দ্রের প্রিয় সোম প্রজ্ঞাযোগে সব কিছুতে প্রবিষ্ট হন।। (৫৬০) পরম আকাশে অবস্থিত তিন ভুবনের সাত প্রকার বাক্ (বা রস্মি) উদকের শ্রেষ্ঠ অংশকে এঁর জন্য (=সোমদেবের জন্য) পুনঃ পুনঃ দোহন করেন। অন্য যে কোন মনোরম চার ভুবন উজ্জ্বল আকাশে চক্রাকারে আবর্তিত হয় তা সত্যের নিয়মে বির্ধিত হয়। [নিখিল বিশ্ব সাতভাগে বিভক্ত। সূর্য, অন্তরিক্ষ ও পৃথিবী এই তিন লোক আমাদের ভুবন]।। (৫৬১) হে সোম তুমি সুন্দর প্রক্রিয়ার জাত হয়েছ, তুমি ইন্দ্রের জন্য ক্ষরিত হও। যাদের হাত থেকে জীবন রক্ষা করে কর্তব্য সেই অপশক্তি ও রোগসমূহ দূর হোক। যারা অসৎ, তারা যেন তোমার রস আস্বাদন করতে না পারে। ক্ষরণশীল জলরাশি আমাদের জন্য হোক।। (৫৬২) মনের অভিলাষ পূর্ণকারী উজ্জ্বল সোম প্রস্তুত হয়েছেন। রাজার মত শত্রুপরাভবকারী সোমদেব মেঘকে পরাভূত করে জলরাশি সৃষ্টি করেন এবং ইন্দ্র যেমন অন্তরিক্ষে অবস্থান করেন তেমনি বর্ষণোন্মুখ হতে জলযুক্ত জলাশয়ে গিয়ে অবস্থান করছেন।। (৫৬৩) অন্তরিক্ষে অবস্থিত গাভীর মত শব্দকারী, মেঘের মধ্যে অবস্থিত মধুময় জলরাশি ইন্দ্রকে লক্ষ্য করে প্রবাহিত হলে আকাশ উজ্জ্বলবর্ণ ধারণ করলো।। (৫৬৪) সুবর্ণরশ্মিগণ বর্ষণ কর্মকে রাঙিয়ে তুলছে, সুপ্রকাশিত করছে, সম্যক্ মিশিয়ে দিচ্ছে, লেহন করছে, ক্ষরণ করছে। নদীর উচ্ছ্বাসে পতনোন্মুখ বারিকণাকে (=জলকে) সুবর্ণরশ্মিগণ পশুর মত ধরে নিয়ে জলে প্রবেশ করাচ্ছে।। (৫৬৫) হে ব্রহ্মের রক্ষক সোম, পবিত্র তোমার বিস্তার; তোমার বিপুল অঙ্গ সর্বদিকে বিস্তৃত। অতপ্ত দেহের মত অপক্ক জল (=যা রশ্মির দ্বারা সম্যক্ পরিশোধিত হয় নি এমন যে জল) রোগ বিস্তার করে; সম্যক্ পরিপক্ক জলরাশির দ্বারাই সকল ভোগ সাধিত হয়।।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
দশম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১২
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ পবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ উষ্ণিক্
মন্ত্রের ঋষিঃ
১।৭।১১ দাক্ষুষ অগ্নি, ২ মানব চক্ষু, ৩।১০ পর্বত ও নারদ কান্ব, শিখন্ডিনী ও অপ্সরা কাশ্যপা, ৪।৯ পর্বত ও নারদ কান্ব, ৫ ত্রিত আপ্ত্য, ৬ আপ্সব মনু, ৮।১১ দ্বিত আপ্ত্য।।
অনুবাদঃ (৫৬৬) এই অভিষুত উজ্জ্বল সোমসকল, যারা এইমাত্র জাত হলেন, যাঁরা সূর্যকে জানেন, তাঁরা বর্ষণশীল ইন্দ্রের কাছে গমন করুন। (৫৬৭) হে সোম, অন্তরিক্ষ হতে সদাজাগ্রতরূপে এস; হে ইন্দু, ইন্দ্রের জন্য ক্ষরিত হও, অতি গম্ভীর শব্দকারী, বলদীপ্ত, সূর্যবেত্তা ইন্দ্রকে পরিস্রবণে ভরে দাও।। ইন্দু, ইন্দ্রের জন্য ক্ষরিত হও, অতি গম্ভীর শব্দকারী, বলদীপ্ত, সূর্যবেত্তা ইন্দ্রকে পরিস্রবণে ভরে দাও।। (৫৬৮) সে সখাগণ, এস, বস; ক্ষরণশীল সোমকে ঘিরে গান কর। শিশুর মত নবজাত এই সোমের শ্রীবৃদ্ধির জন্য যজ্ঞের দ্বারা একে পরিভূষিত কর।। (৫৬৯) হে সখাগণ, তোমাদের আনন্দের জন্য সেই ক্ষরণশীল সোমের উদ্দেশে গান গাও। শিশুর মত নবজাতক এই সোমকে গানের দ্বারা এবং হব্যদানের দ্বারা আহ্লাদিত কর। (৫৭০) জলরাশির প্রাণ এই শিশু জলের উজ্জ্বল সৌন্দর্যকে ধারণ করেন। তারপর দুভাগে বিভক্ত হয়ে সকলের প্রিয় এই জল পৃথিবীর সকল কিছু হলেন।। (দুইভাগ = পৃথিবীর উত্তর ভাগ ও দক্ষিণভাগ)।। (৫৭১) হে ইন্দু, সকল ঔজ্জ্বল্য ধারণ করে দেবগণের আনন্দের জন্য ধারারূপে ক্ষরিত হও। হে মধুমান সোম, অন্তরিক্ষ হতে কলশে (=পৃথিবীতে) আগমন কর। [কলশ = পৃথিবীরূপ কলশ যেখানে সর্বদাই জল থাকে যেমন কলশে জলের তলানি অবশিষ্ট থাকা]।। (৫৭২) ক্ষরণের জন্য প্রস্তুত শোধিত সোম মেঘ থেকে তরঙ্গায়িত হয়ে জলাশয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। সম্মুখে শব্দকে রেখে ক্ষরণশীল সোম শব্দ করতে করতে আসছেন।। (৫৭৩) জগৎধারক ক্ষরণশীল সোমের উদ্দেশে স্তুতি উচ্চারিত হচ্ছে। ভৃতির মত পরিপূর্ণ স্তুতিবাক্যের দ্বারা তাকে প্রীত করা হচ্ছে।। (৫৭৪) হে ইন্দু, তুমি জলপূর্ণ, রশ্মিযুক্ত, অভিষুত, সদক্ষ ধনযুক্ত; তোমার দীপ্তি ও বর্ণলীলা জলরাশির উপরে ধারণ কর। (৫৭৫) ধনবিদ তোমাকে লক্ষ্য করে আমাদের স্তুতিবাক্য স্তব করেছে; জলমধ্যে তোমার বর্ণলীলা আমরা উপভোগ করি। (৫৭৬) আনন্দময় হরি (=সোম) দ্রুতগমনের দ্বারা কুটিল পথ সকল অতিক্রম করে ক্ষরিত হলেন। স্তোতাদের জন্য বীরযুক্ত যশ (=অন্ন) দান করলেন। (৫৭৭) মেঘের সকল দিক থেকে মধুক্ষরা শুদ্ধ সোম বর্ষণ করছেন। ঋষিদের সপ্ত ছন্দে রচিত বাণী তাঁকে লক্ষ্য করে স্তব করেছিল।।
সামবেদ - ৫ম অধ্যায় পাবমান কাণ্ড
একাদশ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৮
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ দেবতা পবমান সোম
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ককুপ্, ৫ যবমধ্যা গায়ত্রী
মন্ত্রের ঋষিঃ
১ গৌরিবীত শাক্ত্য, ২ ঊর্ধ্বসদ্মা আঙ্গিরস, ৩। ৮ ঋজিশ্বা ভারদ্বাজ, ৪ কৃতযশা আঙ্গিরস, ৫ ঋণঞ্জয় রাজর্ষি আঙ্গিরস, ৬ শক্তি বাসিষ্ঠ, ৭ ঊরু আঙ্গিরস।।
অনুবাদঃ (৫৭৮) হে সোম, তুমি উত্তম মধুময় রসযুক্ত ও উত্তম কর্মযুক্ত। তুমি মত্ত হয়ে ইন্দ্রের জন্য ক্ষরিত হও। তুমি অতি দীপ্তিমান, মত্ত, মহান।। (৫৭৯) হে অন্নের অধিপতি দেব, আকাশস্থ মেঘকে উত্তমরূপে মিশ্রিত কর; দেবকাম উজ্জ্বল প্রভূত অন্নকে আমাদের উদ্দেশে দান কর।। (৫৮০) যিনি অশ্বের মত গতিসম্পন্ন ও স্তবযুক্ত, যিনি বৃষ্টি প্রদানকারী ও অন্তরিক্ষচারী, যিনি উদকের দ্বারা পরিপ্লুত হয়ে বনে বনে শব্দ সহকারে প্রবেশ করেন, সেই সোমকে সর্বদিকে সেচন কর।। (৫৮১) এই সেই সোম যাঁকে দ্যুলোক থেকে দোহন করে আনা হয়েছে; ইনি সহস্রধারায় মধুক্ষরা; বিশ্বের সকল ধন ধারণ করে আছেন।। (৫৮২) সেই সোমকেই অভিষুত করা হয়েছে, যিনি সম্পদের, অন্নের ও কর্ষণযোগ্য সুন্দর ভূমির মধ্যে অবস্থান করে আমাদের সকল ধন দান করেন।। (৫৮৩) হে অতি উজ্জ্বলকান্তি পবমান সোম, তুমি ক্ষিপ্ত ও দ্যুলোকসন্বন্ধযুক্ত; তুমি অমৃতত্ব ঘোষণা করতে করতে ক্ষরিত হয়ে থাক (=মৃত্যু নাই, ভয় নাই, একথা বলতে বলতে তুমি ক্ষরিত হও)।। (৫৮৪) দেখ, মদশ্রেষ্ঠ সোম-ধারা মেঘ থেকে উত্তমরূপে নিঃসৃত হয়ে তরঙ্গায়িত ছন্দে খেলা করতে করতে জলাশয়ের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য ক্ষরিত হচ্ছেন।। (৫৮৫) হে সোম, মেঘের মধ্যে যা কিছু জল ও রশ্মি ছিল তা তুমি বলের দ্বারা নির্গত করেছ; তুমি বর্মধারী দুর্ধর্ষ বীরের মত মেঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে বিদীর্ণ করে অন্ন ও গতির বিস্তার সাধন করেছ।।
সামবেদ - ৬ষ্ঠ অধ্যায় আরণ্যক কাণ্ড
প্রথম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৯
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১-৩ ইন্দ্র, ৪ বরুণ, ৫।৭।৮ পবমান সোম, ৬ বিশ্বদেবগণ, ৯ অন্ন।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ১ বৃহতী, ২।৯ ত্রিষ্টুপ, ৩।৭।৮ গায়ত্রী, ত্রিষ্টুপ অথবা চতুস্পদা গায়ত্রী, ৬ একপাৎ জগতী বা গায়ত্রী।।
অনুবাদঃ (৫৮৬) হে উদকবান বজ্রহস্ত ইন্দ্র, তুমি যে অন্নের দ্বারা দ্যু ও পৃথিবী উভয়কে ধারণ করে রেখেছ আমাদের কাছে সেই উত্তম বলকর পুষ্টিকর অন্ন আন।। (৫৮৭) ইন্দ্র জগতের রাজা, মানুষের রাজা; পৃথিবীতে যে বিশ্বরূপ প্রকটিত তাও তাঁর। তাঁকে যিনি দান উৎসর্গ করেন; ইন্দ্র তাঁকে ধন প্রদান করেন; তিনি স্তুত হলে ধন প্রেরণ করেন।। (৫৮৮) যে ইন্দ্রের বিপুল আনন্দদায়ক জল ও তেজ এই সমস্ত যা কিছু হয়েছে তা ইন্দ্রের জ্যোতিযুক্ত বজ্রের দ্বারা জাত হয়েছে।। (৫৮৯) হে বরুণ, আমাদের উপরের পাশ খুলে দাও, নীচের পাশ খুলে দাও, কটিদেশে বন্ধ হয়ে খুলে দাও। তারপর হে আদিত্য, অমৃতরসাস্বাদের জন্য আমরা প্রমাদ রহিত হয়ে তোমার কর্মে নিযুক্ত থাকবো।। (৫৯০) হে সোম, তোমার ক্ষরণের দ্বারা কৃত যে জল তা আমরা সংগ্রহ করি; আমরা যেন চিরকালই তা সংগ্রহ করতে পারি। সুতরাং মিত্র, বরুণ, আদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী এবং দ্যুলোক আমাদের পূজা গ্রহণ করুন।। (৫৯১) হে সোমধারা, তোমরা আমাকেও তোমাদের মতই বর্ষণশীল কর।। (৫৯২) হে ঈশ্বর, তোমার এই সকল বিশ্বধন মানুষদের। আমরা তোমার সেবা করতে ইচ্ছুক, আমরা এই বিশ্বধন কামনা করি।। (৫৯৪) আমি জলরূপে জাত হবার পূর্বে সর্বপ্রথমে দেবগণের জন্য অমৃতবারিরূপে জাত হয়েছিলাম। যিনি আমাকে দান করেন তিনিই এরূপ বলছেন – আমিই অন্ন, আমিই অন্ন, আমিই অদন্ত অন্ন।।
সামবেদ - ৬ষ্ঠ অধ্যায় আরণ্যক কাণ্ড
দ্বিতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ৭
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১। ৩। ৪। ৭ ইন্দ্র, ২ পাবমান সোম, ৫ বিশ্বদেবগণ, ৬ বায়ু।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ১। ৩। ৪। ৬ গায়ত্রী, ২ জগতী, ৫ ত্রিষ্টুপ, ৭ অনুষ্টুপ।। ঋষি ১ শ্রুতকক্ষ আঙ্গিরস, ২ পবিত্র আঙ্গিরস, ৩। ৪ মধুছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৫ প্রথ বাসিষ্ঠ, ৬ গৎসমদ শৌনক, ৭ নৃমেধ ও পুরুমেশ আঙ্গিরস।।
অনুবাদঃ (৫৯৫) হে ইন্দ্র, এই উজ্জ্বলবর্ণবিশিষ্ট জলকে তুমি কৃষ্ণবর্ণা, লোহিতবর্ণা ও কুটিলাগামিনী নদীসমূহে স্থাপন করেছ।। (৫৯৬) সূর্যোদয়ের পূর্বে ঊষার আলোক প্রকাশিত হলে (=অতি প্রত্যুষে) হিমকণারূপ উদক ক্ষরিত হয়; অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন দর্শনকারী মাধ্যমিক দেবগণ (=আকাশের মধ্যে অবস্থিত পিতৃগণ নামে অভিহিত রশ্মিগণ) সর্বতোভাবে অন্নের গর্ভ স্থাপন করেন।। (৫৯৭) ইন্দ্রই উদক ও বিদ্যুতের সম্যক্ মিশ্রণকর্তা (=উদক ও বিদ্যুতের মিশ্রণক্রিয়া থেকে বৃষ্টি হয়); তাঁর ইচ্ছামাত্রই রশ্মিগণ যুক্ত হয়। ইন্দ্র বজ্রধারী ও হিরণ্ময়।। (৫৯৮) হে ইন্দ্র, তুমি উগ্র (=উগ্রকার্যের দ্বারা কর্মকে মিলিত করে থাক); তোমার উগ্রতারূপ সকলপ্রকার রক্ষণ শক্তির দ্বারা অন্নে ও সহস্র ধনে আমাদের রক্ষা কর।। (৫৯৯) যার নাম প্রথ ও সপ্রথ (=যা অতিবিস্তৃত বলে পরিচিত) যা অনুষ্টুভের হবির হবি সেই রথন্তর সামগানকে ধাতা, সবিতা ও বিষ্ণুর তেজ হতে বসিষ্ঠ আহরণ করলেন।। (৬০০) হে বায়ু, তুমি নিষুতগণকে নিয়ে এস; এই উজ্জ্বল সোমরস তোমার জন্য। তুমি সোম অভিষবকারীর গৃহে যাও।। (৬০১) হে অপূর্ব মঘবান ইন্দ্র, তুমি মেঘহননের জন্য যখন জন্মেছ তখন পৃথিবীকে প্রথিত করেছ আর দ্যুলোককে স্তব্ধ করেছ।।
সামবেদ - ৬ষ্ঠ অধ্যায় আরণ্যক কাণ্ড
তৃতীয় খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১৩
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১ প্রজাপতি, ২। ৩ সোম, ৪। ৫। ৮। ১৩ অগ্নি, ৬ অপাংনপাৎ, ৭ রাত্রি, ৯ বিশ্বদেবগণ; ১০ লিঙ্গোক্ত, ১১ ইন্দ্র ১২ আত্মা বা অগ্নি।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ত্রিষ্টুপ, ১। ৭ অনুষতুপ, ৪ গায়ত্রী, ৮। ৯ জগতী, ১০ মহাপঙক্তি।। ঋষি ১। ৫। ৭। ১০ বামদেব গৌতম, ২। ৩ গৌতম রাহুগণ, ৫ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র, ৬ গৃৎসমদ্ শৌনক, ৮ ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য, ৯ ঋজিশ্বা ভারদ্বাজ, ১১ হিরণ্যস্তুপ আঙ্গিরস, ১২। ১৩ বিশ্বামিত্র গাথিন।।
অনুবাদঃ (৬০২) যজ্ঞসাধনভূত যে অন্ন, বল ও জল আমাতে আছে তা পরমেষ্ঠী প্রজাপতি দ্যুলোক আকাশের মত ধারণ করুন। (৬০৩) হে সোম, তোমার জলরাশি অন্ন বীর্য বর্ধন করুক ও অপশক্তি নাশ করুক; তুমি অমরত্বের জন্য বৃদ্ধিলাভ করে দ্যুলোকে উত্তম অন্ন ধারণ কর। (৬০৪) হে সোম, তুমি সকল ওষধী, জলরাশি ও পশুদের সৃষ্টি করেছ; তুমি জ্যোতির দ্বারা তমোনাশ করে বিশাল আকাশকে আরও বিস্তৃত করেছ। (৬০৫) অগ্নিকে আমি পূজা করি, তিনি যজ্ঞের পুরোহিত, ঋত্বিক্, হোতা এবং অতি উৎকৃষ্ট ধনদাতা। (৬০৬) তাঁরা (সপ্ত ঋষিগণ বা রশ্মিগণ) প্রথমে তিনলোকে গোরশ্মিসমূহের নমন অনুমোদন করলেন এবং সপ্তলোকে রশ্মিগণের উৎকৃষ্ট নমন বিষয়ে জানলেন। ঊষাকালে সেই দীপ্ত অরুণবর্ণা রশ্মিগণ উদকের সঙ্গে আবির্ভূত হয়ে পৃথিবীকে স্তব করেছিলেন। (৬০৭) সমানভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জল একে অন্যের সঙ্গে মেশে; সমান ভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সমুদ্রকে নদীসমূহ প্রীত করে। সেই নির্মল জলরাশি শুচি ও দীপ্যমান অপাং নপাৎ (=অগ্নি) দেবতা অভিমুখে গমন করে। (৭০৮) কল্যাণময়ী ঊষা সর্বপ্রথমে উচ্চাকাশে দিনের আলো প্রেরণ করে প্রজ্ঞা সৃষ্টি করেন; কল্যাণী রাত্রি দেবী জগতের সকলপ্রাণীর সুখের আশ্রয় স্বরূপা। (৬০৯) সর্বব্যাপী, বর্ষণকারক, দীপ্তিমান, মহান জাতবেদা অগ্নির উদ্দেশে এই জ্ঞানময় স্তুতি করছি। বিশ্বের প্রিয় বৈস্বানর অগ্নির উদ্দেশে এই নবীন শূচি স্তোত্র সোমের (=জলের মত) নির্গত হচ্ছে। (৬১০) বিশ্বদেবগণ (=সকল রশ্মিগণ), দ্যুলোক ও পৃথিবী উভয়ে এবং অপাং নপাৎ অগ্নি (=জলের রক্ষক বা জলের পৌত্র অগ্নি) আমার এই বুদ্ধিপূর্বক রচিত স্তোত্র শ্রবণ কর। তোমরা আমার এই স্তোত্র বর্জন কোরো না; তোমাদের আনন্দের মধ্যে বাস করে আমরাও হৃষ্ট হবো। (৬১১) দ্যুলোক ও পৃথিবী আমাকে যশ (=অন্ন, জল ও সম্পদ) দান করুন, ইন্দ্র ও বৃহস্পতি যশ দান করেন; ভগদেবতার (=সূর্যের) যশ আমি যেন প্রাপ্ত হই; যশ আমাকে সুপ্রকাশিত করুক। যশের সহায়ে আমি সভাতে যেন সুবক্তা হই। (৬১২) ইন্দ্রর বিরত্বব্যঞ্জক কর্মসমূহ এখনই বলছি। যে কর্মসমূহ বজ্রধারী ইন্দ্র প্রথম থেকেই করে আসছেন। তিনি মেঘকে হনন করেন; পরে বারিরাশিকে ভূমিতে পাতিত করেন; এবং পর্বত ভেদ করে নদীসমূহকে প্রবাহিত করেন। (৬১৩) আমি অগ্নি, আমি জন্ম থেকেই জ্ঞানযুক্ত, ঘৃত (বা জল) আমার চক্ষু, অমৃত আমার মুখে। আমিই তিন লোক ধারণ করে আছি; আমিই ঋক্, আমি অন্তরিক্ষের পরিমাপকারী, আমিই অজস্র জ্যোতি; আমিই সকল হবি (=অন্ন বা জল)। (৬১৪) বিপ্র অগ্নি রক্ষাকর্তা; তিনি প্রথমে গমনশীল সূর্যের বিচরণস্থল আকাশকে রক্ষা করেন এবং প্রাণবায়ু মরুদ্গণকে রক্ষা করেন। মহান অগ্নি দেবগণের হর্ষকেও রক্ষা করেন।
সামবেদ - ৬ষ্ঠ অধ্যায় আরণ্যক কাণ্ড
চতুর্থ খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১২
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১।২ অগ্নি, ৩-৭ পুরুষ, ৮ দ্যাবাপৃথিবী, ৯-১১ ইন্দ্র, ১২ গোগণ (=রশ্মিগণ)।।
উরুঃ পৃথুরয়ং বো অন্তু লোক ইমা আপঃ সুপ্রপাণা ইহ স্ত।।১২।।
অনুবাদঃ (৬১৫) হে প্রজ্জ্বলিত জ্যোতির্ময় অগ্নি, তোমার মুখ মধ্যে জিহ্বা বিচরণ করে (=তোমার মধ্যে বাক্ অবস্থিত)। হে অগ্নি, হে পরমধন, তুমি আমাদের অন্ন সহ রমণীয় ধন ও তেজ জ্ঞানদৃষ্টির জন্য দান কর।। (৬১৬) বসন্ত কালই রমণীয়, গ্রীষ্মও রমণীয়, বর্ষাকালের পরে শরৎ হেমন্ত ও শীতকালও রমণীয়।। (৬১৭) পুরুষের (=এই আত্মার) সহস্র মস্তক, সহস্র চক্ষু, সহস্র পদ। তিনি পৃথিবীর সকল দিক ব্যাপ্ত করে দশ আঙ্গুল পরিমাণ অতিরিক্ত থেকে অবস্থান করেন।। (৬১৮) পুরুষের তিন পদ ঊর্ধ্বমুখী, আর এক পদ (=এক অংশ) এই বিশ্বকে বার বার প্রকটিত করে। তারপর তিনি ভোজনকারী (=প্রাণ বা চৈতন্যযুক্ত) এবং ভোজন রহিত (=অচেতন) তাবৎ বস্তুতে ব্যাপ্ত হন।। (৬১৯) এই পুরুষই এই সব যা কিছু, যা হয়েছে এবং যা হবে। তাঁর এক পদ-ই এই সকল বস্তু, আর দ্যুলোকে অমরণধর্মা তিন পদ অবস্থান করে।। (৬২০) সেই পুরুষের মহিমা এরূপ হলেও তিনি তাঁর সৃষ্টির চেয়ে মহৎ। এর এই সর্বেশ্বরের অমৃতত্বের কারণ তিনি অন্নভোগের দ্বারা অতিরোহণ করেন (ভোগকে অতিক্রম করে ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন)।। (৬২১) তাঁহা হতে বিরাট্ (=ব্রহ্মান্ড) জাত হয়েছে এবং তিনি সেই বিরাটে অধিষ্ঠিত পুরুষরূপে বিরাজমান। তারপর তিনি সেই ভাবে পৃথিবী এবং জীবদেহে অবস্থান করেও অতিরিক্ত রূপে (পৃথকভাবে) অবস্থান করেন।। (৬২২) হে দ্যুলোক ও পৃথিবী, আপনারা শোভন পালয়িত্রী তা আমি জানি; আপনারা অপরিমিত ধন ও সুখ দান করুন; হে দ্যাবাপৃথিবী, আমাদের পাপ থেকে মুক্ত করুন।। (৬২৩) হে ইন্দ্র, তোমার রশ্মিসকল হরিৎবর্ণ, আর তোমার অশ্বদ্বয় (=দেশ ও কাল) সকল কিছু হরণকারী। কবিগণ, পুরুষগণ, জ্ঞানভক্তিযুক্ত সেবকগণ তোমাকে স্তব করেন।। (৬২৪) হিতরমনীয় যে জ্যোতি অথবা স্নিগ্ধ যে জ্যোতি, এবং সত্যস্বরূপ ব্রহ্মের যে জ্যোতি, তার সঙ্গে আমি যেন নিজেকে যুক্ত করতে পারি।। (৬২৫) হে শব্দকারী (বা সত্য বাক্যযুক্ত) ইন্দ্র, তোমার পরাভবকারী তেজ ও বল আমাদের দাও। তুমিই মহৎ বলের ঈশ্বর। সৎকর্মের দ্বারা যে ধন লাভ হয় সেই পরম ধন ও অমিত শক্ত আমাদের দাও। আমাদের পাপনাশক শক্তির উপায় বলে দাও।। (৬২৬) মনবাঞ্ছা পূর্ণকারী, সৎকর্মের সৃষ্টিকারী ও ধারক, হে অমৃতধারা, তোমরা আমাদের প্রাপ্ত হও; বিপুল এই বিশ্ব তোমাদের কৃপার অধীন হোক; তোমাদের অমৃতধারা আমাদের অনায়াসলভ্য হোক।
সামবেদ - ৬ষ্ঠ অধ্যায় আরণ্যক কাণ্ড
পঞ্চম খণ্ড - মন্ত্র সংখ্যাঃ ১৪
মন্ত্রের দেবতাঃ
মন্ত্রের দেবতাঃ ১ পবমান অগ্নি, ২-১৪ সূর্য (৪-৬ সূর্য বা আত্মা)।।
মন্ত্রের ছন্দঃ
মন্ত্রের ছন্দঃ ১, ৪-১৪ গায়ত্রী, ২ জগতী, ত্রিষ্টুপ।। ঋষি ১ শতং বৈখানস, ২ বিভ্রাট্ সৌর্য, ৩ কুৎস আঙ্গিরস, ৪-৬ সর্পরাজ্ঞী, ৭-১৪ প্রস্কণ্ব কান্ব।।
অনুবাদঃ (৬২৭) হে অগ্নি, তুমি আমাদের আয়ু দাও; বল ও অন্ন দাও; দুষ্ট প্রকৃতির দূরে রাখ।। (৬২৮) অতি দীপ্ত সূর্যদেব মধুর সোম পান করুন, যজ্ঞকারীর (-সৎকর্মকারীর) আয়ু বৃদ্ধি করুন। তিনি বায়ু দ্বারা প্রেরিত হয়ে প্রজাদের স্বয়ং রক্ষা করেন, পালন করেন ও বহুরূপে বিরাজ করেন।। (৬২৯) বিচিত্র রশ্মিসমূহের সমষ্টিরূপ সূর্য উদিত হয়েছেন; তিনিই মিত্র, বরুণ ও অগ্নির চক্ষুস্বরূপ; দ্যুলোক, ভূলোক ও অন্তরিক্ষ স্বীয় মহত্ত্বে পূর্ণ করেছেন। সূর্য স্থাবর ও জঙ্গমের আত্মা।। (৬৩০) এই নানারূপ বিচিত্র বর্ণ গমনশীল অগ্নি (=সূর্য) পূর্বদিকে উদিত হয়ে মাতা পৃথিবীকে প্রাপ্ত হন, পরে দ্যুলোকে আকাশপথে গমন করেন। (৬৩১) এঁর দীপ্ত এঁর দেহের মধ্যে (বা দ্যু ও পৃথিবীমধ্যে) বিচরণ করে, এবং এঁর প্রাণ হতে নিঃশ্বাসরূপে প্রাণবায়ু নির্গত হয় (=এঁর প্রাণই বাহিরে নির্গত হয় প্রাণবায়ু রূপে); ইনিই দ্যুলোকে বিপুলাকৃতি ধারণ করে ব্যাপ্ত হন।। (৬৩২) তিরিশ স্থানে ইনি বিরাজ করেন (=সৌর মাস তিরিশ দিনের কথা বলা হয়েছে); পতঙ্গের মত গমশীল এই সূর্যের উদ্দেশে স্তব উচ্চারিত হয়। তিনি দিবারাত্র নিজ করণে উদ্ভাসিত।। (৬৩৩) সর্বজগতের প্রকাশক সূর্যের উদয়ে নক্ষত্রগণ রাত্রির সঙ্গে চোরের মত পালিয়ে গেল।। (৬৩৪) দীপামান অগ্নির মত সূর্যের প্রজ্ঞানরূপ, রশ্মিসকল মানুষদের লক্ষ্য করতে করতে চলেছে।। (৬৩৫) হে সূর্য, তুমি ক্ষিপ্রগামী, বিশ্বদ্রষ্টা ও জ্যোতির কারক। তুমি সমস্ত দীপ্ত বস্তুকে প্রকাশিত কর। (৬৩৬) হে সূর্য দেবগণের প্রজাবৃন্দকে (=রশ্মি দ্বারা সৃষ্ট জীবদের) দেখবার জন্য পশ্চিম দিকে মুখ করে উদিত হও (=পূর্বদিকে উদিত হও পশ্চিমমুখী হতে), মানুষদের দেখবার জন্য (পূর্বদিকে) পশ্চিম মুখ হয়ে উদিত হও, সর্ব জগতকে দেখবার জন্য (পূর্বদিকে) পশ্চিম মুখ হয়ে উদিত হও। (৬৩৭-৬৩৮) হে বরুণ (=সূর্য) হে পবিত্রতাকারক, তুমি যে অনুগ্রহ দৃষ্টিতে জনগণমধ্যে অবস্থিত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সৎকর্মানুষ্ঠানকারীকে দর্শন করে থাক, সেই অনুগ্রহ দৃষ্ঠিতে, হে সূর্য, তুমি রাত্রির সঙ্গে দিনকে সৃষ্টি করে, জাত প্রাণিসমূহকে অবলোকন করে দ্যুলোক এবং মহান অন্তরিক্ষলোক নানাভাবে পরিভ্রমণ কর।। (৬৩৯) রথবাহক সাতটি অশ্বকে (=সপ্ত রশ্মিকে) সূর্য তাঁর রথে যুক্ত করলেন, স্বয়ংযুক্ত সেই অশ্বের সহায়তায় তিনি গমন করছেন।। (৬৪০) হে সূর্যদেব, সাতটি অশ্ব তোমাকে রথে বহন করে; হে সর্বদ্রষ্টা, জ্যোতিই তোমার কেশ।
(৬৪১) হে মহাধন, তুমি সর্বজ্ঞ; তুমি আমাদের স্তুতি জান; আমাদের সৎমার্গ প্রদর্শন কর। হে বহুধন, হে হবু কর্মের অধিপতি, আমাদের ধন দান কর।।
(৬৪২) হে ইন্দ্র, হে প্রশস্ত জ্ঞানযুক্ত, তুমি আমাদের ভক্তিভাব জান। তুমি অন্ন ও ধনলাভের নিমিত্ত হও; আমাদের প্রার্থনা শোন।
(৬৪৩) হে বজ্রধারী ইন্দ্র, ধন ও অন্নদানে তোমার প্রসাদ আমাদের ওপর নেমে আসুক। হে দেব, হে বলিষ্ঠ, হে বজ্রী, সম্পদ লাভের দ্বারা আমাদের সমৃদ্ধ কর। হে মহান দাতা, সোমপানের জন্য এস; সোমপানে হৃষ্ট হও।।
(৬৪৪) হে বজ্রী, ধন রক্ষার জন্য সুবীর্য দান কর। তুমি অন্নবলের অধিপতি, আমাদের কামনা জেনে, হে মহান দাতা, হে বজ্রী, হে বলীয়ানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলশালী, আমাদের অতিদানে সমৃদ্ধ কর।।
(৬৪৫) যিনি ধনসমূহের শ্রেষ্ঠদাতা, যিনি আদিত্যের ন্যায় দীপ্তি, সেই সর্বজ্ঞ ইন্দ্রকে আরাধনা কর। হে জ্ঞানবান ইন্দ্র, আমাদের লক্ষ্য করে ধন আন।।
(৬৪৬) সেই জাতা, অপরাজিত, দেব ঈশ্বরকেই আমাদের রক্ষার জন্য আহ্বান করি। তিনি আমাদের রিপু বিনাশ করে আমাদের কর্ম, ছন্দ, প্রভূত বারি সম্পদ দান করুন।।
(৬৪৭) জেতা ও অপরাজিত ইন্দ্রকে ধনলাভের জন্য আহ্বান করি। তিনি আমাদের দ্বেষ নাশ করুন, আমাদের রিপু নাশ করুন।।
(৬৪৮-৬৪৯) হে মেঘবিদারক ইন্দ্র, তোমার যে চিরায়ত ধন, তোমার মত্ততার জন্য যে সোমরস আছে, তা আমাদের দাও। হে নিবাসপিদ, আমাদের সুখ দাও। হে বলিষ্ঠ, তোমার পূর্ণ দান সকলেই চায়, কারণ তুমি সর্বনিয়ন্তা, শক্তিমান। হে প্রভু, হে বৃত্রহন্তা, হে চিরনূতন, তুমি ও আমি অবশ্যই সৎকর্মে ও সদালাপে নিযুক্ত থাকবো। যে ইন্দ্র অন্ন-বাক্-জল দানে সমর্থ, তিনিই সখা, শোভন সুখকর, কেবল সত্যস্বরূপ