ঋগ্বেদ
অনুবাদকরমেশচন্দ্র দত্ত

সূচিপত্র

প্রথম মণ্ডল:
দ্বিতীয় মণ্ডল:
তৃতীয় মণ্ডল:
চতুর্থ মণ্ডল:
পঞ্চম মণ্ডল:
ষষ্ঠ মণ্ডল:
সপ্তম মণ্ডল:
অষ্টম মণ্ডল:
নবম মণ্ডল:
দশম মণ্ডল:

ভূমিকা - ঋগ্বেদ সংহিতা

বেদ হিন্দুদের প্রাচীনতম ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থের নাম। এর চারটি মূল অংশ রয়েছে: ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সাম বেদ এবং অথর্ব বেদ। বেদ (সংস্কৃত véda वेद " জ্ঞান ") প্রাচীন ভারতে লেখা হয়েছে। তারা সংস্কৃত সাহিত্যের পুরনোতম স্তর সংগঠিত করে হিন্দুধর্মের উপর।

হিন্দু ঐতিহ্য অনুযায়ী, বেদ একটি মানবিক গ্রন্থ নয়। বৈদিক মন্ত্রগুলো হিন্দুদের অনুষ্ঠান, ধর্মীয় কাজ এবং অন্যান্য মঙ্গলজনক কাজে পড়া হয়। ‘বেদ’ শব্দের বু্ৎপত্তিগত অর্থ জ্ঞান। যার অনুশীলনে ধর্মাদি চতুর্বর্গ লাভ হয় তা-ই বেদ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বেদকে অপৌরুষেয় অর্থাৎ ঈশ্বরের বাণী বলে মনে করা হয়। এটি কতগুলি মন্ত্র ও সূক্তের সংকলন। বিশ্বামিত্র, ভরদ্বাজ প্রমুখ বৈদিক ঋষি জ্ঞানবলে ঈশ্বরের বাণীরূপ এসব মন্ত্র প্রত্যক্ষ করেন। তাই এঁদের বলা হয় মন্ত্রদ্রষ্টা। মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলাও ছিলেন, যেমন বিশ্ববারা, লোপামুদ্রা প্রভৃতি।

বেদ সংখ্যায় চারটি — ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুৰ্বেদ ও অথর্ববেদ । এদের মধ্যে ঋগ্বেদই প্ৰধান ও সবচেয়ে প্ৰাচীন । ঋগ্বেদ দশটি মণ্ডলে বিভক্ত । প্রত্যেক মণ্ডলে অনেকগুলি করে সূক্ত আছে। প্রতি সূক্ত আবার অনেকগুলি ঋক বা মন্ত্র নিয়ে রচিত । প্ৰতি সূক্ত হচ্ছে এক বা একাধিক দেবতার উদ্দেশ্যে রচিত স্তুতি ।

ঋগবেদ সংহিতায় রয়েছে স্তুতি ও প্রার্থনামূলক মন্ত্র। এগুলো পদ্যে রচিত। এখানে ১০৪৭২ টি মন্ত্র রয়েছে। আবার কতগুলো মন্ত্র নিয়ে একটি বড় আকারের কবিতা বানানো হয়েছে। এর একটি কবিতাকে বলা হয়েছে সূক্ত। যে সকল ঋষি ঋগ্‌বেদ দর্শন করেছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ঋষি গৃৎসমদ, বিশ্বামিত্র, বামদেব ইত্যাদী। উক্ত ঋষিগন যে সকল দেবতার স্তুতি করেছেন বা যে সকল দেবতার প্রসংঙ্গে ঋগ রচনা করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন- অগ্নি, ইন্দ্র, বিষ্ণু, ঊষা ইত্যাদি।

উৎপত্তি ও ব্যবহারের রীতিনীতি

সংস্কৃত শব্দ véda " জ্ঞান" মূল বে- থেকে উৎপত্তি নির্ণয় করা হল " জানতে "। এটি চার বিধিসম্মত বেদের সঙ্গে সহযোগী (ঋগ্বেদ, যজু বেদ, সাম বেদ ও অথর্ব বেদ) যদিও তথ্যসূত্র অনুযায়ী এটি যুক্ত ছিলো ব্রাহ্মন, আর্য এবং উপনিষদের সাথে। বেদের এক নাম শ্রুতি। এর কারণ, লিপিবদ্ধ হওয়ার আগে দীর্ঘকাল বেদ ছিল মানুষের স্মৃতিতে বিধৃত

গুরুশিষ্য পরম্পরায় শ্রুতি অর্থাৎ শ্রবণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেদ আয়ত্ত করা হতো। যেহেতু শোনা বা শ্রুতির মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ঘটত তাই এ থেকে বেদের এক নাম হয় শ্রুতি। বেদকে ত্রয়ীও বলা হয়। এর কারণ, বেদের মন্ত্রগুলি আগে ছিল বিক্ষিপ্ত অবস্থায়। ব্যাসদেব যজ্ঞে ব্যবহারের সুবিধার্থে মন্ত্রগুলিকে ঋক্, যজুঃ, সাম এই তিন খণ্ডে বিন্যস্ত করেন। তাই বেদের অপর নাম হয় সংহিতা। বেদ চারখানা হলেও চতুর্থ অথর্ববেদ অনেক পরবর্তীকালের রচনা এবং এর কিছু কিছু মন্ত্র প্রথম তিনটি থেকেই নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া যজ্ঞে এর ব্যবহার নেই। অবশ্য বেদকে ত্রয়ী বলার অন্য একটি কারণও আছে এবং তা হলো: এর মন্ত্রগুলি মিতত্ব, অমিতত্ব ও স্বরত্ব এই তিনটি স্বরলক্ষণ দ্বারা বিশেষায়িত, যার ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রগুলিকে উপর্যুক্ত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।বেদের রচনাকাল সম্পর্কে অনেক মতভেদ আছে। এ নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্যও দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, বেদ রচনার শুরু থেকে তা সম্পূর্ণ হতে বহুকাল সময় লেগেছে। সেই কালসীমা মোটামুটিভাবে খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০-৯৫০ অব্দ পর্যন্ত ধরা হয়।

ঋক্, সাম, যজু ও অথর্ব এই চারটি বেদের সঙ্গে পরস্পর ঘনিষ্ঠ সন্বন্ধ আছে। ঋকবেদের শাকল শাখাই সমধিক প্রচলিত। তাতে দশটি মন্ডল আছে এবং প্রতি মন্ডলে অনেকগুলি সূক্ত বা দেবতার উদ্দেশ্যে রচিত প্রশস্তি আছে। এই সূক্তগুলির উপাদান হল কয়েকটি মন্ত্র। এই মন্ত্রগুলিকে ঋক্ বলে। ঋক্ সমূহের সংগ্রহ গ্রন্থ বলেই ঋগবেদের এই নাম। কোনও সূক্তে ঋক্ সংখ্যা ৪।৫টি, কোনও সূক্তে ২৫।৩০টিও আছে। কোথাও আরও বেশী আছে।
ঋগবেদের দশটি মন্ডলে মোট ১০,৫৫২টি ঋক্ নিয়ে ১,০২৮টি সূক্ত আছে। এদের মধ্যে অষ্টম মন্ডলের অন্তর্ভূক্ত ৮০টি ঋক নিয়ে ১১টি সূক্তকে বালখিল্য সূক্ত বলা হয়। সায়ণাচার্য এগুলিকে ঋগবেদের অন্তর্ভূক্ত বলে স্বীকার করেন না। সেই জন্য তাদের ওপর ভাষ্য রচনা করেন নি। তাদের বাদ দিয়ে ঋগবেদে সূক্ত সংখ্যা দাঁড়ায় ১,০১৭এই এবং ঋক্ সংখ্যা দাঁড়ায় ১০,৪৭২টি।

ঋক্, সাম ও যজুর্বেদের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সন্বন্ধ বিদ্যমান। আগেই বলা হয়েছে যাঁর জন্য যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনি যজমান এবং যাঁরা যজ্ঞ কার্যটি অনুষ্ঠান করছেন তাঁরা ঋত্বিক। এই ঋত্বিকদের মধ্যে শ্রেণী বিভাগ ছিল। যিনি প্রশস্তি পাঠ করতেন তিনি হোতা। তাঁর পাঠন মন্ত্রের সংকলন ঋক্ সংহিতা। যিনি গান গেয়ে স্তুতি করেন তিনি উদ্গাতা। তাঁর গেয় মন্ত্রের সংকলন হল সাম সংহিতা। যিনি আহুতি দেন তিনি অধ্বর্যু। সেই সময় যে মন্ত্র উচ্চারণ হত তার সংকলন হল যজুঃসংহিতা। মীমাংসার মত ঋক্ ও সাম ছাড়া সব যজুঃ (মীমাংসা সূত ২।১।৩৭)। সুতরাং ঋক্ মিত’ অর্থাৎ পদবদ্ধ, সাম সুরে বাঁধা সঙ্গীত রূপে গেয়, আর যজুঃ ‘অমিত’ অর্থাৎ তা ঋকের মত ছন্দোবদ্ধ নয়। যজুর্বেদ সংহিতার মন্ত্রগুলি গদ্যে রচিত। সুতরাং ঋক্, সাম ও যজুঃ সংহিতা পরস্পর ঘনিষ্ঠ সন্বন্ধে যুক্ত। সম্ভবতঃ একই যজ্ঞে তিন সংহিতার মন্ত্রই ব্যবহার হত।

এই তিন বেদের ঘনিষ্ঠতা সন্বন্ধে আরও কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। আমরা দেখি সামবেদের কৌথুন শাখার ১,৮১০টি ঋক্ আছে। পুনরুক্তি বাদ দিলে মোট ঋক্ সংখ্যা ১,৬০৩। তাদের মধ্যে ১৯টি বাদে সবই ঋগবেদ হতে নেওয়া। তাদের সম্ভবত ঋগবেদের অন্য শাখা হতে সংগ্রহ করা হয়েছে। এ বিষয়ে নিশ্চিত হবার উপায় নেই। কারণ ঋগবেদের অনেক শাখা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

অনুরূপভাবে যজুর্বেদ যদিও গদ্যে রচিত, তার মধ্যেও অনেক ঋগবেদের ঋকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বাজসনেয় সংহিতার অর্ধেক মন্ত্র ঋগবেদ হতে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে অথর্ববেদের সঙ্গেও ঋগবেদের কিছু সংযোগ আছে। অথর্বেদে ছন্দোবদ্ধ মন্ত্রও আছে, গদ্যে রচিত মন্ত্রও আছে। ছন্দোবদ্ধ মন্ত্রকেও ঋক্ বলা হয়। অথর্ববেদের মোট মন্ত্র সংখ্যার এক পঞ্চমাংশ ঋগবেদ সংহিতা হতে নেওয়া।

এই সব দেখে মনে হয় ঋগবেদ চারটি বেদের মধ্যে প্রাচীনতম গ্রন্থ। এদের মধ্যে আবার ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে বেদগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। ঋক্, সাম ও যজু নিয়ে পরস্পর ঘনিষ্ঠ সন্বন্ধে যুক্ত তিনটি বেদ এক দিকে এবং চতুর্থ বেদ অথর্ববেদ সংহিতা অন্য দিকে। অথর্ববেদের আবির্ভাব হয়েছিল মনে হয় এদের অনেক পরে। এই প্রতিপাদ্যের সপক্ষে কিছু প্রমাণ স্থাপন কর যায়।

প্রথমত লক্ষ্য করা যেতে পারে, অথর্ববেদের প্রকৃতি অন্য তিন বেদ হতে ভিন্ন। সেটা বুঝতে হলে অথর্ববেদের আলোচিত বিষয়ের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন।

অথর্ববেদের সূক্তগুলি কুড়িটি কান্ডে বিভক্ত। সপ্তম কান্ড পর্যন্ত নানা আভ্যুদয়িক কর্মের মন্ত্রই বেশী। এরা হল আয়ূষ্য অর্থাৎ দীর্ঘ আয়ূলাভের জন্য, ভৈষজ্য অর্থাৎ আরোগ্য লাভের জন্য, শান্তিক অর্থাৎ ভৌতিক উপদ্রবাদি দূর করবার জন্য, পৌষ্টিক অর্থাৎ শ্রীলাভের জন্য, সাংমনস্য অর্থাৎ মৈত্রী লাভের জন্য, আভিচারিক অর্থাৎ শত্রুনাশের জন্য, প্রায়শ্চিত্ত, এবং রাজকর্ম অর্থাৎ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও উন্নতির জন্য। এই বিষয়গুলি গার্হস্থ্য ও সামাজিক বিষয় সংক্রান্ত। এ ধরনের মন্ত্রের ব্যবহার জন্য তিন বেদে সাধারণত পাওয়া যায় না। এই হল অথর্ববেদের প্রথম ভাগ।

অষ্টম হতে দ্বাদশ কান্ড অথর্ববেদের দ্বিতীয় ভাগ। এখানেও আভ্যুদয়িক কর্ম আছে। তবে অতিরিক্তভাবে দার্শনিক চিন্তা আছে। এই ধরনের সূক্তগুলি কোনও বৈদিক ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। ঋগবেদের দশম মন্ডলের নানা দার্শনিক তত্ত্ব সম্পর্কিত সূক্তের সহিত এদের তুলনা চলে।

ত্রয়োদশ হতে বিংশ কান্ড অথর্ববেদের তৃতীয় ভাগ। শেষের দুটি কান্ড হল পরিশিষ্ট। অন্য কান্ডগুলির প্রত্যেকটির বিষয়য়বস্তু নির্দিষ্ট। ত্রয়োদশ কান্ডে রোহিত নামে আদিত্যের প্রসঙ্গ আছে। চতুর্দশ কান্ডের বিষয় বিবাহ প্রকরণ। পঞ্চদশ কান্ডে ব্রাত্যের প্রশংসা আছে। ষোড়শ কান্ডে নানা শান্তি স্বস্ত্যয়নের মন্ত্র আছে। সপ্তদশ কান্ডে আছে আদিত্যের স্তুতি এবং অষ্টাদশ কান্ডের বিষয় হল পিতৃমেধ।

সুতরাং অথর্ব সংহিতার শ্রৌত কর্ম হতে স্মার্ত কর্মেরই প্রাধান্য। অবশ্য শ্রৌত কর্মের আদৌ উল্লেখ যে নেই তা নয়। তবে প্রধানত স্মার্তকর্ম প্রাধান্য পাওয়ায় তার প্রকৃতি অন্য তিন বেদ হতে পৃথক।

এককালে বেদ যে তিনটি ছিল এবং চতুর্থ বেদ অথর্বের আবির্ভাব হয়নি তার প্রমাণ নানাভাবে পাওয়া যায়। নেই প্রমাণগুলি এবার একে একে স্থাপন করা হবে।

ঋগবেদের দশম মন্ডল সম্ভবত সবার শেষে রচিত হয়েছিল। তার একটি প্রমাণ তার সূক্তগুলি একেবারে এই বেদের প্রান্তে স্থাপিত। আরও ভাল প্রমাণ হল এই মন্ডলে এমন অনেকগুলি সূক্ত আছে যাদের সঙ্গে শ্রৌত কর্মের কোনও সংযোগ নেই। এগুলিকে মনুষ্য জাতির প্রথম দার্শনিক চিন্তা বলা যায়। চিন্তা পরিণতি লাভ করলেই ব্যবহারিক যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়া হতে বিশুদ্ধ চিন্তায় সরে আসে।

এই দশম মন্ডলে পুরুষ সূক্তে (১০।৯০) সৃষ্টির একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে বেদগুলির উৎপত্তির কথাও আছে। তার নবম মন্ত্রে পাইঃ ‘সেই সর্বহোম সম্বলিত যজ্ঞ ঋক্ ও সাম সমূহ উৎপাদিত হল, ছন্দ সকল আবির্ভূত হল, যজুঃ তা হতে জন্মগ্রহণ করল।’ অর্থাৎ সৃষ্টির এই ব্যাখ্যায় তিন বেদের উল্লেখ আছে, চতুর্থ অথর্ববেদের উল্লেখ নেই। তার তাৎপর্য হল এই যে, এই সূক্ত যখন রচিত হয় তখন অথর্ববেদের আবির্ভাব হয়নি।

তারপর প্রমাণ পাই ব্রাহ্মণের যুগেও অথর্ববেদের সন্ধান পাওয়া যায় না। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে বেদকে ‘ত্রয়ী বলা হয়েছে এবং এই ত্রয়ীর অন্তর্ভূক্ত বেদ হিসাবে কেবলমাত্র ঋক্, সাম ও যজুর্বেদের উল্লেখ করে হয়েছে। প্রাসঙ্গিক উক্তিটি এইঃ ‘যমৃষয়স্ত্রয়ীবিদ্যে বিদুঃ ঋচঃ সামানি যজুংষি ৷৷ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১। ২।১।২৬)। সুতরাং এটা অনুমান করা অসঙ্গত হবে না এই ব্রাহ্মণ যখন রচিত হয় তখন অথর্ববেদের নাম জানা ছিল না।

তারপর আসে উপনিষদের যুগ। ছান্দোগ্য এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ প্রাচীনতম উপনিষদগুলির অন্যতম। এই দুটি উপনিষদই ব্রাহ্মণের অংশ। এদের আলোচনা হতে দেখা যায় যে এরা ‘ত্রয়ী’ কথাটির সঙ্গে পরিচিত এবং সেই সূত্রে যখন বেদের উল্লেখ করছে তখন অন্য তিনটি বেদের উল্লেখ আছে, কিন্তু অথর্ববেদের উল্লেখ নেই। আবার অন্য সূত্রে আলোচনায় চারটি বেদেরই উল্লেখ করা হয়েছে।

ছান্দোগ্য উপনিষদের প্রথম অধ্যায়ের চতুর্থ খন্ডে আছে মৃত্যু হতে ভয় পেয়ে দেবতারা ত্রয়ী বিদ্যায় প্রবেশ করল। (দেবা বৈ মৃত্যোর্বিভ্যতস্ত্রয়ীং বিদ্যাং প্রাবিশন্ ৷৷ ১ ৷৷ ৪ ৷৷ ২)। তারপর আছে তাঁরা ঋক্ সাম এবং যজুর স্বরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। (তে তু বিত্ত্বোর্ধ্বা ঋচঃ সাম্নো যজুষঃ স্বরমের প্রাবিশন্ ৷৷১৷৷৪৷৷৩)। সুতরাং এখানে দেখি ঋক্ সাম ও যজুর্বেদকে ‘ত্রয়ী বিদ্যা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

অপর পক্ষে একই উপনিষদের সপ্তম অধ্যায়ে দেখি নারদ যখন সনৎকুমারের কাছে ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষা লাভের জন্য গেছেন তখন তিনি জিজ্ঞাসা করছেন, নারদ কি বিদ্যা আয়ত্ত করেছেন। তখন নারদ যে বিষয়গুলি পাঠ করেছেন তাদের যে তালিকা দিলেন তার মধ্যে ঋক্ সাম যজু এবং অথর্ব এই চারটি বেদের উল্লেখ আছে (৭।১।২)। সুতরাং ছান্দোগ্য উপনিষদ যখন রচিত হয় তখন যে অথর্বব্দের আবির্ভাব হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

বৃহদারণ্যক উপনিষদেরও একই অবস্থা পাই। তার প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চম ব্রাহ্মণে মাত্র প্রথম তিনটি বেদের উল্লেখ আছে। প্রাসঙ্গিক উক্তিটি এইঃ ত্রয়ো বেদা এত এব বাগের ঋগ্বেদো মনো যজুর্বেদঃ প্রাণঃ সামবেদঃ (১।৫।৫) অর্থাৎ তিনটি বেদের মধ্যে ঋগ্বেদ বাক্যের সঙ্গে তুলনীয়, সামবেদ প্রাণের সঙ্গে তুলনীয় এবং যজুর্বেদ মনের সঙ্গে তুলনীয়। এখানে কেবল তিনটি বেদেরই উল্লেখ পাই।

অথচ দেখি চতুর্থ অধ্যায়ে চারটি বেদেরই উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘মহতো ভূতস্য নিঃশ্বসিতমেতদ্ যদৃগবেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোহথর্বাঙ্গিরসঃ’ ৪।৫।১১)। তাৎপর্য হল ব্রহ্ম হতেই চারটি বেদের উৎপত্তি হয়েছে। এখানে স্পষ্টই প্রমাণ পাওয়া যায় বৃহদারণ্যক উপনিষদ যখন রচিত হয় তখন চারটি বেদের সহিত মানুষ পরিচিত ছিল।

সুতরাং এটা অনুমান করা যায় যে, এই দুই প্রাচীন উপনিষদ যখন রচিত হয় তখন তিন বেদের ধারণা একেবারে লুপ্ত হয়ে যায় নি। ‘ত্রয়ী’ বা ‘ত্রয়ো বেদাঃ’র ধারণা তখনও প্রচলিত ছিল। অবশ্য চতুর্থ বেদ অথর্বের তখন আবির্ভাব হয়েছে এবং তার সঙ্গেও মানুষের পরিচয় ছিল।

তারপর দেখি মুন্ডক উপনিষদে আর ‘ত্রয়ী’র উল্লেখ নেই; সোজাসুজি চারটি বেদকে বেদাঙ্গগুলিসহ অপরা বিদ্যার অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে (১।৫)। সুতরাং অনুমান করা যায় তখন ‘ত্রয়ী’র ধারণা লুপ্ত হয়েছে এবং চারটি বেদই সম্মানের আসন অধিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে লক্ষ্য করা যেতে পারে যে, এই উপনিষদখানি কোনও বেদের সংহিতা বা ব্রাহ্মণ বা আরণ্যকের সঙ্গে সংযুক্ত আকারে পাওয়া যায় না। তা ঐতিহ্য অনুসারে অথর্ববেদের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং বুঝা যায় এটি ছান্দোগ্য এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ হতে অপ্রাচীন এবং এটি যখন রচিত হয় তখন অথর্ববেদ রচিত হয়ে গেছে।

সুতরাং দেখা যায় অথর্ববেদের যে অনেক পথে আবির্ভাব হয়েছিল তার একাধিক প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথমত ঋক্, সাম ও যজুর্বেদ যেমন অঙ্গাঙ্গীভাবে পরস্পরের সহিত সংসুক্ত, অথর্ববেদের সহিত এদের তেমন সংযোগ নেই। দ্বিতীয়ত অথর্ববেদের প্রকৃতি এই তিনটি বেদ হতে বিভিন্ন। প্রথম তিনটি বেদে শ্রৌত কর্ম প্রাধান্য পেয়েছে। চতুর্থ বেদের আভ্যুদয়িক কর্ম প্রাধান্য পেয়েছে। তৃতীয়ত দেখি ব্রাহ্মণের যুগে বেদকে ‘ত্রয়ী’ বলা হত অর্থাৎ তখনও চারটি বেদের কথা মানুষ জানত না। ‘ত্রয়ী’ কথাটি উপনিষদের যুগেও প্রচলিত ছিল। তারপর অথর্ববেদ রচিত হয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করবার পর চারটি বেদের স্বীকৃতি উপনিষদ গুলিতে পাওয়া যায়। সুতরাং এমন অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে অথর্ববেদ তুলনায় অপ্রাচীন বেদ।

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ১

অনুবাদঃ

১। অগ্নি (১) যজ্ঞের পুরোহিত (২) এবং দীপ্তিমান; অগ্নি দেবগণের আহ্বানকারী ঋত্বিক এবং প্রভূতরত্নধারী: আমি অগ্নির স্তুতি করি।

২। অগ্নি পূর্ব ঋষিদের স্তুতিভাজন ছিলেন, নুতন ঋষিদেরো স্তুতিভাজন; তিনি দেবগণকে এ যজ্ঞে আনুন।

৩। অগ্নিদ্বারা যজমান ধনলাভ করেন, সে ধন দিন দিন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও যশোযুক্ত হয় ও তা দিয়ে অনেক বীরপুরুষ নিযুক্ত করা যায়।

৪। হে অগ্নি! তুমি যে যজ্ঞ চারদিকে বেষ্টন করে থাক সে যজ্ঞ কেউ হিংসা করতে পারে না এবং সে যজ্ঞ নি:সন্দেহেই দেবগণের নিকটে গমন করে।

৫। অগ্নি দেবগণের আহ্বানকারী; সিদ্ধকর্মা, সভ্যপরায়ণ ও প্রভূত ও বিবিধ কীর্তিযুক্ত; সে দেব দেবগণের সঙ্গে এ যজ্ঞে আগমন করুন।

৬। হে অগ্নি! তুমি হব্যদাতা যজমানের যে কল্যাণ সাধন করবে, হে অঙ্গিরা সে কল্যাণ প্রকৃত তোমারই।

৭। হে অগ্নি! আমরা দিনে দিনে দিনরাত মনের সাথে নমস্কার সম্পাদন করে তোমার সমীপে আসছি।

৮। তুমি দীপ্যমান, তুমি যজ্ঞের রক্ষক, যজ্ঞের অতিশয় দীপ্তিকারক, এবং যজ্ঞশালায় বর্ধনশীল।

৯। পুত্রের নিকট পিতা যেরূপ অনায়াসে অধিগম্য, হে অগ্নি! তুমি আমাদের নিকট সেরূপ হো; মঙ্গলার্থ আমাদরে নিকটে বাস কর।

টীকাঃ

১। নৈরুক্তদের মতে দেব তিন জন, পৃথিবীতে অগ্নি, অন্তরিক্ষে ইন্দ্র বা বায়ু এবং আকাশে সূর্য। তাঁদের মহাভাগ্য কারণ এক জনের অনেকগুলি নাম, অথবা এটি পৃথক পৃথক কর্মের জন্য, যথা হোতা, অধ্বর্যু, ব্রহ্মা, উদগাতা অথবা তাঁরা পৃথক পৃথক দেবই ছিলেন, কেন না তাঁদের পৃথকরূপে স্তুতি করা হয়েছে এবং পৃথক পৃথক নাম দেওয়া হয়েছে। নিরুক্ত ৭।। ৫। এ থেকে বোঝা যায় যে সে সময়ে ভারতবর্ষের তিনজন অগ্রগন্য দেবের মধ্যে অগ্নি একজন ছিলেন। ঋগ্বেদ সংহিতায় অগ্নি সমন্ধে যতগুলি সুক্ত আছে, ইন্দ্র ভিন্ন অন্য কোনো দেব সম্বন্ধে ততগুলি নেই।

২। অগ্নি না হলে যজ্ঞ হয় না, এ জন্য ঋগ্বেদে অনেক স্থলে অগ্নিকে পুরোহিত বলা হয়েছে। যথা রাজ্ঞ: পুরোহিত: তদভীষ্টং সম্পাদয়তি তথা অগ্নিরপি অপেক্ষিতং হোমং সম্পাদয়তি যদ্বা যজ্ঞস্য সম্বন্ধিনি পূর্বভাগে আহবনীয়রূপেণ অবস্থিতম। সায়ণ।

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ২

অনুবাদঃ

১। হে দর্শনীয় বায়ু (১) এস, এ সোমরস সমূহ (২) অভিযুত হয়েছে; এ পান কর, আমাদের আহ্বান শ্রবণ কর।

২। হে বায়ু! যজ্ঞাভিজ্ঞ স্তোতাগণ সোমরস অভিযুত করে তোমার উদ্দেশ্য স্তুতিবাক্য প্রয়োগ স্তব করছে।

৩। হে বায়ু! তোমার সোমগুণপ্রকাশক বাক্য সোম পানার্থ হব্যদাতা যজমানের নিকট আসছে, অনেকের নিকট আসছে।

৪। হে ইন্দ্র (৩) ও বায়ু! এ সোমরস অভিযুত হয়েছে, অন্ন নিয়ে এস: সোমরস তোমাদরে কামনা করছে।

৫। হে বায়ু ও ইন্দ্র! তোমরা অভিযুত সোমরস জান, তোমরা অন্নযুক্ত হব্যে বাস কর; শীঘ্র নিকটে এস।

৬। ?
৭। হে বায়ু ও ইন্দ্র! অভিষবকারী যজমানের অভিযুত সোমরসের নিকটে এস; হে বীরদ্বয়! এ কাজ ত্বরায় সম্পন্ন হবে।

৮। পবিত্রবল মিত্র ও হিংসকশত্রুনাশক বরুণকে (৪) আমি আহ্বান করি; তাঁরা ঘৃতাহুতি প্রদান রূপ কর্ম সাধন করেন।

৯। হে যজ্ঞ বর্ধয়িতা যজ্ঞস্পর্শী মিত্র ও বরুণ! তোমরা যজ্ঞফল দানার্থ এ বৃহৎ লোকের আশ্রয়ভূত; তাঁরা আমাদের বল ও কর্ম পোষণ করেন।

টীকাঃ

১। বায়ুও আদিম আর্যগণের আরাধ্য দেব ছিলেন, সুতরাং সে জাতির ভিন্ন ভিন্ন শাখার মধ্যে পূজনীয় ছিলেন। প্রাচীন ইরানীয়দের অবস্থা নামক জেন্দ ভাষায় লিখিত ধর্ম পুস্তকে বায়ু দেবের উল্লেখ আছে। প্রথম সুক্তের প্রথম ঋকের টীকার যাস্কের নিরুক্ত হতে যে অংশ উদ্বৃত হয়েছে তাতে প্রাচীন হিন্দুদের প্রধান দেবগণের মধ্যে বায়ুর নাম আছে।

২। সোমলতা পেষণ করলে দুগ্ধের ন্যায় শ্বেতবর্ণ এবং ঈষৎ অম্লরস নির্গত হয়, তাই মাদক অবস্থায় পরিণত করে পূর্বকালে যজ্ঞে ব্যবহৃত হত। প্রাচীন আর্যদের মধ্যে সোমরসের ব্যবহার ছিল, অতএব সে আর্য জাতির শাখা ইরানীদের মধ্যে সোমের ব্যবহার ও উপানসা ছিল। তারা সোমকে হওমা বলতেন ও যজ্ঞে এর অভিষব দিতেন। বোধ হয় ইরানীয় আর্যগণ সোমরস স্বাভাবিক অবস্থায় (unfermented)ব্যবহার করতেন এবং হিন্দু আর্যগণ সোমরস মাদক অবস্থায় (fermented) পান করতে ভাল বাসতেন এবং ঐ দুই আর্যজাতির বিবাদের এটি একটি কারণ।

৩। ভারতবর্ষে নদীর জল ভূমির উর্বরতা, ধান ও খাদ্য দ্রব্য, মানুষের সুখ ও জীবন; সমস্তই বৃষ্টির উপর নির্ভর করে, অতএব বৃষ্টিদাতা আকাশদেব ইন্দ্রের গেৌরব অধিক। তাঁর নাম যাস্ক হতে উদ্বৃত সূত্রে আছে, এবং তাঁর সম্বন্ধে যত সুক্ত আছে, অন্য কোন দেব সন্বন্ধে তত নেই।

৪। মিত্র আর্যদিগের একজন উপাস্য দেবতা ছিলেন সুতরাং প্রাচীন হিন্দু ও ইরানীয় উভয় শাখার মধ্যে তাঁর অর্চনা দেখা যায়। ইরানীয়দের মধ্যে মিথ্যা আলোক বা সূর্য বলে পুজিত হতেন, হিন্দুদের মধ্যে মিত্্আলোকে বা দিবা বলে পূজিত হতেন। বরুণ আর্যদের আরও পুরান দেবতা। আবরণকারী (বৃধাতু হতে) নৈশ আকাশকেই আর্যগণ বরুণ বলে পূজা করতেন, এবং সে দেবকে গ্রীকগণ Uranos, ইরানীয়গণ বরণ ও হিন্দুগণ বরুণ নামে জানেন। মৈত্রং বৈ অহরিতি শ্রুতো** শ্রুয়তে

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ৩

অনুবাদঃ

১। হে ক্ষিপ্রপাণি, শুভকর্মপালক, বিস্তীর্ণ ভুজ বিশিষ্ট অশ্বিদ্বয় (১) ! তোমরা যজ্ঞের অন্ন কামনা কর।

২। হে বহুকর্মা, নেতা, ও বিক্রমশালী অশ্বিদ্বয়! অপ্রতিহত বুদ্ধির সঙ্গে আমাদের স্তুতি গ্রহণ কর।

৩। হে দস্রদ্বয়! হে নাসত্যদ্বয় (২) ! হে রুদ্রবর্ত্মন, অশ্বিদ্বয়! মিশ্রিত সোমরস অভিযুত হয়েছে, ছিন্ন কুশে স্থাপিত হয়েছে, তোমরা এস।

৪। হে বিচিত্র দীপ্তিবিশিষ্ট ইন্দ্র! আঙুল দিয়ে অভিষুত নিত্যশুদ্ধ এ (সোমরস) তোমাকে কামনা করছে, তুমি এস।

৫। হে ইন্দ্র! আমাদের ভক্তিদ্বারা আকৃষ্ট হয়ে, মেধাবীদের দ্বারা আহুত হয়ে অভিষবকারী ঋত্বিকের স্তোত্র গ্রহণ করতে এস। ৬। হে অশ্বযুক্ত ইন্দ্র! তরান্বিত হয়ে স্তোত্র গ্রহণ করতে এস; এ সোমাভিষবযুক্ত যজ্ঞে আমাদের অন্ন ধারণ কর।

৭। হে বিশ্বদেবগণ (৩) ! তোমরা রক্ষক, মনুষ্যগণের পালক, তোমরা হব্যদাতা যজমানের অভিষুত সোম গ্রহণ করতে এস; তোমরাই যজ্ঞের ফলদাতা।

৮। রেপ সূর্য রশ্মি দিনে আসে, বৃষ্টিদাতা বিশ্বদেবগণ ত্বরান্বিত হয়ে সেরুপ অভিযুত সোমরসে আগমন করুন।

৯। বিশ্বদেবগণ ক্ষয়রহিত ও সদা বর্তমান; তাঁরা অকল্যাণরহিত ও ধনবাহক; তাঁরা যেন এ যজ্ঞ সেবন করেন।

১০। পবিত্রা, অন্নযুক্তষজ্ঞবিশিষ্টা, ও যজ্ঞফলরূপধনদাত্রী সরস্বতী (৪) আমাদের অন্নবিশিষ্ট যজ্ঞ কামনা করুন।

১১। সুনৃত বাক্যের উৎপাদয়িত্রী, সুমতি লোকদের শিক্ষয়িত্রী সরস্বতী আমাদের যজ্ঞ গ্রহণ করেছেন।

১২। সরস্বতী প্রবাহিত হয়ে প্রভূত জল সৃজন করেছেন, এবং সকল জ্ঞান উদ্দীপন করেছেন।

টীকাঃ

১। প্রকৃতির কোন দৃশ্যকে অশ্বিদ্বয় নাম দিয়ে প্রাচীন হিন্দুগণ উপাসনা করতেন? যাস্ক নিরুক্ততে সে বিষয়ে লিখেছেন তৎ কৌ অশ্বিনৌ। দ্যাবা পৃথিব্যো ইতি একে, অহোরত্রৌ ইতি একে, সূর্যাচন্দ্রমসৌ ইতি একে। রাজনৌ পুণ্যকৃতৌ ইতি ঐতিহাসিকাঃ। যাস্কের নিজের মত যতদুর বুঝা যায বোধ হয় অর্ধরাত্রির পর ও প্রাত:কালের পূর্বে যে আলোক ও অন্ধকারে বিজড়িত থাকে তাই অশ্বিদ্বয়। ঊষার পূর্বে মিশ্রিত আলোক ও অন্ধকার যদি যমজদেব বলে উপাসিত হন তবে তাঁদের অশ্বী নাম দেওয়া হল কেন? এটি একটি বৈদিক উপম মাত্র। সূর্যের আলোক আকাশে ধাবমান হয়, উষার আলোক আকাশে ধাবমান হয়, সে জন্য সে আলোক বা রশ্মি সমূহকে ঋগ্বেদে সর্বদাই অশ্বি বলে বর্ণনা করা হয়েছে, এবং সূর্য ও ঊষাকে অশ্বযুক্ত বলে সম্বোধন করা হয়েছে। অশ্বিন শব্দেরও সেই অর্থ, অশ্বযুক্ত অর্থাৎ আলোকযুক্ত।

২। দস্রা। শত্রুণামুপক্ষয়িতারৌ যদ্বা দেববৈদ্যত্বেন রোগাণামুপক্ষয়িতারৌ । অশ্বিনৌ বৈ দেবানাং ভিষজৌ ইতি শ্রুতে:। সায়ণ। নাসত্যা। অসত্যমনৃতভাষণং। তদ্রহিতৌ। সায়ণ। দস্রা ও নাসতা এ দৃষ্টি শব্দ সর্বদাই অশ্বিদ্বয় সম্বন্ধে প্রয়োগ হয়।

৩। বিশ্বোদেবাস এতন্নামকা দেববিশেষা:। সায়ণ।

৪। সর: অর্থ জল, সরস্বতীর প্রথম অর্থ নদী এতে সন্দেহ নেই; আর্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে তাই প্রথমে সরস্বতী দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন। এক্ষণে গঙ্গা যেরূপ হিন্দুদের উপাস্যা দেবী, প্রথম হিন্দুদের পক্ষে সরস্বতী সেরূপ ছিলেন। অচিরে সরস্বতী বাপ্দেবীও হলেন। যাস্ক বলেছেন তত্র সরস্বতী ইতি এতস্য নদীবন্দোতাবচ্চ নিগমা ভবন্তি। মূল ঋগ্বেদেও সরস্বতীর উভয় প্রকার গুণ লক্ষিত হয়। পুরাকালে সরস্বতী নদীতীরে যজ্ঞ সম্পাদন হত এবং মন্ত্র উচ্চারিত হত, ক্রমে সে সরস্বতী নদী সে পবিত্র মন্ত্রের দেবী ও বাপ্দেবী বলে পরিণত হলেন।

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ৪

অনুবাদঃ

১। যেরূপ দোহক দোহন হেতু সুদুপ্ধবতী গাভীকে আহ্বান করে, আমরাও সেরূপ রক্ষার্থে দিনে দিনে শোভনকর্মা ইন্দ্রকে আহ্বান করি।

২। হে সোমপায়ী ইন্দ্র! আমাদের অভিষবের নিকট এস, সোমপান কর; তুমি ধনবান তুমি হৃষ্ট হলে গাভী দান কর।

৩। আমরা যেন তোমার সমীপবর্তী সুমতিদের মধ্যে থেকে তোমাকে জানতে পারি; আমাদের অতিক্রমে করে অন্যের মধ্যে আপনাকে প্রকাশ করো না; আমাদের নিকট এস।

৪। অজেয় ও মেধাবী ইন্দ্রের সমীপে যাও। এ মেধাবীর কথা জিজ্ঞাসা কর; সে ইন্দ্র তোমার বন্ধুদের শ্রেষ্ঠ ধন দান করেন।

৫। আমাদরে ঋত্বিকেরা ইন্দ্রের পরিচর্যা করে তাঁকে স্তুতি করুন। হে নিন্দুকগণ! এ দেশ হতে এবং অন্য দেশ হতেও দুর হয়ে যাও।

৬। হে শত্রুক্ষয়কারক! শত্রুও যেন আমাদের সৌভাগ্যশালী বলে; আমাদের মিত্রপক্ষীয় মনুষ্যেরা (১) ত বলবেই; যেন আমরা ইন্দ্রের প্রসাদলব্ধ সুখে বাস করি।

৭। এ সোমরস ব্যাপনশীল ও যজ্ঞের সম্পদরূপ এ মানুষকে হৃষ্ট করে, কার্যসাধন করে এবং হর্ষদাতা ইন্দ্রের সখা; যজ্ঞব্যাপী ইন্দ্রকে এ দান কর।

৮। হে শতক্রতু! এ সোমপান করে তুমি বৃত্র প্রভৃতি শত্রুদের হনন করেছিলে, যুদ্ধে (তোমার ভক্ত) যোদ্ধাদের রক্ষা করেছিলে।

৯। হে শতক্রতু! তুমি সে যোদ্ধা! হে ইন্দ্র! ধনলাভার্থ তোমাকে অন্নবান করি।

১০। যিনি ধনের রক্ষক, এবং মহান যিনি কর্মের পুরয়িতা এবং অভিষবকারীর সখা, সে ইন্দ্রের উদ্দেশে গাও।

টীকাঃ

১। কৃষ্টয়ঃ শব্দের অর্থ মনুষ্যা অশ্মিন্মিত্রভূতাঃ। সায়ণ। কৃষ্ ধাতু অর্থ কর্ষণ বা চাষ করা; আর্যেরা কৃষিজীবী ছিলেন সেজন্য বোধ হয় কৃষ্টয়ঃ অর্থ মনুষ্য।

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ৫

অনুবাদঃ

১। হে স্তুতিবাদক সখাগণ! শীঘ্র এস উপবেশন কর, ইন্দ্রকে লক্ষ্য করে গাও।

২। এ সোমরস অভিযুত হলে সকলে একত্র হয়ে বহন শত্রুর দমনকারী, বহু বরণীয় ধনের স্বামী ইন্দ্রকে লক্ষ্য করে গাও।

৩। তিনি আমাদের উদ্দেশ্য সাধন করুন, তিনি ধন প্রদান করুন, তিনি স্ত্রী প্রদান করুন, তিনি অন্ন নিয়ে আমাদের নিকটে আগমন করুন।

৪। যুদ্ধে শতুরা যার রথযুক্ত অশ্বদ্বয়ের সম্মুখীন হতে পারে না, সে ইন্দ্রকে লক্ষ্য করে গাও।

৫। এ অভিযুত পবিত্র, দধিমিশ্রিত সোমরস সমূহ অভিযুত সোমপায়ীর পানার্থ তার নিকট যাচ্ছে।

৬। হে সুক্রতু ইন্দ্র! তুমি অভিযুত সোম পানের জন্য ও দেবগণের মধ্যে জ্যেষ্ঠত্ব প্রাপ্তির জন্য একেবারেই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছ।

৭। হে স্তুতিভাজন ইন্দ্র। ব্যাপনশীল অর্থাৎ শীঘ্রমাদক সোমরস সমূহ তোমাতে প্রবেশ করুক, প্রকৃষ্ট জ্ঞানলাভে তোমার মঙ্গলকারী হোক।

৮। হে শতক্রতু। স্মোম সমূহ তোমাকে বর্ধন করেছে, উকুথ সমূহ তোমাকে বর্ধন করেছে, আমাদের স্তুতি তোমাকে বর্ধন করুক।

৯। ইন্দ্র রক্ষণে বিরত না হয়ে এ সহস্রসংখ্যক অন্ন গ্রহণ করুন, যে অন্নে সমস্ত পৌরুষ অবস্থিতি করে।

১০। হে স্তুতিভাজন ইন্দ্র। বিরোধী মনুষ্যেরা আমাদের শরীরে যেন আঘাত না করে, তুমি ক্ষমতাশালী, আমাদের বধ নিবারণ কর।

টীকাঃ

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ৬

অনুবাদঃ

১। চারদিকের লোকেরা সূর্যরূপে ইন্দ্রের প্রতাপান্বিত, অরুষ ও বিচরণকারী অশ্ব যোজনা করছে। আলোকগণ আকাশে দীপ্যমান রয়েছে (১)।

২। তারা ইন্দ্রের কমনীয়, রক্তবর্ণ, তেজ:পূর্ণ ও পুরুষবাহক হরি নামক অশ্বদ্বয় রথের উভয় পার্শ্বে সংযোজিত করে।

৩। হে মনুষ্যগণ। সূর্যরূপ ইন্দ্র নিদ্রায় সংজ্ঞারহিতকে সংজ্ঞাদান করে, অন্ধকারে রূপরহিতকে রূপ দান করে, জলন্ত রশ্মির সাথে উদিত হন।

৪। তারপর মরুৎগণ (২) যজ্ঞার্হ নাম ধারণ করে স্বীয় প্রকৃতি অনুসারে মেঘের মধ্যে জলের গর্ভাকার রচনা করলেন।

৫। হে ইন্দ্র! দৃঢ় স্থানের ভেদকারী এবং বহনশীল মরুৎদের সাথে তুমি গুহায় লুকান গাভী সমূদয় অন্বেষণ করে উদ্ধার করেছিলে (৩)

৬। স্তোতাগণ দেবতা কামনা করে ধনযুক্ত ও মহৎ ও বিখ্যাত মরুৎগণকে লক্ষ্য করে সুমন্ত্রী ইন্দ্রের ন্যায় স্তুতি করে।

৭। হে মরুৎগণ। যেন তোমাদের ভীতিরহিত ইন্দ্রের সঙ্গে মিলিত দেখা যায়; তোমরা নিত্য প্রমুদিত ও তুল্যদীপ্তি বিশিষ্ট।

৮। দোষ রহিত, স্বর্গাভিগত ও কাময়িতব্য মরুৎগণের সাথে ইন্দ্রকে বলসম্পন্ন বলে এ যজ্ঞ অর্চনা করছে।

৯। হে চতুর্দিকব্যাপী মরুৎগণ! ঐ অন্তরিক্ষ হতে অথবা আকাশ হতে, অথবা দীপ্যমান আদিত্যমন্ডল হতে এস; এ যজ্ঞে ঋত্বিক সম্যকরূপে স্তুতি সাধন করছে।

১০। এ পৃথিবী হতে অথবা আকাশ হতে অথবা মহৎ অন্তরিক্ষ হতে ধন দানের জন্য ইন্দ্রের নিকট যাঞ্জা করি।

টীকাঃ

১। এ ঋকের অর্থ অপরিস্কার। যথা মুলে অরুষ শব্দ আছে, সায়ণ তার অর্থ করেছেন হিংসক রহিত। পণ্ডিত মক্ষমূলর বলেন অরুষের আদি অর্থ লোহিতবর্ণ এবং অরুষ বিশেষ্য হয়ে ব্যবহৃত হলে সূর্যের একটি অশ্বের নাম। তিনি আরও বলেন এ সূর্যের লোহিত বর্ণ অশ্ব অরুষ গ্রীসদেশে রূপান্তর প্রাপ্ত হয়ে Eros নাম ধারণ করে প্রেমের দেবতা বলে পূজিত হতেন!- Chips from a German Workshop সূর্যের অশগণের সাধারণ নাম হরিৎ সেজন্য সূর্যকে হরিদশ্ব বলে। মক্ষমূলর বিবেচনা করেন এ হরিৎগণ গ্রীসদেশে রূপান্তর প্রাপ্ত হয়ে Charites নাম ধারণ করে পরম রূপবতী ও কমনীয় দেবীরূপে পূজিত হতেন। Science of Language

২। মরুৎগণ কে? মরুৎ শব্দ মৃ ধাতু হতে উৎপনন সে ধাতুর অর্থ আঘাত করা বা হনন করা। মরুৎগণ আঘাতকারী বা ধ্বংসকর ঝড়বায়ু। ঐ ধাতু হতে লাটিনদের যুদ্ধদেব Mars ঐ নাম পেয়েছেন।

৩। পণিঃ নামক অসুরেরা দেবলোক হতে গাভী অপহরণ করে অন্ধকারে রেখেছিল, ইন্দ্র মরুৎদের সাথে তা উদ্ধার করেছিলেন। গাভীর অন্বেষনার্থ সরমা নাম্নী এক দেব কুক্কুরীকে নিযুক্ত করেছিলেন, এবং সরমা অসুরদের সাথে বন্ধুত্ব করে গাভীর অনুসন্ধান পেয়েছিল। সায়ণ। ইউরোপীয় পণ্ডিত মহ্মমূলর বিবেচনা করেন এ বৈদিক উপাখ্যানটি প্রাত:কালে প্রকৃতি সম্বন্ধীয় একটি উপমা মাত্র। তিনি বলেন, সরমা ঊষার একটি নাম। দেবগণের গাভীগণ অর্থাৎ সূর্যরশ্মি সমুদয় অন্ধকার দ্বারা অপহৃত হয়েছে। দেবগণ ও মানুষেরা তাদের উদ্ধারের জন্য ব্যস্ত হয়েছেন। অবশেষে ঊষা দেখা দিলেন। তিনি বিদ্যুৎগতিতে, গন্ধ পেয় কুক্কুরী যেরূপ যায় সেরূপ ইতস্ততঃ ধাবমান হতে লাগলেন। তিনি সন্ধান নিয়ে ফিরে এলে আলোকদেব ইন্দ্র প্রকাশ হয়ে অন্ধকারের সাথে যুদ্ধ করলেন এবং তাদের দুর্গ হতে সে দেবগাভী উদ্ধার করলেন। মহ্মমলর আরও বিবেচনা করেন ট্রয়ের যুদ্ধের যে গল্প নিয়ে চিরস্মরনীয় কবি হোমর গ্রীক ভাষায় মহাকাব্য লিখেছেন, সে গল্প এই পণিঃ ও সরমার গল্পের রূপান্তর মাত্র।

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ৭

অনুবাদঃ

১। গাথাকারেরা বৃহৎ গাথা দ্বারা, অর্কীগণ অর্ক দ্বারা, বাণীকারেরা বাণীদ্বারা ইন্দ্রকে স্তুতি করেছেন।

২। ইন্দ্র হরিদ্বয়কে বচনমাত্রে যোজিত করে সকলের সাথে মিশছেন, তিনি বজ্রযুক্ত ও হিরস্ময়।

৩। ইন্দ্র বহুদূর দর্শনের জন্য আকাশে সূর্যকে আরোহণ করিয়েছিলেন; সূর্য কিরণ দ্বারা পর্বত আলোকিত করেছেন।

৪। হে উগ্র ইন্দ্র! তোমার আমোঘ রক্ষণাবেক্ষণ দ্বারা আহবে এবং (গজাশ্বাদি) লাভযুক্ত সহস্র মহাযুদ্ধে আমাদের রক্ষা কর।

৫। ইন্দ্র আমাদের সহায় এবং শত্রুদের পক্ষে বজ্রধারী আমরা মহাধনের জন্য এবং স্বল্প ধনের জন্যও ইন্দ্রকে আহ্বান করি।

৬। হে সর্ব ফলদাতা, হে বৃষ্টিপ্রদ ইন্দ্র! তুমি আমাদের জন্য ঐ মেঘ উদঘাটন করে দাও; তুমি আমাদরে যাচঞা কখনও অগ্রাহ্য করনি।

৭। ভিন্ন ভিনন ফলদাতা ভিন্ন ভিন্ন দেবতা সম্বন্ধে যে স্তুতিবাক্য প্রয়োগ উৎকৃষ্ট হয়, সে সমস্ত স্তোমই বজ্রধারী ইন্দ্রের; তাঁর যোগ্য স্তুতি আমি জানি না।

৮। যেরূপ বননীয়গতি বৃষভযুথকে বলপুর্ণ করে অভীন্টবর্ষী ইন্দ্র সেরূপ মনুষ্যদের বলপূর্ণ করেন; ইন্দ্র ক্ষমতাশালী ও যাচঞা অগ্রাহ্য করেন না।

৯। যে ইন্দ্র একাকী মনুষ্যদের ধন সমূহের এবং পঞ্চক্ষিতির (১) উপর শাসন করেন।

১০। সর্বজনের উপরিস্থিত ইন্দ্রকে তোমাদের জন্য আহ্বান করি, তিনি কেবল আমাদেরই হোন।

টীকাঃ

১। পঞ্চক্ষিতি সম্বন্ধে ৮৯ সুক্তের ১০ ঋকের টীকা দেখুন।

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ৮

অনুবাদঃ

১। হে ইন্দ্র! আমাদরে রক্ষণার্থে সম্ভোগযোগ্য, জয়শীল, সদা শত্রুবিজয়ী ও প্রভূত ধন দাও।

২। যে ধনদ্বারা (নিযুক্ত সৈন্যদিগের) নিরন্তর মুষ্টিপ্রহার দ্বারা আমরা শত্রুকে নিবারণ করব অথবা তোমার দ্বারা রক্ষিত হয়ে অশ্ব দ্বারা শত্রুকে নিবারণ করব।

৩। হে ইন্দ্র! তোমার দ্বারা রক্ষিত হয়ে আমরা কঠিন অস্ত্র ধারণ করি, যুদ্ধে স্পর্দ্ধাযুক্ত শত্রুকে জয় করব।

৪। হে ইন্দ্র! তোমার সহায়তায় আমরা বীর অস্ত্রধারীদের সাথে সৈন্যসজ্জাযুক্ত শত্রুকেও পরাভব করতে পারি।

৫। ইন্দ্র মহৎ এবং সর্বোৎকৃষ্ট, বজ্রধারী ইন্দ্রে মহত্ত্ব অবস্থিতি করুক; তাঁর সৈন্য আকাশের ন্যায় প্রভূত।

৬। যে পুরুষেরা সংগ্রামে লিপ্ত হন, অথবা পুত্র লাভ ইচ্ছা করেন অথবা যে বিজ্ঞ লোকেরা জ্ঞানাকাঙ্ক্ষায় থাকেন (তাঁরা সকলেই ইন্দ্রের স্তুতি দ্বারা সিদ্ধি লাভ করেন)।

৭। ইন্দ্রের যে উদরদেশ অতিশয় সোমরসপানে তৎপর সে উদর সমুদ্রের ন্যায় স্ফীত হয়, মুখের প্রচুর জলের ন্যায় (কখনও শুষ্ক হয় না)।

৮। ইন্দ্রের সুনৃত বাক্য প্রকৃতই সুনৃত এবং বিবিধ (মিষ্ট) বচনযুক্ত, সে বাক্য মহৎ এবং গাভীদান করে; এবং হব্যদাতার পক্ষে সে বাক্য পরিপক্ক ফলপুর্ণ শাখার ন্যায়।

৯। হে ইন্দ্র! তোমার ঐশ্বর্য প্রকৃতই এরূপ, এবং আমার মত হব্যদাতার রক্ষণে হেতু, এবং তৎক্ষণফলদায়ী।

১০। তাঁর স্তোম ও উক্থ প্রকৃতই এরূপ, অর্থাৎ কাম্য, এবং ইন্দ্রের সোমপানের জন্য কথনীয়।

টীকাঃ

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ৯

অনুবাদঃ

১। হে ইন্দ্র ! এস. সোমরসরূপ খাদ্য সমূহে হৃষ্ট হও; মহাবল হয়ে শত্রুদের পরাজয়ী হও।

২। হর্ষজনক ও কার্যকরণে উত্তেজক সোমরস প্রস্তুত হলে হর্ষযুক্ত ও সর্ব কর্মকারক ইন্দ্রকে উৎসর্গ কর।

৩। হে সুশিপ্র ইন্দ্র! সকল মানুষের অধীশ্বর! হর্ষজনক স্তুতি সমূহদ্বারা হর্ষযুক্ত হও; দেবগণের সাথে এ সবন সমূহে এস।

৪। মুখের প্রচুর জলের ন্যায়

৫। হে ইন্দ্র! শ্রেষ্ঠ ও বহুবিধ ধন আমাদের অভিমুখে প্রেরণ কর; পর্যাপ্ত ও প্রভূত ধন তোমারই আছে।

৬। হে প্রভূত ধনশালী ইন্দ্র! ধন সিদ্ধির জন্য আমাদের এ কর্মে নিযুক্ত কর; আমরা উদ্যোগবান ও কীর্তিমান।

৭। হে ইন্দ্র! গাভীযুক্ত অন্নযুক্ত প্রভূত ও বৃহঃ সমস্ত আয়ুর কারণ ও বিনাশরহিত ধন আমাদের প্রদান কর।

৮। হে ইন্দ্র ! আমাদের মহৎ কীর্তি এবং সহস্রদানযুক্ত ধন এবং বহুরথপূর্ণ সে অন্ন দান কর।

৯। ধনরক্ষার্থ আমরা স্তুতি দ্বারা স্তব করতে করতে ইন্দ্রকে আহ্বান করি, তিনি ধনপালক, ঋকপ্রিয়, এবং যজ্ঞে গমন করেন।

১০। প্রত্যেক সবনে যজমানগণ নিত্যনিবাস ও পৌঢ় ইন্দ্রের বৃহৎ পরাক্রমের প্রশংসা করে।

টীকাঃ

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ১০

অনুবাদঃ

১। হে শতক্রতু! গায়কেরা তোমার উদ্দেশে গান করে, অর্চকেরা অর্চনীয় ইন্দ্রকে অর্চনা করে; নর্তকেরা যেরূপ বংশখণ্ডকে উন্নত করে, স্তুতিকারেরা (১) তোমাকে সেরূপ উন্নত করে।

২। যজমান সোমলতা আহরণার্থ যখন সানু হতে অপর সানুতে আরোহণ করে, এবং প্রভূত কর্ম উপক্রম করে, তখন ইন্দ্র যজমানের প্রয়োজন জানতে পারেন, এবং অভীষ্টবর্ষণে উৎসুক হয়ে মরুৎদলের সাথে যজ্ঞস্থানে আগমনার্থ উদ্যত হন।

৩। তোমার কেশরযুক্ত, পরাক্রান্ত এবং পৃষ্টাঙ্গ অশ্বদ্বয় সংযোজিত কর; তারপর হে সোমপায়ী ইন্দ্র! আমাদের স্তুতি শ্রবণার্থ নিকটে এস।

৪। হে নিবাসকারণভূত ইন্দ্র! এস আমাদের স্তুতির প্রশংসা কর, অনুমোদন কর ও শব্দদ্বারা আনন্দ প্রকাশ কর; আমাদের অন্ন ও যজ্ঞ এককালে বর্ধন কর।

৫। বহু শত্রুনিষেধকারী ইন্দ্রের উদ্দেশে বর্ধনকারী উকথ গীত হবে; যেন সে ক্ষমতাশালী ইন্দ্র আমাদের পুত্র ও বন্ধুদের মধ্যে মহানাদ করেন।

৬। আমরা মিত্রতার জন্য, ধনের জন্য সূবীর্যের জন্য তাঁর নিকট যাই; সে ক্ষমতাশালী ইন্দ্র আমাদের ধন দান করে আমাদরে রক্ষণসথর্থ হয়েছেন।

৭। হে ইন্দ্র! তোমার প্রদত্ত অন্ন সর্বত্র প্রসারিত এবং সুখপ্রাপ্য, হে বজ্রধারী ইন্দ্র! গাভীর নিবাসস্থান খুলে দাও ধন সম্পাদন কর।

৮। হে ইন্দ্র! শত্রুবধ কালে এ উভয় জগৎ তোমাকে ধারণ করতে পার না; তুমি স্বর্গীয় জল জয় কর, আমাদের সম্যকরূপে গাভী প্রেরণ কর।

৯। হে ইন্দ্র! তোমার কর্ণ চারদিক হতে শুনতে পায়, আমাদরে আহ্বান শীঘ্র শ্রবণ কর; আমার স্তুতি ধারণ কর, আমার এ স্তোত্র ও আমার সখার স্তোত্র আপনার নিকটে ধারণ কর।

১০। আমরা তোমাকে জানি; তুমি প্রভূতরূপে অভীষ্ট বর্ষণ কর, তুমি সংগ্রামে আমাদরে আহ্বান শ্রবণ কর; নব্য আয়ুঃ সম্যকরূপে বর্ধন কর, এ ঋষিকে সহস্রধনোপেত কর।

১১। ?
১২। হে স্তুতিভাজন ইন্দ্র! চারদিক হতে এ স্তুতি তোমার নিকট উপনীত হোক; তুমি দীর্ঘায়ুঃ; তোমাকে অনুসরণ করে সে স্তুতি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হোক; তোমার প্রীতি সাধন করে সে স্তুতি আমাদরে প্রীতিকর হোক।

টীকাঃ

১। মুলে ব্রহ্মাণঃ আছে। ঋগ্বেদে ব্রহ্ম অর্থে স্তুতি এবং ব্রহমা অর্থে স্তুতিকারী পুরোহিত। ১৫ সুক্তের ৫ ঋক, ১৮ সুক্তের ১ ঋক দেখুন।

২। ষদ্যপি কিবামিত্রঃ কুশিকসা পত্রজ্ঞথাপি তদ্রুপেণ ইন্দ্রস্যৈবোৎপন্নত্বাৎ কুশিকপুত্রত্বমবিরুদ্ধম। কুশিকস্তৈষীরথিরিন্দ্রতুলাং পুত্রমিচ্ছন ব্রহ্মচর্যং চচার। তসোন্দ্র এর গাথীপুত্র যজ্ঞে। সায়ণ।

প্রথম মণ্ডল: সুক্ত - ১১

অনুবাদঃ

১। সমুদ্রবৎ ব্যাপ্তিবিশিষ্ট, রথীদের মধ্যে রথিশ্রেষ্ঠ, অন্নপতি ও সজনপালক ইন্দ্রকে আমাদের সমস্ত স্তুতি বর্ধন করেছে।

২। হে বলপতি ইন্দ্র! তোমার মিত্রতায় অন্নবান হয়ে আমরা যেন না ভয় করি। তুমি জয়শীল ও অপরাজিত, তোমাকে আমরা স্তুতি করি।

৩। ইন্দ্রের ধনদান পূর্বকাল সিদ্ধ; যদি তিনি স্তোতাদের গাভীযুক্ত ও অন্নযুক্ত ধন দান করন, তা হলে তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ ক্ষান্ত হবে না।

৪। যুবা, মেধাবী, প্রভূতবলসম্পন্ন, সকল কর্মের ধর্তা, বজ্রযুক্ত ও বহু স্তুতিভাজন ইন্দ্র (অসুরদের) নগর বিদারকরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

৫। হে বজ্রযুক্ত ইন্দ্র! তুমি গাভী হরণকারী বলনামক শত্রুর গহ্বর উদঘাটিত করেছিলে (১) তখন বলাসুরনিপীড়িত দেবতাগণ ভরশূন্য হয়ে তোমাকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

৬। হে বীর ইন্দ্র! আমি স্যন্দমান সোমরসের গুণ সর্বত্র ব্যক্ত করে তোমার ধন দানে আকৃষ্ট হয়ে প্রর্ত্যাগত হয়েছি। হে স্তুতিভাজন ইন্দ্র! পূর্ব যজ্ঞকর্তাগণ তোমার নিকট উপনীত হত, এবং তোমার বদান্যতা জেনেছিল।

৭। হে ইন্দ্র! তুমি মায়াবী শুষ্ণ (২) (নামক অসুরকে) মায়াদ্বারা বধ করেছিলে; মেধাবিগণ তোমার (মহিমা) জানে, তাদের অন্ন বর্ধন কর।

৮। বলপ্রবাবে জগতের নিয়ন্তা ইন্দ্রকে স্তোতাগণ স্তুতি করেছিল; তাঁর ধনদান সহস্রসংখ্যক অথবা তা অপেক্ষাও অধিক।

টীকাঃ

১। বলনামক কোন এক অসুর দেবতাগণের গাভী অপহরণ করে কোন এক গহব্বরে গোপন করে রেখেছিল। তখন ইন্দ্র স্বসৈন্যে সে গহব্বর বেষ্টন করে সে গহব্বর হতে গাভী বার করেছিলেন। সায়ণ। চতুর্থ মন্ডলের ৫০ সুক্ত এবং অন্যান্য সুক্ত পাঠ করলে বোঝা যায় যে বল অসুরের উপাখ্যান একটি উপমা মাত্র, মেঘই বলের গাভী, ইন্দ্র তাদের উদ্ধার করে দোহন করেন, অর্থাৎ বৃষ্টি দান করেন। এ নৈসর্গিক ব্যাপার সম্বন্ধে আর একটি উপমা হতে বৃত্রের উপাখ্যান উৎপন্ন হয়েছে; ৩২ সুক্ত দেখুন। ডাক্তার কৃষ্ণমোহন বন্দো্যাপাধ্যায় আসিরীয় ইতিহাসের বাবিলনাধিপতি বল দের সাথে বৈদিক বলের ঐক্য সাধন করেন। এবং তিনি আসিরীয় অসরের সাথে অসুরের ঐক্য সাধনে উৎসুক। তাঁর প্রণীত ঋগ্বেদের প্রথম দুই অধ্যায়ের ভূমিকা দেখুন। এবং তাঁর প্রণীত Aryan Witness দেখুন।

২। শুষ্ণং ভূতানাং শোষণহেতুং এতন্নামকং অসুরং। সায়ণ। অর্থাৎ অনাবৃষ্টিরূপ অকল্যাণ। শুষ্ণের উপাখ্যান বৃষ্টিপাতের আর একটি উপমা। ইন্দ্র শুষ্ণকে হনন করলেন, অর্থাৎ অনাবৃষ্টি প্রতিরোধ করে বৃষ্টি দান করলেন। বৃত্র, অহি, শুষ্ণ, নমুচি, পিপ্রু, শুম্বর, উরণ, কুযব, বর্চী, অর্বুদ প্রভৃতি দনুপুত্রদের সাথে ইন্দ্রের যুদ্ধের এই আদিম অর্থ। ৩২ সুক্ত দেখুন।

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ১২

অনুবাদঃ

১। অগ্নি দেবদুত ও দেবগণের আহ্বানকারী, তিনি সর্বধনযুক্ত এবং এ যজ্ঞের সুনিষ্পাদক আমরা অগ্নিকে বরণ করি।

২। প্রজাপালক, হব্যবাহী, এবং বহু লোকের প্রিয়অগ্নিকে যজ্ঞের অনুষ্ঠাতাগণ নিরুতর আহ্বান মন্ত্র দ্বারা আহ্বান করে থাকে।

৩। হে কাষ্ঠোৎপন্ন অগ্নি! এ ছিন্নকুশযুক্ত যজ্ঞস্থলে দেবতাদের আন, তুমি আমাদের স্তুতিভাজন ও দেবতাদের আহ্বানকারী।

৪। হে অপ্নি! যেহেতু তুমি দেবতাদের দুতকর্ম প্রাপ্ত হয়েছ, অতএব হব্যাকাঙ্ক্ষ দেবগণকে জাগরিত কর; দেবগণের সাথে এ কুশযুক্ত যজ্ঞস্থলে উপবেশন কর।

৫। হে অপ্নি! তুমি ঘৃতের দ্বারা আহুত ও দীপ্যমান; আমাদের বিদ্বেষিগণ রাক্ষুসের সাথে যুক্ত হয়েছে, তুমি তাদেরদহন কর।

৬। অপ্নি অপ্নিদ্বারা প্রজ্বলিত হন, তিনি মেধাবী, গৃহপালক, যুবা (১) হব্যবাহী ও জুহু মুখ (২)

৭। মেধাবী, সত্যধর্মা, শত্রুনাশক, দেব অপ্নির নিকটে এসে যজ্ঞ কর্মে তাঁর স্তুতি কর।

৮। হে দেব অগ্নি! তুমি দেবদূত, যে হরিষ্পতি তোমার পরিচর্যা করে তুমি তার সম্যক রক্ষক হও।

৯। হে হরিষ্পতি, দেবগণের হব্যভক্ষনার্থে অগ্নির নিকটে এসে সম্যক পরিচর্যা করে, হে পাবক! তাকে সুখী কর।

১০। হে দীপ্যমান পাবক অগ্নি! তুমি আমাদের জন্য দেবতাগণকে এখানে নিয়ে এস, এবং আমাদের যজ্ঞ ও হব্য দেবসমীপে নিয়ে যাও।

১১। হে অগ্নি! নতুন গায়ত্রীছন্দের মন্ত্র দ্বারা স্তুত হয়ে আমাদের জন্য ধন ও বীরযুক্ত অন্ন প্রদান কর।

১২। হে অগ্নি! তুমি শুভ্র দীপ্তিযুক্ত ও দেবগণের আহ্বানসমর্থ স্তোত্রসমন্বিত। তুমি আমাদের এ স্ত্রোত্র গ্রহণ কর।

টীকাঃ

১। অগ্নিকে অনেক স্থানে যুবা বলে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি সকল দেবগণের মধ্যে যবিষ্ঠ। এই মন্ডলের ২২।১০, ২৬।২, ১৪১।১৪ প্রভৃতি ঋক দেখুন। গ্রীকদের বিশ্বকর্মার নাম , এবং পন্ডিতগণ বিবেচনা করেন, এ নাম যবিষ্ঠ নামের রূপান্তর মাত্র। দুটি কাষ্ঠ ঘর্ষণ বা মন্থন করলে অগ্নি উৎপন্ন হয় সে জন্য অগ্নিকে প্রমস্থ নাম দেওয়া যায়। গ্রীকদের ধর্মে যে দেব মানুষের হিতার্থে স্বর্গ হতে অগ্নি চুরি করে এনেচিলেন, পন্ডিতদের মতে সে Prometheous দেবের নাম প্রমন্থের রূপান্তর মাত্র। অগিনর আর একটি নাম ভরণু পণ্ডিতেরা বলেন তারই রূপান্তর গ্রীকদের অগ্নিদাতা ও সদাচার নিয়ন্তা .

২। জুহ কাষ্ঠ নির্মিত হাতা যজ্ঞকালে ব্যবহার হয়ে থাকে। সে হাতাই অগ্নির মুখস্বরূপ, কেন না তা দিয়ে অগ্নিকে ঘৃত ভোজন করান যায়।

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ১৩

অনুবাদঃ

১। হে সুসমিদ্ধ (১) নামক অগ্নি! আমাদরে যজমানের নিকট দেবগণকে আন; হে পাবক। হে দেবগণের আহ্বানকারী। তুমি যজ্ঞ সম্পাদন কর।

২। হে মেধাবী তনুনপাৎ (২) নামক অগ্নি! আমাদের রসবৎ যজ্ঞ অদ্য ভক্ষণার্থে দেবগণের নিকট নিয়ে যাও।

৩। এ যজনদেশে, এ যজ্ঞে, প্রিয়, মধুজিহ্ব, হব্যনিষ্পাদক, নরাশংস (৩) নামক অগ্নিকে আহ্বান করি।

৪। হে ঈলিত (৪) অগ্নি। সুখতমরথে দেবগণকে নিয়ে এস; মানুষদ্বারা তুমি দেবগণের আহ্বানকারী রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছ।

৫। হে বুদ্ধিমান ঋত্বিকগণ। পরস্পরসংযুক্ত এবং ঘৃতাচ্ছাদিত বহি (৫) কুশ বিস্তার কর, সে কুশের উপর ঘৃত দৃষ্ট হয়।

৬। দেবীদ্বার (৬) উদ্ঘাটিত হোক; সে দ্বার যজ্ঞের বর্ধন সাধক; দ্যুতিমান, এবং এতদিন জনশূন্য ছিল; অদ্য অবশ্যই যজ্ঞ সাধন করতে হবে।

৭। শোভনরূপযুক্ত নক্ত ও ঊষাকে (৭) এ আমাদের কুশে বসবার জন্য এ যজ্ঞে আহ্বান করছি।

৮। ঐ সুজিহ্ব, মেধাবী, হোতা দেবদ্বয়কে (৮) আহ্বান করছি; তাঁরা আমাদের এ যজ্ঞ সম্পাদন করুন।

৯। সুখপ্রদ ও ক্ষয়রহিত ইলা, সরস্বতী ও মহী (৯) এ দেবীত্রয় এ কুশে উপবেশন করুন।

১০। শ্রেষ্ঠ ও বহুবিধ রূপসম্পন্ন ত্বষ্টাকে (১০১) এ যজ্ঞে আহ্বান করছি; তিনি কেবল আমাদের পক্ষেই থাকুন।

১১। হে দেব বনষ্পতি (১১)! দেবতাদের হব্য সমর্পণ কর; হব্য দাতার যেন পরম জ্ঞান জন্মে।

১২। ইন্দ্রর জন্য যজমানের গৃহে স্বাহা (১২) দ্বারা যজ্ঞ সম্পন্ন কর; সে যজ্ঞে দেবগণকে আহআন করছি।

টীকাঃ

১। এ সুক্তটি আপ্রীসুক্ত অর্থাৎ পশুযজ্ঞে এর নিয়োগ হত। এ সুক্তের বারটি ঋকে অগ্নিকে বারটি ভিন্ন নামে স্তুতি করা হয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন ঋষি গোত্রের ভিন্ন ভিন্ন আপ্রী সুক্ত ছিল। মেধাতিথি দীর্ঘ তমা প্রভৃতি ঋষিদিগের আপ্রীসুক্তে নরাশংস ও তনুনপাৎ, এ উভয় নামেরই উল্লেখ আছে। গৃৎসমদদের আপ্রীসুক্তে নরাশংসের উল্লেখ আছে, তনুনপাতের উল্লেখ নেই। অন্যঋষি গোত্রের আপ্রীসক্তে তনুনপাতের উল্লেখ আছে, নরাশংসের উল্লেখ নেই। ঋগ্বেদে সর্বসুদ্ধ দশটি আপ্রীসুক্ত আছে, যথা- ১ মন্ডলের ১৩, ১৪২, ও ১৮৮ সুক্ত। ২ মন্ডলের ৩ সুক্ত। ৩ মন্ডলের ৪ সুক্ত। ৫ মন্ডলের ৫ সুক্ত। ৭ মন্ডলের ২ সুক্ত। ৯ মন্ডলের ৫ সুক্ত। ১০ মন্ডলের ৭০ ও ১১০ সুক্ত।

২। তনু+উন=তনুন, অর্থাৎ দুর্বলাকলেবর। তনুন+প=তনুনপ, অর্থাৎ দুর্বলাকারের পালক, অর্থাৎ ঘৃত। তুননপ+অৎ=তনুনপাৎ আঘৃতভোজী অগ্নি।

৩। নরাশংস অর্থ মানবপ্রশংসিত। এ নরাশংস নামের রূপান্তর জেন্দ অবস্থা গ্রন্থে পাওয়া যায়।

৪। ঈলিত অর্থাৎ স্তুত। অগ্নির একটি নাম ইলা সে নাম সুচনার্থে ঈলিত বিশেষণ প্রয়োগ হয়েছে। সায়ণ।

৫। বহিঃ অগ্নির একটি নাম, সে নাম সূচনার্থে এ শব্দ প্রয়োগ হয়েছে।

৬। দেবীদ্বার শব্দদ্বারা অগ্নির একটি নাম সূচিত হচ্ছে। সায়ণ।

৭। নক্ত ও উষা অর্থে রাত্রি ও প্রাত:কাল, কিন্তু এখানে এই দুই শব্দ তৎকালসম্ভুত অপ্নি বোঝাচ্ছে। সায়ণ।

৮। মুলে হোতারা দৈব্যা আছে এ শব্দদ্বারা অগ্নি সূচিত হচ্ছে। সায়ণ। ৯। তিনটি দেবীর নাম, এখানে অগ্নি বোঝাচ্ছে। সায়ণ।

১০। এখানে ত্বষ্টা শব্দদ্বারা অগি বোঝাচ্ছে। সায়ণ।

১১। অর্থাৎ বনষ্পতি নামক অগ্নি। সায়ণ। (*১২) সু+আ+হেব। যজ্ঞে হব্য প্রদানের সময় স্বাহা শবদ উচ্চারণ করতে হয়, এখানে এ শব্দে অগ্নিবেোঝাচ্ছে। সায়ণ।

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ১৪

অনুবাদঃ

১। হে ক্ষিপ্রপাণি, শুভকর্মপালক, বিস্তীর্ণ ভুজ বিশিষ্ট অশ্বিদ্বয় (১) ! তোমরা যজ্ঞের অন্ন কামনা কর।

২। হে বহুকর্মা, নেতা, ও বিক্রমশালী অশ্বিদ্বয়! অপ্রতিহত বুদ্ধির সঙ্গে আমাদের স্তুতি গ্রহণ কর।

৩। হে দস্রদ্বয়! হে নাসত্যদ্বয় (২) ! হে রুদ্রবর্ত্মন, অশ্বিদ্বয়! মিশ্রিত সোমরস অভিযুত হয়েছে, ছিন্ন কুশে স্থাপিত হয়েছে, তোমরা এস।

৪। হে বিচিত্র দীপ্তিবিশিষ্ট ইন্দ্র! আঙুল দিয়ে অভিষুত নিত্যশুদ্ধ এ (সোমরস) তোমাকে কামনা করছে, তুমি এস।

৫। হে ইন্দ্র! আমাদের ভক্তিদ্বারা আকৃষ্ট হয়ে, মেধাবীদের দ্বারা আহুত হয়ে অভিষবকারী ঋত্বিকের স্তোত্র গ্রহণ করতে এস।

৬। হে অশ্বযুক্ত ইন্দ্র! তরান্বিত হয়ে স্তোত্র গ্রহণ করতে এস; এ সোমাভিষবযুক্ত যজ্ঞে আমাদের অন্ন ধারণ কর।

৭। হে বিশ্বদেবগণ (৩) ! তোমরা রক্ষক, মনুষ্যগণের পালক, তোমরা হব্যদাতা যজমানের অভিষুত সোম গ্রহণ করতে এস; তোমরাই যজ্ঞের ফলদাতা।

৮। রেপ সূর্য রশ্মি দিনে আসে, বৃষ্টিদাতা বিশ্বদেবগণ ত্বরান্বিত হয়ে সেরুপ অভিযুত সোমরসে আগমন করুন।

৯। বিশ্বদেবগণ ক্ষয়রহিত ও সদা বর্তমান; তাঁরা অকল্যাণরহিত ও ধনবাহক; তাঁরা যেন এ যজ্ঞ সেবন করেন।

১০। পবিত্রা, অন্নযুক্তষজ্ঞবিশিষ্টা, ও যজ্ঞফলরূপধনদাত্রী সরস্বতী (৪) আমাদের অন্নবিশিষ্ট যজ্ঞ কামনা করুন।

১১। সুনৃত বাক্যের উৎপাদয়িত্রী, সুমতি লোকদের শিক্ষয়িত্রী সরস্বতী আমাদের যজ্ঞ গ্রহণ করেছেন।

১২। সরস্বতী প্রবাহিত হয়ে প্রভূত জল সৃজন করেছেন, এবং সকল জ্ঞান উদ্দীপন করেছেন।

টীকাঃ

১। প্রকৃতির কোন দৃশ্যকে অশ্বিদ্বয় নাম দিয়ে প্রাচীন হিন্দুগণ উপাসনা করতেন? যাস্ক নিরুক্ততে সে বিষয়ে লিখেছেন তৎ কৌ অশ্বিনৌ। দ্যাবা পৃথিব্যো ইতি একে, অহোরত্রৌ ইতি একে, সূর্যাচন্দ্রমসৌ ইতি একে। রাজনৌ পুণ্যকৃতৌ ইতি ঐতিহাসিকাঃ। যাস্কের নিজের মত যতদুর বুঝা যায বোধ হয় অর্ধরাত্রির পর ও প্রাত:কালের পূর্বে যে আলোক ও অন্ধকারে বিজড়িত থাকে তাই অশ্বিদ্বয়। ঊষার পূর্বে মিশ্রিত আলোক ও অন্ধকার যদি যমজদেব বলে উপাসিত হন তবে তাঁদের অশ্বী নাম দেওয়া হল কেন? এটি একটি বৈদিক উপম মাত্র। সূর্যের আলোক আকাশে ধাবমান হয়, উষার আলোক আকাশে ধাবমান হয়, সে জন্য সে আলোক বা রশ্মি সমূহকে ঋগ্বেদে সর্বদাই অশ্বি বলে বর্ণনা করা হয়েছে, এবং সূর্য ও ঊষাকে অশ্বযুক্ত বলে সম্বোধন করা হয়েছে। অশ্বিন শব্দেরও সেই অর্থ, অশ্বযুক্ত অর্থাৎ আলোকযুক্ত।

২। দস্রা। শত্রুণামুপক্ষয়িতারৌ যদ্বা দেববৈদ্যত্বেন রোগাণামুপক্ষয়িতারৌ । অশ্বিনৌ বৈ দেবানাং ভিষজৌ ইতি শ্রুতে:। সায়ণ। নাসত্যা। অসত্যমনৃতভাষণং। তদ্রহিতৌ। সায়ণ। দস্রা ও নাসতা এ দৃষ্টি শব্দ সর্বদাই অশ্বিদ্বয় সম্বন্ধে প্রয়োগ হয়।

৩। বিশ্বোদেবাস এতন্নামকা দেববিশেষা:। সায়ণ।

৪। সর: অর্থ জল, সরস্বতীর প্রথম অর্থ নদী এতে সন্দেহ নেই; আর্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে তাই প্রথমে সরস্বতী দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন। এক্ষণে গঙ্গা যেরূপ হিন্দুদের উপাস্যা দেবী, প্রথম হিন্দুদের পক্ষে সরস্বতী সেরূপ ছিলেন। অচিরে সরস্বতী বাপ্দেবীও হলেন। যাস্ক বলেছেন তত্র সরস্বতী ইতি এতস্য নদীবন্দোতাবচ্চ নিগমা ভবন্তি। মূল ঋগ্বেদেও সরস্বতীর উভয় প্রকার গুণ লক্ষিত হয়। পুরাকালে সরস্বতী নদীতীরে যজ্ঞ সম্পাদন হত এবং মন্ত্র উচ্চারিত হত, ক্রমে সে সরস্বতী নদী সে পবিত্র মন্ত্রের দেবী ও বাপ্দেবী বলে পরিণত হলেন।

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ১৫

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! এ বিশ্বদেবগণের সাথে সোমপানার্থে আমাদের পরিচর্যা ও স্তুতি গ্রহণ করতে এস, আমাদের যজ্ঞ সম্পাদন কর।

২। হে মেধাবী অগ্নি! কশ্বপুত্রেরা তোমাকে আহ্বান করছে, এবং তোমার কর্ম সমূহ প্রশংসা করছে; তুমি দেবগণের সাথে এস।

৩ ইন্দ্র ও বায়ু, বৃহস্পতি, মিত্র ও অগ্নি, পুষ্য ও ভগ এবং আদিত্য সমূহ ও মরুৎগণকে যজ্ঞভাগ দান কর (১)

৪। তোমাদের জন্য তৃপ্তিকর, হর্ষকর, বিন্দুরূপ, মধুর ও পাত্রস্থিত সোমরস সমূহ প্রস্তুত হচ্ছে।

৫। হে অগ্নি! হব্যযুক্ত এবং অলষ্কৃত কশ্বপুত্রেরা কুশ ছিন্ন করে তোমার রক্ষণ কামনায় তোমার স্তুতি করে।

৬। হে অগ্নি সস্কল্প মাত্রেই রথে সংযোজনীয়, যে ঘৃতপৃষ্ঠ বাহকগণ তোমাকে বহন করে, তা দিয়ে দেবগণকে সোমপানার্থে আন।

৭। হে অগ্নি! সে যজনীয় যজ্ঞবর্ধক দেবগণকে পত্নীযুক্ত কর। হে সুজিহব! দেবগণকে মধুর সোমরস পান করাও।

৮। যে দেবগণ যজনীয়, যে দেবগণ স্তুতিভাজন, হে অগ্নি! তাঁরা বষটকার কালে তোমার জিহ্বা দ্বারা মধুর সোমরস পান করুন।

৯। মেধাবী ও দেবগণের আহ্বানকারী অগ্নি ঊষাকালে জাগরিত সমস্ত দেবগণকে সূর্যদীপ্ত স্বর্গলোক হতে এ স্থানে নি:সন্দেহরূপে আনুন।

১০। হে অগ্নি! তুমি সমস্ত দেবগণের সাথে, ইন্দ্র ও বায়ুর সাথে ও মিত্রের তেজসমূহের সাথে সোমমধু পান কর।

১১। হে অগ্নি! তুমি মনুষ্য নিযুক্ত দেবগণের আহ্বানকারী যজ্ঞে উপবেশন কর; তুমি আমাদের যজ্ঞ সম্পাদন কর।

১২। হে দেব অগিন! অরুষী, হরিৎ ও রোহিত অশ্বী (২) দের রথে যোগ কর; তা দিয়ে দেবগণকে এ যজ্ঞে আন।

টীকাঃ

১। আদিত্যগণ অদিতির সন্তান। ঋগ্বেদে ২ মন্ডলের ২৭ সুক্তে কেবল ছ জন আদিত্য এরূপ লেখা এছ, যথা মিত্র, অর্যমা, ভগ, বরুণ, দক্ষ এবং অংশ। ৯ মন্ডলের ১১৪ সুক্তে ৭ জন আদিত্য এরূপ লেখা আছে, ১০ মন্ডলের ৭২ সুক্তে আছে যে, অদিতির আট পুত্র অতএব ঋগ্বেদ অনুসারে আদিত্যের সংখ্যা ছয় কিম্বা সাত, কিম্বা আট। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে আদিত্য আটজন এরূপ লিখিত আছে, যথা ধাতা, অর্যমা, মিত্র, বরুণ, অংশ, ভগ, ইন্দ্র, ও বিবস্বান। শতপথ ব্রাহ্মণে দ্বাদশ আদিত্যের কথা লেখা আছে, এবং সে দ্বাদশ আদিত্য দ্বাদশ মাস (অথবা দ্বাদশ মাসের সূর্য।) কতমে আদিত্যা ইতি। দ্বাদশ মাসাঃ সম্বৎসরস্য এতে আদিত্যাঃ। শতপথ ব্রাহ্মণ। ১১।৬।৩।৮। অদিতির অর্থ কি? দিত ধাতু বন্ধনে বা খন্ডনে বা ছেদনে। যা অখন্ড, অচ্ছিন্ন, অসীম, তাই অদিতি। অতএব অদিতি অর্থে অনন্ত আকাশ বা অনন্ত প্রকৃতি, সুতরাং অদিতি সকল দেবের জনয়িত্রী এবং যাস্ক তাকে আদিমা দেবমাতা বলেছেন। .

২। মুলে অরুষী হরিতঃ রোহিতঃ আছে। সায়ণ রোহিতঃ অগ্নির অশ্বের নাম করেছেন, এবং অরুষী অর্থে গতিশীল ও হরিতঃ অর্থে বহনসমর্থ করেছেন। মক্ষমুলর অরুষী অর্থে অগ্নির রক্তবর্ণ অশ্ব করেছেন এবং হরিতঃ ও রোহিত দুটি বিশেষণ করেছেন। অরুষ ও হরিৎ সম্বন্ধে ৬ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ১৬

অনুবাদঃ

১। হে অভীষ্টবর্ষী ইন্দ্র! তোমার অশ্বগণ তোমাকে সোমপানাথে এ স্থানে নিয়ে আসুক; সুর্যের ন্যায় প্রকাশযুক্ত বাহকগণ তোমাকে নিয়ে আসুক।

২। যেন হরি নামক অশ্বদ্বয় এ ঘৃতস্রাবী ধান্যের নিকট সুখতম রথে ইন্দ্রকে নিয়ে আসে।

৩। প্রাতঃকালে ইন্দ্রকে আহ্বান করি, যজ্ঞ সম্পাদনকালে ইন্দ্রকে আহ্বান করি এবং যজ্ঞ সমাপন সময়ে সোমপানার্থে আমি ইন্দ্রকে আহ্বান করি।

৪। হে ইন্দ্র! কেশবযুক্ত অশ্বগণের সাথে তুমি আমাদরে অভিযুত সোমরস সমীপে এস; সোমরস অভিযুত হলে আমরা তোমাকে আহ্বান করি।

৫। হে ইন্দ্র! তুম আমাদের এ স্তুতি গ্রহণ করতে এস, হযহেতু যজ্ঞসবন অভিষত হয়েছে, তুষিত গৌর মৃগের ন্যায় পান কর।

৬। এ তাল সোমরস সমূহ আস্তীর্ণ কুণের উপর প্রচুর পরিমাণে অভিষুত হয়েছে; হে ইন্দ্র! বলের জন্য সে সোম পান কর।

৭। হে ইন্দ্র! এই স্তুতি শ্রেষ্ঠ, এ তোমার দয়স্পর্শী ও সৃখকব হোক; পরে অভিষৃত সোম পান কর।

৮। বত্রহা ইন্দ্র সোমপানার্থে ও হর্ষরা মিত্ত সকল অভিষৃত সবনে গমন করেন।

৯। হে শতক্র! গাভী ও অশ্বসমূহ দ্বাশ তুমি আমাদের অভিলাষ সর্বতোভাবে পূরণ কর; আমরা ধ্যানযুক্ত হয়ে তোমার স্তুতি করি।

টীকাঃ

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ১৭

অনুবাদঃ

১। আমি সম্রাট ইন্দ্র ও বরুণের নিকট রক্ষণের জন্য যাচ্ঞা করি, এরূপে প্রার্থনা করলে তাঁরা উভয়ে আমাদরে সুখী করেন।

২। তোমরা সাদৃশ ঋত্বিকের রক্ষণার্থে আমার আহ্বান গ্রহণ কর; তোমরা মনুষ্যের অধিপতি।

৩। হে ইন্দ্র ও বরুণ। আমাদরে কামনা অনুসারে ধন দিয়ে আমাদরে তৃপ্ত কর; তোমরা সমীপে থাক এ ইচ্ছা করি।

৪। যেহেতু আমাদের যজ্ঞের হব্য মিশ্রিত হয়েছে এবং ঋত্বিকদের স্ত্রোত্রও মিশ্রিত, যেন আমরা যজ্ঞান্নদাতাদের মধ্যে মূখ্য হই।

৫। সহস্র ধনপ্রদদের মধ্যে ইন্দ্র ধনদাতা, স্তুতি ভাজনদের মধ্যে বরুণ স্তুত্য।

৬। তাঁদের রক্ষণদ্বারা আমরা ধন সম্ভোগ করি ও (ধন) সঞ্চয় করি এবং তদ্ব্যতীত প্রচুর ধন হোক।

৭। হে ইন্দ্র ও বরুণ! বিবিধ ধনের জন্য আমি তোমাদের আহ্বান করি, আমাদরে সম্যকরূপে জয়যুক্ত কর।

৮। হে ইন্দ্র ও বরুণ। আমাদরে বুদ্ধি তোমাদের সম্যক সেবা করতে ইচ্ছুক হয়েছে, আমাদরে শীঘ্র সুখ দান কর।

৯। হে ইন্দ্র ও বরুণ! যে স্তুতি দ্বারা আমি তোমাদের আহ্বান করছি। তোমাদের উভয়ের সম্বন্ধীয় যে স্তুতি তোমরা বর্ধন করেছ, যেন সে শোভনীয় স্তুতি তোমাদের প্রাপ্ত হয়।

টীকাঃ

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ১৮

অনুবাদঃ

১। হে ব্রহ্মণস্পতি (১)! সোমরসদাতাকে (অর্থাৎ আমাকে) উশিজ পুত্র কক্ষীবানের (২) ন্যায় দেবগণের নিকট প্রসিদ্ধ কর।

২। যিনি ধনবান, রোগ হস্তা, ধনদাতা, পুষ্টিবর্ধক ও শীঘ্রফলপ্রদ, সে ব্রহ্মণস্পতি আমাদরে অনুগ্রহ করুন।

৩। উপদ্রবকারী মানুষের হিংসাযুক্ত নিন্দা আমাদের যেন স্পর্শ না করে, হে ব্রহ্মণস্পতি! আমাদের রক্ষা কর।

৪। যে মনুষ্যকে ইন্দ্র ও ব্রহ্মণস্পতি ও সোম বর্ধন করেন সে বীর বিনাশ প্রাপ্ত হয় না।

৫। হে ব্রহ্মণস্পতি! তুমিও সোম ও ইন্দ্র ও দক্ষিণা (৩) সে মানুষকে পাপ হতে রক্ষা কর।

৬। বিস্ময়কর, ইন্দ্রপ্রিয় কমনীয় ও ধনদাতা সদসস্পতির নিকট মেধাশক্তি যাচ্ঞা করছি।

৭। যার প্রসাদ ব্যতীত জ্ঞানবানেরও যজ্ঞ সিদ্ধ হয় না, সে সদসস্পতি আমাদের মানসিক প্রবৃত্তি সমূহের যোগ ব্যাপে আছেন।

৮। পরে তিনি হব্য সম্পাদক যজমানকে বর্ধন করেন, যজ্ঞ সম্যকরূপে সমাপন করেন, (তার প্রসাদে) আমাদরে স্তুতি দেবগণকে প্রাপ্ত হয়।

৯। বিক্রমশালী সুবিখ্যাত ও আকাশের ন্যায় প্রাপ্ততেজা নরাশংসকে (৪) আমি দেখেছি।

টীকাঃ

১। ১০ সুক্তের ১ ঋকের টীকায় ও ১৫ সুক্তের ৫ ঋকের টীকায় আমরা বলেছি ব্রহ্মা অর্থে স্তুতিকারী ঋত্বিক। ঋগ্বেদে ব্রহ্ম অর্থে স্তুতি বা প্রার্থনা। সায়ণ এ অর্থ করেছেন এবং ইউরোপীয় পণ্ডিতগণও ঐ অর্থ করেন। পণ্ডিতবর রোথ ব্রহ্ম শব্দের সাতটি অর্থ করেছেন, যথা প্রার্থনা, মন্ত্র, পবিত্রবাক্য, জ্ঞান, সততা, পরমাত্মা, এবং পুরোহিত। মক্ষমুলর বিবেচনা করেন বৃহ ধাতুর একটি অর্থ বর্ধন, আর একটি অর্থ বাক্য এবং ঐ ধাতু হতে বৃহস্পতি ও ব্রহ্মণস্পতি উৎপন্ন হয়েছে। Origin and Growth of Religion (1882)PP, 366, 367 note. ব্রক্ষণস্পতি বা বৃহস্পতি স্তুতিদেব।

২। মহাভারতে, মৎস্য পুরাণে ও বায়ুপুরাণে কক্ষীবানের গল্প আছে। ঋগ্বেদে কক্ষীবান একজন ঋষি, এ মন্ডলের ১১৫ হতে ১২৫ সুক্ত তাঁর রচিত। কলিঙ্গরাজ সন্তান আকাঙ্ক্ষায় তার রাণীকে দীর্ঘ তমা মুনির সঙ্গে সহবাসের আদেশ দিয়েছিলেন। রাণী স্বয়ং না গিয়ে দাসী উশিজকে পাঠিযে দিলেন। মুনি তা বুঝতে পারলেন, এবং উশিজের দ্বারা কক্ষীবান নামক সন্তান উৎপাদন করলেন। এ গল্পটি আধুনিক। প্রকৃত কক্ষীবান একজন বৈদিক ঋষি। এ ঋগ্বেদের প্রথম মন্ডলের ১৫৫ হতে ১২৫ সুক্তের ঋষি কক্ষীবান।

৩। যজ্ঞান্তে দানই দক্ষিণা, এখানে দেবী বলে আহুত হয়েছেন।

৪। অগ্নির নাম বিশেষ।

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ১৯

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! এই চারু যজ্ঞে সোমপানার্থে (১) তুমি আহুত হচ্ছ, অতএব মরুৎগণের সাথে এস।

২। হে অগ্নি! তুমি মহৎ তোমার যজ্ঞ উল্লঙ্ঘন করতে পারে এরূপ উৎকৃষ্টতর দেব বা মানুষ নেই, মরুৎগণের সাথে এস।

৩। হে অগ্নি! যে দ্যুতিমান ও হিংসারহিত মরুৎগণ মহাবৃষ্টি বর্ষণ করতে জানেন, সে মরুৎগণের সাথে এস।

৪। যে উগ্র ও অধৃষ্টবলসম্পন্ন মরুৎগণ জল বর্ষণ করেছিলেন (২) হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৫। যারা শোভমান উগ্ররূপধারী, প্রভূতবলসম্পন্ন ও শত্রুবিনাশক, হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৬। আকাশের উপরি দাপ্যমান, স্বর্গে যে দীপামান মরুতেরা বাস করেন, হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৭। যারা মেঘ সমূহকে সঞ্চালন করেন, জলরাশি সমুদ্রকে উৎক্ষিপ্ত করেন, হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৮। যারা সূর্যকিরণের সাথে (সমগ্র আকাশ) ব্যাপ্ত হন যারা বলদ্বারা সমদ্রকে উৎক্ষিপ্ত করেন, হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৯। হে অগ্নি! তোমার প্রথম পানার্থে সোম মধু প্রদান করছি, হে অগ্নি! মরুৎগণের সাথে এস।

টীকাঃ

১। মুলে গোপীথায় আছে। সোমপানায়। সায়ণ। কিন্তু মক্ষমুলয় অনুবাদ করেছেন For a draught of milk

২। মুলে অর্কং আনৃচুঃ আছে। বর্ষণেন সম্পাদিতবহঃ সায়ণ। কিন্তু মক্ষমুলর অনুবাদ করেছেন Who sing their song.

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২০

অনুবাদঃ

১। যে ঋভুগণ (১) জন্মগ্রহণ করেছিলেন যে দেবগণের উদ্দেশে মেধাবী ঋত্বিকগণ এ প্রভূত ধনপ্রদ স্তোত্র নিজ মুখে রচনা করেছেন।

২। আজ্ঞামাত্র যে হরি নামক অশ্বদ্বয় রথে সংযোজিত হয়, সে অশ্বদ্বয় ইন্দ্রের জন্য যারা মানসিক বলে সৃষ্টি করেছিলেন, সে ঋভুগণ গ্রহ চমসাদি উপকরণ দ্রব্যের সাথে আমাদরে যজ্ঞ ব্যেপে আছেন।

৩। তারা নাস্যত্যদ্বয়ের জন্য সর্বতোগামী ও সুখকর একখানি রথ নির্মাণ করেছিলেন এবং একটি ক্ষীরদোগ্ধ্রী গাভী উৎপন্ন করেছিলেন।

৪। ঋজুতাপ্রিয় ও সর্বকর্মে ব্যাপ্ত ঋভুগণের মন্ত্র বিফল হয় না; তারা পিতা মাতাকে পুনরায় যেৌবনসম্পন্ন করেছিলেন।

৫। হে ঋভুগণ! মরুৎগণ সমভিব্যাহারে ইন্দ্রের সাথে ও দীপ্যমান আদিতাদের সাথে তোমাদের একত্রে হর্ষদায়ক সোমরস প্রদান করা যায়।

৬। ত্বষ্টাদেবের নতুন সে চমস নি:শেষিত রূপে নির্মিত হয়েছিল, ঋভুগণ সে চমস পুনরায় চারখানি করেছিলেন।

৭। হে ঋভুগণ তোমরা আমাদরে শোভনীয় স্তুতি প্রাপ্ত হয়ে অভিষবকারীকে তিন গৃণ সপ্ত প্রকার রত্ন এক এক করে প্রদান কর।

৮। যজ্ঞের বাহক ঋভুগণ অবিনশ্বর আয়ুঃ ধারণ করেন; সুকৃতি দ্বারা দেবগণের মধ্যে যজ্ঞের ভাগ সেবন করেন।

টীকাঃ

১। ঋভবো হি মনুষ্যাঃ সন্তস্তপসা দেবত্বং প্রাপ্তাঃ। সায়ণ। অঙ্গিরার পুত্র সুধম্বা, তার ঋভু, বিভু ও বাজ নামে তিন পুত্র ছিল। তারা নিজ কর্মদ্বারা দেবত্ব লাভ করেছিলেন এবং সূর্যলোকে বাস করেন এরূপ আখ্যান। ১১০ সুক্তের ২ ও ৩ ঋক দেখুন।
প্রকৃত ঋভুগণকে? সায়ণ, ১১০ সুক্তের ৬ ঋকের ব্যাখ্যায় একটি বচন উদ্ধৃত করেছেন, যথা আদিত্যরশ্ময়োহপি ঋভব উচ্যন্তে। অর্থাৎ ঋভুগণ সূর্যরশ্মি।

গ্রীকদের মধ্যে গল্প আছে যে Orpheus নামক এক গায়কের স্ত্রীর কাল হলে তিনি তার গীত দ্বারা মৃত্যুরাজকে তুষ্ট করে স্ত্রীকে ফিরে পেলেন, কিন্তু পথে তিনি ঔৎসুক্যের সাথে স্ত্রীর দিকে চাইতে তার স্ত্রী পুনরায় অদৃশ্য হলেন। মক্ষমুলর বলেন Orpheus ঋভু বা অর্ভুর রূপান্তর মাত্র, এবং গল্পের মুল অর্থ এই যে সূর্য ঊষার দিকে চাইলেই অর্থাৎ উদয় হলেই ঊষা অদৃশ্য হয়ে যান। তিনি আরও বলেন ঊর্বষী ও পুরুরবার যে গল্প বেদে ও হিন্দু সাহিত্যে পাোয়া যায়, তারও এই মুল অর্থ ঊর্বষীর আদি অর্থ ঊষা।

২। ত্বষ্টা দেবগণের অস্ত্রাদি নির্মাতা, বিশ্বকর্মা। তিনি ইন্দ্রের বজ্য নির্মাণ করেন। ৩২ সুক্ত দেখুন। ঋভুগণ ত্বষ্টায় শিষ্য। সায়ণ।

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২১

অনুবাদঃ

১। এ যজ্ঞে ইন্দ্র ও অপ্নিকে আহ্বান করছি, তাদের স্তোত্র কামনা করি, সে বহু, সোমপায়ীদ্বয় সোমপান করুন।

২। হে মনুষ্যগণ! সে ইন্দ্র ও অপ্নিকে এ যজ্ঞে প্রশংসা কর ও শোভিত কর। গায়ত্রীচ্ছন্দের মস্ত্রে তাদের উদ্দেশে গান কর।

৩। অনুষ্ঠাতার প্রশংসার জন্য আমরা ইন্দ্র ও অপ্নিকে আহ্বান করি, সে সোমপায়ীদ্বয়কে সোমপানার্থে আহ্বান করি।

৪। উগ্রদেবদ্বয়কে এ অভিষবযুক্ত যজ্ঞের সমীপে আহ্বান করি, ইন্দ্র ও অপিন এ যজ্ঞে আগমন করুন।

৫। সে মহৎ ও সভ্যপালক ইন্দ্র ও অপিন রাক্ষসজাতিকে ক্ররুতাশূন্য করুন, ভক্ষক রাক্ষসগণ সন্ততিশূন্য হোক।

৬। হে ইন্দ্র ও অপিন! এ যজ্ঞহেতু তোমরাচৈতন্যালোকে জাগরিত হও; আমাদরে সুখদান কর।

টীকাঃ

দ্বিতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২২

অনুবাদঃ

১। প্রাত:কালে সংযুক্ত অশ্বিদ্বয়কে জাগরিত কর, তারা সোমপানার্থে এ যজ্ঞে আসুন।

২। যে দেব অশ্বিদ্বয় শোভনীয় রথযুক্ত, রথিশ্রেষ্ঠ ও স্বর্গবাসী, তাঁদের আহ্বান করি।

৩। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের যে অশ্বস্বেদযুক্ত ও সুধনিযুক্ত চাবুক আছে তার সাথে এসে এ যজ্ঞ সোমরসে সিক্ত কর।

৪। হে অশ্বিদ্বয়! সোমদাতা যজমানের যে গৃহের দিকে রথে গমন করছ, সে গৃহ দূরে নহে।

৫। হিরণ্যপাণি সবিতাকে (১) আমি রক্ষণার্থে আহ্বান করি, সে দেব যজম দেব প্রাপ্য পদ জানিয়ে দেবেন।

৬। জলশোষক সবিতাকে রক্ষণার্থে স্তুতি কর; আমরা তাঁর যজ্ঞ কামনা করি।

৭। নিবাসহেতুভূত, বহুবিধ ধনের বিভক্তা ও মনুষদের প্রকাশকারী সবিতাকে আমরা আহ্বান করি।

৮। হে সখাগণ! চারদিকে উপবেশন কর, সবিতাকে আমাদরে শীঘ্র স্তুতি করতে হবে, ধনদাতা সবিতা শোভা পাচ্ছেন।

৯। হে অপিন! দেবগণের আকাঙ্ক্ষিণী পত্নীদের এ যজ্ঞে আন। ত্বষ্টাকে সোমপানার্থে সমীপে আন।

১০। হে অপ্নি! আমাদরে রক্ষার্থে দেবপত্নীদের এ যজ্ঞে আন। হে যবিষ্ঠ! হোত্রা, ভারতী ও বরণীয়া ধিষণাকে (২) আন।

১১। অচ্ছিন্নপক্ষা (৩) মনুষ্যপালয়িত্রী দেবীগণ রক্ষণ ও মহৎ সুখদান দ্বারা আমাদরে প্রতি প্রসন্না হোন।

১২। আমাদরে মঙ্গলের নিমিত্ত সোমপানার্থে ইন্দ্রাণী, বরণানী ও অপ্নায়ীকে আহ্বান করি।

১৩। মহৎ দৌ ও পৃথিবী (৪) আমাদরে এ যজ্ঞ রসে সিক্ত করুন এবং পুষ্টি দ্বারা আমাদের পুর্ণ করুন।

১৪। মেধাবীরা নিজ কর্মগুণে সে দৌ ও পৃথিবীর মধ্যে গন্ধর্বের নিবাস স্থানে অর্থাৎ অন্তরীক্ষে ঘৃতবৎ জল লেহনকরেন।

১৫। হে পৃথিবী! বিস্তীর্ণ, কন্টকরহিতা ও নিবাসভূতা হও; আমাদরে প্রচুর সুখ দাও।

১৬। বিষ্ণু (৫) সপ্তকিরণের সাথে যে ভুপ্রদেশ হতে পরিক্রমা করেছিলেন, সে প্রদেশ হতে দেবগণ আমাদরে রক্ষা করুন।

১৭। বিষ্ণু এ জগৎ পরিক্রমা করেছিলেন, তিন প্রকার পদবিক্ষেপ করেছিলেন, তাঁর ধুলিযুক্ত পদে জগৎ আবৃত হয়েছিল।

১৮। বিষ্ণু রক্ষত, তাকে কেহ আঘাত করতে পারে না, তিনি ধর্ম সমুদয় ধারণ করে তিন পদ পরিক্রমা করেছিলেন।

১৯। বিস্ণুর যে কর্মবলে যজমান ব্রত সমুদয় অনুষ্ঠান করেন, সে কর্ম সকল অবলোকন কর। বিষ্ণু ইন্দ্রের উপযুক্ত সখ্যা।

২০। আকাশে সর্বতো বিচারী যে চক্ষু যেরূপ দৃষ্টি করে, বিদ্বানেরা বিষ্ণুর পরমপদ সেরুপ দৃষ্টি করেন।

২১। স্তুতিবাদক ও সদাজাগরুক মেধাবী লোকেরা যে বিষ্ণুয় পরমপদ প্রদীপ্ত করেন।

টীকাঃ

১। সূর্য আদিম আর্যদের উপাস্য দেব ছিলেন, সুতরাং সেই আর্য জাতির ভিন্ন ভিন্ন শাখায় তার উপাসনা দেখতে পাওয়া যায়। গ্রীকদের Helios শব্দ সূর্য শব্দের রূপান্তর মাত্র, এবং গ্রীকদের যে Helenes বলত তার আদি অর্থ সূর্য বংশীয়। লাটিনদের Sol ও টিউটনদের Tyr ও সূর্য শব্দের রূপান্তর মাত্র। প্রাচীন ইরাণীয়দের খোর সেদ ও সূর্যের রূপান্তর মাত্র। উপরি উক্ত ঋকে সবিতা বা সূর্যকে হিরণ্যপাণি বলে বর্ণনা করেছে। সায়ণ তার এরূপ অর্থ করেছেনঃ যজমানায় দাতুং হস্তে সুবর্ণধারিণং। আবার সূর্যের বাহুই সুবর্ণগঠিত এরূপ আখ্যান আছে। এ আখ্যানের প্রকৃত কারণ অনুভব করা সহজ। স্বর্ণের ন্যায় কিরণসম্পন্ন সূর্যকে প্রথম কবিগণ উপমাচ্ছলে সুবর্ণপাণি বলত, ক্রমে লোকে এ উপমাটি ভুলে গেল, এবং সুন্দর কল্পনাগঠিত বিশেষণ হতে একটি আখ্যান সৃষ্ট হল! কেবল আমরাই যে মুল উপমা ভুলে একটি আখ্যান সৃষ্টি করেছি তা নয়, জার্মান জাতিদের মধ্যেও সেরূপ ঘটেছিল। তবে আমাদের পুরোহিতরা যজ্ঞে সূর্যের হস্ত বিনাশের গল্পসৃষ্টি করলেন, মৃগয়াপ্রিয় জার্মানগণ কল্পনা করলেন যে তাদের Tyr দেব ব্যাঘ্রের মুখে হস্ত স্থাপন করায় ব্যাস সে হস্ত দংশন করে ফেলে। See Max Muller’s Science of Language. সূর্য ও সবিতা সম্বন্ধে আমাদরে আর একটি কথা বলবার আছে। যাস্ক বলেন আকাশ হতে যখন অন্ধকার যায়, কিরণ বিস্তুত হয়, সেই সবিতার কাল। সায়ণ বলেন সূর্যের উদয়ের পূর্বে যে মুর্তি তাই সবিতা, উদয় হতে অস্ত পর্যন্ত যে মুর্তি সেই সূর্য।
২। হোত্রাং হোমনিষ্পাদকাগ্নিপত্নীং। সায়ণ। ভারতীং ভরতনামকস্য আদিত্যস্য পত্নীং। সায়ণ। বরুত্রীং বরণীয়াং ধিষণং বাপ্দেবীং। সায়ণ।

৩। নহি পক্ষিরপাণাং দেবপত্নীনাং পক্ষাঃ কেনচিং ছিন্দ্যন্তে। সায়ণ।

৪। মুলে দ্যৌঃ পৃথিবী চ আছে। দ্যৌঃ আর্যদের প্রাচীন আকাশ দেব। গ্রীকদের , লাটিনদের কার পদবিক্ষেপ কি? যাস্ক বলেন, যদিদং কিঞ্চ তদ্বিক্রমতে কবষ্ণুঃ। ত্রিধা নিধত্তে পদং। ত্রেধাভাবায় পৃথিব্যাং অন্তরীক্ষে দিবি ইতি শাকপুণিঃ। সমারোহণে বিষ্ণুপদে গয়শিরসি ইতি ঔর্ণবাভঃ। নিরুক্ত ১২।১৯টীকাকার দূর্গাচার্য বলেন, বিষ্ণুরাদিত্যঃ। কথামিতি যত আহত্রেধা নিদধে পদং নিধত্তে পদং নিধানং পদৈঃ। তৎ তাবৎ। পৃথিব্যাং অন্তরীক্ষে দিবি ইতি শাকপুণিঃ। পার্থিবোহগ্নির্ভূত্বা পৃথিব্যাং যৎকিঞ্চিদস্তি তদ্বিক্রমতে তদধিতিষ্ঠিতি। অন্তরীক্ষে বৈদ্যুতাত্মনা। দিবি সূর্যাত্মনা। যদুক্তং তমুঅক্সিম্বন ত্রেধা ভুবে কমিতি। সমারোহণে উদয়গরৌ ইতি ঔর্ণবাভ আচার্য্যো মন্যতে। অতএব স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, সূর্যের উদয়গিরিতে আরোহণ, মধ্য আকাশে স্থিতি এবং অস্তাচলে অন্তগমন, এ তিনটি বিষ্ণুর পদ বিক্ষেপ বলে বণিত হয়েছে। এ উপমা হতে পরে পরে কত পৌরাণিক গল্পের সৃষ্টি হয়েছে।

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২৩

অনুবাদঃ

১। হে বায়ু! এ তীব্র ও সুপাক বিশিষ্ট সোমরস সমূহ অভিষুত হয়েছে, তুমি এস; সে সোমরস আনীত হয়ছে, পান কর।

২। আকাশবাসী ইন্দ্র ও বায়ু উভয় দেবকে এ সোমপানার্থে আমি আহ্বান করি।

৩। যজ্ঞপালক ইন্দ্র ও বায়ু মনের ন্যায় বেগসম্পন্ন ও সহস্রাক্ষ (১) মেধাবী লোকে রক্ষণার্থে তাদের আহ্বান করেন।

৪। মিত্র ও বরুণ শুদ্ধবল ও যজ্ঞদেশে প্রাদুর্ভূত হন, আমরা তাদের সোমপানার্থে আহ্বান করি।

৫। যে মিত্র ও বরুণ সত্য দ্বারা যজ্ঞ বৃষদ্ধ করেন ও যজ্ঞের জ্যোতি পালন করেন, তাদের আমি আহ্বান করি।

৬। বরুণ ও মিত্র সকল প্রকার রক্ষণ কার্যদ্বারা আমাদের রক্ষা করুন, তারা আমাদরে প্রভূত ধনযুক্ত করুন।

৭। মরুদগণের সাথে ইন্দ্রকে সোমপানার্থে আহ্বান করি, তিনি মরুৎগণের সাথে তৃপ্ত হোন।

৮। হে দেব মরুৎগণ! ইন্দ্র তোমাদের মুখ্য, পুষা (২) তোমাদের দাতা, আমার আহগ্বান সকলে শ্রবণ কর।

৯। হে দানশীল। মরুৎগণ। বলবান ও তোমাদের সহায়ভূত ইন্দ্রের সাথে শত্রুকে বিনাশ কর, যেন সে দুমুখ আমাদের উপর আধিপত্য না পায়।

১০। সমস্ত মরুৎ দেবগণকে সোমপানার্থে আহ্বান করি, তাঁরা উগ্র ও পৃষ্নির (৩) সন্তান।

১১। হে নেতৃগণ? যখন তোমরা শোভনীয় (যজ্ঞকার্য) প্রাপ্ত হও, তখন বিজয়ীদের নাদের ন্যায় মরুৎগণের সদর্প রব আসে।

১২। দীপ্তিকর বিদ্যুৎ হতে উৎপন্ন মরুৎগণ আমাদের রক্ষা করুন ও সুখী করুন।

১৩। হে দীপ্তিযুক্ত শীঘ্রগামী পুষা! পশু হারিয়ে গেলে লোকে যেরূপ তাকে (অন্বেষণ করে) আনে, তুমি সেরূপ আকাশ হতে বিচিত্র কুশসংযুক্ত যজ্ঞ ধারক সোম আন।

১৪। দীপ্তিযুক্ত পূষা গুহাস্থিত ও লুক্কায়িত বিচিত্র কুশসংযুক্ত দীপ্যমান সোম পেলেন।

১৫। এবং সে পূষা আমার জন্য সোমের সাথে ছয়্ঋতু ক্রমান্বয়ে বার বার এনেছিলেন, কৃষক যেরূপ গরু দ্বারা বার বার যব চাষ করে।

১৬।আমরা যজ্ঞ কামনা করি, আমাদরে মাতৃস্থানীয় জল যজ্ঞ পথ দিয়ে যাচ্ছে; সে জল আমাদের হিতকারী বন্ধু এবং দুগ্ধকে মিষ্ট করছে।

১৭। এই যে সমস্ত জল সূর্যের সমীপে আছে, অথবা সূর্য যে সমস্ত জলের সাথে আছেন, সে সমস্ত জল আমাদরে যজ্ঞ প্রীতিকর করুক।

১৮। যে জল আমাদের গাভী সকল পান করে, সে জলদেবীকে আহ্বান করি। যে জল নদীরূপে বয়ে যাচ্ছে, তাদের হব্য দেওয়া কর্তব্য।

১৯। জলের ভিতর অমৃত আছে, জলে ঔষধ আছে, হে ঋষিগণ! সে জলের প্রশংসায় উৎসাহী হও।

২০। সোম আমাকে বলেছেন জলের মধ্যে সকল ঔষধি আছে এবং জগতের সুখকর অগ্নি আছে, এবং সকল প্রকার ভেষজ আছে।

২১। হে জল! আমার শরীরের জন্য রোগ নিবারক ঔষধি পরিপুষ্ট কর, যেন আমরা বহুকাল সূর্যকে দেখতে পাই।

২২। আমাতে যা কিছু দুষ্কৃত আছে, আমি যে কিছু অন্যায়াচরণ করেছি, আমি যে শাপ দিয়েছি, আমি যে অসত্য বলেছি, হে জল! সে সমস্ত ধৌত কর।

২৩। অদ্য স্মান হেতু জলে প্রবেশ করছি, জলরসে সঙ্গত হয়েছি; হে জলস্থিত অগ্নি! এস, আমাকে তেজ:পূর্ণ কর।

২৪। হে অগ্নি! আমাকে তেজ ও সন্ততি ও পরমায়ু দান কর; যেন দেবগণ আমার (অনুষ্ঠান) জানতে পারেন, যেন ইন্দ্র ও ঋষিগণ জানতে পারেন।

টীকাঃ

১। যদিও উভয় বিশেষণই উভয় দেব সম্বন্ধে প্রয়োগ হয়েছে, তথাপি মনের ন্যায় বেগসম্পন্ন বায়ুর সম্বন্ধে ও সহস্রাক্ষ ইন্দ্রের সম্বন্ধে খাটে। ইন্দ্রকে সহস্রাক্ষ বলে কেন? আকাশ বিস্তীর্ণ, অথবা বহুনক্ষত্র বিভূষিত, এ জন্য তাঁকে সহস্রাক্ষ বলা হয়েছে। এ উপমা হতে ইন্দ্রের সহস্রাক্ষ সম্বন্ধীয় পৌরাণিক আখ্যান সৃষ্ট হয়।

২। পুষা সম্বন্ধে ৪২ সূক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

৩। পৃশ্মি অর্থ নানা বর্ণযুক্ত। নানা বর্ণযুক্তা মরুৎগণের মাতা কে? সায়ণের মতে পৃশ্মি অর্থ পৃথিবী। কিন্তু নিঘন্টু নামক প্রাচীন সংস্কৃত অভিধানে পৃশ্মি অর্থে আকাশ। রোথ প্রভৃতি ইউরোপীয় পন্ডিতগণ পৃশ্মি অর্থে শমঘ করেছেন।

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২৪

অনুবাদঃ

১। দেবগণের মধ্যে কোন শ্রেণীর কোন দেবের চারু নাম উচ্চারণ করব? কে আমাকে এ মহতী পৃথিবীতে আবার ছেড়ে দেবেন? (১) যে আমি পিতা ও মাতাকে দর্শন করতে পারি?

২। দেবগণের মধ্যে প্রথম অগ্নিদেবের চারুনাম উচ্চারণ করি; তিনি আমাকে এ মহতী পৃথিবীতে ছেড়ে দিন, যেন আমি পিতাকে ও মাতাকে দর্শন করতে পারি।

৩। হে সদা রক্ষণশীল সবিতা! তুমি বরণীয় ধনের ঈশ্বর, তোমার নিকট সম্ভোগযোগ্য ধন যাচ্ঞা করি।

৪। যে প্রশংসিত, অনিন্দিত, দ্বেষরহিত, ও সম্ভোগযোগ্য ধন তুমি হস্তদ্বয়ের ধারণ করে আছ।

৫। হে সবিতা! তুমি ধনযুক্ত, তোমার বরণে দ্বারা ধনের উৎকর্ষ লাভ করতে ব্যাপৃত থাকি।

৬। হে বরুণ! এ উড্ডীয়মান পক্ষিগণ তোমার ন্যায় বল, তোমার ন্যায় পরাক্রম, তোমার ন্যায় ক্রোধ প্রাপ্ত হয়নি; এ অনিমিষ-বিচারী জল ও বায়ুর গতি তোমার বেগ অতিক্রম করে না।

৭। বিশুদ্ধবল রাজা বরুণ মুলরহিত অন্তরীক্ষ থেকে বর্ণনীয় তেজ:পূঞ্জ ঊর্ধে ধারণ করেন; সে রশ্মিপূঞ্জ অধোমুখ, কিন্তু তাদের মুল ঊর্ধ্বে তদ্বারা যেন আমাদের মধ্যে প্রাণ নিহিত থাকে।

৮। রাজা বরুণ সূর্যের ক্রমান্বয়ে গমনার্থে পথ বিস্তীর্ণ করেছেন; পদরহিত অন্তরীক্ষে সুর্যের পদবিক্ষেপের জন্য পথ করেছেন; তিনি আমার হৃদয়বিদ্ধকারী শত্রুকে তিরস্কার করুন।

৯। হে বরুণরাজ! তোমার শত ও সহস্র ঔষধি আছে, তোমার সুমতি বিস্তীর্ণ ও গভীর হোক; নিঋরইতকে (২) পরাম্মুখ করে রাখ, আমাদের কৃত পাপ হতে আমাদের মুক্ত কর।

১০। ঐ যে সপ্তর্ষি নক্ষত্র (৩) যা উচ্চে স্থাপিত আছে এবং রাতে দৃষ্ট হয়, দিনে কোথায় চলে যায়? বরুণের সর্মসমূহ অপ্রতিহত, তাঁর আজ্ঞায় রাত্রে চন্দ্র দীপামান হয়।

১১। আমি স্ত্রোত্র দ্বারা স্তব করে তোমার নিকট সে পরমায়ু যাচ্ঞা করি, যজমান হব্যদ্বারা তাই প্রার্থনা করে। হে বরুণ! তুমি এ বিষয়ে অনাদর না করে মনোযোগ কর, তুমি বহুলোকের স্তুতিভাজন, আমার আয়ু নিও না।

১২। রাতে ও দিনে লোকে আমাকে এই বলেছে, আমার হৃদয়স্থ জ্ঞানও এরূপ প্রকাশ করছে, আবদ্ধ হয়ে শুন:শেপ যে বরুণকে আহ্বান করছে, সে রাজা আমাদের মুক্তি দান করুন।

১৩। শুন:শেপ ধৃত হয়ে ও তিন পদ কাষ্ঠে বন্ধ হয়ে অদিতির পুত্র বরুণকে আহ্বান করেছিল; অতএব বিদ্বান ও অহিংসিত বরুণ তাকে মুক্তি দিন, তার বন্ধন মোচনকরে দিন।

১৪। বরুণ নমস্কার করে তোমার ক্রোধ অপনয়ন করি, যজ্ঞের হব্যদান করে তোমার ক্রাধ অপনয়ন করি। হে অসুব (৪)! হে প্রচেত:! হে রাজন! আমাদের কৃত পাপ শিথিল কর।

১৫। হে বরুণ! আমার উপরের পাশ উপর দিয়ে খুলে দাও, আমার নীচের পাশ নীচে দিয়ে খুলে দাও, মধ্যের পাশ খুলে শিথিল করে দাও। তৎপরে হে অদিতিপুত্র! আমরা তোমার রত খন্ডন না করে পাপরহিত হয়ে থাকব।

টীকাঃ

১। শুন:শেপকে বলি দেবার কথা ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, রামায়ণ ও পুরাণাদি অনেক গ্রন্থে পাওয়া যায়। কিন্তু ঋগ্বেদে শুন:শেপকে বলি দেবে এরূপ কথা কি স্পষ্ট করে লেখা আছে? নরবলি প্রথা কি প্রচলিত ছিল? ঋগ্বেদের অন্য কোনও স্থানে নরবলির স্পষ্ট উল্লেখ নেই, শুন:শেপের এ চতুবিংশ সুক্তেও তাকেঁ বলি দেবার স্পষ্ট কোন কথা নেই। অতএব পন্ডিতবর রোসেন বিবেচনা করেন নরবলি ছিল না। পন্ডিতাগ্রহন্যরাজেন্দ্রলাল মিত্র বিবেচনাকরেন নরবলি প্রথা প্রচলিত ছিল। ঋগ্বেদের সময় নরবলি প্রথা ছিল আমাদের বোধ হয় না, কেন না যে গ্রন্থে সোম অভিষবের ও ঘৃত অভিষবের কথা শত বার বলা হয়েছে, নরবলি প্রথা সে সময়ে প্রচলিত থাকলে সে গ্রন্থে তার বিশেষ উল্লেখ নেই কেন?

২। মুলে নিঋতিং াছে। অস্মদনিষ্টকারিণীং নিঋতিং পাপদেবতাং। সায়ণ। ঋত অর্থ নিয়ম বা সত্য বা যজ্ঞ। নিঋরইত অর্থে অনিয়ম বা অসত্য বা পাপ। তা হতে পাপ দেবীর নাম নিঋরইত হল।

৩। ঋক্ষাঃ মূলে আছে। ঋক্ষাঃ সপ্ত ঋষয়ঃ! যদ্বা ঋক্ষাঃ সর্বেহপি নক্ষত্র বিশেষাঃ সায়ণ। সপ্তর্ষি নক্ষত্রকে ঋক (ভল্লুক) এবং ইউরোপীয় ভাষায় বলে কেন? এর একটি অতি রহস্যজনক কারণ আছে। ঋচ বা অর্চ ধাতুর অর্থ উজ্জ্বল হওয়া বা অর্চন করা। উজ্জ্বল হওয়া অর্থে এ ধাতু হতে উজ্জ্বল লোমধারী ভাল্লুকের নাম ঋক্ষ হয়। কালক্রমে লোকে ঋক শব্দের নক্ষত্র অর্থটি ভুলে গেল, এবং যে সপ্তর্ষি নক্ষত্রকে কক্ষ বলত, তার অর্থ ভল্লুক নক্ষত্র করল। ৪। অস ধাতু অর্থ ক্ষেপণ, অতএব, সায়ণ অসুর অর্থ অনিষ্ট ক্ষেপণশীল করেছেন। কিন্তু বরুণকে অসুর বলবার এ অপেক্ষা গুঢ় কারণ আছে। আদিম আর্যগণ উপাস্যদেবকে অসুর বা দেব বলতেন। পরে সে আর্যদের মধ্যে একটি বিবাদ ও বিচ্ছেদ হয়ে দুটি দল হল এবং এক দলের রোক অন্য দলের উপাস্যদের নিন্দা করতে লাগল। সে দুই দলের এক দল ভারতবর্ষে এলেন, তাঁরা প্রাচীন হিন্দুর অন্য দলে প্রাচীন ইরানীয়। ইরানীয়গণ উপাস্যদেব সাধারণ নাম অসুর দিলেন এবং হিন্দুদের উপাস্য দেবগণকে নিন্দা করতে লাগলেন। এবং হিন্দুগণ উপাস্যদের নাম দেব দিলেন এবং ইরানীয়দের উপাস্য অসুরদের নিন্দা করতে লাগলেন।

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২৫

অনুবাদঃ

১। যেমন লোকে ভ্রম করে, সেরুপ আমরাও দিনে দিনে তোমার রত সাধনে ভ্রম করে থাকি।

২। হে বরুণ! অনাদর করে হননকারী হয়ে তুমি আমাদরে বধ কর না, ক্রুদ্ধ হয়ে আমাদের উপর ক্রোধ প্রকাশ কর না।

৩। হে বরুণ! রথস্বামী যেরূপ শ্রান্ত অশ্বকে (পরিতৃপ্ত করে), আমরা সুখের জন্য সেরূপ স্তুতিদ্বারা তোমার মন প্রসন্ন করি।

৪। পক্ষিগণ যেরূপ নিবাস স্থানের দিকে ধাবমান হয়, আমার ক্রোধরহিত চিন্তা সমূহ সেরূপ ধন প্রাপ্তির জন্য ধাবিত হচ্ছে।

৫। বরুণ বলবান, নেতা ও বহু লোককে দর্শন করেন, কবে আমরা সুখের জন্য তাকে (এ যজ্ঞে) আনতে পারব?

৬। যজ্ঞানুষ্ঠাতা হবাদাতার প্রতি প্রসন্ন হরে (মিত্র ও বরুণ) এ সাধারণ হব্য গ্রহণ করছেন, অগ্রাহ্য করেন না।

৭। যিনি অন্তরীক্ষগামী পক্ষীদের পথ জানেন, যিনি সমুদ্রে নেৌকা সমূহের পথ জানেন।

৮। যিনি ধৃতব্রত হয়ে স্ব স্ব ফলাৎপাদী দ্বাদশ মাস জানেন এবং যে ত্রয়োদশ মাস উৎপন্ন হয় (১) তাও জানেন।

৯। যিনি বিস্তীর্ণ, কমনীয় ও মহৎ বায়ুর পথ জানেন, উপরে যারা বাস করেন তাদেরও জানেন।

১০। ধৃতব্রত ও শোভনকর্মা বরুণ স্বর্গীয় সন্তুতিদের মদ্যে সাম্রাজ্যসিদ্ধির জন্য এসে উপবেশন করেছেন।

১১। জ্ঞানবান লোকে তার প্রসাদে সকল অদ্ভূত ঘটনা, যা সম্পাদিন হয়েছে বা হবে, সমস্তই দেখতে পান।

১২। সে শোভনকর্মা অদিতিপুত্র আমাদের সকল দিনই সুপথগামী করুন, আমাদের আয়ু বর্ধন করুন।

১৩। বরুণ সুবর্ণের পরিচ্ছদ ধারণ করে আপন পৃষ্ট শরীর আচ্ছাদন করেন, হিরণ্যস্পশী রশ্মি চারদিকে বিস্তুত হয়।

১৪। বৈরিগণ যার প্রতি বৈরতা করতে পারে না, মনুষ্য পীড়কগণ যাকে পীড়া দিতে পার না, পাপীরা যে দেবের প্রতি পাপাচারণ করতে পারে না।

১৫। যিনি মানুষের জন্য, আমাদের উদরের জন্য যথেষ্ট অন্ন প্রস্তুত করেছেন।

১৬। বরুণ বহুলোক দ্বারা দৃষ্ট; গাভী যেরূপ গোষ্ঠের দিকে যাব আমার চিন্তা নিবত্তিরহিত হয়ে তার দিকে যাচ্ছে।

১৭। হে বরুণ! যেহেতু আমার মধুর হব্য প্রস্তুত হয়েছে, হোতার ন্যায় তুমি সে প্রিয় হব্য ভক্ষণ কর; পরে আমরা উভয়ে আলাপ করব।

১৮। সকলের দর্শনীয় বরুণকে আমি দেখেছি, ভূমিতে তার রথ বিশেষ করে দেখেছি, আমার স্তুতি তিনি গ্রহণ করেছেন।

১৯। হে বরুণ! আমার এ আহ্বান শ্রবণ কর, অদ্য আমাকে সুখী কর, তোমায় রক্ষণাকাঙ্ক্ষী হয়ে আমি ডাকছি।

২০। হে মেধাবী বরুণ! তুমি দ্যুলোকে, ভূলোকে ও সমস্ত জগতে দীপ্যমান রয়েছে আমাদের ক্ষেমপ্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা শ্রবণানন্তর তুমি উত্তর দান কর।

২১। আমাদের উপরের পাশ উপর দিয়ে খুলে দাও, মধ্যের পাশ খুলে দাও, নীচের পাশ খুলে দাও, যেন আমরা জীবিত থাকি।

টীকাঃ

১। সূর্যের চতুর্দিকে পৃথিবীর গতিদ্বারা যে বৎসর গণনা করা যায়, দ্বাদশ অমাবস্যা গণনা করলে তা অপেক্ষা কয়েকদিন কম হয়ে পড়ে; এজন্য সৌরবৎসর ও চান্দ্রবৎসরের মধ্যে ঐক্য বিধান করবার জন্য চান্দ্রবৎসরের প্রতি তৃতীয় বৎসরে একটি অধিক মাস, (মলিলচ বা মলমাস) ধরতে হয়।

এ ঋক হতে প্রতীয়মান হয় যে প্রাচীন বৈদিক হিন্দুগণ উভয় বৎসরের গননা জানতেন এবং উভয় বৎসরের মধ্যে ঐক্য বিধান করতেও জানতেন।

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২৬

অনুবাদঃ

১। হে যজ্ঞভাজন অন্নপালক অগ্নি! স্বকীয় তেজ গ্রহণ কর, আমাদের এ যজ্ঞ সম্পাদন কর।

২। হে অগ্নি! তুমি সর্বদা যবিষ্ঠ, বরণীয় ও তেজ:সম্পন্ন, আমাদের হোমনিষ্পাদক হয়ে, দীপ্তিমান বাক্যদ্বারা স্তুত হয়ে উপবেশন কর।

৫। হে পুরাতন হোমনিষ্পাদক! আমাদের এ যজ্ঞে ও মিত্রতায় তুমি হৃষ্ট হও, এ স্তুতি বাক্য শ্রবণ কর।

৬ নিত্য বিস্তীর্ণ হব্য দ্বারা অন্যান্য দেবকে আমরা যে যজ্ঞ করি সে হব্য তোমাকেই প্রদত্ত হয়।

৭। সর্ব প্রজ্যপালক, হোমনিষ্পাদক, হর্ষযুক্ত ও বরণীয় অগ্নি আমাদের প্রিয় হোন, আমরাও যেন শোভনীয় অগ্নিযুক্ত হয়ে তোমার প্রিয় হই।

৮। যেহেতু শোভনীয় অগ্নিযুক্ত দীপ্যমান দেবগণ আমাদের বরণীয় হব্য ধারণ করেছেন, অতএব আমরা শোভনীয় অগ্নিহুক্ত হয়ে যাচ্ঞা করি।

৯। হে অগ্নি! তুমি অমর, আমরা মর্ত্যের মানুষ, এস আমরা পরস্পর প্রশংসা করি।

১০। হে বলের পুত্র অগ্নি! তুমি সমস্ত অগ্নিসমূহের সাথে এ যজ্ঞ ও স্তোত্র গ্রহণ করে অন্ন প্রদান কর।

টীকাঃ

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২৭

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি তুমি পুচ্ছযুক্ত অম্বসদৃশ এবং যজ্ঞের সম্রাট; আমরা স্তুতি দ্বারা তোমার বন্দনা করতে (প্রবৃত্ত হয়েছি)।

২। অগ্নি বলের পুর পৃথুগমন, তিনি আমাদরে প্রতি প্রসন্ন হোন, আমাদের অভিীষ্ট, বস্তু বর্ণণ করুন।

৩। হে সর্বত্রগামী অগ্নি! তুমি দূরে ও আসন্ন দেশে পাপাচারী মানুষ হতে আমাদের সর্বদা রক্ষা কর।

৪। হে অগ্নি! তুমি আমাদের এ হব্যের কথা এবং নূতন গায়ত্রীিচ্ছন্দে রচিত স্তোত্র দেবগণের নিকটে বলো।

৫। পরম অন্ন ও মধ্যম অন্ন আমাদের প্রদান কর, অন্তিকস্থ ধন প্রদান কর।

৬। হে বিচিত্ররশ্মি অগ্নি! সিন্ধুর সমীপে উর্মির ন্যায় তুমি ধনের বিভাগ কর্তা, হব্যদাতাকে তুমি সদ্য:কর্মফল বর্ষণ কর।

৭। হে অগ্নি! সংগ্রামে তুমি যে মনুষ্যকে রক্ষা কর, যাকে তুমি সংগ্রামে প্রেরণ কর, সে নিত্য অন্ন লাভ করবে।

৮। হে শত্রুপরাজয়ী অগ্নি! তোমার ভক্তকে কেউ আক্রমণ করতে পারে না, কেন না তার প্রসিদ্ধ বল আছে।

৯। সর্ব মনুষ্যপূজিত সেই অগ্নি অশ্ব দ্বারা আমাদের যুদ্ধে পার করে দিন; মেধাবী ঋত্বিকগণের কমে (পরিতুষ্ট হয়ে) ফলদাতা হোন।

১০। হে অগ্নি তুমি স্তুতি দ্বারা জাগরিত হও; ভিন্ন ভিন্ন যজমানকে অনুগ্রহ করে যজ্ঞানুষ্ঠানার্থে যজ্ঞে প্রবেশ কর। তুমি রুদ্র (১) তোমাকে সুন্দর স্ত্রোত্রে স্তুতি করছি।

১১। অগ্নি মহৎ, পরিমাণ রহিত, ধুমরুপ কেতুবিশিষ্ট ও বহুদীপ্তি সম্পন্ন; অগ্নি আমাদের যজ্ঞে ও অন্নে প্রীত হোন।

১২। অগ্নি প্রজাপালক, দেবগণের হোতা, দেবদুত স্তোত্রভাজন ও পৌঢ়রশ্মিসম্পন্ন; তিনি ধনবান লোকের ন্যায় আমাদের স্তুতি শ্রবণ করুন।

১৩। মহৎ দেবগণকে নমস্কার, অর্ভক দেবদের নমস্কার, যুবাদেবগণকে নমস্কার, বৃদ্ধ দেবগণকে নমস্কার; যদি সাধ্য থাকে দেবগণকে অর্চনা করব; হে দেবগণ! যেন সুবিদেবের স্তুতি না ছেড়ে দিই।

টীকাঃ

১। রুদ্র সম্বন্ধে ৪৩ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২৮

অনুবাদঃ

১। যে যজ্ঞেঝ সোমরসের অভিষবার্থে স্থুলমুল প্রস্তর উন্নত করা হয়, হে ইন্দ্র! সে যজ্ঞে উলুখল দ্বারা অভিষুত সোমরস আপনার জেনে পান কর।

২। যে যজ্ঞে দুজঘনের ন্যায় অভিষব ফলকদ্বয় বিস্তুত হয়, হে ইন্দ্র! সে যজ্ঞে উলুখল দ্বারা অভিষূত সোমরস আপনার জেনে পান কর।

৩। যে যজ্ঞে নারী যজ্ঞশালায় প্রবেশ ও তথা হতে বহির্গমন অভ্যাস করে (১) হে ইন্দ্র সে যজ্ঞে উলুখল দ্বারা অভিষুত সোমরস আপনার জেনে পান কর।

৪। যে যজ্ঞে সংযমরুজুর ন্যায় রুজুদ্বারা মথনদন্ডকে বাধা যায়, হে ইন্দ্র! সে যজ্ঞে উলুখল দ্বারা অভিষুত সোমরস আপনার জেনে পান কর।

৫। হে উলুখল! যদিও তুমি গৃহে গৃহে ব্যবহৃত হও, তথাপি এ যজ্ঞে তুমি বিজয়ীদের দুন্দুভির ন্যায় প্রভুর ধ্বনিযুক্ত শব্দ কর।

৬। হে উলুখল রূপ বনস্পতি (২)! তোমার সম্মুখে বায়ু বইছে; অতএব হে উলুখল! ইন্দ্রের পানার্থে সোমরস অভিষব কর।

৭। হে অন্নপ্রদ যজ্ঞের উপকরণযুক্ত (৩) ! খাদ্য চবণকালে ইন্দ্রের অশ্বদ্বয় যেরূপ ধ্বনি করে, সেরূপ পৌঢ় ধ্বনিযুক্ত হয়ে তোমরা পুন:পুন: বিহার কর।

৮। হে দর্শনীয় বনস্পতিদ্বয়! দর্শনীয় অভিষব যন্ত্র দ্বারা তোমরা অদ্য ইন্দ্রের জন্য মধুর সোমরস প্রস্তুত কর।

৯। হে ঋত্বিক! অভিষব ফলকদ্বয় হতে অবশিষ্ট সোম উঠাও, পবিত্রে রাখ, গোচর্মে স্থাপন কর।

টীকাঃ

১। নারী অপচ্যবম, উপব্যবম চ শিক্ষতে মুলে এরূপ আছে।

২। উলূখল কাষ্ঠ নির্মিত, এ জন্য বনস্পতি শব্দের প্রয়োগ।

৩। মূলে আয়জী আছে। হে উলুখল মুসলে আয়জী সর্বতো যজ্ঞ সাধনে। সায়ণ।

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ২৯

অনুবাদঃ

১। হে সোমপায়ী সত্যবাদী ইন্দ্র! যদিও আমরা প্রসিদ্ধ না হয়ে থাকি, তথাপি হে বহধনশালী ইন্দ্র! শোভনীয় ও সহস্র গো অশ্বদ্বারা আমাদের প্রশংসনীয় কর।

২।হে উলুখল! যদিও তুমি গৃহে গৃহে ব্যবহৃত হও, তথাপি এ যজ্ঞে তুমি বিজয়ীদের দুন্দুভি

শক্তিমান সুশিপ্র অন্নপালক ইন্দ্র! তোমার অনুগ্রহ চিরস্থায়ী! হে বহধনশালী ইন্দ্র! শোভনীয় ও সহস্র গো ও অশ্ব দ্বারা আমাদের প্রশংসনীয় কর।

৩। যে (যমদুতী দ্বয়) পরস্পর পরস্পরকে দেখে তাদের সুপ্ত কর, তারা যেন অচেতন হয়ে থাকে। হে বহুধনশালী ইন্দ্র! শোভনীয় ও সহস্র গো ও অশ্ব দ্বারা আমাদের প্রশংসনীয় কর।

৪। হে শুর! আমাদরে অরাতিগণ সুপ্ত থাকুক, বন্ধুগণ জাগরিত থাকুক। হে বহুধনশালী ইন্দ্র! শোভনীয় ও সহস্র গো ও অশ্বদ্বারা আমাদের প্রশংসনীয় কর।

৫। হে ইন্দ্র! ঐ গর্দভ পাপ বচনদ্বারা তোমার নিন্দা করছে, োকে বধ কর। হে বহুধনশালী ইন্দ্র! শোভনীয় ও সহস্র গো ও অশ্ব দ্বারা আমাদেরপ্রশংসনীয় কর।

৬। প্রতিকুল বায়ু কুটিল গতির সাথে বন হতেও দুরে পড়ুক। হে বহধনশাল ইন্দ্র! শোভনীয় ও সহস্র গো অশ্বদ্বারা আমাদের প্রশংসনীয় কর।

৭। সমস্ত আক্রাশকারীকে হনন কর, হিংসাকারীদের বিনাশ কর। বহুধনশালী ইন্দ্র! শোভনীয় ও সহস্র গো ও অশ্বদ্বারা আমাদের প্রশংসনীয় কর।

টীকাঃ

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ৩০

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! এই চারু যজ্ঞে সোমপানার্থে (১) তুমি আহুত হচ্ছ, অতএব মরুৎগণের সাথে এস।

২। হে অগ্নি! তুমি মহৎ তোমার যজ্ঞ উল্লঙ্ঘন করতে পারে এরূপ উৎকৃষ্টতর দেব বা মানুষ নেই, মরুৎগণের সাথে এস।

৩। হে অগ্নি! যে দ্যুতিমান ও হিংসারহিত মরুৎগণ মহাবৃষ্টি বর্ষণ করতে জানেন, সে মরুৎগণের সাথে এস।

৪। যে উগ্র ও অধৃষ্টবলসম্পন্ন মরুৎগণ জল বর্ষণ করেছিলেন (২) হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৫। যারা শোভমান উগ্ররূপধারী, প্রভূতবলসম্পন্ন ও শত্রুবিনাশক, হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৬। আকাশের উপরি দাপ্যমান, স্বর্গে যে দীপামান মরুতেরা বাস করেন, হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৭। যারা মেঘ সমূহকে সঞ্চালন করেন, জলরাশি সমুদ্রকে উৎক্ষিপ্ত করেন, হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৮। যারা সূর্যকিরণের সাথে (সমগ্র আকাশ) ব্যাপ্ত হন যারা বলদ্বারা সমদ্রকে উৎক্ষিপ্ত করেন, হে অগ্নি! সে মরুৎগণের সাথে এস।

৯। হে অগ্নি! তোমার প্রথম পানার্থে সোম মধু প্রদান করছি, হে অগ্নি! মরুৎগণের সাথে এস।

টীকাঃ

১। মুলে গোপীথায় আছে। সোমপানায়। সায়ণ।

২। মুলে অর্কং আনৃচুঃ আছে। বর্ষণেন সম্পাদিতবহঃ সায়ণ।

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ৩১

অনুবাদঃ

১। লোকে যেরূপ কূপকে (জলপূর্ণ করে), আমরা অন্নাকাঙ্ক্ষী হয়ে সেরূপ তোমাদের শতক্রুতু বিশিষ্ট ও অতি প্রবদ্ধ ইন্দ্রকে সোম রসের দ্বারা সেচন করি।

২। তিনি শতবিশুদ্ধ সোমরসের নিকট এবং আশীর নামক সহস্র শ্রপণ দ্রব্য মিশ্রিত সোমরসের নিকট আসেন, যেরূপ (জল) নিম্নভূমিতে যায়।

৩। এ (শত বা সহস্র সোম) বলবান ইন্দ্রের হর্ষের জন্য একত্রিত হয়, এর দ্বারা ইন্দ্রের উদর সমুদ্রের ন্যায় ব্যাপ্ত হয়।

৪। যেরূপ কপোত গর্ভধারিণী কপোতীকে গ্রহণ করে, হে ইন্দ্র! এ (সোম) তোমার, তুমিও সেরূপ একে গ্রহণ কর ও সে কারণে আমাদের বচন গ্রহণ কর।

৫। হে ধনপালক স্তুতিভাজন বীর! তোমার এরূপ স্ত্রোত্র; তোমার বিভূতি প্রিয় ও সত্য হোক।

৬। হে শতক্রতু! এ সংগ্রামে আমাদের রক্ষার্থে উৎসুক হও; অন্য কার্যের বিষয় (তুমি ও আমি) মিলিত হয়ে বিচার করব।

৭। ভিন্ন ভিন্ন কর্মের উপক্রমে, ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধে আমরা অতিশয় বলবান ইন্দ্রকে রক্ষার জন্য সখার ন্যায় আহ্বান করি।

৮। যদি ইন্দ্র আমাদের আহ্বান শ্রবণ করেন তবে নিশ্চয়ই সহস্য রক্ষণ কার্যের সাথে ও অন্নের সাথে নিকটে আসুন।

৯। ইন্দ্র বহুলোকের নিকট গমন করেন, পুরাতন আবাস হতে (১) আমি সে পুরুষকে আহ্বান করি, যাকে পিতা পূর্বে আহ্বান করেছিলেন।

১০। হে ইন্দ্র! তুমি সকলের বরণীয় ও বহুলোকদ্বারা আহুত, তুমি সখা ও নিবাসহেতু তোমার স্তোতদের প্রতি অনুগ্রহার্থে তোমার নিকট প্রার্থনা করি।

১১। হে সোমপায়ী, সখা, বজ্রধারী ইন্দ্র ! আমরাও তোমার সখা ও সোমপায়ী; আমাদের দীর্ঘ নাসিক (গাভীদল বৃদ্ধি হোক)

১২। হেসোমপায়ী, সখা, বজ্রধারী! এরূপই হোক, তুমি এরূপ আচরণ কর, যেন আমরা মঙ্গলার্থে তোমার (অনুগ্রহ) কামনা করি।

১৩। ইন্দ্র আমাদের প্রতি হৃন্ট হলে আমাদের (গাভীগণ) দুগ্ধবতী ও প্রভূত বলশালিনী হবে, (সে গাভী) হতে খাদ্য পেয়ে আমরা হৃষ্ট হব।

১৪। হে সাহসী ইন্দ্র! তোমার ন্যায় দেব স্বয়ং হৃষ্ট হয়ে, আমাদরে দ্বারা যাচিত হয়ে স্ত্রোতুদের প্রার্থিত ধন তাদরে কামনা অনুসারে অর্পণ কর।

১৫। বীর! তোমার এরূপ স্ত্রোত্র; তোমার বিভূতি প্রিয় ও সত্য হোক

১৬। ইন্দ্রের যে অশ্বগণ আহারের পর পর্যাপ্তিসূচক শব্দ করে, হ্রেষাবর করে ও ঘন ঘন শ্বাস নিক্ষেপ করে সে অশ্বগণ দ্বারা ইন্দ্র সর্বদাই ধন জয় করেছেন; কর্মবান ও দানশীল ইন্দ্র আমাদের গ্রহণার্থে হিরণায় রথ দিয়েছেন।

১৭। হে অশ্বিদ্বয়! বহু অশ্বের দ্বারা প্রেরিত অন্নের সাথে এস; হে শত্রুবিনাশক! (আমাদের গৃহ) গাভীযুক্ত ও হিরণ্যযুক্ত (হোক!)

১৮। হে শত্রুবিনাশক! তোমাদের উভয়ের জন্য সংযোজিত রথ বিনাশরহিত; এ রথ অন্তরীক্ষে গমন করে।

১৯। তোমরা রথের এক চক্র বিনাশরহিত পর্বতের উপর স্থির করেছ, অন্য চক্র্আকাশের চারদিকে ভ্রমণ করছে।

২০। হে স্তুতিপ্রিয়া অমর ঊষা! কোন মানুষ তোমার সম্ভোগের জন্য! হে প্রভাবযুক্ত! তুমি কাকে প্রাপ্ত হও?

২১। হে ব্যাপনশীল বিচিত্র দীপ্যমান ঊষা! আমরা নিকট হতে অথবা দূর হতে তোমাকে বুঝতে পারি না।

২২। হে স্বর্গ দুহিতে! সে অন্নের সাথে তুমি আগমন কর, আমাদের ধন প্রদান কর (২)।

টীকাঃ

১। কার পুরাতন আবাস হতে? পুরাতনস্য োকস: স্থানস্য স্বর্গরূপস্য সকাশাৎ সায়ণ।

২। ঊষা আর্যদের এক অতি প্রাচীন উপাস্য দেব ছিলেন, সুতরাং আর্য জাতির ভিন্ন ভিন্ন শাখার মধ্যে তাঁর নাম ও উপাসনা দেখা যায়। কিন্তু কেবল যে নামে সাদৃশ্য আছে তা নয়, ঊষা সম্বন্ধ এক প্রকারই কয়েকটি গল্প হিন্দু ও গ্রীকদের মধ্যে পাওয়া যায়। ২০ সুক্তের ৬ ঋকের টীকায় সরণ্যুর কথা দেখুন। ১১৫ সুক্তের ২ ঋকে সূর্য ঊষার পশ্চাৎ ধাবমান হচ্ছেন এরূপ কথা আছে; গ্রীকদের মধ্যেওপ্রসিদ্ধ গল্প আছে যে (সূর্য) (অর্থাৎ দহন্া) দেবীর পশ্চাৎধাবন করেছিলেন এবং তাকে ধরা মাত্র বিনাশ প্রাপ্ত হলেন। এ গল্পের অর্থও সরল, সূর্য উদয় হলেই ঊষা শেষ হয়। আবার ঋগ্বেদে ঊষাকে এক স্থানে অহনা নাম দেওয়া হয়েছে; গ্রীকদের সুবুদ্ধির দেবী এইঅহনায় রূপান্তর মাত্র। অতএব অর্থ ঊষার সন্তানগণ। বেদে হ্রস্ব উ দিয়ে উষা লেখা আছে, কিন্তু বাঙলা ভাষার রীতি অনুসারে আমরা দীর্ঘ উ ব্যবহার করলাম।

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ৩২

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! তুমি অঙ্গিরা ঋষিদের আদি ঋষি ছিলে (১) দেব হ{েয় দেবগণের মঙ্গলময় সখ। হয়েছ; তোমার কর্মে মেধাবী, জ্ঞাতকর্মা ও উজ্জ্বলাষুধ মরুৎগণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

২। হে অগ্নি! তুমি অঙ্গিরাদের মধ্যে প্রথম ও সর্বোত্তম; তুমি মেধাবী এবং দেবগণের যজ্ঞভূষিত কর; তুমি সমস্ত জগতের বিভূ; তুমি মেধাবান ও দ্বিমাতু (২) তুমি মনুষ্যের উপকারার্থে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সকল স্থানেই বর্তমান আছে।

৩। হে অগ্নি! তুমি মাতরিবার অগ্রগামী (৩), তুমি শোভনীয় যজ্ঞের ইচ্ছায় পরিচর্যাকারী যজমানের নিকট আবিভূত হও; তোমার সামর্থ দেখে আকাশ ও পৃথিবী কম্পিত হয়; তোমাকে হোতারূপে বরণ করাতে তুমি যজ্ঞে সে ভার বহন করেছ; হে নিবাসহেতু! তুমি পূজ্য দেবগণের যজ্ঞ সম্পাদন করেছ।

৪। হে অগ্নি! তুমি মনুকে স্বর্গলোকের কথা বলেছিলে (৪) পুরুরবা রাজা সুকৃতি করলে তুমি তার প্রতি অধিকতর ফল দান করেছিলে (৫) যখন তোমার পিতৃরূপ কাষ্ঠদ্বয়ের ঘর্ষণে উৎপন্ন হও, তখন তোমাকে বেদির পূর্বদেশে আনে, পরে পশ্চিম দিকে নিয়ে যায়।

৫। হে অগ্নি! তুমি অভীষ্টবর্ষী ও পুষ্টিবর্ধক; যজমান স্রচ উন্নত করবার সময় তোমার যশ কীর্ত্তন করে যে যজমান বষট শব্দ উচ্চারণ করে আহুতি সমর্পণ করে, হে একমাত্র অন্নদাতা অগ্নি! তুমি প্রথমে তাকে, তারপর সকল লোককে আলোক দান কর।
৬।হে বিশিষ্ট জ্ঞানযুক্ত অগ্নি! তুমি বিপথগামী পুরুষকে তার উদ্ধার যোগ্য কার্যে নিযুক্ত কর; যুদ্ধ চতুর্দিকে বিস্তুত হয়ে সম্যকরূপে আরম্ভ হলে তুমি অল্প সংখ্যক বীরত্বরহিত পুরুষদের দ্বারা প্রধান প্রধান বীরদেরও হনন কর।

৭। হে অগ্নি! তুমি সে মনুষ্যকে দিনে দিনে অন্নের জন্য উৎকৃষ্ট ও মরণ রহিত পদে ধারণ কর; যে উভয়রূপে জন্মের জন্য অতিশয় তৃষাযুক্ত হয়, সে অভিজ্ঞ যজমানকে সুখ ও অন্ন দান কর।

৮। হে অগ্নি! আমরা ধন দানের জন্য তোমাকে স্তুতি করি, তুমি যশোষুক্ত ও যজ্ঞ সম্পাদক পুত্র দান কর; নুতন পুত্রদ্বারা যজ্ঞ কর্ম বৃদ্ধি করব। হে দ্যু ও পৃথিবী, দেবগণের সাথে আমাদের সম্যকরূপে রক্ষা কর।

৯। হে দোবরাহত অগ্নি! তুমি সকল দেবগণের মধ্যে জাগরুক; তোমার মাতা পিতার সমীপে বর্তমান থেকে আমাদরে পুত্র দান করে অনুগ্রহ কর; যজ্ঞ কর্তার প্রতি প্রসন্নমতি হও; হে কল্যাণরূপ অগ্নি! তুমি সকল ধন বপন করেছ।

১০। হে অগ্নি! তুমি আমাদরে প্রতি প্রসন্নমতি, তুমি আমাদের পিতাস্বরূপ তুমি পরমায়ু দাতা, আমরা তোমার বন্ধু। হে অহিংসনীয় অগ্নি! তুমি শোভনপুরুষযুক্ত ও ব্রতপালক, শত ও সহস্র ধন তোমাকে প্রাপ্ত হয়।

১১। হে অগ্নি! দেবগণ প্রথমে তোমাকে নহুষের (৬) মনুষ্যরুপধারী সেনাপতি করেছিলেন, এবং ইহলোকে (৭) মনুর ধর্মোপদেষ্টা করেছিলেন। পুত্র যেন পিতৃতুল্য হয়।

১২। যে বন্দনীয় অগ্নি! আমরা ধনযুক্ত, তুমি পালনকার্য সমূহ দ্বারা আমাদরে রক্ষা কর এবং পুত্রদের দেহও রক্ষা কর। আমার পুত্রের পুত্র তোমার ব্রতে নিরন্তর নিযুক্ত আছে, তুমি তার গাভী সমূহ রক্ষা করেছ।

১৩। হে অগ্নি! তুমি যজমানের পালক, যজ্ঞ বাধাশূন্য করবার জন্য নিকটে থেকে চতুরক্ষ রূপে দীপ্যমান রয়েছে। তুমি অহিংসক ও পোষক, তোমাকে যে হব্য দান করে সে স্ত্রোতার মন্ত্র তুমি মনের সাথে াগ্রহণ কর।

১৪। হে অগ্নি! স্তুতিবাদক ঋত্বিক, যাতে স্পৃহনীয় ও পরমধন লাভ করে তুমি তা ইচ্ছা কর। পোষণীয় যজমানের প্রতি তুমি প্রসন্নমতি পিতা স্বরূপ এরূপ লোকে বলে থাকে। তুমি অতিশয় অভিজ্ঞ অর্ভক যজমানকে শিক্ষা দাও এবং দিক সবল নির্ণয় করে দাও।

১৫। হে অগ্নি! যে যজমান ঋত্বিকদের দক্ষিণা দান করেছে, তুমি সে পুরুষকে স্যুত বর্মের ন্যায় সম্পূর্ণরূপে রক্ষা কর। যে যজমান সুস্বাদু অন্নদ্বারা অতিথিদের সুখী করে স্বগৃহে পশু বলিযুক্ত যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে, সে স্বর্গের উপমা স্থল হয়।

১৬। হে অগ্নি! আমাদরে এ যজ্ঞ কার্যে ভ্রম ক্ষমা কর এবং অনেক দূর হতে এ বিপথে এসে পড়েছি তা ক্ষমা কর। সোমাভিষবকারী মনুষ্যদের প্রতি তুমি সহজে অধিগম্য ও পিতাস্বরূপ, প্রসন্নমতি ও কর্মনির্বাহক এবং তাদের প্রত্যক্ষ দর্শন দাও।

১৭। হে বিশুদ্ধ অগ্নি! হে অঙ্গিরা! মনু ও অঙ্গিরা এবং যযাতি ও অন্যান্য পূর্ব পুরুষের ন্যায় তুমি সম্মুখবর্তী হয়ে (যজ্ঞ) দেশে গমন কর, দেবসমূহকে আন ও কুশের উপর উপবেশন করাও এবং অভীষ্ট হব্যদান কর।

১৮। হে অগ্নি! এ মন্ত্র দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হও, আমাদের শক্তি ও জ্ঞান অনুসারে আমরা এ রচনা করলাম; এ দ্বারা আমাদরে বিশেষ ধন প্রদান কর এবং আমাদের অন্নযুক্ত শোভনীয় বৃদ্ধি প্রদান কর।

টীকাঃ

১। অঙ্গিরসানাং ঋষিণাং সর্বেষাং জনকত্বাৎ। সায়ণ। অঙ্গিরাগণ কারা? যাস্ক বলেন, অঙ্গিরা অঙ্গার মাত্র। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ অনুসারে ও অঙ্গিরাঋষিগণ প্রথমে যজ্ঞাগ্নির অজ্ঞার মাত্র ছিলেন। কিন্তু অঙ্গিরার কথা সমস্তই উপমাএরূপ বোধ হয় না। অঙ্গিরা নামে প্রকৃত একটি প্রাচীন ঋষিবংশ ছিল এবং সে ঋষিগণ ভারতবর্ষে অগ্নির পূজা অনেকটা প্রচার করেছিলেন। ৭১ সুক্তের ৩ ঋকের টীকা দেখুন।

২। দুই কাষ্ঠের ঘর্ষণে উৎপন্ন এ জন্য। দ্বয়োররণ্যোরুৎপন্নঃ। সায়ণ।

৩। অগ্নিবায়ুবাদিত্যঃ এ বচনে বায়ুর পূর্বে অগ্নির নাম আছে। সায়ণ। কিন্তু ঋগ্বেদে মাতরিবা অর্থে বায়ু নয়, মাতরিশ্বা অগ্নির রূপ বিশেষ। ৬০ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

৪। পূর্ন কর্মদ্বারা স্বর্গ পাওয়া যায় একথা অগ্নি মনুকে বলেছিলেন। সায়ণ। মনু বিবস্বানের পুত্র ও সবর্ণার গর্ভে জাত। যাস্ক।

৫। পুরুরবা রাজা ঘর্ষণ দ্বারা অগ্নি উৎপন্ন করে তা থেকে তিন প্রকার যজ্ঞ অগ্নি প্রস্তুত করেছিলেন এরূপ আখ্যান বিষ্ণুপুরাণে আছে।

৬। পুরুরবারপৌত্র নহুষ দর্পের জন্য স্বর্গচ্যুত হয়েছিলেন এরূপ বিষ্ণুপুরাণে লিখিত আছে, কিন্তু অগ্নি নহুষের সেনাপতি হয়ছিলেন এরূপ কথা দেখা যায় না।

তৃতীয় মণ্ডল: সুক্ত - ৩৩

অনুবাদঃ

১। বজ্রধারী ইন্দ্র প্রথমে যে পরাক্রমের কর্ম সম্পাদন করেছিলেন, তার সে কর্মসমূহ বর্ননা করি। তিনি হিকে (মেঘকে) হনন করেছিলেন, তৎপর বৃষ্টি বর্ষন করেছিলেন, বহনশীল পর্বতীয় নদী সমূহের (পথ) ভেদ করে দিয়েছিলেন (১)।

২। ইন্দ্র পর্বতাশ্রিত আহিকে (২) হনন করেছিলেন; ত্ষ্টা ইন্দ্রের জন্য সূদুর পাতী বজ্র নির্মান করেছিলেন; তারপর যেরূপ গাভী সবেগে বৎসের দিকে যায়, ধারাবাহী জল সেরূপ সবেগে সমুদ্রাভিমূখে গমন করেছিলেন।

৩। ইন্দ্র বৃষের ন্যায় বেগের সাথে সোম গ্রহণ করেছিলেন; ও তা দিয়ে অিহদিগের মধ্যে প্রথমজাতকেহ হনন করেছিলেন।

৪। যখন তুমি অহিদিগের মধ্যে প্রথমে জাততে হনন করলে, তখন তুমি মায়াবীদিগের মায়া বিনাশ করার পর সূর্য ও ঊষাকাল ও আকাশে প্রকাশ করে আর শত্রু রাখলে না।

৫। জগতের আবরণীকারী বৃত্রকে ইন্দ্র মহাধ্বংসকারী বজ্র দ্বারা ছিন্নবাহন করে বিনাশ করলেন, কুঠারছিন্ন বৃক্ষস্কন্ধের ন্যায় অহি পৃথিবী স্পর্শ করে পড়ে আছে।

৬। দর্পষুত বৃত্ত আপনার সমতুল্য যোদ্ধা নেই মনে করে মহাবীর ও বহু বিনাশী ও শত্রু বিজয়ী ইন্দ্রকে যুদ্ধে আহ্বান করেছিলেন। ইন্দ্রের বিনাশকার্য হতে রক্ষা পেল না। ইন্দ্রশত্রু বৃত্ত নদীতে পতিত হয়ে নদীসমূহকে পিষ্ট করে ফেলল।

৭। হস্ত-পদ-শুন্য বৃত্ত ইনদ্রকে যুদ্ধে আহআন করলে, ইন্দ্র তার সানু তুল্য পৌঢ় স্কন্ধে বজ্র আঘাত করলেন; যেরূপ পুরুষত্বহীন ব্যক্তি পুরুষত্ব সম্পন্ন ব্যক্তির সাদৃশ্য লাভ করতে বৃথা যত্ন করে, বত্রও সেরূপে বৃথা যত্ন করল; বুসঊথানে ক্ষূত হয়ে বৃত্ত ভূমিতে পড়ল।

৮। ভগ্নকূলকে অতিক্রম করে নদ যেরূপ বয়ে যায়, মনোহর জল সেরূপ পতিত বৃত্রদেহকে অতিক্রম করে যাচ্ছে; বৃত্ত জীবন্দশায় নিজ মহিমাদ্বারা যে জলকে বন্ধ করে রেখেছিল, অহি এখন সে জলের পদের নীচে শয়ন করল।

৯। বৃত্রের মাতা তির্যকভাবে রইল, তখন ইন্দ্র তার অধোভাগে অস্ত্রাঘাত করলেন, তখন মাতা উপরে ও পুত্র নীচে রইল, তারপর বঃসের সাথে ধেনুর ন্যায় বৃত্তের মাতা দনু শুয়ে পড়ল।

১০। স্থিতি রহিত বিশ্রাম রহিত জলের মধ্যে নিহিত, নাম শুন্যা শরীরের উপর দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে; ইন্দ্রশত্রু দীর্ঘ নির্দায় পতিত রয়েছে।

১১। পনির দ্বারা গাভী সকল যেরুপ গুপ্ত ছিল, বৃত্তপত্নী সমূহ অহি রক্ষিত হয়ে সেরুপ নিরুদ্ধ হয়েছিল; জেলর বহন দ্বারা রুদ্ধ ছিল, বৃত্তকে হনন করে ইন্দ্র সে দ্বার খুলে দিয়েছেন।

১২। হে ইন্দ্র! যখন সেই এক দেব বৃত্ত (৩) তোমরবজ্রের প্রতি আঘাত করেছিল, তখন তুমি অশ্বপুচ্ছে ন্যায় হয়ে আঘাত নিবারণ করেছিলে; তুমি গহাভী জয় করেছ, সোমরস জয় করেছ এবং সপ্তসিন্ধু প্রবাহ ছেড়ে দিয়েছ।

১৩। ইন্দ্র ও অহি যখন যুদ্ধ করেছিলেন এবং অহি যে বিদ্যুৎ বা মেঘ গর্জন, বা জলবর্ষন বা বজ্র ইন্দ্রের প্রতি প্রয়োগ করেছিল, তা ইন্দ্রকে স্পর্শ করল না; এবং ইন্দ্র অন্যান্য মায়াও জয় করেছিলেন।

১৪। হে ইন্দ্র! অহীকে হনন করবার সময় যখন তোমার হৃদয়ে ভয় সঞ্চার হয়েছিল, তখন তুমি তখন তুমি অহির অন্য কোন হস্তার জন্য প্রতীক্ষা করেছিলে, যে ভীত হয়ে শ্যেন পক্ষীর ন্যায় নবনবতি নদ ও জল পর হয়েঢ গিয়েছিলে?

১৫। বজ্রবাহু ইন্দ্র স্থাবর ও জঙ্গমদের এবং শান্ত পশু ও শৃঙ্গী পশুদের রাজা হলেন; তিনি মনুষ্যদের রাজা হয়ে নিবাস করেছেন, এবং যেরূপ চক্রের নেমি মধ্যস্থা কাষ্ঠ সমূহকে ধান করে, সেরুপ ইন্দ্র সকলকে আপনার মধ্যে ধারণ করেছিলেন (৪)।

টীকাঃ

১। পুরাণে যে বৃত্ত নামক অসূরের সাথে ইন্দ্রের যুদ্ধ সম্বন্ধীয় আখ্যান আছে, তার উৎপত্তি আমরা এই সূত্রে পাই। মেঘের নাম বৃত্র বা অহি, ইন্দ্র মেঘকে বজ্র দ্বারা আঘাত করে বৃষ্টি বর্ণণ করেছেন, এরূপে উপলদ্ধি করে ঋগ্বেদে ঋষিগণ উপমা ও কল্পনাপূর্ণ কবিতা লিখেছেন, তা হতে পৌরাণিক বৃত্র অসুরের গল্প উৎপন্ন। বৃত্রের সাথে বৃত্রহস্তার ধুনদ্ধর গল্প প্রাচীন আর্যদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, সুতরাং হিন্দু ভিন্ন অন্যান্য আর্য জাতির মধ্যেও এ গল্প দেখা যায়। ইরানীয়দিগের অবস্থায় বৃত্তহস্তার অনেক উপাসনা আছে। br>
২। “অহিং মেঘং। সায়ণ। অহি ও বৃত্র একই, ৫ ঋক দেখুন।

৩। বৃত্রকে এখানে দেব বলা হয়েছে। ২৪ সুক্তের ১৪ ঋকের টীকা দেখুন।

৪। ইন্দ্র পণিকে জয় করে দেবগণের গাভী উদ্ধার করেন, এ সম্বন্ধে একটি গল্প আছে তা প্রাত:কালে অন্ধকার বিনাশ ও আলোক প্রকাশ সম্বন্ধে উপমা দেওয়া হয়েছে মাত্র।

৬। সুক্তের ৫ ঋকের টীকা দেখুন। ইন্দ্র বৃত্র বা অহিকে হনন করেন বলে বৃত্রহনন বলা আছে, তাও মেঘ হতে বৃষ্টিপাতন সম্বন্ধে উপমা ঘটিত গল্প। ইউরোপীয় দুজন পণ্ডিত বিবেচনা করেন বৃষ্টিপাতন প্রাত:কালে আলোক প্রকাশ এ দুটি প্রকৃতির কার্য দেখেই আর্যগণ প্রথমে ধর্মজ্ঞান লাভ করেন। বলেছেন। কিন্তু এ মতদ্বয় ইউরোপীয়গণ উদ্ভাব করেন নি। খষ্টের বহুশতাব্দি পূর্বে যাস্ক তার নিরুক্তে বৈদিক উপাখ্যানগুলির এ মুল নির্দেশ করে গেছেন। বৃত্র অর্থে জল অবরোধকারী মেঘ মাত্র নিরুক্ত ২।১৬। অশ্বিদ্বয় বৃকমুখ হতে বর্ত্তিকা পক্ষীকে উদ্ধার করেন, তার অর্থ রাতের অন্ধকার হতে আলোক প্রকাশ হয়, নিরুক্ত

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৩৪

অনুবাদঃ

১। হে মেধাবী অশ্বিদ্বয়! তোমরা অদ্য তিন বার আমাদরে জন্য এস। তোমাদের রথ বহুব্যাপী, তোমাদের দানও বহু ব্যাপী? যেরূপ রশ্মিযুক্ত দিবস ও হিমযুক্ত রাত্রের মধ্যে পরস্পর নিয়মরূপ সম্বন্ধ আছে, সেরূপ তোমাদের উভয়ের মধ্যেও আছে। তোমরা অনুগ্রহ করে মেধাবী ঋত্বিকদের বশবর্তী হও।

২। তোমাদের মধুর খাদ্যবাহী রথে তিনটি দৃঢ় চক্র আছে; তা সকল দেবগণ চন্দ্রের ভার্ষা বেনার সাথে যাত্রা করবার সময় জেনেছে (১); সে রথের উপর অবলম্বনের জন্য তিনটি স্তম্ভ স্থাপিত আছে। হেজ অশ্বিদ্বয়! সে রথে রাত্রে তিন বার ও দিনে তিন বার গমন কর।

৩। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা এক দিনে তিন বার যজ্ঞানুষ্ঠানের দোষ সংশোধনকর; অদ্য তিন বার যজ্ঞের হব্য মধুর রস দ্বারা সিক্ত কর। রাত্রে দিনে তিন বার বলকারী অন্ন দ্বারা আমাদের ভরণ কর।

৪। হে অশ্বিদ্বয়! আমাদরে গৃহে তিন বার এস; আমাদরে অনুকুল ব্যাপারে নিযুক্ত জনের নিকট তিন বার এস; তোমরা রক্ষণীয় জনের নিকট তিন বার এস; আমাদের তিন প্রকার শিক্ষা দাও; আমাদের তিন বার আনন্দজনক ফল প্রদান কর; যেরূপ ইন্দ্র জল দান করেন, সেরূপ তিন বার আমাদরে অন্ন দাও।

৫। হে অশ্বিদ্বয়! তিন বার আমাদরে ধন প্রদান কর; দেব যুক্ত কর্মানুষ্ঠানে তিন বার আগমন কর; তিন বার আমাদরে বুদ্ধি রক্ষা কর; তিন বার আমাদের সৌভাগ্য সম্পাদন কর; তিন বার আমাদের অন্ন প্রদান কর; তোমাদের ত্রিচক্র রথে সূর্যের দুহিতা আরুঢ়া হয়েছেন।

৬। হে অশ্বিদ্বয়! আমাদের দিব্যলোকের ঔষধি তিন বার প্রদান কর; পার্থিব ঔষধি তিন বার প্রদান কর; অন্তরীক্ষ হতে ঔষধি তিন বার প্রদান কর; শংযুর (২) ন্যায় আমার সন্তানকে সুখ দান কর। হে শোভনীয় ঔষধিপালক! তোমরা তিনটি ধাতু বিষয়ক (৩) সুখ প্রদান কর।

৭। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা আমাদের পূজনীয়, প্রতিদিন তিন বার পৃথিবীতে আগমন করে তিনটি কক্ষাযুক্ত কুশোপরি শয়ন কর। হে নাসত্য রথীদ্বয়! আত্মারূপ বায়ু যেরূপ শরীর সমূহে আগমন করে তোমরা সেরূপ তিনটি যজ্ঞস্থানে আগমন কর (৪)

৮। হে অশ্বিদ্বয়! সপ্ত মাতৃ জল দ্বারা (৫) তিনটি সোমাভিষব প্রস্তুত হয়েছে। তিনটি কলস প্রস্তুত হয়েছে, হব্য প্রস্তুত হয়েছে। তোমরা তিন জগৎ হতে উর্ধ্বে গমন করে দিবারাত্র সমন্বিত আকাশের সূর্যকে রক্ষা করেছিলে।

৯। হে নাসত্য অশ্বিদ্বয়! তোমার ত্রিকোণ রথের তিনটি চক্র কোথায়? তিনটি সনীড় বন্ধুর কোথায় (৬)? বলবান গর্ন্দভ কখন তোমাদের রথে যুক্ত হয়ে আমাদরে যজ্ঞে আনবে?

১০। হে নাসত্য অশ্বিদ্বয়! এসহবাদান করছি; তোমাদের মধুপায়ী মুখ দ্বারা মধুর হব্য পান কর; ঊষাকালের পূর্বেই সূর্য তোমাদের বিচিত্র ও ঘৃতবৎ রথযজ্ঞে আগমনার্থে প্রেরণ করেছেন।

১১। হে নাসত্য অশ্বিদ্বয়! ত্রিগুণ একাদশ দেব (৭) গণের সাথে মধু পানার্থে এখানে এস, আমাদরে আয়ু বর্ধন কর; পাপ খনডন কর; বিদ্বেষীদের প্রতিষেধ কর; আমাদের সঙ্গে অবস্থান কর।

১২। হে অশ্বিদ্বয়! ত্রিকোণ রথ দ্বারা আমাদের সম্মুখে বীরযুক্ত ধন আন; রক্ষার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান করছি, তোমরা শ্রবণ করছ, আমাদরে বৃদ্ধি সাধন কর ও সংগ্রামে বলদান কর।

টীকাঃ

১। যখন সোমের বেনার সাথে বিবাহ হয়, তখন নানাবিধ খাদ্যযুক্ত তিন চক্রযুক্ত প্রৌঢ়রথে আরোহণ করে অশ্বিদ্বয় গিয়েছিলেন তা সকল দেব জেনেছেন। সায়ণ।

২। বৃহস্পতির পুত্র শংযুকে অশ্বিদ্বয় পালন করেছিলেন। সায়ণ।

৩। বাত, পিত্ত ও শ্লেষ্ম এই শরীরের তিনটি ধাতু। সায়ণ।

৪। ঘৃত, পশু ও সোমরসরূপ তিনটি বেদী। সায়ণ।

৫। সপ্ত সংখ্যকা। গঙ্গাদ্যা নদ্যো মাতরৎ উৎপাদিকা যেষাং জলবিশেষাণাং তে। সায়ণ

৬।েব যুক্ত কর্মানুষ্ঠানে তিন বার আগমন কর; তিন বার আমাদরে বুদ্ধি রক্ষা কর;

৭। এ ঋকে ও বেদের অন্যান্য স্থলে ৩৩ দেবের উল্লেখ আছে। এ ৩৩ জন দিক দেবকে? তৈত্তিরীয় সংহিতায় আছে যে আকাশে ১১, পৃথিবীতে ১১ এবং অন্তরীক্ষে ১১ জন দেব। তে, সং,

১।৭।১০।১ শর্ত পথব্রাহ্মণে বলে ৮ বসু, ১১ রুদ্র, ১২ আদিত্য দ্যু অর্থাৎ আকাশ এবং পৃথিবী এই ৩৩ জন দেবতা। শ,ব্রা,

৭।৫।৭।২। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ বলে যে ১১ প্রবাজ দেব, ১১ অনুযাজ দেব ও ১১ উপযাজ দেব, এই ৩৩ দেবতা। ঐ.ব্র.

২।১৮। বিষ্ণুপুরাণে বলে ১১ রুদ্র, ১২ আদিত্য, ৮ বসু, এবং প্রজাপতি ও বষটকার এই ৩৩ জন দেবতা। যাস্কের মতে দেব ৩ জন মাত্র, তাহা ১ সুক্তের ১ ঋকের টীকায় দেখান হয়েছে। এ ৩৪ সুক্তের ১১ ঋকে ৩৩ জন দেবের উল্লেখ পেলাম। পরে পুরাণাদি গ্রন্থে ৩৩ কোটি দেবের উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলতঃ ভিন্ন ভিন্ন ঐশ্বরিক কার্য বাদৃশ্যকে ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়া দেবের সংখ্যা বদি্ধি করা হয়েছে। এ কার্য সমূহের কর্তা ও নিয়স্তা যে কেবল এক ঈশ্বর তাহা ঋগ্বেদের দশম মন্ডলের ৮২ সুক্ত, ১২১ সুক্ত ১২৯ সুক্ত এবং অন্যান্য স্থানে বর্ণিত হয়েছে।

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৩৫

অনুবাদঃ

১। রক্ষার জন্য অগ্নিকে প্রথমে আহ্বান করি, রক্ষার জন্য মিত্র ও বরুণকে এ স্থানে আহ্বান করি, জগতের বিশ্রামহেতুভূত রাতকে আব্হান করি, রক্ষার জন্য দেব সবিতাকে আহ্বান করি।

২। অন্ধকারপূর্ণ অন্তরীক্ষ দিয়ে বারবার ভ্রমণ করে, দেব ও মনুষ্যকে সচেতন করে, দেব সবিতা হিরস্ময় রথ দ্বারা ভূবন সমুদয় দেখতে দেখতে ভ্রমণ করছেন।

৩। দেব সবিতা ঊর্ধ্বগামী ও অধোগামী পথ দিয়ে গমন করেন; সেই অর্চনাভাজন দেব দুটি শ্বেত অশ্ব দ্বারা গমন করেন; তিনি সমস্ত পাপ বিনাশ করতে করতে দুর দেশ হতে আসছেন।

৪। যজনীয় ও বিচিত্ররশ্মি সবিতা জগৎ সমূহের অন্ধকার বিনাশার্থে তেজ ধারণ করে নিকটস্থ সুবর্ণ বিচত্রিত, সুবর্ণ শঙ্কুযুক্ত বৃহৎ রথে আরোহণ করলেন।

৫। শ্যাব নামক শ্বেত পদযুক্ত অশ্বগণ সুবর্ণযুগ বিশিষ্ট রথ বহন করে জনসমূহের নিকট আলোক প্রকাশ করছেন; দেব সবিতার সমীপে জনসমূহ ও জগৎসমূহ উপস্থিত আছে।

৬। দ্যুলোক প্রভূতি তিনটি লোক আছে দুটি, দ্যুলোক ও ভূলোক সূর্যের সমীপস্থ একটি (অন্তরীক্ষ) যমের ভবনে গমনকারীদের পথ। (১) রথ যেরূপ আণির উপর অবলম্বন করে, অমর চন্দ্র নক্ষত্রাদি সবিতাকে সেরূপ অবলম্বন করে আছে। যিনি সবিতাকে জানেন তিনি এ বিষয়ে বলুন।

৭। গভীর কম্পন বিশিষ্ট অসুর, সূপর্ণ রশ্মি (২) অন্তরীক্ষাদি (তিন লোক) ব্যাপ্ত করছে। এক্ষণে সূর্য কোথায় কে জানে? কোন দিব্য লোকে তার রশ্মি বিস্তুত হয়েছে?

৮। সবিতা পৃথিবীর অষ্ট দিক প্রকাশিত করেছেন, এবং প্রাণীদের তিন জগৎ ও সপ্তসিন্ধু প্রকাশিত করেছেন। সে হিরষ্ময় চক্ষু বিশিষ্ট সবিতা হবদাতা যজমানকে বরণীয় দ্রব্য দান করে এ স্থানে আসুন।

৯। হিরণ্যপাণি বিবিধদর্শনযুক্ত সবিতা উভয় লোকের মধ্যে গমন করছেন, রোগাদি নিরাকরণ করছেন, সূর্যের নিকট যাচ্ছেন (৩) এবং তমোনাশক তেজ দ্বারা আকাশ ব্যাপ্ত করছেন।

১০। হিরণাহস্ত অসুর, সুনেতা, হর্ষদাতা, ও ধনবান সবিতা অভিমুখ হয়ে আসুন; সে দেব রাক্ষস ও ষাতুধান (৪) দের নিরাকরণ করে প্রতিরাতি স্তুতি প্রাপ্ত হয়ে অবস্থানকরেন।

১১। হে সবিতা! তোমার পথ পূর্বসিদ্ধ, ধুলি রহিত ও অন্তরীক্ষে সুনির্মিত; সে সুগম পথ সমূহ দিয়ে এসে অদ্য আমাদের রক্ষা কর; হে দেব! আমাদের কথা (দেবগণের নিকট) অধিক করে বল।

টীকাঃ

১। প্রেতপুরুষগণ অন্তরীক্ষ দিয়ে যমলোকে গমনকরে। সায়ণ! পুরণে যম অর্থ কি তা আমরা সকলেই জানি, কিন্তু ঋগ্বেদে প্রথমে কাকে যম বলত? বিবস্বানের দ্বারা সরণ্যুর গর্ভে অশ্বিদ্বয়ের জন্ম হয় এবং যম ও তাঁর ভগ্নী যমীরও জন্ম হয়। বিবস্বান, অর্থে আকাশ, সরণ্যু অর্থে ঊষাকাল। তাদের যমজ সন্তান কারা? আচার্য মক্ষমুলয়ের মতে দিন ও রাতকে প্রথম ঋষিগণ যম ও যমী নাম দিয়েছিলেন। ঋষিগণ, যেরূপ পূর্বদিককে জীবনের উৎপত্তিস্থল মনে করতেন, পশ্চিম দিককে সেরূপ জীবনের অবসান মনের করতেন। সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয়ে পশ্চিম দিকে অন্তর্হিত হতেন, অর্থাৎ জীবনের পথ ভ্রমণ করে পরলোকের পথ দেখাতেন। এ রূপে যম পরলোকের রাজা, এই অনুভব উদয় হল। Science of Language. (২) সায়ণ অসুর অর্থে প্রাণদায়ী ও সুপর্ণ অর্থে সূর্য রশ্মি করেছেন। কিন্তু অসুর সম্বন্ধে ২৪ সুক্তের ১৩ ঋকের টীকা দেখুন।

৩। সায়ণ বলেন সূর্য ও সবিতা এক দেব হলেও ভিন্ন ভিন্ন রূপ, সুতরাং একে অন্যের নিকট গমন করতে পারেন। ২২ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা দেখুন।

৪। বেদের ষাতুধান একপ্রকার মায়াবী পাপমতি জীব ইরানীদের জেন্দ অবস্থায় তাদের নাম ষাতুমান।

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৩৬

অনুবাদঃ

১। তোমরা বহু সংখ্যক প্রজা, তোমরা দেবতা কামনা করছ, তোমাদের জন্য মহৎ অগ্নিকে সুক্ত বাক্য দ্বারা প্রার্থনা করি, অন (ঋষিগণও) সে অগ্নির স্তব করে থাকেন।

২। লোকে বলবর্ধনকারী অগ্নিকে অবলম্বন করেছে; হে অগ্নি আমরা হব্য নিয়ে তোমার পরিচর্যা করি; তুমি অন্ন দানে তৎপর হয়ে অদ্য এ কর্মে আমাদের প্রতি প্রসন্নমনা হও এবং আমাদরে রক্ষক হও।

৩। হে অগ্নি! তুমি দেবগণের হোতা এবং সর্বজ্ঞ, আমরা তোমাকে বরণ করি। তুমি মহৎ এবং নিত্য, তোমার দীপ্তি বিস্তুত হচ্ছে, তোমার রশ্মি আকাশ স্পর্শ করছে।

৪। হে অগ্নি! তুমি পুরাতন দুত। বরুণ ও মিত্র ও অর্যমা তোমাকে সম্যকরূপে দীপ্তিমান করছেন। যে মনুষ্য তোমাকে (হব্য) ান করে সে তোমার সহায়তায় সমস্ত ধন জয় করে।

৫। হে অগ্নি! তুমি হর্যদাতা তুমি দেবগণকে আহ্বান কর; তুমি প্রজাদের গৃহপতি, তুমি দেবগণের দূত। দেবগণ যে সকল অমোঘ ব্রত সম্পাদন করেন তা সমস্তই তোমাতে মিলিত হয়।

৬। হে যুবা অগ্নি! তুমি সৌভাগ্যসম্পন্ন; তোমাকে লক্ষ্য করে সমস্ত হব্য প্রক্ষেপ করা হয়। তুমি আমাদের প্রতি প্রসন্নমনা হয়ে অদ্যই বা অন্য সময়ে শোভনীয় বীর্যশালী দেবগণকে অর্চনা কর।

৭। যজমানেরা নমস্কারপূর্বক সেই স্বয়ং দীপ্তিমান অগ্নিকে এরূপে উপাসনা করেন। শত্রু বিজিগীষু মানুষেরা হোত্রদের দ্বারা (১) অগ্নকে প্রদীপ্ত করে।

৮। দেবগণ প্রহার করে বৃত্রকে হনন করেছেন, উভয় জগৎ এবং অন্তরীক্ষ নিবাসার্থে বিস্তুত করেছেন। অগ্নি ধনবান, তিনি গোজয়ার্থে যুদ্ধে শব্দায়মান অশ্বের ন্যায় সর্বতোভাবে আহুত হয়ে কম্বকে অভীষ্ট দ্রব্য বর্ষণ করুন।

৯। হে প্রশস্ত অগ্নি! উপবেশন কর, তুমি মহৎ এবং দেবতাদের অতিশয় কামনা কর, তুমি দীপ্তিপূর্ণ হও। হে মেধাবী উৎকৃণ্ট অপ্নি। গমনশীল ও দর্শনীয় ধুম উৎপাদন কর।

১০। হে হব্যব্যাপী অগ্নি! তুমি অতিশয় পূজাভাজন, সকল দেবগণ মনুর জন্য তোমাকে এই যজ্ঞস্থানে ধারণ করেছিলেন; তুমি ধন দ্বারা প্রীতি সম্পাদন কর, অর্চনাভাজন অতিথি সমেত কব তোমাকে ধারণ করেছেন, বর্ষণকারী ইন্দ্র তোমাকে ধারণ করেছেন অন্য স্তোতাও তোমাকে ধারণ করেছেন।

১১। অর্চনাভাজন অতিথিপ্রিয় কব অগ্নিকে আদিত্য হতেও অধিক দীপ্তিমান করেছেন। সে অগ্নির গমনশীল রশ্মি দীপ্তিমান রয়েছে। এ ঝকসমূহ সে অগ্নিকে বর্ধন করে, আমরাও বর্ধন করি।

১২। হে অন্নবান অগ্নি! আমাদের ধন পূরণ কর। তোমার দ্বারা দেবগণকে প্রাপ্ত হওয়া যায়, তুমি প্রসিদ্ধ অন্নের ঈশ্বর, তুমি মহৎ, আমাদের সুখী কর।

১৩। সবিতা দেবের ন্যায় আমাদের রক্ষণের জন্য উন্নত হও, উন্নত হয়ে অন্নদাতা হও, কেন না বিচিত্র যজ্ঞ সম্পাদকদের দ্বারা আমরা তোমাকে আহ্বান করছি।

১৪। উন্নত হয়ে আমাদের জ্ঞান দ্বারা পাপ হতে রক্ষা কর; কল রাক্ষস দহন কর; আমাদের উন্নত কর, যেন আমরা জগতে বিচরণ করতে পারি বং আমাদের হব্যরূপ ধন দেবগণের সদনে বহন কর, যেন আমরা জীবিত থাকতে পারি।

১৫। হে বৃহৎরশ্মি যুবা অগ্নি! আমাদের রাক্ষস হতে রক্ষা কর; যে ধন দান করে না এরূপ ধূর্ত লোক হতে রক্ষা কর; হিংসক পশু হতে রক্ষা কর এবং জিঘাংসাপরায়ণ শত্রু হতে রক্ষা কর।

১৬। হে তপ্তরশ্মিযুক্ত অগ্নি! যেরূপ কঠিন দন্ড দ্বারা লোকে (ভান্ডাদি) নষ্ট করে, সেরূপ যারা ধন দান করে না তাদের সর্বদা সংহার কর। অন্য যে রিপু আমাদের বিরুদ্ধাচারী, অন্য যে মনুষ্য আয়ুধ দ্বারা আমাদের প্রহার করে, তারা যেন আমাদের প্রভু না হয়।

১৭। শোভনীয় বীর্যের জন্য অগ্নিকে যাচ্ঞা করা হয়েছে; অগ্নি কবকে সৌভাগ্য দান করেছেন; অগ্নি আমার মিত্রদের রক্ষা করেছেন; অর্চনাভাজন অতিথি বিশিষ্ট ঋষিকে রক্ষা করেছেন; এবং ধনাদি দানার্থে অন্য যে কেউ অগ্নির স্তুতি করেছে তাকে রক্ষা করেছেন।
১৮। সদ্যুদমনকারী অগ্নির সাথে তুবশু ও যদু উগ্রাদেবকে দুরদেশ হতে আহ্বান করি; অগ্নি নববাস্তত্ব ও বৃহদ্রথ ও তুর্বীতিকে এ স্থানে আনুন (২)

৯। হে অগ্নি! তুমি জ্যোতিরূপ, বিবিধ জাতীয় মানুষের জন্য মনু তোমাকে স্থাপন করেছিলেন; হে অগ্নি! তুমি যজ্ঞের জন্য উৎপন্ন হয়ে, হব্য দ্বারা তৃপ্ত হয়ে, কবের প্রতি দীপ্তিমান হয়েছ; মানুষেরা তোমাকে নমস্কার করে।

২০। অগ্নির অর্চিৎ প্রদীপ্ত, বলবান ও ভয়স্কর, এবং তাকে প্রত্যয় করা যায় না। হে অগ্নি! রাক্ষসদের যাতুধানদের এবং বিশ্বভক্ষক শত্রুকে দহনকর।

টীকাঃ

১। সে হে ত্রগণ কারা? সপ্ত হোত্রী প্রাচী বষটকুম্বন্তি। সায়ণ। সে সাত জন ঋত্বিক বা পুরোহিত এই যথা (১) যজমান, যিনি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, (২) হোতা, বিনি মন্ত্র পাঠ করেন, (৩) উদগাতা, যিনি মন্ত্র গান করেন, (৪) পোতা যিনি হব্য প্রস্তুত করেন, (৫) নেষ্টা, যিনি হব্য অগ্নিতে প্রক্ষেপ করেন, (৬) ব্রন্ধা যিনি সমুদায় তত্ত্ববধারণ করেন (৭) রক্ষ যিনি দ্বার রক্ষা করেন।

২। এ ছয় জনকে সায়ণ রাজষি বলে বর্ণনা করেছেন। পুরাণে যদু ও তুর্বশু যযাতি নরপতির পুত্রদ্বয়। তুর্বীতি সম্বন্ধে ৬১ সুক্তের ১১ ঋকের টীকা দেখুন

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৩৭

অনুবাদঃ

১। হে কবগোত্রোম্ভব ঋষিগণ, ক্রীড়াশীল ও শত্রুরহিত মরুৎ সমূহের উদ্দেশ্যে গাও; তারা রথে শোভা পাচ্ছেন।

২। তারা স্বকীয় দীপ্তিযুক্ত হয়ে এবং বিন্দুচিহ্নিত মৃগরূপ বাহনের সাথে ও যুদ্ধ গর্জন ও আয়ুধ ও নানারূপ অলঙ্কারের সাথে জন্ম গ্রহণ করেছেন।

৩। তদের হস্তস্থিত কশা যে শব্দ করছে তা শুনতে পাচ্ছি; সে কশা ষুদ্ধে বল বৃদ্ধি করে।

৪। যারা তোমাকে বল সমর্থন করেন, শত্রুবর্ষণ করেন, যারা দীপামান যশ:পূর্ণ ও বলবান, সেই মরুৎগণকে হবির উদ্দেশে স্তব কর।

৫। যে মরুৎগণ পৃশ্নিরূপ ধেনুর মধ্যে অবস্থিত, তাদের বিনাশরহিত, ক্রীড়াশীল ও প্রসহনশীল তেজ প্রশংসা কর; বৃষ্টি আস্বাদনে সে তেজ বৃদ্ধি পেয়েছে।

৬। দ্যুলোক ও ভুলোকের কম্পনকারী হে বীরগণ! তোমাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কে? তোমরা বৃক্ষাগ্রের ন্যায় চারদিক পরিচালিত কর।

৭। হে মরুৎগণ! তোমাদের উগ্র ও ভীষণ গতির ভয়ে মনুষ্যগণ অবনত হয়েছে, কেন না তোমাদের গতিতে বহু পর্বযুক্ত গিরিও চালিত হয়।

৮। তাদের গতিক্রমে পদার্থ সমূহ বিক্ষিপ্ত হতে লাগল; পৃথিবীও বৃদ্ধ ও জীর্ণ নরপতির ন্যায় ভয়ে কম্পিত হয়।

৯। তাদের জন্মস্থান আকাশ অবিচলিত; তাদের জননী স্বরূপ আকাশ হতে বলনির্গত হতে পারে; যেহেতু তাদের বল উভয় লোকের সর্বত্র বর্তমান আছে।

১০। তারা শব্দের উৎপাদক, তারা গমন কালে জল বিস্তার করেন এবং গাভীদের হম্বারবপূর্বক জানু পর্যন্ত সে জলে প্রেরণ করেন।

১১। যে মেঘ প্রসিদ্ধ, দীর্ঘ ও পৃথু এবং জল বর্ষণ করে না ও কারও দ্বারা হিংসনীয় নয়, তাকেও মরুৎগণ স্বকীয় গতি দ্বারা চালিত করেন।

১২। হে মরুৎগণ! যেহেতু তোমাদের বল আছে, মনুষ্যদের নত করেছ, মেঘদেরও নত করেছ।

১৩। যখন মরুৎগণ গমন করেন, তখনই মার্গে সর্বতোভাবে ধ্বনি করেন, তাদের ধ্বনি সকলেই শুনতে পায়।

১৪। বেগবান বাহন দ্বারা শীঘ্র এস কম্বেরা তোমাদের পরিচর্যা প্রস্তুত করেছ; তাদের প্রতি তৃপ্ত হও।

১৫। তোমাদের তৃপ্তির জন্য হব্য রয়েছে, আমরা সমস্ত পরমায়ু জীবিত থাকবার জন্য তোমাদের ভৃতা হয়ে আছি।

টীকাঃ

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৩৮

অনুবাদঃ

১। হে মরুৎগণ! তোমরা স্তুতিপ্রিয় এবং তোমাদের জন্য কুশ ছিন্ন হয়েছে। পিতা পুত্রকে যেরূপ দুটি হস্ত দ্বারা ধারণ করে, আমাদের সেরূপ ধারণ করবে?

২। তোমরা এখন কোথায়? কখন তোমরা আগমন করবে? আকাশ হতে এস, পৃথিবী হতে যেও না; যজমানের গাভীসমূহের ন্যায় তোমাকে কোথায় ডাকছে?

৩। তোমাদের নুতন ধন কোথায়? তোমাদের শোভনীয় দ্রব্য কোথায়? তোমাদের সমস্ত সৌভাগ্য কোথায়?

৪। হে পৃশ্নি পুত্রগণ! যদি তোমরা মনুষ্য হতে তোমাদের স্তোতা অমর হত।

৫। তৃণের মধ্যে মৃগ যেরূপ সেবা রহিত হয় না, তোমার স্তোতাও সেরূপ তোমার সেবা রহিত হত না, কদাচ যমের পথে যেত না।

৬। নি:ঋতি (১) অতিশয় বলবতী এবং তাকে বিনাশ করা যায় না। যেন সে নি: ঋতি আমাদের না বধ করে; যেন সে আমাদের তৃষ্ণার সাথে বিলুপ্ত হয়।

৭। দীপ্তিমান ও বলবান রুদ্রীয়গণ সত্যই (২) মরুভূমিতেও বায়ুরহিত বৃষ্টি দান করেন।

৮। প্রস্রূত স্তনবতী ধেনুর ন্যায় বিদ্যুৎ গর্জন করছে; গাভী যেরূপ বৎসের সেবা করে, বিদ্যুৎ সেরূপ মরুৎগণের সেবা করছে, সুতরাং মরুৎগণ বৃষ্টি দান করলেন।

৯। মরুৎগণ উদকধারী পর্জন্য (৩) দ্বারা দিবাকালেও অন্ধকার করছেন, পৃথিবী জলসিক্ত করছেন।

১০। মরুৎ গণের গর্জনে সমস্ত পৃথিবীর গৃহাদি সমস্তাৎ কম্পিত হয়, মনুষ্যগণ কম্পিত হয়।

১১। হে মরুৎগণ! দৃঢ় পদ অশ্ব দ্বারা বিচিত্র তটযুক্ত নদীর তীর দিয়ে অপ্রতিহত গতিতে গমন কর।

১২। তোমার রথের নেমি সমুদয় দৃঢ় হোক, রথ অশ্বগণও দৃঢ় হোক, তোমাদের বলগা দৃঢ় হোক।

১৩। ব্রন্ধণস্পতি (৪) ও অগ্নি এবং দর্শনীয় মিত্রের স্তুতির জন্য দেবতাস্বরূপ প্রকাশকারী বাক্য দ্বারা আমাদের সম্মুখে তাদের বর্ণন কর।

১৪। মুখে শ্লোক রচনা কর, পর্জন্যের ন্যায় তা বিস্তার কর; উকথস্তুতি বিশিষ্ট গায়ত্রীচ্ছন্দে রচিত (সুক্ত) পাঠ কর।

১৫। দীপ্তিমান স্তুতিযোগ্য এবং অর্চনোপেত রুৎগণকে বন্দনা কর; আমাদের এ কার্যে যেন তারা বর্ধনশীল হন।

টীকাঃ

১। অর্থাৎ পাপ। ২৪ সুক্তের ৯ ঋকের টীকা দেখুন।

২। রুদ্র সম্বন্ধে ৪৩ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

৩। পর্জন্য অর্থে মেঘ। সায়ণ। এরপর ৮৩ ও অন্যান্য সুক্তে পর্জন্যকে দেব বলে স্তুতি করা হয়েছে।

৪। ব্রহ্মণস্পতি সম্বন্ধে ১৮ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৩৯

অনুবাদঃ

১। হে কম্পনকারী মরুৎগণ। যখন দুরে হতে আলোকের ন্যায় তোমাদরে মাননীয় তেজ এ স্থানে নিক্ষেপ কর, তখন তোমরা কার যজ্ঞ দ্বারা, কার স্তোত্র দ্বারা আকৃষ্ট হও, কোথায় কোন যজমানের নিকট গমন কর?

২। তোমাদের আয়ুধ সমূহ শত্রুদের প্রতিরোধের জন্য দৃঢ় হোক; শত্রুদের প্রতিরোধার্থ কঠিন হোক; তোমাদের বল স্তুতিভাজন হোক; আমাদের নিকট ছন্মচারী মানুষের বল যেন স্তুতি ভাজন না হয়।

৩। হে নরসমূহ! যখন স্থির বস্তুকে তোমরা ভগ্ন কর, গুরু বস্তুকে যখন পরিচালিত কর, তখন পৃথিবীর বন বৃক্ষের মধ্য দিয়ে ও পর্বতের পার্শ্ব দিয়ে তোমরা গমন কর।

৪। হে শত্রুহিংসক মরুৎগণ! ্যুলোকে তোমাদের শত্রু নেই, পৃথিবীতেও নেই হেরুদ্রপুত্রগণ (১) ! তোমরা একত্রিত হও, (শত্রুদের) ধর্ষণার্থে তোমাদের বল শীঘ্র বিস্তুত হোক।

৫। মরুৎগণ পর্বত সমূহকে বিশেষরূপে কম্পিত করছেন, বনস্পতিদের বিযুক্ত করছেন। হে দেব মরুৎগণ! সমস্ত দলের সাথে তোমরা উন্মত্তের ন্যায় সর্বস্থানে গমন কর।

৬। তোমরা বিন্দু চিহ্নিত মৃগ রথে সংযুক্ত করেছ। লোহিত মৃগ প্রষ্টি (২) হয়ে রথ বহন করছে। পৃথিবী তোমাদের আগমন শ্রবণ করছে, মানুষেরা ভীত হয়েছে।

৭। হে রুদ্র পুত্র মরুৎগণ! পুত্রের জন্য শীঘ্র তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ প্রার্থনা করি। পূর্বে আমাদের রক্ষনের জন্য যেরূপ এসেছিলে, সেরূপ ভীতিযুক্ত কবের নিকট শীঘ্র এস।

৮। যে কোন শত্রু তোমাদের দ্বারা কিম্বা মানুষ কর্তৃক উত্তেজিত হয়ে আমাদের সম্মুখীন হয়, তার খাদ্য এবং বল হরণ কর, তোমাদের সহায়তা হরণ কর।

৯। হে মরুৎগণ! তামরা সম্পুর্ণরূপে যজ্ঞভাজন এবং প্রকৃষ্ট জ্ঞানযুক্ত, তোমরা কম্বকে ধারণ কর বিদ্যুৎ যেরূপ বৃষ্টি নিয়ে আসে, তোমরাও সম্পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষনের সাথে আমাদের নিকট এস।

১০। হে শোভনীয় দানসম্পন্ন মরুৎগণ! তোমরা সম্পূর্ণ তেজ ধারণ কর; কম্পনকারীগণ! তোমরা সম্পূর্ণ বল ধারণ কর; ঋষিদ্বেষী ক্রোধপরবশ শত্রুর প্রতি ইষুর ন্যায় তোমার ক্রোধ প্রেরণ কর।

টীকাঃ

১। রুদ্রাস শব্দের অর্থ রুদ্রপুত্রা মরুতঃ। রুদ্র সম্বন্ধে ৪৩ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

২। বাহনত্রয় মধ্যবর্তী যুগবিশেষঃ সায়ণ। মক্ষমুলর প্রষ্টি অর্থ Leader করেছেন।

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৪০

অনুবাদঃ

১। হে ব্রহ্মণস্পতি! উত্থান করঃ দেবতা কামনা করে আমরা তোমাকে যাচ্ঞা করছি। শোভনীয় দানযুক্ত মরুৎগণ নিকট দিয়ে গমন করুন, হে ইন্দ্র! তুমি সঙ্গে থেকে সোমরস সেবন কর।

২। হে বলপুত্র! (শত্রুদের মধ্যে) প্রক্ষিপ্ত ধনের জন্য মনুষ্য তোমাকে স্তুতি করে; হে মরুৎগণ! যে মনুষ্য তোমাদের স্তুতি করে, সে শোভনীয় অশ্বযুক্ত ও শোভনীয় বীর্যযুক্ত ধন লাভ করে।

৩। ব্রহ্মণস্পতি আমাদের নিকট আসুন, সুনৃতা দেবী (১) আসুন, দেবগণ শত্রুকে দূরে প্রেরণ করুন, আমাদের হিতকারী ও হবাযুক্ত যজ্ঞে নিয়ে যান।

৪। যে মনুষ্য ঋত্বিককে গ্রহণযোগ্য ধন দান করে সে ক্ষয় রহিত অন্নলাভ করে; তার জন্য আমরা ইলার নিকট যাচ্ঞা করব। ইলা সুবীরা, তিনি শত্রুকে হনন করেন, তাকে কেহ হনন করতে পারে না।

৫। ব্রহ্মণস্পতি নি:সন্দেহই পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করেন (২)। সে মন্ত্রে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ও অর্যমা দেবগণ অবস্থিতি করেন।

৬। হে দেবগণ সুখের উৎপত্তি হেতু এবং হিংসা দোষ রহিত সে মন্ত্র আমরা উচ্চারণ করি। হে নেতৃগণ! যদি তোমরা এ বাক্য কামনা কর তা হলে সকল কমনীয় বাক্য তোমাদের নিকট উপনীত হবে।

৭। যিনি দেবগণকে কামনা করেন, তার নিকট ব্রহ্মণস্পতি ভিন্নকে আসে? যিনি যজ্ঞের জন্য কুশ ছিন্ন করেন, তার নিকট ব্রহ্মণস্পতি ভিন্ন কে আসে? হব্যদাতা যজমান ঋত্বিকদের সাথে যজ্ঞ স্থানে প্রন্থান করেছেন, অন্ত:স্থিত বহু ধনোপেত গৃহে গমন করেছেন।

৮। ব্রহ্মণস্পতি আপন শরীরে বল সংগ্রহ করুন, রাজগনের সাথে তিনি শত্রু হনন করেন, ভয়ের সময় তিনি স্বস্থানে স্থির থাকেন। তিনি বজ্রধারী, মহা যুদ্ধে কিম্বা স্বল্প যুদ্ধে তাকে প্রোৎসাহ অথবা নিরুৎসাহ করে এরূপ কেউ নেই।

টীকাঃ

১। সুনৃতা দেবী প্রিয়সত্যরূপাবাপ্দেবতা। সায়ণ।

২। ব্রহ্ম অর্থ প্রার্থনা বা মন্ত্র এবং ব্রহ্মণস্পতি প্রার্থনা স্বরূপ দেব, তা এ সুক্তে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে। ১৮ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৪১

অনুবাদঃ

১। প্রকৃষ্ট জ্ঞানযুক্ত বরুণ ও মিত্র ও অর্যমা (১) যাকে রক্ষা করেন, কেউ তার হিংসা করতে পারে না।

২। তারা যে লোককে নিজের হস্ত দ্বারা ধনপূর্ণ করেন ও হিংসক হতে রক্ষা করেন, সে লোক কারও দ্বারা হিংসিত না হয়ে বুদ্ধি প্রাপ্ত হয়।

৩। বরুণাদি রাজগণ সে লোকদের জন্য শত্রুদের দূর্গ বিনাশ করেন, শত্রুদেরও বিনাশ করেন; পরে সে লোকদের পাপ সমূহ অপনয়ন করেন।

৪। হে আদিত্যগণ! তোমাদের যজ্ঞে আসবার পথ সুখগম্য ও কন্টকরহিত; এ যজ্ঞে তোমাদের জন্য মন্দ খাদ্য প্রস্তুত হয়নি।

৫। হে নেতা আদিত্যগণ! যে যজ্ঞে তোমরা ঋজুপথ দিয়ে আস, সে যজ্ঞ তোমাদের উপভোগ্য হোক।

৬। হে আদিত্যগণ! সে (তোমাদের অনুগৃহীত) মানুষ কারও দ্বারা হিংসিত না হয়ে সমস্ত রমণীয় ধন সম্মুখেই প্রাপ্ত হয় এবং নিজের সদৃশ অপত্য প্রাপ্ত হয়।

৭। হে সখাগণ! মিত্র ও অর্যমা ও বরুণের মহত্বের অনুরূপ স্তোত্র কি প্রকারে সাধন করব?

৮। হে মিত্রাদিদেবগণ! দেবাকাঙ্ক্ষী যজমানকে যে হনন করে, এবং যে কটু বলে, তার বিরুদ্ধে আমি তোমাদরে নিকট অভিযোগ করি না; আমি ধন দ্বারা তোমাদের পরিতৃপ্ত করি।

৯। অক্ষক্রীড়ায় যে লোক চার কপর্দক হস্তে ধারণ করে, সে কপর্দক ক্ষেপণ পর্যন্ত যেরূপ তাকে অপর পক্ষ ভয় করে সেরূপ যজমান পরের নিন্দা করতে ভয় করে।

টীকাঃ

১। মিত্র ও বরুণ সম্বন্ধে ২ সুক্তের ৭ ঋকের টীকা দেখুন। বরুণ ও মিত্রের সাথে অর্যমাকে অনেক স্থানে স্তুতি করা হয়। অর্যমাকে? ৯০ সুক্তের ১ ঋকের টীকায় সায়ণ বলেন অর্যমা অহোরাত্রবিভাগস্য কর্তা সূর্যঃ। অন্য এক স্থানে সায়ণ লিখেছেন যে মিত্র ও বরুণ দিন ও রাত। অর্যমা উভয়োর্ম ধ্যবত্তী দেবঃ। ১৪ সুক্তের ৩ ঋকের টীকা দেখুন।

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৪২

অনুবাদঃ

১। হে পূষা (১) পথ পার করিয়ে দাও, পাপ বিনাশ কর; হে মেঘপুত্র দেব! আমাদরে অগ্নে যাও।

২। হে পুষা! আঘাতকারী, অপহরণকারী ও দৃষ্টাচারী যে কেউ আমাদের (বিপরীত পথ) দেখিয়ে দেয়, তাকে পথ হতে দূর করে দাও।

৩। সেই মার্গ প্রতিবন্ধক, তস্কর কুটিলাচারীকে পথ হতে দুরে তাড়িয়ে দাও।

৪। যে কেউ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ই হরণ করে এবং অনিষ্ট সাধন ইচ্ছা করে, হে পূষা! তার পরসন্ত্রাপক দেহ তোমার পদের দ্বারা দলিত কর।

৫। হে শত্রুবিনাশী ও জ্ঞানবান পূষা! যেরূপ রক্ষণাদ্বারা পিতৃগণকে কউৎসাহিত করেছিলে, তেমার সে রক্ষণা প্রার্থনা করছি।

৬। হে সর্বধনসম্পন্ন, অনেক সুবর্ণায়ুধযুক্ত লোকগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পূষা! তুমি অনন্তর ধনসমূহ দানে পরিণত কর।

৭। বিঘ্নকারী শত্রুদের অতিক্রম করে আমাদের নিয়ে যাও, সুখগম্য শোভনীয় পথদ্বারা আমাদরে নিয়ে যাও: হে পূষা! তুমি এ পথে আমাদের রক্ষণের উপায় কর।

৮। শোভনীয় তৃণযুক্ত দেশে আমাদরে নিয়ে যাও, পথে যেন নতুন সন্তাপ না হয়। হে পূষা! তুমি এ (পথে) আমাদের রক্ষনের উপায় কর।

৯। (আমাদের অনুগ্রহ করতে) সক্ষম হও, আমাদের গৃহ ধনে পরিপূর্ণ কর, অভষ্টবস্তুদান কর, আমাদের তীক্ষ্মতেঙ্গা কর, আমাদের উদর পূরণ কর; হে পূষা! তুমি এ পথে আমাদের রক্ষণের উপায় কর।

১০। আমরা পূষাকে নিন্দা করি না, সুক্ত দ্বারা স্তুতি করি, আমরা দর্শনীয় পূষার নিকট ধন যাচ্ঞা করি (২)।

টীকাঃ

১। সায়ণ বলেন পূষা অর্থে জগৎ পোষকপৃথিব্যাভিমানিদেবঃ। এটি সায়ণের ভ্রম। যাস্ক নিরুক্তকে লিখেছেন, সর্বোষাং ভূতানাং গোপায়িতা আদিত্যঃ। অর্থাঃ পূষা সূর্য। এ অর্থই সঙ্গত এবং সকল পনিডতদের সম্মত। মেঘ হতে অনেক সময় সূর্য বার হন, এ জন্য পূষাকে মেঘপুত্র বলা হয়েছে।

২। এ সুক্তের কোন কোন ঋক, বিশেষ করে ৮ ঋক হতে প্রতীয়মান হয় যে সে সময়ের হিন্দু আর্যদের মধ্যে কেন কোন অংশ মেঘপালক ব্যবসায় অবলম্বন করে সুন্দর তৃণ অন্বেষণে স্থানে স্থানে ভ্রমণ করত। পূষা বিশেষরূপে তাদেরই রক্ষক, অতএব তিনি ভ্রমণে পথদর্শক। সে কালে ভ্রমণে কি রূপ বিপদ আপদ ছিল তাও এ সুক্ত হতে জানা যায়।

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৪৩

অনুবাদঃ

১। প্রকৃষ্ট জ্ঞান যুক্ত অভীষ্ট বর্বণকারী ও অতিশয় মহৎ রুদ্র (১) আমাদরে হৃদয়ে অধিষ্ঠান করছেন, কবে তার উদ্দেশে সুখকর স্তোত্র পাঠ করব?

২। যা দিয়ে অদিতি আমাদরে জন্য, পশুর জন্য মানুষের জন্য, গাভীর জন্য এবং আমাদের অপত্যের জন্য রুদ্রীয় প্রদান করেন।

৩। যা দিয়ে মিত্র ও বরুণ ও রুদ্র ও সমান প্রীতিযুক্ত সকল দেবগণ আমাদরে অনুগ্রহ করেন।

৪। রুদ্র স্তুতিপালক, যজ্ঞপালক এবং উদকরূপ ঔষধিযুক্ত, তার নিকট আমরা (বৃহস্পতি পুত্র) শংযুর ন্যায় সুখ যাচ্ঞা করি।

৫। যে রুদ্র সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান ও হিরণ্যের ন্যায় উজ্জ্বল, যিনি দেবগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও নিবাসের হেতু।

৬। আমাদরে অশ্ব, মেঘ, মেঘী, পুরুষ স্ত্রী ও গোজাতিকে সুগম্য সুখ প্রদান করেন।

৭। হে সোম! আমাদরে প্রচুর পরিমাণে শত মানুষের ধন দান কর এবং মহৎ ও প্রভূত বলযুক্ত অন্ন দান কর।

৮। সোমপ্রতিবন্ধকেরা ও শত্রুগণ আমাদরে যেন হিংসা না করে। যে সোম! আমাদরে অন্ন দান কর।

৯। হে সোম! তুমি অমর ও উত্তম স্থান প্রাপ্ত, তুমি শির:স্থানীয় হয়ে যজ্ঞগৃহে তোমার প্রজাদরে কামনা কর; যে প্রজাগণ তেমাকে বিভূষিত করে, তুমি তাদের জান।

টীকাঃ

১। ২৭ সুক্তের ১০ ঋকে রুদ্রকে অগ্নির রূপ বলে বর্ণিত হয়েছে, আমরা তা দেখেছি। সে ঋক সম্বন্ধে যাস্ক নিরুক্ততে বলেন অগ্নিরপি রুদ্র উচ্যতে। সায়ণ বলেন রুদ্রায় ক্ররায় অগ্নয়ে। অতএব উভয় যাস্ক ও সায়ণের মতে রুদ্র শব্দের অর্থ অগ্নি। ৩৯ সুক্তের ৪ ঋকে মরুৎগণকে রুদ্রাসঃ বলে বর্ণনা করা হয়েছে তাও আমরা দেখেছি। সায়ণ। রুদ্রাসঃ অর্থে রুদ্রপুত্রা মরুতঃ করেছেন। অতএব রুদ্র মরুৎগণের পিতা। রুদ্র ধাতুর একটি অর্থ শব্দ করা অথবা গর্জন করা বা রোদন করা অতএব রুদ্র অগ্নিরূপী ঋড়ের পিতা শব্দায়মান দেব। এ হতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হচ্ছে যে রুদ্রের আদিম অর্থ বজ্র বা বজ্রধারী মেঘ। এক্ষণে আমরা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্রের আদিম বৈদিক অর্থ পেলাম। ঋগ্বেদে ব্রহ্মণস্পতি অর্থে স্তুতি দেব ১৮ সুক্ত দেখুন, বিষ্ণু অর্থে সূর্য দেব ব২২ সুক্ত দেখুন, রুদ্র অর্থে বজ্রদেব। সকল ঐশ্বরিক কাজের এক ঈশ্বরকে ঋগ্বেদে বিশ্বকর্মা বা হিরণ্যগর্ভ নাম দেওয়া হয়েছে ১০ মন্ডলের ৮২ ও ১২১ সুক্ত দেখুন। ঋগ্বেদ রচনার বহুকাল পর এই এক ঈশ্বরের সৃষ্টি, পালন, ও বিনাশ এ তিনটি কাজ পৃথক পৃথক নির্দেশ করবার জন্য ঋষিগণ তিনটি নামের অন্বেষণ করলেন। তারা নতেন নাম উদ্ভাবন না করে প্রাচীন বৈদিক নামই গ্রহণ করলেন। স্তুতি দেব ব্রহ্মণস্পতির নাম নিয়ে ঈশ্বরের সৃষ্টি কার্যকে ব্রহ্মা নাম দিলেন। সূর্যদেব বিষ্ণুর নাম নিয়ে ঈশ্বরের পালন কার্যকে বিষ্ণুর নাম দিলেন। বজ্রদেব রুদ্রের নাম নিয়ে ঈশ্বরের বিনাশ কার্যকে রুদ্র নাম দিলেন।

চতুর্থ মণ্ডল: সুক্ত - ৪৪

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! তুমি অমর এবং সর্ব ভূতজ্ঞ তুমি ঊষার নিকট হতে নিবাসযুক্ত ও বিচিত্র ধন হব্যদাতা যজমানকে এনে দাও; অদ্য ঊষাকালে জাগরিত দেবগণকে নিয়ে এস।

২। হে অগ্নি! তুমি দেবগণের সেবিত দূত, তুমি হব্য বহন কর, তুমি যজ্ঞের রথী; তুমি অশ্বিদ্বয় ও ঊষার সাথে শোভনীয় বীর্যমুক্ত ও প্রভূত ধন আমাদের দান কর।

৩। অগ্নি দূত, নিবাসের হেতু, অনেকের প্রিয়, ধুমরূপ ধ্বজাযুক্ত প্রসিদ্ধ জ্যেতি দ্বারা অলঙ্কৃত এবঃ ঊষাকালে যজমানদের যজ্ঞ সেবন করেন; সে অপ্নিকে অদ্য আমরা বরণ করি।

৪। অপ্নি শ্রেষ্ঠ, যবিষ্ঠ সদ্য অতিথি, সকলের আহুত, হব্যদাতার প্রতি প্রীত এবং সর্বভূতজ্ঞ; ্র্ষাকালে দেবগণের অভিমুখে গনার্থ আমি তাকে স্তুতি করি।

৫। হে অমর বিশ্বপালক, হব্যবাহী ও যজ্ঞাহ অগ্নি! তুমি বিশ্বের ত্রাণকর্তা, মরণরহিত ও যজ্ঞনির্বাহক; আমিস তোমাকে স্তুতি করব।

৬। হে যুবতম অগ্নি! তুমি স্তোতার স্তুতিভাজন ও তোমার শিখা আনন্দদায়ী, তুমি আহুত হয়ে আমাদরে অভিপ্রায় উপলব্ধি কর।

৭। প্রস্কন্ব জীবিত থাকে এ জন্য তার আয়ুঃ বৃদ্ধি করে দাও, সে দেবপরায়ণ জনকে সম্মান কর। তুমি হোমনিষ্পাদক ও সর্বজ্ঞ, তোমাকে লোকে দীপ্তিমান করে; হে অগ্নি! তুমি অনেকের আহুত, প্রকৃষ্ট জ্ঞানযুক্ত দেবগণকে শীঘ্র এ যজ্ঞে নিয়ে এস।

৮। হে শোভনীয় যজ্ঞযুক্ত অগ্নি! রাত্রের পর প্রভাতে সবিতা ঊষা অশ্বিদ্বয় ভগ ও অগ্নিকে নিয়ে এস; হব্যবাহী, কবেরা সোম অভিষব করে তোমাকে জ্বালাচ্ছে।

৯। হে অগ্নি! তুমি লোকদের যজ্ঞের পালক, তুমি দেবগণের দূত, ঊষাকালে জাগরিত সূর্যদশী দেবগণকে অদ্য সোমপানার্থে নিয়ে এস।

১০। হে প্রভাত সম্পন্ন ধনবান অগ্নি! তুমি সকলের দর্শনীয়, তুমি পূর্বগামী ঊষার পর দীপ্ত হও; তুমি গ্রামসমূহে রক্ষক, যজ্ঞসমূহে পুরোহিত, ও বেদীর পূর্বে মানুষ।

১১। হে অগ্নি! তুমি যজ্ঞের সাধন, তুমি দেবগণের আহ্বানকারী ঋত্বিক, তুমি প্রকৃষ্ট জ্ঞানযুক্ত এবং শত্রুদের আয়ুঃক্ষয়কারী, তুমি দেবগণের দূত ও অমর আমরা মনুর ন্যায় তোমাকে জজ্ঞঝস্থানে স্থাপন করি।

১২। নিত্রদের পূজক হে অগ্নি! যখন যজ্ঞমধ্যে পুরোহিত রূপে তুমি দেবগণের দূতের কর্ম সম্পাদন কর, তখন তোমার সমুদ্রের প্রকষ্টধ্বনিযুক্ত ঊর্মি সমূহের ন্যায় অর্চিঃমূহ দীপ্তিমান হয়।

১৩। হে অগ্নি! তোমার কর্ণ শ্রবণসমর্থ, আমাদরে বচন শ্রবণ কর; মিত্র ও অর্যমা ও অন্য যে দেবগণ প্রাত:কালে দেবযজ্ঞে গমন করেন, তোমার সহগামী সে হব্যবাহী দেবগণের সাথে এ যজ্ঞ লক্ষ্য করে কুশে উপবেশন করুন।

১৪। মরুৎগণ দানশীল, অগ্নি জিহ্ব এবং যজ্ঞবর্ধন করেন, তারা আমাদরে স্তোত্র শ্রবণ করুন, ধৃতব্রত বরুণ অশ্বিদ্বয় ও ঊষার সাথে সোমপান করুন।

টীকাঃ

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৪৫

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! তুমি এ যজ্ঞে বসুদের, রদ্রদের, এবং আদিতাদের অর্চনা কর এবং শোভনীয় যজ্ঞযুক্ত ও জলসেককারী মনুজাত জনকেও অর্চনা কর।

২। হে অগ্নি! বিশিষ্ট প্রজ্ঞাসম্পন্ন দেবগণ হবাদাতাকে ফলদান করেন; হে অগ্নি! তোমার রোহিত নামক অশক্ব আছে এবং তুমি স্তুতিভাজন, তুমি সে ত্রয়স্ত্রিংশ (১) দেবগণকে এ স্থানে নিয়ে এস।

৩। হে অগ্নি! তুমি প্রভূতকর্মা এবং সর্বভূতজ্ঞ। প্রিয়মেধা অত্রি, বিরূপ ও অঙ্গিরা নামক ঋষিদের আহ্বান যেরূপ শ্রবণ করেছিলে সেরূপ প্রস্কম্বের আহ্বান শ্রবণ কর।

৪। অগ্নি যজ্ঞ সমূহের মধ্যে বিশুদ্ধ আলোক দ্বারা দীপ্যমান হন পৌঢ়কর্মা প্রিয়মেধাগণ রক্ষার জন্য অগ্নিকে আহ্বান করেছিলেন।

৫। কম্বের পুত্রেরা যে স্তুতি দ্বারা রক্ষার জন্য তোমাকে আহ্বান করছেন, হে ঘৃতাহুত ফলপ্রদ অগ্নি! সে স্তুতি সমূহ শ্রবণ কর।

৬। হে অগ্নি! তুমি প্রভূত ও বিবিধ অন্নযুক্ত এবং বহুলোকের প্রিয়; তোমার দীপ্তিরূপ কেশ আছে; মানুষেরা তোমাকে হব্য বহনের জন্য আহ্বান করে।

৭। হে অগ্নি! তুমি আহ্বানকারী ঋত্বিক এবং বহুধন দাতা, তোমার কর্ন শ্রবণসমর্থ, তোমার খ্যাতি বহু বিস্তুত; মেধাবীগণ তোমাকে যজ্ঞে স্থাপন করেছেন।

৮। হে অগ্নি! তুমি আহ্বানকারী ঋত্বিক এবং বহুধন দাতা, তোমার কর্ণ শ্রবণসমর্থ, তোমার খ্যাতি বহু বিস্তৃত; মেধাবীগণ তোমাকে যজ্ঞে স্থাপন করেছেন।

৮। হে অগ্নি!হব্যাদাতার জন্য হব্য ধারণ করে মেধাবী ঋত্বিকেরা সোম অভিযুত করে অন্নের নিকট তোমাকে আহ্বান করছে; তুমি মহান ও প্রভাসম্পন্ন।

৯। হে অগ্নি! তুমি বল দ্বারা উৎপন্ন, তুমি ফলদাতা এবং নিবাস হেতু; অদ্য এ স্থানে প্রাতে আগমনকারী দেবগণকে ও দৈব্য জনকে সোম পানার্থে কুশের উপর আনয়ন কর।

১০। হে অগ্নি! সম্মুখস্থ দৈব্য জনকে (২) দেবগণের সাথে সমান আহ্বান দ্বারা অর্চনা কর; হে দানশীল দেবগণ! এ সোম তোমাদের জন্য কল্য প্রস্তুত হয়েছে, এ পান কর।

টীকাঃ

১। ৩৪ সুক্তের ১১ ঋকের টীকা দেখুন।

২। প্রথম, নবম ও দশম ঋকে যে মনুজাত দেবতারূপ প্রাণীর উল্লেখ আছে তারা কে? সম্ভবতঃ ৩ ঋকে উল্লিখিত ঋষিগণ।

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৪৬

অনুবাদঃ

১। প্রিয় ঊষা এর পূর্বে দেখা দেন নি, ঐ তিনি আকাশ হতে অন্ধকার দূর করছেন। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের প্রভূত স্তুতি করি।

২। যে দর্শনীয় সমুদ্রপুত্র দেবদ্বয় মনের দ্বারা ধন দান করেন এবং আমরা যজ্ঞ সম্পাদন করলে নিবাসস্থান প্রদান করেন।

৩। হে অশ্বিদ্বয়! তেমাদের রথ যখন প্রশংসিত স্বর্গলোকে আশ্বগণ দ্বারা নীত হয়, তখন আমরা আমাদরে স্তুতি উচ্চারণ করি।

৪। হে নরদ্বয়! পুরণকারী, পালনকারী, যজ্ঞদর্শী ও জলশোষক সূর্য আমাদের হবা দ্বারা দেবগণকে পূরণ করেন।

৫। হে নাসত্যদ্বয়! আমাদরে প্রিয় স্তুতি গ্রহণ করে তোমাদের বৃদ্ধি পরিচালক যে তীব্য সোম আছে তা পান কর।

৬। হে অশ্বিদ্বয়! যে জ্যোতির্ময় অন্ন অন্ধকার বিনাশ করে আমাদরে তৃপিত দান করে, সে অন্ন আমাদরে প্রদান কর।

৭। হে অশ্বিদ্বয়! স্তুতি সমূহের পারে গমনার্থে নৌকারূপে এস, আমাদরে অভিমুখে তোমাদের রথ সংযোজিত কর।

৮। তোমাদের আকাশ অপেক্ষাও বিস্তীর্ণ যান সমুদ্রের ঘাটে রয়েছে, ভূমিতে রথ রয়েছে; সোমরস তোমাদের যজ্ঞ কর্মে মিশ্রিত হয়েছে।

৯। হে কবগণ! অশ্বিদ্বয়কে জিজ্ঞাসা কর, দিব্যলোক হতে সুর্যরশ্মি আসে, বৃষ্টির উৎপত্তি স্থানে অর্থাৎ অন্তরীক্ষে আমাদের নিবাস হেতু জ্যেতিঃ আবিভূত হয়; হে অশ্বিদ্বয়। তোমাদের রূপ এর মধ্যে কোন স্থানে রাখতে ইচ্ছা কর?

১০। সূর্যের প্রভা ঊষাকালের আলোক উৎপন্ন করেছিল, সূর্য উদিত হয়ে হিরণ্যের ন্যায় হয়েছিলেন, অগ্নি কৃষ্ণবর্ণ হয়ে আপন ঝজহ্বা দ্বারা প্রকাশ পেয়েছিলেন।

১১। রাত্রের পারে গমনার্থ সূর্যের সুন্দর পথ নির্মিত হয়েছিল, সূর্যের বিস্তুত দীপ্তি দৃষ্ট হয়েছিল।

১২। অশ্বিদ্বয় হর্ষ নিমিত্ত সোমপান করেন। স্তুতিকারক তাদের পুন:পুন: রক্ষণ কার্য বিভূষিত করেন।

১৩। হে সুখদাতা অশ্বিদ্বয়! তোমরা যেরূপ মনুতে নিবাস করেছিলে সেরূপ নিবাস করে সোমপান নিমিত্ত এবং স্তুতির জন্য আগমন কর।

১৪। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা চতুর্দিকবিচারী; তোমাদের শোভা অনুসরণ করে ঊষা আগমন করুন; রাতে সম্পাদিত যজ্ঞের হব্য তোমরা গ্রহণ কর।

১৫। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা উভয়ে পান কর, উভয়েই প্রশস্ত রক্ষণ কার্য দ্বারা আমাদের সুখ দান কর।

টীকাঃ

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৪৭

অনুবাদঃ

১। হে যজ্ঞবর্ধয়িতা অশ্বিদ্বয়! এ অতিশয় মধুর সোম তোমাদের জন্য অভিযুক্ত হয়েছে। এটি কল্য প্রস্তুত হয়েছে, পান কর এবং হব্যদাতা যজমানকে রমনীয় ধন দান কর।

২। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের ত্রিবন্ধন যুক্ত ও ত্রিকোণ ও সুরূপ রথে আগমন কর; কবপুত্রেরা যজ্ঞে তোমাদের স্ত্রোত্র পাঠ করছে, তাদের আহ্বান সাদরে শ্রবণ কর।

৩। হে যজ্ঞবর্ধয়িতা অশ্বিদ্বয়। অতিশয় মধুর সোম পান কর; তার পরহে দস্রদ্বয়! অদ্য রথে ধন নিয়ে হব্যদাতার নিকট গমন কর।

৪। হে সর্বজ্ঞ অশ্বিদ্বয়! কক্ষ্যাত্রয়ে স্থিত যজ্ঞকুশে থেকে মধুর রস দ্বারা যজ্ঞ সিক্ত কর; হে অশ্বিদ্বয়! দীপ্তিমান কবপুত্রেরা সোম অভিষব করে তোমাদের আহবান করছে।

৫। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা উভয়ে যে অভীষ্ট রক্ষণকার্য দ্বারা কবকে রক্ষা করেছিলে, হে শোভনকর্ম পালক। সে রক্ষণকার্য দ্বারা আমাদের রক্ষা কর; হে যজ্ঞ বর্ধক! সোম পান কর।

৬। হে দস্রদ্বয়! তোমরা রথে ধন নিয়ে দুস্যসকে (১) অন্ন এনে দিয়েছিলে, সেরূপ অন্তরীক্ষ হতে অথবা দ্যুলোক হতে অনেকের বাঞ্ছিত ধন আমাদরেকে দান কর।

৭। হে নাসতাদ্বয়! তোমরা দুরেই থাক অথবা নিকটেই থাক, সূর্যোদয় কালে সূর্যরশ্মির সাথে নিজ সুনির্মিত রথে আমাদের নিকট এস।

৮। তোমরা সর্বদা যাগসেবী; তোমাদের সপ্ত অশ্ব তোমাদরে নিকটে এনে সবনাভিমুখে নিয়ে যাক; হে নরদ্বয়! শুভকর্মকারী ও দানশীল যজমানকে অন্ন দান করে তোমরা কুশে উপবেশন কর।

৯। হে নাসত্যদ্বয়! তোমরা যে রথে ধন নিয়ে হব্যদাতকে সর্বদা দান করছ, সেই সুর্য রশ্মিপরিবেষ্টিত রথে মধুর সোমপানার্থ আগমন কর।

১০। আমরা রক্ষার জন্য উকথ দ্বারা ও স্তোত্রদ্বারা প্রভূতধনশালী অশ্বিদ্বয়কে আমাদের অভিমুখে আহ্বান করছি; হে অশ্বিদ্বয়! কবপুত্রদের প্রিয় সদনে তোমরা সর্বদাই সোম পান করেছ।

টীকাঃ

১। সুদাসে শোভনদানযুক্ত রাজ্ঞে পিজবনপুত্রায়। সায়ণ। সুদাস পিজবন রাজার পুত্র এবং ঋগ্বেদে উল্লিখিত সকল রাজগণের মধ্যে সুদাসই প্রসিদ্ধ। ভারত আদি দশ জাতি তাকে আক্রমণ করেছিল, কিন্তু সুদাস তাদের পরাস্ত করেন। ৩ মন্ডলের ৩৩ সুক্ত এবং ৭ মন্ডলের ১৮ ও ৮৩ সুক্ত দেখুন। সেই ভারত জাতি কি পরে আবার কুরক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছিল? না সুদাসের ভারতদের সাথে যুদ্ধই বহুকাল পরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বলে মহাভারতে বর্ণিত হয়েছে।

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৪৮

অনুবাদঃ

১। হে দেবদুহিতা ঊষা! আমাদরে ধন দান করে প্রভাত কর; হে বিভাবরি! প্রভূত অন্ন দান করে প্রভাত কর; হে দেবি! দানশীল হয়ে ধনদান করে প্রভাত কর।

২। ঊষা অশ্বযুক্তা, গোসম্পন্না এবং সকল ধনপ্রদাত্রী; প্রজাদের নিবাসের জন্য তার অনেক সম্পত্তি আছে; হে ঊষা! আমাকে সুনৃত বাক্য, বল এবং ধনবানদের ধন দাও।

৩। ঊষা পুরাকালে প্রভাত করতেন, অদ্যও প্রভাত করেছেন; ধনলুদ্ধ লোক যেরূপ সমুদ্রে নৌকা প্রেরণ করে, ঊসার আগমনে যে রথসমূহ সজ্জিত হয়, ঊষা তা সেরূপে প্রেরণ করেন।

৪। হে ঊষা! তোমার আগমন হলে বিদ্বান লোকে দানে মনোনিবেশ করে এবং অতিশয় মেধাবী কবঋষি দানশীল মানবদের প্রসিদ্ধ নাম ঊষাকালেই উচ্চারণ করেন।

৫। ঊষা গৃহকার্যনেত্রী গৃহিনীর ন্যায় সকলকে পালন করে আগমন করেন; তিনি জঙ্গম প্রাণীদের (১) জাগরিত করেন, পদযুক্ত প্রাণীদের গমন করান এবং পক্ষীদের উড়িয়ে দেন।

৬। তুমি সমীচীন চেষ্টাবান পুরুষকে কার্যে প্রেরণ কর, তুমি ভিক্ষুকদেরও প্রেরণ কর, তুমি নীহারবর্ষী এবং অধিকক্ষণ অবস্থান কর না; হে অন্নযুক্ত যজ্ঞসম্পন্না ঊষা! তুমি প্রভাত হলে, উড্ডীয়মান পক্ষীগণ আর কুলায়ে অবস্থান করে না।

৭। তিনি রথ যোজিত করেছেন; এ সৌভাগ্যবতী ঊষা দূর হতে সূর্যের উদয় স্থানের উপরস্থ দিব্যলোক হতে শত রথ দ্বারা মানুষের নিকট আসছেন।

৮। তার প্রকাশ হবার জন্য সকল প্রাণী নমস্কার করছে; কেন না সে নেত্রী জ্যোতি: প্রকাশ করেন এবং সে ধনবতী স্বর্গদুহিতা বিদ্বেষীদের এবং শোষণকারীদের দুর করেন।

৯। হে স্বর্গদুহিতে! আহলাদকর জ্যোতির সাথে প্রকাশিত হও, দিনে দিনে আমাদের প্রভূত সৌভাগ্য এনে দাও এবং অন্ধকার দূর কর।

১০। হে নেত্রী ঊষা! সমস্ত প্রাণীর চেষ্টিত ও জীবন তোমাতেই আছে, কেন না তুমি অন্ধকার দূর কর। হে বিভাবরি! তুমি বৃহৎ রথে এস; হে বিচিত্র ধনযুক্তে! আমাদের আহ্বান শ্রবণ কর।

১১। হে ঊষা! মনুষ্যের যে বিচিত্র অন্ন আছে তা তুমি গ্রহণ কর; এবং যে যজ্ঞনির্বাহকেরা তোমাকে স্তুতি, করে সে শুভকর্মাদের হিংসারহিত যজ্ঞে আনয়ন কর।

১২। হে ঊষা! তুমি অন্তরীক্ষ হতে সকল দেবগণকে সোমপানাথে আনয়ন কর। হে ঊষা! তুমি আমাদের অশ্বগোযুক্ত এবং প্রশংসনীয় ও বীর্যসম্পন্ন অন্ন প্রদান কর।

১৩। যে ঊষার জ্যোতি শত্রুদের বিনাশ করে কল্যাণরূপে দৃষ্ট হয়, তিনি আমাদের সকলের বরণীয়, সুরুপ এবং সুখগম্য ধন প্রদান করুন।

১৪। হে পূজনীয় ঊষা! তোমাকে পূর্ব ঋষিগণ রক্ষণ এবং অন্নের জন্য আহ্বান করেছিলেন, তুমি ধন ও দীপ্তিযুক্ত তেজ্যেবিশিষ্ট হয়ে আমাদের স্তুতিতে তুষ্ট হও।

১৫। হে ঊষা! তুমি অদ্য জ্যোতি দ্বারা আকাশের দ্বারদ্বয় খুলে দিয়েছ, অতএব আমাদের হিংসক রহিত ও বিস্তীর্ণ গৃহ দান কর, এবং গেযুক্ত অন্ন দান কর।

১৬। হে ঊষা! আমাদের প্রভূত ও বহুবিধ রূপযুক্ত ধন দান কর এবং গাভী দান কর। হে পূজনীয় ঊষা! আমাদের সর্বশত্রুনাশক যশ দান কর। হে অন্নযুক্ত ক্রিয়াসম্পন্ন ঊষা! আমাদের অন্ন দান কর।

টীকাঃ

১। মুলে জরয়ন্তী বৃজনং আছে, অর্থ গমনশীলং জঙ্গমং প্রাণিজাতং জরয়ন্তী রাং পাপয়ন্তী। সায়ণ। কিন্তু পন্ডিতবর বেনফে এবং বলেনসন এ স্থানে জরয়ন্তী অর্থ জাগরিত করেন এরূপ অর্থ স্থির করেছেন, তদনুসারে মিউয়ার অনুবাদ করেছেন She hastens on arousing footed creatures.

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৪৯

অনুবাদঃ

১। হে ঊষা। দীপ্যমান আকাশের উপর হতে শোভনীয় মার্গ দ্বারা আগমন কর; অরুণবর্ণ গাভীসমূহ (১) তোমাকে সোমযুক্ত যজমানের গৃহে নিয়ে আসুক।

২। হে ঊষা! তুমি যে সুরূপ সুখকর রথে অধিষ্ঠান কর, হে স্বগদুহিতে। তা দিয়ে অদ্য হব্য দাতা যজমানের নিকট এস।

৩। হে অজুনি (২) ঊষা! তোমার আগমনের সময় দ্বিপদ ও চতুপদ ও পক্ষযুক্ত পক্ষীগণ আকাশ প্রান্তের উপরিভাগে গমন করে।

৪। হে ঊষা! তুমি অন্ধকার বিনাশ করে রশ্মিদ্বারা জগৎকে প্রকাশ কর; কবপুত্রগণ ধনপ্রার্থী হয়ে তোমাকে স্তুতি বচন দ্বারা স্তব করেছে।

টীকাঃ

১। মুলে অরুণপসরঃ আছে। অর্থ অরুণবর্ণা গাবঃ সায়ণ। প্রাতঃকালের কিরণসমূহকে অথবা সে কিরণে রঞ্জিত মেঘমন্ডলকে ঋগ্বেদে অনেক স্থলে গাভী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ৬ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা দেখুন।

২। অর্জুনি শুভ্রবর্ণ। সায়ণ। ঊষার এই বিশেষণ অর্জুনি হতে গ্রীকদিগের মধ্যে Argy noris এবং সম্ভবত Argos ও Acadia উৎপন্ন হয়েছে। ৩০ সুক্তের ২২ ঋকের টীকা দেখুন।

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৫০

অনুবাদঃ

১। সূর্য দীপ্তিমান ও সকল প্রাণীদের জানেন, তার অশ্বগণ (১) তাকে সমস্ত জগতের দর্শনের জন্য ঊর্ধ্বে বহন করেছে।

২। সমস্ত জগতের প্রকাশক সূর্যের আগমনে নক্ষত্রগণ তস্করের ন্যায়রাতের সঙ্গে চলে যায়।

৩। দীপ্যমান অগ্নির ন্যায় সূর্যের প্রজ্ঞাপক রশ্মিসমূহ সকল লোককে এক এক করে দেখছে ।

৪। হে সূর্য! তুমি মহৎপথ ভ্রমণ কর, তুমি সকল প্রাণীদের দর্শনীয়, তুমি জ্যেতির কারণ, তুমি সমস্ত দীপ্যমান অন্তরীক্ষে প্রভা বিকাশ করছ।

৫। তুমি দেবলোকগণের সম্মুখে উদয় হও, মনুষ্যদের সম্মুখে উদয় হও, তুমি সমস্ত স্বর্গলোকের দৃষ্টির জন্য উদয় হও।

৬। হে শোধনকারী অনিষ্টনিবারক (২) ! তুমি যে আলোক দ্বারা প্রাণীগণের পোষণকারীরূপে জগৎকে দষ্টি কর;

৭। সে আলোর দ্বারা রাতের সাথে দিনকে উৎপাদন করে এবং প্রাণীদের অবলোকন করে তুমি বিস্তীর্ণ দিবালোক ভ্রমণ কর।

৮। হে দীপ্তিমান সর্ব প্রকাশক সূর্য। হরিৎ নামক সপ্ত অশ্ব রথে তোমাকে বহন করে, জ্যেতিই তোমার কেশ।

৯। সূর্য রথবাহক সাতটি অশ্বীকে যোজিত করলেন, সেই স্বয়ংযুক্ত অশ্বীদের দ্বারা তিনি গমন করেছেন (৩)।১০। অন্ধকারের উপর উত্থিত জ্যোতি দৃষ্টি করে আমরা সমস্ত দেবগণের মধ্যে দ্যুতিমান সূর্যের নিকট গমন করি; তিনিই উৎকৃষ্ট জ্যোতিঃ।

১১। হে অনুকুল দীপ্তিযুক্ত সূর্য! অদ্য উদয় হয়ে এবং উন্নত আকাশে আরোহণ করে আমার হৃদরোগ এবং হরিমাণ রোগ নাশ কর।

১২। আমরা আমাদের হরিমাণ রোগ শুক ও শারিকা পক্ষীতে স্থাপন করি, আমাদের হরিমাণ হরিদ্রায় স্থাপন করি।

১৩। এই আদিত্য সমস্ত তেজের সাথে উথিত হয়েছেন, তিনি আমার অনিষ্টকারী রোগ বিনাশ করেছেন আমি সে অনিষ্টকারীকে বিনাশ করি না। (৪)

টীকাঃ

১। মুলে কেতবঃ শব্দ আছে। অর্থ সূর্যাশ্বাঃ যদ্বা সূর্যরুময়ঃ। সায়ণ। কিরণ সমূহকে ঋগ্বেদে অনেক স্থলে অশ্বের সাথে তুলনা করা হয়েছে ৩ সুক্তের ১ ঋকের টীকা ও ১৪ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

২। মুলে বরুণ শব্দ আছে, অর্থ অনিষ্টকারক সূর্য। সায়ণ। অত্র বরুণশব্দেন আদিত্য এবং উচাতে। সায়ণ।

৩।৮। ও ৯ ঋকে সূর্যের সাতটি অ্বের কথা আছে, তার অর্থ বোধ হয় সূর্যালোকে নিহিত সপ্তবর্ণ রশ্মি।

৪।১১।১২ ও ১৩ ঋক একটি চিত্র পীড়া আরোগ্যের জন্য সূর্যের উদ্দেশে এ মন্ত্রগুলি পড়তে হয়। কথিত আছে যে সূর্য প্রস্কব মুনি দ্বারা এরূপে স্তুত হয়ে সে মুনির শ্বেতি রোগ ভাল করে দিয়েছিলেন।

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৫১

অনুবাদঃ

১। যাঁকে অনেতে আহ্বান করে, যিনি স্তুতিভাজন এবং ধনের অর্ণব সে মেষ (১) ইন্দ্রকে স্তুতি দ্বারা হৃষ্ট কর। যার কর্ম সূর্য রশ্মির ন্যায় মানষদের হিতসাধন করে সে ক্ষমতাপন্ন ও মেধাবী ইন্দ্রকে ধন সম্ভোগার্থ অর্চনা কর।

১। ইন্দ্রের আগমন শোভাবিশিষ্ট তিনি অন্তরীক্ষ পূরণ করেন; তিনি বলসম্পন্ন দর্পস্থারী ও শতক্রতু। ঋভুগণ রক্ষণে ও বর্ধনে তৎপর হয়ে তার সম্মুখে এসে সহায়তা করেছিলেন এবং উৎসাহ বাক্যদ্বারা প্রোৎসাহ করেছিলেন (২) ।

৩। তুমি অঙ্গিরাঋষিদের জন্য মেঘ খুলে দিয়েছ; শতদবার যন্ত্রে প্রক্ষিপ্ত অত্রিকে তুমিই পণ দেখিয়েছিলে; তুমি বিমদ ঋষিকে অন্নযুক্ত ধন দিয়েছিলে (৩) এবং যুদ্ধে বর্তমান স্তোতার জন্য তুমি আপন বজ্র চালন করে তাকে রক্ষা কছিলে।

৪। তুমি জলধারী মেঘ খুলে দিয়েছ, তুমি পর্বতে বৃত্রাদি দানবদের ধন অপহরণ করে রেখেছ। হে ইন্দ্র! তুমি হত্যাকারী বৃত্রকে বধ করেছিলে এবং তারপর সূর্যকে লোকের দর্শনার্থ আকাশে আরোহণ করিয়ে দিয়েছিলে।

৫। যারা যজ্ঞ অন্ন আপনাদের মুখে স্থাপন করেছিল (৪) হে ইন্দ্র ! সে মায়াবীদের তুমি মায়া দ্বারা পরাস্ত করেছিলে। তুমি মানুষের প্রতি প্রসন্নমনা; তুমি পিপ্রু নগর ধ্বংস করেছিলে এবং ঋজিশ্বান নামক (৫) স্তোতাকে দস্যুদের হস্তে হত্যা হতে সম্যকরূপে রক্ষা করেছিলে।

৬। তুমি শুষ্ণ (অসুরের) সাথে যুদ্ধে কুৎস ঋষিকে রক্ষা করেছিলে, তুমি অতিথিদের রক্ষার্থ শম্বরকে হনন করেছিলে। তুমি মহান অর্বুদকে পদ দ্বারা আক্রমণ করেছিলে; (৬) অতএব তুমি দস্যু হত্যার জন্যই জন্মগ্রহণ করেছ।

৭। তোমাতে সমস্ত বল নি:সংশয়রূপে নিহিত আছে। তোমার মন সোমপানে হৃষ্ট হয়। তোমার হস্তদ্বয়ে বজ্র আছে তা আমরা জানি, অতএব শত্রুর সমস্ত বীর্য ছেদন কর।

৮। হে ইন্দ্র! কারা আর্য এবং কারা দস্যু তা অবগত হও। কুশযুক্ত যজ্ঞের বিরোধীদের শাসন করে বশীভূত কর (৭)। তুমি শক্তিমান, অতএব যজ্ঞ সম্পাদকদের সহায় হও। আমি তোমার হর্য জনক যজ্ঞে তোমার সেই কর্ম প্রশংসা করতে ইচ্ছা করি।

৯। ইন্দ্র যজ্ঞবিমুখদের যজ্ঞপ্রিয় যজমানদের বশীভূত করে ও অভিমুখস্তোতাদের দ্বারা স্তুতি পরামুখদের ধ্বংস করে অবস্থিতি করেন। বম্র ঋষি বর্ধনশীল ও স্বর্গব্যাপী ইন্দ্রের স্তুতি করতে করতে সঞ্চিত যজ্ঞাদ্রব্যসমূহ নিয়ে গিয়েছিলেন (৮)।

১০। হে ইন্দ্র! যখন উশনার (৯) বলদ্বারা তোমার বল তীক্ষ্ম হয়েছিল তখন তোমার বল বিশুদ্ধ তীক্ষ্মতা দ্বারা দ্যু ও পৃথিবীকে ভীত করেছিল। হে ইন্দ্র! তোমার মন মানুষের প্রতি প্রসন্ন, তুমি এরূপ বলপূর্ণ হলে তোমার ইচ্ছামাত্রে সংযোজিত ও বায়ুর ন্যায় বেগবিশিষ্ট অশ্বগণ তোমাকে আমাদের যজ্ঞের অন্নের অভিমুখে নিয়ে আসুক।

১১। যখন ইন্দ্র কমনীয় উশনার সাথে স্তুত হন তখন তিনি বক্রগতি অশ্বদ্বয়ে অধিষ্ঠান করেন। উগ্র ইন্দ্র গমনশীল মেঘসমূহ হতে প্রবাহরূপে জল নির্গত করেছেন এবং শুষ্ণের বিস্তীর্ণ নগর সমূহ ধ্বংস করেছেন।

১২। হে ইন্দ্র! তুমি সোমপানর্থ রথে আরোহণ করে গমন কর। যে সোমে তুমি হৃষ্ট হও, শার্যাত (১০) সে সোম প্রস্তুত করেছেন; অতএব অন্য যজ্ঞে তুমি যেরূপ অভিযুত সোম কামনা কর, সেরূপ শার্যাতের সোমও কামনা কর তা হলে বদব্যলোকে অবিচল যশ প্রাপ্ত হবে।

১৩। হে ইন্দ্র! তুমি অভিযবকারী ও স্তুত্যাকাঙ্ক্ষী বৃদ্ধ কক্ষীবান (রাজ্যকে) যুবতী বৃচয়া নান্মী স্ত্রী প্রদান করেছিলে (১১)। হে শোভন কর্মা ইন্দ্র তুমি বৃষণশ্চ রাজার মেনা নাম্নী কন্যা হয়েছিলে (১২)। এ সকল বিষয় অভিষবণ কালে বর্ণনা করা কর্তব্য।

১৪। শোভনকর্মা লোকদের নির্ধনতায় (রক্ষা করবার জন্য) ইন্দ্রকে সেবা করা হয়েছে; প্রজাদের (১৩) স্তোত্র দ্বারস্থিত যুপের ন্যায় অচল। ধনদাতা ইন্দ্র (যজমানদের জন্য) অশ্ব ইচ্ছা করেন, গো ইচ্ছা করেন, রথ ইচ্ছা করেন এবং অন্য ধন ইচ্ছা করে অবস্থিতি করেন।
১৫। হে ইন্দ্র! তুমি বৃষ্টিদান কর, তুমি নিজ তেজে বিরাজ করছ, তুমি প্রকৃত বলসম্পন্ন ও অতিশয় মহৎ, আমরা তোমাকে এ স্তুতি বাক্য প্রয়োগ করছি, যেন আমরা এ সংগ্রামে সমস্ত বীরগণদ্বারা যুক্ত হয়ে তোমার দত্ত শোভনীয় দৃহে বিদ্বান পুত্রাদির সাথে বাস করি।

টীকাঃ

১। মেঘং শত্রুভঃ স্পর্ধমানং। সায়ণ।

২। ঋভুদিগের সম্বন্ধে ২০ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন। কিন্তু সায়ণের মতে এখানে ঋভূগণ অর্থ মরুৎগণ।

৩। বিমদ ঋষি সম্বন্ধে জ১১৬ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন। অত্রি সম্বন্ধে ১১২ সুক্তের ৭ ঋকের টীকা দেখুন ও ১১৬ সুক্তের ৮ ঋক দেখুন। অঙ্গিরা ঋষি সম্বন্ধে ৩১ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

৪। কৌশিতকী শাখাধ্যায়ীরা বলেন অসুরগণ অগ্নিকে অবহেলা করে আপন মুখে হব্য দিয়েছিল। বাজসনেয়ীরা বলেন দেবগণের সঙ্গে অসুরদের বিদ্বেষ হওয়ায় অসুরগণ বলল আমরা কাকেও হব্য দেব না এ বলে তারা আপন সুখে হব্য দান করল।

৫। ১১ সুক্তের ৭ ঋকের টীকা এবং ৫৩ সুক্তের ৮ ঋকের টীকা দেখুন।

৬। সায়ণ অতিথির অর্থ করেন অতিথিবৎসল দিবোদাস রাজা। ১১২ সুক্তের ১৪ ঋকের টীকা দেখুন। শম্বর ও শুষ্ণ ও অর্বুদ সম্বন্ধে ১১ সুক্তের ৭ ঋকের টীকা দেখুন। কুৎস সম্বন্ধে ৩৩ সুক্তের ১৪ ঋকের টীকা ও ৬৩ সুক্তের ৩ ঋকের টীকা ও ১০৬ সুক্তের ৬ ঋকের টীকা দেখুন।

৭। এ ঋকে আর্য ও দস্যু, উভয় শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে। আর্যগণ দেবগণের যজ্ঞ করত, দস্যুগণ, ভারতবর্ষের আদিম অসত্য জাতিগণ যজ্ঞ করত না।

৮।১১২। সুক্তের ১৫ ঋকের টীকা দেখুন।

৯। উশনা বা শুক্রাচার্য পুরাণমতে অসুরদের দুত বা গুরু। তৈরত্তরীয় সংহিতায় আছে অগ্নিদে বানাং দুত আসীৎ উশনা কাব্যোহসুরাণাম। কিন্তু ঋগ্বেদে উশনা ইন্দ্রের হিতকারী, ইন্দ্রকে বজ্র দান করেছিলেন। ১২১ সুক্তের ১২ ঋক দেখুন।

১০।কৌশিতকীয় ইতিহাসে বলে, ভুগুবংশীয় চ্যবন ঋষি শর্ষাতি রাজর্ষির কন্যার পাণি গ্রহণ করেন। তদুপলক্ষে একটি যজ্ঞ হয় এবং তথায় ইন্দ্র ও অশ্বিদ্বয় উপস্থিত ছিলেন। চ্যবনঋষি অশ্বিদ্বয়ের গ্রহণীয় হব্য নিজে গ্রহণ করেছিলেন। তা দেখে ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, তাকে ইন্দ্রকে বিনয় করে তাকে পুনরায় সোম দেওয়া হয়েছি।
১১। কক্ষীবান রাজার জন্ম সম্বন্ধে ১৮ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন। সে রাজ্য অনেকবার রাজসুয় যজ্ঞ করেন এবং তার কৃত যজ্ঞে পরিতৃষ্ট হয়ে ইন্দ্র তাকে বুচয়া নান্মী তরুণী স্ত্রী প্রদান করেন। সায়ণ।

১২। সায়ণ ব্রাহ্মণ হতে এ গল্পটি উদ্ধৃত করেছেন। যথা, ইন্দ্র বৃযণশ্চ রাজার কন্যা মেনা হয়েছিলেন, পরে মেনাকে প্রাপ্তযৌবনা দেখে ইন্দ্র স্বয়ং তার সাথে সহবাস অভিলাষ করেছিলেন।পৌরাণিক মেনা হিমালয়ের পত্নী।

১৩। পজ্রা ইতি অঙ্গিরসাং আখ্যা। সায়ন।

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৫২

অনুবাদঃ

১। শত স্তোতা একেবারে যার স্তুতি কার্যে প্রবৃত্ত হয়, যিনি স্বর্গ জানিয়ে দেন, সে মেষ ইন্দ্রকে সম্যকরূপে পূজা কর। তার রথ গমনশীল অম্বের ন্যায় বেগে যজ্ঞের দিকে গমন করে, আমি রক্ষার হেতু ইন্দ্রকে সে রথে উঠবার জন্য অনেক স্তুতি দ্বারা অনুরোধ করছি।

২। যখন যজ্ঞান্নপ্রিয় ইন্দ্র জল বর্ণষ করে নদী প্রতিরোধকারী বৃত্রকে হত করলেন, তখন তিনি ধারাবাহী জলের মধ্যে পর্বতের ন্যায় অচল হয়ে লোকদের সহস্ররূপে রক্ষা করে প্রভূত বলপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

৩। তিনি আবরণকারী শত্রুদের জয় করেন, তিনি জলবৎ অন্তরীক্ষে ব্যাপ্ত আছেন, তিনি সকলের আহলাদের মূল এবং সোমপানে বর্ধিত হয়েছেন; আমি মনীষী ঋত্বিকদের সাথে সে প্রবৃদ্ধ ধনসম্পন্ন ইন্দ্রকে শোভন কর্মযোগ্য অন্ত:করণের সাথে আহ্বান করছি, কেননা তিনি অন্ন পূরণ করেন।

৪। সমুদ্রের আত্মীয়ভূত ও অভিমুখগামী নদীসমূহ যেরূপ সমুদ্রকে পূরণ করে, সেরূপ কুশস্থিত সোমরস দিব্যলোকে ইন্দ্রকে পূরণ করে; শত্রুশোষণকারী ও অপ্রতিহত ও শোভনরূপ মরুৎগণ বৃত্রহনন সময়ে সে ইন্দ্রের সহায় হয়ে নিকটে উপস্থিত ছিলেন।

৫। গমনশীল জল যেরূপ নিন্মদেশে যায়, ইন্দ্রের সহজায়ভূত মরুৎগণ হৃষ্ট হয়ে সেরূপ যুদ্ধে লিপ্ত ইন্দ্রের সম্মুখে বৃষ্টিযুক্ত বৃত্রের অভিমুখে গেলেন। ত্রিত (১) যেরূপ পরিধি সমুদয় ভেদ করেছিলেন, ইন্দ্র সেরূপ যজ্ঞের অন্ন দ্বারা প্রোৎসাহিত হয়ে বলকে ভেদ করেন।

৬। জল রুদ্ধ করে যে বৃত্র অন্তরীক্ষের উপরিপ্রদেশে শয়ান ছিল এবং অন্তরীক্ষে যার ব্যাপ্তি অসীম, হে ইন্দ্র! যখন তুমি সে বৃত্রের হনুদ্বয় শব্দায়মান বজ্র দ্বারা আঘাত করেছিলে তখন তোমর শত্রু বিজয়িনী দীপ্তি বিস্তৃত হয়েছিল এবং তোমার বল প্রদীপ্ত হয়েছিল।

৭। ঊর্মি সমূহ যেরূপ হ্রদপ্রাপ্ত হয় সেরূপ যে স্তোত্রসমূহ তোমাকে বর্ধন করে সে সমস্ত তোমাকে প্রাপ্ত হয়। ত্বষ্টা তোমার যোগ্য বল বৃদ্ধি করেছেন এবং তার পরাভবকারী বল দ্বারা বজ্র তক্ষ্মি করেছেন।
৮। হে সিদ্ধকর্মা ইন্দ্র! তুমি অশ্বযুক্ত হয়ে মানুষের নিকট অগমনার্থ বৃত্তকে হত করেছ, বৃষ্টিবর্ষণ করেছ, হসতদ্বয়েলৌহ বজ্র গ্রহণ করেছ, এবং আমাদের দর্শ নার্থ কআকাশে সূর্য স্থাপন করেছ।

৯। স্তোতৃগণ বৃত্রের ভয়ে স্ত্রোত্র রচনা করেছে, সে স্ত্রোত্র বৃহৎ আহ্লাদজনক, বলযুক্ত এবং স্বর্গের সোমপান স্বরূপ; তখন স্বর্গরক্ষক মরুৎগণ মানুষের জন্য যুদ্ধ করে এবং মানুষগণকে পালন করে ইন্দ্রকে প্রোৎসাহিত করেছিলেন।

১০। হে ইন্দ্র! তুমি অভিষুত সোমপান করে হৃষ্ট হলে যখন তোমার বজ্র দ্যু ও পৃথিবীর বাধনকারী বৃত্রের মসতক বেগে ছিন্ন করেছিল, তখন বলবান আকাশও সে অহির শব্দে ভয়ে কম্পিত হয়েছিল।

১১। যদি পৃথিবী দশগুণ হত, যদি মানুষ সকল নিত্য কাল জীবিত থাকত, হে মঘবন! তা হলেই তোমার ক্ষমতা প্রকৃত রূপে প্রসিদ্ধ হত; তোমার বলসাধিত ক্রিয়া আকাশের ন্যায় মহৎ।

১২। হে শত্রু বিনাশক ইন্দ্র! এই ব্যাপ্ত অন্তরীক্ষের উপরে থেকে তুমি নিজ ভুজ বলে আমাদের রক্ষার জন্য ভূলোক সৃষ্টি করেছ; তুমি বলের পরিমাণ স্বরূপ; তুমি সুগন্তব্য অন্তরীক্ষ ও স্বর্গ ব্যাপ্ত করে আছ।

১৩। তুমি বিস্তীর্ণ পৃথিবীর পরিমাণ স্বরূপ; তুমি দর্শনীয় দেবগণের বৃহৎ স্বর্গের পালনকারী; তুমি প্রকৃতই নিজ মহত্ত্ত দ্বারা সমস্ত অন্তরীক্ষ ব্যাপ্ত করে আছ; অতএব তোমার সদৃশ অন্য কেউ নেই।

১৪। দ্যু ও পৃথিবী যে ইন্দ্রের ব্যাপ্তি প্রাপ্ত হয় নি, অন্তরীক্ষের উপরস্থ প্রবাহ যার তেজের অন্ত পায়নি, হে ইন্দ্র! তুমি একা অন্য সমস্ত ভূতজাতকে তোমার অধীন করেছ।

১৫। মরুৎগণ এ সংগ্রামে তোমাকে অর্চনা করেছিলেন; যখন তুমি অশ্রিযুক্ত বজ্র দ্বারা বৃত্রের মুখের উপর আঘাত করেছিলে, তখন সকল দেবগণ যুদ্ধে তোমাকে আনন্দিত দেখে আনন্দিত হয়েছিলেন।

টীকাঃ

১। সায়ণ তৈত্তিরীয় সংহিতা অনুসারে ত্রিত সম্বন্ধে এরূপ লিখেছেন, দেবগণের হব্যের চিহ্ন বিমোচনার্থ অগ্নি জল হতে একত, দ্বিত, ও ত্রিত নামে তিন জন পুরুষ সৃষ্টি করেন। ** ত্রিত উদক পানে প্রবৃত্ত হয়ে কূপে পড়েছিলেন, অসুরেরা তাকে প্রতিরোধ করবার জন্য পরিধি অর্থাৎ কূপের আচ্ছাদন সৃষ্টি করল, ত্রিত তা ভেদ কারছিলেন। ইন্দ্র যেরূপ অহি বা বৃত্তের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন, ত্রৈতন বা ত্রিতত্ত সেরূপ করেছিলেন, তা ঋগ্বেদের স্থানে স্থানে পাওয়া যায়। ত্রিত বা ত্রৈতন যে আর্যদের অতি পুরাতন দেব তা ইরানীয় অবস্থায় দেখা যায়। ঋগ্বেদে অহিহস্তা ইন্দ্র যেরূপ উপাস্য অবস্থায় অজি হস্তা থেতন সেরূপ উপাস্য। ঋগ্বেদের ত্রিত আপ্তা বংশীয় (১০৫ সুক্তের ৯ ঋক দেখুন) অবস্থার থতন ও আথা বংশীয়। আবার ইরানীয়দের জেন্দ অবস্থা রচনার প্রায় দু হাজার বছর পর এ ত্রৈত্যনর গল্প ইরানীয়দের ইতিহাসে প্রবেশ করল। পারস্যদের প্রধান কবি ফেরদৌসী নিজ শাহনামা নামক কাব্যে লিখেছেন যে জোহক নামে পারস্যদেশের ত্রিমস্তক সম্পন্ন রাজ্য ছিলেন এবং পফরুদীন তাকে বিজয় করেন। এ জোহক জেন্দ অবস্থায় অজি দহক এবং বেদের অহি এবং এই ফেরুদীন জেন্দ অবস্থার থ্রেতন এবং বেদের ত্রতন। উপাখ্যানের উৎপত্তি কি বিস্ময়কর! গ্রীকদের ধর্মোপাখ্যানে ও প্রাচীন আর্য ত্রিত দেবের পরিচয় পাওয়া যায় গ্রীকদের প্রধান দেব Zeus এবং তার কন্যা Athene (সংস্কৃত অহনা) কখন কখন ত্রিত কন্যা (Tritogeneia) নামে বর্ণিত হতেন। অতএব প্রতীয়মান হচ্ছে যে আপ্তাবংশীয় অহি হস্তা ত্রিত বা ত্রৈতন আর্যদের অতি প্রাচীন উপাস্য দেব ছিলেন, পরে হিন্দুগণ যখন ইন্দ্রকেই অহিহন্তা বলে অধিক উপাসনা করতে লাগলেন, তখন ত্রিত কেবল একজন বীর মানুষ বলে পরিগণিত হলেন। ১০৬ সুক্তের ৬ ঋকের টীকা এবং ১৫৮ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা দেখুন।

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৫৩

অনুবাদঃ

১। আমরা মহাত্মা ইন্দ্রের উদ্দেশে শোভনীয় বাক্য প্রয়োগ করি এবং পরিচর্যারত যজমানের গৃহে শোভনীয় স্তুতি প্রয়োগ করি। ইন্দ্র সুগ্ধ ব্যক্তিদের ধনের ন্যায় শত্রুর ধন অতি সত্বর অধিকার করেছেন, ধনদাতাদের প্রতি অসমীচীন স্তুতি শোভা পায় না।

২। হে ইন্দ্র! তুমি অশ্ব দান কর, গো দান কর, যবাদি ধান্য দান কর এবং তুমি নিবাস হেতুভুত ধনের প্রভু ও পালক। তুমি শিক্ষার নেতা, তুমি বহুদিনের পুরাতন দেব, তুমি কামনা ব্যর্থ করনা, তুমি সখাদের মধ্যে সখা। তারই উদ্দেশে আমরা এ স্তুতি পাঠ করি।

৩। হে প্রজ্ঞাবান, প্রভূতকর্মা ও অতিশয় দীপ্তিমান ইন্দ্র! সকল দিকে যে ধন আছে তা তোমারই তা আমরা জানি। হে শত্রুদের পরাভবকারী ইন্দ্র! সে ধন গ্রহণ করে আমাদের দান কর; যে স্তোতৃগণ তোমাকে কামনা করে, তাদের অভিলাষ ব্যর্থ করো না।

৪। হে ইন্দ্র! এ দীপ্ত হব্যসমূহ ও এ সোমরস সমূহে তুষ্ট হয়ে গো এবং অশ্বযুক্ত ধন দান করে আমাদের দারিদ্র্য দূর করে প্রসন্নমনা হও। এ সোমরসে তুষ্ট ইন্দ্রের সাহায্যে আমরা দস্যুকে ধ্বংস করে এবং শত্রু হতে মুক্তি লাভ করে সম্যকরূপে অন্ন ভোগ করব।

৫। হে ইন্দ্র! আমরা যেন ধন পাই, অন্ন পাই এবং অনেকের আহলাদকর ও দীপ্তিমান বল পাই। যেন তোমার দীপ্তিমান সুমতি আমাদের সহায় হয়, সে সুমতি বীর শত্রুদের শোষণ করে, স্তোতৃদের গো আদি পশু দান করে এবং অন্ন দান করে।

৬। হে সজনপালক ইন্দ্র! বৃত্রহননের সয় তোমার আনন্দদায়ী সহায় মরুৎগণ তোমাকে হৃষ্ট করেছিল; হে বর্ষণকারী ইন্দ্র! সে হব্য সমুদয় ও সোমরস সমুদয় তোমাকে হ্রষ্ট করেছিল, যে সময়ে তুমি শত্রুদের দ্বারা অপ্রতিহত হয়ে স্তুতিকারক ও হব্যদাতা যজমানের জন্য দশ সহস্র উপদ্রব বিনাশ করেছিলে।

৭। হে ইন্দ্র! তুমি শত্রুবর্ষণকারীরূপে যুদ্ধ হতে যুদ্ধাস্তরে গমন কর, বলদ্বারা নগরের পর নগর ধ্বংস কর। হে ইন্দ্র! তুমি নথী ঋষির সহায়ে (১) দুর দেশে মনুচি নামক মায়াবীকে বধ করেছিলে।

৮। তুমি অতিথিপ্ব নামক রাজার জন্য করঞ্জ ও পর্ণর নামক শত্রুদ্বয়কে তেজস্বী বর্তনী দ্বারা বধ করেছ; তারপর তুমি অনুচর রহিত হয়ে ঋজিশ্বান নামক রাজার দ্বারা চারদিকে বেষ্টিত বঙ্গৃদ নামক শত্রুর শত নগর তভদ করেছিলে (২)।

৯। সহায় রহিত সুশ্রবা নামক রাজার সাথে যুদ্ধ করবার জন্য যে বিংশ নরপতি ও ৬০,০৯৯ অনুচর এসেছিল, হে প্রসিদ্ধ ইন্দ্র! তুমি শত্রুদের অলঙ্ঘ্য রথচক্র দ্বারা তাদের পরাজিত করেছিলে (৩)।

১০। হে ইন্দ্র! তুমি তোমার রক্ষাসমূহ দ্বারা সুশ্রবা রাজাকে রক্ষা করেছিলে, তুর্বযান রাজাকে তোমার পরিত্রাণ সাধন সমূহ দ্বারা রক্ষা করেছিলে; তুমি কুৎস, অতিথিব ও আয়ুকে এ মহৎ যুবক রাজার অধীন করেছিলে (৪)।

১১। হে ইন্দ্র! আমরা তোমার সখা স্বরূপ যজ্ঞ সমাপ্তিতে বর্তমান আছি ও দেবগণের দ্বারা পালিত হচ্ছি; আমাদের সকলই মঙ্গল। আমর তোমার স্তুতি করি এবং তোমার প্রসাদে শোভনীয় সুত্র পাই ও প্রকৃষ্টরূপে দীর্ঘ জীবন ধারণ করি।

টীকাঃ

১। মুলে নম্যা সখ্যা আছে। শত্রুষু নমনশীলেন সখ্যা সহায়ভূতের বজেণ। সায়ণ। কিন্তু বেদার্থযত্ন এবং রমানাথ সরুবতী অর্থ করেছেন নমী নামক ঋষির সাহায্যে। এ অর্থই প্রকৃত, কেননা ঋগ্বেদের ৬ মন্ডলের ২০ সুক্তের ৬ ঋকে এবং ১০ মন্ডলের ৪৮ সুক্তের ৯ ঋকে দেখা যায় যে ইন্দ্র নমী ঋষির হিতার্থ নমুচি নামক অসুরকে বিনাশ করেছিলেন। নমুচি সম্বন্ধে ১১ সুক্তের ৭ ঋকের টীকা দেখুন।

২। অতিথিপ্ব ৫১ সুক্তের ৬ ঋকের টীকা দেখুন। ঐ সুক্তের ৫ ঋকের ঋজিশ্বানের উল্লেখ দেখুন। করঞ্জ ও পর্ণয় ও বঙ্গদকে সায়ণ অসুর বলে বর্ণনা করেছেন, আর কোন পরিচয় দেননি।

৩। এ ঘটনা সম্বন্ধে সায়ণের টীকায় আর কোনও বিবরণ নেই। বায়ু পুরাণে সু্শ্রবা একজন প্রজাপতি।

৪। কুৎস সম্বন্ধে ৬৩ সুক্তের ৩ ঋকের ও ১০৬ সুক্তের ৬ ঋকের টীকা দেখুন। পুরাণে পুরুরবার পুত্র আয়ুঃ; এ ঋকে আয়ু নাম আছে, বিসর্গ নেই। তুর্বযান সম্বন্ধে সায়ণ এখানে কিছু বলেন নি, কিন্তু ৬ মন্ডলের ১৮ সুক্তের ২৩ ঋকের টীকার সায়ণ বলেছেন যে তুর্বযান দিবোদাস হতে পারে।

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৫৪

অনুবাদঃ

১। হে মঘবন! এ পাপে এ যুদ্ধ সমূহে আমাদের প্রক্ষেপ করো না, কেন না তোমার বলের অন্ত পরিমাণ করা যায় না। তুমি অন্তরীক্ষে থেকে অতিশয় শব্দ করে নদীর জলকে শব্দিত করছ। পৃথিবী ভয় প্রাপ্ত হবে না কেন?

২। শক্তিসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান ইন্দ্রকে অর্চনা কর; তিনি স্তুতি শ্রবণ করেন, তাকে পূজা করে স্তুতি কর। যিনি শত্রুবিজয়ী বল দ্বারা দ্যু ও পৃথিবী উভয়কে অলঙ্কৃত করেন, যিনি বর্ষণকারী, সে বর্ষণসামর্থ্য দ্বারা বৃষ্টি দান করেন।

৩। যিনি শত্রু বিঝয়ী ও নিজ বলে দৃঢ়মনা, সে দীপ্তিমান ও মহৎ ইন্দ্রের উদ্দেশে সুখকর স্তুতি বাক্য উচ্চারণ কর। কেননা তিনি প্রভূতষশশালী ও অসুর (১) এবং শত্রুদের দুর করেন; তিনি অশ্বদ্বয় দ্বারা সেবিত, অভীষ্টবর্ষী বেগবান।

৪। হে ইন্দ্র! তুমি মহৎ আকাশের উপরি প্রদেশ কম্পিত করেছ। তুমি নিজের শত্রুবিনাশী ক্ষমতা দ্বারা শম্বরকে স্বয়ং বধ করেছ; তুমি হৃষ্ট উল্লাসিত মনে তীক্ষ্ম ও রশ্মিযুক্ত বজ্র দলবদ্ধ মায়াবীদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছ।

৫। হে ইন্দ্র! তুমি শব্দ করে বায়ুর উপর এবং শোষক ও পরিপাককারী সূর্যের মস্তকে জল বর্ষণ করেছ। তোমার মন পরিবর্তন রহিত এবং শত্রু বিনাশে রত, তুমি অদ্য যে কার্য সম্পাদন করলে তাতে কে তামার উপরে আছে?

৬। তুমি নর্য, তুর্বশ, যদু নামক রজাদের রক্ষা করেছ; হে শতক্রতু! তুমি বর্ষ কুলের তুবীতি নামক রাজাকে রক্ষা করেছ; তুমি আবশ্যকীয় ধন নিমিত্ত যুদ্ধে তাদের রথ ও অশ্ব (২) রক্ষা করেছ; তুমি শম্বরের নবনবতি নগ ধ্বংস করেছ।

৭। যিনি ইন্দ্রকে হব্য দান করে ইন্দ্রের স্তুতি প্রচার করেন, অথবা হব্যের সাথে উকথ পাঠ করেন, তিনিই বিরাজ, করেন, তিনি সাধুগণকে পালন করেন এবং আপনাকে বর্ধন করেন; ফলদাতা ইন্দ্র তার জন্য আকাশ হতে মেঘের জল বর্ষণ করেন।

৮। ইন্দ্রের বল অতুল, তার বুদ্ধিও অতুল। হে ইন্দ্র। যারা তোমাকে হব্যদান করে তোমার মহৎ বল অতুল, তার বুদ্ধিও অতুল। হে ইন্দ্র! যারা তোমাকে হব্যদান করে তোমার মহৎ বল এবং স্থুল পৌরুষ বৃদ্ধি করে, সে সোমপায়ী গণ যজ্ঞকর্মদ্বারা প্রবৃদ্ধ হোক।

৯। এ সোমরসমূহ প্রস্তর দ্বারা অভিষুত ও পরে স্থাপিত এবং ইন্দ্রের পানের যোগ্য; হে ইন্দ্র! এ সকল তোমারই জন্য হয়েছে, তুমি এ গ্রহণ কর, অভিলাষ তৃপ্তি কর এবং তৎপরে আমাদের ধন প্রদান করতে মনোনিবেশ কর।

১০। অন্ধকার বৃষ্টির ধারা রোধ করেছিল, বৃত্রের জঠরের ভিতর মেঘ ছিল; বৃত্রের দ্বারা নিহিত হয়ে যে জলসমুদয় ক্রমান্বয়ে অবস্থিত ছিল ইন্দ্র তা নিন্ম ভূপ্রদেশে প্রেরণ করলেন।

১১। হে ইন্দ্র! আমাদরে বর্ধনশীল যশ দান কর, মহৎ শত্রুপরাজয়ী প্রভূত বল দান কর, আমাদের ধনবান করে রক্ষা কর, বিদ্বানদের পালন কর এবং আমাদের ধন ও শোভনীয় অপত্য ও অন্ন দান কর।

টীকাঃ

১। মুলে অসুয় শব্দ আছে। সায়ণ তার তিন প্রকার অর্থ করেছেন অসুরঃ শতনাং নিরসিতা। যদ্বা অসুৎ প্রাণো বলং বা তদ্বান। অথবা অসবঃ প্রাণ্াঃ তেন চাপঃ লক্ষ্যন্তে** তান রাতি দদাতি ইতি অসুরঃ। অর্থাঃ অসুর অর্থ শত্রু বিনাশক অথবা বলবান অথবা বৃষ্টিদাতা। অসুর সম্বন্ধে ২৪ সুক্তের ১৪ ঋকের টীকা দেখুন। আমরা সে টীকায় বলেছি যে প্রথমে আর্যগণ উপাস্যদের দেব ও অসুর উভয় নামেই সম্বোধন করতেন, পরে আর্যগণ দুভাগে বিভক্ত হলে, ইরাণীয় আর্যগণ উপাস্যগণকে অহুর বলে পূজা করতেন ও পাপমতি জীবদের দেব বলে ঘৃণা করতেন এবং হিন্দু আর্যগণ উপাস্যদের দেব বলে পূজা করতেন, এবং পাপমতি দানব প্রভৃতিকে অসুর বলে ঘৃণা করতেন। ঋগ্বেদে অনেক স্থলে দেখতে পাই দেবগণকে অসুর বলে সম্বোধন করা হয়েছে কেন না তখনও দেব ও অসুর এ দুই শব্দের সম্পূর্ণরপ ভিন্ন অর্থ হয়নি হিন্দুগণ অসুর অর্থে দেবশত্রু করেন নি। এমন কি ঋগ্বেদের প্রারম্ভে অসুর শব্দ কেবল দেবগণের সম্বন্ধেই প্রয়োগ হয়েছে, দানবদের সম্বন্ধে প্রয়োগ হয়নি; ঋগ্বেদের মধ্যে ও শেষভাগে অসুর শব্দ কখন দানবদের সম্বন্ধে প্রয়োগ হয়েছে। প্রথম মন্ডলে অসুর শব্দ কেবল দ্বাদশ বার প্রয়োগ হয়েছে এবং সে সকল স্থলেই দেব বা পুরোহিতদের সম্বন্ধে কোনও এক স্থলেও দানবদের সম্বন্ধে এ শব্দের প্রয়োগ নেই।

পঞ্চম মণ্ডল: সুক্ত - ৫৫

অনুবাদঃ

১। ইন্দ্রের প্রভাব আকাশ অপেক্ষাও বিস্তীর্ণ হয়েছিল, পৃথিবীও মহত্ত্ব বিষয়ে ইন্দ্রের সমতুল্য হতে পারে নি। ভয়স্কর ও বলবান ইন্দ্র মানুষদের জন্য শত্রুকে দগ্ধ করেন; বৃষ যেরূপ শৃঙ্গ ঘর্ষণ করে, ইন্দ্র সেরূপ তীক্ষ্মতার জন্য বজ্র ঘর্ষণ করছেন।

২। অন্তরীক্ষব্যাপী ইন্দ্র সমুদ্রের ন্যায় স্বীয় বিস্তীর্ণ তা দ্বারা বহুব্যাপী জল সমুদয় গ্রহণ করেন। তিনি সোমপানার্থ বৃষের ন্যায় বেগে ধাবমান হন এবং সে যোদ্ধা পুরাকাল হতে আপন বীরত্বের প্রশংসা ইচ্ছা করেন।

৩। হে ইন্দ্র! তুমি নিজের সম্ভোগার্থ মেঘ বিভিন্ন করনি; তুমি মহৎ ধনপতিদের উপর আধপত্য কর। সে দেব ইন্দ্র নিজ বীর্য দ্বারা বিশেষরূপে পরিচিত হয়েছেন, সমস্ত দেবগণ উগ্র ইন্দ্রকে তার কর্মের জন্য সম্মুখে স্থান দিয়েছেন।

৪। সে ইন্দ্রই অরণ্যে স্তুতিকারী ঋষিদের দ্বারা স্তুত হন; তিনি লোকদের মধ্যে স্বীয় বীর্য প্রকটিত করে চারভাবে অবস্থিতি করেন। যখন হবাদাতা ধনবান যজমান ইন্দ্রদ্বারা রক্ষিত হয়ে স্তুতি বাক্য উচ্চারণ করে, তখন সে অভষ্টবর্ষী ন্দ্রি যজ্ঞে রত করেন।

৫। সে ুদ্ধে ইন্দ্র মনুষাদের জন্য সর্ববিশুদ্ধকারী বল দ্বারা মহৎ সংগ্রামসমূহে লিপ্ত হন। যখন তিনি হজননসাধন বজ্র ক্ষেপণ করেন, তখন দীপ্তিমান ইন্দ্রকে সকলে বলবান বলে শ্রদ্ধা করেন।

৬। শোভনকর্ম ইন্দ্র যশ কামনা করে, সুনির্মিত (অসুর) গৃহ সকল বলদ্বারা বিনাশ করে পৃথিবীর সমান বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে, জ্যোতিষ্কদের আবরণ রহিত করে, যজমানের উপকারার্থ বহনশীল বৃষ্টিজল দান করেন।

৭। হে সোমপায়ী ইন্দ্র! তোমার মন দানে রত হোক। হে স্তুতিপ্রিয় তোমার হরিনামক অশ্বদ্বয়কে আমাদরে যজ্ঞের অভিমুখী কর! হে ইন্দ্র! তোমার সারথিগণ অশ্বসংযমে অতিশয় পটু, এজন্য তোমার প্রতিকুলমনা শত্রুগণ আয়ুধ নিয়ে তোমাকে পরাজিত করতে পারে না।

৮। হে ইন্দ্র! তুমি হস্তদ্বয় অনন্ত ধন ধাণ কর, তুমি যশস্বী ও শরীরে অপরাজিত বল ধারণ কর। কূপ সমুদয় যেরূপ জলার্থী লোক দ্বারা বেষ্টিত থাকে, তোমার অঙ্গ সমুদয় বীরত্বের কর্মসমূহদ্বারা বেষ্টিত; তোমার শরীরে বহু কর্ম বিদ্যমান রয়েছে।

টীকাঃ

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৫৬

অনুবাদঃ

১। অশ্ব যেরূপ অশ্বীর দিকে বেগে ধাবমান হয় সেরূপ প্রভূতাহারী ইন্দ্র সে যজমানের প্রভূত পাত্রস্থিত খাদ্যের দিকে ধাবমসান হয়েছেন। তিনি সুবর্ণময় অশ্বযুক্ত ও রশ্মিযুক্ত রথ থামিয়ে পান করছেন, তিনি মহৎ কার্যে সুদক্ষ।

২। ধনার্থী বণিকেরা যেরূপ সকল দিকে ব্যেপে রয়েছে। নারীগণ যেরূপ (পুষ্পচয়নার্থ) পর্বত আরোহণ করে, হে স্তোতা! তুমিও প্রবৃদ্ধ যজ্ঞের প্রতিপালক বলবান ইন্দ্রের নিকট একটি তেজ:পূর্ণ স্তোত্রদ্বারা সেরূপ শীঘ্র আরোহণ কর।

৩। ইন্দ্র ক্ষিপ্রকারী ও মহান; তার দোষশূন্য ও শত্রুবিনাশক বল পুরুষোচিত সংগ্রামে গিরির শৃঙ্গের ন্যায় দীপ্তিমান হয়। শত্রুদমনকারী লৌহধারী ইন্দ্র (সোমপানে) হৃষ্ট হলে সে বল দ্বারা মায়াবী শূষ্ণকে কারাগৃহে নিগড়বদ্ধ করে রেখেছিলেন।

৪। যেরূপ সূর্য ঊষাকে সেবা করেন, দীপ্তিমান বল সেরূপ তোমার রক্ষণের জন্য তোমার স্ত্রোত্র দ্বারা বর্ধিত ইন্দ্রকে সেবা করে। সে ইন্দ্র পরাভবকারী বলদ্বারা অন্ধকাররূপ বৃত্তকে দমন করেন এবং শত্রুদের ক্রন্দন করিয়ে বিশেষরূপে ধ্বংস করেন।

৫। হে শত্রুহসতা ইন্দ্র! যখন তুমি বৃত্ত দ্বারা অবরুদ্ধ জীবনধারক ও বিনাশরহিত জল আকাশ হতে সকল দিকে বিতরণ করলে তখন হৃষ্ট হয়ে সংগ্রামে বৃত্তকে হনন করেছিলে এবং জলের সমুদ্রের ন্যায় মেঘকে নিষ্মমুখ করে দিয়েছিলে।

৬। হে ইন্দ্র! তুমি মহান, তুমি বল দ্বারা আকাশ হতে পৃথিবীর প্রদশ সমূহে জীবনদারক বৃষ্টি দান কর; তুমি হৃষ্ট হয়ে মেঘ হতে জল বার কের দিয়েছ এবং গুরু পাষাণ দ্বারা বৃত্রকে ধ্বংস করেছ।

টীকাঃ

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৫৭

অনুবাদঃ

১। অতিশয় দানশীল ও মহৎ ও প্রভূতধনযুক্ত অমোঘ বলসম্পন্ন ও প্রকান্ড দেহ বিশিষ্ট ইন্দ্রের উদ্দেশে আমি মননীয় স্তুতি সম্পাদন করছি। নিম্ন প্রদেশাভিমুখ জলরাশির ন্যায় তার বল কেউ ধারণ করতে পারে না, তিনি স্তোতৃদের বল সাধনের জন্য সর্বব্যাপী সম্পদ প্রকাশ করেন।

২। হে ইন্দ্র! এ বিশ্বজগৎ তোমার যজ্ঞে রত ছিল; জল যেরূপ নিম্নে যায়, হব্যদাতাদের অভিযুত সোমরস সমূহ তোমার দিকে প্রবাহিত হয়েছিল। ইন্দ্রের শোভনীয় সুবর্ণময় ও হননশীল বজ্র পর্বতে নিদ্রিত ছিল না।

৩। হে শুভ্র ঊষা! ভয়স্কর ও অতিশয় স্তুতিভাজন ইন্দ্রকে এ যজ্ঞে এক্ষণে যজ্ঞন্ন প্রদান কর। তারা বিশ্বধারক, প্রসিদ্ধ ও ইন্দ্রত্বচিহ্নযুক্ত জ্যোতি অশ্বের ন্যায় তাকে যজ্ঞান্ন প্রাপ্তির জন্য ইতস্ত্রতঃ বহন করছে।

৪। হে প্রভূতধনশালী ও বহু লোকের স্তুত ইন্দ্র! আমরা তোমাকে অবলম্বন করে যজ্ঞ সম্পাদন করছি, আমরা তোমারই। হে স্তুতিভাজন! তুমি ভিন্ন অন্য কেউ স্তুতি পায় না; পৃথিবী যেরূপ (স্বকীয় প্রাণীদের ধারণ করেন) তুমিও সেরূপ আমাদের সে স্তুতি বাক্য গ্রহণ কর।

৫। হে ইন্দ্র! তোমার বীর্য মহৎ আমরা তোমারই। হে মঘবন! এ স্তোতার কামনা পূর্ণ কর। বৃহৎ আকাশ তোমার বীর্য মেনে নিয়েছে। এ পৃথিবীও তোমার বলে নত হয়েছে।

৬। হে বজ্রযুক্ত ইন্দ্র! তুমি যে বিস্তীর্ণ মেঘকে বজ্র দ্বারা পর্বে পর্বে কেটে দিয়েছ; সে মেঘে আবৃত জলবয়ে যাবার জন্য নিম্ন দিকে ছেড়ে দিয়েছ; কেবল তুমিই বিশ্বব্যাপী বল ধারণ কর।

টীকাঃ

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৫৮

অনুবাদঃ

১। মহাবলে জাত (১) ও মরণ রহিত অগ্নি শীঘ্রই ব্যথাদান করেন। দেবগণের আহবানকারী ইন্দ্র যখন যজমানের হব্যবাহক দূত হয়েছিলেন তখন সমীচীন পথ দ্বারা গিয়ে অন্তরীক্ষ নির্মাণ করেছিলেন (২); তিনি যজ্ঞে হব্যদ্বারা দেবগণের পরিচর্যা করেন।

২। জরারহিত অগ্নি তৃণ গুল্মাদিরূপ আপন খাদ্য মিশ্রিত ও ভক্ষণ করে শীঘ্রই কাষ্ঠে আরোহণ করেন। দহনার্থ ইতস্ততঃ গামী অগ্নির পৃষ্ঠদেশ স্থিত জ্বালা অম্বের ন্যায় শোভা পায় এবং আকাশের উন্নত শব্দায়মান মেঘের ন্যায় শব্দ করে।

৩। অগ্নি হব্য বহন করেন এবং রুদ্র ও বসুদের সম্মুখে স্থান পেয়েছেন। তিনি দেবগণের আহ্বানকারী এবং যজ্ঞস্থানে উপস্থিত থাকেন। তিনি ধন জয় করেন এবং মরণ রহিত। দীপ্তিমান অগ্নি যজমানদের স্তুতি লাভ করে রথের ন্যায় গমন করে প্রজাদিগের গৃহে বার বার বরণীয় ধন প্রদান করেন।

৪। অগ্নি বায়ু দ্বারা প্রেতি হয়ে মহা শব্দের সাথে এবং জ্বলন্ত জিহ্বা ও প্রসারিত তেজের সাথে অনায়াসে বৃক্ষ সমূহে স্থান পায়; হে অগ্নি! যখন তুমি বন বৃক্ষ সমূহ শীঘ্র দগ্ধ করবার জন্য বৃষের ন্যায় ব্যগ্ন হও, হে দীপ্তিজ্বাল জরারহিত অগ্নি! তখন তোমার গমনামার্গ কৃষ্ণ বর্ণ হয়।

৫। অগ্নি বাহু দ্বারা প্রেরিত হয়ে, শিখারূপে অস্ত্র ধারণ করে মহা তেজের সাথে অশোষিত বৃক্ষ রস আক্রমণ করে, গোযুথের মধ্যে বৃষের ন্যায় সমস্ত পরাজয় করে চারিদিকে বিস্তৃত হন; স্থাবর ও জঙ্গম সকলে বহু বিচারী অগ্নিকে ভয় করে।

৬। হে অগ্নি! মনুষ্যদের মধ্যে ভৃগুগণ দিব্য জন্ম প্রাপ্তির জন্য তোমাকে শোভনীয় ধনের ন্যায় ধারণ করেছিলেন। তুমি সহজে লোকের আহ্বান শ্রবণ কর এবং (দেবগণকে) আহ্বান কর তুমি যজ্ঞস্থানে অতিথি স্বরূপ এবং বরণীয় মিত্রের ন্যায় সুখদাতা। জ
৭। সাত জন আহ্বানকারী ঋত্বিক যজ্ঞসমূহে যে পরম যজ্ঞাহ এবং দেবগণের আহ্বানকারী অগ্নিকে বরণ করেন, সে সর্বধন দাতা অগ্নিকে আমি যজ্ঞান্নের দ্বারা পরিচর্যা করি এবং তার নিকট রমনীয় ধন যাচ্ঞা করি।

৮। হে বলপুত্র। হে অনকুলদীপ্তিযুক্ত অগ্নি! তুমি স্তুতিকারকের গৃহস্বরূপ হও। হে ধনবান অগ্নি! ধনবান যজমানদের প্রতি কল্যাণ স্বরূপ হও। হে অগ্নি! স্তুতি কারকদের পাপ হতে রক্ষা কর। প্রজ্ঞাধনসম্পন্ন অগ্নি এ প্রাতে শীঘ্র আগমন করুন।

টীকাঃ

১। অর্থাৎ কাষ্ঠদ্বয় বলদ্বারা ঘর্ষণ করলে অগ্নি জন্মায়। সায়ণ।

২। অন্তরীক্ষ পূর্ব অবধিই ছিল। কিন্তু অন্ধকারে অপ্রকাশ ছিল; এখন অগ্নির তেজে প্রকাশ পেয়ে যেন নতুন সৃষ্ট হল। সায়ণ।

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৫৯

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! অন্য অগ্নিসমূহ তোমার শাখামাত্র, তোমাতে সকল অমরগণ হাষ্ট হন; হে বৈশ্বানর! তুমি মানুষদের নাভিম্বরূপ, তুমি নিখাত স্তম্ভের ন্যায় লোকদের ধারণ কর।

২। অগ্নি স্বর্গের মস্তক, পৃথিবীর নাভি এবঙ দ্যু ও পৃথিবীর অধিপতি হয়েছিলেন। হে বৈশ্বানর! তুমি দেব, দেবগণ আর্যের জন্য তোমাকে জ্যোতি:পূপে উ:পন্ন করেছিলেন।

৩। সূর্যে যেরূপ ধ্রুব রশ্মিসমূহ স্থাপিত আছে, বৈশ্বানর অগ্নিতে সেরূপ ধনসমূদয় স্থাপিত হয়েছিল। পর্বতসমূহে, ওষধি সমূহে, জলসমূহে ও সকল মানুষে যে (ধন) তুমি তার রাজা।

৪। উভয় পৃথিবী পুত্র বৈশ্বানর বারা যেন বৃহ: হয়ে উঠল। বন্দী যেরূপ প্রভুর স্তুতি করে, সেরূপ এ সুদক্ষ হোতা শোভনগতি যুক্ত, প্রকৃত বল সম্পন্ন এবঙ নেতৃশ্রেষ্ঠ বৈশ্বানরের উদ্দেশে বহুবিধ মহ: স্তুতিবাক্য প্রয়োগ করেছে।

৫। হে বৈশ্বানর! তুমি সমুৎপন্ন সকল প্রাণীকেই জান, তোমার মাহাত্ম্য মহৎ আকাশ হতেও অধিক; আমি মানব প্রজাদিগের রাজ্য, তুমি যুদ্ধ দ্বারা দেবগণের জন্য ধন উদ্ধার করেছ।

৬। মানুষরা যে বৃত্রহস্তা বৈশ্বানরকে বৃষ্টির জন্য অর্চনা করে, সে জলবর্ষী বৈশ্বানরের মাহাত্ম্য আমি শীঘ্র বলছি। বৈশ্বানর অগ্নি দস্যুকে হনন করেছেন, বৃষ্টির জল নীচে প্রেরণ করেছেন এবং শশ্বরকে ভেদ করেছেন।

৭। বৈশ্বানর মাহাত্ম্য দ্বারা সকল মানুষের অধিপতি ও সুনুতবাক্যসম্পন্ন। শতবনি পুত্র পুরুণীথ (১) রাজ্য বহু স্তুতির সাথে সে অগ্নিকে স্তব করেন।

টীকাঃ

১। শতবনি অর্থে যিনি শত যজ্ঞ সম্পাদন করেছেন, পুরুণীথ অর্থে যিনি অনেকের নেতা। সায়ণ। এ রাজাদের ইতিহাস সম্বন্ধে সায়ণ কিছু বলেননি।

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৬০

অনুবাদঃ

১। অগ্নি হব্যবাহক ও যশস্বী, যজ্ঞপ্রকাশক এবং সম্যক রক্ষণশীল, তিনি দেবগণের দূত এবং সদাই দেবগণের নিকট হব্য নিয়ে গমন করেন, তিনি দুটি কাষ্ঠ হতে জাত এবং ধনের ন্যায় প্রশংসিত: মাতরিবা (১) এ অগ্নিকে মিত্রের ন্যায় ভুগুবংশীয়দের নিকট আনলেন।

২। উভয় দেব ও মানুষগণ এ শাসনকর্তাকে সেবা করে, হব্যগ্রাহী দেবগণ এবং মানুষেরা এ’র সেবা করে। কেন না এ পূজ্য প্রজাপালক এবং ফলদাতা আহ্বানকারী অগ্নি সূর্যের পূর্বে ঊষাকালে বর্তমান থকে যজমানদের মধ্যে স্থাপিত হয়েছেন।

৩। আমাদরে নতুন স্তুতি হৃদয়জাত ও মিষ্ট জিহ্ব অগ্নির সম্মুখে ব্যাপ্ত হোক; মনুর সন্তান মানুষগণ যথাকালে যজ্ঞ সম্পাদন করে ও যজ্ঞান্ন প্রদান করে সে অগ্নিকে সংগ্রামকালে উৎপন্ন করে।

৪। অগ্নি কামনার পাত্র এবং বিশুদ্ধকারী, তিনি নিবাস হেতু এবং বরণীয় ও দেবগণের আহ্নকারী; যজ্ঞগৃহে প্রবিষ্ট মানুষদের মধ্যে তাকে স্থাপন করা হয়েছে। তিনি শত্রুদের দমনে কৃতসঙ্কল্প হয়ে এবং আমাদরে গৃহসমূহের পালনকর্তা হয়ে যজ্ঞগৃহে ধনাধিপতি হোন।

৫। হে অগ্নি! আমরা গৌতম গোত্রীয়; তুমি ধনপতি, রক্ষণশীল ও যজ্ঞান্নের কর্তা। আরোহী যেরূপ অশ্বকে হস্ত দ্বারা মার্জিত করে, আমরা তোমাকে সেরূপ মার্জিত করে মননীয় স্তোত্র দ্বারা প্রশংসা করব। অগ্নি প্রজ্ঞা দ্বারা ধন প্রাপ্ত হয়েছেন, এ প্রাত:কালে শীঘ্র আসুন।

টীকাঃ

১। যাস্ক মাতরিবা অর্থে বায়ু করেছেন, সায়ণও বলেন মাতরি অন্তরীক্ষে শ্বসিতি প্রাণিতি বত’তে ইতি যাবৎ ইতি মাতরিশ্বা বায়ুঃ। কিন্তু আধুনিক পন্ডিতগণ এ অর্থ গ্রহণে অসম্মত। আচার্য বোটলিং এবং রোথ তাদের জগদ্বিখ্যাত অভিধানে বলেন যে মাতরিশ্বার দুটি অর্থ বেদে দেখা যায়। প্রথম, মাতরিশ্বা একজন দেব যিনি বিরুস্বানের দূতরূপে আকাশ হতে অগ্নি এনে ভূগুবংশীয়দের দেন। দ্বিতীয় মাতরিশ্বা অগ্নিরই একটি গুপ্ত নাম। তারা আরও বলেন যে, মাতরিশ্বা বায়ু অর্থে বেদের কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। মাতরিশ্বা যে বেদে অগ্নির একটি নাম তা ৩ মন্ডলের ২৬ সুক্তের ২ ঋকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, সে ঋকটি এই তং শুভ্রং অগ্নিং অবসে হবামহে বৈশ্বানরং মাতরিশ্বানং উক খ্যং। আবার এই ১ মন্ডলের ১৬ সুক্তের ৪ ঋকে ও টীকা দেখুন। মাতরিশ্বা অর্থে অগ্নি তা সায়ণ সে ঋকের ব্যাখ্যায় স্বীকার করেছেন। এবং ৩ মন্ডলের ২৬ সুক্তের ২ ঋকের টীকা দেখুন। যদি মাতরিশ্বা ঋগ্বেদে প্রকৃতই অগ্নির একটি নাম হয় তবে এ মাতরিশ্বা কর্তৃক স্বর্গ হতে অগ্নি আনার আখ্যান হতে কি গ্রীকদের Prometheus দেবের গল্প উৎপন্ন হয়েছে? আর ভৃগুবংশীয়দের নিকট মাতরিশ্বা অগ্নিকে এনে দিয়েছিলেন এরই বা অর্থ কি? পন্ডিতবর মিউয়র বিবেচনা করেন ভারতবর্ষে ভৃগু, মনু, অঙ্গিরা প্রভৃতি কয়েকটি ঋষিবংশদ্বারা অগ্নির পূজা প্রচার হয়েছিল।

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৬১

অনুবাদঃ

১। ইন্দ্র বলবান, ত্বরান্বিত ও গুণ দ্বারা মহৎ স্তুতির উপযুক্ত এবং অপ্রতিহতগতি। বুভুক্ষিতকে যেরূপ অন্নদান করে, আমি ইন্দ্রকে তার গ্রহণ যোগ্য স্তুতি পূর্ববর্তী যজমানপ্রদত্ত যজ্ঞান্ন প্রদান করি।

২। তাঁকে অন্নের ন্যায় হব্য দান করছি, শত্রু পরাজয় সাধনস্বরূপ স্তুতিশব্দ সম্পাদন করেছি। অন্য স্তোতাগণও সে পুরাতন স্বামীকে হৃদয়ের সাথে মনের সাথে এবং জ্ঞানদ্বারা স্তুতি সম্পাদন করে।

৩। সেই উপমানভূত বরণীয় ধনদাতা ও বিজ্ঞ ইন্দ্রকে বর্ধন করবার জন্য আমি মুখ দ্বারা উৎকৃষ্ট ও নির্মুল স্তুতিবচনযুক্ত অতি মহৎ শব্দ করছি।

৪। যেরূপ পথ নির্মাণকর্তা রথস্বামীর নিকট রথ চালায় সেরূপ আমি ইন্দ্রের উদ্দেশে স্তোত্র প্রেরণ করি; স্তুতিভাজন ইন্দ্রকে শোভনীয় স্তুতিবাক্য প্রেরণ করি; মেধাবী ইন্দ্রকে বিশ্বব্যাপী হব্য প্রেরণ করি।

৫। অশ্বকে যেরূপ রথে সংযোজিত করে আমি সেরূপ অন্ন প্রাপ্তির ইচ্ছায় স্তুতিরূপ মন্ত্র বাগিন্দ্রিয়ে ধারণ করি; সে বীর, দানশীল অন্নবিশিষ্ট এবং নগরবিদারী ইন্দ্রকে বন্দনা করতে প্রবৃত্ত হই।

৬। ত্বষ্ট ইন্দ্রের জন্য যুদ্ধার্থে শোভনকর্ম ও সুপ্রেরণীয় বজ্র নির্মাণ করেছিলেন, ঐশ্বর্যবান ও অপরিমিত বলবান ইন্দ্র শত্রুবিনাশে উদ্যত হয়ে সে হননকারী বজ্র দ্বারা বৃত্রের মর্ম ভেদ করেছিলেন।

৭। জগতের নির্মাণকর্তা ইন্দ্রের এ মহৎ যজ্ঞে যে অভিষব দেওয়া হয়েছে, ইন্দ্র তাতে সোমরূপ অন্ন সদ্যই পান করেছেন এবং শোভনীয় হব্যরূপ অন্ন ভক্ষণ করেছেন। তিনি বিষ্ণু (১) শত্রুর পরিপক্ক ধন অপহরণকারী, শত্রুপরাজয়ী ও বজ্রক্ষেপক; তিনি বরাহকে অর্থাৎ মেঘকে প্রাপ্ত হয়ে তাকে ভেদ করেছিলেন।

৮। ইন্দ্র অহিকে হনন করলে গমনশীল দেবপত্নীগণও তাকে স্তুতি করেছিলেন। ইন্দ্র বিস্তৃত আকাশ ও পৃথিবী অতিক্রম করেছিলেন। তারা ইন্দ্রের মহিমা অতিক্রম করতে পারে না। ইন্দ্রের মাহাত্ম্য দ্যুলোক ও ভূলোক ও অন্তরীক্ষ অপেক্ষাও অধিক। তিনি নিজ আবাসে স্বকীয় তেজে বিরাজ করেন, সকল কার্যে সমর্থ হন। তার শত্রু সুযোগ্য, তিনি যুদ্ধগমনে নিপূণ এবং মেঘরূপ শত্রুদের যুদ্ধে আহ্বান করেন।

১০। ইন্দ্র স্বকীয় বলদ্বারা জলশোষক বৃত্রকে বজ্র দ্বারা ছেদন করেছিলেন; এবং গাভীসমূহের ন্যায় বৃত্রদ্বারা অবরুদ্ধ জগতের রক্ষণশীল জলসমূদয় ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি হব্যদাতাকে তার অভিলাষানুসারে অন্ন দান করেন।

১১। ইন্দ্রের ক্ষমতাহেতু সমুদ্র ও নদীসকল শোভা পাচ্ছে, কেননা ইন্দ্র বজ্র দ্বারা তাদের সীমা নির্দেশ করে দিয়েছেন। আপনাকে ঐশ্বর্যবান করে এবং হব্যদাতাকে ফল প্রদান করে, ইন্দ্র ত্বরান্বিত হয়ে তুবীতি ঋষির জন্য একটি অবস্থানযোগ্য স্থান সৃষ্টি করলেন (২);

১২। ইন্দ্র ক্ষিপ্রকারী, সকলের ঈশ্বর এবং অপরিমিত বলশালী। হে ইন্দ্র! তুমি এ বৃত্রকেই বজ্র প্রহার কর, গরুর ন্যায় বৃত্রের শরীরের সন্ধিগুলি তির্যক অবস্থিত বজ্র দ্বারা কর্তন কর (৩), যেন বৃষ্টি এবং জল বিচরণ করতে পারে।

১৩। যিনি মন্ত্রদ্বারা স্তুত্য সে ক্ষিপ্রগামী ইন্দ্রের পূর্ব কর্ম সকল বর্ণনা কর। তিনি যুদ্ধের জন্য অস্ত্র সকল নিক্ষেপ করে শত্রুদের হনন করে তাদের সম্মুখে গমন করেন।

১৪। এই ইন্দ্রের ভয়ে পর্বতগণ নিশ্চল হয়ে থাকে, ইন্দ্র প্রাদুর্ভুত হলে আকাশ ও পৃথিবী কম্পিত হয়। নোধাঋষি সে কমনীয় ইন্দ্রের রক্ষণকার্য অনেক সুক্ত দ্বারা বার বার প্রার্থনা করে সদ্যই বীর্য লাভ করেছিলেন।

১৫। তিনি একাকী বহুবিধ ধনের স্বামী। তিনি যে স্তোত্র এ স্তোতৃদের নিকট যাচ্ঞা করেছেন সে স্তোত্র তাকে দাও। স্বশ্বপুত্র সূর্যের যুদ্ধের সময় সোমাভিষবকারী এতশ ঋষিকে ইন্দ্র রক্ষা করেছিলেন (৪)।

১৬। হে অশ্বযুক্ত রথেশ্বর ইন্দ্র! গোতমগণ তোমাকে যজ্ঞে উপস্থিত করবার জন্য স্তুতিরূপ মন্ত্রসমূহ রচনা করেছে; সে স্তোতৃদের বহুবিধ বুদ্ধি প্রদান কর। যিনি বুদ্ধি দ্বারা ধন পেয়েছেন, সে ইন্দ্র প্রাতে শীঘ্র আগমন করুন।

টীকাঃ

১। মূলে বিষ্ণু আছে। জগতো ব্যাপকঃ। সায়ণ।

২। ভুবীত ঋষি জলমগ্ন হচ্ছিলেন, ইন্দ্র তাকে উদ্ধার করে ভূমিতে স্থাপন করেছিলেন। সায়ণ।

৩। মুলে গোঃ ন পর্ব বিরদা আছে। যথা মাংসস্য বিকর্ত্তারঃ লৌকিকা পুরুষাঃ পশোরবয়বান ইতস্ততো তদ্বৎ। সায়ণ। বৃত্রাসুরের শরীরের সন্ধি সকল তির্যকভাবে বজ্রদ্বারা ছেদন করুন, যেরূপ মাংসচ্ছেদক ব্যক্তিরা গোপশুর অবয়ব সকল ছেদন করে পৃথক করে। রমানাথ সরস্বতী।

৪। স্বশ্ব নামে এক রাজা পুত্রকামনা করে সূর্যকে উপাসনা করেছিলেন, সূর্য স্বয়ং তার পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার সাথে এতশ নামক মহর্ষির যুদ্ধ হয় । সায়ণ।

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৬২

অনুবাদঃ

১। বলবান স্তুতিভাজন ইন্দ্রের উদ্দেশে আমরা অঙ্গিরার ন্যায় সুখকর স্তোত্র মনে ধারণ করি। তিনি শোভনীয় স্তোত্র দ্বারা স্তুতিকারী ঋষির অর্চনাভাজন। সে প্রখ্যাত নেতাকে আমরা স্তোত্র দ্বারা পূজা করি।

২। যে স্তোত্র উচ্চৈঃস্বরে গীত হতে পারে এরূপ মহৎ স্তোত্র তোমরা সে মহান বলবান ইন্দ্রের উদ্দেশে অর্পণ কর। তার সহায়তায় আমাদের পূর্বপুরুষ অঙ্গিরাগণ, পদচিহ্ন দেখে পূজা করতঃ পণি অসুর দ্বারা অপহৃত গাভী উদ্ধার করেছিলেন।

৩। ইন্দ্র ও অঙ্গিরা গাভী অন্বেষণ করলে সরমা স্বীয় তনয়ের নিমিত্ত অন্ন প্রাপ্ত হয়েছিল (১)। তখন বৃহস্পতি ইন্দ্র (২) অসুরকে বধ করলেন ও গাভী উদ্ধার করলেন। দেবগণও গাভীদের সাথে হর্ষসূচক শব্দ করতে লাগল।

৪। হে শক্তিমান ইন্দ্র! সপ্ত সংখ্যক ও সঙ্গতি অভিলাষী নবগ্ব ও দশগ্ব (৩) মেধাবীগণের সুখশ্রাব্য স্বরযুক্ত স্তোত্র দ্বারা তুমি স্তুত হবে। তোমার স্বরে পর্বত ভীত হয় এবং শস্যোৎপাদক মেঘও ভীত হয়।

৫। হে দর্শনীয় ইন্দ্র! তুমি অঙ্গিরাগণের দ্বারা স্তুত হয়ে ঊষা ও সূর্যের কিরণ দ্বারা অন্ধকার বিনাশ করেছ। হে ইন্দ্র! তুমি পৃথিবীর সানুপ্রদেশ সমতল করেছ এবং অন্তরীক্ষের মূল প্রদেশ দৃঢ় করেছ।

৬। ইন্দ্র পৃথিবীর উপরে স্থাপিত মধুর উদকপূর্ণ যে চারটি নদী জলপূর্ণ করেছেন, তা সে দর্শনীয় ইন্দ্রের অতিশয় পূজ্য ও সুন্দর কর্ম।

৭। যে ইন্দ্রকে (যুদ্ধরূপ) প্রযত্ন দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া যায় না কিন্তু স্তোতার স্তুতিদ্বারা পাওয়া যায়, সে ইন্দ্র একত্র সংলগ্ন দ্যাব্য পৃথিবীকে দ্বিধা করে স্থাপন করেছেন এবং সে শোভনকর্মা ইন্দ্র সুন্দর ও উৎকৃষ্ট নভস্থলে সূর্যের ন্যায় এ দ্যাবা পৃথিবীকে ধারণ করেছেন।

৮। বিভিন্নরূপা, নিত্যজাতা ও যুবতীর ন্যায় রজনী ও ঊষা দ্যাবা পৃথিবীতে বহুকাল হতে পরুপরাক্রমে আগমন করতঃ বিচরণ করেছেন; রাত্রি কৃষ্ণবর্ণ ও ঊষা দীপ্তিমান শরীরযুক্ত।

৯। যে ইন্দ্র শোভনীয় কর্ম সম্পাদন করেন, যিনি বলের পুত্র এবং উৎকৃষ্ট কর্মযুক্ত, তিনি যজমানদের পুরাতন বন্ধুত্ব পোষণ করেন। হে ইন্দ্র! তুমি অপরিপক্ক গাভীদেরও পক্ক দুগ্ধ দান করেছ এবং গাভী কৃষ্ণবর্ণ বা লোহিত বর্ণ হলেও তন্মধ্যে শুক্রবর্ণ দুগ্ধ দান করেছ।

১০। যে স্থির অঙ্গুলি সকল চিরকাল সন্নদ্ধ হয়ে অবস্থান করেও আলস্য রহিত হয়ে স্বীয় বলদ্বারা বহুসহস্র ব্রত পালন করেছে, সে সেবা পরায়ণ ভগ্নীগণ দেবপত্মীর ন্যায় লজ্জারহিত ইন্দ্রের সেবা করে (৪)।

১১। হে দর্শনীয় ইন্দ্র! তুমি মন্ত্র ও নমস্কার দ্বারা স্তুত হও। যে মেধাবীগণ সনাতন কর্ম বা ধন কামনা করে তারা বহু প্রয়াসে তোমাকে প্রাপ্ত হয়। হে বলবান ইন্দ্র! যেরূপ আকাঙ্ক্ষিণী পত্নী আকাঙ্ক্ষী পতিকে প্রাপ্ত হয় সেরূপ স্তুতি তোমাকে স্পর্শ করে।

১২। হে দর্শনীয় ইন্দ্র! চিরকাল হতে যে ধন তোমার হস্তে আছে তা কখন নাশ বা ক্ষয় প্রাপ্ত হয় না। হে ইন্দ্র! তুমি বুদ্ধিমান, দীপ্তিমান, এবং যজ্ঞবিশিষ্ট। হে কর্মবান ইন্দ্র! তোমার কর্ম দ্বারা আমাদরে ধন দাও।

১৩। হে ইন্দ্র! তুমি সকলের আদি; হে সুনেত্র বলবান ইন্দ্র! তুমি রথে অশ্ব যোজনা কর; গৌতম ঋষির পুত্র নোযা আমাদের নিমিত্ত তোমার এ নুতন স্তোত্র রচনা করেছেন। অতএব যিনি কর্ম দ্বারা ধন প্রাপ্ত হয়েছেন, সে ইন্দ্র প্রাতঃকালে শীঘ্র আগমন করুন।

টীকাঃ

১। সরমা দেবকুক্কুরী। পণি গাভী সকল অপহরণ করলে ব্যাধ যেরূপ মৃগের অন্বেষণে কুক্কুর পাঠায় সেরূপ ইন্দ্র সরমাকে গাভীর উদ্দেশে পাঠালেন। সরমা বলল ইন্দ্র! যদি আমাদের শিশুকে সে গাভীর দুগ্ধ দাও তবে যাব। ইন্দ্র সম্মত হলেন। পরে সরমা গিয়ে সে গাভীর অনুসন্ধান করলে ইন্দ্র তা উদ্ধার করলেন। সায়ণ। ৬ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা দেখুন।

২। বৃহস্পতিঃ শব্দের অর্থ বৃহতাং দেবানাং অধিপতিরিন্দ্রঃ। সায়ণ।

৩। নবগ্বৈঃ ও দশগ্বৈঃ শব্দর অর্থ, যে নবভিঃ মাসেঃ সমাপ্য গতা স্তেনবগ্বাঃ যে তু দশভিমাসৈঃ সমাপ্য জন্মুস্তে দশগ্বাঃ সায়ণ।
৪। অহ্রয়াণং এর অর্থ প্রশস্তগতি অথবা লজ্জারহিত হয়। সায়ণ। অঙ্গুলিরূপ ভগ্নীগণ পত্নীর ন্যায় ইন্দ্রকে সেবা করছে, অতএব লজ্জারহিত অর্থটি ভাল হয়।

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৬৩

অনুবাদঃ

১। হে ইন্দ্র! তুমি সর্বাগ্রগণ্য; ভয়ের সময়ে তোমার শত্রু শোষণকারী বল দ্বারা তুমি দ্যাবা পৃথিবী ধারণ করেছিলে। বিশ্বের সমস্ত ভূত ও পর্বতসমূহ এবং অন্য যে সমস্ত মহৎ ও দৃঢ় পদার্থ আছে, তারাও নভঃস্থলে সূর্যরশ্মির ন্যায় তোমার ভয়ে কম্পিত হয়েছিল।

২। হে ইন্দ্র! তুমি যখন তোমার বিবিধ গতিযুক্ত অশ্ব রথে সংযোজিত কর, তখন স্তোতা তোমার হস্তে বজ্র স্থাপন করে, তুমি সে বজ্র দ্বারা শত্রুর অনভীপ্সিত কর্ম করে শত্রুদের বিনাশ কর। হে বহু লোকের আহূত ইন্দ্র! তুমি তা দিয়ে অনেক নগর ধ্বংস কর।

৩। হে ইন্দ্র তুমিই সত্য, তুমি এ সকল শত্রুর ধর্ষণকারী; তুমি ঋভূগণের অধিপতি, নরের হিতকারী; ও শত্রুহস্তা। সাংঘাতিক ও তুমুল সংগ্রামে তুমি দীপ্তিমান তরুণ কুৎসের (১) সহায় হয়ে শুষ্ণকে বধ করেছিলে।

৪। হে বৃষ্টি বর্ষণকারী, বজ্রী ইন্দ্র। তুমি যখন শত্রুকে বধ করেছিলে; হে শুর, অভীষ্ট বর্ষণাভিলাষী ও শত্রুবিজয়ী ইন্দ্র! তুমি যখন সংগ্রামে দস্যুদিগকে পরাঙ্মুখ করতঃ ধ্বংস করেছিলে, তখন তুমি কুৎসের সহায় হয়ে তাকে প্রসিদ্ধ যশ প্রেরণ করেছিলে।

৫। হে ইন্দ্র! তুমি কোন দৃঢ় ব্যক্তির হানি করতে ইচ্ছা কর না; তথাপি মনুষ্যগণ শত্রুদের দ্বারা উপদ্রুত হলে তুমি তাদরে অশ্ব বিচরণের জন্য চারিদিক খুলে দাও এবং হে বজ্রী! কঠিন বজ্র দ্বারা শত্রুদের বিনাশ কর।

৬। হে ইন্দ্র! যে সংগ্রামে যোদ্ধাগণ লাভ ও ধনপ্রাপ্ত হয় তাতে মনুষ্যেরা তোমাকে (সায়ার্থ) আহ্বান করে। হে বলবান ইন্দ্র! সংগ্রামে তোমার এ রক্ষণকার্যআমাদরে দিকে প্রসারিত হোক যেহেতু যোদ্ধাগণ তোমার রক্ষণ ভাজন।

৭। হে বজ্রিন! তুমি পুরুকুৎসের সহায় হয়ে যুদ্ধ করে সেই সপ্ত নগর ধ্বংস করেছ, তুমি সুদাস রাজার নিমিত্ত অংহা নামক শত্রুর ধন, যজ্ঞ কুশের ন্যায় আনায়াসে কর্তন করেছ। পরে হে রাজন! সে হব্যদাতা সুদাসকে সে ধন দিয়েছ (২)

৮। হে দেব! তুমি আমাদরে বিচিত্র অন্ন সমস্ত ভূমিতে জলের ন্যায় বর্ধিত কর। হে শুর! সকল দিকে যেমন জল ক্ষরিত হতে দিয়েছ, সেরূপ সে অন্ন দ্বারা আমাদের জীবন প্রদান করেছ।

৯। হে ইন্দ্র! তুমি অশ্বযুক্ত; গৌতমগণ তোমার উদ্দেশে ভক্তি পূর্বক মন্ত্রসমূহ উচ্চারণ করেছে; তুমি আমাদের বহুবিধ অন্ন প্রদান কর। যিনি কর্মদ্বারা ধন প্রাপ্ত হয়েছেন সে ইন্দ্র প্রাত:কালে শীঘ্র আসুন।

টীকাঃ

১। কুৎস সম্বন্ধে ৩৩ সুক্তের ১৪ ঋকের টীকা দেখুন। কিন্তু এখানে কুৎসা একজন যোদ্ধা বলে বর্ণিত হয়েছেন।

২। সুদাস সম্বন্ধে ৪৭ সুক্তের ৬ ঋকের টীকা দেখুন। পুরুকুৎসা রাজা মান্ধাতার পুত্র এরূপ পুরাণে দেখা যায়।

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৬৪

অনুবাদঃ

১। হে নোধা! বর্ষণকারী, শোভনযজ্ঞ ও ফলসাধক মরুৎগণের উদ্দেশে সুন্দর স্তোত্র প্রেরণ কর। যে বাক্যদ্বারা বৃষ্টিধারার ন্যায় যজ্ঞস্থলে দেবগণকে অভিমুখ করা যায়, আমি ধীর ও কৃতাঞ্জলি হয়ে মনের সাথে সে বাক্যসমূহ প্রয়োগ করি।

২। মরুৎগণ অন্তরীক্ষ হতে উৎপন্ন হয়েছেন; তারা দর্শনীয়,পৌরুষসম্পন্ন এবং রুদ্রের পুত্র; তারা শত্রুবিজয়ী, পাপরহিত সকলের শোধক, সূর্যের ন্যায় দীপ্ত, সত্ত্বসমূহের ন্যায় বলপরাক্রমশালী, বৃষ্টিবিন্দুযুক্ত ও ঘোররূপ।

৩। রুদ্রের পুত্রগণ যুবা ও জরারহিত এবং যারা দেবগণকে হব্য দেন না (১) তাদের হন্তা; তারা অপ্রতিহতগতি এবং পর্বতের ন্যায় দৃঢ়াঙ্গ। তারা স্তোতৃগণকে অভীষ্ট দিতে ইচ্ছা করেন। পৃথিবীর ও দিব্যলোকের সমস্ত বস্তু দৃঢ় হলেও মরুৎগণ স্বকীয় বলে তা প্রচলিত করেন।

৪। শোভার নিমিত্ত মরুৎগণ নানাবিধ অলঙ্কার দ্বারা স্বশরীর অলঙ্কৃত করেন, শোভার নিমিত্ত বক্ষে সুন্দর হার ধারণ করেন এবং অংশ দেশে আয়ুধসমূহ ধারণ করেন। নেতা মরুৎগণ অন্তরীক্ষ হতে স্বকীয় বলের সাথে প্রাদুর্ভূত হয়েছেন।

৫। স্তোতৃগণকে ধনাধিপতি করে, মেঘাদিকে কম্পিত করে, হিংসককে বিনাশ করে মরুৎগণ স্বকীয় বলে বায়ু ও বিদ্যুৎ সৃষ্টি করেন; পরে মরুৎগণ সকলদিকে গমন করে ও সকলকে কম্পিত করে দ্যুলোকের উধঃঅর্থাৎ মেঘ দোহন করেন এবং জল দ্বারা তুমি সিঞ্চন করেন।

৬। যেরূপ ঋত্বিকগণ যজ্ঞে ঘৃত সিঞ্চন করেন; তারা অশ্বের ন্যায় বেগবান মেঘকে বর্ষণের নিমিত্ত বিনীত করেন এবং গর্জনকারী ও অক্ষয় মেঘকে দোহন করেন।

৭। হে মরুৎ! তোমরা মহৎ, প্রাজ্ঞ, সুন্দর দীপ্তিসম্পন্ন পর্বতের ন্যায় বলবান, এবং শীঘ্রগতি; তোমরা করযুক্ত গজের ন্যায় বন ভক্ষণ কর, যেহেতু তোমরা অরুণ বর্ণ শিখায় প্রচন্ড বল ধারণ করেছ।

৮। প্রকৃষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন মরুৎগণ সিংহের ন্যায় নিনাদ করেন; সর্বজ্ঞ মরুৎগণ হরিণের ন্যায় সুন্দর; তারা শত্রুর বিনাশকারী, স্তোতার প্রীতিকারী এবং অহির ন্যায় ক্রোধযুক্ত এরূপ মরুৎগণ তাদের বাহন মৃগের সাথে (২) এবং আয়ুধের সঙ্গে শত্রুপীড়িত যজমানদের রক্ষা করতে যুগপৎ আসছেন।

৯। হে দল বদ্ধ মানুষের হিতকারী এবং শৌর্যশালী মরুৎগণ! তোমরা বলদ্বারা বিনাশক্ষম কোপযুক্ত হয়ে আকাশ ও পৃথিবী শব্দপূর্ণ কর। হে মরুৎগণ! তোমাদের তেজ নির্মল রূপের ন্যায় অথবা দর্শনীয় বিদ্যুতের ন্যায় রথের সারথি স্থানে অবস্থিতি করে।

১০। সর্বজ্ঞ, ধনাধিপতি, বলযুক্ত, মহৎ, শত্রুবিনাশকারী, অনন্তশক্তিধারী, বৃহৎ খাদ্যযুক্ত, নেতা মরুৎগণ বাহুতে ইষু ধারণ করেন।

১১। বৃষ্টি বর্ধনকারী মরুৎগণ সুবর্ণময় রথচক্র দ্বারা পথিস্থিত মেঘ সকলকে স্থান হতে উত্তোলিত করেন; তারা যজ্ঞবান দেবতাদের যজ্ঞস্থলে গমন করেন, স্বয়ংই শত্রুদের আক্রমণ করেন; নিশ্চল পদার্থ সঞ্চালন করেন; অন্যের অসাধ্য দ্রব্য এবং দীপ্তিমান আয়ুধ ধারণ করেন।

১২। শত্রুক্ষয়কারী, সকল বস্তুর শোধক, বৃষ্টিপ্রদ এবং সর্বদর্শী রুদ্রের পুত্র মরুৎগণকে আমরা স্তোত্র দ্বারা স্তুতি করি। ধুলিপ্রেরক ক্ষমতাশালী, ঋজীষ সোমপায়ী এবং অভীষ্টবর্ষী মরুৎগণের নিকট ধনের জন্য গমন কর।

১৩। হে মরুৎগণ! তোমরা যাকে আশ্রয় প্রদান করতঃ রক্ষা কর, সে পুরুষ বলে সকলকে অতিক্রম করে; সে অশ্ব দ্বারা অন্ন ও মানুষ দ্বারা ধন প্রাপ্ত হয়; সে সুন্দর যজ্ঞ করে ও ঐশ্বর্যশালী হয়।

১৪। হে মরুৎগণ! তোমরা যজমানদের সর্বকর্মকুশল, সংগ্রামে অজেয়, দীপ্তিমান, শত্রুবিনাশকারী, বলবান, প্রশংসাভাজন এবং সর্বজ্ঞ পুত্র প্রদান কর। এরূপ পুত্র এ পৌত্রকে আমরা শত বৎসর পোষিত করি।

১৫। হে মরুৎগণ! আমাদের স্থায়ী, বীর্যযুক্ত ও শত্রুবিজয়ী ধন দাও। এরূপ শতসহস্র ধনযুক্ত হলে আমাদের রক্ষার নিমিত্ত যারা কর্মের দ্বারা ধন প্রাপ্ত হয়েছেন এরূপ মরুৎগণ আসুন।

টীকাঃ

১। অভোগ্ধনঃ শব্দের অর্থ যে দেবান, হবির্ভির্ন ভোজয়ন্তি তেষাং হন্তারঃ। সায়ণ।

২। পুষতীভিঃ অর্থ মরুৎগণের বাহন বিচিত্রকায় হরিণরূপ মেঘ। পৃষত্য ইতি মরুতাং বাহনস্য আখ্যা। পূষতঃ শ্বেতবিন্দ্বঙ্কিতা মৃগা ইতি ঐতিহাসিকাঃ। নানাবর্ণা মেঘমালা ইতি নৈরুক্তাঃ। সায়ণ।

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৬৫

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! পশু অপহরণকারী চোরের ন্যায় তুমিও গুহায় অবস্থান কর মেধাবী ও সমান প্রীতিযুক্ত দেবগণ তোমার পদচিহ্ন লক্ষ্য করে অনুসরণ করেছিলেন;
২। তুমি স্বয়ং হব্য সেবা কর ও দেবতাদের নিমিত্ত হব্য বহন কর; যজনীয় সমস্ত দেবগণ পলায়িত অগ্নির পলায়ন কার্যাদি অন্বেষণ করতে লাগলেন, পরে সকল দিকে অন্বেষণ হল, ভূমি স্বর্গের ন্যায় হল। অগ্নি যজ্ঞের কারণ স্বরূপ, উদকগর্ভে প্রাদুর্ভূত এবং স্তোত্রদ্বারা প্রবর্ধিত; উদকসমূহ সে অগ্নিকে গোপন করবার জন্য বর্ধিত হল।

৩। অগ্নি (অভিমত ফলের) পুষ্টির ন্যায় রমনীয়, ক্ষিতির ন্যায় বিস্তীর্ণ, পর্বতের ন্যায় সকলের ভোজয়িতা, জলের ন্যায় সুখকর। তিনি সংগ্রামে পরিচালিত অশ্বের ন্যায় ও সিন্ধুর ন্যায় শীঘ্রগামী। এরূপ অগ্নিকে কে নিবারণ করতে সমর্থ?

৪। ভ্রাতা যেরূপ ভগ্নীর হিতকর, সেরূপ অগ্নি সিন্ধুর বন্ধু; রাজা যেরূপ শত্রুকে নাশ করে, সেরূপ অগ্নি বন ভক্ষণ করেন; বায়ুচালিত হ{েয় অগ্নি যখন বন দগ্ধ করতে প্রবৃত্ত হন, তখন ভূমির সমস্ত (ঔষধিরূপ) লোম ছেদন করেন।

৫। জল মধ্যে উপবিষ্ট হংসের ন্যায় অগ্নি জলে ভিতর প্রাণধারণ করেন; ঊষা কালে জাগরিত হয়ে আলোক দ্বারা সকলকে চেতন্য প্রদান করেন এবং সোমের ন্যায় সকল ওষধি বর্ধিত করেন। তিনি শয়ান পশুর ন্যায় জলের মধ্যে সংকুচিত হয়ে ছিলেন, পরে বর্ধিত হলে তাহার প্রভা সুদুর বিস্তৃত হল।

টীকাঃ

ষষ্ঠ মণ্ডল: সুক্ত - ৬৬

অনুবাদঃ

১। অগ্নি ধনের ন্যায় বিচিত্র, সূর্যের ন্যায় সকল বস্তুর দর্শয়িতা, প্রাণ বায়ুর ন্যায় জীবনরক্ষক ও পুত্রের ন্যায় হিতকারী; অগ্নি অশ্বের ন্যায় লোককে ধারণ করেন ও দুগ্ধবতী গাভীর ন্যায় উপকারী। দীপ্ত ও আলোক যুক্ত অগ্নি বন দগ্ধ করেন।

২। অগ্নি রমনীয় গৃহের ন্যায় ধন রক্ষণে সমর্থ, পক্ক যবের ন্যায় লোক বিজয়ী, ঋষির ন্যায় দেবগণের স্তোতা এবং লোকের প্রশংসনীয় এবং অশ্বের ন্যায় হর্ষযুক্ত। এরূপ অগ্নি আমাদরে অন্ন প্রদান করুন।

৩। দুষ্প্রাপ্যতেজা অগ্নি যজ্ঞকারীর ন্যায় ধ্রুব ও গৃহস্থিত জায়ার ন্যায় গৃহের ভূষণ। যখন অগ্নি বিচিত্র দীপ্তিমান হয়ে প্রজ্জ্বলিত হন, তখন তিনি শুভ্রবর্ণ আদিত্যের ন্যায়। তিনি প্রজাগণের মধ্যে রথের ন্যায় দীপ্তিযুক্ত ও সংগ্রামে প্রভাযুক্ত।

৪। প্রেরিত সেনার ন্যায় অথবা ধানুকীর দীপ্তিমুখ ইষুর ন্যায় অগ্নি শত্রুগণের ভয় সঞ্চার করেন; যা জন্মেছে ও যা জন্মাবে সে সমস্তই অগ্নি (১); অগ্নি কুমারীগণের প্রণয়ী ও বিবাহিতা স্ত্রীর পতি (২)।

৫। গাভীগণ যেরূপ গৃহে গমন করে সেরূপ আমরা জঙ্গম ও স্থাবর অর্থাৎ পশু ও ব্রীহি আদি উপহারের সাথে প্রদীপ্ত অগ্নির নিকট গমন করি। অগ্নি জল প্রবাহের ন্যায় ইতস্ততঃ জ্বালা প্রেরণ করেন ও নভস্থলে দর্শনীয় অগ্নির রশ্মি মিলিত হয়।

টীকাঃ

১। যমঃঅর্থ অগ্নি। যমোহগ্নিরুচ্যতে। সায়ণ। অথবা ইন্দ্র ও অগ্নি একেবারে উৎপন্ন হয়েছিলেন সেজন্য অগ্নিকে যম (অর্থাৎ যমজ) বলা হয়েছে। সায়ণ। কেননা বিবাহ সময়ে লাজাদি দ্রব্য দ্বারা অগ্নির হোম নিষ্পন্ন হলেই কন্যা আর কন্যা থাকে না, বিবাহিতা হয়। সায়ণ। বিবাহিতা নারী অগ্নির অর্চনা ও সেবায় সহায়তা করেন, এজন্য বোধ হয় অগ্নিকে বিবাহিত নারীর পতি বলা হয়েছে।

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৬৭

অনুবাদঃ

১। রাজা যেরূপ জরা রহিত ব্যক্তিত্তে আদর করেন সেরূপ অরণ্যজাত ও নরের সহিৎ অগ্নি যজমানকে অনুগ্রহ করেন। অগ্নি রক্ষকের ন্যায় কার্যসাধক, কর্মীর ন্যায় ভদ্র, দেবগণের আহ্বানকারী ও হব্যের বহনকারী। তিনি শোভনকর্ম হোন।

২। অগ্নি সমস্ত হব্য রূপ ধন স্বীয় হস্তে ধারণ করে গুহার মধ্যে লুকিয়ে গেলে দেবগণ ভীত হয়েছিলেন, নেতা এবং কর্মধারয়িতা দেবগণ যখন হৃদয়ের কৃত মন্ত্র দ্বারা অগ্নির স্তুতি করলেন, তখন তারা অগ্নিকে পেলেন।

৩। অগ্নি অজাত পুরুষের ন্যায় পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ ধারণ করে আছেন এবং সত্য মন্ত্র দবারা আকাশ ধারণ করেছেন। হে বিশ্বায়ু অগ্নি! পশুদের প্রিয় (বিচরণ) ভূমি রক্ষা কর এবং সঞ্চরণের অযোগ্য গুহাতে গমন কর।

৪। যে পুরুষ গুহাস্থিত অগ্নিকে জানে এবং যে যজ্ঞের ধারয়িতা অগ্নির নিকট উপস্থিত হয় এবং যারা যজ্ঞ সম্পাদন করতঃ অগ্নির স্তুতি করে, অগ্নি তাদরে শীঘ্রই ধনের কথা বলে দেন।

৫। যে অগ্নি ওষধিগণ মধ্যে তাদের নিজ নিজ গুণ নিহিত করেছেন ও মাতৃস্থানীয় ওষধিগণ মধ্যে উৎপন্ন পুষ্পফলাদি স্থাপিত করেছেন, ধীরগণ জল মধ্যস্থিত এবং জ্ঞানদাতা সে বিশ্বায়ু অগ্নিকে গৃহের ন্যায় পূজা করে কর্ম করে।

টীকাঃ

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৬৮

অনুবাদঃ

১। হব্যবাহক অগ্নি হব্য মিশ্রিত করে আকাশে উপস্থিত হয়ে ও স্থাবর জঙ্গম বস্তুকে ও রাতকে স্বীয় প্রভা দ্বারা প্রকাশিত করেন। অগ্নি সমস্ত দেবগণ মধ্যে দ্যুতিমান এবং স্থাবর জঙ্গমাদিতে ব্যাপ্ত আছেন।

২। হে দেব অগ্নি! তুমি শুষ্ক কাষ্ঠ হতে জ্বলন্ত হয়ে প্রাদুর্ভূত হলে সকল যজমানগণ তোমার কর্ম অনুষ্ঠান করে। তুমি অমর, স্তোত্র দ্বারা তোমাকে সেবা করে তারা সকলে প্রকৃত দেবত্ব লাভ করে।

৩। অগ্নি যজ্ঞস্থলে আগত হলে তার স্তুতি ও যজ্ঞ করা হয়; অগ্নি বিশ্বায়ু সকল (যজমানগণ) তার যজ্ঞ সম্পাদন করে। হে অগ্নি! যে তোমাকে হব্য দান করে বা যে তোমার কর্ম করতে শিক্ষা করে তুমি তার কৃত অনুষ্ঠান অবগত হয়ে তাকে ধন প্রদান কর।

৪। হে অগ্নি! তুমি মনুর অপতাগণের মধ্যে দেবগণের আহ্বানকারীরূপে অবস্থিতি কর; তুমিই তাদের ধনের স্বামী, তারা স্বীয় শরীরে পুত্রোৎপাদনার্থ শক্তি ইচ্ছা করেছিল এবং মোহ ত্যাগ করে পুত্রগণের সাথে চিরকাল জীবিত থাকে।

৫। পুত্র যেরূপ পিতার আজ্ঞা পালন করে, যজমানগণ সত্বর হয়ে সেরূপ অগ্নির শাসন শ্রবণ করে ও তার আদিষ্ট কর্ম করে। প্রভূত অন্নযুক্ত অগ্নি যজমানদের যজ্ঞের দ্বারভূত ধন প্রদান করেন। অগ্নি যজ্ঞরত গৃহে আসক্ত এবং আকাশকে নক্ষত্রযুক্ত করেছেন।

টীকাঃ

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৬৯

অনুবাদঃ

১। শুভ্রবর্ণ অগ্নি ঊষার প্রণয়ী সূর্যের ন্যায় সকল পদার্থে প্রকাশক এবং দ্যুতিমান সূর্যের জ্যোতির ন্যায় স্বতেজে (দ্যাবা পৃথিবী) একত্রে পরিপুরিত করেন। হে অগ্নি! তুমি প্রাদুর্ভূত হয়ে কর্ম দ্বারা সমস্ত জগত পরিব্যাপ্ত কর; তুমি দেবগণের পুত্র হয়েও তাদরে পিতা।

২। মেধাবী, দর্পরহিত ও কর্তব্যাকর্তব্য জ্ঞানযুক্ত অগ্নি গাভীর স্থনের ন্যায় সমস্ত অন্ন সুস্বাদু করেন। জনপদে লোকহিতকর পুরুষের ন্যায় অগ্নি যজ্ঞে আহূত হয়ে এবং যজ্ঞস্থলে উপবেশন করে প্রীতি দান করেন।

৩। অগ্নি পুত্রের ন্যায় জন্মগ্রহণ করে গৃহে আনন্দ বিকাশ করেন এবং অশ্বের ন্যায় হর্ষযুক্ত হয়ে সংগ্রামে শত্রুগণকে অতিক্রম করেন। যখন মানুষের সাথে আমি একস্থাননিবাসী দেবতাগণকে আহ্বান করি, তখন হে অগ্নি! তুমি সকল দেবের দেবত্ব প্রাপ্ত হও।

৪। কেউ তোমার ব্রতাদি ধ্বংস করে না, যেহেতু তুমি সে সকল ব্রতের যজমানদের যজ্ঞফলরূপ সুখ প্রদান কর। যদি কেউ তোমার ব্রত নাশ করে, তা হলে সদৃশ নেতা মরুৎগণের সাথে তুমি সে বাধকগণকে পলায়িত কর।

৫। অগ্নি ঊষার প্রণয়ীসূর্যের ন্যায় আলোকবিশিষ্ট ও নিবাস হেতু এবং তার রূপ লোকের পরিচিত, তিনি এ (উপাসককে) অবগত হোন। তার লশ্মি স্বয়ং হব্য বহন করে যজ্ঞ গৃহদ্বারে ব্যাপ্ত হয়, পরে দর্শনীয় নভস্থলে গমন করে।

টীকাঃ

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৭০

অনুবাদঃ

১। যে শোভনীয় দীপ্তিযুক্ত অগ্নি জ্ঞান দ্বারা প্রাপ্তব্য, যিনি সমস্ত দেবকার্য ও মনুষ্যের জন্মরূপ কর্মের বিষয় অবগত থেকে সকল কার্যে ব্যাপ্ত আছেন, তার নিকট প্রভূত অন্ন যাচ্ঞা করি।

২। যে অগ্নি জলের মধ্যে ও বনের মধ্যে ও স্থাবর পদার্থের মধ্যে ও জঙ্গমের মধ্যে অবস্থান করেন, তাকে কি যজ্ঞ গৃহে কি পর্বতের উপর, লোকে হব্য প্রদান করে। প্রজাবৎসল রাজা যেরূপ প্রজার হিতকর কাজ করেন, অমরঅগ্নিও সেরূপ আমাদের হিতকর কার্য সম্পাদন করেন।

৩। যে যজমান মন্ত্র দ্বারা অগ্নির পর্যাপ্ত স্তুতি করে, নিশায় প্রদীপ্ত অগ্নি তাকে ধন প্রদান করেন; হে সর্বজ্ঞ অগ্নি। তুমি দেবতাগণের ও মনষ্যগণের জন্ম অবগত আছ, অতএব সমস্ত ভূতজাতকে পালন কর।

৪। ঊষা ও রাত ভিন্নরূপ হয়ে অগ্নিকে বর্ধন করেন; স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ যজ্ঞ বেষ্টিত অগ্নিকে বর্ধন করে। দেবগণের আহ্বানকারী সে অগ্নি দেবযজন স্থানে উপবিষ্ট হয়ে সকল যজ্ঞকর্ম সত্য ফলযুক্ত করে আরাধিত হন।

৫। হে অগ্নি! আমাদের ব্যবহারযোগ্য গোসমূহকে উৎকৃষ্ট কর; সকল লোক আমাদের জন্য গ্রহণযোগ্য উপায়নরূপ ধন আহরণ করুক। মনুষ্যগণ বহু দেবযজন স্থানে তোমার বিবিধ পূজা করে এবংবুদ্ধ পিতার নিকট হতে পুত্রের ন্যায় তোমার নিকট হতে ধন প্রাপ্ত হয়।

৬। অগ্নি সফলকর্মা লোকের ন্যায় ধন অধিকার করেন, ধানুকীর ন্যায় শুর, শত্রুর ন্যায় ভয়স্কর এবং সংগ্রামে প্রজ্বলিত।

টীকাঃ

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৭১

অনুবাদঃ

১। স্ত্রী যেরূপ স্বামীকে প্রীত করে সেরূপ একস্থানবর্তিনী ও আকাঙ্ক্ষিণী ভগিনীরূপ অঙ্গুলিগণ আকাঙ্ক্ষী অগ্নিকে হব্য প্রদান দ্বারা প্রীত করে। ঊষা প্রথমে কৃষ্ণবর্ণ ও পরে শুভ্রবর্ণ; সে ঊষাকে রশ্মিগণ যেরূপ সেবা করে সেরূপ অঙ্গুলি সকল অগ্নির সেবা করে।

২। অঙ্গিরা নামক আমাদের পিতৃগণ মন্ত্র দ্বারা অগ্নির স্তুতি করে বলবান ও দুঢ়াঙ্গ পণি (নামক অসুরকে) স্তুতি শব্দ দ্বারাই বিনাশ করেছিলেন এবং আমাদের নিমিত্ত মহৎ দ্যুলোকের পথ করেছিলেন। পরে তারা সুখকর দিবস, আদিত্য ও গো সমূহ প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

৩। অঙ্গিরা মহর্ষিগণ যজ্ঞ স্বরূপ অগ্নিকে ধনের ন্যায় ধারণ করেছিলেন। পরে যে সকল যজমানের ধন আছে এবং যারা অন্য বিষয়াভিলাষ ত্যাগ করে অগ্নিকে ধারণ করেন ও অগ্নি সেবায় রত থাকেন, তারা হব্য দ্বারা দেব ও মনুষ্যগণের শ্রীবুদ্ধি সম্পাদন করে অগ্নির অভিমুখে গমন করেন (১)।

৪। মাতরিশ্বা (২) মথিত অগ্নি শুভ্রবণ হয়ে সকল যজ্ঞগৃহে প্রাদুভূত হন; তখন সুহৃৎ রাজা প্রবল রাজার নিকটে যেরূপ স্বীয় লোককে দূত কর্মে নিয়োজিত করে, সেরূপ ভৃগু ঋষির ন্যায় যজ্ঞসম্পাদক যজমান অগ্নিকে দূত কর্মে নিযুক্ত করেন।

৫। যজমান যখন মহান ও পালনকারী দেবকে হব্যরূপ রস প্রদান করেন, তখন হে অগ্নি! স্পর্শনকুশল শত্রুগণ তা জেনে পলায়ন করে। ইষুবিক্ষেপী অগ্নি পলায়মান রাক্ষসগণের প্রতি তার শত্রু বিনাশক ধনু হতে দীপ্তিমান বাণ নিক্ষেপ করেন; এবং দীপ্যমান অগ্নি স্বীয় দুহিতা ঊষাতে (৩) স্বীয় দীপ্তি স্থাপন করেন।

৬। হে অগ্নি! স্বীয়, যজ্ঞগৃহে যে যজমান মর্যাদার সাথে তোমাকে সমস্তাৎ প্রজ্বলিত করে এবং অনুদিন কামনা করে তোমাকে অন্ন প্রদান করে, হে দ্বিবর্হা (৪) অগ্নি! তুমি তার অন্ন বর্ধিত কর। যুদ্ধার্থী যে পুরুষকে রথের সাথে যুদ্ধে প্রেরণ কর, সে ধন প্রাপ্ত হোক।

৭। যেরূপ মহতী সপ্ত নদী (৫) সমুদ্র অভিমুখে প্রধারবত হয়, সেরূপ হব্যের অন্ন অগ্নিকে প্রাপ্ত হয়। আমাদের জ্ঞাতি আমাদের অন্নের ভাগ পান না (অর্থাৎ আমাদের প্রচুর অন্ন নেই); অতএব হে অগ্নি! তুমি প্রকৃষ্ট ধন জেনে দেবগণকে জ্ঞাপিত কর।

৮। অগ্নির বিশুদ্ধ ও দীপ্তিমান তেজ অন্নলাভার্থ নৃপতিকে প্রাপ্ত হোক; অগ্নি গর্ভনিষিক্ত রেতঃ হতে বলবান অনিন্দনীয় যুবা ও শোভনকর্মা পুত্র উৎপন্ন করুন ও যাগাদি কর্মে প্রেরণ করুন।

৯। মনের ন্যায় শীঘ্রগামী যে সূর্য স্বর্গীয় মার্গে একাকী গমন করেন, তিনি সদ্যই অনেক ধন প্রাপ্ত হন; শোভমান এবং সুবাহু মিত্র ও বরুণ আমাদের গাভীগণের প্রীতিকর অমৃতবৎ দুগ্ধ রক্ষা করতঃ অবস্থান করেন।

১০। হে অগ্নি! আমাদের পৈতৃক সৌহদ্য বিনাশ করো না, যেহেতু তুমি অতীতদর্শী এবং বর্তমান বিষয়ও জান। সূর্য রশ্মি যেরূপ অন্তরীক্ষকে আচ্ছাদিত করে, সেরূপ জরা আমাকে বিনাশ করছে; বিনাশহেতু জরা যাতে না আসতে পারে সেরূপ কর।

টীকাঃ

২। ব্যানবৃত্তিরূপেণ অবস্থিতো মুখ্যপ্রাণঃ। সায়ণ। কিন্তু মাতরিশ্বা সম্বন্ধে ৬০ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

৩। দুহিতরি দুহিতৃবৎ সমনন্তরভাবিনাং। সায়ণ। রাত্রি অগ্নির সযয়, ঊষা রাত্রের পর উৎপন্ন, এ জন্য ঊষাকে অপ্নির দুহিতা বলা হয়েছে। ১৩ সুক্তের ১ ও ২ ঋকে এরূপ উপমা দেখুন।

৪। দ্বিহা দ্বয়োম ধ্যমোত্তমস্থানয়োবৃংহিতো বর্ধিতঃ। সায়ণ।

৫। ঋগ্বেদে স্থানে স্থানে সপ্তনদীর উল্লেখ পাওয়া যায়, সেগুলি সিন্ধুনদী ও তার ছয়টি শাখা। ঋগ্বেদের দশম মন্ডলের ৭৫ সুক্তের ৫ ঋকে দশটি নাম আছে যথা- গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, শতুদ্রী, পরুষ্ণী, মরুদ্ধধা, অসিক্নী, বিতস্তা, আর্জীকীয়া ও সুযোমা। এ তালিকার শতুদ্রী আদি ছয়টি নদী সিন্ধু নদীর শাখা এবং সুযোমা সিন্ধু নদীর আর একটি নাম মাত্র।

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৭২

অনুবাদঃ

১। জ্ঞানী ও নিত্য অগ্নির মন্ত্র আরম্ভ কর; তিনি নরের হিতসাধক ধন হস্তে ধারণ করেন। অগ্নি স্তোতৃগণকে অমৃত প্রদান করে থাকেন; অগ্নিই সর্বোৎকৃষ্ট ধনের অধিপতি।

২। সকল অমর দেবগণ মোহশূন্য মরুৎগণ অনেক কামনা করেও আমাদের প্রিয় ও সর্বস্থানব্যাপী অগ্নিকে প্রাপ্ত হন নি; পদব্রজে গমন করতে করতে শ্রান্ত হয়ে এবং অগ্নির কার্য সমূহ লক্ষ্য করে তাঁরা অবশেষে অগ্নির সদনে উপস্থিত হলেন।

৩। হে দীপ্তিমান অগ্নি! দীপ্তিমান মরুৎগণ তিন বছর তোমাকে ঘৃতের দ্বারা পূজা করেছিলেন; পরে মরুৎগণ যজ্ঞ প্রয়োগযোগ্য নাম ধারণ করলেন ও উৎকৃষ্ট জন্ম গ্রহণ করে (অমর) শরীর ধারণ করলেন।

৪। যজ্ঞার্হ দেবগণ বৃহৎ দ্যুলোকে ও পৃথিবীতে বর্তমান থেকে রুদ্রের উপযুক্ত স্তোত্র করেছিলেন; মরুৎগণ ইন্দ্রের সাথে উত্তম স্থানে নিহিত অগ্নিকে জেনে তাকে লাভ করেছিলেন।

৫। হে অগ্নি! দেবগণ তোমাকে সম্যক জ্ঞাত হয়ে উপবিষ্ট হলেন এবং পত্নীদের সাথে সম্মুখস্থ জানুযুক্ত অগ্নির (১) পূজা করলেন; পরে সুহৃং অগ্নিকে দর্শন করে তোমার দ্বারা রক্ষিত হয়ে সুহৃৎ দেবগণ আপনাদের শরীর শোষণ করতৎ যজ্ঞ করলেন।

৬। যজমানগণ তোমাতে নিহিত এক বিংশতি নিগুঢ় পদ জেনেছে এবং তা দিয়ে তোমাকে অর্চনা করে; তুমিও যজমানগণের প্রতি সেরূপ স্নেহযুক্ত হয়ে তাদের পশু ও স্থাবর জঙ্গম রক্ষা কর।

৭। হে অগ্নি! সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় অবগত হয়ে প্রজাগণের জীবন ধারণার্থে ক্ষুন্নিবৃত্তি কর; আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে যে মার্গে দেবগণ গমন করেন তা অবগত হয়ে তুমি অনলস দূতরূপে হব্য বহন কর।

৮। শোভন কর্মযুক্তা মহতী সপ্ত নদী তোমার প্রসাদে দ্যুলোক হতে নির্গত হয়েছেন, যজ্ঞবিৎ অঙ্গিরাগণ ধনের গমনপথ তোমার নিকট জেনেছিলেন। তোমার প্রসাদে সরমা তাদের নিকট হতে প্রচুর গোদুগ্ধ লাভ করেছিল, তা দিয়ে মনুষ্যগণ পালিত হয়।

৯। আদিত্যগণ অমরত্বসিদ্ধির জন্য উপায় উদ্ভাবন করতৎ পতন প্রতিরোধের জন্য যে সমস্ত কার্য সংস্থাপিত করেছেন, অদিতিরূপ জননী পৃথিবী, সমস্ত জগৎ ধারণের নিমিত্ত সে মহানুভব পুত্রদের সাথে যে বিশেষ মহত্ত্বপ্রকাশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন, হে অগ্নি! তুমি হব্য ভক্ষণ করেছিলে এটি তার কারণ।

১০। এ অগ্নিতে (যজমানগণ) সুন্দর যজ্ঞসম্পদ স্থাপন করেছেন এবং যজ্ঞের চক্ষুরূপ ঘৃত দিয়েছেন। পরে অমরগণ আগমন করেন, তা দেখে হে অগ্নি! তোমার উজ্জ্বল শিখা বেগবতি নদীর ন্যায় সকল দিকে প্রসারিত হয় এবং দেবগণও তা জানতে পারেন।

টীকাঃ

১। জানযুক্তং ত্বাং নমস্যন অপূজয়ন। সায়ণ।

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৭৩

অনুবাদঃ

১। পৈত্রিক ধনের ন্যায় অগ্নি অন্নদাতা; শাস্তাভিজ্ঞ ব্যক্তির শাসনের ন্যায় অগ্নি নেতা; উপবিষ্ট অতিথির ন্যায় প্রীতিভাজন; এবং হোতার ন্যায় যজমানের গৃহ বর্ধিত করেন।

২। দ্যুতিমান সূর্যের ন্যায় যথার্থদর্শী অগ্নি স্বীয় কর্ম দ্বারা সমস্ত সংগ্রাম হতে রক্ষা করেন; যজমানগণের প্রশংসিত অগ্নি প্রকৃতির স্বরূপের ন্যায় পরিবর্তন রহিত; আত্মার ন্যায় সুখকর; এরূপ অগ্নি যজমানগণ কর্তৃক ধারণীয়।

৩। দ্যুতিমান সূর্যের ন্যায় অগ্নি সমস্ত জগৎ ধারণ করেন; অনুকুলমিত্র বিশিষ্ট রাজার ন্যায় অগ্নি পৃথিবীতে বাস করেন; লোকে অগ্নির সম্মুখে পিতার গৃহে পুত্রের ন্যায় উপবেশন করে; অগ্নি পতিসেবিতা এবং অনিন্দনীয়া নারীর ন্যায় শুদ্ধ।

৪। হে অগ্নি! লোকে নিরুপদ্রব স্থানে স্বীয় গৃহে অনবরত কাষ্ঠ দ্বারা প্রজ্বলিত করে তোমাকে সেবা করে, বহু যজ্ঞে অন্ন প্রদান করে, তুমি বিশ্বয়ু হয়ে আমাদের ধন প্রদান কর।

৫। হে অগ্নি! ধনযুক্ত যজমানগণ অন্ন লাভ করুক, যে বিদ্বানগণ তোমার স্তব করে ও হব্যদান করে, তারা দীর্ঘ আয়ু প্রাপ্ত হোক। আমরা সংগ্রামে যেন শত্রুর অন্ন প্রাপ্ত হই, পরে যশের জন্য দেবগণকে তাদের অংশ অর্পণ করি।

৬। নিত্যদুগ্ধা ও তেজস্বিনী গভীগণ অগ্নিকে কামনা করে যজ্ঞস্থানে অগ্নিকে দুগ্ধ পান করায়। প্রবাহিনী নদী সকল অগ্নির নিকট অনুগ্রহ যাচ্ঞা করে পর্বতসমীপে দূরদেশ হতে প্রবাহিত হয়।

৭। হে দ্যুতিমান অগ্নি! যজ্ঞার্হ সমস্ত দেবগণ তোমার অনুগ্রহ যাচ্ঞা করে তোমার উপর হব্য স্থাপন করেছেন; পরে (ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য) ঊষা ও রাত্রিকে ভিন্নরূপ করেছেন: রাতকে কৃষ্ণবর্ণ ও উষাকে অরূণ বর্ণ করলেন।

৮। তুমি যে মানুষদের অর্থলাভাথ যজ্ঞকর্মে প্রেরণ কর, তারা ও আমরা ধনী হব। তুমি আকাশ ও পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ পরিপূরিত করছ এবং সমস্ত জগৎ ছায়ার ন্যায় রক্ষা করছ।

৯। হে অগ্নি! তোমার দ্বারা রক্ষিত হয়ে আমরা আমাদের অশ্ব দ্বারা শত্রুর অশ্ব বধ করব; আমাদের যোদ্ধা দ্বারা শত্রুর যোদ্ধা ও আমাদের বীরগণ দ্বারা শত্রুর বীরগণকে বধ করব; আমাদের বিদ্বান পুত্রগণ পৈত্রিক ধনের স্বামী হয়ে শত বছর জীবন ভোগ করুক।

১০। হে মেধাবী অগ্নি! আমাদের স্তোত্র সকল তোমার মনের ও অন্ত:করণের প্রিয় হোক। দেবগণের সন্তজনীয় অন্ন তোমাতে স্থাপন করে আমসরা যেন তোমার দারিদ্র্যবিনাশী ধন রক্ষা করতে পারি।

টীকাঃ

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৭৪

অনুবাদঃ

১। যে অগ্নি দূরে থেকেও আমাদের স্তুতি শ্রবণ করেন, তাকে আমরা যজ্ঞে আগমনপূর্বক স্তুতি করি।

২। বিনাশকারী শত্রুগণ সঙ্গত হলে চিরন্তন অগ্নি হব্যদাতা যজমানের নিমিত্ত ধন রক্ষা করেন।

৩। অগ্নি উৎপন্ন হলেই সকল লোকে তার স্তব করুক; অগ্নি শত্রুহস্তা ও যুদ্ধে শত্রুধন জয় করেন।

৪। হে অগ্নি! যে যজমানের যজ্ঞগৃহে তুমি দেবগণের দূত হয়ে তাদের ভোজনার্থ হব্য বহন কর এবং যজ্ঞ শোভনীয় কর।

৫। হে বলের পুত্র অঙ্গিরা! মনুষ্য সকল সে যজমানকেই শোভন দেবযুক্ত, শোভন হব্যযুক্ত ও শোভন যজ্ঞযুক্ত বলে থাকে।

৬। হে জ্যোতির্ময় অগ্নি! তুমি দেবগণকে এ যজ্ঞে স্তুতি গ্রহণার্থ আমাদের সমীপে নিয়ে এস ও ভোজন করবার নিমিত্ত হব্য প্রদান কর।

৭। হে অগ্নি! যখন তুমি দেব গণের দূতরূপে গমন কর, তখন তোমার গমনশীল রথে অশ্বের শব্দ শ্রুত হয় না।

৮। যে পুরুষ পূর্ব হতে নিকৃষ্ট, সে তোমাকে হব্য দান করে তোমার দ্বারা রক্ষিত ও অন্নযুক্ত হয়ে লজ্জারহিত (অর্থাৎ ঐশ্বর্যশালী) হয়।

৯। হে দ্যুতিমান অগ্নি, যে যজমান দেবগণকে হব্য প্রদান করে, তাকে বহুল দীপ্ত ও উত্তম বীর্যযুক্ত ধন দান কর।

টীকাঃ

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৭৫

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! মুখে হব্য গ্রহণ করে দেবগণের অতিশয় প্রীতি কর ও অতি বিস্তীর্ণ আমার স্তোত্র গ্রহণ কর।

২। হে অঙ্গিরাশ্রেষ্ঠ এবং মেধাবীশ্রেষ্ঠ। আমরা তোমার প্রীতিকর ও গ্রহণযোগ্য স্তুতি সম্পাদন করি।

৩। হে অগ্নি! মনুষ্যের মধ্যে কে তোমার (যোগ্য) বন্ধু? কে তোমার যজ্ঞ করতে সমর্থ? তুমি কে? কোন স্থানে অবস্থান কর?

৪। হে অগ্নি! তুমি সকল লোকের বন্ধু, তুমি প্রিয়মিত্র। তুমি সখাগণের স্তুতিভাজন সখা।

৫। হে অগ্নি! আমাদের নিমিত্ত মিত্র ও বরুণকে অর্চনা কর ও দেবগণকে পূজা কর। বৃহৎ যজ্ঞ সম্পাদন কর ও স্বকীয় (যজ্ঞ) গৃহে গমন কর।

টীকাঃ

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৭৬

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! তোমার মনস্তুষ্টি করবার কি উপায় আছে? তোমার সুখকর স্তুতিই বা কিরূপ? তোমার ক্ষমতার পর্যাপ্ত যজ্ঞ কে করতে পারে? কিরূপ বুদ্ধি দ্বারাই বা তোমাকে হব্য প্রদান করব?

২। হে অগ্নি! এ যজ্ঞে এস; দেবগণকে আহ্বান করত উপবেশন কর। তুমি আমাদের পুরোগামী হও, কেন না তোমাকে কেউ হিংসা করতে পারে না। সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী তোমাকে রক্ষা করুক এবং তুমি দেবগণকে অত্যন্ত প্রীত করবার জন্য পূজা কর।

৩। হে অগ্নি! সমস্ত রাক্ষসগণকে দহন কর এবং হিংসকগণ হতে যজ্ঞ রক্ষা কর। সোমপালক ইন্দ্রকে তোমার হরি নামক অশ্বদ্বয়ের সঙ্গে এ যজ্ঞে আন; আমরা সুফলদাতা ইন্দ্রকে আতিথ্য প্রদর্শন করব।

৪। যে অগ্নি মুখ দ্বারা হব্য বহন করেন, তাকে অপত্যাদিফলযুক্ত স্তোত্র দ্বারা আহ্বান করি। হে অগ্নি! তুমি অন্য দেবগণের সাথে উপবেশন কর এবং হে যজনীয় অগ্নি! তুমি হোতার ও পোতার কর্ম নির্বাহ কর; তুমি ধনের নিয়ন্তা ও জনয়িতা হয়ে আমাদের প্রবুদ্ধ কর।

৫। তুমি মেধাবী গণের মধ্যে মেধাবী হয়ে যেরূপ মেধাবী মনুর যজ্ঞে হব্য দ্বারা দেবগণের পূজা করেছিলে, সেরূপ হে হোমনিষ্পাদক সত্য অগ্নি! তুমি এ যজ্ঞে দেবগণকে আনন্দ কারী জ্বহু দ্বারা পূজা কর।

টীকাঃ

সপ্তম মণ্ডল: সুক্ত - ৭৭

অনুবাদঃ

১। যে অগ্নি অমর, সত্যবান, দেবগণের আহ্বানকারী ও যজ্ঞসম্পাদক, ও যিনি মনুষ্যগণের মধ্যে বর্তমান থেকে দেবগণকে হবিযুক্ত করেন, সে অগ্নির অনুরূপ হব্য কি রূপে প্রদান করব? তেজস্বী অগ্নিকে সকল দেবগণের উপযুক্ত কি স্তুতি করব।

২। যে অগ্নি যজ্ঞে অত্যন্ত সুখকারী ও যথার্থদর্শী ও দেব গণের আহ্বানকারী, তাকেই স্তোত্র দ্বারা আমাদের অভিমুখী কর। যখন অগ্নি মনুষ্যের নিমিত্ত দেবগণের নিকট গমন করেন, তখন তিনি দেবগণকে অবগত হন ও মনের সঙ্গে পূজা করেন।

৩। অগ্নি যজ্ঞের কর্তা, অগ্নি বিশ্বের উপসংহর্তা এবং উৎপাদয়িতা; অগ্নি সখার ন্যায় অলব্ধ ধন প্রদান করেন। দেবাভিলাষী প্রজাগণ সে দর্শনীয় অগ্নির নিকট গমন করে অগ্নিকেই যজ্ঞের প্রথম দেব বলে স্তুতি করে।

৪। অগ্নি নেতৃদের মধ্যে উৎকৃষ্ট নেতা ও শত্রুগণের বিনাশকারী। অগ্নি আমাদের স্তুতি ও অন্নযুক্ত যজ্ঞ কামনা করুন এবং যে ধনশালী ও বলশালী যজমানগণ অন্ন প্রদান করে অগ্নির মননীয় স্তোত্র ইচ্ছা করে, অগ্নি তাদেরও স্তুতি কামনা করুন।

৫। যজ্ঞসম্পন্ন ও সর্বজ্ঞ অগ্নি এ প্রকারে মেধাবী গোতমাদি ঋষি গণ কর্তৃক স্তুত হয়েছিলেন; অগ্নি তাদের দ্যুতিমান সোমরস পান করিয়েছেন ও অন্ন ভোজন করিয়েছেন। অগ্নি আমাদের সেবা জ্ঞাত হয়ে পুষ্টি প্রাপ্ত হন।

টীকাঃ

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৭৮

অনুবাদঃ

১।হে প্রজ্ঞাযুক্ত ও সর্বদর্শী অগ্নি! গোতম বংশীয়গণ তোমাকে স্তুতি করেছে। দ্যুতিমান স্তোত্র দ্বারা আমরা তোমার স্তুতি করি।

২। ধনাকাঙ্ক্ষী হয়ে গোতম স্তুতি দ্বারা যে অগ্নির সেবা করেন, সে অগ্নিকে দ্যুতিমান স্তোত্র দ্বারা পুনঃ পুনঃ স্তুতি করি।

৩। অঙ্গিরার ন্যায় সর্বাপেক্ষা অধিকতর অন্নদাতা অগ্নিকে আহ্বান করি ও দ্যুতিমান স্তোত্র দ্বারা স্তুতি করি।

৪। হে অগ্নি! তুমি দস্যুগণকে স্থান ভ্রষ্ট কর, তুমি সর্বাপেক্ষা শত্রুহস্তা, তোমাকে দ্যুতিমান স্তোত্র দ্বারা স্তুতি করি।

৫। আমরা বহুগণ বংশীয়, আমরা অগ্নিকে মাধুর্যযুক্ত বাক্য প্রয়োগ করি ও দ্যুতিমান স্তোত্র দ্বারা স্তুতি করি।

টীকাঃ

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৭৯

অনুবাদঃ

১। সুবর্ণকেশ বিশিষ্ট অগ্নি (বিদ্যুৎরূপে) হননশীল মেঘকে কম্পিত করেন ও বায়ুর ন্যায় শীঘ্রগামী তিনি সুন্দর দীপ্তিযুক্ত হয়ে মেঘ হতে বারি বর্ষণ করতে জানেন। ঊষা সেটি জানে না ।

২।উষা অন্ন সম্পন্ন সরল নিজকর্মরত প্রজার মেঘকে তাড়িত করে, কৃষ্ণবর্ণ মেঘ বর্ষণশীল ও গর্জন করেছে এবং সুখকর ও হাস্যযুক্ত বৃষ্টি বিন্দুর সাথে আগমন করছে। বৃষ্টি পতিত হচ্ছে মেঘ গর্জন করছে।

৩। যখন অগ্নি জগৎকে বৃষ্টির জল দ্বারা পুষ্ট করেন এবং জলের ব্যবহারের সরল উপায় সমূহ দেখিয়ে দেন, তখন অর্যমা, মিত্র, বরুণ ও সকল দিকগামী মরুৎগণ মেঘের উদকোৎপত্তি স্থানের আচ্ছাদন উদ্ঘাটিত করেন।

৪। হে বলের পুত্র অগ্নি! তুমি বহু গোযুক্ত অন্যের ঈশ্বর; হে সর্বভূতজ্ঞ। আমাকে প্রভূত অন্ন দাও।

৫। দীপ্তিযুক্ত নিবাসস্থানদাতা ও মেধাবী অগ্নি স্তোত্রদ্বারা প্রশংসনীয়। হে বহুমুখ অগ্নি! আমাদের যাতে ধনযুক্ত অন্ন হয়, সেরূপে দীপ্তি প্রকাশ কর।

৬।হে উজ্জ্বল অগ্নি! দিনে ও রাতে স্বয়ং অথবা লোকদ্বারা রাক্ষস প্রভৃতি তাড়িয়ে দাও। হে তীক্ষ্মমুখ অগ্নি! রাক্ষসকে দহন কর।

৭। হে অগ্নি! তুমি সকল যজ্ঞে স্তুতিভাজন, আমাদের গায়ত্তী দ্বারা তুষ্ট হয়ে আমাকে রক্ষণকার্য দ্বারা পালন কর।

৮। হে অগ্নি! আমাদের দারিদ্র্যনাশক, সকলের বরণীয় এবং সকল সংগ্রামে দুস্তর ধন প্রদান কর।

৯। হে অগ্নি! আমাদের জীবন ধারণের জন্য সুন্দর জ্ঞানযুক্ত ও সুখহেতুভূত এবং সকল আয়ুর পুষ্টিকারক ধন প্রদান কর।

১০। হে ধনাভিলাষী গৌতম! তীক্ষ্মজ্বালাযুক্ত অগ্নিকে বিশুদ্ধ স্তুতি সম্পাদন কর।

১১। হে অগ্নি! যে শত্রু আমাদের সমীপে বা দূরে থেকে আমাদের হানি করে, সে বিনষ্ট হোক; তুমি আমাদের বর্ধন কর।

১২। সহস্রাক্ষ সর্বদর্শী অগ্নি রাক্ষসগণকে তাড়িত করেন; আমাদের দ্বারা স্তুত হয়ে দেবগণের আহ্বানকারী অগ্নি তাদের স্তুতি করেন।

টীকাঃ

১। ঊষার সাথে তুলনা করে অগ্নির অধিকতর সুখ্যাতি করাই কবির উদ্দেশ্য; ঊষার নিন্দা করা উদ্দেশ্য নয়। সায়ণ।

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৮০

অনুবাদঃ

১। হে বলশালী ও বজ্রযুক্ত ইন্দ্র! তুমি এ হর্যকর সোমরস পান করলে স্তোতা (১) তোমার বুদ্ধিকর স্তুতি করেছিল; তুমি বলদ্বারা পৃথিবীর নিকট হতে অহিকে তাড়িত করেছিলে এবং স্বীয় প্রভুত্ব প্রকটিভ করেছিলে।

২। হে ইন্দ্র! সেচনযুক্ত, হর্ষ কর এবং শোনপক্ষীর আনীত (২) অভিষুত সোমরস তোমাকে হর্ষযুক্ত করেছে; হে অজ্রিন! তুমি সে বল দ্বারা অন্তরীক্ষের নিকট হতে বৃত্তকে বিনাশ করেছিলে এবং স্বীয় প্রভুত্ব প্রকটিত করেছিলে।

৩। হে ইন্দ্র! গমন কর, শত্রুগণের অভিমুখী হও তোমার বজ্র অপ্রতিহতগতি, তোমার বল পুরুষবিজয়ী, অতএব তুমি বৃত্তকে বধ কর, তন্নিরুদ্ধ জল লাভ কর এবং স্বীয় প্রভূত্ব প্রকটিত কর।

৪। হে ইন্দ্র! তুমি ভূলোকে শত্রুকে বধ করেছ দ্যুলোকেও বধ করেছ। মরুৎগণ কর্তৃক সংযুক্ত ও জীবগণের তৃপ্তিকর বৃষ্টির জল পাতিত করে স্বীয় প্রভূত্ব প্রকটিত কর।

৫। ক্রুদ্ধ ইন্দ্র, অভিমুখ হয়ে কম্পমান বৃত্রের উন্নত হনু প্রদেশে প্রহার করলেন, বৃষ্টির জল প্রবাহিত হতে দিলেন এবং স্বীয় প্রভূত্ব প্রকটিত করলেন।

৬। ইন্দ্র শতধারাযুক্ত বজ্র দ্বারা বৃত্রের কপোলদেশে আঘাত করলেন, তিনি হৃষ্ট হয়ে স্তোতৃগণকে অন্নের উপায় যোগাতে ইচ্ছা করলেন এবং স্বীয় প্রভুত্ব প্রকটিত করেলেন।

৭। হে মেঘবাহন বজ্রযুক্ত ইন্দ্র! শত্রুগণ তোমার বীর্য তিরস্কার করতে পারে না, কেন না তুমি মায়াবী, মায়াদ্বারা মৃগরুপধারী বৃত্রকে বধ করেছ এবং স্বীয় প্রভুত্ব প্রকটিত কর।

৯। সহস্র মনুষ্য যুগপৎ ইন্দ্রকে অর্চনা করেছিল; বিংশ মনুষ্য তার স্তুতি করেছিল; শতসংখ্যক ঋষি পুনঃ পুনঃ ইন্দ্রের স্তব করেছিল। ইন্দ্রের নিমিত্ত হব্য অন্ন ঊর্ধে ধৃত হয়েছিল ইন্দ্র স্বীয় প্রভূত্ব প্রকটিত করেছিলেন।

১০। ইন্দ্র বৃত্রের বল স্বীয় বল দ্বারা নাশ করেছিলেন। অভিভবসাধন আয়ুধদ্বারা বৃত্রের আয়ুধ নাশ করেছিলেন। এ ইন্দ্রের প্রভূত বল, যেহেতু তিনি বৃত্তকে বধ করে তন্নিরুদ্ধ বারি নির্গত করেছিলেন এবং স্বীয় প্রভূত্ব প্রকটিত করেছিলেন।

১১। হে বজ্রযুক্ত ইন্দ্র! তোমার কোপভয়ে এ আকাশ ও পৃথিবী কম্পিত হয়েছিল; যেহেতু তুমি মরুৎগণের সাথে মিলিত হয়ে বৃত্রকে বধ করে স্বীয় প্রভুত্ব প্রকটিত করেছিলে।

১২। বৃত্র স্বীয় কম্পন বা গর্জনের দ্বারা ইন্দ্রকে ভীত করে না, ইন্দ্রের লৌহময় ও সহস্র ধারাযুক্ত বজ্র বৃত্তকে আক্রমণ করল; ইন্দ্র স্বীয় প্রভূত্ব প্রকটিত করলেন।

১৩। হে ইন্দ্র। যখন তুমি বৃত্রকে প্রহার করেছিলে এ তার বজ্রকে প্রহার করেছিলে তখন তুমি অহির বধে কৃতসঙ্কল্প হলে, তোমার বল আকাশে ব্যাপ্ত হয়েছিল; তুমি স্বীয় প্রভুত্ব প্রকটিত করেছিলে।

১৪। হে বজ্রযুক্ত ইন্দ্র! তুমি গর্জন করলে স্থাবর ও জঙ্গম কম্পিত হয়, বজ্র নির্মাতা ত্বষ্টাও তোমার কোপভয়ে কম্পিত হয়, তুমি স্বীয় প্রভুত্ব প্রকটিত করেছ।

১৫। সর্বব্যাপী ইন্দ্রকে আমরা অবগত হতে পারি না; স্বীয় সামর্থ্যের সাথে অতিদূরে অবস্থিত ইন্দ্রকে (কে জানতে পারে)? যেহেতু সে ইন্দ্রে দেবগণ ধন, বীর্য ও বল স্থাপন করেছিলেন; তিনি স্বীয় প্রভুত্ব প্রকটিত করেছেন।

১৬। অথর্বা ঋষি ও পিতা মনু ও (অর্থবার পুত্র) দধাঙৃ ঋষি যে যে যজ্হ করেছিলেন, সে যজ্ঞে প্রযুক্ত হব্য অন্ন ও স্তোত্রসমূহ পূর্বতন যজ্ঞের ন্যায় ইন্দ্রতেই প্রাপ্ত হয়েছিল; ইন্দ্র স্বীয় প্রভূত্ব প্রকটিত করেছিলেন।

টীকাঃ

১। রক্ষা যজ্ঞের একজন স্তোতা। ১০ সুক্তের ১ ঋকের টীকা ও ১৫ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা সহ ১৮ সুক্তের ১ ঋকের টীকা ও ৩৬ সুক্তের ৭ ঋকের টীকা দেখুন।

২। শোন পক্ষী সোম এনেছিল তা ঋগ্বেদের তৃতীয় মন্ডলের ৪৩ সুক্তে চতুর্থ মন্ডলের ২৬ সুক্তে এবং অষ্টম মন্ডলের ৭১, ৮৪ ও ৮৯ সুক্তে পাওয়া যায়। সায়ণ শোন অর্থে গায়ত্রী করেছেন। কিন্তু শোন পক্ষী যে গায়ত্রী, ঋগ্বেদে তার কোনও উল্লেখ নেই। এটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের কল্পনা।

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৮১

অনুবাদঃ

১। বৃত্রহন্তা ইন্দ্র মানুষদের স্তুতি দ্বারা বলে ও হর্ষে প্রবর্ধিত হয়েছেন। সে ইন্দ্রকে আমরা মহৎ ও ক্ষুদ্র সংগ্রামে আহ্বান করি; তিনি আমাদের সংগ্রামে রক্ষা করুন।

১। হে বীর! তুমি একাকী হলেও সেনাসদৃশ; তুমি প্রভূত শত্রুগণের ধন দান কর; তুমি ক্ষুদ্রকেও বর্ধন কর; সোমরসদাতা যজমানকে তুমি ধন প্রদান কর, কেন না তোমার অক্ষয় ধন আছে।

৩। যখন যুদ্ধ হয়, তখন শত্রুগণের জেতাই ধন প্রাপ্ত হয়। হে ইন্দ্র! তুমি শত্রুগণের গর্বনাশকারী অশ্ব রথে সংযোজিত কর, কাকেও বিনাশ কর, কাকেও ধন দান কর, হে ইন্দ্র তুমি আমাদের ধনশালী কর (১)।

৪। ইন্দ্র যজ্ঞ দ্বারা মহান ও ভয়ঙ্কর এবং সোমপান দ্বারা আপন বল বর্ধন করেছেন। তিনি সুদর্শন সুন্দর নাসিকাযুক্ত ও হরিনামক অশ্বযুক্ত; তিনি আমাদের সম্পদের জন্য দৃঢ়বদ্ধ হস্তে লৌহময় বজ্র স্থাপন করলেন।

৫। ইন্দ্র স্বীয় তেজের দ্বারা পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ পরিপূরিত করেছেন; দ্যুলোকে উজ্জ্বল নক্ষত্র সকল স্থাপিত করেছেন; হে ইন্দ্র! তোমার ন্যায় কেউ উৎপন্ন হয় নি ও হবে না; তুমি বিশেষরূপে সমস্ত জগৎ ধারণ কর।

৬। যে পালনকারী ইন্দ্র যজমানকে মানুষের অন্ন প্রদান করেন তিনি আমাদের সেরূপ অন্ন প্রদান করুন। হে ইন্দ্র! আমাদের ধন বিভাগ করে দাও কারণ তোমার অসংখ্য ধন, যাতে আমি তার একাংশ প্রাপ্ত হতে পারি।

৭। সরলকর্মা ইন্দ্র সোমপানে হৃষ্ট হলে আমাদের গোযুথ প্রদান করেন। হে ইন্দ্র! তুমি বহু শতসংখ্যক ধন আমাদের দেবার নিমিত্ত উভয় হস্তে গ্রহণ কর; আমাদের তীক্ষবুদ্ধিযুক্ত কর ও ধন প্রদান কর।

৮। হে শুর! তুমি আমাদের বলের ও ধনের নিমিত্ত আমাদের সঙ্গে সোমরস পান করে তৃপ্ত হও। তোমাকে প্রভূত ধনশালী বলে জানি এজন্য আমাদের অভিলাষ জ্ঞাত করাই; তুমি আমাদের রক্ষা কর।

৯। হে ইন্দ্র! তোমারই লোকসমূহ সকলের বরণীয় হব্য বর্ধন করে। যে সকল লোক হব্য প্রদান করে না, হে অখিলপতি হে ইন্দ্র! তাদের ধন তুমি দর্শন কর, হে ইন্দ্র! তাদের ধন আমাদের প্রদান কর।

টীকাঃ

১। রহুগণের পুত্র গৌতম কুরু ও সুঞ্জয় রাজাদের পুরোহিত ছিলেন। সে রাজাদের শত্রুগণের সাথে যুদ্ধ হলে গৌতম ঋষি এ সুক্ত দ্বারা ইন্দ্রকে স্তুতি করে আপন পক্ষের জয় প্রার্থনা করেছিলেন। সায়ণ।

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৮২

অনুবাদঃ

১। হে ধনবান ইন্দ্র! নিকটে এসে আমাদের স্তুতি শ্রবণ কর; তুমি এখন পূর্ব হতে ভিন্ন প্রকৃতি হয়ো না; তুমিই আমাদের প্রিয় ও সত্য বাকযুক্ত করেছ; সে বাক্য দ্বারা তোমাকে কামনা করি, অতএব তোমার অশ্ব শীঘ্র যোজিত কর।

২। তোমার প্রদত্ত অন্ন ভোজন করে লোকে পরিতৃপ্ত হয়েছে এবং নিজ নিজ প্রিয় শরীর কম্পিত করেছে, দীপ্তিমান মেধাবীগণ সর্বোৎকৃষ্ট স্তুতি দ্বারা তোমার স্তুতি করেছে, হে ইন্দ্র! তোমার অশ্ব শীঘ্র যোজিত কর।

৩। হে মঘবন! তুমি সকলকে অনুগ্রহ দৃষ্টিতে দর্শন কর; তোমার স্তুতি করি, তুমি স্তুত হয়ে, রথ ধনে পুরিত করে তোমাকে যারা কামনা করছে তাদের নিকট যাও। হে ইন্দ্র! তোমার অশ্ব শীঘ্র যোজিত কর।

৪। যে রথ অভীষ্ট বস্তু বর্ষণ করে ও গাভী প্রদান করে এবং ধান্য মিশ্রিত পূর্ণ পাত্র প্রদান করে, ইন্দ্র সে রথে আরোহণ করুন; তোমার অশ্ব শীঘ্র যোজিত কর।

৫। হে শতক্রতু! তোমার রথের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ও বাম পার্শ্বস্থ অশ্ব সংযুক্ত হোক, তুমি সোমপানে হৃষ্ট হয়ে সে রথ দ্বারা তোমার প্রিয়া জায়ার (১) নিকট গমন কর। তোমার অশ্বদ্বয় শীঘ্র যোজিত কর।

৬। তোমার কেশযুক্ত অশ্বদ্বয়কে আমি স্তোত্র দ্বারা (রথে) সংযোজিত করি বাহুদ্বয়ে অশ্ববন্ধক রশ্মি ধারণ করে গৃহে গমন কর। এ অভিষূত তীব্র সোমরস তোমাকে হৃষ্ট করেছে, হে বজ্রিন! তুমি (সোম পান জনিত) তুষ্টিযুক্ত হয়ে পত্নীর সাথে সম্যক হর্ষলাভ কর।

টীকাঃ

১। এরূপে ইন্দ্রের স্তুতিতে ইন্দ্রের জায়ার কোন কোন স্থানে উল্লেখ আছে। ২২ সুক্তের ১২ ঋকে ইন্দ্রের জায়াকে ইন্দ্রাণী বলা হয়েছে। কিন্তু এ ছাড়া ঋগ্বেদ সংহিতায় ইন্দ্রের স্ত্রীর বিশেষ কোনাও পরিচয় নেই। যেখানে ইন্দ্রকে শচীপতি বলা হয়েছে, সেখানে সে শব্দের অর্থ যজ্ঞের পালনকর্তা; শচী ইন্দ্রের পত্রী এরুপ কথা ঋগ্বেদ-সংহিতায় দেখা যায় না। পৌরণিক সময়ে এ বৈদিক‍ ‘‍‌শচীপতি’ শব্দ হতে ইন্দ্রের পত্নী শচী এ কথা সৃষ্ট হয়েছিল এবং শচীর অনেক অর্ণনা ো আখ্যান সৃষ্ট হয়েছিল।

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৮৩

অনুবাদঃ

১। হে ইন্দ্র! যে মানুষ তোমার রক্ষণের দ্বারা রক্ষিত, সে অশ্ব বৃক্ত গৃহে বাস করে সর্ব প্রথমেই গাভী প্রাপ্ত হয়। নদীসমূহ যেরূপ সবদিকে বয়ে স্বভাবতই সমুদ্রকে পরিপুরিত করে, তুমিও সেরূপ তোমার রক্ষিত মানুষকে প্রভূত ধনে পূর্ণ কর।

২। যেরূপ দ্যুতিমান জল বজ্ঞপাত্রে গমন করে, সেরূপ উপরিস্থিত দেবগণ যজ্ঞপাত্র দর্শন করেন; তাদের দৃষ্টি কিরণের ন্যায় বিতত। অনেক পুরুষ যেরূপ একটি কন্যাকে বিবাহের জন্য অভিলাষ করে, দেবগণ সেরূপ সোমপূর্ণ দেবাভিলাষী পাত্রকে অভিলাষ করে।

৩। যে হব্য ও ধান্য যজ্ঞপাত্রে তোমাকে অর্পিত হয়েছে, হে ইন্দ্র! তুমি তাতে মন্ত্রবচন সংযুক্ত করেছ। যজমান যুদ্ধে গমন না করে তোমার কার্যে রত থাকে এবং পুষ্টিলাভ করে, কেননা সোমাভিষবদাতা উৎকৃষ্ট বল লাভ করে।

৪। অঙ্গিরাগণ অগ্নে ইন্দ্রের নিমিত্ত অন্ন সম্পাদিত করেছিলেন, পরে অগ্নি প্রজ্বলিত করে সুন্দর যাগ দ্বারা ইন্দ্রের পূজা করেছিলেন। যজ্ঞের নেতা অঙ্গিরাগণ অশ্বযুক্ত ও গাভীযুক্ত ও অন্য পশুযুক্ত সমস্ত ধন লাভ করেছিলেন।

৫। অথবা ঋষি যজ্ঞ দ্বারা প্রথমে অপহৃত গাভীগণের পথ বার করেছিলেন, পরে ব্রতপালনকারী কমনীয় সূর্য রূপ ইন্দ্র দৃষ্ট হয়েছিলেন অথবা ঐ গাভী সকল প্রাপ্ত হলেন; কবির পুত্র উশনা ইন্দ্রের সহায় হয়েছিলেন। আমরা শত্রু দমনের নিমিত্ত সমূৎপন্ন এবং অমর ইন্দ্রের পূজা করি।

৬। সুন্দর ফলযুক্ত যজ্ঞের জন্য যখন কুশচ্ছেদন হয়, যখন-স্তোত্রনিষ্পাদক হোতা দ্যুতিমান যজ্ঞে স্তুতি ঘোষিত করে, যখন সোমনিসান্দী প্রস্তা শাস্ত্রীর স্তুতিকারী স্তোতার ন্যায় শব্দ করে, তখন ইন্দ্র হর্যযুক্ত হন।

টীকাঃ

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৮৪

অনুবাদঃ

১। হে ইন্দ্র! তোমার জন্য সোমরস অভিষুত হয়েছে; হে বলবান শত্রুদের ধর্ষণকারী ইন্দ্র। আগমন কর। সূর্য যেরূপ অন্তরীক্ষকে কিরণ দ্বারা পূরিত করেন, সেরূপ প্রভূত সামর্থ তোমাকে পূরিত করুক।

২। ইন্দ্রের অশ্বদ্বয় অহিংসিত বল ইন্দ্র ঋষিগণের ও অন্যান্য লোকের স্তুতি ও যজ্ঞের সমীপে বহন করুক।

৩। হে বৃত্রহস্তা! রথে আরোহণ কর, যেহেতু তোমার অশ্বদ্বয় মন্ত্র দ্বারা রথে সংযোজিত হয়েছে। সোমনিস্যন্দ প্রস্তর শব্দের দ্বারা তোমার মন আমাদের অভিমুখী করুক।

৪। হে ইন্দ্র! তুমি এ অতিশয় প্রশংসনীয় হর্যকর ও অমর সোমপান কর। যজ্ঞগৃহে এ দীপ্তিমান সোমধারা তোমারই দিকে বয়ে যাচ্ছে।

৫। শীঘ্র ইন্দ্রের পূজা কর, তার স্তুতি কর, অভিষূত সোমরস তাঁকে হৃষ্ট করুক, প্রসংসনীয় ও বলবান ইন্দ্রকে নমস্কার কর।

৬। হে ইন্দ্র! যখন তুমি অশ্বদ্বয় রথে যোজিত কর, তখন তোমার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট রথী আর নেই। তোমার সদৃশ বলসম্পন্ন কেউ নেই, তোমার ন্যায় শোভনীয় অশ্বযুক্ত কেউ নেই।

৭। যে ইন্দ্র কেবল হব্যদাতা যজমানকে ধন প্রদান করেন, তিনি সমস্ত জগতের নির্বিরোধী স্বামী।

৮। যে হব্য প্রদান করে না, তাকে মন্ডলাকার সর্পের ন্যায় ইন্দ্র কখন পা দিয়ে দলন করবেন? ইন্দ্র কখন আমাদরে স্তুতি শ্রবণ করবেন?

৯। হে ইন্দ্র! যে অভিষুত সোম দ্বারা তোমার সেবা করে, তুমি তাকে ধন দান কর।

১০। সৌবর্ণ দগাভী সকল সুস্বাদু এবং এ প্রকারে সর্ব যজ্ঞে ব্যাপ্ত মধুর সোমরস পান করে। সে গাভীগণ শোভার নিমিত্ত অভীষ্টদাতা ইন্দ্রের সাথে গমন করতৎ হর্ষ প্রাপ্ত হয়। ঐ গাভী সকল ইন্দ্রের রাজত্ব লক্ষ্য করে অবস্থিতি করে।

১১। ইন্দ্রের স্পর্শাভিলাষী উক্ত নানাবর্ণের গাভী সকল সোমের সাথে তাদের দুগ্ধ মিশ্রিত করে। ইন্দ্রের প্রিয় ধেনু সকল শত্রু বিনাশী বজ্রকে শত্রুগণের মধ্যে প্রেরণ করে। ঐ গাভী সকল ইন্দ্রের রাজত্ব লক্ষ করে অবস্থিতি করে।

১২। এ প্রকৃষ্ট জ্ঞানযুক্ত গাভী সকল স্বীয় দুগ্ধরূপ অন্নদ্বারা ইন্দ্রের বলের পূজা করে। তারা (যুদ্ধাভিলাষী শত্রুগণের) পূর্ব হতে অবগতির জন্য ইন্দ্রের শত্রুবধাতি বহু কার্য ঘোষিত করে। ঐ গাভী সকল ইন্দ্রেররাজত্ব লক্ষ্য করে অবস্থিতি করে।

১৩। অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইন্দ্র দধীচি ঋষির অস্থি দ্বারা বৃত্রগণকে নবগুণ নবতি বার বধ করেছিলেন (১)।

১৪। ইন্দ্র পর্বতে লুক্কায়তি দধীচির অশ্বমস্তক পাবার ইচ্ছা করে সে মস্তক শর্ষণাবৎ সরোবরে (২) প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

১৫। এরূপ আদিত্যরশ্মি এ গমনশীল চুন্দ্রমন্ডলের অন্তর্হিত সূর্য তেজ পেয়েছিল (৩)

১৬। অদ্য কে ইন্দ্রের গমনশীল রথে বীর্যযুক্ত, তেজোময় দুঃসহক্রোধযুক্ত অশ্ব সংযোজনা করতে পারে? সে অশ্বগণের মুখে বাণ আবদ্ধ আছে তারা শত্রুদের হৃদয়ে পাদক্ষেপ করে ও মিত্রদের সুখ প্রদান করে। যে এ অশ্বগণের ক্রি{য়া প্রশংসা করে, তারা দীর্ঘ জীবন প্রাপ্ত হয়।

১৭। শত্রুভয়ে কে নির্গত হয়? কে শত্রুদ্বারা নষ্ট হয়? কে ভীত হয়? রক্ষকরূপে সমীপস্থিত ইন্দ্রকে কে জানে? কে বা পুত্রের নিমিত্ত, নিজের নিমিত্ত, ধনের নিমিত্ত, শরীর রাক্ষর নিমিত্ত, বা পরিজন রক্ষার নিমিত্ত ইন্দ্রের নিকটে প্রার্থনা করে (৪)?

১৮। কে অগ্নির স্তুতি করে? কে নিত্য ঋতু উপলক্ষ্য করে পাত্রস্থিত হব্যঘৃত দ্বারা পূজা করে? ইন্দ্র ভিন্ন অন্য দেবগণ কোন যজমানকে প্রশংসনীয় ধন শীঘ্র প্রদান করেন? যজ্ঞরত এবং দেবপ্রসাদযুক্ত কোন যজমান ইন্দ্রকে সম্যক জানে?

১৯। হে বলবান দেব ইন্দ্র! তুমি স্তুতিরত মানুষকে প্রশংসা কর। হে মঘবন! তোমা ভিন্ন আর কেউ সুখদাতা নেই, অতএব তোমার স্তুতি করি।

২০। হে নিবাসস্থানদাতা ইন্দ্র! তোমার ভূতগণ ও সহায়করূপ মরুৎগণ আমাদের যেন কখন বিনাশ না করে। হে মানুষের হিতকারী ইন্দ্র! আমরা মন্ত্র জানি, তুমি আমাদের ধন এনে দাও।

টীকাঃ

১। দধীচির অস্থি নিয়ে ত্বষ্টা বজ্র নির্মাণ করলে সে বজ্র দ্বারা ইন্দ্র অসুরদের নাশ করেন, এরূপ পৌরাণিক গল্প আছে। দধীচির অস্থি দ্বারা ইন্দ্র বৃত্রদের হনন করেছেন, তা বেদে আমরা এ স্থলে পেলাম। ১১৬ সুক্তের ১২ ঋকের টীকা দেখুন।

২। শর্ষাণাবদ্ধ বৈ নাম কুরুক্ষেত্রস্য জঘনার্থে সরঃ। সায়ণ।

৩। ত্বষ্টৃতেজ অর্থাৎ সূর্যতেজ। তদেতেন উপেক্ষিতব্যং আদিত্যতঃ অস্য দীপ্তি র্ভবতি। নিরুক্ত

২।৬। অতএব সূর্য কিরণ চন্দ্রে প্রতিফলিত হয়ে চন্দ্রের আলোক হয় এ কথা ঋগ্বেদের সময় অথবা যাস্কের সমসয় জানা ছিল।

৪। অর্থাৎ ইন্দ্র স্বয়ংই এ সমস্ত আমাদের দেন। এখানেও কঃ অর্থে প্রজাপতি করে সায়ণ দ্বিতীয় একটি ব্যাখ্যা করেছেন।

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৮৫

অনুবাদঃ

১। মরুৎগণ গমন কালে স্বীয় শরীর স্ত্রীলোকের ন্যায় অলঙ্কৃত করেন। তারা গমনশীল রুদ্রের পুত্র এবং হিতকর কার্য দ্বারা আকাশ ও পৃথিবীর বন্ধন সাধন করেন। বীর ও বর্ষণশীল মরুৎগণ যজ্ঞে হব্য প্রাপ্ত হন।

২। ঐ মরুৎগণ দেবগণের দ্বারা অভিষিক্ত হয়ে মহত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন। রুদ্রপুত্রগণ আকাশে স্থান পেয়েছেন; অর্চনীয় ইন্দ্রের অর্চনা করে ও ইন্দ্রকে বীর্যশাল করে পুশ্নিপুত্র মরুৎগণ ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হয়েছিল।

৩। গাভীর পুত্র মরুৎগণ (১) তখন অসংস্কারের দ্বারা আপনাদের শোভাযুক্ত করেন, তখন দীপ্ত মরুৎগণ স্বীয় শরীরে উজ্জ্বল অলঙ্কার ধারণ করেন, তারা সমস্ত শত্রু নাশ করেন এবং তাদের মার্গ অনুসরণ করে বৃষ্টি ঝরে।

৪। সুন্দর যজ্ঞযুক্ত মরুৎগণ আয়ুধের দ্বারা বিশেষরূপে দীপ্তিমান হয়েছেন; তারা স্বয়ং অবিচলিত হয়ে পর্বতাদিকেও উৎপাদিকেও উৎপাটিত করেন; যখন তোমরা রথে বিন্দু চিহ্নিত মৃগ সংযোজিত কর, তখন হে মরুৎগণ! তোমরা মনের ন্যায় বেগগামী এবং বৃষ্টিসেচনব্রতে নিযুক্ত হও।

৫। অন্নের জন্য মেঘকে বর্ষ ণার্থে প্রেরণ করে যখন বিন্দুচিহ্নিত মৃগ রথে সংযোজিত কর, তখন উজ্জ্বল অরুযের নিকট হতে বারিধারা (২) বিমুক্ত হয় এব{ং চম{র্ আধারের জলের ন্যায় জলদ্বারা সমস্ত ভূমি আর্দ্র হয়।

৬। হে মরুৎগণ! তোমাদের বেগবান ও লঘুগামী অশ্ব তোমাদের এ যজ্ঞে বহন করুক; তোমরা শীঘ্রগামী, হস্তে (ধন নিয়ে) এস। হে মরুৎগণ। বিস্তীর্ণ কুশের উপর উপবেশন কর এবং মধুর সোমরস পান করে তৃপ্ত হও।

৭। মরুৎগণ নিজ বলে নির্ভর করে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছেন, মহিমা দ্বারা স্বর্গে স্থান পেয়েছেন এবং বিস্তীর্ণ বাসস্থান করেছেন। যাদের জন্য বিষ্ণ সোমরস রক্ষা করেন, সে মরুৎগণ পক্ষীর ন্যায় শীঘ্র আগমন করে এ প্রীতিকর কুশে উপবেশন করুন।

৮। শুরদের ন্যায়, যুদ্ধার্থীদের ন্যায়, যশঃপ্রিয় পুরুষদের ন্যায় শীঘ্রগামী মরুৎগণ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছেন; বিশ্বভূবন সে মরুৎগণকে ভয় করে, তারা নেতা ও রাজার ন্যায় উগ্নরূপ।

৯। শোভনকর্মা ত্বষ্টা যে সুনির্মিত, হিরস্ময় ও অনেক ধারাযুক্ত বজ্র ইন্দ্রকে দিয়েছিলেন, ইন্দ্র সে বজ্র সংগ্রামে কার্যসাধন করবার জন্য ধারণ করে বৃত্তবধ করেছিলেন এবং বারিয়াশি বর্যিত করেছিলেন।

১০। মরুৎগণ স্বীয় বল দ্বারা কূপ উপরে উঠিয়ে (৩) পথনিরোধক পর্বতকে বিভেদ করেছিলেন। শোভন দানশীল মরুৎগণ বীণা বাজিয়ে (৪) সোমপানে হৃষ্ট হয়ে রমণীয় বন দিয়েছিলেন।

১১। মরুৎগণ সে গোতমের দিকে যুপ বক্রভাবে প্রেরণ করলেন; এবং তুষিত গোতম ঋষির জন্য জল সিঞ্চন করলেন। বিচিত্র দীপ্তিযুক্ত মরুৎগণ রক্ষণের জন্য আগমন করেন এবং জীবনোপায় জলদ্বারা মেধাবী গোতমের তৃপ্তিসাধন করেছিলেন।

১২। হে মরুৎগণ। তোমাদের স্তোতাকে দেয় যে সুখ তিন জগতে আছে, তোমরা তা হব্যদাতাকে প্রদান কর। সে সমস্ত আমাদের দাও। হে অভীষ্ট প্রদ! আমাদের বীরযুক্ত ধন দাও।

টীকাঃ

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৮৬

অনুবাদঃ

১। হে উজ্জ্বল মরুৎগণ! অন্তরীক্ষ হতে আগমন করে তোমরা যার গৃহে সোমপান কর, সে জন অমিশয় সুরক্ষক সম্পন্ন।

২। হে যজ্ঞবাহী মরুৎগণ! যজ্ঞরত যজমানের স্তুতি অথবা মেধাবীর আহ্বান শ্রবণ কর।

৩। যে যজমানের ঋত্বিকগণ মরুৎগণকে (হব্য প্রদান দ্বারা) উৎসাহিত করেছে, সে যজমান বহুগাভী যুক্ত গোষ্ঠে গমন করেন।

৪। যজ্ঞের দিবসে বীর মরুৎগণের নিমিত্ত যজ্ঞে সোম অভিযুত হয়, এবং মরুৎগণের হর্যের নিমিত্ত স্তোত্র উচ্চারিত হয়।

৫। সর্বশত্রু বিজয়ী মরুৎগণ স্তোতার স্তুতি শ্রবণ করুন এবং স্তোতা প্রভূত অন্ন প্রাপ্ত হোন।

৬। হে মরুৎগণ! আমরা, সর্বজ্ঞ মরুৎগণ কর্তৃক রক্ষিত হয়ে, তোমাদের বহুবৎসর হব্য প্রদান করছি।

৭। হে যজনীয় মরুৎগণ! যার হব্য তোমরা গ্রহণ কর, সে সৌভাগ্যশালী হোক।

৮। হে প্রকৃত বলসম্পন্ন নেতা মরুৎগণ! তোমাদের স্তুতি পরায়ণ ও শ্রমের দ্বারা স্বেদযুক্ত এবং তোমাদের অভিলাষী স্তোতৃগণের অভিলাষ অবগত হও।

৯। হে প্রকৃত বলসম্পন্ন মরুৎগণ! তোমরা উজ্জ্বল মাহাত্ম্য প্রকাশ কর এবং তা দিয়ে রাক্ষদের তাড়িত কর।

১০। সর্বব্যাপী অন্ধকারকে নিবারণ কর; রাক্ষসাদি সকল ভক্ষককে বিদুরিত কর; অভিলষিত যে জ্যোতি আমরা

টীকাঃ

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৮৭

অনুবাদঃ

১। মরুৎগণ শত্রুঘাতী প্রকৃষ্ট বল সম্পন্ন, জয়ঘোষযুক্ত, আনতিরহিত, অবিযুক্ত, ঋজীষী ও যজমানের সেবিত এবং মেঘাদির নেতা মরুৎগণ আভরণ দ্বারা নক্ষত্রপূর্ণ আকাশের ন্যায় প্রকাশিত হলেন।

২। হে মরুৎগণ! পক্ষীর ন্যায় কোনও পথ দিয়ে শীঘ্র ধাবমান হয়ে সন্নিকৃষ্ট নভঃ প্রদেশে যখন তোমরা গমনশীল মেঘসমূহকে সমবেত কর, তখন তোমাদের মেঘ সকল তোমাদের রথে সংশ্লিষ্ট হয়ে বারিবর্ষণ করে; অতএব, তোমরা পূজকের উপর মধু সদৃশ স্বচ্ছ বারি সিঞ্চন কর।

৩। যখন মরুৎগণ শুভপ্রদ বৃষ্টির জন্য মেঘ সকলকে সজ্জিত করেন, তখন মরুৎগণ মেঘ সকলকে উৎক্ষিপ্ত করে নিয়মিত করছে দেখে পৃথিবী বিরহিতা স্ত্রীর ন্যায় (১) কম্পিত হন; সেরূপ বিহারশীল, গমনশীল ও দীপ্তায়ুধ মরুৎগণ পর্বতাদি কম্পিত করে স্বকীয় মহিমা প্রকটিত করেন।

৪। মরুৎগণ স্বয়ং পরিচালিত এবং বিন্দু চিহ্নিত মৃগ তাদের অশ্ব। তারা তরুণ বীর্যশালী এবং ক্ষমতাপন্ন, তোমরা সত্য, ঋণ হতে মুক্তিদাতা, আনন্দিত এবং জলবর্ষণকারী; তোমরা আমাদের যজ্ঞের রক্ষক।

৫। আমাদের পুরাতন পিতা বহুগণ কর্তৃক উপদিষ্ট হয়ে আমরা বলছি যে সোমের আহুতির সাথে স্তুতিবাক্য মরুৎগণকে প্রাপ্ত হয়; তারা ইন্দ্রের স্তুতি করে বৃত্র হনন কার্যে উপস্থিত ছিলেন এবং যজ্ঞার্হ নাম ধারণ করেছেন।

৬। ঐ মরুৎগণ প্রাণীগণের উপভোগের নিমিত্ত দীপ্তিমান সূর্যকিরণের সাথে বৃষ্টিবারি সিঞ্চন করতে ইচ্ছা করেন; তারা স্তুতিমান ঋত্বিগণের সাথে সুখকর হব্য ভক্ষণ করেন; স্তুতিযুক্ত বেগগামী ও নির্ভীক মসরুৎগণ সর্বপ্রিয় মরুৎসম্বন্ধীয় স্থান প্রাপ্ত হয়েছেন।

টীকাঃ

১। বিথুরা ইব। ভর্ত্রা বিযুক্তা জায়া। সায়ণ।

অষ্টম মণ্ডল: সুক্ত - ৮৮

অনুবাদঃ

১। হে মরুৎগণ! তোমরা বিদ্যুৎযুক্ত, শোভন গমন বিশিষ্ট, আয়ুধ সম্পন্ন ও অশ্বসংযুক্ত মেঘে আরোহণ করে আগমন কর। হে শোভনকর্মা মরুৎগণ! প্রভূত অন্নের সাথে পক্ষীর ন্যায় আমাদের নিকট আগমন কর।

২। মরুৎগণ অরুণ ও পিঙ্গল রথবাহক অশ্ব দ্বারা দেবগণের কোন স্তোতার নিকট শুভ সম্পাদনার্থে আগমন করছেন? সুবর্ণের ন্যায় দীপ্তিমান আয়ুধযুক্ত মরুৎগণ রথ চক্র দ্বারায় ভূমি ক্ষত করছেন।

৩। হে মরুৎগণ! ঐশ্বর্য লাভার্থ তোমাদের শরীরে শত্রুগণের আক্রোশকারী আয়ুধ আছে। মরুৎগণ বন বৃক্ষ সমূহের ন্যায় যজ্ঞ উর্ধ করেন। হে সুজাত মরুৎগণ! তোমাদের নিমিত্ত প্রভূত ধনশালী যজমানগণ (সোমনিস্যন্দী) প্রস্তর ধন যুক্ত করে।

৪। হে গৃঞ্জ সদৃশ মরুৎগণ! তোমাদরে দিবস আগত হয়েছে, সবং উদকনিস্পাদ্য যজ্ঞকে দ্যুতিমান করেছে। গোতম ঋষিগণ স্তোত্রের সাথে হব্য দান করে পানের নিমিত্ত কুপ উন্নমিত করেছেন।

৫। মরুৎগণ লৌহদংষ্ট্রা, ইতস্ততঃ ধাবমান বরাহ সদৃশ! সে মরুৎগণকে দেখে গোতম ঋষি যে স্তোত্র উচ্চারিত করেছিলেন, এ সে স্তুতি (১)।

৬। হে মরুৎগণ! যোগ্য স্তুতি তোমাদের প্রত্যেককে স্তুতি করে, ঋত্বিকগণের বাণী এখন অনায়াসে এ ঋকসমূহ দ্বারা তোমাদের স্তুতি করেছে, কেন না তোমরা আমাদের হস্তে বহুবিধ অন্ন স্থাপিত করেছ।

টীকাঃ

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৮৯

অনুবাদঃ

১। কল্যাণকর, অহিংসিত, অপ্রতিরুদ্ধ ও শত্রুবিনাশকারী যজ্ঞ সকল সর্বদিক হতে আগমন করুক; যারা আমাদের পরিত্যাগ না করে প্রতিদিন রক্ষা করেন সে দেবগণ সর্বদা আমাদের বর্ধিত করুন।

২। ঋজু লোকপ্রিয় দেবগণের কল্রাণকর অনুগ্রহ আমাদের অভিমুখে আগমন করুন এবং তাদের দান আমাদের অভিমুখে আগমন করুক। আমরা যেন সে দেবগণের বন্ধুত্ব প্রাপ্ত হই, তারা আমাদের জীবন বর্ধন করুন।

৩। তাহাদরে পূর্বের বাক্যের দ্বারা আহ্বান করি। ভগ, মিত্র, অদিতি, দক্ষ, অস্রিধ (১), অর্যমা, সোম এবং অশ্বিদ্বয়কে আহ্বান করি সৌভাগ্যশালিনী সরস্বতী আমাদের সুখ সম্পাদিত করুন।

৪। বায়ু আমাদের নিকট সুখোৎপাদক ভেষজ আনুন। জননী পৃথিবীও পিতা দ্যুলোকও আনুন। সোমনিস্যন্দী সুখোৎপাদক প্রস্তরও সেই ভেষজ আনুন। ধ্যান দ্বারা প্রাপ্তব্য, হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা আমাদের প্রার্থনা শ্রবণ কর।

৫। আমরা সে ঐশ্বর্যশালী, স্থাবর জঙ্গমের অধিপতি যজ্ঞতোষ ইন্দ্রকে আমাদের রক্ষার নিমিত্ত আহ্বান করি। পূষা যেরূপ আমাদের ধন বর্ধনের জন্য রক্ষক আছেন, অহিংসিত পূষা সেরূপ আমাদের মঙ্গলের জন্য রক্ষক হোন।

৬। প্রভূত স্তুতিভাজন ইন্দ্র ও সর্বজ্ঞ পূষা আমাদের মঙ্গল প্রদান করুন।

৭। মরুৎগণ বিন্দুচিহ্নিত মৃগযুক্ত, পৃশ্নিপুত্র, শোভনীয় গতিযুক্ত, যজ্ঞগামী ও অগ্নিজিহ্বায় অবস্থিত (৩) বুদ্ধিসম্পন্ন ও সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান মরুৎ দেবগণ আমাদের রক্ষার জন্য এ স্থানে আসুন।

৮। হে দেবগণ! আমরা যেন কর্ণে কল্যাণকর বাক্য শ্রবণ করত সমর্থ হই। হে যজনীয় দেবগণ! আমরা চক্ষে যেন কল্রাণকর বস্তু দেখতে সমর্থ হই। আমরা যেন দৃঢ়াঙ্গশরীরযুক্ত হয়ে তোমাদের স্তুতি করে দেবগণ দ্বারা নির্দিষ্ট আয়ু প্রাপ্ত হই।

৯। হে দেবগণ। মনুষ্যের পক্ষে শত বছর আয়ু কল্পিত হয়েছে; ঐ সময়ে তোমরা শরীরে জরা উৎপাদন করে থাক, ঐ সময় পুত্রগণ পিতা হন। সে নির্দিষ্ট আয়ুর মধ্যে আমাদের বিনাশ করো না।

১০। অদিতি আকাশ, অদিতি অন্তরীক্ষ, অদিতি মাতা, তিনি পিতা, তিনি পুত্র, অদিতি সকল দেব, অদিতি পঞ্চ লোক, (৪) অদিতি জন্ম ও জন্মের কারণ।

টীকাঃ

১। অস্রিধং শোষণরহিতং সর্বদৈকরূপেণ বর্ত্তমানং মরুদগং। সায়ণ।

২। মূলে তার্ক্ষ্যঃ অরিষ্টনেমিঃ আছে। সায়ণ অর্থ করেছেন অহিংসিত রথমেমিযুক্ত গরুড়। কিন্তু বিষ্ণুর বাহন গরুড় ঋগ্বেদের সময় কল্পিত হয়নি এবং গরুড়কে নেমিযুক্ত বলে কেন বর্ণনা করবে বুঝা যায় না। পুরাণে কোন কোন স্থলে কশ্যপ বা প্রজাপতির নাম অরিষ্টনেমি এরূপ দেখা যায়; এ স্থানেও তার্ক্ষ্যঃ অরিষ্টনেমিঃ অর্থে তৃক্ষের পুত্র কশ্যপ হওয়া সম্ভব।

৩। সকল দেবগণই হব্য প্রাপ্তির জন্য অগ্নির হ্বিয়া অবস্থান করেন। সায়ণ।

৪। অদিতিঃ পঞ্চজনাঃ এ পঞ্চজন কে তা সায়ণ এরূপ লিখেছেন পঞ্চজনা নিষাদপঞ্চামাশ্চাত্বারো বর্ণাঃ। যদ্বা গন্ধর্বাঃ পিতরো দেবা অসুরা রক্ষাংসি। যাস্ক বলেছেন গন্ধর্বাঃ পিতরো দেবা অসুরা রক্ষাংসীত্যেতে চত্বারো বর্ণা নিষাদপঞ্চম ইত্যোপমন্যাবঃ। নিরুক্ত

৫। এ অর্থ সঙ্গত মনের হয় না। ঋগ্বেদে অনেক স্থানে পঞ্চক্ষিতি বা পঞ্চকৃষ্টি বা পঞ্চজন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার অর্থ পাঞ্চাব প্রদেশ ও পঞ্চনদকলবাসী সমস্ত আর্য জাতি। প্রথম মন্ডলের ৭ সুক্তের ৯ ঋক ও দ্বিতীয় মন্ডলের ২ সুক্তের ১০ ঋকের টীকা দেখুন।

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯০

অনুবাদঃ

১। বরুণ ও মিত্র (উত্তম পথ) অবগত হয়ে আমাদের অকুটিল গতিতে নি{েয় যান এবং দেবগণের সাথে সমান প্রীতিযুক্ত অর্যমাও (আমাদের) নিয়ে যান।

২। তারা ধন বিতরণ করেন, তারা মূঢ়তাশূন্য হয়ে স্বীয় তেজের দ্বারা সকল দিন স্বীয় কার্য পালন করেন।

৩। সে অমরগণ আমাদের শত্রু বিনাশ করে আমাদের সুখ প্রদান করুন; আমরা মরণশীল মানুষ।

৪। স্বর্গীয় ইন্দ্র, মরুৎগণ, পূষা ও ভগ দেবগণ উৎকৃষ্ট ফল প্রাপ্তির জন্য আমাদের পথ দেখিয়ে দিন।

৫। হে পূষা, বিষ্ণু ও মরুৎগণ! তোমরা আমাদের যজ্ঞ পশুপ্রাপক কর এবং আমাদের বিনাশ রহিত কর।

৬। বায়ু সকল যজমানের জন্য মধু বর্ষণ করে, নদীসমূহ মধুক্ষরণ করে; ওষধি সকলও মাধুর্যযুক্ত হোক।

৭। আমাদের রাত্রি ও ঊষা মধুর হোক; পার্থিব জনপদ মাধুর্য বিশিষ্ট হোক; যে আকাশ সকলের পালয়িতা সে আক্লাশও মধুযুক্ত হোক।

৮। বনস্পতি আমাদের প্রতি মধুর হোক; সূর্য ও মধুর হোক; ধেনুসকল মধুর হোক।

৯। মিত্র, বরুণ অর্যমা, বৃহস্পতি, ইন্দ্রও বিস্তীর্ণ পাদক্ষেপী বিষ্ণু আমাদের সুখকর হোক।

টীকাঃ

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯১

অনুবাদঃ

১। হে সোম! আমরা বুদ্ধিদ্বারা তোমাকে বিশেষরূপে অবগত আছি, তুমি আমাদের সরল পথে নিয়ে যাও; হে ইন্দ্র! (অর্থাৎ হে সোম!) তোমাকর্তৃক নীত হয়ে আমাদের পিতৃগণ দেবগণ মধ্যে রত্ন প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

২। হে সোম তুমি স্বীয় যজ্ঞ দ্বারা শোভনীয় যজ্ঞযুক্ত, স্বীয় বল দ্বারা শোভনীয় বলযুক্ত, তুমি সর্বজ্ঞ। তুমি অভিষ্ট ফল বর্ষণ দ্বারা বর্ষণকারী এবং তুমি মহিমায় মহান যজমানের অভিমত ফল প্রদর্শন করে যজমানদত্ত অন্ন দ্বারা প্রভূতান্নযুক্ত।

৩। হে সোম! রাজা বরুণের কার্য সমুদয় তোমারই, তোমার তেজ বিস্তীর্ণ ও গভীর মিত্রের ন্যায় তুমি সকলের সংশোধক, অর্যমার ন্যায় তুমি সকলের বর্ধক।

৪। হে সোম! তোমার যে তজ দ্যুলোকে, পৃথিবীতে, পর্বতে, ওষধিতে এবং জলে আছে, সে তেজযুক্ত হয়ে, হে সুমনা এবং ক্রোধহীন, রাজন! আমাদের হব্য গ্রহণ কর।

৫। হে সোম! তুমি সৎলোকের অধিপতি, তুমি রাজা, তুমি বৃত্রহন্তা, তুমিই শোভনীয় যজ্ঞ। ৬; স্তোত্রপ্রিয় এব{ং ওষধি সকলের পালয়িতা সোম। যদি তুমি আমাদের জীবনৌষধ কামনা কর, তা হলে আমরা মরব না।

৭। হে সোম! তুমি যজ্ঞকারী বৃদ্ধ বা তরুণ যজ্ঞকারীর জীবনের জন্য উপভোগযোগ্য ধন দাও!

৮। হে রাজন সোম! আমাদের দুৎখদানে অভিলাষী সকল লোক হতে রক্ষা কর; তোমার মত ব্যক্তির সখা কখন বিনাশপ্রাপ্ত হয় না।

৯। হে সোম! যজমানের সুখজনক তোমার যে সকল রক্ষণ আছে তা দিয়ে আমাদের রক্ষা কর। ১০১। হে সোম! তুমি আমাদের এ যজ্ঞ ও এ স্তুতি গ্রহণ করে এস এবং আমাদের বর্ধন কর।

১১। হে সোম! আমরা স্তুতিজ্ঞ, স্তুতিদ্বারা তোমাকে বর্ধিত করি, তুমি সুখদ হ{েয় এস।

১২। হে সোম! তুমি আমাদের ধনবর্ধক, রোগহস্তা, ধনদাতা, সম্পদ বর্ধক ও সুমিত্রযুক্ত হও।

১৩। হে সোম। গাভী যেরূপ সুন্দর তৃণে তৃপ্ত হয়, মনুষ্য যেরূপ স্বীয় গৃহে তৃপ্ত হয়, সেরূপ তুমি আমাদের হৃদয়ে তৃপ্ত হয়ে অবস্থান কর।

১৪। হে দেব সোম! যে মানুষ বন্ধুত্ব প্রযুক্ত তোমার স্তুতি করে, হে অতীতজ্ঞ ও দক্ষ সোম! তুমি তাকে অনুগ্রহ কর।

১৫। হে সোম! আমাদের অভিশাপ হতে রক্ষা কর ও পাপ হতে রক্ষা কর, সুখদান করে আমাদের হিতকারী হও।

১৬। হে সোম! তুমি বর্ধিত হও, তোমার বীর্য সকল দিক হতে ত্বৎসংযুক্ত হোক, তুমি আমাদের অন্নদাতা হও।

১৭। অত্যন্ত মদযুক্ত, হে সোম! সমস্ত লতাবয়ব দ্বারা বর্ধিত হও, শোভন অন্নযুক্ত হয়ে তুমি আমাদের সখা হও।

১৮। হে সোম! তুমি শত্রুহন্তা, তোমাতে রস ও যজ্ঞের অন্ন ও বীর্য সংযুক্ত হোক, তুমি বর্ধিত হ{েয় আমাদের অমরত্বের জন্য স্বর্গে উৎকৃষ্ট অন্ন ধারণ কর।

১৯। যজমানগণ তোমার হব্যদবারা যে তেজের পূজা করে, সে সমস্ত তেজ আমাদের যজ্ঞকে ব্যাপ্ত করুক। ধনবর্ধক, পাপত্রাতা, বীর যুক্ত ও পুত্রগণের রক্ষাকর্তা সোম। তুমি আমাদের গৃহে এস।

২০। যে সোমকে হব্য প্রদান করে, সোম তাকে গাভী, শীঘ্রগামী অশ্ব প্রদান করেন এবং লৌকিক কার্য কুশল, গৃহকার্য কুশল যাগানুষ্ঠান পর, মাতার অদৃত এবং পিতৃনাম উজ্জ্বলকারী পুত্র প্রদান করেন। ২১। হে সোম! তুমি যুদ্ধে অজেয়, সেনার মধ্যে জয়শীল স্বর্গের প্রাপয়িতা, বৃষ্টিদাতা, বলের রক্ষক, যজ্ঞে অবস্থাতা, সুন্দর নিবাসযুক্ত, সুন্দর যশযুক্ত এবং জয়শীল তোমাকে চিন্তা করে হর্যযুক্ত হই। ২২। হে সোম! তুমি এ সমস্ত ওষধি উৎপাদিত করেছ ও বৃষ্টির জল সৃষ্টি করেছ, তুমি সমস্ত গাভী সৃষ্টি করেছ। তুমি এ বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষকে বিস্তীর্ণ করেছ ও তার অন্ধকার জ্যোতি দ্বারা বিনষ্ট করেছ। ২৩। হে বলবান সোম দেব! তোমার কান্তিযুক্ত বুদ্ধি দ্বারা আমাদের ধনের অংশ প্রদান কর। কোন শত্রু তোমার হিংসা না করুক, যুধ্যমান দুপক্ষের মধ্যে তুমি বলিষ্ঠ, সংগ্রামে আমাদের দৌরাত্ম্য হতে রক্ষা কর।

টীকাঃ

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯২

অনুবাদঃ

১। ঊষা দেবতাগণ আলোকে প্রকাশ করেছেন এবং অন্তরীক্ষের পূর্ব দিকে জ্যোতি প্রকাশিত করেন। যোদ্ধাগণ যেরূপ আয়ুধ সকলের সংস্কার করে, সেরূপ স্বীয় দীপ্তি দ্বারা জগতের সংস্কার করে গমনশীল, দীপ্তিমান এবং মাতৃগণ প্রতিদিন গমন করেন।

২। অরূণ ভানুকিরণ অনায়াসে উদিত হওয়ার পর রথ যোজনযোগ্য শুভ্রবর্ণ গাভীসকলকে ঊষা দেবতাগণ রথে যোজিত করলেন এবং পূর্বের ন্যায় সমস্ত প্রাণীকে জ্ঞানসুক্ত করলেন; তৎপরে দীপ্তিযিুক্ত ঊষা দেবতা সকল শুভ্রবর্ণ সূর্যকে আশ্রয় করলেন।

৩। নেত্রী ঊষা দেবতাগণ উজ্জ্বল অস্ত্রধারী যোদ্ধাদের ন্যায় এবং উদ্যোগ দ্বারাই দূরদেশে পর্যন্ত স্বীয় তেজের দ্বারা ব্যাপ্ত করেন। তারা শোভন কর্মকারী, সোমদায়ী, (দক্ষিণা) দাতা যজমানকে সকল অন্ন প্রদান করেন।

৪। ঊষা নর্তকীর ন্যায় রূপ প্রকাশ করছেন এবং গাভী যেরূপ (দোহনকালে) স্বীয় উধঃপ্রকাশ করে, সেরূপ ঊষাও স্বীয় বক্ষ প্রকাশিত করছেন। গাভী যেরূপ গোষ্ঠে শীঘ্র গমন করে, সেরূপ ঊষাও পূর্ব দিকে গমন করে বিশ্ব ভূবন প্রকাশ করতঃ অন্ধকার বিশ্লিষ্ট করছেন।

৫। ঊষার উজ্জ্বল তেজ প্রথমে পূর্ব দিকে দৃষ্ট হয় পরে সকল দিকে ব্যাপ্ত হয় এবং বিপুল অন্ধকার অপসারিত করে। পুরোহিত যেরূপ যজ্ঞে আজ্যদ্বারা যুপকাষ্ঠ অঞ্জিত করে, সেরূপ ঊষা স্বীয় রূপ প্রকাশ করছেন; স্বর্গ দুহিতা ঊষা দীপ্তিমান সূর্যের সেবা করছেন।

৬। আমরা নৈশ অন্ধকারের পারে এসেছি। ঊষা সমস্ত প্রাণীকে চৈতন্যযুক্ত করেছেন। দীপ্তিমতী ঊষা তোষামোদকারীর ন্যায় প্রীতি পাবার জন্য (স্বীয় দীপ্তি দ্বারাই) যেন হাসছেন। আলোক-বিকসিতাঙ্গী ঊষা আমাদের সুখের জন্য অন্ধকার বিনাশ করেছেন।

৭। গোতমবংশীয়গণ দীপ্তিমতী এবং সুনত বাক্যের উৎপাদয়িত্রী আকাশদুহিতার স্তুতি করেন। হে ঊষা! তুমি আমাদের পুত্রপৌত্রাদিযুক্ত, দাসপরিজনযুক্ত, অশ্বযুক্ত এবং গাভীযুক্ত অন্ন প্রদান কর।

৮। হে ঊষা! আমি যেন যশোযুক্ত বীরযুক্ত দাসবিশিষ্ট এবং অশ্বযুক্ত ধন প্রাপ্ত হই। হে সুভগে! তুমি সুন্দর যজ্ঞে স্তোত্র দ্বারা প্রীত হয়ে আমাদের অন্ন দান করে সে প্রভূত ধন প্রকাশিত কর।

৯। উজ্জ্বল ঊষা সমস্ত ভূবন প্রকাশিত করে, আলোক দ্বারা পশ্চিমদিকে বিস্তৃত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছেন এবং সমস্ত জীবকে স্ব স্ব ব্যাপারে প্রবর্তিত করবার জন্য জাগিয়ে দেন; তিনি ধীশক্তি সম্পন্ন প্রাণীদের বাক্য শ্রবণ করেন।

১০। ব্যাধ পত্নী যেরূপে চলনশীল পক্ষীর পক্ষ ছেদন করে হিংসা করে, সেরূপ পুনঃ পুনঃ আবির্ভূত নিত্য এবং একরূপধারিণী ঊষা দেবী (দিনে দিনে) সমস্ত প্রাণীর জীবন হ্রাস করেন।

১১। ঊষা আকাশ প্রান্তকে (অন্ধকার হতে) বিযুক্ত করে সকলের নিকট জ্ঞাত হন এবংভগিনী নিশাকে অন্তর্হিত করেন। প্রণয়ী সূর্যের স্ত্রী ঊষা দেবী মনুষ্যগণের আয়ু (দিনে দিনে) হ্রাস করে বিশেষরূপে প্রকাশিত হন।

১২। (পশু পালক) যেরূপ পশু বিচরণ করায়, সুভগ্য এবং পূজনীয়া ঊষা সেরূপ (তেজ) বিস্তার করছেন এবং তেজ বিস্তার করে নদীর ন্যায় মহতী ঊষা (সমস্ত জগৎ) ব্যাপ্ত করছেন। তিনি দেবগণের যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে সূর্যকিরণের সথে দৃষ্ট হন।

১৩। হে অন্নযুক্ত ঊষা! আমাদের বিচিত্র ধন প্রদান কর, যে ধনের দ্বারা আমরা পুত্র ও পৌত্রকে পালন করতে পারি।

১৪। হে গাভীযুক্ত, অশ্বযুক্ত, দ্যুতিমান এবং সুনত বাক্যযুক্ত ঊষা! অদ্য এ স্থানে ধনযুক্ত (যজ্ঞ অনুষ্ঠানার্থে) আমাদরে জন্য উদয় হও।

১৫। হে অন্নযুক্ত ঊষা! অদ্য অরুণ বর্ণ অশ্বসংযোজনা কর এবং আমাদের জন্য সমস্ত সৌভাগ্য আন। ১৬ হে দস্র অশ্বিদ্বয়! আমাদের গৃহ গাভীপূর্ণ ও রমনীয় বনপূর্ণ করার জন্য সমান মনোযোগী হয়ে তোমাদের রথ আমাদের গৃহাভিমুখে প্রবর্তিত কর।

১৭। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা আকাশ হতে প্রশংসনীয় জ্যোতি প্রেরণ করেছ তোমরা আমাদের জন্য বলপ্রদ অন্ন আন।

১৮। দ্যুতিমান আরোগপ্রদ সুবর্ণ রথযুক্ত এবং দস্র অশ্বিদ্বয়কে সোমপান করাবার জন্য অশ্বগণ ঊষাকালে জাগরিত হয়ে এস্থলে আনুক।

টীকাঃ

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯৩

অনুবাদঃ

১। হে অভীষ্টবর্ষী অগ্নি ও সোম! আমাদের এ আহ্বান শ্রবণ কর, স্তুতি গ্রহণ কর এবং হব্যদাতাকে সুখ প্রদান কর।

২। হে অগ্নি ও সোম! যে তোমাদের স্তুতি অর্পণ করছে, তাকে বলবান গো ও সুন্দর অশ্ব দান কর।

৩। হে অগ্নি ও সোম, যে তোমাদের আহুতি ও হব্য প্রদান করে, সে পুত্রপৌত্তাদির সাথে বীর্যযুক্ত সমস্ত আয়ু প্রাপ্ত হোক।

৪। হে অগ্নি ও সোম! তোমাদের যে বীর্যের দ্বারা পণির নিকট হতে গোরুপ অন্ন অপহৃত করেছিলে যে বীর্য দ্বারা বৃষয়ের পুত্রকে (১) বধ করে সকলের উপকারের জন্য একমাত্র জ্যোতিপূর্ণ সূর্যকে প্রাপ্ত হয়েছ, তা আমাদরে বিদিত আছে।

৫। হে অগ্নি ও সোম! তোমরা সমানকর্ম যুক্ত হয়ে আকাশে এ উজ্জ্বল নক্ষত্রগ্রহাদি ধারণ করেছ। তোমরা দোষাক্রান্ত নদী সকলকে প্রকটিত দোষ হতে মুক্ত করেছ।

৬। হে অগ্নি ও সোম! তোমোদের মধ্যে একজন (অর্থাঃ অগ্নিকে মাতরিশ্বা আকাশ হতে এনেছ (২) এবং আর এক জনকে (অর্থাঃ সোমকে) অদ্রির উপর হতে শ্যেনপক্ষী বলপূর্বক আহরণ করেছিল (৩) তোমরা স্তোত্রের দ্বারা বর্ধিত হয়ে যজ্ঞের নিমিত্ত ভূমি বিস্তীর্ণ করেছ।

৭। হে অগ্নি ও সোম! প্রদত্ত হব্য ভক্ষণ কর; আমাদের প্রতি অনুগ্রহ কর। হে অভীষ্টবর্ষী। আমাদের সেবা গ্রহণ কর; আমাদের প্রতি সুখপ্রদ ও রক্ষণযুক্ত হও এবং যজমানের রোগ ও ভয় দূর কর।

৮। হে অগ্নি ও সোম! যে যজমান দেবপরায়ণ অন্তঃকরণের সাথে হব্যদ্বারা অগ্নি ও সোমের পূজা করে তার ব্রত রক্ষা কর, তাকে পাপ হতে রক্ষা কর এবং সেই যাগ রত ব্যক্তিকে প্রভূত সুখ দাও।

৯। হে অগ্নি ও সোম! তোমরা সকল দেবগণমধ্যে প্রশংসনীয়, তোমরা সমানধনযুক্ত এবং একত্র আহ্বানযোগ্য, তোমরা আমাদের স্তুতি গ্রহণ কর।

১০। হে অগ্নি ও সোম! যে তোমাদের ঘৃত প্রদান করে, তাকে প্রভূত ধন দাও।

১১। হে অগ্নি ও সোম! আমাদরে এ হব্য গ্রহণ কর এবং একত্রে এস।

১২। হে অগ্নি ও সোম! আমাদের অশ্ব পালন কর। ক্ষীরাদি হব্যের জনয়িত্রী আমাদের গাভী সকল বর্ধিত হোক, আমরা ধনযুক্ত আমাদের ফল প্রদান কর এবং আমাদের যজ্ঞ ধনযুক্ত কর।

টীকাঃ

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯৪

অনুবাদঃ

১। আমরা সর্বভূতজ্ঞ অগ্নির উদ্দেশে সোম অভিষব করি। যারা আমাদের প্রতি শত্রুর ন্যায় আচরণ করে, তিনি তাদের ধন দহন করুন। যেরূপ নৌকাদ্বারা নদী পার করা হয়, সেরূপ তিনি আমাদের সমস্ত দুঃখ পার করিয়ে দিন; অগ্নি আমাদের পাপসমূহ পার করিয়ে দিন।

টীকাঃ

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯৫

অনুবাদঃ

১। আমরা বুদ্ধিদ্বারা পূজনীয় সর্বভূতজ্ঞ অগ্নির রথের ন্যায় এ স্তুতি প্রস্তুত করি। অগ্নিভজনে আমাদের বুদ্ধি উৎকৃষ্ট হয়, হে অগ্নি! তুমি আমাদের বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

২। হে অগ্নি! যার নিমিত্ত তুমি যজ্ঞ কর, তার অভিলাষ পূর্ণ হয়। সে উৎপীড়িত না হয়ে বাস করে, মহাবীর্য ধারণ করে এবং বর্ধিত হয়। দারিদ্র্য তাকে প্রাপ্ত হতে পারে না। হে অগ্নি! তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

৩। হে অগ্নি! আমরা যেন তোমাকে সম্যক প্রজ্বলিত করতে সমর্থ হই। তুমি আমাদের যজ্ঞ সাধিত কর, যেহেতু দেবগণ (তোমাতে) প্রক্ষিপ্ত হব্য ভক্ষণ করেন। তুমি আদিত্যগণকে আন, আমরা তাদের কামনা করি। হে অগ্নি! তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

৪। হে অগ্নি! আমরা ইন্ধন সংগ্রহ করি। তোমাকে জানিয়ে হব্য প্রদান করি। তুমি আমাদের আয়ু বৃদ্ধির জন্য যজ্ঞ সম্পন্ন কর। হে অগ্নি! তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

৫। তার রশ্মি সকল প্রাণীগণকে রক্ষা করে বিচরণ করে। দ্বিপদ ও চতুষ্পদ জন্তুগণ তার কিরণে বিচরণ করে। তুমি বিচিত্র দীপ্তিযুক্ত এবং সকল বস্তু প্রদর্শন কর। তুমি ঊষা হতেও মহৎ। হে অগ্নি! তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

৬। হে অগ্নি! তুমি অধুর্যু তুমি মুখ্য হোতা, তুমি প্রশান্তা পোতা, তুমি জন্ম হতেই পুরোহিত (১)। ঋত্বিকের সমস্ত কার্য তুমি অবগত আছ, অতএব তুমি যজ্ঞ সম্পূর্ণ কর। হে অগ্নি! তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

৭। হে অগ্নি! তুমি সুন্দর তথাপি সকল দিকেই সদৃশ। তুমি দুরস্থ তথাপি নিকটে দীপামান হও। হে দেব অগ্নি! তুমি রাতের অন্ধকার ভেদ করে প্রকাশিত হও। হে অগ্নি! তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

৮। হে দেবগণ! সোমাভিষবকারী যজমানের রথ সর্বাগ্রবর্তী কর, আমাদের অভিশাপ শত্রুগণকে অভিভূত করুক, আমাদের এ বাক্য অবগত হও এবং পূর্ণ কর, হে অগ্নি! তুমি আমাদের বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

৯। তোমার সাংঘাতিক অস্ত্র দ্বারা দৃষ্ট ও দুবৃদ্ধি লোকদের বিনাশ কর, দূরবর্তী বা নিকটবর্তী শত্রুগণকে বিনাশ কর, অনন্তর তোমার স্তুতিকারী যজমানের জন্য সুগম পথ করে যাও। হে অগ্নি! তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

১০। হে অগ্নি! যখন তোমার দীপ্যমান লোহিত বর্ণ এবং বায়ুগতি অশ্বদ্বয় রথে সংযোজিত কর, তখন তুমি বৃষভের ন্যায় রব কর এবং বনের বৃক্ষসকলকে ধূমরূপ কেতু দ্বারা ব্যাপ্ত কর। হে অগ্নি!। তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

১১। পক্ষীগণও তোমার শব্দ শ্রবণ করে ভীত হয়। তোমার কতকগুলি শিখা তৃণদগ্ধ করে যখন সকল দিকে বিস্তুত হয় তখন সমস্ত অরণ্য তোমার ও তোমার রথের সুগম হয়। হে অগ্নি! তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

১২। মিত্র ও বরুণ এ স্তোতাকে ধারণ করুন, অন্তরীক্ষচারী মরুৎগণের ক্রোধ অত্যন্ত অধিক। আমাদের সুখী কর ও এ মরুৎগণের মন পুনরায় প্রসন্ন হোক। হে অগ্নি! তুমি বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

১৩। হে দ্যুতিমান অগ্নি! তুমি সকল দেবগণের পরম বন্ধু তুমি শোভনীয় এবং হজ্ঞে সকল ধনের নিবাস স্থান, তোমার বিস্তীর্ণ যজ্ঞ গৃহে আমরা যেন অবস্থান করি। হে অগ্নি! তুমি আমাদের বন্ধু আমরা যেন হিংসিত না হই।

১৪। স্বকীয় স্থানে প্রজ্জ্বলিত সোমরস দ্বারা আহত হয়ে যখন তুমি পুজিত হও তখন তুমি সুখ সম্ভোগ কর। তুমি আমাদের সুখকর হয়ে হব্যদাতাকে রমণীয় ফল ও ধন দান কর, হে অগ্নি! তুমি আমাদের বন্ধু থাকলে আমরা হিংসিত হব না।

১৫। হে শোভন ধনযুক্ত, অখন্ডণীয় অগ্নি! যে সর্ব যজ্ঞে বর্তমান যজমানকে তুমি পাপ হতে নিষ্কৃতি প্রদান কর এবং কল্যাণ কর বল প্রদান কর (সে সমৃদ্ধ হয়)। আমরা তোমার স্তোতা, আমরাও যেন পুত্তপৌত্রাদির সাথে তেমার ধনযুক্ত হই।

১৬। হে দেব অগ্নি! তুমি সৌভাগ্য অবগত আছ, একাজে তুমি আমাদের আয়ু বর্ধিত কর। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী এবং দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করুন।

টীকাঃ

১। যজ্ঞের প্রধান কয়েক জন পুরোহিতের নাম এ ঋকে পাওয়া যায়। অধ্বর্যু হব্য দান করতেন, হোতা দেবগণকে আহ্বান করতেন, পোতা যজ্ঞ শোধন করেন, দোষাদি হলে তার নিবারণ করেন। ৩৬ সুক্তের ৭ ঋকের টীকা দেখুন।

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯৬

অনুবাদঃ

১। বিভিন্নরূপ বিশিষ্ট দিন রাত শোভনীয় প্রয়োজন বশতঃ বিচরণ করছে, তারা পরস্পর পরস্পরের বৎসকে পালন করে (১)। সূর্য একের নিকট হতে অন্ন প্রাপ্ত হন, অগ্নি অপরের নিকট শোভনীয় দীপ্তিযুক্ত হয়ে প্রকাশিত হন।

২। দশ অঙ্গুলি একত্র হয়ে অবিরত কাষ্ঠ ঘর্ষণ করে ত্বষ্টার গর্ভ স্বরূপ ও সর্বভূতে বর্তমান (২) অগ্নিকে উৎপন্ন করে। সে অগ্নি তীক্ষ্মতেজা, যশস্বী ও সকল জনপদে দীপ্যমান। এ অগ্নিকে সকল স্থানে নিয়ে যায়।

৩। সে অগ্নির তিনটি জন্মস্থান অলঙ্কৃত করে। সমুদ্রে এক, আকাশে এক এবং অন্তরীক্ষে এক (৩)। তিনি (সূর্য রূপে) ঋতুগণ বিভাগ করে পৃথিবীর সকল প্রাণীর হিতার্থ পূর্ব প্রদেশে যথাক্রমে সম্পাদন করেছেন (৪)।

৪। অন্তর্হিত অগ্নিকে তোমাদের মধ্যে কে জানে? সে অগ্নি পুত্র হয়েও হব্যদ্বারা তার মাতাদের জন্মদান করেন (৫)। মহৎ ও মেধাবি ও হব্যযুক্ত অগ্নি অনেক জলের গর্ভরূপ এবং সমুদ্র হতে নির্গত হন (৬)।

৫। কুটিল মেঘের পার্শ্বদেশে যশস্বী বিদ্যুতাগ্নি ঊর্ধ্বে জলে শোভনীয় দীপ্তির সাথে প্রকাশিত হয়ে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হন, অগ্নি ত্বষ্টার সাথে (৭) উৎপন্ন হলে উভয় পৃথিবী ভীত হন এবং সে সিংহের অভিমুখে এসে তাকে সেবা করেন।

৬। উভয় পৃথিবী (৮) সুন্দরী স্ত্রীর ন্যায় তাকে সেবা করে এবং শব্দায়মান গাভীর ন্যায় নিকটে থেকেতাকে বৎসের ন্যায় যত্ন করেন। দক্ষিণ ভাগে অবস্থিত ঋত্বিকগণ যে অগ্নিকে হব্য দ্বারা সেচন করেন, তিনি সকল বলের মধ্যে বলাধিপতি হয়েছিলেন।

৭। তিনি সবিতার ন্যায় তার রশ্মিরূপ উভয় বাহু বার বার বিস্তার করেন এবং সে ভয়ংকর অগ্নি উভয় পৃথিবীকে অলঙ্কৃত করে কর্ম সাধন করেন। তিনি সকল বস্তু হতে দীপ্ত ও সারভূত রস ঊর্ধ্বে আকর্ষণ করেন এবং মাতৃদের নিকট হতে আচ্ছাদক নূতন বসন সৃষ্টি রেন (৯)।

৮। যখন তিনি অন্তরীক্ষে গমনশীল জলদ্বারা সংযুক্ত হয়ে দীপ্ত ও উৎকৃষ্ট রূপ ধারণ করেন, তখন সে মেধাবী সর্ব লোকধারক অগ্নি সকল জলের মূলভূত অন্তরীক্ষ তেজদ্বারা আচ্ছাদন করেন। উজ্জ্বল অগ্নি দ্বারা বিস্তারিত সে দীপ্তি তেজসংহতি রূপ হয়েছিল।

৯। তুমি মহৎ, তোমার সর্ব পরাজয়ী দীপ্যমান ও বিস্তীর্ণ তেজ অন্তরীক্ষে ব্যাপ্ত আছে। হে অগ্নি! তুমি আমাদের দ্বারা প্রজ্বালিত হয়ে তোমার নিজের সমস্ত অহিংসিত ও পালনক্ষম তেজদ্বারা আমাদের পালন কর।

১০। অগ্নি আকাশগামী ঊর্মি সমূহ প্রবাহরূপে ঢেলে দেন এবং সে নির্মল উর্মিসমূহ দ্বারা পৃথিবী ব্যাপ্ত করে দেন; তিনি জঠরে সকল অন্ন ধারণ করেন এবং সে জন্য সে বৃষ্টিজাত নূতন শস্যের মধ্যে বাস করেন।

১১। হে বিশুদ্ধকারী অগ্নি! তুমি কাষ্ঠে বৃদ্ধি পেয়ে আমাদের ধনযুক্ত অন্ন দানার্থ দীপ্তিমান হও। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করুন।

টীকাঃ

১। সূর্য রাতরে গর্ভে অস্তর্হিত থেকে রাতের চরম ভাগে প্রকাশ পায়, অতএব সূর্য রাতের পুত্র। অগ্নি দিবাভাগে বর্তমান থাকলেও জ্যোতি রহিত, অতএব অস্তর্হিতের ন্যায় থাকে, দিনের শেষে যুক্ত হয়ে জ্যোতি প্রাপ্ত হয়, অতএব অগ্নি দিনের পুত্র। সায়ণ। রাতের যা কর্তব্য অর্থাৎ স্বপুত্র সূর্যকে রস পান করান, তা দিন করে এবং দিনের যা কর্তব্য অর্থাৎ স্বপুত্র অগ্নিকে রস পান করান, তা রাত করে। সায়ণ।

২। সায়ণ ত্বষ্ট, অর্থ বায়ু করেছেন।

৩। অর্থাৎ সমুদ্রে বাড়াবানলের জন্ম, আকাশে সূর্য রূপ অগ্নির জন্ম এবং অন্তরীক্ষে বিদ্যুৎরূপ অগ্নির জন্ম। সায়ণ।

৪। দিক ও কালের স্বভাবতঃ কোন ভেদ নেই, পূর্বাদি দিক নির্ণয় এবং বসন্তাদি কাল নির্ণয় সূর্যের গতি দ্বারাই নিষ্পন্ন হয়, অতএব সূর্যই সে দিক ও কাল ভেদের কর্তা। সায়ণ।

৫। বিদ্যুৎরূপ অগ্নি মেঘস্থ জলের পুত্রস্থানীয়, অথচ অগ্নি হব্যদ্বারা সে মাতারূপ বৃষ্টির জলকে জন্ম দেয়। সায়ণ।

৬। অর্থাৎ বিদ্যুৎরূপে অগ্নি মেঘস্থ অনেক জলের গর্ভ অর্থাৎ সন্তান স্থানীয় আবার সূর্যরূপ অগ্নি সমুদ্র হতে নির্গত হন। সায়ণ।

৭। মূলে ত্বষ্টুঃ আছে, সায়ণ অর্থ করেছেন দীপ্তাৎ।

৮। অথবা দিন ও রাত উভয় কাষ্ঠ, যার ঘর্ষণে অগ্নি উৎপন্ন হয়। সায়ণ।

৯। অর্থাৎ মাতৃস্থানীয় বৃষ্টিজলের নিকট হতে নুতন বসন দ্বারা সমস্ত জগতের আচ্ছাদক তেজ সৃষ্টি করেন। সায়ণ।

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯৭

অনুবাদঃ

১। অগ্নি বলদ্বারা (কাষ্ঠ ঘর্ষণে) উৎপন্ন হয়ে তৎক্ষাণাৎ পুরাতনের ন্যায় প্রকৃতই সকল মেধাবীর বজ্ঞ গ্রহণ করেন, মেঘের জল ও শব্দ সে বিদ্যুৎরূপ অগ্নিকে মিত্র বলে গ্রহণ করেন। দেবগণ সে ধনদাতা অগিনকে (দূতরূপে) নিয়োগ করেছেন।

২। তিনি অয়ূর পুরাতন স্তুতিগর্ভ উকথে তুষ্ট হয়ে মনুদের সন্তুতি সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি আচ্ছাদনকারী তেজদ্বারা আকাশ ও অন্তরীক্ষ ব্যাপ্ত করেছেন। দেবগণ সে ধনদাতা অগ্নিকে দূতরূপে নিয়োগ করেছেন।

৩। হে মানুষগণ! স্বামীর (অগ্নির) নিকট গিয়ে সকলে তার স্তুতি কর। তিনি দেবগণের মধ্যে মূখ্য, যজ্ঞের সাধনকর্তা, হব্যদ্বারা আহুত এবং স্তোত্রদ্বারা তুষ্ট হন; তিনি অন্নের পুত্র, প্রজাদের ভরণকারী এবং দানশীল। দেবগণ সে ধনদাতা অগ্নিকে দূতরূপে নিয়োগ করেছেন।

৪। সে অন্তরীক্ষস্থ মাতরিশ্বা (১) অনেক বরণীয় পুষ্টি দান করেন। তিনি স্বর্গদাতা, সকল লোকের রক্ষক এবং দ্যাবা পৃথিবীর উৎপাদক। অগ্নি আমার তনয়কে গমনের পথ দেখিয়ে দিন। দেবগণ সে ধনদাতাকে (অগ্নিকে) দূতরূপে নিয়োগ করেছেন।

৫। রাত ও দিন পরস্পরের বর্ণ পরস্পর পূনঃপুনঃ বিনাশ করেও ঐক্যভাবে একই শিশুকে পুষ্টি দান করে। সে দীপ্তিমান অগ্নি আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে প্রভা বিকাশ করেন। দেবগণ সে ধনদাতা অগ্নিকে দূতরূপে নিয়োগ করেছেন।

৬। অগ্নি ধনের মূল, নিবাসহেতু, অর্থের দাতা, যজ্ঞের কেতু এবং উপাসকের অভিলাষ সিদ্ধিকারক। অমরত্বভাজী দেবগণ এ ধনদাতা অগ্নিকে দূতরূপে নিয়োগ করেছেন।

৭। অগ্নি পূর্বকালে এবং বর্তমানকালে সকল ধনের আবাস স্থান, যা কিছু জন্মেছে বা জন্মাবে তার নিবাস স্থান, যা কিছু বিদ্যমান আছে এবংভবিষ্যতে যে ভুরি ভূরি পদার্থ উৎপন্ন হবে তার রক্ষক। দেবগণ সে ধনদাতা অগ্নিকে দূতরূপে নিয়োগ করেছেন।

৮। ধনদাতা অগ্নি জঙ্গম ধনের অংশ আমাদের দান করুন, ধনদাতা স্থাবর ধনের অংশ আমাদের দান করুন, ধনদাতা আমাদের বীরযুক্ত অন্ন দান করুন, ধনদাতা আমাদের দীর্ঘ আয়ু দান করুন।

৯। হে বিশুদ্ধকারি অগ্নি! এরূপে কাষ্ঠে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে তুমি আমাদের ধনযুক্ত অন্ন দেবার জন্য প্রভা বিকাশ কর। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করুন।

টীকাঃ

১। মূলে মাতরিশ্বা আছে। মাতরি সর্বস্য জগতো নির্মাতর্ষন্তরীক্ষে শ্বসন বর্ধমানঃ। সায়ণ। এস্থলে মাতরিশ্বা অর্থে বায়ু নয়, মাতরিশ্বা অগ্নির বিশেষণ, তা সায়ণ স্বীকার করেন। ৬০ সুক্তের ১ ঋকের মাতরিশ্বা সম্বন্ধে টীকা দেখুন।

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯৮

অনুবাদঃ

১। হে অগ্নি! আমাদের পাপ বিনষ্ট হোক, আমাদের ধন প্রকাশ কর, আমাদের পাপ বিনষ্ট হোক।

২। শোভনীয় ক্ষেত্রের জন্য, শোভনীয় মার্গের জন্য এবং ধনের জন্য তোমাকে অর্চনা করি, আমাদের পাপ বিনষ্ট হোক।

৩। এ স্তোতৃদের মধ্যে কুৎস যেরূপ উৎকৃষ্ট স্তোতা, সেরূপ আমাদের স্তোতৃগণও উৎকৃষ্ট, আমাদের পাপ বিনষ্ট হোক।

৪। হে অগ্নি! যেহেতু তোমার স্তোতৃগণ, পুত্রপৌত্রাদি লাভ করে, অতএব আমরাও (তোমার স্তুতি করে) পুত্রপৌত্রাদি লাভ করব, আমাদের পাপ বিনষ্ট হোক।

৫। যেহেতু শত্রুবিজয়ী অগ্নির দীপ্তিসমূহ সর্বত্র গমন করে, অতএব আমাদের পাপ বিনষ্ট হোক।

৬। হে অগ্নি! তোমার মুখ স্বরূপ শিখা সকল দিকে, তুমি আমাদের রক্ষক হও, আমাদের পাপ বিনষ্ট হোক।

৭। হে সর্বতোমুখ অগ্নি! নৌকায় যেরূপ নদী পার হওয়া যায়, সেরূপ আমাদের শত্রুসমূহ হতে পার করে দাও, আমাদের পাপ বিনষ্ট হোক।

৮। নৌকায় দ্বারা যেরূপ নদী পার হওয়া যায়, আমাদের কল্যাণের জন্য তুমি সেরূপ আমাদের শত্রু হতে পার করিয়ে পালন কর; আমাদের পাপ বিনষ্ট হোক।

টীকাঃ

নবম মণ্ডল: সুক্ত - ৯৯

অনুবাদঃ

১। আমরা যেন শ্বৈানরের অনুগ্রহে থাকি, তিনি ভূবনসমূহের সেবিতব্য রাজা। বৈশ্বানর এই (কাষ্ঠদ্বয়) হতে জন্মগ্রহণ করেই এ বিশ্ব অবলোকন করেন এবং সূর্যের সাথে একত্রে গমন কেরন।

২। অগ্নি আকাশে (সূর্য রূপে) বর্তমান, পৃথিবীতে (গার্হপত্যাদি অগ্নিরূপে) বর্তমান এবং সমস্ত শস্যে বর্তমান (তা পরিপক্ক করবার জন্য) তাতে প্রবেশ করেছেন। সে বলযুক্ত বৈশ্বানর অগ্নি দিবা এবং রাত্রে আমাদের শত্রু হতে রক্ষা করুন।

৩। হে বৈশ্বানর! তোমার সম্বন্ধে এ (যজ্ঞে) সফল হোক; আমরা যেন বহু মূল্য ধন প্রাপ্ত হই; মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের সে ধন রক্ষা করুন।

টীকাঃ

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০০

অনুবাদঃ

১। যে ইন্দ্র, অভীষ্টদাতা ও বীর্যযুক্ত এবং দিব্যলোক ও পৃথিবীর সম্রাট, যিনি বৃষ্টিদান করেন সংগ্রামে আহ্বানের যোগ্য, তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

২। সূর্যের ন্যায় যার গতি অন্যের অপ্রাপ্য, যিনি সংগ্রামে শত্রুহন্তা ও রিপুশোষক, যিনি স্বকীয় গমনশীল সখা (মরুৎগণের) সাথে অভীষ্ট দ্রব্য প্রভূতরূপে দান করেন, তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

৩। সুর্যের কিরণের ন্যায় যার সতেজ ও দুষ্প্রাপণীয় কিরণ সমূহ বৃষ্টি জল দোহন করে চারদিকে প্রসারিত হয়, সে শত্রু পরাজয়ী এবং স্বপৌরুষে লদ্ধবিজয় ইন্দ্র মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

৪। তিনি অঙ্গিরাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অঙ্গিরা, অভীষ্টদাতাদের মধ্যে প্রধান অভীষ্টদাতা, সখাদের মধ্যে উৎকৃষ্ট সখা হয়ে অর্চনীয়দের মধ্যে বিশেষ অর্চনাভ্যজন এবং স্তুতিভাজনদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্তুতিভাজন হয়েছেন। তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

৫। ইন্দ্র রুদ্রদের সহায়তায় বলিষ্ঠ হয়ে, মানুষের সংগ্রামে শত্রুদের পরান্ত করে তার সহবাসী মরুৎগণের সাথে অন্নোৎপাদক বৃষ্টি প্রেরণ করে, মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

৬। শত্রুহন্তা, সংগ্রামকর্তা, সৎলোকের অধিপতি এবং বহু লোকের আহুত (১) ইন্দ্র অদ্য আমাদের লোকেদের সূর্যের আলো ভোগ করতে দিন (২) তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

৭। সহায়ভূত মরুৎগণ তাকে সংগ্রামে শব্দ দ্বারা উত্তেজিত করেন মানুষগণ তাকে ধনের রক্ষক করুন, তিনি সকল ফলদায়ী কর্মের ঈশ্বর। তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

৮। নেতৃগণ যুদ্ধে রক্ষার্থ এবং ধন লাভার্থ সে নেতা ইন্দ্রের শরণ গ্রহণ করে, কেন না ইন্দ্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধক অন্ধকারে আলোক প্রদান করেন। তিনি মুরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

৯। তিনি বাম হস্তদ্বারা হিংসকদের নিবারণ করেন এবং দক্ষিণ হস্তদ্বারা যজমানদত্ত হব্য গ্রহণ করেন। তিনি স্তোতৃদ্বারা স্তুত হয়ে ধন প্রদান করেন। তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

১০। তিনি সহায় মরুৎগণের সাথে ধন দান করেন, তিনি অদ্য সকল মানুষ কর্তৃক তার রথদ্বারা পরিচিত হচ্ছেন। তিনি নিজ বল দ্বারা অশংসনীয় শত্রুদের অভিভূত করেছেন। তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

১১। তিনি অনেকের দ্বারা আহূত হয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হয়ে, অথবা যারা বন্ধু নয় তাদের নিয়ে সংগ্রামে গমন করেন এবং সে শরণাগত পুরুষদের ও তাদের পুত্র ও পৌত্রের জয় সাধন করেন। তিনি মরুৎগণের সঙ্গে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

১২। তিনি বজ্রধারী, দুস্থ্যুহস্তা, ভীম, উগ্র, সহস্রজ্ঞানযুক্ত, বহু স্তুতিভাজন এবং মহৎ, তিনি সোমরসের ন্যায় পঞ্চমশ্রেণীর বলদাতা (৩)। তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

১৩। তার বজ্র অতিশয় শব্দ করে, তিনি শোভনীয় জল দান করেন, তিনি সুর্যের ন্যায় দীপ্তিমান, তিনি গর্জন করেন, তিনি সদয় কর্মে রত; ধন ও ধনদান তাকে সেবা করে। তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

১৪। সকল বলের পরিমাণ স্বরূপ যার বল উভয় পৃথিবীকে সকল সময়ে সকল দিকে পালন করছে, তিনি আমাদের যজ্ঞ দ্বারা পরিতুষ্ট হয়ে আমাদের পার করে দিন। তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

১৫। দেবগণ বা মানুষ বা জল সমূহ যে দেবের বলের অন্ত পায়নি, তিনি নিজ বল দ্বারা পৃথিবী ও আকাশ হতেও অতিরিক্ত হয়েছেন। তিনি মরুৎগণের সাথে আমাদের রক্ষণে তৎপর হোন।

১৬। দীর্ঘাবয়ব, অলঙ্কারধারী ও আকাশবাসী রোহিতবর্ণ ও শ্যামবর্ণ অশ্বদ্বয় ঋৃজাশ্ব নামক রাজর্ষিকে ধন প্রদানের জন্য অভীষ্ট ইন্দ্রের যুক্ত রথাগ্রধারণ করে হর্যযুক্ত নহুষের প্রজাদের (৪) মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে।

১৭। হে কামবর্ষী ইন্দ্র! বৃষাগিরের পুত্র ঋজ্রাশ্ব, অশ্বরীষ, সহদেব, ভয়মান ও সুরাধা (৫) তোমার প্রীতিহেতু তোমার স্তোত্র উচ্চারণ করছে।

১৮। তিনি অনেকের দ্বারা আহূত হয়ে এবং গমনশীল মরুৎগণের দ্বারা যুক্ত হয়ে পৃথিবী নিবাসী দস্যু ও শিম্যুদের প্রহার করে হননকারী বজ্রদ্বারা বধ করলেন, পরে আপন শেতবর্ণ মিত্রদের সাথে ক্ষেত্র ভাগ করে নিলেন (৬) শোভনীয় বজ্রযুক্ত ইন্দ্র সূর্য এবং জল সমুদয় প্রাপ্ত হলেন।

১৯। সর্বকালে বর্তমান ইন্দ্র আমাদের পক্ষ হয়ে বলুন, আমরাও অকুটিল গতি বিশিষ্ট হয়ে অন্ন ভোগ করি। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করুন।

টীকাঃ

১। শত্রুগণ গো অপহরণ করলে ঋজ্রাশ্বাদি ঋষিগণ তাদরে সঙ্গে যুদ্ধার্থ নির্গত হয়ে এ সুক্ত দ্বারা ইন্দ্রকে স্তব করেছিলেন। সায়ণ।

২। অর্থাৎ ইন্দ্র অদ্য আমাদের লোককে সুর্যের আলোক দান করুন এবং শত্রুদের দৃষ্টিতে অন্ধকার সংযোগ করুন। সায়ণ। শবসা পঞ্চজন্যঃ অর্থাৎ বলের দ্বারা পঞ্চ শ্রেণীর রক্ষক। সায়ণ। সে পঞ্চশ্রেণী কি? সায়ণ দুটি অর্থ করেছেন যথা গন্ধর্বা অপ্সরসো দেবা অসুরা রক্ষাংসি পঞ্চজনাঃ। নিষাদপঞ্চমাশ্চত্বারো বর্ণা বা। এ দুটির কোনও অর্থই ঠিক নয়। পঞ্চজন অর্থ পাঞ্চাব নিবাসী সমস্ত আর্যজাতি সমূহ। ৮৯ সুক্তের ১০ ঋকের টীকা দেখুন।

৪। নহুষীষু বিক্ষু শব্দের অর্থ নহুষ সম্বন্ধীয় প্রজা। সায়ণ নহুষাঃ অর্থ মনুষ্যাঃ করেছেন এবং বিক্ষু অর্থ সেনালক্ষনাসু প্রজাসু করেছেন। অতএব তিনি ঋকের ভাব এরূপ করেছেন যে অশ্ব যুক্ত হয়ে সংগ্রামে আসেন। মনুষ্য সৈন্যেরা তা দেখছে। কিন্তু নহুষ একজন রাজার নাম ৩১ সুক্তের ১১ ঋক দেখুন।

৫। এ সুক্তের ঋষিগণ।

৬। সায়ণ দস্যু অর্থ শত্রু, শিম্যু অর্থ রাক্ষ এবং শ্বেতবর্ণ মিত্র অর্থ অলঙ্কার দ্বারা দীপ্তাঙ্গ মরুৎগণ এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু এ শ্বেতবর্ণ আর্যদের সাথে দস্যু আদিম জাতিদের সঙ্গে যুদ্ধের উল্লেখ আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সে আদিম জাতিদের পরাস্ত করে আর্যগণ তাদের ক্ষেত্র কেড়ে নিয়ে আপনাদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন।

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০১

অনুবাদঃ

১। যিনি ঋজিশ্বন রাজার সঙ্গে কৃষ্ণের (১) গর্ভবতী ভার্যাদের হত করেছিলেন, সে হৃষ্ট ইন্দ্রের উদ্দেশে অন্নের সঙ্গে স্তুতি অর্পণ কর। আমরা রক্ষণেচ্ছায় সে অভীষ্টদাতা, দক্ষিণ হস্তে বজ্রধারী ইন্দ্রকে মরুৎগণের সাথে আমাদের সখা হবার জন্য আহ্বান করি।

২। যে ইন্দ্র প্রবৃদ্ধ কোপের সাথে বিগতভূজ বৃত্রকে হত করেছিলেন, যিনি শম্বরকেও যজ্ঞরহিত পিপ্রুকে বধ করেছিলেন যিনি দুজয় শুষ্ণকে সমূলে হত করেছিলেন, সে ইন্দ্রকে মরুৎগণের সাথে আমাদের সখা হবার জন্য আহ্বান করি।

৩। দ্যাবা পৃথিবী যার বিপুল বল অনুধাবন করে, বরুণ ও সূর্য যার নিয়মে চলছেন নদীসমূহ যার নিয়ম অনুসারে প্রবাহিত হয়, সে ইন্দ্রকে মরুৎগণের সাথে আমাদের সখা হবার জন্য আহ্বান করি।

৪। যিনি অশ্বসমূহের অধিপতি, যিনি গোপ সমূহের অধিপতি, যিনি স্বাধীন, যিনি স্তুতি প্রাপ্ত হয়ে সকল কর্মে স্থির, যিনি অভিষব রহিত দুর্ধর্ষ শত্রুদেরও হন্তা, সে ইন্দ্রকে মরুৎগণের সাথে আমাদের সখা হবার জন্য আহ্বান করি।

৫। যিনি গমনশীল নিশ্বাসযুক্ত সকল জীবের অধিপতি, যিনি স্তোতৃদের জন্য গো সকলের প্রথমে উদ্ধার করেছিলেন, যিনি দস্যুদের নিকৃষ্ট করে বধ করেছিলেন, সে ইন্দ্রকে মরুৎগণের সঙ্গে আমাদের সখা হবার জন্য আহ্বান করি।

৬। যিনি শুরদের এবং ভীরুদের আহ্বান যোগ্য, যাকে পলায়মান লোক এবং বিজয়ী লোকও আহ্বান করে। যাকে সকল জীব নিজ নিজ কার্যে সম্মুখে স্থাপন করে, সে ইন্দ্রকে মরুৎগণের সঙ্গে আমাদের সখা হবার জন্য আহ্বান করি।

৭। আলোকময় ইন্দ্র রুদ্রদের গ্রহণ করে উদিত হন এবং সে রুদ্রদের দ্বারা বাক্য বেগযুক্ত হ{েয় বিস্তারিত হয়। প্রসিদ্ধ ইন্দ্রকে স্তুতি লক্ষণ বাক্য পূজা করে। আমরা তাকে মরুৎগণের সাথে আমাদের সখা হবার জন্য আহ্বান করি।

৮। হে মরুৎযুক্ত ইন্দ্র। তুমি উৎকৃষ্ট গৃহেই হৃষ্ট হও অথবা সামান্য বাসস্থানেই হৃষ্ট হও, আমাদের যজ্ঞ অভিমুখে এস। হে সত্যধন! তোমার জন্য উৎসুক হয়ে আমরা হব্য প্রদান করছি।

৯। হে শোভনীয় বলযুক্ত ইন্দ্র! আমরা তোমার জন্য উৎসুক হয়ে সোম অভিষব করছি। তোমাকে স্তুতি দ্বারা পাওয়া যায়, আমরা তোমার উদ্দেশে হব্য প্রদান করছি। হে অশ্বযুক্ত ইন্দ্র! মরুৎগণের সাথে দলবদ্ধ হয়ে এ যজ্ঞের কুশের উপর বসে হৃষ্ট হও।

১০। হে ইন্দ্র! তোমার অশ্বগণের সাথে হৃষ্ট হও, তোমার শিপ্র দুটি খোল, সোম পানার্থ তোমার জিহ্বা ও উপজিহ্বা প্রসারণ কর। হে সুশিপ্র! তোমাকে অশ্বগণ এখানে আনুক, তুমি আমাদরে প্রতি তুষ্ট হয়ে আমাদরে হব্য গ্রহণ কর।

১১। যার স্তোত্র মরুৎগণের সাথে এক, সে শত্রুহস্তা ইন্দ্র দ্বারা রক্ষিত হয়ে আমরা যেন তার নিকট হতে অন্ন প্রাপ্ত হই। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করুন।

টীকাঃ

১। কৃষ্ণ বোধ হয় আদিম জাতীয় কৃষ্ণবর্ণ কোন যোদ্ধা। আবার কৃষ্ণ নামক একজন ঋষি ছিলেন, সে বিষয়ে ১১৬ সুক্তের ২৩ ঋক ও টীকা দেখুন।

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০২

অনুবাদঃ

১। তুমি মহৎ, আমি তোমার উদ্দেশ্যে এ মহতী স্তুতি সম্পাদন করছি, কেন না তোমার অনুগ্রহ আমার স্তুতির উপর নির্ভর করে। ঋত্বিকগণ সমৃদ্ধি ও ধনলাভার্থ সে শত্রুবিজয়ী ইন্দ্রকে স্তুতিবল দ্বারা হৃষ্ট করেছেন।

২। সপ্ত নদী তার যশ ধারণা করছে, আকাশ, পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ তার দর্শনীয় বপু ধারণ করছে, হে ইন্দ্র! সূর্য ও চন্দ্র আমাদের সম্মুখে আলোক বিতরণার্থ এবং আমাদের বিশ্বাস উৎপাদনার্থ পুনঃ পুনঃ একের পর অন্য বিচরণ করছে।

৩। হে মঘবন! হে ইন্দ্র! আমরা মনের সঙ্গে তোমাকে বহু স্তুতি করি। তোমার যে জয়শীল রথ শত্রুসঙ্কুল যুদ্ধে দেখে আমরা হৃষ্ট হই সে রথ আমাদের ধনলাভার্থ প্রেরণ কর। হে মঘবন! আমরা তোমাকে কামনা করি, আমাদের সুখ প্রদান কর।

৪। তোমাকে সহায় পেয়ে আমরা অবরোধকারী শত্রুদের পরান্ত করয সংগ্রামে আমাদের অংশ রক্ষা কর হে ইন্দ্র! সহজে ধন পাই এরূপ করে দাও; হে মঘবন! শত্রুদের বীর্য ভেঙে দাও।

৫। হে ধনাধিপতি! যারা রক্ষণের জন্য তোমার স্তুতি করছে ও তোমাকে আহ্বান করছে এরা নানা প্রকার। (সে সকল লোকের মধ্যে) আমাদের ধন দেবার জন্য রথে আরোহণ কর; হে ইন্দ্র! তোমার মন ব্যাকুলতারহিত এবং জয়শীল।

৬। তোমার বহুদ্বর গোজয় করেছে; তোমার জ্ঞান অপরিমিত; তুমি শ্রেষ্ঠ এবং কর্মে কর্মে শত রক্ষণকায{ সম্পন্ন কর। ইন্দ্র যুদ্ধকর্তা স্বতস্ত্র এবং সকল প্রাণীর বলের পরিমাণস্বরূপ; এ জন্যই ধনলাভার্থী লোকে তাকে বিবিধ প্রকারে আহ্বান করে।

৭। হে মঘবন! তুমি মানুষকে যে অন্ন দান কর তা শত হতেও অধিক অথবা তা হতেও অধিক অথবা সহস্র হতেও অধিক। তুমি পরিমাণরহিত, আমাদের স্তুতি বাক্য তোমাকে দীপ্ত করেছে; হে পুরন্দর, তুমি শত্রুকে হনন করেছ।

৮। হে নরপালক! তুমি ত্রিগুণিত রুজুর ন্যায় (১) সকল প্রাণীর বলের পরিমাণস্বরূপ, তুমি তিন লোকে তিন প্রকার তেজ (২) এবং এ বিশ্বভূবন বহন করতে অতিশয় সক্ষম কেননা হে ইন্দ্র! তুমি বহুকাল হতে, জন্ম অবধি শত্রু রহিত।

৯। তুমি দেবগনের মধ্যে প্রথম, তুমি সংগ্রামে শত্রুবিজয়ী, আমরা তোমাকে আহ্বান করছি। সে ইন্দ্র আমাদের যুদ্ধযোগ্য তেজযুক্ত এবং বিভেদকারী রথকে (অন্য রথের) পুরোবর্তী করে দিন।

১০। তুমি জয় লাভ কর এবং (বিজিত) ধন অবরুদ্ধ করে রাখ না। হে মঘবন! তুমি উগ্র, ক্ষুদ্র যুদ্ধে এবং মহৎ যুদ্ধেও আমরা রক্ষণার্থ তোমাকে স্তোত্র দ্বারা তীক্ষ্ম করি। অতএব হে ইন্দ্র! আমাদের যুদ্ধের আহ্বান সমূহে উত্তেজিত কর।

১১। সর্বকালে বর্তমান ইন্দ্র আমাদের পক্ষ হয়ে বলুন, আমরাও অকুটিল গতি বিশিষ্ট হয়ে অন্নভোগ করি। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করে তা পূজিত করুন।

টীকাঃ

১। যথা ত্রিবিষ্টস্ত্রিগুণিতা রুজুর্দ্রঢ়ীয়সী। ইন্দ্রোহপি দৃঢ় ইত্যর্থঃ।

২। আকাশে সূর্য, অন্তরীক্ষে বিদ্যুৎ এবং পৃথিবীতে অগ্নি। সায়ণ।

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০৩

অনুবাদঃ

১। হে ইন্দ্র! পুরাকালে মেধাবীগণ তোমার এ প্রসিদ্ধ পরম বল সাক্ষাৎ ধারণ করেছে। তার অগ্নিরূপ এক জ্যাতি পৃথিবীতে, সূর্যরূপ অন্য জ্যোতি আকাশে। যুদ্ধে যেরূপ উভয় পক্ষের ধ্বজ মিলিত হয়, সেরুপ উক্ত উভয় জ্যোতি পরস্পরে সংযুক্ত আছে (১)।

২। ইন্দ্র পৃথিবীকে ধারণ এবং বিস্তৃত করেছেন; বজ্র দ্বারা বৃত্তকে হত করে বৃষ্টির জল বার করেছেন, অর্হিকে হত করেছেন, রৌহীণকে বিদারিত করেছেন; মঘবান স্বকীয় কার্যদ্বারা বিগতভূজ বৃত্রকে হত করেছেন।

৩। তিনি বজ্ররূপ অস্ত্র নিয়ে বীরকার্যে উৎসাহ পূর্ণ হয়ে, দস্যুদের নগরসমূহ বিনাশ করে বিচরণ করেছিলেন। হে বজ্রধারিন! আমাদের স্তুতি অবগত হয়ে দস্যুর প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ কর; হে ইন্দ্র! আর্যগণের বল ও যশ বর্ধন কর (২)।

৪। বজ্রবান এবং শত্রু বিনাশী ইন্দ্র, দস্যু বিনাশের জন্য নির্গত হয়ে যে বল যশের নিমিত্ত ধারণ করেছিলেন, কীর্তনযোগ্য সে বল ধারণ করে মঘবান ইন্দ্র, স্তুতিকারী যজমানের নিমিত্ত মনুষ্যগণের যুগ সকল সূর্যরূপে সম্পাদন অর্থাৎ পরিমাণ করেন।

৫। তার এ প্রবৃদ্ধ ও বিস্তীর্ণ বীর্য অবলোকন কর, তার বীর্যে শ্রদ্ধা কর। তিনি গো এবং অশ্ব লাভ করেছেন তিনি শস্যসমূহ ও জল সমূহ এবং বনসমূহ (৩) লাভ করেছেন।

৬। ভূরিকর্মা, দেবশ্রেষ্ঠ, অভীষ্টদাতা, সত্যবল, ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে আমরা সোম অভিষব করি; পথনিরোধক চোর যেরূপ পথিকের নিকট হতে ধন কেড়ে নেয়, শুর ইন্দ্র সেরূপ ধনের আদর করে যজ্ঞবিহীন লোকদের নিকট হতে সে ধন ভাগ করে নিয়ে যজ্ঞপরায়ণদের নিকট তা দান করতে গমন করেন।

৭। হে ইন্দ্র! তুমি সে প্রখ্যাত বীর কর্ম করেছিলে যে, নিদ্রিত অহিকে বজ্রদ্বারা জাগরিত করেছিলে। তখন দেবপত্নীগণ তোমাকে হৃষ্ট দেখে হৃষ্ট হয়েছিলেন।

৮। হে ইন্দ্র! তুমি শুষ্ণ, পিপ্রু, কুথর ও বৃত্রকে বধ করেছ এবং শম্বরের নগর সমুদয় বিনাশ করেছ অতএব মিত্র, বরুণ অদিতি সিন্ধু পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করুন।

টীকাঃ

১। রাত্রিতে সূর্য অগ্নির সাথে সংযুক্ত হয়, দিনে অগ্নি সূর্যের সাথে সংযুক্ত হয়। সায়ণ।

২। এ ঋকে দস্যু ও আর্য উভয় শব্দেরই ব্যবহার আছে।

৩। সায়ণ গো ও অশ্ব অর্থে পণিদিগের অপহৃত গো ও অশ্ব করেছেন এবং জল সমূহ অর্থে বৃত্র দ্বারা অপরুদ্ধ বৃষ্টিজল করেছেন এবং বন সমূহ অর্থে ধন করেছেন। কিন্তু ইন্দ্র আর্যদের গো, অশ্ব, শস্য, জল বা নদী ও অরণ্য দিয়েছেন এরূপ সহজ অর্থই আমাদের মনে লাগে। এর পরের ঋকেও যজ্ঞরত আর্য ও যজ্ঞবিহীন অনার্যদের কথা আছে।

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০৪

অনুবাদঃ

১। হে ইন্দ্র! তোমার বসবার জন্য যে বেদি প্রস্তুত হয়েছে শব্দায়মান অশ্বের ন্যায় তথায় উপবেশন কর। অশ্ববন্ধন রশ্মিবিমোচন করে অশ্বদের মুক্ত করে দাও, সে অশ্ব যজ্ঞকাল সমাগত হলে দিন রাত তোমাকে বহন করে।

২। এ মানুষেরা রক্ষণের জন্য ইন্দ্রের নিকট এসেছে । তিনি শীঘ্র, সদ্যই তাদের (অনুষ্ঠান) মার্গে গমন করতে দিন। দেবগণ দাসদের ক্রোধ বিনাশ করুন এবং আমাদের সুখের জন্য আমাদের বর্ণকে বৃদ্ধি করুন (১)

৩। কুষব (২) পরের ধন জানতে পেরে স্বয়ং অপহরণ কর, জলে বর্তমান থেকে স্বয়ং ফেনযুক্ত জল অপহরণ করে। কুযবের দু ভার্যা সে জলে স্নান করে, তারা যেন শিফানদীর গভীর নিম্নভাগে হত হয়

৪। অযু (৩) জল মধ্যে অবস্থান করে এবং তার বাসস্থান গুপ্ত ছিল; সে শুর পুর্ব অপহৃত জলের সাথে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং বিরাজ করে। অঞ্জসী কুলিশী, ও বীরপত্নী নদীত্রয় (৪) স্বকীয় জল দিয়ে তাকে প্রীত করে জল দ্বারা তাকে ধারণ করে।

৫। বৎসপ্রিয় গরু যে রূপ গোষ্ঠের পথ জানে আমরা সেরূপ সে শত্রুর গৃহের পথ জানি। হে মঘবন! সে শত্রুর পুনঃপুনঃ কৃত উপদ্রব হতে আমাদের রক্ষা কর। কামুক (যেরুপ ধনত্যাগ করে) আমাদের সেরূপ পরিত্যাগ কেরা না।

৬। হে ইন্দ্র! আমাদের সূর্যের প্রতি ও জলসমূহের প্রতি ভক্তিপূর্ণ কর, যারা পাপশূন্যতার জন্য জবি মাত্রের প্রশংসনীয় তাদের প্রতি ভক্তিপূর্ণ কর। গর্ভস্থিত আমাদের সন্ততিকে হিংসা করো না, আমরা তোমার মহৎ বল শ্রদ্ধা করি।

৭। োমাকে আমি মনের সাথে জানি, তোমার সে বলে আমরা শ্রদ্ধা স্থাপন করেছি। তুমি অভীষ্টদাতা, আমাদের মহৎ ধন প্রদান কর। হে ইন্দ্র! তুমি বহু লোকদ্বারা আহুত, তুমি আমাদের ধনশূন্য গৃহে রেখ না, বুভুক্ষিতদের অন্ন ও পানীয় দান কর।

৮। হে ইন্দ্র! আমাদের বধ করো না, আমাদের পরিত্যাগ করো না, আমাদের প্রিয় আহার উপভোগাদি কেড়ে নিও না। হে মঘবন শত্রু। গর্ভস্থিত আমাদের অপত্যদের নষ্ট করো না, যারা জানুদ্বারা চলে এরূপ গমনসমর্থ অপত্যদের নষ্ট করো না।

৯। আমাদের অভিমুখে এস,লোকে তোমাকে সোমপ্রিয় বলেছে এ সোম ভবিষত হয়েছে, এ পান করে হৃষ্ট হও। বিস্তীর্ণাবয়ব হয়ে জঠরে সোমরস বর্ষণ কর পিতা যে রূপ পুত্রের বাক্য শোনে, আমাদের দ্বারা আহুত হয়ে সেরূপ আমাদের বাক্য শ্রবণ কর।

টীকাঃ

১। বর্ণং শব্দের অর্থ সায়ণ ইন্দ্র করেছেন, কিন্তু বোধ হয় বর্ণ অর্থে আর্য জাতি। Bring additions to our race বেদার্থযত্ন।

২। কুযবনামাসুরঃ। সায়ণ। সায়ণ এ অসুর সম্বন্ধে আর কোন বৃত্তান্ত লেখেন নি। পরের দুটি ঋক হতে বোধ হয়, কুযব নামে কোন প্রসিদ্ধ আদিম জাতীয় যোদ্ধা আর্যদের প্রতি অনকে উপদ্রব করেছিল।

৩। অযু বোধ হয় অন্য একজন আদিম জাতীয় যোদ্ধা; ৪; শিফা অঞ্জশী কুলশী ও বীরপত্নী এ নদীগুলি কোথায়?

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০৫

অনুবাদঃ

১। উদকময় অন্তরীক্ষে বর্তমান চন্দ্র সুন্দর কিরণের সাথে আকাশে ধাবমান হচ্ছে। হে সুবর্ণনেমি রশ্মিসমূহ! আমার ইন্দ্রিয়গণ তোমার পদ জানে না (১) হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার এ স্তোত্র অবগত হও।

২। যারা অর্থ অনুসন্ধান করে তারা অর্থ প্রাপ্ত হয়। জায়া পতিকে প্রাপ্ত হয় এবং তাদরে সহবাসে গর্ভে সন্তান উৎপন্ন হয়। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার এ দুৎখ অবগত হও (২)।

৩। হে দেবগণ! স্বর্গস্থ আমার পূর্বপুরুষগণ যেন স্বর্গচ্যুত না হন, আমরা যেন কদাচ সোমপায়ী পিতৃগণের সুখহেতু পুত্র হতে নিরাশ না হই। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও (৩)।

৪। দেবগণের প্রথম যজ্ঞাহ অগ্নিকে আমি যাঞ্চা করছি, তিনি দূতরূপে আমার যাচ্ঞা দেবগণকে জানাবেন। হে অগ্নি! তোমার পূর্বের সে বদান্যতা কোথায় গিয়েছে? নুতন কোন পুরুষ তা এখন ধারণ করেন? হে দ্যাবা পৃথিবী। আমার বিষয় অবগত হও।

৫। সূর্যদীপ্ত তিন লোকে এ যে সকল দেব বাস করেন, হে দেবগণ! তোমাদের সত্য কোথায় অসত্যই বা কোথায়, তোমাদের সম্বন্ধীয় পুরাতন আহুতি কোথায়? হে দ্যাবা পৃথিবী। আমার বিষয় অবগত হও।

৬। তোমাদের সত্য পালন কোথায়? বরুণের অনুগ্রহ দৃষ্টি কোথায়? মহৎ অর্যমার সে পথ কোথায়? যা দিয়ে আমরা পাপমতিদের অতিক্রম করতে পারি? হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

৭। পূর্বে সোম অভিষুত হলে যে কতকগুলি (স্ত্রোত্র) উচ্চারণ করতে পারে, আমি সেই। তৃষার্থ মৃগকে ব্যাঘ্র যেরূপ ভক্ষণ করে, দুঃখ সেরূপ আমাকে ভক্ষণ করছে। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

৮। সপত্নীদ্বয় স্বামীর উভয় পার্শ্বে থেকে যেরূপ তাকে সন্তাপ দেয়, এ পার্শ্বস্থ কূপের ভিত্তি সকল আমাকে সেরূপ সন্তাপ দিচ্ছে। মূষিক যেরূপ সুত্র দংশন করে, হে শতক্রতো! আমি তোমার স্তোতা, দুঃখ আমাকে সেরূপ দংশন করছে। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

৯। এ যে সূর্যের সপ্ত রশ্মি এ কূপে (৪) পতিত হয়েছে, আপ্তা ত্রিত তা জানে এবং কূপ হতে নির্গত হবার জন্য সে রশ্মি সমূহকে স্তুতি করছে। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

১০। এ সে পঞ্চ অভীষ্টদাতা বিস্তীর্ণ আকাশে আছেন (৫) তারা আমার এ প্রসংশনীয় স্তোত্র শীঘ্র দেবগণের নিকট নিয়ে গিয়ে প্রত্যাবর্তন করুন। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষ{য় অবগত হও।

১১। সূর্য রশ্মিসমূহ সর্বব্যাপী আকাশে আছে, ব্যাঘ্র মহৎ জল রাশি পার হবার সময়, পথে সূর্য রশ্মিসমূহ তাকে নিবারণ করে (৬)। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

১২। হে দেবগণ! যে নব্য প্রশংসনীয় ও সুবাচ্য বল তোমাদের মধ্যে নিহিত আছে; তা দিয়ে বহনশীল নদীগণ সর্বদাই জল চালনা করছে এবং সূর্য সর্বদা তার বিদ্যমান আলোক বিস্তার করছেন; হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

১৩। হে অগ্নি! দেবগণের সঙ্গে তোমার সে বন্ধুত্ব প্রসংসনীয়। তুমি অতিশয় বিদ্বান, মনুর যজ্ঞের ন্যায় আমাদের যজ্ঞে উপ বেশন করে দেবগণের যজ্ঞ কর। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

১৪। দেবগণের আহ্বানকারী, অতিশয় বিদ্বান এবং দেবগণের মধ্যে মেধাবী অগ্নিদেব, মনুর যজ্ঞের ন্যায় আমাদের যজ্ঞে উপবেশন করে দেবগণকে আমাদের হব্যের অভিমুখে শাস্ত্রানুসারে প্রেরণ করুন। হে দ্যাবাপৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

১৫। বরুণ রক্ষণ কার্য সম্পাদন করেন, সে পথদর্শকের নিকট আমরা যাচ্ঞা করি। স্তোতা হৃদয়ের সাথে তার উদ্দেশে মননীয় স্তুতি প্রচার করছে। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমরা বিষয় অবগত হও।

১৬। এ যে সূর্য আকাশে সর্পসিদ্ধ পথস্বরূপ হয়েছে; হে দেবগণ! তোমরা তাকে অতিক্রম করতে পার না; হে মনুষ্যগণ! তোমরা তাকে জান না। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষ অবগত হও।

১৭। ত্রিত কূপে পতিত হয়ে রক্ষার জন্য দেবগণকে আহ্বান করছে; বৃহস্পতি তাকে পাপরূপ কূপ হতে উদ্ধার করে তার আহ্বান শ্রবণ করেছিলেন। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

১৮। অরুণবর্ণ ব্যাঘ্র একবার আমাকে পথে গমন করতে দেখেছিল (৭); সূত্রধার নিজ কর্ম করতে করতে পৃষ্ঠদেশে বেদনা হলে যেরূপ উঠে দাড়ায় ব্যাঘ্র সেরূপ আমাকে দেখে উদগত হয়েছিল। হে দ্যাবা পৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।

১৯। এ ঘোষণযোগ্য স্তোত্রদ্বারা ইন্দ্রকে পেয়ে আমরা সকলে বীরদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সংগ্রামে শত্রুদের পরাস্ত করব। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করুন।

টীকাঃ

১। সায়ণ এর মর্ম এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন যে ত্রিত কূপে পতিত হয়ে বলছেন আমার ইন্দ্রিয় সকল কূপে আবৃত হওয়ায় তোমাকে পায় না; এ উচিত নয়, অতএব আমাকে কূপ হতে উদ্ধার কর। ত্রিত সম্বন্ধে ৫২ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা দেখুন।

২। অর্থাৎ আমি অর্থ পাই না, আমার স্ত্রী আমাকে নিকটে পায় না, আমার পুত্র জন্মায় না, এ দুঃখ। সায়ণ।

৩। পুত্র না হলে স্বর্গলোক পাওয়া যায় না, ত্রিতের পুত্র। না হলে তার পিতৃগণ স্বর্গচ্যুত হবে, ত্রিত এরূপ আশঙ্কা করছেন, সায়ণের এ প্রকার অর্থ। কিন্তু ঋকে পুর্ব পুরুষ বা পিতৃগণ বা পুত্রসূচক কোন শব্দই নেই, এগুলি সায়ণ উহা করেছেন;

৪। মুলে নাভি শব্দ আছে। রোসেন ও লাংলোয়া তার অর্থ করেছেন আবাস স্থান কূপ। সে অর্থই আমরা গ্রহণ করেছি।

৫। ইন্দ্র বরুণ, অগ্নি, অর্যমা ও সবিতা। অথবা অগ্নি, বায়ু, সূর্য, চন্দ্র ও বিদ্যুৎ অথবা পৃথিবীতে অগ্নি, অন্তরীক্ষে বায়ু, আকাশে সূর্য, নক্ষত্র জগতে চন্দ্র, মেঘে বিদ্যুৎ। তৈত্তিরীয় অনুসারে পৃথিবীতে অগ্নি, অন্তরীক্ষে বায়ু আকাশে সূর্য, দিকে চন্দ্র এবং স্বর্গে নক্ষত্র। সায়ণ।

৬। ত্রিত কূপে পড়বার পূর্বে তাকে দেখে একটি অরণ্য কুকুর (বৃক) তাকে খাবার জন্য বড় নদী পার হয়ে আসছিল; কিন্তু পথে সূর্য রশ্মি দেখে এখন অবসর নয় ভেবে নিবৃত্ত হল। সায়ণ। কিন্তু যাস্ক বলেন জল (আপ) অর্থে অন্তরীক্ষ বৃক অর্থাৎ চন্দ্র সে অন্তরীক্ষ পার হয়ে আসে, কিন্ত সূর্য কিরণ সে চন্দ্রকে নিবারণ (বিলিপ্ত) করে।

৭। যাস্ক এরূপ অর্থ করেছেন অরুণ বর্ণ অর্ধ মাসের কর্তা চন্দ্র নক্ষত্রগণকে পথে যেতে দেখেছিলেন। ইত্যাদি নিরুক্ত ৫।২০।

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০৬

অনুবাদঃ

১। আমরা রক্ষার জন্য ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অগ্নি এবং মরুৎগণ ও অদিতিকে আহ্বান করি। লোকে দুর্গম পথ হতে যেরূপ রথকে উদ্ধার করে আনে, সেরূপ দানশীল ও বাসগৃহদাতা দেবগণ সকল পাপ হতে আমাদের উদ্ধার করে পালন করুন।

২। হে আদিত্যগণ, তোমরা যুদ্ধে আমাদের সাহায্যার্থে এস এবং যুদ্ধে আমাদের জয়ের কারণ হও। লোকে দুর্গম পথ হতে যেরূপ রথকে উদ্ধার করে আনে, সেরূপ দানশীল ও বাসগৃহদাতা দেবগণ সকল পাপ হতে আমাদের উদ্ধার করে পালন করুন।

৩। যাদের স্তুতি সুখসাধ্য সে পিতৃগণ আমাদের রক্ষা করুন এবং দেবগণের পিতা মাতাস্বরূপ যজ্ঞবর্ধয়িতা দ্যাবা পৃথিবী আমাদের রক্ষা করুন। লোকে দুর্গম পথ হতে যেরূপ রথকে উদ্ধার করে আনে, সেরূপ দানশীল ও বাসগৃহদাতা দেবগণ সকল পাপ হতে আমাদের উদ্ধার করে পালন করুন।

৪। অন্নবান নরাশংস অগ্নিকে (১) প্রজ্বলিত করে এখন স্তুতি করি, বীরবিজয়ী পুষার নিকট সুখকর স্তোত্র দ্বারা যাচ্ঞা করি। লোকে দুর্গম পথ হতে রথকে যেরূপ উদ্ধার করে আনে, সেরূপ দানশীল ও বাসগৃহদাতা দেবগণ সকল পাপ হতে আমাদের উদ্ধার করে পালন করুন।

৫। হে বৃহস্পতি! আমাদের সর্বদা সুখ প্রদান কর, মানুষদের উপকারী যে রোগের উপশম ও ভয়ের দূরীকরণ ক্ষমতা তোমাতে স্থাপিত হয়েছে, তাও যাচ্ঞা করি। লোকে দুর্গম পথ হতে যেরূপ রথকে উদ্ধার করে আনে, সেরূপ দানশীল ও বাসগৃহদাতা দেবগণ সকল পাপ হতে আমাদের উদ্ধার করে পালন করুন।

৬। কুপে নিপতিত কুৎস নিজ রক্ষার (২) জন্য বৃত্তহস্তা ও যজ্ঞ প্রতিপালক (৩) ইন্দ্রকে আহ্বান করছে। লোকে দুর্গম পথ হতে যেরূপ রথকে উদ্ধার করে আনে, সেরূপ দানশীল ও বাসগৃহদাতা দেবগণ সকল পাপ হতে আমাদের উদ্ধার করে পালন করুন।

৭। দেবী অদিতি দেবগণের সাথে আমাদের পালন করুন। সকলের রক্ষক দীপ্যমান সবিতা জাগরুক হয়ে আমাদের রক্ষা করুন। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করুন।

টীকাঃ

১। নরাশংস সম্বন্ধে ১৩ সুক্তের ৩ ঋকের টীকা দেখুন।

২। পূর্বে ত্রিত কূপে পাড়ছিলেন এরূপ দেখা গিয়েছে, এখানে দেখা যাচ্ছে কুৎস ঋষি কূপে পড়েছিলেন। ১০৫ ও ১০৬ সুক্তের ঋষি কৃৎস অথবা ত্রিত। অতএব কুৎস ত্রিত একই তা অনুভব হয়। আমরা পূর্ব বলেছি আপ্ত্য অর্থাৎ জলসম্ভূত ত্রিত আর্যদের একজন পুরাতন দেব ছিলেন। অনুভব হয় তার কথা জলে নিপতিত কুৎস ঋষির বিবরণের সাথে কোনরূপে জড়িত হয়ে গিয়েছে। ৫২ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা দেখুন।

৩। মুলে শচীপতিং আছে। শচীতি কর্মনাম। সর্বেষাং কর্মণাং পালয়িতারং। যদ্বা শচ্যা দেব্যা ভর্তারং। সায়ণ। ঋগ্বেদে শচী শব্দ কর্ম বা যজ্ঞ অর্থেই ব্যবহার হয়েছে। ইন্দ্র যজ্ঞের পতি সুতরাং শচীপতি। পরে এ হতে ইন্দ্রের স্ত্রী শচীর পৌরাণিক উপাখ্যান সৃষ্ট হয়।

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০৭

অনুবাদঃ

১। আমাদের যজ্ঞ দেবগণকে সুখী করুক হে আদিত্যগণ! তুষ্ট হও। তোমাদের অনুগ্রহ আমাদের অভিমুখে প্রেরিত হোক এবং সে অনুগ্রহ দরিদ্র জনের পক্ষে প্রভূত ধনের কারণ হোক।

২। দেবগণ অঙ্গিরাদের গীতমন্ত্র (১) দ্বারা স্তুত হয়ে রক্ষণার্থে আমাদের নিকট আসুন। ইন্দ্র নিজগণের সঙ্গে, মরুৎগণ নিজ দলের সাথে এবং অদিতি আদিত্যদের নিয়ে আমাদের সুখ দান করুন।

৩। যে অন্ন (আমরা যাচ্ঞা করি) ইন্দ্র বরুণ, অগ্নি, অযমা ও সবিতা যেন আমাদের তা দান করেন। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ যেন আমাদের রক্ষা করেন।

টীকাঃ

১। মূলে সামসভিঃ আছে। প্রগীতৈমন্ত্রৈঃ। সায়ণ।

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০৮

অনুবাদঃ

১। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! তোমাদের যে অতিশয় বিচিত্র রথ বিশ্বভূবন উজ্জ্বল করেছে, সে রথে একত্রে বসে এস, অভিষুত সোম পান কর।

২। এ বহুব্যাপী ও আত্মগুরুত্বে গভীর বিশ্বভুবনের যে পরিমাণ, হে ইন্দ্র ও অগ্নি! তোমাদের পানীয় এ সোমের সেরূপ পরিমাণ হোক এবং তোমাদের অভিলাষ পর্যাপ্তরূপে পূরণ করুক।

৩। তোমাদের কল্যাণকর নামদ্বয় একত্রিত করেছ, হে বৃত্রহন্তদ্বয়! তোমরা বৃত্রবধের জন্য সঙ্গত হয়েছিলে (১)। হে অভীষ্টদাতা ইন্দ্র ও অগ্নি! তোমরা একত্র হয়ে উপবেশন করে অভিষিক্ত সোম আপনাদের উদরে সেচন কর।

৪। অগ্নি সমুদয় প্রজ্বলিত হলে পর অধ্বর্যুদ্বয় পাত্র হতে ঘৃত সেচন করে কুশ বিস্তার করেছে। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! চারদিকে অভিষিক্ত তীব্র সোমরসদ্বারা আকৃষ্ট হয়ে অনুগ্রহার্থ আমাদের অভিমুখে এস।

৫। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! তোমরা যে কিছু বীর কর্ম করেছ, যে কিছু রূপ বিশিষ্ট জীব সৃষ্টি করেছ, যে কিছু বৃষ্টি বর্ষণ করেছ এবং তোমাদের যে কিছু পুরাতন কল্যাণকর বন্ধুত্ব আছে, সে সমস্ত নিয়ে এসে অভিষুত সোম পান কর।

৬। প্রথমেই তোমাদের দুজনকে বরণ করছি, আমার অকপট শ্রদ্ধা লক্ষ্য করে এস; অভিষুত সোম পান কর। এ সোম আমাদের ঋত্বিকগণের (২) বিশেষ আহুতি যোগ্য হোক।

৭। হে যজ্ঞ ভাজন ইন্দ্র ও অগ্নি! যদি নিজ গৃহে হৃষ্ট হয়ে থাক, যদি পূজকের প্রতি বা রাজার প্রতি (৩) তুষ্ট হয়ে থাক, তবে হে অভীষ্ট দাতৃদ্বয়! এ সমস্ত স্থান হতে এস, অভিষুত সোম পান কর।

৮। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! যদি তোমরা তুর্বশদের মধ্যে দ্রুহ্যুদের মধ্যে, অনুদের মধ্যে অথবা পুরুষদের মধ্যে অবস্থান করে থাক তবে হে অভীষ্ট দাতৃদ্বয়! সে সমস্ত স্থান হতে এস, অভিষূত সোম পান কর।

৯। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! সে সমস্ত স্থান হতে এস, অভিষুত সোম পান কর।

৯। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! তোমরা যদি নিন্ম পৃথিবীতে বা মধ্যম পৃথিবীতে অন্তরীক্ষে বা আকাশে অবস্থান করে থাকে, তবে হে অভীষ্ট দাতৃদ্বয়! সে সমস্ত স্থান হতে এস, অভিষুত সোম পান কর।

১০। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! তোমরা যদি উচ্চ পৃথিবীতে (আকাশে) বা মধ্যম পৃথিবীতে (অন্তরীক্ষে) বা নিম্ন পৃথিবীতে অবস্থান করে থাক, তবে হে অভীষ্ট দাতৃদ্বয়! সে সমস্ত স্থান হতে এস, অভিষুত সোম পান কর।

১১। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! যদি তোমরা আকাশে বা পৃথিবীতে বা পর্বতে শস্যে বা জলে অবস্থান কর, তবে হে অভীষ্ট দাতৃদ্বয়! সে সমস্ত স্থান হতে এস, অভিষুত সোম পান কর।

১২। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! সূর্য উদিত হলে দীপ্তিমান অন্তরীক্ষে যদি তোমরা নিজ তেজে হৃষ্ট হও, তবে হে অভীষ্ট দাতৃদ্বয়! সে সমস্ত স্থান হতে এস, অভিষুত সোমপান কর।

১৩। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! এ রূপে অভিষুত সোমপান করে আমাদের সমস্ত ধন দান কর। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ যেন আমাদের রক্ষা করেন।

টীকাঃ

১। ইন্দ্রই বৃত্রহন্তা। তবে বেদে দুই দেবি যখন একত্রে অর্চিত হন, তখন উভয়েই এক গুণবিশিষ্ট বলে বর্ণিত হন। সুতরাং ইন্দ্র ও অগ্নিকে বৃত্রহন্তা বলা হয়েছে।

২। মুলে অসরৈঃ আছে। হবিষাং প্রক্ষেপকৈঃ ঋতিগ্রভিঃ। সায়ণ।

৩। যদ ব্রহ্মণি রাজনি বা মূলে এ রূপ আছে। সায়ণ। এ দুই শব্দের অর্থ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় করেছেন। কিন্তু রাজন অর্থ রাজামাত্র ও ব্রহ্মা শব্দের অর্থ স্তুতিকার মাত্র, তা পূর্বে বলা হয়েছে। ১০ সুক্তের ৩১ ঋক, ১৫ সুক্তের ৫ ঋক এবং ১৮ সুক্তের ১ ঋক দেখুন।

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১০৯

অনুবাদঃ

১। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! আমি ধন ইচ্ছা করে তোমাদের জ্ঞাতি বা বন্ধুর ন্যায় মনে করি। আমার প্রকৃষ্ট বৃদ্ধি তোমারাই দিয়েছ, অন্য কেউ নয়, অতএব আমি এ ধ্যাননিষ্পন্ন, অন্নের ইচ্ছা সূচক স্তুতি তোমাদের উদ্দেশে রচনা করেছি।

২। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! তোমরা অযোগ্য জামাতা (১) অথবা শ্যালক (২) অপেক্ষাও অধিক বহুবিধ ধন দান কর, এরূপ শুনেছি; অতএব হে ইন্দ্র ও অগ্নি! আমি তোমাদের সোমপ্রদানকালে পঠনীয় একটি নুতন স্তোত্র রচনা করছি।

৩। আমরা পুত্র পৌত্রাদিরূপ রুজু যেন কখনও ছেদন না করি, এরূপ প্রার্থনা করে এবং পিতৃগণের ন্যায় শক্তিমান পুত্রাদি উৎপাদন করে উৎপাদন সমর্থ (যজমানগণ) ইন্দ্র ও অগ্নিকে সুখে স্তুতি করেন; শত্রুহিংসক ইন্দ্র ও অগ্নি স্তুতির নিকট উপস্থিত থাকেন।

৪। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! দীপ্তিমান প্রার্থনা তোমাদের কামনা করে তোমাদের হর্ষের জন্য সোমরস অভিষব করছে; তোমরা অশ্বযুক্ত শোভনীয় বাহুযুক্ত ও সুপাণি; তোমার শীঘ্র এসে উদকস্থ মাধুর্য দ্বারা আমাদের সোমরস সংপৃক্ত কর।

৫। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! তোমরা (স্তোতাদের মধ্যে) ধন বিভাগে রত থেকে বৃত্তহননে অতিশয় বল প্রকাশ করেছিলে, তা শুনেছি; হে সর্বদর্শিদ্বয়! আমাদের এ যজ্ঞে কুশে উপবেশন করে অভিষুত সোম পান করে হৃষ্ট হও।

৬। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! যুদ্ধের সময় আহ্বান করলে তোমরা এসে স্বকীয় মহত্ত্ব দ্বারা সকল মানুষ অপেক্ষা বড় হও, পৃথিবী অপেক্ষা আকাশ অপেক্ষা নদী ও পর্বত সমূহ অপেক্ষা বড় হও; তোমরা অন্য সকল ভূবন অপেক্ষা বড়।

৭। হে বজ্রহস্ত ইন্দ্র ও অগ্নি! ধন আহরণ কর, আমাদের প্রদান কর, কর্মদ্বারা আমাদের রক্ষা কর। সূর্যের যে রশ্মিসমূহ দ্বারা আমাদের পূর্ব পুরুষগণ সমবেত হয়েছিলেন, সে এই।

৮। হে বজ্রহস্ত নগরবিদারক (৩) ইন্দ্র ও অগ্নি! আমাদের ধন দান কর; সংগ্রামে আমাদের রক্ষা কর। মিত্র, বরুণ, অদিতি সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ আমাদের রক্ষা করুন।

টীকাঃ

১। গুণবিহীন জামাতা কন্যা লাভের জন্য কন্যাকর্তাকে অনেক ধন দান করে, ইন্দ্র ও অগ্নি তা হতেও অধিক দান করেন। সায়ণ। জামাতা=জা অর্থে, অপত্য, তার নির্মাতা। যাস্ক। নিরুক্ত

৬।৯।২।স্যালাৎ অর্থ কন্যার ভ্রাতা; সে যেরূপ ভগিনীকে ভালবেসে অনেক ধন দেয়, ইন্দ্র ও অগ্নি তা অপেক্ষাও অধিক দেন। সায়ণ। স্যাল=সা অর্থে শূর্প বা কুলো, লাজ অর্থে খৈ। যাস্ক নিরুক্ত ৬।

৯। বিবাহের সময় স্যালক শূর্প দ্বারা খৈ ছড়ায়।

৩। পুরন্দর শব্দ প্রায় ইন্দ্র সম্বন্ধেই ব্যবহৃত হয়, এখানে ইন্দ্র ও অগ্নি উভয়ের সম্বন্ধেই ব্যবহৃত হয়েছে। পুরুদরৌ অসুরপুরাণাং দারয়িতারৌ। সায়ণ।

দশম মণ্ডল: সুক্ত - ১১০

অনুবাদঃ

১। হে ঋভুগণ। আমি পূর্বে বারবার যজ্ঞকর্ম অনুষ্ঠান করেছি, এখন আবার অনুষ্ঠান করছি এবং সেখানে তোমাদের প্রশংসার জন্য অতিশয় সুমিষ্ট স্তুতি পাঠ করা হচ্ছে। এখানে সকল দেবগণের জন্য এ সোমরস (১) প্রস্তুত হয়েছে, স্বাহা শব্দ উচ্চারণপূর্বক অগ্নিতে সে রস অর্পিত হলে, তা পান করে তৃপ্ত হও।

২। হে ঋভুগণ! তোমরা আমার জ্ঞাতি, তোমাদের জ্ঞান যখন অপরিপক্ক ছিল, সেই পূর্বকালে তোমরা উপভোগ্য সোমরস ইচ্ছা করে গিয়েছিলে। হে সুধম্বার (২) পুত্রগণ! তখন তোমাদের কর্মের মহত্ত্ব দ্বারা দানশীল সবিতার গৃহে এসেছিলে।

৩। যখন তোমরা প্রকাশমান সবিতাকে তোমাদের (পোমপানের) ইচ্ছা জানিয়ে এসেছিলে এবং অসুর ত্বষ্টার নির্মিত সেই একটি সোমপাত্রকে চারখানা করেছিলে, তখন সবিতা তোমাদের অমরত্ব দান করেছিলেন।

৪। তারা শীঘ্র কর্ম সাধন করেছেন বলে এবং ঋত্বিকদের সাথে মিলিত হয়েছিলেন বলে মানুষ হয়েও অমরত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তখন সুধন্বার পুত্র ঋভুগণ সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান হয়ে সাংবৎসরিক যজ্ঞসমূহের হব্য ভাজন হলেন।

৫। ঋভুগণ নিকটস্থদের স্তুতিভাজন হয়ে, উৎকৃষ্ট সোমরস আকাঙ্ক্ষা করে, দেবগণের মধ্যে হব্য কামনা করে, মানদন্ড দিয়ে যেরূপ ক্ষেত্র পরিমাণ করে সেরুপ তীক্ষ্ম অস্ত্রদ্বারা একটি যজ্ঞপাত্র চারটি ভাগ করেছিলেন।

৬। আমরা অন্তরীক্ষের নেতা ঋভুগণকে পাত্রস্থিত ঘৃত অর্পণ করছি এবং জ্ঞানদ্বারা স্তুতি করছি; তারা জগৎপালক সূর্যের শীঘ্রতা প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তারা দিব্য লোকের যজ্ঞ অন্ন প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

৭। সমবলসম্পন্ন ঋভু আমাদের রক্ষক অন্ন ও বাসগৃহদাতা, ঋভু আমাদের নিবাস হেতু অতএব তিনি আমাদের তা দান করুন। হে ঋভু আদি দেবগণ। আমরা যেন তোমাদের রক্ষা প্রাপ্ত হয়ে অনুকুল দিবসে অভিষববিহীন শত্রু সেনাকে পরাস্ত করি।

৮। ঋভুগণ তুমি গাভীকে চর্ম দ্বারা আচ্ছাদন করেছিলে এবং সে গাভীকে পুনরায় বৎসের সাথে যোগ করে দিয়েছিলে (৩)। হে সুধম্বার পুত্র! যজ্ঞের নেতৃগণ! তোমরা শোভনীয় কর্মদ্বারা বৃদ্ধ পিতা মাতাকে পুনরায় যুবা করে দিয়েছিলে।

৯। হে ইন্দ্র! তুমি ঋভুদের সাথে মিলিত হয়ে অন্নদানের সময় আমাদের অন্নদান কর, বিচিত্র ধন দান কর। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী ও দ্যৌঃ যেন আমাদের রক্ষা করেন।

টীকাঃ

১। মুলে সমুদ্রঃ আছে, সায়ণ তার অর্থ করেছেন সমুদ্র নশীলোহয়ং সোমরসঃ।

২। ঋভু, বিভু ও বাজ এ তিন জন সুধম্বা নামক অঙ্গিরার পুত্র। যাস্ক। নিরুক্ত

১১।১৬। এ সুক্তের ঋষি কুৎস ও অঙ্গিরা বংশীয় অতএব ঋভুগণ তার জ্ঞাতি। ২০ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

৩। পূর্বে কোনও ঋষির ধেনু মরেছিল, ঋষি বৎসটিকে দেখে ঋভুকে স্তুতি করেছিলেন। ঋভুগণ তার সদৃশ আর একটি ধেনু নির্মাণ করে মৃত ধেনুর চর্ম দ্বারা তা আচ্ছাদন করে তাই বৎসের সঙ্গে যাগ করে দিয়েছিলেন। সায়ণ।