প্রথম মন্ত্রঃ ওঁ যে ত্রিষপ্তাঃ পরিয়ন্তি বিশ্বা রূপাণি বিভ্রতঃ। বাচস্পতিবলা তেষাং তম্বো অদ্য দধাতু মে।
বঙ্গানুবাদ –যে লোকপ্রসিদ্ধ অনন্ত-ঐশ্বর্যশালী ত্রিসপ্ত–অশেষ রূপ পরিগ্রহ করে, নিখিল বিশ্বের মঙ্গল-সাধনে সর্বদা সর্বতোভাবে পরিভ্রমণ করছেন, বেদবিদ্যাধিষ্ঠাত্রী দেবতা হে বাচস্পতি! আপনি সেই ত্রিসপ্তের (নিখিল দেবস্বরূপের) আত্মশক্তি এক্ষণে আমার সম্বন্ধে বিধান করুন (যে প্রকারে আমি সেই শক্তি লাভ করতে পারি, সেই জ্ঞান আমাকে প্রদান করুন)
মন্ত্ৰাৰ্থ আলোচনা –অথর্ববেদের প্রথম মন্ত্র (যে ত্রিষপ্তা ইত্যাদি) মেধাজনন-প্রার্থনা-মূলক। কমমাত্রেই মেধা, বুদ্ধি বা জ্ঞান, প্রধান ও প্রথম প্রয়োজন। এই মন্ত্রে, কর্মারম্ভের প্রথমেই তাই জ্ঞানাধিপতি দেবতার (বাচস্পতির) নিকট ভগবদাত্মভূত শক্তি-সামর্থ্যের প্রার্থনা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে,-হে জ্ঞানাধিপতি দেব, ভগবানের সম্বন্ধযুত শক্তি-সামর্থ্য-জ্ঞান আপনি আমাকে দান করুন। লক্ষ্য এই যে, তদাত্মশক্তিসম্পন্ন হলে শ্ৰেয়োলাভে আর কোনই বিঘ্ন ঘটবে না। সৎ-জ্ঞানের মধ্য দিয়েই সেই শক্তি লাভ হয়; তাই জ্ঞানাধিষ্ঠাতৃ দেবতার নিকট মেধাজনন জন্য প্রার্থনা জানান হচ্ছে। কি ভাবে, কি অবস্থায় এই মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়, ভাষ্যে তার আভাষ আছে। কর্মিগণ উপযুক্ত গুরুর সাহায্যে সেই কর্মে প্রবৃত্ত হতে পারবেন।
এই মন্ত্রটি অতি গভীর ভাবদ্যোতক। এর অন্তর্গত প্রথম শব্দ, যে। এই সর্বনাম পদ পূর্ববর্তী আকাঙ্ক্ষার দ্যোতনা করছে। তা থেকে বোঝা যাচ্ছে,–ঐ যে শব্দে সেই লোকপ্রসিদ্ধ সর্বেশ্বরের প্রতিই লক্ষ্য আসছে। তার পরত্রিষপ্তাঃ। এই পদ সম্বন্ধে ভাষ্যকার বহু গবেষণা করেছেন। তিন আর সাত (ত্রি ও ও ২ সপ্ত)–এই দুই-এর যত কিছু সম্বন্ধ থাকতে পারে, ঐ শব্দে তা-ই আমনন করা হয়েছে। পরিশেষে ঐ শব্দে যে সেই অনন্তরূপ পরমেশ্বরকেই বুঝিয়ে থাকে, ভাষ্যকারগণ তা-ই সিদ্ধান্ত করে গেছেন। ত্রি শব্দে এিকাল এবং সপ্ত শব্দে সপ্তলোক; তিন কাল (চিরকাল) সপ্তলোক (অখণ্ড বিশ্ব) ব্যেপে যিনি বিদ্যমান রয়েছেন, ঐ দুটি শব্দের প্রয়োগে তা-ই বোঝা যায়। সত্ত্বরজস্তমঃ–তিন গুণকে বা তিন গুণের আধারকে ত্রি শব্দে বোঝাতে পারে; ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর ঐ ত্রি শব্দেই অভিব্যক্ত হন। সপ্তশব্দে সপ্তর্ষি, সপ্তগ্রহ, সপ্তমরুত্বর্গ, সপ্তলোক প্রভৃতি অর্থও এখানে ভাষ্যকার গ্রহণ করেছেন। ত্রিসপ্ত বলতে শেষে অনন্ত ভাব স্বীকৃত হয়েছে। ত্রিসপ্ত থেকে একবিংশ রূপ অর্থও গ্রহণ করা হয়। সেই অনুসারে, পঞ্চমহাভূত, পঞ্চপ্রাণ, পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চকর্মেন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণসমন্বিত দেহ বা দেহীকে বুঝিয়ে থাকে। এইভাবে, নানা অর্থের মধ্য দিয়ে শেষে ঐ ত্রিষপ্তা শব্দে অনন্তরূপ পরমেশ্বরের প্রতিই লক্ষ্য আসে। তারপর ক্রিয়াপদ পরিয়ন্তি। প্রতি দিন, প্রতি কল্পে, প্রতি শরীরে, যথাবিধি পর্যাবর্তন করছেন অর্থাৎ জড় অজড় সকল পদার্থে সর্বদা বিদ্যমান রয়েছেন–এই ভাবে ঐ ক্রিয়াপদে প্রকাশ করছে। শ্রীভগবান্ যে সকলের মধ্যেই বিরাজমান থেকে ক্রিয়া করছেন, এখানে তা-ই বোঝা যায়। মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশ–বিশ্বরূপাণি বিভ্ৰতঃ। ভাবার্থ এই, জগতের সকলের প্রতিই অনুগ্রহ-বিতরণের জন্য তিনি সকল রূপ সকল আকার পরিগ্রহ করে আছেন। তিনি চেতনাচেতনাত্মক সকল বস্তুকে অভিমত ফল প্রদান পূর্বক পোষণ করছেন। মন্ত্রের প্রার্থনা–সেই যে তিনি এিষপ্তা তিনি অদ্য তাঁর আত্মশক্তি আমাকে প্রদান করুন। মন্ত্রে আছে–তন্ব এবং বলা। ঐ দুই শব্দের (তদা, বলানি) সাধারণ অর্থ-শরীরের বল। সেই ত্রিষপ্তা আমাকে তাদের শরীরের বল দেন,– বাক্যার্থ এমন হলেও, তার ভাবার্থ এই যে,তদাত্মভূত শক্তি যেন আমরা পাই। কিন্তু তদাত্মভূত শক্তি বলতে কি বোঝায়? এখানে ভগবানের স্বরূপ স্মরণ করতে হয়। বহু ব্যষ্টিশক্তির সমষ্টিতে তিনি সমষ্টিভূত শক্তি; তাই তাকে ত্রিষপ্তাঃ অনন্ত-নামরূপধারী অনন্ত শক্তিসম্পন্ন বলা হয়েছে। তার যে শক্তি, সে শক্তি অবিমিশ্র সত্ত্বভাবাপন্ন। যত কিছু দেবশক্তি, সকলই তার সেই শক্তির অন্তর্নিহিত। এখানে তাই বলা হয়েছে–তদন্তৰ্গত দেবশক্তিসমূহ যেন আমি প্রাপ্ত হই। বাচস্পতি–জ্ঞানদাতা দেব। জ্ঞানের মধ্য দিয়েই সকল শক্তি–সকল সৎ-ভাবমূলক শক্তি প্রাপ্ত হওয়া যায়। তাই জ্ঞানাধিপতি দেবতাকে প্রথমেই আহ্বান করা হয়েছে। জ্ঞানোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে-সৎ-বৃত্তি সৎ-ভাবের সমাবেশে ভগবানের স্বরূপ-শক্তি লাভ হয়। এখানকার প্রার্থনা,-হে দেব! আমায় সেই জ্ঞান দাও, যেন আমি সেই জগৎপতি জগন্নাথের স্বরূপ প্রাপ্ত হই।–এই মন্ত্রের ভাষ্যে ভাষ্যকার, দেবতত্ত্ব-বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পূর্বপক্ষ ও উত্তরপক্ষ রূপে, বাদ-প্রতিবাদ-সূত্রে ভাষ্যে দেবকর্তৃত্ব প্রতিপন্ন করা হয়েছে।
বঙ্গানুবাদ –হে জ্ঞানাধিপতি! সত্ত্বগুণের দ্বারা (আমাকে) উদ্ভাসিত করে আমার মনের সাথে আপনি মিলিত হোন। (হে দেব! আপন জ্ঞানরূপ প্রকাশের দ্বারা আমার অন্তঃকরণকে সত্ত্বগুণযুক্ত করে, সেই অন্তঃকরণে আপনি বিরাজ করুন)। হে জ্ঞানরূপ ঐশ্বর্যের অধিপতি! আমার অন্তরে অধিষ্ঠিত থেকে, আমাকে মেধাসমৃদ্ধি প্রদানপূর্বক আনন্দিত করুন। আপনার প্রসাদে আমার জ্ঞান প্রমাদ-পরিশূন্য হোক।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্র পূর্ব-মন্ত্রোক্ত বাচস্পতির উদ্দেশ্যেই প্রযোজিত হয়েছে। মন্ত্রের প্রথম অংশে সাধকের আপন অন্তঃকরণে জ্ঞানাধিপতির মিলন, আগমন অর্থাৎ বিকাশ প্রার্থনা সূচিত রয়েছে।
এই অংশে মনসা পদের যে দেবেন বিশেষণ দৃষ্ট হয়, তা অতি গভীর ভাবোদ্দীপক। এস্থলে দেব শব্দের অর্থ-দীপ্তিযুক্ত। যখন অন্তঃকরণে বিশুদ্ধ জ্ঞান বিকাশ পায়, তখন তাতে রজঃ তমঃ গুণ থাকতে পারে না; কেবল সত্ত্বগুণ আশ্রয় করে; সেই সত্ত্বগুণের প্রভাবে মন (অন্তঃকরণ) স্বচ্ছ আলোক প্রাপ্ত হয়; এখানে তেমনই অন্তঃকরণ লক্ষ্য রয়েছে। যতক্ষণ সত্ত্বগুণ সম্পূর্ণভাবে অন্তঃকরণকে অধিকার না করে, ততক্ষণ মন কলুষিত বা মলিন ভাবাপন্ন হয়ে থাকে; সেই মলিনাবস্থায়, মলিন দর্পণে প্রতিবিম্বের ন্যায়, পরমেশ্বরের দর্শন পাওয়া যায় না। অতএব, মনের মালিন্য দূর করতে হলে, বিশুদ্ধ জ্ঞানপ্রবাহের আবশ্যক। তাই সাধক ডাকছেন,-হে জ্ঞানাধিপতি! আমার সত্ত্বগুণযুক্ত অন্তঃকরণের সাথে মিলিত হোন; আমার হৃদয়ের ৩মঃ ও রজঃ গুণ নাশ করে আমাতে পরিপূর্ণ সত্ত্বগুণের বিকাশ করুন।-মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের বসোপতে পদের দ্বারাও সেই জ্ঞানাধিপতিকেই আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু ভাষ্যকার বসু শব্দে গ্রামাদিরূপ সম্পওির অধিপতি অর্থ করে, পরে প্রাণাধিপতি অর্থ করেছেন। যাই হোক, আমরা বসু শব্দে মেধা-জ্ঞানরূপ সম্পত্তিকে ধরে, উক্ত শব্দে হে মেধা-জ্ঞানরূপ সমৃদ্ধিস্বামি অর্থ গ্রহণ করলাম। এ ক্ষেত্রে, প্রথম ময়ি পদে সামীপ্যার্থে সপ্তমী ও এব শব্দে দূর-ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে। সুতরাং ঐ দুই পদে আমার নিকটেই–দূরে নয় এইরকম অর্থই প্রতীত হয়। দ্বিতীয় ময়ি পদে আধার (আশ্রয়) অর্থে সপ্তমী, সুতরাং আমার আশ্রিত এমন অর্থও হতে পারে। যিনি যে পদার্থের অধিস্বামী, প্রার্থীকে তিনি তা দান করতে পারেন। তাই সাধক তাকে ডাকছেন,–হে সমস্ত মেধা-জ্ঞান-সমৃদ্ধি-স্বামি ভগবন্! আপনি আমার মধ্যে প্রকটিত হয়ে, আমাকে মেধা ও জ্ঞানরূপ সম্পত্তি প্রদানের দ্বারা আনন্দিত করুন। ২৷৷
তৃতীয় মন্ত্রঃ ইহৈবাভি বি তনূভে আত্নী-ইব জয়া। বাচস্পতির্নি যচ্ছতু ময্যেবাস্তু ময়ি তং ৩ ॥
বঙ্গানুবাদ –হে জ্ঞানাধিদেব! যেমন ধনুকে যোজিত গুণ (ছিলা) ধনুকের দুই অগ্রভাগকে শরক্ষেপকের অভিমুখে আকর্ষণ করে, সেই রকম আপনার উপাসক এই আমাকে ঐহিক ও পারত্রিক ফল-সাধক যে মেধা ও জ্ঞান–এই উভয়ের প্রতি সর্বতোভাবে আকর্ষণ করুন। হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমার-বিষয়িণী বেদরূপা বাণীকে নিয়মিত করুন; (যাতে আমার সমুদায় ব্যক্য পরমার্থের অনুসরণ করে, সেইরকম বিধান করুন)। আপনার অনুগ্রহে আমার শাস্ত্রজ্ঞান (গুরু গণের নিকট হতে যে সকল উপদেশ-বাক্য শ্রবণ করেছি, সেই সমুদায়) আমাতে সুস্থির হোক। (ভাবার্থ-হে দেব! আপনি বাক্যের অধিপতি, সুতরাং আপনিই বাক্যকে যথাযথ নিয়মিত করতে সমর্থ। অতএব, যেভাবে আমার বাণী (বাক্য) সত্য অর্থ প্রকাশ করতে সমর্থ হয়, সেই ভাবে তাকে নিয়মিত করুন। ৩।
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা— এই মন্ত্রও বাচস্পতিদেবের নিকট প্রার্থনা-মূলক। এই মন্ত্রের কয়েকটি পদ বিশেষ ভাবে আলোচ্য। ইহ এব এই স্কুলে ইদ শব্দ নিস্পাদিত ইহ শব্দে অতি নিকটস্থিত বস্তুকে বোঝায়। যিনি যে দেবতার উপাসনা করেন, তিনি ক্রমশঃ তার নিকটে অগ্রসর হতে থাকেন। মানস-দৃষ্টিতে বা অন্তরদৃষ্টিতে উপাস্যকে অতি নিকটেই দেখতে পাওয়া যায়।…এই স্থলে ইহ শব্দ উপাস্য-উপাসক ভাব-সম্বন্ধের দ্বারা বাচস্পতিদেবের ও সাধকের পরস্পর নিকটবর্তিত্ব সূচিত করছে। উভে এই পদস্থিত উভ শব্দ স্বভাবুতঃ দুটি বস্তুকে বোঝায়। ঐ পদে পূর্বপ্রার্থিত মেধা ও জ্ঞানকে বোঝাচ্ছে। উক্ত মেধা ও জ্ঞান–ঐহিক ও পারত্রিক এই উভয়বিধ শুভ ফলের জনক! …এই মন্ত্রে প্রার্থনাকারী আপন উপাস্যদেব ভগবান্ বাচস্পতির নিকট উক্ত দুরকম ফলজনক মেধা ও জ্ঞানের অসাধারণ বৃদ্ধি প্রার্থনা করছেন।
মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে যে বাচস্পতিঃ শব্দ আছে, ভাষ্যকারের মতে তার অর্থ বিধাতা। বাচঃ + পতিঃ এমন বিশ্লেষণের দ্বারা অর্থ করলেও লক্ষ্য স্থির হয়। পতি শব্দের অর্থ পালক বা রক্ষাকর্তা। সেই অনুসারে মেধা ইত্যাদির সমৃদ্ধির পালক সেই ভগবান্ বাচস্পতিই লক্ষ্যস্থল হন। তা হলে নিযচ্ছতু এই ক্রিয়ার সাথে অন্বয় করবার জন্য যুগ্মদর্থক ভবৎ (ভবান) শব্দ অধ্যাহার করার আবশ্যক হয়। এবং বাচঃ এই বিশ্লিষ্ট পদের অর্থ বেদরূপ ব্যাক্যসমূহ অথবা জ্ঞানপ্রযুক্ত ভাষা-স্বীকার করতে হয়। তাতে ভাবার্থ দাঁড়ায় এই যে,–যিনি প্রভু, তার অসাধ্য কি আছে! হে দেব! আপনি প্রভু; আপনি আমার এমপ্রমাদজড়িত বাক্যসমূহকে বিশুদ্ধ করে প্রকৃত পরমার্থপথে পরিচালিত করুন; আমি যেন আপনার প্রসাদে শাস্ত্রীয় গূঢ়ার্থ সম্পদ বাক্যসমূহ হৃদয়গত করতে পারি ॥ ৩
চতুর্থ মন্ত্রঃ উপহূত বাচস্পতিরুপাম্মান বাচস্পতিয়তাং। সং শুতেন গমেমহি মা তেন বি রাধিষি ॥৪॥
বঙ্গানুবাদ –হে দেব! আপনি জ্ঞানাধিপতি ও ভক্তপ্রার্থনাপূরক। আমাদের অর্চনার দ্বারা আহুত হয়ে আপনি বেদজ্ঞানের নিমিত্ত আমাদের (আমাকে) মেধা ইত্যাদি শক্তি প্রদান করুন। যাতে (আমি) আমরা (যথাবিধি অধীত বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজনিত) জ্ঞানের সাথে মিলিত হতে পারি; এবং সেই জ্ঞানের সম্বন্ধ হতে কখনও যেন বিচ্ছিন্ন না হই। (প্রার্থনার ভাব এই যে,–যাতে কখনও আমি শাস্ত্রজ্ঞানচ্যুত না হই, সেই ভাবে আমার মেধা ও বল সম্পাদন করুন)
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের প্রথম অংশে বাচস্পতিঃ পদ দুবার উল্লিখিত হয়েছে। ভাষ্যকারের মতে–ঐ দুই পদেরই অর্থ এক। কিন্তু একই বিষয়ে একই অর্থে একই পদের পুনরূল্লেখ হওয়া সঙ্গত নয়। অতএব দ্বিতীয় বাচস্পতিঃ পদের বাচঃ + পতিঃ এইরকম পদ বিশ্লেষণের দ্বারা অর্থসঙ্গতি হবে। বাচঃ এই পদে বেদরূপ বাক্য বোঝাচ্ছে। ভাষ্যকারের মতে উপহুতঃ এই পদের অর্থ সমীপে আহুত। কিন্তু এখানে উপ শব্দের অর্থ পূজা। তাতে, পূজার্থ আহুত এইরকম অর্থ করা যেতে পারে। উপয়ং এই পদের অনুজ্ঞা করুন–আদেশ করুন এইরকম অর্থ ভাষ্যকারও প্রকাশ করেছেন। যিনি বাক্য বা জ্ঞানের অধিপতি, তার প্রদও শক্তি ব্যতীত কি ভাবে জ্ঞানলাভ সম্ভবপর? অতএব, তারই নিকটে মেধা ইত্যাদি। লাভরূপ অনুকম্পা প্রার্থনা করা হয়েছে।-মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে সাধক প্রার্থনা করছেন–আপনার প্রসাদে প্রাপ্ত মেধা ইত্যাদির সমৃদ্ধির দ্বারা আমি যেন জ্ঞানের সাথে মিলিত হই; কখনও যেন জ্ঞান-সম্বন্ধ হতে বিচ্যুত না হই। জ্ঞান না হলে, মনুষ্য কখনই মনুষ্য হতে পারে না। এ জ্ঞান সাধারণ জ্ঞান নয়; যে
জ্ঞানালোকে পরম-পদার্থ দৃষ্ট হয়, সেই জ্ঞানই এখানকার প্রার্থনীয়। মেধা (ধারণাশক্তি) না থাকলে, শাস্ত্র গ ইত্যাদির উপদেশ বিস্মৃত হতে হয়। যা শুনলাম, তা যদি ভুলে গেলাম, তা হলে সে উপদেশ শ্রবণে ফল কি? অতএব, মেধাই এই সূক্তের প্রধান প্রার্থনীয় বস্তু।–জীব! যদি পরিত্রাণ পেতে চাও, তবে সাধনার মূলীভূত সামগ্রী সত্ত্বভাবকে মেধার সাহায্যে (ধৃতির বন্ধনে) হৃদয়ে আবদ্ধ করে রাখো। এটাই এই সূক্তের শিক্ষা।
বঙ্গানুবাদ –সাধকের অভীষ্টদায়ক, চরাচরাত্মক জগতের পোষণকর্তা, লোকহিতকারী ও অভিলষিত প্রদানের দ্বারা ভক্ত-বাঞ্ছাপূরক, এবস্তৃত পরমপুরুষকে আমরা রিপুহিংসক, অজ্ঞানরূপ ব্যুহভেদকারী শরের (যোগকর্মের) জনক বলে জানি; অর্থাৎ জ্ঞানচক্ষুর দ্বারা দেখতে পাই। চরাচর জগতের আধারস্বরূপ, বিস্তীর্ণা পৃথিবীকে (প্রকৃতিকে) তার (শরের, যোগকর্মের) জননী-রূপে জানি। (ভাব এই যে,–জনকস্বরূপ পুরুষের জগৎপোষক গুণের প্রভাবে শরযোগকর্মও সেইরকম শক্তিসম্পন্ন বলে প্রতীত হয়। এইরকম জননীস্বরূপ প্রকৃতির বহুরূপাশ্ৰয়ত্বগুণের দ্বারা তার নানাবিধত্ব সপ্রমাণ হয়ে থাকে। ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সংগ্রাম-জয়ের প্রধান কারণ বাণের উৎপত্তি এবং তার জনক-জননীর বিষয় ভাষ্যকার আলোচনা করেছেন। এদিকে আবার, যুদ্ধজয় কার্য, জ্বরাতিসার প্রভৃতি রোগের শান্তি, অপরাজিতা নামক মহাশান্তি ও পুষ্পভিষেক কর্ম–এই সমস্ত বিষয়েও দ্বিতীয়সূক্তস্থিত মন্ত্ৰসকল প্রযুক্ত হয়,–এ-ও ভাষ্যকারই অনুক্রমণিকায় বলেছেন।…মন্ত্র নিত্য-সত্য। তার প্রয়োগ একাধিক কার্যে সুসিদ্ধ হয়। সংগ্রাম-জয়-বিষয়েও মন্ত্রের যেমন উপযোগিতা, রোগ ইত্যাদির শান্তি প্রভৃতির পক্ষেও তার সেইরকম আবশ্যকতা।-মন্ত্র সর্ব-জ্ঞানের আধার।…মন্ত্রের উদ্দেশ্য জীব সর্বদা সৎপথে সৎকর্মে নিরত হোক; আত্মজ্ঞান লাভ করে সংসার-বন্ধন থেকে মুক্ত থোক। এই মন্ত্রও সেই ভাবই প্রকাশ করছে। মন্ত্রের প্রথম অংশ বিঘা শরস্য। শরস্য এই পদে শর শব্দের অর্থ–যে হিংসা করে। যে শত্রুগণকে হিংসা বা নাশ করে, অথবা যার দ্বারা অজ্ঞানরূপ আবরণ বিদীর্ণ হয়, সেই পদার্থই শর শব্দের অভিধেয়। ভাষ্যকারও শর শব্দের ঐরকম ব্যুৎপত্তি করেছেন। কিন্তু তার ব্যাখ্যায় দাঁড়িয়েছে–শর শব্দের অর্থ বাণ। আমরা মনে করি, যে অন্তঃশত্ৰু কাম-ক্রোধ প্রভৃতি নাশ করে, সেই যোগই (সাধনাই) এখানে শর শব্দের লক্ষ্য। পর্জন্য পদে–যিনি তৃপ্তি দান করেন এবং যিনি সর্বজনের মঙ্গল করে থাকেন, তাকেই বুঝিয়ে থাকে। ভাষ্যেও ঐরকম অর্থই দেখা যায়।….ভূরিধায়সং পদ পরমপুরুষের গুণ প্রকাশ করছে। যিনি ভূরি অর্থাৎ বহুকে ধারণ বা পোষণ করেন, তিনিই ভূরিধায়স।… পিতরং পদের সাধারণতঃ যে জনক-রূপ অর্থ প্রচলিত আছে, এখানেও সেই অর্থ অব্যাহত মনে করি। যিনি বিশ্বজগতের জনক, যা থেকে এই চরাচর উৎপন্ন হয়েছে, তিনিই যে যোগ বা সাধনার জনক, তা বলাই বাহুল্য। এই সকল বিষয় বিবেচনা করলে, মন্ত্রের প্রথম অংশের ভাবার্থ হয় এই যে,-কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য এই ছয় রিপু সর্বদা জীবাত্মার সাথে সংগ্রাম করছে।
ঐ. অন্তঃশত্ৰুসকলের দমনকারী শর (যোগ-সাধনা) জীবন-যুদ্ধে জীবের একমাত্র সহায়। সর্বনিয়ন্তা, চরাচর জগতের হিতৈষী, সেই প্রমপুরুষই সেই শরের বা যোগের জনক, এটা আমরা জ্ঞান-চক্ষে দেখতে পাই।–মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের পৃথিবী এই পদের পৃথিবী শব্দে বিস্তীর্ণ ভূমিকে বোঝায়–এটাই ভাষ্যকারের মত। কিন্তু পৃক্ষু অর্থাৎ স্থূলবস্তু; তার-সম্বন্ধিনী এই অর্থেও পৃথিবী শব্দ নিষ্পন্ন হয়। তাতে স্থূলদেহ-সম্বন্ধিনী যে প্রকৃতি, তা-ই পৃথিবী শব্দ থেকে পাওয়া যায়। আমরা মনে করি, এখানে পৃথিবী শব্দের অর্থ প্রকৃতি। ভূরিবর্পসং শব্দ পৃথিবীর বিশেষণ। ভূরিবর্পস্ শব্দের অর্থ, যাতে ভূরিবর্পস অর্থাৎ বহুবিধ রূপ, চরাচরময় জগৎ বিদ্যমান আছে বা দৃষ্ট হয়ে থাকে। ভাষ্যে ঐরকম অর্থই দেখতে পাই। তাহলে, মন্ত্রের ভাবার্থ হয় এই যে,চরাচর জগতের আধারস্বরূপা স্থূলদেহসম্বন্ধিনী ত্রিগুণময়ী এই প্রকৃতিই যোগ বা সাধনার জননী। এই স্থূলদেহেই প্রথমে সাধনার অঙ্কুর উৎপন্ন হয়, পরে ক্রমশঃ সাধক সূক্ষ্ম পথে সম্মতত্ত্ব অবগত হয়ে, পরমাত্মায় যুক্ত (মিলিত) হতে পারেন। তাতে বিলীন হওয়াই সাধনার পরাকাষ্ঠা বা মুক্তি।–এই মন্ত্রে শরের এবং তার পিতা-মাতার উল্লেখ আছে দেখে, কোনও কোনও ব্যাখ্যাকার তৃণপর্যায়ভুক্ত শরকে লক্ষ্য করেছেন।
পর্জন্য শব্দে মেঘ এবং ভূরিধারসং শব্দে প্রচুর বর্ষণশীল প্রভৃতি অর্থ করে, মেঘকেই শরের জনক বলে কল্পনা করা হয়েছে। পৃথিবীই তাদের উৎপত্তিস্থান–এইজন্য পৃথিবীকে তাদের মাতা রূপে গ্রহণ করা হয়েছে। পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ, প্রায় সকলেই এই মতেরই প্রতিধ্বনি করে থাকেন। সায়ণের ভাষ্যেও এই মত প্রচ্ছন্নভাবে বিদ্যমান রয়েছে। তবে এই সূত্রে, বেদের নিত্যত্ব অনিত্যত্ব, পৌরুষেয়ত্ব অপৌরুষেয়ত্ব প্রভৃতি বিষয় আলোচনা করে, তিনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তা বিশেষ অনুধাবনার বিষয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বিচার করে দেখিয়েছেন–বেদ স্বতঃসিদ্ধ, প্রামাণ্য এবং পুরুষ প্রযত্ন বিরহিত বলে নিত্য ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –হে সর্বজগতের বিলয়ভূমি প্রকৃতি! তুমি আমার সম্বন্ধে সত্ত্বগুণরূপে পরিণত হও; (তুমি সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণস্বরূপা হলেও আমার অন্তরে কেবল সত্ত্বগুণস্বরূপা হয়েই বিরাজ করো)। আমার শরীরকে পাষাণের ন্যায় কঠিন করো, অর্থাৎ আমাকে সাধনায় সক্ষম করো। (প্রথমে প্রকৃতিকে প্রার্থনা করে সাধক পরে জীবনসংগ্রামে একমাত্র সহায় সেই ভগবানের নিকট প্রার্থনা করছেন) হে অনন্তশক্তিশালিন্ সর্বশ্রেষ্ঠ দেব! অন্তঃশত্ৰু কাম ইত্যাদির সহকারী মোহ-মায়া প্রভৃতির স্তম্ভনকর্তা আপনি আমার বহিঃশত্রু ও কাম ইত্যাদি অন্তঃশত্রু এবং তাদের কৃত অপকার সকলকে দূর করুন; তারা যেন আর আমাকে উদ্বিগ্ন (আক্রমণ) করতে না পারে। (ভাবার্থ-হে ভগবন্! আপনার কৃপায় কাম ইত্যাদি শত্রুভয়ে যেন আমাকে ভীত হতে হয় না)। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রে প্রকৃতির ও পুরুষের নিকট প্রার্থনা করা হয়েছে। মন্ত্রের প্রথম পদদ্বয়–জ্যাকে পরি। জ্যাকে এই পদটি জ্যাকা শব্দের সম্বোধনে নিষ্পন্ন। জ্যা শব্দে সাধারণতঃ, ধনুকের ছিলাকে বোঝায়। কুৎসিত জ্যা এই অর্থে জ্যাকা শব্দ নিষ্পন্ন হয়েছে; এমন অর্থই ভাষ্যে লিখিত আছে। কিন্তু আমরা বলি,-যাতে চরাচর জীর্ণ হয় এই ব্যুৎপত্তি থেকে জ্যা শব্দে প্রকৃতিকে পাচ্ছি; এবং ঐ জ্যা শব্দের উত্তর বিহিত কন্ (ক) প্রত্যয়ে সেই প্রকৃতির স্বভাব অতি দুবোধ এমন অর্থ প্রকাশ করছে।…পরিণম এই ক্রিয়াটির দ্বারা সাধক নিজের সম্বন্ধে প্রকৃতির পরিণতি অর্থাৎ স্থিতি প্রার্থনা করছেন।
কিন্তু প্রকৃতির পরিণম বা স্থিতি কি ভাব প্রকাশ করে? এই চরাচরের স্থিতি ও লয়, যথাক্রমে রজঃ, সত্ত্ব ও তমঃ এই গুণত্রয়ের দ্বারা সংসাধিত হয়ে থাকে; এবং এই ত্রিগুণময়ী প্রকৃতি হতেই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় সাধিত হয়। সত্ত্বভাবই স্থিতি বা পরিণাম। প্রকৃতি সত্ত্বগুণময়ী হোক–এটাই এখানে সাধকের প্রার্থনা। দ্বিতীয় প্রার্থনার বিষয়–তন্বং অশ্মানং (তনুং অশ্মসদৃশীং) অর্থাৎ আমার শরীরকে পাষাণের ন্যায় কঠিন করো।-সাধনার পথে অনেক অন্তরায়, বহু বিঘ্ন। মায়া, মমতা, স্নেহ, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা ইত্যাদি বহু উপসর্গ এসে মনকে বিচলিত করে নিয়ে যায়, এবং শরীরকে নানারকম ক্লেশ দান করে বিপথে বিভ্রান্ত করে। সেই আশঙ্কায় সাধক, প্রকৃতিদেবীর সমীপে শরীরের (স্কুল ও সূক্ষ্ম দেহের) প্রস্তরের ন্যায় কঠিনতা প্রার্থনা করছেন।–অতঃপর মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের একটি বিশিষ্ট পদ–বীডুর্বরীয়ঃ। এই অংশে বরীয়ঃ পদটি বরীয় শব্দের সম্বোধনে নিষ্পন্ন। ঐ পদের দ্বারা কোন শ্রেষ্ঠ পুরুষকে সম্বোধন করা হয়েছে বোঝা যায়। সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ অদ্বিতীয়–কে তিনি? বোঝা যায়, এখানে সেই পরম পুরুষকেই আহ্বান করা হয়েছে। বীডুঃ পদের অর্থ–যিনি লজ্জিত করেন। কিন্তু ভাষ্যে স্তম্ভনকারী এমন অর্থ দেখতে পাই। যে সহসা লজ্জা প্রাপ্ত হয়,সেই স্তম্ভিত হয়ে থাকে, এটি স্বতঃসিদ্ধ। এখানে ঐ পদে কাম ইত্যাদি রিপুগণের স্তম্ভনের ভাবই অধ্যাহৃত হচ্ছে। অরাতীঃ ও দ্বেষাংসি এই দুটি পদের অর্থ সাধারণতঃ শত্রু ও তকৃত অপকার, কিন্তু এটা কেবল বহিঃশত্রুকে ও বাহিরের অপকারকে বোঝাচ্ছে না। এর দ্বারা অন্তর-শত্ৰু কামক্রোধ প্রভৃতি এবং তাদের কৃত অনিষ্ট–এই উভয়কেও বোঝাচ্ছে। এইরকম আলোচনায়, মন্ত্রের ভাবার্থ হয় এই যে, হে মায়ামোহ ইত্যাদি-রহিত অলৌকিক-শক্তিসম্পন্ন দেব! আপনি আমার কাম ইত্যাদি অন্তঃশত্রুদের এবং তাদের সহচর মায়ামোহ প্রভৃতিকে স্তম্ভিত করুন। আমার অন্তঃশত্ৰু কাম ইত্যাদি ও নানারকম বহিঃশত্রুসকলকে এবং তাদের কৃত অপকারকে (অনিয়মকে) আপনি নাশ করুন। তারা আমার যেন কোনও অনিষ্ট না করতে পারে। হে দেব! আমার দেহ যেন পাষাণের ন্যায় দৃঢ় হয়, আমার অন্তর যেন সাত্ত্বিকভাবে পবিত্র হয়। আমি যেন সৎ-ভাবসম্পন্ন হয়ে আপনাকে প্রাপ্ত হই–এই আমার প্রার্থনা।–এটাই এই মন্ত্রের স্বরূপ ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –মৌর্বী (ধনুগুণ) যেমন ধনুষ্কোটিতে আরোপিত হয়ে ধনুর্দণ্ডকে অনুসঞ্চালন পূর্বক শাণিত শরকে (শত্রুর অভিমুখে) প্রেরণ করে, সেইরকম হে ইন্দ্রদেব! বজ্রবৎ প্রকাশমান হিংসাকারী শত্রুশরকে আমাদের নিকট হতে (সঞ্চালিত করে) দূরে অপসারিত করুন। (ভাবার্থ– প্রক্ষেপ-বলের দ্বারা উৎক্ষিপ্ত স্বসংশ্লিষ্ট বাণ ধনুগুণ যেমন অন্যত্র প্রেরণ করে থাকে; তেমনি, হে ভগবন্! আপনার শক্তির প্রভাবে আমি আমার অন্তরস্থিত রিপুশত্রুদের দমন করতে বা দূরে। নিক্ষেপ করতে সমর্থ হবো) ৷৷ ৩৷৷
অথবা, আমাদের জ্ঞানসমূহ, সৎ-ভাবসংশ্লিষ্ট হয়ে, মূলস্বরূপ দেবকে আপন প্রকাশ জ্ঞানে, যাতে অনাবিল। যোগ-সাধনা (ভগবৎ-সান্নিধ্য) প্রাপ্ত হয়, তা করুন; আরও, হে ভগব! বজ্রবৎ কঠোর হিংস্র কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপুশত্রুদের আমাদের নিকট হতে দূরে অপসারিত করুন। (ভাবার্থ-আমাদের জ্ঞান ভগবৎ-সম্বন্ধযুত হোক। হে ভগবন্! আপনি আমাদের রিপুশত্রু বিমর্দিত করুন) ॥ ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের আমরা দুরকম অর্থ নিষ্কাষিত করলাম। এক রকম অর্থ প্রায়শই ভাষ্যের অনুসারী; অন্য অর্থ–ভাবমূলক। ভাষ্যকারও মন্ত্রটির ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে নানারকম অর্থ কল্পনা করেছেন। আমরা মন্ত্রের প্রথম যে অর্থ নিষ্কাষণ করলাম, দ্বিতীয় অর্থের সাথে তার ভাবসঙ্গতি রক্ষার চেষ্টা আছে। দুই দিকের দুই অর্থই একই ভাব ব্যক্ত করছে। অথচ শব্দার্থ দুই দিকেই বিভিন্ন প্রকার। প্রথম ব্যাখ্যায়, শব্দার্থ বিষয়ে সায়ণেরই অনুসরণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যায়, শব্দের ভাব মাত্র পরিগৃহীত। প্রথম ব্যাখ্যায়, আমরা মনে করি, একটি উপমা প্রকাশ পেয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই, উভয় প্রকার ব্যাখ্যার মধ্যেই, একজন কর্তার প্রতি লক্ষ্য আসছে।
ধনুকে জ্যা যোজনা করলে শর যেমন ধনুদণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অপরের (শত্রুর) প্রতি ধাবমান হয়, অর্থাৎ ধনুকের সাথে যেমন শরের সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; হে ভগবন! আমার সাথে শত্রুর সম্বন্ধ সেইরকমভাবে বিচ্ছিন্ন করে দাও। আমার দেহরূপ ধনুষ্কোটিতে কাম-ক্রোধ। ইত্যাদি রূপ হিংস্র শর সংলগ্ন হয়ে আছে; সে শর যার প্রতি প্রযুক্ত হবে, তারই মর্মস্থান ভেদ করবে। তাই প্রার্থনা–আমা হতে তাদের বিচ্ছিন্ন ও বিচ্যুত করুন। আমার সঙ্গে তাদের সংযোগ থাকলে, তারা কারও-না-কারও কোনও-না-কোনও অনিষ্টসাধন করবেই করবে।–এটা অবশ্য স্থূলতঃ প্রার্থনা।–সূক্ষ্ম ভাবে দেখলে উপমার একটা সার্থকতা লক্ষ্য করা যায়। শর শত্রুর প্রতি সাধারণতঃ নিক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। আমার সাথে সম্বন্ধযুত শরকে আমা হতে অপসৃত করুন; অথবা, আমার শত্রুর প্রতি তা বিক্ষিপ্ত হোক, এরকম উক্তিতে কি ভাব মনে আসে? কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপুবর্গকে যদি একবার শর ও একবার শত্রু পর্যায়ে গ্রহণ করা যায়, তাহলে পূর্বরূপ উক্তির সার্থকতা সুন্দরভাবে প্রতিপন্ন হয়। ঐ যে রিপুশত্রুগণ, তারা আবার পরস্পর পরস্পরেরই বিরুদ্ধাচারী। এ ক্ষেত্রে কণ্টকেনৈব কন্টকং নীতির অনুসরণে; আমার এক অসৎ-বৃত্তির দ্বারা অন্য অসৎ-বৃত্তিকে পর্যুদস্ত করুন–এটাই এ পক্ষে এ মন্ত্রের প্রার্থনা বলা যেতে পারে। দুই ব্যাখ্যাতেই এই একই ভাব আসে। জ্ঞান যদি সৎ-ভাবসংশ্লিষ্ট হয়, চিত্তবৃত্তি যদি মূলাধার ভগবানকে স্বপ্ৰকাশ বলে বুঝতে পারে, তাহলেই ভগবানের সাথে সাধকের মিলনরূপ যোগসাধন আরম্ভ হয়। আর, সে যোগ-সাধনার ফলে, কামক্রোধ ইত্যাদি রিপুবর্গকে ভগবান্ দূরে অপসারিত করেন। এ মন্ত্রের এমন মর্মই আমরা পরিগ্রহ করলাম ৷ ৩৷৷
চতুর্থ মন্ত্র: যথা দ্যাং চ পৃথিবীং চান্তস্তিষ্ঠতি তেজনং। এবা রোগং চাম্রাবং চান্তস্তিষ্ঠ মুঞ্জ ইৎ ॥ ৪
বঙ্গানুবাদ –যে প্রকারে দ্যুলোকের ও পৃথ্বীলোকের মধ্যে (উন্নত হয়ে, অর্থাৎ দ্যুলোককে ও পৃথীলোককে অবোদেশে রেখে) বংশদণ্ড অবস্থান করে; সেইরকম, সাধারণ রোগের ও। মূত্রাতিসারের (প্রকোপের) মধ্যে মুঞ্জমেখলা অবস্থান করুক। (এই মন্ত্র পাঠ করে মুঞ্জমেখলা প্রভৃতি ধারণ করলে মূত্রাতিসার ইত্যাদি বহু রকম রোগের শান্তি হয়–মন্ত্র এই ভাব দ্যোতন করে)
বঙ্গানুবাদ –যোগসাধনার জনকস্থানীয়, অশেষ কামনা-পূর্ণকারী, অভীষ্টবর্ষী পর্জন্যদেবকে জানা একান্ত কর্তব্য; যোগের প্রভাবে (যোগজনক দেবতার সাথে মিলনের দ্বারা) তোমার দেহের মঙ্গলবিধান কর্তব্য; তোমার শক্তি এবং প্রাণের নিমিত্ত তোমার অন্তরস্থিত ক্লেদরাশি ইহসংসার হতে অপসারিত হোক। (ভাবার্থ-ভগবানই যোগের জনক বা উৎপত্তি-স্থানীয়। যোগের প্রভাবে তোমার ক্লেদরাশি দূরীভূত হোক; এবং তাতে তোমার অশেষ মঙ্গল সাধন হোক)। ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— মন্ত্রে তৃণজাতীয় শরকেই লক্ষ্য করা হয়েছে, ভাষ্যানুসারে তা বুঝতে পারা যায়। পর্জন্য (মেঘ) হতে বৃষ্টি হয়। সেই বৃষ্টির দ্বারা তৃণ-পর্যায়ভুক্ত শর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। সেইজন্যই পর্জন্যকে শরের পিতা বলে অভিহিত করা হচ্ছে।…ভাষ্যানুসারে মন্ত্রের প্রথম অংশের অর্থ–অপরিমত বীর্যশালী (বৃষ্টিপ্রদ) যে পন্যদেব, তিনি শরের পিতা, তাকে আমরা জানি। ভাষ্যানুসারে মন্ত্রের দ্বিতীয় চরণের যে অর্থ অধ্যাহৃত হয়, অতঃপর তার একটু আভাষ দিচ্ছি–সেই যে শর, যার পিতাকে আমরা জানি, সে মূত্রনিরোধ ইত্যাদি ব্যাধিগ্রস্ত জনের শরীরের রোগ নাশ করে। কি প্রকারে? নিষেচনং ও বহিষ্টে পদে তা-ই প্রকাশিত হয়েছে। ঐ শরের প্রভাবে মূত্র নিঃসারণ হয়ে থাকে। সেইজন্যই ঐ দুই পদের সার্থকতা। প্রসঙ্গতঃ একটি শব্দ উচ্চারণের বিষয়ও তাতে খ্যাপিত হয়; বলা হয়ে থাকে যে, বালিতি শব্দ উচ্চারণ করতে করতে রোগীর শরীর হতে বদ্ধমূত্র ভূমিতে পতিত হয়। মন্ত্র কিভাবে উচ্চারণ করতে হয়, তার ক্রিয়াপদ্ধতির বিষয় একমাত্র অভিজ্ঞ জনই বলতে পারবেন। তাছাড়া, এই সূক্তের অনুক্রমণিকায় দেখতে পাই,–মূত্র পূরিষ নিরোধের অবস্থায় এই সূক্তের মন্ত্র কয়েকটি উচ্চারণ পূর্বক রোগীর শরীরে হরিতকী ও কর্পূর বন্ধ করা হয়ে থাকে। ঐ এবং আরও কয়েকটি দ্রব্যের ব্যবহার-বিষয় ঐ অনুক্রমণিকায় থাকলেও সেগুলির বিশেষরূপ ব্যাবহার-বিধি ভাষ্যের মধ্যে বিশেষ কিছুই পাওয়া যায় না। ভাষ্যে যে অর্থই প্রকাশ থাকুক না কেন, আমরা কিন্তু মন্ত্রের মধ্যে এক সর্বজনীন অর্থ লক্ষ্য করলাম। আমাদের মনে হয়, এই মন্ত্রও যোগসাধনার নিমিত্ত জীবকে উদ্বুদ্ধ করছে। ব্যাধিপ্রতিষেধের বিষয় ভাবতে গেলেও বলতে পারি, যোগসাধনাই ব্যাধিনিবৃত্তির প্রকৃষ্ট উপায়। তোমার ঔষধ-পথ্যে কতটুকু কি করতে পারে? যদি যোগের প্রভাবে ভগবানের সাথে মিলিত হতে পারো, ব্যাধি-বিপত্তি তখন আপনিই দূর হয়ে যাবে। বলা হয়েছে, যিনি যোগের জনক, তিনি শতবৃষ্ণ্য (অশেষ কামনাপূরক); তার নাম পন্যদেব। বারিবর্ষণে তিনি ধরণীতে শান্তি-শীতলতা আনয়ন করেন; তার স্নেহাভিষেচনে শুষ্ক বীজ স্নেহভাব প্রাপ্ত হয়। প্রথমেই পর্জন্য-দেবতার সেই স্নেহ ভাবের সম্বন্ধ সূচনা করা হলো; তাৎপর্য এই যে,–তোমার নীরস শুষ্ক হৃদয়ে যদি শুদ্ধসত্ত্ববীজের অঙ্কুরোদ্গম আশা করো, তাঁকে অভীষ্টবর্ষণকারী পর্জন্যদেব বলে হৃদয়ে ধারণা করতে অভ্যস্ত হও। সেই তো এক যোগ। সেই যোগের দ্বারা মন্ত্র বলছেন-দেহের মঙ্গলসাধন হবে, তোমার শক্তি প্রাণ প্রতিষ্ঠার অন্তরায়ভূত অন্তরস্থিত ক্লেদরাশি ইহলোক হতে অপসারিত হবে। এ মন্ত্রে এইরকম আধ্যাত্মিক ভাব আমরা পরিস্ফুট দেখতে পাই ॥ ১
বঙ্গানুবাদ –যোগসাধনার জনকস্থানীয়, অশেষ-কামনা-পূর্ণকারী, মিত্রবৎ স্নিগ্ধতেজঃসম্পন্ন মিত্রদেবকে জানা একান্ত কর্তব্য; যোগের প্রভাবে (যোগজনক দেবতার সাথে মিলনের দ্বারা) তোমার দেহের মঙ্গলবিধান কর্তব্য; তোমার শক্তি এবং প্রাণের নিমিত্ত তোমার অন্তরস্থিত ক্লেদরাশি ইহসংসার হতে অপসারিত হোক। ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –সায়ণভাষ্যানুসারে এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা, মূত্রনিরোধ ইত্যাদি ব্যাধিগ্রস্তের মুএনিঃসারণ সম্বন্ধসূচক। এই পক্ষে, এই সূক্তের ১ম মন্ত্রের যে ব্যাখ্যা উল্লিখিত হয়েছে, এ মন্ত্রেও সেই ব্যাখ্যা প্রযোজ্য। কেবল, পর্জন্য স্থলে মিত্র (স্নিগ্ধালোকরশ্মি) প্রভৃতি রূপ পরিবর্তন হবে।–সূক্তের প্রথম মন্ত্রের সাথে এই দ্বিতীয় মন্ত্রের পার্থক্য–কেবল একটি মাত্র পদের প্রয়োগ-বিষয়ে। প্রথম মন্ত্রে পিতরং পদের পর পর্জন্য পদ ছিল; এখানে তার পরিবর্তে মিত্রং পদ প্রযুক্ত দেখতে পাই। এইরকম পরপর পাঁচটি মন্ত্র একই ছন্দে একই রূপ শব্দসমষ্টিতে সংগ্রথিত; কেবল, এক একটি মাত্র পদের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। কেন এমন হলো? কোনও ভাষ্যকার কেউই এ পর্যন্ত এ বিষয়ে আলোকপাত করেননি। আমরা মনে করি, যদিও শব্দের পার্থক্য একটি পদ-মাত্র; কিন্তু ভাবের পার্থক্য–নিগূঢ় তত্ত্বমূলক।–প্রথম মন্ত্রে দেখলাম–যোগসাধনার ক্ষেত্রে পর্জন্যদেব এসে জলসেচন করলেন। বীজ অভিষিক্ত হলো। কিন্তু কেবল জলাভিষেকে বীজে অঙ্কুর উদ্গত হয় না তো! সুতরাং স্নিগ্ধরশ্মিসম্পাতের প্রয়োজন হলো। তখন মিত্র-ভাবে মিত্রদেব এসে সহায় হলেন। প্রথম মন্ত্রে পর্জন্যদেবকে আহ্বানের পর, দ্বিতীয় মন্ত্রে তাই মিত্রদেবকে আহ্বান করা হলো। এ পক্ষে এই মন্ত্র যোগ-সাধনার দ্বিতীয় স্তর। পর্যায়ক্রমে দুই মন্ত্রে ভগবানকে হৃদয়ে দুই ভাবে ধারণা করা হলো। ২
তৃতীয় মন্ত্র: বিদ্যা শরস্য পিতরং বরুণং শতবৃষ্ণং। তেনা তে তম্বে ৩ শং করং পৃথিব্যাং তে নিষেচনং বহিষ্টে অস্তু বালিতি ॥ ৩
বঙ্গানুবাদ –যোগসাধনার জনকস্থানীয়, অশেষ-কামনা-পূর্ণকারী, ছায়াদানে পরিবৃদ্ধিকারক বরুণদেবকে জানা একান্ত কর্তব্য; যোগপ্রভাবে (যোগজনক দেবতার সাথে মিলনের দ্বারা) তোমার দেহের মঙ্গলবিধান কর্তব্য; তোমার শক্তি এবং প্রাণের নিমিত্ত তোমার অন্তরস্থিত ক্লেদরাশি ইহসংসার হতে অপসারিত হোক। ৩
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রে পুনরায় মিত্রং পদের পরিবর্তন। এখানে তার পরিবর্তে বরুণং। এটা যেন অঙ্কুরোদ্গমের তৃতীয় স্তর। বর্ষণের পর কেবল স্নিগ্ধ উত্তাপ পেলেও অঙ্কুর উদ্গত হয় না। সেই পক্ষে স্নিগ্ধচ্ছায়ার প্রয়োজন। মৃদুমধুর শিশির-সম্পাত আবশ্যক। তাই, মিত্রদেবতার পর বরুণদেবতার অর্চনার আবশ্যক হলো–হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বভাবের বিকাশের পক্ষে তিনটি মন্ত্রে পর পর তিনটি বিষয় বিবৃত রয়েছে। যোগসাধনায় প্রবৃত্ত হয়ে সাধক, প্রথমে ভগবানের পর্জন্যদেব-রূপ বিভূতি প্রত্যক্ষ করলেন। তার পর তার মিত্রদেব-রূপ বিভূতি হৃদয়ঙ্গম হলো। তারপর তিনি আবার স্নিগ্ধ বরুণদেব-রূপ বিভূতিতে সাধকের হৃদয়ে প্রতিভাত হলেন। বীজ, অঙ্কুরোদ্গমের অবস্থা প্রাপ্ত হলো।সায়ণভাষ্যানুসারে এই সূক্তের এ মন্ত্রের ব্যাখ্যাও মূত্রনিরোধ ইত্যাদি ব্যাধিগ্রস্তের মূত্রনিঃসারণ সম্বন্ধসূচক। প্রথম মন্ত্রের পর্জন্য স্থলে এখানে বরুণ (স্নিগ্ধছায়াদানকারী) প্রভৃতি-রূপ পরিবর্তন হবে ॥ ৩॥
চতুর্থ মন্ত্রঃ বিদ্যা শরস্য পিতরং চন্দ্রং শতবৃষ্ণং। তেনা তে তন্বে ৩ শং করং পৃথিব্যাং তে নিষেচনং বহিষ্টে অস্ত্র বালিতি। ৪
বঙ্গানুবাদ –যোগসাধনার জনকস্থানীয়, অশেষ-কামনা-পূৰ্ণকারী, বিকাশ-উন্মেষক চন্দ্রদেবকে জানা একান্ত কর্তব্য; যোগের প্রভাবে (যোগজনক দেবতার সাথে মিলনের দ্বারা) তোমার দেহের মঙ্গলবিধান কর্তব্য; তোমার শক্তি এবং প্রাণের নিমিত্ত তোমার অন্তরস্থায়ী ক্লেদরাশি ইহসংসার হতে অপসারিত হোক। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –সায়ণভাষ্যানুসারে এ মন্ত্রের ব্যাখ্যা, মূত্রনিরোধ ইত্যাদি ব্যাধিগ্রস্তের মূত্রনিঃসারণ সম্বন্ধসূচক। এ পক্ষে এই সূক্তের প্রথম মন্ত্রের ব্যাখ্যায় যা বলা হয়েছে, এখানে সেই ব্যাখ্যাই প্রযোজ্য। কেবল, পর্জন্য স্থলে চন্দ্র (বিকাশ-উন্মেষক) প্রভৃতি-রূপ পরিবর্তন হবে। আমরা মনে করি, এই মন্ত্র অঙ্কুরের উগম-ভাব-দ্যোতক। এই মন্ত্রে পুনরায় পদ-পরিবর্তন ঘটেছে। এখানে পূর্ববর্তী মন্ত্রের পর্জন্য বা মিত্র বা বরুণ পদ চন্দ্রং পদে পর্যবসিত। চন্দ্রদেবই অঙ্কুরের উন্মেষক। প্রকৃতি যে মুকুল-মুঞ্জরায় বিভূষিত হয়, তাতে চন্দ্রদেবেরই প্রভাব প্রকটিত হয়ে থাকে। প্রথম মন্ত্রে বীজে জলসেক, দ্বিতীয় মন্ত্রে স্নিগ্ধ উত্তাপ, তৃতীয় মন্ত্রে মৃদুমন্দ ছায়া, তারপরে এই চতুর্থ মন্ত্রে বীজে অঙ্কুরোদ্গম-ক্রিয়া।-ভগবান, চন্দ্রদেব-রূপ দিনী মূর্তিতে, সাধকের হৃদয়ক্ষেত্রে শুদ্ধসত্ত্বভাবের বীজকে অঙ্কুরিত ও মুকুলিত করলেন। চন্দ্রদেবরূপ ভগবৎ-বিভূতির ধারণায় সেই অবস্থায় উপনীত হওয়া যায়। এ মন্ত্রকে সেই পক্ষে যোগ-সাধনার চতুর্থ স্তর বলে মনে করতে পারি। এই চারটি মন্ত্রে চার স্তরে সাধকের হৃদয় কন্দর হতে প্রতিধ্বনি উঠছে–এস দেব!–এস! তুমি. পর্জন্য-রূপে এস। আমার এ বিশুষ্ক হৃদয়-মরুভূমি তোমার করুণারূপ সুধাঁধারায় অভিষিঞ্চিত হোক। শুদ্ধসত্ত্ব-ভাবের যে বীজটুকু এই হৃদয়-মরুভূমির এক প্রান্তে শুষ্ক হয়ে পড়ে আছে, তাকে আর্দ্র করো। এস, দেব! এস সখে! স্নিগ্ধকিরণরূপে মিত্রদেব হয়ে এস! সে আদ্রবীজ, একটু জীবনী-শক্তি প্রাপ্ত হোক। এস দেব!–এস তুমি! স্নিগ্ধচ্ছায়ারূপে বরুণদেব হয়ে এস; বীজ নবভাব প্রাপ্ত : হোক। অবশেষে, এস দেব! এস তুমি, চন্দ্ররূপে এসে সে বীজ মুকুলিত মুঞ্জরিত করে দাও। পর পর মন্ত্র-চারটিতে এই চার স্তরের প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। ৪
বঙ্গানুবাদ –যোগসাধনার জনকস্থানীয়, অশেষ-কামনা পূর্ণকারী, পূর্ণরূপে প্রকাশক সূর্যদেবকে জানা একান্ত কর্তব্য; যোগের প্রভাবে (যোগজনক দেবতার সাথে মিলনের দ্বারা) তোমার দেহের মঙ্গলবিধান কর্তব্য; তোমার শক্তি এবং প্রাণের নিমিত্ত তোমার অন্তরস্থিত ক্লেদরাশি ইহসংসার হতে অপসারিত হোক ॥ ৫৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –সায়ণভাষ্যানুসারে এই মন্ত্র মূত্রনিরোধ ব্যাধিগ্রস্তের মূত্রনিঃসারণ সম্বন্ধসূচক। এ পক্ষে এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা পূর্বের চারটি মন্ত্রের মতোই। কেবল, পর্জন্য ইত্যাদির স্থলে সূর্য (পূর্ণ-প্রকাশক) রূপ পরিবর্তন হবে। আমরা দেখছি, পূর্ব মন্ত্রে ছিল চন্দ্রং, এবার হলো সূর্যং। বীজ অঙ্কুরিত মুকুলিত হয়েছিল; এবার প্রস্ফুটিত ফুলফলসমন্বিত পরিপক্ক হলো। প্রকৃতির লীলাক্ষেত্রে বীজের উন্মেষ-অভিব্যক্তি সম্বন্ধে যে প্রক্রিয়া-পদ্ধতি বিধাতা বিধান করে রেখেছেন, সাধনার ক্ষেত্রে ভক্তের হৃদয়ের মধ্যেও সেই প্রক্রিয়া-পদ্ধতি অব্যাহত রয়েছে। পরিদৃশ্যমান পৃথিবীর-বিধিবিধানের উপমার দ্বারাই ধ্যানধারণার সামগ্রীকে আয়ত্তীকৃত করবার প্রয়াস হয়েছে।…যদি জ্ঞানলাভের অভিলাষী হও, স্তরে স্তরে অগ্রসর হতে আরম্ভ করো। তখন সেই পূর্ণ জ্যোতিষ্মন্ ভগবান, সূর্যরূপে প্রকাশমান হয়ে, তোমার চির অন্ধ-তমসাচ্ছন্ন হৃদয়াকাশ আলোকিত পুলকিত করবেন। পর পর পাঁচটি মন্ত্র, যোগসাধনার এই পরম পন্থা প্রদর্শন করছে ॥ ৫॥
বঙ্গানুবাদ –তোমার শক্তি ও প্রাণের নিমিত্ত, (তোমার) অন্ত্রমধ্যগত যে পাপ, এবং (তোমার) দেহস্থিত যে পাপ, তোমাতে সংশিত হয়ে আছে, সেই সমস্ত পাপ, মূত্রাশয়স্থিত নাড়ীদ্বয় হতে মূত্র নিঃসরণের ন্যায়, বহির্দেশে বিনির্গত হোক ৷৬৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের সংশ্ৰিতং স্থলে সংশ্রুতং পাঠ দেখা যায়। সায়ণ-ভাষ্যে সংশ্ৰিতং পাঠেরই পোষকতা দেখা যায়। আমরা সেই পাঠই গ্রহণ করেছি।–এ মন্ত্রটি বিষম সমস্যাপূর্ণ। সূঞানুক্রমণিকা এবং মন্ত্রভাষ্য অনুসরণ করলে প্রতীত হয়, মূত্রকৃচ্ছরোগীর মূত্রনিঃসারণ-বিষয়ে সহায়তার জন্য এই সূক্তের অপর সকল মন্ত্রের মতোই প্রযুক্ত হয়। তবে, বলা বাহুল্য, কোন্ পদ্ধতি-প্রক্রিয়া-অনুসারে মন্ত্র প্রয়োগ করলে সেই ভীষণ ব্যাধি হতে মুক্তিলাভ করা যায়, তার কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না। এই মন্ত্রটির মধ্যে আন্ত্র, গবিনী, বস্তি প্রভৃতি যে সকল শব্দ পরিদৃষ্ট হয়, তার দ্বারা শারীরতত্ত্বাভিজ্ঞতার প্রকৃষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় বটে। মূত্রাশয়ের সঙ্গে ভাষ্য-লিখিত উদরান্তৰ্গত পুরীতসুর (নাড়ি-ভুড়ির) ও গবিনী নাড়ি দুটির কী সম্বন্ধ, শারীরতত্ত্ববিদ বৈজ্ঞানিক ভিন্ন অন্যে তা অবগত নন। মূত্রের মূত্রাশয়-প্রাপ্তির সাধনের পক্ষে গবিনী নাড়ীদ্বয় অবস্থিত থাকে। বস্তি বলতে ধনুরাকারে অবস্থিত মূত্রাশয়কে বুঝিয়ে থাকে। মূএনিঃসরণের শব্দকে বালিতি বলে অভিহিত করা হয়। এ সকল বিষয় পর্যালোচনা করলে এবং পরবর্তী মন্ত্রগুলির সাথে এই মন্ত্রের সম্বন্ধের বিষয় ঐ দৃষ্টিতে লক্ষীভূত হলে, সেই কঠিন মূত্রকৃচ্ছব্যাধির প্রতিকারের উপায়ই মন্ত্রের লক্ষ্যস্থল বলে প্রতীতি জন্মে। পক্ষান্তরে দেখতে পাই, এ মন্ত্রে যোগ-সাধনার ॥ সাফল্যের বিষয়ই পরিকীর্তিত হয়েছে। পর, মূত্রকৃচ্ছব্যাধি-শান্তির উপমার–অতি সমীচীনতাই প্রতিপন্ন হয়। মূত্রকৃচ্ছব্যাধি-মহাপাতকের ফল। মুত্র-অবরোধের কারণে এই ব্যাধির যন্ত্রণা–অতীব অসহনীয়।… সর্বাপেক্ষা ক্লেশপ্রদ এই ব্যাধি এবং এর শীঘ্র উপশমের উপমা, অশেষপাপতাপক্লিষ্ট জনগণকে ভগবৎ আরাধনায়যোগসাধনায় প্রলুব্ধ করছে। মন্ত্র যেন বলছেন, তোমার যতরকম পাপ আছে; অন্তরের পাপ, বাহিবের পাপ, সকল প্রকার পাপ, যোগ-সাধনার প্রভাবে বিধৌত হয়ে যাবে। ভগবানের স্বরূপ-তত্ত্ব অবগত হলে–তার প্রতি একান্তে ন্যস্তচিত্ত হতে পারলে, মূত্রকৃচ্ছরোগীর মূত্র-নিঃসারণের ন্যায়, তোমার সর্ববিধ পাপ ঝটিতি দূরীভূত হবে। রোগী যেমন শান্তিলাভ করে তখন তুমিও সেইরকম শান্তি লাভ করবে।
মন্ত্রটিতে উপমার ছলে পরম তত্ত্বে মনকে আকৃষ্ট করা হয়েছে। যিনি যে দৃষ্টিতে দেখতে চাইবেন; তিনি সেই দৃষ্টিতেই মন্ত্রার্থের অনুসরণ করুন। যে জন মূত্রকৃচ্ছরোগাক্রান্ত, সে জন মন্ত্রনির্দিষ্ট মুঞ্জমেখলা ধারণপূর্বক মন্ত্রের অনুধ্যান করুন। আর যে জন ভীষণ ভবব্যাধিগ্রস্ত, সে জন, মন্ত্রকথিত আধ্যাত্মিক ভাব আপন হৃদয়-প্রদেশে স্তরে স্তরে সজ্জিত করে রাখুক ॥ ৬
প্রথম মন্ত্রঃ অন্বয়ো যন্ত্যধ্বভিৰ্জাময়ো অধ্বরীয়ং। পৃঞ্চতীৰ্মধুনা পয়ঃ ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –দেবারাধনায় ইচ্ছুক আমাদের হিতকরী মাতৃস্থানীয় জল (জলাধিষ্ঠাত্রী দেবতা), মাধুর্যরসের দ্বারা অমৃত (প্রাণশক্তি সঞ্চার করতে করতে, দেব্যজন-পথে বাহিত হয়ে (দৈবকার্যের সঙ্গে সঙ্গে) ভগবৎসমীপে উপস্থিত হয়। ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— ভাষ্যকারের মতে–এই সূক্তের মন্ত্র কয়েকটির প্রয়োগে সর্বপ্রকার রোগে শান্তি লাভ, লাভালাভ ও জয় পরাজয় বিষয়ে অভিজ্ঞতা, অর্থপ্রাপ্তি, বিঘ্ননাশ প্রভৃতি ঘটে থাকে। গো-জাতির রোগ উপশমন ও পুষ্টি-সংজনন পক্ষে এ সূক্তের মন্ত্র-কয়টি অশেষ ফলোপধায়ক বলে অভিহিত হয়। অন্বয়ে যন্তি প্রভৃতি মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক লবণযুক্ত জল বা কেবলমাত্র জল গোজাতিকে পান করালে, তাদের সকলরকম ব্যাধিনাশ ও পুষ্টি সংসাধিত হয়ে থাকে। জলপড়ার দ্বারা এবং মন্ত্রের দ্বারা রোগনাশের চেষ্টা অধুনাও আমাদের দেশে পরিদৃষ্ট হয়।– সে ক্ষেত্রে, অথর্ববেদের মন্ত্র যদি যথোপযুক্ত হয়, তাহলে, কি সুফল প্রাপ্ত হওয়া যায়–তা সহজেই অনুমেয়।–আধ্যাত্মিক ভাবেও এই মন্ত্রে গুরুত্ব রয়েছে। এই মন্ত্রে এবং এর পরবর্তী দুটি মন্ত্রে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবতার উপাসনা আছে।
এ মন্ত্রে বলা হচ্ছে, যাঁরা দেবতার উদ্দেশে যজ্ঞ ইত্যাদি সৎ-কর্মের অনুষ্ঠান করে থাকেন, জলদেবতা তাদের মাতৃস্থানীয় এবং পরমহিতকারিণী। জননী যেমন স্তন্যদানে সন্তানের শক্তি-বর্ধন করে সন্তানকে জীবন পথে পরিচালিত করেন, মাতৃস্বরূপিণী জলদেবতাও সেইরকম অমৃতবৎ প্রাণশক্তি দানে সক্কর্মের কর্তাকে ভগবৎসমীপে সংবাহিত করে নিয়ে যান। এখানকার প্রার্থনার ভাব এই যে, সেই মাতৃস্বরূপিণী জলদেবতা আমাদের জীবনী শক্তি দানে ভগবৎসমীপে নিয়ে চলুন। এ মন্ত্রের অন্তর্গত অন্বয়ঃ, মধুনা ও পয়ঃ–এই তিনটি শব্দ উপমায় বহুভাব প্রকাশ করছে। জলের স্নেহভাব, দেবতার মাতৃত্বের সূচনা করছে। পয়ঃ শব্দে দুগ্ধ ও অমৃত–দুই ভাবই আনয়ন করে। জননী যেমন দুগ্ধদানে সন্তানকে পালন করেন, জলাধিষ্ঠাত্রী দেবী সেইরকম জননীর স্নেহে সন্তানকে জ্ঞানামৃত দান করেন। এখানে উপমায় সেই উদার উচ্চ ভাব ব্যক্ত রয়েছে। ভাষ্যকার, মন্ত্রস্থিত অধ্বর পদের অর্থ লিখেছেন-যাতে হিংসা নেই, তা-ই অধ্বর। কিন্তু শ্রুতিবাক্যে যখন আছে–যজ্ঞে পশুহনন করবে; তখন, যজ্ঞকে কি করে হিংসারহিত বলতে পারি? এর উত্তরে তিনি বলেছেন,–সাধারণ-বিধি বিশেষ-বিধির দ্বারা বাধিত হয়। কিন্তু এ সম্বন্ধে একটি নিগূঢ় তত্ত্ব বোঝবার ও ভাববার আছে। সায়ণ বলেন,–এস্থলে হিংসার অভাব বলছি না, প্রত্যবায়ের অভাব বলছি। অর্থাৎ, তার মতে, যজ্ঞে পশুবলিতে হিংসা হয় বটে; কিন্তু পাপ হয় না। আমরা মানি, সাধারণ পশু-হত্যা ও যজ্ঞে পশুবলি এক নয়। যজ্ঞের পশুবলি হলো শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে যজ্ঞকারীর যজ্ঞকার্য। যাজ্ঞিক হিংসার ভাব নিয়ে যজ্ঞ করেন না, সুতরাং যজ্ঞ হিংসারহিত অধ্বর বলে অভিহিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, হিংসা অন্তরের ভাব; হনন-দৈহিক কার্য। অন্তরে হিংসারূপ পাপপ্রবৃত্তির অস্তিত্ব না থাকলেও হননকার্য সংসাধিত হতে পারে। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্র: অমূর উপ সূর্যে যাভিৰা সূর্যঃ সহ। তা নো হিন্বধ্বরং ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –সেই যে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ, তারা জ্ঞানস্বরূপ সূর্যদেবের সাথে সামীপ্য সম্বন্ধ-যুক্ত অথবা জ্ঞানময় সূর্যদেবই তাদের সাথে ওতঃপ্রোতঃ অবস্থিত। সেই জলাধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ আমাদের যাগ ইত্যাদি সৎকর্মনিবহ সর্বতোভাবে সুসিদ্ধ করুন। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— মন্ত্রে ভগবানের সাথে দেবতার-ব্যষ্টিগত দেববিভূতির সাথে সমষ্টিগত দেবতার সম্বন্ধসূত্রের আভাষ পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে এক দেবতার সাথে অন্য দেবতার সম্বন্ধের বিষয়ও এ মন্ত্রে সূচিত হয়েছে, মনে করা যেতে পারে।-সূর্যদেব বলতে জ্ঞানরূপ জ্ঞানাধার ভগবানকেও বোঝাতে পারে, আবার ভগবৎ-বিভূতি জ্ঞানমাত্রকে লক্ষ্য হয়েছে, তা-ও বলতে পারি।…ফলতঃ, ভগবান্ হতে ভগবৎ-বিভূতি যে পৃথক নয়; অপিচ দেববিভূতিগুলির পরস্পরের মধ্যে যে অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ,-এ মন্ত্রের তা-ই মুখ্য লক্ষ্য।–হে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবতা, জ্ঞানের সাথে আপনার সম্বন্ধ অবিচ্ছিন্ন। আপনি আমাদের যজ্ঞ ইত্যাদি কর্ম সুসম্পন্ন করে দিন। স্নেহ-করুণা ইত্যাদি স্নিগ্ধভাবের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানের ঔজ্জ্বল্যে আমাদের হৃদয় পরিপূর্ণ হোক। আমরা যেন স্বরূপ অবগত হই।–মন্ত্রের এটাই প্রার্থনা ॥ ২॥
তৃতীয় মন্ত্রঃ অপো দেবীরুপ হয়ে যত্র গাবঃ পিবন্তি নঃ। সিন্দুভ্যঃ কর্তৃং হবিঃ ৷৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –জলাধিষ্ঠাত্রী (সেই) দেবতাকে সমীপে আহ্বান করছি। যে জলদেবতার অভ্যন্তরে আমাদের জ্ঞানসমূহ, (অমৃত) পান করে থাকে; অথবা, জলাধিষ্ঠাত্রী দেবতা সমীবর্তিনী হলে জ্ঞান-সমূহ আমাদের অধিকার করে (অর্থাৎ, আমাদের হৃদয় জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত হয়); সেই জলদেবতার উদ্দেশে পূজা-অর্চনা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য ॥ ৩॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এই মন্ত্রের অন্তর্গত যত্র গাবঃ পিবন্তি নঃ বাক্যের অর্থ নিয়ে নানারকম। জল্পনা-কল্পনা চলেছে। প্রধানতঃ সকলেই অর্থ করে গেছেন, আমাদের গরুসকল যে জল পান করে। সেই অনুসারে মন্ত্রের ভাবার্থ দাঁড়িয়েছে এই যেআমাদের গাভীরা যে জল পান করে–সেই জলদেবীকে আমরা আহ্বান করি। প্রবহমান নদীকে আমাদের হবিদান করা কর্তব্য।-হায়, গরুতে জল পান করে, অতএব সেই জল দেবী এবং আরাধ্যা,–এমন অর্থ কল্পনা করতেও সঙ্কোচ বোধ হয়। অল্প-মাত্র চিন্তা করলেই বোঝা যায়, এ মন্ত্রে পূর্বোক্ত ভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবই ব্যক্ত আছে। বেদের যে যে স্থলে গো শব্দের ব্যবহার আছে, সর্বত্র সামঞ্জস্য রক্ষা করতে গেলে, গো শব্দে গরু না বুঝিয়ে, কিরণ, জ্যোতিঃ, জ্ঞান প্রভৃতি অর্থই সঙ্গত বলে প্রতিপন্ন হয়। এখানে এ মন্ত্রে, গাবঃ শব্দে জ্ঞানসমূহকেই বোঝাচ্ছে। নানা বিষয়ে নানারকম জ্ঞান সঞ্জাত হলে, জ্ঞানের পূর্ণতা সাধিত হয়। এখানে গাবঃ পদ, সেই বহুবিষয়ক জ্ঞানের ভাব ব্যক্ত করছে। আমাদের বিবিধ-বিষয়ক জ্ঞানের দ্বারা আমরা যে অমৃত পান করতে সমর্থ হই, এখানে সেই কথাই বলা হয়েছে।-জ্ঞানের সাহায্যে দেবতত্ত্ব অবগত হতে পারলে, অমৃতত্ত্ব প্রাপ্তি ঘটে, এটাই এ মন্ত্রের প্রার্থনা ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ— জলাধিষ্ঠাত্রী দেবতার মধ্যে সুধা এবং ঔষধ বর্তমান আছে (অর্থাৎ, জলদেবতার অনুগ্রহে আমরা ব্যাধিশূন্য ও অমর হতে পারি)। অতএব, (তা লাভ করবার জন্য) হে আমার অন্তর্নিহিত দেবভাব ও জ্ঞাননিবহ! তোমরা জলাধিষ্ঠাত্রী দেবতাদের স্তোত্রবিষয়ে (উপাসনায়) ত্বরান্বিত হও ৷ ৪৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এ মন্ত্রে সাধারণ দৃষ্টিতে জলের এবং সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবতার অর্চনার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে। জল যে অমৃতস্বরূপ, ব্যাধিনাশক, জলপক্ষেও তা প্রতিপন্ন হয়। আবার, জলদেবতার উপাসনার মধ্য দিয়েও যে পরম জ্ঞান লাভ হয়, এই প্রসঙ্গে তা-ও বুঝতে পারা যায়। এখানে দুদিকে দুভাবই ব্যক্ত হয়েছে, মনে করতে পারি।…একপক্ষে, জলকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করতে করতে, জলের অধিষ্ঠাত্রী দেবতার প্রতি লক্ষ্য পড়বে; অন্য পক্ষে, যাঁরা সাধনার একটু উচ্চস্তরে আরোহণ করেছেন, তারা জলের মধ্যেই নারায়ণকে প্রত্যক্ষ করতে পারবেন–জলদেবতার স্বরূপ-জ্ঞানে, আমরা যে নীরোগ ব্যাধিশূন্য হতে পারি, এবং ক্রমশঃ অমরত্ব-লাভে সমর্থ হই,–এ মন্ত্রে সেই দুই তত্ত্ব জ্ঞাপিত হচ্ছে। এখানে, জল-চিকিৎসার বিষয় (Hydropathy) ব্যক্ত আছে মনে করা যায়; আবার, জলরূপে ভগবান, জীব-জীবনের শান্তিবিধান করছেন–প্রতীত হয়।
কিন্তু ভাষ্যের আভাষে বোঝা যায়, মন্ত্রে যেন অশ্বকে এবং গরুকে মন্ত্রপূত জল পানের নিমিত্ত আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু আমরা সে ভাব আদৌ সঙ্গত বলে মনে করি না। অন্তরস্থ দেবভাবসমূহকে ও জ্ঞানকে সাধক এখানে অশ্বাঃ এবং গাবঃ পক্ষে সম্বোধন করছেন। তিনি যখন দেবতত্ব-জলদেবতার মাহাত্ম-অবগত হতে পেরেছেন; তখনই তিনি আপন অন্তরস্থিত দেবভাবসমূহকে এবং শুদ্ধসত্ত্বজ্ঞানকে জাগ্ৰৎ করে তুলছেন। দৈবতত্ত্ব অবগত হতে পারলেই, দেবতা বিষয়ে সত্যজ্ঞান সঞ্জাত হলেই, দেবারাধনায় মানুষের প্রবৃত্তি আসে। এ মন্ত্রে সেই সনাতন সত্য-তত্ত্ব পরিব্যক্ত রয়েছে। ৪।
বঙ্গানুবাদ –হে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ! আপনারা স্বতঃই সুখদায়িনী! (প্রার্থনা করি। আমাদের বলপ্রাণের অধিকারী করুন; এবং আমরা যাতে সেই মহৎ পরব্রহ্মের সাথে মিলিত হতে পরি, সেই অবস্থায় আমাদের উপনীত করুন। ১
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এ মন্ত্রের প্রার্থনা, সাধারণ সরলভাবে প্রযুক্ত। জলদেবতা স্বতঃই সুখদায়িকা। তিনি শক্তি ও প্রাণ প্রদান করুন, তার মধ্য দিয়ে পরব্রহ্মের প্রতি দৃষ্টি ন্যস্ত হোক। তার মধ্য দিয়েই যেন পরব্রহ্মের সম্বন্ধ লাভে সমর্থ হই। এটাই এ মন্ত্রের প্রার্থনা।–জল–স্নেহ-ভাবাপন্ন। তাই ভগবৎ-বিভূতি সেখানে দেবীরূপে পরিকল্পিত। স্নেহের ভাব দেবীর মধ্যে সর্বতঃ অভিব্যক্ত হয়। স্নেহভাব নানা দিক দিয়ে প্রাণে শান্তিশীতলতা সিঞ্চন করে। তাই বহুবচনান্ত অপ শব্দে দেবীকে আহ্বান করা হয়েছে।-মন্ত্রের উজে পদে সায়ণ বলকরায় অন্নায় অর্থ লিখেছেন। ভাব এই যে,জলসেচনের ফলে অন্নমূল ধান্য ইত্যাদি পরিপুষ্ট হয় এবং সেই পুষ্ট অন্ন ইত্যাদির দ্বারা জীব পরিপুষ্টি লাভ করে। কিন্তু উর্জে পদে বল ও প্রাণ দুই-ই বোঝায়। জলকে সাধারণ জলভাবে দেখলে, হৃদয়ে স্নেহকারুণ্য-রূপ, সলিল-সেচনে সভাপরিবৃদ্ধিকর অন্নবল প্রাপ্ত হওয়া যায়।
ঐ শব্দে দুই দৃষ্টিতে দুই ভাবই প্রকাশ পায়। মহে রণায় চক্ষসে বাক্যে সায়ণ নানারকম ভাব গ্রহণ করেছেন। পূজনীয় রমণীয় বস্তুকে দেখবার প্রার্থনা তাতে প্রকাশ পেয়েছে। অপিচ, ঋগ্বেদের ভায্যে তিনি এই মন্ত্রের যে অর্থ লিখেছেন, অথর্ববেদের ভাষ্যে সে অর্থের কিছু ব্যত্যয় দেখা যায়। সেখানকার ভাব যেন জলকে আহ্বান করে বলা হয়েছে,-হে জল! তুমি অতি চমৎকার বৃষ্টি দান করো। কিন্তু রণায় পদে রমণীয় পূজনীয় হতে পরব্রহ্মের প্রতি লক্ষ্য আসে। সায়ণ, অথর্ববেদের ভাষ্যে, উপসংহারে, সেই ভাবই ব্যক্ত করেছেন। ফলতঃ, ভগবৎ-বিভূতি দেবীরূপে স্নেহকারুণ্য ইত্যাদি গুলোপেত হয়ে হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন এবং তার ফলে আত্মদর্শন-লাভ হোক, ব্রহ্মসাক্ষাৎকার-লাভ ঘটুক, –এ মন্ত্র, এইরকমই প্রার্থনার ভাব ব্যক্ত করছে।। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ যোবঃ শিবতমো রসস্তস্য ভাজয়তেহ নঃ। উশতীরিব মাতরঃ। ২
বঙ্গানুবাদ –হে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ! আপনাদের মধ্যে অশেষকল্যাণ-স্বরূপ যে সারভূত রস (পরমার্থতত্ত্ব) বিদ্যমান আছে, কল্যাণকামী স্নেহময়ী জননীর (স্তন্যদানের) ন্যায়, সেই রস। ইহলোকে আমাদের প্রদান করে পোষণ করুন। ২৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –পূর্ব মন্ত্রে বল-প্রাণ প্রাপ্তির জন্য এবং পরব্রহ্মের সাথে সম্বন্ধ স্থাপনের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছিল। এখানে আর একটু ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ সূচিত হলো। এখানে, সন্তান হয়ে জননীর স্নেহ-করুণা পাবার জন্য প্রার্থনা জানানো হয়েছে।–জননী যেমন স্তন্যদানে সন্তানকে পোষণ করেন, স্নেইকরুণার আধার হে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ! আপনারা আমাদের পরমার্থতত্ত্বরূপ সুধারস প্রদান করে আমাদের পরম মঙ্গল করুন। সম্বন্ধ যখন ঘনিষ্ট হয়, যখন জননীর ক্রোড়ে আশ্রয় নেবার অধিকার জন্মে, ৩খনই এমন প্রার্থনা করবার সামর্থ্য আসে,তখনই সাধক মাতৃ-সম্বোধনে তাকে সম্বুদ্ধ করেন ॥ ২.
তৃতীয় মন্ত্র: তস্মা অরং গমাম বো যস্য ক্ষয়ায় জিম্বথ। আপো জনয়থা চ নঃ। ৩
বঙ্গানুবাদ— হে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ! সেই ব্রহ্মতত্ত্বরূপ পরমরস দান করে আপনারা আমাদের তৃপ্তি-সাধন করুন। আপনারা যে রসের দ্বারা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডকে প্রাণশক্তিসম্পন্ন করে রেখেছেন, সেই রস আমাদের সম্বন্ধে পরিবৃদ্ধি হোক ৷ ৩৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের নানারকম ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। ক্ষয়ায়, জিম্বথ, জনয়থ আর গমাম-মন্ত্রের এই পদ-কয়েকটির বিশ্লেষণ উপলক্ষে সেই অর্থান্তর সংসূচিত হয়ে থাকে।য়ায় পদের, কেউ অর্থ করেছেন,-পাপের ক্ষয়ের নিমিত্ত, কেউ অর্থ করেছেন,–অভিবৃদ্ধির নিমিত্ত; আমরা অর্থ করলাম,-এই ক্ষয়শীল ধ্বংসুশীল জগতের নিমিত্ত। গমাম পদের, কেউ অর্থ করেছেন,–প্রস্তুত আছ, কেউ অর্থ করেছেন,-প্রাপ্ত হও; আমরা অর্থ করলাম,-তৃপ্ত করছ। জিম্বথ পদের অর্থ কেউ বলেছেন, –জলদানে শস্য ইত্যাদির পুষ্টিসাধন করো, কেউ বলেছেন,-মস্তকে জল নিক্ষেপ করো; আমরা অর্থ করলাম,প্রাণশক্তিদানে পরিতৃপ্ত করো। জনয়থ পদের অর্থ কেউ করলেন, বংশবৃদ্ধি করো, কেউ অর্থ করলেন,–আমাদের পুত্র ইত্যাদিরূপে উৎপন্ন করো। আমরা অর্থ করলাম,পরমার্থতত্ত্বদানে পরিবৃদ্ধ করো। এতে, বিভিন্ন দিক থেকে মন্ত্রের অর্থ বিভিন্ন রকম দাঁড়িয়ে গেছে।
এক অর্থে যেন জলকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,-হে জল! পাপক্ষয়ের জন্য তোমাকে মস্তকের উপর ছিটাচ্ছি। তোমরা আমাদের বংশবৃদ্ধি করো। আর এক মতে অর্থ দাঁড়াচ্ছে,-হে জল! তোমরা অন্নের পরিবৃদ্ধিকারক; তোমাদের বর্ষণে শস্য উৎপন্ন হয়; আমাদের বংশবৃদ্ধি হোক। ইত্যাদি।–এই মন্ত্রটি এবং এর পূর্বের দুটি মন্ত্র ব্রাহ্মণের ত্রিসন্ধ্যায় নিত্যব্যবহার্য। অথচ, এর অর্থ সম্বন্ধে এমনই মতান্তর দেখা যায়। আমরা বলি, বিভিন্ন শ্রেণীর উপাসকের পক্ষে এ মন্ত্র এমনই বিভিন্ন অর্থই দ্যোতনা করে বটে। যে জন অন্নের জন্য লালায়িত, তার অভীষ্ট-পূরণের পক্ষে এ মন্ত্রে অনুবৃদ্ধিরই প্রার্থনা প্রকাশ পাচ্ছে। তেমনি, যার পুত্র পৌত্রাদির কামনা, তার পক্ষে এ মন্ত্রের অর্থে সেই প্রার্থনাই প্রকাশ পাচ্ছে। আবার যাঁরা পরব্রহ্মের সাথে সম্বন্ধ-স্থাপনকেই চরম প্রার্থনা বলে মনে করেন, তাঁদের প্রার্থনাও ঐ মন্ত্রে প্রকাশমান রয়েছে। আমরা সেই অর্থই সম্যক সমীচীন টি বলে মনে করি। কেননা, ধনজনপুত্ৰবিত্ত-সকল প্রার্থনার সার প্রার্থনাই যখন মন্ত্রের মধ্যে পাচ্ছি; তখন আর এক এক করে প্রার্থনা করবার কি প্রয়োজন? আমায় এটা দাও, সেটা দাও ইত্যাদি না বলে, যদি বলি,–আমায় সব দাও; তাতে যে ভাব প্রকাশ পায়, মন্ত্র সেই ভাবই হৃদয়ে ধারণ করে আছে ॥ ৩
চতুর্থ মন্ত্রঃ ঈশানা বাৰ্যানাং ক্ষয়ন্তীৰ্ষণীনাং। অপো যাচামি ভেষজং। ৪।
বঙ্গানুবাদ –শ্রেষ্ঠ-ধনের নিয়ন্ত্ৰী হে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ! আপনারা মনুষ্যগণের (আত্মোৎকর্ষসাধনসম্পন্ন জনগণের) আশ্রয়স্থানভূতা। আমি আপনাদের নিকট শান্তিপ্রদ অমৃতের প্রার্থনা করছি। ৪।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটির তিনরকম অর্থ আমনন করা যেতে পারে। দুরকম অর্থ প্রচলিত দেখি। শেষোক্ত প্রকারের আধ্যাত্মিক-ভাবমূলক অর্থই আমরা পরিগ্রহ করলাম।–প্রথম প্রকার অর্থে, –চর্যণীনাং পদ দৃষ্টে, কৃষকগণের ইষ্টসাধন-পক্ষে মন্ত্রটির প্রয়োগ হয়েছে বলে স্বীকার করা হয়। ভাব এই যে, কৃষকেরা যেন বৃষ্টির প্রার্থনা করছে। তাতে বার্যানাং ঈশানাঃ পদ দুটি বারিরাশির-সলিল সমূহের অধিকারিণী-রূপ ভাব পরিগৃহীত হয়। হে দেবীগণ! আপনারা সেই কৃষকগণের ক্ষয়ন্তী অর্থাৎ আশ্রয়স্থানস্বরূপ হন।–অন্য পক্ষে,–অভিলষিত বস্তুর অধীশ্বর জলেরাই আছেন। মনুষ্যগণকে তারাই বাস করিয়ে থাকেন; সেই জলবৰ্গকে আমি ঔষধের জন্য প্রার্থনা করি। এই রকমে মন্ত্রের অনুবাদ করা হয়। অতঃপর আমাদের পরিগৃহীত ভাবের কথা বলি। চর্ষণীনাং পদে আমরা আত্মোৎকর্ষসাধনসম্পন্ন জনগণের অর্থ গ্রহণ করি। ঈশানাঃ ষড়ৈশ্বর্যশালিনী দেবগণ যে সাধকের আশ্রয়স্থান হন, সাধনার প্রভাবে মনুষ্য যে মুক্তির পর্যন্ত অধিকারী হয়, এখানে সেই ভাবই পরিব্যক্ত। ক্ষয়ন্তীঃ পদের সার্থকতা সেই অর্থেই অধিক সঙ্গত হয়। ক্ষী ধাতু ক্ষীণ হওয়ার বা ক্ষয়প্রাপ্তির ভাব প্রকাশ করে। অতএব ক্ষয়ন্তীঃ পদে যে নিবাস-স্থানকে বোঝায়, তাকে কর্মক্ষয়মূলক মোক্ষরূপ নিবাসস্থানই বলতে পারি। আমায় অমৃতত্ব দাও, আমি যেন মোক্ষলাভে সমর্থ হই,–এটাই এ মন্ত্রের নিগূঢ় তাৎপর্য। ৪।
বঙ্গানুবাদ –দীপ্তিদানাদিগুণবিশিষ্টা স্নেহকরুণারূপা জলাধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ! আমাদের। ১) অভীষ্টসাধনের জন্য এবং তৃষ্ণা নিবারণের জন্য, আমাদের মঙ্গলবিধান করুন। সুখসম্বন্ধযুতা হে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ! আমাদের প্রতি আপনাদের করুণাধারা বর্ষিত হোক। ১।
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –এ মন্ত্রে পানের নিমিত্ত জলের প্রার্থনা অথবা যজ্ঞকার্যের জন্য সুখবিধানের আকাঙ্ক্ষা,ভাষ্যাভাষে প্রকাশ দেখি। যজ্ঞের জন্য সুখের বিধান করুন–পানের উপযোগী হোন, মঙ্গলবিধান ও অমঙ্গল-নিবারণ করুন, আমাদের মস্তকে ক্ষরিত হোন, মন্ত্রের এইরকম অর্থই প্রধানতঃ প্রচলিত আছে। আমরা বুঝছি, এখানে আপঃ সম্বোধনে মাত্র জলকে আহ্বান করা হয়নি। দেবীর পদের দ্বারা–জলের-অতীত ধারণার-বিষয়ীভূত সামগ্রীকেই বোঝাচ্ছে। অভিষ্টয়ে পদে যজ্ঞের জন্য অর্থ গ্রহণ না করে, ঐ শব্দে যজ্ঞফল অভীষ্টসিদ্ধিরূপ কামনা প্রকাশ পেয়েছে বলে আমরা মনে করি। তাতে, অভীষ্টসিদ্ধির জন্য বলতে, নানা ভাব মনে আসে। কেবল যদি জলপান উদ্দেশ্য হতো, তাহলে পীতয়ে পদেই সে ভাব ব্যক্ত হতো; যদি কেবল বারিবর্ষণের ভাবই ব্যক্ত করার অভিপ্রায় থাকত, তাহলে সুব পদে সে ভাব প্রকাশ পেত।
কিন্তু ঐ দুই পদের উপরেও অভিষ্টয়ে পদ আছে। সুতরাং কেবল জলের প্রার্থনা ভিন্ন তার মধ্যে অন্য প্রার্থনা নিশ্চয়ই প্রকাশ পেয়েছে। সর্বাপেক্ষা উচ্চ অভীষ্ট-সিদ্ধি হয়– পরমার্থ-লাভে। ঐ শব্দে সেই চরম আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ পেয়েছে। পীতয়ে পদ সে পক্ষে বিশেষ অর্থ প্রকাশ। করে। তৃষ্ণার জ্বালায় ছটফট করবার সময় পানীয়ের প্রার্থনা আবশ্যক হয়। সংসারের পাপের জ্বালায় মানুষ যখন জ্বলে মরে, তখন সে পুণ্যসমুদ্ভূত শান্তিবারির প্রার্থনা জ্ঞাপন করে। আমার অভীষ্ট পূরণ করো, আমার তৃষ্ণা নিবারণ করো,–এইরকম উক্তিতে অশান্তি দূর করে আমাকে শান্তিধামে নিয়ে যাও, এমন আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ পায়। আমার সুখের বা আমার মঙ্গলের বিধান করো, আমার প্রতি করুণাধারা বর্ষণ করো, আমি শান্তি-শীতলতা প্রাপ্ত হই,–এখানে মন্ত্রের তাৎপর্য এইরকম প্রার্থনা-মূলক বলে আমরা মনে করি। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ অসু মে সোমো অব্রবীদন্তবিশ্বানি ভেষজা। অগ্নিং চ বিশ্বসম্ভবং। ২।
বঙ্গানুবাদ –জলদেবতার মধ্যে সর্বপ্রকার ভেষজ এবং সর্বসুখকর জ্ঞানস্বরূপ অগ্নিদেব বিদ্যমান আছেন। সোম (অন্তরস্থায়ী শুদ্ধসত্ত্বভাব, ভক্তিভাব, পরাজ্ঞান) আমাদের তা বলেছেন। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এ মন্ত্রে অনেকগুলি বিষয় লক্ষ্য করবার আছে। বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিতে সাধারণ জলের বিশেষণ-মূলক উক্তি এ মন্ত্রে দৃষ্ট হয়। জল ভেষজ ইত্যাদি গুণসম্পন্ন, জল সর্বব্যাধিবিনাশক ইত্যাদি উক্তিতে, বর্তমান কালের জল-চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূল তত্ত্ব এর অন্তর্নিহিত আছে, বুঝতে পারা যায়। জলের মধ্যেও যে অগ্নি বিদ্যমান–এ মন্ত্রে সেই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অবগত হওয়া যায়; আবার অন্যপক্ষে, সকল মঙ্গলনিলয় জ্ঞানের এবং সর্বব্যাধি-শান্তিকারক ভেষজের সন্ধান–জলদেবতার অর্চনায় যে প্রাপ্ত হওয়া যায়, তা-ও জানতে পারি।–এ মন্ত্রে আর একটি বিশেষভাবে লক্ষ্য করবার বিষয়–সোমঃ শব্দ। বেদের সোম যে সোমলতা নয়,–এ মন্ত্রে তা সপ্রমাণ হয়। সোমঃ অব্রবীৎ অর্থাৎ সোম বলেছিল–এতেই সোমের লতা-ভাব দূর হচ্ছে।
সোমলতা, সোমলতার রস, মাদকদ্রব্য প্রভৃতি সম্বন্ধে যারা উচ্চ চীৎকার ১) করেন, যাঁদের গবেষণার প্রভাবে পূতিকা পর্যন্ত ঐ সোম-পর্যায়ে গণ্য হয়, তারা এইবার বুঝুন-সোম কি? সোম বলেছিল বলতে, পুইগাছ বলেছিল–বলা যাবে কি? এখানেই বোঝা যায়–সোম শব্দে আমরা যে অর্থ গ্রহণ করে এসেছি, শুদ্ধসত্ত্বভাব ভক্তিভাব–এখানে সেই অর্থেরই সার্থকতা প্রতিপন্ন হচ্ছে। –আমার হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্বভাব আমাকে বলেছিল, আমার সৎ-বৃত্তি সমূহের সাহায্যে আমি জেনেছিলাম, আমার বিবেক-বুদ্ধি আমাকে জ্ঞাপন করেছিল–সোমঃ অব্রবীৎ বাক্যে সেই ভাবই ব্যক্ত করছে।…হৃদয়ে জ্ঞানের সঞ্চার হলে, অন্তর আপনিই বলে দেয়,দেবতা কেমন বা কি ভাবে অবস্থিত আছেন! এখানে এ মন্ত্রে, সেই বিষয়ই ব্যক্ত রয়েছে। সায়ণকেও এখানে সোম শব্দে সোমলতা অর্থ পরিহার করতে হয়েছে। অন্তর্বর্তমানং সোমঃ–এই বাক্য তাঁর ভায্যেই প্রকাশ পেয়েছে। জলদেবতা যে সর্বপ্রকার, ভেষজগুণসম্পন্ন, তাঁকে প্রাপ্ত হলে যে আধি-ব্যাধি-শোক-সন্তাপ দূরীভূত হয়, আবার তারই মধ্যে যে জ্ঞানস্বরূপ অগ্নিদেব বিদ্যমান রয়েছেন,–অন্তর ভক্তিযুত হলে, হৃদয় সৎ-ভাবপূর্ণ হলে, আপনা-আপনিই মানুষ তা জানতে পারে,-সোমরূপ শুদ্ধসত্ত্বভাবই সে তত্ত্বে বিজ্ঞাপিত হয়।
…প্রার্থনা পক্ষে এই মন্ত্রের মর্মার্থ এই যে, সোমস্বরূপ আমার অন্তর্নিহিত হে সৎ-বৃত্তি বা সৎ-ভাব, আমাকে জলদেবতার স্বরূপ-তত্ত্ব জ্ঞাপন করুন। সে ৩ অবগত হয়ে, আমি যেন সর্ববিধ ব্যাধিশূন্য হই এবং সর্বজ্ঞানে জ্ঞানান্বিত হয়ে পরম-মঙ্গল লাভ করি।–বস্তুতঃ এর অপেক্ষা উচিৎ প্রার্থনা আর কিছুই হতে পারে না। ২।
বঙ্গানুবাদ –হে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবতা! প্রার্থনাকারী আমার শরীরের নিমিত্ত আপনি রোগনাশক ঔযধ প্রেরণ (পূরণ) করুন। তাতে আমরা নীরোগ হয়ে চিরকাল জ্ঞান-স্বরূপ জ্যোতির্ময় আপনাকে (সর্বত্র) দর্শন করতে সমর্থ হই। ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এ মন্ত্রের অর্থ সরল ও সুবোধ্য। দেহ ব্যাধিগ্রস্ত হলে ভগবানের আরাধনায় বিঘ্ন ঘটে। এখানকার প্রার্থনা তাই,–হে জলাধিষ্ঠাত্রী দেবতা! আপনি রোগ-নিবারক ঔষধ প্রদান করুন; আমি যেন তার দ্বারা সুস্থ ও নীরোগ থেকে একাগ্রচিত্তে আপনার অর্চনা করতে সমর্থ হই। অর্থাৎ, যে কর্মের প্রভাবে নীরোগ ও সুস্থদেহ হয়ে সৎস্বরূপ জ্ঞান-লাভের অধিকারী হই, হে দেবতা! আপনি আমার পক্ষে তা-ই বিহিত করুন। এই মন্ত্রের অন্তর্গত সূর্যং শব্দে জ্যোতির্ময় জ্ঞানময় ভগবানের প্রতি লক্ষ্য আসে।…এ ঋকের অন্তর্গত বরূথং পদে এক নূতন ভাব পরিগ্রহ করা যায়। শত্রু থেকে দূরে গুপ্ত-স্থানে অবস্থিতি রূপ নিরাপদ অবস্থা বরূথং পদের দ্যোতক হয় ॥ ৩
বঙ্গানুবাদ –মরুদেশসস্তৃতা হে জলসকল (অথবা, আমার মরুসদৃশ হৃদয়-দেশে ক্ষীণাকারে। বিদ্যমানা স্নেহকারুণ্যরূপিণী জলাধিষ্ঠাত্রী হে দেবীগণ)! আপনারা আমাদের মঙ্গলপ্রদায়িনী হোন; হে প্রভূতজলপ্রদেশস্থা আপ (অথবা, প্রবলস্নেহ-কারুণ্যপূর্ণ হৃদয়স্থিত ভগবৎ-বিভূতিনিচয়)! আপনারা সর্বতোভাবে আমাদের মঙ্গলপ্রদায়িনী হোন; খনন দ্বারা উদ্ভূতা জল (অথবা, অতীব প্রয়াসের দ্বারা অধিগতা হে দেববাবলি!), আপনারা আমাদের সুখকারী হোন; কুম্ভে (অথবা, ঘটান্তর হতে) সংগৃহীত যে জল (অথবা, স্নেহভাবাবলি) এবং বর্ষণহেতু যে জল (অথবা, ভগবৎকৃপায় প্রাপ্ত যে স্নেহভাবাবলি!), আপনারা আমাদের মঙ্গলপ্রদ হোন। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— দুভাবে এই মন্ত্রের দুরকম অর্থ অধ্যাহার করা যায়। এক অর্থে, নানারকম জলকে সম্বোধন করে মন্ত্র প্রযুক্ত হয়েছে বলতে পারি; অন্যরকম অর্থে, ভগবানের স্নেহ-কারুণ্য ইত্যাদি বিভূতিকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়াস দেখতে পাই। বলা বাহুল্য, প্রথম প্রকারের অর্থই সাধারণ্যে প্রচারিত আছে। শেষোক্ত প্রকারের অর্থ মন্ত্রের অভ্যন্তরে চিরলুক্কায়িত রয়েছে। প্রথম প্রকার অর্থে মনে হয়, প্রার্থনাকারী যেন বলছেন,–হে মরুদেশের জল! তোমরা আমাদের মঙ্গল করো; হে জলপূর্ণদেশের জল! তোমরা আমাদের সুখী করো; হে খননের দ্বারা উৎপন্ন জল (অর্থাৎ কূপ ইত্যাদির জল)! তোমরা আমাদের সুখবিধান করো; হে কুম্ভস্থিত জল অথবা বৃষ্টির জল!
তোমরা আমাদের পক্ষে সুখকারী হও। বলা বাহুল্য, এ অর্থে বুঝতে পারা যায় না যে, কোনও জলশূন্যদেশের প্রার্থী, জলের নিকট এমন প্রার্থনা করছেন। জনপদের অধিবাসীরা, কূপপাদক ভিন্ন গত্যন্তর নেই যাদের, কুম্ভে জল রক্ষাকারী কিংবা বৃষ্টির জলের জন্য যারা অপেক্ষা করে থাকে–তারা এমন প্রার্থনা জানাতে পারে। কিন্তু তাতে কি ইষ্ট সাধিত হয়, তা বোধগম্য হয় না। পরন্তু এই প্রার্থনার মধ্যে যদি সর্বজনীন ভাব লক্ষ্য করবার প্রয়াস পাই, তাহলে বুঝতে পারি,-এ মন্ত্র সকল দেশের সকল লোকের সকল অবস্থার উপযোগী। বুঝতে পারি,–এ মন্ত্র এক পরম পবিত্র প্রার্থনা বক্ষে ধারণ করে আছে।–মন্ত্রের এক একটি শব্দের বিষয় অনুধ্যান করলেই, সে মর্মার্থ আপনিই হৃদয়গত হবে। ধন্বন্যাঃ আপঃ বলতে কি ভাব মনে আসে? আমাদের মরুসদৃশ এই হৃদয় কখনও সেহকরুণার সুধারসে আর্দ্র হলো না। কখনও লোকহিতকর কোনও বৃত্তি তার মধ্য থেকে জেগে উঠলো না।.. ভগবৎ-প্রেরিতা যে ক্ষীণা স্রোতঃস্বতী (দয়াদাক্ষিণ্য ইত্যাদি) অন্তঃশীলা বইছে, সংসারের বিষম পাপতাপের মধ্যে পড়ে সেটুকুও বিশুষ্ক হতে চললো! তাই প্রার্থনা–আমার মরুসদৃশ হৃদয়ের মধ্যে ক্ষীণাকারে যে স্নেহ-করুণার ধারা প্রবাহিত হচ্ছিল, তারা আবার জেগে উঠুক,–প্রবলভাবে বর্ষার প্লাবনের মতো প্রবাহিত হয়ে বিশুষ্ক হৃদয়-ভূমিকে রসগুণে আর্দ্র করুক।.
.মন্ত্রের প্রথমাংশ (শং নো আপো ধম্বন্যাঃ) সেই প্রার্থনার ভাব প্রকাশ করছে। মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশ (শমুসন্তপ্যাঃ ) এক পক্ষে সাবধানতা-সূচক, অন্য পক্ষে প্রাচুর্যতিবজ্ঞাপক। প্রবল করুণা-স্নেহের বশে বিভ্রান্ত হয়ে মানুষ অনেক সময় অনেক অপকর্ম করে বসে। এক পক্ষে এ মন্ত্রের প্রার্থনার বিষয় তাই মনে হয়,–হে আমার হৃদয়স্থ প্রবল স্নেহ-করুণা! তোমরা আমাদের পক্ষে মঙ্গলপ্রদ হও; অর্থাৎ, যেখানে যেভাবে স্নেহ-কারুণ্য বিতরণ করা কর্তব্য, আমরা যেন সেখানে সেইভাবে তোমাদের বিতরণ করতে সমর্থ হই। অন্য পক্ষে, ভগবৎ-বিভূতি-রূপে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রচুর সৎ-গুণাবলি যেন প্রাচুর্য লাভ করে আমাদের মঙ্গল-বিধানে সমর্থ হয়। অতঃপর মন্ত্রের দ্বিতীয় পংক্তির খনিত্রিমা পদে–খননের দ্বারা–কষ্টের দ্বারা অতি প্রয়াসের দ্বারা যে দেবভাব হৃদয়ে সঞ্জাত হয়, তাই লক্ষ্য হয়। কোনওরকমে, অপরের দৃষ্টান্ত অনুসারে, হৃদয়ে যে একটু সত্ত্বভাবের সঞ্চার হয়, অথবা ভগবানের কৃপায় যে একটু সত্ত্বভাবের অধিকারী হওয়া যায়, উপসংহারে সেই দুই ভাবের প্রতিষ্ঠাকল্পে পরিবৃদ্ধির বিষয়ে, প্রার্থনা করা হচ্ছে। অতঃপর কুম্ভে ও বার্ষিকীঃ পদ দুটির সার্থকতা উপলব্ধি করুন।
… এ বলা হচ্ছে, যদি কোনও রকমে হৃদয়ে একটু সত্ত্বভাবের উদয় হয়, যদি কদাচিৎ ভগবানের অনুকম্পায় একটু সত্ত্বভাবের অধিকারী হই, হে দেবীগণ! সেই ভাবের বিকাশের পক্ষে আপনারা আমায় অনুগ্রহ করুন। সর্বরূপে প্রাপ্ত স্নেহ-করুণা ইত্যাদি দেব-বিভূতি-সমূহ আমাদের মঙ্গলপ্রদ ও সুখের হেতুভূত হোক। স্থূলতঃ, এটাই মন্ত্রের প্রার্থনা ॥৪॥
মন্ত্ৰাৰ্থ আলোচনা— এই মন্ত্রের প্রতি পদের আলোচনা করলে মন্ত্রের নানা রকম অর্থ আমনন করা যেতে পারে। সায়ণের ভাষ্যেও নানারকম অর্থের আভাষ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রের স্তুবানং পদ উপলক্ষে তিনি তিনরকম অর্থ কল্পনা করেছেন।…অগ্নি পদও, তার ব্যাখ্যায়, নানা অর্থ নানা ভাব প্রাপ্ত হয়েছে। ব্যাপ্তি অর্থে তার নাম অগ্নি, অগ্রণী গুণহেতু তাঁর নাম অগ্নি, তাতে স্নেহভাব নেই বলে তার নাম অগ্নি ইত্যাদি। আমাদের কাছে অগ্নে অর্থে হে জ্ঞানস্বরূপ অগ্নি-ই সমীচীন মনে হয়েছে। যাতুধানং পদে সায়ণ রাক্ষসং প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছেন। ভাব এই যে, যে রাক্ষসগণ যজ্ঞ নষ্ট করতো, ঐ পদে তাদের প্রতিই লক্ষ্য আছে। আবহ ক্রিয়াপদ উপলক্ষে এক অর্থে যজ্ঞক্ষেত্রে দেবগণকে আনয়ন-ভাব প্রকাশ পেয়েছে; অন্য অর্থে হিংসক রাক্ষসগণকে দণ্ড-প্রদানের জন্য আনয়ন করুন ভাব আনা হয়েছে। আমরা মনে করি, এখানে যাতুধানং বলতে মন্ত্রে অন্তরস্থিত শত্রুগণের প্রতিই লক্ষ্য আসে। তারা যেন বিস্তৃতি লাভ করতে পারে, তারা যেন দূরীভূত হয়, হৃদয় যেন দেবভাবে পরিপূর্ণ হয়ে আসে,-এটাই এ মন্ত্রের প্রার্থনার মর্মার্থ। ১৷৷
বঙ্গানুবাদ –শ্ৰেষ্ঠস্থাননিবাসিন্ (শুদ্ধসত্ত্বভাবান্তবর্তি), জ্ঞানাধার, সকল প্রাণীশরীরে নিবাসি, হে অগ্নিদেব! আপনি আমাদের শ্রেষ্ঠ হবনীয়াংশ (বিশুদ্ধা ভক্তিকে) সৰ্থা গ্রহণ করুন, আর আমাদের শত্রুগণকে বিশেষরূপে বিনাশ করুন ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এই মন্ত্রে পরমেষ্ঠি পদে স্বর্গ ইত্যাদি উৎকৃষ্ট স্থানের অধিবাসী অর্থ ভাষ্যকার নির্ধারণ করেছেন। এইভাবে তিনি আজ্যস্য পদে ঘৃতের ভাগ, জাতবেদঃ পদে যিনি বেদ জানেন, নূবাসিন অর্থে যিনি সকল দেহের মধ্যে অবস্থিত, তৌলস্য পদে সুক-সুবা ইত্যাদি অর্থ নিষ্পন্ন করেছেন। ইত্যাদি। কিন্তু একটু বিবেচনা করলে বোঝা যায়, এ ঋকের মধ্যে স্থূল-বস্তুর সাথে সম্বন্ধ আদৌ নেই। যিনি সকলের দেহের মধ্যে বিদ্যমান আছেন, যিনি জাবেদ অর্থাৎ সকল জ্ঞানের আধার-স্থান, স্থূল ঘৃতের দ্বারা তার কি উপাসনা করবে? আজ্যস্য পদের সাথে তৌলস্য পদের সম্বন্ধের বিষয় বিচার করলে সূক্ষ্মবিষয়ের সম্বন্ধই সংসূচিত হয়। আমরা তুলনার্থক তুল ধাতু থেকে তৌলস্য পদের ব্যুৎপত্তি স্বীকার করি। তাতে বোঝা যায়, যে হবনীয় তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে প্রতিপন্ন হয়, সেই হবনীয়ের প্রতিই লক্ষ্য রয়েছে।…..এখানে বলা হয়েছে-তুলনায় হৃদয়ের যে ভাব শ্রেষ্ঠ বলে প্রতীত হয়, হে দেব! আপনি আমার সেই ভাবটি মাত্র গ্রহণ করুন; হৃদয়ের আর যে আমার অন্যভাব আছে–অসৎ-ভাবসমূহ আছে–তাদের আপনি দূর করে দিন। ভাব এই যে, আমার বিশুদ্ধা ভক্তিটুকু আপনাতে ন্যস্ত থোক। যাতুধানদের বিনাশ করুন-এই বাক্যে বোঝা যায়, হৃদয়ের শত্রুদের হৃদয় হতে দূর করে দিন। ইত্যাদি। ২
তৃতীয় মন্ত্রঃ বি লপন্তু যাতুনা অত্রিণো যে কিমীদিনঃ। অথেদমগ্নে নো হবিরিন্দ্রশ্চ প্রতি হতং। ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে জ্ঞানদেব! সেই সর্বভু, ভক্ষদ্রব্য অন্বেষণে ইতস্ততঃ বিচরণশীল, শত্রুগণ (রিপুগণ) আপনার দ্বারা বিনাশ-প্রাপ্ত হোক; শত্রুবিনাশের পর আমাদের হৃদয়স্থিত শ্রেষ্ঠ শুদ্ধসত্ত্বভাবকে লক্ষ্য করে, আপনি এবং আপনার ঐশ্বর্য-বিভূতি-সমূহ আমাদের প্রাপ্ত হোক। ৩।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মনুষ্যখাদক রাক্ষসেরা যজ্ঞকারীদের ভক্ষণ করবার জন্য ইতস্ততঃ বিচরণ করতো। ভগবান্ অগ্নিদেব, তাদের সংহার করুন এবং তিনি ও ইন্দ্রদেব উভয়ে মিলিত হয়ে আমাদের প্রদত্ত হবিঃ গ্রহণ করুন-ভাষ্যানুসারে এটাই মন্ত্রের অর্থ হয়।–শব্দানুসারে মন্ত্রের অর্থ ঐরকমই বটে; কিন্তু ভাব অন্যরকম। মন্ত্রের মুখ্য অর্থ আধ্যাত্মিক-ভাবমূলক।কিমীদিনঃ অর্থাৎ ইতস্ততঃ সকলের হৃদয়ে, অলিণঃ অর্থাৎ সকল সৎ-বৃত্তি-ভক্ষণকারী যে যাতুধানাঃ অর্থাৎ শত্রুগণ বর্তমান রয়েছে, তাদের হনন না করলে, বিশুদ্ধ হবির (অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বভাবের) উন্মোয হয় না।…ভক্ত প্রার্থনা করছেন যে, ভগবান্ তার হৃদয়ের শত্রুগণকে একে একে নিঃশেষিত করুন। একে একে অসৎ-বৃত্তিগুলি তার হৃদয় হতে দূরীভূত করুন। তার হৃদয়ে সত্ত্বভাব জাগিয়ে তুলুন; আর সেই সত্ত্বভাবের মধ্যে সকল ঐশ্বর্য সহ আপনি বিরাজমান হোন। ৩।
চতুর্থ মন্ত্রঃ অগ্নিঃ পূর্ব আ রভতাং প্রেন্দ্রো নুদতু বাহুমা। ব্রবীতু সর্বো যাতুমান্ অয়মষ্মীত্যেত্য। ৪
বঙ্গানুবাদ –জ্ঞানস্বরূপ অগ্নিদেব, সর্বদেববর্গের অগ্রণী হয়ে, শত্ৰুসংহারে প্রবৃত্ত হোন; আর প্রচণ্ড বলশালী দেবরাজ ইন্দ্রদেব, শত্রুগণকে দূরীভূত করুন। দেবতার প্রভাবে বিধ্বস্ত হয়ে, শত্রুসেনানায়ক (দুর্বুদ্ধি ইত্যাদি) সকল শত্রুসেনা-সহ দেবতার সমীপে আগমন পূর্বক, আমি এই হই বলে (অর্থাৎ পরাজয় স্বীকার-পূর্বক) পলায়ন করুক। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –পদাবলি যে ভাবেই বিন্যস্ত থাকুক, এই মন্ত্রের তাৎপর্য সহজেই হৃদয়ে ধারণা করা যায়।-জ্ঞানই সর্ব-অপকর্ম-নিবারণে অগ্রণী-জ্ঞানই সকল পাপ দূরীকরণে প্রথম সহায়। জ্ঞানের উন্মেষ না হলে, কে শত্রু–কে মিত্র বুঝতে না পারলে, কিভাবে শত্রু দমিত ও মিত্র সংবর্ধিত হবে? তাই জ্ঞানস্বরূপ অগ্নিদেবকে সকল দেবগণের অগ্রণী বলে অভিহিত করা হয়। জ্ঞানোদয়ের পরেই শক্তিসঞ্চয়। শক্তির রাজা-ইন্দ্রদেব। দৈবভাবের নায়ক তিনি; তাই তিনি দেবরাজ। জ্ঞানের উদয়েই দেবভাব প্রবল হয়। তখন, শত্রুসেনার নায়ক দুবুদ্ধিই বলো, আর মায়া-মোহই বলো, বিধ্বস্ত হতে থাকে।…তখন কোন্ রিপুর কোন্ কার্য, মানুষ তা বুঝতে পেরে একে একে এক এক শত্রুকে তাড়িয়ে দিতে পারে। আমরা মনে করি, প্রার্থনার ছলে, সেই নিগূঢ় তত্ত্বই এই মন্ত্রের মধ্যে বিধৃত রয়েছে। ৪
বঙ্গানুবাদ— জ্ঞানের আধার হে দেব! আপনার শত্রুদমনের সামর্থ্য আমরা নিয়ত প্রত্যক্ষ করছি; হে সকল কর্মের দ্রষ্টা! আমাদের শত্রুগণকে দূরীভূত হবার জন্য আপনি আদেশ করুন; আপনার প্রভাবে সর্বৰ্থা পরিতপ্ত সেই শত্রুগণ, আপন আপন অপরাধ স্বীকার পূর্বক, এই সকর্মের সমীপে বা সৎ-জ্ঞানের সান্নিধ্যে বিনাশপ্রাপ্ত হোক ৫
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এ মন্ত্রে পূর্ব-মন্ত্রের প্রার্থনাই দৃঢ়ীকৃত হচ্ছে। সাধনার পথে অগ্রসর হতে হতে সাধক দেখতে পান–জানতে পারেন–ভগবানের কি অপার মহিমা! তখনই তিনি বলতে পারেন,–হে ভগবন! আপনার বীর্য-সামর্থ্য এইবার আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তারপর বলতে পারেন,–হে ভগবন্! আপনি যখন আমাদের সৎ-অসৎ সকল কর্মের দ্রষ্টা, আমাদের কোনও কর্মই যখন আপনার অ-দৃষ্ট নেই; তখন কাজেই বলতে হয়, শত্রুদের দূর করবার আজ্ঞা দিন। আপনার আজ্ঞা প্রচারিত না হলে, জ্ঞানবার্তা এক বিঘোষিত না হলে, তারা আপন অধিকার-স্থান পরিত্যাগ করতে বাধ্য হবে কেন? আপনার আদেশেই জ্ঞানের প্রভাব। জ্ঞানের প্রভাব বিস্তার হলেই শত্রুগণ পলায়ন করতে বাধ্য হবে।–মন্ত্রের শেষাংশ পূর্ববর্তী মন্ত্রেরই শেষাংশের দৃঢ় প্রতিধ্বনি। শত্রুগণ পরিতপ্ত হোক; আত্মদোষ খ্যাপন করুক; নিজেদের অপকর্মের ফুল নিজেরা উপভোগ করে নিজেরাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হোক। ইদং উপ এই যে দুটি পদ, এদের বিশেষ সার্থকতা দেখি।পাপ ভস্মীভূত হয়–কোথায়? পুণ্যের প্রভায়। দুস্কৃত বিনাশ-প্রাপ্ত হয়–কোথায়? সুকৃতের শাণিত খগাঘাতে। দুর্বুদ্ধি অপসারিত হয়–কোন্ সময়? সৎ-বুদ্ধি এসে যখন হৃদয় অধিকার করে। ঐ দুই পদ সেই তত্ত্ব ব্যক্ত করছে। এইভাবে বোঝা যায়, এই মন্ত্র সত্ত্বভাবের উদ্বোধক হয়ে ভক্তকে শত্রু-নাশের সন্ধান প্রদান করছে। ৫।
বঙ্গানুবাদ –হে জ্ঞানাধার দেব! শত্ৰুসংহার-কার্যে ব্রতী হয়ে আমাদের ইষ্টসাধনের নিমিত্ত আপনি প্রাদুর্ভূত হয়ে থাকেন। হে জ্ঞানস্বরূপ দেব! আমাদের দূতস্বরূপ (সুহৃৎ) হয়ে, আপনি শত্রুদের বিনাশ করুন। ৬
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রে দুটি তত্ত্ব অনুধাবন করবার আছে। প্রথমতঃ, জ্ঞানের উদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই যে শত্রুইনন কার্য আরম্ভ হয়, মন্ত্রের প্রথমাংশে সেই তত্ত্ব পরিব্যক্ত। শত্রুদমনের সঙ্গে সঙ্গেই অগ্নিদেব জন্মগ্রহণ করেন। এরকম বাক্যের মর্মার্থই এই যে, জ্ঞানেনাদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই অজ্ঞানতা মোহান্ধকার দূরীভূত হয়। মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের শব্দগত অর্থ এই যে,–হে দেব! আমার পক্ষের দূত হয়ে গিয়ে তুমি শত্রুকে সংহার করে এসো। এখানকার অর্থে, এক পক্ষে এই ভাব প্রকাশ পায়; এখানে যেন বলা হচ্ছে,–আপনি দূতরূপে বিপক্ষের শিবিরে প্রবেশ করে গুপ্তভাবে শত্রুকে সংহার করে আসুন। যাঁরা অগ্নি প্রভৃতি দেবগণকে মনুষ্য-রপে কল্পনা করেন, তাদের মতে এই অর্থই সমীচীন বলে পরিগৃহীত হয়। কিন্তু পক্ষান্তরে এখানকার মর্ম অন্যরকম। এখানে বলা হচ্ছে যে, জ্ঞানের সাথে পরিচিত হওয়া মাত্রই অজ্ঞানতা বিনাশপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। হত্যাকার্য-সাধনের উদ্দেশে দূত শব্দ প্রয়োগের একটু বিশেষ সার্থকতা আছে। দূত নিরপেক্ষভাবে শত্রুর সন্নিহিত হয়ে তৎক্ষণাৎ বিনাযুদ্ধে শত্রুর বিনাশসাধনে সমর্থ হয়। সেইরকম, দ্বন্দ্ব উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই জ্ঞানের দ্বারা অজ্ঞানতা প্রতিহত হয়ে থাকে। আলোক ও আঁধারের দৃষ্টান্তই এ ক্ষেত্রে সম্যকসমীচীন। আলোকের উপস্থিতি-মাত্রই অন্ধকার দূরে যায়। আলোক ও অন্ধকার কখনও একত্র যুগপৎ থাকতে পারে না ৷ ৬ ৷৷
বঙ্গানুবাদ –জ্ঞানস্বরূপ হে অগ্নিদেব! আপনি আমার শত্রুগণকে (রিপুশত্রুগণকে) আবদ্ধ (সংযত) করে, এই যজ্ঞে আনয়ন করুন (এই কর্মে নিয়োগ করুন); আর, সেই দেবাধিপতি ইন্দ্র, তীক্ষ্ম বজ্রের দ্বারা তাদের মস্তক ছেদন করুন (পরে কর্ম-শক্তির দ্বারা তারা নাশ-প্রাপ্ত হোক) ৭
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যানুসারে এই ঋকের মর্ম এই য়ে,–হে অগ্নি! আপনি রজু প্রভৃতির দ্বারা রাক্ষসদের হস্ত-পদ ইত্যাদি অবয়ব বন্ধন করে এই দেশে আনয়ন করুন; দেবতাদের অধিপতি ইন্দ্রদেব, সেই রাক্ষসদের মস্তক বজের দ্বারা ছেদন করুন। এই অনুসারে নানা উপ্যাখ্যানের ও প্রত্নতত্ত্বের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হতে পারে। রাক্ষসেরা ঋষিদের যজ্ঞ নষ্ট করতো; সেইজন্য ঋষিরা যেন অগ্নিকে বা রাজসেনাপতিকে বলছেন,–আপনি ঐ রাক্ষসদের বেঁধে আনুন; পরিশেষে রাজা তাদের মস্তক ছেদন করবেন! শত্রু নিপাত হলে, আমরা সুখস্বচ্ছন্দে যজ্ঞকার্যে সমর্থ হবো।
প্রত্নতত্ত্বের পক্ষে এ মন্ত্রের অর্থ হয়, –অনার্যের বা দস্যুর উৎপীড়নে ভারতবর্ষে নবাগত আর্যগণ বড় বিপন্ন হয়ে পড়েন। তাঁরা তখন ঐ মর্মের বাক্যে অগ্নিকে সম্বোধন করে বলেছিলেন। আমরা কিন্তু মন্ত্রটিকে সাধারণ দৃষ্টিতে দর্শন করি। এখানে প্রথমে জ্ঞানের দ্বারা রিপুশত্রুদের দমন করাবার বিষয় বলা হয়েছে। রিপুদের দমিত সংযত করে কার্যে প্রবৃত্ত করাতে পারলে, ভগবান্ আপনিই তাদের বিনষ্ট করেন, তারা আপনা আপনিই তখন আত্ম-প্রবৃত্তি ত্যাগ করে সম্মার্গে সৎকর্মে প্রধাবিত হয়। একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা বিষয়টি বোঝাবার চেষ্টা করা যাচ্ছে।–কাম (কামনা) একটা প্রবল রিপু। তার দ্বারা যে কত অপকর্ম সাধিত হতে পারে, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু ঐ কামকে যদি জ্ঞানের দ্বারা রজ্জবদ্ধ অর্থাৎ সংযত করে কর্মে নিয়োগ করতে পারি, তাতে অশেষ সুফল প্রাপ্ত হওয়া যায়। মনে করুন–কামনা যদি পরোপকারে বা পরসেবায় আসে, কামনা যদি বিপন্নের বিপদ-উদ্ধারে বিনিযুক্ত হয়, কামনা যদি ভগবানের প্রতি অচলা থাকে, তাতে কিরকম শ্রেয়ঃ সাধিত হতে পারে! তারই পরবর্তী অবস্থার বিষয় মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে বিস্তৃত রয়েছে। পূর্বোক্তরূপ কামনার বা কামনামূলক কর্মের। ফলে নিষ্কাম কর্মের সূচনা হয়।
নিষ্কাম-কর্মই সে ক্ষেত্রে মুক্তির প্রকৃষ্ট সোপান হয়ে দাঁড়ায়। তুমি তোমার। রিপুগণকে সংযত করো এবং ক্রমশঃ সকার্যে বিনিযুক্ত করো। তোমার শ্রেয়েলাভ আপনিই সাধিত হবে। এটাই মন্ত্রের উপদেশের মর্মার্থ। ৭
প্রথম মন্ত্রঃ ইদং হবির্যাতুনা নদী ফেনমিবাবহৎ। য ইদং স্ত্রীপুমানকরিহ স স্তুবং জনঃ ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ –আমাদের অনুষ্ঠিত এই পূজা (হবিঃ), তরঙ্গিণী যেমন আপন প্রবাহের দ্বারা ফেনপুঞ্জকে মহাসমুদ্রে বহন করে নিয়ে যায়, সেইরকম আমাদের রিপুশত্রুগণকে সম্যকারে ভগবৎ সমীপে নিয়ে যাক (অর্থাৎ ভগবকার্যে সকার্যে নিযুক্ত করুক); স্ত্রী বা পুরুষ, যে জন এই ই রকম হবনীয় (পূজা) করে (করতে পারে), সেই জনই প্রকৃত ভগবৎপূজাপরায়ণ হয়ে থাকে। ১।
মন্ত্ৰাৰ্থ আলোচনা –ভাষ্য-ভাবে বোঝা যায়, এই মন্ত্রে যেন অভিচার কর্মের বিষয় বিবৃত হয়েছে। প্রথমে বলা হচ্ছে,-হে আজ্য (মন্ত্রঃপূত ঘৃত)! এই রাক্ষস পিশাচ ইত্যাদিকে তুমি দূরীকৃত করো। তরঙ্গিণী যেমন ফেনাকে দেশ-দেশান্তরে নিয়ে যায়, এই শত্রুদেরও সেইরকম অন্যত্র নিয়ে যাও। তারপরে বলা হয়েছে–যে পুরুষ বা যে স্ত্রী এইরকম আভিচারিক হবিঃ শত্ৰুকৃত উপদ্রব-নিবারণের উদ্দেশে বিহিত করেন, অগ্নি ইত্যাদি দেবের কৃপায় তারা নিরুপদ্রবে তাদের সেবাপরায়ণ থাকেন। শত্রুনাশ-কামনায় আভিচারিক ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করে যে সুফল লাভ করা যায়,-এক পক্ষে এটাই মন্ত্রের তাৎপর্য।–এখন, আমরা যে দিক দিয়ে যে অর্থের অধ্যাহার করলাম, তার মর্ম প্রকাশ করছি। মন্ত্রে আছে,নদীফেনমিব। এতে ফেনকে নদী যেমন দেশদেশান্তরে নিয়ে যায়–এই অর্থ প্রকাশ করে। আমরা কিন্তু দেশ দেশান্তর না বলে মহাসমুদ্রে নিয়ে যায়–এমন অর্থই সঙ্গত বলে মনে করলাম। তাতে উপমার উপযোগিতাই প্রতিপন্ন হয়। আমার হবিঃ বা পূজা, ভগবানের নিকট যেন আমার বিপুশত্রুগণকে পৌঁছিয়ে দেয়; কাম ইত্যাদি বিপু ভগবৎ-কর্মে নিযুক্ত হোক,–এটাই মন্ত্রের প্রথম অংশের মর্ম।…ফলতঃ, মনোবৃত্তিসমূহ, কাম ইত্যাদি রিপুগণ, সৎপথে পরিচালিত হোক। তারাই আমায় শ্রেয়ঃ লাভ করাবে,তাদের দ্বারাই আমার মুক্তিপথের সকল আশঙ্কা বিদূরিত হবে। এটাই মর্মার্থ। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ অয়ং স্তুবান আগমদিমং স্ম প্রতি হত। বৃহস্পতে বশে লবন্ধাগ্নীষোমা বি বিধ্যতং ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হে দেবগণ! এই শত্রুপীড়িত রিপুনির্যাতনগ্রস্ত জন আপনাদের পূজাপরায়ণ হয়ে অনুগ্রহ-প্রাপ্তির নিমিত্ত অগ্রসর হয়েছে; সেই অর্চনা-পরায়ণ জনকে আপনার বলে গ্রহণ করুন। হে দেবশ্রেষ্ঠ বৃহস্পতি! আপনার অর্চনাপরায়ণ জনের প্রতি উপদ্রবকারী শত্রুদের আপনার আয়ত্তাধীন করে অর্চনাকারীকে রক্ষা করুন। হে একাধারে কঠোর-কোমল-ভাবাপন্ন অগ্নি ও সোম নামক যুগ্ম দেবদ্বয়! আপনারা বিপরীত-মার্গগামী উপদ্রবকারী বৈরিগণকে বিতাড়িত করুন। ২।
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রে তিন রকম প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। সে প্রার্থনা তিন শ্রেণীর দেবতার নিকট তিন রকমে প্রকাশ পেয়েছে। প্রথম–সমস্ত দেবগণকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে–হে দেবগণ! আপনাদের অর্চনাকারী এই আমাদের মধ্যে আপনাদের সকল প্রকার বিভূতির সমাবেশ হোক।.. মর্ম এই যে,-সকল দেবভাবের আমরা যেন অধিকারী হই; দেবগণের অঙ্কে আমাদের যেন স্থান হয়। শত্ৰুনিপীড়িত নির্যাতনগ্রস্ত জনের এমন প্রার্থনাই সঙ্গত। দ্বিতীয় প্রার্থনা–বৃহস্পতি দেবতার নিকট। বৃহস্পতির পরিচয়ে ভাষ্যকারই বলেছেন–সকল দেবতার (বা দেবভাবের) রক্ষাকর্তাই এখানে বৃহস্পতি নামে অভিহিত হয়েছেন। তার নিকট প্রার্থনা জানানো হলো–হে সকল দেবের সংরক্ষক! আমার শত্রুদের আপনার আয়ত্তাধীন করে আপনি আমাকে রক্ষা করুন। এই স্থলে শত্রুদের একেবারে মেরে ফেলার প্রার্থনা জানানো হলো না। বলা হলো,-তাদের বশে রেখে আমাদের শ্রেয়ঃ সাধন করুন। এর তাৎপর্য এই যে, ইহ সংসারে কাম ইত্যাদি রিপুর একেবারে বিসর্জন–দূরের (উচ্চ স্তরের) বিষয়। প্রথমে, তারা যাতে ভগবৎপদাঙ্কানুসারী হয়, তারই চেষ্টা পেতে হবে। তারপর, তারা ক্রমশঃ লয়প্রাপ্ত হবে। প্রথম সূক্তের সপ্তম মন্ত্রে এ প্রসঙ্গের আভাষ আছে।উপসংহারে মন্ত্রের তৃতীয় প্রার্থনা–অগ্নীযোম দেবদ্বয়ের নিকট। ঐ যুগ্ম দুই দেবতায় দুই ভাবের দ্যোতনা করে। অগ্নি-জ্ঞানমূর্তি-তীব্ৰতেজঃসম্পন্ন–দীপ্তিমন্ত। সোম-স্নিগ্ধমূর্তি আবরক-স্নেহভাবের দ্যোতক। একপক্ষে জ্বালামালার ভাব; পক্ষান্তরে স্নিগ্ধতা-দানের ভাব। এ পক্ষে নিগূঢ় আলোচনায় বোঝা যায়, এখানে যেন বলা হচ্ছে-হে কঠোর-কোমল-ভাবাপন্ন দেবযুগল! আপনারা কঠোর-শাসনে আমার রিপুশত্রুদের সন্ত্রস্ত করুন। তারা দমিত বা বিমর্দিত হলে, স্নেহভাবের পোষণে যেন কার্য করে,–এটাই প্রার্থনার ভাব। দুর্দান্ত ও সদা অসৎকার্যে বিনিযুক্ত রিপুগণ অগ্নি-শক্তির দ্বারা স্থির থোক; সোম-শক্তির দ্বারা তারা সুপথে পরিচালিত হোক;- এখানকার এটাই তাৎপর্য।
–কেউ কেউ এ মন্ত্রে আর্য-অনার্যের যুদ্ধের সংস্রব আনতে পারেন। সে দিকের অর্থে, দেবগণ কর্তৃক শত্রু থেকে আর্যদের রক্ষার কথা, সেনাপতি বৃহস্পতি কর্তৃক শত্রুদের আয়ত্তাধীন করা এবং অগ্নি ও সোম বা অগ্নীষোম কর্তৃক শত্রুদের বিতাড়ন,–প্রভৃতি অর্থই অধ্যাহৃত হয় ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ— হে সোমপ (শুদ্ধসত্ত্বভাবগ্রহণশীল দেব)! আপনি রিপুশত্রুদের (অথবা তৎসংক্রান্ত অসম্ভাব-পরম্পরাকে) নাশ করুন; আপনার অনুগত জনকে (আমাকে) অভিমত ফল দান করুন (আমার ইষ্ট সাধিত হোক); স্তবপরায়ণের (আমার) শ্রেষ্ঠ দর্শন লাভ হোক (আপনার অৰ্চনাকারীকে পরম পদার্থের দর্শনশক্তি প্রদান করুন); আর, নিকৃষ্ট শত্রুকে নিঃশেষে বিনাশ। করুন ॥ ৩ ৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— ভাষ্যানুসারে এ মন্ত্রের প্রথমাংশের অর্থ-হে সোমরসপানশীল অগ্নিদেব! আপনি রাক্ষসদের পুত্রপৌত্র ইত্যাদি নাশ করুন; অথবা আমাদের প্রতি উপদ্ৰবকারী রাক্ষসকে হনন করুন। আর আমাদের অভিমত ফল প্রদান করুন, আমাদের অনিষ্ট দূর করে আমাদের ইষ্ট-প্রাপ্তির ব্যবস্থা করুন। সেই অনুসারে দ্বিতীয় অংশের অর্থ–আর, ভীত হয়ে যে শত্রু আপনার স্তুতিপরায়ণ হয়েছে, সেই শত্রুর L উৎকৃষ্ট দক্ষিণ চক্ষুঃ এবং নিকৃষ্ট বাম চক্ষুঃ স্বস্থানচ্যুত অর্থাৎ উৎপাটিত করুন। শত্রু বিনষ্ট হোক। ইত্যাদি। –আমাদের অর্থ কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। আমরা যাতুধানদের প্রজা বলতে, রিপুগণ হতে উৎপন্ন অসৎ-ভাবসমূহ অর্থ গ্রহণ করলাম। রিপুগণ এবং তাদের সম্বন্ধীয় অসৎ-ভাব বা কুকাৰ্য-পরম্পরা নাশ প্রাপ্ত হোক–আমরা মনে করি, এটাই এক প্রার্থনা। দ্বিতীয় প্রার্থনা,–আপনার অনুগত আমায় ইষ্টদান করুন। মন্ত্রের দ্বিতীয় পংক্তির স্তুবানস্য পদে রাক্ষসদের মধ্যে যারা আপনার স্তুতিপরায়ণ হয়–এ অর্থ না ধরে, আমরা আপনার স্তবপর অর্চনাকারী অর্থ গ্রহণ করলাম। স্তুবানস্য অর্থাৎ স্তবকারীর দক্ষিণ ও বাম দুই চক্ষু উৎপাটন করে নাও-এ অর্থও আমরা সঙ্গত মনে করি না। মন্ত্রের দ্বিতীয় পংক্তিতে আমরা দুটি প্রার্থনা দেখি। প্রথম, অর্চনাকারীকে (আমাকে) পরমার্থ-দর্শনশক্তি দিন; দ্বিতীয়, নিকৃষ্ট যে শত্রু, তাকে বিনষ্ট করুন। অথবা আপনার কৃপায় সাধু পরিত্রাণ লাভ করুক; অসাধুর সংহার সাধিত হোক ৷ ৩৷৷
চতুর্থ মন্ত্র: যত্রৈমগ্নে জনিমানি বেথ গুহা সমত্রিণাং জাতবেদঃ। তাংস্তুং ব্ৰহ্মণা বাবৃধানো জহ্যেষাং শততহমগ্নে ॥ ৪
বঙ্গানুবাদ— জ্ঞানোৎপন্ন জ্ঞানস্বরূপ হে অগ্নিদেব! নিভৃত-হৃদয়কন্দরে আশ্রয়প্রাপ্ত শুদ্ধসত্ত্বভাবগ্রাসকারী এই রিপুশত্রুগণ যে স্থানে অবস্থিতি করে এবং যেভাবে উৎপন্ন (বৃদ্ধিপ্রাপ্ত) হয়, আপনি তা অবগত আছেন। হে অগ্নিদেব! মন্ত্রশক্তির প্রভাবে আপনি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে (আমাদের অর্চনায় প্রকাশমান হয়ে), আপনি সেই শত্রুদের সংহার করুন এবং সেই শক্রকৃত অশেষপ্রকার হিংসা নাশ করুন। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— ভাষ্যানুসারে এই মন্ত্রের মর্মার্থ এই যে,-নরভু রাক্ষসেরা যে নিভৃত গিরিগুহায় লুক্কায়িত থাকতো, অগ্নিদেব তা অবগত ছিলেন। তাই, তার নিকট প্রার্থনা করা হচ্ছে,–আপনি মন্ত্রের দ্বারা (আভিচারিক শক্তির দ্বারা) বর্ধিত-বল হয়ে, আপন স্থানে অধিষ্ঠিত সেই রাক্ষসগণকে নাশ করুন এবং তারা আমাদের প্রতি যে শতপ্রকার হিংসা করে, তা নিবৃত্ত করুন। এরকম ভাষ্যাভাষে আর্য-অনার্যের দ্বন্দ্বের বিষয় অথবা ঋষিদের যজ্ঞনাশকারী রাক্ষসদের দমনের প্রশ্নই মনে আসে। সে পক্ষে, অগ্নিকে সেনাপতি অথবা আভিচারিক ক্রিয়াপরায়ণ বলে মনে করা যায়। আমরা যে পথ অনুসরণ করে অর্থ নিষ্পন্ন করছি, তাতে আধ্যাত্মিক পক্ষে সুষ্ঠু-সঙ্গত ভাবই প্রাপ্ত হওয়া যায়। গুহা সতাং পদে পর্বতের গুহায় লুক্কায়িত থাকার ভাব গ্রহণ না করে, আমরা হৃদয়-রূপ গুপ্ত-গৃহের অভ্যন্তরে অবস্থিত অর্থই সঙ্গত বলে মনে করি। এই মন্ত্রের একটি পদ–অত্রিণাং। সায়ণ এখানে অত্রি ঋষির সম্বন্ধ-সূচনা করেননি। তিনি ঐ পদের নরভু অর্থ গ্রহণ করেছেন। আমরা তা না করে ঐ পদের শুদ্ধসত্ত্বভাবগ্রাসকারী অর্থেরই সমীচীনতা দেখি। রিপুশত্রুগণ হৃদয়ের নিভৃত গুহাতে উৎপন্ন ও পরিপুষ্ট হয়ে শুদ্ধসত্ত্বভাবকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এমন কি, তাদের ধর্মই এই–তারা সৎ-ভাবনিচয়কে গ্রাস করবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে থাকে। আমরা যখন তা জানতে সমর্থ হই, তখনই কাতরভাবে জ্ঞানস্বরূপ দেবতার শরণাপন্ন হয়ে থাকি। পরে, সাধনার প্রভাবে শুদ্ধসত্ত্বজ্ঞান অধিকৃত হলে–জ্ঞানাগ্নির জ্যোতিতে আমরা শত্রুর প্রকৃত অবস্থা ও শক্তি-সামর্থ্যের বিষয় দেখতে পাই ও জানতে পারি।তখন মন্ত্র-শক্তির প্রভাবে, ভগবৎ-অর্চনার ফলে, জ্ঞান প্রকাশ পায়; তাতে শত্রু নাশপ্রাপ্ত হয়, শত্ৰুকৃত শত-সহস্র প্রকার উপদ্রব বিদূরিত হয়ে থাকে। এই যে সরল সত্য দার্শনিক তত্ত্বমন্ত্রের মধ্যে সেটাই বিবৃত রয়েছে,-হে জ্ঞানাধার ভগবন্! আমাকে জ্ঞান দাও; আমি যেন শত্রুদের চিনতে পারি।
আমায় শক্তি দাও; আমি যেন তাদের দূরীভূত করতে সমর্থ হই,–আমার নিকট তাদের প্রভাব যেন আদৌ কার্যকরী না হয়।–প্রার্থনা-পক্ষে মন্ত্রের নিগূঢ় মর্ম এটাই ॥৪॥
প্রথম মন্ত্রঃ অম্মি বসু বসবো ধারয়ন্ত্ৰিন্দ্ৰঃ পূষা। বরুণো মিত্রো অগ্নি। ইমমাদিত্যা উত বিশ্বে চ দেবা উত্তরস্মিন জ্যোতিষি ধারয়ন্তু ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –নিবাসহেতুভূত দেবগণ, পরমেশ্বর্যশালী দেব, পোষণকারী দেবতা, অভীষ্টবর্ষী দেবতা এবং বিপদে উদ্ধারকারী দেব, প্রার্থনাকারী এই আমাতে (আমাকে) ধন (পরমার্থ) স্থাপন (প্রদান) করুন। অপিচ; অনন্তের অংশভূত অনন্তস্বরূপ আদিত্য-নামক দেবগণ এবং দ্যোতমান দেববিভূতিসকল, প্রার্থনাকারী এই আমাকে অতিশয় উৎকৃষ্ট জ্যোতিতে (পরব্রহ্মে) স্থাপিত করুন। (অর্থাৎ আমি যেন দেবানুগ্রহে পরব্রহ্ম লাভ করতে সমর্থ হই) ॥ ১।
মন্ত্রাৰ্থ আলোচনা –উপক্রমণিকায় দেখতে পাওয়া যায়,অস্মিন্ বসু ইত্যাদি মন্ত্রবিশিষ্ট সূক্ত, নানা কার্যে ব্যবহৃত হয়। এর দ্বারা সকলরকম সম্পত্তিকামেচ্ছু ব্যক্তি বাসিত কৃষ্ণলমণিদ্বয় (নীলা) ধারণ করবে এবং অন্নের মধ্যে পুরুষের আকৃতি লিখে সেই অন্ন ভোজন করবে। এস্থলে বাসিত শব্দের অর্থ– এয়োদশী ইত্যাদি তিথিত্রয়ে দধি ও মধু-পূর্ণ পাত্রে মণি (নীলা) প্রক্ষেপ করে রেখে তার পরদিবস অর্থাৎ চতুর্থ দিনে সেই মণিবন্ধন। শত্রু কর্তৃক রাজ্যচ্যুত রাজার পুনরায় স্বরাজ্যে প্রবেশের নিমিত্ত এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত অন্ন ভোজন আবশ্যক।
আয়ুষ্কাম ব্যক্তি যুগ্মকৃঞ্চল-মণি স্থালীপাকে প্রক্ষেপ করে এই সূওমন্ত্রের দ্বারা সেই মণিবন্ধন ও স্থালীপাক-উদ্ভব অন্ন ভোজন করবেন। উপনয়ন-কর্মে মাণবকের। অনুমন্ত্রণ বিষয়েও এই সূক্ত বিনিযুক্ত হয়। ঐরাবতী নামক মহাশান্তিতে, বাৰ্হস্পতি নামক মহাশান্তিতে এবং পুষ্পভিষেক কর্মে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে।–সূক্তের এই প্রথম মন্ত্রটির ব্যাখ্যা-প্রসঙ্গে ভাষ্যকার সায়ণ বলেন, এই সর্বসম্পদ ইত্যাদিকামী ব্যক্তিতে, নিবাসহেতুভূত বসুগণ অভিলষিত ধন স্থাপন করুন। কেবল যে বসুগণই ধন স্থাপন করবেন, তা নয়; পরন্তু, পরমেশ্বর্যযুক্ত দেবগণের অধিপতি ইন্দ্রদেব, পোষণকারী পূষাদেব, সকল জগৎকে নিগৃহীত করবার নিমিত্ত পাশজালের দ্বারা ব্যাপ্তকারা রাত্রির অধিষ্ঠাতা বরুণদেব, সকলকে মরণ হতে ত্রাণ করেন বলে মিত্ৰনামক দিবসের-অধিষ্ঠাতা দেব এবং ইন্দ্র দেববৃন্দের অগ্রণী অগ্নিদেবও এই পুরুষে ধন স্থাপন করুন। অপিচ, অদীনা দেবমাতা, তার পুত্র-ধাতা অর্যমা ইত্যাদি আদিত্যগণ এবং অন্য সমস্ত দেবগণ, এই পুরুষকে উৎকৃষ্টতর তেজের মধ্যে স্থাপন করুন। ভায্যের প্রতি দৃষ্টি করলে এই সূক্তের এবং সূক্তের অন্তর্গত এই প্রথম মন্ত্রের এইরকম অর্থই অবগত হওয়া যায়।
আমরা ইন্দ্র ইত্যাদি দেবনামের পূর্বাপর যেভাবে অর্থ-সঙ্গতি রক্ষা করে এসেছি, ভাষ্যকার এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা-প্রসঙ্গে সেই সমস্ত দেব-নামের অর্থ সেইরকমই গ্রহণ করেছেন।–সায়ণ-ভায্যে প্রায় সর্বত্রই দেবগণে ব্যক্তিত্ব আরোপিত দেখি। কোনও কোনও দেবতা-বিষয়ে, তাদের মাতা-পিতা পর্যন্ত তিনি কল্পনা করেছেন। পুরাণে রূপকের মধ্যে ঐ সকল বিষয় বিবৃত আছে। সেই সকল স্থলে ভাষ্যকারকে তারই অনুসরণকারী বলা যেতে পারে। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত ফল ফলেছে। বেদের কদর্থকারিগণ তা দর্শন করে দেবতায় ব্যক্তিত্ব আরোপ করে বেদ-বাক্যের নিত্যত্ব ইত্যাদিতে বিঘ্ন ঘটিয়েছেন। এক একটি মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত ভগবানের এক একটি বিভূতির বিকাশ, এ কথা আমরা পূর্বেই বলেছি। এখানে, ভাষ্যকার প্রত্যেক ভগবৎ-বিভূতির–এক একটি কার্যকারণ ইত্যাদি, শাস্ত্রান্তর হতে প্রমাণ উধৃত করে সপ্রমাণ করেছেন। মন্ত্রের প্রথমেই অস্মিন্ একটি পদ। অস্মিন্ বলতে অন্য একটি বিশেষ পদকে আকাঙ্ক্ষা করে। মন্ত্রে তার কোনও উল্লেখ নেই। ভাষ্যকার, সর্বসম্পদাদিফলকামে জনে পদ অধ্যাহার করেছেন। আমরা এ মন্ত্রটি, সাধকের নিজের প্রার্থনার বেদক বলে, ঐ পদে প্রার্থনাকারিণী ময়ি পদ উহ্য করেছি।
তাতে প্রার্থনার ভাবে মন্ত্রের প্রথমাংশের অর্থ হয়–নিবাসহেতুভূত দেবগণ, পরমৈশ্বর্যশালী দেব, পোষণকারী দেবতা, অভীষ্টবর্ষী দেবতা এবং বিপদ-উদ্ধারকারী দেবতা, প্রার্থনাকারী আমাকে পরমার্থ ধন প্রদান করুন। এ অপেক্ষা দেবতার নিকট উচ্চ প্রার্থনা আর কি হতে পারে? অতঃপর মন্ত্রের শেষাংশে উক্ত প্রার্থনার সামঞ্জস্য রক্ষিত হলো। এই অংশে তিনি মুক্তি–ভগবৎসাযুজ্য প্রার্থনা করছেন। তাঁর প্রার্থনা–এখানে সমস্ত দেবভাবের নিকট। প্রথম অংশের মতো এখানে এক একটি দেবতার কাছে প্রার্থনা জ্ঞাপন করলেন না; তার প্রার্থনা–এখানে সমস্ত দেবভাবের নিকট। অর্থাৎ তার দেবতাতে ভেদজ্ঞান অপসৃত হয়েছে। তিনি জেনেছেন-সকল দেবতাই তো ভগবানের বিভূতি। তাই সকল দেবতার কাছে তার প্রার্থনা–হে দেবগণ! হে অনন্তাংশসস্তৃত অনন্তস্বরূপ আদিত্যগণ! প্রার্থনাকারী আমাকে পরব্রহ্মে মিশ্রিত করুন। আপনাদের অনুগ্রহে আমি যেন পরব্রহ্মে মিলিত হই। আমরা এই মন্ত্রে এমনই প্রার্থনা লক্ষ্য করছি। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ অস্য দেবাঃ প্রদিশি জ্যোতিরস্তু সূর্যো অগ্নিরুত বা হিরণ্যং। সপত্না অম্মদধরে ভবন্ত্তমং নাকমধি রোহয়েমং ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হে সর্বদেবগণ (ভগবৎ-বিভূতিনিবহ)! আপনাদের অনুজ্ঞার প্রভাবে এই প্রার্থনাকারীর (আমার) হৃদয়ে দেবভাবের সঞ্চার (জ্ঞানের উন্মেষ) হোক; সর্বপ্রকাশক সূর্য, অঙ্গনাদিগুণবিশিষ্ট সর্বত্র পরিব্যাপ্ত অগ্নি এবং সুবর্ণ ইত্যাদি ঐশ্বর্য (স্নিগ্ধদ্যুতি), এই প্রার্থীকে (আমাকে) সুখ প্রদান করুন; শত্রুগণ এই অর্চনাকারীর (আমার) নিকট নিকৃষ্ট (উপক্ষীণ) হোক; এই প্রার্থনাকারীকে (আমাকে) শ্রেষ্ঠ-সুখ-স্থানে অধিরোহণ করিয়ে দিন। (সে অর্থাৎ আমি যেন, পরম সুখ প্রাপ্ত হই)। ২
মন্ত্ৰাৰ্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটি গ্রামাদি ফলের কামনায় ইন্দ্রদেব-সকলের উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত হয়েছিল, ভাষ্যাভাষে তা-ই প্রকাশ আছে। সেই অনুসারে এই মন্ত্রের সাথে পুরাবৃত্তের সম্বন্ধ আছে মনে করা যায়।–আমরা কিন্তু মন্ত্রটিকে নিত্যপ্রার্থনামূলক বলেই মনে করি। আমরা দেখছি, মন্ত্রে তিন রকম প্রার্থনা বিদ্যমান। প্রথম–প্রার্থী দেবভাবের যাচ্ঞা করছেন; বলছেন–হে দেববিভূতিনিবহ! আপনাদের জ্যোতিঃ আমার মধ্যে বিচ্ছুরিত হোক; আমি যেন দেবভাবের অধিকারী হতে পারি। জ্যোতিঃ–অর্থাৎ প্রকারান্তরে জ্ঞানোন্মেষেরই প্রার্থনা। মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে, সেই জ্যোতিঃ বা জ্ঞানোন্মেষ যে কিভাবে সংঘটিত হবে, প্রার্থীর আকাঙ্ক্ষা যে কত উচ্চ, তা-ই ব্যক্ত হচ্ছে। প্রার্থী বলছেন,–সূর্যের, অগ্নির এবং হিরণ্যের জ্যোতিঃ যেন আমাতে সমাবেশ হয়। এখানে, তিনটি শব্দে তিনরকম ভাব জ্ঞাপন করছে। সূর্যের জ্যোতিঃ আমাকে দাও,–এ রকম প্রার্থনার মর্ম এই যে,-আমি যেন আত্মজ্ঞানে পরমাত্মার স্বরূপ প্রাপ্ত হই; আমার জ্ঞানে যেন পারিপার্শ্বিক সকলেই জ্ঞানী হয়। সাধনার উচ্চস্তরে উপনীত সাধক এইভাবে নিজেও উদ্ধার পান, অপরকেও উদ্ধার করেন। অগ্নির জ্যোতিঃ চাওয়ার অর্থ হলো,-আমাতে বিস্তৃত হয়ে সে জ্ঞান–সে দেবভাবুনিবহ–সর্বত্র ওতঃপ্ৰোতঃ বিস্তৃত হোক। এই হেন উদার বিশ্বজনীন প্রেমের ভাবে অন্বিত প্রার্থনাতেও যেন তৃপ্তি হলো না। পুনরায় প্রার্থনা জানানো হলো–যেন অগ্নির জ্যোতিরূপে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকলের মধ্যে সে দেবভাব (সে জ্ঞান) বিস্তৃত হয়ে পড়ে। অবশেষে হিরণ্যং পদ। ঐ পদে প্রধানতঃ স্নিগ্ধতার ভাব মনে আসে। জ্যোতির-দীপ্তির ঔজ্জ্বল্যে, যেন নয়ন ঝলসিয়ে না যায়,–যেন হৃদয় প্রপীড়িত। না হয়। স্নিগ্ধতার সাথে-তৃপ্তির সাথে, দেবভাবের দীপ্তি যেন হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়। যেন সহনীয় মনোমদভাবে হৃদয় দেবত্বে আকৃষ্ট হতে পারে। এটাই এই প্রার্থনার মর্ম। হিরণ্যং বলতে, সুবর্ণ ইত্যাদির দ্যুতি বোঝালেও, প্রলোভনের ভাব আসে; সম্পদের ঐশ্বর্যের মত্ততা উপস্থিত হয়। যেন স্নিগ্ধতা দেখে প্রলুব্ধ হয়ে, দেবভাবের প্রতি আকৃষ্ট হয়, সে পক্ষে এটাই তাৎপর্য।-মন্ত্রের শেষাংশ-শত্রুদমনের এবং ঐহিক ও পারত্রিক পরম সুখলাভের প্রার্থনামূলক। হৃদয়ে দেবভাবের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমার রিপুকুল হীনবীর্য হোক, পরম সুখ মোক্ষধন আমার অধিগত হোক;–এটাই আকাঙ্ক্ষা। ২।
বঙ্গানুবাদ –জ্ঞানোৎপন্ন (সর্বজ্ঞ) জ্ঞানস্বরূপ হে অগ্নিদেব! যে প্রসিদ্ধ উৎকৃষ্টতম মন্ত্রশক্তির দ্বারা (জ্ঞানের দ্বারা–আহুত হয়ে) হবনীয় দ্রব্যাদি (সত্ত্বভাব ইত্যাদি) ভগবানকে প্রাপ্ত হয়, আপনি সেইরকম মন্ত্রের (জ্ঞানের) দ্বারা এই অর্চনাকারীকে ইহলোকে সমৃদ্ধিযুক্ত করুন, এবং এই প্রার্থীকে সমানজাতগণের (দেবগণের) মধ্যে শ্রেষ্ঠস্থানে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। ৩ ৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এখানে জাতবেদঃ পদের দ্বারা আমরা জ্ঞানোৎপন্ন (বেদ অর্থাৎ জ্ঞান, তা থেকে জাত অর্থাৎ উৎপন্ন) অর্থ নির্দেশ করলাম। জ্ঞান যে জ্ঞান হতেই উৎপন্ন হয়, অগ্নি যে অগ্নি হতেই সঞ্জাত হয়, তা আর বলার প্রয়োজন হয় না। জাতবেদঃ সেই জন্যই অগ্নিকে বুঝিয়ে থাকে। ব্ৰহ্মণা পদে মন্ত্রশওিপ্রভাবেন বা জ্ঞানেন অর্থ গৃহীত হয়েছে। ব্রহ্ম পদ-জ্ঞানবোধক। জ্ঞানই ব্রহ্মশ্রুতিতে আছে। তাতে ব্রহ্মণা পদের অর্থ হয়–মন্ত্রশক্তির দ্বারা বা জ্ঞানের দ্বারা। ভাব এই যে, জ্ঞানের বা মন্ত্রশক্তির সাহায্যে। পয়াংসি পদে ভাষ্যকার–ক্ষীরোজ্যাদিরূপিণী হবীংষি, লিখেছেন। আমরা তাঁরই অনুসরণে পয়স শব্দের অর্থ দ্রব্য গ্রহণ করলাম। এখানে দ্রব্যও হতে পারে; শুদ্ধ-সত্ত্বভাব বা ভক্তি অর্থও আসতে পারে। তাতে ভাব দাঁড়ায় এই যে,-মন্ত্রপূত বা জ্ঞানসহযুত যে পয়ঃ (শুদ্ধ-সত্ত্বভাব, ভক্তি ইত্যাদি ইবনীয়)। সুজাতানাং পদে ভাষ্যকার, ভাবে জ্ঞাতিগণের অর্থ এনেছেন। তাতে প্রার্থনা দাঁড়িয়েছে, আপনারা, এই উপাসককে তার জ্ঞাতিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠপদ প্রদান করুন। এ ভাবের এমন অর্থ, রাজার নিকট বা কোনও প্রধান ব্যক্তির নিকট প্রার্থনায় প্রকাশ পেতে পারে। কিন্তু ভগবানের দ্বারে দণ্ডায়মান সাধকের প্রার্থনায়, এমন উক্তি কখনও সঙ্গত নয়। সাধনাক্ষেত্রে জ্ঞাতির মধ্যে বড় হবার কামনা কে করে? আমরা সে। ভাব গ্রহণ করলাম না। সজাতানাং পদকে আমরা এখানে দেব-ভাবের দ্যোতক বলে মনে করি। এখানকার ভাব এই যে, অগ্নিদেবকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,–আপনার সহজাতদের মধ্যে। অগ্নির (জ্ঞানের) সহজাত বলতে দেবভাবকেই বুঝিয়ে থাকে ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে জনস্বরূপ অগ্নিদেব! বিঘ্ননাশ-ইষ্টপ্রাপ্তি-সম্বন্ধীয় সৎ-অনুষ্ঠানে, আপনার অনুগ্রহপ্রার্থী আমি, ব্রতী হয়েছি, আমার তেজের এবং ধনের (পরমার্থের) পুষ্টি এবং চিত্তের সৎ-ভাববিধান আপনি করুন; শত্রুগণ এই অর্চনাকারীর নিকট নিকৃষ্ট (উপক্ষীণ) হোক; এই প্রার্থনাকারীকে শ্রেষ্ঠ সুখস্থানে অধিরোহণ করিয়ে দিন (আপনার কৃপায় সে যেন পরম সুখ প্রাপ্ত হয়। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মন্ত্রটিকে আমরা চার অংশে বিভক্ত করেছি। প্রথম অংশে (অগ্নে থেকে আ দদে অংশে) অর্চনাকারী নিজেকে সৎকর্ম সৎ-অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত করছেন। দ্বিতীয় অংশে (উত থেকে চিত্তানি মহ্যং বিধেহি অংশে) তাঁর প্রার্থনা–তেজের পুষ্টি; তিনি চাইছেন–চিত্তে সৎ-ভাবের সমাবেশ হোক। তার পরের প্রার্থনা–পূর্বের (দ্বিতীয় মন্ত্রের মতো) শত্রুদমন এবং শ্রেষ্ঠ সুখ প্রাপ্তির কামনা সেখানে প্রকাশ পেয়েছে। ৪।
বঙ্গানুবাদ —দেবগণের মধ্যে পাপীর (অসতের) দণ্ডদাতা এই বরুণদেব, বিশেষভাবে প্রকাশমান আছেন; কেননা, সত্যভাব রাজা বরুণেরই বশে আছে। সেই কারণে, সর্বতোভাবে সত্যজ্ঞানের দ্বারা বলীয়ান হয়ে, আমি সেই কঠোরশাসক বরুণ-দেবের ক্রোধ হতে এই জীবনকে পরিত্রাণ করছি। ১
মন্ত্রাৰ্থ আলোচনা –এই সূক্তের মন্ত্র-কয়েকটির যে প্রয়োগ-বিধি আছে, তাতে বোঝা যায়, জলোদর-রোগ-নিবৃত্তির পক্ষে এই মন্ত্র কয়েকটি অব্যর্থ ফল প্রদান করে। এই মন্ত্র উচ্চারণ-পূর্বক ঘটস্থিত জলকে গৃহতৃণদর্ভপিঞ্জলীর দ্বারা (শান্তিজল) রোগীর গাত্রে প্রক্ষেপ করতে হয়। তাতেই রোগমুক্ত হওয়া যায়।ভাষ্যে প্রকাশ, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণের মধ্যে বরুণদেবই কঠোর শাসক (অসুর)। (এখানে অসুর পদ পাপীদের শাসনকর্তা–প্রকারান্তরে দেবতা অর্থেই প্রযুক্ত হয়েছে। ঋগ্বেদেও আমরা দেখেছি, অসুর শব্দে কোথাও দেবতা অর্থে এবং কোথাও বা যারা সুর নয় অর্থাৎ দৈত্য অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে)।
তিনি সত্য ভাষণশীল এবং সত্যবস্তু থেকেই তার উৎপত্তি। অথবা, সত্য তার বশে আছে। বরুণ-বিষয়ক এই মন্ত্রের দ্বারা তার আরাধনা করলে, তিনি সন্তুষ্ট হন। তখন তার অনুগ্রহে শক্তি-সামর্থ্য পাওয়া যায়। আর, তার ফলে, পরম উগ্র সেই বরুণদেবের ক্রোধ থেকে মুক্তিলাভ হয়। জলোদরগ্রস্ত রোগী, জলোদর রোগ থেকে মুক্তি লাভ করে। আমি জলোদরগ্রস্ত রোগী, আমি রোগশান্তির জন্য, এই মন্ত্রে বরুণদেবের উপাসনা করছি।–ভাষ্যে মন্ত্রের এমন অর্থই প্রকাশমান আছে। আমরা যে দৃষ্টিতে দেখছি, তাতে বলি-মন্ত্রের অর্থে কেবল যে জলোদরগ্রস্ত রোগীর রোগ-শান্তির প্রার্থনা মাত্র প্রকাশ পেয়েছে, তা নয়। পরন্তু এ মন্ত্রে সংসার-তাপগ্রস্ত জন, শান্তিধামে উপনীত হবার প্রার্থনা করছে,–সাধারণতঃ এই ভাবই প্রকাশ পেয়েছে। …আমরা বলি ইমং পদ এই জীবনকে বোঝাচ্ছে, এবং উন্নয়ামি পদে উগমনের ভাব এসেছে। বরুণদেবের উপাসনায়, তার আদর্শে সত্যপর হয়ে, আমরা যেন আমাদের জীবনকে ঊর্ধ্বদেশে ভগবৎসকাশে নিয়ে যাই–প্রার্থনায় এই ভাবই প্রকাশ পেয়েছে। অসৎকে পাপীকে বরুণদেব দণ্ডদান করেন, বরুণের পাশে আবদ্ধ হয়ে পাপী নির্যাতনগ্রস্ত হয়। আমরা যেন সৎ হই, তাতে তার তৃপ্তি আসবে, আমরা শান্তিধামে উপনীত হবে।
এটাই এ প্রার্থনার সাধারণ মর্মার্থ। জলোদররোগগ্রস্তের রোগশান্তির পক্ষেও এ মন্ত্রের প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়; পরন্তু, ভবব্যাধি নাশের পক্ষেও এ মন্ত্রের উপযোগিতা উপলব্ধ হয়। ১।
বঙ্গানুবাদ— পাপীগণের দণ্ডদাতা হে দ্যোতমান বরুণদেব! (আমাদের পাপকর্মজনিত) আপনার ক্রোধ শান্তি হোক। হে কঠোর-শাসক দেব! সকল প্রাণিকৃত অপরাধ আপনি অবগত আছেন। তথাপি, হয় তো আপনার অপরিজ্ঞাত আছে–আমার এমন সকল সহস্র সহস্র অপরাধ সহ, আমি সর্বতোভাবে আপনার শরণাগত হচ্ছি। এই পাপনিপীড়িত জন, আপনার অনুগ্রহে (পাপক্ষালনের উদ্দেশে সৎ-কর্মের অনুষ্ঠানের নিমিত্ত) শত সংবৎসর জীবিত থাকুক–এই প্রার্থনা ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যাভাষে বোঝা যায়, এ মন্ত্রটি যেন জলোদরগ্রস্ত রোগীর প্রতিনিধিস্বরূপ পুরোহিত উচ্চারণ করছেন। তিনি বলছেন,-হে দেব! আপনার ক্রোধকে নমস্কার। সকলের পাপের সমাচার আপনি অবগত আছেন। তা জানার কারণেই সকলের প্রতি আপনার অশেষ ক্রোধ সঞ্জাত হয়। যাই হোক, আপনার সেই ক্রোধের শান্তির জন্য সহস্র পাপকর্মপরায়ণ জনগণের পক্ষ হয়ে, তাদের প্রতিনিধিস্বরূপ আমি প্রার্থনা করছি যে, এই ব্যাধি-পীড়িত জনকে নীরোগ করুন এবং শতবর্ষ পরমায়ু দান করুন।–শান্তিস্বস্ত্যয়ন-কর্মে জলোদরগ্রস্ত রোগীর রোগ-উপশমের উদ্দেশে যখন এই মন্ত্র প্রযুক্ত হয়, তখন এই অর্থে এই ভাবেই এর প্রয়োগ সঙ্গত বলে মনে করতে পারি। কিন্তু আমরা মনে করি, এ মন্ত্রটি সাধারণ, ভবব্যাধিগ্রস্তের পক্ষেও প্রযুক্ত হতে পারে। আমরা মন্ত্রের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশের অর্থ প্রায়ই ভাষ্যানুমত রেখেছি। তৃতীয় অংশে (তথাপি অন্যান্ থেকে জীবাতি অংশে) দুটি ভাব আমনন করে এনেছি। আমরা মনে করি এখানে অন্যান্ পদে প্রার্থীর মনে আত্মকৃত অপরের অপরিজ্ঞাতনানা পাপকর্মের বিষয় উদয় হয়েছে। তিনি যেন আত্মগ্লানিতে জরজর হয়ে বলছেন–হে দেব! সকল পাপ আপনার জানা আছে সত্য; কিন্তু আমি এত পাপ করেছি যে, তার অনেকগুলি হয় তো আপনার অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। আমার মনের অগোচরে তো পাপ নেই। তাই অতি সঙ্কোচে আমি আপনার শরণ গ্রহণ করছি। আপনার জ্ঞাত ও অজ্ঞাত আমার যত পাপ আছে, সেই সকল পাপ বিমোচনের আপনি উপায় বিধান করুন।–এইরকম অয়ং পদের পর পাপক্ষালনার্থং সৎকর্মানুষ্ঠানকরণায় বাক্যাংশও ঐ অর্থেরই সম্যক্ সঙ্গতি রক্ষার পক্ষে অধ্যাহার করতে হয়েছে। শত শরৎ অর্থাৎ শত বৎসর পরমায়ু দাও-এ প্রার্থনা সাধারণ নিম্নশ্রেণীর প্রার্থীর উপযোগী হতে পারে; কিন্তু উচ্চস্তরের সাধক কেবল বাঁচতে চান না। তারা সৎকর্মের অনুষ্ঠানে পাপক্ষয়কারী জীবনেরই প্রার্থী হন।
সুতরাং আমরা মনে করি-হে ভগবন্! যাতে আমার পাপের ক্ষয় হয়, চরমে আমি পরম আনন্দলাভ করতে সমর্থ হই, দয়া করে তারই উপায় বিহিত করুন।-এটাই এ মন্ত্রের মর্মার্থ। ২
তৃতীয় মন্ত্রঃ যদুবথামৃতং জিহুয়া বৃজিনং বহু। রাজ্ঞা সত্যধর্মণো মূঞ্চামি বরুণাদহং। ৩
বঙ্গানুবাদ— বাক্যের দ্বারা যে-কিছু অসত্য উক্ত হয়ে থাকে, তাতে অধিক পাপ সঞ্জাত হয়। সত্যধর্মপালনশীল, (দণ্ডদানের) বিধানকর্তা পাশবদ্ধকারী যেই বরুণদেব হতে, হে আমার জীবন! তোমাকে আমি (আমার কর্মের প্রভাবে) মুক্ত করছি। (ভাবার্থ,অনৃতই পাপের মূলীভূত। পাপ হতে অশেষ ক্লেশ উৎপন্ন হয়। সেই পাপ বিনাশের নিমিত্ত আমি সত্যরক্ষক ভগবানের অনুসরণ করছি)। ৩।
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা— আমরা মনে করি, জলোদরগ্রস্ত রোগীর রোগ-নিরাময়ের জন্য প্রযুক্ত হলেও এই মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক। সাধক এখানে সঙ্কল্প করছেন,–জীবন! তুমি পাপের পাশে আবদ্ধ হয়েছ; আমি তোমায় মুক্ত করছি–এই সঙ্কল্প করলাম। কিভাবে মুক্ত করব? বরুণদেবের আদর্শের অনুসরণ করে। তিনি সত্য-সংরক্ষক; তিনি সত্যের পালক। আমি যদি সত্যপর হতে পারি, তিনি অবশ্যই আমায় রক্ষা করবেন,অবশ্যই আমার পাপ মোচন হবে। আমি সত্যপর হবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সুতরাং আমার জীবনের বন্ধনমোচনেও আর সংশয়ের কারণ নেই।
পাপের ভার লাঘব করবার পক্ষে, পাপের পাশ ছিন্ন করবার সম্বন্ধে, সত্যভাষণ-সত্যের অনুসরণ–একমাত্র উপায়। এই মন্ত্র সেই শিক্ষাই দিচ্ছেন। মন্ত্রের বক্তব্য যত রোগের মূল-অসত্যকথন; অসত্য পরিবর্জন করো, সত্যে একনিষ্ঠ হও, তোমার সকল সন্তাপ ও দূরীভূত হবে।–তবে ভায্যের ভাব–অবশ্যই একটু স্বতন্ত্র প্রকারের। ভাষ্যকার বলেন,-এ মন্ত্র জলোদরগ্রস্ত রোগীকে সম্বোধন করে প্রযুক্ত হয়। তাতে পুরোহিত যেন বলেন,-তুমি মিথ্যাকথনের ফলস্বরূপ জলোদর-রোগগ্রস্ত হয়েছ। আমি বরুণদেবের প্রসাদে মন্ত্র শক্তির দ্বারা তোমায় রোগমুক্ত করছি। মিথ্যাকথনের ফলে জলোদর রোগের সঞ্চার হয়। এই মন্ত্র উচ্চারণ করলে, শান্তিকর্মের ফলে, সেই রোগ নাশ পায়। এটাই এ মন্ত্রের ভাষ্যের ভাব। ৩।
চতুর্থ মন্ত্রঃ মুঞ্চামি হৃা বৈশ্বানরাদণবান্মহতস্পরি। সজাতানুগ্ৰহা বদ ব্ৰহ্ম চাপ চিকীহি নঃ ॥ ৪
বঙ্গানুবাদ –হে আমার জীবন! তোমাকে অগ্নিদেবের কোপ হতে (জ্বলন-জ্বালা হতে) এবং জলাধিপতির ভীষণ কোপ হতে (জলসম্বন্ধি ভীষণ ব্যাধি হতে) আমার কর্মপ্রভাবের দ্বারা সর্বতোভাবে মুক্ত করছি (অথবা, হে আমার জীবন! বিশ্বহিতসাধক কর্মের দ্বারা তোমাকে সেই ভীষণ সংসার-সমুদ্র হতে সর্বতোভাবে উত্তীর্ণ করছি)। হে দুর্দমনীয় (বিচঞ্চল)! তুমি তোমার কর্মসম্বন্ধ হতে তোমার সহচর অসৎপ্রবৃত্তিদাতাগণকে সর্বতোভাবে অপসারণ করো; মন্ত্ররূপ স্তুতি সর্বতোভাবে উচ্চারণ করো এবং ব্রহ্মকে অবগত হও। (মন্ত্রটিতে পাপক্ষালনের জন্য উদ্বোধন প্রকাশ পাচ্ছে।
পাপমোচনের, সঙ্কল্পও এতে পরিদৃষ্ট হয়। ব্ৰহ্মকে অনুধ্যান করে অসপ্রবৃত্তি বিনাশ করো এবং তার দ্বারা, সকল যন্ত্রণা বিদূরিত হোকমন্ত্রে এই ভাব প্রকাশিত হয়েছে)। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— জলোদরগ্রস্ত রোগীর রোগমুক্তির জন্য এইটি চতুর্থ মন্ত্র। মিথ্যাকথনজনিত পাপে জলোদর রোগ উৎপন্ন হয়। মিথ্যাকে পরিত্যাগ করে, সত্যের অনুসারী হয়ে, এই মন্ত্রের ক্রিয়ার দ্বারা সুফল প্রাপ্ত হওয়া যায়। রক্তহীনতায় জলসঞ্চয়ে যে সকল রোগী নিত্য নিত্য কালের কবলে পতিত হচ্ছে, তারা বিধিপূর্বক এই সূক্তের মন্ত্র-কয়টি প্রয়োগ করে সাফল্য লাভ করুন।-ভাষ্যের মত এই যে, মন্ত্রের প্রথমাংশে জলোরগ্রস্ত রোগীকে এবং শেষাংশে বরুণদেবকে সম্বোধন করা হয়েছে। প্রথমাংশে রোগীকে সম্বোধনপূর্বক বলা হচ্ছে,-হে রোগগ্রস্ত!
তোমাকে সেই বিশ্বনরহিতকারী ভীষণ সমুদ্র হতে অর্থাৎ জলাভিমানী দেবতার কোপ হতে (জলোদর রোগ হতে) মুক্ত করছি। দুশ্চিকিৎস্য যে জলরোগ, এই মন্ত্রের প্রভাবে, তা হলে তুমি মুক্তি পাও। এইরকম, মন্ত্রের শেষাংশে বরুণ দেবতাকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,–হে উগ্র! আপনিও আপনার সহকারীগণকে এই পুরুষের বিষয়ে বলুন। তাঁরা আগত হয়ে আর যেন এই পুরুষকে পীড়ন না করেন, তা সর্বতোভাবে বলে দিন। আমাদের অন্নরূপ হবিঃ বা স্তুতির দ্বারা অপরাধ বিস্মৃত হোন এবং আমাদের জ্ঞাত হোন।–মন্ত্রের প্রয়োগ-সম্বন্ধে এবং মন্ত্রের রোগনাশিকা শক্তির বিষয়ে আমাদের কোনই মতান্তর নেই। আমাদের বক্তব্য, মন্ত্রের ভাব-বিষয়ে। আমরা মনে করি, মন্ত্রটি সর্বথা আত্ম-উদ্বোধন-মূলক। ভাষ্যকার বলেছেন,-মন্ত্রের প্রথমাংশে জরাগ্রস্তকে এবং শেষাংশে উগ্রমূর্তি বরুণদেবকে সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু আমরা বলি, মন্ত্রের দুটি অংশেই আপন জীবনের উদ্দেশে সম্বোধন আছে। জীবন (মন বলতেও পারা যায়) দুর্দমনীয় বিচঞ্চল যথেচ্ছকর্মকারী; তাই উগ্র পদ প্রযুক্ত দেখি। জীবনের সহচর–অসৎপ্রবৃত্তিনিচয়। তাই সজাতান পদের প্রয়োগ আছে। মন্ত্রের উপদেশ, তাদের দূরীকৃত করে, মন্ত্রের দ্বারা-উপাসনার দ্বারা-ব্রহ্মকে অবগত হও। সেই তোমার প্রকৃত কর্ম।
সেই কর্মের প্রভাবেই তুমি পাপের কবল থেকে মুক্তি পেতে পারো। মিথ্যাচারিতার দরুণ রোগসঞ্চার হয়। সকল রোগের মধ্যে নিদারুণ জলরোগ–রক্তশূন্যতা। সেই রোগ দূর হয় কিসে? সে রোগের সে যন্ত্রণার উপশম হয় কিভাবে? মন্ত্রে সেই উপদেশ প্রদত্ত হয়েছে ॥ ৪
বঙ্গানুবাদ –হে প্রাণিসমূহের পোষণকারী (পূষা) দেবতা! আপনার প্রীতিসাধনের নিমিত্ত দেবগণের আহ্বাতা এই উপাসক, সেই প্রাণিসমূহের প্রেরক (অর্যমা দেবতা) এবং জগতের নির্মাতা বিধাতা (বেধাঃ দেবতা) যে দেবতা আছেন, তাঁদের প্রতি চিত্ত ন্যস্ত করে, ইহজগতের পুনর্জন্মের নিবৃত্তির বিষয়ে, কল্যাণপ্রদ বষট্র মন্ত্র উচ্চারণের দ্বারা, আপনার উদ্দেশে ভক্তিরূপ হবিঃ অর্পণ করছে। গর্ভিণী নারী যেমন সন্তানবতী হয়ে প্রসবজনিত ক্লেশ হতে বিমুক্ত হন, সেইরকম পুনর্জন্মের নিবৃত্তি-বিষয়ে মায়ামোহরূপ বন্ধনসমূহ হতে (আপনার কৃপায়) জগতের সকলে মুক্তিলাভ করুক। (মন্ত্রে দুরকম ভাব প্রকটিত। একরকম অর্থে ভগবৎ-অর্চনাপরায়ণ হয়ে ঋত্বিক গর্ভযন্ত্রণা-মোচনের প্রার্থনা করছেন; অন্য অর্থে, জন্মগতি রোধের নিমিত্ত সাধকের ব্যাকুলতা প্রকাশ পাচ্ছে)। ১
মন্ত্ৰাৰ্থ আলোচনা –এই মন্ত্র এবং এই সূক্তের অন্তর্গত এর পরবর্তী কয়েকটি মন্ত্র–সুপ্রসব কার্যে ব্যবহৃত হয়। গর্ভিণী গর্ভ যন্ত্রণায় দারুন কষ্ট পাচ্ছেন, সেই সময় যথাবিধি দেবপূজনের পর এই সূক্তের মন্ত্র কয়েকটি উচ্চারণ-পূর্বক শান্তিজল গ্রহণ করণীয়। গর্ভিণীর মস্তক হুতোষ্ণ শান্তিজলে সিক্ত করে মন্ত্রোচ্চারণ করলে, তৎক্ষণাৎ সুপ্রসব-সুখে সন্তানজনন কার্য সাধিত হয়ে থাকে। এ পক্ষে এই মন্ত্রসম্বন্ধে ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা এইরকম; যথা,-হে সকল প্রাণিজাতের.পোষক দেব! দেবগণের আহ্বানকারী ঋত্বিক, প্রাণিসমূহের প্রেরক অর্যমা-নামক দেবতার (আদিত্যের) প্রতি একাত্ম হয়ে বষ মন্ত্রের দ্বারা হবিঃ অর্পণ করছে এবং সকল জগতের নির্মাতা বেধাঃ দেবতার সাথে ধ্যান-বিশেষের দ্বারা একাত্মভূত হয়ে বষট মন্ত্রে হবিঃ দান করছে।
সেই হবিঃ গ্রহণপূর্বক তুমি তুষ্ট হও। তার পুণ্যফলে এই গর্ভিণী স্ত্রী, সন্তান-প্রসব করে, প্রসবজনিত ক্লেশ হতে বিমুক্ত হোক,–অক্লেশে সে প্রসব করুক। আর তার সুখপ্রসবের জন্য তার প্রসব-নিরোধক সন্ধিবন্ধনগুলি দূর হোক, অর্থাৎ বিশ্লথ হয়ে আসুক।–ভাষ্যের অর্থই প্রচলিত; এবং সে অর্থ যে অসঙ্গত, তা আমরা বলছি না। তবে, আমাদের মত এই যে, কেবল সুপ্রসবের জন্য কেন, এই মন্ত্র ভববন্ধন-মোচনের জন্যও প্রযুক্ত হতে পারে। কেবল নারীর সম্বন্ধেই বা কেন, নরনারী সকলের সম্বন্ধেই এ মন্ত্রের সার্থকতা লক্ষ্য করি। মন্ত্রের দু একটি পদের অর্থ-বিষয়ে একটু অনুধাবন করলেই, তাতে এক সৎ-ভাবপূর্ণ বিশ্বজনীন ভাব প্রাপ্ত হওয়া যায়। মূলের সুতৌ ও সুতবে পদের অর্থ হৃদয়ঙ্গম হলেই মন্ত্রের ভাব পরিস্ফুট হয়। ভাষ্যকার, সুতৌ পদের প্রতিবাক্য লিখেছেন –সুখপ্রসব কর্মাণি। আমরা প্রতিবাক্যে বলছি–জন্মকর্মবিষয়ে, পুনর্জন্মনিবৃত্তৌ। সুতবে পদে ভাষ্যকার লিখেছেন-সুখপ্রসবার্থং; আমরা বলি–পুনর্জন্মনিবৃত্তিবিষয়ে।–মূলের একটি বাক্যহোতা বষট্ কৃণোতু।
একভাবে তার অর্থ দাঁড়িয়েছে-হোতা সুপ্রসবের জন্য বষট্র মন্ত্র উচ্চারণে হবিঃ অর্পণ করছেন; অন্যভাবে অর্থ দাঁড়াচ্ছে হোতা পুনর্জন্ম-নিবৃত্তি-বিষয়ে বষট মন্ত্র উচ্চারণে হবিঃ অর্পণ করছেন। এক ভাবে গর্ভিণী যাতে বিনাক্লেশে সন্তান প্রসব করে–এই প্রার্থনা। অন্যভাবে–আমার যেন জন্মগতি রোধ হয়। আর যেন আমায় গর্ভযন্ত্রণা ভোগ করতে না হয়।–-হোতা যখন অর্যমার ভাবে ভাবুক হতে পারেন, হোতা যখন ধাতার (বেধাঃ) ধ্যানে আত্ম-সম্মিলনে সমর্থ হন, কল্যাণপ্রদ বষট্র মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভক্তিরূপ হবিঃ যখন প্রাণিসমূহের পোষণকারী দেবতার উদ্দেশে সমর্পিত হয়ে থাকে; তখনকার প্রার্থনায় সুপ্রসবের কামনা তুচ্ছাদপি তুচ্ছ কামনা; সে কামনায়, সে প্রার্থনায়, পরম ধনই–জন্মগতি রোধরূপ মোক্ষ ধনই–প্রাপ্ত হওয়া যায়–সে পক্ষে মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে একটি উপমার ভাব প্রকাশ পেয়েছে বলে আমরা মনে করি। এ সংসারে গর্ভ-যন্ত্রণাকে একটি বিষম যন্ত্রণা বলে চিহ্নিত করা হয়। গ্রন্থিবন্ধন (পবাণি) সে যন্ত্রণার প্রধান কারণ। সে বন্ধন বিশ্লথ হলে, প্রসব সুখদ হয়ে আসে। গর্ভ যেমন, ক্লেশের কারণ, জন্ম তেমনই দুঃখের কারণ। গর্ভের যেমন গ্রন্থিবন্ধন ক্লেশ-প্রদায়ক, পুনর্জন্মের নিবৃত্তির বিষয়ে সেইরকম মায়ামোহরূপ বন্ধন সকলই অশেষ ক্লেশের কারণ।
জন্ম হলেই জরা-মৃত্যু এসে কষ্ট দেবে; এই জন্মই আমাকে পুনর্জন্ম গ্রহণের চক্রে নিষ্পেষিত করবার জন্য আবদ্ধ করবে। স্নেহের বন্ধন, মমতার বন্ধন, মায়ার বন্ধন, মোহের বন্ধন–আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। আমি পরিত্রাণ পাবো কি করে? এখানকার তাই প্রার্থনা–হে প্রাণিসমূহের পোষণকারী পূষাদেবতা! আপনার তৃপ্তির জন্য হোতা আমি দেবভাবের আহ্বানকারী আমি, আপনার অর্চনা করছি। আপনাকে অর্চনা করবার সঙ্গে সঙ্গে, আমি আমার প্রেরক দেবতার শরণাপন্ন হয়েছি, আমি আমার নির্মাতা বা ধারক দেবতার শরণাপন্ন হয়েছি। অর্থাৎ, এখন তাদের জানাচ্ছি, তারা যেন আর আমাকে ইহসংসারে প্রেরণ না করেন, তারা যেন আর আমাকে নির্মাণ বা ধারণ না করেন। তাদের অনুধ্যান করার এটাই আমার লক্ষ্য। ইত্যাদি।-মন্ত্র সুপ্রসবের জন্যও প্রযুক্ত হোক; আবার নিজের গতি মুক্তির জন্যও প্রযুক্ত হোক। এটাই আমাদের আকাঙ্ক্ষা ॥ ১.
বঙ্গানুবাদ –দ্যুলোকের এবং ভূলোকের যে চারটি দিক্ এবং চারটি বিদিক্ আছে, সেই সকল দিকের দেবগণ (দেবভাবসমূহ), জন্মগ্রহণের মূল গর্ভকে (সংযত) করুন; পুনর্জন্মের নিবৃত্তির বিষয়ে সেই দেবগণ, গর্ভকে (জীবকে) বিমুক্ত করুন। (ভাবার্থ, বিভিন্ন দিকে অবস্থিত দেবগণ মুক্তিমার্গে সহায় হোন। তারা সকলে জন্মগতি রোধ করে দিন)। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যানুসারে এ মন্ত্রের প্রচলিত ভাব এই যে,দ্যুলোক-সম্বন্ধী চারটি (প্রাচী ও ইত্যাদি) প্রধান দিক আছে। এবং ভূলোকেরও ঐ রকম চারটি প্রধান দিক আছে। সেই সকল দিকের পর অধিপতি ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ পূর্বে যে গর্ভ সঙ্গত করেছেন, অর্থাৎ যে গর্ভের উৎপত্তি তাদের দ্বারা সাধিত হয়েছে, অধুনা সেই দেবগণ প্রসবের নিমিত্ত সেই গর্ভাশয়ের জ্বণকে বহির্গত করে দিন, গর্ভ বিগতাচ্ছাদন হোক,-জরায়ুর বাধা অপসারিত হোক। সুপ্রসবের পক্ষে মন্ত্র এই অর্থেই প্রযুক্ত হয়ে থাকে।–এই অর্থ এক পক্ষে অসঙ্গত নয়। পক্ষান্তরে মন্ত্র থেকে মুক্তির কামনাও প্রকাশ পায়। তার মর্ম এই যে, সকল দিকের সকল দেবভাব এসে জন্মগ্রহণমূলকে সঙ্গত করুন; আর পুনর্জন্মনিবৃত্তি বিষয়ে বাধা অপসৃত হোক, হৃদয়ে দেবভাবসমূহ জাগরূক হলে, পুনর্জন্মগ্রহণের পথ ক্রমশঃ রুদ্ধ হতে থাকে; –জন্মগতিরোধের পক্ষে যে, সকল বাধা ছিল, সেগুলি সবই একে একে দূর হতে থাকে। এপক্ষে, এখানে সেই প্রার্থনাই প্রকাশ পেয়েছে। বলে আমরা মনে করি। ২৷৷
বঙ্গানুবাদ— জ্ঞানদাত্রী (সূষা) দেবতা অজ্ঞানাবরণ অপসারণ করুন; হে দেবতে! আপনি (আমার) উৎপত্তিমূলকে বিশেষ ভাবে মুক্ত করুন (প্রার্থনা–আমার কর্মের দ্বারা আমার উৎপত্তিমূল যেন আর দৃষ্ট না হয়); হে উদ্ধারকারিণি (মুক্তিপ্রদায়িনি) দেবতে! আপনি, আমার সন্ধিবন্ধনসমূহকে বিমুক্ত করুন (যেন আমার বন্ধন দিন দিন শ্লথ হয়ে আসে); হে কালরূপিণি দেবতে! আপনি, আমাকে আপনাতে লীন করুন। (আমি যেন আপনার সাথে মিলিত হই)। (মন্ত্রের এক অর্থ সুপ্রসবমূলক। অপর অর্থে পরিত্রাণ লাভের প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে) ॥ ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এ মন্ত্রটি সুপ্রসব-সংক্রান্ত তৃতীয় মন্ত্র। গর্ভিণীর প্রতি লক্ষ্য করে, মন্ত্রে সূ প্রভৃতি দেবতার নিকট সুপ্রসবের প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হচ্ছে। এই লক্ষ্যে ভাষ্যে যে অর্থ হয়, তার মর্মসূষা দেবতা গর্ভের জরায়ুবন্ধন শ্লথ করুন, তার আবরণ বা বাধা দূর হোক। গর্ভিণীর সুপ্রসবের জন্য (গর্ভস্থ শিশু যাতে সুখে নির্গত হয়, সেই অভিপ্রায়ে) আমরা গর্ভ-নির্গম-মার্গকে বিস্তৃত করি। হে সূষণে দেবতে! সুখপ্রসব নিমিওক আমাদের এই কর্মের দ্বারা প্রীত হয়ে যোনিদ্বার বিশ্লথ করো,-গর্ভিণীর সন্ধিবন্ধন মোচন হোক। হে দেবি বিষ্কলে (কালস্বরূপিণি দেবতে)! আপনি গর্ভস্থ জীবকে অবাঙমুখি (অধোভাগে মুখ রেখে) প্রেরণ করুন।
–কেবল গর্ভিণীর গর্ভযন্ত্রণা লাঘবের প্রতি বা সুপ্রসবের প্রতি লক্ষ্য রেখে মন্ত্র উচ্চারিত হলে, ঐ অর্থই গৃহীত হয়–হোক। তবে এই সকল মন্ত্রের মধ্যে আমরা অপর তত্ত্বের সন্ধান করি। আমরা মনে করি, এ সকল মন্ত্রের প্রয়োগ সকলের পক্ষে সমভাবে হতে পারে। গর্ভযন্ত্রণা কেবল যে গর্ভিণী নারীই ভোগ করছে, তা নয়। জীবমাত্রকেই সে রকম যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে।….আমরা মনে করি, সেই সকল যন্ত্রণা থেকে মুক্তির প্রার্থনাই এখানে প্রকাশ পেয়েছে।–প্রথম, দেবতাকে সূষা বলে অভিহিত করা হয়েছে। সূষণে বিষ্কলে রূপে তার সম্বোধন আছে। সূষা, সূষণে ও বিষ্কলে পদ তিনটির অর্থ-বিষয়ে ভাষ্যকার বিস্তর গবেষণা প্রকাশ করেছেন। আমরা সূষা পদে জ্ঞানদাত্রী অর্থ গ্রহণ করি। আবার সু-উষা এমন বিশ্লেষণেও এই ভাবই অধ্যাহৃত হয়। উষা জ্ঞান-প্রকাশিকা দেবতা। সুষণে সম্বোধন পদেও ঐ ভাবেরই প্রকাশ রয়েছে। জ্ঞানদাত্রী দেবীকে তাই উদ্ধারকারিণী বলা হয়েছে। সুপ্রসব পক্ষেও উদ্ধার করার : ভাব আসে; আবার মুক্তির পক্ষেও সেই ভাবই ব্যক্ত করে। বিষ্কলে পদের ধাতুগত অর্থে ব্যাপ্তি ও কাল একা বুঝিয়ে থাকে। তা থেকেই দেবতাকে কালস্বরূপিণী বলে প্রখ্যাত করেছি; ইত্যাদি।–মূলে আছে–ত্বং অব সৃজ।
ভাষ্যকার বলেছেন-গর্ভং অবাঙমুখে প্রেরয়-গর্ভকে নীচুমুখ করে অবস্থিত করো। প্রত্নতত্ত্ব এখানে আর্যগণের এক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সন্ধান পাবেন; অর্থাৎ প্রসবের সময় সন্তানের মুখ নিম্নভাগে অবস্থিত হলে সুপ্রসব হয়–এ বিষয় তাদের জানা ছিল, বলতে পারবেন। অব পদ রক্ষাৰ্থ অ ধাতু থেকে উৎপন্ন। সেই রক্ষার ভাব নিয়েই ভাষ্যকার অব সৃজ বাক্যের অর্থে মুখ নীচু দিকে হোক—এই ভাব গ্রহণ করেছেন; কিন্তু, এখানেও মুখ্য লক্ষ্য সেই রক্ষা। কেননা, তাহলেই সন্তান রক্ষাপ্রাপ্ত হবে, আমরা এখানে সেই রক্ষার অর্থ অন্যভাবে গ্রহণ করলাম। দেবতাকে কালস্বরূপিণী বলা হয়েছে। তার নিকট প্রার্থনা করা হচ্ছে,-অব সৃজ অর্থাৎ আমায় এমনভাবে সৃষ্টি করুন, যেন আমি রক্ষা প্রাপ্ত হই। আমার রক্ষা কি? কালস্বরূপ দেবতায় লীন হওয়াই-ভগবানে আশ্রয় পাওয়াই আমার রক্ষা। আমরা তাই অর্থ করেছি–হে কালস্বরূপিণী দেবতে! ত্বং মাং তয়ি লীনং কুরু। এই প্রার্থনাই রক্ষার প্রার্থনা। হে ভগবন্! আপনি আমাকে আপনাতে লীন করে নিন,–এটাই তো চরম প্রার্থনা ॥ ৩
বঙ্গানুবাদ— হে পরিত্রাণপ্রার্থী! শরীরগত মাংসের প্রতি তুমি কখনও পিপাসিত (আকাক্ষিত) হয়ো না; মজ্জার সাথেও তুমি কখনও আবদ্ধ হয়ো না; (ভাব এই যে, অস্থি-মাংস-মেদ-মজ্জাযুত দেহের প্রতি যেন তোমার কামনা না থাকে)। জলের উপরিস্থিত শৈবালের ন্যায় এই সংসারের সম্বন্ধ মনে করে, হৃদয়ে জ্ঞানকিরণ ধারণ করো; (ভাব এই যে, নির্লিপ্তভাবে সংসারে বিচরণ করে, ভগবানের কর্ম করে যাও)। হে গতাগতিশীল! তোমার জন্ম-সম্বন্ধ (গতাগতি) নাশের জন্য তোমার জীবসম্বন্ধকে (জীবনকে) সেই রক্ষকসকাশে প্রেরণ করো (এ জীবন যাঁর তে এসেছে, তাতেই গিয়ে পুনর্মিলিত হোক–এমন ভাবে তাতে আত্মসমর্পণ করো)। (ভাবার্থ,-হে পরিত্রাণপ্রার্থী! পুনর্জন্ম-গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা পরিহার করো। ভগবানে আত্মসমর্পণ করো। মন্ত্রে এই রকমই আত্ম-উদ্বোধনের ভাব প্রকাশ পেয়েছে)। ৪।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –সমস্যাপূর্ণ মন্ত্রের সমস্যাপূর্ণ অর্থ আমনন করা হলো। এ মন্ত্রটি সুপ্রসব সংক্রান্ত চতুর্থ মন্ত্র। কিন্তু আমাদের অর্থে দাঁড়াচ্ছে,-মন্ত্রটি ভগবানে আত্মলীন হওয়ার পক্ষে আত্ম-উদ্বোধন মূলক।–ভাষ্যকারের অর্থের উপর আমাদের এই অর্থান্তরকল্পনার প্রয়াসের কারণ এই যে, এই জাতীয় মন্ত্রের এক সর্বজনীন অর্থ আছে–তা আমরা অবশ্যই মনে করি।-এই, যে চতুর্থ মন্ত্রটি, প্রচলিত ভাষ্যানুসারে এটি প্রসবিত্রীকে বা জরায়ুকে সম্বোধন পূর্বক উচ্চারিত হয়েছে-প্রতিপন্ন হয়। তাতে ভাব হয়–হে প্রসবিত্রি! উদরগত মাংসের দ্বারা তোমার স্থূলতা সাধিত হবে না। অথবা, হে জরায়ু! শরীরগত মাংস সম্বন্ধের দ্বারা তুমি সম্বন্ধ নও।
তোমাদের সে সম্বন্ধ কেমন? না, জলে যেমন (শৈবাল) থাকে, সেইরকম। অতএব, শ্বেতবর্ণ যে জরায়ু, তুমি গর্ভ হতে সত্বর পতিত হও। মল যেমন পরিত্যাজ্য, জরায়ুর ও প্রসবিত্রীর সম্বন্ধও তেমনই। তাদের পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া আবশ্যক। অতএব, হে জরায়ু! তুমি সত্বর পতিত হও।–এই মন্ত্রটির এই ভাবেই অর্থ এখন প্রচলিত। কিন্তু, আমরা মনে করি, পরিত্রাণকামী এখানে নিজে নিজেকে সম্বোধন করে মোক্ষপক্ষে অগ্রসর হবার জন্য নিজেকে নিজে প্রস্তুত করছেন। তিনি বলছেন, হে আমার জীবন! যদি তুমি পরিত্রাণ কামনা করো, মাংসের প্রতি মমতাবান্ হয়ো না, মজ্জার প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করো, দেহের অর্থাৎ জন্মের সম্বন্ধ যাতে পরিহার করতে পারো, সেই মতো চেষ্টান্বিত হও। বন্ধন-মোচনের চেষ্টা করো; আনন্দের অধিকারী হবে।–ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আমরা এ মন্ত্রটিকে চার অংশে বিভক্ত করেছি। প্রথম দুই অংশে (মাংসেন নৈব পিবসি এবং মজ্জসু আহতং নৈব অংশ দুটিতে) প্রায়ই ভাষ্যকারের অনুসরণ আছে। কেবল সম্বোধনপদ অধ্যাহারে ও পিবসি পদের অর্থ-বিষয়ে আমরা অন্যমত গ্রহণ করেছি। পানার্থক পা ধাতু হতে ঐ পিবসি পদের বুৎপত্তি স্বীকার করলে ঐরকম অর্থই সিদ্ধ হয়–কাসি, আকাঙ্ক্ষিত ভবসি।
আমরা মন্ত্রের তৃতীয় ও চতুর্থ শব্দার্থ সামান্য পরিবর্তিত করেছি। কিন্তু ভাবে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দাঁড়িয়েছে। শৈবলং পদের প্রতিবাক্যের সাথে আমরা কেবল ইতি মত্বা বাক্যাংশ অধ্যাহার করেছি। পৃশ্নি পদে শ্বেত। সুতরাং জরায়ুকে লক্ষ্য না করে ঐ পদে জ্ঞানকিরণকে লক্ষ্য করছে–বুঝছি। তাতে, মন্ত্রাংশের ভাব যা দাঁড়িয়েছে, বঙ্গানুবাদেই তা অভিব্যক্ত হয়েছে। পদ্মপস্থিত জলের মতো নির্লিপ্ত ভাবে সংসারে অবস্থান করে জ্ঞানের সেবাপরায়ণ হও–এটাই এখানকার তাৎপর্য বলে আমরা মনে করি। চতুর্থ অংশের শুনে পদের অর্থে ভাষ্যকার সমস্যা গণনা করেছেন। আমরা, ঐ পদকে গতার্থক শুন্ ধাতুর দ্বারা নিষ্পন্ন–শুন শব্দের সম্বোধনের রূপ বলে গ্রহণ করেছি। তাতে অর্থ আসে–গতাগতিশীল। যারা আত্মার উদ্ধারের জন্য চেষ্টা করতে না পেরে কর্মবন্ধকে কেবলই আবদ্ধ হয়ে সংসারে গতাগতি করে, ঐ পদে তাদেরই লক্ষ্য করছে। শুন শব্দে কুকুর ও নীচ প্রভৃতি অর্থ সেই কারণেই আসে। এখানে প্রার্থনাকারী নিজেকে নিজেই ঐ সম্বোধনে সম্বুদ্ধ করছেন। তাতে তাঁর আত্মগ্লানির ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। মূলে জরায়ু পদ দুবার প্রযুক্ত দেখি। আমরা এক অর্থে জন্ম-সম্বন্ধং অন্য অর্থে জীবসম্বন্ধং প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছি। তাতে প্রথমকে নাশের জন্য এবং শেষকে ভগবানের সাথে স্থাপন করবার জন্য ভাব প্রকাশ পেয়েছে। অব পদ্যতাং পদের,-আমরা মনে করি এটাই যথাযোগ্য প্রতিবাক্য-রক্ষকসকাশে বা ভগবৎ-সকাশে প্রেরয়তাং। জন্মসম্বন্ধ যাতে ছিন্ন হয় এবং ভগবানের সাথে সম্বন্ধ যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তা-ই এখানকার লক্ষ্য। ইত্যাদি ৷৷ ৪৷৷..
বঙ্গানুবাদ –হে আমার জীবন! তোমার কর্মক্লেদরূপ উৎপত্তিমূল জন্মাধার-স্থানকে আমি বিচ্ছিন্ন করছি, তোমার উৎপত্তিসম্বন্ধযুত নাড়ীকেও আমি বিচ্ছিন্ন করছি; তোমার মাতৃস্নেহ-সম্বন্ধকে ও পুত্রস্নেহ-সম্বন্ধকে আমি বিচ্ছিন্ন করছি, এবং জরায়ুসম্বন্ধ বিশিষ্টের সাথে তোমার কৌমার অবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করছি। তোমার জরায়ুরূপ জন্মসম্বন্ধকে তুমি সেই রক্ষকসকাশে ১৮ প্রেরণ করো। (সংসার-বন্ধনের হেতুভূত সর্ববিধ সম্বন্ধ-স্নেহসম্বন্ধ, কাম-সম্বন্ধ প্রভৃতির বিচ্ছিন্ন করবার আকাঙ্ক্ষা মাত্র প্রকাশ পেয়েছে)। ৫।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –সুপ্রসব-পক্ষে এটি পঞ্চম মন্ত্র। তবে এ মন্ত্রটি পড়ে মনে হতে পারে, যেন কোনও যন্ত্র-ব্যবহারের দ্বারা সন্তান বাহির করা হচ্ছে। প্রত্নতত্বের পক্ষে এ মন্ত্রকে ধাত্রীবিজ্ঞানের পোষক মন্ত্র বলে মনে করা যেতে পারে। ভাষ্যের মতে, এই মন্ত্রের উচ্চারণের দ্বারা সুখপ্রসব সাধিত হয়।–সে অর্থ অসঙ্গত বলছি না। তবে, আমরা মনে করি, মন্ত্রের মধ্যে ক্লেদকর্মরূপ আত্ম-উৎপত্তির সম্বন্ধ ছিন্ন করবার সঙ্কল্প প্রকাশ পাচ্ছে। প্রকারান্তরে এক শ্রেণীর যোগসাধন বলেও মনে করা যেতে পারে। মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধন মূলক। মন্ত্রোচ্চারণকারী নিজেকে নিজে মুক্তির পথে অগ্রসর করছেন। কামসম্বন্ধই উৎপত্তির মূলীভূত। স্নেহ মায়া মমতা সবই তা হতে উৎপন্ন হয়। সাধক, এখানে প্রথম সেই সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করছেন। স্নেহ-মমতা ইত্যাদি বন্ধনের মূল। কাম-সঙ্গ তিনি প্রথমেই পরিত্যাগ করতে সঙ্কল্পবদ্ধ হলেন। তারপর মাতার স্নেহ, পুত্রের মমতা বা নির্ভরতা একে একে সমস্তই পরিহারের পক্ষে প্রতিজ্ঞা করলেন। পরিশেষে তার সঙ্কল্প হলো, জরায়ুর মধ্য দিয়ে সংসারে আর পরিভ্রমণ করবেন না। তাঁর জীব-সম্বন্ধকে তিনি ভগবৎ-পাদপদ্মে উৎসর্গ করলেন। ৫।
বঙ্গানুবাদ –হে গৰ্ভস্থশিশুবৎ সংসারজ্ঞানানভিজ্ঞ (হে দশাবস্থামধ্যগত)! জরায়ু সহ (জরায়ু যেমন বন্ধন মুক্ত হয়ে ভূপতিত হয় সেই রকম, অথবা জরায়ু অবস্থা হতেই) তুমি ভগবৎ সকাশে নিপতিত হও (তাতে আত্মসমর্পন করো); অবাধগতিহেতু যে প্রকারে বায়ু ত্বরিতগমনশীল, যে প্রকারে অপ্রতিবদ্ধ হয়ে মন শীঘ্রতর গতিবিশিষ্ট, পক্ষিগণ অপ্রতিহত-গতিনিবন্ধন যে প্রকারে আকাশমার্গে অবাধে উড্ডীয়মান হয়; তুমিও সেই প্রকারে তোমার জীব-সম্বন্ধকে (সকল বাধা হতে মুক্ত করে) রক্ষক সমীপে (ভগবৎ-সমীপে) প্রেরণ করো। (ভাবার্থ এই যে,–প্রতিবন্ধক-সমূহ অপসৃত হলে মানুষ সত্বরই ভগবানকে প্রাপ্ত হয়ে থাকে)। ৬
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –এই মন্ত্র সুপ্রসব-সংক্রান্ত ষষ্ঠ বা শেষ মন্ত্র। দ্বিতীয় অনুবাকেও এটি শেষ। মন্ত্র।–ভাষ্যানুসারে এই মন্ত্রের অর্থ এই যে,–হে দশম-মাসীয় গর্ভস্থ শিশু! তুমি সত্বর গর্ভ হতে পতিত হও। বায়ু যেমন অবাধে গমন করে, মন যেমন যথেচ্ছ বিচরণ করতে সমর্থ হয়, পক্ষীসকল যেমন অবাধে আকাশে উড্ডীয়মান হয়ে থাকে; তুমিও সেইরূপ অবাধে গর্ভ হতে নির্গত হও। কোনরূপ বাধা যেন তোমাকে আটকিয়ে না রাখে।–আমাদের অর্থ অনুসারে মন্ত্রটিকে সংসার-বন্ধন মোচনের পক্ষে উদ্বোধনা-মূলক বলে মনে করা যেতে পারে। দশমাস্যা পদ ভাষ্যকারের মতে দশমাসকাল গর্ভে অবস্থিত শিশুর সম্বোধনে প্রযুক্ত হয়েছে। আমরা ঐ পদটিকে সংসার-জ্ঞানানভিজ্ঞ অর্থে প্রযুক্ত বলে মনে করেছি।
একটু দূর কল্পনায় ঐ পদে দশ-দশাপন্ন মনুষ্যমাত্রকেই বোঝাচ্ছে বলেও মনে করা যেতে পারে। যাই হোক, ঐ দশমাস্য সম্বোধনে বলা হয়েছে,তুমি জরায়ু সহ পতিত হও। আমরা বলি,–সে পক্ষে তার ভাব এই যে,-বন্ধনমুক্ত হলে প্রাণ যেমন সংসারে পতিত হয়, তুমি সেইভাবে ভগবৎ-পাদপদ্মে পতিত হও। সকল বন্ধন ছিন্ন করে তুমিও সেইরকম তাতে আত্মসমর্পণ করো।-পূর্ব মন্ত্রে সেই সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করার ভাবই ব্যক্ত হয়েছে। এ মন্ত্রে তা-ই দৃঢ়তার সাথে প্রখ্যাপিত হচ্ছে। এখানে যে তিনটি উপমার বিষয় আছে, সে তিনটিতেই অবাধ গতির ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। বায়ু অবশ্যই দ্রুতগতিশীল; মনের ন্যায় দ্রুতগতি, সংসারে আর কার আছে? এই যে দ্রুত অবাধগতি, এই উপমার মধ্যেই বন্ধনমুক্তির ভাব প্রকট হয়ে রয়েছে। পক্ষিগণের গতির উপমায়ও সেই ভাবই ব্যক্ত করছে। বন্ধন-মুক্ত পক্ষিগণই আকাশে অবাধে বিচরণ করে। ঐ উপমা তিনটিতে লক্ষ্য করবার বিষয়-বন্ধনমুক্তি। এই সকল উপমাই যেন বলছে,-এখানে সংসারী মায়ামোহবদ্ধ জীবের প্রতি বন্ধনমোচনের উপদেশ আছে। এখানে মন্ত্র যেন তারস্বরে বলছে, রে ভ্রান্ত জীব! কেন তুমি নিত্য নিত্য অভিনব বন্ধনের ডোরে আবদ্ধ হচ্ছো? ভগবানের কর্মে আত্মনিয়োগ করো। তার শরণে আশ্রয় লও। বন্ধন হতে মুক্তিলাভ করবে। তাতেই পরমসুখ মোক্ষ তোমার অধিগত হয়ে আসবে। আমরা মনে করি এটাই এ মন্ত্রের শিক্ষা ৷ ৬ ৷৷
প্রথম মন্ত্রঃ জরায়ুজঃ প্রথম উস্রিয়ো বৃষা বাতব্রজা স্তনয়ন্নেতি বৃষ্টা। সনো মৃড়াতি তন্থ ঋজুগগা রুজন য। একমোজস্ত্রেধা বিচক্ৰমে ॥ ১
বঙ্গানুবাদ— জরায়ু হতে উৎপন্ন (আমার ন্যায়) জীব, শরীর গ্রহণের নিমিত্ত। (জন্মহেতুভূতকর্মে আনন্দিত হয়ে থাকে; বায়ুবৎ সর্বত্র গতিশীল আদিজ্ঞানকিরণ-বিশিষ্ট অভীষ্ট বর্ষণকারী যে দেবতা মহত্তর করুণা বিতরণের সাথে আপন সত্তা জ্ঞাপন করিয়ে (আমাদের ন্যায় জীবের উদ্ধারের উদ্দেশে) জীব-সকাশে আগমন করেন, সেই অভীষ্টপ্রদ দেবতা আমাদের (আধিদৈবিক ইত্যাদি) দুঃখত্রয়কে নিবৃত্তি করে (আপন) অভিন্ন তেজকে ত্রিলোকে প্ৰকাশপূর্বক বিশেষভাবে ব্যাপ্ত রয়েছেন। (ভাবার্থ,আমরা সদাসর্বদা জন্মহৈতু-ভূত কর্ম-সম্পাদনেই নিরত থাকি। কিন্তু করুণানিদান ভগবান্ জ্ঞানকিরণ বিতরণে আমাদের ত্রিবিধ দুঃখনাশের জন্য সর্বদা প্রযত্নপর রয়েছেন, মন্ত্রের এটাই তাৎপর্য) ১
মন্ত্ৰাৰ্থ আলোচনা— অনুক্রমণিকায় দেখতে পাই, এই সূক্তের মন্ত্রগুলি বাতপিত্তশ্লেষ্মবিকার-জনিত রোগগুলির প্রতিকারার্থে বিনিযুক্ত হয়। দুর্দিন-নিবারণে এবং অতিবৃষ্টি নিবারণেও এই সূক্তের মন্ত্র কয়েকটির প্রয়োগ বিহিত রয়েছে। মুঞ্চশীর্ষক্ত্যা ইত্যাদি তৃতীয় মন্ত্রটি সর্বব্যাধি-নাশক বলে উক্ত আছে। এই সকল মন্ত্রের দ্বারা অভিষেক কার্য করলে সুফল প্রাপ্ত হওয়া যায়–প্রচলিত আছে। এখন প্রথম মন্ত্রের যে অর্থ ভায্যে প্রকাশিত, তার একটু আভায় দিচ্ছি। ভাষ্যকার বলেন,জরায়ুজঃ পদটি–বৃষা পদকে লক্ষ্য করছে। বৃষা শব্দের অর্থ সূর্য। তিনি অদিতির পুত্র, সুতরাং জরায়ুজ। এমতে, প্রথম উয়িঃ ও বাতব্রজা এই তিনটি পদও সূর্যেরই বিশেষণ। এইরকম সূর্য, তিনি মেঘ সকলকে গর্জন করিয়ে মহত্তর প্রকর্ষের সাথে আগমন করেন–ভাষ্যানুসারে মন্ত্রের প্রথম মন্ত্রের এটাই মর্ম। সেই আদিত্য আমাদের দেহকে ত্রিদোষজনিত (বাত-পিত্ত-শ্লেষ্মর বিকারজনিত) রোগ নাশ করে সুখী করুন। অকুটিলগতি সেই সূর্য অভিন্ন তেজকে তিন প্রকার–অগ্নি বায়ু ও সূর্যরূপে পৃথিবী ইত্যাদি লোকত্রয় আক্রমণপূর্বক অধিপতিরূপে স্থিত আছেন। ভাষ্যানুসারে এটাই মন্ত্রের দ্বিতীয় পংক্তির মর্ম।–আমরা মন্ত্রটিকে অন্যভাবে গ্রহণ করি। আমরা জীব, নিয়তই কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হচ্ছি। জন্মের পর আবার জন্ম হোক,আমাদের কর্মের এটাই যেন লক্ষ্য বলে মনে হয়। উচ্চগতি প্রাপ্তির আশা অতি অল্পই থাকছে; পরন্তু, নীচগতির দিকেই আমাদের কর্ম আমাদের আকর্ষণ করে নিয়ে যাচ্ছে। এই মন্ত্র সেই কর্মতত্ত্বের বিষয় ব্যক্ত করছে। একদিকে আমরা আমাদের বন্ধন-মূলক কর্মের প্রতি ধাবমান হচ্ছি, অন্যদিকে সেই করুণানিদান ভগবান্ আমাদের সাবধান করছেন। সংসার-সমরাঙ্গনে যেন এক বিষম সংগ্রাম চলেছে। আমরা বিপথে অগ্রসর হচ্ছি; ভগবান্ আমাদের ফেরাবার চেষ্টা করছেন।-মন্ত্রের উপসংহারের সাথে আরম্ভের সামঞ্জস্য কেমন সুন্দরভাবে রক্ষিত হয়েছে, লক্ষ্য করা যেতে পারে। সেই দেবতা–ঋজুগঃ অর্থাৎ অকুটিলগামী, সকলের প্রতি সমান অনুগ্রহ-পরায়ণ। আমাদের (জীবের) দুঃখত্রয় নিবৃত্তি করবার জন্য তিনি তাঁর অভিন্ন তেজের, সাথে ত্রিলোকে ব্যাপ্ত রয়েছেন। তাঁর করুণার পার নেই; তিনি নিয়ত সকলকে অনুগ্রহ করবার জন্য উন্মুখ। হয়ে আছেন। জীবের (আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক) দুঃখত্ৰয় যাতে দূর হয়, তার প্রতি তাঁর দৃষ্টি নিয়ত প্রধাবিত আছে। কিন্তু আমরা কর্মঘোরে এতই বিভ্রান্ত যে, তাঁর প্রতি ফিরেও চাইছি না। যে কর্মের দ্বারা শ্রেয়ঃ-সাধিত হয়, নিঃশ্রেয়স্ অধিগত হয়, তার প্রতি আমাদের আদৌ লক্ষ্য নেই। আমরা কেবলই কর্মের বন্ধনে দিন দিন আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ হচ্ছি। এই মন্ত্র সেই পক্ষে আমাদের সাবধান করে দিচ্ছেন। ১।
বঙ্গানুবাদ— সকল জীবের মধ্যে দীপ্তি (জ্যোতিঃ) রূপে বিদ্যমান আপনাকে, হে ভগবন্! স্তুতি নমস্কার ইত্যাদির দ্বারা আমরা পূজা করি, এবং হবনীয়দ্রব্যের দ্বারা (ভক্তিভাবে) আপনার পরিচর্যা করব (ঐরূপ পূজা ও পরিচর্যা করা আমাদের কর্তব্য); ভগবৎসম্বন্ধযুত অন্য সকল, দেবতাকেও (তার সাঙ্গোপাঙ্গরূপ দেবভাবসমূহকেও) হবনীয়ের দ্বারা আমরা অবশ্য পরিচর্যা করব (অর্থাৎ তাদেরও পরিচর্যা করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য); জীবের আক্রমণকারী, জীবের বন্ধনহেতুভূত যে অসৎ-ভাব (অসত্য), জীবের কর্মসমূহকে ব্যেপে অবস্থিত আছে, তার নিবৃত্তির। জন্য তার নিবৃত্তিকারক দেবতাকে (দেবভাবকে) আহবনীয়ের দ্বারা আমরা অবশ্য পরিচরর্যা করব। ৮
(অর্থাৎ, তারও পরিচরর্যা করা অবশ্য কর্তব্য)। (ভাব এই যে, কেবল যে ভগবাকেই পূজা করব, তা নয়; পরন্তু ভগবৎসম্বন্ধি সকল দেবভাব সমূহেরই পরিচরর্যা করব। অসৎ-ভাব দূরীকরণের জন্য অসৎ-ভাব দূরীকরণে সমর্থ দেবতাকে অর্চনা করি) ॥ ২॥
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রে তিনটি বিষয় লক্ষ্য করবার আছে। প্রথম–সেই সর্বেশ্বরের পূজা ও পরিচর্যার বিষয়। দ্বিতীয়–তার যাঁরা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, তাদের পরিচর্যার বিষয়। তৃতীয়তার সাথে মিলনের পথে যারা বাধাস্বরূপ বিদ্যমান আছে, তাদের যিনি অপসারিত করতে পারেন, তার পরিচর্যার বিষয়। প্রথম যাঁর প্রসঙ্গ, তিনি অঙ্গে অঙ্গে শশাচিষা শিশিয়াণং। সকলেরই মধ্যে তিনি দীপ্তিরূপে জ্যোতিঃরূপে আত্মরূপে ব্যেপে আছেন। এখানেই বোঝা যায়, কার প্রতি লক্ষ্য আছে।…দ্বিতীয়ের ও তৃতীয়ের পরিচর্যার প্রসঙ্গে তারই সমীপস্থ হওয়ার পথ কিভাবে পরিষ্কৃত হয়, তা বোঝানো হয়েছে। ভগবৎ-বিভূতিগুলি তার অনুচর অন্তরঙ্গ অথবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বলে নির্দেশ করতে পারি। তারাই দেবতা বা দেবভাব।…দেবভাবের সেবা করতে করতে, দেবত্বের অনুসরণ করতে করতে, মানুষ ভগবৎ-সামীপ্য লাভ করে।–ভাষ্যে যে অর্থ প্রকাশিত আছে, তার সাথে আমাদের অর্থের যে অল্প প্রভেদ রয়েছে, উপসংহারে সেই বিষয় একটু আলোচনা করছি। ভাষ্যের মত এই যে, সূর্যকে সম্বোধন করে এই মন্ত্র প্রযুক্ত হয়েছে। বলা হয়েছে,-জ্বর ইত্যাদির পোষক রোগ এই পুরুষের শরীরের সন্ধিস্থানসমূহ আক্রমণ করে আছে। সেই রোগের নিবৃত্তির জন্য এই হবিঃ প্রদানে পূজা করা কর্তব্য। এখানে রোগকে (আক্রমণকারীকে) হবিঃ প্রদান করতে হবে, এইরকম ভাবই প্রধানতঃ প্রকাশ পায়। দেবতার সঙ্গে অপদেবতার পূজা আমাদের দেশে যে প্রচলিত আছে, এই অর্থেই তার সঙ্গতি দেখা যায়। জ্বরনাশক দেবতারও পূজা করা, আর জ্বরপ্রবর্ধক জুরাসুরেরও পূজা করা,–বোধ হয় এই কারণেই প্রবর্তিত হয়ে থাকবে….তবে আমরা যে লক্ষ্য রেখে অর্থ করে যাচ্ছি, তাতে সৎ ভিন্ন অসতের সেবা উপপন্ন হয় না, দেবভাব ভিন্ন অসুরভাবের সেবা সাধারণতঃ স্বীকার করা যায় না। ২।
তৃতীয় মন্ত্রঃ মুঞ্চ শীর্ষক্ত্যা উত কাস এনং পরুষ্পরুরাবিবেশা যো অস্য। যো অভ্ৰজা বাতজা যশ্চ শুম্মা বনস্পতীসচতাং পর্বতাংশ্চ। ৩
বঙ্গানুবাদ –হে ভগবন্! শিরঃসম্বন্ধীয় রোগ হতে (মস্তকের বন্ধন হতে) এই দেহকে মুক্ত করুন; যে ক্ষয়কারক রোগ (অথবা সত্যনাশকারী যে কর্মপ্রভাব) এই দেহের সকল সন্ধিবন্ধনকে অধিকার করেছে, তা হতেও মুক্তিদান করুন; যে ব্যাধি (অথবা-বন্ধন) বায়ুবিকৃতিজাত (অথবা–রজোভাববিকৃতি হেতু উৎপন্ন), যে ব্যাধি (অথবা বন্ধন) পিত্তবিকারজনিত (অথবা সত্ত্ববিকৃতিজ), তা বৃক্ষসমূহকে বা পর্বতসমূহকে প্রাপ্ত হোক (অর্থাৎ, সেরূপ ব্যাধিতে বা বন্ধনে লোকসমাজ যেন কখনও আক্রান্ত না হয়)। (অন্তৰ্য্যাধি বহির্ব্যাধি উভয় ব্যাধিই বন্ধনহেতুভূত। তাই মন্ত্রে সর্বব্যাধি নাশের কামনা এবং সর্ববন্ধন ছেদনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পাচ্ছে)। ৩৷৷
মন্ত্ৰাৰ্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রে সাদাসিদাভাবে ব্যাধিমুক্তির প্রার্থনাই প্রকাশ পেয়েছে। এই পুরুষকে শিরোরোগ হতে মুক্ত করুন। এই পুরুষের গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে শ্লেষ্ম প্রবেশ করেছে; এবং যে ক্ষয়কর কাশরোগে এই পুরুষ আক্রান্ত হয়েছে, তা হতে একে রক্ষা করুন। বাতপিত্তকফজনিত যে ব্যাধি, সে ব্যাধি বৃক্ষসমূহে এবং পর্বতসমূহে সমাবিষ্ট হোক। মন্ত্রের অর্থে, প্রথম দৃষ্টিতে এই ভাবই প্রাপ্ত হওয়া যায়। ভাষ্যেও এই ভাবের অর্থই প্রকাশিত দেখি। কিন্তু পূর্বাপর মন্ত্রের সাথে এই মন্ত্রের অর্থসঙ্গতি রক্ষার পক্ষে উদ্বুদ্ধ হয়ে, আমরা মন্ত্রে দুরকম অর্থ প্রকাশ করলাম। এক অর্থ–ভাষ্যের অনুসারী রইলো। অন্য অর্থ– আমাদের ব্যাখ্যায় পরিগৃহীত পন্থারই অনুগত হলো। তবে ভাব-পক্ষে আমাদের প্রকাশিত দুরকম ব্যাখ্যাতেই সমান অর্থ পাওয়া যাবে।–যেমন,-শীর্ষক্ত্যাঃ পদ। এর প্রকৃত অর্থ–শিরের (মস্তকের) সাথে যা ব্যাপ্য বা অবস্থিত অর্থাৎ সম্বন্ধবিশিষ্ট। এ থেকে শিরোরোগ অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের বক্তব্য এই যে, অসৎ-ভাবের সমাবেশ-রূপ যে বন্ধন মস্তিষ্ককে ঘিরে থাকে, এই পদ তা-ই ব্যক্ত করছে। সেই বন্ধন হতে দেহকে মুক্ত করাই প্রধান মুক্তি।…আবার, কাসঃ পদটি। এর সাধারণ অর্থ–ক্ষয়কর কাসরোগ। কিন্তু বলা হয়েছে, যা সকল সন্ধিস্থলে প্রবিষ্ট হয়ে আছে। ক্ষয়কারী কাস-রোগে শরীরের সকল অঙ্গ-গ্রন্থি শিথিল করে। এক পক্ষে এই ভাবই আসে। অন্য পক্ষে, ক্ষয়রোগের ন্যায় ক্রমে ক্রমে আত্মধ্বংসকারী যে সকল সৎ-ভাববিনাশক অপকর্ম নিত্য নিত্য অনুষ্ঠান করে মানুষ নিজের সকল অঙ্গকে দিন দিন শিথিল করছে এবং সেই কর্মের দ্বারা সেই সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে দিন দিন দৃঢ়তর ও দৃঢ়তম বন্ধনপাশে আবদ্ধ করছে, এখানে যঃ কাসঃ অস্য পরুঃ পরুঃ আবিবেশ বাক্যে সেই ভাবই প্রকাশ পাচ্ছে। আবার, অজাঃ বাতজাঃ ও শুষ্ম পদে যদি যথাক্রমে কফ-পিত্ত-বাত ঐ তিন ধাতুকেই বোঝাচ্ছে মনে করি, তাতেও ঐ তিন ধাতুর বিকৃতির ভাব আসে না কি? ত্রি-ধাতুর সাম্যই স্বাস্থ্যাবস্থা।…এই দিকের এই অর্থ থেকেই গুণসাম্যের ভাব আসতে পারে। শ্লেষ্ম বা কফ-তমোভাবের দ্যোতক। বায়ুর দ্বারা রজোভাবের এবং পিত্তের দ্বারা সত্ত্বভাবের আভাষ প্রাপ্ত হওয়া যায়। বস্তুতঃ, ব্যাধির ও রোগের উপমার মধ্য দিয়ে। এখানে পরমার্থতত্ত্ব বিবৃত আছে, পূর্বাপর ভাবসঙ্গতি-রক্ষায় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। এই সকল বিষয় বিবেচনা করে মন্ত্রের প্রার্থনার ভাবার্থ এইরকম নির্দেশ করতে পারি;-হে ভগবন্! আমার মস্তিষ্ককে কলুষ-চিন্তার সংশ্রব হতে মুক্ত রাখুন। আমার দেহজাত কর্মসমূহকে অসৎ সংশ্রব হতে পৃথক করে দিন। আমার অন্তরস্থিত সত্ত্ব রজঃ তমঃ তিন গুণের কোন গুণে যেন বৈষম্য উপস্থিত না হয়। আমি যেন আমার সকল প্রকার বন্ধন-মোচনে আপনার করুণার স্রোত উন্মুক্ত দেখি।–এটা অবশ্যই সুসঙ্গত প্রার্থনা ॥ ৩।
চতুর্থ মন্ত্রঃ শং মে পরস্মৈ গাত্রায় শমস্তুবরায় মে। শং মে চতুর্ভো অভ্যেঃ শমস্তু তন্বেত মম ॥ ৪৷
বঙ্গানুবাদ –হে ভগবন্! আমার শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ সূক্ষ্ম দেহে সুখ (মঙ্গল) হোক; আমার নিকৃষ্ট দেহে অর্থাৎ মেদমাংসবিশিষ্ট এই দেহে সুখ (মঙ্গল) হোক; আমার চতুরঙ্গে অর্থাৎ কর্মাকর্ম হেতু চতুর্বিধ দেহ-ধারণে সুখ (মঙ্গল) হোক; আমার স্থূলসূক্ষ্মাত্মক সকল প্রকার শরীরে সুখ (মঙ্গল) হোক। (ভগবানের অনুকম্পায় আমার স্থূলসূক্ষ্ম সকল শরীর সর্বকালে সুখস্বরূপ ব্রহ্মকে লাভ করুক–মন্ত্র এই ভাব প্রকাশ করছেন) ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –বন্ধনই দুঃখ। বন্ধন-মোচনেই সুখ। বিবিধ কর্মে বিভিন্ন অঙ্গকে বিবিধ প্রকারে আবদ্ধ করে ফেলে। কর্মের দ্বারা যেমন শ্রেষ্ঠ অঙ্গ মস্তক আবদ্ধ হয়, কর্মের দ্বারা তেমন নিম্ন অঙ্গ হস্ত-পদ ইত্যাদি আবদ্ধ হয়ে থাকে। স্কুল-শরীর সম্বন্ধে যে ভাব, সূক্ষ্মশরীর সম্বন্ধেও সেই ভাব। কর্মের ফল ভোগ করবার জন্য প্রতি অঙ্গ কর্মের ডোরে আবদ্ধ থাকে। এখানে তাই প্রতি অঙ্গের প্রতি অবস্থার কথা সুখ-কামনা করা হয়েছে; প্রতি শরীরের প্রতি অবস্থান্তরের মঙ্গল-প্রার্থনা করা হয়েছে।–ভাষ্যকার দৈহিক ব্যাধিনাশের দিক থেকে অর্থ করেছেন; সে পক্ষে মন্ত্রটিকে দৈহিক ব্যাধিনাশমূলক বলে গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা আধ্যাত্মিক ব্যাধি-নাশ-পক্ষে প্রার্থনামূলক বলে মন্ত্রটিকে গ্রহণ করেছি। তাতে দেহের ব্যাধি ও মনের ব্যাধি উভয় ব্যাধিরই শান্তিকামনা প্রকাশ পেয়েছে।–যেমন,-মন্ত্রে পরস্মৈ এবং অবরায় দুটি পদকে ভাষ্যকার দেহের সম্বন্ধে প্রযুক্ত বলে ঐ দুটি পদের যথাক্রমে পরস্তাৎ উপরি বর্তমানায় শিরোরূপায় এবং অবস্থা বর্তমানায় চরণ লক্ষণায় অঙ্গায় অর্থ গ্রহণ করেছেন। একে মস্তক বোঝাচ্ছে, অন্যে চরণ ইত্যাদি নিম্নাঙ্গকে বোঝাচ্ছে। আমরা পর পদে শ্রেষ্ঠ সূক্ষু অর্থ গ্রহণ করেছি। তাতে পরস্মৈ পদে সূক্ষ্ম শরীরকে–প্রাণকে–আত্মাকে বোঝাচ্ছে। আমাদের মতে, অবরায় পদে-নিকৃষ্ট শরীরকে অর্থাৎ মেদমজ্জামাংসভূত এই দেহকে বোঝাচ্ছে। সেই অনুসারে ঐ দুই পদের মর্ম হয় এই যে, আমার প্রাণ (আত্মা) শান্তিলাভ করুক,-আমার দেহ শান্তিলাভ করুক। কেবল মস্তক আর নিম্ন অঙ্গ ব্যাধিশূন্য হলে, কেবল দেহের (বহিরঙ্গের), সুখ হলে, প্রকৃত শান্তিলাভ হয় কি? প্রাণে অশান্তি থাকলে, দেহে সুখ থাকে কি? দেহে ও প্রাণে-শান্তি উভয়ই চাই। আমরা মনে করি, ঐ দুই পদে সেই ভাব পরিব্যক্ত আছে। শেষে দেখুন, মম তন্বে পদ। ভাষ্যের অর্থ–মধ্যশরীরায় সর্বসমষ্টিরূপায় শরীরায় বা। আমরা অর্থ করেছি–স্থূলসূক্ষ্মাত্মকে সর্বভাবাপন্নে দেহে। এখানে কর্মাকর্মের বিষয় মনে আসে। স্কুল-শরীর ও সূক্ষ্ম শরীর দুই দেহে জীবাত্মা কর্মাকর্মের সুখ-দুঃখ ভোগ করে। এখানে তাই প্রার্থনা করা হচ্ছে,-হে ভগব। কিবা আমার স্কুল-শরীর, কিবা আমার সূক্ষ্ম-শরীর,–আমার উভয় শরীরে আমি যেন শান্তি পাই। ফলতঃ ক্রমে ক্রমে যেন আমার উৎকর্ষ সাধিত হয়,-আমি যেন ক্রমে ক্রমে ভগবানকে প্রাপ্ত হই। এটাই এই মন্ত্রের প্রার্থনার মর্মার্থ। ৪
বঙ্গানুবাদ –হে ভগবন্! আপনার জ্যোতীরূপ আমার নমস্কার প্রাপ্ত হোক, আপনার শব্দরূপ আমার নমস্কার প্রাপ্ত হাৈক, আপনার ব্যাপক-রূপ আমার নমস্কার প্রাপ্ত হোক। যে কারণে দুঃখভাগী জনে (আমাতে) দুঃখ প্রাপ্ত হয়, সেই কারণকে আপনি সর্বতোভাবে দূরে নিক্ষেপ করুন। ভাব এই যে,–ভগবান্ জ্যোতিঃরূপে, শব্দরূপে, ব্যাপ্তিরূপে সর্বত্র বিরাজমান রয়েছেন। আমাদের সর্বপ্রকার দুঃখনিবৃত্তির জন্য সর্বব্যাপী সেই ভগবাকে নমস্কার করি) ॥ ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –সূক্তানুক্রমণিকায় লিখিত আছে,–অশনিপাত নিবারণের জন্য এই সূক্তের মন্ত্রগুলি প্রযুক্ত হয়ে থাকে; এবং এই মন্ত্রের সঙ্গে সোমদর্ভকুষ্ঠলোষ্ঠমঞ্জিষ্ঠা ইত্যাদি দ্রব্য গৃহক্ষেত্র ইত্যাদিতে নিখননে বিনিযুক্ত হয়। এই সূক্তের মন্ত্রের দ্বারা দেবতার উদ্দেশ্যে ঘৃতাহুতি প্রদান করলে, অশনি পাতের আশঙ্কা দূরীভূত হয়ে থাকে, গৃহে বজ্রপাত হয় না। এটাই প্রসিদ্ধি।–ভাষ্যানুসারে, এই মন্ত্রটিতে যেন বিদ্যুৎকে, বজ্রধ্বনিকে এবং মেঘকে নমস্কার করা হয়েছে। ভাষ্যের মতে, মন্ত্রের সম্বোধ্য পর্জন্য। পর্জনকে সম্বোধন করে যেন বলা হচ্ছে, হে পর্জন্য! তোমার বিদ্যুৎকে নমস্কার করি, তোমার ধ্বনিকে (গর্জনকে) পরে মিকার কার মন্ত্র ধ্বনি নমস্কার করি, তোমার মেঘকে নমস্কার করি। সেই নমস্কারের জন্য, যে জন তোমাকে স্তুতি-নমস্কার-হবিঃ প্রদান করে না, তার প্রতি তুমি বজ্র ত্যাগ করো। অর্থাৎ, আমরা যখন তোমার বিদ্যুৎকে, শব্দকে ও মেঘকে নমস্কার করছি, তখন তুমি আমাদের প্রতি তুষ্ট হও; এবং যে জন তোমার পূজা করে না, তাকে বজ্রাঘাতে বধ করো। ভাষ্যেরও এই অর্থ; পাশ্চাত্য-পণ্ডিতগণও এই অর্থই গ্রহণ করেন। বেদের সময় আদিম অসভ্য মনুষ্যগণ যে প্রকৃতির এক একটি ক্রিয়া দেখে বিস্মিত হয়ে তাদেরই পূজায় প্রবৃত্ত হতো, এই উপলক্ষে তথাকথিত পণ্ডিতগণ তা-ই প্রতিপন্ন করবার প্রয়াস পান।–আমাদের অর্থ কিন্তু সে পথ দিয়েই যায়নি, বরং বিপরীত ভাবই প্রকাশ করেছে। অসভ্য অবস্থার কথা কি বলব? এই মন্ত্রে দেখতে পাই, অতি সভ্য সমুন্নত আধ্যাত্মিক জগতে লব্ধপ্রবেশ জনের প্রার্থনাই প্রকাশ পেয়েছে। অপিচ, অধ্যাত্ম-দর্শনের অতি গুঢ়তত্ত্ব এই মন্ত্রে ব্যক্ত দেখি। আমরা দেখছি, এই মন্ত্রে প্রথমে ভগবানের স্বরূপ-শক্তির পরিচয় আছে। তিনি যে এই। সংসারে তিন ভাবে তিনরূপে অবস্থিত আছেন, এই মন্ত্রে তার আভাষ প্রাপ্ত হই।–প্রথম–এই মন্ত্রের সম্বোধন।
সম্বোধন পর্জন্যকে কেন বলবো? পরন্তু পর্জনকে সম্বোধন হয়েছে মনে করতে গেলে অশ্মনে পদের মেঘ-অর্থই বা কেমন করে আনতে পারি? পর্জন্য ও মেঘ সমপর্যায়ভুক্ত। মেঘকে ডেকে কী বলা সঙ্গত হয়,–আমি তোমার এই বিদ্যুৎকে, বজ্রকে আর মেঘকে নমস্কার করি? যদি অশ্মনে পদের পরিবর্তে, তোমাকে বোঝাবার উপযোগী কোনও পদ থাকতো, বরং কতকটা অর্থ উদ্ধার করা যেতে পারতো। কিন্তু তা নেই। সুতরাং পর্জন্যকে সম্বোধন আমরা সঙ্গত বলে মনে করি না। আমরা বলি– এখনকার সম্বোধ্য–ভগবন।–প্রকাশরূপ, শব্দ-রূপ, আর ব্যাপ্তি-রূপ–এই তিন রূপে তিনি জগৎ ব্যেপে আছেন। তিনের মধ্যেই তাকে বিদ্যমান দেখি। এই তিন ভিন্ন অন্য রূপ থাকতে পারে না। এই তিনের মধ্যেই সকল রূপের সকল প্রকার অভিব্যক্তির বীজ নিহিত রয়েছে। বিশ্বরূপে যে বিশ্বনাথ বিদ্যমান, এই তিনের দ্বারাই তা প্রকাশ পেয়েছে। প্রথম-জ্যোতিঃ। জ্যোতিঃই তার প্রকাশ-রূপ। বিদ্যুতে সেই জ্যোতির পরাকাষ্ঠা। তাই বলা হয়েছে বিদ্যুতে আমার নমস্কার সমর্পিত হোক। দ্বিতীয়–শব্দ। শব্দ তার এক অভিব্যক্তি। আবার শব্দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শব্দ–অশনি। তাই প্রার্থনা করা হলো,–হে ভগবন্! আপনার স্তনয়িত্নবে (বজ্রনিনাদে, শব্দরূপে) আমার নমস্কার সমর্পিত হোক।
তৃতীয় ব্যাপ্তি। তাই প্রার্থনা–তার ব্যাপক-রূপ লক্ষ্য করে। অনে পদের অর্থ, ভাষ্যেরই মতো, ব্যাপনশীলায়। এ সংসারে মেঘের–মেঘের উপাদান বাষ্পের সর্বব্যাপকতা প্রসিদ্ধ। অতএব প্রার্থনা করা হলো,-হে ভগবন্! আপনার ব্যাপক-রূপে গিয়ে আমার নমস্কার মিলিত হোক-ভাষ্যের মতে যেন দূড়াশে অস্যসি বাক্যের অর্থ–যারা তোমার পূজা করে না, তাদের প্রতি তোমার বজ্র (রোয) নিক্ষিপ্ত হোক। অর্থাৎআমরা তোমায় নমস্কার করছি; আর, তার ফলে, যারা নমস্কার করে না, তারা নিহত হোক। এ অর্থে, বড়ই স্বার্থপরতার, বড়ই নীচ অন্তঃকরণের, পরিচয় প্রকাশ পায়। বিশ্বপ্রেম বেদের মন্ত্রে এমন ভাব, পরের অনিষ্টসাধনের প্রার্থনা–কোথাও দেখা যায় না। হৃদয়ের অসৎ বৃত্তিসমূহকে এবং কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপুবর্গকে, রূপকে রাক্ষস ইত্যাদি অভিধায়ে অভিহিত করে, বধ করার প্রার্থনা অনেক স্থলেই আছে বটে; কিন্তু হে ভগবন্! তারা তোমার উপাসনা করে না, সুতরাং তাদের প্রতি বস্ত্র নিক্ষেপ করো,–এমন ভাবের প্রার্থনা, এ পর্যন্ত তো কোথাও দেখিনি।…বরং এখানে সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবই ব্যক্ত দেখি। এ পক্ষে, আমাদের মতে,–আমাদের, জগতের সকলেরই–দুঃখের যে মূল কারণ, হে ভগবন! আপনি সেই কারণকে দূর করুন-এই প্রার্থনাই এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
–এখানে আর একটি ভাবের কথা অধ্যাহার করা যেতে পারে। মন্ত্রের শেষাংশে দুঃখের যে কারণ নাশ করবার প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে, সে কারণ কি রকমে নাশ পেতে পারে? আমরা মনে করি, মন্ত্রের প্রথমাংশে যে কর্মানুষ্ঠানের উপদেশ আছে, তা-ই সেই কারণ-দূরীকরণের উপায়। সেই যে নমস্কার, সেই যে ভগবানের পূজা,-তা-ই দুঃখনিবৃত্তির হেতুভূত। মন্ত্রের প্রথমাংশে তাই যেন উপদেশ দেওয়া হয়েছে, তিনি যে জ্যোতীরূপে বিদ্যমান, তা জেনে তাকে নমস্কার করো। তিনি যে বাষ্পরূপে মেঘরূপে বিশ্ব ব্যেপে আছেন, তা বুঝে তাকে নমস্কার করো। তিনি যে শব্দরূপে বিদ্যমান, তা জেনে তাঁকে নমস্কার করে। তার পূজায় তার নমস্কারে–তার অর্চনায়, তাঁর ধ্যান-ধারণায়, সকল বিপদ দূরে যাবে।–এটাই তাৎপর্যার্থ। ১।
বঙ্গানুবাদ –বিপথগামিগণের ভয়প্রদাতা হে ভগবন্! আমার নমস্কার আপনাকে প্রাপ্ত হোক; তাতে, পাতকদাহক আপনার তেজঃ সংহত করুন; সর্বতোভাবে আমাদের এই দেহে (জীবনে) সুখ প্রদান করুন, আমাদের অপত্যগণের (সংসারের সকলের) মঙ্গল করুন; (অর্থাৎ এই নমস্কারের ফলে সংসারের মঙ্গল হোক)। হে ভগবন্! আমরা বিপথগামী হলে আপনি আমাদের সাবধান করে দিন। কেবলমাত্র আমাদের নয়, পরন্তু নিখিল জনগণের মঙ্গল-বিধান করুন। মন্ত্রে এই ভাব প্রকাশ পেয়েছে) ২
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— ভাষ্যকারের মত এই যে, এই মন্ত্রেও পর্জনকে সম্বোধন করা হয়েছে। এর জন্য তিনি প্রবতো নপাৎ পদ দুটির অর্থ দুরকমে নিষ্পন্ন করে পরিশেষে ভাবে ঐ দুই পদে পর্জন্য অর্থ অধ্যাহার করে নিয়েছেন। তার প্রথম প্রকার অর্থের ভাব-যারা স্তুতি-নমস্কার হতে বিরত আছে, তাদের যিনি পালন করেন না; অর্থাৎ অসেবককে যিনি অশনিভয় প্রদর্শন করেন। তাঁর অন্য অর্থ–প্রগতের অর্থাৎ উপাসনাহীন জনের নিকট হতে তিনি বৃষ্টির পতন রোধ করে রাখেন; অনাবৃষ্টি-নিবন্ধন তারা কষ্ট পায়। ইত্যাদি।–যে পথে ভাষ্যকার প্রবতো নপাৎ শব্দে পর্জন্য অর্থ গ্রহণ করেন, সেই পথেই সাদাসিধাভাবে বিপথগামীদের ভয়প্রদর্শনকারী অর্থ-ই পাওয়া যায়। ভগবাকেই লক্ষ্য করে ঐ দুই পদ প্রযুক্ত হয়েছে।… এখন, প্রার্থনার বিষয় লক্ষ্য করুন। প্রথম প্রার্থনা, আপনার পাতক-দাহক তেজঃ সম্বরণ করুন। ভাব এই যে,–আমরা পাপী; পাপের জ্বালায় অহর্নিশি দগ্ধীভূত হচ্ছি, জ্বলে পুড়ে মরছি। আপনি সে জ্বালা নিবারণ করুন। দ্বিতীয় প্রার্থনা,–আমাদের এই দেহে সর্বতোভাবে সুখ উৎপাদন করুন। প্রথম মন্ত্রে দুঃখের কারণকে দূর করতে বলা হয়েছিল। এখানে সর্বতোভাবে সুখের প্রার্থনা প্রকাশ পেলো। সে সুখ-পরম, সুখ-নিঃশ্রেয়স-রূপ সুখ। এটাই আমরা মনে করি।-মন্ত্রের তৃতীয় প্রার্থনা (ভাষ্যের মতে)–আমাদের সন্তানসন্ততিগণকে সুখী করুন। আমরা ঐ স্থানে আর একটু প্রশস্ত ভাব গ্রহণ করি। মন্ত্রে তোকেভ্যঃ পদে শিশু বা ছেলে-মেয়ে অর্থ বোঝালেও, কেবল আপন সন্তান-সন্ততি অর্থ কেন করব? সর্বজনীন সকলের ভাব ঐ পদে প্রাপ্ত হওয়া যায়। তার পর শিশু এই অর্থ আসায়, অজ্ঞজনমাত্রকে (জ্ঞানপক্ষে শিশু) মনে। be করা যেতে পারে। সে পক্ষে এই অংশের তাৎপর্য এই যে, আমাদের ন্যায় আর যারা অজ্ঞ আছে, এই জ্ঞানরাজ্যের শিশু আছে, তাদেরও মঙ্গলদান করুন। কুপথ হতে ফিরিয়ে সংসারের সকলের প্রতি করুণাবর্ষী ] হোন। আমরা মনে করি, এই সর্বজনীন প্রীতির ভাব এই মন্ত্রাংশে পরিব্যক্ত রয়েছে ৷৷ ২
বঙ্গানুবাদ –সৎ-মাৰ্গত্যাগীর অরক্ষক (অসন্মার্গগামীর সংহারক) হে ভগবন্! আপনাকে আমরা নমস্কার করছি; এই প্রকারে আপনার সকল বিভূতিকেই আমাদের নমস্কার প্রাপ্ত হোক; হননকারণ (দুষ্কৃতের নাশের জন্য) সন্তাপদানকারী আপনার আয়ুধকেও আমরা নমস্কার করি; (পরমার্থপ্রদ) শ্রেষ্ঠ প্রসিদ্ধ আপনার যে নিবাসস্থান, তা গুহাবৎ অপরের অনধিগম্য বলে আমরা জানছি; সেখানে, অন্তরিক্ষে প্রাণবায়ুর ন্যায় (দেহের মধ্যে নাভিচক্রের মতো) অদৃশ্যভাবে আপনি বিদ্যমান রয়েছেন। (ভগবান্ সর্বব্যাপী। কেবল সর্বব্যাপী নন; পরন্তু সকলেরই অপ্রত্যক্ষীভূত। একমাত্র সাধকই তার নিবাসস্থানের বিষয় অবগত আছেন। তা ব্যতীত অন্য কেউ অবগত নন। সেই ভগবাকে লক্ষ্য করে প্রার্থনাকারী বিবিধ প্রকারে নমস্কার করছেন। ভরসা, করুণাপ্রকাশপূর্বক করুণানিদান ভগবান্ যদি তার তত্ত্ব বিজ্ঞাপিত করেন অর্থাৎ জানিয়ে দেন) ৷ ৩৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এই মন্ত্রে শেষাংশের ভাব বড়ই জটিল। যাই হোক, ভাষ্যকারের মতে, এই মন্ত্রেও পর্জন্যকে সম্বোধন আছে। সেই অনুসারে পর্জন্যকে দুবার এবং তার সম্বন্ধী অশনিকে একবার নমস্কার করা হয়েছে। মন্ত্রের প্রথম পংক্তির এটাই মর্মার্থ। দ্বিতীয় পংক্তির বিদ্ম তে ধাম পরমং গুহা এই অংশের অর্থে, আমাদেরও মত আছে। ভাষ্যের শেষাংশ–যৎ সমুদ্রে অন্তর্নিহিতাসি নাভীঃ। এই অংশের অর্থ নিষ্কাশনের পক্ষে ভাষ্যকার এইরকম ভাবের অধ্যাহার করেছেন। সমুদ্রে পদে তিনি অন্তরীক্ষে অর্থ। গ্রহণ করেন। তাতে অন্তরীক্ষ মধ্যে নাভি এমন বাক্য দাঁড়ায়। তার ভাবে তিনি লিখেছেন,-যেমন।
দেহমধ্যে নাভিচক্রে সকল নাড়ী আবদ্ধ আছে, সেইরকম পর্জন্যে সমস্ত মেঘমণ্ডল বদ্ধ আছে। সেই। অনুসারে তিনি ঐ অংশের অর্থে লিখেছেন, হে পর্জন্য! তুমি সেখানে স্থাপিত নাভি হও; অর্থাৎ, সমগ্র মেঘমণ্ডলের ধারকত্বহেতু নাভিচক্রবৎ তুমি অন্তরীক্ষের মধ্যে অবস্থিত আছ।–আমরা কিন্তু প্রবতোনপাৎ পদে (পূর্ব মন্ত্রের মতোই) ভগবাকে সম্বোধন করা হয়েছে বলে মনে করি। তিন বার নমস্কারে, প্রথমে সমষ্টিভাবে তাকে নমস্কার করা হয়েছে; তারপর, তাঁর বিভূতিসমূহকে এবং পরিশেষে তার তীব্র শাসন-শক্তিকে নমস্কার প্রকাশ পেয়েছে।…প্রার্থনা-পক্ষে ভাব প্রকাশ পেল,-হে অসৎ-মার্গগামীর প্রতি তীক্ষ্ণ দণ্ডধর! আপনার নিকট আমরা প্রণত হচ্ছি। কুপথ পরিত্যাগ করে আপনার নির্দিষ্ট পথে চলতে সঙ্কল্প করেছি। আমাদের প্রতি আর দণ্ড ধারণ করবেন না। আপনার অঙ্গীভূত সভাবসমূহকে আমাদের দ্বিতীয় নমস্কার। তারা এসে আমাদের সাথে মিলিত হোন। সৎপথানুবর্তিতার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হৃদয়ে সত্ত্বভাব জেগে উঠুক। শেষ নমস্কার আপনার উগ্রভাবকে। সে যেন আর আমাদের দহন না করে। মন্ত্রের প্রথম পংক্তিতে আমরা এই ভাব এই অর্থই প্রাপ্ত হই।–মন্ত্রের দ্বিতীয় পংক্তিটিকে, একই সম্বন্ধ সূত্রে, দুই অংশে বিভক্ত করা যায়।
প্রথমাংশের মর্ম,-ভগবানের ধাম নিগূঢ় গুহার ন্যায়;–অর্থাৎ সে ধাম যে কোথায়, কেউই সহজে তা জানতে পারে না। তাকে পেতে হলে, তার সেই ধামে পৌঁছাতে হলে বহু ধ্যান ধারণা-সাধনার প্রয়োজন। এই ভাব এই অংশে প্রকাশমান। শেষাংশের জটিলতার মধ্যে, একটি পদ পাই– অন্তর্নিহিতাসি। এতে মন্ত্রের লক্ষ্যস্থানীয় ভগবানের প্রতিই দৃষ্টি পড়ে। তিনি যে সকলের অভ্যন্তরে অদৃশ্যভাবে অবস্থিত আছেন, ঐ পদে সেই ভাব মনে আসে। সমুদ্রে নাভীঃ পদ দুটিতে–সেই যে তার সর্বত্র অদৃশ্যভাবে অবস্থান, সে কি রূপ–তা ব্যক্ত করছে। কিন্তু নাভিঃ ও সমুদ্রে এই দুই পদের সম্বন্ধ সন্ধান করে পাওয়া বড়ই কঠিন। আমরা তিনরকমে একই লক্ষ্য রেখে ঐ দুই পদের মর্মানুসন্ধানে প্রয়াসী হয়েছি। পুরাণে রূপকে বিষ্ণুর নাভিপদ্ম সংক্রান্ত ব্যাপার এবং সেই সঙ্গে অনন্ত মহাসমুদ্রের বিষয়ে আমরা লক্ষ্য করেছি। সমুদ্রের সে নাভিমূল যেমন সকলের অলক্ষ্য, ভগবানের অবস্থিতি-স্থানও সেইরকম নিগূঢ় তত্ত্বমূলক। অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন সাধক কেবল সে অবস্থা–সে সমুদ্রের সে নাভিপদ্ম দেখতে পান। অনেকে তা দেখতে পায় না। এই সকল ভাব এই অংশে ব্যক্ত আছে বলে মনে করতে পারি। ৩।
প্রথম মন্ত্র: ভগবস্যা বর্চ আদিষধি বৃক্ষাদিব জং। মহাবুঃ ইব পর্বতো জ্যোক পিতৃধাস্তাং ১
বঙ্গানুবাদ –হে ভগবন! মালী, যেমন পুষ্পিত বৃক্ষ হতে পুষ্পসমূহ চয়ন করে অন্যকে প্রদান করে, সেইরূপ সেই সৎ-বৃত্তিরূপিণী দেবী হতে ভাগ্য ও তেজঃ (গ্রহণ-পূর্বক) সর্বতোভাবে আপনি আমায় প্রদান করুন। আমার চিত্ত দৃঢ়মূল অচল পর্বতবৎ পিতৃলোক-সম্বন্ধী (ভগবৎ-সম্পৰ্কীয়) সত্ত্বভাবে চিরকাল (অবিচলিতভাবে) অবস্থিতি করুক। ভাবার্থ,–হে ভগবন্! আমরা যেন আপনার অনুগ্রহে সত্ত্বভাবের অধিকারী এবং পিতৃপদাঙ্কের অনুসারী হই) ॥১॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই সূক্তে চারটি মন্ত্র। এই মন্ত্র-কটি স্ত্রীর বা পুরুষের দুর্ভাগ্য-নিবারণের জন্য বিহিত। যে স্ত্রী কখনও পতির গৃহে আশ্রয় পায় না, যে স্ত্রীর প্রতি তার পতি বিরূপ ও বিরক্ত, এই মন্ত্রানুগত ক্রিয়ার ফলে, সে স্ত্রী পতির সুনয়নে পতিত হবে এবং পতিগৃহে আশ্রয় পাবে। এই রকমে এই মন্ত্রের প্রভাবে পুরুষেরও সৌভাগ্যোদয় ঘটবে। মন্ত্রের কার্যপ্রণালী কর্মীর আয়ত্তাধীন। কর্মী গুরু-পুরোহিতের দ্বারা কর্মানুষ্ঠান করাতে হবে।এক্ষণে আমাদের আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণের কথা বলি। ভাষ্যের মতে মন্ত্রের অর্থ এইরকম–এই মন্ত্রের প্রভাবে এই অনভিমতা (অর্থাৎ পতির অমনোনীতা) স্ত্রীর ভাগ্য ও তৎ-হেতুভূত শারীরিক অসাধারণ তেজঃ প্রদত্ত হোক। পুষ্পিত বৃক্ষ হতে মানুষেরা যেমন পুস্পনিকর প্রদান করে; সেইরকম ভাবে এই নারী ভাগ্য ও তেজঃ প্রাপ্ত হোক। দৃঢ়মূল পর্বত যেমন আপন স্থান হতে বিচলিত হয় না, সেইরকম এই অতি দুর্ভাগা স্ত্রী চিরকাল পিতৃগৃহেই বাস করছে; পিতৃগৃহ হতে কখনও পতিগৃহে গিয়ে। পতির মুখ-দর্শনে এর সৌভাগ্য হলো না। ভাষ্যানুসারে মন্ত্রের এইরকম অর্থ ও এই রকম ভাব প্রাপ্ত হওয়া যায়।এবার আমাদের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে দু চারটি কথা বলা যাক। মন্ত্রে একটি অস্যা পদ আছে। তা হতে ভাষ্যকার অনভিমতয়াঃ স্ত্রীয়াঃ অর্থ অধ্যাহার করেছেন। কিন্তু আমরা বলি, অস্যাঃ পদ পূর্ব-সম্বন্ধ দ্যোতক। তার বাংলা ভাব-ইহার। অর্থাৎ, পূর্বে যার কথা বলা হয়েছে, যার প্রসঙ্গ চলেছে, ঐ পদে তাকেই লক্ষ্য আছে। হঠাৎ এখানে পতি-পরিত্যাক্তা স্ত্রীকে কেন সন্ধান করে আনি? পূর্ব সূক্তের শেষ মন্ত্রে (এই মন্ত্রের অব্যবহিত পূর্বেই) দেবীর প্রসঙ্গ আছে। সেই দেবী যে সৎ-বৃত্তিরূপিণী দেবী, তা আমরা সেখানেই প্রতিপন্ন করেছি। আমরা বলি, এখানে অস্যাঃ পদে সেই দেবীকেই নির্দেশ করছে। কাকে সম্বোধন করে মন্ত্রটি উচ্চারিত হয়েছে, ভাষ্যে তার নির্দেশ নেই।…এই সকল কারণে, বিশেষতঃ বৃক্ষাদিব জং এই উপমার অর্থানুসরণে, আমরা এই মন্ত্রের সম্বোধনে ভগবানের প্রতি লক্ষ্য আছে–মনে করি।-আমরা মনে করি, মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক।…তাই প্রার্থনা করা হলো,–হে ভগবন্! পুষ্পিত তরু হতে পুষ্প-সম্ভার চয়ন-পূর্বক মালী যেমন অপরকে প্রদান করে, সবৃত্তিরূপিণী দেবীর ঐশ্বর্য ও তেজঃ আপনি সেইরকম আমায় প্রদান করুন। পুষ্পিত তরুর পুষ্পসম্ভার দান-প্রাপ্তির প্রার্থনা–এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও সঙ্গত উপমাই হয়েছে।–মন্ত্রের দ্বিতীয়াংশের প্রার্থনা–দৃঢ়মূল পর্বতের ন্যায় অচল অটল হয়ে আমার চিত্ত সেই ভগবৎ-পাদপদ্মে (সত্ত্বভাবের মহাসমুদ্রে) চিরকাল অবিচলিত-ভাবে আশ্রয় গ্রহণ করুক।–এই সকল বিষয় বিবেচনা করলে, মন্ত্রে আমরা যে অর্থ গ্রহণ করলাম, সেই অর্থই সঙ্গত হয় ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ— সংযম-মূল দ্যোতমান হে শুদ্ধসত্ত্ব-ভাব। সৎ-বৃত্তিরূপা আপনার এই কন্যা মনোরূপ-বরের পরিণীতা পত্নী হন; সেই বধূ পতিগৃহ হতে বিতাড়িত হয়েছেন (অর্থাৎ, মন আর সৎ-বৃত্তিকে পোষণ করতে চায় না, তাই তাকে দূরীভূত করেছে); এইভাবে বিতাড়িত হয়ে, সেই বধূ এখন আপন জননীর এবং ভ্রাতার এবং পিতার গৃহে (আশ্রয় নিয়ে সেখানেই) চিরতরে আবদ্ধ রয়েছে। (ভাব এই যে,–শুদ্ধসত্ত্বভাব হতে নিঃসৃত যে সৎ-বৃত্তি, সে আমার অন্তঃকরণে স্থান-লাভ করেনি। অন্তঃকরণ হতে বিতাড়িত হয়ে সৎ-বৃত্তি সম্প্রতি উৎপত্তি-মূল ভগবানে বিলীন হয়ে আছে)। ২
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মন্ত্রটি বিষম কুহেলিকা-পূর্ণ। পতিপরিত্যক্তা স্ত্রী যাতে পতিগৃহে পুনরায় আশ্রয় পায় এবং পতির প্রিয় হয়, সেই উদ্দেশ্যেই মন্ত্রটির প্রয়োগ-বিধি আছে। তা থাকুক। কিন্তু মন্ত্রের নিগূঢ় তাৎপর্য কি, তা-ই অনুধাবনার বিষয়। ভাষ্যকার বলেন, এখানে রাজন্ পদে সোমকে সম্বোধন করা হয়েছে। যম তার বিশেষণ। মন্ত্রে বলা হয়েছে-হে রাজমান সোম! এই কন্যা বা স্ত্রী তোমার বধূ (জায়া); প্রথমে তুমি একে পরিগ্রহ করেছিলে। কিন্তু এক্ষণে দুর্ভাগ্যবশতঃ পতিগৃহ হতে (তোমার গৃহ হতে) সে নিঃসারিত হয়েছে। এই প্রকারে নিঃসারিত হয়ে, সে এখন আপন জননীর গৃহে, আপন ভ্রাতার গৃহে, এবং, আপন পিতার গৃহে চিরতরে আবদ্ধা রয়েছে। সে এমনই দুর্ভাগা যে, পিতৃমাতৃগৃহে তাকে চিরকাল (যাবজ্জীবন) বাস করতে হলো; সে আর কখনও পতিগৃহে প্রবেশ করতে পেলো না।–আমরা মনে করি, এই মন্ত্রের সম্বোধ্য– শুদ্ধসত্ত্বভাব রাজন্ পদ হতে এবং ঐ পদের প্রতিবাক্যে ভাষ্যকার যে,সোম শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা হতে, আমরা ঐ সম্বোধন আমনন করতে পারি। সোম শব্দে যে শুদ্ধসত্ত্বভাবকে (ভক্তি প্রভৃতিকে) বোঝায়, তা আমরা পুনঃ পুনঃ প্রতিপন্ন করে আসছি। রাজন ও যম এই দুই পদই শুদ্ধসত্ত্বের প্রকৃত দ্যোতক। সত্ত্বভাবের ন্যায় দীপ্যমান (রাজমান) সংসারে আর কি আছে? সংযমসাধনার পক্ষেও সত্ত্বভাবই শ্রেষ্ঠ উপাদান। এষা পদে পূর্বমন্ত্রকথিত সৎ-বৃত্তিকেই লক্ষ্য করে। তে কন্যা অর্থাৎ তোমার কন্যা–অর্থাৎ সত্ত্বভাব থেকেই সৎ-বৃত্তির উৎপত্তি। সুতরাং সত্ত্বভাবকে সৎ-বৃত্তির পিতৃস্থানীয় বলা যেতেই পারে। এখন অবশিষ্ট রইলো-বধূঃ পদ। এখানে মনোরূপস্য বরস্য বাক্য অধ্যাহার করেছি। মন্ত্রের ঐ বধূঃ পদ, ঐ বরের সঙ্গে ভিন্ন অন্য বরের সাথে সম্বন্ধযুত হতে পারে না… বন্ধু পদের তাৎপর্য এই যে, পত্নী যেমন পতির সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়, সৎ-বৃত্তি সেইরকম প্রথমে এসে মনের সাথে মিলিত হয়। মানুষের প্রথম অবস্থায়, নবজীবনে, তরুণ মনে, প্রথমে সৎ-বৃত্তিরই স্বতঃ বিকাশ হয়। পরে ক্রমে, পারিপার্শ্বিক পাপ-প্রলোভনের মোহে পড়ে, নিজের অন্তরস্থিত সৎ-বৃত্তিকে মানুষ তাড়িয়ে দেয়। বড় সঙ্গও উপমা!–মন্ত্রের শেষাংশের ভাব,-পতি-পরিত্যক্তা বধূকে যেমন মাতৃগৃহে ভ্রাতৃগৃহে ও পিতৃগৃহে আশ্রয় নিয়ে দিনযাপন করতে হয়, সৎ-বৃত্তিকেও সেইরকম আপন উৎপত্তিস্থানে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। এখানে মাতা, ভ্রাতা ও পিতা তিনটি পদ আছে। সৎ-বৃত্তির পিতা–শুদ্ধসত্ত্বভাব। তার জননী-পর্যায়ে হৃদয়কে মস্তিষ্ককে নির্দেশ করতে পারি। তার ভ্রাতা বলতে–সত্য, সরলতা, দয়া প্রভৃতি সৎ-গুণাবলিকে নির্দেশ করতে পারি। তখন, পতিগৃহ হতে বিতাড়িত হয়ে, যেখানে শুদ্ধসত্ত্বভাব আছে, সেখানে গিয়ে সে আশ্রয় গ্রহণ করে,-যেখানে দয়া, সত্য, সরলতা প্রভৃতি গুণের সমাবেশ আছে, সেখানে। গিয়ে সে বসতি করে, যে হৃদয়ে বা মস্তিষ্কে একটু জ্ঞান আছে–সেইখানে গিয়ে সে আবদ্ধ থাকে। বদ্ধতাং পদের সার্থকতা এই যে, সেই হৃদয়ে বা সেই মস্তিষ্কেই সে বদ্ধ থেকে যায়, বাহিরে এসে, পরিত্যাগকারীর কাছে এসে, সে আর আপন কর্মকারিতা প্রকাশ করে না।–এইভাবে আমরা মনে করি, মন্ত্র যে কার্ষে, যে ভাবেই প্রযুক্ত হোক, মন্ত্রের লক্ষ্য,-ভ্ৰমান্ধ মনকে সতর্ক করা ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হে দ্যোতমান শুদ্ধসত্ত্ব! সৎ-বৃত্তিরূপা তোমার এই কন্যা কুলপবিত্ৰকারিণী (অর্থাৎ, সে কখনও ব্যাভিচারিণী বিপথগামিনী হয় না); অতএব, সৎ-বৃত্তিরূপা তোমার সেই কন্যাকে তোমারই আশ্রয়ে রক্ষা করো, সে চিরকাল পিতৃগৃহে (সত্ত্ব সম্বন্ধেই) বাস করুক; তাতেই তার মস্তক ভুলুণ্ঠিত হোক (অর্থাৎ, সেই অবস্থাতেই সে তোমাতে লীন হোক)। (ভাবার্থ,-মন হতে পরিত্যক্ত সেই সৎ-বৃত্তি উপায়ান্তর বিহীন হয়ে উৎপত্তিকারণ সত্ত্বভাবের সাথে লীন হয়ে আছে)। ৩৷৷
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –ভাষ্যে এ মন্ত্রেও সোমকে সম্বোধন আছে। ভাষ্যানুসারে এই মন্ত্রের মর্মার্থ এই এ যে,-তোমার এই স্ত্রী পাতিব্ৰত্যের দ্বারা কুলের পালয়িত্রী। যেহেতু বিবাহকালে প্রথমতঃ তোমা কর্তৃক এই স্ত্রী পরিগৃহীত হয়েছিল, তুমি এর রক্ষণাবেক্ষণ করবে বলেই এই কন্যা তোমাকে দান করা হয়। তোমার পর নিকট প্রত্যাখ্যাত হয়ে এক্ষণে সে চিরকালের জন্য পিতৃগৃহে বাস করছে। সেখানেই তার মস্তক ভূপতিত হতে চললো, অর্থাৎ সেই অবস্থাতেই তার মরণ নিকটে এলো। এ মতে, পত্নী-পরিত্যাগকারী কোনও পতিকে সম্বোধন করে যেন এই মন্ত্রটি উচ্চারিত হয়েছিল, এটাই প্রতিপন্ন হয়। পাশ্চাত্য-পণ্ডিতগণ এই ব্যাখ্যারই অনুমোদন ও অনুসরণ করেন।–আমরা পূর্বাপর ভাব-সঙ্গতি রক্ষা-পক্ষে রাজ ও এ পদ দুটিতে যথাক্রমে সত্ত্বভাবকে ও সৎ-বৃত্তিকে লক্ষ্য করে এসেছি। মন যখন সৎ-বৃত্তির সংশ্রব পরিত্যাগ করে, তখন সৎ-বৃত্তি আর কোথায় যাবে? যে সৎ হতে এসেছিল, সে তখন সেই সতেই গিয়ে আশ্রয় নেয়। এখানে সেই কথাই রূপকের আবরণে উপমার মধ্য দিয়ে পরিবর্ণিত হয়েছে। পতি যদি আপন পত্নীকে পরিত্যাগ করে, আর সে পত্নী যদি ব্যাভিচারিণী না হয়; তাহলে, তার পিতা তাকে আশ্রয় দেন,-পালন করেন; সে যদি আর স্বামিগৃহে আশ্রয় না পায়, তাহলে পরিশেষে পিতৃগৃহেই তার আয়ুঃ শেষ হয়। সাংসারিক এই নিত্যপরিদৃশ্যমান ব্যাপারের মধ্য দিয়ে, এখানে মনস্তত্ত্বের এক নিগূঢ় রহস্য ব্যক্ত করা। হয়েছে। …সৎ-বৃত্তি সত্ত্বভাবসস্তৃতা। যেখানে সত্ত্বভাব, সে তো গিয়ে সেখানে বিলীন হলো। এই অর্থেই পিতৃগৃহ-বাসের উপমা। সংসারী লোকের চক্ষে স্বামী-পরিত্যক্তা অবস্থায় পিতৃগৃহে নারীর জীবনযাপন বিসদৃশ দৃশ্য। তাতে তার মস্তক ভূলুণ্ঠিত হলো–ভাব আসে।…কিন্তু, তা হলেও, সে যখন আপন পাতিব্ৰত্য-ধর্ম অক্ষুণ্ণ রেখে, পতির ধ্যানে, পরমেশ্বরের পূজায়, জীবন যাপন করে; তার পারলৌকিক মঙ্গল অবিসম্বাদী। এখানে সেই আভাষই পাওয়া যায়। এ পক্ষে মন্ত্রের উপদেশ এই যে,–মানুষ! তুমি সৎ-বৃত্তিকে পরিত্যাগ করে যেও না। সে আশ্রয়বিহীন নয়। কিন্তু তাকে পরিত্যাগ করে তোমাকেই শেষে নিরাশ্রয় হতে হবে। এই মন্ত্রের ভাব উপলব্ধি করে, মানুষ যখন বলতে পারবে, হে দেবি! তুমি আমারই গৃহে থাকো, পিতৃগৃহে তোমার যাওয়ার প্রয়োজন নেই–তখনই মন্ত্রের লক্ষ্য সিদ্ধ হবে ৷ ৩৷৷
চতুর্থ মন্ত্রঃ অসিতস্য তে ব্ৰহ্মণা কশ্যপস্য গয়স্য চ। অন্তঃকোশমিব জাময়োহপি নহ্যামি তে ভগম ॥ ৪
বঙ্গানুবাদ –হে আমার মন! তোমার দুষ্কৃতিকে, অসিত কশ্যপ ও গয় নামক মহর্ষি-ত্রয়ের প্রবর্তিত (অথবা–পাপ-কালিমা-নাশক, দণ্ড-নিবারণ-কারক এবং উন্মাৰ্গতাজনিত দোষপরিহারক) মন্ত্রের দ্বারা অপনোদন করছি; সেই মন্ত্রের দ্বারা, তোমার সৌভাগ্যকে নিত্যপরিবর্ধনশীল বিত্তকে (অথবা, অপত্য ইত্যাদিকে) নিগূঢ় স্থানে লুক্কায়িত রত্নের ন্যায় প্রকটিত করছি। (মন্ত্রশক্তি অব্যর্থ-ফলপ্রদায়িনী। হে মন! সেই মন্ত্রশক্তির প্রভাবে তোমার উৎকর্ষসাধন করছি।মন্ত্রটি এমনই আত্ম-উদ্বোধনমূলক)। ৪।
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –ভাষ্যে এ মন্ত্রে নারীকে সম্বোধন আছে। তাকে সম্বোধনে বলা হচ্ছে,–হে নারি! অসিত ঋষির, কশ্যপ ঋষির এবং গয় ঋষির মন্ত্রের দ্বারা, তোমার ভাগ্যের বাধা দূর করছি; গৃহের মধ্যে অবস্থিত ধনের ন্যায় তোমার সৌভাগ্য ও অপত্য ইত্যাদি প্রাপ্ত করছি। ভায্যে মন্ত্রার্থে সংক্ষেপতঃ এই ভাবই প্রকাশ পেয়েছে।–কেবল নারীকে কেন, ভাষ্যকারের অনুসরণেই আমরা বলতে পারি, মনকে অথবা সৎ-বৃত্তিকে (বরকে অথবা বধূকে) দুয়ের যে কোনটির সম্বোধনে মন্ত্রটি প্রযুক্ত হয়েছে–এমনও বলা যেতে পারে।…তাতে, দুয়ের একের সম্বোধনে প্রযুক্ত মনে করলে, উভয়ের যে কাউকে সম্বোধন-পূর্বক বলা যায়, মন্ত্রের দ্বারা তোমার ভাগ্যপরিবর্তন সাধিত করছি। আমাদের দৃষ্টিতে অবশ্য, মনঃ-সম্বোধনে মন্ত্রের প্রয়োগই অধিকতর সঙ্গত বলে প্রতীত হয়। পিতৃগৃহে বাসের উপমায় (পূর্ব মন্ত্র দ্রষ্টব্য) যদি খবভাব সৌভাগ্যহানির ভাব গ্রহণ করা যায়, তাতে মন্ত্রটি সৎ-বৃত্তির পক্ষে প্রযুক্ত হয়েছে মনে করলেও মনে করতে পারি। কিন্তু সে পক্ষে প্রথম তে পদটির সার্থকতা থাকে না। ভাষ্যকার ঐ তে পদটি গণনায় আনেননি। আমরা মনে করি, এখানে দুরকম বিষয় প্রখ্যাত হয়েছে। প্রথম–দুষ্কৃত-নাশ, দ্বিতীয়–সৌভাগ্য-লাভ। দুষ্কৃতি নাশ না পেলে, সৌভাগ্য কিভাবে আসবে? উভয়ের পারস্পরিক অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ। তাই দুটি তে পদের ব্যবহারে আমরা ঐ ভাব অধ্যাহার করছি। মন্ত্রের প্রভাবে, তোমার দুষ্কৃত (পত্নীত্যাগ-রূপ সৎ-বৃত্তির পরিত্যাগ) দূর হবে; আর তুমি সৌভাগ্য (পরমৈশ্বর্য) প্রাপ্ত হবে। হঠাৎ কোনও গুপ্তধন প্রাপ্ত হলে মানুষের যে আনন্দ হয়, মন্ত্রের প্রভাব, দুর্ভাগ্যের মধ্যে সৌভাগ্যের উদয়ে তুমি সেই আনন্দ লাভ করবে। অন্তঃকোশমিব উপমায় সেই ভাব প্রকাশ করছে।…মন্ত্রের নিগূঢ় শিক্ষা,-তোমার আপন অবস্থা তোমার আপন উদ্যমে পরিবর্তন করতে হবে। প্রস্তুত হও–প্রস্তুত হও।–মন্ত্রে অসিত, কশ্যপ এবং গয় এই তিনটি পদের দ্বারা ঐ তিন নামধেয় তিন জন ঋষির সংশ্রব সূচিত হয়। এ পক্ষে আমরা দুরকম অর্থ আমনন করলাম। মনে করতে হবে, ঐ সব নামে অনন্ত-সম্বন্ধ আছে। কালচক্রনেমির বিন্দুরূপে ঐ সকল মহাত্মা সংসারে আবির্ভূত হন এবং সংসার হতে তিরোহিত হন। –মশক্তি অব্যর্থ ফলপ্রদ। মন্ত্রশক্তির অনুধ্যানে আত্মজয়ী হও। এটাই এখানকার প্রার্থনার গুঢ় উপদেশ। ৪
বঙ্গানুবাদ –হে জলাধিষ্ঠাত্রী সর্বাভীষ্টবর্ষণকারী স্নেহকারুণ্যরূপী (সর্বধারণক্ষম) দেবতা, (আপনারা) আমাদের প্রভূত মঙ্গল সাধন করুন। হে বায়ুর অধিষ্ঠাত্রী (সর্বত্রগমনশীল, সর্বব্যাপী) দেবতা! (আপনারা) আমাদের মঙ্গল (বিধান করুন); হে পতিত-উদ্ধারকারী দেবতা! আপনারা আমাদের সুখ প্রদান করুন। (অর্থাৎ ভগবানের সকল বিভূতিসমূহের অনুগ্রহে আমাদের সর্বপ্রকার শ্রেয়ঃ সাধিত হোক)। (ভাবার্থ-ভগবানের বিভূতিসমূহ আমাদের অনুকূল হোক এবং সর্বমঙ্গল বিধান করুক। অপিচ, তাদের অনুগ্রহে আমাদের সর্বরকম শ্রেয়ঃ সাধিত হোক) ১
অথবা, হে দেবভাবসমূহ! (আপনারা) সংসার-সমুদ্রে নিমজ্জিত জনগণের উদ্ধার সাধন করেন (অথবা ভগবৎ-অভিমুখী কিম্বা আপনাদের অনুগ্রহপ্রার্থী জনগণকে ত্বরায় ভগবানের সাথে সম্মিলিত করেন); (আপনারা) চঞ্চলচিত্ত জনের চিত্তস্থৈর্য বিধান করে ভগবানে সম্মিলিত করেন; (আপনারা) পতিত ও পতনোন্মুখ জনগণের (দুষ্কৃত দূর করে। তাদের মঙ্গল সাধন করেন (সকর্মনিরত করে উদ্ধার-সাধন করেন)। (ভাবার্থ–তাদের দুষ্কৃত দূর করে সৎকর্মপরায়ণ করুন)। ১
অথবা,
হে দেববিভূতিসমূহ! আপনারা জলচর প্রাণীদের, অন্তরীক্ষচারী জীবগণের এবং স্থাবর জঙ্গমাত্মক সকল প্রকার প্রাণীর সুখ ও মঙ্গল বিধায়ক হন। (ভাব এই যে ভগবান্ সকলেরই মঙ্গল বিধান করেন)। প্রাচীনগণের স্তুত্য দীপ্তিদানাদি গুণযুক্ত সেই আদিদেব (পূর্বোক্ত বিভূতি-সমূহ পরিবৃত হয়ে) প্রার্থনাকারী আমাদের এই অনুষ্ঠান-সমূহ প্রাপ্ত হোন। আমরা পবিত্র (তাঁর সমীপে নয়নসমর্থ) সত্ত্ব ইত্যাদি গুণের দ্বারা তাঁর সেবা করছি; (সত্ত্ব ইত্যাদির দ্বারা তাকে পাবার প্রার্থনা করছি)। ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –নানা ভাবে এ মন্ত্রের নানারকম অর্থ অধ্যাহার করা যেতে পারে। এক অর্থে, মন্ত্রের প্রথমাংশে জলদেবতাকে, বায়ুদেবতাকে এবং বনদেবতাকে সম্বোধন করা হয়েছে, বলা যেতে পারে। আর এক অর্থে, ভগবানের বিভিন্ন বিভূতিগুলিকে আহ্বান করে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হয়েছে, বলতে পারি। আর এক অর্থে, ভগবান্ বিভিন্ন বিভূতিরূপে প্রকটিত হয়ে, বিভিন্ন জনের যে উদ্ধার সাধন করে থাকেন, মন্ত্রে তা-ই খ্যাপিত দেখি।–ভাষ্যানুসারে বোঝা যায়, সূক্তের অন্তর্গত এই মন্ত্রগুলি সর্বপুষ্টি-কর্মে প্রযুক্ত হয়ে থাকে। সেই ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, ভাষ্যকার মন্ত্রের প্রথমাংশের অর্থ করেছেন,স্যন্দনশীল নদীসমূহ আমাদের অনুকূলে প্রবাহিত হোক; গমনশীল বায়ু আমাদের অনুকূল থোক। অর্থাৎ, জল, বায়ু ও বন সর্বত্রবিহারী প্রাণিগণ আমাদের সহায় হোক। মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের অর্থ, ভাষ্যকারের মতে,–পুরাতন দেবগণ আমাদের এই যজ্ঞের সমীপবর্তী হয়ে হবিঃ স্বীকার করুন। আমরা সংস্রবণীয় আজ্য ইত্যাদি হবিঃ অগ্নিতে নিক্ষেপ করছি। মন্ত্রের এই ব্যাখ্যাই অধুনা সাধারণ্যে প্রচলিত। বহির্যাজ্ঞিকের পক্ষে এমন প্রার্থনা এমন কামনা সঙ্গত হলেও, অন্তর্যাজ্ঞিকের-মুক্তিপ্রার্থী জনের পক্ষে, এ মন্ত্রে অন্যভাব প্রতিভাত।একটু বিবেচনা করে দেখলে বুঝতে পারা যায়, স্কুল-বস্তুর সাথে এ মন্ত্রের আদৌ সম্বন্ধ নেই। ব্যষ্টিভাবে সমষ্টিভূত ভগবানের বিভিন্ন বিভূতির সম্বোধনে সেই অদ্বিতীয় পরমেশ্বরকেই এই মন্ত্রে লক্ষ্য করা হয়েছে। অসীমকে সসীম মনের মধ্যে ধারণা করা যায় না; তাই তার বিভিন্ন রূপ ও বিভিন্ন আকৃতির কল্পনা করা হয়ে থাকে। অধিকারী অনুসারে বিভিন্ন জন বিভিন্ন বিভূতির ধারণা করে নেয়।…মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের প্রদিবঃ পদের মর্মগ্রহণ একটু দুরূহ। সায়ণ, ঐ শব্দের অর্থ করেছেন,-পুরাতনা দেবাঃ। আমরা এই অর্থের কোনও সার্থকতা উপলব্ধি করতে পারলাম না। নূতন ও পুরাতন–দেবতার এই পর্যায়-নির্দেশ বড়ই বিসদৃশ। বেদবাক্য নিত্য-সত্য-সনাতন বলে স্বীকার করলে, এমন স্তরনির্দেশে তার অপৌরুষেয়ত্বে বিঘ্ন ঘটে। তাই আমরা ঐ পদে দুই বিভিন্ন অর্থ নির্দেশ করেছি। প্রথম, পুরাতনৈঃ ঈড়িত স আদিদেবঃ; দ্বিতীয়, দীপ্তিদানাদিগুণযুও স জ্ঞানদেব যদ্বা অগ্রগামিনঃ দেবঃ। প্রথম অর্থে বোঝা যায়, সেই দেবতাকে যে কেবল আমরাই আরাধনা করছি, তা নয়; আমাদের পূর্ববর্তিগণপিতৃপিতামহ এবং তাঁদেরও পূর্ববর্তিগণ এই ভাবে অনন্ত অতীত কালে, অনন্ত অতীত জনগণ, তাদের পূজা করে গিয়েছেন। তারাও বলেছেন পুরাতন; আমরাও বলছি–পুরাতন, আমাদের পরবর্তিগণও বলবেন–পুরাতন। সুতরাং যিনি পুরাতনগণের ঔত্য, সেই পুরাণ-পুরুষ আদিদেবকেই ঐ প্রদিবঃ পদে লক্ষ্য করা হয়েছে। আমাদের দ্বিতীয় অর্থে বোঝা যায়–আমাদের হৃদয়ে নিহিত দীপ্তিদানাদিগুণযুক্ত সেই জ্ঞানদেবতা আমাদের অনুষ্ঠানসমূহ দেবভাবসমূহ–ভগবৎসকাশে সংবাহিত করুন।–হে দেববিভূতিনিবহ অথবা হে দেবভাবনিবহ! আপনারা? আমাদের মঙ্গল বিধান করুন। সৎ-ভাব-সহযুত সৎকর্মসমূহ আপনাদের প্রদান করছি। আপনারা তা গ্রহণ করুন,–আমাদের পরমার্থসন্নিকর্ষলাভে সহায় হোন, এবং আমাদের ভগবানের সমীপে নিয়ে যান। প্রার্থনাপক্ষে মন্ত্রের এটাই মূল ভাব। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ ইহৈব হবমা যাত ম ইহ, সংশ্রাবণা উতেমং বর্ধয়তা গিরঃ। ইহৈতু সর্বো যঃ পশুরস্মিন্ তিতু। যা রয়িঃ ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হে দেবভাবনিবহ! আমাদের স্তুতির দ্বারা (প্রসন্ন হয়ে).আমাদের এই কার্যে (আমাদের হৃৎ-প্রদেশে) আগমন করুন (অধিষ্ঠিত হোন)। সুপণশীল (অভীষ্টবর্ষণশীল, আমাদের হৃদয়ে নিহিত শুদ্ধসত্ত্ব ইত্যাদির দ্বারা সম্বর্ধিত হয়ে) আপনারা এই কার্যে (অনুষ্ঠানকারী আমাদের হৃদয়ে) আগমন করুন (প্রতিষ্ঠিত হোন)। আমাদের উচ্চারিত এই স্তুতিমন্ত্রসমূহকে (আমাদের প্রদত্ত এই হবিকে) প্রবৃদ্ধ করুন (অর্থাৎ, আমাদের স্তুতিতে প্রসন্ন হয়ে আমাদের সমৃদ্ধিশালী করুন); হে দেবগণ! আমাদের ইহলোকসম্বন্ধি সমস্ত মঙ্গল আমাদের প্রাপ্ত হোক, অপিচ পরলোক-সম্বন্ধি কল্যাণ আমাদের প্রতি বর্ষিত হোক। (ভাবার্থ-হে দেবগণ! আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন। আপনাদের অনুগ্রহে আমাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয়প্রকার মঙ্গল বিহিত হোক। অপিচ, আমাদের মোক্ষফল প্রদান করুন। মন্ত্রে এই প্রার্থনার ভাব দ্যোতিত হচ্ছে) ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এ মন্ত্র সরল প্রার্থনামূলক। ভাষ্যকার মন্ত্রের যে অর্থ নিষ্পন্ন করেছেন, দু এক স্থান ব্যতীত অন্য কোনও স্থলেই তার সাথে আমাদের মতানৈক্য নেই। ভাষ্যকারের ব্যাখ্যায় প্রকাশ,হে দেবগণ! আমাদের আহ্বান শ্রবণ করে, আমাদের আহ্বানের উদ্দেশে, আপনারা আমাদের সমীপে আগমন করুন। অন্য সকল পরিত্যাগ করে কেবল আমার সমীপেই উপস্থিত থাকুন। আমাদের এই অনুষ্ঠানে আমরা সংস্রবণীয় ইত্যাদির দ্বারা হোম নিষ্পন্ন করি। হে দেবগণ! আমাদের কর্তৃক স্মৃয়মান হয়ে হবিপ্রদানকারী আমাদের প্রজা-পশু-অশ্ব ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধশালী করুন। আমাদের অনুগ্রহে লোকপ্রসিদ্ধ গো-অশ্ব-মহিষ ইত্যাদি এবং ধান্য-কনক ইত্যাদি আমাদের গৃহে আগমন করুক। ইত্যাদি। সায়ণ পশুঃ এবং রয়িঃ পদ দুটিতে যথাক্রমে গো-অশ্ব-মহিষ ইত্যাদি পশু ও ধান্য-কনক ইত্যাদিরূপ ধন অর্থ করেছেন। লৌকিক হিসাবে এমন অর্থ অসঙ্গত নয়; কিন্তু মোক্ষপ্রার্থী ভক্তসাধক ঐহিক সুখলাভের কামনা করেন না। তাঁদের পশু ইত্যাদি লাভের কামনা ইহলৌকিক মঙ্গলপ্রাপ্তি-শুদ্ধসত্ত্বলাভে, সৎকর্মের সম্পাদনে সাধিত হয়ে থাকে। তাই এখানে পশুঃ পদে আমরা ইহলৌকিক মঙ্গল অর্থ অধ্যাহার করেছি। রয়িং পদে পারলৌকিক মঙ্গল অর্থ অধ্যাহৃত হয়েছে। প্রার্থনাপক্ষে মন্ত্রের ভাব এই যে,-হে দেবভাবনিবহ! আপনারা প্রসন্ন হয়ে আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন; আমাদের হৃদয়নিহিত শুদ্ধসত্ত্বভাবের দ্বারা সম্বর্ধিত হয়ে আমাদের হৃদয়ে আসন গ্রহণ করুন। আমাদের উচ্চারিত স্তুতিমন্ত্ৰসমূহ যাতে ভগবৎ-অনুসারী হয়, আপনারা তার বিধান করুন। অপিচ, আমাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল সাধন করে আমাদের পরমার্থলাভে সহায় হোন। হৃদয়ে সত্ত্বভাবের উদয় হোক, আমরা সৎকর্মের সাধনে অনুপ্রাণিত হই, ফলে সংসারসমুদ্র তরে যাই।–আমরা মনে করি, মন্ত্রে এই প্রার্থনাই প্রকটিত রয়েছে। ২।
তৃতীয় মন্ত্রঃ যে নদীনাং সংস্রবন্তুৎসাসঃ সদমক্ষিতা তেভির্মে সর্বৈঃ সংস্ৰাবৈর্ধনং সং স্রাবয়ামসি ৷৷ ৩৷
বঙ্গানুবাদ –নদীগর্ভস্থিত এবং উৎস-উৎপন্ন (গিরিকর হতে উৎপন্ন) সলিলরাশি যেমন অবিচ্ছিন্ন-গতিতে প্রবাহিত হয় (অথবা নদী ও উৎস-সমূহ যেমন স্ব স্ব সলিলরাশি সাগরের অভিমুখে সংবাহিত করে), সেই রকম, হে দেবগণ! আমাদের সৎ-ভাব-সহযুত সৎকর্মনিবহকে ভগবানে সংযোজিত করুন (অথবা, ভগবানের সমীপে পৌঁছিয়ে দিন)। (ভাব এই যে,-হে দেব! আমরা যেন সৎ-ভাব-সহযুত সৎকর্মের প্রভাবে ভগবাকে প্রাপ্ত হই) ॥ ৩॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এ মন্ত্রটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ একটু সমস্যা-মূলক। ভাষ্যকারের ব্যাখ্যায়ই সে সমস্যার অবতারণা হয়েছে। মন্ত্রের ব্যাখ্যা-ব্যপদেশে ভাষ্যকার বলেন,গঙ্গা ইত্যাদি নদীপ্রবাহ এবং গিরিকর-উদ্ভিন্ন নিঝর-সমূহ অবিরাম-গতিতে প্রবাহিত হয়; গ্রীষ্মকালেও তার ক্ষয় নেই। সেই জলপ্রবাহ ইত্যাদির দ্বারা আমরা গো-হিরণ্য ইত্যাদি ধন প্রাপ্ত হবে। অথবা জলপ্রবাহের অবিচ্ছিন্ন অবাধগতির ন্যায় আমরাও অবিচ্ছিন্নভাবে সমৃদ্ধিসম্পন্ন হবো।–মন্ত্রের এমন ব্যাখ্যাই সাধারণ্যে প্রচলিত। কিন্তু মন্ত্রের মধ্যে, যে এক অতি উচ্চ উদার ভাব চিরলুক্কায়িত আছে, তার প্রতি এ পর্যন্ত কেউই লক্ষ্য করেননি।–জল প্রবাহের দ্বারা আমাদের ধনবৃদ্ধি করব–এমন উক্তি বড়ই সমস্যাপূর্ণ। এ থেকে সাধারণ-দৃষ্টিতে দূরকম অর্থ আমনন করা যেতে পারে। নদী ও সমুদ্রগর্ভে নানারকম ধনরত্ন লুক্কায়িত থাকে; সেই সকল ধনরত্নের আহরণে সমৃদ্ধ হবো–এই একরকম ভাব আসতে পারে। আর একরকম ভাব এই যে,-নদীর ও উৎসের জল অবিচ্ছেদে সংবাহিত করে সিঞ্চন করলে শস্য ইত্যাদি বৃদ্ধি হবে। আর তার দ্বারা আমাদের অভীষ্টপূরণ হবে। বহির্যাজ্ঞিকের পক্ষে, ঐহিকসুখপ্রয়াসী জনগণের পক্ষে, সংসারী, সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে, এমন ধনলাভের প্রার্থনা সঙ্গত বটে।–আমরা কিন্তু মনে করি, এ মন্ত্র দেরভাবসমূহকে সম্বোধন করে উচ্চারিত হচ্ছে। মন্ত্রের মধ্যে, আমাদের মতে যে কয়েকটি উপমা বিদ্যমান, তার বিশ্লেষণে মন্ত্রের নিগূঢ় ভাব হৃদয়ঙ্গম হবে।মন্ত্রে বলা হচ্ছে,-নদী ও উৎস-সমূহ যেমন আপন আপন সলিলরাশি সাগরের অভিমুখে সংবাহিত [. করে, সেইরকম হে দেবভাবনিবহ! আপনারা আমাদের সৎ-ভাব-সহযুত সৎকর্মনিবহকে ভগবানের নিকট সংবাহিত করুন। আমরা মনে করি, মন্ত্রের মধ্যে এই নিগূঢ় ভাবই প্রচ্ছন্ন রয়েছে ৷ ৩৷৷
চতুর্থ মন্ত্রঃ যে সর্পিষঃ সংস্রবন্তি ক্ষীরস্য চোদ্দকস্য চ। তেভির্মে সর্বৈঃ সংস্ৰাবৈর্ধনং সং বয়ামসি ॥৪॥
বঙ্গানুবাদ –সর্পণশীল জ্ঞানকিরণ, ক্ষরণশীল সত্ত্বভাব ইত্যাদি এবং দ্রবণশীল সৎকর্মনিবহ (ভক্তিভাব ইত্যাদি) আপনা-আপনিই ভগবৎ-অভিমুখী হয়। জ্ঞানকিরণ, সত্ত্বভাব এবং সকর্মনিবহ বা ভক্তি প্রভৃতির সাহায্যে আমাদের চতুর্বর্গের ফললাভরূপ অভীষ্ট সিদ্ধ হোক। (ভাবার্থ,-জ্ঞানের সত্ত্বভাব ইত্যাদির এবং সৎকর্মের প্রভাব সর্ববিদিত। অতএব, তাদের আনুকূল্যে আমি যেন চতুর্বর্গফলরূপ-ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষরূপ–অভীষ্টধন প্রাপ্ত হই। ৪।
মন্ত্ৰাৰ্থ–আলোচনা –পূর্ব-মন্ত্রের ন্যায় এ মন্ত্রটিও জটিলতাপূর্ণ। ভাষ্যে যে অর্থ প্রকাশিত, তা হতে বোঝা যায়,–সর্পি, ক্ষীর এবং উদক্ প্রভৃতি যে সকল আজ্য যজ্ঞকালে অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হয়, তারই অবয়ব (সারাংশ) নদীরূপে প্রবাহিত হয়ে থাকে। নদীসমূহ যেমন অবিচ্ছেদে সর্বদা প্রবাহিত হয়, সেইরকম আমরাও অবিচ্ছিন্নভাবে শস্য ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধ হতে থাকি। সাধারণভাবে মন্ত্রে এই অর্থই অধ্যাহৃত হয়। এক্ষণে আমাদের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে দুচারটি কথা বলা যাক। মন্ত্রের অন্তর্গত সর্পিষঃ পদে আমরা সর্পণশীলস্য জ্ঞানকিরণস্য অর্থ আমনন করেছি। ধাতুগত অর্থের অনুসরণে ঐ অর্থই সঙ্গত।ক্ষীরস্য পদে আমরা ক্ষরণশীলস্য সত্ত্বভাবাদেঃ অর্থ আমনন করলাম। জ্ঞানের সঙ্গে সত্ত্বভাবের নিত্য-সম্বন্ধ। জ্ঞান হতেই সত্ত্বভাবের সৎ-ভাবসমূহের উৎপত্তি। ক্ষীর যেমন দুগ্ধের সারভূত; সৎ-ভাব ইত্যাদিও সেইরকম জ্ঞানের সারভূত। জ্ঞানের উদয় না হলে সৎ-অসৎ বিচারশক্তির উন্মেষ হয় না।উদকস্য পদের আমরা দ্রবণশীলস্য সৎকর্মনিবহস্য ভক্তিরসস্য অর্থ অধ্যাহার করেছি। এ-ও ধাতুগত অর্থের অনুসরণে সঙ্গত। প্রার্থনাপক্ষে, এ মন্ত্রে যে ভাব উপলব্ধ হয়, তা প্রকটিত করছি;–জ্ঞানকিরণ, সত্ত্বভাব ইত্যাদি এবং ভক্তিসহযুত সৎকর্মনিব, মুক্তিপ্রার্থীজনগণকে ভগবানের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়। এ পক্ষে ঐ তিনের প্রভাব অপরিসীম। মুক্তিপ্রার্থীজন তাই আকুল কণ্ঠে বলছেন,হে দেব! আমরা চতুর্বর্গধনলাভের প্রয়াসী; আমাদের হৃদয়ে জ্ঞানের বিচ্ছুরণ ঘটাও, হৃদয়ে সত্ত্বভাবের সঞ্চার করে দাও, ভগবানের কার্য– সকার্যসম্পাদনে প্রবৃত্তি আসুক। জ্ঞানের উদয়ে হৃদয়ে সত্ত্বভাবের সঞ্চার হোক, সৎকার্যসম্পাদনে তৎপরতা লাভ করি। তা হলেই আমাদের পরমার্থসিদ্ধি হবে;–তাহলেই, আমরা আমাদের আরাধ্য-দেবতা-সকাশে, উপনীত হতে সমর্থ হবো। আমরা মনে করি, সর্বপুষ্টি-কর্মে প্রযুক্ত এই মন্ত্রটিতেও অ্যাধ্যাত্মিকভাবে এই ভাবই অভিব্যক্ত। ৪
বঙ্গানুবাদ –লোকপ্রসিদ্ধ সর্বসংহারক যে শত্রুগণ অমানিশাবৎ অন্ধ তমসাচ্ছন্ন হৃদয়কে, অপিচ স্বল্প-প্রদীপ্ত-হৃদয় ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়, দেবগণের অগ্রগামী পরমৈশ্বর্যশালী অগ্নিদেব (জ্ঞানদেবতা), সেই শত্রুসমূহকে বিনাশ করেন। শহন্তা সেই অগ্নিদেব, আমাদের এই পরিত্রাণের জন্য, (আমাদের অন্তর হতে) শত্রুবর্গকে বিদূরিত করুন। (ভাব এই যে,–জ্ঞানের প্রভার সর্বজনবিদিত। জ্ঞানের প্রভাবে আমাদের অন্তশত্রু বিনষ্ট হোক, আমাদের মায়ামোহ দূরে যাক; আমরা পরমার্থের সন্নিকর্ষলাভের অধিকারী হই) ॥১॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এই সূক্তের মন্ত্রগুলির প্রয়োগ সম্পর্কে বলা হয়েছে দ্বেষ্যমারণার্থং অভিমন্ত্রিত সীসচূর্ণমিশ্ৰান্নপ্রদানং তত্রস্থাবরণসংস্পর্শনং..ইত্যাদি।–সে তো সাধারণ অর্থে। আমরা এই মন্ত্রে প্রধানতঃ দুটি ভাব উপলব্ধি করি। প্রথমতঃ–জ্ঞানোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞানতারূপ শত্ৰুসকল বিধ্বস্ত হয়, দ্বিতীয়তঃ–শত্রুদমনের–অজ্ঞানতা-নাশের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানদেব প্রকাশিত হন। ফলতঃ, জ্ঞানোদয়ই অজ্ঞানতা নাশের মূলীভূত। ভাষ্যের অর্থে মন্ত্রের ভাবগ্ৰহণ পক্ষে বিষম অন্তরায় উপস্থিত হয়। এই পঞ্চম সূক্তের অনুক্রমণিকায় প্রকাশ, (আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি), দ্বেষ্যমারণ বা হিংসা নিবারণের জন্য সূক্তের মন্ত্রসমূহ প্রযুক্ত হয়ে থাকে। সূক্তের অন্তর্গত মন্ত্রগুলির দ্বারা সীসচূর্ণমিশ্রিত অন্নসমূহ নিক্ষেপ করতে হবে, রোগাক্রান্ত ব্যক্তির গাত্র স্পর্শ করতে হবে এবং স্বয়ংছিন্ন বেনুষ্টির দ্বারা তাকে তাড়ন করতে হবে।–এই সূত্রেই ভাষ্যকার মন্ত্রের যে অর্থ প্রকাশ করেছেন, এই স্থলে তার উল্লেখ করছি।অমাবস্যার রাত্রিতে যে সকল রক্ষঃপিশাচ ইত্যাদি নীরোগ হৃষ্টপুষ্ট ব্যক্তিগণের প্রতি হিংসার জন্য বিচরণ করে, তাদের নিবারণ করবার জন্য আত্মরক্ষামূলক রাশ্লোঘ্ন ইষ্টির অনুষ্ঠান করবে। অগ্নিদেব সেই সকল রক্ষঃপিশাচ ইত্যাদি নিহত করেন। সুতরাং সেই অগ্নিদেব রক্ষঃপিশাচ ইত্যাদিজনিত আমাদের ভয় নিবারণ করুন। ইত্যাদি.. রাএিকালে বিচরণশীল অসুরসংহারই কি কেবল অগ্নিদেবতার কার্য? এরকম অর্থে মন্ত্রে কোনও সৎ-ভাবের কল্পনা নিতান্ত দূরূহ। অমাবস্যাং রাত্রিং শব্দ দুটিতে আমরা অমানিশাবৎ অন্ধতমসাচ্ছন্নহৃদয়ং অর্থ আমনন করেছি। তাতে ভাব হয় এই যে,–ঘোরান্ধকার রজনীর ন্যায় যাদের হৃদয় অজ্ঞানতায় সমাচ্ছন্ন। অজ্ঞানতাই যে সকল অনর্থের মূল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।-ব্রাজং রাত্রিং পদ দুটির ভাষ্যকার অর্থ করেছেন,–ভ্ৰাজমানাং তারকাদিভিদ্দীপ্যমানাং রজনীং; আমরা অর্থ করলাম,-দীপ্তবৎ প্রতীয়মানং ন তু সম্যক্ প্রদীপ্তান্তরং। এ স্থলেও অজ্ঞানতার ভাবই প্রকাশ পেয়েছে। জ্ঞানের জ্যোতি এখানে সম্যক্ বিচ্ছুরিত হয়নি। এখানে জ্ঞান-অজ্ঞানের দ্বন্দ্ব চলছে। মেঘের কোলে বিজলীর ন্যায় এক একবার জ্ঞানরশ্মি বিকাশ পাচ্ছে; আবার অমনি অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। নক্ষত্র-তারকা ইত্যাদি সম্যক্ জ্যোতিশীল নয়; কিন্তু তবুও তারা যেমন অন্ধকার রজনীতে অন্তরীক্ষে সঞ্চারিত হয়ে অন্ধকার-নাশের কিছুটা প্রয়াস পায়, জ্ঞানাঙ্কুর উগমের প্রথম অবস্থায়ও সেই ভাব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। নক্ষত্র ও তারকা ইত্যাদির ক্ষীণরশ্মি যেমন রজনীর গাঢ় অন্ধকার ভেদ করতে পারে না; স্ফুরণোন্মুখ জ্ঞানজ্যোতিও সেইরকম প্রথম অবস্থায় অজ্ঞানতিমির নাশ করে হৃদয় আলোকিত করতে সমর্থ হয় না। তখনও অন্তঃশত্ৰু-সমূহ সে হৃদয় আক্রমণ করে বিধ্বস্ত করবার প্রয়াস পায়।ব্রাজং রাত্রিং পদ দুটিতে আমরা মনে করি, সেই ভাবই প্রকাশ পেয়েছে। জ্ঞানলাভেই হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বভাব জাগরিত হয়, শুদ্ধসত্ত্ব-ভাবেই ভগবানের ঐশ্বর্যবিভূতি-সমূহ অধিগত হয়ে আসে। এই জন্যই জ্ঞানাগ্নি যাতুহা বিশেষণে বিশেষিত হয়েছেন।–মন্ত্রে অগ্নিদেবের একটি বিশেষণ আছে–তুরীয়। ঐ পদের নানা অর্থ কল্পিত হয়ে থাকে। সায়ণ ঐ পদের অর্থ করেছেন,–চতুর্থঃ অগ্নিঃ। এই প্রসঙ্গে একটি পৌরাণিক উপাখ্যানের অবতারণা হয়ে থাকে। সে মতে অগ্নি চারপ্রকার বৈতানিক, গার্হ্য, সংগ্রামিক ও আঙ্গিরস। ভাষ্যকারের মতে এস্থলে শেষোক্ত অগ্নির প্রতিই লক্ষ্য আছে। এ হিসাবেও তুরীয় পদে এক উচ্চ ভাব পরিব্যক্ত হয়েছে, বুঝতে পারি। চতুর্থ অগ্নি অর্থাৎ পূর্ণ জ্ঞান। জ্ঞানের চরম সীমায় উঠতে পারলে, তখন আর শক্ৰভয় থাকে না। তুরীয় পদে এ ভাবও ব্যক্ত হতে পারে। তবে সাধারণভাবে–তুরীয়ঃ অর্থাৎ চতুর্থ অগ্নি বা আঙ্গিরস অগ্নি বললে কোনও বিশেষ ভাব উপলব্ধ হয় না, তাই আমরা তুরীয়ঃ পদে অঙ্গনাদিগুণযুক্ত, পরিত্রাতা, পরমৈশ্বর্যশালী অর্থ গ্রহণ করেছি।-মন্ত্রে আছে, ৪ অগ্নিদেব অজ্ঞান হৃদয়ের সকল শত্ৰু সংহার করেন; ভাব এই যে, আমরা অজ্ঞান-তিমিরে ডুবে আছি; কামক্রোধ ইত্যাদি রিপু শত্রুর ভীষণ আক্রমণে বিধ্বস্ত হচ্ছি, মায়ামমাহ প্রভৃতি এসে আমাদের অভিভূত করে ফেলছে। পুত্ৰকলত্রের বন্ধন, ঐশ্বর্যসম্পদের বন্ধন, নানা বন্ধন আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। তাই প্রার্থনা করছি,–হে জ্ঞানদেবতা! আপনি যাতুহা বলে সর্ববিদিত। আপনি এসে আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন; হৃদয় জ্ঞানের কিরণে পোদ্ভাসিত হোক। অজ্ঞানান্ধকার দূরে যাক; মায়ামোহরূপ সংসার-বন্ধন টুটে যাক; সৎকর্মের প্রভাবে হৃদয়ে সত্ত্বভাবের সঞ্চার হোক; সত্ত্বের প্রভাবে সৎ এসে হৃদয়-মন্দিরে আসন গ্রহণ করুন; আমরা সংসার-সমুদ্র তরে যাই; আত্মায় আত্ম-সম্মিলনে সমর্থ হই। এর চেয়ে তুরীয় প্রার্থনা আর কি হতে পারে? ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ— স্নেহকারুণ্যরূপী বরুণদেব, (আমাদের মঙ্গলার্থ) স্নেহকারুণ্যাদি সত্ত্বভাব পোষণ : করেন; দীপ্তিদানাদিগুণযুক্ত জ্ঞানরূপী অগ্নিদেব (আমাদের মঙ্গলের জন্য) আমাদের (হৃদয়ে জ্ঞানকিরণরূপ) অভীষ্টফল বর্ষণ করেন; পরমৈশ্বর্যশালী ইন্দ্রদেব শত্রুনাশসামথ্য প্রদান করেন। হে মন! তাঁদের অংশভূত সেই সকল বিভূতি শত্রুনাশে সমর্থ। (অতএব, হে মন! শত্রুনাশের জন্য তাঁদের সেই বিভূতি সমূহ হৃদয়ে প্রতিষ্ঠাপিত করো)। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এ মন্ত্রে সরল প্রার্থনার ভাব প্রকাশ পেয়েছে। ভগবানের বিভিন্ন বিভূতির, স্নেহকারুণ্যরূপী বরুণদেবের এবং জ্ঞানরূপী অগ্নিদেবের স্তুতি করতে করতে, শেষে সেই বিভূতি-সমূহের আধারভূত পরমৈশ্বর্যশালী আদিদেবতার প্রতি লক্ষ্য পড়েছে। ভেদভাব দূরীভূত হয়ে অভেদভাবের সঞ্চার হয়েছে।…ভাষ্যকারের মতে, এ মন্ত্রে প্রয়োগসাধন-দ্রব্যের বিষয় উক্ত হয়েছে। সূত্রপরিভাষার অনুসরণে সীসায় পদের তাই তিনি অর্থ করেছেন, নদীনেরূপায়। রক্ষঃপিশাচ ইত্যাদির হিংসানিবারণে মন্ত্রে সীস নামক পদার্থের বৈশিষ্ট্য প্রখ্যাপিত হয়েছে। সীসকে জলের ও অগ্নির সম্মুখে স্থাপন করে এই মন্ত্রের প্রয়োগ-বিধি নিবদ্ধ আছে। এইভবে মন্ত্রপূত করে সীস-ধারণের বিধি দূর হয়। ভাষ্যকারের মতে, মন্ত্রের শেষাংশে সাধককে সম্বোধন করে বলা হয়েছে,-হে সাধক! দেবগণের প্রদত্ত, দ্বেষ ইত্যাদি নিরসনে সমর্থ এই সীস রক্ষঃ পিশাচ ইত্যাদির নাশ-সমর্থ। কিন্তু আমরা মন্ত্রটিকে মনঃসম্বোধন মূলক বলে মনে করি। ২।
তৃতীয় মন্ত্রঃ ইদং বিষ্কন্ধং সহত ইদং বাধতে অত্ৰিণঃ। অনেন বিশ্বাসসহে যা জানি পিশাচ্যাঃ ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –এই (পূর্বোক্ত) সীস (জ্ঞানকর্ম) শত্ৰুকৃত বিঘ্ন (জন্মকারণ) নিবারণ করে, শত্রুসমূহ (অন্তরস্থিত রিপুশত্রু) বিমর্দিত করে (অর্থাৎ, জ্ঞানের সাহায্যে জন্মগতি নিবারিত হয়)। (অতএব) জ্ঞানের দ্বারা (আমি) শকৃত (পিশিত-সঞ্জাত কর্মক্লেদরূপ) নিখিল উপদ্রব (দুঃখকারণ সমূহ) নিবারণ (নিবর্তিত) করব। (ভাব এই যে–অজ্ঞানই সকল অনর্থের মূল। জ্ঞানের প্রভাবে যখন আমরা শত্রুদমনে সমর্থ হবো, তখনই মোক্ষপথ সুগম হয়ে আসবে ৷ ৩৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এ মন্ত্রটিও রক্ষপিশাচ ইত্যাদির হিংসা-নিবারণ-মূলক। ভাষ্যকারের মতে, মন্ত্রের অর্থ এই যে,-এই সীস রক্ষপিশাচ ইত্যাদিকৃত বিঘুজাত (গতিপ্রতিবন্ধক) নিবারণ করে। অপিতু এই সীস-দ্বারা রক্ষপিশাচ ইত্যাদি শত্রু নিহত হয়। অর্থাৎ, কেবল যে রক্ষপিশাচ ইত্যাদির কৃত উপদ্রব নিবারিত হয়,তা নয়; পরও বিঘ্ন-উৎপাদনকারী রক্ষপিশাচ ইত্যাদিও বিধ্বস্ত হয়ে থাকে। অতএব, সেই রক্ষসমূহকৃত পীড়াকর উপদ্রব ইত্যাদি এই সীস-সাহায্যে আমি বিদূরিত করব। সাধারণতঃ মন্ত্রের এই অর্থই প্রচলিত আছে। আমাদের মতে, মন্ত্রের ভাব অন্যরূপ। এখন সাধকের হৃদয় জ্ঞানকিরণে প্রোদ্ভাসিত হয়েছে। তাই তিনি বলছেন,জ্ঞানের সাহায্যে আমি আমার অন্তঃশত্রুজনিত সমস্ত উপদ্রব নিবারণ করবো, আমি আমার জন্মগতি রোধ করবো, জ্ঞানের সাহায্যে ভগবানের সাথে মিলিত হবো। মনে এমনই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে এই মন্ত্রের অবতারণা।–এ মন্ত্রে কর্মের প্রভাব প্রখ্যাপিত বলে আমরা মনে করি।-মন্ত্রের অন্তর্গত বিষ্কন্ধং পদ আমরা জন্মকারণানি অর্থে গ্রহণ করেছি.আমরা পূর্বেই বলেছি,-কর্মের দ্বারা কর্মবন্ধন ছিন্ন করতে হবে।…মনে হতে পারে,সে এমন কোন্ কর্ম, যার দ্বারা কর্মবন্ধন ছিন্ন হয়? সে কর্ম আর কিছুই নয়; সে কর্ম সৎকর্ম, শোভন-কর্ম। সৎকর্মের অনুষ্ঠানেই হৃদয়ে সত্ত্বভাবের সঞ্চার হয়। কিন্তু তার মূলীভূত সেই জ্ঞান। …অর্থাৎ, জ্ঞানের উদয়ে কার্য ও কারণ উভয়ই নিরাকৃত হয়। কিন্তু কোন কর্ম বন্ধনজনক, আর কোন কর্মই বা বন্ধনমোচক? এর উত্তর-ফলাকাঙ্গারহিত কর্ম করতে পারলেই সকল বন্ধন টুটে যায়। যা কু বা অসৎকর্ম–সকাম কর্ম, তা-ই বন্ধনের হেতুভূত। আর, অজ্ঞানতাইসকাম-কর্মের জনয়িতা এবং জ্ঞানই নিষ্কাম-কর্মের প্রবর্তয়িতা।-মন্ত্রে তাই সাধক বলছেন,–অন্তরের যে রিপুশত্রুসমূহ জন্মগতির মূলীভূত, যাদের কর্মের প্রভাবে দুঃখকারণ সঞ্জাত হয়, জ্ঞানাগ্নির সাহায্যে-সৎকর্মের প্রভাবে সে শত্রু বিমর্দিত হয়। আমরা জ্ঞান-বলে শত্রু বিনাশ করে জন্মগতি রোধ করবো। ফলে, আমরা পরাগতি-লাভে সমর্থ হবো॥ ৩৷৷
চতুর্থ মন্ত্রঃ যদি নো গাং হংসি যদ্যশ্বং যদি পূরুষং। ত্বং ত্বা সীসেন বিধ্যামো যথা নোহসো অবীরহা ॥ ৪৷
বঙ্গানুবাদ— হে রিপুশত্রুগণ! যদি তোমরা কখনও আমাদের (সংযতচিত্ত জনের) শুদ্ধজ্ঞাননিবহকে, ব্যাপ্তরূপ সৎ-ভাবসমূহকে এবং পুরুষসামর্থোপেত সকর্মনিবহকে হিংসা করতে প্রবৃত্ত হও; (তাহলে), যাতে তোমরা আমাদের বীর্যসম্পন্ন জ্ঞানকর্ম সত্ত্বভাবসমূহকে বিনাশ করতে না পারো, সেইভাবে আমাদের হৃদয়নিহিত সুদৃঢ় দেবভাবসমূহের সাহায্যে তোমাদের বিমর্দিত করবো (অর্থাৎ, রিপুশত্রুগণ হৃদয়ে প্রচ্ছন্ন থেকে সময় সময় হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্ব ও চ জ্ঞানকর্মসমূহকে বিদূরিত করবার অর্থাৎ অজ্ঞানতায় সমাচ্ছন্ন করবার প্রয়াস পায়; সেই জন্য শুদ্ধসত্ত্ব ইত্যাদির দৃঢ়তা-সম্পাদনে তাদের মূলোচ্ছেদ করা কর্তব্য। এই মন্ত্রে সাধকের দৃঢ় সঙ্কল্পে প্রকাশ পেয়েছে)। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এ মন্ত্র সরল ভাবপূর্ণ। সাধক এখানে দৃঢ়সঙ্কল্পবদ্ধ হয়েছেন। পুনঃ পুনঃ অজ্ঞানতায় লাঞ্ছিত হয়ে পুনঃ পুনঃ রিপুশত্রুর উৎপীড়নে উৎপীড়িত হয়ে, তিনি বুঝেছেন, অজ্ঞানতার ও রিপুশত্রুর নাশ ভিন্ন উপায়ন্তর নেই। তাই তিনি বলেছেন,-যা হবার হয়ে গিয়েছে; যে লাঞ্ছনা পাবার পেয়েছি; আর নয়! এখন দৃঢ়সঙ্কল্পবদ্ধ হলাম। আবার যদি কখনও তারা আমার হৃদয়-ক্ষেত্র আক্রমণ করতে অগ্রসর হয়, তাহলে জ্ঞানের দ্বারা তাদের মূলোচ্ছেদ করবো।–ভাষ্যকারের অর্থে যে ভাব প্রকাশিত, তা বড়ই সমস্যাপূর্ণ। ভাষ্যকারের মতেও এ মন্ত্র শত্রুগণের সম্বোধন মূলক। রক্ষঃপিশাচ ইত্যাদি শত্রুগণকে সম্বোধন করে এই মন্ত্রে বলা হয়েছে, যদি তোমরা আমাদের গো-অশ্ব-ভূত্য ইত্যাদিকে নিহত করতে উদ্যত হও; আমরা তোমাদের এই সীসের দ্বারা বিদ্ধ করে সংহার করবো। আমরা এমনইভাবে তোমাদের বিদ্ধ করবো যে, তোমরা আর আমাদের পুত্র-পশু ইত্যাদিকে হিংসা করতে না পারো। মন্ত্রের এই অর্থহ–এই ভাবই সাধারণ্যে প্রচারিত। এই ভাবেই এই মন্ত্রের উচ্চারণে রক্ষঃপিশাচ ইত্যাদিজনিত বিঘ্ন-নিরাকরণের উপদেশ আছে। আমরা দেখেছি, মন্ত্রের মধ্যে কয়েকটি সমস্যামূলক পদ আছে,গাং, অশ্বং ও পুরুষং। ঐ তিন পদেই যত সংশয় আনয়ন করেছে। গাং পদের সায়ণ অর্থ করেছেন গোজাতং। আমরা তার অর্থ করলাম, শুদ্ধজ্ঞাননিবহং। বেদের সর্বত্রই আমরা গাং পদের ঐ অর্থই অধ্যাহার করেছি। ঐ অর্থই যে সমীচীন, তা-ও সেই সেই স্থলে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। হৃদয়ের শুদ্ধজ্ঞানই অজ্ঞানতায় সমাচ্ছন্ন হয়; আধ্যাত্মিক পক্ষে গাং শব্দের ঐ অর্থই সঙ্গত।–অশ্বং পদে, ভাষ্যকারের মতে অশ্ব নামধেয় পশু বোঝাচ্ছে। কিন্তু আমরা তার ব্যাপ্তরূপং সত্ত্বভাবং অর্থ আমনন করলাম। ব্যাপ্তাৰ্থক অ ধাতু থেকে অশ্বং পদ নিষ্পন্ন। মন্ত্রের পুরুষং পদের অর্থে সায়ণ বলেছেন,–অম্মদীয়ং ভৃত্যাদিরূপং পুরুষং। আমাদের মতে ঐ পদে পুরুষসামথোপেতং সকর্মনিবহং বোঝাচ্ছে। কর্মেই পৌরুষ সঞ্জাত হয়, কর্মী ব্যক্তিই পৌরুষসামর্থ্যসম্পন্ন। সৎকর্মের প্রভাবেই পৌরুষ অধিগত হয়ে থাকে।–এ পক্ষে মন্ত্রের ভাব এই যে,-কামক্রোধ ইত্যাদি রিপুশত্রু সময় সময় হৃদয়ের সৎ-বৃত্তি সমূহকে বিধ্বস্ত করবার প্রয়াস পায়। হৃদয়ে দেবভাবসঞ্জাত হোক, জ্ঞান-কিরণ বিচ্ছুরিত হোক, সৎকর্মের অনুষ্ঠানে উদ্বুদ্ধ হই। তাহলেই সে সকল শত্রুকে বিমর্দিত করতে সমর্থ হবো।
আমাদের মনে হয়, মন্ত্রে এই ভাবই পরিব্যক্ত রয়েছে। ৪
প্রথম মন্ত্রঃ অমূর যন্তি ঘোষিত হিরা লোহিতবাসসঃ। অভ্রাতর ইব জাময়স্তিষ্ঠন্তু হতবৰ্চসঃ ॥ ১
বঙ্গানুবাদ –সেবিকাধর্মাবলম্বী (ভগবৎসেবাপরায়ণ) পরিদৃশ্যমান (সর্বজনবিদিত) তেজঃপূর্ণ ও যে প্রসিদ্ধ কর্মশক্তিসমূহ, সহায়হীন (সহযোগীশূন্য) অবস্থায় হততেজস্ক হয়ে আছে; আকাক্ষণীয় সেই কর্মশক্তিসমূহ সহযোগীবিশিষ্ট (সৎসহযুত বল-সমন্বিত) হোক। (অর্থাৎ, যে সকল চিত্তবৃত্তি বা কর্মশক্তি, সৎকর্মের সাধনে সামর্থ্যহীন হয়েছে; তারা সত্ত্বভাবের সহযোগে শক্তিসম্পন্ন হোক। ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটি চতুর্থ অনুবাকের প্রথম সূক্তের প্রথম মন্ত্র। এই সূক্তের মন্ত্রগুলিতে শস্ত্রাঘাতজনিত কারণে রুধিরপাত নিবারণের নিমিত্ত এবং বিশেষভাবে স্ত্রীলোকের অতিরিক্ত রজোরক্তস্রাব বন্ধ করবার উদ্দেশে প্রযুক্ত হওয়ার বিধি আছে। আলোচ্য মন্ত্রটি শান্তিকর্মসূচক। তবে এই মন্ত্রে শান্তিকামনার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতমুখে রথ্যাপাংসুসিকতা প্রক্ষেপ করতে হয়। অর্মকপালিকা দ্বারা নাড়ী বন্ধন করতে হয়। শেষোক্ত পদে শুষ্কপঞ্চমৃত্তিকা বা কেদারমৃত্তিকা বোঝায়–এই মাত্র সূক্তের ভাষ্যানুক্রমণিকায় লিখিত আছে।
ভাষ্যানুসারে মন্ত্রের অর্থে প্রকাশ,-স্ত্রীলোকের সম্বন্ধীয় সম্মুখে দৃশ্যমান এই লোহিত বস্ত্র, অথবা লোহিত রক্তের আশ্রয়ভূতা যে শিরায় অর্থাৎ রজোবহনকারী নাড়ীসমূহে ব্যাধিহেতু সর্বদা রক্ত নিঃসরণ করছে, সেই নাড়ীসকল এই ভৈষজ্যাক্রিয়ার দ্বারা তেজোহীনা হোক, অর্থাৎ সেই সকল হতে যেন আর রক্তক্ষরণ না হয়। এ বিষয়ে উদাহরণ; যথা,ভ্রাতৃহীনা ভগিনীর ন্যায়। অর্থাৎ তারা যেমন পিতৃকুলে সন্তানোচিত কর্মের জন্য–পিণ্ডদান ইত্যাদির জন্য–অবস্থিতি করে, সেইরকম।-মন্ত্রে ঐরকম অর্থ যে গ্রহণ করা যায় না, তা আমরা বলি না। তবে আমরা যে দৃষ্টিতে দেখছি, যে পথে অগ্রসর হয়েছি, তাতে সর্বত্র সকল সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়–যদি আমাদের পরিগৃহীত অর্থের বিষয় বিচার করা যায়। আমাদের ব্যাখ্যায় মন্ত্রটিকে আত্মউদ্বোধনমূলক বলে মনে হবে। মন্ত্রোচ্চারণকারী এই মন্ত্রে আপন চিত্তবৃত্তিসমূহকে সত্ত্বভাবের সহযোগে শক্তিসমন্বিত হবার জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন।যোষিতঃ পদের সাধারণ অর্থ–স্ত্রীলোক-সম্বন্ধীয়। কিন্তু যোষিৎ শব্দে যে স্ত্রীকে বোঝায়, তার মূলতত্ত্ব কি? যু ধাতু হতে ঐ পদ নিস্পন্ন। তার অর্থ–সেবা, করা। স্ত্রী-পতির সেবাপরায়ণা হন, তাই তার সংজ্ঞা–যোষিৎ।
স্ত্রী যেমন পতির সেবায় জীবন উৎসর্গ করেন, সাধকগণও অনেক সময় সেইরকম পতিভাবে ভগবাকে দর্শন করে তার সেবাপরায়ণ হন। এখানে যোষিতঃ পদে, সেই সেবাধর্মপরায়ণ-জনের ভাব গ্রহণ করা যায়। আবার–অমূঃ লোহিতবাসসঃ পদের ভাব লক্ষ্য করুন। অমূঃ পদের প্রতিবাক্যে আমরা পরিদৃশ্যমানাঃ সর্বজনবিদিতাঃ পদ গ্রহণ করেছি। লোহিতবাসসঃ পদে তেজঃপূর্ণাঃ ভাব পরিগ্রহণ করি। ভগবানের সেবায় যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের তেজঃশক্তি সর্বজনবিদিত। যোষিতঃ অমূঃ লোহিতবাসসঃ বাক্যাংশে এই ভাব পরিব্যক্ত। রক্তই তেজের মূলীভূত; রক্তহীন দেহে তেজঃ আদৌ তিষ্ঠিতে পারে না। তাই লোহিতবাসসঃ পদে তেজঃপূর্ণাঃ অর্থ পরিগ্রহণ করলাম। যাঃ পদে প্রসিদ্ধাঃ এবং হিরাঃ পদে শিরাঃ বা কমর্শক্তয়ঃ প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছি। রক্তপূর্ণ তেজঃপূর্ণ শিরাই কর্মশক্তির প্রবর্তক। এ থেকেই ঐ ভাব প্রাপ্ত হই। অভ্রাতর ইব পদদুটিতে উপমায় সহায়হীন সহযোগীশূন্য অবস্থা ব্যক্ত করে। সত্ত্বভাবসমূহ মানুষের জন্মসহচর হয়ে আসে। সুতরাং তাদের ভ্রাতার ন্যায় সহায়স্বরূপ মনে করা যেতে পারে। ইত্যাদি। আমরা মনে করি–যে চিত্তবৃত্তিসমূহ বা কর্মশক্তিসমূহ সঙ্কর্মের সাধনে সামর্থ্যহীন হয়েছে, তারা সত্ত্বভাবসহযোগে শক্তিসম্পন্ন হোক-এ পক্ষে সমগ্র মন্ত্রের এটাই মর্ম ॥১॥
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ তিষ্ঠাবরে তিষ্ঠ পর উত ত্বং তিষ্ঠ মধ্যমে। কনিষ্ঠিকা চ তিষ্ঠতি তিষ্ঠাদিদ্ধমনির্মহী ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হে শুদ্ধসত্ত্ব! আমার নিকৃষ্টকর্মে আপনি অবস্থান করুন; আমার শ্রেষ্ঠকর্মে আপনি অবস্থান করুন; আমার মধ্যম কর্মে আপনি অবস্থান করুন, (অর্থাৎ, আমার সর্বপ্রকার কর্মের সাথে সত্ত্বভাবের সংশ্রব অক্ষুণ্ণ থাকুক); আর, আমার যে ক্ষুদ্র শক্তিটুকু আছে, তা মহতী (মহৎকার্যের সম্পাদনে সমর্থ) হোক। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যে প্রকাশ, এই মন্ত্রে ধমনীসমূহকে প্রার্থনা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে,-হে অবরে অর্থাৎ অধোভাগবর্তিনি শিরে (নাড়ী)! তুমি তিষ্ঠ অর্থাৎ অস্ত্রাঘাতজনিত রক্তস্রাব হতে নিবৃত্ত হও। সেইরকম, হে পরে অর্থাৎ উধ্বাঙ্গবর্তিনি শিরে! তুমিও তিষ্ঠ। অপিচ, হে মধ্যমে অর্থাৎ মধ্যভাগবর্তিনি শিরে! তুমিও তিষ্ঠ (প্রকৃতিস্থ হও)। আর, কনিষ্ঠিকা অর্থাৎ সূক্ষ্মতরা যে নাড়ী এবং মহী অর্থাৎ স্থূলতরা যে নাড়ী, তারাও নিবৃত্তরুধিরস্রাব হয়ে অবস্থিতি করুক। ফলতঃ, পূর্বৰ্মন্ত্রে স্ত্রীলোকের যে,রক্তস্রাবের বিষয় প্রখ্যাপিত হয়েছে, এ মন্ত্রে নাড়ীসকলকে সম্বোধন করে তাদের রক্তস্রাব বন্ধ হোক-তারা প্রকৃতিস্থ হোক, –এই ভাব প্রকাশ পেয়েছে। এটাই ভাষ্যের অভিমত।-আমাদের ব্যাখ্যার বিচারের পূর্বে স্মরণ রাখবেন, আমাদের সাধারণ মত এই যে, যে কার্যেই মন্ত্রসকল প্রযুক্ত হোক, সকল মন্ত্রের মধ্যেই আত্মেক বিধায়ক পরমার্থসম্বন্ধবিশিষ্ট ভাব বিদ্যমান রয়েছে। পূর্ব মন্ত্রে অভ্রাতর ইব পদ দুটির ব্যাখ্যায় সত্ত্বভাব-সংশ্রব শূন্যতার ভাব আমনন করেছি। সেই সম্বন্ধ অক্ষুণ্ণ রাখবার আকাঙ্ক্ষা এখানে প্রকাশ পেয়েছে। সে পক্ষে এখানকার সম্বোধন শুদ্ধসত্ত্ব। মন্ত্রোচ্চারণকারী এখানে শুদ্ধসত্ত্বকে সম্বোধন করে বলছেন,–অধম উত্তম মধ্যম আমার এিবিধ কর্মে যেন শুদ্ধসত্ত্বের সংশ্রব থাকে। অপিচ, আমার যে ক্ষুদ্রশক্তি, তা যেন সত্ত্বসংশ্রবযুত হয়ে মহৎ কার্য-সম্পাদনে সমর্থ হয়। আমরা মনে করি, এটাই এ মন্ত্রের প্রার্থনা। এখানে প্রকারান্তরে নিষ্কাম কর্ম সাধনেরই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে ॥ ২॥
তৃতীয় মন্ত্রঃ শস্য ধমনীনাং সহস্ৰস্য হিরাণাং। অরিন্মধ্যমা ইমাঃ সামন্তা অরংসত। ৩
বঙ্গানুবাদ –শতসংখ্যক ধমনীর এবং সহস্ৰসংখ্যক হিরার (নাড়ীর) শক্তি, আমার এই ক্ষীণশক্তির মধ্যে অবিচ্ছিন্নভাবে বিরাজমান হোক; আর, সকল শক্তির সাথে আমার এই ক্ষীণশক্তিসকল কর্মশীল হোক; (শুদ্ধসত্ত্বভাবের সাথে সম্মিলিত হয়ে, আমার এই ক্ষুদ্রশক্তি সৎকর্মের সম্পাদনে প্রবলা হোক–এই আকাঙ্ক্ষা) ॥ ৩॥
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –ভাষ্যে এই মন্ত্রের যে অর্থ প্রখ্যাপিত হয়েছে, তার মর্ম এই যে,–শতসংখ্যক প্রধান নাড়ী এবং সহস্ৰসংখ্যক ক্ষুদ্র নাড়ীর মধ্যে এই যে সকল নাড়ী হতে রক্তস্রাব হচ্ছিল, মন্ত্রশক্তি: প্রভাবে তাদের সে রক্তস্রাব নিবৃত্ত হয়েছে। সেই সকল নাড়ীর রক্তস্রাব নিবৃত্ত হওয়ার পর যে সকল নাড়ী অবশিষ্ট ছিল, তারা পূর্বের ন্যায় ক্রিয়াশীল হয়েছে। এখানেও রোগিণীর প্রতি ভাষ্যকারের লক্ষ্য অব্যাহত আছে। তার লক্ষ্য যে অসঙ্গত, মন্ত্রের প্রয়োগবিধি স্মরণ করলে, তা কখনই বলা যায় না। তবে আমরা যে দৃষ্টিতে যে ভাবে মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাষণ করছি, তা-ও যে অযৌক্তিক, বলতে পারা যায় না। মন্ত্ৰান্তৰ্গত ইমাঃ পদের লক্ষ্যস্থল নির্দিষ্ট হলেই আমাদের অর্থের সার্থকতা বোঝা যায়। পূর্বে বলা হয়েছে,-আমার শক্তি ক্ষীণ,আমার শক্তি ক্ষুদ্র। এখন বলা হচ্ছে, আমার এই ক্ষীণ শক্তির মধ্যে সহস্র রকমের শক্তি সন্নিবিষ্ট হোক। ভগবানের কৃপা হলে, ক্ষুদ্রশক্তিই অনন্তশক্তির সাথে মিলিত ও অনন্তসামর্থ্য প্রাপ্ত হয়। এখানে এই ভাবই পরিব্যক্ত। অন্যাঃপদের অর্থে শক্তির শেষ (অবশিষ্ট) অর্থাৎ ক্ষীণশক্তিসমূহঅর্থ গ্রহণ করি। ফলতঃ, এই মন্ত্রের প্রার্থনা বা আকাঙ্ক্ষা এই যে,-শুদ্ধসত্ত্বভাবের সাথে সম্বন্ধবিশিষ্ট হয়ে আমার ক্ষুদ্রশক্তিসকল সৎকর্মের সম্পাদনে প্রবল-সামর্থযুক্ত হোক ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –হে কর্মশক্তিসমূহ! শত্রু তোমাদের ব্যেপে আছে; তোমরা মহৎ সত্ত্বভাবে আদ্রীভূত হয়ে অবস্থান করো; আর, আমাদের সুষ্ঠু সুখ প্রেরণ করো। (কর্মসত্ত্বভাবসহযুত হলে, শত্রুর ভয় কখনও তিষ্ঠিতে পারে না–এটাই ভাব) ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যে মন্ত্রের যে অর্থ দৃষ্ট হয়, তা তমসাচ্ছন্ন। তার ভাব এই যে,–হে নাড়ীসকল! তোমাদের সিকতাবতী (রজঃস্রাববিশিষ্ট, রজঃসম্বন্ধীয় ব্যাধি উৎপাদক নাড়ী) ও ধনু (ধনুবৎ বক্র, মূত্রাশয়স্থ নাড়ীবিশেষ) সর্বতোভাবে পরিব্যাপ্ত করেছে। তার দ্বারা তোমাদের রুধিরপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়েছে। এই হেতু হে নাড়ীসকল! তোমরা নিবৃত্তরক্তস্রাব হও। আর এই লোকের সুখ প্রেরণ করো। রক্তস্রাব-নিরোধ হেতু এর সুখ হোক। ভাষ্যের এই ভাব। সূক্তের মন্ত্র-কয়েকটি যে উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত, এখানেও সেই ভাবেই ব্যাখ্যা হয়েছে। আমরা বলি, এ মন্ত্রের সম্বোধন–কর্মশক্তি সমূহ! সেক্ষেত্রে, এখানে আপন কর্মশক্তি-সমূহকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,-শত্রু অর্থাৎ কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপু তোমাদের চারদিকে ঘিরে আছে। তুমি সত্ত্বভাবকে আশ্রয় করো। সত্ত্বভাব-সহযুত হলে, সে শত্রুরা তোমাকে আক্রমণ করতে পারবে না। অতএব, তুমি সত্ত্বসহযুত হয়ে অবস্থান করো। তার দ্বারা আমরা পরমসুখে সুখী হবো।কর্ম যদি সত্ত্বসহযুত হয়, তাহলে শত্রুর আক্রমণের বিভীষিকা থাকে না; পরন্তু পরম সুখ অধিগত হয়। আমরা মনে করি, আধ্যাত্মিক-পক্ষে এ মন্ত্রের এটাই মর্মার্থ। তবে সাধারণে প্রচলিত এই মন্ত্রের প্রয়োেগ অসঙ্গত বলা যায় না। ৪।
প্রথম মন্ত্রঃ নির্লং ললাম্যং নিররাতিং সুবামসি। অথ যা ভদ্রা নি নঃ প্রজায়া অরাতিং নয়ামসি ॥ ১৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে ভগবন! আমার ললাটস্থিত অদৃষ্টগত অসৌভাগ্যকর চিহ্নকে সম্পূর্ণরূপে উৎসারণ করুন, (অর্থাৎ, যার দ্বারা আমার কর্মফল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তার ব্যবস্থা করে দিন); আমার অসৎ-বৃত্তিনিবহকে (অথবা, শত্রুভয়কে, নরক-ভয়কে আপনি বিদূরিত করে দিন। অতঃপর, স্বর্গ ইত্যাদি প্রাপক রূপ যে কল্যাণসমূহ আছে, সেই সমুদায় আমাদের পুত্রপৌত্র ইত্যাদি পারিপার্শ্বিক সকল লোককে প্রাপ্ত হোক; আর, পূর্বনিঃসারিত অসৌভাগ্যকর চিহ্নসকল আমাদের শত্রুকে প্রদান করুন, (অর্থাৎ, অসৌভাগ্যকর অসৎ-বৃত্তিসমূহকে হৃদয় হতে দূর করে দণ্ডদানের নিমিত্ত নরকে নিক্ষেপ করুন ॥ ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— সামুদ্রিক শাস্ত্রানুসারে হস্ত-পদ-মুখ প্রভৃতি অঙ্গে স্ত্রীলোকের কতকগুলি দুশ্চিহ্ন লক্ষিত হয়। সেই সকল দুশ্চিহ্ন-দূরীকরণের জন্য শাস্ত্রীয় প্রক্রিয়ায় মুখপ্রক্ষালন ও হোম ইত্যাদি কার্যের অনুষ্ঠান আবশ্যক। দুর্লক্ষণ-নিবৃত্তি-বিষয়ক শান্তিকল্পে মহাশান্তির উদ্দেশ্যে এই সূক্তের মন্ত্রগুলি উচ্চারিত হবার বিধি আছে। এই সূক্তটি সেই দুর্লক্ষণ-নিবারক বলে কথিত হয়।–মন্ত্রের ভাষ্যানুসারী অর্থের লক্ষ্য সাধারণতঃ দুর্লক্ষণ-দূরীকরণ। সেই ভাবেই মন্ত্রের অর্থ অধ্যাহৃত হয়ে এসেছে। মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাষণে আমরা প্রায়ই ভাষ্যের অনুসরণ করেছি।
তবে আমাদের ব্যাখ্যার বিশেষত্ব এই যে, প্রার্থনাকারী এখানে আপন জন্মগত কর্মফল-নাশের জন্য ভগবানের নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপন করছেন। অসৎ-বৃত্তিসমূহ দূরে অপসৃত হোক, আমার অন্তরে সৎকর্ম সাধনের প্রবৃত্তি জাগ্রত হোক, আর তার ফলে আমার কর্মফল বিধ্বংস হোক, আমি পরমা-গতি লাভ করি। আমাদের মতে, মন্ত্রের এটাই লক্ষ্য ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ –জ্ঞানপ্রদাতা সবিতা দেবতা আমাদের দুর্ভাগ্য দূর করুন; অভীষ্টবর্ষণকারী পাপবারক বরুণদেব, মিত্রস্থানীয় মিত্রদেব, অভিমত-ফল-প্রদাতা গতিকারক অর্যমা-দৈব, আমাদের হস্তদ্বারা কৃত ও পদদ্বারা কৃত পাপকে দূর করুন; এবং আমাদের অনুভবযোগ্যা (ধারণার অন্তর্গত) দেবতা, আমাদের দ্বারা সম্পূজিতা হয়ে, আমাদের জন্য, দুষ্কর্মকে দূর করুন। দেবভাবসমূহ, আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, আমাদের ধারণার অন্তর্ভূর্ত দেবতাকে, আমাদের পরমার্থ প্রাপ্তি-রূপ সৌভাগ্য দানের জন্য, প্রেরণ করে থাকেন। (দেবভাবের সাহায্যেই আমরা দেবানুগ্রহ-লাভে সমর্থ হই) ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যের অভিমত এই যে,-হস্তে এবং পদে মানুষের যে সমস্ত দুর্লক্ষণ থাকে, এই মন্ত্রে সেই সকল দুর্লক্ষণ অপসারণ-পক্ষে প্রার্থনা জানানো হয়েছে। সামুদ্রিক শাস্ত্রানুসারে, ললাটের কতকগুলি চিহ্ন যেমন দুর্লক্ষণ প্রকাশ করে; হস্ত-পদের কতকগুলি চিহ্নও সেইরকম দুর্লক্ষণ প্রকাশক। এই মন্ত্রে দুর্লক্ষণ দূর করবার জন্য প্রথমে সাধারণভাবে সবিতা দেবতাকে আহ্বান করা হয়েছে। তার পর, বিশেষভাবে হস্তের ও পদের দুর্লক্ষণ দূর করবার জন্য, বরুণ মিত্র ও অর্যমা দেবতার অনুগ্রহ প্রার্থনা আছে। এটাই মন্ত্রের প্রথম পাদের ভাষ্যানুমোদিত ভাব।
মন্ত্রের দ্বিতীয় পদে অনুমতিঃ দেবতার প্রসঙ্গ আছে। ঐ দেবতার স্বরূপ-পরিচয়ে ভাষ্যকার লিখেছেন-সর্বেষাং অনুমন্ত্রী দেবতা। সেই দেবতা আমাদের কর্তৃক স্তুত হয়ে আমাদের সকল শরীরাবয়বের দুর্লক্ষণকে দূর করুন;–এটাই দ্বিতীয় পদের প্রথমাংশের প্রার্থনা। ঐ পাদের দ্বিতীয় অংশের ভাব এই যে, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ ঐ অনুমতি দেবতাকে আমাদের সৌভাগ্যের জন্য প্রেরণ করেন। ফলতঃ, দেহাবয়বের দুশ্চিহ্নসমূহকে দূর করাই এই মন্ত্রের লক্ষ্য। এটাই ভাষ্যের ভাব। মন্ত্রার্থে ভাষ্যের অনুসরণ করলেও আমাদের বক্তব্য এই যে, এ মন্ত্রের স্থলমর্ম–পাপ-সম্বন্ধ-পরিত্যাগের কামনা। মানুষের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যে উপস্থিত হয়, সে কেবল কর্মের ফল মাত্র। কর্মের দ্বারা যে অদৃষ্ট সঞ্চিত হয়, তা-ই সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য-রূপে প্রকাশ পায়। এখানে প্রধানতঃ তাই বলা হয়েছে-দেবগণ আমাদের পাপকর্ম হতে নিবৃত্তি দান করুন। আমরা যেন পাপকর্মে প্রবৃত্ত হয়ে দুর্ভাগ্যের সঞ্চয় না করি।… মানুষ হস্তের দ্বারা, পদের দ্বারা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা নানা অপকর্ম করে থাকে। তাতে নানাভাবে পাপ সঞ্জাত হয়। সেই সকল পাপ দূরীকরণের জন্য, নিজের পরম মঙ্গল কামনা করে, মন্ত্রের উচ্চারণকারী এখানে বলছেন,–হে দেবগণ! আপনারা আমার সবরকম পাপকার্যে আমায় বিরত করুন। আমাদের সন্ধ্যার মন্ত্রে আচমন উপলক্ষে এমন প্রার্থনাই আছে।–উপসংহারে অনুমতিঃ দেবতার বিষয় এবং দেবগণ কর্তৃক আমাদের সৌভাগ্যের জন্য আমাদের নিকট তাকে প্রেরণের বিষয় লিখিত হয়েছে। তার মর্ম কি?…অনেক দেবতাকে আমরা অনুভবে অন্তরে ধারণা করতে পারি। বিবেক-বাণী-রূপে দেবতাগণ অনেক সময়ে আমাদের হৃদয়ে উদ্ভাসিত হন। অনুমতিঃ দেবতায় সেই ভাব প্রকাশ পায়। ভাষ্যের সর্বেষাং অনুমন্ত্রী দেবতা বাক্যেও এই আভাষ প্রাপ্ত হই। সেই দেবতা আমাদের হৃদয়ে আবির্ভূত হয়ে আমাদের সৎপথ প্রদর্শন করেন–সকার্য-সাধনে সুমন্ত্রণা দেন–মনে হয়, এই জন্যই তার নাম অনুমতিঃ দেবতা। সেই অনুমতি দেবতা দেবগণ কর্তৃক প্রেরিত হন, এমন বাক্যের মর্ম এই যে,-দেবভাব হতেই অনুমতি দেবতাকে প্রাপ্ত হওয়া যায়, অর্থাৎ বিবেকবাণীরূপা অথবা অনুভবযোগ্যা যে দেবতার কৃপা, দেবভাবসমূহই আমাদের তা প্রদান করেন। দেবতার অনুগ্রহ, আমরা আমাদের সত্ত্বসম্বন্ধযুত কর্মের অর্থাৎ দেবভাব হতেই প্রাপ্ত হই। ২।
বঙ্গানুবাদ –হে জীব (আত্ম-উদ্বোধন)! দ্যোতমান জ্ঞানপ্রেরক সবিতাদেব তোমাকে শ্ৰেয়োদান করুন; তাতে, তোমার হৃদয়ে ও দেহে অনুভূয়মান বা পরিদৃশ্যমান যে পাপ (অজ্ঞানতা-রূপ যে ঘোর) বিদ্যমান রয়েছে, অথবা তোমার শিরোভাগে মস্তিষ্কে এবং দৃষ্টিসাধনভূত ১ নেত্রে যে পাপ বিদ্যমান আছে; বাহ্য ও আভ্যন্তরীণ সেই সকল পাপকে, ভগবৎ-অনুগ্রহ প্রার্থনাকারী আমরা, মন্ত্রশক্তির দ্বারা অপহত করি (দূরীভূত করতে সমর্থ হবো। জ্ঞানপ্রেরক সবিতা দেবতা কৃপাপরায়ণ হলে, মন্ত্রশক্তির প্রভাবে আমরা আমাদের সর্বপ্রকার পাপনাশে সমর্থ, হবো–এটাই ভাবার্থ)। ৩৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের ভাব বড়ই জটিল। মন্ত্রের সম্বোধ্যই বা কে, আর প্রার্থনাই বা কি, ভাষ্য-অনুসারে তা বোধগম্য হওয়া বড়ই কঠিন। ভাষ্যের ভাব এই যে,–এখানে দুলক্ষণাক্রান্ত পুরুষকে সম্বোধন করে মন্ত্ররূপ বাক্য যেন বলছেন–হে দুর্লক্ষণোপেত পুরুষ! তোমার আত্মীয়স্থানীয় শরীরে যে ভয়ঙ্কর দুর্লক্ষণ (দুশ্চিহ্ন) বিদ্যমান আছে, অথবা তোমার শরীরোপহিত পুরুষে যে ভয়ঙ্কর পাপ (চিহ্ন) রয়েছে; অথবা শিরঃস্থিত কেশে বা শিরোরূঢ় যে পাপ (দুশ্চিহ্ন) অথবা তোমার দর্শনসাধনভূত চক্ষুতে যে ঘোর (পাপ–দুশ্চিহ্ন) আছে; সেই আভ্যন্তর ও বাহ্য সবরকম পাপসমূহকে, আমরা প্রয়োগকুশল মন্ত্ররূপ বাক্যের দ্বারা, অপহনন করছি।
এই রকমে অনিষ্ট-নিবৃত্তি করে, পরিশেষে ইষ্ট প্রার্থনা করা হচ্ছে, দ্যোমানাত্মক সবিতা (প্রেরক) দেব তোমাকে শ্রেয়োধামে প্রেরণ করুন। দুর্লক্ষণ দূর করে তিনি তোমার সাথে শ্রেয়ের সম্বন্ধ স্থাপিত করে দিন। ভাষ্যে মন্ত্রের এমনই অর্থ প্রকটিত দেখি।আমরা মনে করি, মন্ত্রটি আত্মোদ্বোধনমূলক। এখানে প্রার্থী প্রথমে নিজেকে নিজেই সম্বোধন করে বলছেন,–হে জীব! হে অহং! ভগবানের অনুগ্রহ-প্রার্থনাকারী আমরা, দেবতার পূজাপরায়ণ আমরা, দেবতার অনুগ্রহে, মন্ত্রশক্তির প্রভাবে, সকল প্রকার পাপকে অপসৃত করবো। সে পক্ষে প্রথমে তুমি জ্ঞানপ্রেরক সেই সবিতা-দেবতার দ্বারে অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে দণ্ডায়মান হও; জ্ঞানদাতা সেই দেবতা তোমায় অনুগ্রহ করবেন-তোমার শ্ৰেয়োবিধান করবেন। তার সেই অনুগ্রহের ফলে, জ্ঞানোদয়ের প্রভাবে, তোমার সকল প্রকার পাপ দূরীভূত হবে। তোমার অন্তরে পাপ আছে; তুমি কত রকম কু-কল্পনার দ্বারা কত রকম পাপই সঞ্চয় করছে। সেই যে পাপ, তা-ই তোমার আত্মনি ঘোরঃ (হৃদয়স্থিত পাপ)। তার পর, ভেবে দেখো দেখি–তোমার দেহের দ্বারা তুমি কত রকম পাপই না করছে।
সেই পাপই তোমার তন্বং ঘোরং (শরীরকৃত পাপ)। তার এক পাপ অনুভূয়মান; অন্য পাপ পরিদৃশ্যমান। (যৎ পদ সেই ভাবই প্রকাশ করে)। এই যে উভয়বিধ পাপ, অথবা তোমার মস্তিষ্ক যে পাপে ঘিরে আছে, তোমার দর্শনে যে পাপ ওতঃপ্রোতঃ বিদ্যমান রয়েছে, তোমার কলুষচিন্তার ফলে যে পাপ সঞ্জাত হয়েছে, তোমার দর্শনে বা কু-দৃষ্টির দ্বারা যে পাপ সঞ্চয় করছে, তোমার আভ্যন্তর ও বাহ্য সেই সমস্ত রকম পাপই (ঘোর অন্ধতামস) অপসৃত হবে;-দেবতার কৃপালাভে সমর্থ হলে, এই মন্ত্রশক্তির প্রভাবে, আমরাই সকল পাপকে দূর করতে সমর্থ হবো। এমন আত্ম-উদ্বোধনের ভাবই এই মন্ত্রে লক্ষ্য করা যায়। আমরা মনে করি, মন্ত্রে বলা হয়েছে-যদি সবিতা দেবতা কৃপাপরায়ণ হন, যদি জ্ঞানার্জনে সমর্থ হই, মন্ত্রশক্তির দ্বারা আমরা নিজেরাই নিজেদের সকল পাপকে দূরীভূত করতে পারবো।–মন্ত্রের এটাই মর্মার্থ ॥ ৩৷৷
চতুর্থ মন্ত্রঃ রিশ্যপদীং বৃষদতীং গোষেধাং বিধমামুত। বিলীঢ্যং ললাম্যং তা অস্মন্নাশয়ামসি ॥৪॥
বঙ্গানুবাদ –হে ভগবন! আমাদের কর্মশক্তিকে হিংসা দ্বেষ ইত্যাদি কুরকর্মান্বিতা, সৎ-ভাবনাকারিণী, বিপথানুবর্তিনী ও মিথ্যাভাষণশীলা করবেন না; অপিচ, ঐ সকল অসৎ-বৃত্তিকে হয়ে আমাদের নিকট হতে বিদূরিত করুন; আর, আমাদের অদৃষ্টগত কর্মফলতভাগকে (আমাদের কর্মের দ্বারাই) নিঃশেষ করে দিন। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যের অনুসরণে এই মন্ত্রের অর্থ-নিষ্কাশনে বড়ই উদ্বেগ পেতে হলো। ভাষ্যে প্রকাশ,–এই মন্ত্রের লক্ষ্য–দুর্লক্ষণাক্রান্ত স্ত্রীগণ। সেই অনুসারে প্রথম রিশপদীং (পাঠান্তরে ঋশ্যপদীং) পদের অর্থ করা হয়–যে স্ত্রীর পদদ্বয় হরিণের শৃঙ্গের ন্যায় বক্র; এবং ঐ পদে সেইরকম বক্রপদ-বিশিষ্টা স্ত্রীকে বোঝাচ্ছে। দ্বিতীয়–বৃদণ্ডীং। ভাষ্যানুসারে ঐ পদে, বৃষের ন্যায় দন্তবিশিষ্টা–স্থূলদন্তা স্ত্রীকে বোঝায়। তৃতীয়–গোষেধাং। ভাষ্যমতে ঐ পদের অর্থ–গোরুর ন্যায় যে স্ত্রী গমন করে, অথবা যে স্ত্রীর শব্দ বিকৃত, যে স্ত্রী ফুকার ইত্যাদি নানা বিকৃতশব্দকারিণী অর্থাৎ যে স্ত্রী বিকৃতগমনশীলা।
তার পর, ভাষ্যকারের ভাব এই যে,-স্ত্রীগণই যেন প্রার্থনা করছেন,-ঐরূপ ঋশ্যপদাদিজনিত যে সকল দুর্লক্ষণ, সেই সমুদায় আমাদের নিকট হতে আমরা নাশ করছি; অর্থাৎ, মন্ত্রশক্তিপ্রভাবে তাদের নিবৃত্ত করছি। তার পর, ললামং পদে ললাটপ্রান্তে উৎপন্ন এবং বিলীঢ্যং পদে কেশসমূহের প্রতিলোম-রূপে ললাটপ্রান্তে বর্তমান যে দুর্লক্ষণ–তাকে বোঝায়। ভাষ্যে এই ভাব প্রকাশমান। রিশপদী প্রভৃতি পদ ব্যবহারহেতু স্ত্রীগণ-সম্পর্কেই মন্ত্র প্রযুক্ত হয়েছে, এই ভাবই সাধারণতঃ পরিগৃহীত হয়। কিন্তু বিলীঢ্য-রূপ দুর্লক্ষণ স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের সম্বন্ধেই প্রযুক্ত হয়েছে–মনে করা যায়। স্ত্রীগণের পদ ও কেশ, চলন ও বলন প্রভৃতিতে সুলক্ষণ দুর্লক্ষণ বিদ্যমান আছে, আমাদের দেশে এই ভাব আজও পোষিত হয়। বিবাহ-সম্বন্ধ। স্থাপনে ঐ সব লক্ষণের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য দেখা যায়। বোধহয় আলোচ্য মন্ত্রের মতো মন্ত্রগুলির অর্থই ঐরকম পরীক্ষার ভাব মনে জাগরুক করে রেখেছে]। যাই হোক, এ তো ভাষ্যের ভাব। আমরা কিন্তু পূর্ব পূর্ব মন্ত্রের সম্বোধন এবং কর্মশক্তির সাথে সেই সকল মন্ত্রের সম্বন্ধের বিষয়, এই মন্ত্রাৰ্থ-অলোচনার সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ করা আবশ্যক বলে মনে করি।
আমরা বলি,–এই মন্ত্রের সম্বোধন-ভগবানকে। তার নিকট প্রার্থনা জানানো হচ্ছে,–আমাদের কার্যশক্তি যেন বিপথগামিনী না হয়। আমাদের কর্মের দ্বারা আমরা যেন আমাদের ভাগ্যরেখা–ললাট-লিপি–পরিবর্তন করতে সমর্থ হই। যেমন–রিশ্যপদীং। ঐ পদের ভাব বগতিবিশিষ্ট, ক্রুভাবাপন্ন। হিংসা দ্বেষ ইত্যাদির প্রাবল্যে কর্মশক্তিসমূহ রিশ্যপদীং অর্থাৎ বক্ৰগতিবিশিষ্টা হয়ে থাকে। দ্বিতীয়-বৃদতীং। স্থূল অর্থ–স্থূলদন্তে চর্বণপরায়ণা। বৃষ পদে অভীষ্টবর্ষণের ভাব আসে; সত্ত্বভাবেই অভীষ্ট পূরণ হয়। যে দন্ত সেই অভীষ্টকে চর্বণ করে, অভীষ্টপূরণের পথ রোধ করে, এখানে সেই ভাব আসে। তৃতীয়–গোষেধাং। ঐ পদের ভাব–বিপথে গমনশীলা। গো-শব্দের জ্ঞান অর্থ গ্রহণ করলেও ঐ ভাব প্রাপ্ত হওয়া যায়। গো অর্থাৎ জ্ঞান হতে চলে যাওয়ার ভাব (বিধু গত্যাং এই ধাতু-অর্থ অনুসারেই) পাওয়া যায়। জ্ঞান-পথ হতে চলে যাওয়াই বিকৃত গমন। গোষেধাং পদ ঐ ভাব প্রকাশ করে। চতুর্থ–বিধমাং। বিকৃত বা বিরুদ্ধ স্বরই মিথ্যাভাষণ। যা সত্য, তা বিকৃত বা বিরুদ্ধ নয়; মিথ্যাই বিকৃত-স্বর। এ পক্ষে ঐ বিধমাং পদে মিথ্যাভাষণের অর্থই প্রাপ্ত হই। এই সকল ভাব আমাদের কর্মশক্তির সাথে সম্বন্ধযুক্ত না হয়, আমাদের কর্মশক্তিকে তাদের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করবেন না; মন্ত্রের প্রথমাংশে এইরকম প্রার্থনা প্রকাশিত হয়েছে।-মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশ–তাঃ অস্মৎ নাসয়ামসি। তার নাশয়ামসি ক্রিয়াকে ভাষ্যকার প্রথম পুরুষের বহুবচনের ক্রিয়াপদ গণ্য করছেন। কিন্তু আমরা মনে করি, ঐ পদ মধ্যমপুরুষের একবচনের ক্রিয়াপদ। তাই ঐ পদের নাশয়ামঃ প্রতিবাক্য-গ্রহণ না করে, আমরা বিনাশয় বিদ্রয় প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছি।…এই সব বিষয় বিবেচনা করলে, এখানকার ভাব হয় এই যে,-হে ভগবন্! ঐ সকল অসৎ-সংশ্রবকে আমার কর্মশক্তি হতে দূরে অপসারণ করুন। মন্ত্রের উপসংহার–ললাম্য বিলীঢ্যং নাশয়।–হে ভগবন্! আমার ললাটলিপি পরিবর্তন করে দিন।…আমার কর্মের দ্বারা আমার অদৃষ্টকে ফিরিয়ে নেবার সামর্থ্য আমাতে আসুক।–সূক্তের শেষে, সকল প্রার্থনার শেষে এই প্রার্থনাই সমীচীন ও সঙ্গত হয় ॥ ৪।
প্রথম মন্ত্রঃ মা নো বিদন ব্রিব্যাধিনো মো অভিব্যাধিনো বিদ। আরাচ্ছরব্যা অস্মদ্বিধূচীরিন্দ্র পাতয় ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ –বিশেষরূপে অস্ত্রের দ্বারা তাড়নশীল শত্রুগণ (বহির্দেশ হতে আগত পারিপার্শ্বিক শত্রুগণ) আমাদের আক্রমণ করতে যেন সমর্থ না হয়; সন্নিহিত শত্রুগণ (অন্তরস্থিত কামক্রোধ ইত্যাদি রিপু-শত্রুগণ) আমাদের নিকট হতে দূরীভূত হোক। হে পরমেশ্বর্যশালি (ভগব ইন্দ্রদেব)! শত্রুগণ কর্তৃক বহু দিক হতে নিক্ষিপ্ত শরসমূহ (শত্রুগণের সর্বতোমুখী আক্রমণ), নানামুখে গতিশীল হয়ে, আমাদের নিকট হতে দূরদেশে পতিত হোক। (প্রার্থনা,–আমাদের প্রতি শত্রুগণের শর-সন্ধান সর্বৰ্থা ব্যর্থ হোক) ১
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই নতুন সূক্তে আবার নতুনরকমের প্রার্থনা আরম্ভ হলো। সুক্তানুক্রমণিকায় প্রকাশ,–এই সূক্তটি এবং এর পরবর্তী আরও দুটি সূক্ত সংগ্রামে বিজয়-শ্রী লাভের উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত হয়। বিঘা শরস্য (১কা-২সূ) প্রভৃতি মন্ত্রের ন্যায় এই সূক্তের মন্ত্র ইত্যাদির বিনিয়োগ-বিধি নির্দিষ্ট আছে। আয়ুধ-ধারণ প্রভৃতি সংক্রান্ত আজহোমে মা নো বিদ্যম্ ইত্যাদি সূক্তের মন্ত্রগুলির বিনিয়োগ হবে। এ বিষয়ের আর আর বিধি, কর্মীর নিকট অবগত হওয়া কর্তব্য। আমাদের ব্যাখ্যা প্রায়ই মন্ত্রের অনুসারী আছে। তবে যুদ্ধজয়ের ব্যাপারে মন্ত্রের প্রয়োগ আছে–এই মাত্র লক্ষ্য রেখে, মন্ত্রের অর্থে ভাষ্যকার যে দূরস্থ ও নিকটস্থ যোদ্ধা-সৈনিকের শরনিক্ষেপ প্রতিহত করবার উদ্দেশ্যে মন্ত্রটি বিহিত হয়েছে নির্দেশ করেছেন, আমরা সে ভাব সম্পূর্ণ পরিগ্রহ করিনি। আমাদের মত এই যে, এই মন্ত্রে আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক দুরকম সংগ্রাম-ক্ষেত্রের চিত্র চিত্রিত আছে। মন্ত্রে বলা হয়েছে,হে ভগবন্! আমাদের বহিঃশত্রুকে আপনি দূরীভূত করুন; আমাদের অন্তরস্থ শত্রুও আপনার প্রভাবে বিনাশ-প্রাপ্ত হোক। ইন্দ্র-সম্বোধনে এখানে দেবাসুরের যুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠতে পারে। আর্যগণের সাথে অনার্যগণের যুদ্ধের বিষয়ও খ্যাপন করা যায়। যে দৃষ্টিতে যিনি দেখবেন, মন্ত্রে সেই ভাবই আমনন করতে পারবেন। তবে আমাদের লক্ষ্য,–সেই। এক। সে পক্ষে প্রার্থনার মর্ম এই যে,–হে ভগবন্! অন্তঃশত্রু বহিঃশত্ৰু উভয় শত্রু আমাদের আক্রমণে নিয়ত শরসন্ধান করে আছে; আপনি তাদের আক্রমণ প্রতিহত করুন,–সেই দুই রকমের শত্রুকে দূরে অপসারণ করে দিন। একদিকে কাম ইত্যাদি রিপুগণের প্রলোভন-রূপ শর, অন্যদিকে অপকর্মের ফলস্বরূপ পারিপার্শ্বিক বিপদ-পরম্পরা-রূপ শর,–দুরকম শত্রুর নিক্ষিপ্ত দুরকমশর,–চারদিক হতে আমাদের আক্রমণ করতে আসছে। হে ভগবন্! সেই সকল শত্রুর আক্রমণ হতে আমাদের রক্ষা করুন। এটাই এখানকার প্রার্থনা ॥ ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ বিম্বঞ্চো অস্মচ্ছরবঃ পতন্তু যে অস্তা যে চাস্যাঃ। দৈবীমনুষ্যেষবো মমামিত্রা বি বিধ্যত ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হিংসাকারী শত্রুগণ! আমাদের নিকট হতে তোমরা বিপরীত পথে গমন করো; (আমাদের পরিত্যাগ করে অন্যত্র যাও); যে শত্রু আমাদের আক্রমণের জন্য আমাদের অভিমুখে প্রধাবিত হয়েছে, যে শত্রুগণ আমাদের আক্রমণের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হচ্ছে, তারা সকলে বিপরীত পথে নিপতিত হোক। দৈবীঃ অর্থাৎ দেব সম্বন্ধীয় অস্ত্র ইত্যাদি (আমাদের হৃদয়স্থিত সত্ত্বভাব ইত্যাদি) এবং মনুষ্যেষবঃ (অর্থাৎ মনুষ্যসম্বন্ধীয় অস্ত্র ইত্যাদি) অর্থাৎ আমাদের মনুষ্যোচিত কর্মের দ্বারা সঞ্জাত আয়ুধ ইত্যাদি, আমাদের ঐ শত্রুদের সংহার করুক। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— ভাষ্যানুসারে এ মন্ত্রে মানুষের সাথে মানুষের যুদ্ধের বিষয় প্রখ্যাপিত। তা থেকে দেবাসুরের যুদ্ধ অথবা আর্যগণের সাথে অনার্যগণের যুদ্ধ অধ্যাহার করা যায়। ভাষ্যনুসারে মন্ত্রের প্রথম পাদের অর্থ এই যে,-শত্রুর যে শর ধনু হতে বিনিমুক্ত হয়েছে, তারা অন্য পথে গমন করুক; আর যে শর তূণীরে সংগৃহীত আছে, তারাও নিপতিত অর্থাৎ ব্যর্থ হোক। শক্রর শর সম্বন্ধে এমন অভিপ্রায় প্রকাশ করে, পরিশেষে নিজেদের শরের কার্যকারিতা-বিষয়ে প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আমাদের পক্ষে দৈবীঃ অর্থাৎ আগ্নেয়-বারুণ ইত্যাদিরূপ অস্ত্রসমূহ, আর মনুষ্যেষবঃ এই আমাদের প্রযুক্ত অস্ত্র ইত্যাদি আমাদের শত্রুগণের সংহার সাধন করুন। এখানে মানুষে মানুষে যুদ্ধে এক পক্ষে দেবতাগণের সহায়তা প্রার্থনা করা হচ্ছে, অন্য পক্ষে নিজেদের কৃতিত্বেরও কামনা প্রকাশ পেয়েছে। আমাদের ভাব ভাষ্যের ভাব হতে একটু স্বতন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মনে করি, এ মন্ত্রের মুখ্য সম্বোধন-ভগবাকে। তাঁর অনুগ্রহে আমাদের সকলরকম শত্রু বিনষ্ট হোক,–এটাই প্রার্থনা। শত্রু বা শর বলতে এখানে হৃদয়স্থিত কামক্রোধ ইত্যাদি রিপু-শত্রুকে লক্ষ্য আছে। শর–প্রলোভন ইত্যাদি-রূপ তাদের কর্ম। তাদের যে কর্ম আরম্ভ হয়েছে, অর্থাৎ তারা আমাদের প্রতি যে শর পরিত্যাগ (নিক্ষেপ করেছে, সে শর বা সে কর্ম। অন্যদিকে বিপরীত-পথে গমন করুক;–এইরকম প্রার্থনার মর্ম এই যে,–শত্রুশরের কার্য–হিংসা ইত্যাদি –আমাদের মধ্যে যেন আর কার্যকরী না হয়। এর ভাব এই যে,–শত্রুর প্রলোভন ইত্যাদি যেন আমাদের প্রতি আদৌ কার্যকরী না হয়। আমরা মনে করি, মন্ত্রের প্রথম পাদের এটাই মর্মার্থ। ভাষ্যানুসারে দ্বিতীয় পাদের দৈবীঃ পদের অর্থ আগ্নেয় ইত্যাদি অস্ত্র বলে আমরা মনে করি না। রিপু দমনের পক্ষে দেবতার সত্ত্বভাবই প্রধান অস্ত্র; এখানে তাই প্রখ্যাপিত হয়েছে।
প্রথমে বলা হয়েছে,–দৈবী অস্ত্র অর্থাৎ আমার হৃদয়াভ্যন্তরস্থিত সত্ত্বভাবসমূহই আমার শত্রুকে বিনাশ করতে সমর্থ হোক। তারপর বলা হয়েছে,-আমার মনুষ্যোচিত কর্ম–আমার সকর্ম-নিবহ–তাদের বিমর্দিত করুক। ফলতঃ, আমি আমার কর্মের দ্বারা যেন আমার সকল অসৎ-ভাবকে দূর করতে সমর্থ হই; হে ভগবন্! আমায় সেই কর্মশক্তি প্রদান করো।–এটাই। এই মন্ত্রের নিগূঢ় তাৎপর্য। ২।
বঙ্গানুবাদ –যে সকল প্রসিদ্ধ আত্মসম্বন্ধী অন্তঃশত্রু (হৃদয়স্থিত রিপুশত্রু) আমাদের পীড়ন করে; যে সকল প্রসিদ্ধ জন্মসহজাত শত্রু (অসৎ বৃত্তিনিচয়) আমাদের নিপীড়িত করে; যে সকল বহিঃশত্রু আমাদের হিংসা করতে উদ্যত হয়; অপিচ, আর যে সকল নিকৃষ্টবল শত্রু আমাদের পীড়া উৎপাদন করে; সংহর্তা রুদ্রদেব আমাদের সেই সকল শত্রুকে আমাদের সৎকর্ম-রূপ আয়ুধের দ্বারা বিনাশ (সংহার) করুন ৷ ৩৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটির ভাব-পরিগ্রহ করা একটু আয়াস-সাপেক্ষ। ভাষ্যকার মন্ত্রের যে অর্থ অধ্যাহার করেছেন, তাতে জ্ঞাতি সজাতি সমবলসম্পন্ন মানুষ-শত্রুর উপদ্রব-নিবারণে এই মন্ত্র প্রযুক্ত হয়েছে বলে বোঝা যায়। ভাষ্যের অর্থে প্রকাশ,আমাদের যে জ্ঞাতিশত্ৰু অধিক বলসম্পন্ন হয়ে, আমাদের ক্ষেত্ৰ-ধন ইত্যাদি অপহরণে আমাদের পীড়ন করছে, হে দেব! আপনি সেই সকল শত্রুর বিনাশ সাধন করুন। আমাদের সম্ভাব্য যে সব শত্রু, আমাদের সমানজন্মা সমবল সজাতি যে সব শত্রু এবং অপরাপর হীনবল যে সব শত্রু আমাদের প্রতি নানারকম উপদ্রব করছে, আমাদের সেই সব শত্রুকে, নানা আয়ুধ-সহকারে নিহত করুন।
আমাদের ব্যাখ্যা ভিন্ন পদ অবলম্বন করেছে। যেমন,-মন্ত্রের অন্তর্গত স্বঃ পদের ভাষ্যকার অর্থ করেছেন,–জ্ঞাতিঃ। আমরা অর্থ করেছি,–আত্মসম্বন্ধী অন্তঃশত্রুঃ যদ্বা অস্মাকং হাদিস্থিতঃ রিপুশত্রুঃ। সজাতঃ পদের অর্থে ভাষ্যকার লিখেছেন–সমানজন্মা সমবলঃ জ্ঞাতি অরাতির্বা। আমরা ঐ পদের অর্থ অধ্যাহার করলাম–জন্মসহজাতঃ অসৎ বৃত্তিনিচয়ঃ ভাষ্যকারের অর্থকে অনুসরণ করলে মানুষের সাথে মানুষের দ্বন্দ্বের–জ্ঞাতি সজাতির সাথে বিবাদ বিসম্বাদের ভাব আসে। কিন্তু, বেদমন্ত্র যে পারিবারিক দ্বন্দ্বকলহের বা জ্ঞাতিনাশের বিষয় বর্ণনা করেননি, তা বেশ উপলব্ধ হয়। বেদমন্ত্রসমূহ উচ্চশিক্ষামূলক; তাতে ইহলৌকিক অনিত্য-সম্বন্ধের বিষয় প্রকটিত হয়নি। ইত্যাদি ॥ ৩॥
চতুর্থ মন্ত্রঃ যঃ সপত্নে যোহসপত্নে যশ্চ দ্বিষপাতি নঃ। দেবাস্তং সর্বে ধূর্বন্তু ব্ৰহ্ম বর্ম মমান্তরং ৪
বঙ্গানুবাদ –আমাদের অন্তরস্থিত যে শত্ৰু, আমাদের কর্মের দ্বারা সঞ্জাত যে শত্রু এবং যে শত্রু আমাদের প্রতি দ্বেষপরায়ণ হয়ে আমাদের অভিসম্পাত করে (বাক্য ইত্যাদির দ্বারা আমাদের অনিষ্টসাধনে প্রবৃত্ত হয়); সেই সকল শত্রুকে আমাদের দেবভাবসমূহ (পরম ঐশ্বর্যশালী দেবগণ) বিনাশ করুন; আর, আমার প্রযুজ্যমান মন্ত্রজাল ব্যবধায়ক বৰ্মস্বরূপ বিদ্যমান থাকুক। (অর্থাৎ, : মন্ত্ররূপ বর্মের দ্বারা যেন আমরা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে সমর্থ হই)। ৪৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— ভাষ্যে এই মন্ত্রের সপত্নঃ পদে জ্ঞাতিরূপ শত্রু এবং অসপত্ন পদে জ্ঞাতিব্যতিরিক্তঃ শত্রু অর্থ গৃহীত হয়েছে। এই দুরকম শত্রু; আর এক রকম শত্রু–যারা হিংসা করে আমাদের গালি দেয়। এই তিন রকম শত্রুকে, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ এসে বধ করুন; আর, আমাদের উচ্চারিত মন্ত্র আমাদের বর্ম-স্বরূপ হয়ে শত্রুর ও আমাদের মধ্যে ব্যবধান রক্ষা করুক। ভাষ্যানুসারে মন্ত্রে এই ভাব পরিব্যক্ত। প্রত্নতত্ত্বের দিক থেকে আবার বলা যায়, আর্যগণ যখন এদেশে আসেন (আমরা অবশ্য তা স্বীকার করি না); তখন এ দেশের লোকের মধ্যে দুটি দল হয়।
একদল আর্যগণের পক্ষ অবলম্বন করেন; আর এক দল, তাদের প্রতিযোগী হন। সেই প্রতিযোগী দলের মধ্যে, অনেকে অনেকের জ্ঞাতিশত্রু ছিলেন, অনেকে আবার বাহিরের শত্রু ছিলেন। অনেকে নিকটে এসে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধবিগ্রহে প্রবৃত্ত হতেন না; তারা দূরে থেকেই নিন্দাবাদে অনিষ্ট-সাধনের চেষ্টা পেতেন। এ পক্ষে প্রার্থনার অর্থ এই যে,-সেই ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ এসে, ঐ তিনরকম শত্রুকে বধ করুন; আর মন্ত্র, আমাদের বর্মরূপে রক্ষা করুক। দেবাসুরের সংগ্রাম এবং আর্য-অনার্যের যুদ্ধের সাথে এই মন্ত্রের সংশ্রব রাখতে গেলে, মন্ত্রে এইরকম অর্থই–এইরকম ভাবই নিষ্কাশন করা যায়। কিন্তু সকল মন্ত্রের সাথে এই সূক্তের মন্ত্র-কয়েকটির সামঞ্জস্য রাখতে হলে, এবং আধ্যাত্মিক জগতের সাথে এই সকল মন্ত্রের সম্বন্ধ আছে বুঝতে পারলে আমরা যে পথে যে ভাবে অর্থ নিষ্কাশন করছি, তার যৌক্তিকতা উপলব্ধ হবে। আমরা মনে করি, হৃদয়-ক্ষেত্রে অহরহ যে সংগ্রাম চলেছে, এখানে সেই সংগ্রামের বিষয়ই প্রখ্যাত আছে। কতকগুলি শত্রু আমাদের অন্তরের মধ্যে আমাদের জন্মসহচর হয়ে আছে। আর কতকগুলি শত্রুকে আমরা আমাদের কর্মের দ্বারা আহ্বান করে আনি। সেই দুরকম শত্রুকে সপঃ ও অসপত্নঃ আখ্যায় আখ্যাত করা হয়েছে।
একরকম শত্রু সঙ্গে সঙ্গেই থাকে (অন্তঃশত্রু); তাই সপত্নঃ। অন্য শত্রুকে আমরা আমাদের কর্মের দ্বারা আহ্বান করে আনি (বহিঃশত্রু); তাই সে বিপত্নঃ। তা ছাড়া, তৃতীয় যে শত্রুতারা অলক্ষ্যে থাকে; কিন্তু আমাদের অনিষ্ট সাধন করে। সে শত্রুকেও কর্মজ শত্রু বলা যেতে পারে। এমন অনেক অপকর্ম আছে, আমাদের অজ্ঞাতে সাধিত হয়। সে সকল কর্মের ফলাফল আমরা বুঝতে পারি না, বোঝবার চেষ্টাও করি না; অথচ সে সকল কর্ম সম্পাদন করে থাকি। এখানে সেই সকল কর্ম-কৃত শত্রুকে লক্ষ্য করা যায়। উপসংহারে-মন্ত্রে বলা হয়েছে, দেবগণ তিনপ্রকার শত্রুকে নাশ করুন। আমরা মনে করি, এখানকার প্রার্থনার মর্ম এই যে,-হে ভগবন্! আমরা যেন আমাদের দেবভাবসমূহের দ্বারা তিন প্রকারে উৎপন্ন তিন প্রকার শত্রুকে সংহার করতে পারি। দেবভাবে–সত্ত্বভাবে সকল অসৎ-ভাব দূর হয়। আমাতে সেই দেবভাবসমূহ–সত্ত্বভাবসমূহ আসুক, আর তার প্রভাবে শত্রু বিমর্দিত হোক। এটাই প্রার্থনার ভাব।-মন্ত্র আমার বর্ম হোক–এই বাক্যের মর্ম এই যে,-মন্ত্রের অনুধ্যানে আমি যেন নিমগ্ন থাকি। তাহলে অসৎ-ভাব আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। মন্ত্রে হৃদয়ে সত্ত্বভাব আনয়ন করে; অসৎ-ভাবকে দূর করে দেয়। তাই মন্ত্রকে বর্মরূপে গ্রহণের কথা বলা হলো। ৪।
বঙ্গানুবাদ –হে দ্যোতমান শুদ্ধসত্ত্বপোষক দেব! আমাদের শত্রু স্বস্থান-চ্যুত হোক; (আপনার কৃপায় আমাদের হৃদয় হতে অন্তর্হিত হোক)। হে বিবেকরূপী মরুৎ-দেবগণ! আমাদের অনুষ্ঠিত কর্মে (হৃদয়ের সৎ-বৃত্তির দ্বন্দ্বে) আমাদের ইষ্টফল প্রদান করুন; (জয়যুক্ত করে সুখী করুন); অপিচ, আমাদের অভিমুখে আগমনকারী শত্রুর তেজঃ যেন আমাদের অভিভূত করতে না পারে; আমাদের অকীর্তিরূপ-শত্রু যেন আমাদের প্রাপ্ত না হয়; (অপিচ) হিংসা ইত্যাদি পাপসম্বন্ধযুত আমাদের অভীষ্টফলনাশক যে সকল শত্রু আছে, তারা যেন আমাদের অভিভূত করতে না পারে। (অর্থাৎ, আমরা যেন আমাদের কর্মের দ্বারা সৎ-ভাব-সহযুত হয়ে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে সমর্থ হই) ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই সূক্তের মন্ত্রগুলিও শত্রুসমরে বিজয়লাভ-মূলক। শক্তসংগ্রামে বিজয়লাভের জন্য এই সূক্তের মন্ত্র-সমূহে নানা প্রার্থনার দ্যোতনা হয়েছে। মন্ত্রের আমরা যে ব্যাখ্যা করেছি, তা প্রায়ই ভাষ্যের অনুসারী হয়েছে। মন্ত্রটিকে আমরা চার ভাগে ভাগ করেছি। প্রথম অংশে শুদ্ধসত্ত্বের পোষক জ্ঞানদেবতার নিকট হৃদয়ের শত্রুসমূহকে–অজ্ঞানতা ও তার সহচর কামনা-বাসনা ইত্যাদি রিপুশত্রুগুলিকে বিনাশ করবার প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। হৃদয়ের শক্রসমূহই ইহলোকে পরলোকে বিষম অনিষ্টের সূত্রপাত করে।…মন্ত্রের প্রথমাংশে তাই অজ্ঞানতা রূপ শনাশে হৃদয়ের নির্মলতাসাধনের বিষয়ে দেবতার নিকট প্রার্থনা করা হয়েছে।মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে, সৎকর্মের ফলে সৎস্বরূপের সামীপ্যলাভের প্রার্থনা প্রকটিত। ঐ অংশে দুরকম ভাব উপলব্ধ হয়। বিবেকরূপী মরুৎ-দেবতার নিকট শত্রুসমরে বিজয়-লাভের প্রার্থনা এবং সৎকর্মের ফলে পরাগতি মুক্তিলাভের কামনা প্রকাশ পেয়েছে। হৃদয়ে অহরহ সৎ-অসৎবৃত্তির দ্বন্দ্ব চলেছে। সেই দ্বন্দ্বে জয়লাভের বা অসৎ-বৃত্তি-নাশের প্রার্থনা অথবা সঙ্কর্মের ফলে সৎ-স্বরূপের সামীপ্যলাভের কামনা দ্যোতিত হচ্ছে। মন্ত্রের শেষ তিন অংশে সর্বশত্ৰু-সংহারের প্রার্থনা করা হয়েছে। প্রথম–অভিভাঃ অর্থাৎ, দীপ্তির দ্বারা অভিভবকারী যে শত্রু। পার্থিব সুখ-ঐশ্বর্যের দীপ্তি মোহকর। কামনা বাসনা ইত্যাদিই তার জনয়িতা। পার্থিব ধনরত্নের লাভের আশায় আমরা মোহগ্রস্ত না হই, কামনা-বাসনা ইত্যাদিরূপ শত্রু এসে আমাদের মোহনীয় লোভনীয় সামগ্রীর দীপ্তির দ্বারা অভিভূত না করে, এ স্থলে সেই প্রার্থনা সূচিত হয়েছে। দ্বিতীয়-অকীর্তি-রূপ শত্রু। আমরা যেন এমন কর্মে লিপ্ত না হই, যাতে আমাদের প্রাক্তন নষ্ট না হয়, যাতে আমাদের সৎকার্যের সুযশ লোপ প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ,-আমরা যেন সৎকার্যের শোভন কার্যের অনুষ্ঠানে অনুপ্রাণিত হই। আমরা যেন সৎ-আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, আর সংসার যেন সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। তৃতীয়–পাপ-রূপ শত্রু।
পাপ-কর্ম–অসৎ-কর্ম-মানুষের সকল সন্তাপের জনক। পাপেই সংসার ভস্মীভূত হয়;-পাপই মানুষকে নিরয়গামী করে। সেই পাপ-রূপ শত্রুকে বিনাশ করবার জন্য দেবতার নিকট প্রার্থনা জানানো হয়েছে। ১।
বঙ্গানুবাদ— ইদানীং (কর্মপ্রারম্ভে) সহচর হিংসা ইত্যাদি পাপশত্রুগণের হননসাধক যে আয়ুধ-জাল আমাদের অভিমুখে নিপতিত হয়, হে সখ্যকারুণ্য-রূপী দেব! আপনারা আমাদের সেই হতে সেই সকল আয়ুধ বিযুক্ত করুন; (শত্রুর আয়ুধ আমাদের যাতে স্পর্শ করতে না পারে, হে দেবদ্বয়! আপনারা তার বিধান করুন)। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মন্ত্রটি শত্ৰু-শর প্রতিষেধক। সাধারণতঃ মানুষের সাথে মানুষের দ্বন্দের বিষয়ই প্রথম দৃষ্টিতে মন্ত্রে উপলব্ধ হয়। যুদ্ধ-জয়-ব্যাপারে মন্ত্রের প্রয়োগ আছে, লক্ষ্য করে, ভাষ্যকার ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান ত্রিকালের শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করবার উদ্দেশ্যে মন্ত্রের প্রয়োগ সিদ্ধান্ত করেছেন। আমরা সে হিসাবে মন্ত্রের ভাব পরিগ্রহ করিনি। আমাদের মতে, এ মন্ত্রে আধ্যাত্মিক সংগ্রামের চিত্র চিত্রিত হয়েছে। মন্ত্রে শত্ৰুকৃত বধ নিবারণের প্রার্থনা আছে। এখানে শত্রু বলতে অজ্ঞানতাকে বোঝাচ্ছে। কাম-ক্রোধ ইত্যাদি অজ্ঞানতার সহচর; হিংসা, পাপ, প্রলোভন এবং কামনা-বাসনা প্রভৃতি তাদের অস্ত্রপর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
শত্রুর অস্ত্র ইত্যাদি অর্থাৎ কামনা-বাসনা ইত্যাদি বা প্রলোভন প্রভৃতি যেন আমাদের স্পর্শ করতে না পারে, তাদের আয়ুধ-প্রহারে আমরা যেন বিচ্ছিন্ন না হই, তাদের ভয়ে আমরা যেন সৎপথ-ভ্রষ্ট না হই। মন্ত্রে এই প্রার্থনার ভাব সূচিত হয়েছে।-হে ভগবন্! আমাদের সকর্মের প্রভাবে আমরা যেন সকল অসৎ-ভাব দূর করতে সমর্থ হই। হে ভগবন! আমাদের সেই কর্ম-শক্তি প্রদান করো; আমাদের সেই জ্ঞান দান করো; তোমার জ্ঞানে তোমার স্বরূপ বুঝে যেন তোমার সাথে সম্মিলিত হই। হে ভগবন! আমাদের সকল সন্তাপ দূরে যাক।-মন্ত্রে এইরকম প্রার্থনার ভাবই প্রকাশ করে। ২।
বঙ্গানুবাদ –স্নেহকারুণ্যবর্ষণকারী হে বরুণদেব! আমাদের নিকটবর্তী শত্রুর (হৃদয়ে বিদ্যমান অন্তঃশত্রুর) এবং আমাদের দূরবর্তী (কর্মের দ্বারা সঞ্জাত) শত্রুর যে হনন-সাধন আয়ুধ আমাদের প্রাপ্ত হয় (অর্থাৎ আমাদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়) সেই সমুদায় আয়ুধকে আপনি আমাদের হতে বিযুক্ত করুন (শত্রুর সেই সকল অস্ত্র যেন আমাদের স্পর্শ করতে না পারে)। অপিচ, হে দেব! আপনি আমাদের শ্রেষ্ঠ সুখ (আশ্রয়) প্রদান করুন; এবং দুস্পরিহর অস্ত্র-শস্ত্রাদি (আমাদের হতে) বিযুক্ত করুন অর্থাৎ দূরে নিক্ষেপ করুন ৷ ৩৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এ মন্ত্রে স্নেহকরুণাধার ভগবানের বরুণরূপী বিভূতির নিকট শত্রুনাশের প্রার্থনা জানানো হয়েছে। লৌকিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় ক্ষেত্রেই এই প্রার্থনা জানানো যেতে পারে। যে সকল শত্রু নিকটে বর্তমান অর্থাৎ জ্ঞাতি প্রতিবেশী প্রভৃতির যে শত্রুতাচরণ, আর যে সকল শত্রু দূরে দৃশ্যমান অর্থাৎ ভিন্ন দেশীয় শত্রু–উভয়রকম শত্রুর আক্রমণ হতে নিমূক্ত করবার আকাঙ্ক্ষা এই মন্ত্রে প্রকাশ পেয়েছে। এ হিসাবে, ব্যাখ্যা-প্রসঙ্গে কেউ কেউ আর্য-অনার্যের যুদ্ধের সম্বন্ধও খ্যাপন করতে কুণ্ঠা বোধ করেননি। যাই হোক, লৌকিক হিসাবেও মন্ত্রে যে উচ্চভাবের সূচনা হতে পারে, এস্থলে তার বিবৃতি করছি। নিকটে P অবস্থিত এবং দূরে অবস্থিত শত্রুর আক্রমণ হতে বিযুক্ত করবার প্রার্থনায় এই ভাব প্রকাশ পেয়েছে যে, হে ভগবন্! আমাদের এমন আদর্শ-কর্মী করো, যেন আমাদের প্রতিবেশী বা জ্ঞাতি অথবা ভিন্ন দেশবাসী বা গ্রামবাসী কেউই আমাদের সাথে শত্রুতাচরণে সমর্থ না হয়। অর্থাৎ আমাদের কর্মগুণে যেন আমরা সকলকেই আপন করে নিতে পারি। সকলেই যেন আমাদের ব্যবহারে ও পরিচর্যায় পরিতুষ্ট হয়ে আমাদের মিত্রের মধ্যে পরিগণিত হয়। আমরা যেন এমনই উদারচেতা–এমনই লোকপ্রিয় হই, যেন এ পৃথিবীর সকলকেই স্বজাতি-স্বজন বলে মনে করতে পারি। লৌকিক হিসাবে, এ অর্থও সঙ্গত হতে পারে। আধ্যাত্মিক হিসাবে, সন্নিহিত শত্ৰু-ইতশ্চ পদে, হৃদয়ের অন্তঃশত্রুসমূহকে বুঝিয়ে থাকে; আর দূরবর্তী শত্রু–অমূতঃ পদে, আমাদের কর্মের দ্বারা সঞ্জাত পাপ ইত্যাদি শত্রুকে বোঝায়। সময় সময় আমরা আমাদের অজ্ঞাতসারে এমন সকল কর্মের অনুষ্ঠান করি, যার দ্বারা পাপ সঞ্চিত হয়ে যায়। কর্ম যদি সত্ত্ব-সহযুত হয়, তাহলে আর সে আশঙ্কা থাকে না। তাহলে অমূতঃ রূপ শত্রুর আক্রমণের বিভীষিকা দূরে পলায়ন করে। শত্রুর আয়ুধ অর্থে প্রলোভন ও কামনা-বাসনা ইত্যাদি-রূপ তাদের অস্ত্র-শস্ত্রাদি। নিকটস্থিত ও দূরস্থিত শত্রুর আয়ুধ আমাদের হতে বিযুক্ত করুন।
এই প্রার্থনার মর্ম এই যে,-হিংসা, প্রলোভন, পাপ-কর্ম, কাম, ক্রোধ প্রভৃতি যেন আমাদের মধ্যে কার্যকারী না হয়। অর্থাৎ, আমরা যেন সর্বতোভাবে হিংসা প্রভৃতি পরিশূন্য হই, শত্রুর প্রলোভন ইত্যাদি যেন আমাদের বিপথগামী করতে সমর্থ না হয়, মায়ামোহ-হিংসা-দ্বেষ ইত্যাদি যেন আমাদের অভিভূত করতে না পারে। ফলতঃ, সর্বতোভাবে আমাদের হৃদয় নির্মল হোক, কাম ক্রোধ ইত্যাদি দূরীভূত হোক।-মন্ত্রে শত্রু-সংহারে অনিষ্ট-নিবৃত্তিতে, ইষ্ট অর্থাৎ মোক্ষলাভের প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। দেবতার কাছে প্রার্থনা জানানো হয়েছে–আমাদের শ্রেষ্ঠ সুখ বা আশ্রয় দান করুন। পরমাত্মায় আত্মলীন হওয়া অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সুখ আর কি থাকতে পারে? ভগবানের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আশ্রয়ই বা আর কি আছে?–ভক্ত সাধক কাতরকণ্ঠে ডেকে বলছেন–হে দেব! আপনি সুপ্রসন্ন হোন। শত্রুর আক্রমণে জরজর হচ্ছি; আপনি সে সকল শত্রু নির্মূল করে দিন। আমি আপনার শরণ গ্রহণ করছি–আত্মনিবেদন করছি। ক্ষুদ্র হৃদয়-সিংহাসন পেতে রেখেছি। ভক্তি-পুস্পাঞ্জলী প্রস্তুত রয়েছে। আসুন, গ্রহণ করুন। আমি পরমাশ্রয় প্রাপ্ত হই।–এই তো তাতে আত্মলীন হবার প্রার্থনা ৷ ৩৷
বঙ্গানুবাদ –হে দেব! হিংসারহিত আপনি শত্রুগণ কর্তৃক অহিংসিত, শত্রুগণের সংহার-কর্তা, বিশ্বের নিয়ন্তা এবং মহত্ত্ব ইত্যাদি গুণোপেত সর্বশ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর্যশালী হন; এই হেতু দেবতার (আপনার) শরণাগত (মিত্রভূত) জনকে শত্রুগণ হিংসা করতে পারে না, এবং শত্রু কর্তৃক কখনও সে জন পরজিত হয় না।, ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –সূক্তের উপসংহারে এই মন্ত্রে অতি উচ্চভাব প্রকটিত। মন্ত্রে ভগবানের শরণ নেওয়ার উপদেশ আছে। নানা গুণ-বিশেষণের অবতারণা করে বলা হয়েছে,–ভগবানের শরণাগত ব্যক্তি কখনও শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হয় না ইত্যাদি। এতে সংসারের সকল প্রাণীকেই তার শরণাপন্ন হওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। বক্ষ্যমান মন্ত্রে সাধক আপন মনকে ভগবানের শরণাপন্ন হবার জন্য উদ্বোধিত করছেন। ভগবান বিশ্বনিয়ন্তা; তিনি বিশ্বের হিতে রত। তিনি কেবল বিশ্বপালক নন; তিনি আবার পর শত্রু-সংহারক। অন্তঃশত্রুর ও বহিঃশত্রুর আক্রমণে মানুষ সর্বদা বিব্রত। ভগবানকে শত্রুনাশক জেনে, শত্রুনাশের কামনায় তার দিকে মানুষের মনকে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা এখানে বিদ্যমান দেখি।
সুখশান্তিহারা হয়ে, আধিব্যাধিশোকতাপে জর্জরিত হয়ে, মানুষ যতই আর্তনাদ করছে, করুণার সাগর দয়াল ভগবান্ ততই অভয় দিয়ে ডেকে ডেকে বলছেন,-কেন ভয় পাও; আমার দিকে অগ্রসর হও; মামেকং শরণং ব্রজ। তোমার সকল সন্তাপ দূরে যাবে; তোমার সকল দুঃখ-সকল অশান্তি তিরোহিত হবে।–মন্ত্রে ইন্দ্রদেব অতঃ বলে বিশেষিত হয়েছেন। তিনি অস্তৃতঃ অর্থাৎ হিংসা ইত্যাদি বিরহিত; পরন্তু তিনি শত্রুদেরও অহিংসিত। এর তাৎপর্য এই যে, তাঁকে কেউ রক্ষা করে না; তিনি স্বয়ংই স্বয়ংকে রক্ষা করে থাকেন। পরন্তু তিনি স্থাবর-জঙ্গম-চরাচর সকলই ধারণ করে আছেন ও রক্ষা করছেন। তার ন্যায় শ্রেষ্ঠ আর কে আছে? পার্থিব বন্ধুত্ব জীবনের সঙ্গে সঙ্গেই অবসান হয়। কিন্তু মরণের পরও যার সাথে বন্ধুত্ব চিরবিদ্যমান থাকে, তিনিই তো প্রকৃত শ্রেষ্ঠ বন্ধু। ইহলোকের বন্ধুত্ব অবস্থা-বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গেই অবসান হয়। কিন্তু সৎস্বরূপের সাথে সখিত্ব মরণের পরও বর্তমান থাকে। তার সাথে সখিত্ব স্থাপনে সমর্থ হলে, তার আর অবসান হয় না। ভাষ্যের ব্যাখ্যায় প্রকাশ–এই মন্ত্রটি ইন্দ্রদেবতার সম্বোধনে প্রযুক্ত হয়েছে। মন্ত্রের মধ্যে ইন্দ্রের সম্বোধনমূলক কোন পদ দৃষ্ট হয় না। মন্ত্রটি ঋগ্বেদ-সংহিতার দশম মণ্ডলের ১৫২ সূক্তের প্রথম ঋক।
মন্ত্রের যে ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে, তা এই,-আমি শাস এইভাবে ইন্দ্রকে স্তব করছি।–হে ইন্দ্র! তুমি মহৎ, শভক্ষণকারী ও আশ্চর্য, তোমার সখার মৃত্যু নেই, তার কখনও পরাজয় হয় না। মন্ত্রে শাসঃ পদ আছে। সম্ভবতঃ তা হতেই ব্যাখ্যাকার শাস নামক ব্যক্তিবিশেষের কল্পনা করেছেন। ভাষ্যকার সে অর্থ গ্রহণ করেননি। এমন ব্যখ্যায় মন্ত্রের ভাব-পরিগ্রহ করা সুকঠিন। ভাষ্যেও এমন অর্থ গৃহীত হয়নি। ৪।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই সূক্তের মন্ত্র চারটিও শত্রুদমনে সংগ্রাম ইত্যাদি কর্মে বিজয়শ্রী লাভ করবার জন্য প্রযুক্ত বলে সূক্তানুক্রমণিকায় উক্ত হয়েছে। (স্বস্তিদাঃ ইত্যস্য অপরাজিতগণে পাঠাৎ সাংগ্রামিকাদিকর্মসু গণপ্ৰযুক্তো বিনিয়োগ উক্ত৷৷…)। গ্রাম ইত্যাদিতে গমনের সময়ে স্বস্ত্যয়ন ইত্যাদিতে এই সূক্তের মন্ত্র পাঠ করে প্রথমে দক্ষিণ পদক্ষেপণ, শর্করাতৃণপ্রক্ষেপণ এবং ইন্দ্ৰোপস্থান প্রভৃতি করতে হয়। 2 পিশাচ ইত্যাদি নিবারণ কার্যে, উদ্বেগ-বিনাশনে এবং বেদিনির্মাণকার্যে এই সূক্তোক্ত মন্ত্রগুলি জপ করবার বিধি আছে। এই সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় ব্রাহ্মণান্তরে বিবৃত আছে। আলোচ্য মন্ত্রটি–ঋগ্বেদ-সংহিতার দশম মণ্ডলের ১৫২ সূক্তের দ্বিতীয় ঋক। মন্ত্রের যে ব্যাখ্যা সাধারণতঃ প্রচলিত আছে প্রথমে তার একটি প্রকাশ করছি; যথা,–যিনি কল্যাণ দান করেন, যিনি প্রজাবর্গের অধিপতি, বৃত্রের বিনাশকর্তা, যুদ্ধে বৃত, শত্রুকে বশ করেন, বৃষ্টি বর্ষণ করেন, সোম পান করেন, অভয় দান করেন, সেই ইন্দ্র আমাদের সমক্ষে আগমন করুন।ভাষ্যের ভাব একটু স্বতন্ত্র। আমরা উপরোক্ত ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এটুকুই বলতে পারি যে, কেবলমাত্র সাধারণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে অন্য অর্থ গৃহীত হয়। মন্ত্রে ভগবানের যে সকল বিশেষণ পদ দৃষ্ট হয়, তার বিশ্লেষণ করলেই মন্ত্রের ভাব উপলব্ধ হতে পারবে। তাতে বোঝা যাবে–ইন্দ্র নামে সেই অনাদি অনন্তকে লক্ষ্য করা হয়েছে। প্রথম বিশেষণ পদ–স্বস্তিদাঃ। অবিনাশী নাম-সমূহের মধ্যে স্বস্তি পদ উল্লিখিত হয়।–অবিনাশী-শাশ্বত সুখ–মোক্ষ বা মুক্তি ভিন্ন আর কি হতে পারে? আর, এই মোক্ষ বা মুক্তি ভগবান্ ব্যতীত আর কে-ই বা দিতে পারে? ভগবাকে স্বস্তিদাঃ বিশেষণে বিশেষিত করায় তার নিকট পরম সুখ প্রাপ্তির–চিরশান্তি-লাভের প্রার্থনা জানানো হয়েছে। ইন্দ্রদেবের আর একটি বিশেষণ–বৃত্ৰহা। সায়ণের মতে ঐ পদের অর্থ–বৃত্ৰো নাম জলাধার-ভূতো মেঘঃ।…
অর্থাৎ বৃষ্টির জন্য জলের আধারভূত বৃত্র নামক মেঘকে হনন করেন বলে তার নাম–বৃহ; অথবা ধৃষ্টার উৎপাদিত বৃত্র নামক অসুরকে হনন করেন বলে তাঁর নাম বৃত্ৰহা। আমরা ঐ পদের অর্থ করেছি–অজ্ঞানতাবিনাশকঃ। বৃত্র পদের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গেই যত কিছু মতান্তরের সৃষ্টি। নিরুওকার যাস্ক আধ্যাত্নিক ও আধিদৈবিক অর্থ ভেদে তার দুরকম অর্থ নিষ্পন্ন করেছেন। আধিদৈবিক অর্থে অর্থাৎ ভাষ্যকারের প্রথম অর্থ অনুসারে, ঐ পদের যে অর্থ নিষ্পন্ন হয়, তা এই-ইন্দ্র শব্দে সূর্য বোঝায়। বৃবৃ ধাতু হতে উৎপন্ন। তার অর্থ–আবরণ। সে হিসাবে, বৃত্র অর্থে-সূর্যের আবরক মেঘকে বুঝিয়ে থাকে। সূর্যের রশ্মি-সম্পাতে, উত্তাপে, পৃথিবী নবজীবন লাভ করে; তাতে বৃক্ষলতা ও জীবজন্তু-সমূহ জীবন প্রাপ্ত হয়। বৃত্র অর্থাৎ মেঘ সূর্যকে আবৃত করলে পৃথিবীতে তার রশ্মির গতিরোধ হয়। এইভাবে, আলোকের জনয়িতা ইন্দ্রের বা সূর্যের সাথে অন্ধকারের উৎপাদক বৃত্রের বা মেঘের দ্বন্দ্ব চলে থাকে। বৃত্র জয়লাভ করলে পৃথিবী অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন হয়,–সূর্যদেব (ইন্দ্র) অদৃশ্য হয়ে পড়েন। তাতে সংসারে বিষম অনর্থের সূত্রপাত হয়, কিন্তু ইন্দ্রের পরাক্রম অপরিসীম। ইন্দ্রের প্রখর প্রভাবের নিকট বৃত্র তিষ্ঠিতে পারে না।
তখন বৃত্র নিহত হয় অর্থাৎ মেঘ বিগলিত হয়ে জলরূপে ধরাতলে নিপতিত হয়ে থাকে; ইন্দ্রের জ্যোতিঃ পূর্ণরূপে প্রকটিত হয়ে পড়ে। সাধারণ দৃষ্টিতে বৃত্র ও ইন্দ্রের যুদ্ধের বিষয় এই ভাবেই পরিগৃহীত হয়ে থাকে। ইত্যাদি। ভাষ্যকারের নিষ্পন্ন বৃত্রহা পদের দ্বিতীয় অর্থ অনুসারে পৌরাণিক উপাখ্যানের প্রতি লক্ষ্য পড়ে। কিন্তু সে উপাখ্যানেও নানা মতান্তর দেখা যায়। কোনও পুরাণে বৃত্রাসুর ত্বষ্টার পুত্র, কোনও পুরাণে বৃত্রাসুর গয়াসুরের পুত্র–এইরকম উল্লেখ আছে। যাই হোক, দধীচির অস্থি-নির্মিত বজের দ্বারা ইন্দ্র বৃত্রকে নিহত করেন,–এ সম্বন্ধে প্রায়ই মতান্তর নেই।–আমরা বৃত্ৰহা পদের যে অর্থ পরিগ্রহণ করেছি, তা আধ্যাত্মিকতা-মূলক–নিরুক্তকার যাস্কের মতের অনুসারী।–মেঘ যেমন সূর্যরশ্মি আবৃত করে সংসারকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলে, অজ্ঞানতা-রূপ মেঘও তেমনই মানুষের হৃদয়কে সমাচ্ছন্ন করে মানুষকে সৎ-অসৎ-বিচার-বিমূঢ় করে ফেলে। সূর্যের উদয়ে যেমন মেঘ অপসারিত হয়ে অন্ধকার বিদূরিত হয়; সেইরকম হৃদয়াকাশে জ্ঞান-সূর্যের উদয়েও অজ্ঞানতারূপ অন্ধকার দূরীভূত হয়ে থাকে।…এ হিসাবে মন্ত্রের ইদ্রঃ পদে সেই প্রজ্ঞানরূপী পরমেশ্বর ব্যতীত আর কাকেই বা বোঝাতে পারে? তিনি আলোকদাতা, তিনি জ্ঞানের, সকল ধর্মের, সকল সত্যের আধার স্থানীয়। সঙ্গেপতঃ, তিনি সৎ–তিনি সংস্বরূপ। বৃত্র তাঁর বিরুদ্ধ-প্রকৃতিসম্পন্ন। বৃত্র–মূর্তিমান অজ্ঞানান্ধকার কুকর্মের জনয়িতা। ইত্যাদি।–এই মন্ত্রে ইন্দ্রদেবের আর কয়েকটি বিশেষণ-বিমৃধঃ, বশী, বৃষ এবং সোমপাঃ। …এই সব বিশেষণের লক্ষ্যই সেই l একমেবাদ্বিতীয় পরমেশ্বর-পরমাত্মা। মন্ত্রের প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে দেব! আপনার শরণ নিলাম। স্বস্তিদাঃ আপনি; আপনি আমাদের নিত্যসুখ পরমশান্তি প্রদান করুন। বিশাং পতি–বিশ্বের অধিপতি বিশ্বেশ্বর আপনি; বশী-বিশ্বের নিয়ন্তা আপনি … আপনি বৃত্ৰহা–বিমৃধঃ। আপনি আমাদের অজ্ঞানতারূপ শত্রুকে বিনাশ করুন।..ইত্যাদি। ১।
বঙ্গানুবাদ –হে পরমেশ্বর্যশালী দেব! আমাদের মঙ্গলের জন্য সংগ্রামকারী শত্রুদের বিনাশ করুন; (হিংসাপ্রলোভন ইত্যাদিরূপ) শত্রুসৈন্যগণকে নীচ (অবনমিত) করে অভিভূত করুন; অপিচ, যে সকল শত্রু আমাদের হিংসা করতে উদ্যত হচ্ছে, তাদের নিকৃষ্ট মরণাত্মক করুন অর্থাৎ তাদের (সর্বথা) বিনষ্ট করুন। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটি ঋগ্বেদ-সংহিতার ১০ম মণ্ডলের ১৫২ সূক্তের চতুর্থ ঋক্। এখানে এই মন্ত্রে সেই একই ভাব–একই প্রার্থনা প্রকটিত। এখানেও সেই শত্রুনাশের কামনা–এখানেও সেই পরাগতি মুক্তিলাভের বাসনা।-মন্ত্রের যে বঙ্গানুবাদ প্রচলিত আছে, তা এই,-হে ইন্দ্র! আমাদের শত্রদের বধ করো; যুদ্ধাভিলাষী বিপক্ষদের হীনবল করো। যে আমাদের মন্দ করে, তাকে জঘন্য অন্ধকারে নিমগ্ন করো। এ অর্থে মানুষের সাথে মানুষের বিবাদ-বিসম্বাদের বিষয়ই উপলব্ধ হয়। ভাষ্যকারের অর্থও এ অপেক্ষা অধিক দূর অগ্রসর হয়নি। তিনিও ক্ষেত্র-ধন ইত্যাদি অপহরণকারী শত্রুর বিনাশের বিষয় প্রখ্যাপিত করেছেন। মন্ত্রে তমঃ পদ আছে। সম্ভবতঃ তার প্রতি লক্ষ্য করেই সাধারণভাবে মন্দকারী শত্রুদের অন্ধকারে নিক্ষেপের বিষয় ব্যাখ্যাকার উপলব্ধি করেছেন। ভাষ্যকার কিন্তু সে ভাব গ্রহণ করেননি। তিনি ঐ পদের অর্থ করেছেন–মরণাত্মকং। অর্থাৎ ক্ষেত্ৰ-ধন অপহরণকারী শত্রুগণকে আপনি এমনভাবে শাস্তি প্রদান করুন যাতে তারা আর কুকার্যে (ক্ষেত্ৰ-ধন ইত্যাদি অপহরণে) প্রবৃত্ত হতে না পারে; তাদের এমনই হীনবল এবং মরণাত্মক করুন। এ হিসাবে ইন্দ্রদেবকে একজন দৈববলসম্পন্ন যোদ্ধৃপুরুষ বলেই মনে হয়। লৌকিক হিসাবে মন্ত্রের প্রয়োগ যাই হোক, আধ্যাত্মিক হিসাবে মন্ত্র অন্য অর্থ সূচনা করে। হৃদয়ের যজ্ঞাগারে সৎ-অসৎ বৃত্তির দ্বন্দ্ব অহরহ চলেছে। তাতে কাম-ক্রোধ ইত্যাদি অজ্ঞানতা-সহচর-সৈন্যসামন্ত, হিংসা-প্রলোভন ইত্যাদি-রূপ আয়ুধ প্রয়োগ করে যজ্ঞভঙ্গ করবার জন্য উদযুক্ত হয়। সেই সব শত্রু যাতে বিধ্বস্ত হয়, হৃদয়-ক্ষেত্র আক্রমণ করতে না পারে, যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়–দেবতার নিকট সেই প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। ইন্দ্রদেব আর কে? তিনি তো ভগবানেরই প্রজ্ঞানরূপী বিভূতি। হৃদয়ে জ্ঞানের উদয়ে অজ্ঞানতা-সহচর অসৎ-বৃত্তিসমূহ নাশ-প্রাপ্ত হয়, এই ভাবই এখানে পরিব্যক্ত। যিনি ঐহিক চিন্তায় নিরত, যিনি বাহ্য-পূজানুষ্ঠানে একান্ত অনুরক্ত, আধিভৌতিক উপদ্রবে মানুষ-শত্রুর আক্রমণে, তাঁর ঐহিক-সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বিঘ্ন ঘটবে মনে করে, তিনি ইন্দ্রদেবের নিকট ঐহিক সেই সকল শত্রুনাশের প্রার্থনা টু জানাতে পারেন। তার এ প্রার্থনা স্বাভাবিক;–তাতে সুফল লাভেরও আশা আছে। কিন্তু যিনি আধ্যাত্মিক পথের পথিক, যিনি অন্তর্যাজ্ঞিক, তাঁর প্রার্থনা অন্যরূপ; তিনি ঐহিক সুখের কামনা করেন না; ঐহিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতিও তাঁর মন আকৃষ্ট নয়। তাই ইহলৌকিক শত্রুর ভয়ে তিনি ভীত নন; তাই তার প্রার্থনা–ঐহিক–পার্থিব শত্রু নাশের জন্যও নয়; তিনি সেজন্য উৎকণ্ঠিতও নন। ইহসংসারে তাঁর শত্রু থাকতে পারে না। তাঁর ঔদার্যে,, তার বিশ্বজনীন প্রীতির ভাবে সকলেই মুগ্ধ;…তাই তার প্রার্থনা–অন্তঃশনাশের জন্য; তার কামনা জ্ঞান-কিরণ লাভের জন্য।–প্রজ্ঞান-স্বরূপ ভগবানের নিকট মন্ত্রে তিন রকম প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। প্রথমতঃ-হে দেব! আমাদের শ্রেয়েলাভের নিমিত্ত আমাদের সমুদায় শত্রুকে বিনাশ করুন। তার পর সেই সকল শত্রুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমতঃ সংগ্রামে উদ্যোগী শত্রু-হিংসা-প্রলোভন ইত্যাদি এবং আমাদের অভিভবকারী মায়ামোহ প্রভৃতি শত্রুর বিনাশ-সাধন ॥ ২॥
তৃতীয় মন্ত্রঃ বি রক্ষো বি মৃধো জহি বি বৃত্রস্য হন্ রুজ। বি মমিন্দ্র বৃহন্নমিত্রস্যাভিদাসতঃ ॥ ৩
বঙ্গানুবাদ— শত্রুনাশক পরমেশ্বর্যশালী হে, দেব! আপনি আমাদের সৎ-ভাববিরোধী (কামক্রোধরূপ) শত্রুগণকে বিশেষভাবে নাশ করুন; (হিংসা প্রলোভন ইত্যাদিরূপ) যুদ্ধেচ্ছু শত্রুদের বিদূরিত করুন; অজ্ঞানতা-রূপ (মায়া-মোহ ইত্যাদি রূপ) শত্রুর অনিষ্ট-সাধন-সামর্থ্য নিবারণ করুন; অপিচ, আমাদের বিনাশে উদ্যত অর্থাৎ সৎকর্মের অনুষ্ঠানে বিঘ্ন-উৎপাদনকারী (কামনা-বাসনা-রূপ) শত্রুর ক্রোধরূপ (পাপসম্বন্ধসূচক) আয়ুধকে বিনষ্ট করুন (অর্থাৎ, মায়ামোহের প্রবল আক্রমণ হতে আমাদের সর্বৰ্থা রক্ষা করুন। ৩।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –প্রথমতঃ মন্ত্রের একটি প্রচলিত অর্থ এস্থলে উদ্ধৃত করছি। মন্ত্রের ব্যাখ্যায় ব্যাখ্যাকার লিখেছেন,–হে বৃত্রসংহারী ইন্দ্র! রাক্ষসকে ও শত্রুদের বধ করো; বৃর্সের দুই হনু ভেঙ্গে দাও। অনিষ্টকারী বিপক্ষের ক্রোধকে নিষ্ফল করো।ভাষ্যের অনুসরণেই এমন ব্যাখ্যার অবতারণা হয়েছে। যেমন, –ভাষ্যকার হনূ পদে কপালৌ অর্থ নিষ্পন্ন করেছেন। …আমরা ঐ হ পদের অর্থ মরণসাধকান আয়ুধান অর্থ নিষ্পন্ন করেছি। হনোর্থ হন্ ধাতু হতে হন্ পদ নিষ্পন্ন। সেই মতে, যার দ্বারা হনন করা যায়, তা-ই হন্। অস্ত্রশস্ত্র-আয়ুধ ইত্যাদির দ্বারাই হননকার্য সমাহিত হয়ে থাকে।যাই হোক, মন্ত্রটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে আমরা মন্ত্রটিকে চার ভাগে বিভক্ত করেছি। প্রথম অংশে সৎ-ভাবের বিরোধী কাম-ক্রোধ ইত্যাদি শত্রুর নাশের প্রার্থনা বিজ্ঞাপিত হয়েছে।…দ্বিতীয় অংশে সংগ্রামেচ্ছু শত্রুগণের–হিংসা প্রলোভন ইত্যাদির বিনাশের প্রার্থনা সূচিত।…মন্ত্রের তৃতীয় অংশে হিংসা-দ্বেষ ইত্যাদি প্রবল শত্রুর আক্রমণ ব্যর্থ করবার প্রার্থনা দেখতে পাওয়া যায়। পৌরাণিক আখ্যায়িকার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে এস্থলে অনেকে ইন্দ্র ও বৃত্রের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।…আমরা কিন্তু বৃত্রস্য পদে অজ্ঞানস্য, মায়ামোহাদিরূপস্য শত্রাঃ অর্থ অধ্যাহার করেছি।…মন্ত্রের শেষাংশে (চতুর্থাংশে) সৎ-অনুষ্ঠানে বিঘ্ন-উৎপাদনকারী কামনা-বাসনা-রূপ অমিত্রের ক্রোধ অর্থাৎ পাপ-সম্বন্ধ বিনাশের প্রার্থনা প্রখ্যাপিত।.মন্ত্রে এইভাবে একে একে সকল শত্রুনাশের প্রার্থনা সূচিত দেখতে পাই। এই মন্ত্রটিও ঋগ্বেদ-সংহিতার ১০ম মণ্ডলের ১৫২ সূক্তের তৃতীয় ঋক্ ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –হে পরমেশ্বর্যশালী দ্যোতনাত্মক দেব! শত্রুর হিংসাপূর্ণ ক্রুর মনকে (পরের অনিষ্ট সাধনের প্রবৃত্তিকে) বিনষ্ট করুন; আমাদের হননেচ্ছু শত্রুর হননসাধন আয়ুধকে অপসৃত করুন; হে দেব! আপনি আমাদের শ্রেষ্ঠ সুখ (আশ্রয়) প্রদান করুন; এবং (শত্রুর) দুস্পরিহর আয়ুধসমূহকে (আমাদের হতে) বিযুক্ত করুন; (অর্থাৎ দূরে নিক্ষেপ করুন)। ৪। মন্ত্ৰার্থ-আলোচনা –যেমন সূক্তের সূচনায়, তেমনই সূক্তের উপসংহারে (অর্থাৎ এই সূক্তে এই শেষ বা চতুর্থ মন্ত্রে) সেই শত্রুনাশে ইষ্টলাভের প্রার্থনা সূচিত হয়েছে। কেবল শত্রুনাশ নয়; পরন্তু তাদের অনিষ্ট-সাধনের প্রবৃত্তি-নাশের প্রার্থনাও এস্থলে, প্রকট দেখি….ঐহিক ধনসম্পদ–ভোগ-বিলাস ইত্যাদি, জীবনে সঙ্গে সঙ্গেই অবসান হয়। কিন্তু যা জীবনের পরও সুখের হেতুভূত হয়ে থাকে, জ্ঞানীজন সেই ইষ্টফল-লাভেরই কামনা করেন। হৃদয়ের অন্তঃশত্রুনাশে মোফলোভের কামনাই তার একমাত্র প্রার্থনা। তিনি ধন-সম্পদ চান না;-মানুষ-শত্রুর অপেক্ষা য়ে প্রবল শত্রু-কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ প্রভৃতি–তিনি তাদেরই নিধনের বাসনা করেন।…মানুষের রিপুশই তার জন্মগতি-রোধের পথ রুদ্ধ করে দেয়।… এখানকার প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে দেব! শত্রুর আক্রমণে প্রপীড়িত হয়ে তোমার শরণাপন্ন হচ্ছি। তুমি আমাদের মানসক্ষেত্রের শত্রুদের সংহার করে আমাদের ইষ্টফল প্রদান করো। প্রজ্ঞানস্বরূপ তুমি; আমাদের হৃদয়ে জ্ঞান-বহ্নি প্রজ্বলিত করে দাও। কামক্রোধ ইত্যাদি ভস্মীভূত হোক; উষালোকে আঁধারের মতো অজ্ঞানতা বিদূরিত হোক। তোমার আলোকে আলোক-লাভ করে, আমরা তোমাতে লীন হয়ে যাই। আমরা মনে করি, মুক্তিকামী জন এ স্থলে এমনই প্রার্থনা করছেন। ঋগ্বেদ-সংহিতা ১০১৫২৫ ॥ ৪৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে জীব (আত্ম-সম্বোধন)! তোমার হৃদয়সম্বন্ধী রোগ (বন্ধনহেতুভূত অন্তৰ্বাধি) এবং কামিলাদি-রূপ শারীর-ব্যাধি (বন্ধনমূল বহিব্যাধি অর্থাৎ সৎপথ-অবরোধক কর্মপ্রভাব ইত্যাদি) সূর্যদেবের (শসন্তাপকারী শুদ্ধসত্ত্বের) উদ্দেশে প্রেরণ করো (অথবা অনুক্রম সহকারে একে একে প্রাপ্ত করাও); ভাব এই যে, শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে বন্ধনমূল–অন্তর্ব্যাধি ও বহিব্যাধি–একে একে নাশ করো)। লোহিতবর্ণ (সৎ-ভাবজনক, সৎসমীপে নয়নসমর্থ) জ্ঞানকিরণের সেই প্রসিদ্ধ (ব্যাধিনাশ-সমর্থ অথবা বন্ধন-মোচন-সমর্থ) দীপ্তির দ্বারা (তুমি) তোমাকে আচ্ছাদিত (দীপ্তিমন্ত) করো ॥ ১
মন্ত্ৰাৰ্থ আলোচনা— নতুন অনুবাকে নতুন সূক্তের নতুন মন্ত্রে এক নতুন রকমের প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। সূঞানুক্রমণিকায় প্রকাশ,অনু সূর্যং প্রভৃতি মন্ত্র হৃৎ-রোগ এবং কামিলাদি (বা কামলা ইত্যাদি) রোগ শান্তির জন্য বিনিযুক্ত হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে যে সকল প্রক্রিয়া-পদ্ধতি অবলম্বিত হয়, তার বিধিও ঐ সূঞানুক্রমণিকায় সক্ষেপে উল্লিখিত আছে। সেখানে দেখতে পাই, হৃৎ-রোগ ইত্যাদি প্রশমনের জন্য রোগীকে রক্তবর্ণ বৃষের রোমমিশ্রিত জল পান করাতে হয়। তারপর, রক্তবর্ণ গোচর্ম এবং অচ্ছিদ্র মণি গোক্ষীরে নিক্ষেপ করবার বিধি আছে। অনুক্রমণিকায় প্রকাশ,–সেই গোচর্ম পেতে, রোগীকে তার উপর উপবেশন করাবে এবং মন্ত্রপূত করে সেই মণি বেঁধে দেবে; পরে সেই গোক্ষীর তাকে পান করাবে। অতঃপর নবমবর্ষীয়া বালিকাকে হরিদ্রা-মিশ্রিত অন্ন ভোজন করিয়ে রোগীকে তার উচ্ছিষ্ট ভোজন করাবে এবং ভুক্তাবশিষ্ট রোগীর দুই পদে লিপ্ত করে রোগীকে খাটের উপর উপবেশন করাবে। তারপর, শুক, কাষ্ঠশুক এবং পীতনকশুক–এই তিন রকম পক্ষীর সব্যজঙ্ হরিৎবর্ণ সূত্রের দ্বারা সেই খাটের সাথে বেঁধে দেবে। মন্ত্রের অন্য যে সব প্রয়োগ-বিধি আছে, তা কর্মীর নিকট অবগত হওয়া কর্তব্য।–মন্ত্রটি বিশেষ জটিলতাপূর্ণ। ভাষ্যে মন্ত্রের যে অর্থ প্রকটিত, তা এই,-হে ব্যাধিত পুরুষ! তোমার হৃদয়-সন্তাপক হৃৎ-রোগ এবং কামিলা ইত্যাদি-জনিত শরীরের হরিৎ-বর্ণ রোগ–এই উভয়প্রকার ব্যাধি সূর্যকে লক্ষ্য করে প্রেরিত হোক; অর্থাৎ, পূর্বোক্ত সন্তাপজনক দুরকম রোগ তোমার শরীর পরিত্যাগ করে সন্তাপক সূর্যকে প্রাপ্ত হোক। তার পর লোহিতবর্ণ বিশিষ্ট গোজাতিসম্বন্ধীয় বর্ণে অর্থাৎ লোহিত বর্ণে তোমার শরীর আচ্ছাদিত হোক। স্থূলতঃ, অনভিমত রোগজনিত তোমার শরীর যে বিকৃতবর্ণ প্রাপ্ত হয়েছে, তা বিদূরিত হয়ে শরীর সুস্থ থোক এবং প্রকৃষ্ট (অর্থাৎ সুস্থতার লক্ষণযুক্ত) বর্ণ ধারণ করুক। সাদাসিধা-ভাবে মন্ত্রে এই রকম ব্যাধি মুক্তির প্রার্থনাই প্রকাশ পেয়েছে।
আমরা মন্ত্রের পদসমূহের অন্বয়ে দূরকম ভাব গ্রহণ করেছি। এক অর্থ–সায়ণের অনুসারী; এবং অন্য অর্থ–আমাদের পরিগৃহীত পন্থারই অনুগামী হয়েছে।-মন্ত্রের সমস্যামূলক প্রথম পদ–হৃদ্যোতঃ। সায়ণ ঐ পদের অর্থ করেছেন,-হৃদয়ং দ্যোতয়তি সন্তাপয়তীতি হৃদ্যোতঃ হৃদ্রোগঃ–অর্থাৎ, যাতে হৃদয়ের সন্তাপ জন্মায়, হৃদয়ের সাথে যা ব্যাপ্য, অবস্থিত বা সম্বন্ধ-বিশিষ্ট এবং সন্তাপজনক, তা-ই হৃদ্দ্যোতঃ। এ থেকেই হৃদ্দ্যোতঃ পদে হৃদ্রোগ অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। এ সম্বন্ধে আমাদের বক্তব্য এই যে, যা হৃদয়ের সন্তাপজনক–তা-ই হৃদয়ের ব্যাধি–তা-ই অন্তর্ব্যাধি। কামনা-বাসনায় এবং অসৎপ্রবৃত্তির সমাবেশ রূপ যে ব্যাধি অহরহ হৃদয়কে নিপীড়িত করে, আমাদের মতে, হৃদ্দ্যোতঃ পদে সেই ভাবই ব্যক্ত করে। হৃদয়ের ব্যাধি–অন্তৰ্বাধি-ভব-ব্যাধির মোচনই প্রধান মুক্তি। শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা জ্ঞানকিরণের সাহায্যে তাকে দুগ্ধীভূত করতে পারলেই ইষ্টলাভের সম্ভাবনা। এই জন্যই আমরা হৃদ্দ্যোতঃ পদে, ভাষ্যকারের অর্থ-ব্যতিরিক্ত হৃদিসন্তাপকং ব্যাধিমূলং, বন্ধনহেতুভূতঃ অন্তঃশঃ অর্থ গ্রহণ করেছি।–মন্ত্রের দ্বিতীয় সমস্যাপূর্ণ পদ–হরিমা। সায়ণ ঐ পদের অর্থ গ্রহণ করেছেন,–কামিলাদিরোগজনিতঃ শারীরো হরিদ্বর্ণঃ; অর্থাৎ কামিলা ইত্যাদি রোগের আক্রমণে শরীর যে হরিদ্রাবর্ণ ধারণ করে,-ভাষ্যকারের মতে হরিমা পদে তা-ই উপলব্ধ হয়। এ অর্থে সাধারণতঃ ব্যাধির বিষয়ই প্রখ্যাপিত হয়েছে। কিন্তু ভাষ্যকারের নিষ্পন্ন অর্থ ব্যতীত, হরিমা পদে তার এক অতি উচ্চ ভাব ও সূচিত হতে পারে। ধাতু-অর্থের আলোচনায় প্রতিপন্ন হয়,-হৃ, ধাতু হতে হরিমা পদ নিষ্পন্ন। হৃ ধাতুর অর্থ হরণ বা ক্ষয় করা। যে রোগে শরীরের সামর্থ্য ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তা-ই হরিমাপদবাচ্য। তা থেকে আমরা শরীরক্ষয়করঃ ব্যাধিঃ-যদ্বা, সৎপথাবরোধকঃ কর্মপ্রভাবঃ, বন্ধনমূলঃ বহির্বাধিঃ অর্থ আমনন করেছি। কামিলা ইত্যাদি রোগে যেমন শরীর ক্ষয় হয়ে আসে, রক্তহীনতা জন্মে, শরীরের সমস্ত সামর্থ্য নষ্ট হয়ে যায়; সেইরকম, ঐ সকল রোগের ন্যায়, আত্মধ্বংসকারী সত্ত্বভাবনাশক যে সকল অপকর্মের অনুষ্ঠান জ্ঞাতসারেই হোক আর অজ্ঞাতসারেই হোক আমরা নিত্য করে থাকি, তাতে আমাদের প্রাক্তন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, আর তাতে আমাদের সংসার-বন্ধন ক্রমে দৃঢ় হতে দৃঢ়তর দৃঢ়তম হয়ে আসে।–সেই অবস্থায় মানুষ হিতাহিত সৎ-অসৎ-বিচারশূন্য হয়ে পড়ে; ফলে, তার পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। সেই অবস্থাই কামিলা ইত্যাদি রোগের অবস্থা বলা যেতে পারে।
কামিলা ইত্যাদি রোগগ্রস্ত ব্যক্তির নিকট যেমন সংসারের যাবতীয় সামগ্রী হরিদ্রাবর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়, অর্থাৎ সবই যেমন তার নিকট বিকৃত বর্ণবিশিষ্ট বলে বোধ হয়, সে যেমন প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারে না; কামনা-বাসনায় নিমজ্জিত ব্যক্তিরও সেই অবস্থা ঘটে। প্রকৃত তত্ত্ব অবগত হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়। এইভাবে, মন্ত্রের প্রথমাংশে যে বলা হয়েছে, তোমার হৃৎ-রোগ এবং কামিলা ইত্যাদি শারীরব্যাধি সূর্যদেবের উদ্দেশে প্রেরণ করো, তার তাৎপর্য এই যে, তোমার অন্তর্ব্যাধি ও বহির্ব্যাধি, শত্রুসন্তাপক শুদ্ধসত্ত্বপোষক সূর্যরূপী বা প্রজ্ঞান-স্বরূপ পরব্রহ্মের প্রভাবে বিনষ্ট করো। অর্থাৎ তুমি সঙ্কর্মের প্রভাবে হৃদয়ে সত্ত্বভাব সঞ্চয় করো; হৃদয়ে জ্ঞানের জ্যোতিঃ আহরণ করো; জ্ঞানসূর্যের উদয়ে শুদ্ধ-সত্ত্ব-পোষক ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করতে সমর্থ হবে; ফলে, হৃদরোগ (অন্তৰ্বাধি)–কামক্রোধ ইত্যাদি জনিত চিত্তের বিক্ষোভ এবং কামিলা ইত্যাদি রোগ (শারীরব্যাধি) বহির্বাধি–অসৎ-প্রবৃত্তি বা অসৎকর্ম-সঞ্জাত আত্মধ্বংসকারী পাপকর্মের অনুষ্ঠান হতে মুক্ত হতে পারবে।–এখানে এক সংশয় বা প্রশ্ন উঠতে পারে। ব্যাধিসমূহকে সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করো বলা হলো কেন? এরও এক নিগূঢ় তাৎপর্য আছে। আলোক ভিন্ন সংসারে কিছুই তিষ্ঠিতে পারে না।
আলোকই তেজই শক্তির জনয়িতা। সূর্যদেব সেই আলোকের–সেই শক্তির–সেই তেজের আধারভূত।-মন্ত্রের আর একটি সমস্যামূলক বাক্যগো রোহিতেস্য বর্ণেন। ভাষ্যকার ঐ বাক্যের অর্থ করেছেন,–লোহিতবর্ণস্য গোজাতীয়স্য বর্ণেন লৌহিত্যেন। অর্থাৎ, লোহিতবর্ণবিশিষ্ট গোজাতি সম্বন্ধীয় লৌহিত্য-বর্ণের দ্বারা। আমরা বলেছি–গো অর্থে জ্ঞানকিরণস্য; রোহিতস্য অর্থে লোহিতবর্ণস্য, সৎ-ভাবজনস্য, সৎসমীপনয়নসমর্থস্য–যদ্বা সৎসামীপ্য প্রদানসমর্থস্য; বর্ণেন অর্থে প্রভাবেন, দীপ্ত্যা ইত্যাদি। কেন? কারণ গো শব্দে কিরণ, রশ্মি প্রভৃতি বোঝায়। তা থেকেই জ্ঞানকিরণস্য অর্থ পরিগৃহীত হয়েছে। রোহিতস্য পদ রুহ ধাতু হতে নিষ্পন্ন। উৎপন্ন করা, আরোহণ করা–এই দুই অর্থেই রুহ ধাতুর প্রয়োগ দেখতে পাই। সুতরাং ঐ পদের অর্থ সৎসামীপ্যপ্রদানসমর্থস্য অযৌক্তিক নয়।–এখানে, এই মন্ত্রে ব্যাধির ও ব্যাধিশান্তির, উপমার মধ্য দিয়ে এক পরম-তত্ত্ব বিবৃত দেখি। কামনা-বাসনা ইত্যাদিই মানুষের পাপ-প্রবৃত্তির উত্তেজক। ব্যাধি যেমন অলক্ষিতে শরীরে প্রবিষ্ট হয়ে, শরীরকে জর্জরিত করে ফেলে, কামনা-বাসনা ইত্যাদিও সেইরকম হৃদয়ের অসৎ-বৃত্তিসমূহকে উত্তেজিত করে মানুষকে অশেষ যন্ত্রণা প্রদান করে।
ইত্যাদি। যাই হোক, মন্ত্রের অন্তর্গত বিভিন্ন পদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের বিষয়, বিবেচনা করে মন্ত্রে যে ভাব উপলব্ধ হয়, তা এই,–হে সংসার-তাপতপ্ত জীব! যদি বন্ধন-মোচনের অভিলাষ থাকে, তাহলে তোমার অন্তর ও বাহির ব্যাধি-নিমুক্ত করো; অর্থাৎ তোমার অসৎ-বৃত্তিসমূহ এবং কর্মক্ষেত্রের পাপ-সংশ্রব জ্ঞানের সাহায্যে দূর করে দাও। এমন কর্মী হও–এমন কর্ম সম্পাদন করো, যাতে হৃদয়ে জ্ঞানের দিব্য-জ্যোতিঃ বিচ্ছুরিত হয়। তাহলেই অসৎ-বৃত্তির নিবারণে হৃদয়ে সৎ-বৃত্তির সঞ্চার হবে; শুদ্ধস্বভাবগুলি এসে হৃদয় অধিকার করবে। তিনি জ্ঞানময়; জ্ঞানের সাহায্যেই তুমি সৎ-স্বরূপ ভগবাকে জানতে পারবে। তাকে জানতে পেরে তার শরণ গ্রহণ করলেই তোমার সকল বন্ধন টুটে যাবে। দেখবে, তোমার অন্তর্ব্যাধি ও বহিব্যাধি কেউই আর তোমাকে তখন পীড়া দিতে সমর্থ হবে না। এইভাবেই এই মন্ত্র, মনকে জ্ঞানের অন্বেষণে ভগবানের অনুধ্যানে নিরত হতে আহ্বান জানাচ্ছে। ১৷
বঙ্গানুবাদ –হে জীব (আত্মসম্বোধন)! দীর্ঘজীবন-লাভের জন্য (ভগবানের সমীপে চিরাবস্থানের নিমিত্ত) সৎসামীপ্যপ্রদানসমর্থ (জ্ঞানকিরণের) দীপ্তির দ্বারা (তুমি) তোমাকে আচ্ছাদিত (দীপ্তিমন্ত) করো। যে রকমে জীব (আমি) অপগতপাপ (নির্মলচিত্ত) হতে পারে (পারি) এবং পাপক্ষয়ের পরে সভাববিনাশকারী পাপসম্বন্ধরহিত হয় (হই), সেই ভাবে জ্ঞানজ্যোতিতে দীপ্তিমান হও ২
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা— এ মন্ত্রও আত্ম-উদ্বোধনমূলক। ভাষ্যকারের মতে, লোহিতবর্ণ পরিধানের ফল। প্রকটনের জন্য এই মন্ত্রের অবতারণা। ভাষ্যের ভাবে ব্যাধিত ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে–হে ব্যাধিত! দীর্ঘায়ু অর্থাৎ শতবর্ষপরিমিত আয়ু লাভের নিমিত্ত, তুমি পূর্বকথিত গো-সম্বন্ধী লোহিত বর্ণের দ্বারা তোমার দেহ আবৃত করো; যাতে তোমার পাপ অপগত হয় এবং পাপ অপগতের পরে যাতে তুমি কামিলা ইত্যাদি রোগ-জনিত হরিদ্বর্ণরহিত হয়ে দীর্ঘায়ু লাভ করতে পারো, হে চিকিৎসিত ব্যাক্তি, তুমি সেইরকম হরিদ্বর্ণ প্রাপ্ত হও। বলা বাহুল্য, রোগ-উপশমের জন্য মন্ত্রের প্রয়োগ-ব্যবস্থায় মন্ত্রের যে অর্থ নিষ্পন্ন হতে পারে, ভাষ্যাভাষে তা-ই প্রকটিত হয়েছে।
এই লৌকিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই বলার নেই। তবে আধ্যাত্মিকভাবে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমাদের অর্থ অন্য পথ পরিগ্রহ করলো। আমরা মনে করি, হৃৎ-রোগে এবং কামিলা ইত্যাদি রোগে শরীর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে, রোগী যেমন অন্তর্দশা প্রাপ্ত হয়; সেইরকম, অন্তর্ব্যাধি ও বহির্ব্যাধি প্রভৃতি মানুষের সৎপ্রবৃত্তিগুলির ক্ষয় করে তার গতি-মুক্তির পথ রোধ করে দেয়। উওম চিকিৎসায় রোগ-নির্ণয়ে প্রকৃত ঔষধের ব্যবস্থা হলে, যেমন রোগ উপশম হয়,শরীর সুস্থতা : অবলম্বন করে; সেইরকম জ্ঞানকিরণের সাহায্যে অন্তরের ব্যাধিমূল কামনা-বাসনা ইত্যাদি বিদূরিত করে মনের স্থৈর্য সাধনে সমর্থ হলে গতি-মুক্তির পথ আপনিই সুগম হয়ে আসে। আমাদের মনে হয়, মন্ত্রে সেই ভাবই প্রকটিত হয়েছে।-ব্যাধিপ্রশমনের দৃষ্টান্তে মন্ত্রে ভগবৎ-ভক্ত সাধক নিজের মনকে সম্বোধন করে বলছেন–যদি গতিমুক্তিলাভের অভিলাষ থাকে, যদি ভগবানের সাথে চিরাবস্থানের অভিলাষ করে থাকো, তাহলে জ্ঞানজ্যোতিঃ আহরণে প্রবৃত্ত হও। সেই জ্যোতিতে হৃদয় আলোকিত করতে পারলে, তুমি সকল পাপ-সম্বন্ধ হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারবে। জ্ঞানজ্যোতিঃ সৎপথের প্রদর্শক; তোমাকে সৎপথে পরিচালিত করে, তা-ই তোমাকে সৎস্বরূপের নিকট পৌঁছিয়ে দেবে। তাই বলি মন, তুমি জ্ঞানার্জনে নিরত হও। সৎপথে অগ্রসর হয়ে সৎকর্মসাধনে উদ্বুদ্ধ হও। তাহলেই তুমি অরপাঅর্থাৎ পাপসম্বন্ধবিহীন হতে সমর্থ হবে, তাহলেই তুমি দীর্ঘায়ু লাভ করতে সমর্থ হবে, আর তা হলেই তুমি তার সাথে চিরাবস্থিত হতে পারবে। তাহলেই তোমার জন্মগতি রোধ হয়ে যাবে।–মন্ত্রে এই ভাবই পরিব্যক্ত বলে আমরা মনে। করি। ২।
তৃতীয় মন্ত্রঃ রোহিণীদের্বত্যাত গাবো যা উত রোহিণী। রূপংরূপং বয়োয়স্তাভিষ্টা পরি দসি ॥ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –দেবভাবসম্ভুত যে ভগবৎ প্রাপ্তিসামর্থ্য, আর জ্ঞানকিরণোদ্ভূত যে ভগবৎ প্রাপ্তিসামর্থ্য (হৃদয়ে উপজিত হয়), তার দ্বারা অরূপ ভগবানের অনন্তরূপকে এবং বয়োহীন ভগবানের অনন্তযৌবনকে তোমার সাথে সংযোজিত করো। (ভাব এই যে, জ্ঞানের প্রভাবে সৎ-ভাবের সাহায্যে ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধ হয়)। ৩।
অথবা, সপ্রবৃত্তিপ্রভাবে এবং সৎকর্মসাহায্যে (হৃদয়ে) ভগবৎসামীপ্যপ্রদানে সামর্থ্য যে জ্ঞানজ্যোতিঃ বিচ্ছুরিত হয়, তার দ্বারা, হে জীব! সেই ভগবানের অনন্তরূপকে এবং তার অনন্তযৌবনকে আহরণ করে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করো। (অর্থাৎ-জ্ঞানের সাহায্যে সঙ্কর্মের দ্বারা সেই অনন্তরূপ অথবা অরূপ এবং অনন্তযৌবন অর্থাৎ চিরনবীন ভগবাকে হৃদয়ে ধারণ করো ॥ ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই সূক্তের সকল মন্ত্রই দুর্বোধ্য। ভাষ্যানুসারে এই মন্ত্রের যে অর্থ হয়, তা এই–লোহিতবর্ণবিশিষ্ট যে সকল কামধেনু আছে এবং লোহিত বর্ণবিশিষ্ট যে সকল সাধারণ গোজাতি পরিদৃষ্ট হয়, সেই উভয়বিধ গোজাতির লোহিতবর্ণ এবং সর্বব্যক্তিগত যৌবন আহরণ করে, হে রুগ্ন, তোমার শরীরে সংযোজিত করো। রোগ-প্রশমন-পক্ষে সাধারণভাবে মন্ত্রের যে অর্থ হয়, ভাষ্যাভাষে তা-ই প্রকটিত হয়েছে বলে মনে করি। আমরা মনে করি, একদিকে যেমন ব্যাধিশান্তি, অন্যদিকে তেমনই সংসারী জীবকে ভগবৎ-অনুসারী কধবার প্রয়াস, মন্ত্রের মধ্যে নিহিত রয়েছে। আমরা দুরকম দিক হতেই দুটি বঙ্গানুবাদে তা ব্যক্ত করেছি।-মন্ত্রের একটি সমস্যামূলক পদ–রোহিণীঃ।
ভাষ্যে ঐ পদের প্রতিবাক্যে রোহিণ্যঃ লোহিতবর্ণাঃ পদ দৃষ্ট হয়। গাবঃ পদে ভাষ্যে গরুগণকে অর্থই গ্রহণ করা হয়েছে। তাতে রোহিণ্যঃ গাবঃ পদ দুটিতে লোহিতবর্ণা গাভীগণ অর্থ দাঁড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু বেদে গাবঃ পদে জ্ঞানরশ্মিসমূহ অর্থই প্রধানতঃ প্রত্যক্ষ করি। রোহিণীঃ পদ আরোহণের ভাবমূলক রুহ ধাতু হতে উৎপন্ন। তাতেই অর্থ আসে–ভগবৎ সমীপে উন্নীত করবার উপযোগী যে জ্ঞানরশ্মিসমূহ। এই অর্থেই সকল ভাব সঙ্গত হয়ে আসে। আমরা এই ভাবেরই অনুসরণ করেছি। মন্ত্রটি আত্মসম্বোধনমূলক। রূপংরূপং এবং বয়োবয়ঃ পদ দুটি বিশেষ দুর্বোধ্য। সাধারণতঃ ঐ দুই পদের যে অর্থ পরিগৃহীত হয়, ভাষ্যে তা প্রকটিত। আমাদের মতে, রূপংরূপং পদে রূপহীনের অনন্তরূপ এবং বয়োবয়ঃ পদে বয়োহীনের-ভগবানের–অনন্ত যৌবন অর্থ হওয়াই সঙ্গত বলে বোধ হয়। ভগবানের অনন্তরূপ হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে, তার অনন্ত-যৌবনের–চিরনবীনত্বের বিষয় উপলব্ধি করতে সমর্থ হলে, পার্থিব রূপ-যৌবনের প্রতি আর আসক্তি থাকে কি? সে রূপের–সে নবীনত্বের ধারণা জন্মে কিভাবে? সে ধারণা জন্মে–সৎ-ভাবের সমাবেশে; সে ধারণা জন্মে–সৎপ্রবৃত্তির উন্মেষে। মন্ত্রে এক পক্ষে যেমন ব্যাধিনাশের কামনায় লোহিতবর্ণ ধারণের উপদেশ আছে; অন্যপক্ষে তেমনই জন্মগতিরোধের জন্য ভগবানের স্বরূপ জেনে তাতে আত্মসমর্পণে সংসারতাপতপ্ত জীবকে উদ্বোধিত করা হয়েছে ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে জীব (আত্মসম্বোধন)! তোমার সম্ভবনাশক পাপপ্রবৃত্তি সমূহকে দীপ্তিমান্ সৎ-ভাবজনক জ্ঞানকিরণ সমূহে সংন্যস্ত করো; আর, তোমার সৎ-ভাব-হরণশীল কর্মপ্রভাব সমূহকে পাপহারী দেবভাব সমূহে সংস্থাপিত করো। (ভাব এই যে, সৎ-অসৎ সকল কর্ম ভগবানে সমর্পণ করো এবং ফলাকাঙ্ক্ষা-বিবর্জিত হয়ে কর্ম করে যাও। তাতেই শ্রেয়ঃ সাধিত হবে)। ৪
মন্ত্ৰাৰ্থ আলোচনা –ভাষ্যের সূচনায় প্রকাশ, পূর্বোক্ত মন্ত্র তিনটিতে রুগ্নশরীরে গরু ইত্যাদি পশুসম্বন্ধি উজ্জ্বল লোহিতবর্ণ প্রবেশের পর, রোগজনিত হরিদ্বর্ণ কি গতি প্রাপ্ত হবে, তা পরিস্ফুট করবার জন্য, এই মন্ত্রের অবতারণা। মন্ত্রের অর্থ এই যে,-হে ব্যাধিত! তোমার শরীরগত রোগজনিত হরিদ্বর্ণ, শুক এবং কাষ্ঠশুক নামক হরিদ্বর্ণ পক্ষিসমূহে সংস্থাপিত করি। অনন্তর তোমার শরীরগত সেই হরিদ্বর্ণ পীতনক নামক হরিদ্বর্ণ পক্ষিবিশেষে স্থাপন করছি। মন্ত্রের এই অর্থে, চিকিৎসক যেন রুগ্ন ব্যক্তিকে সম্বোধন করে, এই সকল মন্ত্র উচ্চারণ করছেন,–এমন ভাব পাওয়া যায়।লৌকিক হিসাবে মন্ত্রের প্রয়োগপ্রণালী যা-ই হোক, মন্ত্রের অর্থ সাধারণ্যে যা-ই প্রচলিত থাকুক, মন্ত্রে যে এক উচ্চ আদর্শ পরিব্যক্ত হয়েছে, মন্ত্রের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তা-ই উপলব্ধ হয়। আমাদের মতে, মন্ত্র নিষ্কাম-কর্মের শিক্ষা প্রদান করছেন। নিষ্কাম-কর্মের মূল-সূত্র গীতায় শ্রীভগবানের উক্তিতে সুন্দর পরিস্ফুট দেখতে পাই যৎকরোযি…মদর্পণম্। ফলাকাঙ্গা পরিশূন্য হয়ে, কর্মফল শ্রীভগবানে সমর্পণ করে কর্ম করতে পারলেই নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান হয়। এখানে এই মন্ত্রে সেই আকাঙ্ক্ষাই, ব্যাধি-প্রশমনের দৃষ্টান্তে, উপদেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রের অন্তর্গত জটিলতাপূর্ণ দুর্বোধ্য পদগুলি–হরিমাণং হারিদ্রবেষু রোপণাকাসু সুকে। ভাষ্যের মতে ঐ সব পদের যে অর্থ নিষ্কাষিত হয়েছে উপরোক্ত মন্ত্রের অর্থেই তা প্রকটিত হয়েছে।আমরা হরিমাণং পদে সৎ-ভাব-নাশকং পাপপ্রবৃত্তিং স্থির করেছি। সুকেষু, রোপণাকাসু এবং হারিদ্রবে্যু পদ তিনটিতে যথাক্রমে দীপ্তিমৎসু, সৎ-ভাবজনকে দীপ্তিপ্রদেষু জ্ঞানকিরণেষু এবং পাপাপহারকে দেবে অর্থ নিষ্পন্ন করেছি। ধাতু-অর্থানুসারে আমাদের পরিগৃহীত অর্থেরই সার্থকতা বোঝা যায়। ইত্যাদি। এখন মন্ত্রের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশে যে ভাব সূচিত হয়, তা প্রদর্শিত হচ্ছে।
মন্ত্রের প্রথমাংশে বলা হয়েছে তোমার সৎ-ভাব-নাশক পাপ-প্রবৃত্তিসমূহকে দীপ্তিমান্ সৎ-ভাব-জনক জ্ঞান-কিরণে নিবেশিত করো। ভাব এই যে–জ্ঞানকিরণের সাহায্যে সৎ-ভাব-নাশক পাপবৃত্তি-সমূহকে বিদূরিত করো; হৃদয়ে সৎ-ভাবের সঞ্চার হোক।-মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে,সৎ-ভাব-হরণশীল কর্মের প্রভাব ভগবানে সংন্যস্ত করো। অর্থাৎ ভগবৎ-অনুসারী হও। তাতে সকল কর্মফল অর্পণ করো; তাহলেই অসৎকর্মে, পাপের অনুষ্ঠানে আর তোমার প্রবৃত্তি আসবে না। তখন তোমার অনুষ্ঠিত কর্ম, তাঁর কর্ম জেনে তারই শরণ নিতে পারবে। ভাব এই যে,–ভগবৎকর্মের অনুষ্ঠান করো; যাতে তাঁর প্রীতি, তাতে তোমারও প্রীতি, এই মনে। করে, সৎকর্মের অনুষ্ঠানে নিরত হও। তাহলেই তুমি ব্যধি-নিমুক্ত হতে পারবে। ৪
বঙ্গানুবাদ –কর্মফলাবসানে বিমুক্তদেহ, চিরনবীনাবস্থাপ্রাপ্ত সৎ-বৃত্তি! যদিও তুমি মায়ামোহজ (এই ) দেহ হতে উৎপন্ন, তথাপি বিশ্বরমণশীল বিশ্বনাথের এবং আকর্ষণ-পরায়ণ ভগবানের সাথে সম্বন্ধযুত হয়েছ। (ভাব এই যে,ভগবানের সাথে সম্বন্ধযুত হওয়াতেই তুমি বিমুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত হতে পেরেছ)। হে কালস্বরূপিণি আবরণকারিণি! তুমি এই দৃশ্যমান, কলুষলাঞ্ছিত, পতনোন্মুখ, মায়ামোহ হতে উদ্ভূত দেহকে চিরতরে বিনাশ করো। (ভাব এই যে, আমাদের দেহসম্বন্ধ হতে বিচু্যত করো। ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই পঞ্চমানুবাকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দুটি সূক্ত শ্বেতকুষ্ঠ ও পলিতকুষ্ঠ ব্যাধিনাশের পক্ষে অমোঘ ঔষধ বলে অভিহিত হয়। সূক্তের মন্ত্রগুলি আবৃত্তি করে হোমক্রিয়া সম্পাদনের বিধি আছে। তা ছাড়া, ব্যাধিত স্থানে নিম্নবিধিমতে প্রলেপ প্রদান করবার ব্যবস্থা দৃষ্ট হয়। ভৃঙ্গরাজ, হরিদ্রা, ইন্দ্ৰবারুণি ও নীলিকা–এই কয়েকটি দ্রব্য বিশেষভাবে পেষণ করে, প্রলেপ প্রস্তুত করতে হবে। সেই প্রলেপ ঐ দুইরকম কুষ্ঠাক্রান্ত স্থানে লেপন করণীয়। শ্বেতকুষ্ঠসম্বন্ধে নিয়ম এই যে,প্রলেপ দেবার পূর্বে শুষ্ক গোময়ের দ্বারা ব্যাধিযুক্ত স্থানে এমনভাবে ঘর্ষণ কর্তব্য, যেন সেই স্থানটি রক্তবর্ণ ধারণ করে। পলিতকুষ্ঠ-সম্বন্ধে নিয়ম,পলিতকুষ্ঠে প্রলেপটি এমনভাবে লাগাতে হবে–যেন ক্ষতস্থান সম্পূর্ণভাবে আবৃত হয়। ক্ষতস্থানে প্রলেপ দেওয়া এবং আজহোমে মন্ত্রোচ্চারণে শান্তিলাভ–এটাই ঐ দুইরকম কুষ্ঠনাশের ঔষধ। ঔষধ ব্যবহারের বিষয়ে এবং মন্ত্রের প্রয়োগ-সম্বন্ধে যে ব্যবস্থা প্রচলিত আছে,–সে বিষয়ে আমাদের মতদ্বৈধের কারণ নেই। মন্ত্র যথাযথ প্রযুক্ত হলে এবং ঔষধ যথারীতি ব্যবহৃত হলে, দুরারোগ্য রোগ যে উপশম হয়, তা আমরা বিশ্বাস করি। তবে বর্তমানে মন্ত্রের যথাযথ প্রয়োগও হয় না, আবার ঔষধও যথারীতি প্রস্তুত হয় না; সুতরাং সুফলও সর্বথা প্রাপ্ত হওয়া যায় না। এটাই ক্ষেভের বিষয়। তবে আমরা মনে করি,-মন্ত্রের প্রার্থনা কেবল এই দেহের ব্যধিনাশমূলক নয়; তাতে দেহব্যাধিনাশের দৃষ্টান্তে ভবব্যাধি বিনাশের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। ভাষ্যে মন্ত্রের যে অর্থ প্রকটিত, তার ভাব এই,-হে ওষধে অর্থাৎ হরিদ্রাখ্যে! তুমি রাত্রিতে উৎপন্ন হও। সেই হেতু তুমি শৈত্য (কুষ্ঠ) নাশে সম্পূর্ণরূপে সমর্থ হও। সেইরূপে, হে রামে অর্থাৎ ভৃঙ্গরাজাখ্য ওষধে! হে কৃষ্ণে অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণসম্পাদন-সমর্থ ইন্দ্রবারুণি নামক ওষধে, এবং হে অসিকি অর্থাৎ অসিতবর্ণোৎপাদিকে হে নীলিকা! তোমরাও রাত্রিতে উৎপন্ন বলে কুষ্ঠব্যাধিনাশে সম্পূর্ণ সমর্থ। হে রজনি! তুমিও এই কিলাস ও পলিত ব্যাধিগ্রস্তকে রঞ্জিত করে নাও অর্থাৎ ঢেকে নাও। এই অর্থে রামে পদে ভৃঙ্গরাজ, কৃষ্ণে পদে ইন্দ্ৰবারুণি এবং অসিকি পদে নীলিকা অর্থ অধ্যাহৃত হয়ে থাকে। আমাদের মনে হয়, আয়ুর্বেদ অথর্ববেদের অন্তর্ভুক্ত বলে, ঐ সব পদার্থের সংশ্রব মন্ত্রে অধ্যাহার করা হয়েছে। আমাদের আরও মনে হয়, যখন মন্ত্রশক্তির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধার হ্রাস হয়ে এলো; সেই সময়ই দ্রব্যবিশেষের দ্বারা রোগনাশের প্রস্তাব উপলব্ধি করে, এইরকম অর্থ পরিগৃহীত হয়েছে। এবার আমাদের পরিগৃহীত অর্থের কথা বলি। প্রথম–ওষধে পদ। ফল পরিপক্ক হলে যে বৃক্ষ নাশপ্রাপ্ত হয়, তাকেই ওষধি বলে। আমরা মনে করি, এই পদটি অন্তরস্থ সৎ-বৃত্তির সম্বন্ধে প্রযুক্ত হয়েছে। সৎ-বৃত্তি যখন পরিপক্ক হয়, হৃদয় যখন সৎ-ভাবে পরিপূর্ণ হয়ে আসে, তখন তার আধারভূত দেহ লোপপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। সেই লোপেরই নামান্তর–মোক্ষ বা মুক্তি।…দ্বিতীয় আলোচ্য পদ–অসিরু। ধাতু-অর্থের অনুসরণে ঐ পদে চিরনবীন অবস্থার ভাব প্রাপ্ত হই। সিত অর্থাৎ শ্বেতবর্ণ হয়নি যার কেশ, তাকেই অসিকি বলে। ফলতঃ বৃদ্ধাবস্থা প্রাপ্ত হয়েও যে নবীনত্ব-সম্পন্ন, সেই অসিক্লী।…মন্ত্রের তৃতীয় আলোচ্য পদ-নক্তংজাত। এর প্রচলিত অর্থ রাত্রি হতে উৎপন্ন। এখানে পূর্ণ অজ্ঞানান্ধকারকে বা মায়ার প্রভাবকে লক্ষ্য করছে। মায়া হতেই–অজ্ঞানতা হতেই–এই মায়িক দেহের উৎপত্তি। কিন্তু এই দেহের মধ্যেই আবার সৎ-বৃত্তির স্ফুর্তি হয়; আর সেই সৎ-বৃত্তির সহায়তাতেই কর্মফল পরিপক্ক হয়ে আসে–মানুষ মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। তাই বলা হলো,-হে ওষধে! হে অসিকি! যদিও তুমি এই মায়ার দেহ হতে উৎপন্ন হয়েছ; তথাপি তুমি যে এই অবস্থায় উপনীত হতে পেরেছ, তার কারণ–রামে ও কৃষ্ণে তোমরা সম্বন্ধযুত। মন্ত্রের অন্তর্গত রামে ও কৃষ্ণে পদ দুটি ভাষ্যকার বিভক্তি-ব্যত্যয়ে সম্বোধনের পদ বলে পরিগ্রহ করেছেন। কিন্তু আমরা ঐ দুই পদকে সপ্তমীর পদ বলে গ্রহণ করি। তাতে ঐ দুইয়ের সাথে সম্বন্ধহেতু–ঐ দুইয়ে অবস্থিতি হেতু–ওষধি ও অসিকী অবস্থা সঞ্জাত হয়েছে, সেটাই বোঝা যায়।
অতঃপর মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের মর্ম অনুধাবন করা যাক। ঐ অংশের সম্বোধ্য পদ–রজনি। ঐ পদে আবরণের–আচ্ছাদনের-বিনাশের ভাব বোঝায়। আলোক বিকাশমান ছিল; অন্ধকারের উদয়ে লোপ পেলো। সুতরাং যিনি বিলোপকারিণী, তাঁকে সম্বোধন করে এই পদ প্রযুক্ত হয়েছে, এটাই আমরা মনে করি। তাহলে, কি বিলোপের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে? বলা হচ্ছে,আমার এই যে দেহ–যে দেহ কলষ-লাঞ্ছিত যে দেহ পতনোন্মুখ; সেই দেহকে আপনি বিধ্বংস করুন। সে দেহের সাথে সম্বন্ধ যেন আমার আর না হয়। জন্ম-জরা-মরণই দুঃখের হেতুভূত; দেহের চিরনাশে জন্ম-জরা-মরণের কবল হতে আমি যেন মুক্ত হই। আপনি তারই ব্যবস্থা করে দিন। এ দেহ আবৃত থোক। এ দেহ চির অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকুক; এ দেহের প্রকাশের আর প্রয়োজন নেই। আপনি এমনই ভাবে আমার সাথে এ দেহের সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করে দিন। এ অংশের প্রার্থনার এটাই মর্ম। আমার সৎ-বৃত্তি ভগবৎ-অনুসারিণী হয়ে আমাকে দেহ-সম্বন্ধ বিমুও জন্মজরামরণরহিত অবস্থা প্রদান করুক; এটাই আমার আকাঙ্ক্ষা। আমরা মনে করি,-মন্ত্রের মধ্যে বন্ধনমোচনের এইরকম প্রার্থনাই নিহিত আছে ৷৷ ১৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে সৎ-বৃত্তি! মায়ামোহ হতে উৎপন্ন, কলুষক্লেদবিশিষ্ট ও জরামধ্যগত, সমুদ্রে বিন্দুবৎ, এই দেহকে সর্বপ্রকারে নিঃশেষে বিনাশ করো (এর লয় সাধন করো); হে সৎ-বৃত্তি! তোমাকে আমরা সর্বতোভাবে আহ্বান করছি; তুমি তোমার আত্মগত শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাব আমাদের মধ্যে প্রবিষ্ট (সঞ্চারিত) করো; তার দ্বারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সত্ত্বভাব প্রাপ্ত করিয়ে দাও। (ভাব এই যে,-সৎ-বৃত্তির প্রভাবে আমাদের জন্ম জরা মরণক্লেশহেতুভূত দেহধারণ নাশপ্রাপ্ত হোক; তার দ্বারা আমরা যেন সত্ত্বাবস্থায় সংবাহিত হই)। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— ভাষ্যানুসারে এই মন্ত্রের অর্থ–পূর্ব মন্ত্রেরই অনুসারী। সেই অনুসারে প্রথম পাদের সম্বোধন–হে ওষধে এবং দ্বিতীয় পাদের সম্বোধন –হে রুগ্ন। অর্থাৎ, প্রথম পাদে হরিদ্রাকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,–হে হরিদ্রা! তুমি আমার এই কিলাস আর পলিত অবস্থাকে আমাদের দেহ হতে দূরীভূত করে। তার পর, ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,-হে রুগ্ন! তোমার দেহে লোহিতাদি বর্ণ প্রবেশ করাও। তোমার শুক্লতা অপসৃত হোক। তোমার শরীরগত যে শুক্লবর্ণ, তাকে দূরে প্রেরণ করে। সে যেন তোমাকে আর স্পর্শ করতে না পারে। আমরা কিন্তু সূক্তের প্রথম মন্ত্রটিকে যেমন সৎ-বৃত্তির সম্বোধনমূলক (আত্ম-উদ্বোধনসূচক) বলে গ্রহণ করেছি, এই মন্ত্রটি এবং এর পরবর্তী মন্ত্রটিকেও সেই অনুসারী মনে করছি। এখানেও সম্বোধ্য-সৎ-বৃত্তি। আমরা প্রতিটি পদকে বিশ্লেষণ করে মন্ত্রের যে ভাব প্রাপ্ত হই, তা এই-সৎ-বৃত্তির প্রভাবে আমাদের এই জন্মজরামরণক্লেশহেতুভূত দেহধারণের বিনাশ, হোক; কেননা তার দ্বারাই আমরা সত্ত্বাবস্থায় সংবাহিত হয়ে থাকি ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হে সৎ-বৃত্তি! অজ্ঞানান্ধকার (মায়ামোহ-রূপ) তোমার উৎপত্তি-স্থান; আবার মায়ামোহ-রূপ অন্ধকারই : তোমার আশ্রয় (অবলম্বন); কর্মফলের অবসানে বিমুক্ত তুমি চিরনবীনতাসম্পন্ন হও; এক্ষণে, মায়ামোহ হতে উৎপন্ন সমুদ্রে বিন্দুবৎ এই দেহকে তুমি সর্বপ্রকারে নিঃশেষে বিনাশ (লয়) করে ফেল। ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যে প্রকাশ, এই মন্ত্রটি নীলি সম্বোধনে প্রযুক্ত হয়েছে। সেই অনুসারে মন্ত্রের প্রথম অংশের অর্থ এই যে,-হে নীলি! তোমার প্রলয়নং অর্থাৎ উৎপত্তিস্থান অসিতং অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণ। সেখানেই তোমার আস্থানং অর্থাৎ সেখানে হতেই পুরুষগণ কর্তৃক তুমি আনীত হয়েছ এবং কৃষ্ণবর্ণ আছ। দ্বিতীয় অংশে ওষধে সম্বোধন আছে। ভাষ্যে প্রকাশ, এখানেও ঐ নীলির সম্বোধন। এখানকার ভাব এই যে,-হে ওষধে নীলি! তুমি অসিতবর্ণা হও। যেহেতু তোমার স্বভাব এরূপ, অতএব শ্বিত্ৰাদিরোগদূষিত অঙ্গে আলেপনাদির দ্বারা, তোমার সঙ্গ হেতু অঙ্গ হতে কিলাস ও পলিত পৃথকীকৃত করে নিঃশেষে বিনাশ করো। ফলতঃ, নীলি কুষ্ঠরোগ নাশ করুক–মন্ত্রে নীলির নিকট এমন প্রার্থনা করা হয়েছে। এটাই ভাষ্যের ভাবার্থ।–আমরা এই মন্ত্রের ভাবে যে অর্থ গ্রহণ করেছি, তা ভাষ্যকারের অর্থ হতে কিছুটা দূরত্বে অবস্থিত হলেও আধ্যাত্মিক ভাবপক্ষে পূর্বাপর সামঞ্জস্যপূর্ণ।–আমাদের যে সৎ-বৃত্তি, তার উৎপত্তি স্থান–আমাদের এই দেহ। জন্ম-জরা-মরণের অধীনতা পাশে আবদ্ধ, মায়ামোহ থেকে উৎপন্ন, এই দেহের অভ্যন্তরেই সৎ-বৃত্তির স্ফুর্তি হয়। সেই দেহের মধ্যে অবস্থিত থেকেই তা কার্য করে। অসিতং তে প্রলয়ং এবং অসিতং তব আস্থানং বাক্য দুটিতে সেই ভাব প্রকাশ করছে। ওষধে অসিকী অসি-এই বাক্যের ভাব প্রথম মন্ত্রেই প্রকাশ পেয়েছে। কর্মফলের অবসানে বিমুক্ত যে অবস্থা, তা চিরনবীন নিত্য–এই ভাব ঐ বাক্যে প্রকাশমান।–উপসংহারে এই মন্ত্রে কি আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, তা-ই লক্ষ্য করুন। আকাঙ্ক্ষা এই যে,জলবিন্দু যেমন সমুদ্রে বিলীন হয়, সৎ-বৃত্তির সাহায্যে আমি যেন সেইরকম সেই অনন্ত ব্রহ্ম-সমুদ্রে বিলীন হতে পারি। যদিও আমরা কর্মবশে এই জগতে পরিভ্রাম্যমান, তথাপি সৎ-বৃত্তির সাহায্যে যেন পরাগতি প্রাপ্ত হই।–আমরা মনে করি মন্ত্রের এটাই নিগূঢ় অর্থ ॥ ৩॥
চতুর্থ মন্ত্র: অস্থিজস্য কিলাসস্য তন্জস্য চ যৎ ত্বচি। দূষ্যা কৃতস্য ব্ৰহ্মণা লক্ষ্ম শ্বেতমনীনশং ॥ ৪
বঙ্গানুবাদ –হে সৎ-বৃত্তি! অস্থিজাত, দেহজাত, কর্মর্জাত, কলুষ-ক্লেদের যে কলঙ্ক দেহে লক্ষীভূত পাপচিহ্নরূপে প্রকাশমান, ব্রহ্মসম্বন্ধযুত হয়ে তুমি তার বয়সাধন করো। (ভাব এই যে, –দেহধারণ কর্মমূলক পাপচিহ্ন-জ্ঞাপক; সেই চিহ্ন লোপ প্রাপ্ত হোক) ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মন্ত্রের ভাব পরিগ্রহণের পক্ষে বিষম সমস্যায় পড়তে হয়। এই মন্ত্রের যে শ্বেতং পদ, তা হতে কুষ্ঠরোগ অর্থই সাধারণতঃ পরিগৃহীত হয়ে থাকে। অস্থির সাথে, ত্বকের সাথে, মাংসের সাথে ঐ ব্যাধির সম্বন্ধ। মন্ত্রের দ্বারা সেই ব্যাধির উপশম হোক–ভাষ্যানুসারে মন্ত্রের অর্থে এই মাত্র ভাক প্রাপ্ত হওয়া যায়। আমরা যে ভাবে অর্থ পরিগ্রহণ করে আসছি, সেই পক্ষেই মন্ত্রের সঙ্গতি লক্ষ্য করি। যে কর্মের ফলে–অথবা যে পাপের প্রভাবে, আমাদের দেহধারণ করতে হয়; সে কর্ম বা সে পাপ, নানা রকমে সঞ্চিত হয়ে থাকে। ইহজীবনে আমরা আমাদের শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা পাপানুষ্ঠান করে থাকি। তার দ্বারা পুনরায় দেহ উৎপন্ন হয়। তাতে পাপের চিহ্নসমুদায়ও প্রকাশ পায়। সেই সকল পাপচিহ্নসমম্বিত দেহ যাতে চিরতরে লোপ পায়, সৎ-বৃত্তির সাহায্যে তার ব্যবস্থা হতে পারে। এখানে এই মন্ত্রে সেই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। আমার এ পাপ-সমুদ্ভূত দেহ লোপ-প্রাপ্ত হোক, আমি যেন ভগবানে আশ্রয় প্রাপ্ত হই,–এটাই মন্ত্রের মর্ম। ৪।
বঙ্গানুবাদ –হে জীব! প্রথমে তুমি ভগবানের সাথে সম্বন্ধযুত (ঊর্ধ্বগতিপ্রাপ্তি-সামর্থ্য বিশিষ্ট) হয়ে জন্মগ্রহণ করো; কিন্তু আসুরী মায়া বিষম দ্বন্দ্বে তোমাকে জয় করে, তখন, তুমি ক্লেদবিশিষ্ট (পাপকলুষলাঞ্ছিত) দেহ প্রাপ্ত হও; তখন সেই মায়া তোমার হৃদয়-রূপ অরণ্যের অধিপতিগণকে (সত্ত্বভাব ইত্যাদিকে) মরণধর্মশীল দেহ প্রদান করে। (ভাব এই যে,–জন্মসহজাত সত্ত্বভাবসমূহ সংসারের কুটিল মায়ার প্রভাবে বিলুপ্ত হয়ে থাকে। তাতেই জীব নীচ গতি প্রাপ্ত হয়। তা হতে তুমি নিজেকে উদ্ধারের চেষ্টা করো) ॥ ১৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –প্রথমে ভাষ্যে এই মন্ত্রে কি ভাব পরিগৃহীত হয়েছে, তার একটু আভাষ প্রদান করি।–ভাষ্যে প্রকাশ, ঔষধের বীর্যাতিশয় প্রবচনের জন্য এখানে একটি উপাখ্যানের সমাবেশ হয়েছে। সেই অনুসারে সুপর্ণঃ পদে শোভনপক্ষদ্বয়বিশিষ্ট গরুড় পক্ষী অর্থ পরিগৃহীত। গরুড় পক্ষী প্রথমে দুটি পক্ষসহ জন্মগ্রহণ করে। তারপর মায়ার সাথে তার যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে আসুরী মায়া জয়যুক্ত হয়েছিল। এ বিষয়ে পুরাণেও নানা উপাখ্যান আছে। একটি উপাখ্যান এই যে,–গরুড়ের পক্ষে ইন্দ্রের বজ্র নিক্ষিপ্ত হয়; তাতে গরুড়ের যদিও কোনও অনিষ্ট হয় না; কিন্তু গরুড় বজ্রের বা ইন্দ্রের সম্মানার্থে একটি পক্ষ পরিত্যাগ করে। সে পক্ষটি সুবর্ণের ন্যায় মনোহর ছিল। ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ তাই গরুড়ের নাম সুপর্ণ রাখেন। ভাব এই যে, স্বর্ণপক্ষবিশিষ্ট ছিল বলে, গরুড় সুপর্ণ আখ্যা প্রাপ্ত হয়। যাই হোক, ঐ দুই রকম উপাখ্যানের সাথে এই মন্ত্রের যে কি সম্বন্ধ আছে, ভাষ্যে তা উপলব্ধ হয় না; যাই হোক ভাষ্যে টেনে-বনে মন্ত্রের একটা অর্থ করা হয়েছে। সে অর্থমন্ত্রটি নীলি প্রভৃতি ওষধিকে সম্বোধন করে প্রযুক্ত; মন্ত্রে বলা হচ্ছে,–হে নীলি প্রভৃতি ওষধে! তুমি পূর্বে সেই গরুড়ের পিত্ত (পিত্তাখ্য দোষ) ছিলে। যুদ্ধে সেই পিত্তকে (তোমাকে) আসুরী মায়া জয় করে। জয় করে তোমাকে সে পিত্তরূপই প্রদান করেছিল। ঔষধাত্মক তোমাকে সেই দোষ-নিবারণে ব্যবহার করা কর্তব্য। তোমাদের রূপ এই যে, তোমরা বনস্পতি। এইভাবে নীলি প্রভৃতির সুপর্ণ-পিত্তত্ব প্রতিদানের দ্বারা, তাদের অমোঘবীর্যত্বের বিষয় কথিত হয়েছে। ভাষ্যের এটাই মর্ম। এ মর্মের মর্ম আমরা অবশ্য অনুধাবন করতে পারিনি।এখন, আমাদের বিশ্লেষণ সম্পর্কে কিছু বলি। আমরা মনে করি, মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক। মন্ত্রের সম্বোধ্য–জীব অহং। মন্ত্রের অন্তর্গত তস্য পূর্বসম্বন্ধ খ্যাপন করছে। অর্থাৎ ভাষ্যকারের মতোই আমরাও মনে করি-পূর্বের দ্বিতীয় সূক্তের সাথে এই তৃতীয় সূক্তের সম্বন্ধ রয়েছে; অর্থাৎ উভয়ই লক্ষ্য সেই ভগবৎ-সম্বন্ধ প্রাপ্তি। মন্ত্রের তস্য পদ সেই সম্বন্ধের বিষয়ই জ্ঞাপন করছে। তারপর সুপর্ণঃ পদ। শব্দার্থ অনুসরণে শোভনপক্ষবিশিষ্ট অর্থ থেকে উধ্বগতিপ্রাপ্তিসামর্থযুত ভাব আমরা প্রাপ্ত হতে পারি। উদ্যমন–ভগবৎসামীপ্য-লাভ-মানুষের আকাঙ্ক্ষা। সুপর্ণঃ পদ সেইরকম. শক্তির বিষয় প্রকাশ করে। সত্ত্বভাবই সেই শক্তির নিদানভূত। সত্ত্বভাব থেকেই ঊর্ধ্বগতি লাভ হয়। প্রথমঃ জাতঃ পদদ্বয়ে জীবের জন্মসহচর হয়ে যে সত্ত্বভাব সংসারে প্রবেশ করে, তারই বিষয় প্রখ্যাত হয়েছে। এই অনুসারে মন্ত্রের প্রথম অংশের (ত্বং প্রথমঃ সুপর্ণঃ জাতঃ–এই বাক্যের) মর্ম হয় এই যে, হে জীব! তোমার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে ভগবানের সাথে সম্বন্ধস্থাপনকারী ভগবাকে পাইয়ে দেবার পক্ষে উপযোগী সত্ত্বভাব তোমাতে সঞ্চিত থাকে। তারপর মন্ত্রের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অংশের ভাবসঙ্গতির বিষয় অনুধাবনীয়। সেই যে জন্মসহজাত সত্ত্বভাব–সে ভাব, সংসারের প্রলোভন ইত্যাদির মধ্যে পড়ে, মায়ামোহ ইত্যাদির সংঘর্ষে বিধ্বস্ত হয়। আসুরী যুধা জিতা এই বাক্যাংশে সেই ভাব প্রাপ্ত হই। তখন যে কি অবস্থায় উপনীত হওয়া যায়, মন্ত্রের তৃতীয় অংশে সেই অবস্থার বর্ণনা দেখতে পাই। জীব তখন পাপকলুষলাঞ্ছিত (ক্লেদবিশিষ্ট) দেহ প্রাপ্ত হয়। পিত্তং পদে পাপ-কলুষলাঞ্ছিত দেহ বুঝিয়ে থাকে। পিত্তং আসিথ বাক্যে–সেই অবস্থা প্রাপ্তির বিষয় খ্যাপন করে। তা হতেই আমাদের এই জন্মজরামরণাধীন ও; দেহ-ধারণ। সত্ত্বভাব ইত্যাদিই আমাদের হৃদয়রাজ্যের অধিনায়কগণ। সত্ত্বভাব ইত্যাদি তখন সূক্ষ্ম অবস্থা পরিহার করে স্থূল অবস্থা ধারণে বাধ্য হয়। মায়া তখন আমাদের সৎ-বৃত্তিসমূহে অসৎ-ভাবের সংশ্রব ঘটিয়ে তাদের মরণধর্মশীল দেহ-উৎপত্তির কারণের মধ্যে পরিগণিত করে।–বনস্পতি পদে বেদে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকটিত করলেও আমরা দেখিয়েছি যে, ঐ পদে হৃদয়রূপারণ্য স্বামিনঃ, সত্ত্ববাদীন অর্থই সমীচীন ও সঙ্গত (বন অর্থে অরণ্য এবং পতি অর্থে স্বামী)। এ থেকেই হৃদয়স্থিত সত্ত্বভাব ইত্যাদি অর্থ সূচিত হয়। রূপং পদে বিনাশধর্মশীল দেহকে বুঝিয়ে থাকে।–এই সব বিবেচনা করলে মন্ত্রের শেষাংশের ভাব দাঁড়ায়,মায়ার দ্বারা আহত হয়ে আমরা যে দেহ প্রাপ্ত হই, সত্ত্বভাবের নাশে তার উৎপত্তি হয়ে থাকে। জীর! সেই দেহ-প্রাপ্তির পক্ষে তুমি সতর্ক হও। এই রকম আত্ম-উদ্বোধনায় সৎ-বৃত্তিকে উদ্বুদ্ধ করাই এই মন্ত্রের লক্ষ্য বলে মনে করি। ১।
বঙ্গানুবাদ –আসুরী মায়া প্রধান হয়ে (শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে) জন্মজরামরণ-কবলিত ধ্বংসশীল এই দেহ প্রদান করেন; আর, আমাদের হৃদয়স্থিত সেই শুদ্ধসত্ত্বভাব, আমাদের কলুষক্লেদ-নিবৃত্তিকারক ঔষধ-স্বরূপ হয়ে কলুষক্লেদ বিদূরণে সমর্থ হন; সেই শুদ্ধসত্ত্বই কলুষক্লেদকে দূর করেন এবং এই ত্বগাদি-ধাতুবিশিষ্ট কায়াকে প্রকৃত-রূপ-সম্পন্না (মোক্ষপথপ্রাপিকা) করেন। (ভাব এই যে,–মায়ার প্রভাবে আমরা মরদেহ প্রাপ্ত হই; শুদ্ধসত্ত্ব। আমাদের নিত্য অবিনশ্বর কায়া প্রদান করেন) ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যে এ মন্ত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত ভাব দেখি। তাতে ভাব আসে,–আসুরী মায়াই আমাদের কিলাস-নামক ভেষজ দান করে এবং সেই মায়াই কিলাস অপনোদন করে আমাদের স্বরূপ প্রদান করে থাকে। এ পক্ষে ভাষ্যের অভিমত এই যে,-পূর্ব মন্ত্রে উক্তা অসুরমায়ারূপা স্ত্রী শিতচিকিৎসার আদিভূতা হয়ে এই সুপর্ণপিত্তের দ্বারা নির্মিত নীলি প্রভৃতি কিলাস-ভেষজকে, কিলাসের (শ্বিত্রের-কুষ্ঠের) নিবর্তক ঔষধকে, প্রস্তুত করেছেন। সেই হেতু নীলি প্রভৃতি অধুনা লোকে কিলাসনামক অর্থাৎ শিরোগের নিবর্তক হয়েছে। তাতে নীলি প্রভৃতি ঔষধ প্রয়োগে শ্বিরোগ বিনাশপ্রাপ্ত হয়, এবং শ্বিদূষিত তৃগ্ধাতু সমানরূপ পায়, অর্থাৎ শিরহিত ত্ব সমানবর্ণ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। এ থেকে নীলি প্রভৃতি যে কুষ্ঠরোগ নিবারণের ঔষধ, তা-ই বুঝতে পারা যায়। আমরা মন্ত্রটিকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছি। প্রথমতঃ আসুরী মায়ার যে কর্ম, তা-ই প্রখ্যাপিত হয়েছে। মায়া যখন প্রধান স্থান অধিকার করে, মায়া যখন প্রবলা হয়, তখনই ধ্বংসশীল দেহের উৎপত্তি হয়ে থাকে। মায়িক এই দেহ, মায়ার প্রভাবেই উৎপন্ন হয়। মন্ত্রের প্রথমাংশের (আসুরী প্রথমা ইদং চক্রে–বাক্যাংশের) এটাই মর্মার্থ। তারপর, শুদ্ধসত্ত্বই যে কলুষক্লেদ নিবৃত্তির ঔষধস্বরূপ, শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবেই যে আমরা আমাদের কলুষক্লেদকে অপসৃত করতে পারি, মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে (ইদং কিলাসভেষজং কিলাসনাশকং–এই মন্ত্রাংশে) এই ভাবই বর্তমান। মন্ত্রের এই দুটি অংশের মর্ম হৃদয়গত হলেই, শেষাংশের মর্ম উপলব্ধির পক্ষে আর কোনও সংশয় আসতে পারে না। শুদ্ধসত্ত্বভাবই যে কলুষ-ক্লেদ নাশ করতে সমর্থ হয়, শুদ্ধসত্ত্বভাবের দ্বারাই যে এই পঞ্চভূতাত্মক দেহ মোক্ষপথের। অধিকারী হতে পারে,–এখানে সেই ভাব পরিব্যক্ত। সেই লক্ষ্য রেখেই ত্বচং আর সরূপাং পদ দুটির প্রতিবাক্যে আমরা যথাক্রমে ত্বগাদিধাতুবিশিষ্টাং কায়াং এবং প্রকৃতরূপসম্পন্নাং মোক্ষপথ প্রাপিকাং প্রতিবাক্য পরিগ্রহণ করেছি। ফলতঃ, একপক্ষে নিত্যসত্যতত্ত্ব প্রকাশক, পক্ষান্তরে আত্ম-উদ্বোধনমূলক এই মন্ত্রের ভাব এই যে,মায়া এই মরদেহকে সৃষ্টি করছে, শুদ্ধসত্ত্বভাব তাকে অমরত্ব দিচ্ছে। আত্ম-উদ্বোধনার পক্ষে মন্ত্রের ভাব এই যে,জীব! মায়ার মোহ পরিত্যাগ করো। শুদ্ধসত্ত্বসঞ্চয়ে প্রবুদ্ধ হও। তাই তোমার শ্রেয়ঃসাধক।-এটাই আমাদের অভিমত ॥ ২॥
তৃতীয় মন্ত্রঃ সরূপা নাম তে মাতা সরূপো নাম তে পিতা। সরূপকৃৎ ত্বমোষধে সা সরূপমিদং কৃধি ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –কর্মফলের অবসানে বিমুক্তদেহ হে সৎ-বৃত্তি! তোমার মাতা নামে সরূপা অর্থাৎ সমানরূপা, তোমার পিতা নামে সরূপ অর্থাৎ সমানরূপ; তুমিও সমানরূপপ্ৰদাত্রী হও; সেই তুমি (সমানরূপ-মাতাপিতা হতে উৎপন্ন) এই দেহকে সমানরূপসম্পন্ন করো। (ভাব এই যে-সৎ-বৃত্তি সত্ত্বভাব হতেই সমুৎপন্ন এবং সত্ত্বভাব-প্রদানে সমর্থ; সেই সৎ-বৃত্তি আমাদের সৎ-ভাবসম্পন্ন করুক) ৩
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –ভাষ্যে প্রকাশ, এই মন্ত্রটিও নীলি প্রভৃতি ওষধিকে সম্বোধন করে প্রযুক্ত হয়েছে। ভাষ্যানুসারে মন্ত্রের ভাব এই যে,-হে ওষধে! তোমার জননী ভূমি, তিনি সরূপা অর্থাৎ তোমার সাথে সমান-কৃষ্ণবর্ণবিশিষ্টা। এইরূপ, তোমার পিতা দ্যুলোক (আকাশ)। (অথবা, পিতৃ শব্দে বীজবিশেষকে বুঝিয়ে থাকে)। সেও সরূপ অর্থাৎ তোমার সাথে সমানবর্ণ। উভয় স্থলেই নাম শব্দ প্রসিদ্ধবাচক। মন্ত্রের প্রথম পাদে এইরকম অর্থ ভাষ্যে প্রকাশমান। মন্ত্রের দ্বিতীয় পদের অর্থ, ভাষ্যে প্রকাশ,–হে ওষধে (অর্থাৎ নীলি প্রভৃতি রূপসম্পন্ন)! তুমি স্বরূপকৃৎ অর্থাৎ সংসৃষ্ট পদার্থকে আত্মসমান বর্ণ প্রদান করো।
সমানরূপ পিতামাতা হতে উৎপন্ন, সেই তুমি এই শিরোগদূষিত অঙ্গকে সমানবর্ণ দান করো। ভাষ্যানুসারে, মন্ত্রের এইরকম অর্থ প্রচলিত।–আমরা কিন্তু আধ্যাত্মিক ভাব-পক্ষে ওষধে পদে শুদ্ধসত্ত্ব অবস্থাপ্রাপ্ত সৎ-বৃত্তিকে বুঝেছি। এখানেও আমরা মন্ত্রটিকে তিন অংশে বিভক্ত করেছি। প্রথমাংশে সবৃত্তির একটু পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে–সৎ-বৃত্তি সত্ত্বভাব হতেই উৎপন্ন, সত্ত্বভাবই তার পোষক। পিতা ও মাতা যথাক্রমে সরূপ ও সরূপা। সতেই সতের অবস্থিতি। সতেই সতের উৎপত্তি। এখানে পিতামাতার পরিচয়েই বুঝতে পারি ওষধি সৎ-বৃত্তিই। দ্বিতীয় অংশে সবৃত্তির শক্তির বিষয় প্রখ্যাত হয়েছে। বলা হচ্ছে,-তুমি সমানরূপপ্ৰদাত্রী। বাস্তবিক, সৎ-ভাবেই সৎস্বরূপকে পাওয়া যায়। উপসংহারে-মন্ত্রের শেষাংশে (সা ইদং সরূপং কৃধি-বাক্যে) আত্ম-উদ্বোধনার ভাব প্রকাশ পেয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে-হে আমার সৎ-বৃত্তি! তুমি আমাকে সত্ত্বভাবাপন্ন করো। আর তার ফলে, আমার এই জন্মজরামরণবন্ধন-হেতুভূত দেহ তোমার সমানরূপ সৎ-অবস্থা প্রাপ্ত হোক।–আমরা মনে করি, মন্ত্রে এই ভাবই, এই আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ পেয়েছে ॥ ৩
বঙ্গানুবাদ –সমানরূপদাত্রী (অজ্ঞানান্ধকারে আচ্ছন্নকারিণী) অজ্ঞানান্ধকাররূপা অসৎ-বৃত্তি ইহসংসারের মধ্যেই নিত্য উৎপন্ন হচ্ছে; অতএব, হে সৎ-বৃত্তি! তুমি এই কলুষক্লেদযুক্ত দেহকে সুষ্ঠুভাবে প্রকৃষ্টরূপে সাধুভাবাপন্ন (সৎ-ভাবান্বিত) করো; আর, সর্বতোভাবে তাতে সত্ত্বভাবের সম্পাদন করো। (ভাব এই যে,–অজ্ঞানান্ধকারে পৃথিবী সদাকাল আচ্ছাদিত হচ্ছে; অতএব, হে সৎ-বৃত্তি, তোমার প্রভাবে আমরা যাতে জ্ঞানালোক প্রাপ্ত হই, অজ্ঞানতার দ্বারা আচ্ছন্ন না হই, তা-ই করো)। ৪।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যানুসারে এই মন্ত্রও নীলি প্রভৃতির সম্বোধনে প্রযুক্ত। নীলি প্রভৃতি ওষধি শ্যামা অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণা। কৃষ্ণবর্ণের মিশ্রণে অন্য দ্রব্য কৃষ্ণবর্ণ হয়, কৃষ্ণবর্ণ অন্য বর্ণকে কৃষ্ণবর্ণ প্রদান করে। তাদের সংস্পর্শে অন্য দ্রব্য কৃষ্ণবর্ণ প্রাপ্ত হয়। তাই তাকে (ঐ ওষধিকে) সরূপংকরণী বলা হয়েছে। সেই যে কৃষ্ণবর্ণপ্রদানকারিণী, তাকে বলা হচ্ছে,-তুমি ভূমির উপরে উদ্ভূত হও,–আসুরী মায়ার দ্বারা উৎপন্ন হয়ে থাক। এই কারণে, হে ওষধে! তুমি এই কিলাসাক্রান্ত অঙ্গকে সুষ্ঠুভাবে রোগনিমুক্ত করো; আর ব্যাধিগ্রস্ত হওয়ার পূর্বের যে রূপ, তাকে ফিরিয়ে দাও,ব্যাধিদূরীকরণের পর আমায় স্বাভাবিক রূপ প্রদান করো। ভাষ্যানুসারে মন্ত্রে এই ভাবই প্রাপ্ত হই। সে পক্ষে, ওষধি-সম্বোধনে কুষ্ঠরোগাক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক এই মন্ত্র উচ্চারিত হয়–এটাই প্রখ্যাত।-কুষ্ঠরোগনাশে মন্ত্র এবং মন্ত্রকথিত ঔষধ ইত্যাদি যে সুফল প্রদান করে, সেই পক্ষে আমরা সংশয় রাখি না। তবে আমাদের মত এই যে, এই মন্ত্রে পক্ষান্তরে ভবব্যাধি নাশের আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ পেয়েছে। যেমন, মন্ত্রান্তর্গত প্রথম পদ- শ্যামা। ঐ পদের কৃষ্ণবর্ণা প্রতিবাক্য থেকেই ভাব আসে–অজ্ঞানান্ধকাররূপা। এখন বুঝে দেখুন–কে সেই অজ্ঞানরূপা? সে সেই অসৎ-বৃত্তি নয় কি? অসৎ-বৃত্তিই অজ্ঞানরূপা। সে-ই আবার অন্যকে আচ্ছন্ন করে। তাই মন্ত্রের দ্বিতীয় পদ-সরূপংকরণী। ঐ পদে শ্যামা যে কেমন, শ্যামা যে কি শক্তিশালিনী, তারই পরিচয় প্রদত্ত হয়েছে। অসৎ-বৃত্তিই। অজ্ঞানতারূপা–অজ্ঞানতার জননী; আর অজ্ঞানতার ধর্মই আচ্ছন্ন করা। যে অজ্ঞানরূপা, তার কার্যই অজ্ঞানতার দ্বারা হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলা। তাই সরূপংকরণী পদের সার্থকতা। সেই অজ্ঞানতারূপা। অসৎ-বৃত্তির জন্মস্থান যে এই পৃথিবী, তাতে আর কি সংশয় আছে? পার্থিব মায়ামোহের মধ্যেই অসৎ-বৃত্তির উৎপত্তি হয়। পৃথিব্যা অধি উদ্ভূতা (উদ্ভূতা)-বাক্যাংশে–এই ভাবই ব্যক্ত হয়েছে। এর পর মন্ত্রের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশের অর্থ-সঙ্গতির বিষয় লক্ষ্য করা যাক। এই অংশ সৎ-বৃত্তির সম্বোধনমূলক। প্রথমে অসৎ-বৃত্তির কার্যের বিষয় প্রখ্যাত হয়েছে। তার পর, সৎ-বৃত্তিকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,-তুমি আমায় সৎ-ভাবান্বিত করো; তুমি আমাকে সরূপ প্রদান করো। অসৎ-বৃত্তি অজ্ঞানান্ধকারে সংসারকে ঘিরে আছে। হে আমার সৎ-বৃত্তি! তুমি উদ্বুদ্ধ হও। আমাদের অসৎ-বৃত্তি অজ্ঞানান্ধকার দূর হোক।–আমরা মনে করি মন্ত্র এই ভাবই দ্যোতনা করছেন। ৪
বঙ্গানুবাদ –যে কারণে দীপ্তিদানাদিগুণযুক্ত জ্ঞানদেবতা হৃদয়ে প্রাদুর্ভূত হয়ে শুদ্ধসত্ত্বভাব প্রদীপ্ত (উন্মোষিত) করেন (অথবা, অজ্ঞানান্ধকার বা মায়ামোহ নাশ করেন); যে কারণে সেই জ্ঞানদেবতা আমাদের সম্যক্ জ্ঞানবান্ করেন; সেই কারণে, হে পাপ (পাপপ্রবৃত্তিপ্রবর্ধক)! তুমি আমাদের পরিত্যাগ করো। যে জ্ঞানাগ্নিতে ভগবগানুসারিগণ আহুতিস্বরূপ সত্ত্বভাব ইত্যাদি প্রদান করেন, হে জীব! সেই অগ্নিতেই তোমার শ্রেষ্ঠ-নিবাসস্থান নির্দিষ্ট (জেনো)। (ভাব এই যে–হে জীব! পাপ-সম্বন্ধ পরিহার করে জ্ঞানলাভে প্রবুদ্ধ হও। তাহলে সেই শ্রেষ্ঠ নিবাস-স্থান ভগবানকে পাবার নিমিত্ত তোমার সামর্থ্য জন্মাবে) ৷৷ ১.
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— মন্ত্রটি বড় সমস্যামূলক। সূক্তানুক্রমণিকায় দেখতে পাই,জ্বর ইত্যাদি রোগ-নিবারণে এই মন্ত্র এবং এর পরবর্তী মন্ত্র-কয়েকটি প্রযুক্ত হয়। ঐকাহিক, দ্বি-আহিক (একদিন, দুদিন) প্রভৃতি জ্বর, কম্পজ্বর, সন্তত (জ্বালাযুক্ত বা সন্তাপক) জ্বর, বেলাজ্বর প্রভৃতি বিদূরিত করবার জন্য মন্ত্র-প্রয়োগের সার্থকতা। সেই অনুসারে যে প্রক্রিয়া-পদ্ধতি অবলম্বিত হয়, সূক্তানুক্রমণিকায় তা নিম্নরূপে বিবৃত হয়েছে;যথা,–প্রথমতঃ একটি লৌহকুঠার অগ্নির তাপে উষ্ণ করণীয়। উষ্ণ জলের মধ্যে সেই কুঠার স্থাপন পূর্বক, সেই জলে রোগীর দেহ সিঞ্চিত করা কর্তব্য। এইরকম প্রক্রিয়া প্রয়োগের সময় মন্ত্র-জপের বিধিও অনুক্রমণিকায় পরিদৃষ্ট হয়।–ভাষ্যে মন্ত্রের যে অর্থ অধ্যাহৃত হয়েছে, তার মর্মের মর্ম এই যে, অঙ্গনাদিগুণযুক্ত অগ্নিদেব তপ্তপরশু-সহযোগে জলের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে তাকে দগ্ধ (তা হতে কাথ আকর্ষণ) করেছেন। এই হেতু জলের মধ্যে ঔষ্ণগুণযুক্ত অগ্নি বিদ্যমান আছেন। অগ্নি-বিশিষ্ট উষ্ণোদকের দ্বারা রুগ্ন ব্যক্তিকে অভিষিঞ্চিত করা হচ্ছে, এই জন্য, হে শরীরের কষ্টদায়ক জ্বর, তুমি তোমার উৎপত্তিকারণবিৎ অগ্নির সাথে আমাদের শরীর পরিত্যাগ করে নির্গত হও। (অর্থাৎ শরীরে উষ্ণোদক সিঞ্চিত হচ্ছে; সেই উষ্ণ জলের উষ্ণতার সাথে জ্বরের উষ্ণতা প্রশমিত হোক–এই ভাব এখানে প্রকটিত)। [ আমাদের মনে হয়–অধুনা চিকিৎসকগণ দুরারোগ্য জ্বরে উষ্ণোদকে গামছা বা বস্ত্র সিক্ত করে রোগীর দেহ মুছিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন। তাতে অনেক সময় জ্বর আরোগ্য হয় এবং রোগী সুস্থতা লাভ করে– মন্ত্রে সেইরকম ব্যবস্থা-প্রক্রিয়ারই মূল সূত্র প্রকটিত]। যাগ ইত্যাদি অনুষ্ঠানকারী যজমানগণ যে অগ্নিতে হবিলক্ষণ অন্ন ইত্যাদি প্রদান করেন, হে জ্বর! সেই অগ্নিতেই তোমার জন্ম বলে কথিত হয়। চিকিৎসকগণ বলেন,অগ্নি দুষ্ট হলেই জ্বর-বিকার প্রভৃতির উৎপত্তি হয়ে থাকে। অগ্নিসাধনভূত জলে অগ্নির বিদ্যমানতা। হেতু, সেই অগ্নি তোমাকে দগ্ধ করছে। অতএব তুমি (অর্থাৎ জ্বর) আমাদের শরীর পরিত্যাগ করে উষ্ণোদক-প্রবিষ্ট তোমার উৎপত্তিমূলীভূত অগ্নির সাথে নির্গত হও, অর্থাৎ আমাদের পরিত্যাগ করো। আমাদের অর্থ কিন্তু আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছে। বোধ-সৌকর্যার্থে মন্ত্রটিকে আমরা চার অংশে বিভক্ত করেছি। প্রজ্ঞানরূপী ভগবান হৃদয়ে জ্ঞানরূপে অধিষ্ঠিত হয়ে অজ্ঞানান্ধকার নাশ করেন; অজ্ঞানতা দূর হয়ে হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বভাবের উন্মেষ হয়; ফলে মায়ামোহের আবরণ নষ্ট হয়ে যায়,-মন্ত্রের প্রথম অংশে (যৎ হতে অদহৎ পর্যন্ত অংশে) এই ভাবই পরিব্যক্ত বলে আমরা মনে করি। আমরা মনে করি-মন্ত্রে জ্ঞানের উদয়ের, অজ্ঞানতা-নাশের, পাপকলুষ-বিধ্বংসের এবং মায়ামোহরূপ ভববন্ধন মোচনের সত্য-তত্ত্ব নিহিত রয়েছে।-মন্ত্রের দ্বিতীয়াংশে (সঃ হতে সংবিদ্বান্ পর্যন্ত অংশে) জ্ঞানদেবের নিকট সম্যক জ্ঞান লাভের প্রার্থনা জানানো হয়েছে। বলা হচ্ছে-হে প্রজ্ঞানস্বরূপ দেব! আপনি আমাদের সম্যক জ্ঞান প্রদান করুন। প্রথমাংশে বলা হলো,-জ্ঞানদেবতা হৃদয়ে প্রবিষ্ট হয়ে অজ্ঞানতা নাশ করেন এবং শুদ্ধসত্ত্বভাবের উন্মেষ করে দেন। দ্বিতীয় অংশে তাই প্রার্থনা–(অতএব) তিনি আমাদের হৃদয়ে উদিত হয়ে, আমাদের বিশুদ্ধ জ্ঞান প্রদান করুন। তৃতীয় অংশের ভাব, পূর্ববর্তী অংশ দুটির সাথে সামঞ্জস্য-বিধানে এই হয় যে,-হে সৎ-ভাব-ক্ষয়কারী পাপবৃত্তি! তোমরা আমাদের পরিত্যাগ করো। মন্ত্রের শেষাংশে (যত্র হতে আহু পর্যন্ত অংশে) ভগবানই যে পরম আশ্রয়স্থান, তাঁর হতেই যে উৎপত্তি আর তাতেই যে লয় হতে হবে,–সেই ভাব প্রকাশ পেয়েছে।–এইরকম বিশ্লেষণে মন্ত্রের যে ভাব হয়– আমরা বঙ্গানুবাদে তা ব্যক্ত করেছি; অর্থাৎ-পাপপ্রকৃতি নাশ করো, সৎ-ভাবের সমাবেশ হোক। তাহলে, উৎপত্তিমূল ধ্বংস হবে। তাহলে, সেই শ্রেষ্ঠনিবাসস্থান ভগবানে আশ্রয় লাভ করতে পারবে। আমাদের মনে হয়–মন্ত্রে, আধ্যাত্মিক পক্ষে, এই ভাবই পরিব্যক্ত ॥ ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ যদ্যৰ্চির্যদি বাসি শোচিঃ শকল্যেষি যদি বা তে জনিং। হ্রভুর্নামাসি হরিতস্য দেব স নঃ সংবিদ্বান পরি বৃদ্ধি তক্মন্ ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হে কৃচ্ছ্বজীবনকারী পাপ (অথবা পাপকারণভূত জ্বর)! যেহেতু তুমি দাহকর, যেহেতু তোমার উৎপত্তিস্থান জ্বলননিদানভূত অগ্নি, যেহেতু হরিৎ-বর্ণ রক্তশোষক (বলেই) তোমার পরিচয় প্রসিদ্ধ হয়; সেই ভীষণতাসম্পন্ন তুমি, আমাদের পরিত্যাগ করো। আর, দীপ্তিদানাদিগুণযুক্ত হে জ্ঞানদেব! আপনি আমাকে সম্যক জ্ঞানবান্ করুন। (ভাব এই যে,অজ্ঞানতাই পাপসন্তাপ মূলক। অতএব প্রার্থনা,পাপ! তুমি দূর হও। হে জ্ঞানদেব! আপনি জ্ঞানদানে আমাদের সর্বৰ্থা পরিত্রাণ করুন) ২
অথবা,
হে পাপ! যদিও তুমি স্বভাবতঃ জ্বালাকর, যদিও তুমি স্বভাবতঃ দাহকর, যদিও তোমার উৎপত্তি স্থান দাহ্য-পদার্থ, যদিও তোমার রক্তশোষক নাম সর্বত্র প্রসিদ্ধ আছে; তথাপি হে দেব! আমাদের মধ্যে তোমার উৎপত্তিকারণ অবগত হয়ে, সেই ভীষণতাসম্পন্ন তুমি, কৃপাপূর্বক আমাদের কে ত্যাগ করে যাও। ২
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রে দুরকম সম্বোধন আছে। এক সম্বোধন–তক্মন্ (পূর্ব মন্ত্রে আমরা এই পদটির অর্থ আমনন করেছিলাম–পাপ প্রবৃত্তি); অন্য সম্বোধন দেব। মন্ত্রার্থে দুই সম্বোধন একজনকে লক্ষ্য করে প্রযুক্ত হয়েছে বলেও মনে করা যায়;–আবার দুই সম্বোধনের লক্ষ্য যে দুরকম স্বতন্ত্র বস্তু, তা-ও মনে করতে পারি। পূর্বোক্ত দুরকম অর্থে আমরা এই দুই ভাবই ব্যক্ত করেছি। একরকম অর্থে তক্মন সম্বোধনে (পূর্বের মন্ত্রের ন্যায়) পাপকে সম্বোধন করে তাকে দূর হতে বলা হয়েছে; আর, সে পক্ষে দেব সম্বোধনে দেবতার অনুগ্রহের প্রার্থনা রয়েছে। দ্বিতীয় রকম অর্থে, পাপকেই যেন মিনতি করে বলা হচ্ছে,–হে পাপ! আর আমায় কষ্ট দিও না। যথেষ্ট কষ্ট দিয়েছ। এখন তুমি আমায় ত্যাগ করো। আমি তোমার শরণাপন্ন। ইহসংসারে দেখতে পাই, শত্রুকে বিমর্দিত বা বশীভূত করতে হলে হয় আত্মশক্তির প্রয়োগ নয় অনুগ্রহ প্রার্থনার আবশ্যক হয়। এখানে দুই অর্থে সেই দুই ভাবই প্রকাশ পেয়েছে। বুঝতে হবে। ভাষ্যে কিন্তু প্রকাশ এই মন্ত্রটিও প্রথম মন্ত্রের মতোই জ্বর-ব্যধি-নাশের উদ্দেশে প্রযুক্ত হয়। এই সূক্তের চারটি মন্ত্র জ্বরের প্রকোপ নাশ উপলক্ষেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট ক্রিয়ার পর এই সকল মন্ত্রে শান্তিজল গ্রহণের বিধি আছে। জ্বর-নাশের পক্ষে যে ভাবই এই মন্ত্রের প্রয়োগ-বিধি থাকুক, সে বিষয়ে আমাদের বলবার কিছুই নেই। আমরা, আধ্যাত্মিক পক্ষে, মন্ত্রের নিগূঢ় ভাবার্থ নিয়েই আলোচনা করব। ভাষ্যের মত এই যে, এই মন্ত্রে জ্বরকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে-কৃচ্ছ্বজীবনকারি হে জ্বর! যদিও তুমি উষ্ণগুণযুক্ত হও, যদিও তুমি শরীরসন্তাপক হও, যদিও তোমার জন্ম অগ্নি হতেই হয়েছে, তথাপি হে দেব (জ্বর)! তুমি পুরুষশরীরে পীতবর্ণের উৎপাদক রূঢু নামে প্রসিদ্ধ হও। যদিও তোমার অনেক নাম আছে, তথাপি ঐ নামে তোমার প্রসিদ্ধি। তুমি এখন আমাদের পরিত্যাগ করে, তোমার স্বকারণভূত অগ্নিকে জ্ঞাত হয়ে, সেই অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করো। মন্ত্রের এই ভাবের অর্থই সাধারণতঃ প্রচলিত আছে।–আমরা পূর্বেই বলেছি, এই মন্ত্রের তক্মন্ এবং দেব এই দুই পদে এক অর্থে পাপকে এবং অন্য অর্থে পাপনাশকারী দেবতাকে সম্বোধন করা হয়েছে। এক রকম অর্থে, তক্স–পদে পাপের এবং দেব পদে জ্ঞানাধার দেবতার সম্বোধন লক্ষ্য করা যায়। প্রথমতঃ পাপকে বলা হচ্ছে,হে সন্তাপকারক দারুণক্লেশপ্রদ পাপ! তুমি আমায় ত্যাগ করো, আমার সম্বন্ধ ত্যাগ করে দূরে চলে যাও। তোমার সংস্পর্শে আমায় যেন আর থাকতে না হয়। এইভাবে পাপের সংস্পর্শ-ত্যাগের উদ্বোধনার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানাধার দেবতার নিকট প্রার্থনা করা হচ্ছে-হে দেবতা! আপনি আমায় জ্ঞানদান করুন। অজ্ঞানতাই সকল পাপের মূল। অজ্ঞানতা দূরীভূত হলেই আমি যন্ত্রণা হতে নিষ্কৃতি পাই। এই মন্ত্র এই ভাবের প্রার্থনা নিয়েই প্রকাশ পেয়েছেন। পাপ দূর হোক–এটাই মন্ত্রের নিগূঢ় লক্ষ্য। দ্বিতীয় রকম অর্থে, ঐ একই ভাব প্রাপ্ত হই। তবে সে অর্থে দেব সম্বোধনও পাপ-পক্ষেই যুক্ত হয়। প্রসঙ্গতঃ, মন্ত্রান্তর্গত একটি পদ বড়ই সমস্যামূলক। সে পদটি হুড়ুঃ। ঐ পদটির নানারকম পাঠ দেখতে পাওয়া যায়। সায়ণ-ভাষ্যে এটির রূঢ়ঃ পাঠ পরিগৃহীত হয়েছে। কোথাও হ্রড়ঃ, কোথাও বা হ্রচুঃ পাঠ দেখা যায়। কখনও বা হ-কার হ্রস্ব-উকারান্ত, কখনও বা দীর্ঘ-উকারান্ত পরিদৃষ্ট হয়। ঐ পদটি যে কি অর্থ দ্যোতনা করে, তা বোঝবার উপায় নেই। সায়ণ ঐ পদের ব্যুৎপত্তি-মূল রুহ, ধাতু নির্দেশ করেছেন; তার অর্থ,বীজজন্মনি প্রাদুর্ভাবে। ঐ পদের সাথে রূঢ়-পদের সাদৃশ্য-সম্বন্ধ পরিলক্ষিত হয়। সেই অনুসারে, ঐ পদে প্রবৃদ্ধ প্রসিদ্ধ প্রভৃতি অর্থ গ্রহণ করতে পারি; আর, সেই অর্থেই ভাবের সঙ্গতি থাকে। ঐ পদকে পাপের প্রতিবাক্যস্বরূপ মনে করা যেতে পারে। পাপ যে রক্তশোষক বলে প্রসিদ্ধ, পাপ যে জীবনকে শোষণ করে, বিকৃত করে ফেলে, হরিতস্য নাম হূড়ুঃ অসি এই বাক্যে প্রখ্যাত হয়েছে। মন্ত্রের অন্তর্গত হরিতস্য পদ উপমার ভাবে শোষকতার পরিচয় দেয়। জ্বররোগে রক্তশূন্যতার অবস্থা উপস্থিত হলে দেহ হরিদ্বর্ণ প্রাপ্ত হয়। রক্তশূন্য ও হরিদ্বর্ণ-প্রাপ্ত দেহ যেমন মানুষকে মৃত্যুর পথে আকর্ষণ করে; পাপ সেইরকম জীবকে বিধ্বস্ত করে ফেলে। অজ্ঞানতাই পাপের মূল বা পাপমূর্তিতে বিদ্যমান। সেই অজ্ঞানতাকে দূর করবার জন্যই এই মন্ত্রে জ্ঞানদেবতার স্মরণ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রের সম্বোধ্য যে জ্বর বলে কথিত হয়, তাতে কি সার্থকতা আছে–বুঝতে পারিনা। জ্বরকে সম্বোধন করলে, জ্বরের কি শক্তি আছে যে, সে অপসৃত হবে? ঔষধের দ্বারা জ্বরকে অপসারণ করতে হয়। এখানে অজ্ঞানতারূপ জ্বরকে বা পাপকে জ্ঞানের সাহায্যে বিতাড়িত করতে হবে। উপসংহারে মন্ত্রের সম্বোধ্য দেব পদের বিষয় একটু আভাষ দেওয়া যাক। পাপকে সম্বোধনে ঐ পদ প্রযুক্ত হলেও ঐ সম্বোধনে তার সন্তুষ্টি-সম্পাদনের ভাব আসে। আমাদের শাস্ত্রে দেবতার ও অপদেবতার উভয়েরই পূজার বিধি আছে। এ পক্ষে সেই ভাবই গ্রহণ করা যায়। ২।
তৃতীয় মন্ত্রঃ যদি শশাকো যদি বাভিশোকো যদি বা রাজ্ঞো বরুণস্যাসি পুত্রঃ। হ্রভুর্নামাসি হরিতস্য দেব স নঃ সংবিদ্বান পরি বৃদ্ধি তক্মন্ ॥ ৩
বঙ্গানুবাদ –হে কৃচ্ছ্বজীবনকারী পাপ! যেহেতু তুমি শোক (তাপক), যেহেতু তুমি সর্বশরীরে সন্তাপক, যেহেতু তুমি মিথ্যাসহজাত হও, যেহেতু রক্তশোষক (বলেই) তোমার পরিচয় প্রসিদ্ধ হয়; পূর্বোক্তরূপ ভীষণতাসম্পন্ন সেই তুমি, আমাদের পরিত্যাগ করো। আর, দীপ্তিদানাদিগুণযুত হে জ্ঞানদেব! আপনি আমাদের সম্যক জ্ঞানবান্ করুন। (এখানে, পাপ-সম্বন্ধ ত্যাগের কামনার সাথে জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে)। ৩।
অথবা, এই প্রসঙ্গে পূর্বৰ্মন্ত্রের ব্যাখ্যা (দেব সম্বোধন প্রভৃতি বিষয়ে) দ্রষ্টব্য ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের ভাবও পূর্বমন্ত্রেরই অনুরূপ। এমনকি, এই মন্ত্রের একটি চরণই পূর্বমন্ত্রের অনুবৃত্তি মাত্র-ডুর্নামাসি…তক্স। তবে এই মন্ত্রে তক্স পদে শীতজ্বরকে, কম্পজ্বরকে সম্বোধন করা হয়েছে,–এটাই ভাষ্যের অভিমত। এ ছাড়া এই মন্ত্রে তিনটি বিষয় নূতন আছে; প্রথম — শোকঃ, দ্বিতীয়–অভিশোকঃ, তৃতীয়–রাজ্ঞো বরুণস্য পুত্রঃ। এর মধ্যে শেষোক্ত পদটিই বিশেষ সমস্যামূলক। প্রথম দুটি পদের ভাব সহজেই অধিগত হতে পারে। এক পদে আত্মীয়স্বজন-সংক্রান্ত শোক বা তাপ, অন্য পদে আত্মসম্পর্কিত শোক বা তাপ বোঝাচ্ছে–মনে করতে পারি। কিন্তু রাজ্ঞো বরুণস্য পুত্রঃ বলতে কি ভাব প্রাপ্ত হই? সায়ণ রাঃ পদে রাজমানস্য, বরুণস্য পদে পাপকারিণাং শিক্ষকস্য প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাতেও কিছু বোধগম্য হয় না। তবে তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণের বচন হতে এবং পুরাণের মতে বরুণাত্মজা পদের অর্থ হতে, রাজ্ঞঃ বরুণস্য পুত্রঃ বাক্যের প্রতিবাক্যে আমরা মায়য়া উৎপন্নঃ মিথ্যাসহজাতঃ পদ দুটি গ্রহণ করেছি। পাপের যে কাৰ্য, যে কার্যে আমরা নিত্য অশেষ ক্লেশ ভোগ করি, তা মায়া বা মিথ্যা হতে উৎপন্ন হয়। এখানে ঐ বাক্যাংশে পাপের পরিচয় বা স্বরূপ পরিবর্ণিত হয়েছে। বরুণ পদে অভীষ্টবর্ষী কৃপাপর দেবতা অর্থই প্রায়শঃ আমরা গ্রহণ করে এসেছি। কিন্তু এখানে বরুণস্য পূর্বে রাজ্ঞ পদের ও পরে পুত্র পদের সমাবেশে ভাব পরিবর্তিত দেখছি। পাপ যেন এখানে নন্দদুলাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাই হোক, ভাবপক্ষে কোনই ব্যত্যয় দেখা যায় না। প্রার্থনা–অজ্ঞানতা দূরীকরণের। প্রার্থনা–জ্ঞানলাভের। মন্ত্রের এটাই অন্তরস্থ তাৎপর্য ॥ ৩!
প্রথম মন্ত্রঃ আরেহসাবম্মদস্তু হেতিৰ্বোসো অসৎ। আরে অশ্ম যমস্যথ॥ ১.
বঙ্গানুবাদ –হে দেবগণ (হে আমার সত্ত্বভাবনিচয়)! দূরে পরিদৃশ্যমান (অথবা–অন্তরস্থিত) শত্রুর নিক্ষিপ্ত হননসাধক আয়ুধ (অথবা–রিপুশত্রুর প্রভাব) আমাদের নিকট হতে দূরে গমন করুক, অর্থাৎ তারা যেন আমাদের স্পর্শ করতে না পারে। আর, হে রিপুগণ! তোমরা যে হনোয়ুধ আমাদের হননের নিমিত্ত নিক্ষেপ করছ, সেই অস্ত্র আমাদের নিকট হতে দূরে গমন করুক। (মন্ত্রের প্রার্থনার ভাব এই যে,-হে দেবগণ! আমাদের রক্ষা করুন, এবং রিপুশত্রুগণের প্রভাব খর্ব করুন; আর হে শত্রুগণ! তোমরা আমাদের সম্বন্ধ পরিত্যাগ করো) ॥ ১।
মন্ত্ৰার্থ-আলোচনা –পঞ্চম অনুবাকের পঞ্চম সূক্তে চারটি মন্ত্র আছে। ঐ মন্ত্র কয়েকটি শত্রুর আক্রমণ নিবারণের উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত হয়। সূক্তানুক্রমণিকায় এই সূক্তের মন্ত্র-কয়েকটির প্রয়োগ-বিষয়ে এইরকম লিখিত আছে,–আরেসৌ ইত্যাদি সূক্তের দ্বারা ভঙ্গ ইত্যাদি সকল শস্ত্রের নিবারণ-কর্মের জন্য উষাকালে হোম করতে হবে। শত্রু যখন আক্রমণ করতে আসছে, সেই সময় এই মন্ত্র জপ করলে শত্রুর আক্রমণ ব্যর্থ হয়ে যাবে। কৌশিতকী ব্রাহ্মণে এ বিষয়ে আরেসাবিতাপনোদনানি ইত্যাদি সূক্ত আছে। কোনরকম দুর্লক্ষণের চিহ্ন দর্শন করলেও এই সূক্ত জপ করণীয়। তাতে দুর্লক্ষণ জনিত বিপদ দূরে যাবে। কোনও বিষয়ে জয়লাভ অভিলাষ করলে, এই সূক্তের দ্বারা হোম করণীয় এবং খঙ্গ ইত্যাদি শস্ত্রকে সেই হোম উপলক্ষে অভিমন্ত্রিত করে নেবে। শয়নকালে এবং সুপ্তোত্থিত হবার সময়ে, এই মন্ত্র অনুসারে নানা প্রক্রিয়ার বিধি আছে। ফলতঃ, এই সূক্তের সহযোগে হোম-কর্মে শত্রুকে অভিভূত করা যাবে এবং জয়শ্রী অধিগত হবে। এই সূক্তের মন্ত্র চারটির ফল সম্বন্ধে এইরকম অনুক্রমিত আছে। এই মন্ত্রে দেবগণকে এবং শত্রুগণকে সম্বোধনের বিষয় সূত্রিত হয়। ভাষ্যেও সেই ভাব গৃহীত হয়েছে। আমরাও সেই ভাব গ্রহণ করলাম। তবে, এই মন্ত্রে অন্তরস্থ শত্রুগণকে–রিপুশত্রুগণকে বিমর্দনের আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ পেয়েছে বলে আমরা মনে করি। মন্ত্র-জপে, সৎ-ভাবের অনুধ্যানে, মানুষ-শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারা যায়; এটা অসম্ভব নয়। কিন্তু মন্ত্রের অনুধ্যানে হৃদয়ে সত্ত্বভাবের সমাবেশে, রিপুশত্রুগণের আক্রমণ যে বিধ্বস্ত করতে পারা যায়, তাতে কোনই সংশয় নেই। তাই মন্ত্রের সেই অর্থকেই আমরা প্রকৃষ্ট অর্থ বলে গ্রহণ করি। সেই অনুসারেই অসৌ পদে অন্তরস্থিতঃ, হেতিঃ পদে হননাস্ত্রঃ-কামক্রোধাদি প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছি। ঐ সব প্রতিবাক্যের মর্ম অনুসরণ করলেই মন্ত্রের তাৎপর্যার্থ অধিগত হবে ॥ ১৷৷
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ সখাসাবস্মভ্যমস্তু রাতিঃ সখেন্দ্রো। ভগঃ সবিতা চিত্ররাধাঃ ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –প্রসিদ্ধ পরমহিতসাধক মিত্রদেবতা, আমাদের অভীষ্টসিদ্ধির নিমিত্ত আমাদের মিত্রস্থানীয় সুহৃৎ হোন; আর, ভাগ্যপ্রদাতা পরমৈশ্বর্যসম্পন্ন ইন্দ্রদেবতা, আমাদের মিত্রস্থানীয় সুহৃৎ হোন; আর, বৈচিত্র্য বিশিষ্ট পরমধনসম্পন্ন জ্ঞানপ্রেরক সবিতা দেবতা, আমাদের মিত্রস্থানীয় সুহৃৎ হোন। (ভাব এই যে, আমাদের কর্মের প্রভাবে দেবগণ আমাদের মিত্রস্থানীয় হোন) ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের প্রার্থনার ভাব সরল ও সহজবোধ্য। দেবগণ আমাদের সখাস্থানীয়। হয়ে আমাদের রক্ষা করুন,–এটাই প্রার্থনার তাৎপর্যার্থ। ভাষ্যে প্রকাশ, শত্রুর শস্ত্রসমূহ নিবারণের জন্যই এই প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। এই পক্ষে মানুষ-শত্রুর প্রযুক্ত শস্ত্রও মনে করা যেতে পারে; আবার হৃদয়স্থিত রিপুশত্রুর দমন-বিষয়ক প্রার্থনাও মনে আসতে পারে। মন্ত্র-উচ্চারণে, মন্ত্রের ভাবে ভাবুক হতে পারলে, দুরকম শত্রুর আক্রমণ হতেই নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভবপর। অন্তঃশত্রু বহিঃশত্রু দুই রকম শত্রুই এই ভাবে দেবারাধনার ফলে পর্যদস্ত হতে পারে। মন্ত্রের অন্তর্গত কয়েকটি পদ লক্ষ্য করবার অছে। প্রথম রাতিঃ পদ। ঐ পদে সায়ণ সূর্য মিত্র প্রভৃতি অর্থ করেছেন। দানার্থক রা ধাতু হতে ঐ পদ নিস্পন্ন। সুতরাং স্বতঃকিরণদানশীল সূর্যদেবকে এবং স্বতঃ অনুগ্রহপ্রদানশীল মিত্রদেবতাকে ঐ রাতিঃ পদ লক্ষ্য করে। যে দেবতার করুণা স্বতঃবষণশীল, তিনিই ঐ পদের অভিধেয়। মিত্রদেব বলতে বা সূর্যদেব বলতে কি ভাব প্রাপ্ত হওয়া যায় নানা প্রসঙ্গে তা আলোচনা করা হয়েছে। ফলতঃ, করুণার আধার দেবতাই ঐ রাতিঃ পদের লক্ষ্য। ইন্দ্রঃ ও সবিতা দেবতার বিষয়ও পূর্বে আলোচিত হয়েছে। জ্ঞানপ্রেরক দেবতাই সবিতা এবং পরমৈশ্বর্যসম্পন্ন দেবই ইন্দ্র অভিধায়ে অভিহিত হন। যে দেবতার সাহায্যে মানুষ জ্ঞানের অধিকারী হয়, সে দেবতা যে বৈচিত্র্যসম্পন্ন পরমার্থযুত হবেন, তা আপনা-আপনিই মনে আসে। সেই জন্যই চিত্ররাধাঃ পদের সার্থকতা। যিনি ভাগ্যদাতা (ভগঃ), তিনিই যে পরমৈশ্বর্যশালী, তা স্বতঃসিদ্ধ। এইসব বিষয় বিবেচনা করলে, এই মন্ত্রে ঐ দেবতার উপাসনায় সবরকম কামনার পরিপূরণ-প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –বিপথগামীগণকে ভয়প্রদানকারী, জ্ঞানকিরণ সমন্বিত বিবেকরূপী হে মরুৎ-দেবগণ! আপনারা আমাদের সর্বতোভাবে সুখপ্রদান করুন। (ভাব এই যে,–বিবেকরূপী দেবগণের কৃপায় বিবেক উন্মেষের সাথে আমাদের শ্রেয়েলাভ হোক–এটাই কামনা ৷৷ ৩৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যে এই মন্ত্রের যে অর্থ প্রচলিত আছে, তা থেকে আমাদের অর্থ সম্পূর্ণরূপ বিভিন্নভাব পরিগ্রহ করলো। ভাষ্যের মতে, প্রবতো নপাৎ পদ দুটিতে পর্জনকে বোঝায়। তার মতে, –প্রবতস্য (অর্থাৎ ভূমি হতে প্রচণ্ড সূর্যকিরণের দ্বারা উর্ধ্বে উখিত উদকের) নপাৎ (অর্থাৎ, পতন না হওয়ায় অবস্থা) এই পদ দুটিতে, অকালে উদক অধোভাগে পতিত না হয়ে মেঘমণ্ডলে অবস্থিতি করে–এই অর্থে, পর্জন্যকে বুঝিয়ে থাকে। সূর্যত্বচসঃ পদে, ভাষ্যকার সূর্যসমানতেজস্কাঃ অর্থ গ্রহণ করেছেন। সূর্যের ত্বকের ন্যায় ত্বক যার–এই বাক্যে তিনি ঐ পদ নিষ্পন্ন করেছেন। মরুতঃ পদে, তার মতে, মরুৎসংজ্ঞক সপ্তগণাত্মক দেবগণকে বোঝায়। ইংরেজীতে বা অন্যান্য ভাষায় যাঁরা এই মন্ত্রের অনুবাদ করেছেন, তাদের সকলেরই মত এই যে, ঝড়ঝঞ্ঝাবাতকে লক্ষ্য করেই এই মন্ত্রের প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। অসভ্য আদিম অবস্থার লোকে ঝড়ঝঞ্ঝাবাতকেও দেবতা বলে মনে করতো, এবং তাদের উদ্দেশে পূজা করতো। সে মতে, এখানে সেই ভাব প্রকাশমান। সে পক্ষে যে অর্থ সিদ্ধ হয় না, তা আমরা বলছি না। বরং তার পোষকতায় বলতে পারি, প্রবতো নপাৎ এবং সূর্যত্বচসঃ বিশেষণ দুটিতে ঝড়ঝঞ্জাবাতকে বেশ লক্ষ্য করা যায়। পর্জন্য হতে পর্জন্যসম্বন্ধভূত হয়েই, অনেক সময় ঝড়-ঝঞ্ঝাবাতের আবির্ভাব হয়। আবার, সেই ঝড়-ঝঞ্ঝাবাতের দ্বারাই মেঘ-সঞ্চালিত হয়ে সূর্যরশ্মিকে আবৃত করে,–সূর্যের ত্বকস্বরূপে (সূর্যত্বচসঃ) বিস্তৃত হয়ে পড়ে। সায়ণভাষ্যের অনুসরণে সাধারণতঃ এইরকম লৌকিক অর্থই আসতে পারে।–কিন্তু, সেই রকম অর্থের সঙ্গতিবিষয়ে নানারকম বাধা আছে। ঝড়-ঝঞ্ঝাবাত রূপ সেই মরুৎ-দেবগণ কিভাবে সুখ দান করতে পারেন? ভাষ্যকার যে শর্ম পদের প্রতিবাক্যে শরণং গৃহং সুখং বা পদ তিনটি গ্রহণ করে গেছেন; সেই শরণ, গৃহ বা সুখ কি রকমে ঝড়-ঝঞ্ঝাবাত হতে মানুষ লাভ করতে পারে? এ পক্ষে ভাবের সঙ্গতি রক্ষা করা বড়ই কঠিন হয়। সুতরাং এখানে রূপকে বা উপমায় এক আধ্যাত্মিক তত্ত্বই প্রকাশ পেয়েছে– বোঝা যায়। সে সম্পর্কে মন্ত্রের অন্তর্গত চারটি পদের অর্থ উপলব্ধ হলে, ভাবগ্রহণ সুস্পষ্ট হয়ে আসবে। প্রথম–প্রবতো নপাৎ পদ দুটি। এই অথর্ববেদেরই বিভিন্ন স্থানে এবং ঋগ্বেদে ও সামবেদে বিভিন্ন মন্ত্রে। এই পদের প্রয়োগ দেখেছি। তাতে, প্রবতো নপাৎ এই দুই পদে আমাদের পরিগৃহীত বিপথগামিনো ভয়প্রদাতরঃ অর্থই সঙ্গত বলে বুঝতে পারি। এই সায়ণভাষ্যেই অন্যত্র (১কা-৩অনু-২সূ-২ম) প্রবতো নপাৎ পদ দুটির যে ব্যাখ্যা আছে, তা থেকেই আমাদের অর্থের পোষক ভাব প্রাপ্ত হই। সেই স্থলে ভাষ্যে প্রকাশ–হে প্রবতো নপাৎ প্রবতঃ প্রগতস্য স্বস্মাৎ প্রচ্যুতস্য ত্বদ্বিষয়স্তুতিনমস্কারাদ্য কর্তৃঃ পুরুষস্য নপাৎ ন পাতঃ ন পালক। অসেবকস্য অশনিভয় প্রদারিত্যর্থঃ। বলা বাহুল্য, ঐ স্থলে দেবতার সম্বোধনে প্রবতো নপাৎ পদ দুটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর সেই সূত্রেই ভাষ্যকার লিখে গিয়েছেন,–অসেবিকে অর্থাৎ ভগবৎসেবাবিহীন জনকে (অসৎ পথাবলম্বী জনকে) ভয়প্রদর্শক দেবতার সম্বোধনেই ঐ পদ প্রযুক্ত হয়েছে। সুতরাং আমাদের পরিগৃহীত অর্থের সার্থকতা প্রতিপাদনের জন্য অন্যের আশ্রয় গ্রহণ করবার আর কোনই আবশ্যক হচ্ছে না। সায়ণের ব্যাখ্যাতেই আমাদের পরিগৃহীত অর্থ আসছে। মন্ত্রের আলোচ্য অপর পদ–সূর্যত্বচসঃ। ঋগ্বেদ সংহিতায় (১ম-৪৭সূ-৯ঋ) সূর্যত্বচা পদ পেয়েছি। সেখানে রথের বিশেষণে ঐ পদ প্রযুক্ত দেখি; আর এখানে, মরুৎ-দেবগণ সম্বন্ধে ঐ পদ দৃষ্ট হয়। রথ বলতে যদি শকট বোঝায়, তাতেও ঐ বিশেষণের সার্থকতা থাকে না, আবার মরুৎ-গণ বলতে যদি ঝড়-ঝঞ্ঝাবাত বোঝায়, তাতেও ঐ বিশেষণের সার্থকতা থাকতে পারে না। ভাবে, উভয় ক্ষেত্রেই রথের বা ঝড়-ঝঞ্ঝাবাতের অতীত সামগ্রীর প্রতি লক্ষ্য আসে। তাই সেখানে রথ বলতে সকর্ম-রূপ-যান অর্থ সঙ্গত বলে সিদ্ধান্তিত হয়েছে; আর এখানে মরুৎ-দেবগণ বলতে বিবেকরূপী দেবতার প্রসঙ্গই প্রখ্যাপিত হচ্ছে। যে দেবতা বিবেকরূপে আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হন, যে দেবতা নানা রকম বিতাড়ন ও ভর্ৎসনার দ্বারা আমাদের সৎপথাবলম্বী করতে প্রয়াস পান, মরুৎ-দেবগণ বলতে তাদের প্রতিই লক্ষ্য আসে।–সকল স্থানেই ব্যাখ্যার সামঞ্জস্য। { থাকে, যদি মরুৎ-দেবগণ বলতে বিবেক-উন্মেষণকারী বিবেক-রূপী দেবভাবনিচয়কে লক্ষ্য করা হয়।–এই সকল বিষয় বিবেচনা করলে, এই মন্ত্রের প্রার্থনার ভাব দাঁড়ায়,-হে বিবেকোষেণকারী দেবগণ! হে সত্ত্বভাবের প্রস্ফুরণকারী দেবভাবনিবহ! আপনারা এসে আমাদের হৃদয়ে উদয় হয়ে, সর্বতোভাবে আমাদের মঙ্গলবিধান করুন। বিপথগামীরাই আপনাদের আগমনে সন্ত্রস্ত হয়। আপনারা জ্ঞান-বিতরণের দ্বারা মনুষ্যগণকে সুখ প্রদান করুন। মন্ত্র এমনই প্রার্থনার ভাবে পরিপূর্ণ। ৩।
চতুর্থ মন্ত্রঃ সুসূদত মৃড়ত মৃড়য়া নস্তভ্যো। ময়স্তোকেভ্যস্কৃধি ॥৪॥
বঙ্গানুবাদ— হে দেবগণ! আপনারা আমাদের পাপসকলকে বিদূরিত করুন, এবং আমাদের সুখদান করুন। হে দেব! আমাদের সুখী করুন; এবং আমাদের অনিষ্ট দূর করে আমাদের দেহ-সকলকে ও বংশপরম্পরাকে সুখে রাখুন। ভাব এই যে, আমাদের অনুষ্ঠিত কর্মের দ্বারা অন্যকে সুখী করুন, এবং আমাদের সর্বপ্রকার সুখবৃদ্ধি করুন,এটাই আকাঙ্ক্ষা)। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের সম্বোধ্য বিষয়ে আপনা-আপনিই সংশয় আসে। কেননা, চারটি ক্রিয়াপদ এই মন্ত্রের অবলম্বন দেখি। অপিচ, সেই ক্রিয়াপদের দুটিতে একবচনের প্রয়োগ দেখি। অতএব, এখানে সম্বোধনে দুরকম পদ অধ্যাহৃত হয়ে থাকে। মন্ত্রের অন্তর্গত, সুসূদত এবং মৃড়ত এই দুই ক্রিয়াপদের সম্বন্ধে সম্বোধন-মূলক দেবাঃ সম্বোধন-পদ অধ্যাহৃত হয়; এবং পরবর্তী মৃড়য় ও কৃধি ক্রিয়াপদ দুটির সম্বন্ধে দেব এই সম্বোধন-পদ অধ্যাহার করা হয়ে থাকে। এ পক্ষে আমরা ভাষ্যেরই অনুবর্তন করলাম। তবে, এ সম্বন্ধে নিগূঢ় তাৎপর্য অনুসন্ধান করা যেতে পারে। বিভিন্ন দেবতার মধ্য দিয়ে, অসংখ্য অগণ্য দেবদেবীর বিকাশ-মূল হতেই, যে সেই একের সন্ধান প্রাপ্ত হওয়া যায়, এখানে আমরা সেই ভাবেরই দ্যোতনা দেখতে পাই। ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বিভিন্ন দেবতাকে আহ্বান করতে করতে, পরিশেষে সেই একেরই প্রতি লক্ষ্য পড়ে। ব্রহ্ম-সর্বদেবময়, তিনি এক হয়েও বহুরূপে বিকাশমান। এই মন্ত্রে যথাক্রমে দেবাঃ ও দেব সম্বোধনে সেই তত্ত্বই উদ্ভাসিত দেখি।
অধ্যায়: এক
সূক্ত -২৯ : স্বস্ত্যয়নম
[ঋষি : অথর্বা (স্বস্ত্যয়নকাম)। দেবতা : চন্দ্রমা ও ইন্দ্রাণী। ছন্দ : অনুষ্টুপ ও পংক্তি ] প্রথম মন্ত্রঃ অমূঃ পারে পৃদাক্কস্ত্রিপ্তা নির্জরায়বঃ। তাসাং জরায়ুভির্বয়মক্ষ্যাহবপি ব্যয়ামস্যঘায়োর পরিপন্থিনঃ ১।
বঙ্গানুবাদ –সেই হৃদয়স্থিতা অসত্যনাশিকা ত্রিগুণসাম্যসাধনভূতা মরণরহিতা দেবতাগণ সংসারের কুটিলতা হতে নিশ্চয়ই দূরে অবস্থিতি করছেন; তাঁদের হতে উৎপন্ন সত্ত্বভাব ইত্যাদির দ্বারা, সৎকর্মের বাধক হিংসাকারী শত্রুর চক্ষু দুটিকে (হিংসুদৃষ্টিশক্তিকে) ক্ষুদ্রশক্তিসম্পন্ন এই আমরাও আচ্ছন্ন করতে (আমাদের প্রতি সঞ্চালনে বাধা প্রদানে) সমর্থ হই। (ভাব এই যে, হৃদয়স্থ সত্ত্বভাবসমূহ এখন দূরে অবস্থিতি করছে; তাদের সহায়তা প্রাপ্ত হলে ক্ষুদ্রসামর্থ্য আমরাও প্রবল শক্তিশালী শত্রুদের অভিভব করতে সমর্থ হই)। ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই ষষ্ঠ সূক্তের মন্ত্র চারটির প্রয়োগ সম্বন্ধে অনুক্রমণিকায় লিখিত আছে যে, যুদ্ধজয়ের জন্য অস্ত্রগ্রহণ উপলক্ষে স্বস্ত্যয়ন-কর্মে এই মন্ত্রের প্রয়োগ-বিধি দৃষ্ট হয়। পূর্ব সূক্তের অনুসরণে এই সূক্তের অনুষ্ঠিত ক্রিয়া ইত্যাদি সম্পন্ন করতে হবে। প্রক্রিয়া-পদ্ধতি যেমনই বিহিত থাকুক, সে বিষয়ে আমাদের বক্তব্য কিছুই নেই। আমরা মাত্র এখানে মন্ত্রের ভাব সম্বন্ধেই আলোচনা করছি।–এই মন্ত্রের পদ কয়েকটি জটিল ভাবাপন্ন। ভাষ্যে এবং প্রচলিত ব্যাখ্যা ইত্যাদিতে তাদের আরও জটিলতা সম্পন্ন করে তুলেছে। যেমন,–মূলের পৃদাক্ক পদ। ভাষ্যে তার প্রতিবাক্য সর্পজাতয়। মূলের ত্রিষপ্তাঃ; ভাষ্যে তার প্রতিবাক্য ত্রিগুনিতসপ্তসংখ্যাকাঃ অর্থাৎ একুশ। মূলের নির্জরায়বঃ পদের ভাষ্যগৃহীত প্রতিবাক্য জরারহিতা দেবা ইব। মূলের পারে পদের ভাষ্যগৃহীত অর্থ ভূম্যাঃ পারদেশে নাগলোকে। মূলের তাসাং পদে পৃদাকূনাং পদকে লক্ষ্য করছে–এই অভিমত ভাষ্যে প্রকাশ পেয়েছে। মূলের জরায়ুভিঃ পদ থেকে ভাষ্যকার সর্পকঞ্চুকা দ্বারা ভাবার্থ গ্রহণ করেছেন। মূলে ব্যয়ামসি পদ আছে। ভাষ্যকার ঐ পদের বিভক্তিব্যত্যয় স্বীকার করে, তার অর্থে ভাবে আচ্ছাদয়ামঃ প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছেন।–এ পক্ষে মন্ত্রার্থে ভাষ্যের ভাব এই দাঁড়িয়েছে যে,-পরিদৃশ্যমান সর্পজাতির অন্তর্ভুক্ত একবিংশসংখ্যক জরারহিত দেবগণ নাগলোকে বাস করেন; সেই সর্পজাতীয় দেবতার শরীরের বেষ্টক ত্বকের অর্থাৎ সপকঞ্চুকের দ্বারা হিংসনেচ্ছুক যুদ্ধার্থী শত্রুগণের চক্ষু দুটি আমরা আচ্ছাদিত করি। অর্থাৎ, যুদ্ধ ইত্যাদির সময়ে শত্রুগণ যেন আমাদের দেখতেই না পায়–সেই ভাবে তাদের চক্ষু দুটি সাপের খোলস দিয়ে ঢেকে দিই। বলা বাহুল্য, এই রকম অর্থে মন্ত্রটিকে হেঁয়ালি-মাত্র বলেই মনে হয়, এর দ্বারা মন্ত্রোচিত কোনও সৎ-ভাবই পাওয়া যায় না।–এইবার আমাদের পরিগৃহীত ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা যাক। মন্ত্রের প্রথম পদ অমূঃ। এই পদে আমরা। প্রসিদ্ধাঃ, হৃদিস্থিতা প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছি। দেবতার স্থান যে হৃদয়ে, দেবতা যে অন্তরে অন্তর্যামী হয়ে বিদ্যমান থাকেন,–সেই ধারণা হতেই এই প্রতিবাক্য। দ্বিতীয়–পৃদাক্ক পদে আমরা অসত্যনাশিকাঃ প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছি। হিংসাকরণেই সপজাতির পরিচয়। যারা হিংসাকারী, তাদের তাই সর্প প্রকৃতির লোক বলা হয়। কিন্তু এখানে দেবতা-সম্পর্কে ঐ পদ প্রযুক্ত হওয়ায়, ঐ অর্থই সৎ-ভাবের প্রকাশক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষতঃ এখানে, দেবতার সম্বন্ধে দুই পক্ষের দুই রকম বিশেষণ যথাপর্যায় লক্ষ্য করলে, সেই ভাবই অধিগত হতে পারে। এক বিশেষণ–পৃদাকঃ, অন্য বিশেষণ–ত্রিষপ্তাঃ। দেবতায় যে কঠোর কোমল দুই ভাব বিদ্যমান, এখানে ঐ দুটি পদে তা-ই ব্যক্ত করছে। তারা যে পৃদার্কঃ (হিংসাকারী), সে কাদের পক্ষে? না–পাপাচারীর পক্ষে–অসৎ-বৃত্তির পক্ষে। পাপাচারিগণকে তারা হিংসা করেন, হনন করেন; আর তারা পুণ্যকর্মানুষ্ঠাতৃগণের গুণসাম্যবিধান করেন, তাদের সত্ত্বভাব প্রদান করেন। এখানে ঐ দুই পদে দেবতাগণের সেই অভিনব মাহাত্ম্য-তত্ত্বই প্রখ্যাত হয়েছে। সেই অনুসারেই পৃদাঃ ও ত্রিষপ্তাঃ পদ দুটির প্রয়োগের সার্থকতা।
নির্জরাঃ পদে, দেবতাগণের বা দেবভাবসমূহের অমরত্বের বিষয় প্রকাশ করছে। এ পদের অর্থ-বিষয়ে ভাষ্যকারের সাথে আমাদের কোনই মতবিরোধ নেই। তার পর পারে পদ। আমরা বলি, এই পদের ভাব এই যে,সংসারের কুটিল ভাবের দূরে। দেবতাগণ সংসারের কুটিলতা হতে দূরে অবস্থিতি করেন। যে হৃদয় কুটিলতায় ভরা, দেবতার স্থান-সেখানে নয়। দেবতা বা দেবভাব এর হৃদয়েরই সামগ্রী বটে; কিন্তু সে হৃদয়ে তারা থাকেন না–যেখানে কুটিলতা স্থান পেয়েছে। আমরা মনে করি, অমু আর আরে এই পদ দুটিতে যুগপৎ এই ভাব ব্যক্ত হয়েছে।-মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে প্রথম সাং পদ। এই পদটিতে ব্যাখ্যাকারগণকে বড়ই সমস্যায় ফেলেছে। এই তাসাং পদ কার সম্বন্ধে প্রযুক্ত হয়েছে, তা নির্ধারণ পক্ষে ভাষ্যই গণ্ডগোলের সৃষ্টি করেছে। ভাষ্যের মত, ঐ পদ পৃদাকঃ (সর্পজাতয়ঃ) পদের সাথে সম্বন্ধ-বিশিষ্ট। এখানে কেন এ ভাব এলো, তার একটু কারণও দেখতে পাই। বহুবচনের স্ত্রীলিঙ্গান্ত জরারহিতাঃ দেবতাঃ না লিখে, ভাষ্যে জরারহিতা দেবা ইব–এইরকম পুংলিঙ্গের বহুবচনান্ত পদ ব্যবহৃত হয়েছে। গণ্ডগোল তাতেই বেধেছে। এ অবস্থায়, দেবাঃ পদ ব্যবহার করে, তাসাং পদের সম্বন্ধ-দ্যোতক পদকে সহসা সন্ধান করে পাওয়া যায় না। তাই বোধ হয়, পৃদাক্কঃ পদটিকে স্ত্রীলিঙ্গান্ত ধরে, পৃদাক পদের সাথে তাসাং পদের সম্বন্ধ সূচনা করা হয়েছে। কিন্তু, একটু অভিনিবেশ সহকারে দেখলেই দেখা যায়, এখানকার বিশেষণপদ কয়েকটিই স্ত্রীলিঙ্গের বহুবচন; এবং দেবতাঃ পদই ঐ সকল পদের দ্যোতক। অমূ পৃদাকঃ, ত্রিষপ্তাঃ, নির্জরাঃ, তাসাং–এই সব পদ পরস্পর সম্বন্ধ-বিশিষ্ট; এবং এদের সকলেই দেবঅর গুণবিশেষণ প্রকাশ করছে। তাই আমরা তাসাং পদের প্রতিবাক্যে দেবভাবানাং পদ গ্রহণ করেছি। এই অংশের দ্বিতীয় আলোচ্য পদ–জরায়ুভিঃ। ঐ পদে কেন সর্পের খোলস অর্থ টেনে আনি? কত দূরের কল্পনায় ঐ অর্থ আনতে হয়, তা সহজেই বোঝা যায়। জরায়ু থেকে প্রাণিজাত উৎপন্ন হয়। সে পক্ষে জরায়ুভিঃ (জরায়ুর দ্বারা) বলতে, তা হতে উৎপন্ন বস্তুর আকাঙ্ক্ষা আসে। সুতরাং তাসাং (দেবতানাং) জরায়ুভিঃ বলতে আমরা ভাবে সত্ত্বভাবের দ্বারা অর্থই পরিগ্রহণ করেছি। একমাত্র সত্ত্বভাবই যে পাপকে দূর করতে সমর্থ হয়, একমাত্র সত্ত্বভাবকেই যে পাপের আবরক বলতে পারা যায়, তাতে সংশয় আসতে পারে না। এ পক্ষে সেই ভাবই ব্যক্ত করছে। তার পর, মন্ত্রের আলোচ্য দুটি পদ–পরিপন্থিন অঘয়োঃ। এই দুই পদে সকর্মে বাধাপ্রদানকারী শত্রুকে বোঝায়। অন্তঃশত্রু বহিঃশত্রু দুরকম শত্রুর পরিকল্পনাই এ পক্ষে সঙ্গত হতে পারে। তার পর অক্ষৌ পদ।
ঐ পদে সাধারণতঃ চক্ষু-দুটিকে বোঝায়। তা থেকেই হিংস্র দৃষ্টিশক্তির ভাব আসে। উপসংহারে আর একটি সমস্যামূলক পদ–ব্যয়ামসি। আধুনিক ব্যকরণ অনুসারে এ পদ সিদ্ধ হয় না। অপিচ, এই পদের বিভক্তিতে, মধ্যম পুরুষের এক-বচনান্ত কর্তার আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু এখানে বয়ং এই কর্তৃপদ পরিদৃষ্ট হয়। সুতরাং ক্রিয়াপদটির ছান্দস-প্রয়োগ স্বীকার ছাড়া গত্যন্তর নেই। অতএব, ভাষ্যের অনুসরণেই আমরাও ঐ পদের অর্থ গ্রহণ করলাম। প্রচলিত ব্যাখ্যা ইত্যাদিতে মানুষের শত্ৰু মানুষের সাথে যুদ্ধের বিষয়ই মন্ত্রে প্রখ্যাপিও আছে, দেখতে পাই। অথচ, সে অর্থে, বিশেষতঃ সর্পের খোলসের দ্বারা বিপক্ষের চক্ষু আবৃত করার প্রসঙ্গে, কোনই ভাব প্রাপ্ত হতে পারি না। কিন্তু মন্ত্রে মনস্তত্ত্বের বিষয়-হৃদয়স্থ শত্রুর সাথে সংগ্রামের কাহিনী-বিবৃত আছে মনে করলেই, সুষ্ঠু ভাব ও অর্থ পাওয়া যায়। এ সব বিষয় বিবেচনার পর, মন্ত্রের যে ভাবার্থ হয়, আমরা আমাদের বঙ্গানুবাদে তা-ই প্রকাশ করেছি। মন্ত্রে বলা হয়েছে,-দেবতা বা দেবভাবসমূহ হৃদয়ের বস্তু। হৃদয়-রূপ গৃহেই তারা অধিষ্ঠিত থাকেন। কিন্তু আমাদের কর্ম-বৈগুণ্যে তাঁরা দূরে গিয়ে পড়েন,-কুটিল সংসারের পর-পারে তাদের আশ্রয় নির্দিষ্ট হয়। অথচ, সেই দেবতাগণের সহজাত যে সভাবসমূহ, তার সাহায্য যদি আমরা প্রাপ্ত হই, তাতে অতি বড় শত্রুর আক্রমণেও আমরা বাধা দিতে পারি। আমরা ক্ষুদ্র বটে, আমাদের শক্তিসামর্থ্য অল্প বটে; আর, আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী শত্ৰু প্ৰবল ও পরাক্রান্ত সত্য; কিন্তু সত্ত্বভাবের সহায়তা পেলে, হৃদয়ে সৎ-ভাবের বিকাশ করতে সমর্থ হলে, আমরা নিশ্চয়ই শত্রুদের হিংস্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হতে পরিত্রাণ পেতে পারি; সেইরকম অবস্থায়, তারা আমাদের প্রতি দৃষ্টিসঞ্চালনেই সমর্থ হয় না। (প্রার্থনাপক্ষে এই মন্ত্রের ভাব এই যে,–হে দেবতা! আর দূরে থেকো না। হৃদয়ের নিধি, হৃদয়ে অধিষ্ঠিত থেকে, আমাদের শত্রুর কবল হতে পরিত্রাণ করো) ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ— পিনাকের ন্যায় ভীষণ আয়ুধধারী, আমাদের বিদারণকারী, অজ্ঞানতা-সম্বন্ধী, শত্রুসেনা বিমুখে গমন করুক (প্রতিহত বিত্ৰস্ত হোক); সেই হেন শত্রুসেনা যদি সঙ্গবদ্ধ হয়, তাহলে তাদের সঙ্কৰ্মনাশের প্রবৃত্তি বিমুখ (অর্থাৎ বিনষ্ট) হোক; সৎকর্মের নাশক শত্রুগণ সর্বৰ্থা পরাজিত হোক। (ভাব এই যে,-সকল শত্রু বিচ্ছিন্ন ও বিনাশপ্রাপ্ত হোক,–এটাই আকাঙ্ক্ষা) ॥ ২॥ মন্ত্ৰার্থ-আলোচনা– ভাষ্যানুসারে এই মন্ত্রের ভাবার্থ এই যে,-ঈশ্বরের ধনু পিনাকের ন্যায় শহননক্ষম আয়ুধধারী, অতএব শত্রুবিদারণকারী–শত্রুসেনাসমূহ নানাদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গমন করুক। যদি সেই সকল শত্রুসৈন্য পুনরায় সদ্যবদ্ধ হয়ে আগমন করে, তাহলে তাদের চিত্ত অন্যদিকে প্রধাবিত হোক; তারা কার্যাকার্য বিচারশূন্য হয়ে থাকুক। আর, সেইরকম পরিভ্রাম্যমাণ সৈন্যসমূহের পরিচালক শসমূহ রাষ্ট্রকোষ ইত্যাদি ভ্রষ্ট হোক।–ভাষ্যের এই অর্থে মানুষ-শত্রুর বিষয়ই উপলব্ধ হয়। কিন্তু মন্ত্রে মানুষ-শত্রু অপেক্ষা প্রবলতর শত্রুর প্রসঙ্গই প্রখ্যাপিত হয়েছে, বুঝতে পারি। আমাদের অর্থ তাই একটু স্বতন্ত্র পথ পরিগ্রহ করেছে। ভাষ্যকার ঈদৃশী শাবী সেনা পদ অধ্যাহার করে বিভ্রতী এবং কৃতী পদ দুটি সেই সেনা-পদের বিশেষণ-রূপে পরিকল্পনা করেছেন। আমরাও তা-ই করেছি। তবে মানুষ-শত্রু বা মনুষ্য-সেনা ভাব গ্রহণ না করে, আমরা অন্তরস্থ শক্রর প্রসঙ্গই সমীচীন বলে বুঝেছি। বিসূচী পদের অর্থ, আমাদের মতে–বিমুখং; অর্থাৎ, আমাদের দিক হতে অন্য দিকে (বিপরীত দিকে)। এর নিগুঢ় তাৎপর্য এই যে, শত্রুর অস্ত্র শত্রুকেই আঘাত করুক; আপন বিষে আপনিই জর্জরিত হয়ে শত্রু নাশপ্রাপ্ত হোক; কণ্টকেনৈব কণ্টকং–শত্রুর দ্বারাই শত্রু যে উলিত হয়–এটাই আকাঙ্ক্ষা।-দেবতা বা দেবভাবসমূহ হৃদয়ের বস্তু। সংসারমোহপঙ্কে নিমজ্জমান নরহৃদয়ে তাদের স্থান কোথায়?…হৃদয় নির্মল হলে-হৃদয়ের পাপ-ক্লেদ ময়লামাটি দূর হলে, তবে সে হৃদয়ে দেবতার বা দেবভাবের অধিষ্ঠান হয়। তাই এই মন্ত্রে যেন বলা হয়েছে,সংসারের কুটিলতা দূরে অবস্থিতি করুক; দেবতা এসে হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন। এখানে শত্রু-শব্দে অন্তঃশত্রু বহিঃশত্রু–উভয় রকম শত্রুকেই বোঝাচ্ছে।…সেই পক্ষে এখানকার নিগূঢ় তাৎপর্য এই যে,– আমাদের হৃদয়ে দেবভাব সঞ্জাত হোক; কুটিল শত্রুগণ পরস্পর বৈরী ভাব অবলম্বন করে আপনা আপনিই নিধন-প্রাপ্ত হোক। মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের ভাব এই যে, দেবতা বা দেবভাব সংসারের কুটিলতা হতে দূরে অবস্থিতি করছেন। শত্রু যদি সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে হৃদয়কে আক্রমণ করে, তাহলে বিষম বিপদের আশঙ্কা। তাই আকাঙ্ক্ষা,-দেবতা হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন; তাদের অধিষ্ঠানে, শত্রুগণের সকর্ম-নাশের প্রবৃত্তি নষ্ট হোক; শত্রুগণ পরাজিত হয়ে দূরে পলায়ন করুক। এখানে, এই ভাবে, হৃদয় নির্মল করবার উপদেশই লক্ষিত হয়। মন্ত্র উপদেশ দিচ্ছেন,–জীব! সংসারের আবিলতা হতে দূরে সরে এসো। হৃদয় নির্মল করো। মনের কুটিলতা দূর হোক। তাহলেই, হৃদয় দেবতার ও দেবভাবের অধিষ্ঠানের যোগ্য হবে; দেবভাবের উন্মেষে শত্রুর আক্রমণে হৃদয় আর বিধ্বস্ত হবে না। শত্রু যদি সংহার-মূর্তিও ধারণ করে, শত্রু যদি শিবের ত্রিশূলের ন্যায় (পিনাকমিব) আয়ুধও প্রাপ্ত হয়, তাতেও ভয়ের কারণ নেই। যদি দেবতার সহায়তা লাভ করতে পারো, তবে তোমার ন্যায় অকিঞ্চনও শত্রুনাশে সমর্থ হতে পারে। এমন কি, তাতে শত্রুগণই পরস্পর মারামারি কাটাকাটি করে আপনা-আপনিই নির্মূল হয়ে পড়বে। আমাদের মনে হয়, মন্ত্রে এই ভাবই প্রকটিত রয়েছে। ২।
বঙ্গানুবাদ –হে ভগবন্! বহুসংখ্যক অথবা বহুশক্তিসম্পন্ন শত্রুগণ যেন আমাদের অভিভূত করতে সমর্থ না হয়; অল্পসংখ্যক অথবা অল্পশক্তিসম্পন্ন শত্রুগণ যেন আমাদের অভিমুখে দৃষ্টি করতেও না পারে। (ভাব এই যে, শত্রুগণ আমাদের যেন সৎসম্বন্ধচ্যুত করতে সমর্থ না হয়)। পরিদৃশ্যমান সৎ-ভাবনাশক শত্রুসমূহ যেন ছিন্ন-বেণুশাখার ন্যায় সমৃদ্ধিরহিত হয়ে পরাজিত হয়। (ভাব এই যে, আমাদের সত্ত্বভাবের প্রভাবে আমাদের সকল রকম শত্রু বিনাশপ্রাপ্ত হোক) ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এই সহজ ও সরলভাব সমন্বিত মন্ত্রে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সকল রকম শত্রুর বিনাশের বিষয় উল্লিখিত হয়েছে। ছোটই হোক আর বড়ই হোক–শত্রুকে কখনই হীনবল বলে মনে করবে না– মন্ত্রের অভ্যন্তরে এই সত্য উপদিষ্ট হয়েছে। বহবঃ এবং অর্ভকাঃ পদ দুটিতে সেই ভাব পরিব্যক্ত বলে মনে করি। মন্ত্রের অর্থ-বিষয়ে ভাষ্যকারের সাথে আমাদের বিশেষ কোনও মতদ্বৈধ নেই। বহবঃ পদে ভাষ্যকার হস্ত্যশ্বরথপদাতিযুক্তা বহুলাঃ শত্ৰবঃ অর্থ গ্রহণ করেছেন। আমরা সাধারণভাবে বহুশক্তিসম্পন্নাঃ) শত্ৰবঃ অর্থ গ্রহণ করেছি।
…মন্ত্রের অন্তর্গত বোরা ইব বাক্যে শত্রুগণের অবস্থিতির বিষয় উল্লিখিত হয়েছে। ভাব এই যে,–বেণুশাখা (কঞ্চি) যেমন অসংহত বিচ্ছিন্নভাবে হীনবল হয়ে অবস্থিতি করে, শত্রুগণও সেই রকম পরাজিত বিধ্বস্ত হয়ে অসহায়ে অবস্থিতি করুক; অর্থাৎ, পুনরাক্রমণে সমর্থ না হয়,–এইরকমভাবে তারা বিধ্বস্ত হোক। ফলতঃ, হৃদয়ের সৎ-ভাবের প্রভাবে সকল শক্রই বিনষ্ট হোক, মন্ত্রে সেই আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ পেয়েছে। এইভাবে বোঝা যায়, এই মন্ত্রের প্রার্থনার ভাব এই যে, –ভগবান্ যেন আমাদের হৃদয়ে এমন সৎ-ভাবসমূহ উপজিত করুন, যার প্রভাবে আমাদের সকলরকম শত্রু. নাশপ্রাপ্ত হয়। পাপপঙ্কে নিমজ্জিত আমরা; আমাদের হৃদয় কুটিলতাময়। তিনি সেই কুটিলতা দূর করুন; আমাদের হৃদয়ে দেবভাবের সমাবেশ হোক; শত্রুনাশে সামর্থ্য আসুক ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –হিংসক শত্রুগণের (রিপুশত্রুসমূহের) নাশকারী, পাপপ্রবৃত্তিরূপ রোগসমূহের বিনাশক, দ্যোতমান জ্ঞানদেব, সেই মায়াবী রন্ধ্রান্বেষী (প্রচ্ছন্নচারী) সর্বশোষক শত্রুগণকে ভস্মসাৎ করে, জ্ঞানলাভে ব্যাকুলচিত্ত সাধককে অথবা শত্রুর আক্রমণে উদ্বিগ্নচিত্ত ব্যক্তিকে প্রাপ্ত হন অর্থাৎ তার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হন। (মন্ত্রটি ভগবান্ জ্ঞানদেবের মাহাত্ম্যমূলক। জ্ঞানের উদয়ে জ্ঞানের প্রভাবে সকল শত্রুই বিনাশপ্রাপ্ত হয়। অতএব অজ্ঞান আমরা, জ্ঞান-সঞ্চয়ে প্রবুদ্ধ হই) ॥১॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটি সরল ভাব-প্রকাশক। ভাষ্যকার মন্ত্রের যে অর্থ গ্রহণ করেছেন, আমাদের পরিগৃহীত অর্থের সাথে তার প্রায়ই মতান্তর ঘটেনি। আমাদের অর্থ উপরোক্ত বঙ্গানুবাদেই পরিব্যক্ত।—উদ্বিগ্নমানস ব্যক্তির উদ্বেগনিবৃত্তির জন্য এই মন্ত্রের প্রয়োগের বিষয় সূক্তানুক্রমণিকায় উল্লিখিত হয়েছে। সেই অর্থে শুক্লবীরিণোষিকার দ্বারা মনিবন্ধন এবং উলুকদ্বয় ঘর্ষণ প্রভৃতির বিধি আছে। সেই অনুসারে ভাষ্যের ভাব দাঁড়ায় এই যে,-দ্যোতমান দানাদিগুণযুক্ত এবং অঙ্গনাদিগুণবিশিষ্ট অগ্নিদেব উদ্বেগকারী রক্ষ প্রভৃতি শত্রুর বিনাশের জন্য উদ্বেগযুক্ত ব্যক্তিকে প্রাপ্ত হন। কিন্তু সেই অগ্নির সেইরকম সামর্থ্য কোথায়? সে বিষয়ে কথিত হচ্ছে; যথা,–তিনি রক্ষোহা অর্থাৎ হিংসক পিশাচ ইত্যাদির হন্তা, তিনি অমীবচাতনঃ অর্থাৎ রোগসমূহের নাশয়িতা। দ্বিভাবসম্পন্ন মায়াময় রন্ধ্রান্বেষণবুদ্ধিযুক্ত রাক্ষসগণকে ভস্মসাৎ করে তিনি উদ্বিগ্নচিত্ত ব্যক্তিকে প্রাপ্ত হন।–আমাদের ব্যাখ্যা অনেকাংশে ভাষ্যকারের মতের অনুবর্তী হলেও কোনও কোনও স্থলে বিশেষ পার্থক্য দেখা যায়। ভাষ্যানুসারী ব্যাখ্যা ছাড়াও মন্ত্রের মধ্যে যে আর এক ভাব নিহিত আছে, তাতে তা-ই প্রকাশ পেয়েছে। চিত্তের উদ্বেগ যে কেবল যজ্ঞনাশকারী রাক্ষসগণের দ্বারাই সাধিত হয়–তা নয়। সেও এক উদ্বেগের কারণ বটে; বহিঃশত্ৰু মানুষকে নানাভাবইে উদ্বিগ্ন করে থাকে সত্য; কিন্তু সে বহিঃশত্রু ছাড়াও, আন্তরশত্রুও যে আছে–তারাও যে নানারকমে উদ্বিগ্ন করতে পারে; মন্ত্রার্থে এমন ভাবও অধ্যাহৃত হয়না কি? বিশেষতঃ যে দেবতার করুণা প্রার্থনা করা হয়েছে, তাঁকে যখন রক্ষোহা ও অমীবচাতনঃ বিশেষণে পরিচিত হতে দেখছি; তখন মন্ত্রে বহিঃশত্রুর ও অন্তঃশত্রুর, দুরকম শত্রুর, উপদ্রবজনিত উদ্বেগ-নাশের কামনাই প্রকাশ পেয়েছে, বুঝতে পারি। ভাষ্যকার সাধারণভাবেই মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাশন করেছেন। কিন্তু তার মধ্য হতেও মন্ত্রে অন্যভাব নিষ্কাশিত হতে পারে।–ভাষ্যকার মন্ত্রের উপ প্রাগাৎ পদের অর্থ করেছেন,-উদ্বিজমানং পুরুষং উপগমৎ অর্থাৎ উদ্বেগপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিকটে গমন করেন অথবা তাকে প্রাপ্ত হন। শান্তি-অপহরক শত্রু অথবা রাক্ষস চিরদিনই মানুষকে অহরহ আক্রমণ করছে–সদাকাল মানুষের শান্তি অপহরণ করে তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। সে শত্ৰু সকলের হৃদয়েই চিরবিদ্যমান–সে শত্ৰু অতি কপটচারী, সে শত্রু সর্বশোষক। এই শত্রুকে আমরা অজ্ঞানতা এবং তার সহচর কাম ইত্যাদি রিপুশত্রু প্রভৃতি বলেই মনে করি। অজ্ঞানতাই যে মানুষের পরম শত্রু, অজ্ঞানতাতেই যে মানুষের সকল সুখ-শান্তি নষ্ট হয়, অজ্ঞানতার প্রভাবেই যে আন্তর-বাহ্য সকল রকম উদ্বেগ অশান্তির উদয় হয়, তা আর বোঝাতে হবে না। ভগবান্ যখন সেই শত্রুকে মানুষের সম্বন্ধ হতে বিচ্ছিন্ন করেন, তখনই মানুষের সকল উদ্বেগ নষ্ট হয়। তখনই মানুষ প্রকৃত সুখ-শান্তির অধিকারী হতে পারে। তখনই জ্ঞানজ্যোতীরূপে ভগবান হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হন।…জ্ঞানের প্রভাবে অজ্ঞানতা যেমন নাশ প্রাপ্ত হয়, সঙ্গে সঙ্গে তার সহচর রিপুগণের প্রভাবও তেমনই অন্তর্হিত হয়ে থাকে। কিন্তু মানুষের সে জ্ঞানলাভ হয় কখন? ভগবান্ কখন এসে হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হন? যখন মানুষ তাকে পাবার জন্য অকুলি-ব্যাকুলি করে, যখন জ্ঞানলাভের জন্য মানুষ একান্ত উৎসুক হয়, তখনই তাঁর আবির্ভাব সম্ভবপর। যতক্ষণ সংসারের ক্লেদ কালিমা মানুষকে ঘিরে থাকে, যতক্ষণ মানুষের আন্তর বাহ্য কপটতা বিদূরিত না হয়, ততক্ষণ তার জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষাও হয় না–ভাগবানকে পাবার জন্যও সে ব্যাকুল হতে পারে না। সেই জন্যই মন্ত্রের উপ প্রাগাৎ পদের সার্থকতা। যখনই মানুষের সে আকাঙ্ক্ষা জন্মে, তখনই সকল বাধা-বিঘ্ন অপসারিত করে, ভগবান্ তার অন্তরে দিব্যজ্ঞানজ্যেতিঃ বিকীরণ করে থাকেন। মন্ত্রের উপ-প্রাগাৎ পদের এটাই তাৎপর্য বলে মনে করি।-মন্ত্রে অমীবচাতনঃ পদেরও সেই হিসেবে সার্থক-প্রয়োগ উপলব্ধ হয়। ঐ পদের ভাষ্যানুসারী অর্থ–রোগাণাং চাতয়িতা নাশয়িতা; অর্থাৎ, তিনি রোগসমূহকে নাশ করেন। যেমন লৌকিক হিসেবে, তেমনি আধ্যাত্মিক হিসেবে–উভয় পক্ষেই এই বিশেষণের সার্থকতা আছে। যখন দেহে ব্রি-ধাতুর (বায়ু-পিত্ত-কফের) সমতা রক্ষিত হয়, তখনই দেহ সুস্থ থাকে। কিন্তু ঐ তিনটির কোনও একটির তারতম্য ঘটলে, শরীরে রোগের উৎপত্তি হয়। উপযুক্ত ঔষধের ও পথ্যের ব্যবহারে ত্রি-ধাতুর সাম্য-সাধন হলে, দেহ পুনরায় সুস্থতা প্রাপ্ত হয়। সে পক্ষেও ভগবানের অনুগ্রহ যেমন প্রয়োজন, আধ্যাত্মিক পক্ষেও তার অনুগ্রহ সেই রকম একান্ত আবশ্যক। পাপের সংশ্রব ভিন্ন রোগের উৎপত্তি হয় না। মানুষের অবৈধ আহারে-বিহারে যেমন ত্রি-ধাতুর বৈষম্য সাধিত হয়, সেইরকম অসৎ-আচরণে কুকর্ম-সাধনে মানুষের পাপোৎপত্তি ঘটে। মানুষে সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ ত্রিগুণের সাম্য সাধন হলে, সেই পাপপ্রবৃত্তি আর জন্মে না–পাপের উৎপত্তিও তখন আর সম্ভবপর হবে না। উপযুক্ত ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থায় যেমন রোগের শান্তি হয়, সেইরকম সৎকর্মের সাধনে জ্ঞানের উদয়ে পাপ-প্রবৃত্তি রূপ রোগ বিনষ্ট হয়ে থাকে। এস্থলে, রূপকে তাই অমীবচাতনঃ পদে ভগবানকে পাপ বা পাপ-প্রবৃত্তিরূপ রোগসমূহের নাশয়িতা বলা হয়েছে।এইভাবে মন্ত্রের রক্ষোহা ও দেব প্রভৃতি বিশেষণেরও সার্থকতা আছে। বহিঃশত্রুকেও রাক্ষস বলা যায়; অন্তঃ-শত্রুকেও রাক্ষস বলা যায়। অজ্ঞানতাই প্রধান অন্তঃশত্রু। বহিঃশত্রু যে, সেও অজ্ঞানতার প্রভাবেই সঞ্জাত হয়।-মন্ত্রে যে প্রার্থনার ভাব প্রচ্ছন্ন রয়েছে, তা এই, মানুষ! তুমি অহরহ শত্রুর আক্রমণে বিধ্বস্থ হচ্ছে। সে আক্রমণের ফলে, তোমার সকল সুখ-সকল শান্তি নষ্ট হচ্ছে; তুমি সর্বদা অশান্তির অনলে জ্বলে মরছে। যদি শত্রুর আক্রমণে পরিত্রাণ পেতে চাও, যদি প্রকৃত সুখ-শান্তি-লাভের আকাঙ্ক্ষা রাখো, জ্ঞানলাভে অজ্ঞানতানাশে প্রবুদ্ধ হও। অজ্ঞানতাই তোমার যত অনর্থের মূল। তোমার হৃদয়ে জ্ঞানের উদয় হলে, অজ্ঞানতা নাশপ্রাপ্ত হবে, অজ্ঞানতার সহচর কাম ইত্যাদি রিপুশত্রু দূরে পলায়ন করবে। পাপরূপ রোগসমূহের আক্রমণে আর তুমি জীর্ণ শীর্ণ হবে না। অতএব, জ্ঞানলাভে প্রযত্নপর হও। হৃদয়ে জ্ঞানের জ্যোতিঃ বিচ্ছুরিত হলে, হৃদয় নির্মল হলে, জ্ঞানরূপী ভগবান আপনিই এসে সে হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হবেন। তখনই তোমার সকল জ্বালার নিবৃত্তি হবে–তখনই তুমি প্রকৃত সুখ ও শান্তির অধিকারী হতে সমর্থ হবে। হৃদয়ে জ্ঞানের উদয় হলে, মনঃপ্রাণ ভগবানে ন্যস্ত করতে পারলে, কি অন্তর-শত্রু, কি বহিঃশত্রু, সকল শত্রুই নাশ-প্রাপ্ত হয়। মন্ত্রে এই উপদেশ প্রচ্ছন্ন রয়েছে। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ প্রতি দহ যাতুথানান্ প্রতি দেব কিমীদিনঃ। প্রতীচীঃ কৃষ্ণবর্তনে সং দহ যাতুধান্যঃ ॥ ২॥
মন্ত্ৰাৰ্থ–আলোচনা— এই সরল ও সহজবোধ্য মন্ত্রের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ভাষ্যকারের সাথে আমাদের বিশেষ কোনও মতান্তর ঘটেনি। পুর্ব-মন্ত্রের মতো এই মন্ত্রেও শত্রুনাশের প্রার্থনা জানানো হয়েছে। ভাষ্যপাঠে মন্ত্রে স্থূলভাবে রক্ষ-পিশাচ ইত্যাদি সাধারণ শত্রুর প্রতিই লক্ষ্য আছে। আমরা এই শত্রু বলতে কি বুঝি, তা উপরোক্ত বঙ্গানুবাদে উক্ত হয়েছে এবং পূর্বের মন্ত্রটিতে আলোচিত হয়েছে। ফলতঃ এখানে বহিরান্তর সকল দিকের শত্রু-নাশের আকাঙ্ক্ষা এবং ভগবানের প্রাপ্তি-কামনা প্রকাশ পেয়েছে।-মন্ত্রে অগ্নিকে কৃষ্ণবর্তনে বলে সম্বোধন করা হয়েছে। অগ্নিশব্দ পর্যায়ে ঐ পদ পরিদৃষ্ট হয়। ভাষ্যকার ঐ পদের অর্থে মাত্র হে কৃষ্ণবর্ক্স লিখেই নিরস্ত হয়েছেন। অগ্নি কেন কৃষ্ণবর্ক্স অভিধায়ে বিভূষিত হন, সে বিষয়ের তিনি কোনই উল্লেখ করেননি এবং ঐ পদের কোনও সুষ্ঠু অর্থও প্রকাশ করেননি। আমরা ঐ সম্বোধন-পদে শত্রুনাশক দেব এবং কৃষ্ণানাং দুরাচারিনাং বর্তনি (বত্মনি) সৎপথি নয়নকত্রে অর্থ আমনন করেছি। এ-সম্বন্ধে আমাদের যুক্তি এই,–অভিধানে কৃষ্ণবর্তনি (কৃষ্ণবনি) পদের দুরাচার যার পথ অন্ধকারময় (কৃষ্ণো বনি মাগো যস্য) অর্থ দৃষ্ট হয়। যে দুরাচার, যে পাপী, তার পথই তো অন্ধকারময় কৃষ্ণবর্ণ। শাস্ত্রে পাপকে কৃষ্ণমূর্তি বলে উল্লিখিত আছে। কিন্তু, যাঁকে দেবতা বলে পূজা করি, যাঁর আশ্রয় গ্রহণ করে সংসার-বন্ধন হতে মুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা করি, তাকে তো দুরাচার বা পাপ-সংসৃষ্ট বলতে পারি। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি উচ্চ আদর্শেরই অনুসরণ করে; সৎ-জন সৎ-এরই আশ্রয় পেতে চায়। মোক্ষলাভে সৎ-স্বরূপ ভগবানই একমাত্র সহায়। অগ্নি-পাবক; অগ্নি-সংস্কারে সকলই পবিত্র-ভাব ধারণ করে। অতি পাপাচারী যে, সেও যদি অগ্নি-সংস্কারে সংস্কৃত হয়, সেও পবিত্র হয়ে থাকে। অজ্ঞানতাই–পাপের জনয়িতা। অজ্ঞানতার প্রভাবেই মানুষ সংসারে নানা পাপ-প্রবৃত্তির প্রলোভনে পড়ে নিরয়কূপে নিমজ্জিত হতে থাকে। পাপ–অপবিত্র। সেইজন্য পাপাচারীও অপবিত্র। কিন্তু সেই পাপী যদি একবার জ্ঞানরূপ অগ্নির সংস্কারে সুসংস্কৃত হয়, তার হৃদয়ে যদি একবার জ্ঞানের পবিত্র-জ্যোতিঃ বিচ্ছুরিত হয়, তাহলে তার সকল অপবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায়, জ্ঞানের প্রভাবে অজ্ঞানতা বিদূরিত হয়, পাপ-প্রবৃত্তির প্রলোভনে তখন আর তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। তখন সে সৎপথে সৎ-এর দিকেই ক্রমশঃ আকৃষ্ট হতে থাকে। এই ভাব উপলব্ধি করেই আমরা ঐ কৃষ্ণবর্তনি পদে কৃষ্ণানাং দুরাচারিণাং বক্মনি সৎপথি নয়নকত্রে অর্থ অধ্যাহার করেছি। মন্ত্রের প্রতীচীঃ পদে এক বিশ্বজনীন ভাব অভিব্যক্ত হয়েছে। ঐ পদের ভাষ্যানুমোদিত অর্থই আমরা গ্রহণ করেছি। মন্ত্রের শেষাংশে বলা হয়েছে-প্রতীচীঃ যাতুধান্যঃ সংদহ। প্রাণিজাতের অর্থাৎ জীবগণের প্রতিকূলাচারী শাত্রব উপদ্রবসমূহকে সম্যকরূপে ভস্মসাৎ করুন (নিঃশেষে বিদূরিত করুন)। এখানে প্রার্থনাকারী কেবলমাত্র নিজ-শত্রু-নাশের–নিজের অজ্ঞানতা-বিনাশের প্রার্থনা জানিয়েই পরিতৃপ্ত নন। নিখিল বিশ্ব যাতে জ্ঞানলাভ করে, যাতে নিখিল বিশ্বের প্রাণিগণ পাপ হতে প্রতিনিবৃত্ত হয়; পরন্তু জগতের সকল প্রাণীই যাতে উদ্ধার লাভ করতে পারে, এ বিশ্বে যাতে পুণ্যের পূত প্রবাহ প্রবাহিত হয়,-মন্ত্রের শেষাংশে সেই বিশ্বজনীন উদার প্রার্থনাই প্রকাশ পেয়েছে। মন্ত্রে এই ভাবই আমরা গ্রহণ করি। ২।
অধ্যায়: এক
সূক্ত -৩১ : রক্ষোঘ্নম (দ্বিতীয় পর্ব )
তৃতীয় মন্ত্রঃ যা শশাপ শপনেন যাঘং মূরমাদধে। যা রসস্য হরণায় জামারেভে তোকম সা॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –যে প্রসিদ্ধ (বা পূর্বোক্ত) শত্রু, বিনাশহেতুভূত আয়ুধের (অথবা, সৎ-ভাব হরণের) দ্বারা, (আমাদের) আক্রমণ করে (অন্তর অধিকার করে); অথবা অপর যে সকল শত্রু, সকল দুষ্কৃতের অদিভূত (অথবা মোহজনক) অজ্ঞানতা-রূপ পাপের অনুষ্ঠান করে; অথবা অপর যে সকল শত্রুর অপত্য (তাদের হতে উৎপন্ন শত্রু) স্নেহরূপ সৎ-ভাবের (অথবা হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্বের) অপহরণ (বিনাশ) করতে প্রবৃত্ত হয়; সেই সকল শত্রুর (অথবা আমাদের সেই সকল শত্রুসম্বন্ধি) অপত্যকে (অথবা শত্রু হতে জাত সর্বপ্রকার পাপকে) আমাদের হৃদয়স্থ সত্ত্বভাব ভক্ষণ (নাশ) করেন। (মন্ত্রে বিশেষভাবে শত্রুনাশের কামনা প্রকাশ পাচ্ছে। প্রার্থনা,ভগবান্ সত্ত্বভাবের প্রভাবে জ্ঞানকিরণ-প্রদানে পাপমূল বিনাশ করুন এবং আমাদের সৎসম্বন্ধযুত করুন) ॥ ৩ ৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এ মন্ত্রটিও সরল প্রার্থনা-ব্যঞ্জক এবং বিশেষভাবে শত্রুনাশের কামনামূলক। পুর্বের মন্ত্র দুটিতে সাধারণভাবে শনাশের প্রার্থনা আছে। এই মন্ত্রে এবং এর পরবর্তী মন্ত্রে বিশেষভাবে শুক্রনাশের বিষয়ে প্রার্থনা জানানো হয়েছে।–এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে ভাষ্যকারের সাথে আমাদের বিশেষ কোনই মতান্তর ঘটেনি। তবে আমাদের পরিগৃহীত পন্থার অনুসরণে কয়েকটি পদের প্রতিবাক্যে আমরা ভাষ্যাতিরিক্ত অপর অর্থও গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি। প্রথম শপনেন পদ। ঐ পদের ভাষ্যানুমোদিত অর্থ–আক্রোশেন, নাশহেতুভূতেন পরুষবচনেন; আমরা এর অতিরিক্ত বিনাশহেতুভূতেন আয়ুধেন, যদ্বা-সম্ভাব-হরণেন অর্থ অধ্যাহার করেছি। মানুষের হৃদয়-সঞ্জাত সৎ-ভাবসমূহ নষ্ট হলেই মানুষ। জীবৎ-মৃত হয়ে পড়ে। পাপী যে, তার জীবনই তো বৃথা। মূরং পদে আমরা ভাষ্যানুমোদিত অর্থই অক্ষুণ্ণ রেখেছি। ভাষ্যের অর্থেই মন্ত্রের ভাব অতি সুন্দর পরিরক্ষিত হয়েছে। সকল দুষ্কৃতের মূল–সেই অজ্ঞানতা হতেই হিংসা-ক্রোধ লোভ মায়া মোহ কামনা বাসনা প্রভৃতির উদ্ভব হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে অঘং পদের অজ্ঞানতারূপং পাপং অর্থ বেশ সুষ্ঠুভাবে প্রযুক্ত হয়েছে। রসস্য পদের আমরা স্নেহরূপস্য সদ্ভাবস্য, হৃতস্য শুদ্ধসত্তস্য অর্থ অধ্যাহার করেছি। হিংসা-প্রলোভন ইত্যাদির প্রভাবে মনে নিত্য নূতন কামনার যে উদয়ে, মানুষের জন্মসহজাত সৎ-ভাবরাশি নষ্ট হয়ে যায়। কামনার অ-পরিপূরণে ক্রোধ ইত্যদির উৎপত্তি ঘটে, এবং তা হতে ক্রমশঃ হিতাহিত বিবেকাভাব ও পরে বুদ্ধিনাশ হয়ে মানুষ মৃতকল্প হয়। তখন হৃদয়ে আর সৎ-ভাবের লেশমাত্র থাকে না; তখন অজ্ঞান-সহচর রিপুগুলি হৃদয়ক্ষেত্র অধিকার করে বসে। সেই জন্য, অজ্ঞানতা হতে উৎপন্ন কামক্রোধ ইত্যাদিকে অজ্ঞানতার অপত্য বলা হয়েছে।–মন্ত্রের শেষ অংশে তোকম সা অংশে, পূর্বোক্ত অজ্ঞানোৎপন্ন সবরকম শত্রুনাশের কামনা প্রকাশ পেয়েছে। মূল যদি উচ্ছিন্ন হয়, শাখাপ্রশাখা কতক্ষণ জীবিত থাকে? যে শত্রু সকল দুষ্কৃতের মূল, যে শত্রু সংসারের সকল রকম বন্ধনের হেতুভূত সেই শত্রুকেই যদি বিনাশ করতে পারা যায়, তাহলে আর ভাবনা কিসের? তখন, সকল অন্ধকার টুটে যায়, তখন জ্ঞানের পূর্ণজ্যোতিঃ বিচ্ছুরণে হৃদয়-ক্ষেত্র দেবতার আসনে পরিণত হয়। তখন আর সৎ-ভাব-হারক শত্রুর আক্রমণে বিধ্বস্ত হতে হয় না। তখন আর হৃদয়ে সঞ্জাত শুদ্ধসত্ত্বভাবেরও অপচয় ঘটে না। তখন সৎ-ভাবে সৎ-স্বরূপকেই টেনে আনে; তখন হৃদয়ে সৎস্বরূপের অধিষ্ঠান হয়; তখন সংসারের সকল বন্ধন টুটে যায়; তখনই পরাগতি মুক্তি অধিগত হয়ে আসে। রূপকে রাক্ষস-নাশের প্রার্থনায় মন্ত্রের মধ্যে এই ভাবই নিহিত রয়েছে বলে আমরা মনে করি ॥ ৩
বঙ্গানুবাদ –হে ভগব। আপনার কৃপায় রাক্ষসীগণ অর্থাৎ অজ্ঞানতাসহচারিণী সকল অসৎ-বৃত্তি, তাদের আত্মজকে অর্থাৎ আমাদের শত্রু কাম ইত্যাদি রিপুকে ভক্ষণ করুক অর্থাৎ বিনাশ করুক; এবং তাদের ভগিনীকে অর্থাৎ তাদের সহজাত অপকর্মকে ভক্ষণ করুক অর্থাৎ বিনাশ করুক; আরও, তাদের পৌত্রকে অর্থাৎ কাম ইত্যাদি হতে উৎপন্ন নানা পাপসম্বন্ধকে ভক্ষণ করুক অর্থাৎ বিনাশ করুক; (ভাব এই যে,-কণ্টকের দ্বারা যেমন কণ্টক উৎপাটিত হয়, সেইরকম শত্রুর দ্বারাই শত্রুগণ নাশপ্রাপ্ত হোক); এই রকমে শত্রুর দ্বারা শত্রুবংশ নাশের পর সেই অসৎ-বৃত্তিসমূহ, পরস্পর দ্বন্দ্ব-কলহের দ্বারা বিচ্ছিন্ন-কেশা (ছিন্নভিন্ন হয়ে, পরস্পর তাড়নার দ্বারা নিহত হোক; এই রকমে সৎকর্মনিবরাধিকা পাপপ্রবৃত্তিসমূহ বিশেষভাবে পরস্পরকে হিংসা করুক। (ভাব এই যে, বিষধর সর্প যেমন পরস্পরকে দংশন করে উভয়ে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়, আমাদের অসৎ-প্রবৃত্তিসমূহ সেইরকম পরস্পরের শত্রুতা-আচরণে পরস্পর নিহত হোক)। ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মন্ত্রটি একটু জটিলতাপূর্ণ।পুত্র শসা পৌত্র প্রভৃতি কয়েকটি পদ মন্ত্রের মধ্যে দৃষ্ট হয়, তাতেই সেই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ভাষ্যমতে, এই মন্ত্রে সপুত্রবান্ধব রাক্ষসগণের বিনাশের বিষয় উক্ত হয়েছে। রাক্ষসগণ যজ্ঞ নষ্ট করতো; সেই জন্য, যজ্ঞরক্ষার উদ্দেশ্যে রাক্ষসগণের বিনাশের নিমিত্ত অগ্নির নিকট প্রার্থনা জানানো হয়েছে।-মন্ত্রের মর্মার্থ-গ্রহণে ভাষ্যকারের সাথে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে। ভাষ্যকার মন্ত্রের যে অর্থ করেছেন, তার কিছুটা এই,-পুত্রবান্ধবের সাথে রাক্ষসনাশের বিষয় কথিত হচ্ছে। পূর্বোক্তলক্ষণযুক্তা রাক্ষসীরা তাদের পুত্রকে ভক্ষণ করুক; তাদের ভগিনীকে ভক্ষণ করুক, এবং তাদের পৌত্রকে ভক্ষণ করুক। পুত্র, ভগ্নী ও পৌত্র ইত্যাদি ভক্ষণের পর, তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন-কেশা হয়ে পরস্পরকে পরস্পর বিতাড়ন-পূর্বক সংহার করুক। দানপ্রতিবন্ধক পিশাচীগণ পরস্পরকে হিংসা করতে প্রবৃত্ত হোক।–আমাদের ব্যাখ্যাতেও এই ভাবই উপলব্ধ হবে। তবে পার্থক্য এই যে, প্রচলিত ব্যাখ্যা হতে, আমাদের ব্যাখ্যা ভাব-পক্ষে একটু স্বতন্ত্র পথ পরিগ্রহ করেছে। আমাদের ব্যাখ্যানুসারে, অন্তর্যজ্ঞের বিপ্ন-উৎপাদনকারী অন্তঃশত্রুর প্রতিই লক্ষ্য পড়ছে। হৃদয়ে মানসযজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়েছে; ভক্ত সাধক সে যজ্ঞে আহুতি দেবার জন্য উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন; আর অমনি রজোরূপী অন্তঃশত্ৰু কাম-ক্রোধ ইত্যাদি এসে সে যজ্ঞ পণ্ড করে দিচ্ছে। সাধক তাই ব্যাকুল-চিত্তে, সেই সকল শত্রু-নাশের প্রার্থনা জানাচ্ছেন; বলছেন,-দেব! এমনই করুন, যাতে শত্রুরা আপনা-আপনিই বিনষ্ট হয়; যাতে তারা আপন-আপন সন্তান-সন্ততিকে ভক্ষণ করে, নিজেদের বংশের মূল নিজেরাই উম্মলিত করে। প্রার্থনার মর্ম এই,অজ্ঞানতাই প্রধান শত্রু; অসৎ-বৃত্তিসমূহ তার সহচর। কাম ইত্যাদি অজ্ঞানতা হতে উৎপন্ন। সুতরাং তার পুত্রস্থানীয়। জ্ঞানের দ্বারা অজ্ঞানতা বিদূরিত হলে, তার সহচর অসৎ-বৃত্তি এবং তা হতে উৎপন্ন কাম-ক্রোধ ইত্যাদি বিনাশ-প্রাপ্ত হয়। সুতরাং অজ্ঞানতাই তখন তাদের ভক্ষণ করে। এইরকম ক্ৰম-পর্যায়ে হৃদয়ের অসৎ-বৃত্তিসমূহের একটি নষ্ট হলে তাদের দ্বারা উৎপন্ন অপর বৃত্তিসমূহ নষ্ট হয়ে যায়। এ থেকেই পরস্পর পরস্পরকে ভক্ষণের ভাব আসে। কণ্টকের দ্বারা যেমন কণ্টক উৎপাটিত হয়, সেইরকম শত্রুর দ্বারাই শত্রুরা বিনাশপ্রাপ্ত হয়।–মন্ত্রের একটি পদযাতুধানী। স্ত্রীলিঙ্গে ব্যবহৃত ঐ পদের প্রতিবাক্যে ভাষ্যকার কাঁচন উদীরিতলক্ষণা রাক্ষসী অর্থ করেছেন। আমরাও সেই ভাবই অক্ষুণ্ণ রেখেছি। তবে আমাদের পরিদৃষ্ট রাক্ষসী-সাধারণ রাক্ষসী নয়। যে রাক্ষসী হৃদয়ে অবস্থিত থেকে মানুষকে অহরহ বিভ্ৰমগ্রস্ত ও বিপথে পরিচালিত করছে, আমরা যাতুধানী পদে সেই রাক্ষসীকেই লক্ষ্য করেছি।…লৌকিক জগতে সাধারণ রাক্ষসী যেমন যজ্ঞনাশ করে যজ্ঞকারীর অভীষ্ট-পূরণে বাধা জন্মায়, তেমনই হৃদয়-রাজ্যে অসৎ-বৃত্তিসমূহ হৃদয়ে আবির্ভূত হয়ে, হৃদয়ের সৎ-ভাব ও সৎ-বৃত্তিগুলি নষ্ট করে, সাধকের অভীষ্ট-পূরণে–ভববন্ধন-ছেদনে বিঘ্ন জন্মিয়ে থাকে।… যাতুধানীর পুত্র অর্থে, অসৎ-বৃত্তি হতে উৎপন্ন কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপুশত্রুকে বোঝাচ্ছে। …এখন দেখা যাক, মন্ত্রের অন্তর্গত পুত্রং স্বসারং নপ্ত্যং প্রভৃতি যাতুধানীঃ পদের সাথে কিরকম সম্বন্ধ-সূত্রে গ্রথিত রয়েছে। যাতুধানী পদে অজ্ঞানতাসহচারিণী অসৎ-বৃত্তি; পুত্রং পদে অসৎ বৃত্তি হতে উৎপন্ন কাম-ক্রোধ ইত্যাদি; স্বসারং পদে অসৎ-বৃত্তি-সহজাত অপকর্মসমূহ; এবং নপ্ত্যং পদে কামক্রোধ ইত্যাদি হতে যে পাপসম্বন্ধের উদ্ভব হয়, তাকেই বোঝাচ্ছে। এ সকলই সংসার-বন্ধনের হেতুভূত;–এ সকলই মানুষের পরম শত্রু। ভগবৎ-ভক্ত সাধক, ভগবানে আত্মলীন হবার প্রয়াসী হয়ে, এই সকলের বিনাশের প্রার্থনাই করে থাকেন। অন্তঃশত্রু নাশ হলেই বহিঃশত্রু বিনাশপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। উদারচরিতানান্তু বসুধৈব কুটুম্বক। মন নির্মল হলে, সকল ভূতে সমদর্শন-সামর্থ্য জন্মালে, তখন আর শত্ৰুমিত্র আত্মপর ভেদাভেদ জ্ঞান থাকে না; তখন সকলই এক সকলেই সমান স্নেহপ্রীতির সামগ্রী। সেই ভাব প্রকটনের জন্যই মন্ত্রে আন্তর বাহ্য সকল শত্রু-নাশের প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। একের নাশে অপরের বিনাশের ভাব–সেই হতেই প্রকট হয়ে পড়েছে। মন্ত্রের অরায্য পদে ভাষ্যকার দানপ্রতিবন্ধকাঃ পিশাচ্যঃ অর্থ পরিগ্রহণ করেছেন। আমাদের অর্থও সেই অনুসারী হয়েছে। তবে ভাষ্যকারের অর্থে সাধারণ রাক্ষস-পিশাচ ইত্যাদির প্রতি লক্ষ্য পড়ে। কিন্তু ঐ পদে আমাদের আন্তর শত্রুর বিষয়ই উপলব্ধ হয়। সেই ভাব উপলব্ধি করেই আমরা ঐ পদের সৎকর্ম-নিরাধিকা পাপপ্রবৃত্তয়ঃ অর্থ আমনন করেছি। দান ইত্যাদি কর্ম সৎ-কর্মের মধ্যে পরিগণিত। সৎবৃত্তির উন্মেষে হৃদয়ে সৎকর্মের সাধনে আকাঙ্ক্ষা জন্মে। অসৎপ্রবৃত্তিগুলি সে আকাঙ্ক্ষায় বিঘ্ন উৎপাদন করে। হৃদয়ে যদি সৎকর্ম-সাধনের আকাঙ্ক্ষাই না জন্মালো, তাহলে সকর্ম সম্পন্ন হবে কেমন করে? রক্ষঃ পিশাচ ইত্যাদি যেমন বহির্যাজ্ঞিকের যাগ-যজ্ঞ ইত্যাদি সঙ্কর্মে বিঘ্ন উৎপাদন করে; সেইরকম অন্তরস্থরক্ষঃ-পিশাচ-সমূহ–অসৎপ্রবৃত্তিরাজি–অন্তর্যাজ্ঞিকের সকর্ম-সাধন-প্রবৃত্তি-উন্মেষের অন্তরায় হয়।… এইভাবে মন্ত্রে যে উচ্চ প্রার্থনার ভাব পরিব্যক্ত, তা এই,–কণ্টকের দ্বারা কণ্টক যেমন উৎপাটিত হয়,, সর্পদংশনে সর্প যেমন পঞ্চত্ব পেয়ে থাকে; হৃদয়ের অন্তঃশত্রু সমুদয়ও সেইরকম পরস্পর পরস্পরকে অস্ত্র তাড়না করে বিনাশপ্রাপ্ত হোক। অর্থাৎ,জ্ঞানের উদয়ে অজ্ঞানতা দূরে যাক এবং সঙ্গে সঙ্গে তার সহচর, তার সহজাত ও তার হতে উৎপন্ন অসৎ-বৃত্তি, কাম ইত্যাদি রিপু, অপকর্ম সাধনের প্রবৃত্তি এবং সেই সমুদায় হতে সঞ্জাত নানা পাপ-সম্বন্ধ বিনাশপ্রাপ্ত হোক। আমরা মনে করি, মন্ত্রে এই ভাবই পরিস্ফুট।। ৪।
বঙ্গানুবাদ –চক্ৰসন্নিবিষ্ট অথবা জ্ঞানভক্তি-পরিচালিত, সমৃদ্ধিসাধন-হেতু প্রসিদ্ধ, ঐশ্বর্যোপেত অপ্রতিহত-গমনশীল রথের দ্বারা অথবা সৎকর্ম-রূপ যানের দ্বারা (অর্থাৎ, সঙ্কর্মের দ্বারা) ভগবান্ সর্বত্র প্রবৃদ্ধ হন (অর্থাৎ, সর্বত্র তার মহিমা প্রকটিত হয়); (উপমার ভাব এই যে, সুপরিচালিত রথ যেমন অপ্রতিহত গতির কারণে মানুষকে গন্তব্যস্থান প্রাপ্ত করায়, জ্ঞানভক্তি পরিচালিত সৎকর্মের দ্বারা মানুষ সেইরকম ভগবানকে প্রাপ্ত হয়; অপিচ, সেই সঙ্কর্মের প্রভাবেই ভগবানের মহিমা উপলব্ধি করতে পারে)। হে, প্রজ্ঞানাধার দেব! পূর্বোক্ত ঐশ্বর্যোপেত যানের সাহায্যে অথবা জ্ঞানভক্তিসমন্বিত সকর্মের দ্বারা আমাদের (মোক্ষপ্রাপ্তেচ্ছু জনকে) হৃদয়রাজ্যের ঔৎকর্ষ-সাধনের জন্য সত্ত্বভাব ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধিসম্পন্ন করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনা হে প্রজ্ঞানাধার ভগবন্! জ্ঞানভক্তি-পরিচালিত সৎকর্মের সাহায্যে যাতে হৃদয়ে সত্ত্বভাবের সঞ্চার করতে সমর্থ হই, অপিচ জ্ঞানভক্তি সৎ-ভাব ও সৎকর্মের দ্বারা যাতে আমরা ভগবানকে প্রাপ্ত হই। এবং তার মহিমা অবগত হতে পারি, আপনি তার বিধান করুন)। ১।
মন্ত্রাৰ্থ আলোচনা –এই নূতন অনুবাকে নূতন সূক্তের নূতন মন্ত্রে এক নূতন প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। সূক্তানুক্রমণিকায় প্রকাশ,–শত্রুমর্দিত রাজ্যের অভিবৃদ্ধির জন্য, মাহেন্দ্ৰী নামক মহাশান্তির কার্যে রথনেমি মণিবন্ধনে এই সূক্ত বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। কৌশিতকী ব্রাহ্মণে, মণিবন্ধন সংক্রান্ত যে উপদেশ আছে, তা এই,–সূত্রোক্ত লক্ষণ অনুসারে রথচক্রনেমিমণিকে সংপাতিত ও মন্ত্রপূত করে উদসৌ সূর্যঃ (কৌ. ১।২৯৪৬) ইত্যাদি মন্ত্রে শরীরের উত্তম, স্থানে বন্ধন করবে। সেই রথনেমিমণি কি সামগ্রী, সে বিষয়ে উক্ত হয়েছে; যথা–অয়স্কান্ত, লৌহ, সীসক, রজত ও তা পরিবেষ্টিত স্বর্ণ, কুশের উপরে স্থাপন করে অভিবৰ্তেন প্রভৃতি মন্ত্র-চারটিতে পরিশোধিত করতে হয়। পরে সূত্রের দ্বারা বন্ধন করে সেই মণি, শরীরের উত্তম স্থানে ধারণ করবার বিধি আছে। (কৌ. ২৭)।-মন্ত্রটি বড়ই জটিলতাপূর্ণ। মন্ত্রের অভিবৰ্তেন এবং মণিনা পদ দুটিই সে জটিলতার সৃষ্টি করেছে। ভাষ্যমতে মন্ত্রের যে অর্থ হয়, তা ও– এই-সমৃদ্ধিসাধক যে প্রসিদ্ধ অপ্রতিহতগমনশীল চক্রনেমিনির্মিত মণির দ্বারা ধৃত হয়ে দেবগণের অধিপতি ইন্দ্রদেব সর্বত্র প্রবৃদ্ধ অর্থাৎ পরমৈশ্বর্যোপেত ত্রিলোকপতি হয়েছিলেন; হে ব্ৰহ্মণস্পতি দেব; সেই পূর্বোক্ত মহিমোপেত মণির দ্বারা, আমাদের শত্রুপীড়িত রাজ্যের অভিবৃদ্ধির জন্য, করি (হস্তী) তুরগ (অশ্ব) ও ধন ইত্যাদির দ্বারা আমাদের সমৃদ্ধিসম্পন্ন করুন; অর্থাৎ, আপনার প্রসাদে সমৃদ্ধিশালী আমাদের রক্ষিত রাজ্য যাতে শত্রুভয়রহিত হয়ে বর্ধিত হয়, তা করুন। এখানে রাজ্যভ্রষ্ট রাজার বা জমিদারী হতে বঞ্চিত জমিদারের রাজ্য বা জমিদারী প্রাপ্তির প্রার্থনার বিষয় সূচিত হয়েছে, মনে করতে পারি। তা ছাড়া, ভাষ্যকারের ব্যাখ্যায় অন্য কোনও উচ্চভাব উপলব্ধ হয় বলে মনে করতে পারা যায় না; সূক্তানুক্রমণিকার প্রয়োগবিধি দৃষ্টেও তার বেশী কোনও ভাব উপলব্ধ হয় না। আমাদের ব্যাখ্যা মূলতঃ ভাষ্যকারের ব্যাখ্যারই অনুসারী হলেও, ভাবে অভিব্যক্তির বিষয়ে স্বতন্ত্র পথ পরিগ্রহ করেছে। আমাদের বঙ্গানুবাদেও তা অভিব্যক্ত হয়েছে। মন্ত্রের সমস্যামূলক কয়েকটি পদের বিশ্লেষণ করলেই আমাদের পরিগৃহীত ভাব হৃদয়ঙ্গম হবে। মন্ত্রের অন্তর্গত অভিবৰ্তেন ও মণিনা পদ দুটি বিশেষ সংশয়-মূলক। ভাষ্যকার ঐ দুই পদের মধ্যে মণিনা পদের কোনও অর্থ নির্দেশ করেননি। তবে তিনি অভিবৰ্তেন পদের যে অর্থ নির্দেশ করেছেন, তাতেই মণিনা পদের ভাব অনেকটা উপলব্ধি করতে পারা যায়। ভাষ্যকারের মতে অভিবৰ্তেন পদের অর্থ–অভিতো বৰ্ততে চক্র অনেনেতি অভিবর্তো নেমিঃ। সুতরাং অভিবর্তঃ পদে নেমি এবং তা হতে তৎসংলগ্ন চক্র অর্থ পাওয়া গেল। ঐ অভিবৰ্তেন পদ মণিনা পদের বিশেষণ-বাচক। তাতে অভিবর্তেন মণিনা পদের ভাষ্যকার এইরকম অর্থ নির্দেশ করেছেন,–চক্রনেমিনির্মিতো মণিঃ। যদ্বা অভিতঃ সর্বতঃ পররাষ্ট্ৰাদৌ অপ্রতিহত-গতির্বর্ততে অনেন ইতি অভিবর্তো মণিঃ তেন। চক্রনেমি নির্মিত যা, তা-ই মণি; অথবা পররাষ্ট্র ইত্যাদি সর্বত্র যার দ্বারা পুরুষের অপ্রতিহতগতি হয়, তা-ই অভিবর্তো মণিঃ। ভাষ্যকার যদ্বা অভিধায়ে যে অর্থ প্রকাশ করেছেন, তাতেই ঐ মণিনা পদে রথ বা যান অর্থ অধিকতর প্রস্ফুট হয়েছে। প্রথম অর্থে তিনি বললেন,–চক্রনেমিনির্মিতে মণিঃ; দ্বিতীয় অর্থে, যদ্বা অভিধায়ে, তা বিশদ করে বললেন,–অভিতঃ সর্বতঃ পররাষ্ট্ৰাদৌ অপ্রতিহতগতিবর্ততে অনেন পুরুষ ইতি অভিবর্তো মণিঃ; অর্থাৎ পররাষ্ট্র ইত্যাদি সর্বত্র এতদ্বারা পুরুষের অপ্রতিহতগতি হয় বলে একে অভিবর্ত মণি বলে। তবেই বোঝা গেল,-কোনও সংবাহনকে বা যানকে ঐ পদে নির্দেশ করছে। এখন, চক্রনেমি-নির্মিত অথচ সর্বত্র অপ্রতিহতগমনশীল যে মণি বা সংবাহন, সে মণি কি সামগ্রী? সে মণি, ভাষ্যকারের অর্থানুসারে রথ বা যান ভিন্ন অন্য আর কি হতে পারে? অভিধানে মণি (মণী) পদের নানা পর্যায় দৃষ্ট হয়। কিন্তু সেখানে ঐ পদে রথবোধক কোনও শব্দই দৃষ্ট হয় না। নিরুক্ত-গ্রন্থেও যান বা রথবোধক কোনও পর্যায় দেখি না। তবে কেন মণি পদে রথ বা যান অর্থ অধ্যাহার করা হয়? ভাষ্যকারই যে অর্থ প্রকাশ করেছেন, তাতে মণিঃ পদে রথ বা যান ভিন্ন অন্য কোনও অর্থই উপলব্ধি করতে পারা গেল না। তবে রথ বা যান শব্দের পরিবর্তে মণি পদের ব্যবহারের তাৎপর্য কি? তারও একটু বিশেষত্ব আছে। রত্নের মধ্যে যেমন মণি শ্রেষ্ঠপদবাচী, সেইরকম রথের মধ্যে যে রথ বা যান শ্রেষ্ঠ, তাকেই বলতে পারা যায়। লৌকিক হিসেবে ইন্দ্রদেবের সংবাহকারী যান যেমন শ্রেষ্ঠ, আধ্যাত্মিক হিসেবে সেইরকম ভগবানের নিকট নয়নসমর্থ যানই শ্রেষ্ঠ-পদবাচ্য। সে যানকে বা রথকে আমরা জ্ঞানভক্তিপরিচালিত সৎকর্ম নামে অভিহিত করতে পারি। সেই ভাব হতেই অভিবৰ্তেন মণিনা পদ দুটির আমরা জ্ঞানভক্তিপরিচালিতেন সৎকর্মরূপযানেন অর্থ অধ্যাহার করেছি। রথনেমি চক্রের দ্বারা সন্নিবিষ্ট থাকলে রথ যেমন আরোহীকে দ্রুতবেগে গন্তব্যস্থানে পোঁছাতে পারে, কর্ম-রূপ যান যদি জ্ঞান ও ভক্তিরূপ চক্রের দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে ভগবৎ-প্রাপ্তি অতি সহজসাধ্য হয়ে আসে। গন্তব্যস্থানে পৌঁছাতে হলে রথনেমিতে যেমন চক্র দুটির সহায়তা বা সংযোজন আবশ্যক ভগবানকে পেতে হলে কর্মের সাথে তেমনি জ্ঞান ও ভক্তির সংমিশ্রণ একান্ত প্রয়োজন। তাই জ্ঞান ও ভক্তি কর্মরূপ যানের দুটি চক্ররূপে নির্দিষ্ট হয়েছে। জ্ঞানের দ্বারা চিত্ত নির্মল হয়; এ ভক্তিতে সে জ্ঞান দৃঢ়তা অবলম্বন করে। ভক্তিসংমিশ্ৰিত জ্ঞান বা জ্ঞান-পরিশুদ্ধ ভক্তি উভয়ই কর্মকে সৎপথে পরিচালিত করে। তখন ভগবানের মহিমা, ভগবানের ঐশ্বর্য, সর্বত্র প্রকটিত দেখতে পাওয়া যায়। সকর্মের প্রভাবে, জ্ঞান ও ভক্তির সংমিশ্রণে, ভগবান্ প্রবর্ধিত হয়ে থাকেন অর্থাৎ ভক্ত সাধকের বহুল সৃষ্টিতে ভগবানের মহিমা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। মানুষ স্বভাবতঃ মনোবৃত্তির বশীভূত। মনোবৃত্তির উৎকর্ষ অপকর্য অনুসারে, মানুষ সৎপথে বা অসৎপথে প্রধাবিত হয়। কিন্তু জ্ঞানের প্রভাবে যদি সে মনোবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত হয়, আর ভক্তির দ্বারা যদি তা সৎ-ভাবে সম্বন্ধযুত হয়, তাহলে, মানুষের চিত্তবৃত্তি সৎ-এর প্রতিই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তখনই সৎস্বরূপে সাযুজ্য-লান্ড তার সহজলভ্য হয়। তখনই সে তার মহিমার ও তার ঐশ্বর্যের বিষয় উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়। মন্ত্রের প্রথমাংশে যে বলা হয়েছে,-সমৃদ্ধিসাধক চনেমিনির্মিত মণির দ্বারা ধৃত হয়ে ইন্দ্রদেব সর্বত্র প্রবৃদ্ধ হয়েছিলেন; আমরা মনে করি, তার তাৎপর্য এই যে,–জ্ঞান ও ভক্তি সংমিশ্রিত সৎকর্মের দ্বারা ভগবানকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে, তাঁর মহিয়সী মহিমা আপনিই হৃদয়ে প্রকটিত হয়ে পড়ে। তখনই তার অনন্তত্বের, তার অসীমত্বের, ভঁর মহত্ত্বের, তার বিশ্বব্যাপকতার, তার সর্বত্র-বিদ্যমানতার, তার নানারকম গুণবিশেষণের বিষয়ে উপলব্ধি জন্মে। তখনই বুঝতে পারা যায়, কেন তিনি এক হয়েও বহু, আবার বহু হয়েও এক; তখনই বুঝতে পারা যায়, কেন তিনি নাম-রূপ বিবর্জিত, আবার কেন তিনি নাম-রূপ সমন্বিত। তখনই বুঝতে পারা যায়, কেন তিনি গুণময়, আবার কেন তিনি গুণাতীত। ফলতঃ, জ্ঞানভক্তিসংমিশ্রিত সকর্মই ভগবৎ-প্রাপ্তির একমাত্র উপায়। মন্ত্রের প্রথম অংশে এই ভাবই পরিব্যক্ত বলে মনে করি।–মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশের (পংক্তির) ভাব এই যে,-হে প্রজ্ঞানাধারদেব! আমাদের হৃদয়-রাজ্যের অভিবৃদ্ধির জন্য আমাদের সেই মণির দ্বারা সমৃদ্ধিসম্পন্ন করুন। এখানে মুমুক্ষু সাধক, জ্ঞানভক্তি-সংমিশ্ৰিত আপন সৎকর্মের দ্বারা হৃদয়ে সত্ত্বভাব ইত্যাদি সঞ্চারের প্রার্থনা জ্ঞাপন করছেন। শত্রুবিমর্দিত রাজ্য যেমন বিশৃঙ্খল ভাবে অবস্থিতি করে; অন্তঃশত্রুর–অজ্ঞানতার এবং তার সহচর অসৎপ্রবৃত্তি-সমূহের-পীড়নে হৃদয়-রাজ্যও সেইরকম অসারতা প্রাপ্ত হয়ে থাকে। রাজ্যে শান্তি স্থাপিত হলে, সে রাজ্য যেমন ক্রমশঃ সমৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হয়; হৃদয়-রাজ্যের সম্বন্ধেও সেইরকম। অজ্ঞানতা ইত্যাদি শসমূহের বিদূরণে হৃদয় নির্মলতা প্রাপ্ত হয়ে শুদ্ধসত্ত্বভাব ধারণ করলে, ক্রমশঃ সে হৃদয় উন্নত ও ভগবৎ-অভিমুখী হতে থাকে। সে পক্ষে দেবতার অনুগ্রহই প্রধান সহায়। সেইজন্য প্রজ্ঞানাধার ভগবানের নিকট জ্ঞান-ভিক্ষা করে প্রার্থনা জানানো হয়েছে; বলা হয়েছে,–হে দেব! আমাদের সৎকর্মে নিয়োজিত করুন; আর, সেই সঙ্কর্ম জ্ঞান ও ভক্তির দ্বারা পরিচালিত হোক। ইন্দ্রদেব যে দুই চক্রবিশিষ্ট মণির সাহায্যে অপ্রতিহতগতিতে অভীষ্ট-স্থানে গমন করেন; আমরা যেন সেইরকম জ্ঞানভক্তির দ্বারা পরিচালিত সৎকর্মের সহায়তায় আমাদের অভীষ্ট সেই ভগবানে উপনীত হতে সমর্থ হই। করি-তুরগ-ধন-রত্ন ইত্যাদি যেমন রাজ্যের ঐশ্বর্য-জ্ঞাপক, সেইরকম সেই জ্ঞানভক্তি-পরিচালিত সৎকর্ম-সঞ্জাত সত্ত্বভাবই হৃদয়ের সমৃদ্ধি- সূচক। সে ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধশালী হতে পারলে, শত্রুভয় আর থাকে না। তখন ভগবৎ-মহিমা আপনা-আপনিই প্রকট হয়ে পড়ে। সেই অবস্থাই সাধনার পরিণতি; সেই অবস্থাই সাধকের মুক্তির অবস্থা। ভগবৎ-ভক্ত সাধক, তারই জন্য প্রার্থনা করেন, তার জন্য তাঁর প্রাণ-মন! নিয়োজিত। আমাদের মনে হয়, মন্ত্র এই উচ্চ ভাব ধারণ করে আছেন। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ অভিবৃত্য সপত্নানভি যা নো অরাতয়ঃ। অভি পৃতন্যন্তং তিষ্ঠাভি যো নো দুরস্যতি ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হে আমার জ্ঞানভক্তি-বিমিশ্র কর্ম! তুমি আমাদের জন্মসহজাত অন্তঃশত্রুদের অভিভব করে বিনাশ করো; আমাদের কর্মের দ্বারা সঞ্জাত যে সকল বহিঃশত্রু আছে, তাদেরও প্রতিকুল হয়ে বিনাশ করো। আমাদের বশীকরণোম্মুখ হিংসা-প্রলোভন ইত্যাদি শত্রুদের পরাভব করো। যে বহিরন্তঃশত্রু আমাদের মায়ামোহ ইত্যাদির দ্বারা বশীভূত করতে প্রযত্নপর হয়, তাদেরও অভিভূত করে বিনাশ করো। (অন্তঃশত্ৰু-বহিঃশত্রু অথবা হিংসাপরায়ণ অপর যে শত্রু আছে, আমাদের কর্মের প্রভাব তাদের বিনাশ করুক। ভাবার্থ এই যে,আমাতে এইরকম কর্ম-সামর্থ্য উপজিত হোক, যার দ্বারা বহিরন্তঃশত্রু সকলকে বিনাশ করতে সমর্থ হই) ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— মন্ত্রটি সরল ও সহজবোধ্য। মন্ত্রের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ভাষ্যকারের সাথে আমাদের বিশেষ কোনও মতান্তর ঘটেনি। যেমন পূর্ব মন্ত্রে, তেমনই এই মন্ত্রেও শত্রুনাশের প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। পূর্ববর্তী মন্ত্রের সাথে মিলিয়ে পাঠ করলে বোঝা যায়, মন্ত্রে মানুষের সাথে মানুষের দ্বন্দ্বের বিষয়ই প্রখ্যাপিত হয়েছে। ভাষ্যকারের ব্যাখ্যায় সেই ভাবই পরিস্ফুট দেখি। কিন্তু আমাদের মনে হয়, মন্ত্রটি আধ্যাত্মিক জগতের এক মহান আদর্শও প্রকটিত করছেন। মানুষ, মানুষের কতটুকু অনিষ্ট সাধন করতে পারে? আর সে অনিষ্ট কত কালই বা স্থায়ী হয়? কিন্তু মানুষ নিজের কর্মের দ্বারা যে অনিষ্ট সাধন করে থাকে, তা জন্মজন্মান্তরেও সংশোধিত হয় না। সেইজন্যই মন্ত্রে বলা হচ্ছে, আমার কর্মের প্রভাব এমন.হোক, যার দ্বারা আমার বহিঃশত্রু ও অন্তঃশত্রুকে আমি পরাভূত করতে পারি।-শাস্ত্রে কর্মে নানারকম স্তরপর্যায় নির্দিষ্ট আছে। যাকে আমরা সকর্ম বলে অনুভব করি, জ্ঞান-বুদ্ধির তারতম্য-হৈতু সে কর্ম সময় সময় বন্ধনের হেতুভূত মহা-অনিষ্টকর কর্মে পর্যবসিত হয়ে থাকে। কিন্তু জ্ঞান ও ভক্তি বিমিশ্র কর্মে সে সম্ভাবনা নেই বললেও অত্যুক্তি হয় না। সেই জন্যই কর্মের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান ও ভক্তির সংমিশ্রণ প্রয়োজনীয় বলে শাস্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে। দুরধিগম্য কর্মতত্ত্ব-সমালোচনার কোনও আবশ্যকতা এই স্থলে উপলব্ধ হয় না। তবে ভগবানের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত কর্মই যে গতিমুক্তির হেতুভূত, সে বিষয়ে কোনই সংশয় নেই। সৎকর্মের অনুষ্ঠান, সপ্রসঙ্গের আলোচনা, সাধুসঙ্গে বসবাস,–এটাই হলো শত্রুনাশের একমাত্র উপায়। কিবা লৌকিক পক্ষে, কিবা আধ্যাত্মিক পক্ষে, উভয়ই এ সকলের সার্থকতা উপলব্ধ হয়ে থাকে। সৎসঙ্গে সৎ-প্রসঙ্গের আলোচনায়, সাংসারিক আবিলতা প্রায়শঃই হৃদয়কে অভিভূত করতে পারে না; সাধুসঙ্গে সহবাসে সাংসারিক দুঃখতাপের অনেকটা শান্তি ঘটে। মন বাহ্য-প্রকৃতিতে আবিষ্ট হতে অল্পই অবসর পায়। এই ভাবে জ্ঞানের ও ভক্তির উদয়ে মানুষের কর্ম সৎপথেই প্রধাবিত হতে থাকে। কর্ম যখন সৎপথে ধাবিত হয়, মন যখন সৎ-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তখন কি আর মানুষের হৃদয়ে কাম-ক্রোধ ইত্যাদি রিপু প্রভুত্ব-বিস্তারে সমর্থ হয়? তখন সেই কর্মই ক্রমশঃ কর্মবন্ধন ছিন্ন করবার পক্ষে সহায়ক হতে থাকে। আমাদের মনে হয়,-মন্ত্রে এই তত্ত্বই নিহিত রয়েছে।-মন্ত্রের ভাব এই যে, আমরা যেন–সেইরকম কর্ম সম্পাদনে সমর্থ হই; আমাদের কর্ম যেন জ্ঞানভক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়। সেইরকম কর্ম করতে পারলেই, আমাদের কর্মবন্ধন ছিন্ন হবে। আমাদের মধ্যে সেই কর্মসামর্থ্য উপজিত হোক, যার দ্বারা আমরা সংসারের সকল বন্ধন হতে মুক্ত হতে পারব ॥ ২
বঙ্গানুবাদ –হে আমার জ্ঞানভক্তি-বিমিশ্র কর্ম! দীপ্তিদানাদিগুণযুক্ত দ্যোতমান, ভূতসমূহের প্রসবয়িতা অর্থাৎ সর্বভূতান্তরাত্মা শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ ভগবান্ তোমাকে সর্বতোভাবে সমৃদ্ধ করুন; অপিচ, হে আমার জ্ঞানভক্তিবিমিশ্র কর্ম! যে রকমে তুমি বর্তনসাধনভূত অর্থাৎ ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল-হেতুভূত হও, সেই রকমে নিখিলচরাচরাত্মক ভূতজাতসমূহ তোমার উৎকর্ষ সাধন করুক। (প্রাণিসমূহ সকর্মপরায়ণ হোক, তা-ই তাদের গতিমুক্তির হেতুভূত। মন্ত্রে এই রকম ভাব দ্যোতিত হচ্ছে)। ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটিও সরল ভাব পরিজ্ঞাপক। মানুষ জ্ঞানলাভ করুক, তার হৃদয় ভক্তিরসে বিগলতি হোক, আর সেই জ্ঞান ও ভক্তির সংমিশ্রণে সক্কর্মের অনুষ্ঠান করুক; তা-ই তার গতিমুক্তির হেতুভূত–মন্ত্র এই শিক্ষা প্রদান করছেন। মন্ত্র বলছেন, মানুষ সৎকর্মপরায়ণ হোক, মানুষ ভগবানে প্রীতিযুক্ত হোক। তাহলেই তার সকল কর্মের অবসান হবে।–তকর্ম হরিতোষং যৎ–সেই কর্মই কর্ম, যাতে ভগবান, পরিতুষ্ট হন। ভগবান্ কর্মকে অভিবৃদ্ধ করুন–এর তাৎপর্য এই যে, যে কর্ম ভগবৎসংশ্রবযুক্ত, যে কর্ম ভগবানের পরিতৃপ্তি-বিধায়ক, সেই কর্ম করতে পারলেই তোমার কর্ম ঊর্ধ্বগতি লাভ করবে। সকর্ম যেমন ইহকালে মানুষের শ্রেয়ঃসাধক, পরকালেও তা তেমনি মানুষের গম্মুিক্তিদায়ক। সেইরকম কর্মানুষ্ঠানের প্রচেষ্টা মানুষের মধ্যে আসুক, মানুষ নিজে হতেই সেইরকম কর্মানুষ্ঠানে ব্যাপৃত থাকুক। আমরা মনে করি, মন্ত্র এই উপদেশ প্রদান করছেন। মণিধারণে মানুষ যেমন সর্বত্র বিজয়লাভে সমর্থ হয়, মণি যেমন সর্বত্র তার অবাধগতি প্রদান করে; জ্ঞানভক্তি-বিমিশ্র সৎকর্মও তেমনি মানুষকে সর্বলোকে সর্বকালে বিজয়শ্রী মণ্ডিত করে থাকে–মন্ত্রের অন্তর্গত অবিবৃধৎ প্রভৃতি অতীতকালের ক্রিয়াপদের প্রয়োগ দেখি। আমরা মনে করি, মন্ত্রের সাথে কোনও কালাকালের সম্বন্ধ নেই। ঐ ক্রিয়াপদে ভূতভবিষ্যৎ বর্তমান ত্রিকালের বিষয়ই প্রখ্যাপিত করছে। ভগবান আমার কর্ম সমৃদ্ধসম্পন্ন করুন–এই বাক্য যেমন বর্তমানে, তেমনি অতীতে, তেমনি ভবিষ্যতে–সর্বকালেই বলা চলতে পারে। মন্ত্র নিত্য-সত্য; তার সাথে কালাকালের কোনও সম্বন্ধ পরিকল্পনা করা সর্বথা সমীচীন নয়। তাতে বেদের নিত্যত্ব-বিষয়ে অন্তরায় ঘটে ॥ ৩॥
চতুর্থ মন্ত্রঃ অভিবর্তো অভিভবঃ সপত্নক্ষয়ণণা মণিঃ। রাষ্ট্রায় মহ্যং বধ্যতাং সপত্নেভ্যঃ পরাভুবে ॥ ৪
বঙ্গানুবাদ –অভিবর্তনসাধনভূত অর্থাৎ ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গলহেতুভূত, কর্মসঞ্জাত শত্রুগণের অভিভবিতা, জন্মসহজাত অন্তঃশত্রুগণের বিনাশকারী জ্ঞানভক্তি-পরিচালিত সঙ্কর্ম, আমার অভিবৃদ্ধির নিমিত্ত, আন্তবাহ্য সকল শত্রুর নাশের জন্য এবং পরমাশ্রয়রূপ রাজ্যধনসম্পাদনের উদ্দেশ্যে, আমাকে বন্ধন করুক অর্থাৎ আমাকে প্রাপ্ত হোক। (সৎকর্মই সকল সুখের নিলয়। সৎকর্ম আমার চিরসহচর হোক। তার দ্বারাই আমি সকল দুষ্কৃতনাশে সমর্থ হবো, তার দ্বারাই আমার পরমাশ্রয় লাভ হবে। এই মন্ত্রে এইরকম ভাব দ্যোতিত হচ্ছে)। ৪
মন্ত্ৰাৰ্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের কয়েকটি পদের বিভক্তি ব্যত্যয় স্বীকার না করলে, মন্ত্রের অর্থ বোধগম্য হওয়া সুকঠিন। ভাষ্যকারও বিভক্তি-ব্যত্যয়েই অর্থ-নিষ্পন্ন করেছেন ও আমরাও তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিভক্তি ব্যত্যয়ে অর্থ নিষ্কাশনে বাধ্য হয়েছি। মন্ত্রে মণির গুণবর্ণন আছে;-মন্ত্রে মণিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা প্রখ্যাপিত হয়েছে। কিন্তু ভাষ্যকার অপহৃত রাজ্য-ধন পুনরুদ্ধারের নিমিত্ত, স্বজাতি-জ্ঞাতি-বিরোধে মণিবন্ধনের যে প্রয়োজনীয়তার বিষয় উল্লেখ করেছেন, তা আমরা স্বীকার করি না, অথবা মণিঃ পদের ভাষ্যকার যে অর্থ পরিগ্রহণ করেছেন, তা-ও আমাদের অনুমোদিত নয়। মণিঃ পদে আমরা যে ভাব উপলব্ধি করি, এই সূক্তের প্রারম্ভেই, প্রথম মন্ত্রের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-ব্যপদেশেই তা পরিব্যক্ত হয়েছে; সুতরাং এই স্থলে তার পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। লৌকিক-প্রয়োগে মারণ-অভিচার ইত্যাদি ব্যাপারে মন্ত্রে যে অর্থ সূচিত হয় হোক। কিন্তু মন্ত্রের লক্ষ্য যে মানুষকে এক অভিনব পথ প্রদর্শন করে, আমরা তা-ই প্রকটিত করছি। শত্রু যতই প্রবল হোক, সৎ-ভাবের, সৎ-ব্যবহারের, সৎ-কর্মের প্রভাবের নিকট তাকে মস্তক অবনত করতে হবেই হবে। মানুষ-শত্রু এমন কেউই থাকতে পারে না, যে এতে বশীভূত না হয়–যে বৈরভাব ভুলে না যায়। যেমন লৌকিক, পক্ষে তেমনই আধ্যাত্মিক পক্ষে–উভয়ই সৎ বা সত্য সমপ্রভাবসম্পন্ন। সৎকর্মে, সৎ-ভাবে, সৎ-চিন্তায়–তার বিপরীত ভাব আসতেই পারে না। কর্ম যদি জ্ঞান ও ভক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে কি আর অন্য কোনও শক্তি তার নিকট তিষ্ঠিতে পারে? কুপ্রবৃত্তি, কুচিন্তা, হিংসা-প্রলোভন ইত্যাদি, কাম-ক্রোধ–যতই শক্তিসম্পন্ন হোক, কেউই সে প্রভাবের নিকট তিষ্ঠিতে পারে না। অজ্ঞানতাই তো সে সকলের মূলীভূত। মূল যদি উচ্ছিন্ন হয়, কাণ্ড-শাখা-প্রশাখা কতক্ষণ তিষ্ঠিতে পারে? আর তার সাথে যদি একটু ভক্তির সংমিশ্রণ থাকে, তাহলে আর রক্ষা থাকে কি? জ্ঞান ও ভক্তি যে সৎ-ভাবজনক অসৎ-ভাবনাশক, শাস্ত্রে সর্বত্রই তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। সেই জ্ঞান ও ভক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যে কর্ম, তা-ই গতিমুক্তির হেতুভূত,–পরমার্থরূপ পরমাশ্রয়ে সংবাহন-কর্তা। মন্ত্রে তাই ভক্ত সাধক কামনা জানাচ্ছেন,–জ্ঞানভক্তি-পরিচালিত কর্মই যেন আমার চিরসহচর হয়। তাহলে কি হবে? জ্ঞানের দ্বারা প্রকৃত কর্ম নির্বাচনে সমর্থ হবো; ভক্তিতে সেই কর্ম ভগবানে ন্যস্ত হবে। তাহলে, আমার কর্মই তখন যানস্বরূপ হয়ে আমাকে সেই সকল কর্মের মূলাধার ভগবানের নিকট নিয়ে যাবে। তখনই আমার কর্মের অবসান হবে; তখনই আমার কর্মের নিবৃত্তি ঘটবে; তখনই চিরশান্তিময়ের ক্রোড়ে, আশ্রয়-লাভ করে পরম শান্তি প্রাপ্ত হবে। আমাদের মতে, মন্ত্রে এই ভাবই দ্যোতিত হচ্ছে। যেমন অন্তরের শত্রু, তেমনি বাহিরের শত্রু, সৎ-ভাবের নিকট সকলেই পরাজিত ॥ ৪।
বঙ্গানুবাদ –নভোমণ্ডলে পরিদৃশ্যমান সকলের প্রকাশক সূর্যদেব যেমন স্বপ্রকাশ হন, তেমনি আমার সম্বন্ধি সদা উচ্চাৰ্যমাণ ভগবৎ-মহিমাপ্রকাশক মন্ত্ররূপ বাক্যও প্রকাশরূপের দ্বারা নিত্য-সত্য হয়; (সূর্যের উদয়ে যেমন নিত্যপ্রত্যক্ষীভূত ধ্রুবসত্য, মন্ত্রশক্তিও তেমনি স্বতঃপ্রকটিত নিত্য-সত্য)। যে প্রকারে সাধনাপরায়ণ আমি শত্রুগণের হন্তা হতে পারি, আমার উচ্চারিত মন্ত্রশক্তি সেইরকম স্বপ্রকাশ অর্থাৎ শক্তিসম্পন্ন হোক; তার দ্বারা আমি বহিরাগত-শত্রুবিরহিত এবং সহাধিষ্ঠিত ১ শত্রুগণের বিনাশ সমর্থ হই। (ভাব এই যে, ভগবৎপ্রসাদে মন্ত্রশক্তি আমাদের শত্রুহননের অনুকূল হোক) ৫
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এই মন্ত্রে শত্রুনাশের কামনা প্রকাশ পেয়েছে; অপিচ, মন্ত্রশক্তির মাহাত্মও প্রকটিত হয়েছে। মণি-বন্ধনে স্বরাজ্যে এবং পররাজ্যে অপ্রতিহত-প্রভাবে গমনাগমন করতে পারা যায়, অপিচ হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার হয়,-সূক্তের আরম্ভে এই যে মণির প্রভাবের বিষয় কথিত হয়েছে, এই সকল মন্ত্রে সেই বিষয় ক্রমে বিশ্লেষিত হচ্ছে। মণিধারণের জন্য তৎকালিক সূর্যোদয় এবং প্রযুজ্যমান বাক্য শত্রুনাশের সহায় হোক, বক্ষ্যমান মন্ত্র এই ভাব প্রকটন করছেন। ভাষ্যপাঠে এই বিষয় অবগত হতে পারি। সূর্যোদয় প্রতিদিনই প্রত্যক্ষীভূত হচ্ছে, বাক্যও আমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়তই উচ্চারণ করছি। তথাপি মন্ত্রে সেই সেই বিষয় বিশেষভাবে বলবার প্রয়োজন কি? প্রয়োজনের বিষয় মন্ত্রেই স্পষ্টীকৃত হয়েছে। মণিধারক যাতে তার শত্রুনাশ করতে পারে, সূর্যোদয় এবং মন্ত্র-প্রয়োগ তার সহায়ক অনুকূল হোক; স্থূলতঃ শুভক্ষণে শুভমুহূর্তে মণিধারণ করা হয়, এটাই উদসৌ হতে বচঃ পর্যন্ত মন্ত্রাংশের প্রয়োজন–ভাষ্যে উক্ত হয়েছে। –মন্ত্রটি কিছুটা জটিলভাবাপন্ন। মন্ত্রে পদসমূহের যে অন্বয় ভাষ্যের মধ্যে পরিদৃষ্ট হয়, তাতে সহসা কোনও ভাব উপলব্ধ হয় না। মন্ত্রের প্রথম পংক্তির সাথে দ্বিতীয় পংক্তির সম্বন্ধ যে ভাবে রক্ষিত হয়েছে, সে পক্ষে আমাদের পদ্ধতি, ভাষ্য অপেক্ষা; কিছুটা স্বতন্ত্রতা অবলম্বন করেছে। দ্বিতীয় পংক্তির যথা পদের সাথে অন্বয়ে তথা এবং উদগাৎ প্রভৃতি পদ অধ্যাহার করতে হয়েছে। এই ব্যতীত ঐ যথা পদের ভাব গ্রহণ করা যায় না।উদসৌ সূর্যো অগাৎ–এই মন্ত্রাংশের অন্তর্গত উদগাৎ পদের ভাষ্যানুমোদিত অর্থ– উদিতবান পদ অতীতকালের ভাব জ্ঞাপন করে। কিন্তু সূর্যোদয় নিত্য-ধ্রুবসত্য। সুর্য যে পূর্বে উদিত হয়েছিলেন, এখন আর উদিত হন না,-এ ভাব গ্রহণ করা যায় না। সূর্যের উদয় ত্রিকালেই সত্য-ধ্রুব নিত্যপ্রত্যক্ষীভূত। মন্ত্রশক্তিও সেইরকম। যথানিয়মে উচ্চারিত মন্ত্র যে অলৌকিক প্রভাব-সম্পন্ন, সর্বত্রই তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করি। এখনও অনেক স্থলে সে শক্তির প্রভাব প্রত্যক্ষীভূত হয়। ভূত-ভবিষ্যৎ বর্তমান ত্রিকালজ্ঞাপক যে ক্রিয়াপদ উদগাৎ, তা কেরলমাত্র অতীত-কালদ্যোতক বলে কিভাবে গ্রহণ করতে পারি? এ ভাব বেদ-মন্ত্রের সর্বত্রই প্রকটিত। তাই উদগাৎ পদের উদয়তি স্বপ্রকাশো ভবতি অর্থ আমরা পরিগ্রহ করেছি। মন্ত্রের প্রথমাংশে এই দুই নিত্য-সত্য-তত্ত্ব প্রকটিত–এই ভাব উপলব্ধি করেই, আমরা মন্ত্রের প্রথম অংশের অর্থ করেছি–সূর্যোদয় যেমন নিত্যপ্রত্যক্ষভৃত স্বতঃসিদ্ধ, মন্ত্রশক্তির প্রভাবও সেইরকম ধ্রুবসত্য। মন্ত্রের প্রথমাংশে এ সত্যতত্ত্ব প্রকটনের উদ্দেশ্য কি? দ্বিতীয় অংশে সেই বিষয় বিশ্লেষিত হয়েছে। মন্ত্রের শক্তি স্বতঃসিদ্ধ নিত্যসত্য বটে; কিন্তু আমার শত্রুনাশের পক্ষে সে শক্তির কার্যকারিতা নিত্যসত্য-রপে প্রকটিত হোক,–দ্বিতীয় অংশে সাধনা-সম্পন্ন জনের এটাই আকাঙ্ক্ষা। মন্ত্রের উচ্চারণে অন্তর পরিশুদ্ধ হোক, কর্ম সৎপথে পরিচালিত হোক, আন্তরবাহ্য শত্রুর বিনাশে মন্ত্রের অলৌকিক প্রভাব প্রকাশ পাক,–এটাই আকাঙ্ক্ষা ॥ ৫।
বঙ্গানুবাদ –হে আমার জ্ঞানভক্তি-পরিচালিত কর্ম! তুমি সহাধিষ্ঠিত বা জন্মসহজাত ও শত্রুগণের বিনাশক, অভীষ্টফলবৰ্ষক বা অভীষ্টপূরক, ইহলোকে ও পরলোকে অপ্রতিহত প্রভাববিশিষ্ট, এবং বিবিধ রকমে বিশেষভাবে শত্রুগণের অভিভবকারী হও। অতএব, তোমার প্রভাবে যে রকমে সৎকর্মপরায়ণ আমি আত্মসম্বন্ধি শত্রুসৈন্যের এবং স্বকীয় ও পরকীয় প্রাণিজাতের অর্থাৎ অন্তঃশত্রু ও বহিঃশত্রুগণের নিয়ামক বা অভিভবকারী হতে পারি, তার বিধান করো। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। সৎকর্মসাধনের দ্বারা যাতে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল-সাধনে সমর্থ হই, তা করবো–এটাই সঙ্কল্প) ॥ ৬৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— মণিবন্ধনে মানুষ যে অলৌকিক প্রভাবে প্রভাবান্বিত হতে পারে, এই সূক্তের মন্ত্রগুলিতে সেই বিষয়ই প্রদর্শিত হয়েছে। মণিধারণে মানুষ শত্রুনাশে সমর্থ হয়, প্রজাদের অভিলষিত কর্মের অনুষ্ঠানে তাদের অভীষ্ট-পূরণে সমর্থ হয়, আপন রাজ্যে এবং পরকীয় রাজ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে এবং বিদ্রোহপরায়ণ জনগণকে অবাধে বশীভূত করতে সমর্থ হয়। মণির প্রভাবে মানুষ এইরকম গুণবিশিষ্ট। হতে পারে। মণি ধারণকারী তাই বলছেন,-পূর্বোক্তরূপ গুণসমূহে বিভূষিত হয়ে যাতে শত্রুসেনাকে এবং স্বকীয় ও পরকীয় ব্যক্তিবর্গকে শাসন করতে পারি, হে মণি, আমি সেইরকম প্রয়াস পাবো। ভাষ্যমতে মন্ত্রের এইরকম অর্থ নিষ্পন্ন হয়েছে। ফলতঃ, কর্মশক্তির অলৌকিক কার্যকারিতার বিষয়ই সর্বত্র প্রখ্যাপিত হয়েছে। আমরাও সেই ভাবেই মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাশনে প্রয়াস পেয়েছি। মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাশনে ভাষ্যকারের সাথে আমাদের বিশেষ মতান্তর ঘটেনি। তবে আমরা যে আদর্শে অনুপ্রাণিত, সেই আদর্শের অনুসরণে আমাদের অর্থ ভিন্ন-পথ পরিগ্রহণ করেছে। আমাদের মনে হয়, মন্ত্রে মানুষের সাথে মানুষের দ্বন্দ্বের বিষয়। প্রকটিত হয়নি। এ মন্ত্র অন্তর-রাজ্যের আন্তর ও বহিঃশত্রুর সম্বন্ধে প্রযুক্ত হয়েছে। কর্মের প্রভাবে তাদেরই বিনাশের কামনা মন্ত্রে প্রকাশ পেয়েছে। এ-সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা আমরা পূর্বে বহুস্থলে করেছি।-মন্ত্রের অন্তর্গত অভিরাষ্ট্রঃ পদে আপন রাজ্যে ও পরকীয় রাজ্যে আধিপত্য বিস্তারের ভাব প্রকাশ পেয়েছে। সেই ভাব হতে আধ্যাত্মিক জগতের যে উচ্চ আদর্শ প্রকটিত হয়েছে, আমাদের বঙ্গানুবাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই তা উপলব্ধ হবে। সৎ-কর্মের প্রভাব ইহলোকে ও পরলোকে উভয়ত্রই প্রকটিত দেখতে পাওয়া যায়। সৎকর্মে যেমন ইহলোকে যশোসম্মান লাভ হয়, তেমনি পরলোকে পরমাগতি প্রাপ্ত হওয়া যায়। সৎকর্মের দ্বারা সেই পরাগতি লাভের কামনাই মন্ত্রে প্রকাশ পেয়েছে ॥ ৬৷৷
অধ্যায়: এক
সূক্ত -৩৪ : দীর্ঘায়ুঃপ্রাপ্তিঃ
[ঋষি : অথর্বা (আয়ুষ্কাম)। দেবতা : বিশ্বে দেবা (বসব, আদিত্যগণ ও দেবগণ)। ছন্দ : ত্রিষ্টুপ, জগতী ]
প্রথম মন্ত্রঃ বিশ্বে দেবা বসবো রক্ষতেমমুতাদিত্যা জাগৃত শূয়মশ্মি। মেমং সনাভিরুত বান্যনাভির্মেমং। প্রাপৎ পৌরুষেয়য়া বো যঃ ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –হে দেবগণ বা দেবভাবসমূহ এবং হে সকলের নিবাসহেতুভূত দেবগণ বা। আশ্রয়প্রদ দেবভাবসমূহ! মুক্তিকাম এই প্রার্থনাকারীকে (শত্রুর আক্রমণ হতে রক্ষা করো। অপিচ, হে অনন্তের অঙ্গীভূত দেবগণ অথবা দেববিভূতি-সমূহ! তোমরাও এই মুক্তিকাম সাধকের অথবা তার অনুষ্ঠিত সকর্মের রক্ষার জন্য সদা জাগরুক থাকো অর্থাৎ সর্বদা অবহিত ভাবে অবস্থিতি করো। যাতে মুক্তিকামী সাধককে আপন জন্মসহজাত শত্রু অথবা বহিরাগত শত্ৰু অভিভূত করতে না পারে; অথবা, তার কর্মের দ্বারা সঞ্জাত শত্রু মুক্তিকাম সাধককে হিংসা করতে সমর্থ না হয়, সেই জন্য তোমরা অবহিতভাবে অবস্থিতি করো। (এই মন্ত্রে শত্রুনাশের কামনা বিদ্যমান। শ্রেয়োলাভে বহু বিঘ্ন ঘটে। সেই জন্য, সকল বাধা অপসারণের নিমিত্ত, মোক্ষেচ্ছজন সকল দেবতার বা দেবভাবের অনুকম্পা প্রার্থনা করছেন। প্রার্থনার ভাব এই যে, দেববিভূতিসমূহ আমাদের কর্মে অধিষ্ঠিত হয়ে আরব্ধকর্ম সুসিদ্ধ করুন এবং আমাদের মুক্তির বিধান করুন)। ১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই দ্বিতীয় সুক্তের মন্ত্রগুলিতেও সেই একই ভাবে শত্রুনাশের প্রার্থনা বিজ্ঞাপিত হয়েছে। সূত্তানুক্রমণিকায় নানারকম কার্যে এই সূক্তের বিনিয়োগবিধি উক্ত হয়েছে। প্রথম-আয়ুষ্কাম ইষ্টিতে এই সূক্তের মন্ত্রসমূহ প্রযুক্ত হয়। স্থালীপাকে তিনটি ঘৃতপিণ্ড নিক্ষেপ করবার বিধি। তারপর সংপাতনের পরে মন্ত্রঃপূত করে সেই ঘৃত ও স্থালীপাক দ্রব্য ভক্ষণ করতে হয়। দ্বিতীয়–উপনয়ন-কার্যে এই সূক্তের মন্ত্রগুলির বিনিয়োগের বিষয় কৌশীতকী ব্রাহ্মণে কথিত হয়েছে। উপনয়ন-কালে মাণবকের নাভিদেশ সংস্তম্ভন করে সূক্তের মন্ত্রগুলি জপ করতে হয়। বাহুর দ্বারা গৃহীত প্রাঞ্চ অবস্থাপন-পূর্বক দক্ষিণ হস্তের দ্বারা নাভিদেশ সংস্তম্ভনান্তর অস্মিন বসু বসবো ধারয়ন্তু বিশ্বে দেবা বসবঃ প্রভৃতি মন্ত্র পাঠ করবার বিধি। তৃতীয়–আয়ুষ্কাম-ইষ্টির বৈশ্বদেবযাগে এই সূক্তের বিনিয়োগ আছে। অধায়োৎসর্জনকর্মে আজ্যহোমে এই সূক্তের মন্ত্রগুলি প্রযুক্ত হয়ে থাকে। চতুর্থ–আয়ুষ্যগণে এই সূক্তের পাঠ বিহিত আছে বলে উপনয়ন-কালে আজহোমে এর বিনিয়োগ দৃষ্ট হয়। পঞ্চম-নক্ষত্রকল্পে বিহিত ঐরাবতাখ্য মহাশান্তিকর্মে, আয়ুষ্যগণের বিধান-হেতু সেই গণপ্রযুক্ত এই সূক্তের মন্ত্রগুলির বিনিয়োগের বিষয় উক্ত হয়েছে। ষষ্ঠ-বৈশ্যদেবাখ্য মহাশান্তি-কার্যেও এর প্রয়োগ পরিদৃষ্ট হয়। সপ্তম–আয়ুষ্য অভয় স্বস্ত্যয়ন প্রভৃতি পঞ্চগণে হোমকার্য সম্পন্ন করণের পর পরিশিষ্টোক্ত পুষ্পভিষেক-কার্যে এই সূক্তের গণপ্রযুক্ত বিনিয়োগ উল্লিখিত হয়েছে। অষ্টম–এই সূক্তের অন্তর্গত যে দেবা দিবি ইত্যাদি মন্ত্র দর্শপূর্ণমাস-ইষ্টির বষট্রকার অনুমন্ত্রণে বিনিযুক্ত হয়। লৌকিক ক্রিয়া-পদ্ধতিতে মন্ত্রের বিনিয়োগ সম্পর্কে বা অর্থ-বিষয়ে ভাষ্যকারের সাথে আমাদের বিশেষ কোনও মতান্তর ঘটেনি। মন্ত্রে এক অতি উচ্চ প্রার্থনার ভাব দ্যোতিত হয়েছে। সাধক ভগবৎ-আরাধনায় সমাবিষ্ট। তিনি সকল দেবতার বা দেবভাবের নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছেন,–তার আর কার্যে যেন কোনও বিঘু উপস্থিত না হয়। দেবগণ সেই বিষয়ে সাধককে রক্ষা করুন। তিনরকম শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা মন্ত্রের মধ্যে প্রকটিত। সেই তিনরকম শত্রু–সনাভিঃ, অন্যনাভিঃ ও পৌরুষেয়ঃ। সনাভিঃ পদের ভাষ্যানুমোদিত অর্থ–সমানো নাভিঃ গর্ভাশয়ো যস্যাসৌ সনাভিজ্ঞাতিঃ। অন্যনাভিঃ অর্থ–অসমানজন্মা অজ্ঞাতিরূপঃ। পৌরুষেয়ঃ অর্থ পুরুষকৃতঃ। এখানে জ্ঞাতি অজ্ঞাতি রূপ দুরকম শত্রুর এবং পুরুষ অর্থাৎ অপরের কৃত অনিষ্টের বিষয় বিবক্ষিত হয়েছে,–ভাষ্যের এটাই অভিমত।–এই সকল শত্রুর দ্বারা ইহসংসারে যে অশেষ অনিষ্ট সংসাধিত হয়ে থাকে, সে বিষয় আর বোঝাতে হবে না। এই সব বাহ্য শত্রুর নাশ-কামনায় এই মন্ত্র প্রযুক্ত হয়–এটাই ভাষ্য ইত্যাদির অভিমত। বহিঃশত্রুর বিনাশের পক্ষে যাই হোক, কিন্তু আধ্যাত্মিক হিসেবে ঐ সকল পদে যে এক অভিনব অর্থের সূচনা করে, সেই বিষয়ই আমাদের আলোচ্য। সনাভিঃ পদের ভাষ্যকার যে অর্থ গ্রহণ করেছেন, সেই অনুসারেই আমরা ঐ পদের অর্থ করি–জন্মসহজাতঃ। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই যাদের উৎপত্তি, তারা সমানজন্ম। জ্ঞাতি প্রভৃতি, জন্মসহজাত অর্থাৎ জন্মমাত্রই জ্ঞাতির সাথে জ্ঞাতিত্ব-রূপ সমান সম্বন্ধের উদ্ভব হয়ে থাকে। জ্ঞাতি যেমন ও ও শত্রু, জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যেমন জ্ঞাতিরূপ শত্রুর সাথে সম্বন্ধ উপস্থিত হয়; তেমনি জন্মমাত্র যে সকল পদ কুপ্রবৃত্তি-কুসংস্কার হৃদয়ে সঞ্জাত হয়, তারাও সেই জ্ঞাতি-শত্রু পদবাচ্য। অন্যনাভিঃ পদে জ্ঞাতি ভিন্ন অন্যান্য শত্রুকে বুঝিয়ে থাকে। জ্ঞাতি যেমন আপন গৃহে থেকে অনিষ্ট-সাধনে প্রয়াস পায়, অন্যনাভিঃ অর্থাৎ জ্ঞাতি ভিন্ন অন্যান্য যে শত্রু, তারা দূরে দূরে থেকে অনিষ্ট সাধন করে। এইরকম শত্রুকে আমরা বহিরাগত শত্রুর পর্যায়ে অভিহিত করি। এরা অন্তরে থাকে না; বহির্দেশ হতে এরা অনিষ্ট-সাধন করে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য প্রভৃতি শত্রু অন্তরস্থ হয়েও বহির্দেশ হতে অনিষ্টসাধন করে। এ পক্ষে সেই বহিরাগত কার্যই লক্ষ্যস্থল। ক্রোধজনক, প্রলোভনজনক, মোহজনক সামগ্রী দর্শনে, হৃদয়ে ঐ সকল বৃত্তির স্ফুরণ হয়। সেই সেই সামগ্ৰী লাভে অন্তরায় উপস্থিত হলে, নানা অনর্থের সূত্রপাত ঘটে। পৌরুষেয়ঃ পদের অর্থ পুরুষকৃতঃ। পুরুষের কর্মের দ্বারা যে অনিষ্ট সঞ্জাত হয়, তাকেই পৌরুষেয়ঃ বলা যেতে পারে। এই ভাব হতে আমরা ঐ পৌরুষেয়ঃ পদের অর্থ অধ্যাহার করেছি–কর্মণা সঞ্জাতঃ। জন্মসহজাত অন্তঃশত্রু, হিংসাপ্রলোভন ইত্যাদি বহিরাগত শত্রু এবং কর্মের দ্বারা সঞ্জাত শত্রু–এই তিনরকম শত্রু যাতে সৎকর্মে বাধা উৎপন্ন করতে না পারে, মন্ত্রে দেবগণের বা দেবভাবসমূহের নিকট সেই প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। ভাব এই যে,-হৃদয়ে যদি দেবভাব উপজিত হয়, তাহলে অন্তঃশত্রু বহিঃশত্ৰু কোনও শত্রুই আর অভিভূত করতে পারে না। তখন অনুষ্ঠিত কর্মও সৎপথে পরিচালিত হওয়ায় তার দ্বারাও কোনরকম অনিষ্টপাতের সম্ভাবনা থাকে না। সৎকার্যের বিঘ্ন বহুরকম। হৃদয় যদি নির্মল হয়, অন্তর যদি দেবভাবে মণ্ডিত হয়; তাহলে সৎকর্মের সকল অন্তরায়ই দূরে পলায়ন করে। বিশ্বে দেবা বসবো রক্ষতেমং মন্ত্রাংশ তাই বলছেন,–তোমরা নিখিল দেবভাবের অধিকারী হও; তাহলে দেবগণ তোমাদের সর্বদা সর্বত্র রক্ষা করবেন। আর, তাহলে প্রজ্ঞানরূপী ভগবান ভগবান্ তোমাদের হৃদয়ে সর্বদা জাগরিত থেকে তোমাদের সৎপথে পরিচালিত করবেন। তখন আর তোমাদের কোনও শত্রুই পরাভূত করতে সমর্থ হবে না। আমরা মনে করি, মন্ত্রের মধ্যে এই ভাবই নিহিত ॥১॥
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ যে বো দেবাঃ পিতরো যে চ পুত্রাঃ সচেতসসা মে শৃণুতেদমুক্ত। সর্বেভ্যো বঃ পরি দদাম্যেতং স্বস্ত্যেনং জরসে বহাথ ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –হে দীপ্তিদানাদিগুণযুক্ত দেবভাবসমূহ! তোমাদের মধ্যে যারা পিতৃবৎ স্নেহকারুণ্যসম্পন্ন অর্থাৎ সত্ত্বসমন্বিত এবং পুত্রবৎ পবিত্রকারক ও পরিত্রাণসাধক, সেই তোমরা সকলে সমানমনস্ক অর্থাৎ অবহিত বা প্রত্যাতিশয়যুক্ত হয়ে বর্তমান এই স্তোত্র শ্রবণ করো অর্থাৎ গ্রহণ করো। হে দেবভাবসমূহ! তোমাদের সকলের উদ্দেশ্যে মোক্ষেছু এই ব্যক্তিকে অর্থাৎ আমাকে পরিরক্ষণের জন্য প্রদান করছি অর্থাৎ শরণ নিচ্ছি। তোমরা তোমাদের স্থিতাত্মা মোক্ষেচ্ছু এই আমাকে পরিত্রাণের নিমিত্ত আধ্যাত্মিক-দুঃখ ইত্যাদি নাশের দ্বারা, জরাপ্রাপ্তি অর্থাৎ মোক্ষপ্রাপ্তি পর্যন্ত সকলরকম মঙ্গল (কল্যাণ) বিধান করো। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক! মোক্ষমার্গ-অনুসারী ব্যক্তিকে দেবতারা সর্বদা রক্ষা করেন। দীপ্তিদানাদিগুণযুক্ত পবিত্রতাসাধক দেবভাবসমূহ আমার মোক্ষ বিধান ও করুন, এই প্রার্থনা)। ২।
মন্ত্রাৰ্থ–আলোচনা –সরল প্রার্থনামূলক এই মন্ত্রে এক উচ্চ ভাব প্রকটিত হচ্ছে। মন্ত্রের অন্তর্গত পিতরঃ ও পুত্ৰাঃ পদ দুটিতে সেই ভাব পরিস্ফুট হয়েছে। পিতার ন্যায় স্নেহকরুণা-পূর্ণ প্রতিপালক সত্ত্বভাব ইত্যাদি এস্থলে পিতরঃ পদের লক্ষীভূত বলে আমরা মনে করি। পুত্রাঃ পদ পবিত্রতাসাধক পরিত্রাণকারক অর্থ দ্যোতনা করে। পুত্র পিতামাতাকে পবিত্র করে-পুন্নামক নরক হতে পরিত্রাণ করে। এই ভাব হতে পুত্রাঃ পদের অর্থ অধ্যাহৃত হয়েছে-পবিত্রকারকাঃ, পরিত্রাণসাধকাঃ। তাতে মন্ত্রের প্রথমাংশের যে অর্থ হয়েছে আমাদের বঙ্গানুবাদে তা পরিদৃষ্ট হবে।-মন্ত্র সরল-ভাবদ্যোতক, ভাষ্যের ভাবও সহজবোধ্য; সুতরাং অধিক অলোচনা নিষ্প্রয়োজন। ভাষ্যকারের পন্থা (লৌকিক প্রয়োগানুসারে) একরকম, আমাদের পরিগৃহীত পন্থা (আধ্যাত্মিক ভাবে) অন্যরকম–প্রভেদ এইমাত্র ॥ ২॥
তৃতীয় মন্ত্র: যে দেবা দিবি ষ্ঠ যে পৃথিব্যাং যে অন্তরিক্ষ ওষধীষু পশুধেষু পশুস্বন্তঃ। তে কৃণুত জরসমায়ুরস্মৈ শতমন্যা পরি বৃণ মৃত্যু ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –দীপ্তিদানাদিগুণযুক্ত হে দেববিভূতিসমূহ! তোমাদের মধ্যে যে সমুদায় দ্যুলোকে অবস্থিতি করে; অপিচ যারা পৃথিবীলোকে, অন্তরিক্ষলোকে বৃক্ষবনস্পতিসমূহে এবং গো-অশ্ব ইত্যাদি পশু সমূহের মধ্যে বর্তমান আছে; মোক্ষপ্রাপ্তিকাম ব্যক্তির–আমার-উপকারের নিমিত্ত, মোপ্রাপ্তির কাল পর্যন্ত, (সিদ্ধিলাভ পর্যন্ত), সেই সকল দেববিভূতি জীবন বিধান করুন; (যে পর্যন্ত অভীষ্টপূরণরূপ সিদ্ধিলাভ না হয়, সে পর্যন্ত সকল দেববিভূতি সকল বাধা দূর করে আমাকে রক্ষা করুন–এটাই ভাবার্থ)। হে দেববিভূতিসমূহ! আপনারা অপরিমিত বা অস্বাভাবিক মরণহেতুভূত জরা ইত্যাদিকে অর্থাৎ অপমৃত্যুকে বা অকালমৃত্যুকে পরিবর্জন অর্থাৎ নাশ করুন এবং শতবর্ষপরিমিত অর্থাৎ পূর্ণায়ুষ্কাল বা মোক্ষ বিধান করুন। (অভীষ্টলাভ বা মোক্ষপ্রাপ্তি পর্যন্ত শত্রুগণ যাতে বিঘ্ন উৎপাদন করতে না পারে, তা করুন। আপনাদের অনুগ্রহে যেন মোক্ষলাভে সমর্থ হই। অতএব হে দেবগণ! সাধনমার্গে আপনারা আমাকে রক্ষা করুন; যাতে আমার পদস্খলন না হয়, আপনারা তার বিহিত করুন।–মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। সর্বলোকে এবং সর্বভূতে যে সকল, দেবভাব আছে, তারা সকলে আমাকে প্রাপ্ত হোক অর্থাৎ রক্ষা করুক। ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটিতেও আয়ুবৃদ্ধির কামনা প্রকাশ পেয়েছে। পৃথিবীতে, অন্তরিক্ষে, স্বর্গলোকে এবং ভূতসমূহে–সুলতঃ সর্বভূতে সর্বলোকে যে যে সকল দেবভাব বিদ্যমান আছে, তারা সকলে আয়ুষ্কাম-ব্যক্তিকে পূর্ণায়ুষ্কাল পর্যন্ত রক্ষা করুন,ভাষ্যপাঠে মন্ত্রের এই ভাব অবগত হওয়া যায়। মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাশনে ভাষ্যকারের সাথে দু এক স্থলে সামান্য যে মতান্তর ঘটেছে, আমাদের বঙ্গানুবাদে তা পরিদৃষ্ট হবে। দিবি, পৃথিব্যাং, অন্তরিক্ষে, ওষধীষু, পশুষু, অপসু প্রভৃতি পদের ভাষ্যকার যে অর্থ পরিগ্রহণ করেছেন, আমরাও ঐ সকল পদের সেই রকমই অর্থ গ্রহণ করেছি। তবে ভাষ্যে সেই সেই অধিষ্ঠাত্রী
দেবতাকে যে ভাবে সম্বোধন করা হয়েছে, আমাদের ভাব তা অপেক্ষা স্বতন্ত্র। যে দেবাঃ দিবি স্থ মন্ত্রাংশের ভাষ্যমতে অর্থ হয়–সূর্য ইত্যাদি যে সকল দেবতা দ্যুলোকে অবস্থিত। এইরকমে যে দেবাঃ পৃথিব্যাংস্থ মন্ত্রাংশের অর্থ–অগ্নি প্রভৃতি যে সকল দেবতা পৃথিবীলোকে অবস্থিত এবং যে দেবাঃ অন্তরিক্ষে স্থ মন্ত্রাংশের অর্থ-বায়ু প্রভৃতি যে সকল দেবতা অন্তরিক্ষলোকে অবস্থিত। স্থূলতঃ, প্রকাশ-প্রবর্ষণ-পচন ইত্যাদি উপকারের নিমিত্ত তিনলোকে যে সকল দেবতা বর্তমান, তারা সকলে আয়ুষ্কাম ব্যক্তিকে রক্ষা করুন, ভাষ্যে এই ভাব পরিব্যক্ত। আমরা দেবাঃ পদে দেবভাব, ভগবৎ-বিভূতি বা শুদ্ধসত্ত্ব অর্থ গ্রহণ করি। সর্বলোকে এবং বৃক্ষবনস্পতি, গো-অশ্ব ইতাদি পশু এবং উদক-সমূহেস্থূলতঃ সর্বভূতে যে সকল সৎ-ভাবের সমাবেশ আছে, সেই সকলে যে সকল ভগবৎ-বিভূতি-সমূহ বিরাজিত, মোক্ষেচ্ছু সাধক সেই সকল সৎ-ভাবের অধিকারী হবার কামনা করছেন। সাধন-পথের অন্তরায় বহুরকম। সৎ-ভাবের উদয়ে হৃদয় নির্মল হলে কোনও বিভীষিকাই তখন হৃদয়কে বশীভূত বা অভিভূত করতে পারে না। এখানে আমাদের মনে হয়, সেই সর্বলোকস্থায়ী সর্বভূতান্তৰ্গত দেবভাবসমূহ সেই সকল অন্তরায় বিদূরিত করে মোক্ষপ্রাপ্তি পর্যন্ত অর্থাৎ সাধনা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত, সাধককে রক্ষা করবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। অন্যান মৃত্যুন পদ দুটির ভাষ্যমতে অর্থ হয়–অকালমৃত্যু বা অপমৃত্যু প্রভৃতি। মন্ত্রের শেষাংশে অকাল মৃত্যু বা অপমৃত্যু নিবারণ করে পূর্ণশতবর্ষ পরিমিত জীবিতকাল বিহিত করবার প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। আমরা এস্থলে অন্যান্ মৃত্যুন পদ দুটিতে অকালমৃত্যু বা অপমৃত্যু অর্থ গ্রহণ করি না। আমাদের ভাব সেইরকমই বটে; কিন্তু অর্থ স্বতন্ত্র। সাধনায়, সিদ্ধিলাভের সময়, পূর্ণসিদ্ধি লাভ করবার পূর্বে, আন্তর-বাহ্য-শত্রুর আক্রমণে চিত্ত যদি বিক্ষোভিত হয়, মন যদি বিপথে গমন করে, তাহলে সেই অবস্থাকেই অকালমৃত্যু বা অপমৃত্যু বলা, চলতে পারে। আমাদের পরিগৃহীত ভাব এমন। তাতে অন্যান্ মৃত্যু পরিবৃণক্ত মন্ত্রাংশের অর্থ হয় যে, সাধনার স্তরে অগ্রসর হবার সময়, যে সকল বিঘ্ন এসে সাধনার ক্রমভঙ্গ করতে প্রয়াস পায়, হে দেবগণ! তোমরা সেই আন্তর ও বাহ্য উভয় রকম বাধাবিঘ্ন অপসারণ করো। আর সেই বাধা-বিঘ্ন অপসারণের কালে আমাদের শতবর্ষ পরিমিত জীবনকাল প্রদান করো; অর্থাৎ যে পর্যন্ত না আমার সাধনায় সিদ্ধি লাভ হয়– আমার অভীষ্ট পূরণ হয়–যে পর্যন্ত না আমি মোক্ষলাভে সমর্থ হই, সে পর্যন্ত, হে দেবগণ! আপনারা আমাকে রক্ষা করুন। আমরা মনে করি, মন্ত্রে এ ভাবই পরিস্ফুট। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যেখানে যে সৎ-ভাবের সমাবেশ আছে, মন্ত্রে প্রার্থনাকারী সাধক সেই সকলকেই আবাহন করছেন। তার আকাঙ্ক্ষা–কি স্বর্গে, কি মর্ত্যে, কি অন্তরিক্ষে, কি ভূতজাতসমূহে–যেখানে যে ভগবৎ-বিভূতিরূপ দেবভাব বা শুদ্ধসত্ত্ব সঞ্চিত আছে, সে সকলই যেন আমি অধিকার করতে পারি। সাধনার অন্ত নেই। সাধনার পথে যতই অগ্রসর হবে, ততই দেবভাবসমূহ হৃদয় অধিকার করবে,ততই হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বভাব সঞ্জাত হবে,ততই ভগবানের অনুকম্পা-লাভে সমর্থ হবে। এইভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, অর্চনাকারী সাধক তাই বলছেন,–স্বর্গে, অন্তরিক্ষে, পৃথিবীতে এবং ভূতজাতসমূহে, যেখানে ভগবানের যতগুলি বিভূতি-স্বরূপ সৎ-ভাব ও শুদ্ধসত্ত্ব বিদ্যমান আছে, সে সমস্তই আমার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হয়ে আমার সাধনায় সিদ্ধি প্রদান করুক; আমি মোক্ষলাভে L. ভগবানের সাথে সম্মিলিত হই।–এই আকাঙ্ক্ষাই মন্ত্রে বিধৃত ॥৩॥
চতুর্থ মন্ত্রঃ যেং প্রজা উত বানুযাজা হুতভাগা অহুতাশ্চ দেবাঃ। যেষাং বঃ পঞ্চ প্রদিশো বিভক্তাস্তান বো অম্মৈ সত্ৰসদঃ কৃপোমি। ৪
বঙ্গানুবাদ –যে দেবভাব প্রথমোৎপন্ন অর্থাৎ জন্মসহজাত, অপিচ যারা সৎকর্মের দ্বারা সঞ্জাত, যারা জ্ঞানের দ্বারা লব্ধ এবং যারা জ্ঞানকর্ম ব্যতিরেকে স্বতঃসঞ্জাত অর্থাৎ সাধুসঙ্গে সম্প্রসঙ্গে উপজিত হয়; অপিচ, যে সকল দেবভাব সকল দিকে পরিব্যাপ্ত হয়ে বিদ্যমান; হে দেবভাবসমূহ। সেই হেন আপনাদের মোক্ষেচ্ছু পুরুষের কল্যাণের জন্য অর্থাৎ আমার উপকারের নিমিত্ত, হৃদয়রূপ যজ্ঞগৃহে সম্যকপ্রকারে নিহিত (স্থাপিত) করছি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক নিখিল দেবভাব আহরণ করে হৃদয়ে সংস্থাপনের জন্য মন্ত্রে সাধকের সঙ্কল্প বিদ্যমান) ৪
বঙ্গানুবাদ –সকল অভীষ্টের পূরক এবং ধর্ম-অর্থ-কাম মোক্ষরূপ চতুবর্গ-ফলের দাতা, মরণরহিত নিত্যসত্যরূপ, স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বিশ্বের অধিপতি দেবগণের পরিতৃপ্তির জন্য, আমার অনুষ্ঠিত এই কার্যে হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা পরিচর্যা করি অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বকে সমর্পণ করি। (মন্ত্রটি সঙ্কল্প-মূলক। ভগবানের পূজায় হৃদয়গত শুদ্ধসত্ত্বই প্রধান উপকরণ। তা-ই ভগবানের প্রীতিসাধক।
অতএব হৃদয়ে সঞ্চিত শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা ভগবানের পূজা করি–এটাই সঙ্কল্প) ১
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –নূতন সূক্তে নূতন প্রার্থনার সমাবেশ। সূক্তানুক্রমণিকায় এই সূক্তের নানারকম প্রয়োগ উল্লিখিত হয়েছে। নিত্য, নৈমিত্তিক এবং কাম্য ভেদে দ্বাবিংশ সবযজ্ঞ বিহিত হয়ে থাকে। সেই দ্বাবিংশতি সব্যজ্ঞ এই,–ব্রহ্মেদিন, স্বগৌর্দন, চতুঃশরাবসবৌদন, সবশতৌদন, দ্বয়াজৌদন, পঞ্চৌদন, ব্রহ্মাসৌদন, মৃত্যুসব-অনডুৎসবদ্বয়, কর্কি-পৃদ্বিয়, পৌনশীল, পবিত্র, অর্বরা, ঋষভ, বশা, শালা, বৃহস্পতি প্রভৃতি। এদের মধ্যে চতুঃশরাবৌদনসবে আশানা প্রভৃতি সূক্তের বিনিয়োগ আছে। সেই যুগে আশানা প্রভৃতি মন্ত্রের দ্বারা বিরুক্ত হবির অভিমৰ্শন, সম্পাতন এবং দাতৃবাচন ও দান করবার বিধি। কৌশিতকী-ব্রাহ্মণে এই প্রক্রিয়া-পদ্ধতির বিস্তৃত বিবরণ পরিদৃষ্ট হবে। এইভাবে ধূমকেতুরূপ অদ্ভুতদর্শনে দিক্-দেবতা বহুরূপ অজের অবদানসমূহ এবং সেই দেবতা-সম্বন্ধি চরু এই সূক্তের প্রতি মন্ত্রে হোমাগ্নিতে নিক্ষেপ করতে হয়। এই বিষয়ে অথ যত্রৈত প্রভৃতি মন্ত্রে প্রক্রম করে, অশোনামিতি দৈশস্য প্রভৃতি মন্ত্রে শেষ করবার বিধি। এই ভাবে গ্রাম-নগর-দেশ-প্রাকার ইত্যাদি অবদরণে আশ্রামস্বা ইত্যাদি মন্ত্রে এই সূক্তের দ্বারা পুরোডাশ ও পাষাণ প্রভৃতি নিখনন করবার বিধি আছে। এই সূক্তের প্রথম ইত্যাদি মন্ত্রে সর্বরোগ-ভৈষজ্যে আপ্লাবন, অবসেচন ও অপায়ন ইত্যাদি করতে হয়। এই সম্বন্ধে অপরাপর বিনিয়োগও আছে। অশ্বমেধ-যাগে উৎসৃষ্ট অশ্বকে আশানা প্রভৃতি মন্ত্রে ব্রহ্মাখ্য অধ্বর্য অনুমন্ত্রিত করবেন। অদ্ভুতমহাশান্তিকর্মে, এই সূক্তের প্রথম মন্ত্র দিক্-দেবতা-বিষয়ে প্রযুক্ত হয়ে থাকে; নক্ষত্রকল্পে এই বিষয় উক্ত হয়েছে। স্বস্তি মাত্র প্রভৃতি শেষ বা চতুর্থ মন্ত্রটির দ্বারা সর্বস্বস্ত্যয়নকাম ব্যক্তি রাত্রিতে উপস্থান করবে। সূক্তের অন্তর্গত মন্ত্র-সমূহের এইরকম প্রয়োগের বিষয় সূক্তানুক্রমণিকায় উল্লিখিত হয়েছে। এইরকম প্রয়োগবিধির অনুসরণেই ভাষ্যকার সূক্তের মন্ত্র-সমূহের অর্থ নিষ্কাশন করেছেন। মন্ত্রটি অবশ্য কিছুটা জটিলভাবাপন্ন। আশানাম্ আশাপালেভ্যশ্চতুর্ভো মন্ত্রাংশেই সেই জটিলতা অধিকতর ঘনীভূত হয়েছে। সূক্তানুক্রমণিকায় প্রকাশ,–মন্ত্রটি দিক্-দেবতাগণের উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত হয়ে থাকে। আশা পদ নিরুক্তে দিক্-বাচী বলে উল্লিখিত। আশানা ও আশাপালেভ্যঃ পদ দুটির আশা পদ সংশয়-মূলক। সেই সংশয় নিরসনের জন্য ভাষ্যকার বলেন,-আশানা ইতি..ইত্যাদি। অর্থাৎআশানাম পদটি ষষ্ঠ্যন্ত বলে ঐ পদে ঈশিতব্যের বহুত্ব প্রতিপাদিত হচ্ছে। পরন্তু দুটি আশা পদে পুনরুক্তিদোষ ঘটেনি। আশানা আশাপালেভ্যঃ পদ দুটিতে দিসমূহের অধিপতিত্ব বিবক্ষিত হয়েছে। ভাষ্যকার চতুর্ভঃ আশাপালেভ্যঃ পদ দুটির ঐ অর্থ গ্রহণ করেছেন। ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ দশদিকপালরূপে উল্লিখিত ও সম্পূজিত হন। চতুর্ভঃ পদে পূর্ব ইত্যাদি চারটি দিককে বোঝায়। সেই হিসাবেই হয়তো ভাষ্যকার ইন্দ্র-যম ইত্যাদি দেবতার বিষয় চতুর্ভঃ পদের লক্ষ্যস্থানীয় বলে নির্দেশ করেছেন। যাই হোক, আমাদের অর্থ একটু স্বতন্ত্র পন্থা অবলম্বন করেছে। আশানা পদে দিক্-বোধক সর্বাং দিশাং প্রতিবাক্যে সকল দিকে বর্তমান অনন্ত ভূতসঙ্ঘকে বোঝাচ্ছে বলে মনে হয়। আশা পদ ব্যপ্তার্থক অশ ধাতু হতে নিস্পন্ন–অশ ব্যাপ্তেী। তাতে ঐ আশা পদে সর্বতোভাবে ব্যাপ্ত বোঝায়। ভগবান্ এই বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপ্ত; আবার ভূত সমষ্টিতে এই বিশ্বের উৎপত্তি অথবা ভূতসঙ্ঘ এই বিশ্বের সর্বত্র অনুপরমাণুক্রমে অবস্থিত। সুতরাং আশানা পদের অর্থে ভাষ্যে যেমন দিমূহ প্রতিপন্ন হয়, তেমনি ঐ পদে দিমূহে অবস্থিত অনন্ত ভূতসঙ্ঘ এবং তাদের অধিপতি অনন্তস্বরূপ ভগবাকে বুঝিয়ে থাকে। আশানা পদের এই একরকম অর্থ হতে পারে। আবার আশা পদের প্রচলিত সাধারণ অর্থ-অভীষ্ট পদ গ্রহণ করলেও আশানা এবং আশাপালেভ্যঃ পদ দুটির সুষ্ঠু সঙ্গত অর্থ হয়। তাতে বহুবচনা আশানা পদের অর্থ হয়–সর্বাভীষ্টানাং। সেই সকল অভীষ্টের যাঁরা পূরণ করেন, আমরা মনে করি, আশানা এই ষষ্ঠী বিভক্তির বহুবচনান্ত পদে তারাই বিবক্ষিত হয়েছেন। সেই হিসাবেই ঐ আশানা পদের অর্থ হয়েছে-সর্বাভীষ্টানাং–পূরকেভ্যঃ ইতি ভাবঃ।–মানুষের কামনার অন্ত নেই। ধনং দেহি, রূপং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষো জহি, ভার্যাং মনোরমাং দেহিতার কত কামনা, তার কত অভিলাষ। কিন্তু সকল অভীষ্টের সকল কামনার শ্রেষ্ঠ কামনা ধ ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষরূপ চতুর্বর্গধন লাভের কামনা। সেই চতুর্বর্গরূপ অভীষ্ট যারা পূরণ করেন, চতুর্ভঃ আশাপালেভ্যঃ পদ দুটিতে তাদের প্রতিই লক্ষ্য আছে। সে হিসাবে, আমাদের মতে, ঐ দুই পদের অর্থ হয়েছে-ধর্মার্থকামমোক্ষরূপেভ্যঃ চতুর্ভঃ ফলদাতৃভ্যঃ। সে কারা? ভূতেভ্যঃ অধ্যক্ষেভ্যঃ পদ দুটিতে তা স্পষ্টীকৃত হয়েছে বলে মনে করি। স্থাবরজঙ্গমাত্মক এই বিশ্বের অধিপতি যে ভগবানের বিভূতি বা ভগবৎ-ভাবসমূহ, তারাই মানুষের সকল অভীষ্ট পূরণ করে থাকেন। এখানে সেই ভগবৎ-বিভূতি সমূহের বা দেবভাবসমূহের শক্তিমত্তার বিষয়ই আশানা ও চতুর্ভঃ আশাপালেভ্যঃ পদসমূহে বিবক্ষিত হয়েছে বলে মনে করি। চতুর্ভঃ পদের ইন্দ্র-যম ইত্যাদি অর্থ আমরা পরিগ্রহণ করি না। বেদে ত্রি, চতুর, সপ্ত প্রভৃতি সংখ্যাবাচক পদ বহু অর্থেই প্রযুক্ত হয়েছে। আমরা এস্থলে ঐ চতুর্ভঃ পদের পূর্ব ইত্যাদি চারিদিক অর্থও পরিগ্রহণ না করে বিভক্তিব্যত্যয়ে বিবিধরূপেন অর্থ গ্রহণ করেছি। আশাপালেভ্যঃ পদে সকল দিকের অর্থাৎ এই বিশ্বচরাচরের যিনি পালক, যিনি সকল অভীষ্টের পূরক, যিনি চতুর্বর্গফলের দাতা, বিশ্বব্যাপক অনন্তস্বরূপ সেই ভগবাকেই লক্ষ্য করা হয়েছে, তা আমাদের বঙ্গানুবাদের মধ্যে পরিদৃষ্ট হবে। দুটি আশা পদ থাকায় আশানা এবং আশাপালেভ্যঃ পদ দুটির অন্বয় সুকঠিন হয়। সেইজন্য ভাষ্যকার দ্বিতীয় আশা পদের অর্থ যে একরকম পরিহারই করেছেন, তা তাঁর ভাষ্য-দৃষ্টেই উপলব্ধ হয়।–ভাষ্যকার মন্ত্রের ইদ পদের বিভক্তি-ব্যত্যয় স্বীকার করেছেন। আমরাও তাঁর পদাঙ্কানুসরণে বাধ্য হয়েছি। তা ছাড়া, ঐ পদের অম্বয় সুকঠিন। ভাষ্যকার ঐ পদের অর্থ করেছেন, ইদানীং চতুঃসরাসব যাগকালে। যাগ-পদে সৎকর্মানুষ্ঠান দ্যোতনা করে। সেই ভাব হতে আমরা ঐ ইদম পদের অর্থ করেছি, মদনুষ্ঠিতে অস্মিন্ সৎকর্মণি। সৎকর্মে ভগবানের অধিষ্ঠান হোক, হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা তার পুজা করি, মন্ত্র সাধকের এমন সঙ্কল্প ব্যক্ত করছেন। সৎস্বরূপ ভগবানের পূজায় হৃদয়ের সৎ-ভাবই প্রধান উপকরণ। আনন্দেই সেই সদানন্দময়ের পরিতুষ্টি। মন্ত্র তাই উপদেশ দিচ্ছেন–সম্ভব সত্ত্বভাবের দ্বারা ভগবাকে। পূজা করো। তাহলেই তোমার সকল অভীষ্ট সিদ্ধ হবে ॥ ১।.
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ য আশানামাশাপালাশ্চত্বার স্থান দেবাঃ। তে নো নিঋত্যাঃ পাশেভ্যো মুঞ্চতাংহসো অংহসঃ ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –সকল অভীষ্টের পূরক এবং বিবিধরূপে পালনকারী অর্থাৎ ধর্মার্থকামমোক্ষরূপ চতুর্বর্গফলের দাতা যে প্রসিদ্ধ দ্যোতনশীল দেবভাব অর্থাৎ ভগবৎ-বিভূতিসমূহ বিদ্যমান আছে; সেই প্রসিদ্ধ দেবভাবসমূহ আমাদের রিপুগণের উৎপন্ন পাপবন্ধন হতে এবং অন্যান্য সর্বপ্রকার পাপবন্ধন হতে মুক্ত করুন অর্থাৎ উদ্ধার করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। ভাব এই যে,–আমাতে সৎ-ভাব চিরকাল অধিষ্ঠিত থাকুক এবং ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষরূপ চারিপ্রকার ফল প্রদান করুক) ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মন্ত্রটিতে সরল প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই, মানুষের কামনা অফুরন্ত। নিঃশ্রেয়স বা ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ লাভের আশাই সর্বপ্রধান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ আশা। প্রার্থনাকারী এই মন্ত্রে সেই ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষরূপ চতুর্বর্গধনলাভের এবং পাপবন্ধন হতে মুক্ত হওয়ার জন্য প্রার্থনা জানাচ্ছেন। পাপবন্ধন আর কি? এই সংসার-বন্ধনই তো পাপ-বন্ধন! যতদিন সংসারে গতাগতি থাকবে, ততদিন পাপের প্রলোভন হতে, রিপু-শত্রুর নানা উপদ্রব হতে পরিত্রাণ-লাভের আশা অতি বিরল। সেইজন্য, জন্মগতিরোধ করে আত্মায় আত্মসম্মিলনের জন্য–সেই ভবভয়হারী ভগবানের নিকট ভক্ত সাধক কাতরকণ্ঠে প্রার্থনা জানিয়ে বলছেন,-হে ভগবন্! এমন করুন, আমাকে এমন কর্ম-সামর্থ্য প্রদান করুন, যেন পাপ মাত্র আমায় স্পর্শ করতে না পারে; যেন আমি চতুর্বর্গ-ধনের অধিকারী হতে পারি। আমাদের মনে হয়, মন্ত্রে এই সরল প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। ভাষ্যের ভাবের সাথে আমাদের ব্যাখ্যার বিশেষ কোনও পার্থক্য ঘটেনি। তবে অন্বয়-মুখে কোনও কোনও পদের বিভক্তি-ব্যত্যয় সংসাধিত হয়েছে। ভাষ্যকার দেবাঃ পদকে সম্বোধনপদ রূপে গ্রহণ করেছেন; আর যে এবং তে পদের সাথে যুয়ং পদ অধ্যাহৃত করে মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাশন করেছেন।দেবাঃ পদকে সম্বোধন পদ ধরলে যে ও তে পদ দুটির সাথে যুয়ং পদের সংযোজনা না করলে মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাশন করা একরকম অসম্ভব হয়ে পড়ে। দেবাঃ পদ প্রথমার বহুবচন। ঐ পদকে সম্বোধন পদরূপে পরিগ্রহণ করবার কোনই কারণ পরিলক্ষিত হয়। না। দেবাঃ পদকে কর্তৃপদরূপে গ্রহণ করলে যে ও তে পদ দুটির সাথে অতিরিক্ত একটি যুয়ং পদ অধ্যাহার করবার কোনই আবশ্যক, দেখি না। আমরা ঐ দেবাঃ পদকে কর্তৃপদ রূপেই গ্রহণ করেছি। স্থন ক্রিয়াপদ ললাটের বহুবচনে ব্যবহৃত। আমরা ঐ পদের অর্থে বিভক্তিব্যত্যয়ে লটের বহুবচনে বিদ্যন্তে পদ অধ্যাহার করেছি। এইভাবে আমাদের মতে মন্ত্রের যে অর্থ নিষ্পন্ন হয়েছে, আমাদের বঙ্গানুবাদে তা পরিদৃষ্ট হবে। মন্ত্রের অন্তর্গত পদসমূহের অর্থ সরল। আশানা এবং আশাপালাঃ পদ দুটির অর্থ পূর্বৰ্মন্ত্রের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য ॥ ২॥
তৃতীয় মন্ত্রঃ অভ্রামস্থা হবিষা যজাম্যশ্লোণা ঘৃতেন জুহোমি। য আশানামাশাপালস্তুরীয়ো দেবঃ স নঃ সুভূতমেই বৎ ॥ ৩ ৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে পরমেশ্বর্যশালী ভগবন্! ক্লান্তিরহিত অর্থাৎ একৈকশরণ্য হয়ে আমি তোমাকে শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা পূজা করি। হে মম কর্ম! পাপবিরহিত অর্থাৎ নির্মলচিত্ত হয়ে ক্ষরণশীল ভক্তিরসের অর্থাৎ অনন্যা ভক্তির দ্বারা তোমাকে সুসংস্কৃত অর্থাৎ ভগবানে নিয়োজিত করি। যিনি সকল অভীষ্টের পূরক, চতুর্বর্গফলের দাতা দ্যোতনাত্মক পরিত্রাতা, সেই ভগবান্ আমাদের অনুষ্ঠিত এই কর্মে চতুর্বর্গফলরূপ প্রভূত ধন আমাদের প্রাপ্ত বা প্রদান করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। প্রার্থনার, ভাব এই যে,-হে ভগবন! আমাদের সৎ-ভাবের ও ভক্তির দ্বারা পরিতুষ্ট হয়ে আমাদের প্রতি সদা করুণাপরায়ণ হোন। আমাদের পূজা গ্রহণ করুন; আমাদের চতুর্বর্গফলরূপ মহৎ ধন প্রদান, করুন) ৩
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটিও সরল প্রার্থনামূলক। প্রার্থনাকারী ভগবৎ-অর্চনাপরায়ণ সাধকের এখানে প্রথমে ভগবাকে শুদ্ধসত্ত্বরূপ হবির দ্বারা অর্চনা করবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেলো। তার পর যখন তিনি বুঝলেন, শুদ্ধসত্ত্বে ভক্তির স্ফুরণ আবশ্যক, তখনই তার প্রার্থনা প্রকাশ পেলো–শুদ্ধসত্ত্বকে ভক্তিরসের দ্বারা সুসংস্কৃত করে নিই। হৃদয়ের শুদ্ধসত্ত্ব আর ভক্তিমিশ্রিত কর্ম–যদি একযোগে আকর্ষণ করে, সাধ্য কি যে ভগবান্ স্থির থাকেন? সে আকর্ষণে তার আসন টলবে; তিনি ভক্তের হৃদয়ে এসে সমাসীন হবেন। হৃদয়ে যখন ভগবানের অধিষ্ঠান হবে, তখনই ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষরূপ চতুর্বর্গফল লাভ হবে, তখনই মুক্তির পথ সুগম হয়ে আসবে। আমরা মনে করি, স্থূলতঃ মন্ত্রে এই ভাবই পরিব্যক্ত।–এই মন্ত্রের অন্তর্গত অশ্লোণঃ এবং তুরীয়ঃ পদ লক্ষ্য করবার বিষয়। ঐ দুই পদের অর্থ সম্বন্ধে ভাষ্যকারের সাথে আমাদের বিশেষ মতান্তর ঘটেছে। ভাষ্যকার অশ্লোণঃ পদের যে অর্থ করেছেন, তা এই,-অশ্রোণঃ শ্রোণাখ্যব্যাধিবিশেষরহিতঃ সন্। কিন্তু ধাতু-অর্থের অনুসরণে ঐ পদের অর্থ হয়–হিংসা করা। শ ধাতু হতে (শৃ + ন–প্রং) ঐ পদের উৎপত্তি। তাহলে, অশ্রোণঃ পদে হিংসারহিতঃ অর্থ নিষ্পন্ন হয়। হিংসা পাপেরই নামান্তর বা রূপান্তর। ব্যাধিও পাপ হতেই উৎপন্ন হয়। এই সকল বিষয় বিবেচনা করে আমরা ঐ অশ্লোণঃ পদের পাপবিরহিতঃ সন, নির্মলচিত্তেন প্রভৃতি অর্থ অধ্যাহার করেছি। সূক্তানুক্রমনিকায় সর্বরোগভৈষজ্যে এই সূক্তের মন্ত্রসমূহের বিনিয়োগ আছে। তা হতেই বোধ হয় ভাষ্যকার পূর্বোক্তরূপ অর্থ নিষ্পন্ন করেছেন। এক্ষণে তুরীয়ঃ পদের অর্থের বিষয় আলোচনা করেই আমাদের বক্তব্যের উপসংহার করি। তুরীয়ঃ পদের প্রচলিত অর্থ সাধারণতঃ চতুর্থ ধরা হয়। ভাষ্যকারও এই ভাবই গ্রহণ করে পূর্বোদরিতেন্দ্রাদিদিপালাপেক্ষয়াঃ চতুর্থঃ প্রতিবাক্য গ্রহণ করেছেন। তুরীয়ঃ পদ নিপাতনে সিদ্ধ। ঐ পদে পরিত্রাতা, পরব্রহ্ম প্রভৃতি অর্থও কোষগ্রন্থে দেখতে পাওয়া যায়। তুরীয় পদের প্রয়োগ হিসাবে আমরা পরিত্রাতা অর্থই গ্রহণ করেছি। তুরীয় পদের এই অর্থই এখানে সুষ্ঠু সঙ্গত এবং এই অর্থই মন্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য প্রকাশ করছে। ॥ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে প্রার্থনাকারিগণ অথবা অর্চনাপরায়ণ জনগণ অথবা হে আমার মনোবৃত্তিসমুহ! তোমরা এই সত্যকে বা ব্রহ্মকে জেনো। সত্য বা ব্রহ্মই সেই মহত্ত্বাদিগুণসম্পন্ন বিশ্বব্যাপক ব্রহ্মকে বিজ্ঞাপিত করেন অর্থাৎ জানিয়ে দেন। যে ব্রহ্মের অনুগ্রহে ওষধিসমূহ অর্থাৎ অমরত্ববিধায়ক অমৃত-অবিনাশিরূপে বিদ্যমান, সেই ব্ৰহ্ম আমাদের সম্বন্ধীয় অর্থাৎ পাপপূর্ণ এই পৃথিবীতে থাকেন এবং দ্যুলোকেও থাকেন না। (ভাব এই যে-ভগবানই ভগবানের স্বরূপ জানিয়ে দেন। তাতেই সুখ-আরোগ্য-সম্পদ ইত্যাদি বিদ্যমান। তিনিই অমৃতত্ববিধায়ক। কিন্তু পাপী তাঁর সাথে সম্বন্ধশূন্য) ১
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই সুক্তের মন্ত্রগুলির তিনরকম বিনিয়োগের বিষয় সূক্তানুক্রমণিকায় পরিদৃষ্ট হয়। প্রথম–বন্ধ্যা স্ত্রীর পুত্রজননকার্যে মন্ত্রসমূহের দ্বারা উদক অভিষেক প্রদান করতে হয়। শিংশুপা শাখায় উদকের দ্বারা বন্ধ্যা স্ত্রীর মস্তকে শান্তিজল প্রক্ষেপ করণীয়। দ্বিতীয়–এই সুক্তের দ্বারা পুষ্টিকাম এবং সম্পৎকাম ব্যক্তি দ্যাবাপৃথিবী যাগ বা উপাদান করবে। তৃতীয়–এই সূক্তের প্রথম মন্ত্র দর্শপূর্ণ মাসেষ্টিতে পত্নীর অঞ্জলিতে উদপাত্র নিনয়নে বিনিযুক্ত হয়। এইরকম প্রয়োগবিধির অনুসরণে ভাষ্যকার উদকাত্মক ব্রহ্মের সত্ত্বা প্রতিপাদিত করবার উদ্দেশ্যে মনুস্মৃতি হতে এবং তৈত্তিরীয়-সংহিতা হতে দুটি প্রমাণ উদ্ধৃত করেছেন, এবং তারই অনুসরণে ব্রহ্ম পদে ব্ৰহ্মণঃ প্রথম কার্যং অর্থ অধ্যাহার করেছেন। তিনি আরও অধ্যাহার করেছেন, মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিঃ পদ। ঐ অধ্যাহৃত পদ বদিষ্যতি ক্রিয়াপদের কর্তৃপদরূপে পরিগৃহীত। বস্তুতঃ ঐরকম কোনও পদ অধ্যাহার না করলে,বদিষ্যতি ক্রিয়াপদের অন্বয় হওয়া কঠিন। আবার ব্রহ্ম পদকে কর্মপদরূপে গ্রহণ করায়, তার বিভক্তি-ব্যত্যয় সংঘটিত হয়েছে। অর্থ হয়েছে-ব্ৰহ্মণঃ প্রথমকা। কিন্তু আমরা বলি, ঐ ব্ৰহ্ম শব্দে উদকাত্মক ব্রহ্ম বা ব্ৰহ্মণঃ প্রথমকার্য অর্থ ব্যক্ত করে না। ব্রহ্ম পদে–মন্ত্রকে এবং ভগবানকে বোঝায়। মন্ত্রই মন্ত্রশক্তির বিষয় বিজ্ঞাপিত করবেন, অথবু ভগবানই তার স্বরূপ বিজ্ঞাপিত করবেন। মহ ব্রহ্ম বদিষ্যতি মন্ত্রাংশে এই ভাব ব্যক্ত করছে বলে আমরা মনে করি। এ মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি ব্রহ্মের প্রথম কার্য তোমাদের বলবেন–এ অর্থে কি কোনও সৎ-ভাবের উপলব্ধি হয়? –বেদমন্ত্রের নিত্যত্ব ও অপৌরুষেয়ত্ব সংরক্ষিত হয়? মন্ত্রে যখন ঋষির কথা নেই, তখন ঋষির সম্বন্ধ টেনে এনে কেন নিত্যসত্য সনাতন বেদমন্ত্রের অর্থান্তর ঘটাবো? সুতরাং আমরা ভাষ্যকারের অর্থ এই বিষয়ে গ্রহণ করতে পারলাম না। পক্ষান্তরে, প্রথম অনুবাকের দ্বিতীয় মন্ত্রে যে ভাব উপলব্ধি করেছি, এখানেও আমরা সেই ভাবই পরিগ্রহণ করি। অন্তরস্থিত সৎ-ভাবই সকল বিষয় জানিয়ে দেয়–সেখানে তা দেখেছি। এখানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি,ভগবানই বা ভগবৎ বিভূতিসমূহই ভগবানের স্বরূপ জানিয়ে থাকে। আবার মন্ত্রশক্তির মাহাত্ম্য অলৌকিক। শাস্ত্রসম্মতভাবে মন্ত্র উচ্চারিত হলে, মন্ত্রের এক অলৌকিক শক্তি প্রকাশ পায়; সে মন্ত্রে অঘটন সংঘটন হয়। সেই মন্ত্রশক্তির প্রভাবে ভগবানও বিচলিত হয়ে পড়েন। আবার মানুষ সৎ-বৃত্তির সাহায্যে-বিবেক-বুদ্ধির প্রেরণায়–ভগবানের স্বরূপ জানতে পারে। হৃদয়ে জ্ঞানের সঞ্চার হলে, অন্তরে সৎ-বৃত্তির উদয় হলে, অন্তর আপনিই বলে দেয়–ভগবান্ কেমন বা কোথায় কি ভাবে অবস্থিত আছেন। অন্তর ভক্তিযুত হলে, হৃদয় সৎ-ভাবে পরিপূর্ণ হলে, আপনা আপনিই মানুষ তা জানতে পারে। ভক্তের হৃদয়ই ভগবানের বাসস্থান, ভক্তির পূজাই তার প্রকৃত পূজা। তিনি অন্তরিক্ষেও থাকেন না, স্বর্গেও থাকেন না, মর্তেও থাকেন না। তিনি তো নিজেই বলেছেন,–নাহুং তিষ্ঠামি বৈকুণ্ঠে যোগিনাং হৃদয়ে ন চ। মদ্ভক্তাঃ যত্র তিষ্ঠন্তি তত্র তিষ্ঠামি নারদঃ। এ তত্ত্ব–এ নিগূঢ় রহস্য–একমাত্র ভক্তিসহযুত হৃদয়ই ব্যক্ত করতে পারে; একমাত্র ভগবৎ-অনুগ্রহেই তা জানতে পারা যায়। আর একমাত্র মন্ত্রশক্তি সে স্বরূপ ব্যক্ত করতে সমর্থ। মন্ত্রের প্রার্থনার ভাব এই যে,-ভগবৎ-অনুগ্রহে আমার অন্তরই যেন ভগবানের স্বরূপ জানিয়ে দেয়। সে তত্ত্ব অবগত হয়ে আমি যেন অমৃতত্ব লাভে সমর্থ হই এবং আমার যেন পরম মঙ্গল লাভ হয়। আমরা মনে করি, মন্ত্রের মধ্যে এই ভাবই নিহিত। মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক। নিজের মনোবৃত্তি-সমূহকে সম্বোধনে ভগবানের স্বরূপ-তত্ত্ব মন্ত্রে পরিব্যক্ত হয়েছে। বীরুধঃ পদে ওষধির অর্থাৎ সুখারোগ্য-সম্পদের ভাব ব্যক্ত করে বলে মনে করি। যেন বীরুধঃ প্রাণন্তি–বলবার তাৎপর্য এই যে, ওষধিতে ব্যাধি নাশ হয়। নির্বাধি না হতে পারলে, ভগবৎ-আরাধনায় নানা অন্তরায় উপস্থিত হয়। পাপ-বৃত্তিই সকল ব্যাধির মূলীভূত। মন্ত্রের ঐ অংশের ভাবু এই যে, পাপস্পর্শে আমি যেন ব্যাধিগ্রস্ত না হই। অপিচ, সর্বব্যাধি-বিনিমুক্ত হয়ে আমি যেন ভগবৎ-আরাধনায় বিনিযুক্ত হতে পারি। অথবা সকল ব্যাধির প্রধান যে ভবব্যাধি, মন্ত্রাংশে সেই ভবব্যাধি-নাশের কামনা প্রকাশ পেয়েছে বলেও মনে করতে পারি। ফলতঃ ভাষ্যকার ঐ অংশের যে অর্থ নিষ্পন্ন করেছেন, তাতে মন্ত্রাংশের কোনই সার্থকতার বিষয় উপলব্ধ হয় না। ভগবান কি কেবল ওষধিকেই জীবিত রাখেন? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকলই তো তারই রক্ষায় ও পালনে জীবিত থেকে আপন আপন কার্যে বিনিযুক্ত রয়েছে। সুতরাং একমাত্র বীরুধঃ বা ওষধিসমূহকে জীবিত রাখেন, এরকম উক্তির তাৎপর্য কি? পূর্বোক্তরূপ ভবব্যাধি-নিবারণের কামনাই এখানে ব্যক্ত বলে আমরা মনে করি। এ ব্যতীত, ঐ অংশে অন্য কোনও উচ্চভাব প্রকাশ করে বলে মনে হয় না। এইরকমে আমরা মন্ত্রে যে ভাব উপলব্ধি করি, আমাদের বঙ্গানুবাদে তা পরিব্যক্ত ॥ ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ অন্তরিক্ষ আসাং স্থাম শ্রান্তসদামিব। আস্থানমস্য ভূতস্য বিদুষ্টদ বেধসো ন বা ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –তপস্যার ও আত্ম-উৎকর্ষের দ্বারা পরমপদপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণের ন্যায় অথবা সাধুগণ যেমন তপস্যার দ্বারা ও আত্ম-উৎকর্ষের প্রভাবে শ্রেষ্ঠপদে অবস্থান করেন–সেইরকম, সর্বাভীষ্টপূরক ভগবানের যোগ্য আসন অন্তরিক্ষবৎ অনন্তপ্রসারিত ভক্তের হৃদয়ে নির্দিষ্ট আছে। (ভাব এই যে, ভক্তের হৃদয়ই ভগবানের উপযুক্ত আসন; অতএব, ভক্তির দ্বারা ভগবাকে পাবার জন্য প্রবুদ্ধ হচ্ছি–এটাই সঙ্কল্প)। ইহলোকে অথবা ইহজন্মে স্থাবরজঙ্গমাত্মক বিশ্বচরাচরের বা জগতের প্রাণস্বরূপ ও কারণভূত ভগবানের স্বরূপকে মেধাবী ক্রান্তদর্শিগণ অবগত আছেন; অন্যে তা জানেন না। ভাব এই যে,ভগবানের মাহাত্ম্য অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন সাধকদেরও দুয়ে; সুতরাং অজ্ঞান ব্যক্তির পক্ষে যে দুজ্ঞেয় হবে, তাতে আর আশ্চর্য কি? ভগবান্ স্বয়ং যদি আপন স্বরূপ বিজ্ঞাপিত না করেন, মানুষ কেমন করে তা জানতে সমর্থ হবে? অতএব, সেই জ্ঞান লাভ করতে হলে, ভগবানের অনুগ্রহ-লাভই সর্বথা বিধেয়। ২।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মন্ত্রটি সরলভাবদ্যোতক। ভক্তের হৃদয়ই ভগবানের যোগ্য আসন, ভক্তির দ্বারাই ভগবাকে পাওয়া যায়। ভগবানের স্বরূপ দুৰ্জ্জেয়, ভগবৎ-ভক্ত সাধকও তাঁর স্বরূপের বিষয়ে সম্যক জ্ঞানলাভে সমর্থ হন না। তিনি যদি জানিয়ে দেন, তবেই তার স্বরূপ জানা যায়। এ ব্যতীত, সে তত্ত্ব দুরধিগম্য। সুতরাং ভগবানের স্বরূপ জানতে হলে, ভগবানের অনুগ্রহলাভে প্রযত্নপর হওয়া একান্ত কর্তব্য। মন্ত্র এই উপদেশ প্রদান করছেন বলে মনে হয়।–ভাষ্যমতে এই মন্ত্রে অপের স্থান নির্দিষ্ট হয়েছে। ওষধি-সমূহের জীবনহেতুভূত অ–পৃথিবীর ও স্বর্গের মধ্যস্থলে অন্তরিক্ষ-লোকে অবস্থিত; এবং অপের এই অবস্থিতির বিষয় মনু ইত্যাদি জ্ঞানিগণও অবগত নন। ভাষ্যকার মন্ত্রের এইরকম তাৎপর্য নির্দেশ করেছেন। কিন্তু আমাদের অর্থ তা হতে স্বতন্ত্র পথ পরিগ্রহ করেছে। আমাদের বঙ্গানুবাদে সেই বিষয় উপলব্ধ হবে। মন্ত্রের মধ্যে অ-বোধক কোনও পদ পরিদৃষ্ট হবে না। আর ভাষ্যানুমোদিত অর্থে মুন্ত্রের কোনও উচ্চভাব দ্যোতিত হয় বলেও মনে হয় না। আমরা মনে করি, মন্ত্রটি ভগবৎ-সম্বন্ধে প্রযুক্ত। সে পক্ষে মন্ত্রে যে ভাব পরিব্যক্ত, প্রথমেই তা প্রকাশিত হয়েছে। ২।
বঙ্গানুবাদ –দ্যাবাপৃথিবী অথবা দ্যাবাপৃথিবীবৎ সর্বব্যাপী আধাররূপী জ্ঞানভক্তি হৃদয়ে প্ৰদ্দীপিত হলে, পৃথিবীবৎ সর্বধারণক্ষম হৃদয় নিশ্চয়ই ভগবানের করুণাধারা ধারণ করতে সমর্থ হয়। সমুদ্রগামী নদী যেমন অক্ষীণততায় হয়ে প্রবাহিত হয়, সেইরকম ভগবানের সেই করুণাধারা ইহলোকে ও পরলোকে সকলকালেই অক্ষীণ অর্থাৎ শেষরহিত হয়ে আছে। (ভাব এই যে, –ভগবানের করুণার অন্ত নেই। জ্ঞান ও ভক্তির দ্বারা সেই করুণা লাভ করতে পারা যায়। জ্ঞানভক্তি লাভের পরে মানুষ ভগবানের করুণা আপনা-আপনিই লাভ করে থাকেন) ॥ ৩॥
মন্ত্ৰাৰ্থ–আলোচনা –মন্ত্রটি বিশেষ জটিলতা-পূর্ণ। এই মন্ত্রের অর্থ নিষ্কাশনে বিশেষ আয়াস স্বীকার করতে হয়েছে। ভাষ্যের প্রচলিত অর্থে মন্ত্রের কোনও উচ্চভাব বোধগম্য হয় না। ভাষ্যকার মন্ত্রের যে অর্থ করেছেন, প্রথমে তার মর্ম দেখা যাক। ভাষ্যমতে, মন্ত্রটি বিশ্বসৃষ্টিবিয়য়ক। মন্ত্রের অর্থ,-হে দ্যাবাপৃথিবী! জল-উৎপাদনে ব্যাপৃত হয়ে পৃথিবী-লোকে ও দ্যুলোকে তোমরা প্রাক্-উদীরিত জলকে উৎপাদন করেছিলে। সেই উদক বর্তমানকালে ও সকলকালে, সমুদ্রগামী নদীর ন্যায়, আর্দ্রগুণযুক্ত ও শোষরহিত হয়ে বিদ্যমান আছে। ভাষ্যের অনুসারী যে সমস্ত অনুবাদ প্রচলিত আছে, তাতে উদকের সম্বন্ধ দৃষ্টিগোচর হয় না। অপিচ, সেই সমস্ত অনুবাদে মন্ত্রের যে অর্থ সূচিত হয়, ভাষ্যের অর্থ অপেক্ষা তা কিছুটা উচ্চবদ্যোতক।–যাই হোক, আমাদের অর্থ ভিন্নপথ পরিগ্রহণ করেছে। সে মতে,–জ্ঞান ও ভক্তিই ভগবানের করুণা-লাভের একমাত্র উপায়। হৃদয়ে যখন জ্ঞানের ও ভক্তির স্ফুরণ হয়, তখনই সে হৃদয়ে ভগবানের করুণার সঞ্চার হয়ে থাকে। ভগবানের করুণা অসীম অনন্ত। তার শেষ নেই–তার ক্ষীণতা নেই। সেই করুণা-স্রোত সর্বকালে সমভাবে প্রবাহিত। মন্ত্রে এই নিত্য-সত্য-তত্ত্ব প্রকটিত বলে মনে করি। জ্ঞানভক্তি লাভ হলে, ভগবানের করুণা আপনা-আপনিই বর্ষিত হয়ে থাকে। সমুদ্রগামী স্রোতের মতো অর্থাৎ নদী যেমন : অবাধগতিতে সমুদ্রের প্রতি প্রধাবমানা হয়, ভগবানের করুণাও তেমনি ভক্তের প্রতি আপনা-আপনিই বর্ষিত হয়ে থাকে। মন্ত্র প্রচ্ছন্নভাবে এই উপদেশ দিচ্ছেন বলে মনে হয় যে,-যদি ভগবানের করুণা লাভ করতে চাও, জ্ঞানের অধিকারী হও; ভক্তিরসের অমৃতের দ্বারা হৃদয়কে অভিসিঞ্চিত করো। তাহলে করুণারূপী ভগবানকে তুমি প্রাপ্ত হতে পারবে।–আমাদের মনে হয়, মন্ত্রে এই ভাবই দ্যোতিত হচ্ছে। ৩
প্রথম মন্ত্রঃ হিরণ্যবর্ণাঃ শুচয়ঃ পাবকাঃ যাসু জাতঃ সবিতা যাস্বগ্নিঃ। যা অগ্নিং গর্ভং দধিরে সুবর্ণাস্তা ন আপঃ শং স্যোনা ভবন্তু। ১।
বঙ্গানুবাদ –হিতরমণীয়-বর্ণবিশিষ্ট (অর্থাৎ গুণসমূহের দ্বারা চিত্তাকর্ষক), বিশুদ্ধ, শোধনকারী শক্তিসমূহ যা হতে (অর্থাৎ যে শুদ্ধসত্ত্ব হতে) সঞ্জাত হয় এবং যা হতে (অর্থাৎ যে শুদ্ধসত্ত্ব হতে) পবিত্রকারক সবিতা এবং জ্ঞানদেবতা উৎপন্ন হন; যে দেবগণ (অর্থাৎ যে শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহ) জ্ঞানদেবতাকে (জ্ঞানকে) আপন গর্ভে ধারণ করেন; আবিল্য-পরিশূন্য আকাঙ্ক্ষণীয় সেই প্রসিদ্ধ জনহিতসাধক শুদ্ধসত্ত্বরূপ দেবতা আমাদের প্রতি শান্তিপ্রদায়ক ও সুখসাধক হোন। (প্রার্থনার ভাব এই যে,–যার দ্বারা অন্তর পবিত্র হয়, যাতে জ্ঞান বৃদ্ধি পায়, যাতে সকল রকম সুখশান্তি অধিগত হতে পারে, সেই শুদ্ধসত্ত্ব আমাদের হৃদয়ে জেগে উঠুক। ১
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই সূক্তের হিরণ্যবর্ণাঃ প্রভৃতি চারটি ঋক্, যেখানেই অপ-দেবতার বিনিয়োগ আছে, সেখানেই বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। গোদানাখ্য সংস্কার-কর্মে, মধুপর্কে পাদোদক অভিমন্ত্রণে, অনুদক দেশে উদক-প্রাদুর্ভাব-লক্ষণের জন্য, উদকপূর্ণ কলশ ভঙ্গ হলে নব-কলশ-সংস্থাপনে এবং পুষ্পভিষেকে কলশ-অভিমন্ত্রণে এই সূক্তের প্রয়োগ বিহিত আছে।–ভাষ্যানুসারে সূক্তের অন্তর্গত প্রথম মন্ত্রের উদ্দিষ্ট দেবতা–অ৷ অপকে অর্থাৎ জলকে সম্বোধন করেই এই মন্ত্রের অর্থ ভাষ্যে অধ্যাহৃত হয়েছে। সেই অনুসারে হিরণ্যবর্ণাঃ পদ অপেরই (জলেরই) বর্ণ প্রকাশ করছে। হিরণ্যের বর্ণের ন্যায় যে জ্বলের বর্ণ, তা-ই এখানকার লক্ষ্যস্থল। শুচয়ঃ এবং পাবকাঃ পদ দুটিতে–জল যে স্নান-পান ইত্যাদির দ্বারা মানুষকে শুদ্ধ করে, তা-ই বোঝানো হয়েছে। সবিতা এবং অগ্নি যে জল হতে উৎপন্ন হন, তার প্রমাণ-স্বরূপ ভাষ্যে নির্দেশ করা হয়েছে,-সমুদ্র হতে সূর্যের উদয় প্রত্যক্ষীভূত হয়ে থাকে। মেঘের মধ্যে বিদ্যুৎরূপে এবং সমুদ্রের মধ্যে বাড়বানল-রূপে অগ্নির বিদ্যমানতা পরিলক্ষিত হয়। অতএব, যাসু অগ্নিঃ বাক্যের সার্থকতা। এই ভাবে, অগ্নি যে জলের গর্ভে আছে, তা প্রতিপন্ন হয়ে থাকে। উপসংহারে সেই জলকে আহ্বান-পূর্বক বলা হয়েছে,–জল আমাদের রোগনাশক এবং সুখকারক হোক। ভাষ্যের এটাই মর্ম।–আমাদের পরিগৃহীত অর্থে আমরা যথাপূর্ব অপ-শব্দে শুদ্ধসত্ত্বকে-হৃদয়ের সৎ-ভাব ইত্যাদিকে নির্দেশ করেছি। সায়ণের ভাষ্যেও সময়ে সময়ে পদার্থবিশেষের উল্লেখ-প্রসঙ্গে তাদের অধিষ্ঠাত্রী দেবতার পরিকল্পনা দেখা যায়। সে ভাব প্রকাশ না করলে, বস্তু-পক্ষে অর্থ পরিগ্রহণ করবার প্রয়াস পেলে, অনেক স্থলে সঙ্গত অর্থই সিদ্ধ হয় না। ফলতঃ, প্রায় প্রত্যেক মন্ত্রেই রূপকের অধ্যাস দেখা যায়। আমরা যেখানে যেখানেই অপ-শব্দের ব্যবহার দেখেছি, সেই সকল স্থলেই দেবভাবের (শুদ্ধসত্ত্বের) প্রতি লক্ষ্য রয়েছে–বুঝেছি। এখানেও সেই দৃষ্টিতেই সৎ-অর্থ প্রাপ্ত হওয়া যায়। বলা হয়েছে–হিরণ্যবর্ণাঃ। সত্ত্বভাবে দেবত্বে ঐ বিশেষণের উপযোগিতা সম্যক্ দৃষ্ট হয়। সত্ত্বভাব যে রমণীয়, তা যে লোকের আপনা-হতেই চিত্তাকর্ষক, পরন্তু তা যে লোকের হিতসাধক, তা আর বোঝাবার প্রয়োজন হয় না। যেমন হিরণ্যের প্রতি লোকের চিত্ত আকৃষ্ট হয়, দেবত্বের সত্ত্বভাবের প্রতিও মানুষের চিত্ত সেইরকম আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এই সংসারে কে না দেবত্বের অধিকারী হতে অভিলাষ করেন? তাই বলা হয়েছে-হিরণ্যবর্ণা। দেবত্ব স্বয়ং নির্মল বিশুদ্ধিতাসম্পন্ন; এবং দেবত্বের সংস্পর্শে অপরেও বিশুদ্ধিতা লাভ করে। তাই বলা হয়েছে–শুচয়ঃ পাবকাঃ। সবিতা এবং অগ্নি যে সত্ত্বভাব হতে উৎপন্ন হন, তার তাৎপর্য এই যে,–পবিত্রতাসাধক জ্ঞান এবং জ্ঞানের উৎপাদক অবস্থা সত্ত্বভাব হতেই সঞ্জাত হয়ে থাকে। মানুষ যতই সৎকর্মপরায়ণ ও সত্ত্বভাবের অনুসারী হবে, ততই তার মধ্যে জ্ঞান বৃদ্ধি প্রাপ্ত হবে। কর্মে ও জ্ঞানে পারস্পরিক অবিচ্ছিন্ন সম্বন্ধ। যেখানেই সৎকর্মের অনুষ্ঠান, সেখানেই জ্ঞানের উদ্ধৃতি; আবার যেখানেই জ্ঞানের বিকাশ, সেখানেই সঙ্কর্মের অনুষ্ঠানে রতি মতি প্রবৃত্তি। এই দৃষ্টিতেই, অগ্নিকে, অর্থাৎ জ্ঞানাগ্নিকে সত্ত্বভাব যে নিজের মধ্যে ১ উৎপন্ন করেন–গর্ভে ধারণ করেন, তা বোধগম্য হয়। মন্ত্রের প্রার্থনা এই যে,-সুবর্ণাঃ তাঃ আপঃ নঃ শং রে স্যোনাঃ ভবন্তু। তার মর্ম– এই যে,–সুবর্ণবৎ রমণীয় আকাঙ্ক্ষণীয় সেই যে আপঃ অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহ, তাঁরা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান থেকে আমাদের শান্তি ও সুখ প্রদান করুন। আমরা সিদ্ধান্ত করি, মন্ত্রে এইরকম ভাবই প্রকাশিত হয়েছে। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ যাসাং রাজা বরুণো যাতি মধ্যে সত্যানৃতে। অবপশ্য জনানাম্। যা অগ্নিং গর্ভং দধিরে সুবর্ণাস্তা ন আপঃ শং স্যোনা ভবন্তু ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –সেই দেবগণের (শুদ্ধসত্ত্বসমূহের) অভ্যন্তরে অবস্থিত থেকে মনুষ্যগণের সৎ ও অসৎ কর্মকে অবগত হয়ে, সেই অনুসারে, পাপীদের নিগ্রহকর্তা ও পুণ্যাত্মাগণের রক্ষক, অভীষ্টবর্ষণকারী বরুণদেব, মনুষ্যগণের নিকট গমন করেন বা তাদের প্রাপ্ত হন; (ভাব এই যে, মনুষ্যগণের সৎ-অসৎ কর্ম অনুসারে অভীষ্টবর্ষক দেবতা তাদের রক্ষক বা দণ্ডদাতা হন); যে দেবতাগণ (অর্থাৎ যে শুদ্ধসত্ত্বভাবসমূহ) জ্ঞানদেবতাকে (জ্ঞানকে) আপন গর্ভে ধারণ করেন; আবিল্যপরিশূন্য আকাক্ষণীয় সেই প্রসিদ্ধ জনহিতসাধক শুদ্ধসত্ত্ব-রূপ দেবতা আমাদের প্রতি শান্তিপ্রদায়ক ও সুখসাধক হোন। (ভাব এই যে,–যে শুদ্ধসত্ত্বের অভ্যন্তরে সৎ-অসৎ কর্মের ফলদাতা দেবতা বাস করেন, সেই শুদ্ধসত্ত্ব আমাদের শান্তিপ্রদ ও সুখসাধক হোক। ২৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের দ্বিতীয় চরণটি পূর্ব মন্ত্রেরই অনুবর্তী। সুতরাং প্রার্থনা অভিন্নই রয়েছে। জ্ঞান যার অভ্যন্তরে বিদ্যমান রয়েছে, সেই সত্ত্বভাব আমাদের শান্তিপ্রদ ও সুখসাধক হোন; অর্থাৎ জ্ঞান-সহযুত সত্ত্বভাবের অধিকারী হয়ে আমরা যেন সুখ-শান্তি লাভ করতে পারি;-প্রার্থনার এটাই। তাৎপর্য। তবে এই মন্ত্রের প্রথম চরণটি কিছু বৈচিত্র্যসম্পন্ন। অপের অর্থাৎ জলের অধিপতি বা রাজা বরুণ। ভাষ্যে প্রকাশ,–তিনি পাপীর নিগ্রহকর্তা; তিনি জলের মধ্যে অর্থাৎ সমুদ্রের গর্ভে অরস্থিতি করেন। সেখানে অবস্থিতি করে, তিনি মনুষ্যগণের সত্যভাষণ ও মিথ্যাকথন লক্ষ্য করে থাকেন এবং সেই অনুসারে আপন হস্তে পাশ ধারণ করে আছেন। এক দৃষ্টিতে দেখতে গেলে এই উপাখ্যান যে ভ্রান্তিমূলক, আপনা-হতেই তা উপলব্ধি করা যায়। পূর্বৰ্মন্ত্রের ব্যাখ্যাতে ও ভাষ্যে সেই ভ্রমের পরিচয় পেয়েছি। সেখানে আছে–সূর্য সমুদ্র হতে উত্থিত হন। এখানে দেখছি, বরুণ-সম্বন্ধেও সেই ভাব প্রকাশমান। কিন্তু তা যে রূপক, তা বলাই বাহুল্য। যাই হোক, ভাষ্যের অর্থ হতেই ভাব প্রাপ্ত হওয়া যায় যে, বরুণ দেবতা রাজার ন্যায় বিদ্যমান থেকে সকর্মকারিগণকে পালন এবং অপকর্মকারিগণকে দণ্ডপ্রদান করেন। আমরা বরুণঃ পদে অভীষ্টবর্ষণকারী দেব অর্থ গ্রহণ করি। সে দেবতা সকলেরই সকল প্রকার কামনা পূরণ করে থাকেন। কিন্তু এখানে এই মন্ত্রে তার কর্ম বিশিষ্টভাবে নির্দেশ করা হয়েছে–বুঝতে পারি। মন্ত্রের অন্তর্গত জনানাং সত্যানৃতে অবপশ্যন্ বাক্যাংশে তার সেই কর্মের ভাব প্রকাশ পেয়েছে। তিনি সত্যও দেখেন এবং অসত্যও দেখেন; সৎকর্মের প্রতিও লক্ষ্য করেন এবং অসৎকর্মের প্রতিও লক্ষ্য করেন। সেই লক্ষ্য অনুসারেই মনুষ্যগণকে তিনি আশ্রয়দান বা দণ্ডপ্রদান করে থাকেন। কিন্তু সেই দেবতারও আবাস-স্থান অপের অর্থাৎ সত্ত্বভাবের মধ্যে। যেখানে সত্ত্বভাব আছে, সেইখানেই তিনি বিদ্যমান থেকে মানুষের সৎ-অসৎ কর্মের ফলদাতা হন। তাঁর আবাসস্থান-স্বরূপ যে সত্ত্বভাব, তা আমাদের মধ্যে সঞ্চিত থোক এবং তার দ্বারা আমরা যেন সুখের ও শান্তির অধিকারী হই। এটাই এই মন্ত্রের প্রার্থনার মর্মার্থ। ২।
তৃতীয় মন্ত্রঃ যাসাং দেবা দিবি কৃন্তি ভক্ষং যা অন্তরিক্ষে বহুধা ভবন্তি। যা অগ্নিং গর্ভং দধিরে সুবর্ণাস্তা ন আপঃ শং স্যোনা ভবন্তু ॥৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –দীপ্তিদানাদিগুণবিশিষ্ট দেবভাবসমূহ (ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ) যে অপের অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বের সারভূত অমৃতকে স্বর্গলোকে উপভোগ্য করেন এবং যে অপ অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বসমূহ অন্তরিক্ষে অর্থাৎ অন্যান্য সর্বলোকে নানা রকমে (বহুরূপে) বিদ্যমান আছে; এবং যে অপ অর্থাৎ শুদ্ধসত্ত্বসমূহ জ্ঞানাগ্নিকে আপন অভ্যন্তরে ধারণ করে আছে; আকাঙ্ক্ষণীয় সেই লোকহিতসাধক সত্ত্বভাবসমূহ আমাদের শান্তিপ্রদায়ক ও সুখসাধক হোক। (ভাব এই যে,-স্বর্গলোক সত্ত্বভাবের নিলয়; অন্যলোকে সত্ত্বভাবসমূহ বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থিত আছে; জ্ঞানের আশ্রয়ভূত সেই সত্ত্বভাবসকল আমাদের সুখশান্তির প্রবর্ধক হোক–এই আকাঙ্ক্ষা) ॥ ৩॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রের দ্বিতীয় চরণ পূর্ববর্তী মন্ত্র দুটির দ্বিতীয় চরণের অনুরূপ। সুতরাং দ্বিতীয় চরণের অর্থ এখানেও অভিন্ন রয়েছে। মন্ত্রটির প্রথমাংশে শুদ্ধসত্ত্বের মহিমা ব্যাখ্যাত হয়েছে। হৃদয়ে দেবভাব সঞ্জাত হলেই শুদ্ধসত্ত্বরূপ অমৃত উপভোগের অধিকার জন্মায়। সত্ত্বভাব সর্বত্রই নানা প্রকারে বিদ্যমান আছে; কিন্তু তা উপভোগের জন্য হৃদয়কে প্রস্তুত করা চাই। কর্ম ও জ্ঞান সাধনার দ্বারা হৃদয়কে পবিত্র দেবভাবসম্পন্ন করা চাই। তবেই শুদ্ধসত্ত্বরূপ অমৃত উপভোগ করতে সামর্থ্য জন্মাবে। যাতে আমরা উপযুক্ত সাধনার দ্বারা সেই অধিকার লাভ করতে পারি, মন্ত্রে সেই প্রার্থনাই দেখতে পাওয়া যায়। অমৃত পানের অধিকার জন্মালে, তার ফলে, পরম সুখ ও শান্তিলাভ ঘটবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই সেই চরম ও পরম শান্তি লাভের জন্য মন্ত্রে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।-যাঁরা সত্ত্বগুণসম্পন্ন, যাঁদের হৃদয় বিশুদ্ধ ও নির্মল, তারা তো আপনা-আপনিই অমৃত লাভ করবেন। কিন্তু অধম পতিত আমরা কি সেই অমৃত-পানে বঞ্চিত থাকব? বিশ্ব ব্যেপেই তো সেই সত্ত্বভাবের প্রকাশ আছে। তবে কেবল অধম আমরাই কি সেই সত্ত্বভাব হতে এবং তার আনুষঙ্গিক অমৃতত্ব হতে বঞ্চিত হবো? তা তো নয়! প্রাণ ভরে অমৃতময়কে ডাকার মতো ডাকতে পারলে তিনি নিজেই তো দয়াপরবশ হয়ে অধম পাপীকেও অমৃতের অধিকারী করে থাকেন? সেই ডাকার মতোই তাঁকে একবার ডেকে দেখি না! মন্ত্রে তাই প্রার্থনা হচ্ছে ভগবানের কৃপায় সেই অমৃতবারির ধারা আমাদের মস্তকে বর্ষিত হোক; আমরাও অমৃতত্ত্ব লাভ করি ॥ ৩৷৷
চতুর্থ মন্ত্র: শিবেন মা চক্ষুষা পস্যতাপঃ শিবয়া তোপ শত ত্বচং মে। ঘৃততঃ শুচয়ো যাঃ পাবকাস্তা ন আপঃ শং স্যোনা ভবন্তু ॥ ৪ ৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ দেবগণ! মঙ্গলরূপ জ্ঞান-দৃষ্টির সাথে অনুগ্রহাকাঙ্ক্ষী আমার হৃদয়ে উপজিত হোন অর্থাৎ যাতে আমার ইষ্ট লাভ হয়, তা বিহিত করুন। অপিচ, মঙ্গলপ্রদ অর্থাৎ ইষ্টপ্রাপক স্পর্শের দ্বারা আমার হৃদয়কে প্রাপ্ত হোন; (ভাব এই যে, আমার হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বভাব উপজিত হোক)। অমৃতপ্রাপক বিশুদ্ধ পবিত্রকারী যে শুদ্ধসত্ত্ব-রূপ দেবতা, সেই দেবতা আমাদের প্রতি শান্তিপ্রদায়ক এবং মঙ্গলবিধায়ক হোন; (ভাব এই যে, অমৃত-প্রাপক, শুদ্ধসত্ত্বভাব-সমূহ আমাদের পরাশান্তি প্রদান করুক) ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক। মন্ত্রের ভাব সরল ও সহজবোধ্য! হৃদয়ে সত্ত্বভাবের সঞ্চারের নিমিত্ত প্রার্থনাই এই মন্ত্রে পরিদৃষ্ট হয়। এই মন্ত্রের ভাব সূক্তান্তৰ্গত অন্যান্য মন্ত্রের ভাবের সাথে একসূত্রে গ্রথিত। অন্যান্য মন্ত্রে পরোক্ষ প্রার্থনা আছে। কিন্তু এই মন্ত্রে সত্ত্বভাবকে দেবতারূপে গ্রহণ করে তাঁর নিকট প্রত্যক্ষভাবে প্রার্থনা করা হচ্ছে। সেই প্রার্থনার মর্ম এই সূক্তের অন্যান্য মন্ত্রের প্রার্থনার অনুরূপ।–শুদ্ধসত্ত্ব পরম-মঙ্গলবিধায়ক। হৃদয়ে শুদ্ধসত্ত্বের আবির্ভাব হলে মানুষ পরম মঙ্গলের পথে অগ্রসর হয়। সত্ত্বভাবের সাথে জ্ঞান অচ্ছেদ্য সম্বন্ধে আবব্ধ। তাই সত্ত্বভাবের সাথে জ্ঞান-উন্মেষের প্রার্থনা মন্ত্রের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। অমৃত-প্রাপক সত্ত্বভাব আমাদের হৃদয়ে উপজিত হোক, হৃদয় পরাজ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত হোক, এই জ্ঞানের আলোকে আমরা যেন পরম মঙ্গলের পথে অগ্রসর হতে পারি–এইরকম প্রার্থনার ভাবই মন্ত্রের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। পরমমঙ্গল পরাজ্ঞান যে শুদ্ধসত্ত্বের সাথে একসূত্রে গ্রথিত, তা-ই এই মন্ত্রের প্রথমাংশে প্রখ্যাত হয়েছে। দ্বিতীয় অংশের বিষয় পূর্ব মন্ত্রগুলিতে এবং বিশেষভাবে আমাদের এই বঙ্গানুবাদে ব্যক্ত হয়েছে। ৪
বঙ্গানুবাদ –হে অমৃতবিধায়ক শুদ্ধসত্ত্বভাব! সাধকের হৃদয়ে বর্তমান, তুমি স্বভাবতঃ অমৃত সুর হতে উৎপন্ন; আমরা তোমাকে অমৃতত্বলাভের জন্য পরমার্থকামনায় যেন লাভ করতে পারি; তুমি অমৃত (অথবা অমৃতের স্বরূপ) হতে উৎপন্ন। সাধকের হৃদয়ে অথবা ভগবানে বর্তমান তুমি আমাদের অমৃতযুত (ইষ্টসিদ্ধিযুত) করো। প্রার্থনার ভাব এই যে, ভগবান্ হতে সত্ত্বধারা প্রবাহিত হয়; আমরা সত্ত্বভাবের প্রভাবে যেন তা লাভ করতে সমর্থ হই) ॥১।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এই সূক্তের অন্তর্গত মন্ত্রগুলির তিনরকম বিনিয়োগের বিষয় ভাষ্যানুক্রমণিকায় পরিদৃষ্ট হয়। প্রথম–পরিযজ্জকর্ম-সমূহে সভায় প্রবেশের পূর্বে এই সূক্তটি পাঠ করে মধুক নামা বীরুধ ভক্ষণ করবে। দ্বিতীয়,–বিবাহ ইত্যাদি কর্মে এই মন্ত্রে অভিষিক্ত করে রক্তসূত্রের দ্বারা মধুকমণি হস্তাঙ্গুলিতে ধারণ করবে। তৃতীয় বিবাহ ইত্যাদি উপলক্ষে চাতুর্থিকা-কর্ম-সমূহে শয়নকালে মধুমণি পিষ্ট করে এই সূক্তের দ্বারা অভিমন্ত্রণের পর বরবধূ পরস্পর গমন করবে। অশ্বমেধ-যজ্ঞে ব্রহ্মেদ্যবদনেও এই সূক্তের বিনিয়োগ আছে। (অশ্বমেধে ব্রহ্মোদ্যবদনেহপি এতৎ সূক্তং)।অনুক্রমণিকার এই নির্দেশ গ্রহণ করে ভাষ্যকার বীরুৎ পদের অর্থ গ্রহণ করেছেন-মধুকনামা লতা; এবং তার জন্য মধু পদেরও নানারকম অর্থ নিষ্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আমাদের ব্যাখ্যায় আমরা সে অর্থ গ্রহণ করিনি। আমরা পূর্বেই (১কা-৬অ-৪সূ-১ম) প্রদর্শন করেছি যে, বিরুৎ পদে অমরত্ববিধায়ক বস্তুর নির্দেশ করে। সেই অর্থে আমরা এখানে বিরুৎ (বীরুৎ) পদে অমৃতত্ববিধায়ক সত্ত্বভাবকেই লক্ষ্য করে, মধু পদে পূর্বাপরই অমৃত অথবা অমৃতস্বরূপ ভগবান্ অর্থ গ্রহণ করেছি। তার দ্বারা যে অর্থ পাওয়া যায়, তা আমাদের বঙ্গানুবাদে পরিদৃষ্ট হবে।–এই মন্ত্রে সত্ত্বভাবের মহিমা প্রখ্যাপিত হয়েছে। সেই সত্ত্বভাব লাভের প্রার্থনাই মন্ত্রে বিদ্যমান আছে। সত্ত্বভাবই অমৃতত্ত্বের বিধায়ক। সত্ত্বভাবের সাহায্যেই মানুষ ভগবানের সাথে নিজের সংযোগ উপলব্ধি করতে পারে। অমৃতস্বরূপ ভগবান্ হতে সত্ত্বভাব সমুদ্ভূত। ভগবৎ-অঙ্গীভূত সেই সত্ত্বভাবের সাহায্যে মানুষ অমৃতত্ত্ব-লাভে অধিকারী হয়। তাই সেই পরমধন-লাভের উপায়ভূত সত্ত্বভাব-প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা মন্ত্রের মধ্যে ফুটে উঠেছে।–সত্ত্বভাব সর্বত্র সর্বজীবের হৃদয়েই বর্তমান আছে। আধারের প্রকৃতি ও প্রকার ভেদে তার বিকাশের বিভিন্নতা হয় মাত্র। যা সর্বত্র আছে, তা আপন হৃদয়ে ধারণ করবার সামর্থ্য-লাভের জন্য প্রার্থনা ও সাধনার প্রয়োজন। ভগবান্ অমৃতস্বরূপ। তার হতেই অমৃতধারা জগতে প্রবাহিত হয়। সাধকের হৃদয় তার বিশেষ আধার মাত্র। মন্ত্রের প্রার্থনা,-নঃ মধুমতং কৃধি–অর্থাৎ আমাদের মধুযুক্ত করুন। আমরা যেন অমৃতত্ব লাভ করতে পারি, আমরা যেন অমৃত হই। ১।
দ্বিতীয় মন্ত্রঃ জিহ্বায়া অগ্রে মধু মে জিহ্বামূলে মধুলক। মমেদহ ক্ৰতাবসো মম চিত্তমুপায়সি ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –আমার রসনায় অমৃত বর্তমান হোক, বাক্-যন্ত্রে অমৃত বিদ্যমান থাকুক; (ভাব এই যে, আমার সকলরকম প্রার্থনা সর্বদা অমৃতসম্বন্ধি হোক)। হে অমৃতসম্বন্ধি শুদ্ধসত্ত্ব! তুমি আমার সবরকম কর্মে নিশ্চিতরূপে বর্তমান থাকো; অপিচ, তুমি আমার অন্তরকে প্রাপ্ত হও অর্থাৎ হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হও; (ভাব এই যে, আমার সবরকম কর্ম সদাকাল অমৃত-সম্বন্ধি এবং ইষ্টপ্রাপক হোক) ॥ ২
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই মন্ত্রটির প্রচলিত ব্যাখ্যায় রূপকের আভাষ আছে। আমাদের চিত্ত মধুময় হোক, বাক্য মধুময় হোক, আমার বাক্য ও চিত্ত উভয়ই পরমার্থলাভে সদা বিনিযুক্ত থাকুক,–এটাই ব্যাখ্যার সারমর্ম। কিন্তু আমাদের ব্যাখ্যা একটু ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করেছে। আমাদের বাক্য কর্ম চিন্তা সমস্তই অমৃতলাভের জন্য প্রযুক্ত হোক, কায়েন-মনসা-বাচা আমরা অমৃতত্বলাভের জন্য প্রবুদ্ধ হই,আমার বাক্য ও চিত্ত উভয়ই পরমার্থ-লাভে বিনিযুক্ত হোক,–এটাই আমাদের ব্যাখ্যার সারমর্ম। নচেৎ, আমাদের জিহ্বাতে মধু থাকুক অথবা কর্মে মধু বর্তমান থাকুক–এই ব্যাখ্যার কোনও সার্থকতা দেখতে পাওয়া যায় না। আমরা যা বলবো, যা করবো, তা যেন আমাদের অমৃতের সন্ধান দেয়, আমাদের চিন্তা যেন আমাদের অমৃতত্ত্বের পথে নিয়ে যায়। আমাদের সর্বরকম প্রচেষ্টা আমাদের সেই পরম সুখ ও শান্তির পথে নিয়ে যাক, আমরা যেন আমাদের শক্তিকে সবরকমে জীবনের সেই পরম ও চরম উদ্দেশ্য-সাধনে নিযুক্ত করতে সমর্থ হই। ভাষ্যে মধুঁকতে সম্বোধন পদ পরিদৃষ্ট হয়। মন্ত্রের মধ্যে কিন্তু সেরকম কোনও পদের সমাবেশ নেই। জিহ্বাতে মধু ইত্যাদি রসের সমাবেশ থাকলে বাক্য সকলের নিকট মধুর ও সুশ্রাব্য হয়–ভাষ্যকার প্রথমাংশে এই ভাব অধ্যাহার করেছেন। আমরা বলি,-মন্ত্রাংশ আরও উচ্চভাবমূলক। জিহ্বার অগ্রভাগে ও মূলদেশে মধু বর্তমান থাকুক–এই বাক্যে আমরা অন্য ভাব উপলব্ধি করি। আমাদের বাক্য ও কার্য যেন মধুময় হয় অর্থাৎ আমরা কখনও ভুল করেও যেন ভগবানের গুণানুকীর্তন ভিন্ন অন্য কিছু না করি, আমাদের বাক্য সর্বদা যেন আমাদের অমৃতের আধার ভগবানের প্রতি প্রধাবিত করে,–উক্ত বাক্যে আমরা এমনই তাৎপর্য উপলব্ধি করি। ফলতঃ, কায়মনোবাক্যে হরিকথা ভিন্ন যেন অন্য কথা আমাদের রসনায় না আসে। বাক্য হরিময় হোক,–সর্বস্ব শ্রীহরিতে সমর্পণ করে হরিপাদপদ্মে লীন হয়ে যাই, মন্ত্রের প্রতি পদের প্রতি শব্দে এই ভাবেরই পরিস্ফুরণ লক্ষ্য করি। ২।
বঙ্গানুবাদ –আমার ইহজীবন (অথবা ভগবৎসন্নিকর্ষ-লাভের নিমিত্ত আমার অনুষ্ঠান-সমূহ) অমৃতময় (ভগবৎপ্রাপ্তিমূলক) হোক; আমার পরজীবন (ভগবৎসন্নিকর্ষলাভ) অমৃতময় (ভগবৎপ্রীতিসাধক) হোক; বাক্-ইন্দ্রিয়ের দ্বারা যা বলবো, সেই সবই যেন অমৃতলাভ-বিষয়িণী হয় অর্থাৎ আমার বাক্য ভগবৎ-প্রীতিমূলক হোক; আমি যেন (সকলের প্রীতিভূত) অমৃতযুক্ত হই। (ভাব এই যে–আমি যেন কায়মনোবাক্যে সর্বতোভাবে অমৃতত্বলাভে সমর্থ হই ৷৩৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এই মন্ত্রটিও পূর্ব মন্ত্রের ন্যায় অমৃতলাভ-বিষয়ক। এই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় ভাষ্যকারের সাথে আমাদের অনৈক্য ঘটেছে। ভাষ্যকার মধুকলতাকে সম্বোধন করে মন্ত্রের ব্যাখ্যা আরম্ভ করেছেন। কিন্তু আমাদের মতে এখানে মধুকলতাকে টেনে আনবার কোনও প্রয়োজন নেই। মধু শব্দে আমরা সর্বত্রই অমৃত অর্থ গ্রহণ করেছি। এখানেও এই অর্থেরই সুসঙ্গতি দেখতে পাই। নিক্রমণং পদে ইহজীবনং এবং পরায়ণং পদে পরজীবনং অর্থ গ্রহণ করেছি। যা আমাদের নিকটে রয়েছে, যার মধ্যে আমরা রয়েছি, তা আমাদের এই বর্তমানজীবন ইহলোক। আবার এই পরিদৃশ্যমান জগৎ হতে বিদায় গ্রহণ ও করে যখন বহুদূরে–লোকান্তরে–গমন করবো, তখন যে জীবন আরম্ভ হবে, তা এই জগৎ হতে দূরে, তাই পরজীবন। তাই নিক্রমণং এবং পরায়ণং পদ দুটিতে যথাক্রমে ইহজীবন এবং পরজীবন অর্থ সুসঙ্গত বলে মনে হয়। নতুবা নিকট গমন এবং দূরগমন মধুময় হোক,–এই বাক্যের বিশেষ কোনও সার্থকতা দেখতে পাওয়া যায় না। তাই এই মন্ত্রের মধ্যে এই প্রার্থনাই দেখতে পাই–আমার জীবন–ইহকাল ও পরকাল–মধুময় হোক, আমার প্রত্যেক বাক্য অমৃতলাভের বিষয়ভূত প্রার্থনায় পর্যবসিত হোক। আমি যা বলবো, তা-ই যেন আমাকে অমৃতের পথে অগ্রসর করে দেবার উপযোগী হয়। আমি যেন অমৃতের অধিকারী হই। নিক্রমণং এবং পরায়ণং পদ দুটির আর যে সুসঙ্গত অর্থ, তার আভাষ বঙ্গানুবাদে প্রদত্ত হয়েছে। সে মতে নিক্রমণং পদের অর্থ হয়,-ভগবৎ-সন্নিকর্ষলাভায় মম অনুষ্ঠানং। ভাষ্যে ঐ পদের সন্নিহিতার্থে প্রবর্তনং এক অর্থ আছে। কার সন্নিহিতার্থে প্রবর্তন? আত্ম-উৎকর্ষসম্পন্ন ব্যক্তি ভগবানের সন্নিকটে গমনই শ্রেয়ঃ-সাধক বলে মনে করেন। অনুষ্ঠান-সমূহ আপনা-আপনিই ভগবৎপ্রাপ্তিমূলকভাবে যাতে অনুষ্ঠিত হয়, সেই প্রচেষ্টাই তাঁর দেখতে পাওয়া যায়। তার আকাঙ্ক্ষাও সেইরকমই হয়ে থাকে। আবার ভগবানের সন্নিকর্ষ লাভ করেও যাতে তাঁর পরিতৃপ্তি বিধান করতে পারেন, সে আকাঙ্ক্ষাও তাতে দেখতে পাওয়া যায়। পাছে, তার অনুষ্ঠান ভগবানের প্রতিমূলক না হয়, পাছে তিনি পুনরায় তার বিরাগভাজন হয়ে সংসার-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েন, এই আশঙ্কা সর্বদা তার মনে জাগরুক থাকে। তাই ভগবৎসন্নিকর্য লাভেও যাতে ভগবানের প্রীতিসাধন করতে পারেন, তার প্রীতিকর কার্যের অনুষ্ঠানে সমর্থ হন,–সেই সঙ্কল্প মধুমন্মে পরায়ণং পদ দুটিতে প্রকাশ পেয়েছে। আমার কর্ম, আমার মন, আমার বাক্য ভগবানের প্রীতিসাধক হোক, মন্ত্রের এই ভাব প্রকাশ পেয়েছে। আমি যেন এমন কর্ম না করি, যাতে ভগবানের প্রীতি উপজিত না হয়; আমার মনে এমন চিন্তার উদয় না হয়, যার দ্বারা আমি ভগবান্ হতে দূরে সরে পড়ি; আমার রসনা হতে এমন বাক্য যেন নিঃসৃত না হয়, যার সাথে ভগবানের কোনও সম্বন্ধ না থাকে। ফলতঃ, কিবা কার্যে কিবা চিন্তায়, কিবা বাক্যে সর্ববিষয়ে ভগবানের প্রতি উৎপাদন করে তাতে আত্মলীন করবার আকাঙ্ক্ষাই এই মন্ত্রে প্রকাশ পেয়েছে। মানবজীবনের চরম উদ্দেশ্যও তা-ই। ভগবৎ-চরণে আত্মলীন হওয়া, অর্থাৎ অমৃতের সাগরে নিজেকে বিসর্জন দেওয়াই, মানুষের জীবনের পরম আকাঙ্ক্ষণীয় সর্বোত্তম পরিণতি। এই মন্ত্রে সেই পরিণতি লাভের জন্য প্রার্থনা পরিদৃষ্ট হয়। ৩।
বঙ্গানুবাদ— অমৃতলাভে (শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে) আমি যেন অমৃত (সৎ-ভাবসম্পন্ন) হই; অমৃতলাভে আমি যেন অমৃতযুক্ত (সৎ-ভাবসহযুত) হই; মধুযুক্ত বৃক্ষ যেমন মানুষের প্রীতি উৎপাদন করে; সেইরকম হে অমৃতস্বরূপ ভগবন্! সৎ-ভাব-কামনাকারী প্রার্থনাকারী আমাকে কলুষকলঙ্ক-পরিশূন্য সৎ-ভাবসম্পন্ন করে আপনাকে প্রাপ্ত করুন অর্থাৎ আমাকে উদ্ধার করুন। (মন্ত্রটি সঙ্কল্পমূলক। ভাবার্থ-অমৃত লাভ করে আমি যেন অমৃত হয়ে যাই) ৪
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই সূক্তের প্রায় সকল মন্ত্রেরই ভাবধারা একরকম। বিভিন্নরকম শব্দপ্রয়োগের সাহায্যে নানাভাবে এই ভাবের বিকাশ মন্ত্রগুলিতে দেখতে পাওয়া যায়। সেই ভাব–অমৃত-লাভের প্রার্থনা।
এই মন্ত্রের মধ্যে অতিশয়-অর্থে তরপ প্রত্যয়ের ব্যবহার সম্বন্ধে একটু আলোচনা করা প্রয়োজন। আমি মধু সুদ হতে মধুতর হবো–এ কথার অর্থ কি? জগতের সকল সামগ্রীর মধ্যেই অমৃতের বীজ নিহিত আছে। সাধনার ফলে; ভগবানের কৃপায় তা-ই বিকশিত হয়ে মানুষকে পূর্ণত্ব প্রদান করে–অমৃতময় করে। এই বীজ-অবস্থা হতে বিকশিত অবস্থায়–পূর্ণত্বের অবস্থায়–যাবার প্রার্থনাই এই মন্ত্রের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। ক্ষুদ্রত্ব হতে মহত্ত্বে যাবার, মৃত্যুর পথ হতে অমৃতে যাবার যে অমৃতবীজ মানুষের মধ্যে আছে, তাকে পূর্ণভাবে ফুটিয়ে তোলবার জন্য প্রার্থনাই এই মন্ত্রের মধ্যে প্রাপ্ত হই। ভাষ্যকার এই মন্ত্রেও মধুঁকতে সম্বোধন পদ অধ্যাহার করে যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা আমরা গ্রহণ করতে পারিনি। সাধারণ মধুকলতার দ্বারা মানুষ কিভাবে মধুময় হতে পারে তা বোধগম্য হওয়া সুকঠিন। পরন্তু, নিত্যসত্য বেদমন্ত্রের সাথে অনিত্য লতার সম্বন্ধ টেনে এনে, বেদের নিত্যত্বেই বা বিঘ্ন ঘটাবার প্রয়োজন কি? আমরা মনে করি, বেদের মন্ত্রের সাথে পার্থিব কোনও সামগ্রীরই সম্বন্ধ বিদ্যমান নেই। অপিচ, নিত্যসত্য বেদের মধ্যে সেই সাধারণ অর্থ অপেক্ষা অনেক উচ্চ নিগূঢ় ভাব নিহিত আছে বলেই আমরা মনে করি। সেই ভাব–অমৃতলাভের প্রার্থনা–যা বেদের অন্যত্র মৃত্যুৰ্মো অমৃতং গময় প্রার্থনায় ধ্বনিত হয়ে উঠেছে। আমরা সেই ভাবধারারই অনুসরণ করবার প্রয়াস পেয়েছি। ৪
বঙ্গানুবাদ –হে ভগবন্! সর্বত্ৰব্যাপকমধুরত্বহেতু লোকে যেমন ইক্ষু কামনা করে, আমি সেইভাবে আপনাকে সম্যভাবে প্রাপ্ত হবার জন্য প্রার্থনা করি; কাময়মানা পতিপরায়ণা পত্নী যেমন আপন পতিকেই কামনা করে, আপনি আমার প্রতি সেইরকম অনুরাগসম্পন্ন হোন, অর্থাৎ আপনি যেন আমাদের পরিত্যাগ না করেন; অপিচ, হে ভগবন্! যাতে আমাকে পরিত্যাগ না করেন, সেইরকম বিহিত করুন। (মন্ত্রটি প্রার্থনামূলক; সর্বতোভাবে আমি যাতে ভগবৎপরায়ণ হতে পারি, হে ভগবন্! সেইরকম বিহিত করুন) ৷ ৫৷৷
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— এ মন্ত্রটি অত্যন্ত জটিলতাসম্পন্ন। ভাষ্যকার সম্বোধনে হে জায়ে পদ অধ্যাহার করে ব্যাখ্যা আরম্ভ করেছেন। (হে জায়ে ত্বা ত্বাং পরিত্যুনা পরিতেন সর্বতোব্যাপেন–ইত্যাদি)। কিন্তু জায়া পদ অধ্যাহার করলেও অর্থ খুব পরিষ্কার ও সুসঙ্গত হয়নি। বিশেষতঃ ভাষ্যকার যে অর্থের কল্পনা করেছেন, সেই অর্থে একটি লৌকিক বিষয়ের নির্দেশ করে মাত্র। তথাপি ব্যাখ্যাতে পরিততুনা ইক্ষুণা পদ দুটির বিশেষ সার্থকতা থাকেনি। এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা সম্বন্ধে আমাদের ধারণা স্বতন্ত্র। আমরা মনে করি, এই মন্ত্র বর্তমান সূক্তের অন্তর্গত অন্যান্য মন্ত্রের মতোই অমৃতস্বরূপ ভগবানকেই লক্ষ্য করে। সর্বতোভাবে অমৃতত্বলাভের জন্য প্রার্থনা এই মন্ত্রে আছে। পত্নী যেমন পতির সাথে মিলিত হন, তিনি যেমন তার প্রতি অনুরাগ-সম্পন্ন অপিচ তারা যেমন পরস্পর একাত্মতা লাভ করেন; সেইরকম অবিচ্ছিন্নভাবে অমৃতলাভের জন্য এই স্থলে প্রার্থনা করা হয়েছে। আমরা যেন অমৃত হতে পারি, আমাদের জীবন যেন অমৃতময় হয়, আমরা যেন কখনও অমৃত হতে বিচ্ছিন্ন না হই। আমরা যেন পরিপূর্ণ অমৃতের পথে অগ্রসর হয়ে জীবন = সার্থক করতে পারি। এইরকম প্রার্থনাই মন্ত্রের মধ্যে নিহিত আছে। ৫৷৷
বঙ্গানুবাদ –আত্মশক্তিশালী শোভনান্তঃকরণবিশিষ্ট সৎ-ভাবসম্পন্ন ব্যক্তিগণ রিপুজয়ের নিমিত্ত যে সকর্মসাধন-সামর্থ্য-রূপ শুদ্ধসত্ত্ব হৃদয়ে সঞ্চয় করেন; হে মোক্ষকামী আত্মা (আমি)! তোমার মঙ্গলকামনায় শুদ্ধসত্ত্বরূপ প্রসিদ্ধ সেই রত্ন, সাধনশক্তি লাভের জন্য, আত্মশক্তির উন্মেষণের নিমিত্ত, অনন্তশক্তি লাভের জন্য এবং অনন্তজীবন প্রাপ্তির নিমিত্ত আমি যেন ধারণ করতে সমর্থ হই। (মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক। ভাব এই যে,-শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে আমি যেন সৎকর্ম সাধনের সামর্থ্য লাভ করতে পারি) ॥ ১
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –এই সূক্তের অন্তর্গত মন্ত্রগুলির নানারকম বিনিয়োগ দৃষ্ট হয়। ভাষ্যকার সেই বিনিয়োগের অনুসরণ করে মন্ত্রগুলির ব্যাখ্যা করেছেন। সূক্তানুক্রমণিকায় প্রকাশ,–সকল রকম সম্পঙ্কর্মে, আয়ুষ্কামনায়, উপনয়নে এবং অলঙ্কারধারণ প্রভৃতি কর্মে এই মন্ত্রগুলি প্রযুক্ত হয়ে থাকে। ভাষ্যকার সেই অনুসারেই হিরণ্যং প্রভৃতি পদের অর্থ করেছেন। মন্ত্রের লৌকিক প্রয়োগ যে ভাবেই নিষ্পন্ন হোক, সেই সম্বন্ধে আমাদের বক্তব্য নেই; তার বিরুদ্ধে মতও আমরা প্রকাশ করছি না। তবে তার অতিরিক্ত আধ্যাত্মিক প্রয়োগের বিষয়ে ঐ পদের অর্থ সম্বন্ধে আমরা সেই বিষয়ে ভাষ্যকারের সাথে একমত হতে পারিনি। আমাদের মতে হিরণ্যং পদে হিতরমণীয় রত্নকেই বোঝায় সত্য; কিন্তু সেই হিতরমণীয় রত্ন কি? যা শ্রেয়ঃ ও প্রেয় উভয়ই, যা মানুষকে পরমানন্দের পথে নিয়ে যায়, অথচ যা মানুষের প্রিয়, সেই বস্তু শুদ্ধসত্ত্ব বা সৎকর্ম-সাধন-সামর্থ্য। সৎকর্মের দ্বারাই মানুষ স্বয়ং নিজের এবং অন্যের প্রকৃত হিতসাধন করতে পারে। পরিণামে শুদ্ধসত্ত্ব–সকর্মই মানুষের প্রিয় বলে বিবেচিত হয়। তাই হিরণ্যং পদে আমরা শুদ্ধসত্ত্বকে বা সকর্ম-সাধন-সামর্থ্যকেই লক্ষ্য করেছি।–অনীক পদে সংগ্রাম, রিপুসংগ্রাম বোঝায়। তাই শতনীকায় পদে রিপুজয়ায় অর্থ গ্রহণ করেছি। শতানীকায় অর্থাৎ বহু শত্রু জয়ের নিমিত্ত। মানুষের শত্রুর অন্ত নেই। অন্তঃশত্রু বহিঃশত্রু-নানা শত্রুর আক্রমণে মানুষ অহরহ বিপর্যস্ত হয়ে আছে। সেই সকল শত্রুজয়ের আকাঙ্ক্ষাই ঐ পদে প্রকাশ পেয়েছে। সৎকর্মের দ্বারা শুদ্ধসত্ত্বের উন্মেষণে চিত্তবৃত্তি নির্মল হলে মানুষ রিপুজয়ে সমর্থ হয়। সৎকর্মের সাহায্যে মানুষ অনন্ত জীবন লাভ করতে পারে। কীর্ত্যিস্য সঃ জীবতি। সৎকর্মের সাধনেই মানুষ চিরজীবী হয়ে থাকে। সদ্ভাবের প্রভাবেই মানুষ সৎকর্মসাধনে সমর্থ হয়। সাধকগণ সেই সঙ্কর্মের দ্বারা নিজেদের জীবনকে উন্নত ও পবিত্র করেন। মন্ত্রের মধ্যে এই প্রার্থনাই আমরা দেখতে পাই।–শতশারদায় পদে ভাষ্যকার অর্থ করেছেন,–শতসংবৎসর জীবনায়। এই পদের দ্বারা মানুষের আয়ুর পরিমাণ নির্ধারিত হয়েছে বলে ভাষ্যকারের ধারণা। কিন্তু শত শব্দ যে বহুসংখ্যা ॥ বোঝাতে–অনন্ত পরিমাণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, তা আমরা বহুবার লক্ষ্য করেছি। এখানেও শত শব্দ অনন্ত অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে করি। সকর্ম-সাধনের দ্বারা অনন্ত-জীবন লাভ হয়। তাই সেই অনন্ত-জীবন-লাভের সাধনভূত সৎকর্ম-সাধন-সামর্থ্য প্রাপ্তির কামনা মন্ত্রে ফুটে উঠেছে। প্রচলিত ব্যাখ্যানুসারে শতশারদায় পদে প্রাচীন ভারতের মানুষের আয়ু-সম্বন্ধে পণ্ডিতগণের এই অদ্ভুত ধারণার পরিচয় পাওয়া যায়। সেই অনুসারে মানুষের আয়ু শতবর্ষ নির্দিষ্ট হয়। ঋগ্বেদেরও বহু স্থলে এই তথ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। পঞ্চাশ ষাট হাজার বর্ষজীবী মানুষের উপাখ্যান পরবর্তীকালের কল্পনা। অবশ্য, বর্ষ শব্দে বহু ক্ষেত্রে দিন বা মাসও কল্পিত হতো। কিন্তু এইস্থলের মতো প্রায় প্রতি স্থলেই শতবর্ষ, সহস্রবর্ষ ইত্যাদি পদের দ্বারা বহু বা অপরিমিত বর্ষই সূচিত হয় ও হতো ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –শুদ্ধসত্ত্বরূপ সৎকর্মসাধনসামর্থ্য সকলের আদিভূত। শুদ্ধসত্ত্বই দিব্যশক্তি প্রদান করে। শুদ্ধসত্ত্বকে রিপুগণ অভিভব করতে পারে না; (ভাব এই যে,–শুদ্ধসত্ত্বের বা সৎকর্মসাধনের দ্বারা রিপুজয় হয়); যে আত্মশক্তিসাধক শুদ্ধসত্ত্বরূপ সৎকর্মসাধন-সামর্থ্য প্রাপ্ত হন, তিনি প্রাণি-সমূহের মধ্যে অনন্ত জীবন লাভ করেন; (মন্ত্রটি নিত্যসত্য-প্রকাশক। ভাবার্থ–শুদ্ধসত্ত্বই সকলের মূলীভূত। শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে মানুষ সকর্মের সাধন-সামর্থ্য এবং অনন্তজীবন-লাভে সমর্থ হয়) ॥ ২॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা— শুদ্ধসত্ত্বের প্রভাবে সৎকর্ম-সাধনের দ্বারাই মানুষ মুক্তির পথে অগ্রসর হতে পারে। সৎ-ভাবের দ্বারা চিত্ত নির্মল হয়, মনোবৃত্তি ঊর্ধ্বগামী হয়ে থাকে। মুক্তিলাভের নানারকম উপায়ের মধ্যে হৃদয়ে সৎ-ভাবের সঞ্চয় এবং সৎকর্মের সাধনই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সহজ উপায়। অন্তরের সৎ-বৃত্তিরাজি সৎকর্মের সাধনায় বিকশিত হয়ে থাকে। সৎকর্মের সাধনার দ্বারা হৃদয় মন উপযুক্তভাবে গঠিত হলে ভক্তি-জ্ঞানের সঞ্চার হয়। তাই সৎকর্মকে প্রথম সাধনোপায় বলা হয়েছে। অবশ্য সাধকভেদে প্রথমে জ্ঞান ও ভক্তিরও আবির্ভাব হতে পারে; কিন্তু তথাপি তার সঙ্গে কর্ম কোন-না-কোনও আকারে বর্তমান থাকে।–সৎকর্মের প্রভাবে শুদ্ধসত্ত্বের উন্মেষে রিপুগণ পরাজিত হয়। সুতরাং মানুষ অনায়াসেই তার চরম পরিণতির দিকে অগ্রসর হতে পারে। অনন্তজীবন-লাভের পথে মানুষের সর্বপ্রধান বিঘ্ন–রিপুশত্রুগণ। রিপুগণই মানুষকে তার গন্তব্য পথ হতে বিচ্যুত করে দেয়। কর্মের প্রভাবে রিপুগণ পরাজিত হলে ঊর্ধ্বগতি সহজ ও সুগম হয়;–পরিণামে মানুষ পূর্ণত্ব লাভ করে। তাই সৎ-ভাবসম্পন্ন সকর্ম-সাধক অনন্তজীবন লাভ করতে পারেন। ভাষ্যকার রক্ষাংসি পিশাচাঃ প্রভৃতি পদে রাক্ষস পিশাচ প্রভৃতি কল্পনা করেছেন এবং পিশাচ পদের জ্বর ইত্যাদি উপদ্রব অর্থ করেছেন। যাস্কের মত অনুসারে রক্ষ পদের অর্থ– যা হতে রক্ষা করতে হবে। আমরাও এই অর্থ সঙ্গত বলে মনে করি। কিন্তু রাক্ষস পিশাচ প্রভৃতি কোনরকম অদ্ভুত দেহধারী জীব আছে বলে মনে করি না। আমাদের অন্তরস্থায়ী রিপুগণ হতেই আমাদের নির্মল সত্তাকে রক্ষা করতে হবে। তারাই প্রকৃত রাক্ষস। পিশাচ শব্দেও আমরা এই ভাব গ্রহণ করি। আমাদের অন্তরস্থ রিপুরূপ রাক্ষস পিশাচ প্রভৃতি হতে আত্মরক্ষা করাই এখানকার উদ্দেশ্য। প্রচলিত ব্যাখ্যা হতে রাক্ষস পিশাচ প্রভৃতি অদ্ভুত জীবগণের আভাষ পাওয়া যায়; এবং এটাও অনুমান করা হয় যে, সেই সকল নরহিংসাকারী জীবগণ হতে রক্ষা পাবার জন্য প্রাচীনগণ নানারকম মন্ত্রপূত মাদুলী ও রত্ন প্রভৃতি। ধারণ করতেন। কিন্তু মন্ত্রের প্রয়োগ যা-ই হোক, মন্ত্রের লৌকিক প্রয়োগ যে ভাবেই নিষ্পন্ন হোক, সে বিষয়ে অমাদের কোনই বক্তব্য নেই। আমরা তার অতিরিক্ত অন্য যে উচ্চভাব মন্ত্রের মধ্যে দেখতে পাই, আমাদের বঙ্গানুবাদে তা-ই প্রকাশ করেছি। এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় বিশদীকৃত করা আবশ্যক মনে করি। শুদ্ধসত্ত্ব ও সঙ্কর্ম–এই উভয়ের মধ্যে কোটি মূল, তা নিয়ে অনেক সময় বিতণ্ডার উদয় হয়। বীজ বা বৃক্ষ-কোটি কোটির মূল, তা যেমন নির্দেশ করা দুরূহ, সৎ-ভাব ও সৎকর্ম সম্বন্ধেও সেইরকম। সৎকর্ম ভিন্ন সৎ-ভাবের উদয় হয় না; আবার সৎ-ভাব উন্মোষিত না হলে, সৎ-অসৎ বিচারশক্তি জন্মে না। অনেকে কর্মের প্রাধান্য খ্যাপন করেন, অনেকে আবার সৎ-ভাবকেই মূলীভূত বলে নির্দেশ করেন। তবে উভয়ই যে পরস্পর অভিন্ন সম্বন্ধ-বিশিষ্ট, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমরা সেই দৃষ্টিতেই অর্থ নিষ্পন্ন করেছি। ২।
তৃতীয় মন্ত্রঃ অপাং তেজো জ্যোতিরোজো বলং চ বনস্পতীনামুত বীর্যাণি। ইন্দ্র ইবেন্দ্ৰিয়াণ্যধি ধারয়ামো অস্মিন তদ। দক্ষমাণণা বিভরদ্ধিরণ্যম ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –শুদ্ধসত্ত্বসম্বন্ধি তেজঃশক্তি, জ্ঞানালোক, বীর্য, শক্তি এবং আত্মশক্তি সম্পন্নগণের শক্তি-সামর্থ্য, আমি যেন প্রাপ্ত হই; অপিচ ইন্দ্রশক্তিতুল্য মহাশক্তি আমি যেন ধারণ করতে সমর্থ হই। প্রসিদ্ধ সেই শুদ্ধসত্ত্বরূপ সৎকর্মসাধনসামর্থ্য আমাতে উপজিত হোক। (ভাব এই যে,আমি যেন আত্মশক্তিসম্পন্ন হই এবং সৎকর্ম-সাধনের সামর্থ্য লাভ করতে পারি) ॥ ৩॥
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –মানুষের মধ্যেই অনন্ত উন্নতির বীজ নিহিত আছে। সাধনার দ্বারা ভগবৎ-কৃপায় সেই শক্তিকে জাগরিত করতে পারলে জীবই শিব হয়ে ওঠে। ভগবানের করুণা-ধারা সমভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। যাঁরা নিজেদের মধ্যে সেই করুণাধারা ধারণ করবার উপযুক্ত শক্তির বিকাশ করতে পারেন, তাঁরাই তা লাভ করেন। তাদের হৃদয়ে আপনা-আপনি শুদ্ধসত্ত্বের বিকাশ হয়। আবার উপযুক্ত ধারণা-শক্তি না জন্মালে, ভগবানের কোনও দানই স্থায়ী হয় না; তাই আত্মশক্তি-লাভের জন্য এই প্রার্থনা। আত্মশক্তি লাভ করলে মানুষ সহজেই নিজের গন্তব্য-পথে চলতে পারে। প্রচলিত ব্যাখ্যার সাথে আমাদের ব্যাখ্যার মিল নেই। তবে এই মন্ত্রের লৌকিক বিনিয়োগের ব্যাপারে আমাদের স্বীকৃতি আছে ৷ ৩৷৷
চতুর্থ মন্ত্রঃ সমানাং মাসামৃতুভিষ্টা বয়ং সংবৎসরস্য। পয়সা পিপর্মি। ইন্দ্রাগ্নী বিশ্বে দেবাস্তেইনু মনস্তামহৃণীয়মানাঃ ॥৪॥
বঙ্গানুবাদ –হে আমার মন! বৎসরের দ্বারা, মাসপরিমাণ কালের দ্বারা এবং ঋতুসমূহের দ্বারা পরিগণিত নিত্যকাল তোমাকে শুদ্ধসত্ত্বের দ্বারা যেন আমি পূর্ণ করতে পারি; (ভাব এই যে, নিত্যকাল যেন আমি শুদ্ধসত্ত্বভাবে পূর্ণ হই); বলৈশ্বর্যাধিপতি জ্ঞানদেব প্রমুখ সকল দেবতা প্রসন্ন হয়ে তোমার মঙ্গল বিধান করুন; (ভাব এই যে, আমি যেন সকল দেবভাব লাভ করতে পারি) ॥ ৪।
মন্ত্ৰার্থ–আলোচনা –ভাষ্যকারের মতে এই মন্ত্রের অর্থ দাঁড়ায় এই,মাস ঋতু প্রভৃতির দ্বারা পরিগণিত সম্বৎসর আমি তোমাকে গোধন ধান্য ইত্যাদির দ্বারা পূর্ণ করবো; ইন্দ্রাগ্নি প্রভৃতি বিশ্বদেবগণ অক্রোধ হয়ে তোমাকে অঙ্গীকার করুন। আমাদের মতে, গোধন ধান্যের কোনও প্রসঙ্গ মন্ত্রে নেই। পয়সা পদে আমরা শুদ্ধসত্ত্ব অর্থ গ্রহণ করেছি। মন্ত্রটি আত্ম-উদ্বোধনমূলক। হৃদয়কে শুদ্ধসত্ত্বে পূর্ণ করবার জন্য প্রচেষ্টা এই মন্ত্রের মধ্যে পরিদৃষ্ট হয়। সকল দেবগণের আশীর্বাদ প্রার্থনাও এই মন্ত্রের মধ্যে আছে। সকল দেবতা আমার প্রতি প্রসন্ন হোন, সকলের মঙ্গল আশীর্বাদ আমার মস্তকে বর্ষিত হোক। সকলের অনুকম্পায়। অমি যেন জীবনের চরম সার্থকতা লাভ করতে পারি। এই ভাবের প্রার্থনাই মন্ত্রে দেখতে পাওয়া যায়। দেবতার কৃপাতেই হৃদয়ে দেবভাবের, শুদ্ধসত্ত্বের বিকাশ সম্ভবপর হয়। তাই মন্ত্রে হৃদয়ে সত্ত্বভাবের উদ্বোধনের প্রার্থনাও করা হয়েছে। ৪।
বঙ্গানুবাদ –সত্য জ্ঞান ইত্যাদি লক্ষণসম্পন্ন পরব্রহ্মে সম্পূর্ণ বিশ্ব লীন হয়ে আছে; এই হেন ব্রহ্মকে বেন (সূর্য) দেখেছিলেন। এই ভৌতিক জগতে অভিন্ন এবং সর্বশক্তিযুক্ত হওয়ায় তাঁকে (পরব্রহ্মকে) তিনি (বেন) সূর্যের রূপে এবং নামে প্রকট করেছিলেন। তবেই উৎপন্ন প্রজাগণ সেই সূর্যকে জ্ঞাত হয় এবং সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে স্তব করে থাকে৷৷ ১।
রশ্মিবন্ত সূর্য হৃদয়-গুহায় স্থিত সেই ব্রহ্মকে আরাধকবৃন্দের নিকট বর্ণনা করুন। এই ব্রহ্মের তিন পাদ গুহায় স্থিত আছে, অর্থাৎ সাধারণ দৃষ্টি অথবা জ্ঞানের অন্তরালে অবস্থিত। সেই ব্রহ্মের জ্ঞান কেবল সত্য উপদেশের দ্বারাই লব্ধ হতে পারে৷৷ ২৷
সেই সূর্যাত্মক ব্ৰহ্ম (পরমাত্মা) আমাদের পোষক পিতা হন, তিনি আমাদের উৎপন্নকর্তা, তিনিই আমাদের ভ্রাতা ইত্যাদি। তিনিই আমাদের কর্মফলরূপ স্বর্গ ইত্যাদির জ্ঞাতা। সকল লোককে তিনি জ্ঞাতশীল। যে পরব্রহ্মকে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি ইন্দ্র, অগ্নি ইত্যাদি নামে লোকে প্রকট হয়ে থাকেন ৷৷ ৩৷
আমি আকাশ পৃথিবী এবং সম্পূর্ণ বিশ্বকে তত্ত্বজ্ঞানের দ্বারা প্রাপ্তি সম্পন্ন করেছি। সত্য ব্রহ্ম দ্বারা প্রথম উৎপন্ন সূত্ৰাত্মা যেমন সংসারকে ব্যাপ্ত করে স্থিত থাকে, সেইরকমেই আমি স্থিত হয়েছি। বক্তার মধ্যে স্থিত বাণীর প্রযুক্ত হওয়া মাত্রই যেমন সকল। জ্ঞান প্রকাশ পায় (জাত হয়), তেমনই তত্ত্বজ্ঞান প্রকট হতেই আমি সেই সব কিছুই প্রাপ্ত হয়ে গেছি। ৪।
ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতা যে কারণভূত ব্রহ্মে লীন হয়ে যান এবং যে ব্রহ্মের বৃত্তিসমূহের দ্বারা সাক্ষাৎ হওয়ার পরমানন্দ ভোগ প্রাপ্ত হয়ে ইন্দ্রিয়সমূহ ব্রহ্মে মগ্ন হয়ে যায়, সেই ব্রহ্মের। দর্শনার্থ আমি জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে বিভিন্ন লোকে অনেক বার ভ্রমণ সম্পন্ন করেছি। ৫।
টীকা –দেবভাষায় বিরচিত উপরোক্ত সূক্তস্য বিনিয়োগঃ অংশে সায়ণাচার্যের বক্তব্য অনুসারে পরমং ধাম নামে প্রসিদ্ধ এই সূক্তের মন্ত্রগুলি নানারকম কর্মে, যথা,-অভিমত ফলসিদ্ধি বা অসিদ্ধি জানার জন্য বিনিয়োগ হয়ে থাকে। এর জন্য করণীয় সম্পর্কে তাঁর নির্দেশ এই যে, পাঁচটি পর্বযুক্ত একটি বংশদণ্ড (বেণুদণ্ড) কাম্পীলবৃক্ষ-শাখা বা যুগকে মন্ত্রপূত করে অভিমত কার্য বা উদ্দেশ্য স্মরণ (চিন্তা) পূর্বক সমতল স্থানে ঊধ্বদিকে ধারণ করণীয়। যদি দণ্ড ইত্যাদি চিন্তিত দিকে নিপতিত হয়, তবে কার্যসিদ্ধি, বিপর্যয়ে অসিদ্ধি, জানা যাবে। এই মন্ত্রের দ্বারা নষ্টদ্রব্য সম্পর্কে সম্যক সন্ধান জ্ঞাত হওয়া যায়। এই মন্ত্রের দ্বারা কুমারী কন্যার বিবাহের পর সৌভাগ্য ইত্যাদি সম্পর্কে ভবিতব্য জানা যায়।–এই প্রথম সূক্তের প্রথম মন্ত্রে বেন অর্থে আদিত্য বলা হয়েছে। গুহারূপে সর্বপ্রাণিহৃদয়ে সুতি-অন্তর প্রসিদ্ধ সত্যজ্ঞান ইত্যাদি পরম ব্রহ্মকে লক্ষ্য করা হয়েছে। এবং উক্তলক্ষণঃ সর্বজ্ঞ আদিত্যঃ শুভাশুভবিজ্ঞানং করোতু ইতি বিজ্ঞানকর্মণ সম্বন্ধঃ। (২কা, ১অ ১.সূ)।
বঙ্গানুবাদ –দিব্য জল (বা রশ্মির) এবং শক্তিসমূহের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন সূর্য (গন্ধর্ব) বর্ষা ইত্যাদির দ্বারা পুষ্ট করার কারণে পৃথিবী ইত্যাদি লোকসমূহের স্বামী হন এবং তিনি প্রাণিসমূহকেও পুষ্টকরণশালী হয়ে থাকেন। তিনি প্রজাগণের নিমিত্ত স্তুত্য (পূজনীয়)। হে গন্ধর্ব সূর্য! আমি তোমাকে পরব্রহ্ম ভাবে (রূপে) মান্য (বা স্বীকার) করছি; এবং হবিঃ প্রদান পূর্বক নমস্কার করছি ৷ ১৷৷ যে গন্ধর্ব আকাশে স্থিত, সূর্যরূপ অপেক্ষাও তেজস্বী, লোকজগতের স্বামী, দেববর্গের ক্রোধ (বা আক্রোশ) দূরীকরণশালী এবং সুখদাতা, তিনি আমাদের সুখ প্রদান করুন। ২। সুন্দর রূপসম্পন্না রশ্মিরূপা অপ্সরাগণ অপেক্ষা সূর্যরূপ গন্ধর্ব সুসংগত হয়েছেন। এই অপ্সরাবৃন্দের স্থান সমুদ্রোপ নামক সূর্যই হন। বিদ্বানগণ বলে থাকেন, সূর্যোদয় কালে সূর্য হতেই রশ্মিসমূহ বহির্গত হয়, আবার অস্তকালে তাতেই লীন হয়ে যায়। ৩ ৷৷ হে নক্ষত্র রূপা রশ্মিসকল! তোমরা তোমাদের অপেক্ষা যে সম্পূর্ণ ঐশ্বর্যশালী চন্দ্রমার সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকে, সেই হেন রূপসম্পন্ন তোমাদের আমি নমস্কারযুক্ত হবিঃ প্রদান করছি। ৪। উপদ্রবের দ্বারা মনুষ্যগণকে রোদন-করণশালিনী, মোহে নিমগ্নকারিণী, গ্লানির কারণস্বরূপা গন্ধর্বপত্নী অপ্সরাগণকে নমস্কার পূর্বক হবিঃ প্রদান করছি। ৫।
টীকা— ভূবনপতিসূক্ত নামে প্রসিদ্ধ এই সূক্তের মন্ত্রগুলি মাতৃনামগণে পঠিত। গন্ধর্ব, রাক্ষস, অপ্সরা, ভূত, গ্রহ ইত্যাদির শান্তিকরণে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। উপরোক্ত সূক্তস্য বিনিয়োগঃ অংশে প্রয়োগবিধি দেওয়া হয়েছে। গ্রহজ্ঞে, মহাশান্তিকর্মে এর প্রয়োগ হয়। অশ্বমেধ যজ্ঞে এই ঋকাবলীর দ্বারা অনুমন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। (২কা, ১অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –যে মুঞ্জ ব্যাধি হরণশীল, শ্রেষ্ঠ পর্বত হতে উত্তরণশীল, তার অগ্রভাগ হতে ঔষধ প্রস্তুত করি। হে মুঞ্জ! তোমাকে পরম বীর্যযুক্ত ঔষধিরূপে প্রস্তুত করে ব্যাধি দূর করার নিমিত্ত প্রযুক্ত করছি। ১।
হে ঔষধি! তুমি প্রযুক্ত হওয়া মাত্রই রোগকে বিনষ্ট করো; অতিসার ইত্যাদি রোগের বিনাশ সাধন করো। হে ঔষধি! তুমি আপন সজাতীয় ওষধি সমূহের মধ্যে উৎকৃষ্ট; তুমি অতিসার, অতিমূত্র এবং নাড়ীব্রণের নাশকরণে সম্পূর্ণভাবে সমর্থ ॥ ২॥
প্রাণনাশক অসুর এবং দেহপাত করণশীল ব্যাধিসমূহ এই ব্রণের মুখ (বা অগ্রভাগ) দিয়ে (দেহে) ব্যাপ্ত হচ্ছে। পরন্তু এই মুঞ্জ নামক ঔষধি স্রাবকে নিবর্তনশীল তথা অতিসার ইত্যাদি রোগকে নষ্টকরণশালী ৷৷ ৩৷৷
ভূমিগত জলরাশি হতে রোগনাশিনী ঔষধিরূপ মৃত্তিকা উপরে আগত হচ্ছে; এই বল্মীক-মৃত্তিকা (বা ক্ষেতের মৃত্তিকা) ব্রণকে পাক-করণশালী এবং অতিসার ইত্যাদি রোগসমূহকে সমূলে বিনাশ করে। থাকে ॥ ৫॥
ভেষজের নিমিত্ত প্রয়োগকৃত জল আমাদের রোগসমূহের প্রশমনকারী ও সুখদায়ক হয়। রোগ-উৎপাদক কারণসমূহকে ইন্দ্রের বজ্র বিনাশ করুক। রাক্ষসদের দ্বারা মনুষ্যগণের উপর। নিক্ষিপ্ত রোগরূপ আয়ুধ (বা বাণসকল) অন্যত্র (দূরে) গমন পূর্বক পতিত হোক৷ ৬ ৷৷
টীকা –বলা হয়েছে, এই সূক্তে পর্বত শব্দের দ্বারা মুঞ্জবান নামক পর্বত বিবক্ষিত। সূক্তস্য বিনিয়োগঃ অংশে দেখা যাচ্ছে, এই সূক্তের মন্ত্রগুলি জ্বরাতিসার, অতিমূত্র, নাড়ীব্রণ ইত্যাদি রোগের না উপশান্তির নিমিত্ত প্রযুক্ত হয়। এই মন্ত্রের দ্বারা মুগ্ধশিরনির্মিত রঞ্জুর বন্ধন করণীয় বা ক্ষেত্ৰমৃত্তিকা ইত্যাদির প্রলেপ প্রদেয়। ইত্যাদি।(২কা, ১অ. ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –আমরা দীর্ঘজীবী; তার নিমিত্ত হিংসাত্মক কর্মসমূহ হতে নিজেদের সদা রক্ষা করতে, রাক্ষসদের বেগকে অবরুদ্ধ করতে এবং শরীরকে সুখশালী করবার উদ্দেশে ব্যাধি দূরীকরণশালী জঙ্গিড় নামক বৃক্ষ নির্মিত মণি বন্ধন (ধারণ) করছি ॥১॥
এই জঙ্গিড়মণি হিংসক কৃত্যা, রাক্ষসগণের চর্বণ (কামড়) হতে শরীরকে খণ্ড বিখণ্ডিত হওয়া হতে রক্ষা করতে সমর্থ। এটি সকল দিক হতে আমাদের সুরক্ষা করুক ॥২॥
এই মণি অপরের দ্বারা প্রেরিত উপদ্রবসমূহের মোকাবিলা করে থাকে এবং কৃত্যা ইত্যাদিকে নাশ করে থাকে। সমস্ত রোগকে শান্তকরণশালী ঔষধি রূপ এই মণি আমাদের পাপ হতে রক্ষা করুক ॥৩॥ অগ্নি ইত্যাদি দেবতাগণের দ্বারা প্রদত্ত সুখ-উৎপাদক জঙ্গিড়মণির সাহায্যে আমরা বিঘুরাশিকে, ভূত, প্রেত, পিশাচ এবং অসুরগণকে তাদের সঞ্চরণ স্থানেই নিবারণ করবো॥৪॥
মণি-বন্ধক সূত্র-রূপ শণ এবং জঙ্গিড় আমাকে সকল দিক হতে রক্ষাকরণশালী হোক। এইগুলি হতে একটি শণ কৃষির রস (সার) হতে এবং জঙ্গিড় জঙ্গল, হতে আনীত হয়েছে। এই রকমে প্রাপ্ত এই দুটি আমাদের বিঘ্ন ইত্যাদি হতে রক্ষা করুক ॥৫॥
অন্যজনের দ্বারা অভিচার হতে উৎপন্ন পীড়াদায়িনী কৃত্যাকে এই মণি দূর করে থাকে। এটি বলবতী, শত্রুকে পরাভব-করণশালী। এই জঙ্গিড় মণি আমাদের আয়ুকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত করুক ॥ ৬ ॥
টীকা –দীর্ঘায়ু অর্থাৎ চিরকাল জীবন লাভের নিমিত্ত, কৃত্যা-দূষণার্থের জন্য, আত্মরক্ষার্থে ও বিঘ্নশমনার্থে জঙ্গিড় নামক বৃক্ষ বিশেষের দ্বারা নির্মিত মনি শণসূত্রে অভিমন্ত্রিত পূর্বক ধারণ কর্তব্য। এই জঙ্গিড় নামক বৃক্ষবিশেষ বারাণসীতে প্রসিদ্ধ এক বৃক্ষ। (২কা, ১অ. ৪সূ.)।.
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! তুমি দিব্য ঐশ্বর্যের দ্বারা যুক্ত; আমাদের ঈঙ্গিত ফল প্রদান করো। আপন হর্ষশ্বের (হরি নামক অশ্বের) দ্বারা বাহিত হয়ে আমাদের যজ্ঞে আগমন করো এবং অভিযুত সোমরস পান করো। দশাপবিত্রে (ছাঁকনিতে) শুদ্ধীকৃত এই সোম তোমাকে তৃপ্ত করণশীল। ১।
হে ইন্দ্র! এই অমৃত তুল্য নবীন রসে যুক্ত সোমের দ্বারা আপন উদর পূর্ণ করো; পুনরপি সোমের আনন্দদায়ক রস তোমাকে স্তুতিকারক বাক্যের মতো স্বর্গের সমান হৰ্ষকারক হোক। ২৷৷
ইন্দ্র সকল জীবের মিত্র এবং শত্ৰুসকলকে বশ-করণশালী; তিনি বৃত্রাসুর এবং আবরক মেঘকে হনন করেছিলেন। অঙ্গিরাগণের যজ্ঞ-সাধন গো-সমূহকে হরণশীল বল নামক দৈত্যকেও ইন্দ্র হত্যা। করেছিলেন। সোমপান পূর্বক হর্ষান্বিত হয়ে ইন্দ্র এই কার্য সাধন করেছিলেন৷৷ ৩।
হে ইন্দ্র! এই অভিযুত সোমকে আপন কুক্ষিতে (উদরে বা গর্ভে) গ্রহণ করো (বা এই অভিযুতসোম তোমার উদরকে পূর্ণ করুক)। আমাদের আহ্বানের পর এই স্থানে আগত হও এবং আমাদের স্তুতিরূপ বাণী শ্রবণপূর্বক প্রসন্ন হও। হে ইন্দ্র! তুমি আপন মিত্র মরুত্বর্গ ইত্যাদি দেবতাগণের সাথে আমাদের কর্মফল প্রদান করতে সোমপান পূর্বক সন্তুষ্ট হও। ৪
ইন্দ্রের বীরত্বপূর্ণ কার্যসমূহের বর্ণনা করছি। তিনি বৃত্রাসুর এবং মেঘকে হত্যা করেছেন এবং অবরুদ্ধ জলকে নিঃসরিত করেছেন এবং পর্বতের উপর নদীসমূহের, নিমিত্ত মার্গ (পথ) নির্মাণ করেছেন। ৫।
ইন্দ্র বৃত্রাসুরকে হনন করেছিলেন, মেঘকে ছিন্নভিন্ন করেছিলেন এবং যখন বৃত্রাসুরের পিতা ত্বষ্টা ইন্দ্রের নিমিত্ত আপন বজ্রকে তীক্ষ্ণ করেছিলেন, তখন গাভীগণের ন্যায় নিম্নাভিমুখী নদীসমূহ সমুদ্রের পানে গমনশীল হয়েছিল। ৬
ইন্দ্র বৃষের ন্যায় সিঞ্চনশীল আচরণশালী। তিনি সোমরূপ অন্নকে প্রজাপতির নিকট হতে বরণ করেছিলেন এবং সোমযাগে অভিযুত সোমকে পান করেছিলেন। তারই শক্তিতে বলবান হয়ে বজ্ৰকে উত্তোলিত করেছিলেন এবং সেই হিংসক অসুরগণের মধ্যে প্রথম-উৎপন্ন বৃত্রাসুরকে নাশ করে দিয়েছিলেন। ৭৷৷
টীকা— এই সূক্তের সাহায্যে বল কামনাপূর্বক ইন্দ্রের উদ্দেশে যজ্ঞ বা পূজা করণীয়। সোমের অভিষবকালে ও অভিষবহোমে এই মন্ত্রগুলির বিনিয়োগ বিহিত হয়েছে। তথা বিজয়লাভ, পুষ্টিপ্রাপ্তি ও পশুলাভের কামনা করে এই সূক্তমন্ত্রসমূহ পঠনীয়। মহাশান্তি হোমেও এগুলির বিনিয়োগ হয়ে থাকে। ভাষ্যে এই সূক্তের দ্বিতীয় মন্ত্রে যে আখ্যান অবলম্বন করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, যে সন্ন্যাসীবৃন্দ বেদান্ত ইত্যাদি আলোচনা করেন না, তারা ইন্দ্রের দ্বারা হত হয়েছিলেন। সায়ণাচার্য পঞ্চম মন্ত্রে অহি শব্দের অর্থ করেছেন মেঘ বা বৃত্রাসুর, এবং বক্ষণা শব্দের অর্থ কুলপ্লাবনকারী নদী। পঞ্চম মন্ত্রে নু শব্দের অর্থ–ক্ষিপ্র! সপ্তম মন্ত্রে ত্রিকক শব্দের অর্থ সংবৎসর-সাধ্য সোমযাগ। (২কা, ১অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! সম্বৎসর, ঋতু, মাস, পক্ষ, দিবস ইত্যাদি তোমার সমৃদ্ধি করুক। পৃথিবী ইত্যাদিও তোমার বর্ধন করুক এবং ঋষিগণও তোমার বর্ধন করুন। অপিচ, তুমি আপন দিব্য শরীরে প্রদীপ্ত হয়ে চারি দিমূহকে প্রকাশিত করো ৷৷ ১।
হে অগ্নি! তুমি স্বয়ং দীপ্যমান হয়ে এই যজমানের কামনাগুলি পূর্ণ করো; তাঁকে ধন দানের নিমিত্ত উদ্যত হও। তোমার সেবা-করণে নিয়োজিত এই ঋত্বি যজমান ইত্যাদি কর্ম করুক এবং এঁরা যেন কদাপি ক্ষীণ না হন। যারা তোমার সেবক নয়, তারা যশোহীন (নিন্দনীয়) হয়ে যাক। ২৷৷
হে অগ্নি! এই ঋত্বিক যজমান ইত্যাদিগণ তোমার উপাসক; তুমি আমাদের (অর্থাৎ ঋত্বিক যজমান ইত্যাদি ব্রাহ্মণদের) কোনও প্রমাদেও (ভুলত্রুটি ঘটলেও) যেন রুষ্ট হয়ো না। তুমি আমাদের শত্রুবর্গকে ও পাপসমূহকে পরাভূত করে আপন গৃহে সচেষ্ট থাকো ॥ ৩
হে অগ্নি! আপন বলের সাথে যুক্ত থাকো। তুমি মিত্রবর্গের উপকারশালী, অতএব তাদের (আমাদের) পোষণ করো। তোমার সমান-জন্মসম্পন্ন অর্থাৎ সজাতিগণের (অর্থাৎ ব্রাহ্মণর্গের) মধ্যস্থ হয়ে থাকো, যজমানের উপজীব্য হও। রাজগণের দেবাত্মক এই যজ্ঞে প্রদীপ্ত হও। ৪
হে অগ্নি! এই বিষয়-বিকার কুকুর-শূকর যোনিতে (জন্মে) নিপতনকারী, তুমি এগুলিকে (এই জন্মগতিগুলিকে) শমন করো। দেহকে শুষ্ককারী (অর্থাৎ দেহের শোষকস্বরূপ) ব্যধিগুলিকে দূর করো। পাপে নিমজ্জনকারী কুবুদ্ধিকে বিনাশ করো। আমাদের শত্রুগণকে নাশ করো; আমাদের পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি সম্পন্ন ধন প্রদান করো ৷ ৫ (২কা, ২অ. ১সূ)।
টীকা –সম্পৎকামী জনের পক্ষে মন্ত্রগুলির সাহায্যে অগ্নিযাগ করণীয়। ভূত, ব্যাধি, চোর ইত্যাদি সম্পর্কিত ভীতি হতে মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে শান্তিকর্মানুষ্ঠানে এই মন্ত্রগুলির দ্বারা আজাহুতি দেয়। অগ্নিভয়ে মহাশান্তি কর্মেও এই মন্ত্রগুলি যোজনীয়। চতুর্থ মন্ত্রে অগ্নিকে ব্রাহ্মণগণের সজাতানাং বলার কারণ এই যে, অগ্নি ও ব্রাহ্মণগণ প্রজাপতির মুখ হতে উৎপন্ন হয়েছিলেন, সুতরাং তারা একে অপরের সজাতি। বিহব্যে পদের দ্বারা যজ্ঞকে লক্ষ্য করা হয়েছে; কারণ, যজ্ঞেই দেবগণ বহুরূপে আহুত হয়ে ১ থাকেন ॥ (২কা, ২অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –পিশাচ ইত্যদি হতে উৎপন্ন পাপ, বিপ্র-শাপ (ব্রাহ্মণের অভিশাপ) ইত্যাদি নাশকারী দেব-নির্মিত বীরুধ (জড়ী বা দূর্বা বা যব) আমাকে নানা রকমের শাপ হতে মুক্ত করে দিক; যেমনভাবে জল শরীরের সকল মলকে দূর করে, মলকে জলের দ্বারা পৃথক্ করে, সেইভাবে (বীরুধ আমাদের সকল শাপ ও পাপ) দূর করুক। ১।
শত্রুর দ্বারা আক্রোশ, ব্রাহ্মণের শাপ, ভগিনীর ক্রোধ–এই তিন দোষ আমার পদের দ্বারা পিষ্ট হোক। ২।
হে মণি! নতমুখ হয়ে বিস্তৃত, জড়বৎ ঊর্ধ্বে উখিত, শত শত গ্রন্থি (গাঁইট বা পর্ব) সমন্বিত দূর্বার দ্বারা তুমি আমাদের শাপ হতে মুক্ত করো ৷ ৩৷৷
হে মণি! তুমি আমার সন্তানকে এবং ধনকে রক্ষা করো। আমাদের শত্রু যেন সমৃদ্ধিপ্রাপ্ত না হয় এবং হিংসক যক্ষ পিশাচ ইত্যাদিও যেন আমাদের হিংসা করতে সমর্থ না হয়। ৪
আমাদের প্রতি শাপ-প্রদানকারীই যেন শাপগ্রস্ত হয় (অর্থাৎ সেই শাপ তাদেরই দিকে বর্ষিত হোক বা তারাই যেন সেই শাপ ভোগ করে)। যে পুরুষ আমাদের অনুকূল, তারা আমাদের সুখদায়ক হোক। আমাদের সাথে দুর্ভাবাপন্ন এবং গোপনে আমাদের নিন্দাকারী জনের নেত্র এবং পার্শ্বের অস্থিগুলিকে আমরা ছিন্ন-ভিন্ন করে দেবো। ৫।
টীকা— লৌকিক বৈদিক আক্রোশ, ব্রহ্মশাপ, ক্রুরচক্ষু পুরুষের দৃষ্টিনিপাত ও পিশাচ-রাক্ষস ইত্যাদি স্বে সম্পর্কিত ভীতি হতে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে এই সূক্তের মন্ত্রগুলির সাহায্যে যমণি অভিমন্ত্রিত করে অঙ্গে ধারণ কর্তব্য।…মহাশান্তি হোমে সহস্ৰকাণ্ডসম্পন্ন মণি বন্ধনেও এই সূক্ত-মন্ত্রগুলি পাঠ বিধেয়। ভাষ্যে অঘদ্বিষ্টা শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে–অঘস্য পিশাচরক্ষঃপ্রভৃতিজনিতস্য পাপস্য দ্বেষিণী বিনাশয়িত্রী।(২কা, ২অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –বিষ্কৃতি নামক দুই মূল নক্ষত্রের উদয় হয়েছে; এরা মানবকে মাতা-পিতা হতে প্রাপ্ত (অর্থাৎ বংশগত) ক্ষয়, কুষ্ঠ, অপম্মার ইত্যাদি ব্যাধির দ্বারা পাশের ন্যায় বন্ধনকারী রোগের বীজকে (বা মূলকে) বিনাশ করুক। ১।
এই উষাকালীন রাত্রি এইসকল ক্ষেত্রিয়-ব্যাধিকে দূর করুক। সূর্য এই ব্যাধিকে প্রশমিত করুন। অপম্মার ইত্যাদি রোগসমুহের প্রেরণকারিণী পিশাচীসমূহ দূর হয়ে যাক। ঔষধিও এই ক্ষেত্রিয় রোগসমূহের নাশ-করণে সমর্থ ॥ ২॥
হে রোগী! অর্জুনবৃক্ষের কাষ্ঠ, যবের ভুষি, এবং তিলের মঞ্জরীর দ্বারা প্রস্তুত মণি তোমার ব্যাধিকে শমিত করুক, তথা ঔষধিও এই ক্ষেত্রিয় ব্যাধির নাশকারক হোক। ৩।
হে রোগী! বৃষভের সাথে যুক্ত হলকে (লাঙ্গলকে) এবং তার (অর্থাৎ হলের) অবয়বকে তোমার রোগ-উপশমের নিমিত্ত নমস্কার করছি। ক্ষেত্রিয় রোগসমূহের নাশক ঔষধি তোমার রোগকে বিনাশ করুক। ৪
মৃত্তিকা নিষ্ক্রান্তের পর ত্যাজ্য গহ্বরকে নমস্কার; যে গৃহের জানালা ইত্যাদি জীর্ণ এবং পতনোম্মুখ, সেই শূন্য গৃহকে নমস্কার; সেই গৃহসমূহের অধিপতিগণের (অর্থাৎ গৃহাধিপতি দেবতাগণের উদ্দেশ্যেও) নমস্কার। এই ক্ষেত্রিয় ব্যাধিসমুদয়ের নাশক ঔষধি তোমার ব্যাধিকে বিনাশ করুক ॥ ৫৷৷
টীকা –কুলাগত অর্থাৎ বংশগত কুষ্ঠ, ক্ষয়, গ্রহণী ইত্যাদি রোগ-শান্তির নিমিত্ত উদকঘটে অর্থাৎ জলপূর্ণ কলসের জলে এই সূক্তমন্ত্রগুলির দ্বারা অভিমন্ত্রিত করে রোগীকে গৃহের বাহিরে আনয়নপূর্বক সিঞ্চিত করা কর্তব্য। এই কর্ম উষাকালে করণীয়। অর্জুনবৃক্ষের কাষ্ঠ, যবের ভূষি এবং তিল-মঞ্জরীর দ্বারা প্রস্তুত মণি এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত করে রোগীর অঙ্গে বন্ধন করণীয়। ইত্যাদি৷৷(২কা, ২অ. ৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে দশবৃক্ষ মণি! তুমি পলাশ, ঔদুম্বর ইত্যাদির দ্বারা নির্মিত। যে জন ব্রহ্ম-রাক্ষসী বা ব্রহ্ম-রাক্ষসের দ্বারা গৃহীত হয়েছে, তাকে (অর্থাৎ সেই জনকে) অমাবস্যা ইত্যাদি পর্বে গ্রহণ করেছে, তাকে তার কবল হতে মুক্ত করো। সেই পুরুষকে মুক্ত করে পুনজীবিত করো। ১।
হে মণি! এই পুরুষ তোমার প্রভাবে গ্রহ হতে মুক্ত হয়ে যাক এবং এই লোকে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করুক। সে আপন ব্যাপারে সমর্থ হোক এবং আপন পুত্রের পিতা তোক। ২৷৷
ব্ৰহ্মগ্রহ হতে বিমুক্ত হওয়ার পর এই পুরুষ তার বিস্মৃত হয়ে যাওয়া বিদ্যা পুনরায় স্মরণ করুক। এই জন। প্রাণিগণের নিবাসস্থলসমূহকে পুনরায় জ্ঞাত হোক ৷ ৩৷৷
হে মণি! তুমি গ্রহ-বিকার হতে রোগীকে এ মুক্ত করে থাকো। তোমার এই সামর্থ্য ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতা জ্ঞাত আছেন। ব্রাহ্মণ, ঔষধসমূহ, বরুণ, মিত্র ইত্যাদি দেবতাও তোমার এই শক্তির জ্ঞাতা, (অর্থাৎ তারাও তোমার এই শক্তির পরিচয় জ্ঞাত আছেন)। ৪
যে মহর্ষি অথর্ব এই মণিবন্ধনের ব্যাপার রচনা করেছিলেন, তিনি এই গ্রহের বিকারকে প্রশমিত করুন। তিনি মহান্ ভিষক (চিকিৎসক বা বৈদ্য ভেষজজ্ঞ)। হে রোগী! পবিত্র জ্ঞানের দ্বারা সম্পন্ন তিনিই তোমার চিকিৎসা করুন। ৫৷৷
টীকা –ব্রহ্মগ্রহশান্তির নিমিত্ত পলাশ-ঔদুম্বর-জম্মু-কাম্পীল্য ইত্যাদি দশটি বৃক্ষের বল্কল-খণ্ড গ্রহণ করে সেগুলির সাথে লাক্ষা, হিরণ্য বেষ্টিত করে মণি প্রস্তুত পূর্বক এই দশবৃক্ষ ইত্যাদি সূক্ত মন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত করে ব্রহ্মগ্রহ-গৃহীত রোগীর অঙ্গে ধারণীয়। তারপর এই সূক্তটি দশজন ব্রাহ্মণ কর্তৃক রোগীর গাত্র স্পর্শপূর্বক জপ করা বিধি ॥ (২কা, ২অ. ৪সূ)।
অধ্যায়: দুই
সূক্ত -১০ : পাশমোচনম
[ঋষি : ভৃগ্বঙ্গিরা। দেবতা : নির্ঋতি, দ্যাবাপৃথিবী, ব্রহ্ম, অগ্নি, আপ, সোম, বায়ু, সূর্য ইত্যাদি। ছন্দ : ত্রিষ্টুপ ইত্যাদি ]
বঙ্গানুবাদ –হে পুরুষ! তুমি হেন রোগ-পীড়িতকে, মাতা-পিতা হতে (অর্থাৎ কুলপরম্পরানুক্রমে) প্রাপ্ত ক্ষয়, কুষ্ঠ ইত্যাদি ব্যাধি হতে মুক্ত করছি। তোমাকে পাপ হতে, পাপীগণকে দণ্ডদানকারী বরুণের পাশ হতে এবং ব্রহ্মদোষ হতেও মুক্ত করছি। আমি এই সকল মন্ত্রের শক্তির দ্বারা সাধন করছি। এই আকাশ পৃথিবী তোমার মঙ্গল সাধন করুক ॥১॥
হে রোগী! এই পার্থিব অগ্নি জলাভিমানী দেবতাগণের সাথে মিলিতভাবে সুখদানকারী হয়ে থাকেন। কাস্পীল ইত্যাদি ঔষধিসমূহের সাথে সোম তোমাকে সুখী করুক। আমি তোমাকে ক্ষেত্রিয় ব্যাধি এবং নৈঋতি হতে মুক্ত করছি। বরুণের পাশ হতে মুক্ত করে আপন মন্ত্রের শক্তির প্রভাবে আমি তোমাকে পাপরহিত করে দিচ্ছি। এই আকাশ ও পৃথিবী (দ্যাবাপৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী দেবতাদ্বয়) তোমার পক্ষে মঙ্গলময় হোক ৷ ২৷৷
হে রোগী! আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থায়ী অন্তরিক্ষে বিচরণশীল বায়ু তোমার মঙ্গল করুক। চারি দিক (বা দিকসমূহের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাগণ) তোমার পক্ষে সুখকারী হোক। আমি তোমাকে আক্রোশ, নির্ঋতি, ক্ষেত্রিয় ব্যাধি, গুরু-দ্রোহজনিত পাপ এবং পাপীগণের নিয়ামক বরুণের পাশ হতে মুক্ত করে পাপ-রহিত করে দিচ্ছি। আকাশ-পৃথিবী তোমার পক্ষে, মঙ্গলময় হোক। ৩।
দ্যোতমানা দিসমূহ বায়ুর পত্নী; সূর্য-মণ্ডলের অধিপতি সবিতাদেব তাঁদের সকল দিকে, হতে দর্শন করছেন; সেই দিকসমূহ এবং সবিতা দেবতা তোমার মঙ্গল বিধান করু। আমি তোমাকে আক্রোশ, নির্ঋতি, ক্ষেত্রিয় ব্যাধি, গুরুদ্ৰোহজনিত পাপ এবং পাপীবর্গের নিয়ামক বরুণের পাশ হতে মুক্ত করে পাপরহিত করে দিচ্ছি। আকাশ ও পৃথিবী তোমার পক্ষে মঙ্গলময় হোক। ৪
হে রোগী! আমি তোমাকে রোগরহিত করে বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত সেই দিকসমূহের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাগণের মধ্যে স্থাপিত করছি। তোমার ব্যাধি দূর হোক, এবং পাপ-দেবতা (নির্ঋতি) তোমার পশ্চাৎ হতে প্রত্যাবর্তন করুন। আমি তোমাকে বান্ধবগণের আক্রোশ, ক্ষেত্রিয়ব্যাধি, পাপদেবতা নির্ঋতি, গুরুদ্ৰোহজনিত পাপ এবং পাপীগণের নিয়ামক বরুণের পাশ হতে মুক্ত করে পাপরহিত করে দিচ্ছি। আকাশ ও পৃথিবী তোমার পক্ষে মঙ্গলময় হোক। ৫
হে রোগী! তুমি ক্ষেত্রিয় ব্যাধি ক্ষয় হয়ে মুক্তিপ্রাপ্ত হচ্ছে এবং আপন ব্যাধির পাপ, ভগিনী ইত্যাদির আক্রোশ, দেব-দ্রোহ, পাপীগণকে দণ্ডদানকারী বরুণের পাশ এবং ব্রহ্ম-রাক্ষসী ইত্যাদির বন্ধন হতেও মুক্তি প্রাপ্ত হতে চলেছে। আমিও তোমাকে এইগুলি হতে মুক্ত করে মন্ত্রবলে নিষ্পাপ করে দিচ্ছি। আকাশ ও পৃথিবী তোমার পক্ষে মঙ্গলময় হোক ৷ ৬ ৷
হে রোগী! তুমি শত্রুসমান ব্যাধি হতে দূরে যাও (অর্থাৎ শত্রুসমান ব্যাধিগুলি তোমার নিকট হতে দূরে হটে যাক)। তুমি আপন পুণ্যফলের দ্বারা মঙ্গলময় পৃথিবীলোকে আগত হয়েছ। আমি তোমাকে ক্ষেত্রিয় রোগ, আক্রোশ, পাপ এবং পাপীগণের নিয়ামক বরুণের পাশ হতে মুক্ত করছি এবং মন্ত্রবলে নিপাপ করে দিচ্ছি; আকাশ ও পৃথিবী তোমার মঙ্গল করুক। ৭।
রাহুর (বা স্বভানুর) গ্রাস হতে সূর্যকে মুক্ত করার কালে দেবতাগণ পাপকেও দূর করেছিলেন, সেই রকম আমি তোমার ক্ষেত্রিয়রোগকে দূর করে দিচ্ছি। তোমাকে নির্ঋতি, আক্রোশ, গুরুদ্ৰোহজনিত পাপ এবং বরুণ-পাশ হতে মুক্ত করে নিষ্পাপ করে দিচ্ছি। আকাশ-পৃথিবী তোমার মঙ্গল করুক ॥ ৮
বঙ্গানুবাদ –হে তিলকমণি! তুমি অন্যের দোষরূপকৃত্যাকে দূষিত-করণে সমর্থ। তুমি অন্যের দ্বারা প্রেরিত আয়ুধকে নষ্ট করে থাকো। পরের দ্বারা উচ্চারিত বাক্ (বা মন্ত্র) রূপ বজ্রের নিবারণকল্পে তুমি বজ্ররূপ হয়ে থাকো। অতএব শত্রুগণের দ্বারা কৃত অভিচার ইত্যাদি কর্ম সম্পর্কিত উৎপাতসমূহকে দূর করে দাও। তুমি আমাদের শত্রুকে এমন ভাবে বিনাশ রো, যাতে আমরা বিনা প্রযত্নেই তাদের দমন করে ফেলি। ১।
হে তিলকমণি! তুমি আগত কৃত্যাকে দূরীকরণশালী এবং মন্ত্রযুক্ত রক্ষাত্মক সূত্রস্বরূপ। তুমি আমাদের সমান বলসম্পন্ন শত্রুগণকে লঙ্ঘন পূর্বক, অধিক বলশালী শত্রুগণকে নাশ করো। ২
যারা আমাদের পশু পুত্র ইত্যাদিকে বন্ধনকারী শত্রু, আমাদের সাথে যারা শত্রুতাচরণ করে, এবং আমরা যাতে নাশ করতে ইচ্ছা করি, সেই শত্রগণকে, হে মণি! তুমি বিনাশ করে দাও। আমাদের সমান বলসম্পন্ন শত্রুগণকে উল্লম্ফন পূর্বক, তুমি অধিক বলসম্পন্ন শত্রুদের সংহার করো ৷৷ ৩৷৷
হে মণি! তুমি শত্ৰুকৃত অভিচারকে জ্ঞাত আছো এবং স্বয়ং তেজের ধারক। তুমি অন্য-কৃত অভিচারসমূহ হতে আমাদের দেহকে রক্ষা-করণে সমর্থ। তুমি আমাদের সমান বলসম্পন্ন শত্রুদের লঙ্ন পূর্বক, অধিক বলশালী শত্রুগণকে সংহার করো। ৪
হে শবর্গকে সন্তাপ-দানশীল মণি! তুমি জ্বর ইত্যাদি যুক্ত সন্তাপ দানে সমর্থ এবং কৃত্যা ইত্যাদিকেও তুমি আপন সূর্যসদৃশ তেজে সন্তপ্ত করে থাকো। তুমি আমাদের সমান বলশালী শত্রুগণকে অতিক্রম করে অধিক বলসম্পন্ন শত্রুদের প্রথমেই নাশ করে দাও। ৫
টীকা –সপ্ত সূক্তসমন্বিত তৃতীয় অনুবাকের এটি প্রথম সূক্ত। স্ত্রী-শূদ্র-রাজা-ব্রাহ্মণ-কাঁপালিক অন্ত্যজ শাকিনী ইত্যাদির দ্বারা অনুষ্ঠিত আভিচারিক কর্মসমূহ হতে নিজেকে রক্ষার উদ্দেশে এই সূক্ত-মন্ত্রগুলির দ্বারা তিলকবৃক্ষ হতে উৎপন্ন মণি (তিলকমণি) অভিমন্ত্রিত করে ধারণীয়।…ইত্যাদি। আপুহি শ্রেয়াংসমতি ইত্যাদি বাক্যের দ্বারা বলা হচ্ছে যে, আমাদের অপেক্ষা কম বলশালী বা সমান বলসম্পন্ন শত্রুদের আমরা নিজেরাই দমন করতে পারব; সুতরাং তিলকমণি যেন আমাদের অপেক্ষা অধিক বলযুক্ত শত্রুদেরই বিনাশ করে দেয়। (২কা, ৩অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –আকাশ, পৃথিবী ও তাদের মধ্যবর্তী স্থানে স্থিত অন্তরিক্ষ এবং তাতে বাসকারী অধিপতি দেবতা বায়ু, সূর্য, অগ্নি, লোকপালক বিষ্ণু ইত্যাদি সকলে এই অভিচার কর্মের দ্বারা। প্রেরণা প্রাপ্ত হয়ে শত্রুগণকে বিনাশশীল হোন। ১।
হে যজ্ঞযোগ্য দেবতাবৃন্দ! আমার নিবেদন। শ্রবণ করুন যে, বষট্কারের দ্বারা দেবতাগণের উদ্দেশে আহুতি দানকারী ভরদ্বাজ ঋষি আমার কাম্যবস্তুর ফলের (অর্থাৎ ঈপ্সিত সিদ্ধির) নিমিত্ত অভিচার-যোগ্য মন্ত্ৰসমূহ উচ্চারণ করছেন। যে শত্রু আমাদের এই শ্রেষ্ঠ কর্মে (যজ্ঞে), বিঘ্ন সৃষ্টি করে মনে দুঃখ দিয়েছে, তারা আমার এই (অভিচার) কর্মের দ্বারা মৃত্যুরূপ দুর্গতি প্রাপ্ত হোক। ২
হে ইন্দ্র! তোমার চিত্ত সোমপান করে প্রফুল্লিত হচ্ছে। তুমি আমার নিবেদনে মনোযোগ অর্পণ করো। আমি নিজে শত্রুগণকৃত দুষ্কর্মের কারণে তোমাকে বারংবার আহ্বান জানাচ্ছি। আমি স্বয়ং আপন শত্রুকে বৃক্ষের ন্যায় ছেদন করছি। ৩৷৷
ইন্দ্র এবং সামমন্ত্রের উদ্গাতাবৃন্দের দ্বারা প্রযুক্ত; অঙ্গিরা ঋষি, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টাবসু এবং রুদ্রগণের সাথে আমাদের পূর্বপুরুষগণের যে যজ্ঞ ইত্যাদি কামনা আছে এবং স্মৃতি বিহিত কূপ, [ বাপী, তড়াগ ইত্যাদি আছে, সেই কামনা পূর্তির দ্বারা প্রকটিত পুণ্য আমাদের রক্ষক হোক। আমি। এই অমুক (যথানাম) নামধারী শত্রুকে আপন অভিচার কর্মের মাধ্যমে কৃত্যারূপ দেবকোপের দ্বারা এই বিনাশ করছি। ৪
হে আকাশ-পৃথিবী! তোমরা শত্রুগণকে তিরস্কৃত করার নিমিত্ত তেজস্বী হয়ে ওঠো। হে বিশ্বদেবগণ! শত্রুবৃন্দকে সংহার করার নিমিত্ত প্রস্তুত (উদ্যোগী) হও। হে অঙ্গিরাগণ! হে পিতৃগণ! আমার শত্রুকে বশীভূত (বা নিগ্রহ) করতে তোমরাও তৎপর হয়ে ওঠো ॥ ৫৷৷
হে মরুৎ-গণ! যারা আমাদের হীন মনে করে এবং যারা আমাদের অনুষ্ঠানকেও নিন্দনীয় বলে থাকে, তাদের উভয় দলকেই তোমরা তোমাদের তেজ-রূপ আয়ুধে বন্ধন করো। আমার কর্মের প্রতি দ্বেষসম্পন্ন শত্রুকে সবিতাদেব সকল দিক হতে ব্যথিত করুন। ৬
তোমার নেত্র ইত্যাদি সপ্ত প্রাণ (মস্তক ও ছয় ইন্দ্রিয়) এবং কণ্ঠগত অষ্ট ধমনী (নাড়ী)-কে এবং অন্য অঙ্গগুলিকে অভিচার কর্মের দ্বারা ছিন্ন-ভিন্ন করে দিচ্ছি। হে শত্রু! তুমি শবরূপ আভূষণে সজ্জিত হয়ে যম-স্থান (যমালয়) প্রাপ্ত হও। ৭।
আমি তোমার চূর্ণিত শরীরের সাথে তোমার পাদপাংশু জাতবেদা অগ্নিতে নিক্ষেপ করছি। তার দ্বারা এই অগ্নি তোমার দেহে প্রবিষ্ট হয়ে তোমার প্রাণ ও বাকশক্তিকেও ব্যাপ্ত করুক ৮
টীকা –এই সূক্তমন্ত্রগুলির দ্বারা অভিচার কর্মে দীক্ষার নিমিত্ত বংশদণ্ড ছেদনীয়। এই সূক্তের দ্বারা বিদ্বেষকারীর পরাজয় কর্মে দক্ষিণাভিমুখে ধাবিত.শত্রুর পদে বৃক্ষপত্র প্রক্ষিপ্ত করে, তা পরশুর (অর্থাৎ কুঠারের) দ্বারা ছেদন করে পদলগ্ন ধূলির সাথে বধকপাত্রে প্রক্ষেপণ পূর্বক ভর্জনীয় (অর্থাৎ ভাজা উচিত)।জাতবেদা অর্থে অগ্নিকে লক্ষ্য করা হয়েছে–যিনি জাতমাত্ৰকেই জানেন বা জাত প্রাণিমাত্রই যাঁকে জানে বা সকল প্রাণির অভ্যন্তরে (জঠরে) যিনি অধিষ্ঠিত হয়ে থাকেন ॥ (২কা, ৩অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! তুমি (মনুষ্যবালকগণকে) শতায়ু (শত বৎসর পরিমিত আয়ু) প্রদানকারী। তুমি ঘৃতের প্রতীক এবং ঘৃত তোমার অবয়বসমূহের আশ্রয়রূপ। এই কারণে এই মন্ত্রপূত গো-ঘৃত পান করে তুমি তৃপ্ত হও এবং পিতা কর্তৃক পুত্রকে রক্ষা-করণের ন্যায় এই বালককে রক্ষা করে শত বৎসরের আয়ু প্রদান করো। ১।
হে দেবতাগণ! এই বালককে পরিধান ধারণ করাও, একে তেজস্বী করে দাও এবং পূর্ণাবস্থাসম্পন্ন করো (অর্থাৎ পূর্ণ মনুষ্যত্বে উপনীত করো)। একে শত বৎসরের আয়ু প্রদান করো। ইন্দ্র ইত্যাদির স্বামী (বা প্রভু) বৃহস্পতি সোমের নিমিত্তও এই পরিধান ধারণ করিয়েছিলেন। ২
হে বালক! এই পরিধান (বস্ত্র) ক্ষেমের (মঙ্গলের) নিমিত্ত ধারণ করানো হয়েছে। তুমি এর প্রভাবে গো-গণের হিংসাজনিত ভয় হতে রক্ষা প্রাপ্ত হয়ে তাদের পোষণ, করো এবং পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি-সম্পন্ন হয়ে শত বৎসর আয়ুষ্মন্ হও। তুমি সমৃদ্ধিযুক্ত ঐশ্বর্যকেও লাভ করো ॥ ৩
হে বালক! আপন দক্ষিণ পাদের দ্বারা এই পাষাণখণ্ডের উপর আঘাত করো এবং এর ন্যায় দৃঢ় এবং নিরোগ থাকো। সকল দেবগণ তোমাকে শত বৎসর আয়ুষ্মন করুন। ৪
হে বালক! তোমার পূরাতন বস্ত্র উন্মোচিত করে আমি গ্রহণ করছি। তুমি সমৃদ্ধির দ্বারা সুশোভিত হও। তোমার জন্মের পরে, পশু পুত্র ইত্যাদিতে প্রবৃদ্ধ হয়ে সুন্দর ভ্রাতা উৎপন্ন হোক এবং সকল দেবতা তোমার রক্ষক হোন ॥ ৫॥
টীকা –মূলতঃ দীর্ঘায়ুপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে এই সূক্তের বিনিয়োগ নির্দিষ্ট আছে। তবে গোদানাখ্য সংস্কার কর্মে শান্তিজল প্রদানে এর প্রয়োগ আছে। এই গোদানাখ্য কর্মে এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা আজাহুতি প্রদান করে ব্রহ্মচারী বালকের মস্তকে জলসিঞ্চন করা হয়।…ইত্যাদি। এছাড়া যথাযথ মন্ত্রের বঙ্গানুবাদে বালক ব্রহ্মচারীর গো-ভীতি নিবারণ, নব-বস্ত্র পরিধান ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। (২কা, ৩অ. ৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –উন্নত শরীরশালিনী, সন্তান নষ্টকারিণী, ভয়-উৎপাদিকা নিঃসালা নাম্নী রাক্ষসী, ধিষণ নামক পাপ-গৃহ, কঠোর বাক্যশালিনী একবাদ্যা রাক্ষসীকে আমরা সংহার করছি এবং চণ্ড নামক পিশাচিনীদেরও বিতাড়িত করছি। ১।
হে মগুন্দী নামধারী পিশাচীর পুত্রীগণ! আমরা তোমাদের গো-গণের গোষ্ঠ হতে নিষ্ক্রান্ত (বিতাড়িত) করে দিচ্ছি। ধন-ধান্য যুক্ত ভবন এবং আবাস স্থানসমূহ হতেও দূরীকৃত করে তোমাদের নাশ করছি। ২।
পৃথিবী হতে দূরে এবং নীচে যে পাতাল লোক আছে, সেখানে পুণ্য কার্যে বিঘ্ন উপস্থিতকারিণী অণয়ি নাম্নী, রাক্ষসীগণ গমন করুক এবং বিনাশিনী নাম্নী রাক্ষসীগণও এই (পৃথিবী) লোককে ত্যাগ করে পাতাল লোকে গমন করে অবস্থান করুক। ৩
ভূতনাথ রুদ্র ও ইন্দ্র এই আক্রোশশালিনী পিশাচীগণকে প্রহার পূর্বক (আমাদের) আবাস স্থান হতে দূর করুন। ৪
হে রাক্ষসীবর্গ! তোমরা মাতা-পিতার দেহ হতে প্রাপ্ত (ক্ষেত্রিব্যাধিরূপ) কুষ্ঠ, অপপ্যার, গ্রহণী ইত্যাদিকে উৎপন্ন করে থাকো। এই রকমের তোমরা আমার এই ঘর হতে দূর হয়ে বিনাশ প্রাপ্ত হও। ৫।
আপন লক্ষ্যের উপর আক্রমণ করে শীঘ্রগামী অশ্ব যেমন স্তব্ধ হয়ে যায়, সেই রকমেই এই পিশাচীগণের আবাসস্থানগুলির উপরে আমি আক্রমণ সংঘটিত করেছি। হে পিশাচীগণ! তোমরা সকলে সেই সংগ্রামে (বা আক্রমণে) পরাজিত হয়েছ। এবং আমি তোমাদের গৃহগুলিকেও অধিকার করে নিয়েছি। এখন তোমরা আশ্রয়হীনা হয়ে মৃত্যু-প্রাপ্ত হও ৷ ৬ ৷
টীকা –মৃতাপত্যা অর্থাৎ যে নারীর সন্তান জাত হয়ে মারা যায়, তার সেই অপত্যনাশ পরিহারের নিমিত্ত তিনটি মণ্ডপে এক একটি করে জলপাত্রে সীসা সম্পাতিত করে সেই জলকে এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত করণীয়। অতঃপর সেই জলে সেই নারীকে অভিসিঞ্চিত করে তার আপন গৃহে আনয়নপূর্বক শান্তিজলে অভিষিক্ত করণীয়। সেই সঙ্গে তাকে এই মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত পুরোডাশ, কন্দুক (গোলা) ও অলঙ্কার প্রদান করণীয়। এর বিকল্পে একটি মণ্ডপেই এই সূক্তের দ্বারা ঔদুম্বরী সমিধ স্থাপন পূর্বক এই মন্ত্রের দ্বারা পূর্ববৎ শান্তিজল ইত্যাদির প্রয়োগ করণীয়। গৃহে গো-ইত্যাদি পশুর বন্ধ্যাত্ব নিবারণকল্পে, দৈবহত গৃহের দোষ। খণ্ডনকল্পেও এই সূক্তের বিনিয়োগ বিহিত আছে। (২কা, ৩য়, ৪সূ)।
যথা দ্যৌশ্চ পৃথিবী চ ন বিভীতো ন রিষ্যতঃ। এবা মে প্রাণ মা বিভেঃ ॥ ১. যহাহ রাত্রী চ ন বিভীতো ন রিষ্যতঃ। এবা মে প্রাণ মা বিভেঃ ॥ ২॥ যথা সূর্যশ্চ চন্দ্ৰশ্চ ন বিভীতো ন রিষ্যতঃ। এবা মে প্রাণ মা বিভেঃ ॥ ৩ যথা ব্ৰহ্ম চ ক্ষত্রং চ ন বিভীতো ন রিষ্যতঃ। এবা মে প্রাণ মা বিভেঃ ॥ ৪। যথা সত্যং চামৃতং চ ন বিভীতো ন রিষ্যতঃ। এবা মে প্রাণ মা বিভেঃ ॥ ৫৷৷ যথা ভূতং চ ভব্যং চ ন বিভীতো ন রিষ্যতঃ। এবা মে প্রাণ মা বিভেঃ ॥৬॥
বঙ্গানুবাদ –দেবাশয় রূপ আকাশ এবং মনুষ্যের আশ্রয়ভূত পৃথিবী–এই দুই লোক সকলের উপজীব্য; অতএব উপজীব্যকে কেউ নষ্ট করতে পারে না। সেই রকমেই হে প্রাণ! তুমি মরণ-শঙ্কা হতে রহিত হও এবং এই মন্ত্রবলের দ্বারা আকাশ ও পৃথিবীর ন্যায় চিরজীবী হও ১৷
যেমন দিবা ও রাত্রি (চিরকাল অস্তিত্বশালী হওয়ার কারণে) কখনও বিনষ্টির ভয়ে ভীত হয় না, তেমনই হে প্রাণ! তুমিও তাদের মতো মরণ-ভীতি থেকে রহিত হয়ে থাকো, এবং এই মন্ত্রের বলে চিরজীবী হয়ে থাকো। ২।
যেমন সূর্য ও চন্দ্র (চিরন্তন হওয়ার কারণে) কখনও ভয়ভীত হয় না, তারা বিনষ্টও হয় না, তেমনই হে আমার প্রাণ! তুমিও কোন কিছু হতে ভয় প্রাপ্ত হয়ো না এবং মৃত্যুর আশঙ্কা পরিত্যাগ করো। তুমিও সূর্য ও চন্দ্রের মতো চিরজীবী হয়ে থাকো ৷৷ ৩৷৷
যেমন ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জাতিগুলি (শাশ্বত জাতি হওয়ার কারণে) ভয়ভীত হয় না, বিনষ্টও হয় না, তেমনই হে আমার প্রাণ! তুমি মরণ-শঙ্কা হতে রহিত হও এবং ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জাতির ন্যায় চিরজীবী হয়ে থাকো ॥ ৪৷
যেমন সত্য ও অসত্য (চিরন্তন হওয়ায়) কখনও কিছুতে ভয় পায় না, বিনষ্টি প্রাপ্তও হয় না, তেমনই হে আমার প্রাণ! তুমিও ভয়প্রাপ্ত হয়ো না এবং বিনাশপ্রাপ্তির চিন্তা করো না; তুমিও সত্য ও অসত্যের সমানই চিরজীবী হয়ে থাকো। ৫
যেমন ভূত (অতীত) ও ভবিষ্য (চিরকাল প্রবাহমান হওয়ার কারণে) কিছু হতে ভয় পায় না, নষ্টও হয় না (অর্থাৎ আজ যা বর্তমান, কাল তা অতীত হয়েই চিরকাল অস্তিত্বসম্পন্ন হয়ে থাকবে, অনাগত কালও তেমনই চিরকাল আসতে থাকবে–সুতরাং এদের কেউ বিনাশ বা শেষ করতে পারে না); তেমনই হে। প্রাণ! তুমিও মৃত্যুর শঙ্কা ত্যাগ করে চিরকাল পর্যন্ত জীবিত থাকো। ৬।
টীকা— এই সূক্তের বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে–যে ব্যক্তি আয়ু কামনা করেন তিনি একটি স্থালীতে পাক করা অন্ন শান্তিজলে প্রোক্ষণপূর্বক এই, সূক্তমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করে ভোজন করবেন। এতে মৃত্যুভয় রহিত হয় ॥ (২কা, ৩অ. ৫সূ)।
প্রাণাপানৌ মৃত্যোর্মা পাতং স্বাহা ॥১॥ দ্যাবাপৃথিবী উপত্যা মা পাতং স্বাহা ॥ ২॥ সূর্য চক্ষু মা পাহি স্বাহা। ৩। অগ্নে বৈশ্বানর বিশ্বৈর্মা দেবৈঃ পাহি স্বাহা ॥ ৪৷৷ বিশ্বম্ভর বিশ্বেন মা ভরসা পাহি স্বাহা ॥ ৫
বঙ্গানুবাদ –ঊর্ধ্বমুখ করে চেষ্টা-করণশালী হয় প্রাণ, নিম্নের দিক হতে চেষ্টাবান হয় অপান। উভয়ের অভিমানী হে দেবতাদ্বয়! আমাকে মরণ হতে রক্ষা করো। এই স্বাহাকৃত আহুতি গ্রহণ করো। ১।
হে আকাশ ও পৃথিবীতে স্থিত দিনের অভিমানী দেবতাগণ! তোমরা শ্রবণশক্তি প্রদান করে আমাকে রক্ষা করো এবং আমার প্রদত্ত এই স্বাহাকৃত আহুতি স্বীকার করো। ২।
হে নেত্রাভিমানী আদিত্য! তুমি দর্শনশক্তি প্রদান করে আমাকে রক্ষা করো। আমি তোমার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি, তুমি তা স্বীকার করে নাও ৩
হে বৈশ্বানর অগ্নি! তুমি বৈদ্যুতিক অগ্নি ও সূর্য হতে উৎপন্ন। তুমি বাক্-ইন্দ্রিয় প্রদান করে আমাকে রক্ষা করো। আমি স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি নিবেদন করছি। ৪।
হে বিশ্বের (অর্থাৎ সকলের) পোষণকারী বিশ্বম্ভর অগ্নি! তুমি আপন পোষণ শক্তির দ্বারা আমাকে রক্ষা করো। তোমার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। ৫৷৷
টীকা –যিনি আয়ু কামনা করেন, তাঁর পক্ষে এই সূক্তের দ্বারা আজ্য, সমিৎ, পুরোডাশ, দুগ্ধ, অন্ন, পায়স, পশু, ব্রীহি, যব, তিল, ধান, করম্ভ ও শঙ্কুল (পিষ্টক)–এই ত্রয়োদশটি দ্রব্যের দ্বারা হোম করণীয়।… ইত্যাদি। (২ কা. ৩অ. ৬সূ)।
ওজোহস্যোজো মে দাঃ স্বাহা। ১। সহোহসি সহো মে দাঃ স্বাহা। ২৷৷ বলমসি বলং মে দাঃ স্বাহা ॥ ৩৷৷ আয়ুরস্যায়ুর্মে দাঃ স্বাহা ॥ ৪৷৷ শ্রোমসি শ্রোত্রং মে দাঃ স্বাহা ॥ ৫॥ চক্ষুরসি চক্ষুর্মে দাঃ স্বাহা ॥ ৬।
বঙ্গানুবাদ –হে ওজ! তুমি ঘৃতের ন্যায় শারীরিক স্থিতি অষ্টম ধাতু। তুমি আমাকে ওজ প্রদান করো, আমি তোমার নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি। ১।
হে অগ্নি! তুমি শত্রুবর্গকে তিরস্কৃত করণে সমর্থ। আমাকে তেজ প্রদান করো। আমি তোমার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি নিবেদন করছি। ২।
হে অগ্নি! তুমি বলস্বরূপ। আমাকে বল প্রদান করো। আমি তোমার নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে এই হবিঃ নিবেদন করছি ৷ ৩৷
হে অগ্নি! তুমি আয়ুস্বরূপ। আমার জীবনের নিমিত্ত শতবর্ষের (দীর্ঘ) আয়ু প্রদান করো। আমি তোমার নিমিত্ত স্বাহা মন্ত্রে এই হবিঃ নিবেদন করছি। ৪।
হে অগ্নি! তুমি শ্রোত্রস্বরূপ, এই নিমিত্ত আমাকে শ্রবণশক্তি প্রদান করো। তোমার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই হবিঃ প্রদান করছি। ৫।
হে অগ্নি! তুমি চক্ষুস্বরূপ। আমাকে দর্শনশক্তিরূপ নেত্র প্রদান করো। আমি তোমার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই হবিঃ প্রদান করছি৷৷ ৬ ৷৷
হে অগ্নি! তুমি সকলের পালনকর্তা; সেই নিমিত্ত আয়ু-ভঙ্গের কারণসমূহ হতে রক্ষাপূর্বক আমাদের পালন করো। তোমার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে প্রদত্ত আমার এই হবিঃ তুমি গ্রহণ করো। ৭
টীকা –আয়ুষ্কামী জন এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা পূর্ব সূক্তে উল্লিখিত আজ্য, সমিৎ, পুরোড়াশ ইত্যাদি ত্রয়োদশ সংখ্যক দ্রব্য সহযোগে পূর্ব সূক্তবৎ হোম করবেন।-অগ্নিই ওজঃ বা তেজঃ সহ শরীরস্থিতির দেবতা। (২কা, ৩অ, ৭সূ)।
অধ্যায়: দুই
সূক্ত -১৮ : শত্রুনাশনম
[ঋষি : চাতন। দেবতা : অগ্নি। ছন্দ : বৃহতী]
ভ্রাতৃব্যক্ষয়ণমসি ভ্রাতৃব্যচাতনং মে দাঃ স্বাহা ॥ ১৷ সপত্নক্ষয়ণমসি সপত্নাতনং মে দাঃ স্বাহা ॥ ২॥ অরায়ক্ষয়ণমস্যরায়চাতনং মে দাঃ স্বাহা। ৩ পিশাচক্ষয়ণমসি পিশাচচাতনং মে দাঃ স্বাহা ॥৪॥ সদান্বক্ষয়ণমসি সদাচাতনং মে দাঃ স্বাহা ॥ ৫
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! তুমি আমার ভ্রাতৃব্য অর্থাৎ আত্মীয়রূপ শত্রুদের নাশকরণে সমর্থ; এই হেতু আমাকেও সেই ভ্রাতৃ-বিনাশক শক্তি প্রদান করো। আমি তোমাকে স্বাহা মন্ত্রে এই হবিস্য, প্রদান করছি। ১।
হে অগ্নি! তুমি আমার সপত্ন অর্থাৎ সাধারণ বিপক্ষীয়রূপ বৈরিবর্গকে বিনাশ-করণে দক্ষ; অতএব আমাকেও বৈরিগণের নাশকতামূলক শক্তি প্রদান করো। আমি তোমার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই হবিষ্য নিবেদন করছি ৷ ২।
হে অগ্নি! যারা দান ইত্যাদি মঙ্গলপ্রদ কর্মের শত্রু, তুমি সেই অরায় নামক রাক্ষসগণকে হনন-করণশালী। আমাকেও সেই অরায়গণের বিনাশক বল প্রদান করো। আমি তোমার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই হবিষ্য প্রদান করছি। ৩।
হে অগ্নি! তুমি পিশাচগণকে বিনাশ-করণক্ষম; তুমি এই রকমই সামর্থ্য আমাকেও প্রদান করো। আমি তোমাকে স্বাহা মন্ত্রে এই হবিষ্য প্রদান করছি। ৪।
হে অগ্নি! তুমি রাক্ষসীবর্গকে সংহারকরণে সমর্থ; আমাকেও রাক্ষসীগণ নাশ-করণশীল বল প্রদান করো। আমি তোমাকে স্বাহা মন্ত্রে এই হবিষ্য প্রদান করছি ৷৷ ৫.
টীকা –নয়টি সূক্ত সম্বলিত চতুর্থ অনুবাকের এটি প্রথম সূক্ত। এই সূক্তের দ্বারা অভিচার কর্মে শরসমিধ আধান এবং কৃষ্ণব্রীহি, যব, তিল ইত্যাদি আবপন করণীয়। এই সূক্তেও সায়ণাচার্য হোমাধাররূপে অগ্নিকে সম্বোধন করে ব্যাখ্যা করেছেন ॥ (২কা. ৪অ. ১ সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! তোমার যে সন্তাপপ্রদ শক্তি আছে, তার দ্বারা শত্রুকে লক্ষ্য করে দীপ্ত হয়ে ওঠো। যে শত্রুআমাদের বিরুদ্ধে কৃত্যা ইত্যাদি কর্ম করে, সেই বিদ্বেষীকে পীড়িত করো। ১।
হে অগ্নি! আমাদের প্রতি বিদ্বেষশীল বা আমরা যাকে বিদ্বেষ করি, সেই শত্রুর উপর তুমি আপন ক্রোধরূপ আয়ুধকে প্রয়োগ করো। ২।
হে অগ্নি! আমাদের প্রতি বৈরিতাসম্পন্ন বা যার প্রতি আমরা বৈরভাবান্বিত, সেই শত্রুকে তুমি আপন তেজের (অর্থাৎ দীপ্তির) দ্বারা ভস্ম করে দাও ৩
হে অগ্নি! যে আমাদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ বা আমরা যার প্রতি বিদ্বেষসম্পন্ন, তার উপর তুমি তোমার শোকপ্রদ শক্তিকে প্রয়োগ করো। ৪
হে অগ্নি! আমাদের বৈরী শত্রুগণকে তোমার অবদমিত করণশালী তেজের দ্বারা বলহীন করে দাও ॥ ৫॥
টীকা –এই সূক্তটি এবং এর অব্যবহিত পরবর্তী চারটি সূক্তের দ্বারা আভিচারিক কর্মে আজ্যের দ্বারা হোম করণীয়। আভিচারিক এবং প্রত্যাভিচারিক (কারও অভিচার কর্মের অভিচার কর্মের বিরুদ্ধে পাল্টা, অভিচার) কর্মে এই সূক্ত-মন্ত্রগুলি প্রয়োগের বিধি আছে।..ইত্যাদি (২কা. ৪অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে বায়ু! তুমি অন্তরিক্ষ লোকে বিচরণশালী। তুমি আপন পীড়াপ্রদ শক্তিকে (আমার) শত্রুর প্রতি প্রযুক্ত করো। আমাদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ কৃত্যাকারী (শত্রুকে) সন্তাপ প্রদান করো। ১
হে বায়ু! আমাদের প্রতি বৈরিতা-পোষণকারী বা যাদের প্রতি আমরা বৈরিতা পোষণ করি, সেই শত্রুগণের উপর তুমি আপন ক্রোধকে প্রয়োগ করো ॥২॥
হে বায়ু! আমাদের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন বা আমরা যাদের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন, এই দুই রকম শত্রুদের বিনাশ করার নিমিত্ত তুমি আপন অৰ্চিতে (সন্তাপক প্রবাহে) প্রদীপ্ত হয়ে ওঠো ॥৩॥
হে বায়ু! আমাদের দ্বেষ-করণশালী শত্রু বা যাদের প্রতি আমরা দ্বেষ পরায়ণ, সেই দুইরকম শত্রুর উপর তুমি আপন শোকপ্রদ সামর্থ্যের প্রয়োগ করো এবং তাদের শোকাকুল করে দাও। ৪
হে বায়ু! আমাদের প্রতি দ্বেষকারী বা যাদের প্রতি আমরা দ্বেষ করে থাকি, সেই দুই রকম শত্রুর উপর আপন বশীকরণ-শক্তিকে প্রয়োগ করো এবং শত্রুগণের তেজকে হরণ করে লও ৫৷৷
টীকা— পূর্ববর্তী সূক্তে বিনিয়োগ উল্লিখিত হয়েছে। এখানে সায়ণাচার্যের উল্লেখমতো পরবর্তী ষষ্ঠ সূক্তের সম্বোধ্য আপঃ পদটি নিত্যবহুত্ব হওয়ার কারণে বহুবচন নির্দেশ করা হয়েছে। (২কা. ৪অ. ৩-৬সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে আদিত্য! তোমাতে যে সন্তাপন শক্তি রয়েছে, সেই শক্তিকে শত্রুর প্রতি লক্ষ্যপূর্বক প্রকটিত করো। তুমি আপন তেজের দ্বারা শত্রুকে বিপরীত করো (অর্থাৎ সন্তাপিত করো)। যে শত্রুকে আমরা বিদ্বেষ করি,অথবা যে শত্রু আমাদের প্রতি বিদ্বেষপূর্বক কৃত্যা ইত্যাদি অভিচার কর্ম করে, তাদের তুমি পীড়িত করো। ১।
যারা আমাদের শত্রুতা করে এবং আমরা যাদের শত্রুতা করি, হে আদিত্য! সেই শত্রুদের উপর তুমি আপন ক্রোধরূপ আয়ুধকে নিক্ষেপ করো। ২।
যারা আমাদের বৈরিতা করে এবং আমরা যাদের প্রতি বৈরভাব-সম্পন্ন, হে আদিত্য! সেই শত্রুগণকে ভস্মীভূত করার নিমিত্ত আপন দীপ্তির দ্বারা সংযুক্ত হও। ৩
হে আদিত্য! তোমার এ যে শোক-প্রদানক্ষম শক্তি আছে, তার দ্বারা আমাদের শোক-প্রদানোদ্যত শত্রুদের শোকাকুল করে দাও। ৪
হে আদিত্য! আমাদের বৈরিগণকে তুমি তোমার শত্ৰু-বশীকরণশীল সামর্থ্যে বশীভূত করে তাদের নির্বীর্য করে দাও। ৫।
টীকা –পূর্ব মন্ত্রে বিনিয়োগ উল্লিখিত হয়েছে ৷ (২কা. ৪৩. ৪সূ)।
বঙ্গানুবাদ– হে চন্দ্র! যে শত্রু আমাদের প্রতি দ্বেষ পোষণ করে এবং আমরা যাদের প্রতি দ্বেষ পোষণ করি, এবং যে শত্রু আমাদের উপর কৃত্যা ইত্যাদি অভিচার প্রয়োগ করতে অভিলাষ করে, তুমি সেই শত্রুকে আপন সন্তাপন শক্তির দ্বারা সন্তপ্ত করো ৷৷ ১।
হে চন্দ্র! যারা আমাদের প্রতি দ্বেষ রক্ষা করে এবং আমরা যাদের প্রতি দ্বেষ করি, তুমি সেই শত্রুগণের উপর আপন ক্রোধ রূপ বলকে প্রয়োগ করো। ২
হে চন্দ্র! তুমি আপন দীপ্তির দ্বারা আমাদের বৈরিবর্গকে এবং যারা আমাদের প্রতি দ্বেষ করে থাকে, তাদের বিনাশ করে দাও। ৩।
হে চন্দ্র! আমাদের প্রতি দ্বেষকারী বা যাদের আমরা দ্বেষ করি, তাদের তুমি তোমার শোকপ্রদ বলের দ্বারা শোকাকুল করে দাও। ৪
হে চন্দ্র! তুমি তোমার শত্রুবশকারী সামর্থ্যের দ্বারা আমাদের বৈরিবর্গকে বশীভূত করো এবং তাদের নিবার্য করে দাও। ৫৷৷
টীকা –পূর্ববর্তী মন্ত্রবৎ এই সূক্তের বিনিয়োগ নির্ধারিত আছে। (২কা, ৪৩. ৫)।
বঙ্গানুবাদ –হে জল (অর্থাৎ জলের অভিমানী দেবীগণ)! যে শত্রু আমাদের দ্বেষ করে অথবা আমরা যাদের দ্বেষ করি, এবং যারা আমাদের প্রতি কৃত্যা ইত্যাদি অভিচার কর্ম প্রয়োগ করতে ইচ্ছা করে, সেই শত্রুগণকে তোমরা তোমাদের সন্তাপন শক্তির দ্বারা সন্তপ্ত করো। ১।
হে জলরাশি। যারা আমাদের দ্বেষ করে বা যাদের আমরা দ্বেষ করে থাকি, সেই শত্রুগণের উপর তোমরা তোমাদের ক্রোধকে প্রকট করো। ২।
হে জলসমূহ! আমরা যাদের প্রতি বিদ্বেষ পরায়ণ, বা যারা আমাদের প্রতি বিদ্বেষ-সম্পন্ন, তোমরা তোমাদের আপন দীপ্তির দ্বারা তাদের বিনাশ করে দাও। ৩৷৷
হে জলসমুদয়! যারা আমাদের দ্বেষ করে এবং আমরা যাদের দ্বেষ করি, তোমরা তোমাদের আপন শোকপ্রদ শক্তির দ্বারা তাদের (অর্থাৎ সেই শত্রুগণকে) শোকাভিভূত করে দাও। ৪।
হে জলবর্গ! যারা আমাদের বিদ্বেষী বা আমরা যাদের বিদ্বেষী, তোমরা তোমাদের বশীকরণ-সামর্থ্যে তাদের বশীকৃত করে নিবীর্য করে দাও। ৫।
টীকা— এই সূক্তেরও বিনিয়োগ দ্বিতীয় সূক্তে উল্লিখিত হয়েছে। জলের বহুবচনত্ব সম্পর্কে তৃতীয় সূক্তে উল্লেখ করা হয়েছে। (২কা. ৪অ. ৬) ॥
বঙ্গানুবাদ –হে রাক্ষসাধিপতি শোরভ! হে রাক্ষসাধিপতির সচিব (মন্ত্রী) শোরভুক! তোমরা শরভের ন্যায় সকলকে হিংসা-করণশীল রাক্ষসগণের মধ্যে মুখ্য। আমাদের অভিমুখে প্রেরিত তোমাদের যে যাতুন (রাক্ষস) আছে, তারা আয়ুধসমূহ সহ আমাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করুক। তোমাদের চোর ইত্যাদি অনুচরগণও এই স্থান ত্যাগ করে গমন করুক। যে প্রযোক্তা তোমাদের আমাদের নিকট প্রেরণ করেছে অথবা তোরা আপন দলের সাথে আমাদের যে শত্রুগণের নিকট অবস্থান করছো, তোমরা আমাদের সেই শত্রুগণকে ভক্ষণ করো। তোমরা এবং তোমাদের আয়ুধ শত্রুগণের মাংস ভক্ষণ করুক। ১
হে শোবৃধক! (অপরকে আঘাত করণশালী) তুমি তোমার আপন আশ্রিতগণের সুখ-বৃদ্ধিকারী শোবৃধবর্গের অধিপতি। তোমার প্রেরিত যাতুধান নামক রাক্ষসবৃন্দ এবং হিংসাত্মক আয়ুধগুলি আমার দিক্ হতে প্রত্যাহরণ করো। তোমার চোর ইত্যাদি অনুচরগণও যেন এইস্থানে না অবস্থান করে। হে রাক্ষসগণ! যে প্রযোক্তা আমাদের নিকটে তোমাদের প্রেরণ করেছে, অথবা তোমরা আমাদের যে বিরোধীবর্গের নিকটে অবস্থান করছে, সেই শত্রুগণের মাংস তোমরা ভক্ষণ করো। ২।
হে ম্রোক ও অনুম্রোক! (চোর) তোমরা ধন অপহরণ করে গুপ্ত রীতি অনুসারে (অর্থাৎ গোপনে) পলায়ন করে থাকো। তোমাদের প্রেরিত যাতুন রাক্ষস এবং হিংসাত্মক আয়ুধগুলি আমাদের নিকট হতে প্রত্যাগমন করুক। তোমাদের চোর ইত্যাদি অনুচরগণও যেন এখানে না অবস্থান করে। হে ম্রোকানুম্রোকবর্গ! যে প্রযোক্তা কর্তৃক তোমরা এই স্থানে প্রেরিত হয়েছে, অথবা তোমরা আমাদের যে বিরোধীসমূহের নিকট অবস্থান করছে, তোমরা সেই শক্রসমূহের মাংস ভক্ষণ করো ৷ ৩৷
সর্পের ন্যায় কুটিলভাবে গমনকারী হে সৰ্পনামক রাক্ষসাধিপতি! এবং সেই সর্পকে অনুসরণকারী (সচিব) হে অনুসর্প! তোমাদের দ্বারা প্রেরিত যাতুধান রাক্ষস এবং হিংসাত্মক আয়ুধ আমার নিকট হতে প্রতিনিবৃত্ত করো। তোমাদের কিমীদন। ইত্যাদি অনুচরগণও যেন এই স্থানে অবস্থান না করে। হে রাক্ষসবর্গ! যে প্রযোক্তা তোমাদের এই স্থানে প্রেরণ করেছে অথবা আমাদের যে বিরোধীগণের নিকট অবস্থান করছো, তোমরা আমাদের সেই শত্রুগণের মাংস ভক্ষণ করো। ৪
হে প্রাণীশরীরকে জীর্ণকারিণী ভূৰ্ণি নামধারিণী রাক্ষসীর দল! তোদের দ্বারা প্রেরিত অলক্ষ্মীরূপ যাতুধান রাক্ষসীসমূহ এবং হিংসাত্মক আয়ুধ আমার নিকট হতে প্রতিনিবৃত্ত হোক। তোদের প্রেরিত কিমীদিনী ইত্যাদি অনুচরীগণও যেন আমার নিকট না অবস্থান করে। হে সদল জুৰ্ণিগণ! যে প্রযোক্তা আমাদের নিকট তোদের প্রেরণ করেছে, অথবা তোরা আমাদের যে শত্রুবর্গের নিকট অবস্থান করছিস, তোরা সেই শত্রুদের ভক্ষণ কর। তাদের মাংস চর্বণ কর। ৫।
হে উপব্দা নাম্নী রাক্ষসী! তুই ক্রুর (বা কর্কশ) শব্দশালিনী এবং ক্র কর্মকারিণী। তোর দ্বারা প্রেরিতা অলক্ষ্মী-করণশীলা যাতুধানী রাক্ষসীগণ এবং হিংসা সাধন রূপ আয়ুধসমূহ আমাদের নিকট হতে প্রতিনিবৃত্ত হোক। তোর কিমীদিনী ইত্যাদি অনুচরীগণও যেন এই স্থানে অবস্থান না করে। হে সদলবল উপব্দ রাক্ষসীগণ! যে প্রযোক্তা তোদের এই স্থানে আমাদের নিকট প্রেরণ করেছে, অথবা তোরা আমাদের যে শত্রুগণের নিকট অবস্থান করছিস, তোরা সেই শত্রুদের মাংস ভক্ষণ করতে থাক্ ॥ ৬।
হে অর্জুনি নাম্নী রাক্ষসী! তোমাদের দ্বারা প্রেরিত যাতনাসমূহ, রাক্ষসীবর্গ এবং হিংসা-সাধন রূপ আয়ুধসমূহ আমাদের নিকট হতে প্রত্যাবৃত্ত হয়ে ও যাক। তোমাদের কিমীদিনী ইত্যাদি অনুচরীগণও যেন এই স্থানে অবস্থান না করে। হে সদলবল অর্জুনি রাক্ষসীগণ! যে প্রযোক্তা আমাদের নিকট তোমাদের প্রেরণ করেছে, অথবা তোমরা আমাদের যে বিরোধীগণের নিকট অবস্থান করছো, তোমরা তার (অর্থাৎ সেই প্রেরণকারীর) এবং সেই শত্রুগণের মাংস ভক্ষণ করো ৷৷ ৭
হে ভরূজি নাম্নী রাক্ষসী! তুমি প্রাণীর দেহ-অপহরণ করে গমনকারিণী! তোমার দ্বারা প্রেরিতা অলক্ষ্মীশালিনী যাতনাসমূহ, রাক্ষসীগণ, হিংসা-সাধন আয়ুধরাশি এবং কিমীদিনী ইত্যাদি অনুচরীবর্গ আমাদের নিকট হতে প্রতিনিবৃত্ত হোক। হে সদলবল ভরূজীসমূহ! যে প্রযোক্তা আমাদের নিকট তোমাদের প্রেরণ করেছে, অথবা তোমরা আমাদের যে বিরোধীগণের সকাশে অবস্থান করছে, সেই শত্রুদের মাংস তোমরা ভক্ষণ করো ॥৮
বঙ্গানুবাদ –এই পৃশ্নিপণী (চিত্রপর্ণী) নামক ঔষধি কুষ্ঠ ইত্যাদি রোগের শান্তি আমাদের সুখসম্পাদনশালিনী হোক। আমরা এই (কুষ্ঠ) রোগকে নাশ করণশালিণী ঔষধিকে (ভক্ষণ ও লেপনের দ্বারা) সেবন করছি। এই ঔষধি প্রচণ্ড বলধারণ পূর্বক পাপকে নাশ করে থাকে; এই ঔষধি নির্ঋতি রাক্ষসীকে পীড়িত করুক। ১।
এই পৃশ্নিপর্ণী ঔষধিগুলির মধ্যে প্রথম উৎপন্ন হয়েছিল। এটি দাদ, হাজা, বিসর্পক, শ্বেতকুষ্ঠ ইত্যাদি মুখ্য রোগকে দমন করার প্রধান সাধন। আমি এটির প্রলেপের দ্বারা উক্ত রোগসমূহকে পক্ষীর মস্তকের ন্যায় সমূলে ছিন্ন (নাশ) করছি ॥ ২॥
হে পৃশ্নিপর্ণী! শরীরের শুদ্ধ রক্তকে চোষণকারী কুষ্ঠ ইত্যাদি ব্যাধিরূপ শত্রুকে এবং শরীরের বৃদ্ধিকে রোধশালিনী ব্যাধিসমূহকে তুমি বিনাশ করো। তুমি গর্ভ-নষ্টকারী রোগকে অথবা গর্ভধ্বংসকারী রোগকেও নাশ করো। ৩।
হে পৃশ্নিপণী! এই কুষ্ঠ ইত্যাদি রোগ প্রাণসমূহকে ভ্রমে (বিমোহনে) পাতিত করে থাকে। এই সকল রোগের কারণভূত পাপকে, সর্প ইত্যাদিকে ভস্মকরণশালী দাবানলের ন্যায়, পর্বতের উপরে নীত করে ভস্ম করো। ৪।
হে পৃশ্নিপর্ণী! সূর্যোদয়ের পর যে দেশে অন্ধকার থেকে যায়, সেই অন্ধকারযুক্ত স্থানে ধাতুসমূহের ভক্ষক কুষ্ঠ ইত্যাদিকে প্রেরণ করছি। তুমি আপন প্রলেপনের দ্বারা, প্রাণসমূহকে ভ্রমে পাতনকারী সেই পাপ-ব্যাধিগুলিকে বিপরীত মুখে প্রেরণ করো ॥ ৫॥
বঙ্গানুবাদ –যে পশুগণ এই স্থান হতে ফিরে গিয়েছিল, তারা পুনরায় এই গোষ্ঠে প্রত্যাগমন করুক। যে পশুগণের রক্ষার নিমিত্ত বায়ু তাদের সাথে সাথে অবস্থান করেন এবং গর্ভপ্রাপ্ত যে পশুগণের নাম এবং রূপকে ত্বষ্টা নির্ধারিত করে থাকেন, সূর্য সেই সকল পশুগণকে এই গোষ্ঠে স্থিত করুন ৷ ১
গো-বর্গের আনয়নসম্পর্কিত বিধিকে যিনি সম্যকরূপে জ্ঞাত আছেন, সেই বৃহস্পতি গো-গণকে গোষ্ঠে প্রেরিত করুন। গবাদি পশু আমার গোষ্ঠে আগত হোক। সিনীবালী (শুক্লবর্ণা চন্দ্রকলার অভিমানী দেবপত্নী) এবং অমাভিমানী দেবতা এই পশুগণকে আনয়নপূর্বক গোষ্ঠে রক্ষা করুন। ২।
গো-সমূহ, অশ্ব ইত্যাদি ভালভাবে এইস্থানে আগমন করুক। সেবক, ধান, যব ইত্যাদিও সমৃদ্ধির সাথে প্রাপ্ত হোক। আমি আপন ঈপ্সিত ফলের সিদ্ধির নিমিত্ত ঘৃতাহুতি প্রদান করছি৷৷ ৩৷
গাভীগণের অধিপতিরূপ আমাতে (অর্থাৎ আমার অধীনে) গো-গণ অবস্থান করুক। আমাদের পুত্রগণ ঘৃত ইত্যাদির দ্বারা পুষ্টশালী হোক। আমি প্রথমে গাভীগণের দুগ্ধ সিঞ্চন করছি। অন্ন, জল এবং রসকে ঘৃতের দ্বারা সিঞ্চন করছি। ৪।
এই প্রয়োগের দ্বারা গো-দুগ্ধ, ধান্য এবং রস ইত্যাদিকে আপন গৃহে আনয়ন করছি। আপন পত্নী, পুত্র ইত্যাদিকেও গৃহে আনয়ন করছি। ৫।
টীকা –এই সূক্তের মন্ত্রগুলি গাভীর পুষ্টিকামনায় প্রযোজ্য হয়ে থাকে। এই উদ্দেশ্যে গো-বৎসের লালামিশ্রিত প্রথম দুগ্ধ এই সূক্তমন্ত্রগুলির দ্বারা অভিমন্ত্রিত করণীয়।…ইত্যাদি। (২কা. ৪অ. ৯সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে পাঠা (একপ্রকার লতা) নাম্নী ঔষধি! যে আমার শত্রু, সে তোমার সেবনকারী আমাকে যেন জয় করতে সমর্থ না হয়। তুমি শত্রুদের মোকাবিলা করে তাদের বশ করে থাকো। বাদ-বিবাদে বিজড়িত আমাকে গ্রহণ করার পর, আমার প্রতিবাদীগণকে পরাভূত করো। তুমি বাত, পিত্ত ইত্যাদি দোষসমূহকে প্রশমনশালিনী। ভিষকের অনুমতিতে যে তোমার রস পান করে, হে পাঠা! তুমি তার প্রতিবাদীদের কণ্ঠ শুষ্ক করে দাও এবং তাদের (সেই প্রতিবাদীদের) শব্দোচ্চারণ স্তব্ধ করে দাও। ১
হে ঔষধি! গরুড় তোমাকে বিষনাশের নিমিত্ত অন্বেষণ করেছিল। (সৰ্পৰ্শত্রু গরুড় সর্পবিষ নিবারণকল্পে তোমাকে অন্বেষণ পূর্বক প্রাপ্ত হয়েছিল)। তুমি আমার প্রতিবাদীগণকে পরাভূত করো। তাদের শুষ্ক-কণ্ঠশালী ও বাহিত করে দাও। ২
হে ঔষধি! ইন্দ্রদেব অসুর-নাশের নিমিত্ত তোমাকে আপন দক্ষিণ ভুজে ধারণ করেছিলেন, সেইরকমেই আমিও ধারণ করছি। তুমি আমার প্রতিবাদীদের স্মৃতি-হরণ পূর্বক পরাভূত করো। তাদের কণ্ঠকে বিশুষ্ক করে দাও, যাতে তারা অসম্বদ্ধ (অসংগত) বাক্যশালী হয়ে যায়। ৩।
হে পাঠা! ইন্দ্রদেব রাক্ষসদের উপর বিজয়-লাভের নিমিত্ত তোমাকে সেবন (ভক্ষণ) করেছিলেন। তোমাকে সেবন-করণশালী আমাকে লক্ষ্য পূর্বক প্রতিবাদীকে পরাভূত করো এবং তাদের কণ্ঠকে বিশুষ্ক করে অসংগত প্রলাপশালী করে দাও। ৪।
হে ঔষধি! তোমাকে সেবনের দ্বারা ইন্দ্রদেব যেমন রাক্ষসবর্গকে নিরুত্তর করে দিয়েছিলেন, সেই রকমেই তোমাকে সেবনকারী আমিও প্রতিবাদীদের নিরুত্তর করে দিচ্ছি। তুমি আমার প্রতিবাদী শত্রুগণকে পরাভূত করো এবং তাদের কণ্ঠকে শুষ্ক করে দাও। তারা যেন অসংগত বাক্যোচ্চারণশালী হয়ে যায় ৷৷ ৫৷
হে রুদ্র। তুমি স্মরণমাত্রই জলকে ঔষধে পরিণত করে থাকো। তুমি নীলবর্ণ শিখাসম্পন্ন এবং সৃষ্টি ইত্যাদি পঞ্চকৰ্ম-সাধনশালী। আমার দ্বারা সেবনকৃত এই পাঠাকে সেইরকম শক্তি দাও, যাতে সে (পাঠা) আমার প্রতিবাদীদের তিরস্কৃত করতে পারে। হে ঔষধি! তুমি আমার প্রতিবাদীদের পরাভূত করো। তারা শুষ্ক কণ্ঠশালী এবং অসম্বন্ধ বাক্যোচ্চারণশালী হয়ে যাক ৷৬৷৷
হে ইন্দ্রদেব! যাদের সাথে তর্কে (যুক্তিসঙ্গত বাক্যে) আমরা ক্ষীণ হয়ে আছি, সেই প্রতিবাদীদের তুমি প্রশ্নহীন করে দাও। আমাদের আপন শক্তিতে তর্কযুদ্ধে প্রবল করে দাও (অর্থাৎ কোনও তর্কে আমরা যেন কখনও র পরাভূত না হই)। ৭
টীকা –পঞ্চম অনুবাকে পাঁচটি সূক্ত। তার মধ্যে এইটি প্রথম। এই সূক্ত মন্ত্রগুলির দ্বারা বিবাদজয় কর্মে পাঠা নামক লতা-ঔষধির মূল অভিমন্ত্রিত করে ভক্ষণ (সেবন) পূর্বক তর্কসভায় প্রবেশ করণীয়। এইভাবে এই ঔষধিরূপ লতার মূল এই সূক্তমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করে বাহুতে ধারণীয়। এই সূক্তমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত এই লতার সাতটি পত্রে বিরচিত পাঠ্য মালা শিরে ধারণীয়।…ইত্যাদি। (২কা, ৫অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ— হে অগ্নি! তোমার সেবার নিমিত্তই এই বালক ব্যাধিরহিত হয়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকুক। তোমাকে প্রাপ্তি পর্যন্ত এই বালক প্রবৃদ্ধ হোক। রোগরূপ পিশাচ ইত্যাদি যেন এর অনিষ্ট না করতে পারে। যেমন মাতা তাঁর পুত্রকে রক্ষা করে থাকেন, সেইরকমেই মিত্র দেবতা, মিত্র দ্রোহের পাপ হতে এই বালককে রক্ষা করুক ॥১॥
দিবসাভিমানী দেবতা মিত্র এবং রাত্রির অভিমানী দেবতা বরুণ সমমনোভাবাপন্ন হয়ে এই বালককে বৃদ্ধাবস্থা প্রাপ্ত করান (অর্থাৎ পূর্ণ আয়ুঃ প্রদান করুন)। দেবাহ্বায়ক অগ্নি দেবতাগণের নিকটে এর দীর্ঘজীবনের নিমিত্ত প্রার্থনা করুন। ২।
হে অগ্নি! পার্থিব প্রাণিসমূহের তুমি অধিস্বামী; যারা উৎপন্ন হয়েছে (অর্থাৎ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে) এবং যারা উৎপন্ন হবে (অর্থাৎ জন্মগ্রহণ করবে), তুমি তাদেরও অধিস্বামী। তোমারই কৃপাবলে প্রাণ ও অপান বায়ু যেন একে ত্যাগ না করে। বন্ধু ও শত্রুরাও যেন একে হিংসা না করে। (শত্রুরা তো হিংসা করবেই, সুতরাং তাদের নিরস্ত করো। মিত্ররূপে পরিগণিত কিছু স্বজনও যেন হিংসান্বিত হয়ে এর ক্ষতি সাধন না করতে পারে) ৷ ৩৷
হে বালক! তুমি পৃথিবীর ক্রোড়ে প্রাণ ও অপান বায়ুর সাথে যুক্ত হয়ে শত হেমন্ত ঋতু পর্যন্ত (বহুবৎসর পর্যন্ত) জীবিত থাকো। পিতৃরূপ আকাশ ও মাতৃরূপা পৃথিবী তোমাকে বৃদ্ধাবস্থায় মরণ-সম্পন্ন করুন। (অর্থাৎ তোমাকে পূর্ণ আয়ুষ্মন্ করুন)। ৪
হে অগ্নি! তুমি এই বালককে সন্তান-উৎপাদনক্ষম বীর্য প্রদান করো। হে বিশ্বদেবগণ! তোমরা এই বালককে সর্ব গুণসম্পন্ন এবং দীর্ঘজীবী করো। হে মাতা অদিতি! তুমি এই বালকের পক্ষে মাতৃবৎ সুখশালিনী হও। ৫।
টীকা — এই সূক্তের দ্বারা গোদান ও চৌলকর্মে মাতা ও পিতা পরস্পর তিন বার পুত্রকে প্রত্যর্পণ করবেন। সেই কর্মে তিনটি ঘৃতপিণ্ড এই সূক্ত-মন্ত্রগুলির দ্বারা অভিমন্ত্রিত করে পুত্রকে ভোজন (প্রাশন) করণীয়। ইত্যাদি। (২কা, ৫অ. ২)।
বঙ্গানুবাদ –পার্থিব রস-পানশালী (অর্থাৎ ব্রীহি যব ইত্যাদির সারাংশ গ্রহণকারী) এই পুরুষকে, ভগ দেবতার তেজে ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাগণ তেজঃ-সম্পন্ন করুন; ইন্দ্র একে শতায়ুষ্য করুন, সূর্য একে তেজঃ প্রদান করুন এবং বৃহস্পতি একে বেদাধ্যয়নের বুদ্ধি প্রদান করুন। ১।
হে অগ্নি! তুমি একে শত বর্ষের আয়ু প্রদান করো। হে ত্বষ্টা! তুমি একে সন্তান প্রদান করো। হে সূর্য! তুমি একে গো-ইত্যাদি ধনে সম্পন্ন করে তোলো। তোমাদের কৃপায় এই পুরুষ শতায়ুষ্য হোক ২
হে আকাশ-পৃথিবী! আমাদের যাচনা (প্রার্থনা) সত্য হোক। আমাদের ঈপ্সিত ধন, অন্ন, বল এবং সন্তান প্রদান করো। তোমাদের আশীর্বাদ আমাদের অন্ন ও সন্তানসম্পন্ন করুক। হে ইদ্রদেব! তোমাদের শক্তির দ্বারা এই পুরুষ রিপুগণের উপর বিজয় প্রাপ্ত হোক এবং তাদের (অর্থাৎ শত্রুদের) গৃহ ইত্যাদিকেও আপন অধিকারভুক্ত করুক ॥ ৩॥
ইন্দ্রের নিকট হতে আয়ু প্রাপ্ত হয়ে, বরুণের নিকট হতে বল লাভ করে, মরুতের দ্বারা অভিপ্রেরিত এই পুরুষ আমাদের নিকট আগত হয়েছে। হে আকাশ-পৃথিবী! তোমাদের ক্রোড়স্থায়ী এই পুরুষ ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় যেন পীড়িত না হয়। ৪
হে আকাশ ও পৃথিবী! তোমরা এই পুরুষকে অন্ন ও জল প্রদান করো। তোমরা একে ঈপ্সিত অন্ন ইত্যাদি প্রদান করেছে এবং বিশ্বদেবগণ, মরুত্বর্গ এবং জলদেবতাবৃন্দ একে বলে (শক্তিতে) পূর্ণ করে দিয়েছেন। ৫।
হে পিপাসার্ত পুরুষ! আমি তোমাকে সুখদায়ক জলে তৃপ্ত করছি। তুমি সুন্দর দীপ্তিসম্পন্ন এবং আনন্দময় হও। এক বস্ত্র পরিহিত বা এক স্থানে অবস্থানকারী এই ব্যাধিগ্রস্ত পুরুষ অশ্বিদ্বয়ের ভেষজরূপ মন্থকে পান করো ৷ ৬ ৷৷
ইন্দ্রদেব তৃষ্ণা নিবৃত্তির নিমিত্ত এই মন্থকে প্রস্তুত করেছিলেন। (পুরাকালে ইন্দ্রদেব বৃত্রাসুর ইত্যাদি কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে, লুক্কায়িতভাবে অবস্থান কালে আপন তৃষ্ণা নিবারণকল্পে এই বলকারক মন্থ প্রস্তুত করেছিলেন)। হে তৃষ্ণার্ত রোগী! যে মন্থ তোমাকে প্রদান করা হয়েছে, তার দ্বারা তুমি বল ও তেজের সাথে সংযুক্ত হয়ে শতায়ুষ্য হও। এই মন্থ তোমার শরীর হতে যেন পৃথক্ না হয় ॥ ৭ ৷৷
বঙ্গানুবাদ— হে পত্নী! যেমন বায়ুর ঘূর্ণনে পতিত তৃণ আবর্তিত হয়, সেই রকমেই আমি তোমার মনকে আন্দোলিত (অর্থাৎ মথিত) করছি, যাতে তুমি আমাতেই অভিলাষিণী হয়ে থাকো এবং আমার নিকট হতে দূরে না গমন করতে পারো। ১।
হে অশ্বিদ্বয়! আমি যাকে কামনা করছি, তাকে প্রাপ্ত করিয়ে আমার নিকট উপনীতা করে দাও। তোমাদের দুজনের মন আমার দিকাভিমুখী হোক (অর্থাৎ তোমরা আমার প্রতি প্রসন্ন থাকো)। ২।
সুন্দর পক্ষীর আকর্ষক স্বর এবং স্বাস্থ্যবান (নীরোগ) পুরুষের প্রভাবযুক্ত বাক্যের ন্যায় আমার এই আহ্বানরূপ বাণী আমার লক্ষ্যে (অর্থাৎ স্ত্রীতে) যেন উপস্থিত হয় এবং তাকে যেন আমার বশীভূতা করে দেয়। ৩
অন্তরে ও বাহিরে এক বিচারশালিনী, নির্দোষ অঙ্গশালিনী কন্যাদের চিত্তকে গ্রহণ করতে সক্ষমা হে ঔষধি! তুমি তাদের মনকে গ্রহণ করো (অর্থাৎ তাদের মন আমার প্রতি আসক্ত হোক)। ৪।
এই কামনাময়ী স্ত্রী পতির কামনায় আমার নিকট আগতা হয়েছে। আমি তাকে কামনা পূর্বক তার নিকট গমন করেছি। আমি ধনের সাথে (অর্থাৎ সম্পৎ-সম্পন্ন হয়ে) এর নিকট আগমন করেছি, যেমন শ্রেষ্ঠ অশ্ব আপন বড়বার (ঘোটকীর) নিকট মিলনের নিমিত্ত গমন করে থাকে। ৫৷৷
টীকা –স্ত্রীবশীকরণ কর্মে গাছের ছাল, শরখণ্ড, রাঞ্জনকুষ্ঠ ইত্যাদি দ্রব্য পেষণ পূর্বক এই সূক্তমন্ত্রগুলির দ্বারা অভিমন্ত্রিত করে ঘৃত মিশ্রিত করে স্ত্রীর অঙ্গে অনুলেপনীয়। (২কা. ৫অ. ৪সূ)।
বঙ্গানুবাদ –ইন্দ্রদেবতার নিকট ক্রিমিসমূহকে নাশ-করণশালী যে মহৎ শিলা আছে, তার দ্বারা আমি পেষণিতে (যাঁতায়): চণক (ছোলা, বুট) ইত্যাদিকে পেষণের মতো শরীরস্থ সকল ক্রিমিকে পেষণ করছি। ১
আমি দেহগত দৃশ্য অদৃশ্য সমস্ত ক্রিমিকে নষ্ট করছি। জালের ন্যায়, রক্ত ও মাংসকে দূষিত-করণশালী এবং সকল প্রকার ক্রিমিকে বিনাশ করছি। ২৷৷
আমি সেই ক্রিমিদলকে মন্ত্র ও ঔষধির দ্বারা বিনাশ করছি। সকল ক্রিমি শুষ্ক হয়ে নির্জীব হয়ে যাক। এই সমস্ত ক্রিমিবর্গকে আমি মন্ত্রবলে শেষ করে দিচ্ছি। ৩
অন্ত্রের (নাড়ীভুড়ির) মধ্যগত, মস্তিষ্কের মধ্যে জাত, শরীরের পশ্চাৎদেশে (পাঝিতে) উৎপন্ন এবং অন্য নানাপ্রকার ক্রিমিকীটগুলিকে আমি মন্ত্রবলে বিনষ্ট করছি। ৪।
পর্বতে, বনে, ঔষধিতে (শাক-সজিতে), পশু ইত্যাদিতে জাত যে ক্রিমিসমূহ আমাদের ব্রণের মধ্য দিয়ে, মুখের মধ্য দিয়ে, স্নান-পানের মাধ্যমে দেহের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে গিয়েছে, আমি সেই সকল ক্রিমির পুষ্টি স্তব্ধ করে তাদের বিনাশ করছি। ৫
টীকা –উপরোক্ত ভাষ্যানুক্রমণিকা অনুসারে শরীরগত বিবিধ ক্রিমিরোগের বিনাশকল্পে ঘৃতমিশ্রিত কৃষ্ণচণক (কালো ছোলা বা বুট) এই সূক্তমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করে হোম করণীয়। সেইরকমে গাভীর রোমে বেষ্টিত শরকাণ্ড অগ্নিতে তপ্ত করে ক্রিমিরোগগ্রস্তকে ধারণ করণীয়। এই ভাবে চতুষ্পথের সংযোগস্থলস্থ ধূলি বাম হস্তের দ্বারা সংগৃহীত করে দক্ষিণ হস্তের দ্বারা মথিত করে দক্ষিণাভিমুখী হয়ে এই সূক্তমন্ত্রগুলি জপ পূর্বক ব্যাধিত ব্যক্তির উপর বিচ্ছুরণ কর্তব্য। এ ছাড়া এই সূক্তমন্ত্রগুলি জপ করতে করতে ক্রিমি-রোগী দুই হস্তে ধূলি মর্দন করলেও রোগের উপশম হয়। এই সূক্ত-মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত পলাশ উদুম্বর ইত্যাদি সমিধ (কাষ্ঠখণ্ড বা বৃক্ষত্বকের খণ্ড) রোগীর পক্ষে ধারণীয়। (২কা, ৫অ. ৫সূ)।
টীকা –ষষ্ঠ অনুবাকের পাঁচটি সূক্তের মধ্যে এই প্রথম সূক্তোক্ত মন্ত্রগুলি গাভীর ক্রিমিজনিত ব্যাধির। ও চিকিৎসায় বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। এই মন্ত্রগুলি ত্রি-সন্ধ্যা জপ পূর্বক ক্রিমিযুক্ত ব্রণের মুখে দর্ভের দ্বারা তাড়ন করণীয়। এবং এই সূক্তের দ্বারা আজ্যসহ কৃষ্ণচণকের হোম ইত্যাদি পূর্ববর্তী সূক্তের প্রকারে করণীয়। (২কা, ৬অ. ১সূ) ॥
বঙ্গানুবাদ –হে ক্ষয়গ্রস্ত (যক্ষ্মারোগাক্রান্ত) মনুষ্য! তোমার নেত্র, কর্ণ, মস্তক, মস্তিষ্ক, নাসিকা, চিবুক এবং জিহ্বা হতে যক্ষ্মা-ব্যাধিকে পৃথক করে দিচ্ছি ৷ ১।
হে রোগী! তোমার গ্রীবাদেশের চৌদ্দটি নাড়ী হতে, তোমার উষ্ণিহ নামক নাড়ী হতে, কণ্ঠ ও বক্ষস্থ নাড়ী হতে, অস্থির সংযোগসমূহ হতে, স্কন্ধ ও বাহুদ্বয় হতে তোমার যক্ষ্মা ব্যাধিতে পৃথক করে দিচ্ছি। ২৷৷
হে রোগী মনুষ্য! তোমার হৃৎপিণ্ড হতে, হৃৎপিণ্ডের সমীপবর্তী ক্লোন্ন ও হলী নামক মাংসপিণ্ড হতে, পার্শ্বদেশ হতে, জঠর হতে, প্লীহা হতে, যকৃৎ ইত্যাদি হতে যক্ষ্মা ব্যাধিকে বিদূরিত করে দিচ্ছি ৷ ৩৷৷
তোমার অন্ত্র হতে, গৃহ্যস্থান হতে, কুক্ষি (উদরের গহ্বর) হতে, প্লাশি (অর্থাৎ জঠরস্থ মলধারক স্থান) হতে এবং নাভি হতে যক্ষ্মা ব্যাধিকে বিতাড়িত করে দিচ্ছি। ৪
তোমার জঙ্ হতে, তোমার পাদস্থ ঊর্ধ্বভাগ (জানু) ও নিম্নস্থ পদতল হতে, কটি হতে, কটির নিম্নভাগ হতে এবং শ্রোণি (নিতম্ব) হতে যক্ষ্মা ব্যাধিকে দূর করছি। ৫
তোমার অস্থি, মজ্জা, সূক্ষ্ম ও স্কুল নাড়ী, অঙ্গুলী ও নখ ইত্যাদি হতে যক্ষ্মা ব্যাধিকে বিদূরিত করছি। ৬
হে রোগী! তোমার অন্য সকল অঙ্গ হতে (অর্থাৎ যে অঙ্গের নাম অনুক্ত রয়ে গেছে), রোমকূপ সমূহ হতে, দেহের সকল সংযোগস্থল হতে, ত্বক ইত্যাদি হতে মহর্ষি কশ্যপের এই বিবৰ্হ (পৃথক্-করণশালী) সূক্ত-মন্ত্রের এ বলে আমি তোমার যক্ষ্মা ব্যাধিকে বিতাড়িত করে দিচ্ছি। ৭।
বঙ্গানুবাদ –যে পশুপতি (অর্থাৎ ঈশ্বর) দ্বিপদ (মনুষ্য) ও চতুষ্পদ (গো ইত্যাদি) প্রাণীগণের স্বামী (অর্থাৎ অধিপতি), তিনি পূর্ণ রূপে জ্ঞাত হয়ে এই যজ্ঞকে প্রাপ্ত হোন। তার কৃপায় এই যজ্ঞ-করণশীল যজমান ধন ও বল প্রাপ্ত হোন ॥ ১।
হে দেবগণ! সংসারের সারভূত উপদেশ দান পূর্বক এই যজ্ঞানুষ্ঠান-কর্তাকে সৎ-পথ প্রদর্শন করো। যে সোম রূপ সুসংস্কৃত অন্ন দেবগণের প্রিয়, তা আমাদের প্রাপ্ত হোক ॥ ২॥
যে প্রকাশমান জীব (পশুগণ) এই বধ্যমান (বলীর জন্য উৎসর্গীকৃত) পশুকে চক্ষুর দ্বারা দর্শন এবং মনের দ্বারা অনুতপ্ত হচ্ছে, তাকে (বা তাদের) সেই বিশ্বকর্তা সর্বাগ্রে মুক্ত করুন ৷ ৩৷৷
গ্রামের যে সমস্ত বিবিধ রূপ ও বর্ণশালী পশু, ভিন্নতা হওয়ার পরেও যজ্ঞে বধ্যমান এই পশুর প্রতি একরকম ভাব প্রাপ্ত হয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে (অর্থাৎ সমভাবাপন্ন হচ্ছে), তাদেরও প্রজাগণের সাথে অবস্থানকারী প্রাণদেব (ঈশ্বর) প্রথমে মুক্ত করুন। ৪।
বিশেষভাবে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চতুর্দিকস্থ স্থানসমূহে ভ্রমণশীল (অর্থাৎ অন্তরিক্ষচারী) জ্ঞানী দেবগণ এই যজ্ঞে বলীপ্রদত্ত পশুর দেহ হতে নিষ্ক্রান্ত প্রাণকে (বা আত্মাকে) সকল অঙ্গ হতে স্বতন্ত্রিত করে স্ববশে গ্রহণ পূর্বক স্বস্থ জীবন-ব্যতীত করে থাকেন এবং পুনরায় দিব্যমার্গে সহজে স্বর্গে গমন করেন। সেই স্থানে এ (অর্থাৎ এই বধ্যমান প্রাণির আত্মা প্রকাশময় স্থান প্রাপ্ত হয়ে থাকে। ৫
টীকা— এই সূক্তের মন্ত্রগুলি বশাশমনকর্মে আজ্যাতি প্রদানে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। সর্বলোকে আধিপত্য কামনায় এই সূক্তের দ্বারা ইন্দ্রাগ্নী-যাগ বা উপস্থান করা হয়। এ ব্যতীত এই সূক্তের দ্বারা অন্ন অভিমন্ত্রিত করে ব্রাহ্মণকে দান করণীয়। পশুযাগে সংজ্ঞপনার্থে ঘূপ হতে প্রমুক্ত পশুর অনুমন্ত্রণ বিহিত আছে।…ইত্যাদি ॥(২কা, ৬অ. ৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –যজ্ঞ-কার্য না করে অন্যত্র ধন-ব্যয় করার কারণে আমরা সমৃদ্ধিহীন রয়ে গিয়েছি। এই নিমিত্ত আহ্বানীয় অগ্নি আমার অনুতাপিত হয়েছেন। এইভাবে আমরা অষ্টা (যাগহীন) ও দুষ্টা (দুষ্ট যাগকারী) রূপে পরিগণিত হয়েছি। আমাদের সুন্দর (ত্রুটিহীন) যজ্ঞানুষ্ঠান করার অভিলাষকে বিশ্বকর্মা পূর্ণ করুন ॥ ১।
অতীন্দ্রিয় ঋষিগণ যাগবৈকল্যশালী এবং স্বয়ংই পাপের জন্য অনুতপ্ত যজমানকে পাপী বলে অভিহিত করেন। যে প্রজাপতি দেবতা সোমের বিন্দুকে অবতরিত করেছিলেন, সেই প্রজাপতি সেই বিন্দুসমূহে আমাদের যজ্ঞকে সম্পন্ন করুন। ২।
রণাঙ্গনে সমুপস্থিত যোদ্ধা অন্য যোদ্ধার (অর্থাৎ প্রতিযোদ্ধার) রূপ (বা সামর্থ্য) জ্ঞাত। হয়ে তাকে যেমন তুচ্ছজ্ঞান করে, সেই রকমেই আমি এই যজ্ঞের স্বরূপকে জ্ঞাত হয়েছিলাম (অর্থাৎ তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলাম)। বিদ্যার অহঙ্কারে মত্ত হয়ে বিদ্বাৰ্গণকে তুচ্ছজ্ঞান করে তাদের প্রতি তিরস্কার করার পাপ করেছিলাম; সেই পাপ হতে, হে প্রজাপতি! আমাকে মুক্ত করো। ৩।
চক্ষু ইত্যাদি প্রাণরূপ ঋষিগণের মধ্যে যথার্থ দর্শনশালী চক্ষুকে নমস্কার। দেবতাগণের পালক বৃহস্পতিকে এবং হে প্রজাপতি! তোমাকেও নমস্কার। তুমি ক্রুর দৃষ্টি হতে উৎপন্ন পাপকে বিদূরিত করে আমাদের রক্ষক হও ৷৷ ৪
যজ্ঞের এই অগ্নিকে চক্ষুর সমান দেখাচ্ছে। সকল যজ্ঞ অগ্নির দ্বারাই (বা উদ্দেশে) অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। দেবতাগণের মধ্যে প্রথমে এঁরই (অর্থাৎ অগ্নির) পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় ইনিই মুখ্যরূপে পরিগণিত। এই হেন অগ্নিদেবের উদ্দেশে আমি ঘৃতাহুতি সমর্পণ করছি; এই প্রজাপতির (অগ্নির) দ্বারা অনুষ্ঠীয়মান যজ্ঞে ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাগণ আপনাপন কৃপাপূর্ণ বা অনুগ্রহসম্পন্ন বুদ্ধির সাথে আগমন করুন ॥ ৫
টীকা –বহু ব্যক্তির মধ্যে ভোজনকারী জনের পক্ষে দৃষ্টিদোষ নিবারণ কল্পে এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত অন্ন ভোজন করণীয়। সর্বলোকের আধিপত্য কামনাতেও এই সূক্তের দ্বারা ইন্দ্র ও অগ্নির উদ্দেশ্যে অন্ন-দান-যজ্ঞ অনুষ্ঠান করণীয়।…ইত্যাদি ॥ (২কা, ৬অ. ৪সূ)।
বঙ্গানুবাদ— হে অগ্নি! কন্যাকে গ্রহণ করতে অভিলাষী সুন্দর বর (পুরুষ বা পাত্র) আমাদের দৃষ্টিগত হয়ে যাক; যে বর আমাদের প্রথমে নিরাশ করে দিয়েছিল (অর্থাৎ এই কন্যাকে অপছন্দ করেছিল), সে এই কন্যাকে লাভ করার অভিলাষের সাথে আগমন পূর্বক আপন ঐশ্বর্যের সাথে এই কন্যাকে গ্রহণ করুক। পুনরায় আগত বরপক্ষীয়গণের নিকট এই কন্যার বরণ সুন্দর লাগুক এবং এই কন্যা পতির সান্নিধ্যে সৌভাগ্যবতী হোক ॥১
সোম, গন্ধর্ব ও অর্যমা নামক বিবাহাগ্নির দ্বারা স্বীকৃত এই কুমারিকা রূপ ধন ধাতা দেবতার অনুজ্ঞাক্রমে মনুষ্যরূপ পতিকে লাভ-করণশালিনী করে তুলুক। ২
এই কন্যা পতিকে প্রাপ্ত হোক, সোমদেব একে সৌভাগ্যবতী করুন; এই কন্যা পতিকে প্রাপ্ত হয়ে তেজস্বিনী হয়ে উঠুক এবং পুত্রোৎপাদনশালিনী শ্রেষ্ঠ জায়ায় পরিণতি লাভ করুক। ৩।
সুন্দর স্থান যেমন মৃগদলের প্রিয় হয়, এবং তারা সেখানে যেমন সুখে অবস্থান করে, তেমনই এই স্ত্রী তার পতির সাথে অবস্থান পূর্বক ভাগ্যবতী হয়ে উঠুক। ৪
হে কন্যা! তুমি অভিলষিত ফলে পরিপূর্ণ (বোঝাই) হয়ে এই নৌকার উপর আরোহণ করো এবং এর দ্বারা আপন আকাঙ্ক্ষিত পতিকে লাভ করো ॥ ৫॥
হে বরুণ! বরকে এই কন্যার সম্মুখে আহ্বান করে তার (অর্থাৎ সেই বরের) মন এর দিকে প্রেরিত করো এবং তাকে বিবাহের অনুকূল ব্যাপারশালিনী করে দাও। তাকে (অর্থাৎ সেই বরকে) বলাও, এই কন্যা আমার পত্নী। ৬
হে কন্যা! এই স্বর্ণভূষণ, এই ঔক্ষ অর্থাৎ প্রলেপন সামগ্রী অলঙ্কার ইত্যাদির অধিষ্ঠাতা দেবতা ভগ (সূর্য) তোমাকে সোম, গন্ধর্ব ও অগ্নি নামক রক্ষকগণের দ্বারা যুক্ত মনুষ্য পতিকে প্রাপ্ত করার নিমিত্ত প্রদান করছেন। ৭।
হে ব্রীহি ইত্যাদি ঔষধি! এই কন্যাকে পতি প্রদান করো। হে কন্যা! সূর্যদেব বরকে তোমার সমীপে আনয়ন করুন। নিয়ত সেই বর তোমার পাণিগ্রহণ পূর্বক তোমাকে আপন গৃহে নয়ন করুক (নিয়ে যাক) ॥৮॥
টীকা— অনূঢ়া কন্যার বারংবার বিবাহ-সম্ভাবনা ভঙ্গজনিত দোষের প্রতিকারকল্পে এই সূক্তের দ্বারা তার অলঙ্কার, ব্যবহৃত গন্ধদ্রব্য, প্রলেপন দ্রব্য ইত্যাদি অভিমন্ত্রিত করে ক্রমে (অলঙ্কার) বন্ধন, (গন্ধদ্রব্য) ধূপন ও (প্রলেপন দ্রব্য) লেপন করণীয়। এই সূক্তের মন্ত্রগুলির দ্বারা সম্পাতবতী নৌকায় কুমারীকে আরোহণ করিয়ে পঞ্চম মন্ত্রোক্ত ভগস্য নাবমা রোহ ইত্যাদি বাক্য উচ্চারণ পূর্বক তাকে নদী উত্তীর্ণ করানো কর্তব্য। সেইরকমে পতিলাভবিজ্ঞান কর্মে এই মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত সাতটি রঞ্জুতে সাতটি গো-বৎস বন্ধন পূর্বক কুমারীর দ্বারা একে একে সেগুলিকে মোচন করণীয়। সেইকালে কুমারী যদি সেগুলিকে প্রদক্ষিণক্রমে উন্মোচিত করে, তবে তার পতিলাভ অনিবার্য।…এই সূক্তটি পতিবেদন নামে প্রসিদ্ধ, কারণ পতিলাভ সাধনের উদ্দেশে এটির বিনিয়োগ বিহিত হয়েছে।..ইত্যাদি। (২কা, ৬অ. ৫সূ)।
বঙ্গানুবাদ –এই অগ্নিদেব সেনাধ্যক্ষের সহযোগে, নাশের নিমিত্ত উদ্যত শত্রুগণের মনকে ব্যাকুল করে অস্ত্র-শস্ত্র ধারণের পক্ষে অসমর্থ করে দিন। এই অগ্নি দেবাসুরের যুদ্ধে দেবসেনাগণের অগ্রবর্তী হয়ে গমনশীল; তিনি বৈরিগণের অঙ্গকে ভস্মীভূত করে অগ্রসর হোন ১
হে মরুত-বর্গ! তোমরা যুদ্ধে আমার সহায়তার নিমিত্ত সমীপবর্তী হয়ে থাকো এবং শত্রুদের প্রহার করো। বসু দেবতাগণও আমাদের নিবেদন গ্রহণ পূর্বক শনাশে প্রবৃত্ত হোন। বসুগণের প্রধান দূতরূপে অগ্নিও শত্রুর অভিমুখে অগ্রসর হোন। ২।
হে ইন্দ্র! আমরা, যারা তোমার পরিচর্যাকারী, সেই নিরপরাধীদের প্রতি শত্রুবৎ আচরণশীল আক্রমণকারী সেনাগণের সম্মুখে। আগমন করো। তুমি এবং অগ্নিদেব উভয়েই শত্রুর নিমিত্ত প্রতিকূলতা সম্পন্ন হয়ে তাদের ভস্মীভূত করে দাও। ৩।
হে ইন্দ্র! তুমি শত্রুসেনার মধ্যে সমুপস্থিত হয়ে বজের দ্বারা তাদের ভয়ঙ্কর ভাবে সংহার করে ফেলো। সম্মুখভাগে অগ্রসরমান, পশ্চাৎভাগ হতে ধাবমান এবং পলায়মান সকল শত্রুগণকে বিনাশ করে ফেলো। এই অবসরে শত্রুকে পরাজিত করা ব্যতীত আর কোন কথা বিচার করো না। ৪।
হে ইন্দ্রদেব! রিপু সেনাগণকে বিমূর্ত (বা বিমোহিত) করে দাও। অগ্নি ও পবনের সহযোগে বিনাশ-সাধনকারী যে বিকরাল গতি হয়ে থাকে, তার দ্বারা তুমি রিপুগণকে পরাজুখ করে শেষ করে দাও। ৫।
হে দেববর্গের অধিপতি (ইন্দ্র)! তুমি রিপু সেনাগণকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দাও এবং তোমার আপন সখা মরুৎ-গণের দ্বারা তাদের নির্মূল করে দাও। অগ্নিদেব রিপুগণের নেত্রগুলিকে বিকৃত করে দিন। এই পদ্ধতিতে এই রকম পরাজিত হয়ে রিপুসৈন্যগণ প্রত্যাবর্তন করুক ৷ ৬ ৷৷
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –তৃতীয় কাণ্ডে ষড়নুবাকাঃ। তত্র প্রথমেনুবাকে পঞ্চ সূক্তানি। তত্র অগ্নিৰ্ণঃ শর্জন ইতি প্রথম সূক্তং। তস্য পরসেনামোহনকর্মণি ফলীকরণমিশ্রিতস্য বা কনিকিকামিশ্রিতস্য বা ওদনপিণ্ডস্য সাংগ্রামিকাগ্নেী উলুখলেন হোমে বিনিয়োগ। তথা অস্মিন্নেব কর্মণি একবিংশতিং শর্করাঃ শূপে কৃত্বা পরসেনাং প্রতি নিপুনীয়াৎ। তথৈব অপা বাখ্যায়ৈ দেবতায়ৈ অনেন সূক্তেন চরুং জুহুয়াৎ। 3ৎ উওং কৌশিকেন।…ইত্যাদি। (৩কা, ১অ. ১সূ.)।
টীকা –তৃতীয় কাণ্ডের ছটি অনুবাকের মধ্যে প্রথম অনুবাকের পঞ্চ সূক্তের এটি প্রথম সূক্ত। এই সূক্তমন্ত্রের সহযোগে পরসৈন্যকে বিমোহিত করতে ফলীকরণ-মিশ্রিত বা কণিকিকা-মিশ্রিত বা অন্নপিণ্ডের সাংগ্রামিক অগ্নিতে উলুখলের দ্বারা হোম করণীয়। এই কর্মকালে একুশটি শর্করা কুলায় করে পরসেনার প্রতি উড়িয়ে দিতে হয়। এবং তারপর অপা নামধেয় (সকলের সুখ ও প্রাণ অপহরণকারী দেবতা বা) অপদেবতার উদ্দেশে এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত চরু-হোম করণীয়।.. ত্যাদি। (৩কা, ১অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ–দেবদূতের ন্যায় অগ্রগণ্য অগ্নি শত্রুগণকে ভস্ম করুন; তাদের মনকে মোহগ্রস্ত করুন এবং তাদের অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণের সামর্থ্য রহিত করে দিন। ১।
হে শবর্গ! আমাদের দমন করার বিষয়ে তোমরা যে পরিকল্পনা করেছে, সেই পরিকল্পনাকে অগ্নি ভ্ৰমান্বিত করুন এবং তোমাদের স্থানচ্যুত করে দিন। ২।
হে ইন্দ্র! শত্রুগণের মনকে ভ্ৰমান্বিত করে তুমি তাদের সম্মুখে বিচরণ করো এবং অগ্নি ও বায়ুর সম্মিলনে যে প্রচণ্ড গতি উৎপন্ন হয়ে থাকে, সেই গতির দ্বারা শত্রুগণকে বিনষ্ট করো ৷ ৩৷
হে শত্রুগণের মনঃসমূহ! তোমরা বিমোহিত বা প্রমান্বিত হয়ে যাও। হে শত্রুগণের সঙ্কল্পসমূহ! তোমরা বিরুদ্ধ হয়ে যাও। হে দেবগণ! তোমরা এই শত্রুগণের মনকে মোহগ্রস্ত করে দাও। হে ইন্দ্র! যুদ্ধের নিমিত্ত প্রস্তুত আমাদের শত্রুবর্গের উৎসাহকে তুমি নষ্ট করে দাও। ৪।
হে সুখ নষ্ট-করণশালিনী অপা নামধারিণী পাপদেবী! আমাদের শত্রুবর্গের মনকে ভ্রমপূর্ণ করে তুমি তাদের শরীরে অবস্থান করো। তুমি শত্রুর অভিমুখে গমন পূর্বক তাদের মতিভ্রষ্ট করো; ভয় শোক ইত্যাদির দ্বারা পূর্ণ করে তাদের মোহ রূপ পিশাচগণের দ্বারা বিনাশ করো ॥ ৫॥
হে মরুৎ-বর্গ! আপন বলের অহঙ্কারে আমাদের প্রতি স্পর্ধাকারী এই শত্রুসেনাগণ আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তুমি আপন মায়ায় তাদের নষ্ট করে দাও। এদের মধ্যে কোন জনও যেন নিজেকে ভিন্ন অপরকে না জানতে পারে (অর্থাৎ মায়ার অন্ধকারে যেন তারা সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হয়ে যায়) ৬
বঙ্গানুবাদ— হে অগ্নি! এই রাজা আপন রাজ্য হতে পতিত (চ্যুত হয়েছেন; পুনরায় রাজ্যপ্রাপ্তির নিমিত্ত তোমাকে আহ্বান করছেন। প্রজাপালক রাজা তোমার কৃপায় পূর্ণ হোন। তুমি এঁর নিমিত্ত দাবা পৃথিবীতে ব্যাপ্ত হও; এই কর্মে উনপঞ্চাশসংখ্যক মরুৎ-বৃন্দ তোমার সহায়তা করুক। তুমি এই রাজাকে পুনরায় রাজ্য প্রাপ্ত করিয়ে দাও। ১।
হে ঋত্বিবৃন্দ! দেবরাজ ইন্দ্রকে এই রাজার সহায়তার নিমিত্ত আহুত করো। দেবগণ এই ইন্দ্রকে গায়ত্রী ছন্দে, বৃহতী ছন্দে ও বৃহৎ- মন্ত্রে পরম পরাক্রমী করে দিয়েছেন। অতএব সেই ইন্দ্রকে এই স্থানে আনয়ন করো ২
হে রাজন্! তোমার রাজ্য অপরে ছিনিয়ে নিয়েছে; সেই রাজ্যে স্থিত করার নিমিত্ত বরুণ তোমাকে জল হতে, সোম তোমাকে তার আশ্রয়স্থান পর্বত হতে এবং ইন্দ্র তোমাকে তোমার প্রজাগণের দ্বারা আমন্ত্রিত করুন। এর পরে তুমি বাজপক্ষীর ন্যায় দ্রুতগতিতে আগমনকারী হয়ে, শত্রুগণের দ্বারা অপরাজিত হয়ে আপন প্রজাবর্গের মধ্যে সুশোভিত হও। ৩
স্বর্গবাসী দেবতা, অপরের আশ্রয়ে পতিত হয়ে থাকা তোমাকে তোমার আপন রাজ্যে উপনীত করুন। হে রাজন! তোমার আগমন-পথ অশ্বিনীকুমারদ্বয় শত্রুশূন্য করে দিন। হে (রাজার) বান্ধবগণ! এই পুনঃ প্রাপ্ত রাজার সাথে মিলিত হয়ে তোমরা এঁর সেবাপরায়ণ হও। ৪
হে রাজন! তুমি প্রতিকূলে অবস্থানশীল ছিলে, এখন অনুকূল হয়ে যাও (অর্থাৎ পূর্বে তুমি যাদের বিরুদ্ধাচারী ছিলে, এখন তাদের স্বপক্ষে আনয়ন পূর্বক পালন করো) এবং তারা তোমাতে স্নেহান্বিত হয়ে আজ্ঞানুবর্তী হয়ে যাক। ইন্দ্র, অগ্নি ও বিশ্বদেবগণ তোমাতে প্রজাপালনের শক্তি উৎপন্ন করুন। ৫।
হে রাজন! তোমার পুনরায় রাজ্য প্রবেশে যে সমান বলসম্পন্ন, তোমার অপেক্ষা উচ্চ বলশালী বা কম বলবান ব্যক্তি সহমত হয়নি, সেই শত্রুকে, হে ইন্দ্র! তুমি বহিস্কৃত করে দাও এবং এই রাজাকে রাজ্যের প্রকৃত অধিস্বামী রূপে ঘোষণা করো। ৬।
টীকা –শত্রুগণ কর্তৃক পরাজিত ও রাজ্যভ্রষ্ট রাজা পুনরায় আপন স্বরাষ্ট্রে প্রবেশের (বা প্রাপ্তির) নিমিত্ত শত্রুসেনার আকারে কৃত পুরোডাশ এই মন্ত্রগুলির দ্বারা অভিমন্ত্রিত করে জলে দুর্ভ বিস্তার পূর্বক তার উপর নিক্ষেপ করবেন। তারপর সেই পুরোডাশ নিমজ্জিত করার নিমিত্ত লোষ্ট্র স্থাপন করবেন। এবং, এই সূক্তের দ্বারা অভিমন্ত্রিত ক্ষীরৌদন স্বরাষ্ট্রে প্রবেশার্থে রাজাকে ভোজন করাতে হয়।…ইত্যাদি। (৩কা, ১অ. ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে রাজন! শত্রুগণের দ্বারা অপহৃত তোমার রাজ্য তুমি পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছে। তুমি প্রজাপালক ও শত্রু-রহিত হয়ে শোভিত হও। সর্বদিকের গৌরবশীল দেবতা এবং সর্ব দিকে নিবাসকারী সকল মনুষ্য তোমাকে নিজেদের অধিস্বামীরূপে জ্ঞান করুক এবং তুমি তাদের অভিবাদন লাভ করো ॥১॥
হে রাজন! এই শ্রেষ্ঠ দিমূহ তোমার পক্ষে শুভ হোক, তুমি আপন দেশে উচ্চ সিংহাসনে বিরাজমান হও এবং পুনরপি, আমরা যারা তোমার সেবক, তাদের যথাযোগ্য ধন প্রদান করো। তোমার প্রজাবৃন্দ তোমাকে রাজকর্ম পালনের নিমিত্ত বরণ পূর্বক তোমার শাসনাধীন থাকুক। ২
হে রাজন! তোমার অপর সজাতীয় রাজ্যন্যগণ তোমার আহ্বান মাত্রই সম্মুখে আগমন করুক। তোমার দূতগণ অগ্নির ন্যায় অপ্রধৃষ্য রূপে বিচরণশীল থোক। তোমার স্ত্রী পুত্র ইত্যাদি সকলে পুনরায় রাজ্যপ্রাপ্তির কারণে প্রসন্ন হয়ে নানা উপটৌকন প্রাপ্তির দ্বারা সন্তুষ্ট হোক ॥ ৩।
হে রাজন! অশ্বিনীকুমারদ্বয়, মিত্রাবরুণ এবং মরুৎ-গণ তোমাকে রাজ্যে প্রবিষ্ট করান। পুনরায় তুমি আপন মনকে দান-কর্মে নিয়োজিত করো এবং অত্যন্ত পরাক্রমে সম্পন্ন হয়ে ওঠো ॥৪
হে রাজন্! যদি তুমি দূর দেশেও থাকো, তবুও শীঘ্রতার সাথে আপন দেশে আগমন করো। তোমার রাষ্ট্র প্রবেশের কালে আকাশ ও পৃথিবী মঙ্গলকারিণী হোক। এই বরুণ তোমাকে আহ্বান করছেন, তুমি আপন রাজ্যে আগমন করো। ৫।
হে ইন্দ্র! মনুষ্যগণের নিকট আগত হও। তুমি বরুণের সাথে সহমত হয়ে এই রাজাকে আহ্বানের আজ্ঞা প্রদান করেছে; সেই নিমিত্ত এখানে আগমন করো। হে রাজন! ইন্দ্র তোমাকে আহ্বান করছেন, অতএব আপন রাজ্যে আগমন করো এবং ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতার উদ্দেশে যজ্ঞানুষ্ঠান পূর্বক প্রজাগণকে আপন আপন কর্মে নিযুক্ত করো ॥ ৬।
হে রাজন্! এই সকল প্রকার জল দেবতা তোমার কল্যাণ-সাধন করুন। এই সকল দেবতা তোমাকে রাষ্ট্রে আগমনের নিমিত্ত আহ্বান করছেন। তুমি আপন শত বৎসরের (দীর্ঘ)। আয়ুষ্কাল পর্যন্ত রাজ্যসুখ ভোগশালী হও। ৭।
বঙ্গানুবাদ –আপন শক্তিতে শত্রুগণকে বিনাশকারিণী, সকল ঔষধির সারভূত পলাশ-মণি আমাকে প্রাপ্ত হোক এবং আপন তেজের দ্বারা আমাকে তেজীয়া করুক ॥১॥
হে পলাশবৃক্ষ হতে নিমিত্ত মণি, আমাতে ধন ও বল স্থিত করো, যাতে আমি আমার আপন রাজ্যকে স্বাধীন করতে (অর্থাৎ আপন অধিকারে আনতে) অপর কারও মুখাপেক্ষী না হতে হয় ॥ ২।
ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ অভীষ্ট ফলদায়িনী হওয়ার কারণে এই গোপনীয় মণিটিকে পলাশ নামক বনস্পতিতে স্থিত করেছিলেন। দেবগণ সেই মণিকে আমাদের ভরণ-পোষণ এবং আয়ু-বর্ধনের নিমিত্ত আমাদের প্রদান করুন ৷৩৷
সোমলতার মণি অপরকে তিরস্কৃত-করণে সমর্থ; অতএব এটি আমাকে প্রাপ্ত হোক (অর্থাৎ আমি এটি লাভ করি)। ইন্দ্র কর্তৃক প্রদত্ত এবং বরুণের দ্বারা অনুশিষ্ট সেই সোমলতার পর্ণ (যা পলাশে রক্ষিত হয়েছিল) হতে উদ্ভূত পর্ণমণিকে আমি শতায়ুষ্য হওয়ার নিমিত্ত গ্রহণ করছি। ৪।
এই পর্ণমণি চিরকাল পর্যন্ত আমার নিকট অবস্থানপূর্বক আমার পক্ষে ) কল্যাণজনক হয়ে থাকুক। শত্ৰু-মদক অত্যন্ত বলশালী অর্যমা দেবতার কৃপায় আমি আমার এক সমবল-সম্পন্নগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভের নিমিত্ত একে (অর্থাৎ এই পর্ণমণিটিকে) আপন বাহুতে ধারন করে রাখবো ॥৫॥
ধীবর, রথকার (সূত্রধর), লোহকার (কর্মকার) ইত্যাদি কর্মজীবী এবং বুদ্ধিজীবী বিদ্বানবর্গকে, হে পলাশ-নির্মিত মণি! আমার অধীন করে দাও ॥৬
রাজার অভিষেক কর্মশালী মন্ত্রী, অন্য দেশস্থ রাজন্যগণ, ব্রাহ্মণ কর্তৃক ক্ষত্রিয়গণের মধ্যে উৎপন্ন সারথি (সূতজাতি) এবং গ্রামের নেতা (গ্রামণী, এদের সকলকে, হে মণি! তুমি আমার সেবায় তৎপর করো ॥ ৭।
হে মণি! তুমি সোমের পর্ণের বিকার রূপ, এই নিমিত্ত দেহের রক্ষক। তুমি বীর্যবান, আমার সমান জন্মা। তুমি সূর্যের সমান তেজস্বিনী। আমি তোমার তেজকে লাভ করার নিমিত্ত তোমাকে পরিধান (অর্থাৎ ধারণ) করছি ॥ ৮
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –আয়মগন পর্ণমণিঃ ইত্যনেন সূক্তেন তেজোবলায়ুৰ্ধনাদিপুষ্টয়ে পলাশবৃক্ষমণিং বাসিতং কৃত্বা সম্পাত্য অভিমন্ত্র বধীয়াৎ।…ইত্যাদি। (৩কা, ১অ. ৫সূ)। টীকা –তেজ, বল, আয়ু, ধন ইত্যাদির পুষ্টির নিমিত্ত পলাশবৃক্ষ হতে নির্মিত মণি এই সূক্তমন্ত্রগুলির দ্বারা বাসিত পূর্বক অভিমন্ত্রিত করে ধারণীয়।..ইত্যাদি। (৩কা, ১অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –অত্যন্ত বীর্যশালী পুরুষ-বৃক্ষ পীপল (অশ্বথ) এবং গায়ত্রী সারোৎপন্ন অত্যন্ত বলবান্ খদির বৃক্ষের সংযোগে নির্মিত অশ্বত্থামণি ধারণের পর, এই মণি আমার শত্রুগণকে নাশ করুক। ১
হে খদিরোৎপন্ন অশ্বত্থের বিকার হতে নির্মিত মণি! বৃত্রঘাতী ইন্দ্র ও বরুণের সাথে তোমার মিত্ৰতা আছে; তুমি আমার শত্রুবর্গকে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করো। ২।
হে পীপল! তুমি মণির উপাদান স্বরূপ। তুমি যেমন ভাবে খদির বৃক্ষের ত্বককে ভেদ করে উৎপন্ন হয়েছে, সেইভাবে আমাদের শত্রুগণকে বিদীর্ণ করে দাও ৷৷ ৩৷
যেমনভাবে পীপল অপর বৃক্ষগুলিকে অবনত করে রাখে (অর্থাৎ পীপুলের উচ্চতা অপর বৃক্ষের চেয়ে বেশী), ঋষভের মতো (দ্রুত) বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়, সেইরকমেই তোমার (অর্থাৎ পীপল বা অশ্বথের) বিকার রূপ মণি ধারণকারী আমরা শত্রুগণকে বিনাশ-করণে প্রবৃদ্ধ (বা সক্ষম) হবো। ৪
হে পীপল! পাপদেবী নির্ঋতি আমার শত্রুদের এমন সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করুক, যাতে তারা কোন রকমেই সেই বন্ধন মোচন করতে না পারে। ৫।
হে পীপল! তুমি যেমন ভাবে বনস্পতি-বৃক্ষগুলিতে আরোহণ করে তাদের নত করে থাকো (অর্থাৎ অন্য সকল বনস্পতিকে ছাপিয়ে তোমার শির যেমন সর্বোচ্চতা প্রাপ্ত হয়ে থাকে), সেই ভাবেই আমার শত্রুদের মস্তক পদদলিত পূর্বক তাদের তিরস্কৃত করে বিনাশ প্রাপ্ত করাও। ৬
যে ভাবে তটস্থিত (তীরস্থায়ী) বৃক্ষে রজ্জবদ্ধ নৌকাগুলি বন্ধন ছিন্ন হয়ে নদীর স্রোতে নিম্নাভিমুখে ধাবিত হয়ে খেইহারা হয়ে যায়, সেই ভাবেই আমার শত্রুগণও যেন প্রবাহিত হয়ে চলে, কখনও যেন পার না প্রাপ্ত হয় (অর্থাৎ রক্ষা না পায়); কেন না, খদির হতে উৎপন্ন হওয়া পীপলের প্রবাহে আগ্রস্ত শত্ৰু পুনরায় আগমন করতে সক্ষম হয় না। ৭।
আমি শত্রুগণের উদ্দেশে উচ্চাটন করছি এবং শত্রুগণকে ধংসসাধনকারী মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত পীপল শাখার দ্বারা তাদের সংহার করছি। ৮
বঙ্গানুবাদ –দ্রুতগামী কৃষ্ণমৃগের মস্তকে যে রোগ-নাশিনী শৃঙ্গ রূপ ঔষধি আছে, মাতৃ-পিতৃ হতে প্রাপ্ত ক্ষয়, কুষ্ঠ, মৃগী ইত্যাদি ব্যাধিসমূহকে বিনাশ করুক৷ ১।
হে মৃগশৃঙ্গ! তোমাকে ক্ষেত্রিয় রোগ (মাতা-পিতা হতে প্রাপ্ত রোগ) বিনাশের নিমিত্ত ধারণ করা হয়েছে। তুমি হৃদয়ে গ্রন্থিত হয়ে থাকা ক্ষেত্রিয় রোগকে শমন করো। ২।
এই যে চতুষ্কোণ সম্পন্ন হরিণচর্ম পরিচ্ছদের ন্যায় শোভিত হচ্ছে, তার দ্বারা আমি তোমার (অর্থাৎ রোগীর) অনেক রকমের ক্ষেত্রিয় রোগকে নাশ করছি। ৩।
মাতা-পিতা হতে আগত ক্ষয়, কুষ্ঠ, অপর ইত্যাদি ক্ষেত্রিয় ব্যাধিসমূহকে আকাশে স্থিত বিচ্যুত নামক তারকা দুটি (রোগীর) দেহের বিবিধ অঙ্গ হতে পৃথক করুক। ৪।
জলই ভেষজ, জলই সমস্ত ব্যাধির নাশক এবং ঔষধি রূপ। হে রোগী! এই হেন জল তোমাকে ক্ষেত্রিয় ব্যাধি হতে মুক্ত করণশালী ॥ ৫৷৷
হে রোগী! অনুপযুক্ত অন্ন ইত্যাদি সেবনের ফলে যে কুষ্ঠ ইত্যাদি রোগ তোমার শরীরে উৎপন্ন হয়ে গিয়েছে, সেগুলিকে দূরীকরণশালিনী যে ঔষধিকে আমি জ্ঞাত আছি, তার দ্বারা তোমার রোগকে দূর করে দিচ্ছি ৷ ৬ ৷
রোগ ইত্যাদির কারণ রূপ পাপ উষাকাল অথবা প্রাতঃকালে অনুষ্ঠিত আমার এই অভিযেক ইত্যাদি কর্মের দ্বারা বিনাশ প্রাপ্ত হোক। পুনরায় আমাদের ক্ষেত্রিয় রোগগুলি (অর্থাৎ পাপের বিনাশের ফলে, আমাদের মধ্যে সংক্রামিত কুলানুক্রমিক ব্যাধিসমূহও) বিনাশপ্রাপ্ত হয়ে যাক ॥ ৭।
টীকা –ক্ষেত্রিয় ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তির ভেষজরূপে হরিণশৃঙ্গের মণিবন্ধন, তার শৃঙ্গের সাথে জল পান, হরিণচর্মের শঙ্কুছিদ্রভাগ প্রজ্বালিত করে জলে নিক্ষেপণ এবং সেই জলের দ্বারা উষাকালে ঐ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তির অবসেচন এবং যব হোম অনুষ্ঠান পূর্বক এই মন্ত্রগুলির দ্বারা অভিমন্ত্রিত অন্ন ভোজন করানো ও কর্তব্য।..ইত্যাদি ॥ (৩কা, ২অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –মৃত্যু হতে রক্ষা-করণে সমর্থ এবং মিত্রের ন্যায় উপকারী মিত্র দেবতা বসন্ত ইত্যাদি ঋতুগুলির সাথে আমাদের দীর্ঘায়ুষ্য করুন। পুনরায় বরুণ, বায়ু ও অগ্নি দেবতা আমাদের মহান্ রাজ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করুন ॥১॥
ধাতা, অর্যমা এবং সবিতাদেব আমার হবিঃসমূহ গ্রহণ করুন। এই সকল দেবতা এবং ইন্দ্র তথা ত্বষ্টা দেব আমার স্তুতিমন্ত্র শ্রবণ করুন। আমি দেবমাতা অদিতিকেও আহ্বান করছি। এঁদের কৃপায় আমি আপন সমকক্ষ ব্যক্তিগণের মধ্যে (বিশেষ) সম্মান লাভ করতে পারি। ২৷৷
আমি যজমানকে শ্রেষ্ঠ পদ প্রাপ্ত করানোর নিমিত্ত সোম, সবিতা তথা অদিতির অন্য সকল পুত্রকে (অর্থাৎ আদিতির অপর সকল পুত্র দেবগণকে) আহুত করছি। এই আহুতির আশ্রয়ভূত অগ্নিদেব আপন দীপ্তি বর্ধন করুন। আমি যেন আপন সজাতীয় ব্যক্তিগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারি ৷ ৩৷
হে বিরুদ্ধ মনঃসম্পন্নগণ! আমি তোমাদের অন্তঃকরণগুলিকে বিরুদ্ধতা হতে মুক্ত করে (বিরোধিতাহীন করে) পরস্পর অনুকূল করে দিচ্ছি ॥৫।
হে বিরুদ্ধ মনঃ-সম্পন্নগণ! আমি তোমাদের মনকে আপন অধীন করে নিচ্ছি। তোমরাও আমার মনের অনুকূলবর্তী হয়ে আমার মনের সাথে সংযোগ প্রাপ্ত হও। তোমরা আমার ইচ্ছানুসার কর্ম করো এবং আমার অনুগত হও। ৬
বঙ্গানুবাদ –হস্তে নখ, খুর ইত্যাদি সম্পন্ন ব্যাঘ্র ইত্যাদি, খুররহিত সর্প ইত্যাদি, তথা গো-মহিষ ইত্যাদিকে বর্ষা ইত্যাদির দ্বারা পোষণ করার কারণে আকাশ পিতা এবং আশ্রয় রূপ হওয়ার নিমিত্ত পৃথিবী মাতা। (সুতরাং এই দৃঢ়মূল জীবসমূহ হতে সৃষ্ট বিপ্নরাশি দূরীকরণের উদ্দেশে প্রার্থনা–) হে দেবগণ! তোমরা যে রকম বিঘ্নের কারণগুলিকে সম্মুখে দিয়েছে, সেই রকমেই এই বিঘ্নরাশিকে দূর করো ৷৷ ১।
ঈপ্সিত কার্যের ফলপ্রাপ্তি-রহিত মনুষ্যগণ এবং দূষিত শরীরশালী দেবতাগণ বিঘু-শান্তির নিমিত্ত অরলু বৃক্ষের মণি ধারণ করেছিল। স্বায়ম্ভব মনুও এই রকমই করেছিলেন। আমিও মণি ইত্যাদি ধারণ পূর্বক বিঘ্নসমূহকে শুষ্ক চর্মের রশ্মির দ্বারা মূল হতে বিনষ্ট (অর্থাৎ নিমূল) করে দিচ্ছি। ২৷৷
হলুদ বর্ণের সূত্রে কবচের ন্যায় গ্রথিত হওয়া অর মণিকে বিঘ্ন শমনের নিমিত্ত ধারণ করা হয়ে থাকে। আমাদের দ্বারা ধারণকৃত এই মণি এবস্য, শোষক, কবুর, ইত্যাদি বিঘ্নরাশিকে প্রভাবহীন করুক৷৷ ৩৷৷
হে মনুষ্যগণ! তোমরা শত্রুগণের উপর বিজয় লাভ, করে অন্ন-ধন গ্রহণ করতে আকাঙ্ক্ষা করছো। তোমরা অসুরগণের মায়ায় বিমোহিত দেবগণের মতো মোহিত হয়ে ঘূর্ণন (বিচরণ) করছে। যেমন কুকুরদের দূষণ বানর, তেমনই বিঘ্নসমূহের দূষক এই মণিখণ্ড। ৪
হে মণি! অন্যের দ্বারা উপস্থিত বিঘুকে নিষ্ফল করণের নিমিত্ত আমি তোমাকে [ ধারণ করছি। কাবব নামক (সকল) বিদ্যুকে দূষণ করছি। হে মনুষ্যগণ! এই রকম বিঘ্নের শান্তি সংঘটনের পরে তুমি নিঃশঙ্ক হয়ে আপন কর্মে নিযুক্ত হও। ৫।
হে মণি! পৃথিবীতে স্থিত একশত এক প্রকার বিঘ্ন আছে, সেগুলির শান্তির নিমিত্ত দেবতাগণ মুক্ত করে দিয়েছিলেন (অর্থাৎ সকলে যাতে বিঘ্নবিনাশের নিমিত্ত তোমাকে ধারণ করতে পারে, তার ব্যবস্থা করেছিলেন)। এই কারণে বিঘ্নের দূষক অরলু-মণিকে আমিও ধারণ করে আছি ৷৷ ৬ ৷৷
বঙ্গানুবাদ –মাঘ মাসের কৃষ্টাষ্টমী তিথি অর্থাৎ একাষ্টকা সম্বন্ধী উষা অন্ধকার দূর করে দিয়েছিল। এইটি সৃষ্টির আরম্ভে উৎপন্ন হয়েছিল। এই একাষ্টকা আমাদের নিমিত্ত দুগ্ধশালিনী (ধেনুবৎ) হোক এবং বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে উত্তমোত্তম ফল প্রদান করুক। ১।
যে একাষ্টকাত্মিকা রাত্রিকে নিকটে আগত দর্শন করে, হবিঃ প্ৰাপণশীল দেবতা প্রশংসা করতে থাকেন, সে (অর্থাৎ সেই একাষ্টকাত্মিকা রাত্রি) সম্বৎসরের পত্নীরূপা। সে আমাদের নিমিত্ত সুন্দর কলাণ-যুক্ত হোক। ২৷৷
হে রাত্রি! আমরা তোমারই উপাসনা করছি; তুমি আমাদের পুত্র-পৌত্র ইত্যাদিকে চিরায়ুষ্য করো এবং গো-ইত্যাদি পশুসমূহে আমাদের সমৃদ্ধ করো ৷৷ ৩৷৷
এই একাষ্টকা লক্ষণশালিনী উষা সৃষ্টির প্রারম্ভে উৎপন্ন হয়ে অন্ধকারকে দূর করে দিয়েছিল। এই উষা অন্য উষাগুলিতে প্রবিষ্ট হয়ে নিত্য উদয় হচ্ছে। এই উষাতে সূর্য, সোম, অগ্নি ইত্যাদির নিবাস। সূর্যের ভার্যারূপা এই উষা প্রাণিগণকে প্রকাশ করে অত্যন্ত শ্রেষ্ঠ ভাবে স্থিত থাকে ৷৷ ৪।
হে একাষ্টকা! বনস্পতির বিকার রূপ উদূখল, মুসল ইত্যাদি তথা প্রস্তরসমূহ তোমার নিমিত্ত যব ইত্যাদি অন্নকে পেষণ করে এবং দধি ইত্যাদি যুক্ত পুরোডাশ প্রস্তুত করে প্রীতিকর শব্দ (বা স্তুতি) করছে। তোমার কৃপায় আমরা সুন্দর পুত্র, পৌত্র, ভৃত্য এবং ধনসমূহের অধিপতি হবো। ৫।
হে জাতবেদা অগ্নি! তুমি হবিঃ গ্রহণ করো এবং প্রসন্নতা লাভ করো। পুনরায় গাভী, অশ্ব, ছাগ, মেষ, গর্দভ, উষ্ট্র নামক এই ছয় প্রকার পশু আমাতে প্রীতি রাখুক। ৬৷৷
হে রাত্রি! আমাকে ধন, পুত্র, পৌত্র ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ করো। তোমার কৃপাবলে আমরা দেবতাগণের কৃপা লাভ করবো। হে দর্বি! তুমি হবিঃযুক্ত হয়ে দেবতাগণকে প্রাপ্ত হও (অর্থাৎ দেবতাগণের সকাশে আমাদের হবিঃ বহন করে নিয়ে যাও) এবং পুনরায় ঈঙ্গিত ফলশালিনী হয়ে আমাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করো। তাঁদের নিকট হতে আমাদের নিমিত্ত অন্ন ও বল আনয়ন করো। ৭।
হে একাষ্টকা! এই সম্বৎসর তোমার পতি। সে এখানে আগত হয়েছে। তুমি তার সাথে অবস্থান পূর্বক আমাদের পুত্র পৌত্র ইত্যাদি সন্ততিগণকে আয়ুস্মান করো এবং ধনের দ্বারা আমাদের সম্পন্ন করো ॥ ৮৷
বসন্ত ইত্যাদি ঋতুসমূহ এবং তাদের স্বামী (বা অধিপতি) দেবতাগণকে হবিঃ-দানের দ্বারা পূজিত করছি। সম্বৎসরের দিন ও রাত্রির উদ্দেশে যজ্ঞ সাধন পূর্বক হবিঃ দান করছি। ঋতুর অবয়ব রূপ কাষ্ঠা ইত্যাদি, চতুস্ত্রিংশ (চৌত্রিশ) পক্ষ, দ্বাদশ মাস ইত্যাদির উদ্দেশেও যাগ করছি। সংসারের অধিস্বামী কালের উদ্দেশেও পূজা করছি। ৯৷
ঋতুসমূহ, দিন রাত্রি এবং সম্বৎসরের প্রসন্নতার নিমিত্ত বিধাতা, ধাতা, সমৃদ্ধ দেবতা তথা সংসারের অধিপতি কালের উদ্দেশে, হে একাষ্টকা! আমি তোমার যজ্ঞ করছি। ১০।
আমরা ঘৃত ইত্যাদি যুক্ত হবির দ্বারা দেবতাগণের উদ্দেশে যজ্ঞ করছি। সেই দেবগণের কৃপায় আমরা অসংখ্য গাভী লাভ পূর্বক সকল কামনায় সম্পন্ন (বা সমৃদ্ধ) হবো॥১১৷
একাষ্টকা দেবী অনুষ্ঠান রূপ কর্মের দ্বারা মহত্তাবান ইন্দ্রকে প্রকট করেছিলেন। সেই ইন্দ্রের বলে দেবতাগণ আপন শত্রু অসুরবর্গেকে বিশেষ রকমে পরাঙ্মুখ করেছিলেন। সেই ইন্দ্র, নাশকারী শত্রুগণকে সংহার করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ১২।
হে ইন্দ্র-পুত্রী (অর্থাৎ ইন্দ্র যাঁর পুত্র), হে সোম-পুত্রী! হে একাষ্টকা! তুমি দেবতা ও মনুষ্যের উৎপন্নকারী প্রজাপতির পুত্রী। অতএব তুমি আমাদের প্রদত্ত হবিঃ গ্রহণ পূর্বক আমাদের প্রজা ও পশুর কামনাকে পূর্ণভাবে সন্তুষ্টকারিণী হও (অর্থাৎ সেই কামনা পূর্ণ করো) ॥ ১৩।
বঙ্গানুবাদ –হে রোগাক্রান্ত পুরুষ! অজ্ঞাতরূপে (বা অজ্ঞাতসারে) দেহে প্রবেশ-করণশালী যক্ষ্মা ব্যাধি (রাজযক্ষ্মা নয়, এমন যক্ষ্মা ব্যাধি) হতে আমি তোমাকে হবির দ্বারা মুক্ত করছি। যা প্রথমে সোমকে গ্রহণ করেছিল (অর্থাৎ সোম যার দ্বারা প্রথমে আক্রান্ত হয়েছিল), সেই রাজযক্ষ্মা (মূল ক্ষয়রোগ) হতে আমি তোমাকে মুক্ত করে চির আয়ুস্মান করে দিচ্ছি। হে ইন্দ্র ও অগ্নি! যে পিশাচী এই বালকের উপর প্রভুত্ব স্থাপিত করেছে, সেই পিশাচী হতে একে মুক্ত করাও। ১।
ব্যাধির কারণে এই পুরুষের আয়ু যদি ক্ষীণ হয়ে গিয়ে থাকে এবং সে যদি এই লোক হতে গমনশীল হয়ে থাকে, অথবা সে যদি যমরাজের নিকট সমুপস্থিত হয়ে গিয়ে থাকে, তবুও আমি তাকে এই লোকে আনয়ন পূর্বক শতায়ুষ্য হওয়ার বল-সমন্বিত করে দিচ্ছি ৷৷ ২৷৷
যে হবির ফল অনন্ত দর্শন-শক্তি প্রাপ্ত করানো এবং শ্রবণশক্তি রূপ বল প্রাপ্ত করানো, সেই হবির শক্তিতে আমি এই ব্যাধিগ্রস্ত পুরুষকে মৃত্যুর নিকট হতে ফিরিয়ে এনেছি। আমি ইন্দ্রকে হবির দ্বারা এই নিমিত্ত প্রসন্ন করছি, যাতে এই পুরুষের আয়ুকে ক্ষীণ-করণশীল পাপসমূহ হতে সে উত্তীর্ণ হয়ে যায় এবং যার ফলে সে শত বৎসরব্যাপী আয়ু ভোগ করতে সক্ষম হয় ॥ ৩॥
আমি এই ব্যাধিগ্রস্ত পুরুষকে শত বৎসরের আয়ু-প্রাপণশীল হবির দ্বারা মৃত্যু হতে ফিরিয়ে এনেছি। হে ব্যাধিমুক্ত! তুমি শত শরৎ, শরৎ হেমন্ত এবং শত বসন্ত পর্যন্ত জীবিত থাকো। ইন্দ্র, অগ্নি, সবিতা ও বৃহস্পতি তোমাকে শতায়ুযুক্ত করুন। ৪
হে প্রাণ ও অপান (বায়ুদ্বয়)! আপন গোষ্ঠে বৃষভের প্রবিষ্ট হওয়ার ন্যায় তুমি এই ক্ষয়-গ্রস্তের শরীরে প্রবিষ্ট হও। লোকে যে রোগকে মৃত্যুর কারণ রূপ বলে থাকে, সেই রোগ দূর হয়ে যাক। ৫
হে প্রাণ ও অপান! তোমরা অকালেই এই শরীরকে ত্যাগ করো না। বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত এই রোগীর শরীরে বর্তমান থাকো ॥ ৬।
হে ব্যাধিমুক্ত! আমি তোমাকে তোমার বার্ধক্য পর্যন্ত জীবন-সম্পন্ন করে দিচ্ছি। তোমাকে তোমার জরাবস্থা পর্যন্ত ব্যাধি হতে রক্ষা করছি। বিদ্বাৰ্গণ যে মৃত্যুকারক ব্যধিগুলির বর্ণনা করে থাকেন, সেই সকল ব্যাধি তোমা হতে পৃথক হয়ে যাক। ৭।
হে ব্যাধিমুক্ত! যেমন সেচনসমর্থ বলীবর্দকে রজ্জ্বর দ্বারা বন্ধন করা হয়, সেইভাবে জরাবস্থা তোমাকে তোমার যথাসময় প্রাপ্তি পর্যন্ত বন্ধন করে রাখুক। (অর্থাৎ জরা প্রাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত তোমার যেন মৃত্যু না হয়)। যে মৃত্যু তোমাকে অকালেই গ্রহণের উদ্দেশে বন্ধনে আবদ্ধ করেছে, বৃহস্পতি সেই বন্ধনকে ছিন্ন করে দিন। ৮।
টীকা –পঞ্চসূক্ত সমন্বিত তৃতীয় অনুবাকের এটি প্রথম সূক্ত। এই সূক্তের দ্বারা বালগ্রহরোগে ও অবিরত স্ত্রী-সঙ্গ জনিত কারণে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত জনকে নিরাময় করা যায়। এই নিমিত্ত দুর্গন্ধযুক্ত বৎসার সাথে অন্ন অভিমন্ত্রিত করে ভোজনকালে ব্যাধিত ব্যক্তিকে গ্রহণ করাতে হয়। এই সূক্তের দ্বারা অভিমন্ত্রিত অরণ্যতিলের সাথে ঈষদুষ্ণ জলের দ্বারা উষাকালে অরণ্যে বা গৃহে ব্যাধিতকে সিঞ্চন, মার্জন এবং আচমন করাতে হয়। এইভাবে অরণ্য-শণ, অরণ্য-গোময় ও চিত্ত ইত্যাদি শান্তৌষধির দ্বারা প্রত্যেকটি প্রজ্বালিত জলে উষাকালে ব্যাধিতের অবসেক, মার্জন, আচমন ইত্যাদিতে করাতে হয়। সর্বব্যাধি নিবৃত্তিকল্পে এই সূক্তের দ্বারা ব্যাধিত ব্যক্তিকে স্পর্শ পূর্বক অভিমন্ত্রণ কর্তব্য।…ইত্যাদি৷৷ (৩কা, ৩অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –আমি এই প্রদেশে (অর্থাৎ স্থানে) স্তম্ভের সাহায্যে গৃহ (শালা) নির্মাণ করছি। এই গৃহ ঘৃত ইত্যাদি প্রদান পূর্বক ভয়-মুক্ত হয়ে থাকুক। (হে গৃহ) সুন্দর গুণশালী, ব্যাধিসমুহ ও অরিষ্টসমুদায় হতে মুক্ত এবং বহু পুত্র-পৌত্র সমন্বিত হয়ে আমরা তোমাতে অবস্থিত (বর্তমান) থাকবো। ১।
হে গৃহ (শালা)! তুমি অনেক অশ্ব, গো ইত্যাদি এবং শিশুর প্রিয় বাণীর (শিশুকণ্ঠের কাকলির) সাথে পরিপূর্ণ এবং ঘৃত দুগ্ধ ইত্যাদির দ্বারা সম্পন্ন হয়ে এই স্থানে স্থিত থাকো; এবং আমাদের মঙ্গলদায়িনী হও। ২
হে গৃহ! তুমি দেবতাগণের দ্বারা সম্পন্ন অসংখ্য ভোগকে ধারণকারিণী। তোমাতে গোবৎস এবং পুত্র আগমন করুক. (অর্থাৎ এই গৃহে আমাদের ধেনুগুলি সুন্দর বৎস এবং আমাদের স্ত্রীগণ সুন্দর পুত্ৰশালিনী হয়ে উঠুক) ॥ ৩॥
গৃহ নির্মাণের বিধিজ্ঞাতা বৃহস্পতি, সবিতাদেব, বায়ু ও ইন্দ্রদেব এই গৃহের স্তম্ভ ইত্যাদি রক্ষা করে নির্মাণ করুন। মরুৎ-বৃন্দ ঘৃত ও জলের দ্বারা এই গৃহের ভূমিকে সিঞ্চিত করুন এবং পুনরায় ভগদেবতা এর (সংলগ্ন) জমিকে কৃষিযোগ্য করুন। ৪
ধান্য ইত্যাদির পোষণশালিনী হে গৃহ! তুমি প্রাণীগণকে সুখদানকারিণী। দেবতাগণ তোমাকে মনুষ্যবর্গের উপভোগের নিমিত্ত রচনা করেছিলেন। তুমি তৃণের (খড়ের) দ্বারা আচ্ছাদিত শুভ আশাসম্পন্ন হও এবং আমাদের পুত্র ইত্যাদি ধন প্রদান করো। ৫।
হে বংশ (অর্থাৎ বাঁশ)! তুমি গৃহের মধ্যস্থায়ী স্তম্ভে অবস্থান করো। হে গৃহ! তোমাতে অবস্থানকারী (আমরা) যেন কখনও সন্তপ্ত না হই এবং পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি সমন্বিত হয়ে শতায়ুম্মান হই। ৬।
এই গৃহে যুবা পুত্রের আগমন ঘটুক এবং গমনশীল গাভীসমূহের সাথে তাদের বৎসগণও আগত হোক। মধু ও দুগ্ধের কলসগুলিও এই স্থানে আগমন করুক ॥ ৭৷
হে স্ত্রী! এই গৃহে ফোঁটায় ফোঁটায় (চুঁইয়ে পড়ার স্বভাববিশিষ্ট, জলের দ্বারা সম্পাদিত মধু ও ঘৃতের ধারাশালী কলসকে নিয়ে আগমন করো। এই কলসকে সুধা রূপ জলে উত্তম রূপে উজ্জ্বল করো। এই গৃহে চোর ও অগ্নির ভয় হতে, আমাদের অনুষ্ঠিত শ্রৌত ও স্মার্ত কর্মগুলি আমাদের রক্ষক হোক ॥ ৮।
আমি যক্ষ্মারহিত ও তোমার (গৃহের) সেবকগণের ক্ষয়-বিনাশক কলসের জলকে, কখনও নাশপ্রাপ্ত না হওন-শালী অগ্নির সাথে নিয়ে গমন (বা তোমাতে অর্থাৎ গৃহে প্রবেশ করছি)। ৯
টীকা –এই সূক্তটি বাস্তাম্পত্যগণে পঠিতব্য। নবগৃহ নির্মাণে বাস্তুসংস্কারার্থে, হলের দ্বারা গৃহভূমি কর্ষণে এই সূক্তের বিনিয়োগ নির্ধারিত। যেখানে চতুৰ্গণী মহাশান্তি কর্মে শান্তিজল ইত্যাদি প্রযুক্ত হয় সেই সর্বত্র এই সূক্তের বিনিয়োগ কর্তব্য।…ইত্যাদি। (৩কা, ৩অ. ২সূ)
যদদঃ সংপ্রয়তীরবনতা হতে। তস্মাদা নদ্যো নাম স্থ তা বো নামানি সিন্ধবঃ ॥ ১৷ যৎ প্রেষিতা বরুণেনাচ্ছীভং সমবল্পত। তদাপ্নোদিম্রো বো যতীস্তদাপো অনুষ্ঠন ॥ ২॥ অপকামং স্যন্দমানা অবীররত বা হি কম। ইন্দ্রো বঃ শক্তিভির্দেবীস্তম্মাদ বার্নাম বা হিতম্ ॥ ৩॥ একো বা দেবাইপ্যতিষ্ঠৎ স্যন্দমানা যথাবশম। উদানিমুর্মহীরিতি তস্মাদুদকমুচ্যতে ॥ ৪। আপাে ভদ্রা ঘৃতমিদাপ আসন্নগ্নীষামৌ বিভ্রত্যাপ ইৎ তাঃ। তীব্রা রসা মধুপৃচামরংগম আ মা প্রাণেন সহ বচসা গমেৎ ॥ ৫|| আদিৎ পশ্যামুত বা শৃণাম্যা মা ঘাযাগচ্ছতি বা মাসাম্। মন্যে ভেজানা অমৃতস্য তহি হিরণ্যবর্ণা অতৃপং যদা বঃ ॥ ৬. ইদং ব আপা হৃদয়ময়ং বৎস ঋতাবরীঃ। ইহেথমেত শরীর্যত্রেদং বেশয়ামি বঃ | ৭||
বঙ্গানুবাদ – হে জলসমূহ! মেঘের প্রতাড়নের পর তোমরা ইতস্ততঃ গমন পূর্বক নাদ (শব্দ) করার কারণে তোমাদের নাম নদী হয়েছে এবং তোমাদের অপ ও উদক, নামও অর্থের অনুকূলই সার্থক হয়েছে । ১।
বরুণের দ্বারা প্রেরিত হওয়ার পর তোমরা নৃত্য করতে করতে একত্রে গমন করেছিলে, সেই সময় ইন্দ্র তোমাদের সাথে মিলিত হয়েছিলেন; সেই হ’তে তোমাদের নাম হয়েছিল আপ ॥ ২॥
ইচ্ছা না থাকলেও ইন্দ্র তোমাদের আপন শক্তিতে বরণ করেছিলেন, সেই নিমিত্ত তোমাদের নাম হয়েছিল বারি ৷ ৩৷৷
ইন্দ্র একবার তোমাদের উপর আধিপত্য জমিয়েছিলেন; ইন্দ্রের মহত্বের কারণে জলসমূহ (অর্থাৎ তোমরা) নিজেদের বড় মনে করে উদান করেছিলে, তখন হ’তে তোমরা (অর্থাৎ জলসমূহ) উদক নামপ্রাপ্ত হয়েছিলে। ৪।
কল্যাণকারী জলই ঘৃত হয়েছিল। অগ্নিতে হোমের (আহুতির) পর ঘৃত জল রূপ হয়ে যায়। এই জলই অগ্নি ও সোমের ধারণকারী। এই হেন জলের মধুর রস আমাকে অক্ষয় বল ও প্রাণের সাথে প্রাপ্ত হোক। ৫৷৷
পুনরপি আমি দর্শন করতে ও শ্রবণ করতে পারি যে, উচ্চারিত শব্দ আমার নিকটে আমার বাণীকে প্রাপ্ত হয়ে আছে। সেই রসের আগমনে আমি শব্দোচ্চারণ ও বাগিন্দ্রিয় লাভ করি। হে জলসমূহ! তোমরা সুন্দর বর্ণশালী, অমৃতের সমান। তোমাদের সেবায় আমি তৃপ্ত হয়ে গিয়েছি। ৬।
এই জলে পতিত হওয়া সূবর্ণ তােমাদের হৃদয়। হে জলসমূহ! এই মণ্ডুক (জলনিবাসী ব্যাঙ) তোমাদের বৎসের সমান। হে অভীষ্ট ফলপ্রদাত্রী জলসমূহ! যে খাতে তোমাদের প্রবেশ করাচ্ছি, তাতে তোমরা মকদের উপর প্রক্ষিপ্ত অবকার ন্যায় দৃঢ় হও বা স্থির প্রবাহযুক্ত হও) | ৭||
টীকা – আপন অভিমত প্রদেশে নদীপ্রবাহ-করণে এই সূক্ত মন্ত্রগুলি বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। যে পথে প্রবাহকে নিয়ে যেতে হবে, প্রথমে সেই দেশ (স্থানে) খনন পূর্বক এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা ক্রমে ক্রমে জল প্রসিঞ্চন করে যাওয়া কর্তব্য। এই সূক্তের দ্বারা কাশ, শৈবাল, পটেরক, বেতলশাখার প্রত্যেকটি অভিমন্ত্রিত M করে সেই খাতে নিখনীয়।..ইত্যাদি ॥ (৩কা, ৩অ. ৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে ধেনুগণ! আমরা তোমাদের সুখপূর্ণ গোষ্ঠের সাথে যুক্ত করে (খাদ্যস্বরূপ) চারা (তৃণ) ইত্যাদিতে সম্পন্ন করছি, আমরা তোমাদের সমৃদ্ধি, পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির সাথেও সম্পন্ন করছি ॥ ১।
হে ধেনুগণ! অর্যমা, পূষা, ইন্দ্র, বৃহস্পতি তোমাদের উৎপন্ন করুন। পুনরপি (অর্থাৎ উৎপন্ন ও সংবর্ধিত হয়ে) তোমরা আপন ক্ষীর ঘৃত ইত্যাদি ধনের দ্বারা আমি হেন তপস্বীকে সন্তুষ্ট (বা পুষ্ট) করো। ২।
হে ধেনুগণ! এই গোষ্ঠে তোমরা ভয়-রহিত তথা সন্ততির সাথে সম্পন্ন থেকে রত্নরাজিতে পরিপূর্ণ হও এবং রোগ-রহিত মধুর দুগ্ধ ধারনে সমর্থ স্থূল স্তন্যশালিনী হয়ে (আমাদের) প্রাপ্ত হও ৷ ৩৷৷
হে ধেনুগণ! মক্ষিকা (মাছি) যেমন ক্ষণমাত্রেই অনেক হয়ে যায়, সেইরকমেই তোমরাও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে এই স্থানে আগমন করো। এই গোষ্ঠে পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির সাথে যুক্ত হও এবং সাধক আমাতে প্রীতি রক্ষা করো। ৪
হে ধেনুসমূহ! তোমাদের গোষ্ঠ সুখময় হোক। তোমরা সহস্রে সহস্রে উৎপন্ন শারিশাক নামক প্রাণীর ন্যায় অসংখ্যশালিনী হও। তোমরা এই গোষ্ঠেই অবস্থান পূর্বক পুত্র-পৌত্রাদি রূপে প্রকট হও (অর্থাৎ বংশ বিস্তার করো)। ৫।
হে ধেনুসকল! আমি তোমাদের পালক; তোমরা আমার গোষ্ঠে আগত হও। প্রভূত পশুখাদ্য ও ধনের সাথে অসংখ্যক হয়ে চিরকাল পর্যন্ত জীবিত থাকে এবং আমরাও যেন চিরায়ুম্মান হই ৬
বঙ্গানুবাদ –আমি ইন্দ্রকে বাণিজ্যকর্তার ভাবে স্তুতি করছি। সেই ইন্দ্র এই স্থানে আগমন করুন এবং (আমাদের) বাণিজ্যকে হিংসা-করণশীল শত্রু, পথ রোধকারী দস্যু এবং ব্যাঘ্র ইত্যাদিকে বিনাশপূর্বক অগ্রসর হোন। সেই ইন্দ্র আমাদের বাণিজ্যে লব্ধব্যরূপ (অর্থাৎ লভিতব্য) ধন প্রদান করুন ॥ ১৷
যে দেশে আমরা বাণিজ্য করছি। সেই দেশের পথগুলি ঘৃত-দুগ্ধের দ্বারা আমাদের সেবা-করণশালী হোক, যাতে আমি ক্রয়-বিক্রয়ের দ্বারা প্রাপ্ত মূলধনকে লাভের সাথে ঘরে আনয়ন করতে পারি। ২!
হে অগ্নি! আমি বাণিজ্যে লাভের কামনা পূর্বক শীঘ্র চলনের শক্তি প্রাপ্তির নিমিত্ত তোমার স্তুতি করে ধনসম্পন্ন হবো। এই নিমিত্ত আমি তোমার উদ্দেশে হবিঃ সমর্পণ করছি ৩
হে অগ্নি! দূরপথ অতিক্রম করে চলার কারণে আমাদের যে ব্রত লোপ হয়ে গিয়েছে (অর্থাৎ গৃহ থেকে দূরে থাকার কারণে আমাদের পালনীয় অগ্নিসেবা ইত্যাদি কর্ম করা হয়ে ওঠেনি), তার জন্য আমাদের ক্ষমা করো। এই দূর দেশে কষ্ট সহনের শক্তি তুমি আমাদের দান করো। ক্রয় ও বিক্রয় দুটি ব্যাপারই লাভপ্রদ ও সুখদায়ী হোক। তুমি আমার প্রদত্ত হবিঃ গ্রহণ করো। হে দেবগণ! মূলধন অপেক্ষা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত লাভের পরিমাণ (ধন) আমাদের সুখী করুক ॥ ৪
হে অগ্নি! লাভের প্রতিরোধশালী দেবতাগণকে এই হবির দ্বারা সন্তুষ্ট করে ফিরিয়ে দাও। হে দেবগণ! যে ধনের দ্বারা আমি ধনের বৃদ্ধি করতে কামনা করছি, সেই ধন তোমাদের কৃপায় নিরন্তর বৃদ্ধিলাভ করুক ॥ ৫৷৷
ইন্দ্র, সবিতা, সোম, প্রজাপতি ও অগ্নি আমার মনকে সেই ধনের দিকে প্রেরিত করুন, যে মূলধনের দ্বারা ধনলাভের ইচ্ছা করে আমি বাণিজ্য করতে ইচ্ছা করছি। ৬। হে দেবাহ্বায়ক অগ্নি! আমরা হবির সাথে তোমার নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপন করছি। তুমি আমাদের পুত্র পৌত্র ইত্যাদি প্রজার রক্ষার্থে সতর্ক থাকো। ৭।
হে উৎপন্ন প্রাণিবর্গের জ্ঞাতা (জাবেদা) অগ্নি। আপন গৃহে বর্তমান অশ্বকে প্রতিদিন তৃণ ইত্যাদি প্রদানের মতো আমরা তোমাকে নিত্য হবিঃ প্রদান করছি। তোমার সেবকরূপী আমরা যেন ধন ও অন্নে পরিপূর্ণ হয়ে থাকতে পারি। ৮।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –ইন্দ্রং অহং বণিজং ইতি বাণিজ্যলাভার্থং বিনিযুজ্যতে। বিক্রয়ার্থং পণ্যানি বিপণিং নয়ন বনি কর্ম বাণিজ্যলাভার্থং কুর্যাৎ। তদ যথা। ইন্দ্রং অহং ইতি সূক্তেন বর্জং বস্ত্রং বা পূগীফলং বা অশ্বান বা হস্তিনো বা রত্নাদি বা সম্পত্য অভিমন্যু তত উত্থাপয়তি।… ইত্যাদি। (৩কা. ৩অ. ৫সূ)।
টীকা –এই সূক্তটি বাণিজ্য লাভার্থে বিনিযুক্ত হয়। বিক্রয়ের নিমিত্ত বণিক পণ্যদ্রব্য বিপণিতে (বা হাটে) নয়ন কালে বাণিজ্যলাভার্থে বজ্র (হীরক) বা বস্ত্র। পূগীফল বা অশ্ব বা হস্তি বা রত্ন ইত্যাদি এই সূক্ত মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করে সেস্থান হতে উত্থাপন করবেন।…ইত্যাদি ॥ (৩কা, ৩অ. ৫সূ)।
যে সূর্যদেব সকলের ধারণকর্তা তথা পোষণকর্তা, দরিদ্র ব্যক্তি তাকে আপন কাম্য ফলের সাধন রূপে মান্য করে তার পূজা করে থাকে। রাজাও তার পূজা করার কামনা করে থাকে। সেই অদিতিপুত্র সূর্যকে আমরাও প্রাতঃকালে আহুত করার অভিলাষ করছি।২।
হে সূর্য! তোমার ধনের কখনও বিনাশ হয় না। তুমি আমাদের বুদ্ধি ইত্যাদি প্রদান পূর্বক সুফল মনোরথ করো। হে ভগ (অর্থাৎ সম্পূর্ণ ঐশ্বর্যশালী দেব)! আমরা যেন গো ও অশ্বের সাথে যুক্ত হই; তথা পুত্র, পৌত্র, ভৃত্য ইত্যাদির সাথেও সম্পন্ন হই ॥ ৩॥
আমরা এই কর্ম সাধিত করে ভগ দেবতার কৃপা-বুদ্ধিতে থাকবো। সায়ংকালে, মধ্যাহ্নে ও সূর্যোদয়ের সময়েও, হে ইন্দ্র! আমরা যেন সূর্য ও অগ্নি ইত্যাদি দেবতাগণের কৃপা-বুদ্ধিতেই অবস্থান করি। ৪
আমরা ধনশালী ভগদেবতার কৃপায় ধনবান্ হবো। হে ভগদেব! তুমি আমাদের। কর্মানুষ্ঠানে পুরোভাগে থাকো; আমরা তোমাকে আহুত করছি ॥ ৫॥
যেমন পুরুষের দ্বারা আরোহণের পরে অশ্ব চলমান হতে প্রস্তুত হয়, সেই রকমেই উষা দেবী ধনদানশীল ভগদেবতাকে আমার নিকট আনয়নের নিমিত্ত প্রস্তুত হোন, এবং অশ্বের দ্বারা রথকে আকর্ষণের ন্যায় তাঁকে (অর্থাৎ সেই ভগদেবতাকে) আমার সমীপে আনয়ন করুন ॥ ৬৷
অশ্ব ও গাভীর দ্বারা সম্পন্ন হয়ে উষা দেবী আমাদের গৃহে সদাই উদয় হোন। হে উষা দেবতা! আপন অবিনাশী কর্মসমূহের দ্বারা আমাদের সর্বদা রক্ষা করতে থাকো। তুমি সর্বগুণসম্পন্ন এমন জল প্রদানশালিনী হও। ৭ ॥
টীকা –চতুর্থ অনুবাকে পাঁচটি সুক্ত। তার মধ্যে এটি প্রথম সূক্ত। এই সূক্তের দ্বারা মেধাকামনায় সুপ্তোত্থিত হয়ে হস্তের দ্বারা মুখপ্রক্ষালন করণীয়।…তেজঃ কামনায় দধি-মধু মিশ্রিত পূর্বক এই সূক্ত-মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করে ব্রাহ্মণকে খাওয়াতে হয়। ক্ষত্রিয়কে এইভাবে দধিমধুমিশ্রিত অন্ন ভোজন করাতে হয়। বৈশ্যকে কেবল এই ভাবে এই সূক্ত-মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত ভোজন করাতে হয়।…ইত্যাদি। (৩কা. ৪অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হাল অর্থাৎ লাঙ্গলগুলিকে যুক্ত করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি দেবাত্মক হবিঃ রূপ অন্ন প্রাপ্তির নিমিত্ত বৃষভসমূহের স্কন্ধোপরি যুগ বা জোয়ালগুলিকে স্থাপন করছে ৷৷ ১।
হে কৃষকগণ! লাঙ্গলগুলিকে জোয়ালে যুক্ত করে জোয়ালগুলিকে বৃষভের স্কন্ধের উপর স্থাপিত করো। এই কর্যণ হওয়া ক্ষেতে বা ভূমিতে ব্রীহি যব ইত্যাদি বপন করো। যব ইত্যাদি রূপ অন্ন শীঘ্রই আমাদের এই স্থানে উৎপন্ন হোক। পুনরায় এই ধান্য ইত্যাদি পক্কতা প্রাপ্ত হয়ে শীঘ্র দা (অর্থাৎ শস্যচ্ছেদক কাটারি) দ্বারা স্পর্শ করণের (অর্থাৎ ছেদন করার) যোগ্য হোক। ২।
কৃষিযোগ্য ভূমিকে লৌহের শল্যশালী (ফলাসম্পন্ন) লাঙ্গল সুখ প্রদান করছে। এইটি (অর্থাৎ লাঙ্গলটি) ধান্য ইত্যাদির উৎপত্তিকারক হওয়ায় সোমবাগের কর্তা (অর্থাৎ নিম্পাদক) হয়েছে। এর অবয়ব ভূমিতে রক্ষিত হয়ে গতি (গমন) প্রাপ্ত হচ্ছে। এই লাঙ্গল গো-ইত্যাদি পশুসমূহের সমৃদ্ধির কারণ হয়ে উঠুক ॥ ৩।
ক্ষেতের রেখাকে (লাঙ্গলপদ্ধতি বা সীতাকে) ইন্দ্র গ্রহণ করুন, পূষা সেই রেখাসমূহকে! ১ রক্ষাকরণশীল হোন। এই রেখাসমূহ আমাদের বাঞ্চিত ফলের দ্বারা সম্পন্ন হয়ে প্রতি বর্ষে সুখ প্রদান কে করুক। এই রেখাসমূহ জলে সম্পন্ন হোক, ধান্য ইত্যাদি প্রদানশালিনী হোক। ৪
সুন্দর শল্য। (লাঙ্গলের মুখ বা ফলা) ভূমি কর্ষণ পূর্বক বলীবর্দসমূহের পশ্চাতে গমন করুক। হে সূর্য ও বায়ু! আমাদের হবিঃসমূহে তৃপ্ত হয়ে তোমরা অন্ন ইত্যাদিকে সুন্দর ফলসালী করে দাও। ৫।
কৃষকগণ সুখ পূর্বক ক্ষেত কৰ্ষণ করুক, বৃষভগুলি তাদের সুখপ্রদানশীল হোক, লাঙ্গল ও রঞ্জুসমূহ অনুকূল হোক। হে শুনঃদেব! তুমি প্রতোদেতেও (চাবুকেও) সুখ পূর্ণ করে দাও। ৬।
হে সূর্য ও বায়ু! আমার প্রদত্ত হবিঃ গ্রহণ করো। আকাশস্থ জল-দেবতা এই কর্ষিত ভূমিকে বৃষ্টির জলে সিক্ত করে দাও। ৭।
হে সীতা! আমরা তোমাকে নমস্কার জ্ঞাপন করছি। তুমি যে ভাবে সুন্দর (সার্থক) ফলের সাথে যুক্ত হয়ে থাকো, সেই ভাবেই আমাদের অভিমুখিনী হও ৮
হে সীতা! মধুর রসে সিঞ্চিত তথা ঘৃতযুক্ত অন্নকে সিঞ্চনশালিনী হয়ে, বিশ্বদেবগণ ও মরুৎ-বর্গের দ্বারা প্রেরিত হয়ে, তুমি জলের সাথে আমাদের সম্মুখে আগতা হও। ৯।
টীকা –এই দ্বিতীয় সূক্ত-মন্ত্রের দ্বারা কৃষিনিষ্পত্তি কর্মে কৃষিক্ষেত্রে গমন পূর্বক যুগলাঙ্গল বন্ধন করতে (জুততে) হয়। এই সূক্তের দ্বারা দক্ষিণে বলদকে যুগে যুক্ত করতে হয়।…ইত্যাদি ॥ (৩কা. ৪অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –যে ঔষধি সতীনকে (অর্থাৎ সপত্নীকে) বাধা প্রদানকারিণী তথা যে ঔষধি স্ত্রীকে তার পতিকে প্রাপ্ত করাতে সক্ষমা, সেই পরম শক্তিশালিনী পাঠা নাম্নী ঔষধিকে আমি খনন করে লাভ করছি৷৷ ১।
হে ঊধ্বমুখশালী পত্রের সাথে যুক্ত পাঠা নাম্নী ঔষধি! আমার সতীনকে পতির সামীপ্য হতে দূর করো এবং আমার পতিকে আমার নিমিত্তই অসাধারণ বলে (শক্তিতে) স্থিত করো। ২।
হে সতী: তুমি আমার পতির সাথে সহবাস (রমণ) করো না। আমি তোমার নামও গ্রহণ করতে চাই না, এবং তোমাকে অনেক দূরে প্রেরণ করছি ৷৷ ৩৷৷
হে পাঠা ঔষধি! আমার সতীন নীচ বা অধম হতেও অধমা হয়ে যাক, এবং আমি শ্রেষ্ঠ বা উত্তম অপেক্ষাও উত্তমা হয়ে যেতে চাই ৷৷ ৪৷৷
হে পাঠা! তুমি শত্রুগণকে তিরস্কার করতে সমর্থ। আমি তোমার প্রভাবে সতাঁকে বশীভূত (বা পরাভূত) করবো। তুমি এবং আমি উভয়ে মিলে সতাঁকে বশীভূত (বা পরাভূত) করবো। ৫।
হে সতীন্! আমি তোমার পর্যঙ্কের (খাটের) চতুর্দিকে তথা পর্যঙ্কের উপরে এই শক্তিশালী ঔষধিকে স্থাপন করছি। ঔষধির শক্তিতে বশীকৃত হয়ে তোমার মন, আপন বৎসের। প্রতি স্নেহবশতঃ ধাবমানা গাভীর ন্যায়, আমার পশ্চাতে ধাবিত হোক (অর্থাৎ আমাকে অনুসরণ করুক) ৬
টীকা— সপত্নী-জয় কর্মে বাণাপর্ণীপত্রের চূর্ণ লোহিতবর্ণজায়া দধি ও জলের সাথে সংমিশ্রিত করে এই সূক্ত-মন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত কর সপত্নীর শয়নক্ষেত্রের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শেষ দুটি মন্ত্র বিবাদে জয়লাভের কর্মে জপনীয়।..ইত্যাদি। (৩কা. ৪অ, ৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –জাতি হতে ভ্ৰষ্ট-করণশালী দোষকে পরিহার করে আমার ব্রাহ্মণত্ব তীক্ষ্ণ (তেজোবিশিষ্ট) হোক এবং এই মন্ত্র তীক্ষ্ণ হয়ে অমোঘ ফলযুক্ত হোক। মন্ত্রশক্তির দ্বারা শারীরিক বল বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হোক এবং আমি যে ক্ষত্রিয়ের পুরোহিত, সেই ক্ষত্রিয়-জাতি ক্ষীণতা-রহিত হোক ॥ ১।
আমি যে রাজার রাজ্যে বাস করি, সেই রাজার রাজ্যকে সমৃদ্ধ করছি। শত্রুদের দূরীকরণশালিনী শক্তি ও সেনাকেও মন্ত্রের প্রভাবে দৃঢ় করছি। আমি তাদের (অর্থাৎ সেই শত্রুদের) হবির দ্বারা ছিন্ন-ভিন্ন করে দিচ্ছি। ২৷
আমাদের কার্যাকার্যের জ্ঞাতা রাজাকে বিজয় করার নিমিত্ত শত্রুগণ সেনা সংগৃহীত করার চেষ্টায় আছে। সেই শত্রুগণ তার অভিমুখী হয়ে পতন-প্রাপ্ত হোক এবং পদের নীচে দলিত হোক। এই নিমিত্ত আমি মন্ত্রশক্তির দ্বারা শত্রুগণকে হীনবীর্য (বা ক্ষীণ) করে আপন রাজাকে বিজয়লাভ করাচ্ছি ৷ ৩৷৷
আমি যে রাজার পুরোহিত, সেই রাজা শত্রুকে বিধ্বংস করার নিমিত্ত কাষ্ঠ-ছেদনকারী কুঠার অপেক্ষাও অধিক তীক্ষ্ণ (বা তেজঃ-সম্পন্ন হয়ে যাক। সম্পূর্ণ বিশ্বলোককে ভস্ম করার শক্তিসম্পন্ন অগ্নিদেবও তীক্ষ্ণ (বা তেজোগৰ্ভ) হয়ে শত্রু-সেনাকে ভস্ম করুন। ৪
আমি আপন রাজার অস্ত্রশস্ত্রগুলিকে শাণিত করে সেগুলিকে বীরবর্গের সাথে যুক্ত করছি (অর্থাৎ রাজার বীর সেনানীগণের হস্তে অর্পণ করছি)। এই রাজার ক্ষত্রিয়ত্বরূপ বল বিজয়শালী হোক; দেবগণ তাঁর মনের রক্ষক হোন ॥ ৫॥
হে ইন্দ্র! তোমার কৃপায় সংগ্রামে উপনীত রথ, হস্তী, অশ্ব ইত্যাদি হর্ষিত থাকুক। আমাদের শূরগণ সিংহনাদ করতে থাকুক। সকল দিকে আমাদের বিজয়াত্মক জয়ঘোষ বিস্তৃত হয়ে যাক। ৬।
হে সৈনিকগণ! তোমরা রণক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হও। আয়ুধসম্পন্ন তোমাদের ভুজসমূহ শত্রুদের উপর প্রহার করুক এবং তোমরা বল-রহিত শত্রুগণকে বিনাশ করে ফেলে। যে মরুৎ-বর্গের মধ্যে ইন্দ্র জ্যেষ্ঠ, সেই মরুৎ-বর্গ আপন সেনাগণের সাথে আগমন পূর্বক তোমার (অর্থাৎ রাজার) সহায়ক হোক৷ ৭ ॥
হে বাণ! তুমি মন্ত্রের দ্বারা তীক্ষ্ণকৃত হয়ে মারণ কর্মে কুশল হয়েছে। তুমি শত্রুবর্গের দিকে গমন পূর্বক তাদের উপর বিজয় লাভ করো। তাদের শ্রেষ্ঠ হস্তী, পদাতিক ও অশ্বারোহী ইত্যাদি সেনাকে বিনষ্ট করো; শত্রুগণের মধ্যে কেউ যেন জীবিত না থেকে যায় ॥ ৮৷৷
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— সংশিতং মে ইতি চতুর্থসূক্তেন পরসেনোন্বেজনকর্মণি আজ্যং হুত্বা চ সিতপদীং অজাং অবিং বা সম্পত্য অভিমন্ত্র শত্রুসেনাং প্রতি বিসর্জয়েৎ। তথা সংগ্রামজয়ার্থং অনেন সূক্তেন আজ্যহোমং সহোমং ধনুরিমাধানং ইসমিদাধানং রাজ্ঞে– অভিমন্ত্রিত ধনুপ্রদানং চ কুঠাৎ..ইত্যাদি। (৩কা. ৪অ. ৪সূ)।
টীকা— এই সূক্তের দ্বারা পরসেনা অর্থাৎ শত্রুসেনাগণের উদ্বেজনকর্মে আজ্যাহুতি প্রদান পূর্বক শ্বেতবর্ণের পদশালী অজা বা অবি অভিমন্ত্রিত করে শত্রসেনাগণের অভিমুখে প্রেরণ করণীয়। এবং সংগ্রামজয়ের নিমিত্ত এই সূক্তের দ্বারা আজ্যহোম, সহোম ধনুরিধান, ইষু-সমিদান অনুষ্ঠান পূর্বক রাজাকে এই মন্ত্রেই অভিমন্ত্রিত ধনু প্রদান করণীয়।…ইত্যাদি। (৩কা. ৪অ. ৪সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি। এই যজমান যজ্ঞের সময়ে তোমার উৎপত্তির কারণস্বরূপ হয়ে থাকেন। তুমি তোমার সেই উৎপত্তি-কারণকে জ্ঞাত হয়ে তাতে প্রবিষ্ট হয়ে আমাদের ধনকে বৃদ্ধিকরণশালী হও ॥১।
হে অগ্নি! আমাদের সমুখস্থ হয়ে আমাদের প্রাপ্তব্য (যজ্ঞীয়) ফল সম্বন্ধে বলো। তুমি বৈশ্বানর রূপে প্রজার পালক; তুমি ধনদানশালী; এই নিমিত্ত আমাদের অভিলষিত ধন প্রদান করো ৷৷ ২।
অর্যমা, ভগ, বৃহস্পতি দেবতা আমাদের ধন প্রদান করুন। ইন্দ্রানী ও বাণীরূপা সরস্বতীও আমাদের ধন প্রদান করুন ৷ ৩৷৷
আমরা সোম ও অগ্নিকে রক্ষার নিমিত্ত আহূত করছি। অদিতির পুত্র ত্রিবিক্রম বিষ্ণুকে (বা তিনপদে পৃথিবীর পরিমাপ গ্রহণকারী সর্বব্যাপী দেবতাকে), সর্ব প্রেরক সূর্যকে তথা দেবতাগণেরও স্রষ্টা (বা রচয়িতা) ব্রহ্মাকে আহূত করছি। দেব-হিতৈষী বৃহস্পতিকেও আমাদের স্ত্রোত্র (বা রচয়িতা) ব্রহ্মাকে আহূত করছি। দেব-হিতৈষী বৃহস্পতিকেও আমাদের প্রয়োজন পূর্ণ করার নিমিত্ত আহ্বান জ্ঞাপন করছি। ৪
হে অগ্নি! তুমি অন্য সকল অগ্নির সাথে আমাদের স্তোত্র ও যজ্ঞফলকে যুক্ত করো। হবিঃ-দানশীল যজমানকে দানের উদ্দেশে ধন প্রেরিত করো ॥৫॥৷
এই কর্মে আমরা ইন্দ্র ও বায়ুকে আহূত করছি। আমাদের সঙ্গতির দ্বারা সকল মনুষ্য শ্রেষ্ঠ মনঃ-সম্পন্ন হোক এবং তারা আমাদের দান দেবার ইচ্ছাশালী হোক, এই নিমিত্ত আমরা তোমাকে আহ্বান জানাচ্ছি ৷৬৷
হে স্তোতা! তুমি অৰ্মা, বৃহস্পতি, ইন্দ্র, সরস্বতী, বিষ্ণু ও সূর্যকে আমাদের ঈঙ্গিত ফলদানের নিমিত্ত স্তুতির দ্বারা প্রেরিত করো। ৭
অন্নের উৎপত্তি রূপ কর্মকে শীঘ্র আমাদের প্রাপ্ত করাও। এই দৃশ্যমানসকল প্রাণী বৃষ্টির দ্বারা অন্ন উৎপাদনশীল বাজ প্রসব দেবতার মধ্যে অবস্থান করছে। তারা দান করতে অনিচ্ছুক জনকেও দান-করণে প্রেরণা দান করুক। আমাদের ধন সমূহ পুত্র, পৌত্র ইত্যাদিতে চিরকাল পর্যন্ত স্থির রাখো ॥৮॥
পৃথিবী, আকাশ, দিবা, রাত্রি, জল ও ঔষধি আমাদের অভিলষিত ধন দান করুক। পূর্ব ইত্যাদি দিকসমূহও আমাদের কাম্য ধন প্রাপ্তি করাক। আমি হৃদয়ে যে সমস্ত সঙ্কল্প করছি, সেগুলি সার্থক ফল প্রাপ্ত হবো ॥৯॥
সকল প্রকার ধন-দানশালিনী বাণীকে আমি উচ্চারণ করছি। হে বাণী (বাগদেবী)! তুমি তেজের সাথে আমাতে উদিত হও। বায়ু আমার শরীরে প্রাণ পূর্ণ করে দিন এবং ত্বষ্টা আমাকে পুষ্ট করুন ১০
টীকা— এই সূক্ত-মন্ত্রের দ্বারা নির্ঋতি কর্মে শর্করামিশ্র ব্রীহি যাগ অনুষ্ঠেয় অর্থোত্থাপন বিঘুশমন কর্মে এই সূক্তের দ্বারা আজ্য, সমিৎ ইত্যাদি ত্রয়োদশ সংখ্যক দ্রব্য সহযোগে হোম করণীয়।…ইত্যাদি। (৩কা. ৪অ. ৫সূ)।
বঙ্গানুবাদ –মেঘের মধ্যে যে বিদ্যুৎ রূপ অগ্নি আছেন এবং জলের মধ্যে যে বড়বানল ইত্যাদি অগ্নি আছেন, মনুষ্যের শরীরে বৈশ্বানর রূপে যে অগ্নি বাস করছেন, সূর্যকান্ত ইত্যাদি মণিসমূহে যে অগ্নি আছেন, তথা অন্য সকল প্রকার অগ্নিসমুদায়কে এই হবিঃ প্রাপ্ত (বা প্রদত্ত) হোক ॥১
যে অগ্নি সোমলতায় অমৃতময় রসের পরিপাকের নিমিত্ত প্রবিষ্ট হয়ে আছেন, যে অগ্নি গো-ইত্যাদি পশুগণের মধ্যে দুগ্ধকে পরিপক্ক করে তুলছেন, এবং যে অগ্নি পক্ষী, মনুষ্য, চতুষ্পদ প্রাণী ইত্যাদির মধ্যে বর্তমান, এই হবিঃ তাদের সকলকে প্রাপ্ত হোক ॥ ২॥
দান ইত্যাদি গুণসম্পন্ন যে অগ্নিদেব ইন্দ্রের সাথে রথগামী হয়ে থাকেন, যে অগ্নিদেব মনুষ্যগণের মধ্যে বৈশ্বানর রূপে বিরাজিত থাকেন, তথা দাবাগ্নি রূপেও যে অগ্নি অস্তিত্ববান্ এবং যে অগ্নিদেব সংগ্রামে শত্রুগণকে দমনকারী হয়ে যাকে, সেই সকল অগ্নিদেবের উদ্দেশে আমি এই স্তুতিমন্ত্র সহকারে হবিঃ প্রদান করছি। এই আহুতি (হবিঃ) তাদের সকলের প্রাপ্ত হোক৷৷ ৩৷৷
বিশ্বকে গ্রাসকারী অগ্নিদেব, ইষ্টফলের দাতা, ধীমান, সকল কার্য সম্পন্নকারী, শত্ৰুসংহারক এই সকল প্রকারের অগ্নিদেব এই হবিঃ প্রাপ্ত হোক। ৪৷
যাতে প্রাণীগণ সত্তাধারী হয়ে থাকে, সেই সম্বৎসরের ত্রয়োদশ মাস ও পঞ্চ ঋতু যে অগ্নিদেবকে দেবাহ্বানকারী বলে জানে, সেই সত্যবাণী যুক্ত ও তার বিভূতি রূপ অগ্নিসমুহের উদ্দেশে এই হবিঃ প্রদত্ত হোক। ৫
বৃষভ যে অগ্নিদেবের হবিঃ রূপ অন্ন, সোম যাঁর পৃষ্ঠভাগের উপর অবস্থান করেন, যিনি সংসারের বিধায়ক এবং বৈশ্বানর রূপে যিনি জ্যেষ্ঠ, সেই অগ্নির নিমিত্ত প্রদত্ত এই হবিঃ তাদের প্রাপ্ত হোক৷ ৬ ৷৷
আকাশ, পৃথিবী ও অন্তরিক্ষলোকে প্রবিষ্ট হয়ে বিচরণশীল অগ্নি, মেঘে বিদ্যুৎ রূপে অধিষ্ঠিত অগ্নি তথা জ্যোতিশ্চক্রে বিচরণকারী অগ্নি এবং সকল দিকে বিরাজমান অগ্নি, সংসারের আশ্রয়ভূত অগ্নি–এই সকলকে এই হবিঃ সমর্পণ করছি। তাদের তা প্রাপ্ত হোক। ৭ ৷৷
স্তবকারীগণকে দানের নিমিত্ত, যাঁর হস্তে সুবর্ণ বিদ্যমান থাকে, সেই; সূর্য এবং ইন্দ্র, মিত্র, বরুন, অগ্নি–তাদের সকলকে এই হবিঃ প্রাপ্ত হোক। তারা এই ব্যাৎ (ক্রব্যাদ অর্থাৎ মাংসাশী) অগ্নিকে শমিত করণশালী হোন। ৮
মাংস ভক্ষক ক্ৰব্যাদ অগ্নি সূর্য ইত্যাদি দেবতাগণের কৃপায় শান্ত হোন; পুরুষের (অর্থাৎ মনুষ্যের) হিংসক অগ্নিও শান্ত হোক এবং সকলকে ভস্ম করণশালী দাবানলকে আমি শান্ত করে দিয়েছি। ৯।
সোমকে ধারণকারী পর্বতসমূহ, ঊর্ধ্বমুখে শয়নকারী (উত্তানশায়ী) জলসমূহ, মেঘ ও বায়ু এই ক্ৰব্যাদ ইত্যাদি (ক্ষতিকারক) অগ্নিসমূহকে শান্ত করে দিয়েছে ৷৷ ১০।
টীকা –পাঁচটি সূক্ত সমন্বিত পঞ্চম অনুবাকের এটি প্রথম সূক্ত। এই সূক্তের প্রথম সাতটি মন্ত্র ব্যাদে উপহত গৃহ, গোষ্ঠ, ক্ষেত্র ইত্যাদির শান্তির নিমিত্ত মণিধারণ ও হোম ইত্যাদি কর্মে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। এই মন্ত্রের দ্বারা পলাশবৃক্ষমণিবন্ধন, আজহোম, উদকহোম, উদকের সাথে যবহোম ইত্যাদি করণীয়। ক্রব্যাদাগ্নির শমনে এই দশটি ঋকের বিনিয়োগ উল্লিখিত হয়েছে। বশাশমন কর্মে এই সূক্তের দ্বারা বশাকে অভিমন্ত্রিত করে ব্রাহ্মণকে দান করা কর্তব্য।…ইত্যাদি। (৩কা, ৫অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –আমাতে হস্তীর মতো অপ্রধৃষ্ট তেজঃ প্রাপ্ত (বা সঞ্চারিত) হোক। দেবমাতা অদিতির দেহ হতে উৎপন্ন মহান তেজকে সকল দেবতা ও অদিতিও আমাকে প্রদান করুন। ১।
দিনের অভিমানী দেবতা মিত্র, রাত্রির অভিমানী দেবতা বরুণ, স্বর্গের রাজা (বা অধিপতি) ইন্দ্র এবং সংহারের দেবতা রুদ্র আমাকে তাদের কৃপার পাত্র বলে উপলব্ধি করুন। এই মিত্র ইত্যাদি দেবতা সংসারের পোষক। তারা আমাকে আমার অভিলষিত তেজে সম্পন্ন করুন। ২।
যে তেজের দ্বারা মনুষ্যগণের মধ্যে রাজা তেজস্বী হয়ে থাকেন, যে তেজের দ্বারা জলে জীব তেজস্বী হয়ে থাকে, যে তেজের দ্বারা হস্তী বিশালকায় হয়ে থাকে, যে তেজের দ্বারা অন্তরীক্ষে যক্ষ-গন্ধর্ব ইত্যাদি দেব যোনিবর্গ যশস্বী হয়ে থাকে, যে তেজের দ্বারা ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাগণ দেবত্ব লাভ করেছিলেন, সেই তেজের দ্বারা, হে অগ্নি! আমাকে তেজস্বী করে দাও ৩
হে জাতবেদা (অর্থাৎ উৎপন্ন প্রাণিসমূহের জ্ঞাতা) ও হবিঃসমূহের দ্বারা আহূত-কৃত অগ্নিদেব! তোমার মধ্যে যত তেজ আছে, সূর্যের মধ্যে যত তেজ আছে, সেইতেজকে পদ্মমালায় সুশোভিত অশ্বিদ্বয় আমাতে ব্যাপ্ত করুন ॥৪॥
দর্শন-শক্তি সম্পন্ন নেত্র নক্ষত্র মণ্ডলের যতদূর পর্যন্ত স্থান দর্শন করতে পারে, চারিটি দিক যত পরিমিত স্থান ব্যাপ্ত হয়ে আছে, মহান্ ঐশ্বর্যশালী ইন্দ্রের তত পরিমাণ বৃহৎ চিহ্ন আমার প্রাপ্ত হোক এবং পূর্ব কথিত তেজও আমার প্রাপ্ত হোক। ৫।
হস্তী অধিক বলবান হওয়ায় বনে বিচরণশীল মৃগ ইত্যাদির উপর শাসনকারী হয়ে তাকে, সেই হস্তীর ভাগ্য রূপ তেজের দ্বারা আমি নিজেকে অভিসিঞ্চিত করছি ৷ ৬
টীকা –তেজস্কামী জন এই সূক্তমন্ত্র পাঠ পূর্বক হস্তিদন্ত স্পর্শ করে অবস্থিত থাকবেন এবং এই মন্ত্রের দ্বারা হস্তিদন্তমনি অভিমন্ত্রিত করে ধারন করবেন। পুরোহিত এই সূক্তমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত হস্তী রাজাকে প্রদান করবেন। এছাড়া ব্রাহ্য নামক মহাশান্তি কর্মে হস্তীদন্তমণিবন্ধনে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে।….ইত্যাদি ॥ (৩কা, ৫অ, ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে স্ত্রী! তুমি যে পাপ হতে উৎপন্ন রোগের দ্বারা বন্ধ্যা হয়েছে, সেই পাপ-রোগকে আমি তোমার থেকে পৃথক করছি। সেই রোগ যাতে পুনরায় না প্রকট হতে পারে, সেই ভাবে তাকে দূর করে দিচ্ছি। ১।
হে নারী! বাণ স্বভাবতঃ যেমন তূণীরে গমন করে (বা অবস্থান করে), সেইরকমেই তোমার প্রজননাঙ্গ বীর্যযুক্ত (অর্থাৎ পুরুষ-জ্বণরূপ) গর্ভ প্রাপ্ত হোক। সেই গর্ভ পুত্র-রূপে পরিণতি প্রাপ্ত হয়ে দশ মাস পরে প্রসবকালে প্রকট হোক ॥ ২॥
হে স্ত্রী! তুমি পুরুষ-সন্তানকে (অর্থাৎ পুত্রকে) উৎপন্ন করো। পুত্রের পরে পুত্রই উৎপন্ন হোক, এমন অটুট নিয়মের দ্বারা তুমি পুত্রবতী হয়ে থাকো। ৩।
হে স্ত্রী! যে অমোঘ বীর্যের দ্বারা বৃষভগণ গাভীগুলিতে বৎস উৎপন্ন করে থাকে, সেই রকমেই (অর্থাৎ পুরুষের সেই রকম অব্যর্থ বীর্যে) তুমি পুত্রলাভ করো। ৪
হে স্ত্রী! ব্রহ্মা কর্তৃক, বিরচিত প্রজনন সম্বন্ধী নিয়ম অনুসারে আমি > তোমার নিমিত্ত এই বিধান (কর্ম) করছি। তোমার গর্ভে গর্ভ সুখদানশালী পুত্র প্রাপ্ত হোক ॥ ৫৷৷
উপর দিকে বৃদ্ধিশালী ঔষধিসমূহের পিতা হলো আকাশ এবং বীজ ধারণকারিণী পৃথিবী হলো। মাতা। সেই ঔষধিসমূহ জলের দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে থাকে। সেই ঔষধি তোমাকে পুত্র প্রাপ্ত করানোর নিমিত্ত গর্ভের রক্ষক হোক। ৬।
টীকা— এই সূক্ত-মন্ত্রের দ্বারা পুংসবন কর্মে (অর্থাৎ গর্ভিণীর দ্বিতীয় বা তৃতীয় মাসে কর্তব্য সংস্কারবিশেষে) বাণ অভিমন্ত্রিত করে স্ত্রীর মস্তকে ধারণীয়। এই সূক্ত-মন্ত্রের দ্বারা আজাহুতি প্রদান পূর্বক শর-মণি অভিমন্ত্রিত করে বন্ধন (ধারণ) করণীয়।..ইত্যাদি। (৩কা, ৫অ. ৩সূ)
বঙ্গানুবাদ –ধান্য, যব ইত্যাদি সারযুক্ত (অর্থাৎ ঔষধিসম্পন্ন) হোক; তেমনই আমার বাক্যও সারযুক্ত (অর্থাৎ অব্যর্থ বা সকলের গ্রহণীয়) হোক। আমি সেই সারযুক্ত ধান্য ইত্যাদি (ঔষধিকে)। লাভ করবো ॥১॥
আমি সেই সারবান্ দেবতাকে জ্ঞাত আছি; তিনি ধান্য ইত্যাদির কা বৃদ্ধি-করণশালী। ধান্য ইত্যাদিকে একত্ৰ-করণশালী দেবতাকে আমরা আহ্বান করছি। অযাজ্ঞিক ধনবানের সমস্ত ধন তাদের গো-ইত্যাদি সহ সভৃত্বা নামক (সঞ্চয়ের) দেবতা আমাদের প্রদান করুন। ২৷৷
এই পরিদৃশ্যমান পঞ্চ দিক (পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ-ঊর্ধ্ব) ও পঞ্চ প্রকার মনুষ্য (ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র-নিষাদ) এই যজমানকে ধন-ধান্যে নানা রকমে সম্পন্ন (সমৃদ্ধ) করুক, যেমন বর্ষা হলে নদীর প্রবাহ জলে পতিত জীবসমূহকে এক স্থান হতে অপর স্থানে নিয়ে যায় ৩
সহস্র ধারায় সম্পন্ন হওয়ার পরও জলের উৎপত্তিস্থল যেমন ক্ষীণতা-রহিত থেকে যায়, সেই রকম এই সঞ্চিত ধান্য অনেক ধারায় প্রদত্ত হলেও যেন ক্ষীণ (বা ক্ষয়) না হয়ে যায় ॥৪॥
হে দেব! তোমার শত সংখ্যক হস্ত আছে। সেগুলির দ্বারা ধন আনয়ন করে আমাদের প্রদান করো। হে সহস্র হস্তশালী! তোমার সেই হস্তগুলির দ্বারা ধন আনয়ন করে আমাদের প্রদান করো; এবং আমাদের দ্বারা সম্পাদিত তথা সম্পাদিতব্য কার্যগুলিকে সমৃদ্ধির সাথে আমাদের সম্পন্ন করাও ৫৷৷
গন্ধর্ববর্গের সমৃদ্ধির কারণ স্বরূপ তিনটি কলা অংশ আছে, তথা অপ্সরাবৃন্দের সমৃদ্ধির হেতুভূত চারিটি কলা আছে; সেইগুলির মধ্যে যা অত্যন্ত সম্পন্ন (বা সমৃদ্ধ) যে কলা, তার দ্বারা আমরা, হে ধান্য! তোমাকে স্পর্শ করাচ্ছি ॥৬।
হে প্রজাপতি! ধান্যকে নিকটে আনয়নশালী। উপপাহ দেব এবং প্রাপ্ত ধনের বৃদ্ধিকরণশালী সমূহ দেব, এই দুজন তোমার সারথিস্বরূপ। অনেক। প্রকারে ধন-ধান্যকে বৃদ্ধি করণের নিমিত্ত তুমি তাদের উভয়কে আনয়ন (প্রেরণ) করো ॥৭॥
বঙ্গানুবাদ –হে স্ত্রী! উদ্ভুদ নামক দেবতা অত্যন্ত ব্যথিত-করণশালী; তিনি তোমাকে কামার্ত করুন। তুমি কামের বাণের দ্বারা বিদ্ধ হয়ে কামবিকারে ব্যাকুল হয়ে পালঙ্কের উপর শয়ন করতে পছন্দ করোনি। আমি তোমার উপর কামের ভয়প্রদ বাণ চালনা করছি ॥১॥
রমণ করার অভিলাষ রূপ পর্ণগুলি যে কামরূপ বাণের অগ্রভাগে যুক্ত হৃদয়ভেদক লৌহ-শলাকা-তুল্য, তা ভোগাত্মক সঙ্কল্পে যুক্ত মশালের মতো (দাহপ্রদ); সেই বাণে আরোহিত হয়েই কামদেব তোমাকে বিদ্ধ করছেন ২
কামদেবের দ্বারা উত্তম প্রকারে নিক্ষিপ্ত বাণ প্রাণের আশ্রয় রূপ প্লীহাকে শোষণ (শুষ্ক) করুক। সরল ফলাসম্পন্ন তথা অনেক রকমে সন্তপ্ত করণশালী বাণের দ্বারা আমি তোমার হৃদয়কে আক্রান্ত করছি ৷ ৩৷
এই সন্তাপময় বাণের দ্বারা তোমার কণ্ঠ শুষ্ক হোক! তুমি আপন ইচ্ছাকে ব্যক্ত করতে উত্তাপের কারণে অসমর্থ হয়ে আমাকে প্রাপ্ত হও। প্রণয়-কলহকে ত্যাগ করে মৃদু-ভাষিণী হও এবং আমার অনুকূলে চলো। ৪।
(কামরূপ) কশার দ্বারা তাড়না করে আমি তোমাকে আমার অভিমুখিনী করছি। তোমাকে তোমার মাতা-পিতার নিকট হতেও আমি আপন সম্মুখে আগমনের আহ্বান করছি, যাতে তুমি আমার মতানুকূলা হয়ে আমাকে প্রাপ্ত হও ॥ ৫
হে মিত্র ও বরুণ দেবদ্বয়! এই স্ত্রীর হৃদয়কে জ্ঞান-শূন্য করে দাও। এ যাতে কার্য বা অকার্য বিস্মৃত হয়ে যায় এবং আমার বশীভূতা হয়ে থাকে, এমন করো ৷৷ ৬
টীকা— এই সূক্ত-মন্ত্রগুলি জপ পূর্বক স্ত্রীবশীকরণ কামনায় অঙ্গুলির দ্বারা স্ত্রীকে তাড়না করণীয়। তথা একবিংশতি সংখ্যক বদরীকন্টক ঘৃতে সিক্ত করে সেগুলির প্রাপ্তভাগ একটি সূত্রের দ্বারা বেষ্টন করে এই সূক্ত-মন্ত্রে হোম করণীয়।….ইত্যাদি। (৩কা, ৫অ. ৫সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে গন্ধর্বগণ! তোমরা দান ইত্যাদি গুণসমূহে যুক্ত আছো। তোমরা আমাদের পূর্ব দিকে হেতয় নামধারী হয়ে উপদ্ৰবকারীদের নাশক রূপে নিবাস করে থাকো। তোমাদের বাণ অগ্নির ন্যায় তীক্ষ্ণ। তোমরা আমাদের রক্ষাকরণে সমর্থ। অতএব আমাদের সুখ প্রদান করো। আমাদের শত্ৰু সৰ্প-বৃশ্চিক ইত্যাদিকে বিনাশ করো। এবং অধিক অধিক ভাবে বলো–এরা (অর্থাৎ আমরা) আমাদের (অর্থাৎ তোমাদের)। তোমাদের উদ্দেশে প্রণাম জ্ঞাপন করছি। তোমরা আমাদের এই আহুতি প্রাপ্ত হও। ১৷
হে গন্ধর্ববর্গ! তোমরা আমাদের দক্ষিণ দিকে অবস্যব নামধারী হয়ে পালনেচ্ছু রূপে নিবাস করে থাকো। তোমাদের বান আমাদের ইচ্ছাকে পূর্ণ-করণে সমর্থ। তোমরা আমাদের সুখ প্রদান করো। তোমাদের উদ্দেশে প্রণাম জ্ঞাপন করছি। তোমরা আমাদের এই আহুতি প্রাপ্ত হও। ২।
হে গন্ধর্বরূপী দেবতাগণ! তোমরা আমাদের পশ্চিম দিকে বৈরাজ নামধারী হয়ে অন্নপ্রদাতা রূপে নিবাস করে থাকো। বৃষ্টির জল হলো তোমাদের বাণ। তোমরা আমাদের রক্ষা-করণে সমর্থ। অতএব তোমরা আমাদের সুখ প্রদান করো। আমরা তোমাদের উদ্দেশে প্রণাম নিবেদন করছি। তোমরা আমাদের এই আহুতি প্রাপ্ত হও ৷ ৩৷৷
হে দান ইত্যাদি গুণসম্পন্ন গন্ধর্বগণ! তোমরা প্রবিধ্যন্ত নামধারী হয়ে আমাদের শত্রুবর্গকে তাড়নাকারী রূপে আমাদের উত্তর দিকে অবস্থান করে থাকো। তোমাদের বাণ বায়ুর ন্যায় বেগবান্। তোমরা আমাদের রক্ষা-করণে সমর্থ। অতএব আমাদের সুখ প্রদান করো। তোমাদের উদ্দেশে আমরা প্রণাম জ্ঞাপন করছি। তোমরা আমাদের এই আহুতি গ্রহণ করো। ৪
হে দেবতাগণ! তোমরা নিলিম্পা নামধারী হয়ে সর্বথা লিপ্ত রূপে এই নিম্ন দিকে অবস্থান করে থাকো। ধান্য, যব, বৃক্ষ, গুল্ম ইত্যাদি ঔষধিসমূহই তোমাদের বাণ। তোমরা আমাদের রক্ষাকরণে সমর্থ। অতএব আমাদের সুখ প্রদান করো। তোমাদের উদ্দেশে আমরা প্রণাম জ্ঞাপন করছি। তোমরা আমাদের এই আহুতি গ্রহণ করো। ৫।
হে অবস্বন্ত নামক রক্ষকরূপী দেবতাগণ! তোমরা আমাদের উধ্বদিকে বাস করে থাকো। মন্ত্রের দেবতা (বা অধিপতি) বৃহস্পতি তোমাদের বাণ। তোমরা আমাদের রক্ষা-করণে সমর্থ। অতএব। আমাদের সুখী করো। নমস্কার যুক্ত এই ঘৃত ইত্যাদির দ্বারা সম্পন্ন হবিঃ তোমাদের নিমিত্ত অর্পিত হচ্ছে, তোমরা তা গ্রহণ করো। ৬।
টীকা— আপন সৈন্যবর্গকে যুদ্ধে উৎসাহজনন কর্মে ষষ্ঠ অনুবাকের ছয়টি সূক্তের মধ্যে এই প্রথম সূক্তটি বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। স্বস্তয়ন কর্মে এই সূক্তমন্ত্রগুলির দ্বারা আজ্যপলাশ ইত্যাদি ত্রয়োদশ দ্রব্য সহকারে হোম করণীয়। সেইরকম সর্প-বৃশ্চিক ইত্যাদির ভয় নিবৃত্তির কামনায় গৃহক্ষেত্রের চারিদিকে এই সুক্তমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত:সিকতা বিক্ষিপ্ত করা কর্তব্য। এই সূক্তের দ্বারা তৃণমালা অভিমন্ত্রিত করে গৃহ নগর ইত্যাদির দ্বারে (প্রবেশ পথের সম্মুখে) বন্ধন করণীয়। এই সূক্তমন্ত্রে গোময় অভিমন্ত্রিত করে গৃহে বিক্ষেপণ, দ্বারদেশে নিখনন ও অগ্নিহোম করণীয়।…ইত্যাদি। (৩কা, ৬অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –পূর্ব দিক আমাদের প্রতি কৃপাশালিনী হোক। সেই দিকের অধিস্বামী হলেন অগ্নি এবং জগৎসংসারের রক্ষার নিমিত্ত সেই দিকে নিবাসকারী হয়ে আছে কৃষ্ণকায় সর্প; ধাতা অৰ্মা ইত্যাদি অদিতির পুত্রগণ সেই দিকের বাণ বা আয়ুধস্বরূপ; অগ্নি ইত্যাদি, অদিতি ইত্যাদি সকলের উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করছি। আমাদের এই নমস্কার তাদের সকলকে প্রসন্ন করুক। হে অগ্নি প্রমুখ দেবতাগণ! আমাদের পীড়াদানকারী শত্রুকে তোমাদের জম্ভে (অর্থাৎ উন্মুক্ত মুখবিবরস্থায়ী দন্তে) নিক্ষেপ করছি। তাকে ভক্ষণ করো ৷ ১।
দক্ষিণ দিক আমাদের নিমিত্ত কল্যাণময়ী হোক। সেই দিকের অধিস্বামী হলেন ইন্দ্র এবং দিক-রক্ষক হয়ে আছে তির্যকরূপী সর্প; সেখানকার দুষ্ট-নাশক বাণরূপ হলেন পিতৃদেব; এঁদের সকলকে নমস্কার। আমাদের এই নমস্কার তাদের সকলকে হর্ষিত করুক। যে আমাদের শত্রুতা করে এবং আমরা যাকে বিদ্বেষ করি, তাকে তোমাদের জম্ভে (দন্তে) ভক্ষণার্থ নিক্ষেপ করছি। ২।
পশ্চিম দিক আমাদের প্রতি অনুগ্রহ-করণশালিনী হোক। সেই দিকের অধিস্বামী হলেন বরুণ; রক্ষক পৃদাকু নামক কুৎসিত শব্দকারী সর্প; ধান-যব ইত্যাদিরূপ অন্ন তার বাণ। এঁদের সকলকে নমস্কার। আমাদের এই নমস্কার এঁদের সকলকে প্রসন্ন করুক। যে আমাদের সাথে বৈরিতা করে এবং আমরা যার বৈরিতা করি, তাকে আমরা তোমাদের জম্ভে ভক্ষণার্থ অর্পণ করছি ৷ ৩৷৷
উত্তর দিক আমাদের প্রতি অনুগ্রহশালিনী হোক। সেই দিকের অধিপতি হলেন সোম, স্বয়ং উৎপন্ন স্বজ নামক সর্প হলো রক্ষক এবং দুষ্টকে শমন-করণশালী অশনিই তার বাণ। এঁদের সকলকে নমস্কার। এই নমস্কার এঁদের সকলকে প্রসন্ন করুক। যে আমাদের প্রতি শত্রুতাচরণ করে এবং আমরা যার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন, তাকে তোমাদের জম্ভে ভক্ষণের নিমিত্ত নিক্ষেপ করছি। ৪।
যে নিম্ন দিক ধ্রুব নামে প্রসিদ্ধ, সে আমাদের প্রতি কৃপাদৃষ্টি করুক। এই দিকের অধিপতি হলেন বিষ্ণু। কল্মষগ্রীব নামে কৃষ্ণবর্ণের গ্রীবাশালী সর্প এর রক্ষক এবং ঔষধিই তার বাণ। এঁদের সকলকে নমস্কার করছি। এই নমস্কার এঁদের সকলকে প্রসন্ন করুক। আমরা যার বিদ্বেষী এবং যে আমাদের বিদ্বেষ করে, তাকে আমরা তোমাদের জম্ভে (দন্তে) নিক্ষেপ করছি। তোমরা তাকে ভক্ষণ করো ৷৷ ৫
উপরে স্থিত যে দিক, তা আমাদের অভিলাষ-পূরণকারিণী হোক। সেই দিকের অধিপতি হলেন বৃহস্পতি, রক্ষক হলো শিত্র নামক শ্বেতবর্ণশালী সর্প, এবং তার বাণ বা আয়ুধ হলো দুষ্টকে নিগ্রহকারী বৃষ্টির জল। আমরা এই সকলের উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করছি। এই নমস্কার এঁদের সকলকে প্রসন্ন করুক। আমরা যার সাথে শত্রুতা করে থাকি এবং আমাদের সাথে যে শত্রুতা করে, তাকে ভক্ষণের নিমিত্ত তোমাদের জম্ভে নিক্ষেপ করছি। ৬
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –প্রাচী দিক ইতি সূক্তস্য পূর্বসূক্তেন সহ স্বসেনোৎসাহজনন কর্মণি স্বস্ত্যয়নকর্মাদৌ চ বিনিয়োগোভিহিতঃ।..ইত্যাদি। (৩কা, ৬অ. ২সূ)।
টীকা — এই সূক্তমন্ত্রগুলি পূর্ববর্তী সূক্তের সাথে আপন সৈন্যগণের উৎসাহজনন কর্মে ও স্বস্তয়নকর্মে বিনিয়োগ হয়।..ইত্যাদি ৷ (৩কা, ৬অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –পৃথিবী ইত্যাদির আদি রচয়িতা ভূতকৃৎ নামক ঋষিগণ একটি একটি করে অনেক বর্ণশালিনী গো-ইত্যাদি সৃষ্টি করেন। এক এক বারে একটি করে সন্তান জাত হওয়া রূপ শুভসৃষ্টি সম্পর্কিত এই বিধান বিধাতারই রচনা। এই সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্ট বীজ (বীর্য) ও রজের দ্বারা যদি কোন গাভী যমজ সন্তান উৎপন্ন করে, তবে তা যজমানের গো-ইত্যাদি পশুসমূহের ক্ষয় এবং চোর, সিংহ ইত্যাদির দ্বারা নাশের কারণ হয়ে থাকে। ১।
এই যমজ-সন্তান-প্রসবকারিনী গাভী তেমন ভাবেই নাশক হয়ে ওঠে (অর্থাৎ পরিগণিত হয়), যেমন মাংসভক্ষক জীব হয়ে থাকে। সেই অভিচার ইত্যাদির সন্তাপপ্রদ ফলের কারণে যজমানের গাভীগুলি হিংসার কারণ হয়ে ওঠে। এইরকম গাভী ব্রাহ্মণকে দান করলে তবে সে পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির সাথে যুক্ত হয়ে সৌভাগ্যবতী হয়ে থাকে। ২।
হে যমজ-বৎস-প্রসবকারিণী ধেনু! তুমি মনুষ্যকে সুখী করণশালিনী হও; অপর গাভী ও অশ্বের পক্ষেও সুখের হেতুভূতা হও। যজমানের সকল শস্যক্ষেত্রের নিমিত্তও সুখদায়িনী হও ৩
এই গৃহে গো-ইত্যাদি ধন পুষ্ট হোক, দুগ্ধ ঘৃত ইত্যাদি বৃদ্ধিপাপ্ত হোক। হে যমজ বৎসবতী মাতা! তুমি এই যজমানের পশুসমূহকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত করাও এবং যজমানকে সহস্র ধন প্রদান করো। ৪
যে লোকে সুন্দর হৃদয়সম্পন্ন ও উত্তম কর্মশালী পুরুষগণ স্বস্থ (অর্থাৎ নিরুদ্বিগ্ন) ও প্রসন্ন হয়ে থাকে, সেখানে যদি যমজ-বস-প্রসবিনী গাভী সম্মুখে আগত হয়ে যায়, তবু সে যেন আমাদের মনুষ্য ও পশুগণের হিংসক না হয়। ৫।
যে লোকে সুন্দর হৃদয়শালী, শোভন জ্ঞানসম্পন্ন এবং সুকর্মকুশল মনুষ্যগণ যজ্ঞ ইত্যাদি শ্ৰেষ্ঠ কর্ম সাধন করে থাকেন, সেই স্থানে যমসূ (যমজ বৎস-প্রসবিত্রী) ধেনু যদি আগতা হয় তবে সে যেন আমাদের মনুষ্য ও পশুগণের বিনাশ না। করে ৷ ৬ ৷৷
টীকা –গাভী, অশ্বা, গর্দভী ও মনুষ্য-স্ত্রীগণের গর্ভে যমজ-সন্তানের জন্ম হলে তার শান্তির নিমিত্ত এই সূক্ত-মন্ত্রের দ্বারা আজ্যাতি প্রদান করে মাতা ও পুত্রের মস্তকে সম্পাত আনয়ন পূর্বক জলপাত্রে উত্তর সম্পাত করে সেই জলের দ্বারা আচমন ও পোক্ষণ করণীয়।…ইত্যাদি। (৩কা, ৬অ. ৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –আকাশের ঐ দক্ষিণদিকে দৃশ্যমান যমের সভাসঙ্গণ হলেন পাপীবর্গকে দণ্ড দানকারী তথা ধর্মাত্মাগণের উপর কৃপা বর্ষণশীল। এঁরা ইষ্টাপূর্ত কর্মের অধিস্বামী, অর্থাৎ শ্রুতি অনুসারী যজ্ঞ ইত্যাদি (ইষ্ট) কর্মে তথা স্মৃতি অনুসারী তড়াগ-কূপ ইত্যাদি (পূর্ত) কর্মে ঘটে যাওয়া পাপকে পুণ্য হতে পৃথক করে থাকেন ॥১॥
এঁরা যজ্ঞকে সকল দিক হতে বৃদ্ধি করণশালী এবং– ফলদানে সমর্থ। এঁরা আমাদের সকল অভিলাষকে পূর্ণ করে থাকেন। (যজ্ঞে) প্রদত্ত এই অবি কখনও ক্ষয়পাপ্ত হয় না ॥ ২
যে যজমান সকল ফলদানশীল এই মেষকে প্রদান করেন, তিনি দুঃখরহিত স্বর্গের ভাগী হয়ে থাকেন। সেই লোকে দুর্বল ব্যক্তিদের পক্ষে সবলদের মানতে হয় না ॥ ৩৷৷
যে পশুর চারটি পদে ও নাভিতে পাঁচটি অপূপ (পিষ্টক) রাখা হয়, সেই প্রঞ্চ-অপূপযুক্ত শ্বেতপাদ মেষের দাতা বসু ইত্যাদি পিতৃলোকে গমন করে অক্ষয় ফল ভোগ করেন ॥৪॥
যে পশুর (অর্থাৎ মেষের) চারটি পদে এবং নাভির উপর পাঁচটি অপূপ রক্ষিত হয়, সেই পঞ্চ অপূপযুক্ত শ্বেতপাদশালী মেষের দাতা সূর্য-চন্দ্র লোকে গমন করে অক্ষয় ফল ভোগ করেন ॥৫।
শ্বেত-পদশালী, যজ্ঞে দানকৃত মেষের কখনও ক্ষয় হয় না। যেমন সমুদ্রের গহন জল এবং সাথে অবস্থানকারী অশ্বিদ্বয়ের ক্ষয় হয় না, তেমনই এ-ও (অর্থাৎ এই মেষও) অক্ষয় হয়ে থাকে ৷ ৬ ৷৷
প্রজাপতিই দাতা, তিনিই গ্রহী। পারলৌকিক ফলাকাঙ্ক্ষী দানদাতা তথা ইহলৌকিক ফলাভিলাষী প্রতিগ্রহীতা, উভয়ই কামাত্মা। অতএব কামই কামকে প্রদান করেছিল; এইরকমে আত্মাকে পৃথক রাখায় প্রতিগ্রহে দোষ লাগে না। ৭৷
হে দানযোগ্য দ্রব্য! পৃথিবী ও অন্তরিক্ষ তোমাকে গ্রহণ করুক। আমি প্রতিগ্রহের দোষের দ্বারা প্রাণকে হারিয়ে বসবো না এবং পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি হতে বিচ্ছিন্ন হবো না ॥ ৮
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –য রাজানঃ ইতি পঞ্চর্চেন ও দনসবে কর্মণি পশ্ববয়বেষু পঞ্চাপূপনিধানং নিরুপ্তহবিরভিমৰ্শনাদিকং চ কুর্যাৎ। তথা চ সূত্রং।…ইত্যাদি। (৩কা, ৬অ. ৪সূ)।
টীকা— এই সূক্তের প্রথম পাঁচটি মন্ত্রের দ্বারা ওদনসবের কর্মে পশুর অবয়বে পাঁচটি অপূপ স্থাপন ও নিরুপ্ত হবির অভিমৰ্শন ইত্যাদি করণীয়। অবশিষ্ট তিনটি মন্ত্রের দ্বারা দোষাবহ কিংবা সাধারণ প্রতিগ্রহ ও সেই সম্পর্কিত দ্রব্যসম্ভার অভিমন্ত্রণ পূর্বক গ্রহণ করা হয়ে থাকে। ইত্যাদি ॥ (৩কা, ৬অ. ৪সূ)৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে বিবাদী পুরুষগণ! তোমাদের নিমিত্ত আমি বিদ্বেষভাব-দূরীকরণশালী, প্রীতিযুক্ত সাংমনস্য কর্ম করছি। গাভী যেমন আপন বৎসকে স্নেহ করে, তেমনই তোমরা পরস্পর ব্যবহার (আচরণ) করো। ১।
পুত্র পিতার অনুগত হোক, মাতাও পুত্রের প্রতি অনুকূল মনঃসম্পন্না হোক, পত্নী পতির প্রতি প্রিয়বাদিনী হোক ৷ ২
(সম্পত্তির) অংশ-বিভাজনের নিমিত্ত ভ্রাতা যেন ভ্রাতার প্রতি মন্দ আচরণ না করে। ভগ্নী যেন ভ্রাতা বা ভগ্নীর প্রতি শত্রুতা না করে। এরা সকলে সমান কর্ম ও সমান গতিসম্পন্ন হয়ে মঙ্গলময় কথাবার্তা বলুক ॥ ৩॥
যে মন্ত্রবলের দ্বারা দেবতাগণ বিভিন্ন মতিসম্পন্ন হন না কিংবা পরস্পরের প্রতি বৈরভাবাপন্ন হয়ে থাকেন না, সেই সমানতার কারণরূপ মন্ত্রের সাথে সম্বন্ধিত সাংমনস্য কর্মকে আমি তোমাদের নিমিত্ত সাধিত করছি। ৪।
তোমরা সমান মনঃসম্পন্ন হয়ে, সমান কার্যশালী হয়ে, জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ সকলের প্রতি সমান মনোযোগী হয়ে এবং পরস্পর শোভন বচনে প্রবৃত্ত হয়ে আগমন করো। হে মনুষ্যগণ! আমিও তোমাদের সমান কার্যে প্রবৃত্ত করছি ॥ ৫
হে সমানতাকাঙ্ক্ষী মনুষ্যগণ! তোমাদের ক্ষুধার অন্ন ও তৃষ্ণার জলের উপভোেগ সমান (বা একই রকম) হোক। আমি তোমাদের এক প্রেম-সূত্রে বন্ধন করছি। যেমন চক্রের অর বা কীলকগুলি (গোঁজগুলি) নাভিকে (অর্থাৎ মধ্যমণ্ডলকে) আশ্রয় করে থাকে, তেমনই তোমরা সকলে এক অগ্নির আশ্রয়ে অবস্থান পূর্বক তার সেবা করো ৷৷ ৬ ৷
আমি তোমাদের সমান মনঃসম্পন্ন করে দিয়ে একসাথে কর্ম সাধনে প্রবৃত্ত করছি; তোমাদের এক রকম অন্নের ভোক্তা করছি; এমন কর্মে আমি তোমাদের বশীভূত করছি। স্বর্গে এক সাথে অমৃত রক্ষাকারী ইন্দ্র প্রমুখ সকল দেবতাগণের মন যেমন একীভূত হয়ে শ্রেষ্ঠতা লাভ করে থাকে, সেই রকমে প্রাতে বা সন্ধ্যায়, সকল সময়, তোমাদের মন সমান ও শোভন-সুন্দর হয়ে থাকুক ॥৭॥
বঙ্গানুবাদ –হে অশ্বিদ্বয়! এই উপনয়নসংস্কৃত মাণবককে (অর্থাৎ বালককে) আয়ু-হানি করণশালিনী বৃদ্ধাবস্থা বা জরা হতে দূরে রক্ষা করো। হে অগ্নি! তুমি একে অদানশীলতা ও শত্রুগণ হতে দূরে রক্ষা করো। আমি একে পাপ হতে বিযুক্ত (পৃথক) পূর্বক যক্ষ্মাব্যাধি হতে মুক্ত করছি এবং দীর্ঘ আয়ুষ্মন্ করে দিচ্ছি। ১।
রোগের হেতুভূত উৎপন্ন দুঃখ হতে বায়ু একে রক্ষা করুন। ইন্দ্র একে পাপ হতে বিযুক্ত করুন। আমি একে রোগের কারণ রূপ পাপ হতে বিযুক্ত করে, যক্ষ্মা ব্যাধি হতে দূরে রক্ষিত করে, দীর্ঘ আয়ুষ্মন্ করে দিচ্ছি ॥ ২॥
সিংহ ইত্যাদি বন্য পশুসমূহ হতে গো-ইত্যাদি গ্রাম্য পশুগণ, যেমন স্বভাবতঃ বিযুক্ত হয়ে অবস্থান করে, জলাভাব জনিত কারণে পিপাসার্ত প্রাণীগণ হতে জল যেমন বিযুক্ত হয়ে থাকে, সেই রকমেই আমি এই ব্রহ্মচারীকে পাপ হতে বিযুক্ত করছি। একে ক্ষয়রোগ হত মুক্ত করে দীর্ঘ আয়ুর সাথে যুক্ত করে দিচ্ছি ৷ ৩৷৷
এক দি হতে অপর দিকে গমনের পথ যেমন পৃথক-পৃথক হয়ে থাকে, আকাশ ও পৃথিবীও যেমন স্বভাবতঃ পৃথক পৃথক হয়ে থাকে, তেমনই আমি এই বালককেও স্বভাবতঃ পাপ হতে বিযুক্ত হয়ে অবস্থানশালী করে দিচ্ছি। যক্ষ্মা রোগ হতে বিযুক্ত করে একে দীর্ঘ আয়ুষ্মত্তা প্রদান করছি। ৪
ত্বষ্টা আপন কন্যার বিবাহের অবসরের পরে যে যৌতুক প্রেরণ করেন, সেগুলিকে নির্গমনের স্থান। ও দানের নিমিত্ত এই পৃথিবী ও অন্তরিক্ষ পরস্পর পৃথক হয়ে গিয়েছিল। সেই রকমে আমি এই নব স্ব যজ্ঞ সূত্রধারী মানবকে পাপ হতে পৃথক করে দিচ্ছি। একে যক্ষ্মা রোগ হতে পৃথক করে দীর্ঘায়ুম্মান করে দিচ্ছি ৷ ৫
ভুক্ত দ্রব্যকে পরিপাকশালী জঠরাগ্নি নেত্র ও প্রাণকে অন্নের রস প্রাপ্ত করান এবং তাদের আপন আপন কর্ম সাধনের সামর্থ্য দান করেন। ঐ রকমেই চন্দ্রমা প্রাণবায়ুর সাথে যুক্ত হয়ে অমৃতময় রসের দ্বারা আত্মাকে পোষিত করে থাকেন। আমি এই মাণবককে সকল পাপ হতে বিযুক্ত করে দিচ্ছি এবং একে যক্ষা রোগ হতে বিযুক্তকরণ পূর্বক দীর্ঘ আয়ুর সাথে যুক্ত করে দিচ্ছি। ৬।
দেবগণ সূর্যকে প্রাণ রূপে প্রকট করেছিলেন। আমিও এমনইভাবে সূর্যকে এই বালকের আয়ু বৃদ্ধির নিমিত্ত স্থাপিত করছি। আমি একে সকল পাপ হতে বিযুক্ত করে দিচ্ছি এবং একে যক্ষ্মা হতে বিযুক্তকরণ পূর্বক দীর্ঘ আয়ুঃশালী করে দিচ্ছি। ৭।
আয়ুষ্মন্ পুরুষগণের দীর্ঘ আয়ুর দ্বারা এবং দেববর্গের চিরস্থায়ী প্রাণবায়ুর দ্বারা, হে উপনীত বালক! তুমি আপন প্রাণকে সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত ধারণ করো। আমি তোমাকে সকল পাপ হতে বিযুক্ত করে দিচ্ছি এবং ক্ষয় হতে রহিতকরণ পূর্বক দীর্ঘায়ু যুক্ত করে দিচ্ছি ॥ ৮।
হে বালক! শ্বাস-গ্রহণশীল সকল প্রাণীর শ্বাসের (অর্থাৎ প্রাণবায়ুর) সাথে তুমি শ্বাস গ্রহণ করো (অর্থাৎ প্রাণবায়ুকে ধারণ করে রাখো)। তুমি মৃত্যুপ্রাপ্ত না হয়ে এই লোকে অবস্থান করো। আমি তোমাকে সকল পাপ হতে বিযুক্ত করে দিচ্ছি এবং ক্ষয়রোগ হতে বিমুক্ত করে দীর্ঘায়ুষ্মন্ করছি ॥ ৯
আমরা আয়ুর শক্তিতেই মৃত্যু হতে জীবিত হয়ে থাকি (অর্থাৎ আয়ু থাকে বলেই বেঁচে থাকি), এবং তার দ্বারা এই লোকে বাস (বা অবস্থান) পূর্বক যব ধান্য ইত্যাদির আয়ুষ্কারক রসের দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হই। আমি তোমাকে (অর্থাৎ তুমি হেন মাণবককে) সকল রোগের জনক পাপ হতে পৃথক্ করে দিচ্ছি, তোমাকে ক্ষয়-রহিত করে দিচ্ছি এবং দীর্ঘায়ু সম্পন্ন করে দিচ্ছি। ১০।
আমরা পর্জন্যদেবের বর্ষার জলের দ্বারা অমৃতত্ব লাভ করে উত্থান ও উপবেশন (ওঠাবসা) করে থাকি। এই বর্ষার জল সংসারের প্রাণভূত। হে উপবীতধারী ব্রহ্মচারী মাণবক! আমি তোমাকে সকল রোগের উৎপত্তির জনকপাপ হতে বিযুক্ত করে যক্ষ্মা-ব্যাধি হতেও বিযুক্ত করে দিচ্ছি। আমি তোমাকে দীর্ঘ আয়ুর সাথে সংযুক্ত করছি ॥ ১১
বঙ্গানুবাদ— সৎ-চিৎ-সুখাত্মক (আনন্দময়), সকল জগৎসংসারের কারণভূত ঈশ্বর সৃষ্টির প্রারম্ভে হিরণ্যগর্ভরূপ সূর্যে প্রকট হয়েছিলেন। পূর্ব দিকে উদয়শীল সেই সূর্য্যাত্মক তেজবা দেবতা সৎ ও অসতের উৎপত্তি-স্থানের জ্ঞানকে প্রকট করণশালীরূপে বিদ্যমান। ১।
অখিল বিশ্বের উৎপত্তিকর্তা প্রজাপতি পিতা বলে কথিত হন। সেই পিতা হতে প্রাপ্ত, নাদরূপে ব্যাপ্তিশালিনী বাণী জগৎসংসারের সকল ব্যবহারের অধীশ্বরী। তিনি প্রথম শব্দ বাচ্য সূর্যাত্মক ব্রহ্মের সমক্ষে স্তুতিরূপে ব্যাপ্ত হোন। ২।
এই প্রপঞ্চ (সংসার) জগৎকে বন্ধন করে বন্ধুর ন্যায় এর হিতসাধনকারী, নিরাবণ জ্ঞানের দ্বারা জগৎসংসারের জ্ঞাতা যে দেব প্রথম উৎপন্ন হয়েছেন, তিনি সূর্য, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণের উৎপত্তি সম্পর্কে অপরকে বলে থাকেন। সেই সূর্য বেদরূপ পরব্রহ্মকে উপর ও মধ্যভাগ হতে উদ্ধার করেছিলেন। তার পরে হবিঃরূপ অন্ন দেবগণের মিলেছিল। ৩।
এই পরব্রহ্ম সূর্যরূপ হতে প্রথম উৎপন্ন হয়ে আকাশের কারণরূপ তথা পৃথিবী সম্বন্ধীয় সত্যস্বরূপে স্থিত হয়ে দ্যারা-পৃথিবীতে বিনাশহীনতা স্থাপিত করছেন ॥ ৪
সূর্যরূপে উৎপন্ন পরব্রহ্ম রসাতল ইত্যাদি লোকে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন। দান ইত্যাদি গুণযুক্ত বৃহস্পতি দেবতা সেই লোকের অধিস্বামী। যখন সূর্যের দ্বারা দিন উৎপন্ন হয়, তখন ঋত্বিগণ হবিদানের দ্বারা দেবতাগণের পূজা করেন। ৫
ঋত্বিকগণ-সম্বন্ধী যজ্ঞ সূর্যের তেজ-মণ্ডলকে উদয়াচলের উপর প্রেরিত করছে। পূর্ব দিকে স্থিত দেশসমূহে এই সূর্য-দেবতা হবিরম্নকে লাভ করবার উদ্দেশে শীঘ্রই প্রকট হচ্ছেন ॥ ৬।
দেবগণের বন্ধু বৃহস্পতি বা দেবগণের উৎপাদক প্রজাপতিকে (বা অথবা নামক মহর্ষিকে) নমস্কার জ্ঞাপন করছি। আপনি যেমন সকল প্রাণীর উৎপত্তি করণশালী হয়ে বিরাজমান, তেমন ভাবেই অন্নযুক্ত হোন। তিনি (অর্থাৎ বৃহস্পতি দেব) অন্নের দ্বারা সম্পন্ন বা সমৃদ্ধ হয়ে সকলের উপর কৃপা করে থাকেন ৭
টীকা— এই সূক্তটি বেদ কল্প ইত্যাদি অধ্যয়নের পূর্বে বিঘ্নবিনাশের নিমিত্ত এবং শাস্ত্ৰবিচারে প্রতিবাদীগণকে জয়ের নিমিত্ত জপ করণীয়।….গো-পুষ্টি কর্মে এবং গোসমূহের রোগবিনাশের নিমিত্ত এই সূক্তের মন্ত্রের দ্বারা লবণ অভিমন্ত্রিত করে গাভীকে খাওয়াতে হয়। বিবাহের চতুর্থিকা কর্মেও এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে।..ইত্যাদি। দ্বিতীয় মন্ত্রোক্ত রাষ্ট্রী পদ সম্পর্কে সায়ণাচার্যের উক্তি–ইয়ং পরিদৃশ্যমানা শব্দব্রহ্মাত্মিকা বান্দেবতা রাষ্ট্রী ॥(৪কা, ১অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –প্রজাপতি সকল পদার্থে (প্রাণীবর্গে) শক্তি দানশালী; তাঁর শাসনাধীন থেকে দেবগণও তাঁর পূজা করে থাকেন। তিনি দেবতা ও মনুষ্য-সকলের শাসক। আমরা সেই প্রজাপতিকে হবিঃ দ্বারা পূজা করছি। ১।
শ্বাস-উচ্ছ্বাসের কারণ রূপ, সকল প্রাণীর অধিস্বামী, মৃত্যু-নাশের সাধন স্বরূপ, যাঁর অধীনে (বা বশে) সকল প্রাণীর মৃত্যু হয়ে থাকে (অর্থাৎ যিনি মৃত্যুরও অধীশ্বর), আমরা সেই প্রজাপতি দেবকে হবিঃ দ্বারা পূজা করছি। ২৷৷
ক্রন্দনশীল প্রাণীবর্গের আশ্রয়ভূত ক্রন্দসী নামে দেবতা আছেন, যাঁর প্রভাবে দ্যাবা-পৃথবী অধঃপাতিত হতে পারে না। তারা নিম্নে পতনের ভয়ে প্রজাপতির নিকট রোদন করেছিল; বলে, তারা রোদসী নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই দ্যাব-পৃথিবী আপন রক্ষার নিমিত্ত যে প্রজাপতিকে আহ্বান করেছিল, তাঁর উদ্দেশে আমরা হবিঃ প্রদান করছি ৷ ৩৷৷
যাঁর মহিমায় আকাশ-পৃথিবী এবং অন্তরিক্ষের বিস্তার হয়েছিল, তথা এই সূর্য প্রত্যক্ষীভূত হয়েছিল, সেই প্রজাপতি দেবকে আমরা হবির দ্বারা পরিচর্যা (বা পূজা) করছি ॥ ৪
যাঁর মহিমায় এই পর্বত উৎপন্ন হয়েছে, নদী সমুদ্রের অন্তর্ভূত হয়েছে, চারিটি দিক্ যাঁর বাহু স্বরূপ, আমরা সেই প্রজাপতি দেবের উদ্দেশে হবিঃ সমর্পণ পূর্বক পূজা করছি ॥ ৫৷৷
জলসমূহ সৃষ্টির আদিতে প্রকট হয়ে জগৎসংসারকে রক্ষা করেছিল। হিরণ্যগর্ভকে এরা ধারণ করেছিল এবং জগৎসংসারের কারণ রূপ ব্রহ্মকে জ্ঞাত হয়ে (অর্থাৎ ঋতজ্ঞ হয়ে) এরা জগৎসংসারকে রক্ষা করেছিল। সেই জলের গর্ভভূত প্রজাপতি দেবকে হবিদানে সন্তুষ্ট করছি। ৬।
হিরণ্যগর্ভ প্রজাপতি সৃষ্টির প্রথমে প্রকট হয়ে জগৎসংসারের অধীশ্বরত্ব লাভ করেছিলেন। তিনিই পৃথিবী ও আকাশকে ধারণ করেছিলেন। সেই প্রজাপতিকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। ৭৷৷
ঈশ্বরের দ্বারা প্রথম উৎপন্ন হয়ে জলসমূহ ভাবী-স্রষ্টা প্রজাপতির উদ্ভবের নিমিত্ত ঈশ্বর প্রদত্ত বীর্যকে গর্ভাশয়ে স্থাপন করেছিল, সেই গৰ্ভরূপ হিরণ্যগর্ভের অণ্ডও (গর্ভাশয়ও) হিরন্ময় ছিল। সেই প্রজাপতি দেবকে আমরা উপাসনা (বা পরিচর্যা) করছি। ৮
বঙ্গানুবাদ— গুঢ়াশয়শালিনী নদীসমূহ যেমন অন্তর্হিত হয়ে প্রবাহিত হয়ে থাকে, বনস্পতি দেবতা যেমন বনে অন্তর্হিত হয়ে অবস্থান করে থাকে, সেই রকমে ব্যাঘ্র, চোর, বৃক–এই তিনই এই স্থান ত্যাগ করে চলে যাক। এদের শত্রুরাও এদের অন্তর্হিত করে বিবশ করে দিক। ১।
যে পথে আমরা গমনাগমন করে থাকি, সেই পথ হতে বন্য কুকুর, বৃক ই্যতদি না চলাচল করে। চোরও সেই পথ হতে দূর দিয়ে গমন করুক। সর্প এবং অপরকে হিংসাকারী শত্রু এবং অন্য হিংস্র প্রাণী এই পথে গমনাগমন না করে অন্য মার্গগামী তোক ॥ ২
হে ব্যাঘ্র! আমি তোমার নেত্র ও মুখকে নষ্ট করে দেব এবং তোমার চারিটি পদের মোট বিংশতি নখরকেও উৎপাটিত করে দেব। ॥ ৩॥
দণ্ডযুক্ত হিংসক পশুগণের মধ্যে ব্যাঘ্রকে আমি প্রথমে বিনাশ করছি। তারপর চোর, সর্প, রাক্ষস ও বৃক ইত্যাদিকে বিনাশ করছি। ৪
এই সময়ে এই দিকে আগমনশীল চোর প্রহৃত হয়ে পলায়ন করুক এবং যে কষ্টদ পথ ধরে সে গমন করবে সেই পথের উপর ইন্দ্র তাকে আপন বজ্রের দ্বারা চূর্ণ করে দিন। ৫।
ব্যাঘ্র ইত্যাদির দন্ত অশক্ত হয়ে যাক, শৃঙ্গশালী প্রাণীর শৃঙ্গগুলি বিনষ্ট হয়ে যাক এবং তাদের অস্থিপঞ্জরগুলিও বিচূর্ণ হয়ে যাক। হে যাত্রী! গোধা নামক জীব তোমাকে যেন দেখা না দেয় (কারণ যাত্রাকালে গোধার দর্শন অশুভ), এবং শয়নের স্বভাব-সম্পন্ন শশয়ু নামক হরিণও যেন অন্য পথ দিয়ে চলে যায়। ৬।
ইন্দ্র হতে ও সোম হতে উৎপন্ন সংযমন নামক মন্ত্র কখনও ব্যর্থ হয় না। হে ক্রিয়াকলাপ! তুমি অথবা মহর্ষির দ্বারা দৃষ্ট হয়েছে; তুমি নিশ্চয়ই ব্যাঘ্র ইত্যাদি ভয়ঙ্কর প্রাণীবগর্কে বিনাশ করে দিয়ে থাকো। ৭।
টীকা –এই সূক্ত-মন্ত্রের দ্বারা গো-ইত্যাদি পশুগণের ব্যাঘ্র, চোর ইত্যাদির ভয় নিবৃত্তির নিমিত্ত খাদির শঙ্কু অভিমন্ত্রিত পূর্বক তার দ্বারা গো-সঞ্চার ভূমি রেখ-চিহ্নিত করে সেখানে গো-গণকে চারণ করণীয়। এবং এই মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত জল-কলস গোপ্রচার স্থানে নয়ন কর্তব্য।…ইত্যাদি। (৪কা, ১অ. ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –বরুণের পৌরুষ নষ্ট হওয়ার পর পুনঃ বীর্য-প্রাপ্তির নিমিত্ত তুমি হেন যাকে গন্ধর্ব খনন পূর্বক লাভ করেছিল, হে কপিথ! আমরা তোমা হেন সেই শক্তিবর্ধক ঔষধিকে খনন করছি ॥১॥
সূর্য তোমাকে শ্রেষ্ঠ বীর্য সম্পন্ন করুন এবং তাঁর পত্নী ঊষা তোমাকে বীর্যের দ্বারা উদ্বৃত্ত করুন। আমার এই মন্ত্র বীর্যের দ্বারা সম্পন্ন (বা সমৃদ্ধ) করণশীল। প্রজাপতিদেব বীর্যের দ্বারা যুক্ত কামেন্দ্রিয়কে সশক্ত করুন ৷৷ ২৷৷
হে বীর্যকামী পুরুষ! তোমার পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির কারণ রূপ পুংব্যাঞ্জক যাতে নাগের ফণার ন্যায় কম্পিত হতে (বা কার্যকরী হতে চেষ্টা করতে) পারে, সেই নিমিত্ত এই ঔষধি তোমাকে অতুল বীর্যে সমৃদ্ধ করুক ৩
এই ঔষধি অত্যন্ত বীর্যশালিনী এবং সেচনসমর্থ বৃষভদের মধ্যেও সাররূপে অবস্থিত। এই ঔষধি এই পুরুষকে বীর্যের সার্থে যুক্ত করুক। হে ইন্দ্র! তুমি এই পুরুষের শরীরকে বীর্যধারণক্ষম করে দাও ৪
হে কপিখের মূল! তুমি জলের মন্থন-কালে উৎপন্ন হয়ে অমৃতময় হয়েছিলে এবং সোম তোমার সজাতীয় হয়েছিল। তুমি অঙ্গিরা ঋষিবর্গের মন্ত্রবলের দ্বারা স্বয়ং বীর্যরূপ হয়ে গিয়েছো ॥৫॥৷
হে অগ্নি! এই বীর্যাভিলাষী পুরুষের শরীরাঙ্গকে বীর্যমুক্ত করে শক্তি প্রদান করো। হে সূর্য! হে সরস্বতী! হে মন্ত্ৰাধিপ ব্রাহ্মণস্পতি! তোমরা এই বীর্যকামী ব্যক্তির অঙ্গকে নীরোগ করে দাও ॥৬॥
হে বীর্যের। কামনাশালী পুরুষ! আমি তোমার অঙ্গকে (বা পুরুষাঙ্গকে) বীর্যের দ্বারা যুক্ত (বা পূর্ণ) করে দিচ্ছি; অতএব তুমি সেচনসমর্থ বৃষভের ন্যায় নৃত্য করতে করতে মনের মতো (উপযুক্ত) আপন পত্নীকে প্রাপ্ত হও (অর্থাৎ সঙ্গমরত হও) ॥৭॥
হে ঔষধি! অশ্ব, অশ্বতর, বৃষভ, মেষ ইত্যাদি পশুসমূহে যে বীর্য আছে, তেমনই বীর্য তোমরা এই পুরুষের শরীরে স্থাপিত করো ॥৮
টীকা –পুরুষের বীর্যকরণকর্মে কপিন্থ-মূল (কয়েতবেল গাছের মূল) ঔষধির মতো খনন (মাড়াই) পূর্বক দুগ্ধে শ্রপিত (পক্ক) করে এই সূক্ত-মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করে যখন বীর্যকামী পুরুষকে খাওয়ানো হয়, তখন তার ক্রোড়ে এই মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত ধনু রাখতে হয়। এইরকমে কীলকে বা মুসলে উপবেশন করিয়ে পূর্বের মতো অভিমন্ত্রিত ঔষধি পান করানো কর্তব্য।…ইত্যাদি। (৪কা, ১অ. ৪সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –কামনাসমূহকে জলের ন্যায় বর্ষণশালী, সহস্ররশ্মিসম্পন্ন সূর্য আকাশে উদয় হয়ে থাকে। শত্রুকে বশ-করণশালী সেই সূর্যের দ্বারাই আমরা উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে নিদ্রাযুক্ত করে দিচ্ছি। ১।
বায়ু যেন অধিক বেগে প্রবাহিত হয়ে মানুষের নিদ্রাভঙ্গ না করে, কোন মনুষ্য যেন (আমার রতিকর্ম) না দেখে ফেলে; হে বায়ু! তুমি ইন্দ্রের মিত্র। সকল স্ত্রী ও কুকুরদেরও নিদ্রাকে বশীভূত করো। (কারণ স্ত্রীলোকের স্বভাবই লুকিয়ে দেখা এবং কুকুরদের চিৎকারে মানুষের নিদ্রাভঙ্গের আশঙ্কা)। ২৷৷
যে স্ত্রীসকল পালঙ্কের উপর বা অঙ্গনে শায়িত হয়ে আছে, যে রমণীগণ দোলনায় দোলায়িত হয়ে আছে, যে সকল রমণীকে পুণ্যগন্ধা বলা হয়ে থাকে, এমন সকল স্ত্রীলোককে আমি নিদ্রাঘোরে অবশ করে দিচ্ছি। ৩।
সকল জঙ্গমাত্মক প্রাণীসমূহকে আমি নিদ্রাভিভূত করে দিয়েছি, তাদের দর্শন-শক্তি আমি গ্রহণ করে নিয়েছি; তাদের ঘ্রাণেন্দ্রিয়ও আমার দ্বারা অধিকৃত হয়ে গিয়েছে। তাদের হস্ত পদ ইত্যাদি সকল অঙ্গকে অর্ধরাত্রের মধ্যেই আপন বশীভূত করে নিয়েছি। ৪
আমাদের অভিসারে যাওয়ার সময় যে পুরুষ বিচরণ করে, ইতস্ততঃ দেখতে থাকে,–যেমন এই ঘর বা গৃহ দর্শনশক্তি রহিত হয়ে আছে, সেইভাবে আমরা সেই সকলের নেত্রকে নিমীলিত করে দিচ্ছি ॥ ৫॥
যে স্ত্রীকে আমরা নিদ্রার দ্বারা বশীভূত করতে অভিলাষী, তার মাতা, পিতা, গৃহরক্ষক কুকুর, গৃহস্বামী এবং তার কুটুম্বী সকলেই নিদ্রামগ্ন হোক। ৬।
হে স্বপ্নের আভিমানী দেব! এদের সকলকে আগামী সূর্যোদয় পর্যন্ত নিদ্রামগ্ন রাখো। সকলের শয়নের পর আমি কারও দ্বারা হিংসিত না হয়ে যে ইন্দ্রের ন্যায় সম্ভোগপ্রাপ্ত হয়ে ঊষাকাল পর্যন্ত জাগ্রত থাকি। ৭
টীকা— স্ত্রী-অভিগমন কালে পার্শ্ববর্তী সকলকে নিদ্রাভিভূত করণের উদ্দেশে এই সূক্তমন্ত্রে জলপাত্র। অভিমন্ত্রিত করে শয়নশালায় প্রেক্ষণ করণীয় এবং অবশিষ্ট জল গৃহের দ্বারে নয়নীয়। নগ্ন হয়ে এই মন্ত্রের দ্বারা উল্খল অভিমন্ত্রিত করতে হয়। তথা, গৃহের উত্তর দিকে স্ত্রীর খট্রের দক্ষিণ পায়ায় এই মন্ত্রে। অভিমন্ত্রিত রঞ্জুবন্ধন করণীয়।…ইত্যাদি। (৪কা, ১অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –তক্ষক হলো প্রথম ব্রাহ্মণ জাতীয় সর্প; তার দশটি ফণা এবং দশটি মুখ। এ ক্ষত্রিয়-জাতীয় সর্পগণের মধ্যে প্রথম হওয়ার কারণে আকাশস্থ সোমকে পান করেছিল। সেই অমৃতময় সোম পানকারী ব্রাহ্মণ সর্প কল-মূল ফল ইত্যাদি হতে উৎপন্ন এই বিষকে নিঃপ্রভাব করুক ॥১॥
দ্যাবাপৃথিবী যত পরিমিত স্থান ব্যেপে বিস্তৃত আছে, সমুদ্র যতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত আছে, ততদূর পর্যন্ত স্থানব্যাপী কলমূল, ফল ইত্যাদি জনিত বিষকে দূরীকরণ শালিনী মন্ত্রযুক্ত বাণীকে প্রযুক্ত করছি। ২।
হে বিষ! বৈনতেয় গরুড় তোমাকে প্রথম ভক্ষণ করেছিল, তাতে তুমি নির্বীর্য হয়ে গিয়েছিলে। এখন এই বিষের দ্বারা পীড়িত পুরুষের জ্ঞানকে নষ্ট করো না। তুমি এর নিমিত্ত অন্নের ন্যায় জীর্ণতা প্রাপ্ত হও৷ ৩৷
পাঁচটি অঙ্গুলীশালী যে হস্ত মুখ-যন্ত্ৰ হতে তোমার (অর্থাৎ পুরুষের) শরীরে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে, সেই বিষ ও বিষ প্রদানকারী হস্তকে আমি ক্ৰমুক অর্থাৎ শুপারি বৃক্ষের খণ্ডের দ্বারা মন্ত্রশক্তির প্রভাবে প্রভাবহীন করে দিচ্ছি। ৪।
বাণের ফলকের দ্বারা যে বিষ তোমার শরীরে প্রবিষ্ট হয়েছে, তাকে আমি মন্ত্রবলে দূর করে দিচ্ছি। প্রলেপ হতে, বিষময় পত্র হতে, শৃঙ্গ হতে এবং মল (বা বিষ্ঠা) ইত্যাদির দ্বারা যে বিষ উৎপন্ন হয়েছে, তাকেও আমি মন্ত্রশক্তির দ্বারা পৃথক করে দিচ্ছি। ৫।
হে বাণ! তোমার বিষযুক্ত ফলক নিবীর্য হোক, তোমার বিষ নিষ্ফল হোক। আরও, তোমার ধনুকও ব্যর্থ হয়ে যাক ৷ ৬ ৷৷
বিষময়ী ঔষধি প্রদানকারী, লেপনের দ্বারা বিষ প্রয়োগশালী, দূর হতে বিষ প্রক্ষেপশালী, নিকটে অবস্থিত থেকে অন্ন ও জলে বিষ মিশ্রণকারী– এই সকল বিষ-দাতৃগণকে এবং বিষের উৎপত্তির কারণ রূপ পর্বত ইত্যাদিকেও আমি নির্বীর্য করে দিয়েছি। ৭
হে বিষযুক্ত ঔষধি! তোমাকে খননকারী জন নিবীর্য হোক; তুমিও মন্ত্রবলের দ্বারা নিষ্প্রভাব হও; যে পর্বতের উপরে এই বিষযুক্ত কন্দ, মূল, ফল ইত্যাদি উৎপন্ন হয়ে থাকে, সেই পর্বতও নির্বীর্য হয়ে যাক ॥ ৮
টীকা— কন্দবিষের ভৈষজ্যার্থে এই সূক্তের দ্বারা জল অভিমন্ত্রিত করে বিষাবৃত জনকে পান করানো কর্তব্য। তথাবিধ জলের দ্বারা প্রেক্ষণ করণীয়। কৃমুক (বা ক্রমুক অর্থাৎ শুপারী) বৃক্ষের বল্কলখণ্ডের সাথে জল অভিমন্ত্রিত করে পান করানো ও প্রক্ষেপ করানো কর্তব্য। ইত্যাদি আরও নানাভাবে নানারকম বিষক্রিয়ার দূরীকরণে এই সূক্তের বিনিয়োগ উপযুক্ত সূক্তস্য বিনিয়োগঃ অংশে দ্রষ্টব্য ॥ (৪কা, ২অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ— বরণ নামক বৃক্ষউৎপন্ন-করণশালিনী বরণাবতীর জল আমাদের বিষকে দূরীভূত করে দিক। এর জলে দ্যুলোকস্থিত অমৃতের স্বরূপ বিদ্যমান রয়েছে। সেই অমৃতময় জলের দ্বারা কন্দ ইত্যাদির দ্বারা উৎপন্ন তোমার বিষকে নিবারণ করছি। ১।
পূর্ব দিকের বিষ নির্বীর্য হোক; উত্তর, দক্ষিণ সকল দিকের বিষ মন্ত্রশক্তির দ্বারা নিবার্য হয়ে যাক। পৃথিবীর নিম্নপ্রদেশে উৎপাদিত বিষ করম্ভ নামক বিষহরি মন্থের দ্বারা নিবীর্য হোক ৷ ২৷৷
হে বিষ! তুমি শরীরকে দূষিত-করণশালী। জেনে করম্ভরূপ মন্থ মনে করে পীড়াজনক তোমাকে এই পুরুষ ভক্ষণ করে ফেলেছে। তুমি একে চেতনা-রহিত করো না ॥ ৩॥
হে চেতনা-বিলোপকারিণী ঔষধি! তোমার বিষকে আমরা ধনু হতে বিক্ষিপ্ত তীরের ন্যায় শরীর হতে দূর করে দিচ্ছি। হে বিষ! গুপ্তভাবে বিচরণশীল দূতের (বা চরের) ন্যায় গোপনরূপে এই বিষোপহত পুরুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ব্যাপ্ত হয়ে অবস্থানকারী তোমাকে মন্ত্রশক্তির দ্বারা নিষ্ক্রান্ত করে দূর করে দিচ্ছি। ৪
হে খননের দ্বারা লব্ধ ঔষধি! তুমি বৃক্ষের ন্যায় আপন স্থানে অটল থাকো, এই পুরুষকে মূৰ্ছিত করো না। আমরা তোমার বিষকে মন্ত্ররূপ বাক্যের দ্বারা দূর করে দিচ্ছি ৷৷ ৫
হে বিষাক্ত ঔষধি! মহর্ষিগণ তোমাকে শুদ্ধকরণের নিমিত্ত ক্রয় করেছিলেন। তুমি হরিণচর্মের বিনিময়ে ক্রীত হয়েছিলে। অতএব তুমি ক্রীত হয়ে (আত্মাধিকারহীনের মতো) এই স্থান হতে দূর হও এবং এই পুরুষকে অচেতন করো না। ৬।
হে মনুষ্যগণ! যে শক্রবর্গ যজ্ঞ ইত্যাদি মুখ্য কর্ম সাধন করেছিল, তারা আপন সেই মুখ্য কর্মের দ্বারা আমাদের পুত্র পৌত্র ইত্যাদির যেন নাশক না হতে পারে। এই (বিপদ) হতে রক্ষিত হওয়ার নিমিত্ত আমি চিকিৎসা রূপ কর্মকে প্রস্তুত (বা উপস্থাপিত) করছি ॥৭॥
বঙ্গানুবাদ –অভিষিক্ত হওয়ার পর ঐশ্বর্য লাভকারী ও অনুজীবী বা আশ্রিত জনগণকে অন্ন দানশীল রাজাই প্রাণধারীগণের অধিস্বামী হয়ে থাকেন। যমরাজ প্রাণীগণের উপর শাসন-করণে এবং দুষ্টকে দণ্ড দানের নিমিত্তই রাজার দ্বারা রাজসূয় যজ্ঞ অনুষ্ঠিত করিয়ে থাকেন ৷৷ ১।
হে রাজন! তুমি হস্তী, অস্ব, রথ, রাজ্য, সিংহাসন ইত্যাদির প্রতি উদাসীন হয়ো না। তুমি কার্যাকার্যের বিভাবের (অর্থাৎ পরিচয়ের) জ্ঞাতা ও মহাবলী হও। ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাগণ তোমাকে লক্ষ্য করে এই জন আমাদের বলে অধিকরূপে ঘোষণা করুন। ২।
সিংহাসনে আরূঢ় রাজাকে সকলে সেবা করুক এবং রাজাও প্রজাপালনে তৎপর হোন। অভিষেকের দ্বারা উৎপন্ন রাজ্য-তেজ (বা রাজার যশ) দশ দিকে ব্যাপ্ত হোক এবং শত্রুগণ ভয়ত্রস্ত হয়ে পলায়ন করুক। এই রাজা শত্রু, মিত্র, স্ত্রী ইত্যাদিতে বিভিন্ন প্রকার আচরণশীল রূপে দণ্ড, যুদ্ধ ও অধ্যয়ন ইত্যাদি কার্য সাধন-সম্পন্ন হোন ৩
হে রাজন্! তুমি ব্যাঘ্র চর্মের উপর উপবশন পূর্বক পূর্ব ইত্যাদি দিকসমূহকে বিজয় করো। তুমি তেজস্বী হও। তোমাকে এই সকল প্রজা নিজেদের অধিপতি রূপে স্বীকার করুক। তোমার রাজ্যে অনাবৃষ্টি রূপ অকাল যেন না হয় ॥ ৪।
হে রাজন! দ্যুলোকস্থ যে জল প্রাণীগণের তৃপ্তিকারক হয়ে থাকে, যে জল পৃথিবী এবং অন্তরিক্ষে বর্তমান, সেই তিনলোকে ব্যাপ্ত জলরাশির অপরিমিত পরাক্রম সমৃদ্ধ তোমাকে অভিষিক্ত করছি ॥ ৫৷৷
হে রাজ! (সেই) দিব্য জলরাশি আপন তেজের দ্বারা তোমাকে অভিসিঞ্চিত করুক। তুমি আপন মিত্রবর্গকে যে স্থিতিতে বৃদ্ধি করতে আকাঙ্ক্ষা করো, সূর্য সেই রকমে তোমাকে সামর্থ্যবান্ করুন ॥ ৬
বীর রাজাকে জলসমূহ মাতার ন্যায় হর্ষিত করছে এবং তাঁকে সৌভাগ্য প্রাপ্ত করানোর নিমিত্ত বীর্যের দ্বারা তৃপ্ত করছে। নদী রূপ জলরাশি যেমন সমুদ্রকৈ সমৃদ্ধ করে থাকে, তেমনই অভিষেকের সময় এই জলরাশি রাজাকে তৃপ্ত করছে। সেবকবৃন্দ বস্ত্র, মুকুট, অলঙ্কার ইত্যাদির দ্বারা রাজাকে সুশোভিত করছে ॥ ৭
টীকা –এই সূক্তের দ্বারা মহতী বা লঘু রাজ্যাভিষেক কর্মে শান্তিজলের কলশ ও জলপাত্র অভিমন্ত্রিত। করে রাজার অভিষেক করণীয় এবং পুরোহিত কর্তৃক এই মন্ত্রগুলি জপনীয়। তথা সম্পাতিত স্থালীপাক প্রাশনে এবং এই সূক্তমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত অশ্বে আরোহণ করিয়ে রাজাকে অপরাজিত দিকে প্রেরণ করা হয়।…ইত্যাদি। (৪কা, ২অ. ৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে অঞ্জনমণি! তুমি ত্রিকূদ (বা ত্রিকূট অর্থাৎ তিনটি শৃঙ্গশালী) নামক পর্বতের চক্ষু স্বরূপ। তুমি জীবধারীগণকে রক্ষা পূর্বক প্রাপ্ত হও। ইন্দ্র ইত্যাদি সকল দেবতা আমাদের রোগরহিত থাকার নিমিত্ত তোমাকে পরিধি (প্রাচীর বা বেষ্ঠন রেখা) রূপে প্রদান করেছিলেন ৷৷ ১।
যার দ্বারা নেত্র স্বচ্ছীকৃত হয়, যা রাক্ষস ইত্যাদি-জনিত পীড়াকে বিনাশ করণশালী, এমনই [ হে অঞ্জন! তুমি আকাশে স্থিত অমৃতের জ্ঞাতা এবং জীবিত প্রাণীসমূহের অনিষ্টকে দূরীকরণশালী। এ : তুমি পাণ্ডু ইত্যাদি রোগজনিত নীলপীত বর্ণত্বেরও নিবারক ॥ ৩॥
হে অঞ্জন! তুমি যার শরীরে অঙ্গ ব্যাপ্ত হয়ে থাকো, তার শরীরকে ক্ষয়রহিত করতে ক্ষণকালের মধ্যে মেঘজাল ছিন্নকারী বায়ুর ন্যায় প্রচণ্ড বেগশালী হয়ে থাকো। ৪
হে অঞ্জন! যে পুরুষ তোমাকে ব্যবহৃত (বা ধারণ) করে, তাকে অপরের শাপ প্রাপ্ত হতে হয় না, অন্যের দ্বারা হওয়া অভিচার রূপ কৃত্যা তথা শোক ও বিঘ্ন ইত্যাদি প্রাপ্ত হতে হয় না। ৫
হে অঞ্জনমণি! অভিচারাত্মক অসৎ মন্ত্রাবলী হতে, সেই মন্ত্রসমূহের দ্বারা প্রাপ্ত দুঃখ হতে, দুঃস্বপ্ন বা পাপ হতে উৎপন্ন হওয়া শোক হতে, দূষিত মন ও অপরের ক্রুর দৃষ্টি হতে আমাকে রক্ষা করো। ৬।
হে অঞ্জন! আমি তোমার মহিমা জ্ঞাত আছি; সেই জন্য এই কথা আমি মিথ্যা বলছি না। এই কারণে আমি তোমার সেবকরূপে গে, অশ্ব এবং প্রাণীমাত্রের সেবা লাভ করবো। ৭।
কাঠিন্যের দ্বারা জীবন অতিবাহনশীল জ্বর, সন্নিপাত (ত্রিদোষজ রোগ), সর্প ইত্যাদির বিষ,–এই প্রাণ হরণশীল বিকার অঞ্জনের প্রভাবে নিবারিত হয়। হে অঞ্জন! ত্রিকূদ পর্বত তোমার জনক ॥ ৮
পর্বতশ্রেষ্ঠ হিমালয়ের উপর ত্রিকূদ নামক পর্বতের অঞ্জন রাক্ষসবর্গের বিনাশে তৎপর হয়ে থাকে; এই নিমিত্ত সেই অঞ্জন আমাদের রোগ ইত্যাদি বিকারগুলিকে নষ্ট করুক। ৯
হে অঞ্জন! যদি তুমি ত্রিকূদ হতে উৎপন্ন বলে অথবা যমুনা হতে সৃষ্ট বলে কথিত হতে ইচ্ছা করো; তাহলে ত্রৈককুদ ও যামুন, এই দুটি নামই আমাদের পক্ষে কল্যাণ-সাধনশীল রূপে প্রতিভাত। তুমি তোমার আপন সেই নামদ্বয়ের দ্বারাই আমাদের রক্ষা করো। ১০৷৷
বঙ্গানুবাদ –বায়ুর দ্বারা অন্তরিক্ষে উৎপন্ন, জ্যোতিমণ্ডলেরও উপরিভাগে জাত এবং সুবর্ণে সৃষ্ট শঙ্খ শত্রুগণকে নির্বল-করণশালী হয়ে থাকে; সেই শঙ্খ আমাদের পাপ হতে রক্ষা করুক। ১।
হে শঙ্খ! যে তুমি প্রকাশিত (ভাস্বর) নক্ষত্র ইত্যাদির সম্মুখ-সমুদ্রের মধ্যে উৎপত্তিশালী; সেই হেন দীপ্তিময় তোমার দ্বারা আমরা রাক্ষসগণকে ও পিশাচবর্গকে বশীভূত করছি। ২৷
মণি রূপে প্রাপ্ত শঙ্খের দ্বারা ব্যাধি ও অজ্ঞানকেও বশীভূত করছি এবং অলক্ষ্মীকেও তিরস্কার করছি। এই সুবর্ণের দ্বারা উৎপন্ন, সন্তাপনাশক শঙ্খমণি আমাদের পাপসমূহ হতে রক্ষা করুক ৷৷ ৩৷৷
শঙ্খ প্রথমে বায়ু হতে উৎপন্ন পুনরায় সমুদ্রে জাত হয়েছিল। নদীর উম স্থান হতে সংগৃহীত বা সুবর্ণ হতে উৎপন্ন শঙ্খের বিকার রূপ মণি আমাদের আয়ুকে বৃদ্ধি করুক। ৪ ॥
অন্তরিক্ষ হতে বা সমুদ্র হতে উৎপন্ন শঙ্খ, মণির উপাদান রূপ। এটি মেঘ হতে উৎপন্ন বা মেঘ-বিদীর্ণকারী সূর্যের ন্যায় দীপ্যমান। এই শঙ্খের বিকার রূপ মণি দেবতা ও দৈত্যবর্গের উপদ্রব হতে আমাদের রক্ষা করুক ৫
হে শঙ্খ! তুমি সুবর্ণ, রৌপ্য ইত্যাদি উজ্বল সামগ্রীর মধ্যে মুখ্য, কেননা তোমার উৎপত্তি অমৃতময় চন্দ্রমণ্ডল হতে হয়েছিল। তুমি যুদ্ধকালে রথের উপর দর্শন দিয়ে থাকে। এই হেন শঙ্খের বিকার মণি আমাদের আয়ুকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত করুক। ৬
শঙ্খের কারণ রূপ সুবর্ণ শঙ্খরূপ দেহের সাথে যুক্ত হয়ে জলে অবস্থান করে। হে যজ্ঞোপবীত-ধারণশালী মাণবক! এই হেন শঙ্খকে তোমার আয়ু, দেহকান্তি এবং বলের নিমিত্ত তোমাকে বন্ধনযুক্ত করে দিচ্ছি। এই মণি তোমাকে শতায়ুষ্য করে রক্ষা করুক ৭
বঙ্গানুবাদ— শকটাকর্ষণকারী বৃষ হাল-চালনায় এবং ভার বহন রূপ কর্মের দ্বারা পৃথিবীর পোষণ করছে। সেই-ই কর্ষণ ইত্যাদির দ্বারা নিষ্পন্ন চরু, পুরোডাশ ইত্যাদির উৎপত্তিতে সহায়ক হয়ে আকাশকে পোষণ করছে। সেই-ই অন্তরিক্ষ, এবং পূর্ব ইত্যাদি মহাদিসমূহকে ধারণ করছে। এইরকমে সেই অনড্রান (বৃষভ) সকল ভুবনে তাদের রক্ষার্থে প্রবিষ্ট হচ্ছে। ১।
এই বৃষভ ইন্দ্র রূপে প্রতীত হয়। যেমন ইন্দ্র বৃষ্টিজলের দ্বারা এই চরাচরাত্মক সংসারকে পালন করছেন, সেইরকমেই এই বৃষভ বীর্য সিঞ্চনের দ্বারা পশুগণের উৎপত্তি সাধন করে, দুগ্ধ দধি ধান্য ইত্যাদি। প্রাপ্ত করিয়ে সংসারকে পোষণ করছে। এই ভাবে এই বৃষভ অতীত, অনাগত ও বর্তমান–এই ত্রিকালব্যাপী সকল সামগ্রীকে উৎপন্ন করছে এবং (যজ্ঞ ইত্যাদি) সকল কর্মানুষ্ঠানকে পূর্ণ করাচ্ছে ॥ ২॥
মনুষ্যগণের নিকট এই বৃষভ ইন্দ্রের তুল্য। এই বৃষভ সূর্য রূপে এই জগৎকে প্রকাশিত করে দিয়ে বিচরণ করছে। আমাদের বৃষভের এই হেন মহিমাকে জ্ঞাতশালী জন সুন্দর সন্তান-সম্পন্ন ই হয়ে থাকে এবং মরণের পর পুনরায় সংসারে প্রত্যাগমন করে না ৷ ৩৷
যজ্ঞ ইত্যাদি কর্মর্জনিত পুণ্যের স্বরূপে এই বৃষভ অক্ষয় ফলের দাতা হয়ে থাকে। সোমযাগে সংস্কৃত সোম আপন রসের দ্বারা বৃষভকে পূর্ণ করে থাকে। বর্ষার কারক (পর্জন্য) দেবতা এরা ধারা রূপ হয় এবং মরুৎ-গণ তার উধরূপ (স্তনরূপ) হয়। এই সম্পূর্ণ যজ্ঞই দোহন যোগ্য দুগ্ধ এবং দক্ষিণা এর দোহন ক্রিয়া হয়ে থাকে। অতএব যজ্ঞরূপী বৃষভকে দোহন-করণই অক্ষয় ফলময় হয়ে যায়। ৪৷৷
যজমান এই বৃষভের অধিস্বামী নন; যজ্ঞ ক্রিয়া, দাতা ও প্রতিগ্রহীতাও এবং নিয়ামক নয়। এ সম্পূর্ণ বিশ্বের বিজেতা; বায়ুরূপে বিশ্বের ভরণ-পোষণকর্তা। সংসারের সকল কর্মই এর অধীন; এই চতুষ্পদশালী বৃষভ আমাদের সূর্যস্বরূপ প্রেরণা প্রদান করে থাকে ॥ ৫॥
যে যজ্ঞরূপী বৃষভের দ্বারা পার্থিব দেহকে ত্যাগ করে এই দেবতাগণ মুক্তিদ্বার স্বর্গে আরোহণ করেছেন, তার দ্বারা আমরা সূর্যের উপাসনা করে সুখের অভিলাষে পুণ্যের ফল লাভ করছি। ৬।
এই বৃষভ ইন্দ্রাকার, অগ্নি রূপ, প্রজাপতি ব্রহ্মার সমান। এই তিন বিশ্বানর ইত্যাদিতে তাদাত্ম রূপে প্রবিষ্ট হয়ে গিয়েছেন ॥ ৭।
অখিল বিশ্বের হিতৈষী বৈশ্বানর অগ্নিতে ব্রহ্মা প্রবিষ্ট হয়ে গিয়েছেন এবং পূর্বোক্ত বৃষভে বিরাট তাদাত্ম রূপের দ্বারা প্রবেশ করে গিয়েছেন; অতএব এই বৃষভ বিরাটের সমান ॥ ৮৷৷
বৃষভের সপ্ত অক্ষয় দোহের জ্ঞাতা পুরুষ পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি সন্তান, এবং শুভ কর্ম সমূহের ফলরূপ স্বর্গ ইত্যাদি লোক-সমুদায়কে লাভ করে থাকে। বৃষভের মহিমা সম্পর্কে এই যা কিছু কথিত হলো, তা সত্যরূপী সপ্ত ঋষিই পরিজ্ঞাত আছেন। ৯।
এই বৃষভ অলক্ষ্মীকে অবোমুখে পাতিত করে তার উপর আরোহন করে; এবং আপন জঙ্ঘার দ্বারা ভূমিকে উভিন্ন করে আপন সম্মুখে আগুয়ান পরিশ্রমী কৃষককে অন্ন প্রদান করছে ॥ ১০
যজ্ঞ সম্বন্ধী প্রজাপতির ব্রতযোগ্য দ্বাদশ রাত্রির কথা বিদ্বানগণ বলে থাকেন। সেই সময়ে এই বৃষভরূপে আগত প্রজাপতিকে যে জানতে পারে, সে-ই এই বৃষভ-ব্রতের (অনডুই-ব্রতের) অধিকার রক্ষা করে থাকে। এই জ্ঞানই প্রজাপতি-সম্বন্ধী অনডুহ নামক অনুষ্ঠান। ১১।
পূর্বোক্ত লক্ষণসম্পন্ন বৃষভকে আমি, সায়ংকালে প্রাতঃকালে এবং মধ্যাহ্নেও দোহন করবো। সকল অনুষ্ঠান করণশালীরও ফলসমূহকে আমি দোহন করবো। এই রকমে এই দোহন কর্মের সাথে যে ফলসমূহ যুক্ত হয়ে থাকে, সেই অক্ষুণ্ণ দোহন-কর্মগুলিকে আমি জ্ঞাত আছি। ১২।
বঙ্গানুবাদ –হে রক্তবর্ণশালিনী লাক্ষা! তুমি রোহণী (উৎপত্তিকারিণী)। তুমি মাংসের ক্ষতকে পূরণ করতে সমর্থ, এই নিমিত্ত খঙ্গ ইত্যাদির দ্বারা ছিন্ন অঙ্গ হতে প্রবাহিত রুধিরকে তুমি সেখানেই রেখে দাও। এই বিন্দু বিন্দু রূপে ক্ষরণশীল রক্তকে শরীরেই ব্যাপ্ত করে রাখো। ১।
হে পুরুষ! তোমাকে শস্ত্র ইত্যাদির দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত (বা আহত) করা হয়েছে এবং তার জন্য ঘটিত বেদনার কারণে তোমার শরীর প্রদাহিত হচ্ছে এবং তোমার শরীর মুরাঘাতে চূর্ণ হয়ে গিয়েছে; তোমার সেই অঙ্গকে বিধাতা জোড়ের সাথে জোড়কে মিলিত করে (অর্থাৎ অঙ্গের একটি ভগ্ন অংশের সাথে অপর ভগ্ন অংশটি যথযথভাবে মিলিয়ে) লাক্ষার দ্বারা যোগ করে দিন। ২।
হে আঘাতপ্রাপ্ত পুরুষ! প্রহারের কারণে তোমার যে মজ্জা পৃথক হয়ে গিয়েছে, অথবা তোমার যে অস্থি ভগ্ন হয়ে গিয়েছে, সেই মজ্জা ও অস্থি সুখের সাথে যুক্ত হোক এবং যে মাংস কর্তিত হয়ে গিয়েছে তা-ও অনায়াসে পূর্বের মতো হয়ে যাক ৷ ৩৷
মজ্জা নামক ধাতু মজ্জা নামক ধাতুর সাথে মিলিত হোক, চর্ম চর্মের সাথে যুক্ত থোক; অস্থির সাথে অস্থির জোড় লাগুক, তোমার শরীর হতে ক্ষারিত রক্ত পুনরায় উৎপন্ন হোক। ৪
হে লাক্ষা! প্রহারের দ্বারা পৃথক হয়ে যাওয়া লোমকে পুনরায় উৎপন্ন লোমের সাথে মিলিয়ে ঠিক করো, ছিন্ন চর্মকে চর্মের সাথে যুক্ত করে দাও; অস্থির উপর রক্ত বাহিত হতে থাকুক। এইভাবে, যে অঙ্গই ভঙ্গ হয়ে গিয়েছে, তাকে ঠিকমতো কর্মের যোগ্য করে তোলো। ৫৷৷
হে পুরুষ! শস্ত্র ইত্যাদির প্রহারে যদি তোমার কোন অঙ্গ পৃথক্ (অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন) হয়ে গিয়ে থাকে, তবে তুমি মন্ত্র ও ঔষধির শক্তিতে ঠিক হয়ে গিয়ে উঠে দণ্ডায়মান হও। রথ যেমন ধাবমান হয়ে কর্মরত হয়ে থাকে, তেমনই তুমিও দৃঢ় শরীরশালী হও এবং উখিত হয়ে বেগের সাথে গমন করো। ৬।
যদি ছেদনকারী কোন শস্ত্র শরীরের উপর পতিত হয়ে তাকে কর্তিত করতে থকে, অথবা অপরের দ্বারা নিক্ষিপ্ত (ছুঁড়ে ফেলা) প্রস্তরের আঘাতে দেহে পীড়া (বা যন্ত্রণা) হতে থাকে তবে সেই আঘাতের দ্বারা বিভগ্ন হয়ে যাওয়া অস্থি এই মন্ত্রবলের দ্বারা যুক্ত হয়ে (জুড়ে) যাক। এই সূক্ত-মন্ত্রের দ্রষ্টা অঙ্গিরাতনয় ঋভু যেমন রথের বিভিন্ন অঙ্গকে মিলিয়ে এক করে থাকেন, তেমনই এই অথর্ব মন্ত্রও শরীরের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অঙ্গগুলিকে যথাযথভাবে যে যুক্ত করে (অর্থাৎ ঠিকমতো মিলিয়ে) দিক ॥৭
টীকা –শস্ত্র ইত্যাদির আঘাত জনিত কারণে রুধির প্রবাহের ও অস্থি ইত্যাদি ভঙ্গ নিবৃত্তির নিমিত্ত লাক্ষা মিশ্রিত জলের কথ এই মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করে উষাকালে ক্ষতস্থানে সিঞ্চন করণীয়। এবং এই সূক্তমন্ত্রে ধৃত ও দুগ্ধ অভিমন্ত্রিত করে তা আহত পুরুষকে খাওয়ানো কর্তব্য এবং তার দ্বারা ক্ষঙ্গে প্রলেপ প্রদান করণীয়…ইত্যাদি। (৪কা. ৩অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে দেববৃন্দ! এই উপনীত বালককে ধর্মবিষয়ে প্রমাদ-হীন করো। একে অধ্যয়ন ও জ্ঞান ইত্যাদির ফলে সমৃদ্ধ করো। অজ্ঞান বশে এর দ্বারা অনুষ্ঠিত পাপ হতেও একে রক্ষা করো। যে অপরাধ সমূহের দ্বারা (লোকে) আয়ুহীন হয়ে থাকে, তা হত একে দূরে রক্ষিত করে শতায়ুষ্য করে দাও। ১।
প্রাণ ও অপান এই বায়ুদ্বয় শরীরের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে স্বেস্থান এবং তারও দূর পর্যন্ত সঞ্চারিত হোক। হে উপনীত! এই বায়ুসমূহে যে প্রাণ আছে, তা তোমাকে বলযুক্ত করুক এবং অপান বায়ু তোমাকে পাপ হতে বিযুক্ত রাখুক। ২।
হে বায়ু সকল রোগের বিনাশকারী ঔষধি নিয়ে আগত হও। রোগের উৎপত্তিকারক পাপকে আমাদের নিকট হতে দূর করে দাও। তুমি সকল রোগকে দূরীকরণে সমর্থ। তুমি দেবতাগণের দূত রূপে বিশ্বজগৎকে রক্ষার্থে বিচরণ করে থাকো এবং ইন্দ্রিয়বর্গকে দূত হয়ে তাদের পোষণ-কর্ম করতে থাকো। ৩।
এই উপনীত বালককে সকল দেবতা রক্ষা করুন। ইন্দ্রিয় সমূহের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা এর ইন্দ্রিয়সকলকে কর্ম-সমর্থ করুন! মরুৎ-বর্গের সপ্ত গণ, প্রাণাপানের গণ তথা অন্য সকল প্রাণী এইরকমে একে রক্ষা করুক, যাতে এ পাপে লিপ্ত না হয়। ৪
হে উপনীত বালক! আমি তোমাকে সুখদায়ক মন্ত্র ও কল্যাণময় কর্মের দ্বারা প্রাপ্ত হয়েছি। আমি তোমাকে অতুল বলের প্রাপ্তি সাধিত করেছি। তোমার যক্ষ্মা ইত্যাদি ব্যাধিকেও আমি তোমা হতে বিযুক্ত করছি। ৫৷৷
আমার এই ঋষি হস্ত পরম ভাগ্যশালী; এতে সকল রোগ-শোককে দূরীকরণশালিনী ঔষধিসমূহের প্রভাব বর্তমান। আমার এই প্রকার গুণশালী হস্তের সুখপ্রদানশীল স্পর্শের দ্বারা পূর্ণ হোক৷ ৬ ৷
হে উপনীত; যে প্রজাপতির হস্তের দ্বারা নির্মিত বাণীরূপ ইন্দ্রিয়ের আশ্রয়ভূত জিহ্বা প্রথমেই চলতে (প্রযুক্ত হয়ে) থাকে, সেই প্রজাপতির হস্তের দ্বারা তোমাকে স্পর্শ করছি ॥ ৭ ৷৷
বঙ্গানুবাদ –অজ (ছাগ) পবিত্র অগ্নির তাপ হতে উৎপন্ন হয়েছে। এ (অর্থাৎ সেই ছাগ) সকলের প্রথমে (বা অগ্রে) উৎপাদক প্রজাপতি বা অগ্নিকে দর্শন করতে পেরেছিল। প্রথম রচিত (অর্থাৎ সৃষ্ট) সেই অজের দ্বারা ইন্দ্র ইত্যাদি দেবত্ব লাভ করতে পেরেছিলেন এবং তারই সাধনে (অর্থাৎ সেই অজের দ্বারা যজ্ঞ সাধিত করে) অপর ঋষিগণও উচ্চ লোকসমূহকে লাভ করেছিলেন। এই রকম অজাত্মক যজ্ঞ দেবত্ব ইত্যাদি ফলকে সিদ্ধ করে থাকে। ১।
হে মনুষ্য! অগ্নির দ্বারা যজ্ঞ সাধন করে তুমি স্বর্গ ইত্যাদি শ্রেষ্ঠ লোকসমূহকে প্রাপ্ত হও। পুনরায় অন্তরিক্ষের পৃষ্ঠের সমান স্বর্গে উপনীত হয়ে (পৌঁছিয়ে) দেবতাগণের মধ্যে স্থান প্রাপ্ত হয়ে তাদের সমানই ঐশ্বর্যশালী হও। ২।
আমি পৃথিবী হতে অন্তরিক্ষে এবং অন্তরিক্ষ হতে স্বর্গলোকে আরোহণ করছি। সেই স্বর্গলোকে দুঃখ নেই। তার উধ্বস্থ সূর্যমণ্ডলের জ্যোতিতে আমি লীন হয়ে যাচ্ছি। ৩।
যজ্ঞফলের দ্বারা স্বর্গলাভকারীগণ সাংসারিক সুখসমূহের কামনা করে না। যে যজমান অভীষ্ট ফলপ্রাপ্তির সাধনভৃত যজ্ঞকে জ্ঞাত ও তাকে সাধন করে থাকেন, তাঁরা অন্তরিক্ষ-স্বর্গ-মর্ত্য এই লোকত্রয়ের উপর বিজয় প্রাপ্ত হয়ে থাকে। ৪
হে অগ্নি! তুমি দেবতাগণের মধ্যে মুখ্য; এই আহ্বান যোগ্য স্থানে আগমন করো। এই অগ্নি ইন্দ্র ইত্যাদি দেববৃন্দের নিকট হবিঃবহনকারী হওয়ায় তাঁদের নেত্রের সমান প্রিয় এবং মনুষ্যকে শ্রেষ্ঠ লোকসমূহ প্রদর্শনকারী হওয়ায় তাদেরও নেত্রের সমতুল্য। অতএব তাঁর প্রকাশে প্রথমে পূজন, তারপর যজ্ঞ-সাধনশীল কর্মের ফলরূপ স্বর্গকে প্রাপ্ত হওয়া যায় ॥ ৫॥
হবিঃ রূপ অজকে দুগ্ধের ন্যায় রসযুক্ত ঘৃতের দ্বারা লিপ্ত করছি। এই অজ যজমানকে স্বর্গে প্রেরণ করতে সমর্থ। এই রকম অজের দ্বারা আমরা শ্রেষ্ঠ স্বর্গলোক লাভ করে পুনরায় সূর্যরূপ পরম জ্যোতিতে একাকার হয়ে যাচ্ছি। ৬।
হে পাবক! পঞ্চ প্রকারে বিভক্ত হওনশীল এই অজকে পঞ্চাঙ্গুলিরূপ দীর সাহায্যে স্থালী হতে উত্তোলিত করে কুশে রক্ষিত পঞ্চভাগে রক্ষিত ওদনে স্থাপিত করো (বা বন্টন করো)। এর পনকৃত শিরোভাগকে পূর্ব দিকে এবং পশ্চাদবর্তী ভাগকে দক্ষিণ দিকে স্থাপন করো। ৭।
কটিদেশের মাংসকে পশ্চিম দিকের ওদনের সাথে উত্তরপার্শ্বস্থ মাংসকে উত্তর দিকের ওদনের সাথে, পৃষ্ঠভাগের মাংসকে ঊর্ধ্ব দিকের ওদনের সাথে, উদরভাগের মাংসকে নিচের দিকের ওদনের সাথে এবং মধ্যভাগের মাংসকে মধ্যবর্তী দিকের ওদনের সাথে স্থাপিত করো ॥ ৮
(এটি অজ অথবা জীবাত্মার আত্মসমর্পণের মন্ত্র, যাতে, কিনা আপন সমস্ত শরীরকে বিশ্ব-হিতের নিমিত্ত সমর্পিত করার ভাবনা ব্যক্ত করা হয়েছে। এই তথ্যকে প্রকট করার নিমিত্ত এই কথা বলা হয়েছে যে, আমার শির পূর্ব দিকের উদ্দেশে অর্পণকৃত হয়েছে–দক্ষিণ দিকের উদ্দেশ্যে আমার দক্ষিণ কক্ষ (বাহুমূল) অর্পিত করা হয়েছে পশ্চিম দিকের উদ্দেশে আমার পশ্চাৎ-ভাগ অর্পিত হয়েছে–উত্তর দিকের উদ্দেশ্যে আমার বাম কক্ষ অর্পণ করা হয়েছে–ইত্যাদি। এই রকমে আমার সম্পূর্ণ শরীর সকল দিকের উদ্দেশ্যে সমর্পিত হয়েছে এবং আমি সকল জগতের নিমিত্ত জীবিত আছি। এইরকমে সম্পূর্ণ জগতের উদ্দেশে আমার আত্মসমর্পণ পূর্ণ হয়ে গিয়েছে)। এই রকমে সকল অঙ্গে বিশ্বরূপ রূপে পরিপূর্ণ অজ-কে পরমাত্মার আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত করো। হে অজ! তুমি এই লোক হতে স্বর্গাভিমুখে উত্থিত হয়ে চারি দিকে ব্যাপ্ত হও। ৯।
বঙ্গানুবাদ –পূর্ব ইত্যাদি দিমূহ মেঘের সাথে উদয় (বা মিলিত) হোক। জল-বৃষ্টিশালী: মেঘ, বায়ুর দ্বারা প্রেরিত হোক এবং একত্রীভূত হয়ে মহা বৃষভের ন্যায় গর্জন পূর্বক ভূমিকে তৃপ্ত করুক ॥১॥
সুন্দর দানশালী মরুৎ-গণ বৃষ্টিপাত করুক। বপনকৃত যব, ধান্য ইত্যাদির বীজসমূহে বৃষ্টির জল মিলিত হোক। বর্ষার ধারারাশি পৃথিবীর অভিষেক করুক। তাতে অনেক রকমের শস্য ও ঔষধি বিবিধ রূপে উৎপন্ন হোক। ২।
হে মরুৎ-বর্গ! আমাদের স্তুতির দ্বারা প্রেরিত হয়ে তোমরা জলপূর্ণ মেঘগুলিকে প্রদর্শন করাও। জলের প্রবাহ পৃথক পৃথক ভাবে উৎক্ষিপ্ত হয়ে পৃথিবীকে অভিষিক্ত করুক। পুনরায় পৃথিবীতে অনেক রকমর বনস্পতি উৎপন্ন হোক ॥ ৩৷৷
হে বর্ষার অভিমানী পর্জন্যদেব! গর্জনশীল মরুঙ্গণ তোমাদের স্তাবক হোক। তোমরা জলের বিন্দুসমূহের দ্বারা পৃথিবীকেসিক্ত করো। ৪
হে মরুৎ-গণ! বর্ষার জলকে সমুদ্র হতে উপর দিকে প্রেরিত করো। জল-বর্ষণশালী মেঘ, বায়ুর দ্বারা প্রেরিত হোক এবং একত্রীভূত হয়ে মহা বৃষভের ন্যায় গর্জনশীল জলের প্রবাহ ভূমিকে তৃপ্ত করুক। ৫।
হে পর্জন্য দেবতা! তুমি সকল দিক হতে শব্দ ধ্বনিত করো। মেঘের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে গর্জন করো। তোমার দ্বারা প্রেরিত মেঘরাশি জলপূর্ণ বৃষ্টিকে আনয়ন করুক। সূর্য আপন কিরণসমূহকে সূক্ষ্ম (ক্ষীণ) করে অদৃশ্য হয়ে যাক ॥ ৬।
হে মনুষ্যগণ! সুন্দর দানশীল মরুৎ-গণ তোমাদের তৃপ্ত করুক। অজগরের তুল্য স্থূল জল-প্রবাহ উৎপন্ন ও হোক এবং প্রেরিত মেঘরাশি পৃথিবীর উপর বর্ষণ করুক। ৭।
প্রতিটি দিকে মেঘকে প্রেরণকারী বায়ুসমূহ সঞ্চারিত হোক। দিকে দিকে বিদ্যুৎ চমকিত হোক এবং বায়ুর প্রেরণায় মেঘের দল পৃথিবীর উপর বৃষ্টিপাতের উদ্দেশ্যে একত্ৰকৃত হোক। ৮।
হে শোভন দানশীল মরুৎ-বর্গ! মেঘে পরিব্যাপ্ত জল, বিদ্যুৎ, জলযুক্ত মেঘ, বৃষ্টির জল তথা অজগর তুল্য স্কুল তোমাদের প্রবাহ সংসারের তৃপ্তিকর হোক। তোমাদের দ্বারা প্রেরিত মেঘ পৃথিবীকে জলে পূর্ণ করে দিক ॥ ৯৷
মেঘের দেহ রূপ জলের দ্বারা প্রকট বিদ্যুৎরূপ অগ্নি উৎপদ্যমান (বা উৎপন্ন-হওনশীল) বনস্পতিসমূহের ঈশ্বরস্বরূপ। সেই জাতবেদা (উৎপন্ন হওনশীল-সকলের জ্ঞাতা) অগ্নি, আমাদের অর্থাৎ প্রাণীগণের প্রাণদায়িনী ও অমৃত প্রাপনশীল বৃষ্টি প্রদান করুক ॥ ১০৷৷
হে সূর্য! তুমি প্রজাপালক; সমুদ্র হতে বৃষ্টি রূপ জলকে প্রেরিত করো। তারা অশ্বের ন্যায় বেগশালী, ব্যাপনশীল বৃষ্টিরূপ মেঘের বীর্য-বর্ধনকে প্রাপ্ত হোক। হে পর্জন্য! এই প্রবৃদ্ধ বীর্যের সাথে তুমি আমাদের সম্মুখে আগত হও ॥ ১১
বৃষ্টির জল প্রদান পূর্বক সূর্য, তির্যক বৃষ্টির দ্বারা প্রাণীগণকে তৃপ্ত করুন। জলের প্রবাহগুলি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠুক। হে বরুণ! জলরাশিকে মেঘসমূহ হতে বিযুক্ত করে ভূমির উপর আনয়ন করো। পুনরায় তৃণহীন ভূমির উপর শ্বেত-বাহুসম্পন্ন মণ্ডুকগণ (রেঙ্গুলি) সুন্দর শব্দ করতে থাকুক ॥ ১২৷৷
ব্রত ও আচার পূর্বক অবস্থানকারী ব্রাহ্মণবর্গের মতো সারাটি বর্ষব্যাপী বায়ু ও সৌরতাপজনিত কষ্ট সহ্য করে শয়নশীল মণ্ডুকগণ বর্ষার জলের দ্বারা জাগ্রত হয়ে মেঘের উদ্দেশে প্রীতিপূর্ণ বাক্য বলে থাকে ॥ ১৩৷৷
হে খন্বখা! হে খৈমখা! হে তাদুরী! তোমরা তিন প্রকার মণ্ডুক দল মিলিতভাবে আপন নির্ঘোষে বৃষ্টি প্রদান করো। হে মকগণ! তোমরা মরুৎ-গণের বৃষ্টি করণের কামনাশালী মনে নিজেদের শব্দের দ্বারা বৃষ্টির-প্রেরণা সঞ্চারিত করো। ১৫৷৷
হে পর্জন্য! তুমি সমুদ্র হতে মেঘ উত্তোলিত পূর্বক আনয়ন করো এবং পৃথিবীর সর্ব দিকে সিঞ্চন করো। বায়ু বৃদ্ধির অনুকূল হোক, অন্তরিক্ষ বিদ্যুতে সাথে যুক্ত হোক, জল বহু প্রকারে যজ্ঞ-কর্মকে বিস্তৃত (বা বৃদ্ধি সাধন) করুক। বর্ষার জলে ধান্য যব ইত্যাদি এবং ঔষধি সমূহ পুষ্ট হয়ে উঠুক ॥ ১৬৷৷
টীকা –সমুৎপতন্তু ইত্যাদি সূক্তের দ্বারা বৃষ্টি কামনা পূর্বক মরুৎ-দেবতাগণের বা মন্ত্রবর্ণিত দেবতাগণের উদ্দেশে আজ্য হোম সাধনীয়। কাশ ইত্যাদি ওষধিসমূহকে একটি পাত্রে গ্রহণ পূর্বক্ত এই মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করণ ইত্যাদিরূপ হোম-প্রক্রিয়া উপযুক্ত সূক্তস্য বিনিয়োগ অংশে দ্রষ্টব্য ॥ (৪কা, ৩অ. ৫সূ)।
বঙ্গানুবাদ –যে বরুণদেব সদা অধিষ্ঠানশীলা বস্তুসমূহের এবং নাশবান্ পদার্থ সমূহের জ্ঞাতা। যে মহিমাবান্ বরুণদেব পাপাচারী শত্রুগণের উপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করে থাকেন এবং তাদের অন্যায় কর্মসমূহকে সমীপবর্তী হয়েই দর্শন করে থাকেন; তিনি অতীন্দ্রিয় জ্ঞানসম্পন্ন হওয়ার কারণে সকল বৃত্তান্তই আতশালী ॥ ১
যে শত্রু ছলনার দ্বারা প্রতারণাশীল, যে শত্রু অদৃশ্য বা দৃশ্যরূপে সঞ্চরণশীল এবং যে কৃচ্ছসাধনের দ্বারা জীবন বিপন্ন করে চলে, রাজা বরুণ তাদের সকলকেই জানেন, কেননা তিনি সর্বজ্ঞ। মন্দ কর্মের ইচ্ছাপরায়ণ হলেও (অর্থাৎ অন্যায় কর্ম করার পূর্বেই) বরুণ তাদের দণ্ড প্রদানে সমর্থ। ২৷
এই পৃথিবী বরুণের বশীভূতরূপে অবস্থিত, এই বৃহৎ দ্যুলোকও বরুণের অধীন; পূর্ব-পশ্চিমের দুই সমুদ্র ও বরুণদেবের দক্ষিণ-উত্তরস্থ দুই পার্শ্বের ন্যায় > বর্তমান। এই রকমে বরুণদেব জগৎসংসারের সর্বত্র ব্যাপ্ত করণশালী হয়ে সরোবর ইত্যাদির স্বল্প জলেও বর্তমান আছেন ৷ ৩৷৷
পাপ-সাধনশীল শত্রু গোপনে কুপথে গমন করলেও, সে বরুণের পাশবন্ধন হতে মুক্ত হতে পারে না। বরুণের দূতগণ (বা চরবর্গ) এই পৃথিবীর উপর বিচরণ পূর্বক সকল বৃত্তান্ত (বা সকলের আচরণ) সূক্ষ্ম রীতির (বা দর্শনের উপায়ের) দ্বারা দর্শনে সমর্থ হয়ে থাকে। ৪।
আকাশ-পৃথিবীর মধ্যস্থানে অবস্থানকারী এবং আপন সম্মুখে অবস্থানকারী প্রাণীবর্গকে বরুণ বিশেষভবে দর্শন করে থাকেন; এই নিমিত্ত সকল কর্ম-অকর্ম অনুসারে, পাপ করণশালীগণকে অক্ষক্রীড়কের অক্ষ-পাতনের (অর্থাৎ জুয়ারীর দ্বারা পাশা ফেলার) ন্যায়, উত্তোলিত করে নিক্ষেপ করেন ॥৫॥
হে বরুণ! তোমার উত্তম, মধ্যম ও অধম ভেদে তিন রকম পাপীদের বন্ধনের নিমিত্ত যে সাত-সাতটি পাশ আছে, সেই সত্যরূপী পাশ মিথ্যাভাষী শত্রুদের সন্তাপ-দানশীল হোক এবং পুণ্যাত্মাগণের পক্ষে সুখপ্রদ হোক ॥ ৬
হে বরুণ! এই মিথ্যাভাষী শত্রুদের বন্ধন পূর্বক তুমি দণ্ডদান করো। তুমি মনুষ্যগণের সত্য-অসত্য কর্মসমূহকে আপন বিবেকের দ্বারা দর্শন করে থাকো; অতএব তোমা দ্বারা কোন মিথ্যাভাষী জন যেন রক্ষা না পায় এবং তার উদর জলোদর ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত (বা নষ্ট) হয়ে ছিন্নতা প্রাপ্ত হোক ॥ ৭।
বরুণের সামান্য নামক পাশ (বন্ধন) সামান্য রূপে ব্যাধিগ্রস্ত করে দেয়; ব্যাম্য নামক পাশ অনেক রূপে ব্যাধিগ্রস্ত করে দেয়; সংদেশ্য নামক পাশ স্বদেশে ও বিদেশ্য নামক পাশ বিদেশে, দৈব নামক পাশ দেবতাগণের মধ্যে এবং মানুষ নামক পাশ মনুষ্যবর্গের উপর প্রভাবকারী হয়ে থাকে। ৮
হে অমুক (যথা) নাম, অমুক (যথা) গোত্র ও অমুক (যথা) মাতার পুত্র! পূর্ব ঋক্-মন্ত্রে বর্ণিত বরুণের সকল পাশের দ্বারা আমি তোমাকে বন্ধন করছি। তুমি হেন শত্রুকে সেই পাশের দ্বারা বশীভূত করছি। ৯।
টীকা –চতুর্থ অনুবাকের পাঁচটি সূক্ত। তার মধ্যে এইটি আদ্য বা প্রথম সূক্ত। এই সূক্তটির দ্বারা অভিচার কর্মে শত্রুর পরাভব সাধিত হয়। ধূমকেতু জনিত উৎপাতের শান্তি ইত্যাদিতে উতেয়ং ভূমি এই তৃতীয় মন্ত্রের বিনিয়োগ দেখা যায়। (৪কা. ৪অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে সহদেবী! তুমি ঔষধি রূপে গৃহীতা অপর ঔষধিসমূহের অধীশ্বরী। শত্রুদ্বারা কৃত অভিচারের দোষকে নষ্ট করার নিমিত্ত আমরা তোমাকে স্পর্শ করছি এবং সকল দোষকে দূর করার নিমিত্ত তোমাকে সামৰ্থযুক্ত করছি। ১
অভিচার (বা পাপজনিত) দোষকে বিনাশশালিনী সত্যজিতা, অভিচারকে সহ্য-করণশালিনী–সহমানা, অন্যের আক্রোশকে দূরীকরণশালিনী শপথযাবনী এবং বারংবার অনেক ব্যাধিনাশিনী–পুনঃসরা, এই ঔষধিসমূহকে অন্য ঔষদিসমূহের অভিচারজনিত দোষ দূর করার উদ্দেশ্যে প্রাপ্ত হতে হয় ॥ ২॥
ক্রোধ পূর্বক শাপ প্রদানশালিনী যে পিশাচী মূৰ্ছিত-করণে বা শরীরের রক্তকে হরণ করার নিমিত্ত অপরের পুত্রকে আলিঙ্গন করে, সেই সকল পিশাচী আমার প্রতি অভিচার-করণশীলেরই পুত্রকে ভক্ষণ করুক৷ ৩৷৷
হে কৃত্যা! যে অভিচারিকগণ ধূমের দ্বারা নীল ও জ্বালার দ্বারা লোহিত তোমাকে অগ্নিস্থানে স্থাপিত করেছে, অপক্ক (কাঁচা) মৃৎপাত্রে, অপক্ক কুকুট ইত্যাদির মাংসের দ্বারা অভিচার কর্ম করেছে, তুমি সেই কৃত্যাকারীদেরই বিনাশ করে দাও। ৪।
ব্যাধি দর্শনরূপ দুঃস্বপ্নকে, রাক্ষসগণকে, অভিচারের দ্বারা উৎপন্ন ভীষণ ভয়কে, দুষ্ট নামধারিণী ও দুষ্ট বচনশালিনী পিশাচিকাগণকে এবং অসমৃদ্ধিকারিকা অলক্ষ্মীবর্গকে আমরা এই অভিচারগ্রস্ত পুরুষ হতে বিতাড়িত করে দেবো ॥ ৫॥
ক্ষুধার দ্বারা পুরুষের মারণ, পিপাসার দ্বারা পুরুষের মারণ বা ক্ষুৎপিপাসায় নষ্ট হওয়ার কারণে পুরুষকে মৃত্যুগ্রস্ত-করণ, পুরুষকে গো-হীনতা ও সন্তান রাহিত্য করণরূপ হে অপামার্গ! তুমি উপায় স্বরূপ; তোমার দ্বারা আমরা এই সন্তাপসমূহকে দূর করছি। ৬।
পিপাসা বা ক্ষুধার দ্বারা মরণ, দ্যুতক্রিয়ায় পরাজয় ইত্যাদি সকল কারণকে, হে অপামার্গ! তোমার দ্বারা দূর করে দিচ্ছি। ৭৷
হে অভিচারগ্রস্ত পুরুষ! কৃত্যার দ্বারা ব্যাপ্ত ব্যাধিসমূহকে আমরা অপমার্গের দ্বারা দূরীভুত করে দিচ্ছি। পুনরায় তুমি রোগ-রহিত হয়ে চিরকাল ব্যাপী (অর্থাৎ পুর্ণ আয়ুষ্কাল পর্যন্ত) জীবিত থাকো। এই অপামার্গ অন্য সকল ঔষধিকে বশীভূত করে থাকে। ৮।
টীকা –স্ত্রী-শূদ্র-কাঁপালিক ইত্যাদি কৃত অভিচারজনিত দোষ নিবৃত্তির নিমিত্ত দর্ভ, অপামার্গ, সহদেবী ইত্যাদি মন্ত্রোক্ত ওষধিসমূহ শান্তু্যদক কলশে প্রক্ষিপ্ত করে তার অনুমন্ত্রণে এই সূক্তটি এবং এর পরবর্তী দুটি সূক্তের মন্ত্র মহাশান্তিগণে বিনিযুক্ত হয়।…ইত্যাদি ॥ (৪কা. ৪অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –আদিত্যের আভা, কখনও আদিত্য হতে পৃথক হয় না। রাত্রিও সমান প্রসারশালিনী হয়ে থাকে। যেমন আভা আদিত্যের এবং দিন তথা রাত্রির সমানত্ব সত্য, তেমনই আমি অভিচার-গ্রস্ত পুরুষের রক্ষার্থে সত্য (বা যথার্থ) কর্ম সাধিত করছি, যাতে হিংসাত্মক কৃত্যাসমূহ ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৷৷
হে দেবগণ! যে শত্রু সন্তাপ-দানশালিনী কৃত্যাকে অপর অজ্ঞাত পুরুষের গৃহে খনন পূর্বক স্থাপন করতে আসে, কৃত্যা প্রত্যাবৃত্ত হয়ে সেই অভিচারীকেই আলিঙ্গন ও ই করুক, যেমন দুগ্ধ পানকারী বৎস আপন মাতার সাথে আঠার মতো লেগে থাকে। ২৷৷
যে বিশ্বাসঘাতী, এক সাথে থেকে কৃত্যা খনন পূর্বক মারণ করতে চায়, সেই শত্রুর কৃত্যা প্রতিকার কর্মের দ্বারা অসমর্থ হয়ে যাক এবং মন্ত্র-বলের দ্বারা উৎপন্ন অনেক প্রস্তরের সাহায্যে সেই শত্রুকে বিনাশ করে দিক৷ ৩৷৷
হে সহদেবী! তুমি অনেক স্থানে উৎপন্ন হয়ে থাকো! তুমি আমাদের শত্রুগণকে ছিন্ন গ্রীবা ও কর্তিত কেশশালী করে বিনাশ করে দাও। তুমি শত্রুগণের হিতকারিণী কৃত্যাকে সেই কৃত্যাকারীর উপরেই প্রত্যাবৃত্ত করে দাও ৷৷ ৪।
যে কৃত্যাকে বীজ-বপনের ক্ষেত্রে খনন করে দেওয়া হয়েছে, যে কৃত্যাকে গো-গণের গোষ্ঠে প্রথিত করে দেওয়া হয়েছে, যে কৃত্যাকে বায়ু-সঞ্চরণের স্থানে রক্ষিত করা হয়েছে এবং যে কৃত্যাকে মনুষ্যের চলাচলের পথে খুনন করা হয়েছে, সেই সকল কৃত্যা এই সহদেবীর দ্বারা নিবীর্য (কর্মক্ষমতাহীন) হয়ে যাক ॥ ৫॥
যে দুষ্ট জন কৃত্যার দ্বারা এক পাদ ও এক অঙ্গুলীকেও নষ্ট করতে চায়, (অর্থাৎ কারো অঙ্গহানি করতে চায়), সে যেন আপন উদ্দেশ্য সাধনে সফল না হয় এবং তার অভিচারকর্মকে নিষ্ফলকারিণী ঔষধিসমূহ এবং মন্ত্রের শক্তিতে আমাদের নিমিত্ত মঙ্গলময় হয়ে সেই কৃত্যাকারী শত্রুকে পীড়িত করুক ॥ ৬৷৷
হে অপামার্গ! মাতা-পিতা হতে প্রাপ্ত (অর্থাৎ বংশগত) কুষ্ঠ, ক্ষয় ইত্যাদি সংক্রামক রোগকে এবং শত্রুর আক্রোশকে আমাদের হতে পৃথক্ করে দাও। পিশাচী ও অলক্ষ্মীবর্গকে বন্ধন পূর্বক আমাদের নিকট হতে দূর করে দাও। ৭।
হে অপামার্গ! তুমি যক্ষ রাক্ষস ই্যদিকে এবং সকল অলক্ষ্মীকরী ও পাপদেবতাগণকে আমাদের নিকট হতে দূর (বা পৃথক) করে দাও ৮৷৷
হে সহদেবী! ষদ-পুত্র কম্ব ঋষি তোমার বিনিয়োগ করেছিলেন। তুমি যজমানের রক্ষার্থে সেনার ন্যায় গমন করে থাকো। তুমি যেস্থানে গমন করো, সেস্থানে অভিচারের ভয় থাকে না ॥ ২
প্রকাশের (অর্থাৎ আপন জ্যোতির) দ্বারা তেজস্বী সূর্য যেমন সকল জ্যোতিষ্কের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তেমনই হে সহদেবী! তুমি সকল ঔষধির মধ্যে শ্রেষ্ঠ। হে অপামার্গ! তুমি আপন শক্তির দ্বারা কৃত্যার নিষ্ফলকর্তা রূপে নির্বলের রক্ষায় ও রাক্ষসগণের হত্যাকর্মে সমর্থ হয়ে থাকো ॥ ৩ ৷৷
হে ঔষধি! পূর্বকালে ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ তোমার দ্বারাই রাক্ষসবর্গকে অধীনস্থ করে ফেলেছিল। তুমি অন্য ঔষধির উপর-স্থানে অবস্থিত হয়ে অপমার্গের দ্বারা উৎপন্ন হচ্ছো। ৪।
হে অপামার্গ! তুমি অসংখ্য শাখাসম্পন্ন হওয়ায় বিভিন্দতী নামশালিনী হয়ে আছে। তোমার উৎপাদক হলো বিভিন্দন। এই নিমিত্ত যারা আমাদের বিনাশ করতে ইচ্ছুক, সেই শত্রুদের সমক্ষে গমন পূর্বক তাদের বিদীর্ণ করে দাও ॥ ৫
হে ঔষধি! তোমার ব্যাপ্ত তেজ যে ভূমি লাভ করে থাকে, তাতে অর্থাৎ সেই ভূমিতে খনিত কৃত্যা নিরর্থক হয়ে কার্য-সমর্থ হয় না, বরং সেই কৃত্যা নিষ্ফল হয়ে, সেই স্থান হতে নির্গমন পূর্বক কৃত্যাকারীকেই নাশ করুক ॥ ৬।
হে অপামার্গ! তুমি প্রত্যক্ষ ফলশালী। তুমি শত্রুর আক্রোশকে আমার নিকট হতে দূর করে এবং তারই উপর পাতিত করো (অর্থাৎ তারই প্রতি আরোপিত করো)। শত্রুর হিংসা-সাধন শস্ত্র বা কৃত্যাকে আমাদের হতে পৃথক্ করে দাও। ৭।
হে সহদেবী! তুমি রক্ষা-যোগ্য সকল উপায়ের দ্বারা আমাদের রক্ষা করো এবং কৃত্যাজনিত দোষকে বিযুক্ত করো। মহাতেজস্বী ইন্দ্রদেব আমাতে তেজঃ স্থাপিত করুন ॥ ৮৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে সদম্পু নাম্নী ঔষধি! এই পুরুষ তোমার মণিকে ধারণ করে আসন্ন (বা, ভাবী) ভীতিকে, বর্তমান ভীতিকে এবং দূরস্থিত ভীতিকে সন্দর্শন করতে পারে। (অর্থাৎ সেই ভীতিগুলিকে পরিহার করতে সক্ষম হয়ে থাকে)। স্বর্গ, অন্তরিক্ষ ও পৃথিবী এই তিন লোকে নিবাসকারী সকল প্রাণী হতে উৎপন্ন ভয়কে ত্রিসন্ধ্যামণির ধারণকারী সাধক সন্দর্শন করতে পারে। (অর্থাৎ ব্রহ্মগ্রহ ইত্যাদি যে ভয়-কারণ-সমূহ ত্রিলোকে ব্যাপ্ত হয়ে আছে, তা ত্রিসন্ধ্যামণির ধারণ মাহাত্মে ধারক পরিহার করতে সক্ষম হয়ে থাকে) ॥১।
হে ঔষধি! তিন স্বর্গ, তিন পৃথিবী, তিন ঊর্ধ্ব-দিক, তিন নিম্ন-দিক ও সেগুলিতে নিবাসকারী সকল প্রাণীকেও আমি তোমাকে মণিরূপে ধারণের প্রভাবে সন্দর্শন করছি। ২৷
হে সদম্পু! তুমি স্বর্গের দেবতা রূপ, সুন্দর পক্ষসম্পন্ন গরুড়ের নেত্রের কনীনিকা (চোখের মণি) স্বরূপ। যেমন পরিশ্রান্তা স্ত্রীলোক বহনযোগ্য শিবিকায় আরোহিতা হয়, তেমনভাবেই তুমি গরুড়ের নেত্র হতে স্খলিত হয়ে ভূমিতে ঔষধিরূপে সমুৎপন্ন হয়েছে ॥৩॥
দান ইত্যাদি গুণে বিভূষিত ইন্দ্রদেব সদম্পুস্পাকে আমার দক্ষিণ বাহুতে ধারণ করিয়েছেন। হে ঔষধি! তোমার দ্বারা আমি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সকলকেই বশীভূত করে রাক্ষস ইত্যাদিকেও নিরাকৃত করার নিমিত্ত যত্ন করছি ৷৷ ৪
হে ঔষধি! তুমি রাক্ষস ইত্যাদিকে, দূরীকরণশালী আপন গুণসমূহকে প্রকট করো, আপন স্বরূপকে সংগুপ্ত করে রেখো না। তুমি সহস্র দর্শন-সাধনের দ্বারা দর্শনশালী হয়ে আছো; তুমি গূঢ়ভাবে বিচরণশীল রাক্ষসদের উপর দৃষ্টি রক্ষা করে, (অর্থাৎ তাদের আক্রমণাত্মক গতিবিধির উপর লক্ষ্য রেখে), আমাদের রক্ষা করো ॥৫৷
হে সদস্পা। তুমি রাক্ষসদের আমাদের দর্শন করিয়ে দাও (অর্থাৎ আমরা যেন রাক্ষসদের দেখতে পারি), যাতে তারা গুপ্তরূপে অবস্থান পূর্বক আমাদের পীড়া দিতে না পারে; সেইসঙ্গে রাক্ষসীদেরও সন্দর্শন করিয়ে দাও। এই নিমিত্ত আমি তোমাকে ধারণ করছি ৷৬৷৷
হে ঔষধি! তুমি কশ্যপ ঋষির নেত্রস্বরূপা। তুমি দেব-কুকুরী সরমার ও নেত্রস্বরূপা। গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি সমম্বিত অন্তরিক্ষলোকে সূর্যের মতোই বিচরণশালী পিশাচদের অন্তর্হিত হতে দিও না ॥৭॥
আমি রক্ষণের উপায়ের উদ্দেশ্যে যাতুনবর্গকে (অর্থাৎ নিশাচর রাক্ষসদের) বশীভূত করে নিয়েছি, যাতে তাদের দ্বারা শূদ্রজাতি যুক্ত নীচ অথবা ব্রাহ্মণজাতিযুক্ত উচ্চ সকল গ্রহকে (অর্থাৎ পিশাচবর্গকে) লক্ষ্য করতে সমর্থ হই ॥৮॥
যে পিশাচ অন্তরিক্ষলোকে এবং দুলোকে বিচরণপূর্বক পৃথিবীকে আপন অধিকৃত (বা বশীভূত) বলে মনে করে, সেই ত্রিলোক-ব্যাপ্ত পিশাচদের আমাকে দেখিয়ে দাও; আমি তার জন্য প্রযত্ন করছি (অর্থাৎ তাদের নিরাকৃত করার জন্য চেষ্টিত আছি) ॥৯॥
বঙ্গানুবাদ –গো-বর্গ আমাদের অভিমুখে আগমন করুক, আমাদের মঙ্গল করুক। তারা আমাদের গোষ্ঠে উপবেশন পূর্বক দুগ্ধ ইত্যাদির দ্বারা আমাদের প্রসন্ন করুক। সন্তানবতী অনেক বর্ণশালিনী গাভী যজমানের গৃহে বর্ধিত হতে থাকুক এবং অনেক উষাকালে দোহন-কৃতা (দুহ্যমানা) হয়ে ইন্দ্রকে আহ্বানকারিণী হোক৷ ১৷
স্তুতি-করণশীল জনকে ইন্দ্র গাভী প্রাপ্তির উপায় বলে দিয়ে থাকেন এবং নিজেও বহু গাভী দান করে থাকেন। তিনি যজ্ঞকারী (যজমান) এবং স্তুতি-করণশীল জন, কারও ধন হরণ করেন না। সূর্যদেব সেই যজমান ও স্তোতাকে দুঃখরহিত স্বর্গে প্রতিষ্ঠিত করে থাকেন। সেই স্বর্গে অযাজ্ঞিক জন গমন করতে পারে না। ২।
ইন্দ্র প্রদত্ত গো-বর্গ যেন নাশ প্রাপ্ত না হয়, চোরও যেন তাদের অপহরণ করতে না পারে। শত্রুবর্গের শস্ত্র তাদের যেন পীড়িত করতে না পারে। যজমান যে গাভীসমূহের দুগ্ধে দেবতাগণের পূজন (বা যজ্ঞানুষ্ঠান) করেন, এবং যে গাভীসমূহ দক্ষিণাস্বরূপ প্রদত্ত হয়ে থাকে, সেই যজমান চিরকাল ব্যাপী সেইরকম গাভীর দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে থাকুন ৷ ৩৷
হিংসক ব্যাঘ্র ইত্যাদি পশু এই গো-বর্গের নিকটে না আসতে পারে! গো-কে হত্যা করে তার মাংস রন্ধনকারী ব্যক্তিগণের দিকে (এই গো-গণ) যেন গমন করতে না পারে। এই যজমানের ভয়রহিত স্থানের দিকে (এই গো-গণ) বিচরণ করতে থাকুক। ৪৷
যাতে আমার নিকট গো-বৰ্গ অবস্থান করতে পারে, ইন্দ্র তেমন করুন। এই গো-বৰ্গই পুরুষের নিমিত্ত ধনস্বরূপ। অভিযুত সোম গোদুগ্ধে সিদ্ধকৃত হয়ে থাকে। হে মনুষ্যগণ! এই গো-বর্গই ইন্দ্রস্বরূপ (অর্থাৎ গাভীগণ যেমন ইন্দ্রের আশ্রিত, ইন্দ্রও তেমনই গাভীগণের মাধ্যমে পূজিত)। এই গাভীবর্গের দুগ্ধ-ঘৃত ইত্যাদির দ্বারা যুক্ত হবির দ্বারা আমি হৃদয়গত ভাব (বা কামনা) নিয়ে ইন্দ্রের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠান করছি। ৫৷৷
হে গাভীবর্গ! তোমরা আপন দুগ্ধ ইত্যাদি রসের দ্বারা (অর্থাৎ সারবস্তুর দ্বারা) নির্বল প্রাণীগণকে পুষ্ট করো; অসুন্দর অঙ্গশালী পুরুষকে সুন্দর করে দাও। তোমরা আমাদের গৃহকে সুশোভিত করো। তোমাদের দুগ্ধ-ঘৃত ইত্যাদি সকলের দ্বারা প্রশংসিত হয়ে থাকে। ৬।
হে গো-বর্গ! তোমরা সুন্দর ঘাসসম্পন্ন ভূমিভাগে বিচরণ করতে করতে স্বচ্ছ জল পান করো। তোমরা সন্তান-সন্ততিদের সাথে যুক্ত হয়ে থাকো। হিংসক ব্যাঘ্র যেন তোমাদের প্রাপ্ত না হয় এবং চোরও যেন তোমাদের অপহরণ করতে না পারে। জ্বরের অভিমানী দেবতা রুদ্রের শস্ত্র যেন তোমাদের উপর নিপতিত না হয়। ৭
টীকা— পঞ্চম অনুবাকে পাঁচটি সূক্ত। তার মধ্যে আ গাবঃ ইত্যাদি সূক্ত দশকের মৃগার-সংজ্ঞত্বের। কারণে (মৃগারৈমুঞ্চেত্যাপ্লাবয়তি ইত্যাদি সূত্রবিহিতে) সকল ভৈষজ্য কর্মে এবং হোম, সম্পাত ও অবসেক ইত্যাদি কর্মে এর বিনিয়োগ হয়ে থাকে। এই আ গাবঃ সূক্তের দ্বারা গো-ব্যাধি উপশম, পুষ্টি ও প্রজনন কর্মে লবণযুক্ত বা কেবল জল অভিমন্ত্রিত করে গাভীকে পান করানো কর্তব্য।…ইত্যাদি। (৪কা, ৫অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –-হে ইন্দ্রদেব! এই রাজাকে পুত্র, পৌত্র, রথ, সম্পতি ইত্যাদির দ্বারা যুক্ত করো; বীর পুরুষগণের মধ্যে এই রাজাকে কারও মুখামুক্ষি করো না। এঁর সকল শত্রুকে নির্বীর্য করে দিয়ে এঁর বশীভূত করে দাও। আমি আপন মন্ত্রবলে এঁকে শ্রেষ্ঠ লোকপাল রূপে প্রতিষ্ঠিত করছি৷৷ ১।
হে ইন্দ্রদেব! এই রাজাকে জনগণের সাথে গভীর সম্পর্কে যুক্ত করো। এই রাজার শত্রুকে গাভী, অশ্ব এবং মনুষ্যের সাথে সম্পর্কশূন্য করো। এই রাজা সকল ক্ষত্রিয়ের মুকুট স্বরূপ হোন। সকল রাজ্য (রাষ্ট্র) ও শত্রুবর্গকে এঁর বশীভূত করে দাও। ২।
এই রাজা সুবর্ণ ইত্যাদি ধনসমূহের এবং প্রজাগণের অধিপতি হোন। হে ইন্দ্রদেব! শত্রুবর্গকে পরাভব-করণশালী তেজকে এই রাজার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করো ৷ ৩৷
হে দ্যাবাপৃথিবী (অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী)! আমাদের রাজাকে প্রভূত ঐশ্বর্য প্রদান করো, যেমন প্রবর্গের জন্য দুটি ধেনু দোহনকারীকে প্রচুর ধন দান করে। ধন-সমৃদ্ধির পর এই রাজা বহু যজ্ঞকর্মের অনুষ্ঠানের দ্বারা ইন্দ্রের স্নেহপাত্র হোন। ইন্দ্রের স্নেহপাত্র হওয়ায় বৃষ্টির ফলে এই রাজা ঔষধিসমূহ ও পশুগণেরও প্রিয় হয়ে উঠুন। ৪
হে রাজন! পরম শ্রেষ্ঠ ইন্দ্রকে। তোমার মিত্র করে দিচ্ছি। ইন্দ্রের প্রেরণায় তোমার মিত্রবর্গ শত্রুসেনার উপর বিজয় লাভ করুক। যে, ইন্দ্রদেব তোমাকে বীরবর্গ ও রাজন্যবৃন্দের মধ্যে মুখ্যস্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন এবং যিনি মনুবংশীয় পুরুরবা ইত্যাদি রাজগণকে অত্যন্ত বীর ও গুণযুক্ত করেছেন, আমি সেই ইন্দ্রদেবকে তোমার মিত্র করে দিচ্ছি। ৫।
হে রাজন! তোমার শত্রু তোমার দ্বারা অবদমিত হয়ে থাকুক, তুমি? সকলের শ্রেষ্ঠ হও। ইন্দ্রের মিত্র হয়ে তুমি বৃষভের ন্যায় পরাক্রমী হও এবং শত্রুগণের নিকট হতে ভোগ-সাধন ঐশ্বর্যকে অপহরণ করো (ছিনিয়ে নাও)। ৬।
হে রাজন্! তুমি আপন আজ্ঞাক্রমে আপন প্রজাদের উপর শাসন করো। তুমি ব্যাঘ্রের সমান পরাক্রমী; এই নিমিত্ত ব্যাঘ্রের মতোই আক্রমণ পূর্বক শক্রবর্গকে সন্তাপময় করে তোলে। ইন্দ্রের মিত্রতার সৌজন্যে বৃষভের ন্যায় অত্যন্ত পরাক্রমী হয়ে শত্রুবর্গের ঐশ্বর্যরাশি বিনষ্ট করো। ৭।
টীকা –এই সূক্তের দ্বারা সংগ্রামজয়ার্থে আজ্যহোম, সঞ্জুহোম ধনুঃ-ইধান, ইষু-সমিদাধান এবং ধনুঃ অভিমন্ত্রিত করে রাজাকে প্রদান কর্তব্য।…ইত্যাদি। (৪কা, ৫অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ— যে পাঞ্চযজ্ঞ অগ্নিদেবকে দেবাগ, পিতৃযাগ, ভূতগ, মনুষ্যযাগ ও ব্রহ্মযাগের দ্বারা আরাধনা করা হয়, যার মধ্যে নিষাদ সহ পঞ্চ বর্ণের মনুষ্য বর্তমান (অর্থাৎ যিনি বহুরূপে চ সন্দীপ্তমান হয়ে থাকেন), সেই পঞ্চ বর্ণে বা পঞ্চযজ্ঞে যিনি বিরাজমান এবং গন্ধর্ব-অপ্সরা-দেবতা- রাক্ষস ও অসুরের দ্বারা অনুষ্ঠিত যজ্ঞে যাঁকে আরাধনা করা হয়ে থাকে, সেই অগ্নির মাহাত্ম্যকে আমি পরিজ্ঞাত আছি। আমরা যে অগ্নিকে প্রদীপ্ত করে থাকি; যিনি সকল প্রাণীর মধ্যে জঠরাগ্নি রূপে বিরাজমান আছেন, সেই অগ্নিদেব সকল পাপ হতে আমাদের রক্ষা করুন। ১।
হে অগ্নি! তুমি জাবেদা অর্থাৎ উৎপন্ন প্রাণীমারেই জ্ঞাতা। তুমি পূজনীয় দেবতার সমীপে যেভাবে হবিঃ বহন করে নিয়ে যাও, এবং যজ্ঞের ভেদকে পরিজ্ঞাত হয়ে যেভাবে সেগুলির রচনা করে থাকো, সেইভাবেই আমাদের শোভন বুদ্ধি প্রাপ্ত করিয়ে পাপসমূহ হতে রক্ষা করো ॥ ২॥
যজ্ঞের আধার, হবির বাহক অগ্নিকে আমি স্তুতি করছি। তিনি রাক্ষসগণের নাশক এবং যজ্ঞের সমৃদ্ধি-করণশীল। সেই অগ্নিকে ঘৃতাহুতির দ্বারা প্রদীপ্ত করছি; তিনি পাপ হতে আমাকে রক্ষা করুন ৷ ৩৷৷
মন্ত্রের দ্বারা শোভন জন্মশালী উৎপন্ন মাত্রেরই জ্ঞাতা (জাতবেদা), সকল প্রাণী যাঁকে জানে, এমন মনুষ্যহিতৈষী ও হবি-বাহক অগ্নিকে আমরা আহ্বান করছি; তিনি আমাদের পাপসমূহ হতে রক্ষা করুন। ৪।
অঙ্গিরা-ঋষিগণ যে অগ্নির সাথে মিত্রতা স্থাপন পূর্বক আত্মশক্তিকে জাগ্রত করেছিলেন, যার দ্বারা দেবতাগণ আসুরী মায়াকে পৃথক করেছিলেন এবং পাণি নামক অসুরদের পরাজিত করেছিলেন, সেই অগ্নিদেব আমাদের পাপসমূহ হতে মুক্ত করুন ॥ ৫॥
ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ যে অগ্নির সহায়তাতেই অমৃত লাভ করেছিলেন এবং যার দ্বারা বৃক্ষ ইত্যাদি ঔষধিসমূহকে মধুর রসে সমৃদ্ধ করেছিলেন, যে অগ্নির দ্বারা যজমান বা স্তোতৃবর্গ স্বর্গলাভ করে থাকেন, সেই অগ্নিদেব আমাদের পাপ হতে বিযুক্ত করুন। ৬।
এই সংসার যাঁর শাসনাধীন, যাঁর তেজের দ্বারা এই গ্রহ নক্ষত্র ইত্যাদি প্রকাশিত হচ্ছে, পৃথিবীতে উৎপন্ন প্রাণীমাত্রই যে অগ্নির বশবর্তী হয়ে থাকে, আমি সেই অগ্নিদেবের উদ্দেশে স্তুতি পূর্বক বারংবার তাকে প্রভুরূপে প্রাপ্তির নিমিত্ত আহ্বান করছি। সেই অগ্নিদেব আমাদের পাপসমূহ হতে মুক্ত করুন ॥ ৭।
বঙ্গানুবাদ –আমরা ইন্দ্রের ঐশ্বর্যযুক্ত মহত্বকে জ্ঞাত আছি। বৃত্ৰনাশক ইন্দ্রের সমক্ষে উচ্চরিতব্য স্তোত্রসমুহ আমার নিকট আছে। যে ইন্দ্র উত্তম মর্মশালী যজমানের আহ্বানকে অনাদর করেন না, তিনি আমাদের পাপসমূহ হতে মুক্ত করুন ॥১॥
সেই ইন্দ্রদেব শত্রুসেনাগণের মধ্যে বিরোধ সাধন করে থাকেন, যিনি মেঘগুলিকে বিদীর্ণ করে জলকে উদ্ধার করেছিলেন এবং দানবদলের শক্তিকে বিনষ্ট করে দিয়েছিলেন, যিনি বৃত্রকে বধ করে নদীসমূহ ও সমুদ্রগুলি হতে পণি নাম, অসুরদের দ্বারা অপহৃত গো-সমূহকে উদ্ধার (বা জয়) করেছিলেন, সেই ইন্দ্রদেব আমাদের পাপসমূহ হতে বিযুক্ত করুন ॥ ২॥
যে ইন্দ্রদেব ফল প্রদানের দ্বারা মনুষ্যগণের অভিলাষ পূর্ণ করেন, যিনি স্বর্গপ্রাপ্তি করাতে সমর্থ, যাঁর ইচ্ছানুসারে সোমকে সিদ্ধকৃত (অভিযুত) করা হয়, যার উদ্দেশে অনুষ্ঠিত সোমযাগ হোতা-মৈত্রাবরুণ- ব্রাহ্মণাচ্ছংসী-পোতা-নেষ্টা-আগ্নীব্র এই সপ্তসংখ্যক হোতার (বষকর্তার) দ্বারা হর্ষকারী হয়ে ওঠে, সেই ইন্দ্রদেব আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন ॥৩৷৷
যে ইন্দ্রের নিমিত্ত গর্তের মধ্যে ঘূপসমূহ স্থাপন করা হয়, যাঁর যজ্ঞের নিমিত্ত সেচন-সমর্থ বৃষভ ও বন্ধ্যা গাভী প্রদত্ত হয়ে থাকে, যাঁর নিমিত্ত সোমরস দশা-পবিত্র (ছাঁকনি) হতে বিন্দু বিন্দু ধারায় নিঃসৃত হয়, তিনি আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন ॥৪॥
সোমযুক্ত যজমান যে ইন্দ্রের কৃপালাভের কামনা করে থাকেন, পণিগণ কর্তৃক অপহরণের পর গাভীগণকে উদ্ধারের নিমিত্ত যাঁকে আহ্বান করা হয়, যার মধ্যে অসাধারণ বল দৃষ্ট হয়, সেই ইন্দ্র আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন ॥৫॥
যে ইন্দ্র যজ্ঞ-কর্মের নিমিত্ত গমন করে থাকেন, যাঁর বৃত্রহনন ইত্যাদি কর্মসকল প্রশংসাত্মক হয়ে আছে, যাঁর বজ্র বৃত্রাসুরকে হত্যা করেছিল, সেই ইন্দ্র আমাদের পাপ হতে রক্ষা করুন ॥৬॥
যে ইন্দ্র যুদ্ধক্ষেত্রে সম্যক উপস্থিত হয়ে থাকেন, যে ইন্দ্র জোড়ায় জোড়ায় (অর্থাৎ মিথুনে মিথুনে) সংসৃষ্ট (অর্থাৎ মিলন) সংঘটিত করিয়ে দেন। স্তোতারূপী আমি সেই হেন ইন্দ্রকে বারংবার আহূত করছি, তিনি পাপ হতে আমার রক্ষা সাধিত করুন ॥ ৭।
বঙ্গানুবাদ –আমরা বায়ু দেবতা ও সূর্য বা সবিতা দেবতার কর্মসমূহকে জ্ঞাত আছি। হে বায়ু! হে সূর্য! তোমরা সমস্ত প্রাণীবর্গের মধ্যে ব্যাপ্ত থেকে সংসারকে রক্ষা করণে ও তাকে ধারণ-করণে নিয়োজিত আছে। তোমরা সকল মন্দ কর্মের মূলীভূত পাপ হতে আমাদের রক্ষা করো ॥১॥
বায়ু ও সবিতা দেবতার শ্রেষ্ঠ কর্মসকল পৃথিবীতে উত্তম রকমে প্রসিদ্ধ আছে। তাদের দ্বারা আকাশে জল ধৃত হয়ে থাকে; অন্য কোন দেবতা তাঁদের শ্রেষ্ঠ চালচলনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। সেই বায়ু ও সূর্য আমাদের পাপ হতে রক্ষা করুন। ২।
হে সূর্য! তোমার সেবা-করণের নিমিত্ত মনুষ্যগণ নিয়মবদ্ধ হয়ে থাকে। তোমার উদয় হওয়ার পরে সকলে আপন আপন কর্মে নিয়োজিত হয়ে থাকে। হে বায়ু ও সূর্য! তোমরা উভয়েই সকল প্রাণীর রক্ষক, অতএব পাপ হতে আমাদের রক্ষা করো। ৩
হে বায়ু! তুমি ও সূর্য, রাক্ষসবর্গ ও তেজোময়ী কৃত্যা হতে আমাদের দূরে রক্ষা করো। অন্ন-রস হতে উৎপন্ন পুষ্টি আমাদের প্রাপ্ত হোক। তোমরা পাপ হতে আমাদের পৃথক করে দাও। ৪
সবিতা দেব আমাদের ঐশ্বর্য প্রদান করুন, শরীরে বল প্রদান করুন, সুখের দ্বারা আমাদের পূর্ণ করুন। হে বায়ু ও সূর্য! এই যজমানকে অত্যন্ত তেজ ও আরোগ্যতার সাথে যুক্ত (বা পরিপূর্ণ) করে দাও ॥ ৫।
হে সবিতা! হে বায়ু! এই হর্ষদ (বা মদকর) সোমের দ্বারা তৃপ্ত হয়ে আমাদের রক্ষার নিমিত্ত সুবুদ্ধি প্রদান করো এবং মহান্ ঐশ্বর্য প্রদান পূর্বক পাপ হতে আমাদের রক্ষা করো ॥ ৬
বায়ু ও সূর্যের সমক্ষে আমাদের উত্তম ফলশালিনী স্তুতিসমূহ উপস্থিত হোক। সেই দান ও ইত্যাদি গুণসম্পন্ন দুই দেবতা আমার অনর্থ-জনিত মূলীভূত পাপ হতে আমাকে রক্ষা করুন। আমি তাদের উদ্দেশে স্তুতি করছি। ৭।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –বায়োঃ সবিতু ইত্যস্য সূক্তস্য অগ্নের্মন্বে ইত্যনেন সূক্তেন সহ উক্তো বিনিয়োগঃ। ….ইত্যাদি। (৪কা, ৫অ. ৫)। টীকা –এই সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ববর্তী অগ্নের্মন্বে ইত্যাদি সূক্তের সাথে উক্ত হয়।…ইত্যাদি। (৪কা. ৫অ. ৫সূ)
মন্তে বাং দ্যাবাপৃথিবী সুভোজসৌ সচেতসৌ যে অপ্রথেমমিতা যোজনানি। প্রতিষ্ঠে হ্যভবতং বসূনাং তে নো মুঞ্চতমংহসঃ ॥ ১৷৷ প্রতিষ্ঠে হ্যভবতং বসূনাং প্রবৃদ্ধে দেবী সুভগে উরুচী। দ্যাবাপৃথিবী ভবতং মে স্যোনে তে নো মুঞ্চতমংহসঃ ॥ ২. অসন্তাপে সুতপসৌ হুবেংহমুর্বী গম্ভীরে কবিভিনর্মস্যে। দ্যাবাপৃথিবী ভবতং মে স্যোনে তে নো মুঞ্চতমংহসঃ ॥ ৩ যে অমৃতং বিভৃথো যে হবীংষি যে স্রোত্যা বিভৃথো যে মনুষ্যান্। দ্যাবাপৃথিবী ভবতং মে স্যোনে তে নো মুঞ্চতমংহসঃ ॥ ৪৷৷ যে উস্রিয়া বিভৃথো যে বনস্পতী যয়োর্বাং বিশ্ব ভুবনানন্তঃ। দ্যাপৃথিবী ভবতং মে সস্যানে তে নো মুঞ্চতমংহসঃ ॥ ৫॥ যে কীলালেন তৰ্পয়থো যে ঘৃতেন যাভ্যামৃতে ন কিং চন শকুবন্তি। দ্যাবাপৃথিবী ভবতং মে স্যোনে তে নো মুঞ্চতমংহসঃ ॥ ৬৷৷ যন্মেদমভিশোচতি যেনযেন বা কৃতং পৌরুষেয়ান্ন দৈবাৎ। স্তোমি দ্যাবাপৃথিবী নাথিতো জোহবীমি তে নো মুঞ্চতমংহসঃ। ৭
বঙ্গানুবাদ –হে সুন্দর ভোগ-সম্পন্ন, সমান চিত্তশালী আকাশ-পৃথিবী (অর্থাৎ দ্যাবাপৃথিবী)! আমি তোমাদের মহিমাকে পরিজ্ঞাত হয়ে স্তুতি করছি। তোমরা দুজনে অপরিমিত মার্গশালী, এমন বিস্তৃত হয়ে আছো। তোমরা দেব ও মনুষ্য উভয়ের ঐশ্বর্যের নিমিত্ত-রূপী। তোমরা সকল পাপ হতে আমাদের রক্ষা করো ॥১॥
হে দ্যাবাপৃথিবী। তোমরা ধনসমূহকে প্রতিষ্ঠিত করণশালী, সকল টি প্রাণীর অধিষ্ঠান রূপ, দান ইত্যাদি গুণসমূহের দারা সম্পন্ন এবং সকল প্রকার মঙ্গলের সাথে যুক্ত। তোমরা আমার সুখের নিমিত্ত স্বরূপ হও এবং সকল পাপ হতে আমাদের মুক্ত করো ॥ ২॥
সকল প্রাণীর দুঃখ দূরীকরণশালী, গম্ভীর, বিস্তৃত, ঋষিবৃন্দের নমস্কার যোগ্য–এমনই দ্যাবাপৃথিবীকে আহ্বান করছি; তারা আমাকে সুখ প্রদানশালী হোন এবং সকল পাপ হতে আমাদের রক্ষা করুন ৩
হে দ্যাবাপৃথিবী! তোমরা সকল প্রাণীর মধ্যে অমৃতত্বকে স্থাপনা করে থাকো। চরু পুরোশ ইত্যাদি হবিসমূহকে ধারণ করে থাকো। তোমরা নদীসমূহকে ধারণশালী হয়ে থাকো। তোমরা; আমার সুখের নিমিত্তভাগী হও এবং আমাদের পাপ হতে রক্ষা করো ৷৷ ৪।
হে দ্যাবাপৃথিবী! তোমরা গো-গণকে পুষ্ট করে থাকো, বনস্পতিসমূহকে পোষণ করে থাকো। তোমাদের মধ্যে যে প্রাণী নিবাস করে, তারা তোমাদের দুজনের সাথে আমাদের নিমিত্ত সুখের হেতু ভূত হোক এবং আমাকে পাপ হতে মুক্ত করুক ॥ ৫৷৷
হে আকাশ-পৃথিবী! তোমরা জগৎসংসারকে অন্নের দ্বারা। পোষণ করছে এবং প্রাণীগণকে জলের দ্বারা তৃপ্ত করছো। তোমাদের ব্যাতিরেকে মনুষ্য কোনো কর্ম করতে সক্ষম হয় না। তোমরা দুজনে সুখের কারণস্বরূপ হও এবং আমাকে পাপ হতে মুক্ত করো। ৬।
যে মনুষ্যকৃত বা দৈবকৃত পাপের ফল আমাকে দগ্ধ করে চলেছে, এবং যে যে কারণে আমি অন্য পাপ করেছি, সেই সমুদায় পাপকে তাদের ফলের সাথে পৃথক করার নিমিত্ত আমি দ্যাবাপৃথিবীর অভিমানী দেবতাদ্বয়ের উদ্দেশে স্তুতি পূর্বক আহুতি প্রদান করছি। তারা আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত করে দিন ৭
টীকা— ষষ্ঠ অনুবাকের পাঁচটি সূক্তের মধ্যে এই প্রথম সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ববর্তী সূক্তের মতো। তথা সোম্যগে উদুম্বরীর দ্বারা আজ্যহোমে এই সূক্তের দ্বারা অনুমন্ত্রণ করণীয়।..ইত্যাদি। (৪কা, ৬অ. ১সূ)।
অধ্যায়: চার
সূক্ত -২৭ : পাপমোচনম
[ঋষি : মৃগার। দেবতা : মরুত। ছন্দ : ত্রিষ্টুপ।]
মরুতাং মন্তে অধি মে ব্রুবন্তু প্রেমং বাজং বাজসাতে অবন্তু। আশূনিব সুয়মানহু উতয়ে তে নো মুঞ্চংহসঃ ॥১॥ উৎসমক্ষিতং ব্যচন্তি যে সদা য আসিঞ্চন্তি রসমোষধীষু। পুরো দধে মরুতঃ পৃশ্নিমাতৃংস্তে নো মুঞ্চংহসঃ ॥ ২॥ পয়ো ধেনুনাং রসমোষধীনাং জবমর্তাং কবয়ো য ইন্বথ। শর্গা ভভন্তু মরুততা নঃ স্যোনাস্তে নো মুঞ্চংহসঃ ॥ ৩॥ অপঃ সমুদ্ৰাদ দিবমুদ বহন্তি দিবম্পৃথিবীমভি যে সৃজন্তি। যে অদ্ভিরীশানা মরুভশ্চরন্তি তে নো মুঞ্চংহসঃ ॥ ৪৷ যে কীলালেন তপয়ন্তি যে ঘৃতেন যে বা বয়ো মেদসা সংসৃজন্তি। যে অদ্ভিরীশানা মরুততা বৰ্ষয়ন্তি তে নো মুঞ্চংহসঃ ॥৫৷৷ যদীদিদং মরুতো মারুতেন যদি দেবা দৈব্যেনেগার। যুয়মীশিধ্বে বসবস্তস্য নিস্কৃতেন্তে নো মুঞ্চংহসঃ ॥ ৬৷ তিস্মমনীকং বিদিতং সহস্বন্মারুতং শর্ধঃ পৃতনাসূগ্রম। স্তৌমি মরুতো নাথিতো জোহবীমি তে নো মুঞ্চংহসঃ ॥ ৭৷
বঙ্গানুবাদ –আমি মরুৎগণের মহিমাকে জ্ঞাত আছি। তারা আমাকে আপন বলে স্বীকার করে নিন এবং আমাদের নিমিত্ত অন্নকে রক্ষা করুন। তাঁরা রণক্ষেত্রে আমাদের কুশলে রাখুন। আমি রক্ষার নিমিত্ত তাদের আহ্বান জ্ঞাপন করছি; তাঁরা আমাকে পাপ হতে রক্ষা করুন ৷ ১।
যে মরুৎ-বর্গ মেঘকে অন্তরিক্ষে বিস্তৃত করে থাকেন এবং অন্ন, বৃক্ষ, ঔষধিতে বৃষ্টির জল (বা রস) সিঞ্চন করে থাকেন, আমরা সেই মরুৎসমূহকে আরাধিত করছি। তারা আমাকে পাপ হতে রক্ষা করুন। ২।
হে মরুৎ-বর্গ! তোমরা গাভীর দুগ্ধকে সর্ব শরীরে ব্যাপ্ত করে থাকো, ঔষধির রসকেও দেহের মধ্যে গতিশীল করে থাকো। এই রকমে তোমরা আমাকে সুখ প্রদান করো এবং পাপ হতে মুক্ত করো। ৩
যে মরুৎসঙ্ অন্তরিক্ষে মেঘসমূহকে প্রেরণ করতে এবং সমুদ্রে জলরাশিকে সমুপস্থিত করতে থাকেন, সেই জলের অধিপতি (বা নিয়ামক) মরুৎ-বর্গ আমাদের পাপসমূহ হতে মুক্ত করুন। ৪
যে মরুৎ-বর্গ পক্ষিগণকে মেদের দ্বারা রচিত করে থাকেন (অথরা বয়স্থ জনের মধ্যে মেদ-বর্ধন সংঘটিত করে থাকেন), এবং মনুষ্যগণকে অন্নের দ্বারা তৃপ্ত করে থাকেন; যে মরুৎ-গণ মেঘ-স্থিত জলের অধিস্বামী হওয়ায় সর্বত্র বর্ষণ করে থাকেন; তাঁরা আমাদের সকল পাপ হতে রক্ষা করুন ৷৷ ৫৷
এই অনুভব-প্রাপ্ত পাপ মরুৎ-সম্পর্কিত অপরাধ হতে সংঘটিত হয়ে থাকে, সেই দুঃখ দূরীকরণের নিমিত্ত মরুৎ-বৰ্গই সামর্থ্যবান্। হে মরুৎ-সমুদায়! তোমরা আমাদের পাপসমূহ হতে মুক্ত করো ৷ ৬ ৷
সপ্ত গণের রূপধারী সেনার সমান, অত্যন্ত বিকরাল, প্রসিদ্ধ মরুতাত্মক বল রণক্ষেত্রে দুঃসহ হয়ে থাকে। আমি এই হেন মরুৎ-গণের উদ্দেশে স্তুতিবাক্য উচ্চারণ পূর্বক তাদের আহ্বান করছি। তাঁরা আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত করুন। ৭ ৷৷
বঙ্গানুবাদ— জগৎসংসারের উৎপত্তি-করণশালী হে ভবদেব! জগৎসংসারের সংহার করণশালী হে শর্বদেবতা! আমি তোমাদের উভয়ের মহিমা জ্ঞাত আছি। তোমরা দ্বিপদাবিশিষ্ট মনুষ্য এবং চতুষ্পদশালী পশু ইত্যাদির সৃষ্টির ঈশ্বর। সম্পূর্ণ বিশ্বজগৎ তোমাদের আজ্ঞাধীনে চালিত। হে শিবের রূপদ্বয়! তোমরা আমাদের সকল অনর্থের মূলীভূত পাপ হতে মুক্ত করো ॥১॥
যে ভব ও শর্ব নামধারী দেবতাদ্বয়ের নিকটে বা দূরবর্তী দেশে যা কিছু বর্তমান, তার সবই যাঁদের অধিকারভূক্ত; যাঁরা ধনুতে বাণ সংযোজন ও নিক্ষেপণের নিমিত্ত প্রসিদ্ধ; সেই দ্বিপদ ও চতুষ্পদ প্রাণীসমূহের অধিস্বামীদ্বয় আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন। ২
সহস্রাক্ষ, বৃত্ৰ সংহারক, গোচারণ ভূমি হতে দূরে অবস্থানকারী, ভব ও শর্বদেবরূপী শিবকে আমি আহ্বান করছি ৷৩৷৷
হে ভব ও শর্ব! তোমরা দুজনেসৃষ্টির প্রারম্ভে অনেক প্রাণীকে উৎপন্ন করেছিলে; সেই মনুষ্যগণের মধ্যে শত্রুভাব ও তাদের পাপের অনুসারে অভিদীপ্তিকে তোমরাই সৃষ্টি করেছিলে। তোমরা দ্বিপদ ও চতুষ্পদ প্রাণীসমূহের অধিস্বামী। তোমরা আমাদের পাপ হতে মুক্ত করো। ৪
যে ভব ও শর্বের হিংসাময় শস্ত্র (অর্থাৎ আয়ুধ) হতে কেউই রক্ষা পায় না, যিনি দ্বিপদ ও চতুষ্পদ প্রাণীসমূহের অধিস্বামী, তিনি আমাদের সকল অনর্থের মূলীভূত পাপ হতে মুক্ত করুন ॥ ৫৷
সে শক্র কৃত্যা কর্মানুষ্ঠানের দ্বারা অনিষ্ট সাধন করে থাকে এবং যে আমাদের বংশবৃদ্ধিশীল সন্তানগণকে বিনাশ করে থাকে, সেই উভয় প্রকার শত্রুর উপর ভব ও শর্বদেব বজ্র প্রহার করুন। সেই দ্বিপদ ও চতুষ্পদ প্রাণীসমূহের অধিস্বামী দেবদ্বয় আমাদের সকল পাপ হতে রক্ষা করুন। ৬
হে ভব ও শর্ব! তোমরা আমাদের শত্রুগণকে শস্ত্রের সাথে আলিঙ্গন করাও (অর্থাৎ তাদের উপর অস্ত্রাঘাত করো); হিংসক রাক্ষসদের প্রতিও এমনই করো। আমাদের পক্ষে কথা বলো (অর্থাৎ আমরা যে তোমাদেরই কৃপানুকুল্যে আছি, তা ঘোষণা করো)। আমরা তোমাদের স্তুতি পূর্বক আহ্বান জ্ঞাপন করছি। তোমরা আমাকে পাপ হতে মুক্ত করো। ৭।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –ভবাশবৌ মন্তে বাং ইতি সূক্তস্য গণবিনিয়োগঃ উক্ত। তথা ॥ সর্বব্যাধিভৈষজ্যকর্মণি চ উদকপূর্ণান্ সপ্ত কাস্পীলপুটা প্রত্যুচং সম্পত্য অভিমন্ত্র্য ব্যাধিতং অবসিঞ্চেৎ। ত উক্তং কৌশিকেন। … ইত্যাদি ৷ (৪কা, ৬অ. ৩সূ)।
টীকা –এই সূক্তের গণবিনিয়োগ উক্ত হয়েছে। তথা সকল ব্যাধির ভৈষজ্যকর্মে জলপূর্ণ সপ্তসংখ্যক কাম্পীলপুট প্রতিটি ঋষ্মন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত করে ব্যাধিগ্রস্তের অবসিঞ্চন কর্তব্য।…ইত্যাদি। (৪কা, ৬অ. ৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে মিত্র ও বরুণ! তোমরা সত্য, জল ও যজ্ঞের বৃদ্ধি-সাধনকারী। আমি তোমাদের মহিমা-গান করছি। তোমরা শত্রুগণকে স্থানচ্যুত করে থাকো এবং সত্যনিষ্ঠ জনদের রক্ষা করে থাকো। তোমরা আমাদের অনিষ্টের মূলীভূত পাপ হতে মুক্ত করো ॥১॥
হে মিত্রাবরুণ! তোমরা সমান জ্ঞানী ও সমান প্রয়োজনশালী। তোমরা বৈরিগণকে স্থানচ্যুত করে থাকো এবং সত্য-প্রতিজ্ঞ জনদের রক্ষা করে থাকো। তোমরা রাত্রি ও দিনের অভিমানী দেবতা, অতএব প্রাণীবর্গের সকল কর্ম জ্ঞাত আছো। তোমরা অভিযুত সোমকে প্রাপ্তকরণশালী হয়ে থাকো। তোমরা আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত করো। ২।
হে মিত্রাবরুণ! তোমরা অঙ্গিরা ঋষিকে রক্ষা করেছিলে। অগস্ত্য, জমদগ্নি, অত্রি, কশ্যপ ও বশিষ্ঠ নামক ঋষিদেরও রক্ষক হয়েছিলে। অতএব তোমরা সকল পাপ হতে আমাদেরও রক্ষা করো ॥ ৩॥
হে মিত্রাবরুণ! তোমরা শ্যাবাশ্ব, বশ্ব, পুরুমীঢ়, বিমদ, অত্রি ও সপ্ত ঋষির রক্ষক। তোমরা আমাদের সকল পাপ হতে রক্ষা করো। ৪
হে মিত্রাবরুণ! তোমরা ভরদ্বাজ, গবিষ্ঠির, বিশ্বামিত্র, কুৎস, কক্ষীবান ও কথ নামক ঋষিবৃন্দকে রক্ষা করেছিলে। তোমরা আমাদের সকল পাপ হতে রক্ষা করো ॥ ৫
হে মিত্র ও বরুণ! তোমরা মেধাতিথি, ত্রিলোক, উশনা, গৌতম ও মুল নামক ঋষিবৃন্দকে রক্ষা করেছিলে। অতএব তোমরা আমাকে আমার পাপ হতে রক্ষা করো ॥ ৬৷৷
মিথ্যাপথে ভ্রমণশীল পুরুষগণের বাধাস্বরূপ, মিত্রাবরুণের যে সত্যমার্গাবলম্বী রথ সম্মুখভাবে আগমন করছে, আমি সেই দেবদ্বয়কে স্তোত্রের দ্বারা আহ্বান করছি। তারা আমাকে সকল পাপ হতে রক্ষা করুন ॥৭॥
বঙ্গানুবাদ –আমি (ব্রহ্মবাদিনী বাকদেবী) একাদশ রুদ্র ও অষ্ট বসুর রূপ ধারণ করে বিচরণ চ করছি, আমি ধাতা ইত্যাদি দ্বাদশ আদিত্য ও বিশ্বদেবগণের রূপ ধারণ করে বিচরণ করছি। আমি? ব্রহ্মবাদিনী পরমাত্মিকা। আমি মিত্রাবরুণকে ভরণ করি, ইন্দ্রাগ্নি ও অশ্বিদ্বয়কে ধারণ করে থাকি ৷৷ ১।
আমি ব্রহ্মত্মিকা স্বরূপশালিনীরূপে সমগ্র বিশ্বের অধীশ্বরী; এই নিমিত্ত আমি আরাধককে ঐশ্বর্যপ্রাপ্ত করিয়ে থাকি। আমি পরব্রহ্মের সাথে সাক্ষাৎ করেছি, এই নিমিত্ত যজ্ঞযোগ্য দেবতাগণের মধ্যে আমি মুখ্যা। এই হেন আমাকে, ফলদাতা দেবতাগণ বহু স্থানে আমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই ভাবেই, দেবগণ যা কিছু করে থাকেন, সেই সবই আমার নিমিত্তই হয়ে থাকে। ২।
আমি স্বয়ং আত্মরূপা। আমি ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতা ও মনুষ্যগণকেও প্রিয় ব্রহ্মাত্মক বস্তুর উপদেশ প্রদান করছি। আমি যাকে যাকে রক্ষা করতে ইচ্ছা করি, তাকে তাকে প্রবল (অর্থাৎ দুঙ্খধর্ষ) করে তুলি। আমি তাদের ঈশ্বর, স্রষ্টা ও ঋষিরূপে রচিত করে শোভন বুদ্ধির দ্বারা সমৃদ্ধ করে থাকি ৷ ৩৷
অন্ন-ভক্ষণকারী ভোক্তা আমার দ্বারাই ভক্ষণ করে থাকে; যারা যা কিছু দর্শন করে, তা আমার দ্বারাই করে থাকে; যারা যা কিছু শ্রবণ করে, তা আমার দ্বারাই শ্রবণ করে থাকে; যারা শ্বাস গ্রহণ ইত্যাদি করে, তা আমার দ্বারাই সম্পাদিত করে থাকে; (অর্থাৎ এই সকল কর্ম আমার দ্বারা কৃত হয়ে থাকে)। আমি এই প্রকার অন্তর্যামী রূপের দ্বারা ব্যাপ্ত আছি। যে আমাকে জানে না, সে উপক্ষীণ হয়ে যায়। হে মিত্র! এই ভক্তি করণের যোগ্য (অর্থাৎ পরতত্ত্বের স্বরূপ সম্পর্কিত) যা কিছু আমি বলছি, তা মন দিয়ে শ্রবণ করো। ৪
ত্রিপুরাসুরকে জয় করার নিমিত্ত আমিই ধনুঃ উত্তোলন করেছি (অর্থাৎ আমিই ত্রিপুরারি রপে আবির্ভূত হয়েছি) এবং (রক্ষাপ্রার্থী) স্তোতৃগণের নিমিত্ত যুদ্ধ করেছি। আমি দ্যুলোকে ও ভূলোকে অদৃশ্য রূপে ব্যাপ্ত হয়ে আছি ৷৷ ৫৷
শত্রুগণের যেস্থানে বিনাশ ঘটে থাকে, এমন সেই স্বর্গলোকে নিবাসকারী দেবতাগণের সাথে সম্বন্ধিত সোমকে আমি পোষণ করি; ত্বষ্টা, পূষা ও ভগ দেবতাকেও আমিই পোষণ করি এবং আমিই হবিদাতা যজমানকেও যজ্ঞের ফলস্বরূপ ঐশ্বর্য প্রদান করি। ৬।
এই পরিদৃশ্যমান লোকের শিরঃ-স্বরূপ সত্যলোকে নিবাস-করণশীল বিধাতাকে আমিই উৎপন্ন করেছি। এই সংসারের আমিই কারণরূপিণী; ব্রহ্মচৈতন্যের নিমিত্তস্বরূপও আমি। সমুদ্রের মধ্যস্থায়ী বড়বানল ও বিদ্যুৎ-রূপ তেজও আমারই। আমি সকল প্রাণীকে প্রকট করে থাকি; স্বর্গে ও ব্রহ্মলোকে অধ্যস্ত বিকারসমূহকে মায়াত্মক দেহের দ্বারা আমি স্পর্শ করে থাকি; আমি পৃথিবীর উপর পিতারূপ দ্যুলোককে প্রেরিত করে থাকি এবং অন্তরিক্ষস্থ জলের বিকাররূপ দেবগণের মধ্যে যে ব্রহ্ম ব্যাপ্ত হয়ে আছেন তার দ্বারা আমি সকলকে স্পর্শ করে থাকি। ৭৷
আমি অপর কারও সহায়তা ব্যতিরেকেই সকল প্রাণীকে উৎপন্ন করে বায়ুর ন্যায়, স্বেচ্ছায় প্রবৃত্ত হয়ে থাকি। দ্যুলোক, ভূলোক ও সম্পূর্ণ বিকার-রহিত ব্রহ্মচৈতন্য-রূপশালিণী আমি নিজেরই মাহাত্মে এমনই শক্তিশালিনী হয়ে গিয়েছি৷ ৮
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –অহং রুদ্রেভিঃ ইতি সূক্তেন জাতকর্মণি শঙ্খপুষ্পিকাগন্ধ-পুষ্পিকে পিন্থা অভিমন্ত্র হিরণ্যশকলেন প্রাশয়েৎ। তথা তত্রৈব কর্মণি অনেন সূক্তেন শঙ্খনাভিং পিপলীং চ পিষ্টা অভিমন্যু হিরণশকলেন প্রাশয়েৎ। তথা মেধাজানোর্থং প্রথমং বাথ্যবহারং কুর্তঃ শিশোমাতুরুৎসঙ্গে বিহিতস্য অনেন সূক্তেন আজ্যং হুত্বা তালুনি সম্পাতা আনয়েৎ। তথা দধিমধুনী একত্র কৃত্বা অনেন সম্পাত্য অভিমন্ত্র শিশুং প্রাশয়েৎ। তথা উপনয়নকর্মাণি দণ্ডপ্রদানানন্তরং এতং সূক্তং মাণবকং বাচয়েৎ। তথা আয়ুষ্কামোপি শঙ্খপুষ্পগন্ধপুষ্প-প্রাশনাদীনুক্তানি পঞ্চকর্মাণি কুর্যাৎ। তথা চ কৌশিকং সূত্র। …ইত্যাদি ৷ (৪কা, ৬অ. ৫সূ)।
টীকা –এই সূক্তের দ্বারা জাতকর্মে শঙ্খপুষ্পিকা ও গন্ধপুস্পিকাকে পিষ্ট করে অভিমন্ত্রিত পূর্বক হিরণ্যখণ্ডের দ্বারা অর্থাৎ স্বর্ণ বা রৌপ্যের চমসে খাওয়ানো কর্তব্য। তথা এই কর্মে শঙ্খনাভি ও পিপলী পিষ্ঠ করে এই সূক্তের দ্বারা অভিমন্ত্রিত পূর্বক হিরণ্যখণ্ডের দ্বারা খাওয়ানো কর্তব্য। তথা মেধাজননের নিমিত্ত শিশুর প্রথম বাক্-ব্যবহার কালে (অর্থাৎ কথা বলার কালে) মাতৃক্রোড়স্থায়ী শিশুর বিহিতে এই সূক্তের দ্বারা আজ্যাতি প্রদান পূর্বক তালুগুলি সম্পাতিত করতে হয়। তথা দধি ও মধু একত্র করে এই সূক্তের দ্বারা অভিমন্ত্রিত পূর্বক শিশুকে খাওয়ানো কর্তব্য। তথা উপনয়ন কর্মে দণ্ডপ্রদানের পর এই সূক্তটি মাণবককে বলাতে হয়। তথা আয়ুষ্কামী জনেরও শঙ্খপুষ্পগন্ধপুষ্প প্রাশন ইত্যাদি ঐ পঞ্চকর্ম করণীয়।.. ইত্যাদি।(৪কা. ৬অ.৫সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে মনুদেব! তুমি ক্রোধ বা উৎসাহের অভিমানী দেবতা এবং মরুৎ-গণের ন্যায় বেগবা। তোমার সাধনের দ্বারা রথযুক্ত শত্রুকে পীড়িত করণ পূর্বক আমাদের শূর সৈন্যগণ অগ্নির সমান দুর্ধর্ষ হয়ে আপন অস্ত্রশস্ত্রসমূহকে তেজঃ সম্পন্ন করে শত্রুর সম্মুখে উপস্থিত হোক। ১।
হে মনু! তুমি অগ্নির ন্যায় তেজস্বী হয়ে শত্রুকে বশীভূত করো। তুমি আমাদের সেনাগণের সেনাপতি হয়ে যুদ্ধে আমন্ত্রিত হও। তুমি শত্রুগণের বিনাশ সাধন পূর্বক তাদের ধন আমাদের মধ্যে বন্টন করে দাও ২
হে মনুদেব! তোমার বলকে কেউই নিরস্ত করতে পারে না। তুমি সকল মনুষ্যকে বশীভূত করে থাকো। অতএব এই রাজার শত্রুগণের হস্তী, অশ্ব ইত্যাদিকে ভঙ্গ করে, সৈনিকদলকে তিরস্কার করে, তাদের বিনাশ করে ফেলো ৷৷ ৩৷
হে মনু! আমাদের দ্বারা স্তুত হয়ে তুমি শত্রুগণকে বশীভূত করণে অত্যন্ত সমর্থ হয়ে থাকো। তুমি আমাদের প্রজাজনের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে তাদের যুদ্ধকুশল করে তোলো। আমরা তোমার সহায়তাতেই এই বিজয়-নিনাদে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠছি। ৪
হে মন্যুদেব! আমরা তোমার উৎপত্তি স্থানকে জানি এবং সেই স্থানেই তোমার প্রিয় নামে তোমায় স্তুতি করছি। তুমি ইন্দ্রের ন্যায় প্রাচীন প্রযত্ন (জয়কৌশল) করে থাকো; এই যুদ্ধে আমাদের রক্ষক হও। ৫।
হে মদ্যুদেব! তুমি প্রচণ্ড বলশালী। তুমি শত্রুবর্গকে বিনাশ-করণে সমর্থ। তুমি বহু যজমান কর্তৃক আহূত হয়ে থাকো। তুমি মহান্ ঐশ্বর্য প্রাপ্তকরণশালী কর্মের রূপস্বরূপে আমাদের প্রাপ্ত হও ৷৷ ৬ ৷
মনুদেব ও বরুণদেব দুজনেই আপনাপন ধন আনয়ন পূর্বক একত্রিত করে আমাদের প্রদান করুন। আমাদের শত্রুবর্গ ভয়ভীত হয়ে পরাজয় স্বীকার করুক এবং পলায়ন পূর্বক লুক্কায়িত হয়ে থাকুক। ৭।
টীকা –সপ্তম অনুবাকের পাঁচটি সূক্তের মধ্যে এই প্রথম সূক্তটি ও এর পরবর্তী দ্বিতীয় সূক্তটি– আপন ও বিপক্ষীয় সেনার মধ্যে স্থিত হয়ে তাদের নিরীক্ষণ করতে করতে জপ করতে হয়। এই সূক্ত দুটির দ্বারা ভাঙ্গপাশা মুঞ্জপাশা বা আমপাত্র অভিমন্ত্রিত করে বিপক্ষীয় সেনাগণের সঞ্চারস্থলে প্রক্ষেপ করণীয়। তথা জয়-পরাজয় সম্পর্কিত বিজ্ঞান কর্মে উভয় সেনার মধ্যে এই সূক্তমন্ত্রে শরতৃণ অভিমন্ত্রিত করে আঙ্গিরস-অগ্নিতে দগ্ধ করণীয়। ঐ ধূম যে পক্ষের সেনাদের ব্যাপ্ত করে, সেই পক্ষের পরাজয় জ্ঞাত হওয়া যায়।…ইত্যাদি ৷ (৪কা, ৭অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ— হে মনুদেব! তোমাকে সেবা-করণশালী পুরুষ, শত্রবর্গকে তিরস্কৃত করার উপযুক্ত বলকে পুষ্ট করে থাকে। তোমারই সহায়তাতে সে পরাভবকারী শত্রুকে বশীভূত করে থাকে। ১।
মনুই ইন্দ্র, সকল দেবতাও মনুই। দেবতাগণের আহ্বায়ক অগ্নিও মনই। বরুণও মনুই। সকল মনুষ্য মন্যুকেই স্তুতি করে থাকে, কারণ সকল দেবতা মরূপেই বর্তমান (অথবা মই সকল দেবতার মধ্যে বিরাজমান)। হে মদ্যুদেব! তুমি আমাদের দুঃখ দূরীকরণ পূর্বক রক্ষা করো ॥ ২॥
হে মনু তুমি অমিত্রের ঘাতক তথা শত্রুর হননশালী হও। তুমি আমাদের সম্মুখে আগমন পূর্বক শত্রুগণকে নাশ করো এবং তাদের সকল ধন আমাদের প্রাপ্ত করাও। ৩।
হে মনুদেব! তুমি স্বয়ং আপন আত্মার মধ্যে উদিত হয়ে থাকো (অর্থাৎ তুমি স্বয়ংজাত ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরাত্মক)। তুমি সকলের দ্রষ্টা ও শত্রুবর্গকে বশীভূতকারী। সকল মনুষ্য তোমার বশানুবর্তী হয়ে থাকে। তুমি যুদ্ধকালে আমাদের দেহে বল স্থাপন করো। ৪
হে মনুদেব! উত্তম জ্ঞানী। তোমাকে স্তুতি করা না হলে যুদ্ধ হতে পৃথক হয়ে থাকো (অর্থাৎ যুদ্ধে প্রবৃত্ত আমাদের সহায়ক হও না)। আমরা তোমার সন্তুষ্টকরণশালী কর্ম সাধিত না করে তোমাকে রুষ্ট করে দিয়েছি। তুমি আমাদের বল প্রদানের নিমিত্ত আগমন করো। ৫
হে মদ্যুদেব! আমি তোমার স্তুতি করতে প্রবৃত্ত হয়েছি; তুমি আমাদের সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে শত্রুর দিকে প্রস্থান করো (বা প্রধাবিত হও)। আমরা এবং তুমি উভয়ই শত্রুকে বিনাশ করবো ৷৷ ৬ ৷৷
হে মদ্যুদেব! তুমি আমাদের সম্মুখে আগত হও। আমাদের পরামর্শদাতৃত্বের নিমিত্ত আমাদের দক্ষিণ ভাগে প্রতিষ্ঠিত হও। পুনরায় আমরা শত্রুগণকে উত্তমভাবে প্রহার করবো। আমরা তোমার উদ্দেশে সোমরসের দ্বারা আহুতি প্রদান করছি; তুমি ও আমরা, উভয়েই গোপনীয় ভাবে সোমপান করবো। ৭।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! তোমার কৃপাতে আমাদের পাপ দূরীভূত হোক। তুমি আমাদের সকল দিক হতে ধনের দ্বারা সমৃদ্ধ করো। তোমার কৃপা দৃষ্টিতে আমাদের সকল পাপ দূরীভূত হোক। ১
হে অগ্নি! আমরা সুন্দর স্থান প্রাপ্তির নিমিত্ত, সুন্দর পথ প্রাপ্তির নিমিত্ত এবং প্রভূত ধন প্রাপ্তির কামনা করে তোমাকে হবির দ্বারা তৃপ্ত করছি। তোমার কৃপায় আমাদের পাপ দূরীভূত হোক। ২।
হে অগ্নি! আমি সকল স্তোতা অপেক্ষা অধিকরূপে তোমার স্তুতি-করণশীল। আমার পুত্র ইত্যাদিও তোমার অনন্য স্তোতা। অতএব তোমার কৃপায় আমাদের পাপ দূরীভূত হয়ে যাক। ৩।
হে অগ্নি! তোমার স্তোতৃগণ পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি সন্ততির সাথে যুক্ত হয়ে থাকে; অতএব তোমার মহিমা-জ্ঞাপক স্তোত্রকারী আমরাও পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির সাথে যুক্ত (বা সম্পন্ন) হবো। তোমার কৃপাতে আমাদের পাপ দূরীভূত হোক। ৪।
পরাক্রমী অগ্নির দীপ্তিরাশি সকল দিক হতে আমাদের মঙ্গল করার নিমিত্ত প্রবর্তিত হচ্ছে। অতএব অগ্নির তেজের দ্বারা আমাদের পাপ দূরীভূত হয়ে যাক ॥ ৫॥ হে অগ্নি! তুমি সর্বত্র ব্যাপক হয়ে আছে, এই সমগ্র জগৎ-সংসার তোমার বশবর্তী
হয়ে আছে; তোমারই কৃপায় আমাদের পাপ দূরীভূত হয়ে যাক। ৬। হে অগ্নি! যেমন নৌকার দ্বারা সমুদ্র উত্তীর্ণ হওয়া যায়, তেমনই তুমি পাপরূপ শত্রুদের কবল, হতে আমাদের নিস্তরণ করিয়ে। দাও। তোমার কৃপায় আমাদের পাপ দূরীভূত হয়ে যাক ৷৷ ৭।
টীকা –এই সূক্তটি, ষষ্ঠ কাণ্ডের দ্বিতীয় অনুবাকের পঞ্চম ও তৃতীয় অনুবাকের দ্বিতীয় সূক্তদ্বয়, বৃহদগণে পঠিত শান্তুদক কর্মে বিনিযুক্ত হয়। তথা পুরুষ বিষয়ে স্ত্রীগণের এবং স্ত্রীলোক বিষয়ে পুরুষগণের অভিরতি (অর্থাৎ আসক্তি) নিবৃত্তির নিমিত্ত এই সূক্তের দ্বারা অসংখ্য শর্করা অভিমন্ত্রিত করে কাম্যমান পুরুষের গৃহে বা কাম্যমানা স্ত্রীর গৃহে প্রকীরিত (ছড়িয়ে দেওয়া) কর্তব্য। ঐ শর্করা হস্তে ধারণ করেও জপনীয়।…ইত্যাদি ॥ (৪কা.৭অ.৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –রথন্তর সাম এই অন্নের (ওদনের) শির, বৃহসাম এর পৃষ্ঠ, বামদেবের দৃষ্টভাগ এর উদর, গায়ত্র ইত্যাদি ছন্দ এবং পঙ্খ (বা পক্ষ) এবং সত্য নামক সাম এর মুখ। এই রকম বিকশিত অবয়বসম্পন্ন সকল যজ্ঞ ব্ৰহ্ম অপেক্ষাও উচ্চ রূপে প্রকট হয়েছে। ১।
যাদের শরীর অস্থির সাথে যুক্ত ষট্-কোশ সম্পন্ন নয়, তারা সকল যজ্ঞের কর্তা বায়ুর দ্বারা পবিত্ৰীকৃত হয়ে উজ্জ্বল লোকে গমন করে; এদের ভোগ-সাধন ইন্দ্রিয় (শিশ্ন)-কে অগ্নি দহন করে না। সেখানে (অর্থাৎ সেই উজ্জ্বল সুকৃতলোকে) পুণ্যের ফলস্বরূপ বহু ভোগের সামগী তারা প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। ২৷৷
যে যজমান উপযুক্ত রীতিসম্পন্ন ওদনকে পাক পূর্বক ব্রাহ্মণবর্গকে প্রদান করেন, দরিদ্রতা কখনও তাঁদের স্পর্শ করে না। সেই সকল যজ্ঞানুষ্ঠানকারীগণ মৃত্যুর পরে যমলোকে পূজিত হয়ে সূখ পূর্বক বাস করে থাকেন এবং যমের অনুমতিক্রমে দেবতাগণের সামীপ্য প্রাপ্ত হয়ে গন্ধর্ব ইত্যাদি গণের সাথে সোমপানে প্রসন্ন হয়ে থাকেন। ৩।
যে যজমান উপরিউক্ত অন্ন পাক করে ব্রাহ্মণগণকে প্রদান করেন, যমরাজ সেই সকল যজ্ঞশালীকে কখনও বীর্যহীন করেন না। তারা পৃথিবীর মধ্যে রথে আরোহন পূর্বক ভ্রমণ করে থাকেন এবং অন্তরিক্ষে পক্ষযুক্ত হয়ে উচ্চ লোকসমূহ প্রাপ্তি পূর্বক ভোগসমূহকেও লাভ করে থাকেন। ৪
পূর্বোক্ত রীতি অনুসারে যজমান অন্ন পাক করে তার ফলস্বরূপ স্বর্গে গমন করে থাকেন। যে যজমান এই জগতে অণ্ডাকার কন্দ হতে উৎপন্ন শ্বেত কমলকে সরোবরে স্থিত করেন এবং পদ্মকন্দ, উৎপলক তথা পশুর খুরাকৃতি সম্পন্ন জলজাত পদার্থকেও সরোবরে স্থিত করেন, তিনি এই সুকর্মফলের ভোগস্থান স্বর্গে কুমুদ ইত্যাদি যুক্ত জলপূর্ণ ক্রীড়া-পুষ্করিণী প্রাপ্ত হন। দধি, মধু, ও ঘৃত ইত্যাদির এই ধারাসমূহ মধুর ভাবকে পুষ্ট করে স্বর্গলোকে তোমাকে প্রাপ্ত হোক ॥ ৫॥
হে সর্বজ্ঞ-কর্তা! ঘৃতযুক্ত সরোবর, মধুর দ্বারা পূর্ণ-কুলা পুষ্করিণী, দুগ্ধ-দধি-জলের দ্বারা পূর্ণ ধারাসমূহ, মধুময় পদার্থ সমূহকে পুষ্ট করে স্বর্গলোকে তোমাকে প্রাপ্ত করাক ॥ ৬৷৷
দুগ্ধ ইত্যাদির দ্বারা পূর্ণ চারিটি কলশকে আমি চারিটি। দিকে স্থাপিত করছি। এই দুগ্ধ ইত্যাদির ধারাসমূহ মধুর রসকে পুষ্ট করে তথা জলের দ্বারা পূর্ণ পুষ্করিণী, নদীসমূহ তোমাকে প্রাপ্ত হোক ॥৭৷
এই পাকনিষ্পন্ন ওদন বিস্তার যুক্ত এমন স্বর্গ ইত্যাদি লোক সমূহকে প্রাপ্তিদায়ক। আমি একে (অর্থাৎ এই ওদনকে) ব্রাহ্মণগণের মধ্যে স্থাপিত করছি (অর্থাৎ দান করছি)। এই ওদন যেন ক্ষীণ না হয় এবং অভিলষিত ফল-দানশালিনী ধেনুরূপে পরিণত হয় ॥ ৮
টীকা— এই সূক্তটি ব্রহ্মাস্য-ওদন যজ্ঞে নিরুপ্ত হবিঃ অভিমৰ্শন ইত্যাদি কর্মে বিনিযুক্ত হয়। এই সূক্তের দ্বারা চতুর্দিকে হ্রদ, পুষ্করিণী প্রভৃতি স্থাপন করে তাদের রসের দ্বারা পূরণ করে ও মন্ত্রোক্ত বিধানে আণ্ডীকাদি ঠি স্থাপন করণীয়।…ইত্যাদি ॥ (৪কা, ৭অ. ৪সূ)।
বঙ্গানুবাদ –যে ওদন (অন্ন)-কে হিরণ্যগর্ভ নামক প্রজাপতি আপন কারণরূপে নির্মাণ (পাক) করেছিলেন; নাভি যেমন প্রাণীগণকে ধারণশালী হয়ে থাকে, তেমনই যে ওদন পৃথিবী ইত্যাদিকে ধারণ করতে সমর্থ হয়ে থাকে; সেই ওদন দান করে আমি মৃত্যুকে অতিক্রম করছি। ১।
যে ওদনকে দেবতাগণ তপস্যার দ্বারা লাভ করেছিলেন, যে ওদনের দ্বারা তারা মৃত্যুকে লঙ্ঘন করে গিয়েছিলেন, যে ওদনকে হিরণগর্ভ নিজের নিমিত্ত পাক করেছিলেন, তার (দানের) দ্বারা আমি মৃত্যু ও তার কারণরূপ দেবতাকে (অর্থাৎ মৃত্যুর অভিমানী দেবতাকে) অতিক্রম করছি ॥ ২॥
যে ওদন পৃথিবীকে ধারণ-নিষ্পন্ন করেছে, যা আপন রসের দ্বারা অন্তরিক্ষকে পূর্ণ করে এবং দ্যুলোককে আপন মহিমায় স্তম্ভিত করে থাকে, তার (অর্থাৎ সেই ওদনের দানের) দ্বারা আমি মৃত্যুকে অতিক্রম করছি ॥৩॥
যে ওদনের দ্বারা দ্বাদশ মাস ও রথচক্রের কীলক (গোঁজ বা খুঁটা) রূপ ত্রিশদিন উৎপন্ন হয়েছিল, যে ওদনের দ্বারা সম্বৎসর উৎপন্ন হয়েছিল, সেই ওদনের দানের দ্বারা আমি মৃত্যুকে লঙ্ঘন করছি। ৪
যে ওদনের নিমিত্ত সকল লোক ঘৃতাধারসমূহকে সিঞ্চন করে, যে ওদনের তেজের দ্বারা দিমূহ তেজঃ-সম্পন্ন হয়ে থাকে, যে ওদন মুমূর্যগণের প্রাণদায়ক হয়ে থাকে, সেই ওদনের দানের দ্বারা আমি মৃত্যুকে উল্লঙ্ঘন করছি। ৫।
পাকযুক্ত (বন্ধনকৃত) যে ওদন হতে আকাশে অমৃত উৎপন্ন হয়েছে, গায়ত্রী ছন্দের অধিপতি দেবতা যে ওদনের দ্বারা হয়ে থাকে, এবং ঋক্-যজু-সাম ইত্যাদি বেদ যে ওদনে ব্যাপ্ত আছে, আমি সেই ওদনের দ্বারা মৃত্যু হতে উত্তীর্ণ হচ্ছি ৷ ৬৷৷
আমি বৈরিতা-সম্পন্ন শত্রুগণকে এবং দেবতাবর্গের হিংসকগণের কার্যে বিঘ্ন সাধিত করছি। আমার শত্রু বিনষ্ট হোক,–এই নিমিত্ত আমি ব্ৰহ্মরূপ ওদনকে (অর্থাৎ ব্রাহ্মণবর্গকে প্রদেয় অন্নকে) সংস্কৃত করছি। পূজ্যপাদ দেবগণ আমার স্তুতি শ্রবণ করুন। ৭।
বঙ্গানুবাদ –যে শত্রু আমাদের হিংসা করতে অভিলাষ করে; যারা আমাদের মধ্যে যে অবগুণ (দোষ) নেই, সেই মিথ্যা দোষ, আমাদের উপর আরোপিত করে; মনুষ্যের উপকার করণশালী সেচনসমর্থ অগ্নিদেব সেই শত্রুগণকে প্রচণ্ডরূপে ভস্ম করে ফেলুন। ১।
যে শত্রু আমাদের দুঃখ প্রদান করে এবং যে আমাদের আঘাত করতে আকাঙ্ক্ষা করে, এই দুই রকমের শত্রুগণকে আমাদের সকলের হিতৈষী অগ্নির দুই হনুর (চোয়ালের) অভ্যন্তরস্থ দন্তের মধ্যে নিক্ষেপ করছি। ২৷
যে যুদ্ধে মাংস ও রক্ত নষ্টকৃত হয়ে থাকে, সেখানে পিশাচ ইত্যাদি আমাদের হনন পূর্বক ভক্ষণের নিমিত্ত অন্বেষণ করে (অর্থাৎ তাকে তাকে থাকে), এবং শত্রুদের দ্বারা প্রেরিত করণের পর যে পিশাচ ইত্যাদি অমাবস্যার অর্ধ-রাত্রির সময়ে হনন করতে আকাঙ্ক্ষা করে, তাদের সকলকে আমরা আমাদের মন্ত্রশক্তির দ্বারা বশীভূত করছি ৷ ৩৷
আমরা এই রাক্ষসবর্গের বল সম্পর্কে জ্ঞাত আছি এবং এদের মন্ত্র-শক্তির প্রভাবে ক্ষীণ করে দিচ্ছি। দুষ্ট আচরণশীল আপন শত্রুদেরও আমি বিনাশ করে দিচ্ছি। আমাদের কাম্য সংকল্প সুখময় এবং সমৃদ্ধির সাথে যুক্ত হোক। ৪
যে পিশাচ আপন মায়ারূপ বিকারের দ্বারা হাস্য করায় এবং সূর্যের ন্যায় ঝলকিত হতে থাকে, যে পিশাচ পর্বত নদী ইত্যাদি স্থানে সঞ্চরণ করে থাকে, আমি তাদের সকল প্রতিবন্ধকতা বা প্রবঞ্চনা হতে মুক্ত হয়ে গো-ইত্যাদি পশুসমূহে সমৃদ্ধ হবো ৷ ৫
সিংহ যেমন গো-ইত্যাদির পালকগণের চিন্তার কারণ হয়ে থাকে, তেমনই আমি আমার আপন মন্ত্র-বলে রাক্ষসগণকে দুঃখ-দানের কারক হবো; সিংহ হতে ভয়ভীত কুকুরেরা যেমন লুকিয়ে থাকে, তেমনই এই পিশাচ ইত্যাদি গণ আমাদের মন্ত্র-বলের প্রভাবে অধঃপতিত হয়ে যাক ৷৷ ৬ ৷
চোর ও দস্যুগণ কখনও আমার সাথে মিলিত হয় না (অর্থাৎ সম্মুখীন হয় না), পিশাচগণ আমাতে বা আমার অধ্যুষিত স্থানে প্রবিষ্ট হতে সক্ষম হয় না। আমি যে গ্রামে গমন করি, সেই গ্রামের পিশাচগণ বিনাশ প্রাপ্ত হয়ে যায় ৷৷ ৭৷
আমার মন্ত্র-বল যে গ্রামে বর্তমান থাকে, সেখানে পিশাচগণ বিনষ্ট হয়ে যায়। এই কারণে সেই স্থানের অধিবাসী মনুষ্যগণ ঐ পিশাচবর্গের হিংসান্বিত কার্যকলাপকে কখনও জানতেই পারে না ॥ ৮
যেমন ক্ষুদ্রকায় কীট জনসমূহের চলাচলে পিষ্ট হয়ে যায় (বা সঙ্কুচিত হয়ে যায়), যেমন হস্তীর শরীরলগ্ন মশক হস্তীর ক্রোধকে বর্ধিত করে, তেমনই আমি আমার শরীরে বিলগ্ন পিশাচগণকে আপন মন্ত্র-রূপ ক্রোধের দ্বারা বিনষ্টের বিষয়ীভূত বলে মনে করি। ৯।
যেমন দুষ্ট অশ্বকে রশ্মির দ্বারা বন্ধন করা হয়, সেই রকমে পাপ দেবতা নির্ঋতি সেই বৈরীকে পাশবদ্ধ করে নিন, যে আমার উপর ক্রোধপরায়ণ হয় (বা আমি যার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে থাকি), সে যেন নিঋর্তির পাশ হতে অব্যাহতি না পায় ॥ ১০।
টীকা –অষ্টম অনুবাকে পাঁচটি সূক্ত। তার মধ্যে এই প্রথম সূক্তটি এবং এর পরবর্তীটির দ্বারা ভূত চি গ্রহ ইত্যাদির উচ্চাটনকর্মে বিনিয়োগ হয়ে থাকে। (৪কা. ৮অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে ঔষধি! অথবা, কশ্যপ, কথ ও অগস্ত্য ইত্যাদি মহর্ষিগণ তোমাকে সাধিত (বা চ উপাসিত) করে রাক্ষসগণকে বিনষ্ট করেছিলেন। সেইরকমেই আমিও করছি (অর্থাৎ তোমার ধারণ, হোম ইত্যাদি সাধনের দ্বারা রাক্ষসগণের বিনাশ সাধিত করছি)। ১।
হে অজশৃঙ্গী (অর্থাৎ অজের শৃঙ্গের আকৃতি বিশিষ্টা)! হে ঔষধি! তোমার দ্বারা আমরা, উপদ্রবী গন্ধর্ব ও অপ্সরাগণকে নাশ করবো। তোমার উগ্র গন্ধের দ্বারা আমরা রাক্ষস, পিশাচ ইত্যাদিদের দূরে বিতাড়িত করবো ২
যেমন পারে উত্তরণ-কুশল নৌকা-চালকের নিকট উপস্থিত হতে হয়; তেমনই গুগুল, পীলা (পীলু), নলদী (নলদ), ঔক্ষগন্ধী, প্রমন্দনী–এই পাঁচ হবন-দ্রব্যসম্ভারের ভয়ে গন্ধর্ব-স্ত্রীগণ (অপ্সরাবৃন্দ) আপন স্থানে প্রত্যাবর্তন করুক ॥ ৩
হে অপ্সরাগণ! তোমরা পীপল, বট, প্লক্ষ ইত্যাদি বৃক্ষসমূহ এবং ময়ূর ইত্যাদিতে সমাকীর্ণ আপন স্থানে প্রত্যাবর্তন করো এবং সেখানে গতি-হীনা হয়ে পড়ে থাকো। ৪
হে অপ্সরাবৃন্দ! যেখানে শ্যামল ও অর্জুন বৃক্ষ আছে, যেখানে তোমাদের আমোদ ও নৃত্যের নিমিত্ত প্রেঙ্খা (বা দোলা) পাতিত হয়ে আছে এবং বাদ্য বাদিত হচ্ছে, তোমরা আপন সেই স্থানে প্রত্যাবর্তন করো এবং সেখানে নিশ্চেষ্ট (চেষ্টারহিত) হয়ে পড়ে থাকো ॥ ৫৷
এই অত্যন্ত বলবতী অজশৃঙ্গী নামক ঔষধি হিংসকবর্গের উচ্চাটন করণে সমর্থ। উগ্র গন্ধ ও শৃঙ্গাকারশালিণী এই ঔষধি রাক্ষস ও পিশাচগণকে বিনষ্ট করুক ৷ ৬ ৷
ময়ুরের ন্যায় নৃত্যপর, গীতিময় বাণীশালী (অর্থাৎ সঙ্গীতকারী), আমাদের হননের অভিলাষকারী গন্ধর্বের (অর্থাৎ অপ্সরাগণের পতির) অণ্ডকোষদ্বয়কে আমি চূর্ণ করছি ও তার উপস্থকে (শিশ্নকে) নির্বীর্য করে দিচ্ছি ৷৷ ৭৷
ইন্দ্রের যে লৌহায়ুধ হতে প্রাণীগণ ভয়ভীত হয়ে থাকে, যাতে শতধার (বা অসংখ্য ধীর) আছে, তার দ্বারা ইন্দ্র জলাশয়ের উপরে আগমনকারী শৈবাল-ভক্ষণকারী গন্ধর্বগণকে সংহার করুন। ৮।
হে অজশৃঙ্গী! সকল দিক হতে দীপ্তিময় হয়ে, শোকপ্রদ, শৈবাল-ভক্ষণশীল গন্ধর্বগণকে জলের মধ্যে প্রকটিত করো এবং উপদ্রব-করণশীল পিশাচগণকে সর্ব দিক হতে প্রহার পূর্বক বশীভূত করো। ১০।
গন্ধর্বগণ আপন মায়া-প্রভাবে কুকুরের আকৃতিশালী, বানরের আকৃতি সম্পন্ন, সকল দিকে কেশযুক্ত বালকের (অর্থাৎ মনুষ্য কুমারের) আকৃতিধারী হয়ে যায়। সুন্দর-দর্শনশালী হয়ে গন্ধর্বগণ গৃহে গৃহে গমন করে স্ত্রীগণকে প্রলোভিত করে তাদের সম্প্রাপ্ত হয়ে থাকে; এই হেন সেই গন্ধর্ববর্গকে আমরা মন্ত্র-বলের দ্বারা সেই স্ত্রীগণের নিকট হতে বিদূরিত করে দিচ্ছি ৷ ১১
হে গন্ধর্ববৃন্দ! অপ্সরাগণই তোমাদের উপভোগের যোগ্য, তারাই তোমাদের পত্নী। এই নিমিত্ত তাদের সঙ্গেই তোমরা মিলিত হও। তোমরা অমরশীল, অতএব মরণশীল ব্যক্তিগণের সাথে সঙ্গতি (বা সম্মিলন) করো না। (এই সূক্তের দ্বারা ব্যাধিসমূহের কীটাণুগুলির বর্ণনা করা হয়েছে এবং ঔষধির দ্বারা সেগুলির বিনাশ-সাধনের বিধি কথিত হয়েছে)। ১২।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –ত্বয়া পূর্বং, ইতি সূক্তস্য গণপ্ৰযুক্তো বিনিয়োগ, পূর্বসূক্তেন সহ উক্তঃ। তথা সর্বভূতগ্ৰহভৈষজ্যার্থং শমীপর্ণচূর্ণং শমীফলমধ্যে কৃত্বা অনেন সূক্তেন অভিমন্ত্র আবিষ্টগ্রহং পুরুষং ভোজয়েৎ। অলঙ্কারেণ সহ ধারয়েৎ। তথা ব্যাধিতগৃহং পরিকিরেৎ। সূত্রিতং হি।…ইত্যাদি। (৪কা, ৮অ. ২সূ)।
টীকা— এই সূক্তটি পূর্বসূক্তের সাথে গণপ্ৰযুক্তে বিনিয়োগ হয়। তথা সর্বভূতগ্রহের ভৈষজ্যার্থে শমীপর্ণচূর্ণ শমীফলের মধ্যে করে এই সূক্তের দ্বারা অভিমন্ত্রিত পূর্বক গ্রহাবিষ্ট পুরুষকে খাওয়ানো কর্তব্য। অলঙ্কারের সাথে ধারণও কর্তব্য। তথা ব্যাধিত ব্যক্তির গৃহে ছড়িয়ে দেওয়া কর্তব্য।..ইত্যাদি। (৪কা, ৮অ. ২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –দূত ক্রিয়ার অধিদেবতা, বিজয়প্রদা, অক্ষশলাকা ইত্যাদির দ্বারা শোভন ক্রীড়া করণ-শালিনী অপ্সরাকে আমি এই দূত-বিজয়ের কর্মে আহ্বান করছি। দূত ক্রিয়া জয়ের নিমিত্ত কৃত ইত্যাদি-কারিণী অপ্সরা আগতা হয়ে আমার জয় সুনিশ্চিত করুক৷ ১।
পাশাগুলিকে একত্রিত করে সেগুলিকে বহু কোষ্ঠে বিজয় হেতু নিক্ষেপ করে, অক্ষশলাকা ইত্যাদির দ্বারা শোভনতাপূর্বক ক্রীড়াশালিনী দূতক্রিয়ার অধিদেবতা অপ্সরাকে আমি এই দূত-বিজয়শালী কর্মে আহ্বান করছি। দূতক্রিয়া জয়ের নিমিত্ত কৃত ইত্যাদি-কারিণী অপ্সরা আগতা হয়ে আমার জয় সুনিশ্চিত করুক ॥ ২॥
যে অস্পা কৃত ইত্যাদি শব্দের দ্বারা কথিত অক্ষগত সংখ্যাবিশেষ বা অয়ের দ্বারা বিজয় প্রাপ্ত হওয়ার কারণে নৃত্যপরা হয়ে থাকে, সে গ্রহণযোগ্য পাশাসমূহে কৃত নামক চারিসংখ্যক অয়কে রক্ষা পূর্বক নিক্ষেপযোগ পাশসমূহের উপর আপন মায়ার সাথে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং আমাদের বিজিত গো-ইত্যাদি ধনের সাথে প্রাপ্ত হোক। কৌশলের উপরে রক্ষিত (অর্থাৎ দাবার পাশায় প্রাপ্ত) আমাদের ধনকে অন্য দূত-ক্রিয়াশীল যেন জয় করে না নিতে পারে ৷৷ ৩৷৷
যে অপ্সরা অভিলষিত জয়ের অভাবে শোককে উৎপন্ন করে থাকে এবং পুনরায় বিজয়-প্রাপ্তির অভিপ্রায়ে ক্রোধকে উৎপন্ন করে থাকে, সেই অপ্সরা দূত-সাধন অক্ষে প্রসন্ন হয়; আমি তাকে আহ্বান করছি। দূতক্রিয়া জয়ের নিমিত্ত কৃত-ইত্যাদি-কারিণী অপ্সরা আগতা হয়ে আমার জয় সুনিশ্চিত করুক ৪
যে অপ্সরাগণের স্বামী দূরস্থ অন্তরিক্ষলোকে বিচরণ করেন এবং উষার সাথে যুক্ত হন, সেই সূর্য সকল লোকের রক্ষক রূপে সকল দিকে সঞ্চারমান হোন। সেই সূর্য অপ্সরাগণের সাথে আমাদের সমীপে আগমন পূর্বক এই হব্য গ্রহণ করুন। ৫৷৷
হে সূর্য! তুমি অপ্সরাগণের সাথে যুক্ত এবং উষাবান্ হয়ে আছে। এই গাভীবর্গের শ্বেতবর্ণশালী বৎসমুদায়কে রক্ষা পূর্বক তাদের পোষণ করো। তোমার দুগ্ধ ইত্যাদির বিন্দু বিন্দু ধারা সমৃদ্ধ হয়ে আমাদের প্রাপ্ত হোক। এই শ্বেত বর্ণালিনী তোমার গাভী এই গোষ্ঠে অবস্থিত আছে। তুমি আমাদের নমস্কার স্বীকার করো ও আমাদের সম্মুখে আবির্ভূত হও। ৬।
হে অপ্সরাবৃন্দের সাথে যুক্ত, উষাবান্ সূর্য! এই স্থানের শ্বেত বর্ণশালী বৎসগণকে রক্ষা করো; তাদের পোষণপূর্বক বৃদ্ধি সাধন করো। খাদ্যের নিমিত্ত দীয়মান এই ঘাস পৌষ্টিক (পুষ্টিকর) হোক। এই গোষ্ঠ গাভীগণের দ্বারা সমৃদ্ধ হোক। এই গোষ্ঠে আমরা বৎসগণকে দ্বাদশ রঞ্জুর দ্বারা বন্ধন করছি। যে প্রকারে তুমি স্বামী হয়েছে, সেই প্রকারে আমরা যাতে তাদের অধিপতি হতে পারি, সেইভাবেই বন্ধন করছি। যথানামে স্বাহামন্ত্রে এই হবিঃ আহুত হচ্ছে ॥৭॥
বঙ্গানুবাদ –অগ্নিদেব ভূতসমূহের সাথে যুক্ত (বা প্রাণীসমূহের দ্বারা প্রণত) হয়ে থাকেন। সেই অগ্নিদেবকে সকল প্রাণী প্রাপ্ত হয়ে থাকে; এই রকমে আমার অভিলষিত ফলগুলি আমাকে প্রাপ্ত হোক ॥১॥
পৃথিবী ধেনু, অগ্নি তার বৎস-স্বরূপ। সেই পৃথিবী অগ্নিরূপী বৎসের দ্বারা অন্ন, পুত্র, পশু ইত্যাদিতে শত বর্ষশালিনী আয়ু ইত্যাদি সকল কাম্য বস্তুসমূহ প্রদান করুক। সেই পৃথিবীর সকল অবদান আমাকে প্রাপ্ত হোক ॥ ২॥
অন্তরিক্ষ লোকের অধিস্বামী রূপে অবস্থিত বায়ুর নিকটে সেই স্থানস্থায়ী যক্ষ, গন্ধর্ব ইত্যাদি নিবাসকারীগণ একত্রে প্রণত হয়ে থাকে এবং তাদের দ্বারা বায়ুও সমৃদ্ধি লাভ করে থাকেন; তেমনই সমৃদ্ধি আমাকে প্রাপ্ত হোক ॥ ৩॥
অন্তরিক্ষ লোক ঈপ্সিত ফলদায়ক হওয়ার কারণে পয়স্বিনী ধেনুর ন্যায় হয়ে থাকে, এবং বায়ু তার বৎস-স্বরূপ। সেই অন্তরিক্ষ আপন বায়ুরূপী বৎসের দ্বারা অন্ন, অন্ন-রস, পুত্র, পশু, শতায়ু প্রজা ইত্যাদিকে পুষ্টির দ্বারা ঈপ্সিত বস্তুসমূহ প্রদান করুক। সেই অন্তরিক্ষের সকল অবদান আমাকে প্রাপ্ত হোক। ৪।
যেমন সূর্যমণ্ডলের নিবাসীগণ, সূর্যের সম্মুখে নত হয়ে থাকে এবং সেই সূর্য সেই দুলোকে বাসকারীগণের সাথেই প্রবৃদ্ধ হয়ে থাকেন। তাদেরই মতো ঈপ্সিত ফলগুলি আমার দিকে নত হোক ॥ ৫॥
অভিলষিত ফল প্রদানের কারণে আকাশ (অর্থাৎ দ্যুলোক) ধেনু এবং সূর্য তার বৎস-স্বরূপ। এই আকাশ আপন সূর্যরূপী বৎসের দ্বারা অন্ন, বল,পুত্র, পশু, শতবর্ষের আয়ু ইত্যাদি সকল ঈপ্সিত বস্তুসমূহ প্রদান করুক। সেই দ্যুলোকের সকল অবদান আমাকে প্রাপ্ত হোক ॥ ৬
পূর্ব ইত্যাদি দিমূহের প্রাণীগণ তাদের অধিস্বামীরূপে স্থিত চন্দ্ৰমার দ্বারা প্রসন্ন হয়ে প্রণত হয়ে থাকে, এবং চন্দ্রমা তাদের দ্বারা সম্পন্ন প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। আমি সেই রকম সম্পন্ন প্রাপ্ত হবো। ৭।
দিমূহ ঈপ্সিত ফলদায়ক হওয়ার কারণে ধেনুস্বরূপ এবং চন্দ্রমা তার বৎস। সেই দিকরূপা গাভী আপন চন্দ্ররূপী বৎসের দ্বারা অন্ন, অন্ন-রস, পুত্র, পশু, শতবর্ষের আয়ু ইত্যাদি দান পূর্বক আমার চ বৃদ্ধি সাধিত করুন। সেই দিকসমূহের সকল অবদান আমাকে প্রাপ্ত হোক ॥ ৮
মন্ত্রের শক্তির প্রভাবে অগ্নিদেব অঙ্গার রূপে স্থিত আহ্বানীয় অগ্নির মধ্যে বাস করে থাকেন। মন্ত্রদ্রষ্টা অথবা, অঙ্গিরা ইত্যাদির পুত্র। তিনি মিথ্যাপবাদ হতে রক্ষা করে থাকেন। এই হেন অগ্নির উদ্দেশে আমি হবিরম্ন প্রদান করছি। আমরা দেবতাদের প্রাপ্য ভাগকে করবো না (অর্থাৎ সত্য বলে স্বীকার করবো) ॥ ৯।
হে অগ্নিদেব! তুমি জাতবেদা, অর্থাৎ সকল প্রাণীজাতের জ্ঞাতা, দান ইত্যদি গুণসমূহের সাথে যুক্ত; তোমার মুখবিবরে সপ্তসংখ্যক জিহ্বা (অগ্নি সপ্তার্চি) বর্তমান। আমি সেই সপ্ত-জ্বিহা সমম্বিত মুখকে উন্মুক্ত করণের নিমিত্ত শুদ্ধান্তঃকরণে পূর্ণাহুতি প্রদান করছি।১০৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! তুমি উৎপন্ন প্রাণীসমূহের জ্ঞাতা (জাবেদা)। যে শত্রু অভিচার কর্মের দ্বারা পূর্ব দিক্ হতে আমাদের বিনাশ করতে ইচ্ছা করে, সেই শত্ৰু ঐ দিক্-অধিপতি অগ্নির নিকট গমন পূর্বক ভস্ম হয়ে যাক। আমি এই সকল অভিচার কর্মশালী শত্রুগণকে এই প্রতিসর (শোধক মন্ত্র সমন্বিত) কর্মের দ্বারা নাশ করছি।১৷
হে অগ্নি! যে শত্রু অভিচার কর্মের দ্বারা দক্ষিণ দিক হতে আমাদের ক্ষীণ করতে ইচ্ছা করে, সেই শত্ৰু ঐ দিক্-অধিপতি যমের নিকট গমন পূর্বক সন্তাপিত হোক। আমি এইসকল অভিচার কর্মশালী শত্রুগণকে প্রতিসর কর্মের দ্বারা, নাশ করছি। ২।
হে অগ্নি! তুমি উৎপন্ন প্রাণীসমূহে জ্ঞাতা। যে শত্রু পশ্চিম দিক্ হতে অভিচার কর্মের দ্বারা আমাদের নাশ করতে ইচ্ছা করে, তারা সেই দিকের অধিস্বামী বরুণের নিকট গমন পূর্বক ব্যথা-প্রাপ্ত হোক। আমি এই সকল অভিচার করণশালী শত্রুগণকে প্রতিসর কর্মের দ্বারা বিনাশ করছি ৷ ৩৷৷
হে অগ্নি! যে শত্ৰু উত্তর দিক হতে অভিচার কর্মের দ্বারা আমাদের নাশ করতে আকাঙ্ক্ষা করে, তারা সেই দিকের অধিস্বামী সোমের নিকট গমন পূর্বক ব্যথিত হোক, এবং আমাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করুক। আমি এই সকল অভিচার কর্মকারী, শত্রুগণকে প্রতিসর কর্মের দ্বারা বিনাশ করছি৷৷ ৪
হে অগ্নি! তুমি জামাত্র প্রাণীগণের জ্ঞাতা। যে শত্ৰু নিম্ন দিক হতে অভিচার কর্মের দ্বারা আমাদের হনন করতে ইচ্ছা করে, তারা সেই দিকের অধিদেবতা পৃথিবীর নিকটে উপস্থিত হয়ে ব্যথায় জর্জরিত হোক। আমি সেই সকল শত্রুগণকে প্রতিসর কর্মের দ্বারা নিবীর্য করে দিচ্ছি। ৫
হে অগ্নি! দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যস্থানবর্তী অন্তরিক্ষ লোকের দিক হতে যে শত্রু অভিচার কর্ম সাধনের দ্বারা আমাদের বিনাশ করতে ইচ্ছুক হয়, সেই শত্রু সেই দিকের অধিস্বামী বায়ুদেবতার নিকট সমুপস্থিত হয়ে ব্যথাপ্রাপ্ত হোক এবং আমাদের নিকট হতে দূরে গমন। করুক। আমি সেই সকল শত্রুগণকে প্রতিসর কর্মের দ্বারা বিনাশ করে দিচ্ছি। ৬৷৷
হে অগ্নি! যে শত্রু ঊর্ধ্ব দিকস্থ দ্যুলোক হতে অভিচার কর্মের দ্বারা আমাদের বধ করতে ইচ্ছা করে, সেই শত্রু সেই দিকের অধিস্বামী সূর্যের নিকটে গমন পূর্বক যন্ত্রণা লাভ করুক এবং আমাদের নিকট হতে দূরে গমন করুক। আমি সেই সকল অভিচার কর্মকারী: শত্রুগণকে প্রতিসর কর্মের দ্বারা বিনাশ করছি। ৭।
হে অগ্নি! পূর্ব ইত্যাদি দিক সমূহের অন্তরালবর্তী স্থান হতে অভিচার কর্মের দ্বারা আমাদের ক্ষীণ করে থাকে, তারা সকলে শক্তিহীন হয়ে যাক এবং আমাদের দিক হতে বিমুখ (বা পরাজুখ) হয়ে সকলকে বশীভূত করণশালী পরব্রহ্মের নিকট গমন পূর্বক ব্যথাগ্রস্ত হোক। আমি সেই সকল শবর্গকে প্রতিসর কর্মের দ্বারা বিনাশ করছি। ৮।
টীকা –এই সূক্তটি এবং দ্বিতীয় কাণ্ডের তৃতীয় অনুবাকের প্রথম সূক্ত ও চতুর্থ কাণ্ডের চতুর্থ অনুবাকের দ্বিতীয় সূক্ত ইত্যাদি কৃত্যাপ্রতিহরণগণে পঠিত কৃত্যা-নিবারণ কর্মে ও শান্তু্যদক কর্মে বিনিয়োগ হয়।(৪কা. ৮অ.৫সূ)।
বঙ্গানুবাদ –দিনের সমান প্রকাশিত, ত্রিলোকের পালক, রক্ষক এবং ধারক পরমাত্মা যোনির দ্বারা উৎপ্ন হয়ে জীবাত্মারূপে প্রকটিত হয়েছেন। এই জীবাত্মা যখন ব্রাহ্মণহিতৈষী পরমাত্মার চিন্তনে ব্যাপৃত থাকেন, তখন তিনি ঈশ্বরত্ব লাভ করে থাকেন। মনু ইত্যাদি ঋষিগণ চৌর্য, গুরুপত্নী-গমন, ব্রহ্মহত্যা, ভ্রণহত্যা, মদ্যপান, মিথ্যাভাষণ এবং পাপকর্ম সাধন জীবাত্মার পক্ষে নিষিদ্ধ করেছেন। যে জীবাত্মা তা পালন করে না, সে পাপী। ঋষিগণের বাক্যকে মর্যাদা দানশীল পুরুষ (জীবাত্মা) মৃত্যুকালে সূর্যমণ্ডলস্থিথ আদিত্যের স্থানকে মহাপ্রলয় পর্যন্ত প্রাপ্ত হয়ে থাকে। যে বলের সাথে হৰিঃ দান করে থাকে, তাকে (বরুণরূপী) ইন্দ্রদেব রত্ন ইত্যাদি প্রদান করেন। বরুণ দেবতা এই সেনাদলকে দুগ্ধ ইত্যাদির দ্বারা বর্ধন করেন। এই জীবাত্মা বিদ্বান ঋষিগণের দ্বারা এইভাবে প্রশংসিত হয়েছেন ॥ ১-৯।
টীকা— সায়ণাচার্য এই পঞ্চম কাণ্ডটির ব্যাখ্যা প্রদানে নিরস্ত থেকেছেন; অবশ্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিস্তৃত বিবরণ উল্লেখ করেছেন। আমরা হিন্দীবলয়ে বহুল প্রচারিত কয়েকটি গ্রন্থ থেকে সূক্তসার অংশটি গ্রহণ করেছি; যদিও তথাকথিত পণ্ডিতবর্গ এই কাণ্ডটির বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।
এই সূক্তটি এবং এর পরবর্তী সূক্তটির দ্বারা সংগ্রাম-জয়েঞ্জু জন হস্তীর পৃষ্ঠে অথবা আপন মস্তকে স্থাপিত অশ্বত্থ কাষ্ঠের দ্বারা নির্মিত যজ্ঞপাত্রে গোময় (ঘঁটে) রক্ষণ পূর্বক তাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করে আজাহুতি প্রদান করে শত্রুকে আক্রমণ করবেন। তথা সেইরকম কর্মে বরাহখাত মৃত্তিকা আনয়ন করে রাজগণ বেদি নির্মাণ করবেন; অতঃপর পুরোধা (পুরোহিত) এই সূক্তদ্বয়ের দ্বারা আজ্য ও সঙ্কু আহুতি প্রদান করবেন। এই সূক্ত মন্ত্রে ধনু অভিমন্ত্রিত করে রাজাকে প্রদান করা কর্তব্য।…আভিচারিক কর্মকুশল ব্যক্তি উপযুক্ত সূক্তস্য বিনিয়োগঃ অংশে আরও বহু প্রকারে এই সূক্তের বিনিয়োগ প্রাপ্ত হবেন ৷ (৫কা, ১৩. ১সূ) ৷৷
সূক্তসার— এই (বরুণরূপী) ইন্দ্রদেব ধনবান্ এবং বলিষ্ঠ হওয়ার কারণে শ্ৰেষ্ঠ (বা উত্তম) বলে মান্য হয়ে থাকেন। তিনি প্রকটিত হওয়া মাত্রই শক্রবর্গকে সংহার করতে থাকেন বলে তার দ্বারা রক্ষিত সৈনিকগণ হর্ষে নিমগ্ন হয়ে থাকে। সম্পূর্ণ বিশ্ব ব্রহ্মে লীন হয়ে যায়। বৈতনিক বীর যুদ্ধ ইত্যাদিতে পরমাত্মাকে প্রার্থনা করে থাকে। বরুণরূপী পরমাত্মা জন্ম, সংস্কার ও যুদ্ধ-দীক্ষা এই তিন জন্ম হতে উৎপন্ন হয়ে ব্যাপক যজ্ঞানুষ্ঠানকে তাঁর মধ্যে মিলিত করে থাকেন। তার দ্বারা আমরা সকল বিপত্তিকে সমাপ্ত করে দিয়ে থাকি। যে গৃহে শ্রেষ্ঠ সাধারণ প্রাণীসমূহ পালিত হয়, যে গৃহে তারা অন্নের সাথে রক্ষিত হয়, সেখানে গতিমতী কালিকা মাতার শক্তি স্থাপিত হয়। স্বর্গপ্রাপ্তির অভিলাষী হয়ে রাজা মহান্ শ্লোকের দ্বারা বরুণকে প্রসন্ন করে থাকেন এবং বরুণদেব মেঘ-বর্ষণের দ্বারা জগৎকে পূর্ণ করেন। আপন দেহকে বরুণরূপী ইন্দ্র বলে মান্য করে মহর্ষি অথবা বলেছিলেন যে, পাপরহিত ভগিনীগণ এই (কালিকা মাতার) শক্তির দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে প্রসন্না হয়ে থাকেন। ১-৯।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— তদিদ আস ইতি সূক্তস্য বিনিয়োগ পূর্বসূক্তেন সহ উক্তঃ। তথা সফলকামোহনেন সূক্তেন ইন্দ্রাগ্নী যজতে উপতিষ্ঠতে বা। তৎ উক্তং কৌশিকেন।..ইত্যাদি ৷ (৫কা, ১অ, ২সূ)।
টীকা— এই সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ব সূক্তের সাথে উক্ত হয়েছে। তথা সর্বফল কামনায় এই সূক্তের দ্বারা ইন্দ্র ও অগ্নির উদ্দেশে যাগ করণীয়।….ইত্যাদি। (৫কা, ১অ. ২)।
সূক্তসার –অগ্নিদেব সংগ্রাম ক্ষেত্রে তেজস্বী হয়ে থাকেন। তিনি শত্রুগণের ক্রোধকে প্রশমিত করে থাকেন। ইন্দ্রের সাথে মরুৎ-বর্গ, বিষ্ণু ও অগ্নি ইত্যাদি দেববর্গ সমরভূমিতে আমাদের অনুকূল হয়ে থাকেন। দেবতাগণকে আহ্বান করে আমি ধনযুক্ত হবো। আমরা সন্তান এবং পশুসমূহ হতে, যেন বিযুক্ত না হই। শত্রুদের দ্বারা আমরা যাতে দুঃখপ্রাপ্ত না হই, সোমদেব তার ব্যবস্থা করুন। ভূমি-বিজেতা, ধন এবং অশ্বসমূহের বিজেতা শত্রুগণের সম্মুখবর্তী ইন্দ্রকে আমরা আহ্বান করছি। তিনি আমাদের স্তুতি শ্রবণ করুন এবং আমাদের প্রতি স্নেহশীল হোন ॥ ১-১১।
টীকা –দর্শপূর্ণমাসে সমিদাধানে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। তথা তেজোলাভের কর্মে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। পুষ্টিকর্মে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়। সম্পতি বিভাগের কর্মে কলহাভাব ইচ্ছা করে পিতা এই সূক্তের দ্বারা তৈলিকের রঞ্জু অভিমন্ত্রিত করে হস্তে ধারণ করে থাকেন। তথা আভিচারিক কর্মে এই সূক্তের দ্বারা বৃহস্পতিশির ওদন পৃষাতকের দ্বারা সিঞ্চন করণীয়। …অন্যত্রও ব্ৰতগ্রহণ ইত্যাদি কর্মে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয় ॥ (৫কা, ১৩. ৩সূ.)।
সূক্তসার –পর্বসমূহে উৎপন্ন কুষ্ঠ নামক বলশালী ঔষধি কঠিন রোগসমূহের নাশক। গরুড়ের প্রাকট্য স্থান হিমালয়ে উৎপন্ন এই ঔষধি ধনের সাথে প্রাপ্ত হয়ে থাকে। তৃতীয় আকাশে দেবস্থান অশ্বথে দেবগণ অমৃতের গুণসম্পন্ন কুষ্ঠকে জ্ঞাত হন। সুরর্ণময় মার্গ, সুবর্ণশালী নৌকা এবং স্বর্ণের দাঁড়ের দ্বারাই কুষ্ঠ গৃহীত হয়ে থাকে। আমাদের পুরুষগণকে এখানে আনয়ন করে কুষ্ঠ-ঔষধি আমাদের রোগ হতে মুক্ত করে আরোগ্য প্রদান করুক। হিমালয়ের উত্তর ভাগে কুষ্ঠ উৎপন্ন হয়ে পূর্বদিকস্থ মনুষ্যগণের নিকট আগত হয়েছে। শির-ব্যাধি, নেত্ৰ-ব্যাধি ও রোগেৎপত্তির নিমিত্ত পাপসমূহকে কুষ্ঠ-ঔষধি দেব-বল প্রাপ্ত করে বিনাশ করে দেয়।১-৯।
সূক্তসার –লাক্ষা চন্দ্রমার কিরণের দ্বারা পুষ্ট হয়ে থাকে, রাত্রি তার মাতৃস্বরূপা এবং বর্ষার দ্বারা উৎপন্ন হওয়ায় আকাশ তার পিতৃস্বরূপ হয়ে থাকে। লাক্ষা দেবতাগণের সিলচী নাম্নী ভগ্নীস্বরূপা। সে ঘা সমূহের উপায় স্বরূপা। লাক্ষা ব্রণশোধক এবং পূরক ঔষধি হওয়ার কারণে নিষ্কৃতি নামে অভিহিতা। লাক্ষা সুবর্ণ-বর্ণশালিনী, রোমশালিনী, সৌভাগ্যবতী, জলের ভগিনীর সমতুল্যা। বায়ু লাক্ষার আত্মার স্বরূপ। লাক্ষা অশ্বরক্তের বর্ণশালিনী এবং বৃক্ষসমূহের সিঞ্চনকারিণী ॥ ১-৯।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— শাস্ত্রাদ্যভিঘাতে রাত্রী মাতা ইতি সূক্তেন দুগ্ধে লাক্ষাং কাথয়িত্বা না অভিমন্ত্র পায়য়তি। তথা চ সূত্রং..ইত্যাদি। (৫কা, ১অ. ৫সূ)।
টীকা— শস্ত্র ইত্যাদির অভিঘাতে দুগ্ধে লাক্ষা পাক করে এই সূক্তের দ্বারা অভিমন্ত্রিত করে পান করণীয়।…ইত্যাদি। (৫কা, ১অ, ৫সূ.)।
সূক্তসার— অখিল বিশ্বের কারণরূপী পরব্রহ্ম সৃষ্টির আদিতে সূর্যরূপে প্রকট হয়েছেন। তার তেজ সকল দিকে ও সকল লোকে ব্যাপ্ত হয়ে থাকে। অভিচার কর্মের দ্বারা আমাদের সন্তানরূপ বীরগণকে বিনাশোদ্যত শত্রুগণকে আমরাও পরব্রহ্মের কৃপায় অভিচার কর্মের দ্বারা নিবৃত্ত করছি। অন্নের নিমিত্ত মেঘের নিকটে গমনশীল সেই সূর্যরূপী পরব্রহ্ম তাদের তাড়না করেন। এই অভিচার কর্মের দ্বারাই আমরা সিদ্ধি লাভ করি। এই অভিচার কর্মের দ্বারাই এই রাজা শত্রুনাশরূপ সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছেন। সোম রুদ্র ইত্যাদি দেবগণ অকথনীয় পাপ হতে আমাদের রক্ষা করুন। ইন্দ্রের গৃহরূপ অগ্নিদেব সর্বত্রগামী, সকলের আত্মা, সকলের শরীর এবং সকল পুরুষের রূপস্বরূপ হয়ে থাকেন। অগ্নিদেব ইন্দ্রের সুখস্বরূপ, তাঁর কবচরূপ ইত্যাদি। আমরা আপন নিধিসমূহের সাথে তার শরণ লাভ করে থাকি। অগ্নি হলেন ইন্দ্রের বরূথ স্বরূপ। আমরা তার শরণ গ্রহণ পূর্বক তাতে প্রবিষ্ট হচ্ছি ॥ ১-১৪।
টীকা –রোগীর আরোগ্য-বিজ্ঞান কর্মে এই সূক্তের দ্বারা তিনটি বরজু অভিমন্ত্রিত পূর্বক অঙ্গারে স্থাপন করণীয়। যদি অঙ্গারস্থ হয়ে সেগুলি ঊধ্বদিকে গমন করে, তবে রোগী জীবিত হবে বলে জ্ঞাত হওয়া যায়। তথা সংগ্রাম জয়ের নিমিত্ত বিজ্ঞান কর্মে এই সূক্তের দ্বারা স্নাবরজু অভিমন্ত্র করা হয়। তথা স্ত্রীলোকের প্রসবদোষে ও সূতিকারোগে এই সূক্তের দ্বারা অন্ন অভিমন্ত্রিত করে প্রদান কর্তব্য।…ইতাদি। (৫কা. ২অ. ১সূ)।
সূক্তসার –অরাতি (বা অদানী) আমাদের ধনযুক্ত করুক। অদানের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর অবৃদ্ধির ইচ্ছার নিমিত্ত এখানে হব্যান্ন লাভ করুক। দেবতাগণের প্রতি ভক্তি দিবা-রাত্র বৃদ্ধিলাভ করুক। অরাতি আমাদের হবিঃ প্রাপ্ত হোক। আমরা সকল অনুমতি, সরস্বতী ও ভগ দেবতার শরণ লাভ করে তাদের আহ্বান করি। অরাতির দুর্বলতা কারক ও পীড়াপ্রদতাকে আমরা জ্ঞাত আছি। তার বিনাশক শক্তিকে আমরা দূরীভূত করে দিচ্ছি। যার ব্যাপ্তির দ্বারা হিরণ্যবর্ণা পৃথিবী হিরণ্যকশিপুর বশীভূত হয়ে অসমৃদ্ধ হয়ে গিয়েছে, সেই রমণীয়তার নাশক অসমৃদ্ধিকে আমি নমস্কার করছি ॥ ১-১০।
টীকা— নির্ঋতি কর্মে এই সূক্তের দ্বারা শর্করামিশ্রিত ধান্যসমূহ আহুতি প্রদান করণীয়। তথা অর্থ-উত্থাপন বিঘ্নশমন কর্মে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে।…অগ্নিচয়নে বণীবাহন ক্রিয়ায় এই সূক্তটি যজমান কর্তৃক উচ্চারিত হয়।….ইত্যাদি। (৫কা, ২অ. ২সূ) ৷
সূক্তসার –অগ্নি বলবতী ঔষধির ইন্ধনের দ্বারা দেবগণকে ঘৃত প্রাপ্ত করান। ইন্দ্র আমার যজ্ঞে আগমন করে আমার স্তুতি সমূহ শ্রবণ করুন। এই যজ্ঞীয় ঋত্বিকগণের প্রযত্নে আমরা বীর্যবান হবো। ইন্দ্রদেব আমাদের শত্রুগণকে মথিত করুন। আমাদের শত্রুগণ আমাদের সম্মুখে যে যোদ্ধাবর্গকে স্থাপন করছে, বৃত্রনাশক ইন্দ্র তাদের পশ্চাদ্ভাগে অপসারিত করে দিন। তিনি এই যুদ্ধে উগ্র ভাবাপন্ন হয়ে সকল শত্রুকে বিচ্ছিন্ন করে দিন। আমরা ইন্দ্রের অনুগত হয়ে তার মতি অনুসারে বর্তমান থাকবো ॥ ১-৬৷৷
টীকা –সর্বরোগের ভৈষজ্যার্থে এই সূক্তের দ্বারা আজাহুতি প্রদান পূর্বক জলপাত্রে চতুর্বার সম্পাতিত করে দুটি পৃথিবীতে আনয়ন করে সম্পাতিত মৃত্তিকার সাথে জল অভিমন্ত্রিত করে ব্যাধিতের দেহে লেপন করণীয়…ইত্যাদি। (৫কা, ২৩. ৪সূ)।
সূক্তসার –প্রস্তরনির্মিত গৃহ আমাদের পূর্বদিকস্থ, দক্ষিণদিকস্থ, পশ্চিমদিকস্থ এবং উত্তর দিকস্থ শত্রুগণকে বিনাশ করুক। যে শত্রু ধ্রুব (অটল) দি হতে আমাদের বিনাশ করতে ইচ্ছা করে, তারা প্রস্তরনির্মিত গৃহে আগমন করে বিনাশপ্রাপ্ত হোক। প্রস্তরের গৃহ আমার হয়ে অবস্থান করে। যে দুষ্ট আমাকে বিনষ্ট করতে ইচ্ছা করে,যে পাপীগণ অন্তরিক্ষে আমাদের হত্যা করতে ইচ্ছা করে, তারা এই প্রস্তরের গৃহ প্রাপ্ত হয়ে বিনাশ প্রাপ্ত হোক। চন্দ্রমার দ্বারা মনকে আহ্বান করি। বায়ুর দ্বারা প্রাণাপানকে, সূর্যের দ্বারা চক্ষুকে, অন্তরিক্ষের দ্বারা শ্রোত্রকে ও সরস্বতীর দ্বারা বাক্ বা বাণীকে প্রার্থনা করছি৷৷ ১-৮৷৷
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— অশ্ববর্ম মেসি ইতি সূক্তেন পত্তনগ্রামগৃহস্বস্ত্যয়নার্থং যঙ অশ্মনঃ সম্পাতবতঃ কৃত্বা অভিমন্ত্র চতুর্য পত্তনাদিকোণেষু চতুরো নিখনতি একং মধ্যে নিথনতি একং পত্তনাপরিনিদ-ধাতি। তৎ উক্তং কৌশিকেন…যো মা দিশাং ইতি সপ্তমী ঋক্ পূর্বাং ঋচাং প্রত্যেকং দ্বিতীয় কার্যা। এবং ষড়ভি ষ সম্পাতাঃ কার্যা ইত্যর্থ। (৫কা, ২অ. ৫সূ)। টীকা –এই সূক্তের দ্বারা নগর, গ্রাম ও গৃহের স্বস্ত্যয়নার্থে ছয়টি প্রস্তর সম্পাতিত পূর্বক অভিমন্ত্রিত করে চতুষ্কোণে নিখনিত করা কর্তব্য এবং একটি মধ্যে ও একটি নগরাদির উপরে ধারণ করণীয়।…ইত্যাদি ॥ (৫কা, ২অ. ৫সূ)।
সূক্তসার –বলিষ্ঠ ও ধনদাতা বরুণদেবতা সূর্যের দক্ষিণা প্রদান পূর্বক মনের দ্বারা চিকিৎসা করে থাকেন। ঋত্বিগণ ও আমরা চাতুর্যের দ্বারা অগ্নির সমান সকলকে জ্ঞাত হয়ে থাকি। 2 বরুণদেব স্বধাযুক্ত হয়ে থাকেন। তিনি প্রাণীবর্গের সকল জন্ম বিদিত হয়ে থাকেন। রজোগুণ যুক্ত ধন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হলো সত্ত্বগুণ। বরুণদেব বারম্বার ধনপ্রাপ্তির অবসরের নিমিত্ত বাক্যবান হয়ে থাকেন। মনুষ্যের দ্বারা যুক্ত সকল দিকে বরুণের স্তোত্র ব্যাপ্ত হয়ে থাকে। বরুণ হলেন দেববন্ধু এবং আমাদের পিতৃসমান অর্থবা ঋষিকে জ্ঞাতশালী জনকে উৎপন্ন করেন। বরুণদেব আমাদের শ্রেষ্ঠ ধনে স্থাপিত করুন। আমরা বরুণদেবতার বন্ধু ও মিত্রস্বরূপ ॥ ১-১১।
টীকা –সর্বসম্পৎকর্মে এই সূক্তের দ্বারা মাদানক-কাষ্ঠ ঘর্ষণ পূর্বক দুগ্ধ ও জলে সম্পাতিত করে অভিমন্ত্রিত পূর্বক চমসের দ্বারা পান করণীয়।..ইত্যাদি। (৫কা, ৩অ. ১সূ)।
সূক্তসার— অগ্নিদেব মনুষ্যগণের যজ্ঞে প্রদীপ্ত হয়ে দেবতাবর্গের সাথে মিলিত হয়ে থাকেন। তিনি মিত্রগণের পূজক ও জ্ঞাতা। তিনি দেবতাগণের আত্মাতা। তিনি দেবগণের দূতস্বরূপ, ক্রান্তদর্শী ও মহান্ জ্ঞানশালী। তিনি সুজিহ্বাশালী, সত্যলোকের প্রাপকভাগী। বেদীরূপ ভূমিকে আচ্ছাদিত করণশালী আহুনীয় অগ্নি পূর্বাহ্নে বিস্তৃত হয়ে থাকেন। অগ্নির দীপ্তি উষা ও আহুতির দীপ্তি নক্তা যজ্ঞের সম্পাদন করে থাকেন এবং দেবগণের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকেন। বায়ু ও অগ্নি দিব্য হয়ে থাকেন, মনুষ্য হোতৃগণের দ্বারা মুখ্য রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকেন, সুন্দর বাণীশালী হয়ে থাকেন। তিনি হোতৃগণের উপর অনুগ্রহ করেন এবং আহ্বানীয় অগ্নিকে সেবার আদেশ দান করেন। যে ত্বষ্টা দেবতার দ্বারা দ্যাবাপৃথিবী ও সকল প্রাণীকে অগ্নিদেব অনেক রকম রূপ প্রদান করে থাকেন, সেই হোতারূপী অগ্নি আমাদের প্রেরণায়, সেই ত্বষ্টাকে পূজন করুন। এই অগ্নি প্রকট হওয়া মাত্রই যজ্ঞারম্ভ করে থাকেন। এই দেবাত্মক অগ্নির মুখ হতে স্বাহাকার যুক্ত হবিঃসমূহকে দেবগণ গ্রহণ করুন ॥ ১-১১।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –বশাশমনকর্মণি বপায়াশ্চত্বারি খণ্ডানি কৃত্বা সমিদ্ধো অদ্য ইতি সূক্তেন একং খণ্ডং জুহোতি। উধ্বা অস্য (৫২৭) ইতি সূক্তেন দ্বিতীয় খণ্ডং জুহোতি। যুক্তাভ্যাং সূক্তাভ্যাং তৃতীয় খণ্ড। অনুমতয়ে স্বাহেতি চতুর্থ খণ্ডং জুহেতি। তথা চ সূত্রং।…ইত্যাদি৷৷ (৫কা, ৩অ. ২সূ)।
টীকা –বশাশমন-কর্মে বপার চারিটি খণ্ড করে এই সূক্তের দ্বারা একটি খণ্ড গ্রহণ পূর্বক হোম করণীয়। দ্বিতীয় খণ্ডটি পঞ্চম অনুবাকের ষষ্ঠ অনুবাকের প্রথম সুক্তের দ্বারা হোম কর্তব্য। যুক্ত সূক্তের দ্বারা তৃতীয় খণ্ডটি এবং অনুমতির উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে চতুর্থ খণ্ডটির হোম করণীয়।..ইত্যাদি ॥ (৫কা, ৩অ. ২সূ)।
সূক্তসার— স্বর্গের দেবতা বরুণের উপদেশ ক্রমে আমি সর্পবিষকে দূরীভূত করে দিচ্ছি। জলের শোষণ (বা হনন) করণশালী সর্পের বিষকে আমি ভিতরেই প্রতিবন্ধতি করে দিচ্ছি। অন্ধকার হতে সূর্যোদয়ের সমান এই পুরুষ বিষমুক্ত হয়ে জীবিত হয়ে যাক। আমি আমার আপন নেত্রশক্তির দ্বারা সর্পের বিষ বিনাশ করছি। বিষের দ্বারা বিষকে বিনষ্ট করছি। কৃষ্ণকায় ও নিন্দনীয় সর্প আমার মিত্রের নিকটে যেন না থাকে। কৃষ্ণবর্ণশালী, গোলাকার স্থানে অবস্থানকারী, ববর্ণসম্পন্ন (অর্থাৎ পিঙ্গল বর্ণশালী), শুষ্কস্থানবাসী ও সাত্ৰাসাদ সর্পের ক্রোধকে, ধনুষের দ্বারা রোদন-উৎপাদনের ন্যায় তথা মরুভূমিতে রথের উত্তরণের ন্যায়, নিবৃত্ত করছি। ১-১১।
সূক্তসার –সুপর্ণ গরুড় ঔষধিকে প্রাপ্ত হয়েছিল এবং আদি বরাহ সেই ঔষধিকে নাসিকার আঘাতে মৃত্তিকা হতে খনন করে তুলেছিল। যারা কৃত্যাকর্মের দ্বারা অপরকে বধ করতে ইচ্ছা করে, যারা উৎপীড়ক রাক্ষস, তাদের সকলকেই ঔষধি বিনাশ করে থাকে। ঔষধিই কৃত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কৃত্যাকারীদের প্রেরণ করে। কৃত্যা হলো সংহার-সাধন এক শক্তি। সে অপকর্তাদের ক্ষতিসাধন করে থাকে। সুন্দর পথে যেমন রথ চলতে থাকে, তেমনই কৃত্যা প্রেরকের উপর কৃত্যা ঘূর্ণন করতে থাকে। ইন্দ্রদেবও এই কৃত্যার কামনা করেন। পিতার নিকট পুত্রের গমনের মতো কৃত্যা আপন উৎপত্তিকর্তার নিকট গমন করে এবং সেই উৎপত্তিকর্তার ইচ্ছানুসারেই অপর কৃত্যাকারীকে সর্পদংশনের দ্বারা নিহত করে। যেমন হস্তিনী, মৃগী এবং এণীমৃগের উপর আক্রমণ চি করে, তেমনই কৃত্যাকারীর উপর কৃত্যা ঝাঁপিয়ে পড়ে ॥ ১-১৩ ৷৷
টীকা –এই সূক্তটি কৃত্যাপ্রতিহরণগণে বিনিযুক্ত হয়। দ্বিতীয় কাণ্ডের তৃতীয় অনুবাকের প্রথম সূক্তে কৃত্যা-পরিহারের জন্য যে বিনিয়োগের বিধান আছে, তা এখানেও প্রযোজ্য। (৫কা, ৩কা. ৪সূ)।
একা চ মে দশ চ মেহপবক্তার ওষধে।। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ ॥ ১ দে চ মে বিংশতিশ্চ মেহপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ ॥ ২॥ তিশ্চ মে ত্রিংশচ্চ মেহপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ ৷ ৩৷৷ চতশ্চ মে চত্বারিংশচ্চ মেহপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ ॥ ৪৷ পঞ্চ চ মে পঞ্চাশচ্চ মেহপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ ॥ ৫॥ ষট চ মে ষষ্টিশ্চ মেহপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ ॥ ৬. সপ্ত চ মে সপ্ততিশ্চ মেহপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ ॥ ৭৷৷ অষ্ট চ মেহশীতিশ্চ মেহপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ। ৮নব চ মে নবতিশ্চ মেহপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ ॥ ৯৷৷ দশ চ মে শতং চ মেহপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ। ১০। শতং চ মে সহস্রং চাপবক্তার ওষধে। ঋতজাত ঋতাবরি মধু মে মধুলা করঃ ॥ ১১।
সূক্তসার –যজ্ঞের নিমিত্ত উৎপন্ন ওষধি, আমার নিন্দাশীল হলেও এক, দশ বা একাদশ, যাই হোক তবু মধুর হোক; অতএব আমার শব্দকেও মধুর করুক। ওষধি ঋতু অনুসারে উৎপন্ন হয়ে থাকে। ওষধি জলেও উৎপন্ন হয়। যত সংখ্যাতেই তা উৎপন্ন হোক না কেন, আমার নিকদেরও যেন তা মিষ্টভাষী করে দেয় (অথবা নিন্দকেরা যত সংখ্যাবান্ হোক না কেন, ওষধি যেন আমাকে মিষ্টভাষী করে দেয়)। হে ঋতাবরি ওষধি! আমার নিন্দকগণ শত বা সহস্র, যা-ই হোক না কেন, তুমি আমাকে মিষ্টভাষী করে গঠন করো। (অর্থাৎ যদি কোন শত্রু আমাদের নিন্দা করতে থাকে, তবে তাকে মধুর ভাষণ অথবা সত্য-বচনের দ্বারা সংশোধন করাই শ্রেষ্ট উপায়। মধুর-ভাষীর কেউই বিরোধী থাকতে পারে না ॥ ১-১১।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –গবাং লোগোপশমনপুষ্টিপ্রজননকর্মসু একা চ মে ইতি সুক্তেন অভিমন্ত্রিত সলবণং কেবলং বা উদকং গাঃ পায়য়েৎ। তদ্ উক্তং কৌশিকসূত্রে।…ইত্যাদি। (৫কা, ৩অ. ৫সূ)। টীকা –গাভীগণের রোগ উপশম, পুষ্টিসাধন ও প্রজনন কর্মে এই সূক্তের দ্বারা অভিমন্ত্রিত লবণযুক্ত জল অথবা কেবল জল গাভীকে পান করানো কর্তব্য। নিন্দুক ব্যক্তির মুখ-স্তম্ভনের নিমিত্তও এই সূক্তের বিনিয়োগ প্রচলিত আছে।…ইত্যাদি ॥ (৫কা, ৩অ. ৫সূ)।
যদ্যেকবৃষোহসি সৃজারসোহসি ॥১॥ যদি দ্বিবৃষোহসি সৃজারসোহসি ॥ ২॥ যদি ত্রিবৃষোহসি সৃজারসোহসি ॥ ৩৷৷ যদি চতুৰ্বমোহসি সৃজারসোহসি ॥ ৪৷৷ যদি পঞ্চবৃষোহসি সৃজারসোহসি ॥ ৫৷৷ যদি ষড়বৃষোহসি সৃজারসোহসি ॥ ৬৷৷ যদি সপ্তবৃষোহসি সৃজারসোহসি ॥৭॥ যদ্যষ্টব্যােহসি সৃজারসোহসি ॥ ৮যদি নববৃষোহসি সৃজারসোহসি ॥৯॥ যদি দশবৃষোহসি সৃজারসোহসি ॥ ১০ যদ্যেকাদশোহসি সোপোদকোহসি। ১১।
সূক্তসার –লবণ এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ বা একাদশ সংখ্যক ॥ বৃষভের সমান শক্তিশালী হলেও তার দ্বারা গাভীবর্গের সন্তান উৎপাদন-জনক সামর্থ্য থাকে না; সে বরং তা কতটা প্রভাবহীন, তা বোধগম্য হওয়া যায়। (মনুষ্যের দশটি ইন্দ্রিয় থাকে, যার প্রতিটিই যথেষ্ট শক্তি বা সামর্থ্য রেখে থাকে। দেহস্থ আত্মাকে সেগুলির দ্বারাই কল্যাণ-সাধনায় নিয়োজিত করা প্রয়োজন) ॥ ১-১১
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— যদ্যেকবৃষোসি ইতি সূক্তস্য পূর্বসূক্তেন সহ উক্তো বিনিয়োগঃ। .. ইত্যাদি। (৫কা. ৪অ. ১সূ)।
টীকা –এই সূক্তটি পূর্ব সূক্তের সাথে বিনিযুক্ত হয়। .ইত্যাদি। (৫কা. ৪অ. ১সূ)।
সূক্তসার— ব্রহ্ম ও ব্রাহ্মণ একই। সূর্য, বরুণ, বায়ু, চন্দ্র-আপোদেবী এই দেবতাগণ ব্রহ্মার পূর্বে উৎপন্ন হয়ে ব্রাহ্মণের অপরাধ-করণের বিষয় বলেছিলেন। প্রথমে সোম ব্রহ্মকে উৎপন্ন করণশালিনী গাভী দান করেছিলেন; সেইকালে বরুণ ও সূর্য তার সহগামী এবং অগ্নি ছিলেন হোতা। আমরাই ব্রহ্মের উৎপাদনকারী–তারা এমন সঙ্কল্পই গ্রহণ করেছিলেন। ফলে ক্ষত্রিয়ের রাজ্য রক্ষিত হয়। ব্রহ্মচারী দেববর্গের অঙ্গস্বরূপ। দেবতাগণ যেমন সোমের চমস প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তেমনই ব্রহ্মচারীদের দ্বারাই বৃহংস্পতি তার জায়াকে অর্থাৎ ব্রহ্মজায়াকে লাভ করেন। স্বর্গস্থিত সপ্তর্ষি ও দেবগণ ব্রহ্মজায়ার চর্চা করলেন। সংসারে তখন বিপর্যয় ইত্যাদি দেখা দিলো–এ সবই ব্রহ্মজায়ার কীর্তি। ব্রহ্মজায়ার অব্রাহ্মণ পালিকাদের মধ্যে ব্রাহ্মণগণ প্রায় সকলেরই পাণিগ্রহণ করেন। এই গাভীর পতিও ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য নয়। রাজা, মনুষ্য ও দেবতাগণ সত্যকে স্বীকার করেই গো-কে বারংবার ব্রাহ্মণদের প্রদান করেন। দেবতাগণ ব্রহ্মজায়াকে পবিত্র অন্ন প্রদানের জন্য পরমাত্মার উপাসনা করতে লাগলেন। ব্রাহ্মণের স্ত্রী ও গাভীগণ প্রতিবন্ধকতা পেলে রাজ্যবাসিনী কল্যাণকারিনী রমণীগণ সুখী হন না, পুরুষগণ হীনতা প্রাপ্ত হয়, ইত্যাদি। গাভীগণও অনাদৃত হলে রাজ্যব্যাপী দুগ্ধাভাব ঘটে, ইত্যাদি। স্ত্রীরহিত হয়ে ব্রাহ্মণ অন্যত্র রাত্রিবাস করলে, সেখানে গাভীগণও কল্যাণকারিণী হয় না, বৃষভও ভার বহনে পরাঙুখ হয়, ইত্যাদি। (এই সূক্তটিতে স্ত্রীর চরিত্র ও পবিত্রতা রক্ষার মহত্ব বলা হয়েছে। কারণ যেখানে পুরুষগণ নারীবর্গের চরিত্র রক্ষায় তৎপর হয়, সেই দেশ ও জাতির উন্নতি হয়ে থাকে; আর যেখানে বিপরীত আচরণ করা হয়, সেখানকার সমাজ পতনের মুখে অগ্রসর হতে থাকে)। ১-১৮
সূক্তসার –গো-কে দেবতাগণ ভক্ষণের নিমিত্ত প্রদান করেননি। (এখানে গো-এর অর্থে বাণী অথবা ভূমিও ধরা হয়)! আত্ম-পরাজিত, ইন্দ্রিয়দ্রোহী রাজা ব্রাহ্মণের গো-ভক্ষণ করলে পাপী হয়। ব্রাহ্মণের পদার্থকে নিজের ভক্ষ্য মনে করলে তা বিষপান-তুল্য হয়। ব্রাহ্মণকে মৃদু মনে করে অজ্ঞানী ব্রাহ্মণের ক্ষতিকারী ব্যক্তি দেব-হিংসক, রূপে প্রতিভাত হয়। নিজের বিনাশ ইচ্ছা না করলে অগ্নিরূপ ব্রাহ্মণের ক্ষতি করা উচিত নয়। সোম ব্রাহ্মণের পুত্র; ইন্দ্র ব্রহ্মশাপকে পূর্ণ করেন। ব্রাহ্মণের তপোময় দন্ত বাণের ন্যায় তীক্ষ্ণ। ব্রাহ্মণ আপন তপস্যা ও ক্রোধের তীক্ষ্ণ বাণ নিক্ষেপে দেব-হিংসকগণকে বিদ্ধ করে থাকেন। ব্রাহ্মণের গো ইত্যাদি অপহরণের অপরাধে বীতহব্য বংশজ সহস্র রাজা ভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছেন। ব্রাহ্মণ-হিংসক বহু জন বিষের দ্বারা জীর্ণ হয়েছে। দেব-বন্ধু ব্রাহ্মণের বিনাশক ব্যক্তি পিতৃযান পথে গমন করতে সক্ষম হয় না। অগ্নি, সোম, ইন্দ্রদেব–এঁরা ব্রাহ্মণের একান্ত আপন জন–এ কথা জ্ঞানীজন জানেন৷ ১-১৫৷৷
টীকা –গো-হরণ, মারণ, বিশসন, অধিশ্রয়ণ, পচন-ভক্ষণ প্রভৃতি কর্মে অভিচারকামী ব্রহ্মচারী এই সূক্তটি, এর পরবর্তী সূক্তটি এবং দ্বাদশ কাণ্ডের পঞ্চম অনুবাকের প্রথম সূক্তটির দ্বারা মনে মনে জপ করবেন।…ইত্যাদি৷৷ (৫কা. ৪অ. ৩সূ)।
সূক্তসার –বুদ্ধিশীল হয়েও সৃঞ্জয় ব্রাহ্মণ ভৃগুবংশীয়গণের প্রতি হিংসান্বিত হওয়ায় স্বর্গলাভ হতে বঞ্চিত হয়েছিলেন। বৃহৎসাম-শালী অঙ্গিরাগণের প্রতি আপত্তিকারক মনুষ্যদের সন্তানগণকে দেবগণ বিদূরিত করে দিয়েছিলেন। যারা ব্রাহ্মণের নিকট হতে কর আদায় করে, এবং তাদের উপর থুৎকার করে, তারা রক্তময় নদীর মধ্যস্থ বালুকার খাতে পড়ে থাকে। যে রাষ্ট্রে ব্রাহ্মণের গো-সমূহ ছটফট করে, সেই রাষ্ট্রের তেজ তাতেই নাশপ্রাপ্ত হয়। সেখানে বীর্যশালী বীর উৎপন্ন হয় না। গো-কে কর্তন ক্রুর কর্ম; এর মাংস মরণোত্তর তৃষ্ণার উৎপাদক। যে রাজা ব্রাহ্মণকে নষ্ট করে, যেখানে ব্রাহ্মণ দুঃখী হয়ে থাকে, সেই রাজা বিনাশপ্রাপ্তই হয়ে যায়। ব্রাহ্মণের উপর আরোপিত বিপত্তি রাজ্যকে বিনাশ করে। (হে নারদ!) যে জন ব্রাহ্মণের ধনকে নিজের মনে করে, বৃক্ষও তাকে আপন ছায়া দানে বিরত থাকে। বরুণ বলেছেন–ব্রাহ্মণের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া বিষপানের তুল্য। অগণিত শক্তিশালী বীর, যাদের ভয়ে পৃথিবী কম্পিত হতো, ব্রাহ্মণ সন্তানদের বিনাশ করার ফলে সকলেই পাপের দ্বারা পরাস্ত হয়েছিল। কৃপাপাত্ররূপে ব্রাহ্মণের অশ্রুরূপ যে জল, সেই জল দেবতাগণ ব্রাহ্মণবিদ্বেষীদের জন্য নিশ্চিত করে রক্ষা করে থাকেন। ব্রাহ্মণকে দুঃখদানকারী রাজ্যের দিকে সূর্য ও বরুণ বর্ষা দান করেন না। সেই রাজা সভায় সামর্থ্যহীন হয়ে ই থাকে; তার সৈন্যগণ মিত্রদেরও বশে রাখতে অক্ষম হয় ॥ ১-১৫৷৷
সূক্তসার— দুন্দুভি (বৃহৎ ঢাক) বনস্পতির দ্বারা নির্মিত এবং উচ্চ স্বরসম্পন্না। সে উচ্চ নির্ঘোষে শত্রুদের মর্দন করে এবং সিংহের ন্যায় গর্জন করে। দুন্দুভি বৃক্ষের ন্যায় আয়ুশালিনী। দুন্দুভি বীর্যবর্ধক, তার শত্রু নিবীর্য হয়ে থাকে। ইন্দ্রের তুল্য বলশালিনী। দুন্দুভি শত্রু-হৃদয়কে সন্তাপিত করে এবং সেনাগণকে গ্রহণ করে অনেক প্রকার শব্দ করে; সে দিব্যবাণী উচ্চারিত করে থাকে। দুন্দুভির গর্জনে সচেতন হয়ে শত্রুগণের স্ত্রী যুদ্ধস্থলে আগতা হয়ে হত্যারাশি দর্শন করে ভীতস্তা হয়ে পুত্রের হস্ত ধারণ করে যাচনাপূর্বক পলায়িতা হয়ে যায়। দুন্দুভির ধ্বনি প্রথমেই উৎসারিত হওয়ায় শত্রুগণের সেনাকে প্রথমেই বিনষ্ট করে থাকে। দুন্দুভি পৃথিবীতে আপন সত্যবাক্যের প্রসার করে। দুন্দুভির ধ্বনি দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যে অনেক রূপে প্রসারিত হয়। বুদ্ধিপূর্বক রচিতা দুন্দুভি সুন্দর শব্দ উৎসারিত করে। দুন্দুভি স্বপক্ষীয় বীরবর্গকে আহ্বান করে মিত্রবর্গের দ্বারা শত্রুগণকে সংহার করায়। দুন্দুভি ধনদাত্রী এবং সেনাগণকে সাহস-প্রদায়িনী। দুন্দুভি কল্যাণ-শালিনী, মন্ত্রের দ্বারা তীক্ষ্ণীকৃতা এবং বলবতী। দুন্দুভি শত্রুবর্গের ধনের উপর অধিকারশালিনী। দুন্দুভি হর্ষে পরিপূর্ণ হয়েও স্থানচ্যুত হয় না। দুন্দুভি ইন্দ্রের দ্বারা রচিতা, অতএব সে শত্রুগণের হৃদয়কে প্রজ্বালিত করে তাদের প্রাপ্ত হয় (বা জয় করে) ॥ ১-১২৷৷
টীকা –এই সূক্তটির দ্বারা ত্রাসন ও পরসেনা-বিদ্বেষণ কর্মে ভেরী ইত্যাদি বাদ্য প্রক্ষালন পূর্বক তগর উশীরের দ্বারা লেপন করে পুরোহিত তিন বার বাদন করে বাদককে প্রদান করবেন। তথা, মহাব্রতে এই সূক্তের দ্বারা ভূমিদুন্দুভির তাড়না করণীয়।…ইত্যাদি ॥ (৫কা. ৪অ. ৫সূ)।
সূক্তসার –দুন্দুভি শত্রুদের মধ্যে পরস্পর বিদ্বেষের প্রসার ঘটাক। আমরা আমাদের প্রতি বৈরভাবাপন্নদের যেন তিরস্কার করতে পারি। আমাদের শত্রু ঘৃতাহুতির দ্বারা কম্পিত হোক। দুন্দুভি বনস্পতির দ্বারা নির্মিত এবং চর্মমণ্ডিত। দুন্দুভি মেঘের মতো শব্দ করে থাকে। দুন্দুভি ঘৃতের দ্বারা অভিধারিত এবং তার ধ্বনি শত্রুর ত্ৰাসজনক। শিকারীর দ্বারা বন-মৃগের ভয়ভীত হওয়ার সমান দুন্দুভি গর্জন করে শত্রুদের মনকে মোহিত করে দিক। যেমন মেষ (ভেড়া) অজ (ছাগল) ইত্যাদি পশু নেকড়ে বাঘের ভয়ে পালিয়ে যায়, দুন্দুভির শব্দে ভীত হয়ে শত্রুগণ সেইভাবেই পলায়ন করুক। বাজ হতে পক্ষীগণ ও সিংহ হতে অপর প্রাণীগণ যেমন ভয়ভীত হয়ে থাকে, দুন্দুভি শত্রুর অভিমুখে গর্জন করে সেইভাবেই ত্রাসিত করুক। যুদ্ধের অধিপতি দেবতা হরিণ চর্মে আবৃত। দুন্দুভির শব্দে শত্রুগণকে ভয়ভীত করে দিয়েছিলেন। শত্রুসেনাদল পরাজিত হয়ে যেদিকে অবস্থান। করছে, সেই দি অভিমুখে আমাদের দুন্দুভি গর্জন করতে থাকুক। সূর্য আমাদের শত্রুদের দৃষ্টিশক্তি গ্রহণ করুন এবং কিরণ তাদের পশ্চাতে ধাবিত হতে থাকুক। মরুৎ-দেবগণ উগ্রকর্মা হোন; রাজা সোম, বরুণ, মহাদেব, মৃত্যু ও ইন্দ্রদেব তাঁদের সঙ্গী হয়ে শত্রুদের মর্দন করুন। সমান চিত্তশালী, সূর্যের পতাকা বহনকারী দেবসৈন্যগণ আমাদের শত্রুদের উপর বিজয় প্রাপ্ত হোক। আমাদের এই আহুতি তাদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হোক॥ ১-১২।
টীকা –এই সূক্তের দ্বারা শত্রুসেনার ত্ৰাসন ও বিদ্বেষণ কর্মে সকল বাদ্যকে (দুন্দুভিকে) প্ৰক্ষালিত করে তগর উশীরের দ্বারা লেপন করে তিনবার বাজিয়ে পুরোহিত বাদককে প্রদান করবেন। তথা, এই সুক্তের দ্বারা সোমাঙ্কুরমণি হরিণচর্মে বেষ্টিত করে অভিমন্ত্রিত পূর্বক বন্ধন করণীয়..ইত্যাদি। (৫কা. ৪অ. ৬সূ)।
সূক্তসার –অগ্নি, সোম, ইন্দ্র, বরুণ, বেদী, বৰ্হি ও সমিধগুলি প্রজ্বলিত হয়ে তক্সকে (জুরকে) অবরোধ করুক এবং আমাদের শত্রু এই স্থান হতে পলায়ন করুক। জ্বর দেহকে কষ্টদানকারী; সকল মানুষকে অগ্নিতুল্য সন্তাপিত করে থাকে, অতএব সে তিরস্কৃত, নির্বল এবং অধম স্থান প্রাপ্ত হোক। আমি জ্বরকে প্রণাম করছি এবং তাকে নিম্নস্থানে প্রেরণ করছি। মুষ্টির আঘাতের ন্যায় প্রহারক জ্বরের স্থান মুঞ্জের সাথে যুক্ত; বীর্যকে অধিকরূপে বর্ষণকারী পুরুষ তার গৃহস্বরূপ। জ্বর জীবনকে সর্পের ন্যায় কষ্টদায়ক। সে চৌর্যশালিনী দাসীর সাথে বজ্ররূপে মিলিত হয়ে তাকে আমার নিকট হতে দূর করে দিক। জ্বর জীবনকে দুঃখীকরণশালী। সে মুঞ্জশালী প্রদেশ অথবা বাহ্বীক প্রদেশে বা সেগুলি অপেক্ষাও দূরে গমন করুক। জ্বর প্রথম অবস্থাশালিনী শূদ্রার সাথে মিলিত হয়ে তাকেই কম্পায়মান করুক। আমরা মুঞ্জযুক্ত বা মহাবৃষ্টি-যুক্ত স্থানে গমনের নিমিত্ত জ্বরকে বলছি। সে সেখানে গমন করে তার বন্ধুবর্গকে ভক্ষণ করুক। সে অন্য ক্ষেত্রে পরিক্রমণ করুক। জ্বর শীতের সাথে প্রবল হওয়ার যোগ্য, সে কাসের (কাসব্যাধির) সাথে কম্পিত করণশালী। তক্স হলো শীত-জ্বর। সে যেন কাশি ও বলক্ষীণ-কারক ব্যাধিগুলিকে আমাদের কখনও মিত্র না করে দেয়। বলকে ক্ষীণ-করণশালী ব্যাধিরূপ তার ভ্রাতা ও কাশি তার ভগিনী এবং পাপ রূপ তার ভ্রাতুস্পুত্র। এইগুলিকে নিয়ে সে যেন দুষ্ট পুরুষকে প্রাপ্ত হয়। হে দেব! তুমি এ্যহিক (যে জ্বর তিন দিন অন্তর আসে), চৌগাহিক (যে জ্বর চার দিন অন্তর আসে), বর্ষা, শরৎ ও গ্রীষ্মের তথা শীত ও প্রচলিত জ্বরের নাশ করো। আমরা কষ্টদায়ক এই ব্যাধিকে দূরস্থ দেশে প্রেরণ করে মনুষ্যগণকে সুখী করছি।
সূক্তসার –দ্যাব-পৃথিবী, সরস্বতী, ইন্দ্র ও অগ্নি আমাতে ওতপ্রোত হয়ে কৃমিগণকে বিনাশ করুন। পরমৈশ্বর্যবান্ ইন্দ্র আমার কুমারের শত্রুরূপী এই কৃমিগুলিকে আমার উগ্র বচনের (বা মন্ত্রের) দ্বারা নষ্ট করে দিন। নেত্রে পরিক্রমণকারী, নাসিকার ছিদ্রে চলাচলকারী তথা দন্তের মধ্যে অবস্থানকারী কৃমিগুলিকে আমরা বিনাশ করছি। দুটিই একরূপশালী, দুটিই বিকট রূপশালী, দুটি রক্তবর্ণশালী, এক ধূসর বর্ণশালী, একটিমাত্র কর্ণশালী, একটি গৃধ্র নামক তথা একটি ব্যাঙ নামক এই সকল কীটই মন্ত্রবলে বিনাশপ্রাপ্ত হোক। তীক্ষ্ণ কুক্ষিশালী, কৃষ্ণ এবং বহু রূপশালী কীটগুলিকে আমরা মন্ত্রবলে বিনষ্ট করছি। সকল প্রাণীর দর্শনীয় সূর্যদেব অদৃষ্ট কীটসমূহকে বিনাশ করছেন। তিনি সেই সকল দৃশ্য, অদৃশ্য সকল প্রকার কৃমিকে হনন পূর্বক পূর্ব হতেই উদয় হয়ে থাকেন। দ্রুতগামী, সন্তাপপ্রদ, কম্পিত-করণশালী, তীক্ষ্ণ, দৃশ্য বা অদৃশ্য সব কীটকেই তিনি নষ্ট করুন।
তীক্ষগামী কৃমি মন্ত্র-শক্তিতে বিনাশ প্রাপ্ত হয়েছে। তিন-শির, তিন ককুদ (পৃষ্ঠ), শবলবর্ণ ও কি শ্বেতবর্ণ-শালী কৃমিসমূহকে আমরা মন্ত্রশক্তির দ্বারা নষ্ট করে দিয়েছি। মহর্ষি অত্রি, কথ ও জমদগ্নি এর যেভাবে মন্ত্রশক্তির দ্বারা কীটগুলিকে বিনাশ করেছিলেন, আমিও সেইভাবেই করছি। অগস্ত্য ঋষির মন্ত্রশক্তিতে আমি কীটগুলিকে বিনাশ করছি। কৃমিবর্গের রাজা ও মন্ত্রীও আমাদের মন্ত্র ও ঔষধির প্রভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মাতা, ভ্রাতা, ভগিনীর সাথে কৃমিগণের সম্পূর্ণ কুটুম্ববর্গ ও নাশ প্রাপ্ত হয়েছে। সকল স্ত্রী ও পুরুষ কৃমিকে প্রস্তরাঘাতে বিনষ্ট করে আমি অগ্নিতে তাদের মুখ দগ্ধ করছি। ১-১৩৷৷
টীকা— কৃমির ভৈষজ্য কর্মে এই সূক্তের দ্বারা কবরীমূল অভিমন্ত্রিত করে কৃমিরোগাক্রান্তকে ধারণ, করানো কর্তব্য। তথা, এই সূক্তের দ্বারা গাভীর লোমের সাথে করীরকাষ্ঠ বেষ্টিত করে সূক্তমন্ত্র জপ পূর্বক প্রস্তরের দ্বারা চূণীকৃত করে অগ্নিতে তাপ প্রদান করে সূক্ত পাঠ করতে করতে ধারণ কর্তব্য। তথা এই সূক্তের দ্বারা গ্রাম্য পশুগণকে অভিমন্ত্রিত করে বাম হস্তের দ্বারা দক্ষিণমুখী হয়ে ধূলি পরিষ্কার করে দিতে হয়। তথা এই সূক্তের দ্বারা ধূলি অভিমন্ত্রিত করে হস্তের দ্বারা মথিত করে ক্ষেপন কর্তব্য। এই সূক্তের দ্বারা শান্তিবৃক্ষের সমিধ আধান করণীয়। এতেই কৃমিভঞ্জন হয়ে থাকে।….ইত্যাদি। (৫কা, ৫অ. ২সূ)।
টীকা— পৌরোহিত্য করার নিমিত্ত এই সূক্তের দ্বারা শূদ্র কর্তৃক আহৃত সমিধ গ্রহণ করণীয়। বিবাহ সম্পকীয় আজ্যহোমে উপযুক্ত সূক্তটির বিনিয়োগ হয়ে থাকে। এই সূক্তটি চাতুর্মাস্যে বৈশ্যদেব পর্বে সাবিত্র যাগেও বিনিযুক্ত হয় ॥ (৫কা, ৫অ. ৩সূ)।
সূক্তসার –পর্বতের ঔষধি, স্বর্গের পুণ্য ও অঙ্গের শক্তির দ্বারা পুষ্ট বীর্যকে ধারণশালী পুরুষ, জলে পত্র নিক্ষেপের ন্যায় গর্ভাধান করে থাকে। সকল প্রাণীর গর্ভকে যেমন পৃথিবী ধারণ করেন, সেইরকমেই আমি (পুরোহিত) তোমার (অর্থাৎ নবগর্ভা রমণীর) গর্ভধারণ করছি; তার রক্ষার জন্য (দেবগণকে) আহ্বান করছি। সিনীবালী, সরস্বতী, পুষ্পমাল্যধারী অশ্বিদ্বয়, মিত্রাবরুণ, বৃহস্পতি, ইন্দ্র, অগ্নি ও ধাতা তোমার (অর্থাৎ নবগর্ভা রমণীর) গর্ভকে পুষ্ট করুন। ত্বষ্টা গর্ভস্থ পুত্রের রূপ রচনা করুন, প্রজাপতি সিঞ্চন করুন; বিষ্ণু তোমার জননেন্দ্রিয়কে সমর্থ করুন ও ধাতা তোমার গর্ভকে পুষ্ট করুন। বরুণ, সরস্বতী ও ইন্দ্র যে গর্ভকরণকে জ্ঞাত আছেন, তুমি সেই গর্ভকারক বস্তুকে পান করো। অগ্নি ঔষধির বনস্পতিসমূহের ও সকল ভূতজাতের গর্ভস্বরূপ, অতএব তিনি এই সান্ত্বনাময়ীর (গর্ভিণীর) গর্ভকে পুষ্ট করুন। সোমপায়ী দেবতাগণ একে ইহলোক ও পরলোকে রক্ষাকারী পুত্র প্রদান করেছেন। ধাতা, ত্বষ্টা, সবিতাদেব, প্রজাপতি প্রমুখ দেবগণ এই গর্ভিণীর গর্ভস্থ পুত্র যাতে দশম মাসে নির্বিঘ্নে বিনাকষ্টে প্রসবিত হতে পারে, তার ব্যবস্থা করুন। (এই সূক্তে গর্ভের সুরক্ষার নিমিত্ত পরমেশ্বর ও অপরাপর দেবতাগণের নিকট প্রার্থনা করা হয়েছে। তার সাথে সাথেই পুত্র উৎপত্তিরও প্রার্থনা জ্ঞাপিত হয়েছে। এই রকম ভাবনার সাথে গর্ভাধান হলে ভাবী সন্তানের উপর মানসিক শক্তির কল্যাণকারী প্রভাব পড়ে থাকে) ॥১-১৩।
টীকা— গর্ভধান নামে আখ্যাত কর্মে এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা আগমকৃশর চরুদ্বয় পাক করে অভিমন্ত্রিত পূর্বক দ্বিতীয় চরু ভক্ষণ করানো কর্তব্য। এছাড়া এই সূক্তমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত ঔষধি শিল্পে লেপন করে মৈথুন করা সম্পর্কে বিধি আছে ॥ (৫কা, ৫অ. ৪সূ)।
সূক্তসার— জ্ঞাতা অগ্নি এই যজ্ঞে যজুমন্ত্র ও সমিধগুলিকে মিলিত করুন। সূর্য এই যজ্ঞে সম্মিলিত হোন। উথরসের সাথে ইন্দ্রদেব এই যজ্ঞে মিলিত হোন। শিষ্ট মনুষ্যবর্গ তাদের পত্নীগণের সাথে এই যজ্ঞ সমূহে আদিষ্ট হোক। মাতার দ্বারা পুত্রকে পালন করার ন্যায় মরুৎ-গণ সংযুক্ত হয়ে এই যজ্ঞে ছন্দসমূহকে পালন করুক। কুশা ও প্রাক্ষণীয়সমূহের সাথে বর্ধন-কারিণী এই অতিথি দেবী যজ্ঞে আগত হয়েছেন। উত্তম প্রকারে তপস্যার সাথে যজ্ঞের ফলকে মিলিতকরণের জন্য ভগবান বিষ্ণু এই যজ্ঞে সমাগত। উত্তম প্রকারে নির্ধারিত কর্মগুলি যজ্ঞে সংযুক্তকরণের নিমিত্ত ত্বষ্টা দেব এইস্থানে উপনীত। ভগদেবতা শোভন আশীর্বাদের সাথে এই যজ্ঞকে মিলিত করুন। সোমদেব এই যজ্ঞে সংযোগশালী জলরাশিকে মিলিত করবেন। ইন্দ্র এই যজ্ঞে যজ্ঞানুরূপ বীর্যসমূহকে সংযুক্ত করুন। বৃহস্পতি মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞের সম্মুখে আগমন করুন। অশ্বিনীকুমার যুগলও যজ্ঞের বৃদ্ধি সাধনের উদ্দেশে সম্মুখে আগমন করুন। এই যজ্ঞ যজমানের কল্যাণকারী হোক। সকল দেবতার উদ্দেশে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদত্ত হচ্ছে ॥ ১-১২।
সূক্তসার –অগ্নির বীর্য তেজঃ-যুক্ত এবং তার সমিধগুলি উচ্চতম হয়ে থাকে। ইনি অত্যন্ত প্রদীপ্ত, সুন্দর এবং সূর্যের সমতুল্য। যজ্ঞে এই প্রাণদাতার অনেক হস্ত রয়েছে। অগ্নি দেবতাগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং মধু ও ঘৃতের দ্বারা দেবমার্গের শোধনকারী। শোভন কর্মশালী তথা মনুষ্যবর্গের শ্লাঘনীয় সবিতাদেব ও জগৎ-সংসারের বরণীয় অগ্নিদেব, যজ্ঞকে মধুযুক্ত করে ব্যাপ্ত হয়ে থাকেন। ঘৃত ও হব্যান্নের সাথে স্তুতিসমূহকে লাভ করে অগ্নিদেবতা সম্মুখে আগমন করেন। অগ্নিদেব দেবগণের অধিক সঙ্গতিসম্পন্ন হয়ে আগত হয়ে এই যজ্ঞের মহিমা ও শ্রবণসমূহকে (ঘৃত বা আজ্যাহুতির ক্ষরণকে) নিজের সাথে যুক্ত করে নেন। দেবগণের সঙ্গতিশালী হর্ষোৎপাদক যজ্ঞসমূহে অগ্নিদেব ও ধন-পুষ্টি-করণশালী বসুদেবগণ বাস করেন। অগ্নির তেজস্বী শিখাসমূহ যজমানের ব্রতকে নানারকমে রক্ষা করে। অগ্নির তেজ হতে উৎসারিত ঐশ্বর্যবান্ দীপ্তি ও আহুতির দীপ্তি যজ্ঞের সম্পাদনশীল। এগুলি পরস্পর আশ্রয়ের সাথে সংযুক্ত হয়ে তেজস্বী হয়ে ওঠে। তারা যজ্ঞের রক্ষক। হোতৃগণ যজ্ঞাগ্নির প্রশংসা করুক, কারণ তাতেই আমাদের কল্যাণ। পৃথিবী, অগ্নির কান্তি ও সরস্বতী এই তিন আমাদের কুশের (যজ্ঞীয় তৃণগুচ্ছের) প্রশংসা পূর্বক বিরাজমান হোন। ত্বষ্টাদেব আমাদের জল, অন্ন ও ধনের পুষ্টি প্রদান করুন। বনস্পতি শব্দ পূর্বক নিজেকে মুক্ত করুক, অগ্নি এই হবিকে দেবগণের নিমিত্ত সুস্বাদু করে তুলুন। অগ্নিদেবতা ইন্দ্রের নিমিত্ত যজ্ঞ সমাপ্ত করুন। সকল দেবতা এই হব্য গ্রহণ করুন ॥ ১-১২।
সূক্তসার –শতায়ু হওয়ার নিমিত্ত নয় (নব সংখ্যক) প্রাণকে নয়ের সাথে সংযুক্ত করতে হয়। এতে সুবর্ণ, রৌপ্য ও লৌহের তিন-তিন তাপের দ্বারা পূর্ণ সূত্র (বা তার) আছে। এই ত্রিবৃৎ কর্মের দ্বারা অগ্নি, চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবী, জল, আকাশ, অন্তরিক্ষ ও দিক্-উপদিক সমূহ তথা ঋতুর অংশ ঋতুসমূহের সাথে প্রাপ্ত হয়ে আয়ুষ্কামী জনকে উত্তীর্ণ করুক (অর্থাৎ আয়ুষ্মন করুক) এই ত্রিবৃতে তিন পুষ্টি আশ্রিত আছে; পূজা দেব ঘৃত-দুগ্ধের দ্বারা এই কর্মকে শুদ্ধি করুক। অন্ন, পুরুষ ও পশুসমূহের আধিক্য এতে আশ্রয় প্রাপ্ত হোক। এই উপনয়ন-সংস্কৃত বালককে আদিত্য ধনের দ্বারা পূর্ণ করুন। অগ্নি বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সাথে সাথে এরও বৃদ্ধি সাধিত করুন। ইন্দ্র একে বীর্যযুক্ত করুন। পোষক ত্রিবৃৎ এর আশ্রিত হোক। সুবর্ণের দ্বারা সমৃদ্ধ পৃথিবী এর রক্ষক হোক। বিশ্বের ভরণকর্তা অগ্নি লৌহের দ্বারা তাকে পালন করুন এবং লতাসমূহ হতে প্রাপ্য জলের উত্তম বল তাকে ধারণ করুক। তিন প্রকারে এই সূবর্ণ উৎপন্ন হয়েছিল। এর এক জন্ম অগ্নির প্রিয় হয়েছিল। বিদ্বজ্জন এর একটিকে জলের বীর্যরূপ বলে থাকেন। ব্রহ্মচারীর (উপনীত মানবকের) আয়ুর নিমিত্ত এই সূবর্ণ ত্রিবৃৎ হয়ে যাক। জমদগ্নি, মহর্ষি কশ্যপ প্রমুখের বাল্য-তারুণ্য-বৃদ্ধাবস্থা এই যে অমৃতের নিদর্শন স্বরূপ তিন আয়ু, সেই আয়ু ব্রহ্মচারী প্রাপ্ত হোক। ত্রিবৃৎ রূপে তিন সুবর্ণ একাক্ষরে পরিণত হলে সকল পাপকে অদৃশ্য করে অমৃতের দ্বারা মৃত্যুকে নষ্ট করা যায়। আকাশ হতে সুবর্ণ ব্রহ্মচারীকে রক্ষা করুক, মধ্যলোক হতে রক্ষা করুক এবং পৃথিবী হতে লৌহ রক্ষা করুক। দেবতাগণ চারিদিক হতে রক্ষা করুন। দেবতাগণের সম্মুখে যে মুখ্য দেবতা সুবর্ণরূপী অমৃতকে বন্ধন করেছিলেন, সেই দেবতা এই ত্রিবৃতকে বন্ধনের নিমিত্ত আমাকে (পুরোহিতকে) আজ্ঞা প্রদান করুন। অর্যমা, পূষা ও বৃহস্পতি দেবত্রয় ত্রিবৃতকে উত্তম প্রকারে বন্ধন করুন। আমরা (পুরোহিতগণ) নিত্য উৎপন্নশীল নামের দ্বারা ত্রিবৃতকে বন্ধন করছি। আমি আয়ু ও তেজের প্রাপ্তির নিমিত্ত ব্রহ্মচারীকে ঋতুসমূহ, মাস সমুদায় তথা। সম্বৎসরের তেজঃ-স্বরূপ সূর্যের সাথে যুক্ত করছি। ধৃতের দ্বারা আর্দ্র হয়ে, মধুর দ্বারা সিঞ্চিত হয়ে, ও পৃথিবীর সমান দৃঢ় হয়ে এই মানবক (ব্রহ্মচারী) অথবা আয়ুষ্কামী জন শত্রুগণকে বিদীর্ণ করে ও তাদের তিরস্কৃত করে মহান্ সৌভাগ্য লাভ করুক ॥ ১-১৪
টীকা –সর্বসম্পকর্মে এই সূক্তটির বিনিয়োগ হয়ে থাকে। তথা আয়ুষ্কামী জনের হিরণ্যমণি বন্ধনে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। এই উভয় বিষয় সম্পর্কে প্রথম কাণ্ডের ষষ্ঠ অনুবাকের সপ্তম সূক্ত দ্রষ্টব্য। উপনয়ন কর্মেও ব্রহ্মচারীর আয়ুষ্কামনায় আজ্যহোমে এই সূক্তের বিনিয়োগ সম্পর্কে (স্বর্ণ, রৌপ্য ও লৌহের খণ্ডে নবশলাক মণি ত্রিবৃৎ-করণ সম্পর্কে) সূক্তের মধ্যেই নির্দেশ রয়েছে।…ইত্যাদি। (৫কা, ৬অ. ২সূ)।
সূক্তসার –সকল কর্মে প্রথম নিযুক্তশালী অগ্নিদেব আমাদের এই (রক্ষোঘ্ন) কর্মের ভার গ্রহণ করুন। সেই বৈদ্য ও ঔষধির নির্মাতা অগ্নিদেবের দ্বারা আমরা গো অশ্ব ও মনুষ্যগণের নীরোগ অবস্থা লাভ করবো। যারা আমাদের তুচ্ছ মনে করছে অথবা আমাদের ভক্ষণের ইচ্ছা করছে, অগ্নি তাদের পতিত করুন। অগ্নিদেব কর্তৃক আমাদের ভক্ষণেচ্ছু পিশাচগণের চক্ষু বিদীর্ণ হোক, হৃদয় ভগ্ন হোক, জিহ্বা কর্তিত হোক এবং দন্তগুলি বিচূর্ণ হয়ে যাক। এই ব্যাধিতের যে মাংস পিশাচগণ ভক্ষণ করে ফেলেছে, অগ্নি সেই মাংসকে পুনরায় এর শরীরে পূর্ণ করে দিন। আমরা এর শরীরে মন্ত্রশক্তির দ্বারা প্রাণকে পুনরায় সঞ্চারিত করছি। দুগ্ধ, মন্থ ও কৃষির দ্বারা রন্ধিত অন্নে প্রবিষ্ট হয়ে যে পিশাচ আমাদের বিনাশের ইচ্ছা পূর্ণ করে ফেলেছে, সে স্বয়ং আপন সন্তান-সন্ততি বা প্রজাগণের সাথে এইরকমই যাতনা ভোগ করুক। যে পিশাচ দিবারাত্র জলপান, যাত্রা, শয়ন ইত্যাদির সময় আমাদের পীড়িত করেছে, সেই মাংসভক্ষী আপন প্রজাগণের সাথে এই ভাবেই পীড়া ভোগ করুক। অগ্নিদেব সেইসব মাংস-ভক্ষী, রুধির-পায়ী ও মনুষ্যের মন-নষ্টকারী পিশাচবর্গকে বিনাশ করুন। অশ্বযুক্ত ইন্দ্রদেব তাদের উপর আপন বজ্র-প্রহার করুন এবং সোমদেব তাদের মুণ্ড (বা শুণ্ড): কর্তিত করুন। অগ্নিদেব সদা সেই রাক্ষসবর্গকে মর্দন করুন, আপন দিব্যাস্ত্রে ভস্ম করুন। অগ্নিদেব কর্তৃক এই পুরুষের বিনাশপ্রাপ্ত জ্ঞান ও মাংস পুনরানীত হোক। এই (ব্যাধিত) জন সোমের অঙ্কুরের ন্যায় পুষ্ট হয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক। অগ্নির দ্বারা এই গুণীপুরুষ জীবিত থাকার প্রয়োজনে রোগ-রহিত হোক। পিশাচবর্গকে বিনাশকারী অগ্নিদেবের উদ্দেশে এই সমিধসমূহ নিবেদিত হচ্ছে, তিনি সেগুলি গ্রহণপূর্বক প্রসন্নতা লাভ করুন। (এই সূক্তের মধ্যে, কয়েক প্রকার রোগের কীটাণুসমূহের বর্ণনা আছে, যেগুলি মনুষ্যের পক্ষে ঘাতক সিদ্ধ হয়ে থাকে। লোকের উচিত–শুদ্ধ বায়ু, সূর্যের প্রকাশ (কিরণ) ও অগ্নি হতে এই রকম দোষাবহতা দূর করে বাতাবরণকে স্বচ্ছ রাখা) ॥ ১-১২
সূক্তসার –আমি (উন্মোচন নামক মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি) তোমাকে (অর্থাৎ রোগাৰ্তকে) নিকট ও দূর দেশ হতে তোমার প্রাণকে দৃঢ়তার সাথে বন্ধনকরছি। তুমি পূর্ব-পিতৃগণের অনুকরণ এখনই করো না; এখানেই থাকো। তোমার উপর কৃত অভিচারের বন্ধন মুক্ত-করণশীল বিষয়টি আমি মন্ত্রবলের দ্বারা বলছি। তুমি যে স্ত্রী বা পুরুষের নিমিত্ত দ্রোহ বা শাপ প্রযুক্ত হয়েছিলে তা হতে মুক্তকরণ সম্বন্ধী বিষয় আমি তোমাকে বলছি। মাতা বা পিতার পাপে যদি তুমি রোগ-শয্যায় পড়ে থাকো, তবে সেই রোগের উন্মোচন ও প্রমোচনের কথাও আমি মন্ত্র-রূপ বাণীর দ্বারা বলছি। তোমার মাতা, পিতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নী যে মন্ত্র বা ঔষধি করেছিল, তুমি তা ভালভাবে সেবন করো। আমি তোমাকে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত জীবনশালী করে দিচ্ছি। তুমি যমদূতের অনুগমন করো না। আপন সকল ব্যাপ্তির সাথে এখানে জীবিত থাকো। হেরোগী! তুমি ভয় ত্যাগ করো। তোমার দেহ হতে যক্ষ্মা ও অস্থি-জ্বর দূর হয়েছে। মন্ত্ররূপ বাণীতে তিরস্কৃত হয়ে অঙ্গে ব্যাপ্ত জ্বর, হৃদয়-রোগ ইত্যাদি বহু দূরে গমন করেছে। তোমার জন্যই তোমার. প্রাণরক্ষক সচেতন ঋষি (আমি) দিবারাত্র জাগ্রত হয়ে আছেন। অগ্নি তোমার সমীপে অবস্থানের যোগ্য; সূর্য তোমার নিমিত্ত এই লোকে উদিত হচ্ছেন তুমি অন্ধকারযুক্ত মৃত্যু হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে জীবন লাভ করো। মৃত্যু, পিতৃগণ ও যমকে নমস্কার। যে অগ্নি দেহকে পারণের বিধি জ্ঞাত আছেন, এই (ব্যাধিত) পুরুষের মাঙ্গল্যে অগ্রে তাকে স্থাপন করছি। প্রাণ একে প্রাপ্ত হোক, মন ও নেত্র একে প্রাপ্ত হোক; আমি এর দেহকে মন্ত্রশক্তির দ্বারা প্রাণবন্ত করে দিয়েছি; এই (ব্যাধিত) ব্যক্তি আপন পদের উপর দণ্ডায়মান হোক। অগ্নিদেব এর প্রাণ ও চক্ষুকে সংযুক্ত করুন, শরীরকে বলের দ্বারা পূর্ণ করে দিন। অমৃতের জ্ঞাতা অগ্নি এই ব্যক্তির নিকট হতে যেন প্রস্থান না করেন; শ্মশানভূমিতে যেন এর ঘর না হয়। রোগীর প্রাণ যেন ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়; সূর্যদেব তার আপন রশ্মিসমূহের দ্বারা তাকে মৃত্যুশয্যা হতে উত্তোলিত করেছেন। ভিতর হতে আন্দোলিত হয়ে এর জিহ্বা ঘোষণা করছে যে তার দেহ হতে যক্ষ্মা রোগ পলায়িত হয়েছে এবং জ্বরের আক্রমণও স্তব্ধ (বা শান্ত) হয়ে গিয়েছে। যদিও প্রতি জনের মতো এই ব্যক্তিও মৃত্যুর নিমিত্তই জন্ম প্রাপ্ত হয়েছে, মৃত্যুলোক দেবতাগণেরও প্রিয়; তথাপি এই (ব্যাধিমুক্ত) জন বৃদ্ধাবস্থার পূর্বে মৃত্যুপ্রাপ্ত হবে না ॥১-১৭
টীকা –এই সূক্তের অংহোলিঙ্গগণে পাঠ করা হয়েছে, সেই জন্য তার গণের যত্রতত্র সর্বভৈষজ্য ইত্যাদি কর্মে বিনিয়োগ অনুসন্ধেয়। তথা এই সূক্তের দ্বারা উপনয়নের পর আয়ু কামনা করে মানবককে স্পর্শ করে অভিমন্ত্রিত কর্তব্য।…ইত্যাদি ॥ (৫কা, ৬অ. ৪সূ)।
বঙ্গানুবাদ –অভিচার-করণশালীগণ অপক (কঁচা) মৃৎপাত্রে বা ধান, যব, গম, তিল ইত্যাদির সাথে মিশ্রিত ধান্যসমূহে অথবা কুকুট ইত্যাদির অপক্ক মাংসে যে কৃত্যাকে সাধিত করেছে, আমি সেই কৃত্যাকে অভিচারকারীদের উপরেই প্রত্যারোপিত করে দিচ্ছি। কুকুট (মুর্গী), ছাগ, বা বৃক্ষের উপর কৃত কৃত্যাকে, মনুষ্যের দ্বারা পূজিত ভক্ষ্য পদার্থে স্থির করে ক্ষেত্রে (জমিতে) কৃত কৃতাকে, গাহপত্যাগ্নি বা যজ্ঞশালায় কৃত কৃত্যাকে, সভামধ্যে বা জুয়ার পাশায় কৃত কৃত্যাকে, সেনার মধ্যে কিংবা বাণের উপর অথবা দুন্দুভিতে কৃত কৃত্যাকে, কূয়ার মধ্যে পাতিত কৃত্যাকে, শ্মশানের মধ্যে গর্ত করে খোদিত অথবা গৃহে কৃত কৃত্যাকে, পুরুষের অস্থির উপর কৃত কৃত্যাকে বা অল্প-জ্বলিত (টিমটিম করে প্রজ্বলিত) অগ্নির উপর কৃত কৃত্যাকে আমি সেই কৃত্যাকারী অভিচারকারীদের দিকেই প্রত্যাবর্তিত করিয়ে দিচ্ছি। যে অজ্ঞানী জন কৃত্যাকে কুমার্গের দ্বারা মর্যাদা-পালনশীল আমাদের উপর আরোপ করেছে, আমরা সেই কৃত্যাকে সেই মার্গেই সেই অজ্ঞানী কৃত্যাকারীর অভিমুখে প্রেরিত করছি। যারা কৃত্যার দ্বারা আমাদের অঙ্গুলী বা পদকে নষ্ট করতে ইচ্ছা করে, তারা যেন তাদের আকাঙ্ক্ষা-পূরণে সফল না হয় এবং ভাগ্যশালী আমাদের কোন অমঙ্গল না করতে পারে। ভেদ-রক্ষাকারী, লুক্কায়িত হয়ে কৃত্যাকারীদের আপন শস্ত্রের দ্বারা ইন্দ্রদেব বিনষ্ট করে দিন, এবং অগ্নিদেব আপন জ্বালাসমূহে তাদের দগ্ধ করে দিন ৷১-১২।
বঙ্গানুবাদ –হে অথবা-পুত্র দধ্য! দিবারাত্র স্তুতিযোগ্য বৃহৎ সাম গান করো। হে স্তুতি করণশীল! সেই গানের দ্বারা দান ইত্যাদি গুণযুক্ত সবিতা দেবের স্তুতি করো ॥১॥
যে সবিতা পরমব্রহ্মের প্রথম উৎপন্ন পুত্র, হে স্তোতা। তুমি তাকেই আপন স্তুতির দ্বারা প্রসন্ন করো। তিনি সমুদ্র হতে উদিত হচ্ছেন, দেখা যাচ্ছে। সেই সতত যুবা, রাত্রির অন্ধকারকে সোপকারী ও শোভন বাক্যশালী সবিতাদেবকে স্তুতির দ্বারা প্রসন্ন করো ॥ ২॥
আমাদের হবিঃ-প্রদান ইত্যাদি কর্মসমূহকে সবিতাদেবই দেবতাগণের নিকট প্রাপ্ত করান এবং অমরত্বের সাধন তথা সুন্দর স্তুতির সাধন, দুই-ই বৃহৎ ও রথন্তর সামগানে আমাদের প্রেরণা দিতে থাকুক ॥ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে অধ্বর্য প্রমুখ ঋত্বিবর্গ! তোমরা সেই ইন্দ্রের নিমিত্ত সোমের অভিষব করো, যিনি আমার স্তুতিরূপ আহ্বানকে আদরপূর্বক শ্রবণ করেন। ১॥
পক্ষী যেমন আপন নিবাসে স্বয়ং উপনীত হয়, তেমনই অভিযুত সোম ইন্দ্রের দেহে স্বয়ংই প্রবিষ্ট হচ্ছে। হে ইন্দ্রদেব! তুমি সোমের প্রভাবে হর্ষিত হয়ে শত্রুসেনাগণকে উৎপীড়িত করো ॥ ২॥
হে অধ্বর্যবৃন্দ! সোমপায়ী, বজ্রধারী, শত্ৰু-মর্দনে সমর্থ ইন্দ্রের নিমিত্ত সোমের অভিষব করো। সেই ইন্দ্ৰ সতত যুবা, শত্রুগণের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আহ্বানকারী, বিজেতা এবং অখিল বিশ্বের প্রভু। যজমান আপন কামনা পূর্তির উদ্দেশে তাঁর স্তুতি করে থাকে ॥ ৩॥
টীকা –উপরে যে দুটি সূক্ত (১ম ও ২য়) ও তার বঙ্গানুবাদ দেওয়া হয়েছে তার বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে–এই সূক্তদ্বয়ের দ্বারা পুষ্টিকামী ব্যক্তি মূতন গৃহে মধুমিশ্রিত ঘৃতে হোম করবেন। তথা এই সূক্তদ্বয়ের দ্বারা স্বস্ত্যয়নের নিমিত্ত আজ্য, সমিৎ, পুরোশ শম্বুল্য অবধি ত্রয়োদশ দ্রব্যের আহুতি প্রদান কর্তব্য। তথা এই সূক্তদ্বয়ের দ্বারা সর্বলোকে আধিপত্যকামী জন অথর্বাণের যাগ করবেন বা উপাসনা করবেন। তথা এই সূক্তদ্বয়ের দ্বারা সমাবর্তনের পর ভুক্তদ্রব্য অভিমন্ত্রিত করে ভোজন করানো কর্তব্য।.. ইত্যাদি। পণ্ডিতপ্রবর দুর্গাদাস বলেছেন–যদ্যপি অস্মিন্ কাণ্ডে প্রায়েন সর্বাণি সূক্তানি তৃচাত্মকান্যেব তথাপি অধ্যাপকসম্প্রদায়ানুরোধেন তৃদ্বয়ং একীকৃত্য সূক্তত্বেন ব্যবহ্রিয়তে। কিন্তু আমরা ঐভাবে দুটি বা তিনটি তৃচ এক করে একটি সূক্ত গঠন করিনি,-মূল সংহিতা অনুসারে এক একটি, স্বতন্ত্র সূক্ত হিসেবেই উল্লেখ করেছি; এর ফলে প্রতিটি সূক্তের যথাযথ সংজ্ঞা, ঋষি, দেবতা ইত্যাদিরও পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য, সূক্তস্য বিনিয়োগঃ অংশটি উদ্ধৃতকরণের ক্ষেত্রে তাঁকে অনুসরণে বাধ্য হয়েছি; কারণ তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থে দুই বা ততোধিক সূক্তের একত্র বিনিয়োগ এইভাবেই দেওয়া হয়েছে৷৷ (৬কা ১অ. ১-২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! হে পূষন! আমাদের রক্ষা করো। দেবমাতা অদিতি আমাদের রক্ষা করুন। অপাংনপাত নামক জলের পৌত্ররূপে মান্যশালী অগ্নি ও ঊনপঞ্চাশৎ মরুৎ-গণ আমাদের রক্ষা করুন। সপ্ত সমুদ্র, আকাশ ও বিষ্ণুদেবও আমাদের রক্ষক হোন। ১
আমাদের ইচ্ছিত ফলপ্রাপ্তির নিমিত্ত দ্যাব-পৃথিবী, নিষ্পন্ন সোম, অভিষবের প্রস্তর, মন্ত্ররূপিনী সরস্বতী, আহ্বানীয় অগ্নি এবং সুখ-প্রদানশালিনী কিরণরাশি–এঁরা আমাদের রক্ষক হোন। ২।
উষাসনাক্তা নামক দিন-রাত্রির দেবতা, দান ইত্যাদি গুণসম্পন্ন অশ্বিনীকুমারদ্বয়, মেঘে স্থিত জলকে পতন হতে রোধকারী অপাংনপাত নামক অগ্নি, এঁরা সকল হিংসা হতে আমাদের রক্ষা করুন। হে ত্বষ্টা! তুমি সকল প্রকারের ফল দানের নিমিত্ত আমাদের বৃদ্ধি করো। ৩
বঙ্গানুবাদ— ত্বষ্টাদেব আমার স্তুতি শ্রবণ করুন, বৃষ্টিকারক পর্জন্যদেব ও মন্ত্রের অধিপতি ব্ৰহ্মণস্পতি আমার স্তুতি শ্রবণ করুন। আপন পুত্র ও ভ্রাতাদের সাথে অদিতি দেবী আমাদের রক্ষক অজেয় বলের রক্ষণশালিনী হোন ॥১॥
অদিতিদেবী এবং তাঁর ভগ, বরুণ, মিত্র, অর্যমা নামক পুত্র মরুৎ-বর্গ আমাদের রক্ষক হোন। আমরা যে শত্রুদের নিকট হতে নিজেদের রক্ষা-কামনা করছি, তাদের অনিষ্ট-কর্ম আমাদের নিকট যেন না আসে। আমাদের নিকট হতে অপগত হিংসক দ্বেষ সেই শত্রুদের আমাদের নিকট হতে দূর করুক ॥২
হে বিস্তৃত গমনশীল বায়ু! আমাদের রক্ষা করো। হে অশ্বিনীকুমারদ্বয়। আমাদের রক্ষক হও। হে পিতা রূপ দ্যুলোক! কৃত্যার ন্যায় অনিষ্টশালিনী পাপের দেবীকে আমাদের নিকট হতে অপসারিত করে দাও ৷৩৷৷
টীকা –উপযুক্ত তৃতীয় ও চতুর্থ সূক্তের বিনিয়োগ প্রসঙ্গে নানা রকম নির্দেশ আছে। তার মধ্যে প্রধান এই যে, এই সূক্তদ্বয়ের দ্বারা বিজয়কর্মে আজ্যাহুতি প্রদান পূর্বক খঙ্গ ইত্যাদি শস্ত্র অভিমন্ত্রিত করে যোদ্ধাকে প্রদান করা কর্তব্য। তথা, স্বস্ত্যয়নকামী রাত্রে শয়নকালে এই সূক্ত জপ করে শয়ন করবেন এবং সুপ্তোত্থিত হয়ে (অপর) সূক্তটি জপ করতে করতে স্বস্ত্যয়নার্থে তিন পদ চলে উঠতে হবে।…ইত্যাদি ॥ (৬কা, ১অ. ৩-৪সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! তুমি ঘৃতের দ্বারা আহূতকৃত হয়ে থাকো। তুমি এই যজমানকে উত্তম পদ লাভ করাও, এঁকে দেহ-কান্তির সাথে যুক্ত করো এবং সন্তান ইত্যাদির দ্বারা এর বৃদ্ধি সাধিত করো। ১।
হে ইন্দ্র! এই যজমানের অত্যন্ত বর্ধন করো। এই যুজমান তোমার কৃপায় সকলকে বশীভূত রাখার সামর্থ্যশালী হোন এবং স্বয়ং স্বতন্ত্র হয়ে উঠুন। এঁকে ধনের দ্বারা সম্পৃষ্ট করো এবং বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত এর আয়ুকে লম্বিত করো (অর্থাৎ ইনি যেন পুর্ণ আয়ুষ্কাল ভোগ করতে পারেন)। ২।
হে অগ্নি! যে যজমানের গৃহে আমরা হব্য ইত্যাদি সম্পন্ন করছি, সেই যজমানকে সমৃদ্ধ করো। সোমদেব এঁকে আপন লোক বলে ঘোষণা করুন এবং ব্ৰহ্মণস্পতি এই জন আমার বলে অনুগৃহীত করুন ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে ব্ৰহ্মণস্পতি! দেবতাগণের প্রতি ভক্তিহীন শত্রু যদি আমাদের বধযোগ্য বলে মনে করে, তবে তাদের আমাদের সোমঅভিষবকারী যজমানের বশীভূত করে দাও। ১।
হে সোম! যে মন্দ বিচারবুদ্ধিশালী শত্রু আমাদের শোভন বিচারবুদ্ধিকে তিরস্কার করে, তুমি তাদের মুখের উপর বজ্র-প্রহার করো, যাতে তারা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে দূরীভূত হয়ে যায়। ২।
হে সোম! যে (সনাভি অর্থাৎ সগোত্রীয় বা সপিণ্ড) শত্রু আমাদের নাশ করতে আকাঙ্ক্ষা করে অথবা যে শত্রু আমাদের সন্তাপিত করে, তুমি তাদের বলকে দ্যুলোকের অশনিরূপ আয়ুধের দ্বারা সংহার-করণের ন্যায় বিনাশ করে দাও ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে সোম! যে দেবযান-মার্গে অদ্বেষী দেবমাতা-অদিতি ও তাঁর কৃপাপরায়ণশীল মিত্র ইত্যাদি দ্বাদশ পুত্ররূপী আদিত্যবর্গ বিচরণ করেন, সেই মার্গ ধরে কল্যাণের সাথে আগমন করো ॥ ১।
হে সোম! তুমি যে বলের দ্বারা রাক্ষসগণকে বশীভূত করে থাকে, সেই বলের কথা। আমাদের বলে দাও। ২।
হে দেবগণ! যে বলের দ্বারা তোমরা অসুরবর্গের বলকে তাদের মধ্যেই অলস করে দিয়ে নিজেদের মধ্যে মিলিয়ে নিয়েছে, সেই বলের দ্বারা আমাদের সুখী করে দাও ৷৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –যেমন তাম্বুল ইত্যাদি বল্লী (লতা) আপন আশ্রয়দাতা বৃক্ষকে সর্ব দিক হতে বেষ্টন করে থাকে, তেমনই, হে জায়া! তুমি আমাতে সংলগ্ন থাকো (বা আলিঙ্গন করো)। যাতে তুমি আমাকেই কামনা করে আমারই নিকটে অবস্থান করো, সেই উদ্দেশেই আমি এই মন্ত্রের প্রয়োগ করছি ॥ ১।
আপন স্থান হতে উড্ডীয়মান হয়ে গরুড় যেমন পৃথিবীর উপর আপন পক্ষ দুটির তাড়না করে, তেমনই হে পত্নী! আমি তোমার মনকে বশান্বিত করছি, যাতে তুমি আমাকেই কামনা করে আমারই নিকটে অবস্থান করো, (বা অন্য কোথাও গমন না করো), সেই উদ্দেশেই আমি এই মন্ত্রের প্রয়োগ করছি। ২৷
এই আকাশ, পৃথিবী ও স্বর্গকে সূর্য যেমন সকল দিক হতে ব্যাপ্ত করে থাকে, তেমনই আমি, হে স্ত্রী! তোমার মনকে ব্যাপ্ত করছি; যাতে তুমি আমাকে কামনা করে আমারই নিকটে অবস্থান করো এবং অন্যত্র না গমন করো। ৩
বঙ্গানুবাদ— হে পত্নী! তুমি আমার শরীর, পাদ, নেত্র ও জঙ্ঘা কামনা করো। তুমি সেচনসমর্থ পুরুষকে কামনাকারিণী। তোমার কেশ ও নেত্র অত্যন্ত সুন্দর; সেগুলি আমার মনকে কাম-বিকারে আগ্রস্ত করছে। ১। হে পত্নী! তুমি আমার ইচ্ছানুকূলা হয়ে মনকে প্রসন্নকারিণী হও, যাতে আমি তোমাকে বাহুপাশে গ্রহণ করে হৃদয়ে রমণ করছি বুঝবো॥ ২॥ যে স্ত্রীগণের নাভিদেশ (অঙ্গ) প্রশংসনীয় হয়ে থাকে, যাদের হৃদয়ে বশীকরণের শক্তি আছে, সেই স্ত্রীগণকে ঘৃত-দুগ্ধ দানশালিনী গাভীগণ আমার অধিকৃতা করে দিক ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ— পৃথিবীর নিমিত্ত, শব্দ শ্রবণের শক্তিসম্পন্ন শ্রোত্রের নিমিত্ত, ভূ-স্থিত বৃক্ষসমূহের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাগণের নিমিত্ত এবং ভূস্বামী অগ্নির নিমিত্ত এই হব্য স্বাহুত হোক ৷ ১। বায়ুরূপ প্রাণের নিমিত্ত, তার সাথে সাথে সম্বন্ধিত অন্তরিক্ষের নিমিত্ত, পক্ষিগণের নিমিত্ত এবং বায়ুদেবতার নিমিত্ত এই হব্য আহুত হোক। ২। আকাশের নিমিত্ত, চক্ষুর নিমিত্ত, নক্ষত্রের নিমিত্ত এবং দুলোকের অধিপতি দিবাকরের উদ্দেশে এই ইব্য স্বাহাকৃত হোক ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –অন্তরিক্ষে সূর্যের ব্যাপ্ত হওয়ার ন্যায়, রাত্রির সংসারকে অন্ধকারে আবৃত করার ন্যায়, সর্পদলের সকল জন্মকে আমি জ্ঞাত হয়ে গিয়েছি। যে বিষ বিষগ্রস্তের সমগ্র শরীরে ব্যাপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তাকে আমি এই ঔষধির দ্বারা বিনষ্ট করে দিচ্ছি। ১৷৷
(হে বিষগ্রস্ত জন!) যে ঔষধিকে ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ জ্ঞাত আছেন, যা অগস্ত্য-বশিষ্ঠ প্রমুখ ঋষিগণও জেনেছেন, এবং যা মন্ত্র ও ব্রাহ্মণদের দ্বারা প্রাপ্ত হয়ে থাকে, সেই ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ কালের ঔষধির দ্বারা আমি তোমার দেহগত বিষকে নষ্ট করে দিচ্ছি। ২৷
গঙ্গা ইত্যাদি নদী সমুদায়, বৃহৎ-ক্ষুদ্র পর্বত সমূহ, পরুষ্ণী নাম্নী নদী তোমার শরীরে মধু সিঞ্চিত করুক। বিষ-হরণকারী অমৃতরূপ মধুকে আমি তোমার সম্পূর্ণ দেহের উপর লেপন করে দিচ্ছি। এই বিষ-নাশক মধু তোমার মুখ ও হৃদয়ের পক্ষে সুখ-করণশালী হোক৷ ৩৷৷
টীকা –উপযুক্ত প্রথম সূক্তের দ্বারা পুংসবন কর্মে শমীগর্ভস্থিত অশ্বত্থাগ্নি মধুমন্থে প্রক্ষিপ্ত করে অভিমন্ত্রিত পূর্বক স্ত্রীকে পান করানো কর্তব্য। তথা এই কর্মে অগ্নিকে কৃষ্ণবর্ণের উর্ণায় বেষ্টন পূর্বক এই সূক্তে অভিমন্ত্রিত করে স্ত্রীর অঙ্গে বন্ধন করে দেওয়া উচিত।…দ্বিতীয় সূক্তটির দ্বারা সর্পবিষভৈষজ্য কর্মে মধুক্ৰীড় অভিমন্ত্রিত করে বিষাবৃত জনকে ভোজন করানো কর্তব্য। এই কর্মে চতুর্থ কাণ্ডের দ্বিতীয় অনুবাকের প্রথম সূক্তে উক্তমতে জপ আচমন ইত্যাদি কর্ম করণীয়।..ইত্যাদি। প্রথম সূক্তে অশ্বত্থ বৃক্ষের নামোৎপত্তি সম্পর্কে সায়নাচার্যের উক্তি–স চ অগ্নি অশ্বে ভূত্বা যস্মিন্ বৃক্ষে পুরা সম্বৎসরং অবাৎসীৎ স বৃক্ষঃ অশ্বথঃ।..ইত্যাদি। (৬কা, ২অ. ১-২সু)৷৷
বঙ্গানুবাদ— শরীরের সর্বত্র ব্যাপ্ত, অস্থিগুলিকে কম্পিত করণশালী, অঙ্গের সংযোগকারী পর্বগুলিকে শ্লথকারী, বল-ক্ষয়কারক হৃদয়স্থ কাসশ্বসাত্মক যে শ্লেষ্ম ব্যাধি আছে, সেই সবকে মন্ত্রশক্তি নাশ করুক ॥১॥
যেমন সরোবরের মধ্য হতে কমল সমূলে উচ্ছেদ প্রাপ্ত হয়, তেমনই আমি এই রোগীর শ্লেষ্ম সম্বন্ধী রোগকে মূল সহ উৎপাটিত করছি। পরিপক্ক কর্কটী (কাকুড়) ফল যেমন আপনিই বৃন্ত হতে পৃথক্ (চ্যুত) হয়ে যায়, সেই রকমেই অকস্মাৎই আমি এই রোগের বিনাশ করবো। ২।
যেমন বিগত হয়ে যাওয়া বৎসর আর প্রত্যাবর্তন করে না, তেমনই হে বল-ক্ষয়কারক ব্যাধি! তুমি আমার পুত্র ইত্যাদির বিনষ্টি না করে গমন করো। যেমন দ্রুতগামী মৃগ দূরে ধাবিত হয়ে চলে যায়, তেমনই তুমি এ ব্যাধিগ্রস্তের দেহ হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে দূরে পলায়ন করো। ৩
টীকা –তৃতীয় সূক্তটির দ্বারা জয়কামী জন আপন সেনার চতুর্দিকে উপস্থান করবেন।..তথা বৈশ্যের সংগ্রাম জয়ার্থে অস্ত্র নিয়ে উদ্যত শত্রুদের দর্শন পূর্বক এই মন্ত্র জপনীয়।…চতুর্থ সূক্তের মন্ত্ৰত্রয় শ্লেষ্মব্যাধির ভৈষজ্য কর্মে সম্পাতিতব্য। এই মন্ত্ৰত্রয়ের দ্বারা অভিমন্ত্রিত বৃক্ষখণ্ডের সাথে ব্যাধিত জনের অঙ্গ সিঞ্চন, মার্জন ও তাকে আচমন করানো কর্তব্য।..ইত্যাদি। (৬কা, ২অ. ৩-৪সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে সোমপর্ণোপন্ন পলাশ! তুমি ঔষধিসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। অন্য বৃক্ষ তোমার অনুগত। যে আমাদের ক্ষীণ (বা হিংসা) করতে ইচ্ছা করে, সেই শত্রু (আমাদের প্রতি) তোমার কৃপার ফলে ক্ষীণ হয়ে যাক। ১।
সগোত্র সম্পন্ন বা অন্য গোত্র সম্পন্ন যে শত্রু আমাদের ক্ষীণ করে দিতে চায়, সেই দুই রকমের শত্রুদের মধ্যেই আমি পলাশের সমান শ্রেষ্ঠ হবো॥ ২॥
যেমন বৃক্ষের মধ্যে পলাশকে উত্তম বলে স্বীকার করা হয়, যেমন অন্য ঔষধি অপেক্ষা সোমকেই পুরোডাশ ইত্যাদিতে প্রযুক্ত করা হয়ে থাকে, তেমনই সগোত্রীয় জনদের মধ্যে আমি শ্রেষ্ঠ হবো॥ ৩
বঙ্গানুবাদ –হে সর্ষপকাণ্ড (সরিষার শাক)! তুমি রোগ-বিনষ্টির নিমিত্ত ভক্ষিত হয়ে থাকো, তোমার তৈল মহান বলশালী। সেই তৈলে সৃষ্ট (ভাজা) তোমার শাক বা করম্ভকে আমরা অভিমন্ত্রিত করে সেবন করে থাকি। ১।
হে সরিষার শাক! তোমার পিতা বিহংল এবং মাতা মদাবতী নামে পরিচিত। তুমি আপন শরীরকে অপরের খাদ্যের নিমিত্ত দান করে দিয়ে থাকো, সেই কারণে শুধুই প্রশস্ত মাতা-পিতার ন্যায় হয়ে থাকো না ॥ ২॥
হে তৌবিলিক নাম্নী পিশাচী! তুমি রোগের নিদানভূত, অতএব আমাদের রোগকে পরাজিত করে নিম্নমুখে প্রেরণ করো। এই ঐলব নামক নেত্র-রোগ দূর হয়ে যাক। ব ও বকর্ণ (বরোগের কারণ) রোগীর নিকট হতে দূরে গমন করুক। হে নিরাল নামক রোগ! তুমিও এই পুরুষের শরীর হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে পলায়ন করো ॥ ৩
হে সস্যমঞ্জরী! তোমার নাম অলসালা। প্রথম গ্রহণ-করণের কারণে তুমি পূর্বা। হে শলাঞ্জালা! তুমি শেষে গৃহীত হয়েছে বলে তুমি উত্তরা। হে নীলাগলসলা! ঐ দুইয়ের মধ্যবর্তী কালে গৃহীতা হওয়ার জন্য তুমি তৃতীয়া ॥ ৪
বঙ্গানুবাদ –হে স্ত্রী! এই মহতী পৃথিবীর দ্বারা প্রাণীবর্গের শরীরকে ধারণ করণের ন্যায় ও তোমার গর্ভও প্রসবের সময় পর্যন্ত (দশমাস কাল) গর্ভাশয়ে স্থিত থাকুক ॥ ১।
হে নারী! এই বিশাল পৃথিবী যে রকমে বনস্পতিরাজিকে ধারণ করে আছে, তেমনই তোমার গভও প্রসবের সময় পর্যন্ত (দশমাস কাল) গর্ভাশয়ে স্থিত থাকুক। ২৷৷
হে স্ত্রী! এই মহতী পৃথিবী যে রকমে পর্বত বা মহাশৈলরাজিকে ধারণ করে আছে, তেমনই তোমার গর্ভও প্রসবের সময় পর্যন্ত (দশমাস কাল) গর্ভাশয়ে স্থিত থাকুক। ৩।
হে স্ত্রী! এই মহতী পৃথিবী যে রকমে সমগ্র চরাচরকে ধারণ করে আছে, তেমনই তোমার গর্ভও প্রসব কাল আসন্ন হওয়ার নিমিত্ত (দশমাস কাল) গর্ভাশয়ে স্থিত হয়ে থাকুক ॥ ৪।
বঙ্গানুবাদ –হে ঈর্ষাযুক্ত পুরুষ! এই স্ত্রীকে অপর কেউ যেন না দর্শন করে–তোমার এই ঈষাপূর্ণ গতিকে শান্ত করে আমরা তোমার মধ্যস্থ ক্রোধ ও শোককেও পৃথক করে দিচ্ছি ॥ ১৷৷
দেহ হতে প্রাণ নিষ্ক্রান্ত হলে শব যেমন মৃতমনা হয়না, যেমন সর্বক্লেশসহ্যকারিণী পৃথিবী সর্বদা শান্ত মনঃশালিনী হয়ে থাকে এবং কখনও ঈর্ষা করে না; তেমনই পুরুষের স্ত্রী-বিষয়ক ঈর্ষাযুক্ত মন যেন ঈর্ষাকে প্রাপ্ত না হয়। ২৷৷
হে পুরুষ! আমি তোমার হৃদয়গত স্ত্রী-বিষয়ক ক্রোধাগ্নিকে নিঃশেষে অপসারিত করে দিচ্ছি, যেমন কর্মকার ভস্ত্রিকার (চর্মনির্মিত হাপরের) মুখ দিয়ে তার অন্তঃপূরিত বায়ুকে নিঃসরিত করে দেয়। ৩।
টীকা –উপযুক্ত সপ্তম সূক্তের দ্বারা গর্ভদৃংহন কর্মে গর্ভকে স্থিরভাবে ধারণের উদ্দেশে কৃত ক্রিয়ায়) ধনুকে জ্যার সাথে তিনবার গাঁইট দিয়ে স্ত্রীকে বন্ধন করা কর্তব্য। তথা এই সূক্তের দ্বারা ক্ষেত্ৰমৃত্তিকা অভিমন্ত্রিত করে প্রতিটি ঋকের উচ্চারণ পূর্বক গর্ভিণীকে খাওয়ানো কর্তব্য। তথা পুত্রের জন্মগ্রহণেও তার শান্তির নিমিত্ত এই সূক্তের দ্বারা ধনুজা-বন্ধন ইত্যাদি কর্ম করণীয়।…অষ্টম সূক্তের দ্বারা স্ত্রীবিষয়ক ঈর্ষা নিবৃত্তির জন্য ঐ ইর্ষাযুক্ত পুরুষকে দর্শন করে জপ করণীয়।…ইত্যাদি। (৬কা, ২অ, ৭-৮সূ)।
বঙ্গানুবাদ –দেবজন আমাকে পবিত্র করুন, মনুষ্যগণ আমাকে কর্ম ও বুদ্ধির দ্বারা পবিত্র করুক। সকল প্রাণী, অন্তরিক্ষে বিচরণশীল পবমান বায়ু এবং দশাপবিত্রে শোধ্যমান (পরিশুদ্ধমান) সোম, এরা সকলে আমাকে পবিত্র করে দিক ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –দাবাগ্নির ন্যায় সব কিছুকে দহনকারী এই জ্বরের জ্বলন সমগ্র অঙ্গে ব্যাপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই সময় উন্মত্তের মতো প্রলাপ করতে করতে মনুষ্য জ্বরের সাথে সংসার হতে গমন র করে থাকে। এই হেন জ্বর আমার নিকট হতে অপসারিত হয়ে কোন দুরাচারী জনকে প্রাপ্ত হোক। এই নিমিত্ত জ্বরের অভিমানী দেবতার উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করছি। ১।
জ্বরের তাপে ক্রন্দনাতুরকারী রুদ্রদেবতাকে নমস্কার, জ্বরকেও নমস্কার; বরুণ, আকাশ, পৃথিবীকে নমস্কার এবং পৃথিবীর উপর উৎপন্নশীল ঔষধিসমূহেরও উদ্দেশে নমস্কার। (দ্যাবা ও পৃথিবী ভূতজাতের মাতাপিতাস্বরূপ, সেই জন্য তাদের উদ্দেশে নমস্কার; পৃথিবীতে উৎপন্ন ব্রীহি ইত্যাদি ঔষধ সেবনে ও পথ্যক্রমে আরোগ্য উপজাত হওয়ার কারণে সেগুলির উদ্দেশে নমস্কার) ॥ ২॥
সকল অঙ্গে ব্যাপ্ত হয়ে, প্রত্যক্ষ অনুভবের দ্বারা আগমন পূর্বক রক্তকে দূষিত করে হরিদ্রাবর্ণ-দানশালী পিত্ত জ্বরের উদ্দেশে আমি নমস্কার জ্ঞাপন করছি। ৩।
বঙ্গানুবাদ –পৃথিবী ইত্যাদি তিনটি লোকের মধ্যে ঐহিক ফলভোগের কারণ হওয়ায়, এবং স্বর্গ ইত্যাদি ফলের সাধন যজ্ঞ ইত্যাদি কর্মের কারণ হওয়ায়, এই পৃথিবী শ্রেষ্ঠ। এই পৃথিবীর ত্বচের (চর্মের) ন্যায় ভূমিভাগে ব্যাধিসমূহের শমন-করণশালী যে ঔষধিসমূহ উৎপন্ন হয়, সেগুলি আমি সংগ্রহ করবো ॥১॥
হে অমোঘ বীর্য যুক্ত হরিদ্রা! তুমি সকল ঔষধি ও বীরুধ সমুদায়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। যেমন দিবা-রাত্রির কালাবচ্ছেদের কারণে চন্দ্র ও সূর্য শ্রেষ্ঠ, যেমন দেবতাগণের মধ্যে বরুণ মুখ্য, তেমনই তুমি ॥ ২॥
হে ঔষধিসমূহ! তোমরা কারও দ্বারা হিংসিত না হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্না, ধনশালিনী, এবং নীরোগ দানশালিনী হয়ে আছে। তোমরা আমার কেশরাশিকে দৃঢ় করো ও সেগুলির বৃদ্ধি করো ৷৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –যে অন্তরিক্ষলোকে নক্ষত্র-চক্র নিয়মিত ভাবে বিচরণ করে, তাকে প্রাপ্ত হয়েই সূর্যরশ্মিসমূহ সকল পার্থিব রসকে গ্রহণ করে সূর্য মণ্ডলে ঊর্ধ্বারোহণ করছে, এবং পুনরায় সেখান হতে বর্ষা করণের জন্য আগত হয়ে পৃথিবীকে সিক্ত করছে। ১।
হে স্বর্ণাভূষণ-ধারী মরুৎ-গণ! তোমরা নিজেদের গমনকালে জল ও ঔষধিসমূহকে পুষ্ট করে থাকো। যে দেশে জল-বর্ষণ করো, সেখানে বলদায়ক অন্ন ও সুবুদ্ধি যুক্ত প্রজাগণকে পোষণ করে থাকো। ২।
হে মরুৎ-গণ! সকল ধান্য ও নিম্নাভিমুখে গমনশালিনী নদীগুলিকে তৃপ্ত করণশালী মেঘসমূহকে প্রেরিত করো। দরিদ্র মাতা-পিতার আপন কন্যাকে দর্শন করে কম্পায়মান হওয়ার তুল্য, গর্জন রূপী ভীতিতে স্তনয়িতুরূপা মাধ্যামিকা বা বৃষ্টির নিমিত্ত সেই মেঘদলকে কম্পিত করছে। পতিকে সম্ভাষণ করে স্ত্রী যেমন অন্ন ইত্যাদি প্রদান করে, তেমনই সেই বাণী গমনশীল মেঘকে অন্ন ইত্যাদি প্রদান করছে ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ— সর্বপ্রাণীর জীবনাত্মক রূপে প্রসিদ্ধ, সংসারের রক্ষা-কর্মের কারণে নিরন্তর প্রবাহিত, সেই জলসমূহকে (বা ঈদৃশী জলরূপা দেবীগণকে) আমি উত্তম কর্মকারী (স্তোতা) নিকটে আহ্বান করছি। ১৷৷
নিরন্তর প্রবাহশালী হয়ে অবস্থিত জলসমূহ উত্তম ফলের নিমিত্ত অনর্থের জড় পাপ হতে আমাদের রক্ষা করুক। তারা আমাদের মঙ্গল প্রাপ্তি করানোর নিমিত্ত পাপ হতে মুক্ত করুক। ২।
সূর্যদেবের প্রেরণায় মনুষ্যগণ সকল বৈদিক কর্মের অনুষ্ঠান করুক। কল্যাণপ্রদ ঔষধিসমূহ ও তাদের পুষ্টকরণশালী জলরাশি আমাদের কল্যাণ সাধন পূর্বক পাপকে নষ্ট করে দিক ॥ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হিমালয় হতে পাপ-নাশক গঙ্গা ইত্যাদির জল প্রবাহিত হচ্ছে; তারা সকলে সমুদ্রে সংযুক্ত হচ্ছে। এই জলরাশি আমাকে এমনই ঔষধিসমূহ প্রদান করুক, যা হৃদয়ের দাহকে প্রশমিত করতে সমর্থ ॥১॥
দেবতা-সমান জলরাশি আমার নেত্রের ব্যাধি, পাষ্ণির (অর্থাৎ পদের উপরভাগের) ব্যাধি, প্রপদের (অর্থাৎ পদের পুরোভাগের) ব্যাধি ইত্যাদিকে দূরীভূত করে দিক। এই জলরাশি ব্যাধি দূরীকরণশালিনী ঔষধির মধ্যে পরম কুশল চিকিৎসক ॥ ২
হে জলদেবীগণ! তোমাদের স্বামী সমুদ্র, এবং তোমরা তার পত্নী। তোমরা ব্যাধিসমূহকে দূরীকরণশালিনী ঔষধি প্রদান করো, যাতে আমরা অন্ন ইত্যাদি বলদানশালী পদার্থগুলিকে সেবন করতে সমর্থ হই ৷ ৩৷৷
টীকা –উপযুক্ত সূক্ত দুটির শান্তিকর্মে বিনিয়োগ হয়। (ষষ্ঠ কাণ্ডের দ্বিতীয় অনুবাকের নবম সূক্ত এবং ষষ্ঠ কাণ্ডের পঞ্চম অনুবাকের দশম সূক্তের সাথে এর বিনিয়োগ সংশিষ্ট)। বিঘ্নবিনাশের কামনাকারী জন এই সূক্ত দুটির সম্পাতনে দুগ্ধ, অন্ন প্রভৃতির দ্বারা যাগকর্ম করবেন। তথা উদরতুল ইত্যাদির ভৈষজ্যে কৃষ্ণ নিয়ানং (ষষ্ঠ কাণ্ডের তৃতীয় অনুবাকের দ্বিতীয়) সূক্তের কর্ম ইত্যাদি করণীয়। হৃদয়-দোষ, জলোদর, কামলবরাগ ইত্যাদির শান্তির নিমিত্ত প্রবাহানুগুণ নদীর জল আহরণ করে বলীক-তৃণ প্রক্ষিপ্ত করে এই সূক্তের দ্বারা ব্যাধিতকে অবসিঞ্চন, মার্জন বা আচমন করানো কর্তব্য।…ইত্যাদি। (৬কা, ৩অ, ৩-৪)।
বঙ্গানুবাদ –গলদেশের শিরাসমূহের মধ্যে এই পঞ্চান্নটি কণ্ঠমালা (বা গণ্ডমালা) ব্যাপ্ত হয়ে আছে, সেগুলি এই মন্ত্রের প্রয়োগে বিনষ্ট হয়ে যাক, যেমন পতিব্রতা স্ত্রীকে প্রাপ্ত হয়ে (পুরুষের) দোষসমূহ বিনষ্ট হয়ে যায় ॥ ১।
গ্রীবাদেশে নাড়ীসমূহে সাতাত্তরটি কণ্ঠমালা ব্যাপ্ত হয়ে আছে, সেগুলি এই মন্ত্রের প্রয়োগে বিনষ্ট হয়ে যাক, যেমন পতিব্রতা স্ত্রীকে প্রাপ্ত হয়ে (পুরুষের) দোষসমূহ বিনষ্ট হয়ে যায়। ২৷
স্কন্ধের ধমনীসমূহের মধ্যে নিরানব্বইটি কণ্ঠমালা ব্যাপ্ত হয়ে আছে, সেগুলি এই মন্ত্রের প্রয়োগে বিনষ্ট হয়ে যাক, যেমন পতিব্রতা স্ত্রীকে প্রাপ্ত হয়ে (পুরুষের) দোষসমূহ বিনষ্ট হয়ে যায় ॥ ৩॥
অধ্যায়: ছয়
সূক্ত -২৫ : পাপনাশনম্
[ঋষি : ব্রহ্মা। দেবতা : পাপমা। ছন্দ : অনুষ্টুপ ]
অব মা পাগান্তসৃজ বশী সন মৃড়য়াসি নঃ। আ মা ভদ্রস্য লোকে পান্ ধেহ্যবিহূতম্ ॥১॥ যো নঃ পাগন্ ন জহাসি তমু বা জহিমো বয়। পথমনু ব্যাবর্তনেহন্যং পাস্নানু পদ্যতাম্ ॥ ২॥ অন্যত্রাম্মন্যুচ্যতু সহস্রাক্ষো অমর্ত্যঃ। যং দ্বেযাম তমৃচ্ছতু যমু দ্বিম্মস্তমিজ্জহি ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –হে পাপের অভিমানী দেবতা! তুমি সকলকে বশে রক্ষণশালী (বশয়িতা)। তুমি আমাকে ত্যাগ করো এবং সুখী করো। তুমি আমাকে আমার পুণ্যের কারণে স্বর্গে প্রাপ্ত করাও ॥১॥
হে পাস্মন্ (পাপাভিমানী দেবতা)! তুমি যদি আমাকে না ত্যাগ করো, তবে আমরা তোমাকে এই অনুষ্ঠান-কর্মের দ্বারা বলপূর্বক পথের চৌমাথায় পরিত্যাগ করছি। এই স্থান হতে তুমি আমাদের শত্রুদের দেহমধ্যে প্রবিষ্ট হও। ২৷৷
যাদের আমরা দ্বেষ করি, তাদেরই এই ইন্দ্রসম শক্তিশালী পাপ প্রাপ্ত হোক। হে পাপ! তুমি তাদের (অর্থাৎ আমাদের যারা দ্বেষ করে, সেই শত্রুদের) বিনাশ করে দাও ৩
বঙ্গানুবাদ –হে দেববৃন্দ! নির্ঋতি নাম্নী এই পাপদেবতার দূতরূপ কপোতাখ্য পক্ষী আমাদের অনিষ্ট সাধনের ইচ্ছা করছে; তার নিবারণের নিমিত্ত আমরা তোমাদের হব্য ইত্যাদির দ্বারা পূজা করছি। আমাদের দ্বিপদ পুত্র প্রজা ইত্যাদি ও চতুষ্পদ গো-ইত্যাদি প্রাণীসমূহের কল্যাণ হোক ॥ ১৷৷
হে দেববৃন্দ! পাপদেবতার এই দূত যেন আমাদের গৃহকে দুঃখগ্রস্ত করতে না পারে, সে যেন আমাদের সুখদায়ক হয়। বিজ্ঞ অগ্নি এই নিমিত্ত আমাদের হব্যকে গ্রহণ করুন। তাঁর কৃপায় এই কপোত আমাদের যেন অকল্যাণ না করতে পারে।২
তার পক্ষযুক্ত আয়ুধ আমাদের যেন নাশ না করে। আমাদের এই গো ও পুরুষদের পক্ষে যেন সে সুখ-প্রদানশালী হয়, হে দেবগণ! এই কবুতর যেন আমাদের সন্তাপকারক না হয়। ৩।
বঙ্গানুবাদ –হে দেববৃন্দ! এই কপোতকে আমাদের গৃহ হতে বিতাড়িত করে দাও। আমরা অন্নের দ্বারা তৃপ্ত হয়ে গো-সকলকে সঞ্চারণ করছি। এই কপোতের পদচিহ্নকে সম্যক প্রমার্জনার দ্বারা শান্তিময় করে তুলছি। এই কপোত আমাদের পাকশালার অন্নকে ত্যাগ করে উড্ডীয়মান হয়ে যাক। ১।
কবুতরের প্রবেশকে শমিত করণের নিমিত্ত এই ঋত্বিকগণ অগ্নিকে গৃহে আনয়ন (বা সংগ্রহ) করেছেন। এই গো-সকল সর্বত্র সঞ্চারণ করছে এবং দেবতাগণের উদ্দেশে হব্য ইত্যাদি সমর্পিত করা হচ্ছে। এই হেন শান্তিকর্মের উপরান্তে কোন হিংসক পুরুষ আমাদের পীড়িত করতে সক্ষম হবে না। ২।
এই আজ মারণের যোগ্য, এই কল্য মারণের যোগ্য এইরকম অনুক্রম করতে থেকে যমরাজ ফল দানের নিমিত্ত স্থিত আছেন (বা পরিগণনা করতে করতে পরিক্রমণ করে চলেছেন। তিনি দ্বিপদশালী মনুষ্য ইত্যাদি ও চতুষ্পদশালী পশুবর্গের নিয়ন্তা। সেই মৃত্যুকেপ্রেরণশালী যমরাজের উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করছি ৷ ৩৷
টীকা –উপযুক্ত ৭ম ও ৮ম এবং পরবর্তী ৯ম সূক্তের মন্ত্রগুলি গৃহ ইত্যাদিতে কপোত (কবুতর, মতান্তরে ঘুঘু), উল্ক (পেঁচা) প্রবেশ করলে তার শান্তির জন্য বিনিয়োগ হয়। এই উদ্দেশে গৃহে হোমাগ্নি আবপনীয় ও কপোতের প্রবেশ স্থলে গাভীকে তিনবার পরিভ্রামিত করানো কর্তব্য ॥ (৬কা, ৩অ. ৭-৮)।
বঙ্গানুবাদ –এই পক্ষশালী (পক্ষীরূপ) আয়ুধ দূরস্থে পরিদৃশ্যমান শত্রুগণকে প্রাপ্ত হোক। ঐ অশোভন বাণী উচ্চারণকারী উল্ক (পেঁচা) নিবার্য হয়ে যাক, পচনাগ্নির (রন্ধনশালাস্থিত অগ্নির) নিকট পদচিহ্ন রক্ষণকারী অশুভসূচক কপোতও নির্বীর্য হয়ে যাক ॥ ১।
হে পাপদেবতা নির্ঋতি! তোমার দ্বারা প্রেরিত হয়ে এই কপোত ও উল্ক আমাদের ঘরে আগত হয়েও যেন না প্রাপ্ত হতে পারে ॥ ২॥
এই কপোত ও উলুকের আগমন জনিত অশুভ চিহ্ন আমাদের নিমিত্ত অহিংসক হয়ে যাক। আমাদের বীরবর্গ পরাজিত হয়ে প্রত্যাবর্তনের ভাবকে যেন প্রাপ্ত না হয়। হে যমের দূতরূপ কপোত! যেমন তোমার অধিস্বামীর গৃহে সেখানকার প্রাণীগণ তোমাকে নির্বীর্যরূপে দর্শন করে, তেমনই যেন আমরাও দেখি ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –মধু-রসযুক্ত এই যবকে দেবতাগণ সরস্বতী নদীর নিকট মনুষ্যগণকে দান করেছিলেন। সেই সময় কর্ষণ করে ধান্য উৎপন্ন করার নিমিত্ত ইন্দ্র হল ধরেছিলেন এবং শোভন দানশালী মরুৎ-বর্গ কৃষক হয়েছিলেন। ১।
হে শমী (শাই বৃক্ষ)! তোমার যে হর্ষ (মদ) অবমত (অপকৃষ্ট) বা বিকেশসম্পন্ন জনের কেশের উৎপাদক, এবং সেই কেশের বৃদ্ধিকারক হয়ে থাকে, তাতে তুমি পুরুষকে সর্বত্র হর্ষযুক্ত করে থাকো। তুমি শতশাখা সম্পন্ন হয়ে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হও। আমি তোমাকে ছেদন করছি না, অন্য বৃক্ষকে ছেদন করছি। ২
হে সৌভাগ্যের করণরূপা, বিনা প্রযত্নেই বর্ষার জলে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত-শালিনী, বৃহৎ বৃহৎ পত্রশালিনী শমী! মাতা কর্তৃক পুত্রকে সুখ। প্রদানের সমান, তুমি কেশসমূহের সুখকারী হও ৩৷
বঙ্গানুবাদ— সূর্য উদয়াচলের উপর আরোহণ করে পূর্ব- দিভাগে দর্শন দান করছেন। এঁর কিরণসমূহ সকলের মাতৃস্বরূপা পৃথিবীকে আবৃত বা ব্যাপ্ত করে দিয়েছে। পুনরায় ইনি স্বর্গ ও অন্তরিক্ষ লোককে ব্যাপ্ত করেছেন. এই সূর্য বৃষ্টির জলকে দোহন করার কারণে গো নামে অভিহিত হয়ে থাকেন। ১।
প্রাণ ও অপান ব্যাপারের করণশালী (অর্থাৎ প্রাণাপানযুক্ত) প্রাণীগণের দেহের মধ্যে সূর্যের প্রভা বিচরণ করছে। এই মহান্ সূর্য স্বর্গ ও উপরস্থ সকল লোককেও প্রকাশমান করে তুলছে। ২।
দিবা ও রাত্রির অঙ্গ রূপ ত্রিশ মুহূর্তকাল এই সূর্যের রশ্মিসমূহ হতেই দেদীপ্যমান হয়ে থাকে এবং বেদত্রয়ী বাণীও সূর্যের আশ্রয়েই অবস্থিত থাকে ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে ঋত্বিকবৃন্দ! যাতুধানদের (রোগের কীটানুরূপ রাক্ষসগণের) বিনাশ করণশালী হব্যকে ঘৃতের সাথে এই অগ্নিতে উত্তম প্রকারে আহুতি দান করো। হে অগ্নি! এই উপদ্রবীদের ভস্ম করে আমাদের গৃহসমূহকে সন্তাপ হতে রক্ষা করো ॥১॥
হে যাতুনরূপী পিশাচগণ (মাংসখাদকগণ)! তোমাদের পঞ্জরস্থ অস্থিসমূহকে রুদ্রদেব ছেদন করে ফেলুন। হে মাংসভক্ষী পিশাচগণ! রুদ্র দেবতা তোমাদের কণ্ঠসমূহকে ছেদন করে দিন। বীর্যময়ী ঔষধিসমূহও তোমাদের যম-প্রাপ্তি ঘটাক ২
হে মিত্রাবরুণ! আমরা যেন নির্ভয় হয়ে এই দেশে থাকতে পারি। তোমরা এই মাংসভক্ষী রাক্ষসগুলিকে আমাদের নিকট হতে বিতাড়িত করে দাও। ওদের যেন কোন ভূমি এবং আশ্রয়দাতা না মেলে। ওরা পরস্পর বিহ্যমান হয়ে (অর্থাৎ হানাহানি করে) নষ্ট-ভ্রষ্ট হয়ে যাক। ৩।
বঙ্গানুবাদ— হে মনুষ্যগণ! যে ইন্দ্রের রঞ্জক-জ্যোতি শত্রু-হিংসার প্রেরণা জোগায়, তার সেই সেবনীয় তেজকে তোমরা গ্রহণ করো। ১৷৷
সেই ইন্দ্ৰ অপরের দ্বারা তিরস্কৃত না হয়ে আপন তেজে শত্রুকে দমিত করে দেন। বৃত্রবধের সময়ে তার বলকে কেউ অবদমিত করতে পারেনি; সেই রকম আজও কারো দ্বারা অভিভূত হয়নি। ২৷৷
সেই ইন্দ্র আমাদের পীতবর্ণের প্রভূত সুবর্ণ প্রদান করুন। সেই দেবতা, মনুষ্য ইত্যাদির অধিস্বামী, সকল রকমে শ্রেষ্ঠ ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে স্তোতা! ইচ্ছিত-বৰ্ষক (অর্থাৎ কামবর্ষণশীল), যাতুনবর্গের সংহারক, অগ্নিকে স্তুতি-করণশালী বাণীসমূহ উচ্চারণ করো। সেই অগ্নিদেবতা আমাদের রাক্ষস পিশাচ ইত্যাদি হতে মুক্ত করুন ৷৷ ১৷৷
যে অগ্নি আপন তীক্ষ্ণ তেজের দ্বারা যাতুধানগণকে বিনাশ করেন, তিনি আমাদের শত্রুগণ হতে মুক্ত করুন। ২।
যে অগ্নিদেব জল-বিহীন মরুভূমিতে রেতঃ-রূপে অধিক তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠেন (অথবা যে অগ্নি অত্যন্ত দূরদেশ হতে জলবর্জিত দেশকে অন্তর্হিত করে অতিশয়রূপে দীপ্যমান হন), তিনি রাক্ষস, পিশাচ ও শত্রুগণ হতে আমাদের মুক্ত করুন ৷ ৩৷
যে অগ্নিদেব জঠরাগ্নি ইত্যাদি অনেক রূপে দর্শন দান করেন এবং সূর্যরূপে সকল ভুবনকে প্রকাশ করেন, সেই অগ্নিদেব রাক্ষস, পিশাচ ও শত্রুগণ হতে আমাদের মুক্ত করুন। ৪।
এই পৃথিবীর উপরস্থ অন্তরিক্ষলোকে যে সূর্যাত্মক অগ্নি প্রকট হয়ে থাকেন, সেই অগ্নিদেব আমাদের রাক্ষস, পিশাচ, শত্রু ইত্যাদি হতে মুক্ত করুন। ৫৷৷
বঙ্গানুবাদ— সকল মনুষ্যের হিতকরী (বৈশ্বানর) অগ্নিদেব দূর দেশ হতে আমাদের রক্ষার্থে। আগমন পূর্বক আমাদের সুন্দর স্তুতিগুলি শ্রবণ করুন ॥ ১৷
সেই বৈশ্বানর অগ্নিদেব আমাদের সমীপে আগমন করে আমাদের স্তুতি রূপ উথ-মন্ত্রসমূহের দ্বারা প্রসন্ন হয়ে যজ্ঞে স্থিত হোন। ২৷৷
বৈশ্বানর অগ্নিদেব অঙ্গিরা মহর্ষিগণের স্তোম ও শস্ত্র নামক স্তুতিকে সমর্থ করে, তাদের উজ্বল যশ ও অন্ন প্রাপ্ত হওয়ার বিধি রচনা করে, শোভন স্বর্গকে প্রাপ্তি করিয়ে দিয়েছেন ॥ ৩
ঋতাবানং বৈশ্বানরমৃতস্য জ্যোতিষম্পতি। অজস্রং ঘর্মমীমহে॥১॥ স বিশ্ব প্রতি চাপ ঋতৃংরুৎ সৃজতে বশী। যজ্ঞস্য বয়ঃ উত্তিরন্ ॥ ২॥ অগ্নিঃ পরে ধামসু কামো ভূতস্য ভব্যস্য। সম্রাডেকো বি রাজতি ॥ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –আমরা সেই বৈশ্বানর অগ্নির উপাসনা করছি, যিনি যজ্ঞানুষ্ঠাবান এবং যজ্ঞানুষ্ঠাত্মক জ্যোতির অধিপতি এবং সদৈব প্রকাশমান থাকেন। তার নিকট হতে আমরা উত্তম (ঈপ্সিত) ফল প্রার্থনা করছি ॥১।
সকল প্রজাকে ফলদানশীল এই বৈশ্বানর অগ্নি দেবতাগণকে যজ্ঞাত্মক অন্ন প্রাপ্ত করাতে এবং সূর্য রূপে বসন্ত ইত্যাদি ঋতুসমূহকে রচনা করছেন ॥ ২॥
একমাত্র অগ্নিই উত্তম স্থানসমূহের অধিস্বামী; তিনি উৎপাদিত ও উৎপাদ্যমান প্রাণীসমূহকে তাদের ঈপ্সিত ফল প্রদান করণের নিমিত্ত অধিক তেজস্বীরূপে প্রতিভাত হয়ে থাকেন ৷৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –শাপক্রিয়ার কর্তা হয়ে সহস্রাক্ষ ইন্দ্র রথে আরোহিত হয়ে (বা অশ্ব সংযুক্ত করে) আমাদের নিকট আগমন করুন এবং আমাদের শাপ প্রদানশীল শত্রুর প্রতি সেই ভাবেই জিঘাংসু হয়ে উঠুন, যেভাবে মেষপালকের গৃহে অগমন করে বৃক (নেকড়ে বাঘ বা শৃগাল) তত্রত্য মেষগুলিকে হনন করে ॥১॥
হে শপথ (শাপক্রিয়ার কর্তা)! তুমি বাধক হয়ো না, আমাদের পরিত্যাগ করো। যেমন পতনশীল বিদ্যুৎ বা বজ্র বৃক্ষকে ভস্ম করে, তেমনভাবেই তুমি আমাদের শাপ-প্রদানকারী শত্রুসমূহকে ভস্ম করে দাও। ২।
আমরা শাপ প্রদান করি না, পরন্তু যে শত্রু আমাদের শাপ প্রদান করে বা কঠোর ভাষণ প্রয়োগ করে, এমন উভয়বিধ শত্রুকে কুকুরের সম্মুখে পিষ্টময় খাদ্যের (পিঠা বা রুটির) মতো মৃত্যুর মুখে নিক্ষেপ করো ॥৩॥
টীকা –উপযুক্ত পঞ্চম সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ববর্তী (চতুর্থ) সূক্তের মতো সর্বভৈষজ্যকর্মে উক্ত হয়েছে। ষষ্ঠ সূক্তের দ্বারা অভিচারজনিত দোষ নিবৃত্তির নিমিত্ত শ্বেত মৃত্তিকা অভিমন্ত্রিত করে কুকুরকে প্রদেয়। সেইরকমে সম্পাতিত অভিমন্ত্রিত পালাশমণি প্রদান, ইঙ্গিড়হোম অথবা সমিদাধান করণীয়।… ইত্যাদি। মন্ত্রের মধ্যে সহস্রাক্ষো যুক্তবা শব্দদ্বয় দর্শন করে আচার্য সায়ণ ইন্দ্র-কে লক্ষ্য করেছেন। সেইমতো ব্যাখ্যাও করেছেন। কিন্তু এখানে সহস্রাক্ষ অর্থে যদি সহস্রাংশু ধরা যায়, তাহলে ইন্দ্রের পরিবর্তে সূর্যে লক্ষ্য আসে। আবার, অসংখ্য অংশুমান হিসেবে চন্দ্র-কেও লক্ষ্য করা যায়। সেই দিক থেকে, আমাদের মনে হয়, এই ষষ্ঠ সূক্তের শাপক্রিয়ার কর্তা-রূপ দেবতা চন্দ্রমা। এই সূক্তের উদ্দিষ্ট দেবতাও চন্দ্রমা। অবশ্য, এটি আমাদেরই ধৃষ্টতাজনিত ধারণা হতে পারে। (৬কা. ৪অ. ৫-৬সূ)।
সিংহে ব্যাঘ্র উত যা পৃদাকৌ ত্বিরিগ্নেী ব্রাহ্মণে সূর্যে যা। ইন্দ্রং যা দেবী সুভগা জজান সা ন ঐতু বৰ্চসা সংবিদানা ॥ ১৷৷ যা হস্তিনি দ্বীপিনি যা হিরণ্যে ত্বিষিরল্স গোষু যা পুরুষেষু। ইন্দ্রং যা দেবী সুভগা জজান সা ন ঐতু বৰ্চস্য সংবিদানা ॥ ২॥ রথে অক্ষেভৃষভস্য বাজে বাতে পর্জন্যে বরুণস্য শুষ্মে। ইন্দ্রং যা দেবী সুভগা জজান সা ন ঐতু বচসা সংবিদানা ॥ ৩॥ রাজন্যে দুন্দুভাবায়তায়ামশ্বস্য বাজে পুরুষস্য মায়ৌ। ইন্দ্ৰং-যা দেবী সুভগা জজানসা ন ঐতু বচসা সংবিদানা ॥ ৪৷৷
বঙ্গানুবাদ –সিংহ, ব্যাঘ্রে ও সর্পের মধ্যে যে আক্রমণাত্মক তেজ (ত্বিষি অর্থাৎ দীপ্তি বা কান্তি) আছে, অগ্নির মধ্যে যে দাহরূপ তেজ আছে, ব্রাহ্মণের মধ্যে যে শাপরূপ তেজ আছে, সূর্যের মধ্যে যে তাপরূপ তেজ আছে, সেই সকল তেজের দ্বারাই ইন্দ্র প্রকট হয়েছেন। সেই তেজোরূপা সৌভাগ্যময়ী দেবী আমাদের অভীপ্সিত তেজের সাথে মিলিত হয়ে প্রাপ্ত হোন ॥১॥
হস্তীতে বলোকরূপে; ব্যাঘ্ৰেতে হিংসনরূপে; স্বর্ণেতে বর্ণোকর্ষরূপে এবং জল, গাভী ও পুরুষে তাদের সাধারণরূপ যে তেজ (ত্বিষি অর্থাৎ দীপ্তি বা কান্তি) আছে, সেগুলির দ্বারাই সৌভাগ্যযুক্তা (ত্বিষ্যাত্মিকা) দেবী ইন্দ্রকে উৎপন্ন করেছেন। সেই তেজোরূপা দেবী আমাদের অভীপ্সিত তেজের সাথে মিলিত হয়ে প্রাপ্ত হোন ॥ ২॥
বর্ষা কারক মেঘে, গমন-সাধন-রূপ রথে, সেচনসামর্থযুক্ত বৃষে, দ্রুত বেগশালী বায়ু ও মেঘের অধিপতি বরুণের মধ্যে যে তেজ বা দীপ্তি আছে, সেগুলির দ্বারাই সৌভাগ্যযুক্তা দীপ্তিময়ী দেবী ইন্দ্রকে উৎপন্ন করেছেন। সেই তেজোরূপা দেবী আমাদের অভীপ্সিত তেজের সাথে মিলিত হয়ে প্রাপ্ত হোন ॥৩৷৷
রাজপুত্রের অভিষেকে বাদিত দুন্দুভিতে, অশ্বের শীঘ্র গমনে ও পুরুষের উচ্চ রবের মধ্যে যে তেজ আছে, এবং এই যে তেজগুলির দ্বারাই যে সৌভাগ্যযুক্তা দেবী ইন্দ্রকে উৎপন্ন করেছেন, সেই তেজোরূপা দেবী আমাদের অভীপ্সিত তেজের সাথে মিলিত হয়ে প্রাপ্ত হোন ৪
বঙ্গানুবাদ –আমাদের দ্বারা ইন্দ্রকে প্রদানশালিনী অত্যন্ত শক্তিময়ী, বলদায়িনী, পরাভবকারিণী, যশোদাত্রী হবিঃ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হোক। হে ইন্দ্রদেব! সেই হবিঃ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ার পরে আমা হেন হবিযুক্ত যজমানকে চিরকাল বৃদ্ধিসম্পন্ন করে রাখো ॥১॥
যশোদাতা ইন্দ্র আমাদের সম্মুখে বর্তমান; আমরা তাঁকে নমস্কার ইত্যাদির দ্বারা পরিচর্যা করবো। হে ইন্দ্র! সেই হেন তোমার প্রদত্ত রাজ্য প্রাপ্ত হয়ে আমরা যশস্বী হয়ে থাকি। ২।
ইন্দ্র, অগ্নি ও সোম যশ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা করে উৎপন্ন (সৃষ্ট) হয়েছেন। এঁদের যশস্বী হওয়ার ন্যায় আমি হেন যশের কামনাশালীও দেবতা ও মনুষ্য ইত্যাদি জীবসমূহের মধ্যে সর্বাধিক যশস্বী হবো ৷৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে দাবা ও পৃথিবী! তোমাদের কৃপায় আমরা নির্ভয় হয়ে আছি। চন্দ্রমা, সূর্য এবং আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থিত অন্তরিক্ষ আমাদের অভয় প্রদান করুক। সপ্ত-ঋষিগণের (অর্থাৎ-বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, ভরদ্বাজ, গৌতম, অত্রি, বসিষ্ঠ ও কশ্যপের) প্রাপ্তব্য হবিও আমাদের অভয় প্রদান করুক ॥১॥
হে সবিতা! আমাদের অধ্যুষিত গ্রামের চতুর্দিকে প্রভূত অন্ন উৎপন্ন হোক। আমাদের এই স্থানে সদা মঙ্গল বিরাজিত থাকুক। ইন্দ্রদেব আমাদের শত্রুভয় হতে মুক্ত রাখুন। তার (অর্থাৎ ইন্দ্রের) কৃপায় আমাদের নিকট হতে রাজরোষ বহু দূরে গমন করুক ॥ ২॥
হে ইন্দ্র! দক্ষিণদিক শত্রুরহিত করো, আমাদের উত্তর দিক শক্তহীন করো, আমাদের পশ্চিম দিক শত্রুশূন্য করো, এবং আমাদের পূর্ব দিক শত্ৰুবর্জিত করে দাও ॥ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –সুখ ইত্যাদিকে প্রত্যক্ষ-করণশালী মনের নিমিত্ত, জ্ঞানসাধন চেতনার নিমিত্ত, ধ্যান-সাধন বুদ্ধির নিমিত্ত, স্তুতি-সাধন মতির নিমিত্ত, জ্ঞানরূপ শ্রুতির নিমিত্ত এবং চাক্ষুষ জ্ঞানরূপ দর্শন শক্তির নিমিত্ত আমরা হব্য ইত্যাদির দ্বারা ইন্দ্রের পূজন (বা পরিচর্যা) করছি ॥১॥
মুখ ও নাসিকার দ্বারা বহির্বিনির্গত বায়ুর পুনরায় অন্তঃপ্রবেশরূপ অপাননব্যাপারকে, ঊর্ধ্ব ও অধোবৃত্তি পরিত্যাগের দ্বারা বায়ুর অবস্থানরূপ ব্যানব্যাপারকে ও শরীরস্থ প্রাণবায়ুকে মুখনাসিকার দ্বারা বহির্বিনির্গমনরূপ প্রাণনব্যাপারকে তথা প্রাণাপান ইত্যাদি বহুর ধারক মুখ্য প্রাণকে এবং সরস্বতী দেবীকে আমরা হব্য ইত্যাদির দ্বারা সেবা করছি৷৷ ২৷৷
প্রাণাধিদেব সপ্ত ঋষি আমাদের শরীরের রক্ষক হোন, তারা ইন্দ্রিয়রূপে উৎপন্ন হয়েছেন। তারা যেন আমাদের ত্যাগ না করেন। হে অবিনাশী দেবগণ। তোমরা আমাদের মধ্যে দীর্ঘ আয়ুর স্থাপনা করো ৷৩৷
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –অভয়ং দ্যাবাপৃথিবী ইতি তৃচেন গ্রামাদ্যভয়কামঃ তস্যৈব প্রতিদিশং সপ্তর্ষী যজতে উপতিষ্ঠতে বা। সূত্রিতং হি…তথা সেনাভয়-নিবৃত্ত্যর্থং তস্যা প্রতিদিশং সপ্তর্ষীণাং যাগং উপস্থানং বা কুর্যাৎ…মনসে চেতসে ধিয়ে ইতি তৃচেন গোদানাখ্যে সংস্কারকর্মণি মহাব্রীহিময়ং স্থালীপাকং শান্তুদকেন অভক্ষ্য অভিমন্ত্র আয়ুষ্কামং মাণবকং প্রাশয়েৎ। সূত্রিতং হি..ইত্যাদি ॥ (৬কা, ৪অ. ৯-১০)৷৷ টীকা –উপযুক্ত নবম সূক্তের দ্বারা গ্রাম ইত্যাদির অভয় কামনা পূর্বক তার চতুর্দিকে সপ্তর্ষির উদ্দেশে যাগ বা উপাসনা করণীয়। তথা সেনাভয় নিবৃত্তির নিমিত্তও প্রতি দিকে ঐরকম যাগ বা উপস্থান করণীয়। দশম সুক্তটির দ্বারা গোদান নামে আখ্যাত সংস্কার কর্মে মহাব্রীহিময় স্থালীপাক শান্তু্যদকের দ্বারা অভক্ষণ ও অভিমন্ত্রিত করে আয়ুষ্কামী মানবককে খাওয়ানো কর্তব্য। (৬কা. ৪অ. ৯-১০)।
বঙ্গানুবাদ –ধনুর্ধারী কর্তৃক ধনুকের দণ্ড হতে জ্যা উন্মুক্ত করণের ন্যায়, হে পুরুষ! আমি তোমার হৃদয় হতে ক্রোধকে অপসারিত করে দিচ্ছি। আমরা উভয়ে যেন পরস্পর অনুরাগ রক্ষা করে একমনা হয়ে কার্য সাধন করতে পারি। ১।
আমরা এক মনে কার্যে নিয়োজিত হতে পারি, সেই কারণে আমি তোমার ক্রোধকে গুরুভার প্রস্তরের নীচে প্রেরিত করছি। ২।
আমি তোমার ক্রোধের উপর দণ্ডায়মান হয়ে পায়ের অগ্রভাগ এবং পাষ্ণির (গোড়ালির) দ্বারা সেই ক্রোধকে নিষ্পীড়ন পূর্বক আমার অধীন করে নিচ্ছি। আমি তোমার ক্রোধকে অবদমিত করে তোমাকে আপন অনুকূল করে নিচ্ছি ৷৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –এই দর্ভ (কুশসমূহ), আপন জাতির অথবা শত্রুজনের ক্রোধকে নষ্ট করণে সমর্থ হয়ে সম্মুখে অবস্থান করছে। স্বভাবতঃ ক্রোধী ও কারণবশতঃ ক্রোধ-করণশালীর ক্রোধকে নিবারণের ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ এক উপায়স্বরূপ ॥ ১।
এই পুরোবর্তী কুশসমূহ অনেক মূলসম্পন্ন হয়ে তথা অধিক জলসম্পন্ন ভূভাগকে অবলম্বন করে অবস্থিত রয়েছে। পৃথিবী হতে অন্তরিক্ষের দিকে উখিত এই দৰ্ভকে ক্রোধের শাস্তি-করণশালী বলা হয়েছে। ২।
হে ক্রোধবন্ত! ক্রোধকে প্রকট-করণশালিনী তোমার হনুসম্বন্ধিনী ক্রোধাভিব্যঞ্জিকা ধমনিসমূহকে আমরা শান্ত করে দিচ্ছি; এবং ক্রোধাবেশে মুখের উপর প্রকটশীলা ধমনিসমূহকেও শান্ত করে দিচ্ছি। আমি তোমার ক্রোধকে অবদমন পূর্বক পরাধীন করে তোমাকে আপন অনুকূল করে দিচ্ছি ৷৷ ৩৷৷
অস্থাৎ দৌরস্থাৎ পৃথিব্যস্থাদ বিশ্বমিদং জগৎ। অম্বুবৃক্ষা ঊর্ধ্বপ্নাস্তিষ্ঠাদ রোগগা অয়ং তব ॥১॥ শতং যা ভেষজানি তে সহস্রং সঙ্গতানি চ। শ্রেষ্ঠমাস্রাবভেষজং বসিষ্ঠং রোগনাশনম্ ॥ ২॥ রুদ্রস্য মূত্ৰমস্যমৃতস্য নাভিঃ। বিষাণকা নাম বা অসি পিতৃণাং মুলাদুখিতা বাতীকৃতনাশনী ৷ ৩৷
বঙ্গানুবাদ— যে প্রকারে গ্রহ নক্ষত্রসমূহের সাথে দ্যুলোক আপন স্থানে অবস্থান করছে, যে প্রকারে সকলের আধারভূত পৃথিবীও অবস্থিত আছে এবং যে প্রকারে এই জঙ্গম প্রাণীসমূহ পৃথিবীর উপর আশ্রিত আছে, যে প্রকারে এই বৃক্ষসমূহ দণ্ডায়মান হয়ে নিদ্রা, অনুভব পূর্বক আপন স্থিতিতে অটল হয়ে থাকে, তেমনই, হে ব্যাধিত পুরুষ! তোমার রুধির স্থির ভাবে অবস্থান করুক, যেন ক্ষরিত (বাহিত) না হয় ॥ ১। হে রোগী! রোগকে প্রশমন করণশালিনী যে শত বা সহস্র সংখ্যক ঔষধি প্রাপ্য হয়ে থাকে, তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো এই রক্তস্রাব দূরীকরণশালী কর্ম। ২।
হে গোশৃঙ্গোদক! তুমি রুদ্রের মূত্রস্বরূপ এবং চিরকাল জীবনরূপ অমৃতকে বন্ধনশালী; অতএব তুমি রোগকে বিনাশ করো। হে গোঙ্গ! তোমার বিষাণকা নাম (নাম বৈ) বিশেষভাবে রোগ-শমনের সূচক ও পিতৃদেবগণের মূল আস্রাব রোগের উপাদান স্বরূপ পাপকে নির্মূল করণশালী ॥ ৩৷৷
পরোহপেহি মনস্পাপ কিমশস্তানি শংসসি। পরেহি ন ত্বা কাময়ে বৃক্ষাং বনানি সং চর গৃহে গোষু মে মনঃ ॥১॥ অবশসা নিঃশাসা যৎ পরাশসোপারিম জাগ্রতো যৎ স্বপন্তঃ। অগ্নিবিশ্বন্যপ দুষ্কৃতান্যজুষ্টান্যারে অম্মদ দধাতু ॥ ২॥ যদি ব্ৰহ্মণস্পতেইপি মৃষা চরামসি। প্রচেতা ন আঙ্গিরসো দুরিতাৎ পাত্বংহসঃ ॥ ৩৷৷ বঙ্গানুবাদ –হে পাপে আসক্তি রক্ষণশালী আমার মন! তুমি আমা হতে দূরে থাকো, আমাদের দুঃস্বপ্ন প্রদর্শন করো না। তুমি অশোভন উক্তি আনয়ন করে থাকো, এই নিমিত্ত আমি তোমাকে কামনা করি না। তুমি বৃক্ষভূমিষ্ঠ বনানীতে প্রবেশ করে সেখানেই অবস্থান করো। আমার মন স্ত্রী, পুত্র ও গো-ইত্যাদি পশুসমূহের মধ্যে যথোচিত ভাবে অবস্থান করুক ॥১।
আমরা যে দুঃস্বপ্নের দ্বারা পীড়িত হচ্ছি, সেই দুঃস্বপ্নের কারণ রূপ পাপকে অগ্নিদেব আমাদের নিকট হতে দূর করে দিন ॥২।
হে মন্ত্রস্বামী ব্ৰহ্মণস্পতি! হে ইন্দ্রদেব! পাপবশ যে দুঃস্বপ্নের দ্বারা পীড়িত হয়ে আমরা মিথ্যালোকে বিচরণ করি, সেই পাপ হতে আঙ্গিরস-মন্ত্রশালী (প্রচেতা বা প্রকৃষ্টজ্ঞানশালী) বরুণ আমাদের রক্ষা করুন ॥ ৩
টীকা –তৃতীয় সূক্তটির দ্বারা অপবাদের ভৈষজ্যকর্মে স্বয়ংপতিত গোঙ্গ সম্পাতিত করে জল রক্ষা পূর্বক অভিমন্ত্রিত করে সেই জলে আচমন ও প্রোক্ষণ করণীয়। চতুর্থ সূক্তটির দ্বারা দুঃস্বপ্নদর্শননিমিত্ত দোষ নিবারণকল্পে শয্যা হতে উত্থিত হয়ে মুখ প্রক্ষালন কর্তব্য। তথা অতিঘোর দুঃস্বপ্ন দর্শনজনিত দোষ নিবারণ কর্মে ব্রীহি-য-গগাধূম ইত্যাদি মিশ্রিত দুটি পুরোডাশ প্রস্তুত করে একটি এই (৪র্থ) সূক্তের দ্বারা অগ্নিতে হোম করণীয়। অপর পুরোডাশটি শত্রুক্ষেত্রে প্রক্ষেপণীয়।…ইতাদি। (৬কা, ৫অ. ৩-৪)।
বঙ্গানুবাদ— হে স্বপ্ন! তুমি প্রাণধারকও নও, মৃতও নও; তুমি জাগ্রতাবস্থার অনুভব হতে উৎপন্ন। হে স্বপ্ন! বরুণের পত্নী তোমার মাতা ও বরুণ তোমার পিতা। তুমি অররু (আর্তিকর অসুর) নামে অভিহিত ॥১॥
হে স্বপ্নভিমানী দেবতা! আমরা তোমার জন্ম সম্পর্কে জ্ঞাত আছি। তুমি বরুণপত্নীর পুত্র। তুমি যমের ব্যাপার (কার্য) সাধন করণশীল। আমরা তোমাকে উত্তম প্রকারে জ্ঞাত আছি। তুমি দুঃস্বপ্নের ভীতি হতে আমাদের রক্ষাকরণশালী। ২
যেমন ঋণী মনুষ্য ধন প্রত্যর্পণের দ্বারা ঋণকে চুকিয়ে দেয়, যেমন গাভীর খুর ইত্যাদি দূষিত অঙ্গকে ছেদন ইত্যাদি কর্মের দ্বারা দূর করা হয়, তেমনই আমরা দুঃস্বপ্ন হতে সঞ্জাতব্য ভয়সমূহকে নিজেদের নিকট হতে দূর করে শত্রুদের উপর আরোপিত (প্রেরিত) করে দেবো॥ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –সেই অগ্নিদেবতা প্রাতঃসবন কর্মে আমাদের রক্ষা করুন। সেই বিশ্বের কর্তা, প্রাণীবর্গের হিতৈষী, দুঃখকে শান্ত করণশালী (বৈশ্বানর) আমাদের যজ্ঞের ফলরূপ ধনে স্থাপিত করুন। তাঁর কৃপায় আমরা দীর্ঘায়ু লাভ করে জীবিত থেকে পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির সাথে একত্রে ভোজন করতে থাকবো ॥১॥
ঊনপঞ্চাশৎ সংখ্যক মরুৎ ও তাদের অধিস্বামী ইন্দ্রদেব আমাদের অর্থাৎ এই ঋত্বিক ও যজমানদের দ্বিতীয় সবনে যেন ত্যাগ না করেন। আমরা তাদের প্রসন্ন-করণশীল স্তুতি-বাক্য উচ্চারণ করে শতায়ু লাভ করবো এবং তাদের কৃপার পাত্র হয়ে থাকবো ॥ ২॥
এই তৃতীয় সূবন সেই ঋতু-দেবতাগণের, যাঁরা সোম-ভক্ষণের পাত্র এই চমসকে আপন শিল্পকর্মের দ্বারা প্রস্তুত করেছিলেন। সেই ঋভুগণ, (অর্থাৎ সুধন্য অঙ্গিরার ঋভু, বিভু ও বাজ বা নামে পুত্রত্রয়), রথ চমস ইত্যাদি নির্মাণের কারণে দেবত্ব লাভ করেছেন। এই হেন সেই ঋভুগণ যজ্ঞের উত্তম ফলকে স্মৃতিতে রক্ষা করে আমাদের সিদ্ধি প্রাপ্ত করান ॥ ৩ ৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে প্রশংসনীয় গতিশালী প্রাতঃসবনে সাধিতব্য যজ্ঞ! তুমি বাজপক্ষীর ন্যায়। শীঘ্রগামী। তোমার স্তোত্রসমূহে গায়ত্রী ছন্দের আধিক্য থাকার কারণে তুমি গায়ত্ৰচ্ছন্দা। আমি। তোমাকে দণ্ডের ন্যায় গ্রহণ করছি, অতএব তুমি আমাকে যজ্ঞের অন্তিম শ্রেষ্ঠ ঋক্-সমূহ প্রাপ্ত করাও (অর্থাৎ যজ্ঞের সুষ্ঠু সমাপ্তি ঘটাও)। তোমার উদ্দেশে এই স্বাহাকৃত হবিঃ আহুত হচ্ছে। ১।
হে তৃতীয় সবনশালী যজ্ঞ! জগতী ছন্দের অধিক প্রয়োগ হওয়ার কারণে তুমি জগচ্ছন্দা। ঋভুগণকে। প্রসন্ন করণশালী হওয়ার কারণে তুমি ঋভু-নামধারী। আমি তোমাকে দণ্ডের ন্যায় গ্রহণ করছি। তুমি আমাকে যজ্ঞের অন্তিম শ্রেষ্ঠ ঋক্-সমূহ প্রাপ্ত করাও। তোমার উদ্দেশে এই স্বাহাকৃত হবিঃ আহুত হচ্ছে ॥ ২।
হে মাধ্যন্দিন সবনশালী যজ্ঞ! তোমার স্তোত্রসমূহে ত্রিষ্টুপ ছন্দের অধিক প্রয়োগ। হওয়ার কারণে তুমি ত্রিষ্ঠুছন্দা, এবং সেচন-সমর্থ ইন্দ্রকে প্রসন্ন করণশালী হওয়ার কারণে তুমি ইন্দ্র-রূপ। আমি তোমাকে দণ্ডের ন্যায় গ্রহণ করছি। তুমি আমাকে যজ্ঞের অন্তিম শ্রেষ্ঠ ঋক্-সমূহ ১ প্রাপ্ত করাও। তোমার উদ্দেশে এই স্বাহাকৃত হবিঃ আহুত হচ্ছে। ৩।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! বানরের ন্যায় চঞ্চল গতিশালিনী ও দেহগত জলকে পানকারিণী তোমার শিখাসমূহ এই জীব-দেহকে সেইভাবেই ভস্ম করে দেয়, যেভাবে প্রসূতা গাভীর দ্বারা প্রসবের পর ভূমিতে পতিত আপন জরায়ু (গর্ভবেষ্টন ঝিল্লি) ভক্ষিত হয়ে থাকে। ১।
হে অগ্নি! তুমি দহন-যোগ্য পুরুষের দেহে সেই রকমে ব্যাপ্ত হয়ে থাকে। যেমন শুষ্ক তৃণময় বনের মধ্যে গমন করে মেষসমূহ সেই তৃণরাশিকে ভক্ষণের নিমিত্ত ব্যাপ্ত হয়ে যায়। বৃক্ষযুক্ত বনে সঞ্চরণশীল দাবাগ্নি ও শবকে ভস্ম-করণশালী শবাগ্নি যখন ভস্ম করতে থাকে, তখন তারা বৃক্ষ বা পুরুষকে, (জীবদেহকে) ভস্ম করতে করতে সোম ইত্যাদি লতাকেও ভক্ষণ করে থাকে। ২।
হে অগ্নি! তোমার জ্বালাসমূহ আনন্দে উৎফুল্ল কৃষ্ণমৃগের লম্ফ-ঝম্পের ন্যায় আকাশে উথিত হয়ে নৃত্য করছে। তারা (অর্থাৎ তোমার সেই শিখাসমূহ) বাজ পক্ষীর ন্যায় বেগশালিনী হয়ে দাহাত্মক ধ্বনি উৎসারিত করছে। তারা অধিক ধূম উৎপন্ন করে মেঘসমূহকে রচনা করছে। হে অগ্নি! সূর্যমণ্ডলকে প্রাপ্ত হয়ে তোমার দীপ্তিসমূহ, প্রাণীবর্গের উপাদান-রূপ বৃষ্টির জলকে সংসারের নিমিত্ত ধারণ, করছে ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে অশ্বিদেবদ্বয়! তোমরা এই হিংসক আখুদের (মূষিকদের) বিনাশ পূর্বক তাদের শিরগুলি বিচ্ছিন্ন করে দাও, তাদের অস্থি-পঞ্জর চূর্ণ করে দাও। তোমরা আমাদের ব্রীহি যব ইত্যাদি ধান্যকে রক্ষা করণের নিমিত্ত তাদের মুখগুলি বন্ধ করে দাও। ১।
হে হিংসক মূষক, পতঙ্গ ইত্যাদি! তোরা উপদ্রবী হওয়ার কারণে হিংসার যোগ্য। ব্রহ্মের সমতুল্য ভয়ঙ্কর এই হবিঃ তোদের বিনাশ-করণের নিমিত্ত অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে সমর্পণ করা হতে যাচ্ছে। অতএব এই হবিঃ-কর্মের আগেই তোরা আমাদের যব ইত্যাদি শস্যকে ভক্ষণ না করে এই স্থান হতে অন্যত্র চলে যা ॥ ২॥
হে মূষক ও পতঙ্গ ইত্যাদির অধিস্বামী! সম্মুখস্থ হয়ে আমার বচন শ্রবণ করো। তোমরা যদি ইচ্ছা করো, তবে জঙ্গলেরই হোক বা গ্রামেরই হোক, যেখানেরই হও না কেন, আমরা আপন এই কর্মের দ্বারা তোমাদের সকলকেই বিনাশ করে দিচ্ছি ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –বায়ু-সম্বন্ধী পবনসাধন দশাপবিত্রের দ্বার শুদ্ধ হয়ে রসতত্বকে প্রাপ্ত হয়ে সোম। প্রত্যেক শরীরস্থ মুখ হতে নাভি পর্যন্ত উপনীত হচ্ছে। সেই সোম ইন্দ্রের সখা ॥ ১৷
সংসারের মাতৃরূপ জল (জলদেবীগণ) আমাদের পাপ-রহিত করুন। ক্ষরণশীল রসের দ্বারা জগৎ-সংসারকে পবিত্রকরণশালী ক্ষরণশীল সারের (বা ঘৃতের দ্বারা) সেই জলদেবীগণ আমাদের পবিত্র করুন। সেই দেব-রূপ জল স্নান, আচমন, প্রোক্ষণ ইত্যাদি কর্মের দ্বারা সকল পাপকে প্রবাহিত (বা ক্ষালন)-করণশালী হয়ে থাকে। আমি এইরকম জলে স্নান ইত্যাদির দ্বারা পবিত্র হয়ে (যজ্ঞ) কর্মের নিমিত্ত উত্থিত হচ্ছি। ২।
হে বরুণ! দেব-সম্বন্ধী যে পাপ মনুষ্যগণ করে থাকে, এবং অজ্ঞানবশে ধর্মকে পালন না করে বিপরীত আচরণ করে; সেই অজ্ঞান হতে উৎপন্ন পাপের দণ্ড-রূপী তোমরা আমাদের বিনাশ করো না ॥ ৩৷৷
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— হতং তং ইতি তৃচেন মূষকপতঙ্গশলভটিটিভকীটহরিণশল্যক– গোধাদীনাং সস্যভক্ষকানাং নিবৃত্তয়ে লোহময়ং সীসং ঘর্ষন এতং তৃচং জপ মূষকাদিযুক্তং ক্ষেত্রং অতিক্রামেৎ। তথা অনেন তৃচেন শর্করা অভিমন্যু মূষকাদিস্থানে পরিকিরেৎ…বায়োঃ পূতঃ ইতি তৃচেন …..সর্বরোগভৈষজ্যে আজ্যহোমং পলাশাদিশান্তবৃক্ষসমিদাধানং চ (কুর্যাৎ)। ….ইত্যাদি। (৬কা, ৫অ. ৯-১০)। টীকা— নবম সূক্তটির দ্বারা মূষক-পতঙ্গ ইত্যাদি শস্যভক্ষকদের নিবারণ করা হয়। এই নিমিত্ত লোহময় সীসা ঘর্ষণ পূর্বক এই সূক্তটি জপ করে মূষিক ইত্যাদি অধ্যুষিত ক্ষেত্র অতিক্রম করণীয়। তথা এই মন্ত্রগুলির দ্বারা শর্করা অভিমন্ত্রিত করে ঐসকল স্থানে পরিকীর্ণ করে দেওয়া কর্তব্য। দশম সূক্তটির দ্বারা সর্বরোগভৈয়জ্যে আজ্যহোম করণে, সোমবমনপান ইত্যাদি জনিত ব্যাধিপ্রশমনে, অর্থোপনবিঘুশমন, ইত্যাদি কর্মে বিনিযুক্ত হয়।..ইত্যাদি। (৬কা, ৫অ. ৯-১০সূ)।
বঙ্গানুবাদ— রাত্রির অন্ধকারে যে পিশাচ ইত্যাদি হিংসকগণ উপদ্রব করে থাকে, তাদের বিনাশকরণের নিমিত্ত সূর্যদেব অন্তরিক্ষে উদিত হচ্ছেন। সেই সূর্যকে সকলে সম্মুখে দর্শন করছে, ) কেননা তিনি উদায়চল পর্বতের শিখরের উপর উদয় হচ্ছেন। আমাদের নিকট অদৃশ্যবান। যাতুধানসমূহ (কীটাণু সমুদায়) কেও তিনি হনন করছেন। ১।
সূর্যের উদয়ের পর যে নদীসকল রাত্রিতে দৃশ্যমান হচ্ছিল না, তাদের দর্শন করা যাচ্ছে। সূর্যদেব অন্ধকারাত্মক রাক্ষসগণকে বিনাশ করে ফেলেছেন। এখন আমাদের গাভীগণ নির্ভয় হয়ে গোশালা সমূহে অবস্থান করছে এবং বন্য পশুগুলিও আপন আপন স্থান প্রাপ্ত হয়েছে ॥ ২
শতায়ু-করণশালিনী, রোগ-বিনাশিনী, মহর্ষি কম্বের দ্বারা কথিত এই চিত্তি প্রায়শ্চিত্তি ঔষধি শমীকে আমি রোগ নিবারণার্থে আনয়ন (বা সংগ্রহ) করছি। সেই ঔষধি অদৃষ্ট রাক্ষস ইত্যাদির (কীটাণুগুলির) দ্বারা উৎপন্ন-কৃত এই ব্যাধিত জনের ব্যাধিগুলিকে সম্পূর্ণভাবে বিনাশ করুক ॥ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –সূর্যদেব দক্ষিণ দিক হতে আমাকে রক্ষা করুন এবং বস্ত্র-ধন ইত্যাদি-যুক্ত দানে। আমাকে পূর্ণ করুন। আকাশ ও পৃথিবীর অভিমানী দেবতা আমাকে অভীপ্সিত ফল প্রদান করুন। পিতৃগণ সম্বন্ধী স্বাধীকারের অভিমানী দেবতা আমাদের নিকট অন্ন ইত্যাদি প্রেরণ করুন। সোম, অগ্নি, বায়ু, সবিতা ও ভগ দেবতা আমাদের কার্যের অনুকূল হোন। ১৷৷
মুখ ও নাসিকায় সঞ্চারণশীল প্রাণরূপ জীবন আমাদের পুনঃপ্রাপ্ত হোক। সকল মনুষ্যের হিতকরী বৈশ্বানর অগ্নিদেব আমাদের পাপকে দূর করে আমাদের শরীর-মধ্যে স্থিত হয়ে রক্ষা করুন। ২।
আমরা সুন্দর অন্তঃকরণের সাথে যুক্ত হবো। দেহের হস্ত পদ ইত্যদি সকল অঙ্গের সাথে যুক্ত হবে। দেহ-কান্তি ও সারভূত রসের সাথে যুক্ত হবে। ত্বষ্টাদেব আমাদের দেহের রোগ-পীড়িত অঙ্গকে রোগরহিত করে আমাদের শরীরকে পুষ্ট করুন। ৩।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –…তত্র উৎ সূর্য ইতি…তৃচেন রক্ষোগ্রহভৈষজ্যার্থং চিত্ত্যাদ্যোষধিসহিতং পূর্ণঘটং অভিমন্ত্র ব্যাধিতং অবসিঞ্চেৎ। তথা শমীসহিতোদকেন বা শমীবিম্বসহিতোদকেন বা শীর্ণপর্ণসহিতোদকেন বা অনেন তৃচেন অভিমন্ত্রিতেন ব্যাধিতং অবসিঞ্চেৎ। সূত্রিতং হি।..দ্যেশ্চ মে ইতি তৃচেন দুষ্টগণ্ডব্ৰণভৈষজ্যার্থং তৈলং অভিমন্যু তেন ব্রণং অবমৃজ্যাং। তথা এতং তৃচং জপ ৮ ব্রণদেশং হস্তেন অবমৃজ্যাৎ। তথা অনেন তৃচেন স্থূণায়াং ব্রণদেশং ঘর্ষয়েৎ। সূত্রিতং হি।..ইত্যাদি৷ (৬কা, ৬অ. ১-২)।
বঙ্গানুবাদ –অভিচারদোষ-বিনাশনের ক্ষমতাসম্পন্ন শ্রেষ্ঠ কর্মকে অভীপ্সিত ফলের নিমিত্ত সাধিত করছি। আমি ইন্দ্রদেবকে মন্ত্রের দ্বারা সুশোভিত করে প্রসন্ন করছি। বৃষ্টি যেমন ধন-ধান্য ইত্যাদির বৃদ্ধি সাধিত করে, তেমনই, হে ইন্দ্রদেব! অভিচার কর্মের দ্বারা পীড়িত (অথবা অভিচর্যমান) এই পুরুষের ধন, বল, পুত্র, পৌত্র ইত্যাদির বৃদ্ধি করো ॥১।
হে অগ্নি! হে সোম! এই যজমানে বল স্থাপনা পূর্বক একে ধন দান করো। এই যজমানের ফলসিদ্ধি প্রাপ্ত হোক; এই নিমিত্ত আমি এই শ্রেষ্ঠ কর্ম সাধিত করছি ২।
হে ইন্দ্র! যে সগোত্রীয় বা অন্য গোত্রীয় শত্রু আমাদের হিংসা করণের ইচ্ছা করছে, তুমি সেই দুই প্রকার শত্রুকে সোমাভিষব-করণশীল আমার যজমানের বশীভূত করে দাও ৩
বঙ্গানুবাদ –যে পথ সমূহে দেবতাগণই গমন করেন, সেই বিভিন্ন লোক-প্রাপ্তির উপায় স্বরূপ পথ পৃথিবীর মধ্যেই বর্তমান রয়েছে। তার মধ্যে বৃদ্ধি প্রদানশীল যে পথ আছে, এই দেশস্থ সেই পথ, হে দেবতাগণ! তোমরা আমাকে প্রাপ্ত করাও ॥ ১।
গ্রীষ্ম, হেমন্ত, শিশির, বসন্ত শরৎ ও বর্ষার অভিমানী ছয় দেবতা আমাদের সুসাধ্য ধনসমূহে স্থিত করুন। হে ঋতুসমূহ! তোমরা গাভী, পুত্র, পৌত্র ইত্যাদির সাথে আমাদের যুক্ত করো, আমরা আপন গৃহের সমান তোমাদের আশ্রয়ে সমস্ত দুঃখ কারণ রহিত হয়ে থাকবো॥ ২॥
হে মনুষ্যবর্গ! ইদাবৎসর (ত্রিশটি সূর্যোদয়সমন্বিত মাসের একত্ৰীকৃত দ্বাদশ মাস), পরিবৎসর (বৃহস্পতির দ্বাদশ রাশি ভোগ্য কাল রা বৎসর) ও সম্বৎসর (সূর্যের দ্বাদশরাশি অতিক্রমের কাল বা বৎসর)-কে নমস্কারের দ্বারা প্রসন্ন করো। এই যজ্ঞের যোগ্য তাদের কৃপা-বুদ্ধি আমাদের উপর থাকুক এবং তা হতে উৎপন্ন শ্রেষ্ঠ ফলও আমরা প্রাপ্ত হবো॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –হে বিষ-শমনকর্তা দেববর্গ! সর্প যেন আমাদের, আমাদের পুত্র-পৌত্রদের, ভৃত্য ইত্যাদির সাথে হিংসা করতে না পারে। সর্পগণের মুখ যেন দংশনের নিমিত্ত উন্মুক্ত হতে না পারে এবং তাদের বিশ্লিষ্ট মুখ মন্ত্রশক্তির দ্বারা যেন যথাযথ থাকে। সর্প ইত্যাদির বিষের শমন কর্তা দেবতাগণের উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করি। ১৷
তির্যক দিকে বলসম্পন্ন তিরশ্চিরাজ নামক সর্পশ্রেষ্ঠের উদ্দেশে নমস্কার, অসিত নামক কৃষ্ণবর্ণ সর্পাধিপতির উদ্দেশে নমস্কার, ববর্ণের স্বজ নামক সর্প সমূহের উদ্দেশে নমস্কার এবং তাদের বশে রক্ষণশালী, দেবতাগণের উদ্দেশেও নমস্কার। ২।
হে স! তোর উপরের দন্ত-পংক্তির সাথে নীচের দন্ত-পংক্তিকে মিলিত করে দিচ্ছি, তোর উপরের ও নীচের হনুদ্বয়কেও পরস্পর সংশ্লিষ্ট করে দিচ্ছি; তোর জিহ্বার সাথে জিহ্বাকে মিলিত করে উপরের মুখভাগকে নীচের ভাগের মধ্যে মিলিয়ে দিচ্ছি এবং বহু সর্পের ফণাগুলিকে এক সাথে বদ্ধ করে দিচ্ছি ॥ ৩
বঙ্গানুবাদ –এই ব্রণরোগের নিবর্তক ভেষজ আমি রচনা করবো। এটি সেই রুদ্রদেবের ঔষধি, যিনি অন্তকালে সকলকে রোদন করান বলে রুদ্র নামে অভিহিত। এই ভেষজটি মহাদেব ত্রিপুর-সংহারকালে এক বেণুকাণ্ডকে শতশল্যময় তীক্ষ্ণ শল্যে পরিণত করেছিলেন ॥ ১।
হে পরিচারকবৃন্দ! তোমরা গো-মূত্রের ফেন-জলের দ্বারা ব্রণকে ধৌত করে এই রোগকে দূরীকরণে শ্রেষ্ঠ। হে রুদ্র! এই ঔষধির দ্বারা আমাদের সুখ প্রদান করো ॥ ২॥
আমাদের সুখ মিলুক, আমাদের পশু-মনুষ্য যেন রোগ-গ্রস্ত না হয় এবং আমাদের পাপের যেন বিনাশ হয়। সমগ্র বিশ্ব ও তার শ্রেষ্ঠ কর্ম আমাদের পক্ষে ঔষধির সমান হোক ৩
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –মা নো দেবা ইতি তৃচেন সর্পবৃশ্চিকাদিভয়নিবৃত্তয়ে গৃহক্ষেত্রাদিযু সিকতা অভিমন্ত্র পরিতঃ পরিকিরেৎ। তথা অনেন তৃণমালাং সম্পাত্য গৃহনগরাদিদ্বারে বীয়াৎ। তথা অনেন তৃচেন গোময়ং অভিমন্ত্র গৃহে বিসর্জনং দ্বারি নিখননং অগ্নৌ: হোমং বা কুর্যাৎ। তথা অনেন অপামার্গমঞ্জরীং গুডুচীং বা অভিম পূর্ববৎ গৃহাদিষু বিসর্জনাদিকং কুর্যাৎ। সূত্রিতং হি। তথা উপাকর্মণি অনেন তৃচেন আজং হুত্বা দধিসত্তুষু সংপাত আনয়েৎ। সূত্রিতং হি।…ইদমিৎ বা উ ভেষজং ইতি তৃচেন মুখরহিতব্রণ-ভৈষজ্যার্থং গোমূত্ৰেণ ব্রণং মর্দয়েৎ। তথা অনেন দন্তমলং অভিমন্ত্র প্রলিম্পে। তথা অনেন ফেনং অভিমন্ত্র ব্রণং প্রলিম্পেৎ। সূত্রিতং হি। …ইত্যাদি। (৬কা, ৬অ. ৫-৬সূ)৷৷
টীকা –পঞ্চম সূক্তটির দ্বারা সর্প, বৃশ্চিক ইত্যাদির ভয় নিবৃত্তির নিমিত্ত গৃহ ক্ষেত্র ইত্যাদিতে কিছু বালুকা অভিমন্ত্রিত করে চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া কর্তব্য। এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা তৃণমালা সম্পাতিত করে গৃহ নগর ইত্যাদির দ্বারে বন্ধন, গোময় অভিমন্ত্রিত করে দ্বারে নিখনন্ বা অগ্নি-হোম করণ, অপামার্গমঞ্জরী বা গুডুচী অভিমন্ত্রিত করে পূর্ববৎ বিসর্জন ইত্যাদি হয়ে থাকে। উপকর্মে এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা দধিসত্তুর আজ্য আহুত করে সম্পাতন কর্তব্য। ….ষষ্ঠ সূক্তটির দ্বারা মুখরহিত ব্রণ ভৈষজ্যার্থে গোমূত্রের দ্বারা ব্রণ মর্দন, দন্তমল অভিমন্ত্রিত করে প্রলিপ্ত করণ, গোমূত্রের ফেন অভিমন্ত্রিত করে ব্রণে প্রলেপন ইত্যাদি করণীয়। (৬কা.৬অ.৫-৬)।
বঙ্গানুবাদ –দ্যাবাপৃথিবী, ইন্দ্র, সবিতা, আমাকে যশস্বী করুন। এই ভাবে যশস্বী হয়ে দক্ষিণা ধারণকারীগণের প্রিয় হবো।১৷
ইন্দ্র যে প্রকারে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে বৃষ্টি ইত্যাদি কর্মের দ্বারা শ্রেষ্ঠ (কীর্তিমান) হয়ে থাকেন, যে প্রকারে ঔষধিসমূহে জল শ্রেষ্ঠ (কীর্তিমান) রূপে পরিগণিত হয়ে থাকে, সেই প্রকারেই সকল দেবতা ও মনুষ্যের মধ্যে আমি শ্রেষ্ঠ হবো। ২৷৷
ইন্দ্র, অগ্নি ও সোম যশের আকাঙ্ক্ষা করে উৎপন্ন (সৃষ্ট) হয়েছেন। এঁদের যশস্বী হওয়ার ন্যায় আমি হেন যশের কামনাশালীও দেবতা ও মনুষ্য ইত্যাদি জীবসমূহের মধ্যে সর্বাধিক যশস্বী হবো॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –যে সূর্যের রশ্মিসমূহ পূর্ব দিকে উদিত হচ্ছে, সেই সূর্য এই স্ত্রীরহিত পুরুষকে স্ত্রী ও কন্যার নিমিত্ত পতি রূপে প্রদান করণের অভিলাষে উদয় হচ্ছেন ॥১॥
এই কন্যা অপর পতিব্রতা রমণীগণের ন্যায় শান্তিকর্ম অনুষ্ঠিত করেছিলেন; তার ফলেও এই পতি-অভিলাষিণী কন্যা, নিজে পতিলাভ না করায় দুঃখিত। হে অর্যমা (সূর্য)! অন্য স্ত্রীগণও এর নিমিত্ত শান্তিকর্ম অনুষ্ঠিত করছেন ॥ ২॥
অখিল বিশ্বের ধারক বিধাতা পৃথিবীকে স্থাপিত করে দুলোক ও সবিতাদেবকে সূর্যমণ্ডলে স্থাপিত করেছিলেন। সেই জগৎ-সংসারের নিয়ন্তা এই কন্যার নিমিত্ত কাম্য পতি প্রদান করুন ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদ –সকলের প্রেরক সূর্য আমার নিমিত্ত সুখকারিণী তেজঃ-রূপ কিরণসমূহকে প্রকট করেছেন। জল ও জলাভিমানী দেবতাগণ মধুর জলকে আমার নিমিত্ত আনয়ন করুন। ব্রহ্মার তপস্যা হতে প্রকটিত সকল দেবতা আমাকে ঈপ্সিত ফল প্রদান করুন। সবিতাদেব ঈঙ্গিত ফলপ্রাপক ব্যাক্তি স্থাপিত করুন, যাতে সেইগুলি প্রেরণা-দানশালী হয়। ১।
আমি পৃথিবী ও স্বৰ্গকে পৃথক করেছি। আমি ছয় ঋতুর সাথে অধিমাস রূপ সপ্তম ঋতুকে যুক্ত করেছি। সংসারের সত্যাসত্য বাক্যের তথা দৈববানীকেও আমিই উচ্চারণ করছি। ২।
পৃথিবী, স্বর্গ, ঋতু, গঙ্গা ইত্যাদি সপ্ত নদী ও সপ্ত সমুদ্রও আমিই উৎপন্ন করেছি। সত্য ও মিথ্যা ভেদে লোকে প্রসিদ্ধ বাক্য আমিই উচ্চারণ করি। এই প্রকারে ডোক্তা ও ভোগ রূপ অগ্নি ও সোমকে আমি ব্ৰহ্মাত্মভাবে সংসারের রচনা কর্মে সহায়ক রূপে প্রাপ্তি সম্পন্ন করেছি ॥ ৩৷৷
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –অয়ম আ যাতি ইতি তৃচেন পতিলাভকর্মণি কাকসঞ্চারাৎ পূর্বং আজ্যং জুহুয়াৎ। সূত্রিতং হি। ….মহ্যং আপঃ ইতি তৃচস্য বৃহগণে পাঠাৎ শান্ত্যদকাদৌ বিনিয়োগোনুসন্ধেয়। তথা অর্থোত্থাপনবিঘুশমনকর্মণি ক্ষীরৌদনহবনাদীনি কর্মাণি কুর্যাৎ। সূত্রিতং হি। …ইত্যাদি। (৬কা, ৬অ. ৯-১০সূ)৷৷ টীকা— নবম সূক্তটির দ্বারা পতিলাভকর্মে রাত্রিশেষে (কাক জাগবার আগেই) আজ্য হোম করণীয়। দশম সুক্তটির বৃহৰ্গণে পঠিত শান্তুদককর্মে বিনিয়োগ হয়। তথা এই সূক্তের দ্বারা অর্থোত্থাপনবিঘুশমন কর্মে সূত্রোক্ত প্রকারে বিনিয়োগ হয়৷৷-দশম সূক্তের ২য় ও ৩য় ঋক্ সম্পর্কে ব্যাখ্যা-মন্ত্রদ্রষ্টা স্বাত্মনঃ সর্বগতব্রহ্মাত্মভাবং অনুসন্দধানং সর্বকর্তৃত্বং আবিষ্করোতি। অর্থাৎ এই দুই ঋকে মন্ত্রদ্রষ্টা অথবা ঋষি সর্বগত ব্ৰহ্মাত্মভাবে অনুসন্ধান পূর্বক আপন সর্বকর্তৃত্ব আবিস্কার করেছেন। এখানে যেন তিনি নিজেই ব্রহ্মরূপে সবকিছু সৃষ্টি করছেন ॥ (৬কা. ৬অ. ৯-১০সূ)।
বঙ্গানুবাদ –সকল প্রাণীতে জঠরাগ্নিরূপে বর্তমান অগ্নি, বৈশ্বানর সূর্য, প্রাণ রূপে দেহমধ্যে বিচরণশীল তথা অন্তরিক্ষে গমনশালী বায়ু ও যজ্ঞকে পূর্ণ-করণশালী দ্যাবাপৃথিবী আমাদের পবিত্র করুন। ১।
হে মনুষ্যবর্গ! বৈশ্বানরাত্মক সত্য স্তুতিরূপ বাণী প্রারম্ভ করো। যে বাণীর শরীর রূপ উপরের ভাগ বিস্তৃত হয়ে আছে, সেই বাণীর দ্বারা আমরা ধনের অধিপতি হওয়ার নিমিত্ত বৈশ্বানর অগ্নির স্তুতি করি। ২।
হে মনুষ্যবর্গ! ব্রহ্মবৰ্চস্ ইত্যাদি তেজকে প্রাপ্তির নিমিত্ত স্তুতিযুক্ত বাণী আরম্ভ করো। পুনরায় আমরা বৈশ্বানর অগ্নির কৃপায় তেজস্বী হয়ে অপরকেও পবিত্র করতে সমর্থ হবো। আমরা অন্নের দ্বারা পুষ্ট থেকে চিরকাল পর্যন্ত (অর্থাৎ দীর্ঘজীবীরূপে) সূর্যোদয়কে দর্শন করবো। ৩।
বঙ্গানুবাদ –হে পুরুষ! অনিষ্টকারিণী দ্যোতমানা নির্ঋতি দেবতা তোমার কণ্ঠগত ধমনীতে যে। অবিমোক্য (মোচন করা যায় না, এমন) পাপরূপ বন্ধন (বা পাশ) আরোপিত করেছেন, আমি তোমাকে চিরকাল জীবিত রাখার নিমিত্ত তোমার অঙ্গ হতে সেই পাপ-পাশ দূর করে (বা মুক্ত করে) দিচ্ছি। তুমি সেই পাশ হতে মুক্ত হয়ে আমাদের দ্বারা প্রেরিত হওয়ার পর এই তৃপ্তিদায়ক অন্ন চিরকাল সেবন করো। ১।
হে তীক্ষ্ণদীপ্তি নির্ঋতি! তোমাকে নমস্কার। তুমি আমাদের এই নমস্কারে প্রসন্ন হয়ে এই লৌহময় অতি দৃঢ় পাশ-বন্ধন মুক্ত করো। হে সাধক! সেই পাপ-পাশ হতে মুক্ত হওয়ার পর যম পুনরায় তোমাকে আমার নিকট প্রত্যর্পণ করে দিয়েছেন, (অর্থাৎ নির্ঋতি-পাশের দ্বারা বন্ধনগ্রস্ত হয়ে পূর্বে তুমি মৃতপ্রায় হয়ে ছিলে, ইদানীং তা বিমোচিত হওয়ায় লব্ধজীবন হয়েছে, সেই কারণে যম তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন)। সেই যমের উদ্দেশে নমস্কার। ২।
হে নির্ঋতি! যখন তুমি লৌহপাশের দ্বারা বিজড়িত করে কারো পদে শৃঙ্খল আরোপিত করো, তখন জ্বর ইত্যাদি ব্যাধি তাকে বন্ধন করে নেয়। তুমি আপন অধিষ্ঠাতা যমরাজ ও পিতৃগণের সহমতি গ্রহণ করে একে দুঃখবহিত স্বৰ্গকে প্রাপ্তি করাও৷ ৩৷
হে কাম্যবৰ্ষক অগ্নি! তুমি সকলকে সকল ধন প্রাপ্ত করিয়ে থাকো, অতএব আমাদের ধন দান করো। তুমি বেদীর উপর দেদীপ্যমান হও। ৪।
বঙ্গানুবাদ –হে সমান-মনঃশালী জনবর্গ! তোমাদের জ্ঞানও সমান হোক। তোমরা পুনরায় একই কর্মে যুক্ত হয়ে যাও। তোমাদের অন্তঃকরণ একই অর্থকে জ্ঞাতশীল হোক। যেমন ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ একই কার্যে জ্ঞান রক্ষা করে (অর্থাৎ একই যজ্ঞে লক্ষ্য রেখে) হব্য ইত্যদি গ্রহণ করেন, সেই রকমে তোমরা ঈপ্সিত ফলকে প্রাপ্তির উদ্দেশে পরস্পরের বিদ্বেষকে ত্যাগ করো ৷৷ ১।
এই পুরুষবর্গের কার্য-অকার্য সম্বন্ধী জ্ঞান সমান; এদের কর্ম, অন্তঃকরণও সমান। শ্রেষ্ঠ ফলপ্রাপ্তির উদ্দেশে আমি একীকরণশালী ঘূত ইত্যাদি হব্য প্রদান করছি। তোমরা এক-চিত্ততা প্রাপ্তশালী হও ২
হে সমানতা আকাঙ্ক্ষাকারী জনগণ! তোমাদের অন্তঃকরণ ও সঙ্কল্প একসাথেই থাকুক। তোমাদের মন একই রকম থাকুক। যাতে তোমাদের সকল কার্য শোভন রীতি অনুসারে সমান হয়, তার নিমিত্ত আমি এই সমানাত্মক কর্ম সাধিত করছি ৷৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –শত্রুর ক্রোধ শান্ত হোক। তাদের আয়ুধ অসফল হোক। আপন মনে নিবিষ্ট হয়ে যা থাকায় শত্রুর ভুজসমূহ শস্ত্ৰাস্ত্র চালনায় অশক্ত হোক। হে পরাশর (পরাগতা শৃণাতি হিনস্তিশজন সু ইতি পরাশর ইন্দ্র)! তুমি শত্ৰুশক্তিকে পরাজুখ করে হননশালী; এই শত্রুকে পরাহত করো এবং এর ধনসমূহ আমাদের প্রদান করো ॥১॥
হে দেবগণ! তোমরা শত্রুবর্গের ভুজবলকে ক্ষীণ করণশালী যে বাণ চালনা করে থাকে, সেই বাণরূপ দেবতাগণের উদ্দেশে দীয়মানা এই হবিঃ-রূপ আয়ুধের দ্বারা শত্রুদের ভুজসমূহকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি ॥ ২॥
পুরাকালে দেবতাগণের অধিপতি ইন্দ্র রাক্ষসগণকে ভুজবল-রহিত করে দিয়েছিলেন, এইরকমে ইন্দ্রের অনুগ্রহে আমাদের যোদ্ধাগণ শত্রুগণের উপর বিজয় লাভ করুক ॥ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –আমাদের সন্তপ্ত করণশীল শত্রুর হস্ত শক্তিহীন হয়ে যাক। শত্রুগণ হিংসাজনক দুঃখ-প্রদানশালী দুষ্ট কুৎসিত গতি প্রাপ্ত হোক। হে ইন্দ্র! শত্রুগণ সেনা-সমভিব্যাহারে আমাদের উপর আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে, তুমি তাদের বজ্রের দ্বারা সংযুক্ত করে হনন করো ॥১।
হে শত্রুগণ! তোমরা ধনু আকর্ষণ করে শরসন্ধান পূর্বক বাণ নিক্ষেপ করতে করতে আমাদের ব অভিমুখে ধাবিত হচ্ছো; ইন্দ্র এখনই তোমাদের সেই সকলকে নিবীর্যহস্তা করে দেবেন। ২।
আমাদের শত্রুবর্গের ভুজ-বল বিনষ্ট হোক, তাদের সকল অঙ্গ শিথিল হয়ে যাক। হে ইন্দ্র! তোমার কৃপায় তাদের সমস্ত সম্পত্তি আমরা পরস্পর (নিজেদের মধ্যে) বন্টন করে নেবো ৷৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –সকলের প্রেরক সবিতা মুণ্ডন-করণশালী ক্ষুরের সাথে নভোমণ্ডলে আগত হয়েছেন। হে বায়ু! তুমিও এই বালকের মস্তক আর্দ্রকরণের নিমিত্ত উষ্ণ জলের সাথে আগমন করো। একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য ও অষ্টবসু সমান জ্ঞানের সাথে (বা ঐকমত্য হয়ে) জলের দ্বারা এর মস্তক সিক্ত করুন। হে প্রকৃষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন মনুষ্যগণ! বরুণ ও সোমের সাথে সম্বন্ধিত ক্ষুরের সাহায্যে এই মানবকের সিক্ত হয়ে যাওয়া কেশসমূহ বপনের (মুণ্ডনের) দ্বারা বর্জন করে দাও ॥১॥
অদিতি এই পুরুষের শ্মশ্রু বপন (ছেদন) করুন; জলদেবগণ এর কেশসমূহকে সিক্ত করুন; স্রষ্টা প্রজাপতি এর চিকিৎসা করুন, যাতে এ চক্ষুশক্তি ও দীর্ঘায়ু সম্পন্ন হয় ২৷৷
সোম ও বরুণের দ্বারা সম্বন্ধিত যে ক্ষুরের দ্বারা সবিতাদেব মুণ্ডন করেছিলেন (অর্থাৎ সবিতা যে ক্ষুরে সোম ও বরুণকে মুণ্ডিত করেছিলেন), হে বিপ্রদল! তেমনই ক্ষুরের দ্বারা এই পুরুষের কেশ-শ্মশ্রু বপন করে দাও। এই পুরুষ এই সংস্কারের দ্বারা গো, অশ্ব, পুত্র, পৌত্র ইত্যাদির দ্বারা যুক্ত হয়ে যাক ॥ ৩
ধীতী বা যে অনয়ন বাচো অগ্রং মনসা বা যেংবদন্তানি। তৃতীয়েন ব্ৰহ্মণা বাবৃধাস্তুরীয়োমশ্বত নাম ধেনোঃ ॥১॥ .. স বেদ পুত্রঃ পিতরং স মাতরং স সূনুর্ভুবৎ স ভুবৎ পুনর্মঘঃ। স দ্যামৌর্ণোদন্তরিক্ষং স্বঃ ইদং বিশ্বমভবৎ স আভবৎ ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –যাঁরা প্রজাপতি, ইন্দ্র ও অগ্নি দেবতার স্বরূপ বর্ণন পরা ইত্যাদি বাণী বা বচনের দ্বারা করে গিয়েছেন, যাঁরা দ্বিতীয় শব্দ ব্রহ্মের মাধ্যমে দেবতাবাচক শব্দবিচার-বিষয়ক বচন উচ্চারণ করেছেন, যাঁরা তৃতীয় ব্রহ্মের অর্থবিশেষ অধ্যবসায় ও বুদ্ধিযুক্ত মধ্যমাখ্যের মাধ্যমে বর্ধিত করেছেন, যাঁরা শব্দের দ্বারা অব্যক্ত হলেও ব্রহ্মের মাধ্যমে মন্ত্রপ্রতিপাদ্য ধেনুর ন্যায় অভিমত ফলপ্রদ প্রজাপতি নামকে ব্যক্ত করেছেন, তাঁরা আমাদের কামনা পূর্ণ করুন। (বক্তব্য–পরমাত্মনো নানাদেবতানামব্যবহার্যত্বদর্শনাদ অত্র প্রজাপতিশব্দব্যপদেশ্যং ইন্দ্রাগ্নিশব্দব্যদেশ্যং বা তদেব তত্ত্বং সম্যগ অধিগতং সৎ অস্মাকং অভিমতং সাধয়ত্বিতি প্রার্থতে)। ১।
প্রজাপতি ব্রহ্মা, যাঁকে পরম ব্রহ্ম পরমাত্মা সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেন, তিনি আপন মাতা-পিতা, দ্যুলোক পরমাত্মা এবং পৃথ্বীলোকে ব্যাপ্ত প্রকৃতিকে জ্ঞাত আছেন। সেই ব্রহ্মা সকলকে, সমগ্র জগতকে কর্মর্সাধনের নিমিত্ত প্রেরিত করেছেন এবং পৃথিবী, আকাশ ও অন্তরিক্ষে ব্যাপ্ত হয়ে বিরাজমান আছেন। (মন্ত্রের প্রার্থনা–সোহস্মাকং অভিমতসর্বফলানি সাধয়ত্বিতি প্রার্থতে) ২৷৷
বঙ্গানুবাদ –প্রজাপতি, মাতার গর্ভ স্বরূপ, পিতার প্রাণময় বীর্যের স্বরূপ এবং নিত্য তরুণ দেববৃন্দের বন্ধু স্বরূপে পিতার ন্যায় রক্ষক। এই হেন ব্রহ্মাকে যিনি মনের দ্বারা জ্ঞাত হয়ে থাকেন, এমন মহান ব্যক্তি (অর্থবাণ বা অথর্বাত্মক ঋত্বিক-রূপ ব্রহ্মা) আমাদের নিকট অভিলষিত বিষয় বর্ণন করুন। (এখানে মন্ত্রদ্রষ্টা মহর্ষি নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করছেন–য উক্তবিধা প্রজাপতিঃ তং নঃ অস্মদর্থং প্র বোচঃ প্রকর্ষেণ ফ্র হ যষ্টব্যদেবতাস্বরূপং সমগ জ্ঞাত্বা ক্ৰ হ) ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ –হে সকলের প্রেরণাদায়ক, শোভনরীতি অনুসারে আবাহন করার যোগ্য, প্রসিদ্ধ প্রজাপতি বা বায়ুদেব! তুমি কখনও একাদশ বা কখনও তার দ্বিগুণ (দ্বাবিংশ) বা কখনও তার ত্রিগুণ (ত্রয়স্ত্রিংশ) সংখ্যক অশ্ববাহিত রথে আরোহিত হয়ে শীঘ্র আমাদের যজ্ঞস্থলে সসম্মানে উপনীত হও এবং আমাদের মনস্কামনা পূর্ণ করো। যজ্ঞে আগত হয়ে তুমি তোমার রথ হতে অশ্বগুলিকে মুক্ত করে দাও, (অর্থাৎ এই স্থান হতে অন্য কোথাও গমন করো না) ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –যজমানগণ প্রকৃষ্ট কর্মের দ্বারা যে দেবত্বকে লাভ করেছিলেন, তারা প্রথমে জ্ঞানযজ্ঞের দ্বারা যজ্ঞরূপ ভগবান বিষ্ণুর পূজা করেছিলেন। এই মহত্বপূর্ণ কার্য সম্পন্ন করায় তারা সুখপূর্ণ স্বর্গলোককে লাভ করেন, যেস্থানে প্রথম হতেই সাধন-সম্পন্ন দেবতাগণ অবস্থান করে থাকেন ॥১॥
যজ্ঞ জাত হয়েছে, বিস্তার লাভ করেছে। তা বিশেষ জ্ঞানের সাধন সৃষ্টি করেছে এবং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে দেবতাগণের স্বামী (বা পালক) হয়ে গিয়েছে। সেই যজ্ঞ আমাদের ধন প্রাপ্ত করাক (বা অভিমত ফল প্রদান করুক) ২
কর্মের দ্বারা দেবত্বপ্রাপ্ত যজমানগণ ইন্দ্র ইত্যাদি অমর দেবগণকে আপন হবিরূপ মনের দ্বারা নিত্য যজন করে থাকেন। এই রকমে আপন আত্মায় পরমাত্মারূপী সূর্যের উদয় হওয়ার পর তা নিত্য প্রকাশপ্রাপ্ত হতে থাকে, (অর্থাৎ চিরকাল পুণ্যফল অনুভব করতে থাকেন) ॥ ৩৷
সেটি কোন্ বিশেষ সাধন যা দেবতাগণকে আপন হবিষ্য রূপ মনের যজনের দ্বারাও মহান্ হতে পারে? অর্থাৎ সেই-ই জ্ঞানযজ্ঞ, যা সর্বশ্রেষ্ঠ। (মর্মার্থ–পুরুষমেধাখ্য মহাক্ৰতোরপি সর্বাত্মকব্রহ্মস্বরূপাবাপ্তিফলপ্রাপকো জ্ঞানযজ্ঞঃ শ্রেয়াণ ইত্যনয়া অভিধীয়তে। আরও প্রাঞ্জল করে বলতে গেলে বলা যায়–সর্ব যজ্ঞের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রূপে পরিগণিত পুরুষমেধ কিংবা অশ্বমেধ, বাজপেয়, রাজসূয় ইত্যাদি বাহ্যিক আড়ম্বর ও উপকরণ সমন্বিত প্রসিদ্ধ সকল যজ্ঞ অপেক্ষাও এই স্থলে জ্ঞানযজ্ঞের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করা হয়েছে। আপন আত্মায় ঈশ্বরের পূর্ণ অধিষ্ঠানের উপলব্ধিই জ্ঞানযজ্ঞ। ৪৷৷
অবিবেকশীল, মূর্খ যজমান কুকুর ও গো ইত্যাদি পশুসমূহের অঙ্গের দ্বারাও যজন করে থাকে–এটি নিশ্চিতভাবেই মূর্খতাপূর্ণ ও নিন্দনীয় ব্যাপার। কিন্তু যিনি নিজের দ্বারা আত্মযজ্ঞ করণশালী মহাপুরুষ, তাঁর সম্পর্কে আমাদের নিকট বর্ণন করুন। তিনিই পরমাত্মার স্বরূপ সম্পর্কে উপদেশ করার যোগ্য হতে সমর্থ ॥ ৫৷৷
বঙ্গানুবাদ –এই দেবমাতা অদিতি বা অখণ্ডনীয়া পৃথিবীই স্বর্গ, ইনিই অন্তরিক্ষ; ইনিই সর্ব জগতের প্রসবিত্রী, ইনিই উৎপাদক পিতা এবং ইনিই উৎপন্ন পুত্র। ইনিই সকল দেব এবং ইনিই নিষাদ ইত্যাদি বা গন্ধর্ব ইত্যাদি সহ মনুষ্য। যা কিছু উৎপন্ন হয়েছে, উৎপন্ন হচ্ছে এবং উৎপন্ন হবে, সে সবই এই অদিতি পৃথিবীই ॥১॥
শুভ কার্যকরণশীলগণের পক্ষে হিতকারিণী, বহু রকমের ক্ষাত্র তেজঃযুক্তা, সত্যের পালনকারিণী, অবিনাশিনী, বিশালা, সুখদাত্রী, অন্নপ্রদান-করণশালিনী দেবমাতা (পৃথিবী)-কে আমরা রক্ষাপ্রাপ্তির নিমিত্ত আবাহন করছি। ২।
সুষ্ঠুভাবে রক্ষাকরণশালিনী, পৃথিবীর উপর সুখদানশালিনী, কুশল-রক্ষণশালিনী, ছেদ-রহিতা সুদৃঢ় নৌকায় আরোহিতের ন্যায় সেই অদিতিরূপা মাতার শরণে আমরা নিরপরাধ জনগণ গমন করছি। ৩
অন্নের উৎপত্তির নিমিত্ত, সেই পৃথিবী মাতার অথবা মাতৃভূমির আমরা গুণগান করছি, যাঁর সমীপেই বিস্তীর্ণ রয়েছে। আকাশ। সেই পৃথিবী মাতা আমাদের ত্রিভূমিক বা ত্রিকক্ষ বিশিষ্ট গৃহ প্রদান করুন (অথবা, আমাদের তিনগুণ বেশী বা ত্রিগুণা সুখ প্রদান করুন) ৪
বঙ্গানুবাদ –দিতি-পুত্ৰ দৈত্যগণ গম্ভীর সমুদ্রে অবস্থান করে, তাদের সেই স্থান হতে বিতাড়িত করে অদিতি-পুত্র গুণশীল দেবতাগণকে তার অধিকার প্রদান করছি, কারণ এঁদের আবশ্যকতা অধিক এবং এঁরাই অধিক যোগ্য। (অর্থাৎ যজ্ঞের যোগ্য দেবতাগণের আরাধনার মাধ্যমে আমরা আমাদের অভিলাষ সিদ্ধির আকাঙ্ক্ষা করছি) ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ –পোষক পূষা দেবতা, স্বর্গ, অন্তরিক্ষ ও পৃথিবীর সকল মার্গে প্রকট হয়ে থাকেন। এই পূষা দেবতা পৃথিবী ও স্বর্গ, দুই প্রিয় স্থানে প্রাণীগণের নিমিত্ত কর্মের সাক্ষী হয়ে গমনাগমন করে থাকেন। ১।
এই পোষণকর্তা পূষা দেবতা, এই সকল দিমূহকে যথাযথ জ্ঞাত আছেন। তিনি আমাদের পরম নির্ভয় পথ (বা স্থান) প্রদর্শন করুন। কল্যাণকারী, তেজস্বী, বলবান, সর্বদা অপ্রমাদী সূর্য (বা পূষা) দেবতা আমাদের মার্গ দর্শন করিয়ে উন্নতি পথ প্রশস্ত করুন। ২।
হে পোষক পূষা দেবতা! আমরা তোমার ব্রতের (বা যাগানুষ্ঠান কর্মের) নিষ্ঠা থেকে কখনও যেন বিনষ্ট না হই। সদা ধন, পুত্র, মিত্র ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে থাকি। আমরা তোমার ব্রত গ্রহণ পূর্বক সদা তোমার স্তুতি করতে থাকবো ৷ ৩৷৷
হে পোষক পূষা দেবতা! এই জগৎসংসারে যে স্থানেই আমাদের যোগ্য ধন আছে, সেগুলি আনয়ন পূর্বক আমাদের প্রদান করো এবং আমাদের সহায়তা করো। আমাদের নষ্ট হওয়া সামগ্রী (বা ধন) পুনরায় যেন আমরা প্রাপ্ত হই এবং আমরা সেগুলিকে উপভোগ করি–তুমি এমনই কৃপা করো। ৪
সভা চ মা সমিতিশাবতাং প্রজাপতেÉহিতরে সংবিদানে। যেনা সংগচ্ছা উপ মা স শিক্ষাচ্চারু বদানি পিতরঃ সংগতেষু ॥১ বিদ্ম তে সভে নাম নরিষ্টা নম বা অসি। যে তে কে চ সভাসদস্তে মে সন্তু সবাচসঃ ॥২॥ এষামহং সমাসীনানাং বর্চো বিজ্ঞানমা দে। অস্যাঃ সর্বস্যাঃ সংসদো মামিন্দ্র ভগিনং কৃণু ॥৩॥ যদ বো মনঃ পরাগতং যদ বদ্ধমিহ বেই বা। তদ ব আ বর্তয়ামসি ময়ি বো রমং মনঃ ॥৪॥
বঙ্গানুবাদ –সভা ও সমিতিসমূহ প্রজাপতি রাজার নিমিত্ত পুত্রীর ন্যায় পোষণ করার যোগ্য হয়ে থাকে। এই উভয়ে মিলিত হয়ে (আমা হেন) রাজাকে রক্ষা করুক। রাজা যার সাথে মিলিত হন, তিনি তাকে উচিত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। হে পিতৃগণ! আমাকে এমনই সৎ-বুদ্ধি প্রদান করুন যে, আমি যেন সভায় বিবেকসম্পন্ন হয়ে এবং নম্রতাপূর্বক আচরণ করি। (অর্থাৎ আমি যেন। ন্যায়ানুগত যথাযথ উত্তর দিতে সমর্থ হই) ॥১॥
হে সভা! আমি তোমার নাম জ্ঞাত আছি। তোমার নরিষ্টা নাম ঠিকই প্রসিদ্ধ আছে। (বহুজন কর্তৃক যদি একটি বাক্য বা বিষয় স্বীকৃত বা কথিত হয়, তাহলে তা অপরে লঙ্ঘন করতে না পারার নিমিত্তই সভা নরিষ্টা নামে প্রসিদ্ধ)। হে সভা! তোমার যে কেউই সদস্য হোক না কেন, তারা সকলেই আমার সাথে সমতাপূর্ণ (অনুকূল) ভাষণ করণশীল হোক ॥ ২।
এই সকল উপবেশকারী সভাসদবৃন্দের নিকট হতে রাজ্যশাসন-সম্বন্ধী বিশেষ জ্ঞানের তেজকে আমি গ্রহণ করছি। (অথবা এই সভায় উপবিষ্ট প্রতিবাদীগণের তেজঃ ও বেদার্থবিষয়ক জ্ঞান আমি অপহরণ করে নিচ্ছি)। ইন্দ্রদেব আমাদের এই সকল সভায় জয়ভাগী করুন। ৩।
হে সভাসদবৃন্দ! তোমাদের যে মন আমাদের দিক হতে অপসারিত হয়ে অন্যত্র অন্যান্য বিষয়ে সংযুক্ত হয়ে গিয়েছে, সেই মনকে আমরা আমাদের দিকে আকর্ষিত করছি। এইক্ষণে তোমরা সকলে আমাদের বক্তব্য শ্রবণ করো এবং তার উপর বিচার করো। ৪
বঙ্গানুবাদ –যে প্রকারে সূর্য উদিত হয়ে তারকাসমূহের দীপ্তিকে ক্ষীণ করে দেয় এবং আপন আলোকের মধ্যে লীন করে নেয়, তেমনই আমি আমার প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ স্ত্রী-পুরুষবর্গের তেজঃসমূহ হরণ করে নিচ্ছি ॥১॥
শত্রুদের মধ্যে যে পরিমাণ শত্রু যুদ্ধে আগমন করে আমাদের প্রতিকূলরূপে নিরীক্ষণ করে, তাদের পরাক্রমরূপ তেজঃ আমি অপহরণ করে নিচ্ছি; যেমনভাবে সূর্য উদয়কালে সুসুপ্ত অসাবধান জনগণের পরাক্রম অপহরণ করে থাকে। (সূর্যস্যোদয়ে অস্তময়ে বা স্বপতাং পুরুষাণাং বৰ্চসঃ সূর্যেণ অপহৃতত্বাং তৎসমাধানায় আপস্তম্বেন প্রায়শ্চিত্তরূপাণি কর্মাণি রে বিহিতানি। উদয় মুহূর্তে বা অস্তগমনকালে সূর্য কর্তৃক সুপ্ত পুরুষের তেজঃ অপহৃত হয় বলেই তার সামাধানকল্পে আপস্তম্বের দ্বারা প্রায়শ্চিত্তরূপ বিধান আছে)। ২।
বঙ্গানুবাদ –আমি দ্যুলোক ও পৃথিবীর সেই সবিতা দেবের পূজা-উপাসনা করছি, যিনি সমগ্র জগৎসংসারের রক্ষক, সকলের উৎপাদক, জগকর্তা, জ্ঞানী, সত্যের প্রেরক, রমণীয় পদার্থসমূহের ধারক, সকলের প্রিয় এবং ধ্যান করার যোগ্য ॥ ১৷
সেই সবিতা দেবের অপার তেজঃ, তার ইচ্ছানুসারের উপর বিকশিত হয়ে সর্বত্র প্রকাশিত হয়ে থাকে; উত্তম কর্মসাধনশীল ব্রহ্মা যার প্রেরণায় হিতকরী হস্তে (বা হিরণ্যপাণিরূপে), অঙ্গুলি ইত্যাদির কল্পনায় স্বর্গদায়ক সোম উৎপন্ন করছেন (বা গ্রহণ করছেন। সেই সবিতা দেবকে আমরা প্রার্থনা করছি ॥ ২॥
হে সবিতা দেব! তুমি এই পালক যজমানের দেহ (অর্থাৎ দেহের পুষ্টি বা রোগহীনতা) ও পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির সমৃদ্ধি, এবং অন্য রকমের যশ প্রদান করো। তুমি আমাদের নিত্য উত্তম পদার্থ (বা সাফল্য) এবং প্রভূত পশু প্রদান করো ৷৷ ৩।
হে দেব! তুমি সকলের প্রেরক, শ্রেষ্ঠ এবং সকলকে দান-পরায়ণশীল। তুমি আমাদের পূর্বজগণের (অর্থাৎ পিতৃপুরুষবৃন্দের) নিকট হতে ধন-বল ও আয়ু আহরণ করে আমাদের প্রদান করো এবং এই অভিযুত সোম পান করো। এই সোম আনন্দিত করণশালী; এটি গতিমান হয়ে দেবলোকের প্রতি (অথবা সবিতাদেবের জঠরে) সঞ্চার করে থাকে। ৪
বঙ্গানুবাদ –হে সবিতা দেব! আমি তোমার সেই সত্যের প্রেরণা-করণশালী, সকলের গ্রহণ করণের যোগ্য, বরণীয় শোভাযুক্ত সুমতির বা অনুগ্রহ-বুদ্ধির) যাচনা করছি, পীনোন্নত-পয়োধরা গাভীর অনেক ধারাশালিনী পীযূষ-সদৃশ যে সুমতিকে আপন সৌভাগ্যসাধনের উদ্দেশ্যে মহান কথ ঋষি দোহন (অর্থাৎ সগ্রহ) করে নিয়েছিলেন৷ ১৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে দেবগণের প্রভু বৃহস্পতি! হে সর্ব-প্রসবিতা দেব সবিতা! যে যজমান (বা ব্রহ্মচারী) অন্য ব্রতের পালন করে থাকে, তাকে সূর্যোদয় কাল পর্যন্ত শয়নজনিত দোষ পরিহার করিয়ে অগ্রবর্তী করে নিয়ে চলো; আরও ব্রতের পালনশালী করে তোলে। এই যজমান (বা ব্রহ্মচারী)-কে উত্তম ভাগ্যের নিমিত্ত উদ্বোধিত করো। সকল দেবতা তার সাধুতাকে অনুমোদন করুন। ১।
বঙ্গানুবাদ –জগতের স্বামী, বিশ্বের ধারণকর্তা ধাতা দেবতা আমাদের প্রভূত ধনের সাথে সংযুক্ত করুন। সেই ধাতা দেবতা আমাদের সকল প্রয়োজনকে সফল (বা পূর্ণ) করতে সমর্থ। ১।
ধাতা দেবতা আমি হেন যজমানকে অক্ষয় জীবন-শক্তি প্রদান করুন। আমরা সেই সম্পূর্ণ ধনের স্বামী ধাতা দেবতার উত্তম বুদ্ধির (অর্থাৎ সদয় মতির) ধ্যান করছি, এবং কৃপা যাচনা করছি। ২৷৷
ধাতা দেবতা প্রজা-কামনাকারী যজমানের নিমিত্ত সকল বরণীয় পদার্থ প্রদান করুন। ইন্দ্র প্রমুখ সম্পূর্ণ দেবতাগণ, অদিতি দেবী ও অন্য দেবতাগণ তাঁকে (অর্থাৎ যজমানকে) অমৃতত্ব প্রদান করুন ৷ ৩৷
সকলের ধারক ধাতাদেবতা, সকলের প্রেরক ও সমস্ত কল্যাণের দাতা সবিতাদেব, প্রজাগণের স্রষ্টা ও রক্ষক পরমেষ্ঠী ব্রহ্মা, পুরুষার্থ যুক্ত বেরক্ষক প্রকাশরূপ অগ্নিদেব, রূপসমূহের কর্তা ত্বষ্টা দেবতা, বিশ্বলোকে ব্যাপ্তিশীল বিষ্ণু দেবতা আমাদের হবিঃসমূহ গ্রহণ করুন এবং পুত্র-পৌত্রাদি ইত্যাদি প্রজাগণের সাথে আপন আপন ফল প্রদান করে যজ্ঞকর্তা যজমানকে অভিলষিত ধন (বা যজ্ঞফল) প্রদান করুন। ৪।
বঙ্গানুবাদ –হে বিস্তীর্ণা পৃথিবী মাতা! হলের দ্বারা কর্ষিতা হওয়ার পরেও (অর্থাৎ বীজবপনার্থে ক্ষেত্ৰাদিকর্ষণে ক্লেশবতী হয়েও) তুমি মহতী বৃষ্টিতে শিথিলাবয়বা না হয়ে বরং দৃঢ়া হয়ে থাকো। হে পর্জন্য! তুমি ঐ দিব্য মেঘ বিদীর্ণ করে উত্তম বর্ষণ প্রদান করো। তুমি বৃষ্টিপ্রদানে সামর্থযুক্ত রূপে মেঘরূপা জলপূর্ণা ভস্ত্রার মুখ উন্মোচিত করে মহতী বৃষ্টির সৃষ্টি করো ॥১॥
যে, স্থানে সোমদেবের পূজা হয়ে থাকে, সোম ইত্যাদি ঔষধিসমূহ উৎপন্ন হয়, সেই স্থানে যথোচিত কালে পর্যাপ্ত বর্ষণ হয়ে থাকে এবং সকল প্রকার কল্যাণ হয়ে থাকে। গ্রীষ্ম অসহ্য তাপ প্রদান করে না এবং হেমন্ত ঋতু অতি শৈত্যের দ্বারা গাত্রসঙ্কোচনরূপ বাধার সৃষ্টি করে না। উপযুক্ত বর্ষণের ফলে ভূমি সমৃদ্ধি লাভ করে। ২।
বঙ্গানুবাদ –প্রজাপতি ব্রহ্মা প্রজাগণকে উৎপন্ন করুন এবং ধাতা দেব তাদের পোষণ করুন। এই সকল প্রজা (ভাবী সন্তান) সঙ্গঠিত এক মনঃসম্পন্ন হয়ে বিবেকশীলতার সাথে কার্য নির্বাহ করুক। পুষ্টির দেবতা আমাদের প্রজা-সম্বন্ধী পুষ্টি প্রদান করুন। ১।
বঙ্গানুবাদ— আজ আমাদের যজ্ঞের বার্তা, আমাদের সকল কর্মের অনুমন্ত্রী চন্দ্রমা দেবতা অর্থাৎ পূর্ণিমার অভিমানী দেবতা, আমাদের অনুকূল হয়ে সকল দেবতার নিকট প্রকাশিত করে দিন। অগ্নিদেবও আমাদের দ্বারা সমর্পিত হবির ভাগ প্রত্যেক দেবতাকে প্রাপ্ত করানোর কৃপা করুন, (অর্থাৎ তাদের নিকট বহন করে গমন করুন। ১।
হে অনুমতি নামী দেবি! আমাদের সুবুদ্ধি প্রদান করো। আমরা যেন কল্যাণকারক কর্ম সাধনের বুদ্ধি প্রাপ্ত হই। তুমি অগ্নিতে হোমকৃত হবিঃ উপভোগ করে আমাদের উত্তম সন্তান প্রদান করো ৷ ২৷
আমরা অনুমন্তা পুরুষ দেবতার ক্রোধের ভাজন যেন না হই; বরং তার সুখদায়ক সুমতির দ্বারা লাভ প্রাপ্ত হই। তিনি আমাদের প্রতি প্রসন্ন হয়ে আমাদের পুত্র ইত্যাদি সন্তানের দ্বারা সম্পন্ন করুন এবং অক্ষয় ধন প্রদান করুন ॥ ৩।
হে অনুমতি দেবী! তোমার নাম অনেক প্রকারের যশের বা কীর্তির সাথে প্রসিদ্ধ আছে। তুমি যজমানকে ধনদানের দ্বারা স্নেহ-করণশালিনী। তুমি আমাদের যজ্ঞকে সফল করে তোনো এবং উত্তম বীর পুত্রগণের সাথে ধন প্রদান করো। ৪
আমাদের এই সকল প্রকারে সম্পন্ন যজ্ঞকে রক্ষা করে, হে অনুমতি দেবি! তুমি সুক্ষেত্র ও শোভনপুত্র ইত্যাদিরূপ ফল দানের নিমিত্ত আগমন করো। তোমার কৃপাতেই আমরা শ্রেষ্ঠ কার্য সম্পন্ন করার প্রেরণা লাভ করে থাকি। ৫।
হে অনুমতি দেবি! তুমি স্থাবর-জঙ্গমাত্মক সকল জগতে অবুদ্ধির দ্বারা এবং সুবুদ্ধির দ্বারা কার্য- করণশালী সব কিছুর মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে আছে। তুমি আমাদের সুবুদ্ধি প্রদান করো ৷ ৬ ৷৷
অধ্যায়: সাত
সূক্ত -১৯ : একো বিভু:
[ঋষি : ব্রহ্মা। দেবতা : আত্মা। ছন্দ : জগতী]
সমেত বিশ্বে বচসা দিব একো বিভূতিথির্জনানাম। স পূর্বে নূতনমাবিবাসৎ তং বর্তনিরনু বাবৃত একমি পুরু ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –হে বন্ধুবর্গ! জন্মগ্রহণকারী নবজাত প্রাণীগণের স্বামী, অতিথির সমান পূজনীয় এবং স্বর্গলোকের অধিপতি সূর্য দেবতাকে সুন্দর মন্ত্রের দ্বারা স্তুতি করো। হে চিরন্তন বা চিরপুরাতন সূর্যদেব! তুমি এই নবজাত প্রাণীকে আপনার মনে করে তার কল্যাণ করো। তুমি সেই একই সূর্যরূপে সকল সকর্মমার্গ অনুবর্তন করে চলেছে (বা. সকল সঙ্কর্মের সঞ্চালকরূপে বিদ্যমান হয়ে আছো ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ –সকলের মধ্যে আত্মা-রূপে ব্যাপ্ত এই সূর্যদেব আমাদের সহস্র সম্বৎসরকাল পর্যন্ত সুস্থ হয়ে জীবন ধারণের শক্তি প্রদান করুন, (আমরা যেন সহস্র বৎসরব্যাপী তাকে চক্ষুগোচর করতে পারি)। এই সূর্যদেবই সকল জ্ঞানী পুরুষের মাননীয় এবং তাদের সৎকর্ম ও কর্মফলের মধ্যে সংযোগ রক্ষাশালী। হে ভগবন্! তুমি সক্কার্য সম্পাদনের নিমিত্ত আমাদের দীর্ঘ আয়ু প্রদান করো ॥ ১।
জ্ঞান-দানশালিনী, পাপহারিণী, তেজঃসংযুক্তা ঊষার রশ্মিগুলি (বা গো-সকল) সূর্য ভগবানের দিকে আমাদের প্রেরিত করতে থাকুক ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –বিষ্ণু ও বরুণ, এই যে দুই দেবতার বলের দ্বারা এই লোক-লোকান্তর স্থিত হয়ে আছে, যে দুই দেবতা বলের দ্বারা আপন কর্তব্য ও ফলের বিশেষত্ব দর্শন করে থাকেন, যাঁদের পরাক্রমের দ্বারা এই সংসার ত্রিকালব্যাপী সচেষ্ট (বা সচল) হয়ে আছে, সেই সর্বব্যাপ্ত বিষ্ণু ও অনর্থনিবারক বরুণ দেবের উদ্দেশে ফলাথীগণের মধ্যে প্রথম আহ্বানকারী এই হোতা হবিঃ প্রদান করুন। ১।
যে বিষ্ণু ও বরুণের আজ্ঞায় এই বিশ্ব বিশেষভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ও প্রাণধারণ করছে। এবং আপন কর্তব্য ও ফলের বিশেষ রূপ দর্শন করছে; সেই যে দুই দেবতার বলে বিশ্বজগৎ ভূত-ভবিষ্য-বর্তমানকালে দীপ্তি ইত্যাদি ব্যাপারের আস্পদ হয়ে আছে, সেই বিষ্ণু ও বরুণদেবকে এই প্রথম আহ্বানকারী ফলার্থী হোতা হবিঃ সমর্পণ করুন। ২৷৷
বঙ্গানুবাদ –সর্বব্যাপক বিষ্ণুর পরাক্রমের কথা আমি যথাযথ বলছি। বলছি যে, তিনিই পার্থিব লোকসমূহ সহ অগ্নি, বিদ্যুৎ ও সূর্যরূপ জ্যোতি রচনা করেছেন; ইনিই পৃথিবী, স্বর্গ ও অন্তরিক্ষে তিন পাদ বিক্ষেপ করে নির্মাণ (বা অধিকার) করে নিয়েছেন এবং এগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্বর্গকে স্বয়ং ধারণ করে আছেন (অর্থাৎ আপনত্বে রক্ষা করছেন)। আমি সেই বিষ্ণুর বীর্যের কথা বলছি, যিনি মহাত্মগণের দ্বারা স্থূয়মান ॥১॥
সেই মহান বিষ্ণুর পরাক্রমের প্রশংসা এই যে, সিংহ যেমন সর্বত্র বিচরণ করতে করতে বনের মধ্যে যেখানে ইচ্ছা সেখানে ক্ষণমাত্রেই উপনীত হয়ে যায়, সেই রকমে বহু দূরে অবস্থিত হলেও তিনি (অর্থাৎ বিষ্ণু) স্তুতিমাত্রই এই স্থানে আগমন করুন। ২।
হে ভগবন! তিন পাদবিক্ষেপ স্থানে (অর্থাৎ পৃথিবী, অন্তরিক্ষ ও দিব্যলোকে) বিচরণ পূর্বক তুমি আমাদের নিবাসের সুবিধা ও ধন ইত্যাদি প্রদান করো। হে অগ্নিরূপ বিষ্ণু ভগবান! এই যজ্ঞে হোমকৃত ঘৃতকে তুমি গ্রহণ করো এবং যজমানকে সমৃদ্ধিশালী করে তোলো ॥ ৩॥
সর্বব্যাপক ভগবান বিষ্ণু এই বিশ্বসংসারে বিক্রমণ করেছেন; তিনি এর উপর তিন পদ স্থাপন করেছেন (অর্থাৎ পৃথিবী, অন্তরিক্ষ ও দিবি লোকে বামনরূপে ত্রি-পাদ বিক্ষেপে আক্রমণ করেছেন–পৃথিব্যাং অন্তরিক্ষে দিবি চ বিষ্ণুবামনো ভুত্বেমাল্লোকাংস্ক্রিভিঃ ক্রমৈরভ্যজয়ৎ ইতি তেঃ)। এই বিক্রমমাণ বিষ্ণুর (অর্থাৎ ত্রিবিক্রম বিষ্ণুর) তিনটি পদে সমগ্র জগতের (অর্থাৎ তিনটি লোকের) স্থিতি নিষ্পন্ন হয়ে গিয়েছে ॥৪॥
রক্ষক, অন্যের প্রভাবে আগমনশীল (বা অনভিভূত) ভগবান্ বিষ্ণু তিনটি পদ স্থাপন পূর্বক এই তিনটি লোক সহ অগ্নিহোত্র ইত্যাদি ধর্ম (বা কর্মসকল) ধারণ করে নিয়েছেন ॥ ৫
হে স্তোতৃবর্গ! সর্বব্যাপক বিষ্ণু ভগবানের নানা কার্যসমূহকে প্রত্যক্ষ করো–যার দ্বারা তিনি তোমাদের গুণ ধর্মসমূহকে দর্শন করছেন বা কর্মসমূহকে সংযুক্ত করছেন। তিনি ইন্দ্রের যোগ্য সখা। (বিষ্ণু কীরকম? না- ইন্দ্রস্য দেবস্য যুজ্যঃ যোগ্যঃ অনুগুণঃ সখা সমানখ্যানো মিত্রভূতঃ) ॥ ৬৷
জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণ সেই ভগবান বিষ্ণুর পরম স্থান (জ্ঞাতব্য তত্ত্ব) সর্বদা দর্শন করে থাকেন। যেমন দ্যুলোকে বিস্তৃত হয়ে থাকা চক্ষুরূপী সূর্য বিদ্যমান, সেই রকমে সর্বত্র ব্যাপ্ত সেই প্রকাশ তত্ত্বকে জ্ঞানী পুরুষ দর্শন করেন। ৭।
হে বিষ্ণু ভগবান! দ্যুলোক, পৃথিবীলোক ও বিস্তৃত অন্তরিক্ষ লোক হতে আনীত ধনরাশিতে আপন হস্তদ্বয় পূর্ণ করো এবং সেই দক্ষিণ ও বাম দুই হস্তে তা প্রদান করো ॥ ৮
বঙ্গানুবাদ –যে ধেনুর চরণের স্পর্শে দেবতাগণের নিকট কামনা-করণশীল যজমান পবিত্র হয়ে থাকেন, সেই ঘৃতপদী, সোমপৃষ্ঠা, ফলদান সমর্থা, বিশ্বদেবাত্মিকা ইড়া নাম্নী ধেনু আমাদের যজ্ঞকে সর্বত্র প্রকাশিত করুক। যেভাবেই হোক, আমরা যাতে আমাদের কৃতকর্মের ফল প্রাপ্ত হই, এই ধেনু তেমনই প্রযত্ন করুক ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –বেদ নামক দর্ভের মুষ্টি আমাদের পক্ষে অবিনাশের হেতু হোক। বৃক্ষ (দ্রুম) ছেদনের হাতিয়ার পরশু বা কুঠার এবং তৃণ ইত্যাদির ছেদনী বেদি আমাদের পক্ষে কল্যাণকারী হোক। এই সকল দেবাত্মক, বেদ দ্রুঘণ ইত্যাদি হবিঃ সমর্পণ-করণশালী আমার যজমানের যজ্ঞকর্মের সহায়ক হোক। ১।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি ও বিষ্ণু দেবতা! তোমাদের দুই জনের এইটাই মহতী কীর্তি বা মহনীয় মাহাত্ম্য যে, তোমরা উভয়ে গুহ্য ঘৃত (অর্থাৎ গোপনীয় গুহারূপ জুহুগত আজ্য বা ক্ষরণশীল পদার্থ) পান করে থাকো। তোমরা সকল যজমানের গৃহে (বা যজ্ঞগৃহে) গো, অশ্ব ইত্যাদি সপ্তসংখ্যক রমণীয় পশুরূপ রত্নকে ধারণ করে থাকো। তোমাদের দুই জনের জিহ্বা হৃয়মান (হোমে আহূত) আজ্য ভক্ষণ করুক ॥ ১৷
হে অগ্নি ও বিষ্ণু দেবদ্বয়! তোমাদের দুইজনের ধাম (স্থান বা তেজঃ) অতি মহৎ বা মহনীয়, সকলের ইষ্ট বা প্রতিকারী। তোমরা ঘৃতের সান্নায্য চরু পুরোড়াশ ইত্যাদি স্বরূপে ভক্ষণ করে থাকো। তোমরা পরস্পর প্রীয়মাণ হয়ে সকল যজমানের গৃহে উত্তম স্তুতির দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে থাকো। তোমাদের জিহ্বা প্রত্যেক ঘৃত ভক্ষণ করুক ॥ ২॥
স্বাক্তং মে দ্যাবাপৃথিবী স্বাক্তং মিত্রো অকরয়। স্বাক্তং মে ব্ৰহ্মণস্পতিঃ স্বাক্তং সবিতা করৎ
বঙ্গানুবাদ –দ্যাবাপৃথিবী আমার দুটি চক্ষু অথবা ঘূপ উত্তম অঞ্জনের দ্বারা রঞ্জিত করুক। সূর্যদেব, ব্ৰহ্মণস্পতি এবং সবিতাদেব, সকলেই আমাদের চক্ষুর স্বস্থতায় প্রযত্নশীল হয়ে অঞ্জন করুন ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! তুমি বহুরকম রক্ষার দ্বারা আজ আমাদের সুরক্ষিত রাখো। হে ধনী, শূরবীর! শ্রেষ্ঠ রক্ষার দ্বারা আমাদের প্রীত করো। যে আমাদের দ্বেষ করে, তার অধঃপতন ঘটুক। আমরা যে শত্রুদের প্রতি দ্বেষ করি সে মৃত্যুপ্রাপ্ত হোক। ১।
সং মা সিঞ্চন্তু মরুতঃ সং পূষা সং বৃহস্পতিঃ। সং মায়মগ্নিঃ সিঞ্চভু প্রজয়া চ ধনেন চ দীর্ঘমায়ুঃ কৃপোতু মে ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ— মরুৎ-দেবগণ ফলাথী আমাকে (অর্থাৎ যজমানকে) পুত্র ইত্যাদি প্রজা ও ধন প্রদান করুন। পূষাদেব, বৃহস্পতি এবং অগ্নিদেবতাও আমাদের সুসন্ততি ও ধন-ধান্যে পূর্ণ করুন। তারা আমাকে বা আমার এই মাণবককে শতসম্বৎসর পরিমিত আয়ু প্রদান করুন। ১।
বঙ্গানুবাদ –হে জাতবেদা অগ্নিদেব! তুমি এইভাবে সেই শত্রুগণকে বিনাশ করে দাও, যারা আমাদের বিরুদ্ধাচারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইভাবে সেই শত্রুগণকে, যারা এখনও প্রকট (বা জাত) হয়নি, তাদেরও সমূলে শেষ করে দাও। আমাদের এই বাসভূমিকে সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যে পরিপূর্ণ করে দাও। সকল দেবৃন্দ এই হেন শত্ৰুহনন কর্মে প্রযোক্তাকে (আভিচারিক কর্মকারীকে) অনুমোদন করুন। ১।
হে বিদ্বেষবতী স্ত্রী! গর্ভধারণের নিমিত্ত তোমার যে শতসংখ্যক নাড়ী ও সহস্ৰসংখ্যক ধমনী আছে, সেগুলির মুখকে আমি (অর্থাৎ আভিচারিক কর্মের দ্বারা বন্ধ্যাত্ব-করণের প্রয়োগকর্তা) প্রস্তরের দ্বারা রুদ্ধ করে দিচ্ছি; যাতে তুমি গর্ভধারণে অক্ষম (অপারক) হয়ে যাও ৷ ২৷৷
হে প্রতিকূলা নারী! তোমার পুত্রজননক্ষম গর্ভাশয় তোমার যোনিপ্রদেশের নীচে (নীচীনং) বা বৰ্হিভাগে স্থানান্তরিত করে দিচ্ছি; এর ফলে তুমি সন্তান-প্রজননে অশক্ত হয়ে যাবে। স্ত্রীব্যঞ্জনযুক্ত হলেও অশ্বতরী যেমন সন্তানরহিত হয়, তোমাকে তেমনই (বন্ধ্যা) করে দিচ্ছি। তোমার সম্বন্ধি গর্ভধারণস্থান পাষাণে আচ্ছাদিত করে দিচ্ছি ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –এই (সৌবচল নামক) ঔষধিকে আমি বশীকরণের নিমিত্ত খনন করছি। এই ঔষধি পতিকে বশীভূত করতে সমর্থ। এটি পতিকে অন্য নারীগমনে (বা অন্য নারীতে আসক্ত হতে) নিরস্ত করে তাকে আমার নিকট (অর্থাৎ পত্নীর সমীপে) প্রত্যাগমনে বাধ্য করে এবং পতির পক্ষে আনন্দকর হয় ॥ ১।
অসুরের মায়া হতে উৎপন্ন এই আসুরী নামক ঔষধি, যার গুণের দ্বারা সকল দেবতাগণের উপর ইন্দ্র অধিক প্রভাবশালী হয়েছিলেন, অথবা পুলোমা নামক অসুরের কন্যা ইন্দ্রপত্নী শচীদেবী যে আসুরী নামক ঔষধির প্রভাবে ইন্দ্রকে বশীভূত করেছিলেন, হে পতি! তারই দ্বারা আমি তোমাকে আমার প্রভাবাধীন করছি, যাতে আমি তোমার প্রিয় ধর্মপত্নী হয়ে বিরাজমানা থাকবো ৷৷ ২৷
হে শঙ্খপুপী নাম্নী ঔষধি! (অনয়া প্রকৃতা শঙ্খপুপাখ্যা ওষধিঃ স্তয়তে)। তুমি রাত্রির দেবতা সোমকে বশ করার নিমিত্ত গমন করছো এবং দিবাধিপতি সূর্যকেও বশীকরণের নিমিত্ত তাঁর অভিমুখী হচ্ছো। তুমি সকল দেবতাকে বশীকরণে সমৰ্থা। আমাদের পতিকে আমাদের দিকে আকৃষ্ট করার নিমিত্ত আমরা তোমা হেন ঔষধির নিকট নিবেদন করছি ॥ ৩॥
হে স্বামি! তুমি এখানে আমার নিকট কিছু বলবে না, আমি বলবো; তুমি বিদ্বৎসমাজেই যেমন ইচ্ছা, তেমন বলবে। তুমি আমাকে অসাধারণ রূপে প্রাপ্ত হও। তুমি আমার সম্মুখে অন্য স্ত্রীর নামও গ্রহণ (বা উচ্চারণ) করবে না। ৪
হে স্বামিন! যদি তোমাকে আমার দৃষ্টির বাহিরে কোথাও যেতে হয়, অথবা কোন নদী আমার ও তোমার মধ্যে এসে তোমাতে-আমাতে ব্যবধান রচনা করে, তবে এই শঙ্খপুষ্পী তোমাকে আবদ্ধ করে স্নেহময়ী আমার সম্মুখে আনয়ন করবে। ৫।
বঙ্গানুবাদ –সকল প্রাণীর দ্রষ্টব্য, প্রশংসনীয় গতিসম্পন্ন সূর্য মরুদেশেও জল বর্ষণ করুন। তিনি আপন মিত্র ইন্দ্রের সাথে আমাদের মঙ্গলকারী হোন, নবীন গৃহ নির্মাণের স্থানে আগমন করুন। ১।
অনন্ত রশ্মিশালী, সুন্দর গতিশালী, অপরিমিত ফলের সাথে সংযুক্ত করণশালী, অন্নধারক সূর্য আমাদের চিরস্থায়ী করুন। আরও, যে ধন চোর ইত্যাদি অপরের দ্বারা অপহৃত হয়ে গেছে, অথবা যে ধন হোমকালে হস্তচ্যুত হয়ে পুরোডাশ ইত্যাদির খণ্ড হতে পতিত হয়েছে, সেই ধন আমাদের পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশে স্বধাকারে হুত (অর্থাৎ মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত স্বরূপ) হোক।
বঙ্গানুবাদ –হে সোমদেব! হে রুদ্রদেব! আমাদের শরীররূপ গৃহে ব্যাপ্ত অমীবা (অর্থাৎ বৃহৎ বিনাশকারী রোগ বিশেষ)-কে বিনষ্ট করো। রোগের কারণভূতা (নির্ঋতিরূপা) পিশাচীকে আমাদের নিকট হতে দূরে অপসারিত করে দাও, যেন সে আর না প্রত্যাবর্তিত হয়ে আসতে পারে এবং আমাদের কৃত পাপকেও আমাদের নিকট হতে পৃথক করো ॥ ১।
হে সোম! হে রুদ্র! আমাদের শরীরে আবদ্ধ আমাদের অর্জিত পাপকে আমাদের নিকট হতে মুক্ত করো; আমাদের (সেই পাপ-সম্বন্ধী) রোগসমূহকে দূর করার নিমিত্ত ঔষধিসমূহকে আমাদের শরীরে ধারণ করাও ২
বঙ্গানুবাদ –হে পুরুষ! তুমি ব্যর্থই (অর্থাৎ অকারণেই) নিন্দিত হয়েছে। তোমার সম্বন্ধে স্তুতি রূপ ও নিন্দা রূপ যে দুই রকমের বাক্য (কথা) বলা হয়ে থাকে, তুমি সেই দুই রকমের কথাই (বাক্যই) প্রসন্ন মনে গ্রহণ করো। সেই অকল্যাণকর কথা বা বাক্যসমূহের তিনটি অবস্থা নিন্দাকারীর অন্তরে বিদ্যমান থাকে, অপর একটি অবস্থা বৈখরীরূপা ধ্বনি (জনসম্মধ্বনি) অনুলক্ষ্য করে নিন্দারূপে বাহিরে প্রকাশ পায়। (অর্থাৎ মূলতঃ অবস্থাচতুষ্টয়াত্মক ঐ দুই প্রকারের বাক্য পরা-পশ্যন্তী ও মধ্যমা ভেদে তিনি অবস্থায় বাক্য-প্রয়োগকারীর মধ্যে থাকে, এবং সম্বন্ধিত ব্যক্তিতে অর্থাৎ নিন্দিত ব্যক্তিতে তার এক অবস্থাই (বৈখরী) হয়ে থাকে) ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! হে বিষ্ণু! তোমাদের কখনও পরাভব ঘটেনি, তোমরা সদাই বিজয় প্রাপ্ত হয়ে থাকো। তোমাদের দুইজনের মধ্যে একে অপরের দ্বারা নির্জিত হওনি। হে ইন্দ্র ও বিষ্ণু! তোমরা যে বস্তুর নিমিত্ত অসুরগণের সাথে স্পর্ধা করে থাকে, সেই বস্তু লোক-বেদ ও বাপে তিন প্রকারে বিভক্ত হয়ে থাকলেও, তা অপরিমিত হয়ে থাকে ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –সকলের হিতসাধক জনপদ, সমুদ্র ও দূর দেশ হতে সংগৃহীত সত্তুমন্থ নামক হে ওষধি! তোমাকে আমি জ্ঞাত আছি। তুমি হেন এই ঔষধি ক্রোধকে দূর করতে সমর্থ ॥১॥
ঈর্ষাকে নিবারণ করণশালী হে দেব! তুমি আমার সকল কার্যকে ভস্মকারী এই ঈর্ষালুর ঈর্ষাকে তপ্তপরশু-কথিত জলের দ্বারা শান্ত করে দাও, যেমন অগ্নিকে জলের দ্বারা শান্ত করা হয় ॥২॥
বঙ্গানুবাদ –হে পৃথুজঘনা সিনীবালি! (চতুর্দশীযুক্তা বা প্রতিপদযুক্তা অমাবস্যায় স্ত্রীত্ব আরোপিত হয়েছে)। তুমি দেবতাগণের সমান কার্যশালিনী হওয়ার কারণে তাদের ভগিনীস্বরূপা। তুমি আমাদের পুত্র ইত্যাদি প্রদান করো। তুমি আমাদের প্রদত্ত হবিঃ গ্রহণ করো। ১।
হে ঋত্বিক! হে যজমান! এই সিনীবালী সুন্দর হস্তশালিনী, সুযোনি সম্পন্না, এবং সুশোভিত অঙ্গুলিসমূহের সাথে যুক্তা। এই প্রজা-পালনকারিণী সিনীবালী দেবীর উদ্দেশে হবিঃ প্রদান করো। ২।
এই সিনীবালী ইন্দ্রের সম্মুখে গমন পূর্বক তার পূজা করে থাকেন। ইনি প্রজাগণকে পালন করে থাকেন। হে দেবপত্নী সিনীবালি! তুমি আপন স্বামী ইন্দ্রকে আমাদের ধন দানের নিমিত্ত প্রেরণা প্রদান করো। আমরা তোমার উদ্দেশে হবিঃ প্রদান করছি ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –চন্দ্রমা-হীন অমাবস্যা (অর্থাৎ কুহু নামে খ্যাত নষ্টচন্দ্রা অমাবস্যায় স্ত্রীত্ব আরোপিত) সুন্দর কর্ম ও শ্রেষ্ঠ আহ্বানশালিনী। আমি তাকে এই দর্শর্যাগে সর্বাভিলষিতসাধনে আহ্বান করছি। তিনি আমাকে বরণীয় ধন ও পরাক্রমী পুত্র প্রদান করুন ॥১॥
সেই কুহূদেবী সকল ভূতসমুদায় ও অমৃতের পোষণকত্রী; তিনি অমৃতরূপ জলকে পুষ্ট করছেন। তিনি আমাদের যজ্ঞকে জ্ঞাত হয়ে আমাদের আহ্বান শ্রবণ করুন, আমাদের হবিঃ গ্রহণ করুন এবং আমাদের ধনের পোষণ করুন। ২।
বঙ্গানুবাদ –আমি রাকাদেবীকে সুন্দর মন্ত্রের দ্বারা আহ্বান করছি। (পূর্ণ চন্দ্রশালিনী পূর্ণিমা। তিথি রাকা নামে খ্যাতা)। সেই সুভগা (সুজ্ঞানাদিকা) দেবী আমাদের স্তুতি শ্রবণ করুন এবং আমাদের অভিপ্রায়কে জ্ঞাত হোন; যেমন বস্ত্র ইত্যাদি সীবন (অর্থাৎ সেলাইয়ের কার্য) যোগ্যতার দ্বারা হয়ে থাকে, তেমনই অচ্ছিদ্যমান সূচীস্থানীয় নাড়ীর সীবনে এই প্রজননরূপ কর্ম করে আমাদের যশস্বী পুত্র প্রদান করুন। (যথা বস্ত্রাদিকং সূচ্যা সূতং চিরং কার্যক্ষমং ভবতি এবং ইদং করোতু)। ১
হে সুরূপা রাকাদেবী! তুমি আপন কল্যাণময়ী সুবুদ্ধির দ্বারা হবিদাতা যজমানকে ধন প্রদান করে থাকো। তুমি সেই শোভন বুদ্ধিসমূহ সহকারে আমাদের নিকট আগমন পূর্বক ধনের পুষ্টি সাধিত করো ॥২॥
বঙ্গানুবাদ –দেবপত্নীবৃন্দ আমাদের অন্ন ইত্যাদি প্রাপ্ত করানোর নিমিত্ত, পুত্র ও ধন রক্ষণের নিমিত্ত স্বেচ্ছায় আগমন করুন। পৃথিবীর উপর যে দেবপত্নী নিবাস করছেন এবং যে দেবপত্নী অন্তরিক্ষে অবস্থান করছেন, তাঁরা আমাদের শোভন আহ্বান শ্রবণ পূর্বক সুখ বা গৃহ (শর্ম) প্রদান করুন ॥১॥
দেবপত্নীগণ আমাদের রক্ষা করুন। ইন্দ্রাণী, বরুণানী, রোদসী (রুদ্রের পত্নী), অগ্নায়ী, অশ্বিযুগলের পত্নী আমাদের আহ্বান শ্রবণ করুন। তাঁদের স্বামী দেবগণ আপন আপন জায়াগণের ঋতুকালে তাদের উদ্দেশে নিবেদিত হবিঃ নিজেরা গ্রহণ করুন। ২।
টীকা –উপযুক্ত চারটি সূক্তের মোট নয়টি মন্ত্র সকল ব্যাধির ভৈষজ্যার্থে এবং সকল সম্পৎ কামনা পূর্বক সূত্রোক্তপ্রকারে, যথালিঙ্গ সিনীবালী, কুহূ ইত্যাদির যাগ বা উপাসনা করণীয় ॥ (৭কা. ৪অ. ৮-১১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –যেমন বৈদ্যুতাগ্নি নিত্য অপ্রতিম হয়ে বৃক্ষসমূহকে ভস্ম করে থাকে, তেমনই আমি সকল জুয়ারীকে (কিতবকে) পাশার (অক্ষের) দ্বারা পরাজিত (বা হনন) করছি, যাতে দূতক্রিয়ায় (জুয়াখেলায়) আমার প্রতি স্পর্ধান্বিত কেউ না থাকে ॥১॥
জুয়াতে ত্বরমাণ (তাড়াতাড়ি পাশার দান প্রদানকারী) এবং বিলম্বমান (অর্থাৎ ধীরেসুস্থে পাশার দান প্রদানকারী) ব্যক্তিগণের মধ্যে আমি শ্রেষ্ঠ। বারম্বার পরাজিত হয়েও দূতক্রীড়াতে আসক্তি রক্ষকারী দূতব্যসনীদের ভাগ্য আমি হেন জুয়ারীতে সর্ব দিক হতে লভ্য হোক। আমার হস্তধৃত পাশায় সর্বদা চতুর্থ সংখ্যাবিশিষ্ট কৃত নামক অয় অবস্থান করুক। (এক হতে পঞ্চসংখ্যান্তা অক্ষবিষয় হলো অয়। তার মধ্যে চতুর্থ সংখ্যাবিশিষ্ট অয়টি কৃত নামে অভিহিত। এই কৃতই জুয়াখেলায় জুয়ারীকে জয় দান করে-তত্র কৃতস্য লাভাদ দূতজয়ো ভবতি) ॥২॥
স্তোতৃগণকে আপন ধন প্রদানশালী (স্বাবসু) অগ্নিকে আমি স্তুতি করছি। দূতকর্মের অধিপতি অগ্নি দূতকর্মে প্রকৃষ্টরূপে আসক্ত আমাদের লাভের হেতুভূত কৃত নামক অয়বিশিষ্ট পাশা দান করুন। যেমন অক্ষের (রথচক্রের) দ্বারা চালিত রথে অন্ন আনীত হয়, তেমনই অক্ষের (পাশার) দ্বারা শত্রুদের (অর্থাৎ বিপক্ষীয় কিতবগণের) সম্পত্তি লাভ করবো ॥৩॥
হে ইন্দ্র! আমি যে কিতবদের পরাজয় বরণ করাবো, তাদের তোমার সহায়তাতেই করাবো। যারা আমাদের জুয়ায় জয় করতে চায়, তাদের তুমি উলিত করো এবং আমাদের নিকট প্রভূত ধন আনয়ন করো। তুমি প্রতিপক্ষ কিতবগণের জয়লক্ষণসমূহকে নিবারণ করো ॥৪৷৷
(জয়লাভের নিমিত্ত অক্ষশলাকা ইত্যাদির দ্বারা সংরোধ-চিহ্নকারী) হে প্রতিপক্ষীয় কিব! যতই চিহ্নিত করো, যতই সংরোধ করো, তোমার উপর আমিই বিজয় লাভ করব। আরণ্যশ্বাপদ বৃক যেমন অবিকে (মেষ বা ছাগকে) বিনাশ করে, তেমনই আমি জয়ের উদ্দেশে তোমার দ্বারা কৃত-শালী পাশকে আমি বিনাশ করে দিচ্ছি।৫।
প্রকৃত জুয়ারী আপন কৃতিত্বে প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর বিজয় প্রাপ্ত হয়। পরস্ব-হা কিতব জয়লাভের নিমিত্ত দূতক্রিয়ার সময়ে আপন পাশায় কৃত-নামক অয়কেই অন্বেষণ করে (অর্থাৎ হস্তস্থিত পাশায় প্রথমেই কৃত-নামক অয়কে রক্ষণ পূর্বক কৌশলে চাল প্রদান করে জয়লাভ করে)। দেবতাগণকে কামনাশীল যে পুরুষ দূতক্রিয়ায় অর্জিত ধন দেবকার্যে ব্যয় করে, ইন্দ্র তাকে অন্ন বলের দ্বারা সমৃদ্ধ করে থাকেন ৷ ৬ ৷
হে ইন্দ্র! দরিদ্রতা হতে আগত দুর্বুদ্ধি আমরা পশুর দ্বারা অতিক্রম করবো। (অর্থাৎ দারিদ্র মানুষকে অনেক সময়ে দুষ্কর্মে প্ররোচিত বা নিয়োজিত করে। পশুগণ কিন্তু স্বাভাবিক জীবননির্বাহ থেকে কোন অবস্থাতেই অপসৃত হয়। পশুর দৃষ্টান্তই মানুষকে অসৎ-প্রবৃত্তি হতে রক্ষা করতে পারে)। হে পুরুহূত (বহুভাবে আহূত)! আমরা সকলে যবের (বা ধান ইত্যাদির) দ্বারা ক্ষুধাকে শান্ত (নিবারণ) করবো। আমরা প্রতিপক্ষীয় কিতবদের দ্বারা পরাজিত হবে না এবং বলকারিণী অক্ষশলার দ্বারা তাদের প্রকৃষ্টমান ধনসমূহ জয় করে নেব ॥৭॥
আমার দক্ষিণ হস্তে লাভহেতু কৃতশব্দবাচ্য অয় আছে, বাম হস্তে কৃত-সাধ্য জয় নিহিত আছে। অতএব আমি এই দুইয়ের দ্বারা পরকীয় গো, অশ্ব, ধন, ভূমি এবং সুবর্ণ ইত্যাদির বিজেতা হবো। ৮।
(দেবসাধনভূতা অক্ষ সমূহের নিকট জয়ের নিমিত্ত প্রার্থনা করা হচ্ছে)–হে অক্ষসমুদায়! দুগ্ধবতী ধেনুর মতো আমার ফলবতী দ্যুতক্রিয়াকে কৃতের ধারায় প্লাবিত করো (অর্থাৎ বারম্বার কৃত-পাতনে দূতে জয়লাভ করিয়ে দাও)। উপর্যুপরি লাভহেতুক কৃতের ধারায় আমাকে বিজয়ী করে দাও, যেমন স্নায়ুনির্মিত মৌবীর বন্ধনযুক্ত ধনু জয়প্রদ হয়ে থাকে। ৯।
বঙ্গানুবাদ –বৃহস্পতি (দৈবগণের বৃহৎ পালয়িতা) দেবতা নিম্ন, ঊর্ধ্ব, পশ্চিম ইত্যাদি দিক হতে আক্রমণোদ্যত হিংসক পুরুষগণের নিকট হতে আমাদের সর্বতো রক্ষা করুন। ইন্দ্রদেব পূর্ব ও মধ্য দিক হতে আমাদের রক্ষা করুন। সকল দিক হতে যে হিংসকগণ আগমন করছে, ইন্দ্র ও বৃহস্পতি তাদের হতে আমাদের পালন (বা রক্ষা) করুন। ইন্দ্র তার সখাভূত স্তোতৃগণরূপ আমাদের মহত্তর (উরুতর) ধন (অর্থাৎ অত্যন্ত ঐশ্বর্য) প্রদান করুন ॥১।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –দূতজয়কর্মণি স্থলশুদ্ধিং অক্ষাধিবাসনং চ কৃত্বা যথা বৃক্ষং অশনি ইতি নবর্চেন অক্ষান্ অভিমন্ত্র দূতং কুর্যাৎ। সূত্রিতং হি।…সফলকামঃ বৃহস্পতিঃ ইতি ঋচা বৃহস্পতিং যজেত উপতিষ্ঠেত বা।…তথা গ্রহজ্ঞে অনয়া হবিরাজ্যহোমর্সমিদাধানোপস্থানানি বৃহস্পতয়ে কুর্যাৎ। তদ উক্তং শান্তিকল্পে।…ইত্যাদি। (৭কা. ৪অ. ১২-১৩সূ)। টীকা— দূতজয়কর্মে স্থলশুদ্ধি ও অক্ষাধিবাস করে উপযুক্ত দ্বাদশ. সূক্তের নয়টি মন্ত্রের দ্বারা ই সূত্রোক্তপ্রকারে অক্ষ অভিমন্ত্রিত পূর্বক দূতক্রিয়া করণীয়।..সর্বফলকামনায় বৃহস্পতির্ন ইত্যাদি সূক্তের মন্ত্রটি বৃহস্পতির উদ্দেশে যাগ বা উপাসনায় বিনিয়োগ হয়। গ্রহজ্ঞেও এই মন্ত্রটি শান্তিকল্পানুসারে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে৷ (৭কা. ৪অ. ১২-১৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –আমরা সকলে একমত-সম্পন্ন হই, আমাদের প্রতিকূলে বাক্যধারীগণও আমাদের অনুকূল মতাবলম্বী হোক। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা উভয়ে আপন ও পর, এই দুই প্রকারের মনুষ্যকে সমান মতিশালী করে দাও। ১।
আমরা আপন মন ও পরের মনকে জ্ঞাত হয়ে, দুইরকম মনকেই যুক্ত করে দেবো, আমরা মিলিত ভাবে কার্য করবো; দেবতায় প্রীতিসম্পন্ন মনের সাথে আমরা যেন পৃথক না হই। মনকে উচ্চাটন (উমূলন বা বিক্ষিপ্ত) করণশীল শব্দ যেন না উখিত (বা কণ্ঠ হতে না নির্গত) হয়; এবং ইন্দ্রের বজ্রসদৃশ মর্মভেদিনী পরকীয়া বা যেন আমাদের উপর পতিত না হয়। ২
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! তুমি হবিঃ বহনের দ্বারা দেবতাগণকে পালন করছে। তুমি যমের পরলোক রূপ ভয় হতে এই উপনীতব্য মাণবককে রক্ষা (বা মুক্ত) করতে সমর্থ। তোমার প্রভাবে দেববৈদ্য অশ্বিদ্বয় এর মৃত্যুর কারণসমূহকে দূরীভূত করুন ॥ ১।
হে প্রাণ ও অপান বায়ু! তোমরা– আয়ুষ্কামনাশালী এই পুরুষের শরীরে পরস্পর সংযুক্ত হয়ে বিরাজমান থাকো। হে পুরুষ! এই প্রাণ ও অপান তোমার শরীরে সংক্রামিত হয়ে থাকুক। তুমি শত বৎসর (শরৎ) পর্যন্ত পুনরায় জীবন ধারণ করো। এবং হবিঃ ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধিপ্রাপ্ত অগ্নি তোমার রক্ষক (গোপা), পালয়িতা (অধিপা) এবং বসু বা ধনদাতা (বসিষ্ঠ) হোন। (প্রাণীর নাসিকাবিবর হতে বহির্নির্গত প্রাণ নামক বায়ু এবং হৃদয়ের অধোভাগে সঞ্চরমাণ অপান নামক বায়ু যাবৎকাল পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত হয়ে দেহে বিরাজমান থাকে, তাবৎকাল প্রাণী আয়ুস্মান হয়ে থাকে–তাবন্তং আয়ুৰ্ভবতীতি তয়োঃ সাহিত্যং প্রার্থিতং)। ২।
হে আয়ুষ্কাম (আয়ুষ্কালের বৃদ্ধি অভিলাষী)! তোমার জীবন সমাপ্ত হওয়ার ছিল বলে মৃত্যু তোমার আয়ুকে অন্যত্র অপসারিত করে রক্ষা করেছিল। দেহধারক প্রাণ ও অপানের পুনরাগমন ঘটিয়ে, অগ্নিদেব সেই আয়ুকে নির্ঋতি অর্থাৎ নিকৃষ্টগমনা মৃত্যুর সামীপ্য হতে আনয়ন করুন। হে আয়ুষ্কামী পুরুষ! অগ্নিদেব কর্তৃক আনীত তোমার সেই আয়ুকে আমি পুনরায় তোমার শরীরে মন্ত্ৰসামর্থ্যে আস্থাপিত (বা প্রবিষ্ট) করাচ্ছি ৷ ৩৷
আয়ুর কামনাকারী এই পুরুষকে প্রাণ ও অপান বায়ু যেন ত্যাগ না করে। আমি একে রক্ষার নিমিত্ত সপ্ত-ঋষির নিকট সমর্পিত করছি। তারা একে বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত সুখের সাথে রক্ষা করুন। (এখানে ঋষি শব্দে প্রাণকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এই আয়ুষ্কাম : ব্যক্তিকে সপ্ত প্রাণের হস্তে সমর্পণ করা হচ্ছে।সপ্তসংখ্যাকেভ্যঃ প্রাণেভ্য)। ৪।
হে প্রাণ ও অপান বায়ুদ্বয়! শকটবহনক্ষম দুইটি বলীবর্দ যেমন গোষ্ঠে প্রবেশ করে, তেমনই তোমরা দুয়ে এই আয়ুষ্কামের শরীরে প্রবিষ্ট হও। এই পুরুষ বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত জীবিত থাকুক ॥ ৫।
হে আয়ুষ্কাম! তোমার প্রাণকে শরীরে প্রেরিত করছি। তোমার আয়ুর প্রতিবন্ধক যক্ষ্মারোগ বা মৃত্যুকে দূর করে আয়ুকে আনয়ন করছি। বরেণ্য এই হুয়মান অগ্নি এই আয়ুষ্কামকে শতায়ুষ্য করুন ৷৷ ৬ ৷
আমরা পাপ হতে উত্তীর্ণ হয়ে দুখসংস্পর্শরহিত হয়ে স্বর্গে আরোহণ করছি। সকল দেবতার মধ্যে শ্রেষ্ঠ দ্যোতমান সূর্যদেবের সমীপস্থ হবো। ৭।
বঙ্গানুবাদ –আমরা পঠিত ঋগ্বেদ ও সামবেদকে পূজা করি। আমরা ঋত্বিক ও যজমানগণ ঋগ্বেদ ও সামবেদের দ্বারা যজ্ঞ কর্ম করে থাকি। এই ঋক ও সাম সদঃ-নামক মণ্ডপে শোভাপ্রাপ্ত হয়ে দেবতাগণের সমীপে যজ্ঞকে উপস্থাপিত করিয়ে দেয়। ১ ॥
আমরা ঋগ্বেদের নিকট হবিঃ সম্পর্কে, সামের নিকট ওজঃ (অর্থাৎ শরীরধারক অষ্টম ধাতু) সম্পর্কে এবং যজুর্বেদের নিকট বল (অর্থাৎ বাহ্য বীর্য) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছি। (ঋচা যাজ্যরূপয়া হবিয়ত ইতি ঋগ্বেদং প্রতি হবিঃ প্রশ্ন। মাধ্যন্দিনসবনে গীয়মানানাং পৃষ্ঠস্তোত্ৰাণাং যজ্ঞপ্রাণত্বেন তাকব্রাহ্মণে সংস্তবাৎ সামবেদৗ প্রতি আন্তরবলরূপৌজঃ প্রশ্নঃ। যজুষা যজ্ঞশরীরনিৰ্বত্তেৰ্য্যজুর্বেদং প্রতি বলপ্রশ্নঃ)। হে ইন্দ্র! এই প্রকারে আমাদের সম্যক পঠিত ঋামযজুর্বোত্মক অধ্যপননিবন্ধন প্রত্যবায় (বা ত্রুটি) ঘটলেও তুমি অভিমত ফল প্রদান করো। ২।
যে তে পন্থনোহব দিবো যেভিধিশ্বমৈরয়ঃ। তেভিঃ সুময়া ধেহি নো বসো॥॥
বঙ্গানুবাদ –হে ধনবান বা ধনপ্রদায়ক ইন্দ্রদেব! তোমার স্বর্গলোকের নিম্নে যে পথ রয়েছে, সেই যে সমস্ত পথসমূহের দ্বারা তুমি প্রাণীগণকে কর্মে নিয়োজিত করে থাকো, সেই পথের দ্বারা আমাদের সুখী রাখো ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –তির্যকভূত রেখাশালী তিরশ্চিরাজ নামক সর্পের বিষকে, কৃষ্ণবর্ণবিশিষ্ট কালসর্পের বিষকে, এবং নাগ ও কঙ্কপর্ণা নামক সর্পের বিষকে এই মধুক নাম্নী ঔষধি দূর করে। দিক ॥ ১৷
এই প্রযুক্ত ঔষধি মধু হতে উৎপন্ন হওয়ার কারণেই মধুময়ী হয়ে থাকে। এটি ক্রুর বিষকে দূর করতে এবং দংশনশীল জীবসমূহকে হনন-করণে সমর্থ। ২।
হে সপর্দষ্ট পুরুষ! তোমার যে অঙ্গে সর্প দংশিত করেছে, আমরা সেই স্থান হতে বিষকে নির্গত করে দিচ্ছি এবং অল্প-বীর্য মশকদের (অর্থাৎ মুখ, পুচ্ছ ও পদের দ্বারা দংশনকারী ত্রিপ্রদংশীগণকে)-ও প্রভাবহীন করে দিচ্ছি ৷ ৩৷
হে বিষনিৰ্হরণ মন্ত্রে সামর্থ্যপ্রদ ব্ৰহ্মণস্পতি! এই বিষদষ্ট পুরুষের দেহে বিষের জ্বালায় খিচুনি ধরে গিয়েছে; এ বিশ্লিষ্টপর্বা (অর্থাৎ বিগতসন্ধি) ও ব্যঙ্গ (অর্থাৎ বিবশাবয়ব) হয়ে মুখ ইত্যাদিতে বক্রত্ব অবস্থাপন্ন হয়েছে; তুমি এর অঙ্গসমূহের বক্রতা জ্যা-মুক্ত ধনুর মতো ঋজু (অর্থাৎ সরল বা সোজা) করে দাও এবং বিষকে দূর করে দাও। ৪৷
এই শর্কোটক নামক বীর্যহীন ও নিম্নমুখে সমীপাগত সর্পবিশেষের বিষকে আমি খণ্ডন করে দিয়েছি। এর পর মন্ত্ৰসামর্থে এই বিষ সহ সর্পকেই আমি বিনাশ করে দিচ্ছি। ৫।
হে বৃশ্চিক! তোর বাহুগুলিতে, মস্তকে ও শরীরে মধ্যভাগেও সন্তাপ-দানক্ষম কোনো রকম শক্তি নেই, তথাপি তুই দুবুদ্ধির বশে আপন পুচ্ছে স্বল্প বিষ বহন করে কেন ঘোরা-ফেরা করছিস? ॥ ৬৷৷
হে সর্প! তোকে পিপীলিকাগণ ভক্ষণ করে এবং ময়ূরীগণও বিশেষভাবে খণ্ড খণ্ড করে ছেদন করে। হে সর্পবিষনিৰ্হরণক্ষমগণ! তোমরা ঘোষণা করো যে, ঔষধিসমূহের দ্বারা এই শর্কোটক সর্পের বিষকে প্রভাবহীন করে দেওয়া হয়েছে। ৭
হে বৃশ্চিক! তোর পুচ্ছেই সামান্য পরিমাণে বিষ আছে। তবুও তুই পুচ্ছ ও মুখ উভয়ের দ্বারাই প্রহার (অর্থাৎ দংশন) করে থাকিস ॥ ৮।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— মার্গস্বস্তয়নকর্মণি যে তে পন্থানঃ ইত্যেনাং ঋচং প্রথমং দক্ষিণপাদপ্রক্ষেপপুরঃসরং গচ্ছেৎ। তথা সর্বস্বস্ত্যয়নকর্মণি অসংখ্যাতা শর্করাণানি বা অনয়া অভিমন্ত্র গৃহক্ষেত্রাদিষু প্রক্ষিপেৎ ইন্দ্ৰং উপতিষ্ঠেত বা। সূত্রিতং হি..বৃশ্চিকমশকপিপীলিকাশকোটকাদিবিষ ভৈষজ্যার্থং তিরশ্চিরাজেঃ ইত্যষ্টৰ্চেন মধুকং অভিমন্যু বৃশ্চিকাদিদষ্টং পায়য়েৎ। তথা তত্রৈব কর্মণি ক্ষেত্ৰমৃত্তিকাং বল্মীকমৃত্তিকাং বা সজীবপশুচমাবেষ্টিতাং অনেন অষ্টৰ্চেন সম্পত্য অভিমন্ত্র বধীয়াৎ। কেবলাং মৃত্তিকাং অভিমন্ত্র উদকেন পায়য়েৎ। তথা তস্মিন্নেব কর্মণি অনেনৈব উদপাত্ৰং হরিদ্রামিং আজ্য বা সম্পত্য অভিমন্ত্র পায়য়েৎ। সূত্রিতং হি।…ইত্যাদি। (৭কা ৫অ. ৪-৫সূ)।
বঙ্গানুবাদ –আমার যে অঙ্গ অভীপ্সিত বস্তুর অভাবে ক্লিষ্ট হয়ে গিয়েছে, ব্যর্থ যাচনার কারণ যে অঙ্গ ব্যাকুল হয়ে রয়েছে এবং জনে জনে পরিভ্রমণের নিমিত্ত বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছে, আমার সেই অঙ্গকে বান্দেবী সরস্বতী ঘৃতবৎ সারভূত ফলের দ্বারা আপূরিত করুন (অর্থাৎ স্বাভাবিক দিশা প্রাপ্ত করান)। ১।
মরুৎ-যুক্ত জলের পুত্রভূত বরুণের উদ্দেশে সপ্ত নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আকাশরূপ পিতার নিমিত্ত এবং প্রমুখ দেবতাগণের পুত্র রূপ মনুষ্যগণ হবিঃ প্রদান ইত্যাদি কর্মের অনুষ্ঠান করছে। আকাশ ও পৃথিবী উভয় লোকে দেবতা ও মনুষ্য উভয়ে বিরাজমান রয়েছে। উভয় লোক উভয়ের মঙ্গলের নিমিত্ত সদা যত্নশীল হয়ে আছে এবং অন্ন ও জলের দ্বারা উভয় লোক উভয়কে পোষণ (বা সম্পন্ন) করছে ॥ ২
বঙ্গানুবাদ –হে ধৃতব্রতো ইন্দ্র ও বরুণ! তোমরা এই প্রসন্নতাপ্রদ আমাদের অভিযুত সোম পান করো। তোমাদের রথ দেবতাগণকে কামনাশালী সোমযুক্ত এই যজমানের ঘরের নিকট উপনীত হোক ॥ ১
হে বরুণ! হে ইন্দ্র! তোমরা অভিলষিত ফল বর্ষণ করে থাকে। তোমাদের নিমিত্ত এই সোমরস গ্রহ চমস ইত্যাদি পাত্রে সর্বতোভাবে অর্পিত (বা সিঞ্চিত) করে দেওয়া হয়ে গিয়েছে; তোমরা এই বিতায়িত (বিছিয়ে দেওয়া) কুশা রূপ আসনের উপর উপবেশন পূর্বক অভিলষিত ফলবর্ষণশালী সোমকে পান করো। ২
বঙ্গানুবাদ— আমরা নিন্দা না করলেও যে শত্রু নিন্দাবাক্যে আমাদের ভর্ৎসনা করে, যারা আমাদের দ্বারা নিন্দিত হয়ে পরুষবাক্য প্রয়োগ করে, তারা বিদ্যুতের দ্বারা হত বৃক্ষের ন্যায় সমূলে বিশুষ্ক হয়ে যাক। তাদের পিতা পুত্র ইত্যাদি সকলেই শুষ্ক হয়ে (বিনষ্ট হয়ে) যাক ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ –আমি মিত্র ভাবযুক্ত স্নেহময় নেত্রে দর্শন করতে করতে, অন্নকে ধারণ করে, ধন-ধারণশালী হয়ে, শোভন বুদ্ধিতে ধন ইত্যাদি সম্পত্তির দ্বারা প্রসন্ন হয়ে স্তুতি করতে করতে আপন গৃহে আগমন করছি। হে গৃহসমুদায়! আমি হেন গৃহস্বামীর সাহচর্যে তোমরা সুখী হও। দেশান্তর হতে আগমনশালী আমা হতে ভয় প্রাপ্ত হয়ো না ॥১॥
অন্ন, রস, দুগ্ধ ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধ এই সুখদায়ক গৃহগুলি প্রবাস হতে আগমনশালী আমাদের আপন স্বামীরূপে জ্ঞাত হোক৷৷২৷৷
গৃহ হতে দূরে গমনকারী (প্রবাসী) জন আপন যে সুন্দর পদার্থের দ্বারা সম্পন্ন গৃহকে স্মরণ করে থাকে, আমরা সেই গৃহসমূহকে পুনরায় প্রাপ্ত হতে ইচ্ছা করি। সেই ঘর প্রবাস হতে আগমনশালী আমাদের জ্ঞাত হোক (বা মান্য করুক) ॥ ৩৷৷
হে গৃহসমূহ! তোমরা বহু ধন ও মধুর পদার্থের দ্বারা সমৃদ্ধ হও। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তোমরা ব্যাকুলতা প্রাপ্ত হয়ো না। অনুজ্ঞার নিমিত্ত প্রার্থিত হয়ে গিয়ে এর তোমাদের মধ্যে অবস্থানকারী মনুষ্য ধন ইত্যাদির দ্বারা সম্পন্ন থাকুক। তোমরা প্রবাস হতে আগমনশালী আমাদের হতে ভয়ভীত হয়ো না। ৪।
আমাদের গৃহে মেষী, ছাগী, গাভী, অন্ন ইত্যাদি সকল উপভোগ্য বস্তু অনুজ্ঞার নিমিত্ত উপহূত (অর্থাৎ প্রার্থিত) হোক ৫
হে গৃহাবলি! তোমরা সুন্দর ভাগ্যশালী হও; অন্ন ও ধনের দ্বারা সমৃদ্ধ হও; তোমাদের উদ্দেশে কথিতা বাণী সত্যযুক্ত ও প্রিয় হোক। তোমাদের মধ্যে নিবাসকারী জন হর্ষ ও হাস্যে থাকুক। তোমাদের মধ্যে নিবাসকারী মনুষ্যগণের কেউ যেন ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত না থাকে। তোমরা প্রবাস প্রত্যাগত আমাদের হতে ভয়ভীত হয়ো না ॥ ৬।
হে গৃহ সমুচয়! তোমরা প্রবাসী আমাদের অনুগামী হয়ো না; তোমরা এই প্রদেশেই স্থিত থাকো। তোমরা (আমাদের) পুত্র ইত্যাদিকে পুষ্ট (বা পালন) করো। আমি দেশ-দেশান্তর হতে কল্যাণ-করণশালী ধনরাশি উপার্জন করে পুনরায় আগমন করবো। তোমরা সেই ধনের সাথে তেজস্বী (বা বহুগুণে বর্ধন-প্রাপ্ত) হয়ো ॥ ৭ ৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! সমিধাদান ইত্যাদির দ্বারা তোমার যে কর্ম করণীয়, তা আমরা তোমার নিকট করবো। কৃচ্ছ্বচান্দ্রায়ণ ইত্যাদি তোমার তপস্যা সম্পর্কিত কর্ম আমরা তোমার সেবা করে সম্পন্ন করছি। (অর্থাৎ তোমার পরিচর্যার মাধ্যমে আমরা তপস্যাগত ফল অর্জন করছি)। আমরা সেই কর্মের দ্বারা শোভন ধারণা শক্তিশালী, বেদ-শাস্ত্র ইত্যাদি অধ্যয়নশীল, প্রসন্ন মনঃসম্পন্ন এবং দীর্ঘায়ু হবো ১
হে অগ্নিদেব! তোমার নিকট আমরা শরীরশোষণরূপ এমন তপঃ সাধিত করছি, যার দ্বারা আমরা অধীত বেদশাস্ত্র ইত্যাদি শ্রবণ পূর্বক স্মৃতি ও ধারণা শক্তিতে সমৃদ্ধ ও দীর্ঘায়ুশালী হবো৷ ২৷৷
বঙ্গানুবাদ –এই গার্হপত্য অগ্নি প্রবৃদ্ধ বলের সাথে যুক্ত। ইনি হবিদানের দ্বারা মহান মহান এ দেবতাগণকে পার্লন করে থাকেন। ইনি সচরাচর বিশ্বের স্বামী ঋত্বিকগণের দ্বারা অগ্রে স্থাপিত হয়ে থাকেন। যেমন রথবান পুরুষ প্রজাবৃন্দকে আপন অধীনস্থ করতে সক্ষম হন, তেমনই ইনি প্রজাবৃন্দকে আপন অধীন করে থাকেন। পৃথিবীর নাভিস্থানীয় এই উত্তরবেদিতে বিরাজমান অগ্নি আমার সংগ্রামেচ্ছু শবৃন্দকে পদদলিত করুন (অথবা আমাদের পদতলে পাতিত করুন)। ১৷৷
টীকা— উপযুক্ত প্রথম সূক্তের প্রথম ছটি মন্ত্র দেশান্তর হতে প্রত্যাগত গৃহস্বামী কর্তৃক আপন গৃহ দর্শন পূর্বক সমিধ গ্রহণ করে সূত্রোক্তপ্রকারে জপ করে গৃহে প্রবেশ করার নিমিত্ত বিনিযুক্ত হয়। সপ্তম মন্ত্রটিতে প্রবাস হতে প্রত্যাগত হয়ে পুত্র ইত্যাদির মাঙ্গল্য চিন্তার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় সূক্তের মন্ত্রদ্বয় মেধাকামনায় সূত্রানুসারে অগ্নির উপাসনায় বিনিযুক্ত হয়। এই মন্ত্র দুটি উপনয়নে অগ্নিকার্যেও বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। তৃতীয় সূক্তের মন্ত্রটি মহাশান্তিগণে আবপনীয় ॥(৭কা, ৬অ. ১-৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –যজমান প্রদত্ত হবির্ভাগকে দেবতাগণের নিমিত্ত তাদের সহাবস্থানে বহনকারী, শত্রুগণের উপর বিজয় লাভকারী, দুলোকে নিবাসকারী অগ্নিদেবকে আমরা উথ স্তোত্রের দ্বারা আহূত করছি। তিনি আমাদের বিপত্তিসমূহ হতে উত্তীর্ণ করুন এবং দুর্গতি প্রদানশীল পাপসমূহকে পূর্ণভাবে ভস্ম করে ফেলুন ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –গগন মার্গ হতে আগত (বা পতিত) কৃষ্ণবর্ণশালী কাকপক্ষী আমার এই অঙ্গে তার পক্ষের দ্বারা আঘাত, করেছে; সেই কারণে প্রাপ্ত (বা সঞ্জাত) দুর্গতিপ্রদ পাপ হতে এই অভিমন্ত্রিত জল আমাকে রক্ষা করুক ॥ ১৷৷
হে মৃত্যু (নির্ঋতি দেবতা)! তোমার মুখের দ্বারা কাক আমার এই অঙ্গে আঘাত করেছে। (কাকঃ স্বচথুপুটেন মদীয়ং অঙ্গং নোপহতবান কিং তু মৃত্যুমুখেনেতি কাকস্পর্শনদোষঃ অতিকষ্ট ইতি জ্ঞাপয়িতুং নির্ঋতিমুখেন অভিমৰ্শনবচনং–অর্থাৎ কাক তার আপন চঞ্চপুটে আঘাত করলেও তার স্পর্শদোষ অতিকষ্টের কারণ হয় বলে ঐ আঘাতকে মৃত্যুমুখের আঘাত বলে অভিহিত করা হচ্ছে)। এই কাকস্পর্শনজনিত পাপ হতে গার্হপত্য অগ্নি আমাকে মুক্ত করুন। ২।
বঙ্গানুবাদ –হে অপামার্গ (পাপাপমার্জনসাধন ইঘপ্রকৃতিভূত কাষ্ঠবিশেষ)! তুমি প্রতীচীনফলত্ব প্রাপ্ত হয়ে উৎপন্ন হয়েছো। (অর্থাৎ অগ্র হতে আরম্ভ করে ফলের মূল পর্যন্ত আত্মাভিমুখী স্পর্শে কণ্টকরহিত হওয়ায় একে প্রতীচীনফল বা প্রত্যঙুখানি ফলানি যস্য বলা হয়েছে)। তুমি আমার সকল শপথজনিত দোষ (শপথা দোষা) পূর্ণভাবে স্খলন (বা পৃথক) করে দাও ॥১॥
হে বিশ্বতোমুখ (অর্থাৎ বিস্তৃত শাখাশালী) অপামার্গ! যে মলিন পাপ আমাদের দ্বারা আচারিত হয়ে গিয়েছে, দুষ্টপ্রবৃত্তির দ্বারা আমরা যে দুঃখদায়ক পাপকে অর্জন করে ফেলেছি, সেগুলি আমরা সবদিক দিয়ে তোমার সাহচর্যে অপসারিত করছি ॥ ২৷৷
স্বভাবতঃ কৃষ্ণবর্ণ দন্তযুক্ত, কুৎসিত নখশালী এবং ব্যাধিগ্রস্ত বা নপুংসক (পণ্ড) পুরুষের সাথে একত্রে ভোর্জন ইত্যাদি ব্যবহারমাত্রে যে পাপ উৎপন্ন করে ফেলেছি, তা তোমার দ্বারা অপমার্জন (বা নিবারণ) করছি ৷ ৩৷৷
যদ্যন্তরিক্ষে যদি বাত আস যদি বৃক্ষেষু যদি বোলপেযু। যদব পশব উদ্যমানং তৎ ব্রাহ্মণং পুনরম্যানুপৈতু ॥ ১।
বঙ্গানুবাদ— মেঘাচ্ছন্ন অন্তরিক্ষে (মেঘলা দিনে) যে বেদ পঠিত হয়েছে, কিংবা তীক্ষ্ণ ঝড়ের মধ্যে বা বৃক্ষের নীচে (অর্থাৎ ছায়ায়) বা হরিৎ শস্যের নিকটে (ধান্য ইত্যাদি শস্যক্ষেত্রের সন্নিকটে) অথবা গ্রাম্য বা আরণ্য পশুর নিকটে যে বেদবাক্য কথিত বা শ্রুত হওয়ায় (অর্থাৎ নিষিদ্ধ কালে ও স্থলে বেদের প্রচলন-জনিত কারণে) আমাদের নিকট হতে যে বেদ (বা বেদ-সম্পর্কিত পুণ্যপ্রভাব) চলে গিয়েছে, আমরা বেদপাঠকগণ সেই বেদকে পুনরায় ফলসহ যেন প্রাপ্ত হই ॥ ১৷৷
অধ্যায়: সাত
সূক্ত -৫৭ : আত্মা
[ঋষি : ব্রহ্মা। দেবতা : আত্মা। ছন্দ : বৃহতী ] পুনমৈত্বিন্দ্ৰিয়ং পুনরাত্মা দ্রবিণং ব্রাহ্মণং চ। পুনরগ্নয়ো ধিষ্ণ্যা যথাস্থাম কল্পয়ামিহৈব। ১। বঙ্গানুবাদ –আমার ইন্দ্রিয়সমূহ পুনরায় আমার প্রাপ্ত হোক, জীবাত্মা পুনরায় আমাতে প্রবেশ করুক, ধন পুনরায় আমার লভ্য হোক, মন্ত্ৰব্ৰাহ্মণাত্মক বেদও পুনরপি আমাতে ব্যাপ্ত হোক। হবন-বেদি সমূহের বিহৃতপ্রদেশে বিহারকারী অগ্নিসমূহ পুনরায় সমৃদ্ধ হোন ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –হে দেবী সরস্বতী! তুমি গার্হপত্য ইত্যাদি স্থানসমূহে আহুত হব্যের সেবন করো। এবং আমাদের পুত্র ইত্যাদি প্রদান করো। ১।
হে শারদা (বর্ণপদাদিরূপেণ প্ৰসরণবতি হে দেবি)! তোমার নিমিত্ত যে ঘৃতযুক্ত হবিঃ হুত হচ্ছে, তা পিতৃগণকে প্রেরিত করো। তোমার নিমিত্ত প্রদত্ত মঙ্গলময় হবির সৌজন্যে আমরা মধুময় অন্নের দ্বারা সমৃদ্ধ হবো। ২।
হে সরস্বতী (বর্ণপদাদিরূপেণ প্ৰসরণবতি হে বাক্-দেবতা)! আমরা তোমার দর্শন হতে (বা তোমার স্বরূপ জ্ঞান হতে) যেন কখনও বঞ্চিত না হই। তুমি আমাদের নিকট সর্বসুখরূপা হও (অর্থাৎ আমাদের শোভন সুখ প্রদানশালিনী হও); তুমি আমাদের রোগ ইত্যাদি সম্পূর্ণভাবে নিবারণশালী হও ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –বায়ু আমাদের সুখকর হয়ে বিচরণ করুক। সূর্য অর্থাৎ সুষ্ঠু সকলের প্রেরক। আদিত্য আমাদের সুখদায়ক তাপদানশীল হোন (অর্থাৎ সন্তাপদায়ক না হোন)। দিনসমূহ আমাদের এ সুখ প্রদান করুক; রাত্রিগুলিও যথায় আমাদের সুখ তথায় প্রতিষ্ঠিত হোক; উষাসমূহও আমাদের যথায় সুখ, তথায় প্রকাশিত হোক। (অর্থাৎ দিন, রাত্রি ও উষা–সকলেই আমাদের সুখ প্রদান করুক) ১
বঙ্গানুবাদ –ঐ যে দূরস্থিত শত্রু অভিচার মন্ত্রের দ্বারা হোম করছে, যে আমাদের প্রতি হিংসার সঙ্কল্প করছে, তবে সেই শত্রুর মন বাক্য ও দেহের দ্বারা ক্রিয়মাণ অভিচার কর্ম সত্য (অর্থাৎ ফলপ্রসূ হবার পূর্বেই পাপদেবতা নির্ঋতি মৃত্যুর সহযোগে তাকে বিনাশ করে দিক ॥১॥
পরপীড়াকারিণী নিকৃষ্টগমনা পাপরাক্ষসী নির্ঋতি ও রাসক্ষসসমূহ সেই শত্রুর দ্বারা কৃত অভিচার কর্মের যথার্থ ফলকে অসত্য (অর্থাৎ নিষ্ফল) করে দিক। আমাদের শত্রুর আজ্যসাধন হোমকর্মগুলি ইন্দ্রের দ্বারা প্রেরিত দেবতা বিনষ্ট করে দিন এবং আমাদের প্রতি হিংসান্বিত (অর্থাৎ আমাদের বধের নিমিত্ত) যে কর্ম তারা অনুষ্ঠিত করছে, তা যেন সম্পন্ন না হয় (অর্থাৎ-ফলপ্রদ ন ভবতি বা অঙ্গবিকলং ভবতু) ॥ ২॥
অজির ও অধিরাজ নামক দুই মৃত্যু-দূত যুদ্ধাকাঙ্ক্ষী শত্রুর হোমক্রিয়াকে বিনষ্ট করে দিক, যেমন আকাশপথ হতে অতর্কিতে নেমে এসে (নিষ্পতিত হয়ে) শ্যেনপক্ষী তার দ্বেষ্যপক্ষীকে বিনাশ করে থাকে। যে শত্রু আমাদের সম্মুখে আগত হয়ে আমাদের প্রতি হিংসারূপ কর্ম সাধন করতে আকাঙ্ক্ষা করে, তাদের ঘৃতযুক্ত কর্ম অসত্য (নিষ্ফল) করে দিক ॥ ৩৷৷
হে অভিচার কর্মে প্রযুক্ত শত্রু! বহন ইত্যাদি কর্মে যুক্ত তোমার হস্ত দুটিকে তোমার পৃষ্ঠভাগে বন্ধন পূর্বক তোমার হোমসাধনভূত মন্ত্রোচ্চারণশীল মুখটিকেও বন্ধন করে রাখছি। এইভাবে হস্তদ্বয় ও মুখ বন্ধ হয়ে যাবার পর, আমি তোমার কর্মকেও (বা হোতব্য দ্রব্যসম্ভারকেও) অগ্নির কোপে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেবো ॥ ৪
হে অভিচার কর্মে প্রযুক্ত শত্রু! পৃষ্ঠভাগে বন্ধনপ্রাপ্ত তোমার হস্তদ্বয় আর হোমকর্ম সাধনে সক্ষম হবে না। তোমার মুখ বন্ধনপ্রাপ্ত হওয়ায় আর আভিচারিক মন্ত্র উচ্চারণে সক্ষম হবে না। ভয়ঙ্কর অগ্নির তেজঃ প্রভাবে যজ্ঞীয় দ্রব্য বিনষ্ট হওয়ায় হোম কর্মও বিনাশপ্রাপ্ত হবে। (অর্থাৎ হবিঃসমূহের দ্বারা সিদ্ধ হওনশীল তোমার অভীষ্টকেও আমি অগ্নির বিকরাল ক্রোধের দ্বারা বিনষ্ট করে দেবো॥ ৫
বঙ্গানুবাদ –হে ঋত্বিকবর্গ! উপবিষ্ট হয়ে থেকো না। উথিত হয়ে বসন্ত ইত্যাদি ঋতুতে অনুষ্ঠিতব্য যজ্ঞে ইন্দ্রের ভাগ নিরীক্ষণ করো। যদি তা পক (রন্ধিত) না হয়ে থাকে, তবে যতক্ষণ তা পর্ক হচ্ছে ততক্ষণ ইন্দ্রদেবকে স্তুতির দ্বারা তৃপ্ত করতে থাকে এবং পক্ক হয়ে যায় তো তা অগ্নিতে ইন্দ্রের উদ্দেশে আহুতি প্রদান করো ॥১॥
হে ইন্দ্র! দধিঘর্ম নামক তোমার হবিঃ পক হয়ে গিয়েছে, অতএব শীঘ্র এইস্থানে আগমন করো। অর্ধ হতে কিছুটা কম পথে সূর্য উপনীত হয়েছে। টি (অর্থাৎ মধ্যাহ্নকাল সমুপস্থিত); অভিযুত সোমকে অর্ঘ্যরূপে গ্রহণ করে ঋত্বিৰ্গ, বংশধর পুত্রগণ কর্তৃক গৃহপতির পরিচর্যার মতো, তোমারই উপাসনায় প্রবৃত্ত হয়েছেন। ২।
এই দধিঘর্ম নামক হবিঃ দুগ্ধরূপে গাভীর স্তনে পক্ক হয়ে রয়েছে বলে মনে করি। এই সময়ে দধির অবস্থা প্রাপ্ত হওয়ার নিমিত্তও তা অগ্নিতে পাক হচ্ছে। আমি জানি যে, এই দধিঘর্ম ঠিক রকমে পক্ক হয়েছে। অতএব তা সত্যস্বরূপ নবতর হয়েছে। হে কর্মবান্ বর্জি! তুমি প্রীতমাণ হয়ে মধ্যন্দিনে অনুষ্ঠিত সবনে অভিযুত সোমের দধি (অর্থাৎ দধিঘর্মাখ্য হবিঃ) পান করো ॥৩॥
বঙ্গানুবাদ –হে বৃষণা (অর্থাৎ অভিমতফলের বর্ষণকারী) অশ্বিদ্বয়! তোমরা আকাশে অবস্থানকারী দেববর্গের নেতাস্বরূপ। এক্ষণে অগ্নি সন্দীপ্ত হয়েছে। মহাবীর নামক পাত্রে রক্ষিত ঘৃত (ঘ) উত্তম প্রকারে পক্ক হয়ে গিয়েছে। এবং অধ্বর্যগণ তোমাদের নিমিত্ত দুগ্ধও দোহন করে নিয়েছেন। এখন আমরা হোতারূপ স্তোতৃবর্গ তোমাকে হবির দ্বারা পূর্ণ যজ্ঞসমূহে আহূত করছি৷৷ ১।
হে অশ্বিদ্বয়! অগ্নি প্রদীপ্ত হয়ে গিয়েছে, তোমাদের নিমিত্ত মহাবীরপাত্রে রক্ষিত ধৃত (আজ) তার দ্বারা তপ্ত হয়ে গিয়েছে; এই নিমিত্ত হবিঃ ভক্ষণার্থে তোমরা এই স্থানে আগত হও। হে ইচ্ছিত ফলবৰ্ষক অশ্বিদ্বয়! এই কর্মে গাভীসমূহ প্রভূত পরিমাণে দুগ্ধ প্রদান করছে। তোমাদের স্তুতি করতে করতে হোতৃগণ আনন্দে বিভোর হয়ে রয়েছেন ২।
স্বাহাকৃত দীপ্ত যজ্ঞ প্রবর্গ নামক অশ্বি প্রভৃতি দেবতাগণের উদ্দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অশ্বিনীকুমারযুগলের পানের (বা ভক্ষণের) নিমিত্ত যে চমস রূপ পাত্র আছে, তা সকল অমবর্ণধর্মী (অমৃতাসঃ) দেবতার প্রিয়। তারা ঐ হবিঃ অগ্নির (বা গন্ধর্ব আদিত্যের) মুখ হতে লেহন (বা ভক্ষণ) করে থাকেন। ৩।
হে অশ্বিদ্বয়! দুগ্ধের নিবাসস্থানভূত গাভীতে বর্তমান ঘৃতের ন্যায় ক্ষরণশীল বা ঘৃতের উৎপাদক যে দুগ্ধ যজ্ঞীয় মহাবীরপাত্রে প্রক্ষিপ্ত করা হয়েছে (বা ঢেলে দেওয়া হয়েছে), তা তোমাদের ভাগ। এই নিমিত্ত তোমরা এই স্থানে আগমন পূর্বক যজ্ঞের পূর্ণতা সম্পাদনশালী হও। হে মধুসম্বন্ধিনী বিদ্যায় পারদর্শী ও দেবগণের পালকদ্বয়! দ্যুলোকের প্রকাশক অগ্নিতে তপ্ত ঘৃত পান করো। ৪
তোমাদের দুজনের উদ্দেশে হোতা কর্তৃক সম্যক অভিষ্ঠুত, মহাবীরপাত্রে রক্ষিত এই তপ্ত ঘৃত (আজ) ব্যাপ্ত হোক। অধ্বর্য নামক ঋত্বিক তোমাদের হবিঃ প্রদান করুন। তোমরা দুগ্ধ, দধি এবং ঘৃত দিয়ে সমান তৃপ্ত-করণশালী দুগ্ধ পান করো ॥৫॥
হে অধ্বর্য! তুমি ঘর্মদুঘা গাভীর দুগ্ধকে তপ্ত ঘৃতে নিক্ষেপ করো (অর্থাৎ ঢেলে দাও)। বরণ করার যোগ্য সূর্যদেব দুঃখরহিত স্বৰ্গকে প্রকাশময় করেছেন, তিনি উষার গমনকে লক্ষ্য রেখে অত্যন্ত তেজস্বী হয়ে উঠেছেন। (অতএব দুগ্ধ (পায়স) সহ আগত হও এবং আগত হয়ে সেই দুগ্ধ ঘর্মে নিক্ষেপ করো (আসিঞ্চ)।–এই কথা এইস্থানে হোতা অধ্বর্যকে বলছেন) ॥ ৬।
আমি উত্তম প্রকারে বা সহজে দোহনযোগ্যা (সুদুঘা) পুরোবর্তিনী ধেনু আহ্বান করছি, মঙ্গলময় হস্তশালী অধ্বর্য তাকে (অর্থাৎ এই গাভীকে) দোহন করুন। সর্বপ্রেরক সবিতা দেব ঐসব উপনামশালী দুগ্ধকে আমাদের প্রদান (বা প্রেরণ) করুন। (ঘর্ম সুষ্ঠুভাবে তপ্ত হয়েছে, তাতে দুগ্ধ নিক্ষেপ করো–এই কথা পরোক্ষে হোতা অধ্বর্যকে বলছেন)। ৭।
ধনের পোষণশালিনী গাভী বৎসের কামনায় যুক্ত হয়ে হিং শব্দ করে আগতা হোক এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের নিমিত্ত দুগ্ধ দোহন করতে দিক। এই গাভীও আমাদেরও ঐশ্বর্যের নিমিত্ত সমৃদ্ধি প্রাপ্ত করাক ॥ ৮ ৷
হে অগ্নি! তুমি সকল যাজ্ঞিকের গৃহে গমন করে থাকো। সকলেই তোমার সেবা-করণে যত্নশীল। তুমি আমার ভক্তির দিকে লক্ষ্য করে আগমন করো এবং শত্রু-সেনাগণকে বিনষ্ট করে তাদের ধনরাশি আমাদের নিমিত্ত আনয়ন করো ॥ ৯৷
হে অগ্নি! আমাদের প্রভূত ঐশ্বর্য প্রদান করার নিমিত্ত তুমি উদার চিত্তসম্পন্ন হও। তোমার তেজঃ উচ্চগামী হোক, (অর্থাৎ অন্ধকার দূরীভূত করুক)। আমরা পতি-পত্নী যাতে সমানভাবে তোমার পরিচর্যা-কর্মে নিয়োজিত থাকতে পারি, সেইরকম অনুগ্রহ করো; অধিকন্তু শত্রুর তেজঃকে পরাভূত করো। ১০।
হে ঘর্মদ্ঘা (ধেনু)! তুমি সুন্দর তৃণ ভক্ষণ করে ধনবতী বা ভাগ্যবতী হয়ে ওঠো। অনন্তর আমরাও ধনবন্ত হয়ে উঠবো। হে অদ্য (অর্থাৎ বধের অযোগ্যা) গাভী! তুমি সর্বদা তৃণ ভক্ষণ পূর্বক বিচরণ এ করতে থাকো এবং শুদ্ধ জল পান করতে থাকো। ১১।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— শং নো বাতো বাতু শিবা নঃ ইত্যনয়োবৃহঙ্গণে পাঠাৎ শান্তুদকাভিমন্ত্রণাদৌ বিনিয়োগঃ…অভিচারকর্মণি যৎ কিং চাসৌ ইতি পঞ্চর্চেন মধ্যমপলাশেন ফলীকরণা জুহুয়াৎ। দর্শপূর্ণমাসয়োর পরিত্বাগ্নে পুরং বয়ং ইত্যনয়া তণ্ডুলানাং পর্যাগ্নিকরণং কুর্যাৎ। সোমযাগে মাধ্যন্দিন সব ধিষ্ণাগ্নিং অবলোকয় পরি ত্বাগ্নে পুরং বয়ং ইতি ব্রহ্ম যজমানশ্চ জপেৎ।…সোমযাগে প্রবর্গে ঘর্মধুদ্দোহাৰ্থং উত্তিষ্ঠিতঃ অধ্বর্যাদী উত্তিষ্ঠতাব পশ্যত ইত্যনয়া ব্রহ্মা অনুমন্ত্রয়েত।…অগ্নিষ্টোমে প্রবর্গে হৃয়মানং আজ্যং সমিদ্ধো অগ্নিবৃষণা রথী ইতি সূক্তেন ব্রহ্মা অনুমন্ত্রয়েত।…প্রবর্গে দুহ্যমানাং ধর্মদুঘাং উপ হ্রয়ে ইতি ব্রহ্মা অনুমন্ত্রয়েত। বৈতানে সূত্রিতং।…ইত্যাদি ॥ (৭কা, ৬অ. ১০-১৪সূ)। টীকা –উপযুক্ত দশম সূক্তটি (এবং পূর্ববর্তী নবম সূক্তের শেষ মন্ত্রটি) শান্তুদকে অভিমন্ত্রণ ইত্যাদি কর্মে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। অভিচার কর্মে একাদশ সূক্তের পাঁচটি মন্ত্রের দ্বারা মধ্যমপলাশের দ্বারা ফলীকরণে যাগ করণীয়। দ্বাদশ সূক্তের মন্ত্রটির দ্বারা দর্শপূর্ণমাসে তণ্ডুলের দ্বারা পর্যাগ্নিকরণে বিনিযুক্ত হয়। সোমযাগে মাধ্যন্দিন সবনে অগ্নিকে অবলোকন পূর্বক ব্রহ্মা (ঋত্বিক) ও যজমান এই মন্ত্রটি জপ করবেন। সোমযাগে প্রবর্গে এয়োদশ সূক্তের মন্ত্রগুলি ব্রহ্মা কর্তৃক অনুমন্ত্ৰণীয়। অগ্নিষ্টোমে প্রবর্গে হুয়মান আজ্য চতুর্দশ সূক্তের দ্বারা ব্রহ্মা কর্তৃক অনুমন্ত্ৰণীয় ॥ (৭কা.৬অ. ১০-১৪সূ)।
বঙ্গানুবাদ –আমি মিত্র ভাবযুক্ত স্নেহময় নেত্রে দর্শন করতে করতে, অন্নকে ধারণ করে, ধন-ধারণশালী হয়ে, শোভন বুদ্ধিতে ধন ইত্যাদি সম্পত্তির দ্বারা প্রসন্ন হয়ে স্তুতি করতে করতে আপন গৃহে আগমন করছি। হে গৃহসমুদায়! আমি হেন গৃহস্বামীর সাহচর্যে তোমরা সুখী হও। দেশান্তর হতে আগমনশালী আমা হতে ভয় প্রাপ্ত হয়ো না ॥১॥
অন্ন, রস, দুগ্ধ ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধ এই সুখদায়ক গৃহগুলি প্রবাস হতে আগমনশালী আমাদের আপন স্বামীরূপে জ্ঞাত হোক৷৷২৷৷
গৃহ হতে দূরে গমনকারী (প্রবাসী) জন আপন যে সুন্দর পদার্থের দ্বারা সম্পন্ন গৃহকে স্মরণ করে থাকে, আমরা সেই গৃহসমূহকে পুনরায় প্রাপ্ত হতে ইচ্ছা করি। সেই ঘর প্রবাস হতে আগমনশালী আমাদের জ্ঞাত হোক (বা মান্য করুক) ॥ ৩৷৷
হে গৃহসমূহ! তোমরা বহু ধন ও মধুর পদার্থের দ্বারা সমৃদ্ধ হও। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তোমরা ব্যাকুলতা প্রাপ্ত হয়ো না। অনুজ্ঞার নিমিত্ত প্রার্থিত হয়ে গিয়ে এর তোমাদের মধ্যে অবস্থানকারী মনুষ্য ধন ইত্যাদির দ্বারা সম্পন্ন থাকুক। তোমরা প্রবাস হতে আগমনশালী আমাদের হতে ভয়ভীত হয়ো না। ৪।
আমাদের গৃহে মেষী, ছাগী, গাভী, অন্ন ইত্যাদি সকল উপভোগ্য বস্তু অনুজ্ঞার নিমিত্ত উপহূত (অর্থাৎ প্রার্থিত) হোক ৫
হে গৃহাবলি! তোমরা সুন্দর ভাগ্যশালী হও; অন্ন ও ধনের দ্বারা সমৃদ্ধ হও; তোমাদের উদ্দেশে কথিতা বাণী সত্যযুক্ত ও প্রিয় হোক। তোমাদের মধ্যে নিবাসকারী জন হর্ষ ও হাস্যে থাকুক। তোমাদের মধ্যে নিবাসকারী মনুষ্যগণের কেউ যেন ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত না থাকে। তোমরা প্রবাস প্রত্যাগত আমাদের হতে ভয়ভীত হয়ো না ॥ ৬।
হে গৃহ সমুচয়! তোমরা প্রবাসী আমাদের অনুগামী হয়ো না; তোমরা এই প্রদেশেই স্থিত থাকো। তোমরা (আমাদের) পুত্র ইত্যাদিকে পুষ্ট (বা পালন) করো। আমি দেশ-দেশান্তর হতে কল্যাণ-করণশালী ধনরাশি উপার্জন করে পুনরায় আগমন করবো। তোমরা সেই ধনের সাথে তেজস্বী (বা বহুগুণে বর্ধন-প্রাপ্ত) হয়ো ॥ ৭ ৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! সমিধাদান ইত্যাদির দ্বারা তোমার যে কর্ম করণীয়, তা আমরা তোমার নিকট করবো। কৃচ্ছ্বচান্দ্রায়ণ ইত্যাদি তোমার তপস্যা সম্পর্কিত কর্ম আমরা তোমার সেবা করে সম্পন্ন করছি। (অর্থাৎ তোমার পরিচর্যার মাধ্যমে আমরা তপস্যাগত ফল অর্জন করছি)। আমরা সেই কর্মের দ্বারা শোভন ধারণা শক্তিশালী, বেদ-শাস্ত্র ইত্যাদি অধ্যয়নশীল, প্রসন্ন মনঃসম্পন্ন এবং দীর্ঘায়ু হবো ১
হে অগ্নিদেব! তোমার নিকট আমরা শরীরশোষণরূপ এমন তপঃ সাধিত করছি, যার দ্বারা আমরা অধীত বেদশাস্ত্র ইত্যাদি শ্রবণ পূর্বক স্মৃতি ও ধারণা শক্তিতে সমৃদ্ধ ও দীর্ঘায়ুশালী হবো৷ ২৷৷
বঙ্গানুবাদ –এই গার্হপত্য অগ্নি প্রবৃদ্ধ বলের সাথে যুক্ত। ইনি হবিদানের দ্বারা মহান মহান এ দেবতাগণকে পার্লন করে থাকেন। ইনি সচরাচর বিশ্বের স্বামী ঋত্বিকগণের দ্বারা অগ্রে স্থাপিত হয়ে থাকেন। যেমন রথবান পুরুষ প্রজাবৃন্দকে আপন অধীনস্থ করতে সক্ষম হন, তেমনই ইনি প্রজাবৃন্দকে আপন অধীন করে থাকেন। পৃথিবীর নাভিস্থানীয় এই উত্তরবেদিতে বিরাজমান অগ্নি আমার সংগ্রামেচ্ছু শবৃন্দকে পদদলিত করুন (অথবা আমাদের পদতলে পাতিত করুন)। ১৷৷
টীকা— উপযুক্ত প্রথম সূক্তের প্রথম ছটি মন্ত্র দেশান্তর হতে প্রত্যাগত গৃহস্বামী কর্তৃক আপন গৃহ দর্শন পূর্বক সমিধ গ্রহণ করে সূত্রোক্তপ্রকারে জপ করে গৃহে প্রবেশ করার নিমিত্ত বিনিযুক্ত হয়। সপ্তম মন্ত্রটিতে প্রবাস হতে প্রত্যাগত হয়ে পুত্র ইত্যাদির মাঙ্গল্য চিন্তার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় সূক্তের মন্ত্রদ্বয় মেধাকামনায় সূত্রানুসারে অগ্নির উপাসনায় বিনিযুক্ত হয়। এই মন্ত্র দুটি উপনয়নে অগ্নিকার্যেও বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। তৃতীয় সূক্তের মন্ত্রটি মহাশান্তিগণে আবপনীয় ॥(৭কা, ৬অ. ১-৩সূ)।
বঙ্গানুবাদ –যজমান প্রদত্ত হবির্ভাগকে দেবতাগণের নিমিত্ত তাদের সহাবস্থানে বহনকারী, শত্রুগণের উপর বিজয় লাভকারী, দুলোকে নিবাসকারী অগ্নিদেবকে আমরা উথ স্তোত্রের দ্বারা আহূত করছি। তিনি আমাদের বিপত্তিসমূহ হতে উত্তীর্ণ করুন এবং দুর্গতি প্রদানশীল পাপসমূহকে পূর্ণভাবে ভস্ম করে ফেলুন ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –গগন মার্গ হতে আগত (বা পতিত) কৃষ্ণবর্ণশালী কাকপক্ষী আমার এই অঙ্গে তার পক্ষের দ্বারা আঘাত, করেছে; সেই কারণে প্রাপ্ত (বা সঞ্জাত) দুর্গতিপ্রদ পাপ হতে এই অভিমন্ত্রিত জল আমাকে রক্ষা করুক ॥ ১৷৷
হে মৃত্যু (নির্ঋতি দেবতা)! তোমার মুখের দ্বারা কাক আমার এই অঙ্গে আঘাত করেছে। (কাকঃ স্বচথুপুটেন মদীয়ং অঙ্গং নোপহতবান কিং তু মৃত্যুমুখেনেতি কাকস্পর্শনদোষঃ অতিকষ্ট ইতি জ্ঞাপয়িতুং নির্ঋতিমুখেন অভিমৰ্শনবচনং–অর্থাৎ কাক তার আপন চঞ্চপুটে আঘাত করলেও তার স্পর্শদোষ অতিকষ্টের কারণ হয় বলে ঐ আঘাতকে মৃত্যুমুখের আঘাত বলে অভিহিত করা হচ্ছে)। এই কাকস্পর্শনজনিত পাপ হতে গার্হপত্য অগ্নি আমাকে মুক্ত করুন। ২।
বঙ্গানুবাদ –হে অপামার্গ (পাপাপমার্জনসাধন ইঘপ্রকৃতিভূত কাষ্ঠবিশেষ)! তুমি প্রতীচীনফলত্ব প্রাপ্ত হয়ে উৎপন্ন হয়েছো। (অর্থাৎ অগ্র হতে আরম্ভ করে ফলের মূল পর্যন্ত আত্মাভিমুখী স্পর্শে কণ্টকরহিত হওয়ায় একে প্রতীচীনফল বা প্রত্যঙুখানি ফলানি যস্য বলা হয়েছে)। তুমি আমার সকল শপথজনিত দোষ (শপথা দোষা) পূর্ণভাবে স্খলন (বা পৃথক) করে দাও ॥১॥
হে বিশ্বতোমুখ (অর্থাৎ বিস্তৃত শাখাশালী) অপামার্গ! যে মলিন পাপ আমাদের দ্বারা আচারিত হয়ে গিয়েছে, দুষ্টপ্রবৃত্তির দ্বারা আমরা যে দুঃখদায়ক পাপকে অর্জন করে ফেলেছি, সেগুলি আমরা সবদিক দিয়ে তোমার সাহচর্যে অপসারিত করছি ॥ ২৷৷
স্বভাবতঃ কৃষ্ণবর্ণ দন্তযুক্ত, কুৎসিত নখশালী এবং ব্যাধিগ্রস্ত বা নপুংসক (পণ্ড) পুরুষের সাথে একত্রে ভোর্জন ইত্যাদি ব্যবহারমাত্রে যে পাপ উৎপন্ন করে ফেলেছি, তা তোমার দ্বারা অপমার্জন (বা নিবারণ) করছি ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে দেবী সরস্বতী! তুমি গার্হপত্য ইত্যাদি স্থানসমূহে আহুত হব্যের সেবন করো। এবং আমাদের পুত্র ইত্যাদি প্রদান করো। ১।
হে শারদা (বর্ণপদাদিরূপেণ প্ৰসরণবতি হে দেবি)! তোমার নিমিত্ত যে ঘৃতযুক্ত হবিঃ হুত হচ্ছে, তা পিতৃগণকে প্রেরিত করো। তোমার নিমিত্ত প্রদত্ত মঙ্গলময় হবির সৌজন্যে আমরা মধুময় অন্নের দ্বারা সমৃদ্ধ হবো। ২।
হে সরস্বতী (বর্ণপদাদিরূপেণ প্ৰসরণবতি হে বাক্-দেবতা)! আমরা তোমার দর্শন হতে (বা তোমার স্বরূপ জ্ঞান হতে) যেন কখনও বঞ্চিত না হই। তুমি আমাদের নিকট সর্বসুখরূপা হও (অর্থাৎ আমাদের শোভন সুখ প্রদানশালিনী হও); তুমি আমাদের রোগ ইত্যাদি সম্পূর্ণভাবে নিবারণশালী হও ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –ঐ যে দূরস্থিত শত্রু অভিচার মন্ত্রের দ্বারা হোম করছে, যে আমাদের প্রতি হিংসার সঙ্কল্প করছে, তবে সেই শত্রুর মন বাক্য ও দেহের দ্বারা ক্রিয়মাণ অভিচার কর্ম সত্য (অর্থাৎ ফলপ্রসূ হবার পূর্বেই পাপদেবতা নির্ঋতি মৃত্যুর সহযোগে তাকে বিনাশ করে দিক ॥১॥
পরপীড়াকারিণী নিকৃষ্টগমনা পাপরাক্ষসী নির্ঋতি ও রাসক্ষসসমূহ সেই শত্রুর দ্বারা কৃত অভিচার কর্মের যথার্থ ফলকে অসত্য (অর্থাৎ নিষ্ফল) করে দিক। আমাদের শত্রুর আজ্যসাধন হোমকর্মগুলি ইন্দ্রের দ্বারা প্রেরিত দেবতা বিনষ্ট করে দিন এবং আমাদের প্রতি হিংসান্বিত (অর্থাৎ আমাদের বধের নিমিত্ত) যে কর্ম তারা অনুষ্ঠিত করছে, তা যেন সম্পন্ন না হয় (অর্থাৎ-ফলপ্রদ ন ভবতি বা অঙ্গবিকলং ভবতু) ॥ ২॥
অজির ও অধিরাজ নামক দুই মৃত্যু-দূত যুদ্ধাকাঙ্ক্ষী শত্রুর হোমক্রিয়াকে বিনষ্ট করে দিক, যেমন আকাশপথ হতে অতর্কিতে নেমে এসে (নিষ্পতিত হয়ে) শ্যেনপক্ষী তার দ্বেষ্যপক্ষীকে বিনাশ করে থাকে। যে শত্রু আমাদের সম্মুখে আগত হয়ে আমাদের প্রতি হিংসারূপ কর্ম সাধন করতে আকাঙ্ক্ষা করে, তাদের ঘৃতযুক্ত কর্ম অসত্য (নিষ্ফল) করে দিক ॥ ৩৷৷
হে অভিচার কর্মে প্রযুক্ত শত্রু! বহন ইত্যাদি কর্মে যুক্ত তোমার হস্ত দুটিকে তোমার পৃষ্ঠভাগে বন্ধন পূর্বক তোমার হোমসাধনভূত মন্ত্রোচ্চারণশীল মুখটিকেও বন্ধন করে রাখছি। এইভাবে হস্তদ্বয় ও মুখ বন্ধ হয়ে যাবার পর, আমি তোমার কর্মকেও (বা হোতব্য দ্রব্যসম্ভারকেও) অগ্নির কোপে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেবো ॥ ৪
হে অভিচার কর্মে প্রযুক্ত শত্রু! পৃষ্ঠভাগে বন্ধনপ্রাপ্ত তোমার হস্তদ্বয় আর হোমকর্ম সাধনে সক্ষম হবে না। তোমার মুখ বন্ধনপ্রাপ্ত হওয়ায় আর আভিচারিক মন্ত্র উচ্চারণে সক্ষম হবে না। ভয়ঙ্কর অগ্নির তেজঃ প্রভাবে যজ্ঞীয় দ্রব্য বিনষ্ট হওয়ায় হোম কর্মও বিনাশপ্রাপ্ত হবে। (অর্থাৎ হবিঃসমূহের দ্বারা সিদ্ধ হওনশীল তোমার অভীষ্টকেও আমি অগ্নির বিকরাল ক্রোধের দ্বারা বিনষ্ট করে দেবো॥ ৫
মন্ত্রঃ অন্তকায় মৃত্যবে নমঃ প্রাণা অপানা ইহ তে রমন্তাম্। ইহায়মস্তু পুরুষঃ সহাসুনা সূর্যস্য ভাগে অমৃতস্য লোকে। ১। উদেনং ভগগা অগ্রভীদুদেনং সোমো অংশুমান। উদেনং মরুততা দেবা উদিভ্রাগ্নী স্বস্তয়ে। ২৷৷ ইহ তেহসুরিহ প্রাণ ইয়ুরিহ তে মনঃ। উৎ ত্বা নিঋত্যাঃ পাশেভ্যো দৈব্যা বাঁচা ভরামসি ৷৩৷৷ উৎ কামাতঃ পুরুষ মাব পথা মৃত্যোঃ পড়ীশমবমুঞ্চমানঃ। মা চ্ছিখা অস্মাল্লোকাদগ্নেঃ সূর্যস্য সংদৃশঃ ॥৪॥ তুভ্যং বাতঃ পবতাং মারিশ্যা তুভ্যং বর্ষমৃতান্যাপঃ। সূর্যস্তে তন্থে শং তপাথি ত্বাং মৃত্যুদয়ং মা প্র মেষ্ঠাঃ ॥ ৫৷৷ উদ্যানং তে পুরুষ নাবয়ানং জীবাতুং তে দক্ষতাতিং কৃণোমি। আ হি রোহেমমমৃতং সুখং রথমথ জিবিৰ্বিদথমা বদাসি ॥ ৬৷ মা তে মনস্তত্র গাম্মা তিরা ভূন্মা জীবেভ্যঃ প্র মদো মানু গাঃ পিতৃন। বিশ্বে দেব অভি রক্ষন্তু ত্বেহ৷ ৭৷৷ মা গতানামা দীধীথা যে নয়ন্তি পরাবত। আ বোহ তমসো জ্যোতিরেহ্যাঁ তে হস্তৌ রভামহে৷ ৮শ্যামশ্চ ত্বা মা শবলশ্য প্রেষিতৌ যমস্য যৌ পথিরক্ষী শ্বানৌ।। অর্বাঙেহি মা বি দীধ্যো মাত্র তিষ্ঠঃ পরাঙ্গনাঃ ॥ ৯৷৷ মৈতং পন্থমনু গা ভীম এষ যেন পূর্বং নেয়থ ত্বং ব্রবীমি। তম এতৎ পুরুষ মা প্র পন্থা ভয়ং পরস্তাদভয়ং তে অর্বাক। ১০
বঙ্গানুবাদ –অন্তক, অর্থাৎ সর্বপ্রাণীর অন্ত করেন যিনি, সেই মৃত্যুনামক প্রাণিবিয়োজক দেবতাকে নমস্কার। এঁরই কৃপায় প্রাণ ও অপান জীবের শরীরে বিহার করে থাকে। হে আয়ুষ্কাম মাণবক! এই প্রাণত্যাগের শঙ্কাশীল পুরুষ (সেই মৃত্যুদেবতার কৃপায়) সূর্যের ভাগরূপ পৃথিবীর উপরে প্রাণ ও প্রজাসমূহের (পুত্রপৌত্র ইত্যাদির) সাথে যুক্ত হয়ে নিবাস করুক। (সুর্যের ভাগরূপ অর্থে বোঝানো হচ্ছে–সূর্যের ব্যাপ্তির বিষয়ভূত তিনটি ভাগ–দ্যৌ, অন্তরিক্ষ ও ভু)। ১।
সর্বপ্রাণীর ভজুনীয় ভগ নামক দেবতা, যিনি আদিত্যের মূর্তিবিশেষ, তিনি মূছালক্ষণ অন্ধকারে প্রবেশ করে এই পুরুষকে উদ্ধার করেছেন। চন্দ্রমা ও মরুৎ-বর্গও এই পুরুষকে রক্ষা করেছেন এবং ইন্দ্র ও অগ্নিদেবও একে রক্ষার্থে স্বীকার করে নিয়েছেন ॥ ২॥
হে আয়ুষ্কাম পুরুষ! তোমার– মুখ্য প্রাণ, চক্ষু ইত্যাদি এই শরীরে থাকুক। তোমার পঞ্চবৃত্ত্যাত্মক বায়ুও এবং আয়ু ও মনও এই শরীরে বিদ্যমান থাকুক। নির্ঋতি কর্তৃক অধোগতির পাশবদ্ধ তোমাকে আমরা দৈব বাক্যের (অর্থাৎ মন্ত্রের) দ্বারা উর্ধ্বে রক্ষা করছি (বা পাশমুক্ত করছি) ॥ ৩৷৷
হে পুরুষ! তুমি মৃত্যুর পাশনিচয় (ফঁদগুলি) হতে উক্রমণ করো (অর্থাৎ বহির্গত হয়ে এসো), এর বন্ধনগুলিকে ছিন্ন করে দাও এবং কখনও অগ্নি ও সূর্যের দর্শন রহিত হয়ো না এবং পৃথিবীকেও ত্যাগ করো না। (অর্থাৎ চিরজীবন লাভ করো) ॥ ৪।
হে মুমূষু পুরুষ! অন্তরিক্ষে শ্বাসগ্রহণের নিমিত্ত প্রবাহিত মাতরিশ্বা বায়ু তোমার নিমিত্ত সুখময় হোক, জল তোমার নিমিত্ত পীযুষ-বর্ষক হোক (অর্থাৎ অমৃত সিঞ্চন করুক); সূর্যদেবতা তোমার শরীরের পক্ষে যাতে সুখ হয়, তেমন তাপ বিকিরণ করুন। মৃত্যুদেবতার দয়ায় মরণরহিত হয়ে থাকো, মৃত্যুগ্রস্ত হয়ো না। ৫৷৷
হে পুরুষ! তুমি মৃত্যুর পাশ হতে উমিত হও; তোমার নিম্ন গমন নেই। আমি তোমার জীবনের নিমিত্ত ঔষধি প্রযুক্ত করছি। তোমার নিমিত্ত বল প্রদান করছি। তুমি ইন্দ্রিয়সুখের কারণভূত শরীররূপ রথে আরোহণ করে অজীর্ণ হয়ে ঘোষণা করো–আমি লব্ধসংজ্ঞ হয়েছি (অর্থাৎ আমি চেতনা লাভ করেছি) ৬
তোমার মন যমের বিষয়ের দিকে যেন গমন না করে এবং যমের বিষয়ে যেন অন্তর্হিত (অর্থাৎ বিলীন) না হয়। তুমি বন্ধুরূপ মনুষ্যগণের প্রতি অযত্নপরায়ণ (অনবধান) হয়ো না (অর্থাৎ বিরক্ত হয়ো না)। তুমি পরলোকগত পিতৃপুরুষগণের অনুগামী হয়ো না। ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাগণ সকল দিক। হতে তোমার শরীরকে রক্ষা করুন ॥ ৭৷
পিতৃগণের মার্গকে ধ্যান করো না; তারা মৃত্যুপ্রাপ্ত হলেও তোমাকে যেন পুনরায় প্রত্যাবর্তন করিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম না হন। তুমি জ্ঞাননাশরূপ অন্ধকার হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে প্রকাশরূপ জ্ঞানে আরোহণ করো, আমরা তোমার হস্ত ধারণ করে আরোহণের অনুকূল প্রযত্ন করছি। (আরোহণানুকূলপ্রযত্নং কুৰ্ম্ম ইত্যর্থ) ॥ ৮ ৷
হে মুমূর্ষ পুরুষ! সর্বপ্রাণীর প্রাণাপহর্তা যমের মার্গকে রক্ষাকারী শ্যাম (কৃষ্ণবর্ণ) এবং শবল (বিবিধ বর্ণযুক্ত) নামক কুকুরদ্বয় (দিন ও রাত্রি) তোমাকে যেন বাধা প্রদান না করে। তুমি সেই কুকুরদ্বয়ের দ্বারা সন্দষ্ট (দংশিত) না হয়ে এই স্থানে আগত হও। এই ভূলোকের বিষয় সম্পর্কে নিবৃত্তচিত্ত হয়ে এখানে প্রত্যাবর্তন না করার ইচ্ছা পরিত্যাগ করো (অর্থাৎ এই ভূলোকের প্রতি আসক্তচিত্ত হয়ে নিবাস করো) ॥ ৯।
হে আসন্নমৃত্যু পুরুষ! তুমি মৃতগণের মার্গ অনুসরণ করো না। এই মার্গ কত ভয়ঙ্কর, তা মৃত্যুর পূর্বে জানা যায় না। তুমি মরণাত্মক তন্দ্রাকে প্রাপ্ত হয়ো না। যমালয় ভয়াবহ, এবং আমাদের অভিমুখে আগমনের পথ তোমার পক্ষে ভয়হীন (অর্থাৎ মঙ্গলময়–ক্ষেমং ভবতীত্যর্থঃ) ॥ ১০৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে রক্ষাকামী রাজা! যে অগ্নি বাড়বা ইত্যাদিরূপে জলের মধ্যে অবস্থিত, সেই বড়বানল তোমাকে রক্ষা করুক। আহ্বানীয় অগ্নি ও বৈশ্বানর অগ্নিও তোমাকে রক্ষা করুক। হে রক্ষার কামনাশালী পুরুষ! বৈদ্যুতাগ্নিও তোমাকে যেন হিংসা না করে। ১১।
মাংসাশী ক্রবাদ অগ্নি যেন তোমাকে তার আহার রূপে মান্য না করে। তুমি সংকসুক নামক শবভক্ষণকারী অগ্নি হতেও দূরস্থ হয়ে বিচরণ করো। সূর্য, চন্দ্র, আকাশ ও পৃথিবীও তাদের আপন আপন সম্বন্ধীয় ভীতি ই হতে তোমাকে রক্ষা করুন। দৈবপ্রেরিত আয়ুধসমূহ হতে অন্তরিক্ষ তোমাকে রক্ষা করুন। ১২।
বোধ, প্রতিবোধ, অস্বপ্ন, অনিদ্রা, গোপায় (সর্বদা দেহের রক্ষণক) জাগৃবি (জাগরণশীল) নামক ঋষি বা দেহাশিত প্রাণ-অপান-মন-বুদ্ধি ও চক্ষুদ্বয় রূপ ইন্দ্রিয়াভিমানী দেবতা তোমাকে রক্ষা করুন। (৫ম কাণ্ডের ৩০ সূক্তের ১০ম মন্ত্রে বোধ ও প্রতিবোধ নামক ঋষির কথা উক্ত হয়েছে। বোধ অর্থে সর্বদা প্রতিবুধ্যমান এবং প্রতিবোধ অর্থে প্রতিবন্তু বা প্রতিক্ষণে বুধ্যমান)। ১৩।
সেই হেন বোধ ইত্যাদি তোমাকে সর্বদা রক্ষা করুন। সেই ঋষি নামে অভিহিত দেবতাগণকে নমস্কার। তাদের উদ্দেশে এই হব্য স্বাহুত হোক ॥ ১৪৷
বায়ু, ইন্দ্র, ধাতা ও সূর্য তোমাকে মৃত্যুর গ্রাস হতে নিষ্কাসিত করে তোমার পুত্র-ভার্যা ইত্যাদিকে তাদের আনন্দের নিমিত্ত প্রদান করুন। প্রাণ ও বল তোমায় যেন ত্যাগ করতে সক্ষম না হয়। তাদের আমরা তোমার আনুকূল্যে আহ্বান করছি ॥ ১৫
জম্ভ নামক সংহতহনু অস্কুলদন্তশালী রাক্ষস যেন তোমাকে ভক্ষণার্থে না প্রাপ্ত হতে সমর্থ হয়। রাক্ষসের জিহ্বাও যেন তোমার নিকট উপনীত হতে না পারে এবং অজ্ঞানতাও যেন। তোমার নিকট না থাকে ॥ ১৬৷
ধাতা, অষ্টবসু, ইন্দ্র, অগ্নি, আকাশ ও পৃথিবী তোমাকে মৃত্যুর মুখ হতে নিষ্ক্রান্ত করুন। সর্বদেবতার পিতৃস্বরূপ প্রজাপতি তোমাকে মরণ হতে রক্ষা করুন এবং সোমরাজ্ঞী (অর্থাৎ সোমের পত্নীস্বরূপা) ঔষধিদেবীগণ তোমার পোষণ করুক ॥ ১৭৷
হে অদিতির পুত্র দেবগণ! এই পুরুষ এই পৃথ্বী লোকেই অবস্থান করুক, যেন স্বর্গলোকে না গমন করে। আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী (বা সহস্রবীর্যসম্পন্ন) রক্ষা-সাধনের দ্বারা একে মৃত্যুর নিকট হতে আকর্ষণপূর্বক আনয়ন করছি। (অর্থাৎ মৃত্যু যাতে একে তার আপন অধিকারে রক্ষা করতে না পারে, তেমন করছি)। ১৮
হে আয়ুর কামনাকারী পুরুষ! মৃত্যুর কবল হতে তোমাকে রক্ষার উদ্দেশে অন্নের বা আয়ুর ধারণকর্তা দেবগণ তোমাকে সন্ধান করুন (বা ধারণ করুন)। তোমার ব্যাপ্তকেশা (অর্থাৎ কেশবন্ধন উন্মুক্তকারিণী) বন্ধুপত্নীগণ যেন (তোমার শোকে অভিভূত হয়ে) অশ্রুপাত না করে। তোমার বান্ধবগণও যেন রোদনরহিত হয়ে থাকে। ১৯
হে মৃত্যুগ্রস্ত পুরুষ! আমি তোমাকে মৃত্যুর মুখ হতে আহরণ বা আকর্ষণ করে (অর্থাৎ ছিনিয়ে নিয়ে) পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছি। তোমার পুনর্জন্ম হয়েছে, অতএব তুমি পুনরায় নবীন হয়ে গিয়েছে। তোমাকে আমি শত সম্বৎসরের আয়ুর দ্বারা লব্ধবান করিয়েছি। এইবার সবকিছু তোমার চক্ষুগোচর হোক এবং সকল ইন্দ্রিয় আপন আপন কার্যে সক্ষম হোক। (মৃত্যু না হলেও দৃঢ়রোগগ্রস্তের প্রায়ই অঙ্গবৈকল্য ঘটে থাকে, সেই নিমিত্তই নিরাময়ের সাথে সাথে তার সকল অঙ্গ পূর্ণ-সমর্থ হয়ে উঠুক, এটাই বক্তব্য)। ২০৷
হে চৈতন্যতাহীন (বিসংজ্ঞ) পুরুষ! তুমি জ্ঞানহীনতার কারণে তমসাচ্ছন্ন হয়ে ছিলে, এক্ষণে জ্ঞান বা চৈতন্যের প্রাপ্তির ফলে সেই তমসা তোমার নিকট হতে অপসারিত হয়ে গিয়েছে। আমরা তোমার নিকট হতে পাপের অধিষ্ঠাত্রী দেবী নির্ঋতিকে এবং প্রাণাপহত্রী দেবতা মৃত্যুকে দূর করে দিয়েছি এবং সেই সঙ্গে নিঃশেষে দূর করে দিয়েছি তোমার অন্তরস্থ ও বাহ্যিক সকল ব্যাধিকেও। ২১।
বঙ্গানুবাদ –হে আয়ুর কামনাশালী পুরুষ! আমাদের দ্বারা ক্রিয়মান অমৃতের (অমরণত্বের) প্রস্রবণ অনুভব করতে উপক্রম করো। এই উদকধারা অপরের দ্বারা অচ্ছিদ্যমান এবং তোমার বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত স্থায়ী থাকুক। তুমি রজঃ ও তমঃ গুণকে প্রাপ্ত না হয়ে অহিংসিত হয়ে থাকো। তোমার নিমিত্ত আমি মৃত্যুর দ্বারা অপহরিত প্রাণ ও আয়ুকে পুনরায় আনয়ন করছি। (রজঃ– আমাদের সত্ত্বগুণের প্রতিবন্ধক এবং তমঃ-আবরক অর্থাৎ হিতাহিতবিবেকপ্রতিরোধক) ॥ ১।
হে পুরুষ! তুমি আমাদের সম্মুখে জীবিত মনুষ্যের জ্যোতি বা দীপ্তি বা জ্ঞান (অর্থাৎ চৈতন্যতা) প্রাপ্ত হও। তুমি নিন্দা রহিত হয়ে থাকো; আমি তোমাকে, জ্বর-শিরোরোগ ইত্যাদি মৃত্যুর নানাবিধ পাশবন্ধন ছিন্ন করে আনয়ন করছি। আমি তোমাতে শত সম্বৎসর লক্ষণ (দীর্ঘ) আয়ু স্থাপনা করছি৷৷ ২
হে আসন্ন মৃত্যু পুরুষ! আপন আশ্রয়ভূত বাহ্যবায়ুর নিকট হতে (সকাশাৎ) আমি তোমার প্রাণবায়ুকে, প্রাপ্ত করে নিয়েছি। সূর্য হতে তোমার নেত্রকে প্রাপ্ত করে নিয়েছি, (কারণ, পূর্বে মৃত্যু সময়ে চক্ষুষঃ সূর্যপ্রাপ্তেঃ এবং উৎপত্তিসময়েও সূর্যাদেববাৎপত্তেঃ–এমনই বলা হয়ে থাকে)। তোমার যে মন মৃত্যুর সময়ে বহির্গত হয়ে গিয়েছিল, তাকে তোমার দেহে পুনঃ প্রবিষ্ট করাচ্ছি। তুমি সর্বাঙ্গসম্পন্ন হয়ে জিহ্বা আন্দোলিত করে স্পষ্ট আলাপন করো। ৩।
হে নিঃসৃতপ্রাণ পুরুষ! যেমন মন্থন হতে জাত অতি ক্ষীণ বা মৃদু অগ্নি মুখায়ুর ফুকারে সমিদ্ধ (জ্বালিত) করা হয়, তেমনই তোমাকে দ্বিপদ-চতুষ্পদ ইত্যাদি সকল প্রাণীর প্রাণের দ্বারা প্রভূত প্রাণবন্ত করছি। হে মৃত্যু! তোমার প্রকৃষ্ট প্রাণবল ও ক্রুর দর্শনশক্তিকে নমস্কার। ৪
এই পুরুষ যেন মৃত্যুপ্রাপ্ত না হয়। আমরা এই পুরুষের চিকিৎসায় সচেষ্ট হয়ে আছি। হে মৃত্যু! তুমি একে বিনাশ করো না ॥ ৫॥
পাঠা নামে আখ্যাত মহিমোপেত ঔষধিকে আমি শান্তি কর্মের নিমিত্ত আহূত করছি। এই ঔষধি জীবনদায়িনী, চির-অশুষ্কা, রোগপরিহারের দ্বারা রক্ষাকর্তী, এবং বলদাত্রী। আমি এই হেন ঔষধিকে এই পুরুষের অমৃতত্বের নিমিত্ত গ্রহণ (বা প্রয়োগ) করছি। ৬।
হে মৃত্যু! তুমি অধিকার নিয়ে বলো–এ আমার জন (মদীয়োয়ং ইতি বদ) একে হিংসিত (বা বিনাশ) করতে উদ্যত হয়ো না। এ তোমারই, অতএব এর প্রাণকে গ্রহণ করো না। এ এই পৃথিবীর উপর সকল প্রকার গতি প্রাপ্ত হোক। হে ভব! হে শর্ব! তোমরা উভয়ে সুখী হয়ে (অর্থাৎ সন্তুষ্ট হয়ে) এই পুরুষকে সুখ প্রদান করো। এর উপস্থিত ব্যাধি ইত্যাদি লক্ষণসমন্বিত পাপ নিরাকৃত করে একে আয়ুষ্মন করো ৭
হে মৃত্যু! তুমি অধিকার নিয়ে বলো–এ আমার অনুগ্রহের যোগ্য (অসৌমদনুগ্রহার্য ইতি শব্দং কুরু)। এর উপর কৃপা করো। এ মরণহীন ও চক্ষু ইত্যাদি ও সুষ্ঠু শ্রবণশক্তি সহ সকল অঙ্গসম্পন্ন হয়ে থাকুক। এ যথাকালে বৃদ্ধাবস্থা প্রাপ্তি পূর্বক অনন্যাপেক্ষ হয়ে (অর্থাৎ নিজ সামর্থেই) শত সম্বৎসরের আয়ু ভোগ করুক ॥ ৮
হে পুরুষ! দেবতাগণের অস্ত্র যেন তোমার উপর পতিত না হয়, তোমাকে যেন হিংসা না করে। আমি তোমাকে মূছলক্ষণযুক্ত আবরণ হতে রক্ষা করছি (পারয়ামি বা পালয়ামি); আরও, তোমাকে মৃত্যুর সমীপ হতে উদ্ধার করছি এবং দূরদেশবর্তী ক্ৰব্যাদ নামক মাংসভক্ষী অগ্নি হতে অপসারিত করিয়ে দিচ্ছি। তোমার জীবনের নিমিত্ত দেবযজন অগ্নিকে স্থাপনারূপ প্রাচীর নির্মাণ করে দিচ্ছি। ৯।
হে মৃত্যু! তোমার রজোময় মার্গে ধর্ষণ করণে কেউ সমর্থ হবে না। এই মূৰ্হিত পুরুষকে রক্ষা করতে আমরা একে এই মন্ত্ররূপ কবচ ধারণ করিয়ে দিচ্ছি। ১০
বঙ্গানুবাদ –হে আয়ুর কামনাশালী পুরুষ! আমি তোমার দেহে ঊর্ধ্ব ও অবধাদিকে সঞ্চারিণী প্রাণ ও অপান বায়ুকে স্থিত করছি। তোমার নিমিত্ত দীর্ঘ আয়ু প্রযোজিত করে তোমাকে জরা ও মৃত্যুর অস্পৃশ্য করে দিচ্ছি। আমি যম-দূতগণকে মন্ত্রশক্তির দ্বারা দূর করে তোমার নিমিত্ত স্বস্তি প্রতিষ্ঠিত করছি। ১১।
আমরা শত্রুভূতা, সম্মুখস্থ হয়ে গ্রহণশীলা (পুরো গ্রাহিং), কলহ সৃষ্টিকারিণী পাপ দেবতা নির্ঋতিকে হিংসিত (অর্থাৎ হত) করছি। মাংসভক্ষক পিশাচবর্গকে হিংসা (হনন) করছি এবং অন্ধকারের ন্যায় আবরণ সৃষ্টিকারী রাক্ষসগণকে সংহার করছি ॥ ১২
হে পুরুষ! নির্ঋতি ইত্যাদি কর্তৃক তোমার প্রাণ অপহৃত হয়েছে। আমি অমৃতত্বশালী জাবেদা অগ্নির নিকট হতে তোমার প্রাণ প্রার্থনা করছি। তুমি যাতে মৃত্যুপ্রাপ্ত না হও (অর্থাৎ হিংসিত না হও)। তেমনই শান্তি কর্ম অনুষ্ঠিত করছি। এই কর্ম তোমার পক্ষে সমৃদ্ধকারী হোক ॥ ১৩৷
হে কুমার! তোমার নিষ্ক্রমণ সময়ে (অথবা গো দান ইত্যাদির দ্বারা সংস্ক্রিয়মাণ হে পুরুষ!) তোমার নিমিত্ত আকাশ ও পৃথিবী মঙ্গলময়ী হোক, শ্রীবৃদ্ধি করণশালিনী হোক। সূর্যও তোমাকে সুখপ্রদ তাপ প্রদান করুন; বায়ুও তোমার মনের অনুকূলে (অর্থাৎ মনোমত রূপে সঞ্চারিত হোক; জলসমূহ স্বাদযুক্ত ও কল্যাণ করণশালী হয়ে প্রবাহিত এবং বর্ষিত হোক ॥ ১৪
হে কুমার! তোমার আহারার্থ উপযুজ্যমান ব্রীহি ইত্যাদি ঔষধিসমূহ তোমাকে সুখী করুক। তোমাকে নীচের পৃথিবী হতে উত্তরের পৃথিবীতে উধৃত করা হয়েছে। সেই স্থানে অর্থাৎ সেই উত্তরের পৃথিবীতে, হে বালক! অদিতি-পুত্র সূর্য-চন্দ্র দেবদ্বয় তোমাকে রক্ষা (বা পালন) করুন ॥ ১৫
হে বালক! তোমার পরিধানের উপরে যে আচ্ছাদনীয় (অর্থাৎ উত্তরীয়) বস্ত্র আছে, যে বস্ত্র তুমি নীবি বা নাভিদেশে বন্ধন করেছে, সেই দুপ্রকার বস্ত্রই তোমার শরীরের পক্ষে সুখকর করে দিচ্ছি। সেই বস্ত্রের সংস্পর্শে যাতে তুমি কোমলতা অনুভব করো, তেমন করছি। ১৬।
হে দেব সবিতা! বা হে সংস্কারক পুরুষ! বপ্তা (অর্থাৎ নাপিত) যখন তার সুন্দর ও তীক্ষ্ণ ক্ষুরের দ্বারা এই বালকের মস্তকের কেশ ও মুখমণ্ডলের শ্মশ্রু বপন বা মুণ্ডন করছে, তখন গোদান উপনয়ন ইত্যাদি সংস্কারসমূহকে প্রাপ্ত করিয়ে বালকের মুখ তেজস্বী (বা দীপ্ত) করে দাও। আমাদের পুত্রের আয়ুকে ছেদন করে নিও না (প্র মোষীঃ)। ১৭ ॥
হে বালক! তোমার ভক্ষণের যোগ্য ব্রীহি, যব ইত্যাদি অন্নসমূহ মঙ্গলকর অর্থাৎ শরীরের বলকে অক্ষীণ কারক; এবং উপযোগের (অর্থাৎ ভোজনের) পরে মধুর হোক। এই ব্রীহি, ধান্য শরীরগত যক্ষ্মা ইত্যাদি ব্যাধির বিশেষরূপে বাধক হোক। এগুলি এই কুমারকে সকল পাপ হতে মুক্ত রাখুক ॥ ১৮ ॥
হে কুমার! যে ধান্য তুমি কাঠিন্যের সাথে ভক্ষণ করে থাকো এবং পয়োবৎ সারভূত পিষ্টময় যে অন্ন তুমি পান করে থাকো, সুখের বা সরলতার সাথে ঘা ভক্ষণীয় (আদ্য) বা অত্যন্ত কটুতিক্তত্বের জন্য যা অভক্ষণীয় (অনাদ্য), আমি তোমার সেই সকল অন্নকেই বিষরহিত (অর্থাৎ অমৃত) করে দিচ্ছি। ১৯৷৷
হে কুমার! আমরা তোমাকে রাত্রির অভিমানী দেবতা এবং দিনের অভিমানী দেবতার উদ্দেশে তোমার রক্ষণের নিমিত্ত সমর্পণ করছি। হে সকল দেবতাবৃন্দ! তোমরা এই বালককে (অর্থাৎ কুমারকে) ধনহীন বা ধনের অপহরণশালী এবং ভোজনেচ্ছু বা হননেচ্ছু (জিঘৎসু) রক্ষঃ-পিশাচ ইত্যাদির কবল হতে রক্ষা করো। ২০।
বঙ্গানুবাদ –হে বালক! তোমার শত সম্বৎসরের পরমায়ুকে অযুতসংখ্যক করে দিচ্ছি। আমরা তোমার নিমিত্ত দাম্পত্য রূপে এক যুগ, সন্তান রূপে দ্বিতীয় বা দুই যুগ, এবং এইভাবে এরও অধিক যুগ করে দিচ্ছি। (অথবা সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি ইত্যাদি চতুযুগ সমন্বিত বহু বহু যুগ পর্যন্ত তোমার পরমায়ু করে দিচ্ছি। দেবগণ অক্রোধিত হয়ে আমাদের নিবেদনের উপর অনুমতি প্রদান করুন। (সায়ণের ভাষ্যে বলা হয়েছে–যদ্যপি একশত বর্ষ পর্যন্তও আয়ু মনুষ্যগণের পক্ষে ন সম্ভবতি, তথাপি আকল্প জীব কল্পায়ুশষ্যং অস্ত ইত্যাদি আশিস্ দানের ন্যায় এখানেও বালকের দীর্ঘ আয়ু কামনা করা হয়েছে–এটাই তাৎপর্য)। ২১।
হে বালক! রক্ষার নিমিত্ত আমরা তোমাকে শরৎ, হেমন্ত, বসন্ত ও গ্রীষ্ম ঋতুর অভিমানী দেবতাগণের উদ্দেশে সমর্পণ করছি। বৎসরের তিনশত ষাট (বা পয়ষট্টি) দিবস (ষষ্ঠুত্তরশতত্রয়দিনসংখ্যাকানি) তোমাকে সুখ দানশালী হয়ে থাকুক এবং তোমার ভোগসাধনভূত ঔষধি সমূহকেও বর্ধনশালী হয়ে থাকুক। ২২।
মৃত্যু হলো দ্বিপদ মনুষ্য-পক্ষী ইত্যাদি এবং চতুষ্পদ গো-অশ্ব ইত্যাদি সকল প্রাণীর অধিপতি। আমি সেই হেন মৃত্যুরূপ ঈশ্বরের পাশবন্ধন হতে তোমাকে মুক্ত করে দিচ্ছি; এই নিমিত্ত মৃত্যু হতে ভয়ভীত হয়ে তুমি ভীতি ত্যাগ করো ৷৷ ২৩৷
হে অরিষ্ট অর্থাৎ দৈববিমুখ অথবা নিরস্তহিংস পুরুষ! তুমি মৃত্যুকে ভয় করো না, কারণ তুমি মৃত্যুপ্রাপ্ত হবে না, অতএব আমি মরে যাবো এমন ভয় ত্যাগ করো। এই শান্তি কর্মের কারণে মনুষ্য মৃত্যু হতে রক্ষা প্রাপ্ত হয়ে থাকে, অথবা মরণকালীন দুঃসহ মূচ্ছাও প্রাপ্ত হয় না। অথবা শান্তিকর্ম-করণশালী জন মৃত্যুর পর দুষ্কর্কের নিমিত্ত প্রাপ্তব্য অধোলোকে স্থিত সবিতৃপ্রকাশশূন্য ঘোরান্ধকারকে প্রাপ্ত হয় না ॥ ২৪
যেস্থানে রাক্ষস পিশাচ ইত্যাদিকে নিবারণের নিমিত্ত প্রাচীর-রূপে শান্তিকর্ম অনুষ্ঠিত করা হয়, সেই স্থানে গো-অশ্ব ইত্যাদি পশু এবং মনুষ্য সকলে প্রাণময় হয়ে অবস্থিত থাকে ৷ ২৫।
হে শান্তিকর্ম সাধনে ইচ্ছুক পুরুষ! আমার কর্ম তোমাকে সকল দিক হতে রক্ষিত রাখুক। সমান পুরুষ, সমান বান্ধব ইত্যাদির দ্বারা কৃত অভিচার ইত্যাদি হিংসা কর্ম হতেও এই শান্তিকর্ম তোমাকে রক্ষা করুক। তুমি অমামঃ অর্থাৎ অমরণশীল হও, অমৃত অর্থাৎ মরণহীন হও এবং অতিজীব অর্থাৎঅতিশায়িত জীবন ভোগ করো। তোমার চক্ষু ইত্যাদি ইন্দ্রিয়রূপ অমুখ্য প্রাণসমূহ এবং প্রসিদ্ধ মুখ্য প্রাণ তোমার দেহ হতে নিষ্ক্রান্ত হবে না; তুমি দীর্ঘজীবন লাভ করো ৷৷ ২৬৷৷
যমের জ্বর-শিরোব্যথা ইত্যাদি একশত সংখ্যক মুখ্যভূত অস্ত্র আছে, এবং নাশকারী অতিতরীতব্যা শক্তি আছে; সেগুলি সেগুলি উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব হয় না। সেই মৃত্যু নাশক শক্তিসমূহ হতে ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতা রক্ষা করুন এবং তারা তোমাকে বৈশ্বানর অগ্নি হতেও রক্ষা করুন। ২৭।
হে পূত-নামক বৃক্ষ! তুমি অগ্নির পারয়িষ্ণু অর্থাৎ পারপ্রাপক শরীর হয়ে আছো। তুমি রাক্ষস ও শত্রুগণের সংহারক। তুমি রোগনাশক ও ঔষধি-স্বরূপ। সেই হেন পূত আমাদের কামনার পূর্ণতা সাধিত করুক। ২৮
বঙ্গানুবাদ –আমি সূত্রে বর্ণিত ফলের কামনাশালী হয়ে রাক্ষসগণের অপহন্তা বলবান্ অগ্নির উপর সকল দিক হতে ঘৃত (অর্থাৎ আজ্য) সিঞ্চন করছি। আমি অগ্নিকে প্রদীপ্ত করে সুখের নিমিত্ত সেই সখীভূত ও পৃথুতর (বিপুলকায়) অগ্নির শরণ গ্রহণ করছি (বা তার নিকট গমন করছি)। সেই অগ্নি আজ্যের দ্বারা আপন জ্বালাসমূহকে তীক্ষ্ণীকৃত করে যজ্ঞাঙ্গভূতরূপে সমিদ্ধ অর্থাৎ সম্যক দীপ্ত হয়ে উঠুন। সেই হেন রাক্ষসবিনাশক অগ্নি দিবা-রাত্র আমাদের প্রতি হিংসকদের নিকট হতে আমাদের রক্ষা করুন। ১।
হে জাতবেদা অগ্নি! আমাদের আজ্য ইত্যাদির দ্বারা উত্তম প্রকারে প্রবৃদ্ধ হয়ে তুমি লৌহময় দণ্ডশালীরূপে আপন জ্বালামালায় যন্ত্রণাদায়ক রাক্ষসগণকে স্পর্শ করো এবং অভিচারকারীগণকে ভস্ম করে ফেলো। মাংসাশী রক্ষঃ-পিশাচ ইত্যাদিকেও ভক্ষণ করো। ২।
তুমি হননযোগ্য ও রক্ষণযোগ্যকে জ্ঞাতশালী (পরিজ্ঞানবা)। তুমি তীক্ষ্ণজ্বালাযুক্ত ও শক্তিসম্পন্ন। আমাদের অপেক্ষা নিকৃষ্ট ও আমাদের অধিক দ্বেষ্যগণকে তোমার উপর ও নিম্ন দন্তের মধ্যে গ্রহণ করো, অর্থাৎ চর্বণ করে ফেলো এবং আকাশে বিচরণপূর্বক তথায় সঞ্চরমান রাক্ষসগণকেও আপন দন্তে পেষণ করে ফেলো ॥ ৩॥
হে অগ্নি! তুমি রাক্ষসগণের বাহিরের ত্বক (গাত্রচর্ম) ছিন্ন করে ফেলো এবং তোমার হিংসক বজ্র তাপের দ্বারা এদের তেজোহীন (বা বিনাশ) করে দিক। হে জাতধন বা জাতপ্রজ্ঞ অগ্নি! তুমি রাক্ষসবর্গের শরীরগ্রন্থিগুলি প্রকর্ষের সাথে ছিন্ন-ভিন্ন করে দাও। মাংসভক্ষী শৃগাল ইত্যাদি প্রাণীগণ মাংসের অভিলাষে এদের দেহগুলি চারিদিক হতে আকর্ষণ (অর্থাৎ টানাটানি) করতে থাকুক। ৪
হে জাতবেদা অগ্নি! তুমি যেখানে কোনও না কোন উপদ্ৰবী রাক্ষসগণকে উপবিষ্ট বা আকাশে বিচরণ করতে দেখবে, তবে তাদের ঐ স্থানেই পাতিত করে দেবে এবং তীক্ষ্ণ হয়ে হিংসাত্মক জ্বালারূপ শরের দ্বারা বিদ্ধ করে ফেলবে ৫
হে অগ্নি! আমাদের অনুষ্ঠিত যাগকর্মের প্রয়োগের দ্বারা আপন বাণসমূহকে ঋজু করে এবং মন্ত্রের দ্বারা সেগুলিকে তীক্ষ্ণ করে রাক্ষসগণের হৃদয়প্রদেশে বিদ্ধ করো। তারপর তাদের সেই বাহুগুলি, যেগুলি আমাদের বধ করার নিমিত্ত বর্ধিত করে, সেগুলিকে ভগ্ন করে দাও ৬
অধিকন্তু, হে জাতবেদা অগ্নি! তোমার আরব্ধমান স্তুতিকারী আমাদের তুমি পালন করো। শব্দকারী (শব্দং কৃতবতো) রাক্ষসগণকে আপন আয়ুধের দ্বারা নিহত করো। তোমাদের দ্বারা হিংসিত সেই রাক্ষসগণের অপক্ক মাংসকে শুভ্রবর্ণ বা সন্ধ্যাবর্ণ ক্ষিঙ্ক নামক (শকুনি জাতীয়) মাংসভক্ষী পক্ষীবিশেষ ভক্ষণ করুক।৭
হে অগ্নি! যে রাক্ষস আমাদের এই প্রকৃত শান্তিবিষয়ক কর্মে শরীর পীড়ন ইত্যাদি (অত্যাচার) করছে, তাকে বলে দাও, (অর্থাৎ সাবধান করে দাও)। হে পাপীঘাতক যুবতম অগ্নি! তুমি তোমার ভস্ম-করণশালী জ্বালার দ্বারা সেই পাপীকে স্পর্শ করো। হে অগ্নি! সেই পাপীকে আপন কর্মসাক্ষি- রূপ দৃষ্টির দ্বারা বশীভূত (অর্থাৎ দগ্ধীভূত) করো ॥ ৮৷৷
হে অগ্নি! তুমি তোমার আপন বিকরাল নেত্রের দ্বারা আমাদের যজ্ঞকে রক্ষা করো। হে প্রচেতঃ (অর্থাৎ প্রকৃষ্টরূপে চিত্তশালী) অগ্নি! আমাদের এই যজ্ঞকে বসুদেবতাগণের সমীপে শীঘ্র উপনীত করিয়ে দাও। হে নৃচক্ষঃ (অর্থাৎ মনুষ্যগণের দ্রষ্টা) অগ্নি! আমাদের এই যজ্ঞকে রক্ষার কালে তুমি সেই রাক্ষসগণকে হনন করো, তারা যেন দহনকারী তোমাকে নিজেদের বশীভূত করতে (বা তোমাকে হিংসনে) সমর্থ না হয় ॥৯॥
হে অগ্নি! তুমি মনুষ্যগণের দণ্ড এবং অনুগ্রহ যোগ্য কার্যের দ্রষ্টা। তুমি প্রজাপীড়ক রাক্ষসের উপর সর্বতোভাবে অবলোকন করো। তার অঙ্গের উপরের তিনটি অংশ ছিন্ন করে দাও; আপন তেজের দ্বারা তার পঞ্জরগুলি (বক্ষঃপার্শ্বস্থ অস্থিসমূহ) এবং পাদপ্রদেশের তিন পর্বকেও ছেদিত করো ॥১০।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! তোমার জ্বালামালাসমূহকে যাতুন (অর্থাৎ রাক্ষসগণ) তিনবার প্রাপ্ত হোক। (অর্থাৎ প্রথমে অগ্নিশিখার স্পর্শ, পরে অর্ধদগ্ধ এবং শেষে সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়ে যাক)। যে রাক্ষস আমার সত্য যজ্ঞকে ছলনা পূর্বক বিনষ্ট করছে, হে জাতপ্রজ্ঞ অগ্নি! তাকে তোমার স্তোত্রকারী আমার দৃষ্টির সম্মুখে আনয়ন পূর্বক তোমার আপন জ্বালামালায় নিগৃহীত করে বিনাশ করো। (নিগৃহ্য বিনাশয়)। ১১।
হে অগ্নি! যে যাতুনের কারণে স্ত্রী-পুরুষ পরস্পর আক্রোশময় হয়ে থাকে, এবং স্তোতা কটুবাণীতে মন্ত্রোচ্চার করতে থাকছে, সেই যাতুধানের উপর আপন জ্বালাযুক্ত ক্রোধিত মনঃস্বরূপ ইমুর দ্বারা আঘাত করো (বা ক্রুদ্ধ মনের জ্বালা হতে জাত ইযুর দ্বারা তার হৃদয়দেশ বিদ্ধ করো)। ১২।
হে অগ্নি! যাতুধান বা রাক্ষসগণকে তোমার তেজের দ্বারা পরাম্বুখ করে বা নিম্নাভিমুখী করে বিনাশ করো। অভিচার কর্মপরায়ণগণকে আপন তেজোময় প্রাণঘাতী দীপ্ত জ্বালাসমূহের দ্বারা বিনাশ করো। অপরের প্রাণ নিয়ে আপন আত্মায় সন্তোষশালী সেই রাক্ষসগণকে দীপ্যমান জ্বালার প্রভাবে বিনাশ করো। ১৩।
অদ্য অগ্নি ইত্যাদি সকল দেবতা সম্মিলিত ভাবে সেই প্রাণনাশক পাপপরায়ণ রাক্ষসকে এমনভাবে প্রহৃত (বা হিংসা) করুন, যেন সে পুনরায় আর না প্রত্যাবর্তন করতে পারে। আমাদের প্রতি প্রয়োগ করা তার শপনগুলি (অর্থাৎ গালিসমূহ) তাকেই প্রাপ্ত হোক। সেই মিথ্যাভাষীর হৃদয়কে দেবতাবর্গের আয়ুধ ছেদিত করুক। (অথবা, সে বিশ্বব্যাপ্ত অগ্নির জ্বালায় দগ্ধীভূত হয়ে যাক)। ১৪।
যে রাক্ষস অশ্বের বা অজ ইত্যাদির মাংসের দ্বারা অথবা মনুষ্যের মাংসের দ্বারা নিজেকে পোষণ, করে; যে রাক্ষস অবধ্যা (অহন্তব্যা) গাভীর দুগ্ধ জোরপূর্বক হরণ করে, সেই সকল প্রকার রাক্ষসের মস্তকগুলিকে, হে অগ্নি! তুমি আপন তেজে অর্থাৎ জ্বালায় ছিন্ন করে ফেলল ৷৷ ১৫৷৷
গো-দুগ্ধের কামনাশালী রাক্ষস গাভীর বিষ প্রাপ্ত হোক। দুর্গমনশীল যাতুন পৃথিবীর উপর উপলব্ধ পদার্থ হতে বিচ্যুত হোক (অর্থাৎ পদনিম্নস্থ ভূমি উপলব্ধি করতে পেরে যেন পতন লাভ করে)। সর্বানুজ্ঞাতা সবিতাদেব যেন তাদের ব্রীহি ইত্যাদির ঔষধিসমূহের ভাগ গ্রহণ করতে অনুজ্ঞা না প্রদান করেন এবং তাদের হিংসক ঘাতকদের হস্তে সমর্পণ করে দিন। ১৬৷৷
হে মনুষ্যের প্রতি দৃষ্টিশালী অগ্নি! গাভীগণের গর্ভাধান ইত্যাদি প্রসব কাল হতে সম্বৎসরব্যাপী পর্যন্ত আমাদের প্রাপ্য গো-দুগ্ধ রাক্ষস যেন পান করতে সমর্থ না হয়। যে রাক্ষস গাভীর অমৃতরূপ বা হবিলক্ষণযুক্ত ঘৃতের দ্বারা নিজেকে তৃপ্ত করতে ইচ্ছা ই করে থাকে, তুমি তোমার জ্বালাসমূহকে তার প্রতিমুখে তাড়িত করে তার মর্ম প্রদেশে বিদ্ধ করো। ১৭ ॥
হে অগ্নি! তুমি রাক্ষসগণকে সদা সংহার (বা মর্দন) করে থেকেছে। কোনও রাক্ষসই তোমাকে কখনও বশীভূত (বা পরাভূত করতে সক্ষম হয়নি। তুমি এই মাংসভক্ষী রাক্ষসগণকে সমূলে বিনাশ (বা ভস্ম) করো। এরা যেন তোমার দিব্যাস্ত্র হতে নিস্তার না প্রাপ্ত হয়। (এই মন্ত্রটি ৫ম কাণ্ডের ২৯ সূক্তের ১১ মন্ত্রেও পাওয়া যায়)। ১৮
হে অগ্নি! তুমি অবধাদেশ হতে পীড়াদায়ক রাক্ষসগণের কবল হতে আমাদের রক্ষা করো। সেইরকম, দক্ষিণ, উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব দিক সমুদায়ে অবস্থানকারী রাক্ষসগণের উৎপীড়ন হতে আমাদের রক্ষা করো। তোমারই অজর, তাপদাহক ও অতিশয় দীপ্ত জ্বালাসমূহ হিংসক যাতুধানগণকে (অর্থাৎ রাক্ষসবর্গকে) নাশ করতে সমর্থ। ১৯।
হে অগ্নি! তুমি কবি অর্থাৎ ক্রান্তপ্রজ্ঞ। সেই হেতু তুমি পশ্চাৎ ইত্যাদি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত রাক্ষসগণকে প্রজ্ঞাত হয়ে আমাদের সর্বতো রক্ষা করো। তুমি রক্ষক, তোমার রক্ষণ-সাধনোপায় সমূহেয় দ্বারা আমাদের রক্ষা করো। তুমি আমার সখাভূত হয়ে আমাকে নির্ভয় করো। তুমি জরারহিত; সুতরাং অত্যন্ত জীর্ণ আমাকে রক্ষা করো। হে অগ্নি! তুমি অমর্ত্য (অর্থাৎ অমর); সুতরাং মরণধর্মশীল আমাকে পালন (বা রক্ষা) করো। ২০।
বঙ্গানুবাদ— হে অগ্নি! শব্দকারী রাক্ষসগণকে ভস্ম করো। শধারী (খুর বা নখধারী) পশুরূপ ধারণ করে আমাদের পীড়িত করণশালী রাক্ষসগণের উপর তোমার দৃষ্টি পতিত করো এবং মহর্ষি। P অথবা যে মন্ত্রবলে রাক্ষসগণকে দগ্ধকার্য সমাপন করেছিলেন, তেমনই আপন দিব্য তেজঃপ্রভাবে ঐ নিরন্তর হিংসককারী কাণ্ডাকাণ্ড-জ্ঞানহীন রাক্ষসগণকে ভস্মীভূত করে দাও। ২১।
হে অগ্নি! তুমি কামনাসমূহের সম্পূরক মেধাবী, ধর্ষকবৰ্ণশালী (খৃষদ্বর্ণ), মন্থন বা বল হতে উৎপন্ন হওনশীল (অর্থাৎ অভিভবনশীল) এবং অনেক প্রকারে তৃপ্ত করণশালী। আমরা তোমাকে সর্বতোভাবে ধ্যান করছি। তুমি প্রতিদিন ভঙ্গ-স্বভাবোপেত বলযুক্ত রাক্ষসবর্গকে আপন দর্শনমাত্রের দ্বারা বলহীন করে বিনাশ করণশালী ॥ ২২।
হে অগ্নি! বিষবৎ ভয়ঙ্কর তেজের দ্বারা ভঙ্গশালী রাক্ষসবর্গকে বিনাশ করো এবং জ্বালসমূহের তাপের দ্বারা তাদের ভস্ম করো ॥ ২৩
এই অগ্নি আপন মহান তেজের দ্বারা তেজস্বী হয়ে অবস্থান করছেন। হে অগ্নি! তুমি সেই জ্যোতির দ্বারা সকল ভূত জাতকে (অর্থাৎ প্রাণীকে) স্পষ্টরূপে প্রতিভাত করাচ্ছো। এই অগ্নি আসুরী মায়াকে প্রকর্ষের দ্বারা অভিভব করে থাকেন এবং রাক্ষস্বর্গকে সংহারের নিমিত্ত আপন জ্বালারূপ শৃঙ্গ তীক্ষ্ণ (বা প্রবৃদ্ধ) করে তুলছেন। ২৪।
হে জাতবেদা অগ্নি! তোমার জ্বালারূপ প্রসিদ্ধ ও অবিনশ্বর যে দুটি শৃঙ্গ আমাদের ব্রহ্ম-মন্ত্রের প্রয়োগে তীক্ষ্ণভূত হয়েছে, সেই শৃঙ্গ দুষ্টবর্গকে ক্ষয় করতে সক্ষম। তুমি তার দ্বারা ছিদ্রান্বেষী যাতুধান অর্থাৎ রাক্ষসগণকে সংহার করো ॥ ২৫৷
এই অগ্নি. সকল প্রকার সন্তাপদানশীল রাক্ষসবর্গকে বিনাশ করেন। ইনি অমরণ-ধর্মশীল; এঁর প্রকাশ দীপ্ত হয়ে বিরাজমান থাকে। ইনি শুচি অর্থাৎ শুদ্ধ। ইনি পাবক অর্থাৎ সকলকে শোধন করে থাকেন। ইনি সকলের স্তুতির পাত্র ॥ ২৬৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! হে সোম! রাক্ষসগণকে সন্তাপিত করো (দুঃখ প্রদান করো) তাদের বিনাশ করে ফেলো। তোমরা অভীষ্টসমূহের বর্ষণকারী; তমসাবৃত রাত্রে বা মায়ার দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত অজ্ঞানী রাক্ষসগণকে তোমরা ভস্মীভূত করে দাও। ভক্ষণশীল রাক্ষসগণকে প্রহার পূর্বক আমাদের দিক হতে অপসারিত করে দাও এবং তাদের পক্ষকে অত্যন্ত নির্বল করে দাও ॥ ১।
হে ইন্দ্র ও সোম দেবদ্বয়! এই পাপী (অনর্থকারী) রাক্ষসকে তিরস্কৃত করো; যেমন অগ্নির তাপে চরু তপ্ত হয়, তেমনই অগ্নির তাপে সংযুক্ত হয়ে এই রাক্ষস চরম পরিণতি প্রাপ্ত হোক। ব্রাহ্মণদ্বেষ্টা, মাংসভক্ষী, ভয়ঙ্করদর্শন, যেথা-সেথা বিচরণকারী রাক্ষসদের মধ্যে পরস্পর দ্বেষ ও শত্রুভাব উৎপন্ন করো৷৷ ২।
হে ইন্দ্র! হে সোম! দুষ্ট কর্মশীল রাক্ষসগণকে আশ্রয়হীন করে বিতাড়িত করো। এই রাক্ষসগণের মধ্যে একজনও যেন অন্ধকার হতে নিষ্ক্রান্ত (বা উখিত) হতে না পারে। এদের তিরস্কার করণের নিমিত্ত তোমাদের বল ক্রোধে পূর্ণ হয়ে যাক ৷ ৩৷৷
হে ইন্দ্র ও সোম দেবদ্বয়। পাপকে বর্ধনশীল রাক্ষসগণের উপর প্রয়োগের নিমিত্ত আকাশ ও ভূলোক হতে হিংসা-সাধন আয়ুধ একত্রিত করো। পর্বত ও মেঘ সমুদায় হতে উদয় হওয়া রাক্ষসগণকে সংহার করার নিমিত্ত আপন বজ্ৰকে তীক্ষ্ণ করো ॥ ৪।
হে ইন্দ্র ও সোম দেবদ্বয়! তোমরা অগ্নির দ্বারা তপ্ত হওয়া লৌহাস্ত্রগুলিকে অন্তরিক্ষের সর্ব দিকে পরিভ্রামিত করো এবং ঐ রাক্ষসগণের বক্ষঃপঞ্জর (পার্শ্বস্থ অস্থি) ভঙ্গ করে দাও, যাতে তারা শব্দহীন হয়ে (কোন আতাঁরব উৎসারিত করতে না পেরেই) পতন লাভ করে। ৫।
হে ইন্দ্র ও সোম দেবদ্বয়! যেমন কক্ষবন্ধনসাধনভূতা রঞ্জু বলবন্ত অশ্বদ্বয়কে একত্রে বন্ধন করে, তেমনই আমাদের স্তুতি তোমাদের দুজনকে গ্রহণ করুন। আমি যে আহ্বানযোগ্য বুদ্ধির দ্বারা তোমাদের উদ্দেশে (স্তুতি) প্রেরণ করছি, তা তোমাদের বন্ধনযুক্ত করুক। যেমন বন্দী জনগণের কৃত স্তুতিসমূহ (প্রশস্তিসম্বলিত গান) রাজন্যবৃন্দকে হর্ষিত করে থাকে, তেমনই এই ব্রহ্মমন্ত্র তোমাদের দুজনকে হর্ষান্বিত করুক ॥ ৬।
হে ইন্দ্র ও সোম দেবদ্বয়! তোমরা গমনসাধন অশ্বগণকে স্মরণ করো, তাদের দ্বারা এই স্থানে আগত হয়ে দ্রোহী ভঙ্গকারী রাক্ষসবর্গকে সংহার করো। অধিকন্তু, হে ইন্দ্র ও সোম! সেই দুষ্কর্ম করণশীল রাক্ষসগণের জীবন দুঃখময় হোক। আমাদের যে দ্রোহশীল শত্রু (রাক্ষস) আমাদের একবারও দুঃখ প্রদান করেছে, তার জীবন সদা দুঃখে পূর্ণ হয়ে থাকুক ॥ ৭
হে ইন্দ্র! যে রাক্ষস ইত্যাদি (শত্রু) পরিপক্ক মনে (জেনেশুনে) যজ্ঞে নিয়োজিত আমাকে মিথ্যা অজুহাতে অভিশাপ শাপ প্রদান করে, সেই দুষ্টের অসৎ বাক্যরূপ অভিশাপ সেই রকমেই বিগলিত (অর্থাৎ ব্যর্থ হয়ে যাক, যেমন মুষ্টিতে গৃহীত জল অঙ্গুলির সন্ধি (ফাঁক) দিয়ে বিগলিত হয়ে যায়। (অর্থাৎ অকৃতের বা অন্যায়ের বক্তা (শাপদানকারী) স্বয়ংই শূন্য বা ব্যর্থ হয়ে যাক)। ৮।
যে রাক্ষসগণ আমা হেন সত্যভাষীকে মিথ্যা নিন্দায় পীড়িত করে থাকে, এবং যারা আমার মঙ্গলকারী কর্মকে বা স্বধাকে অন্নের নিমিত্ত দূষিত করে থাকে, সোমদেবতা সেই পাপীদের সর্পের মুখে নিক্ষেপ বা সমর্পণ করুন অথবা পাপদেবতা নির্ঋতির (অর্থাৎ মৃত্যুর) ক্রোড়ে স্থাপন করুন ॥৯॥
হে অগ্নি! যে রাক্ষস আমাদের শরীরের বা আমাদের অশ্ব, গাভী ইত্যাদি পশু ও আত্মীয় পুত্র ইত্যাদির শরীরের রস (জীবনীশক্তি) হরণ করতে আকাঙ্ক্ষা করে, সেই দুষ্ট শত্রু তস্কর (মোষকর্তা) নিজেরই শরীর হতে তথা পুত্র ইত্যাদির হতে বিযুক্ত হয়ে যাক (হীয়তাং বিযুক্তো ভবতু)। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে দেববর্গ! সেই রাক্ষস ইত্যাদি শত্রুগণ, যারা রাত্রি বা দিনে আমাদের বধ করতে ইচ্ছা পোষণ করছে, তারা আপন শরীর ও পুত্রের শরীর হতে বিযুক্ত হয়ে যাক। তারা তিন পৃথিবীর নীচে স্থিত (অর্থাৎ দিব্য, অন্তরীক্ষ ও ভূমি–এই তিন পৃথিবীর নিম্নে অবস্থিত) নরকে বা তমোলোকে উপনীত হোক। তাদের অন্ন বা কীর্তি বিনাশপ্রাপ্ত হোক। ১১।
এইটি বিদ্বান জন জানেন যে, সৎ ও অসৎ বচন পরস্পর প্রতিদ্বন্দিতা করে থাকে। তাদের মধ্যে সত্যবচনকে রক্ষা সোম করে থাকেন, তথা তিনি অসত্য বচনশালীকে হিংসিত করে থাকেন। এই হতে মিথ্যাভাষী কে, তা উত্তমরূপে জ্ঞাত হয়ে যায়। ১২।
পাপযুক্ত অসুরকে এবং মিথ্যাচারী এবং ক্ষত্রবলসম্পন্ন রাক্ষসগণকে সোমদেবতা অব্যাহতি দেন না। তিনি পাপী অসুরকে হিংসা করে থাকেন। উপরোক্ত দুই প্রকারের দুষ্টজনই ইন্দ্রের বন্ধনসাধন পাশে বদ্ধ হয়ে শায়িত থাকে ॥ ১৩ ৷৷
হে অগ্নিদেব! আমি দেবতাগণ হতে কখনও রহিত (বা বিচ্যুত) হইনি, তাদের ব্যর্থ আহ্বান করিনি, কখনও মিথ্যাচরণে রত হইনি। তথাপি, হে জাতবেদা! কি কারণে আমার প্রতি রুষ্ট হয়েছো? যে রাক্ষসবর্গ দেবতাগণের দ্রোহী, তারা অত্যন্ত নিকৃষ্ট গতি প্রাপ্ত হোক ॥ ১৪
আমি যদি কাউকে সন্তাপ দানশালী হয়ে থাকি, তবে আজই যেন মৃত্যুমুখে পতিত হই। হে মিথ্যা দোষারোপকারী পুরুষ! যদি তুমি নিরপরাধী আমার উপর মিথ্যা (বা ব্যর্থ দোষারোপ করে থাকো, তো তুমি দশ পুত্রের সাথে বিচ্ছেদ প্রাপ্ত হও ॥ ১৫৷৷
যে দুষ্ট রাক্ষস নিজেকে শুদ্ধ রূপে ঘোষণা করে থাকে, অথবা যে দুষ্ট নিজে রাক্ষসিক বৃত্তিশালী হয়েও যথার্থ সদাচরণশীল আমাকে রাক্ষস নামে অভিহিত করে থাকে, সেই উভয়বিধ অসত্যবাদীকে ইন্দ্রদেব আপন বিকরাল হিংসাত্মক বজের দ্বারা বিনষ্ট করুন। সেই দুষ্ট সকল প্রাণী অপেক্ষা নিকৃষ্টরূপে পতিত (বা বিনাশ প্রাপ্ত) হোক। ১৬।
উলুকীর (অর্থাৎ পেচকীর) সমান যে রাক্ষসী রাত্রিকালে আমাদের হননের নিমিত্ত বেগে ধাবিত হয় এবং যে দ্রোহপরায়ণা রাক্ষসী নিজেকে অদৃশ্যরূপে রক্ষা করে আগমন করে, সেই দুষ্টা অথৈ গহ্বরে পতিত হোক। এবং সোম-অভিষবকারী পাষাণগুলির শব্দে দুষ্ট রাক্ষস-রাক্ষসী স্বয়ংই বিনাশ প্রাপ্ত হোক। ১৭।
হে মরুৎ-বর্গ! তোমরা প্রজাগণের মধ্যে অনেক প্রকারে ব্যাপ্ত হয়ে থেকে দুষ্টগণকে হনন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো। তাদের গ্রহণ পূর্বক সম্যক পেষণ (অর্থাৎ চূর্ণিত) করো। যে রাক্ষসগণ পক্ষীরূপ ধারণ করে রাত্রিকালে সঞ্চরণ করতে থাকে, এবং যারা দেবতার উদ্দেশে অনুষ্ঠিত যজ্ঞকর্মের বাধক হয়ে থাকে, তাদের সকলকে পেষণ করে ফেলো ॥ ১৮৷৷
হে বজি! অন্তরিক্ষ হতে অশনিলক্ষণ বর্জকে সঞ্চালিত করো;, সেটিকে সোমের দ্বারা সম্যক তীক্ষ্ণ করো। তারপর পর্ববৎ (পর্বত সদৃশ) বজ্রের দ্বারা পূর্ব-পশ্চিম-দক্ষিণ-উত্তর ইত্যাদি সকল দিকে। অবস্থানকারী রাক্ষস্বর্গকে নষ্ট করে দাও। ১৯।
কুকুরের সমান ভক্ষণ করণশালী যে রাক্ষসবর্গ অগ্রবর্তী হয়ে অহিংসক ইন্দ্রকে হত্যা করতে ইচ্ছুক হয়ে উঠেছে; এবং ইন্দ্র যে রাক্ষসগণকে বিনাশ করার উদ্দেশে আপন বর্জকে তীক্ষ্ণ করছেন; সেই ইন্দ্র সেই বজ্রের দ্বারা সেই রাক্ষসবর্গকে নিহত করুন। (অথবা তাদের হননের নিমিত্ত বর্জ্য সৃষ্টি করেছেন–বং সৃজতি বা) ॥ ২০।
বঙ্গানুবাদ –ইন্দ্রদেব সেই হিংসক রাক্ষসগণের প্রতি আপন আয়ুধ (বা শর) প্রক্ষেপণ করুন, যারা দেবতার উদ্দেশে প্রদত্ত পুরোডাশ ইত্যাদি হবিকে বিনাশিত করার নিমিত্ত যজ্ঞাভিমুখে গমন করে থাকে। যেমন বৃক্ষসমূহকে ছেদন করতে কুঠার লাগে যেমন মৃৎপাত্র ভগ্ন করার নিমিত্ত দণ্ড (লকুট) লাগে, তেমনই যাতুনবর্গকে বিনাশ করণের প্রয়োজনে ইন্দ্রের আগমন ঘটুক। ২১।
হে ইন্দ্র! যেমন পাষাণাঘাতে মৃৎপাত্র ভগ্ন হয়ে থাকে, সেইভাবে উলুকাকৃতি রাক্ষসগণকে সপরিবারে অর্থাৎ শিশু উলুকাকৃতি সম্পন্ন রাক্ষসগণকেও ইন্দ্র বিনাশ করুন। সেইরকম যারা কুকুরাকৃতি সম্পন্ন, যারা চক্ৰবাকের আকারধারী, যারা গরুড় মূর্তিধারী, এবং যারা শকুনীর ন্যায় রূপগ্রাহী, সেই সকল রাক্ষসবর্গকে ইন্দ্রদেব হনন করুন ॥ ২২
যাতনা প্রদানশীল রাক্ষসজাতি যেন আমাদের নিকটবর্তী হতে না পারে। কিমীদিন অর্থাৎ কি ইদানীং বা কি এটি বলে যত্রতত্র বিচরণশীল মিথুনভূত (অর্থাৎ স্ত্রী-পুরুষ সমন্বিত) রাক্ষসগণ দূর হয়ে যাক। অন্তরিক্ষদেবতা আমাদের দেব সন্তাপ হতে রক্ষা করুন। এবং পৃথিবী দেবী আমাদের তাঁর-সম্বন্ধীয় রক্ষ-পিশাচ ইত্যাদি কৃত পীড়ন বা পাপ হতে আমাদের রক্ষা করুন ॥ ২৩ ৷৷
হে ইন্দ্র! পুরুষরূপধারী যাতনা দানশীল রাক্ষসগণকে তুমি বিনাশ করো; আরও, মোহে আকর্ষণপূর্বক পাতনকারিণী হিংসিকা রাক্ষসীকে বিনাশ করো। আরও, বিষৌষধির দ্বারা মারণক্রীড়াশালী অর্থাৎ অভিচার কর্মকারী দুষ্টগণের গ্রীবা বিচ্ছিন্ন পূর্বক বিনাশ করো; তারা যেন আর সূর্যোদয় দর্শন করতে না পারে ॥ ২৪
হে সোম! হে ইন্দ্র! তোমরা প্রত্যেক হিংসক রাক্ষসদের প্রতি দৃষ্টিপাত করো। আমাদের রক্ষার নিমিত্ত তোমরা জাগরিত (বা চৈতন্যসম্পন্ন) থাকো; অধিকন্তু, ঐ হিংসক রাক্ষসগণের উপর হননসাধন বায়ুধ ক্ষেপণ করো ॥ ২৫
বিনিয়োগঃ –ইন্দ্রো যাতুনাং ইতি মন্ত্রস্য রক্ষোহণং ইত্যনুবাকেন উক্তো বিনিয়োগঃ। (৮কা, ২অ. ২সূ-২১-২৫ঋ)। টীকা–মূল গ্রন্থ অনুসারে এই ২য় অনুবাকের ২য় সূক্তের মোট ঋংখ্যা ২৫; সুতরাং উপযুক্ত পাঁচটি মন্ত্র তারই অন্তর্গত এবং এগুলির বিনিয়োগ একই সঙ্গে হওয়া বিধেয় ॥ (৮কা, ২অ, ২সূ–২১-২৫ঋক)।
বঙ্গানুবাদ –এই তিলকবৃক্ষ হতে নির্মিত মণি প্রতিসরণসাধনীয়া, অর্থাৎ কৃত্যা-করণশালী শত্রু প্রভৃতির কর্মের প্রতিকার করণশালিনী। এটি বীর কর্মশালিনী, শত্রুগণকে বিতাড়িত করণে সমৰ্থা। এটি শত্রুঘাতিনী, সংগ্রাম ক্ষেত্রে বীর্য প্রকটনকারিণী। এটি যজমানকে রক্ষা করণশালিনী এবং সুন্দর কল্যাণময়ী। এই মণি অধিকারী পুরুষেরই বশ্যা ॥১॥৷
এই মণি শত্রুগণের নাশিকা এবং সুন্দর বীর পুত্র ইত্যাদি দানশালিনী, এটি বলবান শত্রুগণকে অবদমিত করণশালিনী এবং কৃত্যাকে কৃত্যাকারীর উপরেই প্রেরণকারিণী। (অর্থাৎ অভিচার কর্মকারীর উপরেই তার অভিচার কর্মের ফল প্রেরয়িত্রী)। আমার বাহুতে বন্ধনের নিমিত্ত এই মণি আগতা হচ্ছে। ২৷
এই মণির প্রভাবেই ইন্দ্র পূর্বকালে বিজয় প্রাপ্ত হয়ে অসুরবর্গকে বিনাশ করেছিলেন এবং এরই প্রভাবে বৃত্রকে পরাভূত করেছিলেন। এই মণিবন্ধনের সামর্থ্যের দ্বারা মনীষী (অর্থাৎ জয়োপায় সম্পর্কে জ্ঞানবান) ইন্দ্র অন্যান্য অসুরগণকে পরাভূত করেছেন। এরই দ্বারা তিনি আকাশ ও পৃথিবীর অধিপতি হয়েছেন এবং এই মণিরই প্রভাবে তিনি চতুর্দিককে আপন অধীনে আনয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন (স্বাধীনং কৃতবান) ॥ ৩
এই তিলকবৃক্ষের বিকারোৎপন্ন মণি বিদ্বেষীগণকে বিপরীত মুখে (প্রতিকূলে) প্রেরয়িত্রী, রোগ ইত্যাদির প্রতিসরণসাধনভূতা (অর্থাৎ প্রতিকার করণশালিনী), শত্রুকে নিরসনক্ষম তেজে তেজোময়ী। এই মণিকে যিনি ধারণ করেন, তাঁকে দর্শনমাত্রই শত্রু বিমর্দিত হয়ে পলায়ন করে থাকে। সকলকে বশীভূত করণশালিনী এই মণি সকল তিরস্কার বা অভিভব হতে আমাদের রক্ষা করুক ॥ ৪৷
অগ্নির উক্তিই হলো যে, স্বাক্ত্যমণির (অর্থাৎ তিলকমণির) বন্ধনে সকল সম্পদ সাধিত হয়। এই কথা বৃহস্পতি, সূর্য এবং ইন্দ্রও বলেছেন। এই মণির দ্বারা সর্বসাধনত্ব সম্পর্কে নির্দেশ দানকারী এই অগ্নি ইত্যাদি দেবগণ, শত্রুদের দ্বারা আমাদের প্রতি অন্যের উৎপাদিত কৃত্যাকে তারই কর্তার (অর্থাৎ সেই কৃত্যকারীর) দিকেই আপন প্রভাবের দ্বারা প্রতিসারিত করে দিন। ৫।
আমি আকাশ ও পৃথিবীকে এবং দিবস ও দিবাকরকে আমার নিজের ও কৃত্যার মধ্যে ব্যবধান রূপে স্থাপিত করছি। সেই হিতকর ফলশালী দেবতা (অর্থাৎ দ্যাবাপৃথিবী ইত্যাদি) প্রতিসর মন্ত্রের বলে কৃত্যাকে বিপরীত দিকে প্রত্যাবর্তিত করিয়ে দিন। ৬।
যে মনুষ্য এই ক্ত্য বা তিলক মণিকে কবচ রূপে ধারণ করে থাকে, তার নিমিত্ত সাধিত কৃত্যা (অর্থাৎ আভিচারিক ফল) পরিহার করণশালিনী এই মণি সূর্যের দ্বারা অন্ধকারকে বিদূরিত করণের সমান শত্রুর দ্বারা সাধিত সেই কৃত্যাকে বিনাশ করে দিয়ে থাকে ॥ ৭
আমি সাধক, অতীন্দ্রিয় দ্রষ্টা মহর্ষি অথর্বর ন্যায় তিলকবৃক্ষের বিকাররূপ এই মণির দ্বারা আমি শত্রুসেনার উপর বিজয়লাভ সম্পন্ন করেছি, এবং প্রমাথী (অর্থাৎ পীড়নকারী) রাক্ষসগণকে এই মণির প্রভাবের দ্বারাই আঘাত (বা বধ) করছি ॥৮॥
মহর্ষি অঙ্গিরা-কৃত যে কৃত্যা ও অসুরগণ কর্তৃক নির্মিত যে কৃত্যা এবং স্বয়ংকৃত অর্থক কোন বৈকল্যের দ্বারা কৃত যে কৃত্যা ও অন্যের প্রযুক্ত (পরার্থপ্রয়োগে) যে নিষ্ফল কৃত্যা–এই উভয়বিধ কৃত্যাই নবতিসংখ্যকা মহানদীরও পার অতিক্রম করে দূরে গিয়ে পতিত হোক। (এইস্থানে চতুষ্প্রকার নির্দিষ্ট কৃত্যার কথা বলা হলেও আঙ্গিরস ও অসুরগণের কৃত্যাকে এক দিকে এবং স্বয়ংকৃত ও অপর মনুষ্যগণের কৃত কৃত্যাকে অপর দিকে দেখানো হয়েছে। সুতরাং উভয়বিধ কৃত্যা রূপে উল্লিখিত হয়েছে)। ৯।
ইন্দ্র-বিষ্ণু-সবিতা ইত্যাদি আদিত্যগণ, রুদ্র, অগ্নি প্রজাগণের স্রষ্টা প্রজাপতি ও পরমেষ্ঠী, নিরতিশয় স্থানে বর্তমান ব্রহ্মাণ্ডাভিমানী দেব বিরাট, সকল মনুষ্যের হিতকরী বৈশ্বানর বা হিরণ্যগর্ভ এবং সমস্ত ঋষিবর্গ অপরের দ্বারা কৃত কৃত্যার প্রহার প্রতিকারের (বা পরিহারের) আকাঙ্ক্ষাশালী এই যজমানকে এই তিলকমণিরূপ কবচ ধারণ করিয়ে দিন ॥ ১০
বঙ্গানুবাদ –হে মণি বা মণির উপাদানরূপ বৃক্ষ! তুমি সর্বাভিমতফলসাধনত্বের কারণে কতিপয় ফল দানশালিনী হলেও ঔষধিসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। ভারবহনে সমর্থ, উপকারী ও গমনশীল চতুষ্পদ পশুর মধ্যে যেমন বলদ শ্রেষ্ঠ, বন্য পদগণের মধ্যে শত্ৰুহিংসা ইত্যাদি ক্রকর্মের নিমিত্ত ব্যাঘ্র যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনই তুমি হেন শ্রেষ্ঠ যে সর্বপুরুষার্থসাধক বলকে লাভ করতে আমরা আকাঙ্ক্ষা করেছি, তাকে প্রাপ্ত হয়েছি, (অথবা তোমা হেন প্রতিকূল দ্বেষ্টাকে অন্তিকে প্রাপ্ত হবো) ॥ ১১৷
উক্ত মহিমাশালিনী মণিকে যে পুরুষ ধারণ (বা বন্ধন) করে, সে ব্যাঘ্রের ও সিংহের মতো পরাভিভবনশীল (অর্থাৎ অপরকে পরাভবক্ষম) হয়ে থাকে; সে (অর্থাৎ সেই মণিধারণকারী পুরুষ) গাভীসমূহের মধ্যে স্বচ্ছন্দসঞ্চারী বৃষের মতো শত্রুগণকে বশ করণশালী হয়ে থাকে। ১২৷৷
এই মণির ধারণকর্তার উপর অপ্সরাবর্গ, গন্ধর্বগণ এবং মনুষ্যবৃন্দ প্রহার করতে পারে না। সে সর্বদিকে সুশোভিত হয়ে আধিপত্য লাভ করে। ১৩৷৷
হে মণি! তোমাকে প্রজাপতি কশ্যপ সৃষ্টি করে সকলের উপকারের নিমিত্ত প্রেরিত করেছিলেন। হে প্রশস্ত মণি! সকল দেবতার অধিপতি ইন্দ্র আপন বৃত্রহনন ইত্যাদি সিদ্ধির বিষয়ে এবং আপন রাজ্য প্রাপ্তির নিমিত্ত তোমাকে ধারণ করেছিলেন; অতএব যে পুরুষ তোমাকে ধারণ করে থাকে, সে পরস্পর সংশ্লেষণসাধনে (অর্থাৎ যুদ্ধে) অজেয় হয়ে থাকে। এই ভ্রাক্ত্য মণিকে দেবতাগণ কবচের সমান রক্ষাত্মক প্রভাবশালী করে দিয়েছিলেন ॥ ১৪
হে শান্তিকামী, পুরুষ! যে জন হিংসক কৃত্যাসমূহ (অর্থাৎ মারণাত্মক আভিচারিক ক্রিয়া), দীক্ষাসমূহ (অর্থাৎ যজ্ঞিয় নিয়ম ইত্যাদি); এবং হিংসা সাধন শ্যেন ইত্যাদি যাগ (শ্যেনেম্বাদিভির্যাগৈঃ) সাধনের দ্বারা তোমাকে হত্যা করতে আকাঙ্ক্ষা করছে, ইন্দ্রদেব সেই জিঘাংসুর উপর তার শতপর্বশালী বজ্র প্রহার করুন। ১৫৷
এই পরম শক্তিশালিনী মণি কৃত্যা ইত্যাদিকে নির্বীর্য করণশালিণী, অতিশয় ওজস্বিনী এবং বিজয়াত্মক সাধনসমূহের দ্বারা সমৃদ্ধ। এই মণি সকল দিকে হতে আমার নিমিত্ত রক্ষক ও সুন্দর কল্যাণসমূহের সাধনরূপ হোক। এই মণি আমার সন্তান ইত্যাদি প্রজা এবং ধন ইত্যাদি সম্পৎ রক্ষা করুক ॥ ১৬
হে ইন্দ্র (বা হে মণি)! তুমি শূর; আমাদের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকস্থায়ী শত্রুকে বিনাশ করো। উত্তরতঃ পশ্চাৎ বা পূর্ব দিকে শত্ৰুনিপাতক জ্যোতিকে আমাদের সম্মুখে প্রকাশিত করো। ১৭।
আকাশ ও পৃথিবীর দেবতাদ্বয় আমাকে তনুত্ৰাণ অর্থাৎ বর্ম প্রদান করুন। এইরকমেই দিনের অভিমানী দেবতা, সূর্য, ইন্দ্র, অগ্নি ও ধাতা আমাকে কবচ প্রদান করুন।১৮
ইন্দ্র ও অগ্নি দেবতার যে মণিরূপ প্রচণ্ড বলসম্পন্ন কবচ আছে, তাকেই সকল (বিশ্ব) দেবতাগণ অতিবেধন (অতিক্রমণ বা বিদ্ধ) করতে পারেন না; বরং তা পালন করেন। সেই কবচ সকল দিক হতে আমার রক্ষক হোক, যাতে বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত আমি জীবিত থাকতে পারি, (অর্থাৎ শত সম্বৎসর পর্যন্ত আয়ু ভোগ করতে পারি) ॥ ১৯৷৷
এই দেবমণি বা ইন্দ্রের দ্বারা ধৃত এই মণি আমার মঙ্গলের নিমিত্ত আমার বাহু ইত্যাদি প্রদেশে আরূঢ় হয়েছে (অর্থাৎ আমি ধারণ করেছি)। হে মনুষ্যবর্গ! এই হেন মণিকে শত্রুর উৎপীড়ন, শরীর রক্ষণ এবং বলের নিমিত্ত ধারণ করো। (অথবা, হে ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ! তোমরা এই মেথীস্থানীয় অর্থাৎ শক্রবর্গকে বিলোড়য়িত বা বিনাশকারক মণিতে অধিষ্ঠিত হও) ॥ ২০
ইন্দ্র এই মণিতে আমাদের অভীপ্সিত সুখরাশিকে ব্যাপ্ত করুন। হে দেববর্গ! তোমরা এই মণিতে স্বয়ং ব্যাপ্ত (বা বিরাজমান) হও। তোমরা এই মণিকে এই প্রকার মঙ্গলকারিণী করে দাও, যাতে আমরা (যজমানগণ) শত শরৎ অর্থাৎ শত সম্বৎসরব্যাপী আয়ুষ্মন হতে পারি এবং বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত নিরোগ দেহ ভোগ করতে পারি। ২১।
আপন সেবকগণের মঙ্গল করণশালী দেবতা, মনুষ্য ইত্যাদির অধিপতি বা পালক, বৃত্রের হননকর্তা, বিগতযুদ্ধ বা নানা শত্রুবিনাশকারী, সকলকে বশকারী (বশী), জয়শীল (জিগীবান), স্বয়ং অন্য কর্তৃক অনভিভূত (অপরাজিত), সকল সোমযাগে স্বয়ং মুখ্যরূপে সোেমপানকারী (সোমপা), ভয়রাহিত্যের কর্তা (অভয়কর) ও অতিশয়িত পুস্ত্রের বা অভিমত ফলের বর্ষক (বৃষা) ইন্দ্রদেব তোমাকে মণিবন্ধন করান এবং তিনিই সকল দিক হতে দিবারাত্র সর্বদাই তোমাকে সকল ভয় হতে রক্ষা করুন ॥ ২২
বঙ্গানুবাদ –হে গর্ভিণী! তোমার উৎপত্তিমাত্রে তোমার জননী পতিকে দেয় যে দুর্নাম ও সুনাম বা দুর্নামবৎসপাখ্য প্রতিবেদন পরিহার বা উন্মার্জন করেছেন তার মধ্যে ত্বচা দোষ তোমাকে যেন ইচ্ছা না করে; পক্ষান্তরে অলীশ অর্থাৎ ভ্রমরাকারে বর্তমান কোন রোগ বা তার অভিমানী দেবতা এবং সম্বর্ত নামক বৎসপালক দেবতাও যেন তোমাকে বাধা না দান করেন ॥১॥
গর্ভিণীকে পীড়া দানশালী পলাল সদৃশ অতি সূক্ষ্ম রাক্ষসকে এবং অনুপলাল নামক অতি তুচ্ছ অঙ্গকে বিনাশ করছি। সেই সঙ্গে শকু নামক শরশর শব্দকারী, কোক বা চক্ৰবাকের ন্যায় আকৃতিশালী মলিম্লচ অর্থাৎ অত্যন্ত মলিনাঙ্গসম্পন্ন, পলীজক অর্থাৎ পাণ্ডুবর্ণের ন্যায় বর্তমান বা পলিতকারী, আশ্রেষ অর্থাৎ আলিঙ্গনের দ্বারা পীড়াপ্রদানকারী, বব্রিবাসস অর্থাৎ রূপোপেত বসনধারী, প্রমীলিন অর্থাৎ প্রতিক্ষণে নেত্র সঙ্কোচনকারী, এবং ঋক্ষগ্রীব অর্থাৎ বানরের ন্যায় গ্রীবাশালী–এই সকল রাক্ষস, যারা গার্ভিণীগণকে পীড়া প্রদান করে, তাদের প্রত্যেককে বিনাশ করছি। ২।
হে দুনাম নামক রোগের অভিমানী (দেবতা)! তুমি এই গর্ভিণীর ঊরুদ্বয়ের অন্তঃপ্রদেশকে সঙ্কুচিত করো না; এবং এর উরুদ্বয়ের মধ্যে নীচের দিকে প্রবেশ করো না। আমি এই দুর্নাম রোগ-নাশিনী শ্বেতসরিষারূপ ঔষধিকে প্রাপ্ত করছি ৷ ৩৷
দুর্নাম ও সুনাম এই দুই দোষ একত্রে বর্তমান থাকতে বা সঞ্চরণ করতে ইচ্ছা করে। এর মধ্যে দুর্নাম প্রভৃতি অলক্ষ্মীক রোগকে আমরা বিনাশ করে দিচ্ছি। দ্বিতীয় সুনামা রোগ স্ত্রীসম্বন্ধীরূপে থাকতে বা স্ত্রী-অঙ্গে লগ্ন হয়ে থাকতে ইচ্ছা করণশালী হোক। ৪
প্রসিদ্ধ কৃষ্ণবর্ণ কেশবান্ নামক অসুর, স্তম্বজ অর্থাৎ স্তম্বে জাত অসুর, তুণ্ডিক অর্থাৎ কুৎসিত তুণ্ড বা মুখশালী অসুর,–এগুলি সবই ব্যাধিসমূহের দুর্ভাগরূপ। এগুলিকে এই গর্ভিণীর মুষ্ক নামক অঙ্গস্থান ও কটিদেশের সন্ধিস্থান হতে অপসারিত করে দিচ্ছি। (মুষ্ক হলো অণ্ডকোষ। বলা হয়েছে স্ত্রীণামপি মুষ্কং অস্তি অর্থাৎ শরীর-বিজ্ঞান অনুসারে স্ত্রীগণেরও মুষ্ক থাকে) ॥ ৫॥
অনুজিঘ্র অর্থাৎ যারা আঘ্রাণের দ্বারা মারণশীল, প্রমৃশ অর্থাৎ যারা বলপ্রয়োগে (বা স্পর্শের দ্বারা) হত্যাকারী, ক্ৰব্যাদ অর্থাৎ যারা হত্যা করে মাংস ভক্ষণ করে ফেলে, রেরিহ অর্থাৎ যারা লেহন করে হত্যাকারী, উক্ত ব্যতিরিক্ত অন্যান্য অলক্ষ্মীকর কিকি শব্দকারী সকল ব্যাধি-রাক্ষসগণকে এই (অভিমন্ত্রিত) পীতবর্ণ-সরিষা বিনাশ করুক ৷৷ ৬ ৷
হে গর্ভিণী! পিতা বা ভ্রাতার ন্যায় রূপ ধারণ করে যে রাক্ষস স্বপ্নে অর্থাৎ নিদ্রাবস্থায় তোমার শরীরে প্রবিষ্ট হয়ে তোমার গর্ভকে ধ্বংস করে, তাদের এই শ্বেতসরিষা অভিভব করুক। এবং নপুংসক (হিজড়া) রূপে বা অলক্ষিত রূপে এই গর্ভিণীর নিকটে আগমনশীল দুষ্টবৃন্দকে এই সরিষা বিনাশ করে দিক। ৭
হে গর্ভিণী! শয়নের মধ্যে (অর্থাৎ স্বপ্নবস্থায়) কিংবা জাগরণের মধ্যে বিচরণকারী যে রাক্ষস তোমাকে হিংসা করতে ইচ্ছা করে। থাকে, তাদের সকলকেই এই (অভিমন্ত্রিত) সরিষা, সূর্য কর্তৃক তমোনাশের মতো, নষ্ট করে দিক ॥ ৮।
হে সরিষা-রূপা ঔষধি! রাক্ষস ইত্যাদি যে দুষ্টগণ এই স্ত্রীকে মৃত সন্তানের জন্মদাত্রী (অর্থাৎ মৃতবৎসা) করে দেয় বা যারা এর গর্ভকে বিপত্তিগ্রস্ত (অবতোকা অর্থাৎ গর্ভস্রাববিশিষ্টা বা অবপন্নগর্ভা অর্থাৎ অধঃপতিতগর্ভা) করে, তুমি তাদের বিনাশ পূর্বক এর গর্ভদ্বার (কমলং) অভিব্যক্ত বা ক্ষণেপেত করো, (অর্থাৎ এর গর্ভকে পুষ্ট করণশালিনী হও) ॥ ৯৷
যে পিশাচগণ সায়ংকালে আক্রোশন্ত হয়ে গর্দভের ন্যায় চিৎকার পূর্বক গৃহের সর্বদিকে নৃত্য করতে থাকে, যারা কুসূলাকৃতি (অর্থাৎ ধানের গোলার ন্যায় আকৃতিধারী) হয়ে নৃত্য করে, যারা বৃহকুক্ষিযুক্ত (অর্থাৎ ভয়ঙ্কর জঠরসম্পন্ন আকৃতিধারী হয়ে নানারকম শব্দ সহকারে গৃহের সর্বদিকে নৃত্য করতে থাকে, তাদের, হে শ্বেত ও পীত সরিষারূপা ঔষধি! তোমরা আপন গন্ধের দ্বারাই নাশ প্রাপ্ত করিয়ে দাও ১০
বঙ্গানুবাদ –মোরগের ন্যায় কু কু রবকারী, দূষিত কর্মকারী, উন্মাদের ন্যায় অঙ্গভঙ্গী করণশালী এবং অরণ্যে শব্দকারী যে কৃকন্ধ (বা কুকুন্ধ) নামক পিশাচ আছে, তাদের আমরা এই গর্ভিণীর নিকট হতে অপসারিত (বা বিনাশ) করছি ৷৷ ১১৷৷
যে পিশাচগণ (বা ভূতবিশেষ) দ্যুলোক হতে প্রেরিত সূর্যের তাপ সহ্য করতে পারে না, যারা শ্রীহীন, ছাগচর্ম-পরিধায়ী, দুর্গন্ধযুক্ত অঙ্গসম্পন্ন, সর্বদা নব-মাংস ভক্ষণের কারণে রক্তাপ্লুত মুখশালী, অস্থি ইত্যাদির অলঙ্কার ধারণকারী ও কুৎসিতগতিসম্পন্ন, তাদের আমরা বিনাশ করছি৷৷ ১২।
যে পিশাচগণ গর্ভের কারণে অতিরিক্ত স্থূলদেহশালিনী গর্ভিণীদের স্কন্ধে বহন করে নৃত্য করতে থাকে, স্ত্রীগণের কটি প্রদেশকে ব্যথিত করণশালী সেই পিশাচগণকে, হে ইন্দ্র! তুমি বিনষ্ট করে দাও। ১৩।
যে পিশাচগণ আপন স্ত্রীগণ। সহ তাদের অগ্রগামী হয়ে হস্তে, শৃঙ্গ (অর্থাৎ বিষাণ নামক বাদন) ধারণ করে পরিভ্রমণ করে, পাকশালায় গমন করে অট্টহাস্য করে, যারা ব্রীহি ইত্যাদি স্তম্ভে বা গৃহস্তম্ভে অগ্নিরূপ জ্যোতি উৎপাদন করে, সেই সব পিশাচকে আমরা গর্ভিণীর বাসস্থান হতে বিদূরিত (বা বিনাশ) করে দিচ্ছি ৷৷ ১৪৷
যে রাক্ষস প্রভৃতির পশ্চাৎ দিকে পাদাগ্রপ্রদেশ এবং পুরোভাগে পাষ্ণী (অর্থাৎ গোড়ালি), যারা খলজা অর্থাৎ ধান্যশোধনপ্রদেশে জাত, যারা শকধূমজা অর্থাৎ গোবর ও অশ্ব ইত্যাদি জন্তুর বিষ্ঠায় উৎপন্ন, যারা উরুণ্ডা অর্থাৎ মুণ্ডহীন, যারা মটমটা অর্থাৎ মুমুটু শব্দকারী বা ছিন্ন-সর্বাবয়বী, যারা কুম্ভমুষ্ক অর্থাৎ কুম্ভের ন্যায় মুম্বযুক্ত (বিশাল অণ্ডকোষধারী), যারা অয়াশব অর্থাৎ বায়ুবৎ আশুগামী, হে বেদরাশির অধিদেব ব্রহ্মণস্পতি! তুমি এই অভিমন্ত্রিত শ্বেত-সরিষার প্রভাবে তাদের (অর্থাৎ সেই রাক্ষস প্রভৃতিকে) বিনাশ করে দাও। ১৫।
যে রাক্ষসবৃন্দ বিকীর্ণলোচন (অর্থাৎ যাদের দৃষ্টি ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হয় বা যারা বিস্ফারিত নেত্রে দৃষ্টিপাত করে) ও যে রাক্ষসগণের উরুদেশ প্রক্ষীণ (প্রচঙ্কশাঃ), যারা পন্নগ অর্থাৎ পদের দ্বারা গমন করে না, তারা অস্ত্রৈণ অর্থাৎ স্ত্রীরহিত হোক অথবা সর্পে পরিণত হোক। আরও, হে সরিষারূপা ঔষধি! যে, রাক্ষস ইত্যাদি এই পতিরহিতা স্বাধীনপতিকা নিদ্রিতা স্ত্রীকে সংবর্তিত করতে (বা লুকিয়ে রাখতে) ইচ্ছা করছে, তুমি তাদের অধোমুখ করে নিপাতিত করো ৷৷ ১৬৷৷
উদ্ধষী অর্থাৎ উক্তৃষ্ট ধর্ষণযুক্ত, মুনিকেশ অর্থাৎ মুনিবৎ জটাত্মক কেশযুক্ত, জম্ভয়ন্ত অর্থাৎ হিংসুক, মরীমৃশ অর্থাৎ পুনঃ পুনঃ বলাকারী, উপৈষন্ত অর্থাৎ সর্বতং গর্ভিণীর অন্বেষণকারী, উদুম্বল অর্থাৎ উৎসৃষ্ট বলশালী, তুণ্ডেল অর্থাৎ প্রকৃষ্ট তুবন্ত, এবং শালুড নামক পিশাচগণকে এই সরিষারূপা ঔষধি সেইরকম ভাবেই পদাঘাত পূর্বক বিতাড়িত করুক, যেমন ভাবে দুষ্টা গাভী দোহনের পর দুগ্ধের পাত্রকে পশ্চাতের এ পদদ্বয়ের দ্বারা আঘাত করে থাকে ॥ ১৭ ॥
হে গর্ভিণী! তোমার গর্ভকে পীড়িত করণশালী বা আর তোমার উৎপন্ন শিশুকে মারণের ইচ্ছাশালী পিশাচ ইত্যাদি হিংসকগণকে এই ঔষধি পদদলিত করে বিনষ্ট করুক। হে শ্বেত-সরিষা! তুমি সেই গর্ভঘাতক রাক্ষসদের হৃদয়ে মহাধনুর্ধরের (উগ্রধনার) মতো তাড়িত করো (অর্থাৎ উদয়ূর্ণগতি হয়ে তাদের হৃদয়-প্রদেশকে বিদ্ধ করো)। ১৮৷৷
যে পিশাচ ইত্যাদি রাক্ষসগণ অর্ধ-উৎপন্ন (অর্থাৎ অসম্পূর্ণ) গর্ভকে নষ্ট করে দিয়ে থাকে, যারা স্ত্রীলোকের ছদ্মবেশে সূতিকার অর্থাৎ অভিনবপ্রসবার সাথে শয়ন করে, (অর্থাৎ তার ক্ষতি সাধনের সুযোগে রত থাকে), সেই গর্ভিণীকে আপন ভাগরূপে (গ্রহণযোগ্যারূপে) মান্যকারী গন্ধর্ব রাক্ষস-পিশাচগণকে জলরহিত মেঘের বায়ুর দ্বারা তাড়িত করণের মতো এই শ্বেত-সরিষা। বিতাড়িত করে দিক ॥ ১৯
হবন ইত্যাদি হতে বিনিয়োগবশিষ্ট (বিনিয়োগের পর অবশিষ্ট) সরিষাকে গর্ভিণী ধারণ করুক, যাতে তার অভিপ্রায় অনুসারী পুত্র ইত্যাদি লক্ষণযুক্ত গর্ভ বিনষ্ট না হয়। হে গাভিণী! এই উদগ্র্ণ অর্থাৎ উগ্র বলশালিনী ভেষজরূপা শ্বেত ও পীত উভয়বিধ সরিষা নীবিদেশে বস্ত্রাঞ্চলে ধারণ করণের পর, এরাই তোমাকে রক্ষা করবে। ২০।
বিনিয়োগঃ— যে কুকুন্ধাঃ ইতি মন্ত্রস্য পূর্বসূক্তেন সহ উক্তো বিনিয়োগঃ ॥ (৮কা. ৩অ. ২সূ১১-২০ঋ)।
টীকা –৮ম উপযুক্ত ১০টি মন্ত্র দ্বিতীয় সূক্তেরই অংশবিশেষ। এগুলির বিনিয়োগ পূর্বেই উক্ত হয়েছে। …ইত্যাদি। (৮কা, ৩অ. ২সূ-১১-২০ঋ)।
বঙ্গানুবাদ –হে গর্ভিণী! পবীনসাৎ অর্থাৎ বজ্রসদৃশ নাসিকোপেত এবং তঙ্গ, সায়ক ও নগ্নক নামক অসুরগণের নিকট হতে এই পীত-সরিষা (ঔষধি) তোমাকে রক্ষা করুক; সেইসঙ্গে পুত্রলাভার্থে ও পতির আনুকূলার্থে এই ঔষধি তোমার সহায়ক হোক। ২১।
হে ঔষধি! দুই মুখ, চতুনেত্র, পল্ক পাদযুক্ত, অঙ্গুলিরহিত, লতাপুঞ্জের অভিমুখে গমনকারী, সর্বাঙ্গ ব্যাপ্ত পিশাচগণের · (অর্থাৎ সর্বাঙ্গব্যাপী পৈশাচিকতা-সম্পন্ন দুষ্টদের) নিকট হতে তুমি এই গর্ভিণীকে রক্ষা করো ॥ ২২।
যে পিশাচ মনুষ্যের অপরু (কাঁচা) মাংস ভক্ষণ করে, প্রকৃষ্ট কেশযুক্ত যে পিশাচগণ মায়াপূর্বক গর্ভে প্রবেশ করে (গর্ভস্থ ভ্রূণকেও) ভক্ষণ করে যায়, সেই ত্রিবিধ পিশাচগণকে আমরা এই গর্ভিণীর সমীপ হতে বিনাশ (বা বিদূরিত) করছি। ২৩।
শ্বশুরের আজ্ঞাক্রমে পুত্রবধূ যেমন শ্বশুরের পুত্রের (অর্থাৎ আপন পতির) নিকট গমন করে, সেই রকমেই সূর্যের আজ্ঞাক্রমে পৃথিবীর প্রাণীবর্গকে পীড়া প্রদানের নিমিত্ত আগমনশীল পীড়ক পিশাচদের হৃদয়দেশে এই (অভিমন্ত্রিত) শ্বেত ও পীত সরিষা তাড়িত করুক। ২৪
হে শ্বেত সরিষা! উৎপদ্যমান (উৎপন্ন হচ্ছে এমন) গর্ভস্থ শিশুকে রক্ষা করো। জায়মান (জন্মাচ্ছে, এমন) পুরুষ বা স্ত্রী শিশুকে আক্রান্ত হতে দিও না, (অথবা কোন কোন ভূত বিশেষের দ্বারা গর্ভস্থ পুরুষ-জ্বণকে স্ত্রী-ণে পরিণত হতে দিও না)। অণ্ডপ্রদেশ ভক্ষণকারী ও ইতস্ততঃ বিচরণকারী রাক্ষসগণকে, হে পীত সরিষা! এই গর্ভিণীর নিকট হতে অন্যত্র নীত পূর্বক পীড়া প্রদান করো। ২৫।
হে পীত-সরিষা! এই গর্ভিণীর সন্তানহীনতা (অপত্যবিধুরত্ব), মৃত সন্তানের মাতৃত্ব (মৃতবৎসত্ব), সর্বদা উৎপদ্যমান দুঃখ বা হৃদয়ের ক্রন্দন, পাপ বা তার ফলভূত দুঃখের আবর্তন–শত্রুর উপর এই প্রকার দুর্ভাগ্যগুলিকে মাল্যাকারে অর্পণ করো, যেমন আপন কোন প্রিয়তমের উপরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। ২৬।
বঙ্গানুবাদ –বিভিন্ন বর্ণ ও বিভিন্ন আকারশালিনী ঔষধির সম্মুখে সমুপস্থিত হয়ে আমরা ব্যাধি বিনাশ করণের প্রার্থনা জ্ঞাপন করছি। আকাশ যার পিতা, পৃথিবী যার মাতা এবং সমুদ্র যার মূল সেই ঔষধিসমূহ আমাদের যক্ষ্মা ব্যাধি হতে রক্ষা করুক। হে রোগী! তোমার যক্ষ্মা ব্যাধিকে জল ও দিব্য ঔষধিসমূহ প্রতি অঙ্গ হতে আকর্ষণ (টেনে বাহির) করে নিক। হে রোগী! বহু শাখাশালিনী, বিস্তারশালিনী, স্তম্বশালিনী, কূপশালিনী, জীবনদায়িনী, দৈবাত্মক ঔষধিসমূহকে তোমার নিমিত্ত গ্রহণ (সংগ্রহ) করছি।..কল্যাণের নিমিত্ত জীবনদায়িনী, ক্রোধরহিত, রোপনশালিনী পুষ্পমতী জীবন্তীকে আমি আহ্বান করছি। চৈতন্যতাযুক্ত মন্ত্ররূপ ঔষধিসমূহ এই পুরুষের রোগকে নষ্ট করার নিমিত্ত এইস্থানে আগত হোক।…জলোদর ইত্যাদি রোগের বিনাশক, বিষ-প্রশমক, রোগের উপর প্রবল, কাস ইত্যাদি ব্যাধিকে নাশ করণশালিনী এবং কৃত্যাসমূহকে খণ্ডনশালিনী ঔষধিসমূহ এই স্থানে আগত হোক।…স্বয়ং নীতা, ব্যাধিসমূহকে দমনে সমর্থ, মন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত ঔষধিসমূহ এই গ্রামস্থ গাভী, অশ্ব ইত্যাদি পশু এবং মনুষ্যগণের রক্ষক হোক।…যে ঔষধিসমূহ চক্ষের সম্মুখে অবস্থিত, যাদের মধ্যে রোগ-নাশক তত্ব বিদ্যমান রয়েছে, যারা অজ্ঞাত রয়েছে, সেই সকল ঔষধি সমূহকে আমরা জ্ঞাত আছি। ঔষধিসমূহের দর্প পীপল, রাজা সোম এবং হবি হলো অমৃত। ধান্য এবং যব-রূপ ঔষধিসমূহ অন্তরিক্ষ হতে বৃষ্টি হওয়ার কারণে অন্তরিক্ষের সন্তন-স্বরূপ এবং অমৃতত্বের দ্বারা যুক্ত।…ঔষধিসমূহের অমৃত রূপ বল, এই পুরুষকে ভোজন করানো হচ্ছে; আমি এই ঔষধি-সেবনকারীকে শতবর্ষ আয়ুসম্পন্ন করছি।…অহিংসিত গাভীবর্গ যে ঔষধিকে ভক্ষণ করে থাকে, যে ঔষধিগুলিকে মেষ, ছাগ ইত্যাদি ভক্ষণ করে, তাদের সকলের সাথে এই ঔষধিসমূহ তোমাকেও (রোগীকেও) সুখ প্রদান করুক।…হে রোগী! আমি তোমাকে পঞ্চ শলাকা, দশ শলাকাশালী কাষ্ঠের পাদবন্ধন হতে এবং যমের পাদবন্ধন হতে মুক্ত করার নিমিত্ত মন্ত্রশক্তির দ্বারা প্রাপ্ত করে নিয়েছি।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি যক্ষ্মা, জলোদর ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা কর্মে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। এই কর্মে এই মন্ত্রে দশবৃক্ষখণ্ডের লাক্ষাহিরণ্যের দ্বারা বেষ্টিত মণি অভিমন্ত্রিত ও জপ পূর্বক বন্ধন করণীয়। পলাশ, উদুম্বর, জম্বু ইত্যাদি উল্লেখিত বৃক্ষের খণ্ডে মণি নির্মাণ করণীয়। এই সূক্তের দ্বারা ঔষধিরূপ সন্ধীয়মান সুরা অনুমণীয়। (৮কা. ৪অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –ইন্দ্র দেবতা পরাক্রমী, সামর্থশালী এবং শত্রু-সেনাগণকে মথিত করণশালী। তিনি অগ্নিকে মন্থন করুন যাতে আমরা শত্রুগণকে হননে সমর্থ হই। অগ্নিতে পতনশালিনী জীর্ণ বন্ধন-রশি শত্রুসেনাগণকে জীর্ণ করুক। অগ্নির ধূমকে দর্শনমাত্রই শত্রুবর্গ ভয়ভীত হয়ে যাক। হে পীপল! হে খদির! এইসকল গমনশীল শত্রুগণকে ভক্ষণ করো।…বধক কাষ্ঠ হিংসাত্মক উপায়সমূহের দ্বারা এই শত্রুগণকে হিংসা করুক; পরুষ বস্তু এদের বাধা প্রদান করুক। যেমন বৃহৎ জালের দ্বারা বাণ ভঙ্গ হয়ে যায়, তেমনই এই শত্রু ভঙ্গ হোক।…মহান্ ইন্দ্রদেবের জাল অত্যন্ত বিশাল। হে ইন্দ্রদেব! সেই জালের দ্বারা শত্রুবর্গকে পরাজুখ করো। এদের মধ্যে কেউই যেন অবশিষ্ট না থাকে।…নিন্দা, তন্দ্রা, মোহ, আর্তি, নির্ঋতি, বৃদ্ধি ইত্যাদির দ্বারা সেই শত্রুসমূহকে আচ্ছাদিত করছি। এই শত্রু মৃত্যুর পাশের দ্বারা বন্ধন প্রাপ্ত হয়েছে; আমি তাকে মৃত্যুরই অধীন করে দিচ্ছি। এই শত্রুগণকে বন্ধন পূর্বক মৃত্যুদূতবর্গের নিকট গমন করছি। হে মৃত্যুদূতগণ! এই শত্রুগণকে নিয়ে গমন করো। হে যমদূতগণ! এদের সহস্র পরাক্রমীকে নিপাতিত করো। রুদ্রের আয়ুধ এদের শেষ করে দিক। জালদণ্ড গ্রহণ করে সাধ্য দেবতা শত্রুগণকে নিয়ে যাচ্ছেন। একটি জালদণ্ডকে রুদ্র, একটিকে বসু এবং একটিকে আদিত্য গ্রহণ করেছেন।…বনস্পতিসমুদায় তাঁদের দ্বারা নির্মিত হওনশালিনী ঔষধিসকল, লতাসমূহ এবং দ্বিপদ ও চতুষ্পদগণকে মন্ত্রশক্তির দ্বারা প্রেরিত করছেন। এইগুলি সবই সেই শত্রুসেনাকে সংহার করুক। হে শত্রু! এই মৃত্যুপাশের বন্ধনকে তোমরা লঙ্ঘন করতে করতে সমর্থ হবে না। এই কূট (জাল) ঐ শত্রুসেনাকে নানাভাবে সংহার করে ফেলুক।…এই হবি অগ্নির দ্বারা তপ্ত হয়ে আছে, এই হোম রিপু-নাশক শক্তির সাথে যুক্ত। হে ভব, শর্ব দেবতাগণ! আপনারা শত্রু সেনাকে সংহার করুন।…অম্বর, ধরা, অন্তরিক্ষ ও দেবগণ এই শত্রুদলকে অভিশাপিত করুন। এরা যেন কোনওভাবে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত না হয়। এরা যেন। কোনও অথর্ববিদের আশ্রয় প্রাপ্ত না হতে পারে। এরা পরস্পর বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে বিনষ্ট হয়ে যাক। অগ্নির রথকে আকর্ষণকারিণী হলো চারটি দিক; পুরোডাশ হলো পশুর পাদ-খুর; আকাশ-পৃথিবী, পক্ষদ্বয় এবং ঋতুসমূহ এবং লাগাম স্বরূপ। সম্বৎসর তার রথ, পরিবৎসর রথের গদি (সিংহাসন), বিরাট এর ঈষা, অগ্নিমুখ ও চন্দ্রমা এর সারথি। ইন্দ্র একে চালিতকারী এবং এতে উপবেশনকারী। হে রাজন্! এদিক হতে বিজয়, ঐদিক হতে বিজয়, সকল দিক হতে জয়ই জয়। আমাদের যজমান বিজয় লাভ করুন, শত্ৰু পরাভূত হোক; এই মিত্রবর্গের বিজয়ের নিমিত্ত এই আহুতি স্বাহুত হচ্ছে। নীল ও লাল বর্ণের সূত্রের (বা রজ্জ্বর) দ্বারা শত্রুগণকে বেষ্টন করছি, তাদের নিমিত্ত আহুতি দুরাহুতি হোক।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –ইন্দ্রো মন্থতু ইতি অর্থসূক্তস্য শত্রুক্ষয়শভয়নাশনশজয়স্বকীয় বলবর্ধনকর্মসু বিনিয়োগ। তানি কর্মাণি সেনাকর্মাণি নাম ভবন্তি। তত্র সেনাগ্নিসিদ্ধ্যর্থং পূতিরক্ষ্ম (২) ইত্যধর্চেন অগ্নিপাতদেশে জীর্ণাং রঞ্জুং অবধায় অশ্বত্থাবধকয়োর্নাম পিপ্পলকরিমালকয়োঃ কাষ্ঠমোঃ ইন্দ্রো মন্থতু ইতি ঋচা অগ্নিং মন্থতি। ধূমং দৃষ্টা অগ্নিপদরহিতেনার্ধৰ্চেন অনুমন্ত্রয়তে ॥ (৮কা. ৪অ. ২সূ.)। টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি অর্থসূক্ত। এই সূক্তের দ্বারা সূত্রানুসারে শত্রুক্ষয়, শত্রুভীতি ইত্যাদির বিনাশ ও আপন বলবর্ধন কর্মে বিনিয়োগ কর্তব্য। এই কর্মগুলি সেনাকর্ম নামে অভিহিত। এছাড়া এই সূক্তের বিভিন্ন মন্ত্রাংশে এরসমিধ, পলাশসমিধ, তিনিসমিধ, খদিরসমিধ, শরসমিধ সংগ্রহ, এবং সপত্নক্ষয় ইত্যাদি কর্ম সাধিত হয়। কৌশিক সূত্রে (২/৭) এগুলির যথাযথ বিনিয়োগ পাওয়া যায় ॥ (৮কা. ৪অ. ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –এই বিরাট বৎস জল হতে প্রকট হয়েছেন। যিনি জলের আশ্রমে ত্রিভুজ রূপে শয়ন করেছিলেন এবং স্বয়ংই মহত্বের দ্বারা জলকে ব্যথিত করে দিয়েছিলেন, বিরাটের সেই বৎস অভীষ্টকে পূর্ণ করে থাকেন তিনি দেহকে আপন গুম্ফা করে নিয়েছিলেন।…বৃহতের দ্বারা পঞ্চ সাম নির্মিত হয়, তা হতে ষষ্ঠ হয়েছে। আকাশ-পৃথিবী বৃহৎকে নির্মাণ করেছিলেন।… আকাশ-পৃথিবী যে পর্যন্ত বিরাজিত, সেই পর্যন্ত অগ্নি বাধক হতে সক্ষম। বৈশ্বানর অগ্নির উপরেই দৌ প্রতিষ্ঠিত। দিনের ছয় ভাগে স্তোম ছয় ভাগ হয়ে যায়। হে কশ্যপ! তুমি যুক্ত ও যোগ্যকে উত্তম প্রকারে যুক্ত করে (জুড়ে দিয়ে) থাকো। আমরা ছয় ঋষি বলে থাকি যে, বিরাট ব্রহ্মার পিতা, এই নিমিত্ত আমাদের সেই বিরাটের উপদেশ করো।–বিরা যখন প্রচ্যুত হয়ে থাকেন, তখন যজ্ঞও সাধিত হয় না। যখন বিরাটকে উপতিষ্ঠ করানো হয়, তখন যজ্ঞেরও উপস্থান করা হয়। কর্মের দ্বারা প্রাকট্য হওয়ার পর যাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জাগ্রত হয়, সেই বিরাটু পরম ব্যোমে স্থিত আছেন।…এই বিরাট উষা-রূপে প্রথমে উৎপন্ন হয়েছিলেন। ইনিই উষা-রূপে সৃষ্টিলোকের অন্ধকার বিদূরিত করেন। বিরাট সম্বন্ধী উষা অন্যান্য উপায়ে ব্যাপ্ত হয়ে ঝলকিত (দীপ্তিমা) হয়ে থাকেন। সোম, সূর্য, অগ্নি ইত্যাদি সকল দেবতা বিরাটেরই আশ্রিত। বিরাটাত্মক উষা সূর্যের বধূ। ইনি প্রাণিসমুদায়কে প্রকাশ প্রদান করণশালিনী।…সূর্য, চন্দ্র ও অগ্নি সত্য-মার্গে আপন বীর্যের সাথে গমন করেন। এঁদের মধ্যে একের শক্তি ঋত্বিকগণকে তৃপ্ত করে, দ্বিতীয়ের শক্তি বলকে পুষ্ট করে এবং তৃতীয়ের শক্তি রাষ্ট্র-রক্ষণে তৎপর হয়ে থাকে। চতুর্থ শক্তিকে অগ্নি, সোম ও অন্য ঋষিগণ ধারণ করেছিলেন; আবার গায়ত্রী, ত্রিষ্টুপ, অনুষ্টুপ, জগতী, অর্কী এবং বৃহৎ নামক যজ্ঞের পক্ষ নির্মিত (রচিত) হয়। পঞ্চ বলের অনুকূল পঞ্চ দোহ (দোহন), পঞ্চ গাভীর অনুকূল পঞ্চ ঋতু। …ঋতু হতে পূর্ব জন্মে ছয় দিনের ছয় বিভাগের ছয় সাম বহন করে থাকে।…ছয় মাস শীত ঋতুর এবং ছয় মাস গ্রীষ্ম ঋতুর বলা হয়ে থাকে।…সপ্ত হোম, সপ্ত সমিধ, সপ্ত মধু এবং সপ্ত ঋতু হয়ে থাকে।.সপ্ত ছন্দ, চারি উত্তর পরস্পর সমর্থিত হয়।…ঋতের প্রথম অষ্ট ভূত উৎপন্ন হয়, সেগুলি অষ্ট দিব্য ঋত্বিক। হে ইন্দ্র! অষ্ট পুত্ৰশালিনী অদিতি অষ্টমীর রাত্রে হব্য গ্রহণ করে থাকেন। তোমা হেন জন্মশালীতে, তোমার সখ্য ভাবকে লাভ করে আমি সুখী হয়েছি। তোমার কল্যাণ করণশালী ক্রতুই সূকলকে জ্ঞাত হয়ে পরিভ্রামিত হচ্ছে। …প্রথম প্রসূতা ধেনুই অমৃত-রূপ দুগ্ধকে দোহন করেছিল।…পৃথিবীতে একই বৃৎ (কর্মর্করণার্থে নিযুক্ত ব্রাহ্মণ) পূজনীয়।–ইত্যাদি।
টীকা –এই সূক্তটিতে বিরাটু ইত্যাদি বিষয়সম্পর্কিত সংবাদ ও বিচার বর্ণিত হয়েছে। এই সূক্তটি এবং এর পরবর্তী সূক্তটি স্বৰ্গকামী জনের জপে বিনিয়োগ কর্তব্য। (৮কা, ৫অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –এই জগৎ সংসার প্রারম্ভে বিরাট ছিল। এর উৎপত্তি হওয়ার পর সকলের এই ভয় জন্মেছিল যে, এটি বুঝি এক হবে (অর্থাৎ এক হলে এই বিরাটের বিরাটত্ব অসীম হয়ে উঠবে)। সেই বিরাট যখন উক্ৰম (উচ্চলন) করেছিলেন, তখন তিনি গাৰ্হপত্যে প্রবেশ করে গিয়েছিলেন। এইরকম জ্ঞানবান, গৃহমেধী গৃহস্বামী হয়ে যান।…অতঃপর সেই বিরাট আহ্বানীয় অগ্নিতে প্রবেশ করে গিয়েছিলেন।–এটি জ্ঞাতশালী জন দেবতাগণের প্রিয় হয়ে থাকেন। পুনরায় উক্ৰম পূর্বক সেই বিরাট দক্ষিণাগ্নিতে ব্যাপ্ত হয়েছিলেন।–এর জ্ঞাতা যজ্ঞ ঋত দক্ষিণীয়তে বাসকারী হয়ে থাকেন। পুনরায় সেই বিরাট সভাতে প্রবিষ্ট হলে, তা জ্ঞাতশীল ব্যক্তি সদস্য হয়ে থাকেন এবং তাঁর সভায় সকলে সমবেত হন। এইভাবে বিরাট সমিতিতে প্রবিষ্ট হয়ে সামিত্বের সৃষ্টি করেন এবং এই সমিতিতে সৈনিকের আগমন ঘটে। পুনরায় উক্ৰম পূর্বক বিরাট আমন্ত্রণে প্রবিষ্ট হন। এই আমন্ত্রণস্থ বিরাটকে. যিনি জ্ঞাত হন তিনি সকলকে আমন্ত্রণ করার যোগ্য হয়ে। থাকেন এবং সকলেই তাঁর আমন্ত্রণ স্বীকার করে থাকে।
বঙ্গানুবাদ— সেই বিরাট দ্বিতীয়বার উৎক্রমণ করেছিলেন এবং চারি রূপে বিক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি অন্তরিক্ষে হয়ে গিয়েছিলেন।…দেবতা ও মনুষ্যগণ তাঁদের উপজীবনের নিমিত্ত তাকে ঊর্জা, স্বধা, সুনৃতা, ইরাবতী বলে আহ্বান করলেন। তখন ইন্দ্র তার বৎস, গায়ত্রী অভিধানী ও মেঘ তার দুই স্তন্য বৃন্ত হয়েছিল। আবার বৃহৎসাম ও রথন্তর সামও দুই স্তন্যবৃন্ত হয়েছিল। যজ্ঞাযজ্ঞিয় ও বামদেব্য সামও দুই স্তন্য-রূপে প্রকটিত হয়। দেবগণ যজ্ঞাযজ্ঞিয় সাম হতে যজ্ঞকে এবং বামদেব্য সাম হতে জলকে দোহন করেন। এমন যিনি জ্ঞাত হন, তিনি বৃহৎসাম ব্যচকে এবং রথন্তর ঔষধিসমূহকে দোহন করে থাকেন। এই হেন জ্ঞাতশীলের নিমিত্ত যজ্ঞাযজ্ঞিয় যজ্ঞকে এবং বামদেব্য জলকে দোহন করা হয়।
টীকা –পূর্বেই বলা হয়েছে এগুলি ষট্পর্যায়াত্মক, অর্থাৎ দ্বিতীয় সূক্ত হতে সপ্তম সূক্ত পর্যন্ত সব সূক্তই বিরাটপুরুষ সম্পর্কে বিনিযুক্ত এবং স্বর্গকামী জনের পক্ষে এগুলি সূত্রোক্তপ্রকারে জপনীয় ॥ (৮কা, ৫অ. ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –সেই বিরাট উক্রমণের দ্বারা বনস্পতি সমূহের নিকট গমন করেছিলেন। বনস্পতি-সমূহ তাকে হনন করলে তখন তিনি সম্বৎসরে গমন করলেন।…সেই বিরাট পিতৃগণের সকাশে গমন করলে পিতৃগণের দ্বারা তার হনন হওয়ার পর তিনি মাসে সমাগত হলেন।…এই সম্পর্কে, যিনি জ্ঞাত হন, তিনি পিতৃযান মার্গের জ্ঞাতা হয়ে থাকেন। সেই বিরাট এইবার দেবতাগণের সমীপে গমন করলে, দেবতাগণের দ্বারা হনন কৃত হওয়ার পর তিনি পক্ষে উৎপন্ন হন। এই কারণে দেবতাগণের নিমিত্ত পঞ্চদশ দিবসের অবধিতে (পক্ষকালে) বষট করা হয়।… অতঃপর সেই বিরাট মনুষ্যের নিকট গমন করলে তৎক্ষণাই প্রকট হয়ে গিয়েছিলেন। এই নিমিত্ত মনুষ্য দ্বিতীয় দিবসে উপহরণ করে থাকে। এই সম্পর্কে জ্ঞাতশীল জনের গৃহে নিত্য প্রতি অন্ন। লভ্য হয়ে থাকে।
টীকা— এই সূক্তের বিনিয়োগ পূর্ববৎ ॥ (৮কা, ৫অ. ৪সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –সেই বিরাট পুনঃ উক্রমণ করে অসুরগণের সন্নিকটবর্তী হলেন। অসুরগণ তাঁকে ভ্রাতারূপে সম্বোধিত পূর্বক স্বাগত জানালো। তখন তাঁর বৎস হলো বিরোচন এবং লৌহপাত্র হলো পাত্র। দ্বিমূর্ধা অর্থ্য তাকে এবং মায়াকে দোহন করলো। অসুরগণ সেই মায়ার দ্বারা উপজীবন করে থাকে। এমন জ্ঞাতশীল জন উপজীবনের যোগ্য হন। অতঃপর বিরাট পিতৃগণ কর্তৃক স্বধা নামে সম্বোধিত হয়ে স্বাগত জ্ঞাপিত হলেন। তখন যম তার বৎস হয়েছিল এবং রৌপ্যের পাত্র তার পাত্র হয়েছিল। মৃত্যুর দেবতা অন্তক তাকে দোহনের কালে স্বধাকেও দোহন করে ফেলেছিল। পিতৃগণ সেই স্বধার দ্বারা উপজীবন করে থাকেন।… অতঃপর বিরাট মনুষ্যগণের নিকট উপস্থিত হয়ে ইরাবতী নামে সম্বোধিত ও স্বাগত জ্ঞাপিত হয়েছিলেন। বিবস্বান-পুত্র মনু তখন তার বৎস এবং ভূমি তার পাত্র হয়েছিল। বেন-পুত্র পৃথু তাকে দোহন করে কৃষি ও শস্যকেও দোহন করেছিল। সেই কৃষি ও ধান্যই মনুষ্যের উপজীবন হলো।…অতঃপর বিরাট সপ্তঋষির দ্বারা ব্রহ্মান্বতী নামে সম্বোধিত ও স্বাগত জ্ঞাপিত হলেন। আঙ্গিরস বৃহস্পতি তাকে তখন দোহন করলেন এবং সেইসঙ্গে তার ব্রহ্ম ও তপঃকেও দোহন করলেন। উপ ব্ৰহ্ম ও তাপের দ্বারা সপ্তর্ষিগণ উপজীবন করতে থাকেন। এই বার্তা যিনি জ্ঞাত হন, তিনি ব্রহ্মতেজঃ যুক্ত হয়ে থাকেন।
বঙ্গানুবাদ –সেই বিরাট পুনরায় উক্ৰমণ পূর্বক দেবতাগণের নিকট গমন করলেন। তারা তাঁকে ঊর্জা সম্বোধনে স্বাগত জ্ঞাপন করলে ইন্দ্র তার বৎস ও চমস তার পাত্র হলো। সবিতাদের তাঁকে ও ঊর্জাকে দোহন করলে দেবতাগণ সেই ঊর্জার দ্বারা উপজীবন করতে থাকলেন। অতঃপর বিরাট গন্ধর্বগণের নিকট পুণ্যগন্ধ নামে অভিহিত হয়েছিলেন। তখন তাঁর বৎস হয়েছিল সূর্যবর্চার পুত্র চিত্ররথ এবং পাত্র হয়েছিল পুষ্করপৰ্ণ। সূর্যবর্চার পুত্র বসুরুচি তাকে এবং তাঁর পবিত্র গন্ধকে দোহন করলে অপ্সরা ও গন্ধর্বগণ সেই গন্ধের দ্বারা উপজীবন করতে লাগলেন।…অতঃপর ইতর জনগণের নিকট বিরাট তিরোধা নামে সম্বোধিত ও স্বাগত জ্ঞাপিত হলে বিশবা-পুত্র কুবের তাঁর বৎস হয়েছিল এবং অপক্ক (কাঁচা) পাত্র তার পাত্র হয়েছিল। রজতনাভি কাবেরক তাকে ও তিরোধাকেও দোহন করে নেওয়ায় ইতরগণ তিরোধার দ্বারাই উপজীবিকা চালিয়ে থাকে। যিনি এই বার্তা জ্ঞাত হন, তিনি পাপকে তিরোহিত করণশালী হয়ে থাকেন।…অতঃপর বিরাট সর্পগণ কর্তৃক এই বিষবৎ নামে সম্বোধিত ও স্বাগত জ্ঞাপিত হলে বৈশালেয় তক্ষক তার বৎস ও অলাবু তার পাত্র হয়েছিল। ঐরাবতীয় ধৃতরাষ্ট্র নামক সর্প তাকে দোহন করে তার বিষকেও দোহন করে নিয়েছিল। সেই হতে সকল সর্পের উপজীবিকা হয়েছিল বিষ।
বঙ্গানুবাদ –এইরকম জ্ঞাতশালী জন অলাবু দ্বারা সিঞ্চনকারী (কৃত্যাকারী)-কে বিনাশ করে থাকেন। মনের দ্বারা মারণকারীকেও তিনি বিনাশ করেন। তিনি মারণ-বিষেরও মারক। তিনি (অর্থাৎ উপযুক্ত সূক্তগুলির মর্মজ্ঞ ব্যক্তি) শত্রুরূপ অপ্রিয় বিষেরও অনুবিসিঞ্চিত হয়ে থাকেন।
বঙ্গানুবাদ— এই মধুকশা গাভী অন্তরিক্ষ, স্বর্গ, পৃথিবী, সমুদ্র ও অগ্নির দ্বারা উৎপন্ন। সেই অমৃত ধারণশালিনী গাভীকে পূজা করে সকল প্রজা প্রসন্ন হয়ে থাকে। এই পয়স্বতী গাভীর মহান দুগ্ধকেই সমুদ্র বলা হয়।…এর চরিত্র নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। কখনও একে মরুত্বর্গের প্রচণ্ড পুত্রী, অগ্নি ও বায়ুর দ্বারা উৎপন্ন বলা হয়। ..কখনও বলা হয়, একে দেবতাগণ উৎপন্ন করেছেন, বিশ্ব রূপ এর গর্ভ হয়েছে। …তার হৃদয়, সোম স্থাপিত করণের নিমিত্ত কলশ রূপ হয়ে থাকে, সেটি সদা অক্ষয় হয়ে থাকে, শোভন মতিশীল ব্রহ্মা তাতে আনন্দিত হয়ে থাকেন।…হবিঃ ধারণশালিনী, শব্দবতী গাভী, কর্মক্ষেত্রে আগতা হয়ে অগ্নি, চন্দ্র ও সূর্যের তেজের উপর অধিকার করে থাকে এবং দেবাশ্রয় প্রাপ্ত হওনশালীর শব্দকে আপন দুগ্ধের দ্বারা শক্তিযুক্ত করে থাকে।…হে প্রজাপতি! তুমি বৰ্ষক, তুমি পৃথিবীর উপর বল সিঞ্চন করে থাকে। বজ্র-সম গর্জনসমূহই তোমার বাণী।…অগ্নি ও বায়ুর দ্বারাই মরুৎ-গণের উগ্র পুত্রী মধুকশা উৎপন্ন। যেমন প্রাতঃসবনে এ অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের প্রিয় হলো সোম, অশ্বিনীকুমারদ্বয় আমাতে তেজঃ স্থাপিত করুন। ইন্দ্র ও অগ্নির পক্ষে দ্বিতীয় সবনে যেমন সোম প্রিয় হয়, তেমনই ইন্দ্রাগ্নি আমাতে তেজঃ সংস্থাপিত করুন। ঋভুগণের নিকট তৃতীয় সবনে সোম যেমন প্রিয় হয়ে থাকে, তেমনই ঋভুগণ আমাতে তেজঃ স্থাপিত করুন। আমি অগ্নির সেবক, সকলে তা জ্ঞাত হোক। অগ্নি আমাতে অন্নের তেজঃ, সন্তান ও আয়ুর দ্বারা সমৃদ্ধ করুন।… সুন্দর আভূষণধারী হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা মক্ষিকার দ্বারা সঞ্চিত মধুর দ্বারা আমাকে যুক্ত করো।…কশার সাথে মধুসমূহের জ্ঞাতা, মধুমান হয়ে যায়। ব্রাহ্মণ, গাভী, অনড়বা (বৃষ), ধান্য, যব, মধু ও রাজা–এই হলো সপ্ত মধু।…যে আকাশে বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্র। ইত্যাদি প্রকাশমান, সেই আকাশে যে গর্জনসমূহ হয়ে থাকে, তা-ই প্রজাগণের নিমিত্ত অবতীর্ণ হওনশালী প্রজাপতি। অতএব যজ্ঞোপবীতধারী এই নিমিত্ত তৎপর হোন যে প্রজাপতি আমাকে জ্ঞাত হোন।
বঙ্গানুবাদ –শরিনাশ করণশালী কাম বৃষভকে আমি হবিঃ সমর্পণ করছি, হে ঋষভ! আমার স্তুতি শ্রবণ করে আমার শত্রুগণকে নিপাতিত করো।…হে কামদেব! তুমি উগ্র হয়ে থাকো, তুমি স্বামী (প্রভু) হয়ে আছে। তুমি আপন দুঃস্বপ্নকে, নিৰ্ধনতাকে, প্রজাহীনতা ও দারিদ্র্যকে তার উপর প্রেরণ করো, যে আমাদের পরাজয়রূপ বিপত্তিতে পাতিত করতে চেষ্টা করছে।…হে অগ্নি! তুমি আমাদের শত্রুগণের গৃহের বস্তুসমূহকে নষ্ট (ভস্ম) করে ফেলে। সেই গৃহগুলি অন্ধকারে পূর্ণ হয়ে যাক….আমার এই যজ্ঞ আমার চক্ষের সম্মুখে ছবির দ্বারা সম্পন্ন হোক এবং আমাকে শত্রুশূন্য করে দিক। হে কামের প্রমুখতায় অবস্থানশীল দেবগণ! এই ঘৃত ইত্যাদির হবিকে ঘৃতের তুল্যই সেবন করে সুখী হও এবং আমাকে শত্রুরহিত করে দাও। হে কাম! হে ইন্দ্র! তোমরা তোমাদের রথে আরোহিত হয়ে রিপুগণকে নিপাতিত করো। হে অগ্নি! তুমি সেই শত্রুদের নিমিত্ত ঘোর অন্ধকার প্রকটিত করে তাদের গৃহ ও সমস্ত সম্পত্তিকে ভস্মীভূত করে ফেলল।…ইন্দ্র, অগ্নি, সোম, এরা সকলে, আমার শত্রুবর্গকে বিদূরিত করণে সমর্থ। এই নিমিত্ত তোমরা শত্ৰুদলকে দূর করে আমাদের রক্ষা করো।…এই মন্ত্রবলে প্রেরিত হয়ে আমাদের শত্রু পুত্র, পৌত্র ইত্যাদি এবং সকল যোদ্ধা হতে হীন (বিহীন) হয়ে যাক। তার আপন বান্ধবদের দ্বারাও ত্যাজ্য হোক। বিদ্যুৎ তাদের খণ্ড খণ্ড করে দিক। হে যজমানগণ! আপনাদের শত্রুদলকে উগ্র দেবতা মর্দিত করুক।…হে কামদেব! তুমি আপন ব্রহ্মময়, বিশাল কবচের দ্বারা আমার শত্রুদলকে সংহার করো। ঐ শত্রু প্রাণ, আয়ু ও পশু সকল হতে হীন (বিহীন) হয়ে যাক। যে বলের দ্বারা ইন্দ্রদেব রাক্ষসগণকে মৃত্যু রূপ ঘোর অন্ধকারে নিপতিত করে দিয়েছিলেন এবং যে বলের দ্বারা দেবগণ দৈত্যবর্গকে বিতাড়িত করে দিয়েছিলেন, সেই বলের দ্বারা তুমি এই জগৎ হতে আমার শত্রুসমূহকে দূরে নিক্ষিপ্ত করে দাও। …কামদেব প্রথমে উৎপন্ন হলে, দেবতা ও পিতৃগণও তার সাথে সমতা রক্ষা করতে পারেননি। সকল প্রাণীর দ্বারা গৃহীত হওয়ার কারণে কামদেব মহান্ (শ্রেষ্ঠ)।…কামদেব আকাশ, পৃথিবী, অগ্নি ও জলের বিস্তৃতি অপেক্ষাও বিশাল।… সকলের মধ্যে ব্যাপ্ত মহান্ কামদেবকে আমি নমস্কার করছি।…হে কামদেব! তোমার যে কল্যাণকারী দেহ আছে, তার দ্বারা তুমি যাকে বরণ সে-ই সত্য হয়ে যায়। তুমি আপন সেই শরীররূপী বুদ্ধিসমূহের দ্বারা আমাদের দেহে প্ৰবষ্ট হও এবং আপন পাপবুদ্ধিসমূহকে আমাদের নিকট হতে দূর করে শত্রুগণের মধ্যে প্রবিষ্ট করে দাও।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –সপত্নহনংইতি সূক্তং কামদেবতাকং। কাম ইচ্ছারূপে দেবঃ। তৎ সম্বোধ্য সপত্নক্ষয়ং প্রার্থয়তে। তদ এবং। সপত্নহনং ইত্যর্থসূক্তেন অভিচারকর্মণি ঋষভং সম্পাতবন্তং কৃত্বা র দ্বেষ্যাভিমুখং বিসৃজতি। তথা তত্রৈব কর্মণি আশ্বথিঃ স্বয়ংপতিতা সমিধ আদধাতি। তথা চ সূত্রং।..তথা সোম্যগে অনুবন্ধ্যায়াং অপরাজিতায়াং তিষ্ঠ্যাং কামদেবনমস্কারে অস্য সূক্তস্য বিনিয়োগঃ। ত উক্তং বৈতানে (৩১৪)। (৯কা, ১অ. ২সূ.)। টীকা –সপত্ন শব্দের অর্থ–বিপক্ষ, শত্রু। শত্রু-হনন সম্পর্কিত উপযুক্ত সূক্তটিতে ইচ্ছারূপী কাম-দেবতার নিকট প্রার্থনা প্রসঙ্গে তার বিষয়ে স্তুতি রয়েছে। অভিচার কর্মে এই সূক্তের দ্বারা একটি ঋষভকে অভিমন্ত্রিত করে শত্রুর অভিমুখে প্রেরণ করণীয়। এই কর্মে সূত্রানুসারে অশ্বত্থ বৃক্ষের স্বয়ংপতিত যজ্ঞীয় কাষ্ঠ (সমিধ) গ্রহণীয়। তথা সোমযাগে কামদেবতার নমস্কারেও এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে ॥ (৯কা, ১অ. ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –উপমিত, প্রতিমিত ও পরিমিত শালাকে (গৃহকে) উন্মোচিত করে, সকলের নিমিত্ত বরণীয় শালার বন্ধনকে উন্মোচন করা হচ্ছে।…হে শালা! তুমি সকলের দ্বারা বরণযোগ্য।… হে শালা! তুমি হব্যযুক্ত অগ্নিকুণ্ড, দেবতাগণের উপবেশনের আসন এবং পত্নীবর্গ সমভিব্যাহারে উপবেশনের স্থানসমূহের সাথে যুক্ত।…হে শালা! যে তোমাকে নির্মাণ করেছে এবং যে তোমাকে গ্রহণ করে রেখেছে, সেই দুজন বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত আয়ু লাভ করুক।…শালার অধিস্বামীকে, দাতাকে, অগ্নিকে এবং বিচরণ করণশীল পুরুষকে, তথা তোমাকেও (শালাকেও) আমরা নমস্কার করছি। শালাতে উৎপন্ন হওনশালী গো-সমূহ, অশ্ব-সমুদায়কে এই অন্ন প্রদত্ত হচ্ছে। হে বিজাবতী! হে প্রজাবত! আমরা তোমার বন্ধনকে উন্মোচিত করছি।…দ্যাব-পৃথিবীর মধ্যে যে ব্যচ (বিস্তৃত অবকাশ) রয়েছে, তার দ্বারা তোমার এই শালাকে গ্রহণ করছি। অন্তরিক্ষ ও পৃথিবীর যে রচনা-শক্তি আছে, তা আমার উদরস্থ হয়ে থাকে। অতএব আমিই এই শালাকে স্বর্গপ্রাপ্তির নিমিত্ত গ্রহণ করছি।…হে শালা! তুমি প্রতিগ্রহকারীদের নাশ করো না।…তুমি উত্তম পাদশালিনী হস্তিনীর ন্যায় পৃথিবীর উপর স্থিরভাবে দণ্ডায়মান থাকো। বিদ্বানবর্গের মন্ত্রের দ্বারা নির্মিত এই শালীকে সোমপানের স্থানে প্রতিষ্ঠিত ইন্দ্র. ও অগ্নি রক্ষা করুন। ঘর-রূপ বাসার মধ্যে দেহ-রূপ বাসা বিদ্যমান, তাতে গর্ভকোষ অধোমুখে স্থিত রয়েছে। তারই দ্বারা মরণধর্মী মনুষ্য জন্ম নিয়ে থাকে এবং তারই দ্বারা সমগ্র সংসার উৎপন্ন হয়। দ্বিতল, চারিতল, ছয় বা আট বা দশ কক্ষশালিনী শালা নির্মাণ করা হয়; সেই শালাতে আমি জঠরাগ্নির গর্ভাশয়ে শয়ন করার ন্যায় শায়িত আছি।…যক্ষ্মা ব্যাধির নাশ করণশালী জলকে আমি ভরণ করছি এবং অমৃতময় অগ্নির সাথে ঘরের নিকটে (বা পার্শ্বে) উপবেশন করছি। হেঃ শালা! বধূর সমান আমরা তোমাকে পুষ্ট করছি; তুমি আপন পাশবন্ধন আমাদের দিকে পাতিত করো না।..শালা প্রত্যেক দিকের মহত্বকে নমস্কার। দেবগণ এই আহুতি প্রাপ্ত হোন।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –উপমিতাং ইতি সূক্তের শালাসবং দদাতি সব্যজ্ঞবিধানেন স্বৰ্গকামঃ ইতি বিনিয়োগমালা। সূত্রমপি। উপমিতাং ইতি যচ্ছালয়া সহ দাস্য ভবতি তদন্তর্ভবত্যপিহিতং ইত্যাদি (কৌ. ৮/৭)। শালা নাম গৃহং। (৯কা, ২অ. ১সূ.)।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির দ্বারা স্বর্গকামী জন সব যজ্ঞবিধানের দ্বারা সূত্রোক্ত প্রকারে গৃহদানের নিমিত্ত বিনিয়োগ করবেন। বংশ-সন্দংশ ইত্যাদির দ্বারা বদ্ধ শালা উঘাটন পূর্বক প্রতিগ্রহীতাকে দান করণীয়। …ইত্যাদি। (৯কা, ২অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –এটি সহস্র সিঞ্চনে সমর্থ কান্তিমান ঋষভ। এটি দুগ্ধের সাথে যুক্ত। বৃহস্পতির মন্ত্রের দ্বারা যুক্ত গাভীগণের যোগ্য, এই ষণ্ড যজমানের মঙ্গল সাধন পূর্বক সন্তানসমূহের বৃদ্ধি করে থাকে।..ঋষভ বৎসগণের জনক এবং গাভীবর্গের পতি; সে মেঘ সমূহের পালনকর্তা। এর বীর্য অমৃত, আমিক্ষা, প্রতিধুক এবং ঘৃতের স্বরূপ। ঔষধি ও ঘৃত-রস জলের ভাগ, উপনাহ দেবতাগণের ভাগ এবং সোম-পানের নিমিত্ত পর্বতাকার শরীরকে বরণ করেছিলেন।…এই বৃষ ক্ষরণশীল, ঘৃতকে ধারণশালী এবং সহস্র পুষ্টি প্রদান করণশালী। ইন্দ্রের রূপ-ধারণ করতে পারঙ্গম এই ঋষভ আমাদের কল্যাণরূপে মিলিত (প্রাপ্ত) হোক।…এই ঋষভের ওজুঃ ইন্দ্রের ভাগ, এর বাহু বরুনের, ককুদ (স্কন্ধের ঝুঁটি) মরুৎ-গণের, অংস (স্কন্ধ) অশ্বিদ্বয়ের এবং সংভৃত (পোষণ) বৃহস্পতির প্রিয়।…হে ঋষভ! তুমি দেবতাগণকে দুগ্ধ, হবিঃ ইত্যাদির দ্বারা যুক্ত করে বৃদ্ধি সাধিত করে থাকো। এই নিমিত্ত তোমাকে ইন্দ্র বলা হয়। মন্ত্রযুক্ত যজ্ঞের বৃষভকে দান-করণশালী (অর্থাৎ যিনি বৃষভ-দান করেন), এক মুখশালিনী সহস্র গাভী দান করণশালীর তুল্য হয়ে থাকেন।…ইন্দ্র যেমন দেবতাগণের মধ্যে আগমন করেন, তেমনই গাভীগণের মধ্যে গর্জন করতে করতে আগমনশীল ঋষভের অঙ্গকে ব্রহ্মা মঙ্গলময় বাণীর দ্বারা প্রার্থনা করে থাকেন।…ভগ, অনুমতি, মিত্র, আদিত্য, বায়ু, সূর্য, সিনীবালী প্রমুখ।– দেবগণ ঋষভের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কল্পনা করেছিলেন।…গাভীগণের পতি প্রধান (বা শ্রেষ্ঠ) ঋষভ শৃঙ্গের দ্বারা রাক্ষসগণকে বিতাড়িত করে থাকে, দৃষ্টির দ্বারা দারিদ্র্য দূর করে এবং আপন শ্রোত্রের দ্বারা সৌভাগ্যকে শ্রবণ করে।…গাভী হোক, প্রজা হোক, শরীরে বল হোক, দাতার নিমিত্ত ঋষভ এই সবই দিয়ে থাকে।..হে ইন্দ্র এই ঋষভের বীর্য তোমারই। হে গাভীগণ! এই যুবা বৃষ তোমাদের নিমিত্ত রক্ষিত আছে। তোমরা এই গোষ্ঠে তার সাথে ক্রীড়া পূর্বক বৎসগণের সাথে বিচরণ করো এবং আমাদের ত্যাগ করো না। তুমি ধনের দ্বারা আমাদের পুষ্ট করো।
বঙ্গানুবাদ— (এই সূক্তে যে অজ-এর উল্লেখ করা হয়েছে তার অর্থ ছাগ বা পাঁঠা বলে বুঝলে ভুল হবে; বরং এর অর্থ অজন্মা জীবাত্মা বোঝাই উচিত। কারণ এই সূক্তেই বলা হয়েছে। অজ হলো ব্রহ্মজ্ঞানী, বলকে জ্ঞাতশালী এবং অগ্নির শিখায় প্রকটনশালী)।
এই অজকে নিয়ে যজ্ঞ-কার্য আরম্ভ করো। যে লোকে পুণ্যাত্মা গমন করেন, সেখানে এই অজও গমন করুক এবং অন্ধকার উত্তীর্ণ হয়ে স্বর্গপ্রাপ্ত হোক। হে বিজ্ঞ অজ! এই যজ্ঞে, আমি তোমাকে ইন্দ্রের ভাগের নিমিত্ত যজমানের নিকট সমর্পণ করছি। তুমি আমাদের বৈরীগণের উপর পাদস্থাপন করো। এই যজমানের পুত্র ইত্যাদি তাহলে পাপরহিত তোক।…হে অজ! তুমি বিভিন্ন লোককে দর্শন পূর্বক তৃতীয় নাকে (স্বর্গে) গমন করো।…আমি ঋকের (মন্ত্রের) দ্বারা অগ্নির উপর কলসকে স্থাপিত করছি।..অজই জ্যোতি, সে-ই অগ্নি; জীবিত পুরুষ অজকে দান করুক। শ্রদ্ধার সাথে এই লোকে দান-কৃত অজ পাপসমূহকে দূরীভূত করে স্বর্গের সাধন করে থাকে। পঞ্চৌদনের (পঞ্চযজ্ঞের) পাঁচটি ক্রম আছে। তা সূর্য, চন্দ্র ও অগ্নি এই জ্যোতিত্রয়ের উপর আরোহণ করে। হে পঞ্চৌদন! তুমি যজ্ঞাত্মক সুকর্মের মধ্যে গমন করে স্বর্গকে প্রাপ্ত হও।…ব্রহ্মার নিমিত্ত কৃত পঞ্চৌদন দাতাকে তৃপ্ত করে দিয়ে থাকে। এই অজ দাতাকে তৃতীয় নাক ও ত্রিপৃষ্ঠ ইত্যাদি স্বর্গে আরোহিত করিয়ে দিয়ে থাকে। হে অজ! ব্রহ্মার নিমিত্ত দানকৃত হয়ে পঞ্চৌদন দাতার নিকট কাম পূর্ণ করণশালিনী ধেনুতে পরিণত হয়ে যায়।…হে পিতৃগণ! ব্রহ্মার নিমিত্ত তৃতীয় পঞ্চৌদন রূপ যে অজকে দান করা হয়, তা তোমাদের নিমিত্ত জ্যোতিরূপ হয়ে যায়। এই অজ ব্রহ্মাকে জ্ঞাতশালী, বলকে জ্ঞাতশালী এবং অগ্নির জ্বালার দ্বারা প্রকট হওনশালী। এর দ্বারা পূর্ণ ইষ্টপূর্তি, অভিপূর্তি ও ব র্মকে দেবগণ কল্পিত করুন। …হে অজ! তুমিই স্বর্গ, এমনকি অঙ্গিরাবংশীয় ঋষিগণও তোমার দ্বারাই স্বর্গকে জ্ঞাত হয়েছিলেন।…অজ প্রথমে ব্যক্রমণ করেছিল, ভূমি তার উদর, দ্যৌ তার পৃষ্ঠ, অন্তরিক্ষ মধ্যভাগ, দিসমূহ পঞ্জর, তথা সমুদ্র কুক্ষি হয়েছিল। তার নেত্র সত্য ও ঋতু হয়েছিল, শির বিরাট হয়েছিল, প্রাণ সত্য ও শ্রদ্ধা হয়েছিল; এই নিমিত্ত পঞ্চৌদন অজ অসীমিত যজ্ঞই হয়ে গিয়েছিল।…যে ব্যক্তি দক্ষিণাযুক্ত পঞ্চৌদন অজকে দান করে থাকেন, তিনি স্বর্গকে উপভোগ করে থাকেন।…যে দাতা উপবহণ বৃষভ এবং অনুপূর্ববৎসা ধেনুকে স্বর্ণ-বস্ত্রের সাথে দান করে থাকে, সে শ্রেষ্ঠ স্বর্গলোকে গমন করে থাকে।…পঞ্চৌদন অজই নৈদাঘ ঋতু। যে এই নৈদাঘ নামক গ্রীষ্ম ঋতুকে জ্ঞাতশালী হয় এবং পঞ্চৌদন অজকে দক্ষিণার সাথে দান করে, তার শুভ কর্ম শত্রুর ঐশ্বর্যকে ভস্মীভূত করে দিয়ে থাকে।…পঞ্চৌদন অজকে কুবন্ত ঋতুরূপে জ্ঞাত হয়ে, কিংবা তাকে সংযন্ত ঋতুরূপে জ্ঞাত হয়ে, কিংবা তাকে পিন্বন্ত ঋতুরূপে জ্ঞাত হয়ে, কিংবা তাকে উদ্যন্ত ঋতুরূপে জ্ঞাত হয়ে, কিংবা তাকে অভিভূ ঋতুরূপে জ্ঞাত হয়ে, ঐ ঐ ঋতুতে দক্ষিণাযুক্ত পঞ্চৌদনকে দান করে, সে শত্রুর ধনসমূহ, সম্পদরাশি, ঐশ্বর্য, লক্ষ্মী ইত্যাদি ভস্ম করে থাকে। …সকল দিক, সকল অন্তর্দিকের সাথে সমান মনঃশালিনী হয়ে এই পঋেীদুনকে স্বাগত করুক। সেই দিকসমূহ, (হে যজমান!) তোমার যজ্ঞের রক্ষক হোক; তাদের নিমিত্ত আমি (ঋত্বিক) এই হবিঃ সমর্পণ করছি। [ সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –অস্মিন সূক্তে পৗেদনে নামে সবে হৃয়মানস্যাজস্য জীবতো মারিতস্য চ প্রশংসা। অপরাজিতায়া আনীয়মানোজঃ প্রোক্তপ্রকারেণ হতঃ সংস্কৃতশ্চ ইন্দ্রং তপয়িত্বা তৃতীয়নাকে নাম স্বর্গভাগে যদ্বা সুকৃতাং পুষ্ণলোকে গচ্ছতি। তত্র গতপূর্বস্য যজমানাদেশ্চ তমোহন্তা ভবতীত্যাদি বর্ণনং। সাম্প্রদায়িকা অপ্যেবমেব। পঞ্চোদনসবে আ নয়ৈতং ইত্যর্থসূক্তস্য, বিনিয়োগঃ।…তথা অগ্নিচয়নে পুনশ্চিতৌ যেনা সহস্রং ইত্যনয়া গার্যপত্যে চীয়মানা ইষ্টকা ব্রহ্মা অনুমন্ত্রয়েত। তদ্ উক্তং বৈতানে। …যেনা সহস্রং ইতি বৈশ্বকর্মণহোমান ইতি (বৈ. ৫/২ ॥ (৯কা, ৩অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ— যা প্রত্যক্ষ ব্রহ্মের জ্ঞাতা, যার গ্রন্থিতেই সম্ভার এবং অনুক্যই ঋসমূহ; যার হৃদয় যজুঃ এবং লোম সাম এবং পরিস্তরণই হব্য; যে অতিথিপতি অতিথিকে দেখে থাকে, সে দেবযজ্ঞকেই দর্শনশালী হয়। অতিথির দ্বারা ভাষণই দীক্ষা এবং উদকের প্রার্থনাই প্রণয়নস্বরূপ।… অগ্নিযোমীয় পশুকে বন্ধনই তৰ্পণ ..ধান্য ও যবই সোম। উল্খল ও মূসলই গ্রাবা।…দবীহ সুবা, শুদ্ধ করণই আয়বন, কলশই দ্রোণকলশ (কুম্ভ) এবং কৃষ্ণমৃগের চমই বায়ব্য, পাত্র।
টীকা –স্বৰ্গকামী জন উপযুক্ত সূক্তটির দ্বারা সম্প্রদায়ানুসারে সূত্রোক্ত প্রকারে জপ করবেন–এমনই বিনিয়োগের নির্দেশ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই সূক্তটি এবং এর পরবর্তী পাঁচটি সূক্তে একই রকমের বক্তব্য ও বিনিয়োগ বিধৃত আছে। এগুলিতে অতিথির মাহাত্ম, সভাজন ও তার সভাজনের সেবার যজ্ঞফল লাভের তুল্য ফল ও আতিথেয়তার প্রশংসা বর্ণিত হয়েছে ৷ (৯কা, ৩অ. ২সূ.)।
যজমানব্রাহ্মণং বা এতদতিথিপতিঃ কুরুতে যদাহার্যাণি। প্রেক্ষত ইদং ভূয়া ইদামিতি। ১। যদাহ ভূয় উদ্ধরেতি প্রাণমেব তেন বর্ষীয়াংসং কুরুতে। ২ উপ হরতি হবীংষ্যা সাদয়তি। ৩। তেষামাসন্নানামতিথিরাত্মন্ জুহোতি। ৪সুচা হস্তেন প্রাণে ঘূপে সুক্কারেণ বষট্কারেণ। ৫৷৷ এতে বৈ প্রিয়াশ্চাপ্রিয়াশ্চর্ভূিজঃ স্বর্গং লোকং গময়ন্তি যদতিথয়ঃ ॥ ৬ স য এবং বিদ্বান্ ন দ্বিষন্নশীয়ান্ন দ্বিষতোহমশীয়ান্ন মীমাংসিতস্য ন মীমাংসমানস্য৷ ৭৷ সর্বো বা এষ জগ্ধপাপ্পা যস্যান্নমন্তি। ৮। সর্বো বা এষোইজদ্ধপাস্ম্যা যস্যান্নং নাশ্নন্তি ॥ ৯। সর্বদা বা এষ যুক্তগ্রাবাপবিত্রো বিততাব্বর আহৃতজ্ঞতুর্য উপহরতি ॥ ১০৷ প্রাজাপত্যো বা এতস্য যজ্ঞো বিততো য উপহরতি ৷ ১১৷ প্রজাপতো এষ বিক্রমাননুবিক্রমতে য উপহরতি। ১২ যোহতিথীনাং স আহবনীয়ো যো বেশ্মনি স গার্যপত্যো। যস্মিন্ পচন্তি স দক্ষিণাগ্নিঃ ॥ ১৩৷৷
বঙ্গানুবাদ— এই অতিথিপতি অধিক গুণসম্পন্ন, এইরকম দর্শনশালী যজমান ব্রাহ্মণেরই হিত সাধিত হয়। উঠাও, ভক্ষণ করো (অতিথিকে) এমন কহনশীল ব্যক্তি তার প্রাণেরই বৃদ্ধি সাধিত করেন।..উপহরণ পূর্বক অতিথি সেই হবিকে গ্রহণ করে থাকেন। অতিথি সেই স্পৃষ্ট হওয়া পদার্থকে আপন আত্মায় হবন করে থাকেন। তিনি হস্তরূপী সুবায়, প্রাণরূপী যুপে এবং বযটুকার রূপী সুককারের দ্বারা আপন আত্মায় হবন করে থাকেন।…অতিথিগণকে সর্বদা অন্নদানরত ব্যক্তি গ্রাবাসমূহ সহ, আর্দ্র পবিত্র যজ্ঞকরণশালী ও যজ্ঞকে পূর্ণ করণশালী হয়ে থাকেন।…অতিথি আহ্বানই আহ্বানীয় অগ্নি, গৃহে স্থিত অগ্নিই গার্হপত্য অগ্নি এবং রন্ধনশীল অগ্নিই দক্ষিণাগ্নি।
ইষ্টং চ বা এষ পূর্তং চ গৃহাণামাতি ষঃ পূবোহতিথেরশ্নাতি। ১। পয়শ্চ বা এষ রসং চ গৃহাণামশ্নাতি যঃ পূর্বোহতিথেরশ্নতি। ২৷৷ উজাং চ বা এষ ফাতিং চ গৃহাণামাতি যঃ পূর্বোহতিথেরশ্নাতি ॥ ৩॥ প্রজাং চ বা এষ পশূংশ্চ গৃহাণামাতি যঃ পূর্বোহতিথেরশ্নাতি। ৪ কীর্তিং চ বা এষ যশশ্চ গৃহাণামশ্নাতি যঃ পূর্বোহতিথেরাতি ॥ ৫৷৷ শিয়ং চ বা এষ সংবিদং চ গৃহাণামশ্নাতি যঃ পূর্বোহতিথেরশ্নাতি৷ ৬ ৷৷ এষ বা অতিথিচ্ছোত্রিয়স্তস্মাৎ পূর্বে নামীয়াৎ ৭৷ অশিতাব্যতিখাবশ্নীয়াদ যজ্ঞস্য সাত্মত্বায়। যজ্ঞস্যাবিচ্ছেদায় তদ ব্ৰতম্ ॥৮ _ এতদ বা উ স্বাদীয়ো যদধিগবং ক্ষীরং বা মাংসং বা তদেব নাশীয়াৎ। ৯৷৷
বঙ্গানুবাদ –যিনি অতিথির পূর্বে ভোজন করে থাকেন, তিনি গৃহের সকল ইষ্টকর্মের ফলকেই ভক্ষণ করে থাকেন। এইভাবে, অতিথির পূর্বে ভোজনকারী ব্যক্তি তার গৃহের দুগ্ধ ও, রসকে, গৃহের বল ও সমৃদ্ধিকে, গৃহের প্রজা ও পশুকে, গৃহের যশকে এবং গৃহের শ্রী ও সমান মতিকে নষ্ট করে থাকেন। শ্রোত্রিয়ই বাস্তবিক রূপে অতিথি হয়ে থাকেন, সুতরাং তার পূর্বে ভোজন করা উচিত নয়। অতিথির ভোজনের পর ভোজন করাই গৃহস্থের ব্রত। গাভীর দুগ্ধ ও মাংস (আমিষ পদার্থ) ভক্ষণ অনুচিত।
টীকা— এই সূক্তের বিনিয়োগ দ্বিতীয় সূক্তে উল্লেখিত হয়েছে। (৯কা, ৩অ. ৪সূ.)।
স য এবং বিদ্বান্ ক্ষীরমুপসিচোপহরতি ॥১॥ যাবদগ্নিষ্টোমেনেস্ত্রা সুসমৃদ্ধেনাবরুধে তাবদেনেনাব রুধে ৷৷ ২৷৷ স য এবং বিদ্বাৎসর্পিরুপসিচোপহরতি। ৩। যাবদিতরাত্রেণেষ্টা সুসমৃদ্ধেনাবরুধে তাবদেনেনাব রুধে ॥৪॥ স য এবং বিদ্বান্ মধূপসিচোপহরতি ॥ ৫৷৷ যাবৎ সত্ৰসদ্যেনো সুসমৃদ্ধেনাবরুধে তাবদেনেনাব রুধে। ৬। স য এবং বিদ্বান্ মাংসমুপসিচোপহরতি ॥ ৭৷৷ যাবদ দ্বাদশাহেনো সুসমৃদ্ধেনাবরুধে তাবদেনেনাব রুধে ॥ ৮ স য এবং বিদ্বানুদকমুপসিদ্যোপহরতি। ৯। প্রজানাং প্রজননায় গচ্ছতি প্রতিষ্ঠাং প্রিয়ঃ প্রজানাং ভবতি য এবং বিদ্বানুদকমুপসিচ্যোপহরতি ॥ ১০।
বঙ্গানুবাদ— এই সম্পর্কে যিনি জ্ঞাত আছেন (অর্থাৎ গো-দুগ্ধ ভক্ষণ অনুচিত, এই কথা যিনি জানেন), তিনি দুগ্ধকে উপসেচন পূর্বক অতিথির নিমিত্ত ভোজ্য পদার্থে পরিণত করে অগ্নিষ্টোমের দ্বারা যজ্ঞ করার পর যতটুকু স্থান নিজের নিমিত্ত উন্মুক্ত (প্রাপ্ত) করা হয়, অতিথির (সেবার) দ্বারা ততটাই স্থান প্রাপ্ত হন।…অতিথির নিমিত্ত মৃতকে উপসেচনকারী জন, অতিরাত্র যজ্ঞ সাধনের পরে স্বর্গের যতটুকু অধিকার প্রাপ্ত হওয়া যায়, অতিথির দ্বারা ততটাই অধিকার লাভ করেন। অতিথির নিমিত্ত মধুযুক্ত ভোজ্য পদার্থ আনয়নকারী জন সত্ৰসদ্য যজ্ঞের ফলের ন্যায় স্বর্গফল প্রাপ্ত হন। এইভাবে অতিথির নিমিত্ত বস্তুকে উপসৈচন পূর্বক খাদ্য আনয়নকারী ব্যক্তি দ্বাদশাহ কর্মের ফল লাভ করেন। অতিথির নিমিত্ত জল উপসেচনপূর্বক ভোজ্য আনয়নকারী পুরুষ সন্তানবর্গের প্রজনন প্রাপ্ত হন, প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং প্রজাবর্গের প্রিয় রূপে গণ্য হন।–ইত্যাদি।
তম্মা উষা হিঙকপোতি সবিতা প্র স্তেতি৷ ১বৃহস্পতিরূর্জয়োয়তি ত্বষ্টা পুষ্ট্যা প্রতি। হরতি বিশ্বে দেবা নিধনম্ ॥ ২ নিধনং ভূত্যাঃ প্রজায়াঃ পশূনাং ভবতি য এবং বেদ ৷৷ ৩৷ তস্মা উদ্যন্তসূর্যো হিকৃণোতি সঙ্গবঃ প্র স্তেীতি। ৪মধ্যন্দিন উগায়ত্যপরাহ্নঃ প্রতি হরত্যস্তংযন্নিধন। নিধন ভূত্যাঃ প্রজায়াঃ পশুনাং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৫তম্মা অভ্রো ভবন্ হিকৃপোতি স্তনয় প্র স্তেীতি ৷৷ ৬ ৷৷ বিদ্যোতমানঃ প্রতি হরতি বর্ষায়ত্যু নিধন। নিধন ভূত্যাঃ প্রজায়াঃ পশূনাং ভবতি য এবং বেদ। ৭। অতিথী প্রতি পশ্যতি হিকৃণোত্যভি বদতি প্ৰ স্তৌত্যুদকং যাচয়তি ॥ ৮৷৷ উপ হরতি প্রতি হরত্যুচ্ছিষ্ঠং নিধন। ৯. নিধনং ভূত্যাঃ প্রজায়াঃ পশুনাং ভবতি য এবং বেদ। ১০
বঙ্গানুবাদ –অতিথি-সেবকের নিমিত্তই প্রজাগণ ধন্য ধন্য রব করে, সূর্য তাঁকে যশস্বী করেন, বৃহস্পতি অন্নরসের দ্বারা উৎপন্ন পুষ্টি উগায়ন করেন, ত্বষ্টা পুষ্টি দান করেন এবং সামপরিসমাপ্ত করণশালিনী বাণীর দ্বারা বিশ্বদেবগণ তাঁর স্তুতি করে থাকেন। সূর্য তার প্রশংসাও করেন এবং তিনি ঐ অতিথি-সেবকের মৃত্যুকে বিনাশ করেন।…মেঘও তার প্রশংসায় গর্জন করে।…এমন যিনি জানেন, তিনি ভূতি (অষ্ট-ঐশ্বর্য), প্রজা ইত্যাদি লাভ করেন। টীকা –এই সূক্তের বিনিয়োগ পূর্ববৎ। (৯কা, ৩অ. ৬সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –যিনি অভিলষিত কার্যশালী ক্ষাকে আহ্বান করেন, তিনি শ্রুতিকেই শ্রবণশালী হন।..হস্তে পাত্র গ্রহণ করে, অগ্রে-পশ্চাতে ভ্রমণ পূর্বক পরিবেশনশালীই চমস ও অধ্বর্য।.. অতিথিগণকে পরিবেশন করে গৃহের নিকটে আগমনশীল অতিথিপতি, অবyথ স্নান পূর্বক গৃহে উপবেশনকারীর সমান। ভোজনসামগ্রীগুলিকে পৃথক পৃথকভাবে পরিবেশন করে দক্ষিণা দিয়ে দণ্ডায়মান থাকা, এটাই উদবসান।…উপহৃত হওয়ার পর দেবতাগণের মধ্যে ভোজন করা হয়, দেবগণের মধ্যে যে প্রাণী আছে, তাদের দ্বারা উপহৃত হয়ে থাকে।…(অতিথিপতি) এই লোক ও পরলোকেও সাদরে আহূত হয়ে থাকেন। তিনি এই লোক ও পরলোককে লাভ করে থাকেন। যিনি এই তথ্য জ্ঞাত হন, তিনি জ্যোতির্ময় লোক প্রাপ্ত হন।
টীকা –এই সূক্তের বিনিয়োগ পূর্ববৎ ॥ (৯কা, ৩অ. ৭সূ)। –উপযুক্ত সূক্তে বৃষভকে বলি প্রদান করে তার মাংসে ভিন্ন ভিন্ন দেবতার উদ্দেশে যজ্ঞের নির্দেশ রয়েছে। সেই প্রসঙ্গে বৃষভের প্রশংসা ও তার কোন্ কোন্ অঙ্গ কোন্ দেবতার কত প্রিয় তা বলা হয়েছে। বৃষভবলি হবনের ও মহত্ব বর্ণিত হয়েছে।…বৃষোৎসর্গে এই সূক্তের দ্বারা ঋষভকে অভিমন্ত্রিত পূর্বক তাকে ত্যাগ করার বিধান রয়েছে। মূল বিনিয়োগে উল্লেখিত ছয়টি মন্ত্রের সাথে এতং বো যুবানং ঋকটির দ্বারা বৎসের অভিমন্ত্রণ পূর্বক পোণ করণীয়। এই সূক্তের দ্বারা পুষ্টিকামী ব্যক্তি কর্তৃক বশাবিধানের দ্বারা, সূত্রানুসারে বৃষভের দ্বারা, ইন্দ্রের যাগ করণীয়। আবার সম্পৎকামী ব্যক্তি কর্তৃক পৌর্ণমাসীতে ববিধানের দ্বারা, শ্বেতবর্ণের বৃষভের দ্বারা, ইন্দ্রের যাগ করণীয়।..ইত্যাদি। (৯কা, ২অ, ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –এই আহ্বান করণের যোগ্য সূর্য, স্তুতির দ্বারা সকলকে পালন করে থাকেন। বায়ু এঁর মধ্যম স্থানীয় ভ্রাতা। তিনিই আকাশে জল বহন করে নিয়ে যান। এই বায়ুর তৃতীয় ভ্রাতা অগ্নি। এই প্রকার বায়ু, সূর্য ও অগ্নিরূপ জ্যোতিসমূহের মধ্যে আমি সূর্যকেই মুখ্য বলে মনে করি। …পলায়নপ্রয়াসী কিরণসমূহ অন্য জ্যোতিসমূহের তেজকে দূরীভূত করে একচক্রশালী সূর্যের রথে মিলিত হয়ে যায়। এই সূর্য সপ্ত ঋষির দ্বারা নমস্কৃত হয়ে, সপ্ত অশ্বের দ্বারা বাহিত রথে আরোহণ পূর্বক গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত নামক ঋতুগুলির কাল নির্ধারণ করে ভ্রমণ করে থাকেন। সেই রথে সপ্ত রশ্মিও অবস্থান করে। …আমি (অধ্যাত্ম-জিজ্ঞাসু ঋত্বিক) জানতে চাই–ভূমিকে প্রাণ দানশালী, জলকে রক্ষাকারী আত্মা কোথায় আছে? এই প্রথম উৎপন্ন প্রপঞ্চকে কে দেখেছে?…সূর্যের বিষয়ে যিনি জানেন, তিনি বলবেন কি যে, এঁর প্রতিষ্ঠা কেমন করে হয়?…সত্যলোক নামে যে স্থান আছে, সেইস্থানে কি কেউ গমনে সমর্থ?…আমি আদিত্যমণ্ডলে দৃষ্ট, শ্রুতির দ্বারা প্রতিপাদিত সেই হিরন্ময় পুরুষের স্বরূপ কে আমাকে প্রদর্শন করাবে?..সকলের মাতা (নির্মাত্ৰী) পৃথিবী সূর্যের উৎপত্তি কালেই পিতা (পালক) দ্যুলোকস্থ সূর্যের সেবা করে থাকেন এবং মন বুদ্ধির দ্বারা সম্পন্ন হয়ে যায়।…বলবতী স্ত্রীসমূহে গর্ভ স্থিত হয়, বৎস ধেনুর দিকে দর্শনমাত্রই শব্দ করে।…তিন দ্যৌ রূপ তিনটি পিতা এবং তিন পৃথিবী ৰূপ তিনটি মাতা, এর মধ্যভাগে এক সূর্য স্থিত আছেন। বিশ্বকে জ্ঞাতশীল আকাশের পৃষ্ঠে বিশ্বকে অপ্রাপ্তশালিনী বাণী আলোচিত হয়। সেই পঞ্চ অরযুক্ত একচক্র ই রথে (ঋতুরূপ কালচক্রে) সম্পূর্ণ জগৎ স্থিত আছে; তার ভারশালী অক্ষ স্বয়ং সন্তাপিত হয় না এবং সেটি পুরাতন হলেও কোন ভাবে ভঙ্গ হয় না। দ্বাদশ-মাসরূপ আকৃতি সম্পন্ন সম্বৎসর স্বয়ং চালিত হয়ে কখনও জীর্ণ হয় না এবং এই পঞ্চ ঋতুরূপ পদশালীকে স্বর্গের পরার্ধে শয়নশালী বলা হয়। হে অগ্নি! এই সম্বৎসরের সন্তানরূপ সপ্তশত বিংশতি সংখ্যক মিথুন-যুগল বিরাজমান। (৩৬০ দিবা ও ৩৬০রাত্রি)।…শ্বেতবর্ণশালিনী গাভী (আহুতি) (বৎসস্থানীয় অগ্নিকে) সম্মুখস্থ পদদ্বয়ের দ্বারা অন্নকে (অগ্নিকে) নিম্নদিকে এবং পশ্চাদবর্তী পদদ্বয়ের উপর ভর দিয়ে বৎসকে ধারণ করে সূর্যের দিকে উখিত হচ্ছে। …হে সোম! তুমি ও ইন্দ্র যা করতে আকাঙ্ক্ষা করো (অর্থাৎ যে মণ্ডপে পরিভ্রমণ করতে চাও), সেই লোক ধারণ করণে সমর্থ হয়।..সমান মায়ার দ্বারা যুক্ত এবং সমান প্রসিদ্ধিশালী দুটি সুন্দর পক্ষী (জীবাত্মা ও পরমাত্মা) একই বৃক্ষের (আদিত্যের) উপর উপবিষ্ট। পরন্তু একটি পক্ষী (জীবাত্মা) সুস্বাদু পীপলকে (দেহ হতে উদ্ভূত সুখ-দুঃখরূপ ফলকে)। ভোজন (ভোগ) করে ও অপরটি (পরমাত্মা) তা ভোজন না করে সবকিছু দর্শন করতেই থাকে। বৃক্ষের যে ভাগ সুস্বাদু বলা হয়, তাতে যে মধুপানকারী পক্ষী বসে থাকে, সে সৃষ্টির বিস্তার করে। থাকে। …ইত্যাদি।
টীকা— এই অনুবাকের সলিলগণে পাঠ আছে। সুতরাং প্রথম কাণ্ডের প্রথম অনুবাকের পঞ্চম সূক্তে (আপো হি ষ্ঠা ইত্যাদি) এই সম্পর্কিত বিস্তৃত আলোচনা দ্রষ্টব্য। ঋগ্বেদের ১ম মণ্ডলের ১৬৪ সূক্তে এই সম্পর্কে ব্যাখ্যা আছে। এই মন্ত্রগুলির মধ্যে আধ্যাত্মিক পক্ষে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা অবশ্য অথর্ববেদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয়; কারণ আভিচারিক ক্রিয়ায় যথাযথ মন্ত্রই বিনিয়োগে প্রযোজ্য, তার আধ্যাত্মিকতা বা রূপকত্ব প্রযোজ্য নয়। (৯কা, ৫অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –গায়ত্রীর মধ্যে গায়ত্র এবং ত্রৈষ্টুভে ত্রিষ্টুপ নিরতক্ষিত (বা নিহিত) হয়ে থাকে এবং জগতীতে জগৎ নিহিত আছে। এটি বাস্তবিকভাবে জ্ঞাতশালী জন অমৃতত্ব ভোগ করে। গায়ত্রের দ্বারা অর্ক, অর্কের দ্বারা সাম, সাম হতে ত্রিষ্টুপ, ত্রিষ্টুপ হতে বাক্ এবং বাকের দ্বারা দ্বিপদা, চৌপদা ইত্যাদি ছন্দ ও সেই ছন্দের দ্বারা সপ্ত বাণীকে (সুরকে) শব্দবান্ করে তোলা হয়।…গো-সমূহকে নিপুণ হস্তে দোহনশালী আমি সরলতার সাথে দোহনশালিনী (সুদুঘা) ধেনুকে, দোহন করে নিকটে ডাকছি। বন হতে বৎসকে কামনা করে, ধনের দ্বারা পালন করণের যোগ্য এই ধেনুই শব্দ পূর্বক ধনবাৰ্গণের প্রাপ্ত হয়ে থাকে। এই সৌভাগ্যের নিমিত্ত আমাদের গৃহে শ্রীবৃদ্ধি লব্ধ থোক এবং অশ্বিনী কুমারদ্বয়ের নিমিত্ত দোহন হোক।…আমি যমলোকের ভয়ে কম্পায়মান প্রাণীর গৃহে শয়ন করে শ্বাস গ্রহণ করছি। অমর্ত্য (অমরণধর্মী) জীব মরণধর্মী প্রাণীসমূহের সযোনি (সমজন্মা) হয়ে স্বধার সাথে আজ্য ভক্ষণ করে থাকে।…ঈশ্বরের কুশলতা দেখো যে, যে চন্দ্রমা অদ্য মৃত্যু লাভ করেছে (অর্থাৎ অস্তমিত হয়েছে), সে-ই পুনরায় আগামী কল্য শ্বাস গ্রহণ করছে (অর্থাৎ উদিত হচ্ছে)।…গর্ভ করণশালী জন, গর্ভের তত্বকে জ্ঞাত হয় না। গর্ভের ভিতরে যে গমন করে, সে-ই (অর্থাৎ সেই জ্বণই) গর্ভকে দর্শন করে। মাতার ভোজন ব্যবহারে পুষ্ট হয়ে সেই সময় মতো উৎপন্ন হয়ে থাকে। সে বহুবার উৎপত্তি-রূপশালিনী নির্ঋতির জালে পতিত হয়।..আমরা সংরক্ষক আত্মাকে জগৎ-রূপ চক্রে ঘূর্ণিত হতে দেখেছি। তাকে ইহলোক-পরলোকে সত্ত্ব-রজঃ তমাত্মক মার্গে বিচরণ করতেও দেখেছি। সে আপনার মধ্যে ব্যাপ্ত ইন্দ্রিয়সমূহের (বা ইন্দ্রিয় জগতের) মধ্যে পরিভ্রমণ করছে।…বেদী হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বস্তু (অর্থাৎ পরম স্থান); সোমই বর্ষক ব্যাপকের বীর্য; যজ্ঞই সম্পূর্ণ জগতের নাভি এবং ব্রহ্মবাণীই পরম ব্রহ্ম।…আত্মা আমরণ ধর্মশীল, তা মর্ত্য মনের সাথে গর্ভ হতে প্রকট হয়ে থাকে। তার মধ্য দিয়েই আত্মা ব্রহ্মে মিলিত হয়ে তৎ-রূপ হয়ে যায় এবং হৃদয় তার নিকট পৌঁছাতে পারে না।…হে পৃথিবী! তুমি জলময় সূর্যের দ্বারা জল রূপ সমৃদ্ধির সাথে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। আমরাও তোমার জল রূপ ধনের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছি। তুমি সেই মেঘকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে শুদ্ধ জলকে সেবন করো, সূর্যের কিরণের দ্বারা নীত জলকে পান করো।…এই বাণীরূপ ধেনুই জগৎ-সংসারের নির্মাত্ৰী। সে-ই জলের উৎপত্তিশালিনী। …পৃথিবী সকলের ভারই ধারণ করে; তবে সে সত্যবাদী জনকে পালন করে এবং মিথ্যাবাদী জনকে বিনাশ করে থাকে।…যে সূর্য, অগ্নি ও বায়ু আপন কর্মের দ্বারা সময়ে সময়ে জগতের প্রতি অনুকম্পা করে থাকেন, তাদের মধ্যে এক অগ্নি সম্বৎসরে ধরাকে ভস্ম করে থাকেন; এর দ্বারা তিনি কার্যের যোগ্য হয়ে যান এবং সূর্য আপন কর্ম সাধিত করেন; তথা বায়ুর রূপ দেখা যায় না, কেবল তার গতিই দেখা যায়।…বাণীর চারিটি পদ আছে, তা বিদ্বান্ ব্রাহ্মণ জ্ঞাত আছেন। তার মধ্যে তিনটি পদ গুপ্ত আছে এবং চতুর্থ পদ রূপ বাণীকে মনুষ্যগণ উচ্চারণ করে থাকে। তত্বজ্ঞানী বিদ্বান্ ব্যক্তি অগ্নি, মিত্র, বরুণ ইত্যাদিকে অগ্নিই বলে থাকেন এবং দ্যুলোকে যে, সুন্দর পর্ণযুক্ত বন্দনীয় সূর্য আছেন, তাঁকেও অগ্নিই বলে থাকেন। এই এক অগ্নিকে আত্মস্বরূপের দ্বারা দর্শনশালী বিদ্বান (এঁকে) মাতরিশ্বা, যম, অগ্নি ইত্যাদি নানা নামে আহ্বান করে থাকেন।
টীকা –এই সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ব সুক্তে উক্ত হয়েছে।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য এই যে, এই সূক্তে বৈদিক ব্রহ্মবিদ্যার মর্মস্পর্শী রীতির দ্বারা বিশেষভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একেই আত্মবিদ্যা বলা হয়ে থাকে। এটিকে সদা গুপ্তবিদ্যা বোঝানো হয়েছে এবং অধিকারী পুরুষকেই এর উপদেশ দানের বিধান রয়েছে। এই কারণে এই বিষয়টিকে এইস্থানে স্পষ্ট ভাষায় কথনের পরিবর্তে গুঢ় ভাষা ও ব্যঙ্গ শব্দে বর্ণনা করা হয়েছে। সূক্তকার পরমাত্মা ও আত্মার স্পষ্ট নামোল্লেখ না করে সংকেতের মাধ্যমে লিখেছেন–দুই উত্তম পঙ্খশালী পক্ষী একত্রে সাথে-সাথে অবস্থান করায় পরস্পর মিত্র হয়ে থাকে এবং সেই দুই পক্ষী একই বৃক্ষের উপর মিলে-মিশে থাকে; পরে তাদের মধ্যে একটি তো, সেই বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে, দ্বিতীয়টি কেবল দর্শন করতে থাকে, পরন্তু ভক্ষণ (ভোগ) করে না। (১সূ. ২০ মন্ত্র)। এই মন্ত্রের দ্বারা ব্ৰহ্ম ও জীবের একতা ও তাদের অন্তর, দুটি কথায় খুব উৎকৃষ্ট প্রকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এইরকমে, শেষ মন্ত্রে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, সুপর্ণ, যম ইত্যাদি অনেক দেবতার নাম গ্রহণ করা হয়, কিন্তু বাস্তব পক্ষে তা এক পরমাত্মারই বিভিন্ন রূপ এবং সেই একতম পরমাত্মাই জগৎ-সংসারের আদি স্রোত ও একমাত্র আধার। এইভাবে, এই সমস্ত সূক্তটি আত্মবিদ্যার দৃষ্টিতে বড়ই মহত্বপূর্ণ হয়ে আছে ॥ (৯কা, ৫অ. ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –কৃত্যাকে (আভিচারিক কর্মকে) যৌতুকে প্রাপ্ত বধূর ন্যায় যে ব্যক্তি সজ্জিত (বা সাধিত) করে; আমি তার সেই কৃত্যকে বিদূরিত করছি, সেই কৃত্য আমার নিকট হতে দূর হোক। ঐ রকম সুসজ্জিত শির, নাসিকা ও কর্ণযুক্ত আপত্তিকারক কৃত্যাকে আমি দূর করছি। শূদ্রের দ্বারা, রাজা বা স্ত্রীগণের দ্বারা, পতিসমূহ বা ভ্রাতৃগণের দ্বারা কৃত কৃত্যা তাদের নিকটেই প্রত্যাবর্তন করুক। ক্ষেত্র, গাভী ও পুরুষের উপরে কৃত কৃত্যা নিবর্ষে হোক। শপথ, শপথ দানশালীকেই প্রাপ্ত হোক। হিংসারূপ পাপ হিংসুকের নিকটেই উপনীত হোক। হে পুরোহিত! সম্মুখ হতে আগমনশাশিনী কৃত্যাসমূহকে প্রহার করো। হে কৃত্যা! তুই কৃত্যাকারীর নিকটেই প্রত্যাবর্তন কর, আমি হেন নিরপরাধী জনকে বিনাশ করি না। আমরা যে কৃত্যাকে প্রাপ্ত হয়ে মৃতবৎসারূপ দুর্ভাগ্যকে প্রাপ্ত হয়েছি, আমাদের সেই পাপ দূর হোক এবং আমাদের নিকট ধন ইত্যাদি স্থিত হোক। পিতৃযজ্ঞের পাপ, দৈবাপরাধজনিত পাপ, পিতৃগণের নাম গ্রহণের পাপ ইত্যাদি পাপসমূহ হতে এই ঔষধি সমুদায় তোমাকে মুক্ত করুক। তোমার পাপ এই মন্ত্রবলের দ্বারা ভীতত্রস্ত হয়ে যাক। হে কৃত্যা! তুই। মন্ত্রের দ্বারা প্রহৃতকৃত্যাকারীর নিকট গমন করে তাকে বিনাশ কর। শত্রুর দ্বারা প্রেরিত কৃত্যা তারই নিকট গমন করুক এবং তাকে বিভঙ্গ করুক, তার গো-ইত্যাদি ধনের বিনাশ করুক, তাকে সন্তানহীন করুক। হে কৃত্যা! তোকে অগ্নিতে, শ্মশানে, ক্ষেত্রে, গুপ্তরীতির দ্বারা কপটতার সাথে অভিচারিক কর্মতৎপর মনুষ্যজন নির্মাণ করেছে, তুই আমি হেন অপরিচিত নিরপরাধীকে ত্যাগ করে শত্রুর নিকট গমন কর এবং তাকে বিনাশ কর। ইন্দ্রাগ্নি, ভব, শর্ব, সোম আমাকে রক্ষা করুন। যদি তুই চতুষ্পদশালিনী হয়ে আগত হয়ে থাকিস, তাহলে অষ্টপদশালিনী হয়ে প্রেরকের নিকট গমন কর, এখানে অবস্থান করি না। তোর কর্ণ মৃগরূপ, তুই সিংহরূপে সেখানে গমন কর। হিংসা ভয়ঙ্কর কর্ম, তুই হিংসা করি না। তুই বৃক্ষপত্রের ন্যায় ভারহীন (হাল্কা) হয়ে যা, ভীত হয়ে যা। সূর্য ও ঊষা অন্ধকারকে এবং হস্তী রজকে যেমন মুক্ত করে, তেমনই আমি কৃত্যাকারীর পাপরূপ কৃত্যাকে দূর করে দিচ্ছি।
টীকা –উপযুক্ত অর্থ সূক্তের মুন্ত্রগুলি অপরের দ্বারা কৃত আভিচারিক কর্মের ফল পরিহারের নিমিত্ত সূত্রোক্ত প্রকার শান্তুদক কর্মে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। দ্বিতীয় কাণ্ডের তৃতীয় অনুবাকের প্রথম সূক্তে এর বিনিয়োগ ও বিনিয়োগান্তর বিষয়ে আলোচনা আছে। (১০কা, ১অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –মনুষ্যের পাষ্ণী (পাদগ্রন্থী বা গোড়ালির অগ্রভাগ), পাদগ্রন্থির অস্থি, অঙ্গুলীসমূহ, উরু, পদ,জঙ্, স্কন্ধ, কণ্ঠ, বাহু, নেত্র, কর্ণ, নখ, মুখ, জিহ্বা, চিবুক, ললাট, কপাল, বাণী ইত্যাদি শরীরের অঙ্গসমূহ, শরীরের ত্বক এবং প্রাণ ইত্যাদি বায়ুকে কে রচনা করেছে? দ্বিপদ, চতুষ্পদ প্রাণীগণের কারক-মারক কে? পুরুষের পাপ, সন্তাপ, ঋদ্ধি-সিদ্ধি, সমৃদ্ধি কোথা হতে আগত হয়? জলরাশি, তাদের বক্র-কুটিল গতি, যজ্ঞরূপ কর্মসমুদায়, জন্ম-মৃত্যু, সত্য-মিথ্যা, দিন, সন্ধ্যা ও রাত্রিকে কে নির্মাণ করেছে? কার প্রভাবে মনুষ্য কর্ম করে থাকে, কার দ্বারা মনুষ্যের শ্রদ্ধা, অশ্রদ্ধা, সৎকর্ম-দুষ্কর্ম প্রাপ্ত করা হয়? কার দ্বারা অগ্নিকে লাভ করা যায়, কে সম্বৎসর ইত্যাদিকে গণনা করছে? …পরমেষ্ঠী তথা অগ্নিকে ব্রহ্মই প্রাপ্ত হয়ে আছেন, তিনিই সম্বৎসরকে গণনা করছেন। ব্রহ্মর দ্বারাই দৈব অনুকূল হয়ে যায়, সৎ-ব্রহ্মকেই ক্ষত্র বলা হয়। ব্রহ্মই দ্যাবাপৃথিবীকে রচনা করেছেন, প্রজাপতি ব্রহ্ম মনুষ্যের শির হৃদয় ইত্যাদি নির্মাণ করেছেন।…সেই ব্রহ্ম সকল দিকে প্রকট আছেন। যিনি ঐ ব্রহ্মকে জ্ঞাত হন; তিনি ব্রহ্ম ও মন্ত্রযুক্ত কর্ম, নেত্র প্রাণ এবং সন্ততি প্রদত্ত হন। ব্রহ্ম পুরীতে শয়ন করেন বলে তাকে পুরুষ বলা হয়। এই কথা যিনি জ্ঞাত হন, তাঁর নেত্র ইত্যাদি অঙ্গ বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত অটুট থাকে। এই শরীর অষ্টচক্র ও নব-দ্বারশালিনী দেবতাগণের বাসস্থান বা নগরী, তাঁকে স্বর্গদা হিরন্ময় জ্যোতি আচ্ছাদিত করে থাকে। সেই হিরন্ময় কোশে আত্মার যে স্থান আছে, তাকে ব্রহ্মের জ্ঞাতা উত্তমভাবে জ্ঞাত হন। পাপনাশক, যশস্বী, কান্তিযুক্ত, অপরাজের ব্রহ্ম হিরন্ময় পুরীর মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে থাকেন।
টীকা –এই সূক্তে পুরুষের অর্থাৎ মনুষ্যের মাহাত্ম বর্ণিত হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন অবয়বশালী মনুষ্যের কোন্ কোন্ দেবতা সৃষ্টি করেছেন, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তা জ্ঞাপন করা হয়েছে। যজ্ঞপ্রিয় মনুষ্যগণ এই সূক্তটি পুরুষমেধ যজ্ঞে বিনিয়োগ করে থাকেন। শনৈশ্চর গ্রহদেবতার হবিরাজ্য হোমে এই সূক্তটির বিনিয়োগ হয়ে থাকে। এই সূক্তের দ্বারা সূত্রোক্ত প্রকারে পুরুষমেধে পুরুষপশু অভিমন্ত্রিত করা হয়ে থাকে ॥ (১০কা, ১অ. ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –বরণ (বা বরুণ) বৃক্ষের মণি শত্রুনাশক, ঈঙ্গিত ফলসমূহের রক্ষিকা, সর্বদুঃখের চিকিৎসিকা (অবসানকারিণী), শত্ৰুপতনকারিণী ও সহস্রাক্ষের (ইন্দ্রের) সমান পরাক্রমী; তুমি এই মণি ধারণ করো এবং শত্রুমর্দন করে। এটি ব্যাধি, পাপ-ভীতি, দুঃস্বপ্ন-ভীতি কুলক্ষণ (কাক ইত্যাদি পক্ষীসমূহের দ্বারা প্রাপ্ত দুর্লক্ষণ), শত্রু-ভীতি, অভিচার এবং মৃত্যুময় তথা মাতা-পিতার প্রতি অপরাধজনিত পাপ ইত্যাদি হতে তোমাকে রক্ষা করবে। আমার শত্রু এই মণির দ্বারা ব্যথিত হয়ে আছে, তারা ভীষণ অন্ধকারে পতিত হয়ে রয়েছে। আমি হিংসরহিত হয়ে (অর্থাৎ কারো দ্বারা হিংসিত না হয়ে) শান্তি প্রাপ্ত হয়ে আছি। আমি পুত্র, ভৃত্য ইত্যাদি সম্পন্ন আছি; আয়ুষ্মন হয়েছি। এই মণি সর্বত্র আমাকে রক্ষা করুক। এই মণি আমার হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এটি আমার শত্রুদের বাধক। এটি আমাতে সকল রক্ষাসাধনকে স্থাপনা করুক। আমি শতায়ু হওয়ায় এটিকে ধারণ করছি। বায়ু যেমন বৃক্ষকে উৎপাটিত করে, তেমনই এই মণি আমার সকল শত্রুকে উৎপাটিত করে দিক। যেমন অগ্নি নিকটে আগত হয়ে বৃক্ষসমূহকে ভস্ম করে, তেমনই এই মণি আমার শত্রুদের ভস্ম করে দিক। শুষ্ক বৃক্ষ যেমন ভূপতিত হয়, তেমনই আমার শত্রুগণ পতন লাভ করুক। …এই মণি আমাকে পৃথিবী, অগ্নি, চন্দ্র-সূর্য তুল্য যশ প্রদান করুক। যেমন মধুপর্কে যশ রয়েছে, তেমনই এই মণি আমাকে যশ প্রদান করুক। অগ্নিহোত্র ও বষট্কারে যেমন,যশ আছে, তেমনই যশ এই বরণমণি আমাকে প্রদান করুক। যেমন যশ প্রজাপতি ও পরমেষ্ঠীতে রয়েছে, যেমন যশ দেবতাগণের অমৃতে রয়েছে, তেমন এই মণি আমাতে যশ ও ভূতি তথা তেজ ও যশ প্রতিষ্ঠিত করুক।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তে বরণ (বরুণ নামক বৃক্ষের) মণির প্রভাব, শৌর্য, শত্রুক্ষয়ের সামর্থ্য, ধারণকারীর সর্বদুঃখবিনাশ ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। সর্বকাম পূর্তির নিমিত্ত এই সূক্তমন্ত্রগুলির দ্বারা দধি ও মধু তিন রাত্রি বাসিত করে বরণমণি আভিমন্ত্রিত করে ধারণ করণীয়। কৌশিক সূত্র (৩/২) অনুসারে পরবর্তী অনুবাকের দ্বিতীয় সূক্তে উল্লেখিত সূক্তস্য বিনিয়োগঃ অনুসরণীয়। নক্ষত্র কল্পে (১৯) বলা হয়েছে– মহাশান্তৌ বরণমণিবন্ধনেপি এতৎ সূক্তং। অর্থাৎ মহাশান্তিকর্মে বরণমনি-বন্ধনেও এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। আবার, নক্ষত্র কল্পে (১৭) অভয়ং ভয়ার্তস্য কথাটি উল্লেখিত হওয়ায় এই সূক্তটি ভয়ার্তকে অভয়দানের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বিহিত হয়েছে ৷ (১০কা, ২অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –ইন্দ্রের প্রথম, দেবতাগণের দ্বিতীয়, বরুণের তৃতীয় এবং সর্পগণের অপমা নামক রথ আছে। এই দর্ভ (ঔষধি) সর্পগণের শোকপ্রদ, এবং তরূণক, অশ্ব, পরুষ নামক সর্পের বিষকে নিবারণশালী। হে দর্ভ! তুমি শ্রেষ্ঠ; তুমি শ্বেত, কৃষ্ণ এবং অন্য সর্পসমূহের নাশক। তুমি এইস্থানে আগত হও এবং যে মার্গে আমরা গমনাগমন করি, সেই পথ সর্পরহিত করে দাও। আমাদের দংশনের নিমিত্ত সর্পের মুখ যেন উন্মোচিত হতে না পারে। এই ক্ষেত্রের নর ও স্ত্রীজাতীয়–দুই রকম সর্প নষ্ট হোক। নিকটস্থ; দূরস্থ, সকল সর্প বিষহীন হয়ে যাক। আমি মুরাঘাতে বৃশ্চিকগণকে দলিত করছি। এই সর্পগুলির বিষকে বজ্রধারী ইন্দ্র নষ্ট করে দিয়েছেন। ইন্দ্রের দ্বারা প্রহৃত (বা নিহত) সর্পগুলিকেই আমরা প্রহার করছি। মন্ত্রশক্তির দ্বারা তির্যক, তিরশ্চরাজ, শ্বেত ও কৃষ্ণবর্ণের সর্পকে কুশের (দর্ভের ) উপর স্থাপন করে বিনাশ করছি। এই যুবা বৈদ্য বৃশ্চিক ও সর্পের বিষকে নষ্ট-করণে সমর্থ। এঁর মধ্যে মন্ত্রশক্তি ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে। আমি আপন সৎ-বুদ্ধির দ্বারা উবা ঔষধিগুলিকে বরণ পূর্বক সেগুলিকে বেগের সাথে প্রেরণ করছি; তাতেই সর্প তোমার (সর্পদষ্ট ব্যক্তির) বিষ দূর হয়ে যাক। সূর্য, অগ্নি, পৃথিবী ও ঔষধিসমূহে যে বিষ আছে, তা পূর্ণভাবে দূরে যাক। হে তৌদি ও ঘৃতাচী নামশালিনী ঔষধি! আমি বিষকে নির্বীর্য করণশালী অঙ্গকে গ্রহণ করছি। হে রোগী! তোমার উপর বিষের প্রভাব নষ্ট হয়ে যাক। অগ্নি ও সোম সর্পবিষকে দূর করে দিয়েছেন। এই বিষ দংশনকারী সর্পেরই প্রাপ্য হোক!
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –অস্মিন সূক্তে নানাসপান্তেষাং চ বিষানি তত্তপ্রতীকারাশ্চ কবিবাগ্বিষয়ঃ। সর্পবিষভৈষজ্যে চ মন্ত্রাঃ। বিষভৈষজ্যে কর্মণি ইন্দ্রস্য প্রথমঃ ইত্যর্থসূক্তস্য ব্রাহ্মণো জজ্ঞে ইতি (৪/৬) সূক্তবৎ বিনিয়োগগাবগন্তব্যঃ।…ইত্যাদি। (১০কা, ২অ. ২সূ.)। টীকা –উপযুক্ত সূক্তটিতে নানা রকম সর্প ও তাদের বিষের প্রতিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই মন্ত্রগুলির সব কটিই সর্পবিষের ভৈষজ্যে বিনিয়োগ হয়। এই সূক্তের বিশেষ বিনিয়োগগুলি চতুর্থ কাণ্ডের দ্বিতীয় অনুবাকের প্রথম সূক্তে দেওয়া হয়েছে। এই কর্মে এই সূক্তের দ্বারা অভিমন্ত্রিত কুশ-তৃণ পিষ্ট করে দক্ষিণ অঙ্গুষ্ঠের দ্বারা রোগীর দক্ষিণ নাসাপুটে নস্য প্রদান করণীয়।…ইত্যাদি। (১০কা, ২অ, ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে জলরাশি! তোমরা ইন্দ্রের ওজঃ, বল ও বীর্যের শক্তি হয়ে আছে এবং তোমরা ইন্দ্রের ঐশ্বর্যস্বরূপ। আমি তোমাদের ব্রহ্মযোগ, ক্ষত্রযোগ, অপযোগ ও সোমযোগের সাথে সম্পন্ন করে জয়শীল যোগের নিমিত্ত সমর্থ করছি। হে জল সমুদায়! তোমরা ইন্দ্রের ভাগ, অগ্নির ভাগ, সোমের ভাগ এবং বরুণের ভাগ হয়ে আছো, এই লোকে প্রজাপতির তেজের নিমিত্ত জলের বীর্য, তেজ ও উজ্জ্বল জলরাশিকে আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করো। হে জলরাশি! তোমরা মিত্রাবরুণের, যমের, পিতৃগণের ও সবিতার ভাগ হয়ে আছে। এই লোকে প্রজাপতির তেজের নিমিত্ত জলের বীর্য, তেজ ও উজ্জ্বল জল সমুদায়কে আমাদের মধ্যে পূর্ণ করে দাও। হে জলরাশি! তোমাদের যে জলীয় ভাগ যজুর্বেদের মন্ত্রের দ্বারা সেবনীয় হয়ে থাকে, তোমাদের যে তরঙ্গ (আবেগ), তোমাদের মধ্যে যে বৎস, যে বৃষভ, যে হিরণ্যগর্ভ, যে দিব্য অগ্নি ও প্রস্তর আছে, সেগুলি যজুর্বেদের মন্ত্রের দ্বারা সেবনীয় এবং দেবতাবর্গের সাথে সম্বন্ধযুক্ত। সেই জলীয় ভাগকে, যারা আমাদের শত্রু, তাদের উপর নিক্ষেপ (প্রয়োগ) করছি এবং নিজেকে পুষ্ট করছি। আমি এই মন্ত্রবলে অভিচার কর্মের দ্বারা কৃত বলরূপ অস্ত্রের সাহায্যে আপন শত্রুকে দমিত ও বিনষ্ট করছি। আমি তিন বৎসরের মধ্যে যে মিথ্যা ভাষণ করেছি, সেই পাপ হতে জলসমুদায় আমাকে মুক্ত করুক। হে জলরাশি! তোমরা সমুদ্রে লীন হয়ে থাকো, তোমাদের গতি সর্বব্যাপী। পাপরহিত জলরাশি আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুক। হে জল! তুমি বিষ্ণুর পরাক্রম স্বরূপ; তোমাকে দ্যাবাপৃথিবী, অন্তরিক্ষ, দিমূহ, আশা, ঋক, যজ্ঞ, ঔষধি জল, বৃষ্টি, প্রাণ ইত্যাদি তীক্ষ্ণ করেছে, তুমি এই সকলের উপর বিক্রমণ করো। তোমাকে অগ্নি, বায়ু, সূর্য, মন, ব্রহ্মতেজ, সোম, বরুণ, অন্ন ও পুরুষ তেজস্বী করেছেন, তুমি এঁদের উপর বিক্রমণ করো; আমি শত্রুকে এঁদের দ্বারা দূরীভূত করছি; আমার শত্রু প্রাণরহিত হোক, যেন জীবিত না থাকে। আমি অমুক (উদ্দিষ্ট) গোত্রীয়, অমুক মাতার পুত্র আপন শত্রুকে বশীভূত করছি। তার কান্তি, তেজ, আয়ু ও প্রাণকে বেষ্টন পূর্বক তাকে পাতিত করছি। দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত সূর্যের দ্বারা আবৃত মার্গকে আমি অনুবর্তন করছি; সেই দক্ষিণ দিক আমাকে ব্রহ্মতেজ-সম্পন্ন করুক। আমি দিকসমূহকে পরিক্রম করছি, সপ্ত ঋষি এবং মন্ত্রসমূহের সম্মুখে উপস্থিত হচ্ছি। এঁরা আমাকে ব্রহ্মতেজ ও ঐশ্বর্য প্রদান করুন। ব্রাহ্মণগণকে পরিক্রমা করে তাদের নিকট ব্ৰহ্মতেজ ও ধন প্রার্থনা করছি। আমি শত্রুর মুখকে মন্ত্রবলের দ্বারা অগ্নিমুখে সজোরে নিক্ষেপ করছি। সমিধসমূহের যুক্ত এই হবিরূপ শস্ত্র সেই শত্রুকে অগ্নি মুখে পাতিত করুক।…হে পৃথিবী! আমাকে বল প্রদান করো। হে অগ্নি! আমাকে তেজ, সন্তান ও আয়ুর সাথে যুক্ত করো এবং আমাকে যারা প্রপীড়িত করে, তাদের মর্দিত করো। আমি মন্ত্রশক্তির দ্বারা শত্রুর মস্তক ছিন্ন করার নিমিত্ত জল রূপ বজ্রে প্রহার করছি; সকল দেবতা আমার অনুকূল হোন।
বঙ্গানুবাদ –আমি দ্বেষী শত্রুর মস্তক মন্ত্রের দ্বারা ছেদন করছি। এই মণি আমার কব-সম সুক রক্ষক। এই কালের দ্বারা উৎপাদিত হিরণ্যরূপ মণি আমার গৃহে অতিথি স্বরূপ। এটি কল্যাণকারিণী। আমরা একে ঘৃত, মধু, অন্ন ইত্যাদি উপহার প্রদান করছি। খদির বৃক্ষের মণির দ্বারা ইন্দ্র বল ও বৃহস্পতি ওজঃ লাভ করেছিলেন। এটি আমার শত্রুকে হনন করুক। যার দ্বারা চন্দ্রমা শ্রী-লাভ করতে সমর্থ হয়েছেন; তুমি সেই মণি বন্ধন (বা ধারণ) করে শত্রুকে বিনাশ করো; এই মণি বায়ুকে করেছে বেগবান, অশ্বিনীকুমার যুগলকে করেছে ঋষি রক্ষক এবং সবিতাকে করেছে স্বর্গবিজয়ী। এটি জলকে অমৃতত্ব ও বরুণকে সত্য প্রদান করেছে। তুমি সেই মণি ধারণ করে শত্রু নাশ করো; যে মণিকে বন্ধন করে ঋতু, মাস ও সম্বৎসর প্রাণীবর্গকে রক্ষা করছে। প্রজাপতি এই মণিকে নির্মাণ পূর্বক অথর্ব মন্ত্রের দ্বারা যাঁকে এটি ধারণ করিয়েছেন, সে-ই শত্ৰু-সংহার করেছে; ধাতা এই মণি ধারণ করে প্রাণীবর্গকে রচনা করেছেন, সেই হেন মণি আমার প্রাপ্ত হয়েছে। যে মণি বৃহস্পতি স্বয়ং দেবতাগণকে ধারণ করিয়েছিলেন, সেই গো-ইত্যাদি পশু, ধন, উৎসব, মধু, ঘৃত, অন্ন, বল, তেজ, কীর্তি ও সম্পূর্ণ বিভূতিশালিনী তথা রাক্ষসনাশিনী মুণি দেবতাগণ আমাকে প্রাপ্ত করান। হে কল্যাণকারিণী! আমি তোমাকে গ্রহণ করছি। আমার শত্রুগণকে দুর্গতি সম্পন্ন করো। দেবতা, পিতৃগণ ও মনুষ্য যার দ্বারা জীবন লাভ করেন, সেই মণি যজ্ঞ, খাদ্যান, প্রজা ও পশুর বৃদ্ধিকারিণী। হে মণি! তুমি এই হবিকে সেবন করো, তৃপ্ত হও এবং আমাদের কল্যাণ সাধন করো।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –খদিরকাষ্ঠকালবিকারং মণিং শত্রুনাশায় তথা সর্বকামায়ে বর্ধতি সূক্তেনানেন। সাম্প্রদায়িকা হি বক্ষ্যমাণপ্রকারেণ বিনিযুঞ্জন্তি।… ইত্যাদি। (১০কা, ৩অ. ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –স্কম্ভের (সর্বাধারের) কোন্ কোন্ অঙ্গে ঋত, শ্রদ্ধা, সত্যব্রত, দ্যাবাপৃথিবী অবস্থিত আছে? কোন্ কোন্ অঙ্গে বায়ু চলাচল করে, অগ্নি জ্বলে? উৰ্ব্বদিকে উখিত অগ্নি এবং প্রবাহিত বায়ু কোথায় যায়? পক্ষ, মাস, ঋতু, রাত্রি-দিন, জল কোথায় গমন করে? পরম, অধম, মধ্যম রূপসমূহের মধ্যে কতটা অংশে তিনি (স্কম্ভ) প্রবিষ্ট আছেন, কতটায় নয়? যার মধ্যে লোক ইত্যাদি নিহিত রয়েছে, যাতে সৎ-অসৎও আছে, সেই স্কন্তু সম্পর্কে আমাকে বলো। যার মধ্যে অগ্নি, সূর্য, চন্দ্র, অন্তরিক্ষ, ঋক্, সাম, যজু, রুদ্র-ভূত, সত্যলোক স্থিত আছে, সেই স্কম্ভ কেমনতর? যিনি ব্রহ্ম, পরমেষ্ঠী, প্রজাপতি ও ব্রাহ্মণকে জ্ঞাত আছেন, তিনিই স্কম্ভকেও জ্ঞাত হন। যাঁর শির বৈশ্বানর, নেত্র অঙ্গিরাবংশীয় ঋষি, যাঁর জিহ্বা মধুকশা, মুখ ব্রহ্ম, দেহ বিরাট–সেই স্কন্তু সম্পর্কে চি বলো। দেবতা তাঁর বিধি এবং তাঁরা তাঁর শরীরেই নিবাসিত, সেই হিরণ্যগর্ভ বর্ণনার অতীত। হে ইন্দ্র! তুমিও স্কম্ভের মধ্যে নিহিত। পৃথিবী যার প্রভা, অন্তরিক্ষ যাঁর উদর, দুলোক শির, চন্দ্র-সূর্য যাঁর নেত্র এবং অগ্নি যাঁর মুখস্বরূপ, আমি সেই ব্রহ্মকে নমস্কার করছি। স্কন্তু দ্যাবাপৃথিবীকে, অন্তরিক্ষকে, সকল দিককে, ছয় ভুবনকে ধারণ করে আছেন; তিনি সর্বলোকে ভ্রমণ করেন; যাঁর ইচ্ছায় বায়ু প্রেরণা প্রাপ্ত হয় না, যাঁর ইচ্ছায় জল অচেষ্ট হয়ে থাকে এবং মন পরিভ্রামিত হয় না; সকল দেবতা তারই আশ্রিত এবং তাঁকেই সেবা করে থাকে। যিনি অমিত দেহসমুহে অমিত রূপে বিদ্যমান আছেন, তিনিই স্কম্ভ।
বঙ্গানুবাদ –ভূত ও ভবিষ্য কালে ব্যাপক দিব্যলোকাধিষ্ঠাতা ব্রহ্মকে নমস্কার করি। এই পৃথিবী ও আকাশ সেই স্কম্ভের (বা ব্রহ্মের) দ্বারাই স্থিত হয়ে আছে। গুম্ফা রূপ দেহে আত্মা নিবাস করেন। তাতেই এই সচেষ্ট, শ্বসবা বিশ্ব স্থিতিপ্রাপ্ত হয়েছে। তার অর্ধভাগের দ্বারা বিশ্ব উৎপন্ন হয়েছে এবং অপর অধভাগ নিকট হতেও নিকট এবং দূর হতেও দূরে আছে। যিনি সচেষ্ট আছেন–অচেষ্ট আছেন, প্রাণক্রিয়া করেন বা না-ও করেন; যিনি সকল রূপের দ্বারা সম্পন্ন হয়েও একরূপধারী হয়ে আছেন; তিনি অনন্ত, তিনি প্রশান্ত, তিনি কর্মজ্ঞ, তিনি সর্বজ্ঞ। তিনি গর্ভমধ্যে অদৃশ্য হয়ে থাকেন। তাকে পূর্ণ বলে মান্য করুক অথবা হীন বলে মনে করুক, তিনি এমন সকলের থেকে দূরে থাকেন। যিনি পৃথিবীকে ধারণ করেছেন, যার দ্বারা সূর্যের উদয়-অস্ত হয়ে থাকে, তিনি সকলের অপেক্ষা বৃহৎ, অনন্তবিক্ৰমণীয়। পুরাতন বিদ্বান্ তাঁকে হংস বলে। তার দ্বারাই সূর্য দিবারাত্র উৎপন করে থাকেন। তিনি সংক্ষিপ্ত রূপী। তিনি আত্মা প্রমুখ হয়েও দৃষ্টিগোচর হন না, যেহেতু তিনি সূক্ষ্মতম। আত্মা কল্যাণময়ী ও জরারহিত। তিনি কুমারী, স্ত্রী, পুরুষ ইত্যাদি সর্বরূপ। তিনি মনের মধ্যে, গর্ভের মধ্যে স্থিত আছেন। তিনি পূর্ণ হতেই পূর্ণকে সিঞ্চন করেন, পূর্ণের দ্বারা পূর্ণকে নির্গত করেন। তিনি অজর-অমর। বাক্যসমূহ তার দ্বারাই বহির্গত হয় এবং তার মধ্যেই লীন হয়ে যায়। রথচক্রের নাভিতে (মধ্যস্থানে) অর্পিত অবের (নাভি ও নেমি অর্থাৎ চক্রের প্রান্তভাগের) সমান যাতে দেবগণ অর্পিত হয়ে আছেন, সেই নারায়ণ মায়ার দ্বারা কোথায় স্থিত আছেন? তিনি সকল দিকে ও সকলের মধ্যে স্থিত আছেন। তিনিই মহৎ-ব্রহ্ম। তিনি নবদ্বারযুক্ত ত্রিগুণাত্মক। তাকে স্থিত আত্মাকে ব্রহ্মজ্ঞানী জন জ্ঞাত হয়ে থাকেন। তিনি স্বয়ম্ভু, তিনি নিজেতে নিজেই তৃপ্ত হয়ে আছেন।
বঙ্গানুবাদ –এই শত্রুনাশিকা, স্বর্গপ্রদায়িণী ধেনু ইন্দ্র কর্তৃক প্রদত্ত। এটি হিংসক শত্রুবর্গের মুখ বন্ধ করুক। হে ধেনু! তোমার নোম কুশরূপী, চর্ম বেদী রূপ। হে অজ! তোমার নোম (বা কেশ)!! প্রোক্ষণী স্বরূপ। তুমি শতৌদনা যজ্ঞকে প্রস্তুত করণশালী ইচ্ছাপূর্তিতে সমর্থ হয়ে থকো, তুমি দিব্যলোককে প্রাপ্ত করিয়ে থাকো। স্বর্ণালঙ্কৃত করে ধেনু দানকারী জন দিব্য ও পার্থিব লোক প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। হে দেবী শতৌদনা! দক্ষিণে বসুদেবগণ, উত্তরে মরুৎ-বর্গ, পশ্চাতে সূর্য তথা মনুষ্যগণ, পিতৃবর্গ ও গন্ধর্ববৃন্দ তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি ঘৃত প্রেক্ষণ করে দেবগণকে প্রাপ্ত হবে। ত্রিলোকবাসী দেবতাগণকে দুগ্ধ, ঘৃত, মধু দান করতে থাকো। তোমার বাহ্য ও আন্তরিক অঙ্গ-দানকর্তাকে দুগ্ধ, ঘৃত ও মধুকে দোহন করুক। হে দেবী শতৌদনা! পুরোডাশ সমূহ তোমার, ঘৃতের সাথে যুক্ত। মাতরিশ্বা যে অন্নকে মন্থন করে শুদ্ধ করেছেন, তার দ্বারা হোতাগণ অগ্নিতে সুহুত করুন। আমি যে অভীষ্ট লাভের উদ্দেশে তোমাকে চিন্তা করছি সেইসব ধনের দ্বারা হবে।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি শতৌদনযজ্ঞে আহুতির নিমিত্ত গো-বধের ক্ষেত্রে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। বন্ধ্যা গাভীই শতৌদনা নামে উক্ত হয়েছে। এই শতৌদনা যজ্ঞের কর্তা (যজমান) অগ্নিষ্টোম এবং অতিরাত্র যজ্ঞ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ ফল লাভ করেন, এমনই সব প্রশংসা করা হয়েছে। সূত্রানুসারে এই সূক্তের দ্বারা শতৌদন যজ্ঞে নিরুপ্ত হবিঃ অভিমৰ্শন পূর্বক দাতৃবাচন ও দান করণীয়।…ইত্যাদি। (১০কা, ৫অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে বশা (বন্ধ্যা ধেনু)! উৎপন্ন হওনশালিনী তোমাকে, তোমার রোমাবলীকে, তোমার শফকে (খুরকে) নমস্কার। দ্যাবাপৃথিবী, জলরাশি যার দ্বারা রক্ষিত হয়, সেই বশা গাভীকে নমস্কার। যজ্ঞপদী, ইরা, ক্ষীরা, স্বধা, পর্জন্যপত্নী-রূপা বশা তন্ত্রশক্তির দ্বারা দেবগণকে সন্তুষ্ট করে। থাকেন। হে বশা! তোমাতে সোম ও অগ্নি প্রবেশ করেছেন, পর্জন্য ও বিদজৎ তোমার স্তন। তুমি জল-অন্ন-দুগ্ধ প্রদায়িনী। আদিত্যের দ্বারা আহূত হয়ে ইন্দ্র তোমাকে বিপুল পরিমাণ সোম পান করিয়েছিলেন। যখন তুমি ইন্দ্রের সম্মুখে অবস্থান করছিলে, তখন ঋষভ তোমাকে আহ্বান করেছিল এবং ইন্দ্র রুষ্ট হয়ে তোমার দুগ্ধ হরণ করে নিয়েছিলেন। সেই হরণ-কৃত দুগ্ধ স্বর্গলোকে তিনটি পাত্রে রক্ষিত হয়ে আছে। বশা ঋক্সমূহ ও সামগুলিকে ধারণ করে থাকে। হে বশা! যখন তুমি স্বর্ণালঙ্কৃত হয়ে দণ্ডায়মানা হয়েছিলে, তখন দ্রুতগামী সমুদ্রও অধিক স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। যে স্থানে দীক্ষিত অথবাগণ (অথর্ববেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ) কুশসমূহের উপর উপবেশন করেন, সেই স্থানে বশা মঙ্গল সাধন করে থাকে। হে বশা! তুমি ব্রহ্মের শিখর অপেক্ষা উচ্চ হয়ে ওঠা একটি বিন্দু হতে উৎপন্ন হয়েছে এবং পুনরায় হোতা উৎপন্ন হয়েছে। তোমার মুখ হতে গাথা সমূহ, নাড়ি সমূহ হতে বল, বল হতে যজ্ঞ এবং স্তন হতে কিরণ রাশি উৎপন্ন হয়েছে। তোমার ব্রণসমূহ ও শক্তি হতে অয়ন হয়েছে, অন্ত্র সমূহ হতে অস্ত্র এবং উদর হতে লতাসমূহ উৎপন্ন হয়েছে। যে প্রাণী উৎপন্ন হতে থাকে, সে গর্ভ হতে ভীত হয়। বশাই তাকে জন্ম দিয়ে থাকে। বশা যজ্ঞের প্রতিগ্রহণ করে থাকে। বশা অমৃত ও মৃত্যুর উপাস্য। বরুণের মুখের মধ্যে যে তিনটি জিহ্বা চক চক করে (উজ্জ্বল হয়ে বিরাজমান) তার মধ্য ভাগেরটিই বশা। বশাই দ্যাবাপৃথিবী, বিষ্ণু ও প্রজাপতি। যিনি বশাকে দান করেন, তিনি স্বর্গে গমন করে থাকেন। বশাদানীকে দেবতাগণ জীবিকা প্রদান করেন। এই সমগ্ৰ সংসার যতদূর পর্যন্ত সূর্যকে দর্শন করতে পারে, সেই সকল স্থান বশা-রূপই হয়ে থাকে।
টীকা— পূর্ববর্তী সূক্তে যে বশা বা শতৌদনার কথা বলা হয়েছে, সে কেবল মেধ্যমাংসাত্মিকা গাভী। নয়, বরং সে বিশসনের পরে দেবীরূপে দেবতাগণের মধ্যে সর্বাত্মিকা যজ্ঞস্বরূপা হয়ে যায়, ইত্যাদি মাহাত্ম্য ও প্রশংসা উপযুক্ত সূক্তে বিধৃত হয়েছে। সূত্রানুসারে এর বিনিয়োগ কর্তব্য। (১০কা, ৫অ. ২সূ.)। [ইতি দশমং কাণ্ডং সমাপ্ত]
বঙ্গানুবাদ –এই দেবমাতা অদিতি পুত্র-কামনায় ব্রহ্মোদন নামে আখ্যাত যজ্ঞ (জগৎস্রষ্টা ব্রহ্মার উদ্দেশে স্বাহাকারে দেয় অন্ন, ব্রাহ্মণগণকে ভোজন করানোর নিমিত্ত যজ্ঞানুষ্ঠান) করতে ইচ্ছুক হয়েছেন। হে অগ্নি! তুমি মন্থনের দ্বারা উৎপন্ন হও। মরীচি প্রমুখ সপ্তর্ষিগণ, যাঁরা ভূতসমূহের উৎপাদন-কর্তা, তারা এই দেব-যজ্ঞে যজমানের পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির সাথে মন্থনের দ্বারা তোমাকে প্রকট করুন। ১।
হে সপ্তর্ষিবৃন্দ! তোমরা জগৎ-সংসারের মিত্র-স্বরূপ এবং অভীষ্টবষক। তোমরা। মন্থনের দ্বারা ধূমকে পুষ্ট করো। এই অগ্নি যজমানগণের রক্ষক। এই ঋক্ সমূহ (মন্ত্র সমুদায়)-রূপ স্তুতিবাক্যের দ্বারা অগ্নিকে তুষ্ট করো। এই অগ্নি শত্রু-সেনাকে বশ করে থাকেন; দেবতাগণ নিজেদের ক্ষয়করণশালী অসুররূপী শত্রুগণকে এঁরই দ্বারা বশীভূত (পরাজিত) করেছিলেন। ২।
হে অগ্নি! তুমি উৎপন্ন প্রাণীবর্গের জ্ঞাতা হয়ে বিরাজমান এবং মন্থনের দ্বারা প্রকট হয়ে থাকো। তুমি দাহ-পাকে (ব্রাহ্মণগণের নিমিত্ত অন্ন পাকে, অর্থাৎ ব্রহ্মোদনে) সমর্থ। আমাকে অত্যন্ত বীর্য প্রদানের নিমিত্ত মন্ত্রশক্তির দ্বারা প্রদীপ্ত হয়ে থাকো। সপ্তর্ষিগণ তোমাকে ব্রহ্মোদনের নিমিত্ত প্রকট করেছেন। এই নিমিত্ত এই পত্নীকে (যজমান-পত্নীকে) ধন পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি সমন্বিত ধন প্রদান করো। ৩
হে অগ্নি! তুমি মন্ত্রের দ্বারা অধীয়মান এই সমিধের মাধ্যমে প্রজ্বলিত হয়ে দেবতাগণের নিমিত্ত হবিঃ পাক করো এবং এই যজমানের দেহাবসানের পর এঁকে উৎকৃষ্ট স্বর্গলোকে স্থিত করো। ৪।
হে দেবতাগণ! অগ্নি প্রমুখ দেবগণ; পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ তথা ব্রাহ্মণ ইত্যাদির যে ভাগ, সেই তিন ভাগ আমি বন্টন (বা বিভাগ) করে রেখেছি; তার মধ্যে হতে তোমরা আপন অংশকে জ্ঞাত হও। এর মধ্যে দেব-ভাগ অগ্নিতে হবিঃ স্বরূপে হুয়মান হয়ে যজমানের এই পত্নীকে অভীষ্ট ফল দানশালী হয়ে থাকে। (সায়ণাচার্যের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে–দেবগণের ভাগের দ্বারা নির্বাপ অর্থাৎ দান ইত্যাদি কর্তব্য, পিতৃবর্গের ভাগের দ্বারা বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ অর্থাৎ আভ্যুদায়িক বা সমৃদ্ধি-সাধক শ্রাদ্ধ এবং মনুষ্যগণের ভাগের দ্বারা ব্রাহ্মণভোজন অর্থাৎ ব্রহ্মোদন যজ্ঞ কর্তব্য)। ৫।
হে অগ্নি! তুমি শত্রুগণকে বশ করণশালী বলের সাথে যুক্ত; তুমি আমাদের শত্রুবর্গকে নিম্নে পাতিত করো। হে যজমান! এই গৃহের উপনয়ন দ্রব্য ইত্যাদি (বলিঃ) তোমার সমানজন্ম পুরুষদের (সজাতগণকে) উপহার দেবার নিমিত্ত আমার সাথে মিলিত করো ৷ ৬ ৷
হে যজমান! তুমি সমৃদ্ধি লাভ করে। এর অধিক (আরও) পরাক্রমের নিমিত্ত এই পত্নীকে উন্নত করো এবং দেহাবসানের পরে সেই ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ করো, যাকে অভিজ্ঞ জনেরা সুকৃতফলভোগের উপযুক্ত দুঃখস্পর্শরহিত স্বর্গলোক নামে অভিহিত করে থাকেন। ৭৷
সম্মুখস্থ এই যজ্ঞভূমি আস্তীর্ণ চর্ম (অজিন) স্বীকার করুন। এই পৃথিবী দেবী (অজিনের দ্বারা আস্তীর্ণ হওয়ার পর) আমাদের উপর কৃপাশালিনী হোন। তার কৃপাকে প্রণাম পূর্বক আমরা যজ্ঞ ইত্যাদি হতে উৎপন্ন পুণ্যফলের কারণরূপ লোক (স্বর্গ) প্রাপ্ত হবো॥ ৮৷
হে ঋত্বিক! তোমরা এই পুরোবর্তী পাষাণবৎ দৃঢ়তর উলুখল ও মুসলকে এই আস্তীর্ণ অজিনে স্থাপিত করো এবং যজমানের নিমিত্ত ধান্যসমূহকে সোমলতাখণ্ডবৎ শোভন করো। হে পত্নী! অবহনন করে (অবহ্বতী) আমাদের প্রজারূপ তোমার পুত্রগণকে বিনাশ করণের উদ্দেশে যে পৃতনা (শত্রুসেনা) আগমন করছে, তাদের স্তম্ভিত (বা নিবৃত্ত) করো এবং হবনের পরে মুসলকে। উথিত করে আমাদের সন্তানগণকে শ্রেষ্ঠ পদ প্রদান করো ॥৯॥
হে বীর্যবান্ অধ্বর্য! তুমি উত্তম কর্মশালী হস্তে উদূখল-মুসলকে গ্রহণ করো। দেবতাগণ তোমাদের যজ্ঞে আগত হয়েছেন। হে যজমান! তুমি যে তিনটি বর (অভীষ্ট) যাচনা করতে চাইছো, সেই কর্মসমৃদ্ধি, ফল-সমৃদ্ধি এবং পরলোকের সমৃদ্ধি, আমি এই যজ্ঞের দ্বারা সেই তিনটিকেই সিদ্ধ করছি। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে শূর্প (কুলা)! চাউল হতে তুষকে পৃথক করাই তোমার কর্ম। তোমাকে মিত্র, বরুণ, ধাতা ইত্যাদি দেবগণের মাতা অদিতি ঝাড়াই-বাছাই করণের নিমিত্ত হস্তে গ্রহণ করুন। এই পত্নীকে হত্যার নিমিত্ত যে শত্রু সৈন্য-সংগ্রহ করতে ইচ্ছা করে, তাদের নিপাতিত করণের নিমিত্ত ব্রীহিরূপ ধন হতে অমঙ্গলরূপ ভূসিগুলি পৃথক করে দাও এবং এই পত্নীকে পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি যুক্ত ধন দান করো। ১।
হে চাউল! তোমাদের সত্য ফলরূপ কর্মের নিমিত্ত প্রভূত করছি। তোমরা শূপে অবস্থান পূর্বক তুষসমূহ হতে পৃথক হয়ে যাও। তোমাদের প্রাপ্ত হয়ে শ্রীর (সম্পদের) দ্বারা এ : আমরাও সমানজন্মা পুরুষবর্গকে অতিক্রম করে যাবো এবং শত্রুগণকে পদদলিত করবো। ২।
হে নারী! তুমি জলাশয় হতে জল সংগ্রহ করে শীঘ্র প্রত্যাবর্তন করো। জলকুম্ভ পূর্ণ করে শিরে বহন পূর্বক সেই সময়ের মধ্যে গোষ্ঠে আগমন করো, যে সময়ে গাভীগণ জল পান করে থাকে। এর মধ্যে যা যজ্ঞের যোগ্য জল তা ঘট ইত্যাদি পাত্রে গ্রহণ করো, অযজ্ঞীয় জল, ধীমতী তুমি, বিবেচনা পূর্বক পরিত্যাগ করো ৷ ৩৷৷
শোভন অলঙ্কার সংযুক্তা রমণীগণ জল বহন করে উপস্থিত হয়েছে, হে পত্নী! তুমি আসন হতে উত্থিত হয়ে সেই জল গ্রহণ করো। তুমি সুন্দর পতিশালিনী এবং শোভন পুত্রযুক্ত সৌভাগ্যবতী, তুমি জলের কলশ গ্রহণ করো। এইরূপে এই যজ্ঞ তোমাকে উদকরূপের দ্বারা প্রাপ্ত হোক। ৪
হে জলরাশি! পূর্বকালে ব্রহ্মা যে সারভূত ভাগকে তোমাদের নিমিত্ত পরিকল্পিত করেছিলেন, তা-ই এইস্থানে আনীত হবে। হে ভার্যা! তুমি এই সারভূত জলকে অজিনের উপর স্থাপিত করো। ঋষিদের দ্বারা অনুষ্ঠীয়মান এই ব্রহ্মোদন নামক যজ্ঞ স্বর্গপথ প্রদর্শন করিয়ে থাকে, বল দান করে থাকে এবং পুত্র-পৌত্র গো-ইত্যাদি পশুসমূহকে প্রদানশালিনী হয়ে থাকে। হে যজমানের পত্নী ইত্যাদি! এই যজ্ঞ তোমাদের ঐসব ফলসমূহ প্রদানশালিনী হোক॥৫॥
হে অগ্নি! হবি প্রস্তুতের নিমিত্ত তোমার উপর চরুস্থালী স্থাপিত হোক এবং তুমি আপন শুদ্ধ ও সন্তাপক তেজের দ্বারা একে তপ্ত করো। গোত্রপ্রবর্তক ঋষিগণের জ্ঞাতা আর্ষেয় ব্রাহ্মণগণ তথা ইন্দ্র ইত্যাদির সাথে সম্বন্ধিত দেবতাগণ আপন-আপন ভাগ প্রাপ্ত হয়ে একে (এই হবিঃ বা চরুকে) বসন্ত ইত্যাদি কালবিশেষে তপ্ত করুন ৷ ৬ ৷
এই যজ্ঞের যোগ্য নির্মল জলরাশি চরুস্থালীতে প্রবিষ্ট হোক। এই জলরাশি আমাদের পুত্র ইত্যাদি এবং পশুসমূহ প্রদান করুক। ব্রহ্মোদন পাককারী যজমান পুন্যবানগণের সুখের স্থান স্বর্গলোককে প্রাপ্ত হোন ॥ ৭
মন্ত্রের দ্বারা শুদ্ধ এবং ঘৃতের দ্বারা পাককৃত দোষ রহিত হওনশালী এই চাউলগুলি সোমের অংশরূপ। হে চাউল সমুদায়! তোমরা যজ্ঞের যোগ্য, অতএব চরুস্থালীর মধ্যে রক্ষিত জলরাশির মধ্যে প্রবিষ্ট হও; এই ব্রহ্মোদন পাককারী যজমান পুণ্যলোক প্রাপ্ত হোন। ৮
হে ওদন (অন্ন)! তোমরা সহস্র অবয়বশালী হয়ে আছে। তোমাদের দ্বারা আমাদের পিতৃ-পিতামহ ইত্যাদি ঊর্ধ্বতন সপ্ত পুরুষ এবং পুত্র-পৌত্র ও তাদেরও সন্তান ইত্যাদি অধস্তন সপ্ত পুরুষ (ভাবী বংশধরগণ) তোমার দ্বারাই তৃপ্তি লাভ করুক, আর এর অতিরিক্ত আমিও, এই ব্রহ্মোদনের পাককারী যজমানও তোমার দ্বারা তৃপ্ত হয়ে পঞ্চদশ সংখ্যক পুরুষের পূরক হবো (অর্থাৎ ঊধ্বর্তন সাতপুরুষ ও অধস্তন সাতপুরুষের মধ্যবর্তী আমাকে নিয়ে আমার পঞ্চদশ পুরুষ তৃপ্ত হোক)। ৯।
হে যজমান! তোমার দ্বারা অনুষ্ঠীয়মান এই ব্রহ্মোদন নামক যজ্ঞ সহস্র শরীর এবং শতসংখ্যক ধারাযুক্ত। এ কখনও ক্ষয়প্রাপ্ত হবার নয়। এই ব্রহ্মোদন কর্মশালী যজমান ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাগণকে প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। হে যজ্ঞ! আমি এই সজাতিগণকে তোমার সকাশে উপস্থিত করছি, তুমি তোমার উপায়নদ্রব্য হরণের কারণে তাদের পুত্র-ভৃত্য ইত্যাদির সাথে উপক্ষীণ করে দাও। তুমি আমাকে সর্বোৎকৃষ্টভাবে সুখী করো। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে পকৌদন (পাকনিষ্পন্ন অন্ন)! তুমি বেদীতে হবিঃ রূপে স্থিত হওয়ার নিমিত্ত আগত হও এবং এই যজমান-পত্নীকে সন্তান ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধ করো। যজ্ঞ-হিংসকরাক্ষসকে এই স্থান হতে অপসারিত করে দাও এবং এই পত্নীকে প্রকৃষ্টতরভাবে পোষণ করো। আমরা সজাত পুরুষগণ অপেক্ষা অধিক শ্ৰী (অর্থাৎ ঐশ্বর্য) সম্পন্ন হয়ে তাদের অতিক্রম করেছি এবং আমি আমাদের শত্রুগণকে পদদলিত করছি। ১। হে ব্রহ্মৌদন! তুমি যজমান ইত্যাদির সমান পশুবান্ হয়ে পূজ্য দেবতাগণের সাথে আগমন করো। হে যজমান দম্পতি! তোমরা যেন অপরের আক্রোশ প্রাপ্ত না হও। অন্যের দ্বারা কৃত (বা প্রেরিত) অভিচার কর্ম (মারণ-ক্রিয়া) তোমাদের নিকট না আগমন করতে পারে। তোমরা রোগ রহিত হয়ে ঐশ্বর্য ভোগ করতে থাকো। ২।
ব্রহ্মা এই বেদীকে রচনা করেছেন, হিরণ্যগর্ভ এটিকে স্থাপনা করেছেন। ঋষিগণ ব্রহ্মৌদনের নিমিত্ত এই বেদীর কল্পনা করেছিলেন। হে পত্নী! তুমি দেবতা, পিতৃগণ ও মনুষ্যবর্গের আশ্রয়স্বরূপ এই বেদীর সমীপে গমন করো এবং তার উপর দেবগণের অন্ন স্থাপন করো। ৩৷৷
দেবমাতা অদিতির দ্বিতীয় হস্তস্বরূপ, হোমসাধনভূত যে সুককে (যজ্ঞীয় পাত্রকে) প্রাণীগণের স্রষ্টা সপ্তর্ষিগণ নির্মিত করেছেন, সেই দৰ্বী (যজ্ঞীয় সুক বা হাতা) অন্নের পক দেহকে জ্ঞাত হয়ে (অর্থাৎ অন্ন ঠিকমতো পাক হয়েছে কিনা তা জ্ঞাত হয়ে) বেদীর উপর ব্রহ্মেদিনকে স্থাপন করুক। ৪
হে পক্ক ওদন! তুমি হবনযোগ্য হওয়ায় তোমার সমীপে যজ্ঞাহঁ দেবতাগণ আগত হবেন। তুমি অগ্নি হতে বহির্গত (বা উখিত) হয়ে তাদের প্রাপ্ত হও। দুগ্ধ, দধি ইতাদি অমৃতস্বরূপ পদার্থ ও সোমরসের দ্বারা শুদ্ধিকৃত হয়ে তুমি ব্রাহ্মণবর্গের উদরে গমন করো। এঁরা আপন-আপন গোত্ৰ-প্রবরের জ্ঞাতা। তুমি এঁদের হিংসা করো না। ৫।
হে ব্রহ্মেদিন! তুমি রাজা সোমের সাথে সম্বন্ধিত। এই ব্রাহ্মণবর্গকে মোহে পাতিত করো না। যাঁরা তোমার সমীপে স্থিত, সেই ব্রাহ্মণগণকে সম্যক জ্ঞান প্রদান করো। তপস্যা হতে উৎপন্ন (ভৃগু, অঙ্গিরা ইত্যাদি বংশীয়) এই যে ঋষিগণ তোমায় গ্রহণ করেছেন, তাঁদের এবং শোভন আহ্বানা ঋষি-পত্নীগণকে বা মহিলা ঋষিগণকে (ঋষী) ব্রহ্মোদনের নিমিত্ত প্রাপ্ত করছি (বা পুনঃ পুনঃ আহ্বান করছি)। ৬।
আমি যজ্ঞের উপযুক্ত, নির্মল, পবিত্র করণশালিনী, পাপরহিত জলসমূহকে ব্রাহ্মণগণের হস্তে প্রক্ষালনের নিমিত্ত প্রদান করছি (ঢেলে দিচ্ছি)। হে জলরাশি! আমি অভীষ্টের নিমিত্ত তোমাকে অভিসিঞ্চিত করছি, আমার সেই অভীষ্টকে মরুৎ-বর্গের মাধ্যমে ইন্দ্র পূর্ণ করুন।৭৷৷
এই নিধীয়মান (নিধিস্বরূপ) হিরণ্য (হিরণ্যসদৃশ ওদন) অবিনশ্বর, আমার জ্যোতি বা প্রকাশক (অর্থাৎ আমার স্বর্গ-মার্গের প্রকাশক। এই শুদ্ধ ওদন ধান যব ইত্যাদিযুক্ত ক্ষেত্র হতে প্রাপ্ত কামধেনু সদৃশ। আমি এই ওদনরূপ ধনকে দক্ষিণা-রূপে ব্রাহ্মণগণকে প্রদান করতে রত হয়েছি; এই ধন স্বর্গে কোটি-গুণ হয়ে যাক। তথা পিতৃগণের যে অভিষ্মিত স্বর্গ, এর দ্বারা সেই পুণ্যলোকের মার্গ প্রশস্ত (বা প্রস্তুত) করছি। ৮।
হে ঋত্বিবৃন্দ! ব্রহ্মোদনের চাউলগুলি হতে পৃথক করে তুষগুলিকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করো এবং ফলীকরণগুলিকে (ককগুলিকে) পাদের দ্বারা অপমার্জন করো। এই ফলীকরণগুলি গৃহাধিপতি বাস্তুনাথের (বা বাস্তুনাগের) ভাগরূপে নির্ধারিত–এই কথা অভিজ্ঞজনের নিকট হতে শ্রুত হওয়া যায়। তথা এটি নির্ঋতির (অর্থাৎ পাপদেবতার) হবির্ভাগ বলেও আমরা জ্ঞাত আছি.৷ ৯।
হে ব্রহ্মেদিন! তুমি তপঃকরণশীল, ব্রাহ্মণগণের নিমিত্ত অন্নপাকের শ্রমের পর সর্ব যজ্ঞরূপ সোমাভিষবশালী, যজমানগণকে জ্ঞাত হয়ে তাদের স্বর্গমার্গে (স্বর্গ প্রাপ্তির পথে) আরোহণ করাও। পরে এঁরা যেন এই উৎকৃষ্ট শ্যেনপক্ষীর ন্যায় দ্রুতগতি সম্পন্ন হয়ে স্বর্গ-নামক পরমব্যোমে উপনীত হতে পারেন, এমনই করো। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে অধ্বর্যু! এই ব্রভ্র অর্থাৎ ভরণশীল ওদনের মুখ অর্থাৎ উপরিভাগকে বিশেষ ভাবে শুদ্ধ করো, পুনরায় ওদনের মধ্যভাগে আজ্য ধারণের নিমিত্ত গর্তরূপ স্থান প্রস্তুত করো, তথা সকল স্থালীগত ওদনের অবয়বকে ঘৃত-সিঞ্চিত করো। যে মার্গ আমাদের পূর্বপুরুষগণের অভিলষিত স্বর্গলোকের প্রতি ঋজুভাবে চলে গিয়েছে, এই ওদনের দ্বারা আমরা সেই পথকে প্রস্তুত করছি৷৷ ১।
হে বর্ভে (ভরণশীল ব্রহ্মৌদন)! ব্রাহ্মণব্যতিরিক্ত ক্ষত্রিয় ইত্যাদি যারা প্রাশন হেতু তোমার সমীপবর্তী হয়েছে, তাদের রাক্ষসগণের সাথে যুদ্ধ-কলহে প্রবৃত্ত করো, তারা রাক্ষসকৃত পীড়া প্রাপ্ত হোক। এবং যে গোত্র-প্রবর ইত্যাদি জ্ঞাতা ঋষিগণ উপবিষ্ট আছেন, তাঁরা পুত্র-পৌত্র ও পশু ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধ হোন। সেই প্রাশন করণশালী ব্রাহ্মণগণ, হে ওদন! যেন বিনাশ প্রাপ্ত হন। ২৷৷
হে ওদন! আমি তোমাকে আষেয় ব্রাহ্মণদের মধ্যে স্থিত করছি। এই ব্রহ্মেদনে অনার্যের (অর্থাৎ ঋষিগোত্রপবর সম্পর্কে অনভিজ্ঞ) পুরুষগণের সম্ভাবনা (বা স্থান) নেই। অগ্নি, মরুৎ-বর্গ, বরুণ ইত্যাদি সকল দেবতা এই পাকের দ্বারা সংস্কৃত ব্রহ্মেদিনকে রক্ষা করণশীল হোন ॥ ৩॥
এই ব্রহ্মেদিন যজ্ঞসমূহের উৎপাদন করণশালী, প্রবৃদ্ধাত্মক, ধনের আধার এবং পুংরূপা (অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ) ধেনু। হে ব্রহ্মেদিন! আমরা তোমার দ্বারা পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি ধন-পুষ্টি এবং দীর্ঘ আয়ু (অমরণধর্মতা) প্রাপ্ত হবো। ৪
হে ব্রহ্মৌদন! তুমি বৃষভ (অর্থাৎ কাম-বৰ্ষক); তুমি স্বর্গ-প্রাপ্ত চ করিয়ে থাকো; অতএব আর্ষেয় ব্রাহ্মণগণকে আমার দ্বারা প্রাপ্ত হও এবং পুনরায় পুণ্যাত্মবর্গের স্বর্গে গমন করো। সেখানে আমাদের ও তোমার (ভোক্তৃভোক্তব্যাত্মক) সংস্কার হোক। ৫
হে ওদন! তুমি সমাচয়ন (অর্থাৎ সকলের অঙ্গে সমূহীভবন) করে গন্তব্যকে প্রাপ্ত হও। হে অগ্নি! এই ওদনের গমনের নিমিত্ত দেব-মার্গের (দেবতাগণের গমনের নিমিত্ত দেবযান পথের) রচনা করো এবং আমরাও সেই পথে সপ্তরশ্মিসমন্বিত আদিত্যমণ্ডলের উপরে স্থিত যজ্ঞের অনুগামী হবো। ৬।
ব্রহ্মেদিন যজ্ঞের দ্বারাই ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাগণ দেবযান মার্গ অবলম্বন করে সুকৃত ফলস্বরূপ স্বর্গলোকে গমন করেছিলেন। এই হেতু দেবযান মার্গ নামে অভিহিত সেই হেন পথ ধরে আমরাও সব্যজ্ঞাত্মক পুণ্যকর্মের ফলভূত সেই লোক প্রাপ্ত হবো। আমরা প্রথমে স্বর্গলোকে আরোহণ করবো, এবং তার পরে নাক পৃষ্ট নামক উৎকৃষ্টতম স্থানে স্থিত হবো। ৭।
বঙ্গানুবাদ— (এইটি এবং এর পরবর্তী সূক্তদ্বয়ের দ্বারা ভৌম, অন্তরিক্ষ ইত্যাদির উৎপাত দোষ নিবৃত্তির উদ্দেশে অষ্টমূর্তিধারী মহাদেবের নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপিত হচ্ছে। আগমশাস্ত্রে মহাদেবের এই অষ্টমূর্তি অনুক্রান্ত হয়েছে, যথা–শর্ব, পশুপতি, উগ্র, রুদ্র, ভব, ঈশ্বর, মহাদেব ও ভীম। এগুলির উৎপত্তি সম্বন্ধে শতপথ ব্রাহ্মণের ষষ্ঠকাণ্ডে অস বা ইদং অগ্র আসীৎ (শ. ব্রা. ৬।১।১।১) ইত্যাদির মাধ্যমে বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। উপস্থিত এই সূক্তে ভব, শর্ব, পশুপতি, রুদ্র ও উগ্রের নিকট প্রার্থনা প্রজ্ঞাপিত হচ্ছে)– হে ভব (সর্ব-জগতের সৃষ্টি ইত্যাদি কর্তা মহাদেব)! হে শর্ব (সংহার কালে সর্ব-জগতের লয়কারী মহাদেব)! তোমরা সুখ প্রদান করো। রক্ষার নিমিত্ত আমাদের অভিমুখে গমন করো। হে ভূতেশ্বরদ্বয় (প্রাণীবর্গের প্রভু)! হে পশুপতিদ্বয় (পশুগণের পালক)! আমি তোমাদের নমস্কার করছি। এতে প্রসন্ন হয়ে তোমরা আমাদের দিকে আপন বাণ নিক্ষেপ করো না এবং আমাদের দ্বিপদ (মনুষ্য), চতুষ্পদ (পশু)গণকেও সংহার করো না। ১।
হে ভব ও শর্বদেব! আমাদের দেহের মাংস যেন কুকুর, শৃগাল, শকুন-কাক ইত্যাদি যেন ভক্ষণ না করতে পারে। তোমাদের যে মক্ষিকা ও পক্ষীসমূহ আছে, তারা খাদ্যরূপে যেন আমাদের প্রাপ্ত না হয়। ২।
হে ভব! অন্তকালে সকলকে ক্রন্দন কারক তোমার শক্তি (বা শব্দ) এবং জগৎ প্রাণভূত তোমার মায়াময় মহিমাকে নমস্কার। হে ভব! তুমি জগতের সাক্ষীরূপ (নিরাবরণজ্ঞানরূপ) দেবতা, তুমি অমরণ-ধর্মশীল; তোমাকে আমরা নমস্কার করছি ৷ ৩৷৷
হে রুদ্র! পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে অবস্থিত তোমাকে আমরা নমস্কার করছি। আকাশের মধ্যে অবস্থিত হয়ে সকলকে নিয়ন্তারূপে প্রতিষ্ঠিত তোমাকে আমরা নমস্কার করছি ৷৷ ৪।
হে ভবদেব! তোমার মুখ, চক্ষু, ত্বক ও নীলপীত বর্ণকে আমরা নমস্কার করছি। তোমার সমান রূপশালিনী দৃষ্টিকে ও প্রত্যগাতমরূপী (প্রতীচীনায়) তোমাকে নমস্কার। হে দেব! আমার নমস্কার গ্রহণ করো ৷ ৫৷৷
হে দেব! তোমার উদর, জিহ্বা, দন্ত, ঘ্রাণেন্দ্রিয় তথা অন্য অঙ্গসমূহের উদ্দেশে নমস্কার করছি৷৷ ৬ ৷
নীলকেশশালী, সহস্রচক্ষুধারী, অশ্বসম বেগশালী, সেনাবর্গকে শীঘ্র হননকারী রুদ্রের দ্বারা আমরা যেন কখনও আহত না হই। ৭।
যে ভবদেবের মহিমা প্রত্যক্ষ হয়ে থাকে, তিনি আমাদের সকল উৎপাত হতে পৃথক রূপে রক্ষা করুন। অগ্নি যেমন জলকে পরিত্যাগ করে (অর্থাৎ দহন করে না), ভবদেবও যেন সেইভাবে আমাদের পরিত্যাগ করুন (অর্থাৎ আমাদের হিংসা না করুন)। সেই ভবদেবকে নমস্কার করি ॥ ৮ ॥
শর্বদেবকে চারিবার নমস্কার ও ভবদেবকে অষ্টবার নমস্কার। হে পশুপতি! তোমাকে দশবার নমস্কার। তোমার স্বভূত (অর্থাৎ তোমার দ্বারা উৎপাদিত) বিভিন্ন জাতীয় গো, অশ্ব, অজ, অবি ইত্যাদি একখুর বা দ্বিখুর পশু এবং মনুষ্যগণকে রক্ষা করো। ৯।
হে রুদ্র (রোদনকারক দেব)! তুমি প্রচণ্ড উগ্র (অর্থাৎ ১উর্ণবল)। এই প্রাচী ইত্যাদি প্রধানভূতা চারিটি দিক, পৃথিবী ও ভূলোক তোমার স্বভূতা। এই পরিদৃশ্যমান বিস্তীর্ণ অন্তরিক্ষও তোমার অধীন। এই দিক-বলয় ও লোকত্রয়, এই পরিদৃশ্যমান সব কিছু তোমার শরীররূপ। যা কিছু প্রাণনব্যাপার (অর্থাৎ জীবনধারণের ক্রিয়া), সবই তুমি। সকলের প্রতি অনুগ্রহকারী এই হেন তোমাকে নমস্কার। ১০।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— ভবাশবৌ মৃড়তং ইত্যাদি সূক্তত্ৰয়ং অর্থসূক্তং। তেন অর্থসূক্তেন স্বস্ত্যয়নকামঃ আজ্য সমিৎপুরোশাদিশম্বুল্যন্তানাং ত্রয়োদশদ্রব্যাণাং অন্যতমং জুহুয়াৎ! সর্বানি বা ত্রয়োদশ দ্রব্যানি জুহুয়াৎ। সূত্রিতং হি।…কৌ. ৭/১, ৭/২ ইত্যাদি। (১১কা, ১অ. ৫সূ.)।
টীকা— পুর্বেই উল্লেখিত হয়েছে–এই সূক্তটি এবং এর পরবর্তী দুটি সূক্ত অর্থসূক্ত। এই তিনটি অর্থসূক্তের দ্বারা স্বস্ত্যয়ন কামনায় আজ্য সমিৎ পুরোডাশ ইত্যাদি এয়োদশ দ্রব্যের যে কোন একটি বা সবগুলির দ্বারা হোমে বিনিয়োগ কর্তব্য। তথা রুদ্র-ভূত-প্রেত-রাক্ষস-লোকপাল ইত্যাদির নিমিত্ত অভিঘাতের স্বস্ত্যয়নের নিমিত্ত সরূপ-বৎসা (তুল্য রূপশালিনী বৎসযুক্তা) গাভীর দুগ্ধে পনকৃত চরু তিনভাগে ভাগ করে সমস্ত অর্থসূক্তের দ্বারা তিন রুদ্রদেবতার উদ্দেশে তিনটি আহুতির দ্বারা যজ্ঞ নির্বাপণ করণীয়। বলা হয়েছে মাংসমুখাগ্রপতনলক্ষণাদ্ভূত শান্তির নিমিত্তও এই অর্থসূক্তের দ্বারা রুদ্রের উদ্দেশে আজাহুতি সমর্পণের বিধান আছে। তথা অগ্নিচয়নে এই অর্থসূক্তের দ্বারা অনুমন্ত্রণে বিনিয়োগ হয়। তথা সর্বকামনা প্রাপ্তির নিমিত্ত বা শান্তির নিমিত্ত ক্রিয়মানে লক্ষহোমে এই অর্থসূক্তের বিনিয়োগ হয় ॥ (১১কা, ১অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে পশুপতি (পশুগণের পালকরূপী মহাদেব)! নিবাসের কারণরূপ কর্ম (অর্থাৎ পাপপুণ্যরূপ কর্ম) যে স্থানে ধৃত হয়, সেই অণ্ডকটাহাত্মক কোশ তোমারই। এরই মধ্যে এই পরিদৃশ্যমান সকল প্রাণী নিবাস করে থাকে। তুমি আমাদের সুখ প্রদান করো। তোমাকে নমস্কার। তোমার প্রসাদে ক্রোশনশীল শৃগালেরা ও মাংসভক্ষক কুকুরগুলি আমাদের নিকট হতে দূরদেশে গমন করুক। রোদনকারিকা অমঙ্গলকারিণী বিকীর্ণকেশা পিশাচিনীগণও অন্যত্র গমন করুক৷৷ ১৷৷
হে রুদ্র! তুমি সংহারকালে সংহারাত্মক ধনু ধারণ করে থাকো। সেই হরিতবর্ণ, হিরন্ময় ধনু সহস্র সংখ্যককে একই সঙ্গে হননক্ষম, শতসংখ্যক প্রাণীজাতের মারক (অথবা অপরিমিত সংখ্যক বিশ্বকে সংহারক্ষম)। তোমার সেই ধনুকে প্রণাম। রুদ্রের বাণ সকল দিকে অবাধ গতিতে ধাবিত হয়ে থাকে। এই বাণ দেবহেতি অর্থাৎ দেবতাগণের সম্বন্ধিনী শক্তির মত, আমাদের দিক হতে যে দিকেই এই বাণ অবস্থান করুক, সেই দিকেই সেই বাণকে আমরা নমস্কার করছি। ২।
হে রুদ্র! যে পুরুষ অসমর্থ হয়ে তোমার সম্মুখ হতে পলায়ন করে, সেই অপরাধীকে তুমি উচিত দণ্ড দিতে সমর্থ। তার দৃষ্টান্ত, শস্ত্রহত পুরুষের লুক্কায়িত চিহ্নের দ্বারা তার নিবাস স্থানে উপনীত হয়ে হনন করা হয়; তুমি তেমনই করে থাকো ॥ ৩॥
ভব ও রুদ্র দুজনেই সমান মতি সম্পন্ন, এবং পরস্পর মিত্র-রূপে বিরাজমান। সেই প্রচণ্ড পরাক্রমী দুই মূর্তিই কারো দ্বারা অভিভূত না হয়ে আপন শির প্রকট করে পরিক্রমণ করে থাকেন। তাদের নমস্কার। যে দিকেই তারা বিরাজমান আছে, সেই দিকেই তাদের উদ্দেশে আমাদের প্রণাম প্রাপ্ত হোক। ৪
হে রুদ্র! আমাদের সম্মুখভাগে আগমনশীল তোমাকে নমস্কার, আমাদের দিক হতে প্রত্যাগমনশীল তোমাকে নমস্কার। এইরকম আগমন ও পরাগমন ব্যাতিরিক্ত তুমি যেস্থানেই উপবিষ্ট বা দণ্ডায়মান হয়ে আছে, সেই স্থানস্থায়ী তোমাকে আমাদের নমস্কার ॥ ৫॥
হে রুদ্র তোমাকে সায়ংকালে, প্রাতঃকালে, রাত্রিতে বা দিবাতেও আমরা নমস্কার করছি। ভব ও শর্ব, পরস্পর অনুরাগযুক্ত, এই দুই দেবতাকে আমরা নমস্কার করছি ৷ ৬ ৷
অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী, সহস্র নেত্রশালী, মেধাবী, অসংখ্য বাণ নিক্ষেপকারী এবং জিহ্বাগ্রে সমগ্র জগৎ ব্যাপ্তকারী রুদ্রের সম্মুখে আমরা উপনীত হবো না। ৭।
কপিশবর্ণ অশ্বশালী, শ্বেত ও কৃষ্ণবর্ণ পরিচ্ছদধারী, ভয়ঙ্কর স্বভাবশালী, কেশী নামক দৈত্যের রথকে ভূমিতে নিক্ষেপকারী, সেই রুদ্রদেবকে আপন-রক্ষকরূপে জ্ঞাত স্তোতৃগণের পূর্ব হতেই আমরা জ্ঞাত আছি। সেই হেন রুদ্রদেবের উদ্দেশে আমাদের নমস্কার। ৮৷৷
হে রুদ্র! আমরা মরণধর্মশীল মনুষ্য, আমাদের উপর তোমার আপন দেবসম্বন্ধী আয়ুধরূপী বজ্ৰাত্মক বাণ নিক্ষেপ করো না। আমাদের প্রতি রুষ্ট হয়ে না। অন্যদেশে বিস্তৃত শাখার ন্যায় আপন দিব্যাস্ত্রকে নিক্ষিপ্ত করো। তোমার উদ্দেশে আমরা নমস্কার করছি। ৯।
হে রুদ্র! আমাদের প্রতি হিংসাত্মকভাব পোষণ করো না। আমাদের আপন অনুগ্রহের যোগ্য বলে সংজ্ঞা (অধিবচনং) প্রদান করো। আমাদের উপর ক্রোধান্বিত হয়ো না। তোমার শাস্ত্রসমূহ আমাদের হতে পৃথক্ থাকুক। আমরা তোমার ক্রুদ্ধ ভাবের সাথে যেন মিলিত না হই। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে রুদ্র! আমাদের গো, পুত্র, ভৃত্য ইত্যাদির প্রতি হিংসা-কামনা করো না। সেই রকমই, আমাদের মেষ ও ছাগসমূহের প্রতিও হিংসা কামনা করো না। তুমি আপন অস্ত্র-শস্ত্রগুলিকে দেববিরোধীগণের উপর নিক্ষেপ পূর্বক তাদের সন্তান ইত্যাদিকেই বিনষ্ট করো। ১
রুদ্রদেবের যে আয়ুধ-রূপ আর্তস্বরকরী পীড়াময় কাস ও জ্বর ইত্যাদি ব্যাধিগুলি বর্তমান, সেগুলি সেচন-সমর্থ অশ্বের হ্রেষার ন্যায় অপকারী (বা অপরাধী) পুরুষগণেরই প্রাপ্য হোক। সেই অস্ত্র-শস্ত্র পূর্ব পূর্ব অপরাধীর কর্মকে লক্ষ্য করে যারা যোগ্যরূপে প্রতীত হয়, তাদের নিঃশেষে বিনাশ করে থাকে। এই হেন সেই জ্বর ইত্যাদি উপদ্রবকারী রুদ্র দেবতার উদ্দেশে আমরা নমস্কার করছি। ২৷৷
যে রুদ্রদেবতা নিরাধার প্রদেশে (অন্তরিক্ষে) অবস্থান পূর্বক অযজ্ঞকারী (বা অজ্ঞানী) জনকে সংহার করে থাকেন, আমরা সেই রুদ্রের উদ্দেশে অজ্ঞলিবদ্ধ হয়ে প্রণাম করছি। ৩।
হে পশুপতি! শার্দুল, মৃগ, শ্যেন, হংস, শকুন, বাজ ইত্যাদি বনচর পশু ও বনবিহারী পক্ষীগণকে তোমার ভাগের নিমিত্ত বিধাতা নির্ধারণ করেছেন; তুমি এদের আপন ইচ্ছানুসারে স্বীকার করো (অর্থাৎ আমাদের গ্রাম্য পশুগণের প্রতি দৃষ্টি দিও না বা তাদের বিনাশ করো না)। তোমার পূজনীয় রূপ জলের মধ্যে। স্থিত রয়েছে। এই নিমিত্ত তোমাকে অভিষিক্ত করতে দিব্য জল প্রবাহমান হয়ে চলেছে। (অর্থাৎ আমাদের উপভোগ্য উদকও স্পর্শ করো না)। ৪
হে রুদ্র! শিংশুমার (জলজন্তু বিশেষ, শিশুমার বা শুশুক), অজগর (বিরাটায়তন সর্পবিশেষ), পুরীকয় ইত্যাদি (জলচর প্রাণীবিশেষ), জষ, মৎস্য ইত্যাদি জলচরও তোমার নিমিত্ত ভাগরূপে নির্ধারিত হয়েছে, তাদের উদ্দেশে তুমি আপন তেজরূপ শস্ত্র নিক্ষিপ্ত করো। হে ভব! তুমি সর্বগত, তোমা হতে দূর বলে কিছু নেই। তুমি ক্ষণমুহূর্তের মধ্যেই সমগ্র পৃথিবীকে দেখতে এবং পুরোবর্তী সমুদ্র হতে উত্তর-দিক্রবর্তী সমুদ্রে পৌঁছাতে পারো। ৫।
হে রুদ্র! তুমি আমাদের জ্বর ইত্যাদি ব্যাধিরূপ অস্ত্রের সাথে মিলিত (বা সংযুক্ত) করো না, এবং স্থাবর-জঙ্গম হতে উদ্ভুত প্রাণঘাতী বিষের সাথেও মিলিত করো না। আকাশের বিদজরূপ অগ্নির সাথেও আমাদের যুক্ত করো না। তোমার আয়ুধ স্বরূপ বিদ্যোতমান অশনিকে অন্যত্র (অর্থাৎ আরণ্য পশু ইত্যাদি উপর) প্রক্ষিপ্ত করো, আমাদের উপর নয় ৷৷ ৬ ৷৷
ভবদেবতা দুলোক ও পৃথিবীর অধিপতি, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থানে স্থিত অন্তরিক্ষকে তিনিই আপন তেজের দ্বারা যুক্ত করে থাকেন। ত্রৈলোক্যব্যাপী এই হেন ভবদেব যে দিকেই থাকুন, তার উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করছি। ৭৷
হে ভব! হে সকলের অধিপতি! তোমার উদ্দেশে যজ্ঞকারী যজমানকে যজমানকে সুখ প্রদান করো। তুমি পশুপতিরূপে গো, অশ্ব প্রভৃতি বহু পশুর পালক। যে পুরুষ ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাগণকে আপন রক্ষক বলে মনে করেন, সেই শ্রদ্ধাশীল জনের চতুষ্পদ গো ইত্যাদি পশুকে এবং দ্বিপদ পুত্র-ভৃত্য ইত্যাদিকে সুখ প্রদান করো। ৮
হে রুদ্র! আমাদের জ্যেষ্ঠ গণকে (অর্থাৎ পিতা-মাতা প্রমুখ বৃদ্ধজনদের), ভারবহনক্ষম মধ্যবয়স্কদের (অর্থাৎ ভ্রাতা, পুত্র, ভৃত্য প্রমুখ যুবজনদের), অথবা আমাদের কনিষ্ঠবর্গকে (অর্থাৎ শিশুদের) প্রতি হিংসা (বা, সংহার) করো না, এবং আমাদের শরীরের প্রতিও হিংসা করো না। ৯।
বঙ্গানুবাদ –এই বিরাডাত্মক ভাবনীয় ওদনের শির হলো বৃহস্পতিদেব। তারও কারণভূত যে ব্রহ্ম, তিনি এর মুখ ॥১॥
আকাশ ও পৃথিবী এই ওদনের দুই কর্ণস্বরূপ; সূর্য ও চন্দ্র এর দুই নেত্রস্বরূপ এবং মরীচি, অত্রি প্রমুখ সপ্তর্ষিগণ তার প্রাণ ও অপান বায়ুস্বরূপ। (এখানে প্রাণবায়ু অর্থে নিশ্বাস ও অপানবায়ু অর্থে প্রশ্বাস)। ২৷
এই ওদনের উপাদান রূপ ব্রীহিবহনের জন্য যে মুসল (টেকির মোনা) নির্মিত, তা হলো তার চক্ষুরিন্দ্রিয় এবং উদূখল (উলুখল অর্থাৎ ধান্য ইত্যাদি কণ্ডনের নিমিত্ত পাত্রবিশেষ) এর কাম (অর্থাৎ অভিলাষ)। (উদূখলে ধান রেখে মুসলপ্রহারে পরিষ্কার করা হয়) ৷৷ ৩৷৷
অসুরমা দিতিই শূর্প (অর্থাৎ কুলা) এবং যিনি সেই শূর্পকে ধারণকারিণী (বা চালনকারিণী), তিনি দেবমাতা অদিতি। এবং বায়ু হলো ধান ও চাউলের বিবেচয়িতা (অর্থাৎ পৃথকারী)। ৪৷
ওদনের কণা হলো অশ্ব, ওদনের উপাদানভূত তণ্ডুল হলো গো এবং পৃথকীকৃত হয়ে যাওয়া তুষ হলো ক্ষুদ্রজন্তু মশকস্বরূপ। ৫।
ফলীকরণ হলো কব্রু বা ক। (যে প্রাণীর মস্তক ও জ্বর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায় না, সেইরকম প্রাণীর ভাবনীয় হলো ফলীকরণ)। অন্তরিক্ষে সঞ্চরণশীল মেঘ এর শির। ৬।
শ্যামবর্ণ যে লৌহ অর্থাৎ খনিত্ৰ ইত্যাদি উপাদান তা এই বিরাডাত্মক ওদনের মাংস এবং লোহিত বর্ণ যে তাম্ৰাত্মক ধাতু এই লোকে দেখা যায়, সেই সবই এই ওদনের রক্ত ৷৷ ৭৷
ওদন পাকের পর যে ভস্ম থেকে যায়, তা হচ্ছে আপু অর্থাৎ সীসা; ওদনের যে হেম বৰ্ণ তা-ই স্বর্ণ। ওদনেলর গন্ধ হলো কমল। ব্রীহি ইত্যাদি ধান্যের খড়গুলিকে পৃথক করার স্থানই হলো এর পাত্র; ধান্য ধারণের শকটের দুটি অবয়ব এর অংস (বা স্কন্ধ), ঈষাদ্বয় (অর্থাৎ লাঙ্গলের দণ্ডদ্বয়) এর অনূক্য (অর্থাৎ স্কন্ধের বা দেহের সন্ধি); ওদন-সম্বন্ধি শকটে যোজিত বৃষভের কণ্ঠে আবদ্ধ রঞ্জুগুলি এর অন্ত্র (নাড়ীভুড়ি) এবং শকট লাঙ্গল যোজনের চর্মময় রঞ্জুদ্বয় এর দুই গুহ্যস্থান (লিঙ্গ ও পায়ু)। ৮-১০৷
এই পরিদৃশ্যমান পৃথিবী (অর্থাৎ বিস্তীর্ণা ভূমি) রাধ্যমান (অর্থাৎ রন্ধন করা হচ্ছে, এমন) ওদনের কুম্ভী (অর্থাৎ পাকার্থ হাঁড়ি বা স্থালী); আকাশ এই কুম্ভীমুখের আচ্ছাদন-পাত্র (ঢাকনা বা সরা)। ১১।
সীতা (অর্থাৎ কর্ষণোৎপন্না বীজবপনার্থ লাঙ্গল-পদ্ধতিসমূহ) এই ওদনের পার্শ্বস্থ অস্থি এবং নদীসমূহের বালুকারাশি তার অধজীর্ণ তৃণাত্মক উদরগত শকৃৎ (অর্থাৎ বিষ্ঠা)। ১২।
লোকে বিদ্যমান জলসমূহ এই ওদনের প্রক্ষালনের জন্য, এবং ক্ষুদ্রকায় নদীসমূহের সমস্ত জল এর উপসেচন (অর্থাৎ মিশ্রণসাধনরূপ) ॥১৩।
উদীরিতলক্ষণা এই ওদনের পাকের নিমিত্ত কুম্ভী ঋগ্বেদের দ্বারা অগ্নিতে স্থাপিতা, সেই সম্পর্কিত কর্ম-প্রতিপাদকের দ্বারা (অর্থাৎ যজুর্বেদের দ্বারা) তা প্রেরিতা, ব্রহ্মবেদের দ্বারা (অর্থাৎ আথর্বণের দ্বারা) সর্বতোভাবে পরিগৃহীতা এবং সামবেদের দ্বারা অঙ্গারে পরিবেষ্টিতা (অর্থাৎ কুম্ভীর চতুর্দিকে অঙ্গার সংযুক্ত হয়ে আছে)। ১৪-১৫৷
বৃহৎ সাম হলো জলে প্রক্ষিপ্ত তণ্ডুলসমূহের মিশ্রণসাধন কাষ্ঠ (অর্থাৎ তণ্ডুলে ও জলে মিশ্রিত করণের নিমিত্ত কাষ্ঠনির্মিত যজ্ঞীয় খন্তী) এবং রথন্তর সাম হলো ও ওদন উদ্ধারসাধন দর্বি (যজ্ঞীয় হাতা)। ১৬৷৷
বসন্ত ইত্যদি ঋতু সমুদায় এই ওদনের পাকক্রিয়ার কর্তা। ঋতুসম্বন্ধি অহোরাত্রগুলি বা সেই সেই ঋতুতে জায়মান প্রাণীবিশেষ একে সন্দীপিত করছে। (ঋতুগণই এই ওদনের পাক-কর্তা; কারণ সর্বজগদাত্মকৌদন-পাকস্য কালাধীনত্বাৎ নান্যঃ পং শক্লোতীত্যর্থঃ–সায়ণাচার্য)। ১৭ ৷৷
(চরু শব্দে ওদন কিংবা ওদনপাকের স্থালীও বোঝায়)–এই চরুর পাঁচটি বিভিন্ন মুখ। (কারণ এটি গো-অশ্ব-মনুষ্য মেষ-ছাগ এই পাঁচটি পশুর উৎপত্তির হেতুভূত-১১/১/৫)। অতএব এই হেন চরু বা স্থালীকে তেজস্বী আদিত্য তাপিত করছেন। ১৮
অগ্নিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞের দ্বারা যে লোক-প্রাপ্তির কথা বলা হয়ে থাকে, সেই সব লোক এই মহাপ্রভাবশালী পক্ক ওদনের দ্বারা সম্যক প্রাপ্তি সম্ভব হয়ে থাকে। ১৯৷
যে ওদনের নিম্নে ও উপরে পৃথিবী, সমুদ্র ও আকাশ স্থিত হয়ে আছে, এ ওদন তা-ই। ২০৷
যে ওদনের উচ্ছিষ্টে অর্থাৎ যাগাবশিষ্ট অংশে ষড়গুণিতাশীতিসংখ্যক (৪৮০ সংখ্যক) দেবতা বীর্যবন্ত হয়েছেন, হে গুরুদেব! সেই ওদনের যে মহিমা তা আমি আপনার নিকট জিজ্ঞাসা করছি। ২১-২২৷
উদীরিত লক্ষণ এই ওদনের মহিমাকে যে গুরু জ্ঞাত আছেন, তিনি উপদেশ দেওয়ার সময়ে এর মহিমাকে অল্প বলেন না এবং এও বলেন না যে, এই ওদনে দুগ্ধ, ঘৃত, দধি ইত্যাদির অবশ্যকতা নেই। এটির পুরোবর্তীত্ব নির্দেশ করেন না, আবার এটিকে অনির্দিষ্টরূপেও বলেন না। (অর্থাৎ কেবল এটির মাহাত্ম্যটুকুই বলে থাকেন)। ২৩-২৪।
সব যজ্ঞের অনুষ্ঠানকারী দানী যেমন অভিমত ফলের কামনা করেন, তার অধিক বলেন না। ২৫৷
ব্ৰহ্মবাদী মহর্ষিগণ পরস্পর বলে থাকেন-হে দেবদত্ত! তুমি এই ওদনপরাজুখে (অর্থাৎ প্রতিকূল রূপে) অথবা আত্মাভিমুখে (অর্থাৎ আপন অনুকূল রূপে) ভক্ষণ করেছে। যদি তুমি পরাজুখরূপে (পশ্চাতে স্থিত) এই ওদন ভক্ষণ করে থাকো, তবে প্রাণবায়ু তোমা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এমন কথা প্রাশিতকে (ভক্ষণকারীকে) বলা উচিত। যদি তুমি প্রতিমুখ-স্থিত এই ওদন ভক্ষণ করে থাকো, তা হলে অপানবায়ু তোমাকে ত্যাগ করবে–এই রকম কথা প্রাশিতকে বলা প্রয়োজন। ২৬-২৯
ওদনকে ভক্ষণ আমি করিনি, এবং ওদন আমাকে ভক্ষণ করেনি। ভোক্তৃভোক্তব্য (ভক্ষক ও ভক্ষণীয়) প্রপঞ্চাত্মক (মায়াময়) এই ওদনই ওদনের কর্তারূপে ভক্ষণীয় ওদনকে ভক্ষণ করেছে। এ (ওদন এব কর্তা ওদনং স্বাত্মানং প্রাশিতবা) ॥ ৩০-৩১৷৷.
[ঋষি : অথর্বা। দেবতা : মন্ত্রোক্ত। ছন্দ : ত্রিষ্টুপ, গায়ত্রী, জগতী, অনুষ্টুপ, পংক্তি, বৃহতী, উষ্ণিক] ততশ্চৈনমন্যেন শীষ্ণা প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। জ্যেষ্ঠতস্তে প্রজা মরিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। বৃহস্পতিনা শীষ্ণা। তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ১। ততশ্চৈনমন্যাভ্যাং শ্রোত্ৰাভ্যাং শীর্ষাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। বধিররা ভবিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। দ্যাবাপৃথিবীভ্যাং শ্রোত্ৰাভ্যাং। ভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপুরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ২॥ ততশ্চৈনমন্যাভ্যামক্ষীভ্যাং শীর্ষাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। অন্ধো ভবিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চম। সূর্যাচন্দ্রমসাভ্যামক্ষীভ্যাম্। ভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপুরুঃ সর্বত। সর্বাঙ্গ এব সর্বপুরুঃ সর্বতঃ সং ভবর্তি য এবং বেদ ॥ ৩৷৷ ততশ্চৈনমন্যেন মুখেন প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। মুখতস্তে প্রজা মরিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ। ব্ৰহ্মণা মুখেন। তেনৈনং প্রাশিষং তৌননমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ ৷৷ ৪৷৷ ততশ্চৈনমন্যয়া জিয়া প্ৰাশীৰ্ষয়া চৈতং পর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। জিহ্বা তে মরিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। অগ্নেৰ্জিহুয়া। তয়ৈনং প্রাশিষং তয়ৈনমজীগম। এব বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৫৷৷ ততশ্চৈনমন্যৈদন্তেঃ শীর্ষেশ্চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। দন্তাস্তে শস্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ ঋতুভিদন্তৈঃ। তৈরেনং প্রাশিষং তৈরেনমজীগম। এষবা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৬৷৷ ততশ্চৈনমন্যৈঃ প্রাণাপানৈঃ শীর্ষৈশ্চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রাশন। প্রাণাপানাস্তু হাস্যন্তীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। সপ্তর্ষিভিঃ প্রাণাপানৈঃ। তৈরেনং প্রাশিষং তৈরৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৭৷৷ ততশ্চৈনমন্যেন ব্যচসা শীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। রাজযক্ষ্মা হনিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। অন্তরিক্ষেণ ব্যচসা। তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতনূঃ। সর্বাঙ্গ এব, সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৮৷৷ ততশ্চৈনমন্যেন পৃষ্ঠেন শীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। বিদজৎ ত্বা হনিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। দিবা পৃষ্ঠেন। তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বর্তনূঃ। সর্বাঙ্গঃ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৯৷ ততশ্চৈনমন্যেনোরসা প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। কৃষ্যা ন রাৎস্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। পৃথিব্যোরসা। তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গঃ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ১০ ততশ্চৈনমন্যেনোদরেণ প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্বং ঋষয়ঃ প্রশ্ন। উদরদারস্তুা হনিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। সত্যেনোদরেণ। তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ১১। ততশ্চৈনমন্যেন বস্তিনা প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। অষ্ণু মরিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। সমুদ্রেণ বস্তিনা। তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগমম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বর্তনূঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ১২। ততশ্চৈনমন্যাভ্যামূরুভ্যাং শীর্ষাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। ঊরূ তে মরিষ্যত ইত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। মিত্রাবরুণয়োরূরুভ্যাম্। তাভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ১৩ ৷৷ ততশ্চৈনমন্যাভ্যামষ্ঠীবদ্ভ্যাং শীর্ষাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। শ্ৰামো ভবিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। ত্বরষ্ঠীবদ্ভ্যাং। ভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বনূঃ। সবার্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ১৪। ততশ্চৈনমন্যাভ্যাং পাদাভ্যাং শীর্ষাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। বহুচারী ভবিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। অশ্বিনোঃ পাদাভ্যাং। ভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ১৫৷৷ ততশ্চৈনমন্যাভ্যাং প্রপদাভ্যাং শীর্ষাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। সর্পা হনিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। সবিতুঃ প্রপদাভ্যাং। ভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতনুঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ১৬ ততশ্চৈনমন্যাভ্যাং হস্তাভ্যাং প্ৰাশীৰ্ষাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। ব্রাহ্মণং হনিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। ঋতস্য হস্তাভ্যাং। ভ্যামেনং প্রাশিষং ভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গঃ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ ৷৷ ১৭ ৷৷ ততশ্চৈনমন্যয়া প্রতিষ্ঠয়া শীর্ষয়া চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। অপ্রতিষ্ঠানোহনায়তনো মরিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চং। সত্যে প্রতিষ্ঠায়। তয়ৈনং প্রাশিষং তয়ৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ১৮
বঙ্গানুবাদ— পূর্বে অনুষ্ঠানকারী ঋষিগণ যে শিরের দ্বারা (অর্থাৎ ওদনের যে শিরোভাগ হতে) এই ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, তার অতিরিক্ত অন্য শিরের দ্বারা যদি তুমি এই ওদনকে ভক্ষণ করে থাকো, তবে জ্যেষ্ঠ ইত্যাদি ক্রমে তোমার প্রজা অর্থাৎ পুত্র ইত্যাদি মরণপ্রাপ্ত হতে থাকবে।–এই রকমই অভিজ্ঞজনেরা ভক্ষণকারীকে প্রতিজ্ঞার সাথে বলে থাকেন।-আমি সেই ওদনকে অভিমুখ পরাঙ্খ ও আত্মাভিমুখ হওয়ার পরও ভক্ষণ করিনি। পূর্ব ঋষিগণ বৃহস্পতির দ্বারা সম্বন্ধিত যে শিরের দ্বারা একে ভক্ষণ করেছিলেন, আমি ওদন-সম্বন্ধী সেই শিরের দ্বারা সেই রকমেই ভক্ষণ করেছি। (অর্থাৎ এইভাবে ভক্ষণ পূর্বক আমি গন্তব্য দেশ প্রাপ্ত হয়েছি)। (অথবা আমাকে ওদন ভক্ষণ করেছে)। এই প্রকার ভক্ষিত এই ওদন সকল অবয়বসন্ধির দ্বারা যুক্ত হয়ে (অর্থাৎ সম্পূর্ণশরীরশালী হয়ে) সর্বাঙ্গ ফল লাভ পূর্বক এই সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিকে স্বর্গ ইত্যাদি লোকে উপনীত করে থাকে। ১।
পূর্ব ঋষিগণ যে শ্রোত্রের দ্বারা ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, সেই বিধির অতিরিক্ত অন্য লৌকিক শ্রোত্রের দ্বারা যদি ওদন ভক্ষণ করে থাকে, তবে তুমি বধির হবে।–এই রকমই অভিজ্ঞজনেরা ভক্ষণকারীকে প্রতিজ্ঞার সাথে বলে থাকেন।–আমি সেই ওদনকে অভিমুখ, পরাজুখ ও আত্মাভিমুখ হয়ে ভক্ষণ করিনি। পূর্ব ঋষিগণ বৃহস্পতির দ্বারা সম্বন্ধিত যে শ্রোত্রের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, সেই দ্যাব-পৃথিবীরূপ শ্রোত্রদ্বয়ের দ্বারা আমি এই ওদন ভক্ষণ অথবা আমাকে ওদন ভক্ষণ করেছে)। এই প্রকারে ভক্ষিত এই ওদন সকল অবয়বসন্ধির দ্বারা যুক্ত হয়ে (অর্থাৎ সম্পূর্ণশরীরশালী হয়ে) সর্বাঙ্গ ফল লাভ পূর্বক এই সম্পর্কে জ্ঞাত জনকে স্বর্গলোকে উপনীত করে থাকে। ২।
পূর্ব ঋষিগণ যে নেত্রের দ্বারা ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, তুমি তার অতিরিক্ত লৌকিক নেত্রের দ্বারা যদি ভক্ষণ করে থাকো, তবে তুমি অন্ধ। হয়ে যাবে।–এই রকমই অভিজ্ঞজনেরা ভক্ষণকারীকে প্রতিজ্ঞার সাথে বলে থাকেন।–আমি সেই ওদনকে অভিমুখ, পরাজুখ ও আত্মাভিমুখ হয়ে ভক্ষণ করিনি। পূর্ব ঋষিগণ বৃহস্পতির দ্বারা সম্বন্ধিত যে নেত্রের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, সেই সূর্য-চন্দ্ররূপ নেত্র দুটির দ্বারা আমি এই ওদন ভক্ষণ করেছি। (অথবা আমাকে ওদন ভক্ষণ করেছে)। এই প্রকারে ভক্ষিত এই ওদন সকল অবয়বসন্ধির দ্বারা যুক্ত হয়ে (অর্থাৎ সম্পূর্ণশরীরশালী হয়ে) সর্বাঙ্গ ফল লাভ পূর্বক যিনি এই সম্পর্কে জ্ঞাত হন তাঁকে স্বর্গলোকে উপনীত করে থাকে ৷ ৩৷৷
পূর্বে অনুষ্ঠানকারী ঋষিগণ যে ব্ৰহ্মাত্মক মুখের দ্বারা ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, তুমি তার অতিরিক্ত লৌকিক মুখের দ্বারা যদি ওদন-ভক্ষণ করে থাকো, তবে (শিরের দ্বারা ভক্ষণের মতো) তোমার প্রজা বা পুত্র ইত্যাদি মরণ প্রাপ্ত হবে।–এই রকমই অভিজ্ঞ জনেরা ভক্ষণকারীকে প্রতিজ্ঞার সাথে বলে থাকেন।–আমি সে ওদন অবাজুখে, পরাজুখে অথবা আত্মাভিমুখে ভক্ষণ করিনি। আমি জগকারণ ব্রহ্ম বা বেদান্তক মুখের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছি। (অথবা এই ওদন আমাকে ভক্ষণ করেছে, অর্থাৎ আমার প্রাপ্ত হয়েছে)। এই প্রকারে ভক্ষিত এই ওদন সকল অবয়বসন্ধির দ্বারা যুক্ত হয়ে (অর্থাৎ সম্পূর্ণ শরীরশালী হয়ে) সর্বাঙ্গ ফল লাভ পূর্বক এই সম্পর্কে জ্ঞাত জনকে স্বর্গলোকে উপনীত করে থাকে। ৪।
পূর্বে অনুষ্ঠানকারী ঋষিগণের বিধির অতিরিক্ত লৌকিক জিহ্বার দ্বারা যদি তুমি এই ওদনকে ভক্ষণ করে থাকে, তবে তোমার জিহ্বা প্রাণত্যাগের মাধ্যমে স্বকার্যক্ষমতাহীন হয়ে যাবে। –এই রকমই অভিজ্ঞজনেরা ভক্ষণকারীকে বলে থাকেন। আমি অবাঙ্গুখে, পরাজুখে অথবা আত্মাভিমুখে সেই ওদনকে ভক্ষণ করিনি। আমি অগ্নির অবয়বভূত জিহ্বার দ্বারা এই ওদনকে ভক্ষণ করেছি। এই প্রকারে ভক্ষিত এই ওদন…… ৫
পূর্ব ঋষিগণের বিধির অতিরিক্ত লৌকিক দন্তের দ্বারা যদি তুমি ওদন ভক্ষণ করে থাকো তবে তোমার দন্তসকল বিশীর্ণ হয়ে পাতিত হয়ে যাবে।……আমি এই ওদন………ভক্ষণ করিনি। আমি বসন্ত-গ্রীষ্ম ইত্যাদি ঋতুরূপ, দন্তের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছি, এই প্রকারে কৃত ভক্ষণ সর্বাঙ্গ ফল দান করে। যিনি এই ভক্ষণকে এই প্রকারে জ্ঞাত হন, তিনি সর্বাঙ্গ ফল প্রাপ্ত হয়ে স্বর্গ ইত্যাদি লোকে স্থিত হয়ে থাকেন ৷ ৬।
যে ঋষ্যাত্মক প্রাণ ও অপানের দ্বারা পূর্বে অভিজ্ঞ জনেরা ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, তুমি তার অতিরিক্ত লৌকিক প্রাণাপানের দ্বারা যদি ওদন ভক্ষণ করে থাকো, তবে তোমার প্রাণপানাত্মিকা অর্থাৎ মুখ্য প্রাণের বৃত্তিসমূহ তোমাকে ত্যাগ করে যাবে।…….। আমি সে ওদন.. ভক্ষণ করিনি। আমি সপ্তর্ষিরূপ প্রাণাপানের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছি। এই রকমে এই ওদন সকল অবয়সন্ধির দ্বারা যুক্ত হয়ে সর্বাঙ্গ ফল লাভ করে। যিনি এই ওদন-ভক্ষণকে জ্ঞাত হন, তিনি সর্বাঙ্গ ফল লাভ পূর্বক স্বর্গ ইত্যাদি লোকসমূহে স্থিত হয়ে থাকেন। ৭।
যে বিধির দ্বারা অর্থাৎ সর্বশরীরবর্তী যে ব্যাপ্তির দ্বারা পূর্ব ঋষিগণ এই ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, তুমি যদি তা ব্যতীত অন্য কোন বিধির দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করে থাকে, তবে তোমাকে রাজযক্ষ্মা নামক ক্ষয়রোগ বিনাশ করে দেবে।………। –আমি সে ওদন………ভক্ষণ করিনি। আমি অন্তরিক্ষাত্মক বিধির দ্বারা সেই ওদন ভক্ষণ করেছি। এইরকম ওদন……….সর্বাঙ্গ ফল লাভ করে। যিনি এই………স্থিত হয়ে থাকেন ॥ ৮
পূর্ব ঋষিগণ দজলোকাত্মক যে পৃষ্ঠের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, তা ভিন্ন। শরীরের অন্য কোন অংশের দ্বারা যদি তুমি এই ওদন ভক্ষণ করে থাকো, তবে বিদ্যোমানা অশনি তোমাকে হনন করবে।……..।–আমি………ভক্ষণ করিনি। আমি দজলোকাত্মক শরীরের অপর ভাগের দ্বারা একে ভক্ষণ করেছি।……….এইরকম ওদন……….সর্বাঙ্গ ফল লাভ করে। যিনি এই……..স্থিত হয়ে থাকেন। ৯৷
পূর্ব ঋষিগণ যে বক্ষের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, সেই বক্ষ ব্যতীত স্তনমণ্ডলের উপরিবর্তী অর্থাৎ পুরোভাগস্থ অবয়বের দ্বারা যদি তুমি ওদন ভক্ষণ করে থাকো, তবে কৃষিতে তুমি সফলতা প্রাপ্ত হবে না (অর্থা ব্রীহি, যব ইত্যাদি ফসলে সমৃদ্ধ হতে পারবে না।…….–আমি সে ওদন……ভক্ষণ করিনি। আমি পৃথিবীরূপ (পৃথিবীত্ব ভাবমান) বক্ষের দ্বারা সেই ওদন ভক্ষণ করেছি। এইরকম ওদন………ফল লাভ করে। যিনি এই…….স্থিত হয়ে থাকেন। ১০৷
পূর্ব ঋষিগণ যে উদরের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, তার ব্যতিরিক্ত অন্য উদরের দ্বারা যদি এই ওদন ভক্ষণ করে থাকো, তাহলে উদর বিদীর্ণকারী (দরণাত্মক) অতিসার নামক ব্যাধি তোমাকে গ্রাস পূর্বক বিনাশ করে দেবে।…….। আমি সে ওদন……….ভক্ষণ করিনি। আমি সে ওদন যথার্থকথনাত্মক (অর্থাৎ সত্যস্বরূপ) উদরের দ্বারা ভক্ষণ করেছি। এই রকম ওদন………সর্বাঙ্গ ফল লাভ করে। যিনি এই………স্থিত হয়ে থাকেন ৷৷ ১১।
পূর্বে ঋষিগণ যে বস্তি বা মূত্রাশয়ের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, তুমি যদি সেই বস্তি ব্যতিরেকে অন্য বস্তির দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করে থাকে, তবে তুমি জলেতেই (অর্থাৎ জলে নিমজ্জিত হয়েই) মৃত্যুপ্রাপ্ত হবে।–এই কথা………বলে থাকেন।-আমি সে ওদন……… ভক্ষণ করিনি। আমি সমুদ্ৰাত্মক বস্তির দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছি এবং এইভাবেই আমি একে লাভ করেছি। এইরকম ওদন………..সর্বাঙ্গ ফল লাভ করে। যিনি এই………..স্থিত হয়ে থাকেন / ১২।
পূর্বে ঋষিগণ যে ঊরু দুটির দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করেছিলেন, তুমি যদি তার অতিরিক্ত অন্য ঊরুদ্বয়ের দ্বারা এই ওদন ভক্ষণ করে থাকে, তবে তোমার দুটি ঊরু ত্যক্তপ্রাণবৎ বিশুষ্ক হয়ে যাবে।–এই কথা……… বলে থাকেন।–আমি সে ওদন………ভক্ষণ করিনি। আমি মিত্র ও বরুণ সম্বন্ধী উরুদ্বয়ের দ্বারা সেই ওদন ভক্ষণ করেছি এবং তার দ্বারা এই ওদন আমাকে ভক্ষণ করেছে (অর্থাৎ ওদনই ওদনকে ভক্ষণ করে প্রাপ্ত হয়েছে)। এই প্রকারে ভক্ষিত এই ওদন……… সর্বাঙ্গ ফল দান করে। যিনি এই………স্থিত হয়ে থাকেন ॥ ১৩
বঙ্গানুবাদ –পূর্বোক্ত মহিমার সাথে যুক্ত (মহিমোপেত) ঐ ওদন আপন মহিমায় বিশ্বের রচয়িতা এবং সূর্যমণ্ডলে বর্তমান ঈশ্বরের স্বরূপ: (অর্থাৎ এ ওদন সূর্যমণ্ডলাত্মক)। ১।
যে পুরুষ সূর্যমণ্ডলাত্মক ওদনের রূপকে জ্ঞাত হন (অর্থাৎ মণ্ডলাভিমানী সূর্যরূপে ওদনের উপাসনা করেন), তিনি ব্ৰধুলোক (অর্থাৎ সূর্যলোক) প্রাপ্ত হন (অর্থাৎ সূর্যের মতো লোকনীয় বা দর্শনীয় হন)। তিনি সূর্যের বিষ্টপি অর্থাৎ মণ্ডলাত্মক স্থানের সেবা করেন (অর্থাৎ সূর্যাত্মক হয়ে যান)। ২।
প্রজাপতি এই সূর্যাত্মক ওদনের দ্বারা অষ্টবসু (আপ, ধ্রুব, সোম, অনল, অনিল, ধর, প্রত্যুষ ও প্রভাব), এ একাদশরুদ্র (অজ, একপাৎ, অহিব্ৰধু, পিণাকি, অপরাজিত, ত্র্যম্বক, মহেশ্বর, বৃষাকপি, শম্ভু, হরণ ও ই ঈশ্বর), দ্বাদশ-আদিত্য (ধাতা, মিত্র, অর্যমা, রুদ্র, বরুণ, সূর্য, ভগ, বিবস্বান, পূষা, সবিতা, ত্বষ্টা ও বিষ্ণু), প্রজাপতি ও বষট্কার-এই তেত্রিশ দেবতাকে সৃষ্টি পূর্বক তাদের অধিষ্ঠানও (লোকসমূহও) নির্মাণ করেন। ৩।
সেই দেবলোকসমূহকে প্রকৃষ্টরূপে জানার জন্য (অর্থাৎ সেই সেই লোকের উপভোগ্য সুখের সাক্ষাৎকারের নিমিত্ত (তত্তলোকোপভোগ্যসুখসাক্ষাৎকারায়) তাদের সাধনত্বরূপে এই যজ্ঞের সৃষ্টি (বা বিধান) করেন। ৪
এই প্রকার জ্ঞাতশীল উপাসককে যে পুরুষ উপদ্রষ্টা (সাক্ষাৎকর্তা) হন, সেই উপরোধক নিক আপন শরীরস্থ প্রাণের গতিকে রুদ্ধ করে দিতে পারেন। ৫।
শুধু প্রাণের গতিই অবরুদ্ধ হয় না, বরং সেই নিন্দাকারী জনের সন্তান, পশু ইত্যাদি অভিমত সকল বস্তুরও হানি ঘটে। ৬।
শুধু সর্বস্ব হানি হয় এমন নয়, তার সাথে তাঁর প্রাণও বৃদ্ধাবস্থার পূর্বেই তাকে পরিত্যাগ করে যায় (অর্থাৎ তার অকালমরণ ঘটে)। ৭।
বঙ্গানুবাদ— সকল প্রাণধারীগণের শরীরে ব্যাপ্ত (অর্থাৎ সমষ্টিশরীরাভিমানী) হিরণ্যগর্ভরূপ সেই প্রাণকে নমস্কার। সেই সগুণব্রহ্মাত্মক, যাঁর বশে এই সংসার (অর্থাৎ চরাচরাত্মক জগৎ) বর্তমান, যিনি অতীতকাল হতে অবিচ্ছিন্ন, যিনি প্রাণীবর্গের ঈশ্বর, যে উদীরিতলক্ষণ প্রাণে (অর্থাৎ পরমব্রহ্মাত্মকে) সমগ্র জগৎ প্রতিষ্ঠিত, এমনই সেই প্রাণের উদ্দেশে নমস্কার। ১।
যখন জগৎপ্রাণভূত সূর্যরূপী দেবতা মেঘধ্বনির ব্রীহি যব ইত্যদি গ্রাম্য ও, আরণ্য ঔষধি সমুদায়কে অভিলক্ষিত করে গোযূথমধ্যে বৃষভের ন্যায় গর্জন করতে থাকেন, তখন ঔষধি ইত্যাদি গর্ভধারণে সমর্থ হয়ে থাকে; অনন্তর বিবিধরূপে জাত (উৎপন্ন) হয়৷ ৩৷৷
বর্ষা-ঋতুকে প্রাপ্তির পর প্রাণদেব যখন ঔষধিসমূহের প্রতি গর্জন করেন, তখন সকলে হর্ষিত হয়। ভূমির উপরে (অর্থাৎ পৃথিবীর) সকল প্রাণীজাত আনন্দে পূর্ণ হয়ে যায়৷ ৪
যখন প্রাণদেব পৃথিবীর বিস্তীর্ণ ভূমিকে বর্ষায় সর্বদিকে সিক্ত করেন, তখন গো ইত্যাদি পশুসকল উৎসবানন্দে নৃত্য করতে থাকে। (কারণ বৃষ্টির পর পৃথিবীতে প্রভূত শস্য উৎপন্ন হলে তার দ্বারা তারা পুষ্টিলাভ করবে)। ৫৷৷
প্রাণদেবের দ্বারা অভিসিক্ত ঔষধিসকল তাকে বলতে থাকে–হে প্রাণ! তুমি আমাদের সুন্দর গন্ধশালিনীরূপে সৃজন করো এবং আমাদের জীবনকে বর্ধিত করো ॥ ৬
হে প্রাণ! সম্মুখে আগমনশীল তোমাকে নমস্কার, এবং বিমুখে গমনশীল তোমাকে নমস্কার। যে স্থানেই তুমি অবস্থান করো, সেই স্থানেই তোমাকে নমস্কার। তোমাকে উপবিষ্ট অবস্থাতেও নমস্কার ॥ ৭৷
হে প্রাণদেব! প্রাণবায়ুর কর্মকরী (প্রাণব্যাপারং কুর্বতে) তোমাকে নমস্কার। তথা অপানবায়ুর কর্মকরী (অর্থাৎ অপানবৃত্ত্যাত্মক) তোমাকে নমস্কার। অভিমুখে গমন-স্বভাব (অর্থাৎ দেহের বাহিরে অবস্থিত) তোমাকে নমস্কার, দেহের মধ্যে অবস্থিত (প্রতিমুখং অঞ্চতে) তোমাকে নমস্কার। ৮
হে প্রাণ! তোমার প্রীতিবিষয়ক যে দুই শরীর আছে, সেই প্রাণ ও অপান বৃত্তিদ্বয়াত্মক বা অগ্নি-সোমাত্মক প্রেয়সীদ্বয় এবং তোমার সম্বন্ধি যে অমৃতপ্রাপক ঔষধি আছে, সেই সকলের নিকট হতে আমাদের জীবনের নিমিত্ত অমৃত-গুণ দানশালী ভেষজ গ্রহণ করে আমাদের প্রদান করো। ৯
প্রাণদেব দেব, তির্যক প্রাণী ও মনুষ্য ইত্যাদি প্রজাগণকে ক্রমানুসারে (নাড়ীর দ্বারা) আচ্ছাদিত করে (ব্যাপ্ত হয়ে আছেন, যেমন পিতা তার স্নেহের পাত্ৰভূত পুত্রকে নিজে (বস্ত্রের দ্বারা) আচ্ছাদন করে থাকেন। যারা জঙ্গমাত্মক বস্তুপ্রাণন ব্যাপারশালিনী, এবং যারা বস্তুপ্রাণন ব্যাপার হতে রহিত, পরন্তু প্রাণ তাদের মধ্যে নিরুদ্ধগতির দ্বারা বাস করেন, এই সকল জঙ্গম-স্থাববের সাথে যুক্ত জগৎসংসারের ঈশ্বর বা স্বামী প্রাণই। ১০
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –প্রাণায় নমঃ ইত্যাদি সূক্তত্ৰয়ং অর্থসূক্তং। অনেন উপনয়নকর্মণি মাণবকস্য নাভিং সংস্পৃশ্য আচার্য জপেৎ। উপনয়ন প্রক্রম্য সূত্রিতং…(কৌ. ৭/৬)। তথা আয়ুষ্কামঃ অনেনার্থসূক্তেন দক্ষিণং কর্ণং অনুমন্ত্রয়েত। তথা ঋষিহস্তে আয়ুষ্কামস্য শরীরং অভিমন্ত্রয়েত। সূত্রিতং হি।…(কৌ. ৭/৯)। তথা অস্যার্থসূক্তস্য আয়ুষ্যগণে পাঠাৎ…..বিনিয়োগগাহনুসন্ধেয়।–ইত্যাদি। (১১কা, ২অ. ৪সূ.)।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি ও এর পরবর্তী দুটি সূক্ত অর্থসূক্ত। এই সূক্তের দ্বারা উপনয়নকর্ম, আয়ুষ্কামী জনের কর্ম, আয়ুষ্যগণে পাঠ, মহাশান্তি কর্মে ব্রীহিযবময় মণিবন্ধন, গ্ৰহযজ্ঞে শনৈশ্চরের উদ্দেশে সমিধাদান বা উপস্থান করণ, শান্তির নিমিত্ত লক্ষহোমে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে ॥ (১১কা, ২অ. ৪সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –প্রাণই শরীর হতে বহির্গত হয়ে মৃত্যু উপস্থিত করে থাকে বলে সর্বপ্রাণীর মরণের কর্তা। প্রাণই জীবনের কষ্টদায়ক জ্বর ইত্যাদি রোগ। দেহমধ্যবর্তী সেই প্রাণকে ইন্দ্রিয়রূপী দেবগণ উপাসনা করে থাকে। সেই প্রাণই সত্য-আচরণ-শীল মহানুভব জনকে উদ্ধৃষ্টতম লোকে স্থাপন করে থাকে। ১।
প্রাণ হেন দেব বিরাট অর্থাৎ স্থলপ্রপঞ্চাভিমানী ঈশ্বর। প্রাণই দেন্ত্রী অর্থাৎ আপন আপন ব্যাপারে সকলের প্রেরয়িত্রী পরদেবতা। সেই হেন প্রাণকে আপন অভিলষিত ফলসিদ্ধির নিমিত্ত সর্ব জন সেবা করে থাকে। প্রাণই সূর্য অর্থাৎ সকলের প্রেরক আদিত্য, প্রাণই চন্দ্রমা অর্থাৎ অমৃতময় সোম। (এই কারণেই প্রাণের অগ্নীষোমাত্মকত্ব উক্ত হয়)। তথাবিধ এই প্রাণকেই অভিজ্ঞ জনগণ প্রজাপতি অর্থাৎ প্রজাগণের স্রষ্টা বলে অভিহিত করেন। ২।
প্রাণ ও অপান প্রাণেরই প্রধানভূত বৃত্তিবিশেষ, তারাই ব্রীহি ও যব। যা বৃত্তিমা (মুখ্য) প্রাণ, তা-ই অনড্রান (বৃষ বা বলদ) নামে কথিত। (কারণ কর্ষণের দ্বারা ব্রীহিও যবের উৎপাদকরূপে অনডুহ প্রাণের স্বরূপ)। স্রষ্টাদেব যবের মধ্যে প্রাণবৃত্তি ও ধান্যের মধ্যে অপানবৃত্তিশালী বায়ুকে স্থাপিত করেছেন। এই উভয়ের দ্বারাই সকল প্রাণী আপন কার্য সাধিত করে থাকে। অতএব লোকরক্ষণের কারণে প্রাণই ব্রীহি-ব-অনড্রান (ধান্য-ব-বলদ) রূপে কথিত হয় ৷৷ ৩৷৷
প্রাণের অন্নাত্বকত্ব উক্ত হয়েছে। হে প্রাণ! অন্নরসের পরিণামরূপ শরীর ধারণশালী মনুষ্য স্ত্রীর গর্ভে তোমাকে প্রবিষ্ট করিয়েই অপানন ব্যাপার ও প্রাণন ব্যাপার করিয়ে থাকে। তুমি গর্ভস্থ শিশুকে মাতা কর্তৃক ভোজন-কৃত আহরের দ্বারাই পুষ্ট করে থাকো। পুনরায় সেই পুরুষ (অর্থাৎ শিশু) পুণ্য-পাপের ফল ভোগের নিমিত্ত ভূমির উপর জন্ম গ্রহণ করে। (অন্নই পুরুষশরীরে শুক্ররূপে উৎপন্ন হয়ে মাতৃ-শোনিতে মিশ্রিত হয়ে মাতৃগর্ভে সন্তানের উৎপাদক)। ৪
মাতরিশ্বা বায়ুকে প্রাণ বলা হয়। জগৎ সংসারের আধারভূত বায়ুই প্রাণ। সেই বায়ুরূপ প্রাণে অতীতকালে উৎপন্ন জগৎসংসার ও ভবিষ্যৎকালে উৎপাদিতব্য জগৎসংসার আশ্রয় রূপে বিদ্যমান থাকে। অধিকন্তু সেই প্রাণে এই সম্পূর্ণ বিশ্বই আশ্রিত হয়ে রয়েছে ॥ ৫॥
হে প্রাণ! যখন তুমি বর্ষার দ্বারা সকলকে তৃপ্ত করে থাকো, তখন অথবা মহর্ষির দ্বারা ও অঙ্গিরা ঋষির দ্বারা সৃষ্ট (অর্থাৎ আথবণ ও আঙ্গিরস গোত্রীয় ঋষিগণের দ্বারা সৃষ্ট), এবং দেবতাগণের দ্বারা রচিত, তথা মনুষ্যগণ কর্তৃক প্রকটনশালী সকল প্রাণী ও ঔষধিসমূহ উৎপন্ন হয় ৬
যখন প্রাণ বৃষ্টিরূপে পৃথিবীর উপর বর্ষণ করতে থাকে, তখনই ব্রীহি, যব ইত্যাদি গ্রাম্য ঔষধিগুলি এবং লতারূপিণী অন্যান্য আরণ্য ঔষধিগুলি উৎপন্ন হয়ে থাকে। ৭।
হে প্রাণ! তুমি যে বিদ্বানের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে থাকো এবং যিনি তোমার উক্ত মহিমাকে মান্য করে থাকেন, সকল দেবতা সেই বিদ্বানকে শ্রেষ্ঠ লোকে (অর্থাৎ স্বর্গে) অমৃতত্ব প্রদান করে থাকেন। ৮।
হে প্রাণ! দেবতা, তির্যক প্রাণী, মনুষ্য ইত্যাদি সকল প্রজা যে প্রকারে তোমার উপভোগের যোগ্য বলি (অর্থাৎ বলকারক অন্ন) প্রদান করে থাকে, তেমনই তোমার মহিমাজ্ঞ বিদ্বানের উদ্দেশেও করুক। ৯৷
শুধু মনুষ্যের মধ্যেই নয়, দেবতাগণের মধ্যেও প্রাণ গৰ্ভরূপে বিচরণ করে থাকে। সকল দিকে ব্যাপ্ত হয়ে নিত্যবর্তমান সেই প্রাণ পুনরায় ভূতকালাবচ্ছিন্ন বস্তুতে ও ভাবিকালাবছিন্ন বস্তুতে প্রবিষ্ট হয়, যেমন পিতা আপন পুত্রের মধ্যে আপন অবয়বের দ্বারা প্রবেশ করেন। (অর্থাৎ প্রাণই পিতারূপে আপন আত্মজের মাধ্যমে পুনর্জন্ম প্রাপ্ত হয়)। ১০। টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির বিনিয়োগ ইত্যাদি চতুর্থ সূক্তে উক্ত হয়েছে ৷ (১১কা, ২অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –জগৎপ্রাণভূত সূর্য হংসস্বরূপ (হন্তি গচ্ছতীতি হংসঃ)। এই সূর্য সলিল হতে উত্থিত হয়ে একটি পাদ নিশ্চলরূপে রক্ষা করে অন্য পাদে পরিভ্রমণ করছেন। হে দেবদত্ত (অঙ্গ)! সূর্য যদি নিহিত পাদ ক্ষেপণ করতেন (উৎখিদেৎ), তবে যত্রতত্র গমন করতে পারতেন। তাহলে কালপরিচ্ছেদক সূর্যের পরিস্পন্দনের অভাবে অদ্য, আগামী কল্য, রাত্রি, দিবা এইরকম বিভিন্ন ব্যবহার হতে পারতো না। সূর্যোদয়ের অসম্ভাব্যমানে তার পুরোভাবিনী উষাও উদিত হতো না। (অর্থাৎ জগৎসংসার অন্ধকারাবৃত হয়ে যেতো)।–অথবা সকল শরীরে ব্যাপ্ত প্রাণও হংস নামে কথিত। (হন্তি গচ্ছতি কৃৎস্নশরীরং ব্যাপ্য বৰ্তত ইতি হংস)। ঐ সলিল-উপলক্ষিত, পঞ্চ-ভূতাত্মক দেহ প্রাণবৃত্তিরূপ এক পাদের দ্বারা উপরে উত্থিত হয়ে অপানবৃত্তিশালী অপর পাদকে ক্ষেপণ করে না (ননাৎক্ষিপতি)। যদি প্রাণ সেই অপানবৃত্তিশালী পাদকে শরীর মধ্য হতে উৎক্ষেপণ করে (উৎক্ষিপেৎ), তবে কৃৎস্ন শরীর হতে প্রাণ নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলে মৃত শরীরের কালবিভাগ থাকে না। কদাপি তার অন্ধকারেরও. নিবৃত্তি ঘটে না। (এই কারণে জগৎকে সজীব রাখতে আপন এক পাদকে, স্থির রাখে)। ১।
(রস, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা ও শুক্র এই সপ্তধাতু এবং ওজঃ অর্থাৎ বল নিয়ে মোট অষ্টধাতু। শরীরস্থ এই) অষ্টধাতুরূপ যে চক্র আছে, তাতে যুক্ত প্রাণ এক নেমি। (এখানে শরীরকে রথের সাথে তুলনা করা হয়েছে। রথের অষ্টচক্র যেমন একটি নেমির দ্বারা যুক্ত শরীরও তেমনই অষ্টধাতুরূপ চক্র ও প্রাণরূপ নেমি সমন্বিত)। এই চক্র সহস্র অর্থাৎ বহু অক্ষের দ্বারা যুক্ত। (শরীরও তেমনই প্রাণপরিষ্পবশে বহুবিধ শব্দের সাথে যুক্ত)। এমনই রথাত্মক শরীর প্রথমে পূর্বভাগে প্রবর্তিত অর্থাৎ নিয়োজিত বা চালিত হয়, পরে অপর ভাগে নিবর্তিত অর্থাৎ প্রত্যাবর্তিত হয়। (অর্থাৎ প্রাণ প্রাণীর শরীরে প্রবিষ্ট হয়ে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির সৃষ্টি করে। এই প্রাণ আপন অর্ধাংশের দ্বারা সকল ভূতজাতের শরীরে প্রাণবায়ুরূপে প্রবেশ করে থাকে। এবং তার অপর অংশ অপরিচ্ছিন্ন। এইট কিরকম? এটি নির্ধারণ করা যায় না। (কারণ, ঐ অবশিষ্ট স্বরূপ পরব্রহ্মাত্মক অর্থাৎ অনন্ত)। ২।
যে প্রাণ জন্মধারণ করণশীল সচরাচর বিশ্বের অধিপতি, সে দেহধারীগণের দেহে শীঘ্রতার সাথে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। এমনই মহিমাশালী, হে প্রাণ! তোমাকে নমস্কার ৷৩৷
যে প্রাণ জগৎসংসারের অধিপতি, সে প্রমাদরহিত হয়ে অনবচ্ছিন্নরূপে আমাতে– বর্তমান থাকুক। ৪
হে প্রাণ! তুমি নিদ্রা হতে উত্থিত হয়ে নিদ্ৰাপরবশ প্রাণীবর্গকে তাদের রক্ষণার্থে সচেতন হও। সুপ্ত প্রাণী তির্যবস্থিত হয়ে (অর্থাৎ বক্রভাবে অবস্থিত হয়ে) শায়িত থাকে। (অতএব তাদের জাগ্রত করো)। (হিন্দী ভাষ্যকারের উক্তি–প্রাণী শয়ন করে, পরন্তু প্রাণের শয়ন ও কখনও শ্রুত হয় না)। ৫৷৷
হে প্রাণ! তুমি আমার প্রতি বিমুখ হয়ো না। আমা হতে অন্যত্র হয়ে আমি জীবনের নিমিত্ত তোমাকে আপন শরীরে ধারণ করছি। ৬। টীকা –উপযুক্ত সূক্তটিও চতুর্থ সূক্তের ন্যায় বিনিয়োগ করণীয় ॥ (১১কা, ২অ, ৬সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –আকাশ ও পৃথিবী এই দুই লোককে ব্যাপ্ত করণশালী ব্রহ্মচারীর (বেদান্তক ব্রহ্মে অভ্যস্ত জনের) প্রতি সকল দেবতা সমানমনস্ক (অর্থাৎ অনুগ্রহবুদ্ধিযুক্ত) হয়ে থাকেন। তিনি আপন তপের প্রভাবে পৃথিবী ও আকাশকে পোষণ করে থাকেন এবং আপন গুরুকেও পালন করেন। (অর্থাৎ সৎ পথাবলম্বনের প্রবৃত্তির দ্বারা আচার্যকেও পরিপালন করেন)। ১।
ব্রহ্মচারীর রক্ষার নিমিত্ত দেবজন সংজ্ঞায় পরিচিত দেবগণ এবং ইন্দ্র প্রমুখ সকল দেবতা তার অনুসরণ করেন; গন্ধর্ব বিশ্বাবসু ইত্যাদিও তার পশ্চাতে গমন করতে থাকেন। অষ্টবসু ইত্যাদি ত্রয়স্ত্রিংশৎ (৩৩) দেবতা, তার বিভূতিরূপ তিনশত তিন (এ্যত্তরত্রিশতসংখ্যক) দেবতা হতে আরম্ভ করে ছয় সহস্র দেবতা পর্যন্ত সকলকে আপন তপের দ্বারা পোষণ করে থাকেন। ২৷
উপনয়মান মানবককে উপগময়ন (উপনয়ন করণশালী) আচার্য আপন বিদ্যাময় শরীরের মধ্যে (গর্ভে) স্থাপিত করে, তিন রাত্রি পর্যন্ত তাকে (সেই ব্রহ্মচারী মানবককে) আপন উদরে রক্ষা করেন, চতুর্থ দিবসে সেই বিদ্যাময় শরীর হতে উৎপন্ন ব্রহ্মচারীকে দর্শনের নিমিত্ত তার সম্মুখে আগত হন ৷ ৩৷
পরিদৃশ্যমান পৃথিবী এই ব্রহ্মচারীর প্রথম সমি, এবং আকাশ তাঁর দ্বিতীয় সমিৎ। অধিকন্তু অন্তরিক্ষে অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যভাগের অগ্নিতে স্থাপিত সমিধের দ্বারা ব্রহ্মচারী সংসারকে সন্তুষ্ট করে থাকেন। এই প্রকারে সমিধসমূহ, মেখলা (শরপত্র ইত্যাদি দ্বারা নির্মিত ধারণীয় উপবীত), ইন্দ্রিয় নিগ্রহ-উদ্ভূত শ্রম ও দেহসন্তাপক অন্যান্য নিয়মগুলিকে পালন পূর্বক (অর্থাৎ তপস্যায়) পৃথিবী ইত্যাদি লোকসমূহকে পোষণ করে থাকেন। ৪
ব্রহ্মচারী ব্ৰহ্ম হতেও প্রথমে প্রকট হয়েছেন; তিনি তেজোময় রূপ ধারণ করে তপের সাথে যুক্ত হয়েছেন। সেই ব্রহ্মচারী রূপের দ্বারা দীপ্ত হয়ে ব্রহ্মার দ্বারা শ্রেষ্ঠ বেদাত্মক ব্ৰহ্ম প্রকট হয়েছেন এবং তার দ্বারা প্রতিপাদিত অগ্নি ইত্যাদি দেবতাও আপন অমৃতত্ব। ইত্যাদি গুণ সমুদায়ের সাথে প্রকট হয়েছেন। ৫
প্রাতে ও সায়ংকালে অগ্নিতে রক্ষিত সমিধ সমূহ এবং সেগুলি হতে উৎপন্ন তেজের দ্বারা তেজস্বী, কৃষ্ণ মৃগচর্মধারী যে ব্রহ্মচারী আপন ভিক্ষাচরণ ইত্যাদি নিয়মসকল পালন করে থাকেন, সেই দীর্ঘশ্মশ্রুধারী ব্রহ্মচারী শীঘ্রই পূর্ব সমুদ্র হতে উত্তর সমুদ্রে গমন করেন। (অর্থাৎ তার তপস্যার মহিমা ব্যাপ্ত হয়–এটাই তাৎপর্য)। তথা তিনি পৃথিবী অন্তরিক্ষ ইত্যাদি লোকসমূহকে হস্তে ধারণ পূর্বক আপন অভিমুখীন করে থাকেন। ৬।
ব্রহ্মচারী ব্রহ্মতেজের (বা ব্রহ্মচর্যের) দ্বারা ব্রাহ্মণ জাতিকে উৎপন্ন করে থাকেন। তিনিই গঙ্গা ইত্যাদি নদীগুলিকে প্রকট করে থাকেন। তিনিই স্বর্গ ইত্যাদি লোক সমূহ, প্রজাপতি পরমেষ্ঠী এবং বিরাটকে উৎপন্ন করে থাকেন। এই অমরণশীল ব্রহ্মের সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ গুণের সাথে যুক্ত (অর্থাৎ ত্রিগুণাত্মিকা) প্রকৃতির মধ্যে গর্ভরূপ স্বীকার করে প্রথম ব্রহ্মচারী প্রাণধারীগণকে উৎপন্ন করছেন এবং তার পরে ইন্দ্র হয়ে সুরবিরোধী রাক্ষসগণকে বিনাশ করছেন ॥ ৭৷
এই আকাশ ও পৃথিবী বিশাল। এই পৃথিবী ও আকাশের উৎপাদক আচার্যকেও ব্রহ্মচারী রক্ষা করেন। সকল দেবতা এমনই ব্রহ্মচারীর উপর কৃপা বর্ষণ করে থাকেন। এই বিস্তীর্ণ পৃথিবীকে ব্রহ্মচারী প্রথমে ভিক্ষারূপে গ্রহণ করে পুনরায় দ্বিতীয় ভিক্ষারূপে সেই আকাশকে গ্রহণ করেছেন ॥ ৮।
পুনরায় আকাশ ও পৃথিবীকে সমিধরূপে অগ্নিকে আরাধনা পূর্বক জগৎসংসারের সকল প্রাণীকে সেই আকাশ ও পৃথিবীর আশ্রয়ীভূত করেছেন। ৯
দুলোকের পৃষ্ঠ (অর্থাৎ উপরিভাগ) হতে অবাকে (অর্থাৎ অর্ধেভূলোকে) একটি নিধি (অর্থাৎ বেদাত্মক ধন) গুহায় (অর্থাৎ আচার্যের হৃদয়রপ গুহার অভ্যন্তরে) গচ্ছিত আছে। তার উপরিদেশস্থ গুহায় অপর একটি দেবতারূপ নিধি আছে, যা জ্ঞাত হওয়া যায় না। অধীতবেদের সম্বন্ধিনী (অর্থাৎ বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের গচ্ছিত) সেই নিধি দুটি ব্রহ্মচারী। তপস্যার দ্বারা (অর্থাৎ আপন ব্রহ্মচর্য-মহিমায়) রক্ষা করছেন। বেদরাশির শব্দ ও অর্থের সাথে যা সম্বন্ধিত (অর্থাৎ অধিষ্ঠানভূত) পরব্রহ্মকে বেদবি ব্রাহ্মণ সাক্ষাৎ করে থাকেন। ১০।
টীকা –এই অনুবাকের পাঁচটি সূক্তের মধ্যে প্রথম তিনটি সূক্তে ব্রহ্মচারীর মাহাত্ম্য-কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলি ব্ৰহ্মযজ্ঞ-জপে বিনিয়োগ করণীয় ॥ (১১কা, ৩অ. ১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –এক অনুদিত সূর্যাত্মক অগ্নি এই পৃথিবীর নীচে বর্তমান রয়েছে, অপর পার্থিব অগ্নি পৃথিবীর উপরে রয়েছে। সূর্যোদয়ের পর এই আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে ঐ দুই অগ্নি পরস্পর মা সংযুক্ত হয়ে থাকে। সেই সূর্য ও অগ্নি-সম্বন্ধি রশ্মিসমূহ পরস্পর সম্মিলনের দ্বারা অতি দৃঢ় হয়ে আকাশ ও পৃথিবীকে আশ্রয় করে। এই অগ্নিদ্বয়োপেত (দুই অগ্নিকে প্রাপ্ত) ভূমিতে ব্রহ্মচারী আপন। তপোমহিমায় অধিষ্ঠান করেন। (অর্থাৎ অগ্নিরূপে সেই ভূমির অধিদেবতা হয়ে থাকেন)। ১।
সর্বদিকে গর্জনকারী জলপূর্ণ মেঘকে প্রাপ্ত হয়ে বরুণ দেবতা আপন বীর্যকে পৃথিবীর উদ্দেশে প্রেরণ করছেন। ব্রহ্মচারী সেই বরুণাত্মক বীর্যকে আপন তপোমহিমায় পৃথিবীর উন্নতপ্রদেশে বর্ষণ করছেন। সেই উদকলক্ষণ বীর্যের দ্বারা প্রাচী ইত্যাদি চারি প্রধান দিকের প্রাণীগণ প্রাণ ধারণ করে (বা সমৃদ্ধ হয়)। (যে রাজ্যে ব্রহ্মচারী বাস করেন, সেই স্থানে যথাকালে বৃষ্টি হয়–এটাই তাৎপর্য)। ২।
ব্রহ্মচারী (অর্থাৎ ব্রহ্মচর্যনিয়মবান্ পুরুষ) পার্থিব অগ্নিতে অন্তরিক্ষগত সূর্যে, চন্দ্রে, মাতরিশ্বা বায়ুতে ও অন্দু (অর্থাৎ জলে সমিধসমূহ প্রক্ষেপণ করেন। এই অগ্নি ইত্যাদির তেজ পৃথক পৃথক রূপে অন্তরিক্ষে অবস্থান করে। ব্রহ্মচারীর সমিধের দ্বারা সমৃদ্ধ অগ্নি ইত্যাদি আজ্য (অর্থাৎ গো-সমৃদ্ধি), পুরুষ (অর্থাৎ পুত্র ইত্যাদির সমৃদ্ধি), বর্ষ (অর্থাৎ কালে বৃষ্টির আবির্ভাব) ও আপ, (অর্থাৎ বাপী, কূপ, তড়াগ ইত্যাদির সমৃদ্ধি) উৎপন্ন করে থাকেন ৷ ৩৷
আচার্যই মৃত্যু দেবতা (কারণ, অপরাধাচরণের নিমিত্ত রুষ্ট হয়ে অপরাধীর জীবন অপহরণ করেন); তিনিই বরুণ অর্থাৎ পাপের নিষেধক (কারণ পরিচর্যাকারী ব্রহ্মচারীর পাপের নিবারণ করেন); তিনিই সোম বা চন্দ্রমা (কারণ চন্দ্রবৎ আহ্বালকর); তিনিই ওষধি সমূহ (কারণ ব্রীহি যব ইত্যাদি ঔষধিরূপে প্রাণরক্ষক), তিনিই পয়ঃ বা দুগ্ধ (কারণ দুগ্ধরূপে পুষ্টিদায়ক)। এই সবই আচার্যের প্রসাদে লভ্য বলে এগুলি সবই আচাৰ্যাত্মক। (অথবা মৃত্যু দেবতা যুম নচিকেতাকে ব্রহ্মবিদ্যা উপদেশের দ্বারা, কিংবা বরুণ দেবও ভৃগুকে উপদেশ দান করে যেমন আচার্য হয়েছেন, সেই রকম আচার্য হলেন সর্বদেবাত্মক এটাই তাৎপর্য)। বরুণ দেবতা যে সদনশীল মেঘগুলিকে আপন পার্শ্বে রক্ষা করেছেন, তারাই তার অনুচর, তারাই বর্ষণশীল জলকে ধারণ করছে (বা আহরণ করছে)। ৪।
বরুণদেব আচার্য হয়ে ক্ষরণশীল জলরাশিকে নিজের সাথে একাত্ম করে নিয়েছেন। তিনি প্রজাপতির নিকট হতে যে ফল ইচ্ছা করেছিলেন, মিত্রদেব ব্রহ্মচারী হয়ে স্বকীয় ব্রহ্মচর্য-মাহাত্মে আপন শরীর হতে সে সবই আচার্যভূত বরুণকে দিয়েছিলেন। (এর দ্বারা ব্রহ্মচারীর পালনীয় একটি নিয়ম কথিত হলো যে, শিষ্যরূপে বিদ্যা-উপদেশকারী আচার্যকে তার আকাঙ্ক্ষিত ধন দক্ষিণারূপে প্রদান করা কর্তব্য)। ৫৷৷
বিদ্যা উপদেশ করে আচার্য ব্রহ্মচারী রূপে প্রকট হয়ে থাকেন। তিনিই ব্রহ্মচর্য পালনরূপ তপস্যার দ্বারা মহিমাবা হয়ে প্রজাপতি অর্থাৎ জগৎস্রষ্টা হয়ে থাকেন। এবং সেই প্রজাপতি হতে তিনি বিরাটু (অর্থাৎ শ্রুতি-কথিত স্থলপ্রপঞ্চশরীরাভিমানী ঈশ্বর) বিরাজমান হয়ে যান। এবং বিরাট হতে তিনিই পরমৈশ্বর্যযুক্ত সর্বজগৎস্রষ্টা পরমাত্মা হয়ে থাকেন। (সেইজন্যই বলা হয় যে, পরম্পরা অনুক্রমে আচার্যের সর্বদেবাত্মক মহিমা কেউই বর্ণনা করতে সক্ষম নয়)। ৬।
বেদকে ব্রহ্ম বলা হয়। বেদাধ্যয়নের নিমিত্ত আচরণীয় কর্মই (যথা,সমিধাদান অর্থাৎ যজ্ঞকাষ্ঠ স্থাপন, ভৈক্ষচর্য অর্থাৎ ভিক্ষাচরণ, ঊর্ধরেতস্কত্ব অর্থাৎ শুক্ৰসংযম ইত্যাদি) ব্রহ্ম। সেই ব্রহ্মচর্যের দ্বারা এবং তার দ্বারা পালিত উপবাস ইত্যাদি ব্রতনিয়মের দ্বারা রাজা আপন রাজ্য বিশেষভাবে রক্ষা করেন (অর্থাৎ পালন করেন) এবং আচার্যও ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই ব্রহ্মচারীকে আপন শিষ্য করেন ॥৭॥
অকৃতবিবাহ (অবিবাহিতা) কন্যা ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই যুবত্ব-গুণযুক্ত উৎকৃষ্ট পতি প্রাপ্ত হন। (এমনকি পশুজাতিও ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই আপন অভিলষিত ফল লাভ করে, যেমন–) শকট-বহনকারী পুঙ্গম (বৃষ) ঊর্দ্ধরেতস্কত্ব ইত্যাদি ধর্মের (ব্রহ্মচর্যের) দ্বারাই উৎকৃষ্ট পতি লাভ করে এবং অশ্ব ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই ১ ভক্ষণীয় তৃণ ইত্যাদি ভক্ষণ করতে ইচ্ছা করে। (বক্তব্য এই যে, অবিবাহিত কালে কন্যার আত্মসংযমরূপ ব্রহ্মচর্য তাকে মনোমত পতি প্রাপ্ত করায়; গাভী-সঙ্গমে অপারঙ্গম বলদ রেতঃ হীনতারূপ ব্রহ্মচর্যের দ্বারা মনোমত প্রভু লাভ করে; অশ্ব অশ্বী-সঙ্গমে অনিচ্ছারূপ ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই মনোমত তৃণ ইত্যাদি নিরামিষ খাদ্য প্রাপ্ত হয়)। ৮
অগ্নি প্রমুখ দেবতাগণ ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই মৃত্যুকে জয় (বা দূর) করেছেন। ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই ইন্দ্র দেবতাগণকে স্বর্গপ্রাপ্ত করিয়েছেন। ৯।
ব্রীহি, যব ইত্যাদি গ্রাম্য ঔষধিসমূহ, অন্য বনৌষধিসমূহ, দিবা-রাত্রি, অতীত ও অনাগত কালসমূহ (বা দ্বাদশমাসাত্মক কাল), হেমন্ত-শীত ইত্যাদি ঋতুরাজি–এ সবই ব্রহ্মচারীর তপস্যা-মাহাত্মে উৎপন্ন হয়েছে। ১০।
বঙ্গানুবাদ –পার্থিব জনগণ, দিব্যলোকের প্রাণীগণ, অরণ্যের সিংহ-শার্দুল ইত্যাদি ও গ্রাম্য। গো-অশ্ব-মহিষ ইত্যাদি পশুগণ, পক্ষরহুত ও পক্ষবন্ত জীব বা বস্তুসমূহ যা কিছু, তা সবই ব্রহ্মচর্যের প্রভাবেই উৎপন্ন হয়েছে ৷ ১।
প্রজাপতির দ্বারা সৃষ্ট দেব-মনুষ্য ইত্যাদি সকলেই আপন আপন প্রাণকে (স্বস্বসম্বন্ধিন এব) ধারণ বা পোষণ করছে। আচার্যের মুখ-নিঃসৃত বেদাত্মক ব্রহ্মই ব্রহ্মচারীর মধ্যে স্থিত হয়ে সকল প্রাণীকে রক্ষা করছে। ২৷৷
এই পরব্রহ্ম দেবতাগণ হতে পরোক্ষ নন, তিনি দেবতাগণের দ্বারা পরিগৃহীত (অর্থাৎ তাদের আত্মরূপে সাক্ষাৎকৃত)। তিনি আপন সচ্চিদানন্দ রূপে দীপ্তিবান্ থাকেন, তার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কেউ নেই। তার নিকট হতেই ব্রহ্ম-সম্বন্ধি বা ব্রাহ্মণগণের অসাধারণ (অর্থাৎ প্রবৃদ্ধতম বা প্রশংসনীয়) ধন বেদাত্মক ব্রহ্ম প্রকট হয়েছেন এবং তৎপ্রতিপাদ্য অগ্নি ইত্যাদি সকল দেবগণ অমৃতত্বের সাথে যুক্ত হয়ে প্রকট হয়েছেন। (অমৃতেন রে স্বাপতভাগ্যেন অমৃতত্বপ্রাপকেন সুধারসেন সহ জাতা ইত্যর্থঃ) ৷৷ ৩৷৷
ব্রহ্মচর্যবান পুরুষ দীপ্যমান বেদাত্মক ব্রহ্মকে ধারণ করে থাকেন। তার উপরে সকল দেবতা অবস্থান করে থাকেন। এবং সকল দেবতার নিবাসভূত ব্রহ্মচারী সর্বপ্রাণীর প্রাণ ও অপান বায়ুকে প্রকট করে থাকেন; পুনরায় ব্যান নামক বায়ু, শব্দাত্মিকা বাণী, অন্তঃকরণ ও তার আবাসস্থানরূপ হৃদয়কমল, বেদাত্মক ব্ৰহ্ম, মেধা (অর্থাৎ আশুবিদ্যাগ্রহণকুশলা বুদ্ধি)–এই সবই ব্রহ্মচারীর দ্বারা উৎপন্ন হয়ে থাকে। ৪
হে ব্ৰহ্মন (ব্রহ্মচাৰ্যাত্মক)! আমাদের অর্থাৎ তোমার স্তোতৃবর্গের মধ্যে রূপ-গ্রাহক নেত্র, শব্দগ্রাহক শ্রোত্র ও যশ (বা কীর্তি) স্থাপন করো। (অন্ধত্ব বধিরতা কখনও যেন আমাদের না হয়)। আমাদের ভোজ্য অর্থাৎ অন্ন, পুত্র ইত্যাদির নিমিত্ত রেতঃ, শরীরগত রক্ত এবং উদর উপলক্ষিত সমস্ত শরীর কল্পিত পূর্বক ব্রহ্মচারী সলিলের পৃষ্ঠে অর্থাৎ উদকের মধ্যে তপস্তপ্যমান হয়ে অবস্থান করছেন। সেই তপস্বী ব্রহ্মচারী সর্বদা স্নানের দ্বারা পবিত্ৰীকৃত ও পিঙ্গল বা বভ্রুবর্ণধারী হয়ে পৃথিবীতে দীপ্যমান হয়ে আছেন। ৫-৬।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি প্রথম ও দ্বিতীয় সূক্তের অনুরূপ ব্রহ্মজ্ঞ জপে বিনিযুক্ত ও ব্রহ্মচারীর মাহাত্ম্য কীর্তনে প্রযুক্ত ॥ (১১কা, ৩অ. ৩সূ.)।
অধ্যায়: এগারো
সূক্ত -১৭: পাপমোচনম
[ঋষি : শন্তাতি। দেবতা : অগ্নি ইত্যাদি। ছন্দ : অনুষ্টুপ।]
বঙ্গানুবাদ –সকল দেবতার আদিভূত অগ্নিদেবের উদ্দেশে আমরা স্তুতি পূর্বক অভীষ্ট ফল। প্রার্থনা করছি। আমরা বনস্পতির স্তুতি করছি। আমরা মহাবৃক্ষ ব্রীহি, যব, ইত্যাদি গ্রাম্য ও লতারূপ বনৌষধি সমূহের স্তুতি করছি। আমরা ইন্দ্র, বৃহস্পতি ও আদিত্যেরও স্তুতি করছি। এঁরা সকলে আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন–এটাই প্রার্থনা ॥১॥
আমরা রাজমা বা ঈশ্বরত্ব সম্পন্ন বরুণ দেবতার, সকলের মিত্রভূত মিত্র দেবতার, ব্যাপনশীল বিষ্ণু দেবতার, ভজনীয় ভগ দেবতার, অংশ ও বিবস্বান দেবতার স্তুতি করছি। এঁরা সকলেই আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন। ২।
আমরা সর্বপ্রেরক ও দান ইত্যাদি গুণযুক্ত সবিতা দেবের স্তুতি করছি। তথা ধাতা, পূষা ও অগ্রগণ্য (অগ্রিয়ং) বৃষ্টাদেবের স্তুতি করছি। এঁরা সকলে আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন। ৩।
আমরা মন্ত্রপ্রসিদ্ধ গন্ধর্ব ও অপ্সরা নামক দেবগণের স্তুতি করছি। তথা অশ্বিদ্বয় দেবতার স্তুতি করছি। বেদপতি ব্রহ্মার ও অর্যমা দেবতার স্তুতি করছি। সেই দেবতাগণ আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন। ৪
আমরা দিবা ও রাত্রির উদ্দেশে এই স্ততিবাক্য উচ্চারণ করছি। তাদের অধিষ্ঠাত্ দেবতা সূর্য ও চন্দ্র এবং দেবমাতা অদিতির সকল পুত্রদের উদ্দেশেও স্তুতি করছি। তারা আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত করুন। ৫।
আমরা বায়ু, পর্জন্য, অন্তরিক্ষ ও দিক-বিদিকস্থ দেবতাগণের উদ্দেশেও স্তুতি করছি। এঁরা সকলে আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন ৷ ৬ ৷৷
দিবা ও রাত্রির অভিমানী দেবতা আমাদের শপথাত্মক পাপ হতে মুক্ত করুন। উষাকালের অভিমানী দেবতা ও চন্দ্রমারূপ সোম দেবতা আমাকে শপথের কারণভূত পাপ হতে মুক্ত করুন। (শপথ করে তা রক্ষা না করার পাপ হতে এঁরা সকলে আমাকে রক্ষা করুন) ৭
আমরা পৃথিবীস্থ ও দিব্যস্থানস্থায়ী প্রাণীসকলের উদ্দেশে (অর্থাৎ দেহধারী মনুষ্য, অদৃশ্য দেবতা ইত্যাদির উদ্দেশে), গাভী ইত্যাদি গ্রাম্য ও হরিণশাদূলসিংহ ইত্যাদি আরণ্য পশু সমূহের উদ্দেশে এবং শকুনভূত পিঙ্গল ইত্যাদি পক্ষিগণের উদ্দেশেও স্তুতি করছি। এঁরা সকলে আমাদের পাপ হতে রক্ষা করুন ॥ ৮৷৷
আমরা ভব ও শর্ব দেবতার উদ্দেশে এই স্তুতিবাক্য নিবেদন করছি। আমরা রুদ্র ও পশুপতি দেবতার উদ্দেশে স্তুতি করছি। এঁদের যে বাণগুলিকে আমরা পরিজ্ঞাত আছি, সেইগুলি আমাদের নিকট সুখপ্রদ হোক। ৯।
আমরা দ্যোতমান আকাশ, সেই স্থানে আশ্রিত পুণ্যবার্গের ধামরূপ নক্ষত্র সমূহ, পুণ্যক্ষেত্র ভূমিভাগ, হিমালয় প্রমুখ মহাগিরী, ভূমিস্থ সপ্তসংখ্যক প্রসিদ্ধ সমুদ্র, গঙ্গা ইত্যাদি নদীসমূহ এবং সরোবর ইত্যাদি ক্ষুদ্র জলাশয় সমূহের স্তুতি করছি। এরা সকলে আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুক। ১০।
বঙ্গানুবাদ –আমরা এই স্তুতিবচন সপ্ত-ঋষির উদ্দেশে নিবেদন করছি (অথবা তাঁদের নিকট এই ফল যাচনা করছি)। আমরা অপোদেবী অর্থাৎ জলদেবতার, স্রষ্টা প্রজাপতি দেবতার, তথা মুখ্যোধিপতি বহিষদ-আগ্নিম্বাত্ত ইত্যাদি পিতৃবর্গের স্তুতি করছি। তারা সকলে আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন ৷ ১৷
যে দেবগণ দ্যুলোকে আছেন, যে দেবগণ অন্তরিক্ষে আছেন এবং যে শক্তিশালী দেবগণ পৃথিবীতে অর্থাৎ ভূমিতে আশ্রিত আছেন, তাঁরা সকলে আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন। ২।
দ্বাদশ আদিত্য, একাদশ রুদ্র, অষ্টবসু-দিব্যলোকের এই গণত্রয়াত্মক দেবগণ; বিংশতিকাণ্ডাত্মক বেদের (অর্থাৎ অথর্ববেদের) দ্রষ্টা মহর্ষি অথবা ও আঙ্গিরস ইত্যাদি মনীষি আমাদের স্তুতির দ্বারা সন্তুষ্ট হয়ে আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত করুন। ৩।
আমরা অগ্নিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞসমূহের স্তুতি করছি, সেই যজ্ঞফল প্রাপ্ত করণশালী যজমানের স্তুতি করছি, যজ্ঞসমূহে বিনিযুক্ত পাদবদ্ধ মন্ত্রসমূহের স্তুতি করছি। স্তোত্রসমূহকে সম্পন্ন করণশালী (অর্থাৎ প্রগীতমন্ত্রাত্মক রথন্তর, বৃহৎ, বৈরূপ ইত্যাদি) সামসমূহের স্তুতি করছি, সোমকে ও ঔষধিসমূহকে স্তুতি করছি, সোমবাগের (হোতা, মৈত্রাবরুণ, ব্রাহ্মণাচ্ছংসি,পোতা, নেষ্টা, অচ্ছাবাক, আগ্নী) সপ্ত বষট্কারের স্তুতি করছি, তাদের ক্রিয়া হোত্রার স্তুতি করছি। তারা আমাদের সব পাপ হতে বিমুক্ত করুন। ৪৷৷
ভিষকগণের দ্বারা বিনিযুজ্যমান পত্র, কাণ্ড, ফল, পুষ্প ও মূল এই পঞ্চ রাজ্যশালিনী ঔষধিসমূহের মধ্যে সোমলতা শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ সোমলতা এদের রাজা। আমরা এদের স্তুতি করছি। তথা দর্ভ অর্থাৎ কুশময়, ভঙ্গ অর্থাৎ শন, যব নামক প্রসিদ্ধ ঔষধি, সহ নাম (কোনও) ঔষধি বিশেষকেও আমরা স্তুতি করছি। এরাও আমাদের সকল পাপ মোচন করুন। ৫
আমরা দানপ্রতিবন্ধক (অর্থাৎ দানকর্মে বাধা দানকারী) হিংসকদের (অর্থাৎ রাক্ষসবৎ পিশাচ সমুদায়ের) স্তুতি করছি। তথা রাক্ষসগণের, সর্পগণের, যাতুনগণের (পুণ্যজন সমূহের), পিতৃলোকগত পূর্বপুরুগণের (পিতৃ) ও একশত একসংখ্যক মৃত্যুদায়ক (বা মৃত্যুর অধিষ্ঠাতৃ) দেবতাবৃন্দের স্তুতি করছি; তারা সকলে আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুন ৷৷ ৬ ৷৷
আমরা বসন্ত ইত্যাদি ঋতু সমূহের স্তুতি করছি। তথা সেই ঋতু সমূহের অধিপতি দেবতা (বসন্তের) বসুগণ, (গ্রীষ্মের) রুদ্রগণ, (বর্ষার) আদিত্যগণ, (শরতের) ঋভুগণ এবং (হেমন্ত ও শিশিবের) মরুৎ-গণকে তথা ঋতু সমূহে উৎপন্ন পদার্থগুলির স্তুতি করছি। আমরা চান্দ্র-সৌর-সাবন ভেদাত্মক তিন প্রকার সম্বৎসরের এবং চৈত্র ইত্যাদি মাস সমূহের স্তুতি করছি। তারা সকলে আমাদের পাপ হতে মুক্ত করুক ॥ ৭
হে দেববর্গ! আপনারা যাঁরা দক্ষিণ দিকে স্থিত আছেন, তারা আগমন করুন। যাঁরা পশ্চিম দিকে, পূর্ব দিকে, উত্তর দিকে, সম্মুখে ও পশ্চাতে অবস্থান করছেন, তাঁরাও আপন আপন দিক হতে এই স্থানে আগমন পূর্বক আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত করুন। ৮ ৷৷
আমরা বিশ্বদেবগণের উদ্দেশে এই স্তুতিবাক্য উচ্চারণ করছি (অথবা এই ফল যাচনা করছি)। তাঁরা সত্যসন্ধান (অর্থাৎ সত্যপ্রতিজ্ঞান), তারা ঋতাবৃধ (অর্থাৎ সত্যের বা যজ্ঞের বর্ধক)। তারা বিশ্বা নামে আখ্যাতা পত্নী সমভিব্যাহারে আমাদের দ্বারা স্তুত হয়ে আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত করুন। ৯।
আমরা সকল দেবগণের উদ্দেশে এই স্তুতি বাক্য উচ্চারণ করছি। তারা সত্যবর্ধক, যজ্ঞ বা সত্যের বধক। তাঁরা সকল পত্নী সমভিব্যাহারে আমাদের দ্বারা স্তুত হয়ে আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত করুন ১০
ভূত অর্থাৎ লব্ধসত্তা বস্তুমাত্রের উদ্দেশেই আমরা স্তুতি করছি। ভূতপতি অর্থাৎ ভূতের অধিপতি বা ঈশ্বরের উদ্দেশে আমরা স্তুতি করছি। অধিকন্তু, সেই সকল ভূতের নিয়ন্তার উদ্দেশেও আমরা স্তুতি করছি। সকল ভূত একত্রিত হয়ে এই স্থানে আগমন করুন এবং আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত করুন। ১১
প্রধান দিকবর্তিনী যে প্রসিদ্ধা পঞ্চসংখ্যকা দেবী আছেন, দান ইত্যাদি গুণযুক্ত চৈত্র বৈশাখ ইত্যাদি। দ্বাদশ-সংখ্যক যে মাস আছে, ঐ দ্বাদশ-মাসাত্মক সম্বৎসরের যে ঋতু দেবতা আছেন, ঐ এক সম্বৎসররূপ প্রজাপতির বিষ্টি (অর্থাৎ যন্ত্রণাদায়ক) ইত্যাদি দোষযুক্ত যে কালাত্মক দন্তবিশেষ আছে, –তারা সকলে সর্বদা আমাদের কল্যাণের কারণ হোন (কল্যাণহেতবঃ সন্তু)। ১২।
ইন্দ্রের সারথি মাতলী রথের ক্রয়ের দ্বারা যে অমৃত (অর্থাৎ অমরণসাধন)ভেষজ জ্ঞাত হয়েছেন, রথের অধিপতি ইন্দ্র সেই ভেষজ জলে প্রক্ষিপ্ত করেছেন। হে আপঃ (জলরাশি)! তোমরা সেই মাতলীক্রীত ও ইন্দ্র কর্তৃক নিক্ষিপ্ত ঔষধ আমাদের প্রদান করো। ১৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হবনের পর হুতাবশিষ্ট যে ওদন প্রাশনার্থে রক্ষিত থাকে, তাকে উচ্ছিষ্ট বলা হয়। সেই উচ্ছিষ্টে বা ওদনে (অর্থাৎ অন্নে) নামধেয়াত্মক ও রূপধেয়াত্মক পৃথিবী ইত্যাদি প্রপঞ্চ আহিত (অর্থাৎ আস্থিত বা সমাশ্রিত) হয়ে রয়েছে। সেই উচ্ছিষ্টে দ্যুলোকাধিপতি ইন্দ্র ও পৃথিবীস্বামী অগ্নি উভয়ে আহিত হয়ে রয়েছেন। অধিক কি (কিং বহুনা), এতৎ উপলক্ষিত ঐ উচ্ছিষ্টের মধ্যে সর্ব জগৎ সমাহিত (অর্থাৎ ঈশ্বরের দ্বারা স্থাপিত) হয়ে রয়েছে। ১৷
সেই উচ্ছিষ্টরূপ ব্রহ্মে আকাশ ও পৃথিবী আহিত হয়ে আছে; সেইগুলিতে বাসকরণশীল জীবও সেই উচ্ছিষ্টে সমাহিত (সম্যগ নিহিত) হয়ে আছে। ব্যাপনশীল প্রথমসৃষ্ট জগকারণভূত সমুদায়াত্মক জলরাশি ও সমুদ্র সেই উচ্ছিষ্টে সমাহিত। সেই সমুদ্র মথ্যমান হলে চন্দ্র উৎপন্ন হয়েছেন এবং অন্তরিক্ষাধিপতি বায়ুদেবতাও সেই উচ্ছিষ্টরূপ ব্রহ্মে আহিত (অর্থাৎ আশ্রিত) হয়েছেন। ২৷
সৎ ও অসৎ উভয় সেই উচ্ছিষ্টে কার্যাত্বের কারণে বর্তমান। সেই সৎ-অসতের সাথে সম্বন্ধিত মারক মৃত্যু দেবতা, তার বল (বাজঃ), ও সকলের স্রষ্টা প্রজাপতি সেই উচ্ছিষ্টে বর্তমান রয়েছেন। লোসম্বন্ধি প্রজাগণও সেই উচ্ছিষ্টে স্থাপিত। তথা বারক (ব্ৰঃ) বরুণ ও দ্রাবক (দ্রঃ) অমৃতময় সোমও সেই উচ্ছিষ্টে আশ্রিত হয়ে রয়েছেন। সেই উচ্ছিষ্টের প্রসাদে (অথবা, উচ্ছিষ্টে আশ্রিত ঐ সকলের প্রসাদে) আমাতে সম্পদ (শ্রী) আস্থিত হোক৷ ৩৷৷
দৃঢ় অঙ্গসম্পন্ন দেব, স্থিরীকৃত লোক, এবং তত্রস্থ প্রাণীবর্গ, জগকারণ ব্রহ্ম, নয়জন বিশ্বস্রষ্টা ব্রহ্মা ও তাঁদের রচয়িতা দশম ব্রহ্মা (অথবা নয়টি প্রাণ ও এক মুখ্য প্রাণ–এঁরাই প্রথম সৃষ্ট বিশ্বের স্রষ্টা)-এঁরা সকলে উচ্ছিষ্টে সমাহিত। অপিচ, ইন্দ্র ইত্যাদি সকল দেবতা সেই উচ্ছিষ্টে অর্থাৎ কারণরূপ ব্ৰহ্মকে আশ্রয় করে আছেন, যেমন রথচক্রের মধ্যস্ত নাভি সর্বতঃ আবেষ্টন করে থাকে। ৪
ঋক্ (অর্থাৎ পাদবদ্ধ যে মন্ত্রগুলি যাজ্যা-অনুবাক্য ইত্যাদি রূপে যজ্ঞে বিনিযুক্ত), সাম (অর্থাৎ প্ৰগীত মন্ত্রসমূহ স্তোত্রসাধনত্বে বিনিযুক্ত), যজুঃ (অর্থাৎ অনুষ্ঠেয়ার্থ-প্রকাশক মন্ত্র),–এই ত্রিবিধ মন্ত্ররাজি উচ্ছিষ্যমাণ ব্রহ্মে সমাশ্রিত। তথা উষ্মীথ (অর্থাৎ উদ্গাতা কর্তৃক সামবেদের গীয়মান ভাগ), প্রস্তুত (অর্থাৎ প্রস্তোতা কর্তৃক গীয়মান প্রস্তাবাখ্যো ভাগ), স্তোত্র (অর্থাৎ স্তবনকর্ম), হিঙ্কার (অর্থাৎ উদ্গাতাগণ কর্তৃক অগ্রে প্রযুজ্যমান হিং শব্দ), স্বর (অর্থাৎ কৃৎস্নসামাশ্রিত সপ্তবিধ স্বর), তথা ঋক-অক্ষরের ও গান বিশেষের মিলন (অর্থাৎ সংসর্গজনিত বা একত্রাবস্থানে উৎপন্ন স্তোভবিশেষ)–এই সবই, অর্থাৎ উষ্মীথ ইত্যাদি সবই, উচ্ছিষ্টে সমাশ্রিত। এই সকলই আমার যজ্ঞসমৃদ্ধির নিমিত্ত হোক। ৫৷
ঐন্দ্রাগ্ন (প্রাতঃসবনে প্রযুজ্যমান ইন্দ্র ও অগ্নির স্তুতি), পাবমান (সবনের প্রথমে গীয়মান পবমান-সোমদেবতাক সাম), মহানামী ঋক (বা গীয়মান শাক্কর সাম), মহাব্রত (বা রাজন গায়ত্র বৃহৎ রথন্তর ও ভদ্রখ্য পঞ্চ সামরূপ ক্রিয়মান স্তোত্র) যজ্ঞের এই অঙ্গ সমূহ মাতার গর্ভে স্থিত অভিবর্ধনশীল জীবের ন্যায় উচ্ছিষ্টে আশ্রিত থাকে৷ ৬ ৷৷
সার্বভৌম রাজা কর্তৃক অনুষ্ঠেয় পশু-সোম-দর্বি-হোমাত্মক শস্ত্রপ্রধান) রাজসূয়, (বাজ অর্থাৎ অন্ন দ্রবীকৃত পূর্বক পেয় বা ঘৃত পানাত্মক যে কর্ম, সেই) বাজপেয়, (চরমস্তোত্রে যজ্ঞাযজ্ঞীয়ে অগ্নি স্তুতিপ্রধান) অগ্নিষ্টোম, (হিংসাপ্রত্যবায়রহিত) সোধ্বরঃ, (বিরাডাত্মক উপাস্যমান চিত্যাগ্নিরূপ) অর্ক, (বিরাডাত্মক অশ্বের উপাসনা প্রধান) অশ্বমেধ, (জীরাবস্থাভিন্ন যাগবিশেষ) জীববৰ্হি এবং দেবগণের তৃপ্তিবিশেষকর অন্যান্য সোমবাগ সমূহ সেই উচ্ছিষ্টমান নিষ্প্রপঞ্চ ব্রহ্মে সমাশ্রিত হয়ে আছে। ৭।
গার্হপত্য ইত্যাদি অগ্নিসমূহের আধানের (অর্থাৎ স্থাপনের) পর সোমবাগের যে দীক্ষণীয়েষ্টি ইত্যাদি যজমানের অভিলষিত ফলবিশেষগুলি আছে, তা গায়ত্রী, ত্রিষ্টুপ ইত্যাদি ছন্দসমূহের সাথে নিষ্পন্ন হয়ে থাকে। ইদানীং দুরধিগম্য হওয়ায় অনুষ্ঠানের অভাবে লুপ্তপ্রায় এই যজ্ঞসমূহ উৎসন্ন যজ্ঞ নামে উক্ত হয়। (কিম্বা অল্পায়ু সম্পন্ন জনের পক্ষে এই সত্রগুলির অনুষ্ঠান সম্ভব না হওয়ায় এইগুলি উৎসন্ন যজ্ঞ নামে অভিহিত)। বহু যজমানের কর্তৃত্বে (অনুষ্ঠিতব্য) এই সোমযাগসমূহ সত্র নামে উক্ত। এইরকম অনুক্রান্ত সকল যাগ সেই উক্তৃষ্ট ব্রহ্মে সমাশ্রিত ৷ ৮
(সায়ং ও প্রাতে সাগ্নিকগণের দ্বারা অগ্নির উদ্দেশে কৃত হোমমূলক) অগ্নিহোত্র, (অনুষ্ঠেয় যজ্ঞ কর্মে আস্তিক্যবুদ্ধিমূলক) শ্রদ্ধা, (যাজ্যান্তে হবিঃপ্রদানে প্রযুজ্যমান বৌষ শব্দমূলক) বষট্কার, (মিথ্যাকথা বর্জন, চৌর্য বর্জন, হিংসা বর্জন, অশৌচ বর্জন ইত্যাদি ইন্দ্রিয়নিগ্রহমূলক) ব্রত, (শরীরসন্তাপকর কৃচ্ছু চান্দ্রায়ন ইত্যাদি) তপস্যা, (ঋত্বিকগণকে দেয়) দক্ষিণা, (শ্রুতিবিহিত যাগহোম ইত্যাদি) ইষ্টকর্ম এবং (স্মৃতি-পুরাণ অভিহিত বাপী-কূপ-তড়াগ-দেবায়তন-উদ্যান ইত্যাদি নির্মাণমূলক) পূর্তকর্ম– এইগুলি সবই উচ্ছিষ্যমান মায়া-সংস্পৃষ্ট ব্রহ্মে সমাশিত হয়ে আছে। ৯
(এক রাত্রি ব্যাপী বর্তমান সোমবাগ) একারা, (দুই রাত্রি ব্যাপী বর্তমান অহীন নামে উক্ত) দ্বিরাত্র, (একটি দিন ব্যাপী ক্রীয়মান দুই বিশেষ সোমবাগ) সদ্যঃক্রী ও প্রক্রী, (অগ্নিষ্টোম সংস্থা ইত্যাদি যে সোমযাগ উথ মন্ত্রে কৃত হয়, সেই) উকথ্য–এই যাগগুলি উদীরিতলক্ষণ উচ্ছিষ্টে নিক্ষিপ্ত হয়ে সূক্ষ্ম রূপে ব্রহ্মে আশ্রিত রয়েছে। ১০।
বঙ্গানুবাদ –(চারি রাত্রে আবর্তমান সোমাগ) চতুরাত্র, (সেরূপ পঞ্চরাত্রে আবর্তমান সোমবাগ) পঞ্চরাত্র, (এইরকম) ষড়রাত্র, সপ্তরাত্র ইত্যাদি এবং এদের দ্বিগুণ দিনশালী, অর্থাৎ অষ্টরাত্র, দশরাত্র, দ্বাদশরাত্র, চতুর্দশাত্র এবং সোড়শী (অর্থাৎ যোড়শসংখ্যা পূরক উথ স্তোত্র ও শাস্ত্র সমন্বিত সোমবাগ) এবং এইরকম অমৃতলক্ষণ ফলজননে সমর্থ অন্যান্য যাগসমূহ উচ্ছিষ্যমান জগকারণ ব্রহ্ম হতে (ব্রহ্মেদিননাচ্ছেষণাৎ) জাত হয়েছে ৷ ১৷
প্রতীহার (প্রতিহর্তা কর্তৃক উচ্যমান সাম), নিধন (উগাতা কর্তৃক উচ্যমান সংহিতার যে ভাগের দ্বারা সাম পরিসমাপ্ত হয়), বিশ্বজিৎ ও অভিজিৎ (দুই সোমযাগের অগ্নিষ্টোম-সংস্থা), সাহ্ন (একদিনে সমাপ্যমান সবনত্রয়াত্মক সোমবাগ), অতিরাত্র (রাত্রি অতীত পূর্বক ঊনত্রিংশস্তুত শস্ত্রবান সোমযাগ), এবং দ্বাদশাহ (দ্বাদশ দিনের সমাহারে অনুষ্ঠিত ক্রতু)–ব্রহ্মে অর্থাৎ উচ্ছিষ্টে সমাশ্রিত এই সকল যজ্ঞ আমাতে স্থিত হোক। (অর্থাৎ অনুক্রান্ত যজ্ঞজাত ফল আমি যেন লাভ করি) ॥ ২
সুনৃত (অর্থাৎ প্রিয়সত্যাত্মিকা বাক), সন্নতি (অর্থাৎ সেই বাকের উপস্থিতি), ক্ষেম (অর্থাৎ সেই উপস্থিতির ফলের পরিরক্ষণ), স্বধা (অর্থাৎ পিতৃবর্গের তৃপ্তিকরী অন্ন), ঊর্জা (অর্থাৎ সর্বপ্রাণীর বলকর অন্ন), অমৃত (অর্থাৎ দেবতার উপভোগ্য অমৃতত্বপ্রাপক পীযুষ) ও সহ (অর্থাৎ অপরজনকে অভিভবনক্ষম বল)–এই সকল যে কাম্যমান ফলবিশেষ ব্রহ্মময় উচ্ছিষ্টে আশ্রিত আছে, সেগুলি যজমানের আত্মাভিমুখে আগত হয়ে তাকে তৃপ্ত করুক৷ ৩৷৷
নবখণ্ডাত্মিকা (নয়ভাগে খণ্ডিতা) পৃথিবী, সপ্তসংখ্যক সমুদ্র ও উপরিতন দুলোক–এইগুলি সেই উচ্ছিষ্যমান ব্রহ্মে আশ্রিত। সূর্যও সেই উচ্ছিষ্যমান স্বপ্রকাশ পরব্রহ্মে আশ্রিত হয়ে সর্বত্র দীপ্ত করছে। দিবা ও রাত্রও তার আশ্রিত হয়ে প্রভান্বিত। এইগুলি সবই আমার হোক। ৪৷
উপহব্য নামক সোমবাগ, গরাময়নাখ্য ছয়মাস-সাধ্য বিষুবান নামক সোমবাগ, এবং যে সকল যজ্ঞ অজ্ঞাতরূপে রয়েছে, সেগুলি সেই উচ্ছিষ্যমান ওদন বা পরমাত্মা পোষণ করেন। (তিনি কীদৃশ? না, তিনি সর্ব জগতের ভর্তা ও পরমাত্মপক্ষে এই লোকে যিনি জনক, তারও তিনি জনয়িতা। (অর্থাৎ তিনি সর্বকরণের কারণভূত) ॥ ৫॥
হুতাবশিষ্ট ওদন (উচ্ছিষ্ট) আপন ৮ উৎপাদকের পিতা (অর্থাৎ লোকান্তরে দিব্যশরীরের উৎপাদক, তথা তিনি প্রাণের পৌত্র (অর্থাৎ প্রাণচলনের দ্বারা শরীরের চলন, এই জন্য ওদনের পৌত্রত্ব), তথা সেই প্রাণের পিতামহ (অর্থাৎ ভাবী স্বর্গভোগযোগ্যের শরীরের তিনিই তাবৎ পিতা; আবার সেই শরীরের উৎপত্তির পরে তাতে প্রাণ সঞ্চার করে পিতামহ)। এবষ্কৃত সেই উচ্ছিষ্ট সর্ব জগতের ঈশ্বর, কামবর্ষিতা ও অতিক্রান্তহনন (অর্থাৎ অবধ্য) হয়ে পৃথিবীতে (অর্থাৎ পৃথিবীর সকল প্রাণীর শররে) বিরাজিত হয়ে আছেন। ৬৷৷
ঋতম্ (অর্থাৎ মনের যথার্থ সঙ্কল্প), সত্যম্ (অর্থাৎ বাক্যের যথার্থ ভাষণ), তপঃ (অর্থাৎ শরীরসন্তাপকর ব্রত-উপবাস ইত্যাদি নিয়মবিশেষ), রাষ্ট্রং (অর্থাৎ রাজ্য), শ্রমঃ (অর্থাৎ শান্তি বা শব্দ ইত্যাদি বিষয় উপভোগের উপরতি), ধর্মঃ (তার জন্য অপূর্ববিশেষ), কর্ম (অর্থাৎ বর্ণাশ্রম অনুসারে বিহিত যাগ-দান-হোম ইত্যাদি), ভূত (অর্থাৎ উৎপন্ন জগৎ), ও ভবিষ্যৎ (অর্থাৎ উৎপস্যমান বা উৎপাদিতব্য জগৎ)–এই সবই সেই উচ্ছিষ্ট ব্রহ্মে বা তদাত্মক ওদনে কার্যাত্বে নিত্য আশ্রিত হয়ে আছে। তথা বীর্যম্ (অর্থাৎ সামর্থ্য), লক্ষ্মীঃ (অর্থাৎ সর্ববস্তু-সম্পত্তি), বলম্ (অর্থাৎ সর্বকর্ম নিবর্তনক্ষম শরীরগত সামর্থ্য) সেই বলবান্ উচ্ছিষ্টে আশ্রিত রয়েছে। ৭৷
সমৃদ্ধি (অর্থাৎ ইষ্টফলের অভিবৃদ্ধি), ওজঃ (অর্থাৎ শরীরবল বা অষ্টম ধাতু), আকৃতি (অর্থাৎ ইষ্টফল-বিষয়ে সঙ্কল্প), ক্ষত্র (ক্ষাত্ৰ-তেজঃ), রাষ্ট্র (ক্ষত্ৰধর্মের দ্বারা পরিপালনীয় রাজ্য), ষট সংখ্যক উর্বী (অর্থাৎ মন্ত্রান্তরে পরিগণ্য দ্যৌ, পৃথিবী, দিবা, রাত্রি, জল ও ঔষধি), সম্বৎসর (অর্থাৎ দ্বাদশমাসাত্মক কাল), ইড়া (অর্থাৎ যে দেবতার প্রীতির নিমিত্ত যজ্ঞের হুতাশিষ্ট হতে পুরোডাশ ইত্যাদির ভাগ প্রদান করা হয়ে থাকে), প্রৈষা (অর্থাৎ যজ্ঞে ঋত্বিকগণের প্রেরক মন্ত্ৰসমূহ), গ্রহ (অর্থাৎ বায়ব্যের দ্বারা গৃহ্যমান ঐন্দ্ৰবায়ব ইত্যাদির সোমবিশেষ), হবি (অর্থাৎ চরু, পুরোডাশ ইত্যাদি লক্ষণ আজ্য)–এগুলি সবই সেই উচ্ছিষ্যমান ব্ৰহ্মরূপ আধারে সমাশ্রিত। ৮।
চতুর্যোতৃ সংজ্ঞক মন্ত্ররাজি, আল্লী বা আপ্রিয়। সংজ্ঞক পশুগসম্বন্ধি যাজ্যা সমূহ, চারিটি মাসে ক্রিয়মান, বৈশ্বদেব-বরুণপ্রঘাস-সাকমেধ ও শুনাসীরিয় নামে আখ্যাত চারিটি পর্বসমম্বিত চাতুর্মাস্য, নিবিদ অর্থাৎ স্তোতব্য-গুণ প্রকর্ষ নিবেদনপর মন্ত্র সমুদায়, যজ্ঞ অর্থাৎ যাগ, হোত্ৰা অর্থাৎ হোতৃপ্রমুখ সপ্ত বষর্তা, পশুবন্ধা অর্থাৎ অগ্নীষোমীয়-সবনীয়-অনুবন্ধ্যাত্মক সোমাঙ্গভূত পশুগ সকল, এবং অঙ্গভূত স্বতন্ত্র ইষ্টি বা যজ্ঞও সেই উচ্ছিষ্যমান ব্রহ্মে বা তদাত্মক ওদনে সমাশ্রিত হয়ে আছে। ৯।
পঞ্চদশদিবসাত্মক পক্ষ বা অর্ধমাস, চৈত্র ইত্যাদি মাস সমূহ, আর্তব (অর্থাৎ সেই সেই ঋতু সম্বন্ধী পদার্থসমূহ)–এগুলি সবই উচ্ছিষ্টে সমাশ্রিত তথা ঘোষযুক্ত (শব্দকরী) জল, গর্জনকারী মেঘ, শুদ্ধামহতী ভূমি (শ্রুতির্মহী)– এগুলিও সেই উচ্ছিষ্টে সমাশ্রিত ॥ ১০
রাদ্ধি (সংসিদ্ধি বা সম্যগ নিষ্পত্তি), প্রাপ্তি (ফলের অধিগম), সমাপ্তি (সম্যগ আপ্তি), ব্যাপ্তি (বিবিধ আপ্তি), মহ (তেজঃ বা উৎসব), এধতু (অভিবৃদ্ধি), অত্যাপ্তি (অধিক প্রাপ্তি), ভূত(সমৃদ্ধি)–এগুলি সবই সেই উচ্ছিষ্টে স্থিত। ২।
যে সকল প্রাণিজাত প্ৰাণবায়ুর দ্বারা জীবনধারণ করে বা ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের দ্বারা গন্ধ গ্রহণ করে, যে সকল প্রাণিজাত চক্ষুরূপ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা নীলপীত ইত্যাদি দিককে সাক্ষাৎ বা দর্শন করে, সেই সকল প্রাণী উচ্ছিষ্যমান ব্রহ্মের নিকট হতে (সকাশাৎ) উৎপন্ন হয়েছে। তথা দ্যুলোকে স্থিত ও অন্য দ্যুলোকে বর্তমান যে দেবতাগণ আছেন, তাঁরা সকলে সেই উচ্ছিষ্টে উৎপন্ন হয়েছেন ৷৷ ৩৷
পাদবদ্ধ মন্ত্ররাজি (ঋক), গীতবিশিষ্ট মন্ত্রাবলি (সাম), গায়ত্রী-উষ্ণিক ইত্যাদি চারি অক্ষরের অধিক বা সপ্তসংখ্যক ছন্দ, পুরাতন বৃত্তান্তকথনরূপ আখ্যান (পুরাণ), এগুলি সবই, যজুর্মন্ত্রের সাথে এবং দ্যুলোকস্থ ও অপর দ্যুলোকস্থ দেবতাগণের সাথে সেই উচ্ছিষ্ট হতে জাত হয়েছে। ৪।
প্রাণবৃত্তি ও অপানবৃত্তি, রূপদর্শন-সাধন চক্ষুরিন্দ্রিয়, শব্দগ্রহণ-সাধন শ্রোত্র, ক্ষয়াভাব (অক্ষিতি) ও ক্ষয় (যা চ ক্ষিতি ) বা অক্ষীয়মান ও ক্ষয়াভিমানী দেবতা–এই সকল পদার্থ এবং দ্যুলোকস্থ ও অপর দ্যুলোকস্থ দেবতাগণ উচ্ছিষ্যমান ব্ৰহ্ম হতে জাত। ৫৷৷
আনন্দ (বিষয়োপভোগজনিত সুখবিশেষ), মোদ (বিষয়দর্শনজন্য হর্ষসমূহ), প্রমুদ (প্রকৃষ্ট বিষয়লাভজন্য হর্ষসমূহ), অভিমোদ (অভিমুখে বর্তমান আমোদ) এবং মুদ (সন্নিহিত সুখহেতু পদার্থনিচয়)–এই সবই সেই উচ্ছিষ্যমান ব্ৰহ্ম হতে জাত। তথা যে দেবগণ দ্যুলোকে স্থিত এবং যে দেবগণ অন্য দ্যুলোকে বর্তমান, তারা সকলেই এই উচ্ছিষ্ট হতে জাত ৬
দেবগণ (অর্থাৎ অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র ইত্যাদি), পিতৃগণ (অর্থাৎ পিতৃলোক-নিবাসী পূর্ব-পুরুষগণ), মনুষ্য (অর্থাৎ মনের নিকট হতে উৎপন্ন মনুষ্যজাতি), গন্ধর্ব (অর্থাৎ বিশ্বাবসু প্রভৃতি দেবযোনিবর্গ), অপ্সরা (অর্থাৎ উর্বশী প্রভৃতি স্বর্গকামিনীগণ)–এই সকলেই সেই উচ্ছিষ্যমান ব্ৰহ্ম হতে বা ব্রহ্মেদিন হতে জাত। তথা যে দেবগণ দ্যুলোকে স্থিত এবং যে দেবগণ অন্য দ্যুলোকে বর্তমান, তাঁরা সকলেই সেই উচ্ছিষ্ট হতে জাত ॥ ৭।
বঙ্গানুবাদ –মনু (অর্থাৎ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত সর্বদেবাত্মক পরব্রহ্ম) সৃষ্টিকর্মের উদ্দেশে আপন সঙ্কল্প হতে (সঙ্কল্পের গৃহ হতে) মায়াশক্তিস্বরূপাকে (লৌকিকবিবাহাত্বের দ্বারা) বিবাহ করেছিলেন। (সঙ্কল্প যেন শ্বশুরগৃহ এবং মায়াশক্তি তার জায়া। সৃষ্টির ইচ্ছা সমন্বিতা পরমেশ্বরী, হলেন মায়াশক্তি)। সেই জায়া আবাহনকালে বধূ ও বরপক্ষীয় বান্ধবগণ কারা ছিল? কে আর কন্যাবরণের কর্তা ছিল। সেই সময়ে প্রধানভূত বর অর্থাৎ উদ্বাহকর্তার নাম কি? (কো নাম তস্মিন্। সময়ে জ্যেষ্ঠবরঃ অভবৎ)। ১৷৷
সেই সৃষ্টিকালে প্রলয়কালীন মহতি অর্ণবের মধ্যে (অর্থাৎ মহাসমুদ্রের অভ্যন্তরে) সৃষ্টিব্যাপার পর্যালোচনাত্মক যে জ্ঞানময় তপস্যা ও সুখদুঃখফলোন্মুখ পরিপক্ক কর্ম ছিল, সেই উভয়ের প্রকাশই ছিল বিবাহপ্রবৃত্ত বন্ধুজন ও বরয়িতা (বরণকর্তা)। সেই সৃষ্টি-অভিলাষী জগকারণ ব্ৰহ্ম ছিলেন মায়াশক্তিরূপার (জায়ার) প্রধানভূত উদ্বাহকর্তা (জ্যেষ্ঠবর) ॥ ২॥
যে সশক্তক ব্রহ্মের কথা বলা হয়েছে, তার নিকট হতে অধিষ্ঠাত্ অগ্নি ইত্যাদির উৎপত্তির পূর্বে দশসংখ্যক দেবতা (অর্থাৎ জ্ঞানকর্মেন্দ্রিয়; বা সপ্ত শীর্ষণ, দুই অধো-প্রাণ ও এক মুখ্য-প্রাণ; অথবা প্রাণ, অপান, চক্ষু, শ্রোত্র ইত্যাদি উত্তরোত্তর বক্ষ্যমান দশসংখ্যক দেবতা) উৎপন্ন হয়েছিলেন বলে শ্রুত হওয়া যায়। যে উপাসক এই দেবগণকে অপরোক্ষভাবে জ্ঞাত, সেই বিদ্বান্ (উপাসক) ইদানীং দেশকালকৃত পরিচ্ছেদরহিত সর্বগত ব্ৰহ্ম সম্পর্কে বলবেন বা উপদেশ করবেন (বদেৎ উপদিশেৎ) ৩॥
হৃৎ-কমলের মধ্যে অবস্থিত ক্রিয়াশক্তিরূপ মুখ্যপ্রাণের বৃত্তিসমূহ হলো–প্রাণ, অপান, চক্ষু, শ্রোত্র, অক্ষিতি (অর্থাৎ অক্ষীয়মাণ জ্ঞানশক্তি), ক্ষিতি (অর্থাৎ ক্ষীয়মাণা বা নিবাসহেতুভূতা ক্রিয়াশক্তি), ব্যান (অর্থাৎ সকল নাড়ীতে অন্নরস প্রেরণকারী), উদান (উরব্যাপার নিষ্পন্নকারী)–এগুলি প্রাণের বৃত্তি। এতদ্ব্যতীত বদনসাধন ইন্দ্রিয় বাক্ ও সর্বেন্দ্রিয়ানুগ্রাহক বা সুখ ইত্যাদি জ্ঞানসাধন অন্তঃকরণ বা মন–এই দশ আকুতি (বা দেবগণ), পুরুষকৃত সঙ্কল্পকে অভিমুখে প্রাপ্ত করায়। (অর্থাৎ পুরুষের অভিমত অর্থ নিষ্পদন করে) ॥ ৪
সৃষ্টিকালে বসন্ত ইত্যাদি ঋতু বা কালবিশেষসমূহ অনুৎপন্ন ছিল। অতএব সেগুলির অধিপতি দেবগণ অর্থাৎ অদিতি-পুত্র ধাতা, সুরগুরু বৃহস্পতি, ইন্দ্র ও অগ্নি, অশ্বিন্দ্বয়–এই ছয় দেবতাও সেই কালে অজাত ছিলেন। তাহলে তারা নিজেদের উৎপত্তির নিমিত্ত কোন বৃদ্ধতম (কারণভূত) জনয়িতার উপাসনা করেছিলেন? (এই প্রশ্নের উত্তর অনন্তর ভাবিনী অর্থাৎ পরবর্তী ঋকে প্রাপ্তব্য) ৷৷ ৫
(পূর্ব ঋকে ব্যাখ্যাত হয়েছে যে,) সৃষ্টিকালে প্রলয়কালীন মহতি অর্ণবের মধ্যে স্রষ্টা পরমেশ্বরের সৃষ্টিব্যাপার পর্যালোচনাত্মক জ্ঞানময় তপস্যা ও সুখদুঃখফলোন্মুখ পরিপক্ক কর্ম বিদ্যমান ছিল। অতএব ঋতুর অধিপতি ধাতা ইত্যাদি দেবগণ সেই সৃষ্টির কারণাত্মক স্বকৃত কর্মের নিকট স্ব-উৎপত্তির নিমিত্ত উপাসনা (বা প্রার্থনা) করেছিলেন। (বক্তব্য এই সে, দেব-মনুষ্য ইত্যাদি-রূপ সকল জগতের মূল কারণ কর্মই)। ৬।
এই পুরোবর্তিনা ভূমির পূর্বভাবিনী অতীতকল্পস্থা যে ভূমি ছিল, যে ভূমি অতীত ও অনাগত সম্পর্কে জ্ঞাত মহর্ষিগণ প্রত্যক্ষ করেছেন, সেই ভূমি ও তার বস্তুনিচয়কে নামপ্রকারের দ্বারা যিনি সম্যক পরিচিত বা জ্ঞাত, সেই পুরাণবিৎ (অর্থাৎ পুরাতন সম্পর্কে অভিজ্ঞ) বিদ্বান ইদানীন্তন কালেরও সকল ভূমি জানতে পারেন (বা জানতে, সমর্থ)। ৭।
কোন কারণ হতে ইন্দ্র উৎপন্ন হয়েছেন?, কোন্ কোন কারণ হতে সোম, অগ্নি, ত্বষ্টা ও ধাতা উৎপন্ন হয়েছেন? (এই প্রশ্নসমূহের প্রতিবচন পরবর্তী ঋকে দেওয়া হয়েছে) ৮
পূর্ববর্তী কল্পে যেমন রূপে ইন্দ্র ছিলেন, সেই ইন্দ্ৰ হতেই ইদানীন্তন ইন্দ্র জন্মেছেন (অর্থাৎ সেই সমান রূপে জাত হয়েছেন)। এইরকমেই পূর্বকল্পের সোম হতে এই কল্পের সোম, পূর্বকল্পের অগ্নি হতে বর্তমান অগ্নি, পূর্বকল্পের ত্বষ্টা হতে ইদানীন্তন ত্বষ্টা এবং বিগত কল্পের ধাতা হতে অধুনাতন ধূল্পের ধাতা জাত হয়েছেন। (অর্থাৎ পূর্বপূর্ব সৃষ্টি অনুসারে ইদানীন্তনের ইন্দ্র ইত্যাদি। দেবগণ সৃষ্ট হয়েছেন– এটাই বক্তব্য)। ৯।
অগ্নি ইত্যাদি দেবতা হতে পূর্বোক্ত প্রাণাপান রূপ যে দশ-সংখ্যক দেবতা উৎপন্ন হয়েছিলেন, তারা আপন আপন আত্মজদের (অর্থাৎ পুত্রদের) নিকট আপন আপন স্থান প্রদান পূর্বক কোন্ লোকে (বা স্থানে) স্থিত হয়েছিলেন? (যথা লৌকিক জনগণ পুত্ৰ উৎপদিত করে তাদের নিকট আপন স্থান প্রদান করে স্থানান্তরে নিবাসিত হয়–সেইরকম ইন্দ্রিয়গণ ও সেগুলির যথাযথ অধিষ্ঠাতৃবৃন্দ কোথায় আশ্রয়াম্বিত হয়ে গিয়েছিলেন–এটাই প্রশ্নার্থ। এই প্রশ্নের প্রতিবচন পরবর্তী সূক্তের তৃতীয় মন্ত্রে দেওয়া হয়েছে)। ১০
বঙ্গানুবাদ –সৃষ্টির সময়ে সেই বিধাতা কেশ, অস্থি, স্নায়ু, মাংস ইত্যাদি শরীরোপাদানভৃত সামগ্রী (অর্থাৎ ধাতু) সঞ্চিত করেছিলেন। তারপর সেগুলির দ্বারা হস্ত, পদ ইত্যাদি অঙ্গ-উপাঙ্গের সাথে শরীর নির্মাণ করেছিলেন। তখন (তদানীং) তিনি কোন্ লোকে প্রবেশ করেছিলেন? (তদেব তিনি আত্মভাবের দ্বারা শরীরে প্রবেশ করেছিলেন–এটাই অর্থ)। ১।
স্রষ্টা ঈশ্বর কোন উপাদান-কারণ হতে কেশ সমূহ সংগৃহীত করেছিলেন? তথা স্নায়ু কোথা হতে প্রকট হয়েছিল? অস্থিসমূহ কোথা হতে আগত হয়েছিল? অঙ্গোপাঙ্গ অর্থাৎ হস্তপদ ইত্যাদি পর্ব সমূহ এবং তৎসম্বন্ধী মজ্জা (অর্থাৎ অস্থির অন্তর্গত রস), মাংস কোথা হতে প্রাপ্ত হয়েছিল? (বস্তুতঃ এ সবই আর কেউ নয়, সেই উপাদানভাবের দ্বারা স্থিত ও বিচিত্রশক্তিযোগে একেরই মধ্যে কর্তৃত্ব ও কর্মত্ব সম্পন্ন ঈশ্বরের দ্বারাই একত্রে সংগৃহীত হয়েছিল। তিনি ব্যতীত আর কে-ই বা সংগ্রহ করবে?) ২
পূর্বে জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়াত্মক অধিষ্ঠাতৃ দেবগণ বা প্রাণাপান ইত্যাদির সঞ্চয়কারীর কথা বলা হয়েছিল, তারা সংসেচনসমর্থ (অর্থাৎ সংচিত বা সন্ধায়ক নামে অভিহিত)। তারা মরণশীল দেহকে রক্তের দ্বারা আদ্রীকৃত পূর্বক তাকে পুরুষাকৃতি সম্পন্ন করে তারই মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। (ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে–যাবৎ শরীরে প্রাণ নিবাস করে, তাবকাল প্রাণাধিষ্ঠিত শরীর সর্বব্যবহারক্ষম হয়ে থাকে। তখন প্রাণদেবগণ পৃথিবী ইত্যাদি পঞ্চভূতমাত্ৰ হতে সমুদ্ভুত প্রা-কথিত ধাতুময় পুরুষ-শরীরে প্রবেশ করে বিদ্যমান থাকে) ॥ ৩॥
জানুর উপরিভাগে বর্তমান উরুদ্বয়, জানুর নিম্নভাগে বর্তমান পাদদ্বয়, ঊরু ও পাদদ্বয়ের মধ্যস্থানবর্তী জানুদ্বয়, শির, বাহুদ্বয়, মুখ বা আস্য, পৃষ্টবংশের উভয় দিকে বর্তমান পঞ্জর, বর্জহ্যে নামক অবয়বদ্বয়, উভয় পার্শ্ব–এই সকল অনুক্রান্ত সকল অঙ্গজাতকে কোন সন্ধানোপায়-জ্ঞানবান (ঋষি) পরস্পর সংশ্লিষ্ট করেছেন? ৪
শির, হস্ত, মুখ, জিহ্বা, গ্রীবা, অস্থিসমূহ ইত্যাদি ও এতদ উপলক্ষিত প্রাক্-উক্ত অস্থি-স্নায়ু ইত্যাদি ও ঊরু-পাদ ইত্যাদি সমগ্র অঙ্গসমূহ চর্মের দ্বারা প্রাবৃত বা আচ্ছন্ন করে মহতী সন্ধানকত্রী দেবতা, পরস্পর সংশ্লিষ্ট করণ পূর্বক আপন আপন ব্যাপারক্ষম করেছেন (অর্থাৎ আপন আপন কর্মে প্রবৃত্ত করেছেন)। ৫৷
উক্তপ্রকার যে শরীরে কৃতাবয়বসন্ধান (অর্থাৎ অবয়বসমূহ, যুক্তকারী) যে সন্ধায়ক নামক দেবতা (সন্ধয়া) শায়িত বা অবস্থিত হয়ে আছেন, সেই শরীর ইদানীং কৃষ্ণ গৌর ইত্যাদি রূপে দীপ্যমান হয়ে আছে। কোন্ দেবতা এই শরীরে বর্ণ সম্পাদন করেছেন? ॥ ৬।
ইন্দ্র ইত্যাদি সকল দেবতা এই শরীরের সমীপে অবস্থানে সমর্থ হতে আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। পরমেশ্বরের দ্বারা কৃতোদ্বাহা (বিবাহিতা) ভগবতী আদ্যা পরচিপিনী শক্তি দেবতাগণের কৃত সেই আকাঙ্ক্ষা জ্ঞাত হয়েছিলেন (তৎ দেবৈঃ কৃতং অজানাৎ জ্ঞানবতী)। যিনি এই সর্ব জগতের নিয়ন্ত্রী মায়াশক্তি, সেই পরমেশ্বরী শক্তি, তিনিই এই ষাটুকৌশিক শরীরে গৌর-পীত-নীল ইত্যাদি বর্ণ আরোপ (বা উৎপাদন) করেছেন ৷৷ ৭৷
মনুষ্য-গো-অশ্ব ইত্যাদি প্রাণী সমূহের বিকর্তা ত্বষ্টাদেবের উৎপাদক উৎকৃষ্টতর ত্বষ্টা, যিনি বিচিত্র জগতের নির্মাতা, তিনি যেকালে পুরুষের শরীরে বিবিধ চক্ষু-শ্রোত্র ইত্যাদি ছিদ্রসমূহ সৃষ্টি করেছিলেন, তখন সেই ছিদ্র-সমন্বিত পুরুষ-শরীরকে আবাসস্থান করে ইন্দ্রিয় ইত্যাদি এবং প্রাণাপান ইত্যাদি দেবগণ (দেবাঃ) সেই পুরুষে প্রবিষ্ট হয়েছিল। ৮।
(এই শরীরের উৎপত্তি অভিধায়ে ইন্দ্রিয় সমূহ ও প্রাণাপান ইত্যাদি কর্তৃক তাতে প্রবেশের কথা উক্ত হয়েছে। তারই ফলে সেই শরীর সর্বব্যবহারক্ষম হয়েছিল। এইবার সর্ববিকারের আশ্ৰয়ত্ব উক্ত হচ্ছে)।–স্বপ্ন (নিদ্রা), অলসতা (তন্দ্রী), নির্ঋতি (পাপদেবতা দুর্গতি), পাপমান (ব্রহ্মহত্যা ইত্যাদি পাপসমূহ)–এই সকল দেবতা পুরুষ-শরীরে অনুপ্রবেশ করেছিল। তথা জরা (বয়োহানিকরী চরমাবস্থা), খালভ্য (চিত্তের ও চক্ষু ইত্যাদির স্থলন), পালিত্য (পলিতত্ব অর্থাৎ বার্ধক্কহেতু কেশ ইত্যাদির শুক্লতা)–এই সকলের অভিমানী দেবগণ সেই শরীরে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছিল। ৯।
স্তেয় (তস্করত্ব), দুস্কৃত (সুরাপান ইত্যাদি জনিত পাপ), সত্য (যথার্থকথন), যজ্ঞ (যাগ), বৃহৎ যশ (প্রভূত কীর্তি), বল (প্রসিদ্ধ সামর্থ্য বা শক্তি), ক্ষত্র (ক্ষত্রিয়সম্বন্ধি তেজঃ), ওজঃ (শরীরগত বলহেতু অষ্টম ধাতু–এগুলি পুরুষের শরীরে অনুপ্রবেশ করেছিল। (অর্থাৎ জীব-শরীরে আশ্রিত বা উৎপন্ন হয়েছিল। ১০।
নিন্দা (কুৎসা), অনিন্দ (অকুৎসা), হন্ত (হর্ষোৎপাদক বস্তু), নেত্যয় (হর্যের নিষেধ), শ্রদ্ধা (অভিলাষবিশেষ), দক্ষিণা (ধনসমৃদ্ধি), অশ্রদ্ধা (শ্রদ্ধার অভাব অর্থাৎ অভিলাষরাহিত্য)–এই সবই পুরুষের শরীরে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে আছে। (অর্থাৎ প্রাদুর্ভূত হয়েছে)। ২।
বিদ্যা (শাস্ত্রজনিত জ্ঞানরাশি), অবিদ্যা (বেদবিরুদ্ধ অজ্ঞানরাশি) ও উপদেশ্য (উপদেশের দ্বারা অধিগম্য বিদ্যা) এগুলিও পুরুষের শরীরে অনুপ্রবেশ করেছে। সেই সঙ্গে ঋক্-সাম-যজুরাত্মক (এবং তার অঙ্গভূত পুরাণ ইত্যাদি সম্পর্কিত) বিদ্যাও পুরুষের শরীরে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে ৷৩৷
আনন্দ, মোদ, প্রমুদ, অভিমোদ, মুদ (৪অ. ৩. ৬ মন্ত্রে ব্যাখ্যাত), হসঃ (হাস্য), নরিষ্ট (মনুষ্যের ইচ্ছাগোচর শব্দস্পর্শ ইত্যাদি বিষয় সমূহ), নৃত্য (ভরতশাস্ত্রোক্ত নর্তন)–এই সবগুলি পুরুষের শরীরে অনুপ্রবেশ করেছিল। ৪
আলাপ (আভাষণ অর্থাৎ সার্থক বচন সমূহ), প্রলাপ (অর্থহীন বচন সমূহ), অভিলাপলপ (সঙ্কল্পের অঙ্গীভূত বাক্যের বা শব্দের উচ্চারণ)–এই সবগুলি পুরুষের শরীরে অনু; প্রবিষ্ট হয়েছিল। আযুজঃ (অর্থাৎ আয়োজন সমুদায়), প্রযুজঃ (অর্থাৎ প্রয়োজন নিচয়) ও যুজঃ (অর্থাৎ যোজন বা সঙ্টন সমুচয়)–এই ক্রিয়া নিবহও শরীরে অনুপ্রবেশ করেছিল ৷৷ ৫
প্রাণ, অপান, চক্ষু, শ্রোত্র, অক্ষিতি, ক্ষিতি, ব্যান, উদান, বাক্য ও মন (পূর্বে ব্যাখ্যাত)–এইগুলিও শরীরে, অনুপ্রবিষ্ট হয়ে আপন আপন ব্যাপারে (পুরুষকে) প্রবর্তিত করেছিল ৷ ৬ ৷৷
আশিষ (আশাসন অর্থাৎ ইষ্টফলপ্রাপ্তির প্রার্থনা-পূরক বাক্যসমূহ), প্রশিষ (প্রশাসন সমূহ), সংশিষ (সংশাসন সমূহ), বিশিষ (বিবিধ শাসন সমূহ)–চিত্তের এই সকল সঙ্কল্প বা বৃত্তিসমূহ পুরুষের শরীরে অনুপ্রবেশ করেছিল। ৭৷
আসমন্তাৎ স্নান (আয়ে) অর্থাৎ সর্বাঙ্গ নিমজ্জন পূর্বক স্নানের নিমিত্ত আপঃ (অর্থাৎ জল), শরীরে প্রাণাবস্থানের নিমিত্তভূতা জল, শীঘ্র গমনকারিণী জল, কৃপণা অর্থাৎ অল্প জল, গুহ্যাঁ অর্থাৎ গুহায় সৃষ্ট জল, শুক্লবর্ণা বা শুক্রে পরিণতা জল, স্থলা অর্থাৎ ব্যাপনশীলা নদী ইত্যাদি রূপে বর্তমান জল এবং সর্বব্যবহারাস্পদ জল–এই সকল জল জুগুপ্স্যমান (অর্থাৎ অপবাদগ্রস্ত) পুরুষের দেহে স্বকার্যে প্রাপ্ত (অসাদয়ন) হয়েছে ৷ ৮
প্রাণীশরীর-সম্বন্ধি অস্থিজাত সমিধসমূহ শরীরপরিপাকের নিমিত্ত করে সেই ষাটকোশিক শরীরে পূর্বোক্ত অষ্টসংখ্যক জলকে স্থাপন (বা প্রাপ্ত) করেছে। সেই সমিন্ধনের অভিবৃদ্ধির কারণে আজ্যকে রেত বা শুক্ররূপে। পরিকল্পনা করে ইন্দ্রিসমূহ বা তার অধিষ্ঠাতা অগ্নি প্রমুখ দেবগণ সেই শরীরে প্রবেশ করেছে। (এই স্থানে পুরুষশরীরান্তৰ্গত অস্থি সমুদায় শরীরবৃদ্ধির হেতুত্বে সমিধত্বে আরোপিত হয়েছে (সমিত্বেন রূপ্যন্তে); এবং আপন শরীরের বৃদ্ধির হেতুত্বে ও পুত্র ইত্যাদির উৎপত্তির হেতুত্বে রেতঃ বা শুক্র আজ্যত্বে আরোপিত হয়েছে ॥৯॥
পূর্বকথিত (প্রাপ্তদীরিতা) যে জলরাশি, ইন্দ্রিয়াভিমানী যে দেবগণ, তারা এবং বিরাট-নামক যে দেবতা ব্ৰহ্মণা অর্থাৎ ব্রাহ্মণতেজের সাথে বর্তমান, তারা সকলে শরীরে প্রবেশ করেছিলেন। তারপর যিনি জগকারণ পরম ব্রহ্ম, তিনিও অন্তর্যামীরূপে সেই শরীরে প্রবেশ করেছিলেন। সেই শরীরে প্রজাপতি (অর্থাৎ প্রজাগণের পালয়িতা পুত্র ইত্যাদির উৎপাদক জীব) অবস্থান করছেন। (তস্মিন্ শরীরে (অধি) প্রজাপতি প্রজানাং পালয়িতা পুত্ৰাদ্যুৎপাদকো জীববা বর্তন্তে) ১০
চক্ষুরাভিমানী সূর্যদেবতা পুরুষের সম্বন্ধি চক্ষুরিন্দ্রিয়কে আপন ভাগরূপে স্বীকার করেছেন (আত্মীয়ভাগত্বেন স্বীকৃতবা)। প্রাণদেবতা বায়ু ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে স্বীকার করেছেন। এই প্রকারে পুরুষসম্বন্ধিনী ইন্দ্রিয়গুলি সেই সেই অধিদেবতা কর্তৃক তাঁদের নিজ নিজ ভাগরূপে স্বীকৃত হয়েছিল। অনন্তর সকল দেবতা প্রাণেন্দ্রিয়ব্যতিরিক্ত ষাটুকৌশিক স্থূলশরীরকে অগ্নির ভাগ রূপে স্বীকার করেছেন। (মরণের পরে অগ্নি কেবল স্থলশরীরকেই দহন করেন; ইন্দ্রিয় সমূহের অধিষ্ঠাত্ দেবতাগণকে নয়) ॥১১।
এই কারণে বিদ্বান ব্যক্তি এই পুরুষ শরীরে অপরোক্ষ ব্রহ্মের অবস্থিতি জ্ঞাত হন; যেহেতু এই দেহ সকল দেবতার নিবাসস্থান। (তার দৃষ্টান্ত এই যে,) গাভীগণ যেমন স্বকীয় গোষ্ঠে (স্থানে) স্বচ্ছন্দে নিবাস করে। (অর্থাৎ সেই রকমেই সকল দেবতার আশ্রয়ভূত পুরুষশরীরকে ব্রহ্মের আবাসরূপে বিদ্বান ব্যক্তি সাক্ষাৎ করেন)। ১২।
প্রথমোৎপন্ন স্থূলশরীরের অবসান ঘটলে, সেই ত্যক্তদেহ আত্মা তিন রকম গতি প্রাপ্ত হয়ে থাকে বা নিয়মে বদ্ধ হয়। শরীরভোগকালে পুণ্যকর্মের অনুষ্ঠানের দ্বারা স্বর্গ নামক স্থান, পাপকর্মের অনুষ্ঠানের দ্বারা বিপ্রকৃষ্ট নরক নামক স্থান এবং পুণ্য-পাপাত্মক মিশ্রিত কর্মের দ্বারা এই ভূলোকে নিরন্তর সুখ-দুঃখাত্মক ভোগের ভোগী হয় ॥ ১৩ ৷৷
সমগ্র শুষ্ক জগৎসংসারকে আর্দ্র করণশালী প্রবৃদ্ধি জলরাশির মধ্যে ব্রহ্মাণ্ড সম্বন্ধী দেহ স্থিত আছে। সেই ব্রহ্মাণ্ড উপরে ও মধ্যভাগে সর্বাধার ভূতবস্তুরূপ (ভূতত্ত্বাত্মকঃ) পরমেশ্বর বিরাজমান থাকেন। (সমষ্টিশরীর হতে অধিক হওয়ার কারণে সেই (শবঃ) বলাত্মক সূত্ৰাত্মা নামে উক্ত হয়ে থাকে)। ১৪
টীকা –এই সূক্তের বিনিয়োগ ইত্যাদি পূর্ব সূক্তের অনুরূপ। (১১কা. ৪অ. ৬সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –আমাদের যোদ্ধৃবর্গের আয়ুধগ্রাহী হস্তগুলি, ইষু অর্থাৎ বাণসমূহ, ধন্ব অর্থাৎ ধনুক সমূহ, অসি অর্থাৎ খঙ্গ সমূহ, পরশু অর্থাৎ কুঠারাস্ত্র সমূহ, এবং অন্যান্য আয়োধনসাধন শস্ত্রসমূহের সাথে আমাদের যোদ্ধৃগণের হৃদয়ে অবস্থিত (বা সঞ্জাত) শত্রুগণকে মারণবিষয়ে যে ধৈর্যযুক্ত সঙ্কল্পসমূহ, হে অর্বুদ নামক সর্পঋষি (বা অবুদের হে পুত্র, হে সর্প)! তুমি ঐগুলি (অর্থাৎ ঐ অস্ত্র ইত্যাদি) আমাদের শত্রুগণকে দর্শন করাও। যার দ্বারা তারা ভয়ভীত হয়ে যাবে। অপিচ, মন্ত্ৰসামর্থ্যে উদ্ভাবিত অন্তরিক্ষচর রাক্ষস-পিশাচ ইত্যাদিকে অথবা সূর্যরশ্মিপ্ৰভব উল্কা ইত্যাদি অন্তরিক্ষের উৎপাত সমূহ আমাদের শত্রুগণের পরাজয়ের নিমিত্ত তাদের (অর্থাৎ আমাদের শত্রুগণকে) প্রদর্শন করো (প্ৰদৰ্শয়)। ১।
আমাদের জয়ের নিমিত্ত প্রবৃত্ত হে মিত্রভূত দেববর্গ! এক্ষণে আমাদের সেনানিবেশ হতে উত্থিত হও এবং সংগ্রামের নিমিত্ত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত (সন্নদ্ধ) হও। তোমাদের দ্বারা সম্যক্ নিরীক্ষিত আমাদের সৈন্যগণ রক্ষিত (গুপ্তা) হোক। হে অকুঁদে (স)! আমাদের যে মিত্ৰসমূহ শত্রুর সাথে সংগ্রামের নিমিত্ত আগত হয়েছে, তুমি তাদেব রক্ষা করো। ২।
হে অর্বুদি! তুমি ও ন্যর্বুদি উভয়ে আপন স্থান হতে উত্থিত হয়ে যুদ্ধের উপক্রম করো। অনন্তর আদান নামক রঞ্জুযন্ত্র ও সন্দান নামক বন্ধনরঞ্জুর দ্বারা শত্রুসম্বন্ধিনী সনাগণকে বন্ধন করো (বা বশীভূত করো) ৷৩৷
অর্বুদি নামে প্রসিদ্ধ সাত্মক যে দেবতা এবং সকলকে বশকারী (ঈশানঃ) যে ন্যর্বুদি ও নামক সর্প, যাঁদের দ্বারা অন্তরিক্ষ ও এই পরিদৃশ্যমান পৃথিবী আবৃত হয়েছে (অর্থাৎ যাঁরা তাঁদের শরীরের দ্বারা বেষ্টন করে রেখেছেন, তাঁরা সংগ্রামজয়-কর্মে সর্ব-উৎকর্ষের দ্বারা বিদ্যমান রয়েছেন। ৪
দ্যাবাপৃথিবী ব্যাপী বর্তমান ইন্দ্রের স্নেহধন্য (স্নিগ্ধ) সেই শ্রেষ্ঠ অবুদি-ন্যবুদির দ্বারা জয়কৃত (জিত) শত্রুবলের পশ্চাতে আমি সেনাগন সহ (আক্রমণের উদ্দেশ্যে) অনুগমন করছি। হে দেবজন (অর্থাৎ দেবজাতীয় বা দেবতুল্য) অবুদি! তুমি আপন সেনাগণের সাথে উত্থিত হও এবং সেনাগণকে ভগ্নবীর্য করে (ভঞ্জ) আপন শরীরের দ্বারা তাদের পরিবেষ্টন করো। (অর্থাৎ শত্রুসেনা যেন আমাদের দর্শন করতে পারে, তেমন ভাবে তাদের চক্ষু আবৃত করে দাও–এটাই বক্তব্য) ৫।
হে ন্যর্বুদি নামক সর্প দেব! প্রাগুক্তলক্ষণ সপ্তসংখ্যায় উৎপন্ন দৃষ্টি-তিরোধক উৎপাতগুলি শত্রুদের সম্যক দর্শন করিয়ে আজাহুতি প্রদানের পর তুমি সেই আজ্যোপলক্ষিত দ্রব্যের সাথে আমাদের সেনাগণ সহ উদ্দত (বা উত্তিষ্ঠিত) হও ৬
হে অর্বুদি! তোমার দস্তাঘাতে (বা ভক্ষণে) আমাদের শত্রু নিহত হলে তার জায়া তার দিকে মুখ করে নিজের বক্ষতাড়না করুক, অশ্রুমুখী হোক, এবং কর্ণাভরণ পরিত্যাগ পূর্বক বিকীর্ণকেশা (বিক্ষিপ্ত কেশাশালিনী) হয়ে রোদন করুক ॥৭।
হে অর্বুদি! তোমার দংশনে শত্ৰু বিষাবেশবশতঃ নিপাতিত হলে সেই শস্ত্রী তার হস্তাঙ্গুলির সঙ্কর্ষনে অনুকরণশব্দ করে (করূকর) আপন পুত্র, পতি, ভ্রাতা ও আত্মীয়বর্গের বিষপ্রতিকারের ইচ্ছা করুক। (অর্থাৎ কর্তব্য অবধারণে অসমর্থ (ইতিকর্তব্যতামূঢ়া) হোক–এটাই বক্তব্য) ৮
শরীরের ক্লান্তিদায়ক অলিক্লবা (অর্থাৎ ধৃষ্ট) পক্ষীগণ, মাংসাভিলাষী শকুনি (গৃধ্র), বাজপক্ষী (শ্যেন) এবং মাংসভক্ষক অন্যান্য পক্ষী,যথা ধ্বক্ষ (অর্থাৎ কাক) ইত্যাদিও তোমার রদনে (অর্থাৎ দংশনে) নিপাতিত শত্রগণকে লক্ষ্য করুক (অর্থাৎ তাদের মরণের জন্য প্রতীক্ষমাণ থাকুক এবং তারপর, অর্থাৎ তাদের মরণ ঘটলে, তাদের ভক্ষণ করে তৃপ্ত হোক) ॥৯॥
(হে অর্বুদি!) সকল শ্বাপদ (অর্থাৎ শৃগাল, ব্যাঘ্র ইত্যাদি সমূদায়), মক্ষিকা (অর্থাৎ মাংসনিষেবিনী নীলমক্ষিকা ইত্যাদি), কৃমি (অর্থাৎ জীর্ণ মাংসে জায়মান প্রাণী সমূহ) তোমার দংশনে মৃত পুরুষসম্বন্ধিনী শবশরীরের উপরে তৃপ্তি লাভ করুক (অর্থাৎ শত্রুগণের মৃতদেহ ভক্ষণ করুক– এটাই বক্তব্য) ॥১০
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –পঞ্চমেনুবাকে ষট্ সূক্তানি। তুত্র যে বাহবঃ ইত্যাদি সূক্তত্ৰয়ং অর্থসূক্তং। উত্তিষ্ঠত সং নহ্যধ্বং ইত্যাদি সূক্তত্ৰয়ং অর্থসূক্তং। আভ্যাং অর্থসূক্তাভ্যাং জয়কামো রাজা যুদ্ধকালে যথালিঙ্গং স্বীয়া ভটা প্রতি সম্প্রৈষং কুর্যাৎ জপং কুর্যাচ্চ।…ইত্যাদি। (১১কা, ৫অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে ন্যর্বুদি! তুমি ও অর্বুদি উভয়ে আমাদের শত্রুসম্বন্ধি প্রাণাপানকে গ্রহণ করো এবং তারপর তাদের সমূলে উৎখাত করো। হে অবুদি! তোমার দংশনের কারণে বিষনীপিড়িত শত্রুগণের আর্তধ্বনি সম্যক উৎসারিত (বা উৎপাদিত), হোক ॥১॥
হে ন্যর্বুদি! নামক সর্পজাতীয় দেব! তুমি আমাদের শত্রুবর্গকে উৎকম্পিত করো, এবং তারপর তারা উদ্বিগ্ন হয়ে স্বস্থান হতে প্রচলিত হোক। তারপর ঊরু ও বাহুর বক্ৰবন্ধনে আমাদের শত্রুদের তাড়িত করো (বিধ্য) ॥ ২॥
হে অর্বুদি! তোমার দ্বারা দংশিত হওয়ার পর শত্রুগণের বাহুসমুদায় বিষাবেশ বশতঃ মূহ্য (অর্থাৎ ব্যাপারসাধনে অসমর্থ হয়ে যাক। শত্রুগণ তাদের চিত্তের দ্বারা সঙ্কল্পিত প্রার্থনাসমূহও বিস্মৃত হয়ে যাক। অপিচ, সেই শত্রুগণের কোনও রথ-অশ্ব-হস্তী ইত্যাদি সমন্বিত বল যেন অবশিষ্ট না থাকে। (অর্থাৎ সবই তুমি নিঃশেষে হনন করো) ॥৩॥
হে অর্বুদি। তোমার দ্বারা দংশিত হয়ে শত্রুবর্গীয় পুরুষগণ নিহত হলে তাদের স্ত্রীগণ আপন বক্ষ তাড়না পূর্বক উন্মুক্তকেশা হয়ে ভর্তৃ-বিয়োগজনিত দুঃখে আর্ত হয়ে সঞ্জাতরোদনা রূপে মৃত পুরুষ সমীপে শীঘ্র গমন করুক ॥ ৪৷৷
হে অর্বুদি! মায়াবশে, রূপমাত্রের দ্বারা উপলভ্যমান (অর্থাৎ সেনারূপধারী) কুকুরগুলির সাথে ক্রীড়মানা অপ্সরাগণকে (অর্থাৎ, গন্ধর্বস্ত্রীগনকে) শত্রুদের প্রদর্শন করো। তথা পাত্রের মধ্যে পুনঃ পুনঃ লেহনকারী দুষ্ট-ইচ্ছাকারিণী গাভীগণকে এবং উল্কাপাত ইত্যাদি বিকৃতদর্শন যক্ষ ও রাক্ষসগণকে ঐ পূর্বোক্ত শত্ৰুগণের নিকট প্রদর্শন করো ॥৫॥
আকাশের (অর্থাৎ দূরদেশের) উপরে চক্রমনশীলা (বা মায়াবশে ইতস্ততঃ প্রাদুর্ভূতা) হ্রস্বদেহা ও অল্প শব্দায়মানা মাতৃগণকে প্রদর্শন করো, যাতে তারা পরাজিত হয়। যে যক্ষ-রাক্ষস ইত্যাদি স্বমায়ায় অন্তর্হিত হয়ে আছে, যে গন্ধর্ব-অপ্সরা ঐ রকম দৃষ্টির অগোচরে আছে, সেই সবই ঐ শত্রুগণকে পরাজয়ার্থে দর্শন করাও ॥৬॥
সর্পস্বরূপ ইতরজন-সংজ্ঞক দেবজাতীকে, রাক্ষসগণকে, দংশনসাধন চতুর্দন্তযুক্ত, শ্যামবর্ণ দন্তযুক্ত মায়াময়গুলি (অর্থাৎ মায়াগঠিত সব কিছু) শত্রুদের দর্শন করাও। তথা কুম্ভমুষ্কা অর্থাৎ কুম্ভ বা ঘটের ন্যায় আকৃতিসম্পন্ন অণ্ডকোষ-যুক্ত, রক্তময় মুখশালী, স্বায়ত্তভীত অর্থাৎ ভীতি-উৎপাদক ও উতভীত অর্থাৎ ভীতি-উমকারী রাক্ষসদের (অর্থাৎ বিবিধ ভয়জনক মায়াময় রাক্ষসগণকে) শত্রুদের দর্শন করাও ॥৭॥
হে অর্বুদি! তুমি শত্রুসেনাবর্গকে বিষাবেশজনিত শোকে ঊকম্পিত করো। শত্রুসেনাবর্গকে পরাভূত করে জিষ্ণু (অর্থাৎ জয়শীল) অবুদি ও ন্যঝুঁদি ইন্দ্রের দ্বারা স্নেহপূরিত হয়ে আমাদের জয়প্রাপ্তি সঙ্টিত করুন ৷৷ ৮
হে ন্যর্বুদি! প্রকৃষ্টরূপে ভীত আমাদের শত্রুগণ সম্যক মর্দিত দেহে গতাসু হয়ে শায়িত থাকুক। মায়াবশে তোমার দ্বারা উৎপাদিত অগ্নির জ্বালা ও ধূমশিখা সমূহ শত্রুসেনাগণকে জয় করতে করতে (জয়ন্ত) আমাদের সেনাগণের সাথে গমন করুন।৯।
হে অর্বুদি! যুদ্ধক্ষেত্র হতে প্রত্যাবৃত্ত শত্রুগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ বীরগণকে শচীপতি (ইন্দ্র) হত্যা করুন; শত্রুগণের মধ্যে কেউই যেন মুক্তিপ্রাপ্ত না থাকে। (অর্থাৎ ক্রমশঃ সকলকেই হত্যা করুন–এটাই বক্তব্য)।১০
বঙ্গানুবাদ –শত্রুবর্গের দেহ হতে অন্তঃকরণসমূহ উগত হয়ে যাক। শত্রুবর্গের শরীর হতে তাদের প্রাণবায়ুসমূহ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে নির্গত হয়ে যাক (ঊর্ধ্ব সন উদীষ)। ভীতিবশে শত্রুগণের মুখ (আস্য) শুষ্কতা (নিদ্ৰবত্ব) প্রাপ্ত হোক। অপিচ, আমাদের মিত্রভূত জনগণের ক্ষেত্রে যেন তার অনুবর্তন না ঘটে (অর্থাৎ মিত্রবর্গের আস্য যেন বিশুষ্ক না হয়)।১।
যে সৈন্যগণ বীর (ধীরাঃ), যে সৈন্যগণ কাতর (অধীরাঃ), যে সৈন্যগণ যুদ্ধ হতে পলায়মান (পরাঞ্চো), যারা ভয়বশতঃ হতশ্রবণসামর্থ (বধির), যে সৈন্যগণ মোহবশে শৃঙ্গহীন পশুর মতো অবস্থিত (তমসা যে চ তুপরাঃ), যে সৈন্যগণ ছাগের ন্যায় শব্দকারী (বস্তাভিবাসিনঃ), হে অবুদি! তোমার আপন মায়ায় উদ্ভাবিত সেগুলি শত্রুবর্গকে পরাজয়ের নিমিত্ত দর্শন করো (দৃশে কুরু)। ২।
হে ত্রিসন্ধি অর্থাৎ, সেনামোহনকারী (কোনও) দেবতা (বা সন্ধিত্রয়োপেত বজ্ৰায়ুধাভিমানী কোন দেবতা) ও অবুদি! তোমরা উভয়ে আমাদের শত্রুবর্গকে বিবিধ ভাবে তাড়না করো (বিধ্যতাং)। হে বৃহন্তা শচীপতি (ইন্দ্রদেব)! যে ভাবেই হোক আমরা যাতে সংহস্ৰসংখ্যক শত্রুকে এক-উদ্যোগে হনন করতে পারি, তেমনভাবে তাড়না করো ॥৩৷৷
হে অর্বুদি! বনস্পতি নামক সমগ্র বনস্পতি সমূহের বিকার সমুদায়, ব্রীহি-যব ইত্যাদি ওষধিরাশি,বিরোহণশীল আরণ্য-সম্ভার (বীরুধ), গন্ধর্ব ও অপ্সরা নামক দেবযোনিবর্গ, বিকৃতবিষ সর্পসমষ্টি, পুণ্যজন যক্ষবৃন্দ, মৃত পিতৃপুরুষগণ–তোমার মায়াময় এই সকলকে শত্রুবর্গের দৃষ্টির বিষয়ীভূত করো (দৃষ্টিবিষয়ান্ কুরু) ॥৪॥
হে শবর্গ! মরুৎ ইত্যাদি দেবগণ, আদিত্যগণ ও ব্রহ্মণস্পতি দেব তোমাদের নিয়ন্তা (দমনকারী) হোন। তথা ইন্দ্র, অগ্নি, ধাতা, মিত্র ও প্রজাপতি তোমাদের দণ্ডদাতা হোন। তথা অথবা, অঙ্গিরা প্রভৃতি ঋষিগণ তোমাদের শিক্ষক (শাসনকর্তা) হোন।
হে অর্বুদি! তোমার দন্তের দ্বারা বিদারিত আমাদের শত্রুগণের দৃষ্টিগোচর হলে সেই অবলোকিত দেব ও ঋষিগণ তাদের (অর্থাৎ শত্রুগণকে) নিয়ন্ত্রিত বা দণ্ডিত করুন ॥ ৬।
টীকা –পূর্ব সূক্তের অনুরূপ এই সূক্তটিরও বিনিয়োগ শত্রুজয়কর্মে করা হয়ে থাকে। (১১কা, ৫অ. ১) ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –যে ত্রিসন্ধির দ্বারা ঐ দূরে দিবিলোকে দৃশ্যমান আদিত্য রক্ষিত (অর্থাৎ অসুরকৃত উপদ্রব পরিহার পূর্বক পালিত) হয়ে আছেন; যে ত্রিসন্ধির বজের বা বলের দ্বারা সেই আদিত্য ও ইন্দ্র উভয়ে স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছেন, সেই অসুরক্ষয়কারী আয়ুধভূত ত্রিসন্ধি দেবকে সকল দেবতা ওজঃ (অর্থাৎ শরীরান্তৰ্গত অষ্টম ধাতু) ও বল (অর্থাৎ তেজঃ) প্রাপ্তির নিমিত্ত সেবা করে থাকেন (অভজন্ত)।১।
(ইন্দ্র ইত্যাদি) দেবগণ এই আহুতির (অর্থাৎ পৃষদাজ্য হোমের) দ্বারা অসুরগণকে নিহত করে সর্ব লোক সম্যক জয় করেছিলেন। আঙ্গিরস বৃহস্পতি অসুরগণের ক্ষয়কর রে (অর্থাৎ তাদের বধসাধন) এই আয়ুধ (বা বজ্র) সেচনের দ্বারা নির্মিত করেন (অসিঞ্চত নির্মিতবান)। (অর্থাৎ পৃষদাজাহুতিই এই বজ্ররূপে (বজ্রাত্মনা) পরিণত হয়েছিল–এটাই বক্তব্য) ॥ ২
আঙ্গিরস বৃহস্পতি সেচনের দ্বারা অসুরগণের বধসাধন বজ্ৰায়ুধ নির্মাণ করেছিলেন। হে বৃহস্পতি! তোমার নির্মিত অসুরগণের অন্তকারী সেই বজ্রের দ্বারা শত্রুসেনাকে নিরন্তর ছিন্ন করছি; তারপর (অর্থাৎ সেনাচ্ছেদনের পর) তাদের অধিপতি-শত্রুদের আপন বলের দ্বারা (ওজসা) সংহার করছি ৷৩৷৷
ইন্দ্রপ্রমুখ সকল দেবতা শত্রুগণকে অতিক্রম পূর্বক (বা তাদের সংহারপূর্বক) আমাদের অভিমুখে আগমন করেছেন, যে দেবগণ বষট্রারের দ্বারা দত্ত হবিঃ ভোগ করেন, এমনই হে দেববৃন্দ। আপনারা আমাদের আহুতি সেবন করে প্রীত হয়ে আমাদের সেনাগণকে জয়প্রাপ্ত করুন এবং পরকীয় সেনাগণকে পরাজয় প্রাপ্ত করুন (অর্থাৎ তারা যেন জয়লাভ করতে না পারে) ॥৪॥
ইন্দ্র প্রমুখ সকল দেবতা শত্রুগণকে অতিক্রম পূর্বক আমাদের অভিমুখে আগমন করছেন। তথা সেনাগণকে মোহনকারী ত্রিসন্ধি নামক দেবের পক্ষে আমাদের (নিবেদিত) এই আহুতি প্রীতিকরী হোক। হে দেববর্গ! পূর্বে দেবাসুরযুদ্ধকালে যে জয়বিষয়ক প্রতিজ্ঞার দ্বারা আপনারা অসুরগণকে পরাজিত করেছিলেন, এখন সেই জয়বিষয়ক প্রতিজ্ঞা রক্ষা করুন ৷৷ ৫৷
বায়ুদেব শত্রুগণের শরের (বাণের) অভিমুখে গমন করুন। (অর্থাৎ প্রতিকুল বায়ুর দ্বারা লক্ষ্যপ্রাপ্তির পূর্বেই শত্রুগণের বাণসমূহ নিপাতিত হয়ে যাক)। তথা ইন্দ্রদেব এই শত্রুগণের বাহুগুলি প্রতিকূল আঘাতের দ্বারা ভগ্ন করুন, যাতে তারা আয়ুধগ্রহণে অসামর্থ্য হয়ে যায় (অর্থাৎ ধনুতে পুনরায় শর-যোজনা করতে না পারে) ॥৬॥
সূর্য (আদিত্য) এই শত্রুদের আয়ুধসমূহের সামথ্য-সঙ্কোচন পূর্বক বিনষ্ট করুন এবং চন্দ্রমা (অর্থাৎ সোম) শত্রুগণের (পক্ষে আমাদের প্রাপ্তির উপায়ভূত) পথসমূহকে পৃথক করুন। ৭।
(হে দেব!) শত্রুগণ যদি ইতিপূর্বেই মন্ত্রময় কবচ ধারণ করে থাকে, তবে তাদের সেই মন্ত্রকেই ব্যর্থ করে দাও; সেই সঙ্গে তাদের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত দেহ ও অন্নরস ইত্যাদি সবকিছুই বিশুষ্ক করে দাও (অরস কৃধি)। [এই মন্ত্রটি ৫ম কাণ্ডে, ২য় অনুবাকের ৩য় সূক্তে প্রাপ্তব্য] ॥৮॥
হে ত্রিসন্ধি দেব! সম্মুখবর্তী এই আমমাংসভক্ষক শত্রুগণের পশ্চাৎ মৃত্যুদেবতা সহ আপন সেনাগণ সমভিব্যাহারে অনুগমন করো; এবং তার পরে (গত্বা চ) সেই শত্রুগণকে জয়ের নিমিত্ত তাদের মধ্যে প্রবেশ করো (বিশ) ॥৯৷৷
হে ত্রিসন্ধি নামক দেবতা! তুমি তমসা অর্থাৎ মায়াময় অন্ধকারের দ্বারা শত্রুগণকে পরিবেষ্টিত করো। হুয়মান পৃষদাজ্যের (অর্থাৎ হোমের জন্য বিহিত দধিমিশ্র আজ্যের) দ্বারা প্রকৃষ্টরূপে নিক্ষিপ্ত (প্রণুত্তানাং) শত্রুবর্গের মধ্যে একজনও যেন না মুক্ত থাকে। (অর্থাৎ সকল শত্রুকে তমসাবৃত করে হত্যা করো–এটাই বক্তব্য) ॥১০৷৷
শিতিপদী (অর্থাৎ শ্বেতবর্ণপাদশালিনী) গাভী (পূর্ব সূক্তের ৬ষ্ঠ মন্ত্রে উল্লিখিত) আমাদের আয়ুধের দ্বারা পীড্যমান শত্রুসেনার সাথে সঙ্গত হোক। (অর্থাৎ আভিচারিক মন্ত্রে উৎসৃষ্ট গাভীর শত্ৰুহননে নিযুক্ত হোক)। হে ন্যঝুঁদি নামক সর্প! দূরে দৃশ্যমান শত্রুর সেনাদল অদ্য (অর্থাৎ ইদানীং যুদ্ধসময়ে) মুহ্যমান হয়ে পড়ুক। (অর্থাৎ তুমি আপন মায়াবশে তাদের মোহ উৎপাদন করো–এটাই বক্তব্য) ১১।
টীকা –এই সূক্তটিও প্রথম সূক্তের ন্যায় বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। (১১কা, ৫৩, ৫সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে ঔদার্যগুণযুক্ত সেনানায়কবৃন্দ! তোমরা নিজ নিজ ধ্বজাগুলি উড্ডীয়মান পূর্বক (বা ধ্বজাণ্ডলি সহ) উখিত হও এবং কবচ ইত্যাদি ধারণ পূর্বক যুদ্ধের নিমিত্ত উদযুক্ত হও। হে সর্পকৃতি ও সর্পব্যতিরিক্ত দেবজন! হে (পূর্বোক্ত মায়াময়) রাক্ষসগণ! তোমরাও আমাদের শত্রুগণের পশ্চাদ্ধাবন করো ॥১॥
হে ত্রিসন্ধি! তোমার মনে (বা চেতনায়) বর্তমান আমাদের দুষ্ট সংজ্ঞক যে শত্রুগণ উপাসত (বা সম্ভজন্ত) হয়ে আছে, তাদের প্রতি তোমার দ্বারা প্রেরিত অয়োমুখ (লৌহাগ্র বাণের ন্যায় তুণ্ডযুক্ত), সূচীমুখ (সূচির ন্যায় আকারসম্পন্ন তুণ্ডযুক্ত), বিকঙ্কতীমুখ (বহুকন্টকযুক্ত বৈঁচি নামক বৃক্ষবিশেষের ন্যায় তুণ্ডযুক্ত), ক্রব্যাদ (মাংস ভক্ষণকারী গৃধ্র ইত্যাদি) ও বাতরংহস (বায়ুর ন্যায় গতিশীল) পক্ষীসমূহ আসক্ত (বা সম্বন্ধযুক্ত) হোক। (অর্থাৎ তোমার বর্জ্যের দ্বারা যেমন দুষ্টেরা হত হয়, তেমনই ঐ পক্ষীগণের তুণ্ডাঘাতে আমাদের শত্রুগণ হত হোক)। (যারই নিকটে এইরকম পক্ষীগণ উপসৰ্পন অর্থাৎ গমন করে, তার অবশ্যই মরণ হয়–শাকুনিকশাস্ত্রে এমনই প্রসিদ্ধি আছে) ॥৩॥ হে জাতমাত্রকেই জ্ঞাপিত (সাংগ্রামিক অগ্নি বা) আদিত্য! তুমি শত্রুগণের শবদেহের দ্বারা অন্তরিক্ষকে আচ্ছাদিত করো। ত্রিসন্ধিদেবের এই সেনাগণ আমার বশে সম্যক স্থাপিত হোক (সুহিতান্তু)। (অর্থাৎ তাদের দ্বারা আমি আমাদের শত্রুগণকে জয় করতে পারবো) ॥৪॥
হে দেবজন অবুদি! তুমি আপন সেনাগণ সহ উগমন করো। হে অবুদি! এই হৃয়মান পৃষদাজ্য (আহুতি) তোমাদের তৃপ্তিকর হবির্ভাগ (বলি)। (অর্থাৎ যেহেতু তোমাদের সর্পসমূহ বলিপ্রিয়, সেই হেতু আমাদের এই বলি স্বীকার পূর্বক তোমরা আমাদের শত্রুগণকে হনন করো–এটাই বক্তব্য) ॥৫॥
শিতিপদী (অর্থাৎ শ্বেতবর্ণ পাদবিশিষ্টা) চতুষ্পদী গাভী শরসংহতি রূপে (বানসমূহের রূপ ধরে) আমাদের শত্রুগণের প্রাপ্ত হোক। হে কৃত্যা (কৃত্যারূপিনী অর্থাৎ অভিচার-কর্মের দ্বারা উৎসৃষ্টা শিতিপদী গাভী)! তুমি ত্রিসন্ধি দেবের সেনাগণের সাথে মিলিত হয়ে আমাদের শত্রুগণের সংহারকত্রী হত (সংহত্রী ভব)। (অর্থাৎ সেনাগণও তোমার সহায়ভূত হোক–এটাই বক্তব্য) ৷৷ ৬ ৷৷
শুত্রুসম্বন্ধিনী সেনাগণের চক্ষুগুলি মায়াময় ধূমের দ্বারা আবৃত হয়ে যাক এবং তারা কৃধুকর্ণী (অর্থাৎ অল্পশ্রোতা) হয়ে ও ঢক্কানিনাদ শ্রবণে হতশ্রবণসামর্থ্য হয়ে ইতিকর্তব্যতামূঢ় হয়ে যাক। ত্রিসন্ধি দেবতার সেনাগণের দ্বারা পরকীয় বল (অর্থাৎ শত্রুসেনাগণ) বিজিত হলে তাদের ধ্বজাসমূহ রুধিরাক্ত হয়ে অরুণবর্ণ ধারণ করুক ৭
আকাশে যে পক্ষীগণ সঞ্চরণ করছে, সেই পক্ষীগণ মৃত শত্রুসেনার মাংস ভক্ষণের উদ্দেশ্যে নিম্নমুখী হয়ে নিপতিত হোক (নিপদ্যাং)। তথা দ্যুলোকে বিচরণকারী পক্ষীগণও তা-ই করুক। আমমাংসভক্ষক (অর্থাৎ অপক্ক বা কাঁচা মাংস ভক্ষণকারী) কুকুর (শ্বাপদ অর্থাৎ শুন-পাদা), শৃগাল ইত্যাদি ও মক্ষিকাগণ ঐ শত্রুগণের শবভক্ষণার্থে উপক্ৰম করুক (উপক্রমন্তাৎ)। তথা আমমাংসভক্ষণকারী গসমূহ শত্রুসেনাগণের শবশরীরে (কুণপে) আপন তুণ্ড ও পাদের দ্বারা বিলিখন করুক (অর্থাৎ আঁচড়াতে থাকুক) ৮
হে বৃহস্পতি দেব! দেবগণের অধিপতি ইন্দ্র ও ব্রহ্মা এবং তাদের স্রষ্টা প্রজাপতি যে প্রতিজ্ঞারূপ সন্ধানক্রিয়ায় সংহিতবান্ (মিলিত) হয়েছিলেন, এবং হে ইন্দ্র! তোমার সেই প্রতিজ্ঞারূপ সন্ধানক্রিয়ার দ্বারা সকল দেবতাকে এই সংগ্রামে আহ্বান করছি। হে আহূত দেববর্গ! তোমরা আমাদের এই সেনাগণকে জয়যুক্ত করো (ইতঃ জয়ত), শত্রুসেনাগণকে নয় (মা অমূতঃ) ॥৯॥
আঙ্গিরস (অর্থাৎ অঙ্গিরসের পুত্র) দেবমন্ত্রী বৃহস্পতি ও আপন আপন মন্ত্রের দ্বারা তেজঃপ্রাপ্ত (তীক্ষ্ণীকৃত) অন্য ঋষিগণ ও অসুরবর্গের বিনাশকারী হননসাধন (ক্ষয়কর) আয়ুধ দ্যুলোকে অবস্থিত ত্রিসন্ধি নামক দেবের বা সন্ধিত্রয়োপেত বজ্রের ভজনা করুক। (অর্থাৎ বৃহস্পতি দেব ও অন্যান্য ঋষিগণও অসুরনাশী হিংসা-সাধন বজ্রের বা ত্রিসন্ধি দেবের সহায়তা গ্রহণ করুক ॥১০৷
বঙ্গানুবাদ –হে ন্যর্বুদি নামক দেব! তুমি তোমার মায়ায় আমাদের শত্রুবর্গকে সঞ্জাতমূঢ় করো (অর্থাৎ কর্তব্য-অকর্তব্য সম্পর্কে বিভাগজ্ঞান-শূন্য করে দাও)। এই শত্রুগণের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত শ্রেষ্ঠ, তাদের নিধন করো। তথা আমাদের সেনাগণ তাদের নিধন করুক। (অর্থাৎ তোমার প্রসাদে আমাদেরও সেনাবর্গ জয়লাভ করুক–জয়ং লভতাং–এটাই বক্তব্য) ১।
আমাদের যে শত্রু কবচী (অর্থাৎ কবচবান বা তনুত্রাণে আবৃত শরীর), যে শত্রু অকবচ (অর্থাৎ কবচরহিত বা অনাবৃতশরীর), যে শত্রু রথ ইত্যাদ যানে বর্তমান, সেই সকল শত্রু জ্য-পাশে (অর্থাৎ আপন আপন ধনুর্গত মৌর্বী বা ছিলাতে), কবচ-পাশে (অর্থাৎ বর্ম বন্ধনের রজ্জতে) ও রথ। ইত্যাদি সম্পর্কিত রঞ্জুতে) বদ্ধ হয়ে সেই স্থানেই শায়িত থাকুক। (অর্থাৎ স্ব-রক্ষণার্থে গৃহীত যে ধনু-কবচ ইত্যাদি তারা ধারণ করেছে, সেগুলিই তাদের গতি-প্রতিবন্ধক হোক)। ২
যে শত্রুগণ বর্মযুক্ত (অর্থাৎ শস্ত্রবারক কবচের দ্বারা যুক্ত), যারা অবর্মিত (অর্থাৎ বর্মরহিত) এবং যে শত্রুগণ বর্ম ব্যতিরিক্ত অন্য কোন শস্ত্র-নিবারকে (প্রকরণে) আচ্ছাদিত, হে অবুদি! তারা সকলে তোমার দ্বারা হত হয়ে ভূমিতে নিপাতিত হোক এবং কুকুর শৃগাল ইত্যাদি শ্বাপদগণ তাদের ভক্ষণ করুক। (অন্তু) ॥৩৷
যে শত্রুগণ রথারূঢ় (রথিনঃ), যারা রথরহিত (অরথাঃ), যারা পদাতিক (অর্থাৎ অশ্ব ইত্যাদি যানরহিত) এবং যারা অশ্বারূঢ়, হে অবুদি! তোমার প্রসাদে আমাদের দ্বারা হত সেই সকল শত্রুকে গৃধ্র, শ্যেন ইত্যাদি পক্ষীগণ নখ ও তুণ্ডের দ্বারা বিদারণ করুক। (অর্থাৎ বিদারণ পূর্বক ভক্ষণ করুক–এটাই বক্তব্য) ॥৪॥
শক্রসম্বন্ধিনী সেনাগণ (আমিত্রী বা শাবী) আমাদের সেনাগণের হননসাধন আয়ুধের সঙ্গমনে (সমরে) বিবিধ শস্ত্রপাতের দ্বারা আহত হয়ে অসংখ্যাত শবযুক্ত হয়ে কুৎসিত বা বিলোল আকৃতিসম্পন্ন হোক ॥৫॥
শোভনপতন (সুপর্ণৈঃ) শরে মর্মবিদ্ধ হয়ে (অর্থাৎ স্তনমূল ইত্যাদি স্থানে বিধ্যমান হয়ে) মর্মান্তিক দুঃখে পূরিত ও চূর্ণীকৃত অঙ্গে আতাঁরব উৎসারণকারী ভূমিতে শায়িত শত্রুকে কুকুরশৃগাল ইত্যাদি শ্বাপদগণ ভক্ষণ করুক। যে শত্রু আমাদের সম্বন্ধিনী এই পৃষদাজ্যের দ্বারা হৃয়মান আহুতিকে প্রতিনিবৃত্তিগতি করার নিমিত্ত যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করে তারাও এইভাবে ভক্ষিত হোক ॥৬।
যে পৃষদাজ্যাতি বর্জ্য উৎপাদনের নিমিত্ত দেবগণ অনুষ্ঠিত করেছেন, যে আহুতিতে অমোঘ বীর্যতা বিদ্যমান (অর্থাৎ যাতে অপ্রহিত শক্তি বিদ্যমান), যে আহুতির দ্বারা উৎপাদিত ত্রিসন্ধিসম্পন্ন (অর্তাৎ সন্ধিত্রয়োপেত) বজ্রের দ্বারা ইন্দ্র বৃত্রাসুরকে নিহত করেছিলেন, সেই বজ্রের দ্বারা আমাদের শত্রুগণ হনন প্রাপ্ত হোক (হিনস্তু) ॥৭॥
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটিও পূর্ববর্তী সূক্তের ন্যায় শত্ৰজয় কর্মে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। (১১কা, ৫অ. ৬সূ.)।
[এই অংশটি স্বর্গীয় দুর্গাদাস মহাশয় কর্তৃক সম্পাদিত ও মুদ্রিত অথর্ববেদ-সংহিতার চতুর্থ খণ্ডে যোড়শ কাণ্ডের পরে একাদশ কাণ্ড, দ্বিতীয় অনুবাক, দ্বিতীয় পর্যায় রূপে উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও সেইস্থলে এইটির ব্যাখ্যা ইত্যাদি দেওয়া হয়নি; কারণ, এই ৭২টি মন্ত্রই একাধারে ১৮টি মন্ত্রে সংগঠিত হয়ে ১১শ কাণ্ডের ২য় অনুবাকের দ্বিতীয় সূক্তে যথাযথ ব্যাখ্যাত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে স্বর্গীয় দুর্গাদাসের বক্তব্য উল্লেখনীয়–অথর্ববেদের অনুক্রমণিকা অংশে একাদশ কাণ্ড দ্বিসপ্ততি অবসানে বিভক্ত হইয়াছে। বক্ষ্যমান দ্বিতীয় পর্যায় তাহারই অন্তর্ভুক্ত বলিয়া উক্ত হয়। এস্থলে অনুক্রমণিকার নির্দেশ মত সেই দ্বিতীয় পর্যায় প্রদত্ত হইল।– ]
অধ্যায়: এগারো
সূক্ত -৩১ -একতম সূক্ত : ওদনঃ
ততশ্চৈনমন্যেন শীষ্ণা প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রাশন। ১। জ্যেষ্ঠতস্তে প্রজা মরিষ্যতীত্যেনমাহ। ২ তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ৷৷ ৩৷৷ বৃহস্পতিনা শীষ্ণা ॥ ৪৷৷ তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগমম্ ॥ ৫৷৷ এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ॥ ৬৷ সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সঃ ভবতি য এবং বেদ ॥৭॥ ততশ্চৈনমন্যাভ্যাং শ্রোত্ৰাভ্যাং প্ৰাশীৰ্যাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন ৮বধিররা ভবিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চম। ৯। দ্যাবাপৃথিবীভ্যাং শ্রোত্রাভ্যাম্ ॥ ১০। তাভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ১১। ততশ্চৈনমন্যাভ্যামক্ষীভ্যাং প্ৰাশীৰ্যাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্নন। ১২। অন্ধো ভবিষ্যসীত্যেনমাহ। তৎ বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ৷ ১৩৷৷ সূর্যাচন্দ্রমসাভ্যামক্ষীভ্যাম্ ॥ ১৪৷ তাভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বর্তনূঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ১৫৷৷ ততশ্চৈনমন্যেন মুখেন প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রাশন। ১৬ মুখতস্তে প্রজা মরিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ৷ ১৭৷৷ ব্ৰহ্মণ মুখেন।১৮তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ১৯৷৷ ততশ্চৈনমন্যয়া জিয়া প্রাশীয়া চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন৷ ২০৷ জিহ্বা তে মরিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ৷৷ ২১। অগ্নেজিহ্বায়া ॥ ২২। তয়ৈনং প্রাশিষং তয়ৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গঃ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ২৩৷৷ ততশ্চৈনমন্যৈদন্তৈঃ শীর্যেশ্চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন। ২৪ দন্তাস্তে শস্যন্তীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চম ॥ ২৫৷৷ ঋতুভির্দন্তৈঃ ॥ ২৬। তৈরেনং প্রাশিষং তৈরেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতনূঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ২৭ ৷৷ ততশ্চৈনমন্যৈঃ প্রাণাপানৈঃ শীর্যেশ্চৈতং পূর্ব ঋষয় প্রশ্ন ২৮৷ প্রাণাপানাস্তা হাস্যন্তীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ ॥ ২৯। সপ্তর্ষিভিঃ প্রাণাপানৈঃ ॥ ৩০। তৈরেনং প্রাশিষং তৈরেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ ৷৷ ৩১ ॥ ততশ্চৈনমন্যেন ব্যচসা প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন৷ ৩২ রাজযক্ষ্মাস্ত্রা হনিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ। ৩৩। অন্তরিক্ষেণ ব্যচসা ॥ ৩৪৷৷ তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপুরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ৩৫ততশ্চৈনমন্যেন পৃষ্ঠেন শীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্নন ৷৷ ৩৬৷৷ বিদ্যুৎ স্বা হনিষ্যতীত্যনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ। ৩৭। দিবা পৃষ্ঠেন। তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগমম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৩৮ ততশ্চৈনমন্যেনোরসা প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রাশন। ৩৯। কৃষ্যা ন রাৎস্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ ৷৷ ৪০ পৃথিব্যোরসা। তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতনূঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৪১। ততশ্চৈনমন্যেনোদরেণ প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন ৷৷ ৪২৷৷ উদরদারস্তুা হনিষ্যতীত্যেনমাহ। তৎ বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চম ৷ ৪৩৷৷ সত্যেনোদরেণ। তেনৈনং প্রাশিষং তেনৈনমজীগমম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৪৪৷৷ ততশ্চৈনমন্যেন বস্তিনা প্রাশীর্ষেন চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন ৷৷ ৪৫৷৷ অন্দু মরিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাবাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চম ৷৷ ৪৬। সমুদ্রেণ বস্তিনা ॥ ৪৭ ॥ তেনৈনং প্রাশিষং তৈনৈনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ ৷৷ ৪৮৷৷ ততশ্চৈনমন্যাভ্যামূরুভ্যাং প্ৰাশীৰ্যাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রাশন। ৪৯৷ ঊরু তে মরিষ্যত ইত্যেনমাহ। তৎ বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ ৷৷ ৫০৷৷ মিত্রাবরুণয়োরূরুভ্যাম্ ॥ ৫১। তাভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ৫২। ততশ্চৈনমন্যাভ্যামষ্ঠীব্যাং প্ৰাশীৰ্যাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন ৷৷ ৫৩৷৷ শ্রামো ভবিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চম্ ॥ ৫৪৷ ত্বষ্টুরষ্ঠীবদ্যা। তাভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ৫৫৷৷ ততশ্চৈনমন্যাভ্যাং পাদাভ্যাং প্ৰাশীৰ্যাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন৷ ৫৬৷৷ বহুচারী ভবিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চম্ ॥ ৫৭। অশ্বিনোঃ পাদাভ্যাম। তাভ্যামেনং প্রাশিষং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বতঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ ॥ ৫৮৷ ততশ্চৈনমন্যাভ্যাং প্রপদাভ্যাং প্ৰাশীৰ্যাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন ৷৷ ৫৯৷ সর্পস্থা হনিষ্যতীত্যেনমাহ। তং বা অহং নাৰ্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চ ৷৷ ৬০৷ সবিতুঃ প্রপদাভ্যাম। তাভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম। এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বর্তনূঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ৬১ ততশ্চৈনমন্যাভ্যাং হস্তাভ্যাং প্ৰাশীৰ্যাভ্যাং চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন৷ ৬২। ব্রাহ্মণং হনিষ্যসীত্যেনমাহ। তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চম ৷ ৬৩ ৷৷ ঋতস্য হস্তাভ্যাম্ ৷৷ ৬৪ ৷৷ তাভ্যামেনং প্রাশিষং তাভ্যামেনমজীগম, এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বর্তঃ। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বর্তনুঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ৬৫৷৷ ততশ্চৈনমন্যয়া প্রতিষ্ঠয়া প্রাশীয়া চৈতং পূর্ব ঋষয়ঃ প্রশ্ন৷ ৬৬৷৷ অপ্রতিষ্ঠানোহনায়তনো মরিষ্যসীত্যেনমাহ৷ ৬৭৷ তং বা অহং নার্বাঞ্চং ন পরাঞ্চং ন প্রত্যঞ্চম ৷ ৬৮। সত্যে প্রতিষ্ঠায়। ৬৯। তয়ৈনং প্রাশিষং তয়ৈনমজীগম ৷৷ ৭০৷৷ এষ বা ওদনঃ সর্বাঙ্গঃ সর্বপরুঃ সর্বঃ ॥ ৭১। সর্বাঙ্গ এব সর্বপরুঃ সর্বতঃ সং ভবতি য এবং বেদ। ৭২
বঙ্গানুবাদ –ব্রহ্ম, তপ, সত্য, যশ, দীক্ষা, বৃহৎ জল–পৃথিবীর ধারক। জীবন-পালনকর্ত্তী পৃথিবী আমাদের স্থান প্রদান করুন। সর্বসাধন-সামর্থ-সম্পন্না পৃথিবী আমাদের কামনা পূর্ণ করুন। পৃথিবী আমাদের গো ও অন্নযুক্ত করুন। জগৎ সংসারের আশ্রয়ভূত অগ্নির ধারয়িত্ৰী পৃথিবী আমাদের কৃষিজাত নানাবিধ দ্রব্যাদি প্রদান করুন। দেবরক্ষিত পৃথিবী আমাদের রাষ্ট্রবল, মধুর-ধন এবং তেজঃ, ও ঐশ্বর্য প্রদান করুন।…যে পৃথিবীকে অশ্বিনীকুমারদ্বয় নির্মাণ করেছিলেন, যাঁর উপর বিষ্ণুদেব বিক্রমণ করেছিলেন, ইন্দ্র যাঁকে আপন অধিকারভুক্ত করে শত্রুহীন করেছিলেন, সেই পৃথিবী, মাতা কর্তৃক পুত্রকে দুগ্ধ পান করানোর মতো, আমাদের সার রূপ জল প্রদান করুন। পৃথিবীর স্থাবর জঙ্গম সব কিছুই আমার সুখপ্রদ হোক। আমি বহু-রত্ন-শালিনী ইন্দ্রগুপ্তা পৃথিবীতে ক্ষয়রহিত ও পরাজয়রহিত হয়ে যেন সদা প্রতিষ্ঠিত থাকি। আমাদের শত্রুগণ পৃথিবী কর্তৃক বিনষ্ট হোক সূর্য-রশ্মিসমূহ আমাদের নিমিত্ত প্রজা (সন্তান) ও মৃদুল বানীকে দোহন করুক। পৃথিবীর সকল দিক আমাকে বিচরণ-শক্তি প্রদান করুক, পৃথিবী সকল দিক হতে আমাকে রক্ষা করুন।…যে পৃথিবী ইন্দ্রকে বরণ করেছিলেন, যিনি বীর্যবানের অধীনে অবস্থান করেন, যার উপর বেদমন্ত্রের ধ্বনি (বা গান) উৎসারিত হয়, যেস্থানে সোমপান হয়, যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়, দেবপূজন হয়, সেই পৃথিবী আমাদের অভীষ্ট ধন প্রদান করুন।…হে পৃথিবী! গ্রাম, জঙ্গল, সভা, যুদ্ধ-মন্ত্রণা, যুদ্ধ ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রেই আমরা তোমার বন্দনা করছি। …হে পৃথিবীমাতা! আমরা তোমাকে হবিঃ প্রদান করছি! আমরা যেন রোগরহিত হই, দীর্ঘায়ু হই, মঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত থাকি।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! মনুষ্য ও পশুগণের যক্ষ্মা দূর করো, পাপ ও দুর্ভাবনা দূর করো। আমরা শত্রুগণকে, নির্ঋতিকে ও মৃত্যুকে দূর করছি।…আমি ক্ৰব্যাদ (মাংসভক্ষক) অগ্নিকে দূর করছি। জাবেদা অগ্নি এই স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেবতাগণের নিমিত্ত হবিঃ বহন করুন। গার্হপত্য অগ্নি পিতৃগণের ভাগ গ্রহণপূর্বক তাদের লোকে স্থিত থোক। হে ক্ৰব্যাদ অগ্নি! তুমি পিতৃযান মার্গের দ্বারা প্রবৃদ্ধ হও এবং সেই স্থানে থাকো। পুনরায় এই স্থানে প্রত্যাবৃত্ত হয়ো না। পবিত্রতাপ্রদ অগ্নিদেব শুদ্ধ হওয়ার নিমিত্ত যখন শবভক্ষক অগ্নিকে (শবাগ্নিকে) প্রদীপ্ত করছেন, তখন তিনি আপন পাপকে ত্যাগ করছেন;…ক্রব্যাদ অগ্নি পশুগণে ব্যাপ্ত আছেন, তাঁকে দূর করছি। হে পুরুষগণ! শিরোরোগকে তাকিয়ায় (বালিশে) স্থাপন করো এবং নড়ঘাসের (অর্থাৎ নলতৃণের) দ্বারা দূর করো। হে মৃত্যু! তুমি দেবমার্গ হতে নিম্নমার্গে গমন করো। আমাদের মন্ত্র (বা বাণী) মৃত্যু দূর-করণশালিনী শক্তির সাথে যুক্ত থোক। হে মনুষ্য! তুমি আপন মৃত্যুকে প্রস্তরাঘাতে দমন করো–মন্ত্র-কবচ ধারণ করো, শত বৎসরের আয়ু লাভ করে। ত্বষ্টা তোমাকে দীর্ঘ জীবন প্রদান করুন। এই পাষাণ নদী উত্তীর্ণ হও, পাপসমূহকে এই নদীতেই নিক্ষেপ করো। হে অগ্নি! শুদ্ধ হওয়ার কালে দেবস্তুবন করো। আমরা শত হেমন্ত পর্যন্ত যেন সন্তন-সম্পন্ন থাকি। মৃত্যুর লক্ষ্যকে ভ্রমিতকরণশালী ঋষি পূর্ণায়ু হয়ে থাকেন; তুমিও মৃত্যুকে বিতাড়িত করো। এই স্ত্রীলোকগণ সুন্দর পতির সাথে যুক্ত থাকুক, যেন বিধবা না হয়, অলঙ্কারসমূহ ধারণ করুক, সন্তানোৎপত্তির নিমিত্ত মনুষ্যযোনিতেই থাকুক। আমি এদের দীর্ঘায়ু করে দিচ্ছি। হে পিতৃগণ! হৃদয়ে ব্যাপ্ত অগ্নি আমাদের এবং আমরা যেন তাকে দ্বেষ না করি। যে জন ক্ৰব্যাদ অগ্নিকে ত্যাগ না করে, সে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে থাকে, যজ্ঞের অধিকারী থাকে না, তার তেজঃ ও ঐশ্বর্য নষ্ট হয়ে যায়। হে অগ্নিদেব! তুমি ক্রবাদকে (ক্রবাদ অগ্নিকে) আমাদের নিকট হতে দূর করে দাও। অগ্নিদেব সকল মনুষ্যের মধ্যে স্থিত আছেন, তিনি জীবিতগণের আয়ুকে বৃদ্ধি করুন। এই অগ্নির স্তুতি করো! তিনি তোমাদের পাপমুক্ত করুন, কল্যাণপ্রদ হয়ে পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির সাথে যুক্ত করুন। হে অগ্নিদেব! তোমার আরাধনা সরল, তুমি আমাদের নীরোগ রেখে থাকো। ধনেচ্ছার দ্বারা যে জন ক্ৰব্যাদ অগ্নির সেবা করে, সে বিফল হয়, অধোগতি প্রাপ্ত হয়। এই অগ্নির ভাগ হলো কৃষ্ণ ছাগ বা মেষ, সীসা ও চন্দ্রমা এবং হব্য হলো পিষ্ট (পেষাই করা) কলাই (ডাল)। বিদ্বান ব্যক্তি গার্হপত্য অগ্নি তথা সূর্যকে অর্পিত হয়ে দেবযান মার্গে প্রবিষ্ট হয়, আদি সেই যজমানকে চিরায়ুষ্মন্ করে দিচ্ছি।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –ক্ৰব্যাৎ নাম যোগিস্তদ্বিষয়ং সূক্তং এতৎ। এয়োগ্নয়ো ভবতি। আমাক্ৰবাদ্ধব্যবাহ ইতি। আমং অপক্কং অত্তীতি আমাদ লৌকিকোগ্নিঃ যেনদং মনুষ্যাঃ পাশন্তি ইতি শতপথে (১/২/১/৪)। ক্ৰব্যং শবদাহে মাংসং অত্তীতি ক্ৰব্যাৎ ঘোরস্বরূপশ্চিতাগ্নিঃ যেন পুরুষং দহন্তি স ক্ৰব্যাৎ ইতি তত্রৈব।…ইতাদি। (১২কা, ২অ. ১সূ.)। টীকা –ক্ৰব্যাদ নামক অগ্নি বিষয়ে এই সূক্ত। আমাদ, ক্ৰব্যাদ ও হব্যবাহ–এই তিন প্রকার অগ্নির মধ্যে আমাদ বা লৌকিক অগ্নি অপক্ক সামগ্রীকে পন করে, অর্থাৎ মনুষ্যগণ এই অগ্নিতে পাকক্রিয়া (রন্ধন) করে, ক্ৰব্যাদ অগ্নি হলো মাংসভক্ষক অগ্নি বা ঘোরস্বরূপ চিতাগ্নি বা শবদাহকারী অগ্নি। হ্যবাহ বা হব্যবা অগ্নি হলো যাগযোগ্য অগ্নি। আমাদ ও ক্ৰব্যাদ অগ্নি যাগযোগ্য নয়। এই সূক্তে সেই ক্ৰব্যাদ অগ্নির কথা বলা হয়েছে। ক্ৰব্যাদ অগ্নি শবমাংস ভক্ষণের সাথে সাথে ঘোরত্ব হেতু যক্ষ্মা ইত্যাদি বহু রোগ ও বহুরকমের মৃত্যু বহন করে। সুতরাং ক্ৰব্যাদ অগ্নিকৃত নানা আপদ (বিপদ), রোগ ও মৃত্যু পরিহারের নিমিত্ত এই সূক্তে প্রার্থনা জানানো হয়েছে। অবশ্য ক্ৰবাদ অগ্নি যেহেতু ঘোরস্বরূপ, সেইজন্য শত্রুমারণ কর্মে তার নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। আবার, গার্হপত্য অগ্নির নিকট ক্ৰব্যাদ অগ্নির বিনাশের নিমিত্ত প্রার্থনা করা হয়েছে। এগুলি কৌশিক সূত্রের ৯ম অধ্যায় ৪র্থ কণ্ডিকায় বিস্তৃত ভাবে উল্লিখিত হয়েছে। (১২কা, ২অ.. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে পুংস্তুবান্ (পুরুষ)! তুমি পশুচর্মে আরোহণ (অর্থাৎ উপবেশন) করো। পূর্বে যে দম্পতিগণ এমন করেছিলেন, তাদের মতো তোমাদেরও সুফল প্রাপ্তি ঘটুক। ওদনের প্রভাবের দ্বারা তোমরা উভয়ে একসাথে অবস্থান করো। তোমরা যজ্ঞের দ্বারা পবিত্ৰীকৃত হয়েছে। হে দম্পতি! তোমরা বীর্য রূপ জলের সন্তান। জলই ওদন পাক করে থাকে। সেই জলের অমৃতাংশকে তোমরা সেবন করো। তোমরা মধুময় লোকে সন্তানসম্পন্ন হয়ে বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত অবস্থান করো। তোমাদের দ্বারা অগ্নিতে সমর্পিত ওদনকে রক্ষা করো। তোমরা দক্ষিণাবর্ত হয়ে পাপকে পরিক্রমণ, করো। এই দিকের অধিপতি যমরাজ তোমাদের কল্যাণ করুন। পশ্চিম দিকের অধিপতি সোমের অভিমুখে ওদন রক্ষা করলে তিনি শ্রেষ্ঠ ফল দান করবেন। প্রজাযুক্ত উত্তর দিক আমাদের শ্রেষ্ঠতা প্রদান করুক। এই অটল বিরাট পৃথিবী আমাদের সুখ প্রদান করুন, পুত্রগণের মঙ্গল করুন, পঙ্কিত ওদনকে রক্ষা করুন। হে ওদন! তুমি চর্মের উপর আগত হয়ে কল্যাণপ্রদ হও। তেত্রিশ দেবতার দ্বারা সেবনীয় এই ওদনের প্রভাবে এই দম্পতিকে যেন পাপ স্পর্শ করতে না পারে। এই ওদন আমাদের সর্বলোকের উপর বিজয়প্রাপ্ত করাবে।…হে ওদন! মুসলাঘাতে তোমার যে পীড়া হচ্ছে, তার দ্বারা তুমি তুষ হতে পৃথক হয়ে গিয়েছো,আমি এক্ষণে তোমাকে অগ্নিতে অর্পণ করছি। অগ্নি পাঁচনকর্মের দ্বারা তোমার রক্ষক হোন। ইন্দ্র, বরুণ, মরুৎ-বর্গ, সোম ইত্যাদি তোমাকে সর্ব দিক হতে রক্ষা করুন। হে জল! দম্পতির দ্বারা আনীত ওদনকে শোধন পূর্বক পঙ্কন করো।…হে ওদন! তুমি ধারক, এই হেতু তুমি ভূমির ধারক স্থানে প্রতিষ্ঠিত হও।…হে দম্পতি! মহিমাবান্ গমনশীল এই ওদন তোমাদের স্বর্গে স্থান প্রদান করবে। হে জায়া! তুমি এই ওদনকে পরুন (রন্ধন) করছে। তুমি যদি সংসার হতে পতির পূর্বেই গমন করো, তবে পরে স্বর্গে দুজনে মিলিত হবে। তোমরা দুজনে একই লোকে অবস্থান করো এবং এই ওদনও তোমাদের সাথে থাকুক।…অঙ্গিরাগণ ও আদিত্যবর্গের নিমিত্ত আমি এই ঘৃতযুক্ত ওদন প্রস্তুত করছি। ব্রাহ্মণের পবিত্র হস্তের স্পর্শ একে স্বর্গে উপনীত করুক।…আমরা আমাদের পত্নী, কুমারাবস্থা সম্পন্ন পুত্র ইত্যাদি সমভিব্যাহারে এই উত্তম যজ্ঞানুকে দান ইত্যাদি কর্মের নিমিত্ত পাক করছি।…হে যজমান! আমরা তোমার নিমিত্ত প্রিয় অপেক্ষাও প্রিয়তর কর্মানুষ্ঠান করছি। তোমার দ্বেষী পুরুষ নরকরূপ অন্ধকার লাভ করুক।…হে ওদন! তুমি ঘৃতযুক্ত হয়ে এই যজমানকে স্বর্গে প্রাপ্ত হও।…জরা অবস্থায় আমাদের মরণের পরও, এই সুপক্ক ওদনের সাথে স্বর্গে উপনীত হয়ে আনন্দ ভোগ করবো।..
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –পুমা পুংসোধি তিষ্ঠ চর্ম ইতি স্বগোদন বিষয়কং সূক্তং…ইত্যাদি। (১২কা, ৩অ. ১সূ.)। টীকা— উপযুক্ত স্বগৌদনবিষয়ক সূক্তে যম-নামক দ্রষ্টা-ঋষি কখনও ওদন আবার কখনও দম্পতিকে সম্বোধনের মাধ্যমে পৰু স্বগৌদনের প্রতাপ তথা তার প্রাপনীয় ফলসমূহের চিন্তা করেছেন। স্বর্গলোকে এই ওদনের দ্বারা পুত্র ইত্যাদির সাথে সমাগম হয়। স্বর্গোদনের দ্বারা ক্ৰব্যাদ, রাক্ষস, ও পিশাচগণের পরিহার বিষয়ে বলা হয়েছে। …স্বগোদন ষষ্টিবর্ষান্তর ফলপ্রদ হয়।…সাম্প্রদায়িক সোমযাগের বিধি অনুসার এই সূক্তের বিনিয়োগ কৌশিকসূত্রে (কৌ.৮/১-৪) দ্রষ্টব্য। এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে–অয়ং যঃ সৌত্রিকো বিনিয়োগস্তেন কতিপয়-মন্ত্রাণাং তাৎপর্যং সমীচীনং আবির্ভবতীত্যসংশয়ং।–ইত্যাদি। (১২কা. ৩অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –যে পুরুষ, ঋষি ইত্যাদি সমৃদ্ধ ব্রাহ্মণবর্গের প্রার্থনার পর দেববৃন্দের নিমিত্ত গোদান করেন না, তিনি আপন সন্তানগণের অমঙ্গল সাধন পূর্বক পশুরহিত হয়ে যান। যিনি ব্রাহ্মণগণের প্রার্থনার পর তাদের গোদান করেন, তিনি সন্তান ইত্যাদির দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকেন। বশা (গবী) দেবতা ও ব্রাহ্মণগণের নিমিত্তই প্রকট হয়ে থাকে; তাকে ব্রাহ্মণের হস্তে দান করার অর্থই হলো নিজেকে রক্ষা করা। তা না করলে অদাতার সকল সামগ্রী তথা সন্তান বিনাশ প্রাপ্ত হয়। এবং তার বিপত্তি আসে; সে কুরূপ সম্পন্ন হয়ে যায়; রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তার নানারকম অনর্থ ঘটতে থাকে।…..যিনি এই বশাকে পরমপ্রিয় জ্ঞান পূর্বক তার সেবা করেন, তাঁর নিমিত্ত এই বশা ব্রহ্মজ্যা (ব্রহ্মজ্যেয়ং) হয়ে যায়। এই গো দান হতে নিবৃত্ত মানব ব্রহ্মকোপে নিপতিত হয়। গচ্ছিতের মতোই বশা ব্রাহ্মণের সম্পদ (বা সামগ্রী) হয়ে থাকে। তিন বৎসর পর্যন্ত বশাকে গচ্ছিত সামগ্রী রূপে পালন করার পর এটিকে দানের নিমিত্ত কোন ব্রাহ্মণের অনুসন্ধান করা কর্তব্য। এই বশাকে অ-বশা বলে অভিহিত করলে কিংবা যাচক ব্রাহ্মণের হস্তে দান না করলে সেই অদানী ব্যক্তি ভবদেবের ও শর্বদেবের বিধ্বংসী বাণসমূহের লক্ষ্যে পতিত হয় কিংবা সেই বশার ক্রোধে পতিত হয়।….পিতৃগণের উদ্দেশে স্বধা করণের নিমিত্ত, দেবতাগণের উদ্দেশে যজ্ঞ করণের, অভিলাষে এবং বশা দানের দ্বারা ক্ষত্রিয় তার মাতৃক্রোধ প্রাপ্ত হন না। রাজন্যের মাতা এর বশা-ই।…গৃহীত ঘৃত যেমন সুবা নামক যজ্ঞপাত্রের দ্বারা পৃথকীকৃত হয়, ব্রাহ্মণকে বশ অদানকর্তা অগ্নির নিমিত্ত পৃথক হয়ে থাকে…যমের রাজ্যে এই বশা-দাতার সকল কামনা এই বশা-ই পূর্ণ করে থাকে।…ক্রোধে আপূরিত বশা গোপতিকে ভক্ষণ পূর্বক তাকে মৃত্যুর বন্ধনে নিপতিত করে থাকে।… হে বশা! যে অব্রাহ্মণ ঐশ্বর্য যাচনা করে, সে যেন বশাকে না প্রাশন করে। বশার তিনটি ভেদ আছে–বিলিপ্তি, সূতশা ও বশা। এদের যদি ব্রাহ্মণগণকে দান না করা হয়, তবে প্রজাপতি ক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন।…যে ব্যক্তি গো-স্বামীকে বশা-দানে নিষেধ করে, সেই মূখের প্রতি ইন্দ্রের কোপভাজন হয়, এবং রুদ্রের আয়ুধের লক্ষ্য হয়।…হুত বা অহুত (দেবতার উদ্দেশে মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত বা অপ্রক্ষিপ্ত) এবং অপক্ক (কাঁচা) বশাকে (অর্থাৎ বশামাংস) পাককারী জন দেবতা ও ব্রাহ্মণগণের অপমানকারী হয়ে থাকে। সেই জন এই লোকে অশেষ দুর্গতি লাভ করে।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –বশাবিষয়কং সূক্তং এতৎ। বশা গৌর্যা গর্ভং ন গৃহ্নাতীতি দারিলঃ (কৌ.৫/৮)। বশা বন্ধ্যা গৌরিতি সায়নঃ (ঋ, ২৭৫)। বশা স্বভাববন্ধ্যা গৌরিতি স এব (ঋ. ১৯১১৪)। যস্য গৃহে বশা জাতা তস্য গৃহে অজ্ঞাতগদা সতী অর্থাৎ অজ্ঞাতবশাত্বরূপবৈকল্যা সতী আ বৰ্ষত্ৰয়াৎ রক্ষিতব্য। তদনন্তরং অসংগ্রাহ্যাঁ ভবতি।…ইতাদি। (১২কা. ৪অ. ১সূ.)৷৷ টীকা –এই বশা-বিষয়ক সূক্তটিতে বশার পরিচয় সম্পর্কে কৌশিক কূত্রের উল্লেখ করা যায়–বশা হলো এমন গবী, যে গর্ভধারণ করে না, অর্থাৎ বন্ধ্যা গাভী। সায়ণাচার্যও ঋগ্বেদের ভাষ্যে বশাকে স্বভাববন্ধ্যা গবী বলে উল্লেখ করেছেন। যার গৃহে বশা জাত হয়, সে প্রথমে সেই গবীটি বশা (অর্থাৎ বন্ধ্যা) হবে কিনা জানতে পারে না। সেই জন্য তিন বৎসর পর্যন্ত সেটিকে রক্ষণের পর যখন জানা যায় যে, সেটি বন্ধ্যা, তখন সেটিকে দেবগণের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিতব্য যজ্ঞের নিমিত্ত ঋষি-প্রবরযুক্ত যাচক ব্রাহ্মণকে দান করণীয়। বশা দান করলে প্রজা ইত্যাদির বৃদ্ধি, ঐশ্বর্য ও আয়ুপ্রাপ্তি, সকল বিপদ হতে মুক্তিলাভ, ইহকালে ও পরকালে সুখপ্রাপ্তি ইত্যাদি ঘটে থাকে। যজ্ঞার্থে যাচিত বশা ব্রাহ্মণকে দান না করলে দেবতার কোপানলে পতিত হতে হয়, ইহলোকে অশেষ দুর্গতি ভোগ করতে হয়। বশ হবিরূপে অর্পণীয়। কৌশিক সূত্রে (৫/৮/৯ ও ৮/৭) এই সম্পর্কে আরও বহুরকম তথ্য দেওয়া হয়েছে ॥(১২কা. ৪অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –তপের দ্বারা রচিত সত্য, সম্পৎ ও যশে পরিপূর্ণ এই গবীকে শ্রমের দ্বারা ব্রাহ্মণগণ লাভ করেছেন। এই গবীর দিকে ক্ষত্রিয়ের দৃষ্টিপাত মৃত্যুসম। এর দ্বারা ব্ৰহ্মপদ প্রাপ্তি হয়। এই হেন ব্রহ্মগবীর অপহরক ক্ষত্রিয়ে বীর্য, লক্ষ্মী ও ঐশ্বর্য বিলুপ্ত হয়ে যায়।
সূক্তসার –এই ব্রহ্মগবী বিকরাল হয়ে থাকে এবং হিংসাত্মক পাপের বিষের সাথে যুক্ত হয়ে কৃত্যারূপ হয়ে যায়। ব্রাহ্মণের নিকট হতে অপহৃত এই ধেনু শত প্রকারের অস্ত্রস্বরূপ হয়ে অপহর্তাকে মৃত্যু-বন্ধনে আবদ্ধ করে। অগ্নিসম উগ্রা ও বজ্রসম ধ্বনিময়ী এই ধেনু মহাদেবের অস্ত্রস্বরূপ। এই ধেনু আঘাতপ্রাপ্ত হলে আঘাতকারীর পক্ষে দুর্গতিপ্রদা ও মৃত্যুদায়ক ব্যাধিকারিকা হয়ে থাকে। এই ব্রহ্মগবী ব্রাহ্মণের হানি-করণশালী জনের অনুগমক পূর্বক তার প্রাণ-বিনাশ করে থাকে।
সূক্তসার –ব্রাহ্মণের ধেনু অপহৃত হলে সেই গবী অপহরণকারীর পুত্র-পৌত্রাদির বিভাজন করে থাকে। হরণের সময়ে এই ধেনু অস্ত্ররূপ এবং হরণের পরে অপহর্তাকে ক্ষীণ-করণশালী হয়ে থাকে এবং তাকে মৃত্যু-বন্ধনে আবদ্ধ করে। পাপরূপা হয়ে এই ধেনু কঠোরতা উৎপন্নকারিণী হয়ে থাকে এবং অপহর্তার পক্ষে বিষের ন্যায় জীবনকে সংকটে নিপতিত করে। প্রাশনকৃত (ভক্ষিত) হয়ে এই ধেনু দারিদ্র্য ও প্রাশনের পর প্রাশনকারীর পক্ষে পাপদেবী নির্ঋতিতে রূপান্তরিত হয়। এই ব্রহ্মগবী ব্রাহ্মণের হানিকারক জনকে ইহলোক ও পরলোক উভয় হতেই হীন (বা বর্জিত) করে থাকে।
বঙ্গানুবাদ –এই ধেনুকে পীড়িত করা কৃত্যাস্বরূপ নিজেরই মারণাস্ত্র। এই ব্রহ্মগবী ক্ৰব্যাদ অগ্নি হয়ে অপহরণকারীকে ভক্ষণ করে থাকে। অপহরণকারীর পিতা, পিতৃবান্ধব, মাতা, মাতৃবান্ধব সকলকেই ছেদন করে থাকে। ক্ষত্রিয়ের দ্বারা ব্রহ্মগবী প্রত্যপিতা না হলে তার সকল বিবাহিত বন্ধু-বান্ধবকে বিনষ্ট করে থাকে, তাদের সন্তানহীন করে থাকে।
বঙ্গানুবাদ –অপহর্তা ক্ষত্রিয়কে এই গবী ভস্ম করে থাকে। তার চিতার পার্শ্বে তার স্ত্রীবর্গ উপনীত হয়ে বক্ষ-তাড়ন করতে করতে অশ্রুপাত করতে থাকে। তার গৃহে শৃগাল বিচরণ করে। হে আঙ্গিরস! তুমি ব্রহ্মগবীর অপহরণকর্তাকে বিনষ্ট করো। হে গবী! তুমি কৃত্যারূপা তথা মৃত্যুরূপা হয়ে ধাবিত হও এবং অপহরণকর্তার তেজঃ, কাম ইত্যাদিকে হরণ করো। তুমি ব্রাহ্মণের হানিকর্তার আয়ুকে অপহরণ করে পরলোকে প্রেরণ করো। ব্রাহ্মণের শাপপ্রভাবে তুমি অপহর্তার পদ-শৃঙ্খল (পায়ের বেড়ি) হয়ে যাও। এই দেবহিংসক অপরাধীর সকল কর্মকে বিকল করার নিমিত্ত তার শিরচ্ছেদন করো। সেই পাপ-চিত্তশালীকে অগ্নি ভস্ম করে ফেলুন।
টীকা –উপযুক্ত সাতটি সূক্ত ব্রহ্মগবীবিষয়ক। ব্রাহ্মণের গবী হলো ব্রহ্মগবী। ক্ষত্রিয়ের পক্ষে এই গবী গ্রহণ বা অপহরণ বা হত্যা, বা বন্ধন বা ভক্ষন করলে কি ঘটে, তা সূক্তের মধ্যেই উল্লেখিত। সম্প্রদায় অনুসারে এই সূক্তের বিনিয়োগ ৫ম কাণ্ডের ১৮শ ও ১৯শ সূক্তে (অর্থাৎ চতুর্থ অনুবাকের ৩য় ও ৪র্থ সূক্তে) উল্লিখিত আছে ৷ (১২কা, ৫অ. ১-৭সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –অন্তরিক্ষে লুক্কায়িত হে রোহিত (সূর্য)! তুমি উদিত হও। প্রিয় ও সত্যবাণীযুক্ত হও; এই রাষ্ট্রে আগমন পূর্বক সংসার-প্রকাশক ভরণ কর্তা রূপে তুমি রাষ্ট্রকে পুষ্ট করো; জলস্থায়ী বলপ্রদ অন্ন, দ্বিপদ-চতুষ্পদ জীব ও জলের ঔষধি সমূহকে পুষ্ট করো। হে মরুৎ-বর্গ! সুস্বাদু পদার্থে তুষ্ট হওনশীল তোমরা বর্ষক হওঁ, শত্রু-নাশক হও। রাষ্ট্রের উপরে রোহিত (সূর্য) উদিত হয়েছেন, তোমরা যুদ্ধের নিমিত্ত ভীত হয়ো না। রোহিত (সূর্য) কর্তৃক প্রকটিত ও দৃঢ়ীকৃত এই দ্যাবাপৃথিবীকে প্রজাপতি বলযুক্ত করেছেন; রোহিতই অন্তরিক্ষ ইত্যাদি লোকসমূহকে নির্মাণ করেছেন, দেবতাগণ সেগুলিকে পুষ্ট করেছেন। তিনিই লতা ইত্যাদি উৎপন্ন করেছেন, সকল শরীর পুষ্ট করেছেন, তিনিও প্রাণীগণের ভরণ-পোষণ করছেন, অতএব সেই হেন সূর্যের রাজ্যে সচেতন থাকো। ঘূতের দ্বারা আহূত, ইষ্টপূরক, সোম-পুষ্ট জাতবেদা অগ্নি আমাকে যেন ত্যাগ না করেন, আমাকে সন্তান-গো ইত্যাদি ধনের দ্বারা পুষ্ট করুন। আমি যজ্ঞ-প্রকট-কর্তা, যজ্ঞমুখ সূর্যের উদ্দেশে আহূতি প্রদান করছি, তিনি আমাকে সংগ্রামে উচ্চস্থান প্রদান করুন। হে অগ্নি। বৃহতী-পংক্তি ইত্যাদি ছন্দ এবং বষট্কার তথা সূর্যতেজ তোমাতে প্রবিষ্ট হয়ে গিয়েছে। সূর্যতেজ দ্যাবাপৃথিবী ও স্বর্গকে স্পর্শ করছে। হে বাচস্পতি! হে প্রজাপতি অগ্নি! পৃথিবী আমাদের পক্ষে সুখদায়িনী হোক। আমাদের গোষ্ঠে গাভীসমূহ এবং যোনিমধ্যে সন্তান উৎপন্ন হোক।…হে রাজা! অগ্নি, মিত্রাবরুণ তোমাকে পুষ্ট করুন, শত্রু তোমার বশীভূত হোক।….অগ্নিদেব দ্যাবাপৃথিবীকে স্থির রাখেন, তাঁর বলের দ্বারা দেবতাগণ সৃষ্টি রচনা করেন।…অগ্নিদেব ঘৃতের দ্বারা প্রবৃদ্ধ হয়ে শত্রুগণের সংহারক হোন।….আমরা ক্ৰব্যাদ অগ্নির দ্বারা শত্রুগণকে দগ্ধ করছি।…হে ইন্দ্র! হে অগ্নি! আমাদের শত্রুগণকে প্রহার করো, ভস্ম করো। হে অগ্নি, বৃহস্পতি, সূর্য, মিত্রাবরুণ! তোমরা আমাদের শত্রুসমূহকে বিনষ্ট করো, তারা ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হোক। বিরাটের বৎস রোহিত (সূর্য) অন্তরিক্ষের উপর আরোহণ করছেন ( বা বৃদ্ধি পাচ্ছেন)। হে রাজা! তুমি পৃথিবীর উপর অধিষ্ঠিত হও; অমৃতের উপর অধিষ্ঠিত থেকে প্রজাপালন করো। হে রোহিত (সূর্য)! এই মন্ত্রপূত যজ্ঞ তোমাকে বহন করছে।…বসুজিত, গোজিত্, সঘনজিত্ নামক রোহিতে (সূর্যে) আকাশ ও পৃথিবী আশ্রিত রয়েছে।…সূর্যাত্মক স্বর্গের কামনাশালী জন মন্ত্ৰাহুত অগ্নিকে মন্ত্রের দ্বারা প্রবৃদ্ধ করে থাকেন। এবং অগ্নিপূজন করেন। …পৃথিবীকে বেদী, আকাশকে দক্ষিণা, দিন (সূর্য প্রকাশ)-কে অগ্নি এবং বর্ষাজলকে ঘৃতরূপে স্থির করে রোহিত (সূর্য) সৃষ্টি-যজ্ঞ করেছিলেন। স্তুতির দ্বারা সমুদ্র হয়ে অগ্নি পর্বতকে উন্নত করেছিলেন। রোহিত (সূর্য) পৃথিবীকে বলেন-ভবিষ্যতে যা কিছু হবে, তা তোমাতেই প্রাদুর্ভূত হোক। যে জন সূর্যের দিকে মুখ-করে মূত্রত্যাগ করে, গাভীকে (আপন) পদের দ্বারা স্পর্শ করে, দুই অগ্নির মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে গমন করে, আমি তার মূলচ্ছেদ করছি। হে– সূর্য! যে জন আমাদের ও তোমার মধ্যে বাধক হবে, সে পাপ দুঃস্বপ্ন ও দুষ্কর্মে স্থাপিত হোক। হে ইন্দ্র! যে যজ্ঞবিধির দ্বারা সোম প্রযুক্ত হয়ে থাকে, আমরা যেন সেই পদ্ধতি হতে পৃথক্ না হই। আমরা দেবতাগণে সুবিস্তীর্ণ যজ্ঞকে বৃদ্ধি-করণশীল হবো; আমাদের দেশে যেন শক্ত না থাকে।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি রোহিত নামক কোনও দেবতাত্মক সূক্ত। রোহিত অর্থে উদিত সূর্য জানা উচিত। রোহিতের সাহচর্যে মরুৎ, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণকে আহ্বান ও তাঁদের বর্ণনার প্রয়োজন হলো রাজার রাষ্ট্রের ভরণ-এ কথা সূক্তের মধ্যে ইতস্ততঃ দেখা যায়। কোন কোন মন্ত্রে রোহিত পদের নির্বচনে রুহে রুরোহ রুহো রুরোহ ইত্যাদি পদের প্রয়োগে এটাই বোধগম্য হয় যে, দ্যাবাপৃথিবী হতে যা রুরোহেতি অর্থাৎ উদ্ভূত বা জাত–তাই রোহিত। যাজ্ঞিকগণ বক্ষ্যমাণ প্রকারে এই মন্ত্রগুলির বিনিয়োগ করে থাকেন। অর্থকামনার জন্য আদিত্যের উপাসনায় অর্থোত্থাপন কামনায় স্নানপূর্বক উপাসনায়, অর্থসিদ্ধি কামনায় অক্ষত বস্ত্র পরিধান পূর্বক উপাসনায়, বিদ্রাবণ ইত্যাদি বিষয়ে শান্তি কামনায় বস্ত্র অভিমন্ত্রণে, ইত্যাদিতে এই সূক্তের বিনিয়োগ কৌশিক সূত্রে (৫৫) উল্লিখিত আছে। এ ছাড়া যো রোহিতো (২৫ তম মন্ত্র) ও রোহিতো দিবমারুইন্মহতঃ (২৬তম মন্ত্র) সলিলগণে পঠিত। এই বিনিয়োগ কৌশিক সূত্র (৩১,৩৭) অনুসারে কর্তব্য। আরও সলিলগণে পঠিত হওয়ায় প্রথম কাণ্ডের পঞ্চম সূক্তে (আপো হি ষ্ঠা ইত্যাদিতে) এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। সমিদ্ধো অগ্নি সমিধানো থেকে উদ্যংজ্বং দেব সূর্য-এই পাঁচটির (২৮তম থেকে ৩২তম মন্ত্রের) বিনিয়োগ এই কাণ্ডের ৩য় অনুবাকের প্রথম সূক্তে (য ইমে দ্যাবাপৃথিবী ইত্যাদিতে) দ্রষ্টব্য। (১৩কা, ১অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –মহৎকর্মা, সেচনসমর্থ, সাক্ষীরূপ আদিত্যের (সূর্যের) নির্মল রশ্মিসমূহ উন্নত হচ্ছে। আমরা এই রশ্মিসমূহ উন্নত হচ্ছে। আমরা এই রশ্মিসমূহের দ্বারা দিকসমূহকে প্রকাশ দানশীল, লোকরক্ষক সূর্যের স্তুতি করছি। হে সূর্য! হবিসমূহের দ্বারা তুমি পূর্ব-পশ্চিম দিকসমূহে গমন করে থাকো, দিবা ও রাত্রকে বিভিন্ন রূপ দান করছে, তোমার যশ সর্বতঃ প্রশংসনীয়। তেজস্বী তুমি, তোমার রশ্মিসমূহের দ্বারা বাহিত, ভবসিন্ধুর তরণিরূপ তোমাকে ব্রহ্ম সমুদ্র হতে উপরে সূর্যলোকে গমন করছেন। যুদ্ধভূমিতে তোমার প্রবেশ কেউই রোধ করতে পারে না। তোমার অগ্নিসম তেজস্বী স্বর্ণবর্ণের সপ্ত অশ্ব, পূর্ব-পশ্চিমব্যাপী গমনকারী তোমার রথ–সকলের মঙ্গল। হোক।…অদিতিপুত্র সূর্য সর্বলোকে বিখ্যাত।…হে সূর্য! ত্রিতাপ হতে মুক্ত অত্রি তোমাকে মাস সমূহের নিমিত্ত জগৎসংসারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন; তুমি স্বয়ং তপ্ত হয়েও সকলকে প্রকাশ দান করে থাকো।..সূর্য বালকের ন্যায় ক্রীড়াশীল; বালক যেমন মাতা-পিতার নিকট উপনীত হয়, সূর্যও তেমনই পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্রের নিকট উপস্থিত হন। সূর্যের উদয়ে নক্ষত্রসমূহও তস্করের ন্যয় দ্রুত পলায়ন করে।…সর্বদ্রষ্টা সূর্য সকলকে দর্শনের নিমিত্ত প্রকট হন। পাপনাশক সূর্য পুণ্যকর্মাদের প্রতি কৃপাপূর্ণ দৃষ্টিতে দর্শন করে থাকেন। সূর্য হলেন দেবতাগণের স্বামী (পালক)। অনেক মুখশালী, অনেক ভুজশালী অসাধারণ দেবতা সূর্য আপন রশ্মিসমূহের দ্বারা দ্যাবাপৃথিবীকে প্রকাশিত করতে এবং ভরণ-পোষণ করতে থাকেন। অতন্দ্রিতভাবে বিচরণ করে সূর্য যখন বিশ্রাম নেন, তখন তিনি দুই রূপ নির্মাণ করেন। এক রূপের দ্বারা তিনি জগৎসংসারের অন্তরালবর্তী হন, অপর রূপের দ্বারা তিনি জগৎসংসারে প্রকট হয়ে সর্ব লোককে প্রকাশিত করে থাকেন। মহান্ অপেক্ষাও মহান, জ্ঞানবান, পূজ্য সূর্য শোভন মার্গে গমন করতে করতে দ্যাবাপৃথিবী, অন্তরিক্ষ ও জলরাশিকে দীপ্ত করে থাকেন এবং সকলকে পার করে থাকেন। জ্যোতির্মান, অন্নপোকক ও দিশাপ্রকাশক সূর্য দেববৃন্দের ধ্বজারূপ, দর্শনীয়, অন্ধকার-পাপনাশক, দিনকর, সর্বপ্রাণীর আত্মস্বরূপ, দ্যাবাপৃথিবী অন্তরিক্ষ তথা সকল প্রাণীতে ব্যাপ্ত আছেন। আমরা ঊর্ধ্বগামী, অরুণ, শোভিত সূর্যকে সদৈব দর্শন করি। হে সূৰ্য্য! তুমি আমাদের প্রতি কৃপাপরায়ণ হও, আমরা যেন হিংসিত না হই, যেন দীর্ঘজীবী হই। সূর্যের দক্ষিণ ও উত্তর–দুই অয়ন নিয়মিত হয়ে থাকে, সেগুলি দেবগণকে নিজেদের মধ্যে লীন করে থাকে। তিনি প্রজাপতি, তিনি যজ্ঞের মুখ, তিনি রোহিত এবং স্বর্গের পোষক, তিনি স্বর্গাধিপতি, তিনি সকল দিকে ভ্রমণকারী, তিনি সকল জীব এবং পৃথিবীর রক্ষক। আমরা সেই হেন সূর্যকে আহ্বান করছি। যাঁর দৃষ্টি কখনও ক্ষীণ হয় না, যিনি মহিমাবান, যিনি পালনকর্তা, যিনি সকল দিকে ব্যাপ্ত, তিনি আমার প্রার্থনা শ্রবণ করুন। আমি তার আশ্রয় গ্রহণ করছি।
বঙ্গানুবাদ –দ্যাবাপৃথিবীর প্রকটকর্তা, সর্বলোকাচ্ছাদক, সর্বদিশার প্রকাশক, ঋতু অনুসারে বায়ু চালনাকারী, সমুদ্রকে প্রভাবিত-করণশালী সূর্যকে অথবা বিদ্বান ব্রাহ্মণকে যে অপমান করে থাকে, সেই ব্রাহ্মণকে, হে রোহিতদেব! কম্পান্বিত করো, তাকে ক্ষীণ করে বন্ধনে পাতিত করো। যে দেবতার প্রভাবে ঋতু অনুসারে বায়ু চালিত ও সমুদ্র প্রবাহিত হয়, যিনি মনুষ্যের মধ্যে প্রাণপূর্ণ করেন, যার কারণে শ্বাস-প্রশ্বাস চালিত হয়, যিনি বিরাট, যিনি পরমেষ্ঠী, যিনি বৈশ্বানর, যাঁতে প্রজা অগ্নি নিবাস করেন, যিনি প্রাণের তেজের ধারক, যার মধ্যে দিশাসমূহ রশ্মিসকল জল ও যজ্ঞ আশ্রিত, যিনি দ্যাবাপৃথিবীর দ্রষ্টা, যিনি ব্ৰহ্মণস্পতি, যিনি ভূত-ভবিষ্য-বর্তমানের তথা ত্রিলোকের স্বামী–এমনই ক্রোধবন্ত সূর্যকে যে অপমান করে অথবা যে বিদ্বান ব্রাহ্মণের নিকট অপরাধী, তাকে, হে রোহিতদেব! কম্পান্বিত করো, ক্ষীণ করো এবং বন্ধনযুক্ত করো। যাঁর অনুকূলে অবস্থান পূর্বক বৃহৎ এবং রথন্তর সাম আচ্ছাদন করে থাকে, যিনি স্বয়ং সূর্য-বরুণ-অগ্নি-মিত্র তথা সবিতারূপে অন্তরিক্ষস্থ এবং ইন্দ্ররূপে স্বর্গস্থ আছেন, যিনি পাপনাশক, যাঁর অয়ন সর্বদা নিয়মবদ্ধ, যার মধ্যে দেবতাগণ লীন হয়ে থাকেন, যিনি সর্বলোকের প্রকাশক, যিনি জলে নিবাসকারী, যিনি সকলের মূল ও ত্রিতাপ-রহিত, যার দ্রুতগামিনী রশ্মিসমূহ স্বর্গে প্রকাশিত, যার প্রভাবে সূর্যের অশ্ব সূর্যরথকে বহন করে এবং বিজ্ঞ পুরুষ যজ্ঞ ইত্যাদি কর্মসমূহকে প্রাপ্ত হয়, যিনি সপ্তর্ষিগণের দ্বারা নমস্কাৰ্য, যার দ্বারা ঋতু ও কালচক্র প্রবর্তিত হয়, যিনি বুদ্ধির উৎপাদক–সেই হেন ক্রোধবন্ত সূর্যের অপরাধীকে অথবা ব্রাহ্মণের হিংসক ব্রহ্মজ্যকে, হে রোহিতদেব! তুমি ব্যথিত করে ক্ষীণ করো এবং বন্ধনে আবদ্ধ করো। যিনি উৎপন্ন হয়ে ভূমিকে আচ্ছাদিত ও জলকে অন্তরিক্ষস্থ করেন, সেই বলপ্রদাতা, আত্মবল-প্রেরক, দেবতাগণের আরাধ্য, সর্বেশ্বর, একপাদ দ্বিপাদ ইত্যাদিরূপে বিক্রমণশীল ব্ৰহ্মকে আমরা পূজা করি–এমনই ক্রোধবন্ত দেবের নিকট অপরাধী এবং বিদ্বান ব্রাহ্মণের হিংসককে, হে রোহিতদেব! তুমি কম্পিত করো, ক্ষীণ করো এবং আপন দৃঢ় পাশে আবদ্ধ করো…কৃষ্ণা রাত্রির পুত্র সূর্য জাত হয়ে শুভ্রজ্যোতির্ময় রূপে গগনে আরোহণ করছেন এবং তিনিই রোহিত হয়ে রোহনশীল পদার্থের উপর আরোহণ করছেন। (তাকে নমস্কার)।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –রোহিতদেবতাকং এতৎ সূক্তং। রোহিত কশ্চিদ দেব উদ্যৎসূর্যরূপঃ সূর্যস্য রোহিতনামকো যঃ প্রধানেশ্বস্তপেন বা কল্পিতঃ! তস্য পরমার্থং রূপং ত্রয়োদশচতুর্দশপঞ্চদশযোড়শ সপ্তদশাষ্টাদশৈকোনবিংশেযু মন্ত্রে দ্রষ্টব্যং….ইত্যাদি। (১৩কা, ৩অ. ১)। টীকা –এই সূক্তটি রেহিতদেবতাক। রোহিত অর্থে কোন দেবতা উদীয়মান সূর্যরূপে প্রতিভাত অথবা সূর্যের রোহিতনামক যে প্রধান অশ্ব আছে, তার রূপের দ্বারা কল্পিত। তার পরমার্থরূপ ১৩শ থেকে ১৯শতম মন্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন,-তিনি প্রাতঃকালে বরুণ ও সায়ংকালে অগ্নি হন এবং প্রাতঃকালে উদিত হয়ে মিত্র হয়ে যান; আবার সবিতা রূপে অন্তরিক্ষে ও ইন্দ্র রূপে স্বর্গে স্থির থাকেন। ইত্যাদি। সম্প্রদায় অনুসারে যাজ্ঞিকগণ আভিচারিক কর্মসমূহে এই সূক্তের বিনিয়োগ করে থাকেন। এই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা দ্বেষ্যগণের ক্ষতিসম্পাদন ইত্যাদি বহু কর্ম সাধিত হয়। এতদ্ব্যতীত ষষ্টতম(ষমিন ষডুবী পঞ্চ) মন্ত্রের দ্বারা উদবর্জ প্রহরণ, সপ্তম (যো অন্নদো অন্নপতিঃ) মন্ত্রের দ্বারা ঘেষ্যের মনঃপীড়া সংঘটন, ইতাদি সাধিত হয়। (কৌ. ৬৩)–ইত্যাদি ॥ (১৩কা, ৩অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –এই সূর্য আকাশপৃষ্ঠে দীপ্যমান হয়ে আগমন করছেন; তিনি আকাশকে আবৃত করছেন। তিনিই ধাতা ও বিধাতা, তিনিই বায়ু ও উচ্ছিত আকাশ। তিনিই অর্যমা, তিনিই বরুণ, তিনিই রুদ্র, তিনিই মহাদেব, তিনিই যম। উদয় হওয়া মাত্রই তিনি দীপ্ত হতে থাকেন, তাঁর রশ্মিরাশি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হতে থাকে। তার গণ হলেন মরুৎ এবং ইন্দ্র যাঁর কিরণে আবৃত আছেন, সেই সর্বদ্রষ্টা ও সর্বসাক্ষী একতম দেবকে সকলে বরণ করে থাকে।
বঙ্গানুবাদ –যিনি এই একবৃত সূর্যকে জ্ঞাত হন, তিনি কীর্তি, জল, আকাশ, যশ, ব্রহ্মচর্য, অন্ন ও অন্নপাঁচনক্রিয়া লাভ করেন। যিনি এই এককৃতকে জ্ঞাত হন, তিনি দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম বলেন না। এই একবৃতের জ্ঞাতা পুরুষ স্থাবর জঙ্গম সব কিছুই দর্শনশালী হয়ে থাকেন। এই একবৃত সকল দেবতায় ব্যাপ্ত।
বঙ্গানুবাদ— একবৃতের জ্ঞাতা পুরুষ ব্রহ্ম, তপ, কীর্তি, যশ, জল, আকাশ, ব্রহ্মতেজ, অন্ন ও অন্নপাঁচনের শক্তি, ভূত, ভবিষ্য, শ্রদ্ধা, রুচি, স্বর্গ, স্বধা, স্বাহা ইত্যাদি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। সেই চ একবৃতই মৃত্যু, অমৃত, রাক্ষস, রুদ্র, বসুবর্গ, বষট্কার। চন্দ্রমা সহ সকল নক্ষত্র তাঁরই বশীভূত।
বঙ্গানুবাদ –(সেই একবৃত দেবতা) ইন্দ্র ও মৃত্যুর কারণ সমূহ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। তিনি দান-প্রতিবন্ধিকা শক্তি অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। তিনি বৈভববন্ত এবং আরাধ্য। তাকে নমস্কার। জল-পৌরুষ-মহত্তা এবং সম্পন্নতার রূপধারী তাকে আমরা আরাধনা করছি। সেই অন্নবান দেব আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখুন।
বঙ্গানুবাদ –বৃহতী, বিস্তৃতা ও উৎকৃষ্টা ভূমি এবং আকাশ স্বরূপ সেই একবৃত দেবতাকে আমরা আরাধিত করছি। ব্যক্ত ও অভীষ্ট লোকরূপে তোমাকে আমরা আরাধনা করছি। ভবধ্বসু, ইদদ্বসু, সংযদ্বসু ও আয়সুর রূপে আমরা তোমার আরাধনা করছি। তুমি আমাদের অন্ন-যশ-তেজ ও ব্রহ্মতেজের দ্বারা দর্শন করো। আমরা তোমার উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করছি।
টীকা— রোহিত দেবতা-বিষয়ক এই সূক্তমন্ত্রগুলির বিনিয়োগ জপতি স্বৰ্গকাম এই বিনিয়োগমালায় দেওয়া হয়েছে। এই অনুবাকের ছয়টি সূক্তই মূলে যথাক্রমে পর্যায়সূক্ত বলে উল্লেখিত আছে। এই চতুর্থ অনুবাকটি পূর্বোক্ত তৃতীয় অনুবাকের পরিপূরক ॥(১৩কা. ৪অ. ১-৬সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –সত্যের দ্বারা পৃথিবী-আকাশ ও সূর্য-চন্দ্রমা স্থিত, সূর্যের দ্বারা আকাশ স্থিত, সোমের দ্বারা পৃথিবী পূজিত ও সত্যবলযুক্ত হয়ে আছে। সোম নক্ষত্রগণের নিকটে থাকেন। সোম-ঔষধিকে চূর্ণ করে পানকারী জন নিজেকে সোমপায়ী বলে উপলব্ধি করে, কিন্তু এই সোম ভাগই সোম নয়; যাকে জ্ঞানীজন সোম বলেন, তা আরও কিছু, তাকে চূর্ণ করে পান করা যায় না।…যখন সূর্যা পতির নিকট চলেন, তখন জ্ঞান উপবহণ, চক্ষু অভ্যঞ্জন ও দ্যাবাপৃথিবী আবরণে পরিণত হয়। ন্যোচনী রৈম্যা সূর্যার সাথে গমন করে। তারা নারাশংসী গাথা সমূহে সজ্জিত হয়ে সূর্যার পরিধান বহন করে চলেছিল। স্তোত্রসমূহ সূর্যার কেশজাল, স্তুতিসমূহ প্রতিধি, অগ্নি পুরোগব ও অশ্বিদ্বয় সূর্যার বর হয়। যখন সে পতির সাথে মিলিত হয়, তখন মন রথরূপ হয়েছিল, শুভ্রতা বৃষভ হয়েছিল এবং দ্যুলোক গৃহরূপ হয়েছিল। ঋক্-সাম দুই বৃষভ, সূর্য-চন্দ্র চক্র, ব্যান অক্ষদণ্ড হয়েছিল এবং মঘা-ফাল্গুনী নক্ষত্রে রথ আকর্ষিত হয়েছিল। অশ্বিদ্বয় তিন চক্রের রথে আগমন করেছিলেন। সূর্যা রথে উপবিষ্টা হয়ে পতির সমীপে চলেন। সবিতা সূর্যাকে বিবাহের যৌতুক দেন। ইন্দ্র আশীর্বাদ করেন–এই কন্যা সৌভাগ্যবতী-সুসন্তানশালিনী হোক। এই মধুরভাষিণী শ্রেষ্ঠ কর্মশালিনী কন্যা সুখী হোক। সে স্বগৃহে গমন পূর্বক পালিকা এবং সর্ববশকত্ৰী হোক। আপন গৃহে গার্হপত্যাগ্নির প্রতি সচেতন থাকুক। তার সন্তানের নিমিত্ত বস্তুনিচয় বৃদ্ধি লাভ করুক।…ব্রহ্মণস্পতি এই পতি-পত্নীর মনকে উজ্জ্বল করুন।…পূষা, মরুৎ-গণ, ধাতা, সবিতা এদের মার্গকে সুগম করুক।…শ্বশুর-দেবর এর প্রতীক্ষায় আছেন।…হে বধূ? তোমার নিমিত্ত জল কল্যাণকারী হোক, আকাশ সুখদায়ী হোক, সুবর্ণ সুখদ হোক। তুমি কল্যাণ লাভ পূর্বক পতি-দেহকে স্পর্শ করো।…হে শতকর্মা ইন্দ্র! আমি সেই হবিকে পবিত্র করে সূর্য-সম দীপ্তিমান অগ্নিকে উপহার দিয়েছি। হে বধূ! সন্তান, ধন, সৌভাগ্য ও প্রসন্নতার কামনাশালিনী তুমি পতির অনুকূল থেকে অমৃতময় সুখ প্রাপ্ত হও। অমৃতবৰ্ষক সমুদ্র, যেমন নদীসমূহের রাজ্যকে প্রাপ্ত হয়, তেমনই তুমি পতিগৃহকে প্রাপ্ত হয়ে সম্রাজ্ঞীর সমান হও। তুমি শ্বশুর, দেবর, ননদ ও শ্বশ্র–সকলের মধ্যে সম্রাজ্ঞী হয়ে থাকো। হে আয়ুষ্মতী! স্ত্রীগণ কর্তৃক সূত্র-বুনন পূর্বক নির্মিত এই শতায়ু দানশীল বস্ত্র পরিধান করো। যজ্ঞরূপা কন্যাকে যখন পুরুষ (পতি) গ্রহণ পূর্বক গমন করে, তখন (কন্যার) পিতা শোক করতে থাকেন, কন্যাপক্ষীয় সকলে তার নিমিত্ত রোদন করে। এই নিমিত্ত, (বরের কথন)–হে বধূ! তুমি মাতৃপক্ষীয় এবং বরপক্ষীয় সকলকে আলিঙ্গন করো। আমি এই পাষাণ তোমার উপবেশনের জন্য রাখছি; হে : শোভনরূপশালিনী ও সকলকে প্রসন্নতা-দানশালিনী! তুমি এর উপর উপবিষ্টা হও। হে বধূ! যে প্রকারে অগ্নি এই পৃথিবীর দক্ষিণ হস্ত ধারণ করেছিলেন, সেই প্রকারে আমি তোমার পাণিগ্রহণ করছি। তুমি দুঃখী হয়ো না। আমার সাথে ধন-সন্তানসহ নিবাস করো।…তোমাকে ভগ, অৰ্মা, সবিতা ও লক্ষ্মী গৃহস্থ ধর্মের নিমিত্ত আমাকে প্রদান করেছেন।..তুমি আমার ধর্ম-পত্নী এবং আমি তোমার ধর্মপতি। বৃহস্পতি তোমাকে আমার নিমিত্ত দান করেছেন; অতএব তুমি সন্তানবতী ও শতায়ু হয়ে আমার পোষক থাকো। হে শুভে! বৃহস্পতির আজ্ঞাক্রমে ত্বষ্টাদেব এই কল্যাণকারী বস্ত্র নির্মাণ করেছেন। এই বস্ত্রের দ্বারা সবিতা ও ভগ দেবতা তোমাকে সন্তান-ইত্যাদি সম্পন্ন করুন। অশ্বিদ্বয় ইন্দ্রাগ্নি, মিত্রাবরুণ, দ্যাবাপৃথিবী, বৃহস্পতি, বায়ু, মরুৎ-বর্গ, ব্রহ্মা ও সোম দেবতা এই স্ত্রীকে সন্তানে সমৃদ্ধ করুন।…(ঋত্বিকের কথন)–হে অশ্বিদ্বয়! যেমন বৃহস্পতি সূর্যার কেশবিন্যাস করে সজ্জিত করেছিলেন, তেমনই আমরাও পতির নিমিত্ত এই স্ত্রীকে সজ্জিত করছি। আমি এর মনরূপ হৃদয়কে জ্ঞাত আছি। এর রূপকে দর্শন করে একে নিজের দ্বারা আবদ্ধ করছি। আমি চৌর্যকর্ম করছি না। স্বয়ং এর কেশরাশি গ্রথিত করে বরুণ-পাশ হতে মুক্ত করছি।….হে বৃহস্পতি! হে ইন্দ্র! হে সবিতা! এই বধূকে তার ভ্রাতা, পতি, পশু ইত্যাদির ক্ষয়কারিণী না করে পুত্র, ধন ইত্যাদির সম্পন্নকী করে আমাদের প্রাপ্ত করাও। হে দেবগণ! এই বধূকে বহনশালী রথের যেন কোন হানি ঘটে। আমরা তার পতিশালার দ্বারে দণ্ডায়মান হয়ে এই বধূর আগমন-পথকে কল্যাণময় করে দিচ্ছি। এই পথের সম্মুখভাগে, পশ্চাতে, ভিতরে, বাহিরে, মধ্যভাগে, সর্বদিকে ব্রাহ্মণগণ বিরাজিত থাকুন। হে বধূ! তুমি দেবগণের নিবাসশালিনী, রোগ-রহিত, স্বাস্থ্যপ্রদ পতিগৃহকে প্রাপ্ত হও এবং এই স্থানে মঙ্গলময়ী হয়ে প্রসন্ন থাকো।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! প্রথমে যৌতুকের সাথে তোমার নিমিত্ত সূর্যাকে আনয়ন করেছিলাম, তুমি আমাদের সন্তানবতী পত্নী প্রদান করো। অগ্নি আয়ু ও তেজের সাথে আমাদের পত্নী প্রদান করেছেন। এর পতিও দীর্ঘজীবী হোক।… হে পত্নী! তুমি প্রথমে সোমের, পুনরায় গন্ধর্বের এবং পুনরায় অগ্নির পত্নী হয়েছে। অগ্নির দ্বারা তুমি আমাকে প্রদত্তা হয়েছে। অশ্বিদ্বয়ের হৃদয়ে যা কিছু অভীষ্ট আছে, তা সবই আমরা পতি-পত্নী প্রাপ্ত হয়েছি।…হে বধূ! ঔষধি, নদী, ক্ষেত্র, বনানী তোমার ও তোমার পতিকে রক্ষা করুক, তোমাকে সন্তানশালিনী করে তুলুক। আমরা এমন সুখময় ধনদ পথে চলবো, যেখানে বীরগণের হানি ঘটে না। গন্ধর্ব ও অপ্সরাবর্গ এই পথকে সুখদ করুন এবং যৌতুকে প্রাপ্ত ধনকে যেন নষ্ট না করেন।…এই দুর্গম পথকেও সুগমতার দ্বারা উত্তীর্ণ করুক এবং আমাদের শত্রু দুর্গতিগ্রস্ত হোক। সবিতাদেব যৌতুকের সামগ্রীকে সুখদায়ক করুন। এই কল্যাণী স্ত্রী ধাতার দ্বারা নির্মিত পতিগৃহকে লাভ করেছে। এই বধূকে অশ্বিদ্বয়, অর্যমা, ভগ ও প্রজাপতি সন্তানের দ্বারা প্রবৃদ্ধ করুন।..হে পুরুষ (পতি)! তুমি এই উর্বরা নারীতে বীজ বপন করো। ঋষভের সমান তোমার বীর্যকে ধারণ পূর্বক এই যোনি সন্তান উৎপন্ন করুক। হে সরস্বতী! তুমি বিরাট; তুমি প্রতিষ্ঠিত হও। হে সিনীবালী! তুমি ভগদেবতার অনুকূলা হয়ে সন্তানোৎপত্তি করো। হে বধূ! তুমি স্নিগ্ধ দৃষ্টি রক্ষা করে পতিকে অক্ষীণ করো। তুমি বীর পুত্র উৎপন্ন করে সকলকে সুখী করো। তুমি পতি ও দেবরের অনিকারিকা, পশুবর্গের হিতসাধিকা, প্রজাবতী, শোভন কান্তিশালিনী ও সুখী হয়ে অগ্নির পূজন করো। হে নির্ঋতি! তুমি অন্যত্র গমন করো।…হে স্ত্রী! তুমি এই রোহিত মৃগের চর্মের উপরে আগ্নি দেবতার সমীপে উপবেশন করো এবং দেবতাগণকে সুশোভিত করো। তুমি পতি-শ্বশুর-শ্বকে সুখী করে গৃহপ্রবেশ করো।…এই মনভাবন সুন্দর পর্যঙ্কের উপর সূর্যা আরোহণ করেছিলেন, তুমিও প্রসন্নতাপূর্বক এই পালঙ্কের উপর আরোহন করো, পতির নিমিত্ত সন্তানোৎপত্তি করো, সমান মনোভাবাপন্ন হয়ে অবস্থান করো, নিত্য উষাকালে জাগরিতা হও….হে বিশ্বাবসু! তুমি হবির্ধানের স্থানে ও অপ্সরাগণের হর্ষিত হওয়ার স্থানে গমন করো।…গন্ধর্বের ক্রোধময় নেত্রকে নমস্কার।…হে পতি-পত্নী। তোমরা দুজন পিতা মাতা হওয়ার উদ্দেশে ঋতুকালে মিলিত হও। মানবোচিত বিধিতে আরোহণ করো এবং সন্তানোৎপত্তি করো। হে পূষা! যাতে বীজবপন হয়, তেমন করো..হে পতি! তুমি জায়াকে স্পর্শ করো। প্রসন্নতার সাথে তোমরা দুজনে প্রজা-উৎপত্তির কর্ম করো। সবিতা তোমাদের আয়ু-বৃদ্ধি করুন, অর্যমা দিবা ও রাত্রির মিলনের সমান তোমাদের মিলিত করুন, প্রজাপতি প্রজা-উৎপত্তি করুন।…(বর-বধূর প্রার্থনা)–আমরা দুজন হাস্য-প্রসন্নতা ও সুখবোধ প্রাপ্ত হয়ে পুত্র ইত্যাদির দ্বারা সম্পন্ন হবে এবং বহু উষা উত্তীর্ণ করতে থাকবো। আমরা অণ্ড হতে মুক্ত পক্ষীর ন্যায় সকল পাপ হতে মুক্ত হবো। ভস্মরণশালিনী কৃত্যাসমূহ, বরুণপাশ এবং অসমৃদ্ধিসমূহ স্থবির হয়ে যাক। বনস্পতি দেবতার কৃপায় আমাদের সুখপ্রদ বস্ত্রে সজ্জিত দেহ দীপ্যমান হয়ে থাকুক।…(ঋত্বিকের বক্তব্য)-পিতৃগৃহ হতে পতিগৃহে গমনকারিণী এই কন্যা অনেক কামনা নিয়ে গমন করছে।… লাজ-সমূহকে আহুতি দিয়ে এই বধূ পতির শতায়ুষ্য কামনা করছে। ইন্দ্রের কৃপায় এই পতি-পত্নীর প্রীতি চক্রবাকমিথুনের সমান হোক।…বিবাহকালে যৌতুক-গ্রহণ জনিত যে দোষ ঘটেছে, তা আমরা কম্বলে স্থাপিত করছি। কম্বলে পাপরাশি স্থিত করে এই যজ্ঞীয় পুরুষ শুদ্ধ হয়ে গিয়েছে, দেবগণ একে পূর্ণায়ু করুন। এই কৃত্রিম রূপে নির্মিত শত শত দন্তশালী কন্থা, এর শীর্ষস্থান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে এর মস্তকের এবং অঙ্গে অঙ্গে পুঞ্জীভূত মলরাশিকে দূর করুক। এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হতে সংহারক ও দোষরাশি দূরীভূত করছি। এই দোষ-সমূহ আমাকে, অন্তরিক্ষকে, আকাশকে, পৃথিবীকে, দেবগণকে, পিতৃগণকে এবং যমকে যেন না স্পর্শ করে। হে জায়া! পৃথিবীর দুগ্ধসমতুল্য সারতত্বের দ্বারা এবং ঔষধি সমূহের সারতত্বের দ্বারা আমি তোমাকে সংযুক্ত করছি। তুমি প্রজা ও ধনে সমৃদ্ধ হয়ে ধনপ্রদায়িনী হও।…(বরের উক্তি)–হে জায়া! তুমি ঋক্–আমি সাম, তুমি পৃথিবী–আমি আকাশ, আমি বিষ্ণু–তুমি লক্ষ্মী। আমরা দুজনে একসাথে অবস্থান পূর্বক সন্তানোৎপত্তি করবো। আমরা মঙ্গলময় দানে দাতা পুত্রকে লাভ করবো। আমরা বিপুল অন্নপ্রাপ্তির নিমিত্ত সংযুক্ত থেকে সকল প্রাণীর দ্বারা অহিংসতি থাকবো।…হে সুবুদ্ধি! জাগ্রত হওয়ার পর শত বর্ষের আয়ু প্রাপ্ত করণের নিমিত্ত জাগ্রত হও। সবিতাদেব তোমাকে দীর্ঘ জীবন প্রদান করুন। তুমি গৃহপত্নীর যোগ্যা রূপে গৃহে গমন করো।
বঙ্গানুবাদ –স্থিত হওয়ামাত্রই ব্রাত্য প্রজাপতিকে প্রেরণা দিয়েছিলেন। প্রজাপতি আত্মাকে দর্শন করেছিলেন এবং সকলেই উৎপন্ন করেছিলেন। প্রজাপতিই জ্যেষ্ঠ, মহৎ, লোম, ব্রহ্মা, তপ ও সত্য হয়েছিলেন, অর্থাৎ তার হতেই এগুলি উৎপন্ন হয়েছিল। সেগুলি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছিল, তারাই মহান্ ও মহাদেব হয়েছিল। তিনিই দেবতাবর্গের স্বামী-ঈশান হয়েছিলেন। তিনি সকল সমূহের স্বামী এক ব্রাত্য হয়েছিলেন। তিনি ধনু উত্তোলিত করেছিলেন, সেটিই ইন্দ্রধনু নামে অভিহিত হয়েছিল। সেই ব্রাত্যের তুন্দদেশ নীলবর্ণের এবং পৃষ্ঠদেশ লোহিতবর্ণের হয়েছিল। শত্রুকে তিনি নীলের দ্বারা বেষ্টন করেন এবং দ্বেষীকে লোহিতের দ্বারা বিদীর্ণ করেন।
বঙ্গানুবাদ –তিনি উত্থিত হয়ে পূর্ব দিকে গমন করেছিলেন। বৃহৎ সাম, রথম্ভর সাম, সূর্য ও সকল দেবতা তার পশ্চাতে গমন করেছিলেন। ব্রাহ্মণগণের নিন্দক যারা, তারা এই দুই সাম, সূর্য ও সকল দেবতা হিংসা করে থাকে, এবং ব্রাহ্মণগণের যিনি সংস্কারকর্তা, তার নিকট সামদ্বয় ইত্যাদি প্রিয় হয়ে যায়, তথা পূর্বদিকে তাঁর ধাম হয়। শ্রদ্ধা পুংশ্চলী, বিজ্ঞান বস্ত্র, দিবা পাপ, রাত্রি কেশ, মিত্র মাগধ, হরিৎ প্রবর্ণ, কল্মলি তাঁর মণি হয়ে থাকে। ভূত-ভবিষ্য ও মন তার রথ তথা মাতরিশ্বা-পবমান তাঁর সারথি হয়। তিনি দক্ষিণ দিকে গমন করলে যজ্ঞাযজ্ঞিয় সাম-যজ্ঞ। যজমান-পশু-বামদেব্য তাকে অনুসরণ করে। ব্রাত্যের নিন্দক যারা, তারা উক্ত সকলের নিকট অপরাধী হয় এবং আদরকর্তা উক্ত সকলের প্রিয় হয়। তখন দক্ষিণ দিকে তাঁর ধাম হয়। অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তার রথ হয়। ব্রাত্য পশ্চিম দিকে গমন করলে বরুণ, জল, বৈরূপ সাম, বৈরাজ সাম, তাঁকে অনুর্বর্তন করে। এরা ব্রাত্যের নিন্দকদের অপরাধী হয় এবং সংস্কারকর্তা এদের প্রিয় হয়। রাত্রি ও দিবস তার রথ হয়। এইভাধে ব্রাত্য উত্তর দিকে গমন করলে সপ্তর্ষি, সোম ইত্যাদি তাকে অনুধাবন করলে, তারা ব্রাত্যের নিন্দকদের প্রতি অপরাধী ও ব্রাত্যের সংস্কারকর্তার প্রিয় হয়। উত্তর দিক তাঁর ধাম হয় এবং শ্রুত-বিশ্রুত তার রথ হয়।–এমন যিনি জ্ঞাত হন, তিনি কীর্তি ও যশ লাভ করে থাকেন।
বঙ্গানুবাদ –তিনি বর্ষব্যাপী ঋজুভাবে দণ্ডায়মান থাকায় দেবগণ জিজ্ঞাসা করলেন–হে ব্রাত্য! তুমি দণ্ডায়মান আছো কেন? ব্রাত্য বললেনআমার নিমিত্ত আসন্দী (ক্ষুদ্র খট্টা) নির্মাণ করো। দেবতাগণ সেই মতো যে আসন্দী নির্মাণ করলেন তার চারিটি পদ (পায়া) হলো গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ও শরৎ। বৃহৎ, রথন্তর, যজ্ঞাজ্ঞিয়. ও বামদেব্য নাম চারিটি সাম তার তিরশ্চ্য (আড়াআড়ি ভাবে স্থাপিত তক্তা) হয়েছিল। ঋক্ সমূহ তন্তু ও যজুঃ সূক্ষ্ম সূত্র হয়েছিল। বেদ হয়েছিল আস্তরণ এবং ব্রহ্ম হয়েছিলেন উপবহন (উপাধান বা বালিশ)। ব্রাত্য সেই আসন্দীতে উপবেশন করলে দেবতাগণ তাঁর পরিকর হয়েছিলেন।
বঙ্গানুবাদ –দেবতাগণ ফাল্গুন ও চৈত্রকে (বসন্ত ঋতুর মাস দুটিকে) পূর্ব দিকের রক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন এবং বৃহৎ ও রথন্তর সামকে অনুষ্ঠাতা করে দিয়েছিলেন। তারা গ্রীষ্ম ঋতুর দুই মাসকে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠকে) দক্ষিণ দিকের রক্ষক এবং যজ্ঞযজ্ঞিয় ও বামদেব্য সামকে অনুষ্ঠাতা রূপে নিয়োগ করেছিলেন। তাঁরা আষাঢ়-শ্রাবণ দুটি মাসকে (বর্ষা ঋতুকে) পশ্চিম দিকের রক্ষকরূপে বহাল করেছিলেন এবং বৈরূপ-রৈরাজ সামদ্বয়কে তার অনুষ্ঠাতা করে দিয়েছিলেন। দেবতাগণ উত্তর দিকের রক্ষক রূপে শরৎ ঋতুর ভাদ্র ও আশ্বিন দুটি মাসকে নিয়োজন করেছিলেন এবং নৌধস ও শ্বেত নামক সামদ্বয়কে তার অনুষ্ঠাতা করে দিয়েছিলেন। তাঁরা ধ্রুব দিকের রক্ষক রূপে হেমন্তের কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসদ্বয়কে প্রবৃত্ত করেছিলেন এবং পৃথিবী ও অগ্নিকে তার অনুষ্ঠাতা করেছিলেন। দেবতাগণ শিশির ঋতুর পৌষ ও মাঘ মাসকে ঊধ্বদিকের রক্ষকরূপে ব্যাপৃত করেছিলেন এবং তাদের অনুষ্ঠাতা করেছিলেন আকাশ ও আদিত্যকে।
বঙ্গানুবাদ –দেবগণ পূর্ব দিকের কোণ হতে বাণ সন্ধান-করণশালী ভবকে (ব্রাত্যকে) সেই দিকের অনুষ্ঠাতা করে দিয়েছিলেন। সেই ব্রাত্যের নিমিত্ত দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর, ধ্রুব, ঊর্ধ্ব এবং সর্ব দিক হতে বাণ প্রক্ষেপকারী (উক্ত দিকসমূহের ক্রমানুসারে ক্রমশঃ) শর্ব, পশুপতি, উগ্রদেব, রুদ্র, মহাদেব ও.ঈশানকে অনুষ্ঠাতা করে দিয়েছিলেন। (অর্থাৎ উক্ত উক্ত দিকে ব্রাত্যের এইরকম A. নামকরণ হয়)।
বঙ্গানুবাদ –সেই ব্রাত্য ধ্রুব দিকে গমন করলে পৃথিবী, অগ্নি, বনস্পতি ও বনস্পতি সমূহের ঔষধি সকল তার অনুগত হয়। তিনি ঊর্ধ্ব দিকে গমন করলে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, সত্য তাকে অনুসরণ করে। তিনি উত্তর দিকে গমন করলে সাম, যজুঃ, ঋকসমূহ ও ব্রহ্ম তার পশ্চাতে গমন করে। তিনি বৃহতী দিকে গমন করলে পুরাণ, ইতিহাস ও মনুষ্যের প্রশংসাত্মক গাথাসমূহ তাকে অনুসরণ করে। তিনি পরম দিকে প্রস্থান করলে আহ্বানীয়, গার্হপত্য ও দক্ষিণাগ্নি তার অনুগামী হয় এবং সেই সঙ্গে যজ্ঞ, যজমান ও পশুগণও পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করে। তিনি অনাদিষ্ট দিকে চলমান হলে ঋতুসমূহ, পদার্থ, লোক, মাস, পক্ষ, দিবস ও রাত্রি তার পশ্চাতে চলে। তিনি অনাবৃত দিকে অগ্রসর হলে তার পশ্চাতে ইড়া, ইন্দ্রাণী, দিতি ও অদিতিও গমন করেছিলেন। তিনি সর্ব দিকের উদ্দেশে গমনের পর বিরাট ইত্যাদি সকল দেবতা তাঁর অনুগামী হয়েছিলেন। তিনি অন্তর্দিশাভিমুখে গমন করলে প্রজাপতি, পরমেষ্ঠী, পিতা ও পিতামহও তার অনুগমন করেছিলেন।–যিনি এই প্রকার জ্ঞাত হন, তিনি উক্ত দেবতাবর্গের কৃপাপাত্র হয়ে থাকেন এবং তাঁকে তারা হিংসিত করেন না।
বঙ্গানুবাদ –সেই ব্রাত্য পৃথিবীর অন্তে গমন করে সমুদ্রের মহিমায় সমুদ্র হয়ে গিয়েছিলেন। প্রজাপতি, পরমেষ্ঠী, পিতা, পিতামহ, জল ও শ্রদ্ধা–এঁরা সকলে বর্ষারূপ হয়ে তাঁর অনুকূল হয়ে গিয়েছিলেন। লোক, যজ্ঞ, অন্ন, অন্নাদ্য ও শ্রদ্ধা আপন সত্তাতে প্রাদুর্ভূত হয়ে তার চারিদিকে। অবস্থিত হয়েছিলেন।–এই সম্পর্কে জ্ঞাত জন জল-শ্রদ্ধা-বর্ষা প্রাপ্ত হন এবং লোক-অন্ন অন্নাদ্য-শ্রদ্ধা-যজ্ঞ লাভ করেন।
টীকা –আমরা এই কাণ্ডের প্রথম অনুবাকের সাতটি সূক্ত (এবং পরবর্তী অনুবাকের সূক্তগুলি) পর্যালোচনা করে যে ব্রাত্যের মহিমা জ্ঞাত হই, তা সাধারণ্যে প্রচলিত ব্রাত্য নামে আখ্যাত পুরুষ নন। সাধারণতঃ উপনয়ন ইত্যাদি সংস্কারবিহীন বা সাবিত্রী-মন্ত্রভ্রষ্ট বা অযোগ্যকালে উপনীত পুরুষকেই ব্রাত্য বলা হয়। সেই দিকের বিচারে প্রচলিত ব্রাত্যজন যজ্ঞ ইত্যাদি বেদবিহিত কর্মের অনধিকারী, এবং ব্যবহার যোগ্য নয়। জনগণের মধ্যে এমনই ধারণার কথা মনে রেখে এখানে যে ব্রাত্যের মহিমা ব্যক্ত হয়েছে তা ঐ প্রচলিত ব্রাত্যের সঙ্গে মেলে না। কারণ, এই ব্রাত্যকে মহাদেব বা শিবরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। শিবের অপরাপর সংজ্ঞাগুলিও এই ব্রাত্যে আরোপিত দেখা যায়। শ্মশানবাসী, সর্বাঙ্গে ভস্মধারী, পশুচর্ম-পরিধেয়ী বা দিগ্বাসা, সর্পনির্মিত কটিবন্ধ ও সপোত্তরীয় ধারণকারী শিবকে প্রচলিত ধারণা অনুসারে ব্রাত্য বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি মহানুভাব ব্রাত্য, দেবপ্রিয়, ব্রাত্য, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় তেজের মূলীভূত ব্রাত্য; তিনি দেবতাগণেরও অধিদেবতা ও দেবাদিদেব। এই হেন সর্বৈশ্বর্যসম্পন্ন ব্রাত্যদেবতাকে অপর সকল দেবতা কেমন অনুসরণ করেন, কেমন পরিচর্যা করেন, ইত্যাদি বিষয়গুলি উপযুক্ত সাতটি সূক্তে এবং পরবর্তী অনুবাকের সূক্তগুলিতে পরিস্ফুটিত হয়েছে। এই অনুবাকের পঞ্চম সূক্তে দেবতারূপে ব্রাত্যের পরিবর্তে রুদ্র নামটি উল্লেখ করে তাঁর শিবত্ব স্থিরীকৃত হয়েছে। ঋগ্বেদেও এই রুদ্র নামটি উল্লেখ করে তার শিবত্ব স্থিরীকৃত হয়েছে। ঋগ্বেদেও এই রুদ্রশব্দের উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং প্রাক্-বৈদিক যুগের অনার্য-উপাসিত শিবকে বৈদিকোত্তর কালে যে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়, বর্তমান ও পরবর্তী অনুবাকের সূক্তগুলিতে তারই পরিচায়ক রূপে চিহ্নিত করা যায়। ঐতিহাসিক দিক থেকে আগমশাস্ত্র, তন্ত্রশাস্ত্র ইত্যাদির উদ্ভব, কিংবা প্রাক-বৈদিক যুগের বিশেষ কোন সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠীকে বেদবিরোধী বলে চিহ্নিত; করণ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করা যায়। কিন্তু এখানে সে সুযোগ নিতান্তই কম। (১৫কা, ১অ. ১-৭সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –রঞ্জন পূর্বক (অর্থাৎ সকলের প্রীতিকারক হয়ে) সেই ব্রাত্যদেব রাজা হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি প্রজাগণের অন্ন ও অন্নাদ্যের অনুকূল হলেন।–এই জ্ঞাতশীল প্রজাবর্গ, অন্ন ও অন্নাদ্যের প্রিয় হয়।
বঙ্গানুবাদ –তিনি (সেই ব্রাত্যদেব) প্রজার অনুকূল ব্যবহার করেছিলেন, সভা-সমিতি-সেনা সুরা তার অনুকূল হয়ে গিয়েছিল।–এমন যিনি জ্ঞাত হন, তিনি সভা ইত্যাদির প্রিয় হন।
তদ যস্যৈবং বিদ্বান্ ব্রাতত্যা রাজ্ঞোহতিথিগৃহানাগচ্ছেৎ ॥১॥ শ্রেয়াংসমেনমাত্মননা মানয়েৎ তথা ক্ষত্রায় না বৃশ্চতে তথা রাষ্ট্রায় না বৃশ্চতে ॥ ২॥ অতত বৈ ব্ৰহ্ম চ ক্ষত্রং চোদ্দতিষ্ঠতাং তে অত্রুতাং কং প্ৰ বিশাবেতি৷ ৩৷৷ অতো বৈ বৃহস্পতিমেব ব্ৰহ্ম প্ৰা বিশত্বিং ক্ষত্রং তথা বা ইতি ॥৪॥ অতো বৈ বৃহস্পতিমেব ব্ৰহ্ম প্রবিশদিন্দ্রং ক্ষত্রম ॥৫॥ ইয়ং বা উ পৃথিবী বৃহম্পতিদৌরেবেন্দ্রঃ ॥ ৬৷৷ অয়ং বা উ অগ্নিব্রহ্মাসাবাদিত্যঃ ক্ষত্রম্ ॥৭॥ ঐনং ব্রহ্ম গচ্ছতি ব্রহ্মবৰ্চসী ভবতি ॥ ৮যঃ পৃথিবীং বৃহস্পতিমগ্লিং ব্ৰহ্ম বেদ ॥৯॥ ঐনমিন্দ্ৰিয়ং গচ্ছতীন্দ্রিয়বান ভবতি ॥ ১০ য আদিত্যং ক্ষত্রং দিবমিং বেদ। ১১। বঙ্গানুবাদ –এই হেন বিজ্ঞ ব্রাত্য যে রাজার অতিথি হন, তিনি যদি তাঁকে (ব্রাত্যদেবকে) সম্মান করেন, তবে সেই রাজার রাষ্ট্র এবং ক্ষাত্রশক্তির বিনাশ হয় না। ব্রাত্যের নির্দেশে ব্রাহ্মবল বৃহস্পতিতে এবং ক্ষাত্রবল ইন্দ্রের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আকাশই ইন্দ্র, পৃথিবীই, বৃহস্পতি; আদিত্য ক্ষাত্রবল, অগ্নি ব্রহ্মবল। যিনি পৃথিবীকে বৃহস্পতি ও অগ্নিকে ব্রহ্ম বলে জ্ঞাত হন, তিনি ব্রাহ্মবল ও ব্রহ্মতেজঃ প্রাপ্ত হন। যিনি আদিত্যকে ক্ষত্র ও দ্যুলোককে ইন্দ্র বলে জ্ঞাত হন, তিনি ইন্দ্রিয় সমুদায়কে (অর্থাৎ অক্ষুণ্ণ ইন্দ্রিয় শক্তিকে) লাভ করেন।
বঙ্গানুবাদ –এই হেন বিজ্ঞ ব্রাত্য যাঁর ঘরে অতিথি হন, তিনি তাঁকে স্বয়ং আসন প্রদান পূর্বক নিবেদন করেন যে, ব্রাত্য তার গৃহেই অবস্থান করুন এবং তাঁর গৃহস্থ জন তাকে তুষ্ট করুন। এমন বলার ফলে সেই বক্তার দেবযান পথ উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং তিনি নিজেই আপন প্রাণের সিঞ্চন করেন। গৃহস্বামী যখন ব্রাত্যকে বলেন যে, তাঁর গৃহে জল আছে, তখন তিনি নিজের নিমিত্তই অশেষ জল প্রাপ্তি থাকেন। যখন তিনি বলেন যে, ব্রাত্যের যা প্রিয়, তা-ই হবে, তখন বক্তা তাঁর নিজের প্রিয় কর্মসমূহেরই পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটিয়ে থাকেন। গৃহস্বামী যখন বলেন যে, তার যেমন– ইচ্ছা তেমনই সব তার বশীভূত হোক, তখন বক্তা নিজেই সকলের বশকর্তা হয়ে যান। গৃহস্বামী যখন ব্রাত্যকে বলেন যে, যেমন তার কামনা তেমনই হোক, তখন বক্তা তার নিজেরই কামনাপূর্তি করে নেন!–এমন যিনি জানেন, তিনি বক্তার ন্যায় উক্ত উক্ত অভীষ্ট ফল লাভ করেন।
বঙ্গানুবাদ –অগ্নিহোত্রের সময় ব্রাত্যের গৃহে অতিথি হয়ে তাঁকে কেউ হোম-করণের জন্য আজ্ঞা প্রার্থনা করলে তিনি যদি তাকে আজ্ঞা প্রদান করেন তবে তিনি আহুতি প্রদান করেন, অন্যথায় করেন না। এইভাবে বিদ্বান ব্রাত্যের আজ্ঞাক্রমে যিনি. আহুতি প্রদান করেন, তাঁর আহুতি দেবতাগণের নিকট উপনীত হয়। আজ্ঞা না হলেও যিনি আহুতি প্রদান করেন, তখন সেই আহুতি তার দেবযান-পিতৃযান মার্গকে অবরুদ্ধ করে দেয় এবং আহুতিও নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ দেবতাগণই সেই আহুতি নষ্ট করে দিয়ে থাকেন।
বঙ্গানুবাদ –এই হেন ব্রাত্য যাঁর গৃহে অতিথি হন, তখন প্রথম রাত্রির ফলস্বরূপ তিনি পৃথিবীর পুণ্যলোক সমূহকে জয় করেন। দ্বিতীয় রাত্রির ফলস্বরূপ অন্তরিক্ষের পুণ্যলোক সমূহকে, তৃতীয় রাত্রির ফলস্বরূপ পুণ্যাত্মবর্গের পুণ্যলোককে, বহুরাত্রির ফলস্বরূপ অসংখ্য পুণ্যলোককে নিজের নিমিত্ত উন্মুক্ত করে থাকেন। যদি অব্রাত্যও ব্রাত্যবেশে আগত হয়, তবে তাকেও বিদুরিত করা উচিত নয়। তাকেও দেবতা-জ্ঞানে স্বাগত জ্ঞাপন করা উচিত।
বঙ্গানুবাদ –যখন সেই ব্রাত্য বায়ুর অনুকূলে পূর্বাভিমুখে গমন করতে থাকেন, তখন তিনি আপন মনকে অন্নাদ (অন্নভোক্তা) করে নিয়েছিলেন। অতঃপর দক্ষিণ দিকে গমন কালে তিনি আপন মনকে অন্নাদ করে স্বয়ং ইন্দ্র রূপে গমনশীল হয়েছিলেন। যখন তিনি পশ্চিম দিকে গমন করলেন তখন তিনি জলকে অন্নাদ করে স্বয়ং বরুণরূপে গমনশীল হলেন। উত্তর দিকে গমন করলে তিনি স্বয়ং সোম রাজা হয়েছিলেন এবং সপ্তর্ষিগণের দ্বারা প্রদত্ত আহুতিকে অন্নাদরূপে গঠিত করে নিয়েছিলেন। ধ্রুব দিকে চলমান হয়ে তিনি বিরাটকে অন্নাদে পরিণত করে স্বয়ং বিষ্ণুরূপে গমন করেছিলেন। পশুগণের অভিমুখে গমন করলে তিনি ঔষধিগুলিকে অন্নাদ করে নিয়ে নিজেকে রুদ্ররূপে গঠিত করেছিলেন। এইভাবে যখন তিনি পিতৃগণের দিকে গমন করেছিলেন তখন স্বধাকে অন্নাদে পরিণত করে নিজে যম হয়ে গমন করেছিলেন, মনুষ্যগণের দিকে গমনকালে স্বাহাকে অন্নাদ ও নিজেকে অগ্নিতে রূপান্তরিত করে নিয়েছিলেন, ঊর্ধ্ব দিকে গমনকালে বষট্কারকে অন্নাদ ও নিজে বৃহস্পতি হয়ে গমন করেছিলেন, দেবতাগণের দিকে গমনকালে যজ্ঞকে অন্নাদ ও নিজেকে ঈশানে পরিণত করে নিয়েছিলেন, প্রজাগণের দিকে যাত্রা করে তিনি প্রাণকে অন্নাদ করে নিজে প্রজাপতি রূপে চলমান হয়েছিলেন এবং যখন তিনি সর্ব অন্তর্দিশাভিমুখে সংক্রমণ করেছিলেন তখন ব্রহ্মকে অন্নাদ করে নিজে প্রজাপতি হয়েছিলেন।–এই সকল বিষয়ে জ্ঞাতশীল জন অন্নদ, বিরাট, ঔষধি, স্বধাকার, স্বাহাকার, বষট্কার, যজ্ঞ ও ব্রহ্মের 2 দ্বারা অন্ন ও জল লাভ করে থাকেন।
বঙ্গানুবাদ –সেই ব্র্যাত্যের সপ্ত প্রাণ, সপ্ত অপান ও সপ্ত ব্যান। প্রথম ঊর্ধ্ব প্রাণ–অগ্নি, দ্বিতীয় প্রৌঢ় প্রাণ-আদিত্য, তৃতীয় অভ্যুদয় প্রাণ–চন্দ্রমা, চতুর্থ বিভুপ্রাণ–পবমান, পঞ্চম যোনিপ্রাণ–জল, ষষ্ঠ প্রিয়প্রাণ–পশু এবং সপ্তম অপরিমিত প্রাণ-প্রজা।
বঙ্গানুবাদ –এই ব্রাত্যের দক্ষিণ চক্ষু–আদিত্য, বাম চক্ষু–চন্দ্রমা, দক্ষিণ শ্রোত্র–অগ্নি, বাম শ্ৰোত্র–পবমান। এঁর নাসিকা হলো দিবস ও রাত্রি, শীর্ষ কপাল হলেন দিতি ও অদিতি এবং শির হলো সম্বৎসর। ইনি দিবা ও রাত্রের প্রতিটি মুহূর্তে সকলের পূজনীয়। এই হেন ব্রাত্যকে নমস্কার।
টীকা — এই অনুবাকের সূক্তগুলির বিনিয়োগ এবং আলোচনা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখনীয়–এই কাণ্ডের সব সূক্তই মূলে যথাক্রমে পর্যায়সূক্ত বলে উল্লেখ আছে ৷(১৫কা, ২অ. ১-১১)। এ
বঙ্গানুবাদ –জলে বৃষভের ন্যায় যে জল আছে, তা অতিসৃষ্ট (ত্যক্ত) হয়েছিল এবং অগ্নি সমুদায়ও অতিসৃষ্ট হয়েছিল। ভঙ্গ করণশালী, নাশক, পলায়নশীল, মনকে দাবিত করণশালী, দাহোৎপাদক, খননের দ্বারা প্রাপ্ত, আত্মা ও দেহকে দূষিত-করণশীল যে জল আছে, তাকে আপন শত্রুদের সাথে সংযুক্ত করে আমি অতিমৰ্জন করছি। আমি তাকে স্পর্শ করবো না। আমি জলের শ্রেষ্ঠ ভাগকে সমুদ্রে প্রেরণ করছি, তার ভীষণ অগ্নিযুক্ত অংশকে ত্যাগ করছি, তার ঐশ্বর্যযুক্ত অংশকে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা সিঞ্চন করছি। জল আমাদের পাপ-স্বপ্নকে দূর করে আপন কল্যাণকরী অংশের দ্বারা আমাদের স্পর্শ করুক, বলসঞ্চার করুক।
টীকা –এই মন্ত্রগুলির দ্বারা কোন কোন কর্মে শান্তিজল বিহিত। তাতে আচমন-প্রোক্ষণ-অবসেচন আসেচন-আপ্লাবন ইত্যাদি করণীয়। কাংস্য পাত্রে করণীয়। এই জল নিক্ষেপণের ফলে তার মধ্যগত ময়লা নির্গত হয়ে যায়। কৌশিক সূত্রে (১/৯) এর বিবরণ আছে।–এটি এই অনুবাকের প্রথম পর্যায়সূক্ত বলে উল্লেখিত ॥ (১৬কা, ১অ. ১সূ.)৷৷
বঙ্গানুবাদ –আমি দূষিত চর্মরোগ হতে মুক্ত থাকবো, আমার বাক্ (বাণী) বলবতী ও মধুমতী থাকুক। ঔষধি সমূহ আমার বাণীকে মধুর করুক। আমি ইন্দ্রিয়পালক মনকে আহ্বান করছি। আমার কর্ণ কল্যাণকারী বাক্যসমূহ শ্রবণ করুক। আমার নেত্র গরুড়ের ন্যায় দর্শন-শক্তি লাভ করুক।
টীকা –কৌশিক সূত্র (৬/৩) অনুসারে এই সূক্তের অভিমর্শনে কোন কোন দোষবিশেষ দূর হয়। এই সূক্তের দ্বারা অভিচার কর্ম, উপনয়নে মাণবকের দীর্ঘায়ু কামনা ইত্যাদি সাধিত হয়। (কো, ৭/৯)। চক্ষু ইত্যাদি ইন্দ্রিয় সমূহের দৃঢ়তা-কামনায় অরণ্যে গমন পূর্বক এই সূক্তের দ্বারা সবৌষধি অভিমন্ত্রিত করে অনুক্রমে প্রলিপ্ত করার বিধি আছ। (কৌ. ৭/৯)। এর ফলে বাক্, মন, চক্ষু, দন্ত, নাসিকা এবং অন্য সকল বিকল ইন্দ্রিয় দৃঢ়তা লাভ করে।–এই সূক্তটির পরিচয় প্রসঙ্গে প্রথমেই উক্ত হয়েছে–মরণং ব্যসনং চৈব বন্ধনং চ বিশেষতঃ।/প্রণিপাতেন্মত্ততা বা দৈবোপহতিরেব চ। পুত্রাদিধননাশশ্চ গৃহে দোষান্ বনপি।–এটি এই অনুবাকের দ্বিতীয় পর্যায়সূক্ত ॥ (১৬কা, ১অ. ২সূ)।.
মূর্ধাহং রয়ীণাং মূর্ধা সমানানাং ভূয়াসম্ ॥১৷ রুজশ্চ মা বেনশ্চ মা হাসিষ্টাং মূর্ধা চ মা বিধৰ্মা চ মা হাসিষ্টাম ॥ ২॥ উর্বশ্চ মা চমসশ্চ মা হাসিষ্টাং ধর্তা চ মা ধরুণশ্চ মা হাসিষ্টাম৷৩৷৷ বিমোক মাপবিশ্চ মা হাসিষ্টামার্টুর্দানুশ্চ মা মারিশ্যা চ মা হাসিষ্টাম ॥৪॥ বৃহস্পতির্ম আত্মা নৃমণা নাম হৃদ্যঃ ॥৫৷৷ অসন্তাপং মে হৃদয়মুবী গন্যূতিঃ সমুদ্ৰো অস্মি বিধর্মণা ॥ ৬৷৷
বঙ্গানুবাদ –আমি ধনরাশি ও আপন সমান ব্যক্তিগণের মধ্যে মস্তকের ন্যায় শ্রেষ্ঠ হবো। রজঃ, যজ্ঞ, মূর্ধা, বিধর্মা, আমাকে যেন ত্যাগ না করে। উর্ব, চমস, ধরুণ ও ধর্তা (যজ্ঞপাত্র) আমাকে যেন ত্যাগ না করে। বিমোক, আদ্রর্দানু ও মাতরিশ্বা আমা হতে যেন পৃথক না হয়। হর্ষদ, অনুগ্রহপ্রদ, মনকে নিযুক্ত করণশীল বৃহস্পতি আমার আত্মা। দুই ক্রোশব্যাপী (বহুবিস্তীর্ণ) ভূমি আমার অক্ষতিকারক হোক; আমার হৃদয় যেন অসন্তপ্ত থাকে এবং যেন সমুদ্রসম গম্ভীর হয়।
টীকা –উপনয়নে মূর্ধাহং নাভিরহং (পরবর্তী) সূক্তদ্বয়ের দ্বারা মাণবকের আয়ু বৃদ্ধির নিমিত্ত আদিত্যের উপাসনা বিহিত আছে। (কৌ. ৭/৯)। এই দুটি সূক্তও যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়সূক্ত। (১৬কা, ১অ. ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –আমি ধনের ও আপন সমান ব্যক্তিগণের মধ্যে নাভি সমান (প্রধান) হবো। অমৃতত্বশালিনী উষা মরণধর্মা মনুষ্যগণের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত হোন। প্রাণ ও অপান যেন আমাকে না ত্যাগ করে। সূর্য দিন হতে, অগ্নি পৃথিবী হতে, বায়ু অন্তরিক্ষ হতে, যম মনুষ্যগণ হতে এবং সরস্বতী পার্থিব পদার্থ সমূহ হতে আমাকে রক্ষা করুন। ঊষাকাল হতে রাত্রি পর্যন্ত আমার মঙ্গল হোক। আমি সর্ব গণ ও জলের উপভোক্তা হয়ে থাকবো। বরুণ আমার প্রাণাপান ও অগ্নি আমার বলকে দৃঢ় করুন।
টীকা –প্রথম অনুবাকের এই চতুর্থ পর্যায়সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ববর্তী সূক্তের সাথে বিনিযুক্ত হয়। (১৬কা, ১অ. ৪সূ.)।
বঙ্গানুবাদ— গ্রাহ্য পিশাচী হতে উৎপন্ন স্বপ্ন যমকে প্রাপ্তিকরণশালী হয়ে থাকে। সে অন্ত-কারক মৃত্যুরূপ। সে (দুঃস্বপ্ন) নির্ঋতির পুত্র ও যমকে প্রাপ্ত করিয়ে থাকে। সে (দুঃস্বপ্ন) ভবতির পুত্র এবং যমের কারণ স্বরূপ। সে নির্ভূতির পুত্র ও যমের কারণ স্বরূপ। সে পরাভূতির পুত্র এবং যমের কারণ স্বরূপ। সে দেব জামিগণের (দেবদুহিতাগণের) পুত্র ও যমের কারণ স্বরূপ। হে স্বপ্নের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা! আমরা তোমাকে জ্ঞাত আছি। তুমি এই দুঃস্বপ্ন হতে আমাদের রক্ষা করো।
টীকা –বিনিয়োগ প্রসঙ্গে প্রথমেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে–দুঃস্বপ্নদর্শনে শান্তাবেতৎ পর্যায়সূক্তং বিনিযুজ্যতে। তদ্যথা।–দুঃস্বপ্ন দর্শন করলে এই সূক্তের দ্বারা মুখ-বিমার্জন, অতিঘোর দুঃস্বপ্ন দর্শন করলে এই সূক্তের দ্বারা মৈশ্রধান্যের পুরোডাশ হোম ইত্যাদি বিনিয়োগ কৌশিক সূত্রে (৫/১০) পাওয়া যায়। এটি এবং এই অনুবাকের অবশিষ্ট চারিটি সূক্তই পর্যায়সূক্ত বলে উল্লিখিত ॥ (১৬কা, ২অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –আমরা ভূমি ও বিজয় লাভ করি, পাপরহিত থাকি, দুঃস্বপ্ন হতে ভয়ভীত আমাদের ভয় দূর হয়ে যাক। মন্ত্রশক্তির দ্বারা আমরা এই ভয়কে আমাদের দ্বেষী, অভিসম্পাতকারী ও শত্রুগণের নিকট প্রেরণ করছি। উষা ও বাণী সমান মতশালিনী হোন। উষার পতি উষস্পতি ও বাণীর পতি পাঁচস্পতি সমমনস্ক হয়ে থাকুন। তারা দূষিত নামশালিনী কুম্ভীকে শত্রুর প্রতি প্রেরণ করুন। আমরা রাত্রের দুঃস্বপ্নে প্রাপ্ত ঘটিতব্য ফলগুলিকে, দিবাভাগে দুঃস্বপ্নজনিত ঘটিতব্য ফলগুলির দ্বারা উসৃষ্ট সঙ্কল্পের বন্ধনগুলিকে এবং শত্রুদের দ্বারা প্রেরিত বন্ধন সমূহকে উন্মোচিত করছি ॥ (১৬কা, ২অ. ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –আমি এই দুঃস্বপ্নকে অভিচার কর্মের দ্বারা, অভূতি-বিভূতি-পরাভূতি-গ্রাহ্যাঁ ও মৃত্যুরূপ অন্ধকারের দ্বারা বিদীর্ণ করছি। আমি একে দেবতাগণের ভয়ঙ্কর আজ্ঞা সমূহের সমক্ষে উপস্থিত করছি। আমাদের প্রতি দ্বেষী জনকে সপ্ত আকাশ, পৃথিবী ও অন্তরিক্ষ হতে দূর করছি। দুঃস্বপ্নের দ্বারা প্রাপ্তব্য ফলকে অমুক গোত্রশালী (যথাগোত্র উল্লেখ্য) ব্যক্তির (যথানাম বিদ্বেষপরায়ণের) প্রতি প্রেরণ করছি। পূর্বরাত্রিতে আমি অমুক-অমুক (কার্যাবলীর উল্লেখ) কর্ম সম্পন্ন করেছি; জাগ্রতাবস্থায়, সুষুপ্তাবস্থায়, দিবা-রাত্রে বা নিত্য প্রতিক্ষণে আমি যে পাপ-দোষ প্রাপ্ত হয়েছি। তা ঐগুলির দ্বারা বিনষ্ট করছি। হে দুঃস্বপ্নের বিনাশক দেবতা! তুমি আমাদের শত্রুনাশ করে দাও।
বঙ্গানুবাদ –শত্রুকে হনন ও জয় করে অনীত পদার্থসমূহ আমার। সকল সত্য, তেজঃ, ব্রহ্ম, স্বর্গ, পশু, প্রজা ও বীর সমুদায় আমার। অমুক গোত্রীয় অমুক নামধারী (শত্রুর গোত্র ও নাম উল্লেখ্য) এবং অমুকের পুত্রকে (শত্রুর পিতার নাম উল্লেখ্য) আমরা অভিচার কর্মের দ্বারা এই লোক হতে বিদূরিত করে দিচ্ছি। সে যেন গ্রাহ্যের পাশ-বন্ধন হতে মুক্ত হতে না পারে; আমি তার তেজঃ, বর্চঃ, প্রাণ ও আয়ুকে নিপাতিত করছি। সে যেন নির্ঋতির পাশ-বন্ধন হতে মুক্ত না হতে পারে; সে যেন অভূতি, নির্ভূতি, পরাভূতি, দেবজামি ও বৃহস্পতি পাশ-বন্ধন হতে মুক্ত হতে না পারে। শত্রুকে বিদারিত করে আনীত পদার্থ আমার। সকল সত্য, তেজঃ, ব্রহ্ম, স্বর্গ, পশু, প্রজা ও বীর সমুদায় আমার। অমুক গোত্রীয় অমুকের পুত্রকে আমরা অভিচার কর্মের দ্বারা, এই লোক হতে পৃথক করে দিচ্ছি। আমি তার তেজঃ, বৰ্চঃ, প্রাণ ও আয়ুকে নিম্নভিমুখে নিপাতিত করছি। সে প্রজাপতি, অঙ্গিরসবৃন্দ, অথর্বাবৃন্দ, আথবণবৃন্দ, বনস্পতি সকল, বাহস্পত্যগণ, ঋতুসমূহ, ঋতু-পদার্থনিচয়, মাস সমুদায়, অর্ধমাসাবলি, দিবা-রাত্রি সমুচয়, ও দিবা-রাত্রির সংযত ভাগগুলির পাশ-বন্ধন হতে মুক্ত হতে না পারে। আমি তার তেজঃ, বৰ্চঃ, প্রাণ ও আয়ুকে বন্ধন পূর্বক নিম্নাভিমুখে নিপাতিত করছি। শত্রুগণকে বিদীর্ণ করে আনীত অর্থাৎ বিজিত পদার্থ আমার। সত্য, তেজঃ, ব্রহ্ম, স্বর্গ, পশু এবং সকল বীর আমার। আমরা অমুক গোত্রীয় অমুকের পুত্রকে অভিচার কর্মের দ্বারা এই লোক হতে দূর করে দিচ্ছি। সে দ্যাবাপৃথিবী, ইন্দ্রাগ্নি, মিত্রাবরুণ, রাজা বরুণ ও মৃত্যুর পাশ বন্ধনগুলি হতে যেন মুক্ত হতে না পারে। আমি তার বর্চঃ, তেজঃ, প্রাণ ও আয়ু–সবগুলিকেই বন্ধন পূর্বক নিম্নভিমুখে নিপাতিত করছি।
বঙ্গানুবাদ –শত্ৰুদলকে বিদীর্ণ করে আনীত তথা বিজিত সকল পদার্থ আমার। আমি শত্রুগণের সেনাবর্গের উপর অধিষ্ঠিত হবে। অগ্নি ও সোম এমনই বলে থাকেন। পূষা আমাকে পুণ্যলোকে প্রতিষ্ঠিত করুন। আমরা সূর্যের জ্যোতি-প্রভাবে উত্তম প্রকারে স্বর্গলোক প্রাপ্ত হবো। আমি ধনী এবং সৎকার প্রাপ্তির যোগ্য হবো। হে দেব! আমাকে ধনের দ্বারা পুষ্ট করো।
টীকা –উপযুক্ত শেষ চারিটি পর্যায়সূক্তে (অর্থাৎ ২য়, ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম সূক্তে) আভিচারিক ক্রিয়ার মাধ্যমে শত্রুকে পাশবদ্ধ করণের মন্ত্রগুলি পাওয়া যায়। কৌশিক সূত্রে (৬/৩, ১/৬) এগুলির নানা বিনিয়োগ উক্ত হয়েছে। বলা হয়েছে–…অগন্ম স্ব ইতি অবসানদ্বয়বর্জিতেন পদেপদে পাশা বৃশ্চতি। অর্থাৎ ৫ম সূক্তের শেষ দুটি মন্ত্র ছাড়া সব সূক্তের সব মন্ত্রই আভিচারিক ক্রিয়ায় বিনিযুক্ত হয়।–চতুর্থ সূক্তে বিন্দু-চিহ্নিত মন্ত্রাংশগুলি পূর্ববর্তী মন্ত্রের পুনরাবৃত্তির নির্দেশক ॥ (১৬কা, ২অ, ২-৫)।
বঙ্গানুবাদ— আরোগ্য ইত্যাদির নিমিত্ত প্রার্থনাকারী সকল প্রাণীর দ্বারা সর্বদা স্তোতব্য, আমি সেই পরম ঐশ্বর্যযুক্ত ইন্দ্ররূপ সূর্যকে (যিনি বৃষ্টি ইত্যাদির দ্বারা সকল প্রাণীকে পোষণ করেন, তাঁকে) আহ্বান করছি। অন্যকে দমনশালী তেজের সাথে যুক্ত, শত্রবর্গের মধ্য হতে সেই তেজঃকে জয়কারী, শত্ৰুহননে স্বভাবসিদ্ধ, সহনশীলগণের মধ্যে অতিশয় সহনশীল, শত্রুবর্গের গো-ইত্যাদি পশু-সমূহকে জয়কারী (বা জলের জেতা), শত্রুর বল ও সুখের বিনাশক, শত্রুগণের সুবর্ণ-রজত মণিমুক্তা ইত্যাদি জয়ে পারঙ্গম–সেই হেন ইন্দ্র-শব্দবাচ্য ভগবান্ সূর্যকে ত্রিকাল কর্মের দ্বারা (প্রাতঃ, মধ্য ও সায়ংকালে সাধ্য নিত্যকৃত্যের দ্বারা) আহূত করছি; তার কৃপায় আমি আয়ুষ্মন্ হবো (অর্থাৎ শত সম্বৎসরের আয়ু লাভ করবো ॥১॥
বিষাসহি, সহমান,সাসহান, সহীবান্ (সহীয়াংস), তেজের বিজেতা, স্বর্গ ও গাভীগণের বিজেতা, জলের বিজেতা-ইন্দ্ৰ শব্দবাচ্য সেই ভগবান্ সূর্যকে ত্রিকাল কর্মের দ্বারা আহূত করছি; তাঁর কৃপায় আমি দেবগণের (প্রিয়) হবো। (সূর্য হলেন একেব মহান আত্মা বা দেবতা, অর্থাৎ সর্বভূতাত্মা। সুতরাং তার প্রীতিতে আমি সর্ব দেবতার প্রীতি লাভ করবো)। ২।
বিষাসহি…আহূত করছি; তাঁর কৃপায় আমি পুত্র ভৃত্য ইত্যাদি প্রজাগণের প্রিয় হবো৷ ৩৷
বিষাসহি….আহূত করছি; তার কৃপায় আমি গো-মহিষ-অজ-অবি ইত্যাদি ও হস্তী-অশ্ব উষ্ট্র ইত্যাদি চতুষ্পদ পশু সমূহের প্রিয় হবো ॥৪॥
বিষাসহি…আহুত করছি; তাঁর কৃপায় আমি কুল-জাতি-বয়স-ধন-বিদ্যা-কর্ম ইত্যাদিতে আমার সমান ব্যক্তিগণের মধ্যে প্রিয় হবো॥ ৫॥
উদয় হওয়ার পর সকল প্রাণীকে আপন আপন কর্মে প্রেরণকারী হে সূর্য! তুমি উদিত হও, উদিত হও। (সূর্যের উদয়বিষয়ে ত্বরা দ্যোতিত হচ্ছে)। তুমি সকলকে দমনকারী; আমাতে তেজঃপ্রাপ্ত করানোর। নিমিত্ত উদয় হও। তোমার কৃপায় আমাতে দ্বেষ-পোষণকারী জন আমার অধীন হোক। আমি এ তোমার উপাসক, কখনও শত্রুর বশীভূত হবো না। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আপন কিরণের দ্বারা বিশ্বকে ব্যাপ্ত করণশালী। (বিষ্ণুরাদিত্য আপন রশ্মির দ্বারা সকল ব্ৰহ্মাণ্ডান্তরাল:ব্যাপ্ত করেন–এটি শ্রুতির মত)। তুমি আমাদের বহু প্রকারের (অর্থাৎ গো-মহিষ-অজ-অবি করি-তুরগ-উষ্ট্র ইত্যাদি) পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর আমাকে (ক্ষুৎপিপাসা-শোক মোহ-জরা-মরণ ইত্যাদি রহিত) সুধাময় পরম ব্যোমে স্থাপিত করো ৷ ৬ ৷
হে সূর্য! তুমি উদিত হও, উদিত হও। তুমি সকলের দমনকারী; আমাকে তেজঃপ্রাপ্ত করানোর নিমিত্ত উদিত হও। যে প্রাণী আমার সম্মুখে দৃষ্ট হচ্ছে অথবা যারা (দেশ ইত্যাদির ব্যবধানবশতঃ) দৃষ্ট হচ্ছে না, সেই দ্বিবিধ প্রাণীর প্রতি আমাকে সুমতি অর্থাৎ শোভনবুদ্ধিযুক্ত করো। (অর্থাৎ তাদের প্রতি আমাকে দ্রোহরহিত চিত্তশালী করো–এটাই বক্তব্য)। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! এমন তোমারই প্রভাব, অন্য কারো নয়। তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর আমাকে সুধাময় পরম ব্যোমে স্থাপিত করো ৷৷ ৭
হে সূর্য অন্তরিক্ষ-স্থানে সলিলের অভ্যন্তরে পাশধারী প্রচ্ছন্নচারী হিংসক রাক্ষসগণ যেন দম্ভভরে তোমাকে প্রতিরোধ করতে না পারে। (পরাখ্যব্রহ্মের সগুণমূর্তিভূত ভগবানই সূর্যের গতি রাক্ষসগণ কর্তৃক প্রতিবন্ধিত হয়েছে, এমন) নিন্দা প্রতিহত করে তুমি আপন সামর্থ্যে অন্তরিক্ষে আরূঢ়বান হয়ে থাকো। তুমি আমাদের সুখ প্রদান করো। আমরা তোমার শোভন অনুগ্রহবুদ্ধিতে অবস্থান করবো। (অর্থাৎ তোমার অনুগ্রহবুদ্ধির সৌজন্যে আমরা যে অভীষ্ট প্রার্থনা করি, তা সুলভ হবে)। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর আমাকে সুধাময় পরম ব্যোমে স্থাপিত করো ॥ ৮
হে (ইন্দ্ররূপী) পরমেশ্বর সূর্য! তুমি আমাদের (ধর্ম-যশ-শ্রী-জ্ঞান-বৈরাগ্য ইত্যাদিরূপ) প্রভূত ঐশ্বর্যসিদ্ধির নিমিত্ত ব্যাধি-সর্প-অগ্নি-তস্কর ইত্যাদি জনিত হিংসা হতে আমাদের দিবারাত্রগুলিকে রাহিত্য প্রদান করো। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর আমাকে সুধাময় পরম ব্যোমে স্থাপিত করো ৷ ৯৷
হে ঐশ্বর্যসম্পন্ন..(ইন্দ্ররূপী) সূর্য! তুমি আমাদের সুখতম হও। (অর্থাৎ পুনপুনঃ জন্ম-মরণ ইত্যাদির ক্লেশ হতে আমাদের রক্ষাজনিত সুখয়িত্ব হও)। অগ্নিতে আহুত সোম পান করে (অর্থাৎ যাগ ইত্যাদি কর্মে আহূত হয়ে হুতসোম পান করে) এবং আমার দ্বারা স্তুত হয়ে তোমার প্রিয় ধাম ত্রিদিবে (দুস্থানে) আরোহণ করো এবং জগতের স্বস্তি (অর্থাৎ মঙ্গল) বিধান করো। হে। অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশুসমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর আমাকে সুধাময় পরম ব্যোমে স্থাপিত করো। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে পরমেশ্বর্যবান্ ইন্দ্রাত্মক সূর্য! তুমি বিশ্বজিৎ (অর্থাৎ জগৎ-সংসারের বশীকর্তা (বা অধিপতি)। তুমি সর্ববিৎ (অর্থাৎ সকলের প্রেরকত্বের কারণে সর্বাত্মক)। হে ইন্দ্র! তুমি পুরুহুত (অর্থাৎ যজমানগণের দ্বারা তাদের আপন আপন যাগসিদ্ধির নিমিত্ত প্রভূতরূপে আহূত। হে ইন্দ্র! ইদানীং সর্বতঃ ক্রিয়মাণ-প্রকার শোভন আহ্বান-সাধন স্তবের (বা স্তুতির) প্রেরণ দান করো (অথবা এই স্তোত্র সমূহকে স্বীকার করো)। তুমি আমাদের সুখ প্রদান করো। আমরা তোমার শোভন অনুগ্রহ বুদ্ধিতে অবস্থান করবো। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর সুধাময় পরম ব্যোমে স্থাপন করো। ১।
হে ইন্দ্রাত্মক সূর্য! তুমি দ্যুলোকে কোনও রাক্ষস ইত্যাদির দ্বারা, বা পৃথিবীতে কোনও ভূচরের দ্বারা, বা অন্তরিক্ষেও কারো দ্বারা তুমি হিংসিত হওনি। অতি কঠোর তেজস্বী হওয়ায় এই তিন লোকও তোমার সন্তাপলক্ষণ মহিমা আপ্ত করতেই সক্ষম হয় না (তো তোমাকে দমন করবে কেমন করে?)। এমন কি, তুমি অসীম শক্তির দ্বারা সম্পন্ন গায়ন্ত্রী মন্ত্রে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকছে (অর্থাৎ অন্যের অলভ্য মাহাত্মে তুমি মহীয়া)। হে ইন্দ্র! তুমি দিবি অর্থাৎ দ্যুলোকে আমাদের সুখ প্রদান করো। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর সুধাময় পরম ব্যোমে স্থাপিত করো ॥ ২॥
(ইখং মণ্ডলাভিমানিনঃ সূর্যস্য মাহাত্ম্যং উপবর্ণ বহুবিধং স্বাভিষ্টমপি অর্থয়িত্বা….ইত্যাদি–অর্থাৎ এতক্ষণ এইভাবে মণ্ডলাভিমানী সূর্যের মাহাত্ম্য বর্ণনা পূর্বক নিজের নানা অভীষ্ট প্রার্থনার পর সূর্যের পঞ্চ মহাভূতস্থ অর্থাৎ ক্ষিতি-অপ-তেজঃ মরুৎ-ব্যোমে বিরাজমান মূর্তিগুলির নিকট অথর্ববেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ আপন অভীষ্ট প্রার্থনা করছেন)–হে পরমেশ্বর্যযুক্ত সূর্য (অথবা প্রসিদ্ধ ইন্দ্র)! জলরাশির মধ্যে তোমার যে মূর্তি আছে, সেই মূর্তি সমূহের দ্বারা আমাদের সুখ প্রদান করো; (অর্থাৎ জলে বিদ্যমান সারভূত অমৃত, ভৈষজ্য ইত্যাদির দ্বারা সুখ সম্পাদিত করো। হে ইন্দ্র! পৃথিবীতে তোমার যে তন্ আছে, সেই তনুর দ্বারা (অর্থাৎ পৃথিবীর অভিমানী দেবমূর্তিগুলির মাধ্যমে) আমাদের সুখ প্রদান করো; (অর্থাৎ পৃথিবীর বিকারভূত অন্ন ইত্যাদির দ্বারা সম্পন্ন করো)। অগ্নিতে ব্যাপ্ত তোমার যে তনু আছে, সেই মূর্তির দ্বারা তুমি আমাদের সুখ প্রদান করো; (অর্থাৎ তোমার তেজোময় মূর্তি সমূহের দ্বারা দাহ-পাক-প্রকাশ ইত্যাদির দ্বারা সুখ প্রদান করো)। (বাহিরের অনুকূল স্পর্শের জন্য এবং অন্তরের প্রাণ ইত্যাদি বায়ুর চিরকাল সঞ্চারের নিমিত্ত) স্বর্গের জ্ঞাতা প্রবহমান বায়ুতে তোমার যে মূর্তি আছে, সেগুলির দ্বারা তুমি আমাদের সুখ প্রদান করো। হে ইন্দ্র! অন্তরিক্ষ ব্যেপে তোমার যে মূর্তি সমূহ আছে, সেগুলির দ্বারা তুমি আমাদের (বৃষ্টি ইত্যাদির দ্বারা সাধ্য) সুখ প্রদান করো। হে অনন্ত বীর্যশালী, বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর সুধাময় পরম ব্যোপে স্থাপিত করো ৷৩৷
হে ইন্দ্রাত্মক সূর্য! অভীষ্ট ফলসমূহের অভিলাষী হয়ে পুরাতন-কালীন (অঙ্গিরা প্রভৃতি) ঋষিগণ অভিমত ফল যাচনা করে তোমাকে স্তোত্র ইত্যাদির দ্বারা প্রবুদ্ধ করেছিলেন (অথবা সোম, পশু ইত্যাদি রূপ হবিঃর দ্বারা অভিবর্ধন করেছিলেন)। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর পরম ব্যোমে অমৃতময় স্থানে প্রতিষ্ঠিত করো। ৪।
হে ইন্দ্রাত্মক সূর্য! তুমি বিস্তীর্ণ অন্তরিক্ষে ব্যাপ্ত হয়ে অপরিমিত ধারাশালী মেঘকে প্রাপ্ত হয়েছে। (অর্থাৎ সেই সহস্রধার মেঘ ঔষধি-বনস্পতির অভিবৃদ্ধি সাধিত করে স্বর্গ-সুখের উৎসরূপ সাক্ষাৎ যজ্ঞের স্বারূপ্য প্রাপ্ত হয়েছে)। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য। তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর পরম ব্যোমের অমৃতে প্রতিষ্ঠিত করো ৫
হে সূর্য! তুমি পূর্ব ইত্যাদি চারিটি দিককে পালন (বা রক্ষা) করছে; (অর্থাৎ তথাকার সকল লোককে বা প্রাণীসমূহকে পালন করছে)। তুমি আপন প্রকাশের দ্বারা আকাশ ও পৃথিবীকে প্রকাশিত করে থাকো। তুমি যজ্ঞের বা জলের মার্গ অন্বেষণ করে ক্রমে ক্রমে তা ব্যাপ্ত করছো; (যেমন বিদ্বান্ ব্যক্তি যজ্ঞের অবস্থিতি জ্ঞাত হন; অর্থাৎ কখনও কোন পদার্থ অজ্ঞাত থাকলে তা অন্বেষণ করে জ্ঞাত হন, সেই ভাবে তুমি যজ্ঞের মার্গ অন্বেষণ করে জ্ঞাত হয়েছে)। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর পরম ব্যোমের অমৃতময় স্থানে প্রতিষ্ঠিত করো ॥ ৬।
হে সূর্য! তুমি পঞ্চ দীধিতির (অর্থাৎ কিরণের) দ্বারা পরা অর্থাৎ উধ্বমুখ হয়ে উপরিতন (স্বঃ-মহঃ-জন-তপঃ ও সত্য) লোকে প্রকাশ প্রাপ্ত হয়ে থাকো এবং একটি দীধিতির দ্বারা অবাঙ অর্থাৎ অধোমুখ হয়ে (ভূলোকে) তাপ প্রদান করে থাকো। এই রূপে, সুদিনে অর্থাৎ শোভনদিবসে নীহার (হিম), মেঘ ইত্যাদির উপদ্রবরহিত দিবসে পৃথিবীকে একটি দীধিতিতে তাপ প্রদান করে নিন্দাভাজন হয়েছে। (অথবা নিম্নমুখী তেজঃ চক্ষুগম্য হওয়ায় একটি অংশরূপে ও ঊর্ধ্বমুখী পঞ্চ তেজঃ অসীম–এমন প্রতিভাত হওয়ায় সকলের স্তুতিভাজন হয়েছে)। হে অনন্ত বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে সমৃদ্ধ করো এবং দেহান্তের পর পরম ব্যোমের অমৃতময় স্থানে স্থাপিত করো। ৭।
হে সূর্য! তুমি (স্বর্গাধিপতি) ইন্দ্র, তুমিই (মহত্বগুণবিশিষ্ট) মহেন্দ্র। (তান্ত্রিকগণ বিশেষণ ভেদে দেবতার ভেদ করে থাকেন)। তুমিই পুণ্যাত্মাগণের প্রাপ্য স্বর্গ ইত্যাদি লক্ষণ সমন্বিত লোক; (অথবা পরব্রহ্মের স্বরূপত্বের কারণে সর্বকোত্মক)। তুমিই প্রাণীগণের রচয়িতা; এই কারণে যজমানগণ তোমার প্রীতি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি বিস্তাৰ্যমান যজ্ঞে আহুতি প্রদান করছেন; এবং হোমে আহুতি প্রদান করছেন। (যাজ্যা ও পুরোনুবাকা পুরঃসর হৃয়মান যজ্ঞ হলো যাগ, তা ব্যতিরেকে আহুতি হলো হোম)। হে বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে সমৃদ্ধ করো এবং দেহান্তের পর পরম ব্যোমের অমৃতময় স্থানে প্রতিষ্ঠিত করো ॥ ৮।
অসতের (অর্থাৎ চক্ষু ইত্যাদির অবিষয়ী হওয়ায়, দর্শনের যোগ্য না হওয়ায়, অসৎ সংজ্ঞায় বিভূষিত মায়াময় ব্রহ্মেরই) মধ্যে ভূতস্রষ্টা ব্রহ্মের স্বরূপে, হে সূর্য! তুমি অধিষ্ঠিত আছো। হে বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে সমৃদ্ধ করো এবং দেহান্তের পর পরম ব্যোমের অমৃতময় স্থানে প্রতিষ্ঠিত করো ॥ ৯
হে সূর্য! তুমি শুক্র (অর্থাৎ অতিবিশদ স্বচ্ছ প্রকাশরূপ বা শুক্রগুণযুক্ত বা অত্যন্ত নির্মল স্বরূপ) হয়ে থাকো। সর্বলোককে প্রকাশিত করণশালী তেজের দ্বারা তুমি জ্যোতির্ময় (ভ্ৰাজমান) হয়ে আছো। (সেই হেন তোমার মতোই) তোমার উক্ত স্বরূপের উপাসক আমি জ্যোতির্ময় শরীরকান্তি প্রাপ্ত হয়ে দীপ্ত হবো। (অর্থাৎ–তেজোগুণযুক্ত সূর্যের উপাসকও তেজোগুণসম্পন্ন হয়–এটাই যুক্তি)। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে সূর্য! তুমি রুচিমান অর্থাৎ প্রকৃষ্ট দীপ্তিমা৷ তুমি যেমন জগৎসংসারকে প্রকাশিত করণশালিনী দীপ্তির দ্বারা দীপ্ত হয়ে আছে, তেমনই আমিও পশুর দ্বারা (অর্থাৎ গো-মহিষ ইত্যাদির দ্বারা) এবং ব্রাহ্মণের বর্ডসের দ্বারা (অর্থাৎ বেদাধ্যয়ন, তপস্যা ইত্যাদির মাধ্যমে ব্রাহ্মণের অর্জিত ব্রহ্মতেজের দ্বারা) দীপ্ত হবো ৷৷ ১।
হে সূর্য! উদয়াচল প্রাপ্ত তোমাকে নমস্কার; অর্ধ-উদিত ও সম্যক ঊর্ধ্বপ্রাপ্ত তোমাকে নমস্কার। একদেশোদিত বিরাজ বা বিরাডাত্মক (অর্থাৎ পরমেশ্বরের সকল লোকাত্মক স্থূল-শরীরাভিমানী পুরুষশব্দবাচী দেবরূপী) তোমাকে নমস্কার। অর্ধ-উদিত স্বরাজ বা স্বরাডাত্মক (অর্থাৎ ভূতপঞ্চকের সারাত্মক পরমেশ্বরের সর্বসমষ্টিরূপ সূক্ষ্মশরীরের অভিমানী হিরণ্য গৰ্ভরূপী) তোমাকে নমস্কার। পূর্ণ উদিত সম্রাজ বা সম্রাডাত্মক (অর্থাৎ পরমেশ্বরের কারণশরীরাভিমানী সকল-ভূত ভৌতিক-প্রপঞ্চস্রষ্টা মায়া–উপাধিক ঈশ্বররূপী) তোমাকে নমস্কার। (এইরূপে বিরাট, স্বরাষ্ট্র ও সম্রাট অর্থাৎ অগ্নি-বায়ু-আদিত্য আখ্যাত পরমেশ্বরের তিনটি মূর্তিকে পৃথক পৃথক ভাবে নমস্কার করা হয়েছে)। ২।
(হে সূর্য!) অস্তাচলে গমনোদ্যত (অর্থাৎ কিঞ্চিৎ অস্তমিত) বিরাট নামে আখ্যাত তোমাকে নমস্কার। অর্ধ-অস্তমিত স্বরা নামে আখ্যাত তোমাকে নমস্কার। সম্পূর্ণরূপে অস্তপ্রাপ্ত সম্রাট নামে আখ্যাত তোমাকে নমস্কার। এইভাবে বিরাট, স্বরা ও সম্রাট-রূপী (পূর্বে ব্যাখ্যাত) তোমাকে নমস্কার ৷৷ ৩৷৷
সর্ব লোককে পূর্ণভাবে সন্তাপ-দানশীল রশ্মিনিচয় সহ পরিদৃশ্যমান আদিত্য উদিত হয়েছেন। (সূর্যের রশ্মিজালে রাক্ষসাদিকৃত অপকর্মগুলি : ন্যূনতা, প্রাপ্ত হয়, এটাই বিশেষিত)। হে উদ্যত আদিত্য! তোমার অনুগ্রহে (উদয়তস্তবানুগ্রহাৎ) আমার সপত্ন অর্থাৎ শত্রুগণ আমার বশীভূত হোক; আমি যেন আমার দ্বেষ্যগণের বশীভূত না হই। হে বীর্যশালী বিষ্ণুরূপী সূর্য! তুমি আমাদের বহু প্রকারের পশু সমূহে পূর্ণ করো এবং দেহান্তের পর পরম ব্যোমের অমৃতময় স্থানে প্রতিষ্ঠিত করো। ৪।
হে আদিত্য! সকল প্রাণীর স্বস্তির নিমিত্ত তাদের ব্যোমরূপ (বা জগৎসংসাররূপ) সমুদ্র উত্তীর্ণ করানোর উদ্দেশে তুমি (গ্রহমণ্ডলকে আকর্ষণকারী বায়ুরূপ) শত (বা অপরিমিত) অরিত্রযুক্ত (বা রশ্মিসমন্বিত) রথলক্ষণান্বিত নৌকায় আরূঢ় হয়েছে। (অরিত্র হলো নৌকার জল-আকর্ষণকারী কর্ণ, হাল বা দাঁড়)। এই হেন নৌকায় আরূঢ় হয়ে তুমি আমাদের (আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক–এই ত্রিবিধ বিঘ্ন বা দুঃখ। পরিহার করিয়ে) দিনের পার প্রাপ্ত করিয়ে দাও। এইরূপে আমাদের রাত্রিরও পরপার প্রাপ্ত করাও। (অর্থাৎ দিবা ও রাত্রির মধ্যে ব্যবধান না করে পার করাও)।–(এই মন্ত্রের দ্বারা মরণ ইত্যাদির ভীতি, জ্বর-শিরোব্যথা ইত্যাদি পরিহারের দ্বারা আয়ুর অভিবৃদ্ধি প্রার্থিত হয়ে থাকে)। ৫।
হে আদিত্য! সকল প্রাণীর কল্যাণের (স্বস্তির) নিমিত্ত তাদের ব্যোমরূপ সমুদ্র উত্তীর্ণ করানোর উদ্দেশে শত অরিত্রযুক্ত রথলক্ষণান্বিত নৌকায় আরূঢ় হয়েছে। এই হেন নৌকায় আরূঢ় হয়ে তুমি আমাদের রাত্রির পার প্রাপ্ত করিয়ে দিয়েছো;এবার দিনও পার করিয়ে দাও ৬
প্রজাপতিরূপ সূর্যের (অথবা প্রজাগণের স্রষ্টা হিরণ্যগর্ভের) তেজোরূপ করচের দ্বারা বেষ্টিত (বা আচ্ছাদিত) হয়ে, কিম্বা সূর্য-মূর্তির প্রভেদভূত কশ্যপের প্রকাশময় জ্যোতিরাশির দ্বারা আবৃত হয়ে, আমি (অবিচ্ছিন্ন) জরাকাল পর্যন্ত অশন (অর্থাৎ ভোজন) লাভ করে, আরোগ (অর্থাৎ দৃঢ় অঙ্গসম্পন্ন) হয়ে, অপরিমিত বীর্যশালী হয়ে (বা অনেক পুত্র ইত্যাদি উৎপাদনের সামর্থোপেত হয়ে), সর্বত্র অপ্রতিহত গতিসম্পন্ন হয়ে (বিহায়াঃ), অপরিমিত আয়ুঃশালী হয়ে (সহস্ৰায়ুঃ), সুষ্ঠু সংস্কৃত হয়ে (সুকৃতঃ), (অথবা লৌকিক ও বৈদিক কর্তব্য সমূহ পালন করে) পৃথিবীর সর্বত্র গমন করবো। ৭।
আমি সূর্যের ও কশ্যপরূপ আদিত্যের মন্ত্রময় কবচের দ্বারা আচ্ছাদিত। আমি তেজঃ ও রক্ষাত্মক রশ্মিরাশির দ্বারা রক্ষিত আছি। এই কারণে আমার প্রতি হিংসার উদ্দেশে দেবতা ও মনুষ্যবর্গের দ্বারা প্রযুক্ত বাণসমূহ যেন আমার প্রাপ্য না হয় (অর্থাৎ আমাকে যেন বধ করতে না পারে) ॥ ৮৷
আমি ঋতের (যথার্থ সত্যের) দ্বারা (অথবা আদিত্যাখ্য সত্যস্বরূপ ব্রহ্মের দ্বারা) গুপ্ত (অর্থাৎ রক্ষিত) আছি। তথা (বসন্ত ইত্যাদি) সকল ঋতুর দ্বারা রক্ষিত আছি। তথা ভূতের (অর্থাৎ পূর্বকালে উৎপন্ন পদার্থনিচয়ের) দ্বারা রক্ষিত আছি। আমি ভব্যের (অর্থাৎ ভাবীকালে উৎপাদিতব্য পদার্থ সমূহের) দ্বারা রক্ষিত। অতএব নরকের হেতুভূত পাপ যেন আমাকে না প্রাপ্ত হতে পারে এবং মরণকর্তা দেবও যেন আমার সমীবর্তী হতে না পারেন। আমি মন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত জলে। অন্তর্হিত হয়ে থাকবো। (অর্থাৎ লোকে যেমন সলিলের মধ্যে অন্তর্হিত প্রাণীকে কেউ দর্শন করতে পারে না, সেই রকমেই আমি মন্ত্রময় সলিলে পাপ ইত্যাদির বাধারাহিত্য হয়ে নিজেকে গোপন করে রাখবো) ॥৯॥
অগ্নিদেব আপন আশ্রিতের রক্ষক; তিনি আমাকে (সঃ) ভয় হতে রক্ষা করুন। তথা সূর্যদেব উদয় মুহূর্তেই (সর্প-অগ্নি-ব্যাঘ্র-কন্টক ইত্যাদি রূপ) মৃত্যুর পাশগুলি অপসারিত করে দিন; সেগুলি যাতে আমাকে স্পর্শ করতে না পারে, তেমন করুন। তথা (উদয়পূর্বকালভিমানিনী) উদেবতাবৃন্দ এবং ধ্রুব (অর্থাৎ নিশ্চল বা স্থির) পর্বর্তসমূহ (যথা হিমালয় ইত্যাদি শৈলগুলি) মৃত্যুপাশ সমুদায়কে দূর করুক (অথবা মাং অনুগৃদ্ধৃতি…–অর্থাৎ আমাকে অনুগৃহীত করুক)। তাদের (অর্থাৎ অগ্নি ইত্যাদির) অনুগ্রহে সহস্র (অর্থাৎ অপরিমিত) প্রাণ আমার আয়ুর কামনায় সর্বতোভাবে চেষ্টা করুক ॥ ১০
টীকা –উপযুক্ত দ্বিতীয় ও তৃতীয় সূক্তদ্বয়ের বিনিয়োগ প্রথম সূক্তেই উল্লেখিত হয়েছে। তৃতীয় সূক্তের ৪র্থ মন্ত্রের একটি অতিরিক্ত বিনিয়োগ সেখানেই উল্লেখ করা হয়েছে। (১৭কা, ১অ. ২-৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –(যমীর বচন)–আমি আমার সমান প্রসিদ্ধিশালী, (গর্ভস প্রভৃতিতে যুগলভাবে অবস্থান-জনিত কারণে) সখা বা মিত্ররূপ যমকে সম্ভোগের নিমিত্ত অনুকূল করছি। তারপর সমুদ্র তটবর্তী দ্বীপে গমন পূর্বক যম (আমাদের পিতা বিবস্বানের পৌত্রকে, অর্থাৎ আমাদের) পুত্রকে আমার গর্ভে উৎপাদিত করুক। সেই যমের খ্যাতি কেবল তার নিজ লোকে (যমলোকে) প্রকৃষ্টতর ভাবে দীপ্যমান, এমন নয়; ভূলোকেও সর্বপ্রাণীর সংহারকত্বের অধিকারে বর্তমান ॥১॥
(যমের বচন)–আমি সহোদরে উৎপন্ন হওয়ায় তোমার সখা বটে। কিন্তু আমি ভ্রাতা-ভগ্নীর (সম্ভোগাত্মক) সখ্য কামনা করি না। এক-উদরত্বলক্ষণ ভগ্নীরূপ সম্বন্ধ পরিত্যাগ পূর্বক কোন ভগ্নী কখনও ভাৰ্যাত্ব প্রাপ্ত হয় না। দ্যুলোকের ধারক, প্রকৃষ্টরূপে সর্বত্র ব্যাপ্ত, শত্রুকে দমনশীল, মহাবলী রুদ্রের পুত্র মরুত্বর্গও তা নিরাকরণ করবেন ॥ ২॥
(যমীর বচন)–হে যম! রুদ্রের পুত্রগণ নিরাকরণ করবেন–এমন বলো না। পরন্তু অমৃতলোকবাসী মরুৎগণ আমার প্রাথ্যমান কর্ম ইচ্ছা করেন। অসাধারণ মনুষ্যের গর্ভ হতে নির্গমন তারা বাসনা করেন (উশন্তি)। অতএব আপন মনকে আমার দিকে বিলগ্ন করো; তারপর সন্তানোৎপত্তি করণশালী পতি হয়ে ভ্ৰাতৃভাব পরিত্যাগ পূর্বক আমার তনুতে তোমার তনু প্রবেশ করাও। (অর্থাৎ সম্ভোগ করো)। ৩।
(যমের বচন)–হে যমী! যে কারণে পূর্বে এতাদৃশ (ভগিনীসম্ভোগরূপ) নিন্দাহ্ কর্ম করিনি, এখন তা কি কারণে করবো? আমরা সত্য কথনশীল হয়ে এই অসত্য (অযথার্থ) আচরণ কেমন করে করবো? জলধারক গন্ধর্ব সূর্যও অন্তরিক্ষে আপন ভার্যার সাথে স্থিত আছেন। অতএব অভিন্ন মাতা-পিতাশালী আমরা দুজনে তাদের সম্মুখে তোমার ইচ্ছিত বিষয় পূর্ণ করতে সমর্থ হবো না ৷৷ ৪৷
(যমীর বচন)–হে যম! সন্তানোৎপাদক দেবই আমাদের দুজনকে মাতার উদরের মধ্যেই দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছেন; সেই সবিতাদেবের কর্মফলকে কে নিষ্ফল করতে সক্ষম? বিশ্বকর্মা বিশ্বস্রষ্টা ত্বষ্টাদেবের এই (গর্ভের মধ্যেই আমাদের দম্পতিকরণরূপ) কর্ম আকাশ ও পৃথিবী উভয়েই জ্ঞাত আছেন। এই কারণে এটি অসত্য নয়। ৫।
(যমের বচন)–সত্যের ভার-বহনের নিমিত্ত বাণীরূপ বৃষভকে ইদানীং কে নিযুক্ত করে থাকে? (সত্যমেব জয়তি নামৃতং এই শ্রুতিবচনানুসারে) সত্য বচনই জয়লাভ করে; সত্য বদনে ক্রোধ-লজ্জা থাকে না। সর্বদা সত্যবিষয়ে সঙ্কল্পযুক্ত পুরুষের মুখ বা কণ্ঠ হতে নির্গত শব্দ শ্রোতার হৃদয়ে সুখসঞ্চার করে থাকে, অসত্য বাক্য নয়–এ কথা লোকে সুপ্রসিদ্ধ। মহান্ বিশেষণযুক্ত পুরুষ সত্য বচনের বৃদ্ধি সাধন করেন এবং তার ফলে দীর্ঘজীবী হয়ে থাকেন ৷ ৬ ৷
(যমীর বচন)–হে যম! আমাদের প্রথম (সঙ্গম) দিনটি কে জ্ঞাত হবে? আমাদের এই ইদানীং কর্ম কে প্রত্যক্ষ করবে? প্রত্যক্ষ করেই বা কে অন্য কার নিকট ব্যক্ত করবে? এর কোন জ্ঞাতা, দ্রষ্টা ও কথয়িতা নেই। মিত্রদেবের স্থান দিবায় এবং তমোবারক বরুণদেবের স্থান রাত্রে। (তাহলে অহোরাত্রির মধ্যে কোন সময়টি সম্ভোগের জন্য নির্ধারিত–এই-ই প্রশ্নের উদ্দেশ্য)। হে ক্লেশকারী (অর্থাৎ আমার অভিমত কর্ম অকরণের নিমিত্ত আমাকে কষ্টদানকারী)! বিবিধ সঞ্চরণশীল মনুষ্যগণের উপস্থিতি সম্পর্কে উক্তি করছো কেন?। ৭ ৷৷
(যমীর পুনঃ-বচন)–যমের বিষয়ে আমার (কাম)-অভিলাষ আগত (সঞ্জাত) হয়েছে। জায়া যেমন আপন ভর্তার নিকট (কামার্থিনী হয়ে শয়ন-শয্যায়) আপন তনু বিস্তার করে (অর্থাৎ মেলে ধরে), তেমন ভাবেই আমি যমের নিকট (কামোভোগের নিমিত্ত) তনু সমর্পণ করছি। রথচক্র যেমন অক্ষের সাথে মিলিত হয়ে বিবর্তিত হয়, সেইরকমে আমরাও মিলিত হবো ॥ ৮৷
(যমের বচন)–হে যমী! এই লোকে দেবতার যে চর সকল ভ্রমণ করে, তারা কেউই একত্রে স্থিত হয় না; তারা নিমেষও পাতিত করে। না (অর্থাৎ তাদের চক্ষের পলকও পড়ে না–সর্বদা জাগরূক থাকে–সদা সতর্ক থাকে)। অতএব, হে ক্লেশদানকারিণী (অর্থাৎ আমার ধর্ম-মতিকে নষ্ট-করণের ইচ্ছাশালিনী)! তুমি আমাকে পরিত্যাগ করে অন্য কোন জনের পত্নী হয়ে তার সাথে রমণ করো। সেই নিমিত্ত শীঘ্র গমন পূর্বক তার সাথে। সংশ্লিষ্ট হও, যেমন রথচক্র অক্ষের সাথে মিলিত হয়। ৯।
(যমীর বচন)–এই যমের নিমিত্ত যজমান দিবা-রাত্র আহুতি (হবিঃ) প্রদান করুন। তথা সূর্যদেবের চক্ষু (অর্থাৎ প্রকাশক তেজঃ) ঊর্ধ্বে। গমন করুক (অর্থাৎ সূর্যোদয়ও এর ভোগের নিমিত্তভাগী হোক)। পৃথিবীর সাথে দ্যুলোকের পরস্পর মিথুনভাবে অবিশ্লিষ্ট (অবিচ্ছিন্ন) থাকার মতো, আমি (যমী) ভ্রাতা যমের ভগ্নীত্ব হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে (অর্থাৎ অবন্ধুরূপে) সংশ্লিষ্ট হবো। ১০
বঙ্গানুবাদ –(যমের বচন)–সম্ভবতঃ উত্তরকালে দিবা ও রাত্রির এমন দিনগুলি আসবে যখন ভগ্নীগণ অবন্ধুত্বের বা ভার্যাত্বের দ্বারা (ভ্রাতৃগণের) প্রাপ্যা হতে থাকবে। হে যমী! (যতদিন তা না হয়, ততদিন) তুমি বৃষভসদৃশ (রেতঃসেক্তা) অন্য কারো প্রতি সম্ভোগের নিমিত্ত তোমার বাহু বিস্তারিত করো। হে সুভগে কামিনী! আমাকে পরিত্যাগ করে তাকেই পতিরূপে কামনা করো ॥১॥
(যমীর বচন)–সেই নিন্দিত ভ্রাতার বিদ্যমানতা অবিদ্যমানতারই পরিচায়ক, যার বিদ্যমানতায় ভগ্নী। নাথরহিত হয় (অর্থাৎ অপূর্ণকামা হয়ে যায়)। সেই ভগ্নীও নিন্দাহ, যার বিদ্যমানতা সত্ত্বেও তার ভ্রাতা। (কাম-অপূর্তিজনিত কারণে) দুঃখ প্রাপ্ত হয়। যেহেতু আমি সনাথা (যতোহং সনাথা), সেই হেতু কামের দ্বারা মূচ্ছিতা (অর্থাৎ বহুবিধ কমোপেতা) হয়ে এই হেন প্রলপন করছি। অতএব আমার প্রলাপের সার্থকত্বে আমার শরীরের সাথে, (হে ভ্রাতঃ) তোমার শরীরের সম্পর্ক সূচীত করো। ২৷৷
(যমের বচন)–হে যমী! এই বিষয়ে অমি তোমার নাথ (অর্থাৎ তোমার অভিমতার্থ-সম্পাদক ভ্রাতা) নই; এবং তোমার শরীরের সঙ্গে নিশ্চয়ই সম্পর্ক সূচীত করবো না। তুমি আমা ব্যতিরিক্ত অন্য পুরুষের সাথে মিলিত হয়ে (সম্ভোগজনিত) প্রমোদ লাভ করো। হে সুভগে! আমি তোমার ভ্রাতা হয়ে কখনও (জায়াপতি লক্ষণ) এই হেন কর্ম কামনা করি না ৷ ৩৷৷
(পূর্বমন্ত্রোক্ত অত্যন্ত পাপাত্মক কর্মের নিষেধ সম্পর্কে পুনরায় দৃঢ়তা প্রকাশের উদ্দেশ্যে যমের পুনর্বচন)–হে যমী! তোমার তনুর সাথে আমার তনুর সংসর্গ কখনও করতে পারি না। ভ্রাতা কর্তৃক আপন ভগ্নীকে সম্ভোগ করা পাপ–এই হেন কর্ম ধর্মরহস্যবিদগণ কর্তৃক নিষিদ্ধ আছে। ভ্রাতা হয়ে ভগ্নীর সাথে একশয্যায় শয়নরূপ এই অসংযত কর্ম করলে তা আমার মন ও হৃদয়কে অথবা মন ও হৃদয়ের সাথে প্রাণকেও অপহরণ করবে। ৪।
(যমীর বচন)–হে যম! তুমি বলের অতীত (অর্থাৎ দুর্বল), আমার প্রতি তোমার মন নেই (অর্থাৎ আমার প্রতি তুমি উদাসীন)। কিন্তু তোমার হৃদয়কে আমি বা (পূজার্থে) আমরা জ্ঞাত হয়েছি। (হৃদয়ের স্বাধীনতার অভাব দেখিয়ে খেদের সাথে উক্ত)। অপরা কোন কামিনী তোমাকে আলিঙ্গন (পরিঙ্গ) করেছে, সেই জন্য তুমি আমাকে অবমানা করছে। (অতএব তুমি পরাধীন ও দুর্বল)। (এর দুটি দৃষ্টান্ত)–কক্ষ্যার (অর্থাৎ অশ্বের বগল-প্রদেশে বদ্ধ রঞ্জুর) সাথে সম্বন্ধযুক্ত (দুর্দান্ত) অশ্বও যেমন ঐ কক্ষ্যার দ্বারা আবদ্ধ হয়ে (স্বাচ্ছন্দ হারিয়ে) থাকে, কিংবা লিবুজা (অর্থাৎ ব্রততী বা লতানিয়া গাছ) যেমন বৃক্ষকে গাঢ়ভাবে আলিঙ্গন করে (অর্থাৎ গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত বেষ্টন করে থাকে), সেইরকম তুমিও অন্য কোন কামিনীর দ্বারা আত্মহারা হয়ে গিয়েছো ॥ ৫॥
(যমের বচন)–হে যমী! ব্রততীর বৃক্ষালিঙ্গনের মতো তুমিও অন্য পুরুষকে (এবং সে-ও তোমাকে) আলিঙ্গন করুক। (অর্থাৎ তোমরা পরস্পরে আলিঙ্গনাবদ্ধ হও)। (এর ফলে) তোমাদের মন একে অপরকে ভজনা করুক। (এইভাবে পরস্পরে অনুকূলান্তর হয়ে) অত্যন্ত কল্যাণপ্রদ (সুভদ্রাং) সুখানুভব (সম্বিদং) করো ৷ ৬
৷৷ পূর্বকালে, জ্ঞানী মহর্ষিগণ বা দেবগণ জগৎ-সংসারকে আচ্ছাদিত করার নিমিত্ত (অর্থাৎ জগৎ-নির্বাহের জন্য) শ্ৰবণ-মনের প্রীতিপ্রদ তিনটি ছন্দ (আবাদী) গ্রহণ করেছিলেন। (আচ্ছাদন হতে ব্যুৎপত্তি হওয়ায় তা ছন্দ নামে অভিহিত)। সেই তিনটি ছন্দের মধ্যে প্রথম জল নানারূপ অবিকারত্বের কারণে সর্বরূপে সকলের দর্শতং অর্থাৎ দর্শনীয়, স্পৃহণীয়ত্যের দ্বারা প্রিয়দর্শন, বিশ্বচক্ষণ অর্থাৎ বিশ্বের দ্রষ্ট। দ্বিতীয় বায়ুও প্রাণাত্মরূপে বর্তমান ও দর্শনীয় এবং, সূত্রাত্মারূপে বিশ্বের দ্রষ্ট। তৃতীয় ঔষধিগুলিও এই রূপে দ্রষ্টব্য। এই আবাদীত্রয় ভুবনাচ্ছাদকত্বের নিমিত্ত প্রসিদ্ধ ॥ ৭৷
কাম ও জলের বর্ষক মহান্ (যঃ মহন্নামৈতৎ) অগ্নি অখণ্ডনীয় দ্যুলোক হতে (যজমানকে আপন ভোগাৰ্থে অর্থাৎ আজ্য প্রাপ্তির অভিলাষে দোহনসাধনের দ্বারা) যজ্ঞীয় ঘৃতও বর্ষণ করেন। তিনি অদভ্য (অর্থাৎ রক্ষ প্রভৃতির দ্বারা অহিংসিত। এই অগ্নি আপন প্রজ্ঞানের দ্বারা সব কিছুই সাক্ষাৎ করে থাকেন। (দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়। যেমন বরুণদেব আপন ধিষণায় সব জ্ঞাত হয়ে থাকেন। সেই যজ্ঞাহ অগ্নি যজ্ঞের যথাযথ ঋতুতে যাগের যথোপযুক্ত দেবতাগণের উদ্দেশে যজন করেন। ৮
জলধারক (গন্ধর্ব) আদিত্যের স্বভূতা ভারতী ও অম্বন্ধিনী অর্থাৎ জলস্থায়িনী যুবতী সরস্বতী রুপৎ অর্থাৎ স্পষ্ট বক্তা আমার দ্বারা অগ্নিকে স্তুত করুন (অগ্নিং স্তৌতু)। স্তোতা আমার স্তোত্ররূপে নাদে (ধ্বনিতে) আমার মনকে সর্বতোভাবে রক্ষা করুন। অনন্তর অদিতি (দেবমাতা দেবী) ইষ্টফলের মধ্যে বা যজ্ঞে আমাদের আত্মাদের স্থাপন করুন। ভ্রাতা (অর্থাৎ ভরণকর্তা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃবৎ হিতকরী) মুখ্য (প্রথমো) অগ্নি আমাকে বলুন–এই জন নিপুণ যাগকর্তা যজমান (সাধু যষ্টা) ॥৯॥৷
সেই বন্দনীয়া (ভদ্রা), মন্ত্ররূপ-শব্দবতী (ক্ষুমতী), অন্নবতী (যশস্বতী অর্থাৎ মনুষ্যের উপভোগাৰ্থে হবিলক্ষণ অন্নযুতা) ও স্ববর্তী (অর্থাৎ আদিত্যবতী) উষা মনুষ্যের ব্যবহারের নিমিত্ত বা (অগ্নিহোত্র ইত্যাদি যজ্ঞার্থে) যজমানের নিমিত্ত (অন্ধকার দূরীভূত করে) প্রাদুর্ভূত হয়েছেন। সেই উষাকালে কাময়মান (উশন্তং), দেবগণের আহ্বায়ক বা হোমনিস্পাদক অগ্নিকে যজ্ঞার্থে কাময়মান (উশতাং) যজমানগণের প্রদত্ত হবিঃ দেবগণের প্রাপ্তি করণের নিমিত্ত (অর্থাৎ দেবতাগণের নিকট বহন করার নিমিত্ত অধ্বর্যগণ উৎপাদন করে থাকেন)। ১০।
বঙ্গানুবাদ–(পূর্বে) শ্যেনের দ্বারা মহান্ত বিচক্ষণ সোম যজ্ঞের নিমিত্ত আহৃত হয়েছিল। সোম আহৃত হলে যজমানগণ (আর্যা) হোমনিম্পাদক অগ্নিকে বরণ করেন। এবং সোম ও অগ্নির সিদ্ধত্বের পর অগ্নিষ্টোম ইত্যাদি কর্মও সম্পূর্ণ হয়। (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ও তৈত্তিরীয় সংহিতায় আছে যে, গায়ত্রী সুপর্ণরূপ ধারণ পূর্বক দ্যুলোক হতে সোম আহরণ করে এনেছিলেন) ॥১॥
হে অগ্নি! তুমি যজ্ঞকে সুষ্ঠুভাবে নিবর্তন করে থাকো। যেমন হরিত্বর্ণের তৃণ ইত্যাদি ভোজনকারী পশু আপন পালকের নিকট সুন্দররূপে প্রতিভাত হয়, তেমনই আজ্য ইত্যাদির দ্বারা তোমাকে পুষ্ট করণশালী যজমানের নিকট তুমি দর্শনীয় হয়ে থাকো। এমন কি তুমি স্তুত্য তুল্য হয়ে বিপ্রস্য অর্থাৎ মেধাবী যজমানের প্রশংসা পূর্বক তার নিবেদিত হবিঃ ভক্ষণ করে বহু কাম বা দেববর্গ সমভিব্যাহারে আগমন করে থাকো। (এইরকম করায় তুমি যজমানের সাথে সদা রমণীয় সম্বন্ধযুক্ত)। ২।
হে অগ্নি! তুমি (দ্যাব-পৃথিবীরূপ) পিতা-মাতার নিকট তোমার তেজুঃ উদীরিত (প্রেরিত) করো, যেমন রাত্রির জার (অর্থাৎ উপপতি) স্বরূপ আদিত্য দ্যাবাপৃথিবীতে আপন ভজনীয় আলোক (প্রকাশ) প্রেরণ করেন। যজমান যে দেবগণের উদ্দেশে যাগানুষ্ঠানের ইচ্ছা করেন, কমনীয় (হর্যতো) অগ্নি হৃদয় হতেই (অর্থাৎ স্বেচ্ছান্বিত হয়ে বা স্বতঃপ্রবৃত্ত ভাবে) তাদের যাগানুষ্ঠানে ইচ্ছা করেন। হবিঃবহনকারী (বহ্নি–হবিষাং বোঢ়াগ্নি), যজ্ঞসাধনকারী (মখসাধন) বা পূজনীয় অগ্নি শোভন কর্ম-সাধনে অভিলাষী যজমানকে বলে থাকেন যে, তিনি সেই তাঁকে তার অভিলষিত ফল দান করবেন। বৃদ্ধিশীল (ভবিষ্যতে) বলবান্ (অসুরঃ) অগ্নি যাগের নিমিত্ত আগমন করে থাকেন ৷ ৩৷৷
হে অগ্নি! তোমার (অনুগ্রহলক্ষণ) শোভনা বুদ্ধি সম্পর্কে মরণধর্মা মনুষ্য (অর্থাৎ যজমান) অন্যকে বলে থাকেন। (অর্থাৎ স্বয়ং প্রাপ্ত হয়–এটাই বক্তব্য)। হে বলের পুত্র (অর্থাৎ বলের দ্বারা মথ্যমান হয়ে জাত) অগ্নি! তোমার অনুগ্রহপ্রাপ্ত যজমান সর্বতঃ প্রকর্ষের দ্বারা শ্রুত হন (অর্থাৎ প্রসিদ্ধি লাভ করেন)। তিনি অন্ন, অশ্ব ইত্যাদির দ্বারা সংযুক্ত হয়ে চিরকাল ব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকেন। ৪।
হে অগ্নি! তুমি এই দেব-স্থানে অর্থাৎ যজ্ঞ-গৃহে আমাদের আহ্বান শ্রবণ করো। তার নিমিত্ত অমৃতের (অর্থাৎ জলের) দ্রাবক রথকে সেই দেবতাগণের নিমিত্ত সংযোজিত করে। এবং আমাদের নিমিত্ত দেবপুত্রগণের পিতামাতারূপী আকাশ ও পৃথিবীর (রোদসীর) অধিষ্ঠাত্ দেব-দেবীকে যজ্ঞার্থে আনয়ন করো। কিন্তু সেই দেবসঘের সাথে তুমি যেন অপগত হয়ো না, পরন্তু আমাদের এই যাগগৃহে এমনই অবস্থান করো। (অর্থাৎ সর্বকর্মার্থে সর্বদা সন্নিহিত থাকো)। ৫৷৷
হে যজত্র (অর্থাৎ যাগযোগ্য) অগ্নি! যখন দেবগণের মধ্যে (দেবেষু মধ্যে) পূজনীয়া দেবসম্বন্ধিনী বা দীপ্তা সংহতি (সমিতি) হয় (অর্থাৎ দেবগণ যখন সকলে সম্মিলিত হন), এবং হে অন্নবান্ (স্বধাবঃ) অগ্নি! যখন তুমি স্তোতৃগণের মধ্যে রমণীয় ধনসমূহ (রত্ন) বিভাজিত করে দাও, সেই কালে আমাদেরও প্রভূত ধনযুক্ত (বসুমন্তং) ভাগ প্রদান করো। ৬।
নিত্যে উষাকালের পূর্বেই প্রথম (মুখ্য) এই জাতবেদা অগ্নি সূর্য, উষা (উষসসা), রশ্মিরাশি (রশ্মীননু) ও দ্যাব-পৃথিবীতে প্রবিষ্ট হন (আ বিবেশ) ৭
সর্ব দেবতা ও মনুষ্যের আশ্ৰয়ত্ব ও সকলের উপকারত্বের নিমিত্ত স্তুতিরূপা সত্যস্বরূপা বাণী (বাক)-র দ্বারা দ্যাবাপৃথিবী সকলের শ্রবণযোগ্য হন; যখন দ্যোতমান অগ্নি মনুষ্যগণ কর্তৃক অনুষ্ঠিতব্য যাগের হোতা অর্থাৎ হোমনিস্পাদক দেববৃন্দের আহ্বাতা হয়ে যজমানের অভিমুখে আপন প্রজ্ঞা অর্থাৎ যাগসম্পর্কিত বল বা জ্বালালক্ষণ দীপ্তি প্রকাশ পূর্বক অবস্থান করে থাকেন। ৮-৯।
হে অগ্নিদেব! তুমি দ্যোতমান (প্রকৃষ্টজ্বালস্তং) হয়ে ঋত অর্থাৎ যজ্ঞের দ্বারা যাগযোগ্য দেবতাগণকে আপন অধীন করে (পরিভূঃ), মুখ্যরূপে (প্রধানরূপে), এঁদের মধ্যে যাঁরা যাগের যোগ্য, সেই কথা জ্ঞাত হয়ে আমাদের নির্বপিত হবিঃ সেই দেবগণের নিকট উপস্থাপিত করো। (এই অগ্নি বহুধা প্রশংসিত হয়ে থাকেন, যেমন–) তুমি ধূমকেতু অর্থাৎ ধূমের দ্বারা প্রজ্ঞায়মান, সমিধা অর্থাৎ সমিন্ধন সাধনের দ্বারা ভাসমানদীপ্তি, মন্দ্র অর্থাৎ মন্দ্র (স্বয়ং) আনন্দপূর্ণ বা (অপরকে) আনন্দিতকারী, হোতা অর্থাৎ দেবগণের আহ্বা, নিত্য অর্থাৎ অবিনাশী বাঁচা অর্থাৎ স্তুতিরূপ বাক্যে যজীয়া বা অতিশয় যষ্টা। (তুমিই যজ্ঞে আহুত দেবতা, আবার তুমিই যজ্ঞে আহুত দেবগণের যাগকারী)। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে ধৃত (অর্থাৎ উদকের সারভূত) দ্যাবাপৃথিবী! আমি তোমাদের কর্মের অভিবৃদ্ধির নিমিত্ত স্তুতি করছি (অৰ্চামি)। হে রোদসী (পিতা আকাশ ও মাতা পৃথিবী)! সকল প্রাণীকে নিরোধ করার নিমিত্ত (রোধয়িত্ৰেী) অথবা বৃষ্টিফলগুলি প্রতিবন্ধ করে সকল প্রাণীকে রোদন করানোর কারণে (রোদয়িত্মেী) তোমরা আমার স্তুতিবাক্য শ্রবণ করো। যখন ঋত্বিকগণ (স্তোতাগণ) যজ্ঞের নিমিত্ত স্বকীয় বল অর্জনে অগ্রসর হবেন, তখন তোমরা (পিতা-মাতা স্বরূপ দ্যাবাপৃথিবী) মধুময় জল প্রদান পূর্বক আমাদের বৃদ্ধিসাধন বা সংস্কার কোরো (শিশীতাং) ॥১॥
দ্যোতমান অগ্নির রশ্মি হতে যখন অমৃতবৎ উপকারক জল সকল প্রাণীর নিমিত্ত সুষ্ঠুভাবে আবর্জিত (আহৃত) হয়, তখন সেই অমৃতময় বৃষ্টিজলের দ্বারা উৎপাদিত (তিল-ব্রীহি ইত্যাদি) ঔষধিসমূহকে দুলোক ও ভূলোক ধারণ করে থাকে। অধিকন্তু, হে অগ্নি! তোমার শ্বেত-দ্বীপ্তি (এনি) দিবিলোক হতে ক্ষরিত হয়ে সর্বলোকের আচ্ছাদক জল দোহন করে, তখন সকল দেবতা তোমার যজুঃ নামে অভিহিত সেই কর্মজনিত জলের অনুগমন করে থাকেন। (অথবা–যজুঃ শব্দের অর্থ এই স্থানে দান ধরলে–তোমার সেই উদকবিষয়ক দান সকল দেবগণের স্তোতা ঋত্বিকগণকে অনুগমন করে)॥ ২॥
দেবতাগণের (দেবেযু) মধ্যে ক্ষত্রিয়জাতি (অর্থাৎ ক্ষত্রিয়বলসম্পন্ন) (রাজা) যম কি কখনও আমাদের হবিঃ গ্রহণ করেন? কে জানে, (কো বি বেদ), কখন (কদা) যমের প্রীতিকর নিত্যনৈমিত্তিকরূপ কর্ম (যমস্য প্রীণনং ব্রতং) আমরা অতিক্রম করে ফেলেছি (অতিক্ৰমং কৃতবন্ত স্মঃ)। যম-বিষয়ক অপরাধ পরিহারের নিমিত্ত দেবতাগণের আহ্বানকারী (জুহুরাণঃ), মিত্রবৎ হিতকরী অগ্নি বিদ্যমান আছেন (অগ্নির্বিদ্যতে)। আমাদের রক্ষার নিমিত্ত স্তুতি (শ্লোকঃ) ও হবিও (বাজঃ অর্থাৎ হবিলক্ষণ অন্নও) বিদ্যমান আছে। (তার দ্বারা অগ্নিকে পরিতোষিত করে যমের নিকট আমাদের অপরাধ পরিহার করবো–এটাই অভিপ্রায়) ॥ ৩৷৷
(পূর্ববর্তী ১ম ও ২য় সূক্তে উল্লেখ মতো) যমের নিকট যমীর সম্ভোগ প্রার্থনা-বিষয়ে যে নিন্দাসূচক কথা (দুর্মন্তু) আছে এবং যে ব্যক্তি (তা নিরাকরণের নিমিত্ত) যমরাজের উদ্দেশে স্তুতিবাক্য প্রয়োগ করে (সুমন্তু), হে দর্শনীয় অগ্নি (ঋ)! তুমি সেই হেন স্তোতাকে বিস্মৃত হয়ো না (অপ্রযুচ্ছ); তাকে রক্ষা করো (পাহি) ॥ ৪।
যজ্ঞনিবৰ্ত্তকত্বের নিমিত্ত প্রসিদ্ধ যে অগ্নির বিদ্যমানে (ইন্দ্র ইত্যাদি) দেবগণ যজ্ঞে প্রমোদ লাভ। করেন (মাদয়ন্তে) এবং যার কারণে মনুষ্যগণ সূর্যলোকে (বিবস্বতঃ সদনে) কর্মফল উপভোগ পূর্বক সুখে অবস্থান করে (অবতিষ্ঠন্তে), বা যে অগ্নির দ্বারা দেবগণ সূর্যে (ত্রিলোককে প্রকাশকারী) তেজঃ (জ্যোতিঃ) স্থাপিত করেন (অদধুঃ) এবং তমোনিবর্তক রশ্মিগুলিকে (যে অগ্নির নিকট হতে আহরণ পূর্বক) চন্দ্রে স্থাপন করেন, সেই দ্যোতমানের (অগ্নির) চতুর্দিকে (চন্দ্র-সূর্য) সতত পরিভ্রমণ করছেন (অর্থাৎ পূজা করছেন)। ৫৷
বরুণ নামক দেবতার যে অন্তর্হিত স্থানে (অপীচ্যে) দেবগণ সঞ্চরণ করে থাকেন, তা আমরা বিদিত নই (ন বয়ং বিদ্য)। হে অগ্নি! অন্তর্হিতস্থানে স্থিত (সেই দেবসঞ্চারাস্পদে) বরুণের নিকটে সবিতাদেব, দেবমাতা অদিতি, ও মিত্রদেব–এঁরা প্রত্যেকে তোমার অনুগ্রহে আমাদের নির্দোষিতা সম্পর্কে (অস্মন্ অনাগা বলুন (বোচৎ)। ৬।
হে সখাগণ (পরস্পর প্রেমবন্ত আমরা)! (অতিশয় বীর্যত্বের নিমিত্ত) বজ্ৰী নামে অভিহিত ইন্দ্রের সমর্থ কর্ম সম্পাদনের আশা করি। সকল দেবগণের মধ্যে মুখ্য (নৃতমায়), শত্রুবর্গের ধর্ষক (ধৃষ্ণবে) ইন্দ্রদেবের প্রীতির উদ্দেশে আমরা স্তুতি করছি (স্তষে)। ৭৷৷
(পূর্ব মন্ত্রে বজ্রধারী ইন্দ্রের উল্লেখ করা হয়েছে, এইবার তার মহত্ত্ব বর্ণনা প্রসঙ্গে আপন অভিমত প্রার্থনা করা হচ্ছে)।–হে ইন্দ্র! তুমি বৃত্রের হন্তা (বৃত্ৰহা)। তুমি বলবান্ অসুরগণের বিনাশ-করণরূপ সামর্থ্যের নিমিত্ত বিখ্যাত (তঃ)। হে শূর (বিক্রান্ত)! তুমি বহু রকমের ধনে ধনবান; তুমি আমাদের সেই ধন অতিরিক্ত প্রদান করো। (অর্থাৎ সেই ধন-প্রার্থনায় আমরা তোমার উদ্দেশে যাগ করছি–এটাই বক্তব্য)। ৮।
বর্ষাকালে মণ্ডুক (স্তেগঃ) যেমন সমগ্র পৃথিবীব্যাপী (লম্ফ প্রদান পূর্বক) ভ্রমণ করে, সেইভাবে মহান্ বায়ু (বাতা) (অগ্নির সহায়তায় আমাদের সুখের নিমিত্ত) এই ভূমিতে প্রবাহিত হোন। মিত্র (অর্থাৎ সকল প্রাণীর মিত্রভূত) দেবতা এবং বরুণ দেবতাও অগ্নি যেমন বনে তৃণগুল্ম ইত্যাদি দহন করে, সেই রকমে এই কর্মে যুক্ত হয়ে (অস্মিন্ কর্মণি যুজ্যমানঃ সন) আমাদের শোক নাশ করুন (ব্যসৃষ্ট) ॥৯॥
(এই স্থানে স্তোতা নিজেকে নিজেই অগ্নিরূপধারী রুদ্রের স্তুতি করণের নিমিত্ত উদ্বোধিত করছেন)–হে স্তোতা! তুমি সেই শ্মশানসঞ্চারী (নিরুক্ত মতে গর্ত অর্থে শবদাহপ্রদেশ, সুতরাং গর্তসদ অর্থে শ্মশানবাসী বা শ্মশানবিহারী), (কিরাত-পিশাচ ইত্যাদি) জনগণের স্বামী (রাজানং), ভয়জনক (ভীমং), হন্তারক (উপহতুম), উদঘূর্ণ-বলশালী (উগ্রং), মহানুভাব রুদ্রের স্তুব করো। স্বসেবক আমাদের দুঃখ বা দুঃখহেতুভূত পাপসমূহকে বিতাড়নকারী, হে রুদ্র! আমাদের দ্বারা স্কৃয়মান হয়ে আমাদের সুখ (মৃড়) প্রদান করো। তোমার সেনাগণ আমাদের ব্যতিরেকে তোমার অন্য দ্বেষকারীগণের প্রতি গমন করুক ॥ ১০
বঙ্গানুবাদ –মৃতদেহের সংস্কার-করণশালী পুরুষ অগ্নির (অর্থাৎ চিতাগ্নির বা যমের) নিমিত্ত অভিলাষী হয়ে বাগদেবতা সরস্বতীর আহ্বান করে থাকেন (অর্থাৎ প্রীত করে থাকেন) এবং (জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি) যজ্ঞেও সরস্বতী দেবীকে আহূত করে থাকেন। সেই দেবী সরস্বতী সুকর্মশীল হবিদাতা যজমানকে অভিলষিত পদার্থ প্রদান করুন ॥১॥
বেদীর দক্ষিণভাগে ব্যাপ্ত (বা প্রতিষ্ঠিত) পিতৃগণও দেবী সরস্বতাঁকে আহ্বান করেন। হে পিতৃগণ! তোমরা এই যজ্ঞস্থলে উপবেশন পূর্বক (আমাদের প্রদত্ত স্বধায়) তৃপ্তি লাভ করো। হে সরস্বতী! তুমি পিতৃগণ কর্তৃক আহূত হয়ে (রাক্ষস ইত্যাদি বর্জিত বা) ব্যধিরহিত অন্নসমূহ আমাদের প্রদান করো (বা আমাদের মধ্যে স্থাপন করো)। ২৷৷
হে সরস্বতী দেবী! তুমি উথ-রূপ শস্ত্র ও পিতৃগণের উদ্দেশে নিবেদিত স্বাধা-রূপ অন্নে নিজেকে তৃপ্ত করে পিতৃগণ সমভিব্যাহারে একই রথে আগমন করছো। তুমি অনেক ব্যক্তি ও পুত্র ইত্যাদিকে তৃপ্ত করণশালী অন্নের ভজনীয় অংশ এবং (গো-ইত্যাদি লক্ষণ) ধনের পুষ্টি আমি হেন যজমানকে প্রদান করো ৷ ৩৷৷
অবরে অর্থাৎ (বয়সোচিত কারণে নিকৃষ্ট বা কনিষ্ঠ) পুত্র-পৌত্র-প্রপৌত্র ইত্যাদি, পরাস অর্থাৎ (বয়সোচিত কারণে পর বা শ্রেষ্ঠ) বৃদ্ধপ্রপিতামহ ইত্যাদি এবং মধ্যম অর্থাৎ (কনিষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠের মধ্যবর্তী) পিতৃ-পিতামহ-প্রপিতামহ ইত্যাদি,-সোমযাগের যোগ্য বা সম্পাদক তোমরা সকলে উত্তিষ্ঠিত হও। (তপঃ ইত্যাদির তারতম্যের দ্বারা অবর-পর-মধ্যমত্ব লক্ষণে. পুরুষগণের বিভাগ করা হয়েছে)। যাঁরা প্রাণোপলক্ষিত লিঙ্গশরীর প্রাপ্ত হয়েছেন, যাঁরা অহিংসক, যাঁরা সত্যবিদ, সেই পিতৃগণ এই আহ্বানে আমাদের রক্ষা করুন। ৪
আমি সুবিদত্রান অর্থাৎ কল্যাণরূপ ধনে ধনী পিতৃগণকে অভিমুখে প্রাপ্ত হয়েছি বা জ্ঞাত হয়েছি, যজ্ঞ-নির্বাহক অগ্নিকে প্রাপ্ত হয়েছি বা জ্ঞাত হয়েছি এবং সবন-ত্রয়ের ক্রম (সবনত্রয়াক্রমণং) প্রাপ্ত হয়েছি বা জ্ঞাত হয়েছি। (সবন অর্থে যস্নান বা সোমরস-পান)। বহিষদ নামক যে পিতৃবর্গ স্বধার সাথে অভিযুত সোম পানের অভিলাষী, তারা (আমাদের এই যজ্ঞে বা আমাদের নিকটে) আগমন করুন। ৫৷৷
যাঁরা পূর্বে (অর্থাৎ প্রথমে) পিতৃলোক প্রাপ্ত হয়েছেন এবং যাঁরা পরে (পিতৃলোকে) গমন করেছেন, যাঁরা পৃথ্বীলোকে স্থিত (নিষত্তা) আছেন এবং যারা ইদানীং সুষ্ঠুভাবে বিভক্ত হয়ে (পূর্ব ইত্যাদি) দিকে স্থিত আছেন–সেই সকল পিতৃগণের উদ্দেশে এই নমস্কার জ্ঞাপিত হচ্ছে। (তেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ পিতৃভ্যঃ ইদং নমোস্ত) ৷৷ ৬ ৷৷
মাতলী নামক দেবতা, যিনি পিতৃগণের নেতা, তিনি পিতৃগণের সাথে যজমান কর্তৃক প্রদত্ত এই হবির দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছেন। যম নামক দেবতা, যিনি পিতৃগণের নেতা, তিনি অঙ্গিরা ইত্যাদি পিতৃগণের সাথে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হচ্ছেন। বৃহস্পতি দেবতা, যিনি দেবগণের নেতা, তিনিও ঋক নামক অর্চনীয় পিতৃগণের সাথে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হচ্ছেন। মাতলী প্রমুখ যে দেবগণ যজ্ঞে পিতৃবর্গের বর্ধন সাধন করছেন এবং যে পিতৃগণ কব্য বা স্বধা প্রদানের দ্বারা দেবগণের বৃদ্ধি সাধন করছেন, সেই নির্দিষ্ট পিতৃগণ (সকলে) আমাদের আহ্বানে আমাদের রক্ষা করুন। (অস্মন্ হবে অবন্তু)। ৭
এই অভিযুত সোম স্বাদু (অর্থাৎ সুখের সাথে আস্বাদ্য); এই সোম মধুমান (অর্থাৎ মাধুর্যোপেত); এই সোম আশু (তীব্র) মদয়িতা (অর্থাৎ বহু মদকর রসোপেত)। এই সোম-পীতবন্ত ইন্দ্রকে (পরস্পর আহ্বানবৎ) সংগ্রামে কেউ (অর্থাৎ কোন অসুর ইত্যাদি) অভিভব করতে পারে না (ন সহতে)। ৮৷
অত্যন্ত বিপ্রকৃষ্ট দেশে গতবন্ত (অর্থাৎ সকল ভূমি অতিক্রম পূর্বক বর্তমান), পিতৃলোকে গমনের বহু মার্গ অবগতশীল, মৃত-জনগণের প্রাপ্তিস্থানভূত বৈবস্বত (বিবস্বানের পুত্র) রাজা যমকে হবির দ্বারা পূজা করো (হবিষা সপত)। ৯৷
যমদেব আমাদের সম্বন্ধীয় মৃতজনের গমন মার্গ প্রথমে জ্ঞাত হয়ে থাকেন; যমের পদ্ধতি (গন্যূতি), মৃতের গন্তব্য মার্গ দেবতা বা মনুষ্য পরিহার করতে সক্ষম হন না। (কারণ অত্মসাক্ষাত্রহিত অর্থাৎ পরমাত্মজ্ঞানহীন পুরুষের পক্ষে আপন কর্মফল ভোগের নিমিত্ত পিতৃলোক অবশ্য প্ৰাপণীয়)। যে মার্গে আমাদের পূর্বভাবী পিতৃগণ গমন করেছেন, এবং পরে যে মার্গে পুনরায় প্রত্যাগমন করে (অর্থাৎ পুনরায় জাত হয়ে) আপন আপন কর্মানুরোধিণী হিতকরী (পথ্য) ভূমি লাভ করেছেন, সেই সবই যমরাজ জ্ঞাত থাকেন ৷৷ ১০৷৷
টীকা –পুর্বেই উল্লিখিত হয়েছে–অষ্টাদশ কাণ্ডের চারটি অনুবাকের সকল মন্ত্রই পিতৃমেধে নানাভাবে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। এই প্রথম অনুবাকের প্রথম চারটির বিনিয়োগ পুর্বেই উক্ত হয়েছে। উপযুক্ত পঞ্চম সূক্তের প্রথম তিনটি মন্ত্রের দ্বারা পিতৃমেধকর্মে অগ্নিদাতা কনিষ্ঠ পুত্র কর্তৃক চিতার দক্ষিণ পার্শ্বে আজ্যের দ্বারা সারস্বত হোম করণীয়। চতুর্থ (উদীরং) মন্ত্রে শব্দহন স্থানে কাস্পীল্যশাখা উধৃত পূর্বক প্রেক্ষণ করণীয়। (কৌ. ১১/১)। পিণ্ডপিতৃযজ্ঞেও এই মন্ত্রে গর্ত খননীয়। (কৌ. ১১/৮)।…ইত্যাদি ॥ (১৮কা, ১অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –যজ্ঞে সমাগত হে বহিষদ (অর্থাৎ দুর্ভে বা কুশে আসীন) পিতৃগণ! আমাদের রক্ষার নিমিত্ত আমাদের সম্মুখে আগমন করো। এই হবিঃ তোমাদের নিমিত্ত আমরা প্রস্তুত করেছি, তোমরা এটি সেবন করো (জুষধ্বং)। এবং আমাদের সুখতম রক্ষার সাথে আগমন করে (অর্থাৎ আমাদের ক্লেশলেশরহিত করে) ব্যাধি ও শমনের ভয় হতে (অর্থাৎ পাপ হতে) রক্ষা করো। (অপাপং যথা ভবতি তথা দধাত)। ১।
হে পিতৃগণ! তোমরা সকলে জানুপ্রদেশ আকুঞ্চিত করে (অর্থাৎ ভোজনের উপযুক্ত হাঁটু মুড়ে) বেদীর দক্ষিণ ভাগে উপবিষ্ট হয়ে আমাদের দীয়মান এই পুরোবর্তী হব (হবিঃ) গ্রহণ করো। হে পিতৃবর্গ! আমাদের অল্প বা বিরাট কোনও অপরাধের (অর্থাৎ কর্তব্য বিষয়ের অতিক্রম জনিত ত্রুটির কারণে আমাদের হিংসা করো না; কারণ মনুষ্য স্বভাব বশতঃ আমাদের অপরাধ হওয়া অসম্ভব নয়। ২
ত্বষ্টাদেব (যিনি সিঞ্চিত বীর্যকে পুরুষ ইত্যাদি আকৃতিতে রূপান্তরিত করণশালী, তিনি) আপন দুহিতা সরণুর সাথে বিবস্বানের বিবাহ দিয়েছিলেন, এবং তা দর্শনের নিমিত্ত সকল ভূতজাত (ভুবনং) সমবেত (সমেতি অর্থাৎ সঙ্গীত) হয়েছিল। যমদেবের মাতা সরণু (যমের জন্মের পরেই) (বিবস্বানের অতিশয়িত প্রভা বা তেজঃ সহ্য করতে অপারগ হয়ে) বিবস্বানের নিকট হতে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন (ননাশ)৷ ৩৷৷
(এই মন্ত্রের বিনিয়োগে যেন প্রেতকে শকটের প্রতি অথবা যমলোকের প্রতি গমন করানো বা প্রেরণ করা হচ্ছে)–হে প্রেত (মৃতের আত্মা)! তুমি গমন করো গমন করো (প্রেহি প্রেহি)। (শকটের দিকে অথবা যমলোকের প্রতি গমন করো–বোঝানোর নিমিত্ত দুবার প্রেহি)। যে যানে বা যে মার্গে মনুষ্য বা তোমার পিতৃপিতামহ ইত্যাদি পিতৃলোক প্রাপ্ত হয়েছেন (পরেতাঃ), সেই পথে বা যানে গমন করো। তথায় দেবগণের মধ্যে উভয় (উভা) অর্থাৎ দুজন ক্ষত্রিয় জাতীয় রাজা আমাদের প্রদত্ত স্বধায় (অর্থাৎ স্বধা গ্রহণ করে) হৃষ্ট হয়ে বিরাজমান আছেন (মদন্তৌ বিদ্যেতে)। সেই লোকে যমদেব ও বরুণদেবকে প্রত্যক্ষ করবে; (অতএব প্রেহি প্রেহি)। (উল্লেখ্য–তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে, ৩১।২।১১ ও ৩৭/৭/৬, বলা হয়েছে–যমো রাজা, বরুণণা রাজা)। ৪
হে রাক্ষস-পিশাচ ইত্যাদি! তোমরা এই (দহন)-স্থান হতে বিশেষ ভাবে দূরে গমন করো (রি সর্পত)। এই স্থলে তোমরা যারা পূর্বতন (অর্থাৎ পূর্বস্থ) এবং যারা ইদানীন্তন (অর্থাৎ সাম্প্রতিক স্থিত) তারা সকলে অপগত হও। (তে সর্বে অপেতেতি সম্বন্ধঃ)। এই প্রেতকে ক্ষালনসাধন উদকের দ্বারা (অদ্ভিঃ) দিবায় এবং অভিব্যক্তিসাধন উদকের দ্বারা রাত্রিকালে যমদেব সুবিশদ (ব্যক্তং) অবসান প্রদান করেছেন; সেই জন্য তোমরা অপগমন করো। (তদর্থং অপেতেতি সম্বন্ধঃ)। ৫।
হে অগ্নি! এই পিতৃযজ্ঞকে নির্বাহ করণের নিমিত্ত (উশন্তঃ) তোমার প্রতি কাময়মান হয়ে তোমাকে আহ্বান করছি। কাময়মান হয়ে আমরা তোমাকে সম্যক্ প্রজ্বলিত করছি (সমিধীমহি)। এবং যজ্ঞ (উশন) (বা স্বধা) কামনা পূর্বক তুমি হবিঃ স্বীকার করে তা ভক্ষণের নিমিত্ত স্বধা-কামনাকারী (উশতঃ) পিতৃপুরুষগণ সমভিব্যাহারে আগত হও ৷ ৬ ৷
হে অগ্নি! তোমার অনুগ্রহে দীপ্তিমন্ত (দ্যুমন্ত, অর্থাৎ অতিশয় তেজস্বী) আমরা তোমাকে আহ্বান করছি। দ্যুতিমান্ (দ্যুমা) তুমি, স্বয়ং হবিঃ স্বীকার করো এবং সেই হবিঃ ভক্ষণের নিমিত্ত স্বধা-কামনাকারী আমাদের দীপিত (দ্যুমত) পিতৃপুরুষগণ সমভিব্যাহারে আগত হও॥৭॥
প্রাচীন অঙ্গিরা প্রভৃতি (অঙ্গারাত্মক) মহর্ষিগণ ও নূতন স্তোত্রশালী (নবঘা) অথবা ও ভৃগুগণ আমাদের পিতৃপুরুষ (অথবাণশ্চ নঃ পিতরঃ ভৃগবশ্চ নঃ পিতরঃ)। এঁরা সকলে সোম সম্পাদক (সোম্যাসঃ সোমাই)। (এই অঙ্গিরা প্রভৃতি ঋষিগণের মধ্যে প্রাধান্যবশতঃ ইদানীন্তন অথবা, ভৃগু প্রভৃতিও তাদের গোত্রত্বের কারণে পিতৃপুরুষ-রূপে গৃহীত)। যজ্ঞাহ (যজ্ঞিয়ানাং) তাঁদের অনুগ্রহরূপ বুদ্ধি (সুমতৌ, শোভন মতি) আমরা স্থিত হববা (স্যাম)। তাদের কল্যাণে (ভদ্রে) তাদের প্রসন্নতা (সৌমনসে) আমরা লাভ করবো॥ ৮
হে যম! আমাদের এই কর্মে অঙ্গিরা ইত্যাদি যজ্ঞায় পিতৃগণ সহ আগত হও এবং বিরূপ নামে আখ্যাত (বৈরূপৈঃ) মহর্ষির। গোত্রসস্তৃতগণের সাথে (এই যজ্ঞে আগত হয়ে) সন্তোষ লাভ করো (মাদয়স্ব)। অধিকন্তু (শুধু তোমাকেই নয়) তোমার যে পিতা বিবস্বান (আদিত্য, বিবস্বন্তং), তাঁকেওঁ আহ্বান করছি (হুবে)। তিনি এই কুশের আসনে (বহিষ্যা) উপবেশন করুন। (অর্থাৎ আমাদের প্রদত্ত হবিঃ স্বীকার করুন। ৯।
হে যম! অঙ্গিরা প্রভৃতি পিতৃগণের সাথে সহমত হয়ে সম্মুখে বিস্তারিত এই কুশ রচিত আস্তরণে (প্রস্তরমা) উপবেশন করো (আ সীদ)। হে রাজন্ (যম)! ক্রান্তপ্রজ্ঞ মহর্ষিগণের (কবিশস্তা) স্তুত মন্ত্রসমূহ তোমার আগমনের নিমিত্ত আহ্বান করুক (আ বহন্তু)। তুমি আমাদের হবিঃ প্রাপ্ত হয়ে সন্তুষ্ট হও। (হবিষা অস্মাভিদত্তেন মাদয়স্ব)। ১০।
শবসংস্কার-কতা পুরুষগণ এই মৃতশরীর (এতৎ) ভূপ্রদেশের পৃষ্ঠ হতে (ভূমি থেকে) উর্ধ্বে শকটে বা শয়নে স্থাপন করেছে। অনন্তর দ্যুলোকের পৃষ্ঠস্থ উপরিতন ভোগ্যস্থানসমূহের পথে আরোহণ করাবে (আরোহয়ন্নিতি, তাহ), যে পথে ভরণবন্ত অর্থাৎ পোষণকারী (ভূর্জয়ঃ) বা ভুবন-জয়কারী (ভুবং জিতবন্ত) অঙ্গিরাগণ যে পথে গমন করে দ্যুলোক (স্বর্গ) প্রাপ্ত (যযুঃ) হয়েছেন। ১১
বঙ্গানুবাদ –সোমযাগে (অর্থাৎ জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞে) যমদেবতার উদ্দেশে সোম অভিযুত হচ্ছে (পবতে)। ঘৃত ইত্যাদির দ্বারা উৎপাদিত হবিঃ সংস্কারের দ্বারা যমকে প্রদান করা হচ্ছে। স্তোত্র, শস্ত্র ইত্যাদির দ্বারা সুশোভিত (অরস্কৃত) হবির বাহক অগ্নি (বা অগ্নিদূত) এই হবিঃ বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞ যমের উদ্দেশে বাহিত হচ্ছে। (যম হলেন সর্বপ্রাণিসংহর্তা বা পিতৃলোকাধিপতি। অতএব হবি তার প্রাপ্য হলে সকল দেবতারই প্রাপ্য হয়)। ১।
হে যজমানবৃন্দ! যমের উদ্দেশে মধুময়োত্তম সোম আজ্য (ঘৃত ইত্যাদি) আহুতি রূপে প্রদান করো, তার উদ্দেশে যজ্ঞ সমাপ্তি (প্রতিষ্ঠা) করো। পূর্বজাত বা পূর্বপুরুষ পথিকৃৎ (মন্ত্রদ্রষ্টা) অঙ্গিরা ইত্যাদি ঋষিবৃন্দের (যাঁরা প্রথম স্বর্গমার্গ প্রদর্শন করিয়েছেন, তাদের) উদ্দেশে নমস্কার প্রজ্ঞাপন করো। ২।
হে যজমানবৃন্দ! ঘৃত-সম্পন্ন ক্ষীররূপ হবি (অর্থাৎ হবিরূপে সংস্কৃত করে) রাজা যমের উদ্দেশে অর্পিত করো। সেই হবি প্রাপ্ত হয়ে দেবতা যম আমরা যারা জীবিত আছি তাদের মনুষ্যগণ-মধ্যে রক্ষা করুন এবং শতসম্বৎসর-লক্ষণ আয়ু (অর্থাৎ দীর্ঘ জীবন) প্রদান করুন ৷ ৩৷
হে অগ্নি! এই প্রেতকে তুমি অতিরিক্ত ভাবে দগ্ধ করো না (বিদহহ), অতিরিক্ত শোকযুক্ত করো না; এর শরীর হতে ত্বক বিচ্ছিন্ন করো না। (অর্থাৎ ত্বগভেদ করো না)। যখন তুমি এই হবির্যোগ্য শরীরকে পঙ্কন (শৃতং) করো, হে জাতবেদা! তখন এর রক্ষার নিমিত্ত পিতৃগণকে প্রদান করো (বা তাদের নিকট প্রেরণ করো)। ৪
হে জাতবেদা (অর্থাৎ প্রাপ্তহবিলক্ষণধন অগ্নি)! যখন তুমি এই হবি-রূপ শরীরকে পঙ্কন করো, তখন একে দাহের দ্বারা সংস্কৃত এই পুরুষকে পিতৃগণের সকাশে রক্ষার নিমিত্ত প্রদান করো। যখন এ অসুনীতি অর্থাৎ প্রাণাপহত্রী দেবতাগণের নিকট গমন করবে, তখন সে চক্ষু ইত্যাদি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সূর্য ইত্যাদি দ্যোতমান দেবগণকে প্রাপ্ত হবে ॥ ৫॥
ত্ৰিকদ্রুক (অর্থাৎ জ্যেতিষ্টোম, গোষ্টোম ও আয়ুষ্টোম) যজ্ঞ সাধনের কালে যমের নিমিত্ত সোম অভিযুত হচ্ছে (পবতে)। ছয় উর্বী (অর্থাৎ আকাশ, পৃথিবী, দিবা, রাত্র, জল ও ঔষধি) একমেব মহান্ত (বৃহৎ) যমের উদ্দেশে প্রবৃত্ত হচ্ছে। (অথবা বৃহৎ বা বৃহাতী সহ) ত্রিষ্টুপ, গায়ত্রী ইত্যাদি ছন্দে উপলক্ষিত সকল মন্ত্র যমের বিষয়ীভূত হচ্ছে বা যমের উদ্দেশে অর্পিত হচ্ছে ৷ ৬ ৷৷
হে মৃতক (অর্থাৎ মৃত পুরুষ)! তুমি নেত্রের দ্বারা সূর্যকে প্রাপ্ত হও (অর্থাৎ দর্শন করো); মুখ্য প্রাণের সহায়তায় (আত্মনা) সূত্ৰাত্মা বায়ুর নিকট গমন করো। এইরূপে শরীরের ধারকধর্মা অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের। দ্বারা আকাশ (দিবং), পৃথিবী ও অন্তরিক্ষ লোককে (বা অপপাকে) প্রাপ্ত হও। (অর্থাৎ সেই অন্তরিক্ষস্থায়ী জল তোমার হিতকরী হবে)। তুমি সুলশরীরের দ্বারা সেই স্থানে ইচ্ছামতো উপভোগ্য ব্রীহি যব ইত্যাদি ঔষধিসমূহে প্রতিষ্ঠিত বা প্রবিষ্ট হও। ৭।
হে অগ্নি! এই হন্যমান অজ তোমার ভাগ। তুমি তোমার তেজের দ্বারা একে সন্তপ্ত করো। একে তোমারই দীপ্তির জ্বালা সন্তপ্ত করুক। (এই অজের তাপ ইত্যাদি বিষয়ত্বে প্রেতের অভিমত লোকপ্রাপ্তি আশা করা হচ্ছে)। হে জাতবেদা! তোমার যে প্রাপ্তপশুলক্ষণধন সুখকর (শিবাঃ) তনু আছে, সেই (বিরাট স্বরাষ্ট্র ইত্যাদি) শরীরের দ্বারা এই প্রেতকে সুকৃত বা পুণ্যকৃত লোক (অর্থাৎ পুণ্যাত্মাগণের অধ্যুষিত লোক) প্রাপ্ত করিয়ে দাও ৮.
হে জাবেদা অগ্নি! তোমার শোকপ্রদ (শোচয়ে) ও বেগবতী (রংহয়ে) গতি বা জ্বালারূপ তনুর দ্বারা আকাশ (দিব) ও অন্তরিক্ষ পূর্ণ করে আছে (পৃণাসি); তার দ্বারা তুমি এই গমনশীল (সমৃগ্ধতাং) অজকে ব্যাপ্ত করো (বা প্রাপ্ত হও)। এবং অন্য বা অত্যন্ত সুখকরী (শিবতম) তনু বা জ্বালার দ্বারা তুমি এই প্রেতকে হবির সমান করেই পক্ক করো। ৯.
হে অগ্নি! তোমার হবিরূপে কল্পিত এই প্রেতকে পিতৃলোকস্থানে ত্যাগ করো। তোমার হবি বা আহুতি রূপে এই যে প্রেতকে প্রদান করা হয়েছে এবং আমাদের দ্বারা প্রদত্ত স্বধা সম্পন্ন যে হবি বিচরণ (অর্থাৎ গমন) করছে; এবং সেই প্রেতের অপত্য অর্থাৎ পুত্ৰ আয়ুসম্পন্ন হয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করুক। এই প্রেত শোভন তেজে (সুবৰ্চাঃ) যুক্ত হয়ে পিতৃলোকের অবস্থানোচিত শরীরে আপন শরীর সহ গমন করুক, (বা বিমিশ্রিত হয়ে যাক)। (মন্ত্রের এই পাদে এমনও অর্থ করা যায় যে, এই প্রেতের পুত্র ইত্যাদি অপত্যগণ শোভন, তেজস্বী হোক বা পিতৃবিয়োগ জনিত দুঃখ বিস্মৃত হয়ে তারা শোভনদেহী হোক)। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে প্রেত! তুমি পিতৃলোকে গমনশালী হয়েছে। (সরমা নাম্নী দেবশুনী অর্থাৎ দেব-কুকুরীর) চারিচক্ষুবিশিষ্ট প্রতিটি শবলবর্ণশালী দুই সারমেয়কে (অথবা শ্যাম ও শবল নামক কুকুরদ্বয়কে) সমীচিন বা ঋজু পথে (সাধুনা পথা) অতিক্রম পূর্বক শোভন হবিরূপ অন্নবান্ অথবা জ্ঞানবান্ (সুবিদান) সেই হব্যসম্পন্ন পিতৃগণের নিকট গমন করো, যে পূর্বজ পিতৃগণ পিতৃরাজ যমের দ্বারা তৃপ্তির সাথে বা হর্ষের সাথে (সধমাদং সহ) বিরাজমান আছেন। ১। হে পিতৃগণের প্রভু যম! যমপুরীর রক্ষক রূপে নিযুক্ত চারি-চক্ষুশালী যে দুটি কুকুর পিতৃলোকের গমন পথে অবস্থান করছে, তারা (যমালয়ে) গমনোদ্যত মনুষ্যের দ্রষ্টা (পথিষদী নৃচক্ষসা)। এই প্রেতকে (অর্থাৎ তোমার লোকে গমনশীল এই প্রেতপুরুষকে) রক্ষার নিমিত্ত সেই কুকুরদ্বয়ের নিকট সমর্পণ করো। তোমার লোকে অবস্থানের উদ্দেশ্যে আগমনশীল এই প্রেতপুরুষকে অবিনাশশীল অর্থাৎ রোগ বাধাহীন (স্বস্তীত্যবিনাশিনাম) স্থান বিধান করো (ধেহি) ॥ ২॥
বিস্তীর্ণ বা দীর্ঘ নাসিকাসম্পন্ন (উরুণসৌ), প্রাণীবর্গের প্রাণাপহারক (অসুতৃপৌ), বিস্তীর্ণবলশালী (উদুম্বলৌ), যমের দূতদ্বয় জনগণের প্রাণবিনাশের নিমিত্ত সর্বত্র সঞ্চরণ করছে; সেই দুই দূত সূর্যদর্শনের নিমিত্ত অদ্য আমাদের শরীরে পুনরায় পঞ্চবৃত্তিক (অর্থাৎ পঞ্চেন্দ্রিয়যুক্ত) প্রাণ (অসুং) প্রদান করুক ॥ ৩॥
কোন কোন (একেভ্যঃ) পিতৃপুরুষের (যাঁদের বংশধরগণ ব্রহ্মযজ্ঞকালে সাম গান করে, তাদের) উপভোগের নিমিত্ত সোম নদীরূপে প্রবাহিত হয়ে থাকে; কোন কোন (একে) পিতৃপুরুষ (যাঁদের কুলজাত সন্তানগণ ব্ৰহ্মযজ্ঞকালে যজুর্মন্ত্র পাঠ করে, তারা) ঘৃত বা আজ্য উপভোগ করে থাকেন, (অর্থাৎ তাদের উপভোগের নিমিত্ত আজ্য প্রবাহিত হয়ে আসে); কোন কোন পিতৃপুরুষের নিকট মধুময়। নদী (মধু বা মধুকুল্যা) প্রবাহরূপে শীঘ্র গমন করে থাকে (যাঁদের সন্তানগণ ব্ৰহ্মযজ্ঞার্থে অথর্ব- বেদোক্ত মন্ত্ৰসমূহ অধ্যয়ন করে)। অতএব, হে ম্রিয়মাণ যজমান বা মৃতাবস্থা-প্রাপ্ত প্রেত! তুমিও সেই পূর্বোক্ত পিতৃপুরুষবৃন্দের সকাশে গমন করো। ৪
যে পূর্বপুরুষগণ ঋতসাতা (অর্থাৎ সত্য বা যজ্ঞ সাধিত করেছেন বা যজ্ঞফল সম্ভোগ করেছেন); যে পিতৃপুরুষগণ ঋতজা (অর্থাৎ সত্যের দ্বারা উৎপন্ন বা যজ্ঞজাত); যে পূর্বপুরুষগণ ঋতব্ধ (অর্থাৎ সত্য বা যজ্ঞের বর্ধন-সাধক), যে পুর্বপুরুষগণ তপস্যাযুক্ত এবং তপস্যা হতে উৎপন্ন, সেই অতীন্দ্রিয়ার্থদর্শী ঋষিবৃন্দের নিকট, হে যমবৎ নিয়ত বা পিতৃরাজ যমের দ্বারা নীয়মান প্রেত! গমন করো ॥৫॥
যে (পূর্বজ) জনগণ চান্দ্রায়ন (তপসা) ইত্যাদি কৃচ্ছ্বসাধনে যুক্ত হয়ে পাপের দ্বারা ধর্ষিত হননি (অর্থাৎ অনাধৃষ্য থেকেছেন), যাঁরা যাগ (তপসা) ইত্যাদি সাধনের দ্বারা স্বর্গপ্রাপ্ত হয়েছেন (স্বর্যযুঃ), যাঁরা রাজসূয়-অশ্বমেধ ইত্যাদি মহৎ যজ্ঞ বা হিরণ্যগর্ভ ইত্যাদির উপাসনা করেছেন–হে প্রেত! তুমি তাদের অধ্যুষিত লোকে গমন করো ॥ ৬।
যে (পূর্বজ) বীরবৃন্দ (শূরাসো) যুদ্ধে শত্রুগণকে সম্যক প্রহার করতে করতে দেহত্যাগ করেছেন–হে প্রেত! তাঁরা যে উত্তম লোকে (যেযু) নির্বাসিত হয়েছেন তুমি সেইলোকে গমন করো (বা সেই লোক প্রাপ্ত হও)। ৭
সহস্র বা অনন্ত দৃষ্টিসম্পন্ন (সহস্ৰণীথাঃ) যে ক্রান্তদর্শীগণ (কবয়ে) আদিত্যকে রক্ষা করেছেন (গোপয়ন্তি সূর্য); যাঁরা তপস্যায় নিয়োজিত থেকেছেন। (তপস্বতঃ), যাঁরা তপস্যা হতে জাত হয়েছেন (তপোজা),-হে নিয়ত বা শকটে বদ্ধ বা যমের দ্বারা নীয়মান প্রেত! তুমি সেই ঋষিগণের সকাশে গমন করো ॥ ৮
হে বেদি-রূপিণী পৃথিবী! তুমি অনাধিকা (অনৃক্ষরা) শয়নাহা (নিবেশনী) হয়ে এই মুমূর্য জনের পক্ষে (অর্থাৎ মরণোন্মুখ বা অস্থিরূপ প্রেতের পক্ষে) সুখকরী হও (স্যোনা) এবং বিস্তীর্ণতার সাথে (সপ্রথাঃ) একে সুখ দান করো (শর্ম যচ্ছ)। ৯।
হে মুমূর্ষ বা প্রেত! তুমি অসম্বাধে অর্থাৎ বাধারহিত বিস্তীর্ণ লোকে (উরৌ পৃথিব্যা) স্থাপিত হও (ধীয়স্ব)। তুমি পূর্বে জীবৎকালে পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশে যে অন্ন (স্বধা) দান করেছিলে এবং দেবতাগণের উদ্দেশে যে হবিঃ সমর্পণ করেছিলে, সেই স্বধা তোমার পক্ষে মধুপ্রবাহ ক্ষরণ করুক (মধুঞতঃ)। (অর্থাৎ মধুররসঘৃতসোম ইত্যাদি প্রবাহরূপে তুমি প্রাপ্ত হও ১০
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –পিতৃমেধে অতি দ্রব ইতি অষ্টানাং ঋচাং দহ্যমানতেশরীরোপস্থানে বিনিয়োগ উক্তঃ। তথা এতাভিরষ্টভিদহনদেশং নীয়মানং প্রেতশরীরং অনুমন্ত্রয়েত।–ইত্যাদি৷৷ (১৮কা. ২অ, ২সূ.)।
টীকা –পিতৃমেধে এই সূক্তটির প্রথম আটটি ঋক্ দহ্যমান প্রেতশরীরের উপাসনায় বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। এই মন্ত্রাক্টকের দ্বারা দহনস্থানে নীয়মান প্রেতশরীর অনুমন্ত্রিত হয়। এই মন্ত্রগুলি সঞ্চয়ন কর্ম, অগ্নিহোত্রশালায় দর্ভ আস্তীর্ণ করণ, অগ্নির উত্তর পার্শ্বে প্রেতের শরীর বা শবকে শকট হতে অবতরণ করণ ইত্যাদি কর্মে বিহিত আছে। এই কর্ম দহনস্থানে কর্তব্য। ইত্যাদি ॥ (১৮কা, ২অ. ২সূ.)। .
বঙ্গানুবাদ –হে প্রেতপুরুষ! তোমার সম্বন্ধি অন্তঃকরণকে (মনঃ) আমাদের মনের দ্বারা (মনসা) এই লোকে আহ্বান করছি (হুয়ামি)। আমাদের গৃহে তোমার নিমিত্ত যে ঔধ্বদেহিক কর্ম (উদ্দিশ্য) করা হচ্ছে। তাতে সেবমান বা প্রতিমান হয়ে (জুজুষাণ) আগত হও এবং সংস্কারোত্তরকালে (অর্থাৎ ঔৗঁদেহিক ক্রিয়ার পর) পিতৃ-পিতামহ-প্রপিতামহ (পিতৃভিঃ)-গণের সাথে সপিণ্ডীকরণের দ্বারা সঙ্গত হও, এবং পিতৃলোকাধীশ্বর যমের সাথেও মিলিত হও। পিতৃলোকে গমনকালে তোমার যে পথশ্রম (অধ্বজন্যশ্রম) হয়েছে, তা দূর করার নিমিত্ত নিরন্তর শীতল-সৌরভযুক্ত বা গতিগন্ধমূয় বায়ু (শগ্ম) তোমার সন্নিকটে উপগত হোক (বান্তু) ॥১॥
হে প্রেত! মরুৎ নামক দেবগণ তোমাকে ঊর্ধ্বাকাশে ধারণ করুন (উদ্বহত্ত)। জলধারণকারী, ভূমিকে জলের প্লাবনে আদ্রকারী, শৈত্যগুণবিশিষ্ট মেঘরাশি তোমার সমীপবদ্ধ অজের সাথে অনুকরণ শব্দে (বা) সিঞ্চিত করুক (উক্ষন্তু)। ২।
হে প্রেত! তোমার আয়ুকে উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করছি। (কি জন্য?-না) জীবনের জন্য (আয়ুষে), যজ্ঞ ইত্যাদি কর্মে বলের জন্য (দক্ষায়), বা প্রাণাপান বায়ুর জন্য (ক্ৰত্বে)। তোমার মন স্বকীয় তনু সংস্কারের নিমিত্ত অভিনব শরীরে গমন করুক (নবরূপ লাভ করুক) এবং সেই শরীর প্রাপ্তির পর বসু ইত্যাদিকে উপলক্ষ্য (উপ দ্রব) পূর্বক গমন করুক৷ ৩৷৷
হে প্রেত পুরুষ! তোমার মানসেন্দ্রিয় (মনঃ) যেন তোমাকে পরিত্যাগ না করে (মা হাস্ত)। (অর্থাৎ তোমাতেই যেন বিরাজিত থাকে)। তথা তোমার প্রাণ কোনও রূপে যেন তোমাকে না ত্যাগ করে;, তোমার হস্তপদ ইত্যাদি অবয়ব (অঙ্গানাং) তোমাকে যেন পরিত্যাগ না করে; তোমার রুধির ইত্যাদি (রসস্য)-ও কিছুই কোনভাবে যেন তোমাকে না ত্যাগ করে। এই লোকে তোমার কোন উপাঙ্গও যেন তোমাকে ত্যাগ না করে। (অর্থাৎ লোকান্তরে মন প্রাণ ইত্যাদি সর্বাঙ্গ-সহিত শরীর-যুক্ত হও এটাই বক্তব্য)। ৪
হে প্রেত! তোমার আশ্রয়ভূত বৃক্ষ (অর্থাৎ তুমি যে বৃক্ষের নিম্নে আশ্রয় গ্রহণ করে থাকো) যেন তোমাকে হিংসা বা ব্যথিত না করে (মা সং বাধিষ্ট)। তথা দ্যোতমানা বা দানাদিগুণযুক্তা (দেবী) মহতী (মহী) পৃথিবী (তোমার আশ্রয়ভূতা ভূমি যেন তোমাকে পীড়িত না। করে। এবং সেই পিতৃগণের ঈশ্বর বা রাজা যমের লোক (অর্থাৎ পিতৃদেবগণের অধ্যুষিত লোক) লাভ করে (বিত্ত্বা) বর্ধিত হতে থাকো (এধস্ব) ॥ ৫॥
হে প্রেত! তোমার যে শরীর (অঙ্গং) পরাহূখ হয়ে (পরাচৈ) অতীত (অতিহিত্য) হয়ে গিয়েছিল, সেই শরীরে বর্তমান ছিল যে অপানবায়ু (অপাঃ ), প্রাণবায়ু (প্রাণঃ) এবং চক্ষু-শ্রোত্র ইত্যাদিরূপ অন্য সপ্তপ্রাণ,–যেগুলি তোমার শরীর হতে নির্গত হয়ে গিয়েছে (পরেতঃ), সেগুলি পিতৃদেবতাগণের সাথে সঙ্গত হয়ে ভোগায়তন শরীর হতে (ঘাসাৎ) অন্য ভোজনাধিকরণ শরীর (ঘাসং) পুনরায় প্রাপ্ত হোক (বেশয়ন্তু)। ৬।
জীবন্ত অর্থাৎ প্রাণধারী বান্ধবগণ এই প্রেতশরীরকে (ইমং) গৃহ হতে অপসৃত করুন (অপারুধ)। হে বান্ধবগণ! তোমরা এই মৃতদেহটিকে গ্রাম হতে পরিহার করে নিয়ে যাও (অর্থাৎ গ্রাম হতে নির্গমিত করে নিয়ে যাও)। মারক পুরুষ (মৃত্যু) অর্থাল যমরাজের দূত এই প্রকৃষ্টজ্ঞান বা ম্রিয়মান (প্রচেতাঃ) পুরুষের প্রাণ (অসূন) পিতৃপুরুষগণের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট করানোর উদ্দেশে পরিগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছেন। ৭।
যে উপক্ষয়কারী অর্থাৎ হানিকারক রাক্ষসগণ (দস্যব) জ্ঞাতিবর্গের মুখ (বা মূর্তি) ধরে পিতৃ-পিতামহ-প্রপিতামহের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে অহুত অর্থাৎ লৌকিক অন্ন ভক্ষণ করে বা অহুতাবস্থায় (অর্থাৎ অনাহূত হয়ে) মায়া-প্রভাবে পিতৃপুরুষগণের মধ্যে বিচরণ পূর্বক হবির্ভক্ষণ করে, এবং নিয়মানুসারে পিণ্ডদান ইত্যাদি কর্মকারী পুত্র ও পৌত্র ইত্যাদিকে বিনষ্ট বা হরণ করে (ভরন্তি)–সেই মায়াবী রাক্ষসগণকে (তা) অগ্নিদেব পিতৃগণের উদ্দেশে ক্রিয়মাণ এই যজ্ঞ হতে (অস্মাৎ) প্রকর্ষের সাথে নির্গমিত বা অপসারিত করে দিন (প্রধমতু)। ৮৷
এই যজ্ঞে আমাদের গোত্ৰজ পিতৃ-পিতামহ-প্রপিতামহোদয়গণ (স্বাঃ) উপবেশন করুন এবং উপবেশনান্তে আমাদের সুখ (স্যোনং) দান করুন এবং আয়ু বা জীবন বর্ধিত (প্রতিরন্ত) করুন। ধর্ধনপ্রাপ্ত (নক্ষমাণা) আমরা সেই পিতৃপুরুষগণকে চরুপুরোডাশ ইত্যাদির দ্বারা (হবিষা) পরিচর্যা করতে সক্ষম হবো (শকেম) এবং চিরকাল (জ্যোক) তাদের প্রসাদপুষ্ট হয়ে বহু সম্বৎসরকাল জীবন্ত থাকবো॥ ৯।
হে প্রেত! তোমাকে যে দুগ্ধবতী গাভী (ধেনু) প্রদান করছি (অর্থাৎ পিতৃশ্রাদ্ধে যে ধেনু দান করা হচ্ছে), এবং দুগ্ধে পক্ক যে ওদন (অন্নপিণ্ড) প্রদান করছি, তার দ্বারা (অর্থাৎ ধেনুসহিত সেই ওদনের দ্বারা) তুমি সেই জনের ধারক বা পোষক (ভর্তা) হও, যে জন এই লোকে জীবনরহিত (অজীবনঃ) হবে (অসৎ)। ১০৷৷
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি পূর্ব সূক্তের ৯ম মন্ত্রের সাথে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। এ ছাড়া এই সূক্তের বিভিন্ন মন্ত্রের দ্বারা চিতার দক্ষিণ পার্শ্বে অজ পশু বধ, আহিতাগ্নি সংস্কারার্থে আজ্য-যাগ পিণ্ডপিতৃযজ্ঞে বৰ্হি-আস্তরণ ইত্যাদি বহুবিধ ক্রিয়া সম্পাদিত হয়। (কৌ. ১১।৮) ইত্যাদি ॥ (১৮কা, ২অ. ৩সূ.)।
অশ্বাবতীং প্র তর যা সুশেবাক্ষাকং বা প্রতরং নবীয়ঃ। যা জঘান বধ্যঃ সো অস্তু মা সো অন্য বিদৎ ভাগধেয়ম্ ॥১॥ যমঃ পরোহবরো বিবস্বান্ ততঃ পরং নাতি পশ্যামি কিং চন। যমে অধ্বররা অধি মে নিবিষ্টো ভুবো বিবস্বানন্বততান৷ ২ অপাগৃহন্নমৃতাং মর্তেভ্যঃ কৃত্বা সবর্ণামদধুর্বিবস্বতে। উখিনাবভর যৎ তদাসীদজহাদু বা মিথুনা সরণঃ ॥৩৷৷ যে নিখাতা যে পরোপ্তা যে দগ্ধা যে চোদ্ধিতাঃ। সর্বাংস্তানগ্ন আ বহ পিতৃন্ হবিষে অত্তবে ॥৪॥ যে অগ্নিদগ্ধা যে অনগ্নিদগ্ধা মধ্যে দিবঃ স্বধয়া মাদয়ন্তে। ত্বং তান বেথ যদি তে জাতবেদঃ স্বধয়া যজ্ঞং স্বধিতিং জুষন্তাম্ ॥ ৫৷৷ শং তপ মাতি তপো অগ্নে মা তন্বং তপ। বনেষু শুষ্মে অস্ত্র তে পৃথিব্যামস্তু যদ্ধরঃ ॥ ৬। দদাম্যম্মা অবসানমেত ষ এষ আগন্ মম চেদভূদিহ। যমশ্চিকিত্বান প্রত্যেতদাহ মমৈষ রায় উপ তিষ্ঠতামিহ ॥৭॥ ইমাং মাত্রাং মিমীমহে যথাপরং ন মাসাতৈ। শতে শরৎসু নো পুরা ॥ ৮প্রেমাং মাত্ৰাং মিমীমহে যথাপরং ন মাসাতৈ৷ শতে শরৎসু নো পুরা ॥৯৷৷ অপেমাং মাত্ৰাং মিমীমহে যথাপরং ন মাসাতৈ। শতে শরৎসু নো পুরা ॥১০৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে প্রেত! তুমি অশ্বের আকরভূতা (অশ্বাবতী) নদী প্রকর্ষের সাথে উত্তরণ করিয়ে দাও (প্র তরয়), এবং এই নদী আমাদের সুসুখা অর্থাৎ অতি সুখকরিণী (সুশেবা) হোক। তথা ভল্লুকৈরূপেত দুষ্টমৃগনিষেবিত (ঋক্ষাকং) অদৃষ্টপূর্ব (নবীয়ঃ) অবণ্য ও আমি উত্তরণ করবো। হে প্রেত! তোমাকে যে পুরুষ বধ করেছে (জঘান) সে বধাহ (বধ্যঃ) হোক। সেই ঘাতক পুরুষ যেন পূর্বের উপভোগ্য বস্তু (অন্য ভাগধেয়ম) লাভ করতে না পারে (মা বিদত)। (অর্থাৎ নির্ধন হয়ে যাক)। ১৷
বিবস্বানের পুত্র যমের তেজ অধিক (পরঃ) হয়েছে। যমের পিতা আদিত্য তেজে নিকৃষ্ট হয়েছেন (অবরঃ); (অর্থাৎ যম তেজের দ্বারা তাঁর পিতা অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছেন–এটাই বক্তব্য)। সেইজন্য (তত) যম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কোনও প্রাণিজাতকে আমি জানি না (নাতি পশ্যামি)। সেই সর্বোৎকৃষ্ট যমে আমার (মে) যজ্ঞ (অধ্বরো) অধিক অবস্থিত (অধি নিবিষ্টঃ) ( থাকুক। (অর্থাৎ এই যজ্ঞ তাঁর প্রীতিকররূপে নিম্পাদিত হোক)। যজ্ঞের সিদ্ধির নিমিত্ত বিবস্বান (অর্থাৎ যমের পিতা সূর্য) ভূপ্রদেশে (ভুবঃ) আপন কিরণ বিস্তারিত করছেন (অন্বতনান)। ২।
মরণধর্মশীল মনুষ্যের (মর্তেভ্যঃ) নিকট হতে মরণধর্মরহিত (অমৃতা) দেবগণ তাদের অমৃতত্বপ্রাপক রূপ তিরোহিত করে রেখেছেন বা প্রাচ্ছাদিত করে রেখেছেন (অপাগৃহন)। সমানরূসম্পন্না (সবর্ণাং) অন্য স্ত্রীকে সৃষ্টিপূর্বক তাকে বিবস্বানের নিকট প্রদান করে সরণ অশ্বিনীরূপ স্বীকার করেছিলেন; তাতে (তৎ) অশ্বিনীকুমার যুগল উৎপাদিত হন (অভরৎ)। (বা সূর্যও স্বয়ং অশ্বরূপী হয়ে অশ্বিনীরূপিনী সরণুর সাথে সঙ্গত হয়ে তার গর্ভে আপন রেতঃ নিষিক্ত করে অশ্বিদ্বয়ের জন্ম দান করেছিলেন)। এবং ত্বষ্টুদুহিতা সরণু (সূর্যতাপ সহ্য করতে না পেরে, সূর্যগৃহ হতে নির্গমন কালে যম ও যমী নামে আপন) দুই মিথুন-সন্তানকে ত্যাগ করে এসেছিলেন। [পূর্বে এই কাণ্ডের ১ম অনুবাকের ৬ষ্ঠ সূক্তের ৩য় মন্ত্রে এই সম্পর্কিত ইতিহাস অভিহিত আছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে-সূর্যগৃহ হতে পলায়নকালে সরণু বা সংজ্ঞা মনু ব্যতীত যম-যমী; নামে যমজ (মিথুন) সন্তানকে রেখে এসেছিলেন। নির্গমন কালে সরণু তার সবর্ণা অর্থাৎ সমানরূপসম্পন্না যে স্ত্রীকে বিবস্বানের নিকট রেখে এসেছিলেন, তার নাম ছায়া। ছায়ার গর্ভে বিবস্বানের ঔরসে শনির জন্ম; ইত্যাদি। অশ্বিনী-রূপ-ধারিণী সরণু যখন উত্তরকুরুবর্ষে অবস্থান করছিলেন, তখন বিবস্বান আপন বিবেক-জ্যোতিতে তা জ্ঞাত হয়ে রহস্যচ্ছলে অশ্বরূপ ধারণ করে সরণুর গর্ভে আপন ঔরসে যে অশ্বিনীকুমারযুগলের জন্ম দান করেন, পৌরাণিক মতানুসারে, তাদের নাম নাসত্য ও দ] ৷ ৩৷৷
যাঁরা (অর্থাৎ যে পিতৃপুরুষগণ) ভূমিত নিখনন সংস্কারের দ্বারা (অর্থাৎ সমাধিস্থ হয়ে) সংস্কারপ্রাপ্ত হয়েছেন (নিখাতা), যাঁরা দূরদেশে কাষ্ঠবৎ পরিত্যক্ত হয়ে সংস্কারপ্রাপ্ত হয়েছেন (পরোপ্তা), যাঁরা অগ্নির দ্বারা সংস্কারপ্রাপ্ত হয়েছেন (দগ্ধা) এবং যাঁরা সংস্কারোত্তরকালে (অর্থাৎ সংস্কারপ্রাপ্তির পর) ঊর্ধ্বদেশে পিতৃলোকে স্থিত হয়েছেন (উদ্ধিতা), হে অগ্নি! তুমি সেই সকল পিতৃপুরুষগণকে আমাদের দত্ত হবিঃ ভক্ষণের নিমিত্ত (হবিষে অত্তবে) আনয়ন করো (আ বহ) ॥ ৪
যাঁরা (অর্থাৎ যে পিতৃগণ) অগ্নির দ্বারা সংস্কৃত হয়েছেন (অগ্নিদগ্ধা), এবং যাঁরা অগ্নিদাহরহিত (অনগ্নিদগ্ধা) হয়েও খনন ইত্যাদির দ্বারা সংস্কারপ্রাপ্ত হয়ে দ্যুলোকের মধ্যে অবস্থানপূর্বক স্বধা (অর্থাৎ পুত্র ইত্যাদিগণ কর্তৃক দত্ত পিণ্ডরূপ হবিঃ) ভক্ষণ করেছেন অথবা স্বৰ্ধকার-উপলক্ষিত পিণ্ডপিতৃযজ্ঞ ইত্যাদি কর্মে হৃষ্ট-তৃপ্ত হয়েছেন (মাদয়ন্তে),–হে জাতবেদা (জাতমাত্ৰ সকলের জ্ঞাতা অগ্নি)! তুমি তাদের সকলকে নিশ্চয়রূপে জ্ঞাত আছো (যদি বেখ)। আমাদের স্বধা-সম্বন্ধি যাঁরা (স্বধয়া) তারা এই যজ্ঞে (স্বধিতং) আগমন পূর্বক (যজ্ঞ) সেবন করুন (জুষন্তা)।. (বা আমাদের জ্ঞাতি পুত্রপৌত্র ইত্যাদির হিত সাধনের উদ্দেশে তারা এই স্বধা-যজ্ঞ সেবন করুন)। ৫।
হে অগ্নি! এই প্রেতশরীরকে সুখে (শং), (অর্থাৎ যাতে সুখ হয়, তেমনভাবে), তপ্ত করো (তপ); অতিরিক্ত তাপ প্রদান করো না (মা অতি তপো)। (অতিদহনে অস্থিসমূহও ভস্মীভূত হয়ে যায়; সেই কারণে সঞ্চয়ন ইত্যাদি সংস্কারের প্রতিবিধানে অতিদাহ নিষিদ্ধ)। তথা আমাদের শরীরও (তন্থঃ) তাপিত করো না (মা তপঃ)। তোমার শোষক জ্বালাসমূহ (শুম্মা) অরণ্যে (বনেষু অবস্থান করুক (অস্তু); তোমার রসহরণশীল তেজঃ ভূমিতে (পৃথিভ্যাং) অবস্থান করুক (অস্তু)। ৬
(যমে ক্ৰতে অর্থাৎ যম বলেন)–এই মৃত পুরুষ যে কারণে আমার নিকট আগমন করেছে, সেই কারণে আমি একে এই লোকে আবাসস্থান (অবসানং) প্রদান করছি। এবং এ নিশ্চয়ই এই লোকে আমার পরিচরণশীল হয়ে অবস্থান করুক (অভূচ্চেৎ)।–এইরকম জ্ঞাত করে ও (চিকিত্বান) যম মৃতের (অর্থাৎ মৃত-পুরুষের প্রতি এই কথা বললেন (আহ)–আমার সমীপে আগত পুরুষ (এষঃ) আমার স্তোতা হয়ে (রায়ে) আমার লোকে সেবা করুক (উপতিষ্ঠতাম)। ৭।
এই (ইমাং, এতাবতীং) শ্মশানদেশের পরিমাণ অরত্নিপ্রাদেশ পরিমিত (কনুই থেকে কনিষ্ঠাঙ্গুলির অগ্রভাগ পর্যন্ত হস্ত পরিমাপ) দণ্ডের দ্বারা পরিচ্ছেদ অর্থাৎ ইয়ত্তারপে অবধারণ করছি (নিমীমহে), যথা (যেন কোনরকমভাবে) অন্য শ্মশানকর্ম (অপরং) হতে না পারে (মা ন আসাতৈ)। ব্রহ্মের দ্বারা আমাদের জীবন শত-সম্বৎসর পরিকল্পিত হয়েছে, সেই শত-সম্বৎসর মধ্যে (পুরা) আমরা যেন শ্মশানকর্ম না প্রাপ্ত হই (নো)। (অর্থাৎ আমাদের যেন অকালমৃত্যু না ঘটে)। ৮।
প্রকর্ষের সাথে। আমরা এই শ্মশানদেশের পরিমাপ প্রতিপাদিত করছি, যাতে অন্য শ্মশানকর্ম হতে না পারে। ব্রহ্মের দ্বারা আমাদের জীবন শত-সম্বৎসর পরিকল্পিত হয়েছে, সেই শত-সম্বৎসর মধ্যে আমরা যেন শ্মশানকর্ম না প্রাপ্ত হই। (অর্থাৎ আমাদের যেন অকালমৃত্যু না ঘটে) ৯৷
এই পরিমাপরূপ উপসর্গের দ্বারা (অপেমাং) অপগত দোষতা অর্থাৎ শ্মশানলক্ষণ দোষ নিষিদ্ধ হয় (বা বিনষ্ট হয়) এই জন্যই এই পরিমাপ প্রতিপাদিত করছি, (যেন কোনরকমভাবে) অন্য শ্মশানকর্ম হতে না পারে। ব্রহ্মের দ্বারা আমাদের জীবন শত-সম্বৎসর পরিকল্পিত হয়েছে, সেই শত সম্বৎসরের মধ্যে আমরা যেন শ্মশানকর্ম না প্রাপ্ত হই। (অর্থাৎ আমাদের যেন অকালমৃত্যু না ঘটে)। ১০।
বঙ্গানুবাদ— [এই মন্ত্রে বিমাং মাত্রাং অর্থাৎ মুক্তি তথা নিবৃত্তির উপসর্গের দ্বারা শ্মশানদেশের পরিমাপের বিশিষ্ট গুণযোগ প্রদর্শিত হচ্ছে। আমরা এই শ্মশানদেশের ভূমিকে বিশিষ্ট প্রকারে পরিমাপ করছি, (যেন এখানে কোনরকমভাবে) অন্য শ্মশানকর্ম হতে না পারে। ব্রহ্মের দ্বারা আমাদের জীবন শত-সম্বৎসর পরিকল্পিত হয়েছে, সেই শত সম্বৎসরের মধ্যে আমরা যেন শ্মশানকর্ম না প্রাপ্ত হই। (অর্থাৎ আমাদের যেন অকালমৃত্যু না ঘটে)। ১।
( এই মন্ত্রে নিরিত্যুপসর্গেন অর্থাৎ নির্গতদোষতারূপ উপসর্গের দ্বারা শ্মশানদেশের পরিমাপের কথা বলা হচ্ছে–আমরা দোষশূন্য করণের নিমিত্ত এই শ্মশানভূমিকে পরিমাপ করছি, যাতে এই স্থানে অন্য শ্মশানকর্ম হতে না পারে। ব্রহ্মের দ্বারা কল্পিত আমাদের শত সম্বৎসর পরিমিত আয়ুর মধ্যে আমাদের যেন অকালমৃত্যু না ঘটে। ২।
[এই মন্ত্রে উৎ অর্থাৎ উৎকর্ষ উপসর্গের দ্বারা শ্মশানদেশের পরিমাপের উৎকর্ষণ প্রদর্শিত হচ্ছে–আমরা উৎকৃষ্ট করণের নিমিত্ত এই শ্মশানভূমিকে পরিমাপ করছি; যাতে এই স্থানে অন্য শ্মশানকর্ম হতে না পারে। ব্রহ্মের দ্বারা কল্পিত আমাদের শত সম্বৎসর পরিমিত আয়ুর মধ্যে আমাদের যেন অকালমৃত্যু না ঘটে ৷৷ ৩৷
আমরা উদীরিত-গুণযোগের দ্বারা (অর্থাৎ উচ্চারিত মন্ত্রের দ্বারা) এই শ্মশানভূমিকে পরিমাপ করছি; যাতে এই স্থানে অন্য শ্মশানকর্ম হতে না পারে। ব্রহ্মের দ্বারা পরিকল্পিত আমাদের শত সম্বৎসরের আয়ুর মধ্যে যেন আমাদের অকালমৃত্যু না ঘটে। ৪
শ্মশানদেশের পরিমাণ (মাত্রাং) পরিচ্ছেদিতবান অর্থাৎ নিরূপিত হয়েছে (অমাসি)। সেই পরিমাপের দ্বারা আমি স্বর্গলোকে গমন করবো; (অর্থাৎ এই পরিমাপ-করণের ফল ভাবী স্বর্গলোকপ্রাপ্তি)। এবং এই পরিমাপ-কর্মে আমি শত-সম্বৎসর পরিমিত আয়ুশালী (আয়ুষ্ম) হবে। যাতে এই স্থানে অন্য শ্মশানকর্ম হতে না পারে! ব্রহ্মের দ্বারা পরিকল্পিত আমাদের শত সম্বৎসরের আয়ুর মধ্যে যেন আমাদের অকালমৃত্যু না ঘটে। ৫।
প্রাণ (অর্থাৎ মুখ-নাসিকা হতে বহির্নিঃসরণ বায়ু), অপান (অর্থাৎ অন্তর্গামী বায়ু), ব্যান (সমগ্র অবয়ব ব্যাপী অবস্থানকারী বায়ু), চক্ষু (নীলপীত ইত্যাদি দর্শন-সাধন ইন্দ্রিয়) এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে সূর্যদর্শনের নিমিত্ত (সূয়ায় দৃশয়ে) আমরা শত সম্বৎসরকাল অর্থাৎ চিরকাল জীবন (আয়ু)। যাপন (বা অবস্থান) করবো। হে মৃতপুরুষ! তুমি যমরাজার স্বভূত চোরগণ-রহিত (অপারিপরেণ) মার্গ অবলম্বন পূর্বক (পথা) (অর্থাৎ যে পথে যমের নিয়োজিত তস্করগণ গমনাগমন করে না, সেই পথ ধরে) পিতৃলোকে গমন করো। ৬।
দ্রুতগতিশীল (শশমান অর্থাৎ শশ বা অশ্বের ন্যায় গতিসম্পন্ন), অগ্রগামী (অবঃ) যে পিতৃগণ অনপত্যবন্তরূপে (অর্থাৎ অপত্যরহিত অবস্থায়) পাপসমূহ (দ্বেষাংসি) পরিহার করে চলে গেছেন (হিত্বা পরেযুঃ), সেই পিতৃগণ (তে)। অন্তরিক্ষলোকের ঊর্ধ্বে (দ্যাং উদিত্য) স্বর্গের (নাকস্য) দুঃখস্পর্শরহিত স্থানেরও উপরিভাগে বা অধিক দীপ্যমানা অর্থাৎ সুকৃতফল-উপভোগের উপযুক্ত স্থান লাভ করেছেন (অবিদন্ত)। ৭।
[ এই মন্ত্রে পিতৃলোকের সর্বোৎকৃষ্টতা প্রতিপাদিত হচ্ছে]–দুলোকের নিম্নভাগে (অবমা দৌঃ) উদস্বতী অর্থাৎ জলপূর্ণা মেঘ প্রবর্ষণ করে থাকে। মধ্যমা অর্থাৎ মধ্যকক্ষ্যায় দুলোক পীলুমতী অর্থাৎ গ্রহনক্ষত্রের ধারিণী হয়ে থাকে। তৃতীয় স্থানে (তৃতীয়া হ) দ্যুলোক প্রকৃষ্টফলোপেত (প্রদ্যোঃ) নাকপৃষ্ঠ নামে আখ্যাত। সেই স্থানে পিতৃদেবগণ অবস্থান করেন (আসতে)। ৮৷
যাঁরা আমাদের পিতার পিতা (পিতুঃ পিতরঃ), এবং যারা পিতামহগণেরও জনক (পিতামহাজনকাঃ), এবং অন্য যাঁরা বিস্তীর্ণ অন্তরিক্ষলোকে নিবাস করছেন (আবিবিশু উরু অন্তরিক্ষ), যাঁরা পৃথিবীলোকে নিবাস করছেন (আয়িন্তি), (অর্থাৎ প্রেতরূপে পৃথিবীতে বর্তমান রয়েছেন), এবং যাঁরা স্বর্গলোকে (দ্যাং) আশ্রিত, (অর্থাৎ যাঁরা লোকত্রয় ব্যাপী বর্তমান), সেই সকল (তেভ্য) পিতৃগণকে আমি এই হবিলক্ষণ অন্নের দ্বারা (নমসা) পরিচর্যা করছি (বিধেম)। (অথবা নমসা শব্দের অর্থ অন্ন না ধরলে, অর্থ হয়–নমস্কার করছি) ॥ ৯৷ হে মৃতপুরুষ! আমাদের দ্বারা শ্রাদ্ধে প্রদত্ত এই সামগ্রীই (ইদং ইৎ বা উ) তোমার জীবন; অন্য কিছু নয় (অপরং ন কিঞ্চিৎ)। এই শ্মশানদেশে নিবাসিত থেকে আকাশে (দিবি) সূর্য দর্শন করো। যে রকমে জননী আপন বসনাঞ্চলের দ্বারা (সিচা) আপন পুত্রকে আচ্ছাদিত করেন, তেমনই, হে পৃথিবী (ভূমে)! শ্মশানস্থকে অর্থাৎ মৃতপুরুষকে (এনং) আপন তেজের দ্বারা প্রকৃষ্টভাবে আচ্ছাদিত করো (অভণুহি)। (যেন এ শীত, বায়ু, উষ্ণ ইত্যাদি প্রাপ্ত না হয়–এটাই এর অন্তর্নিহিত ভাব)। ১০।
বঙ্গানুবাদ –এই মৃত পুরুষ জরা অবস্থায় (জরসি) যে অন্ন ইত্যাদি উপভোগ করেছে, তা ব্যতীত অন্য (নাপরং অন্যৎ) ভোক্তব্য নেই। এই শ্মশানদেশ ব্যতীত অন্য কোন স্থানও তার নেই, অপর কোন কার্যও সম্ভব নয়। শ্মশানে পরিত্যক্ত এই মৃত পুরুষকে, হে পৃথিবী! জায়া যেমন পতিকে বসনের দ্বারা প্রচ্ছাদিত করে, তেমনই তুমি একে তোমার তেজে প্রচ্ছাদিত করো। ১।
হে মৃতপুরুষ! সর্বজনের মাতৃস্বরূপা (মাতুঃ) কল্যাণকারিণী (ভদ্রায়াঃ) পৃথিবীর বস্ত্রের দ্বারা তোমাকে (ত্বা) সর্বতোভাবে আচ্ছাদিত করছি (অভিপ্রোণোমি)। জীবেষু অর্থাৎ প্রাণধারী (মনুষ্যগণের মধ্যে) আমাদের কল্যাণ হোক (অর্থাৎ শোভন সংস্কার হোক) পিতৃদেবতাগণের উদ্দেশে স্বধাকারের দ্বারা হৃয়মান হবিলক্ষণ অন্ন তোমার (ত্বয়ি) হোক। (বা আপন জ্ঞাতিগণের দ্বারা পিতৃবর্গের তৃপ্তিকরী পিণ্ডোদক দান ইত্যাদিরূপ ক্রিয়া বা স্বধা তোমার প্রাপ্য হোক– এটাই বক্তব্য)। ২।
অগ্নিদেব ও সোমদেব হলেন পথিকৃৎ (অর্থাৎ পুণ্যলোক-গমনসাধন মার্গের নির্মাতা); তারা সুখকর (স্যোনং) বা রত্নবৎ উৎকৃষ্ট স্বর্গ-নামক সেই লোক দেবতাগণের নিমিত্ত নির্মাণ করেছেন, যে লোক তার সমীপে (উপ) প্রকৃষ্টরূপে গমনশীল (প্রেষ্যন্তং) পূষা নামে আখ্যাত দেব বা সর্বপ্রাণীর পোষক সূর্যকে ধারণ করেছে, হে পথিকৃৎ অগ্নি ও সোম! সেই লোকে সরলভাবে (অঞ্জয়ানৈঃ) গমনযোগ্য পথে তোমরা এই প্রেতকে গমন করাও ॥ ৩॥
হে প্রেত! তোমাকে জ্ঞাতশীল (বিদ্বান) পূষাদেব এই স্থান হতে নির্গমিত করুন (প্র চ্যাবয়তু)। (কিরকম পূষা? না–) পশুগণের (অর্থাৎ গো ইত্যাদির) পোষক, ভূতজাতের (ভুবনস্য) অর্থাৎ প্রাণীবর্গের রক্ষক (গোপা)। এবং তারপর তিনি তোমাকে তোমার পিতৃপিতামহ-প্রপিতামহ (এতেভ্য) অর্থাৎ মৃতপুরুষসম্বন্ধি পিতৃগণের নিকট রক্ষার নিমিত্ত পরিদান করুন (পরি দদৎ)। এবং অগ্নিদেব দহনসংস্কারের দ্বারা শোভনবিজ্ঞান করুন বা সুখের দ্বারা লব্ধব্য ধনরূপ দেবগণের নিকট তোমাকে সুষ্ঠুভাবে (সুবিদত্রং) দান করুন। ৪
আয়ু নামক জীবনাভিমানী দেবতা সকলের জীবনবান রূপে (বিশ্বায়ুঃ) তোমাকে রক্ষা করুন; তথা পূষা অর্থাৎ জীবনপোষক দেবতা পূর্বদিকে (পুরস্তাৎ) গমনমার্গের প্রারম্ভে (প্রপথে) তোমাকে রক্ষা করুন। যে স্বর্গলোকে (যত্র) পুণ্যকৃত জনগণ উপবেশন করেন (আসতে), সেই স্বর্গসম্বন্ধিনী নাকপৃষ্ট (ঈয়ুঃ) নামে আখ্যাত দেশে দেব অর্থাৎ দান ইত্যাদি গুণযুক্ত সর্বপ্রেরক-সংজ্ঞক সবিতা তোমাকে স্থাপন করুন ৫
হে মৃতপুরুষ! তোমার গতপ্রাণ দেহকে (অসুনীতায়) বহনের নিমিত্ত (বহ্নী) এই বলদদ্বয়কে (ইমৌ) সংযোজিত করছি (যুনন্নি)। এই বলদ্বয়ের দ্বারা (ভ্যাং) তুমি যমের গৃহ (সদনং) এই রকমেই সম্যক জ্ঞাত হবে (অবগচ্ছতাৎ) ॥ ৬।
এই সন্নিহিত মুখ্য (প্রথমং) বস্ত্র (বাসঃ) আজ (নু) তুমি প্রাপ্ত হয়েছে (আগন), এখন তুমি সেই বসন পরিত্যাগ করো (অপোহ), যেটি পূর্বে জীবিতকালে (পুরা) ভূলোকে (ইহ) পরিধান করতে (অবিভঃ)। মোহরহিত হয়ে (বিদ্বা) তুমি তোমার পূর্বকৃত ইষ্টাপূর্ত, কর্মাবলী (অর্থাৎ শ্রুতিশাস্ত্রানুমোদিত অগ্নিহোত্র-দর্শপূর্ণমাস ইত্যাদি ইষ্টকর্ম এবং স্মৃতিশাস্ত্রানুমোদিত বাপী-কূপ-তড়াগ ইত্যাদি নির্মাণরূপ পূর্তকর্ম) অনুক্রমে লক্ষ্য পূর্বক গমন করতে থাকো; যে ইষ্টাপূর্ত ক্রিয়মাণে তুমি বান্ধবজনেদের (বন্ধু) বহুপ্রকার (বহুধা) ধন বিতরণ করেছিলে। ৭।
হে প্রেত! তুমি গোভিঃ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়-সম্বন্ধী অবয়বের দ্বারা অগ্নির দাহ-নিবারক কবচ (বর্ম) পরিধান করো বা নিজেকে আচ্ছাদিত করো। হে প্রেত! তুমি স্কুলমেদময় (পীবসা) আচ্ছাদনে নিজেকে আবৃত করো, যাতে সেই ধর্ষক (ধৃষ্ণঃ), রসহরণশীল (হরসা), তেজের সাথে দগ্ধকারী (জর্ষণঃ দধূক) অগ্নি তোমাকে অধিক ভস্ম করার ইচ্ছায় ইতস্ততঃ নিক্ষেপ করতে না পারে। ৮।
গতপ্রাণ ব্রাহ্মণের হস্ত হতে এই দণ্ড (যে সমন্ত্রক বেণুদণ্ড সমাবর্তন প্রভতি কালে ব্রাহ্মণ কর্তৃক ধৃত হয়েছিল, সেই বিহিত দণ্ড) আমি গ্রহণ করছি, যার ফলে আমি শব্দশ্রবণ- সাধনেন্দ্রিয়জনিত বা ত-অধ্যয়ন-সস্তৃত তেজের দ্বারা ও তৎকৃত বলের সাথে (শ্রোত্রেণ বচসা বলেন) যুক্ত হবো। হে প্রেত! তুমি এই দহনদেশে অর্থাৎ চিতায় (অত্র) অবস্থান করো; আমরা (বয়) এই ভূলোকে (হই) সুখের সাথে অবস্থান পূর্বক সকল সংগ্রাম (মৃধঃ) ও হিংস্রক শত্রুদের (অভিঘাতীঃ) অভিভব করবো (জয়েম)। ৯।
মৃত অর্থাৎ ত্যক্তপ্রাণ ক্ষত্রিয়ের হস্ত হতে আমি এই ধনু গ্রহণ করেছি (আদদানঃ), যার ফলে আমি ক্ষত্ৰজাতির (ক্ষত্রং) অসাধারণ তেজের দ্বারা (বৰ্চসা, অর্থাৎ পরাভিভব-সমর্থ বীর্য) ও তৎকৃত বলের সাথে যুক্ত হবো। বহুল (ভূরি) পোষক (পুষ্টং) ধন (বসু) আমাদের দানের নিমিত্ত (সমাগৃভায়) এই জীবলোকে আমাদের অভিমুখে (অর্বা) তুমি আগত হও ১০৷৷
বঙ্গানুবাদ –এই পুরোবর্তিনী (ইয়ং) স্ত্রী (নারী) পতির দ্বারা অনুষ্ঠিত (পতিলোকং) যাগ-দান হোম ইত্যাদির ফলভূত স্বর্গ ইত্যাদি স্থান সহধর্মচারিণীত্বের দ্বারা সম্যক্ ভজমানা হয়েছেন (বৃণানা), (অর্থাৎ প্রাপ্তির জন্য অভিলাষিণী হয়েছেন)। এবস্তৃতা স্ত্রী, হে মরমধর্মী মনুষ্য (মত)! প্রকর্ষের সাথে (প্রেতং) এই ভূলোক হতে বিনির্গত হয়ে তোমার সমীপে অবশ্য গমন করছেন (অর্থাৎ অনুসরণ প্রাপ্ত হচ্ছেন)। অনাদি-শিষ্টাচার-সিদ্ধ বা স্মৃতিপুরাণ ইত্যাদি প্রসিদ্ধ (পুরাণং) ধর্ম অনুপালনের তিনি গমন করছেন। তথাবিধ অনুমরণ-কৃতবতী স্ত্রীর নিমিত্ত (তস্যৈ) এই ভূলোকে (জন্মান্তরেও) পুত্রপৌত্র ইত্যাদিরূপ প্রজা ও ধনরাশি (দ্রবিণং) প্রদান করো। (এখানে বক্তব্য এই যে, স্বেচ্ছায় সহমরণের প্রভাবে জন্মান্তরেও সে এমন পতি লাভ করবে)। [এই মন্ত্রে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় সহমরণাকাক্ষিণী পত্নীর কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী মন্ত্রে ইহলোকে জীবিত থাকার জন্য আকাক্ষিণী অর্থাৎ সহমরণে অনিচ্ছুকা পত্নীর ইচ্ছাকে অনুমোদন বিষয়ে বলা হয়েছে। সুতরাং প্রাচীনকালে সহমরণপ্রথা যে শাস্ত্রানুসারে বাধ্যতামূলক ছিল না, তা বোঝা যায় ॥১॥
হে ধর্মপত্নী (নারী)! এই প্রাণধারীগণের লোককে (জীবলোকং–অর্থাৎ জন্মান্তরকৃত-ধর্মফলরূপ সুখদুঃখাত্মক ভূলোককে) অভিলক্ষ্য করে পতির নিকট হতে (অর্থাৎ পতির চিতা হতে) উত্থিত হয়ে আগমন করো (উদী)। গতপ্রাণ (গতাসু) যেস্থানে পতির নিকট (চিতায়) শয়ন করে আছো সেস্থানে শাস্ত্রাবিরোধী-দৃষ্ট ফলের অনুরোধে বা অভাবে পতির নিকট হতে প্রত্যাগমন করো। তোমার পাণিগ্রহণকর্তা (হস্তগ্রাভঃ তস্য) পতি তোমার অপত্য ইত্যাদি রূপে জন্মলাভ করেছেন; (অর্থাৎ জীবনাবস্থাতেই ঐহিক পুত্র ইত্যাদিরূপে তিনি তোমার অভিপ্রাপ্ত হয়েছেন)। ২।
শবসমীপে নীয়মানা যৌবনাবস্থাপেত (যুবতিং) জীবিত নারীকে গাভীর আস্তরণে (চাদরে) আবৃতাবস্থায় অবলোকন করছি। অনুস্তরণী সেই গাভী গাঢ় তমসায় অর্থাৎ অজ্ঞানলক্ষণের দ্বারা প্রকর্ষের সাথে বেষ্টিতা (প্রাবৃতা); (সে স্বয়ং হিতাহিত বিভাগ জ্ঞাত নয়)। সেই হেন গাভীকে (তৎ) পূর্বস্থান হতে (প্রাক্তঃ) অর্থাৎ শবসমীপ হতে অপাঙুখী (অপাচীং) করে অর্থাৎ শব হতে পরাস্থূখী করে আমাদের অভিমুখী করে আনয়ন করবো॥ ৩
হে অঘ্নে (বধের অযোগ্যা গাভী)! এই জীবলোককে প্রকর্ষের সাথে জ্ঞাত হয়ে (প্রজানতি) দেবগণের (ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণের) পন্থা (মার্গ অর্থাৎ যজ্ঞলক্ষণ) · অনুসঞ্চরণ করে আগমন পূর্বক ক্ষীর-দধি ইত্যাদি হবি নিম্পাদন করো। তোমার এই পালকের (গোপতিঃ) সেবা করো (জুষস্ব)। এই মৃত পুরুষকে (এন) স্বর্গলোকে অধিরোহণ করাও (অর্থাৎ স্বর্গপ্রাপ্তি করাও)। ৪৷
জলের উপর প্ররূঢ় ভূসংস্পর্শরহিত অবকা (শৈবাল) ও নদীতীরবর্তী বেতস (বেতগাছ) ইত্যাদি ঔষধি সমূহে রক্ষণসমৰ্থ সারভূতাংশ বিদ্যমান। [তৈত্তিরীয় সংহিতায় (৫৪, ৪।২) বেতস ও অবকার অপ্সরত্ব উক্ত হয়েছে। হে অগ্নি! তুমিও অপাং পিত্তং অর্থাৎ জলসম্বন্ধী পিত্তধাতু। এই নিমিত্ত আমি তোমাকে বেসের শাখা ও অবকা প্রভৃতির দ্বারা (সেইসঙ্গে নদীর ফেনা, বৃহদূর্বা, মণ্ডুকপণী ইত্যাদি ঔষধি সমূহের দ্বারা) তোমাকে শান্ত করছি; (অবত্তর ইতি)। ৫।
হে অগ্নি! তুমি যে (মৃত)-পুরুষকে সম্যক্ দগ্ধবান্ হয়েছে (সমদহঃ) তাকে পুনরায় সুখী করো (পুনর্নির্বপয়া); (অর্থাৎ তাকে দাহজনিত উষ্ণতা পরিহার করো–এটাই বক্তব্য)। এই দহন প্রদেশে (অত্র) ক্যাম্পূ নামক ঔষধি তথা জলের নিকট উৎপদ্যমানা অণ্ডাকৃতি-মূলসহিতা বা দীর্ঘকাণ্ডা ও বিধিশাখাযুক্তা (ব্যল্কশা) বৃহদ্বা নামে অভিহিতা শাণ্ডদূর্বা উৎপন্ন হোক ৷৷ ৬।
হে প্রেত! তোমার পরলোকগমনের নিমিত্ত এই গাৰ্হপত্য অগ্নি (গৃহস্থ ব্যক্তি কর্তৃক চিরকাল অবিচ্ছেদে রক্ষিত অগ্নি) এক জ্যোতিস্বরূপ; দ্বিতীয় অন্বহার্য-পচনাখ্যও এক জ্যোতি; (অর্থাৎ পিতৃলোকের উদ্দেশে মাসিক শ্রাদ্ধের স্বধান্ন পাককারী অগ্নিও দ্বিতীয় জ্যোতিস্বরূপ। তৃতীয় জ্যোতি আহুনীয় অগ্নি (যজ্ঞ বা হোম করণের যোগ্য অগ্নি)। তুমি এই জ্যোতির সাথে সঙ্গত হও (সং বিশেষ্য)। এই অগ্নি-সংস্কারজনিত দেবশরীরের দ্বারা (ইথং সংবেশনে তন্ব) তুমি অসাধারণ হয়ে (চারুঃ এধি) উস্কৃষ্ট দেবলোকে (পরমে সধস্থে) দেবানাং অর্থাৎ ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণের প্রিয়পাত্র (প্রিয়ঃ) হও। ৭।
হে প্রেত! তুমি এই স্থান হতে ঊর্ধ্বে উত্থিত হয়ে প্রকর্ষের সাথে অর্থাৎ শীঘ্র ধাবিত হও (প্রেহি প্ৰদব); এবং তারপর অন্তরিক্ষের অলৌকিকে (সলিলে সধস্থে) তোমার গৃহ (ওকঃ) স্থাপন করো (কৃণুম্ব)। সেই স্থানে তুমি তোমার পিতৃগণের (পিতৃভিঃ অর্থাৎ বহিষদ, অগ্নিদাত্ত ইত্যাদি নামে আখ্যাত পিতৃগণের) সাথে ঐকমত্য হয়ে (সম্বিদানঃ) সোমপানের দ্বারা তৃপ্ত হও। (সোমযাগেই নারাশংসাখ্য সোমরসের ভাগ পিতৃগণের; তা উপভোগ পূর্বক হর্ষিত হও। অথবা সোমের দ্বারা পিতৃলোকের অধিপতির সাথে আনন্দজনিত সম্মোহ প্রাপ্ত হও) ৮
হে প্রেত! তুমি এই স্থান হতে প্রকৃষ্টরূপে পতিত হও (প্রচ্যবস্ব); সেই নিমিত্ত তুমি আপন শরীরের (তন্বং) হস্ত-পাদ ইত্যাদি সকল অঙ্গকে একীভূত করো (ভরস্ব), তোমার গাত্রের (গাত্রাণি) হস্ত-পাদ ইত্যাদি যেন পরিত্যক্ত না হয় (মা বি হায়ি); তথা শরীরের অবয়বিভূত মধ্যদেহও যেন ত্যাগ করো (মা মৈব ত্যাক্ষীঃ)। যে স্থানে (যত্র) তোমার মন নিবিষ্ট বা অবস্থিত আছে, সেই স্থানে (অর্থাৎ মনের বিষয়ভূত সেই স্বর্গ ইত্যাদি লক্ষণান্বিত স্থানে) সম্যক্ প্রবিষ্ট হও (অনুসম্বিশস্ব)। তথা যে ভূপ্রদেশে (যত্র ভূমে) তুমি প্রীতিপ্রাপ্ত হয়ে থাকো. (জুয়সে), তথায় গমন করো; (অর্থাৎ সেই ভূপ্রদেশ প্রাপ্ত হও। ৯।
সোমের যোগ্য (সোম্যাসো) পিতৃদেববৃন্দ (পিতরঃ) আমি হেন যজমানকে (মাং) তেজের সাথে সংশ্লিষ্ট করে দিন (অঞ্জন্তু)। তথা সকল দেবগণ (দেবা) আমাকে মাধুর্যোপেত ঘৃতের দ্বারা (অর্থাৎ দীপ্তিকর আজ্যের দ্বারা) লেপন করুন (অঞ্জন্তু), অধিকন্তু, দর্শনের নিমিত্ত (চক্ষুষে) আমাকে প্রকৃষ্টতর প্লাবিত করুন (তারয়ন্তঃ); (অর্থাৎ আমি যাতে দীর্ঘকাল দর্শন করতে পারি, সেই নিমিত্ত রোগ ইত্যাদি হতে আমাকে পরাঙ্খী করুন–এটাই বক্তব্য) এবং যাবৎকাল পর্যন্ত আমার জরা থাকবে (জরসে), তাবৎকাল পর্যন্ত আমাকে জরদষ্টি করে (অর্থাৎ খাদ্য জীর্ণ করার সামর্থ্যবান্ করে) আমার বর্ধন সাধন করুন (বর্ধয়ন্তু)। ১০।
বঙ্গানুবাদ –অগ্নি অর্থাৎ অঙ্গনাদিগুণযুক্ত দেব আমাকে তেজের সাথে সংযোজিত করুন (বৰ্চসা সমন); তথা বিষ্ণু আমার মুখে সর্বথা মেধা সংযোজিত করুন (আসন মেধাং নি অন); তথা সকল দেবগণ (বিশ্বে দেবাঃ) আমাকে সুখকরী ধন নিরন্তর নিয়মের দ্বারা প্রদান করুন (স্যোনাং রয়িং মে নি যচ্ছন্তু); তথা জলসমূহ (আপঃ) শোধনসাধন অংশের দ্বারা (পবনৈঃ) আমাকে শুদ্ধ করুন (পুনন্তু) ॥১॥
দিবসের অভিমানী দেবতা মিত্র ও রাত্রির অভিমানী দেবতা বরুণ–এঁরা উভয়ে আমাকে সর্বতোভাবে ধারণ করুন, বা বস্ত্র ইত্যাদি পরিধান করান (পর্যধাতাং); তথা অদিতির পুত্র (আদিত্যগণ) অর্থাৎ অন্য দেবগণ স্বরবে অর্থাৎ শোভন শব্দ করে বা আমাদের শত্রুগণকে সন্তপ্ত করে আমার বর্ধন করুন (বর্ধয়ন্তু)। আরও, ইন্দ্রদেব আমার বাহুদ্বয়ে বৰ্চ অর্থাৎ বল নিয়োজন করুন (নি অন); (অর্থাৎ ইন্দ্রের বাহুবল তার প্রসাদে লাভ করবো-এটাই বক্তব্য)। সকলের জনয়িতা (প্রসবিতা) দেব সবিতা আমাকে জরাবস্থা পর্যন্ত ভোজন-সমর্থ করে দীর্ঘায়ু করুন (জরদষ্টিং কৃণোতু)। ২।
যে রাজা যম মরণধর্মী মনুষ্যগণের মধ্যে (মর্ত্যানাং) স্বয়ংই প্রথম মরণ প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যিনিই মরণের পরে প্রথম লোকান্তর প্রাপ্ত হয়েছিলেন, (প্রথম মরণ ও তারপর লোকান্তর প্রাপ্তি, এই উভয়ই যমোপযজ্ঞ ছিল), সেই বিবস্বানের পুত্র (বৈবস্বত) যম জাত সকল প্রাণীর (জনানাং) সম্প্রপ্য; (অর্থাৎ প্রাণীকৃত পুণ্য ও পাপের তিনিই বিচারক)। অতএব হে ঋত্বিবৃন্দ! সেই হেন গুণবিশিষ্ট রাজা বা ঈশ্বর স্বরূপী যমকে আজ্য-পুরোডাশ ইত্যাদির দ্বারা পূজা। করো (হবিষা সপ্যত)। ৩।
হে পিতৃদেবতাগণ! আমাদের কৃত পিতৃযজ্ঞরূপ কর্মের দ্বারা সন্তুষ্ট হয়ে তোমরা পরাগমন করো (পরা যাত); (অর্থাৎ পরার্মুখী হয়ে নিজ লোকে গমন করো); এবং পুনরায় যাগার্থে আমাদের দ্বারা আহূত হয়ে আগমন করো (আ যাত)। তোমাদের নিমিত্ত (বঃ) আমাদের দ্বারা প্রদত্ত মধুর আজ্যের দ্বারা সম্যক্ সংসিক্ত (সমক্তঃ) এই যজ্ঞ স্বীকার করে আমাদের নিমিত্ত (অস্মভ্যং) কল্যাণকর ধন (ভদ্রং দ্রবিণা) এই গৃহে (ইহ) ধারণ করো (দধাত)। তথা পুত্র পৌত্র ইত্যাদিরূপ বীর্যজাত প্রজা (সর্ববীরম) ও পশু ইত্যাদিরূপ ধন (রয়িং) আমাদের নিমিত্ত ধারণ করো। ৪।
কথ (যজুর্বেদীয় কাথ শাখার প্রণেতা), কক্ষীবান্ (কক্ষদেশে অর্থাৎ কটিবন্ধে অশ্ব-রজু ধারণকারী), পুরুমীঢ় (বহু ধনশালী), অগস্ত্য (মিত্র-বরুণের রেতঃ হতে বশিষ্ঠ সহ জাত প্রসিদ্ধ মহর্ষি), শ্যাবাশ্ব (শ্যাবা অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণা অশ্বাযুক্ত), সোভরী (তপস্যা দ্বারা অসীম আত্মোন্নতি-সাধক প্রসিদ্ধ ঋষি), অর্চনানা (অৰ্চনীয় শকট-সম্পন্ন প্রসিদ্ধ ঋষি), বিশ্বামিত্র (সর্ব জগৎ মিত্র যাঁর), জমদগ্নি (জ্বলন্ত অগ্নির মতো কর্মকারী), অত্রি (সত্ত্ব-রজঃ তমঃ নেই যাঁর, বা আধ্যাত্মিক-আধিদৈবিক আধিভৌতিক ভেদ ভিন্ন ত্রিবিধ দুঃখানুভব যাঁর নেই), কশ্যপ (সর্ব জগৎ সর্বদা সূক্ষ্মভাবে দর্শনকারী), ও বামদেব (তত্ত্ববিষয়ে দ্যোতক বোধ যাঁর)–এই দ্বাদশ-সংখ্যক ঋষি আমাদের রক্ষা করুন (অয়ম্ অবন্তু)। ৫।
(এই মন্ত্রের পূর্বার্ধে ছয়জন ঋষিকে প্রথমে সম্বোধন করা হচ্ছে)-হে বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, বসিষ্ঠ (বসুমত্তমঃ। অতিশয় জিতেন্দ্রিয়), ভরদ্বাজ (সকলের ভরণকারী), গোতম (ন্যায়শাস্ত্র-প্রণেতা ঋষি) ও বামদেব! তোমরা আমাদের সুখদান করো (নঃ মৃড়ত)। হে মহর্ষি অত্রি! তুমি আমাদের বলকারক (শর্দি, শয়তি বলয়তীতি) হয়ে আমাদের আত্মীয়ত্বের দ্বারা গ্রহণ করে আমাদের গৃহ রক্ষা করো (অগ্রভীৎ)। (অথবা অত্রির সাথে শর্দি নামধারী অন্য কোন ঋষির নিকটও ঐ প্রার্থনা করা হয়েছে)। নমস্কারের দ্বারা বা আমাদের দীয়মান কব্যরূপ হেতুর দ্বারা (অর্থাৎ মৃত পিতৃলোককে দেয় অন্ন ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্যের কারণে), হে পিতৃদেবতাগণ! তোমরা আমাদের দ্বারা। সংস্তুত হয়ে (সুসংশাসঃ) আমাদের সুখী করো ৷৷ ৬ ৷
দহনদেশে (কস্যো) বান্ধব-মৃত্যুজনিত দুঃখপ্রাপ্তি (মৃজানাঃ) ও শবস্পর্শজনিত পাপ (রিং) অতিক্রম করে (অতি যন্তি) আমরা অতিশয় উক্তৃষ্ট আয়ু (অর্থাৎ দীর্ঘকাল-জীবন) প্রকৃষ্টতর ভাবে ধারণ করবো (নবীয়ঃ প্রতরং); আমরা (এই হেতু) পুত্রপৌত্র ইত্যাদিরূপ (প্রজয়া), কনক-রজত ইত্যাদি লক্ষণ এবং গো-অশ্ব ইত্যাদি ধনের দ্বারা (ধনেন) বর্ধমান (আপ্যায়মানাঃ) হবো। অনন্তর (অধ) গৃহে শোভনগন্ধোপেত অর্থাৎ প্রশংসনীয় গুণযুক্ত (সুরভয়ঃ) হয়ে থাকবো (স্যাম)। ৭
(পিতৃলোকপ্রাপ্ত জনগণ ধূমাকীর্ণ পথে গমন পূর্বক চন্দ্রলোক প্রাপ্ত হন এবং তথায় ইহলোকে কৃত যাগ-হোম ইত্যাদি সম্পর্কিত পুণ্যজনিত ফল ভোগ করে থাকেন। এই কারণে এই মন্ত্রে সোম স্তুত হচ্ছেন)–সোমযাগ প্রবর্তন করে ঋত্বিকগণ প্রথমে যজমানকে অঞ্জনের দ্বারা সংস্কৃত করিয়ে থাকেন (অঞ্জতে)। এই অঞ্জন লৌকিক অঞ্জন রূপে প্রতিপাদিত (ব্যঞ্জতে)। অতঃপর ঐ লৌকিক অঞ্জন হতে ভিন্ন অন্য প্রকারে যজমানের চক্ষুর অঞ্জন করেন, তথা সম্যক লিপ্ত করেন (সমঞ্জতে)। অতঃপর যজমানকে সোমযাগ-সংকল্প আস্বাদন করিয়ে থাকেন (ক্রতুং রিহন্তি); (অর্থাৎ সোমের দ্বারা যজ্ঞ করবো এমন বাক্য উচ্চারণ করিয়ে থাকেন)। অতঃপর মাধুর্যোপেত নবনীতের দ্বারা (সোমকে) যজমানের আপাদমস্তক প্রলিপ্ত করেন (মধুনা অভ্যঞ্জতে)। (আকাশে স্থিত চন্দ্র পৃথিবীতে সোমরূপ লতারূপে বিরাজিত–তা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে)–স্যন্দনশীল বেগবান বা জলসম্ভারশালী) সমুদ্রের অভিবৃদ্ধিকালে (সিন্ধুরুচ্ছাসে) উদয়প্রাপ্ত (অর্থাৎ অভিষবকালে পতয়ন্ত বা উত), অমৃতময় কিরণে অভিষিক্ত (উক্ষণ), আপন প্রভায় সর্ব জগৎকে প্রকাশকারী (পশু),–এই হেন গুণবিশিষ্ট (অর্থাৎ রসাত্মন) সোমকে হিরণ্যপানি এ (হিরণ্যপাবাঃ অর্থাৎ হিরণ্যের দ্বারা পবিত্ৰীকৃত) ঋত্বিগণ স্থালীতে গ্রহণ করছেন (আসু গৃহুতে)। (সোমযাগে বিহিত চারিটি স্থালীতে গ্রহ চমস ইত্যাদি যজ্ঞপাত্র সোমরস গ্রহণের নিমিত্ত সংস্কার করা হচ্ছে–এটাই বক্তব্য) ৮
হে পিতৃগণ (পিতরঃ)! তোমাদের হর্ষজনক (মুদ্রং) ও সোমাহ (সোম্যং) যে ধন বিদ্যমান, সেই ধনের সাথে (তেননা) আমাদের সঙ্গত হও (সচধ্বং); (অর্থাৎ সেই ধন আমাদের প্রদান করো) এবং তোমরা স্বায়ত্তযশস্কা অর্থাৎ যশস্বী হও (স্বযশসো হি ভূত)। যে হেন তোমরা গমনশীল (অর্বাণঃ), ক্রান্তদর্শী (কবঃ) শোভনজ্ঞানী বা শোভনধনা (সুবিদত্রাঃ), সেই তোমরা আমাদের এই যজ্ঞে (বিদথে) হুয়মান হও; অর্থাৎ আমাদের আহ্বান শ্রবণ করো। ৯ ৷
(হে পিতৃবর্গ!) তোমাদের মধ্যে যারা অত্রিগোত্রোৎপন্ন (অত্রয়ঃ), বা যারা অঙ্গিরোগোত্ৰজাত (অঙ্গিরসঃ) (বা অত্রিমহর্ষিরূপে অঙ্গিরোরূপে অবস্থিত), যারা অভিনবগমনা (নবদ্যা), (অথবা অঙ্গিরসগণের কেউ কেউ সত্রযাগ পূর্বক নবভিমাসৈঃ অর্থাৎ নয়মাসে স্বর্গে গমন করার জন্য নবথা নামে অভিহিত হয়, তারা), যারা দর্শপূর্ণমাস ইত্যাদি যাগকারী (ইষ্টাবন্তঃ), যারা দক্ষিণাযুক্ত ক্রিয়াকারী (রাতিযাচঃ), যারা দানযুক্ত (দধানাঃ), অন্য যারা দক্ষিণাদানযুক্ত (দক্ষিণাবন্ত) হয়ে পুণ্যকারী বা পুণ্যবন্ত (সুকৃত) হয়েছে, সেই হেন তোমরা এই যজ্ঞে বা আস্তীর্ণ দর্ভে (বহিষি) উপবিষ্ট হয়ে আমাদের প্রদত্ত হবির দ্বারা তৃপ্ত (মাদয়ধ্বং)। ১০।
বঙ্গানুবাদ –আরও (অধ), যে প্রকারে আমাদের পূর্বকালীন উৎকৃষ্ট (পরাসঃ প্রত্নাসঃ) পিতৃপিতামহগণ (বা আমাদের পিতৃভূত অঙ্গিরাগণ), হে অগ্নি! তোমার প্রসাদে যজ্ঞ ব্যাপ্ত করে (ঋতম্ আশশানাঃ) দীপ্ত স্থানে (অর্থাৎ নাকপৃষ্ঠাখ্য স্থানে) গমন করেছেন (শুচীদয়ন), উথ শস্ত্রের দ্বারা দীপ্যমান সেই হেন গুণবিশিষ্ট পিতৃপুরুষগণ রাত্রির অন্ধকার (ক্ষামা) ভেদ করে (ভিতঃ) (অর্থাৎ আপন তেজে নিবর্তন করে) অরুণবর্ণা উষাকাল অপাবৃত অর্থাৎ প্রকাশ করেছিলেন। (অরুণীরপ ব্রণ)। (অথবা এইস্থানে একটি আখ্যায়িকাও বলা হয়েছে, মনে করা যেতে পারে; যথা–পুরাকালে পণি-নামক অসুরগণ অঙ্গিরা-গোত্রীয় ঋষিগণের যজ্ঞসাধনভূতা গাভীগুলিকে অপহৃত করে ভূমির নিম্নে একটি গহ্বরে গোপন করে রেখেছিল। অঙ্গিরাগণ তা জ্ঞাত হয়ে ইন্দ্রের সহায়তায় সেই ভূমি-গহ্বর বিদারিত করে গাভীগুলিকে পুনরায় প্রাপ্ত হয়েছিলেন।–এই আখ্যায়িকার পক্ষে কতকগুলি শব্দের পরিবর্তিত অর্থ লক্ষণীয়; যথা–ক্ষাম (ভূমি), ভিন্দন্তঃ (বিদারণ করণ), অরুণী, (অরুণবর্ণা গাভী), অপ ব্রন (গহ্বরের দ্বার অপবৃত করে প্রাপ্তি) ইত্যাদি। ১।
শোভনকর্মা (সুকৰ্মাণঃ) শোভন দীপ্তিশালী (সুরুচঃ) পিতৃদেবগণ (দেবাঃ) দেবত্ব (প্রাপ্তির) ইচ্ছায় (দেবয়ন্তঃ), লৌহকার যেমন লৌহকে (বহ্নিদ্বারা) পরিশুদ্ধ করে (ধমন্তঃ), সেই রকমে আপন জন্মকে তপস্যার দ্বারা শোধন করে (শুচন্তঃ) দেবত্ব লাভ পুর্বক গার্হপত্য ইত্যাদি অগ্নিকে (অগ্নিং) প্রজ্বালিত করে স্তুতির দ্বারা ইন্দ্রকে বর্ধিত করেছেন (ববৃধন্তঃ); তাঁদের মহতী (উব্বীং) গাভীসমূহ আমাদের সর্বদিকে (পরিসদন) নিবাস (বা বিচরণ) করছে (অক্র)। ২
বোদ্যত (উগ্রঃ) অগ্নি যজ্ঞাই ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণের (দেবানাং) জন্ম বা প্রাদুর্ভাব (জনম) জ্ঞাত হতে সক্ষম (অন্তি)। যেমন শব্দবতী গাভীর যূথসমূহের মধ্যে পশুর স্বামী (পালক) তাদের আপন গাভীকে দেখতে পায়। (যদ্বা দাহকোগ্নি সম্বোধ্য–অর্থাৎ মৃতপুরুষকে দহনকারী অগ্নির উদ্দেশে বলা হচ্ছে)-হে অগ্নে! (ত্বয়া দহ্যমানো)। তোমার দ্বারা দহ্যমান (অয়ং যজমানঃ) এই যজমান (তৎপ্রসাদাৎ) তোমার প্রসাদ হতে (উঃ) উনূর্ণবল লাভ করে (ক্ষুমতি) শব্দবতী (যুথে) গো-সম্মের মধ্যে (পঃ) পশুর আত্মীয় অর্থাৎ পালক (আখ্যৎ) যেমন আপন পশুগণকে জ্ঞাত হয় (অর্থাৎ দেবলোকে গত এই যজমানের অন্তিকে দেবগণ প্রাদুর্ভূত হন), তেমনই (মর্তাসশ্চিৎ) মনুষ্যজাতীয়গণও (তোমার প্রসাদে) উর্বশী প্রমুখ অপ্সরীদের (অকৃপ্রন) অকৃত্রিমরূপে লাভ করে (অর্থাৎ উপভোগে সমর্থ হয়ে থাকে) এবং (তোমার সে প্রসাদে) দেবত্ব প্রাপ্ত হয়ে (অৰ্য্যঃ) স্বামী হয়ে (উপরস্য) গর্ভাশয়ে (বীর্য) নিষিক্ত পূর্বক (আয়োঃ) গর্ভাবস্থ মনুষ্যের বর্ধন করে; (অর্থাৎ পিতার প্রসাদ হতে পুত্র-পৌত্র ইত্যাদির অভিবৃদ্ধি হয়ে থাকে–এই-ই ভাবার্থ) ॥ ৩॥
হে পালক অগ্নি (অব)! তোমাকে পরিচর্যা করবো (তে অকর্ম)। অতএব তোমার প্রসাদে শোভনকর্মা হবো (স্বপসঃ অভূম); (অর্থাৎ আমাদের কৃত যাগ-হোম ইত্যাদি কর্মসমূহ যেভাবে শোভন ফলযুক্ত হয় সেইভাবে সাধিত করবো)। তথা প্রকাশিকা (বিভাতীঃ) ঊষার সত্য (উষসশ্চ ঋত) (অর্থাৎ যাগ-দান ইত্যাদি কর্মফল-লভ্য কর্ম) সাধিত করবো। যে শাস্ত্রবিহিত কর্ম (যৎ) দেবগণ রক্ষা করেন (দেবা অবন্তি) তা সকলের কল্যাণকর হয়ে থাকে (তৎ বিশ্বং ভদ্রং ভবতি)। আমরাও শোভন পুত্র ইত্যাদির দ্বারা যুক্ত হয়ে (সুবীরাঃ) যজ্ঞে (বিদর্থে) মহৎ স্তোত্র উচ্চারিত করবো (বৃহৎ বদাম)। ৪
একোনপঞ্চাশ সংখ্যক মরুৎ-দেবতাগণের সাথে (মুরুত্বা) ইন্দ্র, সংস্কারকারক আমাকে (মা-মাং সংস্কর্তারং) পূর্বদিক সম্বন্ধি ভয়ের হেতু হতে তেমনই রক্ষা করুন (প্রাচ্যা দিশঃ পাতু); যেমন বাহুচ্যুতা পৃথিবী (দানের নিমিত্ত ভূমিদানকারীর বাহু হতে নির্গত ভূমি বা প্রতিগ্ৰহ-সম্বন্ধিরূপে প্রাপ্তা ভূমি–অর্থাৎ উদকপূর্ব ভূমির দাতা বা প্রতিগ্রহীতা) উপভোগ্য স্বর্গলোকে (দ্যামিববাপরি) পালিত হয়। আরও, লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদি প্রাপ্তির (লোককৃতঃ) এবং সেই প্রাপ্তির উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। (যজামহে)। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ সহ হুতভাগারূপে (অর্থাৎ স্বাহাকার বষটকারের দ্বারা অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে) আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধকর্মে অবস্থান করো (ইহ স্থ)। ৫।
সর্ব জগতের বিধাতা বা ধারয়িতা (ধাতা) আমাকে (দক্ষিণ দিকস্থ) আর্তিকরী পাপদেবতা নির্ঋতির ভয় হতে (অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে অবস্থিত রাক্ষস পিশাচ ইত্যাদি হতে) রক্ষা করুন (দক্ষিণায়াঃ দিশঃ মাং পাতু)। লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদি প্রাপ্তির এবং তার উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ সহ স্বাহাকার-বষট্কারের দ্বারা অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধকর্মে অবস্থান করো। ৬।
অদিতি (অদীনা দেবমাতা) তাঁর স্বপুত্র আদিত্যগণের সাথে (সা আদিত্যৈঃ) পশ্চিম দিক হতে (অর্থাৎ পশ্চিমদিকস্থ রাক্ষস পিশাচ ইত্যাদির ভয় হতে) আমাকে রক্ষা করুন। লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদি প্রাপ্তির এবং তার উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বার পূজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ সমভিব্যাহারে হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধকর্মে অবস্থান করো ॥ ৭৷
সকল দেবগণ সহ (বিশ্বৈঃ দেবৈঃ) সোমদেবতা আমাকে উত্তর দিক হতে (মাং উদীচ্যা দিশঃ) রক্ষা করুন (পাতু)। (অর্থাৎ উত্তর দিকস্থায়ী রাক্ষস-পিশাচ ইত্যাদির ভয় হতে রক্ষা করুন)। লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদি প্রাপ্তির এবং তার উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ সমভিব্যাহারে হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধকর্মে অবস্থান। করো। ৮।
হে প্রেত! সকল জগতের ধারয়িতা (ধারণকর্তা) ধর্তা নামক উধ্বদিকের অভিমানী দেবতা ঊধ্বদিকে অবস্থিত লোকান্তরে গমনোদ্যত বা ঊর্ধ্বমুখী তোমাকে ধারণ করুন। (কেমন ভাবে? না) যেমন সর্বপ্রেরক সূর্য (সবিতা) দীপ্ত দ্যুলোককে উপরে যথা ভানুং দ্যাং ধারণ করেছেন। লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদি প্রাপ্তির এবং তার উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ সমভিব্যাহারে ও হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধকর্মে অবস্থান করো। ৯
হে প্রেত! দহন-স্থান হতে পূর্বদিকের পার্শ্বে (প্রাচ্যাং ত্বা দিশি) কম্বলের দ্বারা আবেষ্টিত (পুরা সমৃতঃ) আমি, তোমাকে স্বধাতে (অর্থাৎ পিতৃদেবগণের তৃপ্তিকরী জল-পিণ্ড ইত্যাদিতে) ধারণ করছি (দধামি), যেমন দাতার হস্তচ্যুত ব্রাহ্মণকে প্রদত্ত ভূমি দাতাকে ও প্রতিগ্রহীতাকে স্বর্গের উপরে নাকপৃষ্ঠাখ্য লোকে পালন করায়; (অর্থাৎ সংস্কার কর্মের দ্বারা তোমার প্রেতত্ব-প্রচ্যুতিপূর্বক পিতৃদেবতাত্ব প্রাপ্তি করাচ্ছি), লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদি প্রাপ্তির এবং সেই প্রাপ্তির উপায়ভূত মার্গের কর্তা। দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ সহ হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধ কর্মে অবস্থান করো। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে প্রেত। পূর্বের মতো (পুরা) আত্মরক্ষার্থে কম্বল ইত্যাদির দ্বারা প্রাবৃতাঙ্গে আমি (দহনস্থান হতে) দক্ষিণদিক্-ভাগে তোমাকে পিতৃদেবরূপে স্বধাতে স্থাপন করবো; (অর্থাৎ তোমাকে স্বধাকার-ভাজন করবো); যেমন ভূমির দাতা ও প্রতিগ্রহীতা স্বর্গলোকে পালিত হয়। লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদির প্রাপ্তি এবং সেই প্রাপ্তির উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ সহ হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধ কর্মে অবস্থান করো। ১।
হে প্রেত। পূর্বের মতো আত্মরক্ষার্থে কম্বল ইত্যাদির দ্বারা প্রাবৃতাঙ্গে আমি (দহনস্থান হতে) পশ্চিম দিক্-ভাগে তোমাকে পিতৃদেবরূপে স্বকারভাজন করছি; যেমন ভূমির দাতা ও প্রতিগ্রহীতা স্বর্গলোকে পালিত হয়। লোকের পুণ্যফলভৃত স্বর্গ ইত্যাদির প্রাপ্তি এবং সেই প্রাপ্তির উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ সহ হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধ কর্মে অবস্থান করো ৷ ২৷৷
হে প্রেত! পূর্বের মতো আত্মরক্ষার্থে কম্বল ইত্যাদির দ্বারা প্রাবৃতাঙ্গে আমি (দহনস্থান হতে) উত্তর দিক-ভাগে (উদীচ্যাম) তোমাকে পিতৃদেবরূপে স্বকারভাজন করছি; যেমন ভূমির দাতা ও প্রতিগ্রহীতা স্বর্গলোকে পালিত হয়। লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদির প্রাপ্তি এবং সেই প্রাপ্তির উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পুজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ সহ হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধকর্মে অবস্থান করো ॥ ৩ ৷৷
হে, প্রেত! পূর্বের মতো আত্মরক্ষার্থে কম্বল ইত্যাদির দ্বারা প্রাবৃতাঙ্গে আমি (দহনস্থান হতে) ধ্ৰুবা দিভাগে (অর্থাৎ স্থিরা অধরা দিকে) তোমাকে পিতৃদেবরূপে স্বকারভাজন করছি; যেমন ভূমির দাতা ও প্রতিগ্রহীতা স্বর্গলোকে পালিত হয়। লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদির প্রাপ্তি এবং সেই প্রাপ্তির উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ সহ হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধকর্মে অবস্থান করো ৷৷ ৪
হে প্রেত! পূর্বের মতো আত্মরক্ষার্থে কম্বল ইত্যাদির প্রাবৃতাঙ্গে আমি (দহনস্থান হতে) উপরিতন দিভাগে (উর্ধ্বায়াং দিশি) তোমাকে পিতৃদেবরূপে স্বধাতে স্থাপন করবো; (অর্থাৎ তোমাকে স্বকারভাজন করবো); যেমন ভূমির দাতা ও প্রতিগ্রহীতা স্বর্গলোকে পালিত হয়। লোকের পুণ্যফলভূত স্বর্গ ইত্যাদির প্রাপ্তি এবং সেই প্রাপ্তির উপায়ভূত মার্গের কর্তা দেবগণকে আমরা হবির দ্বারা পূজা করছি। হে দেবগণ! তোমরা যারা ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ সহ হবির্ভাগ গ্রহণের উদ্দেশে আগমন করেছে, তারা এই পিতৃমেধ কর্মে অবস্থান করো ॥ ৫৷৷
হে অগ্নি! তুমি সকলের ধারয়িতা (ধর্তাসি)। তুমি সকলের দ্বারা ধৃত বা অবলম্বিত (ধরুণঃ), (অর্থাৎ গার্হপত্য ইত্যাদিরূপে সকলের দ্বারা ধার্যমান); তুমি বননীয়গতি বৃষভ (বংসগঃ)। [ ঋগ্বেদের চত্বারি শৃঙ্গা (৪৫৮৩) ইত্যাদি ঋক্ হতে অগ্নির বৃষভরূপের কল্পনা সমান্নাতা] ৷ ৬ ৷
(তথা) হে! অগ্নি! তুমি উদকের অর্থাৎ জলের পূরয়িতা (উদপূঃ অসি)। (তথা) মাক্ষিকের অর্থাৎ মধুর পূরয়িতা? (মধুপূঃ অসি)। (তথা) প্রাণাত্মক বায়ুর পূরয়িতা (বীতপূঃ অসি)। ৭
এই ভূলোক হতে স্বর্গলোক, পর্যন্ত (ব্যাপ্ত) (ইতশ্চ অমুতশ্চ) অর্থাৎ লোকদ্বয়ে অবস্থিত ভয়ের হেতু হতে আমি হেন যজমানকে (মাং) হবির্ধানীদ্বয় (অবতাং) (অর্থাৎ হবির আধারভূতা দ্যাবাপৃথিবী) রক্ষা করুক। হে দ্যাবাপৃথিবী! তোমরা যমজের মতো (যমে ইব) অর্থাৎ যুগপৎ উৎপন্না সন্তানের মতো সমান কর্মে ব্যাপৃত হয়ে (যতমানে-সমানব্যাপ্রিয়মাণে) জগৎসংসারকে পোষণের নিমিত্ত প্রযত্ন করো। তোমাদের দুজনের (বাং) দেবত্ব কামনা করে (দেবয়ন্তঃ) ঋত্বিক যজমান মনুষ্যগণ (মানুষাঃ) হবিঃ সংগ্রহ করেছেন (প্র ভরন); তোমরা দুজনে স্বকীয় (স্বং) স্থান (লোকং) বিদিত হয়ে (বিদানে) উপবেশন করো (আ সীদতাং)। ৮৷৷
হে হবির্ধানীদ্বয়! আমাদের (নঃ) সোমের নিমিত্ত (ইন্দবে) সুস্থির হও অর্থাৎ সুখাসনস্থ হও (স্বাসন্তে)। আমি তোমাদের (বাং) নমস্কারের সাথে (নমোভিঃ) চিরন্তন (পূর্বাং) সমর্থ স্তুতি (ব্রহ্ম) করছি। এই শ্লোকনীয় স্তুতিগুলি (শ্লোকঃ) বিশেষভাবে (ব্যেতি) তোমাদের নিকট গমন করুক, যেমন ধর্মপথগামী (পথোনপেতেন) বিদ্বান্ (সূরিঃ) (অভিমত ফল লাভ করেন)। আমাদের কৃত এই স্তোত্র (এতৎ) সকল দেবগণ (বিশ্বে অমৃতাসঃ, অর্থাৎ সকল অমরবৃন্দ) শ্রবণ করুক। ৯।
এই অনুষ্ঠীয়মান পৈতৃমেধিক (পিতৃমেধ-সম্বন্ধীয়) সংস্কারের দ্বারা (এতৎ ব্ৰতেন) চারিপাদশালিনী গাভী (চতুষ্পদী অর্থে অনুস্তরণী গাভী) দ্যুলোককে লক্ষ্য রেখে ক্রমে তিন লোকে আরোহণ করে থাকে (অম্বারোহৎ); (অর্থাৎ সংস্কারমাহাত্মে মৃতজন লোকত্রয়ে ব্যাপ্ত হয়ে যায়)। পরিচ্ছেদক শরীর ত্যাগ করে ব্যাপক বা বিনাশরহিত আত্মস্বরূপের দ্বারা অর্চনীয় সুকৃতফল (স্বর্গ ইত্যাদি) লাভ করে (অর্কং) কিংবা সূর্যের ন্যায় প্রতিমুখে ব্যাপ্ত হয় (প্রতি মিমীতে) বা সূর্যের প্রতিবিম্ব হয়। সত্যের উদক বা যজ্ঞের নামধেয় (ঋতস্য নাভৌ) তার উৎপত্তিস্থানে (অর্থাৎ সূর্যমণ্ডলের) সর্বত্র বা অভিমুখে সম্যক পূত হয়ে অবস্থান করে (অভি সম্ পুনাতি) ॥ ১০৷
বঙ্গানুবাদ— সৃষ্টির আদিতে বিধাতা (স্রষ্টা) ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাগণের নিমিত্ত কোনরকম মৃত্যুর বিধান করেছেন কি? (দেবেভ্যঃ কম্ মৃত্যু অবৃণীত), (অর্থাৎ দেবগণকে মৃত্যুসম্বন্ধ-বিরহিত বা অমর করলেন)। কিন্তু কি কারণে (কিং) মনুষ্য ইত্যাদিরূপ প্রজাবৃন্দের নিমিত্ত অমরণ (অমৃতং) করলেন না (ন অবৃণীত)? (অর্থাৎ মনুষ্য ইত্যাদিকে দেবতাগণের ন্যায় অমর করলেন না)। (অতএব প্রজাপতি কর্তৃক দেবগণের অমরত্ব এবং মনুষ্যগণের মরণ অনাদিসিদ্ধ; এর কারণ অনুসন্ধান বৃথা)। বৃহস্পতি (দেবপ্রভু বা দেবগুরু), যিনি অতীন্দ্রিয়ার্থদ্রষ্টা (ঋষিঃ), তিনি সোমযাগ (যজ্ঞং), অনুষ্ঠিত করেছিলেন (অতনুত); (অর্থাৎ ভূলোকে ঋষিরূপে অবস্থিত বৃহস্পতি আপন ঐহিকামুষ্মিক অর্থাৎ ইহলোক ও পরলোক সম্বন্ধীয় সুফল প্রাপ্তির উপায়ভূত যজ্ঞ করেছিলেন, এটাই বক্তব্য)। বৃহস্পতির প্রেমাস্পদ মনুষ্যশরীরকে (প্রিয়ং তং) বৈবস্বত (যম) সমস্ত কিছু হতে নিঃসার বা মৃত করে দিয়েছিল (আ রিরেচ)। (সুতরাং ঋষিরূপে অবস্থিত বৃহস্পতিরও প্রাণ যখন যম কর্তৃক অপহৃত হয়েছিল, তখন অন্যেষাং অর্থাৎ মনুষ্য ইত্যাদিরও প্রাণ যে যম অপহরণ করবে, তাতে আর বলার কি আছে (কিমু বক্তব্যং)? ॥১॥
হে জাতবেদা (জাত প্রাণীবর্গের জ্ঞাতা) অগ্নি! তুমি আমাদের দ্বারা স্তুত হয়ে (ঈড়িতঃ) আমাদের প্রদত্ত চরুপুরোডাশ ইত্যাদি (হব্যানি) সুরভিত বা রসবন্ত করে দেবগণের নিকট বহন করে থাকো (অবাট)। তথা পিতৃদেবতাগণের নিকট স্বধাকারের সাথে কব্যসংজ্ঞক হবি (স্বধয়া) প্রদান করে থাকো (প্রাদাঃ)। এবং সেই পিতৃগণ তোমা কর্তৃক দত্ত কব্য ভোগ করে থাকেন (অক্ষ)। হে দেব (দ্যোতমান আগ্নি)! তুমিও (ত্বমপি) প্রকর্ষের সাথে আমাদের প্রদত্ত হবি ভক্ষণ করো (প্রয়তা অদ্ধি)। ২।
হে পিতৃগণ! তোমরা অরুণবর্ণশালিনী উষা-মাতৃগণের (অরুণীনাম) ক্রোড়ে উপবেশন করে (উপস্থে আসীনাসঃ) হবি-দানকারী (দাশুষে) মরমধর্মী যজমানকে (মর্তায়) ধন প্রদান করো (রয়িং ধত্ত)। পুন্নাম (পুনামক) নরক হতে ত্রাতা পুত্ররূপী আমাদের (পুত্রেভ্যঃ) সেই প্রসিদ্ধ (তৎ) ধন (বসু) প্রদান করো। হে পিতৃগণ! তোমরা (তে) এই ভূলোকে (ইহ) বলকারক অন্ন (ঊর্জ) আমাদের প্রদান করো (দধাত) ৩
হে অগ্নিদাত্তা পিতৃগণ! [তৈত্তিরীয়ক অনুসারে পিতৃদেবগণ বহিষদ ও অগ্নিদাত্ত ভেদে দুই প্রকার। যে পিতৃগণ কৃতসোমযাগ, তাঁরা বহিষদ এবং যারা অকৃতসোমযাগ, তাঁরা অগ্নিদাত্ত]। এই যজ্ঞে আগত হও (আ ইহ গচ্ছত)। হে প্রকৃষ্ট ও শোভন ফলদাতা (সুপ্রণীতয়ঃ) (পিতৃগণ)! আগমন পূর্বক তোমরা নিজ নিজ স্থানে উপবেশন করো (সদঃসদঃ)। (অর্থাৎ পিতৃ-পিতামহ-প্রপিতামহ ইত্যাদির নিমিত্ত যে যে স্থান পরিকল্পিত, সেই সেই স্থান প্রাপ্ত হও)। (উপবেশনের পর) যজ্ঞে প্রদত্ত (বহিষে প্রয়তানি) বা শুদ্ধ চরুপুরোডাশ ইত্যাদি (হীংষি) ভক্ষণ করো (অত্ত)। হবির্ভক্ষণে সন্তুষ্ট হয়ে তোমরা সকল পুত্রপৌত্র ইত্যাদি (সর্ববীরং) এবং ধন (রয়িং) প্রদান করো (দধাত) ৪
আমাদের পিতৃ-পিতামহ-প্রপিতমহ ইত্যাদি যে পিতৃপুরুষগণ সোমাহ (সোম্যাসঃ) (অর্থাৎ সোম প্রাপ্তির যোগ্য), তারা আমাদের সমীপে আহূত হয়ে এই যজ্ঞের হবিতে প্রতিমান ও নিধীয়মান হতে আগমন করুন (বহিষ্যেষু নিধিষু প্রিয়ে আগমন্তু)। এই যজ্ঞে (ইহ) সেই পিতৃগণ (তে) আমাদের স্তোত্র শ্রবণ করুন (বস্তু), আমাদের সম্পর্কে অধিক বলুন (ব্রুবন্তু) (অর্থাৎ আমাদের প্রভূত আশীর্বাদ প্রদান করুন); অধিকন্তু সেই পিতৃগণ আমাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সুফল প্রদানের দ্বারা রক্ষা করুন (অবন্তু)। ৫।
আমাদের (নঃ) পিতার জনক যে পিতামহগণ, সেই পিতামহগণের যারা পিতা বা প্রপিতামহগণ, যাঁরা উত্তম ধনবান, (বসিষ্ঠ), যাঁরা অনুক্রমে সোমপান হরণ বা আত্মসাৎ করে থাকেন (সোমপীথং অনূজহিরে), সেই কাময়মান (উশন) পিতৃগণের সাথে রমমান অর্থাৎ আনন্দিত (সংররাণঃ) যমও কাময়মান হয়ে (উশদ্ভিঃ) আমাদের প্রদত্ত পুরোশ ইত্যাদি (হীংষি) প্রত্যাভিলাষ পূর্বক অর্থাৎ অভিলাষানুসারে ভক্ষণ করুন (প্রতিকামং অদ্ভু)। ৬।
দেবতাগণের প্রতি প্রযতমান (দেবত্রা জেহমানা) (অর্থাৎ দেবকর্মে ব্যাপ্রিয়মাণ) সপ্ত বষট্কর্তার (হোত্রাগণের) হোমকর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন (হোত্রাবিদঃ), অর্চনীয় (অর্কৈঃ) স্তোত্রের কর্তা বা নিষ্ঠাবান যে হেন পিতৃগণ পিপাসার্ত (তাতৃষ্ণুঃ), সেই দেব-বন্দনাপরায়ণ (দেববঃ ), সত্যস্বরূপ (সত্যৈঃ), অতীন্দ্রিয়দ্রষ্টা (ঋষিভিঃ), সোমযাগে উপবিষ্ট (ঘর্মর্সদ্ভিঃ), পিতৃগণের সাথে, হে অগ্নি! তুমি আমাদের নিমিত্ত অপরিমিত ধন (সহস্রং) সহ আগমন করো; (অর্থাৎ আগমন পূর্বক আমাদের প্রদত্ত হবির দ্বারা পিতৃগৃণের পিপাসা নিবারণ করো–এটাই বক্তব্য)। ৭৷
যে পিতৃগণ সপ্রভ বা সত্যভাষী (সত্যাসঃ), যাঁরা চরু-পুরোডাশ ইত্যাদি ভক্ষণকারী (হবিরদঃ), যাঁরা, সোমরস পানকারী (হবি), যাঁরা ত্বরমান অর্থাৎ শীঘ্রতাসম্পন্ন বা শত্রুহিংসক (তুরেণ) ইন্দ্রদেবের সাথে সমান রথে (সরথং) আরোহণকারী, (অর্থাৎ ইন্দ্রদেবতার সাথে একই রথে উপরূঢ়), সেই হেন শোভনপ্রজ্ঞ (সুবিদত্রেভিঃ), অতীন্দ্রিয়ার্থদর্শী (ঋষিভাঃ), যজ্ঞে আসনগ্রহণকারী (ঘর্মর্সদ্ভিঃ), উৎকৃষ্ট (পরৈঃ) পূর্বপুরুষবর্গের (পূর্বৈঃ) অর্থাৎ পিতৃ-পিতামহ-প্রপিতামহগণের সাথে, হে অগ্নি! তুমি আমাদের অভিমুখী হয়ে (অর্বাঙ) আগমন করো (আ যাহি) ॥ ৮
হে প্রেত! তুমি জননীস্বরূপা (মাতরম্) এই ভূমিতে (এতাং ভূমিং) উপগমন করো (উপ সর্প) (অর্থাৎ এই ভূমির সন্নিহিত হও)। (এই ভূমি কিরকম? না–) ইনি বিস্তীর্ণব্যাপনা রূপে প্রখ্যাত (উরুবাচসং), সুসুখা (সুশেবাং) (অর্থাৎ শোভন সুখদাত্রী); তোমার উপসৃপ্তা এই (এষা) পৃথিবী (অর্থাৎ তুমি যে পৃথিবী বা ভূমির নিকটে উপনীত হয়েছে) তোমা হেন বহু দক্ষিণাযুক্ত যজ্ঞকারীর (দক্ষিণাবতে) প্রতি মেষ ইত্যাদির লোমে বিরচিত নরম কম্বলের ন্যায় সুখকরী হয়ে (উদাঃ ) পূর্বদিকে বা পূর্বের ন্যায় (পুরস্তাৎ) মার্গের প্রারম্ভে (প্রপথে) রক্ষা করুন (পাতু)। ৯।
হে পৃথিবী (ভূদেবতে)! তুমি উচ্ছুনাবয়বা অর্থাৎ পুলকে স্ফীতাঙ্গিনী হও (উচ্ছঞ্চস্ব); অধিকন্তু এই উপসৃপ্ত (অর্থাৎ নিকটে গমনকারী) পুরুষের প্রতি কার্কশ্যের দ্বারা বাধক হয়ো না (মা বাধথাঃ), এই পুরুষের প্রতি সুখের সাথে গমনকারিণী (সূপায়না) এবং শোভন- উপসর্পণযুক্ত (সূপসৰ্পণা) (অর্থাৎ সহজে নিকটস্থিতা) হও। যে রকমে (যথা) জননী আপন পুত্রকে চেলাঞ্চলের দ্বারা অভিচ্ছাদিত করেন (সিচা), সেই রকমেই এই উপগত পুরুষকে (এনং), হে ভূমি! তুমিও সর্বতোভাবে আচ্ছাদিত করো (অভূর্ণহি); (অর্থাৎ এর যেন শীতলবায়ু ও উষ্ণতাজনিত দুঃখ না ঘটে, তেমনভাবে একে রক্ষা করো। ১০।
বঙ্গানুবাদ –এই পৃথিবী পুলকে উচ্ছলিত অঙ্গে (উচ্ছ্বঞ্চমানা) সুখে অবস্থান করুন (সু। তিষ্ঠতু); শ্মশানস্থানে সহস্ৰসংখ্যায় (অর্থাৎ অপরিমিতভাবে) স্থাপিত (মিতঃ) ঔষধি মিলিতভাবে আশ্রিত হোক (উপ শয়ন্তাং)। যখন (হি) ঔষধিগুলি বনস্পতিসমূহের সাথে মিলিত হয়, তখন সেগুলি ঘৃতস্রাবী (ঘৃততঃ) সুখকর (স্যোনাঃ) গৃহরূপে (গৃহাসঃ) শ্মশানস্থানে (অত্র) মৃতপুরুষের সর্বকালের (বিশ্বাহা) রক্ষক হোক (শরণাঃ সন্তু) ॥১॥
হে মৃতপুরুষ! তোমার নিমিত্ত এই পৃথিবীকে উধ্বে ধারণ করছি (উৎ স্তম্লামি)। তোমার সর্বদিকে (তৎ পরি) সকল প্রাণাধিষ্ঠিত ভূলোককে (ইমং লোকং) নিক্ষেপ করে (নিদধৎ) আমি যেন হিংসিত না হই (অহং মো রিষ)। এই উত্তোলনের দ্বারা ধৃত ভূমিতে পিতৃদেবতাগণ তোমার গৃহনির্মাণের নিমিত্ত প্রসিদ্ধ স্তম্ভ (এতাং স্থূণাং) স্থাপন করেছেন (ধারয়ন্তি)। সেই স্থানে (তত্র) যম তোমার গৃহ (সাদনা) নির্মাণ করুন (কৃণোতু)। ২৷৷
হে অগ্নি! তুমি এই চীয়মান অর্থাৎ ভক্ষণসাধন যজ্ঞীয় চমসকে (ঈড়াপাত্রকে) কুটিল বা বক্র করে দিও না (মা বি জিহুরঃ)। এই চমস দেবগণের প্রীতিকর (দেবানাং প্রিয়); অধিকন্তু সোমাহঁ পিতৃগণেরও প্রীতিকর। এই চমসে সকল দেবগণ অমৃত পান করেন (দেবপানঃ); অতএব এই হেন গুণবিশিষ্ট চমসও অমৃতের দ্বারা তৃপ্ত হোক (মাদয়স্তা) ॥ ৩॥
অথবা নামধারী অতীন্দ্রিয়ার্থদ্রষ্টা কোন ঋষি হবিলক্ষণযুক্ত যজ্ঞে (বাজিনীবতে) ইন্দ্রের প্রীতির নিমিত্ত সোম ইত্যাদি হবি-পূরিত যে চমস সংগ্রহ করেছিলেন (অবিভঃ অর্থাৎ সভৃতবা), সেই চমসে (তস্মিন্ সুষ্ঠুভাবে কৃত যজ্ঞে (ঋত্বিকগণ) হুতশিষ্ট হবিঃ ভক্ষণ করে থাকেন (ভক্ষণং করোতি)। তথা সেই অথবা কর্তৃক সংগৃহীত চমস হতে (তস্মিন্) সর্বদা (বিশ্বদানীং) অমৃতরসাত্মক সোম ক্ষরিত হয় (ইন্দুঃ পবতে)। ৪
হে পুরুষ তোমার– (তে) যে অঙ্গ (যৎ) কৃষ্ণবর্ণ কাক ইত্যাদি (শকুনঃ) পক্ষী দংশনের দ্বারা ব্যথিত করেছে। (আতুতোদ); তথা বিষাদ্রংষ্ট্র পিপীলিকা বিশেষ (পিপীলঃ) অথবা সর্প বা ব্যাঘ্র ইত্যাদি (শ্বাপদঃ) ব্যথিত করেছে, সেই অঙ্গ (তৎ) সর্বক্ষক অগ্নি (বিশ্বাৎ) আরোগ্য বা নিরাময় (অগদং) করুন (কৃণোতু); এবং যে সোম (যঃ চ সোমঃ) ঋত্বিক-যজমানগণের (ব্রাহ্মণা) অন্তরে রসরূপে প্রবিষ্টবান্ (আবিবেশ), সেই সোমও তোমাকে বা তোমার সেই ব্যথিত অঙ্গকে রোগরহিত করুন। ৫
ঔষধিসমূহ (অর্থাৎ ব্রীহি, যব ইত্যাদি ও অন্য ফলপাকান্তা ওষধিসমূহ (ওষধয়ঃ) আমাদের নিমিত্ত সারভূতশালিনী হোক (পরস্বতীঃ), আমাদের শরীরস্থিত (মামকং) যে সারভূত বল (পয়ঃ) আছে, তাও সারবান হোক (পয়স্বৎ)। তথা জলসম্বন্ধী (অপাং) সারভূত অংশের (পয়সঃ) যে উৎকৃষ্ট অংশ (যৎ পয়ঃ), তা ওষধি ইত্যাদিগত জলের সকল সারের সাথে (পয়সা) আমাকে শোভন বা দীপ্ত করুক (শুম্ভতু); (অর্থাৎ জলের অভিমানী দেবতা বরুণ স্নানের দ্বারা আমাকে শোধিত করুন ৬
প্রেতকুলোৎপন্না এই নারীগণ (ইমাঃ নাৰ্য) বৈধব্যরহিতা (অবিধরা) হয়ে সুপত্নিকা রূপে (অর্থাৎ শোভনা পত্নী রূপে) (সুপত্নীঃ) ঘৃতমিশ্রিত কজ্বলের দ্বারা (সর্পিষ আঞ্জনেন) সংস্পৃষ্টা হোক (সং স্পশন্তাম)। অরহিতা, রোগরহিতা, শোভন আভরণযুক্তা জননীগণ অপত্য উৎপাদন করুন (আ রোহন্তু)। ৭৷
হে মৃতপুরুষ! তুমি পৈতৃমেধিক (সপিণ্ড্যকরণাবধি) সংস্কারের দ্বারা পিতৃ-পিতামহ-প্রপিতাগণের (পিতৃভিঃ) সাথে সঙ্গত হও অর্থাৎ পিতৃগণের স্থান প্রাপ্ত হও (সং গচ্ছস্ব); এবং তাদের রাজা যমের সাথেও সঙ্গত হও (সং যমেন গচ্ছস্ব)। তথা পিতৃলোক হতেও উৎকৃষ্ট (পরমে) ব্যোমে (ব্যোম ইষ্টাপূর্ত কর্মের ফলোপভোগস্থানে (ইষ্টাপূৰ্তেন) অর্থাৎ দ্যুলোকের উধ্বস্থায়ী নাকপৃষ্ঠাখ্য স্থানে স্থিত হও। (প্রত্যক্ষ শ্রুতি বিহিত যাগ-হোমদান ইত্যাদি কর্ম ইষ্ট এবং স্মৃতি-পুরাণ-আগম অনুসারে বাপী-কূপ-তড়াগ-দেবগৃহ ইত্যাদি স্থাপন পূর্ত। জীবিতকালে এই কর্ময়ের পালনকারী মরণের পরে স্বর্গেরও উপরে স্থানপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন)। তথা পাপ (অবদ্যম) ত্যাগ পূর্বক (হিত্বা) উত্তম লোকস্থিত গৃহ পুনরায় প্রাপ্ত হও (পুনঃ অস্তম্ আ ইহি); সুবৰ্চা অর্থাৎ শোভনদীপ্তিসম্পন্ন হয়ে স্বর্গলোক-ভোগযোগ্য শরীরের দ্বারা (তৰা) সংযুক্ত হও (সংগচ্ছতাং)। ৮।
আমাদের (নঃ) জনকের যে জনক অর্থাৎ পিতামহ (পিতুঃ যে পিতরঃ) তাঁদের জনকগণ অর্থাৎ প্রপিতামহ ইত্যাদিগণ, এবং অপর যাঁরা গোত্রজবৃন্দ (যে) বিস্তীর্ণ অন্তরিক্ষে (উরু অন্তরিক্ষ) প্রবিষ্ট হয়েছেন (আবিবিশুঃ), অদ্য তাদের শরীরসমূহ (তন্বঃ) স্বয়ং রাজা (স্বরাট) অসুনীতি নামক (প্রাণের নেতা বা প্রভু) দেবতা আমাদের (নঃ) অভিলাষানুসারে রচনা করে দিন (যথাবশং কল্পয়াতি); (অর্থাৎ যথাযথ কর্মফলভোগের উপযোগী করে শরীরসমূহকে সম্পাদন করুন) ৯
হে প্রেত! ঘনীভূত শিশির (নীহার) তোমার সুখকর হোক (তে শং); (অর্থাৎ দাহজহিত উত্তাপ নিবারিত হোক)। তথা জলের উৎস তোমার সুখের নিমিত্ত অধোমুখে সুবিত হোক (ম্বা অব শীয়তাম)। হে শীতিকা (শীতকারিণী ওষধিবিশেষ)! হে শীতিকাবতী (শীতিকাখ্য ঔষধি যুক্তা পৃথিবী)! হে হ্রাদিকা (হ্রদ অর্থাৎ সুখকারিণী বা স্নাদিকাখ্য ঔষধি যুক্তা পৃথিবী! তুমি মণ্ডুকপর্ণা (মণ্ডুকী অঙ্গু) নামে আখ্যাতা ঔষধির দ্বারা এই দগ্ধ পুরুষের সুখ (শং) সম্পাদিকা হও। (অর্থাৎ দাহশমনের হেতুভূত হও)। সেই নিমিত্ত এই দাহক অগ্নিকে (ইমং অগ্নিং) শান্ত (সু) করো ১০
বঙ্গানুবাদ— দেব বিবস্বান অর্থাৎ আদিত্য সূর্য আমাদের মরণজনিত ভীতি রহিত করুন : (অভয়ং কৃণোতু)। তথা জীবনের কর্তা অর্থাৎ প্রাণীগণের জীবৎকালের নিয়ামক (জীরদানু) ও শোভন দাতা (সুদানু)–এই মতো গুণবিশিষ্ট সুত্রামা (অর্থাৎ শোভন ত্রাতা বা ইন্দ্র নামক) দেবতাও আমাদের নিরাভয় করুন। এই লোকে (ইহ) আমাদের পুত্রপৌত্র ইত্যাদি বহুল (পরিমাণে) হোক বা জন্মলাভ করুক (ইমে বীরাঃ বহবঃ ভবন্তু)। তথা বহু গাভীযুক্ত (গোমৎ) বহু অশ্বোপেত (অশ্ববৎ) পোষক ধন (পুষ্টং) আমার হোক (ময়ি অস্তু)। (মরণজনিত ভীতি হতে মুক্ত হয়ে আমরা যেন পুত্রপৌত্র ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধ বংশ ও বহু গাভী-অশ্ব ইত্যাদি সহ প্রভূত ধন লাভ করতে পারি এটাই বক্তব্য)। ১।
সূর্য আমাদের অমৃতত্বে অর্থাৎ অমরণত্বে স্থাপন করুন; তার প্রসাদে মৃত্যু অর্থাৎ মরণকারী দেব পরাজুখে গমন করুন (পরৈতু); আমরা (নঃ) অমৃত অর্থাৎ অমরণ প্রাপ্ত হই (এতু)। (সূর্যদেব) আমাদের পুত্রপৌত্র ইত্যাদিকে (ইমা পুরুষান) জরাকাল পর্যন্ত পালন করুন (আ জরিপঃ রক্ষতু)!. এই পুরুষগণের প্রাণ (এষাং অসবঃ) যেন কখনও যম অর্থাৎ বিবস্বানের পুত্র বৈবস্বতের নিকটে সুষ্ঠুভাবে গমূন না করে (সু মো গুঃ)।(মৃত্যুদেবতা যমের পিতা বিবস্বান আমাদের পুত্রপৌত্র ইত্যাদিকে তাঁর পুত্রের হাত হতে রক্ষা করুন–এটাই প্রার্থনার ভাব) ২৷
যে শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিশালী (মতিঃ), ক্রান্তদর্শী (কবিঃ) যম আপন মহিমায় (মহ্ন) স্তোতৃ (মতীনাং) পিতৃগণকে অন্তরিক্ষ লোকে ধারণ করে আছেন (দর্ধে), হে সর্বজনের মিত্রভূত ব্রাহ্মণগণ (বিশ্বমিত্রাঃ) সেই হেন (তং) যমকে তোমরা অর্চনা করো (অৰ্চত); (অর্থাৎ চরু-পুরোডাশ ইত্যাদি সমর্পণ করো)। সেই অর্চিত যম (সঃ) আমাদের জীবনকে (নঃ জীবনে) প্রকৃষ্টরূপে ধারণ করুন (ধাৎ)। ৩৷৷
হে মন্ত্ৰদৰ্শী মনুষ্যগণ (ঋষয়ঃ)! তোমরা উত্তম স্বর্গে (দিবং) আরোহণ করো; (অর্থাৎ যজ্ঞ-দান ইত্যাদি সঙ্কর্মের ফল প্রাপ্ত হও); ভয়প্রাপ্ত হয়ো না (মা বিভীতন)। স্বয়ং সোমযাগকারী (সোমপাঃ) ও অন্য যজমানগণকে সোমযাগের কারয়িতা (সোমপায়িনঃ) তোমরা যারা স্বর্গে আরূঢ় হয়েছে, সেই তোমাদের উদ্দেশে এই হবিঃ সম্পাদিত হচ্ছে (ইদং হবিঃ ক্রিয়তে); (অর্থাৎ সেই হবির দ্বারা তোমরা দ্যুলোকে সুখে স্থিত হও)। এবং আমরা তোমাদের প্রসাদে উৎকৃষ্টতম (উত্তম) প্রকাশ (জ্যোতিঃ) অর্থাৎ চিরকালের জীবনে গমন করবো (অগন্ম)। (বক্তব্য এই যে, আমরাও তোমার অনুগ্রহে দীর্ঘ জীবন প্রাপ্ত হবো) ॥ ৪৷
এই অগ্নি আপন মহতী ধ্বজায় (অর্থাৎ বৃহতী ধূমের দ্বারা) প্রকর্ষের সাথে দীপ্যমান হয়েছেন (প্র ভাতি)। ইনি কামবৰ্ষক (বৃষভঃ)। আকাশ ও পৃথিবীকে (রোদসী) অবিলক্ষ্য করে (আ) এই অগ্নি শব্দ করছেন (রোরৰীতি)। আমার সমীপে (মাং উপ) আকাশ অবধি (দিবশ্চিন্তাৎ) এই অগ্নি উধ্বে ব্যাপ্ত রয়েছেন (উদানট)। তারপর জলের উপস্থানে (অপা উপস্থে) অর্থাৎ অন্তরিক্ষ প্রদেশে আপন মহিমায় প্রবৃদ্ধ হয়েছেন মাহবঃ ববর্ধ)।.৫৷৷
হে প্রেত! নাকে (নাই অক অর্থাৎ পাপ বা দুঃখ যথায়–অর্থাৎ স্বর্গলোকে) গমনকারী (পতন্তং) তোমাকে শোভনপদ্ধশালী-রূপে (সুপর্ণমুপ) দর্পণ করে মনে মনে কাময়মান মনুষ্যগণ (হৃদা বেনন্তঃ) তোমাকে হিরণ্যপক্ষোপেত বরুণের (অর্থাৎ প্রাণীগণের সত্য-মিথ্যার শিক্ষকরূপী দেবতার) দূতের ন্যায় এবং যমের গৃহে (যেনৌ) শকুনিবৎ বর্তমান (শকুনং) এবং ভরণ করণশালী রূপেই (ভুর«ং) দর্শন করে থাকে। ৬।
হে ইন্দ্র (পরমৈশ্বর্যযুক্ত দেব)! যে প্রকারে (যথা) পিতা পুত্রকে তার অভিমত ফল প্রদান করে, সেই প্রকারে সোমযাগ ইত্যাদি লক্ষণ কর্ম (ক্রতু) অথবা সেই বিষয়ক জ্ঞান আমাদের নিমিত্ত আহরণ করো অর্থাৎ প্রদান করো (আ ভর)। হে পুরুক্ত (পুরুভির্যজমানৈরাহূত অর্থাৎ পর্যাপ্ত যজমানগণ কর্তৃক আহূত, ইন্দ্রদেব)! আমাদের (নঃ) এই সংসারগমনে বা সংসার-যাত্রায় (যামনি) তুমি সেই সম্পর্কিত শিক্ষদানকর্তা হও; এবং আমরা যেন। ( তোমার প্রসাদে চিরকাল-জীবনযুক্ত হয়ে (জীবাঃ) ইহলোকের সুখানুভব (জ্যোতিঃ) প্রাপ্ত হতে পারি এ (অশীমহি)। ৭৷
হে প্রেত! তোমার নিমিত্ত (তে) অপূল্পের দ্বারা আচ্ছাদিত (অপূপাপিহিতান) ঘৃত-মধু ইত্যাদির দ্বারা পূর্ণ যে কুম্ভগুলি দেবগণ ধারণ করেছেন, সেগুলি তোমার নিকট অনুবন্ত (স্বধাবন্তঃ), মধুযুক্ত (মধুমন্তঃ) ও ঘৃতস্রাবী (ঘৃততঃ) হোক (সন্তু) ॥ ৮
হে প্রেত! তোমার উদ্দেশ্যে তিলমিশ্রিত স্বধাকারবতী বা স্বধা-উদকবতী (স্বধাবতীঃ) যে সৃষ্ট যবগুলি (ধানাঃ) বিক্ষেপ করছি (অনুকিরামি) (অর্থাৎ সমর্পণ করছি), সেগুলি তোমাকে বিবিধ ভাবে বা বিভুত্বগুণোপেতা অর্থাৎ বৈভবশালিনী হয়ে (বিত্বীঃ) তোমার তৃপ্তিজননে সমর্থ হোক (প্রভৃীঃ সন্তু)। রাজমান ঈশ্বর (রাজা) যম তোমাকে সেই ভৃষ্ট যব ভোগের নিমিত্ত আজ্ঞা প্রদান করুন (অনু মন্যতা)। ৯।
হে বনস্পতি (বৃক্ষবিশেষ)! তোমাতে অস্থিরূপে যে পুরুষ (ত্বয়ি য এষ) পূর্বে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তা পুনরায় আমাদের প্রত্যর্পণ করো; যার ফলে (যথা) রাজা যমের গৃহে (সদনে) আপন অর্জিত যজ্ঞাত্মক কর্মসকলের কথা (বিদথা) প্রকাশিত করে (বদ) উপবেশন করতে পারে। ১০।
হে জাতবেদা (জাত প্রাণীগণের বেত্তা, অগ্নি)! এই মৃতকে দগ্ধের উপক্রম করো (আ রভস্ব); তোমার জ্যোতিৰ্জালাযুক্ত তেজঃ (তেজস্ব) রসহরণশীল অর্থাৎ দহনসামর্থ্য হোক (হরঃ অস্তু)। এই মৃতের শরীর সম্যক দগ্ধ করো (সং দহ), (অর্থাৎ যেন ভস্মসাৎ হয়ে যায়, তেমন করো)। শরীর দহনের পর (অথ) এই পুরুষকে (এনং) সুকৃতলোকে (অর্থাৎ পুণ্যকর্মাগণের নিবাসস্থান স্বর্গলোকে) স্থাপন করো (স্থাপয়)। (এই প্রেতকে স্বর্গপ্রাপ্তি করাও–এটাই বক্তব্য) ॥১১।
পূর্বে উৎপন্ন যে জ্যেষ্ঠ পিতৃগণ (যে তে পূর্বে পিতরঃ) পরাজুখ হয়ে গমন করেছেন (পরাগতা), (অর্থাৎ পুনরায় জীবনবৃত্তি গ্রহণ না করার নিমিত্ত প্রস্থান করেছেন); এবং পশ্চাৎ কালে উৎপন্ন যে পিতৃগণ (যে চ অপরে) প্রস্থান করেছেন; তাদের সকলের নিমিত্ত (তেভ্যঃ) ঘৃত- ক্ষরণশীল কৃত্রিম সরিৎ (ঘৃতস্য কুল্যা) প্রবাহিত হোক। (কিরকম তা? না–) শতধারা অর্থাৎ শতধারাসমন্বিত, অতএব বিবিধ দিককে আদ্রীকৃত করুক (ব্যুন্দতী)। ১২।
হে মৃত পুরুষ! তুমি এই সন্নিহিত বা পরিদৃশ্যমান (এতৎ) অন্তরিক্ষে (বয়ঃ) আরূঢ় হও (আ রোহ)। (কেমন করে? না–) উম্মার্জন করে (উন্মাজানঃ), অর্থাৎ শরীর হতে উক্রমণের দ্বারা আপন আত্মাকে শোধন করে। তোমার জ্ঞাতিবর্গ (স্বাঃ) এই লোকে (ইহ) অধিক দীপ্যমান হোক (বৃহৎ দীদয়ন্তে) অর্থাৎ অধিক সমৃদ্ধ হয়ে নিবাস করুক। আরোহণার্থে বন্ধুজনের মধ্যে হতে লোকান্তর অভিলক্ষ্য করে প্রকর্ষের দ্বারা গমন করো (অভি প্রেহি)। এই দ্যুলোকে (অত্র) পিতৃগণ-সম্বন্ধী যে মুখ্য লোক (যঃ প্রথমঃ লোকং) তা যেন তুমি পরিত্যাগ করো (মা অপ হাস্থাঃ); (অর্থাৎ চিরকাল সেখানে নিবাসিত হও–এটাই বক্তব্য)। ১৩
বঙ্গানুবাদ –হে জাতবেদাগণ (জাত প্রাণীগণের বেত্তা অগ্নিসকল)! [ বৈনিক বহ্নিকে লক্ষ্য ) করে বহুবচন করা হয়েছে। আহুনীয়, গার্হপত্য, দক্ষিণাগ্নি ইত্যাদি ভেদে অগ্নি এক নন, একাধিক ]। তোমরা আপন উৎপাদক অরণিতে (জনিত্ৰীং) প্রবিষ্ট হও (আ রোহত)। আমিও তোমাদের পিতৃযান মার্গে সম্যক অর্থাৎ বিধি অনুযায়ী অরণিদ্বয়ে অধিরোহণ করাচ্ছি (সম্ বঃ আ রোহয়ামি)। [মার্গ দুরকম–দেবযান ও পিতৃযান। দেবলোকপ্রাপ্তিসাধনভূত দেবযান এবং পিতৃলোক প্রাপক পিতৃযান। যে দুই খণ্ড কাষ্ঠের ঘর্ষণে অগ্নি জ্বালানো হয়, তা অরণী; সেইজন্য পিতৃযজ্ঞ সাধনের জন্য যজ্ঞাগ্নিকে অরণিদ্বয়ে সমারোপণের কথা বলা হয়েছে]। হব্যবাহক অগ্নি দেবগণের উদ্দেশে (ইষিতঃ) যজমান কর্তৃক প্রদত্ত হবিঃ বহন করেছেন (অবাট)। [দেবতাগণের নিমিত্ত হব্য বহন করেন যে অগ্নি তিনি হব্যবাহক; যে, অগ্নি পিতৃগণের নিমিত্ত হব্য বহন করেন তিনি কব্যবাহন]। অতএব হে অগ্নিগণ! তোমরা পরস্পর সমবেত ভাবে (যুক্তাঃ) হয়ে দেশান্তরে মৃত এই যজমানকে (ঈজানং) পুণ্যাত্মাগণের প্রাপণীয়, লোকে (সুকৃতাং লোকে) ধারণ বা স্থাপন করো (ধত্ত)। ১।
ইন্দ্র প্রমুখ যাগযোগ্য দেবতাগণ (দেবাঃ) ও বসন্ত ইত্যাদি কালসমূহ (ঋতবঃ) যজ্ঞ কল্পনা করেছেন; (অর্থাৎ স্বয়ং হবিঃ-স্বীকারের নিমিত্ত ও যজ্ঞকারীর ফলসিদ্ধির নিমিত্ত যজ্ঞ নির্মাণ করেছেন। হবিঃ (চরু-আজ্য-সোমলক্ষণ), পুরোডাশ (পিষ্টময়), সুচ (যজ্ঞীয় পাত্র) ও যবে আয়ুধবৎ অর্থাৎ যজ্ঞের জুহু ইতাদি অন্যান্য পাত্রগুলির নির্মাতা, হে আহিতাগ্নি! (তুমি এই প্রেত সহ) দেবলোক-প্রাপ্তিসাধন মার্গে গমন করো (পথিভিঃ যাহি)। [ সুক ইত্যাদি যজ্ঞীয় পাত্রগুলি যজ্ঞবিদ্বেষকারী ও উপদ্রবকারীগণকে যজ্ঞের মাধ্যমে পরিহারে সমর্থ বলে এগুলিকে আয়োধনসাধন-শস্ত্র ইত্যাদিরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। তুমি সেই পথে গমন করো, যে পথে ইষ্টবন্ত অর্থাৎ কৃতজ্ঞ পুরুষগণ (ঈজানাঃ) সুখাত্মক স্থানে (স্বর্গং নোকম) গমন করে থাকে (যন্তি)। ২।
হে প্রেত! তুমি সত্যভূত যজ্ঞের পথ (ঋতস্য পন্থাং) সম্যক্ (অর্চি ইত্যাদি মার্গ) অনুক্রমে জ্ঞাত আছো (সাধুং অনু পশ্য)। সুকর্মা অঙ্গারোৎপন্ন মহর্ষিগণ (সুকৃত অঙ্গিরসঃ) যে পথে স্বর্গলোকে গমন করেছেন (যেন যান্ত) (অঙ্গিরাগণ সত্রযাগনুষ্ঠানের স্বর্গলোক প্রাপ্ত হয়েছিলেন), সেই পথে স্বর্গ গমন করো (তেভি পিথিভি স্বর্গং যাহি)। যে স্বর্গে (যত্রা) আদিত্যগণ (অর্থাৎ আদিতির পুত্র দেবগণ) মধুবপ্রীতিকর অমৃত আস্বদন করছেন (মধু ভক্ষয়ন্তি), তুমিও সেই ত্রিত্বসংখ্যাপূরক (উত্তম) দুঃখলেশহীন লোকে (অর্থাৎ সুখাত্মক স্বর্গে) প্রতিষ্ঠিত হও (তৃতীয়ে নাকে অধি বি শ্ৰয়স্ব) ৷ ৩৷৷
সুন্দর পক্ষশালী তিন (দেব) অগ্নি, সূর্য ও সোম ঊর্ধ্বলোকে অর্থাৎ স্বর্গে (উপরস্য নাকস্য পৃষ্ঠে) এবং মায়ুমন্ত অর্থাৎ শব্দকারী বায়ু ও মেঘ (মায়ু) অন্তরিক্ষ লোকে (বিষ্টপি) অধিশ্রিত রয়েছেন। (অগ্নি ইত্যাদির দ্বারা অধিষ্ঠিত) এই সুখাত্মক লোকসমূহ (স্বর্গ লোকা) অমরসাধন সুধারসের দ্বারা (অমৃতেন) পূর্ণা (বিষ্ঠা)। তারা যজমান অর্থাৎ যজ্ঞকর্তা বা স্মার্ত অর্থাৎ বৈদিক কর্ম-অনুষ্ঠানকারী এই প্রেতকে (যজমানায়) অন্ন (ইষং) ও বলকর অনুরস (উর্জং) প্রদান করুন (দুঘ্রাম)। ৪
জুহু অর্থাৎ হোমসাধনভৃত পাত্রবিশেষ দ্যুলোককে ধারণ করেছে, (দ্যাঃ দাধার); উপভৃৎ অর্থাৎ হোমসাধনভূত পাত্রবিশেষ অন্তরিক্ষ অর্থাৎ মধ্যম লোককে ধারণ করেছে; বহিতে স্থাপন হতে আরম্ভ করে যজ্ঞের পরিসমাপ্তি পর্যন্ত অচলভাবে প্রতিষ্ঠিত (প্রতিষ্ঠাং) বা নামে অভিহিত সুক (যজ্ঞপাত্র বিশেষ) চরাচরাত্মক জগতের আশ্রয়ভূতা পৃথিবীকে ধারণ করেছে। এই ধ্রুবার দ্বারা ধারিত পৃথিবীর (ইমাং) অভিলক্ষ্য (প্রতি) ঘৃতপৃষ্ঠ (ঘৃক্ষরণদীপ্ত্যো) অর্থাৎ দীপ্তির উপরিভাগে সর্বতো জ্যোতিষ্মন্ত সুখাত্মক লোকসমূহ (স্বর্গা) যজমানের কাম্যমান সকল ফল প্রদান করুন (কামংকামং দুহ্রা)। [পূর্বৰ্মন্ত্রে যজমানের স্বকর্মার্জিত সুকৃত ফলের বিষয় বলা হয়েছিল। এই মন্ত্রে পুণ্যক্ষয়ের পর মর্ত্যলোক প্রাপ্ত হলে আহিতাগ্নি যেন সেই যজমানের পূর্বজন্মার্জিত সুকৃত-বাসনা বলে এই লোকেও পুনরায় এক স্বর্গলোক প্রাপক যজ্ঞ ইত্যাদি সমীচীন কর্ম করতে পারেন, তেমন করেন] ৷ ৫৷৷
হে ধ্ৰুবা নামধেয় সুক (যজ্ঞে ঘৃতপ্রক্ষেপের নিমিত্ত পাত্রবিশেষ)! তুমি সকল ভোজয়িত্রী বা সকল ভোগাধিকরণভূতা পৃথিবীতে আরোহণ করো অর্থাৎ অধিষ্ঠিত হও (আ রোহ)। (বহিতে স্থাপন হতে আরম্ভ করে যজ্ঞের পরিসমাপ্তি পর্যন্ত আজ্যের দ্বারা সম্পূর্ণ হয়ে স্থিরভাবে অর্থাৎ ধ্রুবভাবে অবস্থান করার নিমিত্ত সুক যেমন ধ্রুব নামে অভিহিত, তেমনই পৃথিবীও স্থিরা। সেই কারণে পৃথিবীকে সুকের অধিষ্ঠাত্রী বলা হয়)। হে উপভৃৎ (বটকাষ্ঠনির্মিত গোলাকার যজ্ঞপাত্র, যাতে রক্ষিত আজ্য সুকে গ্রহণ করা হয়)! তুমি অন্তরিক্ষ অর্থাৎ মধ্যমলোকে অধিষ্ঠিত হও (আ ক্রমস্ব)। (অধ্বর্য যাগকালে অগ্নিতে ঘৃত প্রক্ষেপের সুবিধার নিমিত্ত দক্ষিণ হস্তে জুহু বা সুক এবং বাম হস্তে উপভৃৎ ধারণ করেন)। হে জুহু! তুমি যজমানের সাথে (যজমানেন সাকং) দ্যুলোকে গমন করো (দ্যা গচ্ছ)। (ধ্রুব ইত্যাদি সুক ক্রমে পৃথিবী ইত্যাদি লোকসমূহে যজমানের দ্বারা অধিষ্ঠিত হোক–এটাই বক্তব্য)। এবং যজমান বৎসরূপ সুবের দ্বারা (বৎসেন সুবেন) সকল দিকে (সর্বা দিশঃ) প্রকর্ষের সাথে (প্রপীনাঃ) অভিলষিত ফলের ধুন্ধু দোহক (অহৃনীয়মানঃ) হোন। (বৎস যেমন প্রথম স্তন্যপানের দ্বারা মাতাকে স্থূলস্তনবিশিষ্টা অর্থাৎ দুগ্ধপূর্ণ-শুনশালিনী করে, সেই রকমেই সুবও অর্থাৎ হোমের নিমিত্ত খদির ইত্যাদি কাষ্ঠনির্মিত পাত্রবিশেষ সকল জুহু ইত্যাদি পাত্রগুলিকে বৎসত্বরূপেই আজ্যপূরিত করে দেয়–এটাই বৎসেন সুবেন শব্দ দুটির বক্তব্য) ৷ ৬ ৷৷
তরণসাধন অর্থাৎ মহতী আপদ অতিক্রামক (তীর্থেঃ তরন্তি প্রবতঃ মহীঃ) এমন বুদ্ধিতে যাঁরা যজ্ঞ করেন (ইতি যজ্ঞকৃতঃ) ও বৈদিক স্মার্তকর্ম সাধিত করেন, যাঁরা সুকৃত কর্মপথে গমন করে পুণ্যলোক প্রাপ্ত হয়েছেন (সুকৃতঃ যেন) এই (অত্র) পুণ্যলোক প্রাপ্তিসাধনের পথ অনুসরণে আগত যজমানের উদ্দেশে (যজমানায়) দিকসমূহ এবং তদর্থ পুণ্যার্জিত লোক (লোকং) বা সেই লোকবাসী প্রাণীবর্গ (ভূতানি) পূর্বৰ্মন্ত্রে উল্লিখিত অভিলষিত ফল (যৎ) সম্পাদন করুক (অকল্পয়ন্ত)। ৭।
পূর্ব দিকে বর্তমান (পূর্বঃ) অঙ্গিরাগণের অয়ন নামক (অঙ্গিরসাময়নং) সত্ৰাত্মক আহবনীয় অগ্নি, আদিত্যগণের অয়ন নামক (আদিত্যানামায়নং) সত্ৰাত্মক গার্হপত্য অগ্নি এবং দক্ষগণের অয়ন নামক (দক্ষিণানাময়নং) সত্ৰাত্মক দক্ষিণাগ্নি (দক্ষিণ দিকে বর্তমান অগ্নি এই মন্ত্রের দ্বারা বা মন্ত্রসাধ্যসত্ৰ্যাগাত্মক (ব্ৰহ্মণা) নির্মিত পৃথক আয়তনে স্থাপিত (বিহিতস্য) অগ্নির মহিমা (অগ্নেমহিমানং) (অর্থাৎ আহ্বানীয় ইত্যাদি সংজ্ঞায় অভিহিত অগ্নিসমূহের বিভূতি) সংহতাবয়ব (সমঙ্গ) ও সম্পূর্ণাবয়ব (সর্বঃ); এতএব হে প্রেত! তুমি সুস্থিত (শগ্মঃ) হয়ে (সেই সল দহ্যমান অগ্নির নিকট) গমন করো (উপ যাহি)। ৮।
হে অগ্নির দ্বারা দহ্যমান প্রেত! পূর্ব দিকে দীপ্যমান আহ্বানীয় অগ্নি (পূর্বঃ অগ্নিঃ) তোমাকে পূর্ব দিক হতে (পুরস্তাৎ) তোমার যাতে সুখ (শং) হয় তেমন ভাবে তোমাকে দহন করুক (দহতু); তথা গার্হপত্য অগ্নি (অর্থাৎ গৃহপতি যজমানের দ্বারা আহিত সকল অগ্নির যোনিভূত অগ্নি) তোমার পশ্চিমভাগে (পশ্চাৎ) তোমাকে সুখে দগ্ধ করুক। [পূর্বকালে প্রতি সাগ্নিক ব্রাহ্মণ আপন গৃহে দিবারাত্র (সর্বক্ষণ) একটি অগ্নি প্রজ্বলিত করে রাখতেন। অপর যে কোনও অগ্নি প্রজ্বলনের জন্য এই অগ্নি থেকেই সাহায্য নেওয়া হতো। এই অগ্নির নাম গার্হপত্য অগ্নি। সুতরাং এই অগ্নিকে সকল অগ্নির যোনিভূত বলা হয়েছে। দক্ষিণ দিকে নিহিত দক্ষিণাগ্নি তোমাকে সর্ববারক কবচের (বর্ম) দ্বারা আচ্ছাদিত-করণের ন্যায় সুখের সাথে (শর্ম, দগ্ধ করুক। হে অগ্নি! (আহবনীয় ইত্যাদি অগ্নির অনুগতত্বে এখানে একবচন প্রয়োগ করা হয়েছে)। তুমি উত্তর দিক। হতে (উত্তরঃ) মধ্য অর্থাৎ পূর্ব ইত্যাদি চতুর্দিক হতে, আকাশ হতে (অন্তরিক্ষাৎ) ও দশ দিক হতে অর্থাৎ সকল অবান্তর দিক হতে (এই প্রেতকে) রক্ষা করো (পরি পাহি); কেবল দিক নয়, কিন্তু সেই সকল দিকের ভয়ঙ্কর অর্থাৎ ক্রুর বা হিংসকগণ হতেও (ঘোরাৎ) রক্ষা করো ৷ ৯
হে অগ্নিগণ! (একই অগ্নির ত্রিধাভবনের কারণে শূয়ং-এই বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে)। পৃথক আয়তনে স্থাপিত তোমাদের অত্যন্ত সুখকরী বা মঙ্গলময় শরীর (শমাভিস্তভিঃ)! (প্রধানতঃ অগ্নি দ্বিবিধ-ঘোর অর্থাৎ ভয়ঙ্কর এবং শিব অর্থাৎ মঙ্গলময়)। সেই মঙ্গলময় তনুর দ্বারা তোমরা তোমাদের ইষ্টবন্ত (যাগকারী) পুরুষকে (ঈজানম) সুখাত্মক লোকে (স্বর্গং লোকং) অভিগমন বা আরোহণ করাও (অভি বহাথ)। (অগ্নিত্রয়ের অর্থাৎ ত্রিধাভূত অগ্নির গন্তব্যপ্রাপণের দৃষ্টান্তস্বরূপ তাঁদের তিনটি অশ্বরূপে বলা হচ্ছে)–তিনটি অশ্বভূত (পৃষ্টিবাহঃ) হয়ে দৈবরথে বহন করে তোমরা এই যজমানকে (সেই) স্বর্গলোকে অভিগমন করাও, যে স্বর্গলোকে (যত্র) অমৃতপায়ী অর্থাৎ দেবতগণের সাথে সে প্রসন্নতা প্রাপ্ত হবে (দেবৈঃ সধমাদং মদন্তি)। ১০।
বঙ্গানুবাদ –হে অগ্নি! তুমি পশ্চিম (পশ্চাৎ) ভাগে (গার্হপত্য অগ্নি রূপে) একে সুখে দহন করো (তপ)। পূর্বভাগে পুরস্তাৎ) একে সুখে দগ্ধ করো (শং)। উত্তরদিক প্রদেশে (উত্তরা) ও দক্ষিণদিক্ প্রদেশে (অধরা। অধর শব্দে উত্তর প্রতিযোগিনী দক্ষিণ দিক উক্ত হয়) একে সুখে (আহিতাগ্নি রূপে) দহন করো (তপৈন)। হে জাতবেদা (জামাত্রেরই জ্ঞাতা অগ্নি)! তুমি এক হয়েও (গার্হপত্য ইত্যাদি) তিনরূপে তোমাকে স্থাপনকারী (একঃ ত্রেধা বিহিত) এই যজমান প্রেতকে (এনং) সুকৃতকর্মকারীগণের লোকে (অর্থাৎ স্বর্গে) সম্যক্ (অর্থাৎ চিরকালের জন্য) স্থাপন করো (ধেহি)। ১।
(এইখানে অগ্নিসকলের মিলন প্রার্থনা করা হচ্ছে)–হে জাতবেদা অগ্নিসকল (শমগ্নয়ঃ) তোমরা সম্যক প্রদীপিত হয়ে (সমিদ্ধা) প্রজাপতি-দেবতা রূপে পিতৃমেধে (মেধ্যং) প্রেতরূপ পশুকে পাক পূর্বক (শৃতম্ কৃথন্তঃ) অবক্ষিপ্ত করো না (মা অব চিক্ষিপ)। (অর্থাৎ নিরবশেষে দগ্ধ কবে) ৷ ২৷
এই পূর্ব ইত্যাদি সকল দিকে বিস্তৃত (বিততঃ) পিতৃমেধ নামে আখ্যাত ইষ্ট প্রদেশ প্রাপণে সমর্থ যজ্ঞ (কল্পমনঃ) যাগকারী প্রেতকে (ঈজানং) সুখাত্মক লোক (স্বর্গ) প্রাপ্ত করায় (অভি)। অতএব জাতবেদা অগ্নিসকল (জাতবেদসঃ অগ্নয়ঃ) মেধ্য এই (প্রাজাপত্যং) প্রেতরূপ পশুকে নিরবশেষে দগ্ধ পূর্বক সেবা করুক। এই দহনকর্মে যজ্ঞাই এই পশুকে পাক পূর্বক অবক্ষিপ্ত করো না ৷ ৩৷৷
এই যাজ্ঞিক পুরুষ (ঈজানঃ) বিষমসংখ্যক শলাকায় ও ইষ্টকে সংস্কৃত চিতাগ্নি প্রদেশে (চিতং) আরোহণ করেছে। (কেন? না–) দুঃরহিত স্বর্গের উপরিভাগে (নাকস্য পৃষ্ঠে) তৃতীয় কক্ষ্যারূপ দ্যুলোকে (দিবং) গমনের উদ্দেশে (উৎপতিষ্য)। এই হেন সুকৃতকর্মকারীর নিমিত্ত মধ্যাকাশের নভসঃ) জ্যোতির্মান অর্থাৎ প্রকাশক (জ্যোতিষীমান) দেবযান পথ অর্থাৎ দেবতাগণের সুখের দ্বারা গন্তব্য পথ বা স্বর্গসাধনভূত পথ (পন্থাঃ) প্রকর্ষের সাথে দীপ্ত বা প্রকাশ হোক (প্রভাতি) ৪
হে চিতাস্থ প্রেত! তোমার এই পিতৃমেধ যজ্ঞে অগ্নি হোতা অর্থাৎ বষট্কর্তা ঋত্বিক হোন (অগ্নিহোতা অস্তু)। দেবগণের পালক অর্থাৎ বৃহস্পতি অধ্বর্য অর্থাৎ যজমানের কাময়মান ঋত্বিক হোন। ইন্দ্র দক্ষিণ দিকে আসীন ব্রহ্মা নামক ঋত্বিক হোন। এইরূপ হোতা ইত্যাদি রূপে অগ্নি ইত্যাদির দ্বারা অনুষ্ঠিত পিতৃমেধে (যজ্ঞঃ) সমাপিত হয়ে (সংস্থিত) গমন করছে। (গন্তব্য স্থানটি কোথায়? না) যে স্থান (যত্র) পূর্বকালীন যজ্ঞের প্রাপ্তিস্থান (হুতানাং অয়নং)। (যজ্ঞের দ্বারা সংস্কৃত পুরুষের স্বর্গলোকপ্রাপ্তি হয়ে থাকে–এটাই বক্তব্য)। ৫৷৷
গোধুম ইত্যাদির পিষ্টবিকার (অর্থাৎ চূর্ণীকৃত গম, অপূপবা), গোদুগ্ধ (ক্ষীরবান) এবং কুম্ভে পক্ক ও ওদন বা অন্ন (চরুঃ) এই সঞ্চয়ন কর্মে অস্থিসমূহের সমীপে পশ্চিম দিক্-ভাগে উপস্থিত হোক (আ সীদ)। এইগুলির দ্বারা সংস্ক্রিয়মাণ প্রেতের স্বর্গলোকের (লোককৃতঃ) পথিকৃৎ অর্থাৎ গন্তব্যস্থান স্বর্গলোকের মার্গপ্রদর্শক দেবতাগণকে প্রীত করছি। এই সঞ্চয়ণকর্মে অর্থাৎ অপূপক্ষীরযুক্ত চরু নিবেদনের দ্বারা যাগযোগ্য ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণের মধ্যে তোমরা যারা (যে) হবির অংশপ্রাপক (হুতভাগাঃ) এই স্থানে আছে (ইহ স্থ), তাদের উদ্দেশে যাগ করছি ৷ ৬ ৷
গোধুমচূর্ণ (অপূপবান), দধি (দধিবা) ও চরু (দধিযোগে দ্বিতীয় চরুবিশেষ) এইস্থানে অর্থাৎ এই সঞ্চয়ন কর্মে উপস্থিত হোক (ইহ সীদ)। সংস্ক্রিয়মাণ প্রেতের স্বর্গলোকের পথিকৃৎ দেবতাগণকে এর দ্বারা প্রীত করছি। এই সঞ্চয়ণকর্মে যাগযোগ্য ইন্দ্রপ্রমুখ দেবগণের মধ্যে তোমরা যারা হবির অংশপ্রাপক এই স্থানে আছো, তাদের উদ্দেশে যাগ করছি ॥ ৭
পিষ্টকৃত গোধুম (অপূপবা), দধিকণা (দ্রক্ষ্মা) ও চরু (দধিকণা মিশ্রিত চরুবিশেষ) এই সঞ্চয়ণকর্মে উপস্থিত থোক। এর দ্বারা সংস্ক্রিয়মাণ প্রেতের স্বর্গলোকের পথিকৃৎ দেবতাগণকে প্রীত করছি। এই সঞ্চয়ণকর্মে যাগযোগ্য ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণের মধ্যে তোমরা যারা হবির অংশপ্রাপক এই স্থানে আছে, তাদের উদ্দেশে যাগ করছি ॥ ৮৷৷
পিষ্টকৃত গোধুমের বিকার (অপূপবা), বহুতর ঘত (ঘৃতবা) ও চরু (প্রচুর ঘৃতমিশ্রিত চরুবিশেষ) এই সঞ্চয়ণকর্মে উপস্থিত থোক। এর দ্বারা সংস্ক্রিয়মাণ প্রেতের স্বর্গলোকের পথিকৃৎ দেবতাগণকে প্রীত করছি। এই সঞ্চয়ণকর্মে যাগযোগ্য ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণের মধ্যে তোমরা যারা হবির অংশপ্রাপক এই স্থানে আছে, তাদের উদ্দেশে যাগ করছি। ৯।
পিষ্টকৃত গোধুমের বিকার (অপূপবা), মাংস ও চরু (মাংসবত্ত্ব চরুবিশেষ এই সঞ্চয়ণকর্মে উপস্থিত থোক। এর দ্বারা সংস্ক্রিয়মাণ প্রেতের স্বর্গলোকের পথিকৃৎ দেবতাগণকে প্রীত করছি। এই সঞ্চয়ণকর্মে ইন্দ্রপ্রমুখ যাগযোগ্য দেবগণের মধ্যে তোমরা যারা হবির অংশপ্রাপক এই স্থানে আছে, তাদের উদ্দেশে যাগ করছি। ১০
বঙ্গানুবাদ –গোধুম ইত্যাদির পিষ্টবিকার (অপূপবান), অন্ন ও চরু (ওদনান্তর যুক্ত চরুবিশেষ) এই সঞ্চয়ণ কর্মে উপস্থিত হোক। এর দ্বারা সংস্ক্রিয়মাণ প্রেতের স্বর্গলোকের পথিকৃৎ দেবতাগণকে প্রীত করছি। এই সঞ্চয়ণকর্মে ইন্দ্রপ্রমুখ যাগযোগ্য দেবগণের মধ্যে তোমরা যারা হবির অংশপ্রাপক এই স্থানে আছে, তাদের উদ্দেশে যাগ করছি। ১৷৷
গোধুম ইত্যাদির পিষ্টবিকার (অপূপবা), মাক্ষিক (মধুমা) ও চরু (মধুমিশ্রিত চরুবিশেষ) এই সঞ্চয়ণকর্মে উপস্থিত হোক। এর দ্বারা সংস্ক্রিয়মাণ প্রেতের স্বর্গলোকের পথিকৃৎ দেবতাগণকে প্রীত করছি। এই সঞ্চয়ণকর্মে ইন্দ্রপ্রমুখ যাগযোগ্য দেবগণের মধ্যে তোমরা যারা হবির অংশপ্রাপক এই স্থানে আছে, তাদের উদ্দেশে যাগ করছি ॥ ২॥
গোধুম ইত্যাদির পিষ্টবিকার (অপূপবা), কটু-তিক্ত-কষায়-লবণ-অম্ন ও মধুর এই ছয় রসযুক্ত পিষ্টক (রসবান) ও চরু (রসাত্মক কুম্ভী-পক্ক ওদনরূপ চরু) এই সঞ্চয়ণকর্মে উপস্থিত থোক। এর দ্বারা সংস্ক্রিয়মান প্রেতের স্বর্গলোকের পথিকৃৎ দেবতাগণকে প্রীত করছি। এই সঞ্চয়ন কর্মে ইন্দ্রপ্রমুখ যাগযোগ্য দেবগণের মধ্যে তোমরা যারা হবির অংশপ্রাপক এই স্থানে আছে, তাদের উদ্দেশে যাগ করছি। ৩।
গোধুম ইত্যাদির পিষ্টবিকার (অপূপবান), ভিন্ন প্রকৃতির পিষ্টক (অপবা) ও চরু (স্বতন্ত্রভাবে কুম্ভী-পক্ক ওদনরূপ চরু) এই সঞ্চয়ণকর্মে মধ্যপ্রদেশে (ইহ) উপস্থিত থোক। এর দ্বারা সংস্ক্রিয়মাণ প্রেতের স্বর্গলোকের পথিকৃৎ দেবতাগণকে প্রীত করছি। এই সঞ্চয়ণকর্মে ইন্দ্রপ্রমুখ যাগযোগ্য দেবগণের মধ্যে তোমরা যারা হবির অংশপ্রাপক এই স্থানে আছো, তাদের উদ্দেশে যাগ করছি। ৪
গোধুম ইত্যাদি পিষ্টবিকারের দ্বারা আচ্ছাদিত নয়টি চরুপূর্ণ কলস মন্ত্রোক্ত দেবগণ, হে সঞ্চিতাস্থিরূপ প্রেত! নিজেদের ভাগরূপে স্বীকার করেছেন (অধারয়); সেই কুম্ভস্থ চরুসমূহ পরলোকপ্রাপ্তবন্ত তোমাকে স্বধাবন্ত (অনুবা), মধুমন্ত (মধুমান) করুক ও তোমার পক্ষে আজ্য ক্ষরণকরী (ঘৃততঃ) হোক। (অর্থাৎ তোমার অস্থিসমীপে স্থাপিত চকসমূহ পরলোক প্রাপ্ত তোমা হেন প্রেতের প্রীতির নিমিত্ত বহু অন্নরাশি সহ মধুঘৃতকুল্যাযুক্ত হোক)। ৫।
হে সঞ্চিতাস্থিরূপ প্রেত! তোমার নিমিত্ত (তে) তিলমিশ্রিত (কৃষ্ণতিলযুক্ত) অন্নবতী (স্বধাবতী) ও ভৃষ্টয়বান যব (ধান্য) অনুক্রমে বিকীর্ণ বা বিক্ষেপ করেছি, সেইগুলি পরলোকপ্রাপ্তবন্ত তোমার পক্ষে প্রভূত পরিমাণে (প্রভৃীঃ) প্রীতিদায়করূপে প্রাপ্ত হোক এবং পিতৃলোকের রাজা যম সেইগুলি বহুকাল পর্যন্ত (ভূয়সীং অক্ষিতিং-৭ম মন্ত্র) তোমার ভোগের নিমিত্ত অনুজ্ঞা প্রদান করুন (অনুমন্যতা)। (লোকে অবস্থানকারী পুরুষ যেমন আপন ধনসমূহ পুরস্বামীর অনুমতিক্রমে ভোগ করে, যমলোক-প্রাপ্ত প্রেত তেমনই আপন লব্ধ স্বধা ইত্যাদি ভোগের নিমিত্ত পিতৃলোকাধীশ্বর যমের অনুজ্ঞা প্রার্থনা করে)। ৬-৭
(ধূম ইত্যাদি পরিকীর্ণ পথ অবলম্বন পূর্বক পিতৃত্ব প্রাপ্ত জনসমূহ পিতৃলোকে উপনীত হয়ে সোমযাগজনিত সুকৃতফল উপভোগ করে। এই কারণে এই পিত্রে অর্থাৎ পিতৃ-সম্পর্কিত) প্রকরণে সোমে স্থিত জলের কণা বা সোমের স্তুতি করা হচ্ছে)–সোমরস-স্থিত উদককণা (দ্রপ্সঃ) ভূলোক (পৃথিবীং) ও দ্যুলোকে (দ্যাং) বিকীর্ণ (চস্কন্দ) হয়েছে। (গ্রাবে অর্থাৎ প্রস্তরে অভিষবণের সময়ে সোমরস ভূমিতে ক্ষরিত হয়ে থাকে এবং দশাপবিত্র হতে দ্রোণকলসের প্রতি ধারাপাত সময়ে সোমকণাসমূহ অন্তরিক্ষে বিকীর্ণ হয়ে থাকে। এই কারণে এমন বলা হচ্ছে)। চরাচরাত্মক সর্ব জগতের কারণ পৃথিবী অনুলক্ষ্য করে (ইমং যযানিং) তথা পূর্বে উৎপন্ন দ্যুলোককে অনুলক্ষ্য করে বিকীর্ণ সোমরসকণা (দুন্সং) সপ্তসংখ্যক বষটকর্তার (সপ্ত হোত্রাঃ) উদ্দেশে জুহোমি অর্থাৎ যাগাগ্নিতে প্রক্ষেপ করছি। (অর্থাৎ হোতৃ-মৈত্রাবরুণ- ব্রাহ্মণাচ্ছংসি-পোত্ব নো-আগ্নী-অচ্ছাবাক সংজ্ঞক সপ্ত বষট্কর্তাকে অনুলক্ষ্য করে এই সোমরসকণা অগ্নিতে প্রক্ষেপ করছি। এই সোমরস বাজসনেয়-ব্রাহ্মণে আদিত্য রূপে স্তুত)। ৮।
হে প্রেত! শতসংখ্যক ছিদ্ৰপতিত-উদকপ্রবাহযুক্ত (শতধারং), বিচরণশীল বায়ুর ন্যায় অর্চনীয় (বায়ুমর্কং), স্বর্গের লম্ভক (স্বর্বিদং), মনুষ্যগণের দ্রষ্টব্য (নৃচক্ষসঃ) কুম্ভটি দেবতাবর্গ তোমার ধন (রয়িং) বলে জ্ঞাত আছেন (অভিচক্ষতে)। তোমার যে (গোত্ৰিণঃ অর্থাৎ) গোত্রীয় সংস্কারকর্তাগণ অস্থিরূপ তোমাকে কুম্ভের জলের দ্বারা প্রীত করে (পৃণন্তি) এবং কুম্ভজল প্রদান করে (প্র যচ্ছন্তি), তারা সপ্তসংখ্যক মাতৃভূতা অগ্নিষ্টোম ইত্যাদি সংস্থায় বা কর্মে সর্বদা দক্ষিণা দোহন করে (সর্বদা দুহূতে দক্ষিণা)। (জলের দ্বারা আপ্লাবন অর্থাৎ স্নান বা সিক্ত করণের নাম দক্ষিণাদোহন)। ৯
(শতসংখ্যক ছিদ্রযুক্ত কুম্ভের চারিটি ছিদ্রাবয়বের স্তুতি। চতুচ্ছিদ্র অর্থাৎ চতুঃস্তন কোশ-কোশবৎ কোশ)–ধন, সুবর্ণ ইত্যাদির দ্বারা সম্পূর্ণ কোশের (কোশং) সমান, পয়ঃপূর্ণ কুম্ভোপম (কলশ) চারিটি ছিদ্রযুক্ত (ঊধঃ অর্থাৎ স্তনবৃন্ত-সম্পন্না) মধুররসক্ষরযুক্তা (মধুমতীং) ইড়া নাম্নী ধেনুকে বা ভূমিরূপা ধেনুকে প্রেতের সর্বদা পরলোক নিবাসের নিমিত্ত দোহন করা হচ্ছে। (চতুচ্ছিদ্র কলশের জলে আপ্লাবনের নাম চতুঃস্তনধেনুর দোহন)। হে অগ্নি! প্রেতরূপ পিতৃত্ব-প্রাপ্ত (অর্থাৎ পিতৃলোকপ্রাপ্ত) জনের ভোগের নিমিত্ত সন্তোষকর (মদন্তীং), অখণ্ডনীয়া (অদিতিং), বলকর অন্ন (উজ) তুমি খণ্ডিত করো না (মা হিংসীঃ)। পরমে অর্থাৎ উৎকৃষ্ট আকাশে (ব্যোমে) শতচ্ছিদ্র কলশের দোহন হচ্ছে ॥ ১০৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে প্রেত! সকলের প্রেরক সবিতা দেব, তোমার আচ্ছাদনের নিমিত্ত (ভর্তবে) এই বসন (এতৎ বাসঃ) প্রদান করছেন। এবং তুমি সেই প্রীতিকর (তৎ তাপং) বস্ত্রে আচ্ছাদিত হয়ে (বসানঃ) প্রেতাধিরাজ যমের রাজ্যে পরিভ্রমণ করো (চর)। (মতান্তরে তার্পং অর্থাৎ তৃপা নামক তৃণবিশেষে নির্মিত ঘৃতাক্ত বস্ত্রে আচ্ছাদিত হয়ে যমলোকে বিচরণ করো)। ১।
ভৃষ্ট যব (ধান) গো-সদৃশ (ধেনুরভব) এবং এই তিলসমূহ বৎস-সমান (বৎসো অভবৎ)। সেই (তাং) বৎসরূপ তিলের সাথে ধেনুরূপা সৃষ্ট যব যমের রাজ্যে ক্ষয়রহিত ভাবে অর্থাৎ দীর্ঘকাল এই প্রেত উপভোগ করুক (অক্ষিতা উপ জীবতি) ২
(পূর্ব মন্ত্রোক্ত অর্থ ব্যাখ্যাত হচ্ছে)–হে প্রেত! সন্ধ্যাবর্ণা, শুভ্রবর্ণা, হরিতবর্ণা (হরিণীঃ), অভিভর্জনের জন্য কৃষ্ণবর্ণা, অরুণবর্ণাঃ (রোহিণীঃ) ধেনুরূপা ভৃষ্ট যবগুলি তোমার হোক (তে)। সেই তিলবৎসা ধেনুসমূহ চিরদিন (বিশ্বাহা) অবিনশ্বর ভাবে (অনপস্ফুরত্য) অর্থাৎ অক্ষীণ হয়ে অস্থিরূপ (অস্মৈ) তোমাকে বলকর অন্ন (উর্জম) প্রদায়ক হোক (দুহানাঃ সন্তু) ॥ ৪৷
বৈশ্বানর (বৈশ্বানরে বিশ্বনরহিতো বিশ্বানরঃ। নরে সংজ্ঞায়াং ইতি পূর্বপদস্য দীর্ঘঃ। বিশ্বানর এব বৈশ্বানরঃ) অগ্নিতে এই (ইদং) পয়োরূপ বা স্থালীপাকরূপ হবিঃ প্রক্ষেপ করছি (জুহোমি)। সহস্রবিবোধক প্রবাহযুক্ত (সাহং), শতপ্রবাহেপেত (শতধারং) প্রস্রবণ-সদৃশ এই হবিঃ (হবিরিদং)। (যেমন এইরকম উৎস স্বাপজীবিগগণের প্রীত করে, সেইরকম এই হবিঃ নানাবিধ সৎ পিতৃপুরুষগণের পুষ্টির উৎসরূপে রূপিত)। হবির দ্বারা প্রীত সেই (স) বৈশ্বানর অগ্নি পিতৃত্বপ্রাপ্ত স্বজনক প্রেত (পিতরং) পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহগণের প্রীতি সাধন পূর্বক পোষণ করেন (বিভর্তি পিন্বমানঃ) ॥ ৫॥
সহস্ৰসংখ্যকচ্ছিদ্র-পতিত জলপ্রবাহযুক্ত (সহস্রধারং), শতধারা সমন্বিত প্রস্রবণের মতো (উৎসবৎ) ক্ষয়রহিত (অক্ষিতং), অন্তরিক্ষের উপরিভাগে (সলিলস্য পৃষ্ঠে) ব্যাপ্ত, বলকর অন্নসাধোদক ক্ষারণকারী (ঊর্জং দুহানং), বহুচ্ছিদ্রযুক্ত অবিদীৰ্যমান বা সম্যক্ শোভমান (অনপফুরন্তং) যে কুম্ভপ্রেতভূত পিতৃগণ (পিতরঃ) আপন তুষ্টির হেতু সেই কুম্ভের সেবা করেন (স্বধাভিঃ)। ৬৷
হে সমানকুলে জাত বা সমগোত্রীয়গণ (সজাতা)! তোমরা এই সঞ্চয়নকর্মের দ্বারা (চয়নেন) সঞ্চিত বা সমূহীকৃত অস্থিগুলি (কসান্ত্ব) অবলোকন করো (অব পশ্যত)। (অর্থাৎ পূর্বৰ্মন্ত্রে উদকাপ্লাবিত যে অস্থিগুলির কথা বলা হয়েছে, তা দর্শন করো)। আগত হও (এত)। এই মরণধর্মা প্রেত (অয়ম মর্ত) অমৃতত্ব অর্থাৎ অমরণ-ধর্ম প্রাপ্ত হয়েছে (অমৃতত্বং এতি)। সেই নিমিত্ত তোমরা যত সমান-গোত্রীয় সবান্ধব আছো (যাবৎসবন্ধু), তারা সকলে তাকে (তস্মৈ) অর্থাৎ সেই প্রেতকে স্থান করে দাও (গৃহাণ কৃণুত)। (প্রেতের অস্থি নিরীক্ষণই পরলোকে স্থানকরণ–এটাই অর্থ)। ৭।
হে দীপ্তপাংসুতে (ধূলিতে) স্থাপিত অঙ্গার (উন্মুক) বা অঙ্গারময় প্রেত! তুমি এই পাংসুলক্ষণ প্রদেশেই অবস্থান করো (ইহৈব এধি। আমাদের ধনের দাতা হও (ধনসনিঃ); এই প্রদেশে প্রজ্ঞাত হও (ইহ চিত্ত); আমাদের কর্ম-সম্পাদক হও (ইহক্রতুঃ);তথা এই প্রদেশে অত্যন্ত বলবান বিধাতা হও (বীর্যবত্তরঃ বয়োধা); সেই বিধাতারূপে শত্রুর দ্বারা অপরাজিত হয়ে অবস্থান করো (অপবাহতঃ এধি)। ৮।
মধুরবসোপেতা এই আচমনাহ জলসমূহ (ইমা আপঃ) পুত্র-পৌত্রগণের প্রীতিকর (অভিতৰ্পয়ন্তীঃ), অতএব পিণ্ডোপজীবী আপন পিতৃগণের উদ্দেশে (পিতৃভ্যঃ) অমরণসাধন আত্মপ্রীতিকর অন্ন (অমৃতং স্বধাং) প্রদায়ক (দুহানাঃ) দ্যোতমানা (দেবীঃ) আচমনীয় সমুদায় (আপঃ–জলরাশি) পুত্র ও পৌত্রদের (উভয়া) বর্ধন করুক (তপয়ন্তু)। (অথবা–উভয় শব্দের দ্বারা আপন মাতৃ ও পিতৃকুলের তৃপ্তি সাধন করুক, অর্থাৎ পিণ্ডদানের পর ক্রিয়মাণ আচমনের দ্বারা তৃপ্তি সাধন করুক–এমনও অর্থ করা যায়। এই পক্ষে পিতৃভ্যঃ অর্থে পিতা মাতা বুঝতে হবে)। ৯।
হে অবসেচন-সাধনভূতা জলরাশি (আপঃ) তোমরা তোমাদের অবসিচ্যমান দক্ষিণাগ্নিকে (অগ্নিং) পিতৃপিতামহ ইত্যাদির সমীপে প্রেরণ করো (প্র হিণুত); (অর্থাৎ বৰ্হিতে অর্থাৎ কুশে প্রদত্ত পিণ্ড দানের নিমিত্ত প্রেরণ করো)। পিতৃগণ আমাদের (মে) ইদানীং অনুষ্ঠীয়মান পিণ্ডপিতৃযজ্ঞ নামক যজ্ঞের (ইমং যজ্ঞং) সেবা করুন (জুষন্তা); (অর্থাৎ পিণ্ড আস্বাদন করুন)। যে পিতৃগণু কুশে উপবিষ্ট হয়ে আছেন, তাঁরা বলকর পিণ্ডলক্ষণ অন্ন স্বীকার করুন (ঊর্জং উপসচন্তে); তাঁরা আমাদের বহু কর্মকুশল পুত্রপৌত্র ইত্যাদির সাথে স্থির ধন দান করুন (নঃ রয়ি সর্ববীরং নি যচ্ছা)। ১০
বঙ্গানুবাদ –কর্মকর্তাগণ (যাগকারীবৃন্দ) অমরণধর্মা (অমর্ত্য), আজ্যপ্রিয় (ঘৃতপ্রিয়), হবির বাহক (হব্যবাহ) অগ্নিকে সমিধের (অর্থাৎ কাষ্ঠের) দ্বারা সম্যক্ দীপিত করছেন (সমিন্ধতে)। তিনি (স) অর্থাৎ সেই অগ্নি ভূমিতে নিহিত নিধির ন্যায় অতি দূরদেশগত পিতৃগণকে জ্ঞাত আছেন। (ভূমিতে নিগূঢ় নিধি যেমন প্রদর্শক বিনা প্রকাশ পায় না, পিতৃলোকপ্রাপ্ত পিতৃগণও সেই রকম, দূরবর্তী, অজ্ঞাতলোকে অবস্থান করলেও একমাত্র অগ্নিদেবই তাদের অবস্থান জ্ঞাত আছেন–এটাই বক্তব্য) ১॥
(প্রেতেরই প্রীতির নিমিত্ত সত্তুমন্থ ইত্যাদি প্রদান করা হচ্ছে)–হে প্রেত! তোমার প্রীতি নিমিত্ত যে মন্থ (যন্মন্থং), যে অন্ন (যমোদনং), যে মাংস (যন্মাংসং) প্রদান করছি (নিপূণামি), তে অর্থাৎ সেই মন্থ ইত্যাদি তোমার বহু অন্নযুক্ত (স্বধাবন্তঃ), মধুযুক্ত (মধুমন্তঃ) এবং ঘৃতের সাথে যুক্ত (ঘৃততঃ ) তোক (সন্তু) ॥ ২॥
হে প্রেত! তোমার উদ্দেশে এই যে কৃষ্ণ তিলযুক্ত ভৃষ্ট যব নিক্ষেপ করছি, সেগুলি মহৎ ও প্রভূত পরিমাণে তোমার প্রাপ্ত হোক; এবং পিতৃলোকাধিপতি যম তা ভক্ষণের জন্য তোমাকে অনুজ্ঞা প্রদান করুন। [ এই মন্ত্রটি এই অনুবাকের তৃতীয় সূক্তের ষষ্ঠ মন্ত্রেও পাওয়া যায় ] ৷ ৩৷
এই যে পুরোবর্তী প্রেতবহনের শকট (নিনং), তা পূর্বের এবং অদ্যতন; অর্থাৎ পূর্বে যে শকটে তোমার পিতৃপুরুষগণ পরাজুখে গমন করেছিলেন (পরেতাঃ), বর্তমানেও সেই শকট প্রেতবহনের জন্য অবস্থিত রয়েছে। ইদানীং এই সন্নহ্যমান শকটের (অস্য) সম্মুখভাগের দুই পার্শ্বে (অভিশাচঃ) যে দুটি বলদ যুক্ত হয়ে আছে, তারা তোমাকে (তুমি হেন প্রেতকে) সুকৃতলোকে বহন পূর্বক গমন করুক (বহন্তি সুকৃতাম্ লোকম)। ৪
মৃতদেহের সংস্কার করণশালী অগ্নি বা যমের প্রীতির নিমিত্ত সকলশব্দ-সরণিস্বরূপা বাগদেবতার (সরস্বতীর বা সরণবতীর) আহ্বান করা হয়। তথা অধ্বরে অর্থাৎ জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞের তায়মানে অর্থাৎ বিস্তার লাভ ঘটলে বাগদেবীর (সরস্বতীর) আহ্বান করা হয়। (যজ্ঞে সারস্বত হোমের বিদ্যমানতার কারণে স্তোত্ৰশব্দ ইত্যাদির বাগাত্মকত্ব এবং তার সিদ্ধির নিমিত্ত সরস্বতীর আহ্বান করা হয়ে থাকে)। পূর্বে সুকৃত কর্মকারীগণ আপন আপন অভিমত ফল-লাভের নিমিত্ত দেবী সরস্বতাঁকে আহ্বান করেছেন; এখনও সরস্বতী দেবী হবির্দানরত যজমানকে বরণীয় বস্তু (বার্যং) দান করুন। [এই মন্ত্রটি এই কাণ্ডের প্রথম অনুবাকের পঞ্চম সূক্তের প্রথম মন্ত্র রূপেও পাওয়া যায়। ৫৷৷
বেদীর দক্ষিণ দিকে প্রতিষ্ঠিত পিতৃপুরুষবর্গও দেবী সরস্বতীর আহ্বান করে থাকেন। হে পিতৃপুরুষগণ! তোমরা এই যজ্ঞে বিরাজমান হয়ে আমাদের প্রদত্ত স্বধা লাভপূর্বক প্রসন্নতা প্রাপ্ত হও। হে দেবী সরস্বতী! তুমি পিতৃগণের দ্বারা আহুতা হয়ে রোগ-রহিত অভীপ্সিত অন্ন আমাদের প্রদান করো। [এই মন্ত্রটিও এই কাণ্ডের প্রথম অনুবাকের পঞ্চম সূক্তের দ্বিতীয় মন্ত্র রূপেও পাওয়া যায়। ৬।
হে সরস্বতী দেবী! তুমি উথ-শস্ত্রে (সামবেদীয় অংশবিশেষ বা যজ্ঞবিশেষে) ও স্বধায় (পিতৃলোকের উদ্দেশে প্রদত্ত জল-পিণ্ড ইত্যাদি বা জল-পিণ্ডদানের মন্ত্রে) তৃপ্ত হয়ে পিতৃগণ সমভিব্যাহারে এক-রথে গমন করছো। তুমি বহু পুত্র ও প্রজাদের তৃপ্ত করার উপযুক্ত অন্নের ভাগ এবং গো-ইত্যাদি লক্ষণ ধনের পুষ্টি আমি হেন যজমানকে প্রদান করো। [এই মন্ত্রটিও এই কাণ্ডের প্রথম অনুবাকের পঞ্চম সূক্তের তৃতীয় মন্ত্র রূপেও পাওয়া যায়] ॥ ৭।
পৃথিবীবিকারভূত কুম্ভীরূপা (পৃথিব্যাং) হে মৃত্তিকা (পৃথিবীং)! তোমাকে আমি আলিম্পিত করছি। (অর্থাৎ মৃত্তিকা, গোময় ইত্যাদি লেপনের দ্বারা আমি এই চরুস্থালী ঈষৎ দৃঢ়া (ত্বা) করছি)। বিধাতা (ধাতা) অর্থাৎ সকলের দেবতা আমাদের সকল যজ্ঞীয় অনুষ্ঠানের অনুষ্ঠাতা রূপে আমাদের জীবন (আয়ুঃ) বর্ধন করুন (প্র তিরাতি)। হে দূরদেশে গত (পরাপরৈতাঃ) পিতৃগণ! তোমরা বসুবিৎ অর্থাৎ এই অন্নলক্ষণ ধন তোমাদের প্রাপয়িত্রী হোক; (অর্থাৎ এই মৃত্তিকালিপ্তা চরুকুন্তী তোমরা লাভ করো)। চরু-প্রদান, স্বাহাকার ইত্যাদির পর (অধ) ইদানীন্তন পরলোক প্রাপ্ত (মৃতাঃ) পিতৃগণ আপন পূর্বজ পিতৃবর্গের সাথে সংযুক্ত হোন (সং ভবন্তু) ৮
হে প্রেতবাহক বৃষভদ্বয়! তোমরা শকট হতে বিযুক্ত হয়ে (প্র চ্যাবেথাং) আমাদের অভিমুখে আগত হও (আ); সেই নিন্দারূপ বাক্য অপমার্জিত অর্থাৎ শোধন করো (অপ তৎ মৃজেথাং), যা দূষক পুরুষগণ (অভিভাঃ) তোমাদে সম্পর্ক বলে থাকে। এই বৃষভদ্বয় অস্পৃশ্য, অনিরীক্ষ প্রেতকে বহন কর্মে নিয়োজিত হয়েছে–ইত্যাদি নিন্দারূপ যে বাক্য উদিত হয়েছে, তা শোধন করো। অতএব হে অহন্তব্য অর্থাৎ অবধ্য (অগ্নৌ) বৃষভদ্বয়! তোমরা এই নিন্দানিমিত্ত শকট হতে আগত হও। সেই আগমন (তৎ) শ্রেষ্ঠ (বশীয়ঃ) হবে। তাহলে এই (ইহ) পিতৃমেধ যজ্ঞে অর্থাৎ পিতৃগণের উদ্দেশে অগ্নির প্রদাতা (দাতুঃ) বা হবির প্রদাতা আমার পক্ষে তোমরা পালয়িন (মম ভোজনৌ) হবে ॥ ৯
এই গোরূপা দক্ষিণা (ইয়ং দক্ষিণা) সংস্কারকারী আমাদের (নঃ) কল্যাণ প্রদেশ হতে (ভদ্রতঃ) আগত হয়েছে (আ অগন)। এই প্রেতের দ্বারা বিতীর্ণা (অনেন ৭৬, দোঞ্জী (সুদুঘা), অন্নের ক্ষীরলক্ষণ-প্রদাত্রী (বয়োধাঃ) গোরূপা দক্ষিণা বার্ধক্যে জরাযুক্তা হলেও বর্তমানের ন্যায় যৌবন সদৃশ জীবন (শরীরের মধ্যাবস্থা) প্রাপ্ত হোক (যৌবনে জীবান)। অধিকন্তু, (এই গোরূপা দক্ষিণা) অধুনা (ইমা) সংস্ক্রিয়মাণ পূর্ব পিতৃগণের সমীফে সম্যক্ প্রাপ্ত হোক (উপসম্পরাণয়াৎ)। ১০.
বঙ্গানুবাদ— পিতৃপুরুষগণের নিমিত্ত (পিতৃভ্যঃ) এই কুশ (ইদং বৰ্হি) আস্তৃত করছি (প্র ভরামি)। সেই আস্তীর্ণ কুশের উপর (উত্তরং) আমি হেন সংস্কারক (জীব–জীবনবান) দেবতাগণের নিমিত্ত অপর কুশ আস্তীর্ণ করছি (খৃণামি)। হে পুরুষ! তুমি এই পিতৃমেধাখ্য যজ্ঞের যোগ্য (মেধ্য) হয়ে সেই কুশে আরোহণ করো (আ রোহ)। তোমার পূর্বজ পিতৃগণ (পিতরঃ) পরাঙ্খ-গত বা পরলোক-প্রাপ্ত (পরেতং) তোমাকে অনুমোদন করুন (ত্বা প্রতি জানন্তু); (অর্থাৎ কুশে আরোহণের কারণে তারা এই কথা স্মরণ করুন যে, আমাদের এই জন পিতৃলোক লাভ করেছে)। ১।
হে প্রেত! তুমি এই (ত্বং ইদং) চিতায় আস্তীর্ণ কুশে আরোহণ করে (বহিরসদো) এবং অতঃপর পিতৃমেধ যজ্ঞের যোগ্য হও (মেধ্যেভূঃ); অর্থাৎ দহনের দ্বারা সংস্কৃত হও)। তোমার পূর্বজ পিতৃগণ (পিতরঃ) পরাঙ্খ-গত বা পরলোক-প্রাপ্ত (পরেতং) তোমাকে অনুমোদন করুন। জীবিত অবস্থায় তোমার দেহের অস্থিগুলির পর্বে যেমন সন্নিবেশিত ছিল (তন্বং যথাপরু সংভরস্ব গাত্রাণি), আমিও এই ব্রহ্মমন্ত্রের দ্বারা তা পূর্বস্থিত পর্বানতিক্রমে সংহত করছি (কল্পয়ামি)। (আমিও অর্থে–অহমপি কুলে জ্যেষ্ঠ অর্থাৎ কুলের জীবিত জ্যেষ্ঠ পুরুষ রূপে)। ২।
কুম্ভ্যা-পক্ক অন্নের (চরূণাম) আচ্ছাদনভূত (পিধানং) সকল যজ্ঞীয় বৃক্ষের অধিপতি পলাশবৃক্ষ (পর্ণঃ রাজা) আমাদের বলবন্তকারী অন্নরস (ঊর্জঃ), শারীরিক ও বাহ্যিক অর্থাৎ মনুষ্য-সম্পদ ইত্যাদি লক্ষণ সমন্বিত দুই প্রকার বল, শত্রুধর্ষণের সামর্থ্য (সহঃ), শরীরের কান্তি বা শরীরধারক অষ্টম ধাতু (ওজঃ) প্রদানের নিমিত্ত আগত হোক; (অর্থাৎ সকলচরু-পিধায়ক পলাশপর্ণ আমাদের উর্জবল ইত্যাদির আকর হয়ে আগমন করুক)। (কেবল অন্ন ইত্যাদি দানই নয়, অধিকন্তু) জীবিত আমাদের (জীবেভ্য) আয়ুকে শতসম্বৎসরব্যাপী দীর্ঘায়ুত্ব প্রদান করুক (বিদধৎ) ৩
অস্থিসমীপে স্থাপিত অন্নের সম্ভোগকারী (উর্জঃ ভাগঃ) যম (য) এই প্রেতকে উৎপাদিত করেছেন (ইমস্ জজান)। এবং যমের দ্বারা (যেন চ) চরুর আচ্ছাদক পাষাণ (অশ্ম) চরুর উপর স্থায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছে (অন্নানাম্ আধিপত্য জগাম)। হে সকলের উপকারীজনবস্তু বান্ধবগণ (বিশ্বমিত্রা )! তোমরা সেই যমকে চরুপুরোডাশ ইত্যাদি হবির দ্বারা প্রীত করো (তম্ অৰ্চত হবির্ভি)। সেই অর্চিত যম (স যমঃ) আমাদের (নঃ) প্রকৃষ্ট (প্রতরং) জীবন বা দীর্ঘ আয়ু লাভের নিমিত্ত ধারণ করুন (জীবসে ধাৎ)। [ এই ঋকটির অর্ধাংশ এই কাণ্ডের তৃতীয় অনুবাকের সপ্তম সূক্তের তৃতীয় মন্ত্রে পাওয়া যায় ] ৷৷ ৪
পঞ্চ সংখ্যক জন (মনোরপত্য ইত্যাদি পঞ্চ মানবাঃ) অর্থাৎ নিষাদ ও ব্রাহ্মণ ইত্যাদি চতুবর্ণীয় মানব অথবা ঐতরেয়ক ব্রাহ্মণানুসারে দেব-মনুষ্য-গন্ধর্বপ্সরা-সর্প ও পিতৃগণ) যে প্রকারে (যথা) প্রেতাধিপতি যমের নিমিত্ত নিবাসস্থান নির্মাণ করেছে (হং অবপন), তেমন (এব) প্রেতের নিবাসের নিমিত্ত উন্নত পিতৃগৃহ মৃত্তিকার দ্বারা সম্পাদিত করছি (হং আবপামি), যাতে আমার বান্ধবগণ (মে) বহু (ভুরয়ঃ) হয় (অসত); (অর্থাৎ প্রেতরূপী বান্ধবগণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে নিবাস করতে পারে)। (প্রেতের নিমিত্ত উন্নত স্থান না করলে বন্ধুবর্গের অনিষ্ট বা অসুবিধা হতে পারে, সেই কারণেই উন্নত পিতৃগৃহ নির্মাণের প্রয়োজন হয়)। ৫।
হে প্রেত! এই সুবর্ণনির্মিত অঙ্গুরি (ইদং হিরণ্যং) ঘৃতের দ্বারা ধারণ করো (বিভৃহি), যে হিরণ্য (যৎ) তোমার (তে) পিতা অতীতে দক্ষিণ হস্তে ধারণ করতেন। সুখের সাথে কর্মার্জিত লোকে গমনকারী (স্বর্গং যত) জনকের দক্ষিণ হস্ত নিৰ্মার্জন বা শোধন করে দাও (নিঃ মৃড়টি দক্ষিণ)। (দক্ষিণহস্তে ধারণের কারণে দক্ষিণ হস্তের প্রমার্জন প্রয়োজন) ॥ ৬
যারা জীববন্ত (অর্থাৎ জীবন্ত) ও যারা মৃত, যারা জনিমন্ত (অর্থাৎ জাত হয়েছে) এবং যারা জনিষ্যমাণ (যজ্ঞিয়াঃ-অৎ উৎপাদিতব্য)–সেই সকলের (তেভ্যঃ) নিমিত্ত মধুপ্রবাহ বিশেষভাবে অভিবর্ষিত হোক (মধুধারা ব্যুন্দতী) এবং আজ্যের কৃত্রিম নদী (ঘৃতস্য কুল্যা) তাঁদের প্রীতির নিমিত্ত গমন করুক বা প্রবাহিত হোক (এতু)। ৭৷
(পিতৃত্ব প্রাপ্ত পুরুষগণ. ধূম ইত্যাদি মার্গ অবলম্বনে পিতৃলোক প্রাপ্ত হয়ে সোমযাগ ইত্যাদি জনিত সুকৃত বা পুণ্যফল উপভোগ করে। সেই কারণে পিতৃপ্রকরণে সোমের স্তুতি করা হচ্ছে)।–স্তোতৃগণের (মতীনাং) অভিমত ফলবৰ্ষক (বৃষা) বা স্তুতিবিষয়ে বিশেষভাবে দ্রষ্টা (বিচক্ষণঃ) সকলের দ্রষ্টব্য সোম দশাপবিত্র হতে স্যন্দিত অর্থাৎ ক্ষরিত হচ্ছে (পবতে)। দিবা ও রাত্রির নিষ্পদয়িতা (অহ্নাং সূরঃ), উষাকাল ও দুলোকের প্রবর্ধয়িতা (প্রতরীতা উষসাং দিবঃ), ক্ষরণশীল বসতীবরী জলের (সিন্ধুনাং) প্রাণভূত স্বাত্মরূপের কর্তা (প্রাণঃ) সোমকলশসমূহের (অর্থাৎ দ্রুমময় যজ্ঞপাত্রবিশেষের) অথবা (ইন্দ্র-বায়ু ইত্যাদি সম্বন্ধীয় গ্রহপাত্রের) অভিলক্ষ্যে অত্যন্ত শব্দ করছে অথবা ধারাপাতনের ধ্বনিতে তাদের সেইরকম ধ্বনি উৎসারিত করাচ্ছে (অচিক্রদৎ)। অতঃপর তিন সবনে (ত্রৈকালিক যজ্ঞে) যষ্টব্য ইন্দ্রের (ইন্দ্রস্য) হৃদয়ে বা জঠরে (হার্দিৰ্ম) যথামনোভিলাষে (মনীষয়া) প্রবেশ করছে। (অবিশৎ)। ৮।
(এই স্থানে প্রেতাগ্নির স্তুতি করা হচ্ছে)–হে প্রেতাগ্নি! তোমার দীপ্ত ধূম আচ্ছাদিত করুক (অর্থাৎ অন্তরিক্ষের সর্বত্র মেঘে পরিণত হোক) (তে ত্বেষ ধূমঃ উর্ণোতু)। অন্তরিক্ষে প্রভাময় হয়ে বিস্তীর্ণ (দিবি সন্ শুক্রঃ আততঃ) হে পাবক বা পবিত্রকারক (অর্থাৎ দাহক বা শোধক প্রেতাগ্নি)! তুমি (ত্বং) স্তুতির সাথে অর্থাৎ স্থূয়মান হয়ে (কৃপয়া) সূর্যের ন্যায় (সূরঃ ন) দীপ্ত হয়ে প্রকাশমান হচ্ছো (দ্যুতা রোচসে)। ৯
(পিতৃলোকাধিপতি সোমের স্তুতি করা হচ্ছে)-স্যমান অর্থাল ক্ষরণশীল সোম (ইন্দুঃ) ইন্দ্রের জঠরলক্ষণ স্থানে (নিষ্কৃতিং) গমন বা প্রবেশ করছে (বৈ প্রৈতি)। সখার ন্যায় হিতকরী সোম (সখা) অভিষবস্তোত্র ইত্যাদির দ্বারা সখিভূত (সখৃঃ) ইন্দ্রকে কাম্যমান বস্তু সমূহ প্রদান করছে অথবা সখা সোম তার সখা ইন্দ্রের উদর শূন্য হতে দিচ্ছে না (ন প্র মিনাতি) অর্থাৎ সর্বদা নিজের দ্বারা পূর্ণ করছে। মরণধর্মা মনুষ্য যেমন (মর্য ইব)। যেমন যুবতীর সাথে সঙ্গত হয়, সেইরকম সোমও সোমাধারে অর্থাৎ দ্রোণকলসে (কলশে) শত পথে অর্থাৎ বহুধারায় (শত্যমনা পথা) পতিত হচ্ছে অর্থাৎ সঙ্গত হচ্ছে (সমর্ষসে)। ১০ ]
টীকা –উপযুক্ত সূক্তের প্রথম মন্ত্রের প্রথমার্ধের দ্বারা চিতিকাষ্ঠের উপরে কুশ বিস্তার ও শেষার্ধের দ্বারা কুশাস্তীর্ণ চিতায় প্রেতকে (অর্থাৎ শবকে) ঊর্ধ্বমুখ (অর্থাৎ চিৎ) করে শায়িত করা হয়।..দ্বিতীয় মন্ত্রে কুলের জ্যেষ্ঠ জনের দ্বারা অস্থিপর্বগুলি সন্নিবেশ করণীয়। এইভাবে পর পর মন্ত্রগুলি শতচ্ছিদ্ৰপাত্র ও পলাশপত্রের আচ্ছাদন, চরুর আচ্ছাদক পাষণ স্থাপন, মৃত্তিকার দ্বারা উন্নত পিতৃগৃহ নির্মাণ, জ্যেষ্ঠপুত্র কর্তৃক প্রেতহস্তে বিদ্যমান হিরণ্যাঙ্গুরীয় মার্জন, পূর্ব ও উত্তর পুরুষদের নিমিত্ত কৃত্রিম আজ্য-নদীর আবাহন ইত্যাদি পিতৃমেধ সম্পর্কিত কর্মে বিনিয়োগ করা হয় ॥ (১৮কা. ৪অ. ৬সূ.)।
বঙ্গানুবাদ— (এখানে পিতৃগণের স্তুতি করা হচ্ছে)–কুশের উপরে দত্ত পিণ্ডসমূহ (অক্ষ) ভক্ষণ পূর্বক পিতৃপুরুষগণ তুষ্ট হয়েছেন (অমীমদন্ত হি অব)। পুনরায় তারা আপনাপন শরীরকে (প্রিয়া) কম্পায়মান করছেন (অধুষত); (অর্থাৎ অতিশয়িত রসাস্বাদনের নিমিত্ত তাদের শরীরে কম্পন হচ্ছে)। অনন্তর নিজেদের আয়ত্তাধীন দীপ্তি সম্পন্ন (স্বভানবঃ) পিতৃগণ সাধু কর্ম করার নিমিত্ত আমাদের প্রশংসা করছেন। সেই পিণ্ডভক্ষণে তৃপ্ত পিতৃগণের নিকটে মেধাবি (বিপ্রাঃ) যুবতম (যবিষ্ঠাঃ) আমরা আপন ইষ্টফল যাচনা করছি (ঈমহে)। ১।
হে পিতৃগণ! সোমের যোগ্যরূপী তোমরা (সোম্যাসঃ) দুর্গম পিতৃযান পথে আগমন করো (আ যাত গম্ভীরৈঃ পথিভি পিতৃযানৈঃ)। এবং আগমন পূর্বক পিণ্ডদানার্থে আস্তীর্ণ কুশের উপর তিল বিকিরণকারী আমাদের (অস্মভ্য) বহুকালব্যাপী জীবন (আয়ুঃ) ও প্রকর্ষের দ্বারা জায়মান পুত্রপৌত্র ইত্যাদি লক্ষণ সন্ততি (প্রজাং) প্রদান করো (দবতঃ)। অধিকন্তু আমাদের ধন ও সমৃদ্ধির সাথে সংযোজিত কমরো (রায়শ্চ পোষৈঃ অভি নঃ সচধ্বম্ ২
হে সোমের (সোমপান, বা সোমযাগের) যোগ্যরূপী পিতৃগণ (পিতরঃ সোম্যাসঃ)! তোমরা আপন লোক-প্রাপ্তি সাধনে (পূর্যাণৈঃ) দুর্গম পিতৃযান পথে অর্থাৎ পরাজুখে গমন করো। অনন্তর এক মাস পূর্ণ হলে (মাসি পূর্ণে, অর্থাৎ পরবর্তী অমাবস্যায়) হবির্ভক্ষণের স্থানভূত (হবিঃ অতুম) আমাদের গৃহে পুনরায় আগমন করো (পুনঃ আ যাত নঃ গৃহান)। (আমাদের গৃহের বৈশিষ্ট্য কি?-না) আমাদের গৃহ শোভন পুত্রযুক্ত (সুপ্রজসঃ) ও কর্মকুশল পৌত্র ইত্যাদি সমন্বিত (সুবীরাঃ) ৷ ৩৷৷
হে প্রেত পুরুষবর্গ! তোমরা (বঃ) পিতৃগণের অধিষ্ঠিত স্থানের প্রাপক (পিতৃলোকং গময়ং)। জাত প্রাণীমাত্রেরই পুণ্য-পাপের জ্ঞাতা অগ্নি (জাবেদাঃ) প্রেতদহনকালে তোমাদের যে (যৎ) একটি অঙ্গ ত্যাগ করেছেন (অজহাৎ), সেই পুরোবর্তী অবয়ব, অগ্নিতে প্রক্ষেপ করছি (পুনরা প্যায়য়ামি)। তোমরা সম্পূর্ণ অঙ্গে (সাঙ্গাঃ) পিতৃগণের স্থানভূত স্বর্গে (পিতরঃ স্বর্গে) গমন পূর্বক প্রসন্নতা প্রাপ্ত হও (মাদয়ধ্বম্) ৪
সন্ধ্যায় ও প্রাতঃকালে (সায়ং ন্যহ্নে) মনুষ্যগণের উপাসনীয় (নৃভিঃ উপবন্দ্যো), জামাত্রেরই জ্ঞাতা (জাতবেদাঃ), দূতত্বে নিযুক্ত হয়ে আমাদের পিতৃপুরুষগণের প্রতি প্রেরিত (দূতঃ প্রহিতঃ অভূৎ)–এই হেন তুমি হে অগ্নিদেব! আমাদের হবিঃ পিতৃপুরুষগণকে প্রদান করো (পিতৃত্যঃ প্রাদাঃ প্রযতানি হবীংষি); এবং পিতৃপুরুষগণ (তে) স্বধাকারের দ্বারা (স্বধয়া অক্ষ) হবিঃ ভক্ষণ করুন। অনন্তর হে দেব অগ্নি! তুমিও আমাদের দ্বারা তোমাকে প্রদত্ত হবিঃ ভক্ষণ করো (অদ্ধি ত্বম)। ৫৷৷
(এখানে প্রেতকে সম্বোধন করা হচ্ছে)–হে (অমুকনামধেয়) প্রেত (অসৌ হা)! তোমার মন (তে মনঃ) এই ইষ্টকচিত প্রদেশে (ইহ) (অর্থাৎ শ্মশানপ্রদেশে) অবস্থিত রয়েছে। হে ভূমি চিতশ্মশাদেশ! এই স্থানে অবতিষ্ঠমান (এনং) প্রেতকে সর্বতোভাবে আচ্ছাদিত করো (অভূর্ণহি)। (তার দৃষ্টান্ত) আপ্তা বান্ধবাঃ ককুৎসলমিব জাময়–অর্থাৎ স্ত্রীগণ যেমন পুত্র ইত্যাদির মস্তক প্রভৃতি অঙ্গসমূহ শীত-আতপ-বায়ু নিবারণের নিমিত্ত আপন বসনের দ্বারা আচ্ছাদিত করেন ॥ ৬৷৷
হে প্রেত! তোমার পিতৃপুরুষগণের নিবাসস্থান (পিতৃসদনাঃ) পিতৃলোকসমূহ তোমার নিমিত্ত প্রকটিত হোক (শুম্ভন্তাং)। আমি হেন সংস্কর্তা সেই পিতৃসদনে (অর্থাৎ পিতৃগণের অধিষ্ঠিত লোকে) তোমাদের স্থাপন করছি (ত্বা আ সাদয়ামি) ॥৭॥
(পিণ্ডদানার্থে আস্তীর্ণমান বৰ্হি অর্থাৎ কুশকে সম্বোধন করা হচ্ছে)–হে বৰ্হি! যারা আমাদের (যে অস্মাকং) পিতৃপুরুষ অর্থাৎ পিতৃলোক প্রাপ্ত পূর্বজ পিতৃগণ (পিতরঃ), তুমি তাদের (তেষাং) বৰ্হি (অর্থাৎ কুশরূপ আসদনস্থান হয়ে থাকো (অসি)। ৮।
এই মন্ত্রটি অষ্টম অনুবাকের দ্বিতীয় সূক্তের তৃতীয় মন্ত্রে ব্যাখ্যাত হয়েছে। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয়-বরুণপাশ তিন প্রকার, উত্তম-অধম-মধ্যম। এই স্থলে সেই কারণে বরুণের উদ্দেশে বলা হচ্ছে–হে বরুণ! তোমার উত্তম পাশ আমাদের নিকট হতে ঊর্ধ্বে উন্মোচন করো (উত্তমং পাশং তস্মৎ উৎ শ্ৰথায়); (অর্থাৎ উত্তম পাশটিকে আমাদের কাছ থেকে অনেক উপরে নিয়ে গিয়ে বিনাশ করো)। অধম অর্থাৎ নিকৃষ্ট পাশ আমাদের নিকট হতে নিম্নে মোচন করো (অব শ্ৰথায়) এবং মধ্যম পাশ শ্লথ করে অর্থাৎ শিথিল করে আমাদের দিকে বিমোচন করো (বি শ্ৰথায়), (যাতে ঐ পাশ আমাদের ক্ষতি করতে না পারে)। অনন্তর বিমুক্তপাশ আমরা, হে অদিতি পুত্ৰ বরুণ (অধা বয়ম্ আদিত্য)। তোমার পরিচরণরূপে (তব ব্রতে) নিদোষ অর্থাৎ প্রত্যবায়রহিত হয়ে (অর্থাৎ তোমার উদ্দেশে যাগানুষ্ঠানের যোগ্য হয়ে) অহিংসায় নিযুক্ত হবো (অদিতয়ে স্যাম); (অর্থাৎ তোমাকে সেবা পূর্বক অহিংসিত হয়ে থাকবো)– ৯
হে বারক দেব (বরুণ)! তোমার যে পাশসমূহে (যৈঃ) সন্নিহিত প্রদেশের ও দূর প্রদেশের পুরুষ বদ্ধ হয় (সমামে বধ্যতে যৈবামে), তোমার সেই সকল বন্ধনসাধনভূত: পাশ হতে (পাশা) আমাদের প্রমোচিত করো (অস্মৎ প্র মুঞ্চ)। তোমার পাশমোচনের পর, হে রাজা বরুণ (রাজ)! তোমার দ্বারা রক্ষিত হয়ে বা পালিত হয়ে (গুপি) আমরা শত শরব্যাপী (শরদং শতানি) অর্থাৎ বহুবর্ষ পর্যন্ত জীবনবন্ত হয়ে থাকবো (জীবেম)। ১০।
টীকা— উপযুক্ত সূক্তের প্রথম ঋকটির দ্বারা পিণ্ডপিতৃযজ্ঞে পিণ্ডেপস্থানের পর (অর্থাৎ কুশের উপরে। পিণ্ডদানের পর) উত্তরপরিষেক করণীয়। দ্বিতীয় মন্ত্রটির দ্বারা আস্তীর্ণ কুশে তিল-বিক্ষিপ্ত করণীয়। পরবর্তী ঋকটি পিতৃগণের বিসর্জন অর্থাৎ পিতৃলোকে প্রেরণ সম্পর্কে বিনিয়োগ করণীয়। এইভাবে পরপর মন্ত্রগুলি তণ্ডল হোমে, সমিৎ-আধানের পর অগ্নির প্রত্যানয়নে, শ্মশানদেশে শলাকা স্থাপন ও চিতা নির্মাণে, পিণ্ড প্রদানের নিমিত্ত কুশ আস্তীর্ণ করণে, শবদাহের পর ব্রাহ্মণগণের স্নান করণে বিনিয়োগ নির্দিষ্ট আছে। শেষোক্ত ঋকটি পিতৃমেধে দশরাত্র পর্যন্ত সন্ধ্যায় ও প্রাতে স্বস্ত্যয়নের নিমিত্ত পঠনীয় ॥ (১৮কা. ৪অ. ৭সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –[দৈবহবির অর্থাৎ দেবতার উদ্দেশে দেয় হবির প্রাপক বা বাহক অগ্নি হব্যবাহক। এই হবিঃ স্বাহাকারের (বষারের) দ্বারা অগ্নিকে অর্পণ করা হয়। পিতৃগণের উদ্দেশে প্রদত্ত হবিকে যেহেতু কব্য বলা হয়, সুতরাং সেই হবির প্রাপক (বা বাহক) অগ্নি হলেন কব্যবাহক। এই হবিঃ স্বধাকারের দ্বারা হুত হয়। সেই কারণে পিণ্ডপিতৃ-যজ্ঞে প্রথম চারটি মন্ত্রে স্বধাকার উল্লেখ করা হয়েছে। ] কব্যবাহক অগ্নিকে স্বধাকারের দ্বারা এই হবিঃ অর্পণ করছি। তাকে নমস্কার। (অর্থাৎ তার বহনের মাধ্যমে আমার পিতৃপুরুষগণ কব্য প্রাপ্ত হোন) ॥ ১।
পিতৃমান সোমের উদ্দেশে স্বধাকারের দ্বারা এই হবি অর্পণ করছি। তাঁকে নমস্কার। (অর্থাৎ যে সকল পিতৃগণ সোমরূপে অবস্থিত, তাঁরা এই কব্য লাভ করুন)। ২৷
সোমশালী (অর্থাৎ জীবিতকালে সোমযাগকারী) পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশে স্বধাকারের এবং নমস্কারের দ্বারা সম্পন্ন এই হবিঃ অর্পণ করছি। তারা এই হবিঃ প্রাপ্ত হোন ॥ ৩৷
পিতৃগণের অধিপতি যমের উদ্দেশে স্বধা এবং নমস্কারের দ্বারা এই হবিঃ অর্পিত হচ্ছে। (আমার পিতৃগণ এই হবিঃ প্রাপ্ত হোন)। ৪
(এই ভাবে পিণ্ডপ্রদানমন্ত্র কথিত হচ্ছে)–হে। প্রপিতামহ (ততামহ)! [ তত শব্দ পিতৃবচন ] তোমার উদ্দেশে এই পিণ্ডলক্ষণ হবিঃ স্বধাকারের দ্বারা প্রদত্ত হচ্ছে এবং যে পিতৃ-পুরুষগণ ভার্যা-পুত্র ইত্যাদি সহ তোমাকে অনুসরণ পূর্বক অবস্থান। করছেন (ত্বা অনু) তাদের উদ্দেশেও স্বধামন্ত্রে এই পিণ্ডলক্ষণ হবিঃ অর্পিত হোক; (অর্থাৎ তারাও এই পিণ্ডের অংশভাগী হোন)। ৫।
হে পিতামহ (ততামহ)! তোমার উদ্দেশে এই পিণ্ডলক্ষণ হবিঃ স্বধাকারের দ্বারা প্রদত্ত হচ্ছে এবং যে পিতৃগণ (অর্থাৎ পরলোকগত পিতামহ স্থানীয়গণ) ভার্যা-পুত্র ইত্যাদি সহ তোমাকে অনুসরণ পূর্বক অবস্থান করছেন, তাঁরাও এই পিণ্ডের অংশভাগী হোন। ৬।
হে পিতা (ততা)! তোমার উদ্দেশে স্বৰ্ধকার যুক্ত অর্পিত এই হবিঃ তুমি প্রাপ্ত হও এবং পিতৃস্থানীয় পরলোকপ্রাপ্ত জন, যাঁরা তোমাকে অনুসরণ পূর্বক অবস্থান করছেন, তাঁরাও এর অংশভাগী হোন। (এই ক্ষেত্রে অনুগামী হিসাবে ভার্যা-পুত্র ইত্যাদির উল্লেখ করা হয়নি; কারণ পিণ্ডপ্রদাতা পুত্র জীবিত থাকায় পরলোকগত পিতার অনুগামী জনের নাম মন্ত্রশেষে উল্লেখনীয়)। ৭।
পৃথিবীতে অবস্থানকারী (পৃথিবিষ্যঃ) পিতৃগণের উদ্দেশে (পিতৃভ্য) স্বধাকারে এই হবিঃ অর্পিত হচ্ছে। তারা তা প্রাপ্ত হোন। ৮।
অন্তরিক্ষলোকে অবস্থানকারী (অন্তরিক্ষসদ্ভঃ) পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশে (পিতৃভ্যো) স্বকারে এই হবিঃ অর্পিত হচ্ছে। তারা তা প্রাপ্ত হোন। ৯
দ্যুলোকে অর্থাৎ স্বর্গে অবস্থানকারী (দিবিষ্য) পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশে স্বধাকারে প্রদত্ত এই হবিঃ তাদের লভ্য হোক। ১০
টীকা –উপযুক্ত নির্দেশানুসারে এই মন্ত্রগুলির দ্বারা স্থালীপাক-যাগ, কুশে পিণ্ড সংহিত করণ ইত্যাদি বিধেয়। কৌশিক সূত্রে এই ক্রিয়ার বিস্তৃত নির্দেশ উল্লিখিত আছে ॥ (১৮কা. ৪অ. ৮সূ.)।
বঙ্গানুবাদ— [এই মন্ত্রগুলি কথিতরূপে ব্যাখ্যাত হয়েছে। এগুলির দ্বারা পিতৃগণের প্রতি নমস্কার প্রতিপাদিত (সম্পন্ন) করা হচ্ছে। (তৈ, ব্রা, ১৩১০৮)। নমস্কারের ফল প্রতিপাদকসমূহ ঊর্জে (অন্ন) ইত্যাদি অথবা পিতৃগণের দীয়মান অন্নরসকে নমস্কার করা হয়েছে। পরবর্তী সর্বক্ষেত্রে এইরকমই বোধিতব্য হে পিতৃগণ! তোমাদের উদ্দেশে দীয়মান ঊর্জকে (অন্নকে) ও অন্নরসকে (রসায়) নমস্কার করছি। ১।
হে পিতৃগণ! তোমাদের সম্বন্ধী ক্রোধের উদ্দেশে (ভামায়) এবং তোমাদের সম্বন্ধী মনু নামক বিশেষ ক্রোধের (মন্যবে) (অর্থাৎ অহঙ্কারজনিত রোষের) উদ্দেশে নমস্কার করছি। ২।
হে পিতৃগণ! তোমাদের সেই অহিতকারী ভয়ঙ্কর রূপকে (ঘোরং) এবং তোমাদের সেই হিংস্র রূপকে নমস্কার করছি৷৷ ৩৷৷
হে পিতৃগণ! তোমাদের যে মঙ্গলময় রূপ আছে (যৎ শিব), তার উদ্দেশে নমস্কার করছি; তোমাদের যে সুখপ্রদ রূপ আছে (স্যোনং), তার উদ্দেশেও নমস্কার করছি। ৪
হে পিতৃগণ! তোমাদের উদ্দেশে নমস্কার করছি। হে পিতৃগণ! স্বধাকারের দ্বারা এই হবিঃ তোমাদের নিমিত্ত স্বাহুত হোক ॥ ৫॥
এই পিণ্ডপিতৃযজ্ঞে (অত্র) যে পিতৃগণ দেবতাত্ব প্রাপ্ত হয়েছে, তোমাদের অনুসরণকারী (বা আশ্রিত) যাঁরা আছেন, তোমরা তাঁদের মধ্যে প্রশস্যতম অবলম্বন (শ্রেষ্ঠাঃ) হয়ে ওঠো (ভূয়াস্থ)। তোমাদের প্রসাদে তারা পিণ্ডাংভাগী হোন; (অর্থাৎ এই যজ্ঞে পিতৃত্বের দ্বারা যারা সম্ভাবিত হয়েছেন তাদের মধ্যে তোমরা শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠো)। ৬।
এই লোকে (ইহ) পিণ্ডদাতা আমরা (বয়ং) যেন জীবনবস্তু (অর্থাৎ আয়ুষ্মন্ত) হই (স্মঃ)। আমাদের অনুসরণকারী (সমানবয়স্ক, সমবয়সী, সমানবংশসম্পন্ন, সমান বিদ্যাশালী ও সমানধনশালী) যাঁরা, আমরা যেন তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠি (তেম শ্রেষ্ঠা ভূয়াস্ম)। ৭।
হে দ্যোতমান (দেব) অগ্নি? তুমি দীপ্তিমন্ত (দ্যুমন্তং), জরারহিত (অজরং)। তোমাকে আমি সমিধের দ্বারা উদ্দীপিত করছি (ত্বা আ ইধীমহি)। তোমার স্তুতিরূপ প্রশংসনীয় দীপ্তি (পনীয়সী) অন্তরিক্ষে সম্যক্ প্রকাশিত হচ্ছে (সমিৎ)। হে অগ্নি! তুমি সমিদ্ধমান হয়ে (সমিধা) স্তুতিকারী আমাদের নিমিত্ত (স্তোতৃভ্যঃ) অন্ন বা ইষ্টফল (ইষং-ইষ্যমা) আহরণ পূর্বক প্রদান করো (আ ভর) ॥ ৮
অন্তরীক্ষজাত উদকময় মণ্ডলের মধ্যে (অসু অন্তঃ) (অথবা অন্তরিক্ষনামক জলে) বর্তমান শোভনপতন (সুপর্ণঃ) অথবা সুপর্ণ নামক রশ্মি সহ (অর্থাৎ সুষুম্না নামক সূর্যরশ্মির সাথে যুক্ত) সকল জগতের (অথবা দাসীরূপা তারাগণের আহ্বাদকারী চন্দ্রমা দ্যুলোকে শীঘ্র ধাবিত হয়ে চলেছেন (দিবি আ ধাবতে)। সেই হেন চন্দ্রমাসম্বন্ধিনী সুবর্ণসদৃশপর্যন্তা বা হিতরমণীয়প্রাপ্তা নেমিগুলি অর্থাৎ কূপের উপরিস্থ পট্টসমূহ (হিরণ্যনেময়ঃ), হে বিদ্যোতমানা রশ্মিসমুদায় (বিদ্যুতঃ)! তোমাদের পাদস্থানীয় অগ্রাংশ (বঃ পদং) (কুপের তারা আবৃত থাকার কারণে) আমার ইন্দ্রিয়সমূহের গোচরীভূত হচ্ছে না (ন বিন্দন্তি); (অতএব এটি অনুচিত; সেই কারণে আমাকে কূপ হতে উদ্ধার করো, এটাই বক্তব্য)। অপিচ, হে দ্যাবাপৃথিভী (রোদসী)! তোমরা আমার এই স্তোত্র জ্ঞাত হও (মে ২ অস্য বিত্তং)। (অথবা মে অর্থাৎ মদীয় কূপপতনরূপ এই দুঃখ অবগত হও। অর্থাৎ আমার স্তোত্র শ্রবণ পূর্বক, আমাকে কুপ হতে উদ্ধার করো–এই-ই বক্তব্য ॥ ৯ ৷৷
টীকা –উপযুক্ত সূক্তের প্রথম আটটি যজুর্মন্ত্রে বহিতে পিণ্ড প্রদানের পর পিতৃগণের উদ্দেশে নমস্কার, জ্ঞাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও সমিধ সংগ্রহ ইত্যাদি এবং সমিধপ্রাপ্ত অগ্নির স্তুতি ইত্যাদি কর্মেও এই মন্ত্রগুলির সূত্রানুসারে বিনিয়োগ নির্ধারিত আছে। শেষোক্ত (নবম) মন্ত্রটি বরুণদেবতার উদ্দেশে মহাশান্তির নিমিত্ত নক্ষত্ৰকল্প (১৮) অনুযায়ী আবপনীয়।–এই মন্ত্রটির ব্যাখ্যায় প্রথমেই শাট্যায়ন নামক জনৈক ঋষি কথিত একটি ইতিহাস-কথার উল্লেখ করা হয়েছে।–পুরাকালে একত, দ্বিত এবং ত্রিত নামক তিন বান্ধব-ঋষি কোন মরুস্থলীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে গমনকালে পিপাসার্ত হয়ে একটি কূপ দর্শন করেন। প্রথম জন ত্রিত জলপানের উদ্দেশ্যে সেই কূপে অবতরণ পূর্বক জল পান করে তৃপ্ত হয়ে অপর দুজনের জন্য জল উত্তোলন করে দেন। একত ও দ্বিত নামক ঋষিদ্বয় সেই জল পান করে তৃপ্ত হয়ে দুর্বুদ্ধিবশতঃ ত্রিতকে সেই কূপ থেকে উদ্ধার না করে বরং তার ধনসামগ্রী অপহরণ পূর্বক তাকে সেই কূপের মধ্যেই ত্যাগ করে সেই কূপের মুখটি একটি রথের চক্রের দ্বারা আবৃত করে গমন করেন। অতঃপর কূপে পতিতাবস্থায় সেই ত্রিত কূপ থেকে নির্গত হতে অসমর্থ হয়ে মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকেন–সর্বে দেবা মাং উদ্ধরন্তু, অর্থাৎ সকল দেবতা আমাকে উদ্ধার করুন। অতঃপর রাত্রিকালে কূপের উপরিস্থ প্রান্তভাগে ক্ষীণ চন্দ্ররশ্মি, দর্শন করে উপযুক্ত (নবম) ঋটির দ্বারা বিলাপ (পরিদেবন) করতে থাকেন।-(আমরা মনে করি, এই কাহিনীটি রূপক এবং কিছু কিছু ত্রুটিযুক্ত। শাট্যায়ন ঋষির মূল বক্তব্য আমরা পাঠ করিনি। কিন্তু বর্তমান ব্যাখ্যাকার মরুভূমৌ অরণ্যে অর্থাৎ মরুভূমির অরণ্যে কথাটি উল্লেখ করেছেন। মরুস্থলীতে অরণ্য থাকা সম্ভব হয় না। মরূদ্যানে গাছপালা থাকতে পারে, কিন্তু তাকে অরণ্য বলা যায় না। তারপর কূপং রথচক্রেণ পিধায় ইত্যাদি। এখন, ঐ অরণ্যে রথচক্র কোথা থেকে পাওয়া গেল? আসলে মূল মন্ত্রের হিরণ্যনেময়ঃ শব্দাটি থেকে নেমি অংশের ধারণায় রথচক্রের নেমি-র অবতারণা। কিন্তু নেমি শব্দটির অর্থ কেবল চক্ৰপরিধি বা চক্রের প্রান্ত-ই নয়, নেমি অর্থে কূপের উপরিস্থ পট্ট বা প্রান্তভাগ-ও বোঝায়। সেই হিসেবে আলোচ্য বঙ্গানুবাদে রথচক্র কথাটি অবান্তর। সেই জন্যই আমরা ব্যাখ্যাকারের ব্যাখ্যা অনুসারে কূপের মুখটি রথের চক্রের দ্বারা আবৃত করার কথা বলেও কূপের উপরিস্থ প্রান্তভাগে ক্ষীণ চন্দ্র রশ্মি দর্শন ইত্যাদি উল্লেখ করেছি।যাই হোক, এই কাহিনীর রূপকত্ব থাকলেও এটি একটি বিশেষ উপাখ্যানরূপে এখানে গৃহীত হওয়ার যোগ্য; তাতে কোন সংশয় নেই) ॥ (১৮কা. ৪অ. ৯সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –নিম্নগামিনী নদীগুলি (নদ্যঃ) সম্যক্ প্রবাহিত হোক, বাতাসও আমাদের আনুকূল্যে বহমান হোক, পক্ষী ইত্যাদি সকলেও (পতত্ৰিণঃ) আমাদের আনুকূল্যে উড্ডীয়মান হোক (সংসং স্রবন্তু)। (অর্থাৎ আমাদের অভীষ্ট প্রদানশীল হোক)। হে স্থূয়মানগণ অর্থাৎ দেবতাসকল (গিরঃ)! যে হবিঃপ্রদ যজমানের দ্বারা.এই পুণ্য ইত্যাদি শান্তিকর্ম অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেই ফলস্বামী যজমানকে পশু পুত্র ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধ করো- এই ক্ষরণশীল আজ্য ইত্যাদির সাথে সংস্রবযুক্ত হবিঃ দেবতাগণের উদ্দেশে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করছি (জুহোমি)। ১।
হে আহুতিসমূহ (হোমাঃ)! তোমরা প্রবর্তমান আহুতিসমুদায়াত্মক কর্মের (ইমং যজ্ঞং) রক্ষণ করো (অবত)। এবং হে ক্ষরণশীলগণ (সংস্রবণাঃ) অর্থাৎ আজ্য দুগ্ধ প্রভৃতিবৃন্দ! তোমরা এই যজ্ঞের রক্ষণ করো। অথবা হে হোতব্য দেবতাগণ। (হোমাঃ)! তোমরা ফলকামী যজমানকে রক্ষা করো। এঁকে পশু পুত্র ইত্যাদির দ্বারা সমৃদ্ধ করো। আমি এই ক্ষরণশীল আজ্য ইত্যাদির সাথে সংস্রবযুক্ত হবিঃ দেবতাগণের উদ্দেশে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করছি ॥ ২॥
হে দেবগণ! আমি এই ফলকামী যজমানের নিমিত্ত পশু পুত্র ইত্যাদি সমস্ত অভিলষিত ফল সংগৃহীত করছি এবং এই কর্ম-প্রযোজয়িতা যজমানকে সেই পশু পুত্র ইত্যাদি ফলের দ্বারা সম্বন্ধিত করছি–এই কথা প্রযোক্তা বলেন। প্রকৃষ্ট প্রাচী ইত্যাদি মহা দিকস্থ জনগণ (চতঃ প্রদিশঃ) এই যজমানকে (ইমং যজ্ঞং) বর্ধিত করুন। আমি এই ক্ষরণশীল আজ্য ইত্যাদির সাথে সংস্রবযুক্ত হবিঃ দেবতাগণের উদ্দেশে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করছি ৷ ৩৷৷
টীকা— ঊনবিংশ কাণ্ডের উপযুক্ত প্রথম সূক্তটি সর্বপুষ্টিকর্মে মৈশ্ৰধান্যচরুপ্রাশনে ও দধিমধুমিত্র- এ সক্মন্থপ্রাশনে বিনিযুক্ত হয়। লক্ষ্মীকরণে অর্থাৎ সৌভাগ্য প্রাপ্তির নিমিত্ত কর্মেও এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়।
[ঊনবিংশ কাণ্ড মহাশান্তিসাধারণভূত কমেও নদী, হ্রদ ইত্যাদি থেকে সমাহৃত জল এই মন্ত্ৰত্রয়ের দ্বারা অভিমন্ত্রিত করণীয়। কৌশিক সূত্রে ও নক্ষত্রকল্পে এই বিনিয়োগগুলি উল্লিখিত আছে। (১৯কা, ১অ. ১সূ.)]
বঙ্গানুবাদ –[শান্তিকর্মকর্তা ঋত্বিক কর্তৃক প্রযোজয়িতা ফলকামী যজমানকে সম্বোধন ]-হে যজমান! হিমালয় পর্বত (হৈমবতীঃ) হতে আগত জলসমূহ তোমার সুখকারী হোক (শং); তথা প্রস্রবণ (উৎস্য) হতে সদা প্রবাহিত (সনিষদাঃ) জলরাশিও তোমার কল্যাণকরী হোক (শং)। অধিকন্তু (উ) বর্ষায় (বৰ্য্যা) উৎপন্ন জলরাশিও তোমার পক্ষে মঙ্গলময় হোক (তে শংসন্তু)। ১।
মরুদেশে স্থিত (ধন্বনা) জলরাশি তোমার কল্যাণকারী হোক (তে শং সন্তু); জলসমৃদ্ধ দেশে (অনূপ্যা) অর্থাৎ যে দেশে জল অনুগত, সেই স্থানস্থায়ী) জলরাশি (আপঃ) তোমার সুখকারী হোক (তে শং সন্তু), খননের দ্বারা নির্বর্তিত অর্থাৎ নিষ্পদিত (খনিত্রিমা) কূপ তড়াগ ইত্যাদির জলরাশি তোমার পক্ষে মঙ্গলপ্রদ হোক (তে শং ভবন্তু) এবং কুম্ভে আহৃত জলরাশিও (কুম্ভেভিঃ আভৃতাঃ যা) তোমার সুখকর হোক (শং ভবন্তু) ॥ ২॥
খননসাধন কোদাল ইত্যাদি (অনভ্ৰয়ঃ) ব্যতিরেকে, কাষ্ঠ-হস্ত-পদ ইত্যাদি খননশীল (খনমানা) সামগ্রীর দ্বারাও যা অসাধ্য বা দুঃসাধ্য, সেই উভয় তটের বিদারণকারী জলরাশিকে মন্ত্রবলে সাধিত করেন ঋত্বিকবৃন্দ (বিপ্রাঃ)। এই জলরাশি মহাহ্রদ ইত্যাদির অগাধ স্থানে ব্যাপ্ত। এই হেন ব্যাপনশীল জলরাশি লৌকিক বৈদ্য (ভিষভ্যঃ) অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ (বৈদ্য) (ভিষতরা)। এমন অত্যন্ত হিতকারিণীরূপা জলরাশিকে আমরা স্তুতি করছি ৷৷ ৩ ॥
[ এই মন্ত্রটি ঋত্বিকগণ, পরস্পর বলছেন, অথবা যজমান ঋত্বিকগণকে বলছেন]–দ্যুলোকে উৎপদ্যমান (দিব্যানাং) জলরাশি ও প্রবাহে উৎপদ্যমান (স্রোতস্যানাং) জলরাশি, এই উভয় ব্যতিরিক্ত জলরাশির শোধন বিষয়ে (প্রণেজনে) অশ্বের ন্যায় (অশ্বা) বেগবন্ত (বাজিনঃ) হও (ভবথ)। (অথবা আমার নিমিত্ত ব্যাপ্রিয়মান তোমরা শান্তু্যদকর্মে ত্বরান্বিত হও) ৪
[এই মন্ত্রটিও প্রযোজকের বাক্য ]-যে জলরাশি কল্যাণকারিণী (আপঃ শিবা), যে জলরাশি অরোগকারিণী (অযক্ষ্মঙ্করণীঃ য। অপঃ), সেই (তা) ভেষজরূপে হিতকরিণী (ভেষজীঃ) জলরাশি তোমরা আনয়ন করো (আ দত্ত)। (জলরাশি অনয়নের ফল কি? না) সুখ (ময়) যে প্রকারে (যথৈব) অধিক (তৃপ্তং) হয়; (অর্থাৎ অধিক সুখলাভের নিমিত্ত শান্তুদক আনয়ন করো–এটাই বক্তব্য) ॥ ৫॥
টীকা –উপযুক্ত সূক্তের মন্ত্রগুলির দ্বারা তন্ত্রভূত মহাশান্তি কর্মে নদী ইত্যাদি হতে সমাহৃত জল অভিমন্ত্রিত করণীয়। নক্ষত্রকল্পে (২০) এই সম্পর্কে বলা হয়েছে-নদী কিংবা হ্রদ কিংবা অপর কোন পুণ্যস্থান হতে সম্যক প্রবহমান জল ঋত্বিকগণ কর্তৃক অভিমন্ত্রিত করণীয়।–হিমালয় পর্বত হতে নিম্নে প্রবাহিত জলরাশিও শাস্ত্যদক কর্মে গৃহীতব্য ॥ (১৯কা, ১ম, ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ— হে জাতবেদা (অগ্নি)! আমাদের দ্বারা স্তুত হয়ে (স্তুতঃ) তুমি যথায় যথায় অবস্থান করে বিশিষ্ট পূর্ণতাশালী হয়েছে (যতযত্র বিস্তৃতঃ) সেই সেই স্থান হতেই আমাদের প্রসন্নতার নিমিত্ত (জুষমাণে) আগমন করো। আকাশ (দিবঃ), পৃথিবী ও মধ্যমলোক হতে (অন্তরিক্ষাৎ), পুষ্পরহিত ফল দানকারী বৃক্ষ (বনস্পতি) এবং ফলপাকান্ত বৃক্ষ-লতা (ওষধিভ্যঃ) ইত্যাদি হতে (উৎপন্ন হয়ে) তুমি আমাদের নিকট আগমন করো। ১।
হে অগ্নি! তোমার যে মহিমা জলে (বড়বাগ্নি রূপে) বিদ্যমান (যস্তে অঙ্গু মহিমা), বনে (দাবাগ্নি রূপে) (যে মহিমা বিদ্যমান) (যো বনেষু), ওষধীতে (ফলপাকনিমিত্তভূত) (যে মহিমা বিদ্যমান) (যঃ ওষধীষু), সর্বপ্রাণীতে (বৈশ্বানররূপে) (যশ্চ পশু-পশুপলক্ষিত) (যে মহিমা বিদ্যমান), অন্তরিক্ষের জলে (অল্প অন্তঃ) (বিদ্যুঞ্জপে অর্থাৎ বৈদ্যুতাত্মনা) (যে মহিমা বিদ্যমান), সেই সকল তনু (সর্বা তন্বঃ) সঙ্কলিত করো (সং রভস্ব) (অর্থাৎ ) বিভক্ত তনুগুলি একত্র করো)। (কি জন্য একত্র করো? না–) সেই সকল তনুগুলির সাথে আমাদের (নঃ) অজস্র অর্থাৎ অনবরত ধনদাতারূপে (দ্রবিণোদা) আগমন করো (এহি আ)। ২।
হে অগ্নি! তোমার স্বর্গ-গমন রূপ যে মহিমা দেবতাগণের মধ্যে বিদ্যমান আছে (যস্তে দেবেষু মহিমা স্বর্গঃ) (অর্থাৎ যজমান কর্তৃক দত্ত হবিঃ স্বর্গলোকে বহন পূর্বক দেবতাগণকে প্রদানের যে তনু আছে), যে তনুর দ্বারা তুমি পিতৃগণে বা পিতৃলোকে প্রবিষ্ট হয়েছে (যা তে তনুঃ পিতৃষ্ণু আবিবেশ) (অর্থাৎ স্বধাকারে প্রদত্ত কব্য নামক হবিঃ সহ তুমি তোমার যে তনুর দ্বারা পিতৃগণের নিকট সঞ্চারিত হয়ে থাকো), তোমার যে পোষণকর্ম মনুষ্যে বর্তমান থেকে (পুষ্টির্যা তে) (অর্থাৎ মনুষ্যোপলক্ষিত সকল চরাচরাত্মক প্রাণীতে) ভক্ষণ, পান ইত্যাদির সাধন হয়ে থাকে (পপ্রথে), সেই সকল তনুর সাথে আগমন পূর্বক আমাদের ধন প্রদান করো (অস্মাসু রয়িং ধেহি) ৷ ৩৷৷
হে অগ্নি! তুমি আমাদের স্তুতিশ্রবণে সমর্থ কর্ণশালী (শুল্কৰ্ণায়), ক্রান্তদর্শী (কবয়ে) (অর্থাৎ অতীন্দ্রিয়ার্থদর্শী), সকলের জ্ঞাতা (বেদ্যায়) বা বেদাহ্ (জ্ঞানযোগ্য), এই হেন গুণাবশিষ্ট তোমার নিকট অভিলষিত ফলদানের জন্য (রাতিং) মন্ত্ররূপ বাক্যের দ্বারা (বচোভিঃ) যাজ্ঞা করছি (উপযামি)। (অভিলষিত ফল কি?) আমাদের যত কিছু ভয় আছে (যতঃ ভয়ম), তা হতে আমাদের ভয়রাহিত্য করো (অভয়ং নঃ অস্তু)। (অথবা আমাদের যত ভয় আছে, সেই সকল ভয়ের কারণসমূহকে দূর করো)। তুমি আমাদের প্রতি ক্রোধ-করণশীল দেবতাগণকে (দেবানাং হেড়ঃ) তিরস্কার করো (অব যজ); (অর্থাৎ আমাদের প্রতি যারা ক্রোধী, তাদের ক্রোধ নিবারণ করো– এটাই বক্তব্য)। ৪
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি এবং পরবর্তী ৪র্থ সূক্তটি মেধাজনন কর্মে বিনিয়োগ হয়। এই দুই সূক্তমন্ত্রের দ্বারা মেধাকামী জন নিদ্রা হতে উত্থিত হয়ে হস্তের দ্বারা মুখ প্রক্ষালন করে থাকেন। এই মন্ত্রগুলির দ্বারা দধি ও মধু অভিমন্ত্রিত পূর্বক ভক্ষণ করলে তেজঃসম্পন্ন হওয়া যায়। এটি ক্ষত্রিয়গণের পক্ষে বিশেষ প্রযোজ্য। তেজস্কামী বৈদ্য, শূদ্র ইত্যাদি জন কেবল অন্নমিশ্রিত দধি ও মধু এই মন্ত্রের দ্বারা অভিমন্ত্রিত পূর্বক ভক্ষণ করলে তেজঃলাভ করবেন।…এই সবই কৌশিক সূত্রে বিস্তৃতভাবে উল্লেখিত আছে।- ইত্যাদি৷ (১৯কা. ১অ. ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –(অগ্নির তিনটি ত–দেবতারূপ, হবিঃপ্রাপকদূতরূপ ও হবিঃপ্রক্ষেপা ধারাঙ্গরূপ)।–হে অগ্নি! সর্ব সৃষ্টির প্রাক্কালে (প্রথমাং) অথবৰ্শব্দবাচ্য, পরমাত্মা (অথবা) আপন সৃষ্টি দেবতাগণের প্রীতিসাধনের নিমিত্ত যে আহুতি প্রদান করেছিলেন (যাং আহুতিং অকৃপণাৎ), জাতমাত্রেরই জ্ঞাতা (জাতবেদাঃ) অগ্নি সেই আহুতি (যাং) দেবতাগণের নিকট যথাভাগে প্রদান করে দিয়েছিলেন; সকল যজমানের পূর্বভাবীরূপী আমি (তা এতাং প্রথমঃ) সেই আহুতিকে তোমার আস্যে (মুখমধ্যে) উৎসর্জন করছি (জোহবীমি)। তুমি তোমার সেই তিনটি তনুসহ স্তোতৃগণের দ্বারা স্তুত হয়ে দেবগণের পরিগ্রহণীয় হবিঃ দেবগণের নিকট বহন করে তাদের প্রাপ্ত করাও (তাভিঃ স্তুতঃ হব্যং বহতু)। অগ্নিশব্দের দ্বারা প্রতিপাদ্য অগ্নিত্ৰয়েব (অগ্নয়ে) উদ্দেশে এই হবিঃ সুহুত হোক (অর্থাৎ স্বাহা মন্ত্রে নিবেদিত হোক)। ১।
[এইটি এবং এর পরবর্তী ঋকটিতে বাক্-দেবী সরস্বতীর নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হচ্ছে]।-তাৎপৰ্যরূপা (আকুতিং) (অর্থাৎ লৌকিক-বৈদিক সর্ব বাক্য প্রতিপাদ্যা), দ্যোতমানা (দেবীং), শোভন ভাগ্যযুক্তা বাক্-দেবতাকে পূর্বে পরিচর্যা করছি (পুরো দধে); (অর্থাৎ সর্বাভীষ্ট-কর্মে প্রথমেই দেবী সরস্বতীর অনুধ্যান করছি). (অনর্থনিবারণের নিমিত্ত লোকে যেমন আপ্ত জনের আশ্রয় গ্রহণ করে, অর্থাৎ পুত্র যথা মাতৃবশে অবস্থান করে) আমরাও তেমনই আমাদের মনের নিয়ময়ন্তী (চিত্তস্য মাতা) বাক্-দেবীকে সুষ্ঠুভাবে আহ্বান করছি (সুহবা নো অস্তু); (অর্থাৎ আমাদের আহ্বানের দ্বারা তিনি আমাদের অনুকূলা হোন)। অধিকন্তু ফল বিষয়ে আমি যে কামনা প্রাপ্ত করছি (যাং আশাং এমি) আমার (মে) সেই কামনা আসাধারণী হোক (সা কেবলী অস্তু); (শুধু অসাধারণীই নয়, কিন্তু আমি ব্যতীত অপরে কেউ যেন কামনা করতে না পারে–এটাই বক্তব্য)। আমার মনে সর্বদা নিহিত ফলবিষয়ক কামনা যেন ফলপৰ্যবসায়িনী হয় (বিদেয় এনাম্ মনসি প্রবিষ্টা)। ২।
হে বৃহস্পতি (বৃহতাং অর্থাৎ দেবগণের হিতোপদেষ্টুত্বের দ্বারা পিতা বা পালকরূপে অভিহিত দেবতা)! সর্ববাক্যের তাৎপৰ্যরূপা বাক্য সহ (আকুভ্যা) বাক-দেবতাকে আমাদের অনুকূলান্বিতা করার নিমিত্ত আগমন করুন (ন উপাগহি)। অধিকন্তু (অথো) আমাদের সৌভাগ্য (নঃ ভগস্য) প্রদান পূর্বক সুষ্ঠু আহ্বানমাত্র আমাদের অনুকূল হও (সুহবঃ হ্রাতব্য ভব) ৷ ৩৷
[ সরস্বতীকে, প্রাপ্তির নিমিত্ত বৃহস্পতির নিকট প্রার্থনা]–অঙ্গিরস ঋষির পুত্র বৃহস্পতিদেব। (আঙ্গিরসঃ বৃহস্পতি) সকল অভিপ্রায় স্বরূপ (আকূতিং) (সকল শ্রুতি-পুরাণ ইত্যাদি প্রসিদ্ধ) এই বাক্যকে (এং বাচঃ) (অর্থাৎ প্রসিদ্ধ বাণীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতাঁকে) আমাদের প্রাপ্ত করানোর নিমিত্ত স্মরণ করুন (মে প্রতি জানাতু)। স্ত্রী-পুরুষাত্মক সকল দেবতা (দেবাঃ দেবতাশ্চ) ঐকমত প্রাপ্ত হয়ে (সম্বভূবুঃ) যে বৃহস্পতির বশে অবস্থান করেন (যস্য সুপ্রণীতাঃ), সেই কাম্যমান- ফলপ্রদাতা বৃহস্পতি (সঃ কামঃ) কাময়মান আমাদের (অ) অভিমুখে আগমন করুন (অনু এতু)। ৪
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –যামাহুতিং ইতি সূক্তস্য মেধাজননকর্মণি বৰ্চস্যকর্মণি ৮ বিনিয়োগঃ পূর্বসূক্তেন সহ উক্তঃ ৷৷ (১৯কা, ১অ, ৪সূ.)৷৷
টীকা –মেধাজনন-কর্মে (অর্থাল বুদ্ধিবৃত্তি বা স্মৃতিশক্তি লাভের নিমিত্ত যাগক্রিয়ায়) এবং বচস্য-কর্মে (অর্থাৎ তেজ বা কান্তি লাভের নিমিত্ত যাগক্রিয়ায়) পূর্ব সূক্তের ন্যায় বিনিয়োগ হয়ে থাকে৷ (১৯কা, ১অ. ৪সূ)
বঙ্গানুবাদ— ত্রিলোকে বাসকারী মনুষ্য ও দেবতা-সম্বন্ধীয় প্রজাগণের প্রভু (জগতঃ চর্ষণীনামধি রাজা) পরমৈশ্বর্যসম্পন্ন দেব (ইন্দ্র) হবিঃ-দানকারী জনগণকে (দাশুষে) তত কিছুই ধন প্রদান করুন, পৃথিবীতে যত কিছু ধন আছে। সেই দেব (ইন্দ্র) আমাদের দ্বারা স্তুত হয়ে তিনি আমাদের অভিষ্টুত ধন (উপস্তুত) আমাদের অভিমুখে প্রেরণ করুন (অর্বাক্ রাধঃ চোদ্দৎ) ॥১॥
টীকা— পূর্ববর্তী সূক্তে যেমন বুদ্ধিবৃত্তি বা স্মৃতিশক্তি লাভের নিমিত্ত কিংবা তেজঃ বা কান্তি লাভের নিমিত্ত বিনিয়োগ নির্ধারিত আছে, উপযুক্ত একমাত্র ঋক্-সম্বলিত সূক্তটি তেমনই ধনাকাঙ্ক্ষী যজমানের দ্বারা ইন্দ্রের উদ্দেশে যজ্ঞক্রিয়ায় বা উপাসনায় বিনিযুক্ত হয়। (১৯কা, ১অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –অনন্ত ভুজশালী (সহস্রবাহুঃ), অনন্ত অক্ষিশালী (সহস্রাক্ষঃ) ও অনন্ত পাদশালী (সহস্রপাৎ) যে পুরুষ যজ্ঞানুষ্ঠাতা নারায়ণ নামে আখ্যাত, তিনি আপন মহিমায় সপ্ত সিন্ধু ও দ্বীপ সমন্বিতা পৃথিবীকে (ভূমিং) সর্বতোভাবে ব্যাপ্ত করে (বিশ্বতঃ বৃত্ব) দশাঙ্গুলি পরিমিত স্থান (হৃদয়াকাশ) অতিক্রম পূর্বক অবস্থান করছেন (অত্যতিষ্ঠৎ)। (অর্থাৎ পূর্বে হৃদয়াকাশে পরিচ্ছিন্ন স্বরূপে অবস্থিত থেকে, পরে স্বানুষ্ঠিত ক্রতু সামর্থ্যে সেই পরিচ্ছিন্নাকারতা পরিত্যাগ পূর্বক সর্বাতিশায়ি-স্বরূপে অবস্থিত রয়েছেন–এটাই বক্তব্য) ॥১॥
সেই যজ্ঞানুষ্ঠাতা নারায়ণ-পুরুষ আপন তিন পদে বা পাদবিক্ষেপে (ত্রিভিঃ পদ্ভিঃ) স্বর্গলোকে আরোহণ করেছেন (দ্যাং আরোহৎ); তার চতুর্থ পাদ বা পদবিক্ষেপ (পাদঃ) এই ভূমণ্ডলে পুনঃ পুনঃ প্রকটমান হচ্ছে (পুনরাভবৎ)। এই পাদে ভোজনজীবী সকল মনুষ্য ও পক্ষী ইত্যাদি তির্যক প্রাণী (অশনা) এবং দেব-বৃক্ষ ইত্যাদি (অনশনা) সর্বতো ব্যাপ্ত বা বিক্ৰান্তবান হয়ে রয়েছে (বিম্ব ব্যক্ৰামৎ)। ২।
(সম্পূর্ণ বিশ্বই (অর্থাৎ দেব-তির্যক-মনুষ্যাত্মক যত কিছু জগৎ আছে, তা সকলই) সেই যজ্ঞানুষ্ঠাতা পুরুষের মহিমা অর্থাৎ স্বকীয় সামর্থবিশেষ)) এই মহিমা (তাবন্তো মহিমান) হতেও সেই (মহিমাধার) পুরুষ প্রবৃদ্ধ (জ্যায়া)। এঁর চতুর্থ পাদ (অস্য) স্থাবর-জঙ্গমাত্মক সকল ভুবনে (বিশ্বা ভূতানি) ব্যাপ্ত। এঁর চতুর্থ পাদ (অস্য) স্থাবর-জঙ্গমাত্মক সকল ভুবনে (বিশ্বা ভূতানি) ব্যাপ্ত। এঁর তিনটি পদ (অস্য ত্রিপাৎ) অমরণধর্মক হয়ে (অমৃতং) স্বর্গলোকে (দিবি অর্থাৎ দুলোকে) স্থিত হয়ে আছে ॥ ৩॥
বিগত (অতীত বা ভূত), ভবিষ্যৎ (ভাব্যং) ও বর্তমান সঙ্গত প্রত্যক্ষের দ্বারা দৃশ্যমান বা ব্যক্ত স্থাবর জঙ্গমাত্মক জগৎ–এই সব কিছুই সেই পুরুষের রূপ। এই পুরুষ দেবতাগণেরও (অমৃতত্বস্য) স্বামী (ঈশ্বরঃ)। যত কিছু জীব অন্নরস ইত্যাদি ভোগের দ্বারা জীবিত থাকে, ইনি তাদেরও ঈশ্বর। (অর্থাৎ ইনি অযোনিজ দেবগণের ও মর্তবাসী জীবনগণের ঈশ্বর)। ৪
[এই মন্ত্রে ব্রাহ্মণ ইত্যাদির সৃষ্টি বিষয়ে ব্রহ্মবাদীগণের প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। তাদের প্রশ্ন–সাধ্য নামক দেবগণ ও বসুগণ ] যখন সেই পুরুষকে অর্থাৎ যজ্ঞপুরুষকে বিশেষভাবে বিস্তারিত করেছিলেন (বি অধুঃ) তখন সেই পুরুষকে কত প্রকারে (কতিধা) বিবিধ কল্পনা করা হয়েছিল (ব্যকল্পয়ন) (অর্থাৎ ভাগ করা হয়েছিল)? (এটি সামান্যরূপ প্রশ্ন। এরপর বিশেষ প্রশ্নাবলী)–এই যজ্ঞাত্মন পুরুষের মুখ। ছিল কোন বস্তু (কিমস্য মুখং)? বাহু ছিল কোন্ বস্তু? কোন বস্তু ঊরু, এবং কোন্ বস্তু তাঁর পাদ বলে কথিত (কিম্ ঊরু পাদা উচ্যেতে) ॥ ৫৷৷
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি ও পরবর্তী সূক্তটি মূলতঃ একটি সূক্তেরই দুটি অংশ। দুটিই জগদ্বীজঃ পুরুষ নামে অভিহিত। এই সূক্তদ্বয় পুরুষমেধ যজ্ঞে পুরুষপশু-অনুমন্ত্রণে বিনিযুক্ত হয়। (বৈতান সূত্রে, ৭২, এগুলির নির্দেশ পাওয়া যায়। শনৈশ্চর গ্রহদেবতার আজ্যহোমে ও সমিদাধান-উপস্থানে এই দুটি সূক্তের বিনিয়োগ শান্তিকল্পে সূত্রিত, ১৫)। সুবর্ণ ও ভূমিদানেও এই সূক্ত দুটি আজ্যহোমে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। (পরিশিষ্ট ১০/১)। সর্বাতিশায়িত্ব ও সর্বভূতাত্মকত্ব কামনায় নারায়ণ নামে আখ্যাত পুরুষের দ্বারা অনুষ্ঠিত এই ক্রতুর প্রতিপাদকত্বের কারণে বা জগকারণ আদি নারায়ণ পুরুষের প্রাতিপাদকত্বের কারণে এই দুটি সূক্তই পুরুষসূক্ত (জগদ্বীজঃ পুরুষ) নামে কথিত। একই সূক্তের এই দুটি ভাগেরই দুরকম অর্থ আছে। এক, আধিযজ্ঞিক; অপর, আধ্যাত্মিক। পুরুষমেধ-বিধায়ক বাজসনেয়কব্রাহ্মণে (শুক্লযজুর্বেদে) এই রকমই আখ্যাত আছে। শতপথ ব্রাহ্মণে (১৩।৬।১১) অর্থাৎ যজুর্বেদের অংশবিশেষেও আধিযজ্ঞিকের সাথে আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণও পাওয়া যায়। আমাদের প্রকাশিত শুক্ল যজুর্বেদের মধ্যে উভয় অর্থ প্রদত্ত থাকলেও, এই স্থানে সায়ণাচার্য কৃত আধিযজ্ঞিক ব্যাখ্যাই অনুদিত হয়েছে৷৷ (১৯কা, ১অ. ৬সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –[পূর্ব সূক্তের শেষ মন্ত্রে কতিধা ব্যকল্পয়ন অর্থাৎ কত রকমে ভাগ করা হয়েছিল–এই সামান্য প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী মন্ত্রগুলিতে প্রদত্ত হয়েছে। এই প্রথম মন্ত্রে মুখ ইত্যাদি বিশেষ প্রশ্নে উত্তর দেওয়া হচ্ছে ]। এই যজ্ঞাত্মন পুরুষের মুখ ছিল ব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণো অস্য মুখং আসীৎ), (অর্থাৎ ব্রাহ্মণজাতি বিশিষ্ট পুরুষ এই যজ্ঞাত্মন পুরুষের মুখ বা মুখমণ্ডল হতে উৎপন্ন হয়েছিল); এই যজ্ঞাত্মন পুরুষের বাহু দুটি ছিল রাজন্য বা ক্ষত্রিয় (বাহু রাজন্য অভবৎ), (অর্থাৎ এই যজ্ঞাত্মন পুরুষের ভুজদ্বয় হতে ক্ষত্রিয়-জাতি-বিশিষ্ট পুরুষ উৎপন্ন হয়েছিল); এই যজ্ঞাত্মন পুরুষের মধ্যাঙ্গ অর্থাৎ বক্ষ হতে ঊরুদ্বয় পর্যন্ত ছিল বৈশ্য (মধ্যং তদস্য য বৈশ্যঃ), (অর্থাৎ এই যজ্ঞাত্মন পুরুষের উরুদ্বয় পর্যন্ত হতে বৈশ্য-জাতি-বিশিষ্ট পুরুষ উৎপন্ন হয়েছিল); এই যজ্ঞাত্মন পুরুষের পাদদ্বয় হতে শূদ্ৰজাতি উৎপন্ন হয়েছিল (প্যাং শূদ্রো অজায়ত)। ১।
সেই যজ্ঞাত্মন পুরুষের মন হতে আহ্বদকর চন্দ্র [(চন্দ্ৰং আ) হ্রদং] জাত হয়েছিলেন; চক্ষু দুটি হতে সূর্য জন্মলাভ করেছিলেন (চক্ষোঃ সূর্যঃ অজায়ত)। সেই যজ্ঞাত্মন পুরুষের মুখ বা বাগিন্দ্রিয় হতে (মুখাৎ) ইন্দ্র ও অগ্নির উৎপত্তি হয়েছিল। এবং তার প্রাণ বা ঘ্রাণেন্দ্রিয় হতে (প্রাণাৎ) বায়ু জাত হয়েছিল। ২৷
এই যজ্ঞপুরুষের নাভি হতে অন্তরিক্ষ, শিরোদেশ হতে (শীষ্ণঃ) স্বর্গলোক (দৌঃ বা দ্যুলোক বা আকাশ), এবং চরণ দুটি হতে ভূলোক (পৃথিবী) সম্ভবিত হয়েছিল। (নাভিশিরপাদেভ্যঃ অন্তরিক্ষদ্ভূময়স্ত্ৰয়ো লোকাঃ সমভবন)। সেই যজ্ঞাত্মক পুরুষের শ্রোত্রেন্দ্রিয় হতে প্রাচী ইত্যাদি দশ দিক সৃষ্ট হয়েছে; (অর্থাৎ দিসমূহ শ্রোত্ররূপে কর্ণদ্বয়ে প্রবিষ্ট হয়)। (এই প্রকারে সাধ্য নামক দেবগণ সেই যজ্ঞ পুরুষ হতে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় ইত্যাদি বর্ণ চতুষ্টয় ও অন্তরিক্ষ ইত্যাদি লোকত্রয় সৃষ্টি করেন) ৷ ৩৷৷
(পুর্বে যে পুরুষ হতে ব্রাহ্মণ ইত্যাদির সৃষ্টি কথিত হয়েছে, এইবার তার সৃষ্টি সম্পর্কে কথিত হচ্ছে)।–সৃষ্টির আদিতে (অগ্রে) বিবিধ রাজান্ত বস্তু নিয়ে যাতে সন্নিবিষ্ট ছিল, সেই বিরাট (বিরা) নামক (ব্রহ্মাণ্ডরূপ দেহধারী) পুরুষ সম্ভবিত হয়েছিলেন। (সহস্রবাহুঃ পুরুষঃ ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা উপবর্ণিত আদিপুরুষ বা মহাপুরুষ হতে বিরাট-সংজ্ঞক পুরুষের উৎপত্তি)। সেই বিরাট-পুরুষ হতে অতিরিক্ত পুরুষের উৎপত্তি (অত্যরিচ্যত)। তিনিই যজ্ঞাত্মা-পুরুষ। তিনি জাতমাত্র এই ভূমি ইত্যাদি লোকসমূহে প্রথমে (পুরঃ) ব্যাপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন এবং পরে (পশ্চাৎ) জীবসমূহের দেহ রচনা করেছিলেন। ৪
সাধ্য নামক দেবগণ (দেবাঃ) যখন অশ্বরূপের দ্বারা বা পুরুষরূপ হবির দ্বারা (পুরুষেণ হবিষা) যজ্ঞ করেছিলেন (অতন্বত) তখন বসন্ত (অর্থাৎ রসের উৎপাদক ঋতু) স্বমহিমায় এই যজ্ঞের (অস্য) আজ্য হয়েছিল, গ্রীষ্ম (অর্থাৎ শোষক ঋতু) ই (অর্থাৎ অগ্নিসমিন্ধন-সাধনভূত একবিংশতি দারুময়াত্মক পদার্থ) হয়েছিল; শরৎ (ওষধিসমূহের পক্ককালরূপ ঋতু) যজ্ঞিয় চরু-পুরোডাশ ইত্যাদি হবিরূপ হয়েছিল। (পুরুষরূপ হবিঃ অর্থে অশ্বমেধ যজ্ঞের হবিঃ অথবা মুখ্য পুরুষ এবং পুরুষমেধে পশু) ॥ ৫॥
সৃষ্টি সাধনযোগ্য সাধ্য নামক দেবগণ ও বসুগণ (প্রাণসমূহ ও ইন্দ্রিয়সমূহের দেবগণ) সেই যাগযোগ্য (তং যজ্ঞং) পুরুষকে বা সৃষ্টির আদিতে জাত অশ্বভূত পুরুষকে বর্ষা (প্রাবৃষা) ঋতুর দ্বারা প্রোক্ষণ (প্রৌক্ষন) করেছিলেন। (বর্ষা ঋতুকে সেচনসাধন উদকরূপে সঙ্কল্প করেছিলেন, এটাই বক্তব্য–প্রাবৃটকালং প্রোক্ষণসাধনোদকরূপত্বেন সঙ্কল্পিতবন্ত ইত্যর্থঃ)। ৬।
(এইবার পশুসৃষ্টি বিষয়ে বলা হচ্ছে) সেই যজ্ঞাত্মন পুরুষ হতে অশ্ব জাত হয়েছিল (তস্মাৎ অশ্বাঃ অজায়ন্ত) এবং অব্যতিরিক্ত গর্দভ ও অশ্বতর (যে কে চ) এবং উভদন্তশালী (উভয়াদঃ) অর্থাৎ উধ্ব ও অধোভাগে দন্তপাটী-সমন্বিত প্রাণীগণ উৎপত্তি লাভ করেছিল। সেই যজ্ঞপুরুষ হতে (তস্মাৎ) গাভীগণ প্রাদুর্ভূত হয়েছিল (গাবো হ জজ্ঞিরে) এবং তার হতেই জাত হয়েছিল ছাগ, মেষ ইত্যাদি (তস্মাৎ জাতাঃ অজাবয়ঃ)। ৭।
আশ্বমেধিকের সর্বহুত (অর্থাৎ সর্বাঙ্গই হোমযোগ্য, এমন) অশ্বভূত সেই যজ্ঞ-পুরুষ হতে পাদবদ্ধ মন্ত্ররাশি (ঋচঃ বা ঋ-বেদ) ও গীতিমূলক মন্ত্রাবলী (সামানি বা সামবেদ) প্রাদুর্ভূত হয়েছিল। সেই দেবপুরুষ হতে ঋক ইত্যাদির অধিষ্ঠান স্বরূপ ছন্দসমূহ প্রাদুর্ভূত হয়েছিল এবং তার হতেই (তস্মাৎ) এশ্লিষ্ট-পাঠাত্মক মন্ত্র সমুদয় (যজুর্বেদ) জাত হয়েছিল (অজায়ত! ৮
সেই সর্বহুত (অর্থাৎ আশ্বমেধিকের অশ্বভূত যজ্ঞপুরুষ) হতে সম্পাদিত (সস্তৃতং) যা কিছু দ্রব্যজাত সৃষ্ট হয়েছিল, সেগুলি পৃষদাজ্য নামে অভিহিত হয়। সেই সাধ্য নামক বায়ুদেবগণ (বায়ব্যা) আরণ্য (দ্বিখুর, পদ, পক্ষী, সরীসৃপ, হস্তি, মর্কট ইত্যাদি ও আরও বহুরকমের অরণ্যচরী) পশুগণকে এবং গ্রাম্য (গো, অশ্ব, অজ, অবি, গর্দভ, উষ্ট্র ও আরও বহুরকমের গ্রামোব) পশুদের সমূহরূপে (পশূন তান চক্রে উৎপন্ন করেছিলে। ৯।
সাধ্য দেবগণ যখন অশ্বমেধ বা পুরুষমেধ যজ্ঞ করেছিলেন (তন্বনাঃ), তখন সেই যজ্ঞে পুরুষ পশু অথবা অশ্বভূত মুখ্য পুরুষকে যুপে বদ্ধ করেছিলেন (অব)। সেই সময়ে তারা (অর্থাৎ সাধ্য নামক দেবগণ) যজ্ঞের সপ্তসংখ্যক ছন্দ (গায়ত্রী ইত্যাদি), একবিংশতি সংখ্যক পরিধি (ত্রিঃ সপ্ত পরিধয়ঃ) এবং সমিধ সম্পাদন করেছিলেন ॥ ১০৷৷
[সকল যজ্ঞের সোমসাধ্যত্বের জন্য এই যজ্ঞেও পরম্পরাগত ভাবে সোমের সম্বন্ধ দর্শাবার উদ্দেশে এই শেষ মন্ত্রে সোমের স্তুতি করা হচ্ছে]–সেই যজ্ঞাত্মন বা বিরাট পুরুষ হতে (পুরুষাৎ অধি) নিষ্পন্ন (জাতস্য) সোম রাজার (সোমস্য রাজ্ঞ) একোনপঞ্চাশ সংখ্যক (সপ্ত সপ্ততীঃ–সপ্তগুণিতাঃ সপ্ততয়ঃ) কিরণরাশি (অংশবঃ) নহৎ (বৃহতঃ) দ্যোতনাত্মকের (দেবস্য) (অর্থাৎ সহস্রবাহু পুরুষ ইত্যদির দ্বারা নিরূপিত আদি পুরুষের) মস্তক হতে (মুধুঃ) উদ্ভুত (অজায়ন্ত)। [এই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে–সোম দুরকমের-লতারূপ ও দেবতারূপ (বল্লীরূপো দেবতারূপশ্চেতি)। এর মধ্যে লতারূপ সোমের সংখ্যা প্রকৃতি-বিকৃতি ভেদে নানা (প্রকৃতিবিকৃত্যাদিভেদেন নানাসংখ্যাকা)। ইত্যাদি। দ্যুলোকে কলারূপ সোমের একোনপঞ্চাশ (৪৯) সংখ্যক কিরণ নিষ্পন্ন হয়। পক্ষান্তরে সূর্যের সহস্ৰকিরণ, কিন্তু সোমের চারিশত নব্বই (৪৯০) সংখ্যক (দশোনপঞ্চশতসংখ্যাকা) কিরণ আদিপুরুষের মস্তক হতে উৎপন্ন হয়েছে] ৷ ১১।
বঙ্গানুবাদ –নানা রূপশালী বা বর্ণ-বিশিষ্ট (চিত্রাণি) যে নক্ষত্র সমুদায় দ্যোতমান স্বর্গের সাথে (দিবি সাকং) দীপ্যমান (রোচনানি), যারা অন্তরিক্ষে পুনঃপুনঃ আবর্তমান (ভুবনে সরীসৃপানি জবানি), সেই স্বর্গলোকে (নাক–সুখদুঃখহীন লোকে) অবস্থিত নক্ষত্ররাজির উদ্দেশে (অহানি) স্তুতিরূপ বাক্যের দ্বারা বা মন্ত্ৰকৃত হবির দ্বারা পরিচর্যা করছি (গীর্ভি সপর্যামি)। (কিজন্য? কেননা) আমরা নক্ষত্রগুলির হিংসানিবারণী বা দুঃখনাশিনী অনুগ্রহবুদ্ধির জন্য কাময়মান হয়েছি (তুর্মিশং সুমতিম্ ইচ্ছমানঃ)। (এইভাবে এই মন্ত্রে সকল নক্ষত্রসঙ্রে উদ্দেশে প্রার্থনা প্রজ্ঞাপিত হয়েছে। অতঃপর পরবর্তী চারটি মন্ত্রে কৃত্তিকা ইত্যাদি প্রত্যেক নক্ষত্রের উদ্দেশে প্রার্থনা করা হচ্ছে)। ১।
হে অগ্নি! কৃত্তিকা (অশ্বিনী ইত্যাদি সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের তৃতীয় নক্ষত্র কৃত্তিকার আগ্নেয়ত্বের কারণে অগ্নি সম্বোধন) আমাদের সুষ্ঠু আহ্বানের যোগ্যা হোক (সুহব অস্তু), (অর্থাৎ আপন দোষাংশ পরিত্যাগ পূর্বক আমাদের অনুকূল হোক)। হে প্রজাপতি দেবতা! রোহিণী (সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের চতুর্থ নক্ষত্র রোহিণীর অধিপতি প্রজাপতি দেবতা হওয়ার কারণে প্রজাপতি সম্বোধন) আমাদের সুষ্ঠু আহ্বানের যোগ্যা হোক, (অর্থাৎ আপন দোষাংশ পরিত্যাগ পূর্বক আমাদের অনুকূলা হোক)। হে সোম! মৃগশিরা (মৃগের শিরের ন্যায় প্রতীয়মান পঞ্চম নক্ষত্রের অধিপতি সোম হওয়ার কারণে সোম সম্বোধন) আমাদের মঙ্গলপ্রদা (ভদ্রং) হোক। হে রুদ্র! আড্রা (ষষ্ঠ নক্ষত্র আদ্রার অধিপতি রুদ্র হওয়ার কারণে রুদ্র সম্বোধন) আমাদের সুখকারিণী (শং) হোক। হে অদিতি! পুনর্বসু (সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের সপ্তম নক্ষত্র পুনর্বসুর অধিদেবতা অদিতি) আমাদের প্রিয়সত্যাত্মিকা (সুনৃতা) বা প্রদান করুক। হে পুষ্যা নক্ষত্রের অধিপতি বৃহস্পতি! (সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের সপ্তম) পুষ্যানক্ষত্র আমাদের শ্রেয়ঃপ্রদা (চারু) হোক। হে অশ্লেষা নক্ষত্রের অধিপতি সর্পদেবতা! (নবম নক্ষত্র) অশ্লেষা আমাদের দীপ্তি (ভানুঃ) প্রদায়িকা হোক। হে পিতৃদেবগণ! মঘা (দশম নক্ষত্র মঘার অধিপতি পিতৃদেবগণ : হওয়ায় পিতৃদেবগণের উদ্দেশে সম্বোধন) আমার (মে) গন্তব্য স্থান (অয়নং) হোক ॥ ২॥
হে অর্যমা! পূর্বফনী নক্ষত্র (অশ্বিনী ইত্যাদি সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের অন্তর্গত একাদশ নক্ষত্র) আমাদের পুণ্যস্বরূপা (পুণ্যং) হোক। হে ভগদেব! উত্তরফল্গুনী নক্ষত্র (অশ্বিনী ইত্যাদি সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের দ্বাদশ নক্ষত্র) আমাদের পুণ্যস্বরূপা হোক। হে সবিতা (সাবিত্রঃ)! হস্তা (সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের মধ্যে ত্রয়োদশ নক্ষত্র) আমাদের পুণ্যপ্রদা হোক। হে ইন্দ্র! (সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের মধ্যে অন্যতম) চিত্রানক্ষত্র মঙ্গলকারিণী (শিবা) হোক। হে বায়ুদেব! স্বাতি নক্ষত্র আমার সুখস্বরূপ হোক (সুখো মে অস্তু)। হে ইন্দ্ররূপ অগ্নি! রাধা ও বিশাখাসংজ্ঞক একই নক্ষত্র আমাদের সুষ্ঠু আহ্বানের যোগ্য হোক (সুহবা)। হে মিত্রদেবতা! অনুরাধা (সপ্তদশ নক্ষত্র) সুষ্ঠু আহ্বান আহ্বান-যোগ্যা হোক। ইন্দ্রের জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রও আমার নিমিত্ত কল্যাণকারিণী হোক। অরিষ্টের নিদানভূত পিতৃদেবগণের মূলানক্ষত্র আমার শোভন-নক্ষত্র অর্থাৎ শ্রেয়ঃপ্রদা হোক, (অরিষ্টনিদানং মূলসংজ্ঞকং পিতৃদেবভ্য সনক্ষত্রং শোভননক্ষত্রং মম শ্রেয়ঃপ্রদ ভবতু) ৩
হে জলদেবতা! আপনাদের আধিপত্যাধীনা পূর্বাষাঢ়া (সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের মধ্যে বিংশ নক্ষত্র) আমাকে সুভক্ষ্য অন্ন প্রদান করুক, (পূর্বাষাঢ়াঃ অব্দেবত্যা মে মহ্যং অনংরাসতাং)। হে বিশ্বদেবগণ! উত্তরাষাঢ়া (সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের একবিংশতিতম নক্ষত্র) আমাদের অভিমুখে বলকারক অন্নরস (উর্জং) প্রেরণ করুক (আ বহন্তু)। হে ব্রহ্মদেব! অভিজয়সাধন অভিজিৎ (খগোলকের দক্ষিণ দিকে নিরীক্ষিত নক্ষত্র) আমাকে পুণ্য প্রদান করুক (পুণ্যমেব রাসতাং)। হে বিষ্ণুদেবতা! আপনার শ্রবণা (সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের দ্বাবিংশতম নক্ষত্র) ও হে বাসুদেবতা আপনাদের ধনিষ্ঠা বা বিষ্ঠা (ত্রয়োবিংশতিতম নক্ষত্র) আমাকে সুপুষ্টি অর্থাৎ পশু-পুত্র ইত্যাদির সাথে পালন করুক। হে ইন্দ্রদেবতা! শতবিশাখা অর্থাৎ শতভিষা নক্ষত্র (যেটি সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের চতুর্বিংশতম) আমার নিমিত্ত প্রভূত (বরীয়ঃ) ফল (অর্থাৎ পুণ্যফল) বহন করুক (আ বহৎ)। হে অজৈকপাদ দেবতা! আপনার পূর্বভাদ্রপদা (সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের মধ্যে পঞ্চবিংশতম নক্ষত্র) এবং হে অহিব্রপ্ন দেবতা! আপনার উত্তরভাদ্রপদা (ষড়বিংশতম নক্ষত্র) আমার নিমিত্ত সুশৰ্ম অর্থাৎ শোভন সুখ বা গৃহ বহন করুক (আ বহৎ)। হে পূষা দেবতা! আপনার রেবতী নক্ষত্র এবং অশ্বিদেবতাযুগলের অশ্বিনী নক্ষত্র (অশ্বযুজ) আমার নিমিত্ত সৌভাগ্য (ভগং) বহন করুক! হে যমদেব! ভরণী (দ্বিতীয় নক্ষত্র) আমাকে ধনৈশ্বর্যে প্রতিষ্ঠিত করুক ॥ ৫॥
টীকা –উপযুক্ত সূক্ত ও পরবর্তী সূক্ত নক্ষত্রদেবতার আজহোমে বিনিযুক্ত হয়। নক্ষত্র কল্পে (১ ও ৬) এর উপচার বলা হয়েছে–যেমন, কৃত্তিকার জন্য ঘৃত, অশ্বিনীর নিমিত্ত ক্ষীরিবৃক্ষাঙ্কুরা, ভরণীর জন্য ঘৃত ও মধুমিশ্রিত কৃষ্ণতিল ইত্যাদি। নক্ষত্র কল্পে (১২) এই সম্পর্কে আরও তথ্য সন্নিবিষ্ট আছে ৷ (১৯কা, ১অ. ৮সূ.)।
বঙ্গানুবাদ— যে নক্ষত্রসমূহকে আকাশ (দিবি), মধ্যলোকে (অন্তরিক্ষে), জলে (অ), পৃথিবীতে (ভূমৌ), পর্বতে (নগেষু) এবং দিকসমূহে দেখা যায়, এবং চন্দ্রমা যে নক্ষত্রগুলিকে প্রকর্ষের দ্বারা প্রদীপ্ত করে প্রকট হয়ে আসেন (প্রকল্পয়ন্ চন্দ্রমা), সেই সকল নক্ষত্রই (যানি এতি সর্বাণি) আমার সুখকর হোক (মম শিবানি সন্তু) ॥১॥
সুখদর্শন ও সুখপ্রদ (শিবানি শশ্মানি) অষ্টাবিংশতি সংখ্যক নক্ষত্রসমূহ আমাকে ফল দানের নিমিত্ত ঐকমত্য প্রাপ্ত হোক (সহ যোগং ভজন্তু মে)। আমি তাদের সহযোগে (যোগং) যেন অলভ্যবস্তু-প্রাপ্তিরূপ যোগ ও লব্ধবস্তুর পরিপালনরূপ ক্ষেম প্রাপ্ত হতে পারি (প্র পদ্যে যোগং চেতি)। দিবা ও রাত্রির উদ্দেশে নমস্কার (নমঃ অহোরাত্রাভ্যাম অস্তু)। (দিবা রাত্রে নক্ষত্রসমূহের সঞ্চার ঘটে; সুতরাং তাদের আনুকূল্য করণের নিমিত্ত দিবা ও রাত্রির উদ্দেশে নমস্কার জ্ঞাপন করা হয়েছে। বস্তুতঃ, নভোমণ্ডলে দিবারাত্ৰব্যাপী নক্ষত্রসঞ্চারের ফলেই রাশিচক্রে তার প্রভাবে ভালো-মন্দ ঘটে থাকে) ॥ ২॥
প্রাতঃকালগুলি সুকারিত্বের দ্বারা সমৃদ্ধ হোক, (অর্থাৎ আমাদের শোভন সুখ প্রদান করুক) (সুপ্রাতঃ)। সায়ংকালগুলিও আমাদের সুখে সমৃদ্ধ হোক। আমাদের দিবা-রাত্র সুখ-সমৃদ্ধ হোক (দিবং–অহোরাত্রপরঃ)। মৃগগণ ও পক্ষীগণ সুখ-সমৃদ্ধ হোক (সুমৃগং সুশকুনং মে অস্তু), (অর্থাৎ অনুকূল নক্ষত্রে গমনকারী আমার ভাবিফলসূচকত্বের নিমিত্ত মৃগ ইত্যাদি পশুগণ ও কাক ইত্যাদি পক্ষীগণ অনুকূলগতিচেষ্টাযুক্ত হোক)। (এইভাবে নক্ষত্রগুলির দ্বারা সুখসমৃদ্ধি প্রাপ্তির ইচ্ছায় নক্ষত্রাধিপতি দেবতার নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপিত হচ্ছে)–হে অগ্নি! (কৃত্তিকানক্ষত্রের দেবতা অগ্নিকে উপলক্ষ করে সকল নক্ষত্রদেবতাকেই সম্বোধন) সুষ্ঠু আহ্বানযোগ্য (সুহব) অমরণধর্মা (অমর্তং) লোকে (দ্যুলোকে) ক্ষেমের দ্বারা গমন করে হবিপ্রদাতৃ হয়ে পুনরায় আমাদের হৃষ্ট করণের নিমিত্ত আগমন করো (অভিনন্দন্ পুনঃ আয়)।–অথবা (কেবল অগ্নিকেই সম্বোধন)–হে অগ্নি! সুষ্ঠু হবিঃ (সুহবং) (অর্থাৎ যথাযথ দেবতার উদ্দেশে নিবেদিত হবিঃ) অমরণধর্মা (অমর্তং) অর্থাৎ সেই সেই অমর নক্ষত্রদেবতার নিকট ক্ষেমের সাথে গমন পূর্বক (স্বস্তি) অর্থাৎ সেই সেই হবিঃ (প্রেরণ পূর্বক) পুনরায় আমাদের হৃষ্ট করার নিমিত্ত আগমন করো (পুনঃ আয় অভিনন্দ) ৩
(অনুকূল নক্ষত্রে ধনার্থে গমনকারী পুরুষের ভাবী কার্য-প্রতিবন্ধকগুলি নিবাবণের নিমিত্ত আশা করা হচ্ছে)–হে সবিতাদেব! সম্মুখগামী পুরুষের নাম গ্রহণপূর্বক পশ্চাদ্ভাগে অবস্থিত পুরুষের দ্বারা আহ্বান (অনুহবং–পিছুডাক), পার্শ্বদ্বয়, হতে আহ্বান (পরিহবঃ), পরুষ অর্থাৎ কর্কশ ভাষণ (পবিবাদং), সর্বতঃ হাঁচি (পরিক্ষব) বা হাঁচিবর্জন, শূন্য কলস (রিক্তকুম্ভা), ইত্যাদি দুর্নিমিত্ত দোষসমূহ (তান) সকল নক্ষত্রদেবের সাথে (সর্বৈঃ) আপনি কার্যার্থে গমনকারী আমার দূর করুন (মে পরা সুব) ॥ ৪৷
(এখানেও দুর্নিমিত্তদোষ পরিহারের আশা করা হচ্ছে)–অহিত-নিমিত্ত পরিক্ষব (ক্ষতিকারক হাঁচি) আমি যেন পরিহার করতে পা; কেবল অহিতনিবারণই নয়, পরন্তু দুর্নিমিত্তরূপ ক্ষুতের (হাঁচির) শ্রেয়স্করতা যেন লাভ করতে পারি (পুণ্যং ভক্ষীমহি)। (পরবর্তী অর্ধাংশ ঋত্বিক বচন)-ধনাৰ্থে গমনকারী হে পুরুষ! তোমার গমন পথে শৃগালগমন বা শৃগালদর্শন বা বিরুদ্ধ শব্দায়মান শৃগাল (শিবা) তোমার দুর্নিমিত্তদোষনিবারক (পাপ নাসিকাং) হোক। তথা নপুংসক, পুরুষের (পণ্ডকঃ) দর্শন-স্পর্শন ইত্যাদি (অশুভ ব্যাপার) পরিহার করে তোমার কার্যসিদ্ধানুকূল হোক ৫
হে ব্ৰহ্মণস্পতি! (পরবর্তী অর্ধাংশে ইন্দ্র নির্দেশ করা হয়েছে, এইটি তারই বিশেষণ। ব্ৰহ্মণঃ অর্থে মন্ত্রসঙ্রে এবং পতি অর্থে স্বামী-সৰ্বৰ্মন্ত্রের প্রতিপাদ্য ইন্দ্র)। এই পরিদৃশ্যমান (ইমাঃ) পূর্ব ইত্যাদি দিকে (যাঃ) বাত্যারূপ বায়ু (বাতঃ) দিক-বিদিকশূন্য হয়ে পরিভ্রমণ করছে (বিষুচীঃ ঈরতে) (অর্থাৎ ঝঞ্ঝাবাতে সব দিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন একাকার হয়ে যাচ্ছে),৬
হে ইন্দ্র! তাদের (তা) যথাস্থিত-প্রদেশে অবস্থায়িনী করে (সস্ত্রীচীঃ কৃত্বা) আমার নিমিত্ত (মহ্যং) অত্যধিক সুখকারিণী করো (শিবতমাঃ কৃধি)। আমাদের অবিনাশী মঙ্গল হোক (নঃ স্বস্তি অস্তু), আমাদের ভয়রাহিত্য হোক (নঃ অভয়ং অস্তু), দিবা ও রাত্রিকে নমস্কার (নমঃ অহোরাত্রাভ্যাম্ অস্তু)। (এই মন্ত্রটি যজুঃরূপে পঠনীয়) ৭
বঙ্গানুবাদ — (এই সূক্তে সর্বতঃ শান্তি প্রতিপাদিত হচ্ছে। শান্তি অর্থে অনিষ্ট পরিহারের দ্বারা সুখকারিরূপতা। এখানে শান্তিকারী পদার্থবিশেষ দ্যুলোক ইত্যাদি)–আপন কারণে উৎপন্ন দোষাবলী বা উপদ্রবসমূহকে শমন বা দমন করে দুলোক শান্ত হোক, অর্থাৎ আমাদের সুখ প্রদান করুক (শান্তা দ্যৌঃ); পৃথিবী অর্থাৎ এই প্রথিতা ভূমি শান্ত হোক, অর্থাৎ আমাদের সুখ প্রদান করুক (শান্তা পৃথিবী); এই পরিদৃশ্যমান বিস্তীর্ণ (ইদং উরু) অন্তরিক্ষ বা মধ্যমলোক শান্ত হোক, অর্থাৎ আমাদের সুখ প্রদান করুক (শান্তম্ অন্তরিক্ষম); সমুদ্র শান্ত হোক, অর্থাৎ সুখ-প্রদান করুক (শান্তা উন্বতী), জলসমূহ শান্ত হোক, অর্থাৎ আমাদের সুখ প্রদান করুক (তা আপঃ শান্তা সন্তু) এবং ওষধিসমূহ শান্ত হোক, অর্থাৎ আমাদের সুখ প্রদান করুক (নঃ সন্তু ওষধীঃ)। ১৷
কারণাবস্থাপন্ন বস্তু নিয়ে (পূর্বরূপাণি–কার্যাপেক্ষয়া পূর্বরূপাণি), কৃত অর্থাৎ কার্যজাত ও অকৃত অর্থাৎ অনিষ্পন্ন নিত্যকর্মগুলি (কৃতাকৃতম) আমার নিমিত্ত শান্ত হোক (শান্তং নো অস্তু)–অথবা–আমার দুষ্কৃতফলভূত প্রাক্তন জন্মসমূহ (মদীয়ানি পূর্বাণি রূপাণি প্রাক্তনানি জন্মানি) শান্ত হোক (শান্তানি সন্তু)। (পূর্বজন্মের কর্মফলের মধ্যে যা কিছু অনিষ্টকর, অর্থাৎ তির্যক ইত্যাদি যোনীতে জন্মভোগ, পরিহারের নিমিত্ত শান্তির প্রার্থনা করা হচ্ছে)। আমার অতীত জন্মের বা কালের যা কিছু অনিষ্ট, তা শান্ত হোক (শান্তং ভূতং); আমার ভাবী জন্মের বা কালের যা কিছু অনিষ্ট, তা শান্ত, হোক (শান্তং ভব্যং)। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ–এই কালক্ৰয়াবচ্ছিন্ন উক্ত (কথিত) ও অনুক্ত (অকথিত) সব কিছু দোষ শমিত হোক (সবর্ম) এব শমস্তু নঃ), (অর্থাৎ সুখপ্রদায়ক হোক)। ২। পরম স্থানের নিবাসিনী বা পরমেষ্ঠি ব্রহ্মার পত্নী (পরমেষ্ঠিনী), ব্রহ্মমন্ত্রে সম্যক উত্তেজিতা অর্থাৎ সকল বৈদিক বাক্যের প্রতিপাদিস্বরূপা (ব্রহ্মসংশিতা) এই যে স্বাত্মভূতের দ্বারা সম্যক্ অনুভূয়মানা (ইয়ং যা) বাক্-দেবী, তার দ্বারা শাপ ইত্যাদি রূপ যে ক্লেশদায়ক বাক্য সৃষ্ট হয়, (যয়ৈব সসৃজে ঘোরং) সেই বাক্যের দ্বারাই আমাদের শান্তি হোক (তয়ৈব শান্তিঃ অস্তু নঃ)। (অর্থাৎ তার যে বাক্যের দ্বারা অনিষ্ট উৎপন্ন হয়েছে, তিনিই তার স্বকৃত অনিষ্ট পরিহার করুন–এটাই বক্তব্য)। ৩।
পরম উৎকৃষ্ট স্থানে নিবাসকারী (পরমেষ্ঠিনং) যে ব্রহ্মার দ্বারা সৃষ্টি বিষয়ে তীক্ষীকৃত (ব্রহ্মসংশিতং) সর্বজগতের মূল কারণরূপ যে মন বিদ্যমান, যে মনের দ্বারা ঘোর বা নিদারুণ অনিষ্টকর কর্মসমূহের সৃষ্টি হয়েছে (সসৃজে), সেই মনের দ্বারাই আমাদের মনে উৎপন্ন অনিষ্ট-কর্মসমূহের শান্তি হোক (তেনৈব শান্তিঃ অস্তু নঃ) ॥ ৪
যষ্ঠেন্দ্রিয় মনের সাথে (মনঃষষ্ঠানি) যে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (ইমানি যানি পঞ্চ ইন্দ্রিয়াণি–অর্থাৎ চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা-জিহ্বা-ত্বক) আমাদের হৃদয়প্রদেশে স্থিত আছে, (হৃদয়ই হলো আত্মনিবাসের স্থান; সুষুপ্তিকালে আপন আপন কারণরহিত সকল ইন্দ্রিয় আত্মায় লীন হয়–এটাই হৃদি শব্দের তাৎপর্য); যে ইন্দ্রিয়সমূহ চেতন আত্মার দ্বারা (ব্ৰহ্মণা) আপন আপন ব্যাপারে অর্থাৎ বিষয়-প্রবণত্বের কারণে নিয়ন্ত্রিত হয় (সংশিনি), যে ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা (যৈরেব) নিদারুণ পাপাবহ কর্ম সৃষ্টি হয়েছে (ঘোরং সসৃজে), (অর্থাৎ আমাদের ইন্দ্রিয়গুলির দ্বারা আমরা যে-সকল অপরাধমূলক কার্য সাধিত করেছি), আমাদের ইন্দ্রিয়-সৃষ্ট সেই ঘোর কর্মসমূহের (তৈরেব) শমন হোক (শান্তিঃ অস্তু নঃ)।৫৷
মিত্র (অর্থাৎ দিনের অভিমানী দেবতা সূর্য), বরুণ (রাত্রির অভিমানী দেবতা), বিষ্ণু (ব্যাপক দেবতা), প্রজাপতি (প্রকর্ষের সাথে জায়মান দেব-মনুষ্য ইত্যাদি প্রজার পালক), ইন্দ্র (পরমৈশ্বর্যসম্পন্ন দেবতা), বৃহস্পতি (বৃহতের অর্থাৎ বাক্যের বা দেবতাগণের পতি, যিনি হিতকারিত্বের দ্বারা পালন করেন) ও অৰ্যৰ্মদেবতা আমাদের পক্ষে শান্তিদায়ক হোন (শং, শান্ত্যৈ ভবন্তু)। (বাক্যভেদের জন্য শং পদের প্রতিবাক্যে প্রয়োগ হয়েছে)। ৬।
মিত্রদেব ও বরুণ দেবতা আমাদের শান্তি প্রদান করুন (শং নো মিত্রঃ শং বরুণঃ)। বিবস্বান অর্থাৎ সূর্যদেব (অন্ধকার নাশক দেবতা) ও অন্তক (সকল প্রাণীর অবসানকারী দেবতা) আমাদের শান্তি প্রদান করুন (শং বিবস্বান্ শং অন্তকঃ)। পৃথিবী ও অন্তরিক্ষে ঘটিতব্য উৎপাত সমূহ প্রশমিত হোক (উৎপাতাঃ পার্থিবা আন্তরিক্ষাঃ শম্)। দ্যুলোকে সঞ্চরণশীল গ্রহগণ (দিবিচরা গ্রহাঃ) আমাদের দোষশমকারী অর্থাৎ সুখকর হোক (শং নো) ॥ ৭।
কম্পমানা পৃথিবী আমাদের নিমিত্ত শান্তিকারিণী তোক (শং নো ভূমিঃ বেপ্যমানা); (অথবা–প্রাণীসংহারক কালের দ্বারা কম্প্যমানা সেই ভূমি আমাদের কম্পদোষ পরিহারের নিমিত্ত হোক)। উল্কার দ্বারা (আয়ত জ্বালারূপে আকাশ হতে পতিত অগ্নিপিণ্ডে) দগ্ধীভূত যা কিছু (উল্কা নিঃহত চ যৎ) তা শান্তিপ্রদ হোক (তচ্চ শং অস্তু)। লোহিতের ন্যায় দুগ্ধদাত্রী গাভীগণ দোষশূন্যা বা মঙ্গলপ্রদা হোক (শং গাবঃ লোহিতক্ষীরাঃ); (অর্থাৎ আমাদের যে পাপের কারণে গাভীগণের দুগ্ধ লোহিতময় হয়ে যাচ্ছে, সেই পাপের উপশম ঘটুক)। অবদীমানা ভূমি মঙ্গলদায়িনী হোক (শং ভবতু); (অর্থাৎ আমাদের যে দোষের কারণে ভূমিকম্পে ভূমি বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে বা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাচ্ছে, সেই দোষের শান্তি হোক) ॥ ৮৷
উল্কার দ্বারা অভিহত হয়ে আকাশ হতে পতিত নক্ষত্রসমূহ আমাদের শান্তিপ্রদ হোক (নক্ষত্রম্ উল্কা অভিহতম শং), (অর্থাৎ উপপ্লব বা উল্কাপাত ইত্যাদির উপদ্রব শান্ত হোক)। মারণার্থে শত্রুগণের ক্রিয়মাণ কর্মগুলি আমাদের শান্তিপ্রদ হোক (অভিচারাঃ শম), এবং সেই অভিচারকর্মের ফলে উৎপাদিত পিশাচীগণও উপদ্রব শমনের নিমিত্ত হোক (উম ইতি সন্তু কৃত্যাঃ)। ভূমিতে নিখাতিত বক্সাগুলি (অর্থাৎ অপরের পীড়াৰ্থে ভূমির নীচে এক বাহু সমান গর্তে নিখন্যমান অস্থি অস্থি-কেশ ইত্যাদি বেষ্টিত, বিষবৃক্ষ ইত্যাদির দ্বার নিমিত্ত পুত্তলীগুলি) আমাদের শান্তিকর হোক। (অর্থাৎ শত্রুর দ্বারা কৃত আমাদের ক্ষতিকর অভিচার কর্মগুলি যেন ব্যর্থ হয়ে আমাদের মঙ্গলকর হয়)। আকাশ হতে পতিত আয়তজ্বালা উল্কাদর্শনজনিত আমার নিজের পাপ ও জনপদে যত কিছু উপদ্রব শান্ত হোক, (শম্ উল্কাঃ দেশোপসৰ্গাঃ….ভবন্তু) ৯
চন্দ্রমণ্ডলের ভেদক বা সঙ্ক যে মঙ্গল ইত্যাদি গ্রহ আছে, সেগুলি আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোক, (শং নঃ গ্রহাঃ চান্দ্রমসাঃ)। এবং রাহু-গ্রহের দ্বারা গ্রস্ত সূর্য শান্তির নিমিত্ত হোক, (শম্ আদিত্যঃ চ রাহুণা)। তথা মৃত্যু অর্থাৎ মারক ধূমকেতুর অনিষ্টকর দোযাবলী দূর হয়ে তা আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোক (শং নঃ মৃত্যুঃ ধূমকেতুঃ), (অর্থাৎ শাস্ত্রে উল্লিখিত ধূমকেতুর উদয়ে বিশেষ অনিষ্ট ঘটে থাকে; সুতরাং সেই অনিষ্ট বিনষ্ট হয়ে বরং মঙ্গলপ্রদ হয়ে ওঠে)। তীক্ষ্ণতেজঃ-সম্পন্ন রুদ্র নামক দেবগণ আপন তেজের সন্তাপক-উপদ্রব পরিহার করে মঙ্গল সাধিত করুন, (শ রুদ্রাঃ তিগৃতেজসঃ) ১০
রুদ্রগণ (রুদ্রাঃ) (অর্থাৎ অজৈকপাদ, অহিব্রধ, বিরুপাক্ষ, সুরেশ্বর, জয়ন্ত, বহুরূপ, এ্যম্বক, অপরাজিত, বৈবস্বত, সাবিত্র ও হর–এই একাদশ রুদ্র) শান্তির নিমিত্ত হোন (শং)। বসুগণ (বসবঃ) (অর্থাৎ ভব, ধ্রুব, সোম, বিষ্ণু অনল, অনিল, প্রভূষ ও প্রভব–এই অষ্ট গণদেবতা) শান্তির নিমিত্ত হোন, (শং)। আদিত্যগণ (আদিত্যাঃ) (অর্থাৎ ধাতা, মিত্র, অর্যমা, রুদ্র, বরুণ, সূর্য, ভগ, বিবস্বান, পূষা, সবিতা, ত্বষ্টা ও বিষ্ণু–এই দ্বাদশ আদিত্য) আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন (শ)। অগ্নিগণ (অগ্নয়ঃ) (অর্থাৎ দক্ষিণ, গার্হপত্য, আহবনীয়, সত্য ও আবসথ্য–এই পঞ্চ অগ্নি) আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন (শ)। দ্যোতমান তেজোরূপা মহর্ষিগণ (মহর্ষয়ে দেবাঃ) (অর্থাৎ মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু ও বশিষ্ঠ–এই সপ্ত ঋষি) আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন (শং নো)। দেবতাগণ (দেবাঃ) (অর্থাৎ ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাগণ আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন (শং)। বৃহস্পতি (অর্থাৎ দেবগণের পুরোহিত বা গুরু) আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন (শ)। ১১ ॥
ব্রহ্ম (অর্থাৎ দেশকালের অতীত সচ্চিদানন্দ-লক্ষণ পরম ব্রহ্ম), প্রজাপতি (অর্থাৎ প্রজাগণের পালক তথা সর্বনিয়ন্তা সর্বান্তর্যামী), ধাতা (অর্থাৎ সকলের ধারণকর্তা চতুর্মুখ ব্রহ্মা), লোকসমূহ (অর্থাৎ ভুঃ-ভুবঃ-স্বঃ-মহঃ-জন-তপঃ-সত্য-উপরিস্থ এই সাতটি লোক), বেদ সমুদায় (সাঙ্গ অর্থাৎ শিক্ষা-কল্প-ব্যাকরণ-নিরুত্তছন্দ ও জ্যোতিষ সহ বেদ চতুষ্টয়), সপ্ত-ঋষিবর্গ (অর্থাৎ মরীচি ইত্যাদি সপ্তর্ষিগণ) ও দক্ষিণাগ্নি ইত্যাদি অগ্নিবর্গ (অগ্নয়ঃ)–এঁরা সকলে আমার স্বস্ত্যয়ন (মঙ্গল প্রাপ্তির কর্ম) করুন (তৈঃ মে কৃতম্ স্বস্ত্যয়ন); ইন্দ্র আমাকে সুখ (শর্ম) প্রদান করুন; ব্রহ্মা আমাকে সুখ প্রদান করুন, বিশ্বদেবগণ আমাকে সুখ প্রদান করুন (বিশ্বে মে দেবাঃ শৰ্ম যন্তু); সকল দেবগণ 2 আমাকে সুখ প্রদান করুন (সর্বে মে দেবাঃ শৰ্ম যচ্ছন্তু)। ১২।
অতীন্দ্রিয়ার্থদ্রষ্ট সপ্ত-ঋষিবর্গ (সপ্তঋষয়ঃ) সর্ব লোকে যা কিছু বস্তু (যানি কানি চিৎ) শান্তিকারক বলে জ্ঞাত হয়েছেন (শান্তানি বিদুঃ) সে সবই আমাদের সুখের নিমিত্ত হোক (সর্বাণি শং ভবন্তু মে)। (এবার সূক্তের প্রতিপাদ্য অর্থ-সংগ্রহের নিমিত্ত বলা হচ্ছে)–সর্বতঃ আমাদের সুখ বা মঙ্গল হোক, আমাদের অভয় তোক (শং মে অস্তু অভয়ম মে অস্ত)। ১৩
পৃথিবী শান্তি প্রদান করুন, অন্তরিক্ষ শান্তি প্রদান করুন, দ্যুলোক শান্তি প্রদান করুন, জলরাশি (আপঃ) শান্তি প্রদান করুন, ওষধিসমূহ শান্তি প্রদান করুন, বনস্পতিরাজি শান্তি প্রদান করুক, বিশ্বদেবগণ আমাকে শান্তি প্রদান করুন (শান্তির্বিশ্বে মে দেবাঃ), সকল দেবতা আমাকে শান্তি প্রদান করুন। তাদের প্রদত্ত শান্তি সমূহের দ্বারা এই কর্মে (যজ্ঞে) যদি কিছু ভয়ঙ্কর (ঘোর) অর্থাৎ বিপরীত অনুষ্ঠানের কারণে বিপরীত ফল-প্রাপক কর্ম হয়ে থাকে তার শান্তি (অর্থাৎ উপশম) হোক; (যদি কিছু) কূর কর্ম হয়ে থাকে, তার শান্তি হোক; (যদি কিছু) পাপ হয়ে থাকে তবে তার শান্তি হোক; সেগুলি মঙ্গলদায়ক হোক (শিব); এইভাবে সেগুলি সবই আমাদের শান্তির নিমিত্ত থোক (এব শম অস্তু নঃ)। ১৪।
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –প্রত্যহং কর্তব্যে রাজ্ঞো বাসগৃহপ্রাপণকর্মাণি শর্করাপ্রক্ষেপনান্তরং শান্তা দৌঃ ইতি শান্তিসূক্ত জপেৎ।–ইত্যাদি। (১৯কা, ১অ. ১০সূ.)। টীকা— উপযুক্ত সূক্তটির নাম শান্তি সূক্ত। রাজা কর্তৃক বাসগৃহপ্রাপণ কর্মসমূহে যেমন এই সূক্তটির বিনিয়োগ রয়েছে, তেমনই যে কোন শান্তিকর্মে এই মন্ত্রগুলির বিনিয়োগ পিষ্টরাত্রিকল্পে (প. ৬/৫) নির্ধারিত আছে। এই সূক্তটি শান্তিগণে পঠনীয়। নক্ষত্র কল্পেও (১৮) এর বিনিয়োগ দ্রষ্টব্য। (১৯কা, ১অ. ১০সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র ও অগ্নিদেব! আপনারা রক্ষা-বুদ্ধির দ্বারা অববাভিঃ) আমার বা আমাদের সকল দুঃখের নিবারণের নিমিত্ত হোন (নঃ শম্ ভবতা)। যজমান-প্রদত্ত হবিঃ প্রাপ্ত হয়ে (রাতহবৌ) ইন্দ্র ও বরুণদেব আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন (শম্ নঃ)। ইন্দ্র ও সোমদেব আমাদের সুষ্ঠু প্রাপ্তব্য মঙ্গলের নিমিত্ত হয়ে রোগ, ভয় ইত্যাদির উপশম করুন (শম্ সুবিতায় শম যোঃ)। ইন্দ্র ও পূষাদেব যুদ্ধে বা অন্নলাভে (বাজতৌ ) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন (শম্ নঃ) ॥১॥
ভজনীয় (ভগ নামক) দেবতা আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন (নঃ শম্)। সকলের দ্বারা স্কৃয়মান (নরাশংস নামক) দেবতা আমাদের কল্যাণের নিমিত্ত হোন (শঃ এব নঃ অস্তু)। আমাদের পূর্ণা বুদ্ধি (পুরমধিঃ) মঙ্গলের নিমিত্ত হোক (শং নঃ অস্তু)। ধনসমূহ (রায়ঃ) সুখের নিমিত্ত হোক (সুখায়ৈব সন্তু)। আমাদের সুষ্ঠু যন্তব্য বা শোভন-সংযমযুক্ত সত্যবচন (সুমস্য সত্যস্য শংসঃ) সুখের নিমিত্ত হোক। [ পাতঞ্জল অনুসারে (পা, সূ. ২৩০) যম শব্দের স্বরূপ অহিংসা, সত্য, অস্তেয় অর্থাৎ চৌর্যাভাব, ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ অর্থাৎ অন্যদত্ত বস্তুর অগ্রহণ বিহিত আছে]। পুরুজাত অর্থাৎ বহুভাবে বা বহুরূপে প্রাদুর্ভূত অর্যমাদেব আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন (শং নোস্তু)। ২
সকলের বিধাতা (ধাতা) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন (নঃ শং অস্তু)। পুণ্য ও পাপসমূহের ধারণকর্তা (ধর্তা-বিধারয়িতা) বরুণ আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন (শং এব নঃ অস্তু)। বিস্তীর্ণগমনা বা বিবর্তগমনা পৃথিবী (উরূচী) অন্নের সাথে (স্বধাভিঃ) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন। বৃহতী দ্যাবাপৃথিবী (রোদসী) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন। পর্বত (অদ্রিঃ) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোক। দেবগণের উদ্দেশে স্তুতিসমূহ আমাদের কল্যাণের নিমিত্ত হোক (নঃ দেবানাং সুহবানি শং সন্তু) ॥ ৩॥
জ্যোতির্মুখ (জ্যোতি অনীকে অর্থাৎ মুখে যার–জ্যোতিরনীকঃ) অঙ্গনাদিগুণযুক্ত দেবতা (অগ্নি) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন (শম্ নঃ অস্তু)। মিত্র (সূর্য) ও বরুণ দেবতা আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন। অশ্বিদ্বয় দেবতা (অশ্বিনা) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন। পুণ্যকর্মের (সুকৃতাং) পুণ্যসমূহ (সুকৃতানি) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোক, (অর্থাৎ আমরা যে পুণ্যকর্ম করি তার ফল আমাদের মঙ্গলকর হোক)। গমনশীল বায়ু (ইষিরঃ বাঃ) শান্তির নিমিত্ত আমাদের অভিলক্ষ্যে প্রবাহিত হোক (শং নঃ অভি বাতু) ॥ ৪
দ্যাবাপৃথিবী দেবগণের উদ্দেশে প্রথম স্তুতির নিমিত্ত অথবা পূর্বজাত দেবগণের উদ্দেশে যজ্ঞের নিমিত্ত (পূর্বহূতৌ) আমাদের কল্যাণপ্রদ হোক। অন্তরিক্ষ অর্থাৎ মধ্যমলোক দর্শনের নিমিত্ত (দৃশয়ে) আমাদের হিতকরী হোক। (শং নো অস্তু)। ওষধী ও বনরূপ সমুদায় বৃক্ষরাজি (বনিনঃ) আমাদের শুভপ্রদ হোক। লোকপালক (রজসঃ পতিঃ) জয়শীল ইন্দ্র (জিষ্ণুঃ) আমাদের ক্ষেমকর হোন (শং নোস্তু) ৫
বসুদেবগণের সাথে ইন্দ্র আমাদের কল্যাণকরী হোন (ইন্দ্রো দেবঃ বসুভিঃ শং ন অস্তু)। শোভন-স্তুতিশালী (সুশংসঃ) বরুণদেব আদিত্যগণের সাথে আমাদের শুভদায়ক হোন (শং নোস্তু)। সুখকর (জলাষঃ) রুদ্র দেবতা রুদ্রগণের সাথে আমাদের মঙ্গলকারক, হোন (রুদ্রঃ রুদ্রেভিঃ শং নোস্তু)। ত্বষ্টাদেব (সর্বপ্রাণীর রূপস্রষ্টা দেবতা) দেবপত্নীগণের সাথে (গ্নাভিঃ) আমাদের মঙ্গল বিধান করুন এবং এই কর্মে (ইহ) আমাদের স্তুতিসমূহ শ্রবণ করুন (শৃণোতু)। ৬।
লতারূপ অভিমৃয়মাণ সোম আমাদের মঙ্গলদায়ক হোক। ব্রহ্ম অর্থাৎ স্তোত্রশস্ত্রাত্মক সোম আমাদের মঙ্গলদায়ক হোক। ব্রহ্ম অর্থাৎ স্তোত্রশস্ত্রাত্মক বেদজ্ঞান আমাদের কল্যাণকর হোক। গ্রাবাণঃ অর্থাৎ অভিষব-সাধনভূত প্রস্তরগুলি আমাদের শুভদায়ক হোক। সোমরসসাধ্য ক্রতুগুলি (যজ্ঞাঃ) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোক। যূপসমূহ অর্থাৎ যজ্ঞীয় পশুবন্ধন স্তম্ভগুলি (স্বরূণাং-স্বরূমতাং) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোক। প্রকর্ষের সাথে জায়মান (প্রস্বঃ) চরুপুরোশ-সম্পাদিকা ওষধিসমূহ আমাদের মঙ্গলকারক হোক (শং নঃ সন্তু)। বেদি (যজ্ঞ সাধনের নিমিত্ত পরিষ্কৃত উচ্চ ভূমি) মঙ্গলের নিমিত্ত হোক (শমেবাস্তু) ৭
বিস্তীর্ণতেজঃসম্পন্ন বা বহুরূপে দৃশ্যমান (উরুচক্ষাঃ) সূর্যদেব আমাদের শান্তির নিমিত্ত উদিত হোন (নঃ শং উদেতু)। চারিটি মহান্ দিক্ (চতস্রঃ প্রদিশঃ) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোক (শং নো ভবন্তু)। স্থির পর্বতসমূহ (ধ্রুবয়ঃ পর্বঃ ) আমাদের নিমিত্ত মঙ্গলকর হোক। বেগবান্ নদীগুলি (সিন্ধবঃ) আমাদের শান্তিপ্রদ হোক। এইরকমে জলরাশিও আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোক (শং এব সন্তু আপঃ) ॥ ৮
অখণ্ডনীয়া দেবমাতা (অদিতিঃ) কর্মসমূহের সাথে (ব্রতেভিঃ) আমাদের সুখ-সম্পাদন করুন। উৎকর্ষময় স্তুতিসম্পন্ন (সু অর্কাঃ) মরুৎ-গণ আমাদের মঙ্গলসাধন করুন। বিষ্ণুদেব (ব্যাপক দেবতা) আমাদের হিতসাধন করুন; এই রকমে পালক দেবতা পূষাও আমাদের হিতের নিমিত্ত হোন। জল অথবা অন্তরিক্ষ (ভবিত্রং) আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোক। বায়ু আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোক (শং–শান্ত্যর্থমেবাস্তু)। ৯।
ভয় হতে রক্ষাকারী (ত্ৰায়মাণঃ) কলের প্রেরক দেবতা সবিতা আমাদের মঙ্গলবিধায়ক হোন। প্রকাশিকা (বিভাতী) উষাভিমানিনী দেবীগণ আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন (উষসঃ শং নো ভবন্তু)। বৃষ্টিপ্রদায়ক পর্জন্য দেবতা আমাদের প্রজাবর্গের মঙ্গলের নিমিত্ত হোন (শং ভবতু)। সুখের ভাবয়িতা ক্ষেত্ৰপতি শম্ভু আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন (শম্ নঃ অস্তু শম্ভুঃ) ॥ ১০৷
বঙ্গানুবাদ –সত্যর পালক অর্থাৎ সত্যশীলগণ (সত্যস্য পতয়ঃ) আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন, (অর্থাৎ সত্যশীল দেবতাগণ আমাদের মঙ্গল বিধান করুন। অশ্ব (অবঃ) আমাদের হিতসাধক হোক। এইরকমে ধেনুগণও আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত হোক (শং এব সন্তু গাবঃ)। সুকৃতকর্মা (সুকৃতঃ) অর্থাৎ সুকর্মের দ্বারা দেবত্বপ্রাপ্ত এবং কুশলহস্ত (সুহস্তাঃ) অর্থাৎ শোভনহস্তে যজ্ঞীয় পাত্রধারী ঋভু নামক দেবগণ আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন (শম্ নঃ ঋভবঃ)। (বক্তব্য এই যে, সুকৃতিসম্পন্ন ঋভুগণ আমাদের অনিষ্ট দূর করুন)। পিতৃপুরুষগণ (পিতরঃ) স্তোত্রে বা যজ্ঞে (হবে) আমাদের কল্যাণের নিমিত্ত হোন (শ নঃ ভবন্তু)। ১৷
বিশ্বদেবগণ অথবা বহুস্তোত্রশালী ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ (দেবাঃ বিশ্বদেবাঃ) আমাদের কল্যাণের নিমিত্ত হোন। বর্ণপদবাক্যাত্মিকা বাগ্নেবী (সরস্বতী) স্তুতির সাথে বা কর্মের সাথে (ধীভিঃ) শান্তির নিমিত্ত হোন। যজ্ঞের অভিমুখে। বা নিকটে সম্মিলিত দেবগণ (অভিযাচঃ) মঙ্গলের নিমিত্ত হোন। এইরকমে দানের নিমিত্ত সমাগত দেবগণ (রাতিষাচঃ) মঙ্গলের নিমিত্ত হোন (শম্ এব)। দ্যুলোকস্থ দেবগণ (দিব্যাঃ), পৃথিবীস্থ দেবগণ (পার্থিবাঃ) ও অন্তরিক্ষস্থ দেবগণ (অপাঃ) আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন। ২
অজায়মান এক পাদ স্থাবরজঙ্গমাত্মক যার অর্থাৎ অজৈকপাদ নামক দেবতা (একাদশ রুদ্রের অন্যতম) আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন। অহন্তব্য মূল যার অর্থাৎ অহিবু নামক দেবতা (একাদশ রুদ্রের অন্যতম) আমাদের শান্তির নিমিত্ত হোন। সমুদ্র আমাদের কল্যাণের নিমিত্ত হোক। অপাং নপাৎ নামক দেবতা (অর্থাৎ জলের পৌত্র) আমাদের শান্তির নিমিত্ত দুঃখের পারয়িতা হোক। মরুৎ-বর্গের মাতা (মরুতাং মাতা), দেবগণের রক্ষাকারিণী (দেবগোপা-দেবা গোপয়িতাররা) দেবী পৃশ্নি আমাদের শুভের নিমিত্ত হোন ॥ ৩
অদিতির পুত্র দুঃস্থানস্থ দেবগণ (আদিত্যাঃ), অন্তরিক্ষস্থ রোদনকারক রুদ্র নামক দেবগণ (রুদ্রাঃ), ও পৃথিবীস্থ বসু নামক দেবগণ ইদানীং (ইদং) ক্রিয়মাণ নবতর (নবীয়ঃ) স্তোত্রের (ব্রহ্ম) সেবা করুন (জুষং) এবং অন্য দেবগণ আমাদের স্তোত্র শ্রবণ করুন (শৃথন্তু)। (কে তাঁরা?-না) অন্তরিক্ষস্থ (দিব্যা) দেবগণ, পৃথিবীস্থ (পার্থিবাসো) দেববর্গ, পৃশ্নিজাত মরুৎদেব-সমূহ (গোজাতা) ও যজ্ঞাহঁ (যজ্ঞিয়াসঃ) দেববৃন্দ; (তারা আমাদের স্তোত্র শ্রবণ করুন) ৷ ৪৷৷
দেবানাং ঋত্বিজঃ অর্থাৎ যথা ঋতুতে বা কালে দেবগণের যাগকারী, যাগযোগ্য (যজ্ঞিয়াসঃ), প্রজাপতির যজনাহ (মনোঃ যজত্রাঃ), অমরণধর্মা (অমৃতাঃ), সত্যভূত যজ্ঞে জ্ঞানবান্ (ঋতজ্ঞা) যে দেবতাগণ আছেন, সেই দেবতাগণ ইদানীং (অদ্য) আমাদের (নঃ) প্রভূতা কীর্তি প্রদান করুন (উরুগায়ম রাসন্তা)। হে দেবগণ! আপনারা আমাদের সদা (যুয় নঃ সদা) অবিনাশী ক্ষেমংকর উপায়ের দ্বারা রক্ষা করুন (স্বস্তিভিঃ পাত)। ৫।
হে মিত্রাবরুণ (মিত্র ও বরুণ, যথাক্রমে দিবা ও রাত্রির অভিমানী দেবতাদ্বয়)! আমাদের সেই বক্ষ্যমাণ ফল হোক (তৎ অস্তু)। হে অগ্নি (প্রাতঃ ও সায়ংকালের অভিমানী দেবতা)! সেই বক্ষ্যমাণ ফল হোক (তৎ অস্তু)। (বক্ষ্যমাণ অর্থে পরে যা বলা হচ্ছে)। (তা কি?-না)-যা রোগের উপশমকারী এবং যা ভয় হতে আমাদের পৃথককারী (শং যো); অধিকন্তু (উত), যা ধনলাভ ও ক্ষেত্রাদিরূপ প্রতিষ্ঠা বিস্তার করেছে (গাধং অশীমহি প্রতিস্থা); এমন উক্ত ফল (ইদং) আমাদের (অস্মভ্যং) প্রশস্ত বা সমীচিন (শস্তম্) হোক (অস্তু)। দ্যুলোকের উদ্দেশে (এবং) সকলের মহান নিবাসস্থানের উদ্দেশে (অর্থাৎ পৃথিবীর উদ্দেশে) নমস্কার (দিবে বৃহতে সদনায় নমঃ) ৷ ৬ ৷৷
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ— শং নঃ সত্যস্য ইতি সূক্তস্য রাত্রীকল্পাদিষু শান্ত্যর্থজপে পূর্বসূক্তেন সহ উক্তো বিনিয়োগঃ ৷ (১৯কা, ২অ. ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ— উষাকালাভিমানিনী দেবতা (উষা) তার আপন ভগ্নীরূপা (স্বসুঃ) রাত্রির অন্ধকার অপসারিত করছেন (তমঃ অপ), (উষার আগমন ও রাত্রির অপসরণ, দুটিই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। এই জন্য উষা ও রাত্রিকে ভগ্নীদ্বয়রূপে কল্পনা করা হয়েছে); অতঃপর সুষ্ঠু প্রাদুর্ভাবের দ্বারা অর্থাৎ সম্যক্ প্রকাশ করণের দ্বারা (সুজাততা) লৌকিক ও বৈদিক মার্গের (বর্তনিং) সম্যক্ নিবর্তন করছেন (সং বর্তয়তি), (উষা কালে সকল প্রাণীজাত আপন আপন কর্ম সম্পাদনের ব্যাপারে মার্গ দর্শন করে থাকে, এটি লৌকিক মার্গ সন্দর্শন। আবার এই উষাকালেই বৈদিকগণও অগ্নিহোত্র ইত্যাদি কর্মমার্গ দর্শন করে থাকেন, এটি বৈদিক সন্দর্শন)। এই উষা কর্তৃক (অয়া) দেবতাগণের দত্ত বা নিহিত (দেবহিতং) অন্ন (বাজ) লাভ করবো (সনেম); অনন্তর সুকর্মকুশল পুত্রপৌত্র ইত্যাদি সমেত (সুবীরাঃ) শত হেমন্তকাল অর্থাৎ শত সম্বৎসরব্যাপী হর্ষান্বিত থাকবো (শতহিমাঃ মদেব) ॥১॥
সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –উষা অপ স্বসুঃ ইতি একচস্য সূক্তস্য রাত্রিকল্পে শান্ত্যর্থজপে শান্তা দ্যৌ ইত্যাদি সূক্তত্রয়েন সহ উক্তো বিনিয়োগ। (১৯কা, ২অ. ৩সূ.)।
টীকা –এই সূক্তটির বিনিয়োগ সম্পর্কিত নির্দেশ এই অনুবাকের প্রথম সূক্তের সূক্তস্য বিনিয়োগঃ অংশের টীকায় বলা হয়েছে ৷ (১৯কা, ২অ, ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ— [এই সূক্তে শত্রুদমনসমর্থ ইন্দ্রের স্তুতি করা হয়েছে]-পরমৈশ্বর্যসম্পন্ন ইন্দ্রের স্থূল বা পুষ্ট (স্থবিরো), অভিমতফলষণকারী বা শস্ত্র-অস্ত্র-বর্ষণকারী (বৃষাণো), সকলের শ্লাঘনীয় বা কটক-অঙ্গদ-ইত্যাদি আভরণযুক্ত (চিত্রা), পরিদৃশ্যমান (ইমা), বৃষভতুল্য প্রক্রান্ত শত্ৰুহননকর্মশালী (বৃষভৌ পারয়িষ্ণু) দুটি বাহু বর্তমান, আমি সেই দুটি বাহুকে (তৌ) সকল উপাসকের পূর্বভাবী হয়ে অর্থাৎ সকলের আগে (প্রথমঃ) পূজা করছি (যক্ষে)। (কি জন্য?–না) অপ্রাপ্য বস্তুর প্রাপ্তির (যোগে) এবং ক্ষেম অর্থাৎ প্রাপ্ত বস্তুর পরিরক্ষণের নিমিত্ত, (আগতে)। (সেই দুটি বাহু), যার দ্বারা (যাভ্যাং) অসুরগণের (অসুরাণাং) স্বর্গ বা সেখানকার নিবাসী দেববর্গের বাধকত্বের নিমিত্ত প্রাপ্ত শারীরিক ও সেনালক্ষণ বীর্য বা বল (স্বঃ যৎ) নিরস্ত হয়েছে (জিতং)। ১।
শীঘ্নকারী বা ব্যাপক (আশুঃ), আপন অভিমত সম্পাদনে ব্যগ্র (শিশানঃ), বৃষভের ন্যায় ভয়ঙ্কর (বৃষভো ন ভীমঃ), সতত শত্রুঘাতক (ঘনাঘনঃ), মনুষ্যগণের ক্ষোভয়িতা (চর্ষণীনাং ক্ষোভণঃ) (অর্থাৎ বর্ষা ইত্যাদির দ্বারা কৃষকগণের বা যুদ্ধে পরসেনার বিক্ষোভ সৃষ্টিকারী), যুদ্ধে শত্রুগণকে আহ্বানকারী বা তাদের ক্রন্দন বা শব্দ সৃষ্টিকারী (সংক্রন্দনঃ), অনিমেষচক্ষু (অনিমিষঃ) (অর্থাৎ অত্যন্ত তীক্ষ্ণদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ায় যাঁর পলক পড়ে না), একবিক্রান্ত অর্থাৎ কারো সহায় ব্যতিরেকে একাকীই আপন প্রতাপে কর্মসমর্থ (একবীরঃ), শত শত শত্রুসেনাকে একসঙ্গে জয়কারী (শতং সেনা অজয়ৎ সাক) আপন ইষ্টসিদ্ধির নিমিত্ত এই হেন ইন্দ্রের আশ্রয় গ্রহণ করো (তস্মাৎ তমেবায়ত ইষ্টসিদ্ধ্যর্থং ইতি শেষঃ)। ২।
শত্রুদের আহ্বানকারী বা ক্রন্দয়িতা (সংক্রয়িা ) ও অনিমেষচক্ষু (অনিমিষচক্ষুষা), জয়শীল (জিষ্ণু), যুদ্ধাসক্ত (যোধ্য), দুঃখে অবিচল (দুঃ-চ্যবন), প্রকৃষ্ট সহনশীল (খৃষ্ণু), বাণধারী (ইমুহস্ত), কামবর্ষয়িতা অর্থাৎ শরণার্থীর বাঞ্ছা পূরণে অকৃপণ (বৃষ্ণা)–এই হেন যথোক্তগুণসম্পন্ন ইন্দ্রের সহায়তায়, হে মনুষ্যগণ (নরঃ)! হে যোদ্ধাগণ (যুধঃ)! তোমরা (যুদ্ধে) জয়লাভের সামর্থ্য লাভ করো (জয়ত) এবং সেই শত্রুদের অভিভব করা (তৎ সহধ্ব) ৷ ৩৷
সেই বাণধারী (ইমুহস্ত), সেই ধনুর্ধর বা খঙ্গ ইত্যাদি ধারণকারী (নিষঙ্গী), বশবর্তী অনুচরগণের সাথে সংযোজনশীল (বশী সংস্রষ্টা), সেই যোদ্ধা ইন্দ্ৰ আপন সামর্থ্যে পরকীয় সৈন্যের নিমিত্ত একীভবনশীল (যুধ ইন্দ্র গণেন)। তিনি কেবল অনুচরগণের সাথে সংযুক্তই নন, অধিকন্তু তিনি সংসৃষ্টজিৎ অর্থাৎ সঙ্ীভূতভাবে তাঁর অভিমুখে আগত শত্রুদের জেতা। সেই সোমরক্ষক (সোমপাঃ), বাহুবলবান বা বাহুদ্বয়ের দ্বারা অভিভবকারী (বাহুস্পর্ধী), ভয়ঙ্কর ধনুযুক্ত (উগ্রধ), শত্রুদেহে বাণক্ষেপনকারী (প্রতিহিতাভিঃ অস্তা)। এতাদৃশ গুণণাপেত ইন্দ্রের সাহায্যে জয়লাভ করো এবং শত্রুদের অভিভব করো ৷ ৪৷৷
পরের বল সম্পর্কে অভিজ্ঞ অর্থাৎ সকলের বলভূত (বলবিজ্ঞায়), মহান্ বা পুরাতন (স্থবিরঃ), প্রকৃষ্ট বীর বা পরাগত বলও যাঁর শৌর্যে পরাহত (প্রবীরঃ), অভিভবন-শক্তিশালী (সহস্বান), অন্নবান্ বা বেগবান্ (বাজী), শত্রুবর্গের অভিভবনে পারঙ্গম (সহমানঃ), উমূর্ণ বলশালী (উঃ), সর্বদিকে বলবন্ত অনুচর সমন্বিত হয়ে শত্রুসেনাভিমুখে গমনশীল (অভিবীরঃ অভিষত্বা), শবর্গীয় বলের জয়কর্তা (সহোজিৎ), পরকীয় ধেনুকে স্বকীয়ত্বে আনয়নকারী (গোবিদ), এমন গুণবিশিষ্ট হে ইন্দ্র! আমাদের নিমিত্ত বিজয়াত্মক রথে আরোহণ করো (ইন্দ্র জৈত্ৰং রথং আতিষ্ঠ) ৫
হে সমান-বুদ্ধি-কর্মসম্পন্ন যোদ্ধাগণ (সখায়ঃ)! তোমরা শত্রুধর্ষণসমর্থ বিক্রান্ত (ইমং বীরং), অতএব এই উনূর্ণবল ইন্দ্রের পশ্চাতে অবস্থান পূর্বক তুষ্ট হও (অনু হর্ষধ্বং); (অর্থাৎ ইন্দ্ৰ হেন বীরকে অগ্রে রক্ষা পূর্বক তোমরা তাঁর পশ্চাৎ হতে উৎসাহিত হও)। তথা শক্ৰহননের নিমিত্ত উদ্যোগবন্ত ইন্দ্রের পশ্চাতে অবস্থান পূর্বক তোমরা নিজেরাও উদ্যোগী হও (ইন্দ্রং অনু সংরভধ্বম)। (এই ইন্দ্র) শত্রুসঙ্রে জেতা অথবা শত্ৰুপুরী জয়কারী (গ্রামজিতং), শত্রুর গাভীগুলির জেতা (গোজিত), বাহুদ্বয়ে বজ্রধারী (বজ্রবাহং), যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভকারী বা শত্রুদের মর্দনকারী (জয়ন্ত অজ্ঞ), আপন পরাক্রমে শত্রুসৈন্যের প্রকৃষ্ট হিংসক (ওজস্য প্রমৃণন্তং) ॥.৬
বলের দ্বারা (সহসা) যুদ্ধক্ষেত্রসমূহে (গোত্রাণি) প্রবেশপূর্বক নিদয়রূপে অবস্থানকারী (অদায়ঃ), উম্পূর্ণ বলশালী বীর (উগ্রঃ), বহুবিধ ক্রোধসমন্বিত (শতমন্যুঃ), যুদ্ধক্ষেত্র হতে কেউই যাঁকে অপসারিত করতে অক্ষম (দুঃ-চ্যবনঃ), শত্রুসেনার অভিভবিতা অর্থাৎ শত্রুগণকে পরাভূতকারী (পৃতনাষাট), শত্রুগণ যাঁকে প্রহার করতে অক্ষম (অযোধ্যঃ),–এই হেন ইন্দ্র যুদ্ধে আমাদের সেনাবর্গকে প্রকর্ষের সাথে রক্ষা করুন (যুৎসু অস্মাকং সেনাঃ প্রাবতু)। ৭।
হে দেবগণের পালক বৃহস্পতি! তুমি রাক্ষসগণের হন্তা অর্থাৎ শত্রু (রক্ষোহা অমিত্রা); তুমি শত্রুদের প্রকর্ষের সাথে মর্দনের নিমিত্ত (অপবাধমানঃ শত্রু প্রভঞ্জন) সর্বতো গমন করো। তুমি শত্রুর প্রকৃত হিংসা হতে আমাদের শরীরের রক্ষার নিমিত্ত হও (অমিত্রা প্রমৃণন অস্মাকং তনূনাং অবিতা এধি)। ৮৷৷
ইন্দ্র আমাদের অমিতাবর্গকে মর্দনের নিমিত্ত (অভিভঞ্জতীনাং) জয়শীল (জয়ন্তীনাং) দেবসেনাগণের নেতা হোন (আসাং দেবসেনানাং ইন্দ্রো নেতা অস্তু)। বৃহস্পতি সম্মুখে আগমন করুন; এবং দক্ষিণা, যজ্ঞ ও সোম সম্মুখে আগমন করুন। (এখানে দক্ষিণা শব্দে যজ্ঞে দীয়মানা গোরূপা দক্ষিণা বিবক্ষিত)। তথা মরুৎ দেবতাগণ দেবসেনাগণের মধ্যে অর্থাৎ মধ্যভাগে গমন করুন (মরুতো দেবসেনানাং মধ্যে যন্তু)। ৯।
কামসমূহের বর্ষণকারী বা শাস্ত্ৰাস্ত্র-প্রক্ষেপকারী (বৃষ্ণঃ) ইন্দ্রের, শনিবারক রাজনশীল (রাজ্ঞঃ) বরুণের, অদিতিপুত্র আদিত্যগণের ও মরুৎ-বর্গের উল্লীর্ণ ও শত্ৰুপ্ৰসহনসমর্থ বল (উগ্রং শর্ধ) উত্তিষ্ঠিত বা আবির্ভূত হোক (উৎ অস্থাৎ)। তারপর অদীনমনা (মহামনসাং), সর্বভুবন বা সর্বলোক, হতে শক্রবর্গকে বিতাড়নে সমর্থ (ভুবনচ্যবানা), শত্রুর বিনাশকারী (জয়তাং) দেবগণের জয়ধ্বনি (ঘঘাষঃ) উত্তিষ্ঠিত হোক (উৎ অস্থা) ॥ ১০
ধ্বজাশোভিত সংগ্রাম সমুপস্থিত হলে (ধ্বজেষু সমৃতেষু) ইন্দ্র আমাদের রক্ষাকারী হোন। আমাদের প্রেরিত শরগুলি (যা ইষবঃ) জয়লাভ করুক (জয়ন্ত), (অর্থাৎ শত্রগণকে জয় করুক) অথবা (ইষু শব্দে ইষুমন্ত যোদ্ধা ধরলে অর্থ হয়)–আমাদের ধনুর্বাণধারী যোদ্ধাগণ জয়লাভ করুক। আমাদের সম্বন্ধীয় বিক্রান্তকর্মা পুরুষগণ (বীরাঃ) জয়ের দ্বারা উৎকৃষ্ট হয়ে উঠুক (উত্তরে ভবন্তু)। হে দেবগণ (দেবাসঃ)! আপনারাও সেই সংগ্রামে আমাদের রক্ষা করুন (তেষু অস্মন্ অবত), যে সংগ্রামে যোদ্ধাগণ পরস্পরকে আহ্বান করে (হবে)। ১১।
ইদমুচ্ছুয়োহবসানমাগাং শিবে মে দ্যাবাপৃথিবী অভূতাম্। অসপত্নঃ প্রদিশো মে ভবন্তু ন বৈ ত্বা দিষ্মে অভয়ং নো অস্তু ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –কৰ্মাবসানে প্ৰাপণীয় শ্রেষ্ঠ ফল আমরা লাভ করেছি (অবসানং ইদং উৎশ্রেয়ঃ আগাং)। দ্যাবাপৃথিবী অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী আমাদের শ্রেয়ঃপ্রদ অর্থাৎ সৌভাগ্যদায়ক হোক (মে শিবে অভূতা); তথা প্রাচী ইত্যাদি মহান্ দিমূহ আমাদের শত্রুরহিত অর্থাৎ বাধকত্বের হেতুভূত উপদ্রবরহিত হোক (মে প্রদিশঃ অসপত্না ভবন্তু)। হে শত্রু অথবা দেবগণ! আমরা আপনাদের বিদ্বেষ করি না, অতএব আমাদের ভয়বাহিত্য হোক (ন বৈ ত্বা দ্বিষ্মে অভয়ং নঃ অস্তু)। ১।
বঙ্গানুবাদ –হে অভয়ঙ্কর ইন্দ্র! যথা হতে আমরা ভীতি প্রাপ্ত হয়েছি (ভয়ামহে), সেই ভয়ের হেতুভূত স্থান হতে আমাদের অভয় বা ভয়রাহিত্য করো, অর্থাৎ উপদ্রব পরিহার করিয়ে দাও (অভয়ং কৃধি)। আরও, হে ধনবান্ (মঘব) ইন্দ্র! তোমার সম্বন্ধিনী রক্ষণের বা পালনের দ্বারা তুমি আমাদের রক্ষা করতে সমর্থ (উতিভিঃ শগ্ধি)। অনন্তর তুমি আমাদের দ্বেষ্টা অর্থাৎ শত্রুগণকে (দ্বিষঃ) সংগ্রামে বিশেষভাবে বিচ্ছিন্ন করো (বি জহি) এবং বিশেষভাবে বিনাশ করো (মৃধঃ বি জহি)। অথবা–(দ্বিষো মৃধঃ শব্দদ্বয়ের দ্বারা বাহ্যাভ্যন্তররূপা দ্বিবিধ শত্রু বিবক্ষিত হলে, অর্থ হয়) আমাদের বাহ্য ও অন্তরের সন্নিহিত বা অসন্নিহিত শত্রুদের বিনাশ করো ॥ ১।
যে হেন ইন্দ্র পর্যায়ক্রমে পূজনীয় (অনুরাধং), আপন ইষ্টসিদ্ধির নিমিত্ত তাকে আমরা আহ্বান করছি (হবামহে)। ইন্দ্রের নিকট এই প্রার্থনার দ্বারা আমরা দ্বিপদা অর্থাৎ পুত্রভৃত্য ইত্যাদি এবং চতুস্পদা অর্থাৎ গো-অশ্ব ইত্যাদির দ্বারা পর্যায়ক্রমে সমৃদ্ধ হবো (অনু রাধ্যাস্ম), (অর্থাৎ পুত্ৰভৃত্য-গবাদিরূপ অভিমত ফলসমৃদ্ধ হবো)। অধিকন্তু, অভিমত ফলের প্রতিবন্ধক (অররুযীঃ) সেনাগণ যেন আমাদের না প্রাপ্ত হয় (নঃ মোপ গুঃ), (অর্থাৎ যেন আমাদের নিকটে না আগমন করতে পারে)! কেবল সমীপস্থ হতে না পারাই নয়, কিন্তু হে ইন্দ্র! সর্বতো ব্যাপ্ত (বিসূচীঃ) শত্রুসেনাদের (দ্রুহঃ) বিশেষভাবে বিনাশ করো। ২।
বৃত্রহা অর্থাৎ আবরক অসুর বা মেঘের হন্তা ইন্দ্র আমাদের ত্রাণকারী (ত্রাতা) হোন। বরেণ্য ইন্দ্ৰ অপরের হাত হতে বা পরে আমাদের রক্ষাকর্তা (পরস্ফানঃ) হোন! সেই ইন্দ্র (সঃ) অন্তে (চরমতঃ), মধ্যদেশে (মধ্যতঃ), পৃষ্ঠভাগে (পশ্চাৎ), পুরোভাগে (পুরস্তাৎ) (অর্থাৎ সর্বত্র) আমাদের রক্ষাকারী হোন (নঃ রক্ষিতা অস্তু)। ৩
হে সর্বজ্ঞ (বিদ্বা) ইন্দ্র! আমাদের বিস্তীর্ণ লোক (উরুং লোকং) অনুক্রমে প্রাপ্ত করিয়ে দিন (অনু নেষি)। আপনি সর্বত্রগামী বা সর্বত্রব্যাপ্ত আদিত্যাখ্য অবিনাশী সত্তা (স্বঃ যৎ জ্যোতিঃ)। আপনি ভয়ের হেতুভূত উপদ্রবের পরিহারক ও ক্ষেম ইত্যাদি সকল অভীষ্টের প্রদায়ক হোন (অভয়ং স্বস্তি)। হে ইন্দ্র! আমরা আপনার মহৎ বা পুরাতন (স্থবির), উসূর্ণবল (উগ্ৰা), শত্রুবিনাশসমর্থ বা সকলের রক্ষাকারী (শরণা), বৃহৎ (বৃহন্ত) বাহুযুগলের (বাহ্) শরণ গ্রহণ করছি। ৪।
অন্তরিক্ষ অর্থাৎ মধ্যমলোক আমাদের ভয়রাহিত্য করুক (অভয়ং করতি), এই সর্বপ্রাণীর নিবাসস্থানভূত অর্থাৎ পরিদৃশ্যমান দ্যাবাপৃথিবী (উভে ইমে) আমাদের অভয় করুক। তথা পশ্চিম দিশা (পশ্চাৎ) আমাদের অভয়প্রদ হোক; পূর্ব দিশা (পুরস্তাৎ), উত্তর দিশা (উত্তরা) ও দক্ষিণ দিশা (অধরা) আমাদের অভয়প্রদায়ক হোক (নঃ অভয়ং অস্তু) ৫
মিত্র অর্থাৎ সুহৃর্গ হতে আমাদের ভয়রাহিত্য হোক; (সর্বদা হিতকরী পুরুষ হলেন মিত্র; তার হতে ভয় থাকে না। তবে কি নিমিত্ত ভয়রাহিত্য আশা করা হচ্ছে? আসলে, তাদের নিকট হতে ভয়ব্যতিরিক্ত হিতফল সর্বদা প্রার্থনা করা হচ্ছে)। অমিত্র অর্থাৎ শত্রুবর্গের নিকট হতে আমাদের অভয় হোক (অভয়ং মিত্রাৎ অভয়ং অমিত্রাৎ)। পরিজ্ঞাত শক্ত হতে অপরিজ্ঞাত অর্থাৎ গূঢ় শত্রু হতে আমাদের অভয় হোক (জ্ঞাতাৎ অভয়ম্ পুরঃ যঃ)। রাত্রি ও দিবা আমাদের অভয় হোক (অভয়ং নক্ত অভয়ং দিবা), (অহোরাত্ৰব্যাপী অভয় প্রার্থনার দ্বারা কালনিবন্ধন ভয় পরিহারের প্রার্থনা করা হচ্ছে)। সর্ব দিশা (আশা) সর্বদা অভয়কামী আমার মিত্রবৎ হিতকরী হোক (মম মিত্রং ভবন্তু) ॥ ৬
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি অভয়গণে পঠিত হয়। নক্ষত্র কল্পে (১৮), শান্তি কল্পে (১৬) ও পরিশিষ্ট ইত্যাদিতে (৫৩) এই সূক্তটির গণপ্রযুক্ত বিনিয়োগ পাওয়া যায় ৷ (১৯কা, ২অ. ৬সূ.)।
অসপত্নং পুরস্তাৎ পশ্চাদ্যে অভয়ংকৃত। সবিতা মা দক্ষিণত উত্তরাত্মা শচীপতিঃ ॥১॥ দিবো মাদিত্য রক্ষন্তু ভূম্য রক্ষগ্নয়ঃ। ইন্দ্রাগ্নী রক্ষং মা পুরস্তাদর্শ্বিবভিতঃ শৰ্ম যচ্ছতাম। তিরস্টীনঘ্ন্যা রক্ষতু জাতবেদা ভূতকৃত মে সর্বতঃ সন্তু বর্ম৷৷ ২৷৷
বঙ্গানুবাদ –পূর্বদিক আমাদের সপত্নরাহিত্য (অসপত্নং) অর্থাৎ শত্রুজনিত বাধা পরিহার করুক। পশ্চিম দিক (পশ্চাৎ) আমাদের অভয় দান করুক। সকলের প্রেরক হে সবিতাদেব! দক্ষিণ দিকে আপনি আমাকে রক্ষা করুন। হে শচীপতি (অর্থাৎ ইন্দ্রাণীর পতি ইন্দ্রদেব)! আপনি আমাকে উত্তর দিক্ হতে রক্ষা করুন ॥১॥
আদিত্যগণ (অর্থাৎ অদিতির পুত্র সকল দেবগণ) দ্যুলোক হতে (দিবঃ) আমাকে রক্ষা করুন। (অর্থাৎ বজ্র ইত্যাদি দৈবী আপদ হতে রক্ষা করুন)। অশ্বিদ্বয় (অর্থাৎ সূর্যপুত্র দেববৈদ্য নাসত্য ও দস্র নামক দেবযুগল) আমাদের সর্বত্র সুখ প্রদান করুন (অভিতঃ শর্ম যচ্ছতা)। অঙ্গনশীল গার্হপত্য ইত্যাদি অগ্নিক্রয় ভূমি হতে রক্ষা করুন (ভূম্যা রক্ষন্তু), (অর্থাৎ ভূমি সম্বন্ধীয় উপদ্রব পরিহার করুন)। ইন্দ্র ও অগ্নিদেব (ইন্দ্রাগ্নী) আমাকে পূর্বদিকে হতে পালন করুন (পুরস্তাৎ মাং রক্ষতা)। জাতবেদা (অর্থাৎ জাতমাত্রকেই জ্ঞাতা বা জাতমাত্ৰতেই বিদ্যমান অগ্নিদেব বক্রগামী বা বিদিশগামী (তিরস্টী) আমাদের বধের অযোগ্যরূপে (অগ্ন্যা) রক্ষা করুন। (অর্থাৎ আমরা বিপথগামী হলে তিনি যেন আমাদের সুপথে আনয়ন করেন)। প্রাণীবর্গের নির্মাতা দেবগণ বা গ্রহপিশাচ ইত্যাদি ভূতসমূহের হিংসক দেবগণ (ভূতকৃতঃ) সর্বত্র আমার সুরক্ষক কবচ হোক (বর্ম সন্তু)। ২।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি পরবর্তী তিনটি সূক্ত সহ রাত্রে রাজার শয্যাগৃহে প্রবেশকর্মে শর্করা অভিমন্ত্রিত করে প্রতি দিকে প্রদক্ষিণ পূর্বক প্রক্ষেপে বিনিযুক্ত হয়। পরিশিষ্টে (৪/৫) এর বিধান আছে। অতএব এই অর্থসূক্তটি আথবণ কর্তৃক ব্যবহার হয় ৷ (১৯কা, ২অ. ৭সূ.)।
অধ্যায়: উনিশ
সূক্ত -১৮ : সুরক্ষা
[ঋষি : অথর্বা। দেবতা : মন্ত্রোক্ত। ছন্দ : জগতী, শক্করী।] অগ্নিৰ্মা পাতু বসুভিঃ পুরস্তাৎ তস্মিন্ ক্রমে তস্মিংচ্ছুয়ে তাং পুরং প্রৈমি। স মা রক্ষতু স মা গোপায়তু তস্মা আত্মানং পরি দদে স্বাহা ॥১॥ বায়ুর্মান্তরিক্ষেণৈতস্যা দিশঃ পাতু তস্মিন্ ক্রমে তস্মিংচ্ছুয়ে তাং পুরং প্রৈমি। স মা রক্ষতু স মা গোপায়তু তম্মা। আত্মানং পরি দদে স্বাহা ॥২ সোমো মা রুদ্রৈর্দক্ষিণায়া দিশঃ পাতু তস্মিন্ ক্রমে তস্মিংচ্ছুয়ে তাং পুরং প্রৈমি। স মা রক্ষতু স মা গোপায়তু তস্মা আত্মানং পরি দদে স্বাহা ॥৩ বরুণো মাদিত্যৈরেতস্যা দিশঃ পাতু তস্মিন্ ক্রমে তস্মিংজ্জ্বয়ে তাং পুরং প্রৈমি। স মা রক্ষতু স মা গোপায়তু তম্মা। আত্মানং পরি দদে স্বাহা ॥৪॥ সূর্যো মা দ্যাবাপৃথিবীভ্যাং প্রতীচ্যা দিশঃ পাতু তস্মিন্ ক্রমে তস্মিংচ্ছুয়ে তাং পুরং প্রৈমি। স মা রক্ষতু স মা গোপায়তু তস্মা। আত্মানং পরি ঈদে স্বাহা ॥আপো মৌষধীমতীরেতস্যা দিশঃ পান্তু তাসু ক্রমে তাসু শ্রয়ে তাং পুরং প্রৈমি। তা মা রক্ষন্তু তা মা গোপায়ন্তু তাভ্য আত্মানং পরি দদে স্বাহা ॥ ৬ বিশ্বকর্মা মা সপ্তঋষিভিরুদীচ্যা দিশঃ পাতু তস্মিন্ ক্রমে তস্মিংছুঁয়ে তাং পুরং প্রৈমি। স মা রক্ষতু স মা গোপায়তু তস্মা আত্মানং পরি দদে স্বাহা ॥৭ ইন্দ্রো মা মরুত্বানেতস্যা দিশঃ পাতু তস্মিন্ ক্রমে তস্মিংচ্ছুয়ে তাং পুরং প্রৈমি। স মা রক্ষতু স মা গোপায়তু তস্মা আত্মানং পরি দদে স্বাহা ॥ ৮ ৷৷ প্রজাপতির্মা প্রজননবাৎসহ প্রতিষ্ঠায়া ধ্রুবায়া দিশঃ পাতু তস্মিন্ ক্রমে তস্মিংচ্ছুয়ে তাং পুরং প্রৈমি। স মা রক্ষতু স মা গোপায়তু তস্মা। আত্মানং পরি দর্দে স্বাহা ॥৯৷৷ বৃহস্পতির্মা বিশ্বৈর্দেবৈরূধ্বায়া বায়া দিশঃ পাতু তস্মিন্ ক্রমে তস্মিংহূয়ে তাং পুরং প্রৈমি। স মা রক্ষতু স মা গোপায়তু তস্মা। আত্মানং পরি দদে স্বাহা ॥১০৷
বঙ্গানুবাদ –পৃথিবীস্থ অগ্নিদেব বসু নামক দেববর্গের সাথে পূর্বদিকে (পুরস্তাৎ) আমাকে রক্ষা করুন (অগ্নিঃ মা পাতু)। যেস্থানে পাদপ্রক্ষেপ করবো (ক্রমে), সেই (তস্মি) আশ্রয়ে বা অবস্থানে (শ্রয়ে); যে শয্যাগৃহে গমন করবো (তাং পুরং প্রৈমী), সেই সর্বত্র অগ্নিদেব আমাকে রক্ষা করুন (অগ্নিঃ মা পাতু)। (অথবা–সেই অগ্নিদেব আমার রক্ষাকর্তা হলে পাদপ্রক্ষেপ করবো, সেই অবস্থান গ্রহণ করবো, সেই শয্যাগৃহে গমন করবো)। সেই বসুমান্ (অর্থাৎ ধনসম্পন্ন) অগ্নি আমাকে রক্ষা করুন (মা রক্ষতু), সেই অগ্নি আমার অহিতনিবারণ রূপ রক্ষণ ও হিতকরণরূপ পালন দান করুন (মা গোপায়তু)। আমি সর্বতোরক্ষক সেই বসুমান্ অগ্নির অধীনে নিজেকে স্বাহা সহকারে রক্ষণার্থে বা সমর্পণ দান করছি (আত্মানং পরি দদে স্বাহা) ॥১॥
অন্তরীক্ষস্থ বায়ুদেব স্বাধিষ্ঠিত মধ্যমলোকের সাথে পূর্বদিকে (এতস্যাঃ দিশঃ–অর্থাৎ পূর্বৰ্মত্রে উল্লিখিতপুরস্তাৎ বা প্রাচ্য দিকে) আমাকে রক্ষা করুন। [পরবর্তী অংশ পূর্ববর্তী মন্ত্রবৎ; কেবল অগ্নিদেব স্থলে বায়ুদেব পঠনীয় ] ॥২৷৷
সোমদেব রোদনকারক রুদ্ৰনামক দেবগণের সাথে দক্ষিণ দিকে আমাকে রক্ষা করুন। [পরবর্তী অংশ প্রথম মন্ত্রের মতো; কেবল অগ্নিদেব স্থলে সোমদেব পঠনীয়] ৷ ৩৷৷
বারক দেবতা বরুণ অদিতিপুত্র আদিত্য নামক দেবগণের সাথে দক্ষিণ দিকে (এতস্যা দিশঃ–অর্থাৎ পূর্বৰ্মন্ত্রে উল্লিখিত দক্ষিণায়া দিশঃ বা দক্ষিণ দিকে) আমাকে রক্ষা করুন। [পরবর্তী অংশ প্রথম মন্ত্রের মতো; কেবল অগ্নিদেব স্থলে বরুণদেব পঠনীয়] ৷৷ ৪
সূর্যদেব অর্থাৎ সর্বপ্রেরক আদিত্য দ্যাবাপৃথিবীর পশ্চিম দিকে (প্রতীচ্য দিশঃ) আমাকে রক্ষা করুন।[পরবর্তী অংশ প্রথম মন্ত্রের মতো; কেবল অগ্নিদেব স্থলে সূর্যদেব পঠনীয় ৷৷ ৫
জলদেবীগণ (আপঃ বা অপাং) ওষধীসমূহের সাতে (ওষধীমতী) আমাকে পশ্চিম দিকে (এতস্যা দিশঃ–অর্থাৎ পূর্ব মন্ত্রে উল্লিখিত প্রতীচ্য দিশঃ) রক্ষা করুন। [পরবর্তী অংশ প্রথম মন্ত্রের অনুরূপ; কেবল অগ্নিদেব স্থলে আপঃ বা জলদেরীগণ পঠনীয়] ৷৷ ৬ ৷
সকলের সৃজনকর্তা বা বিশ্বজগতের কারণভূত পরমাত্মা দেব বিশ্বকর্মা তার আপন মনঃসৃষ্ট সপ্তর্ষিগণের সাথে আমাকে উত্তর দিকে (উদীচ্যাঃ দিশঃ) রক্ষা করুন। [পরবর্তী অংশ প্রথম মন্ত্রবৎ; কেবল অগ্নিদেব স্থলে বিশ্বকর্মা পঠনীয়)। ৭৷৷
ইন্দ্রদেব মেঘবর্গের (মরুত্বান) অর্থাৎ মরুৎ-গণের সাথে উত্তর দিকে (এতস্যা দিশঃ) আমাকে রক্ষা করুন। পরবর্তী অংশ প্রথম মন্ত্রের অনুরূপ; কেবল অগ্নিদেব স্থলে মরুৎ-বর্গ পঠনীয় ] ॥ ৮৷
সকল জগতের উৎপাদনসাধক অর্থাৎ প্রকর্যের সাথে জায়মানা মনুষ্য ইত্যাদি সহ চরাচরাত্মিকা প্রজাগণের পতি বা স্রষ্টা দেব প্রজাপতি সর্বজগতের আধারভূতা স্থির ভূমির দিকে অর্থাৎ নিম্ন দিকে (ধ্রুবায়াঃ দিশঃ) আমাকে রক্ষা করুন। [পরবর্তী অংশ প্রথম মন্ত্রের মতো; কেবল অগ্নিদেব স্থলে দেব প্রজাপতি পঠনীয় ] ৯।
দেবগণের পতি দেব বৃহস্পতি (বৃহঃ পতি) সকল দেবতা সহ (বিশ্বৈ দেবৈ) উপরিস্থিত দিকে অর্থাৎ আকাশের দিকে (উধায়াঃ দিশঃ) আমাকে রক্ষা করুন। [পরবর্তী অংশ প্রথম মন্ত্রবৎ; কেবল অগ্নিদেব স্থলে দেব বৃহস্পতি পঠনীয় ]। ১০।
[ঋষি : অথর্বা। দেবতা : মন্ত্রোক্ত। ছন্দ : ত্রিষ্টুপ, অনুষ্টুপ।] অগ্নিং তে বসুবন্তমৃচ্ছন্তু। যে মাঘায়বঃ প্রাচ্যা দিশোহভিদাসাৎ ॥১॥ বায়ুং তেহরিক্ষবন্তমৃচ্ছন্তু। যে মাঘায়ব এতস্যা দিশোহভিদাসাৎ ॥ ২॥ সোমং তে রুদ্রবন্তমৃচ্ছ। যে মাঘায়বো দক্ষিণায়া দিশোহভিদাসাৎ ॥৩॥ বরুণং ত আদিত্যবন্তমৃচ্ছ। যে মাঘায়ব এতস্য দিশোহভিদাসাৎ ॥৪॥ সূর্যং তে দ্যাবাপৃথিবীবন্তমৃচ্ছন্তু। যে মাঘায়বঃ প্রতীচ্যা দিশোহভিদাসাৎ ॥৫৷৷ অপস্ত ওষধীমতীঋচ্ছন্তু। যে মাঘায়ব এতস্যা দিশোহভিদাসাৎ ॥৬॥ বিশ্বকর্মাণাং তে সপ্তঋষিবন্তমৃচ্ছন্তু। যে মাঘায়ব উদীচ্যা দিশোহভিদাসাৎ ॥৭৷৷ ইন্দ্রং তে মরুত্বমৃচ্ছ। যে মাঘায়ব এতস্যা দিশোহভিদাসাৎ ৮ প্রজাপতিং তে প্রজননবমৃচ্ছন্তু। যে মাঘায়বো ধ্রুবায় দিশোহভিদাসাৎ ॥৯॥. বৃহস্পতিং তে বিশ্বদেববন্তমৃচ্ছন্তু। যে মাঘায়ব ঊর্ধ্বায়া দিশোহভিদাসাৎ ১০
বঙ্গানুবাদ –হিংসালক্ষণ যে পাপ অর্থাৎ জিম্ৰাংসু যে শত্ৰুবর্গ (অঘায়বঃ) পূর্বদিক হতে (প্রাচ্যাঃ দিশঃ) আগত হয়ে আমাকে সর্বতো হিংসা করবে (অভিদাসাৎ), সেই শত্রুবর্গ বসুদেবগণের সমভিব্যাহারী (বসুবন্তম) অগ্নিকে মরণার্থে প্রাপ্ত হোক (ঋচ্ছ)। ১।
যে হিংসক শত্রুগণ পূর্বদিক হতে (এতস্যাঃ দিশঃ) আগত হয়ে আমাকে সর্বতো হিংসা করবে, তারা মরণের নিমিত্ত অন্তরীক্ষে অধিষ্ঠিত বায়ু দেবতার নিকট গমন করুক৷ ২৷
যে হিংসক শত্রুবর্গ দক্ষিণ দিক হতে (দক্ষিণায়াঃ দিশঃ) আমাকে সর্বতো হিংসা করবে, তারা রুদ্রগণ সমভিব্যাহারী (রুদ্রবন্তম) সোমদেবতার নিকট মরণার্থে গমন করুক ॥ ৩
যে হিংসক শত্রুবর্গ দক্ষিণ দিক হতে (এতস্যাঃ দিশঃ) আগত হয়ে আমাকে সর্বতো হিংসা করবে, তারা মরণের নিমিত্ত আদিত্যগণ সমভিব্যাহারী (আদিত্যবন্তম) অরিষ্টনিবারক বরুণ দেবতার সমীপে গমন করুক। ৪
যে হিংসক শত্রুবর্গ পশ্চিম দিক হতে (প্রতীচ্যাঃ দিশঃ) আগমন পূর্বক আমাদের সর্বতো হিংসা করবে, তারা দ্যাবাপৃথিবী সমভিব্যাহারী (দ্যাবাপৃথিবীবন্তম) সূর্যদেবের সকাশে মরণের নিমিত্ত গমন করুক ॥ ৫॥
যে হিংসক শত্রুবর্গ পশ্চিম দিক হতে (এতস্যাঃ দিশঃ) আগত হয়ে আমাদের সর্বতো হিংসা করবে, তারা ওষধীমতী জলসমূহের (অর্থাৎ জলদেবীগণের) নিকট মরণের নিমিত্ত গমন করুক৷ ৬ ৷
যে হননেচ্ছু শত্রুবর্গ উত্তর দিক হতে (উদীচ্যাঃ দিশঃ) আমাদের সর্বতো হিংসা করবে, তারা সপ্তর্ষি সমন্বিত (সপ্তঋষিবন্তং) বিশ্বজগতের কারণভূত দেব বিশ্বকর্মার সম্মুখে মরণের নিমিত্ত গমন করুক। ৭৷
যে হিংসক শত্রুগণ উত্তর দিক হতে (এতস্যাঃ দিশঃ) আমাদের সর্বতে হিংসা করবে, তারা মরুৎগণ সমভিব্যাহারী ইন্দ্রদেবের নিকট মরণের নিমিত্ত গমন করুক ॥ ৮
যে অনিষ্টসাধনেচ্ছু শবর্গ স্থির ভূমির দিকে অর্থাৎ নিম্ন দিক হতে (ধ্রুবায়াঃ দিশঃ) আগমন পূর্বক আমাদের সর্বতো হিংসা করবে, তারা চরাচরাত্মকা প্ৰজাগণের পতি প্রজাপতি দেবতার নিকট মরণের নিমিত্ত গমন করুক। ৯।
যে বধাভিলাষী শত্রুগণ ঊর্ধ্ব দিক্ হতে (উধ্বায়াঃ দিশঃ) আগমন পূর্বক আমাদের সর্বতো হিংসা করবে, তারা সকল দেবতা সমন্বিত (বিশ্বদেববন্তং) বৃহস্পতি দেবতার নিকট মরণের নিমিত্ত গমন করুক। ১০।
বঙ্গানুবাদ –মিত্র অর্থাৎ আহবনীয় ইত্যাদি রূপে প্ৰণীয়মান অগ্নিদেব স্বনিবাসস্থানভূত পৃথিবীলোকের সাথে যে পুরী রক্ষা করতে উক্ৰান্তবান (উৎ অক্রামৎ) হয়েছেন, সেই পৃথিবীলোকের অভিমানী দেবতা অগ্নি কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধ নগরী, (হে রাজ!), তোমাদের প্রকর্ষের সাথে প্রাপ্ত করাচ্ছি (নয়ামি)। সেই পুরী বা শয্যগৃহের অভিমুখে প্রবেশোন্মুখ হও (আ বিশত); অতঃপর সেই পুরী বা শয্যাগৃহে অন্তঃপ্রবিষ্ট হও (প্র বিশত)। (অর্থাৎ সেই শয্যাস্থানে বা আপন সৌধে নিবিষ্ট হও)। সেই শয্যাগৃহ বা পুরী প্রবিষ্ট বা অভিনিবিষ্ট ; তোমাদের সুখ (শর্ম), কবচ বা পরের অভেদ্যত্বলক্ষণ আবরণ (বর্ম) প্রদান করুক (যচ্ছতু) ১
বায়ু অর্থাৎ মাতরিশ্বা দেব আপন নিবাসস্থানভূত মধ্যমলোকের সাথে (অন্তরিক্ষেণ) যে পুরী রক্ষা করতে উক্ৰান্তবান্ হয়েছেন, সেই অন্তরিক্ষলোকের অভিমানী দেবতা বায়ু কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধ নগরী, (হে রাজন!)….[অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রবৎ ]। ২।
সূর্য অর্থাৎ সর্বপ্রেরক আদিত্যদেব স্বনিবাসস্থানভূত দ্যুলোকের সাথে (দিবা) যে পুরী রক্ষা করতে উক্ৰান্তবান্ হয়েনে, সেই দ্যুলোকাভিমানী দেবতা সূর্য কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধ নগরী, (হে রাজ!)….[ অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রের ন্যায় ] ৩
চন্দ্রমা অর্থাৎ সর্ব লোকের আহ্বদকর চন্দ্রদেব তার উপভোগ্য অশ্বিনী ইত্যাদি নক্ষত্রগণের সাথে যে পুরী রক্ষা করতে উক্রান্ত হয়েছেন, সেই নক্ষত্রাধিপতি চন্দ্রমা কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধা নগরী, (হে রাজন!)..[ অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রের অনুরূপ ]। ৪
সোম অর্থাৎ তরু-গুল্ম ইত্যাদি ওষধীগণকে রসপ্রদানের দ্বারা পোষক দেবতা তাঁর স্বপোষ্যগণের সাথে যে পুরী রক্ষা করতে উক্রান্ত হয়েছেন, সেই ওষধী ইত্যাদির অভিমানী দেবতা কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধ নগরী, (হে রাজন!)… [ অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রের সমতুল ] ॥ ৫৷
যজ্ঞ অর্থাৎ জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি প্রকৃতি-বিকৃত্যাত্মক সকা ঐতু তার বিহিত যথোক্ত দক্ষিণার সাথে যে পুরী রক্ষা করতে উক্রান্ত হয়েছেন সেই দক্ষিণাভিমানী দেবতা কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধ নগরী, (হে রাজন!)…[ অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রের অনুসরণীয়] ৬
সমুদ্র অর্থাৎ নদমশীলা নদীসমূহের পতি তার অধীনস্থ অম্বুরাশির সাথে (নদীভিঃ) যে পুরী রক্ষা করতে উক্ৰান্তবান্ হয়েছেন, সেই নদীপতি সমুদ্র কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধা নগরী, (হে রাজন!)…[ অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রের অনুরূপ ] ৷৷ ৭৷
ব্ৰহ্ম অর্থাৎ সাঙ্গ বা সর্বাবয়ববিশিষ্ট বেদ (সংহিতা, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ ইত্যাদি সমন্বিত অপৌরুষেয় বেদ) বেদবিহিত যজ্ঞ ইত্যাদি কর্মকুশল ব্রহ্মচারিগণের সাথে (ব্রহ্মচারিভিঃ) যে পুরী রক্ষা করতে উক্রান্ত হয়েছেন, সেই শ্রৌতস্মার্ত-কর্মকারীগণের বা সাঙ্গবেদাধ্যায়ীগণের উপাস্য ব্রহ্ম কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধ নগরী, (হে রাজন!)…[ অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রের অনুরূপ ] ॥ ৮।
ইন্দ্র অর্থাৎ পরমৈশ্বর্যশালী সমস্ত-দেবতাধিপতি দেবতা বীরকর্মসমূহ বা আপন বাহুশৌর্যের (বীর্যের্ন) সাথে যে পুরী রক্ষা করতে উক্ৰান্তবান্ হয়েছেন, সেই সেনালক্ষণ বলের অভিমানী দেবতা ইন্দ্র কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধ নগরী, (হে রাজন্!)…[ অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রবৎ] ৯
দেবগণ (দেবাঃ) অর্থাৎ দ্যোতনশীল অমরগণ অমরণসাধন সুধারসের সাথে (অমৃতেন) যে পুরী রক্ষা করতে উক্ৰান্তবান হয়েছেন, সেই অমৃতাভিমানী দেবগণের দ্বারা রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধ নগরী, (হে রাজন!)… [ অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রের অনুরূপা। ১০।
প্রজাপতি অর্থাৎ প্রজাগণের পতিরূপ দেবতা প্রকর্ষের সাথে জায়মান মনুষ্য ইত্যাদির সাথে (প্রজাভিঃ) যে পুরী রক্ষা করতে উক্ৰান্তবান্ হয়েছেন, সেই প্রজাবর্গের অভিমানী দেবতা কর্তৃক রক্ষিত পুরী বা শয্যাগৃহলক্ষণ প্রসিদ্ধ নগরী, (হে রাজন!)…[ অবশিষ্ট অংশ প্রথম মন্ত্রবৎ]। ১১..
অপ ন্যধুঃ পৌরুষেয়ং বধং যমিন্দ্রাগ্নী ধাতা সবিতা বৃহস্পতিঃ। সোমমা রাজা বরুণো অশ্বিনা যঃ পূষাম্মা পরি পাতু মৃত্যোঃ ॥১॥ যানি চকার ভূবনস্য যম্পতিঃ প্রজাপতির্মাতরিশ্বা প্রজাভ্যঃ। প্রদিশো যানি বসতে দিশশ্চ তানি মে বর্মাণি বহুলানি সন্তু ॥ ২॥ যৎ তে তনুম্বনহ্যন্ত দেবা রাজয়ো দেহিনঃ। ইন্দ্রো যচ্চত্রে বর্ম তদন্মান্ পাতু বিশ্বতঃ ॥ ৩৷৷ বর্ম মে দাবাপৃথিবী বর্মাহবর্ম সূর্যঃ।. বর্ম মে বিশ্বে দেবাঃ ক্রন্ মা মা প্রাপৎ প্রতীচিকা ॥ ৪৷৷
বঙ্গানুবাদ –আমাদের প্রতি হিংসান্বিত হয়ে যে বধসাধন কর্ম (যং বধম) (বলগলক্ষণ অর্থাৎ চলমান বা শস্ত্ৰাস্ত্র ইত্যাদিরূপ হননসাধন আভিচারিক ক্রিয়া) আমাদের শত্রুগণ গূঢ়ভাবে (অপ ন্যধুঃ) আমাদের অভিমুখে প্রেরণ করেছে, সেই অপ্রকাশ্য শত্রুর দ্বারা প্রেরিত মৃত্যুসাধন বা মৃত্যুরূপা কর্ম হতে (মৃত্যোঃ ) আমাদের বা আমাদের কবচধারী রাজাকে ইন্দ্র ও অগ্নি (ইন্দ্রাগ্নী), ধাতা, সবিতা, বৃহস্পতি, রাজা সোম, বরুণ, অশ্বিযুগল (অশ্বিনা), যম ও পূষা সর্বতঃ রক্ষা করুন (পরি পাতু–পরিতঃ পান্তু) ॥১॥ ভুতজাতের পতি বা পালক (ভুবনস্য পতিঃ) যে প্রজাপতি মাতরিশ্বা (অর্থাৎ সূত্ৰাত্মা বায়ু)-রূপে বিরাজমান, তিনি আপন প্রজাগণের রক্ষণার্থে যে বর্ম বা কবচসমূহের দ্বারা আচ্ছাদন করেছিলেন (বসতে), প্রজাপতির দ্বারা নির্মিত যে বর্ম বা কবচ প্রাচ্য ইত্যাদি মহা-দিসমূহ ও অবান্তর দিসকল (প্রদিশঃ) ধারণ করেছিল, সেই বর্ম বা কবচ যুদ্ধাভিলাষী আমার বা আমাদের (মে) প্রভূত সংখ্যায় প্রাপ্তি হোক (বহুলানি সন্তু)। (অর্থাৎ সেই কবচসমূহ সর্ব দিক্ হতে আমাদের রক্ষাকারী হোক)। ২।
দ্যুলোকে রাজমান শরীরী (রাজয়ঃ) দেবতাগণ অসুরযুদ্ধে আপন দেহরক্ষার্থে যে বর্ম পরিধান বা ধারণ করেছিলেন (অনহ্যন্ত), এবং ইন্দ্রদেব যে বর্ম শত্ৰুবিজয়ার্থে (যৎ চক্রে) ধারণ করেছিলেন, তাঁদের দ্বারা ধারিত সেই কবচ যুদ্ধোদ্যত আমাদের (অস্মা) সর্বতঃ (বিশ্বতঃ) শক্রকৃত প্রহার হতে রক্ষা করুক (পাতু)। ৩।
দ্যো অর্থাৎ স্বর্গলোক ও পৃথিবী (দ্যাবাপৃথিবী) উভয়ে আমার (নিমিত্ত) কবচ (বর্ম) (নির্মাণ বা প্রেরণ) করুন। অগ্নি আমার (নিমিত্ত) কবচ (বর্ম) (নির্মাণ বা প্রেরণ) করুন। ইন্দ্র প্রমুখ সকল দেবতা যুদ্ধাভিলাষী আমার বা আমাদের রাজার (নিমিত্ত) কবচ (বর্ম) (নির্মাণ বা প্রেরণ) করুন (ক্র)। শত্রুসেনা অজ্ঞাতকুলাঞ্চনা হয়ে অর্থাৎ গুপ্ত-রীতিতে (প্রতীচিকা) যেন যুদ্ধোদ্যত কবচধারী আমাকে না প্রাপ্ত হয় (মা মা প্রাপৎ)। (বক্তব্য এই যে, কবচধারণের দ্বারা দৃপ্ত আমি হেন দেবানুগৃহীতের সম্মুখে শত্রুবর্গ প্রকাশ্যে আগমন করুক, আমি তাদের হননে সমর্থ হবো)। ৪ ৷৷
টীকা— তৃতীয় অনুবাকের ছটি সূক্তের মধ্যে উপযুক্ত এক ঋক্-বিশিষ্ট প্রথম সূক্তটি ব্রহ্মতেজঃকামী জনের গায়ত্রী নামক মহাশান্তিকর্মে বিনিয়োগ হয়। নক্ষত্র কল্পে (১৭) এ সম্পর্কে বলা হয়েছে। নক্ষত্র কল্পে আরও বলা হয়েছে–ছন্দোগণঃ (২২) গায়ত্ৰাং সমাসঃ (২২।২৩) আঙ্গিরস্যাং ইতি (ন.ক. ১৮) ৷ (১৯কা. ৩অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –বিংশতিকাণ্ডাত্মিকা এই শাখায় (অর্থাৎ অথর্ববেদীয় শৌনক শাখায়) বিদ্যমান অনুবাক, সূক্ত, গণবিশেষ ইত্যাদির সংজ্ঞারূপ শব্দের দ্বারা অনুবাক ইত্যাদির দ্রষ্টা ঋষিগণ প্রতিপাদিত হয়েছেন।–যথা, আঙ্গিরস ঋষির নিমিত্ত আদিতে পঞ্চম অনুবাক হতে এই আহুতি স্বাহুত হোক ॥ ১।
ষষ্ঠে অনুবাকের নিমিত্ত, সপ্তম ও অষ্টম অনুবাকের নিমিত্ত, নীলনখ নামক ঋষির নিমিত্ত, হরিত নামক ঋষির নিমিত্ত, ক্ষুদ্র নামক ঋষির নিমিত্ত, পৰ্যায়িক নামক ঋষির নিমিত্ত, প্রথম শঙ্খ নামক ঋষির নিমিত্ত, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শঙ্খের নিমিত্ত, উপোত্তম নামক ঋষির নিমিত্ত, উত্তম নামক ঋষির নিমিত্ত, উত্তর নামক ঋষির নিমিত্ত, শিখি নামক ঋষির নিমিত্ত, গণ নামক ঋষির নিমিত্ত, মহাগণ নামক ঋষির নিমিত্ত, সকল বিদ্বান অঙ্গিরার নিমিত্ত, পৃথক সহস্র ঋষিগণের নিমিত্ত এবং ব্রহ্ম নামক বেদস্রষ্টা ঋষির নিমিত্ত আহুতি স্বাহুত হোক। ২-২০
সকল বীরকর্ম (বীর্যাণি) জ্যেষ্ঠ ব্রহ্মা (ব্রহ্মজ্যেষ্ঠা) অর্থাৎ প্রশস্যতম ব্রহ্মা কর্তৃক কৃত। অগ্রে অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে জ্যেষ্ঠ ব্রহ্মা দ্যুলোকে বিস্তারিত হয়েছিলেন (দিবম্ আ ততান)। ব্রহ্মা সকল সৃজ্যমান পদার্থের (ভূতানাং) পূর্বভাবীরূপে উৎপন্ন (প্রথমঃ যজ্ঞে); সেই কারণে অন্য কোন্ দেবতা বা মনুষ্য (কঃ) সেই ব্রহ্মার সাথে স্পর্ধা করতে সমর্থ হবে (ব্ৰহ্মণা স্পর্ধিতুং অতি)? (অর্থাৎ অধিকতর বীর্যবত্তার নিমিত্ত, সর্বোৎকৃষ্ট স্থানের নিবাসিত্বের নিমিত্ত ও সকলের আদিভূতত্বের নিমিত্ত ব্রহ্মার সমান কেউ নেই)। ২১।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি ও পরবর্তী সূক্তটি সম্পদকামী ও অভিচার কর্ম হতে অভিমান জনের নিমিত্ত আঙ্গিরস্যা নামক মহাশান্তি যাগে বিনিয়োগ হয়ে থাকে। নক্ষত্র কল্পে (১৭) এ সম্পর্কে বলা হয়েছে। নক্ষত্র কল্পে আরও বলা হয়েছে–সমাসঃ (১৯।২২।২৩) আঙ্গিরস্যাং ইন্দ্র জুষস্ব (২৫) ইতৈন্দ্রাং (ন. ক. ১৮)। এখানে সমাস শব্দের দ্বারা সূক্তদ্বয় উক্ত হয়েছে ৷ (১৯কা, ৩অ. ২সূ)।
মহাকাণ্ড অর্থাৎ বিংশতি কাণ্ডাত্মক অথর্ববেদের সকল বেদবাক্যের দ্রষ্টা যথাযথ নামধারী ঋষির উদ্দেশে আহুতি স্বাহুত হোক। সেরূপ তৃচো ও একাৰ্চোর উদ্দেশে আহুতি স্বাহুত হোক ৷ ১৮-২০
ক্ষুদ্র নামধেয় যজুর্মন্ত্ৰবাচী ঋষির উদ্দেশে, একান্চ অর্থাৎ পর্যায়সূক্তবাচী ঋষিগণের উদ্দেশে, রোহিত নামক ঋষির উদ্দেশে, সূর্য নামক ঋষির উদ্দেশে, ব্রাত্য নামধেয় ঋষির উদ্দেশে, প্রজাপতি নামক ঋষির উদ্দেশে, বিষাসহি নামধেয় ঋষির উদ্দেশে, মাঙ্গলিক নামক ঋষির উদ্দেশে এবং ব্রহ্মা নামক ঋষির উদ্দেশে এই আহুতি স্বাহুত হোক। ২১-২৯।
[অবশিষ্ট অংশ পূর্ববর্তী সূক্তের ২১তম মন্ত্রের অনুরূপ] ॥ ৩০৷
বঙ্গানুবাদ –দ্যোতমান ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাগণ (দেবাঃ) দ্যোতমান (দেবং) সর্বপ্রেরক আদিত্যকে (সবিতারং) যে হেতুর দ্বারা (যেন) অর্থাৎ যে রক্ষোহনরূপে সর্বত আচ্ছাদন করেছিলেন (পরি অধারয়ন), সেই শত্ৰুনিৰ্হরণাত্মক কারণের দ্বারা (তেন), হে ব্ৰহ্মণস্পতি অর্থাৎ বেদরূপ মন্ত্রের। পালক দেব (ব্ৰহ্মণঃ পতে)! এই মহাশান্তি-প্রযোক্তাকে (ইমং) অর্থাৎ যজমান রাজাকে বা আমাকে রাজ্য রক্ষার্থে (রাষ্ট্রায়) প্রতিস্থাপন করো (পরি ধস্তন)। ১।
হে পরমেশ্বর্যসম্পন্ন ইন্দ্রদেব! তুমি এই সাধক আমাকে বা রাজাকে (ইমং) আয়ুলাভের নিমিত্ত (আয়ুষে) ও চিরকাল (জ্যোক) মহৎ ক্ষাত্রবল অর্থাৎ পরকৃত বাধা-পরিহারক বলে (ক্ষত্রেধি) বলীয়ারূপে অবহিত হতে পারি এবং যাতে (যথা এনং) শান্তিকর্তা (আমি বা রাজা) জরা পর্যন্ত (জরসে) আয়ুলাভ করতে পারি, তেমন ভাবে প্রতিস্থাপিত করো (পরি পত্তন)। ২
হে বাসোভিমানী (অর্থাৎ বস্ত্রের ন্যায় আচ্ছাদনকারী) সোমদেব! এই শান্তিকর্মকারী (ইমং) আমাকে বা যজমানকে দীর্ঘ আয়ুর নিমিত্ত (আয়ুষে), মহান ইন্দ্রিয়সাধ্য রূপ ইত্যাদি উপলব্ধির নিমিত্ত (শ্ৰোত্রায়) ও আদান ইত্যাদি কর্মের নিমিত্ত সর্বত পুষ্ট করো (পরি ধত্তন)। যাতে এই আমি বা রাজা চিরকাল শ্রোত্র ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ে শক্তিমান বা যশস্বী হয়ে জাগ্রত বা অবহিত হতে পারি (জাগরৎ) এবং যাতে শান্তিকর্তা (আমি বা রাজা) জরা পর্যন্ত, আয়ুলাভ করতে পারি, তেমন ভাবে প্রতিস্থাপিত করো ॥ ৩॥
[ এই ঋটি দ্বিতীয় কাণ্ডের ত্রয়োদশ সূক্তের (অর্থাৎ তৃতীয় অনুবাকের তৃতীয় সূক্তের) দ্বিতীয় মন্ত্রে ব্যাখ্যাত হয়েছে]–হে দেবগণ! এই মাণবক অর্থাৎ ব্রাহ্মণকুমারকে বস্ত্র পরিধান করিয়ে দাও (পরি ধত্ত–ইমং মাণবকং বাসঃ পরিধাপয়ত); আমাদের একে তেজের দ্বারা আচ্ছাদিত করে দাও বা পুষ্ট করো (নঃ ইমং বচসা। ধত্ত); এ যেন বৃদ্ধাবস্থায় মরণপ্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ এর যেন অকালমৃত্যু না ঘটে এবং একে শতপরিমিত আয়ুস্মান করো (জরামৃত্যুং দীর্ঘ আয়ুঃ কৃণুত)। ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণের পালক দেবতা বৃহস্পতি এই নির্মিত বসন (এতৎ বাসঃ) ব্রাহ্মণগণের পালক রাজা সোমকে পরিধানের নিমিত্ত (পরিধাতবা) দান করেছিলেন (প্রাযচ্ছৎ)। ৪।
[ এই ঋটিও উপযুক্ত কাণ্ডে (২।১৩।৩) ব্যাখ্যাত হয়েছে। তবে এখানে প্রথম পাদটি ভিন্নতর ]–হে শান্তিপ্রযোক্তা (যজমান)! তুমি সম্যক বার্ধক্য লাভ করো (জরাং সু গচ্ছ), অর্থাৎ জরাকাল পর্যন্ত আয়ুষ্মন হও। এই বসনে আচ্ছাদিত হয়ে (বাসঃ পরি ধৎস্ব), অর্থাৎ এই বসন পরিধানের দ্বারা, গাভীগণের (গৃষ্টীনাং) হিংসা নিমিত্ত ভয় হতে (অভিশস্তিঃ) তাদের পালক হও (পাতা)। অধিকন্তু বহুকালব্যাপী বা বহুবিধ পুত্রপৌত্র ইত্যাদি সহ (পুরূচী) শতসংখ্যক সম্বৎসর পর্যন্ত (শতং শরদঃ) জীবিত থাকো এবং ধনের পুষ্টি বা সমৃদ্ধি (বায়ঃ পোষং) লাভ করো (উপসংব্যয়স্ব), (বক্তব্য এই যে, এই বসন পরিধানের দ্বারা ধন ইত্যাদির সমৃদ্ধি হয়ে থাকে) ॥ ৫॥
[এই সূক্তটিও ঐ দ্বিতীয় কাণ্ডে (২।১৩।৩) ব্যাখ্যাত হয়েছে। তবে এখানে চরম পদগুলি বিভিন্ন ]–হে শান্তিকর্তা (যজমান)! উক্ত বসন (ইদম্ বাসঃ) (তুমি) মঙ্গলের নিমিত্ত পরিহিত হয়েছে। এই বসন পরিধানের দ্বারা গাভীগণের হিংসা নিমিত্ত ভয় হতে তাদের পালক হও। বহুকালব্যাপী শত সম্বৎসর পর্যন্ত জীবনবান্ হয়ে এবং অসামান্য (চারুঃ) বসনের দ্বারা দীপ্যমান হয়ে পুত্র-মিত্র-জ্ঞাতি ইত্যাদির মধ্যে ধনসমূহ (বসূনি) বিভাগ করে দাও (বি ভজাসি) বা অর্থীদের প্রদান করো। ৬।
সকল অপ্রাপ্য ফলের প্রাপ্তি বিষয়ে (যোগ যোগে) ও অন্ন ইত্যাদি লক্ষণযুক্ত ফল লাভের বিষয়ে (বাজেবাজে) অতিশয় সমৃদ্ধ (তবস্বিনং) পরমেশ্বর্যসম্পন্ন দেব ইন্দ্রকে আমরা স্তোতৃবর্গ (সখায়ঃ) রক্ষার নিমিত্ত (উতয়ে) আহ্বান করছি (হবামহে)। (বক্তব্য এই যে, অভিমত ফললাভার্থে, লব্ধ সামগ্রীর পরিপালনার্থে ও নিজেদের রক্ষণার্থে আমরা ইন্দ্রকে এইভাবে আহ্বান করছি)। ৭।
(হে যজমান!) হিতরমণীয় শরীরকান্তিশালী বা হিরণ্যসমান বর্ণশালী (হিরণ্যবর্ণঃ), জরারহিত (অজরঃ), কর্মকুশল বা শোভন পুত্র ইত্যাদি যুক্ত (সুবীরঃ) ও অকাল মরণরহিত হয়ে (জরামৃত্যু সন) প্রকর্ষের সাথে জায়মান পুত্র ইত্যাদি সহ বা ভৃত্য ইত্যাদি রূপ প্রজাগণ সহ (প্রজয়া) আপন গৃহে চিরকাল সুখে অধিষ্ঠিত থাকো বা এই গৃহে সম্যক প্রবেশ করো (সং বিশস্ব)। অঙ্গনাদিগুণযুক্ত অগ্নিদেব, ব্রাহ্মণগণের পালক সোমদেব, দেবগণের গুরু বৃহস্পতি দেবতা, সর্বপ্রেরক সবিতাদেব, ও পরমৈশ্বর্যশালী ইন্দ্রদেব প্রমুখ সকল বাসোভিমানী দেবতাই এই বচনের সমর্থন করেছেন (আহুঃ)। (অতএব এতে কোন বিপ্রতিপত্তি অর্থাৎ সংশয় নেই–এটাই বক্তব্য) ॥ ৮৷৷
অশ্রান্তস্য ত্বা মনসা যুনজ্ঞি প্রথমস্য চ।উকুলমুদ্বহে ভবোদুহ্য প্রতি ধাবৎ ॥১॥
বঙ্গানুবাদ –[ হে গান্ধর্ব (অশ্ব)!] তোমাকে শ্রান্তিহীন (অশ্রান্তস্য) অর্থাৎ শত্রুসেনার অভিমুখে গমনেও আয়াসরহিত-শরীর তুরঙ্গমের মনের সাথে, এবং সৃষ্টির আদিতে (প্রথমস্য) অশ্বজাতির উৎপত্তির পূর্বে উৎপন্ন শত্রুধর্ষণোৎসুক বা আপন অধিরোহণকারীকে প্রোৎসাহিত করণশালী অশ্বের মনের সাথে যুক্ত করছি (চ মনসা যুনষ্মি)। (সকল অশ্বাৎপত্তির পূর্বে উৎপন্ন অশ্ব উচ্চৈঃশ্রবা; সেই হেন জিতশ্রম অশ্বশ্রেষ্ঠ উচ্চৈঃশ্রবার মন-উপলক্ষিত সর্বেন্দ্রিয়শক্তি, শারীরিক দৃঢ়তা, আশুত্ব ও পরসেনার অভিভবনসামর্থ্য,–এই শান্তিফল রূপে কাম্যমান যা কিছু, তা এই অশ্বে যোজিত করছি–এটাই বক্তব্য)। এমন সামর্থোপেত হয়ে তুমি অতিদৃপ্ত হও (উৎকূল উহঃ ভব)। নদী যেমন প্রভূত জলপ্রবাহের দ্বারা দুই তীর প্লাবিত করে ঊর্ধ্বে উচ্চলিত হয়ে থাকে, সেই রকমে তুমিও যুদ্ধের নিমিত্ত বর্মিত বা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শত্রুসৈন্যকে আপন সামর্থ্যে অতিক্রম পূর্বক বিক্ষোভিত করো। অতঃপর হে অশ্ব! তুমি জেত্যব্য স্থানের প্রতি (অর্থাৎ জয়লাভের নিমিত্ত যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে) ধাবিত হও (ত্বং প্রতিধাবতাৎ)। ১৷৷
টীকা –উপযুক্ত এক ঋক্-সম্বলিত সূক্তটি গান্ধর্ব নামক মহাশান্তি কর্মে বিনিযুক্ত হয় (নক্ষত্র কল্প ১৭)। এটি অশ্বের আয়ু ইত্যাদির নিমিত্ত শান্তি স্বস্তিগণেও বিনিযুক্ত হয়ে থাকে (ন. ক. ১৮) ৷ (১৯কা, ২অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –অগ্নি হতে প্রকর্ষের সাথে উৎপন্ন (প্রজাতং) যে সুবর্ণ (হিরণ্যং) বিদ্যমান, যা মরণধর্মা মনুষ্যের নিকট অমরণসাধন (অমৃতং) রূপে অবস্থিত (দর্ধে), উক্ত হিরণ্যকে (এনৎ) যে পুরুষ স্বরূপে জ্ঞাত হয়, সে এই অম্বাদিষ্ট হিরণ্যরূপ পদার্থ ধারণ করে থাকে (ইৎ এনম্ অহতি)। যে পুরুষ আপন শরীরে (এই হিরণ্যকে) মনি-কুণ্ডল-অঙ্গুলীয়ক ইত্যাদিরূপে ধারণ করে (বিভর্তি), সেই হিরণ্যধারী পুরুষ জরাকালে মৃত্যুপ্রাপ্ত হয় (জরামৃত্যু ভবতি)। (অর্থাৎ অকালমৃত্যুরহিত হয়ে থাকে)। ১।
প্রকর্ষের সাথে জায়মান পুত্র-মিত্র ইত্যাদি সম্পন্ন (প্রজাবন্তঃ) মনুর পুত্র মানবগণ হিরণ্যধারীগণের মধ্যে প্রথমভাবী হয়ে (পূর্বে), বা সৃষ্টির পূর্বে উৎপন্ন মনুগণ (মনবঃ পূর্ব), যে শোভনবর্ণ (সুবর্ণং) হিতরমণীয় হেম (হিরণ্যং) সকলের প্রেরক স্বকারণ আদিত্যের সাথে প্রাপ্ত হয়েছিল (সূর্যেণ ঈষিরে), সেই মনুগণের দ্বারা ধারিত (তৎ) আহ্লাদক হিরণ্য (চন্দ্রং) হিরণধারক তোমাকে (ত্বা) শরীর কান্তির সাথে সংযোজিত করুক (বৰ্চসা সং সৃজতু)। যে পুরুষ (যঃ) হিরণ্য ধারণ করে, সে চিরকাল জীবনবান হয় (আয়ুষ্মন্ ভবতি)। ২।
(হে হিরণ্যধারী মানব!) তোমার চিরকাল জীবনের নিমিত্ত (ত্বা আয়ুষে), তোমার তেজঃ বা কান্তির নিমিত্ত (ত্বা বর্চসে), তোমার শারীরিক বলের বা শরীরধারক অষ্টম ধাতুর নিমিত্ত (ত্বা ওজসে), ও তোমার ভৃত্য ইত্যাদি সম্পত্তিরূপ বাহ্য বলের নিমিত্ত (ত্বা বলায়) সেই হিরণ্য তোমাতে সংযোজিত হোক। যেমন সুবর্ণ তেজের দ্বারা শুক্লভাস্বর রূপে (অর্থাৎ বিশুদ্ধ দীপ্তিশীল হয়ে) বিশেষভাবে দীপ্যমান হয় (বিভাসাসি), সেইরকমে তুমিও জনগণের মধ্যে বিশেষভাবে দীপ্যমান হও (জনান অনু)৷ ৩৷৷
যে হিরণ্যকে (যৎ) রাজমান বরুণ দেব অগ্নি হতে উৎপন্ন বলে ও মনুষ্যগণের মরণ হতে উদ্ধরণের উপায় বলে বিদিত আছেন (বেদ), তথা দেবগণের পালক বৃহস্পতি দেবতা ও বৃহন্তা ইন্দ্রদেবও যে হিরণ্যের উক্তলক্ষণ জ্ঞাত আছেন, সেই বরুণ ইত্যাদির জ্ঞাত বা ধারিত হিরণ্যের প্রভাব, তুমি হেন (তে) হিরণ্যধারণকারী পুরুষের অনুকূলে আয়ুস্কারী–(আয়ুষ্যং) ও তোমার অনুকূলে তেজস্কারী (বৰ্চসং) হোক (ভুবৎ) ॥ ৪৷
বঙ্গানুবাদ –হে ত্রিবৃৎ-মণিধারক পুরুষ! সেক্তা, প্রবল বৃষ-যুথের পতি (ঋষভঃ) গাভীগণ সমভিব্যাহারে (গোভিঃ সহ) তোমাকে (ত্বা) রক্ষা করুক (পাতু)। (অর্থাৎ বহু অপত্য উৎপাদনের মাধ্যমে সমৃদ্ধিকরণের দ্বারা তোমাকে সমৃদ্ধ করুক)। অথবা–বৃষভদেবতা আপন গো-দেবতাবর্গের সাথে স্বয়ং অনিষ্টসূচক উৎপাত হতে তোমাকে রক্ষা করুক। তথা প্রজননসমর্থ অশ্ব (বৃষা) শীঘ্রগতিশীল অশ্বগণের সাথে (বাজিভিঃ) তোমাকে রক্ষা করুক। (অর্থাৎ অশ্বগণের পুষ্টির মাধ্যমে সমৃদ্ধিকরণের দ্বারা তোমাকে সমৃদ্ধ করুক)। অন্তরীক্ষচর বায়ুদেব যজ্ঞলক্ষণের সাথে (ব্রাহ্মণ) তোমাকে রক্ষা করুন (ত্বা পাতু)। অথবা-বায়ু পরিবৃত বা ব্যাপ্ত সূত্ৰাত্মলক্ষণের সাথে রক্ষা করুক। অথবা-(ব্রহ্ম শব্দে পরিবৃঢ়ং বা অন্তরিক্ষং বা স্বাশ্রয়ং বোঝালে অর্থ হয়)–বায়ু তাঁর আপন আশ্রয়ের সাথে তোমাকে রক্ষা করুন। এইরকমে, ইন্দ্রদেব তার সৃষ্ট বা সেবিত বা ইত্যাদি ইন্দ্রিয় সমুদয়ের সাথে তোমাকে রক্ষা করুন। ১।
সোম অর্থাৎ বল্লীরূপ ওষধীসমূহের রাজা বা দেবতা ব্রীহি ইত্যাদির (ওষধীভিঃ) সাথে তোমাকে রক্ষা করুন (ত্বা পাতু)। এইরকম, সূর্যদেব তাঁর গ্রহসমূহের সাথে (নক্ষত্রৈঃ) তোমাকে পরিরক্ষিত করুন। এইরকম চন্দ্র অর্থাৎ সকল প্রাণীর আহ্বাদকারী দেবতা মাস সমূহের সাথে (মাদ্ভিঃ) তোমাকে সংরক্ষিত করুন। এই রকম, বায়ু প্রাণ ইত্যাদি পঞ্চবৃত্তি-রূপ বায়ুগণের সাথে (অর্থাৎ প্রাণ-অপান-সমান-উদান-ব্যান শরীরস্থ এই পঞ্চবায়ুর সাথে) তোমাকে অনুরক্ষিত করুক (বাতঃ প্রাণেন রক্ষতু) ॥ ২॥
(অভিজ্ঞাঃ কথয়ন্তি অভিজ্ঞ জনেরা বলে থাকেন)–দ্যুলোক অর্থাৎ স্বর্গ বা আকাশ ত্রিগুণশালী (দিবঃ তিস্র)–(অর্থাৎ চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্রের আশ্রয়স্থান ভেদে দ্যুলোক তিন প্রকার অবগন্তব্য; অথবা সেই লোকে গমনাভিলাষীগণ উত্তম-মধ্যম-অধম ভেদে ত্রিবিধ দেখা যায়)। তথা পৃথিবীও তিন প্রকার (পৃথিবী তিস্রঃ)–(অর্থাৎ উত্তম-মধ্যম-অধম ভেদে তিন প্রকার জীবের ভোগাশ্রয় এই পৃথীলোক; অথবা তৃণ-ঔষধি-বনস্পতির উৎপাদিকা হওয়ায় পৃথিবী ত্রিগুণিত)। অন্তরীক্ষও ত্রিগুণিত (ত্রীণি অন্তরিক্ষাণি)-(অর্থাৎ এখানেও তিন প্রকার জীবের গতায়ত হওয়ায় অন্তরীক্ষ তিন প্রকার; অথবা যক্ষ-গন্ধর্ব-অপ্সরাগণের দ্বারা সেবিত হওয়ায় বা তাদের আবাস ভেদে অন্তরীক্ষ ত্রিবিধ)। সমুদ্র চারিপ্রকার (সমুদ্ৰান্ চতুরঃ)-(সমুদ্র সংখ্যা সপ্ত; তথাপি এখানে চারি সমুদ্রের উল্লেখ করা হয়েছে। মনে হয়, উত্তর-পূর্ব-দক্ষিণ-পশ্চিম এই চারিদিকে ব্যাপ্ত সমুদ্রের দিকে লক্ষ্য রেখে সমুদ্র সংখ্যা চারি বলা হয়েছে। তবে উল্লেখ্য এই যে, এই সূক্তে ত্রিবৃৎ মণির স্তুতি সাধনত্বে ত্রিত্বের মহিমা জ্ঞাপন করা হয়েছে; সুতরাং চারি সমুদ্রের উল্লেখ এখানে বিসদৃশ মনে হতে পারে। ভাষ্যকার বলেছেন–চারি সংখ্যার মধ্যে তিন সংখ্যা রয়েছে, অর্থাৎ–তিনকে লঙ্ঘন করেই চারি সংখ্যার অস্তিত্ব। এই বিচারে চতুরঃ সমুদ্র উক্ত হয়েছে)। স্তোম তিন প্রকার (ত্রিবৃতম্ স্তোম)–অর্থাৎ ত্রিবৃৎ নামে আখ্যাত-স্তোমে ত্রয়ানাং ঋচাং অর্থাৎ তিনটি ঋক্ ও গানের ত্রিরাবৃত্তেঃ অর্থাৎ তিনবার আবৃত্তি থাকায় এই স্তোত্র ত্রিবৃৎ নামে কথিত)। তথা জল ত্রিবিধ (আপঃ ত্রিবৃতঃ)–অর্থাৎ স্বর্গস্থ, আকাশস্থ ও পৃথিবীস্থ ভেদে জল তিন রকমের।–এইরকম ত্রিবৃত্ত্ব অর্থাৎ তিন ধর্মশালী দু-পৃথিবী ইত্যাদি সকলে মণিগত সুবর্ণ-রজত-লৌহলক্ষণ ত্রিবৃতের সাথে (অর্থাৎ ত্রিবৃৎ মণির সাথে) অভেদরূপে তোমাকে রক্ষা করুক (ত্বা রক্ষন্তু)। ৩।
হে সুবর্ণ-রজত-লৌহাত্মক ত্রিবৃৎ মণির ধারক পুরুষ! তিন স্বর্গ (ত্রী নাকা) ও তিন সমুদ্র বা অন্তরীক্ষবিশেষকে (ত্রী সমুদ্রা) ত্রিবৃৎ মণির দ্বারা তোমার রক্ষকরূপে কল্পনা বা নিয়োজিত করছি (তে গোন, কল্পয়ামি)। সকলের আধারভূত তিন আদিত্য (ত্রী ব্রধান), তিন ভুবন (ত্রী বৈষ্টপা) অর্থাৎ স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল অথবা দেব-মনুষ্য-পিত্রাত্মক তিন লোক, তিন বায়ু (ত্রী মাতরিশ্বনঃ) অর্থাৎ উধ্বঃ-অধঃ-তির্যক গতিভেদে বা স্বর্গ-মত-পাতালে সঞ্চারাশ্রয়ভূত তিন প্রকার বায়ু, ত্রিগুণশালী, দ্যুলোকে প্রকাশমান রশ্মিমণ্ডলের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা তিন সূর্য–তোমার (তে) রক্ষকরূপে কল্পনা বা নিয়োজিত করছি (গোধূন কল্পয়ামি)। ৪
হে অগ্নি! তোমাকে হোমসাধন ঘৃতের দ্বারা অভিবর্ধিত করার অভিলাষে সম্যক সিঞ্চিত করছি (ত্বা আজ্যেন ঘৃতেন বর্ধয় সমুক্ষামি)। হে মণির ধারক পুরুষ! ঘৃতের দ্বারা সমুক্ষিত অগ্নিদেব, চন্দ্রদেব ও সূর্যদেবের অনুগ্রহে, তোমার প্রাণ যেন মায়াবন্ত অসুরবর্গ অপহরণ করতে না পারে (মা মায়িনঃ দভ)। ৫।
হে রাজন্যবৃন্দ (বা পুত্রভৃত্য ইত্যাদি সমন্বিত হে রাজা)! মায়াবন্ত অসুরবর্গ যেন তোমাদের প্রাণের প্রতি হিংসা করতে না পারে (মা দভ)। সেইসঙ্গে তারা যেন তোমাদের অপান ও শত্ৰুবলাপহারক তেজঃ না হরণ করতে পারে (মা হরঃ)। সেই নিমিত্ত, হে দীপ্যমান (ভ্রান্ত) সর্বজ্ঞ বা সকল ধনাধিকারী (বিশ্ববেদসঃ) অগ্নি-চন্দ্র-সূর্য নামক দেবগণ (দেবাঃ)! তোমরা দেবসম্বন্ধী রথে আরূঢ় হয়ে বা রথের সহায়ে সবেগে (দৈব্যেন) এদের প্রাণরক্ষার্থে ধাবিত হও (ধাবত) ॥ ৬।
[এখানে প্রাণরক্ষার প্রয়োজনে তার মাহাত্ম বর্ণিত হচ্ছে ]-সমিন্ধনকর্তা পুরুষ (অর্থাৎ যিনি অগ্নি উদ্দীপন করেন, তিনি) প্রাণের দ্বারা (প্রাণেন) অর্থাৎ মুখস্থিত প্রাণবায়ুর দ্বারা অগ্নি সংযোজিত করেন (অগ্নিং সং সৃজতি)। (অতএব প্রাণ রক্ষিতব্য)। আরও, বাহ্য বায়ু (বাতঃ) প্রাণবায়ুর অর্থাৎ মুখস্থিত বায়ুর সাথে মিলিত (সংহিতঃ) হয়ে থাকে। (অর্থাৎ এর দ্বারা প্রাণবায়ু ও বাহ্যবায়ুর একত্ব কথিত হচ্ছে)। প্রাণের দ্বারা (প্রাণেন) অর্থাৎ সূত্ৰাত্মরূপ ব্রহ্মের দ্বারা সর্বত্র প্রকাশক বা প্রতি পুরুষের অভিমুখ্য জ্ঞান সম্ভবকারী (বিশ্বতোমুখ) সূর্যকে দেবগণ আপন আপন প্রয়োজন মতো লাভ করেছিলেন (অজনয়)। (এই হেন মহানুভাব প্রাণের রক্ষণ অবশ্যই কর্তব্য) ৭
(হে মণিধারক রাজন্!) তুমি আয়ুষ্কৃত হও, অথবা চিরকালজীবী প্রাচীন মহর্ষিগণ তপঃ ইত্যাদির দ্বারা যে আয়ু লাভ করেছিলেন, সেই আয়ুর দ্বারা অথবা তাদের প্রদত্ত আর দ্বারা তুমি জীবায়ুষ্মন্ হও। তুমি জীবিত থাকো, প্রাণত্যাগ করো না (জীব মা মৃথাঃ)। স্থির প্রাণশালী (আত্মম্বতাং) জনের প্রাণের সহায়তায় তুমি জীবিত থাকো; অধিকন্তু মারক দেবতার (মৃত্যোঃ ) বশবর্তী হয়ো না (মা উৎ অগাঃ) ॥ ৮৷
যে দেবযানমার্গে দেবগণ হিরণ্য নামক প্রসিদ্ধ নিধিকে সংগুপ্ত করে রেখেছিলেন (যং নিহিতম), ইন্দ্রদেব সেই দেবযানমার্গে (পথিভিঃ) স্বয়ং গমন পূর্বক সেই দেবনিধিরূপ হিরণ্যকে (যৎ) অন্বেষণ পূর্বক লাভ করেছিলেন (অন্ববিন্দং)। যে দেবনিধিরূপ হিরণ্য উক্ত প্রকারে ত্রিবিধ জল (ত্রিবৃতঃ আপঃ) ত্রিবৃৎ সাধনের দ্বারা রক্ষা করেছিল (জুগুপুঃ), সেই ত্রিবৃৎ জল (তাঃ ত্রিবৃত আপঃ) হিরণ্য রজত-লৌহ এই ত্রিবিধ স্বরূপে (ত্রিবৃৎভিঃ) তোমাকে রক্ষা করুক বা পালন করুক (ত্ব রক্ষন্তু) ॥ ৯৷
ত্রয়স্ত্রিংশ অর্থাৎ তেত্রিশ সংখ্যক দেববৃন্দ (অর্থাৎ অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, প্রজাপতি ও বষট্কার বা ইন্দ্রদেব) তিন প্রকার বীর্যকে (ত্রীণি বীর্যাণি–অর্থাৎ কায়িক বাঁচিক-মানসিক ভেদে ত্রিবিধ সামর্থ্যকে) অত্যধিক প্রিয়মাণ (প্রিয়ায়মানা) জলের মধ্যে গোপন করে রেখেছিলেন (অপসু অন্তঃ জুগুপুঃ), (যাতে অপরে না হরণ করতে পারে)। অথবা–হিরণ্য রজত-লৌহ সমন্বিত ত্রিবৃৎ মণিতে আয়ুবর্ধনকর, ঐশ্বর্যদায়ক ও শত্ৰুজয়াখ্য যে অনন্যসাধারণ তিন প্রকার বীর্য আছে, তা অন্যে যাতে না প্রাপ্ত হয়, সেই নিমিত্ত জলের মধ্যে গোপন করে রেখেছিলেন।–এই পরিদৃশ্যমান (অস্মি) চন্দ্রে আহ্লাদক উদকে (অধি) যে হিরণ্য বিদ্যমান (যৎ হিরণ্যম), সেই হিরণ্যের মুখ্য অংশের দ্বারা (তেন) এই মণিধারক পুরুষকে (অয়ম) ত্রয়স্ত্রিংশৎ দেবতা কর্তৃক ধারিত ত্রিবিধ সামর্থ্যে মণ্ডিত করুক (কৃণুবৎ বীর্যানি)। ১০।
দিব্যলোকে যে একাদশ সংখ্যক আদিত্য দেবগণ (দেবাঃ) বিদ্যমান, তাঁরা (তে দেবাসঃ) এই হুয়মান আজ্য সেবন করুন (ইদং হবিঃ জুষধ্বম)। আদিত্যের সংখ্যা দ্বাদশ; তথাপি এখানে একাদশ সংখ্যার মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে আদিত্য-সংখ্যা একাদশ উল্লেখিত হয়েছে। ভাষ্যকার বলেন–এতে কোন বিরোধ ঘটেনি; কারণ একাদশ সংখ্যা দ্বাদশ সংখ্যার চেয়ে নূন অর্থাৎ দ্বাদশের মধ্যেই একাদশ নিহিত আছে অধিকসংখ্যায়া ন্যূনসংখ্যায়াঃ সম্ভবাৎ] ॥১১।
অন্তরীক্ষলোকে যে একাদশ রুদ্রদেবতা বিদ্যমান, তারা এই হুয়মান আজ্য সেবন করুন। ১২৷৷
পৃথিবী লোকে যে একাদশ দেবতা বিদ্যমান, তারা এই হুয়মান আজ্য সেবন করুন। [এর পূর্বে পৃথিবী তিন প্রকার বলা হয়েছিল। তথাপি একাদশ সংখ্যার মাহাত্ম্য খ্যাপন উপলক্ষে পৃথিবীতে একাদশ দেবতার অধিষ্ঠান বলা হয়েছে ]। ১৩
[যদিও এখানে সম্মুখে ও পশ্চাতে কোন্ দেবতা রক্ষা করবেন, সেই প্রসঙ্গে নির্দিষ্ট কোন উল্লেখ নেই তথাপি কৃতং পদে দ্বিবচন বোঝায় বলে উত্তরাধে সবিতা ও শচীপতি ইন্দ্র উভয়কেই উদ্দেশ করা হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে]–হে উক্ত দেবদ্বয় (অর্থাৎ হে সবিতা ও ইন্দ্রদেব)! তোমরা আমার সম্মুখ বা পূর্ব দিক (পুরস্তাৎ) ও পশ্চিম অর্থাৎ পশ্চাৎ-দিক অভয় করো (অভয়ং কৃত); (অর্থাৎ যাতে শত্রু হতে ভীতি না থাকে, তেমনভাবে রক্ষা করো)। অথবা–সম্মুখভাগ শক্তহীন করো এবং পশ্চাৎ-ভাগ ভয়হীন করো।–তথা সবিতা আমাকে দক্ষিণদিক্ হতে আগত (দক্ষিণতঃ) ভীতি হতে ও ইন্দ্রদেব আমাকে উত্তরদিক হতে আগত (উত্তরা) ভীতি হতে রক্ষা করুন ৷ ১৪।
আদিত্যগণ দুস্থান হতে (দিবঃ) আমাকে রক্ষা করুন ও অগ্নিগণ পৃথিবী হতে (ভূম্যাঃ) আমাকে রক্ষা করুন (রক্ষন্তু)। ইন্দ্রাগ্নী অর্থাৎ ইন্দ্রদেব ও অগ্নিদেব আমাকে (মা) সম্মুখ হতে রক্ষা বা পালন করুন (পুরস্তাৎ রক্ষতাং)। তথা অশ্বীদেবদ্বয় আমাকে সকল দিক হতে সুখ প্রদান করুন (অভিতঃ শৰ্ম যচ্ছতাং)। তির্যক অর্থাৎ বক্রভাবে অবস্থিত দিমূহ হতে (তিরশ্চিন) প্রজাপতি ব্রহ্মা (অগ্ন) রক্ষা করুন; অথবা–তির্যক দিক হতে রক্ষাবিষয়ে প্রজ্ঞাবান্ (জাতবেদাঃ) অগ্নিদেব আমাকে রক্ষা করুন। পৃথিবী ইত্যাদি পঞ্চভূতের কর্তা বা পঞ্চভূতের অভিমানী (ভূতকৃতঃ) অগ্নি ইত্যাদি দেবগণ সর্বত আমার কবচ হোন (মে বর্ম সন্তু); (অর্থাৎ আমার কবচরূপে আমাকে রক্ষা করুন)। ১৫।
ইমং বামি তে মণিং দীর্ঘায়ুত্বায় তেজসে। দর্ভং সপত্নদম্ভনং দ্বিষতস্তপনং হৃদঃ ॥১॥ দ্বিষতস্তাপয়ন হৃদঃ শত্রণাং তাপয়ন মনঃ। দুহাদঃ সর্বাংস্তুং দর্ভ ঘর্ম ইবভিনৎসন্তাপয়৷ ২৷৷ ঘর্ম ইবাভিতপন্ দর্ভ দ্বিষতো নিতপন্ মণে। হৃদঃ সপনাং ভিদ্ধীন্দ্র ইব বিরুজং বল ৷৩৷৷ ভিদ্ধি দর্ড সপত্নানাং হৃদয়ং দ্বিষং মণে। উদ্য ত্বচমিব ভূম্যাঃ শির এষাং বি পাতয়৷ ৪৷৷ ভিনদ্ধি দর্ড সপত্নান মে ভিনদ্ধি মে পৃতনায়তঃ। ভিনদ্ধি মে সর্বান দুহার্দো ভিদ্ধি মে দ্বিষতো মণে ॥ ৫ছিদ্ধি দর্ভ সপত্নান্ মে ছিদ্ধি মে পৃতনায়তঃ। ছিদ্ধি মে সর্বান্ দুহাদা ছিদ্ধি মে দ্বিষত মণে ॥ ৬৷৷ বৃশ্য দর্ড সপত্নান মে বৃশ্চ মে পৃতনায়তঃ। বৃশ্চ মে সর্বান্ দুহার্দো বৃশ্চ মে দ্বিততা মণে ॥৭॥ কৃন্ত দর্ভ সপত্নান্ মে কৃন্ত মে পৃতনায়তঃ। কৃন্ত মে সর্বান্ দুহাদাং কৃন্ত মে দ্বিষতোমণে ॥৮ পিংশ দর্ড সপত্ন মে পিংশ মে পৃতনায়তঃ। পিংশ মে সর্বান্ দুহাঃ পিংশ মে দ্বিততা মণে ॥৯॥ বিধ্য দর্ড সপত্নান মে বিধ্য মে পৃতনায়তঃ।বিধ্য মে সর্বান্ দুহার্দো বিধ্য মে দ্বিষতে মণে।১০
বঙ্গানুবাদ –হে বিজয়, বল ইত্যাদি কামনাকারী পুরুষ! তোমাকে এই দৰ্ভময় মণি বন্ধন করছি। (ইমং মণিং বর্ধামি)। (কি জন্য?–না) যাতে তুমি দীর্ঘ আয়ু ও অতিশয়িত তেজ লাভ করতে পারো (দীর্ঘায়ুত্বায় তেজসে)। দর্ভনির্মিত মণি (দর্ভং) শত্রুগণের হিংসক ও দ্বেষকারীগণের (অর্থাৎ শত্রুবর্গের) হৃদয়ের সন্তাপক (সপত্নদম্ভনং দ্বিষতঃ তপন হৃদঃ)। ১।
হে দৰ্ভমণি! তুমি দ্বেষকারী শত্রুগণের হৃদয় সন্তপ্ত করো (দ্বিষতঃ হৃদঃ তাপয়), তথা শত্রুগণের মন তাপিত করো। এইভাবে হৃদয়ত দুষ্টভাবান্নগণের (দুহাদঃ) সব কিছু (সর্বান) (অর্থাৎ গৃহ, ক্ষেত্র, পশু ইত্যাদি) আদিত্যের ন্যায় (ঘর্ম ইব) সন্তাপিত করে দাও (সন্তাপয়ন); অথবা-ইন্দ্রের ন্যায় শত্রুর হৃদয় ও বলকে নাশ করো (অভী সন্তাপয়ন)। ২।
হে দর্ভনির্মিত মণি (দর্ভ মণে)! তুমি আদিত্যের মতো (ঘর্ম ইব) অথবা নিদাঘ কালের মতো দ্বেষকারী শত্রুগণের হৃদয় (দ্বিষতঃ) অথবা শত্রুগণকে সকল দিক্ হতে সন্তাপিত করো (অভিপ) এবং সন্তাপের দ্বারা ভেদ করো (নিতপ)। তুমি ইন্দ্রের ন্যায় (ইন্দ্র ইব) শত্রুদের হৃদয় (সপত্নানাং হৃদঃ) বিদারিত করো (ভিদ্ধি) এবং তাদের শারীরিক ও বাহ্যিক বল (বলং) নাশ করো (বিরুজন)। ৩।
হে দৰ্ভমণি! তুমি শত্রুবর্গের হৃদয় বিদারিত করো। ঊর্ধ্বে গমন পূর্বক (উদ্য) শত্রুগণের শির অধঃপাতিত করো (শিরাংসি বি পাতায়), যেমন লোকে গৃহ ইত্যাদি নির্মাণের নিমিত্ত ভূমির ত্বক স্বরূপ (ভূম্যাঃ স্বচমিব) তৃণ-গুল্ম-ঔষধি ইত্যাদি ছেদন করে। ৪
হে দৰ্ভমণি! আমার শক্তবর্গকে বিদারিত করো, আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনা সংগ্রহশালী (পৃতনায়তঃ) শত্রুদের বিদারিত করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী (দুর্দঃ) আমার শত্রুদের বিদারিত করো, আমার প্রতি বিদ্বেষকারী (দ্বিষতঃ) শত্রুদের বিদারিত করো। ৫।
হে দর্ভমণি! আমার শত্রুবর্গকে ছিন্ন অর্থাৎ কর্তিত করো (ছিদ্ধি), আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনা সংগ্রহকারী শত্রুদের ছিন্ন করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের ছিন্ন করো, আমার প্রতি বিদ্বেষকারী শত্রুদের ছিন্ন করো। ৬।
হে দৰ্ভমণি! আমার শত্রুবর্গকে ছেদন করো (বৃশ্চ), আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনা সংগ্রহশালী শত্রদের ছেদন করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের ছেদন করো, আমার প্রতি বিদ্বেষকারী শত্রুদের ছেদন করো ॥৭॥
হে দৰ্ভমণি! আমার শক্তবর্গকে চূর্ণবিচূর্ণ করো (কৃন্ত), আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনা সংগ্রহকারী শত্রুদের চূর্ণবিচূর্ণ করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের চূর্ণবিচূর্ণ করো, আমার প্রতি বিদ্বেষকারী শত্রদের চূর্ণবিচূর্ণ করো ॥ ৮৷৷
হে দমণি! আমার শত্রুবর্গকে পিষ্ট অর্থাৎ মর্দিত করো (পিংশ), আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনা সংগ্রহশালী শত্রুদের পিষ্ট করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের পিষ্ট করো, আমার প্রতি বিদ্বেষকারী শত্রুদের পিষ্ট করো। ৯।
হে দৰ্ভমণি! আমার শক্রবর্গকে বিদ্ধ করো বা প্রহার করো (বিধ্য), আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনা সংগ্রহকারী শত্রুদের প্রহার করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের প্রহার করো, আমার প্রতি বিদ্বেষকারী শত্রুদের প্রহার করো। ১০।
নিক্ষ দর্ড সপত্নান মে নিক্ষ মে পৃতনায়তঃ। নিক্ষ মে সর্বান্ দুহার্দো নি মে দ্বিততা মণে ॥১॥ তৃদ্ধি দর্ভ সপত্না মে তৃদ্ধি মে পৃতনায়তঃ। তৃদ্ধি মে সর্বান্ দুহাদস্তৃদ্ধি মে দ্বিততা মণে ॥ ২॥ রুদ্ধি দর্ড সপত্নান্ মে রুদ্ধি মে পৃতনায়তঃ। রুদ্ধি মে সর্বান্ দুহার্দো রু৮ি মে দ্বিষতত মণে ॥ ৩৷৷ মৃণ দর্ভ সপত্নান্ মে মৃণ মে পৃতনায়তঃ। মৃণ মে সর্বান্ দুহার্দো মৃণ মে দ্বিষতো মণে ॥৪॥ মন্থ দর্ড সপত্নান মে মন্থ মে পৃতনায়তঃ। মন্থ মে সর্বান্ দুহার্দো মন্থ মে দ্বিততা মণে ॥৫॥ পিণ্ডটি দর্ড সপত্নান মে পিণ্ডটি মে পৃতনায়তঃ। পিণ্ডটি মে সর্বান দুহাদঃ পিণ্ডটি মে দ্বিষতো মণে ॥ ৬৷৷ ওষ দর্ভ সপত্নান্ মে ওষ মে পৃতনায়তঃ। ওষ মে সর্বান দুহার্দ ওষ মে দ্বিষতো মণে ॥৭॥ দহ দর্ভ সপত্নান মে দহ মে পৃতনায়তঃ। দহ মে সর্বান্ দুহার্দো দহ মে দ্বিষতো মণে ॥৮॥ জহি দর্ড সপত্নান্ মে জহি মে পৃতনায়তঃ। জহি মে সর্বান্ দুহার্দো জহি মে দ্বিততা মণে ॥৯॥
বঙ্গানুবাদ –হে দমণি (দর্ভ মণে)! আমার শত্রুবর্গকে চুম্বন করো (নিক্ষ) অর্থাৎ চুম্বনের দ্বারা তাদের অবয়ব নিঃসার করে দাও, আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনাসংগ্রহকারী শত্রুদের চুম্বন করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের চুম্বন করো, আমার বিদ্বেষী শত্রুদের চুম্বন করো ॥ ১।
হে দৰ্ভমণি! আমার শক্রবর্গকে বিনাশ করো (তৃদ্ধি), আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনাসংগ্রহকারী শত্রুদের বিনাশ করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের বিনাশ করো, আমার বিদ্বেষী শত্রুদের বিনাশ করো। ২।
হে দৰ্ভমণি! আমার শক্তবর্গকে নিরুদ্ধ করো (রুদ্ধি) অর্থাৎ আবরণের দ্বারা প্রতিরুদ্ধ করো, আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনাসংগ্রহকারী শত্রুদের নিরুদ্ধ করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের নিরুদ্ধ করো, আমার বিদ্বেষী শত্রুদের নিরুদ্ধ করো ৷৷ ৩৷৷
হে দর্ভমণি! আমার শক্রবর্গকে হিংসা করো (মৃণ) অর্থাৎ হনন করো, আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনাসংগ্রহকারী শত্রুদের হিংসা করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের হিংসা করো, আমার প্রতি ১ বিদ্বেষপরায়ণ শত্রুদের হিংসা করো। ৪
হে দর্ভমণি! আমার শক্তবর্গকে লোড়িত বা মথিত করো (মন্থ) অর্থাৎ মন্থনের দ্বারা বিনাশ করো, আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনাসংগ্রহকারী শত্রুদের মথিত করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের মথিত করো, আমার বিদ্বেষী শত্রুদের মথিত করো ৷ ৫৷৷
হে দমণি! আমার শত্রুবর্গকে পিণ্ডাকৃতিভূত বা চূর্ণীভূত করো (পিটি), আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনাসংগ্রহকারী শত্রুদের চূর্ণিত করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের চূর্ণিত করো, আমার বিদ্বেষী শত্রুদের চূর্ণিত করো। ৬।
হে দর্ভমণি! আমার শত্রুবর্গকে দাহ করো (ওষ) অর্থাৎ ভস্মীকারিত করো, আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনাসংগ্রহকারী শত্রুদের দাহিত করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের দাহিত করো, আমার বিদ্বেষী শত্রুদের দাহিত করো ॥ ৭৷৷
হে দর্ভমণি! আমার শক্রবর্গকে দহন করো (দহ), আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনাসংগ্রহকারী শত্রুদের দহন করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের দহন করো, আমার বিদ্বেষী শত্রুদের দহন করো ॥ ৮
হে দৰ্ভমণি! আমার শক্তবর্গকে প্রহার করো (জহি), আমার ক্ষতির অভিলাষে সেনাসংগ্রহকারী শত্রুদের প্রহার করো, সকল দুষ্ট হৃদয়শালী আমার শত্রুদের প্রহার করো, আমার বিদ্বেষী শত্রুদের প্রহার করো ৷ ৯৷
বঙ্গানুবাদ –হে দর্ভ (অর্থাৎ দৰ্ভমণি)! তোমার পর্বে পর্বে অর্থাৎ গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে যে অপরিমিত (যৎ তে মর্মসু শতং) জরা ও মৃত্যু পরিহারক কবচ বিদ্যমান (বর্ম), সেই বর্মের দ্বারা (তেন) তোমার ধারক অর্থাৎ রক্ষা-জয় ইত্যাদি কামনাকারী পুরুষকে (অর্থাৎ এই রাজাকে) আযুক্তবর্মিত করে অর্থাৎ বর্মরূপ রক্ষাযুক্ত করে (বর্মিণং কৃত্বা) বীর্যের মাধ্যমে অর্থাৎ পরকৃত উপদ্রব পরিহার ও শত্ৰুবিজয়-করণ ইত্যাদি লক্ষণযুক্ত সামর্থ্যে মণ্ডিত করে শত্রুগণকে বিনাশ করো (সপত্নান জহি)। ১।
হে মণিরূপ দর্ভ! তোমার অপরিমিত পর্বে পর্বে (শতং মর্মাণি) পরকৃতপীড়া পরিহারের নিমিত্ত সহস্ৰসংখ্যক সামর্থ্য (বীর্যাণি) বিদ্যমান। সেই মর্মশতাচ্ছাদনসাধন বীর্য এই রাজার জরাপরিহার ও পোষণের প্রয়োজনে (জরসে ভর্তবৈ) সকল দেবগণ, তোমাকে প্রদান করেছেন (অদুঃ)। অতএব এই রাজার জরা পরিহার করাও এবং এঁকে পোষণ করো ৷ ২।
হে দর্ভমণি! তুমি দেবগণের বর্ম অর্থাৎ রক্ষণার্থ কবচ বলে কথিত (ত্বাং দেববর্ম আঃ)। বেদ-বিদিতগণের রক্ষাকারিত্বের নিমিত্ত তুমি ব্ৰহ্মণস্পতি অর্থাৎ বেদের পালক নামে কথিত। অধিকন্তু, তুমি দেবাধিপতি ইন্দ্রেরও বর্ম অর্থাৎ কবচ বলে কথিত। (ত্বাং ইন্দ্রস্য বৰ্ম আহুঃ)। (বক্তব্য এই যে, দেবগণ, বৃহস্পতি ও ইন্দ্রদেব আপন আপন রক্ষার্থে তোমাকে ধারণ করে থাকেন)। এই হেন তুমি, রাষ্ট্রের ধারয়িতা রাজার রাজ্য রক্ষা বা পালন করো (ত্বং রাষ্ট্রাণি রক্ষসি) ৷ ৩৷৷
হে দর্ভমণি! তোমাকে শত্রুক্ষয়কারী (সপত্নক্ষয়ণ), দেষ্টাগণের হৃদয়-সন্তাপকারী (দ্বিষতঃ তপনম হৃদঃ), ক্ষত্রবলের বর্ধনকারী (ক্ষত্ৰস্য বর্ধন) এবং শরীরের রক্ষাকারী (তনূপানং)–এমন মহানুভাব মণি করছি (মণিং কৃণোমি)। অথবা–হে রক্ষাকামী পুরুষ বা রাজ! শত্রুক্ষয় ইত্যাদি সামর্থোপেত এই দৰ্ভমণিকে তোমার বলবর্ধন ও শরীর রক্ষণের নিমিত্ত সংযোজিত করছি। ৪
যে স্থানে জল উদ্ৰবিত হয় সেই হেন স্থানে (যৎ সমুদ্রঃ) বিদ্যুতের সাথে গর্জনকারী মেঘ হতে (বিদ্যুতা সহ অভিন্দৎ পর্জন্যঃ) যে হিরন্ময় বিন্দু উদ্ভূত হয়েছিল, সেই উৎপাদিত হিরণ্যবিন্দু হতেই (ততঃ হিরণ্যয়ঃ বিন্দু) দর্ভ প্রাদুর্ভূত হয়েছে (দর্ভঃ অজায়ত)। (এই দুর্ভোৎপত্তি বর্ণনার দ্বারা দৰ্ভময় মণির অতিশয়িত বীর্যত্ব উক্ত হয়েছে)। ৫৷৷
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি পূর্ববর্তী দ্বিতীয় ও তৃতীয় সূক্তের সাথে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। কোন কোন পুঁথিতে এই সূক্তের প্রথম মন্ত্রটির মর্মসু পদটির স্থলে বর্মসু এবং দ্বিতীয় মন্ত্রটির মর্মাণি স্থলে বর্মাণি পাঠান্তর পাওয়া যায় ৷ (১৯কা. ৪অ, ৪সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –পুষ্টিকামী অর্থাৎ পশু-পুত্র-ধন-শরীর ইত্যাদি বিষয়ের পুষ্টি কাময়মান জনের নিমিত্ত বিধাতা (বেধসা) উদুম্বরের দ্বারা (ঔদুম্বরেণ) নির্মিত মণি (যজ্ঞডুমুরের মণি) প্রয়োগ করেছিলেন। অথবা-পুষ্টি ইত্যাদির বিধাতা বা কর্তা (বেধসা) ঔদুম্বর মণির দ্বারা তুমি হেন পুষ্টিকামী জনকে রক্ষা করছি। সবিতা অর্থাৎ সকলের প্রেরক দেবতা গোভূমিতে (গোষ্ঠে) আমার (মে) সকল পশুবর্গের বর্ধন সাধন করুন (স্ফাতিং করৎ)। (সকল পশু অর্থে গো-মহিষ-অশ্ব-অজ গজ ইত্যাদি চতুষ্পদ প্রাণী অথবা দ্বিপদ ও চতুষ্পদ উভয়বিধ প্রাণীকেই বোঝাচ্ছে। এখানে শ্রুতি অনুসারে সকলের প্রেরক সবিতা দেবতার নিকট ব্যাঘ্র, তস্কর ইত্যাদি কর্তৃক বিনাশ পরিহার পূর্বক বা গো সহ সকল পশুর বৃদ্ধি প্রার্থনা করা হয়েছে)। ১।
যজমানের দ্বারা সংযুক্ত গার্হপত্য নামক যে অগ্নি বিদ্যমান (যঃ অগ্নিঃ গার্হপত্যঃ), তিনি আমাদের গো-অশ্ব ইত্যাদি পশুগণের রক্ষক বা পালনকর্তা হোন (পশূনাম্ অধিপাঃ অসৎ)। (অর্থাৎ চোর ইত্যাদির ভয় হতে রক্ষা করুন)। অভিমত-ফলবৰ্ষক (বৃষা) উদুম্বর-বিকার মণি (ঔদুম্বরঃ মণিঃ) পোষণের দ্বারা সর্বতঃ শরীরের অভিবৃদ্ধি সৃজন করুন (পুষ্ট্যা আ সং)। (অর্থাৎ পশুগণের পুষ্টি সাধন করুন)। ২।
প্রভূত গোময়যুক্ত (করীষিণীং) (অর্থাৎ গো-গণের সমৃদ্ধি হোক, এই বক্তব্য), প্রকৃষ্ট (ফলবতীং) ব্রীহি যব ইত্যাদি লক্ষণ সমন্বিত অন্ন (স্বধাং) ও ভূমি বা গো (ইরাং) আমাদের গৃহে (নঃ গৃহে) বিদ্যমান হোক। উদুম্বর মণির তেজের দ্বারা বা সামর্থের দ্বারা (তেজসা) ধাতা নামধেয় সকলের ধারণকর্তা দেবতা আমার শরীর ইত্যাদিতে পুষ্টি স্থাপন করুন (মে পুষ্টি দধাতু) ৷৷ ৩৷
ঔদুম্বর মণি ধারণকারী আমি (বিভ্রৎ) দুইপদবিশিষ্ট মনুষ্য ইত্যাদি, চারিপদবিশিষ্ট গো ইত্যাদি পশু, তিল-মাষ-ব্রীহি-যুব প্রিয়ঙ্গু ইত্যাদি অন্ন ও দধি-ক্ষীর-মধু-গুড় ইত্যাদিরূপ রস বহুভাবে (ভূমান) ভোগ করবো (গৃহে)। ৪
আমি (অহং) দ্বিপদা মনুষ্য ইত্যাদির ও চতুষ্পদা গো-মহিষ ইত্যাদি পশুসমূহের এবং ব্রীহি-যুব-ইত্যাদিরূপ ধান্যের পোষণ (পুষ্টিং) পরিগ্রহ করবো (পরিজগ্রভ)। অধিকন্তু, সকলের অনুজ্ঞাতা (সবিতা) বৃহস্পতিদেব পশুগণের রস অর্থাৎ গো-মহিষ ইত্যাদির দুগ্ধ এবং ব্রীহি-যব ইত্যাদির সারভূত অংশ (ওষধীনাম) উদুম্বরের তেজের দ্বারা আমাকে (মে) প্রদান করুন (নি যচ্ছাৎ) ৫
আমি হেন পুষ্টিকামী জন (অহং) পুত্ৰ-ভৃত্য ইত্যাদি দ্বিপদ মনুষ্যগণের ও গো-অশ্ব ইত্যাদি চতুষ্পদ প্রাণীসমূহের পালক হবো (পশুনা অধিপাঃ অসানি)। সেই নিমিত্ত পুষ্টিকামী আমাকে (ময়ি) পশু ইত্যাদির পোষণের স্বামী (পুষ্টপতিঃ) পুষ্টি অর্থাৎ পশুসমূহের সমৃদ্ধি অর্থাৎ উদুম্বর মণি প্রদান করুন (পুষ্টং দধাতু)। উদুম্বরের বিকার সম্ভুত এই মণি আমাকে (মহ্যং) হিরণ্যরাশি প্রদান করুক (নি যচ্ছতু) ৷ ৬ ৷
এই উদুম্বর-বিকৃত মণি পুত্র-পৌত্র ইত্যাদি রূপ প্রজা ও হিরণ্য ইত্যাদি লক্ষণযুক্ত গো-ইত্যাদিরূপ ধনের সাথে আমার নিকট আগমন করুক (মাং উপ)। ইন্দ্রের দ্বারা প্রেরিত (ইন্দ্রেণ জিন্বিতঃ) এই মণি আমাদের অভিলষিত তেজের সাথে (বৰ্চসা সহ) আমাদের প্রাপ্ত হোক (আ মা অগন) ৭
পুষ্টির নিমিত্ত দেবগণ কর্তৃক নির্মিত বা দ্যোতমান এই উদুম্বর-বিকার মণি (দেবঃ মণিঃ) শত্রুগণের হন্তা (সপত্নহা) ও. আমাদের অভিলাষ পূরণকারী অর্থাৎ আমাদের ইচ্ছিত সামগ্রীর দাতা (ধনসাঃ)। এই হেন মণি আমাদের ধনরাশি লাভের নিমিত্তভূত হোক (ধনসাতয়ে)। অধিকন্তু, (এই মণি) পশু ও অন্নের প্রভূত সমৃদ্ধি প্রদান করুক (পশোঃ অন্নস্য চ ভূমানং নি যচ্ছতু) তথা গো-বর্গের অভিবৃদ্ধি প্রদান করুক (গবাং স্ফাতিং নি যচ্ছতু) ৮
হে বনের পালক (বনস্পতি অর্থাৎ উদুম্বরমণি)! তুমি ওষধিরূপ বনস্পতির সৃষ্টির সময়ে (ত্বং যথা অগ্রে) পুষ্টির সাথে উৎপন্ন হয়েছে (পুষ্ট্যা সহ জজ্ঞিষে)। তোমার সাধনের দ্বারা বাক্-দেবী (সরস্বতী) এইরূপে আমার ধনের অভিবৃদ্ধি করুন (এবা..দধাতু)। ৯।
দেবী সরস্বতী আমাকে হিরণ্য ইত্যাদি লক্ষণ সমন্বিত ধন ও গোদুগ্ধের অভিবৃদ্ধি বা প্রাচুর্য (অর্থাৎ গো-সমৃদ্ধি) প্রাপ্ত করান (আ মে ধনম পয়ঃস্ফাতিম্ চ)। সিনীবালী (চতুর্দশীযুক্তা বা প্রতিপদযুক্তা অমাবস্যা, যাতে চন্দ্রকলা দৃষ্ট হয়ে থাকে–সেই শুক্লবর্ণা চন্দ্রকলার অভিমানী দেবতা) ও ঔদুম্বর মণি ব্রীহি-যব ইত্যাদি ওষধীসমূহের ফলরাশি (ধান্য) আমার সমীপে প্রাপ্তির ব্যবস্থা করুন (উপা বহাৎ)। অথবা–বাক্-দেবী (সরস্বতী) হিরণ্য-রজত-মণি-মুক্তা ইত্যাদি ধন আমার হস্তের দ্বারা ধারণযোগ্য করুন এবং সিনীবালী ও উদুম্বর মণি গো-দুগ্ধের অভিবৃদ্ধি ও ব্রীহি-যব ইত্যাদি ধনের সমৃদ্ধি আমার সমীপদেশে প্রেরণ করুন ॥ ১০
হে উদুম্বর মণি (উদুম্বরঃ)! গো-অশ্ব ইত্যাদি সহ সকল পদার্থের পোষণকর্তা (প্রজাপতি) তোমাকে উৎপাদিত করেছেন (পুষ্টপতিঃ জজান); সেই হেতু তুমি দৰ্ভ ইত্যাদি দ্বারা নির্মিত সকল মণি সমূহের অধিপতি ও সকলের অভিমত ফলবর্ষণকারী হয়েছে (মণীনাম্ অধিপাঃ বৃষা অসি)। তুমি সকল সমৃদ্ধির আস্পদভূত; সুতরাং তোমার দ্বারা আমার বহুবিধ অন্ন ও মণি- মুক্তা-প্রবাল ইত্যাদি লক্ষণান্বিত ধন লব্ধ হোক (ত্বয়ি ইমে বাজাঃ দ্রবিণানি সর্বা)। হে ঔদুম্বর! সেই হেন (স) অন্ন-ধন ইত্যাদির সাধক তুমি (ত্বং) আমাদের নিকট হতে (অস্মৎ) অলাভ (অরাতিং) অর্থাৎ ক্ষতি, দারিদ্র্য (অমতিং) বা বুদ্ধিভ্রংশ ও খাদ্যাভাব (ক্ষুধং) অত্যন্ত দূরে অপগমিত করো (আরাৎ সহস্ব)। ১১।
হে ঔদুম্বর! তুমি গ্রামের স্বামীস্বরূপ (গ্রামনীঃ অসি); গ্রামণী যেমন গ্রামের মধ্যে প্রধানভূত, তেমনই তুমি সকল মণির মধ্যে প্রধানভূত; অতএব আমাদের মধ্যেও প্রধান হও; অথবা আমাদেরও শ্রেষ্ঠ করে দাও (গ্রামনীঃ উত্থায় অভিষিক্তঃ); অর্থাৎ আমাদের পক্ষেও অভিমত ফলপ্রাপণকারী হও। তুমি তেজের দ্বারা আচ্ছন্ন (ত্বং বচসা অভিষিক্ত অসি), আমাদেরও তেজের দ্বারা অভিষিক্ত করো (মা বচসা অভি সিঞ্চ)। হে মণি! তুমি সাক্ষাৎ তেজোপ (তেজঃ অসি) অতএব আমার মধ্যে তেজঃ ধারণ করো (ময়ি তেজঃ ধারয়); তুমি ধনপ্রাপ্ত হয়েছে (অধি রয়িঃ অসি), আমাতেও ধন স্থাপন করো অর্থাৎ আমাকেও ধন প্রদান কেরা (রয়িং মে ধেহি)। ১২।
হে মণি! তুমি সাক্ষাৎ পুষ্টিস্বরূপ (পুষ্টিঃ অসি); অতএব পুষ্টির দ্বারা আমাকে সম্যক্ অক্ত করো (সম অগ্ধি) অর্থাৎ সমৃদ্ধ করো। তথা তুমি গৃহমেধী অর্থাৎ গৃহস্থ; অতএব আমাকে গৃহপতি করো অর্থাৎ ধন-স্বর্ণ ইত্যাদি সমৃদ্ধ গৃহের অধিকারী করো বা সোমবাগ ইত্যাদি কর্মের অনুষ্ঠাতা করো (কৃণু)। হে ঔদুম্বর মণি! তুমি সেই হেন উক্তবিধ নানা ধর্মোপেতত্বে বিদ্যমান (স), অতএব সেই গ্রামণীত্ব বৰ্চস্বিত্ব-তেজোরূপত্ব-অধিরয়িত্ব ইত্যাদি সকলই আমাদের মধ্যে স্থাপন করো (অস্মাসু ধেহি)। অধিকন্তু, আমাদের (নঃ) পুত্র-ভৃত্য ইত্যাদি যার দ্বারা আমরা তুষ্ট হই, সেই ধন প্রদান করো (রয়িং চ সর্ববরং নি যচ্ছ)। হে মণি! আমি ধন ইত্যাদির পুষ্টি কামনায় (রায়স্পোষায়) তোমাকে বন্ধন করছি, অর্থাৎ ধারণ করছি (অহং ত্বম্ প্রতি মুঞ্চে)। ১৩ ৷৷
(উপযুক্ত মন্ত্রের শেষাংশ ফলান্তর সম্বন্ধে পরোক্ষে পুনরায় অভিধীত হয়েছে) (আমি ধন ইত্যাদির পুষ্টি কামনায় ঔদুম্বর মণি ধারণ করেছি)। এই মণি (অয়ম্ ঔদুম্বরঃ মণিঃ)। যেখানে বিবিধ শত্রু (বীরঃ) আছে, সেখানেই সেই শত্রুবর্গকে (বীরায়) বধ করে থাকে। তাদৃশ মণি (স) আমাদের প্রভূত মধুবৎ ধন ইত্যাদি লব্ধ করিয়ে দিক (নঃ মধুমতীং সনিং কৃণোতু) এবং আমাদের সকল পুত্র ইত্যাদি প্রদান করুন (নঃ সর্ববীরং নি যচ্ছা)। অথবা-পুত্র ইত্যাদির সাথে ধন প্রদান করুন; অর্থাৎ পুত্র ইত্যাদি ও ধন প্রদান করুন। ১৪।
বঙ্গানুবাদ — (এখানে মৃত্যুভয় পরিহারের উদ্দেশ্যে দর্ভের মণিসাধনভূত স্বরূপ সম্পাদন পূর্বক বন্ধন কথিত হয়েছে)–অনেক পর্বযুক্ত (শতকাণ্ডঃ), কারো দ্বারা ছেদিতব্য নয় (দুঃচ্যবনঃ), অনেক পত্রযুক্ত (সহস্রপর্ণঃ), সকল ওষধির মধ্যে উৎকৃষ্টতর অর্থাৎ অতিশয় বীর্যশালী (উত্তিরঃ), উর্ণবল (উঃ) দর্ভ নামক যে ওষধিবিশেষ, সেই দর্ভের মণির দ্বারা, হে মৃত্যুভয়ার্দিত পুরুষ! তোমাকে বন্ধন করছি। (কি জন্য?–না) শতসম্বৎসরলক্ষণ আয়ুর নিমিত্ত (আয়ুষে) ১
মৃত্যুদূতবর্গ বা রাক্ষস-পিশাচ ইত্যাদি এর কেশ আকর্ষণ করতে পারে না (ন অস্য কেশান প্র বপন্তি) এবং বক্ষে আঘাত করতে পারে না (ন উরসি তাড়ম্ আ ঘুতে)। প্রয়োগকারী জন সেই মৃত্যুভয়ার্দিত পুরুষকে (যস্মা) অচ্ছিন্নপর্ণ দর্ভের দ্বারা নির্মিত মণি বন্ধন পূর্বক সুখ প্রদান করেছেন (শর্ম যচ্ছতি)। ২।
হে। শতকাণ্ডাখ্য ওষধি! তোমার অগ্রভাগ দ্যুলোকে (তে তুলং দিবি) অর্থাৎ দ্যুলোক পর্যন্ত উর্ধ্বে তোমার অভিবৃদ্ধি এবং সম্পূর্ণ দ্যাবাপৃথিবীব্যাপী অনেক কাণ্ডোপেত (সহস্ৰকাণ্ডেন) তোমার দ্বারা এই মৃত্যুভয়ার্দিতের (অস্য) আয়ু প্রকর্যের সাথে অভিবর্ধন করছি (প্র বর্ধয়ামহে)। ৩।
হে শতকাণ্ডাখ্য ঔষধি! তুমি তোমার ভোগস্থান ত্রিবৃৎ দ্যুলোক এবং এই পরিদৃশ্যমান (ইমাঃ) ত্রিগুণাত্মক পৃথিবী অতিক্রম পূর্বক অবস্থান করে আছো, অর্থাৎ বেষ্টিতবান্ হয়ে আছো (অতি অতৃণৎ)। এমন মহানুভাব তোমার দ্বারা আমি (ত্বয়া অহং) দুষ্টহৃদয়শালী শত্রুর জিহ্বা (দুঃহার্দঃ জিহ্বা) বেষ্টন করছি (নি তৃণদ্মি) এবং তাদের বচন (বচাংসি) রুদ্ধ করছি। ৪
হে শতকাণ্ডাখ্য ঔষধি! তুমি শত্রুগণের আক্রমণ সহনশীল (সহমানঃ অসি), অর্থাৎ তাদের পরাভবক্ষম; আমিও কৃতসহন অর্থাৎ শহিংসাসাধনের বলধারী (অস্মি সহস্বা)। আমরা উভয়ে সহনধর্মী হয়ে (উভৌ সহস্বন্তৌ ভূত্ব) অর্থাৎ সমান বলশালী হয়ে, শক্রবর্গকে অভিভূত করবো (সপত্না সহিষীমহি)। ৫।
হে শকাণ্ডাখ্য ঔষধি! আমাদের অভিহিংসক (অভিমাতি) অর্থাৎ শত্রু বা পাপকে পরাভূত করো (সহস্ব)। তথা আমার সাথে যুদ্ধের উদ্দেশে যারা সেনা সংগ্রহে অভিলাষী (পৃতনায়তঃ), তাদের অভিভব করো (সহস্ব)। সকল দুষ্ট-হৃদয়শালী শত্রুদের (দুঃহার্দঃ) পরাভূত করে আমার প্রতি বহুভাবে শুভ হৃদয়সম্পন্ন করো (সুহাদঃ কৃধি), অর্থাৎ সকলকে আমার অনুরক্ত করো। ৬।
দেবতাবর্গের নিকট হতে উৎপন্ন (দেবজাতেন), দ্যুলোকের অধঃপতন রোধকারী অর্থাৎ স্তম্ভস্বরূপ (ষ্টম্ভেন) বা দ্যুলোকের স্তম্ভনকারী দর্ভের দ্বারা সর্বদা (শশ্বাদৎ) আমি জনগণকে দীর্ঘজীবী করববা (শশ্বতঃ জনা) ও তাদের অলভ্য সামগ্রী সুলভ্য করবো (অসনং সনবানি চ)। ৭।
হে দর্ভ (অর্থাৎ দৰ্ভমণি)! তোমাকে ধারণকারী আমায় ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় বর্ণের প্রিয় করো (প্রিয়ং কৃণু), অর্থাৎ আমি যাতে তাঁদের প্রিয় হই তৈমন করো। তথা শূদ্র ও আর্য অর্থাৎ মানী পুরুষগণকে (শূদ্রায় আর্যায় চ) আমার, প্রিয় করো। অধিকন্তু, আমি অনুলোম ও প্রতিবোম জাতীয়ের মধ্যে যাকে যাকে (যস্মৈ) প্রিয়ভাবে কামনা করবো, সেই সকল পাপাকাঙ্ক্ষিত (বিপশ্যতে) পুরুষবর্গকে আমার প্রিয়ভূত করো। ৮।
যে শতকাণ্ডাখ্য দর্ভ প্রাদুর্ভাব মাত্রই (যে জায়মানঃ) পৃথিবীর সবকিছুকে দৃঢ় করেছে (অদৃংহৎ), অর্থাৎ যাতে জলে সবকিছু বিলীন না হয়, সেই নিমিত্ত আপন মূলের দ্বারা ভূ-ভাগকে দৃঢ় করেছে)। যে প্রাদুর্ভূত হওয়া মাত্রই আপন কাণ্ডের দ্বারা অন্তরীক্ষলোক ও দ্যোতমান দ্যুলোককে স্তম্ভিত করেছে; অর্থাৎ যাতে নিপতিত না হয়, তেমন স্তম্ভস্বরূপ হয়েছে। এই হেন শতকাণ্ডোপেত দর্ভমণি ধারণকারী (বিভ্রতং) পাপ কি তা জানেন না (পাপ্পা ননু বিবেদ), অর্থাৎ তাঁকে পাপ স্পর্শ করতে পারে না। সেই হেন এই অন্ধকার-নিবারক দর্ভ (বরুণঃ দৰ্ভঃ) আমাদের প্রকাশ করুক (নঃ দিবা অকঃ)। ৯।
শত্রুঘাতক (সপত্নহা), শতকাণ্ডোপেত বলবান্ বা মহানুভাব (সহস্বা) দর্ভ ওষধীসমূহের মধ্যে মুখ্যরূপে সস্তৃত হয়েছে (সং বভূব)। এই হেন দর্ভ (অয়ং) আমাদের সকল দিকের ভয় হতে পরিত্রাণ করুক (পরি পাতু)। এই দমণির দ্বারা (তেন) আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে সেনা সংগ্রহে অভিলাষী শত্রুদের (পৃতন্যতঃ পৃতনা) পরাভব করবো (সাক্ষীয়)। ১০।
বঙ্গানুবাদ— বহুমূল্য (সহস্রার্ঘঃ), বহুঁকাণ্ডোপেত (শতকাণ্ডঃ) বলবান, (পয়স্বান–সহস্বান), জলের অগ্নিস্থানীয় (অপাং অগ্নিঃ) অর্থাৎ জলের স্রষ্টা বা জলের শোষক, লতা ইত্যাদির মধ্যে রাজসূয় সম (বীরুধাং রাজসূয়) অর্থাৎ সকল যজ্ঞের মধ্যে রাজসূয়ের শ্রেষ্ঠত্বের সমতুল্য সকল ওষধির মধ্যে শ্রেষ্ঠ; এই হেন দর্ভ (স অয়ং দর্ভঃ) আমাদের সর্বতোভাবে রক্ষা করুক (নঃ বিশ্বতঃ পরি পাতু)। সেই দেবসৃষ্ট মণি (দেবঃ মণিঃ) আমাদের আয়ুর সাথে সংসর্গ বিশিষ্ট করুক (নঃ আয়ুষা সং সৃজাতি), অর্থাৎ দীর্ঘ আয়ু প্রদান করুন ॥১॥
হুতাবশিষ্ট আজ্যের দ্বারা অনুলিপ্ত (ধৃতাং উৎলুপ্তঃ), মাধুর্যোপেত (মধুমা), প্রভূত দুগ্ধশালী (পয়স্বা), আপন মূলের দ্বারা ভূমির দৃঢ়ীকর্তা (ভূমিদৃংহঃ), চ্যুতি বা নাশরহিত (অচ্যুত), দৃঢ় শত্রুগণেরও ক্ষরণকারী (চ্যায়িষ্ণুঃ), হে দৰ্ভমণি! তুমি শত্রুবর্গকে সুদূরে প্রেরণ করে (নুদ) ও তাদের নিকৃষ্টভাবে বলহীন করে (অধরা স্বয়ং মহত্ত্বোপেত অর্থাৎ অতিশয়িত বীর্যশালী (মহতাং) অন্য ওষধীর ইন্দ্রসৃষ্ট সামর্থ্যের সাথে (ইন্দ্রিয়েন) ভুজ ইত্যাদি প্রদেশে অধিষ্ঠিত হও (আ রোহ)। ২।
হে মণিভূত দর্ভ! তুমি বলের দ্বারা ভূমি অতিক্রম করেছো (ওজসা ভূমি অতি এষি), তুমি হিংসারহিত যজ্ঞের বেদীতে (চারুঃ অধ্বরে বেদ্যা) হবিঃ আস্বাদনের নিমিত্ত উপবিষ্ট হয়েছে (সীদসি)। অধিকন্তু তুমি শুদ্ধিকারক (পবিত্রং ত্বাং)। অতীন্দ্রিয়দ্রষ্টাগণ (ঋষয়ঃ) স্বপাবনার্থে অর্থাৎ নিজেদের শুদ্ধিকরণের নিমিত্ত তোমাকে আহরণ করেছেন (অভরন্ত)। এই হেন তুমি (ত্বম) আমাদের নিকট হতে (অস্মৎ) সকল পাপ (দুরিতানি) শোধন করো (পুনীহি) ॥ ৩॥
অতি তীক্ষ্ণীকৃত শক্তিসম্পন্ন (তীক্ষঃ), সকল ওষধী বা মণির মধ্যে রাজস্বরূপ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ (রাজা), বিশেষভাবে সহনশীল অর্থাৎ শত্ৰুমৰ্ষক (বিষাসহি), রাক্ষসহন্তা (রক্ষোহা), বিশ্বদ্রষ্টা (বিশ্বচৰ্ষণিঃ), ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণের ওজঃ অর্থাৎ তেজঃস্থানীয় (ওজঃ ॥ দেবানাম), পরের পক্ষে অসহনীয় বলস্বরূপ (উগ্রং বলং), এমন রক্ষাসাধন এই দৰ্ভাখ্য বস্তু অথবা অথবা ইদানীং (এতৎ)। এই হেন মণি (তং), হে রক্ষাকামী পুরুষ (তে)! তোমাকে বন্ধন করছি। (কি জন্য?–না) জরাপরিহারার্থে ও ক্ষেমার্থে অর্থাৎ কল্যাণার্থে (জরসে স্বস্তয়ে)। ৪।
হে পুরুষ! তুমি দৰ্ভমণির সাধনের দ্বারা (দর্ভেণ) শত্ৰুজয় ইত্যাদি কর্ম করো (বীর্যাণি কৃণুবৎ)। অতঃপর এই বীর্যসাধন দর্ভ ধারণ পূর্বক তুমি নিশ্চলতার সাথে যুক্ত হয়ে (বিভ্ৰৎ আত্মনা) ব্যথানুভব করো না (মা ব্যথিষ্ঠাঃ)। অধিকন্তু, তুমি শারীরিক বলের দ্বারা অধিষ্ঠিত হয়ে (বচসা অন্যান্) সূর্যের ন্যায় চারি প্রকৃষ্ট দিক প্রকাশ করো (প্রদিশঃ চতস্র আ তাহি), অর্থাৎ সূর্য যেমন আপন তেজে বা আলোকে পূর্ব ইত্যাদি চারিটি দিকের লোকসমূহকে প্রকাশ করে, তুমিও তেমনই প্রকাশ করো। ৫
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! তুমি পরমৈশ্বর্যবান অথবা সোমের (পানের) নিমিত্ত সত্বর গমনশীল। তুমি অভীষ্টবর্ষণে সমর্থ (বৃষভং)। সেই হেন তোমাকে আমরা অর্থাৎ যজমানগণ সোম অভিযুত হলে পর, তা পান করার নিমিত্ত আহ্বান করছি (হবামহে)। তা (স) অর্থাৎ আমাদের দ্বারা আহূত হয়ে তুমি মধুর রসযুক্ত (মধ্বঃ) সোমলক্ষণ অন্ন (অন্ধসঃ) বা অন্নলক্ষণ মধুর সোমরস পান করো (পাহি)। ১।
হে মরুৎ-বর্গ! তোমরা সকল দেবগণের মধ্যে অতিশয়িত বীর্যবান, (প্রাণান্তক বায়ুর নির্গমে প্রাণীগণের মৃত্যু প্রসিদ্ধ, সুতরাং যাদের দ্বারা প্রাণীগণের মৃত্যু হয়, তোমরাই তারা; অথবা অদিতি গর্ভে অবস্থানকালে সেই গর্ভে প্রবিষ্ট ইন্দ্র কর্তৃক ঊনপঞ্চাশৎ ভাগে খণ্ডিত যে দেবগণ মরুৎ নামে প্রসিদ্ধ, তোমরাই তারা); যে যজমানের (স জনঃ) যজ্ঞগৃহে (ক্ষয়ে) দ্যুলোক হতে আগত হয়ে তোমরা সোম পান করে থাকো (পাথ), সেই যজমান এই লোকে আপন আশ্রিত রক্ষকগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ (সুগোপাতমঃ)। (অতএব আমি হেন সেই যজমানের গৃহে বা যজ্ঞগৃহে তোমরা সোমপান করো)। ২৷৷
উক্ষান্ন অর্থাৎ সেচনসমর্থ বৃষ যাঁর অন্ন, বোন্ন অর্থাৎ বন্ধ্যা অজ ইত্যাদি যাঁর অন্ন বা হবিঃ, তথা সোমরস যাঁর পৃষ্ঠে বা উপরিদেশে অর্থাৎ মুখে স্থিত হয়ে আছে (সোমপৃষ্ঠায়), সেই হেন বিধাতা বা সকলের স্রষ্টা (বেধসে) উক্তগুণবিশিষ্ট বা অঙ্গনাদিগুণবিশিষ্ট অগ্নিদেবের (অগ্নয়ে) স্তুতিসাধনভূত স্তোত্রের দ্বারা (স্তোমৈঃ) পরিচর্যা করছি (বিধেম)। ৩ ৷৷
বিনিয়োগ ও টীকা— এই বিংশ কাণ্ডের নয়টি অনুবাক। প্রথম অনুবাকে সূক্তসংখ্যা ত্রয়োদশ। এর মধ্যে প্রথম অর্থাৎ উপযুক্ত তিনটি ঋক্ সম্বলিত সূক্তে অগ্নিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞে ব্রাহ্মণাচ্ছংসি, পোত্রা বা পোতা ও অগ্নিবর্গ ক্রমে প্রাতঃসবনিক প্রস্থিতযাজ্যার কথা বলা হয়েছে। বৈতানে (৩/৯) এর বিধান সূত্রিত আছে। অগ্নির উক্ষান্ন বশান্ন ইত্যাকার রূপ আখলায়ন গৃহ্যসূত্রেও (১১) পাওয়া যায়। (২০কা, ১অ. ১১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –মরুৎ-দেবগণ সুন্দর স্তোত্রসম্পন্ন ও শস্ত্রশালী পোতার বা হোতার যজ্ঞে ঋতুগণ সমভিব্যাহারে আমাদের অভিষব ইত্যাদি সংস্কারোপেত সোমরস পান করুন (পিবতু) ॥১॥ অগ্নিদেব সুন্দর স্তোত্রসম্পন্ন ও শস্ত্রশালী আগ্নীদ্রের অর্থাৎ অগ্নিরক্ষণে নিযুক্ত ঋত্বিকের যজ্ঞে ঋতুগণ সমভিব্যাহারে আমাদের অভিষব ইত্যাদি সংস্কারোপেত সোমরস পান করুন। ২। পরমৈশ্বর্য ইত্যাদি গুণযুক্ত ইন্দ্রদেবই ব্রহ্মা অর্থাৎ ব্রহ্মাত্মক ইন্দ্র দেবতা সুন্দর স্তোত্রসম্পন্ন ও মন্ত্রযুক্ত ব্রাহ্মণাচ্ছংসী (ব্রাহ্মণাৎ) নামক শস্ত্রযাগলক্ষণ ঋত্বিকের যজ্ঞে ঋতুগণ সমভিব্যাহারে আমাদের অভিষব ইত্যাদি সংস্কারোপেত সোমরস পান করুন৷ ৩৷ হিরণ্য ইত্যাদি-লক্ষণ ধন বা বল প্রদাতা (দ্রবিনোদা) দেব সুন্দর স্তোত্রসম্পন্ন ও মন্ত্রোপেত পোতা নামক ঋত্বিকের যজ্ঞে ঋতুগণ সমভিব্যাহারে আমাদের অভিষব ইত্যাদি সংস্কারোপেত সোমরস পান করুন। ৪
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির চারিটি মন্ত্রই ঋতুষৈ নামে আখ্যাত। এখানে ১ম ও ৪র্থ মন্ত্রের দ্বারা পোতা নামক ঋত্বিক যাগের মাধ্যমে ঋতু প্রেরণ করেন, ২য়টির দ্বারা আগ্রীব্র ও ৩য়টির দ্বারা ব্রাহ্মণাচ্ছংসী নামক ঋত্বিকদ্বয় যথাক্রমে যাগ করে থাকেন। বৈতানিক (৩/৯) এর বিধান সূত্রিত আছে। (২০কা, ১অ. ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে পরমেশ্বর্য ইত্যাদি গুণবিশিষ্ট ইন্দ্র! তুমি আগমন করো (আ যাহি)। (কি জন্য? না) তোমার নিমিত্ত সোম অভিযুত হয়েছে (সুষুমা হি); এই অভিযুত সোম পান করো (ইমম্ পিব); এবং আমার এই আস্তীর্ণ কুশে (ইদং বর্হিঃ) উপবিষ্ট হও (আ সদঃ) ১।
হে ইন্দ্র! মন্ত্রের দ্বারা রথে যুজ্যমান (ব্রহ্মযুজা), স্কন্ধদেশে প্রকৃষ্ট কেশশালী লোহিত অশ্বদ্বয় (কেশিনা হবী) তোমাকে বহন পূর্বক আগত হোক (আ বহতামং)। তদর্থে অথবা আগমন করে আমাদের আহ্বানসাধন মন্ত্ৰসমূহ শ্রবণ করো (নঃ ব্রহ্মণি উপ শৃণু) ॥ ২॥
হে ইন্দ্র! আমরা ব্রাহ্মণ যজমানগণ (বয়ং) অথবা ব্রাহ্মণাচ্ছংসী ঋত্বিকগণ তোমাকে স্তুতিযোগ্য দেবগণের হৃদয়স্পর্শকরী স্তোত্রের দ্বারা আহ্বান করছি (তা যুজা)। (কিরকম তোমাকে? না–) সোমপানে অত্যন্ত প্রিয়ত্বসম্পন্ন (সোমপা)। (আমরা কেমন? না) আমরা কৃতসোম্যগ অর্থাৎ সোম্যগানুষ্ঠানে রত (সসামিনঃ) এবং অভিযুত- সোমবন্ত অথবা সোমের দ্বারা যুক্ত (সুতাবন্তঃ)। আমরা তোমাকে (সোমপানের নিমিত্ত) আহ্বান করছি (হবামহে) ॥ ৩
বিনিয়োগ ও টীকা –জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞবিশেষে প্রাতঃসবনে ব্রাহ্মণাচ্ছংসী-শস্ত্রে উপযুক্ত সূক্তটি সহ পরবর্তী চারিটি (৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম) সূক্ত বিনিযুক্ত হয়েছে। বৈতানিকে (৩।১১) এই বিনিয়োগ-পদ্ধতি সূত্রিত আছে ৷ (২০কা, ১অ. ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! সোম-অভিষবকারী আমাদের প্রতি আগমন করো (সুতাবতঃ আ নঃ যাহি), আমাদের শোভন স্তুতি প্রাপ্ত হও (সুষ্ঠুতীঃ উপা যাহি); এবং আগমন পূর্বক, হে শোভন– হনুযুক্ত ইন্দ্র (সু শিপ্রিণ)! (অর্থাৎ সোমপানোচিত মুখসম্পন্ন বা শোভন-নাসিকোপেত হয়ে)। আমাদের এই সোমরসলক্ষণ অন্ন (অন্ধসঃ) গ্রহণ করো বা সোমের অংশ পান করো (পিব) ॥১॥
হে ইন্দ্র! তোমার কুক্ষির অর্থাৎ জঠরের উভয় পার্শ্ব (কুক্ষ্যোঃ ) সোমরসে পূর্ণ করে দিচ্ছি (আ সিঞ্চামি)। সেই সোমরস উদরস্থ হয়ে সর্বাঙ্গে অর্তাৎ হস্ত-পদ ইত্যাদির সকল নাড়ীতে প্রবাহিত হোক (বি ধাবতু)। অতএব তুমি মধুবৎ স্বাদুতর (মধু) সোমরস জিহ্বার দ্বারা আস্বাদন বা লেহন করো (গৃভায়)। ২.
হে সম্যক্ সুষ্ঠু দাতা (সংসুদে) ইন্দ্র! তোমার উদ্দেশে আমাদের দ্বারা উপহৃত মাধুর্যময় (মধুমা) সোম সুস্বাদনীয় হোক (স্বাদু তে অস্তু)। অনন্তর সেই সোম তোমার দেহে (তন্বে) বলকারক হোক অথবা সুখদায়ক হোক (শং অস্তু)। এই সোম তোমার হৃদয়ে (হৃদে) প্রসন্নতা প্রদান করুক ৷ ৩৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে পশ্যতিকর্মা অর্থাৎ বিশেষ-দ্রষ্টা (বিচৰ্ষণিঃ) ইন্দ্র! অপত্য ইত্যাদির দ্বারা এ ও স্থিত (সভৃতঃ) উৎপত্তি স্থানের মতো (জনীরিব), অথবা সন্তানবতী জননী যেমন পুত্র ইত দ্বারা সর্বদিকে বেষ্টিত হয়ে থাকে, তেমনই এই নোম অধ্বর্য প্রভৃতির দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পে প্রকৃষ্টভাবে গমন করুক (প্র সর্পতু) ॥ ১।
সোমলক্ষণ অন্নের ভক্ষণে হর্ষান্বিত (অং ৩০ নদে) ইন্দ্রদেব প্রভূতকন্ধর (তুবিগ্রীবঃ) অর্থাৎ বৃষের ন্যায় সম্যক বৃদ্ধিসম্পন্ন স্কন্ধশালী, মেদে বিস্তীর্ণ অর্থাৎ চর্বিতে পূর্ণ বিশাল উদরশালী, (বপা উদরঃ), তথা শোভন বা বিস্তৃত বাহুশালী (সুবাহুঃ) হয়ে শত্রুগণকে সংহার করে থাকেন (বৃত্রাণি জিঘুতে)। ২।
হে ইন্দ্র! তুমি বিশ্বের অর্থাৎ স্থাবর-জঙ্গমাত্মক সব কিছুর প্রভু। এই হেন তুমি আমাদের সেনাবর্গের পুরোগামী হয়ে (ত্বং পুরঃ প্রেহি), হে বৃঘাতী (বৃহ)! আমাদের অবরোধকারী শত্রুগণকে হত্যা করো (বৃত্রাণি জহি) ॥ ৩ ৷৷
হে ইন্দ্র! তোমার অঙ্কুশবৎ নম্র বা সূক্ষ্মাগ্র অঙ্গুলিযুক্ত হস্ত দীর্ঘ হোক, অর্থাৎ প্রদানবিষয়ে সঙ্কোচরহিত হোক, যার দ্বারা (যেন) অর্থাৎ যে অঙ্কুশের দ্বারা তুমি সোম-নিষ্পন্নকারী ও সোমলক্ষণ হবির দাতা (সুম্বতে) যজমানকে বসু অর্থাৎ ধন প্রদান করতে পারো (সেই রকম দীর্ঘহস্তশালী হও) 8
হে ইন্দ্র! আস্তীর্ণ দুর্ভে (অধি বহিষি) দশাপবিত্রের দ্বারা নিরন্তর শোধিত (নিপূতঃ), (অর্থাৎ গ্রহণ-শ্রয়ণ ইত্যাদি সংস্কারের দ্বারা সংস্কৃত) এই সোম তোমারই নিমিত্ত, অতএব অবিলম্বে আমাদের এই যজ্ঞাভিমুখে (এহি) আগমন করো এবং আগমন করে এক্ষণই (ঈং) এই অভিযুত সোমকে (অস্য) পান করো ৷৷ ৫৷৷
হে পণি নামক অসুরণের দ্বারা অপহৃত গো-বর্গকে পুনরুদ্ধার পূর্বক আনয়নের নিমিত্ত প্রসিদ্ধ (শাচিগো), স্তুতির মাধ্যমে গুণপ্রকাশের নিমিত্ত পূজিত (শাচিপূজন), হে ইন্দ্র! তুমি রমণীয় (রণায়), অথবা তোমার ক্রীড়নায় (রণায়), এই সোম অভিষব ইত্যাদির দ্বারা সংস্কৃত (সুতঃ)। সেই কারণে, হে আখণ্ডল (শত্রুগণকে হিংসাকারী ইন্দ্র)! তুমি সোমপানার্থে আমাদের দ্বারা প্রকৃষ্টভাবে আহূত হচ্ছো (প্র হুয়সে) ॥ ৬৷
হে শৃঙ্গবৃষ নপাৎ (শৃঙ্গবৃণ নামক কোনও ঋষির কুলপালক পুত্র, অথবা শৃঙ্গবৎ উন্নত রশ্মিসমূহের পাতয়িতা আদিত্যকে দ্যুলোকে স্থাপয়িতা, ইন্দ্র)! এই বহুসোমযুক্ত প্রসিদ্ধ ক্রতুতে (কুণ্ডপায্যঃ) তুমি সর্বর্তভাবে মন স্থাপন করো (মনো নি দর্ধে)। ৭।
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তের সাতটি মন্ত্রই সোমযাগে সোমের স্তুতির মাধ্যমে সোমপ্রিয় ইন্দ্রের নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপনে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে ॥ (২০কা, ১অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –[এই ঋকটি এই অনুবাকের প্রথমেও ব্যাখ্যাত হয়েছে]–হে ইন্দ্র! তুমি পরমেশ্বর্যবান্ অথবা সোমের (পনের) নিমিত্ত সত্বর গমনশীল। তুমি অভীষ্টবর্ষণে সমর্থ। সেই হেন তোমাকে আমরা অর্থাৎ যজমানগণ সোম অভিযুত হলে পর, তা পান করার নিমিত্ত আহ্বান করছি। আমাদের দ্বারা আহূত হয়ে তুমি মধুর রসযুক্ত সোমলক্ষণ অন্ন বা অন্নলক্ষণ মধুর সোমরস পান করো ॥১।
হে পুরুষ্টুত (অর্থাৎ বহু যজমান কর্তৃক বা বহুপ্রকারে স্তুত ইন্দ্র)! যাগের নিম্পাদক (ক্রতুবিদ), অভিষব ইত্যাদির দ্বারা সংস্কৃত (সুতং) এই সোম কামনা করো (হৰ্য); অতঃপর প্রতিদায়ক এই সোম (ততৃপিং) জঠরকুহর পূর্ণ করে (আ বৃষস্ব) পান করো (পিব)। ২।
হে স্কৃয়মা (স্তবা), হে মরুৎগণের স্বামী বা সকল প্রজার পালক (বিপতে), ইন্দ্র! সকল যাগযোগ্য দেবগণের সাথে (বিশ্বেভিঃ দেবেভিঃ) গ্ৰহপাত্র ইতাদির দ্বারা গৃহীত (ধিতাবানং) সোমের আধারভূত যজ্ঞের বর্ধন করো (প্র তির) অর্থাৎ হবিঃ স্বীকার করো। ৩।
হে সৎপতে (অর্থাৎ যজমানবৃন্দের পালক) ইন্দ্র! এই অভিযুত (সুতাঃ), আহ্লাাদকারী (চন্দ্রাসঃ) রসাত্মক (ইন্দবঃ) আমাদের দ্বারা হুয়মান (ইমে) সোম তার নিবাসস্থানে (ক্ষয়ং) অর্থাৎ তোমার জঠরকুহরে প্রকৃষ্টভাবে গমন করছে (প্র যন্তি) ৷ ৪.
হে ইন্দ্র! আমাদের দ্বারা হুয়মান এই স্পৃহণীয় (বরেণ্য) অভিযুত সোম তোমার জঠরে ধারণ করো (জঠরে দধিম্ব)। এই দীপ্তি নিবাসস্থানভূত (ক্ষাসঃ) সোমরাশি তোমার নিমিত্ত বিশিষ্ট ভাগ ॥ ৫॥
হে সম্যক ভজনীয় (গির্বণঃ) ইন্দ্র! আমাদের অভিযুত সোম (সুতং) পান করো (পাহি), যেহেতু মধুর সোমের ধারার দ্বারা (মধ্যেঃ ধারাভিঃ) তুমি আদ্ৰীক্রিয় হচ্ছো (অজ্যসে) অর্থাৎ আহূত হচ্ছে। হে ইন্দ্র! তোমার দাঁতব্য অন্ন বা শোধিত যশ আছে (ত্বাদাতম ইৎ)। (অর্থাৎ তোমাকে আমরা সোমের দ্বারা আহূতি প্রদান করছি। এই সোম তোমার সুন্দর যশোরূপ) ৷ ৬ ৷৷
দেবগণের সম্ভজমান অর্থাৎ সম্যক্ ভজনাকারী যজমানের (বনিনঃ) দ্যোতমান সোমলক্ষণ অনুরাশি (দ্যুম্ননি) প্রভূত পরিমাণে (অক্ষিতা) ইন্দ্রদেবের অভিমুখে সম্যক্ গমন করছে (অভি সচন্তে); ইন্দ্র সেই সোম পান করে প্রবৃদ্ধ হচ্ছেন (সোমস্য পীত্বী বাবৃধে)। ৭
হে বৃহন্তা (বৃহ) অর্থাৎ ইন্দ্রদেব! তুমি আমরা হেন যজমানগণের নিকটে নিকটবর্তী দেশ বা স্থান হতে (অর্বাবতঃ), তথা দূরদেশ বা স্থান হতে (পরাবতঃ) আগমন করো। এবং আগমন করে আমাদের স্তুতিরূপ বাক্যসমূহের সেবা করো (নঃ ইমাঃ গিরঃ জুষস্য), অর্থাৎ আমাদের দ্বারা উচ্চারিত তোমার গুণকথন শ্রবণ করো ॥ ৮৷
হে ইন্দ্র! তুমি দূরস্থান (পরাবতং) তথা সন্নিহিত স্থান (অৰ্বাবতং) এবং তার যে (যৎ) অন্তরালদেশে (অন্তরা) আহূত হয়েছে, সেই সেই দেশ হতে (ততঃ) আমাদের এই যাগদেশের প্রতি (ইহ) অর্থাৎ যজ্ঞস্থলে আগমন করো (আ গহি) ॥ ৯৷৷
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তের নয়টি মন্ত্রই প্রাতঃসবনশস্ত্রে বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। (২০কা, ১অ. ৬সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে সূর্য! স্তোতা অর্থাৎ স্তুতিপরায়ণ ও যজ্ঞক্রিয়াশীল অর্থাৎ যজমানবর্গকে দাঁতব্যের নিমিত্ত যাঁর বিখ্যাত ধনরাশি আছে (তমঘং); যিনি অভীষ্ট ফলের বর্ষক (বৃষভং); মনুষ্যের হিতের নিমিত্ত যাঁর কর্মসমূহ (ন্যাপসং), অর্থাৎ আপন সেবকগণের ইষ্টপ্রাপ্তি ও অনিষ্ট পরিহারের বিষয়ে যিনি কর্মবন্ত; তথা যিনি শূঞগণের নিবর্তক, সেই হেন মহানুভাব ইন্দ্রের অভিলক্ষ্যে তুমি উদিত হও (উৎ ব ইৎ অভি)। (সূর্যোদয়ের অভাবে ইন্দ্রের উদ্দেশে সোমলক্ষণ হবিঃ-প্রদান অসম্ভব; সেই হেতু সূর্যের নিকট এই উদয়-প্রার্থনা) ॥১॥
যে ইন্দ্র শম্বরাসুরের নব নবতি অর্থাৎ নিরানব্বই সংখ্যক মায়ানির্মিত পুরী (পুরঃ) বাহুবলে (বাহোজসা) অর্থাৎ অন্যের সাহায্য ব্যতিরেকে বিনাশ করেছেন (বিভেদ), সেই ইন্দ্ৰ শত্ৰুগণকে হত্যা করেছেন (বৃত্ৰহা) অথবা মেঘদলকে বিদীর্ণ করেছেন এবং বৃত্ৰ নামক অসুরকে বধ করেছেন (অহি চ অবধীৎ)। ২।
সেই পূর্বোক্ত গুণবিশিষ্ট ইন্দ্র আমাদের সুখকারী (শিবঃ) ও মিত্রভূত (সখা)। তাদৃশ ইন্দ্র আমাদের বহু অশ্ব, বহু গাভী ও বহু যবযুক্ত অর্থাৎ ধান্যযুক্ত ধন প্রদান করুন, যেমন প্রভূত ধারাযুক্ত অর্থাৎ বহুক্ষীরা গাভী সর্বজনের তৃপ্তিসাধন প্রভূত দুগ্ধ প্রদান করে (উরুধারেব দোহতে)। ৩।
হে বহু যজমান কর্তৃক বা বহুপ্রকারে স্তুত ইন্দ্র! যাগের নিম্পাদক, অভিষব ইত্যাদির দ্বারা সংস্কৃত এই সোম কামনা করো; অতঃপর প্রীতিদায়ক এই সোম জঠরকুহর পূর্ণ করে পান করো। ৪
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি ব্রাহ্মণাচ্ছংসিগণের প্রাতঃসবনে বিনিয়োগ হয়ে থাকে। ৪র্থ মন্ত্রটি ৬ষ্ঠ সূক্তের ২য় মন্ত্ররূপে পাওয়া যায়, আবার পরবর্তী ৮ম সূক্তের ১ম মন্ত্ররূপে উল্লিখিত। (২০কা, ১ ১অ. ৭সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে বহু যজমান কর্তৃক বা বহুপ্রকারে স্তুত ইন্দ্র! জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি যজ্ঞ নিষ্পদক, অভিষব ইত্যাদির দ্বারা সংস্কৃত এই সোম কামনা করো; অতঃপর প্রীতিপ্রদায়ক এই সোম জঠরকুহর পূর্ণ করে পান করো১
হে ইন্দ্র! তুমি পূর্বকালে (প্রত্নথা) অর্থাৎ অঙ্গিরা প্রভৃতি ঋষিগণের কালে তাদের অনুষ্ঠিত সোমযাগে যে প্রকারে সোম পান করেছিলে, সেইরকমে আমাদেরও সোম পান করো (এব পাহি), সেই নিমিত্ত আমাদের মন্ত্রাত্মক স্তোত্র শ্রবণ করো (ব্রহ্ম শ্রুধি)। সেই পীত সোম তোমাকে হর্ষান্বিত করুক (স ত্বা মন্দতু)। কেবল শ্রবণের দ্বারা হর্ষান্বিত নয়, অধিকন্তু আমাদের স্তুতিবাক্যে (গীর্ভি) বর্ধিত হয়ে ওঠো (ববৃধস্ব)।অতএব তোমার যাগের নিমিত্ত। সর্বকর্মের প্রেরক সূর্যদেবকে প্রকাশিত করো (আবিঃ কৃণুহি) অথবা আমাদের ব্যবহারের নিমিত্ত সূর্যদেব বহুকাল প্রকাশিত থাকুক। আমাদের উপভোগ সাধনোপযোগী অন্ন ইত্যাদির (ইষঃ) সম্যক বৃদ্ধি সাধন করো (পীপিহি); অধিকন্তু আমাদের শত্রুগণের অর্থাৎ বিরোধী ও দ্বেষীগণের বিনাশ সাধন করো (জহি)। হে ইন্দ্র! পণি নামক অসুরগণ কর্তৃক অপহৃত গাভীসমূহ আমাদের প্রত্যর্পিত করো (অভি তৃন্ধি)। ২।
হে ইন্দ্র! আমাদের অভিমুখে আগত হও (অবাঙ এহি)। (কি জন্য?) সোমকামং তাহুরিতি অভিজ্ঞজনেরা তোমাকে সোমবিষয়ে অত্যন্ত অভিলাষী বলে থাকেন, যে জন্য এই সোম তোমার নিমিত্ত অভিযুত হয়েছে (তাহুঃ অয়ং সুতঃ তস্য)। সেই সোম তুমি কুক্ষিপরিপূর্তিপর্যন্ত অর্থাৎ যতক্ষণ না উদর পরিপূর্ণ হয়ে না ওঠে, ততক্ষণ পর্যন্ত পান করো (উরু ব্যচা…); এবং পিতা যেমন পুত্রের বাক্য (অর্থাৎ অনুরোধ) শ্রবণ করে (অর্থাৎ রক্ষা করে) তেমনই তুমি আমাদের আহ্বান শ্রবণ করো (পিতা ইব নঃ…)৷ ৩৷৷
এই দ্রোণকলস (দ্রুমময় যজ্ঞীয় কলশ) ইন্দ্রের উদ্দেশে (অস্য) সোমরসের দ্বারা সর্বতঃ পূর্ণ করা হয়েছে (আপূর্ণঃ অস্য কলশঃ); (কি নিমিত্ত? না) হোমের নিমিত্ত (স্বাহা অর্থাৎ স্বাহুতত্বায়)। সেক্তা অর্থাৎ পূরক জল বা। ভিস্তিবাহক তার কোশ অর্থাৎ দৃতি বা ভিস্তি জলে পূর্ণ করে, সেইভাবে ইন্দ্রের পানের নিমিত্ত বের (পিবধ্যৈ) অধ্বর্য সোমরসে গ্রহ ইত্যাদি পাত্র পূর্ণ করছে। সেই হৃদয়গ্রাহী (প্রিয়াঃ) স্বাদু সোমসমূহ (সোমাসঃ) ইন্দ্রের তৃপ্তির নিমিত্ত (মদায়) প্রদক্ষিণক্রমে (প্রদক্ষিণিৎ) ইন্দ্রের অভিমুখে সম্যক্ ব্যাপ্ত হচ্ছে (সম্ উম্ অভি) ৪
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তের ১ম ঋটি ব্রাহ্মণাচ্ছংসীগণের শস্ত্রজ্যা এষা পাহি ইত্যাদি পরবর্তী তিনটি ঋক্ ব্রাহ্মণাচ্ছংসীগণের মাধ্যন্দিন সবনের প্রস্থিত্যজ্যা। বৈতানিকে (৩/১১) এই বিনিয়োগ সূত্রিত আছে। (২০কা, ১অ. ৮সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে যজমানবৃন্দ! তোমাদের যজ্ঞের সম্পন্নতার বা অভিমত ফলের নিমিত্ত (বঃ) সেই প্রসিদ্ধ ইন্দ্রের অভিলক্ষ্যে আমরা স্তুতিপ্রকাশক বাণীর দ্বারা (গীর্ভিঃ) স্তুতি করছি (নবামহে)। (কীরূপ ইন্দ্র? না–) তিনি দর্শনের যোগ্য (দস্মং), আর্তিনাশক অর্থাৎ দুঃখবিনাশক (ঋতীষহং), সোমলক্ষণ অন্নপানে নন্দমান অর্থাৎ আনন্দিতচিত্তশালী (নন্দানং)। (স্তুতির দৃষ্টান্ত কি? না) অভিনবপ্রসবা ধেনুগণ (অভি ধেনবঃ) সন্ধ্যা ও সকালে (স্বসরেষু) যেমন বৎসগণকে (বৎস) স্তন্য প্রদানের নিমিত্ত উচ্চ শব্দ সহকারে (ক্ষুমন্তং) আহ্বান করে, আমরাও সেইরকমেই ইন্দ্রকে স্তুতি করি। ১
দীপ্ত (দ্যুক্ষুং) শোভনদান (সুদানুং) অর্থাৎ বিশিষ্টদানযোগ্য, বলে বা শক্তিতে আচ্ছন্ন (তবিষভিঃ আবৃতম) অর্থাৎ বলপ্রদ, বহু প্রজার ভোগযোগ্য পর্বতের মতো (গিরিং ন পুরুভোজসং) (যেমন দুর্ভিক্ষে জীবনধারণের নিমিত্ত বহু কন্দমূল ইত্যাদিসম্পন্ন পর্বতের আশ্রয় করে, তেমন) শব্দোপেত অর্থাৎ স্তুতিমন্ত (ক্ষুমন্ত), শত-সহস্ৰসংখক প্রজার পোষকৃত্ব সম্পন্ন অর্থাৎ অপরিমিত প্রাণীর পোষক, বহুগাভীযুক্ত অন্নের (বাজং) শীঘ্র (মঞ্জু) প্রার্থনা করছি (ঈমহে)। ২।
হে ইন্দ্র আমি তোমার নিকট (তৎ) শোভন বীর্যের সাথে যুক্ত (সুবীর্যং), পরিবৃঢ় অর্থাৎ সমর্থ অন্ন (ব্রহ্ম) যাচনা করি (ত্বা যামি); উক্তলক্ষণ অন্ন (তৎ ব্রহ্ম) পূর্বপ্রজ্ঞানের নিমিত্ত (পূর্বচিত্তয়ে); যে অন্নের দ্বারা কর্ম চ হতে নিবৃত যতিগণের (যেনা যতিভ্যঃ) বা ভৃগু নামধারী (ভৃগবে) মহর্ষির নিকট হতে আহরণ করে তাঁদের প্রতিবিধান কবেছে (ধনে হিতে) অথবা যে সুবীর্য অন্নের দ্বারা কর্মনিবৃত অন্য মহর্ষিগণকে পরিতোষিত করেছে। তথা যে ধনের দ্বারা কথপুত্র প্রস্ক ঋষি রক্ষিত হয়েছেন (আবিথ)। ৩।
হে ইন্দ্র! যে বলের দ্বারা (যেন) সৃষ্টির আদিতে (অসৃজঃ) সমুদ্রকে প্রভূত জলে পূর্ণ করেছো (মহীঃ অপঃ), সেই প্রকার (তৎ) তোমার বল (তে শবঃ) সকলের অভিমত ফলের বৰ্ষক হোক (বৃষ্ণি), অর্থাৎ সকলকে অভিলষিত ফল প্রদান করুক। এই ইন্দ্রের মহিমা (অস্য সঃ মহিমা), অর্থাৎ প্রভূত জলের দ্বারা সমুদ্রের পূর্তি ইত্যাদি লক্ষণরূপ মাহাত্ম, বর্তমানে (সদ্যঃ) ও পরেও কেউ নাশ করতে পারেনি (সন্নশে); যে মহিমা (যং) পৃথিবী (ক্ষোণীঃ) অর্থাৎ পৃথিবীর প্রাণীনিকর উদ্ঘঘাষিত করে থাকে (অনুচক্রদে)। ৪
বিনিয়োগ ও টীকা— উপযুক্ত সূক্তটি ও এর পরবর্তী তিনটি সূক্ত মাধ্যন্দিনসবনে ব্রাহ্মণাচ্ছংসীগণের শস্ত্রে বিনিযুক্ত হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, ১২শ সূক্তের শেষ (৭ম) মন্ত্র ঋজীষী বজ্ৰী ইত্যাদি শস্ত্রযাজ্যা। উপযুক্ত সূক্তের প্রথম মন্ত্র তং বো দস্মমৃতীষং ইত্যাদি ও তৃতীয় মন্ত্র তৎ ত্বা যামি সুবীর্যং ইত্যাদি প্রগাথ স্তোত্রিয়ানুরূপ। তেমনই, পরবর্তী (অর্থাৎ ১০ম) সুক্তের প্রথম মন্ত্র উদু ত্যে মধুমত্তমা ইত্যাদি সামপ্রগাথ। একাদশ সূক্তের মন্ত্ৰসমুদায় উথমুখং। দ্বাদশ সূক্তের মন্ত্রগুলি পর্যায়সংজ্ঞ। এর মধ্যে ৬ষ্ঠ মন্ত্র এবেদিন্দ্রং বৃষণং ইত্যাদি পরিধানীয়া। (বৈ. ৩১২)। (২০কা, ১অ, ৯সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –এই মাধুর্যযুক্ত স্তোম (ত্যে মধুমত্তমা) অর্থাৎ গায়ন-মন্ত্রগুলি (ত্রিবৃৎ ইত্যাদি প্ৰগীতমন্ত্রসাধ্য স্রোত্ৰসমূহ) ও অতিশয় মধুর বস্তুবৎ অগায়নশীল বাণীসমূহ (গিরঃ) (অপ্রগীতমন্ত্রসাধ্য শস্ত্রসমূহ) একেবারে শত্রুগণের জয়শীল (সত্রাজিতঃ), ধনপ্রদ (ধনসা), সর্বদা রক্ষক (অক্ষিতোতয়য়া); অন্নের অভিলাষী হয়ে ইন্দ্রের পরিতোয় সম্পাদনের নিমিত্ত প্রেরিত হয়; (তার দৃষ্টান্ত কি? না–) যেমন যথোক্তলক্ষণ রথ সেই রথস্বামীর প্রয়োজন অনুসারে প্রেরিত বা চালিত হয় (রথা ইব) ৷ ১।
কন্বগোত্রীয় মহর্ষিগণও যেমন (কথা ইব) বিশ্বব্যাপ্ত অর্থাৎ লোকত্রয়ের স্বামী ইন্দ্রকে (ইমিৎ) স্তোত্র-শস্ত্র ইত্যাদির দ্বারা প্রাপ্ত হয়েছিলেন, ভৃগু-বংশোদ্ভবগণ যেমন (ভৃগবঃ ইব) ইন্দ্রকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন, ধাতা অর্যমা ইত্যাদি সূর্যসকল যেমন (সূর্যা ইব) স্বনিয়ন্তা ইন্দ্রকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন (আনশু), সেইরকম উক্তগুণক ইন্দ্রকে প্রিয়ভূত মনুষ্যগণ বা প্রিয়মেধা নামক মহর্ষিগণ স্তোত্রের দ্বারা ইন্দ্রের উদ্দেশে স্তুতিধ্বনি উৎসারিত করেছিলেন (অস্বর) ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদ –ইন্দ্রদেব শত্ৰুপুরীসমূহের ভেত্তা অর্থাৎ বিদারক (পূর্ভিৎ); তিনি অর্চনীয় স্ববীর্যে (অকৈঃ) অর্থাৎ আপন শক্তিতে, সর্বতোভাবে শত্রুর প্রতি হিংসিতবান্ (দাসং) হয়েছিলেন বা অর্চনীয় সূত্মক রশ্মির দ্বারা (অর্কৈঃ) তমসাবিনাশক (দাসং) দিনের প্রকাশ করেছিলেন। তিনি লব্ধধন (বিদত্বসু) অর্থাৎ শত্রুধনের অপহর্তা এবং বৃত্র ইত্যাদির বিশেষভাবে হিংসক (শন্ বি দয়মানঃ)। তিনি প্রভূত স্তোত্রের দ্বারা অভিবৃদ্ধ (ব্রহ্মজুতঃ), শরীরের দ্বরা বর্ধমান (তন্ব ববৃধানঃ)। তিনি প্রভূত আয়ুধশালী (ভূরিদাত্রঃ) অথবা বহু ধনশালী। এই হেন ইন্দ্রদেব দ্যাবা ও পৃথিবী উভয়লোককেই। (উভে রোদসী) ব্যাপ্ত করেছেন (আপৃণ)। ১।
হে ইন্দ্র! মহনীয় বা মখাত্মক অর্থাৎ যজ্ঞাত্মক (মখস্য), অতিশয়িত বলের দ্বারা যুক্ত (তবিষস্য) তোমার (তে), প্রেরয়িত্রী বা বর্ধয়িত্রী (জুতিম) স্তুতিলক্ষণা বাণী (বাচ) প্রেরণ করছি (প্র ইয়র্মি)। (কি জন্য? না–) অমৃতায় অর্থাৎ অমৃত বা অন্নের জন্য। (কেমন করে? না) তোমাকে ভূষিত বা অলঙ্কৃত করে (ভূষন)। হে ইন্দ্র! তুমি পৃথিবীর মনুষ্য (ক্ষিতীনাম্ মানুষীণাম) ও অধিকন্তু (উত) দেবতা অর্থাৎ দেবসম্বন্ধী (দৈবীনা) প্রজাগণের (বিশাং) পুরোগন্তা (পূর্বসাবা), অর্থাৎ সকল প্রাণীর শ্রেষ্ঠ; (সেই হেতু তোমার স্তুতি করছি। ২।
ইন্দ্রদেব শক্রর প্রতি স্ববল প্রাপক হয়ে অর্থাৎ হিংসার উপযুক্ত বল প্রাপ্ত হয়ে সর্বতো ব্যাপ্ত,অসুরকে বা জলাবরক মেঘকে (বৃত্রং) বিদীর্ণ বা রুদ্ধ করেছিলেন (অবৃণোৎ)। সেই ইন্দ্র যুদ্ধে শত্রুর প্রতি স্বশরীর প্রাপক হয়ে অর্থাৎ শক্রর প্রতি অসীম-হিংস্ররূপী হয়ে (বর্পনীতিঃ) মায়াবী অসুরবর্গকে (মায়িনাং) বিনাশ করেছিলেন (প্র অমিনাৎ)। শত্ৰুদহনে কাময়মান অথবা তার সাথে যুদ্ধ কামনাকারী শত্রুদের দাহক ইন্দ্র (উশধ) বনে জলের নিমিত্ত আবরক মেঘকে বিদীর্ণ (বা বৃত্রাসুরকে স্কন্ধচ্যুত) (বি অংস) করে বধ করেছিলেন (অহন)। তারপর তার রমণীগণের (রাম্যাণাম) শোকরব উৎসারিত করিয়েছিলেন (আবিঃ)। (অথবা পণি নামক অসুরগণের দ্বারা তমসাবৃত রাত্রিতে অপহৃত গাভী, অসুরগণকে বিনাশ পূর্বক উদ্ধার করেছিলেন) ৷ ৩৷৷
স্বর্গের লম্ভক অর্থাৎ যিনি স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটিয়ে থাকেন (স্বর্ষা), শত্রুগণের অভিভবকারী (অভিষ্টি) ইন্দ্র তমোরাশি নিবর্তিত করে দিবার প্রাদুর্ভাব পূর্বক (অহানি জনয়ন) যুদ্ধকামনাকারী অসুরবর্গের সাথে যুদ্ধ করে (উশিগভিঃ) তাদের সৈন্যগণকে জয় করেছিলেন (পৃতনা জিগায়)। অধিকন্তু তিনি মনুষ্য (মনবে) অর্থাৎ যজমানবর্গের প্রভূত বৈদিক বা দৈবিক ও লৌকিক ব্যবহারের নিমিত্ত (বৃহতে রণায়) সর্বপ্রকাশক আদিত্যকে দিবিলোকে অর্থাৎ আকাশমণ্ডলে দীপিত করেছিলেন (অহ্নাং কেতুং প্র অরেচয়েৎ)। এবং সূর্যের সর্বপদার্থপ্রকাশনক্ষম তেজঃ লাভ করেছিলেন.(জ্যোতিঃ অবিন্দৎ)। ৪।
ইন্দ্রদেব সর্বতোভাবে বর্ধনপ্রাপ্ত (বহণাঃ) হিংসক মনুষ্যবৎ (নৃবৎ) শত্রুসেনার মধ্যে (তুজঃ) প্রবেশ করেছিলেন (আ বিবেশ), যেমন মনুষ্য ঋত্বিক ইত্যাদির (নর্যা) হিতের নিমিত্ত প্রভূত (পুরূণি) সামর্থযুক্ত শত্রুধন ধারণ করে (দধানঃ) যুদ্ধার্থে শত্রুসেনার মধ্যে প্রবেশ করে, সেই রকম। [ যেমন যুদ্ধাভিলাষী বীর শত্রুসেনার মধ্যে প্রবেশ করে, তেমনই ইন্দ্রও ঋত্বিকরূপী মনুষ্যবর্গের হিতের নিমিত্ত শত্রুসেনার মধ্যে প্রবেশ করেন ]। সেই হেন ইন্দ্র স্তোতাদের জন্য (জরিত্রে) অন্ধকারনিবর্তনের দ্বারা পরিদৃশ্যমানা বা প্রসিদ্ধ উষার প্রকাশ করেছেন (ইমাঃ ধিয়ঃ); (কারণ উষাকালে স্তোত্র-শস্ত্র ইত্যাদির প্রবর্তন ঘটে)। এবং উষার শুক্লবর্ণ বৃদ্ধি করেছেন (আসাং ইমং প্র অতিরত) ॥ ৫॥
পূজনীয় বা মহৎ গুণে প্রবৃদ্ধ (মহঃ) প্রসিদ্ধ ইন্দ্রের (অস্য) সুষ্ঠু সম্পাদিত বহু মহৎ (সুকৃতা পুরূণি) কর্ম স্তোতাগণ স্তুতি করে থাকে (পনয়ন্তি)। (সেই কর্মের মধ্যে একটি কর্ম বর্ণিত হচ্ছে)–শত্রুকে অভিভবে পারঙ্গম (অভিভূতোজা) অথবা শত্রুর পরাভবে ওজঃসম্পন্ন ইন্দ্র আবর্জক বলের দ্বারা (বৃজনেন) বা আয়ুধের দ্বারা পাপরূপ অসুরবর্গকে (বৃজিনান) সম্যক্ চূর্ণ করেছিলেন (সং পিপেষ); তথা আপন শক্তির দ্বারা (মায়াভিঃ) শত্রুদের (দসূন) চূর্ণ করেছিলেন। ৬।
ইন্দ্রদেব যুদ্ধের দ্বারা (যুধা) আপন মহত্বে (মা) অর্থাৎ কারো সহায়তা ব্যতিরেকেই আপন বলে, তার স্তোতাদের উদ্দেশে (দেবেভ্যঃ) বরণীয় ধন দান করেছিলেন (বরিবঃ চকার)। সত্য-কর্মানুষ্ঠানকারী যজমানগণের পালক (সৎপতিঃ), মনুষ্যগণের অভিমত ফলের পূরক (চণিপ্রাঃ), সেই হেন ইন্দ্ৰ আদিত্যের স্থানে অর্থাৎ আদিত্যলোকে (বিবস্বতঃ সদনে) বৃষ্টিপ্রতিবন্ধক অসুরবর্গকে বৃষ্টিলক্ষণ ধন দান করেছিলেন; অথবা বিশেষভাবে অগ্নিহোত্র ইত্যাদি কর্মের নিমিত্ত বাসকারী যজমানের গৃহে সম্পদ ইত্যাদি দান করেছিলেন। উক্ত মহিমোপেত অর্থাৎ প্রসিদ্ধ বৃত্রবধ ইত্যাদি কর্মসমূহের কর্তা (অস্য) ইন্দ্রকে মেধাবী ঋত্বিকগণ (বিপ্রাঃ) (কিরকম মেধাবী? –) ক্ৰান্তপ্রজ্ঞা বা অতিবিদ্বানগণ (কবয়ঃ), উথ মন্ত্রে অর্থাৎ যজ্ঞে আজ্যপ্রদান ইত্যাদি শস্ত্রে স্তব করে থাকেন ॥ ৭
শত্রুসেনাগণের অভিভবকারী অথবা এক প্রয়াসে শত্রুসেনার পরাভবক্ষম (সত্ৰাসাহং), যজ্ঞাদি কর্মশীল মনুষ্যগণ কর্তৃক বরণকৃত (বরেণ্যং), বলের দাতা (সহোদাং) তথা স্বর্গের দেবনশীল অর্থাৎ স্বর্গে ক্রীড়াশীল ও জলের সম্ভোক্তা (স্বঃ অপঃ চ দেবীঃ সসংস) এই হেন মহানুভাব ইন্দ্রের স্তোতা বা স্তুতিকর্মে তুষ্ট স্তোতাগণ ও যজমানবৃন্দ (ধীরণাসঃ) অনুক্রমে স্তুতি ও হবির দ্বারা তার (অর্থাৎ ইন্দ্রের) সন্তোষ বিধান করছেন (মদন্তি)। যিনি (অর্থাৎ যে ইন্দ্র) বিস্তীর্ণ দিবিলোক (দ্যাং) ও এই পৃথিবী (ইমাং পৃথিবী) দেবতা ও মনুষ্যগণকে প্রদান করেছেন (সসান)। ৮।
সেই ইন্দ্রদেব প্রাণীগণের অর্থাৎ মনুষ্যবর্গের ব্যবহারের নিমিত্ত অশ্ব-হস্তী-উষ্ট্র ইত্যাদি বাহন (অত্যা) প্রদান করেছেন (সসান)। তিনি সর্বপ্রকাশক সূর্যদেবকে প্রাণীবর্গের ব্যবহারার্থে প্রদান করেছেন (সূর্যম্ সসান)। এইমতো দুগ্ধ-দধি ইত্যাদি লক্ষণ বহু প্রকার ভোগসাধন বা বহুবিধ প্রাণীর ভোগসাধন গাভী (পুরুভোজসং গাং) ও হিরণ্যবিকারাত্মক ভোগসাধন কটক-মুকুট ইত্যাদি প্রদান করেছেন (হিরণ্যয়ং উত ভোগম সসান)। সেই ইন্দ্র প্রাণীঘাতক অসুর ইত্যাদিকে (দসূন) হত্যা পূর্বক উত্তমবর্ণীয় (আর্যং বর্ণং) অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্যাত্মক যজমান ইত্যাদি কর্মাধিকারীগণকে প্রকর্ষের সাথে রক্ষা করেছেন (প্র আবৎ)। ৯।
উক্ত মহিমোপেত সেই হেন ইন্দ্রই প্রাণীগণের উপভোগের নিমিত্ত ওষধিসমূহ অর্থাৎ ব্রীহি-যব ইত্যাদি সৃষ্টি করেছেন (অসনোৎ)। তথা তিনি দিবস সমুদয়ও (অহানি) প্রাণীগণের উপভোগাৰ্থে সৃষ্টি করেছেন; বনস্পতিগুলিকেও সৃষ্টি করেছেন; অন্তরিক্ষলোকও প্রাণীগণের ভোগাৰ্থে সৃষ্টি করে প্রদান করেছেন। অধিকন্তু তিনি বল নামধারী অসুরকে বিদারিত করেছেন (বলম্ বিভেদ), বিরুদ্ধবাদীগণকে বিদূরিত করেছেন (বিবাচঃ নুনুদে); অনন্তর (অথ) বিরুদ্ধ কর্মের বা যজ্ঞের অনুষ্ঠানকারী দুষ্টদের দমন বা বিনাশ করেছেন (অভিঞতুনাম, দমিতা অভবৎ) ১০
সর্বগুণে উৎকৃষ্ট অথবা সুখকর (শুন), ধনবন্ত (মঘবান) ইন্দ্রদেবকে এই সংগ্রামে অথবা যজ্ঞে (অস্মিন ভরে) অন্নলাভের নিমিত্ত আহ্বান জ্ঞাপন করছি (বাজতৌ )। সংগ্রামে পুরোগামী অথবা যজ্ঞের নেতা (নৃতমং), আহ্বানের শ্রোতা (শৃন্বন্তম), উগ্র্ণ বলশালী (উগ্রং), সংগ্রামে আবরক শত্রুগণের বিঘাতক (সমৎসু বৃত্রাণি ঘন্তং) তথা তাদের ধনসমূহের সম্যক বিজেতা–এই হেন মহানুভাব ইন্দ্রকে আমাদের রক্ষার নিমিত্ত আহ্বান জ্ঞাপন করছি (উভয়ে হুবেম) ॥ ১১ :
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ব সূক্তের অনুরূপ ৷৷ (২০কা, ১অ. ১১সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে ঋত্বিবৃন্দ! আপনারা অন্নাকাঙ্ক্ষী হয়ে (শবস্যা) স্তোত্রসমূহ (ব্রহ্মাণি) প্রেরণ করুন (উদৈরত) অর্থাৎ উগ্নীত করুন। হে যজমান (বসিষ্ঠ)! আপনি ঋত্বিকগণের সাথে বা মর্যাদার সাথে (সমৰ্যে) এই যজ্ঞে হবিঃ ইত্যাদি সহযোগে সেই ইন্দ্রদেবের পূজা করুন (মহয়), যে ইন্দ্রদেব (যঃ) আপন শক্তির দ্বারা (শবসা) সকল ভূতজাতকের (বিশ্বানি) বিস্তার বা বৃদ্ধি করেছেন (আ ততান); সেই ইন্দ্র আমি হেন উপাসকের (ম ঈবতঃ) স্তুতিরূপ বাক্যসমূহের শ্রোতা (বচাংসি উপশ্রোতা) হোন। ১।
হে ইন্দ্র! দেবগণের বন্ধু সদৃশ যে শব্দ, (দেবযামিঃ ঘোষঃ), অর্থাৎ উক্ত লক্ষণসম্পন্ন যে স্তোত্র, উগ্নীত হয়েছে, যার ফলে নিয়মস্থ (বিবাচি) অর্থাৎ সংযমপরায়ণ যজমানের নিমিত্তভূত জন্ম-মৃত্যুলক্ষণাত্মক শোক-নিবর্তক স্বর্গপ্রাপণশীল সোম (শুরুধঃ) বর্ধিত হচ্ছে (ইরজ্যন্ত)। মনুষ্যগণের মধ্যে (জনেষু) বা মনুষ্যগণের মধ্যে জাত এই জন অর্থাৎ যজমান। আপন (স্বং) পরমায়ু বা জীবিতকাল (আয়ুঃ) জ্ঞাত নন (ন চিকিতে); অতএব তাকে যাগ ইত্যাদি অনুষ্ঠানের উপযোগী দীর্ঘ আয়ু প্রদান করুন। (শতসম্বৎসরলক্ষণ জীবন প্রার্থনা করা হচ্ছে)। আয়ুক্ষয়কর হেতুত্বের জন্য প্রসিদ্ধ (তানিৎ) পাপসমূহকেও অতিক্রম পূর্বক (অংহাংসি অতি) আমাদের (অস্মা) অর্থাৎ আপনার সম্ভজমানগণকে পালন করুন (পর্যি) ॥ ২॥
যে ইন্দ্র আমাদের যাগসদনে প্রাপ্তির জন্য অর্থাৎ আগমনের জন্য গাভীগণের প্রাপয়িতা রথে (গবেষণং রথং) ইন্দ্রের হরি-নামক সাধারণ অশ্বদ্বয়কে (হরী) যুক্ত করেছেন (যুজে), আমাদের প্রবৃদ্ধ স্তোত্রসমূহও (ব্রহ্মাণি) সেবমান বা সকলের সেব্যমান (জুজুষাণ) যে ইন্দ্রের সেবা করে (অস্থঃ), সেই ইন্দ্র (স্যঃ) আপন মহত্বের দ্বারা (মহিত্বা) দ্যাবাপৃথিবীকে অতিক্রম করেছেন (রোদসী বি বাধিষ্ট), অধিকস্তু আপন আবরক শত্রুগণ (বৃত্ৰাণি) যাতে বিদ্যমান না থাকে (অপ্রতি) অর্থাৎ পুনরায় যাতে প্রত্যাগত হতে না পারে সেইরূপে বিনাশ করেছেন (জঘন্বন)। ৩
হে ইন্দ্র! সোম অভিষবের নিমিত্ত জলসমূহ বশা গাভীর ন্যায় (আপঃ চিৎ স্তঃ ন গাবঃ) বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছে (পিপুঃ), আপনার (তে) স্তোতা ঋত্বিগণ (জরিতারঃ) সত্য ফলস্বরূপ যজ্ঞ (ঋত) প্রাপ্ত হয়েছেন (নক্ষ); অতএব আমাদের যে (নঃ) স্তোত্ৰসমূহ (নিযুতঃ) লক্ষ্য পূর্বক আগত হও (অচ্ছ)। (কেমন করে? না–) বায়ুর্ন নিযুতঃ যাতি অর্থাৎ বায়ুদেব যেমন যজ্ঞদেশ প্রাপ্তির নিমিত্ত আপন নিযুত নামক বা সংখ্যক অশ্বগণের প্রতি গমন করেন, আপনিও তেমনই আমাদের কর্মে অভিস্তুষ্ট হয়ে (ধীভিঃ) অন্ন প্রদান করুন (বাজান বি দয়সে)। ৪
হে ইন্দ্র! এই অভিযব ইত্যাদির দ্বারা সংস্কৃত প্রসিদ্ধ সোম (মদা) আপনাকে মদযুক্ত করুক (মাদয়ন্ত)। (তুমি কিরকম? না)বলবন্ত (শুষ্মিণ), স্তোতৃবর্গকে প্রদানের নিমিত্ত প্রভূত ধনশালী (জরিত্রে তুবিরাধস)। অধিকন্তু, দেব-মনুষ্যগণের মধ্যে (দেবত্রা) আপনিই একমাত্র (একঃ হি) মনুষ্যগণের প্রতি দয়াশীল (মর্তা দয়সে), অর্থাৎ মনুষ্যগণের রক্ষণে আপনি অদ্বিতীয়, অন্য কোন দেবতা নন। অতএব হে শৌর্যশালী ইন্দ্র (শূর)! আপনি এই যুগে (অস্মিন্ সবনে) বা মাধ্যন্দিন সবনে অভিমত ফল প্রদানের দ্বারা আমাদের হর্ষান্বিত করুন বা সোমপানের দ্বারা নিজে হর্ষান্বিত হোন (মাদয়স্ব) ৷৷ ৫
(উক্ত স্তুতির উপসংহার করা হচ্ছে)–উক্ত প্রকারে (এব) কামবর্ষক (বৃষণং), বজ্ৰবাহু অর্থাৎ বজ্রধারী বা বজ্রের ন্যায় কঠিন বাহুদ্বয়সম্পন্ন ইন্দ্রকে বসিষ্ঠগণ, অর্থাৎ তপস্যারূপ ধনবিশিষ্টগণ, অর্চনীয় স্তোত্রসমুহের দ্বারা (অর্কৈঃ) সুপূজিত করে থাকেন (অভ্যৰ্চন্তি)। সেই হেন ইন্দ্র (সঃ) স্তোত্রের দ্বারা পূজিত হয়ে (স্তুতঃ) আমাদের (নঃ) বহু পুত্র ইত্যাদিরূপ (বীরবৎ) ও বহু গো-রূপ ধন (গোমৎ) প্রদান করুন (ধাতু)। হে দেববৃন্দ! আপনারাও (যুয়) ইন্দ্রকে অনুসরণ পূর্বক আমাদের (নঃ) মঙ্গলের সাথে (স্বস্তিভিঃ) সর্বদা রক্ষা করুন (সদা পাত)৷ ৬ ৷৷
প্রাতঃ ও মাধ্যন্দিন সবনে অভিষবের দ্বারা গতসার তৃতীয় সবনে উপয়োক্ষ্যমাণ সোমের সাথে যুক্ত বা সোমাত্মক (ঋজীষী), বজ্ৰবান (বজ্রী), কামবর্ষণকারী (বৃষভঃ), শত্রুবর্গের অভিভবিতা, (তুরাষাট), শত্রুশোষক বলশালী (শুষ্মী), দেবগণের মধ্যে ক্ষত্রিয়জাতীয় বা সকলের, প্রভু (রাজা), বৃহন্তা (বৃত্রহা), যেথা যেথা সোমাভিষব হয় সেথা সেথা নিয়মিত সোমপানকারী (সোমপাবা)-এই হেন মহানুভাব ইন্দ্র তার রথ অশ্বদ্বয়ের দ্বারা যোজিত করে (হরিভ্যাং যুক্ৰা) আমাদের অভিমুখী হয়ে আগমন করুন (অবাঙ উপ যাস) এবং এই মাধ্যন্দিন সবনে আমাদের দত্ত সোমের দ্বারা হর্ষিত হোন (মৎসৎ)। ৭।
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ব সূক্তের অনুরূপ। (২০কা, ১অ. ১২সূ.)।
অধ্যায়: কুড়ি
সূক্ত -১৩
[ঋষি : বামদেব, গোতম, কুৎস ও বিশ্বামিত্র। দেবতা : ইন্দ্রাবৃহস্পতি, মরুৎ ও অগ্নি। ছন্দ : জগতী ও ত্রিষ্টুপ।]
বঙ্গানুবাদ –হে বৃহস্পতি (বৃহতো অর্থাৎ বেদরাশির পতি বা স্বামী)! আপনি ও ইন্দ্রদেব সোম পান করুন (ইন্দ্রঃ বৃহস্পতে চ সোমম্ পিবত)। (আপনারা কিরকম? না–) এই যজ্ঞে হৃষ্ট হয়ে ধনবর্ষণকারী (অস্মিন্ যজ্ঞে মন্দসানা বৃষথসূ), অর্থাৎ যজমানদের যজ্ঞকর্মে তুষ্ট হয়ে তাদের ধন বিতরণকারী; আপনারা সর্বতোস্থায়ী (বাং স্বাভুবঃ) অর্থাৎ সর্বশরীরে ব্যাপনসমর্থ; সেই হেতু এই সোমসমূহ আপনাদের শরীরে প্রবেশ করুক (ইন্দবঃ আ বিশন্তু)। আপনারা আমাদের সর্বপুত্র ইত্যাদি যুক্ত ধন প্রদান করুন (অস্মে রষিং সর্ববীরং নি যচ্ছত)। ১।
হে মরুৎ-গণ! দ্রুত ও স্বচ্ছন্দগামী অশ্বগণ (রঘুষ্যদো সপ্তয়ো) আপনাদের (বো) যজ্ঞগৃহে বহন করে আনয়ন করুক (আ বহন্তু) এবং আপনারাও শীঘ্রতাপূর্বক এই স্থানে প্রকর্যের সাথে আগমন করুন (বাহুভিঃ রঘুপত্বানঃ প্র জিগাত)। আপনাদের নিমিত্ত (বঃ) বিস্তীর্ণ (উরু) সদনে অর্থাৎ বেদিতে (সঃ) কুশসমূহ আস্তীর্ণ রয়েছে (বহিঃ সীদত) অথবা সদনাহ অর্থাৎ আসনযোগ্য করে কুশগুলি বিছিয়ে রাখা হয়েছে; তথায় আপনারা উপবিষ্ট হোন এবং মধুর (মধ্বঃ) সোমলক্ষণ অন্নের অংশ (অন্ধসঃ) বা সোম পান করে তৃপ্তি লাভ করুন (মাদয়ধ্বং)। ২।
জাতপ্রজ্ঞ বা জাতধন বা জাতমাত্রই সকলকে বিদিত (জাতবেদসে), পূজ্য (অহঁতে), অগ্নির উদ্দেশে ইদানীং ক্রিয়মাণ (ইমং) স্তোত্ৰসমূহ তীক্ষ্ণ বুদ্ধির দ্বারা (মনীষয়া) সম্যক্ নিষ্পদন করছি (সং মহেম)। (তার দৃষ্টান্ত কি? না–) রথমিব অর্থাৎ রথকার যেমন অক্ষ-ফলক ইত্যাদি, অর্থাৎ চক্রদণ্ড-পাটা ইত্যাদি, অবয়ব সংযোজনের দ্বারা রথের সংস্কার করে, তেমন। এই পূজ্য অগ্নি বিষয়ে (অস্য সংসদি) আমাদের প্রকৃষ্টা মতি (নঃ প্ৰমতিঃ) মঙ্গলময়ী হেতু (ভদ্রা হি), হে অগ্নি! আপনার সখ্যতায় (তব সখ্যে) আমরা অর্থাৎ স্তোতাগণ (বয়ং) হিংসিত বা বিনাশিত হবো না (মা রিষাম)। ৩।
হে অগ্নি! (এভিঃ অগ্নে) বক্ষ্যমাণ, ত্রয়স্ত্রিংশৎ (তেত্রিশ) সংখ্যক দেবগণ সহ প্রতিনিয়ত এক রথে (সরথং) অথবা পৃথকভূত রথে (নানারথং) আরোহণ পূর্বক আমাদের অভিমুখে আগমন করুন (অর্বাঙ্ আ যাহি)। আপনার রথে নিযুক্ত অশ্বগুলি অতিভার বহনে সমর্থ (বিভবো হি)। অতএব আপন আপন ত্রয়স্ত্রিংশৎ পত্নীগণ সমভিব্যাহারে দিব্যলোকস্থ দেববৃন্দকে (পত্নীবতঃ ত্রিংশতম চ ত্রী দেবা) স্বধা অনুলক্ষ্য করে (অনুস্বধ) অর্থাৎ যেখানে যেখানে সোমাহুতি দেওয়া হয়, সেই সেই স্থানে আনয়ন করে তাদের সোম প্রদান করে প্রসন্ন করুন (আ বহ মাদয়স্ব) 8
বিনিয়োগ ও টীকা –জ্যোতিষ্টোম ইত্যাদি ক্রতুতে উপযুক্ত সূক্তের প্রথম তিনটি ঋক্ ক্রমে ক্রমে পঠনীয়। এগুলি প্ৰস্থিত্যজ্যা। (বৈ, ৩১২)। চতুর্থ মন্ত্রটি (ঐভিরগ্নে ইত্যাদি) আগ্নীপ্র কর্তৃক পাত্নীবত গ্রহে যজনীয়। (বৈ. ৩১৩)। (২০কা, ১অ. ১৩সূ.)। .
বঙ্গানুবাদ –হে সর্বদা গমনে নবীন (অপূর্ব) ইন্দ্র! পূজনীয় (চিত্রং) আপনি, আপনি পোষণকর্তা অথবা হবিঃ ইত্যাদির দ্বারা আপনাকে পুষ্ট করে (ত্বম ভরন্তঃ) রক্ষার কামনাশালী আমরা অন্নের নিমিত্তভূত হয়ে অথবা সংগ্রাম জয়ের নিমিত্ত (বাজে) আপনাকে আহূত করছি (বয়ম্ হবামহে)। আপনি আমাদের প্রতি আগত হোন, আমাদের প্রতিপক্ষের প্রতি নয় (উম্)। (তার দৃষ্টান্ত কি? না–) স্তুরং ন কচ্চিৎ ভরন্তঃ অবস্যবঃ অর্থাৎ লোকে যেমন কদাচিৎ গুণাঢ্য রাজা ইত্যাদিকে। অভিমত প্রদানের দ্বারা পোষণ পূর্বক আপন জয়ের নিমিত্ত আহ্বান করে, সেই রকম ॥ ১।
হে ইন্দ্র! যুদ্ধ ইত্যাদি কর্মে প্রস্তুত হয়ে (কর্ম) রক্ষার নিমিত্ত আপনার নিকট আমরা গমন করছি (ত্বা উতয়ে উপ) বা আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি। যে ইন্দ্র নিত্যযুবা (যুবা), উগ্র্ণবল (উগ্রঃ), শত্রুবর্গের ধর্ষক (ধৃষৎ)–সেই ইন্দ্র আমাদের সহায়তার্থে আগত হোন (স নঃ চক্রাম)। হে ইন্দ্র! সম্যক্ পূজনীয় (সানসিং), রক্ষক (অবিতারং) আপনাকেই (তামিদ্ধি) সখারূপে বরণ করে অর্থাৎ আপনারই মিত্রভূত হয়ে আমরা আপনাকেই সম্ভজনা বা কামনা করছি (ববৃমহে)। ২
হে মিত্রভূত (সখায়ঃ) যজমানবৃন্দ! আপনাদের রক্ষার্থে (বঃ উতয়ে) সেই ইন্দ্রের স্তব করছি (তং ইন্দ্ৰং স্তবে); যে ইন্দ্র পূর্বেই (পুরা) আমাদের (নঃ) অতি-প্রশংসনীয় বা শ্রেষ্ঠ হিরণ্য ইত্যাদি ধনসামগ্রী (প্র বস্যঃ) ও গো-ইত্যাদি নির্দিষ্ট প্রাণীগণকে (ইদমিদং) প্রাপ্ত করিয়েছেন (আনিনায়)। আমরা সেই অভীষ্ট-প্রদাতা ইন্দ্রের স্তুতি করছি (তম্ উম্ বঃ স্তষে) ৷ ৩৷৷
হরিনামক অশ্বযুগল-সম্পন্ন (হশ্বং), শ্রেষ্ঠ কর্মকারীগণের পালক (সৎপতিং), মনুষ্যবর্গের অভিভবিতা বা নিয়ন্তা (চর্ষণীসহং) ইন্দ্রের স্তুতি করছি। যে ইন্দ্র স্তুতির দ্বারা প্রসন্ন হয়ে থাকেন (যে অমত) তিনি নিশ্চয় স্তুতির যোগ্য (স হি স্ম); (অতএব উক্ত গুণবিশিষ্ট সেই ইন্দ্রের স্তুতি করছি–এটাই বক্তব্য)। অথবা–যে জন ইন্দ্র কর্তৃক প্রদত্ত ধনে প্রসন্ন হয়ে ছিল, সেই জন ইন্দ্রকে স্তুতি করতে অভিলাষী হয়ে থাকে। সেই ধনবান ইন্দ্র (মঘবা) আমারা হেন স্তোতৃবর্গকে (স্তোতৃভ্যো নঃ) শতসংখ্যক গো ও শতসংখ্যক অশ্ব প্রাপ্ত করিয়ে দিন (শত গব্যম্ অশ্যম্ আ বয়তি ॥ ৪৷
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্ত এবং পরবর্তী তিনটি সূক্ত, অর্থাৎ এই অনুবাকের মোট চারটি সূক্তই উকথ্যে, ক্রতুতে, ব্রাহ্মণাচ্ছংসীতে ও শস্ত্রে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। চতুর্থ সূক্তের শেষে শস্ত্রযাজ্যা। এগুলি বৈতানে (৪১) সূত্রিত আছে। (২০কা, ২অ. ১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ— অতিশয় অর্চনীয় বা দাতৃতম অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ দাতা (মংহিষ্ঠায়), মহৎ গুণে প্রবৃদ্ধ (বৃহতে), প্রভূত ধনশালী (বৃহৎ-রয়ে), যথার্থ সামর্থশালী (সত্যশুম্মায়), অতিশয়িত বলসম্পন্ন (তবসে) ইন্দ্রের উদ্দেশে অথবা বলোভের নিমিত্ত উক্ত গুণসম্পন্ন ইন্দ্রের উদ্দেশে স্তোত্র সম্পাদন করছি অর্থাৎ স্তুতি করছি (মতিং প্র ভরে)। সেই ইন্দ্র সকল মনুষ্যগণের পোষণসমর্থ ধন (বিশ্বায়ু রাধঃ) অবনত প্রদেশে বেগে প্রবাহিত জলের মতো (অপামিব প্রবণে) প্রয়োজনে (শবসে) অপগতাবরণ করেছেন, অর্থাৎ উন্মোচন করেছেন (অপাবৃত)। (সেই ইন্দ্রকে আমরা স্তুতি করছি- এটাই বক্তব্য) ॥১॥
হে ইন্দ্র (অধ)! জল যেমন নিম্ন স্থানের অনুকুলে অনুক্রমে প্রবাহিত হয় (আপো নিম্নেব), সেই রকম তোমার এষণায় বা যাগের নিমিত্ত (তে ইষ্টয়ে) সর্ব জগৎ অনুকূল হোক (বিশ্বম্ অনু হ অসৎ)। (অথবা পরবর্তী দৃষ্টান্ত)-জলের নিম্নগামিতার মতো যজমানের সবনত্রয় (সবনা) অর্থাৎ প্রাতঃ-মাধ্যন্দিন-সায়ংকালীন যজ্ঞাঙ্গ স্নান বা সোমাভিষব আপনার অনুগমন করছে (আপো..হবিষ্মতঃ)। যেহেতু (যৎ) কমনীয় (হত), শত্রুগণের প্রতি হিংসক (শথিতা), হিরণ্যভূষিত (হিরণ্যয়ং) ইন্দ্রের বজ্র পর্বতেও বাধা পায় না, কিন্তু পর্বতকেও বিদারিত করে (পর্বতে ন সমশীত)। (অতএব সর্ব জগৎ তাঁর অনুকূল হবে–এটাই বক্তব্য)। ২।
হে শুভ্র দীপ্তিময়ী উষা দেবতা! শত্রুগণের ভয়ঙ্কর (ভীমায়), অতিশয় স্তোতব্য (পনীয়সে) ইন্দ্রের উদ্দেশে যাগ করুন (আ ভর), এবং অন্ন (নমঃ) ও উক্তলক্ষণ ইন্দ্রকে সম্যরূপে আমাদের প্রাপ্ত করিয়ে দিন অর্থাৎ এই স্থানে আনয়ন করুন। (ঊষা উদিত হলে ইন্দ্রের আগমন হওয়ার কারণে ইন্দ্রের আহরণ কথিত হয়েছে। অথবা অন্নের সমৃদ্ধিতে ইন্দ্রের উদ্দেশে যাগপ্রবৃত্তি হয়, এই জন্য এমন বলা হয়েছে)। যে ইন্দ্রের ধাম (যস্য ধাম), সকলের ধারক বা পোষক ইন্দ্রহিত বা ইন্দ্রদত্ত জলসমূহ (নাম) অন্নের সমৃদ্ধির নিমিত্ত হয় (শবসে), এবং যে ইন্দ্রের দ্বারা সকল প্রাণীর গমন ইত্যাদি ব্যবহারের নিমিত্ত (হরিতঃ ন অয়সে) জ্যোতির প্রকাশ করা হয় (জ্যোতিঃ অকারি)। (সেই ইন্দ্রের উদ্দেশে যাগ করুন–এটাই বক্তব্য) ॥ ৩॥
হে ইন্দ্র! এইগুলি আপনার (ত ইমে), আমরাও আপনার স্বভূত অর্থাৎ আপন জন (বয়ম্ তে)। হে বহুপ্রকারে স্তুত (পুরুষ্টুত) ইন্দ্র! আমরা হেন যারা আছি (যে বয়ং), হে প্রভূত ধনশালী (প্রভূবসো) ইন্দ্র! তারা আপনার আশ্রিত হয়ে অর্থাৎ শরণ লাভ করে বিচরণ করছি (ত্বাং আরভ্য চরামসি)। হে ভজনীয় ইন্দ্র (গির্বণঃ) আপনি ব্যতিরিক্ত অন্য কোনও দেবতা (ত্বৎ অন্য) আমাদের বচন সহ্য করেন না (গিরঃ নহি সঘৎ), অর্থাৎ আপনিই আমাদের স্তুতি বচন সহ্য করেন; (তার দৃষ্টান্ত)-ক্ষোণীরিব অর্থাৎ প্রজাগণ যেমন যেমন রাজাকে, বিজ্ঞাপিত করেন, তা সবই রাজা সহ্য করেন, তেমন। অতএব আপনি আমাদের সেইরূপ বচন অর্থাৎ স্তুতিবচনের (নঃ তৎ বচঃ) প্রতিকামনা করুন (প্রতি হর্য)। ৪
হে ইন্দ্র! আপনার বীরকর্ম বৃত্রবধ ইত্যাদি লক্ষণসমন্বিত বহু রকমের (বীর্যং ভূরি ত); অতএব আমরা আপনার বশ্য বা উপাসক হয়েছি (স্মসি)। হে ধনবান্ (মঘব) ইন্দ্র! এই আমি হেন আপনার স্তবকারী (অস্য স্তোতুঃ) যজমানের কামনা প্রীণিত বা আপূরিত করুন (কামং আ পৃণ)। আপনার বীর্য মহতী দ্যুলোক অনুক্রমে বিভক্ত বা ব্যাপ্ত করেছে (তে বীর্যং বৃহতী দৌঃ অনু মমে)। কেবল দ্যুলোকে নয়, এই পৃথিবীও (ইয়ং পৃথিবী চ) আপনার বলের নিমিত্তে (তে ওজসে) নম্র হয়েছে (নেমে)। (ইন্দ্রের দ্বারা সৃষ্ট বৃষ্টির জলে দ্যুলোক পরিচ্ছন্ন, অন্য কোন পরিচ্ছেত্তা নেই। তেমনই ইন্দ্রের ওজঃস্যুতের দ্বারা পৃথিবীও গিরি-তরু-গুল্ম-প্রাণী ইত্যাদি ধারণে নত–এটাই বক্তব্য)। ৫।
হে বজ্ৰবান্ (বজি) ইন্দ্র! আপনি আপনার বর্জ্যরূপ আয়ুধের দ্বারা (বজ্রেণ) মহত্বযুক্ত অতি বিরাট পর্বতের (উরু পর্বতং) পক্ষ ইত্যাদি ক্রমে (পর্বশঃ) ছেদন করেছেন (চকর্তিথ)–অথবা বৃষ্টির অভিমানী মেঘসমূহকে (পূর্বতং) বজ্রের দ্বারা (বজ্রেণ) বিদারিত করেছেন (পর্বশঃ)। অনন্তর সেই মেঘের দ্বারা নিরন্তর আবৃত জল (নিবৃতাঃ অপ) নদী ইত্যাদির দ্বারা প্রবাহিত করণের নিমিত্ত (সৰ্তবৈ) নিম্নাভিমুখে বিসৃষ্টবান্ অর্থাৎ নিক্ষেপকারী হয়েছেন (অব অসৃজঃ)। এইরকম অসাধারণ (কেবলং) সকল বল (বিশ্বং) আপনি ধারণ করেছেন (ত্বং দধিষে); এটি সত্য, মিথ্যা নয় (এতৎ সত্ৰা) ৷ ৬ ৷৷
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তের বিনিয়োগ উথ্যে, ক্রতুতে ও ব্রাহ্মণাচ্ছংসীশস্ত্রে উক্ত হয়েছে। (২০কা, ২য়, ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –জলে গমনপূর্বক বিচরণশীল (উদঃ ), ব্যাধি ইত্যাদি হতে নিজেদের রক্ষাকারী (রক্ষমাণাঃ) পক্ষীগণ যেমন উচ্চরব ধ্বনিত করে (বয়ো ন বাবদতঃ), মেঘের নিকট হতে অধোমুখে পতনকালে শস্য ইত্যাদির তৃপ্তিপ্রদ জলরাশি (গিরিভ্রজঃ মদন্তঃ উর্ময়ো ন) যেমন মেঘের ন্যায় গর্জন করে (অভ্রিয়স্য ইব ঘোষাঃ), সেইরকম অর্চনসাধন মন্ত্রাবলী অথবা অর্চনাকারী স্তোতৃগণ (অর্কাঃ)। বৃহতীর অর্থাৎ মন্ত্রবাক্যের পতির (বৃহস্পতি) অভিস্তবন করছে (অভি অনাব)। ১।
মহর্ষি আঙ্গিরস অর্থাৎ আঙ্গিরাগোত্রোৎপন্ন মহর্ষি যেমন ভগদেবের ন্যায় গো-ঘৃত ইত্যাদির সাথে অথবা স্তুতিবাক্যের সাথে বিবাহকালে বরবধূকে বিবাহহোমাভিমানী অর্যমা দেবতার শরণ প্রাপ্ত করিয়ে থাকেন, তেমনই এই দম্পতিকে অমা দেবতার শরণ লাভ করিয়ে দিন। যেমন মিত্র অর্থাৎ সূর্যদেব প্রকাশের নিমিত্ত আপন রশ্মিসমূহকে একত্রিত করেন, তেমনই এই পতি-পত্নীকে একভাবে যুক্ত করুন। হে বৃহস্পতি দেব! যুদ্ধে উদ্যত বীর যেমন অশ্বগুলিকে (রথে) যোজিত করে, সেইরকম আপনিও এই বধূ ও বরকে সংযযাজিত করুন (বাজয়)। ২৷
সেই গাভীগণ সুন্দর গমনশীলা (সাধ্বর্যা), দুগ্ধ ইত্যাদি দানে অতিথিগণের তৃপ্তিসম্পাদিকা বা অতনশীলা, স্পাহনীয়া (স্পার্থ), সুন্দর বর্ণোপেতা, অনিন্দিতরূপা–এইরকম লক্ষণা গাভীগণকে বৃহস্পতিদেব বলসম্বন্ধী অসুরগণের দ্বারা অবরুদ্ধ পর্বত হতে উদ্ধার পূর্বক স্তোতৃগণকে প্রদান করছেন। (তার দৃষ্টান্ত) যবমিব স্থিরিব্য অর্থাৎ যবকাণ্ড হতে যব নিষ্কাশিত পূর্বক যেমন বপন করা হয়, তেমন; অথবা ব্রীহ্যাধার বা গোলা হতে যব বা শস্য নিষ্কাশনের মতো। ৩।
যেমন আদিত্য (অর্কঃ) দুলোক হতে অধোদিকে উল্কাকে ক্ষেপণ করেন, তেমনভাবেই বৃহস্পতিদেবতা জলের দ্বারা সর্বতো ভূমি সিঞ্চনের নিমিত্ত (মধুনা আষায় জলের কারণভূত মেঘকে দুলোক হতে নিম্নাভিমুখে প্রেরণ করছেন (অবক্ষিপ)। অধিকন্তু, সেই বৃহস্পতি দেবতা মেঘের নিকট হতে (অশ্মনঃ) জলরাশি (গাঃ) উদ্ধার পূর্বক ভূমির ত্বক বা উপরিভাগ (ত্ব) সিঞ্চিত বা ভিন্ন করছেন। অথবা–পণি নামক অসুরগণের দ্বারা আচ্ছাদিত পর্বত হতে তাদের দ্বারা অপহৃত গাভীগুলিকে উদ্ধার করে সেই গাভীগুলির খুরাগ্রে ভূমির ত্বক বা উপরিভাগ বিদীর্ণ করাচ্ছেন, অর্থাৎ সর্বত্র গাভীগুলিকে বিচরণ করাচ্ছেন ৷৷ ৪৷৷
বৃহস্পতি দেবতা আপন দীপ্তি প্রকাশের দ্বারা (জ্যোতিষা) অন্তরিক্ষরূপ গিরিকুহর হতে (অন্তরিক্ষাৎ) অন্ধকার অপসারিত করছেন; (তার দৃষ্টান্ত)বাত উন্নঃ শীপালমিব অর্থাৎ বায়ু যেমন জল হতে শৈবালগুলিকে অপগমিত করে, সেই রকম। অধিকন্তু, বৃহস্পতি দেবতা বলনামক অসুরের দ্বারা অপহৃত গাভীগুলির অবস্থানপ্রদেশ জ্ঞাত হয়ে সেই স্থান হতে সেই গাভীগুলিকে সর্বত্র ব্যাপ্ত করছেন। (তার দৃষ্টান্ত)–বাতঃ অভ্রমিব অর্থাৎ বায়ু যেমন মেঘকে ছিন্ন-ভিন্ন করে সর্বতঃ প্রসারিত করে থাকে, সেই রকম। ৫।
যখন বল নামধারী হিংসাকর্মকারী (পীয়স) অসুরের হিংসাসাধন আয়ুধকে (জসুং) বৃহস্পতি দেবতা অগ্নিসম তাপদায়ক (অগ্নিতপোভিঃ) আপন দীপ্ত রশ্মি বা মন্ত্রের দ্বারা (অর্কৈঃ) ভেদ করেন, তখন জিহ্বা যেমন মন্টক ইত্যাদি লক্ষণ অন্ন দন্তের দ্বারা চর্বণ পূর্বক ভক্ষণ করে, সেইরকমে তিনি বলনামক অসুরকে ভক্ষণ করেছেন (আদ)। এবং তারপর তাঁর অপহৃত গাভীগুলিকে (উস্রিয়াণাং) আবিষ্কার করেছেন (নিধীন) অর্থাৎ স্পষ্ট করেছেন (অকৃণোৎ)। ৬।
বৃহস্পতি দেবতা যখন পর্বত গুহায় বা সদনে লুক্কায়িত ভাবে রক্ষিত শব্দায়মান গাভীগুলির (স্বরীণাম আসাং) নাম জ্ঞাত হয়েছিলেন, তখন সেই দুগ্ধক্ষরণশালিনী গাভীগণ নিজেরাই (ত্মনা) অর্থাৎ অপরের সহায়নিরপেক্ষ হয়ে পর্বত ভেদ করে উগমন করেছিল (উৎ আজৎ), অর্থাৎ বাহির হয়েছিল। (তার দৃষ্টান্ত)–আণ্ডের ভিত্বা শকুনস্য গর্ভ অর্থাৎ ময়ূর ইত্যাদি পক্ষীসকল যেমন অণ্ড ভেদ করে তার গর্ভ হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে আসে, সেইরকম। ৭৷
বৃহস্পতি দেবতা পর্বতের দ্বারা (অশ্না) আবৃত (অপিনদ্ধং) মধুর ন্যায় ভোগযোগ্য গাভীগণকে আবরণভূত পর্বত অপসারণ পূর্বক দর্শন প্রাপ্ত হয়েছিলেন (পরি অপশ্যৎ)। (তার দৃষ্টান্ত)–দীনে উদনি ক্ষিয়ন্তং মৎস্যং ন অর্থাৎ অল্প জলাশয়ে নিবাসকারী মৎস্যকে যেমন দেখা যায়, তেমন। চমস নামক যজ্ঞীয়। সোমপাত্র যেমন তার উপাদানভূত মধু নিষ্কাশন পূর্বক হরণ বা ভক্ষণ করে সেই রকমে বৃহস্পতি ও দেবতা বিরবের দ্বারা অর্থাৎ বিকৃত হস্তালক্ষণ রবের দ্বারা গোরূপধারী বল নামক অসুরকে জ্ঞাত হয়ে তাকে ছিন্ন করে পর্বত-গহ্বর হতে গাভীগুলিকে উদ্ধার করেছিলেন (নির্জভার)। ৮।
সেই হেন পূর্বোক্ত বৃহস্পতি দেবতা (স) পর্বতকুহরের অন্ধকারে গোপনে রক্ষিত গাভীগুলিকে দর্শনের উদ্দেশে উষাকে লাভ করেছিলেন (উষাং অবিন্দ), আদিত্যকে (স্বঃ) প্রকাশের উদ্দেশে লাভ করেছিলেন, এবং অগ্নিকে লাভ করেছিলেন। তারপর সূর্যের তেজঃপ্রভাবে অন্ধকার বিদূরিত করে বিশেষভাবে বাধিত হয়েছিলেন (বি বাধে)। তারপর বৃষভরূপধারী (গোবপুষঃ) বলাসুরকে হনন পূর্বক গাভীগুলিকে নিষ্কাশিত করে আহরণ করেছিলেন (নিঃ জভার) ॥ ৯৷
হিম যেমন (বৃক্ষের) পত্রগুলি নিঃসার করে অপহরণ করে (মুষিতা), সেইভাবে বৃহস্পতি দেবতা গো-লক্ষণ ধনরাশি (বনানি) অপহরণ পূর্বক আনয়ন করেছিলেন, এবং বল-নামক অসুরও অপহৃত গাভীগুলিকে প্রত্যর্পণ করেছিল (অকৃপয়ৎ)। অধিকন্তু, বৃহস্পতি দেবতা যে কর্ম করেছিলেন, সেই কর্ম অন্যের অননুকরণীয় (অননুকৃত্যং) অর্থাৎ অন্য কেউই এই কর্ম সম্পাদনে সমর্থ নয়; পুনরায় কাউকে কখনও যে কর্ম সাধন করতে হবে না, অর্থাৎ যে কর্ম অন্যের পুনঃ কর্তব্যরহিত। (কি সেই কর্ম, তা বলা হচ্ছে)–সূর্য ও চন্দ্র (সূর্যমাসা) যে পরস্পর (মিথঃ) অর্থাৎ অনুক্রমে দিবায় ও রাত্রে ঊর্ধ্বে বিচরণ করছে (উৎ চরাতঃ)-এটাই বৃহস্পতির সেই কর্ম) ॥ ১০৷
তখন পালক দেবগণ অর্থাৎ ইন্দ্র ইত্যাদি সকল রক্ষক দেববৃন্দ (পিতরঃ) লোকে যেমন কপিশবর্ণ অর্থাৎ নীলপীতবর্ণ অশ্বকে (শ্যাবং ন অশ্ব) সুবর্ণময় অলঙ্কারে অলঙ্কৃত করে (কৃশনেভিঃ–কৃশনৈঃ পিংশন্তি), সেইভাবে গ্রহ-তারকা ইত্যাদির দ্বারা (নক্ষত্রেভিঃ) দ্যুলোককে অলঙ্কৃত করেছিলেন (দ্যা অপিংশন); এইরূপে তারা রাত্রিকালে অন্ধকার (রাাম্ তমঃ) এবং দিবাভাগে (অহ) জ্যোতিঃ অর্থাৎ সকলের দীপক আদিত্য নামক তেজঃ স্থাপিত করেছিলেন (অদধুঃ)। (কখন? না–) যখন বৃহস্পতি দেবতা গাভীগুলির আচ্ছাদক পর্বত বিদারিত করে (অদ্রিম্ ভিনৎ) গাভীগুলিকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন (গাঃ বিদৎ)। ১১।
মেঘকে বিদীর্ণ করে জল নিষ্কাশনকারী বৃহস্পতি দেবতার উদ্দেশে এই নমস্কার করছি বা নমস্কারোপলক্ষিত অন্নসাধন করছি বা স্তুতি করছি। বৃহস্পতি দেবতা (যো) বহু ঋকের অনুক্রমে (পূর্বীঃ অনু) স্তুতি করেছেন–এ কথা বলা হয় (আনোনবীতি)। তিনিই নিশ্চয় (সঃ হি) আমাদের বহু গাভীর সাথে অন্ন প্রদান করুন (বয়ঃ অধৎ)। এইভাবে বৃহস্পতি দেবতা বহু অশ্বের সাথে অন্ন প্রদান করুন। সেই বৃহস্পতি দেবতা বহু পুত্রের (বীরোভিঃ) সাথে অন্ন প্রদান করুন। এবং সেই বৃহস্পতি দেবতা বহু ভৃত্য ইত্যাদির সাথে (ভিঃ) আমাদের (নঃ) অন্ন প্রদান করুন। ১২।
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তের উথ্যে, ক্রতুতে ও ব্রাহ্মণাচ্ছংসিশস্ত্রে অর্থাৎ পূর্ববর্তী সূক্তের মত বিনিয়োগ উক্ত হয়েছে ৷ (২০কা, ২৩অ ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –ইন্দ্রদেবকে অভিমুখী করে (অচ্ছ) স্বর্গ বা সুখপ্রাপক (স্বর্বিদঃ), পরস্পর সঙ্গত (সীচীঃ), ব্যাপ্ত (বিশ্বাঃ), ইন্দ্রের প্রতি কাময়মান (উশতীঃ) আমার স্তোত্রগুলি স্তুতি করছে (মে মতয়ঃ অনুষত)। জনয়ঃ অর্থাৎ অপত্য উৎপাদনকারিণী যোষিৎ-বর্গ যেমন পতিকে দৃঢ় আলিঙ্গন করে (পরি স্বজন্তে), অধিকন্তু দূরদেশ হতে আগত পিতা ইত্যাদিকে পুত্র প্রমুখ বন্ধুজনবর্গ (শুল্কং) নিজেদের রক্ষার নিমিত্ত আলিঙ্গন করে (উতয়ে পরিজন্তে), সেইরকম আমার স্তুতিসমূহ রক্ষার নিমিত্ত ধনবন্ত ইন্দ্রকে (মঘবান) আলিঙ্গন করছে ৷ ১।
হে বহুজনের দ্বারা বা বহুভাবে আহূত ইন্দ্রদেব (পুরুহুত)! আপনার অভিমুখে গমনশীল আমার মন (মে মনঃ) কখনও অপসরণ করে না (ন ঘ অপ বেতি); বরং আপনারই আশ্রয় কামনা করে (শিশয় কামং)। হে শত্রুগণের বিনাশক বা দর্শনীয় ইন্দ্রদেব (দস্ম)! রাজা যেমন (রাজেব) সিংহাসনে উপবিষ্ট হন, আপনি তেমন এই আস্তীর্ণ দর্ভে উপবেশন করুন (অধি বহিষি নি ষদঃ)। (এখানে বসে কি লাভ? বলা হচ্ছে–) এই সোমযাগে বা অভিযুত সোমে আপনার অবনত পান সূচিত হোক (তে অবপানং অস্ত), অর্থাৎ উধ্বলোক হতে ১. নিম্নে অবতরণ পূর্বক এই সোমযাগে আগমন করুন অর্থাৎ সোম পান করুন। ২।
ইন্দ্রদেব আমাদের দারিদ্র্যের নিঃশেষক হোন (অমতেঃ) অর্থাৎ দারিদ্র্যের বিনাশক হোন এবং ক্ষুধা-বিতাড়ক হোন (বিষুবৃদ ভবতু)। সেই ধনবান্ ইন্দ্র দানাহ ধনের স্বামী (বায়ঃ বস্বঃ ঈশতে)। অধিকন্তু, কামবর্ষণকারী, বলবান (বৃষভস্য শুষ্ণিণঃ) সেই ইন্দ্রের (তস্যেৎ) প্রসিদ্ধ (ইমে) গঙ্গা ইত্যাদি স্যন্দনশীলা নদী অথবা লবণ-ইক্ষু ইত্যাদি সপ্ত সমুদ্র (সপ্ত সিন্ধবঃ) অবনত দেশে (প্রবণে) অন্নের বৃদ্ধি সাধিত করছে (বয়ঃ বর্ধন্তি)। ৩
যেমন পক্ষীগুলি (বয়ঃ) শোভনপর্ণযুক্ত বৃক্ষে (সুপলাশং) উপবেশন করে, সেইরকম মদকর অর্থাৎ হর্ষদায়ক (মন্দিনঃ) চম্বোরধিষবণফলকসমূহে অবস্থিত (চমূদঃ) সোমরাশি ইন্দ্রকে আশ্রয় করেছে (আসদ। এই সোমরাশি বা তাদের মুখসমূহ (এষাং অনীকং) দ্যোতিত হচ্ছে। অধিকন্তু সেই সোমরাশি আদিত্য নামে আখ্যাত (স্বঃ) অরণীয় অর্থাৎ অভিগমনীয় (আর্য) জ্যোতি মনুষ্যগণের প্রকাশের নিমিত্ত প্রদান করেছেন (বিদৎ)। ৪
কিতব অর্থাৎ জুয়াড়ী (শ্নগ্নী) যেমন দূতে অর্থাৎ পাশার জুয়ায় (দেবনে) কৃতশব্দবাচ্য লাভহেতু পাশার গতি বা চাল (কৃত) অন্বেষণ করে (বি চিননাতি), সেইরকম আমাদের স্তুতিসমূহ ক্রীড়নে বা প্রমোদে নিমিত্তভূত হয়ে ইন্দ্রকে অন্বেষণ করছে; যে কারণে (যৎ) ধনবান্ ইন্দ্র (মঘবা) অন্ধকার-বিনাশক (সম্বৰ্গং) সূর্যদেবকে সকল জগতের প্রকাশের নিমিত্ত দিবিলোকে স্থাপন করেছিলেন (জয়ৎ)। হে ধনবান্ ইন্দ্র (মঘব)! আপনার উক্ত লক্ষণসম্পন্ন শক্তি (বীর্য) অপর কেউ অনুকরণ করতে সক্ষম নয় (ন অনু শকৎ); পূর্বকালেও (পুরাণঃ) কেউ সক্ষম হয়নি; অধিকন্তু আধুনিক কালেও কেউই (নূতনঃ) সক্ষম হবে না। ৫।
সকল উপাসকের বা যজমানের (বিশংবিশং) যজ্ঞে সমকালে আপন বিভূতির প্রভাব গমনকারী (পরি অশায়ত) কামবৰ্ষক (বৃষা) ধনবান্ (মঘবা) ইন্দ্র স্তোতৃগণের (জনানাং) প্রীতিপ্রদ স্তুতিসমূহ এককালে শ্রবণ করছেন (ধেনাঃ অবচাশৎ)। এইরকম সমর্থবান ইন্দ্র (শঃ) যার অর্থাৎ যে যজমানের তিনটি সবনে সন্তোষ লাভ করেন, সেই যজমান অত্যন্ত মদকর সোমরস (তীব্রৈঃ সোমৈঃ) পানের দ্বারা সংগ্রামে শত্রুগণকে পরাভূত করে (পৃতন্যতঃ সহতে)। ৬৷
জলরাশি (আপঃ) অর্থাৎ নদী ইত্যাদি যেমন সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়, কিংবা নালাসমূহ (কুল্যা) যেমন হ্রদের দিকে ধাবিত হয়, সেইরকম সোমগুলি যখন ইন্দ্রদেবের প্রতি সর্বতোভাবে ক্ষরিত হয় (অভি সমক্ষরণ), তখন মেধাবী স্তোতৃবর্গ (বিপ্রাঃ) যজ্ঞগৃহে (সাদনে) স্তুতির দ্বারা এঁর অর্থাৎ ইন্দ্রের (অস্য) মাহাত্ম্য বর্ধন করেন (মহঃ বর্ধন্তি)। (তার দৃষ্টান্ত কি? না) যবং ন বৃষ্টিরিতি অর্থাৎ যেমন মেঘ দিব্য জলের দ্বারা (দিব্যেন দানুনা) বা বৃষ্টি আপন দানের দ্বারা (দিব্যেন) যবের বর্ধন করে থাকে, সেইরকম। ৭।
যে ইন্দ্ৰ আদিত্যের দ্বারা পালিত, অর্থাৎ সূর্য কর্তৃক রক্ষিত, (অর্যপত্নীঃ) প্রসিদ্ধ জলরাশিকে (ইমা অপঃ) ভূমিতে স্থিত করেছেন (অকৃণোৎ করতি), সেই ইন্দ্র সর্ব লোকে মেঘকে বিদারিত করার উদ্দেশে গমন করেন (রজঃসু আ পতয়ৎ); (কেমন ভাবে? না) বৃষা ন ক্রুদ্ধ অর্থাৎ ক্রোধের দ্বারা অন্ধীভূত বৃষভ অর্থাৎ যণ্ড যেমন তার প্রতিদ্বন্দ্বী বৃষভকে পরাভূত করতে গমন করে, সেই ভাবে। অনন্তর ধনবান ইন্দ্র (মঘবা) সোমাভিষবকারী (সুন্বতে), শীঘ্র হবিঃ প্রদানকারী (জীরদানবে), সোম ইত্যাদি হবিযুক্ত (হবিষ্মতে), যজমানকে জ্যোতি প্রকাশক তেজঃ প্রাপ্ত করান, অর্থাৎ প্রদান করেন (মনেব জ্যোতিঃ অবিন্দৎ) ৮
আপন তেজঃপ্রভাবে (জ্যোতিষা) মেঘকে বিদীর্ণ করার নিমিত্ত ইন্দ্রের বজ্র (পরশুঃ) ঊর্ধ্বে প্রাদুর্ভূত হোক (উজ্জায়তাং)। জলের সুষ্ঠু দোহয়িত্রী মাধ্যমিকা বাণী (ঋতস্য সুদুখা), অর্থাৎ জলের কলধ্বনির মাধ্যমে উৎসারিতা বাক্, পূর্বের ন্যায় এখনও প্রকট হোক (পুরাণবৎ ভূয়াঃ); অধিকন্তু দীপ্তমান্ (অরুষঃ) আপন তেজের দ্বারা (ভানুনা) প্রজ্বলন্ পূর্বক (শুচিঃ) প্রকাশিত হোক (বি রোচং )। আদিত্য যেমন দীপ্ত তেজঃ প্রকাশ করেন (স্বঃ ন শুক্র), অর্থাৎ তেজের দ্বারা স্বয়ংই দীপ্যমান হন, সেইমতোই সাধুজনের রক্ষক (সৎপতি) ইন্দ্র অত্যন্ত দীপ্তিশালী হোন (শুশুচীত) ৯।
হে পুরুহুত! আমরা যজমানবৃন্দ আপনার অনুগৃহীত হয়ে (বয়ং) আপনার দানে (গোভিঃ) অর্থাৎ কৃপায় দুর্গমনীয় (দুরেবাং) দারিদ্র্য বা দারিদ্র্যের বাধা (দুরেবাং) অতিক্রম করবো (তরেম)। অধিকন্তু আপনার দেওয়া যব, ব্রীহি ইত্যাদির দ্বারা সকলের (বিশ্বা) অর্থাৎ পুত্র-ভৃত্য ইত্যাদির ক্ষুধা অতিক্রম করবো (যবেন ক্ষুধম্ তরেম)। আরও, আপনার অনুগ্রহের দ্বারা সমজাতীয়গণের মধ্যে মুখ্যভূত (প্রথমাঃ) হয়ে আমরা ক্ষত্রিয় ভূপালগণের সাথে (রাজভিঃ) বহু ধন (ধনানি) লাভ করবো এবং আমরা আমাদের বলের দ্বারা শত্রুগণকে জয় করবো (অস্পাকেন বৃজনেন জয়েম) ১০।
বৃহস্পতিদেব পশ্চিম দেশ হতে আগত (পশ্চাৎ) পাপ (অঘায়োঃ) ইচ্ছাকারী হিংসকগণের নিকট হতে আমাদের সর্বতোভাবে রক্ষা করুন (পরি পাতু); অধিকন্তু (উত) উত্তর ও অধো দেশ হতে (উত্তরস্মাদ অধরাৎ চ) আগমনকারী পাপেচ্ছু হিংসকগণের নিকট হতে আমাদের রক্ষা করুন। এইরকমে ইন্দ্রদেবও সম্মুখ বা পূর্ব দেশ হতে (পুরস্তাৎ) ও মধ্য দেশ হতে আগত হিংসক পাপীগণের নিকট হতে আমাদের রক্ষা করুন। এইভাবে সর্বতো রক্ষা করে মিত্রভূত (সখা) ইন্দ্রদেব সখ্যতাপন্ন (সখিভ্যঃ-সখিভূতেভ্যঃ) আমাদের বহু ধনে ধনী করুন (বরিবঃ কৃণোতু) অর্থাৎ প্রভূত ধন প্রদান করুন। ১১।
হে বৃহস্পতি ও ইন্দ্র (বৃহস্পতে ইন্দ্ৰশ্চ)! আপনারা উভয়ে (যুবং) দিব্য লোকস্থ ও পৃথিবী লোকস্থ (দিবস্য পার্থিবস্য চ) ধনরাশির স্বামী (বস্বঃ ঈশাখে); অতএব আপনাদের স্তোত্রকারী আমাদের (স্তুবতে কীরয়ে) ধন প্রদান করুন (রয়িম্ ধত্তম) এবং আপনারা (যুয়) সর্বদা পরম মঙ্গলের সাথে আমাদের (সদা স্বস্তিভিঃ নঃ) পালন বা রক্ষা করতে থাকুন (পাত)। ১২।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্রদেব! আমরা কম্বগোত্রোৎপন্ন মহর্ষিগণ (কথাঃ) আপনার স্তোত্রের প্রয়োজনে আপনার সখা-রূপ বা মিত্রত্ব কামনা পূর্বক উথ অর্থাৎ স্তোত্রের দ্বারা আপনার স্তবন করছি (জরন্তে)। ১।
হে বজ্ৰধাবী ইন্দ্র! আমি এই নবীন যাগের কর্তা (নবিষ্টো); আপনাকে স্তোত্রসমূহের দ্বারা পূজা করছি; আপনি ব্যতীত অন্য কোন দেবতাকে নয়। কিন্তু আপনার স্তোত্র আমি জ্ঞাত আছি (তবেদু স্তোমং চিকেত); অর্থাৎ আপনি এই যজ্ঞকে লাভ করুন। ২।
ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ (দেবাঃ) সোমাভিষবকারী যজমানকে রক্ষা করতে ইচ্ছা করেন, সেই বিষয়ে কোন অনাদর অর্থাৎ ঔদাসীন্য করেন না। বরং প্রকর্ষের দ্বারা তুষ্টিকারী যজমানের বা মত্ততাদায়ক সোমের উদ্দেশ্যে অনালস্যে গমন করে থাকেন (অতন্দ্রাঃ যন্তি) ৷৷ ৩৷
হে কামব্যর্ণকারী (বৃষ) ইন্দ্র! আপনার প্রতি ইচ্ছাবন্ত হয়ে, অর্থাৎ আপনার কৃপাকাঙ্ক্ষী হয়ে (ত্বায়বঃ) আমরা প্রকর্ষের সাথে আপনার স্তুতি করছি (অভি প্র ননানুমঃ)। হে ধনবান্ (বসো) ইন্দ্র! আপনিও আমাদের এই স্তোত্রের কামনা করুন (অস্য বিদ্ধি)। ৪।
হে ইন্দ্র! আপনি আমাদের স্বামী (অঃ)। আমাদের নিন্দক (নিদে), বক্তব্যে আমাদের প্রতি কঠোর বাক্য প্রয়োগকারী, অদাতা অর্থাৎ দানকর্মরহিত যে সকল শত্রু আছে (অরাবণে), আমাদের তাদের বশীভূত বা অধীনস্থ করে দেবেন না (মা রন্ধীঃ)। অধিকন্তু, আমার সঙ্কল্প বা স্তুতিলক্ষণ কর্মসমূহ (ক্রঃ) আপনারই উদ্দেশে নিবেদিত (ত্বে)। (অতএব নিন্দক ইত্যাদির অধীনে আমাদের স্থাপিত করবেন না–এটাই বক্তব্য) ॥ ৫॥
হে বৃত্র-হন্তারক (বৃহ) ইন্দ্র! আপনি সর্বতঃ মহান্ (সপ্রথঃ), সংগ্রামে অগ্ৰযোদ্ধা (পুরোয়োধঃ) অর্থাৎ আপন সৈন্যগণের পুরোভাগে অবস্থানপূর্বক শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামশালী; আপনি আমার কবচ স্বরূপ (ত্ব বর্ম অসি)। এই হেন সহায়ভূত (যুজা) আপনার দ্বারা আমি শত্রুগণকে ভর্ৎসনা করবো (ত্বয়া প্রতি ব্রুবে), অর্থাৎ প্রতিহনন করবো। ৬।
বিনিয়োগ ও টীকা— ষোড়শ সূক্ত সম্বলিত তৃতীয় অনুবাকের উপযুক্ত সূক্তটি সহ প্রথম চারটি সূক্ত অতিরাত্র ক্রতুতে প্রথম পর্যায়ে ব্রাহ্মণাচ্ছংসী শস্ত্রে বিনিযুক্ত হয়। চতুর্থ সূক্তের শেষ (য উদৃচীন্দ্র ইত্যাদি) মন্ত্রটি পরিধানীয়া। বৈতানিকে (৪২) আরও বিস্তৃত পরিচয় উক্ত হয়েছে। (২০কা, ৩অ. ১সূ.)।
হে শতসংখ্যক অশ্বমেধ যজ্ঞকারী বা বহুজী (শতক্রতো) ইন্দ্রদেব! আপনার মনকে আমরা হেন সুষ্ঠু অর্বাচীন যজ্ঞনির্বাহক ঋত্বিকগণের (বাঘতঃ) অভিমুখী করুন, এবং আপনার দৃষ্টিকেও আমাদের প্রতি কৃপাবতী করুন। ২।
হে শতক্রতু! শত্রুগণের সংগ্রামে আপনার দ্বারা সহযোগ্যতার উদ্দেশ্যে (অতিমাতিহ্যে) অথবা আপনার দ্বারা সহনযোগ্যকৃত পাপক্ষয়ের নিমিত্ত, আপনার নামসকল, অর্থাৎ সহস্রাক্ষ-পুরন্দর ইত্যাদিরূপ নামগুলি, অথবা বৃত্রবধ ইত্যাদি কর্মসমূহ, স্তুতিলক্ষণ সকল বাক্যের দ্বারা (বিশ্বাভিঃ গীর্ভিঃ) আমরা সঙ্কীর্তন করছি (ঈমহে) ॥ ৩ ৷৷
বহুজনের দ্বারা বা বহুভাবে স্তুত (পুরুস্তুতস্য), শতসংখ্যক অর্থাৎ অপরিমেয় তেজোযুক্ত অথবা সংখ্যাতীত স্থানযুক্ত (শতেন ধামভিঃ), মনুষ্যবর্গের ধারক (চর্ষণীধৃতঃ) ইন্দ্রের পূজা করছি অথবা শতসংখ্যক স্তোত্রের দ্বারা ইন্দ্রের স্তুতি করছি (মহুয়ামসি)। ৪৷৷
বহু যজমানের বা স্তোতৃবর্গের দ্বারা আহূত অথবা সংগ্রামে আপন আপন জয়ের নিমিত্ত বহুজন কর্তৃক আহূত (পুরুহুতং), ইন্দ্রদেবের উদ্দশে বৃত্র নামক অসুরকে বধের জন্য বা পাপকে বিনাশের জন্য। অথবা অন্নলাভের নিমিত্ত (বাজসাতয়ে) আমরা স্তুতি করছি (উপ ব্রুবে) ৷৷ ৫৷৷
হে ইন্দ্র! সংগ্রামে (বাজেযু) আপনি শত্রুগণের অভিভবিতা অর্থাৎ আক্রমণকারী হয়ে থাকেন (সাসহিঃ ভব); এই নিমিত্ত, হে শতক্রতু! আপনার নিকট এই প্রার্থনা করছি (ত্বা ঈমহে)। অধিকন্তু, ইন্দ্রদেব বৃত্রাসুরকে হনন করুন বা পাপকে নিবারণ করুন (বৃত্রায় হন্তবে)-(এই নিমিত্ত তাঁর সঙ্কীর্তন করছি–এটাই। বক্তব্য ৷৷ ৬ ৷
হে ইন্দ্র! সংগ্রামে (পৃতনাজ্যে) ধনপ্রাপ্তির সময়ে (দ্যুম্নেষু), শত্রুসেনাগণকে অতিক্রম করার সময়ে (পৃৎসুতৃষ্ণু, অন্নলাভের সময়ে (শ্ৰবঃসু) এবং শত্রুকে বধ বা পাপকে বিনাশের সময়ে (অভিমাতিযু) আপনি আমাদের অনুসরণ করুন অর্থাৎ সহযোগী হোন (সা)। ৭৷
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি অতিরাত্রে প্রথম পর্যায়ে ব্রাহ্মণাচ্ছংসীশস্ত্রে বিনিয়োগ উক্ত হয়েছে। (২০কা, ৩অ. ২সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে শতক্রতু ইন্দ্র! আমাদের সম্বন্ধিত অর্থাৎ আমাদের দ্বারা নিবেদিত (নঃ) অতিশয় বলবন্ত (শুষ্মিন্তমং), দ্যোতনবন্ত (দ্যুনিং ) জাগরণশীল অর্থাৎ স্বপ্ননিবারক (জাগৃবি) সোম আমাদের রক্ষণের নিমিত্ত পান করুন (উতয়ে পাহি)। ১।
হে শতক্রতু ইন্দ্র! আপনার সম্বন্ধী যে প্রসিদ্ধ ইন্দ্রিয়সমূহ (ইন্দ্রিয়াণি) অর্থাৎ আপনার সৃষ্ট বা আপনা কর্তৃক দত্ত যে বীর্য সমুদায় অর্থাৎ দর্শন-শ্রবণ ইত্যাদি লক্ষণান্বিত সামর্থ্য পঞ্চ জনে (পঞ্চসু জনে্যু) অর্থাৎ দেব-মনুষ্য-পিতৃ-অসুর রাক্ষসে অথবা ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র-নিষাদে বিদ্যমান, সেগুলি যেন আমরা লাভ করতে পারি (তানি তে আ বৃণে)। ২।
হে ইদ্র! আপনার সম্বন্ধী প্রভূত অন্ন (বৃহৎ শবঃ) আমাদের নিকট আগত তোক (অগন) অর্থাৎ আমরা যেন তা লাভ করতে পারি অথবা উক্তরূপ সোমলক্ষণ অন্ন আপনার সমীপে গমন করুক, অর্থাৎ আপনি প্রাপ্ত হোন। আপনি শত্রুগণের তরণের বা পরিহারের অযোগ্য (দুস্তরং) দ্যোতমান (দ্যুম্নং) যশ বা স্বর্ণ ইত্যাদি সম্ভার আমাদের মধ্যে স্থাপন করুন (দধি); আমরা সোমের দ্বারা ও স্তোত্রের দ্বারা আপনার বলবৃদ্ধি করছি (তে শুষ্মং উৎ তিরামসি) ॥ ৩॥
হে বলবান্ ইন্দ্র (শ)! আপনি সমীপবর্তী দেশ হতে (অর্বাবতঃ) কিংবা (অথথা) অতি দূরবর্তী কোন দেশ হতে (পরাবতঃ) আমাদের অভিলক্ষ্যে (নঃ) আগমন করুন (আ গহি)। হে বজ্রধারী (অদ্রিবঃ) ইন্দ্র! আপনার যে উত্তম লোক আছে (তে যঃ লোকঃ), সেই স্থান হতে এই দেবযজন দেশে অর্থাৎ যজ্ঞস্থানে (ইহ) সোমপানার্থে আগমন করুন। ৪
হে আত্মা বা ঋত্বিক (অঙ্গ)! ইন্দ্রদেব আমাদের নিমিত্ত অন্যের দ্বারা উৎপন্ন প্রভূত (মহৎ) ভয় পরিহার পূর্বক (অভী যৎ) আমাদের নিকট হতে পৃথক করে দূরে অপসারিত করে দেন (অপ চুচ্যবৎ)। সেই ইন্দ্র (সঃ হি) অবশ্যই স্থির, অন্যের দ্বারা বিচলিত নন এবং বিশ্বের দ্রষ্টা (বিচর্ষাণিঃ)। ৫।
আমাদের আশ্রয় স্বরূপ, সর্বপ্রাণীর রক্ষক পরমৈশ্বর্য-গুণবিশিষ্ট ইন্দ্রদেব আমাদের সুখী করুন (মৃলয়াতি)। তাহলে পশ্চাৎ দিক হতে আমাদের নিকট কোন পাপ বা দুঃখ (পশ্চাৎ অঘ) প্রাপ্ত না হই (ন নশৎ), অধিকন্তু আমাদের সম্মুখে (নঃ পুরঃ) মঙ্গল হোক (ভদ্রং,ভবাতি)। ৬৷৷
সেই ইন্দ্রদেব সকল দিক হতে (সর্বাভ্যঃ আশাভ্যঃ পরি) অর্থাৎ দিক-বিদিক হতে ও ঊর্ধ্ব-অধঃ দিক হতে আমাদের অভয় করুন; (সকল দিক্-গত ভয় পরিহারের সামথ্য সম্ভাবিত করুন–এটাই প্রার্থনা)। সেই ইন্দ্র সকল দিকে আমাদের ভয়প্রদায়ী যে সকল শত্রু আছে, তাদের সকলের অভিভবিতা (জেতা) ও তাদের বিরূপভাবে দ্রষ্টা (বিচৰ্ষণিঃ) ॥৭
বিনিয়োগ ও টীকা— এই সূক্তটির অতিরাত্রে ব্রাহ্মণাচ্ছংসীগণের প্রথম পর্যায়শস্ত্রে বিনিয়োগ উক্ত হয়েছে। (২০কা, ৩অ, ৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –আমরা মহান (মহে) ইন্দ্রদেবের নিমিত্ত (ইন্দ্রায়) সুন্দর স্তোত্র (সু বাচম) নিরন্তর প্রযুক্ত বা প্রয়োগ করছি (নি প্র ভরামহে)। যেহেতু পরিচর্যাকারী যজমানের (বিবস্বতঃ) যজ্ঞমণ্ডপে (সদনে) তাঁর উদ্দেশে স্তুতি করা হয়, (গিরঃ)। সেই ইন্দ্র (হি) ক্ষিপ্রতার সাথে (নূ চিৎ) অসুরগণের রমণীয় ধন (রত্নং) লাভ করেন (অবিদৎ); (তার দৃষ্টান্ত কি? না–) সসতামিব অর্থাৎ চোর যেমন নিদ্রিত মনুষ্যের ধন ক্ষিপ্রতার সাথে লাভ করে, সেই রকম। (ভাব এই যে, এই কারণে ইন্দ্রদেব আমাদের ধনপ্রদানে সমর্থ)। ধনদাতা পরুষের প্রতি (দ্রোবিপণাদে) অসমীচীনা স্তুতি (দুস্তুতি) বচনীয় নয় বা ফলপ্রসূ নয় (ন শস্যতে)। (বক্তব্য এই যে, সেই জন্যই আমরা সুন্দর স্তোত্রের দ্বারা স্তুতি করছি)। ১।
হে ইন্দ্র! আপনি অশ্ব-গজ ইত্যাদি বাহন সমূহের দাতা (অশ্বস্য দুরঃ) এবং গো-মহিষ ইত্যাদি সম্পদ ও ব্রীহি ইত্যাদি ধান্যজাত অন্নের দাতা (গোঃ যবস্য দুরঃ অসি)। এইমতো আপনি হিরণ্য-মণিমুক্তা ইত্যাদিরূপ ধনের (বসুনঃ) স্বামী (ইনঃ) ও পালক (পতিঃ)। আপনি দানের নেতাস্বরূপ অথবা মনুষ্যগণের শিক্ষকস্বরূপ (শিক্ষানরঃ), অত্যন্ত প্রাচীন বা আদিমতম (প্রদিবঃ), আপন সেবকদের প্রতি অভীষ্টবর্ষক (অকামকৰ্শনঃ), সখিভূত অর্থাৎ সখ্যতাসম্পন্ন ঋত্বিকগণের মিত্রভূত (সখা সখিভ্যঃ)–এই হেন মহিমময় আপনার (তং) উদ্দেশে আমরা স্তোত্র উচ্চারণ করছি (ইদং গৃণীমসি)। ২।
হে প্রজ্ঞানী (শচীবঃ)! হে পরমেশ্বর্যশালী (ইন্দ্র)! আপনি বহু কর্মকারী (পুরুকৃৎ), শ্রেষ্ঠ দীপ্তিমান্ (দ্যুমত্তম)। সর্বত্র যে ধন বিদ্যমান (অভিতঃ যৎ বসু), তার সবেরই আপনি অধিকারী বলে আমরা জ্ঞাত আছি (তৎ ইদং তব ইৎ চেকিতে)। হে শত্রুগণের অভিভবকারী ইন্দ্র! এই কারণে (অতঃ) সকল ধন সংগ্রহ পূর্বক (সংগৃভ্য) আমাদের প্রদান করুন (আ ভর)। আপনাতে ইচ্ছাকারী (ত্বায়তঃ), অর্থাৎ আপনার কৃপাভিলাষী, স্তোতারূপী আমার কামনা (জরিতুঃ কাম) নিষ্ফল করবেন না (মোনয়ীঃ); (অর্থাৎ পূর্ণ করুন–এটাই প্রার্থনা) ৷ ৩৷৷
হে ইন্দ্র! আমাদের প্রদত্ত (এভিঃ) দীপ্ত চরু-পুরোডাশ ইত্যাদি (দ্যুভিঃ) এবং আমাদের প্রদত্ত (এভিঃ) সোমের দ্বারা (ইন্দুভিঃ) প্রসন্ন হয়ে আপনি আমাদের বহু গো-অশ্ববৎ ধনের দ্বারা (গোভিঃ অশ্বিনা) আমাদের দারিদ্র্য (অমতিং) নিবারণ পূর্বক (নিরুন্ধানঃ) শোভন মনোভাবাপন্ন (সুমনাঃ) হোন। আমরা আমাদের প্রদত্ত সোমের দ্বারা প্রীত ইন্দ্রের দ্বারা (ইন্দুভিঃ ইন্দ্ৰেন) উপপয়িতা অর্থাৎ হানিকারক শত্রুদের (দস্যুং) বিদারক হবো (দরয়ন্ত) এবং অপগতশত্রু হয়ে (যুতদ্বেষসঃ) ইন্দ্রদত্ত অন্নের দ্বারা (ইষা) সঙ্গত অর্থাৎ যুক্ত হবো (সং রভেমহি) ॥ ৪
হে ইন্দ্র! আমরা আপনার ধনের (রায়া) সাথে যুক্ত হবো (সং রভেমহি)। তথা সকলের ইষ্যমাণ অর্থাৎ অভিলষিত অন্নের সাথে যুক্ত হবো। তথা আপনার বলের সাথে (বাজেভিঃ) যুক্ত হবো। (কিরকম বল? না) পুরুশ্চন্দ্রৈঃ অভিদ্যুভিঃ অর্থাৎ বহু প্রজার আহ্লাদক, ও তাদের অভিমুখে দীপ্যমান বল। অধিকন্তু, ইন্দ্রদেব। ( সম্বন্ধিনী প্রকৃষ্ট অনুগ্রহরূপা বুদ্ধির (প্রমত্যা) সাথে যুক্ত হবে। (কিরকম অনুগ্রহ বুদ্ধি? না) বীরশুষ্ময়া অর্থাৎ বিবিধ ক্লেশ নিবারক বল, এবং গোঅগ্রয়া অশ্বাবত্যা অর্থাৎ গাভী ও অশ্বের দানসমন্বিত অনুগ্রহ বুদ্ধি। ৫।
হে সাধুজনের রক্ষক (সৎপতে) ইন্দ্র! শত্রুগণের বিনাশের নিমিত্তভূত (বৃহত্যে) প্রসিদ্ধ মদকর সামগ্ৰীসমূহ (তে মদাঃ) অর্থাৎ আজ্য-পুরোডাশ ইত্যাদি আপনাকে হর্ষান্বিত করে (অমদ)। তথা প্রসিদ্ধ (তানি) হর্ষসাধনত্ব সম্বন্ধিনী স্তোত্রের দ্বারা প্রবুদ্ধ হয়ে আপনি আমাদের নিমিত্ত অভীষ্ট ফলের বর্ষক (খৃষ্ণা) হোন। প্রসিদ্ধ (তে) সেই সোমসমূহও আপনাকে হর্ষান্বিত করে (সোমাসঃ অমদ, যখন (যৎ) স্তোতৃগণ (কারবে) যাগরত যজমানের (বহিষ্মতে) দশ সহস্ৰসংখ্যক আবরক পাপসমূহ (বৃত্রাণি) বা শত্রুগণকে আপনি নিশ্চিহ্ন (অপ্রতি) করে বধ করে থাকেন (বয়ঃ) ৬
হে ইন্দ্র! আপনি প্রহরণসাধন বজ্রের দ্বারা (যুধা) শত্রুর প্রহরণের বা ধর্ষক যোদ্ধার (ধৃষ্ণুয়া) সম্মুখে গমন করেন। (এখানে দ্বন্দ্বযুদ্ধের কুশলত্ব উক্ত হয়েছে)। স্বকীয় মরুৎ প্রভৃতি যোদ্ধৃবৃন্দের বলের দ্বারা (ওজসা) ইদানীং (ইদ) শত্রু-নগরে বাসকারী বীরবর্গকে সম্যক বিনাশ করিয়ে থাকেন (সং হংসি)। যে কারণে সকলের নমনীয় (যৎ নম্যা) আপনার সখিভূত (সখ্যা) অস্ত্রের দ্বারা দূরদেশে (পরাবতি) নমুচি নামধেয় মায়াবী (মায়িন) অসুরকে নিরন্তর বিনাশ করেছেন। (অতএব সেই কারণে আপনার স্তুতি করছি–এই বক্তব্য)। ৭
হে ইন্দ্র! আপনি করঞ্জ নামক অসুরকে বধ করেছেন। অধিকন্তু (উত) পর্ণয় নামক অসুরকেও বধ করেছেন। (কি জন্য? না–) অতিথিথ নামক সেই রাজার প্রয়োজনে, যাঁর গাভীগুলি অতিথির সেবার্থে রক্ষিত। (কিসের দ্বারা অসুরকে নিধন করেছেন? না–) তেজিষ্ঠয়া বর্তনী অর্থাৎ অতিশয় তেজোবত্যা অর্থাৎ সুতীক্ষ্ণ বর্তনী নামক আয়ুধের দ্বারা। আরও, আপনি ঋজিশ্বনা নামক রাজার নিমিত্ত সর্বতোভাবে আবেষ্টনকারী (পরিদূতা) শতসংখ্যক বদ নামক অসুরের নগরসমূহ (পুরঃ) আপনি অসহায়ভূত অবস্থায় অথবা একাকীই ধ্বংস করেছেন ॥ ৮।
হে বিখ্যাত (তঃ) ইন্দ্র! আপনি সহায়বর্জিত অর্থাৎ বন্ধুহীন (অবন্ধুনা) সুশ্রবা নামক রাজার নিমিত্ত প্রসিদ্ধ প্রতিরোধকারী (এতান উপজম্মুষঃ) জনরাজার দ্বিগুণিত দশসংখ্যক অর্থাৎ বিংশতি সংখ্যক (দ্বির্দশ), ষষ্টিসহস্ৰসংখ্যক অর্থাৎ ষাট সহস্র (যষ্টিং সহস্রা), তথা নবোত্তরনবতিসংখ্যক অর্থাৎ নিরানব্বই সংখ্যক (নবতিং নব) সেনানায়কগণকে শত্রুর অগম্য (দুষ্পদা) মার্গে (রথ্যা) চক্রের দ্বারা বিনাশ করেছেন (চক্রেণ নি অবৃণ) ॥৯॥
হে ইন্দ্র! আপনি সুশ্রবা নামক দুর্বল রাজার রক্ষার নিমিত্ত (পূর্ব মন্ত্রে বন্ধুহীন সুশ্রবা নামক রাজা এই মন্ত্রে পুনরায় উল্লেখিত হচ্ছেন তবে এই স্থলে উতিভিঃ অর্থাৎ রক্ষার নিমিত্ত কথাটি যুক্ত হয়েছে) তুর্বয়াণ নামক রাজাকে পালন করেছেন (তব ভ্রামভিঃ)। এইভাবে আপনি মহৎ (মহে) যুবরাজভূত (শূনে) সুশ্রবা রাজার নিমিত্ত কুৎস, অতিথিথ ও আয়ু নামধেয় রাজগণকে বশে আনয়ন করেছেন (অরন্ধনায়ঃ)। ১০
হে ইন্দ্র! এই যজ্ঞের সম্পন্নতার সময়ে বর্তমান (উদৃচি) আপনি হেন দেবতা দ্বারা রক্ষিত বা পালিত (দেবগোপাঃ) আমরা, আপনার বন্ধুর ন্যায় (তে সখায়ঃ) অতিশয় প্রিয়রূপে কল্যাণ লাভ করবো (শিবতমা অসাম)। আমরা যজ্ঞসমাপ্তির উত্তরকালেও আপনার স্তব করবো (ত্বম স্তোষাম)। আমাদের দ্বারা স্তুত আপনার দ্বারা (ত্বয়া) আমরা শোভন পুত্রবন্ত (সুবীরাঃ) হয়ে অতিশয় দীর্ঘ আয়ু (দ্রাঘিয়ঃ আয়ুঃ) প্রকৃষ্টরূপে ধারণ করবো (প্রতরং দধানাঃ)। ১১
বঙ্গানুবাদ –হে অভীষ্টবষক (বৃষভ) ইন্দ্র! সোম অভিযুত হলে (সুতে) সেই অভিষব ইত্যাদির দ্বারা শোধিত বা সংস্কৃত সোম পানের নিমিত্ত (সুতং পীতয়ে) আপনাকে (ত্বা) সংযোজিত বা নিয়োজিত করছি (সৃজামি)। সেই সোমের দ্বারা আপনি তৃপ্তি লাভ করুন (তৃম্প) এবং মদকর সোম (মদং) ব্যাপ্ত করুন (বি অশ্নহি)। ১।
হে ইন্দ্র! আপনার অনুগ্রহ ব্যতিরেকে (ত্বা অবিষ্যবঃ) নিজেকে রক্ষার অভিলাষ করে আমরা আত্মহিতের উপায় অজ্ঞাত (মুরাঃ–মূঢ়াঃ) হয়েছি। অতএব আমাদের হিংসা করবেন না (মা দভ)। তথা আপনাকে উপহাসকারীগণও (উপহস্বানঃ) যেন আপনাকে হিংসা করতে না পারে। এবং আপনি ব্রাহ্মণবিদ্বেষীগণের ভজন করবেন না অথবা তাদের সেবা স্বীকার করবেন না (ব্রহ্মদ্বিষঃ মাকী বনঃ)। ২।
হে ইন্দ্র! এই যুগে (ইহ) গোরস (অর্থাৎ গো-বিকারের দ্বারা প্রস্তুত দুগ্ধ) মিশ্রিত সোমের দ্বারা (গোপরীণসা) ঋত্বিগণ মহতি ধনের নিমিত্ত আপনাকে প্রসন্ন করুন (মহে রাধসে ত্বা মন্তু)। যেমন (যথা) সরণশীল জলে বা সরোবরে (সরঃ) গমন পূর্বক পিপাসার্ত গৌরমৃগ (গৌরঃ) জল পান করে, আপনিও তেমনই (সোমরস) পান করুন (পিব) ৷ ৩৷
হে স্তুতিকারীগণ! স্বর্গের বা গাভীবর্গের স্বামী (গোপতিং) ইন্দ্র যাতে তার সেবকরূপী আমাদের পালকরূপে নিজেকে জ্ঞাত হন (যথা সৎপতিম বিদে), সেই রকমে প্রকর্ষের সাথে তার অর্চনা করো (গিরা অভি প্র অর্চ)। (কিরকম ইন্দ্র? না) সত্যস্য সূনুম অর্থাৎ সত্যের ফলস্বরূপ যজ্ঞের বা সত্যের পুত্রস্থানীয়। (যেখানে যজ্ঞ সেখানেই ইন্দ্রের অবস্থান হেতু তাদের পিতা-পুত্রবৎ অব্যবহিত সম্বন্ধ লক্ষণার দ্বারা বোধিত)। ৪।
ইন্দ্রের আরোচমান অর্থাৎ দীপ্তিমান চ অশ্বগুলি (অরুষীঃ হরয়ঃ) তার রথে যোজিত হয়ে কুশাস্তীর্ণ স্থলে (আ সমৃজ্বিরে অধি বহিষি) অর্থাৎ যজ্ঞস্থলে তাঁকে নীত করুক। সেই কুশের দ্বারা (যত্র) আমরা ইন্দ্রের স্তুতি করছি (অভি সন্নবামহে)। ৫।
যখন (যৎ) নিকটে (উপরে) বিদ্যমান মধুর ন্যায় স্বাদুভূত সোম ইন্দ্র সর্বতঃ লাভ করেন (সীম্ বিদৎ), তখন বজ্রযুক্ত ইন্দ্রের উদ্দেশে (বর্জিণে ইন্দ্রায়) গাভীগণ মধুর আশ্রয়ণসাধন দুগ্ধ ক্ষরণ করছে (মধু আশিরং দুদুহ্রে) ॥ ৬৷
বিনিয়োগ ও টীকা –অতিরাত্ৰ ক্ৰতুতে মধ্যমপর্যায়ে ব্রাহ্মণাচ্ছংসী শস্ত্রে উপযুক্ত সূক্তটি সহ পর পর চারটি (অর্থাৎ ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম) সূক্ত বিনিযুক্ত হয়। বলা বাহুল্য উল্লিখিত সূক্তগুলির শেষে এইরকমেই বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। (২০কা, ৩অ. ৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে বজ্ৰবান্ (অদ্রিবঃ) ইন্দ্র! হুয়মান অর্থাৎ আহূত (হুবানঃ) আপনি আমাদের যজ্ঞের অভিমুখে (নঃ মদ্র) অশ্বের দ্বারা বাহিত হয়ে (হরিভ্যা) সোমপানের নিমিত্ত। ( (সোমপীতয়ে) আগমন করুন (আ যাহি) ॥১।
হে ইন্দ্র! আমাদের যজ্ঞে হোতা নামক ঋত্বিক প্রাপ্তকাল হয়ে (ঋত্বিয়) অর্থাৎ উপস্থিত হয়ে বেদীতে পরস্পর সম্বন্ধিত করে অর্থাৎ ঘনিষ্ঠভাবে কুশ আস্তীর্ণ করেছেন (বৰ্হি আনুষ তিস্তিরে); সেইমতো প্রাতঃসবনে (প্রাতঃ) প্রস্তরগুলি (অদ্রয়ঃ) সোমাভিষবের নিমিত্ত সঙ্গত বা সজ্জিত করা হয়েছে (অযুজন)। ২।
হে ব্রহ্মবাহ (স্তোত্ররূপ মন্ত্রের প্রাপক) ইন্দ্র! আপনার উদ্দেশে এই স্তোত্ৰসমূহ (ইমা ব্রহ্ম) প্রয়োগ করা হচ্ছে (ক্রিয়ন্তে)। সেই হেতু আপনি এই কুশসমূহের উপরে উপবেশন করুন (বৰ্হি আ সীদ)। হে শৌর্যশালী (শূর) ইন্দ্র! আমাদের দীয়মান ব্রীহি বা হবিঃ ভক্ষণ করুন (পুরোলাশ)। ৩ ৷৷
হে স্তুতির দ্বারা বর্ণনীয় (গির্বণঃ) ইন্দ্র! হে বৃত্রের হন্তা (বৃহ) ইন্দ্র! আমাদের তিনটি সবনে ক্রিয়মাণ (সবনেষু এষু) স্তোত্র ও উথ শস্ত্রে (স্তেমেষু চ উকথেযু) আপনি প্রীত হোন (ররন্ধি)। ৪
আমাদের ক্রিয়মাণ স্তুতিগুলি (মতয়ঃ), মহান (উরুং), সোমপানকারী (সোমপাম), ও বলের প্রভুস্বরূপ (শবসঃ) ইন্দ্রকে প্রাপ্ত হোক (রিহন্তি); (তার দৃষ্টান্ত কি? না) বৎসং ন মাতরঃ অর্থাৎ মাতা গাভী যেমন বৎসগাত্র লেহন করে, সেইরকম ॥ ৫৷৷
হে ইন্দ্র! তথাবিধ আপনার (সঃ) শরীরের বলের নিমিত্ত (তন্ব) ও প্রভূত ধনের অর্থাৎ ধন দানের নিমিত্ত (মহে রাধসে) সোমলক্ষণ অন্নের দ্বারা অর্থাৎ সোমপানের দ্বারা (অন্ধসঃ) আপনি হর্ষিত হোন (মন্দস্ব)। আমি হেন স্তুতিকারী জনকে (স্তোতার)। পরকৃত নিন্দাভাজন করবেন না (নিদে ন করঃ) ॥ ৬৷৷
হে ইন্দ্র! তোমাতে কাময়মান আমরা (ত্বায়বঃ) (তোমাকে প্রদানের নিমিত্ত) সোমলক্ষণ হবির দ্বারা সম্পন্ন হয়ে (হবিষ্মন্তঃ) আপনার স্তুতি করছি (জরামহে)। (উত) হে সকলের নিবাসরূপ (বসো) ইন্দ্র! আপনি (ত্বম) অভিমত ফল প্রদানের নিমিত্ত আমাদের কাময়িতা হোন (অস্মান অন্ত্ৰয়ুঃ ভব)। ৭।
হে হরিপ্রিয় (হরী নামক দুই অশ্বের প্রতি প্রতিমান) ইন্দ্র! আমাদের নিকট হতে দূরে (আরে) আপনার রথযুক্ত অশ্বদ্বয়কে মুক্ত করবেন না (মা বি মুমুচঃ), বরং রথারূঢ় হয়ে আমাদের অভিমুখে আগমন করুন (অর্বাঙ যাহি)। হে হবিলক্ষণ অন্নের দ্বারা যুক্ত (স্বধাবঃ) ইন্দ্র! আমাদের এই দেবযজনে (ইহ) সোমপানের দ্বারা হর্ষে পূর্ণ হোন (মৎস্ব) ৮
হে ইন্দ্র! আপনাকে আপন শরীরপীড়নের দ্বারা সুখকর (সুখে) রথে বহন পূর্বক (বহতাম), স্কন্ধপ্রদেশে লম্বমান কেশযুক্ত (কেশিনা), শ্রমজনিত কারণে স্বেদাবী অশ্বদ্বয় (ঘৃত) আমাদের যজ্ঞাগ্নির নিকটে বা আস্তীর্ণ কুশসমূহের উপরে (বহি) বিরাজমান করার নিমিত্ত আনয়ন করুক (আসদে)। ৯৷৷
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির অতিরাত্রে মধ্যমে রাত্রিপর্যায়ে ব্রাহ্মণাচ্ছংসী শস্ত্রে বিনিয়োগ উক্ত হয়েছে ৷ (২০কা, ৩অ. ৬সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! আমাদের অভিযুত (সুতং) গব্যদুগ্ধের আশ্রয়সাধন (গবাশিরঃ) অর্থাৎ গব্যদুগ্ধমিশ্রিত সোমের প্রতি বা সমীপে আপনি আগত হোন (উপা গহি), যেহেতু (যঃ) আপনার অশ্বযুক্ত (হরিভ্যাং) রথ আমাদের এই স্থানে আগমনের নিমিত্ত কামনা করছে ৷৷ ১।
হে ইন্দ্র! আপনার প্রসিদ্ধ (তং) মদকর (মদ), বিস্তৃত কুশের উপরে স্থিত বা রক্ষিত (বহিষ্ঠাং) পাষাণের দ্বারা অভিযুত অর্থাৎ শিলে পিষ্ট সোম (গ্রাবভিঃ সুতং) অভিলক্ষ্য করে আগমন করুন (আ গহি) এবং ক্ষিপ্রতার সাথে (নু) এই সোমপানের দ্বারা (অস্য) প্রভূত (কুবি) তৃপ্ত হও (তৃষ্ণবঃ)। ২।
আমাদের স্তুতিরূপা বাণীসমূহ ইন্দ্রের অভিলক্ষ্যে (ইন্দ্রং অচ্ছ মম গিরঃ) আমাদের দ্বারা প্রেরিত হয়ে (ইষিতা) এই যজ্ঞস্থলী হতে উচ্চাৰ্যমাণ প্রকারে প্রাপ্ত হচ্ছে অর্থাৎ উচ্চারণ করা মাত্রই ইন্দ্রাভিমুখে উপনীত হতে চলেছে (ইতঃ ইস্থা অগুঃ)। (কি জন্য? না–) আবৃত সোমপীতয়ে অর্থাৎ আমাদের প্রতি আগমনের জন্য এবং সোমপানের জন্য ৷৷ ৩৷৷
ইন্দ্রদেবকে সোমপানের নিমিত্ত (সোমস্য পীতয়ে) এই যজ্ঞস্থলে (ইহ) ত্রিবৃৎ ইত্যাদি স্তোমসাধ্য স্তোত্রসমূহে (স্তোমৈঃ) ও আজ্য ইত্যাদি শস্ত্রসাধ্য স্তুতিমন্ত্রের দ্বারা (উথেভিঃ) আমরা আহ্বান জ্ঞাপন করছি (হবামহে)। এবং আমাদের দ্বারা আহূত হয়ে ইন্দ্রদেব বহুবার (কুবি) আগমন করুন (আগমৎ), অর্থাৎ আমাদের যজ্ঞে যুক্ত হোন ॥ ৪।
হে ইন্দ্র! এই গ্রহচমসস্থিত (ইমে) সোমরাশি আপনার নিমিত্ত অভিষব ইত্যাদির দ্বারা সংস্কৃত (সুতাঃ) হয়েছে। হে বহু যজ্ঞসাধনকারী ইন্দ্র (শতক্রতো)! হে অন্নধনশালী বা কর্মফলদাতা (বাজিনীবসো) ইন্দ্র! আপনার নিমিত্ত অভিযুত, সোমসমূহ (তান) জঠরে ধারণ করুন (দধিম্ব) ॥৫
হে ত্রিকালজ্ঞ বা সূক্ষ্মার্থদর্শী (কবে) ইন্দ্র! আপনি সংগ্রামে অতিশয় শত্রুধর্ষক (বাজেষু দধৃষং) ও শত্রুধনের জয়শীল (ধনঞ্জয়ং)–আমরা জ্ঞাত আছি (বিদ্য)। এই কারণে (অধ) আপনার সুখ বা সুখকর ধন (তে সুম্নং) আমরা যাচনা করছি। ৬।
হে ইন্দ্র! গো-দুগ্ধের আশ্রয়ভূত অর্থাৎ গো-দুগ্ধে মিশ্রিত এবং যবলক্ষণ-মিশ্রণদ্রব্যোপেত (গবাশিরং যবাশিরং চ), পাষাণে পেষণ-নিষ্পন্ন (বৃষভিঃ) এই সোম (সুম) আমাদের অভিমুখে আগমন পূর্বক পান করুন (নঃ আগত্য পিব)।৭৷
হে ইন্দ্র! এই সোম পান করে (পীতয়ে) আপনি আপন উদরস্থ করুন (তুভ্য ইৎ স্বে ওক্যে), সেই নিমিত্ত এই সোম প্রেরণ করছি (চোদামি)। এই পীত অর্থাৎ পানকৃত সোম (এষঃ) আপনার হৃদয়ে (তে হৃদি) অত্যন্ত রম্যক্রীড়া করুক, অর্থাৎ হর্ষোৎপাদন করুক (ররন্তু)। ৮।
হে ইন্দ্র! আমরা হেন কুশিক- গোত্রোৎপন্ন জন (কুশিকাসঃ) নিজেদের রক্ষাকামী হয়ে (অবস্যবঃ) আপনার নিমিত্ত অভিযুত পুরাতন সোম পানের নিমিত্ত (ত্বাং প্রত্ন সুতস্য পীতয়ে) আপনাকে আহ্বান করছি (হবামহে)। ৯।
বিনিয়োগ ও টীকা– অতিরাত্র এবং মধ্যম রাত্রিপর্যায়ে ব্রাহ্মণাচ্ছংসিশস্ত্রে উপযুক্ত সূক্তটির বিনিয়োগ হয়। (২০কা, ৩অ, ৭সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! যে মনুষ্য (মঃ) আপনার দ্বারা সুষ্ঠুভাবে রক্ষিত (সুপ্রাবীঃ) হয়, সে বহু অশ্ববান্ হয় এবং গো-স্বামীগণের মধ্যে মুখ্য হয় (প্রথমঃ গচ্ছতি)। (অর্থাৎ বহু পশুর অধিকারী হয়, এটাই বক্তব্য)। আপনি সেই মনুষ্যকে বহু ধনের দ্বারা সম্পৃক্ত করে থাকেন (বসুনা অভিতঃ তমিৎ পৃক্ষি); যেমন বিনিষ্টিজ্ঞানসাধন জলরাশি সর্বতোভাবে সমুদ্রকে পূর্ণ করে থাকে বা প্রাপ্ত হয় (বিচেতসঃ আপঃ সিন্ধু ভবীয়সা)।১৷
হে হোত্রিয় (অর্থাৎ হবির্যোগ্য) ইন্দ্র! দ্যোতমানা ও জলরাশি (ন দেবীঃ আপঃ) যেমন নিম্ন প্রদেশে বা সমুদ্রের দিকে গমন করে (উপ যন্তি), তেমনই স্তুতিগুলি বা স্তোতৃগণ আপনার দিকে গমন করছে, অর্থাৎ অনায়াসে আপনাকে লাভ করছে। তথা আপনার স্বরূপ দর্শনে অসমর্থ হয়ে স্তোতাগণ নিম্নাভিমুখে দৃষ্টি ক্ষেপণ করছে (অবঃ পশ্যন্তি) যেমন সর্বতো ব্যাপ্ত (যথা বিততং) সবিতাদেবের জ্যোতি (রজঃ) দর্শনে অপারগ হয়ে লোকে দৃষ্টি অবনত করে। অধিকন্তু ঋত্বিকগণ (দেবাসঃ) আপনাকে প্রাচীন (প্রাচৈঃ) বেদির অভিমুখে নীত করছেন (প্রণয়ন্তি); অথবা আপনার নিমিত্ত সোম ও অগ্নিকে পূর্বস্থ বেদিতে স্থাপন করতে গমন করছেন। ব্রহ্ম পরিবৃঢ় স্তোত্র বা কর্মপ্রিয় (ব্রহ্মপ্রিয়) আপনাকে ঋত্বিকগণ সেবা করছেন, যেমন জামাতাগণ কন্যার সেবা করে (বরা ইব জোষয়ন্তে)। ২৷৷
হে ব্রাহ্মণাচ্ছংসি! দুটি হবিধানের মধ্যবর্তী তৃতীয় ছদিস্থানের উপরে (দ্বয়োহবির্ধানয়োচ্ছদিষ্মতেরধি উপরি) উথ্য স্তোত্রের যোগ্য বচন নিহিত রয়েছে (অধি অদধাঃ)। সেই উভয় হবির্ধানে গ্রহ-চমস-ইত্যাদি লক্ষণ-সমন্বিত যজ্ঞসাধন পাত্ৰসমূহ যুগলরূপে বর্তমান (যতসুচা মিথুনা যা)। এই হেন হবির্ধানে ইন্দ্র সম্পূজিত হন (সপৰ্যতঃ); (অর্থাৎ সোমপানের উপযুক্ত পাত্র ইন্দ্রের উদ্দেশে নিবেদিত হয়–এটাই ভাব)। অধিকন্তু, হে ইন্দ্র! আপনার কর্মে, অর্থাৎ আপনার উদ্দেশে অনুষ্ঠিত যাগে (তে ব্রতে) যজমান অবিরামভাবে (অসংযত্তঃ) পুত্র-পশু ইত্যাদির দ্বারা নিজের পোষণ করেন (ক্ষেতি পুষ্যতি)। আপনার নিমিত্ত সোম অভিষবকারী (সুন্বতে) যজমানের কল্যাণী (ভদ্রা) শক্তি হোক। (অর্থাৎ যজমান আপনার অনুগ্রহ লাভ করুন)। ৩।
হে ইন্দ্র! অঙ্গিরা মহর্ষিবর্গ অগ্রে (প্রথমং) আপনার উদ্দেশে হবিলক্ষণ অন্ন সম্পাদিত করেছিলেন (বয়ঃ); (কখন? না) যখন পণিনামক অসুরগণ গাভী অপহরণ করেছিল, তারপর (আৎ)। (কিরকম অঙ্গিরাগণ? না–) সুকৃত্যয়া অর্থাৎ করণব্যাপারে শোভনশালী, এবং অগ্নিষ্টোম ইত্যাদি যাগকর্মের নিমিত্ত (শম্যা) আহ্বানীয় ইত্যাদি অগ্নি প্রজ্বলনকারী (ইদ্ধাগ্নয়ঃ) নেতা (নরঃ) অঙ্গিরা ঋষিগণ, যাঁরা বপু অশ্ববন্ত ও বহু গো-সমৃদ্ধ এবং অজা-অবি ইত্যাদি অন্য পশুজাতের অধিকারী (পশুম আ) সেই অসুরগণের সকল ধন (সর্বং ভোজন) লাভ করেছিলেন (সম্ অবিন্ত) ॥ ৪
অথবা নামক মহর্ষি ইন্দ্রের উদ্দেশে ক্রিয়মাণ যজ্ঞ সাধনের দ্বারা (যজ্ঞৈঃ) প্রথমে অপহৃত গাভীর পথ অর্থাৎ গাভীগুলির বিস্তারিত সন্ধান জ্ঞাত হয়েছিলেন, তারপর (ততঃ) কান্ত অর্থাৎ স্পৃহণীয় (বেনঃ) ও গবানয়ন কর্মের পালয়িতা (ব্রতপাঃ) সূর্য প্রাদুর্ভূত হয়েছিলেন (আজনি)। (অর্থাৎ অন্ধকারাবিষ্ট গো-সমূহকে প্রকটিত করে দিয়েছিলেন–এটাই বক্তব্য)। অনন্তর কবির পুত্র (কাব্য) উশনা অর্থাৎ ভৃগু ইন্দ্রের সহায়তায় (সচা) গাভীগুলিকে লাভ করেছিলেন। সর্বনিয়ন্তা সূর্যের প্রয়োজনে (যমস্য) প্রাদুর্ভূত (জাতং) অথবা সকলের নিয়ন্তা ঈশ্বর হতে সৃষ্ট, অমরণধর্মা অর্থাৎ অবিনাশী (অমৃতং) ইন্দ্রের পূজা করছি (যজামহে) ॥ ৫৷৷
যে যজ্ঞে (যৎ) শোভন অপত্যলাভরূপ ফলের নিমিত্ত অথবা শোভনায়তন যজ্ঞপাত্রের নিমিত্ত কুশ আস্তীর্ণ করা হয় (বহিঃ স্বপত্যায় বৃজ্যতে), অর্চনসাধন মন্ত্রোপেত হোতা (অর্কো বা) যে দ্যোতমান যজ্ঞে (দিবি) বাগাত্মক শস্ত্র ইত্যাদি উচ্চারণ করেন (শ্লোক আঘোষতে) এবং যে যজ্ঞে (যত্র চ) অভিষবসাধন পাষাণ (গ্রাবা) উথাহঁ স্তোতার মতো শব্দ করে (কারুরুকথ্য বদতি), সেইরকম যজ্ঞের (তস্যেৎ) সমীপস্থানে ইন্দ্রদেব সহর্ষে বিরাজমান হয়ে থাকেন (অভিপিত্বেযু রণ্যতি) ৬
হে হরি নামক অশ্বোপেত (হযর্শ্ব) ইন্দ্র! অভীষ্ট ফলবর্ষণকারী (বৃষ্ণে) ও প্রকৃষ্ট গমনশালী (প্রয়) আপনার উদ্দেশে উদ্যত বল (উগ্ৰাং) ও যথার্থ সামথ্যসম্পন্ন (সত্যা) সোমরস (সুতস্য) পানের নিমিত্ত (পীতিং) প্রেরণ করছি (প্র ইয়র্মি)। হে ইন্দ্র! আপনি এই যজ্ঞে (ইহ) সকল প্রীতিকর (বিশ্বাভিঃ ধেনাভিঃ) স্তোত্ৰাত্মক কর্মের দ্বারা (ধীভিঃ) অর্থাৎ যাগের দ্বারা বা বলের নিমিত্ত স্তয়মান হয়ে (গৃণানঃ) হৃষ্ট হোন (মাদয়স্ব) ৭
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ববর্তী সূক্তের অনুরূপ। এই সূক্তের ষষ্ঠ (বহিবা যৎ ইত্যাদি) মন্ত্রটি এর পরিধানীয়া। (২০কা, ৩অ, ৮সূ)।
বঙ্গানুবাদ –শত্রুসেনাদের সঙ্গমে সঙ্গমে বা প্রতিটি যাগকর্মে (যোগেযোগে) আমরা অতিশয় বলবন্ত ইন্দ্রের নিকট (তবস্তর) রক্ষার নিমিত্ত (উতয়ে) আহ্বান জ্ঞাপন করছি (হবামহে)। তথা যখন যখন অন্নপ্রাপ্তি ঘটে (বাজেবাজে) তখন তখনই আমরা সখিভূত (সখায়ঃ) ইন্দ্রকে আহ্বান করছি ॥১॥
তিনি অর্থাৎ সেই ইন্দ্রদেব যদি আমাদের আহ্বান শ্রবণ করেন (নঃ হবং শ্রবৎ), তাহলে তাঁর সহস্ৰসংখ্যাযুক্ত অর্থাৎ অসীম রক্ষাশক্তি ও অন্ন সহ (সহশ্ৰিণীভিঃ উতিভিঃ বাজেভিঃ) আগত হোন (উপ আ গমদ)। ২
হে ইন্দ্রদেব! আপনি প্রাচীন স্বৰ্গনামক স্থানের অধিপতি (প্রত্নস্য ওকসঃ), বহু যোদ্ধার প্রতিনিধিভূত (তুবিপ্রতিম) নেতা (নরং)–এই হেন আপনাকে আমি অনুক্রমানুসারে আহ্বান করছি (অনু হুবে)। আপনি হেন যাঁকে (যং তে) পূর্বকালে (পূর্বং) আমাদের পিতা আপন অভীষ্ট সিদ্ধির উদ্দেশে আহ্বান করেছিলেন (হুবে)। (বক্তব্য এই যে, পূর্বকালে আমাদের পিতৃ-পিতামহ ইত্যাদি পূর্বপুরুষগণ যেমন আপনাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তারই পরম্পরাক্রমে আমরাও আপনাকে আহ্বান জ্ঞাপন করছি)। ৩
মহৎ নামান্বিত (ব্ৰধং), আরোচমান (অরুষং), স্থারব-জঙ্গমের উপরে অর্থাৎ স্বর্গ ইত্যাদিতে বিচরণশীল বা সূর্যাত্মক (তস্থূষঃ পরি চরন্তম) ইন্দ্রের হরি নামক অশ্বসমূহকে রথে যযাজিত করা হচ্ছে। রথ ও রথযুক্ত অশ্বসমূহের রশ্মিরাশি দিব্যলোকে দীপ্ত হয়ে রয়েছে (রোচন্তে রোচনা দিবি)। [পরবর্তী মন্ত্রে যুঞ্জন্ত্যস্য কাম্যা হরী ইত্যাদি শব্দাবলীর অনুসরণে ইন্দ্ররথে হরিনামক অশ্বগণের যোজনা ব্যাখ্যাত হয়েছে]। ৪।
উক্তলক্ষণসম্পন্ন ইন্দ্রের রথে হরিনামক অশ্বদ্বয়কে সারথিগণ যোজিত করছে (হরী যুঞ্জন্তি অস্য রথে)। (কিরকম অশ্বদ্বয়? না–) কাম্যা বিপক্ষ অর্থাৎ সেই অশ্বদ্বয় সকলের কাম্য ও রথের উভয় পার্শ্বে স্থিত; রক্তবর্ণশালী (শোণা) ও সারথি ইত্যাদি মনুষ্যগণের বাহক (ধৃষ্ণু নৃবাহসা)। ৫।
হে মরণশীল মনুষ্যবর্গ (মর্যা)! এই সূর্যস্বরূপ ইন্দ্রকে দর্শন করো। ইনি অন্ধকারে লুক্কায়িত রূপহীন পদার্থসমূহকে আপন প্রকাশের দ্বারা রূপ-দানশীল (অপেশসে পেশঃ), প্রজ্ঞানরহিত জনকে প্রজ্ঞাদানশীল (অকেতবে কেতুং কৃথন) এবং রশ্মিসমূহের সাথে (উষট্টি সহ) সস্তৃত (সং অজায়থাঃ)। (অর্থাৎ এই হেন সূর্যাত্মক সস্তৃত ইন্দ্রকে দর্শন করো–এটাই মন্ত্রণা)। ৬৷৷
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি সহ পর পর চারটি সূক্ত (অর্থাৎ ৯ম, ১০ম, ১১শ ও ১২শ সূক্ত), অতিরাত্র ক্রতুসমূহে তৃতীয় রাত্রিপর্যায়ে ব্রাহ্মণাচ্ছংসিশস্ত্রে বিনিযুক্ত হয়। বৈতানে (৪২) এগুলি বিস্তারিতভাবে সূত্রিত আছে। যেমন–যোগেযোগে তবস্তরং ও যুঞ্জন্তি ব্ৰধুমরুষং এই সূক্তের এই ঋদ্বয় স্তোত্রিয়ানুরূপ। আবার, ১৫শ সূক্তের (আ রোদসী ইত্যাদি সূক্তের) অন্তিম মন্ত্রটি অর্থাৎ অপাঃ পূর্বেষাং ইত্যাদি মন্ত্রটি পরিধানীয়া। আবার ১৬শ সূক্তের অন্তিম মন্ত্রটি অর্থাৎ উতী শচীবঃ ইত্যাদি মন্ত্রটি যাজ্য।…ইত্যাদি। (২০কা, ৩অ. ৯সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে পরমেশ্বর্যশালী ইন্দ্রদেব! যেমন দেবগণের মধ্যে আপনিই একমাত্র ধনের ঈশ্বর (যথা ত্বং এক ইৎ বস্ব ঈশীয়), আমিও যেন তেমন হই (অহং)। (অর্থাৎ আপনার অনুগ্রহে আমিও যেন শ্রেষ্ঠ ধনস্বামী হতে পারি)। আপনার স্তোতৃবর্গ যেমন বহু গাভীর স্বামী অর্থাৎ পালয়িতা হয়ে থাকেন (স্তোতা গোষখা স্যাদ), তেমনই আমার হোক (মে)। (অর্থাৎ আমারও স্তোতৃবর্গ বা প্রশংসাকারীগণ যেন আপনার অনুগ্রহে তেমনই বহু গাভীর অধিপতি হয়, অথবা আমি হেন আপনার স্তোতা যেন বহু গো-সমৃদ্ধি লাভ করতে পারি)। ১।
হে শচীপতি ইন্দ্রদেব! যখন (যৎ) আমি আপনার কৃপায় গোস্বামী হবো (অহং গোপতিঃ স্যাং), তখন যেন স্তুতিকারী জ্ঞানীজনবর্গকে (মনীষিণে অস্মৈ) দান করতে অভিলাষী হই (দিৎসেয়ং), এবং প্রার্থিত ধনও দান করতে পারি (শিক্ষেয়ং চ)। (অর্থাৎ আমাকে সেইরকম সামর্থ্য প্রদান করুন)। ২।
হে ইন্দ্রদেব! আমাদের প্রিয়, সত্যগর্ভা বাণী (সুতা), দুগ্ধবতী গাভীর ন্যায় আপনার প্রীণয়িত্রী হয়ে (তে ধেনুঃ) সোমাভিষব কর্মরত (সুম্বতে) যজমানকে বর্ধন পূর্বক (পিপুষী) তাঁর গো-অশ্ব ইত্যাদি সকল অভিলষিত সামগ্রীকে দোহন করছে (দুহে)। অর্থাৎ গো-অশ্ব ইত্যাদি প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ করছে। ৩
হে ইন্দ্রদেব! যদি (যৎ) আমাদের স্তুতি প্রাপ্ত হয়ে (স্তুতঃ) অর্থাৎ প্রখ্যাপিতগুণ হয়ে প্রভূত ধন (মঘং) দানের নিমিত্ত ইচ্ছা করেন (দিৎসসি) তাহলে দেবতা বা মনুষ্যগণের মধ্যে (দেয়ো ন মর্ত) কেউই আপনার সেই ধনের (রাধসঃ) নিবারক নেই (বর্তা ন অস্তি), অর্থাৎ আপনাকে কেউই বাধা দিতে। সক্ষম হবে না। ৪
আমাদের দ্বারা অনুষ্ঠীয়মান যজ্ঞ ইন্দ্রদেবকে বর্ধিত করে, অর্থাৎ হবিঃ বা স্তুতির দ্বারা ইন্দ্রের মহিমা বৃদ্ধিলাভ করে, যখন (যৎ) অন্তরিক্ষে (দিবি) মেঘ সর্বত বিদারিত করে (ওপশং চক্রাণঃ) ভূমিকে বৃষ্টির জলের দ্বারা সিক্ত করে (বি অবর্তয়ৎ), অর্থাৎ ইন্দ্রদেবই বর্ষার জলে ভূমি সিক্ত করে ধান্য ইত্যাদি শস্যের সমৃদ্ধি ঘটান ৷৷ ৫৷৷
হে ইন্দ্রদেব! আপনি স্তুতির দ্বারা প্রবৃদ্ধমান (বধূধানস্য) ও শত্রুসম্বন্ধিনী ধনরাশি (বিশ্বা ধনানি) জয়কারী (জিগুবঃ)। এই হেন আপনার রক্ষণ (ঊতিং) আমরা আমাদের আভিমুখ্যে বরণ করছি (আ বৃণীমহে) ॥ ৬ ৷৷
বিনিয়োগ ও টীকা— উপযুক্ত সূক্তের বিনিয়োগ অতিরাত্রে তৃতীয় পর্যায়ে ব্রাহ্মণাচ্ছংসী শস্ত্রে উক্ত হয়েছে। (২০কা, ৩অ. ১০)।
বঙ্গানুবাদ— সোমরস পানে উৎপন্ন শক্তির মত্ততায় ইন্দ্রদেব যখন (যৎ সোমস্য মদে ইন্দ্ৰঃ) সবকিছুকে আবৃতকারী বল নামক অসুরকে বা উক্তলক্ষণ মেঘকে বিদীর্ণ করেছিলেন (বলং অভিনৎ), তখন দীপ্যমান (রোচনা) অন্তরিক্ষ বর্যার জলে তাকে প্রবৃদ্ধ করেছিল (ব্যতিরৎ)। [ অন্তরিক্ষ কর্তৃক সহায়তা দানের কথাই এখানে বলা হয়েছে] ১৷
ইন্দ্রদেব অঙ্গিরা ঋষিদের নিমিত্ত কন্দরস্থিত (অঙ্গিরোভ্য গুহা সতী) অর্থাৎ গুহায় অপ্রকাশ্যভাবে বিদ্যমান, গাভীগুলিকে (গাঃ) প্রকাশযুক্ত করে বহির্দেশে অর্থাৎ গুহার বাহিরে প্রেরণ করেছিলেন (আবিষ্কৃথন উৎ আজত); এবং সেই গাভীগণের অপহর্তা বল নামক অসুরকে অধোমুখ করে পাতিত করেছিলেন (অর্বাঞ্চং নুনুদে বলং)। ২
ইন্দ্রদেব দ্যুলোকস্থিত দীপ্তিমান্ গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদিকে (দিবঃ রোচনা) বলবন্ত ও দৃঢ়ীকৃত করেছিলেন (দৃানি দৃংহিতানি চ); অতএব স্থিরভাবে অবস্থিত (স্থিরানি) তাদের অর্থাৎ গ্রহ-নক্ষত্রগুলিকে কেউই স্থানচ্যুত অর্থাৎ পাতিত করতে পারে না (ন পরাণুদে)। ৩
হে ইন্দ্রদেব! আপনার বিষয়ভূত স্তোত্রসমূহ (স্তোমঃ) জলাশয়ভূত সমুদ্রের তরঙ্গরাশির ন্যায় (অপাম্ উর্মিঃ) আপনার অভিমুখে ক্ষিপ্রতার সাথে প্রধাবিত হচ্ছে (স ইব অজিরায়তে), অর্থাৎ মুখ হতে নির্গত হওয়া মাত্রই আপনার নিকট গমন করছে। আপনার সোমপানজনিত মত্ততা (তে সদাঃ) বিশেষভাবে দীপ্যমান হয়ে উঠছে, অর্থাৎ প্রকটিত হচ্ছে (বি অরাজিঃ )। ৪
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির বিনিয়োগ পূর্ব সূক্তের অনুরূপ ৷৷ (২০কা, ৩অ. ১১সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! আপনি ত্রিবৃৎ ইত্যাদি স্তোমের দ্বারা বর্ধনীয় (স্তোমবর্ধনঃ) তথা উথ অর্থাৎ সামবেদীয় মন্ত্রসমূহের দ্বারা বর্ধনীয় (উথবর্ধনঃ)। অধিকন্তু (উত) আপনি স্তোতৃগণের কল্যাণকর্তা (ভদ্রকৃৎ) ৷৷ ১।
স্কন্ধপ্রদেশস্থিত কেশযুক্ত (কেশিনা) হরি-নামক অশ্বদ্বয় (হরী) শোভন ধনফলোপেত হয়ে (সুরাধসম্) আমাদের যজ্ঞের প্রতি (যজ্ঞং) সোমপানার্থে (সোমপেয়ায়) ইন্দ্রকেই বহন পূর্বক আনয়ন করছে (ইন্দ্রম্ ইৎ উপবক্ষতঃ), অথবা যজ্ঞাহ্ (যজ্ঞং) শোভন ধনের দাতা (সুরাধসং) ইন্দ্রকে অশ্ব দুটি বহন করছে। ২।
হে ইন্দ্র! আপনি জলের ফেনার দ্বারা বজ্র নির্মাণ পূর্বক (অপাং ফেনেন) নমুচি নামক অসুরের শির শরীর হতে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন, (উৎ অবর্তয়ঃ); (কখন করেছিলে? না) যখন (যৎ) সকল সকল স্পর্ধাশালী অসুরসেনাকে জয় করেছিলেন (বিশ্বাঃ স্মৃধঃ অজয়ঃ)। ৩।
হে ইন্দ্র! আপনি আপন মায়ার দ্বারা উর্ধর্গমনশীল (উৎসিঙ্গতঃ), দ্যুলোকে আরোহণেচ্ছুক (দ্যা আরুরুক্ষতঃ) দস্যুগণকে নিম্নাভিমুখে পাতিত করেছিলেন (অব অধূনথাঃ)। ৪
হে ইন্দ্র! আপনি সোমপানে অভ্যস্থ (সোমপাঃ); সুতরাং সোমপানজনিত বলের দ্বারা উৎকৃষ্টতর হয়ে অর্থাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশী শক্তিমত্ত হয়ে (উত্তরঃ ভবন) সোমাভিষবহীন অর্থাৎ সোমযজ্ঞহীনগণের (অসুম্বাম) সমাজকে অর্থাৎ অজ্ঞীয় সভাকে (সংসদং) বিশেষভাবে বিনাশ করেছিলেন (বিসূচীং বি অনাশয়ঃ) ॥ ৫৷৷
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সুক্তের বিনিয়োগ অতিরাত্রে ব্রাহ্মণাচ্ছংসীগণের তৃতীয় পর্যায়ে বিহিত হয়ে থাকে। এই সূক্তটির ৩য় মন্ত্রে জলের ফেনার দ্বারা বজ্র নির্মাণ পূর্বক নমুচি দৈত্যকে নিহত করা প্রসঙ্গে আচার্য সায়ন তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে (১৭।১।৬) উল্লেখিত একটি উপাখ্যানের কথা বলেছেন।–পূর্বকালে একদা দেবশত্রু নমুচিকে অবরোধ করতে ব্যর্থ ইন্দ্রকেই নমুচি অবরুদ্ধ করেছিল। তখন ইন্দ্রের অনুরোধে নমুচি তাকে মুক্ত করার সময়ে সর্ত করিয়ে নিয়েছিল যে, ইন্দ্র যেন দিনে বা রাত্রের ক্ষণে, শুষ্ক বা আর্দ্র বস্তুর দ্বারা নমুচিকে আঘাত করতে পারবেন না। ইন্দ্র এই সর্তে সম্মত হলে নমুচি তাকে মুক্তি প্রদান করে। সেই কারণে দেবাসুর সংগ্রামে স্পর্ধান্বিত সকল অসুরদের বিনাশ করার পর ইন্দ্র অহোরাত্রির সন্ধিক্ষণে (অর্থাৎ দিনও নয়, রাত্রিও নয়, এমনই কালে), সমুদ্রের ফেনাকে (অর্থাৎ শুষ্কও নয়, আর্দ্রও নয়, এমনই পদার্থকে) মন্ত্রের দ্বারা বজ্রময় করে তার আঘাতে নমুচিকে বধ করেছিলেন। (২০কা, ৩অ. ১২সূ)।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! এই মহতি যজ্ঞে (বিদথে) শীঘ্রতাপূর্বক আগমনের নিমিত্ত আপনার হরি নামক অশ্বদ্বয়ের প্রশংসা করছি (প্রশংসিষ) অর্থাৎ স্তুতি করছি। সেইরকমে শত্রুর হননকর্তা বা যাচ্যমান (বনুষঃ) আপনার সোনাপানজনিত কমনীয় অর্থাৎ কাম্য শক্তির মত্ততা (হতং মদং) যাচনা করছি (প্র বন্বে), অর্থাৎ সেই শক্তির দ্বারা আমি আপন অভীষ্ট ফল প্রার্থনা করছি। ধৃত যেমন হোমাৰ্থে অগ্নিতে সিঞ্চিত হয়, সেইরকম যে ইন্দ্র (যঃ) হরিতবর্ণ অশ্বের সহযোগে আগমন পূর্বক (হরিভিঃ) রমণীয় ধন বর্ষণ করেন (চারু সেচতে), সেই হরিতরূপ (হরিবল্পসং) আপনার নিকট আমাদের স্তুতিবচনসমূহ (ত্বা গিরঃ) প্রবেশ করুক (আ বিশন্তু), অর্থাৎ আপনার বোধগম্য হোক। ১।
প্রাচীন মহর্ষিবর্গ (যে) হরণশীল বা হরিতবর্ণ (হরি) সকলের মূলকারণ ইন্দ্রের স্তুতি করেছিলেন (যোনিং হি সমস্বর)। (কখন? না) দিব্যং অর্থাৎ দেবসম্বন্ধি সদঃ অর্থাৎ যাগগৃহে যথা অর্থাৎ যে প্রকারে বা যাতে ইন্দ্র গমন করেন, সেই নিমিত্ত হরি নামক অশ্বদ্বয়কে রথে যোজনা করেন (হরী হিন্বন্তঃ)। নবপ্রসূতিকা গাভীগণ (ধেনবঃ) যেমন তাদের আপন পালককে ক্ষীর ইত্যাদির দ্বারা পূর্ণ তৃপ্তি প্রদান করে (পৃণন্তি), সেইরকম যজমানবৃন্দ হরিতবর্ণ সোমরসের দ্বারা সেই ইন্দ্রকে পূর্ণতৃপ্তি প্রদান করেন (আ অর্থাৎ পৃণন্তি)। হে ঋত্বিকগণ! শত্রুশোষণসাধন বলযুক্ত (শূষ), হরণশীল (হরিবং ) সেই ইন্দ্রের ইন্দ্রায়) পূজা করুন (অৰ্চত); অথবা ইন্দ্রের হরণশীল প্রীণনসাধন বলের (শূষং) অর্চনা করুন। ২।
ইন্দ্রের (অস্য) যে লৌহময় বজ্র আছে (যঃ আয়সঃ বজ্রঃ) সেই বজ্ৰ হরিতবর্ণ (হরিতঃ) এবং নিরন্তর কমণীয় (স নিকামঃ)। ইন্দ্রও হরিতবর্ণ (হরিঃ); উক্তরূপ (স হরিঃ) ইন্দ্র হস্তে বত্র ধারণ করে থাকেন (গভস্ত্যোঃ আ)। অধিকন্তু ইন্দ্র অন্নবান্ বা ধনবান্ (দ্যুম্নী), সুন্দর হনু বা সুন্দর নাসিকাসম্পন্ন (সুশিঃ )। তিনি হরণশীল মনুলক্ষণ সায়কোপেত অর্থাৎ গ্রহণক্ষম যজ্ঞরূপ বজ্রযুক্ত বা হরিতবর্ণময় বাণযুক্ত (হরিমোসায়কঃ)। যতরকম রূপময় (রূপা) আভরণ আছে, তার সবগুলিই হরিতবর্ণের এবং তার নিযোজক, অর্থাৎ ইন্দ্রের উপযুক্ত (নি মিমিক্ষিরে) ॥ ৩৷৷
ইন্দ্রসম্বন্ধী বজ্ৰ অন্তরিক্ষে (দিবি) কেতুর ন্যায় বা প্রজ্ঞাপক আদিত্যের ন্যায় (কেতুঃ ন) কান্তিময় হয়ে নিহিত রয়েছে (হ্যতঃ অধি ধায়ি)। অধিকন্তু সেই বজ্র হরিতবর্ণশালী আদিত্যের অশ্বের ন্যায় (হরিতঃ ন) বেগে গমন করে (রংহ্যা) অথবা বেগের দ্বারা সবকিছুকে ব্যাপ্ত করে (বিব্যচৎ)। অপিচ যে হরিতবর্ণ বজ্র আছে (য আয়সো), সেই বজ্রের দ্বারা সোমপানে হরিতবর্ণ হবিশিষ্ট ইন্দ্র (হরিশিপ্রঃ) বৃত্রাসুরকে (অহি) ব্যথিত করেছেন (তদুৎ)। হরি-নামক অশ্বদ্বয়ের ভর্তা বা অধিপতি ইন্দ্র (হরিম্ভরঃ) সেই বজ্রের সাধনে সহস্ৰসংখ্যক শত্রুর শোকের কারণভূত হয়েছেন (সহস্ৰশোকাঃ অভবৎ), অথবা অপরিমিত দীপ্তিশালী হয়েছেন (অপরিমিতদীপ্তিরভবৎ সায়ণ)। ৪।
হে হরিকেশ অর্থাৎ হরিতবর্ণ কেশযুক্ত বা হরিতবর্ণ কেশসম্পন্ন অশ্বযুক্ত ইন্দ্র! যথায় যথায় সোম ইত্যাদি হবিঃ বর্তমান, সেই সকল স্থানেই আপনি বর্তমান (ত্বত্ত্বং)। পূর্ববর্তী যজমানগণের দ্বারা স্তুত হয়ে (পূর্বেভিঃ যজ্বভিঃ উপস্তুতঃ) আপনি যেমন কামনা করেছিলেন, অর্থাৎ যেমন সোম ইত্যাদি প্রাপ্তির অভিলাষ করেছিলেন (অহৰ্যর্থঃ), তথা এখনও সেইরকম হবিঃ কামনা করেন (ত্বং হর্যসি)। অতএব হে হরিজাত (অর্থাৎ হরিতবর্ণ অশ্বদ্বয়ের সাথে যজ্ঞে প্রাদুর্ভূত বা হরিতবর্ণত্বের দ্বারা প্রাদুর্ভূত) ইন্দ্র! এই সকল সোম ইত্যাদিরূপ (বিশ্বং) প্রশস্য (উথ্যম), অনল্প বা অর্থাৎ প্রচুর (অসামি), কমনীয় (হতং) অন্ন (রাঃ) তোমারই (তব)। ৫৷৷
বিনিয়োগ ও টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির অতিরাত্রে ব্রাহ্মণাচ্ছংসীর তৃতীয় পর্যায়শস্ত্রে বিনিয়োগ অভিহিত।–মূল পুঁথি অনুসারে এই তৃতীয় অনুবাকের মোট সূক্ত সংখ্যা ষোড়শ। কিন্তু স্বর্গীয় দুর্গাদাস লাহিড়ী মহাশয় তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থে ১৩শ সূক্তের মধ্যে মূলের ১৪শ, ১৫শ ও ১৬শ সূক্ত অন্তর্ভূক্ত করে নেওয়ায় মূলের সাথে সূক্তসংখ্যার বিচারে বৈষম্য ঘটেছে। ফলে সেখানে এই ১৩শ সূক্তটির মন্ত্রসংখ্যা দেখানো হয়েছে ষোড়শটি। অর্থাৎ মূল পুঁথির ১৩শ সূক্তের ৫টি মন্ত্র + ১৪শ সূক্তের ৫টি মন্ত্র + ১৫শ সূক্তের ৩টি মন্ত্র + ১৬শ সূক্তের ৩টি মন্ত্র নিয়ে মোট মন্ত্রসংখ্যা ১৬টি। বলা বাহুল্য সেখানে ১৪শ থেকে ১৬শ সূক্ত বলে কোন উল্লেখ নেই। যদিও অর্থ বা ভাষ্যের ক্ষেত্রে উপযুক্ত অনুল্লেখিত সূক্তগুলির মন্ত্রাবলী উপেক্ষিত না হওয়ায় পাঠকদের কোন অসুবিধা ঘটেনি। আমরা অবশ্য মূল পুঁথি অবলম্বনে এই অনুবাকের মোট সূক্তসংখ্যা ১৬টি দেখিয়েছি। (২০কা, ৩অ. ১৩সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –গমনশীল বা কমনীয় (হর্যতা) সেই প্রসিদ্ধ হরি-নামক অশ্বদ্বয় (হরী) বজ্রযুক্ত (বজিং ), হৃষ্যমান অর্থাৎ হৃষ্টচিত্ত (মন্দিনং), স্তুতির যোগ্য (স্তোম্যং)–এই হেন মহানুভাব ইন্দ্রকে সোমপানজনিত উন্মাদনায় (মদ) রথে বহন পূর্বক আমাদের যজ্ঞে আনয়ন করছে। কান্ত অর্থাৎ কমনীয় (হতে) এই ইন্দ্রের উদ্দেশে প্রাতঃ ইত্যাদি বহু বা তিনটি সবনে (পুরূণি সবনানি) হরিতবর্ণ সোম (হরয়ঃ সোমা) ধারণ করা হয় (দধন্বিরে) ১
কমনীয় (কামায়), সংগ্রামে স্থিরতাসম্পন্ন (স্থিরায়) ইন্দ্রের উদ্দেশে অত্যন্ত হরিতবর্ণ (অরং হরয়ঃ) সোমসমূহ সবনে ধারণ করা হয়েছে (দধন্বিরে)। সেই হরিতবর্ণ সোমসমূহ (হরয়ঃ) ত্বরমাণ অর্থাৎ শীঘ্রগামী অশ্বদ্বয়কে (তুরা হরী) যজ্ঞের প্রতি প্রেরণ করছে (হিন্ব)। যে ইন্দ্র (যঃ) বেগবান (অদ্ভিঃ) অশ্বদ্বয়ের দ্বারা (হরিভিঃ) যজ্ঞে গমন করে থাকেন (জোষ ঈয়তে), সেই ইন্দ্র (সঃ) এই যজ্ঞের (অস্য) কাময়িতব্য অর্থাৎ অভিলাষকারী (কামং) সোমবান্ যজমানকে ব্যাপ্ত করে থাকে (হরিবং আনশে)।–অথবা যে বেগবান্ রথ যজ্ঞে গমন করে, সেই রথ ইন্দ্রের স্বভূত সোমরসের কামনা প্রাপ্ত হয় ॥ ২।
হরিতবর্ণ শ্মশ্রুসম্পন্ন (হরিশ্মশারুঃ), হরিতবর্ণ কেশযুক্ত (হরিকেশঃ), লৌহসারের ন্যায় কঠিন হৃদয়শালী (আয়সঃ) প্রসিদ্ধ ইন্দ্র (যঃ) শীঘ্র পানীয়রূপে সোম সংস্কারিত হলে অর্থাৎ অভিযুত হলে (তুরস্পেয়ে) সেই হরিতবর্ণ সোমের পানকর্তা হয়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হন (হরিপাঃ অবধত)। হবিলক্ষণ অন্নরূপ বা অশ্বরূপ ধনে সমৃদ্ধ (বাজিনীবঃ) ইন্দ্র (যঃ) আপন দ্রুতগাগী অশ্বের সাথে সোমপানের নিমিত্ত আগমন করেন। সেই হেন ইন্দ্র তাঁর হরি-নামক অশ্বদ্বয়কে রথে যোজিত করে আগমন পূর্বক আমাদের সকল পাপ বা অনিষ্ট (বিশ্বা দুরিতা) বিনাশ করুন বা সকল পাপ হতে আমাদের উত্তীর্ণ করুন (পারিষৎ) ৷ ৩৷৷
ইন্দ্রের (যস্য) হরিতবর্ণ হন্ বা চোয়াল (হরিণী শিপ্রে) যখন সুব নামক ঘৃতাধার যজ্ঞীয় পাত্রের ন্যায় (সুবেব) যজ্ঞে সঞ্চরণ করে অর্থাৎ সোমপানের নিমিত্ত চলিত হয় (বিপেততুঃ), সম্মুখস্থ সোমপানের নিমিত্ত কম্পিত হতে থাকে (দবিধ্বতঃ) এবং যজ্ঞীয় চমস পাত্ৰ সংস্কৃত সোমের দ্বারা পূর্ণ হলে (চমসে কৃতে) মদকর (মদস্য), কমনীয় (হস্য) সোমলক্ষণ অন্নের অংশ (অন্ধসঃ) পান পূর্বক (পীত্ব) যখন (যৎ) ইন্দ্র হরিতবর্ণঅশ্বদ্বয়কে চালিত করেন (হরী প্র মন্থজৎ) (তখন ইন্দ্র সকলের স্তুতি প্রাপ্ত হন–এটাই বক্তব্য)। ৪।
অধিকন্তু (উত স্ম) কমনীয় বা গমনশীল ইন্দ্রের (হযঁতস্য) নিবাসস্থান (সদ্ম) হলো দ্যাবাপৃথিবী-সম্বন্ধী (পস্ত্যো)। অশ্ব যেমন যুদ্ধের নিমিত্ত অগ্রসর হয় (অত্য না বাজ), তেমনই আপন অশ্বে আরোহিত হয়ে (হরিবান) ইন্দ্র যজ্ঞগৃহের প্রতি গমন করছেন (অচিক্রদৎ)। আরও, আমাদের মহতী স্তুতিও (মহী চিৎ ধিষণা) বলের দ্বারা যুক্ত (ওজসা) ইন্দ্রকে কামনা করছে (ওজসা অহযৎ)। অতএব হে ইন্দ্র! কাময়মান যজমানেরও নিমিত্ত (হ্যতঃ চিৎ) আগত হয়ে (আ) প্রভূত অন্ন (বৃহৎ বয়ঃ) ধারণ করুন (দধিষে) অর্থাৎ প্রদান করুন ৷৷ ৫৷৷
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! আপনি কাময়মান (হমানঃ) অর্থাৎ সকলেই আপনাকে কামনা করে। আপনি আপন মহিমায় (মহিত্বা) আকাশ ও পৃথিবীকে অর্থাৎ দ্যাবাপৃথিবীকে (রোদসী) পূর্ণ করেছেন (আ)। তথা হে ইন্দ্র! আপনি সর্বদা নূতন নূতন (নব্যন্নব্যং) হৃদয়ঙ্গম (প্রিয়ং) স্তোত্র (মন্ম) ক্ষিপ কামনা করে থাকেন (নু হসি)। হে প্রকৃষ্ট বলবান্ (প্র অসুর) ইন্দ্র! আপনি পণিগণের দ্বারা অপহৃত স্পৃহণীয় গাভীগণের (হতং গোঃ) নিবাসস্থান (পস্ত্যং) প্রকটিত করুন (আবিঃ কৃধি) সূর্য যাতে স্তোতৃগণকে সেই হরণশীল বা হরিতবর্ণ (সূর্যায় হরয়ে) গাভীগুলিকে প্রত্যর্পণ করেন। (অথবা গো শব্দের দ্বারা উদক অর্থাৎ জল বোঝালে, অর্থ হয়–) সূর্য যাতে জলের স্থান আবিষ্কার করেন এবং তিনি যাতে বৃষ্টি প্রদান করেন, তেমন করুন ৷ ১।
হে ইন্দ্র! সোমপানের দ্বারা হরিতবর্ণ হনুযুক্ত (হরিশিপ্রং), সেই হেন সোমপান-কামনাকারী আপনাকে (হর্যন্তং ত্ব) যজমানগণের নিমিত্ত (জনানাং) রথে প্রকর্ষের সাথে সংযুক্ত অশ্বগুলি (প্রযুজঃ) বহন পূর্বক আনয়ন করুক (আ বহন্তু)। হে ইন্দ্র! কাময়মান (হর্য) যজ্ঞসাধনভূত (যজ্ঞং) গ্রহ-চমস ইত্যাদিতে ধৃত (প্রতিভৃতস্য) মধুর ন্যায় প্রিয়ভূত সোম (মধ্বঃ) দশ অঙ্গুলির দ্বারা নিপীড়িত করে (দশোণিম) যাতে যজ্ঞে পান করতে পারেন (যথা পিব সধমাদে)। (সেইভাবে আপনাকে রথে বহন করুক–এটাই বক্তব্য)। ২।
হে হরিবঃ (অর্থাৎ হরি-নামক অশ্ববাহিত) ইন্দ্র! আপনি পূর্ববর্তী প্রাতঃসবনে (পূর্বেষাং) (অর্থাৎ এই মাধ্যন্দিনসবনের পূর্বে সম্পাদিত) অভিযুত সোম (সুতানাং) পান করেছেন (অপাঃ); অপিচ, এই মাধ্যন্দিনসবন (ইদং সবনং) অসাধারণ (কেবলং) আপনারই (তে অর্থাৎ তবৈব)। অতএব মাধ্যন্দিনসবনে মাধুর্যোপেত (মধুমন্তং) সোম পান করে আন্তরিক মদান্বিত হোন (মমদ্ধি)। হে অভীষ্টবর্ষক (বৃষ) ইন্দ্র! একেবারে (সা) আপন উদরে (জঠরে) এই সোম আসিঞ্চন করুন (আ বৃষস্ব), অর্থাৎ উদর পূরণ করে পান করুন। ৩৷৷ বিনিয়োগ ও টীকা— এই সূক্তিটির বিনিয়োগ পূর্ববৎ ॥ (২০কা, ৩৩অ ১৫সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –হে হরিবঃ ইন্দ্র! এই যজ্ঞে (ইহ) অধ্বর্য প্রভৃতি ঋত্বিকগণের দ্বারা (নৃভিঃ) জলে মিশ্রিত (অষ্ণু খুঁতস্য) অভিযুত সোম (সুতস্য) পান পূর্বক জঠর পূর্ণ করুন (পিব জঠর পৃণস্ব), অর্থাৎ জঠরপূর্তি পর্যন্ত পান করুন। হে ইন্দ্র! যে অভিষব-সাধন প্রস্তরসমূহ (যং অদ্রয়) আপনার। নিমিত্ত (তুভ্যং) সোম অভিষবের ইচ্ছা করছে (মিমিঃ ), হে উথ শস্ত্রের দ্বারা আকৃষ্যমাণ ও ই (উথবাহঃ) ইন্দ্রদেব! সেই অভিযুত সোমরসে (তেভিঃ) অর্থাৎ সেই সোমরস পান করে আপনি মদিরাকৃত মনোবিকারের (মদং) অভিবৃদ্ধি সাধিত করুন (বর্ধস্ব); অর্থাৎ মদান্বিত হোন। ১।
হে হশ্ব (অর্থাৎ হরি-নামক অশ্বসমন্বিত) ইন্দ্রদেব! অভীষ্টফলবর্ষক আপনার উদ্দেশে (বৃষ্ণে তুভ্যং) প্রকর্ষের দ্বারা অভিযুত, উদঘূর্ণবলপূর্ণ অর্থাৎ প্রচণ্ড শক্তিরূপী (উগ্রাং), যথার্থ মত্ততাকারক (সত্যাং) সোমকে পানের নিমিত্ত প্রেরণ করছি (পীতিং প্র ইয়র্মি)। হে ইন্দ্র! যজ্ঞ কর্মের নিমিত্ত (শচ্যা) সকল স্তুতির দ্বারা (বিশ্বাভিঃ বীভিঃ) স্কুয়মান হয়ে (গৃণানঃ) প্রীণয়িত্ৰী স্তুতিবাক্যে (ধেনাভিঃ) এই যজ্ঞে তৃপ্ত হোন (ইহ মাদয়স্ব) ৷ ২
হে শচীবঃ (অর্থাৎ শক্তিমা) ইন্দ্র! আপনার রক্ষণের ও সামর্থ্যের দ্বারা (তব ঊতি বীর্যেণ চ) পুত্র ইত্যাদিরূপ প্ৰজাগণের সাথে (প্রজাবৎ) অন্নের ধারণকারী (বয়ঃ দধানা), আপনাকে কামনাকারী (উশিজঃ), সতভূতফলসাধন যজ্ঞের জ্ঞাতা অর্থাৎ ঋত্বিকবর্গ (ঋতজ্ঞাঃ) যজমানের যাগগৃহে (মনুষঃ দুরোণে) সমবেতভাবে হৃষ্ট হয়ে (সধমাদ্যাসঃ) আপনার স্তবে মুখরিত হয়ে (গৃণন্তঃ) অবস্থান করছে (তস্থঃ) ॥৩॥
বিনিয়োগ ও টীকা— পূর্বেই উক্ত হয়েছে যে, একই রকম বিনিয়োগের নিমিত্ত ১৩শ থেকে ১৬শ পর্যন্ত সূক্ত চারটিকে স্বর্গীয় দুর্গাদাস একটি সূক্তের মধ্যে বিধৃত করেছেন। সুতরাং এই চারটি সূক্তের মন্ত্রগুলির বিনিয়োগ একই ॥ (২০কা, ৩অ. ১৬সূ.)।
বঙ্গানুবাদ –আমি সেই (অস্মা ইৎ উ) ইন্দ্রের উদ্দেশে প্রাপণীয় (ওহং) স্ত্রোত্র প্রকর্ষের সাথে প্রেরণ করছি (প্র হর্মি)। (কিরকম ইন্দ্র? না–) প্রবৃদ্ধ বা বলবান্ (তবসে), সোমপানের নিমিত্ত শীঘ্র আগমনকারী বা শত্রুহিংসক (তুরায়), অসীম গুণশালী (মাহিনায়) হয়েও ঋক-মন্ত্রের দ্বারা অর্থাৎ স্তুতি সাধনের দ্বারা পরিমিত বা নির্ধারিত (ঋচীষমায়) ও অপ্রতিহত গতি (অগিবে)। (স্তোত্র প্রেরণের দৃষ্টান্ত কি? না–) প্রয়ো ন…। অর্থাৎ ক্ষুধাগ্রস্তকে যেমন অন্ন প্রেরণ করা হয় সেই রকম স্তুতিকামী ইন্দ্রের উদ্দেশে স্তোত্র প্রেরণ করছি।–কেবল স্তোত্রই নয়, প্রাচীনকালীন যজমানগণ কর্তৃক দত্ত (রাততমা) প্রবৃদ্ধ সোর্ম ইত্যাদি হবিও (ব্রহ্মাণি) প্রেরণ করছি। ১
আমি সেই ইন্দ্রের উদ্দেশে অন্নের ন্যায় (প্রয় ইব) স্ততিগুলি প্রয়োগ করছি (প্র যংসি) এবং শত্রুদের বাধক (বাধে), ও সুষ্ঠু নিক্ষেপণীয় (সুবৃক্তি) সেই স্তোত্রগুলি (আঙ্গুষং), সম্পাদন করছি (ভরামি)। অধিকন্তু, পুরাতন (প্রায়), সকলের প্রভু (পত্যে) ইন্দ্রের উদ্দেশে ঋত্বিকগণও তাদের হৃদয়ের দ্বারা (হৃদা) ও হৃদয়ান্তবর্তী অন্তঃকরণ (মনসা) ও বুদ্ধির দ্বারা (মনীষা) স্তুতিসমূহকে মার্জিত বা সংস্কারিত করে থাকেন, অর্থাৎ স্তোত্রের যাবতীয় ত্রুটি অপনোদিত করেন (ধিয়ঃ মর্জয়ন্ত) ২।
আমি সেই ইন্দ্রের উদ্দেশে প্রসিদ্ধ উপমাস্থানভূত (ত্যং উপমং), সুষ্ঠু ধনদাতা বা স্বর্গপ্রাপক লক্ষণান্বিত (স্বর্ষাং) স্তোত্রগুলি (আঙ্গুষং) মুখের দ্বারা (আস্যেন) সম্পাদন করছি (ভরামি)। (কি জন্য? না)–অতিশয় ধনবন্ত বা অতিশয় প্রবৃদ্ধ (মংহিষ্ঠং), সুষ্ঠু ধনের প্রেরয়িতা বা পণ্ডিত (সূরিং) ইন্দ্রদেবের ॥ স্তুতি-বৃদ্ধির নিমিত্ত (ববৃধধ্যৈ) স্তুতি সম্বন্ধিনী (মতীনাং) সুষ্ঠু নিক্ষেপণীয় (সুবৃক্তিভিঃ) স্বচ্ছবচনের দ্বারা (অচ্ছোক্তিভিঃ) স্তুতি সম্পাদন করছি ৷ ৩৷
আমি সেই সোম ইত্যাদি লক্ষণান্বিত অন্নযুক্ত (তৎসিনায়) ইন্দ্রের উদ্দেশে, রথশিল্পী কর্তৃক রথ প্রেরণের মতো (রথং ন তষ্টা ইব) স্তুতিসমূহ প্রেরণ করছি (স্তোমং সম্ হিনোমি)। অধিকন্তু বাক্যের দ্বারা প্রাপণীয় (গির্বাহসে), যজ্ঞাহ বা মেধাবী (মেধিরায়) ইন্দ্রের উদ্দেশে সুষ্ঠু নিক্ষেপণীয় (সুবৃক্তি), সকলের প্রাপ্তব্য বা সকল যজমানের প্ৰাপণীয় সোম ইত্যাদি লক্ষণান্বিত হবিঃ ও স্তুতি ইত্যাদি নিমিত্তভূর্ত বাক্য (গিরঃ চ) প্রেরণ করছি। ৪৷৷
সেই ইন্দ্রের উদ্দেশে আমি অন্নলাভের কামনায় (শবস্যা) অর্চনীয় হবিলক্ষণ অন্ন (অর্কং) জুহু নামক যজ্ঞীয় পাত্রে আজ্যপূর্ণ করছি (জুহ্বা সমঞ্জে), অথবা স্তুতিসাধন মন্ত্র (অর্কং) জুহূবৎ অঞ্জনসাধন জিহ্বায় যুক্ত করছি (জুহৃ সমঞ্জে)। (তার দৃষ্টান্ত কি? না) সপ্তিমিব অর্থাৎ অশ্বের ন্যায়। অশ্বগুলিকে যেমন রথে যুক্ত করা হয়, তেমন। অধিকন্তু শত্রুবর্গের অপসারক (বীরং), দানের গৃহরূপ (দানৌকসং), অসুরনগরসমূহের বিদারক (পুরা দর্মাণম), প্রশস্যান্ন বা প্রশস্যকীর্তি ইন্দ্রকে বন্দনার নিমিত্ত আহ্বান করছি (গ্র্তবসং বন্দধ্যৈ)। ৫।
এই ইন্দ্রের নিমিত্ত নিখিল সংসারের রচয়িতা বিশ্বকর্মা (ত্বষ্টা), বজ্ৰ-নামক আয়ুধ নির্মাণ করেছিলেন (তক্ষৎ)। (কীরকম সেই বজ্র? না) অতিশয় শোভনকর্মকারী (স্বপঃতম), স্বায়ত্তবীর্য বা স্তুত্য (স্বর্যং)। (কিজন্য তা নির্মাণ করেন? না–) রণায় অর্থাৎ যুদ্ধের উদ্দেশে। হিংসতাসম্পন্ন (তুজতা) যে বজ্রের দ্বারা শত্ৰুকর্তৃক ধৃত বলের পক্ষে অপরিচ্ছেদ্য বলে বলশালী হয়ে (কিয়েধাঃ) সকলের প্রভুস্বরূপ (ঈশানঃ) ইন্দ্র সর্বাবরক প্রবল বৃত্রাসুরের (বৃত্রস্য চিৎ) মর্মস্থল হিংসন পূর্বক (তুজন) লাভ করেছিলেন (বিদৎ), অর্থাৎ প্রহার করেছিলেন–এটাই বক্তব্য)। ৬৷
সকলের নির্মাতা (মাতুঃ) মাহাত্মবান (মহঃ) ইন্দ্রের অসাধারণ কর্ম উক্ত হচ্ছে।–অথবা উক্তলক্ষণসম্পন্ন যজ্ঞের কথা বলা হচ্ছে। কি তার কর্মাবলী, সেই প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। এই ইন্দ্র সোময়াগসম্বন্ধী প্রাতঃ-মধ্যাহ্ন-অপরাহ্নকালীন সবনয়ে অর্থাৎ তিনবার সোমাভিষবের হোমসময়ে (সদ্যঃ) পেয় সোম (পিতু) পান করেন (পপিবা), অধিকন্তু অনিন্দ্য (চারু) সবনীয় পুরোডাশ-ধানা-করম্ভ ইত্যাদি (অন্না) ভক্ষণ করেন। আরও সবনয়ব্যাপী (বিষ্ণুঃ) সোমপান ইত্যাদি জনিত বলে শত্রুগণের অভিভবিতা (সহীয়ান) ইন্দ্ৰ শত্ৰুগণের অপহরণযোগ্যভূত ধন (পচতং) অপহরণ করে থাকেন (মুষায়)। তথা বজ্রের ক্ষেপণকারী বা প্রযোক্তা (অদ্রিং অস্তা) ইন্দ্রদেব উৎকৃষ্ট জলের ধারক মেঘকে প্রাপ্ত হয়ে (বরাহারং তিরঃ) বৃষ্টিলাভের জন্য তা বিদারিত করেন (বিধ্যৎ) ॥ ৭৷
এই ইন্দ্রের উদ্দেশে বৃত্রাসুরের নাশের নিমিত্ত (অহিহত্যে) গায়ত্রী ইত্যাদি দেবগণের পালয়িত্রীগণ (দেবপত্নীঃ) গমনস্বভাবা (গ্লাঃ চিৎ) হয়েও অর্চনসাধন স্তোত্রগুলিকে (অর্কং) বিস্তৃত করেছিলেন (উবুঃ–উবুরিত্যুবুঃ);–অথবা ইন্দ্রাণী-অগ্নায়ী- অশ্বিনী ইত্যাদি আপনাপন পতির অভিগন্তব্য স্ত্রীগণ (দেবপত্নীঃ) অর্চনসাধন হবিঃ (অর্কং) নিজেরাই বিস্তার করেছিলেন। সেই ইন্দ্র বিস্তৃতা (উর্বী) দ্যুলোক ও পৃথিবীকে আপন তেজে অতিক্রম করেছিলেন (পরি জভ্রে); এই ইন্দ্রের (অস্য) মহত্ব (মহিমানং) সেই দ্যুলোক ও পৃথিবী (তে) পরাভব করতে, অর্থাৎ সংকোচ বা খর্ব করতে সমর্থ হয় নি (ন পরি ষ্টঃ)। ৮
এই ইন্দ্রের মাহাত্ম্য (মহিত্বং) দ্যুলোকের উপরে অধিকরূপে বিস্তৃত রয়েছে (দিবঃ পরি প্র রিরিচে), তথা পৃথিবীর উপরেও অধিকরূপে বিস্তৃত রয়েছে এবং অন্তরিক্ষলোকেও অর্থাৎ দ্যুলোক ও ভূলোকের অন্তরালবর্তী যক্ষ-গন্ধর্ব-অপ্সরা প্রভৃতির আশ্রয়ভূতা লোকেও সমধিকরূপে বিস্তৃত রয়েছে। এই ইন্দ্রদেব দমনযোগ্য শত্রুজনের নিকটে (দমে) স্বরাষ্ট্র অর্থাৎ আপন তেজে দীপ্যমান এবং সকল কর্মে উদ্যতবলশালী (বিশ্বপূর্তঃ) ও প্রত্যুষ্পমনকারী (স্বরিঃ), অথবা শোভন তিনি ব্যতিরিক্ত অন্যের দ্বারা অপরাভবনীয় শত্রুকে প্রাপ্ত (সু অরিঃ), অর্থাৎ এমন শত্রুদের তিনি পরাজিত করে থাকেন, যাদের তিনি ব্যতীত আর কেই পরাজয় করতে সক্ষম নয়। যুদ্ধার্থে গমনকুশল (অমত্রঃ) ইন্দ্রদেব রমণীয় যুদ্ধের উদ্দেশে (রণায়) বৃষ্টির নিমিত্ত মেঘসমূহকে উৎপাদন বা সগৃহীত করেছিলেন (আ ববক্ষে)। ৯৷
এই ইন্দ্রেরই তেজঃপ্রভাবে (শবসা) শোষণপ্রাপ্ত বৃত্রকে (শুষন্তং বৃত্ৰ) ইন্দ্রদেব বজ্ৰাস্ত্রের দ্বারা (বজেন) বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন; যে ইন্দ্র পণিগণের দ্বারা অপহৃত গাভীগুলিকে যেমন মুক্ত করেছিলেন (গাঃ ন অমুঞ্চৎ), সেইরকম বৃত্রের দ্বারা আবৃত (ব্রাণাঃ) সকল প্রাণী-রক্ষণের হেতুভূত জলরাশিকে মেঘ বিদীর্ণ পূর্বক মুক্ত করে বর্ষণ করেছিলেন (অবনীঃ অমুঞ্চৎ)। এমন করে সেই ইন্দ্র হবিদাতা যজমানকে (দাবনে) সকল বিখ্যাত অন্ন (শ্ৰবঃ) যজমানগণের সাথে সমানচিত্ত হয়ে (সচেতাঃ) তাদের অভিমুখে প্রদান করেছিলেন (অভি– প্রাযচ্ছদ) ॥ ১০
এই ইন্দ্রেরই দীপ্ত বলে (ত্বষসা) বেগবতী নদীসমূহ আপন আপন স্থানে প্রবাহিত হচ্ছে (সিন্ধবঃ রন্ত), যে কারণে (যৎ) এই ইন্দ্ৰ বজ্রের দ্বারা (বজ্রেণ) এই নদীগুলিকে (সীং) সর্বতোভাবে নিয়মান্বিত করেছেন (পরি অচ্ছৎ)। অধিকন্তু শত্রুগণকে হত্যাপূর্বক নিজেকে তাদের অধিপতিরূপে (ঈশানকৃৎ) অথবা দরিদ্রগণের ঈশানকর্তা অর্থাৎ নিয়ন্ত্ৰা ইন্দ্র হবির্দানকারী যজমানগণকে (দাশুষে) তাঁদের অভীষ্ট ফল দান পূর্বক (দশস্য) অগাধ জলে নিমজ্জিত হয়ে অবস্থানের নিমিত্ত তুর্বিত নামে অভিহিত তপস্বীকে (তুর্বীতয়ে) শীঘ্র সম্ভক্তা হয়ে (তুৰ্বাণিঃ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন (গাধং কঃ)। ১১।
এই ইন্দ্র বৃত্রবধের নিমিত্ত অত্যন্ত ত্বরান্বিত হয়ে বা অত্যন্ত চলায়মান হয়ে (ভূতুজানঃ) শত্রুবল তুচ্ছীকৃত পূর্বক তার বলের ধারক হয়েছিলেন (কিয়েধাঃ) অথবা ক্রমমাণ হয়ে শত্রুধারক বজ্র প্রহার বা প্রয়োগ করেছিলেন (প্র ভর বজ্র)। কেবল প্রহারমাত্রই নয়, তাকে চূর্ণিত করেছেন, যেমন মাংসাৰ্থীগণ গো-বৃষভ ইত্যাদি পশুগণের অঙ্গের প্রতিটি অংশ (গোঃ ন পর্ব) ছিন্ন করে থাকে। ভূমিতে প্রবাহের নিমিত্ত (অপাং চরধ্যৈ) জল কামনা পূর্বক (অর্ণাংসি ইষ্যন) তির্যভাবে মেঘকে বিদীর্ণ করেছেন (তিরশ্চা বি রদ) (বজ্রেণ বিশেষেণ বৃত্ৰং বিলেখয়)। ১২
হে স্তোতা! স্তুতিযোগ্য শস্ত্রসমূহের দ্বারা স্তবনীয় (উক্থৈঃ ), যুদ্ধার্থে ত্বরমাণ এই ইন্দ্রের (অস্যেদু তুরস্য) পূর্বকৃত কর্মসমূহের (পূৰ্বাণি কমাণি), অর্থাৎ বলপূর্ণ কর্মগুলির, প্রশংসা করো (প্ৰ ক্ৰহি)। যে ইন্দ্র (যৎ) যুদ্ধের উদ্দেশে (যুধে) বজ্র ইত্যাদি আয়ুধসমূহ (আয়ুধানী) প্রেরণ পূর্বক (ইষ্ণানঃ) শত্রুর প্রতি হিংসন বা বিনাশনের নিমিত্ত (শ ঋঘায়মাণঃ) তাদের অভিমুখে গমন করেন (নিরিণতি), তাঁর প্রশংসা করো। ১৩ ৷
এই ইন্দ্রের প্রাদুর্ভাব মাত্র (জনুষঃ) বা উৎকৃষ্ট জন্মলাভের কারণে পর্বতসমূহও (গিরয়ঃ চ) পক্ষচ্ছেদনের ভয়ে (ভিয়া) দৃঢ় (ঢা) হয় অর্থাৎ জড়বৎ অচল হয়ে পড়ে এবং এঁর ভয়ে দ্যাবাপৃথিবীও কম্পিত হতে থাকে (তুর্জেতে)। আরও, কমনীয় (বেনস্য) এই ইন্দ্রের দুঃখাপনোদক রক্ষণে (ওণিং) অনেক সূক্ত ধ্বনিত করে (জোগুবানঃ) নূতন স্তবের ধারয়িতা নোধা-নামক মহর্ষি তখনই (সদ্যঃ) সামর্থ্যের (বীর্যায় ) সমীপবর্তী হয়েছিলেন (উপপা ভুবৎ), অর্থাৎ বীর্যবান্ হয়েছিলেন ৷ ১৪
এই ইন্দ্রের উদ্দেশে সেই প্রসিদ্ধি স্তোত্র বা সোমলক্ষণ অন্ন (ত্যৎ) আনুলোম্যের দ্বারা প্রদত্ত হয়েছে (অনু দায়ি)। (এই উক্তির কারণ কি? না) যেহেতু (যৎ) বা যে কারণে প্রভূত ধনের হবিঃ বা স্তোত্রের (ভুরেঃ) স্বামী ইন্দ্রই (ঈশানঃ) স্তোত্র ইত্যাদি বিষয়ে একমাত্র অসাধারণ (একঃ)। আরও, এই ইন্দ্র স্বশ্বের অপত্য সৌবশ্ব ১) নামক রাজার রক্ষণীয়ত্বের নিমিত্তভূত হয়ে সূর্য দেবে পুনঃ পুনঃ স্পর্ধমান বা সঙ্ঘর্ষকারী (পসৃধানম) সোমাভিষবকারী (সুমি) এতশ-নামক মহর্ষিকে প্রকর্ষের সাথে রক্ষা করেছেন (প্র আবৎ)। [স্বশ্বের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে সূর্যদেব তাঁর পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন–আখ্যায়িকামুখে এমনই অবগত হওয়া যায়। ১৫৷
হে হরি নামক অশ্ববর্গযুক্ত রথের স্বামী (হারিযোজন) ইন্দ্রদেব! সুষ্ঠু প্রয়োগকুশল (সুবৃক্তি) গোতম-গোত্রোৎপন্ন মহর্ষিগণ (গোতমাসঃ) স্তুতিরূপা মন্ত্রসমূহ (ব্রহ্মণি) আপনার উদ্দেশে এইভাবেই উৎপন্ন করেছিলেন (তে অক্র)। এই স্তোত্রসমূহে (এষু) বপুবিধ রূপযুক্ত (বিশ্বপেশসং) ধন বা কর্ম (ধিয়ং) অর্থাৎ পশু ইত্যাদি বিবিধরূপ ধন বা অগ্নিষ্টোম ইত্যাদি বহুপ্রকার যজ্ঞকর্ম, স্থাপন করুন (আ ধাঃ)। প্রাতঃকালে অর্থাৎ ইদানীং বুদ্ধির বা কর্মসমূহের দ্বারা প্রাপ্ত ধন (ধিয়াবসুঃ) ইন্দ্রদেব শীঘ্ৰ (মক্ষু) আমাদের রক্ষণার্থে আনয়ন করুন (জগম্যাৎ) ১৬
বঙ্গানুবাদ –মনুষ্যগণের (চর্ষণীনাং) অর্থাৎ মনুষ্যরূপী যজমানগণের যজ্ঞে যে ইন্দ্র (যঃ ইন্দ্ৰঃ) প্রাধান্যের সাথে হৃতব্য অর্থাৎ আহ্বানীয় (একঃ ইৎ হব্যঃ), সেই ইন্দ্রের উদ্দেশে (তম্ ইন্দ্রং) ক্রিয়মাণপ্রকারে স্তুতিবাক্যের দ্বারা অর্চনা বা স্তুতি করছি (আভিঃ গীর্ভিঃ অভি অর্চে)। অধিকন্তু যে বক্ষ্যমাণ-গুণবিশিষ্ট ইন্দ্র (যঃ) সকলের ঈশ্বর (পত্যতে), কামবর্ষণকারী (বৃষভঃ), বর্ণযোগ্য বলে অন্বিত (বৃষ্ণ্যাবাৎ), সত্যফলরূপী (সত্যঃ), অপরের বলনাশক (সত্বা), বহুকর্মকারী (পুরুমায়ঃ) ও বলবান (সহস্বা)–তাঁকে স্তুতিবাক্যের দ্বারা অর্চনা বা স্তুতি করছি ৷ ১
নয়টি মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত যজ্ঞ ইত্যাদি কর্মের ফল লব্ধ হয়ে (নবৰ্থাঃ) পিতৃলোকপ্রাপ্ত আমাদের পূর্বপুরুষগণ (নঃ পূর্বে পিতরঃ) এবং সপ্তসংখ্যক মেধাবী জনগণ (সপ্ত বিপ্রাসঃ) হবিলক্ষণ অন্নের ইচ্ছায় এই ইন্দ্রের স্তুতি করেছেন (বাজয়ন্তঃ মতিভিঃ)। (কীরকম ইন্দ্র? না–) নক্ষদ্দাভং অর্থাৎ তাঁর প্রতি আগুয়ান শত্রুগণের হিংসক। দুর্গম পথগামীর তারক (ততুরিং), পর্বতে মেঘে অবস্থিত (পর্বতেষ্ঠাং, অনতিক্ৰমণীয় বাক্যবান অর্থাৎ যাঁর আদেশ অলঙ্ঘনীয় (অদ্রোঘবাচম) এবং অতিশয় বলবন্ত (শবিষ্ঠম)। ২।
প্রসিদ্ধ ইন্দ্রের (তং) নিকটে আমরা যাচনা করছি (ঈমহে)। (কি যাচনা করি? না) অস্য রায়ঃ অর্থাৎ এই ধন। (কিরকম তা? না–) বহু পুত্র ইত্যাদির সাথে (পুরুবীরস্য) ও মনুষ্য সেবকগণের সাথে (নৃবতঃ) যে ধন ভোক্তব্য হয়ে থাকে, যা বহু অন্নময় (পুরুক্ষোঃ ); সেই হেন বিশেষণবিশিষ্ট ধন আমরা যাচনা করছি। অধিকন্তু যে ধন অচ্ছিন্ন (অস্কৃধোয়ুঃ), জরারহিত (অজরঃ) ও স্বর্গ বা সুখবান অর্থাৎ তার প্রাপ্তিকারক (স্বর্বা), হে হরিবঃ (অর্থাৎ হরি নামক অশ্বযুক্ত) ইন্দ্র! আমাদের তৃপ্তির নিমিত্ত সেই ধন আনয়ন করুন (মাধয়ধ্যৈ আ ভর)। ৩৷৷
হে ইন্দ্র! পুরাকালেও আপনার স্তোতৃবর্গ (পুরা চিৎ তে জরিতারঃ) আপনার নিকট হতে যে সুখ প্রাপ্ত হয়েছেন (সুন্নম্ যদি আনশু) তা (তৎ) (অর্থাৎ সেই সুখ) আমাদেরও (নঃ) প্রদান করুন (বি বোচঃ)। সেই সুখের। উৎকোচস্বরূপ অসুরবিনাশক অর্থাৎ শত্রুঘাতী (অসুরঘুঃ) যজ্ঞে আপনার যথাযথ ভাগ (তে ভাগঃ) নির্দিষ্ট করা হয়েছে। হে দুর্ধর্ষ, অর্থাৎ শত্রুর পক্ষে অপরাজেয় (দু), হে শত্রুগণের খেদয়িতা অর্থাৎ আক্ষেপ উদ্রেককারী (খিদ্বঃ), হে বহুজন কর্তৃক আহূত (পুরুষ্কৃত), হে প্রভূত ধনশালী (পুরূবসো), ইন্দ্রদেব! আপনি আমাদের নিমিত্ত সেই হবির্লক্ষণ অন্ন প্রদান করুন (কিং বয়ঃ…)৷৷ ৪৷৷
যজমানের যজ্ঞ ইত্যাদি লক্ষণযুক্ত কর্মবতী (যস্য বেপী) প্রবচনশীলা বাণী (বরী গীঃ) হস্তে বজ্ৰধারণকারী (বজ্রহস্তং), রথে অবস্থিত (রথেষ্ঠাং) সেই প্রসিদ্ধ ইন্দ্রকে প্রশ্ন করছে (তং পৃচ্ছন্তী), অর্থাৎ ইন্দ্রের অভিমুখে গমন করছে, [বক্তব্য এই যে, স্তুতিগুলি ইন্দ্রের উদ্দেশে ধ্বনিত হচ্ছে। বহুজনের গ্রাহক (তুবিগ্রাভং), বহু কর্মকারী (তুবিকুর্মিং), এবং বল-প্রদায়ক (রভোদাং)–এই হেন লক্ষণান্বিত ইন্দ্রের নিকটে সেই যজমান সুখ কামনা করেন (গাতুং ইষে)। অধিকন্তু সেই ইন্দ্র অভিগামী বা শীঘ্রগামী শত্রুর অভিমুখে গমন করে থাকেন (তুষং অচ্ছ নক্ষতে)। ৫
হে স্বায়ত্তবল (স্বতবঃ) (অর্থাৎ সকল বলকে আপন আয়ত্তে স্থাপনকারী) ইন্দ্র! আপনি মনের ন্যায় শীঘ্র গতিযুক্ত (মনোজুবা) পর্বতবৎ বজ্রের (পর্বতেন) প্রসিদ্ধ (অয়া) শক্তির দ্বারা (মারয়া) বর্ধমান (ববৃধানং) সেই প্রসিদ্ধ বৃত্রকে (ত্যং) বিশেষভাবে ভগ্ন করেছেন (বি রুজঃ)। তথা হে শোভনবল (সোজঃ)! হে মহান (বিরপশি) ইন্দ্র! আপনি অন্যের দ্বারা চ্যুত হবার নন্ (অচ্যুতা চিৎ), দৃঢ় অর্থাৎ অশিথিলীকৃত (বীলিতা), দৃঢ় শত্রুনগরগুলি (দ) ধর্ষক বজ্রের দ্বারা বিদারিতবান্ হয়েছেন (বি রুজঃ) অর্থাৎ বিভগ্ন করেছেন ৷ ৬ ৷
হে যজমানবৃন্দ! আপনাদের নিমিত্ত (বঃ) অতিশয়িত বলশালী (শবিষ্ঠং), প্রাচীন (প্রত্নং), সেই প্রসিদ্ধ ইন্দ্রকে (তং) নবতর স্তুতির দ্বারা (নব্যস্যা ধিয়া) প্রাচীন মহর্ষিগণের ন্যায় (প্রত্নবৎ) আমিও অলঙ্কারমণ্ডিত করতে উদ্যত হয়েছি (পরিতংসযধ্যে)। ইয়ত্তাশূন্য অর্থাৎ সর্বার্থে অসীম (অনিমানঃ) বা মহান, শোভন-বাহনশালী (সুবহ্মা) সেই ইন্দ্র আমাদের (স ইন্দ্ৰঃ নঃ) সকল দুস্তর বাধা (বিশ্বানি দুঃগহানি) অতিক্রম করিয়ে দিন ॥ ৭
হে ইন্দ্র! আপনি সাধুজনের প্রতি দ্বেষকারী (হূনে) রাক্ষস ইত্যাদিকে (জনায়) পার্থিব অর্থাৎ পৃথিবীলোকে, দিব্য অর্থাৎ দ্যুলোকে ও অন্তরিক্ষ স্থানের সর্বত্র তাপ প্রদান করুন (আ দীপয়ঃ)। হে বৃষণ (অর্থাৎ কামবৰ্ষক) ইন্দ্র! আপনি সর্বতে বিদ্যমান (বিশ্বতঃ) সেই রাক্ষস ইত্যাদিকে (তা) আপনার দীপ্তির প্রভাবে দহন করুন (শোচি তপ)। অধিকন্তু, ব্রাহ্মণদেষ্টা রাক্ষস ইত্যাদিকে (ব্রহ্মদ্বিষে) পৃথিবী ও অন্তরীক্ষে (ক্ষাম অপঃ চ) দগ্ধীভূত করুন (শোচয়)। ৮
হে দীপ্তদর্শন অর্থাৎ প্রজ্বলিত অগ্নির ন্যায় দেহধারী (ত্বেষসক) ইন্দ্র! আপনি দ্যুলোকস্থ জনগণের (দিব্যস্য জনস্য) এবং পার্থিব জগতের (পার্থিবস্য জগতঃ) রাজা অর্থাৎ ঈশ্বর (রাজা ভুবঃ)। আপনি দক্ষিণ হস্তে বজ্র ধারণ করেছেন (ধিষ)। হে অজুর্য (অর্থাৎ জরার স্পর্শের অতীত) ইন্দ্র! আপনি সেই নিহিত বজ্রের দ্বারা সকল আসুরিক মায়া (বিশ্বাঃ মায়াঃ) বিদূরিত করে দিন (বি দয়সে)। ৯।
শত্রুগণের কবল হতে উদ্ধারণের নিমিত্ত (শত্রুতূর্যায়) মহতী (বৃহতীং), অহিংসিতা (অমৃভ্রাং), সঙ্গতা (সংযতং) ও ক্ষেমলক্ষণা সম্পদ (স্বস্তিং), হে ইন্দ্র! আপনি আমাদের নিমিত্ত (নঃ) আহরণ করুন (আ হর) অর্থাৎ আমাদের প্রদান করুন। হে বজ্রভান (বজি) ইন্দ্র! সেই ক্ষেমরূপা সম্পদের দ্বারা (যয়া) কর্মের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষয়কারী (দাসানি) হীন শত্ৰুভূত (বৃত্ৰা) মনুষ্যগণকে (নাহুষানি) শ্রেষ্ঠ (আর্যাণি) তথা শোভন-অপত্যভূত অর্থাৎ পুত্রস্থানে স্থাপিত করুন (সুতুকা করঃ)। ১০।
হে পুরুহৃত (অর্থাৎ যজমানগণ কর্তৃক বহুভাবে আহূত) ইন্দ্র! হে বেধঃ (অর্থাৎ সকলের বিধাতা) ইন্দ্র! হে প্রযজ্যো (অর্থাৎ প্রকর্ষের সাথে স্তবনীয় বা প্রকৃষ্ট গমনশালী) ইন্দ্র! সকলের বরণীয় (বিশ্ববারাভিঃ) নিযুত নামক অশ্বসমূহের সাথে (নিযুৎভিঃ) আমাদের নিকট আগমন করুন (নঃ আ গহি)। আপনার আগমনসাধন সেই নিযুক্ত নামক অশ্বগুলিকে (যাঃ) দেবলক্ষণহীন অসুরগণ (অদেব) নিবারণ করতে পারে না (ন বরতে) তথা দেবতাগণও (দেবঃ) নিবারণ করতে পারেন না (ন বরতে)। কারও পক্ষেই অনিবারণীয় সেই নিযুত নামক অশ্বগুলি সমভিব্যাহারে (আভিঃ) আমাদের অভিমুখে দৃষ্টি স্থাপন পূর্বক অর্থাৎ আমাদের অভিমুখী হয়ে (মদ্রি) শীঘ্র আগমন করুন (তৃয়ম্ আ যাহি) ॥১১।
বঙ্গানুবাদ –হে ইন্দ্র! যে আপনি তীক্ষ্ণ শৃঙ্গশালী বৃষভের ন্যায় ভয়জনক (যঃ তিগ্মশৃঙ্গঃ বৃষভঃ ন ভীমঃ); সেই আপনি কারো সহায় ব্যতিরেকে অর্থাৎ একাকীই (একঃ) আমাদের সকল শত্ৰুজনকে (বিশ্বাঃ কৃষ্টীঃ) প্রকর্ষের সাথে বিদূরিত করুন (প্র চ্যাবয়তি)। আপনি চিরন্তন বা নিত্য (যঃ শশ্বতঃ)। হবিঃ-অদানকারী, অজমানগণের (অদাশুষঃ) ধনপূর্ণ গৃহসদৃশ লুব্ধকের (গয়স্য) ধন (বেদঃ) সুষ্ঠু সোমাভিষববান (সুম্বিতরায়) যজমানগণকে প্রকর্ষের সাথে প্রদান করে থাকেন (প্রত্না অসি) ॥১॥
হে ইন্দ্র! আপনিই মর্তের যোদ্ধাগণের সাথে সংগ্রামে (সমর্যে) অথবা মর্তের ঋত্বিকগণের সাথে যজ্ঞে, শরীরের দ্বারা (ত) শুশ্রূষা প্রাপ্ত হয়ে (শুশ্রুষমাণঃ) কুৎসকে রক্ষা করেছিলেন (আবঃ)। যখন আপনি (অস্মৈ) অর্জুনীর পুত্র কুৎসের নিমিত্ত দাস নামক ও কুযব নামক অসুরবর্গকে (শুষ্ণং) শিক্ষা দান পূর্বক (শিক্ষণ) তাদের ধন কুৎসকে প্রদানের নিমিত্ত নিরন্তর বশ করেছিলেন (নি অরন্ধয়ঃ)। ২।
হে ধৃষ্ণো (অর্থাৎ শত্রুগণের ধর্যক) ইন্দ্র! আপনি আপনার (ত্বং) শত্রুধর্ষক বজ্রের দ্বারা (ধৃষতা) হবিদাতা (বীতহব্য) সুদাস অর্থাৎ শোভনদান নামক রাজাকে অথবা বীতহব্য ও সুদাস নামক রাজদ্বয়কে সকল রক্ষণের দ্বারা (বিশ্বাভিঃ ঊতিভিঃ) রক্ষা করেছিলেন, (প্র আবঃ)। অধিকন্তু সংগ্রামে (বৃহত্যেষু) ভূমিদানের নিমিত্তভূত হয়ে (ক্ষেত্ৰসাতা) পৌরকুৎসি অর্থাৎ পুরুকুৎসের পুত্র রাজা সদস্যুকে ও পুরু নামক রাজাকে রক্ষা করেছিলেন (আবঃ) ॥ ৩৷৷
হে নৃমণঃ (অর্থাৎ স্তোতৃগণের মননীয় অর্থাৎ অনিবার অনুচিন্তনীয়, অথবা মনুষ্য যজমানগণের প্রতি অনুগ্রহ মনোযুক্ত) ইন্দ্র! হে হর্যশ্ব (অর্থাৎ হরি-নামক অশ্বোপেত) ইন্দ্র! আপনি দেবগণের আগমনস্থল বা ভক্ষণস্থলরূপ যজ্ঞে (দেববীতৌ) অথবা যুদ্ধার্থে দেবগণের গমন স্থলে, যোদ্ধা মরুত্বর্গের সাথে। (নৃভিঃ) বহু আবরক রাক্ষস ও পাপ (ভূরীণি বৃত্ৰা) হনন করেছেন (হংসি)। অধিকন্তু, হে ইন্দ্র! আপনি দভীতি নামক রাজর্ষির নিমিত্ত (দভীতয়ে) শোভন হনন-সাধন বজোপেত হয়ে (সুহঃ) দস্যু চুমুরি ও খুনিকে বিনাশ করেছেন (অস্বাপয়ঃ)। ৪
হে বজ্রধারী ইন্দ্র! আপনার (তব) সেই প্রসিদ্ধ বলসমূহ (তানি) অতি দৃঢ় অর্থাৎ অপর কর্তৃক অনভিভবনীয় (চৌত্ননি), এবং সেই বলের দ্বারা আপনি অসুরগণের একোনশতসংখ্যকা (নব নবতিং চ) অর্থাৎ নিরানব্বইটি নগরী (পুরঃ) বিধ্বংস করেছেন (সদ্যঃ) এবং শততম নগরী, বা বাসগৃহও (শততমা নিবেশনে) ব্যাপ্ত করেছেন (অবিবেষীং); এবং বৃত্র ও নমুচি নামক অসুরকে নিহত করেছেন (অহ) ॥ ৫॥
হে ইন্দ্র! আপনার দত্ত ধনসমূহ (ভোজনানি), যা আপনি শোভন হবিদাতা যজমানকে (রাতহব্যায় দাশুসে সুদাসে) অথবা সুদাস নামক রাজাকে দান করেছিলেন, তা চিরস্থায়ী (সনা) হয়েছিল। হে পুরুনাক (অর্থাৎ বহুকর্মকুশল) ইন্দ্র! কামবৰ্ষক (বৃষ্ণে) আপনাকে আনয়নের নিমিত্ত (তে) হরি নামক অশ্বদ্বয় (বৃষনা) রথে যোজিত করছি (যুনন্নি)। আমাদের স্তোত্রসমূহ (ব্রহ্মণি) বলবান্ (বাজং) আপনার সমীপে গমন করুক (ত্বাং ব্যন্তু) ॥ ৬।
হে সহসাব (অর্থাৎ বলবান্ বা সকল বিষয়ে সামর্থ্য-সম্পন্ন) ইন্দ্র! হে হরিবঃ (অর্থাৎ হরিতবর্ণোপেত অশ্বশালী) ইন্দ্র! আপনার এই ক্রিয়মাণ (তে অস্যাং) পর্যেষণায় (পরিষ্টো) পরিত্যাগ-লক্ষণযুক্ত (পরাদৈ) পাপ (অঘায়) যেন আমাদের না ঘটে (মা ভূম); [বক্তব্য এই যে, ইন্দ্রের উদ্দেশে অনুষ্ঠিত যজ্ঞ যেন আমরা কখনও পরিত্যাগ না করি]। হে ইন্দ্র! হিংসা-পরিশূন্য উপদ্রবরহিত বক্ষণের দ্বারা আমাদের রক্ষা করুন (নঃ অবৃকেভিঃ বন্ধুথৈ); [বক্তব্য এই যে, আমাদের সেইভাবে রক্ষা করুন, যাতে কেউ যেন আমাদের প্রতি হিংসা না করতে পারে এই এবং কোন উপদ্রব করতে না পারে ]। এবং আমরা বিদ্বান স্তোতৃবর্গের মধ্যে (সূরিষু) আপনার প্রিয় হবো (তব প্রিয়াস স্যাম)। ৭
হে ধনশালী (মঘব) ইন্দ্র! আপনার (তে) অভিগমনের ইচ্ছায় (অভিষ্টে) হবিদাতা যজমানরূপী আমরা (নরঃ) আপনার মিত্রস্বরূপ প্রিয় হয়ে (সখায়ঃ প্রিয়াসঃ ইৎ) আমাদের গৃহে (শরণে) যেন হৃষ্ট হই (মদেম)। অধিকন্তু অতিথিগণের সেবার্থে গাভী-পালক, অথবা সকারার্থে অতিথিবৃন্দের অভিমুখে গমনকারী রাজার, অর্থাৎ অতিথিদ্যের (অতিথিদ্যায়) প্রখ্যাপনীয় সুখ সম্পাদনের ইচ্ছা করে (শংস্যং করিষ্য) তুবশ নামক রাজাকে ও যদুকুলোৎপন্ন রাজাকে (যাদ্ব) আপনি তীক্ষ্ণীকৃত বা তাড়িত করুন (নি শিশীহি) ॥ ৮
হে ইন্দ্র (মঘবৎ)! আপনার অভিগমনে (তে অভিষ্টেী) অর্থাৎ আগমন ঘটলে স্তুতি-প্রবর্তক ঋত্বিকবৃন্দ (নরঃ) সেইক্ষণেই উথ শস্ত্রে আপনার স্তুতি উচ্চারণ করেন (সদ্যঃ চিৎ নু উথশাসঃ উতা শংসন্তি)। স্তুতি-প্রবর্তক ঋত্বিকবৃন্দ (যে) আপনাকে (তে) আহ্বানের মাধ্যমে (হবেভিঃ) বণিকভূত লুব্ধক অযাজ্ঞিকগণকে (পণী) বধ করে থাকেন (বি অদাশ)। এইরূপে সেই সামমন্ত্রের উদ্গাতা আমাদের (অস্মা) সেই প্রসিদ্ধ (তস্মৈ) যোজয়িতব্য ফলের নিমিত্ত অথবা যাগের নিমিত্ত (যুজ্যায়) বরণ করুন (বৃণী)। [বক্তব্য এই যে, যেহেতু আমরা উথ মন্ত্রের উচ্চারণকারী, সেই হেতু আমাদের অভিমত ফলপ্রাপ্তির পক্ষে স্বীকৃতি প্রদান করুন ] ৯
পুরুষগণের মধ্যে (নরাং), হে পুরুষোত্তম (নৃতম) ইন্দ্র! আমাদের ইদানীং এই স্তুতি সমুদায় (এতে স্তোমা) আমাদের অভিমুখে (অস্মন্ অঞ্চন্তঃ) হবিলক্ষণ ধনরাশির (মঘানি) প্রদাতা (দঃ ) আপনার উদ্দেশে (তুভ্যং) কৃত। হে ইন্দ্র! শত্রু বা আবরক পাপ হননের নিমিত্তভূত হলে (বৃহত্যে) স্ততি-সম্পাদক আমাদের অথবা আমাদের কৃত স্তোমগুলির প্রতি (তেষাং) আপনি সুখয়িতা বা মঙ্গলপ্রদায়ক হোন (শিবঃ ভূঃ)। অধিকন্তু হবিদাতা বা স্তুতিকারক আমাদের (নৃণা) পক্ষে আপনি বীরস্বরূপ (রঃ), সখিবৎ মিত্রভূত (সখা) ও রক্ষিত (অবিতা) হোন ॥ ১০
হে শৌর্যসম্পন্ন (শূর) ইন্দ্র! আপনি রক্ষণের নিমিত্তভূতরূপে (উতী) আমাদের দ্বারা স্থূয়মান (স্তবমানঃ) ও হবিঃ-সমূহের প্রাপিত (ব্রহ্মজুতঃ) হয়ে আপন শরীরের দ্বারা অত্যন্ত প্রবৃদ্ধ হয়ে উঠুন (তন্ব ববৃধস্য)। অতঃপর আমাদের (নঃ) অন্নসমূহ (বাজা) প্রদান করুন। (উপ মিমীহি)। তথা কুলের অর্থাৎ রংশের সমর্ধনের অর্থাৎ সম্যক্ বর্ধনের উপযুক্ত পুত্র ইত্যাদি প্রদান করুন (উপ স্তী)। হে অগ্নি প্রমুখ দেবগণ। আপনারাও (যুয়) মঙ্গলের সাথে (স্বস্তিভিঃ) সদা আমাদের রক্ষা করুন (নঃ পাতা)। ১১।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটি পূর্বসূক্তের মতোই বিনিযুক্ত হয়। এইটি কেবল তৃতীয় দিবসেই নয়, ষষ্ঠ দিবসেও মাধ্যন্দিন সবনে বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। পূর্ব সূক্তে এর সূত্রে উল্লেখিত আছে ৷ (২০কা. ৪অ. ৪সূ)। [অতঃপর, অর্থাৎ ২০শতি কাণ্ডের ৫ম অনুবাক থেকে গ্রন্থের অন্তিম পর্যন্ত অংশের ভাষ্য ইত্যাদি আচার্য সায়ন রচনা করেননি। সেই জন্য পণ্ডিতবর দুর্গাদাসও তার সম্পাদিত গ্রন্থে পূর্ববর্তী কিছু অংশের মতো এই অংশটুকুরও ভাষ্য কিংবা অনুবাদ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। তবে আমরা যথা-প্রতিশ্রুতি অনুসারে হিন্দী-বলয়ের অথর্ববেদজ্ঞ পণ্ডিতবর্গের অবদান-অবলম্বনে এই অংশেরও সূক্তসার ইত্যাদি উল্লেখ করেছি।]
সূক্তসার— হে ইন্দ্রদেব! মন্ত্রের দ্বারা রথে যযাজিত অশ্বের সহযোগে আপন অভিলষিত স্থানে গমনাগমনে সক্ষম, বজ্রধারী, উপাসকগণের হিতৈষী, স্বয়ং সূর্যরূপী আপনি। আপনি সোমাগকারী আমাদের দ্বারা সংস্কারিত সসাম পানের নিমিত্ত এই যজ্ঞে আগমন করুন এবং কুশাস্তীর্ণ আসনে। উপবিষ্ট হয়ে সোম পান করুন।
সূক্তসার –আমরা সমগ্র বিশ্বের প্রাণীগণের পক্ষে সেই ইন্দ্রকে আহূত করছি যিনি সোমের দ্বারা হষপ্রাপ্ত হয়ে অন্তরিক্ষলোককে বৃষ্টির জলে প্রবৃদ্ধ করেছেন এবং আপন বলে মেঘকে বিদীর্ণ করেছেন। যে ইন্দ্র অঙ্গিরাবর্গের নিমিত্ত পর্বত কন্দরস্থিত গাভীগুলিকে প্রকট করে বাহিরে আনয়ন করেছেন, তিনি বল নামক দৈত্যকে অধোমুখী করে নিপাতিত করেছেন।
টীকা –গবাময়ন ইত্যাদি সম্বৎসরে প্রাতঃসবনে অনুরূপের পর উপযুক্ত সূক্তের প্রথম ঋটি আরম্ভণীয়া এবং সেই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ঋটি পর্যাস হয়ে থাকে। যে মন্ত্রের দ্বারা উৰ্থ-মুখ আরম্ভ হয়, তা আরম্ভণীয়া নামে উক্ত হয়। যে মন্ত্রের দ্বারা পরিসমাপ্তি করা হয়, সেই শস্ত্র পর্যাস নামে কথিত হয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য এই যে উপযুক্ত সূক্তটি ও ৯ম অনুবাকের ৮ম সূক্তের ৩য় মন্ত্রস্থ (আ নো বিশ্বাসু হব্য) আজ্যপৃষ্ঠস্ত্রোত্রিয় হয়ে থাকে। (বৈতনিক, ৮।১)। (২০কা.-৫অ. ২সূ.)।
সূক্তসার –মহান্ ইন্দ্রের পরাক্রম আকাশ-সম-বিশাল। সোমপায়ী ইন্দ্রের কুক্ষি সদা বৃদ্ধিমান। ইন্দ্রের রক্ষাসাধন সদা উপলব্ধ হয়ে থাকে। সোমপানের সময়ে উথ এবং স্তোত্রসমূহ ইন্দ্রের নিমিত্ত প্রসন্নতা-দায়ক হয়ে থাকে। হে ইন্দ্রদেব! এই সোম-সবনে আগমন করুন, সোম পান করুন, সুন্দর চিবুক সম্পন্ন হোক। হে অধ্বর্যগণ! আপনারা সোমাভিষবের পর সুন্দর চিবুকশালী ইন্দ্রকে আহ্বান জ্ঞাপন পূর্বক তাকে হর্ষান্বিত করুন। ইন্দ্র আমাদের ধন, ঐশ্বর্য, কীর্তি, আয়ু ও খ্যাতি প্রদান করুন।
সূক্তসার — হে ইন্দ্রদেব! আপনি আপনার ন্যায় অভয়প্রদানশীল মরুৎ নামক দেবতাগণের সাথে বিরাজিত থাকেন। পাপরহিত ও তেজস্বী ইন্দ্রকে কামনাকারী যজমানের যজ্ঞ অত্যন্ত সুশোভিত হয়ে থাকে। হবিঃপ্রাপ্ত হয়ে ইন্দ্রদেব প্রবৃদ্ধ হয়ে ওঠেন।
সূক্তসার— যুদ্ধে অপশ্চাদপদ ইন্দ্রদেব বৃত্রের নিরানব্বই সংখ্যক নগরীকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তিনি পর্বতসমূহের মস্তক ছেদন করেছিলেন এবং চন্দ্রমণ্ডলে সূর্যরূপে তিনিই এক রশ্মিরূপে বিদ্যমান।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তটির বিনিয়োগ ১ম সূক্তের অনুরূপ। পৃষ্ঠ্য ষষ্ঠ দিবসের একবিংশ স্তোমকে চতুর্থ I দিবসে একাহে উপযুক্ত সূক্তমন্ত্র যথাক্রমে আজ্যপৃষ্ঠ্য ও উথস্তোত্রিয় হয়ে থাকে। (বৈতান, ৮।২) ইত্যাদি। (২০কা, ৫৩. ৪সূ.)।.
টীকা— উপযুক্ত সূক্তটির বিনিয়োগ ১ম সূক্তের অনুরূপ। তথা অশ্বমেধ যজ্ঞের তিনদিনের মধ্যে দ্বিতীয় দিনে উপযুক্ত সূক্তমন্ত্রগুলি ও ৯ম অনুবাকের ১৩শ সূক্তের মন্ত্রগুলির দ্বারা যথাক্রমে আজ্যপৃষ্ঠ ও স্তোত্রিয় হয়ে থাকে। (বৈতান. ৮।৩)। ইত্যাদি। (২০কা, ৫অ, ৫সূ.)।
অধ্যায়: কুড়ি
সূক্ত -৪৩
[ঋষি : ত্রিশোক। দেবতা : ইন্দ্র। ছন্দ : গায়ত্রী।]
ভিন্ধি বিশ্বা অপ দ্বিষঃ পরি বাধো জহী মৃধঃ। বসু স্পাহং তদা ভর ॥১॥ যদ বীলাবিন্দ্র যৎ স্থিরে যৎ পৰ্শানে পরাভূতম্। বসু স্পাহং তদা ভর ৷৷ ২. যস্য তে বিশ্বমানুষো ভূরেদত্তস্য বেদতি। বসু স্পাহং তদা ভর ॥৩৷৷ সূক্তসার হে ইন্দ্রদেব! আপনি আমাদের শত্রুগণকে বিধ্বংস করুন, রণের প্রতিবন্ধকতা বিদূরিত করুন এবং আমাদের পক্ষে গ্রহণীয় সেই ধন প্রদান করুন, যা স্থির ব্যক্তির নিকট বর্তমান থাকে এবং সকল উপাসকের পক্ষে প্রাপ্তব্য হয়ে থাকে।
সূক্তসার –হে ইন্দ্র! গর্ভধারণক্ষমা কবুতরীর সকাশে কবুতরের মতো আমাদের যুক্তিগ্রাহ্য রাণী বা স্তোত্রমন্ত্রের অভিমুখে আপনি আগত হোন। সত্যময় বিভূতিসম্পন্ন ধনেশ্বররূপী আপনাকে স্তুতিসমূহই প্রাপ্ত করাতে সমর্থ। হে শতকর্মা! আপনি আমাদের রক্ষা করুন। আমরা আপনার স্তবন করছি।
টীকা –স্বরসাম নামে অভিহিত তিনটি দিবসে ও অভিপ্লবে উপযুক্ত সূক্তটি ও ৬ষ্ঠ অনুবাকের ৫ম সূক্তের ১১শ মন্ত্র পর্যায়ক্রমে আজ্যপৃষ্ঠস্তোত্রিয় হবে। (বৈ. ৮/৪)। (২০কা, ৫অ, ৯সূ.)।
সূক্তসার— অভীষ্টবর্ষক ইন্দ্র সকলের মধ্যে উৎকৃষ্ট। বৃত্র-বিনাশার্থে আমরা তাকে পুষ্ট করছি। ইন্দ্র প্রশংসনীয়, তেজস্বী ও বলবান। গায়ক, বাণী, পূজামন্ত্র সকলেই তাঁর স্তুতি করে থাকে। সূর্যকে ইন্দ্রই আকাশস্থ করেছেন। সূর্যরূপে ইন্দ্ৰই মেঘসমূহকে বিদীর্ণ করেছেন। হে ইন্দ্র! আপনার রথে যোজিত অশ্বসকল আপনাকে আমাদের নিকটে আনয়ন করুক। আমরা সোমপান করার নিমিত্ত আপনাকে আহূত করছি। আপনার রথ সকল প্রাণীকে লঙ্ঘন করে চলে এবং সেই রথে যোজিত হরি নামক অশ্ব আকাশ মার্গে দীপ্তমান হয়ে ওঠে। হে মনুষ্য! সূর্যরূপী ইন্দ্র অন্ধকার এবং অজ্ঞানকে বিদূরিত করার জন্য উদিত হচ্ছেন, তোমরা দর্শন করো। রাত্রির অবসানে চোরের মতো সূর্যের উদয়ে নক্ষত্রগুলি পলায়ন করে থাকে। হে সূর্যাত্মক ইন্দ্র! আপনি ভবের নৌকাস্বরূপ, আপনি সর্বদ্রষ্টা, আপনি সর্বপ্রকাশক। যাঁরা পুণ্যমার্গ অবলম্বন করে চলেন, তাদের আপনি কৃপা করে থাকেন। আপনি ত্রৈলোক্যবিহারী, আপনার রশ্মিরূপ সপ্ত অশ্ব আপনাকে বহন করে থাকে।
সূক্তসার— বিচরণশীল গাভী যেমন আপন বৎসের প্রতি ধাবিত হয় এবং মাতা যেমন আপন সন্তানের প্রতি গমন করে, তেমনই আমাদের স্তুতিসমূহ ইন্দ্রের নিকটে গমন করছে। সেই বজ্রধারী ইন্দ্র আমাকে যশ-আয়ু-ঘৃত-দুগ্ধ দান করবেন। সূর্যাত্মক ইন্দ্র পূর্বদিকস্থায়ী উদয়াচলে উদিত হয়ে বর্ষাজলে অন্তরিক্ষকে ব্যাপ্ত করছেন। বর্ষাজলরূপ অমৃত দোহনের কারণে এগুলিকে গাভীও বলা হয়। সূর্য সর্বপ্রকাশক এবং প্রাণ ও অপানরূপে শরীরসমূহে স্থিত হয়ে থাকেন। সূর্যের অনুকম্পাতেই দিবা ও রাত্রির সৃষ্টি হয়। বেদবাণী সূর্যেরই আশ্রয়ে অবস্থিত।
সূক্তসার— দেবতা স্তুতিবাণীতে প্রসন্ন হয়ে থাকেন। হে মহিষ্ঠ (মহত্তম)! হে শক্র! আপনি আকাশকে হর্ষপূর্ণ করুন এবং কারো প্রতি কঠোর বাক্য উচ্চারণ করবেন না। হে যজমানগণ! দুঃখনাশক, দর্শনীয়, সোমপ্রিয় ইন্দ্রকে আমরা আপনাদের যজ্ঞপুষ্টয়র্থে স্তুতি করছি। আমরা আমাদের আপন স্তুতিসমূহের সাথে ইন্দ্রের দিকে গমন করছি। দুর্ভিক্ষকালে সকল জীব যেমন কন্দ মূল-ফল সম্পন্ন পর্বতকে স্তুতি করে, আমরাও তেমনই স্তুত্য, পোষক, দানী ও তেজস্বী ইন্দ্রকে স্তুতি করছি। হে ইন্দ্র! যে ধনের দ্বারা ভৃগু শান্তিলাভ করেছিলেন এবং প্রকথ রক্ষালাভ করেছিলেন, আমরা সেই ধন প্রার্থনা করছি। সকলের অভীষ্টফলদায়ক আপনার সেই বল আমরা যাচনা করছি; তা যেন শত্রুর লভ্য না হয়!
সূক্তসার –নিত্যনবীন, মনুষ্যের আকারধারী, বলবা ইন্দ্রের স্তুতি করো; তার অল্প স্তুতিতেও স্বর্গপ্রাপ্তি হয়ে থাকে। হে ইন্দ্র! কোন্ ঋষি আপনার বিষয়ে তর্ক করেন? কোন কারণেই বা আপনি স্তোতার আহ্বানে আগমন করেন?
সূক্তসার –হে স্তোতৃগণ! সহস্ৰ সংখ্যক ধনের ও অন্নের দাতা ইন্দ্রের স্তুতি ধ্বনিত করুন। হবিদাতা যজমানের নিমিত্ত ইন্দ্র স্বর্গ হতে ধন বর্ষণ করে থাকেন। ইন্দ্রকে সংস্করিত সোম নিবেদন করলে তিনি প্রসন্ন হয়ে অন্ন-ধন দান করেন।
সূক্তসার— সকল সেনানী শত্রুকে মূৰ্ছিত করণশালী, অতি বলশালী ও উগ্র ইন্দ্রকে বরণ করেছেন। স্তুতিকরণশীল সকলে সোমপানের নিমিত্ত ইন্দ্রকে স্তুতি করে থাকেন। ইন্দ্রের বজ্ৰাস্ত্রের ধ্বনি যেন স্তোতৃগণের কর্ণকে ব্যথিত না করে।
টীকা— পৃষ্ঠ্যষড়হের একবিংশ স্তোমে চতুর্থ দিবসে ইন্দ্রো দধীচে অস্থভিঃ (২০৪০ অর্থাৎ ২০কা. ৫অ. ৪সূ), উপযুক্ত সূক্ত, এবা হ্যসি বীরয়ুঃ (২০।৬০ অর্থাৎ ২০ কা. ৫অ, ২৩সূ.) ইত্যাদি যথাক্রমে আজ্যপৃষ্ঠ, উথ ও স্তোত্রিয় হবে। বৈতানিকে (৮।২, ৮।৩) এই প্রসঙ্গে আরও বিশদ বিনিয়োগের উল্লেখ আছে ॥ (২০কা, ৫অ. ১৭)।
অধ্যায়: কুড়ি
সূক্ত -৫৫
[ঋষি : রেভ। দেবতা : ইন্দ্র। ছন্দ : বৃহতী।]
তুমিং জোহবীমি মঘবানমুগ্ৰং সত্ৰা দধানমপ্রতিদ্ভুতং শবাংসি। মংহিষ্ঠা গীৰ্ভিরা চ যজ্ঞিয়ো ববর্ত রায়ে নো বিশ্বা সুপথা কৃপোতু বজ্ৰী ॥১॥ যা ইন্দ্র ভুজ আভরঃ স্ববা অসুরেভ্যঃ। স্তোতারমিন্মঘবন্নস্য বর্ধয় যে চ ত্বে বৃক্তবহিষঃ ॥ ২॥ যমিন্দ্র দধিষে ত্বমশ্বং গাং ভাগমব্যয়ম্। যজমানে সুন্বতি দক্ষিণাবতি তস্মিন্ তং ধেহি মা পণৌ ॥ ৩৷৷ সূক্তসার– ধনবান, বজ্রধারী, যুদ্ধে অগ্রবর্তী, বলধারক, স্তুত্য, ধনমার্গ-প্রদর্শনকারী, স্বর্গাধিপতি ইন্দ্রদেবকে আমি আহ্বান করছি। তিনি স্তোতা ও যজমানের শ্রীবৃদ্ধি-সাধক; দক্ষিণাদাতা যজমানকে গাভী-অশ্ব ইত্যাদি প্রদান করেন, পণি নামক অসুরদের নয়।
সূক্তসার –বৃহন্তা ইন্দ্রকে আমরা আহূত করছি। তিনি সামান্য বা বিরাট যুদ্ধে আমাদের বল ও হর্ষ প্রদান করুন। সেই বীরেন্দ্র দুষ্টের খণ্ডনকর্তা, শত্রুর দণ্ডদাতা এবং সোমাভিষবকারীগণের ঐশ্বর্যদাতা। তাঁর নিমিত্ত সম্পন্নকৃত যজ্ঞের ফলস্বরূপ তিনি আমাদের গাভী ইত্যাদি ধন প্রদান করুন। তিনি সংস্কারিত সোম পান করে বল ও হর্ষ প্রাপ্ত হয়ে আমাদের রক্ষা করুন। যারা হবিঃ নিবপন করে না, সেই নিন্দকগণের ধন আমাদের দান করুন। সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –পৃষ্ঠ্যপঞ্চাহস্য পঞ্চমেহহনি উত্তিষ্ঠন্নেজসা সহ (২০।৪২।৩) ইন্দ্রো মদায় বাবৃধে (২০৫৬) ইন্দ্রায় সাম গায়ত (২০।৬২ ৫-৭) ইত্যেতে আজ্যপৃষ্ঠোথস্তোত্রিয়া ভবন্তি। তৎ উক্তং বৈতানে।–ইত্যাদি৷৷ (২০কা, ৫. ১৯সূ.)।
টীকা— পৃষ্ঠ পঞ্চার্হ যাগের পঞ্চম দিনে উত্তিষ্ঠন্নোজসা সহ (২০কা, ৫অ. ৫সূ. ৩মন্ত্র) ইন্দ্রো মদায় বাবৃধে (২০কা, ১৯সূ.) ইন্দ্রায় সাম গায়ত (২০কা, ২৫সূ. ৫-৭মন্ত্র) ইত্যাদি আজ্যপৃষ্ঠ, উথ ও স্তোত্রিয় হবে। এই প্রসঙ্গে বৈতানে (৮।৩) উল্লিখিত আছে–পঞ্চম উত্তিষ্ঠন্নোজসা সহেন্দ্রো মদায় বাবৃধ ইন্দ্রায় সাম গায়তেতিঃ ॥ (২০কা, ৫. ১৯সূ.)।
সূক্তসার –প্রত্যেক অবসরের পর রক্ষার নিমিত্ত আমরা ইন্দ্রকে আহ্বান করছি। সদা হর্ষিত, ধনবান্ ইন্দ্র সোম-সত্রে আগমন পূর্বক সোম পান করুন। ইন্দ্রদেব আমাদের নিন্দিতরূপে গ্রহণ না করে, এই স্থানে আগমন করুন। বহুকর্মকারী ইন্দ্রদেব আপন অপরিমিত ধনবল আমাদের প্রদান করুন এবং শত্রুদের কবল হতে আমাদের রক্ষা করুন। ইন্দ্রদেব দূর বা নিকট যেস্থানেই অবস্থান করুন, এই স্থলে সোমপানার্থে আগত হোন। হে ঋত্বিকগণ! ইন্দ্রদেব ভয়াপহারী, সর্বদ্রষ্টা, অপ্রতিরোধ্যগতিক, দুঃখনাশক ও মঙ্গলকারী। হবির দ্বারা তুষ্টান্তর ইন্দ্রদেব শত্রুনগরীকে বিধ্বস্ত করে থাকেন। হে ইন্দ্রদেব! আপনি আপন বলে মহা। সোম অভিযুত হওয়ার পর এই স্থলে আগমন করুন।–আহ্বান করলে তিনি অবশ্যই স্তোতার নিকট আগমন করে থাকেন। সম্পন্ন সোম পানের নিমিত্ত উথ-গায়ক ঋত্বিক ইন্দ্রকে আহ্বান করছেন। হে ইন্দ্র! বৃষভতুল্য পিপাসার্ত হয়ে কখন আপনি আগত হবেন?
সূক্তসার— রশ্মিরাশি যেমন নিয়ত সূর্যের সাথে অবস্থান করে, তেমনই ইন্দ্রের সাথেও অবস্থান করে। ইন্দ্র ত্রিকালব্যাপী জলরূপ ধনকে বন্টন করেন। মঙ্গলময় দানসমূহের দাতা, উপাসকগণের কামনাপূরক ইন্দ্রকে, হে স্তুতিকারক! তোমরা স্তুতি করো। হে সূর্যরূপ ইন্দ্র! হে আদিত্য! আপনি সত্যই মহিমাবান, আপনি হবিঃরূপ অন্ন অপেক্ষাও মহান। আপনি আপন মহিমায় রাক্ষসগণকে সংহার করে থাকেন। আপনি অহিংসিত ও ব্যাপক রূপ। সূক্তস্য বিনিয়োগঃ –বিষুবতি সৌর্যপৃষ্ঠে বহাঁ অসি সূর্য (২০।৫৮।৩ মন্ত্র) শ্রায়ন্ত ইব সূর্যং (২০।৫৮।১মন্ত্র) ইতি বিকল্পিতৌ পৃষ্ঠস্তোত্রিয়ানুরূপৌ ভবতঃ। তৎ উক্তং বৈতানে।…তথা সাকমেধস্য তৃতীয়েহহনি অস্য সূক্তস্য বিনিয়োগ উক্তঃ।…ইত্যাদি৷ (২০কা, ৫অ. ২১সূ.)।
টীকা –বিষুবে সৌর্যপৃষ্ঠে বহাঁ অসি সূর্য (উপযুক্ত সূক্তের ৩য় মন্ত্র) ও শ্রায়ন্ত ইব সূর্যং (উপযুক্ত সূক্তের ১ম মন্ত্র) ইত্যদি বিকল্পিত পৃষ্ঠস্তোত্রিয় ও অনুরূপ হয়। বৈতানে বলা হয়েছে–বহাঁ অসি সূর্য শ্রায়ন্ত ইব সূর্যমিতি বা ইতি (বৈ. ৬।৩)। অহমিদ্ধি পিতুস্পরি (২০কা, ৯অ. ১৯সূ) ও উপযুক্ত সূক্ত আজ্য-স্তোত্রিয়। (বৈ. ৮।২)। সাকমেধ যজ্ঞে তৃতীয় দিবসে এই সূক্তের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। এই সম্পর্কে তমিং বাজয়ামসি (২০কা, ৫অ. ১০সূ.) ইত্যাদি সূক্তের বিনিয়োগের টীকা দ্রষ্টব্য। তথা উপযুক্ত সূক্তটি ও ত্বং ন ইন্দ্রা ভর (২০কা, ৯অ. ১২সূ.) ইত্যাদি সূক্ত পৃষ্ঠ, উথ ও স্তোত্রিয় হবে।-বৈ. ৮।৩)। এতদ্ব্যতীত ত্রিককুৎ-দশাহে উপযুক্ত সূক্তটি অহীনের নয়দিনে নয়টি পৃষ্ঠস্তোত্রিয়ের অন্যতমরূপে বিনিযুক্ত হয়ে থাকে। বৈতানিকের (৮।৪) এই উক্তি ২০ কাণ্ডের ৫ অনুবাকের ১৬ সূক্তের বিনিয়োগের টীকায় উল্লিখিত আছে ৷ (২০কা, ৫অ. ২১সূ)।
সূক্তসার –স্তোত্র ও গায়নযোগ্য বাণীসমূহ ইন্দ্রকে সন্তুষ্ট করে চলে। যেমন ধাতা, অর্যমা ইত্যাদি সূর্য আপন প্রেরক ত্রৈলোক্যাধিপতি ইন্দ্রকে প্রাপ্ত হন, যেমন ভৃগুবংশীয় ঋষি ইন্দ্রের আশ্রয় গ্রহণ করেন, যেমন কথবংশীয় ঋষিগণের স্তুতি সমুদায় ইন্দ্রকে প্রাপ্ত হয়, তেমনই বুদ্ধিমান জনগণের স্তুতিগুলিও ইন্দ্রেরই সমীপগত হয়। পাপ কর্তৃক অহিংসিত হযশ্বরা ইন্দ্র সোমপ্রদাতা যজমানকে বল প্রদান করে থাকেন। হে ঋত্বিকগণ! আপনারা সুন্দর মন্ত্র উচ্চারণ করুন। ইন্দ্রের সেবক পূর্ব বন্ধন হতে মুক্ত হন।
টীকা –অভিপ্লবের মধ্যগত দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম দিবসে উপযুক্ত সূক্তের আটটি তৃচ তৃতীয় সবনে উথ, স্তোত্রিয় ও অনুরূপ যথাক্রমে হবে। এবং এইরূপে এবা হ্যসি বীরয়ুঃ (উপযুক্ত সূক্ত), এবা হ্যস্য সুনৃতা (উপযুক্ত সূক্তের ৪-৬ মন্ত্র) ইত্যাদি দ্বিতীয়ে স্তোত্রিয় ও অনুরূপ হবে। তং তেমদং গৃণীমসী (২৪ সূক্ত) ও তম্বভি প্র গায়ত (২৪ সূক্তের ৪-৬ মন্ত্র) ইত্যাদি তৃতীয়ে স্তোত্রিয় ও অনুরূপ হবে। বয়মু স্বামপূর্ব (২৫সূক্তের ১মন্ত্র) ও যো ন ইদমিদং পুরা (২৫সূক্তের ৩মন্ত্র) ইত্যাদি চতুর্থে স্তোত্রিয় ও অনুরূপ হবে। ইন্দ্রায় সাম গায়ত (২৫ সূক্তের ৫-৭ মন্ত্র) ও তম্বভি প্র গায়ত (২৪ সূক্তের ৪-৬ মন্ত্র) ইত্যাদি পঞ্চমে স্তোত্রিয় ও অনুরূপ হবে।–(বৈতান ৬।১)। এইভাবে বৈতানে (৮।৩, ৮।৪) বিশদে আরও বিনিয়োগের নির্দেশ উক্ত আছে ৷ (২০কা, ৫অ. ২৩সূ.)।
সূক্তসার –অভীষ্টদাতা, শত্রুনাশক হে ইন্দ্র! আপনার হর্ষকে আমরা পূজা করছি। সোমের দ্বারা পুষ্ট হয়ে আপনি যজমানের এই কুশ-আসনের উপর বিরাজমান হোন। উথ-গায়ক আপনার মহিমা গান করছেন, আপনি বিজয় লাভ করুন। বহুস্তুত ও আহূত ইন্দ্রকে, হে স্তোতৃবৃন্দ! আপনারা স্তুতি করুন। ইন্দ্রের সেই মহান্ বলপৌরূষ ও বজ্র, যা দ্যাবাপৃথিবী ধারণ করে আছেন, তার পূজা করুন। হে ইন্দ্রদেব! আপনি একাকীই শত্রুনাশ-করণে সমর্থ।
সূক্তসার— হে ইন্দ্রদেব! আপনি সদা নবীন। আমরা আপনাকে আহ্বান করছি; আমাদের রক্ষার নিমিত্ত আগমন করুন। কর্মাবসরের পর আমরা আপনারই আশ্রয় গ্রহণ করছি; আপনি আমাদের রক্ষার্থে সখারূপে আগত হোন। প্রথমে যিনি আমাদের গো-ইত্যাদি অভীষ্ট ধন প্রদান করেছেন, আমি সেই ইন্দ্রের স্তুতি করছি। জনরক্ষক, হরিত-অশ্ববান, সর্বনিয়ামক ইন্দ্রকে আমি স্তুতি করছি। তিনি আমাদের ধন প্রদান করুন। হে স্তোতৃবর্গ! আপনারা সামগানের মাধ্যমে ইন্দ্রের স্তুতি করুন। হে ইন্দ্রদেব! আপনি সূর্যের প্রকাশক, শত্রু-তিরস্কারক। আপনি বিশ্বকর্মা এবং দেবতাগণ আপনার মিত্র। হে স্তোতাগণ! আপনারা বহুস্তুত ইন্দ্রের স্তুতি করুন। যাঁর মহিমার দ্বারা দ্যাব-পৃথিবী জল-পর্বত-বজ্র-বল ও স্বৰ্গকে ধারণ করে থাকে, আপনার সেই হেন ইন্দ্রের স্তুতি করুন।
টীকা –উপযুক্ত সূক্তের আদ্য তিনটি ঋকের বিনিয়োগ (অর্থাৎ বয়মু ত্বামপূর্ব ইত্যাদি থেকে সখায় ইন্দ্রমূতয়ে পর্যন্ত ঋকের ব্যাখ্যা) বয়মু স্বামপূর্ব (২০কা, ২অ. ১সূ.) ইত্যাদির সাথে উক্ত হয়েছে। তথা ৫ম ঋক্ হতে (অর্থাৎ ইন্দ্রায় সাম গায়ত ইত্যাদি) অবশিষ্ট অংশ পর্যন্তের বিনিয়োগ ইন্দ্রো মদায় বাবৃধে (২০কা. ৫অ. ১৯সূ.) ইত্যাদি সূক্তের সাথে উক্ত হয়েছে। (২০কা, ৫অ. ২৫সূ.)।
সূক্তসার –ইন্দ্রদেব সকল বিশ্বদেব ও আদিত্যগণের সাথে আমাদের সর্ব-সামর্থ্য প্রদান করুন। আদিত্যবান ও মরুত্বান ইন্দ্রদেব আমাদের দেহকে রক্ষা করুন। আপন শক্তিতে সূর্যকে প্রত্যক্ষকর্তা, পৃথিবীকে অন্নবতী করণশালী ইন্দ্রের কৃপাতেই আমরা দেবহিতকারী অন্ন ও শত সম্বৎসর পরিমিত আয়ু লাভ করবো। হবিদাতা যজমানের অনন্য ধনদাতা হলেন ইন্দ্রদেব! হে ইন্দ্র। সোমবান্ স্তোতা বল-ঐশ্বর্যসম্পন্ন হয়ে ওঠেন; আপনি আমাদের অসুর-নাশক বল প্রদান করুন। অমৃতমার্গে অগ্রসর হবার নিমিত্ত আপনার সেই বল আমরা যাচনা করছি, যে বলের দ্বারা আপনি স্বর্গকে রক্ষা করেছিলেন এবং সমুদ্র ও জলরাশিকে গতিসম্পন্ন করেছিলেন।
টীকা — পৃষ্ঠ্য যাগের ষষ্ঠ দিবসে উপযুক্ত সুক্তের ১ম মন্ত্রের অংশ বিশেষের সাথে ২য় মন্ত্রের অংশ বিশেষের বিনিয়োগের নির্দেশ বৈতানে (৬।২) উল্লিখিত আছে। তেমনই বাজপেয় যাগে তৃতীয় সবনে য এক ইৎ বিদয়তে (২০।৬৩।৪) ও য ইন্দ্র সোমপাতমো (২০।৬৩।৭) ইত্যাদি উথ-স্তোত্রিয়-অনুরূপ হবে।-বৈ. ৪।৩। এইরকম বৈতান সূত্রানুসারে (৮।২, ৮।৩, ৮।৪) এই সূক্তটির অপরাপর বিনিয়োগের নির্দেশ পাওয়া যায়। যেমন বলা হয়েছে-মহাঁ ইন্দ্রো য ওজসা (২০।১৩।৮), য এক ইৎ বিদয়তে (উপযুক্ত সূক্তের ৪র্থ মন্ত্র) এগুলি আজ্য-উথ-স্তোত্রিয়। আবার, অভিপ্লবের ষষ্ঠ দিবসে য এক ইৎ বিদয়ত (উপযুক্ত সূক্তের ৪র্থ মন্ত্র) ও যৎ সসামমিন্দ্র বিষ্ণবি (২০।১১।১) বিকল্পিত উথ স্তোত্রিয় হবে। এইরকমেই ত্বং ন ইন্দ্রা ভর (২০।১০।৮) য এক ইৎ বিদয়তে এগুলি উথ স্তোত্রিয় যথাক্রমে হবে। (২০কা, ৫অ. ২৬সূ.)।
সূক্তসার— সত্যের দ্বারা বিজয়-লাভকারী, আমাদের প্রিয়, বিস্তৃত স্বর্গের অধিপতি, হে ইন্দ্রদেব! আপনি আমাদের আপন প্রিয় রূপে গণ্য করুন। আপনি সোমপায়ী, দ্যাবাপৃথিবীতে প্রকটিত সত্তাশালী, সোমাভিষবকর্তা তথা মনুষ্যগণের বর্ধনকারী ও অসুরনাশক। হে অধ্বর্যগণ! মধুরতম অন্নের দ্বারা ইন্দ্রকে তুষ্ট করুন। হর্যশ্বের উপরে আরূঢ়, হে ইন্দ্রদেব! আপনার দ্বারা কৃত বা বর্ষিত কল্যাণরাশির সমানতা অন্য কেউ করতে পারে না। অন্নকামী আমরা অন্নার্থে ইন্দ্রদেবকে আহূত করছি।
সূক্তসার— যিনি সোমাভিষবকর্তা, তিনি ইন্দ্ৰকৃপার দ্বারা নিজের ও দেবতাগণের শত্রুবর্গের পরাভব কর্তা, অন্নবান ও ধনবান হয়ে ওঠেন। হে মরুৎ-বর্গ! আপনাদের তেজ আমাদের যেন জীর্ণ নাকরে; আপনি আমাদের অবিনাশী বল প্রদান করুন। ধনদাতা, দেবহোতা, বলী অগ্নি যজ্ঞকে সুসজ্জিত করছেন, তিনি জাবেদা ও বলের অনুজ। হে স্বৰ্গনেতা মরুৎসঙ্! আপনারা আপনাদের বাহনে আরোহিত হয়ে (পৃষতী অর্থাৎ পবনবাহন মৃগ) যজ্ঞস্থলে আগমন পূর্বক কুশাস্তীর্ণ আসনে উপবেশন করে সোম পান করুন। হে অগ্নি! আপনি দেবগণ সমভিব্যাহারে আগত হোন; আপনি দ্যুলোক, পৃথিবী ও অন্তরিক্ষে হবিঃবহন করুন, স্বয়ং হবিঃ গ্রহণ করুন এবং এই যজ্ঞস্থলে কুশ আসনে আসীন হয়ে সোম পান করে তৃপ্ত হোন। হে ইন্দ্রদেব! অধ্বর্যগণের দ্বারা এই অভিযুত সোমরূপ মধু পূর্ণ তৃপ্তি না প্রাপ্তি পর্যন্ত পান করো।
সূক্তসার— আমরা রক্ষার নিমিত্ত প্রতিটি মুহূর্তে সেই ঐশ্বর্যবান, সোমপানে হৃষ্টচিত্ত, গো ইত্যাদি ধনদাতা ইন্দ্রদেবকে আহ্বান করছি। হে ইন্দ্রদেব! এই সোম-সবনে আগমন পূর্বক সোম পান করুন। আমরা যাতে নিন্দাগ্রস্ত না হই আপনি তেমন করুন; আমরা যেন যশস্বী হই। হে. স্তোতাগণ! ইন্দ্র সদা অহিংসিত, মিত্র-মঙ্গলকর্তা; তার আশ্রয় গ্রহণ করুন। ইন্দ্রদেব মনুষ্যগণকে মুদিত করেন, যজ্ঞের শোভা বর্ধন করেন, সকল প্রাণীর ভরণ করেন। হে ইদ্র! আপন বৃত্রের নিমিত্ত ভীষণরূপ ধারণ করেন। শতকর্মা ইন্দ্রকে আমরা ধন প্রাপ্তির নিমিত্ত আহ্বান করছি। তিনি ধনের পালক এবং রক্ষক। তিনি সোমকর্তার সখা। হে স্তোতাগণ! বরণকারীগণের ঈশ্বরস্বরূপী সেই বিশাল ইন্দ্রকে সোমপানে আহ্বান করো।
সূক্তসার –চিন্তাবসরের পর ইন্দ্র আমাদের সম্মুখে অন্নসহ আগত হন। হে স্তোতাগণ। আপনারা ইন্দ্রের স্তুতি করুন। দধিযুক্ত পবিত্র সোম ইন্দ্রের নিমিত্ত নীত হচ্ছে। হে ইন্দ্র! আপনি সোমপানের নিমিত্ত প্রস্তুত হোন; সোম আপনাকে তৃপ্ত করুক। আপনাকে স্তোত্র ও উন্থরূপ স্তুতিসমূহ প্রবৃদ্ধ করুক। পরাক্রমী ও যজ্ঞরক্ষক ইন্দ্রের আমরা সেবা করি। হে ইন্দ্র! শত্রু যেন আমাদের প্রতি হিংসা করতে সমর্থ না হয়। ইন্দ্ররথে যযাজিত হযশ্ব আকাশে দীপ্তিমান হচ্ছে। ঐ রথ যেন সকলের বশকারী। হে মনুষ্য! সূর্য ইন্দ্ররূপে উদিত হচ্ছেন, দর্শন করো। মরুৎ-বর্গ এই হবিঃ-দানশীল গৰ্ভত্ব প্রাপ্ত হয়ে যজ্ঞিয় নামে প্রসিদ্ধ হয়েছেন।
সূক্তসার –হে ইন্দ্র! আপনি উযযাদয়ের পর আপন জ্যোতিষ্মতী শক্তিরাশির দ্বারা পর্বত করে গোপনে রক্ষিত ধনসমূহ প্রাপ্ত হয়েছেন। আমাদের স্তুতিগুলি সেই মহান্ ইন্দ্রকে প্রাপ্ত হোক। ইন্দ্রদেব ও মরুৎ-দেবগণের তেজঃ একসাথে নিত্য বিরাজমান আছে। পৃথিবীলোক, মহর্লোক অথবা স্বর্গলোক–ইন্দ্রদেব যে লোকেই অবস্থান করুন, আমরা তাকে আহ্বান করছি। পূজক যজমান ইন্দ্রের আরাধনা করছেন। স্তোতাগণ তাঁর যশোগান করছেন। ইন্দ্র তার রথে অশ্ব যোজিত করছেন এবং স্বয়ং বজ্র ধারণ করছেন। ইন্দ্ৰই মেঘকে বিদীর্ণ করছেন, বৃত্রকে বজ্রের দ্বারা প্রহার করেছেন। তিনি কৃষিকে সম্পন্ন-করণ-শালিনী শক্তির দ্বারা ফল প্রেরণ করেন। ঈশান ইন্দ্রের তিরস্কার অমোঘ। তিনি পঞ্চক্ষিতীশ্বর, সদাসহ, প্রীতিকর। হে ইন্দ্রদেব! আমাদের পুত্রপৌত্র ইত্যাদি বীরগণ সদা আপনার দ্বারা রক্ষিত হোক! আমরা যেন আপনার কৃপায় শত্রুগণকে বশীভূত করতে সক্ষম হই।